আঁস্তাকুড়ের এলেকট্রা : মলয় রায়চৌধুরী

রেজিস্ট্রেশানের সময় বানান ভুল করে ফেলেছিল ক্লার্ক নবীন খান্না, মুখে পান সত্ত্বেও পরশ্রীকাতর ফিকে হাসি,  ঠোঁটের কোনায় লালচে ফেনা, পেটের ভেতর কৃষ্ণচূড়া ছড়িয়ে চলেছে ফিনফিনে পাপড়ি, টাকের জেদি কয়েকটা চুল ফ্যাকাশে,  আলস্য দেখে মনে হয় যেন ঠাকুমার পালঙ্কের পাশে হাঁটু গেড়ে সম্পত্তির আশায় সময় কাটাচ্ছে ।

তখনও পর্যন্ত জংধরা টাইপরাইটার সরিয়ে ঝকঝকে কমপিউটার আর ঝুলেল টুনিবালব নিভিয়ে কুয়াশাময় সিএফএল ঢোকেনি সরকারি দপতরে ।

##

রাস্তায় কুড়িয়ে পাওয়া মেয়ের জন্মদিন কে নিশ্চিত করবে ; করল একটা ভুল, যেমন নামের ভুল, ভুল লেখা হল বার্থ সার্টিফিকেটে, তোর জন্মদিন পয়লা জানুয়ারি, হ্যাপি নিউ ইয়ার আর হ্যাপি বার্থডে ।

কত মজার, না ? উঁহু, তুই বলবি, মোটেও মজার নয় ।

দিল্লিতে প্রথম আষাঢ়ের ফোঁটায় ফোঁটায় ভেজা সকাল,  গাড়ির কাচে ওয়াইপার নিজের মনে গাইছে , মুছে দাও মুছে দাও মুছে দাও ।

##

চিরুনিধার বৃষ্টিতে, ভুরুকোঁচকানো হাওয়ায়, সমস্ত ডানা সরিয়ে ফেলা হয়েছে আকাশ থেকে ।

রুলটানা শুকনো অশথ্থপাতা ওড়ে । নারকেল পাতার ওপর কাকগৃহিণীর বলশয় ।

ফুটপাতের বালিতে জল সেঁদোবার রিনরিন রিনরিন রিনরিন রিনরিন ।

শোনা গিয়েছিল অন্ধের পা রাখার আওয়াজ । বৃষ্টির টুপটাপে সময় পড়ার শব্দ ।

ভাসিয়ে নিয়ে গেলি ধাঁধার উড়ন্ত মেঘের পালকে শুয়ে চাই চাই চাই চাই, তোর দাবি ।

##

 

যায়নি মোছা, মুছতে পারিনি রে ।

কত জরুরি ছিল মুছে ফেলা ।

জগদীশ ব্যানার্জি তখন পানিপতে পোস্টেড, এজিএমইউ ক্যাডার বলে হার্ড পোস্টিঙ ঘুরে এসে আমি দিল্লিতে প্রথম পোস্টিঙে, ওকে বলেছিলাম আসতে, তোকে পছন্দ করার জন্য ।

জগদীশ ব্যানার্জির নতুন টাকের ফিকে উঁকির ওপর বৃষ্টি, খবরের কাগজ দিয়ে আড়াল করছে বৃষ্টির ফোঁটা । বৃষ্টি আমার ভালোলাগে, মাত্র কয়েকটা তো  ফোঁটা, আদর করতে করতে গড়িয়ে চলে যায় বুকে, পেটে বা আরও তলায় ।

আমরা দুজনে, বৃষ্টির পিছুধাওয়া এড়াতে, প্রায় দৌড়ে ওদের হলঘরে ঢুকতেই, প্রথমে তুই-ই চোখে পড়লি, তোর খিলখিল হাসি, এক বছর বয়সেই। অন্য বাচ্চাদের চেয়ে তোর পা লম্বা, নজরে পড়ে গিয়েছিলি, সবার চেয়ে ঢ্যাঙা ।

কোলে তুলে নিলাম তোকে ।

এটা সেই মুহূর্ত, যা সবায়ের জীবনে আসে, এমনই এক মোড়, যেখান থেকে ফিরে যাওয়া যায় না, সবুজ প্রতিভা, সুরের গমক, মায়া ;  নিজের অবস্হান এক মুহূর্তের মধ্যে নির্ণয় করে ফেলতে হয় । আমি অনুপ্রাণনা-তাড়িত পুরুষ, ঠিক সময়ে যথার্থ নির্ণয় নিতে না পারলে জীবনের ভারসাম্য গোলমাল হয়ে যেতে পারে, এরকমটা মনে হয়, শেষে জমে-থাকা হতাশা হয়ে উঠবে অত্যন্ত কষ্টকর, ভবিষ্যতে কি হবে আঁচ করে নির্ণয় ঝুলিয়ে রাখতে পারি না।

##

স্পর্শের মর্মার্থ হয়, মর্মার্থের রসায়ন, রসায়নের সম্পর্কে, রেণু, পরাগ, উড়াল, জীবন ।

চাউনির কোলাহল, উতরোল শ্বাস । প্রতিরোধে ক্ষয়ে অনড় ঝর্ণাপাথর । জিওল মাছের নিঃশব্দ ছটফট । তোর মতো তোর মতো তোর মতো করে নিয়ে গেলি আমাকে আমার আমি থেকে ছিঁড়ে ।

##

এর মতো, ওর মতো, তার মতো, কারো মতো নয় ।

যেন এমন, যেন অমন, যেন তেমন নয় ।

##

তোর নাকে নাক দিয়ে আদর করেছিলাম, গালে আর নাভিতে চুমো খেয়েছিলাম, উসকে দিয়েছিলাম তোর খিলখিল, পাখিদের গান শুধরে দেবার হাসি, খাঁজকাটা রোদ্দুরের ডালে-ডালে দোয়েল-কিশোরীরা স্বরলিপি ভুলে যায়, পায়ের তলায় আদর করতে পা গুটিয়ে নিয়েছিলি, ওঃ, তোর সেই মিডাস টাচ ।

তোর নাম আমি রাখতে চেয়েছিলুম নীতি, আসলে ওটা আমার ঠাকুমার নাম; উনি আমায় সবচেয়ে বেশি আদর করতেন, খাওয়ার পরও জানতে চাইতেন, কি রে খাওয়া হয়েছে ?

##

নকশিকাঁথা, আমসত্ব, শেতলপাটি, তামার পয়সা, গোবিন্দভোগ, কুমড়োবিচির মেঠাই, রেড়ির তেলের গন্ধ, কুপির আলো, পুকুর, ধানখেত, টিয়াপাখি । রামধনু গড়তে শিখছে আকাশ । গাছের ছায়া কিনে নিয়ে গেছে পাইকার । পায়ের শিরায় মাইল-পাথরের স্হায়ীত্ব । ঠাকুমা ।

##

একটা ইংরেজি ই বাদ পড়ায় তোর নাম হয়ে গেল নেতি ; শুনেছি, বন্ধুরা তোকে নেটি নাটি নাট করে দিয়েছে, তা তো আমার দোষ নয় ।

শুনেছি, তোর একাধজন  ক্লাসমেট খুনসুটি করে  নেটা বলে ক্ষ্যাপায়, নেটা মানে শিকনি । তুই একেবারে গা করিস না, তাও শুনেছি, তোর এক সহপাঠিনীর অভিভাবকের কাছে, আমার সঙ্গে সেও তখন পুডুচেরিতে পোস্টেড, কাঁধ শ্রাগ করে নাকি বলিস, সো হোয়াট , আই’ল স্টিক ইট টু ইওর আস, ক্লাস ফোর থেকেই ।

জগদীশের স্ত্রী অমরিন্দর, কখনও হরিয়ানভি জাঠ ছিল, বিয়ের পর মাছভাত খেয়ে, জামদানি পরে, দুর্গাপুজোয় গরদের শাড়িতে সিঁদুর খেলে, জলসায় গলাকাঁপা বাংলা গান গেয়ে, পুরোপুরি বাঙালি, তোকে নিত্তু বলে ডাকে, জানি,  নিত্তু বেটি, কি খাবি, বাংলা না পানজাবি রেসিপি, সরসো কা সাগ উইথ মক্কি কি রোটি, ছোলে ভাটুরে, রাজমা চাওয়ল । বলেছে জগদীশ, চেককাটা লুঙ্গিতে বাইফোকাল পুঁছে ।

তুই বলতিস, নো নো, আন্টিমা, আমি মাছ ভাত খাবো, মুড়িঘন্ট বানাও না, আঙ্কলবাপির ফেভারিট। শুনেছি ।

জগদীশের বড় মেয়ে বৈদেহী বিরক্ত হতো, এতো সাধাসাধি কিসের ? যা সবাই খায় তা-ই খাবে । পরে মানিয়ে নিয়েছিল, তোর আপন করে নেবার বৈশিষ্ট্যের আদরে । তোর আয়ত্বে আছে গোপন উষ্ণমণ্ডল, শুনেছি।

##

অমরিন্দরের বিয়ের সময়ে ঝামেলা করেছিল ওদের  এক ভঁয়সাপেটা জাঠ পঞ্চায়েত কর্তা ; জগদীশ সিলকের পাঞ্জাবি খুলে, পৈতে দিখিয়ে হেঁকেছিল , আমি হলুম বাঙালি ব্রাহ্মণ, স্যারজি, ব্যানার্জি, সবচেয়ে উঁচু ব্রাহ্মণ ।

ওদের ষণ্ডাদের ব্যানার্জির হাঁটু ছুঁয়ে সে কি পরনাম, পরনাম, পরনাম । এও শোনা, বলেছে অমরিন্দর ।

পৈতেতে বুড়ো আঙুল জড়িয়ে বাপের বয়সী ভুঁড়োদের পাগড়িতে হাত রেখে জগদীশ বলেছিল, জিতে রহো পুত্তরজি , ফুলো ফলো, পিও পিলাও ।

বিয়ে হল, বিয়েতে মদ খেয়ে ব্যাণ্ডবাজিয়েদের তালে-তাল  নাচ হল, জগদীশ যৌতুকে পেল গুড়গাঁওয়ে জমি, যার ওপর ও দোতলা বাঙলো তুলেছে, আর ঘুষের টাকায় তাকে ক্রমশ ফিল্মসেটের মতন করে ফেলেছে, মায়াবি। ঘুষের টাকায় কলকাতায় নিউটাউনে ফ্ল্যাট কিনে রেখেছে, অমরিন্দরের নামে,মায়াবি । চণ্ডীগড় ছেড়ে বেরোতে চায় না, তাই । ছুটিতে বোতলক্রেট গুড়গাঁও কিংবা যেখানে আমি বা কোনো বাঙালি কলিগ পোস্টেড ; থ্রি চিয়ার্স ।

ঘুষের টাকা নেবার জন্য ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলে আর বছর দুয়েক পরে বন্ধ করে আবার অন্য অ্যাকাউন্ট খোলে ; কখনও নিজের নামে, কখনও অমরিন্দরের নামে, কখনও শিডুল্ড ব্যাঙ্ক, কখনও প্রায়ভেট ব্যাঙ্ক, কখনও আরবান কোঅপারেটিভ ব্যাঙ্ক, কখনও টয়লেটের লফ্ট ব্যাঙ্ক, কখনও পুজোর ঘরের ফাঁপা দেয়ালে আনারকলি ব্যাঙ্ক ।

##

গলা অব্দি কুয়াশায় ডোবা মানুষের নাম না-পালটাতে পারার মজাদার অসুখের আনন্দ । চাঁদবণিক প্রায়ভেট লিমিটেড বললে, হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ । প্রতি বদলির বিদায় সম্বর্ধনায় একই বক্তৃতা দ্যায়, লিখে রাখা আছে ।

##

সকালে স্নানের পর গামছা-কোমর জগদীশ, টাকের চুল ফুরিয়ে গিয়ে করোটিতে রূপান্তরিত, বাঁহাতে পেতলের ছোটো ঘন্টিতে টুংটাং, ডানহাতে দুশো এম এল গঙ্গাজল, গ্যাঁদাপাপড়ি, দরোজায় দরোজায়, সংস্কৃত মন্তরের ফিসফিস, বৈশাখ জৈষ্ঠ আষাড় শ্রাবণ ভাদ্র আশ্বিন কার্তিক অঘ্রাণ পৌষ মাঘ ফাল্গুন চৈত্র, কিছুটা ঝুঁকে, যেন সময়ের সঙ্গে বেমানান আধ্যাত্মিক কোনো ষড়যন্ত্রের শিকার ।

পুজোর ঘর পাথর-মাটি-কাঠ-পেতলের দেবী-দেবতায় ছয়লাপ, দেয়ালের পেরেকে-পেরেকে কুড়ি-পঁচিশ বছরের পুরোনো বাংলা ক্যালেণ্ডারের দেবী-দেবতা, থাক-থাক পাঁজি, পুজোর বই, পাঁচালি, পিলসুজ, পুজোর ন্যানো সাইজের থালা-ঘটি-বাটি, রুপোর ; হেসে, গলার লাল শালুতে শালিগ্রামশিলা ঝুলিয়ে, বলেছিল ওর পার্টটাইম পুরুত অবিনাশ ভট্টচাজ্জি, যে নিজেই গজগজ করে দেবী-দেবতারা সংস্কৃত মরা ভাষা থেকে আজও বেরোতে পারেনি, বুঝতে পারে না কোন বিসর্গের কি অর্থ ।

জগদীশের জ্বরজারি হলে, অমরিন্দর, কালোর চেয়ে কালো কলপে ভেজা চুল, কোমরে এক গামছা বুকে আরেক, আজও জিগ্যেস করে, এর পর কোন মন্তর ? গামছা যায় কলকাতা থেকে, বাঙালি জুনিয়ার অফিসারদের দৌলতে । অবশ্যই লাল, অবশ্যই সবচেয়ে বড় মাপের, যদিও অমরিন্দরের জাঠনি বুক ঢাকতে পারে না সে-গামছা, পেটে সিজারিয়ানের কাটার দাগ উঁকি দিয়ে ঝোলে । তিন বছর লেগেছিল শাঁখ-বাজানো শিখতে, শুনেছি।

কী করে আপনাদের পরিচয় হল, অমরিন্দর তো দু-এক ইঞ্চ লম্বা, জানতে চেয়েছিলাম ।

জগদীশ বলেছিল, ভাঁজের প্রতিভায় ছিল সীমাভাঙার টান, জগদীশেরই দপতরে, পানিপতে, এসডিও অফিসে এসেছিল কোনো কাজে । ব্যাস, বাস্তববাদিনীর উদ্যমের  সঙ্গে বলগাছেঁড়া কল্পনা ; দেহের আনাচে-কানাচে টই-টই জাঠনির অবিমিশ্র উপঢৌকন ; ধুলোয় মোচড় দেয়া গন্ধ । জাঠনির মতো উরু পাবেনা ভারতে ; মোষের দুধ-দই খায়, গোরু একদম নয়।

পানিপতের রঞ্জক গোলাপ, সাদা গোলাপ, লাল গোলাপ, হলুদ গোলাপ, কমলা গোলাপ, গোলাপি গোলাপ, কালো গোলাপ, ইরানি গোলাপ, মিরিন্ডা গোলাপ ; শাখা কলম, দাবা কলম, গুটি কলম, চোখ কলম । আহাআহা। দেহজুড়ে চুমুর দাঙ্গা ।

##

সংবেদনশীল আলোড়ন, জলসিক্ত উড়ন্ত ছাতা ।

শান্তির মৌনতা হাওয়া থেকে হাওয়ায়, স্হান থেকে স্হানান্তরে ।

উতরোল কোলাহল ।

##

অমরিন্দর: যাক ওই করওয়া চৌথের জুঠঝামেলা থেকে বাঁচলুম, না খেয়ে থাকো সারাদিন, ওসব আমার দ্বারা হবে না, চালুনি দিয়ে বরের মুখ দেখে তাকে বাঁচিয়ে রাখার চেয়ে আমি সিঁদুর-খেলা খেলে তাকে বেশিদিন বাঁচিয়ে রাখব । বরকে বরং আলুর পরোটা, মেথি-শাকের পরোটা, পুদিনার পরোটা, বেসনের পরোটা, কিমার পরোটা খাওয়াবো, সিঁদুর খেলা থেকে ফিরে, ঘিয়ে চপচপে পরোটা । করওয়া চৌথ হল চালুনি কারখানাগুলোর কারসাজি ; নয়তো কবেই বন্ধ হয়ে যেত, পুরোনো কারখানা বন্ধ হয়ে এখন বের করেছে প্লাস্টিকের চালুনি ।

সাহেবরা চাঁদে গিয়ে গোসল করে এলো, সেই চাঁদের দিকে তাকাও, মানে হয় কোনো, অ্যাঁয়জি !

জগদীশ : কিন্তু তুমি লাঞ্চ আর ডিনারে কাঁচা পেঁয়াজ কামড়ে খাবার অভ্যাস ছাড়তে পারলে না ।

অমরিন্দর : তোমার শুঁটকি মাছের গন্ধ সহ্য করতে পারি, আর তুমি কাঁচা পেঁয়াজের গন্ধ সহ্য করতে পারো না ? প্যার মোহব্বত প্রেম ভালোবাসা হল গন্ধের আপোস । বাজারে পেঁয়াজ না এলে হরিয়াণার সরকার উলটে যায় । পশ্চিমবঙ্গের বাজারে মাছ না এলে কি সরকার ওলটায় ?

জগদীশ : অমন কখনও হয় না, মাছ আসবেই, বাঙালি মাছ খাবেই, যত দামই হোক, সরকারকে ফেলবে না । সেখানে সরকার পড়ে মাৎস্যন্যায়ে ।

অমরিন্দর : তোমরা বাংগালিরা পরৌনঠাকে পরোটা বলো কেন, অ্যাঁয়জি ?

##

চাবির ঘোলাটে ফুটোয় যাবৎজীবন চোখ । অন্ধকারকে খুঁচিয়ে বের করে-আনা সকালের বিকল্প ।

সান্নিধ্যের নৈকট্য ঘিরে অফুরন্ত অবসর । প্রেম-টিকলিং নিড়ুনি ।

কৃষ্ণবিবরের অচিন্ত্যনীয় ভর, আলো পর্যন্ত বেরোতে পারেনি ।

##

জগদীশ আর অমরিন্দর আমাকে ব্রো-প্রো বলে ডাকে, এল বি এস ন্যাশানাল অ্যাকাডেমি অব অ্যাডমিনিস্ট্রেশানে ট্রেনিঙের সময় থেকে আমাকে সকলে ব্রো-প্রো করে নিয়েছে, ব্রাদার প্রভঞ্জন । জগদীশ আমার চেয়ে পাঁচ বছরের সিনিয়র, ঘোঁৎঘাঁত বিশেষজ্ঞ । ও ঠিক খবর রাখে  কখন বিরোধীদলে চলে যাবার কথা চিন্তা করছে সকালবেলার সূর্য ।

##

তুই কি কখনও আমার নাম জানতে পারবি নেতি ?

আমার গোপন কোষাগারে তোর নাম নেতি থেকে ইতি করে নিয়েছি ; তুই জানিস না, জানতে পারবি একদিন, যখন আমার উইলে তোর নাম থাকবে, আমি এতদ্বারা আমার স্হাবর ও অস্হাবর সমস্ত সম্পত্তি নেতি ওরফে ইতি ব্যানার্জিকে । তেমনই তো ভেবে রেখেছিলাম রে ।

পরিকল্পনা ভেস্তে দিয়ে তার আগেই সব জেনে ফেলেছিলি ; তোর গায়ে  গোখরোর ঠাণ্ডা রক্ত। কোনো যুবতীর গা এত ঠাণ্ডাও হয় ! প্রতিশোধ নেবার ষড়যন্ত্র শিরায়-শিরায়, রসতরঙ্গিনী তুই । তোর দুই হাতে অ্যানাকোণ্ডার দমবন্ধ করা পাকের পর পাকের পর পাকের পর পাক, উফ কি ঠাণ্ডা, আঁস্তাকুড়ের হেমন্তের শীতেল জঞ্জালের জাপট ।

##

চব্বিশ বছরের শ্যামলী দীর্ঘাঙ্গী, জানি না কেমন দেখতে হয়েছে তোকে, খুঁজে বেড়াচ্ছিস তোর নামকরণকারীকে, জন্মদিন নির্ধারণকারীকে, যেন তোর অস্তিত্বকে সেই লোকটা করায়ত্ব করে গুমখুন করে লুকিয়ে রেখেছে নিশুতি রাতের পোড়োবাড়ির সিঁড়ির স্যাঁতসেঁতে অন্ধকারে ।

##

শিমুলের পাকা ফল ফেটে রোঁয়া উড়ছে, তুই তাদের ধরতে চাইছিস, শিমুলের লাল টকটকে ফুলগুলো শুকিয়ে তৈরি করেছে রোঁয়াবীজ, সেগুলোকে উড়িয়ে চলেছে দূরান্তরে, কোথাও গিয়ে অঙ্কুর তুলে লুকিয়ে গাছ হয়ে উঠবে, বসন্তের আকাশকে রাঙিয়ে দেবে ।

তুই কি চাস না যে বিশাল একটা শিমুলগাছ সবুজ মুকুট মেলে আকাশের চিরনবীন শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা ছুঁয়ে দেখুক, মেখে নিক বসন্তের উদাসীন রক্তাক্ত তাড়না , বল তুই ?

আমারই মস্তিষ্কে ওই গাছ পুঁতে দিবি, রোঁয়া উড়বে, আঁচ করিনি । তুই মারাত্মক । বৃষ্টি ফোঁটারা কি হলুদ পাতার রঙ তুলতে পারে, বল তুই ? মোম-আলোয় শ্যামাপোকা নাচতে ভোলে না ।

##

প্রেপ থেকে তোকে ভর্তি করা হল নৈনিতালের সেইন্ট মেরি কনভেন্ট হাই স্কুলে, বোর্ডিঙের অঢেল, সিসটাররা ছাত্রীদের সুখসুবিধা-অসুবিধার খেয়াল রাখেন, স্কুলের রেজাল্টও ভালো হয় প্রতিবছর । ফিস বেশি হলেই বা, আমার মাইনেটা আছে কি জন্য ! ক্লাস টুয়েলভ পর্যন্ত টানা পড়লি সেখানে । ব্যাস, জিভে সেই যে কনভেন্টি অক্সব্রিজ ইংরেজি ঘাঁটি গাড়ল, তা কখনও ছাড়ল না তোকে । এও শোনা, সূত্র অমরিন্দর, টেলিফোনে, আমি তখন পোর্ট ব্লেয়ারে ।

জগদীশের মেয়ে তোর চেয়ে চার বছর সিনিয়র, ও কি  জিভে অক্সব্রিজ কনভেন্টি ইংরেজি জড়াতে দিয়েছে ? বলেনি কেউ, কেনই বা জানতে চাইব, বল ? আমার আগ্রহের কেন্দ্রে তো তুই । ওই স্কুলের বোর্ডিঙেই তো ছিল বৈদেহী ।

কত ইচ্ছা করছিল, তবু ভর্তির সময়ে আমি স্কুলে যাইনি, কিন্তু নৈনিতালে গিয়েছিলাম, উদ্বেগ, উদ্বেগ, যাতে তোর অ্যাডমিশানে অসুবিধা না হয় । এডুকেট এ গার্ল চাইল্ডের দপতরের পর আমি তোকে আর চাক্ষুষ দেখিনি, কেবল ফোটোতে যা । তারপর থেকে, জগদীশের মেয়ে আর ছেলেকেও দেখিনি । ওদের বাড়িতে আমি যাই না, তোর কারণেই যাই না ।

এনজিওর মনোবিদ তনজিম হায়দার বলেছিল, আপনি  নেতির সামনে কখনও যাবেন না, স্মৃতিতে আপনার মুখ থেকে যাবে, খুঁজবে আপনাকে, শেষে আপনাকে না পেলে ডিসগ্রান্টলড আর রিভেঞ্জফুল ফিল করবে ; আপনি তো তা চাইছেন না । অচেনা একজন মানুষ ওর সমস্তকিছু ফানডিং করছে জানতে পারলে হীনম্মন্যতার দোষ ফুটে উঠবে চরিত্রে ।

আমি চেয়েছি তুই বোল্ড হয়ে ওঠ । তাই বলে এরকম বোল্ড, অ্যাঁ ?

##

শাদা ঘোড়া, কেশর হাওয়ায়, দৌড়োচ্ছে, সবুজ মাঠের ওপর দিয়ে, ওই দূরে সূর্য, ওই দূরে পূর্ণিমার চাঁদ, দৌড়চ্ছে ঘোড়া, ওই দূরে ঝড়, ওই দূরে বৃষ্টি ।

ক্লপ ক্লপ ক্লপ ক্লপ ক্লপ ক্লপ ক্লপ ক্লপ…….মরুভূমিতে ঘোড়ারা দৌড়োলে বালি ওই শব্দকে শুষে নেয়।

##

নৈনিতাল তোর পছন্দ হল । কত সুন্দর না ? জায়গাটা ? বিশেষ করে শীতের সময়ে, তুষার দেখতে দেখতে তোর স্কুল ছুটি  । বৈদেহীরও প্রিয় ছিল স্কুল আর শহরটা, শুনেছি ।

সতীর নয়ন পড়েছিল বলে নৈনিতাল, শুনেছি ।

সতীর চোখ, ভেবেছিস কখনও !

অমরিন্দরের মতে সতীর মতন চোখ কোনো মহিলা পেতে পারে না; ওই তিনটে চোখই তৈরি হয়েছিল।

আইডেনটিটিকার্ডে তোর ফোটো, আইগ্লাস দিয়ে এনলার্জ করে দেখে,  অনুমান করতে পারি, চোখ দুটো কত সুন্দর, যতো তোর বয়স বেড়েছে, ঠিক জানি,  তত সুন্দর হয়েছে তোর চোখ, কালো গভীর আর বেশ বড়ো, যেমন বাঙালি মেয়েদের হয়। কাঁদলে কেমন হয় তোর চোখজোড়া ? হাসলে কেমন হয় ? কারোর সঙ্গে ঝগড়া করলে কেমন হয় ? তোর এখনকার জীবন্ত চাউনিগুলো দেখার বড়ো ইচ্ছা হয় রে ।

কবে দেখলাম তোর চোখ ? দেখেছি বৈকি । চোখ বুজলেই দেখতে পাই আর ভাবি কত ভুল যে করেছিল তোর মা তোকে ডাস্টবিনে  ফেলে দিয়ে । আমার মনে হয় দূর থেকে লক্ষ্য রেখেছিল, তোকে কেউ তুলে নিয়ে যাচ্ছে কিনা দেখার জন্য ; তখনই তোর চোখের টান এড়ানো ছিল অসম্ভব ।

আমি তোর চোখের টানেই সন্মোহিত হয়েছিলাম । তোর গন্ধে । কেন বল তো ? কারণ তোর গন্ধ অন্য শিশুদের থেকে আলাদা ছিল, তুই তোর মায়ের দুধ খাসনি, বোতলের দুধ খেয়ে বড়ো হয়েছিস ।

##

এর মতো, ওর মতো, তার মতো, কারো মতো নয় ।

যেন এমন, যেন অমন, যেন তেমন নয় ।

বড়ো হয়ে উঠলি, বড়ো হয়ে উঠলি, অমাবস্যাকে একরাতে পরিযায়ী করে চলে যাবি বলে !

##

তোর ক্লাস সেভেনের ডায়রিতে, হস্টেলের ওয়ার্ডেন দেখেছিলেন, একটা পৃষ্ঠায় তুই লিখে রেখেছিস, লাল ডটপেন দিয়ে, “আই নো, সামওয়ান ওনস মি, বাট ইজ সিক্রেটলি ট্রাইং টু ডিজওন মি ।” পৃষ্ঠাখানা ছিঁড়ে অমরিন্দরেকে দিয়েছিলেন ওয়ার্ডেন, এই ভেবে যে তুই কোনো ছেলের সঙ্গে প্রেম করছিস ।

ওই স্কুলে ছেলেরা পড়ে না, কি করেই বা কোনো ছেলের সঙ্গে তোর যোগাযোগ হবে, তা নিজেও চিন্তা করেছিলেন ওয়ার্ডেন ।

জগদীশ বুঝিয়েছিল অমরিন্দরকে, না, না, ও জেনে ফেলেছে, যে ওর পড়াশুনা থাকা খাওয়া পোশাক আর জীবনে যা প্রয়োজন তা কেউ একজন অলক্ষ্যে যুগিয়ে যাচ্ছে, আর তার জন্য তুমিই দায়ি অমরিন্দর, আমাদের ছেলে আর মেয়ের চেয়ে দামি জুতো জামা উপহার ইত্যাদি কিনে  ওর মনে সন্দেহ তৈরি করে দিয়েছ । ও ভাবে, ওকে কেন স্পেশাল ট্রিটমেন্ট দেয়া হচ্ছে ।

মেয়ে বৈদেহী আর ছেলে আরিয়ানও প্রশ্ন তোলে, কেন স্পেশাল ট্রিটমেন্ট । শুনেছি ।

অমরিন্দর উত্তরে বলেছিল, আর ব্রো-প্রো যে অন্যদের দিয়ে নেতিকে বাংলা-ইংরেজি বই পাঠায়, প্রতি বছর দূর্গাপুজোয় দামি টোম্যাটোরেড পোশাক পাঠায়, তার বেলা ?

যাতে ওর জ্ঞান বাড়ে, কালচার্ড হয়, সেজন্য পাঠায় ; ব্রো-প্রোর মগজে আঁস্তাকুড়ের ভয় কি আর নেই !

তা বইগুলো বৈদেহী আর আরিয়ানই বেশি পড়ে, নেতি স্কুল থেকে ছুটিতে এলেও ম্যাথস ফিজিক্স কেমিস্ট্রিতেই বসবাস । বৈদেহী বইগুলো পেয়ে সাহিত্যের পোকা হয়ে গেছে ; বাংলা সিডি এনে গান শোনে। শুনেছি।

আমি চেয়েছিলুম তোকে সবচেয়ে ভালো পোশাক আর জুতো কিনে দেয়া হোক ; বই কিনে দেয়া হোক। কিন্তু কি করেই বা তুই জানলি, বিশ্বাস করলি ? বিশ্বাস আর সন্দেহ  তো একই ব্যাপার নয় । জানিস তো, মানুষের সন্দেহ হল বিশ্বাসঘাতক প্রক্রিয়া, কিন্তু নিজের ভেতরের আলো-অন্ধকার খুঁজে পেতে হলে সন্দেহ ছাড়া উপায় নেই, না রে ?

তোর কি মনে হয় না যে বিশ্বাস ব্যাপারটা জঘন্য, দূষিত, মন্দ ? বিশ্বাসের বিপরীত হল সন্দেহ, কিন্তু তা যদি বিশ্বাসের উপাদান হয়, তাহলে কি করবি ? তোর মাথায় নিশ্চয়ই এই দোনামনা দোল খেয়েছে, টিং টুং টিং টুং, জানি আমি, ফর শিওর ।

##

পথপ্রদর্শকের হাত ধরে প্রতিবিম্ব পালটে যায়, পাহাড় ফাটিয়ে বের করে আনে প্রতিধ্বনি ।

রোদে নিকানো আকাশে তখন ঝুলে থাকে পরিযায়ী পাখির একাকীত্ব ।

রোদ্দুর উত্তরায়ন মেনে চললে কী-ই বা করার ! অপেক্ষা করো, অপেক্ষা করো ।

##

সেভেনথ স্ট্যাণ্ডার্ড থেকে তোর প্রতিটি ক্লাসের আইডেনটিটি কার্ড রেখেছি যত্নে, চণ্ডীগড় থেকে ডাকে আমাকে পাঠিয়ে দিয়েছিল তোর অভিভাবক পরিবার , যখন তোর বারো ক্লাস শেষ হল, আমি তখন সিলভাসাতে পোস্টেড ।  তুই কি টের পাসনি যে কোথায় গেল স্কুলের আইডেনটিটিকার্ডগুলো ? ওগুলো দেখি মাঝেসাজে, কেমন একটু একটু করে ডাগর হয়ে উঠেছিস; ফিচার্স স্পষ্ট হয়ে উঠছে । জগদীশের বাড়িতে আছিস বলে তোকেও নাকি বৈদেহী আর অমরিন্দরের  মতো দেখতে হয়ে যাচ্ছে, শুনেছি ।

জাঠনি ! ভাবা যায় !

তুই তো বাঙালি ; মোষের দুধ হজম করতে পারিস তো ?

আশ্চর্য না ? তুই কলকাতার আঁস্তাকুড় থেকে এসে যাদের বাড়ির সদস্য হলি, তাদের মা-মেয়ের মতনই দেখতে হয়ে গেলি ক্রমশ, বারো ক্লাস পর্যন্ত তোর আইডেনটিটি কার্ডের ফোটো দেখে তেমনটা অনুমান করতে ভালো লাগে।

তুই কি ঢ্যাঙা হয়েছিস,  তোর পাদুটো লম্বা হয়ে চলেছে নাকি, বৈদেহী-আরিয়ানের মতন, জাঠদের মতন?  নাচ শিখতে পারতিস, তা নাচ তোর প্রায়রিটিতে নেই, শুনেছি।

ক্লাস টেনে যখন ফার্স্ট হলি, সিস্টার অ্যানি তোর সাক্ষাৎকার নিয়ে ছাপিয়েছিলেন স্কুল ম্যাগাজিনে, তার কপি আছে আমার কাছে, পড়ে পড়ে মুখস্হ হয়ে গেছে প্রশ্ন আর উত্তরগুলো ; শুনবি ?

তুই তো এখন আমেরিকায়, চাকরি করিস, শুনেছি গাড়িতে অফিস যাস, তবু শোন, তোরই ইনটারভিউ।

সিসটার অ্যানি : তোমার নাম নেটি, এর অর্থ কী ?

তুই : নেটি মানে নিও টেরেস্ট্রিয়াল, শর্টে নেটি রেখেছিলেন আমার ফসটার ফাদার । বাংলায় নেতি।

সিসটার অ্যানি : তুমি বড়ো হয়ে কী হতে চাও ?

তুই : আমি অ্যাস্ট্রনট হতে চাই, স্পেস সাইন্টিস্ট হতে চাই । চাঁদের মাটিতে, মঙ্গলগ্রহের মাটিতে হাঁটতে চাই ।

সিসটার অ্যানি : কেন ? তোমার সহপাঠিরা বেশির ভাগই ডাক্তার হতে চাইছে, বা কমার্স পড়ে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট হতে চাইছে, পলিটিশিয়ান, উকিল, বিজনেসউওম্যান হতে চাইছে ।

তুই : জানি । আমার ম্যাথেম্যাটিক্স খুব ভালো লাগে, ফিজিক্স ভালো লাগে; সীমাহীনতার বিস্ময় আমাকে মোটিভেট করে । আমি আইআইটিতে কমপিট করতে চাই ।

সিসটার অ্যানি : তোমার প্রিয় ফিল্ম নায়ক কে ?

তুই : ব্র্যাড পিট ।

সিসটার অ্যানি : কেন ? দেখতে অ্যাট্রাকটিভ বলে ?

তুই : শুধু তাই নয়, উনি আর অ্যানজেলিনা জোলি বেশ কয়েকজন শিশুকে অ্যাডপ্ট করেছেন । একিলিসের ভূমিকায় মানিয়েছিল ওনাকে ।

সিসটার অ্যানি : তুমিও বড়ো হয়ে কোনো শিশুকে অ্যাডপ্ট করার কথা ভাবো কি ?

তুই : হ্যাঁ, আমি বিয়ে করব না । কয়েকটি শিশুকে অ্যাডপ্ট করব ।

সিসটার অ্যানি : যদি কাউকে তুমি ভালোবেসে ফ্যালো ? কিরকম সঙ্গী চাও ?

তুই : আমি চোখ বুজে তাকে দেখতে পাই, কিন্তু বর্ণনা করতে পারব না । আমি আমার ফসটার ফাদারকে আজও দেখিনি, তাঁকে আমি আমার ফাউনডিং ফাদার মনে করি, আমার প্রতিষ্ঠাতা, তাঁর মতো পুরুষ আমার পছন্দ, তাঁকেই পছন্দ ।

সিসটার অ্যানি : তোমার উড বি হাজব্যান্ড কোথায় তোমাকে প্রোপোজ করুক, তুমি চাও ?

তুই : যদি বিয়ে করি, চাঁদের মাটিতে দাঁড়িয়ে প্রোপোজ করলে ভালো । তবে আমি ওই পুরোনো প্যাট্রিয়ার্কাল রিচুয়াল রিভার্স করতে চাই, আমিই প্রপোজ করব, সে গ্রহণ করবে । বিয়ে আমি করব না বলেই মনে হয় ।

সিসটার অ্যানি : ফিল্ম দ্যাখো, মুভিজ ?

তুই : না, ফিল্ম দেখতে আমার তেমন ভালো লাগে না, ওয়েস্টেজ অফ টাইম মনে হয় ।

সিসটার অ্যানি : কোন ধরণের ফিকশান তোমার ভালো লাগে ?

তুই : ফাইভ সিক্সে পড়ার সময়ে হ্যারি পটার সিরিজের  বইগুলো ভালো লাগত ; এখন ট্র্যাশ মনে হয় । এখন আমার সিমপ্লিফায়েড শেক্সপিয়ার ভালো লাগে, বিশেষ করে ট্র্যাজেডিগুলো ।

সিসটার অ্যানি : কমিকবুকের কোন চরিত্র তোমার পছন্দ ?

তুই : অ্যাস্টারিক্স আর ওবেলিক্স । ওতে আমি নিজের একটা চরিত্র কল্পনা করে নিই, নেটিফিক্স, যে নেটওয়র্কিং করে সকলের সমস্যা সমাধান করে, কেননা ওই কমিকবুকে চরিত্ররা কেবল একের পর এক সমস্যা গড়ে তোলে ।

সিসটার অ্যানি : কোন খেলা ভালো লাগে ?

তুই : ফুটবল ।

সিসটার অ্যানি : কোন টিমকে সমর্থন করো ?

তুই : ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ।

সিসটার অ্যানি : কার কবিতা ভালো লাগে ?

তুই : টি এস এলিয়ট, কবিতায় গল্প না থাকলে ভালো লাগে না ।

সিসটার অ্যানি : ওনার কবিতা তো বেশ কঠিন, বুঝতে পারো ?

তুই : বুঝতে বিশেষ পারি না, অনুভব করতে পারি ।

সিসটার অ্যানি : বেঙ্গলি পোয়েট্রি পড়ো না ?

তুই : না, পড়ি না , পড়তে ইচ্ছা করে না। আমার বেঙ্গলি বার্থ পোয়েটিকাল নয়, আই অ্যাম এ ডিসাকার্ডেড বেঙ্গলি । তবে একজন বেঙ্গলি কবির আত্মহত্যার ঘটনা আমায় সন্মোহিত করেছে ।

সিসটার অ্যানি : তোমার প্রতি বছরের ডায়েরিতে একটা লাইন লেখো, “ আই নো, সামওয়ান ওনস মি, বাট ইজ সিক্রেটলি ট্রাইং টু ডিজওন মি।” তুমি কি ঈশ্বরের কথা ভেবে লেখো ? নাকি তুমি কবিতা লিখতে চাইছ?

তুই : হ্যাঁ, উনি আমার ব্যক্তিগত ঈশ্বর, আমার ফাউনডিং ফাদার । ওই লাইনটা লিখে ওনার আরাধনা করি, সম্পর্ক পাতাই । আই লাভ হিম ইন অ্যাবসেনশিয়া ।

##

এর মতো, ওর মতো, তার মতো, কারো মতো নয় ।

যেন এমন, যেন অমন, যেন তেমন নয় ।

##

জগদীশ একবার বলেছিল,  নিজের ছেলেমেয়ের চেয়ে তোকে বেশি ভালোবাসে, ও যা চায়, তুই তেমন করেই গড়ে তুলছিস নিজেকে, কখনও অবাধ্যতা করিস না । প্রায় তোর মতনই ওদের গায়ের রঙ ; জগদীশের রঙ পেয়েছে দুজনেই । হাইট পেয়েছে অমরিন্দরের । ফর্সা হলে তিনজনের মধ্যে কমপ্লেক্স গড়ে উঠত, সে আরেক হ্যাঙ্গাম। কী করে এরকম মানিয়ে নেবার চরিত্র পেলি রে ?

বৈদেহী আর আরিয়ানের খারাপ লাগতে পারে, তুই ওদের বাবা-মায়ের ওপর ভাগ বসাচ্ছিস ভাবতে পারে বলে, জগদীশকে আঙ্কলবাপি আর অমরিন্দরকে আন্টিমা সম্বোধন আবিষ্কার করে ফেললি । সবই অবশ্য শোনা, একবছর বয়সের পর  তো আজও দেখিনি তোকে, আর ওদের ছেলেমেয়েকে ।

জগদীশ জানিয়েছিল, বৈদেহী আর আরিয়ান নাকি চাইত না  যে তুই বাপি আর মা বলে সম্বোধন করিস ওনাদের, বাপি আর মা কেবল ওদের ।

##

তুই জেনে ফেলেছিস যে তোর জন্মের পরেই তোর মা তোকে অনাথ করে দিয়েছিল ; অনাথ শিশুদের হামাগুড়ি থেকে কেউ একজন তোকে পছন্দ করে তুলে দিয়েছিল  ‘এডুকেট এ গার্ল চাইল্ড’ সংস্হার হাতে।

বৈদেহীর সঙ্গে ঝগড়ায় ওর আলটপকা মন্তব্যে সন্দেহ হয়েছিল তোর ; তারপর জগদীশ-অমরিন্দরের কথাবার্তা শুনে ফেলে থাকবি কখনও । ওরা দুজনেই মদ খাবার পর বড্ড বকবক করে, বিছানায় শুয়েও গ্যাঁজায়, ব্রো-প্রোর টাকা এসে পড়ে আছে রেলিভ্যান্ট অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করে দাও, এই ধরণের কথাও বলাবলি করে থাকবে।

আমি তোকে দিতে চেয়েছিলাম কোপাকাবানা সমুদ্র সৈকতের বসন্তকাল, শীতের পশ্চিমবাংলার ফিনফিনে গ্রামীণ রোদ, চিরসবুজ অ্যামাজন অরণ্যের ব্লু-গোল্ড ম্যাকাও পাখিদের রঙিন উড়াল ।

তুই চাইলি আরও ওপরের আকাশে ভেসে বেড়াবার স্বাধীনতা, আরও উঁচু, আরও উঁচু, আরও উঁচু, বাধাবন্ধনহীন  নীল, যেখানে পাখিদের ডানার রঙ কালো বা ধূসর ।

যে আঁস্তাকুড়ে অবহেলায় ভোররাতের শিশিরে ভিজছিলিস তা পশ্চিমবাংলায়; তোর  রোষ চাপিয়ে দিলি পশ্চিমবাংলার ওপর, কলকাতা শহরের ওপর ।

##

জানি, ব্লু-গোল্ড পোশাকে তোকে মানায় । কিন্তু আমার পছন্দ টোম্যাটোরেড লাল রঙের পোশাক ।

কোপাকাবানা সমুদ্র সৈকতের কথা  কেন বলছি বলতো ? তোর গায়ের রঙ শ্যামলা, বৈদেহীর চেয়ে এক পোঁচ বেশি,শুনেছি । ব্রাজিলের রিও ডি জেনেরিওর ওই সমুদ্র সৈকতে পয়লা জানুয়ারি অজস্র মানুষ-মানুষীর ভিড় হয় ; অন্য সময়েও নগ্নিকারা শুয়ে থাকেন বালির ওপর নরম ম্যাট বিছিয়ে । তারা তোর মতোই শ্যামলী, অনেকে কৃষ্ণাঙ্গীও । কেবল শেতাঙ্গিনি আর শেতাঙ্গদের জমায়েত তোকে বিব্রত করত, যেমনটা ইউরোপের সমুদ্র সৈকতগুলোয় হয় । গোয়ার সমুদ্র সৈকতের কথাও বলতে পারতাম, সেখানে রাশিয়ার নগ্নিকারা ভারতীয় চোরাদর্শকদের হাতছানি দ্যায় ।

যখন রিও ডি জেনেরিও আর সাও পাওলো যাবি, দেখিস সেখানকার কার্নিভাল, চোখ জুড়িয়ে যাবে, ইচ্ছা করবে কার্নিভালের নর্তকীদের সঙ্গে নাচতে ।

আমি তো ছিলাম রিও ডি জেনেরিওর ভারতীয় এমব্যাসিতে, ট্রেনি হিসাবে, প্রোবেশানারি  পোস্টিঙের আগে। সেসময়ে পরিচয় হয়েছিল দূতাবাসের অফিশিয়াল ট্রানস্লেটর-ইনটারপ্রেটার কণিকা হালদারের সাথে, হৃদ্যতা বলতে পারিস; দজনেই বুঝতে পারছিলাম একে অন্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ছি, বাঙালি বন্ধুর অভাব মেটাতে, বাংলায় কথা বলার লোভে । আমরা দুজনেই টের পেয়েছিলাম যে প্রেম বিয়ে সংসার করা টাইপের নই, দুজনেই, ক্যারিয়ারের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে শেষকালে, জীবনকে রুদ্ধ করে দেবে, পরস্পর আলোচনা করে আর এগোইনি।

কোপাকাবানা সমুদ্র সৈকতে অন্য যুবক-যুবতীরা চুমু খাচ্ছিল, দেখাদেখি বলতে পারিস, আমরাও খেলাম, কণিকা হালদার বলল, ছিঃ, চুমু জিনিসটা নোংরা, স্মেলি, কি যে হয় চুমু খেয়ে ।

আমারও মনে হয়েছিল, একে তো ভালোবাসি না, কেনই বা একে চুমু খাচ্ছি, এর মুখে ক্যাণ্ডললাইট শুয়োর-ডিনার খাবার দুর্গন্ধ । ব্যাস, আমার জীবনে শেষ তরুণী ।

এখন ভেবে দেখলে, মনে হয়, ভাগ্যিস কণিকা আর আমি জড়িয়ে পড়িনি । পড়লে, তোকে অন্য কেউ স্পনসর করত, আর আমার জীবনের অভিমুখ থাকত না কোনো ।

অভিমুখ সব সময় যে নিজের নির্ণয়ের ওপর নির্ভর করে না, তাও জেনেছি, পরে ।

##

পূর্বপুরুষ না থাকলেও উত্তরাধিকার বর্তায়, পাখিরা ওড়ে তবু কিন্তু হাওয়ায় দাগ পড়ে না ।

মাঘ মাস আসতে না আসতেই পাতারা সবুজ রঙ খরচ করে ফ্যালে । ধুলো, ধুলো, ধুলো ।

মুখমেহনের স্বাদ, উল্লাসধ্বনি, স্ফীতির কনকনে চড়াই-উৎরাই, কেবল ঘণ্টাখানেকের উগ্রতা ।

তোর মতো তোর মতো তোর মতো অনুচক্রিকা, ভাবতে পারিনি আমিই ঘুটি, আমিই জুয়া ।

##

জগদীশ আর ওর বউ একবার দুজনে এসেছিল লাক্ষাদ্বীপে, কাভারাত্তিতে, আমার কাছে, তোরা দুজনে নৈনিতালে আর আরিয়ান আজমেরের হোস্টেলে । বৈদেহী ক্লাস টুয়েলভে, পরীক্ষায় টেন্সড আপ ।

অমরিন্দর কয়েক পেগ টানার পর রোজই সন্ধ্যায় বলত, প্রধান ইউ হ্যাভ স্পয়েল্ড ইওর লাইফ, জীবন নষ্ট করে ফেললে, এখনও চান্স আছে, লাইফ পার্টনার যোগাড় করে নাও, নয়তো চুল পেকে গেলে ভিষণ লোনলি ফিল করবে ।

বিয়ে করার জন্য আমাকে চাপ দেবার পেছনে যে অন্য উদ্দেশ্য আছে, তা তখন বুঝতে পারিনি ।

লোনলি ? একা ? নিঃসঙ্গ ? নাঃ, মনে হয়নি কখনও যে আমি একা । এইজন্য নয় যে তুই আছিস আমার জীবনে, আমি তোর পালক পিতা, তোর কথায় ফাউনডিং ফাদার, আসলে আমার চরিত্রে একাকীত্বের বিষ নেই রে, একেবারেই নেই । ফাইল খুললেই মানুষের ভিড় দেখতে পাই, তারা আমার দিকে ফ্যালফ্যাল চেয়ে থাকে ।

##

পালক পিতা বলতে পারব কি নিজেকে, ধাত্রীবাবা  ?

একরাতের ঘটনা বলি তোকে ; তখন আমি পুডুচেরিতে । তোর বারো ক্লাসের আইডেনটিটি কার্ডের ফোটো দেখে অব্দি পরাভূত টান অনুভব করেছি । কার্ডটা পাবার পর কতবার যে দেখেছি ফোটোটা। আর তার ফলে কী হল জানিস ? স্বপ্ন দেখলুম তোকে, স্বপ্নে পেলুম তোকে,  ভরাট শরীর, আর আমার, বহুদিন পর, এই বয়সে, ভেবে দ্যাখ, এই বয়সে আমার নাইটফল হল ।

উড়তে লাগলাম, ঝড়ের চক্রব্যুহে থেকে অতিঝড়ের চক্রব্যুহে, বাজপাখি হয়ে, ঈগল হয়ে, নখের রক্ত চাটছি, নিচে চোখ মেলে দেখছি উপত্যকায় তুই দৌড়োচ্ছিস দু-হাত দুই দিকে মেলে, পোশাক পরিসনি, নামছি, নামছি, নামছি, ব্যাস, ছোঁ মেরে তুলে নিলাম তোকে ; কিন্তু তুই-ই আমাকে খেতে লাগলি, বললি, বদলা, বদলা, প্রতিশোধ, কারাগারে আটক রাখার প্রতিশোধ ।

তোর কনকনে দেহ, বললি, আগুনের ফোয়ারা দিন, বরফকে গলিয়ে ফেলুন, গলিয়ে ফেলুন, দ্রুত নয়, দ্রুত নয়, এক ঘণ্টা মানে ষাট মিনিট, প্রচুর সময় রয়েছে, অন্ধকারকে রোমশ হতে দিন, হাতের আঙুলের ডগায় দৃষ্টি নিয়ে যান, প্রচুর সময় আছে, সময়ই সময় ।

##

ঘরের ভেতরে ঢুকে ঝোড়ো ঝড় যদি নিজের হাতে চুপিচুপি দরোজা বন্ধ করে দ্যায়, অন্ধকার পোড়োবাড়িতে আটক প্রতিধ্বনির ঢঙে, যেন গর্তের হৃদয়ে ইঁদুরের ধান জমা করার রাত ।

##

বলা যাবে কি জীবন নষ্ট ?

স্বপ্নে তুই যবে থেকে আসা আরম্ভ করেছিস, তোর আইডেনটিটি কার্ডের ফোটোগুলো আর দেখি না । তোকে স্বপ্ন থেকে চলে যেতেও বলেছি একদিন স্বপ্নের ভেতরেই, তুই-ই আষ্টেপৃষ্টে  শরীরের ফেরোমোন দিয়ে জড়িয়ে ধরলি, আমি ছাড়াতে পারলাম না, সারা স্বপ্ন ছেয়ে গিয়েছিল তোর উড়ালক্লান্ত সুগন্ধে।

আসলে নষ্টামির স্বপ্ন দেখি ; ভালো লাগতে আরম্ভ করেছে রে,  স্বপ্ন, উঞ্ছমজুরিতে-পাওয়া সম্রাজ্ঞীর প্রেরণার অপ্রত্যাশিত আক্রমণে কাহিল । এছাড়া অন্য উপায় আমার জানা নাই, আয়ত্বে নেই ।

আহ, কি আরাম, কি আরাম, কি আরাম ।

##

জীবন নষ্ট কাকে বলে ? জগদীশের ছোটোবোন চিন্ময়ীর বর অর্নব চ্যাটার্জি প্যাংক্রিয়াটিক ক্যানসারে মারা গেল, যেদিন চিন্ময়ীর শাশুড়ির শ্রাদ্ধের ভোজ, সেই দিনকেই । রান্নাবান্নাও আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল শাশুড়ির শ্রাদ্ধের ভোজের জন্য । অতিথিরাও বাইরে থেকে এসে পড়েছিল অনেকে । আমিও গিয়েছিলাম জগদীশের সঙ্গে । শ্মশান থেকে যখন আমরা ফিরে এলাম, চিন্ময়ী কান্না থামিয়ে বলেছিল, কী পেলুম সারা জীবন ? আইবুড়ো নাম ঘোচাবার জন্যে একটা বর, আর বাঁজা নাম ঘোচাবার জন্যে দুটো বাচ্চা, সারাজীবন তো ও নিচের তলায় মায়ের সেবা করায় ম্যা ম্যা ম্যা ম্যা করে কাটিয়ে পাড়ি মারল ; এত বড় বাড়িটার কী হবে এখন, বাগানের, গাছগুলোর, গাছের ফলের, ফুলের ? ছেলে আর মেয়ে বিদেশেই থাকবে । আমি দোতলায় শুচ্ছি দ্বিতীয় বাচ্চাটা হবার পর থেকে । আমি যে পৃথিবীতে আছি তা ওর খেয়াল ছিল না কখনও । বিধবা শাশুড়ির জন্যে চারবেলা টাটকা নিরামিষ রেঁধে কেটে গেল; তিনি চলে গেলেন, ছেলেকেও সঙ্গে নিয়ে গেলেন, সগগে গিয়ে স্যাবা নেবার জন্য ।

কী বলবি তুই ?

##

আমি তো উচ্চিংড়ের স্বরলিপিতে গাওয়া ফুসফাসুরে গান ; বেড়াজালের হাজার যোনি মেলে ধরে রেখেছি ইলশে ঝাঁকের বর্ণালী । তাকিয়ে-তাকিয়ে যে যুবতীর কৌমার্য নষ্ট করেছি, তারই অদৃশ্য হাতের মাংসল আলিঙ্গনে চোখে পড়েছে কাঁকড়ার আলোতরল বুকে আমার ছককাটা ঠিকুজি, শনি বক্রি, কালসর্পযোগ, কপালের বলিরেখায় গৃহত্যাগী বিষপিঁপড়ের সার । সে যুবতী স্বপ্ন ছেড়ে যেতে চায় না ।

##

জগদীশ ব্যানার্জিকে বলেছিলাম তোর নামটা স্কুলেই সংশোধন করে এফিডেভিট আর গেজেট নোটিফিকাশান দিয়ে নেতি থেকে ইতি করিয়ে নিতে । জগদীশের স্ত্রী অমি,  রাজি হয়নি, বেশ হ্যাঙ্গাম বলে নয়, স্পনসর যে করেছে তাকেই করতে হতো, আর আমি চাইছিলাম না যে তুই কখনও আমার উপস্হিতি তোর জীবনে টের পাস । আমার সাহায্যের ভারে ঝুঁকে পড়িস ।

জগদীশের মেয়ে আর ছেলেও মত দিয়েছিল, নেতি নতুন ধরণের নাম, বদলাবার কোনোই প্রয়োজন নেই।

তেইশ বছর বয়সে নিজেকে পালক পিতা, ফসটার ফাদার, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে, বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছি, জাস্ট ইডিয়টিক, ভাবতেই পারিনি আমি একজন মুকুটপরা বাবা, তোর কুড়িয়ে পাওয়া বাবা । ফসটার মাদারদের বলে ধাই-মা ; আমি তার মানে তোর ধাই-বাবা ।

আমার মা যখন হাসপাতালের বিছানায়, তখন তাঁকে বলেছিলাম যে আমি বিয়ে এইজন্যই করিনি, কেননা আমি একটি শিশুর পালক পিতা । সংবাদপত্রের কাটিংটা দেখিয়েছিলাম মাকে, একজন নার্সের কোলে তুই, সদ্য আঁস্তাকুড় থেকে থানা হয়ে হাসপাতালে পৌঁছেছিস ।

নিয়ে আয় না, যাবার আগে চাক্ষুষ করে যাই, মার নাক থেকে কেরালিয় নার্স ভেন্টিলেটার সরিয়ে দিতে, বলেছিলেন ।

আমি ওকে জানতে দিতে চাই না মা, যে আমি ওর জীবনে ঈগলপাখির মতন ডানা মেলে আছি; জগদীশ আর ওর বউ অভিভাবকের দায়িত্ব নিয়েছে ।

##

সত্তা, মুহূর্ত, ভাষা, বীর্য, স্পন্দন, উৎসমুখ, কচুর জঙ্গলে ফড়িং, কলার মান্দাস, কাপড়ের খুঁট ।

বরফঝুরির গ্রন্হি শুভ্রবিষ অনন্ত শিকড়ে । কাদায় কলকা এঁকে রেখে গেছে কীট ।

কাঠঠোকরার বাসার ফুটোয় সাইক্লোনের মতন ফুঁ দিয়ে বাজানো বাঁশির সুর । বাজাও হে বাজাও

বুদবুদেরা জাতিস্মর হয়, তা এক মাদারির ইন্দ্রজাল ।

##

এর মতো, ওর মতো, তার মতো, কারো মতো নয় ।

যেন এমন, যেন অমন, যেন তেমন নয় ।

##

ব্যানার্জি পরিবারকে তোর স্হানীয় অভিভাবক করতেও চাপ দিতে হয়েছিল । ওরা প্রথমে রাজি হয়নি । অযথা ঢুকতে চাইছিল না আমার আর তোর জীবনের আগাম জটিলতায় । ব্যানার্জি যখন হরিয়ানায় হিসারের এসডিও ছিল তখন আমিই ওকে বাঁচিয়েছিলা জাঠদের গোঁসা থেকে ।

ব্যানার্জি কীই বা করত ! মারোয়াড়ি আর গুজরাতিদের ছেড়ে দেয়া ধর্মের ষাঁড়গুলো হেলতে দুলতে হরিয়ানায় পৌঁছে মাদি মোষদের সঙ্গে সঙ্গম করছিল আর মোষগুলোর কিছুদিনেই গর্ভপাত হচ্ছিল, শরীর খারাপ হচ্ছিল, দুধের ঋতু হাতছাড়া হচ্ছিল । ষেঁড়োমোষগুলোকে ওরা বেঁধে রাখে, প্রজননের ঋতুতে মাদিমোষদের চাষিরা নিয়ে যায় ষেঁড়োমোষদের মালিকের গোয়ালে ; মালিকদেরও রোজগার হয় ।

জাঠ পঞ্চায়েতের কর্তা জগদীশকে টিটকিরি মেরে বলেছিল, বাঙালি ষাঁড় চাপছে হরিয়ানার মাদিমোষের ওপর, সে আর কি করে বুঝবে যে গোরু আর মোষ একই প্রজাতির প্রাণী নয় ।

ষাঁড়গুলো গরু খুঁজে পায় না হরিয়ানার পথে আর খেতে । তারা তাড়নায় এলে সামনে মাদিমোষ পেয়ে তাদের ওপরই চাপে ।

আমি হিসারের জাঠসভার কর্তাদের সঙ্গে কথা বলে, গ্রামীণ উন্নয়ন বিভাগের বাজেট থেকে  লোকসানের টাকার সরকারি ব্যবস্হা করে মন্ত্রীর রোষ থেকে বাঁচিয়েছিলুম ব্যানার্জিকে । তখন আমি ওই বিভাগে ।

##

পৌরুষের গরিমা, মৌমাছিদের প্রত্যাখ্যাত ফুলের মধু ।

অন্ধকারে স্পর্শের মর্মার্থের সাথে আলোয় স্পর্শের মর্মার্থের প্রভেদ, সব দেশের সন্ধ্যায় শঙ্খ বাজে না।

##

পশ্চিমবঙ্গের ক্যাডারের জগদীশ হারিয়ানাতে পোস্টিং নিয়েছিল  । না, অমরিন্দরকে হাসিখুশি রাখার জন্য নয় ; নয়তো সরকারি আধিকারিকদের তো শাসকদলের হ্যাঁ-তে হ্যাঁ আর না-তে না মেলানো ছাড়া কোনো কাজ নেই, পুঁজিবাদ হোক, সাম্যবাদ হোক, গান্ধিবাদ হোক, খিচুড়িবাদ হোক, হিন্দুবাদ হোক, মুসলমানবাদ হোক, গণতন্ত্র হোক, আমিরতন্ত্র হোক, একনায়কতন্ত্র হোক, দেশে-দেশে তা-ই তো ঘটে চলেছে ।

না, না, বউয়ের জন্য নয়, হরিয়াণায় উপরি রোজগার করাকে সমাজ স্বাভাবিক  মনে করে, তাই। পশ্চিমবাংলায় ঘুষও খায় আবার সৎসন্ন্যাসী সেজে থাকে, প্যাঁচ-পয়জার মারতে হয়, বুঝিয়েছিল জগদীশ, অমরিন্দরের সামনেই,  ওদের অ্যানিভার্সারির ককটেল পার্টিতে, হোটেলের ব্যাঙ্কোয়েট হলে, চণ্ডীগড়ে । পশ্চিমবাংলায় ঘুষের গুড় খেয়ে ফ্যালে নেতারা । ব্যুরোক্র্যাটদের তোল্লাই দেয় না । হরিয়াণায় খাও আওর খিলাও, পেয়ারে, মজাদার চানা জোরগরম ।

পশ্চিমবাংলাকে জগদীশ বলে ওয়েএএএএস্ট বেঙ্গল, বামপন্হীরা সুযোগ ওয়েএএএস্ট করেছে, তারপর যারা এলো তারা ওয়েএএএস্টকে সুযোগ দিয়েছে, যারা জঙ্গলে লুকিয়ে বিপ্লব করছে তারা নিজেদের জীবন ওয়েএএএস্ট করছে । কোথায় খাবে, খাওয়াবে, তা নয়, কেবল বাকতাল্লা । জগদীশের ওয়েস্টলাইন পাছার দ্বিগুণ হতে চলল ।

প্রেগনেন্ট বলে অমরিন্দর তিন পেগ মাত্র সিঙ্গল মল্ট  খেয়েছিল, ঘুষের । জাঠনি, মাতাল হয় না, মাতন লাগে ।

আমি বাড়ির বাইরে ড্রিংক করতে পারি না, যুৎসই মনে হয় না, নিজেকে অগোছালো না করে, লুঙ্গি পরে, ঠ্যাঙ ছড়িয়ে, একা-একা, চুপচাপ, বসে  ড্রিংক করি ।

##

জগদীশ আর অমরিন্দর প্রথমে গররাজি থাকলেও, নেতি, তোকে ওনারা  ডানার আড়ালে নিয়েছিলেন, তা তুই স্বীকার করিস কিনা জানি না ।

আমি ব্যানার্জির বলে-দেয়া অ্যাকাউন্টে প্রতিবছরের শুরুতে টাকা জমে করে দিয়েছি, আজও করি। ওরা যে অ্যামাউন্ট বলে, জমা করে দিই । বারবার নতুন অ্যাকাউন্ট খোলে, বড্ড মনে রাখার ঝামেলা । তুই অ্যাডাল্ট হলে তোর নামে খুলবে হয়ত, কিন্তু তখন তো তুই স্বাবলম্বী । আমাকে কি বিদায় করে দিবি স্বাবলম্বী হলে ?

এনজিওকে সাহায্যের রিবেট পায় আয়করে, তাই ব্যানার্জিও মেনে নিয়েছিল বন্দোবস্তটা ।

ব্যানার্জিকে স্হানীয় অভিভাবকই শুধু নয়, ওদের পদবীটা্ও আমি তোর নামে জুড়ে দিতে চেয়েছিলাম । আমি তো ব্রাহ্মণ নই, জানি অব্রাহ্মণদের নিয়ে কেমন ঠেলাঠেলি চলে বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজে ।

আমার পদবি তো প্রধান, প্রভঞ্জন প্রধান । গুজরাতি, কর্নাটকি, মারাঠিদের মধ্যেও প্রধান পদবি আছে ।

আমি তোকে বাঙালি করে তুলতে চেয়েছি ; তাতেও তোর চাপা অস্বস্তির কথা অমরিন্দর জানিয়েছিলেন একবার । তখনও পর্যন্ত তুই জানতিস না যে তোকে কলকাতা শহরের এক আঁস্তাকুড়ে ফেলে চলে গিয়েছিল তোর মা । যখন জানলি তখন তোর গোঁসা গিয়ে পড়ল পশ্চিমবাংলার ওপর ।

বৈদেহী আর আরিয়ানের চরিত্রে, শুনেছি, বাঙালি হয়ে ওঠার  গোঁ, সব দ্রুত সেরে ফেলতে হবে, শিখে ফেলতে হবে, ক্লাস ফাইভ থেকে, গান, নাচ, বইপড়া, শাড়ি, নলেন গুড়, ছানার মুড়কি, পলাশ ফুল, মাছরাঙা, শুঁটকি মাছ, রাধাবল্লভি, পান্তুয়া-লুচি, ভাপা ইলিশ, সরস্বতী পুজো, বলেছিল অমরিন্দর ।

পদবি ব্যাপারটা কত  গুরুত্বপূর্ণ তা তোকে স্পনসর করতে গিয়ে টের পেয়েছিলাম ।

আঁস্তাকুড় তো পদবি দিতে পারে না, নাম দিতে পারে না, জন্মদিনও দিতে পারে না ।

##

ব্যানার্জি, বন্দ্যোপাধ্যায়, চ্যাটার্জি, চট্টোপাধ্যায়, মুখার্জি, মুখোপাধ্যায়, গাঙ্গুলি, গঙ্গোপাধ্যায় ।

কারা তুলে নিয়ে যাবে পথপার্শে পড়ে থাকা কয়েকদিনের বাসি লাশ ?

মৃতদেহে পোকা ? মৃতের দেহ থেকে তাহলে প্রাণও জন্মায়, অবাক অবাক হও ।

শ্মশানে কাদের হাতে নিজেকে তুলে দিয়ে চলে যেতে চাও !

শকুন, পদবি বলো, কাদের মাংসপিণ্ড অসীম আকাশে গিয়ে খাও ।

##

তুই বেশ পরে সুস্পষ্টভাবে জানতে পেরেছিলি,  যে তোকে ডাস্টবিনে কুড়িয়ে পেয়েছিল কলকাতার যাদবপুর থানার পুলিশ, ভোররাত থেকে যারা বাঁশদ্রোণী বাজারের সামনে বাঁধাকপির সবুজ পাহাড় গড়ে তোলে, একের পর এক দূরপাল্লার ট্রাক থেকে, তখনই ওরা তোর কান্না শুনতে পেয়েছিল ।

এত জায়গা থাকতে ডাস্টবিনেই কেন ? তুই বার বার নিজেকে আর তোর  অভিভাবকদের প্রশ্ন করেছিস, শুনেছি । তারাই বা এর উত্তর কী করে দেবে । হয়ত তোর মা চেয়েছিলেন যে তুই বেঁচে থাক, বাজারের সামনে ভোর রাত থেকেই সবজির ট্রাক আসে একের পর এক ।

তোর মায়ের হয়তো আশা ছিল যে ট্রাকচালদের কেউ যদি সন্তানহীন হয়, সে তোকে কোলে তুলে নেবে । নেয়নি রে, নেয়নি । ওরা কাছের ক্লাবের ছেলেদের খবর দিলে, তারা থানায়, আর থানা তুলে নিয়ে গিয়ে সরকারি হাসপাতালে, নয়তো তুই সত্যিই মরে যেতিস ।

হাসপাতাল থেকে সমাজসেবীদের চ্যানেল হয়ে এডুকেট এ গার্ল চাইল্ড এনজিওতে পৌঁছোলি ; আরও বহু পরিত্যক্ত শিশুদের একজন  ।

সংবাদপত্রে তোর ওই সময়ের যে ফোটো বেরিয়েছিল, তা আমার সংগ্রহে আছে ; হলুদ হয়ে গেছে, ভাঁজে-ভাঁজে ছিঁড়ে গেছে, কতোবার যে দেখেছি । তোর এখনকার মুখের সঙ্গে একেবারে মেলে না, ভাগ্যিস মেলে না ।

তোর চোখমুখ, এডুকেট এ গার্ল চাইল্ড দপতরে, ওই বয়সেই এমন আকর্ষক মনে হয়েছিল যে চব্বিশটা শিশুর মধ্যে থেকে তোকেই স্পনসর করার জন্য বেছে নিয়েছিলাম আমি ।

##

বাঁশদ্রোণী বাজার যে  কোথায় স্পষ্ট করে বলতে পারেনি পরিচিত বাঙালি অফিসাররা, দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা যেতে পড়ে, বলেছিল কেউ । কলকাতায় গিয়ে, জিপিএস নিয়ে, পৌঁছেছিলাম । আঁস্তাকুড় বা ডাস্টবিন বলা উচিত হবে না; জায়গাটা আসলে ভ্যাট, সারাদিনের বাতিল পচাগলা শাক-সবজি আর মাছের আঁশ-পোঁটা ওখানে ফেলা হয়, হয়তো সবজির নরম সবুজ পাতার ওপরে শুয়েছিলি, হেমন্তের রাতে ।

বাজারের ভেতরে গিয়ে দীর্ঘদেহী কোনো বিক্রেতাকে দেখিনি, সবজিঅলারা অধিকাংশই মুসলমান,  চাষি পরিবারের ।

অন্য কোনো এলাকা থেকে তোকে এনে ওখানে ফেলে গিয়ে থাকবে তোর মা কিংবা বাবা, যাতে সহজে তাদের  খুঁজে পাওয়া না যায় ।

আঁস্তাকুড়ের প্রসঙ্গ উঠলেই তুই বিব্রত হতিস, তোর মনে হতো সারা গায়ে নোংরা, কখনও উৎসাহ প্রকাশ করিসনি জায়গাটা দেখে আসার, শুনেছি । বরং বিরক্ত হতিস প্রসঙ্গটা উঠলে ।

জগদীশ বলেছিল আমাকে, ক্লাস সেভেন থেকে পড়াশুনার শেষ ধাপ পর্যন্ত তুই প্রতিবছরের ডায়রিতে একটা বাক্য অবশ্যই লিখেছিস, “আই নো সামবডি ওনস মি, বাট হি ইজ সিক্রেটলি ট্রাইং টু ডিজওন মি ।” তোর সেই সব ডায়রির ওই পাতাটা ছিঁড়ে আমাকে দিয়েছে অমরিন্দর ।

শেষে, বাঁশদ্রোণী বাজার তুই গেলি দেখতে, আমাকে সঙ্গে নিয়ে ।  যৌবনের শীর্ষে তখন তুই, আঁস্তাকুড়ের কথা শুনলেই যার সারা গায়ে র‌্যাশ বেরোতো ? শুনেছি,  অমরিন্দরের মুখে ।

 

 

দুই

ইলেকট্রিক ? এরকম নাম হয় নাকি !

তাই তো বললেন ।

অনুমান করিনি তুই কখনও আমার শান্তি ইনভেড করবি, এইভাবে, হাতে লাল সুটকেস, কাঁধে হলুদ ব্যাগ, ফেডেড জিন্স, লাল ঢিলেঢালা টপ কিংবা জার্সি, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের জার্সি মনে হল, তার ওপর শাদা ব্লেজার, পায়ে সাতরঙা ফ্ল্যাপার, ডান হাতে গোটা পাঁচেক স্লোগানচুড়ি, কানে চুড়ির মাপের লাল রঙের মাকড়ি, হাতের আর পায়ের নখে ব্রাউন-লাল নখপালিশ, হাতের নখ ততো বড়ো নয়, পোশাক অত্যন্ত দামি, আঁচ করতে পেরেছিলাম, ঘাড় পর্যন্ত কোঁকড়া চুল । অথই আলগা চটক, অথই ।

দেখছি দেখছি দেখছি দেখছি দেখছি দেখছি ; সন্মোহনকে অনুবাদ করা নির্বাক দৃষ্টি; আজ দশটা বেজে তিন মিনিটে সময় কিছুক্ষণের জন্য স্হির, অবিচল, পৃথিবী শুরু হল, রাতে  ঘুমিয়েছিলাম কিনা মনে করতে পারছি না, ধুনুরিরা কি আমাকে পিটিয়ে মেঘ করে উড়িয়ে দিয়েছে !

তুই ছাড়া আর কে-ই বা এভাবে শান্তিভঙ্গ করতে চলে আসবে নিজের বাক্সপ্যাঁটরা নিয়ে ?

দুই হাতে মেহেন্দির নকশা !

মেহেন্দি ? কেন ? প্রশ্নের উদ্বেগে আক্রান্ত হল মস্তিষ্ক ; মরুভূমির বালিতে মাকড়সাপায়ে আঁকা মানচিত্র ।

তুই তো চাকরি নিয়ে আমেরিকায় চলে গিয়েছিলি, নিঃশব্দে নিজেকে বললাম, নিশ্চিন্ত হয়েছিলাম শুনে, যাক, সেটল হলি, আমার মিশন সাকসেসফুল, ভাবছিলাম, ভাবছিলাম, ভাবছিলাম, তোকে দেখতে দেখতে, তোকে দেখে যে চিনতে পারিনি তা বলব না, চিনতে পারার আক্রমণে বিপর্যস্ত, সেই ক্লাস টুয়েলভের পর তোর ফোটো দেখার সুযোগ হয়নি । কিন্তু ঝলকানি, ঝলকানি, ঝলকানি ।

কেবল স্বপ্নে যেটুকু আবছা ঢেউ ।

আমার সমান ঢ্যাঙা হয়ে উঠেছিস ।

আমি স্তব্ধ হতবাক থ দেখে তুই বলে উঠলি, ঠিকই বলেছে তোমার পিওন না অর্ডারলি, হোয়াটএভার, আমি এলেকট্রা, মহাকাব্যের নায়িকা, কবিকল্পনার মেয়ে ।

মগজের ভেতরে বিস্ফোরণ ঘটল, এলেকট্রা, কবিকল্পনার নায়িকা, অপার্থিব, রহস্যময় ?

একটা শব্দের ভেতরে কতটা বারুদ যে লুকিয়ে থাকতে পারে তা আমিই জানি । নিজেকে বললাম, হ্যাঁ, স্বপ্নের ভেতরে তোকে, যার পালক পিতা আমি, যাকে তুই বলেছিস ফাউনডিং ফাদার, পেয়েছি, এলকট্রার মতনই নিষিদ্ধ সম্পর্ক পাতিয়েছি ।

সেই সম্পর্কের প্রতিষ্ঠা দিতে এলি নাকি, মুখ দিয়ে কথা বেরোলো না, গলা শুকিয়ে গেছে ।

##

আমার চাঞ্চল্য গোপন করতে গিয়ে প্রবল আবেগে আপ্লুত হলাম, টের পাচ্ছিলাম যে প্রতিক্রয়ার বিস্ফোরণ ঘটছে নিঃশব্দে, তোকে ঘিরে তেজোময়তার দুর্নিবার জ্যোতি, তুই এই মুহূর্তে যদি না আসতিস তাহলে আমি পচনে ধ্বসে পড়তাম – এরকম মনে হল, বাসনার , চকিত দ্যুতি দিয়ে আমাকে নতুন দৃষ্টি দিলি তুই, এতদিন পর্যন্ত আমি বন্দি ছিলাম ফালতু জাগতিক জীবনে, তুই মুক্ত করে ছড়িয়ে দিলি মঙ্গলময় লিবিডোর গোপন রঙ্গ । উচ্ছ্বাস ।

##

এর মতো, ওর মতো, তার মতো, কারো মতো নয় ।

যেন এমন, যেন অমন, যেন তেমন নয় ।

##

ইতি, তুমি, আমার মুখ দিয়ে এইটুকই বিস্ময় ক্ষরিত হয়েছিল, সন্তর্পনে, নিয়ন্ত্রিত শ্বাসে ।

কান থেকে ইয়ার-প্লাগ বের করে বললি, ইতি, এখন ইতি, নেতি নাম রেখেছিলে তো ! নেটি, বাঃ, কি একখানা নাম রেখেছিলে ! আশ্চর্য লাগছে না? কী করে তোমায় খুঁজে বের করলুম ? এনিওয়ে, আজ তো রবিবার, তোমার কর্মীদের দিয়ে আজও খাটাচ্ছো? ওদের তো পরিবার পরিজন আছে । টেল দেম টু গো হোম ।

বোধহয় বাবলগাম খাচ্ছিস, কথাগুলো চিবিয়ে বললি, চিবিয়ে বলা সংলাপে থাকে বেপরোয়াভাব, জানি । ইয়ার-প্লাগ  জিন্সের সামনের পকেটে ঢুকিয়ে রাখতে-রাখতে বললি, তোমাদের ঈশ্বরগুলো সব কালা হয়ে গেছে, কেউ তাকে ছাদে দাঁড়িয়ে লাউডস্পিকারে ডাকছে, কেউ আবার দল বেঁধে জগঝম্প বাজিয়ে ডাকছে, ডিসগাস্টিং টোটালিটেরিয়ানিজম । ঈশ্বরগুলোও আমার মতো সকাল থেকে বিরক্ত হয়ে গিয়ে থাকবে জগঝম্পের ঝালাপালায় ।

অ্যাটিট্যুড, অ্যাটিট্যুড, আই অ্যাম কুল, আই অ্যাম গার্লি, আই অ্যাম ফেমিনিন, অ্যাটিট্যুড । তোর দিকে, চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত এক পলক তাকিয়ে, নিজেকে নিঃশব্দে বললাম আমি।

আমার উত্তরের অপেক্ষা না করে, স্লোগানচুড়ির ঝিনঝিন বাজিয়ে, নিজেই হুকুম দিলি, আপ লোগ ঘর যাইয়ে, আজ কিঁউ কাম কর রহেঁ হ্যাঁয়? ছুট্টি হ্যায় না আজ ।

সেকশান অফিসার পেনডিং ফাইলগুলো দিতে, আর রাতে যেগুলো ক্লিয়ার করে দিয়েছি সেগুলো নিতে এসেছিল । পিওন রবিন্দর সিং ওর সঙ্গে  । ওরা আমার দিকে তাকিয়ে নির্দেশের অপেক্ষা করছে দেখে তুই বললি, হাঁ, হাঁ, যাইয়ে, ঘর যাইয়ে, ম্যাঁয় ইনকি রিশতেদার হুঁ, বিদেশ সে আয়া হুঁ বহুত দিনোঁ বাদ ।

আমি তো জাস্ট বোবা, মাথা নাড়িয়ে, ঠোঁটে জিভ বুলিয়ে, বললুম, করিম সাহব, যাইয়ে, ফাইলোঁ কো লে যাইয়ে, কল অফিস যাকর হি দেখুংগা ।

হুকুম করার কন্ঠস্বরে তুই বললি, চাপরাশি কুক আর কে কে আছে, সবাইকে যেতে বলো, আমি রাঁধতে পারি, ইনডিয়ান, ওয়েস্টার্ন, চাইনিজ, থাই, মেক্সিকান, টার্কিশ, যা খেতে চাও । টেল অল অফ দেম টু গো ; আমি চাই না যে তোমার কোনো কর্মচারী আজ বাড়িতে থাকে।

চাপরাশি নানকু প্রসাদ তোর সুটকেসটা তুলে আমাকে জিগ্যেস করল, গেস্ট রুমমেঁ রখ দুঁ ?

তুই তাকে বললি, আপকো কুছ করনে কি জরুরত নহিঁ হ্যায়, আপ ভি ঘর যাইয়ে, রসোই বনানেওয়ালে অওর মালি কো ভি বোলিয়ে আজ সবকি ছুট্টি ।

তোর হুকুমে সন্মতি দিলাম, চলে গেল ওরা ।

##

ফেনিল কথার ঢেউ, আলোকোজ্জ্বল চাউনি, উসকে-দেয়া রক্তসঞ্চালন ।

চৌম্বকীয় আঠা, আকস্মিকতার টান, অমেয় চিরন্তন ।

##

ইলেকট্রিসিটি নয়, আমি এলেকট্রা । জানো তো এপিকের নায়িকা এলেকট্রা ? গ্রিক মহাকাব্যের এলেকট্রা ? এলেকট্রা কমপ্লেক্সের এলেকট্রা । আমি সেই এলেকট্রা কমপ্লেক্সের এলেকট্রা, মহাকবির কল্পনা দিয়ে গড়া । তুমি তো ইংরেজি সাহিত্যে ফার্স্টক্লাস পেয়েছিলে !

আমি চুপ করে আছি, দেখছি তোকে, অবাক, কুয়াশা, অঝোর বৃষ্টি, বাতাসে শিউলিফুলের গন্ধ বলে চলেছে উৎকীর্ণ করো, শিহরিত করো, উষ্ণ করো ।

ভাবছি, তুই কি করে এলেকট্রার গল্প জানলি, তুই তো ম্যাথামেটিক্স, ফিজিক্স আর কেমিস্ট্রির বইপোকা ছিলিস, ইলেকট্রনিক্স পড়েছিস । আমি যেসব বইপত্র তোর নামে জগদীশের বাড়ি পাঠিয়েছিলাম, তাতে কি এলেকট্রা প্রসঙ্গ ছিল, মনে পড়ছে না, উঁহু, মনে পড়ছে না  । থেকে থাকবে, বইগুলো বাছাই করত পড়ুয়া জুনিয়ার অফিসাররা, আমি পেমেন্ট করে দিতাম ।

##

ভাবছ কী করে তোমাকে লোকেট করলুম, তাই না ? না, বাপি, আই মিন আঙ্কলবাপি, বা আন্টিমা বলেননি, ওনাদের কাছে জানতে চাইনি কখনও ; জানতে চাইলে ওনারা তোমাকে নোটিফাই করে দিতেন, আর তুমি তোমার পায়ের ছাপ মুছে ফেলার চেষ্টা করতে ।

হাত ঝাঁকিয়ে স্লোগানচুড়ি বাজিয়ে বললি, তোমাকে লোকেট করা ছিল বেশ সিম্পল । প্রায়ভেট ডিটেকটিভ এজেন্সিকে বলেছিলুম, আঙ্কলবাপির অ্যাকাউন্টের ফিনানশিয়াল ট্রেইল ফলো করতে, কোথা থেকে টাকা আসত ওনার অ্যাকাউন্টে আর যেত আমার স্কুলে,  এডুকেট এ গার্ল চাইল্ড সংস্হায়, যাদের আজও সাহায্য করে চলেছ । আর যিনি ফানডিং করতেন তাঁর নাম কি, এখন কোথায় থাকেন । বাপির, আই মিন আঙ্কলবাপির, বড্ড বদভ্যাস ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট অহরহ বন্ধ করা আর খোলা । প্রতিটি অ্যাকাউন্ট নম্বর জানি ।

গত রবিবার তোমার লোকেশান জানতে পেরেছি, সঙ্গে সঙ্গে ফ্লাইট নিয়ে চলে এসেছি ।

তারপর তুই যা বললি, তা আরও আক্রমণাত্মক, বললি, তোমার বেডরুমটা কোথায়, জিনিসগুলো রাখি ।

বললুম, ওদিকে নয়, ওই রুমটা জিম, এক্সারসাইজ করি ।

ওউ-ওউ-ওউ-ওউ, জিম, রিয়ালি ? তাই এমন পেটা মাসকুলার বডি রেখেছ, ব্রোঞ্জপুরুষ, হি-ম্যান । ভালো, ট্রেডমিলও রেখেছ দেখছি, কাজে দেবে । ঘুষের টাকায় নয়তো ?

জিমঘরটা আমার আগে যিনি এই বাংলোয় ছিলেন, তাঁর ।

জানি, তুমি ঘুষ নাও না, তবু জিগ্যেস করতে ভালো লাগল । তুমি তো জ্ঞানবৃক্ষ, বোধিবৃক্ষ, তাই না ? ফাঁসিবৃক্ষ বলা যাবে কি ? ঘুষ নিতে ভয় পাও ? না এথিকসে বাধে ? ঘুষ ছাড়া দিল্লি শহরে সৎ থাকা শুনেছি অলমোস্ট ইমপসিবল, টিকে আছ কেমন করে ? মন্ত্রীদের প্লিজ করতে হলে তো ঘুষ ছাড়া উপায় নেই ! ঘুষ নেয়া হল এ ফর্ম অফ আর্ট, দুর্বলহৃদয় মানুষ রপ্ত করতে পারে না, বিশেষ করে ডুগুডাররা । দিল্লিতে কতদিন আছো ? ট্রান্সফার অর্ডার এলো বলে, ঘুষ না খেলে আর তা শেয়ার না করলে ট্রান্সফার অনিবার্য, তাও তুমি আবার এজিএমইউ ক্যাডারের, পাঠাবে সিলভাসা, পোর্ট ব্লেয়ার বা পুডুচেরি ; অরুণাচল প্রদেশ বা সিকিমেও পাঠিয়ে দিতে পারে ।

##

শিশিরে কেউটের গন্ধ ।  উতরোল কোলাহল ।

স্ফিংক্স, মরুভূমি, পিরামিড, মমি । চাউনির অতিশয়োক্তি ।

এর মতো, ওর মতো, তার মতো, কারো মতো নয় ।

##

আমি সুটকেসটা তুলে নিচ্ছিলাম, তুই নিজেই তুলে নিয়ে বললি, যথেষ্ট শক্তি আছে গায়ে, ড্যাডি ডিয়ারেস্ট, আই নিউ, সামওয়ান ওনস মি, অ্যান্ড ওয়াজ সিক্রেটলি ট্রাইং টু ডিজওন মি ।

এক পলকে দেখলাম, তোর সোনালি আর রুপালি স্লোগান-চুড়িগুলোতে গোলাপি রঙে লেখা লাভ ইউ, কিস ইউ, ইউ আর মাইন, ইংরেজিতে । দু-হাতে কনুই পর্যন্ত মেহেন্দির নকশা । আমেরিকায় মেহেন্দির ব্যবসা পৌঁছে গেছে, আশ্চর্য লাগল দেখে ।

বললাম, কি মাথামুণ্ডু বকছিস ! আমার গলায় শ্লেষ্মার বদলে অবাক হওয়ার শেষে অতিপরিচিতির স্ফূর্তি ।

এই তো, এই তো, তুমি থেকে তুইতে এলে তো ? তুই বললি ।

আমার কাছে এসে, নিঃশ্বাস ফেলা দূরত্বে দাঁড়িয়ে বললি, প্রায় ফিসফিস করে বললি, ফ্রম টুডে অনওয়ার্ডস, আই ওন ইউ ইন দ্য সেম ওয়ে অ্যাজ ইউ ওনড মি ওয়ান্স আপঅন এ টাইম । হ্যাঁ, তুমি আমার অস্তিত্বের মালিক ছিলে এতকাল, এখন আমি তোমার অস্তিত্বের মালিক, বা মালকিনি, হোয়াটএভার । অদৃশ্য রিমোট কন্ট্রোল এবার আমার মুঠোয় ।

##

এগোলুম বেডরুমের দিকে, তোর হাত থেকে সুটকেসটা কেড়ে নিয়ে, পেছন-পেছন তুই । আবৃত্তি করতে লাগলি, খোশমেজাজি কন্ঠস্বরে, কোনো পরিচিত গায়িকার মতন গলা, কার গলা যেন, কার গলা যেন :

You do not do, you do not do

Any more, black shoe

In which I lived like a foot

For thirty years, poor and white,

Barely daring to breathe or Achoo

#

Daddy, I have had to kill you

You died before I had time

Marble-heavy, a bag full of God

Ghastly statue with one gray toe

Big as Frisco seal

#

And a head in the freakish Atlantic

Where it pours bean green over blue

In the water of beautiful Nauset.

I used to pray to recover you

Ach, du

#

পেছন ফিরে জিগ্যেস করলাম, কার কবিতা  ।

তোর মুখেচোখে কেমন যেন পরিতৃপ্ত ব্যঙ্গের ছায়া ।

তুই বললি, জাস্ট দ্যাট ? কবিতাটা সম্পূর্ণ মুখস্হ ; আমার সবচেয়ে প্রিয় কবিতা । যিনি লিখেছেন তিনি বলেননি কি যে কবিতাটা একজন মেয়ের এলেকট্রা কমপ্লেক্স ? আর হলোকস্টের মেটাফরগুলো ? ভয় পাচ্ছ কেন?  শোনো না পুরোটা । তোমাকে তো আউশউইৎসে পাঠাচ্ছি না । আর হ্যাঁ, বইগুলো তুমিই বাপির, আই মিন আঙ্কলবাপির, ঠিকানায় আমার জন্য পাঠিয়েছিলে । মনে করো, মনে করো, মনে করো ।

ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর করেছি, কবিতাটা কার লেখা মনে করতে পারলাম না ; সিলেবাসে ছিল না, বোধহয় । এমিলি ডিকিনসন কি ? নাহ, অন্য কারোর । ক্রিস্টিনা রসেটি, এলিজাবেথ বিশপ, এডিথ সিটওয়েল? মনে আসছে না । এই কবির বই তো পাঠাইনি বলেই মনে হয়, কে জানে হয়তো ভুলে গিয়ে থাকব, আমি নিজে তো পাঠাইনি, জুনিয়ার অফিসারদের দিয়ে কিনিয়ে পাঠিয়ে দিতাম ।

অফিসের ফাইলের জগতে ঢুকে গিয়ে সাহিত্য উধাও হয়ে গেছে মগজ থেকে ; সরকারি ফাইলের আঁকশি হয়, অক্টোপাসের মতন ।

##

বাবলগাম ফুলিয়ে ফাটালি, বললি, নিও-ফ্রয়েড মনস্তত্ব, কার্ল গুস্তাভ ইয়ুং, মনে পড়ছে? তুমি তো ইংরেজিতে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্স্ট ক্লাস এম এ ! কবির নাম মনে পড়ছে না ? তোমার স্নাতকস্তরে সাইকোলজি ছিল, তাও জানি।  না, আমি পেনিস এনভির প্রসঙ্গ তুলছি না, ন্যাটালি অ্যানজিয়ার তো বলেই দিয়েছেন, পেনিস এনভি আবার কি, শটগান নিয়ে কী হবে, যখন মেয়েদের রয়েছে অটোম্যাটিক অস্ত্র ।

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে, বোধহয় আমার উত্তরের প্রতীক্ষা করে, জবাব না পেয়ে, বললি, লিবিডোও নয়, জাস্ট ফ্যাসিস্ট ড্যাডি আর মহাকাব্যের এলেকট্রার সম্পর্কের প্রসঙ্গ, ইনসেস্ট, ইনসেস্ট, ইনসেস্ট।

পেনিস শব্দটা এমনভাবে বললি, যেন প্রায়ই বলিস ; হতে পারে, আমেরিকানদের তো কথার আড় নেই। আর ইনসেস্ট ? রক্তচাপে শিবের তাণ্ডবনাচ শুনতে পাচ্ছি ; হলোকস্ট ? আউশউইৎস ? রগের দপদপ কানের ইয়ারড্রামে ।

কবিতাটা আবৃত্তি করে কী বলতে চাইছিস বুঝতে পারছি না, তবে তোর কন্ঠস্বর বেশ মধুর, বললাম, শুকনো গলায় খাঁকারি দিতে না হয়, তাই ঢোঁক গিলে ।

বেডরুমে ঢুকে তোর সুটকেস নামিয়ে রাখতে, তুই দেখলি সেন্টার টেবিলের ওপর ব্ল্যাক ডগ স্কচ আর একটা গেলাসে সামান্য মদ, কাল রাতে অর্ধেক খাইনি, কাজে মশগুল ছিলাম, বেঁচে গেছে কিছুটা ।

তুলে খেয়ে নিলি, এক চুমুকে,বললি, বড়ো ক্লান্ত হয়ে গেছি, জেট ল্যাগ, এত দীর্ঘ ফ্লাইট, কই আরেকটু দাও তো, গিলে বাকি অংশ শোনাই তোমায় । ভাবছ নাকি, যে ইলেকট্রনিক্স ইনজিনিয়ার কি করে কবিতা শোনাচ্ছে? তোমার দেয়া লিরিকাল ব্যধি । হ্যাঁ, তোমারই দেয়া, থরে-থরে বই, তাক-তাক বই, এনজয় করতুম, স্যাডনেস এনজয় করতুম, গ্রিফ এনজয় করতুম, তোমার অদৃশ্য বন্দিত্ব এনজয় করতুম, আর প্যাঁচ কষতুম, কে লোকটা, আমাকে নিয়ন্ত্রণ করে চলেছে, আমার হাঁটবার রাস্তায় অ্যাসফাল্ট পেতে সুগম করে দিচ্ছে, জীবনে একবারও হুঁচট খেয়ে পড়তে দিল না ।

এক পেগ মতন ঢালার পর সোডার বোতল খুলতে যাচ্ছিলুম, বললি, নো, নো, মাতন লাগতে দাও, খাবো তবে তো মনের কথা বলতে পারব, কতকাল যাবত চেপে গুমরে উঠেছে কথাগুলো ।

এক চোঁয়ে খেয়ে, ফ্ল্যাপার ছুড়ে ফেলে দিলি দীর্ঘ ঢ্যাঙ নাচিয়ে, বিছানায় চিৎ শুয়ে-শুয়েই আবৃত্তি করতে লাগলি, চোখ বুজে :

In the German tongue, in the Polish town

Scraped flat by the roller

Of wars, wars, wars.

But the name of the town is common

My Polack friend

#

Says there are a dozen or two

So I never tell where you

Put your foot, your root,

I never could talk to you.

The tongue stuck in my jaw.

আবৃত্তি থামিয়ে, আরও বারোটা স্তবক আছে, বললি,  মনে রেখো আই ওন ইউ, আমি তোমার অস্তিত্বের সত্বাধিকারিণী । কবির নাম জানো না ? খুঁজো , খুঁজো, খুঁজো ।

আমি : ঘুমিয়ে পড়, ক্লান্ত হয়ে গেছিস, দেখাই যাচ্ছে, রেস্ট নিয়ে স্নান করে, লাঞ্চ সেরে তারপর কথা হবে।

তুই : না, না, না, না, পালিও না, বসে থাকো, আমি ঘুমোবো আর তুমি এদিক ওদিক টেলিফোন ঘোরাবে, সেটি হচ্ছে না, মোবাইল কোথায়, অফ করে দাও বা সাইলেন্ট মোডে করে দাও । বসে থাকো, চুপটি করে বসে থাকো, আমি ঘুমোবার চেষ্টা করছি, ঘুম ভেঙে যেন তোমাকে বসে থাকতে দেখি । নয়তো, এতক্ষণে জেনে গিয়ে থাকবে আমার বিহেভিয়ার কেমন রাফ, আনকালচারড, মোটেই ভদ্রজনোচিত নয় , জাস্ট রিক্লাইন অন দ্যাট সোফা ।

বিছানা থেকে উঠে, সেন্টার টেবিলের ওপরে রাখা মোবাইল তুলে সুইচ অফ করে দিলি, ল্যাণ্ডলাইনের রিসিভারটা নামিয়ে রাখলি , আর চিৎ হয়ে শুয়ে পড়লি আবার, চোখ বুজলি ।

তুই চোখ বুজতেই খুঁটিয়ে দেখতে লাগলাম তোকে ।  তোর বারো ক্লাসের আইডেনটিটি কার্ডের ফোটোর সঙ্গে যৎসামান্য মিল আছে, ভরাট হয়ে উঠেছিস, ডেলিবারেটলি সেক্সি।

তোর আদেশ শুনে আশ্রয়ের ভালোলাগায় পেয়ে বসল আমায়, অথচ অতিথি তো তুই । আমার শরীর থেকে ব্যুরোক্র্যাটের পার্সোনা ছিঁড়ে ফেলে দিলি যেন ।

##

প্রজাপতিদের ফ্রিল-দেয়া শালুকের কোঁচকানো ঢেউ । আমি ? পাগলের ওড়ানো ঘুড়ি ।

বুকে, বিজয়ের আহ্লাদে মিশেছে জয়ের আছাড়, স্বপ্ন দেখার জন্য গড়ে-নেয়া দ্যুতিময় অন্ধকার ।

##

এর মতো, ওর মতো, তার মতো, কারো মতো নয় ।

যেন এমন, যেন অমন, যেন তেমন নয় ।

##

প্রায় দুঘণ্টা বসেছিলাম সোফায় হেলান দিয়ে, চোখ লেগে গিয়ে গিয়েছিল । চোখ খুলতে দেখি তুই পাশে বসে, আমার মুখের কাছে মুখ এনে, ল্যাভেণ্ডার আইসক্রিমের গন্ধের দূরত্বে, গভীর কালো চোখ মেলে, আমাকে তারিয়ে দেখছিস,  হাতে স্মার্টফোন । এত কাছে একজন যুবতীর মুখ, সুগন্ধ পাচ্ছি হাঁ-মুখের, ল্যাভেণ্ডার মাউথ ফ্রেশেনার ইনহেল করে থাকবি ।

কি গভীর চোখজোড়া, আমার ভেতর পর্যন্ত তিরতিরিয়ে সেঁদিয়ে গেল । কোথা থেকে পেলি এরকম চোখ, চোখের পাতা? তোর মা তোকে আঁস্তাকুড়ে ফেলে দেবার সময়ে জানত কি যে  তুই এরকম সুশ্রী আর স্মার্ট যুবতী হয়ে উঠবি, সেক্সি অ্যাটিট্যুড ঝলকাবে !

বললি, দেখছি, তোমার ভেতরের সোকল্ড ঈশ্বরের চেহারাটা কেমনতর, কত পার্সেন্ট হিউমান আর কত পার্সেন্ট গডলি, কিংবা কোনো গডজিলা বা কিংকং লুকিয়ে রয়েছে কিনা ।

গম্ভির হবার অভিনয় করলাম ।

তুই : ওউ-ওউ-ওউ-ওউ, দুচারগাছা পাকাচুলে রোমের গ্ল্যাডিয়েটারদের মতন দেখাচ্ছে তোমায় ; হেয়ার ডাই করা আমি একেবারে পছন্দ করতে পারি না । তোমার ঘুমন্ত পোজের গোটা দশেক ফোটো তুলে নিয়েছি, ইন্সটাগ্রাম, পিন্টারেস্ট, গুগল প্লাস আর আমার ফেসবুক পাতায় পোস্ট করে দিয়েছি, যাতে ফোটো তুলছি দেখে ডিলিট করার চেষ্টা না করো । একটা সেলফি তুলি, কি বলো, বলে আমার গলা বাঁহাতে জড়িয়ে সেলফি তুলে নিলি, বললি, এটা আপলোড করছি না, আপাতত করছি না, কখনও করব ।

তোকে প্রশ্রয় দিতে আমার ভালো লাগছিল । আর স্পর্শ ? অবর্ণনীয় । নবীকরণ, নবীকরণ, নবীকরণ ।

নারীশরীর, নারীশরীর, নারীশরীর । সুগন্ধ সুগন্ধ সুগন্ধ ।

##

স্পর্শের মর্মার্থ, মর্মার্থের রসায়ন, রসায়নের সম্পর্কে, রেণু, পরাগ, উড়াল, জীবন ।

শিশিরে কেউটের গন্ধ । উতরোল কোলাহল ।

##

তুই ফ্রেশ হয়ে নিয়েছিলি, আমি যখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, পারফিউম মেখেছিস, সিল্কের নাইটগাউন পরে নিয়েছিস, হালকা গোলাপি লিপ্সটিক লাগিয়েছিস, কাঁধ পর্যন্ত কোঁকড়া চুলে হয়ে উঠেছিস আকর্ষক, বললুম, ব্রেকফাস্ট করে নিয়েছিস ?

তুই জানালি ফ্রিজ থেকে ব্রেড নিয়ে টোস্টারে টোস্ট করে খেয়েছিস, কিচেনে গিয়ে দুমুঠো অ্যাসর্টেড বাদাম খেয়েছিস ।

তুই : হ্যাজেলনাট দেখলুম, ইনডিয়ায় আজকাল সবই পাওয়া যায় দেখছি, বললি ।

আবার ব্যঙ্গের পরিতৃপ্তি তোর কথায় ঝরল, বললি, তোমার প্যানিকড হবার প্রয়োজন নেই, ওয়াচম্যান না কি সেন্ট্রি, তাকে বলে দিয়েছি কেউ এলে বলে দিতে যে আজ সাহেব কারোর সঙ্গে দেখা করবেন না, ওনার এক আত্মীয় এসেছেন বিদেশ থেকে, সদর দরোজা বন্ধ করে এসেছি, এই ঘরের পর্দাও টেনে দিয়েছি, আর তুমি যা চাইছিলে, আমাকে অন্য ঘরে স্হানান্তরিত করতে, পাশের ঘরে আমার বিলংগিংস রেখে এসেছি, দেখলুম ঘরটাতে অ্যাটাচড বাথ রয়েছে, টিশ্যু পেপারের রোলও রয়েছে, আমার এখন রোল ইউজ করার অভ্যাস হয়ে গেছে । ডেস্কটপটা ইউজ করে নিলুম, বেশ কয়েকটা ই-মেল লেখা জরুরি ছিল । একটা শাঁখ দেখে ভাবলুম বাজাই জোরে আর তোমার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাই, তারপর মনে হল, নাঃ, বেচারা ব্যুরোক্র্যাট, সরকারি চেস্টিটি বেল্ট পরে বসে আরাম করছে ।

##

স্মার্টফোনটা বিছানার ওপর ছুঁড়ে ফেলে , তুই আমার কাঁধের ওপর দিয়ে দুটো হাত বাড়িয়ে আমাকে কাছে টেনে নিয়ে বললি, আই লাভ ইউ, আমি তোমায় ভালোবাসি, ইউ আর মাই লাভার, আই অ্যাম ইওর বিলাভেড, ওই ব্যুরোক্র্যাটিক চেস্টিটি বেল্ট খুলে ফ্যালো, আর স্বচরিত্রে এসো ।

আমি : কী বলছিস কি, আবোল তাবোল, বললুম।

তুই : ডোন্ট ট্রাই টু বিহেভ লাইক অ্যান ওল্ড বাবা । বাবা সাজার চেষ্টা কোরো না, আমি সবচেয়ে বেশি অপছন্দ করি বাবা অভিনয়কারীদের ।

আমি : আবার মদ খেলি ?

তুই : হ্যাঁ, মেরে দিলুম এক পেগ তুমি ঘুমোচ্ছ দেখে, কিছু করার নেই, মদের খোঁয়ারিতে তোমাকেই দেখছি কতক্ষণ হয়ে গেল, তোমাকে দেখার মাদকতার সঙ্গে ব্ল্যাক ডগের নেশা, আইডিয়াল । কতকাল তোমাকে দেখার কথা ভেবেছি, কেমন দেখতে ভেবেছি, দেখা পেলে কতগুলো টুকরো করব ভেবেছি, কোন টুকরোটা আগে খাবো ভেবেছি । বিছানায় রুবিক কিউব রয়েছে দেখলুম, ও আমি চেষ্টা করেও পারি না, আমার বোন অবশ্য এক মিনিটে করে ফেলতে পারে ।

আমি : ছাড় দিকি, গলা ছাড় ।

তুই : আবার অ্যান ওল্ড বাবা সাজার চেষ্টা করছ, ভুলে যেওনা মিস্টার প্রভঞ্জন প্রধান, আমার নাম ইতি প্রধান নয়, আমার নাম নেতি ব্যানার্জি । তারপর নাকে নাক ঠেকিয়ে, চোখে চোখ রেখে বললি, বলিউডি ফিল্মে যেমন দেখায়, সেই কাঁথাটা রাখোনি, যেটায় আমাকে মুড়ে ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে গিয়েছিল আমার রেপিস্ট বাবা আর ভিতু মা । রেপিস্ট ছিল নিশ্চয়ই, দেখছ তো আমি কতো ওয়েল বিল্ট লম্বা চওড়া, বায়োলজিকাল বাবা গায়ের জোর খাটিয়ে রেপ করেছিল বায়োলজিকাল মাকে, মা হয়ত কাজের বউ ছিল কিংবা চাষি বউ বা পরিচারিকা বা হোয়াটএভার, হু কেয়ার্স ।

আমি : ঠিক আছে, গলা ছাড় ।

তুই : মিস্টার প্রভঞ্জন প্রধান, গলা ছাড়ব বলে অত দূর থেকে উড়ে আসিনি । থাকব এখন, একমাস, দুমাস, তিনমাস, যত দিন না আমার উদ্দেশ্যপূরণ হয় । ছাড়াবার চেষ্টা কোরো না, আমার গায়ে তোমার চেয়ে বেশি জোর আছে বলে মনে হচ্ছে, তোমার হাইটের সমান আমি, হাতও তোমার চেয়ে দীর্ঘ ।

তোর চোখের আইল্যাশ কি নকল, এত বড়ো দেখাচ্ছে ? এড়াতে চাইলাম ।

আমার কিচ্ছু নকল নয়, বলে, উঠে দাঁড়ালি তুই, ফাঁস খুলে গাউনটা ফেলে দিলি কার্পেটের ওপর, নগ্ন, জড়িয়ে ধরলি আমাকে, বললি, দেখে নাও, আগাপাশতলা খাঁটি ।

কী করছিস কি ! আমি চড় কষিয়ে দিলাম তোর গালে ।

তুই আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরলি, ঠোঁটের ওপর ঠোঁটের আলতো ঠোক্কোর মেরে মেরে বলতে লাগলি, আই লাভ ইউ, আই লাভ ইউ, আই লাভ ইউ, আই লাভ ইউ ।

আচমকা দুহাত দিয়ে আমার পাঞ্জাবির বোতামের জায়গায় টান দিয়ে ছিঁড়ে ফেললি, মুখ গুঁজে দিলি আমার বুকে, ঠোঁট ঘষতে লাগলি, বলতে লাগলি, আমি এখনও ভার্জিন, তোমার জন্য, তোমার জন্য, তোমার জন্য, কবে থেকে খুঁজছি তোমায়, সেই ক্লাস এইট থেকে, আমি তোমাকে ভালোবাসি । শুইয়ে দিলি সোফার ওপরে, টান মেরে খুলে দিলি আমার লুঙ্গি, বললি, তবে, ইউ আর গেটিং ইনটু ফর্ম, নাউ মেক লাভ, আমাকে টেনে নামিয়ে দিলি কার্পেটের ওপর, মেক লাভ, প্রভঞ্জন, তোমার অদৃশ্য ব্যুরোক্র্যাটিক চেস্টিটি বেল্ট খুলে ফ্যালো ।

##

শিশিরে কেউটের গন্ধ । উতরোল কোলাহল ।

স্ফিংক্স, মরুভূমি, পিরামিড, মমি । চাউনির অতিশয়োক্তি ।

স্পর্শের মর্মার্থ, মর্মার্থের রসায়ন, রসায়নের সম্পর্কে, রেণু, পরাগ, উড়াল, জীবন ।

##

আমি উঠে বসে আরেকবার চড় মেরে বললাম, স্টপ দিস।

চড় মেরে ফিলগুড অনুভূতি হাতের তালু বেয়ে ছড়িয়ে পড়ল শিরা-উপশিরায়, নেমে গেল বুক-পেট-জানু হয়ে পায়ের দিকে, শিউরে-ওঠা কাঁপুনির  এক ভালো লাগা ।

তুই : স্টপ ? তোমার শরীর তো রেসপণ্ড করছে, লুকোচ্ছ কেন যে তুমিও আমাকে ভালোবাসো । বাবাগিরি ফলিও না, যথেষ্ট বাবাগিরি ফলিয়েছ, এবার প্রভঞ্জনে এসো মিস্টার প্রধান, আমি নেতি ব্যানার্জি, এসো, আমার চোখের দিকে স্পষ্ট করে তাকাও । তাকাও, চোখের পাতা ফেলবে না, তাকাও, আমার মুখের দিকে তাকাও। তুমি যে আমার সো কল্ড বাবা নও, ভুলে যাচ্ছ কেন ? আর হলেই বা বাবা, সম্পর্ক পাতাও, ইনসেস্টের সম্পর্ক, প্রিহিসটরিক যুগে যেমন মেয়েদের সঙ্গে বাবাদের সম্পর্ক হতো, যেমন বাঘ সিংহ হাতি ঘোড়ার হয় ।

বলতে লাগলি আই ওয়ান্ট ইওর বেবি, আমি তোমার বাচ্চা কনসিভ করতে চাই, ডোন্ট রেজিস্ট, তোমার মুখে আঁচড়ে-কামড়ে বাইরে বেরোনো বন্ধ করে দেবো কয়েক দিনের জন্য । নখ দেখেছ, যৎসামান্য ছুঁচালো ; দাঁতও ব্যবহার করতে পারি । আমার সেক্সের চাহিদা নেই ; আমি বাচ্চা চাই ।

দুহাতের চেটো দেখিয়ে বললি, এই দ্যাখো, মেহেন্দির নকশায়  ডান হাতে লেখা রয়েছে ড্যাড আর বাঁহাতে ব্রো-প্রো ; আমার উদ্দেশ্য পরিষ্কার ।

##

প্রলোভনের সমস্যা চিরকাল এই যে জীবনের তাৎক্ষণিক সুযোগ আর পাওয়া যায় না ।

ছেড়ে দিলাম শরীরকে তোর হাতে, টেনে তোকে বিছানায় নিয়ে যেতেই বুঝতে পারলাম যে  তোকে এই ভাবেই পেতে চেয়েছি, বড়ো করে তুলেছি, অপেক্ষায় থেকেছি যে একদিন না একদিন তুই আসবি ; নেতি ব্যানার্জি আমার, আমিই তাকে আঁস্তাকুড় থেকে তুলে আনার পর নারীত্বে প্রতিষ্ঠা দিয়েছি ।

আমাকে জড়িয়ে তুই নিজের ওপর তুলে নিলি  । তোর বুকে মুখ গুঁজলুম, কী তপ্ত তোর বুক । উত্তেজনায় জড়িয়ে ধরলুম তোকে ।

বললুম, আমিও ভার্জিন রে, সেক্স করিনি এখনও । দুবছর আগে পর্যন্ত আমার নাইট ফল হতো, স্বপ্নে তোকে পেয়ে, চটকে-মটকে  । ইউরোলজিস্টকে কনসাল্ট করেছিলাম, সে বললে ম্যাস্টারবেট করে বের করে দিতে । কম বয়সে করতাম, তোর মুখ মনে করেই করতাম, কিন্তু এত বয়সে কেউ কি ম্যাস্টারবেট করে ; ইচ্ছে করেছে, কিন্তু করিনি, কেমন নোংরা মনে হতো, ওই যে তুই চেস্টিটি বেল্টের কথা বলছিস ।

আমিও করিনি, ইন দ্যাট সেন্স করিনি, তোমাকে ইম্যাজিন করে ডিজিটালি যতটুকু  আনন্দ পাওয়া যায় ; ননডিজিটালি করলে নাকি ভার্জিন থাকা যায় না, জাঠনি বাড়ির ভিতু মেয়ে বলতে পারো । এই তো তোমার বেডশিটে দ্যাখো, ব্লাড । চাদরটা তুলে দিতে হবে, আমি এই অংশটা কেটে নেবো, মেমেন্টো হিসাবে, নয়তো তোমার সারভেন্ট সকালে এসে সন্দেহ করবে ।

মগজে প্রশ্ন উঠল, কত স্বাভাবিক বোধ করছি এখন, কেন, এই দৈহিক সম্পর্ক ঘটে গেল বলে ? আড়ষ্ট লাগছে না তো ! আমাদের দেখা হয়নি কত বছর, অথচ দুজনেই দুজনের অতিপরিচিত ছিলাম ।

বললাম, তুলে দিস, অনেক চাদর আছে, কালারড প্রিন্টেড চাদরও আছে । জাঠদের সংস্কৃতি থেকে পেয়েছিস নাকি এই বিদকুটে প্রদর্শনী ?

তুই : হতে পারে, অভিভাবক মা যখন জাঠনি, কিছু তো পাবো । যাকগে, এবার এলেকট্রা বলে ডাকো ।

আমি : এলেকট্রা, মাই ডিয়ার চাইল্ড, জানি তুই নিও টেরেস্ট্রিয়াল ।

তুই : জানলে কি করে ?

আমি : আন্দাজে, নেটি যখন, তার মানে নিও টেরেস্ট্রিয়াল । আমি মনে মনে তোকে ইতি নাম দিয়েছি ।

তুই :না, তুমি হলে ইটি,  এক্সট্রা টেরেস্ট্রিয়াল । মঙ্গলগ্রহের সরকার তোমায় চেস্টিটি বেল্ট পরে পাঠিয়েছে।

আমি : কিন্তু তুই আনওয়েড মাদার হয়ে সমাজে থাকবি কী করে ?

তুই : ধ্যুৎ, আমি আমেরিকায় থাকি । তুমি কি আমাকে রিচুয়ালি বিয়ে করতে চাও ?

আমি : হ্যাঁ ।

তুই : আমি কনসিভ করতে চাই, বিয়ে-ফিয়ে আবার কি ? এক পাকেই বাঁধতে চাই না নিজেকে তো সাত পাকে । তোমার রিমোট কন্ট্রোল যথেষ্ট প্রয়োগ করেছ, এবার আমার পালা, ড্যাডি ডিয়ারেস্ট । বাট আই উড  থিংক ওভার ইয়র প্রোপোজাল ।

আমি : কি করে জানলি যে বাচ্চা পেতে হলে এই সব করতে হয় ?

তুই : আঁস্তাকুড়ে শুয়ে শুয়ে শিখে ফেলেছি ; তুমি কি করে শিখলে ?

আমি : শরীরের জিপিএস কাজ করল ; উ উ উ উ উ উ করছিলিস কেন ? অরগ্যাজমের উত্তেজনা রিলিজ করার জন্য ?

তুই :হাঃ, এতক্ষণ তোমাকে কবিতা শোনালুম, রাইমিং মার্ক করোনি ? উ উ উ উ ? মহাকাব্যের এলেকট্রার স্বপ্নপূরণ হল বলে মনে হচ্ছে ।

আমি : না, মার্ক করিনি, টেন্সড আপ ছিলাম, তুই হঠাৎ এসে পড়েছিলিস, কী করব ভেবে পাচ্ছিলাম না, লস্ট ফিল করতে আরম্ভ করেছিলাম ।

তুই বললি, লস্ট ? নিজের মধ্যে নয়, আরেকজনের মধ্যে হারিয়ে যেতে হয়, ইতস্তত করতে নেই, সব সীমা মানুষের বানানো, ভাঙো যেদিন যখন চাও, নেভার গেট লস্ট  । তারপর আরম্ভ করলি তোর গায়িকাসুলভ কন্ঠস্বরে :

It struck me a barbed wire snare

Ich, ich, ich, ich,

I could hardly speak

I thought every German was you

And the language obscene

#

An engine, an engine

Chuffing me off like a Jew.

A Jew to Dachau, Auschwitz, Belsen.

I began to talk like a Jew.

আমি : আমাকে শোনাবি বলে মুখস্হ করে রেখেছিস ? কার কবিতা বললি না তো ?

তুই : খুঁজো, খুঁজো । হ্যাঁ, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আবৃত্তি করেছি, কল্পনা করেছি তোমাকে কেমন দেখতে।

আমি : কেমন ? ফানুসনাভি ব্যাঙ-থপথপে শুশুকমাথা আমলা, চোখে-চোখে শেকল আঁকা ভিড়ের মধ্যে এঁদো বিভাগের কেঁদো ?

তুই : হা হা, সেল্ফডেপ্রিকেট করছ কেন, লেডিজ টয়লেটের দেয়ালে আঁকা ড্রইংয়ের মতন । কোরো না, শিরদাঁড়া ঘিরে তালের আঁটির মতন শুকিয়ে যাবে ।

আমি :কত কথা বলতে শিখে গেছিস ।

তুই : থ্যাংকস ফর দি কমপ্লিমেন্ট, সবই মোর অর লেস বরোড ফ্রম বাঙালি ক্লাসমেটস  ।

আমি : তাহলে কি করব ? পোলকাফোঁটা পুঁইফুলে দুভাঁজ করা হেঁইয়োরত বাতাস হয়ে উড়ব?

তুই : হ্যাঁ, হেঁইয়ো করাতেও তো পাল তুলতে হল আমাকেই ।

আমি : এখন দ্যাখ, চিংড়িদাড়া আঙুল দিয়ে খুলছি বসে জটপাকানো মুচকি-ঠোঁটের হাসি ।

তুই : ইয়েস, বেটার দ্যান আই এক্সপেক্টেড ; আমি ভেবেছিলুম তুমি সত্যিই ড্যাডি টাইপের হবে, পেট মোটা, আনস্মার্ট, লেথারজিক, বুকে চুল নেই, বগলে চুল নেই, কুঁচকিতে চুল নেই ।

আমি : কী করতিস অমন হলে ।

তুই : এখন যা করলুম, তা-ই করতুম, তোমাকে কেমন দেখতে ওটা ইররেলিভ্যান্ট ।

আমি : আমি তো আরোহী-ফেলা পুংঘোড়ার লাগাম-ছেঁড়া হ্রেষা ।

তুই : হ্যাঁ, আই ওয়ান্টেড ইউ, দি পার্সন হু ওনড মি । নাউ আই ওয়ান্ট দি সোয়েটিং স্ট্যালিয়ন, প্রত্যেকদিন , অফিস থেকে ফিরতে দেরি করবে না, আর, আমি সকালেও তোমাকে চাই, দি মর্নিং গ্লোরি । আমার কাছে সেক্স অত গুরুত্বপূর্ণ নয়, আমি তোমাকে আমার জীবনে কখনও অতীত হতে দিতে চাই না, তাই আমার বেবি চাই, সম্পর্ককে যে বাচ্চা অতীত হতে দেবে না, যতদিন সে বেঁচে থাকবে ততদিন, আর তারপর তোমার সঙ্গে আমার সম্পর্ককে নিজের ছেলেমেয়ের মাধ্যমে বর্তমান থেকে ভবিষ্যতের দিকে বয়ে নিয়ে যাবে । ক্যারি অন অ্যাণ্ড অন অ্যাণ্ড অন ইনটু ইটারনিটি, ইনটু নিউ সানরাইজ এভরি ডে ।

তোকে বললুম, এত ফ্যাক-ফ্যাক করে কনভেন্টি ইংলিশ বলিসনি, দিল্লিতে এখন হিন্দিঅলাদের রাজত্ব শুরু হয়েছে, ওপরে উঠতে হলে হিন্দির বাঁশের মই বেয়ে উঠতে হবে, নেহেরুভিয়ান অক্সব্রিজ বাবু-মন্ত্রীদের যুগ ফুরিয়েছে । মোগল সম্রাট আকবরের বংশধররাও ক্যারি অন করে পোঁছেছিল ক্যাবলা বাহাদুর শাহ জাফরে, যত ক্যারি অন হয় তত ফিকে হতে থাকে ভবিষ্যত । মোতিলাল নেহেরু পৌঁছেচে রাহুল আর বরুণ গান্ধিতে ।

তুই : ভালো বলেছ, ফাক-ফাক হিন্দির বাঁশ; এ হল অকলোক্র্যাসি বা টির‌্যানি অফ দি মেজরিটি, মেজরিটি সেক্টের পুরুষরা পাকিস্তানে কি করছে দেখতেই পাচ্ছ, তুই খিলখিলিয়ে বললি । যোগ করলি, কাঁধ শ্রাগ করে, হিন্দি সাবজেক্টেও প্রতিটি ক্লাসে সবচেয়ে বেশি মার্কস পেতুম, সো আই ডোন্ট কেয়ার ; আই ওন ইউ ইন অল দি ইনডিয়ান ল্যাঙ্গুয়েজেস । আমার জিভে আছে তোমার অস্তিত্বের মালিকানা ।

##

 

এর মতো, ওর মতো, তার মতো, কারো মতো নয় ।

যেন এমন, যেন অমন, যেন তেমন নয় ।

##

আমি : আই ডিডন্ট ওন ইউ ; তুই তোর নিজের মালিক, কেউ কাউকে ওন করে না ।

তুই : করে, সম্পর্ক হল অন্যের আত্মার মালিকানা । তুমি আমার আত্মার মালিক, আমি তোমার ।

আমি : আত্মা ? হয় নাকি সেরকম কিছু ?

তুই : কেন হবে না ! না হলে কী করে তোমাকে খুঁজে বের করলুম, কাঠঠোকরা যেমন গাছের বাকলে ঠোঁটের ঠোক্কোর মেরে মেরে পোকা বের করে আনে ।

আমি : পোকা ?

তুই : ওউ-ওউ-ওউ-ওউ, দি মেল অরগ্যান লুকস লাইক এ বিগ ক্যাটারপিলার, উত্তুঙ্গ গুটিপোকা, প্রজাপতির নয়, টাইগার মথের । টু বি ফ্র্যাংক, আজকেই আমি স্পষ্ট করে দেখলুম প্রত্যঙ্গখানা কতটা আর্টিস্টিকালি বিল্ট । তোমার প্রত্যঙ্গখানা বোধহয় গ্রিসে বা রোমে তৈরি, খাজুরাহোয় নয় ।

##

আমি : চণ্ডীগড়ে, জগদীশের বাড়িতে আগে যাওয়া উচিত ছিল তোর ।

তুই : দুটো কারণে যাইনি ; উনি তোমাকে ইনফর্ম করে দিতেন আর তুমি নির্ঘাত লুকিয়ে পড়তে, আমার পরিকল্পনা, জীবন নিয়ে ভাবনা, তোমাকে আগাপাশতলা খেয়ে ফেলার ইচ্ছে, সব গোলমাল হয়ে যেত ।

আমি : আর দ্বিতীয় ?

তুই : বৈদেহী ওর বরকে ডিভোর্স দিয়েছে, বরটা গে, নেশাভাঙ করে, বাস্টার্ড, কোনো গে ছেলেকে বিয়ে করলেই পারত, কোর্ট তো অ্যালাউ করে দিয়েছে । স্কাউন্ড্রেলটা বৈদেহীকে কামড়ে দিয়েছিল, হাতে, কাঁধে। ওর বিধবা শাশুড়ি আর ওর বর দুজনে মিলে এক রাতে, তখন রাত দুটো, বৈদেহীকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিল, ওর মোবাইল কেড়ে নিয়ে, হায়দ্রাবাদের  রাস্তায় ভেবে দ্যাখো ; সাইবারাবাদ আইটি ইনডাস্ট্রির এক এমপ্লয়ি স্কুটারে ফিরছিল, তাকে থামিয়ে বাড়িতে ফোন করতে বাপি, আই মিন আঙ্কলবাপি, ওনার আইএস বন্ধুকে জানায়, তিনি বৈদেহীকে নিজের বাড়ি নিয়ে গিয়ে রাখেন, আর পুলিসে এফ আই আর করেন ।

আমি : জানি, আমাকে আবার কি বলছিস, আমিই তো পরিচিত একজন আন্ডার সেক্রেটারিকে বলে বৈদেহীর চণ্ডীগড় ফেরার ব্যবস্হা করেছিলাম । জগদীশের তো শুনেই ব্লাড প্রেশার লো হয়ে গিয়েছিল ; সারাজীবন হরিয়ানায় কাটাল, বাইরের ক্যাডারের অফিসারদের সঙ্গে ওর যোগাযোগ প্রায় নেই ।

তুই : ওউ-ওউ-ওউ-ওউ, তুমি ? তুমি ? তুমি ? তোমার ভূমিকা, অ্যাজ ইউজুয়াল, ওনারা চেপে গিয়েছিলেন, বলেননি আমাকে । বলতে পারতেন, আমি তো আর তক্ষুণি আমেরিকা থেকে উড়ে তোমায় কবজা করতে আসতুম না ।

তুই : আরিয়ানও আঙ্কলবাবা আর মাকে, আই মিন আন্টিমাকে, না জানিয়ে বিয়ে করে চলে গেছে ছত্তিশগড়ের রায়পুরে । ওনারা যথেষ্ট ডিপ্রেসড, আই অ্যাম শিওর । যাবো না ওনাদের বাড়ি, জানতে দিতেও চাই না যে আমি ইনডিয়ায় এসেছি।

আমি : জানি, আমি জগদীশকে বলেছিলাম যে বৈদেহীর পাত্র বিশেষ সুবিধার বলে মনে হচ্ছে না, একটা পুলিশ এনকোয়ারি করিয়ে নিই, তা ওর আর অমরিন্দরের টাকাকড়ি সম্পর্কে এমন লোভ যে কানে হিরের টপ-পরা পাত্রের বানজারা হিলসের বাড়ি, বিএমডাবলিউ গাড়ি  আর ব্যবসার সাইনবোর্ড দেখে ভিরমি খেয়ে গিয়েছিল, শেষে এই বিপদ ডেকে এনেছে ।

তুই আচমকা বললি, আমি তো শুনেছিলুম, বৈদেহী অব্রাহ্মণ কাউকে পছন্দ করত, তার বয়স নাকি ওর চেয়ে চোদ্দো-পনেরো বছর বেশি, ওনারা তাতে রাজি হননি, সেই লোকটি সুদর্শন, ওয়েল বিল্ট, আইএএস, তোমার মতো এজিএমইউ ক্যাডারের ।

আমি : তা জানি না, ওরা বলেনি কখনও এ-ব্যাপারে, বললে মধ্যস্হতা করতাম ।

তুই : করতে ? আর ইউ শিয়র ?

আমি : আরিয়ানের পছন্দ করা মেয়েটাকে অ্যাকসেপ্ট করে নিতে বলেছিলাম, করল না, ট্রাইবাল ফ্যামিলির বলে । আরিয়ান হল অ্যানথ্রপলজিস্ট, যে মেয়েটিকে বিয়ে করল তাদের সমাজে ঢুকে বিস্তারিত জেনে নিতে চাইছে, তাতে দোষের কি? শুনতে ট্রাইবাল, আমি ফোনে কথা বলেছি মেয়েটির সঙ্গে, স্কুলে পড়ায়, প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্রী ছিল । জগদীশ ভাবল যে ওর ভবিষ্যৎ প্রজেনির ব্রিড নষ্ট হয়ে গেল । ব্রিড বলে কিছু হয় নাকি, তোকে দেখে শেখা উচিত ছিল ওদের, তোর ব্রিড কেউ জানে ? আজ কোথায় পৌঁছে গেছিস ।

##

লোকে বলে, বলেরে, ঘরবাড়ি ভালা নয় আমার….

মাটির পিঞ্জিরার মাঝে বন্দি হইয়ারে…..

কানাই তুমি খেইর খেলাও কেনে….

নিশা লাগিল রে, নিশা লাগিল রে, নিশা লাগিল রে….

##

তুই : ধ্যুৎ, এইসব প্রসঙ্গ তুলছ কেন ! আমার তো অ্যাপ্রিহেনসান ছিল, আতঙ্কও বলতে পারো, এসে দেখব, একজন হাড়গিলে টাকমাথা চশমাচোখ বুড়ো অন দি ভার্জ অফ রিটায়ারমেন্ট । আমার ডিটেকটিভ এজেন্সি প্রচুর সময় নষ্ট করে দিলে তোমায় লোকেট করতে, আমিই ওদের আঙ্কলবাপি আর মা, আই মিন আন্টিমায়ের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নম্বর দিয়ে বললুম ফাইনানশিয়াল ট্রইল ধরে এগোতে । আঙ্কলবাপি তো এতো ঘুষ খায় যে ওরা ডাইভার্টেড হয়ে যাচ্ছিল ; তখন ওদের বললুম পুরোনো ট্রেইল ধরে এগোতে, যখন আমি আইআইটিতে  পড়তুম, আর আমার অ্যানুয়াল ফিস এটসেটরা পে হচ্ছে, সেই সময়ের ট্রেইল ।

আমি : বুড়ো হলে কি করতিস ।

তুই : সুইসাইড, জোক করছিনা, বুড়ো হলে তার কোঁচড় থেকে ফুলঝুরির বদলে কুয়াশা উড়ত । কুয়াশায় বাচ্চা হয় না ।

আমি : ইশারার সাহায্যে বেশ পোয়েটিক কথাবার্তা বলতে শিখেছিস দেখছি ।

তুই : বাঙালি ব্যাচমেটদের কনট্রিবিউশান । প্রচুর বাংলা গালাগাল জানি । বলব ? হিন্দিও জানি, গিগলিং টাইপ । হরিয়ানভি গালাগাল কিন্তু বেশি ইউজার-ফ্রেণ্ডলি ।

আমি : না না, বলতে হবে না । বুড়োর বদলে কি পেলি ?

তুই : কোঁচড় থেকে বকুল ফুলের ঝরণা ঝরাতে পারে এমন মাসকুলার স্ট্যালিয়ন । এসো, বুলশার্ক, আরেকবার হয়ে যাক ।

নিজেকে নিঃশব্দে বলতে শুনলাম, প্রভঞ্জন, তুমি কতোকাল নেতির জন্য অপেক্ষা করেছ, আর লজ্জায় বিব্রত বোধ কোরো না, নিয়ে নাও, যতো পারো নিয়ে  নাও, একেই যদি প্রেম বলে তাহলে চুটিয়ে ভালোবেসে নাও, প্রেমকে গোপন রেখো না, একেই তো চাইতে তুমি, নিজেকে এই মেয়েটির বাবা বলে মনে কোরো না।

এতকাল যুবক-যুবতীদের পারস্পরিক সান্নিধ্য আর প্রেমের প্রদর্শনী দেখে হিংসে করতাম, আড়চোখে,   ভুলেই গিয়েছিলাম যে আমি প্রভঞ্জন প্রধান, নিজেকে নিজে ভাবতে আড়ষ্ট বোধ করতাম, ভয়ও পেতাম, মনে মনে তোকে ধন্যবাদ দিলাম, নিজেকে প্রভঞ্জন প্রধান হিসাবে নিজের কাছে তুলে ধরার যোগ্য করে তোলার জন্য, আমার ভেতর থেকে আমাকে প্রসব করার উপযুক্ত করে তোলার জন্য, বুঝতে পারলাম রে, যে আমি কোনও স্হাবর-স্হির বস্তুপিণ্ড নই, তোর শিশুকাল থেকে আমিও তোর পাশাপাশি গড়ে উঠেছি, তুই না এলে আমার অতীত থেকে যেত একেবারে ফাঁকা , ব্যথার মোড়ক খুলে আরেক ব্যথার সাথে মেশানো হয়ে উঠত না ।

বললাম, হোক, উ উ উ উ করিসনি, প্লিজ ।

তুই : ওউ-ওউ-ওউ-ওউ, তুমি এক্টিভ হও, আমি তোমাকে কবিতাটার একটা রেলিভ্যান্ট প্যারা শোনাচ্ছি, বেশ মজার হবে, না ? কবি কখনও ভাবতেও পারেননি যে ওনার কবিতা এইভাবে কাজে লাগানো হবে, স্টার্ট ।

No God but a swastika

So black no sky could squeak through

Every woman adores a Fascist,

The boot in the face, the brute

Brute heart of a brute like you

পাশে শুয়ে পড়লাম, বললাম, আমাকে ফ্যাসিস্ট বলছিস, ব্রুট বলছিস, অতদূর থেকে উড়ে এই কথা বলতে এলি ?

তুই : ব্রুট ফ্যাসিস্ট ছাড়া আর কি ? আমার জীবনকে একেবারে আয়রন গ্রিপে রেখেছিলে, গেস্টাপো কেজিবি সিআইএর মতন নজর রেখেছো সদাসর্বদা । আমি ভিতু টাইপের নই, তুমি যদি বিদ্রোহ না করো তাহলে ভালোবাসা পাবে না, ভালোবাসতে গেলে গায়ে আঁচড়-কামড়ের রক্ত ঝরবে, ভালোবাসায় মাংসের সঙ্গে মাংসের জখমগুলো খুবই সুন্দর, এমনকি মধুময় বলা যেতে পারে, প্যাশনে রক্ত গরম হয়ে উঠবে, তবেই তো ভালোবাসার আমেজ নিতে পারবে । ভয়ও যদি করে, ঝাঁপাতে হবেই ।

আমি : এলি কেন তাহলে ?

তুই : আমি ঝাঁপিয়ে পড়লুম । তোমার গ্লোরি দখল করে তোমার প্রথম রক্ত প্রথম স্পার্ম নেবো বলে ; এখন তোমার মাথার পেছন থেকে হ্যালো ঝরিয়ে দিয়েছি, তোমার রক্ত পালটে দিয়েছি, তোমার যিশুখ্রিস্টগিরি শেষ করে দিয়েছি । তুমি আর আগের প্রভঞ্জন প্রধান নও, না ব্রো-প্রো ?

আমি : জানিস ব্রো-প্রো ?

তুই : জানিতো, আঙ্কলবাপি আর আন্টিমা ওই নামেই তো উল্লেখ করেন তোমায়, তুমি সামনে কোনোদিন না এলেও আমি অনুমান করেছিলুম যে এই ব্রো-প্রো লোকটাই আমাকে কনট্রোল করছে, দি ব্লাডি ফ্যাসিস্ট ড্যাডি, দি ডিকটেটরিয়াল পালক পিতা, অ্যাবরিভিয়েট করলে হয় পাপি । তোমার ব্যাচমেটরা আর পরের আগের ব্যাচের সবাই তোমাকে ব্রো-প্রো মানে ব্রাদার প্রভঞ্জন বলে ডাকে, জানি ।

আমি : বিয়ের মেহেন্দি-নকশা কোথায় করালি ?

তুই : হোটেলে রিসেপশানিস্ট কে বলতেই ও পাঠিয়ে দিলে ঘরে ; লাগিয়ে বসে রইলুম চার ঘণ্টা, তোমার প্রতি ডিভোটেড, একা-একা আমার মেহেন্দি সেরিমনি, পরে দুজনে মিলে সঙ্গীত সেরিমনি করব ।

##

 

স্পর্শের মর্মার্থ, মর্মার্থের রসায়ন, রসায়নের সম্পর্কে, রেণু, পরাগ, উড়াল জীবন ।

চাউনির কোলাহল, উতরোল শ্বাস ।

##

এর মতো, এর মতো, তার মতো, কারো মতো নয় ।

যেন এমন, যেন অমন, যেন তেমন নয় ।

##

 

আমি : ওই স্টিলের আলমারিটা খোল, বাঁদিকে একটা সেফ আছে, সেটাও খোল, চাবি সামনের ড্রয়ারে আছে ।

তুই : কী আছে সেফে ? আমার গয়না-ফয়না টাকাকড়ি সম্পত্তি-ফম্পত্তি চাই না ।

আমি : খুলে তো দ্যাখ, যা আছে নিয়ে আয় বিছানার ওপর ।

তুই সম্পূর্ণ নগ্ন,  ড্রয়ার থেকে চাবি নিয়ে আলমারি খুলে সেফ থেকে কাগজপত্র বের করে প্রায়-স্তম্ভিত হয়ে গেলি, বললি, এতো আমার স্কুলের আইডেনটিটি কার্ডগুলো, ফাইনালের রেজাল্টগুলো, আর এটা, আরে, মাই গড, এতে তো আমার ইনটারভিউ বেরিয়েছিল, সিসটার অ্যানে নিয়েছিলেন, আর এটা, এটা তুমি ?

আমি : হ্যাঁ, আমি, তোকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি, তুই তখন এক বছরের ।

তুই : তুমি তো দারুন দেখতে ছিলে গো , পালক পিতা হের হিটলার, ওয়ান হু ওনস মি । ফোটোতে তোমার মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে, পুরো সূর্যের গুঁড়ো মুখে মেখে হাসছ । ডানহাতে ওটা তোমার কনট্র্যাক্ট, তাই না, আমার লাইফ লং এডুকেশান স্পনসর করার ?

আমি : দুটো কনট্র্যাক্ট রে, একটা তোর স্বনির্ভর না হওয়া পর্যন্ত এডুকেশান স্পনসর করার, আরেকটা তোকে অ্যাডপ্ট করার ? তোর পদবির এফিডেভিট জগদীশের কাছে ছিল, তোর স্কুল লিভিং সার্টিফিকেট পাবার পর হয়তো ডেসট্রয় করে দিয়েছে ।

তুই : মাই গড, তুমি অ্যাডপ্ট করেছিলে ? আমি ভাবতুম বাপি, মানে আঙ্কলবাপি, করেছিল, আমার নামে তোমার পদবির বদলে তাহলে আঙ্কলবাপির পদবি জুড়লে কেন ? অ্যাডপ্ট করেও ডিজওন করতে চাইলে, আমি তোমার কনট্র্যাকচুয়াল ডটার বলে ?

আমি : না, আমি তো মোড়লচাষার ছেলে, প্রধানরা মাহিষ্য হয় ; তোকে ব্রাহ্মণ করার জন্যে জগদীশকে দিয়ে এফিডেভিট করিয়ে তোর পদবি ব্যানার্জি করিয়ে নিয়েছিলাম ।

তুই : ধ্যুৎ, আমার ওবিসি হবার সুযোগটাই কেড়ে নিয়েছিলে, কত সুযোগ-সুবিধা পেতুম, তা নয়, বামুন, শ্যাঃ। অবশ্য একদিক থেকে ভালো যে আমি তোমার মেয়ে নই, জাস্ট অ্যান অ্যাডপ্টেড বেবি, এলেকট্রা অফ দি এলেকট্রা কমপ্লেক্স লাস্ট । দি ইনফেমাস এলেকট্রা, বুকের মধ্যে পুষে রাখা ইনসেসচুয়াস ব্যাটলক্রাইয়ের এলেকট্রা, ফসটার ফাদারের  প্রতিষ্ঠিত সন্তান । ইইইইইএএএএএ।

আমি : সিচুয়েশান ভিলিফাই করছিস কেন ?

তুই : তোমার সংগ্রহের কাগজপত্রগুলো দেখব পরে সময় করে ।

আমি : হ্যাঁ, পরে সময় করে বসে বসে দেখিস, যখন অফিস চলে যাব । একটা পেপার কাটিং আছে, দেখতে পারিস, তুই যে ডাস্টবিনে পড়েছিলিস, তার সংবাদ ।

তুই : তোমার বাঁহাতের কাটা দাগটা সেই বালি মাফিয়াদের আক্রমণে পাওয়া, না ?

আমি : তুই কি করে জানলি ? ও তো অনেককাল আগের ঘটনা । হ্যাঁ, বেআইনিভাবে নদীর বালি তুলে নিয়ে গিয়ে বেচত বালিমাফিয়ারা, তাদের ট্রাক ক্রেন লোডার সিজ করার অর্ডার দিয়েছিলাম, তারই পরিণতি ।

তুই : জানি, তার পরের দিনই তোমার বদলি হয়ে গেলে ।

আমি : আর টিভিতে দেখালো মাফিয়াকর্তা জেল থেকে বেরিয়ে দু-আঙুলে ভি এঁকে হাসছেন ; সাঙ্গোপাঙ্গোরা তার জয়ধ্বনি করছে ।

 

প্রদাহ, যন্ত্রণা, আশঙ্কা, আতঙ্ক, উদ্বেগ, মুখের ভিতরে জিভে ।

তোর মতো, তোর মতো, তোর মতো, তোর মতো  ঐশিতা, উপলব্ধি, সান্ত্বনা, অনুবোধ ।

 

তুই : আমি তোমাকে তিনটে চিঠি লিখেছিলুম, জানো ?

আমি : চিঠি ? কই পাইনি তো ? স্কুল কি সেন্সর করে দিয়েছিল ? নাকি জগদীশ-অমরিন্দর ?

তুই : ধ্যুৎ, সেসব চিঠি পাঠাই-ইনি তোমায়; তুমি তো ইনভিজিবল ডুগুডার, জাস্ট অ্যান্টিসিপেট করে যে তুমি আমার জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করছ, আমি দশ, এগারো আর বারো ক্লাসে তোমায় চিঠিগুলো লিখেছিলুম।

আমি : রেখে দিতে পারতিস তো ! পড়তাম ।

তুই : তোমাকে প্রেমিকড্যাডি মনে করে লিখেছিলুম ।

আমি : ডেসট্রয় করে দিলি কেন ?

করিনি, আমার সঙ্গেই এনেছি ।

তুই : কই, দে দে দে, কেউ তো কোনো কালে আমাকে চিঠিই লেখেনি, প্রেমপত্র তো বাদ দে ।

আমি : ওই তো টেবিলের ওপরে রাখা খামে আছে, চাইলডিশ যদিও, পড়ে দ্যাখো । বাংলায় লিখেছি, তার কারণ স্কুলে সিসটার আর ওয়ার্ডেনরা বাংলা জানতেন না ।

আমি : কার কাছে শিখলি বাংলা ?

তুই : কেন , আঙ্কলবাপির কাছে, উনি ভিষণভাবে বেঙ্গলি, দেখছ না আন্টিমাকে কত তাড়াতাড়ি বাঙালি বানিয়ে দিয়েছিলেন, আণ্টিমাও বাংলা পড়তে-লিখতে পারেন, তাই স্কুলের পর্ব শেষ হলে গুড়গাঁওয়ের বাড়িতে চিঠিগুলো লুকিয়ে রেখেছিলুম, তারপর নিজের সঙ্গেই রেখেছি । তোমার খবর পেতেই সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি, যাতে আমার ফিলিংস বুঝতে পারো, চিঠিগুলোর এমোশান দেখেই বুঝতে পারবে কত পুরোনো আনুগত্য আর ডিপরুটেড ফিলিংস ।

তোর চিঠি আমি এক -এক করে পড়া আরম্ভ করলাম, পড়তে-পড়তে তোর মুখের দিকে তাকিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখছিলাম, বুঝতে পারছিলাম বিব্রত বোধ করছিস, আবার আহ্লাদিতও হচ্ছিস, ঠোঁট বন্ধ রেখে গিগল করছিস ।

##

 

ক্লাস টেন ( ২৫ ডিসেম্বর )

ডারলিং ড্যাড,

তুমি সান্টাক্লজের মোজায় লুকিয়ে চলে এসো, আমি স্লেজগাড়ি পাঠাচ্ছি । আমরা দুজনে শীতের এই ঠাণ্ডায় মোজার ভেতরে ঢুকে বেশ মজা করব । আমি তোমার পোশাক খুলে মোজার বাইরে ফেলে দেব আর বলব, ড্যাড, এই দ্যাখো, তোমার বুকে মিথ্যা কথা বলার জন্য লোহা গরম করে ডেভিল তোমায় নরকে পাঠাবার বন্দোবস্ত করে দিয়েছে । তুমি কেমন লোক ড্যাড, আমার জন্যে তোমার একটুও মনকেমন করে না ? কেন তুমি লুকিয়ে আমাকে নিয়ন্ত্রণ করছ ? যদি নিয়ন্ত্রণ করছই, তাহলে আমার সামনে আসার তোমার সাহস নেই কেন ? আমি তোমাকে ভালোবাসি ড্যাড, তুমি মনে কোরো না যে তুমি দূর থেকে আমাকে নিয়ন্ত্রণ করে চিরকাল আড়ালে থেকে যাবে । আমি তোমাকে একদিন নিশ্চিত খুঁজে বের করব । আর যেদিন তোমায় খুঁজে পাবো, সেদিন তোমায় আমি খুন করে চিবিয়ে খেয়ে ফেলব । ইয়েস, আই উইল কিল ইউ অ্যাণ্ড ইট ইউ । সামনে এসো, দেখা দাও, প্রক্সি দিও না । তুমি কি বুড়ো, ফোকলা দাঁতে হাসো, গুটকা খাও, ছাতা মাথায় অফিস যাও ? তোমার কি বিয়ে হয়ে গেছে, ছেলে-মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিয়েছ ? তোমার নাতি-নাতনি কয়টা ? যতই যাই হোক, তোমাকে আমি ছাড়ছি না, ছাতা উড়িয়ে তোমায় টেনে নিয়ে আসব ঝাঁঝা রোদ্দুরে, কাদা-জমা বৃষ্টিতে, মনে রেখো, হুশিয়ারি দিয়ে রাখছি। পুরাণের ঋষিমুনিরা তো বুড়ো হয়েও কত কি করতেন, যেখানে সেখানে সিমেন ফেলতেন, সেই সিমেন থেকে শিশুরা জন্মাত, যা ঋষিমুনিরা জানতেও পারতেন না । পুরাণ অনুযায়ী ওল্ড এজ ইজ নট এ ফ্যাক্টর ইন ইমমরাল লাভ অ্যান্ড ইনহিউম্যান ওয়ার । কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের কথা চিন্তা করেছ কখনও, কিংবা হেলেন অফ ট্রয়ের জন্য যুদ্ধ ? এপিকগুলোয় বুড়োরাই যুদ্ধ করেছে, চিরকাল । এপিক লেখা তাঁমাদি হয়ে গেলেই বা, আমি আর তুমি তো আছি, আমাদের এপিক প্রোপোরশানের সম্পর্ক তো আছে, ইন পারপেচুইটি ? আরেকটা কথা । তুমি গোপন থাকতে চাও কেন ? তোমার গোপন জীবন আমি একদিন ঘা মেরে আখরোটের মতন দুফাঁক করে দেবো । তবে গোপনীয়তা তোমাকে বেশ রহস্যময় করে তুলেছে ; তোমার কি মনে হয় না যে গোপনীয়তাও একরকমের ভার, যা অত্যন্ত বিপজ্জনক, তাকে রিলিজ করার পথ করে না দিলে উন্মাদ হয়ে যাবে? ইনসেস্টকে অস্বাভাবিক মনে কোরো না । তোমার সন্মোহনপ্রবৃত্তিকে এবার ক্ষান্ত দাও।

তোমার মেয়ে ও প্রেমিকা

নেতি ( দি আগলি নেম ইউ গেভ মি )

##

 

ক্লাস ইলেভন ( দুর্গাপুজো, বিজয়া দশমী )

ডিয়ার ড্যাড দি মহিষাসুর

আমার আগের বছরের চিঠি তুমি পাওনি বলেই মনে হচ্ছে, তুমি এই এক বছরে নিজেকে অসুর হিসাবে প্রমাণ করেছ ; বৈভবী আর আরিয়ানের জন্য কমদামের পোশাক , আর আমার জন্য দামি পোশাক । আমার তা একেবারে পছন্দ নয় । জানি তুমি পাঠাওনি,  আন্টিমা কিনেছেন, কিন্তু আন্টিমা এই কাজ করে ফাঁস করে দিলেন যে তুমি আছ কোথাও । এরকম করার উদ্দেশ্য ? তুমি কি আমাকে এনটাইস করার চেষ্টা করছ ? সিডিউস করতে চাইছ? করো, করো, যতো পারো করো । তুমি অমন না করলেও আমি তোমাকে ভালোবাসি । আগের চিঠিতে লিখেছিলুম যে আমি তোমার প্রেমিকা । তুমি কি জানো প্রেমিকা কাকে বলে ? জীবনে কখনও প্রেম করেছ ? নাকি এরকম আড়ালে থেকেই মদনের শর চালিয়েছ । মদনের কথা কার কাছে জানলুম । আন্টিমায়ের কাছে । উনি পুরানের গল্প আমাকে শোনান যাতে আমি বাইবেলের কাহিনিতে নিজেকে গুলিয়ে না ফেলি । আমি কিন্তু মেরির চেয়ে বেশি ভার্জিন । তোমাকে ছাড়া আর কাউকে চাইনি, চাইবো না কোনোদিন, দেখে নিও । আগের চিঠিতে তোমার ফ্যামিলির কথা জানতে চেয়েছিলুম, বললে না তো কিছু, তুমি এরকম ভিতু কেন ? ফ্যামিলি থাকলেই বা, তুমি যদি কাউকে বিয়েও করে থাকো, তবু আমি তোমার সঙ্গে প্রেম করব, আর প্রেম করার পর পুরুষ মাকড়সাকে যেমন প্রেমিকা মাকড়নি মেরে ফ্যালে, তেমন করে কুচিয়ে মেরে ফেলব । তোমাকে কিন্তু বলে রাখলুম, আমি সবকয়টা ঋতু তোমার কাছ থেকে চাই, শুধু বসন্তকাল নয় । তুমি আমার শরীরের সঙ্গে কথা বলে দ্যাখো, ও তোমাকে খাঁটি সত্য কথা বলবে ; আমার ঠোঁট, জিভ, মুখের ভিতরটা তোমার। চিঠি লিখো । লিখে না পাঠালেও আমি পেয়ে যাব । গুড নাইট ডিয়ার ব্রহ্মা, ইট ইজ পদ্মা হেয়ার ফ্রম হেভেন। তুমি আমার নাম নেতি কেন রেখেছ, আমি জানি । কারণ ইমমরাল প্রেমের মতন স্বর্গীয় সুষমা আর নেই ; প্রেমে ইমমরাল না হওয়া হল নৈতিক শূন্যতা, ব্যানালিটি । আমাদের বয়স প্রতি বছর বাড়ে কেন ? যাতে আমরা ক্রমশ ইমমরাল হতে পারি, প্রেমকে মেনে নিতে পারি । হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ । তুমি আমার ইনটারভিউটা কি করে পড়লে । নিশ্চয়ই পড়েছ । ছুটিতে বাড়ি ফিরে দেখলুম, আঙ্কলবাপি দেখালেন, আমার আলমারিতে নতুন বই, বাংলা কবিতার, ইংরেজি কবিতার । ঘরে ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডের জার্সি ঝুলছে । আন্টিমাকে জিগ্যেস করতে উনি বললেন, ফার্স্ট হয়েছি বলে গিফ্ট এসেছে । কার গিফ্ট, তা উনি জানেন না, যে পাঠিয়েছে সে ঠিকানা লেখেনি । তুমি কেমন পাগল গো ? ধ্যুৎ, এত এত বই আমি পড়তে পারব না, বড় হলে পড়ব । রিমাইন্ড করিয়ে দিই, ইনসেস্টকে অনৈতিক মনে কোরো না ।

ফাক ইউ অ্যান্ড লাভ ইউ ।

তোমার নেতি ( ইওর এলেকট্রা অফ দি ম্যাজিকাল এপিক )

##

 

ক্লাস টুয়েলভ ( দোলযাত্রা )

ইউ ফ্যাসিস্ট বাস্টার্ড বাবা

আজকে দোলযাত্রা, আমাদের ছুটি নেই। সিজনটা ভিষণ খারাপ । বাজে হাওয়া দিচ্ছে । আমার রুমমেট পামেলা ঝিংরণ পারমিশান নিয়ে বাড়িতে দোল খেলতে গেছে । সুতরাং দুই দিনের সুযোগ । তোমাকে ইম্যাজিন করে কী করলুম জানো ? রাতের বেলায় আলো নিভিয়ে, জামা-কাপড় খুলে ফেলে পুরো উলঙ্গ হয়ে বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে পড়লুম । চোখ বুজে নিজেকে বিছানার ওপর ঘষতে লাগলুম, এগোলুম, পেছোলুম । তোমার জন্যে আমি আমার জীবনের প্রথম অরগ্যাজম ডেডিকেট করলুম । হস্টেলে আমার ক্লাসে সবাই করে, আমিও শিখে নিয়েছি । আমি কিন্তু হাত দিয়ে বা কোনো জিনিস দিয়ে ম্যাস্টারবেট করি না । করলে আমি ভার্জিন থাকব না । ডিয়ার ফ্যাসিস্ট ফাদার অলমাইটি, তোমার জন্য আমি নিজেকে ভার্জিন রেখেছি । তুমি কি চাও যে আমি ভার্জিন হয়েই মরে যাই ? কবে দেখা দেবে তুমি ? কেমন দেখতে তোমায় ? তুমি বুড়ো নও তো ? বুড়ো হলে ভিষণ খারাপ হবে কিন্তু, ছিঁড়ে খেয়ে নেবো । তুমি কি আমার জন্যে তোমার ইম্যাজিনেশান ডেডিকেট করো ? কালকেও আরেকবার ডেডিকেট করব । আমি কি তোমার স্বপ্নে আসি, যেমন তুমি আমার স্বপ্নে আসো ? স্বপ্নে আমাকে কষে জড়িয়ে ধোরো, আমি তোমার বুকের চাপ অনুভব করতে পারব । তুমি যে মিথ্যাবাদী তা ধরে ফেলেছি, প্রেমিকরা অমন মিথ্যাবাদী হয় ; আসলে প্রেম তো এক ধরণের সন্ত্রাস, তাই না? তুমি কি নিজের প্রতি বিশ্বস্ত । চিন্তা কোরো না, ইনফেডেলিটি প্রেমিকদের সাহসী করে তোলে । আমি বলছি তুমি খোলোস থেকে বেরিয়ে এসো, আমি তোমাকে আগাপাশতলা চাই, এই চাওয়াকে যেন সেক্সুয়ালি ইনটারপ্রেট কোরো না । যেদিন দেখা হবে সেদিন আমি তোমার মাথায় এমন ঠুসে-ঠুসে উদ্বগ, অশান্তি, আশঙ্কা, আতঙ্ক, যন্ত্রণা ভরে দেব যে যতদিন বেঁচে থাকবে মাথার জায়গায় এক কুইন্টালের বাটখারা বইবে । আমি নিশ্চিত যে সবাই, তোমার পরিচিত মানুষেরা, তোমাকে ভিষণ নিরাশ করেছে, তাই তুমি আমার সঙ্গে বায়বীয় সম্পর্কে পাতিয়েছ ; ওভাবে স্মৃতিকে ধরে রেখো না, পশ্চাত্তাপ হবে, আমি তো রয়েছি, তোমার নিঃসঙ্গতার একমাত্র নিরাময় । মনে আছে তো যে ইনসেস্ট ব্যাপারটা প্রকৃতির অবদান ?

নেতিস্মর ( যার  স্মৃতি নেই)

##

 

চিঠি তিনটে পড়ার পর দুজনেই চুপচাপ বসেছিলাম কিছুক্ষণ । দুজনেই জানতে পারছিলাম কে কি ভাবছে। আমিই প্রথমে কথা বলা আরম্ভ করলাম।

আমি : তোর বাংলা হাতের লেখা খুব স্পষ্ট, স্ট্যাণ্ডার্ড টেন থেকেই রবীন্দ্রনাথের মতন হাতের লেখা রপ্ত করে ফেলেছিস।

তুই : হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ ; আসল প্রসঙ্গে এসো, কনটেন্টে, বিষয়ে, হ্যান্ডরাইটিঙের প্রশংসা করে পাশ কাটিয়ে বেরোতে চাইছ কেন, টেক্সট ডিকন্সট্রাক্ট করো, সম্পর্ক, রিলেশানসিপ, রক্তের খেলা ।

আমি : ডিকন্সট্রাক্ট আবার কি করব, জানি তো, তুই কোল্ড ব্লাডেড রিভেঞ্জ নেবার ফাঁদ পাতছিলিস, আমি তো তোর ভালোর জন্যই সবকিছু করেছি, আর নেতিস্মর লিখে জানিয়ে দিয়েছিস তুই কি বলতে চাস , ওয়ার্ডটা শুনিনি আগে ।

তুই :নেতিস্মর শব্দটা আঁস্তাকুড়ে পেয়েছিলুম, ইউ লায়ার লাভার, লুকিয়ে রিমোট কনট্রোল করে গেছ, আর এখন অ্যালিবাই খাড়া করছ, ইউ আর এ কাওয়ার্ড।

আমি : বলে নে, বলে নে, মেটা তোর ঝাল, আমি ছাড়া কার কাছেই বা পুষে রাখা ক্রোধ, ক্ষোভ, আক্রোশ, দুঃখ, নিঃসঙ্গতা রিলিজ করতিস ।

তুই আহত হলি আমার কথায়, কাঁদতে আরম্ভ করলি, ফুঁপিয়ে, সামলে নিলি, তারপর বললি, আমাকে ফেলে যাওয়া হয়েছিল কলকাতার এক আঁস্তাকুড়ে, আমি দিল্লির এনজিওর হাতে গেলুম কেমন করে গো, তুমি তো আমাকে দিল্লির সংস্হা থেকেই সেলেক্ট করেছিলে ?

আমি : ওঃ, বেশিরভাগ এনজিও বিদেশ থেকে ডলার-ইউরোর ধান্দায় যতো পারে আনওয়ান্টেড বেবিদের নিজেদের আওতায় আনতে চায় ; বিদেশীরা অ্যাডপ্ট করার জন্য ওদের কাছে আসে বা ওদের ফাণ্ডিং করে, বাচ্চাদের পড়াশুনা করাবার জন্য, স্বাস্হ্যের জন্য । দিল্লির এডুকেট এ গার্ল চাইল্ড  চালায় একজন অবসরপ্রাপ্ত আই এ এসের স্ত্রী। ওরা অ্যাবানডণ্ড চিলড্রেনদের সংবাদের দিকে লক্ষ্য রাখে , তোর সংবাদ কাগজে পড়ার পর ওদের প্রতিনিধি কলকাতা পুলিসের সঙ্গে কথা বলে দিল্লি এনেছিল ।

তুই : তুমি মাঝখান থেকে কি করে উদয় হলে ? তুমি স্পনসর করলেই বা কেন ? তুমি তো ব্যাচেলার ছিলে, ফ্যামিলি লাইফ শুরু করোনি, নেহাতই কাঁচা অভিজ্ঞতা তখন ।

আমি : আমার কাছে চিঠি এসেছিল একটি গার্ল চাইল্ডকে স্পনসর করার জন্য । জানি না কে আমার ঠিকানা ওদের দিয়েছিল । আমি কিছু একটা ভালো কাজ করতে চাইছিলাম, চাকরিতে ঢুকেই তো চারিদিকে দেখছিলাম রাজনীতিকদের জোচ্চুরি আর লোকঠকানো, আমার কলিগরাও এই ধান্দায় প্রথম থেকেই ফেঁসে যাচ্ছিল, যেচে ফেঁসে যাচ্ছিল, যারা বিয়ে করেনি তারা মোটা ডাউরি হাঁকছিল, সে এক বিরাট নরক, আমি সেখানে এক টুকরো স্বর্গ গড়তে চাইছিলাম, আর ব্যাস, পেয়ে গেলাম তোকে। জগদীশও পড়েছে গিয়ে ওই নরকে, তাই জন্যেই ও হরিয়ানা ছেড়ে যেতে চায় না ; মন্ত্রিদের তেল দাও, তাদের কথামতো চলো আর আনলিমিটেড কালোটাকা রোজগার করো।

তুই : ভাগ্যিস দিয়েছিল ; নয়তো বাচ্চাগুলো কোথায় যাচ্ছে, তাদের শেষপর্যন্ত কি হচ্ছে, তার ফলো আপ হয় না। আমিও পড়তুম কোনো বাজে ফ্যামিলির খপ্পরে ।

আমি : হ্যাঁ, তুইও তো নিজেই যেচে আমার খপ্পরে পড়তে এলি । নীতি আমার ঠাকুমার নাম, তাই আমি ওই নামটা বেছেছিলাম, কিন্তু রেজিস্ট্রেশানের ক্লার্কটা গোলমাল করে একটা ই বাদ দিয়ে তোকে করে দিলে নেতি।

তুই : স্বর্গে সামান্য নরকের নুন-মিষ্টি থাকা দরকার, নয়তো বিস্বাদ লাগতো, তোমার আমার দুজনের রসায়নই। আমি নেতি আর তুমি ইতি, ব্যাস, প্লাস-মাইনাসের যোগফল যা হয়, কী বলো ।

আমি : ইতি বলিস বা ইটি বলিস, যা ইচ্ছে হয় বলিস । ওগো, হ্যাঁগাও বলতে পারিস ।

তুই : ওউ-ওউ-ওউ-ওউ, দ্যাট ইজ এ গুড ওয়ান । না, তুমি আমার ড্যাডি, আমি তোমার বেবি এলেকট্রা, ড্যাডি বলেই ডাকব ।

##

 

এর মতো, ওর মতো, তার মতো, কারো মতো নয় ।

যেন এমন, যেমন অমন, যেন তেমন নয় ।

##

 

তুই : ওউ-ওউ-ওউ-ওউ, আরে, ফোটো দ্যাখো দ্যাখো, তুমি কোলে নিয়ে আমার গালে চুমো খাচ্ছ ? তখনই চুমো খেয়ে নিয়েছিলে তাহলে ?

আমি : খেয়েছিলাম, অনেক চুমো খেয়েছিলাম, গালে, পেটে । পেটে ফুঁ দিয়ে হাসিয়েছিলাম , কত হাসতিস খিলখিল,  আমি তোর ন্যাপিও চেঞ্জ করেছি কয়েকদিন ।

তুই : ওঃ, সব জায়গায় হাত দেয়া হয়ে গেছে ; তাই মনে হচ্ছিল, হাতটা, ঠোঁটটা যেন চেনা-চেনা লাগছে। এখন আরেকবার পেটে ফুঁদিয়ে হাসাতে পারতে ।

আমি : তুই অ্যাস্ট্রনট হতে চাইছিলি, স্পেস সাইন্টিস্ট হতে চাইছিলি, বাচ্চা নিয়ে কি করে সামলাবি?

তুই : সব ব্যাপার ইনডিয়ান পার্সপেক্টিভে ভাবো কেন ? যারা অ্যাস্ট্রনট তাদের কি ওয়াইফ বা হাজব্যাণ্ড বা বেবিজ নেই ? আমার ইনটারভিউটা পড়ে বলছ, বুঝেছি । কয়েকটা রিসার্চ পেপার পাবলিশ করেছি, পিয়ার অ্যাপ্রুভড, আরও কিছু করতে হবে।

আমি : তুই স্নান করে নিয়েছিস ?

তুই : পাগল নাকি ! প্রেম করব বলে প্ল্যান করে তোমার ঘুম ভাঙার অপেক্ষা করছিলুম, পাউডার পারফিউম মেখে নিয়েছিলুম, লিপ্সটিক লাগিয়ে নিয়েছিলুম, ব্যুরোক্র্যাট বিশ্বামিত্রের চেস্টিটি বেল্টের তালা খোলার পণ করে বসেছিলুম । চলো তোমাকে চান করিয়ে দিই । তুমি আমার ডায়াপার চেঞ্জ করতে, আমি তোমার গায়ের ময়লা ঘষেমেজে তুলি । তোমার পিঠে যথেষ্ট ময়লা জমে আছে, নাকের দুপাশে ব্ল্যাকহেড ফুটে উঠেছে, তোমার পাও বেশ নোংরা ।

আমি : চল, ওই ঘরের বাথরুমে চল, ওটা বড়ো । স্ক্রাবার আছে । ভাগ্যিস তুই আমেরিকান মেয়েদের মতন গায়ে ট্যাটু করাসনি ; আমার একেবারে ভালো লাগে না কারোর গায়ে উল্কি আঁকা দেখলে ।

তুই : ধ্যুৎ, ট্যাটু আবার কি করাব ! তামাটে চামড়ায় কেউ ট্যাটু করায় না ।

আমি : তামাটে নয়, তোর ত্বক হল উজ্জ্বল ।

তুই : থ্যাংকস ফর দি মিথ্যেকথা । চুলটুল না কামিয়ে তুমি কিন্তু রিয়্যাল হিম্যান । আজকাল বুকে বগলে কুঁচকিতে পুরুষরাও চুল রাখছে না; পুরুষের গা থেকে পুরুষ হরমোনের দুর্গন্ধ না বেরোলে আকর্ষণ গড়ে ওঠে না, মনে হয় ডলফিন ।

ঘরে ঢুকে, দেখলুম তোর বাক্স খুলে বিছানার ওপর পোশাক টুকিটাকি ছড়িয়ে রেখেছিস, জিগ্যেস করলি, দেয়ালে ওটা কার ফোটো গো ?

বললুম, চিন্তা করিসনি, ওটা আমার মায়ের ।

তুই : কোনে রাখা গিটারটা ?

আমি : ওটা আমার, কলেজে বাজাতাম ।

তুই : দারুণ হবে, তুমি গিটার বাজাবে আর আমি গাইব, আমার পেনডিং সঙ্গীত সেরিমনি ।

আমি : গিটার বাজালে আর গান গাইলে পাশের বাংলোয় ‌ভাণ্ডারির মেয়েরা শুনতে পাবে,  আর ওরা দেখতে আসবে, যে আজ অচানক প্রধান সাহেবকো হো কেয়া গয়া, এক লড়কি গা রহি হ্যায় অওর গিটার বজা রহি হ্যায়, কৌন হ্যায় ইয়ে লড়কি ? আমার বাংলোয় তরুণী কেউ তো কখনও আসেনি ।

তুই : তাহলে নেক্সট হলিডেতে কোথাও বাইরে চলো, দূরে, ধানক্ষেতের পাশে দাঁড়িয়ে গিটার বাজিও আর আমি গান গাইব ।

আমি : মার্কিন গান ? এদিকে ধানের খেত পাবি না, পাবি কালো টাকায় কেনা ফার্মল্যাণ্ড ।

তুই : না, না, আমি রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতে পারি, আমেরিকায় বাঙালিদের অনুষ্ঠানে গাই ।

আমি : বারবার আমেরিকা বলছিস, শহরের নাম বলছিস না তো ? কোন রাজ্যের কোন শহর,  কোন রাস্তা, অ্যাঁ?

তুই : হুঁ হুঁ, আমি যেমন তোমাকে লোকেট করার জন্য খেটে মরেছি, আমি চাই আমি চলে যাবার পর তুমিও সেরকম মরো, তোমার তো লোকবল আছে, কানেকশান আছে, সরকারি যন্ত্র আছে, চেষ্টা চালিও ; আমার ডিসপোজালে কিছুই ছিল না মিস্টার আগামেমনন, কিছুই ছিল না, কাঠের ঘোড়ায় লুকোনো সৈন্যসামন্তও নয়, জাস্ট একা, বুঝেছ, জাস্ট একা । আর আরশুলাকে ঠিক ধরে ফেলেছে টিকটিকি । খুঁজো, আমাকে খুঁজো ।

আমি : কেনই বা খুঁজব তোকে ?

তুই : যেদিন যাব সেদিন বলব । রিভেঞ্জ, রিভেঞ্জ, প্রতিশোধ হল সবচেয়ে সুন্দর শিল্প ; প্রত্যেক মাসে আমি রক্ত ঝরাই, কেন ? প্রতিশোধ হল নলেন গুড়ের সন্দেশ ।

##

এর মতো, ওর মতো, তার মতো, কারো মতো নয় ।

যেন এমন, যেন অমন, যেন তেমন নয় ।

##

 

আমি :আচ্ছা, বাথরুমে চল আপাতত । আমি কিন্তু শর্টস পরে নিচ্ছি, বেশ এমব্যারাসড ফিল করছি এভাবে, অভ্যাস নেই তো ।

তুই : তুমি যাও, আমি একটা জিনিস নিয়ে আসছি । আমারও অভ্যাস নেই, তো তাতে কি । যা-যা করলুম, তার কি অভ্যাস ছিল নাকি, করলুম তো, বিন্দাস, তোমার জন্য ।

আমি শাওয়ারের তলায় টুলের ওপর বসেছিলাম, তুই হাঁটুগেড়ে আমার সামনে বসলি, নেকেড, শাওয়ারের তলায়, একটা আঙটি হাতের তালুতে রেখে বললি, আমি নেতিস্মর আঁস্তাকুড়বাসিনী, আজ দ্বিপ্রহরের এই ঝরণাতলায়, তোমায় প্রোপোজ করছি, তুমি কি আমাকে গ্রহণ করবে ?

বলে, আমার উত্তরের অপেক্ষা করলি না, বাঁহাতখানা নিয়ে অনামিকায় পরাবার চেষ্টা করলি আঙটিটা, ঢুকল না, তর্জনীতে ঢুকল, বললি, ভালো হল, ওয়েডিং ফিংগারের চেয়ে ডিজিটাল ফিংগার উপযুক্ত, ডিজিটাল ফিংগার ছাড়া প্রেম হয় না, অর্জুনের ডিজিটাল ফিংগার ছিল সবচেয়ে ইমপরট্যান্ট ; অতগুলো মহাকাব্যিক প্রেমিকাকে হ্যাণ্ডল করা সহজ ব্যাপার ছিল না ।

উঠে দাঁড়িয়ে, বললি, কি কোলে তুলে নিলে না, ছোটোবেলায় তো নিয়েছিলে, নাকে নাক, গালে ঠোঁট ঠেকিয়েছিলে ।

ডিবেতে দেখলাম তনিষ্ক লেখা ।

পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে জিগ্যেস করলাম, কখন কিনলি, যখন এসেছিলি তখন তো দোকান খোলার টাইম হয়নি ।

গলা জড়িয়ে ধরলি, আমি তোর নাকে নাক গালে ঠোঁট ঠেকাতে, হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ, হাসতে হাসতে বললি, আমি পরশু এসেছি, হোটেলে উঠেছিলুম, তোমার লোকেশান সম্পর্কে নিশ্চিত হবার জন্য রিকনাইসান্স ভিজিট করে গেছি, গেটে দেখে গেছি প্রভঞ্জন প্রধানের নাম ।

ডিটেকটিভ এজেন্সি বাপির, আই মিন আঙ্কলবাপির, আর আন্টিমায়ের অ্যাকাউন্ট ট্রেইল করার সময়ে, তোমার অ্যাকাউন্টও ট্রেইল করেছিল, আর সেখান থেকে এডুকেট এ গার্ল চাইল্ডকে আজও যে টাকা পাঠিয়ে চলেছ তা জানিয়েছিল আমায়; আমি কালকে এডুকেট এ গার্ল চাইল্ড-এর পরিচালক মিসেস সোমপ্রীত কৌরের সঙ্গে দেখা করেছি, পরিচয় দিয়েছি, কিন্তু ওনারা তোমার সঙ্গে হওয়া কনট্র্যাক্ট আর আঙ্কলবাপির এফিডেভিট দেখতে দিলেন না, সিক্রেট ডকুমেন্ট ।

ফোটো দেখালেন, ফাইলে, তোমার কোলে, যে ফোটোর কপি রয়েছে তোমার আলমারিতে, প্রায় সেইরকম কয়েকটা ফোটো, নাকে নাক, গালে ঠোঁট । অ্যাকাউন্ট ট্রেইল না করলে তোমার পরিচয়, বাড়ি, এনজিওর ঠিকানা পেতুম না । সরি ফর দি ইনট্রুজান । তুমি আমার লাইফে ঢুকেছ, আমি তোমার লাইফে ঢুকলুম, শোধবোধ । ওকে ?

ওরকম হাসিসনি, হাসলে তোর বুক দুলে দুলে উঠছে, আর আমি ডিস্টার্বড ফিল করছি, ওদের বাড়িতে থাকার ফলে তোর বুক-পাছাও হয়ে গেছে জাঠনিদের মতন, নিয়ন্ত্রণহীন ।

থ্যাংকস ফর দি কমপ্লিমেন্ট ড্যাড ।

আঙটিটা দামি, হিরের, কত ক্যারাট রে ? কিন্তু আমার কাছে তোকে দেবার মতন আঙটি তো নেই, কিনে দেবো, কি বল ?

না, না, ধ্যুৎ,ওসব করতে হবে না, আমরা এনগেজমেন্ট করছি না, ইউ আর মাই ফ্যাসিস্ট ড্যাডি, দি রিমোট কনট্রোলার, ওই আসনেই থাকো ।

নামিয়ে দিলাম তোকে শাওয়ারের তলায় ।

হঠাৎ জিগ্যেস করলি, এর আগে চুমো খেয়েছ কাউকে ?

বেফাঁস বলে ফেললুম, হ্যাঁ । স্মৃতির চোট খেয়ে কোপাকাবানা সমুদ্র সৈকত ভেসে উঠেছিল।

তোর মুখ দেখে বুঝতে পারলাম, কথাটা শুনে চকিতে বদলে গেল অভিব্যক্তি, এক বর্ণনাতীত ক্রোধ ফুটে উঠল, কোমরে দুহাত দিয়ে, নেকেড, তুই জিগ্যেস করলি, কে সে ?

টের পেলাম, মারাত্মক ভুল  করে ফেলেছি, যৌনসম্পর্কে মিথ্যা কথা বলা কত যে জরুরি ।

এসে পর্যন্ত তোর এই রূপ যে লুকিয়ে রেখেছিস, জানতে দিসনি, রগের পাশে উঁচু হয়ে উঠেছে শিরা ।

কাছে এসে, বাঁহাত দিয়ে আমার বুকে ঠেলা মেরে বললি, কে সে, অ্যাঁ, কে সে ?

আমি দ্রুত কি উত্তর দেব ভাবছি, ডান হাত দিয়ে বুকে ঠেলা মারলি, বললি, কে মেয়েটি ?

আবার বাঁহাতে ঠেলা মারলি, আমি দেয়ালে পিঠ, দ্রুত একটা উত্তর খুজছি, মগজকে বলছি, দাও দাও, তাড়াতাড়ি যোগাও মনের মতন উত্তর । তোর ঠেলাও উপভোগ করছি, দেয়ালটা আরেকটু পেছনে হলে আরও কি-কি বলতিস জানতে পারতাম ।

তুই, আরও ক্রুদ্ধ, আবার বুকে ঠেলা মেরে বললি, আর কি-কি করেছ ?

নাম কি ?

অপেক্ষা করতে পারোনি ?

আমি তো বড়ো হচ্ছিলুমই, না কি, অ্যাঁ ? হলেইবা বয়সের ডিফারেন্স !

তিন তিনটে চিঠি লিখেছিলুম, পড়লে তো, তবে ?

এত তাড়া কিসের ছিল ?

তোমার জন্যই যে আমি তা কি জানতে না ?

তোমার নামের মেহেন্দি লাগিয়েছি কেন দুহাতের চেটোয় ?

দ্যাখোনি লাভ ব্যাঙ্গলস পরে এসেছিলুম ?

তোমার কাছে এলুমই বা কেন, অ্যাঁ ?

হোয়াই আই ওয়াজ সিইং ইউ উইদাউট সিইং ইউ ফর মোর দ্যান টু ডিকেডস, বলো, বলো?

বলো, বলো, বলো, বলো,বলো, চুপ করে থেকো না, কি কথা নেই কেন ?

প্রথম রক্ত আর প্রথম স্পার্মের বেবি চেয়েছিলুম আমি, জানতে না ? সেক্স নয়, বেবি, তোমার বাচ্চা চেয়েছিলুম, উইদাউট ব্লেমিশ, জানতে না ?

##

এর মতো, ওর মতো, তার মতো, কারো মতো নয় ।

যেন এমন, যেন অমন, যেন তেমন নয় ।

অন্ধকারে, অন্ধকারে, অন্ধকারে, কেননা তোর দেহ থেকে আলো বিচ্ছুরিত হয় ।

বানভাসি, বানভাসি, ভাসিয়ে নিয়ে সাগরে, কূলকিনারাহীন ।

##

তোর অভিব্যক্তির ভেতর যে বার্তা আবিষ্কার করলুম, তা হল, আমি হাতছাড়া হয়ে যেতে পারি ভেবে তুই সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে গেছিস, যেন  কখনও কেউ তোকে আমার কাছ থেকে আলাদা করে দিয়েছিল, আর তাদের কারাগারের কথা চিন্তা করলেই মগজে ছড়িয়ে পড়ছে উষ্মা ।

আমার মুখের কাছে তোর ঠোঁট হুইস্কির গন্ধের কাছাকাছি নিয়ে এলি, একটা উত্তর আপনা থেকে বেরোলো, দুর্গন্ধের স্মৃতি থেকে, প্রথম চুমুতে ছিল ইনটারপ্রেটার-ট্রানস্লেটারের হাঁ-মুখের দুর্গন্ধ, ক্যাণ্ডললাইট শুয়োর খাবার পরিণাম, বললাম, হ্যাঁ, আমি একটা ছোট্ট মেয়েকে চুমু খেয়েছিলাম, বহুকাল আগে তাকে কোলে তুলে, নাকে নাক ঠেকিয়াছিলাম, নাভিতে ফুঁ দিয়ে কাতকুতু দিয়েছিলাম ।

আশ্চর্য, যত দ্রুত রেগে গিয়েছিলি, তত দ্রুত তোর উগ্রতা প্রশমিত হয়ে গেল; ফিরে এলি দ্যুতিময়তায় ।

হাত ধরে শাওয়ারের তলায় টেনে নিয়ে গিয়ে বললি, সরি, তোমার ওপর আর কারো অধিকার, তা আংশিক হলেও, আমি মোটেই বরদাস্ত করব না, যথেষ্ট নিষেধ মাথা পেতে নিয়েছি, আর নয় ।

শান্ত গলায় বললি, জানো কি সাইক্লোনের নাম মেয়েদের নামে হয় ? ক্যাটরিনা, লায়লা, নিলম, হেলেন, নিশা ? আমার নামে আছে তোমার দেয়া সুপার সাইক্লোন ।

টুলের ওপরে গিয়ে বসলাম ; মগজে তখন ভাবনার জেলি তৈরি হয়ে চলেছে, তাহলে কি আমি হেরে গেলাম, তোর সামনে কখনও না গিয়ে তোর ওপরে উল্টে এক কুইন্টালের বাটখারা চাপিয়ে দিয়েছি, যা তুই জীবনে মাথার ওপর থেকে সরাতে পারবি না ? তোকে বড়ো করে তুলে নিজস্ব নারী হিসাবে পেতে চাই বলেই কি এডুকেট এ গার্ল চাইল্ডের আহ্বানে সাড়া দিয়েছিলাম, আমার একজন তরতাজা মানস-ক্রীতদাসীর প্রয়োজন মেটাবার জন্য ?

মুষড়ে পড়লাম ।

তুই বুঝতে পারলি না কেন মুষড়ে পড়েছি, কিন্তু ভাবলি যে তোর কথায় আর বুকে থাবড়ানিতে  অপমানিত আহত হয়ে বাকরুদ্ধ ।

ক্রোধ নয়, তুই ক্ষিপ্ত হয়ে গিয়েছিলি, বজ্রপাত ঘটিয়ে দিলি, এটাই বোধহয় আমাকে টুকরো-টুকরো করে খেয়ে ফেলার আগাম ইশারা । আমাকে বাদ দিলেই যেন তোর সামনে কালো গহ্বর, যেন ওই গহ্বরে তোকে কেউ ঠেলে দিয়েছিল, সেখান থেকে বেরোবার জন্য আমার হাত আঁকড়ে ধরেছিস ।

বললুম না যে তুই অকারণে ক্ষিপ্ত হয়ে গিয়েছিলি । বললুম ঠিকই করেছিস, ক্রোধ ধরে রাখলে ভেতরটা পচতে আরম্ভ করে, দেখেছিস তো অ্যানিমাল প্ল্যানেটে, বাঘিনীর ক্রোধে তার থাবা থেকে নখগুলো বেরিয়ে আসে, শিকারকে ধরার সময়ে আসে, খাবার আয়োজন করার সময়ে আসে । গোরিলারা নিজেদের বুক থাবড়ায়, তুই আমার বুক থাবড়ালি ।

প্রায়শ্চিত্ত করার বা পারস্পরিক দায়মোচনের তরল কন্ঠস্বরে, তুই বললি, ডিয়ার সিলভার-ব্যাক আলফা মেল, এসো, তোমার পায়ের নোংরা ঘষে তুলি, নখে আর পায়ের আঙুলে এতো নোংরা, কখনও কি সাবান লাগাও না ? এত রোজগার করো, স্পাতে গিয়ে পেডিকিওর করালেই তো পারো, কতো স্পা চোখে পড়ল কালকে, এক্সক্লুসিভলি পুরুষদের জন্যে । আমার জন্য তো অনেক কিছু করেছ, এবার না হয় নিজের জন্য করলে

শাওয়ারের তলায় আমাকে জড়িয়ে ধরে তুই আবার কবিতাটার আরেক স্তবক আরম্ভ করলি, বললি, লিসন ইউ লাভিং বাস্টার্ড:

There’s a stake in your fat black heart

And the villagers never liked you

They are dancing and stamping at you.

They always knew it was you

Daddy, daddy, you bastard, I’m through.

#

সাবান মাখাবার সময়ে তুই চেঁচিয়ে উঠলি, ওউ-ওউ-ওউ-ওউ, আইডিয়া ।

আমি জিগ্যেস করলাম, কী, শুনি ? জারজপুরুষ হিসাবে আমার নামকরণ ?

তুই বললি, ধ্যুৎ, আরে নাঃ , চলো, আমার জন্মস্হান সেই আঁস্তাকুড়টা দেখে আসি, ফোটো তুলে নেব, আমি ওখানে বসব, তুমি ফোটো তুলে নিও, যদি নোংরা না হয় তাহলে শুয়ে পড়ব, আর শুয়ে থাকার ফোটো তুলে নিও  ।

দাঁড়িয়ে ফোটো সম্ভব, বসে বা শুয়ে সম্ভব কি না জানি না ; কর্পোরেশানের গাড়ি জঞ্জাল তুলে নিয়ে যাবার পর হয়ত বসতে পারবি ।

নোংরা তো কি হয়েছে, শুয়ে ছিলুম এককালে, কতক্ষণ শুয়েছিলুম কেউ কি জানে ? ফোটো তুলতে তো কয়েক মিনিট ।

আটপৌরে পোশাক আছে কি তোর ? শাড়ি-ব্লাউজ, চুড়িদার ? আঁস্তাকুড়ে বসতে বা শুতে হলে মার্কিন পোশাক তো চলবে না ।

স্ট্রেঞ্জ, না ? আমেরিকায় বহু আফ্রিকান-আমেরিকান গারবেজ ডাম্প থেকে খাবার তুলে খায়, তারা কেউ-কেউ রাতে ড্রাগ ফুঁকে শুয়েও থাকে গার্বেজ ডাম্পে । দেখেছ তো হলিউডের ফিল্মে ?

যাক, সে তুলনায় আমাদের আঁস্তাকুড় বেশি ডেভেলাপড, অনেকের রুজি-রুটির ব্যবস্হা হয়, বাতিল জিনিস  কুড়িয়ে-বাড়িয়ে ।

যাই, দেখি গিয়ে, কবে যাবে ?

ঠিক আছে, চল যাওয়া যাক, সেই কতকাল আগে গিয়েছিলাম, দেখে আসি আরেকবার ।

তুই বললি, আবদারের কন্ঠে, এই প্রথম তোর কন্ঠে ড্যাডের প্রতি মেয়ের কন্ঠস্বর শুনলুম, বললি, চলো না তোমার গ্রামেও একটা ট্রিপ মারি, তোমাদের জমিজমা আছে তো সেখানে ? কোথায় তোমাদের গ্রাম, একটু কানট্রিসাইড ঘুরে নেবো, তোমার জ্ঞাতিদের সঙ্গে তোমার বউয়ের পরিচয় করিয়ে দিতে পারবে ।

আমার বাবা স্কুল টিচার ছিলেন, হুগলি জেলার আরামবাগে, মাধবপুর গ্রামে জমিজমা ছিল । সম্পত্তি নিয়ে কখনও ভাবনা-চিন্তা করেননি বাবা-কাকারা ; অনেক জমি ছিল, সবই বেদখল হয়ে গেছে, বাবা রাজনীতি করতেন না, হাতছাড়া জমিজমা আর ফেরত পাননি । কাকারা বাবার আগেই গ্রাম ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন, কোথায় ওনারা থাকেন, খুড়তুতো ভাইবোনরা কে কোথায়, তাও জানি না ।

আমি আইএএস হবার পর মা-বাবাকে নিজের সঙ্গে নিয়ে ঘুরেছি প্রতিটি পোস্টিঙে; আমরা আর ওমুখো হইনি কখনও ।

তুই বললি, তোমার বাবা অমন সাধাসিধে মানুষ ছিলেন বলে তুমি এরকম নিষ্ক্রিয় টাইপের হয়েছ, প্রিহিসটরিক মরালিটির মানুষ, বর্তমান ভারতবর্ষের অনুপযুক্ত । আন্টিমা বলেন যে একটা ফ্ল্যাটও কিনে রাখতে পারোনি প্রভঞ্জন প্রধান, এমনই ফুলিশ।

আমি তোকে জিগ্যেস করলাম, কি করে সন্দেহ করলি যে তোর জীবনের আড়ালে আমি আছি ? আর আমি তোকে সাড্ডল্য সুন্দরী করে তুলছি একদিন তোকে পাবো বলে ? আমার ডারলিং ডটার গ্রোইং আপ ফর মি !

তুই বললি, ক্লুটা পেয়েছিলি  কবিতার লাইন থেকে, “আই টক টু গড বাট দি স্কাই ইজ এম্পটি।” তারপর আমার গা তোয়ালে দিয়ে পুঁছতে-পুঁছতে বললি, আমি লেগহর্ন মুর্গি তো, তুমি একদিন যে খাবে আমাকে তা জানতুম ।

আর তুই ?

রয়াল বেঙ্গল টাইগ্রেস, টুঁটি ধরে ঝুলিয়ে জঙ্গলের ভেতরে নিয়ে গিয়ে খাবার পরিকল্পনা চালিয়ে গেছি, ঘ্র্যাঁওওওওও । কাল অফিস যাবার সময়ে সরোজিনি নগর মার্কেটে ড্রপ করে দিও, কটা দরকারি জামাকাপড় কিনে নেবো ।

সরোজিনি নগর মার্কেটে পৌঁছে তোর নজরে পড়ল এক প্রৌঢ় দম্পতি, বললি, পাল্কি ফ্যামিলি, চেনো না বোধহয় । ওনাদের মুখের ভেতর সদাসর্বদা পাঁকের ল্যাণ্ডস্লাইড চলতে থাকে, সাবধান না হলেই ডুববে সেই পাঁকে ।

পাল্কি ?

মিস্টার পাল আর মিসেস পাল, এত গুলগল্প ঝাড়েন যে ওনাদের আরিয়ান নাম দিয়েছে পাল্কি, লিপিকা-কিরণশঙ্কর থেকে খামচে তোলা ; দুজনেই বুদ্ধি আর কল্পনায় দেউলিয়া । ওই যে এদিকেই আসছেন, তুমি চেনো না, কাচ তুলে দাও, কাচ তুলে দাও, শিগগির, শিগগির, দেখে ফেললেই কেলেঙ্কারি ।

গেছেন ওনারা, তোর ভয় পাবার কারণ বুঝতে পারলাম না, আমি যখন তোকে অ্যাকসেপ্ট করে নিয়েছি, তখন যার যা ইচ্ছা হয় বলুক, কিচ্ছু এসে যায় না ।

ও তুমি বুঝবে না, ওনারা আমাকে তোমার সঙ্গে দেখে ফেললে ভিষণ বিপদ হতো ।

এখন যা, কি-কি কিনবি কিনে নে । তুই ওই গাছটার তলায় দাড়িয়ে থাকিস, আমার ড্রাইভার আমাকে পৌঁছে তোকে পিক আপ করে নেবে । তোদের বাড়ি যেতে চাস তো গুড়গাঁও হয়ে আয়, বৈদেহী আছে; জগদীশ-অমরিন্দর তো চণ্ডীগড়ে । নয়তো কলকাতা থেকে ফিরে তারপর যাস ।

যাবো’খন, তাড়া নেই, তোমার সঙ্গে তো তিনমাস কাটাবো, তোমার বিছানার চাদর থেকে মেমেন্টোটা কেটে রেখে নিয়ে চাদরটা  তোমার আলমারিতে ঢুকিয়ে রেখে দিয়েছি, তোমার সংরক্ষণের মেমেন্টো হিসাবে ; একটা নীল ফুলফুল বেডশিট বিছিয়ে দিয়েছি, রাতে আকাশে বিচরণ করব ।

##

স্পর্শের মর্মার্থ, মর্মার্থের রসায়ণ, রসায়নের সম্পর্কে, রেণু, পরাগ, উড়াল, জীবন ।

চাউনির কোলাহল, উতরোল শ্বাস ।

##

এর মতো, ওর মতো, তার মতো, কারো মতো নয় ।

যেন এমন, যেন অমন, যেন তেমন নয় ।

##

 

রাত দুটো নাগাদ ঘুম ভেঙে গেল । উঠে, তোর দেহের পাশে বসে, নাইটল্যাম্পের ফিকে নীল আলোয়, দেখছি , চিৎ হয়ে ঘুমোচ্ছিস, নেকেড । আমি তো পায়জামা বা শর্টস না পরে ঘুমোতে পারি না ।

তোর ভুরু দেখছি, সরু করিয়েছিস । ভ্রুযুগল, ভ্রুযুগল ।

তোর দুজোড়া ঘুমন্ত চোখ দেখছি, আইলাইনার বোধহয় স্মাজফ্রি, রয়েছে এখনও, পাতার তলায় ।

তোর চোখের পাতা দেখছি । সত্যিকার পক্ষ্ম, পক্ষ্ম, পক্ষ্ম । চাপা দিয়ে রেখেছিস, স্বপ্ন, স্বপ্ন ।

তোর নাকের পাটা দেখছি, নাকছাবির দাগ রয়েছে, পরতিস হয়তো শখ করে ।

তোর কান দেখছি, মাকড়ি খুলে রেখে দিয়েছিস ।

তোর ঠোঁট দেখছি, স্নানের পর আর লিপ্সটিক লাগাসনি । ওষ্ঠ, অধর, ওষ্ঠ, অধর ।

তোর কোঁকড়া চুল দেখছি, আঁচড়াসনি মনে হল ।

তোর গলা দেখছি, বেশ লম্বা, ঢ্যাঙাদের গলা বোধহয় এরকমই হয় ।

তোর বুক দেখছি, শ্বাস নিচ্ছিস, আলতো উঠছে-নামছে ।

তোর শরীরের গন্ধ নিলাম ঝুঁকে, শোবার আগে পারফিউম মেখেছিস ।

দেখছি, মানুষীর মাংসল নির্যাস, নীলতিমিরে আচ্ছন্ন প্রতিমা, সেই কবেকার শিশু,  যাকে ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগ করছি, চিন্তা করা বন্ধ করে নিজেকে ছেড়ে দিয়েছি ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের দখলে, উদ্বেল হয়ে উঠছি । প্রেম করার সময়ে এভাবে চোখ বন্ধ রাখিস না কেন যাতে তোকে ভালোভাবে দেখে নিতে পারি, তখন তো হাসিস, কবিতার লাইন বলিস, গানের কলি গেয়ে উঠিস, মাংসের সঙ্গে মাংসের সম্পর্ককে চরমে নিয়ে যাবার নিজস্ব পদ্ধতি আবিষ্কার করে ফেলেছিস নাকি ?

বাস্তবকে অবাস্তব করে দিচ্ছিস, তোর জাদুতে আবিষ্ট হই । ঘুমও প্রেমের স্ফূরণ ঘটিয়ে দিল, ঘুমন্ত শরীরও ভালোবাসার জ্যোতি বিকিরণ করতে পারে । কত কিছু জানা ছিল না, তুই এলি, জানতে পারছি ।

##

ইচ্ছে হল তোর গলা টিপে ধরি, মেরে ফেলি তোকে, যাতে তুই আমাকে ছেড়ে চলে না যাস ।

তোর দেহের দিকে হাত নামালাম, গলায় নয়, বগলের পাশ দিয়ে দুহাতে তুলে নিলাম তোর ঘুমন্ত শরীর, ঘুমের ঘোরে বললি, আই লাভ ইউ ব্রো-প্রো, আমি অন্যের ভূমিকায় অভিনয় করছি না, আমি রক্তমাংসের জেনুইন প্রেমিকা ।

অনেকসময়ে তোকে প্রশ্ন করলে কেন চুপ করে থাকিস, তক্ষুনি উত্তর দিস না, কিসের ইঙ্গিত দিস অমন করে, নাকি নিজের মস্তিষ্কে কোনো উত্তর গড়ে ওঠে না ।

স্বপ্ন দেখছিস, দ্যাখ, দেখে নে স্বপ্নসংকটের স্বপ্ন, ঘুম ভাঙাবো না ।

আলতো শুইয়ে দিলাম তোকে ।

 

 

তিন

তোর আবদার ছিল আমরা ফার্স্ট ক্লাস এসির একটা ক্যুপে রিজার্ভ করে ট্রেনের চাকার তালে-তালে প্রেম করতে করতে যাই, তাতা ধিন না, তাতা ধিন না, দ্রিদিম দ্রিদিম দ্রিদিম দ্রিদিম ব্রিজের ওপর দিয়ে, প্লিজ প্লিজ প্লিজ প্লিজ ।

তা সম্ভব ছিল না, আমার পক্ষে অতদিন ছুটি কাটানো অসম্ভব, জানাজানি হলে ঘুষখোর অফিসাররা টানাহেঁচড়া করবে ; তারা ওৎ পেতে আছে বহুকাল যাবত ।

আমি আমার ক্রেডিট কার্ড দিয়ে দুটো এয়ার টিকিট কাটলাম, মিস্টার প্রভঞ্জন প্রধান, মিসেস নেতি প্রধান, দমদমের, ভোরের ফ্লাইট ।

আট নম্বর রোতে সিট বেল্ট বাঁধতে বাঁধতে তুই বললি, ড্যাড, প্লেনটা যদি ক্রাশ করার মতো হয়, আমি তোমাকে জড়িয়ে ধরব, তুমিও তক্ষুনি জড়িয়ে ধোরো আমায় ।

ছি ছি, কি বলছ গো, যাত্রা আরম্ভ হবে, এখন ওসব কি অলুক্ষুনে কথা । পেছন ফিরে দেখলাম, রিমলেস  বৃদ্ধা । আমি পেছন ফিরেছি দেখে বললেন, আপনার মেয়েকে যথাযথ শিক্ষাদীক্ষা দেননি, এতগুলো মানুষ, আপনার মেয়ে চাইছেন সবাই এক সঙ্গে মরি ।

উনি আমার মেয়ে নন, স্ত্রী ।

পেছন থেকে ফিসফিসগুলো ভেসে আসতে লাগল ।

ফাঁসিয়েছে মালদার আসামী।

না, তেমন বুড়ো নয় লোকটা, বেশ স্মার্ট, পঁয়তাল্লিশ হবে মনে হয় ।

মেয়েটা তো তার অর্ধেক, দেখছিস না, তাও আধুনিকা, খাঁজ দেখা যাচ্ছে ।

বাপের সঙ্গে বেরোলেও মেয়েরা খাঁজ দেখায়, খাঁজ তো আর বাপকে দেখাচ্ছে না, পাবলিককে দেখাচ্ছে; নতুন কি এতে ?

আমি তো বলব লোকটা টাকার টোপ দেখিয়েছিল, মেয়েটা তো কম স্মার্ট নয়, সুশ্রী ।

ম্যাট্রিমোনিয়াল ডট কমে দিয়েছিল হয়ত, সেখান থেকে খুঁটে তুলেছে রে ।

দুটোই ডিভোর্সি হবে বোধহয় ।

ঘাটে-ঘাটে জল খেতে গিয়ে নদীকূলে পরিচয় ।

মেয়েটা ভাবছে ক্র্যাশ হলে ও বেঁচে যাবে আর আমরা সবাই থেঁতলে ছড়িয়ে থাকব সর্ষের খেতে ।

হ্যাঁ, গায়ে পড়া টাইপের, হাই-হ্যালো করেছে, ক্যান্ডললাইট ডিনার খেয়েছে, ডিসকোয় নেচেছে, আর ব্যাস, আঙটি বদল আর লেংটি দখল ।

আমি পেছন ফিরে বলতে চাইছিলাম, না সেসব কিছুই হয়নি, নেতি আমার হাত চেপে বলল, দাও না বলতে, এনজয় করছি, আলোচনার পাত্রী হয়ে উঠেছি, ল্যাজটা না হয় খানিক মোটা হল, বাজেট এয়ারলাইন্সে চাপার এটাই প্লাস পয়েন্ট ; অন্য এয়ারলাইন্সে গেলে বিজনেস ক্লাসে সবাই মুখ গোমড়া করে দার্শনিক সেজে থাকে, বাঞ্চ অফ ওল্ড হ্যাগার্ডস, যেন আইনস্টাইনের পেট থেকে জন্মেছে ।

ফিসফিস বিরক্তিকর হয়ে উঠছিল, পেছন ফিরে বললাম, আমি সাতচল্লিশ আর উনি চব্বিশ, প্রেম করে বিয়ে করেছি । উনি আমেরিকা থেকে আমাকে বিয়ে করার জন্য এসেছেন ।

তা উনি আপনাকে ড্যাড বলছিলেন যে, একজনের যুক্তিপূর্ণ প্রশ্ন ।

উত্তরটা তুইই দিলি, আমেরিকায় এই কিছুকাল আগে অব্দি হাজব্যাণ্ড আর প্রেমিককে মেয়েরা বেবি বলে ডাকত, এখন বেবি পুরোনো হয়ে গেছে, ড্যাডি বলে ডাকা হয়, আদর করে ডাকতে হলে ব্যাড ড্যাড, শোনেননি সেই গানটা, ব্যাড ড্যাড, ডোন্ট ফিল স্যাড, ইউ আর এ ল্যাড, লে মি ওন ইওর প্যাড, স্নুপি বিচের গাওয়া ?

##

 

এলোচুলে ঢাকা রাজকন্যার মুকুটের ঝিলিক থেকে গানের টুকরো ।

কিছুটা অপরিচিত থাকার আহ্লাদ ।

##

এয়ারপোর্টের কাছের হোটেলে বাক্স-ব্যাগ রেখে তোকে পাশে বসিয়ে বাঁশদ্রোণী বাজারের দিকে চললাম, হোটেলের নির্ধারিত গাড়িতে । তুই চুড়িদার পরে নিয়েছিস ;  বাচ্চাদের মতো চারিদিকে মাথা ঘুরছে তোর । গাড়ির ভেতর থেকে স্মার্টফোনে ছবি তুলছিস, ডাবের ঠেলা, মিনিবাস, রাজনৈতিক দলের ছেঁড়া পোস্টার, মোড়ের হিজড়ে, রাস্তা পেরোনো অলস ভিড়, যা  তোকে অবাক করছিল, তারই ।

একটাও আঁস্তাকুড় দেখলুম না এখনও, বললি ।

সমবেদনার মুচকি ঠোঁটে খেলিয়ে, ড্রাইভার বলল, আঁস্তাকুড়ের ফোটো তুলবেন নাকি, দিদি । একটু অপেক্ষা করুন, সকাল এদেশে কুঁড়ে-স্বভাবের, সূর্য একটু জোর পাক গায়েগতরে, দেখতে পাবেন ।

তুই উত্তর দেয়া দরকার মনে করলি না , ঘাড় নাড়াটা সন্মতিসূচক কিনা বুঝতে পারলাম না।

আচমকা উচ্ছ্বসিত, বললি, এটা আমার দেশ, ওই বউটা কি বাচ্চা-ফেলে দেয়া মা, আরে ওই লোকটা আমার মতন ঢ্যাঙা, ও নিশ্চয়ই ফেলে দেয়া বাচ্চার বাবা, নাঃ, রাসকেলটা  বুড়ো হয়ে গিয়ে থাকবে, কিংবা নরকে গিয়ে গরম তেলে ঝলসে মরছে । কে জানে, মুসলমানও হতে পারে, মুসলমানরা বেশ লম্বা-চওড়া হয়, তা যদি হয় তাহলে জাহান্নমে অপেক্ষা করছে কয়ামতের জন্য ।

বেশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে উঠলি, যতই যাই হোক, আঁস্তাকুড়ে জন্মে থাকি বা না থাকি,  এটা আমার মাতৃভূমি, আই লাভ ইট।

তোকে চিমটি কাটতে হল, ড্রাইভার তো আমেরিকা বা গুড়গাঁওয়ের নয়, যে বাংলা বুঝতে পারবে না!

তোর মুখের দিকে তাকিয়ে বললাম, মাতৃভূমি মানুষকে মূর্খ করে তোলে, আবেগের গাধা বানায় ; মাতৃভূমির প্রেমে পড়ে রাশিয়ানরা কার্ল মার্কসকে বদনাম করে দিলে । শুনেছিস তো মার্কসের নাম ।

শুনেছি, শুনেছি, দাড়িগোঁপ ছিল, তোর কন্ঠস্বরে অন্য চিন্তাকে বিপথগামী করে দেবার অভিযোগ ।

ড্রাইভার শুনছিল তোর কথা, বলল, দিদি, মাতৃভূমি আর নেই, এখন যে দল সরকার চালায় সেই দলকে ভালোবাসতে হয় । দেশটাকে তো সবাই মিলে  আঁস্তাকুড় বানিয়ে ফেলেছে । যে লোক নেতা হয়, সে মনে করে সে-ই বুঝি সরকার, তার হুকুম সবাইকে মানতে হবে, নইলেই কেলেঙ্কারি, খুনোখুনি, মাটির তলায় হাড়পাঁজর, ছেলেপুলে কাঁখে গ্রাম ছেড়ে পালাতে হবে ।

তুই বললি, কী যে বলছেন, সরকার আর মাতৃভূমি তো এক নয় ।

এখন লোকে মাতৃভূমির জন্য জান দেয় না গো দিদি, দলের জন্য দেয়, শহিদ হয়, যারা মরে আর যারা মারে, সবাই তা দলের জন্য করে, মাতৃভূমির জন্য নয়, বলল ড্রাইভার , নিজের মাকেই বুড়ো বয়সে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দ্যায়, আর আপনি মাতৃভূমির কথা বলছেন । এই তো সেদিন পড়লুম,  মাকে খুন করে তার সম্পত্তি হাতিয়েছে চার ছেলে ষড়যন্ত্র করে, মুখে অ্যাসিড ঢেলে তারপর পুড়িয়ে মেরে ফেলেছিল, যাতে পুলিশ চিনতে না পারে ।

যাক, ড্রাইভারটা অন্তত তোকে চুপ করিয়ে দিতে পারল, নয়তো কি-কি বকে যেতিস মাথামুণ্ডু ।

নাঃ, তুই দমবার নয়, আবার আরম্ভ করলি কিছুক্ষণ চুপ থেকে, ওরা সব প্যারানয়েড, বুঝলেন, পশ্চিমবাংলা হল আমার আর আপনার, আমাদের, আমি নলেন গুড়ের সন্দেশ ভালোবাসি, পাটালি গুড়, পাটি সাপটা, জামদানি শাড়ি, দুর্গাপুজো, সরস্বতী পুজোর অঞ্জলি, রবীন্দ্রসঙ্গীত, ভাপা ইলিশ, ট্যাংরা মাছের ঝোল, শিষপালঙের চচ্চড়ি, চালতার অম্বল, আমার চাষি-ড্যাডিকে ভালোবাসি, এইগুলোতে কি পশ্চিমবাংলা নেই ?

এবার ড্রাইভার যা বলল, তাতে তুই একেবারে চুপ করে গেলি, জিগ্যেস করল, আপনি কোথায় থাকেন?

তুই বললি, আমেরিকা, আর সামনের আয়নায় দেখতে পেলি ড্রাইভারের ঠোঁটে মৃদু শ্লেষের হাসি ।

হঠাৎ বলে উঠলি, আচ্ছা, জোনাকি কোথায় দেখতে পাবো ? আমি আজ অব্দি জোনাকি দেখিনি ।

ড্রাইভার এবারে তোকে বিপদে ফেলল ওর অনুসন্ধিৎসা প্রয়োগ করে, দিদি, কোথায় জন্মেছেন, পশ্চিমবাংলায় কোথায়, যে জোনাকি দেখতে চাইছেন ?

আঁস্তাকুড়ে, বললি তুই ।

ড্রাইভার ভাবল ঠাট্টা করছিস, আমাকে জিগ্যেস করল, স্যার কোথাকার লোক আপনারা, আপনার মেয়ে এখনও পশ্চিমবাংলা দেখেননি ?

উনি আমার মেয়ে নন, আমার স্ত্রী, বললুম, তারপর যোগ করলুম, তুমি আমাদের যেখানে নিয়ে যাচ্ছ, বাঁশদ্রোণী বাজার, সেই বাজারের বাইরে জঞ্জাল ফেলার যে আঁস্তাকুড় আছে, সেখানে এনাকে ফেলে গিয়েছিলেন এনার বাবা কিংবা মা, তখন এনার কয়েকদিন মাত্র বয়স, তারপর স্হানীয় ক্লাব, যাদবপুর থানা, হাসপাতাল, স্হানীয় এনজিও  হয়ে ইনি দিল্লির জনসেবামূলক এক সংস্হায় পৌঁছোন, একটি বাঙালি পরিবারে পড়াশুনা করে আমেরিকায় বড়ো চাকরি করছেন ; ওনার সঙ্গে আমার পরিচয় দিল্লিতে ।

দিদি, আপনাকে দেখে বাংলা ফিলিমের  নায়িকা মনে হয়েছিল, এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না যে ঘটনাটা সত্যি ।

তুই বললি, গ্রেট, সিনেমা হলে বসে বাংলা ফিল্ম জীবনে দেখিনি, একটা ফিল্মও দেখব ড্যাড । হিরোরা কি বলিউডের মতন মারামারি করে ? নাচে ? ঝিনচাক ঝিনচাক ? আইটেম ডান্স হয় ? বিড়ি জালাইলে ? ঝাণ্ডুবাম ? বেবি ডল ম্যায় সোনে দি হয় ?

ড্রাইভার বলল, সব শিল্প পশ্চিমবাংলা ছেড়ে চলে যাচ্ছে ।

শিল্প আবার চলে যাবে কেন, কোটি-কোটি টাকায় আজকাল বাঙালি শিল্পীদের পেইনটিং বিক্রি হচ্ছে ; যারা আর্টিস্ট নয় তাদের পেইনটিংও অনেক দামে বিক্রি হচ্ছে, পশ্চিমবাংলার আর্ট জগদ্বিখ্যাত ।

আর্টের কথা বলছে না, বলছে কলকারখানার কথা, ইনডাসট্রির কথা । আমি বললুম ।

ইনডাসট্রিকে আর্ট মনে করা ভুল, মনে হবে রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে কলকারখানা বসিয়ে গেছেন ।

তাই করলেই ভালো হতো দিদি, ড্রাইভার বলল ।

তুই বললি, এখন তো তাই মনে হয় ; শান্তিনিকেতনে যাবার কথা ভাবি , এবার হবে না ।  রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করব ।

রবীন্দ্রনাথ বহুকাল আগে মারা গেছেন, বললাম আমি ।

মারা গেলেই বা, মারা গেলেই তো আর মানুষ মরে যায় না, আমি শান্তিনিকেতনে গেলে রবীন্দ্রনাথের অবশ্যই দেখা পাবো ; জোড়াসাঁকোয় গিয়ে রবীন্দ্রনাথের পরিবারের সবাই কে কেমন আছেন খোঁজ নেবো। দক্ষিণেশ্বরে গিয়ে রামকৃষ্ণদেব আর স্বামী বিবেকানন্দর সঙ্গে দেখা করব । সুভাষচন্দ্র বসু তো বাড়ি ফেরেননি, নয়তো ওনার সঙ্গেও দেখা করতুম । লোকে বোধগয়ায় যায় কেন ? গৌতমবুদ্ধের সঙ্গে কথা বলবে বলে, ওওওওউউউম মণিপদ্মে হুমমমমমম ।

তুই ইনকরিজিবল, বললাম গলার স্বর নামিয়ে ।

##

এর মতো, ওর মতো, তার মতো, কারো মতো নয় ।

যেন এমন, যেন অমন, যেন তেমন নয় ।

##

বাঁশদ্রোণী বাজারের কাছে পৌঁছে ড্রাইভার বলল, এখানে পার্কিং নেই, আপনারা যা কেনাকাটা বা দরকারি কাজ সেরে আমায় ফোন করে দেবেন, এসে যাবো, দেখি কোথায় গাড়ি পার্ক করা যায় ।

গাড়ি থেকে নামলি, সামনেই সেই জঞ্জালের ভ্যাট বা আঁস্তাকুড়, তুই একেবারে কাছে গিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিস, তোর মায়ের স্মৃতি টিকে আছে কিনা, হয়তো সেকথাই ভাবছিস, কিংবা কি করে এরকম নোংরা জায়গায় পড়ে থেকেও বেঁচে রইলি ।

আমি দাঁড়িয়ে রইলাম দূরে, যাতে তুই নিজের সঙ্গে কথা বলতে পারিস, বোঝাপড়া করতে পারিস । ফোটো তুলছিস না কেন, বলেছিলিস ফোটো তুলবি, মনে করিয়ে দেব কিনা ভাবছিলাম, তখনই তুই আঁস্তাকুড়ের ভেতরে ঢুকে পচা সবজি, ছাই, মাছের আঁশপোঁটার ওপর চিৎ হয়ে শুয়ে পড়লি, নানা ভঙ্গীতে একের পর এক সেলফি তুলতে লাগলি, আর লোক জড়ো করে ফেললি ; আমি দৌড়োলাম তোর দিকে, পরিস্হিতি সামলাবার জন্য ।

হাত ধরে তোকে টেনে তুলতে যাব, তুই বললি, আমি চিৎ হয়ে, পাশ ফিরে, নানা পোজে শুচ্ছি, তুমি ফোটো তুলে নাও তো ।

তুই পোজ দিতে লাগলি, আমি ক্লিক করতে লাগলুম । হলুদ রঙের কুর্তার ওপর সবুজ ফুল, সবুজ চুড়িদার, ওড়না নেই ।

যখন উঠে দাঁড়ালি, ঠাকুমার ঝুলি বইয়ের গাছপাতা-চরিত্র, তোর পোশাকে  ডাস্টবিনের নোংরা জঞ্জাল জেঁকে বসেছে, মাছের আঁশ ঝরছে ।

দুহাত দুপাশে ছড়িয়ে বললি, এই দ্যাখো, জঞ্জালমাতা হয়ে গেছি, বিশ্বসুন্দরী প্যাজেন্টে চললুম ।

কোনো প্রতিযোগীতা আছে কি ম্যাডাম, আঁস্তাকুড়ে সেলফি নেবার ? জানতে চাইল এক পথচারী ।

অনেক ভালো সেলফি উঠত, আপনার কাছে যদি সেলফি স্টিক থাকত, বলল একজন যুবতী, থলে থেকে লাউ, পালং শাকের আঁটি, সজনে ডাঁটা  বেরিয়ে রয়েছে ।

আরেকজন জানতে চাইল, কিসের বিজ্ঞাপনের মডেলিং করছেন ম্যাম, হার্বাল প্রডাক্টের ? দেখিনি তো আগে  আপনাকে টিভিতে বা কাগজে ।

চব্বিশ বছর আগে ওনার মা বা বাবা ওনাকে এই আঁস্তাকুড়ে ফেলে চলে গিয়েছিলেন, বললাম আমি, অগত্যা  ।

ভিড়ের মেজাজ বোঝা বেশ কঠিন, কখন কোন দিকে মোড় নেবে বলা যায় না । তোর বাহু ধরে একটু এগিয়ে ড্রাইভারটাকে ফোনে ডাকলাম । তোকে বললাম, কি করলি কি, এখন এগুলো পালটাবি কি করে?  ইনফেকশান হয়ে যাবে ।

হাত ছাড়িয়ে নিয়ে তুই বললি, কিছুই হবে না, দেখে নিও, আমি জঞ্জালপ্রুফ, লাথিপ্রুফ, ঘেন্নাপ্রুফ, গলাধাক্কাপ্রুফ, নয়তো বাঁচতুম না, তখনই মরে যেতুম । তোমার কি মনে হয় জীবনে ধাক্কা খাইনি ? শুনলে তোমার মাথায় রক্ত উঠে যাবে ।

একটি লোক আমাদের পেছু নিয়েছিল, বলল, স্যার, আমাদের দোকানে ওনার মাপের চুড়িদার আছে, পোশাক পালটাবার ঘরও আছে ।

দারুণ তো, বলে লোকটার সঙ্গী হলি তুই, আমি পেছন-পেছন, ড্রাইভারকে বললাম, এক্ষুনি আসতে হবে না, একটু পরে এসো ।

লাল রঙের কুর্তা কিনলি, তাতে কালো ডোরা লম্বালম্বি, চুড়িদারও লাল । তোকে ঘিরে থাকা ভিড়ে দশ-বারো বছরের একটা ছেলে তোর মুখের দিকে বিস্ময়ে তাকিয়েছিল, তুই তাকে নোংরা পোশাকের প্যাকেটটা দিয়ে বললি, খোকাবাবু, এটা ওই আঁস্তাকুড়ে ফেলে এসো তো ।

ছেলেটি বলল, আমার নাম খোকাবাবু নয় ।

তুই বললি, আচ্ছা নবীনকিশোর, ফেলে এসোতো এটা ।

ছেলেটি : আপনি কি করে জানলেন আমার নাম নবীনকিশোর ?

তুই : তোমার গোল মুখ দেখে ; যাদের মুখ গোল হয়, তাদের নাম সাধারণত নবীনকিশোর হয় ।

বৃদ্ধ কেশিয়ার টাকা গুণতে-গুণতে বলল,  শুনলাম আপনাকে আঁস্তাকুড়ে পাওয়া গিয়েছিল, আমি জানি ব্যাপারটা, অষ্টম সন্তানকে ত্যাগ করার ঘটনা, হইচই হয়েছিল বেশ । শান্তনুর বাচ্চাদের গঙ্গাদেবী জলে ভাসিয়ে দিতেন, গল্প শুনেছেন তো ? শেষে অষ্টম সন্তানকে ভাসাতে গেলে শান্তনু বাধা দিয়েছিলেন, সেই অষ্টম সন্তান ছিলেন মহাভারতের ভীষ্ম ; কত কষ্ট ভোগ করতে হয়েছিল ওনাকে, বিয়ে করতে পারেননি, সংসার করতে পারেননি ।

তুই আমার দিকে তাকিয়ে বললি, ভাগ্য ভালো যে জোর করে দখল করে নিয়েছি পছন্দের লোকটাকে।               গেঞ্জি কিনছিল এক প্রৌঢ়, বলল, ভাদ্রমাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টম তিথিতে মথুরার রাজপরিবারে বাসুদেব আর দেবকীর অষ্টম পুত্র হয়ে জন্মেছিলেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ, জানেন কি ?

তুই বললি, গল্পটা জানি, অষ্টম গর্ভের কথা জানতুম না, জানা ছিল না, শ্রীকৃষ্ণের চেয়ে যেমন বয়সে অনেক বড়ো ছিলেন ওনার প্রেমিকা রাধা, তেমনি আমার আর আমার শ্রীকৃষ্ণের বয়সের পার্থক্য ; আমি ওনার এলেকট্রারাধা । আমার দিকে তাকিয়ে তোর উক্তি, কি ঠিক বলেছি না, ড্যাড ?

বৃদ্ধ বলল, আমরা শুনেছিলাম সেই বাচ্চাকে কোনো বিদেশি কোল নিয়েছে । নিচের তলায় যান, মাছের বাজারে, অনন্ত নামে একজন মাছ বিক্রি করে, ওর কুটুমের গ্রামের ঘটনা, অবশ্য অনন্ত তখন ছোটো ছিল, গ্রামের এবং পরিবারের তো হালহদিশ দিতে পারবে ।

শুনেই তুই দৌড়োলি নিচে, মাছের বাজারে, ঢুকেই চেঁচালি, অনন্ত, অনন্ত কে, আপনাদের মধ্যে কার নাম অনন্ত ?

আঁশবঁটিতে ধড় থেকে তিন কেজি রুইয়ের মুড়ো আলাদা করছিল, লুঙ্গি-পরা মাঝবয়সী মাছবিক্রেতা, সে বলল, আমিই অনন্ত, বলুন, কবেকার অর্ডার, যত ওজনের চাইবেন এনে দেবো, বিয়ের সিজন, দিন পাঁচেক আগে অর্ডার দিতে হবে ।

আমাদের পেছনে যারা জড়ো হয়েছিল, তাদের একজন বলল, উনি তোমার কুটুমের গ্রামে যাবেন, তোমার কোন এক জ্ঞাতি তার অষ্টম মেয়েকে ফেলে গিয়েছিল বাজারের জঞ্জাল ফেলার জায়গায়, সেই যে কত থানা-পুলিশ কাগজ-কিচাইন হয়েছিল, তারপর যাদের বাচ্চা তারা ধরা পড়ার পর বললে যে, না, তাদের নয়, মনে নেই ? কত কচাল করেছিল লোকেরা । উনি বলছেন যে উনিই সেই বাচ্চা ।

লুঙ্গিতে হাত পুঁছে উঠে দাঁড়াল চশমা-পরা তেলালো টেরিকাটা অনন্ত, যেন মাছেদের নিশিডাক দিয়ে জালে তুলতে চলেছে । বাকরহিত বলতে যা বোঝায় । বসল, কাৎ করে রাখল মেগাসাইজ বঁটি । বলল, আজকে হবে না দিদি, আজকে আমার ছেলে আসতে পারেনি, আপনি কালকে ভোরবেলা আসুন, ভোর-ভোর না বেরোলে  ফিরতে অনেক রাত হয়ে যাবে আপনাদের, দিনকাল ভালো নয় জানেনই তো । গ্রামর নাম লক্ষ্মীপুর, ঈশ্বরপুরের কাছে, জীবনপুরে যাবার পথে, রাজপুর-সোনারপুর বা বারুইপুর হয়ে যেতে হবে । আজকে আপনি ক্লাবে হয়ে আসুন বরং, ওনারাই আপনাকে থানায় নিয়ে গিয়েছিলেন ।

তুই : ঈশ্বরপুর, জীবনপুর, লক্ষ্মীপুর, বাঃ, পারফেক্ট নাম, গডলি-গডলি । ঠিক এই কথাই রইল তাহলে, কাল সকাল সাতটায় এসে যাবো, গাড়ি ভাড়া নিয়েই আসব, আমার বরের সঙ্গে ।

অনন্ত : বিয়েও হয়ে গেছে আপনার ? বর পক্ষ ব্যাপারটা জানে ?

তুই : ওই তো আমার সুপুরুষ বর দাঁড়িয়ে আছেন ।

অনন্ত : বড়লোক বর পেয়েছেন দিদি, কি ভাগ্যি আপনার । গিয়ে আপনার বোনেদের দেখবেন, দু-বেলা খেতে পায় না, সবায়ের অ্যাণ্ডাগ্যাণ্ডা  ছেলে-মেয়ে ।

তুই : বোন ? কতগুলো বোন ? জিগ্যেস করে আমার দিকে ফিরে জয়ের হাসি খেলালি ঠোঁটে ।

অনন্ত : আপনি অষ্টম গর্ভের সন্তান তো, আপনার আগে আরো সাত বোন, সবাই হয়তো বেঁচেবর্তে নেই, কারা আছে কারা নেই বিশেষ জানি না গো, ছেলেপুলেরা থাকবে । দশ-বারো বছর হয়ে গেল ওমুখো হইনি । ছেলে হয়েছিল ওদের,  আপনার পর, শুনেছি, সেই ছেলে বিয়োতে গিয়ে আপনার মা মরে গিসলো । কি করবে বলুন, খাওয়াতে পারে না, বাচ্চা বিইয়ে চলেছে, গেল শেষে সগগে ।

তুই : বিইয়ে চলেছে, শুনতে কতো ভালো লাগে, তাই না ? অষ্টম গর্ভ ? এইটথ চাইল্ড ! হুউউউশ ওয়ান, হুউউউশ টু, হুউউউশ থ্রি, হুউউউশ ফোর, এই করে আটবার । ঈশ্বরপুরের মেয়ে, যেতেই হবে, আপনি রেডি থাকবেন, আমরা সাতটায় পোঁছোচ্ছি।

বিশাল ভেটকি কেটে খদ্দেরের জন্য ফিলে বানাচ্ছিল যে, সে বলল, কিন্তু ক্লাব তো এখুন তৃণমূল নিয়ে নিয়েচে ।

শিঙিমাগুর বিক্রেতা : আরে ঘেঁচুবাবু সিপিএম ছেড়ে তৃণমূলে চলে গেচেন, ফুটানিবাবুও ওনার পেচন পেচন গেচেন, ভালোবাবু তো তৃণমূলের কি একটা পুরস্কারও পেলেন, ওনার হ্যাদানে ফোটো আছে ক্লাবঘরে, দুহাতে সেই কেঠো তকতিখানা ধরে আচেন, মুচকি হাসিতে গুটকা-দেঁতো ফোকলা ঢেকে ।

ভেটকি : তখুন তো অ্যামবুলেন্স পায়নি ওঁয়ারা, চাঁদুচৈতনের বউ রিকশায় চেপে আপনাকে কোলে করে থানায় নিয়ে গিসলো ।

রুই : চাঁদুচৈতনকে পাবো কি ক্লাবঘরে ?

শিঙি : না ওনারা দুজনেই গত হয়েছেন ।

তুই : ক্লাবটা কোথায় ?

কুচোমাছ বিক্রেতা : অ্যাই বদনা মাছ বাচা বন্ধ রেখে এনাদের নিয়ে যা তো ক্লাবঘরে, ক্যারাম খেলছে বোধহয় ঘেঁচুবাবুর ছেলেরা । তোকে মাছ ছাড়াবার ভরতুকি দিয়ে দেবেন দিদি ।

তুই : কত দূরে ?

কুচো : ওই তো রাস্তায় বেরিয়ে দু’পা হাঁটলেই বাঁদিকে ।

তুই : এটা কি মাছ ?

অনন্ত : ফলুই ।

তুই : ওউ-ওউ-ওউ-ওউ, কত্তো রকমের মাছ, কত টাটকা, পাবদা, পারসে, খয়রা, বাটা, গুড়জাওলি, কাজরি, আহা, মনে হচ্ছে কাঁচাই খেয়ে নিই । বাসি মাছ খেয়ে বোর হয়ে গেছি । যে মাছে কাঁটা থাকে না, সে মাছে বোধহয় স্বাদ হয় না ; কাঁটাহীন ইলিশ কি ভাবা যায় ?

অনন্ত : যা বলেছেন, এদেশে একবার আসে হেঁটে কাঁটার দল, তারা গিয়ে আসে ওপরে কাঁটার দল ।

তুই : মানে ?

অনন্ত : মানে ওই ওপরে কাঁটা হেঁটে কাঁটা, এদেশে থাকলে টের পেতেন ।

নবীনকিশোর ছুটতে ছুটতে এসে জানাল, ক্লাবঘর বন্ধ, তালা দেয়া, ঘেঁচুকাকু আর ফুটানিকাকু দুজনেই কলেজ ইউনিয়ানের নির্বাচন সামলাতে গেছেন ।

তুই : ধ্যুৎ, এই বয়সে কলেজে পড়েন নাকি তাঁরা ?

নবীনকিশোর : দিদি, ঘেঁচুকাকু-ফুটানিকাকুকে বাদ দিয়ে এই এলাকায় কোনো ছাত্রের ইয়ে ঝরে না আর কোনো ছাত্রির উয়ো পড়ে না ।

অনন্তর দিকে তাকিয়ে বললি, সেই কথাই রইল, কাল সকাল সাতটা ।

আমার দিকে তাকিয়ে বললি, ইয়ে ঝরার পর কিন্তু উয়ো পড়া বন্ধ হয়ে যায় ; ড্যাড, অবসিনিটি ব্যাপারটা জেনারেশান গ্যাপের সঠিক মেজারমেন্ট করে ।

আমাদের বয়সের পার্থক্যকে টিটকিরি মারলি কিনা বুঝতে পারলাম না, বললাম, জানি, ওসব কুকথা শুনে-শুনেই এখান-ওখানের চুল পাকিয়েছি ।

তুই কাপড়ের দোকানটায় গিয়ে আবার ঢুকলি, বললি, শুনলুম আমার সাত বোন আছে, তাদের ছেলেপুলে আছে, কতজন তা তো জানি না, আপনি গ্রামে পরা যায় এমন কুড়িটা শাড়ি প্যাক করে দিন, আর আমার মাপের যেকোনো রঙের ব্লাউজ দিন, গ্রামে পরা যায় এমন ।

দেখলিও না ব্লাউজ আর শাড়িগুলো, দাম যা চাইল মিটিয়ে দিলি । আমি দিতে পারতাম, কিন্তু তোর তো মুখের আগল নেই, বেফাঁস কি বলে ফেলবি, পকেটে হাত ঢুকিয়েও বের করে নিলাম ।

বাজার থেকে বেরিয়ে দেখলাম আঁস্তাকুড় ঘিরে ভিড় ; একজন করে তার ভেতর ঢুকে জঞ্জালের ওপর শুয়ে সেলফি তুলছে, আরেকজন দ্রুত ঢুকতে চাইছে, বেশ ঠেলাঠেলি, বুম হাতে একজন সাংবাদিকা আর কাঁধে ক্যামেরা তার আধাযুবক সঙ্গী । জঞ্জালের ওপর শুয়ে যে প্রৌঢ়া সেলফি নিচ্ছে, তাকে জিগ্যেস করল, কেমন লাগছে আপনার ?

সে বলল, ওঃ অসাধারণ অভিজ্ঞতা, কি যে ভালো লাগল, দারুণ দারুণ !

তোর বাহু ধরে ছুটলাম গাড়ির দিকে ।

##

 

মায়ের ঘরেই শুয়েছিলি তুই, আমাকেও টেনে নিয়ে গিয়েছিলি, দুজনের বেশি আঁটে ওই খাটে, বলেছিলি। মোবাইলে অ্যালার্ম দিয়েছিলি ভোর পাঁচটার, উঠতে যাবো, বললি, অ্যালার্মটা মরনিং গ্লোরির জন্য, বিছানা থেকে বেরোবার জন্য নয়, ভোরের স্পার্ম অব্যর্থ, ঠিক পথ কেটে পোঁছে যায় গন্তব্যে ।

তোর নির্দেশ অনুযায়ী গন্তব্যে পাঠিয়ে উঠে পড়লাম, মিনিট তিরিশেক জিমে কার্ডিও না করলে শরীর বেশ ঢিলেঢালা ঠ্যাকে ।

##

 

বেরোবার সময় দেখলাম তুই তোর ব্যাগে একশো টাকার বেশ কয়েকটা প্যাকেট ঢোকালি ; আমিও নিয়েছি, সঙ্গে, যদি দরকার পড়ে । শাড়িগুলো নিয়েছিস প্লাসটিকের প্যাকেটে ।

তুই পারফিউম লাগাসনি, লিপ্সটিক বোলাসনি ঠোঁটে, নখপালিশ তুলে ফেলেছিস, হাফহাতা সবুজ ব্লাউজ পরেছিস, তার সঙ্গে মানায় না এমন  খয়েরি সিনথেটিক শাড়ি । পায়ে ফ্ল্যাপার । কিন্তু একবার আধুনিকতা যদি আঁকড়ে ধরে, যতই পোশাক-আশাক পালটাও, ছাড়াতে পারবে না ।

##

সকালে বাজারের সামনে অনন্ত ধুতি পাঞ্জাবিতে, টেরিকাটা তেলালো চুল, হাতে থলে, সম্ভবত আত্মীয়ের জন্য উপহার নিয়ে যাচ্ছে ।

ভাজা হচ্ছে দেখে, তুই চেঁচিয়ে উঠলি, জিলাপি জিলাপি জিলাপি জিলাপি ।

এক চ্যাঁচারি জিলিপি আর রাধাবল্লভি-আলুর দম কিনলাম । তোর বোনেদের জন্য সন্দেশ আর রসগোল্লার হাঁড়ি ।

অনন্ত ড্রাইভারকে বলল, দুধানি, সাহেবপুর, বোদরা, হয়ে চলুন, বারুইপুর থেকে টার্ন নেবেন, নেত্রা পর্যন্ত ভালো বাঁধানো রাস্তা ছিল, এখন কেমন বলতে পারব না ; জানেন তো রাস্তটা ?

ড্রাইভার ঘাড় নাড়ল, যারা ভাড়া নিয়েছে তাদের বদলে একজন সামান্য লোক হুকুম দিল বলে ওর মুখের অস্বস্তি তুই দেখলি আয়নায়, সামলাবার জন্য আমাকে জিগ্যেস করলি, তুমি জানো ?

বললাম, না, এদিকে কখনও আসিনি, সুন্দরবনে যাবার পরিকল্পনা একবার করেছিলাম, সঙ্গী পেলাম না।

মুখে জিলিপি নিয়ে বললি, এবার তো সঙ্গিনী রয়েছে, চলো না ঘুরে আসি, দারুণ হবে, টাইগ্রেস অ্যাণ্ড দি টাইগার ইন টাইগারল্যাণ্ড, ঘ্র্যাঁআওওওও ।

যে কয়দিন ছুটি, তার ভেতরেই সেরে ফেলতে হবে তোর মিশন ; প্রথম মিশন সফল, সেলফি তুলে নিয়েছিস, জেনেও ফেলে থাকবে তোর বন্ধুবান্ধব, নেট থেকে ।

গ্রামে আমার আত্মীয়স্বজন কারা আছে দেখি, তাদের ফোটো আপলোড করা যাবে কিনা গিয়ে দেখা করলে টের পাবো , গ্রামের ফোটো তুলে নেব।

গাড়ি বারুইপুর ছাড়ার পর মেঠো সবুজ বাতাসে তন্দ্রা এসে গিয়েছিল । তুই ঠেলে তুললি, বললি, দ্যাখো-দ্যাখো ধানখেত, খেজুর গাছ, কতো গাছের সারি রাস্তার দুপাশে, আমার মাতৃভূমি । এটা কি গাড়ি, অন্য কোথাও দেখিনি তো, গাদাগাদি মানুষ ?

মোটরসাইকেলভ্যান, ভটভটিরিকশা ।

ড্রাইভার মনে রেখেছে তোর কালকের কথোপকথন, পেছন ফিরে হাসল, সমবেদনার মুচকি  ।

পাখি দেখে চেঁচিয়ে উঠলি, মাছরাঙা, মাছরাঙা ।

অনন্ত বলল, দিদি ওটা নীলকন্ঠ পাখি ।

বেশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে অবাক করে দিয়ে আরম্ভ করলি, তোর চরিত্রের এই দিকের সঙ্গে পরিচিত ছিলাম না, এত বেশি কনভেন্টি অক্সব্রিজ ইংরেজি দিয়ে আমার বাংলা-টানের ইংরেজিকে আঘাত করছিলি এসে পর্যন্ত, জানতে পারিনি যে আঁস্তাকুড়ে পড়ে থাকার স্মৃতি তোকে এভাবে সমৃদ্ধ করে তুলেছে, শুনতে-শুনতে কাঁটা দিতে লাগল গায়ে :

##

 

আবার আসিব ফিরে ধানসিড়িটির তীরে– এই বাংলায়

হয়তো মানুষ নয়– হয়তো বা শঙ্খচিল শালিকের বেশে;

হয়তো ভোরের কাক হয়ে এই কার্তিকের নবান্নের দেশে

কুয়াশার বুকে ভেসে একদিন আসিব এ কাঁঠাল ছায়ায় ;

হয়তো বা হাঁস হব — কিশোরীর — ঘুঙুর রহিবে লাল পায়,

সারা দিন কেটে যাবে কলমীর গন্ধ ভরা জলে ভেসে ভেসে ;

আবার আসিব আমি বাংলার নদী মাঠ ক্ষেত ভালোবাসে

জলাঙ্গীর ঢেউয়ে ভেজা বাংলার এ সবুজ করুণ ডাঙায় ;

##

হয়তো দেখিবে চেয়ে সুদর্শন উড়িতেছে সন্ধ্যার বাতাসে ;

হয়তো শুনিবে এক লক্ষ্মীপেঁচা ডাকিতেছে শিমুলের ডালে ;

হয়তো খইয়ের ধান ছড়াতেছে শিশু এক উঠানের ঘাসে;

রূপসার ঘোলাজলে হয়তো কিশোর এক শাদা ছেঁড়া পালে

ডিঙা বায় ; — রাঙা মেঘ সাঁতরায়ে অন্ধকারে আসিতেছে নীড়ে

দেখিবে ধবল বক : আমারেই পাবে তুমি ইহাদের ভিড়ে–

##

 

ড্রাইভারই প্রথম মন্তব্য করল, দেখছেন তো আপনিও মানুষ হয়ে আসতে চাইছেন না, শালিক, কাক, হাঁস, লক্ষ্মীপেঁচা, বক হয়ে আসতে চাইছেন, কেউই আর মানুষ হয়ে জন্মাতে চায় না এই পোড়া দেশে ।

অনন্ত বলল, আপনার গলাটা বেশ মিঠে, শুনতে শুনতে বিভোর হয়ে গিসলুম, ঠিকই বলেছেন আপনি, কেউই আর মানুষ জন্ম চাইছে না , আমি মাছ হয়েও জন্মাতে চাই না, শেষে এই পাপীদের পেটের খিদে মেটাতে হবে, তারচেয়ে মাছরাঙা হব, পানকৌড়ি হব, শকুন হতেও রাজি আছি ।

তুই বললি, কবিতাটা আমার নয় ।

আমি জানতে চাইলাম, কার ?

তুই বললি, বইগুলো তো তুমিই পাঠিয়েছিলে, ভুলে গেলে কি করে ।

বললাম, আমার এক জুনিয়ার অফিসার, কলকাতায় বাড়ি, তাকে বলেছিলাম, বাংলা সেলেকটেড বইয়ের অর্ডার দিয়ে দিতে, যাতে তোর নামে ওরা জগদীশের গুড়গাঁয়ের বাড়িতে পাঠিয়ে দ্যায় । এরকম যে কবিতা হয় জানতাম না, স্কুলের পর তো আর পড়া হয়নি কবিতা । কার লেখা ?

তুই বললি, খুঁজো ।

##

 

এর মতো, ওর মতো, তার মতো, কারো মতো নয় ।

যেন এমন, যেন অমন, যেন তেমন নয় ।

##

পথের বোর্ড দেখে বুঝলাম আমরা ঈশ্বরপুরের  কাছাকাছি এসে পড়েছি । অনন্ত বলল, এবার নাবুন, লক্ষ্মীপুর যেতে কিছুটা কাঁচা রাস্তায় হাঁটতে হবে ।

গাড়ি আসছে দেখে দূর থেকে গ্রামের কিশোর-কিশোরীরা ছুটে এইদিকেই আসছিল ।

অনন্ত তাদের দিকে তাকিয়ে বলল, মানিক সর্দারের বাড়িটা কোন দিকে রে, নিয়ে চল তো আমাদের।

মানিকবুড়ো তো কবেই মরে গেচে, বলল একটি কিশোরী, বেশ কয়েকদিন স্নান করেনি বোধহয়, চুল শুকনো, বাসি বিনুনি, বয়সের চেয়ে বড়ো মাপের ফ্রক ।

তা জানি, অনন্ত বলল, বাড়ি তো আছে, বাড়ির লোকজন তো আছে ?

তুই আমার দিকে তাকিয়ে বললি, সি, আই নিউ আই অ্যাম এ সরদারনি । দুহাত তুলে চেঁচিয়ে উঠলি, জো বোলে সো নিহাল, সত শ্রী অকাল ।

কয়েকজন বাচ্চা তোর দেখাদেখি দুহাত তুলে চেঁচালো, অকাল অকাল অকাল অকাল, কি মজা, অকাল অকাল, চেঁচাতে চেঁচাতে দৌড়োলো খড়ের চাল দেয়া  কুঁড়েঘরগুলোর দিকে ।

এরা না চেঁচানো পর্যন্ত মনে হচ্ছিল গ্রামটা মৌনতায় ঝিমিয়ে , দুঃখি-দুঃখি, চুপচাপ শোক পালন করছে ।

কাপড়ের থলেটা আমার হাতে ধরিয়ে বাচ্চাদের ফোটো তুললি, আমাকে বললি, এদের সঙ্গে কয়েকটা গ্রুপ ফোটো তুলে দাও তো । দিলুম । তুই দুই কিশোরীকে জড়িয়ে উবু হয়ে পথের ওপর । একটি কিশোরী কেঁদে ফেলল, তুই তাকে জড়িয়ে ধরিসনি বলে ; সবাইকে জড়িয়ে সাতটা ফোটো তোলালি । জিলিপি আর রাধাবল্লভির চ্যাঁচারিটা একটি কিশোরীর হাতে দিয়ে বললি, তোমাদের জন্য ।

আমার দিকে তাকিয়ে বললি, জড়িয়ে পাঁজরের হাড় ঠেকলো, এই পশ্চিমবাংলা দেখতে পাইনি, বাইরে-বাইরে সবুজ দেখছি তখন থেকে, গুড়গাঁওয়ের ময়লাকুড়ুনিয়াদের হাড়পাঁজর দেখি না তো  । এত এত সবুজ অথচ হাড়পাঁজুরে ছেলেমেয়ে ! ম্যালনিউট্রিশান, দেখেই বুঝতে পারছি ।

বললুম, আঁস্তাকুড়ে সেলফি তুললি আর এখন দারিদ্র দেখতে পাচ্ছিস গ্রামে এসে ?

তুই বললি, জানি জানি, গরিবের মাংস খেয়ে লোকে ধনী হয়, ধনীর মাংস যদি খেতে না পায় তাহলে গরিব কি করেই বা স্বাস্হ্যবান হবে ! এসে পর্যন্ত যা দেখছি, খাওয়া যেতে পারে এমন ধনী চোখে পড়ল না ।

অনন্ত বলল, আচে আচে দিদি, তেনারা সব নেতা, গরিব সেজে থাকেন, গরিবেরই মাংস হাপুস-হুপুস করে খান, খেয়ে পিচ করে রক্তের পিক ফ্যালেন ।

##

মানিক সর্দারের বাড়ি, খড়ের চালা, বাঁশের বেড়া ভেঙে পড়েছে, একটা খুঁটিতে বাদামি রঙের শিড়িঙে গাইগোরু, পৌঢ়া বেরিয়ে এলেন ডাক শুনে, তোমরা কারা, কাকে খুঁজচ ? কন্ঠস্বর বুড়িদিদিমার মতন, যেন জীবন আর মৃত্যু সম্পর্কে  জানার কিছু বাকি নেই, চোখে বিষন্ন দৃষ্টির অপ্রতিরোধ্য টান, ছানির আড়ালে ।

অনন্ত বলল, তোমায় তো চিনতে পারলুম না, আমি প্রমথ মাঝির নাতজামাই, অনন্ত ।

ইনি যে তোর বোন, সন্দেহ নেই, প্রায় তোর মতোই দেখতে, ঢ্যাঙাও তোর মতন , দাঁড়াবার ধরণে যৎকিঞ্চিত টিকে আছে যৌবনকালের মহনীয়তা ।

নাতজামাই ? অনন্ত ? না গো, মনে পড়তেছে না । প্রমথ নেই, মারা গেচে, দ্যাকো কারা আচেন ওনার বাড়ি, আর তো কোতাও যেতে পারিনে, ভালোও লাগে না ।

ভবিষ্যতকে অবিশ্বাস করার বয়সে প্রৌঢ়া, যখন জীবন বললে অতীতের কালো গহ্বর বোঝায়, যাদের চাই না, অতীত থেকে তাদের ঝেড়ে ফেলে দিতেও অনিচ্ছা ; এখন আর অতীত থেকে খুঁটে-খুঁটে আহ্লাদের স্মৃতিগুলো তুলে নেবার অবসর নেই ।

তুমি মানিক সর্দারের কে হও ?

আমি ? আমি বিন্তি, আমিই আচি শুদু । বাবা তো সব জমিজমা বেচেবুচে বিয়ে দিলে আমার বোনগুনোর, এখন এই এগারো কাটা জমিই বেঁচেচে আর পুকুরটা, এতেই যা হয়, চলে যায় । আমি বাবার বড় মেয়ে, এই যে দুহাতে বাবার ছেঁকা দেয়া বিড়ির দাগ ; সব কান্নাই তো আর দ্যাকা যায় না, শোনা যায় না । দাগ দেকে ভেবোনি যে রক্ত শুকিয়ে গেচে । ছেলে তো হয়ে বাঁচেনে, ছেলে-ছেলে করে মাটাকে মেরে ফেললে ।

ভাবলাম, বিড়ির ছেঁকায় রয়ে গেছে অতীত ; দাগগুলোকে গোপনে ভালোবাসেন বলেই তো মনে হল । আহত বোধ করাও মানুষের অধিকার বৈকি ।

তুই জিগ্যেস করলি, বোনেদের কোথায় বিয়ে হয়েছে ? কারোর সঙ্গে দেখা করা যাবে কি ?

না গো, দুই বোন রিমি আর ঝিমি পাকা সড়কের ওই পারের গাঁয়ে ছেল, এখন সব গ্রামছাড়া, পার্টি করত তো ওদের বরেরা, ওরাও তাতে পোঁ ধরত । ফেলি, কুমু আর চিনুর  বীরভূম-মালদায় বিয়ে হয়েছে, খবরাখবর নেয় না, কোতায় ওদের শশুরবাড়ি, তাও জানিনে । দাঁড়াও তোমাদের বসার মাদুর আনি, আমি বেশিক্ষুণ দাঁড়িয়ে কতা বলতে পারিনে ।

গ্রাম ছাড়া ? গ্রামও ছেড়ে চলে যেতে হয় নাকি, পার্টি করলে ; পাঞ্জাবের ডিভিশানের সময়ে নিজেদের গ্রাম ছেড়ে চলে এসেছিল আণ্টিমায়ের আত্মীয়রা, এখানে এখনও সেই ডিভিশান চলছে ?

বললাম, ঠিক ধরেছিস, ওই সোয়াইনফ্লুটাই ছড়িয়ে পড়েছে পশ্চিমবাংলার গ্রামে-গ্রামে, পাড়ায় পাড়ায় ।

##

 

মেঘেদের গায়ে খোসপাঁচড়ার দাগ, শূন্যতা চলেফিরে বেড়ায়, অপূরণীয় গহ্বরে একফোঁটা জলের বীজ ।

জোঁকেদের তুলতুলে ব্যক্তিত্ব, হাওয়ায় মানুষের খোসা উড়ছে ।

যে মরে যাচ্ছে তার সঙ্গে কথা বলতে শেখানো হয়নি কোনো স্কুলে কলেজে ।

তলিয়ে যাবার মাধুর্য, সৌষ্ঠব, সদগুণ, কৃপা, প্রসন্নতা, করুণা ।

##

গোবর নিকোনো মাটির দাওয়ায় বসে তুই বললি, মাদুরের চেয়ে মাটিতে বসে বেশি আনন্দ । মামারবাড়ি পানিপতে ছোটোবেলায় গিয়েছিলুম একবার, এরকমই দাওয়া ছিল ।

কি বলতে কি বলে ফেলবি, তোর দিকে তাকিয়ে গম্ভীর মুখে বলতে হল, ডোন্ট টক অ্যাবাউট দোজ থিংস, দিস ইজ ইয়র ফাদার্স হাউস ।

তুমি কে গা ? তোমাদের তো চিনতে পারচিনে । প্রৌঢ়ার শাদা শাড়ি অতিব্যবহারে ময়লা, মুখও দারিদ্র্যের অন্তর্ঘাতে  বয়সের তুলনায় কুড়ি বছর বেশি বলেই মনে হল ।

তোমার সবচেয়ে ছোটো বোন কোথায় আছ জানো ?

বাবা তো কলকাতা যাবার সবজির গাড়িতে চেপে তাকে ফেলে দিয়ে এস্ছিল কলকাতার বাজারের আঁস্তাকুড়ে । থানা-পুলিশ হয়েছেল, বাবা বললে, না, বাচ্চাটা আমাদের বাড়ির নয় । জানিনে সে মরে গেল না বেঁচেবর্তে আচে কোতাও ।

তুই ফোঁপাতে আরম্ভ করে সামলে নিলি ।

তোর মুখের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ মনে পড়ে গেল, ক্লাস টেনের ইনটারভিউতে তুই সিসটার অ্যানিকে বলেছিলি টি এস এলিয়টের কবিতা ভালো লাগে।  আশ্চর্য, হঠাৎ মনে পড়ে গেল সিলভিয়া প্লাথের নাম আর তাঁর ড্যাডি কবিতাটা, তুই আবৃত্তি করছিলি ; তখন তোর কন্ঠস্বরে আপ্লুত হয়ে গিয়েছিলাম বলে মনে পড়েনি, এখন তোর ক্ষণিক ফোঁপানির জন্য মনে পড়ে গেল ।

তোর কাঁধে হাত রেখে বললুম, খুঁজে পেয়ে গেছি, সিলভিয়া প্লাথের ড্যাডি ।

জানতুম ড্যাড, পাবে, বাংলা কবিতার কবির নাম এখন খোঁজো, তুই চোখের মৃদু হাসি খেলিয়ে বললি ।

মানিক সরদারের বড় মেয়ে জিগ্যেস করলে, আপনি ওনার বাবা ?

তুই বললি, না, উনি আমার ড্যাড, মানে বর । আর আপনি আমার দিদি, আমাকেই আঁস্তাকুড়ে ফেলে দিয়েছিল আপনার বাবা ।

পৌঢ়া স্তম্ভিত । ঠোঁটের ওপর বেশ কয়েকবার জিভ বুলিয়ে বললে, আপনি আমার বোন ? তুমি আমার ছোটো বোন ? সবচেয়ে ছোটো বোন ? বাবা ভেবেছেল তুমি ছেলে হবে, যখন মেয়ে হয়ে জন্মালে তখন অষ্টম গর্ভের দোহাই দিয়ে, মাকে ভুজুংভাজুং বুঝিয়ে, ফেলে এলো কলকাতার আঁস্তাকুড়ে, গোলোকধাঁধায় ।

প্রৌঢ়াকে তুই জড়িয়ে ধরতে, উনি কাঁদতে লাগলেন, বলতে আরম্ভ করলেন, আমাদের সবকটা বোনকে ফেলে আসতে পারত কলকাতার জঞ্জালে, কলকাতায় তো ভাগাড়ের অভাব নেই, তাহলে আমরা কেউই এই দুঃখের দিন দেখতুম না, বোনরা সোয়ামি পুত্তুর নিয়ে গা ঢাকা দিয়ে পালিয়ে পালিয়ে বেড়াত না । বাবা-মায়েরা ছেলেমেয়ের জীবনকে তালগোল পাকিয়ে অগোছাল করে ফ্যালে, এর কোনো নিদান নেই গো, কাচের বাসনের মতন ভেঙে এমন টুকরো করে দ্যায় যে জুড়লেও ফাটলের দাগ রয়ে যায়, জল খেতে গেলে চুয়ে পড়ে, খাবার খেতে বসলে হাত কেটে যায় ।

তুই বললি, তবুও তো বাবা-মাকে ভালো না বেসে পারা যায় না ।

যা মনে রাখার প্রয়োজন নেই, তাকেই কেন মনে রাখা ? হয়ত মনে রাখার আনন্দের দুর্ভোগ রসিয়ে উপভোগ করতে ভালো লাগে, অতীতের সেই মুহূর্তগুলো বর্তমান হয়ে টিকে থাকে, অতীত হয় না, ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যায় । অন্যের স্মৃতিতে বেঁচে থাকতে চায় মানুষ, ভুগতে চায় স্মৃতির যাতনার টিমটিমে আনন্দে, অদ্ভুত ।

##

স্পর্শের মর্মার্থ, মর্মার্থের রসায়ন, রসায়নের সম্পর্কে, রেণু, পরাগ, উড়াল, জীবন ।

চাউনির কোলাহল, উতরোল শ্বাস ।

মনে রাখার মন । ভুলে যেতেও তো মন । স্মৃতি কোথায় থাকে ? কোন রঙে ? রক্তের লাল রঙে ?

খসে পড়ে হলুদ পাতারা, খসে পড়ে পাকা হিমসাগর, ঝড়ে খসে পড়ে কচি-কচি আম ।

গাছের স্মৃতিতে কে থেকে যায় ? দূরের ওই ফলবণিক ? দূরের ওই কাঠুরে ?

##

কাঁদবেন না, তুই বললি, আপনার এক বোনকে তো দেখতে পেলেন যে সে ভালো আছে ।

সে ভালো আচে ; বাপের ফাটা থালায় খেয়ে সে রক্ত ঝরায়নে । যাঁরা তোমায় মানুষ করেচেন, নিশ্চই খুব ভালোবাসেন তোমায়, দেখেই বুঝতে পারচি ; বরও তো ভালো পেয়েচ । তা তোমার নাম তো বললে না ?

আমার নামটা একটু অন্যরকম ; আমার নাম এলেকট্রা ।

বেশ ভালো নাম রেকেচেন যাঁরা তোমায় পোষ্য করেচেন, বড় করেচেন । আমাদের ক্ষয়ে ন্যাতাজোবড়া হয়ে যাওয়া একঘেয়ে নামের চেয়ে অনেক ভালো ।

প্লাসটিকের থলেটা এগিয়ে দিয়ে তুই বললি, আমার বোনেদের জন্য শাড়ি এনেছিলুম, আপনি নেবেন যেগুলো আপনার পছন্দ, যদি অন্য বোনেরা কখনও আসেন, আমার কথা বলবেন, তাঁদের দেবেন । আর কিছু মিষ্টি, খাবেন যখন ইচ্ছা হবে ।

প্রৌঢ়া বললে, একটা চিরুনি আনতে পারতে গা, কতকাল যে চুল আঁচড়াইনে ।

শুনে, তুই হেয়ার ব্রাশ বের করে দিতে গেলি, তোর দিদির প্রতিক্রিয়ায় অপ্রস্তুত হলি, বললি, দিন আমি আঁচড়ে দিচ্ছি আপনার চুল ।

তোর ইশারায় ফোটো তুলে নিলাম, দিদির চুল বেঁধে দিচ্ছিস ।

আপনার ঘরের ভেতরটা তো দেখা হল না, চলুন না দেখি, কোথায় থাকতেন আপনার বাবা-মা ।

চলো । তুই প্রৌঢ়ার হাত ধরে সাহায্য করলি উঠে দাঁড়াতে, আমার দিকে মুখ করে বললি, আই অ্যাম গিভিং হার এ লিটল মানি টু ক্যারি অন ফর সাম টাইম ।

কাঁধে ব্যাগ নিয়ে ভেতরে ঢুকলি, ঝোপের আড়ালে গিয়ে হিসি করে এসে বসে রইলাম বেশ কিছুক্ষণ ।

অনন্তর পাত্তা নেই ।

আমার বাবা-মায়ের অনুপস্হিতি মাঝে-মাঝে আমায় নিঃসঙ্গ করে, অথচ জীবনে একটা এমন সময় এসেছে যখন নিজের অজান্তে বাবা-মাকে ছলনা করেছি, সেই স্বরূপের সঙ্গে পরিচয়ে অবাক আর পরাজিত লাগে, নিজেকে বিশ্বাসঘাতক মনে হয়, তাঁদের কাছে আমি যেন আগন্তুক ।

ছোটো চুবড়ি করে পানিফল নিয়ে এলেন প্রৌঢ়া, বললেন, তোমাদের খাওয়াবার মতন কিচুই নেই গো, এইগুলো খাও পেট ভরে যাবে, অতটা রাস্তা, সন্ধে হয়ে যাবে, খিদে পেয়ে যাবে ।

প্রৌঢ়ার পেছনে তুই, শাড়ি-ব্লাউজ, দেখেই বুঝলুম, খুলে দিয়ে দিয়েছিস, এই পরিকল্পনা করেই এসেছিলিস তাহলে, ব্যাগের ভেতরে একটা নীল টপ নিয়ে আর শাড়ির তলায় ডেনিম জিনস পরে ।

শায়া নেই, কি করব, শাড়ির তলায় এটাই পরে এসেছিলুম, বললি । তারপর যোগ করলি, দেয়ার ইজ নো টয়লেট, শি অ্যালাউড মি টু ইউজ দি কর্নার অফ এ রুম শি ইউজেস ডিউরিং নাইট ।

প্রৌঢ়াকে জিগ্যেস করলি, আঁতুড়ঘরটা কোথায়, যেখানে আমি জন্মেছিলুম ?

সেসব আর কিচুই নেই গো, যেটুকু ছিল তাও আয়লার ঝড়ে খেয়ে ফেলেচে, ওই দেকচ মাটির ঢিবি, ওইটে ছিল আঁতুড়ঘরের দক্ষিণদিকের দেয়াল, ওই ঘরে আমার মা মারা গেসলো, তোমার পরের বাচ্চাটা বিয়োবার সময়ে ; উচিত শিক্ষে পেয়েছিল বাবা, ছেলে হয়েছিল, মরা, মাও মরে গেল তার সঙ্গে, সেই বাচ্চাটা মাকে নিতেই এস্ছিল । তারপর বাবা ভেউভেউ করে কাঁদত আর মদ খেতো, ধেনো মদে ঝাঁঝরা হয়ে মরল দশাসই লোকটা, অ্যাগবারে দড়িদঙ্কা ।

তুই বললি, দিদির সঙ্গে আর এই বাড়ির ব্যাকগ্রাউণ্ডে কয়েকটা ফোটো তুলে দাও তো, ধুলোয় মেশা আঁতুড়ঘরেরও, তুলে দিলাম ।

স্মার্টফোন হাতে নিয়ে বললি, নাঃ, এখানে টাওয়ার নেই, এক্ষুনি আপলোড করা যাবে না ।

ভারচুয়াল জগতের মাধ্যমে তুই আত্মীয়তা গড়তে চাইছিস, দেখাতে চাইছিস যে তোরও শেকড় রয়েছে পশ্চিমবাংলার মাটিতে । কখনও কি ভেবে দেখেছিস, যারা চোদ্দোপুরুষের শেকড় বেয়ে ডালে-ডালে দোল খাচ্ছে, অসময়ে খসে পড়ছে, তাদের কোনো পরোয়া নেই ।

তোর দিদি তোর হাতে গুঁজে দিলে রুপোর টাকা, বললে এটা আমার জন্মের সময়ে মুখদেখানি দিয়েছেল আমার বাপের বাপ গৌরহরি সরদার, কাকেই বা দেব যত্ন করে রাখতে, তোমায় দিলুম । তুই পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলি, জাঠদের মতন হাঁটু ছুঁয়ে নয় ।

হাতের তালুতে রাখা টাকাটা দেখালি আমায়, ভিক্টোরিয়ার মুখ । চেঁচিয়ে উঠলি, দু হাত উঁচু করে, ইইইইএএএএ, তোর দিদির মুখে হাসি ফুটল, আমরা আসার পর প্রথম ।

খিদে পেলে আমরা পথে কোথাও খেয়ে নেব, অনন্তর কন্ঠস্বর শোনা গেল ।

পেলে কাউকে ?

শালার ছেলেবউরা ছিল, তারা তো আমায় প্রথম দেখল । কলকাতায় প্রায়ই সবজি নিয়ে যায়, মাছের ব্যবসা আর করে না, মাছ নিয়ে বড্ড দলাদলি ইদিকে । বলেছি এবার এলে আমার বাসায় আসতে । ওদের অবস্হাও বিশেষ ভালো নয়, কে যে কোথায় সুখে আছে তা-ই তো বুঝিনে ।

পানিফলগুলো তুই তোর কাঁধের ব্যাগে পুরে নিলি । আরেকবার প্রণাম করলি তোর দিদিকে । তোর দিদি আরেকবার তোকে জড়িয়ে কাঁদতে লাগল, তোরা দুজনেই জানিস আর কখনও দেখা হবে না । না হওয়াই ভালো, তুই গাড়িতে বসে বলেছিলি, এই স্মৃতি অনেক দামি, একে নষ্ট করতে দিতে চাস না, স্মৃতিকে গন্ধের মতন ছড়িয়ে দিতে চাস  ।

##

জোনাকিরা চলে গেছে ফিনফিনে এনডোসালফিনে ।

সন্ধ্যাকে আলোময় করে তুলছে অন্ধকারের ধুলোট সোঁদা অভিপ্রায় ।

##

গাড়িতে সকলেই বহুক্ষণ চুপচাপ, অনন্ত বলল, মনটা বেশ খারাপ হয়ে গেল কুটুমের বাড়ি এসে, আপনাদের মনও তো ভার হয়ে রয়েছে, দিদি, আপনি একটা গান ধরুন না, যাতে পথটা কেটে যায় ।

গান ? তুই বোধহয় অন্য চিন্তায় ছিলি, দিদির কি হবে, অন্য বোনেদের সঙ্গে দেখা হল না, এইসবই ভেবে চলেছিস হয়তো ।

গুনগুন করে, মনের ভেতরে গেয়ে নিয়ে, আরম্ভ করলি, আমার দিকে তাকিয়ে বললি, রবীন্দ্রসঙ্গীত, আই অ্যাম সিংগিং ফর ইউ, সাতরঙা ফ্ল্যাপার খুলে খালি পায়ে আমার জুতোর ওপর পা রেখে, হাতের কবজি ধরে তালের সঙ্গে চাপ দিয়ে, ইশারা করতে লাগলি:

##

তোরা যে যা বলিস ভাই, আমার সোনার হরিণ চাই।

মনোহরণ চপলচরণ সোনার হরিণ চাই ।।

সে যে চমকে বেড়ায় দৃষ্টি এড়ায়, যায় না তারে বাঁধা ।

সে যে নাগাল পেলে পালায় ফেলে, লাগায় চোখে ধাঁদা ।

আমি ছুটব পিছে মিছে মিছে পাই বা নাহি পাই–

আমি আপন মনে মাঠে বনে উধাও হয়ে ধাই ।।

তোরা পাবার জিনিস হাতে কিনিস, রাখিস ঘরে ভরে–

যারে যায় না পাওয়া তারি হাওয়া লাগল কেন মোরে ।

আমার যা ছিল তার গেল ঘুচে যা নেই তার ঝোঁকে–

আমার ফুরোয় পুঁজি, ভাবিস বুঝি মরি তারি শোকে ?

আমি আছি সুখে হাস্যমুখে, দুঃখ আমার নাই ।

আমি আপন মনে মাঠে বনে উধাও হয়ে ধাই……

##

অনন্ত নেমে গেল গড়িয়ায়, বলল, মাছের দরকার হলে বলবেন, আবার এলে, ওই বাজারেই দেখা হবে দিদি ।

হোটেলের লিফ্টের ভেতরে তুই আর আমি একা, লিফ্টম্যান নেই, চুমু খেলুম তোকে, বললুম, এই গান আগেও অনেকবার শুনেছি, কিন্তু গানটায় তোর মতন কেউ সেনশুয়ালিটি আনতে পারেননি ; রবীন্দ্রনাথও নিশ্চয়ই আঁচ করেননি যে এই গানে যৌনতার সঞ্চার করা যেতে পারে ; ইউ আর ইনক্রেডিবল ।

যাবার ছিল সেকেন্ড ফ্লোর, ডান হাতে আমার কোমর জড়িয়ে, বাঁহাতে তুই টপ ফ্লোরের বোতাম টিপে বললি, ওউ- ওউ-ওউ-ওউ, ড্যাড, থ্যাংকস, লিফ্টে সিসিটিভির ক্যামেরা আছে । ইইইইইইএএএএএ ।

##

এর মতো, ওর মতো, তার মতো, কারো মতো নয় ।

যেন এমন, যেমন অমন, যেন তেমন নয় ।

 

চার

ইলেকট্রিক ? ঠিক শুনেছিস ? এলেকট্রা বলেছেন বোধহয় ।

হ্যাঁ হ্যাঁ স্যার, এলেকট্রা নামই বললেন , কিন্তু ইনি আগের ম্যাডাম নন , চাপরাশি নানকু প্রসাদ জানাল, ওর অনুসন্ধিৎসা স্বপ্রকাশ ।

##

কিন্তু নেতি, মহাকাব্যের এলেকট্রা, তো চলে গেছে,  মেসেজ করেছিল, ফ্র্যাংকফুর্টের পথে, ওখানে ফ্লাইট চেঞ্জ করে আমেরিকার প্লেন ধরবে । আমি তখন অফিসে, সকালেও জানতে দেয়নি যে সেইদিনকেই ও চলে যাচ্ছে, যেমন উদয় হয়েছিল হঠাৎ, তেমনই উধাও হয়ে গেল ।

আমি মেসেজ করেছিলুম, পৌঁছে জানাস, দেখাল পেনডিং , আজ সকালে এলো ডেলিভার্ড ।

ওর মেসেজ পেলাম, খুঁজো আমাকে ; তোমার জন্য ব্যবস্হা করে এসেছি ।

ব্যবস্হা ? তুই তো রাতে চাইতিস ব্রাউন স্ট্যালিয়ন আর ভোর বেলা মরনিং গ্লোরি ।

আমি বলেছিলাম, তুই এভাবে আমার জীবনে ঢুকে সব নয়ছয় করে দিলি, সিম্পল লাইফ লিড করছিলুম, রুটিন, সেক্সের আর্জ বলতে গেলে, তেমন হতই না, অফিসে কাজ, বাড়িতেও কাজ এনে সকাল-রাত ফাইল ক্লিয়ার করতাম, ড্রিংক করতাম, বাংলা-হিন্দি-ইংরেজি নিউজ চ্যানেল দেখতাম, চারটে নিউজপেপারে চোখ বোলাতাম, চলছিল এইভাবে; চাকরিতে যোগ দেবার পর যেখানেই পোস্টিং হয়েছে, পোর্ট ব্লেয়ার,  সিলভাসা, দমন, পুডুচেরি, লাক্ষাদীপের কারাভাত্তি আর এখন দিল্লিতে, রুটিন, রুটিন, রুটিন, রুটিন, সকাল-অফিস-বিকেল-সন্ধ্যা-রাত ।

এজিএমইউ ক্যাডারের, তাই অমন পোস্টিং, ভালোই তো ছিলাম ।

তোর তো বেবি চাই, আমাকে যে সঙ্গদানের অভ্যাস করে দিয়ে গেলি, প্রতিদিনের অভ্যাসে অভ্যস্হ প্রাণী বানিয়ে দিলি, প্রতিদিনের, কেননা, তুই যেদিন এসেছিলি তার কুড়ি দিন পরের প্রেগনেন্সি টেসটিং কিট দেখিয়ে খিলখিলিয়ে বলেছিলি, অ্যাচিভড, গন্তব্যে পৌঁছে গেছি, এখন একমাস পর আবার টেস্ট করাব, ইইইইইএএএএ ।

আমার কর্মচারীদের তুই কখনও টের পেতে দিসনি যে আমরা রাতে একসঙ্গে শুই ; অ্যালার্ম দিয়ে মরনিং গ্লোরি নিয়ে তুই বলতিস, এবার যাও, ঘুমিয়ে নাও ঘণ্টা দুয়েক ।

##

মাংসে বুনে-দেয়া মৌনভাঁজের উল্লাস ; তাপের অদৃশ্য শিখা ।

ষাঁড় হয়ে ওঠার মনোবাঞ্ছা। খুরের দ্রুততায় ছুটন্তের নির্বাণধ্বনি ।

গর্তের ভেতরে পোকাদের গানের প্রতিধ্বনি; খোলোসের সঙ্গে সাপ  ব্যথা ফেলে যায় না !

##

একদিন কেবল শাঁখ বাজিয়ে ঘুম ভাঙিয়েছিলি ; আমার মায়ের শাঁখ ।

বাজাতে পারিস ?

বাড়িতে পুজোটুজো থাকলে বাজাতে হয়, মা, মানে আন্টিমা, একনাগাড়ে বাজাতে পারেন না, হাঁপান ।

তুই চলে গেলে আমি কি করব ?

তার ব্যবস্হাও হয়ে যাবে ।

অমন ব্যবস্হা আবার হয় নাকি ; ওসব কল গার্লের পেছনে পড়ার হলে আমি কয়েকজন কলিগের নাইটগ্রুপে কবেই ঢুকে যেতাম, প্রতিটি ইউনিয়ান টেরিটরিতে অমন গিভ-অ্যাণ্ড-টেক ব্যবস্হা আছে, ঠিকাদাররা সবসময়েই খুশি করার জন্য মুখিয়ে ।

তুই বলেছিলি, চিন্তা কোরো না ; অনেক কিছু যোগাযোগের ফলে ঘটে যায়,  তোমার ক্ষেত্রেও তাই হবে, কে বলতে পারে ? তুমি আমাকে চাইতে, কিন্তু যোগাযোগ করতে ভয় পেতে । আমি যাবার পর তোমার সেক্সের প্রয়োজন হবে, কেউ হয়ত উদয় হবে ।

হতে পারে, হয়তো হতে পারে, সে তো আর এলেকট্রা হবে না, তোর মতন উড়ন্ত জাজিম হবে না, ওউ-ওউ-ওউ-ওউ করে ঠোঁটে ইশারা খেলাবে না  ।

মহাকাব্যে হয়ত একজন এলেকট্রা ছিল । এলেকট্রা কমপ্লেক্সে ভোগার মেয়ে তো কেবল একজন নয়, নিও ফ্রয়েডিয়ান ইয়ুংগিয়ান কমপ্লেক্স নিয়ে কেউ হয়তো দেখা দেবে, তখন অবাক হয়ে আমার ভবিষ্যবাণীর কথাটা মনে কোরো, অন্য ইশারে খেলাবে, প্রতিটি যুবতীর জাদুবাক্সে অমন হামিংবার্ড থাকেই ।

এ তো বিশ্বাসঘাতকতা করলি ।

বিশ্বাসঘাতকতার কথা বলছ কেন, আমি তো প্রথম থেকেই বলেছি তোমাকে,  আমি তোমার কাছে কি চাই।

তুই যা চাইছিলি, তা পেয়ে গেলি ; আমি যা চাইছিলাম, তা এই কয়দিনের জন্য নয়, দিনের পর দিন রাতের পর রাতের জন্য, ছুটির দিনে দুপুরের জন্য, সারাজীবনের, দুজনে একসঙ্গে বুড়ো-বুড়ি হবার ।

আমি চলে গেলে দেখবে সব ব্যবস্হা হয়ে যাবে ।

তুই এইসব কথা বলতিস । জানতাম না যে তোর আইডেনটিটিকার্ডগুলো, স্কুলের রিপোর্ট, ইনটারভিউ, তোর যত স্মৃতি আমি যত্ন করে তুলে রেখেছিলাম, সব তুই নিজের সঙ্গে নিয়ে চলে গেছিস ।

তুই চলে যাবার পর এত মনখারাপ হয়ে গিয়েছিল যে আলমারি খুলে দেখি কিছুই নেই, ব্যবহৃত তিনটে প্রেগনেন্সি টেস্টিং কিট আর গায়নাকলোজিস্টের রিপোর্টও সঙ্গে নিয়ে গেছিস , ওগুলো দেখিয়েছিলি স্তোক দেবার জন্য যে আমি তোর বাচ্চার বাবা হতে চলেছি ।

রয়ে গেছে আমার মোবাইলে তোর খোলা-বুকের ফোটো ; তাতে আরও মনখারাপ হয় । কেবল বুক, নিজেই তুলেছিলিস বুকের সেলফি, তোর মুখ নেই ।

তুই বলেছিলি তোর বেবিকে গিটার বাজিয়ে শোনাতে । নিজে ড্রাইভ করে ছুটির দিনে তোকে নিয়ে গিয়েছিলাম কুতুব মিনারের চত্বরে, শুনিয়েছিলাম গিটার, ওঃ কতদিন পর বাজিয়েছিলাম , তোর দেয়া আঙটি পরেই বাজিয়েছিলাম ।

আমাকে গিটার বাজাতে দেখে জেএনইউয়ের কয়েকজন যুবকযুবতী, যারা গিটার নিয়ে যুৎসই জায়গা খুঁজছিল, এসে বসে পড়ল আমাদের ঘিরে, আর তখনই তুই আরম্ভ করলি এমন এক গান, যা আমার মনে হল, আঁস্তাকুড়ে পড়েছিলেস বলে খুঁজে চলেছিস, তুই কে, তুই কে, তুই কে ? ওরাও অবশ্য যোগ দিল তোর গানে, আমার গিটারে  :

#

বুল্লা কি জানা ম্যায় কওন

না ম্যায় মোমন ভিচ মাসিতা

না ম্যায় ভিচ কুফর দিয়া রীতাঁ

না ম্যায় পালন ভিচ পাকিতাঁ

বুল্লা কি জানা ম্যায় কওন

#

না ম্যায় অন্দর বেদকিতাবাঁ

না ম্যায় রেহেন্দা ফাঙ শরাবাঁ

না ম্যায় রহন্দা মস্ত খারাবাঁ

বুল্লা কি জানা ম্যায় কওন

#

না ম্যায় শাদি না ঘমনাকি

না ম্যায় ভিচ পলিতাঁ পাকিঁ

না ম্যায় আবি না ম্যায় খাকি

না ম্যায় আতিশ না ম্যায় পওন

বুল্লা কি জানা ম্যায় কওন

#

না ম্যায় আরবি না লাহোরি

না ম্যায় হিন্দি শেহর নাগোরি

না হিন্দু না তুর্ক পাশাওরি

বুল্লা কি জানা ম্যায় কওন

#

না ম্যায় ভেত মজহব দে পায়া

না ম্যায় আদম হব্বা যায়া

না কোই অপনা নাম ধরায়া

বুল্লা কি জানা ম্যায় কওন

#

অওয়ল আখর আপনু জানা

না কোই দুজা হোর পছানা

ম্যায় তো না কোই হোর সেয়ানা

বুল্লে শাহ খড়া হ্যায় কোন

বুল্লা কি জানা ম্যায় কওন

#

না ম্যায় মুসা না ফারাওয়া

না ম্যায় জগন না ভিজ সওন

না ম্যায় আতিশ না ম্যায় পওন

না ম্যায় রহান্দা ভিচ নাদাওন

না ম্যায় বৈঠা না ভিচ ভাওন

বুল্লে শাহ খড়া হ্যায় কওন

বুল্লা কি জানা ম্যায় কওন

#

গানের শেষে ছেলেমেয়েগুলো দাঁড়িয়ে নাচতে লাগল, তুইও দুহাত তুলে যোগ দিলি তাদের সঙ্গে । গানটা শুনে আমার তো মনখারাপ হয়ে গিয়েছিল ; অথচ তোর প্রকৃত আবেগ ধরতে পারলাম না, কেনই বা হঠাৎ এই গানই গাইবার ইচ্ছা হল তোর ! বুল্লে শাহের বেশি প্রচলিত গান তো দমাদম মস্ত কলন্দর ।

আমি এই নই, আমি ওই নই, আমি সেই নই । আমি কে ? আমি এই নই, আমি ওই নই, আমি সেই নই । আমি কে ? আমি এই নই, আমি ওই নই, আমি সেই নই । আমি কে ? সত্যিই তো, তুই কে ? মহাকাব্যের এলেকট্রা !

কেন এই প্রশ্ন তোকে ঘিরে ধরল কুতুবুদ্দিন আইবেক আর ফিরোজ শাহ তুঘলকের তৈরি এই মিনার চত্বরে ! অন্তর্দ্বন্দ্বের সঙ্গে শীতযুদ্ধ ? কেন ? দ্রুতির হাতিয়ার চালিয়ে যা আয়ত্ব করতে চাইছিলি, তা করলি । তাহলে ? মস্তিষ্কে লুকিয়ে থাকা প্রশ্নদের লাই দিলেই ঝামেলা, আমার চেয়ে তুই তা ভালো করে জানিস, তোর সমবেত নাচ দেখতে-দেখতে মনে হল ।

অনিশ্চয়তার উত্তর হয় না, না রে ? অনিশ্চয়তাকে সবাই গোপনে ভালোবাসে, এরকম মনে হচ্ছিল ; প্রেমের মতন অনিশ্চয়তা আর নেই ।

এই কখন, এই কখন, এই কখন, এই কখন ! যাঃ ।

অনিশ্চয়তার সুস্বাদু বিষ জিভে লেগে থাকুক সবসময়, এরকমই ভাবিস কি ?

টিভিতে রাব্বি শের গিলকে গাইতে শুনেছি গানটা, তখন বেশ ভালো লাগত । যত বয়স বাড়ে তত অনিশ্চয়তার মাত্রা বৃদ্ধি পায়, তার প্রকৃতিতে রদবদল ঘটে ।

জীবনযাপনের  নিত্যকর্মপদ্ধতি হয় না, যতই না কেন দিনযাপনের রুটিন থাকুক !

তুই চলে যাবার পর খুলে রেখে দিয়েছি আঙটি । সৎ সৎ সৎ সৎ বলার আড়ালে বোধহয় বলেছিস বোকা বোকা বোকা বোকা ।

আমার পুরোনো আমিকে এখন কি করে ফিরে পাবো , রক্তমাংসের যান্ত্রিক আমি ? তুই আমাকে বিধ্বস্ত করে চলে গেছিস, ধ্বংস করে, চুরমার করে ।

সিনিয়ার-জুনিয়ার কলিগরা ভেবেছিল যে মালদার পোস্টিঙের জন্য তর্জনীতে পোখরাজের আঙটি পরেছি। হ্যাঁ, তোর দেয়া আঙটি পরে সেরকম উন্নতি হয়েছে আমার, ঘুষের রাজত্বের অংশীদার হয়েছি । অভ্যাস নেই বলে বিভ্রান্ত বোধ করছি ।

মিস করছি তোর রাঁধা মেক্সিকান কোচিনিতা পিবিলি, শুয়োরের মাংসও তোর হাতে ছোঁয়া পেয়ে ভিনচরিত্র পায়, আমি তো আগে শুয়োর তেমন রেলিশ করতুম না, অ্যালবোনডিগা মিট বল, ভেড়ার মাংসের বার্বাকোয়া, কালদে দ্য পোলো মুর্গির স্যুপ ; টার্কিশ বিরিয়ানি এতলি পিলাফ, টোমাটো পিলাফ ; থাই এঁচোড়ের ডালনা কায়েং কানুন ।

কুকটা কত চেষ্টা করল, তোর মতন রাঁধতেই পারেনি ; ও বলছে তুই মশলাগুলো সিক্রেট রেখেছিলি । তোর কি সবই সিক্রেট ?

##

পিওনকে বললাম, পাঠিয়ে দাও ।

তোর মতনই হাতে লাল রঙের স্যুটকেস, কাঁধে হলুদ ব্যাগ, ফেডেড জিন্স, লাল ঢিলেঢালা ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডের জার্সি, তার ওপর সাদা ব্লেজার, পায়ে রঙিন ফ্ল্যাপার, ডান হাতে গোটা-পাঁচেক স্লোগানচুড়ি, কানে চুড়ির মাপের লাল রঙের মাকড়ি, হাতের আর পায়ের নখে ব্রাউন-লাল নখপালিশ, হাতের নখ ততো বড় নয়, কাঁধ পর্যন্ত কোঁকড়া চুল, তোর সমান ঢ্যাঙা ।

আমার চাউনি তোতলাতে থাকে, মগজের ভেতরে লুডোর ঘুটি পড়ার শব্দ, বুকময় স্টেথোস্কোপের স্মৃতি ।

##

সেই নারঙ্গঠোঁট কুচকুচে হাঁস । মাছেদের দেখা স্বপ্নে ভারাতুর নদীতে ।

ঘাসে-ঘাসে তাঁবু ফেলেছে ফড়িঙেরা । সবুজ পৃথিবীকে মৌমাছিদের প্রণাম ।

##

কি করে সম্ভব ! যেন তোর পোশাক আর অ্যাকসেসরিজ পরে চলে এসেছে মেয়েটি, কেবল মুখ আলাদা । সুস্পষ্ট ফিচার্স, বেশ সুশ্রী ।

আমি :তুমি এলেকট্রা ?

যুবতী : হ্যাঁ স্যার, আমি আঁস্তাকুড়ের এলেকট্রা । আমিই আঁস্তাকুড়ের প্রকৃত এলেকট্রা, যে নিজেকে এলেকট্রা বলে আপনার বাড়ি এসে আপনার জীবনে ঢুকে পড়েছিল, সে মহাকাব্যের এলেকট্রা, তাকে আমি আমার স্বপ্ন প্রায় সম্পূর্ণ দান করে দিয়েছি ।

আমি :কি বলছ তুমি ? স্পষ্ট করে বলো , হেঁয়ালি কোরো না, আমি বেশ ডিসটার্বড ।

আঁস্তাকুড়ের এলেকট্রা : স্যার আপনার পিওন বা সার্ভেন্টদের বলুন আমার স্যুটকেস এটসেটরা  পোর্টিকো থেকে নিয়ে আসতে ।

আমি : বিলংগিংস নিয়ে চলে এসেছ ? আই অ্যাম ব্যাফলড , চলো, ভেতরে চলো, ডিসটার্বড মনে হচ্ছে তোমাকেও, ড্রিংক করো, তাহলে একটু ড্রিংক করে নাও, কিংবা যদি ট্র্যাংকুলাইজার চাও, আছে আমার কাছে ।

আঁস্তাকুড়ের এলেকট্রা : না, আমি ঠিকই আছি, জিনিসগুলো বাইরে থেকে আনিয়ে নিন আর ভেতরে চলুন।

আমি : তোমার বাড়ির লোক জানে ?

আঁস্তাকুড়ের এলেকট্রা : বাড়ির লোক কয়েকবছর থেকে জানে যে আমরা  দুজনেই আপনাকে ভালোবাসি, কিন্তু দুজনের ভালোবাসায় যথেষ্ট পার্থক্য আছে ।

আমি : কি বলছ কি বোকার মতন, নেতি নাম তো আমিই নেতিকে দিয়েছিলাম ।

আঁস্তাকুড়ের এলেকট্রা : সেই নেতি, যে নেতিকে আপনি এতদিন নেতি মনে করে ভালোবাসলেন, সে নেতি নয় স্যার । আমি আছি নেতিতে।

আমি : দুজন ? স্ট্রেঞ্জ, মেলাতে পারছি না । স্বপ্নদান ? বুঝিয়ে বলো, বুঝিয়ে বলো । ভেতরের ঘরে বসবে চলো ।

মনের ভেতরে সমান্তরাল চিন্তার স্রোত বইছিল, আমি কি তাহলে আমার দেয়া নামকেই ভালোবেসে গেছি, সেই নামের বাস্তব যুবতীটিকে নয় ? নামের প্রচণ্ড ক্ষমতা হয়, জানি, ভয় উদ্রেক করা নাম, এড়িয়ে যাবার নাম, রাখা যায় না এমন নাম, কিন্তু ভালোবাসবার নাম ?

নেতি বলেছিল একদিন স্নানের সময়, সাইক্লোনের নাম মেয়েদের নামে হয়, তা কি ওর ইঙ্গিত ছিল ? মেয়েদের নাম, কই, বিয়োগিনী রাখা হয় না তো ! ভালোবাসবার আগে শোনা নামের সঙ্গে ভালোবাসবার পরে শোনা নামের তফাত আছে নাকি ! মানুষটা বাস্তব না তার নাম ! গুলিয়ে ফেলছি সবকিছু ।

নানকু প্রসাদকে বললাম মেয়েটির জিনিসপত্র বাইরে থেকে নিয়ে আসতে ।

যুবতীটি বলল, স্যার আপনি দিল্লিতে এসেছেন বহুকাল পরে, যখন প্রথমবার আপনার পোস্টিং দিল্লিতে হয়েছিল, ইয়াং ছিলেন,আমার দিদি, যে এতদিন রইল আপনার সঙ্গে, তার ক্রাশ হয়েছিল আপনার সম্পর্কে, মনে করে দেখুন, আপনি কোনো দুর্গাপুজোয় অভিনয় প্রতিযোগীতার বিচারক ছিলেন, তারপর ও আপনাকে  দূর থেকে যখনই দেখেছে, ততো আকৃষ্ট হয়েছে, আপনি তো আমাদের পরিবারের দৃষ্টি এড়িয়ে যেতেন, ও কিন্তু ঠিক লক্ষ্য রাখত আপনার ওপর, ও আপনার ব্যক্তিত্ব, ম্যাগনানিমিটি আর সততার প্রেমে পড়ে গেল । আঙ্কলবাপি-আণ্টিমা আপনার পোস্টিঙের শহরে ছুটি কাটাতে গেলে, অবভিয়াসলি, আমাদের নিয়ে যেতেন না, কিন্তু অসংখ্য ফোটো তুলে আনতেন ; সেই ফোটোগুলো থেকে আপনার মহাকাব্যের এলেকট্রা,  যাকে নেতি মনে করে সঙ্গ দিলেন, সে আপনার ফোটোগুলো বেছে নিয়ে পার্সোনাল অ্যালবাম তৈরি করেছে ।

আমি : বসো, বসো, ওই সোফাতে বসে বলো । তুমি কে ?

আঁস্তাকুড়ের এলেকট্রা : বসছি স্যার । আমি নেতি, আঁস্তাকুড়ের এলেকট্রা । যে এসেছিল সেও এলেকট্রা, এলেকট্রা কমপ্লেক্সের মেয়ে, মহাকাব্যের নায়িকা  । পার্থক্য এই যে আমি আপনাকে ঐশ্বরিক বলে মনে করি ; আপনাকে ভীষণ ভালোবাসি, আপনি আমার জীবনে না থাকলে যেখানে আমি আজ পৌঁছেছি, সেখানে পৌঁছোতে পারতুম না । আপনি গিফ্টপ্যাকের মতো করে গড়ে দিয়েছেন আমার জীবন ।

আমি : মানে ?

আঁস্তাকুড়ের এলেকট্রা : আমাকেই আমার বাবা আঁস্তাকুড়ে ফেলে চলে গিয়েছিলেন । আমি কোনো দিন ওই আঁস্তাকুড় দেখতে যাবো না, আমি জীবনে কখনও কোনো আঁস্তাকুড়ে শুয়ে সেলফি তুলব না, আমি কখনও সেই পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করতে যাবো না, যারা আমাকে আঁস্তাকুড়ে ফেলে দিয়েছিল, আমি কখনও সেই আঁতুড়ঘর দেখতে যাবো না, যেখানে আমি জন্মেছিলুম । আমি ওই গ্লানি থেকে মুক্ত করে নিয়েছি নিজেকে, আর পিছন ফিরে তাকাতে চাই না।

আমি : তুমি বলতে চাইছ যে তুমিই নেতি ?

আঁস্তাকুড়ের এলেকট্রা : বললুম তো, আমিই নেতি ব্যানার্জি, আমিই সিলিকন ভ্যালিতে অ্যাডভান্সড মাইক্রো সিস্টেমসে চাকরি করি, আজকে রাতের ফ্লাইটে ফিরে যাচ্ছি, যাবার আগে আপনার সঙ্গে আমার যে সম্পর্ক তাকে স্হায়ীত্ব দেওয়া  আমার কর্তব্য। বিশ্বাস না হয়, এই দেখুন স্যার, আমার পাসপোর্ট আর ওয়ানওয়ে এয়ার টিকেট ।

যুবতীর পাসপোর্ট দেখলাম, নেতি ব্যানার্জির নামে, গুড়গাঁওয়ের বাড়ির ঠিকানা, বাবার নাম জগদীশ ব্যানার্জি, ফোটোও এই মেয়েটির, এইচ ওয়ান বি ভিসা  । নেতি ব্যানার্জির নামে এয়ার টিকেট, আজ রাতের ।

টেবলের ওপরে রাখা ব্ল্যাক ডগের  গ্লাস থেকে এক ঢোঁক খেয়ে বললাম, আমি এখনও কনফিউজড, পাজলড ।

আঁস্তাকুড়ের এলেকট্রা : আপনি কনফিউজড এই জন্য যে আপনি কখনও জগদীশ ব্যানার্জির বাড়িতে যাননি, তাঁর ছেলেমেয়েদের এড়িয়ে গেছেন, বইপত্র পাঠিয়ে খোঁজ নেননি যে সেগুলো কে পড়ছে, কার কিসে আগ্রহ । আমি বিজ্ঞানের ছাত্রী, বিজ্ঞানের বই আপনি পাঠাতেন না, ইংরেজি আর বাংলা সাহিত্য, রাজনীতি, দর্শন, ভারত আর বিশ্বের ইতিহাস বিষয়ে বই পাঠিয়েছেন । এই বইগুলো পড়েছে বৈদেহী আর আরিয়ান । বৈদেহীও ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্রী ছিল। জামিয়া মিলিয়াতে অধ্যাপনা করত বিয়ের আগে ।

আমি : কেন জানি না মনে হচ্ছে আমাকে ডেলিবারেটলি আঘাত দিয়ে কনফিউজ করতে এসেছো ।

আঁস্তাকুড়ের এলেকট্রা : ছি ছি, আপনার জ্বর হয়েছে বা শরীর খারাপের সংবাদে আমরা বিপর্যস্ত বোধ করেছি । কিন্তু আপনার নিষেধাজ্ঞার জন্য দেখা করতে আসা বা সেবা করা সম্ভব হয়নি ।

আমি : স্পষ্ট করে বলছই না । যে এসেছিল, মনে হচ্ছে তার পোশাক পরেই এসেছ, এমন জটিলতায় ফেলেছ যে সমাধান করতে পারছি না, যেমন রহস্যময়ী তুমি, তেমনই নেতি, আমাকে একা ফেলে চলে গেল ।

আঁস্তাকুড়ের এলেকট্রা : না, স্যার, এই পোশাকটা আমারই, দিয়েছিলুম বৈদেহীকে । আমি তখন থেকে বৈদেহীর কথাই বলছি, ওর ক্রাশ ছিল আপনার সম্পর্কে, আপনি ছয় বছর আগে দিল্লি সরকারি কর্মচারি ম্যারাথনে প্রথম হয়েছিলেন, টিশার্ট খুলে বিজয় পালন করেছিলেন, তখন আরও কয়েকজনের সঙ্গে বৈদেহীও ফুলের তোড়া দিয়েছিল আপনাকে, বেশ কাছ থেকে দেখেছিল আপনাকে । সেই থেকে ও বিয়ে করতে চেয়েছে আপনাকে, আঙ্কলবাপি আর আন্টিমা বলেছিলেন আপনি ওনাদের চেয়ে নিচু জাতের, তা যে কি করে হয় আপনিই বলুন, আন্টিমা তো নিজে জাঠ পরিবারের ; তাছাড়া ওনারা আপত্তি করেছিলেন আপনাদের দুজনের মধ্যে বয়সের পার্থক্যের কারণে, বেশি তো পার্থক্য নয়, কুড়ি  বছর বোধহয়, আর তৃতীয় আপত্তি ছিল আপনি অত্যন্ত সৎ বলে আপনার স্ট্যাণ্ডার্ড অফ লিভিং ওনাদের তুলনায় ভালো নয়, আপনি ঘুষ নেন না, নেন না বলে আপনাকে ইউনিয়ান টেরিটরির যেখানে-সেখানে শর্ট নোটিসে পাঠিয়ে দেয়া হয়, অবসর নেবার পর থাকার জন্য ফ্ল্যাটও কিনে রাখেননি ।

আমি : বৈদেহীই এসেছিল ? সেই জন্যই কি জগদীশ আর অমরিন্দর আগের মতো তেমন যোগাযোগ রাখে না, মনে হতো যেন অ্যাভয়েড করে, কারণ বুঝতে পারিনি এতকাল ।

আঁস্তাকুড়ের এলেকট্রা : হ্যাঁ, বৈদেহী যখন জোরাজুরি করছিল আপনাকে বিয়ে করার জন্য তখন ওনারা ওকে কয়েকদিন ঘরে বন্ধ করে রেখেছিলেন, তারপর পঞ্চাশ লাখ টাকা আর দু-কিলো সোনার গয়না যৌতুক দিয়ে, এক সমকামী নেশাখোরের সঙ্গে  বিয়ে দিলেন । যখন ডিভোর্স নিয়ে ফিরে এলো তখন ওনারা বিপদে পড়লেন । ডিভোর্সিকে বিয়ে করার পাত্র, প্রচুর যৌতুক দিতে রাজি থাকলেও, পাচ্ছেন না ওনারা, সবায়েরই ভার্জিন মেয়ে চাই । পাত্রপক্ষরা বিশ্বাস করতে চায় না যে বৈদেহী ভার্জিন, ওর বর ওর সঙ্গে শুতেই চায়নি কখনও । ও যখন বরের সঙ্গে বিয়ে কনজিউমেট করার জন্য প্রেশার দেয়া আরম্ভ করল, তখন শাশুড়ি আর স্বামী দুজনে মিলে বৈদেহীকে দৈহিক যাতনা দিতে লাগলেন ।

বললাম, জানি ।

আঁস্তাকুড়ের এলেকট্রা : তবে ! কী হত ওর জীবন, বলুন স্যার ? যদি আপনি ওকে অমনভাবে ভালো না বাসতেন ! আমিই ওকে পাঠিয়েছিলুম আপনার কাছে, জোর করে, আমার ড্রেস ওকে পরিয়ে, হাতে মেহেন্দি লাগিয়ে , যা ও চায় তা যদি বাবা-মা না চান, তাহলে, এত বয়সে কেন মেনে নেবে মেয়ে, কেন বিদ্রোহ করবে না, কেন জীবন নষ্ট হয়ে যেতে দেবে, বলুন? বৈদেহী এখানে গুড়গাঁওয়ের বাড়িতে একা, আঙ্কলবাপি আর আন্টিমা চণ্ডীগড়ে, কতদিন চলতে পারে এভাবে ?

এরপর মেয়েটি যে কথাগুলো বলল, তাকে স্টানিং বললেও কম বলা হবে ।

মেয়েটি বলল, সকলেই সমাজবিপ্লবের কথা বলে, তারাই আবার একজন তরুণীর ব্যক্তিগত বিদ্রোহকে খারাপ মনে করে ; বৈদেহী নিজে যা হতে চায় সেটা কি জরুরি নয় ? কেন সারাজীবন মুখোশ পরে কাটাবে ? নিজের ভেতরের নাচকে অমন বেড়ি পরিয়ে রাখার চেয়ে আত্মহত্যা করা শ্রেয় । নিজের জীবনে বিদ্রোহ করব না,  অথচ সামাজিক বিদ্রোহের ঢাকঢোল পেটাব, এটা তো নিছক জোচ্চুরি ।

আমি তখনও স্মৃতির হাজতে, বললাম, তাহলে স্কুলের আইডেনটিটিকার্ড ?

আঁস্তাকুড়ের এলেকট্রা : কার্ডগুলো আমার কিন্তু তাতে বৈদেহীর ফোটো লাগানো আছে, তাই তো স্ট্যাণ্ডার্ড সেভেন্হ থেকে কার্ডগুলো, যেগুলো দেখে আপনি চিনতে পারেননি যে কার্ডে আমার মুখ না বৈদেহীর মুখ ।

আমি : তিনটে ক্লাসের প্রেমপত্র ? ওগুলো তোমার নয় ? তুমিই তো স্বাক্ষর করেছ !

আঁস্তাকুড়ের এলেকট্রা : না, স্যার, তিনটে চিঠিই বৈদেহীর লেখা, আপনাকে ইমপ্রেস করার জন্য, দ্যাখেননি কি একই রকম হাতের লেখা, তার কারণ ও একই দিনে বসে লিখেছিল ওগুলো ।

আমি : আর ইনটারভিউ ?

আঁস্তাকুড়ের এলেকট্রা : ওটা আমার ।

আমি : তো ও আমাকে ছেড়ে চলে গেল কেন ? মিথ্যা কথা বলে গেল কেন ?

আঁস্তাকুড়ের এলেকট্রা : ও আপনাকে ছেড়ে যায়নি স্যার । ও বাড়ি ফিরে গেছে আঙ্কলবাপি আর আন্টিমাকে শেষ পর্যন্ত বাধ্য করার জন্য । প্রেগন্যান্ট হয়েছে জানার পরই ও ফিরেছে । বৈদেহী বাড়িতে বলে এসেছিল যে ও আপনার সঙ্গে লিভটুগেদার করতে যাচ্ছে । আমিই বৈদেহীকে ফোর্স করেছিলুম, আপনার কাছে সরাসরি পৌঁছে আপনাকে দখল করতে, আমি জানি আমার ফাইনানশিয়াল ফাদার হিসাবে আমার প্রতি আপনার সমর্পিত অধিকারবোধ আছে, নয়তো প্রতি ক্লাসের প্রতি বছরের ফিস, অমন রেগুলার বইপত্র, দুর্গা পুজোর পোশাক পাঠাতেন না আপনি । আমি সেকারণেই বলেছি যে আমি ওকে আমার স্বপ্ন প্রায় সম্পূর্ণ দান করে দিয়েছি । আপনার বাড়িতে আমিই বৈদেহীকে আমাদের গাড়িতে করে পৌঁছে দিয়েছিলুম । আজকে আমাকে পৌঁছে দিয়ে গুড়গাঁও ফিরে গেল বৈদেহী ।

আমি :  বৈদেহীকে ফোন করছি এক্ষুনি চলে আসার জন্য, ওর অভাবে আমি বেশ ডিপ্রেশানে আছি । এখন খেয়াল হচ্ছে, বৈদেহী মাঝে-মাঝে  আঙ্কলবাপির বদলে বাপি আর আণ্টিমার বদলে মা বলে ফেলত । একদিন রাতে ঘুমের ঘোরে বলেছিল যে ও অভিনয় করছে না, ও জেনুইন ।

আঁস্তাকুড়ের এলেকট্রা : আপনি দুদিন অপেক্ষা করুন, বৈদেহীকে সঙ্গে নিয়ে আঙ্কলবাপি আর আন্টিমা সোমবার নিজেরাই আসবেন, আমি ওনাদের ইনফর্ম করে দিয়েছি । বৈদেহী আমাদের গুড়গাঁওয়ের বাড়িতে, আঙ্কলবাপি আর আন্টিমা চণ্ডীগড়ের কোয়ার্টারে ।

আমি : তোমার ভূমিকায় ও তো দারুণ অভিনয় করে গেল তাহলে ।

আঁস্তাকুড়ের এলেকট্রা : আমার ভূমিকায় নয় স্যার, ও ওইরকমই, আগল নেই  বলতে যা বোঝায়, অ্যাগ্রেসিভ, আনইনহিবিটেড, হ্যাঁ, দিল্লিতে ইংরেজি আর বাংলা নাটকে অভিনয় করত, ছাত্র ইউনিয়ান করত। আমাকে দেখছেন তো, আমি ওর বিপরীত, রিজার্ভড, ইনহিবিটেড, কম কথা বলি, বিশেষ মিশি না, হইচই ভালো লাগে না, ড্রিংক করি না । আপনাকে লোকেট করার আইডিয়াটা আমার ; আমি আর বৈদেহী দুজনেই এডুকেট এ গার্ল চাইল্ড সংস্হায় গিয়েছিলুম ।

আমি : তোমরা দুজনেই দাবি করছ কেন যে তোমরা এলেকট্রা ।

আঁস্তাকুড়ের এলেকট্রা : ও এলেকট্রা কমপ্লেক্সের এলেকট্রা, মহাকাব্যের নায়িকা ; আপনাকে সিলভিয়া প্লাথের ড্যাডি কবিতাটা শুনিয়েছে তো, বলেছে আমায় ; অনেকদিন ধরে ও মুখস্হ করেছে দীর্ঘ কবিতাটা, স্রেফ আপনার জন্য, জীবনানন্দ দাশের কবিতাও বেশ কয়েকটা মুখস্হ করেছে, আপনাকে শোনাবে বলে । ও পশ্চিমবাংলাকে ভালোবাসে, নিজেই তার পরিচয় পেয়েছেন। ওর প্রেমকে রুদ্ধ করে রাখা হয়েছিল, হয়তো আপনার প্রতি ওর উন্মাদ ভালোবাসাও ওকে বেপরোয়া করে থাকবে, ওর পক্ষে মেনে নেয়া সম্ভব নয় যে আপনি অন্য কাউকে জীবনসঙ্গিনী করুন ।

আমি : জীবনানন্দ দাশের কবিতা ? তো উনি বাংলার মানুষ হয়ে জন্মাতে চাননি কেন ?

আঁস্তাকুড়ের এলেকট্রা : উনি জীবনে কাউকেই বিশ্বাসযোগ্য পাননি, আইআইটিতে শুনেছি বন্ধুদের কাছে, ট্রামের ঘণ্টির ছন্দে বিভোর হয়ে মারা গিয়েছিলেন, ট্রামলাইনে শালিক, কাক, পায়রা, শঙ্খচিল  বসেছিল, উড়তে চায়নি ।

আমি : তুমি ?

আঁস্তাকুড়ের এলেকট্রা : আমি  আঁস্তাকুড়ের এলেকট্রা, ড্যাডিজ লিটল গার্ল । আমার নাম নেতি রাখার জন্য, আর জন্মদিন পয়লা জানুয়ারি করার জন্য আমি কৃতজ্ঞ স্যার, নামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে আমার জন্মের ইতিহাস, আর বছরের প্রথম দিনে তা আমায় আমার জন্মের কথা মনে করিয়ে দ্যায় । আমি পশ্চিমবাংলাকে বৈদেহীর মতন ততো ভালোবাসি না । আমার সমস্ত আপনাতে কেন্দ্রিত ।

পরাজিত বোধ করছি মনে হল ।

আঁস্তাকুড়ের এলেকট্রা : আমি আজ  চলে যাচ্ছি স্যার, আর কখনও ফিরব কিনা জানি না । আপনার সঙ্গে অন্তত একবার দেখা করা জরুরি ছিল । আপনি চেয়েছিলেন নৈনিতালের বোর্ডিং স্কুলে পড়ি, পড়েছি । আপনি চেয়েছিলেন সায়েন্স স্ট্রিম নিয়ে পড়ি, পড়েছি । আপনি চেয়েছিলেন আইআইটির জন্য প্রতিযোগীতা করি, করেছি আর পড়েছি । আপনি চেয়েছিলেন ইলেকট্রনিক্স পড়ি, পড়েছি । আপনি চেয়েছিলেন ভালো চাকরি করি, করছি । আপনার প্রতিটি নির্দেশ পালন করেছি । আপনার পছন্দ বলে চিরকাল টোমাটোরেড লাল রঙের পোশাক পরেছি। প্রতিদান হিসাবে আমি কি আপনার একঘণ্টা সময় পেতে পারি ?

আমি : হ্যাঁ, হ্যাঁ, বসেই তো আছ, রেস্ট নিয়ে নাও, বহুক্ষণের জার্নি ।

আঁস্তাকুড়ের এলেকট্রা : না, স্যার । আপনি আমার প্রতিষ্ঠাতা, আপনার শরীরের ওপর আমার তেমনই অধিকার আছে, যেমন আমার অস্তিত্বের ওপর আপনার ; আমি যাবার আগে আপনার সঙ্গে একবার মনের মতন যৌনসম্পর্ক পাতিয়ে যেতে চাই, আমি মহাকাব্যের এলেকট্রার সঙ্গে প্রতিযোগীতা করছি না, আমার বাচ্চা চাই না, কেবল এক ঘণ্টা আপনাকে সেক্সুয়ালি পেতে চাই, আর তার জন্য এই নিন রানি ভিক্টোরিয়ার সময়ের রূপোর টাকা, আমার দিদি বৈদেহীকে আমি মনে করে দিয়েছিলেন । আপনার সঙ্গে সম্পর্কের  গোটা বেডশিটই মেমেন্টো হিসাবে নিজের কাছে রাখব আমি, সারাজীবন ।

##

শিশিরে কেউটের গন্ধ । উতরোল কোলাহল । গাছে-গাছে না-খোলা কাঁচা দরোজার আড়াল ।

স্ফিংক্স, মরুভূমি, পিরামিড, মমি । চাউনির অতিশয়োক্তি । জলের গভীরে রুপালি মৃগেলতন্বী ।

পদশব্দ থেকে মুক্ত হয়ে যায় পায়ের পাতা ।

কৃষ্ণবিবরের অচিন্ত্যনীয় ভর, আলোকেও হয়তো শেষাবধি আটক করে নিয়েছিল ।

##

আরেকটা কথা স্যার , বৈদেহী আপনারই মেয়ে ; আপনি যখন দমন-এ পোস্টেড ছিলেন, তখন আপনার কোয়ার্টারে গিয়েছিলেন আন্টিমা আর আঙ্কলবাপি, হানিমুন আর অফুরন্ত মদ খাবার লোভে । আন্টিমার সঙ্গে পর-পর কয়েকরাত আপনার দৈহিক সম্পর্ক হয়েছিল । আন্টিমা নিজে আমাকে বলেছিলেন, একদিন কান্নামেশা মাতাল অবস্হায়, আপনিই ওনার ভার্জিনিটি ডিফ্লাওয়ার করেছিলেন । সো লেট আস গো ইউ অ্যাণ্ড আই, লাইক টু পেশেন্টস ইথারাইজড আপঅন এ বেড…..

 

Posted in যৌনতা ও প্রেমের গল্প | Tagged , | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

আওয়ার লেডি অফ দি জিজুয়া : মলয় রায়চৌধুরী

স্কুলে ভর্তি হইয়াছিলাম অত্যন্ত অল্প বয়সে, জনৈক পাদ্রির বদান্যতায়, তাঁহার নাম ফাদার হিলম্যান, সম্পূর্ণ নাম জানা হয় নাই, কী করিয়াই বা জিজ্ঞাসা করিব যে, ফাদার আপনার নাম কি । তিনি জার্মানি হইতে ভারতে আসিয়াছিলেন, তাহা তিনি আমার পিতৃদেবকে একদা বলিয়াছিলেন, এবং ভারতের বৈচিত্র্য ও বৈভিন্ন্যের বহুমাত্রিকতা তাঁহাকে অত্যন্ত মুগ্ধ করিয়াছিল ; তিনি মনে করিতেন যে এই দেশ সূর্যরশ্মির সাতটি রঙের বিস্ফোরণ হইতে জন্মগ্রহণ করিয়াছে  ।

পাদ্রিসাহেবকে প্রথমবার দেখিয়া আমি অবাক হইয়া গিয়াছিলাম, কেননা তৎপূর্বে এই প্রকার ধবলত্বক মানুষ আমি দেখি নাই । তাঁহার দেহ একটি শ্বেত বস্ত্রে ঢাকা, কেবল মুখ ও দুইটি হাত কনুই হইতে ঢাকা নহে। এইরূপ পোশাকও পূর্বে দেখি নাই ।

গীর্জার যাযক ফাদার হিলম্যান তাঁহার মুগ্ধতাকে জাগতিক রূপ দিবার নিমিত্ত  ফোটো তুলিতে ভালোবাসিতেন । সেসময়ে ডিজিটাল ক্যামেরা ও হাই রেজোলিউশান ফোটোগ্রাফি আবিষ্কার হয় নাই । কাঁচকড়ার রোল ফিল্মে ফোটো তোলা হইত, এবং একটি ফিল্মে বারোটি অথবা ষোলোটি ফোটো তোলা যাইত । কাঁচকড়ার ফিল্মটি  অন্ধকার ঘরে রক্তবর্ণ আলো জ্বালাইয়া, রসায়নে চোবাইয়া প্রস্ফূটিত করা হইত, এবং তাহা শুকাইয়া গেলে সেই অন্ধকার ঘরে সেগুলি হইতে ফোটোগ্রাফির কাগজের উপর প্রিন্ট করা হইত । অজস্র ফোটো তুলিতেন তিনি, এবং ফোটোগ্রাফির সূত্রেই পিতৃদেবের সহিত তাঁহার পরিচয় । অজস্র ফোটো তুলিতেন বলিয়া প্রায়ই পিতৃদেবের সন্নিকটা আসিতেন ও কোথায় কী তাঁহাকে অবাক করিয়াছে তাহার গল্প করিতেন ।

পিতৃদেবের কৈশোরে তাঁহার পিতা, অর্থাৎ আমার পিতামহ, হৃদরোগে আক্রান্ত হইয়া  দেহত্যাগ করিয়াছিলেন । পিতৃদেব এবং তাঁহার ভাইবোনগণ কেহই স্কুলে পড়াশোনা করার সুযোগ পান নাই । পিতামহ ফোটোগ্রাফি ও ছবি অঙ্কনের একটি ভ্রাম্যমাণ সংস্হা স্হাপন করিয়াছিলেন, এবং তৎকালীন রাজা ও নবাবদিগের আহ্বানে সাড়া দিয়ে রাজপরিবারের সদস্যদিগের ফোটো তুলিয়া তৈলচিত্র অঙ্কনের উদ্দেশে বিভিন্ন রাজদরবারের অতিথিরূপে এক-একটি শহরে সপরিবারে আশ্রয় লইতেন, এবং বহুদিবস অতিথিরূপে অতিবাহিত করিতেন । পিতৃদেব ও ভাইগণের যেটুকু পড়াশুনা, তাহা রাজপরিবারের শিক্ষকদের অবদান । বাংলা ভাষার তুলনায় তাঁহারা ইংরেজি ও ফার্সিতে সড়গড় হইয়াছিলেন ।

পিতৃদেবের নিকট তাঁহার জীবনের বহু আকর্ষণীয় কাহিনি শুনিয়াছি । তাঁহাদের আতিথ্য সম্পর্কিত, খাদ্য ও ভ্রমণ সম্পর্কিত । এক্ষণে যাহাকে পাকিস্তান বলা হইয়া থাকে,  পিতামহ ও ভাইগণের সহিত তিনি তথাকার প্রতিটি রাজ্যে নবাব ও রাজাগণের আতিথ্য লইয়াছিলেন এবং রাজপরিবারের বিলাসিতা তাঁহাদের উপরও কিঞ্চিদধিক বর্ষিত হইত । কিন্তু পিতামহের মৃত্যুর কারণে আমরা অকস্মাৎ আর্থিক দারিদ্র্যে আক্রান্তি হইয়াছিলাম, শেষে ভাইগণ পাটনা শহরের মহাদলিতগণের পাড়ায় আশ্রয় লইতে বাধ্য হইয়াছিল ।

ফাদার হিলম্যানের সহিত ইংরেজিতে বার্তালাপ করিতে পিতৃদেবের অসুবিধা হইত না । কোনো এক দিবসে পিতৃদেব আমাকে তাঁহার স্টুডিও-দোকানে লইয়া গিয়াছিলেন । ফিল্মের কাঁচকড়া মুড়িবার যে লাল কাগজ থাকিত, তাহাকে লাঠির মতো পাকাইয়া দিয়াছিল রামখেলাওন সিং ডাবর, বাবার স্টুডিও-দোকানের কাজের লোক । আমি সেই লাঠিটিকে তরোয়ালের ন্যায় আমার চারিধারে ঘুরাইতে ছিলাম ও অদৃশ্য শত্রুদিগকে অসিযুদ্ধে পরাজিত করিতে ছিলাম । অকস্মাৎ ফাদার হিলম্যান স্টুডিও-দোকানে প্রবেশ করিলে, তাঁহার দিকেও অসি চালনা করিলে, ফাদার হিলম্যান পিতৃদেবকে প্রশ্ন করিলেন, এই বালকটি কি আপনার সন্তান , এখনও স্কুলে দেন নাই কেন, এই বয়সে যাহা শিখিবে তাহা সম্পূর্ণ জীবন স্মরণে রাখিতে পারিবে ।

ফাদার হিলম্যান ও পিতৃদেবের পরস্পরের কথোপকথন আমি তৎক্ষণে বুঝিতে পারি নাই, কিন্তু রাত্রে খাইতে বসিয়া পিতৃদেব মাকে যাহা বলিয়াছিলেন তাহা এইরূপ:-

পিতৃদেব ফাদার হিলম্যানকে কহিলেন, এতো কম বয়সে কি স্কুলে ভর্তি লয় ? দুই বৎসর পর দিব মনস্হ করিয়াছি, আমার প্রথম পুত্র যে সরকারি স্কুলে শিক্ষালাভ করিতেছে, সেই স্কুলেই দিব, তথায় এতো কম বয়সের বালকদের ভর্তি লয় না ।

ফাদার কহিলেন, আপনি আমার স্কুলে এই বালককে ভর্তি করিয়া দিতে পারেন, আমাদের স্কুলে একটি প্রাথমিক ক্লাস আছে, আপনার সন্তানের বয়সী বালক-বালিকাদের জন্য ।

পিতৃদেব কহিলেন, আপনাদের ক্যাথলিক স্কুলের মাসান্তিক ফিস তো আমি গণিতে পারিব না, আমাকে আমার ভাতৃগণের সংসারও প্রতিপালন করিতে হয় ।

ফাদার পিতৃদেবকে কহিলেন, আমি ওই স্কুলের সর্বময় কর্তা, ফিস মুকুব করিবার বন্দোবস্ত করিব, আপনি নামমাত্র টাকা দিয়া উহাকে আমাদের স্কুলে ভর্তি করিয়া দিন । কল্য আপনার ছেলেটিকে সঙ্গে লইয়া নয়টার সময় আসিবেন, দরখাস্ত পূরণ করিয়া কর্ম সমাধা করিলে কল্য হইতেই ক্লাস করিতে পারিবে ।

পরের দিন পিতৃদেবের সহিত ক্যাথলিক স্কুলে গিয়া ভর্তি হইয়া গেলাম । ফাদার হিলম্যানের ঘরের ছাদ বহু উচ্চ এবং চারিদিকের প্রতিটি দেয়ালে বিশালাকায় তৈলচিত্র, দেখিয়া মনে হইল চিত্রগুলি সন্তদিগের, যাহাদের গল্প বড়োজ্যাঠাইমা সন্ধ্যাবেলায় লন্ঠনরশ্মির চারিধারে বসিয়া শোনাইয়া থাকেন । সকলেই আলখাল্লা-পরা মানুষ, দাড়ি রহিয়াছে, মাথার পিছনে গোল রশ্মি । বিশাল ঘরটি তাঁহার একার ; আমরা যে গৃহে বসবাস করি তাহার দ্বিতলের সবকয়টি ঘরের ক্ষেত্রফল এই ঘরটির মাপের হইবে ।

স্কুলে প্রবেশ করিবার পর সিংহদ্বারের সন্মুখেই একটি শ্বেতপাথরের মূর্তি দেখিয়াছিলাম, জনৈক মা তাঁহার সদ্যোজাত সন্তানকে কোলে লইয়া বসিয়া আছেন, তাঁহার পিছনে লম্বা-দাড়ি একজন মানুষ, গায়ে আলখাল্লা, পায়ের নিকটে দুইটি মেষ শাবক লইয়া , দাঁড়াইয়া আছেন । সিংহদ্বার হইতে ভিতরে প্রবেশ করিবার পর, দক্ষিণ দিকে বিশাল সবুজ মাঠ, বালক বালিকারা খেলা করিতেছে, তাহাদিগের মধ্যে বেশ কয়েকজন ফাদার হিলম্যানের ন্যায় ধবলত্বকের বালক ও বালিকা, চুলগুলি স্বর্ণবর্ণ । বাম দিকে একটি ফুলের বাগান, বালক বালিকারা কেহই ফুলগুলি তুলিতে আগ্রহী নহে । আমার পাড়ার বালকেরা যদি এই ফুলগুলি দেখিত তাহা হইলে তৎক্ষণাত তুলিয়া পূজার জন্য বাড়ি লইয়া যাইত অথবা মন্দিরের সামনে বসিয়া বিক্রয় করিত ।

ঢং ঢং করিয়া কয়েকবার কাঁসরের ন্যায় ঘণ্টা বাজিলে, বালক বালিকারা বিভিন্ন ঘরের দিকে দৌড়াইয়া চলিয়া গেল, নিমেষে মাঠ ফাঁকা ।

পিতৃদেব আমাকে কহিলেন, ভালো করিয়া ক্লাস করিবে, দ্বিপ্রহরে স্টুডিও-দোকানের কাজের লোক রামখেলাওন সিং ডাবর টিফিন লইয়া আসিবে, তাহা ভক্ষণ করিয়া লইও, কল্য হইতে স্কুলে আসিবার সময়ে তুমি নিজের সঙ্গে টিফিন লইয়া আসিবে । স্কুল ছুটির সময়ে দ্বারপ্রান্তে ডাবর তোমার জন্য অপেক্ষা করিবে, তাহার সাইকেলে বসিয়া গৃহে ফিরিও ।

যে ক্সাসঘরে আমাকে লইয়া যাওয়া হইল, তথায় বালক বালিকারা সকলেই আমার বয়সী ; আমার চেয়ে কম বয়সীও রহিয়াছে কয়েকজন । আমি অদ্য প্রথম ক্লাস করিতেছি বলিয়া ক্লাসের শিক্ষিকা আমার নিকটে আসিয়া নিচু হইয়া আমার মুখের নিকট মুখ আনিয়া কিছু প্রশ্ন করিলেন, ইংরাজি প্রশ্নের কিছুই বুঝিতে পারিলাম না ; তিনি আমার হস্তা কয়েকটি কার্ড দিলেন, যাহাতে সন্তদিগের ছবি এবং তুষারের ভিতর দিয়ে হরিণের যান লইয়া একজন লালপোশাক বৃদ্ধ, শাদা দাড়ি, ছুটিয়া চলিয়াছে । ইহার পর তিনি আমাকে কয়েকটি গ্রন্হ দিলেন, একটিকে গ্রন্হ বলা চলে অন্যগুলি পুস্তিকা, ইংরেজি অক্ষর সম্বলিত ।

ক্লাসের শিক্ষিকাও ধ্ববলত্বক, কেবল তাঁহার মুখ দেখা যাইতেছে । পোশাককে এতো বেশি শ্বেত কি করিয়া রাখেন বুঝিয়া পাইলাম না । আমার মা কাপড় কাচেন, সোডা দিয়া কাচিলেও শ্বত বস্ত্র এতো বেশি শ্বেত হয় না । শিক্ষিকা আমার মুখের নিকটা তাঁহার মাথা নামাইয়া আনিলে, তাঁহার গভীর দৃষ্টিতে অভয় দর্শন করিয়া আশ্বস্ত হইলাম ।

ক্রমে স্কুলে কার্যক্রমে অভ্যস্ত হইয়া গেলাম । আমার ন্যায় একটি বালিকা ইংরেজি জানিত না, সে ফিসফিস করিয়া বাংলায় বলিয়াছিল যে সুযোগ পাইলে আমরা দুইজনে লুকাইয়া বাংলায় কথা কহিব, ইংরেজি শিখিয়া গেলে তৎক্ষণে ইংরেজিতে বার্তালাপ করিব । আমি একজন বন্ধু পাইলাম । প্রতিদিন দ্বিপ্রহরে আমরা আমাদের জলখাবার দুইজনে অর্ধেক বিনিময় করিয়া লইতাম । তাহার খাদ্যবস্তু দেখিয়া বুঝিতাম সে কোনো ধনী গৃহের সন্তান ; তদ্যপি আমার টিফিন খাইতে তাহার আনন্দ হইত, বলিত যে এইপ্রকার স্বাদু খাবার সে খায় নাই ।

প্রথম সপ্তাহের পর একটি আনন্দের ঘটনা ঘটিল । ফাদার হিলম্যান আমাদের সবাইকে বলিলেন গ্রন্হের মতো দেখিতে যাহা, তাহা লইয়া অন্য একটি ক্লাসে শিক্ষণের জন্য যাইতে হইবে । আমাদিগের সকলকে তাঁহার পিছন-পিছন লইয়া চলিলেন স্কুল সংলগ্ন একটি বিশাল অট্টালিকায়, তাহার গম্বুজ অতিউচ্চ । ভিতরে প্রবেশ করিয়া অবাক হইয়া গেলাম । একটি দালানঘর, দুই পাশে বসিবার বেঞ্চ ও তাহার সামনে টেবিলের ন্যায়, ঝকঝকে পালিশ করা  । সন্মুখে একটি পাথরের মূর্তি, একজন মানুষের দুই হাত দুইদিকে করিয়ে পেরেক দিয়া কাষ্ঠখণ্ডে পোঁতা হইয়াছে, তাহার পদদ্বয়ও সেইরূপে পেরেকে বিদ্ধ করা হইয়াছে, আরেকটি লম্বালম্বি কাষ্ঠখণ্ডে ।

আমাদিগকে আশ্বস্ত করিয়া ফাদার হিলম্যান প্রথমে ইংরেজিতে কিছু বলিয়া কহিলেন যে উনি ইরেজিতে যাহা কহিবেন তাহাকে হিন্দিতেও বলিবেন । বড়োই আনন্দ হইল । উনি বলিলেন যে প্রতিদিন একটি ক্লাস হইবে যাহার নাম বাইবেলের গল্পের ক্লাস । যে গ্রন্হটি আমাদের দেয়া হইয়াছে তাহাতে বাইবেলের কয়েকটি গল্প রহিয়াছে, এবং তিনি সেইগুলিই শোনাইবেন । যাঁহাদের গল্প তিনি বলিবেন তাঁহাদের তৈলচিত্র এই গীর্জাঘরটিতে আছে । ইংরেজিতে এই ঘরটিকে বলে চার্চ এবং হিন্দিতে গির্জাঘর ।

পোশাকহীন যে মানুষটিকে কাষ্ঠখণ্ডে পেরেক দিয়া ঝুলাইয়া রাখা হইয়াছে, তাহার গল্প দিয়া তিনি আরম্ভ করিলেন । কাষ্ঠখণ্ডে ঝুলাইবার পূর্বে তাঁহাকে ঐ ভারি কাষ্ঠখণ্ড বহু পথ পরিভ্রমণ করিয়া বহন করিতে হইয়াছিল, তাঁহাকে শান্তির ধর্ম প্রচারের জন্য ঐরূপ শাস্তি প্রদান করা হইয়াছিল । যে কাষ্ঠখণ্ডে তিনি বিদ্ধ তাহার নাম ক্রস এবং যাঁহাকে বিদ্ধ করা হইয়াছে তাঁহার নাম জিজাস খ্রাইস্ট ।

আমাদের গৃহে বহু কাষ্ঠখণ্ড আছে যাহা প্যাকিং বাক্সের রূপে পিতৃদেবের স্টুডিও-দোকানে প্রায়ই বিক্রয়ের সম্ভার লইয়া ভারতের বিভিন্ন স্হান হইতে আসে । প্যাকিং বাক্স খুলিয়া বিক্রয়ের দ্রব্যাদি স্টুডিও-দোকানে রক্ষিত হয় এবং প্যাকিং বাক্স হইতে পেরেকগুলি খুলিয়া রাম খেলাওন সিং বিক্রয় করে, নিজ খইনি খাইবার দাম সংগ্রহের নিমিত্ত । কাষ্ঠখণ্ডগুলি ক্রয়ের জন্য কয়েকমাস অন্তর ক্রেতা আসিলে তাহাকে বিক্রয় করিয়া জঞ্জাল পরিষ্কৃত হয় ।

জিজাস খ্রাইস্টের জীবনকাহিনীতে উৎসাহিত হইয়া স্কুলের ছুটির পর গৃহে প্রত্যাবর্তনান্তে  বৈকাল বেলায় দুইটি কাষ্ঠখণ্ডকে দড়ি দিয়া বাঁধিয়া ক্রস তৈয়ারি করিয়া লইলাম, পাড়ায় পথে বাহির হইলে সমবয়সী বালক-বালিকাগণ জানিতে চাহিল ইহা কী বস্তু, কোনো নূতন ধরণের খেলা ? বলিলাম, ইহা কাঁধে লইয়া পথে-পথে ভ্রমণ করিতে হয় এবং যাহারা পিছনে আসে তাহারা চিৎকার করিয়া জনগণকে সংবাদ জানাইতে থাকে ।

পাড়ার বালক অথবা কিশোর ফুটবল দল জিতিয়া ফিরিলে যদ্রুপ ‘হিপ হিপ হুররে’ চিৎকারধ্বনিতে উল্লাস প্রকাশিত হয়, আমার পিছনের বালক-বালিকাগণ তদ্রুপ ‘হিপ হিপ হুররে’ চিৎকার করিতে লাগিল । আমি পাড়ার বিভিন্ন গলির ভিতর দিয়া পরিক্রমা করিতে লাগিলাম ।

বিরজুর মা, যিনি ছোলাভাজা বিক্রয় করিয়া জীবন অতিবাহন করেন, তাঁহাকে দেখিলাম গালে হাত রাখিয়া অত্যন্ত দুঃখী মুখে চুপচাপ বসিয়া আছেন । তাঁহার মাটির গৃহের দ্বারপ্রান্তে বসিয়াছিলেন । ইহা তো বিরজুর মায়ের ছোলা বিক্রয়ের সময় । কাষ্ঠখণ্ডের ক্রস কাঁধ হইতে মাটিতে নামাইয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, কী হইয়াছে, বিরজু কি আবার কোনো অপকর্ম করিয়াছে ?

বিরজুর মা কহিলেন, বিরজুকে আবার পুলিশ ধরিয়া লইয়া গেছে ; চুরি করিতে গিয়া ধরা পড়িয়া গিয়াছিল, এক্ষণে গৃহে কাষ্ঠ নাই যে আগুন ধরাইয়া ছোলা ভাজিব ।

তাঁহার কথা শুনিয়া আমি আমার ক্রস মাটি হইতে তুলিয়া বিরজুর মাকে দিয়া দিলাম । উনি প্রশ্ন করিলেন, ইহা কী বস্তু, তুই  কী লইয়া খেলা করিবি ।

আমি বলিলাম, ইহা জিজাস খ্রাইস্টের কাষ্ঠখণ্ড, তিনি মহাপুরুষ ছিলেন, স্কুলে শিখাইয়াছে ; বিরজুকে পুলিশ যতদিবস ধরিয়া রাখিবে, আমি বৈকালে পরিক্রমার পর একটি করিয়া ক্রস তোমাকে আনিয়া দিব ।

বিরজুর মা আমাকে জড়াইয়া ধরিলেন ও আদর করিয়া কহিলেন, তুইই আমার জিজুয়া মহাপুরুষ ।

বুঝিতে পারিলাম স্হানীয় ভাষায় নামের সংক্ষিপ্তকরণ প্রক্রিয়া প্রয়োগ করিয়া বিরজুর মা জিজাস খ্রাইস্টকে জিজুয়া নামে অভিহিত করিয়াছেন ।

বিরজু গৃহে প্রত্যাবর্তনের দিন পর্যন্ত আমি প্রতিদিন বৈকালে ছোলাউলিকে দুইটি করিয়া কাষ্ঠখণ্ড দিয়াছি, এবং  জিজুয়া মহাপুরুষরূপে আদৃত হইয়াছি ।

 

 

 

Posted in মলয় রায়চৌধুরী, স্যাটায়ার | Tagged , | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

এই রোগের নাম চাই : মলয় রায়চৌধুরী

—তুমি পুলিশে চাকরি পেলে কী করে ? তোমার নামে তো অনেককিছু শোনা যেতো, মানে তোমার অসামাজিক কাজকারবারের ব্যাপারে ।

—না স্যার, আমি প্রথম থেকে এরকুম ছিলুম না ; রোজগারপাতির জন্যে, বাবা-মা আর সংসারের ব্যাগার ঠেলতে  আমাকে নানা কাজ করতে হয়েচে, এখুন অবশ্য নানুদি আমার টাকায় সংসার চালাতে দিতে চান না, বলেন ও হোলো রোগের ট্যাকা । আপনি তো জানেন আমার বাবা-মা দুজনেই অন্ধ। অন্ধ ছিলেন না, সুদু ক্যাটারাট ছিল ওনাদের ; বিনে পয়সায় অপারেশান করাতে গিয়ে চোখ খুইয়েচেন, ক্যাম্প বসিয়েছিল ক্লাবের গেঁড়ে-কাত্তিকরা,  চোখের ডাক্তারদের এনে, ক্লাবেই চল্লিশ জনের অপারেশান হয়েছিল, সকলেই অন্ধ হয়ে গেচে । হেমুদা মারা যাবার পর ওনার অন্ধ বাবা-মা ভিককে করে খাচ্চেন, খাচ্চেন আর কি বলব, ওই কোনো রকুমে টিকে আচেন । ক্লাবের কত্তাদের ধরেছিলুম আমরা, তা ওয়াঁরা বললে সরকারের কাচে আবেদন করা হয়েচে । সরকার আর কী করবে বলুন, তাদের কি হেগে-পেদে কাজ নেই যে অন্ধদের পেচনে দৌড়ুবে, অন্ধ বলে তো ভোটও দিতে যেতে পারেনি ওয়াঁরা, শেষে আমরাই ব্যবস্হা করে ওয়াঁদের ভোটগুনো দিলুম, তার বদলে নেতাটা যতো টাকা দেবে বলেছিল, তা দিলে না, ঘাগুর মেসো ।

—কিন্তু পুলিশে চাকরি পেলে কেমন করে, তোমার তো লেখাপড়াও ঢুঢু ।

—বলচি স্যার । ইসকুলে টেন পর্যন্ত পড়েছিলুম, টেনে-টুনে, ক্লাস টিচারদের ভয় দেখিয়ে ; ক্লাস টিচাররা কেউই চাইতো না যে আমি ওয়াঁদের ক্লাসে পরের বচরও থাকি । আর না পড়েও তো বারো ক্লাসের সার্টিফিকেট পাওয়া যায়, জানেন তো । ক্লাবের কত্তা অন্তত এটুকু খয়রাত তো করেছিলেন । বাবা-মায়ের চোখ ফিরিয়ে দিচ্চি, বলেছিলেন উনি সার্টিফিকেটের কাগচটা দেবার সময়ে । ইংরিজি বলতে পারি না, নয়তো উকিল হবার ডিগ্রিও যোগাড় করে ফেলতুম । শালা ইসকুলের মাস্টাররাই ইংরিজি জানে না, পড়াবে কি ! ঝণাদা উকিল হবার ডিগ্রি পেয়েচে বাবা-মায়ের চোখের বদলে, তবে ঝণাদা বাবা-মাকে দেখার বদলে বিয়ে করে অন্য শহরে ওকালতি করতে চলে গেচে, ওয়াঁর মা-বাপ ভিককে করে চালাচ্চেন ।

—ইনটারভিউ তো ইংরেজিতে হয় ?

—না, স্যার, কন্সটেবলদের ইনটারভিউ ইংরিজিতে হয় না । তাই রক্ষে ।

—কিন্তু তুমি তো ইন্সপেক্টার ।

—হ্যাঁ, স্যার, ধাপে-ধাপে হয়েছি ।

—ধাপে-ধাপে ? না লাশে-লাশে ?

—আমার কোনো দোষ নেই স্যার । আমি হুকুম পেয়েছি, হুকুম তামিল করেছি ।

—তোমার দাদা তো রাজনীতি করতেন ?

—দাদা নয় স্যার, উনি আমার কাকা । সংসারটা উনিই টানতেন । রাজনীতি করতেন না উনি, লেকালিকি নিয়ে থাকতেন । তখন  খতমের যুগ চলছিল, ওয়াঁদের কোটা পুরো করার জন্যে কাকাকে বদনাম দিয়ে তুলে নিয়ে গেল, তারপর কয়েকদিন পাওয়া যায়নি ; পাওয়া গেল একটা নৌকো ডুবে যাবার পর।

—বদনাম ?

—বদনামইতো । সব সরকারেরই একদিকে থাকে যারা বদনাম, আরেক দিকে নাম । এ এক গোলকধাঁধা আমি আজও বুঝে উটতে পারিনি । কে যে কখুন নাম থেকে বদনামের দলে চলে যাবে আর কে যে কখুন রঙ পালটে বদনাম থেকে রাতারাতি নামের দলে চলে যাবে, তার কোনো ঠিকঠিকানা নেই ।

—তুমি তো বদনামেও নেই নামেও নেই ।

—হ্যাঁ, স্যার, আমি ওই যারা দোল খায় তাদের দলে । আমি চিরকাল সিংহাসনের পক্ষে, যে বসবে তার থুতু চাটবো, এই আমার জীবনের লটারি ।

—এখন হঠাৎ মুখ খুলতে চাইছ কেন ?

—কালা করতুত করেচে যারা তারা এবার ফেঁসে যাবে । তারা আমাকে ফাঁসাতে চাইচে । আমাকে সরিয়ে দিতে লোক লাগিয়েচে , কাকার মতন আমাকেও লোপাট করার তালে আচে ।

—তুমিও তো ওই যাকে বলছ কালা করতুত, সেই সব কাণ্ড নিজেও করেছ ।

—নিজের ইচ্ছেয় তো করিনি স্যার । হুকুম পেইচি, হুকুম তামিল করিচি ।

—কিন্তু করেছ তো তুমি ?

—আমি কি আর একা করিচি ? ওয়াঁরাও করেচেন । ওয়াঁরাই বেশি করেচেন । আপনি শুনে দংগ রয়ে যাবেন ওয়াঁদের কালা করতুত শুনে । কন্সটেবলের চাকরি তো এমনি-এমনি পাইনি, ওয়াঁদের কালা করতুত ঢাকার জন্যে মনহুস একজন লোকের দরকার ছিল যে কখুনও না বলবে না, মুখ বুজে অর্ডার শুনবে ।

—তোমার ভয় করে না ? একদিকে তোমার ওপরওয়ালারা আরেক দিকে যাদের খতম করেছ তাদের লোকেরা এবার তোমাকে সরিয়ে দিতে চাইবে, মুখ খোলার জন্য ।

—আমি ওয়াঁদের সব কালা করতুত একটা ভিডিওতে রেকর্ড করে রেকিচি ।

—মানে ? সবকটা মার্ডারের ভিডিও তুলে রেখেছ ?

—না, কারা কাকে আর কাদের মার্ডার করার হুকুম দিয়েছিল, তা বলিচি আর সেই সঙ্গে কিছু ফোটুও আচে।

—তোমার ওপরওয়ালারা তো নিজেদের ইচ্ছেয় করেননি । তাঁরাও নেতাদের হুকুমে করেছেন ।

—সে সব নেতাদের নামও রেকর্ড করিচি ভিডিওতে ; সহজে কেউ আমার গায়ে হাত দিতে পারচে না তাই । জানে যে আমার গায়ে হাত দিলেই ভিডিওর কপি পৌঁছে যাবে নিউজ চ্যানেল আর খবরের কাগচের দপতরে, সেরকম ব্যবস্হা করে রেকিচি । আপনি আগে আমাদের পাড়ায় থাকতেন, ছোটোবেলা থেকে চেনেন আমায়, তাই আপনাকেই সব খুলে বলচি, আমাকে লোপাট করে দিলে আপনি সব জানিয়ে দিতে পারবেন । আপনাদের চ্যানেল দেখি তো, বেশ চেঁচামেচি করে খবর পড়েন সবাই, দিল খুশ হয়ে যায় ।

—আমি তো নিউজ চ্যানেলে আগে কাজ করতাম, এখন করি না, এখন আমি তোমাকে নিয়ে একটা বই লিখতে চাইছি । বইটা লিখে রেডি রাখব, তোমাকে সরিয়ে দিলেই প্রকাশ করব । তুমি একটা কনট্র্যাক্ট সই করে দেবেন ।

—হ্যাঁ, স্যার, তখুন বিক্কিরি বেশি হবে । আমি বেঁচে থাকতে বইটা তেমন বিক্কিরি হবে না । বইতে ফোটুগুনোও দেবেন স্যার । আর এই ডায়েরিটা রাখুন, এটা আমার কাকার, উনি লেকালিকি করতেন ।

—কই দেখি । বাঃ, প্রচুর কোটেশান দেখছি, ওনার নিজের ?

—হ্যাঁ, স্যার ।

—যাক ভালো হলো । বইটায় কিছু জ্ঞানগর্ভ ব্যাপার রাখতে পারব, নয়তো সমালোচকরা ভাববে পাল্প ফিকশান । আগের বইটাকে কেউ ননফিকশান বলে মানতে চায়নি ।

—রাখবেন স্যার, কাকা সারা রাত পড়তেন আর লিখতেন, পায়ে পোলিও ছিল তো, ক্রাচ নিয়ে অফিসে যেতেন । বাড়িতে হুইল চেয়ার ব্যবহার করতেন, এঘর-ওঘর করার জন্যে, লেখালিখির জন্য ।

—দাঁড়াও, একটু পড়ি কোটেশানগুলো ।

*শত্রুতাও সম্পর্কে, যা কেউ চায় না।

*জলাতঙ্ক রোগটা মানুষেরা কুকুরের কাছ থেকে পেয়েছে ।

*জীবনে অন্তত একবার কেউ না কেউ না কেউ পিঠে ছুরি মারবেই, আর সে আঘাত কখনও সারবে

না।

*সঙ্গমের চেয়ে যোনির দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকার আনন্দ বেশি ।

*তুমি যদি কাউকে ঘৃণা করো, সে যদি তা জানতে না পারে, তাহলে ঘৃণা করাটা উদ্দেশ্যহীন ।

*যদি না চোখে-চোখে রাখা হয়, তাহলে পুলিশ স্টেট হয়ে ওঠার জন্য গণতন্ত্রের মাটি সবচেয়ে নরম ।

*আমার কখনও ‘লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট’ হয়নি ; প্রতিবার ‘লাভ অ্যাট ফার্স্ট টাচ’ হয়েছে ।

*সৃজনশীল মানুষের অধঃপতনের অভিজ্ঞতা হওয়া জরুরি, কেননা তা জ্যোতিষ্কদের হয়, পশুদের

হয় না ।

*অতীতকে কারাগার মনে করলে সমস্ত স্মৃতি নোংরা হয়ে যায় ।

*যে মেয়েকে দেখতে এসে পাত্র পক্ষ পছন্দ করল না, সে জীবনকেই রিজেকশান বলে মনে করবে ।

*কবিতার জন্য নিয়তিকে বশে আনতে হয় ।

*মানুষ পৃথিবীর প্রতি অপার বিরক্তি নিয়ে জন্মায় ; তাই সে জন্মেই কাঁদতে আরম্ভ করে ।

*অপবাদ আকর্ষণ করার ক্ষমতা না থাকলে জীবদ্দশায় একজন কবির খ্যাতি মেকি হবার সম্ভাবনা ।

*মানব সম্প্রদায়ের মুক্তির তাত্বিকরা শেষ পর্যন্ত গণহত্যাকারীতে রূপান্তরিত হয় ।

*এককালে যারা অবক্ষয়-বিরোধী ছিল, তারাই বঙ্গসমাজে অবক্ষয় নিয়ে এলো ।

*ভদ্রলোক কাদের বলে ? যারা ক্লিটোরিস উচ্চারণ করতে লজ্জা পায় ।

*বিশ্বাসঘাতকেরা মরার আগে আত্মসন্মানহীন শিষ্যদল তৈরি করে যায়, যারা মৃতের গোলামি করে

বেঁচে থাকে ।

*রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং গুণ্ডামি হল বিশুদ্ধ ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বীতার পরিসর ।

*”পবিত্র বই” আর “অপবিত্র বই”-এর পার্থক্য হল যে “অপবিত্র বই” কেবল মানুষরাই লিখতে পারে ।

*এক-একজন মানুষকে একবার দেখেই টের পাওয়া যায় তার মগজে সাভানার কোন জন্তুদের

উৎপাত চলছে ।

*যে লোকটা কখনও কোনো মাদক জীবনে নেয়নি, সে গাঁজা ফোঁকার বিরোধিতা করবেই ।

*আশাবাদ : একটা নক্ষত্র কয়েক লক্ষ বছর আগে মরে গেছে ; তার আলো এখন পৃথিবীতে এসে

পৌঁছেচে ।

*বিছানাকে অন্ধকারে আরণ্যক করে তোলাই ফুলশয্যা ।

*কবিতার উৎস কোনো না কোনো রহস্য যার উন্মোচন অন্য উপায়ে সম্ভব নয় ।

*কোথায় জায়গাটা ঠিক কোথায় ?

*পশুরা জানতে পারল না যে মানুষ হল সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী ।

*ঈশ্বর কেবলমাত্র একজন এবং তাঁর নাম যৌনতা ।

*প্রতিশোধের ষড়যন্ত্র করা জরুরি কেননা তা জখমকে শুকোতে দ্যায় না ।

*জীবন সম্পর্কে কথা বলা প্রায় অসম্ভব কেননা তার জন্য যথার্থ অভিব্যক্তি কোনো ভাষায় নেই।

*ব্যর্থ বিপ্লবী মার্কসের কবর দেখতে যান ; ব্যর্থ কবি দেখতে যান বদল্যারের কবর ।

*প্রেম তখনই সফল যখন তা প্রেমিক ও প্রেমিকা দুজনকেই ধ্বংস করে দ্যায় ।

*বর্ণবিভাজিত সমাজব্যবস্হায় শ্রেণিহীন সমাজের কল্পনা অবাস্তব ; মনুস্মৃতির পাহাড় মাথায়

চাপিয়ে বিপ্লবের কথা ভাবা বাতুলতা । নির্বাচন প্রক্রিয়া বর্ণবিভাজনের শেকড় সমাজের আরও

গভীরে পৌঁছে দিয়েছে ।

*স্মৃতির জ্বলন্ত শবকে শ্মশানের ডোমেদের মতন খুঁচিয়ে আগুনের ফিনকি উড়িয়ে চলেছি।

—তোমার কাকা বোধহয় প্রেম করতেন ? কবিতার বইও লিখে থাকবেন ।

—হ্যাঁ, করতো তো , কবিতার বইতে লেখা আছে, যাকে ভালোবাসতো তার নাম , সংস্কৃততে কি সব লেখা তাকে নিয়ে।

—কই দেখি ।

—এক-আধ কপি আছে হয়তো । বিক্রি হয়নি তো, আমিই বইয়ের দোকানে দিয়েছিলুম, এক কপিও বিক্রি হয়নি । বইগুলো একে-তাকে ডাকে পাটাত, একআধজন চিটি লিকে জানাতো কেমন লেগেচে । ব্যাস । আমিই তো পোস্টাপিসে গিয়ে ডাকবাক্সে ফেলে আসতুম । এই নিন, রেখে-রেখে উইয়ে কেটে দিয়েচে ।

—বাঃ, ওনার প্রেমিকার নাম তো বেশ, নয়নসুন্দরী  । কোথায় থাকেন উনি ? বেঁচে আছেন এখনও?

—ও তো আমাদের নানুদির ভালো নাম । একটু আগে দেখলেন না, আমাদের বাড়িতেই থাকে এখুন, আগে কম বয়েসে আমাদের কাজের বউ ছিল । উনিই নানুদি, এখন বয়স হয়ে গেচে একটু, তবু চোখ দুটো দেখলেন তো কেমন বড়ো-বড়ো । নানুদির বরকেও পুলিশ মেরে ফেলেছিল, ফালতু ছিঁচকে কাজ করতো, পাউচে মাল ভরে বিক্রি, ড্রাগ নিয়ে এখান-সেখান, ঠ্যাঙানির চোটে মরেই গেল বেচারা । নানুদি আর কাকা তার আগে থেকেই ঘরের দরোজা বন্ধ করে নিজেদের ভালোবাসতো । একবার দরোজার ফাঁক দিয়ে দেখেছিলুম, নানুদি শাড়ি-ব্লাউজ খুলে দাঁড়িয়ে আচে আর কাকা একেবারে কাচ থেকে হুইলচেয়ারে বসে নানুদির দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আচে, দুপায়ের ফাঁকের দিকে, বুঝচেন তো কী বলচি । তারপর নানুদি হাঁটুগেড়ে কাকার কোলে মুখ রাখলে, জানেন তো, মুখ দিয়ে যা করবার করলে । কাকাও মুখ দিয়েই যা করার করতো । নানুদি কাকাকে চান করিয়ে দিতো, সাবান মাখিয়ে দিতো, গা পুঁচে দিতো । কাকা মরে যাবার পর নানুদি বিধবার সাদা সাড়ি ধরেচে । বর মরার পর সাদা সাড়ি ধরেনি ।

—উনি তোমাদের বাড়িতে এসে রয়ে গেলেন তোমার মা-বাবা অবজেকশান নেননি ?

—মা-বাবা দেখতেই পায় না ; নানুদি হাল না ধরলে ওয়াঁরা অক্কা পেয়ে যেতো অ্যাদ্দিনে, ওয়াঁদের কে দেখতো ।

—তুমিই খরচ যোগাও ? প্রচুর টাকা করেছ শুনেছি, জমিজমাও কিনেছ ।

—নাহ, নানুদি আমার টাকা নেন না । উনি বলেন এই রোগের টাকা নেবেন না । রোগের কী আচে বলুন আপনি? নানুদি নিজের বর থাকতেই কাকাকে ভালোবাসতো, ঘর বন্ধ করে কতো কি করতো, অথচ আমার কাজকে বলে রোগ ।

—তুমি খুনি বলে, কতো খুন করেছ তার হিসেব রেখেছ ? খুন করা আর ভালোবাসার মধ্যে মেরে ফেলা আর বাঁচিয়ে রাখার তফাত । তোমার কাকাকে উনি ভালোবেসে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন । তোমাদের সংসারে রয়ে গেলেন তোমার কাকাকে ভালোবাসতেন বলে ।

—না, স্যার, কোনো হিসেব রাখিনি, রাখলে মাথা গোলমাল হয়ে যেতো ।

—তোমার কাকাকে কী ভাবে খুন করা হয়েছিল তা জেনেছ নিশ্চয়ই ওই চাকরিতে যোগ দিয়ে ?

—কাকাকে ওনার হুইল চেয়ারের সঙ্গে নাইলন দড়ি দিয়ে বেঁধে নৌকোয় চাপিয়ে মাঝনদীতে নিয়ে গিয়ে ফেলে দিয়েছিল । গুলি মেরে বা গলা কেটে ফেলে দিলেও কথা ছিল ; তা নয়, একেবারে জ্যান্ত মানুষটাকে তার হুইল চেয়ারের সঙ্গে বেঁধে জলে ফেলে দিলে ।

—তুমি সেই থেকে তোমার কাকার মৃত্যুর প্রতিশোধ নিয়ে চলেছ নানা মানুষকে মেরে ।

—তা জানি না, ভেবে দেখিনি । কাকাকে ছেদ্দাভক্তি করতুম, কিন্তু ওয়াঁর জন্যে জান লড়িয়ে দেবার কতা ভাবিনি কখুনও । মানুষ মারি মারার জন্যে । একজন মানুষকে দনাদ্দন গুলি চালিয়ে উড়িয়ে দেয়াটা যেন নিজেই পাখনা মেলে ওড়ার মতন । মানুষকে মেরে ফেলার আনন্দ বাঘ-সিংহ মারার চেয়ে ঢের ঢের বেশি। আপনাকে বোঝাতে পারব না ।

—প্রথমবার যখন একজনকে মেরেছিলে তখন হাত কাঁপেনি ?

—না স্যার, হাত কাঁপবে কেন ? আমি তো চুরি করছি না বা পকেট মারছি না যে প্রথমবার হাত কাঁপবে।

—চালাঘরসুদ্ধ পুড়িয়ে কয়েকজনকে মেরেছিলে বলে শুনেছি ।

—একা করিনি তো ! আমাদের সিনিয়র সঙ্গে ছিল । বাড়ির ভেতর থেকে মেয়েমানুষ-পুরুষমানুষের বাঁচাও বাঁচাও চিৎকার শুনতেন যদি আপনি । কী যে মজা পাচ্ছিলুম আমরা সবাই বুঝিয়ে বলতে পারব না। সিনিয়ররা আমাদের দামি মদ খাইয়ে নিয়ে গিসল, ভেবেছিল যে আমরা ঘাবড়ে যাবো, ভয় পাবো । আমরা যে ওয়াঁদের মাতায় হাগি তা দুচার মাসেই বুঝে গিসলেন ওয়াঁরা ।

—কেউ বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেননি ?

—চেষ্টা আবার কী করবে । আগুন লাগাবার পর গুলি চালিয়ে চিৎকার-চেঁচামেচি বন্ধ করে দিয়েছিলুম ।

—ধর্ষণের মোটর সাইকেল গ্যাঙ হয়েছে, তুমি তার সদস্য তো ?

—না স্যার, আমি কোনোরকুম রাজনীতিতে নেই ; ওসব রাজনীতির ব্যাপার-স্যাপার, বুঝিও না ভালো।

—সেক্সে তোমার আগ্রহ নেই ।

—আজকাল উঁচু দরের কল গার্ল পাওয়া যায়, টাকা ঢাললে ; রাজনীতির নোংরামিতে কেন যাব মিছিমিছি ।

—উঁচু দরের মানে । অনেক টাকা খরচ করতে হয় ? মধুচক্র ?

—ঠিক তা নয় । নেটওয়ার্ক আছে, তাদের বললে হোটেলে রুম বুক করে সাপলাই দ্যায় । বেশ্যাদের চেয়ে আমার কলগার্লদের পছন্দ । রেট যে বেশি তা ঠিক । উজবেকিস্তানের মেয়েদের ভালো নেটওয়য়র্ক ছিল, মাঝখান থেকে দুজন খুন হয়ে কলগার্লের বাজারটাকে সামনে এনে গোলমাল বাধিয়ে দিয়েছে । ওদের সঙ্গে বিকিনি পরা সেলফি তোলাতেও এক হাজার টাকা চায় । শোবার জন্যে পনেরো হাজার থেকে এক লাখ, মালের বডি অনুযায়ী । তাজাকিস্তানের এক আধবুড়ি ওদের নেটওয়ার্কের আন্টি, তাকে আগাম জানাতে হয়, টাটকা মাল চাইলে আনিয়ে দ্যায় । ট্যুরিস্ট ভিসা নিয়ে আসে, কুড়ি-পঁচিশ লাখ কামিয়ে এক হপ্তায় নিজের দেশে ফিরে যায়। । হিন্দি  ফিলিমে নাচের দলে ঢোকার জন্যে যারা আসে, তাদের রেট আরও বেশি, দেখেছেন তো, সকলেই বলতে গেলে সুন্দুরী আর কী ফসসা, গোলাপি মাখন অ্যাগবারে। আপনার দরকার হলে বলবেন, অ্যারেঞ্জ করে দেব ।

—বলব ।

—ওদের আসা-যাবার গাড়ির ব্যবস্হা করতে হয় ।

—তোমার কাকা কবিতার বইটার নাম রেখেছেন “নয়নতারা”, হ্যাঁ, সংস্কৃতেই উৎসর্গ করেছেন নয়নতারাকে ।

—নানুদি কাকার হুইল চেয়ার ধরে নিজের চারিধারে হাসতে-হাসতে ঘোরাতো আর কাকা ওই সংস্কৃত কবিতাটা পড়ে-পড়ে নানুদিকে শোনাতো । নানুদি তো বাংলা পড়তেই জানে না, সংস্কৃত আর কি বুঝবে, কাকা তবু শোনাত আর নানুদি ওনার চেয়ার নিজের চারিধারে ঘোরাতো ।

—আরে না হে, এটা সংস্কৃত কবিতা নয় । তুমি ভালো করে শোনো, তাহলে বুঝতে পারবে নানুদি কেন নিজের চারিধারে তোমার কাকাকে ঘোরাতেন আর কাকা এটা ওনাকে শুনিয়ে-শুনিয়ে পড়তেন :

 

ওম ইষ একপদী ভব,

সা মামনুব্রতা ভব,

বিষ্ণুস্ত্বা নয়তু পুত্রান বিন্দাবহৈ,

বহূং স্তে সন্তু জরদষ্টয়ঃ

ওম ইষ একপদী ভব ইতি প্রথমন ।।

 

ওম ঊর্জে দ্বিপদী ভব,

সা মামনুব্রতা বভ,

বিষ্ণুস্ত্বা নয়তু পুত্রান বিন্দাবহৈ,

বহূং স্তে সন্তু জরদষ্টয়ঃ ।

ওম ঊর্জে জরদষ্টয়ঃ ।।

 

ওম বায়স্পোষায় ত্রিপদী ভব,

সা মামনুব্রতা ভব,

বিষ্ণুস্ত্বা নয়তু পুত্রান বিন্দাবহৈ,

বহূং স্তে সন্তু জরদষ্টয়ঃ ।

ওম রায়স সন্তু জরদষ্টয়ঃ ।।

 

ওম মায়োভব্যাস চতুষ্পদী ভব,

বিষ্ণুস্ত্বা নয়তু পুত্রান বিন্দাবহৈ,

বহূং স্তে সন্তু জরদষ্টয়ঃ ।

ওম মায়োভব্যাস জরদষ্টয়ঃ ।।

 

ওম প্রজাভ্যঃ পঞ্চপদী ভব,

সা মামনুব্রতা ভব,

বিষ্ণুস্ত্বা নয়তু পুত্রান বিন্দাবহৈ,

বহূং স্তে সন্তু জরদষ্টয়ঃ ।

ওম প্রজাভ্যঃ সন্তু জরদষ্টয়ঃ ।।

 

ওম ঋতুভ্যঃ ষষ্টপদী ভব,

বিষ্ণুস্ত্বা নয়তু পুত্রান বিন্দাবহৈ

বহূং স্তে সন্তু জরদষ্টয়ঃ ।

ওম ঋতুভ্যঃ সন্তু জরদষ্টয়ঃ ।।

 

ওম সখে সপ্তপদী ভব,

সা মামনুব্রতা ভব,

বিষ্ণুস্ত্বা নয়তু পুত্রান বিন্দাবহৈ,

বহূং স্তে সন্তু জরদষ্টয়ঃ ।

ওম সখে জরদষ্টয়ঃ গা ।।

 

—বুঝলুম না স্যার । সংস্কৃত বইয়ের স-ও দেখিনি কখুনো ।

—এটা বিয়ের মন্ত্র, যা আগুনের চারিধারে বর-বউ ঘোরার সময়ে বর উচ্চারণ করে । বউয়ের দায়িত্ব নেবার মন্ত্র । সপ্তপদী শুনেছ তো, তার মন্ত্র । আমি নিজের বিয়েতে পুরুতের কথামতো এই মন্তর আউড়ে ছিলাম, আজকে ভালোভাবে পড়ে বুঝতে পারলাম । তোমার নানুদিকে উনি নিশ্চয় জানিয়েছিলেন যে এটা বিয়ের মন্ত্র ।

—আচ্ছা, তাই কাকা মারা যাবার পরে নানুদি এক কপি নিজের টিনের সুটকেসে যত্ন করে রেখেচে । আর কাকার ঘরে টোপোর-মুকুটও আচে একটা তাকের ওপরে । নানুদি কাকাকে টোপর পরিয়ে, নিজে মুকুট পরে, হুইল চেয়ার ঘোরাতো, তখুন অতো খেয়াল করিনি যে কাকার ছুটির দিনে চান করাবার আগে দুজনে মিলে বিয়ে করত টোপোর-মুকুট পরে ।

—নানুদি তোমার টাকা নেন না তো সংসার চলে কেমন করে ?

—কাকা ওনার বীমা, পেনসনের আর প্রভিডেন্ট ফাণ্ডের নমিনি করে গিসল নানুদিকে, ভাগ্যিস কাকার বডি পাওয়া গিসল, তাই তো ক্লেম করতে পারলো নানুদি ।

—বডি ? কী করে ? তুমি বলছ রাতে নৌকোয় চাপিয়ে মাঝনদীতে ফেলে দেয়া হয়েছিল । স্টিলের চেয়ারে বাঁধা বডি, ভেসে ওঠার তো কথা নয় ।

—সেও এক ভগবানের ম্যাজিক স্যার ।

—ভগবানের ম্যাজিক ?

—পরের দিন সকালে একটা ভুটভুটির মেশিন ফেটে গিয়ে কেলেঙ্কারি হয়েছিল । কাটা তেল মিলিয়ে চালায়, কখুন যে ফাটে কেউ বলতে পারে ?

—তারপর ?

—যারা সাঁতার জানতো তারা সাঁতরে পারে উটে যেতে পেরেছিল কিন্তু বেশ কয়েকজন বউ আর বাচ্চা তলিয়ে গিসল । তাদের খোঁজে ডুবুরি নাবল । ডুবুরিরা সবচেয়ে আগে কাকার বডিটাই তুলে আনল । পুলিশের নথিতে লেখা আছে যে কাকাও ওই ভুটভুটি করে যাচ্ছিল । ভালোই হল, কি বলুন ? কেন যে দড়ি বাঁধা তা আর কেউ জিগ্যেস করলে না ; করলে নিজেরাই বিপদে পড়ত । আত্মহত্যা বলেও চালাতে পারেনি বীমা কোম্পানি ; বীমার টাকাটা ব্যাংকে রেখেচে নানুদি, তারও সুদ পায় ।

—নানুদি রোজগার করে তোমাকে খাওয়াচ্ছেন তাহলে ।

—না, স্যার, আমি এখানে থাকি না, আমার নিজের ডেরা আচে, এখেনে আপনার সঙ্গে কথা বলার জন্য ডেকেছিলুম । নিরিবিলি পাড়া, বাড়িতেও কোনো কিচাইন নেই ।

—থ্যাংক ইউ, তুমি এই কনট্র্যাক্টটায় সই করে দাও, তোমার জীবনী লেখার গল্পের সত্ত্ব আমাকে দিচ্ছ, আর কেউ লিখতে পারবে না ।

—একটু হিরোগিরি দেখাবেন স্যার ; আমার কয়েকটা ফোটো আছে, দিচ্ছি আপনাকে । কিছু কেচ্ছা জুড়ে দেবেন, কাটবে তাহলে, বিকোবেও ভালো ।

—হ্যাঁ, দেখাবো, রবীন্দ্রনাথকে নিয়েই  গাঁজাখুরি উপন্যাস লিখে বাজার মাৎ করছে লিখিয়েরা । তোমার রোগের তো একটা নাম দিতে হবে, দেবো খুঁজেপেতে একখানা ।

 

 

 

 

 

 

Posted in ছন্নছাড়া সময়ের গল্প, মলয় রায়চৌধুরী, স্যাটায়ার | Tagged , | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

খাওয়াশেকল – অণুগল্প : মলয় রায়চৌধুরী

 

কেষ্টর বাবা মারা যাবার পর থেকেই আমায় এই রোগে ধরেছে, আমি নিজে একে রোগ মনে করিনা, বাড়ির সবাই মনে করে, কেষ্ট, কেষ্টর বউ, কেষ্টর ছেলে, ছেলের বউ, এমন কি নাতি আর নাতনিও, যাদের কোলে-পিঠে করে মানুষ করলুম, মনে করে লোকটার, মানে কেষ্টর বাপের, অভাব আমি এই রোগ দিয়ে পুষিয়ে নেবার চেষ্টা করছি । এরা কেউ আমাকে বুঝতেই পারে না, নিজেদের যুক্তি দিয়ে আমায় যাচাই করে, এই যে তালিবানরা বামিয়ানে বুদ্ধমূর্তি বোমা মেরে উড়িয়ে দিলে, তাকে কি রোগ বলা যাবে, তালিবানদের আগেও তো আফগানিস্তানে মুসলমানরা আছে, কই তারা তো মূর্তিটা নষ্ট করেনি, লোকে এখন বলছে ওটা তালিবানদের রোগ, আমাদের দেশে যখন তুর্কি আফগান আরব রাজারা এলো, তখন তারাও এখানকার কতো মূর্তির নাক মুখ পা ভেঙে দিয়েছিল, এখন এদেশে তাদের বংশধররা রয়েছে, কই তারা তো ভাঙাভাঙি করে না, আগেকার লোকগুলোর কি রোগ ছিল, নাকি এখনকার বংশধরদের রোগ নেই, এই কিছুদিন আগে বাংলাদেশে দুর্গা কালীর মূর্তি ভাঙলে লোকেরা, যারা ভাঙলে তাদের কি রোগে ধরেছিল, তারা কি বংশধর নয়, তারাও তো বংশধর, এদেশের বংশধরদের সঙ্গে ওদেশের বংশধরদের তফাত আছে নাকি, আমি বাবা ওসব রোগটোগ বুঝিনে, ওদের কি কেউ কাছের মানুষ মনের মানুষ মারা যাবার অভাবে ভুগছে, কেষ্ট যেমন আমাকে বলে, প্রায়ই বলে, যে, ওর বাবা মারা যাবার পর থেকে, ওর বাবার উপস্হিত না থাকার অভাব, আমি নাকি আমার খাই-খাই রোগ দিয়ে পুষিয়ে নিই, সত্যিই, আমার সবসময় বড্ডো খেতে ইচ্ছে করে, মনে হয় পেট ভরেনি, সকালের খাবার পরও সামনে যা পাই খেয়ে নিই, রান্নাঘরে ঢুকে আরেকবার ভাত বেড়ে খেয়ে নিই, আমি পুরো ভাতই খেয়ে নিই, এমন নয় যে ফেলে ছড়িয়ে উঠে পড়ি, তা ওদের পছন্দ হয় না, বলে সকালে অতো খেলে, তারপরও তোমার খাই-খাই বাই, টেবিলের ওপর থেকে ফলগুলো খেয়ে নিলে, বললেই তো হতো ধুয়ে কেটে সবাই মিলে খেতুম, কী বোকা, সবাই মিলে কেন খাবো, ফলগুলো আমায় ডাকছিল, খাবার জিনিস আমায় ডাকে তাই খাই, তোদের ডাকে না বলে তোরা খাস না, তোদের ঘড়িগুলো ডাকে, সকালে আটটা বাজলে খাবি, দুপুরে দেড়টা বাজলে খাবি, চারটে বাজলে চা-চানাচুর খাবি, দশটা বাজলে আবার রাত্তিরের খাবার খাবি, তোরা বিশ্বাস করতে চাস না খাবার জিনিস আমায় ডাকে, রান্নাঘরের তাকে রাখা বিস্কুট আমায় ডাকে, দুটো বিস্কুটের মাঝে যে গোলাপি মিষ্টি মাখানো থাকে তা চাটতে আমার ভাল্লাগে, হলেই বা আমার ছেষট্টি বছর বয়স, নিমকির জার আমায় ডাকে, তা আমি কী করব, তোরা ঘড়ির ডাক শুনতে পাস, আমি খাবারের ডাক শুনতে পাই, তোরা ভাবিস কেষ্টর বাপ খাবারের ভেতরে লুকিয়ে থাকতে পারে না, সে স্বর্গে চলে গেছে, স্বর্গে গেলেই বা, স্বর্গ থেকে নেমে এসে আমাকে ইশারায় বলে যে তিলের নাড়ু রাখা আছে, বয়ামে, কেষ্টর ছেলের বউ লুকিয়ে রেখেছে, নারকেলের নাড়ু লোকানো আছে টিনের ডিবেতে, তোমার নাতবউ বাপের বাড়ি থেকে এনেছে, আমি ঠিক ওনার ফিসফিস শুনতে পাই, আর তোরা যখন সামনে থাকিস না তখন লুকিয়ে খেয়ে নিই, তোরা বকাঝকা করিস, যেমন ওই তালিবানদের পৃথিবীর লোকে বকাঝকা করলে, বাংলাদেশে যারা দেবী-দেবতার মূর্তি ভাঙলে তাদের বকাঝকা করলে, কিন্তু তারা তো কোনো ইশারা পেয়েছিল, আরবি ভাষায় লেখা বইয়ের ইশারা, সরকম ইশারা কেষ্টর বাপ আমায় করে, তখন আমি কী খাবো কী খাবো করতে থাকি, কিছু খেতে না পেলে মন খারাপ হয়ে যায়, তোরা সব লুকিয়ে রাখা আরম্ভ করেছিস, তালাচাবি দিয়ে রাখা আরম্ভ করেছিস, আমি কি আর জানিনে, তোরা ভাবছিস বুড়িটা আগেকার কালের, অতো বুঝবে না, আমি সব বুঝি, এখন তোদের পাল্লায় পড়ে আমি যখন আমার সামনে কোনো খাবার জিনিস দেখতে পাই না তখন রান্নাঘর থেকে চিনি খাই, তাও তোরা তালা বন্ধ করে রাখা আরম্ভ করলি, কেষ্টর বাবা রোজ আপিস ফেরত আমার জন্য হয় রসমুণ্ডি, নয় মোয়া, নয় রসগোল্লা, নয় মুড়কি, নয় সন্দেশ কিনে আনতো, আমি পরের দিন বিকেল পর্যন্ত খেতুম, তোদেরও দিতুম, কেষ্টর বাপ তোদের মতন কিপটে ছিল না, কতো কি আনতো খাবার জন্যে, আমার পছন্দের ফল, আমার পছন্দের মিষ্টি, আর তোরা, আমাকে তোদের মতন করেই খেতে দিস, বুঝতেই পারিস না যে কেষ্টর বাপের ভাগের খাওয়াটাও আমাকে খেতে হয়, ওই করেই তো কেষ্টর বাপকে বাঁচিয়ে রেখেছি আমার মধ্যে, তা তোদের পছন্দ হলো না, তোরা আমার ডবল খাওয়া বন্ধ করে দিলি, আমি আর কী করব, আমি এখন মুখ চোকাই, মুখে কিছু না থাকলেও খাবার ভান করি, তাও কেষ্টর পছন্দ হল না, ওর বন্ধুবান্ধব নাকি হাসাহাসি করে, আমার খাইখাই বাই দেখে, আমি কী করেছি বলো, আমি ওর বন্ধুদের জন্যে বৈঠকখানা ঘরে মিষ্টি সিঙাড়া দেখে তুলে খেয়ে ফেলি, কেষ্ট নাকি তাতে অপমানিত বোধ করতে লাগল, যারা আসে তারাও নাকি ওর মাকে দেখে অবাক হয়, কোথায় কেষ্ট বন্ধুদের বোঝাবে যে আমার মা ঘড়ির নির্দেশে চলে না, স্বর্গীয় বাবার ইশারায় চলে, তা নয়, কেষ্ট এখন বৈঠকখানা ঘরে বিছানা পেতে, খাটের সঙ্গে আমার পায়ে শেকল বেঁধে রেখেছে, যাতে সারাক্ষণ নজরে-নজরে রাখা যায়, ওদের ঘড়ি যখন বলে, ওরা তখন খায়, তখন আমার খাবার নিয়ে আসে কেষ্টর বউ কিংবা কেষ্টর ছেলের বউ, আমি রাগ দেখালেও ওদের কিছু যায় আসে না, বলেছে, ডাক্তার দেখাবে, তা ডাক্তার এসে বলে গেল আমার খাই খাই রোগে ধরেছে, এ সারানো যাবে না, উনি যেমন শেকলবাঁধা আছেন, তেমনই থাকুন, এখানেই বেডপ্যান রেখে দিন, আর দুজন সেবিকা নিয়োগ করুন যারা ওনার পেচ্ছাপ-পায়খানা পেলে বেডপ্যানে করাতে পারবেন, এ কেমনতর ডাক্তার বুঝিনে, একজন সুস্হ সবল মানুষকে হাসপাতালের রোগির মতন চোপোরঘণ্টা বিছানায় শুইয়ে রেখেছে, তাও সময়ে অসময়ে ওষুধের বড়ি খাওয়ালে খেতুম মাঝে-সাজে, রোগিদের যেমন বেদানা আপেল দ্যায় তেমন দিলে খেতুম, কিন্তু সেবিকারা সারাদিন আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে, আর হাসি পেলে পেছন ফিরে হাসে. বলি যে, এই তোরা আমার পায়ের শেকলের তালা খুলে দে দিকিনি, আমার কাছেও লুকোনো টাকাকড়ি আছে, তোদের দিয়ে দেবো, তা ওরা শুনবেনে, আমি এই খাওয়াশেকল বাঁধা অবস্হায় সারা দিন বিছানায় শুয়ে থাকি আর মুখ চোকাই..

Posted in অণুগল্প, মলয় রায়চৌধুরী | Tagged , | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

প্ল্যানচেটে ঝিংচাক – পোস্টমডার্ন গপপো : মলয় রায়চৌধুরী

পোথোম পড়বো ( কুমিল্লা স্পেশাল )

         আমরা, আমরা মানে আমিপাদ আর হুবহু আমার মতন সিদ্ধাচার্য আরও কয়েকজন,  মানে লুইপাদ, কাহ্ণপাদ, ভুসুকপাদ, সরহপাদ, শবরীপাদ, বিরূপাদ, লাড়ীডোম্বীপাদ, কুম্বলাম্বপাদ, ঢেন্ডনপা, কুক্কুরীপাদ, কঙ্ককপাদ, গুণ্ডরীপাদ, চাটিলপাদ, ডোম্বীপাদ, শান্তিপাদ, মহিত্তাপাদ, বীণাপাদ, আজদেবপাদ, দারিকপাদ, ভাদেপাদ, তাড়কপাদ, জঅনন্দিপাদ, ধামপাদ, আর তান্তিপাদ মাঝরাতে, এই নাইটক্লাবে জড়ো হয়েছি, প্ল্যানচেটে যে বা যারা আসতে চায় বা চান তাদের আদর-আপ্যায়ন করার জন্য, প্রমাণ করার জন্য যে আধুনিকরা যে প্ল্যানচেটে বিশ্বাস করতো না তা তাদের রদ্দি মগজের ফসল, আমরা এখন উত্তরাধুনিক যুগে, প্ল্যানচেটে বিশ্বাস করি আর যেদিন যখন ইচ্ছা একত্র হয়ে মৃত হোক বা জীবিত, মানুষ-মানুষীদের নামিয়ে আনি, তাদের আমরা খাই, খেয়ে আবার ফুৎকারে উড়িয়ে দিই যাতে তারা যে যার দেশে সংসারে সমাজে ফিরে যেতে পারে ।

আমাদের নামের শেষে পাদ আমাদের পদবি, আমরা শাসক আর শোষকের মুখে অনন্তকাল যাবত পাদছি বলে বেদের সময়কার মুনীঋষিরা আমাদের এই পদবি দিয়ে গেছেন। কিছুকাল শাসক-শোষকের আওতার বাইরে গিয়ে লুকিয়ে পড়তে হয়েছিল, সেই তখন থেকেই আমাদের হাবভাব চল-চলন আচার-আচরণ কাজ-কম্মো পোশাক-আশাক হয়ে গেছে ঐন্দ্রজালিক ।

সংসারজীবনে সিদ্ধাচার্যদের নাম ছিল যা ওনাদের পিতৃদত্ত নাম, কয়েকজনের ইতিহাস লুম্বিনি পার্কের নথিতে আছে, যেমন ঋত্বিক ঘটক, বিনয় মজুমদার, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সঞ্জয় ভট্টাচার্য, মলয় রায়চৌধুরী প্রমুখ ।

নাইটক্লাবের নাচ-গান যেমন চলে তেমন চলছে, ডিজের ঝপ্মকঝিলু বাজনার সঙ্গে  আধা-ল্যাংটো মেয়েদের নাচ, বিদেশিনি উলঙ্গিনিরাও আছে , বিদেশিনি মানে চিন আফ্রিকা ইউরোপ আমেরিকা মোঙ্গোলিয়ার যুবতীরা, আর ভারতীয় যুবতীরা তো আছেই, নাইটক্লাব মানেই তো যুবতীদের গায়ের সুগন্ধে ম-ম, আর নাচিয়ে যুবকদের তাগড়া ঘামের দুর্গন্ধে ছ্যাছ্যা ।

এতোদিন লোকে অন্ধকারে একজোট হয়ে বসে প্ল্যানচেট করতো, তা ছিল প্রাগাধুনিক যুগের বোকামি, এখন বিজ্ঞানের সঙ্গে যখন উত্তরাধুনিক যুগ এসে পড়েছে তখন, বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে আমরা এই লেজার আলোর ঝিলমিলে অন্ধকারে নাইটক্লাবের একেবারে মাঝখানের বিশাল টেবিলটা আগে থাকতে অর্ডার দিয়ে সংরক্ষণ করে রেখেছি, নাইটক্লাবের কর্তা জানেন যে আমরা সিদ্ধাচার্য, বিশেষ ক্ষমতার অধিকারী, তাই ছয় মাস অন্তর আমাদের জন্য বিশেষ ব্যবস্হা করেন ।

হুইস্কিতে চুমুক দিয়ে, সাজানো বাগানের পরের স্টপের নাইটক্লাবের উত্তেজনাপ্রবণ ঝিলঝিলে আলোয়, গোরা, মানে যার নাম লুইপাদ, আমার দিকে না তাকিয়েই, জিগ্যেস করল, আচ্ছা, আপনি লুইপাদের কাছেই বা এসেছেন কেন ? জানলেনই বা কেমন করে যে লুইপাদ প্রতিদিন সন্ধ্যায় এখানে আসে ?

আমি মানে আমিপাদ বলল, তুমি ক্লাসিক পর্যায়ের যুবক বলে ; তোমাকে দেখতে শুনতেও ভালো, টকটকে গায়ের রঙ, এখনকার ইনডিয়ানদের মতন ল্যাদখোর নও, মাথায় ছ’ফুট লম্বা, হাড় চওড়া. দু’হাতের মুঠো যেন বাঘের থাবার মতন ; তাছাড়া তোমার চরিত্রের তো কপিরাইট আর নেই । কপিরাইট শেষ হয়ে গেলেই ক্লাসিক পর্যায়ে চলে যায়, আই মিন ধ্রুপদি । আর এই ভাষায় যারা ধ্রুপদি ভাবুক তারা সন্ধ্যায় এখানেই নিজের সঙ্গে নিজে মজে থাকে । তুমি তো হিন্দুহিতৈষী সভার সভাপতি ছিলে, কপালে সিঁদুরের তেলক কেটে বেরোলে খোট্টা ভামরাও ভড়কে যেতো ।

হ্যাঁ, লুইপাদের বাপ ছিল আইরিশম্যান, মিউটিনির সময়ে পিরালির ঠাকুর রাস্তায় কুড়িয়ে পেয়ে দু’মলাটের সংসারে ঢুকিয়েছিলেন, আর লুইপাদ মানে আমি যে কেবল হিন্দু নই তা তো পরেশচন্দ্র ভট্টাচার্যের বাড়ি গিয়ে ওনাকে প্রণাম করে জানিয়েছিলাম, জানেন তো আপনি, লুইপাদের বন্ধু বিনয়ের কাছে খোঁজ নিয়ে জেনেছেন, বিনয় বলেছিল আমাকে ; বিনয়কে জানেন তো ? ‘ফিরে এসো, চাকা’ বইয়ের বিনয় নয়, হিন্দুহিতৈষী সভার সেক্রেটারি বিনয়ভুষণ চট্টোপাধ্যায়। সে যাকগে যাক । ‘ফিরে এসো, চাকা’র বিনয় তো নামকরা সিদ্ধাচার্য, ওই তো, কুম্বলাম্বপাদ, গণিত নিয়ে নিজের সঙ্গে নিজে কথা বলতে ব্যস্ত ।

আমি, মানে আমিপাদ, মনে-মনে ভাবছিল, পিরালির ঠাকুর লুইপাদ মানে গোরার লেংটু নিয়ে দুচারকথা লেখেননি কেন ? আইরিশম্যানের ছেলে, লম্বা-চওড়া জোয়ান, লেংটু তো সাধারণ বাঙালি ছেলে-ছোকরার চেয়ে মাপে বেশ বড়ো আর ফর্সা তো হবেই । কে জানে, হয়তো মাধবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে দুচারটে ছাত্রীকে টোপ দিয়ে ফাঁসিয়েও থাকতে পারে। ছাত্রীদের কি ইচ্ছে করে না ধবধবে ফর্সা লেংটু নিয়ে খেলা করবার, একবার এই পাশ একবার ওই পাশ, তারপরে মেমসাহবকো সেলাম দেও, ট্যানট্যাট্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যান !

গোরা মানে লুইপাদ শুধোলো, আপনি তো দেবদাসের কাছে গেলেই পারতেন, ওনারও তো কপিরাইট নেই, উনি আমার চেয়েও বেশি ধ্রুপদি, যাঁর যেমন ইচ্ছে ওনার মুখে সংলাপ গুঁজে দিতে পারেন ; আপনিও আপনার যা ইচ্ছে গুঁজে দেবেন, তবে যতোটা জানি দেবদাস সমকামী ছিলেন না । দেবদাস মানে কুক্কুরীপাদ, ওই যে বোতলের সঙ্গে কথা বলছেন সন্ধেবেলার সান্ধ্য ভাষায় ।

নাইটক্লাবের এলজিবিটিরা জোড়ায় জোড়ায় নাচছে চুমু খাচ্ছে, ভাগ্যিস শুনতে পায়নি লুইপাদের কথা।

লুইপাদ মানে গৌরমোহনের কথা শুনে চটে গেলুম । বললুম, আরে ওই মাগিবাজটার কথা বোলো না, আমড়াগাছিতে গিয়ে সারাদিন বাংলা টেনে পড়ে থাকে, এরেকটাইল ডিসফাংশানে ভোগে, দিনভর পারো পারো বকতে থাকে, আমার কাছে ভায়াগ্রার টাকা চাইছিল সেদিন । একদিন গিয়ে দেখেছিলুম । চন্দ্রমুখী নামের সেয়ানা ডবকাবুকো মেয়েটা যতো বলছে হ্যাঁ পারি পারি, পারব না কেন, বিছানায় তো এসো, শুধু বোতল নিয়ে মাটিতে গড়াগড়ি খেলে চলবে নাকি ।

লুইপাদ আমার দিকে ঝিমধরা চাউনি মেলে তাকিয়ে আছে দেখে বললুম, অর্থাৎ আমিপাদ বলল, মানে কুক্কুরিপাদ সম্পর্কে বলল, ব্যাটার অতো বয়স হয়ে গেল তবু কচি খোকার মতন ছোটোবেলাকার কোন এক গেঁয়ো প্রেমিকার জন্য সিরোসিস বাধিয়ে ফেললে । ওকে দিয়ে কাজ হবে না ; সোজা হয়ে দাঁড়াতেই পারে না । তোমার সঙ্গে একই আশ্রমে থাকেন নাকি ? এড়িয়ে যেও, মাতাল-সিদ্ধাচার্যদের এড়িয়ে যাওয়াই মঙ্গল । পালিয়ে গিয়ে যখন তিব্বত, নেপাল আর চীনদেশে শুধু কুক্কুরীপাদ কেন, আমিপাদসহ সকলেই খেতুম ছাঙ, রাকসি আর তোঙবা মদ, নিষেধ ছিল না । নিষেধের ব্যাপারটা নিয়ে এলো আধুনিকতাবাদীরা । এখন উত্তরাধুনিক যুগে আর কোনো নিষেধের বালাই নেই ।

গোরা, মানে লুইপাদ, এক চুমুকে হুইস্কি শেষ করে বললে, দোষটা কুক্কুরীপাদ মানে দেবদাসের নয়, আফিমসায়েবের, সতেরো বছর যদি আফিম খাইয়ে ট্যাঁকের ডিবেতে বন্ধ করে রেখে তারপর বাইরে বেরোতে দেন তো বয়স বেড়ে যাবেই, সতেরো প্লাস সতেরো চৌত্রিশ বছর বয়স । চন্দ্রমুখীর উচিত ছিল দেবদাসের ভুট্টায় জাপানি তেল মাখানো ।

কথাটা শেষ হবার আগেই, বোধহয় প্ল্যানচেটে আদর আপ্যায়নের নেওতা দেয়া  হয়েছে বলে, একাবারে খালি গায়ে উদোম ধবধবে স্কারলেট জোহ্যানসন, জেনিফার লরেন্স, চারলিজ থেরন, ন্যাটালি পোর্টম্যান, অ্যাঞঞ্জেলিনা জোলি, স্যাণ্ড্রা বুলোক, এমা স্টোন, কেট ব্ল্যানচেট, কিয়েরা নাইটলি, জেনিফার অ্যানিসটন নিকোল কিডম্যান আর জুলিয়া রবার্টস দুই বুকে দুহাত রেখে নেচে-নেচে গাইতে আরম্ভ করলে, মাই গড, বাংলা গান, আর সেকি বুকদোলানি কোমরানাচানি, মেমদের বুক দুটোকে যে লাউ বলে তা আগে সন্দেহ থাকলেও আজ যাকে বলে নিরসন হওয়া, তাই হলো, এর আগে, সত্যি, নিরসন বলতে যে কী বোঝায় জানতুম না, যখন কিনা আমি একজন আমিপাদ । গোরা, মানে লুইপাদ, মাথা দোলাতে লাগল গানের তালে তালে :

 

সাধের লাউ বানাইল মোরে বৈরাগী

লাউয়ের আগা খাইলাম

ডোগা গো খাইলাম

লাউ দি বানাইলাম ডুগডুগি

লাউয়ের এতো মধু

জানেগো জাদু

লাউ ধরলাম সঙ্গের সঙ্গী

আমি গয়া গেলাম

কাশি গো গেলাম

সঙ্গে নাই মোর বৈষ্ণবী

 

সিদ্ধাচার্য আমিপাদ উঠে দাঁড়িয়ে ওদের কয়েকজনকে টকাটক খেয়ে ফেলতে লাগল,  সবই ফসকা, রঙিন বাতার দিয়ে গড়া, কোনোই অসুবিধা হলো না ওদের পুরো গিলে ফেলতে । আমিপাদের দেখাদেখি আরও কয়েকজন বয়োজ্যেষ্ঠ সিদ্ধাচার্য বিরাট হাঁ করে চুমুক দেবার মতন করে খেয়ে ফেললেন বিদিশিনি উলঙ্গিনিদের, পেটে হাত বুলিয়ে ঢেঁকুর তুলতে লাগলেন । শ্বেতাঙ্গিনিদের খেয়ে ফেলার পর সিদ্ধাচার্যরা সকলেই গৌরবর্ণের হয়ে উঠলেন । নাইটক্লাবের মালিকের আনন্দ ধরে না, গিয়ে সব আলো নিভিয়ে দিলেন, গৌরবর্ণের মানুষের দেহের আলোয় পুরো নাচঘর আলোয় আলো হয়ে গিয়েছিল ।

উপস্হিত সিদ্ধাচার্যরা, আমিপাদসহ, লুইপাদ, কাহ্ণপাদ, ভুসুকপাদ, সরহপাদ, শবরীপাদ, বিরূপাদ, লাড়ীডোম্বীপাদ, কুম্বলাম্বরপাদ, ঢেন্ডনপাদ, কুক্কুরিপাদ, কঙ্ককপাদ, গুণ্ডরীপাদ, চাটিলপাদ, ডোম্বীপাদ, শান্তিপাদ, মহিত্তাপাদ, বীনাপাদ, আজদেবপাদ, দারিকপাদ, ভাদেপাদ, তাড়কপাদ, জঅনন্দিপাদ, ধামপাদ, তান্তিপাদ প্রমুখ সবাই বলে উঠলেন, সাধু সাধু, আজ প্রমাণ হয়ে গেল যে আধুনিকতা ছিল একটা বুজরুকি, এখন উত্তরাধুনিক যুগে প্ল্যানচেটে আদরের নেওতা দিলে সুন্দরীতমা সুপারস্টাররাও সাড়া দেন, তাঁদের খেয়ে ফেলার আপত্তি করেন না ।

প্ল্যানচেট করার এই সুবিধা, সুন্দরীদের না চাইতেও পাওয়া যায়, হাওয়াকে জড়িয়ে ধরার অভিজ্ঞতা হয়। আমিপাদ বসে পড়ল  নিজের চেয়ারে, আরেকটু হলেই পড়ে যাচ্ছিল, অন্ধকারে তো কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। অন্ধকার ব্যাপারটা এমন যে কেউ যদি যেচে দেখা দেয় তাহলেই দেখা যায় । সমীর রায়চৌধুরীর ‘মেথিশাকের গন্ধ’ গল্পে আছে ।

গোরা, মানে লুইপাদকে আমিপাদ বলল, তুমি মদ খাওয়া শুরু করলে কবে ? পিরালির ঠাকুর তো অ্যালাউ করেননি ।

লুইপাদ বললে, পিরালির ঠাকুরের কথা ছাড়ুন, উনি ছিলেন নাচিয়ে-গাইয়ে, বব ডিলানের মতন মোটা টাকা পেয়েছিলেন, মেডেল পেয়েছিলেন । সে মেডেলখানাও চাটগাঁর চোরের দল নিয়ে চমপট, কপিরাইট ফুরোলে ছাড়াবে বাজারে, কিংবা সেখানের মিউজিয়ামকে বেচবে । উনি যাকে বলেছিলেন মিউটিনি তা তো প্রথম স্বাধীনতা আন্দোলন । আমি সেই স্বাধীনতার প্রডাক্ট । বাহাদুর শাহ জাফরকে মনে আছে আপনার ? চেঙ্গিজ খানের বংশধর ? আটটা বউ আর সাতাশিটা হারেমের বাঁদির সঙ্গে শুতো আর কবিতা লিখতো, শেষে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির সাহেবদের সামনে কেলিয়ে পড়লো । কবিতা লিখিয়েদের শেষ পর্যন্ত বাহাদুরশাহ জাফরের অবস্হা হয় । আমাদের কুক্কুরিপাদ মানে দেবদাসও তাই, বুঝলেন কিনা, প্রেমে পাগল হয়ে সংলাপ আউড়েই ফেঁসে গেল । আপনিপাদ যেমন জানেন যে লুইপাদ প্রতি সন্ধ্যায় এখানে আসে, কুক্কুরীপাদ মানে দেবদাসও জানে, হয়তো এসেও পড়েছে অন্ধকারে, একাধজন সুন্দরীতমাকে নিঃশ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে রেখে নিয়েছে, কেই বা বলতে পারে, ওর কোনো ঠিক নেই ।

বললুম, তাই তো তুমিপাদকেই যেতে বলছি আমার কাজে ।

এই সময় এক গ্রিক দার্শনিক  আমিপাদদের টেবিলে চেঁচিয়ে উঠলো, দার্শনিককে  চেনে আমিপাদ, বেহালা না ওই দিকে কোথাও থাকে, নাম ভুসকুপাদ মানে পণ্ডশ্রম সেন, সব সময় গ্রিক দেবতাদের পোশাক পরে থাকে, সারা পোশাকে মার্কস, এঙ্গলস,  লেনিন, স্ট্যালিন, মাও, চে-গ্বেভারা, রোজা লুক্সেমবুর্গ, হো চি মিন, ম্যালকম এক্স, কাস্ত্রোর মুখের ছাপ, অনেক সময়ে ফ্যানের হাওয়ায় বা ঝড়ে মুখের ছাপগুলো ওর গ্রিক পোশাক থেকে খসে উড়ে যায়,  নিজেকে বলে প্ল্যাটোর সময়কার সিদ্ধাচার্য, হতেও পারে, এই উত্তরাধুনিক যুগে তো সবকুছ চলতা হ্যায়, কোনো এক সুন্দরীতমাকে অর্ধেক খেয়েছে, তার উরু থেকে পা পর্যন্ত বেরিয়ে রয়েছে মুখ থেকে, কোঁৎ পেড়ে অ্যানাকোণ্ডার মতন গিলে ফেলল আর বসেই নিজেকে নিজে জ্ঞান দিতে দিতে লাগল, লুইপাদ মানে গোরার শুনতে ভালোই লাগছিল, দার্শনিকদের ও বড্ড ভালোবাসে, ওর মতে দার্শনিকদের মতো প্রতিভা-ঝিংচাক আর নেই ।

ভুসকুপাদ, মানে পণ্ডশ্রম  সেন সবাইকে একটা করে সোভিয়েত আমলের ঘুষি পাকিয়ে স্যালু্ট ঠুকলো, তেমনটাই মনে হলো অন্ধকারে, ওটা আসলে অন্ধকারকে সেলাম, ভুসকুপাদের ঢেঁকুরের গন্ধে  অ্যাঞ্জেলিনা জোলির ছাড়া হাওয়া বেরিয়ে এলো,তারপর বলা আরম্ভ করল, একটা কথার সঙ্গে আরেকটা কথার সম্পর্ক ভুসকুপাদ মানে পণ্ডশ্রম সেন নিজে, আমরা আর কীই বা করি, শুনলুম বসে-বসে : “কিছুই আসে-যায় না, তাই-ই করা ; একটা ফুলের দিকে তাকিয়ে ভাবি ফুলটা আমায় পছন্দ করছে তো ; প্রতিবাদ এক ধরণের বিশ্বাস, আর পাঁচটা বিশ্বাসেরই মতো, যা সন্দেহের উর্দ্ধে নয় ; নিজের চোখে দেখা, নিজের কানে শোনা, নিজের হাতে ছোঁয়ার দৌরাত্ম্য ততদিন চলবেই যতদিন না নিজের ভাবনার লেজটা খসে পড়ছে ; এখানেই শেষ, তবে ভাষার কথাটা মনে করিয়ে দেওয়াটা বাদ দেওয়া গেল না, জীবনের হাত থেকে বাঁচতে চাওয়ায় আশ্চর্যের কী আছে ; লেখা শুরু হয়, আপত্তি কাজ শুরু করে তন্মুহূর্তে ; তবেই এই দাঁড়ায়, তা সে তিনি যে পথিকবরই হন না কেন, যখন পথ যাচ্ছে রোগ আর যুদ্ধ আর অসহায় ধ্বংসের দিকে, পথ দেখাচ্ছে অবলুপ্তির ইশারা, তোমাকে তো পা টিপেটিপেই চলতে হবে নাকি ; আলো জ্বলতেই সে হাত দিয়ে চোখ আড়াল করে, খানিক যাতে দেখতে পায় ; যাই, থেকেই যাই ; যিনি দেশ ও দশের উপকারের কথা ভাবছেন তাঁর থেকে সাবধানে থাকাই ভালো, যদিও তাহলেই, কামড় থেকে নিস্তার পাওয়া নিশ্চিত হচ্ছে না।”

আমিপাদ বলল, ভুসকুপাদবাবু, একটু থামুন, পরে আবার বলবেন আপনার ট্র্যাজেডির কথা, ঠোঁটের কোনে অ্যাঞ্জেলিনা জোলির থুতু চলে এসেছে । পণ্ডশ্রম সেন থামলেন, আমিপাদ এক পেগ জিন-মেশানো ভোদকা আনিয়ে দিতে, এক চোঁয়ে মেরে দিয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে বসে রইলেন । বোধহয় এর পর যা বলবেন তা ফেঁদে নিচ্ছেন সিদ্ধাচার্য সেন ভুসকুপাদবাবু । পেসিমিস্টদের আমিপাদের ভালো লাগে, তারা অন্তত নিজেদের হার স্বীকার করে না, সেই চর্যাপদের দিনকাল থেকে দেখছে তো আমিপাদ ।

লুইপাদ, মানে গোরা এমন টলছিল যে  আমিপাদ টের পেলো ওকে শক্তিমাতাল মানে লাড়ীডোম্বীপাদের  রোগে ধরেছে, যিনি ঝর্ণাকলমে রাম ভরে একের পর এক প্রেমের কবিতা লিখে চলেছেন । মাতাল অবস্হাতেই লুইপাদ বলল, আপনি এক কাজ করুন, ওই যে দেখছেন ধুতি-পাঞ্জাবি পরা সিদ্ধাচার্য, উনি শান্তিপাদ, চুপচাপ লেমোনেড খাবার ভান করছেন, কিন্তু খাচ্ছেন না, ওনার পাশে যে ছোকরাগুলো বসে আছে তাদের গ্যাঁজানি শুনছেন, উনি মাল্যবান, মানে শান্তিপাদ, ওনার কাছে যান, উনি  ইজিলি অ্যাভেইলেবল, যদিও ওনার কপিরাইট ফুরোয়নি, কিন্তু যার ইচ্ছে সে-ই ওনাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে ।

লুইপাদ কথা বজায় রাখল,  উনি শান্তিপাদবাবু, আমার কাছে টাকা ধার চাইতে এসেছেন, প্ল্যানচেটে যোগ দেয়া জোর করে, সংসারে বেশ টানাটানি, আমাকে বলছিলেন কয়েকটা কবিতার বদলে কিছু টাকা দাও, একটা উপন্যাসও দিতে চাইছিলেন, বেনামে ছাপতে হবে, কেননা ওনার বউ পড়লে একসঙ্গে বিছানায় শোয়া হবে না আর এই জীবনে ।  লেমোনেড ধরিয়ে বসিয়ে রেখেছি, বেচারা শান্তিপাদ, হুইস্কি খাবার প্রস্তাব দিতেই আঁৎকে উঠেছিলেন । এমনিতেই বউ পাত্তা দেয় না, তার ওপর মুখ থেকে মদের গন্ধ বেরোলে হয়তো বাড়িতে ঢোকাই মুশকিল হবে । শান্তিপাদের পাশের ছোকরাগুলোকে চেনেন তো, নাকি, তাড়কপাদ, তান্তিপাদ আর আজদেবপাদ?  কেনারাম স্ট্রিট কফিখানায় আড্ডা মারে, আজকে শনিবার তো, ওদের মদ খাবার দিন, চাপলুসিটোলায় যায় না, সেখানে অভিজাত লেখকরা যায় না, তাই এই নাইটক্লাবের অন্ধকারে এসেছে, তিনজনই সিদ্ধাচার্য ইন দি মেকিং। আর আপনি তো ডেকেই এনেছেন প্ল্যানচেটের লোভ দেখিয়ে। এবার দেখুন কোথাকার সুন্দরীরা এসে ফুল-মন্টি দোলান ।

আমিপাদ বলল, কী যে বলো ! শান্তিপাদ, মানে মাল্যবান মানুষটা সাহিত্যিক, এক্কেবারে শান্তিপাদ, ক্যাবলা, তোমার মতন স্মার্ট নয়, নিজের মনে ঘেঙিয়ে মরে, দেখে তো মনে হয় পৃথিবীর ‘প’ও জানে না, নিজের সঙ্গে নিজে কথা বলে, কে জানে স্কিৎসোফ্রেনিয়া আছে কিনা । আর তুমি যা বলছ, আমিপাদেরও তাই মনে হয়, বাড়িতে সদর দরোজা বন্ধ দেখে ডাকাডাকি না করে রাতভর কলকাতা চষে বেড়ায় ।

মাতাল হলে কী হবে ; লুইপাদ অর্থাৎ গোরা উল্টে আমাকেই চার্জ করল, আপনি সাহিত্যের কী বোঝেন ? সাহিত্য কাকে বলে জানেন ? তখন থেকে ভ্যাজর ভ্যাজর করে আমার নেশাটা মাটি করে দিলেন । এই বোতলটা দেখছেন তো? ১৯৩০  সালের শিভাস রিগাল, যত্ন করে রেখে দিয়েছিলুম, লাতিন আমেরিকার মেমবউ পিরালির ঠাকুরকে দিয়েছিলেন, প্যারিসে চিত্রপ্রদর্শনীর সময়ে, আজকে আমার জন্মদিন বলে খেলুম, আপনি একটু আগে এলে এক পেগ খেতে পারতেন । এই নাইটক্লাব বাইরের মাল এনে খেতে দেয় না, নেহাত আমি রেগুলার কাস্টামার বলে অ্যালাউ করেছে, বলেছে খালি বোতলটা দিয়ে যাবেন । ওই আপনাদের যুগের ডবল ডেকার উপন্যাস লিখিয়েদের মতন আরকি, এই পার আর ওই পার দুই পারেই, পুরোনো বোতলে চাপলুসটোলার মাল ঢুকিয়ে ধ্রুপদি বলে চালিয়ে দেবে । ছাঙ, রাকসি, তোঙড়ার যুগ, যাকে বলে অবসিত ।

আমি, মানে আমিপাদ বলল, না মিস্টার পাদ, আমিপাদ কেবল সিঙ্গল মল্ট খায়, আর ওনাদের, মানে ডবল ডেকার লেখকদের  বইপত্তর পড়ার সুযোগ হয়নি আমিপাদের, বড্ডো দাম, যদিও কেনারাম স্ট্রিট ফুটপাতে পাওয়া যায়, কিন্তু কাদের বাড়ির বই, কতোজনের কতোচামের রোগের জার্ম, শুকনো বীর্য, তাই ফুটপাতের বই কিনিনা, তাছাড়া সময় কোথায়  ।

ওই যে বললুম, রূপসী বাংলার প্রেমিক শান্তিপাদ, মানে মাল্যবান লোকটাকে নিয়ে যান, বললে লুইপাদ, মানে গোরা, কথা জড়িয়ে যাচ্ছিল ।

আরে, ওসব সাহিত্যিকদের দিয়ে হবে না । কাজটা বেশ রিসকি। তুমিপাদের মতন তাগড়া লোকই চাই । তাছাড়া  লুইপাদের ধর্মের মা-বাপ নেই, যদিও এককালে নিজেকে গোঁড়া ব্রাহ্মণ ভাবতে ।

লুইপাদ, মানে গোরা এবার চটে গেল, বলল, সাহিত্যের আপনি কী বোঝেন ? যত্তো প্রতিক্রিয়াশীল তত্ত্ব দিয়ে চাপা দিয়ে দিয়েছেন সাহিত্যকে, কোনো মূল্যবোধ নেই, মানদণ্ড নেই, বিদ্যায়তনিক অনুমোদন নেই ।

আমিপাদও চটে গিয়ে ঝাঁঝিয়ে উঠল, বলল, আমি আমিপাদ, বুঝলে, সার্টিফায়েড সিদ্ধাচার্য, যে সে লোক নয়, তুমিপাদ বলো, যেমন ? যেমন ?

গোরা, মানে লুইপাদ বললে আপনাদের তো শুধু নারীবাদ, মার্কসবাদ, বিনির্মাণবাদ, উত্তরঔপনিবেশিকতাবাদ, অপরবাদ, চিহ্ণবাদ, কালচারাল মেটেরিয়ালিজম, সবই সরকারদের পোঁদে বাঁশ করার তত্ব । সমীর রায়চৌধুরী নামে একজন ভাবুক ‘হাওয়া৪৯’  পত্রিকা যেদিন থেকে প্রকাশ করা আরম্ভ করেছেন, সেদিন থেকে ছেলে-ছোকরারা ঢুকে গেছে মহাদর্শনের ভুলভুলাইয়ায়, ওনার সঙ্গে আছে ব্রহ্মপুরের মুর্শিদ আলি মণ্ডল, আর আজকাল জুটেছে বৈদ্যনাথ মিশ্র নামের মালদা জেলার এক বামুন , একেবারে রাষ্ট্রের তিন সিংহের  ছাপ্পা । এগুলো এসেনশিয়ালিজম । সাহিত্যের জন্যে ওসব তত্ত্ব-ফত্ত দরকার হয় না ।

গোরা, মানে লুইপাদের কথা শুনে মনে হল, আইরিশম্যান নয়, ও বোধহয়, ফরাসি দেশের ষোড়শ লুই-এর বংশধর । মিউটিনি নয়, ফরাসি বিপ্লবের সময়ে ফুটপাথে কুড়িয়ে-পাওয়া ।

গোরা, মানে লুইপাদ,  তারপর একটু শান্ত হয়ে জিগ্যেস করল, তা আমাকে কী জন্যে চাই সেটাই খোলোসা করে বলুন ।

বললুম, এক ট্রাক গোরু পাচার করতে হবে ।

গোরা, মানে লুইপাদ, আমার মুখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে শ্লেষের মুচকি হাসি দিলো, যেন বলতে চাইছে যে গোরু পাচারের জন্যে গেরুয়াল্যাণ্ডে নানা জায়গায় চালক-বাহকদের পিটুনি দিয়ে ঠগিরা ঠেঙিয়ে মেরে ফেলছে বটে, কিন্তু লুইপাদের দিকে দশ জন লোক লাঠি হাতে এগোলেও ও তাদের ক্যাঁৎকা কোঁৎকা দিয়ে কুপোকাৎ করে দিতে পারবে ।

মাল্যবান, মানে শান্তিপাদ লোকটা বোধহয় আমাদের আলোচনা শুনতে পাচ্ছিল, নিজের অন্ধকারেই নিজের চেয়ার থেকে সঙ্গে অন্ধকার নিয়ে উঠে এসে বসল আমাদের দুজনের মাঝের অন্ধকার  চেয়ারে, হাতে লেমোনেডের গেলাস, বোঝা যাচ্ছে খায়নি, হয়তো মনে করে লেমোনেড খেলেও নেশা হবে, কবিতার লাইন মগজ থেকে হাপিশ হয়ে যাবে, কিংবা জেনিফার অ্যানিস্টনকে খেয়েছে, ওর বুক দুটো জেনিফার নিজের দুই কাঁধে ফেলতে পারে বলে চকচকে পত্রিকায় কতোবার যে রসিয়ে লিখেছে । চেয়ারে কুন্ঠিত বডি ল্যাঙ্গুয়েজে বসে মাল্যবান, মানে শান্তিপাদ,  বললে, আপনাদের আলোচনা কানে আসছিল, এই যে আপনি গোরু পাচার করতে চাইছেন, গোরুদের প্রত্যেকের পাসপোর্ট করিয়েছেন কি, তাদের ভিসা পেয়েছেন কি ?

আমিপাদ বলল, মশায়, পাচারের ব্যাপারে পাসপোর্ট ভিসা লাগে না ; তাছাড়া আমিপাদ গোরুগুলোকে এক দেশ থেকে আরেক দেশে পাচার করবে না, বুঝলেন । আমি হলুমগে আমিপাদ, হেলাফেলার লোক নই ।

মাল্যবান, মানে শান্তিপাদ, অপ্রস্তুত । লেমোনেড এক চোঁয়ে খেয়ে নিয়ে, গলায় আটকে থাকা জেনিফার অ্যানিস্টনকে ধুয়ে পাকস্হলিতে নামিয়ে,  ফ্যালফ্যালিয়ে জিগ্যেস করল, তাহলে ? পাচার তো এক দেশ থেকে আরেক দেশেই হয় বলে জানি । আমাদের ক্যানিঙ আর বাংলাদেশ থেকে কতো কচি-কচি মেয়ে যে আরব দেশগুলোয় পাচার হয়ে যাচ্ছে, রোজ কানে আসে, আমাদের কাজের বউ তো ক্যানিঙে থাকে, খুলনা থেকে এসেছে মাস তিনেক হলো, ছি-ছি, এই জন্যেই আমি রূপসী বাংলার পাণ্ডুলিপি লুকিয়ে রেখেছিলাম, জানতাম, একদিন বাঙালির এই দশাই হবে ।

আমিপাদ বলল, শান্তিপাদবাবু,  গোরুগুলোকে এক ভাষা থেকে আরেক ভাষার রাজ্যে পাচার করা হবে, বুঝলেন, তাতে পাসপোর্ট লাগে না, কিন্তু পথের আনাচে কানাচে আজকাল ঠগিদের বংশধররা লাঠিসোঁটা নিয়ে লুকিয়ে থাকে, কোনো কোনো ভাষার ঠগিরা এই কিছুদিন আগেই কয়েকজনকে পিটিয়ে মেরে ফেললে ।

গোরা, মানে লুইপাদ, শান্তিপাদ মানে মাল্যবানের কথা একাগ্র হয়ে শুনছিল, বললে, ওর গমগমে মোদো গলায় বললে, শান্তিপাদবাবুর পাসপোর্ট ভিসার আইডিয়াটা মন্দ নয়, হয়তো এক ভাষার লোকেরা মনে করে তাদের ভাষার এলাকা আর সংস্কৃতি হলো আলাদা দেশ, তাদের ভাষা শ্রেষ্ঠ, তাদের ভাবনাচিন্তা সবচেয়ে শ্রেয় আর কল্যাণকর । সেক্ষেত্রে প্রতিটি গোরুর পাসপোর্ট-ভিসা না থাকলেও, অন্তত ফোটো আইডেনটিটি কার্ড যদি থাকে তাহলে হয়তো বিপদের সম্ভাবনা কম ।

মাল্যবান, মানে শান্তিপাদবাবু লোকটি তার প্রস্তাবের প্রশংসা শুনে উত্তেজিত, বললে, আপনারা সাহিত্য নিয়ে কথা বলছিলেন, তা থেকে গোরুতে চলে গেলেন, অ্যাকচুয়ালি আমি সাহিত্যের কথাবার্তা শুনেই এসেছিলাম আপনাদের নিকটে বসব বলে, গলায় জেনিফার অ্যানিস্টন আটকে গিয়েছিলেন বলে বিলম্ব হলো । জানি, গোরু দুধ দেয় এবং সাহিত্য থেকেও পুষ্টিকর দুধ দই মাখন ঘি ছানা পনির খোয়া পাওয়া যায় ।

আমিপাদের দিকে ইশারা করে শান্তিপাদকে লুইপাদ বললে, এই মালটা তখন থেকে আমাকে জপাচ্ছে গোরু পাচারের ব্যাপারে, তারপর হঠাৎ সাহিত্য নিয়ে পড়ল । এরা কী জানে সাহিত্যের, বলুন শান্তিপাদবাবু, আরে নিজেদের বিকিকিনির বাজার নিয়ে মজে আছেন তাতেই থাকুন দিকি, সাহিত্য নিয়ে মেলা ফ্যাচ-ফ্যাচ করবেন না । লেখালিখির একটা মানদণ্ড আছে, সৌন্দর্যের সেই মানদণ্ড প্রয়োগ করেই বোঝা যায় একটা লেখা সাহিত্য হলো না হলো না । মানদণ্ড, যাকে ইংরেজিতে বলে ক্যানন, তা আমার পুর্বপুরুষ ইংরেজরাই এনেছিল এদেশে ।

শান্তিপাদবাবু অবাক চাউনি মেলে ধরল লুইপাদের দিকে । জিগ্যেস করল, আপনি তো গৌরচন্দ্র মুখোপাধ্যায়, বোধহয় পরে আমার বাবার মতন  ব্রাহ্মধর্ম নিয়েছিলেন, তা ঠিক জানি না, কিন্তু ইংরেজরা আবার কবে আপনার পূর্বপুরুষ হলো ? তা যাক আপনার জন্মের উৎস জানতে চেয়ে বিব্রত করতে চাই না । বরং সাহিত্যের আলোচনায় ফিরে যাওয়া যাক ।

লুইপাদ কথা বলতে আরম্ভ করে ক্রমে গলার স্বর উচ্চগ্রামে নিয়ে গেলো, সাহিত্যের মানদণ্ড বা ক্যানন এলো কোথ্থেকে, বলুন, বলুন, আপনারা, এই তো এক্ষুনি আমায় জ্ঞান দিচ্ছিলেন । লাতিন আর গ্রিক সাহিত্য থেকে, ধ্রুপদি সাহিত্য থেকে, আপনারা বাঙালিরা সেইটাই লুফে নিলেন আর ভাবলেন মানদণ্ডটা আপনাদের অধ্যাপক অচ্যুত গোস্বামী, নীহাররঞ্জন রায়, অক্ষয়চন্দ্র সরকার, অতল সুর, সুকুমার সেন, শ্রীকুমার মুখোপাধ্যায়, অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায়, অচিন্ত্য বিশ্বাস, শশিভূষণ দাশগুপ্ত, উজ্জ্বল মজুমদারদের তৈরি । ক্যানন হলো মানবের জীবনাবস্হার অভিপ্রকাশ ; তা হলো শুভচিন্তা যা মানবসমাজে ক্রিয়ান্বিত, আর লেখালিখির বিষয়বস্তু হিসাবে তুলে ধরা হয়েছে, তাকে সঠিক প্রকাশ করার জন্যই লেখার মানদণ্ড বা ক্যানন, প্রেমের আহ্লাদ, মৃত্যুর দুঃখ, দায়িত্বের ব্যথা, যুদ্ধ আর দাঙ্গার আতঙ্ক, আর সবচেয়ে যা গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, নিজেকে আর নিজের আত্মাকে স্বীকৃতিদান ।

শান্তিপাদবাবু যে ছোকরাদের পাশে এতক্ষণ বসেছিলেন, তাদের মধ্যে থেকে এক ছোকরা, যার নাম আজদেবপাদ,  চেঁচিয়ে বলে উঠল, লুইপাদদা, এই বিষয়ে আমাদিগেররও বক্তব্য আছে ; জানেনই মদ খাইলে আমাদিগের চিন্তা চাগাড় দিয়া উঠে ।

বুঝতে পারলুম, ওল্ড মঙ্ক টেনে  আজদেবপাদ ওল্ড বাংলায় ফিরে গেছে, মুখ দিয়ে সাধু বাংলায় ভকভক করে সংলাপ বেরুচ্ছে, ভাগ্যিস চর্যাপদের সময়কার ভাষা ভুলে গেছে ।

শান্তিপাদবাবু একাগ্র হয়ে শুনছিলেন । লুইপাদের কথা শেষ হতেই বলে উঠলেন, ওগুলো অবাস্তব আর দমনের তর্ক । বলেই তিনি বেশ বিব্রত, অন্ধকারে অন্ধকারাচ্ছন্ন মুখ দেখে, বডি ল্যাঙ্গুয়েজ দেখে বুঝলুম, কেননা লুইপাদ যদি টাকাটা না দেয় তাহলে উনি হাতটানে পড়বেন । ধুতির কোঁচা দিয়ে লেমোনেড আর জেনিফার অ্যানিস্টন  খাওয়া ঠোঁট মুছে বললেন, গতানুগতিক লেখকরা ভাষাবিদ্যাগত হাসিখুশির আড়াল তুলে এই তর্কটিকে তোল্লাই দিতেন বটে, তবে অনেকেই তাঁদের অভিজ্ঞতাকে সুবেদী এবং অতিসূক্ষ্ম তারতম্যের মাধ্যমে উপস্হাপন করতে ভালোবাসতেন, আজও বাসেন ; এবং বইগুলো ছিল জায়মান আলোচনার অংশ, যার বদলরত যোগফল, আর কিছুই নয়, ছিল এবং আছে, আইডিয়ার ইতিহাস হিসাবে । আপনি যদি মানদণ্ডের বিশৃঙ্খলা ঘটান তাহলে লোকে বলবে আপনি মানব সভ্যতায় বিশৃঙ্খলা ঘটাতে চাইছেন । অথচ মৌলিক লেখা লিখতে গেলে বিশৃঙ্খলা ঘটানো ছাড়া উপায় নেই, লুইপাদবাবু আপনি যদি সমীর রায়চৌধুরীর গল্পের বই ‘খুল যা সিমসিম’ পড়ে না থাকেন, তাহলে এক কপি সংগ্রহ করে পড়ে দেখবেন ।

আমিপাদ আর লুইপাদ দুজনেই টের পেলুম শান্তিপাদবাবুর ছোঁড়া তীর কোন দিকে । আসলে লুইপাদ যতোই বলুক ওর বাপ একজন আইরিশম্যান, পাবলিক মনে করে যে লুইপাদ আসলে পিরালি ঠাকুরের  আইভিএফ সন্তান । কোন যুবতী যে মিউটিনির সময়ে ফ্রোজন স্পার্ম নিয়েছিলেন তা কিছুটা রহস্য থেকে গেছে, কিছুটা এইজন্য যে মির্জা গালিব যৎসামান্য ইশারা দিয়ে গেছেন বলে গুজব শোনা যায় ।

শান্তিপাদবাবুর কথায় লুইপাদ কিছুটা আহত হয়েছে বুঝতে পারলুম, মাতাল হলে কী হবে, বাংলা টানার পর চাপলুসটোলায় জঅনন্দিপাদ মানে বাসুদেব দাশগুপ্তকে দেখেছি সত্যি কথায় টলে গেছে ।  ঘোষভাইদের পোঁদে-পোঁদে ঘুরতো, আমড়াগাছিতে বেবি-মীরা-দীপ্তির ন্যাওটা ছিল, সমীর রায়চৌধুরীর কাছ থেকে টাকা কড়ি চাইতো মাঝে-মধ্যে । ব্যাগপাইপার হুইস্কিকে মনে করতো অমৃত, অথচ সব কয়টা ভারতীয় মদই তৈরি হয় মোলাসেস থেকে, শুধু রঙ আর ফ্লেভার পালটিয়ে দেয়া হয় , প্যাকিঙ আলাদা হয়, তার চেয়ে রাম খাওয়া ভালো, ওটা খাঁটি মোলাসেস । আজকাল তো লোকে বেশ রামভক্ত হয়ে পড়েছে ।

লুইপাদ বলল, আপনি কী ভাবছেন আমি আঁচ করতে পেরেছি ; সব ভারতীয় মদই তৈরি হয় মোলাসেস থেকে, তাদের সঙ্গে দেশি বাংলা মদের বিশেষ তারতম্য নেই । আপনি কি ভাবছেন পিরালি ঠাকুরের আস্তাবলের লোক বলে এসব জানি না ? বিলকুল জানি । ওদের দেশে হুইস্কি তৈরি হয় শষ্য আর মল্টেড শষ্য থেকে, শাদা ওকগাছের কাস্কে রাখা থাকে অন্তত তিন বছর ; মল্টকে কাঠের আগুনে শুকিয়ে নেয়া হয় বলে ধোঁয়ার সোঁদা গন্ধ হয় যা এখানের হুইস্কিতে পাবেন না ; তার কারণ এখানের হুইস্কি তৈরি হয় গুড়ের চাসনি থেকে । ওদের দেশে ব্র্যাণ্ডি তৈরি হয় গ্যাঁজানো আঙুরের সঙ্গে চোলাই করা পোমেস মিশিয়ে । আমাদের দেশের ব্রাণ্ডি মোলাসেসের সঙ্গে সামান্য আঙুরের গ্যাঁজলা  মিশিয়ে তৈরি । সুচরিতার পালক পিতাকে দুধের সঙ্গে যে ব্র্যাণ্ডি খাইয়ে বিনয় তরতাজা করে তুলেছিল, তা বিদেশের ।ওদের দেশে জিন তৈরি হয় শষ্যের অ্যালকোহলে জুনিপার মিশিয়ে, তাই ওদের জিনে জুনিপারের সুগন্ধ থাকে ; আমাদের দেশে মোলাসেসের অ্যালকোহলের সঙ্গে জুনিপারের পারফিউম মেশানো হয় । ওদের দেশে ভোদকা তৈরি হয় আলু আর অন্য আনাজের অ্যালকোহলের সঙ্গে আখের রসের পচাই মিশিয়ে । আমাদের দেশে মোলাসেসের সঙ্গে যেকোনো কারবোহাইড্রেটকে গেঁজিয়ে তৈরি হয় ।

শান্তিপাদ শুনছিলেন চুপ করে, বলে উঠলেন, দীর্ঘশ্বাস মিশিয়ে, বাংলা সাহিত্য আজ সবই মোলাসেসের পচাই, মহৎ সাহিত্য বলে আর কিছু রইলো না । মোটা-মোটা ডবল-ডেকার উপন্যাসগুলো খুললেই ভক করে চিনিকলের পচা মোলাসেসের দুর্গন্ধ বেরোয়, মনে হয় টেরিটিবাজারের নর্দমা ।

আমিপাদ বলল, তোমরা দুজনেই গড়বড়ঘোটালা করে ফেলছ । মহৎ সাহিত্য সৃষ্টি এইজন্য হয় যে মহৎ লেখক আর কবিরা যা লিখতে চান তার টান দিয়ে তাড়িত হন । মানদণ্ড বা ক্যানন  হলো মধ্যবিত্তের নিজেদের মূল্যবোধের প্রতিফলনের আকাঙ্খার ফল । ফলে দেখা গেল সাহিত্যিক মানদণ্ডকে শিক্ষার প্রসারের সঙ্গে জুড়ে দেয়া হয়েছে, বইয়ের বাজারের ফুলে-ফেঁপে ওঠা, উপন্যাসের চাহিদার রমরমা, কফিহাউস আর সাহিত্যিক আড্ডার প্রসার, রিভিউ আর পত্রিকার ছড়াছড়ি, গ্রামেগঞ্জে বেসরকারি গ্রন্হাগারের সংখ্যা বৃদ্ধি, ধারাবাহিক উপন্যাসের জনপ্রিয়তা, ডাবল-ডেকার উপন্যাস লিখিয়েদের ঝড়তি-পড়তি দোল-দুর্গোৎসবের ফিকশান আর শয়ে-শয়ে কবিতা, আর সবশেষে সাহিত্যকে বিদ্যায়তনিক সংস্হাগুলোর কুক্ষিগত করার প্যাঁচপয়জার ।

লুইপাদ বলল, বলুন বলুন, শুনছি, ভাববেন না পুরো শিভাস রিগ্যাল বোতলটা ফাঁকা করে দিয়েছি বলে নেশা হয়ে গেছে । গোরু পাচারের প্রস্তাবটাও মনে আছে । ইউ ক্যারি অন । কিন্তু যে জন্য আমরা এখানে জড়ো হয়েছি, প্ল্যানচেটে ঝিংচাক শ্বেতাঙ্গিনি-শ্যামাঙ্গিনি-পীতাঙ্গিনিদের আদর আপ্যায়ন করব বলে, তাঁরা এখনও এলেন না ।

আমিপাদ বললে, আসবেন আসবেন, অপিক্ষে করো দিকিন । শ্বেতাঙ্গিনিরা এসেছিলেন, এবার অন্যরাও নাচতে-নাচতে আসবেন ।

আমরাও শুনছি, বলল আজদেবপাদ আর ওর সঙ্গি দুই পাদছোকরা ।

আমিপাদ কথা বলা বজায় রাখল, বলল, ইউরোপ থেকে আনা ওই যাকে তুমি বলছ মানদণ্ড বা ক্যানন, সেগুলো তিরিশের দশক থেকে পত্র-পত্রিকায় রিভিউকার আর সমালোচকদের দখলে গেল, সেগুলো অধ্যাপকরা হাতিয়ে নিয়ে স্নাতক আর স্নাতকোত্তরের সিলেবাসে ঢুকিয়ে দিতে লাগল, বুঝতেই পারছ, তারপর থেকে মানদণ্ড বা ক্যানন মানেই সিলেবাস, যার লেখা সিলেবাসে ঢুকতে পারল সে ধ্রুপদি হিসাবে গজিয়ে গেঁজিয়ে ওঠার সুযোগ পেল। অবশ্য সিলেবাসে ঢোকার জন্যেও বেঁচে থাকতেই বেশ কাঠখড় পোড়াতে হয়, ঘাপটি মেরে শাসক আর শোষকের পা চাটতে হয়, পা না পেলে অন্য কিছু চাটতে হয় ।

শান্তিপাদবাবু উত্তেজিত হয়ে প্রায় চেঁচিয়ে বলে উঠলেন, যা ওনার চরিত্রের সঙ্গে খাপ খায় না, বললেন, একথা একেবারে সত্যি, ওনারা আমার কবিতা নিয়ে কতোই না রঙ্গরসে রসোগোল্লার মতন ভাসেন, অথচ আমার উপন্যাসগুলোকে অবহেলা করেন, বলেন বাক্যগুলো বড্ডো জটিল, ছাত্ররা বুঝতে পারে না, অথচ তারা দিব্বি জেমস জয়েস আর প্রুস্ত বোঝে ।

আমিপাদ মাল্যবানবাবুর কাঁধে হাত রেখে বলল, আপনি চিন্তা করবেন না, মানদণ্ডের গেটকিপাররা প্রায় সকলেই অবসর নিয়েছেন, এখন নতুন যুবকদের প্রজন্ম এসেছে বাংলা আর তুলনামূলক বিভাগগুলোয়, তারা আপনার ফিকশানগুলোকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয় । তারা যখন সিলেবাস তৈরি করবে তখন অনেককিছু পালটে যাবে। গেটকিপাররা যতোদিন ছড়ি ঘোরাবে ততোদিন তারা একশো শ্রেষ্ঠ কবি আর একশো শ্রেষ্ঠ গল্পকার বা একশো শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিকের পাঁজি তৈরি করতে থাকবে । পাঁজিগুলোর জন্য গেটকিপাররা একটা চার্জ ধার্য করে রেখেছে, কার পদ্য বা গল্প ঢুকলো তা প্রকাশক বাছাই করে দেয় আর গেটকিপারদের চেক ধরিয়ে দেয়।

শান্তিপাদ  বললেন, তা জানি, ওটা ওনাদের রুজিরুটির ব্যাপার, মেয়ের বিয়ে দিতে হয়, বাপের শ্রাদ্ধ করতে হয়, ছাদের ফাটল সারাতে হয়, ছেলেকে ডাক্তারি কিংবা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াতে হয়, পাড়ার পুজোয় মোটাটাকা চাঁদা দিতে হয়, বউয়ের মেনোপজের হরমোনের খরচ তুলতে হয় ।

আমিপাদ বলল, দেখেছেন তো কমার্শিয়াল পত্রিকার শারদ-ঈদ সংখ্যা বা লেখনপঞ্জিকায় নিজেদের অন্তর্ভুক্ত করাবার জন্য কবিরা ছোটো মাপের কবিতা আর গল্প লেখেন, আগে থাকতে লিখে রাখেন, ঠিক সময়ে ছাড়েন ।

যে চেয়ারে শান্তিপাদবাবু আগে বসেছিলেন, সেই চেয়ারের পাশের আজদেবপাদ, তাড়কপাদ আর তান্তিপাদ নামের  যুবকপাদ সিদ্ধাচার্যরা চেঁচিয়ে উঠল, পাল্টাইতেছে কোথায় অগ্রজপাদগণ, এখনও হাংরি আন্দোলনের নাম শুনিলে এই বাংলা এবং ওই বাংলা, দুই বাংলার অধ্যাপক আলোচকগণ কাপড়ে-চোপড়ে করিয়া ফ্যালেন ।

যুবকপাদদের বক্তব্য  শুনে দূর থেকে মনে হচ্ছিল ওরা বিশ শতকের প্রথম দিকের ভদ্রতা বজায় রেখেছে, হয়তো প্রাগাধুনিক যুগে গঙ্গাজলের সঙ্গে রাম মিশিয়ে খেতো ।

আমিপাদ, মানে  আমি ওদের দিকে তাকিয়ে বললুম, অপেক্ষা করো, সবই সময়ের ব্যাপার ।

অপেক্ষা করতে হলো না । হ্যালি বেরি, জেনিফার হাডসন, ভায়োলা ডেভিস, কেকে পামার, রেজিনা কিং  উদোম শ্যামাঙ্গিনি সুন্দরীদের দল খোলা বুকে দু’হাত চেপে বুক আর পাছা দুলিয়ে নাচতে-গাইতে লাগল :

 

মধু হৈই হৈই বিষ খাওয়াইলা

হন কারণে

ভালোবাসার দাম নও দিলা হন দোষ আন পাই

আশা আছিল তোয়াতে লই

বাইন্দুম একখান সুখের ঘর

সুখের বদলে দুৎখ দিলা

হন কারণে

মধু হৈই হৈই বিষ খাওয়াইলা

হন কারণে

 

শ্যামাঙ্গিনি বিদেশিনিদের সঙ্গে আজদেবপাদ আর বাকি দুই পাদও নাচতে আরম্ভ করেছিল, গানটা ওরা জানে মনে হলো, সব যুবতীদের ওরাই খেয়ে ফেলবে আঁচ করে বাকি সবাই উঠে শ্বাস টেনে খেয়ে ফেলতে লাগল যার ভাগে যেটুকু পড়ে। আমিপাদের ভাগ্য ভালো যে জেনিফার হাডসনের সিলিকন জেল-ভরা বুক দুটো খেতে পেলো । আগের বার শ্বেতাঙ্গিনিদের খাবার ফলে সিদ্ধাচার্যরা সবাই গৌরবর্ণের হয়ে উঠেছিলেন, নাইটক্লাবের মালিক আনন্দে হাততালি দিয়ে সব আলো নিভিয়ে দিয়েছিলেন সারাঘর গৌরবর্ণ পুরুষের আলোয় জ্বলজ্বল করছিল বলে । এবার উনি গিয়ে আবার লেজার আলো জ্বালাবার হুকুম দিলেন, কেননা শ্যামান্ধকারে কে কার সঙ্গে কী করবে শেষে পুলিশ কোর্ট কাছারির ঝামেলা ।

আমিপাদসহ লিউপাদ, কাহ্ণপাদ, ভুসকুপাদ, সরহপাদ, শবরীপাদ, বিরূপাদ, লাড়ীডোম্বীপাদ, কুম্বলাম্বপাদ, ঢেণ্ডনপাদ, কুক্কুরীপাদ, কঙ্ককপাদ, গুণ্ডরীপাদ, চাটিলপাদ, ডোম্বীপাদ, শান্তিপাদ, মহিত্তাপাদ, বীণাপাদ, আজদেবপাদ, দারিকপাদ, ভাদেপাদ, তাড়কপাদ, জঅনন্দিপাদ, ধামাপাদ, তান্তিপাদ প্রমুখ সিদ্ধাচার্যরা বলে উঠলেন, সাধু, সাধু, উত্তরাধুনিক যুগে প্ল্যানচেটে যে ঝিংচাক করে সুন্দরীতমাদের ডেকে এনে আদর-আপ্যায়ণ করা যায় তা গোমাতামুখখু আধুনিকরা খাটো চিন্তার ফলে বুঝতেই পারেনি, ছি-ছি ।

লুইপাদ যুবক সিদ্ধাচার্যদের  দিকে তাকিয়ে বলল, এই আদিত্যপাদ, মন্মথপাদ, নগেন্দ্রপাদ, তোরা যে-যার গেলাসের ওল্ড মঙ্ক শেষ করে নে, আরেকটা বোতলের অর্ডার দিচ্ছি, অন দি রকস খা, গোরু পাচারের আলোচনা জমে গেছে, অংশ নিবি ।

লুইপাদ যাদের সন্ন্যাস জীবনের আগের নামে সম্বোধন করল, আজদেবপাদ, ভাদেপাদ, তাড়কপাদ, তারা টলছিল, যেমন একটু আগে লুইপাদ নিজেই টলছিল । ভাদেপাদ জানতে চাইলে, গোরুপাচারের আলোচনাটা ঠিক ঠাহর করিতে পারিলাম না, আমাদিগের সুবিধার্ধে যদি ব্যখ্যা করেন ।

আমি বললুম, প্রথমে তো গোরু বাছাই, তারপর পাচার । বাছাই মানে মানদণ্ড, লুইপাদ যাকে বলছে ক্যানন, ‘হাওয়া৪৯’এর সম্পাদক সমীর রায়চৌধুরীও ক্যানন নিয়ে যুক্তিতর্ক দিয়ে গেছেন । উনি বলেছিলেন সাহিত্যের মানদণ্ডে রদবদল ঘটতে পারে সময় এবং পরিসর, কিন্তু সাহিত্য বলতে কী বোঝায় তা নিয়ে মতান্তর বড়ো একটা হয় না । বার্টান্ড রাসেলের মতো আরও অনেককে সাহিত্যের জন্য নোবেল প্রাইজ দেয়া হয়েছে যাঁদের নাম শুনে আমরা অবাক হয়েছি, সাহিত্য বলতে উন্নতামানের লেখাই বোঝায়, তা উন্নত কি না সেটা পাঠক নিজেই নির্ণয়  নেয় । সে যদি উন্নত মনে করে তাহলে বাড়িতে রাখবে, নয়তো বাজেকাগজঅলাকে বেচে দেবে, তার ছেলে বা নাতি উন্নত মনে না করলে, তারা নিয়ে গিয়ে ফুটপাথে বেচে দেবে। বিদ্যায়তনিক সংস্হাদের ষড়যন্ত্র সত্ত্বেও, বই বিক্রির ব্যবসাদারদের লবি সত্ত্বেও, মানদণ্ড আসলে এক ব্যক্তিগত নান্দনিকতার এলাকা, যা ক্রমে কৌমের এলাকা হয়ে যায় । অবশ্য সে-বাগানে যে চোরকাঁটা গজাবে না তা জোর দিয়ে বলা যায় না । প্রবাল দাশগুপ্ত, সমীর রায়চৌধুরীকে সাজানো বাগানের পরের স্টপের কথা বলেছিলেন ।

লুইপাদ শুনছিল, দুহাতে গাল রেখে, হয়তো শুনতে-শুনতে সুচরিতার কথা ভাবতে আরম্ভ করেছিল, সুচরিতা মুখোপাধ্যায়, ৭৮ নম্বর বাড়ির পরেশচন্দ্র ভট্টাচার্যের পালিতা কন্যা । কিংবা নিজে কোনো আইরিশম্যানের ছেলে, অতএব জারজ, তাই হয়তো ভাবছিল, পিরালি ঠাকুরের ল্যাখা উপন্যাসে এতো বামুনের ছড়াছড়ি কেন । কিংবা পিরালি ঠাকুর হয়তো বলতে চেয়েছিলেন যে যারা ধর্ম নিয়ে বেশি হামবড়াই করে তারা সাধারণত জারজ হয় । আফিমবাবুও কুক্কুরীপাদবাবুকে বামুনবাড়িতেই খুঁজে পেলেন ।

আমি ওর মুখের দিকে তাকাতে, লুইপাদ মানে গৌরমোহনের হুঁশ হলো, বলল, সাহিত্যের মানদণ্ড ব্যাপারটা অনেকটা গাছের মতন, যাদের শাখা কখনও ছিল মহাকাব্য, সংস্কৃতের ট্র্যাজিক কাব্য, তামিলভাষার কাব্য, কিছু ধর্মশাস্ত্র আর পুরাণের কাহিনি । গাছটা যেমন যেমন বড়ো হতে লাগল, তার ডালে বিদেশ থেকে আনা ফলের কলম লাগিয়ে নাটক, উপন্যাস, বিভিন্ন আঙ্গিকের কবিতা, ছোটো গল্প ইত্যাদি পাওয়া যেতে লাগলো।  কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেমন যেমন মানদণ্ডের গেটকিপারদের কব্জায় যেতে লাগলো, বাংলা ভাষার সিলেবাসটাই হয়ে দাঁড়ালো সবচেয়ে বড়ো বাধা । অনেক আলোচকদের দেখলাম যে তাঁরাও বিরক্ত বোধ করতে আরম্ভ করেছেন, ভালো বই বনাম খারাপ বইয়ের তরজায় । সমীর রায়চৌধুরীর সঙ্গে ওনার বাঁশদ্রোণীর বাড়িতে একবার আলোচনার সময়ে উনি বলেছিলেন যে টেরি ইগলটন প্রশ্ন তুলেছেন যে সাহিত্য বলে আদপে কিছু হয় কিনা । একটা সাহিত্যকর্মের বিশেষ কোনো চি্হ্ণ থাকে না যা দিয়ে কোনো লেখাকে দেগে দেয়া যাবে, তার চেয়ে বাংলা বিভাগগুলোকে ডিসকোর্স ডিপার্টমেন্ট বলা উচিত । কোনো একটা লেখাকে একই মানদণ্ড দিয়ে মাপা হয় না, নানা বোমক্যাওড়ার নানা মত । সমীরবাবু বলছিলেন যে কোনো উপন্যাস নিয়ে ভালো ফিল্ম হলে সেই উপন্যাসে আলোচকরা হঠাৎই উন্নতমানের বৈশিষ্ট্য খুঁজে পান ; বোঝো শ্যামপিয়ারির ঠেলা ।

মন্মথ নামের যুবক সিদ্ধাচার্য, মানে তাড়কপাদ,  বলে উঠল, তার গেলাসে রাম ঢালতে-ঢালতে, কবি-লেখক-চিত্রকরগণ মাঝে-মাঝে পিছন ফিরিয়া তাকান, সন্মুখে অগ্রসর হইবার সুবিধার জন্য । পিছন ফিরিয়া, যাঁহাদের শিল্পকর্মকে হিংসা করেন, সেগুলিই সম্ভবত উন্নতমানের ।

শান্তিপাদ সিদ্ধাচার্য মাল্যবান বললেন, তা নয়, তা নয়, আমি পেছন ফিরে তাকানো পছন্দ করি না, হিংসেও করি না কাউকে। মহৎ রচয়িতার সংজ্ঞা যেমন যুগে যুগে পালটে যাচ্ছে, তেমনই সাহিত্য কাকে বলে তাও পালটে যাচ্ছে। তবে একথা ঠিক যে সমালোচনামূলক বিচারপদ্ধতিতে যৎসামান্য বিদ্বেষ থেকে । বুদ্ধদেব বসুকে দেখেছি বিদ্বিষ্ট হতে, তাকে হিংসে করা বলব না, তিনি সেইজন্য সিদ্ধাচার্য হতে পারেননি । মানুষ নিজের ছায়ার বাইরে যেমন লাফিয়ে বেরোতে পারে না, তেমনই নিজের মনের গড়নের বাইরে যেতে পারে না ।

আমিপাদ বুকপকেট থেকে গোরুর তালিকা বের করে লুইপাদ অর্থাৎ গৌরমোহনকে দিতে, শান্তিপাদ অর্থাৎ মাল্যবান জানতে চাইলে, গোরুগুলোর মাতৃভাষা লেখা আছে তো ? নয়তো এক ভাষা থেকে আরেক ভাষায় পাচার করতে গেলে জাগতিক সংকট উৎপন্ন  হতে পারে ।

 

দিতিয় পড়বো ( ময়মনসিংহ স্পেশাল )

তালিকায় চোখ বুলিয়ে গৌরমোহন অর্থাৎ লুইপাদ বলল, আছে আছে, এই নিন হয়তো আপনার ব্রায়ান জিসিন টেকনিকে কাজে দিতে পারে ।

শান্তিপাদ অর্থাৎ মাল্যবান তালিকাটা হাতে নিয়ে সবাইকে শুনিয়ে পড়তে লাগলেন :-

গোরুর প্রজাতি এবং তার মাতৃভাষা

১) গির — গুজরাতি  ( মা, মাঁ, মাতাশ্রী, মাম্মি  )

২ ) সাহিওয়াল — পাঞ্জাবি, হরিয়ানভি, হিন্দি ( মাই, পাব্বো, মাঁ, মাতাশ্রী, মাম্মিজি  )

৩ ) লালসিন্ধি — সিন্ধি, উর্দু ( অম্মি, অম্মা, মাতাশ্রী, মাম্মি  )

৪ ) রাঠি — রাজস্হানি-হিন্দি, মারোয়াড়ি, পাঞ্জাবি, হরিয়ানভি ( মা, মাই, মাতাশ্রী, পাব্বো, মাম্মিজি )

৫ ) থারাপারকর — উর্দু, কচ্ছি, রাজস্হানি-হিন্দি ( অম্মি, আম্মা, মাই, মাতাশ্রী, মাম্মিজি )

৬ ) দেওনি — মারাঠি ( আঈ, মাম্মি )

৭ ) হরিয়ানা — হরিয়ানভি, হিন্দি, ভোজপুরি, মৈথিলি ( মায়, মাঁ, মইয়া, মাতৃ, মাতাশ্রী, মাম্মিজি )

৮ ) কঙ্করেজ — গুজরাতি, রাজস্হানি-হিন্দি ( মা, মাঁ, মাতাশ্রী, মাম্মিজি  )

৯ ) ওঙ্গোল — তেলুগু ( আম্মা, অম্মা, মাম্মি )

১০ ) লাল কান্ধারি — মারাঠি ( আঈ, মাম্মি )

১১ ) নিমারি — ছত্তিশগড়ি হিন্দি ( মায়, মইয়া, মাঁ, মাম্মিজি )

১২ ) মালবি –মধ্যপ্রদেশি হিন্দি, রাজস্হানি হিন্দি ( মায়, মাঁ, মইয়া, মাতাশ্রী, মাম্মিজি )

১৩ ) দাঙ্গি — মারাঠি ( আঈ, মাম্মি  )

১৪ ) খিল্লারি — মারাঠি, কন্নডিগা ( আঈ, অম্মা, মাম্মি  )

১৫ ) হালিকার — কন্নডিগা ( অম্মা, মাম্মি  )

১৬ ) নাগোরি — রাজস্হানি হিন্দি ( মাঁ, মাতাশ্রী, মাম্মিজি  )

১৭ ) বারাগুরু — তামিল ( অম্মা, মম্মি  )

১৮ ) সিরি — নেপালি, ভুটানি, কোচ ( মাঁ, মইয়া, মায় )

১৯ ) বাচ্ছৌর — ভোজপুরি, মৈথিলি ( মায়, মইয়া, মাম্মিজি )

২০ ) খেরিগড় — উর্দু, হিন্দি, পাঞ্জাবি ( অম্মি, মাঁ, মাতাশ্রী, পাব্বো, মাম্মিজি )

২১ ) মেওয়াতি — রাজস্হানি হিন্দি ( মাঁ, মাতাশ্রী, মাম্মিজি )

২২ ) উমব্লাচেরি — তামিল ( অম্মা, মাম্মি  )

২৩ ) কৃষ্ণা — মারাঠি, তেলুগু ( আঈ, অম্মা, মম্মি  )

২৪ ) পোনওয়ার — হিন্দি ( মায়, মাঁ, মাতাশ্রী, মইয়া, মাম্মিজি )

২৫ ) ভেচুর — মালায়ালি ( অম্মা, মাম্মি  )

২৬ ) মালেন্দু গিদ্দা — কন্নডিগা, তুলু ( অম্মা, মম, মাম্মি  )

২৭ ) কাসারগড় — মালায়ালি ( অম্মা, মম, মাম্মি  )

২৮ ) জার্সি ক্রস — বাংলা – ঘটি ও বাঙাল ( ওয়াঁ, মা, মাগো, আম্মা, মম, মাম্মি )

২৯ ) হলস্টিন ফ্রিজিয়ান ক্রস — বাংলা – ঘটি ও বাঙাল ( ওয়াঁ, মা, মাগো, আম্মা, মম, মাম্মি )

পড়া শেষ হলে, সিদ্ধাচার্য শান্তিপাদের  মুখে হাসি ফুটলো, বললেন, যাক, দুই বাংলার ভাষাই আছে ।

ওনার কথা শুনে আমিপাদ বললু, আজকাল পৃথিবীতে সর্বত্র মার্কিন প্রভাব । বাঙালির গোরুর ওপরেও না হয় মার্কিন প্রভাব পড়লো, দুধ তো পাওয়া যাবে মাদার ডেয়ারির প্যাকেটে, একটা কোনে ছ্যাঁদা করে জেনিফার লোপেজ বা ব্রিটনি স্পিয়ার্সের দুধের মার্কিন স্বাদ পাবেন ।

শান্তিপাদ বললেন, গোরুর গায়ে তার ভাষা লিখে দেবেন যাতে আবগারি বিভাগ তাদের দুধে ভাষানুসারি ট্যাক্স বসাতে পারে । নয়তো গোরু পাচারে ওরা মোষের ট্যাক্স ধার্য করতে পারে । আমাদের বাংলাদেশে দেখেছি পাচার করা গোরু-মোষের গায়ে আমদানিকারকের নামের আদ্যাক্ষর আর গোরু-মোষ-বলদের গায়ে নম্বর দেয়া থাকে, যাতে কমিশনদারদের ভাগবাঁটোয়ারায় অসুবিধা না হয় ।

উঠে পড়ব ভাবছিলুম । সিদ্ধাচার্য পণ্ডশ্রম  সেন অর্থাৎ ভুসকুপাদ নিজের বকবকানি আরম্ভ করে দিলেন । দার্শনিক বলে তো আর ছেড়ে দিয়ে উঠে পড়ে নাইটক্লাবের নাঙ্গা নাচে ভিড়ে যাওয়া যায় না । তাছাড়া শান্তিপাদ আর লুইপাদ দুজনেই বেশ আগ্রহী মনে হল । শান্তিপাদ  তো জানি পেসিমিস্ট কিন্তু লুইপাদের আগ্রহের কারণের হদিশ পেলুম না ।

পণ্ডশ্রম সেন অর্থাৎ ভুসকুপাদ মাথা ঝুঁকিয়ে রেখেই বলতে লাগলেন, “আয়নার মানুষটিও আজ আর তেমন বন্ধু নয় ; বলি না, বিড়বিড় করি, ভয় হয়, পাছে এ-ও ‘বক্তব্য’ না হয়ে ওঠে ; ভরসা নেই, সময়ও কম, আগামীকালের স্মৃতিগুলো এখনই গুছিয়ে নেওয়া ভালো ; রাজা আজও উলঙ্গ, আজও সব্বাই পটাপট হাততালি দিচ্ছে, ওইই জন্যই, আহ রাজা ট্রুলি সৎ, রাজা বোল্ড অ্যাণ্ড বিউটিফুল, রাজা লিবারেল, রাজা ইকোলজিকালি এনলাইটেনড, রাজার ন্যুডিটিই রাজার ফ্যাশান স্টেটমেন্ট, শিশুটি আজ বৃদ্ধ, অনেককালের ব্যাপার, কোমরের ব্যথাট্যাথা সামলে, আলস্য ঝেড়ে, অবশেষে সে পোস্ট করতে বসে, ডিয়ার রাজাসাহেব, নগ্নতার পোশাকটি তোমায় ঢেকে ফেলেছে হে, ভাষাকে জিততেই হয়, সেটাই ভাষার দুর্বলতা ; লেখা লিখি, ছেঁড়া লেখা লিখি, লেখালিখি ছিঁড়ি ; পা পিছলে লেখক হলাম, দাঁড়াতে আর পারলাম কই ; এমনই তার গোগ্রাসে পড়ার ধরন, মনে হয় পাঠশেষে বইটা ডাইরি হয়ে উঠবে ; লেখা লেখে লেখাকেই ; আজ পর্যন্ত লিখিত সমস্ত শব্দের উত্তরাধিকার তোমার, সেটিই তোমার বোঝা, আজ পর্যন্ত লিখিত সমস্ত সাহিত্য তোমার, সেটিই তোমার বাধা।”

পণ্ডশ্রম সেন অর্থাৎ ভুসকুপাদ মাথার চে-গ্বেভারা টুপি দুহাতে একটু চেপে, গ্রিক পোশাকের খাঁজে হাত ঢুকিয়ে আচমকা চুপ করে গেলেন । উঠে, নাইটক্লাবের গেটকিপারকে মুঠোকরা স্যালুট ঠুকে দরোজা খুলে শীতকাল থেকে গ্রীষ্মকালে বেরোলেন, পেছন ফিরে তাকালেন না। ঘোড়ার খুরের আওয়াজ শুনে টের পাওয়া গেল, উনি জুড়িগাড়িতে উঠলেন, যাবেন ঢপের রাজত্বে । কিন্তু কিছুক্ষণেই ফিরে এলেন, মেঝেয় কিছু পড়ে গেছে সম্ভবত, লাড়ীডোম্বীপাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, সব কয়টা মুখই পোশাক থেকে কোথায় যে খসে পড়ে গেল, খুঁজে পাচ্ছি না, শেষে ঢপাচার্য না চটে যায় ।

আগে দু’বার নাচিয়েরা যেমন ল্যাংটো হয়ে গাইতে-গাইতে এসেছিলেন, এবার অন্ধকারের সঙ্গে মিশে মোঙ্গোলয়েড আদল-আদরার তরুণীরা দেখা দিলেন, তাঁদের চিনতে মোটেই অসুবিধে হলো না, হাজার হোক আমিপাদরা সিদ্ধাচার্য, গায়ের রঙ হলদেটে, ছোটো-ছোটো বুক, গোলাপি ছোট্টো বোঁটা, তার ওপর হাত রেখে কোমরা দোলাচ্ছেন লুসি লিউ, ফ্যান বিংবিং, ঝাঙ ঝিয়ি, গঙ লি, ঝাঙ ইউকি, ডঙ জিয়ি, জিঙ তিয়ান :

 

যদি সুন্দর একখান মুখ পাইতাম

যদি নতুন একখান মুখ পাইতাম

মইশখালির পানের খিলি

তারে বানাই খাবাইতাম

নয়া মুখের নয়া কথা হুনিতে সুন্দর

মাঝে-মাঝে পান চিবাইত

হাসিরও ভিতর

প্রেমের মালা দোখনো হাতে

তার গলাৎ পরাইতাম

মইশখালির পানের খিলি

তারে বানাই খাবাইতাম

 

আমিপাদসহ অন্য সিদ্ধাচার্যরা, ভুসকুপাদ ছাড়া, উনি তো আবার বেরিয়ে গেলেন পোশাক থেকে খসে যাওয়া মুখ খুঁজতে, চান্স মিস করলেন, আগের বারের মতনই শ্বাস টেনে-টেনে পীত সুন্দরীদের উদোম দেহকে নিজেদের ফুসফুসে ভরে নিতে লাগলেন চিরযুবক সিদ্ধাচার্যরা, আর ক্রমশ শ্যামাঙ্গ থেকে পীতাঙ্গ হয়ে উঠতে লাগলেন, তাঁদের চোখ ছোটো হয়ে এলো, তাঁদের দাড়ি আর গোঁফের চুল সংখ্যায় কমে  গেল, নাক চাপা হয়ে উঠলো, তবু তাঁরা আনন্দে মাতাল তরণী, প্ল্যানচেটে ঝিংচাকে টালমাটাল ।

আমিপাদসহ অন্য সিদ্ধাচার্যরা, ভুসকুপাদ আর জঅনন্দিপাদ বাদ দিয়ে, লুইপাদ, কাহ্ণপাদ, সরহপাদ, শবরীপাদ, বিরূপাদ, লাড়িডোম্বীপাদ, কুম্বলাম্বরপাদ, ঠেণ্ডনপাদ, কুক্কুরীপাদ, কঙ্কপাদ, গুণ্ডরীপাদ, চাটিলপাদ ডোম্বীপাদ, শান্তিপাদ, মহিত্তাপাদ, বীণাপদ, আজদেবপাদ, দারিকপাদ, ভাদেপাদ, তাড়কপাদ, ধামপাদ, তান্তিপাদ প্রমুখ একসঙ্গে বলে উঠলেন, সাধু, সাধু, আধুনিকরা নিজেদের মূর্খতার কারণে প্ল্যানচেটে বিশ্বাস করেনি, আর আজ আমরা দেখিয়ে দিয়েছি যে প্ল্যানচেটে ঝিংচাক করলেই পৃথিবীর মৃত ও জীবিত সুন্দরীদের নিজের শ্বাসের সঙ্গে বুকের ভেতরে ভরে নেয়া যায় ।

 

তিতিয় পড়বো ( বগুড়া স্পেশাল )

লুইপাদ অর্থাৎ গোরার কাছ থেকে এক তাড়া দুহাজার টাকার গোলাপি নোট  নিয়ে শান্তিপাদ অর্থাৎ মাল্যবান চলে গেলেন । লুইপাদ অর্থাৎ গোরা, আমিপাদ  আর অন্য সিদ্ধাচার্যরা মাথা ঝুঁকিয়ে শুনতে লাগল আদিত্য-নগেন্দ্র-মন্মথদের তক্কাতক্কি, মানে আজদেবপাদ, তাড়কপাদ আর তান্তিপাদের গর্মাগরম মাতলামি । শুনতে শুনতে আমিপাদ ভাবছিল, এরা বন্ধু অথচ তুই-তোকারি করে না কেন ? মনে পড়ে গেল  ‘অরণ্যের দিনরাত্রী’ আর ‘জঙ্গলের দিনরাত্রী’ বইগুলোর গপপো— কেমন ধরনের বন্ধুর দল যে নিজেদের মধ্যে অশ্লীল গালমন্দ করে না, নোংরা ইশারা করে না, স্নান করার সময়ে কোনো যুবতী দেখে ফেললে কুয়োর পেছনে লুকিয়ে পড়ে, অথচ তারা মদ-টদ টানে, কলকাতায় মাগিবাজি করে । তারাও আসলে পিরালি ঠাকুরের বাচ্চাকাচ্চা, এই আদিত্য-নগেন্দ্র-মন্মথ অর্থাৎ আজদেবপাদ, তাড়কপাদ, তান্তিপাদের মতন, দুমিনিট ম্যাগি দিয়ে গড়া চরিত্তির ।

আজদেবপাদ : সাহিত্য জিনিসটা বিষয়ের উপর বেশি নির্ভর করে না রচনার উপরে ? লক্ষ্যের উপরে না লক্ষণের উপরে ?

তান্তিপাদ : তুমি তো একথাও জিজ্ঞাসা করিতে পার, মানুষ বাম পায়ের উপর বেশি নির্ভর করে, না ডান পায়ের উপরে ?

আজদেবপাদ : মানুষ দুই পায়ের উপর সমান নির্ভর করে, এ যেমন স্পষ্ট অনুভবগোচর, সাহিত্য তার বিষয় এবং রচনাবলীর উপর সমান নির্ভর করে সেটা তেমন নিশ্চয় বোধগম্য নয় এবং এই কারণেই সাহিত্য আজকাল কেহ-বা নীতিকে প্রাধান্য দেন, কেহ-বা সৌন্দর্যকে, কেহ-বা বৈজ্ঞানিক তত্ত্বপ্রচারকে । সেই জন্যই আলোচনা উথ্থাপন করা গেল ।

তাড়কপাদ : বেশ কথা । তা হইলে একটা দৃষ্টান্ত অবলম্বন করিয়া আলোচনা শুরু করা যাক । ভ্রমণকারীদের সুবিধার জন্য যে গাইড-বই রচনা করা হয় এবং ভ্রমণবৃত্তান্ত, এ-দুইয়ের মধ্যে কোনটা সাহিত্য লক্ষণাক্রান্ত সে বিষয়ে বোধকরি কারও মতভেদ নাই ।

আজদেবপাদ : ভালো, মতভেদ নাই — গাইড বই সাহিত্য নহে । কিন্তু ওই কথাতেই আমার সাহিত্যের উত্তর পাওয়া যায় । গাইড-বই এবং ভ্রমণবৃত্তান্তের বিষয় এক, কেবল রচনাপ্রণালীর প্রভেদ ।

তান্তিপাদ : আমার মতে দুয়ের বিষয়েরই প্রভেদ । ফিজিক্স এবং কেমিস্ট্রি যেমন একই বস্তুকে ভিন্ন দিক দিয়া দেখে এবং সেইজন্য উভয়ের বিষয়কে স্বতন্ত্র বলা যায়, তেমনি গাইড-বই এবং ভ্রমণবৃত্তান্ত দেশ-বিদেশকে ভিন্ন তরফ হইতে আলোচনা করে ।

তাড়কপাদ : গাইড-বইয়ে কেবলমাত্র তথ্যসংগ্রহ থাকে, ভ্রমণবৃত্তান্তে লেখকের ব্যক্তিগত প্রভাব বিদ্যমান এবং তাহাতেই সাহিত্যের বিকাশ । ব্যক্তিত্ববর্জিত সমাচারমাত্র বি্জ্ঞানে স্হান পাইতে পারে, সাহিত্যে নহে ।

আজদেবপাদ : তাহা হইলে দেখিতে হইবে কিসে ব্যক্তিত্ব প্রকাশ করে । কেবল মাত্র তথ্য নিতান্ত সাদা ভাষায় বলা যায়, কিন্তু তাহার সহিত হৃদয়ের ভাব ব্যক্ত করিতে গেলেই ভাষা নানা প্রকার আকার-ইঙ্গিতের সাহায্যে নিজের মতো করিয়া গড়িয়া তুলিতে হয় । তাহাকেই কি ইংরেজিতে ম্যানার এবং বাংলায় রচনাভঙ্গি বলা যায় না?

তাড়কপাদ : কেবল রচনার ভঙ্গি নহে, দেখিবার সামগ্রীটাও বিচার্য । এমন-কি কেবলমাত্র হৃদয়ের ভাবও নহে, কে কোন জিনিসটাকে বিশেষ করিয়া দেখিতেছে তাহার উপরেও তাহার ব্যক্তিত্বপ্রকাশ নির্ভর করে । কেমন করিয়ে দেখিতেছে, এবং কী দেখিতেছে এই দুটা লইয়াই সাহিত্য । কেমন করিয়া দেখিতেছে সেটা হইল হৃদয়ের এলাকা এবং কী দেখিতেছে সেটা হইল জ্ঞানের ।

আজদেবপাদ : তুমি কি বলিতে চাও, সাহিত্যের উপযোগী কতকগুলি দেখিবার বিষয় আছে ? অর্থাৎ কতকগুলি বিষয় বিশেষরূপে সাহিত্যের কতকগুলি তাহার বহির্ভূত ?

তাড়কপাদ : আমি যাহা বলিতে চাই তাহা এই — জ্ঞানস্পৃহা সৌন্দর্যস্পৃহা প্রভৃতি আমাদের অনেকগুলি স্বতন্ত্র মনোবৃত্তি আছে, বিজ্ঞান দর্শন এবং কলাবিদ্যা প্রভৃতিরা সেগুলোকে স্বতন্ত্ররূপে চরিতার্থ করে । বিজ্ঞানে কেবল জিজ্ঞাসাবৃত্তির পরিতৃপ্তি, সংগীত প্রভৃতি কলাবিদ্যায় কেবল সৌন্দর্যবৃত্তির পরিতৃপ্তি, কিন্তু সাহিত্য সমস্ত বৃত্তির একত্র সামঞ্জস্য । অন্তত সাহিত্যের সেই চরম চেষ্টা, সেই পরম গতি ।

তান্তিপাদ : সাহিত্যের উদ্দেশ্য সম্মন্ধে আর-একটু খোলসা করিয়া বলো, শুনা যাক ।

তাড়কপাদ : ম্যাথ্যু আর্নলড বলেন, সাহিত্যের উদ্দেশ্য মনুষ্যত্ব বিকাশ করা । জ্ঞানস্পৃহা সৌন্দর্যস্পৃহা প্রভৃতি মানুষের যতগুলি উচ্চপ্রবৃত্তি আছে তাহার প্রত্যেকটার পরিপূর্ণ পরিণতির সহায়তা করা । আমার মতে শিক্ষাবিধানকে গৌণ করিয়া আনন্দ-উদ্রেককে মুখ্য করিলে সেই উদ্দেশ্য সাধন হইতে পারে ।

তান্তিপাদ : বেশ কথা । তাহা হইলে শেষে দাঁড়ায় এই যে হৃদয়ের প্রতিই সাহিত্যের প্রধান অধিকার, মুখ্য প্রভাব । এস্হলে নীতিবোধকেও আমি হৃদয়বৃত্তির মধ্যে ধরিতেছি । কারণ সাহিত্য হৃদয়পথ দিয়াই ধর্মবোধের উদ্দীপন করে, তর্কপথ দিয়া নহে ।

তাড়কপদ : এই সম্বন্ধে বক্তব্য আছে । সত্যকে দুই খণ্ড করিয়া দেখা যায় । প্রথম, চিন্তার বিষয়রূপে ; দ্বিতীয়, অনুভবের বিষয়রূপে । কিন্তু সাহিত্য সত্যকে আমাদের কাছে জীবন্ত অখণ্ড সমগ্রভাবে উপনীত করে । প্রাকৃত বিজ্ঞানের নির্দেশ অনুসারে আমরা প্রকৃতিকে কেবলমাত্র বস্তু ও ক্রিয়ার সমষ্টিরূপে মনে করিতে পারি ; কিন্তু প্রকৃতিকে তার সমগ্র বস্তু ও ক্রিয়া এবং সৌন্দর্য সহযোগে একটি অখণ্ড সত্তারূপে অনুভব করাইতে পারে যে একটি একীভূত মানসিক শক্তি, সাহিত্য সেই শক্তিরই বিকাশ ।

তান্তিপাদ : সত্য হৃদয়ের দ্বারা কিরূপে অনুভব করা যায় বুঝিলাম না । প্রকৃতির সৌন্দর্যকেই বা কী হিসাবে  সত্য বলা যায় ধারণা হইল না । সৌন্দর্য বিশেষরূপে আমাদের হৃদয়বৃত্তিকে উত্তেজিত করে, এই কারণে তাহা বিশুদ্ধরূপে হৃদয় সম্পর্কীয় । ইহাকে যদি সত্য নাম দিতে চাও তবে ভাষার জটিলতা বাড়িয়া উঠিবে । নদী-অরণ্য-পর্বতের যে সমষ্টিকে আমরা প্রকৃতি বলি তাহার একটা বিভাগ হৃদয়-সম্পর্ক-বর্জিত, এইজন্য সেই বিভাগটাকে আমরা কেবলমাত্র বৈজ্ঞানিকভাবে আলোচনা করিতে পারি । কিন্তু তাহার যে দিকটা আমাদের হৃদয়ভাবকে উত্তেজিত করে, সেদিকে সত্য-মিথ্যা উচিত-অনুচিত নাই । এটা সুন্দর হওয়া উচিত বা উচিত নয় এমনও কোনো কথা নাই । সৌন্দর্য মানুষের মন এবং বহিঃপ্রকৃতির মধ্যগত একটা সম্বন্ধমাত্র । সে সম্বন্ধ সর্বত্র ও সর্বকালে সমান নহে, সেইজন্যই সাধারণত তাহাকে বৈজ্ঞানিক কোঠা হইতে দূরে রাখা হয় ।

তাড়কপাদ : অনেক কথা আসিয়া পড়িল । আমার মোট কথা এই, সাহিত্যের বিষয় সুন্দর , নৈতিক এবং যুক্তিসঙ্গত । ইহার কোনো গুণ বাদ পড়িলে সাহিত্য অসম্পূর্ণ হয় ।

তান্তিপাদ : সাহিত্যের লক্ষ্য হইতেছে সৌন্দর্য । তবে যাহা আমাদের ধর্মবোধকে ক্ষুণ্ণ করে তাহা আমাদের সৌন্দর্যবোধকেও আঘাত করে ; কতকগুলো যুক্তির নিয়ম আছে, তাহাকেও অতিক্রম করিলে সৌন্দর্য পরাভূত হয় । সেইজন্যই বলি, হৃদয়বৃত্তিই সাহিত্যের গম্যস্হান, নীতি ও বুদ্ধি তাহার সহায়মাত্র । অতএব, বিষয়গত সত্য এবং বিষয়গত নীতি অপেক্ষা বিষয়গত সৌন্দর্যই তাহার মুখ্য উপাদান ; এবং সেই সৌন্দর্যকে সুন্দর ভাষা সুন্দর আকারদানই তাহাতে প্রাণসঞ্চার ।

আজদেবপাদ : পুঁথির গহনা এবং হীরার গহনা গঠনসৌন্দর্যে সমান হইতে পারে কিন্তু ভালো গহনার উপকরণে পুঁথি দেখিলে আমাদের চিত্তে একটা ক্ষোভ জন্মিতে পারে ; তাহাতে করিয়া সৌর্ন্দযের পূর্ণফল নষ্ট করে । কবি বলিয়াছেন — ‘বীর রমণী রতন আর কারে শোভা পায় রে’, তেমনি পাঠকহৃদয় সাহিত্য ও সৌন্দর্যের সমাবেশ না দেখিলে সেই অসংগতিতে পীড়া এবং ক্রমে অবজ্ঞা উৎপাদন করিতে পারে ।

তাড়কপাদ : ইহার মধ্যে বিপদের সম্ভাবনা এই যে, গঠনের মূল্য অপেক্ষা হীরার মূল্য নির্ণয় করা সহজ, সেইজন্য অধিকাংশ লোক অলংকারের অলংকারত্ব উপেক্ষা করিয়া হীরার ওজনেই ব্যস্ত হয় এবং যে রসজ্ঞ ব্যক্তি মূল্যলাভ অপেক্ষা আনন্দলাভকেই গুরুতর বলিয়া গণ্য করেন, নিক্তির মানদণ্ড দ্বারা তাঁহাকে অপমান করিয়া থাকে । এই সকল বৈষয়িক সাংসারিক পাঠক-সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্রোহী হইয়াই এক এক সময় রসজ্ঞের দল সাহিত্যের বিশ্বগৌরবকে একান্ত অবহেলাপূর্বক নিরালম্ব কলাসৌন্দর্য সম্বন্ধে অত্যুক্তি প্রকাশ করিয়া থাকেন ।

আজদেবপাদ, তাড়কপাদ আর তান্তিপাদের তক্কো তখনও ফুরোয়নি, নাইটক্লাবের নাচঘরে আচমকা ফ্ল্যামেঙ্কো নাচের পোশাকে এসে পড়লেন নন্দনা সেন, তনুশ্রী দত্ত, শুস্মিতা সেন, ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, রানি মুখার্জি, বিপাশা বসু, কাজোল দেভগণ, কোয়েল মল্লিক, মনামি বসু, কোয়েনা মিত্র, কোঙ্কনা সেনশর্মা, রাইমা সেন, রিয়া সেন, স্বস্তিকা মুখার্জি, ইন্দ্রানী হালদার, শ্রেয়া ঘোষাল আর তাঁরা আরম্ভ করে দিলেন ফ্ল্যামেঙ্কো নাচ, ওফ সেকি তাতে তাল মিলিয়ে ভাঁজকরা লালকালো ফ্রক উড়িয়ে তাঁদের নাচ আর গান :

 

এম্বে এম্বে পঁ, বাঙালি য্যাম্নে কবি ক

অ আ ক খ গ লইয়া ডাইনে বাঁয়ে ক

হেইল্লা দুইল্লা কোরে তোরা য্যাম্নে খুশি ক

বাঙালি এম্বে এম্বে পঁ, হাইস্যা কাইন্দা ক ।

 

প্রমিত রঙ্গ কইরা তোরা কইথ্থ ভাষায় ক

মনের সুখে বাংলা ভাষা পরাণ ভইরা ক

চাষাভুযা কামার-কুমোর ক্ষ্যাতে বইয়া ক

য্যাম্বে কবি ক বাঙ্গালি বাংলায় কথা ক ।

 

মানুষ লইয়া করে তোরা মাটি লইয়া ক

বলে যারা বাংলা ভাষা বুইজ্জ্যা লইব ক

দখলদারের চাবুক ভাষা ফিক্ক্যা দিয়া ক

তোরা বাংলা কথা কয়ে মানুষ বাংলাডারে ক ।

 

সাহেব টুপি পাগড়ি হগল গাঙ্গে ফেলায় ক

ঢ্যাপের খই আর মোয়ামুড়ি মিঠাই খায়া ক

গ্যান্দামালা আলতা পইরা নাইচ্চা কুইদ্দা ক

‘বাংলা তোমায় ভালোবাসি’ তোরা য্যাম্নে খুশি ক ।

 

আমিপাদসহ অন্যান্য সিদ্ধাচার্যরা, ভুসকুপাদ আর জঅনন্দিপাদ ছাড়া, অন্য সবাই, লুইপাদ, কাহ্ণপাদ, সরহপাদ, শবরীপাদ, বিরূপাদ, লাড়ীডোম্বীপাদ, কুম্বলাম্বরপাদ, ঢেণ্ডনপাদ, কুক্কুরীপাদ, কঙ্ককপাদ, গুণ্ডরীপাদ, চাটিলপাদ, ডোম্বীপাদ, শান্তিপাদ, মহিত্তাপাদ, বীণাপাদ, আজদেবপাদ, দারিকপাদ, ভাদেপাদ, তাড়কপাদ, ধামপাদ, তান্তিপাদ প্রমুখ একস্বরে বলে উঠলেন, সাধু, সাধু, উত্তরাধুনিক যুগের এটাই সফলতা যে আমরা প্ল্যানচেটে ঝিংচাক করে জীবিত সুন্দরীতমাদের ডেকে এনে আদর আপ্যায়ন করতে পারি, যা আধুনিকদের কালে সম্ভব ছিল না ।

 

চতুৎথো পড়বো ( বরিশাল স্পেশাল )

ফ্ল্যামেঙ্কো নাচ সেরে সুন্দরীরা হাওয়ায় মিলিয়ে যাবার পর সিদ্ধাচার্যরা উনত্রিশটা গোরুর কাঁধে ডানা তৈরি করে দিলেন, গোরুরা কি খুশি ডানা পেয়ে, যে যার মাতৃভাষায় হোঙ্গা হোঙ্গা করে গান গাইতে গাইতে আকাশে উড়ে চলল, তাদের পাশে এক টুকরো মেঘের জাজিমে বসে শিভাস রিগাল খেতে খেতে গোরুগুলোকে আকাশের ঘাস খাওয়াবার জন্য লুইপাদ মানে গৌরমোহন সবুজ মেঘ ছিঁড়ে ছিঁড়ে যা করল তা পরের বার যখন সবাই নাইটক্লাবে জড়ো হবে তখন শোনাবে । আমি, মানে আমিপাদ, এতো নেশা করে ফেলেছিল যা মেঝে থেকে পণ্ডশ্রম সেন মানে ভুসকুপাদের খসিয়ে যাওয়া মুখগুলোকে তুলে তুলে নাইটক্লাবের মালিককে দিয়ে দিলে, ভুসকুপাদ যদি পরের বার দর্শন ফলাতে আসে তাহলে তাকে দেবার জন্য ।

ভুসকুপাদ এসেছিল, খরগোশের চামড়ার মুকুট পরে, বললে, দেশপ্রেম আর জাতীয়তাবাদকে মিশিয়ে ফেলে এক রকমের আইসক্রিম তৈরি করেছে, ইংরেজিতে যাকে বলে জিঙ্গোইজম, একরকমের আদর্শ, সবাইকে পিটিয়ে সমান করার আদর্শ, যেমনটা স্ট্যালিনের রাশিয়ায় ছিল, মুসোলিনির ইতালিতে ছিল, হিটলারের জার্মানিতে ছিল, পিনোশের চিলিতে ছিল, ইন্দিরা গান্ধীর ছেলে সঞ্জয় গান্ধির ইনডিয়ায় ছিল — ওনার বুড়ো-হাবড়া চেলারা চেঁচাতো ইনডিয়া ইজ ইন্দিরা, ইন্দিরা ইজ ইনডিয়া, এখন ভুসকুপাদ ভাবেন উনি কেন ইনডিয়া নন, ইন্দিরা কে হে, চর্যাপদের ডোম্বি কেন ইনডিয়া নন, শ্রীকৃষ্ণের গোপীরা কেন ইনডিয়া নন, রামায়ণের সীতা কেন ইনডিয়া নন, মহাভারতের দ্রৌপদী কেন ইনডিয়া নন !

 

 

Posted in পোস্টমডার্ন-গল্প, মলয় রায়চৌধুরী, স্যাটায়ার | Tagged , | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

হৃৎপিণ্ডের সমুদ্রযাত্রা : রবীন্দ্রনাথের দাদুর মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ ও দেবেন্দ্রনাথের সমালোচনা মলয় রায়চৌধুরীর উপন্যাস

 

        হৃৎপিণ্ড : আর কতো দূর হুলি ?

আমি : আরও চার মাস, রাজকুমার ।

 

        আমি, হুলি গন্ধবণিক, রাজকুমারের ভৃত্য, আমার সমস্যা হলো যে, মাথায় চুলের জঙ্গলে ভাববার কুয়াশা গড়ার দরকার হয় না, মুখ খুললেই নর্দমার পাঁকের তোড়ের মতন কথা ওগরাতে থাকি, গাঁয়ের নর্দমা নয়, সুতানুটি-গোবিন্দপুরের  বর্ষাকালের আধকাঁচা নর্দমা, যে নর্দমায় জোব চার্নক দাঁড়িয়ে হিসি করে গেছেন, লর্ড হবার আগে পোঁদপোঁছা টয়লেট-কাগজ ফেলে গেছেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাহি লুটেরা রবার্ট ক্লাইভ, চার্লস স্টুয়ার্ট যাকে আমরা বলতুম হিন্দু স্টুয়ার্ট যিনি প্রতিদিন গঙ্গাস্নান করতেন আর নিজের হিন্দু বউকে পাল্কিতে বসিয়ে নিজের সঙ্গে স্নান করাতে নিয়ে যেতেন,  ব্রিটিশ আমল থেকে জেরা করার মতন করে বকবক, বর্ষা ফুরোলেই কথা বন্ধ, পচা গন্ধের সঙ্গে আমোদে ফুলতে থাকে, এখন, কয়েকশো বছর পরে, বাতিল প্লাসটিকের থলে, নেতাদের হাসিমুখের পোস্টার আর কন্ডোমে জ্যাম ।

আমার কথা বলতে হলে বলতে হয় যে, গ্রামসমাজ, ধর্ম আর গোষ্ঠীজীবন কিংবা বয়োজ্যেষ্ঠ লোক, যাঁদের মতামত আদ্যিকালে সমাজের সব স্তরে প্রভাবী ছিল, সেই লোকগুলোর পরের প্রজন্মকে দেয়া একপ্রস্হ আচার আচরণকে  ঐতিহ্য আর পরম্পরা বলে মেনে নিতে খটকা লাগে ; সেসব আজ উপড়ে ফেলে দেয়া হয়েছে, আর তার জায়গায় এসেছে কারখানার পাতিমার্কা জীবন, সেই সঙ্গে জটিল আমলাবাজির বাড়বাড়ন্ত, নিয়মকানুন, হ্যান কোরো না, ত্যান কোরো না, ওখানে ঢুকতে পারবে না, সেখানে অনুমতি নিয়ে যেতে হবে । তাহলেই বুঝুন ।

আইডেনটিটি কার্ড হাতে, দরোজার বাইরে দাঁড়িয়ে বিচি চুলকোন ।

যাকগে যাক,  এখন রাজকুমারের ব্যাপারটাই বলি ; পরে অন্য ।

         আমি একজন রাজকুমারের হৃৎপিণ্ড, ক্লিপার জাহাজে করে সুতানুটি-গোবিন্দপুরে, রাজকুমারের নিজের বাড়িতে ফিরছি, তাঁর ছেলেদের জিম্মায় হৃৎপিণ্ড বা হৃৎখণ্ডখানা হিল্লে করে আমার ছাড়ান, ওনাদের হাতে তুলে দিয়ে নিশ্চিন্তি , এর আগে আফ্রিকার পোঁদের তলা দিয়ে ফিরতে হতো, সেই যে-জলরাস্তায় ভাস্কো ডাগামা এসেছিল, আর তার পেছু-পেছু পর্তুগিজ জলদস্যুর দলবল, ওরা অবশ্য আলু, বাঁধাকপি, ফুলকপি, টোমাটো এনেছিল, তার আগে আমরা সেসব খেতুম না, রাজকুমারের বাড়ির লোকজনও খেতো না, জাত যাবার আঁৎকানির দরুন, রাজকুমার নিজে কিচ্ছু মানতেন না, বলতেন ওরা সময়-অন্ধ, নিজের সময়কে চিনতে পারছে না, বাইরের জগতের বদলে নিজেদের মাথার পাঁকে সাঁতরায় ।

রাজকুমার ছিলেন আত্মগর্বী, বেপরোয়া, রুচিবাগীশ, কড়া-মেজাজের, বেয়াদপি করলে চাবকাতে কুন্ঠিত হতেন না, আয়েশি, ধবধবে ফর্সা, আদেশ না শুনলে বরখাস্ত করতেন, টাকা রোজগারের আর খরচ করার ঘাঁতঘোঁত খুঁজতেন, অন্নসত্র খুলে কাঙালিভোজন করাতেন, যোয়ান বয়সে খড়াদার গোঁসাইয়ের শিষ্য ছিলেন, পেঁয়াজও ছুঁতেন না,  কিন্তু ‘চৈতন্য মঙ্গল’ পড়া সুতানুটি-গোবিন্দপুরের বামুনরা ওনাকে ঠ্যাটা করার পর উনি বললেন, আচ্ছা দাঁড়া তোদের দেখাচ্ছি, আমি তোদের চেয়ে কতো বড়ো হই, কতো উঁচু হই, সেই যে উনি পালটে গেলেন, তারপর ওনার উন্নতি শুধু মরণই থামাতে পেরেছে । রাজকুমারের ভেতরে যে একজন সম্রাট রাজত্ব করছে, তা উনি বামুনদের খেলো-করা কথা শোনার পরই টের পেলেন ।

ওনার বংশে কেউই ওনার মতন  শ্বেতাম্বর টাইকুন হতে পারেননি, দিগম্বর হয়ে গেছেন ।

রাজকুমার বলতেন, বাঙালিরা এমন জায়গায় গিয়ে ঠেকেছে যে, যেকোনো নতুন ধারণাকেই মনে করে বিপজ্জনক, যেকোনো নতুন আবিষ্কার দেখলেই ভাবে আবার সেই খেটে মরতে হবে, সমাজে এগিয়ে যাবার নতুন পদক্ষেপকে মনে করে বুঝি বিদ্রোহ করে ফেলছে, তাই যখানে বসে আছে সেখাইনেই পাথরের মতন বসে থাকতে চায় ।

রাজকুমারের বড়ো ছেলে ঠাকুর-দেবতা দেখতে পান না, ওনার ঠাকুর-দেবতা নাকি নিরাকার, যেমন মোচরমানদের হয়, বলেছিলেন আমায় রাজকুমার ।

এই সমুদ্রযাত্রা  আমার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের, শান্তি আর অশান্তির জগাখিচুড়িতে ডুবে অদ্ভুত আনন্দ গড়ে ফেলতে পেরেছি, রাজকুমারের জন্য, চোখ বুজলেই আকাশে প্রায় কুড়িটা পূর্ণিমার চাঁদ দেখতে পাই ।

আমার প্রতিটি জন্মে থেকে গেছে এই নাতিশীতোষ্ণ বোধ, থেকে গেছে সমুদ্রে দেখা উড়ন্ত মাছেদের নোনা হাওয়া, ঢেউদের ওপরে ফেনার গান ।

সেইন্ট মার্টিন দ্বীপের একজন হাবশিকে, সে বলতে গেলে বাঙ্গাল হয়ে গেছে, পর্তুগিজরা আফ্রিকার সিমলোপা প্রদেশ থেকে আরও অনেক ছেলে-ছোকরার সঙ্গে ওকে জাল ফেলে চুরি করে এনেছিল, যাতে যুদ্ধে কাজে লাগাতে পারে, তা সে যাদের সঙ্গেই যুদ্ধ হোক না কেন, রণে বনে জঙ্গলে, রাজকুমার পর্তুগিজদের মোটা টাকা দিয়ে হাবশিটাকে ছাড়িয়ে নিয়েছিলেন, এখন ব্যাটা নিজের দেশে ফিরতে চায় না, গিয়ে করবেটাই বা কী, নিজের ভাষাও তো ভুলে গেছে । সমুদ্রপথে আঁকশি দিয়ে, ও দুটো উড়ুক্কু মাছ ধরে লোহার চৌবাচ্চায় ঢাকা দিয়ে রেখেছে, এই জাহাজে, মাংসের টুকরো খেতে দেয়, শুকনো মাংস, উটের, ভেড়ার, হলুদ আর লঙ্কাগুড়ো মাখানো, যাতে পচে না যায়, জাহাজের খালাসি ক্যাপ্টেন সকলেই ওই মাংস খায় ।

হাবশিটা আমার দেখাশোনা করে, আমি তো চাকর, ও হলো চাকরের ভৃত্য । সেইন্ট মার্টিন দ্বীপ এখন বাংলাদেশে । রাজকুমারের সময়ে বাংলাদেশ ছিল না, অখণ্ড বঙ্গদেশ ছিল, সেখানে ওনার জমিদারি ছিল, সে অনেক জমিজমা ছিল, মোচোরমানরা ভেন্ন হয়ে যেতে চাইলো, তাই আলাদা হয়ে গেছে, তারপর নিজেদের মধ্যে কচুকাটা খুনোখুনি করে আলাদারও আলাদা হয়ে গেছে, এখন সেই আলাদার আলাদার মধ্যেও আলাদা হবার মারিকাটারি চলছে, আদালত চত্বর থেকে গ্রিক দেবীর মূর্তি হাপিশ করে দিয়েছে, নেড়ে সালাফিস্টদের যা তে মন ভরে।

সুতানুটি-গোবিন্দপুরের এখনকার লোকেরা বলে যে ওরা আলাদা হয়ে ভালোই করেছে, নয়তো ছেচল্লিশের খুনোখুনি  বজায় থাকতো, এখন নিজেরা লড়ে মরছে, সে-ই ভালো ।

রাজকুমার চোগা-চাপকান পরতে ভালোবাসতেন, কাঁধে কাশ্মিরি কাজ করা শাল, নাগরা জুতোয় মুক্ত বসানো, সবই বিলেতে ছেড়ে আসতে হয়েছে, ওনার সুইটহার্টরা কেউ-না-কেউ হাতিয়ে নিয়ে থাকবেন । এখন যাকে অ্যাটিচিউড বলে, ওনার চাল-চলন থেকে তা গর্বের গুঁড়ো হয়ে ঝরে-ঝরে পড়তো, হাওয়ায় উড়তো ওনার জ্যোতি ।

ক্লিপার জাহাজ মানে তিন মাস্তুলের জাহাজ, সবকটা মাস্তুলে চারচৌকো নস্যি রঙের ছোটো-ছোটো পাল,  সবচেয়ে উঁচু মাস্তুল মায়িস, দ্বিতীয়টা ফোরমাস্ট, তৃতীয় মেজ্জিন ; দুবার বিলেত যাওয়া আর দুবার আসায় ক্লিপার জাহাজের অনেক ব্যাপার জেনে ফেলেছি ।

আমি পেয়েছি চারচৌকো কেবিন, কাঠের মেঝেয় নীল রঙের কার্পেট, বার্নিশ-করা সেগুনকাঠের দেয়াল, ল্যামিনেশানে চকচকে, রাজকুমারের হৃৎপিণ্ড নিয়ে যাচ্ছি বলে আমার দেখাশোনার জন্যে হাবশিটা রয়েছে, সে আফ্রিকার মোচোরমান ছোঁড়া, কিন্তু বাঙ্গাল হয়ে গেছে, না ও আমার ঘটি ভাষা বোঝে আর না আমি ওর বাঙ্গাল ভাষা বুঝি । সঙ্গে ঢিলা কুলুপ আনেনি, সমুদ্রের নোনতা জল ব্যবহার করে-করে নুনুতে নুনের পলি জমে হেজে যেতে বসেছে, নোনতা জল মানে যে জলে উড়ুক্কু মাছ দুটো পুষেছে, ফিদিন বদলাতে হয়, ক্যাপ্টেন বলেছে খাবার জল ব্যবহার করতে পারবে না । সুতানুটি-গোবিন্দপুর না পৌঁছানো অব্দি বেচারার অঙ্গখানা আস্ত থাকলে হয় ;  নুনুর খোসা ছাড়ানোয় যেমন সুবিধে আছে, তেমন অসুবিধেও আছে।

রাজকুমারের এক মেয়ে আর পাঁচ ছেলে , ওনাদের পরিবারে বছর বছর বিয়োবার রীতি,  তা সত্বেও উনি বেশি ছেলেমেয়ে পয়দা করতে পারেননি কেননা ওনার বউ, ব্রাহ্মণ পুরুতদের পরামর্শে, ওনাকে ছুঁলে সাতবার পাল্কিসুদ্দু গঙ্গায় চান করতেন, তখন অবশ্য গঙ্গা এরকম গুয়ে গোবরে পাঁকে নর্দমার-কারখানার  জলে দুর্গাকালীর মূর্তি-ভাসানো খড়ে কালোকেলটে হয়ে যায়নি, মাদি ইলিশরা দুরছাই করে বর্মায় বিয়োতে পালায় নি, শুশুকরা এই নদীতে যাতে না সেঁদোতে হয় তার প্রতিজ্ঞা করেনি, দলদাসদের খুন করা মুন্ডুহীন ধড় ইয়ে আজাদি ঝুটা হ্যায় গাইতে-গাইতে ভাসতো না।

ওনার বউ ছিলেন গোঁড়াবামুন- বাড়ির মেয়ে, বরের দেহের  চেয়ে বেশি গঙ্গার জলকে পবিত্র মনে করতেন ।

রাজকুমার বলতেন, যারা গোঁড়া তারা অজানার চেয়ে পরিচিতকে পছন্দ করে, যা পরখ করা নয় তার চেয়ে বেশি পছন্দ করে যা আগে থাকতে পরখ করা, রহস্যের চেয়ে ঘটনাকে পছন্দ করে, সম্ভাব্যের চেয়ে যথাযথকে পছন্দ করে, অসীমের চেয়ে সীমিতকে পছন্দ করে, দূরের চেয়ে কাছেরকে পছন্দ করে, প্রাচুর্যের তুলনায় যা যথেষ্ট তাকে পছন্দ করে, নিখুঁতের হবার চেষ্টার চেয়ে যা সুবিধাজনক তাকে পেতে চায় ।

একটা উড়ুক্কুমাছ লাফিয়ে উঠে বললে, গুড স্পিচ ।

রাজকুমারকে  বিদেশিনী বন্ধুনিরা এতো চাইতো যে বউয়ের দরকার পড়তো না, নিজের চোক্ষে দেখা, কানে শোনা । আমার মাঝে-মাঝে সন্দেহ হয় যে কোনো বিদেশিনী বন্ধুনি ওনার টাকাকড়ি মণিমুক্তো চুরি করে ওনাকে মেরে ফেলার তাল করেছিল, তাই অতো কম বয়সে হঠাৎ মারা গিয়েছিলেন । তখনও ওনার কতো কাজ বাকি ।

চাকর তো, তাই হলফ করতে পারি না, নইলে তাও করতুম আপনাদের খাতিরে ।

         যতোদূর মনে পড়ে, আমি আমার গত চার জন্মের কথা পুরোটা মনে রাখতে পেরেছি, গ্রীষ্মের কী-গরম কী-গরম ঘামে গলগল খরার গাঁয়ের ছমছমে রাত ( অক্ষাংশ ২২.৩৪ উত্তর, দ্রাঘিমাংশ ৮৮.২৪ পূর্ব ) ।

হেমন্তের ফুরফুরে হাওয়ার সোনালি বিকেল ( অক্ষাংশ ২৫.৬ উত্তর, দ্রাঘিমাংশ ৮৫.৭ পূর্ব ) ।

শীতের হিহি ঠাণ্ডা  লালশালুর দুপুর ( অক্ষাংশ ২৫.৩৬ উত্তর, দ্রাঘিমাংশ ৮৩.১৩ পূর্ব ) ।

বর্ষার ঝমাজঝম বরফের সুপুরি বৃষ্টির সকাল ( অক্ষাংশ ১৯.০১ উত্তর, দ্রাঘিমাংশ ৭৩.০১ পূর্ব )।            বিশ্বাস না হলে লাহোরে আকবরের ফারসিতে খাকের কলমকারি নথি , ব্রিটিশ মিউজিয়ামে রাখা রানি ভিক্টোরোয়ার গেজেট আর দুই বাংলার ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান, দুইরকম বাংলায় ছাপানো খবরের কাগজ দেখতে পারেন ; প্রতিবারই আমার নাম হুলি রেখেছেন আমার নিজের বাবা-মা বা অন্যের বাবা-মা, আমার চোখ কটা বলে তিনবার আর একবার আকাশ কালো করে নিম্নচাপের হুলোরাঙা মেঘ জমেছিল, তাই ।

তার আগের জন্মগুলোর ঘটনা একটু-আধটু কখনও সখনও মনে পড়ে বটে, তবে গোলমাল হয়ে যায় যে তা ছয় বারের জন্মে ঘটেছিল নাকি দশ বারের,  নাকি অন্য কোনো, তবে হুলি নামটা পালটায়নি, বড়ো জাতে জন্মালে পদবি পালটেছে, ছোটো জাতে জন্মালে পদবির দরকার হয়নি ।

রাজকুমার, মানে  ছয় ফুটের গৌররাঙা যে মানুষটার কথা থেকে-থেকে মনে পড়ছে, যিনি মেমদের কোমরে হাত রেখে সুইটহার্ট বলতেন, যদিও  সুইটহার্ট বলতে যে ঠিক কী বোঝায় তা আজও জানি না, মিষ্টি হৃদয় মানেই কি মিষ্টি মেয়ে, ভেতরে নোনতা বাইরে মিষ্টি কিংবা ভেতরে নোনতা বাইরে নোনতা হলেও তো তাকে চাওয়া যায়, নয় কি ?

সেই রাজকুমারের, যাঁর গোলাপি প্রজাপতির ডানার মতন কাঁপতে-থাকা  হৃৎপিণ্ডও বিশ্বাস করতে চাইছেন না যে, ওনার সঙ্গে কথাবাত্রার আগেও আমি জন্মেছিলুম, উনি যে ভাবছেন হুলি নামটা ওনার দেয়া,  তাও ভুল।

রাজকুমার ঠাকুর ঘরে গরদের ধুতি কাঁধে সিল্কের চাদর দিয়ে দেবী-দেবতার এতো পুজোআচ্চা করতেন, অথচ বিশ্বাস করতে পারলেন না যে আমি এর আগেও জন্মেছি, হিন্দু যখন, তখন বার বার জন্মাবার সুযোগটা নেবো না কেন ! অ্যাঁ ?  শীতেও খালি গায়ে পুজো করতেন উনি ।

এই জন্মটা না হয় শুদ্দুর হয়ে জন্মেছি, আগের জন্মে তো ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য হয়ে জন্মেছিলুম।    মনুস্মৃতির প্রোটোকলটা যে কোন খাতে বয়, তা ঠাহর করতে মাথা ডগমগ করে, বামুনের মধ্যেও এতো রকমের বামুন কেন, উনি রাঢ়ীশ্রেণির বামুন, অন্য বামুনগুলো বোধহয় আড়িশ্রেণি, ঘড়িশ্রেণি, বড়িশ্রেণি, নুড়িশ্রেণি, চুড়িশ্রেণি । নাহ, সংসারত্যাগী বামুন, দীক্ষা বিলোবার বামুন, গেরস্ত বামুন, জজমানি বামুন, মন্দিরের পুজুরি বামুন, ছেরাদ্দের বামুন, ব্রাত্য বামুন যারা পৈতে ফেলে দিয়েছে, বর্ণহীন বামুন যে জাতিপ্রথা মানে না । তাহলে বামুনদের মধ্যেও উঁচু জাত-নীচু জাত আছে, অ্যাঁ ।

বাঙালিদের মধ্যে ক্ষত্রিয়  আর বৈশ্য নেই কেন, যার জন্যে আমাকে দুবার অবাঙালি হয়ে জন্মাতে হয়েছিল, শুদ্দুরদের মধ্যেও এতো ভাগাভাগি কেন, ওফ কতো রকমের শুদ্দুর যে হয় তা শুদ্দুররাই বলতে পারে না, কামার কুমোর ছুতার স্যাকরা লোহার মালি মালো তাঁতি তেলি জেলে চাষি, তারা তো কৌরব পক্ষে ছিল, তবে ক্ষত্রিয় নয় কেন !

পাটনার আফিমকুঠীর এক আফিমচাষীর বিধবাকে বিয়ে করেছিল জোব চার্ণক, চাষীরা তো তখন শুদ্দুর ছিল না !

পৌণ্ড্রক্ষত্রিয়, উগ্রক্ষত্রিয় বাঙালিরা সব গেলো কোথায় ? তারা তো ক্ষত্রিয় ছিল !

নেপালের লুম্বিনীর  গৌতমও রাজকুমার ছিলেন, তিনিই যখন এই প্রোটোকল নষ্ট করতে পারলেন না, গাছের তলায় বসে বুদ্ধ হয়ে গেলেন, তখন যে-রাজকুমারের হৃৎপিণ্ড আমি ফরম্যালিনের শরবতে চুবিয়ে সুতানুটি-গোবিন্দপুর ফিরছি, তিনি কীই বা করতে পারতেন ।

কলকাতায় লুম্বিনী পার্ক নামে একটা পাগলামি সারাবার হাসপাতাল আছে যেখানে ঋত্বিক ঘটক, বিনয় মজুমদার, সঞ্জয় ভট্টাচার্য, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় আর আমি ছিলুম দিনকতকের জন্যে, বিজলির ছোবল মেরে-মেরেও  কোনো সুরাহা হয়নি।

পুরুষের পাগলামি সারে না, সে যদি রাজকুমার হয়ে জন্মায়, তাহলেও ।

হায়, রাজকুমার দেখে যেতে পারলেন না টু-পিস সাঁতারের পোশাকে বিদেশিনীদের ।

তুই ভাবছিস দেখিনি, আমি চিরটকাল ভবিষ্যৎ দেখতে পেয়েছি ।

হায়, রাজকুমার দেখে যেতে পারলেন না বিশ্বসুন্দরী প্রতিযোগীতায় জিতে ফেরা ভারতীয় নিকোল ফারিয়া, দিয়া মির্জা, সুস্মিতা সেন, ঐশ্বর্য রায়, প্রিয়াঙ্কা চোপড়া, লারা দত্ত, যুক্তা মুখি, ডায়না হেডেনকে।

তুই ভাবছিস জানতে পারিনি, আমি সবই আগাম জানতে পারি রে ।

হায়, রাজকুমার দেখে যেতে পারলেন না সুচিত্রা সেনকে ; সুচিত্রা সেনও দেখে যেতে পারলেন না রাজকুমারকে ।

আমরা দুজনে দুজনকে দেখেছি, তুই জানিস না ।

রাজকুমারের হৃৎপিণ্ডের সঙ্গে আমার কথাবাত্রা হয়েছিল ১৮৪৬ সালে, যখন কিনা আজ এটা ২০১৭ সাল, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, সেই সময় থেকে বয়সের হিসাব ধরলে এখন আমার বয়স  ১৭১ বছর, দাড়ি-চুল-গোঁফে চিরুনি পড়েনি বহুকাল, যশোর থেকে পালিয়ে আসার সময়ে আনা হয়নি, মেহেদি লাগিয়ে বাদামি জটাজুট হই, আর ভালো না লাগলে ন্যাড়া হয়ে যাই ।

জাহাজের কেবিনে বসে কথা বলার সময়ে টের পাচ্ছিলুম যে দুঃখে-দুঃখে আমার গলার ভেতরে চার-পাঁচটা কাক ঢুকে বসে আছে ।

এই ১৭১ বছরেও, চাকরদের হেড হরিখুড়ো যে গাঁয়ে থাকে, সেখানে এই ব্যাপারগুলো এখনও পালটায়নি : ১) শ্রাদ্ধ আর বিয়ের ভোজে বামুনদের আগে খাওয়ানো হয়, সব শেষে শুদ্দুরদের ; ২) নিচুজাতের মানুষকে খেতে দেবার জন্যে উঁচু জাতের বাড়িতে কাপ-গেলাস এমন অচ্ছুত করে রাখা থাকে যেন সেগুলো হাতবোমা ; ৩) গাজন বা শিবের অন্য পুজো্য নিচুজাতের কাউকে সন্ন্যাসী সাজতে দেয়া হয় না ; ৪) উঁচুজাতের বউ-মেয়েরা নিচুজাতের বউমেয়েদের ছুঁতে চায় না, এড়িয়ে যায় ; ৫) একজন পৈতেধারী বামুনের বারো বছরের ছেলেকে নিচুজাতের সত্তর বছরের বুড়ো পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে আশীর্বাদ চায় ; ৬ ) অনেক গ্রামে জাত অনুযায়ী পাড়া ভাগ করা আছে ; ৭ ) গরিব পুজারী আর পিণ্ডদানকারী বামুনকে অন্য বামুনরা নিচু নজরে দ্যাখে ; ৮) উঁচুজাতের রান্নাঘর, শোবারঘর আর ঠাকুরঘরে নিচুজাতের লোকেদের ঢুকতে দেয়া হয় না ; ৯ ) নীচুজাতের মানুষকে যে থালায় খেতে দেয়া হয় তা উঁচুজাতের বাড়ির বউরা ধুতে চায় না, কাজের লোককে দিয়ে ধোয়ায় আর যদি কাজের লোক না থাকে তাহলে বাড়ির পুরুষরা ধুয়ে দ্যায় ; ১০ ) মোচোরমানদের জন্যে বাসন-কোসন আলাদা।

হরিখুড়োর গাঁয়ে মোচরমানদের মধ্যেও উঁচু জাত নীচু জাত আছে, তাদের মধ্যে বিয়ে হয় না । সুন্নি মুসলমান আর শিয়া মুসলমান আছে, তাদের মধ্যে বিয়ে হয় না ।

আমি বিয়েথা করিনি, রাজকুমারের দেখাশুনা কে করবে আমি যদি সংসারি হয়ে যাই !

১৭৫৬ সালে সিরাজ উদ দৌলা যখন কলকাতা আক্রমণ করেছিলেন, তখন আমি দু’পক্ষের লড়াইয়ের মাঝে পড়ে খুন হয়ে গিসলুম, তারপর গোবিন্দপুরের জঙ্গলে এক গর্ভবতী বাঘিনী আমাকে খেয়ে ফেলেছিল, যখন ওর বাচ্চা হলো, সেই সঙ্গে আমিও সুন্দরবনে জন্মেছিলুম, বাঘ হয়ে নয়, মানুষ হয়েই, বাঘিনী আমাকে অন্য রকমের দেখতে বলে খুবই আদর করতো, আমার সারা শরীর চাটতো আর আমার কাতুকুতু লাগতো।         বাঘিনীর পেটের ভেতরে আরও বেশ কয়েকজন মানুষ ছিল, তারা বললে, না, না, পেছন দিক দিয়ে জন্মাতে পারব না, বাঘিনী হজম করে আমাদের বদবুদার ন্যাড়ে প্রসব করে দিক সেও-ভি-আচ্ছা, আমাদের দাবি মানতেই হবে, আমরা সামনে দিক থেকে জন্মাতে চাই, ফলে সেই মানুষগুলো আর জন্মাতে পারলো না, সুন্দরীগাছের গোড়ায় বাঘিনীর গু হয়ে অমর হয়ে গেল ।

ভাটার সময়ে সুন্দরীগাছের আকাশমুখো শেকড়ের মাঝে ন্যাড় হয়ে যাওয়া মানুষরা দেখা দিতো যখন, তারা চেঁচাতো সর্বহারা হওয়া ভালো, গরিব হওয়া ভালো, উদ্বাস্তু হওয়া ভালো, জবরদখল করা ভালো, ইংরেজি না শেখা ভালো ; এই সমস্ত কথা আউড়ে তারা অমর হতে চাইলে ।

যে লোকটা এইসব স্লোগানের নেতা ছিল, সে নিজের মরিচঝাঁপি নামে উদ্বাস্তুদের দ্বীপকে চারিদিক থেকে ঘিরে গুলি চালিয়ে বাড়িঘরে আগুন লাগিয়ে লাশগুলোকে সমুদ্রে ফেলার হুকুম দিয়ে বিলেতে গরমকাল কাটাতে হার সিঙ্গল মল্ট খেতে চলে গিয়েছিল ।

মানুষ যতোদিন বেঁচে থাকে, অমর হতে চায়, তা সে গু হয়েই হোক, কিংবা নিরাকার গোল্লা  হয়েই হোক।

বাঘিনীর কাছ থেকেই আমি কাঁচা মাংস খেতে শিখেছিলুম, জন্তু আর মানুষ মেরে খেয়ে ফেলতুম, পরে শুনেছি যে বাঘিনীর  ছেলেপুলেরা এইশাল ওইশাল হ্যানশাল ত্যানশাল নাম নিয়ে মানুষ মারতো আর খেয়ে ফেলতো, লুকিয়ে ঘুরে বেড়াতো আর যাদের জমিজমা আছে তাদের জবাই করতো, ওদের দেখাদেখি সেপাই সান্ত্রিরাও   ঝাঁটছাল বালছাল আঁড়ছাল গাঁড়ছাল সেজে মানুষ খাওয়া আরম্ভ করেছিল, কিন্তু সেসময়ে আমি আরেকবার জন্মাইনি, দুই জন্মের মাঝে আরাম করছিলুম । ওদের কারোর গায়েই আমার মতন বাঘের চামড়ার ডোরা দাগ ছিল না, যে কজনের গায়ে চিতাবাঘের ফুটকি ছিল তারা শীতকালেও পুকুরে কুয়োয় কলতলায় নদীতে চান করে ধুয়ে ধুয়ে ফুটকির দাগ চামড়া থেকে মুছে ফেলতে পেরেছিল, মুছে ফেলে বলেছিল এইশাল ওইশাল হ্যানশাল ত্যানশাল চিতাবাঘদের দাগগুলো ছিল পদ্ধতিগত ভুল, এগুলোকে বাঘের ডোরার মান্যতা দেয়া যায় না ।

ওরা কিন্তু অমর হতে পারেনি, ওদের নাম-সাকিনও কেউ মনে রাখেনি ; যে গেছে সে গেছে ; যা গেছে তা গেছে । ওদের যারা হালুমখোর বানালে, আর যারা হাপিশতোড় শেখালে, সেই , চারু এম, জ্যোতি বি, সিদ্ধার্থ আর,  আজ অমর, হাসি মুখ, ছবি হয়ে, ভক্তদের চুনওঠা দেয়ালে, দরমার বেড়ায়, চ্যাঁচারির কুঁড়েঘরে এই যে হেথায় কুঞ্জছায়ায় স্বপ্নমধুর গাইছেন ।

আমি তো যতোদূর জানি ভুল মানে ভুল, তা সে পদ্ধতিগত হোক বা দিবঙ্গতবা সদগতিগত হোক ।

বাঘিনীর পেছন দিক দিয়ে জন্মেছিলুম বলেই তো আমি এককালে ঠগীদলের সর্দার হতে পেরেছিলুম ; কমিউনিস্ট দলের সর্দার হবো তাও ভেবেছিলুম, কিন্তু বার বার জন্মাবার ফলে এমন ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলুম যে আর আগ্রহ  হয়নি । ততোদিনে কমিউনিজমও ক্লান্ত, ভোদকা টেনে ইয়েল্তসিন নামে এক মাতাল কামান দেগে উড়িয়ে দিলে হাজার হাজার লোকের জোর করে দেখানো স্বপ্ন ।

আসলে কমিউনিজম হোক বা অন্য কোনো ইজম, সব ইজমই একসময়ে ক্লান্ত হয়ে যায়, তত্বতে গাঁটে-গাঁটে আরথ্রাইটিস হয়ে যায় । পুঁজির হলকা ভেতরে ভেতরে ফোঁপরা করে ফ্যালে সবকটা ইজমকে ।

চীন দেশে কমিউনিজম ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছিল, তাই ওরা নতুন উপায় বার করলে, বললে সর্বহারা হওয়া ভালো নয়, গরিব হওয়া ভালো নয়, উদ্বাস্তু হওয়া ভালো নয়, ন্যাড়ের জীবন ভালো নয়, যে করেই হোক ইংরেজি শিখতেই হবে , ব্যাস, ওরা এখন সবচেয়ে বেশি ক্ষমতাধর দেশ, ওদের চেপ্টা নাক প্রতি বছর একটু-একটু করে উঁচু হয়ে চলেছে। ওরা সব রকমের মাংস খায়, যেকোনো প্রাণী হলেই হলো, ঘাস থেকে ফড়িং তুলে খেতে ভালোবাসে, তেঁতুলে বিছের বড়া খেতে ভালোবাসে, রাস্তার ধারে কাঠিতে গিঁথে সাপের ফুলুরি বিক্রি করে । যখন মনোজ বসুর সঙ্গে চীনে গিয়েছিলুম, তখন খেয়েছি ।

যারা চীনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান হাঁকতো, তারা বাঙালির গাঁ-গেরাম-গঞ্জ-শহর থেকে উধাও । চীনও সেই চেয়ারম্যানকে উধাও করে দিয়েছে ।

এই যে গোরু-মোষের মাংস খাই, তার কোনো শাস্ত্রগত ভুল নেই, কিন্তু হিন্দিওয়ালারা, যারা শাকাহারি, মানে শাক দিয়ে ঢেকে টাকা খায়, টাক পড়ে গেছে বলে টিকি ঝরে গেছে, টিনের ত্রিশূলকে মনে করে সমাজ পালটানোর তত্ব, ভাবে, তাদের যা শেখানো হয়েছে তা-ই তো তারা ভাববে,  মনে করে, গোরু-মোষ খেলে নরকে যাবে।

কী বোকামি বলুন ! আরে আমি তো হিন্দু, বার বার জন্মাই, জন্মাবো, জন্মেছি, সেখানে নরকে যাওয়া স্বর্গে যাওয়ার গোলমাল আসছে কোথ্থেকে শুনি, অ্যাঁ !

মহাভারত বইয়ের, মহাভারত তো আমাদের ইতিহাস, কী না, অ্যাঁ, ব্যাসদেবজীর লেখা, তা ওই ইতিহাসের অনুশাসন পর্বে পাণ্ডবদের ক্যাবলা বড়ো ভাই যুধিষ্ঠিরকে ভীষ্ম বলেছিলেন শ্রাদ্ধে যাদের নেমন্তন্‌ করা হয়েছে তাদের যেন গোরুর মাংস ভালো করে রেঁধে খাওয়ানো হয়, তাহলে পূর্বপুরুষরা স্বর্গসুখ পাবেন ।

বিরাট রাজা তো পুরো একটা খাটাল খুলেছিলেন টেস্টি-টেস্টি গোরু পোষার জন্য, এখনকার দিন হলে অবশ্য সেগুলো পাচার হয়ে যেতো আর গৌরাক্ষসরা পাচারকারীদের আড়ং ধোলাই দিয়ে তক্তা করে মাটিতে মিশিয়ে দিতো ।

আরেকটা ইতিহাস, যেটা বাল্মীকিজি লিখেছিলেন, তাতে আছে যে বনবাসের পথে রাম-সীতা-লক্ষ্মণ যখন ভরদ্বাজ মুনির আশ্রমে পৌঁছেছিলেন, তখন ভরদ্বাজ সন্ন্যাসি ওনাদের মধুপর্ক, বৃষমাংস আর ফলমূল দিয়ে লাঞ্চ করিয়েছিলেন । বাল্মীকিজি শুদ্দুর ছিলেন শুনেছি, নারদের আশীর্বাদে ব্রাহ্মণ হয়ে গিসলেন ।

চাণক্যর কথা তো জানেন, যাঁর সমান আই কিউ সেই সময়ে কোনো পণ্ডিতের ছিল না, উনি অর্থশাস্ত্র বইতে লিখে রেখে গেছেন যে রাখালরা মাংসের জন্য ছাপ দেয়া গোরুর মাংস কাঁচা কিংবা শুকিয়ে বিক্রি করতে পারে । ছাপ দেয়া মানে এখন যাকে বলে আধারকার্ড ।

তারপর চরক, ওই যিনি ডাক্তার ছিলেন, উনি ওনার সংহিতায় লিখে গেছেন যে গোরুর মাংস খেলে বাত, নাক-ফোলা, জ্বর, শুকনোকাশি, রোগা হয়ে যাওয়া, পেট গরম সারে । চরক কিন্তু সত্যিকারের ডাক্তার, দেড়-দুকোটি টাকা দিয়ে এমবিবিএস আর এমডি হতে হয়নি ।

ব্যাপারটা আমি জানি, তার কারণ বাবর আর ইব্রাহিম লোদি দুটো পার্টিকেই পানিপতের যুদ্ধের সময়ে আমি মাংস নুন তেল কাঠকয়লা সাপলাই দিতুম । সেই জন্মে আমার নামছিল হুলিকাঞ্চন গুপ্তা, বেনের বাড়ি জন্মেছিলুম, বাপ-ঠাকুর্দা আগে থাকতেই ব্যবসার ঘাঁতঘোঁত জানতো, সিংহাসনে যে পার্টিই বসুক না কেন, মাল তাকে তো বেচবেই, তার শত্তুরকেও বেচবে । শত্তুরকে একটু বেশি দামে খারাপ মাল বেচবে, যাতে যে সিংহাসনে বসে আছে, সে চটে না যায় । বেনে বলে আমরা ছিলুম শাকাহারি, দইয়ের রায়তা দিয়ে পুদিনার পরোটা খেতুম, কিন্তু ব্যবসা তো যেকোনো জিনিস নিয়ে করা যায়, কেনবার পার্টি হলেই হলো ; এই যে আজকাল বুদ্ধি ছড়ানোর এতো বই বিক্রি হচ্ছে, তাও তো ব্যবসা, মুকখুরা তো কিনছে ঝাঁপিয়ে পড়ে ।

বাবর এসেছিল বাইরে থেকে, নাক চেপটা, দাড়িতে চারটে চুল, গোঁফে দুটো করে, সেই চেঙ্গিজ খানের বংশধর, যার তত্ব ছিল ধরো আর মারো, মেয়েদের লোটো আর তুলে নিয়ে যাও, বাড়িঘর পুড়িয়ে পাবলিকদের ভাগাও । সেই  টেকনিক রপ্ত করে তিনি আজ অমর, ওনার স্টেনলেস স্টিলের বিরাট মূর্তি বসেছে মোঙ্গোলিয়ার ফাঁকা মরুভূমিতে, সেই চেঙ্গিজ খান, তার কোনো এক প্রজন্ম ছিল বাবর, চেঙ্গিজ খানের একশো আটাত্তরটা বউ ছিল, বাবর নিশ্চয়ই কোনো তাগড়া বউয়ের নসল থেকে জন্মেছিল ।

আসবার আগে বাবর এদেশের কিছুই জানতো না, শুধু তরমুজ খাওয়া জানতো । তবে বাবর লোকটা দিন নেই দুপুর নেই রাত নেই সন্ধে নেই লড়ে লড়ে যুদ্ধু  বিশেষজ্ঞ হয়ে গিয়েছিল, সেই তখনকার দিনে, মানে ১৫২৬ সালে, মোটে পনেরো হাজার সেনা নিয়ে সুলতান ইব্রাহিম লোদির চল্লিশ হাজার সেনাকে গুহারান হারিয়ে দিলে,  তার কারণ বাবরের ছিল কামান বন্দুক আর ঘোড়সওয়ার, যখন কিনা ইব্রাহিম লোদির এক হাজার হাতি বাবরের কামানের গোলায় ক্ষেপে গিয়ে নিজের সেনাদেরই পায়ে পিষে মেরে ফেললে, তাছাড়া সুলতানের সেনায় অনেক হিঁদু ছিল যারা মাংস খেতে চাইলে না, তাদের জন্যে ফলমূল চালডাল সাপলাই দিতে হয়েছিল, তারা বোধহয় ভেবেছিল নেড়ের সঙ্গে নেড়ে লড়ে মরুক, আমাদের তাতে কি, এক নেড়ে গিয়ে আরেক নেড়ে আসবে, অবস্হা যে কে সেই ।

বাবরের পার্টি অনেক দূর দেশ থেকে এসেছিল বলে ওদের শুকনো মাংস খাইয়ে চালিয়ে দিয়েছিলুম, শুকনো মাংসই ওরা পছন্দ করতো, সঙ্গে কাঁচা মাংস নিয়ে তো আর যুদ্ধুর মাঠে যাওয়া যায় না । সেনারা তো সবাই নেড়ে, মাংস পেয়ে বাবর কতো যে সোনাদানা দিয়েছিল, বাড়িতে মাটির তলায় পুঁতে রাখতে হয়েছিল । এই যে শেষ পর্যন্ত বাবর জিতে গেল, তা তো আমাদের সাপলাই দেয়া শুকনো মাংসের জোরে, নয়তো ভারতে মোগল সাম্রাজ্য হতেই পারতো না । সিংহাসনে হাঁটু মুড়ে বসেও বাবর শুকনো মাংসের দোপেয়াজা রিজালা খেতে চাইতো, এক পিস তরুমুজ খেয়ে এক কামড় রিজালা, তখন জোরে ঢেঁকুর তোলা আর পাদায় ছিল সম্রাটদের একচ্ছত্র অধিকার ।

একটা উড়ুক্কুমাছ লাফিয়ে উঠে বলল, গুড স্পিচ ।

বাবরের ছেলেও রাজকুমার, বড্ডো রোগে ভুগতো, সাত মাসের মাথায় পয়দা হয়েছিল, হুমায়ুন, সেও বেশি দিন সিংহাসনে টিকলো না, আটচল্লিশ বছর বয়সে ওই যাকে বলে ইন্তেকাল, তাই করলো, যখন কিনা বাবর পশ্চিম দিকে মুখ করে নিজের জীবনের বদলে ছেলেকে বাঁচিয়ে রাখতে বলেছিল । পরে একজন কাব্যলিখিয়ের সুবিধে হল বাবরের পশ্চিমমুখো দোয়া চাইবার ব্যাপারটা নিয়ে ; না, বাবরের ভাষায় নয়, সুতানুটি-গোবিন্দপুরের ভাষায় ।

হুমায়ুন বড্ডো আফিম খেতো, নেশার ঘোরে সিঁড়ি থেকে গড়িয়ে ইন্তেকাল করেছিল, তার দোষ আমার বাপ-ঠাকুর্দার ওপর এসে পড়েছিল, ভালো জাতের আফিম সাপলাই করার জন্য, আমরা তো ওনার দরবারের সকলকেই, যারা আফিম ভালোবাসতো, তাদের বিশুদ্ধ আফিম সাপলাই দিতুম । তারপর থেকে বিশুদ্ধ জিনিস বিক্রি বন্ধ করে সবেতেই ভেজাল মেশাতে হয় ।

হুমায়ুনের পরে যে সিংহাসনে বসল, সে সত্যিই কচি খোকা রাজকুমার, আকবর । উনিও যুদ্ধু করতে ভালোবাসতেন, আমারাও শুকনো মাংস সাপলাই করতে ভালোবাসতুম ।

আমি যে রাজকুমারের হৃৎপিণ্ড নিয়ে সুতানুটি-গোবিন্দপুরে ফিরছি, সেই রাজকুমারের বাপ-ঠাকুর্দা চালাক-চতুর লোক ছিলেন, সিরাজের দলকে সমর্থন করেননি ; বিলেতের সায়েবদের পক্ষে ছিলেন, যেমন ছিলেন কৃষ্ণচন্দ্র, যাকে সায়েবরা রাজা করে দিলে, রাজা নয় মহারাজা, আলিবর্দি খাঁ তাকে জেলে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন, খাজনা দিতে পারেননি বলে, কিন্তু লোকটা ঘোড়েল, যেদিকে হাওয়া বয় সেই দিকে মুখের তত্বে বিশ্বাস করতেন ।

অন্য দেশে জামশেদজি টাটা, ঘনশ্যামদাস বিড়লা, ধিরুভাই আমবানি, আজিম প্রেমজি, নারায়ণ কৃষ্ণমূর্তি, রাহুল বাজাজ, ওয়ালচাঁদ হীরাচাঁদ, পালোনজি মিস্ত্রি, ইন্দু জৈন, কস্তুরভাই লালভাই, জামশেতজি জিজিভয়, টি ভি সুন্দরম আইয়ার, নবীন জিন্দল, অজিত গুলাবচাঁদ, আনন্দ মহেন্দ্র, অজয় পিরামল, আরদেশির গোদরেজ, বি এল মুঞ্জল, জি আর গোপীনাথ, কিরণ মজুমদার শা, এল আর কিরলোসকর, শিব নাদার, ভেনুগোপাল ধুতদের মতন ধনী পাঁয়তাড়া-বিশেষজ্ঞ জন্মেছেন , অথচ রাজকুমারের পর,  আমার এই-ওই জন্মে আমাদের দেশে কেউই অমন হতে পারল না ।

রাজকুমার বিশ্বাস করতেন ইউরোপীয় বৌদ্ধিক প্রগতিতে, সময়ের সামাজিক প্রগতিতে, যুক্তিবাদী বিচার বিবেচনা আর বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের সাহায্যে পাওয়া মুক্তিতে, ইতিহাসের এমন এক গতিতে যার গড়াগ্গড়  রাস্তা হলো মানব কল্যাণমুখী । গোঁড়া হিন্দু বাঙালির মামদোবাজি থেকে সমাজকে ছাড়িয়ে এনে আরও তাড়াতাড়ি বাঙালির জীবনে যুক্তি আর বিচারবুদ্ধির ভূমিকাকে গূরুত্ব দিতে চেয়েছিলেন উনি, কিন্তু সেই জন্যে সকলেই ওনাকে ইউরোপের নকলনবীশ বলে দুষতে লাগলো । বিলেতে গিয়ে ইউরোপীয়দের এমন তারিফ করলেন যে সে খবর পেয়ে সুতানুটি-গোবিন্দপুরের হিন্দু নেতারা খাপ্পা ।

রাজকুমার কি কখনও বিষাদে ভুগেছেন ? নাহ, কক্ষোনো নয় ।

হ্যাম, টেণ্ডারলয়েন, ফিলেটো, কোপা, বোস্টন বাট, হকস, চপস, রিবটিপ, জোল, বেকন, স্পাটা, টেস্টা কিংবা সালামির সঙ্গে দুপেগ  সিঙ্গল মল্টে বিষাদ ছাক্কাস।

হায়, কম বয়সেই মারা গেলেন রাজকুমার ।

রাজকুমার পড়ে যেতে পারলেন না ওনার জগৎবিখ্যাত নাতির এই লেখা, ‘সুবিচারের অধিকার’ শিরোনামে নাতি লিখেছিলেন, “মুসলমান ভ্রাতাদের প্রতি ইংরেজের স্তনে যদি ক্ষীরসঞ্চার হইয়া থাকে তবে তাহা আনন্দের বিষয়, কিন্তু ‘আমাদের’ প্রতি যদি কেবলই পিত্তসঞ্চার হইতে থাকে তাবে সে আনন্দ অকপটভাবে রক্ষা করা কঠিন হইয়া উঠে।”

রাজকুমার পড়ে যেতে পারলেন না ওনার জগৎবিখ্যাত নাতির এই লেখা, ‘স্বামী শ্রদ্ধানন্দ’ শিরোনামে নাতি লিখেছিলেন, “অতএব যদি মুসলমান মারে আর ‘আমরা’ পড়ে পড়ে মার খাই — তবে জানব, এ সম্ভব করেছে শুধু ‘আমাদের’ দুর্বলতা । আপনার জন্যেও, প্রতিবেশীর জন্যেও, ‘আমাদের’ নিজেদের দুর্বলতা দূর করতে হবে । ‘আমরা’ প্রতিবেশীদের কাছে আপিল করতে পারি, ‘তোমরা’ ক্রুর হোয়ো না, ‘তোমরা’ ভালো হও, নরহত্যার উপরে কোনো ধর্মের ভিত্তি হতে পারে না — কিন্তু সে আপিল যে দুর্বলের কান্না।”

হায়, রাজকুমার পড়ে যেতে পারলেন না, সতেরো বছর বয়সে লেখা ‘দেবদাস’ উপন্যাসের লেখকের জ্ঞানবাক্যি, যা নিয়ে কতোবার যে সিনেমা হয়েছে কতো ভারতীয় ভাষায়, দেবদাস সেজেছে ফণী শর্মা, প্রমথেশ বড়ুয়া, কে এল সায়গল, নাগেশ্বরা রাও, দিলিপ কুমার, হাবিব তালাশ, ঘাট্টামামেবি কৃষ্ণ, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, বুলবুল আহমেদ, ভেনু নাগাভাল্লি, প্রসেনজিৎ চ্যাটার্জি, শাহরুখ খান, অভয় দেওল, নাদিম শাহ, শাকিব খান, রাহুল ভাট, সেই   লেখকের ‘বর্তমান হিন্দু-মুসলমান সমস্যা’ শিরোনামে এই মতামত, “হিন্দুস্তান হিন্দুর দেশ । সুতরাং এ-দেশকে অধীনতার শৃঙ্খল হইতে মুক্ত করিবার দায়িত্ব একা হিন্দুরই । মুসলমান মুখ ফিরাইয়া আছে তুরস্ক ও আরবের দিকে, — এ দেশে তাহার চিত্ত নাই । যাহা নাই তাহার জন্য আক্ষেপ করিয়াই বা লাভ কি, এবং তাহাদের বিমুখ কর্ণের পিছু পিছু ভারতের জলবায়ু ও খানিকটা মাটির দোহাই পাড়িয়াই বা কি হইবে । আজ এই কথাটাই বুঝিবার প্রয়োজন হইয়াছে যে এ কাজ শুধু হিন্দুর, — আর কাহারও নয় ।”

হায়, রাজকুমার দেখে যেতে পারলেন না তাঁর প্রপৌত্রের আঁকা ভারতমাতা ।

তুই কী করে জানলি দেখিনি ? আমি তো আগাম দাঙ্গাও দেখে ফেলেছি ।

হায়, রাজকুমার দেখে যেতে পারলেন না তাঁর ছেলের অতিবামুন কাল্টের নিরাকার পরমব্রহ্ম কেমন করে ছবি আঁকার পৌত্তলিকতায় পৌঁছে গিয়েছিল ।

তুই জানিস না, আমি তখনই জানতুম, কোথাকার ঠাকুর-দেবতা কোথায় পৌঁছোবে ।

হৃৎপিণ্ড : আর কতো দূর হুলি ?

আমি : আরও তিন মাস, রাজকুমার ।

 

রাজকুমার আমায় বলেছিলেন যে, আমবাগানে পড়াশুনা শেখাবার  বদলে, দোলখেলার নাচানাচির বদলে, বাউলদের ছিলিমটানা হইচইয়ের বদলে, একটা ইন্সটিউট অফ টেকনোলজি খোলার ইচ্ছে ছিল তাঁর, উনি বেঁচে থাকলে তা-ই করতেন, ওনার অতিবামুন কাল্টগুরু হবার আদেখলাপনা ছিল না ; জমিদারি আর ব্যবসা অবহেলা করে ওনার ছেলে অতিবামুন কাল্টগুরু হয়ে গিয়েছিল বলে রাজকুমার মারা যাবার আগের বছর, ১৯৪৫ সালের মে মাসে  কড়া চিঠি লিখেছিলেন তাকে, মনে আছে আমার :

“আই হ্যাভ দিস মোমেন্ট রিসিভড ইয়োর লেটার অফ ৮থ এপ্রিল অ্যাণ্ড কোয়াইট ভেক্সড উইথ দি নেগলিজেন্স শোন বোথ অন দি পার্ট অফ রাজা বরদাকান্ত অ্যাণ্ড ইয়োর ওন মোক্তারস অ্যাবাউট দি সেল অফ শাহুশ তালুক । অ্যাজ ফর দি ফরমার, হি ডাজ নট কেয়ার এ পাইস অ্যাবাউট হিজ ওন অ্যাফেয়ার্স — বাট হাউ ইয়োর সারভেন্টস ক্যান শেমফুলি নেগলেক্ট টু রিপোর্ট দিজ ম্যাটার্স ইজ সারপ্রাইজিং টু মি । অল দ্যাট আই হ্যাভ হিদারটু হার্ড ফ্রম আদার কোয়ার্টার্স, অ্যাজ ওয়েল অ্যাজ হোয়াট মিস্টার গর্ডন হ্যাজ রিটন টু মি অ্যাবাউট ইয়োর আমলাজ নাউ কনভিনসেস মি অফ দি ট্রুথ অফ দেয়ার রিপোর্টস । ইট ইজ ওনলি এ সোর্স অফ ওয়ানডার দ্যাট অল মাই এসটেটস আর নট রুইনড । ইয়োর টাইম, আই অ্যাম শিওর, বিইং মোর টেকন আপ ইন রাইটিং ফর নিউজপেপার্স অ্যাণ্ড ইন ফাইটিং উইথ দি মিশনারিজ দ্যান ইন ওয়াচিং ওভার অ্যাণ্ড প্রোটেক্টিং দি ইমপরট্যান্ট ম্যাটার্স হুইচ ইউ লিভ ইন দি হ্যাণ্ডস অফ ইয়োর ফেভারিট আমলাজ — ইনস্টেড অফ অ্যাটেণ্ডিং দেম ইয়োরসেল্ফ ভিজিল্যান্টলি ।”

হাবশিকে বলছিলুম, ও বুঝুক বা না বুঝুক, জানিস, রাজকুমার বলেছিলেন, বুঝলি হুলি, ধনী হবার চেষ্টা করবি, পয়সাঅলা হবার চেষ্টা করবি, বৈভবশালী হবার চেষ্টা করবি,  ব্যবসাদার হবার চেষ্টা করবি, কারখানা খোলার চেষ্টা করবি । অতিবামুন হবার চেষ্টা করিসনি, জাতধর্ম যাক চুলোয় । ধর্ম নিয়ে এতো ঢাকঢোল পেটাবারই বা কী দরকার ।

উড়ুক্কু মাছ দুটো লাফিয়ে উঠে বললে, গুড ফিলোজফি, বাট বেঙ্গলিজ লাভ হোয়াইট কলার জবস ।

রাজকুমারকে  যদি সুতানুটি-গোবিন্দপুরের ইংরেজরা, যারা নেটিভদের ভালো চোখে দেখতো না, আর বাড়ির লোকেরা, জলচল বন্ধ করে একঘরে  না করতো, তাহলে উনিও ধিরুভাই আম্বানি হতে পারতেন, এমনকি ওদের থেকে অনেক এগিয়ে থাকতে পারতেন, ধিরুভাই আম্বানিও তো আরবদেশে ভুঁড়িকাঁপানো মেয়েদের নাচ দেখতো।  তবে রাজকুমারের দোষ ছিল যে উনি কারখানা বসাবার চেয়ে সবকিছু কেনা আর বেচায় এতো জড়িয়ে পড়েছিলেন যে পরে গিঁট খুলে বেরোতে পারেননি, নয়তো রানিগঞ্জ থেকে কলকাতা, বর্ধমান থেকে হাওড়া  পর্যন্ত রেল লাইন উনিই বসিয়ে দিতেন ।

ধিরুভাইয়ের বিরাট কারখানা কেমন খেপে-খেপে  বিদেশ থেকে লুকিয়ে আনা হয়েছিল তা কি আর আমি জানি না, সকলেই জানে, ওনার মা, ছেলেরা, গাঁয়ের লোকেরা, দিল্লির নেতারা, কিন্তু কই ওনার কাগজপত্র তো ওনার নাতিরা পুড়িয়ে দেয়নি, উল্টে ওনার বড়ো ছেলে বড়োলোকদের মধ্যে সবচেয়ে বড়োলোক হয়ে গেল । সেই কারখানা বসানোর তিকড়মবাজি নিয়ে সিনেমাও হলো, ওনাদের কিন্তু কেউ কমপ্রাডর বলে টিটকিরি মারে না, তার কারণ যারা টিটকিরি মারতো তারা আজ ভিখিরি । এক নৌকরি দে দে ও বাবু, ভগবান তেরা ভলা করেগা, ভিক্ষে করে মরে ।

বড়োলোক হতে হলে যা দরকার রাজকুমারের চরিত্রে কাজকম্মে সবই ছিল, বাধ সাধলো ওনার আশেপাশের বাঙালিরা আর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হিংসুটে সায়েবরা  ।

বাংলার ইতিহাসে রাজকুমার ছিলেন প্রথম প্রেমিকবয় ।

উনি যে মারা গেলেন সে খবর অব্দি কলকাতায়, পৌঁছোয়নি, তখন তো আর পাবলিকের জন্যে টেলিগ্রাফ ছিল না, ফোনও ছিল না, চিঠি পৌঁছোতেই তিন মাস লাগতো, বিলেতে কোথায় কবর দেয়া হয়েছিল, তা খুঁজে বের করতেই কতোকাল লেগে গিয়েছিল।  কেমন বংশ রে বাবা ।

ওনার বাড়ির লোকে গঙ্গার ঘাটে কুশপুতুল জ্বালিয়ে অন্ত্যেষ্টি করলে, এখন ওনার হৃৎপিণ্ড নিয়ে যাচ্ছি আসল শ্রাদ্ধের জন্যে, জানি না কী করবে বাড়ির লোকে, হয়তো লুকিয়ে ফেলবে । অতিবামুন কাল্টের তো নতুন হুজুগ জেগেছে, সব ঠাকুরদেবতাকে এক জায়গায় জড়ো করে তাদের হাপিশ করে ফেলে সেই ফাঁকা জায়গাটাকে পুজো করা, নিরাকার গোল্লাছুট যাকে বলে ।

নেইকে পুজো করা আর নেইকে পুজো না করার মধ্যে তফাত আছে কোনো ? বলুন দিকি ।

রাজকুমার যখন সুতানুটি-গোবিন্দপুরের বাড়িতে থাকতেন তখন রোজ বাড়ির ঠাকুদেবতার ঘরে বসে কতোক্ষণ পুজো করতেন, তখন তাঁকে কেউ ডাকতে পারতো না, লোকে দেখা করতে এলেও দু’ঘণ্টা বসে থাকতে হতো । যারা নেইকে পুজো করতে লাগলো তারা ওনাকে কতো যে হ্যাটা করেছে তা ইয়ত্তা নেই ।

হ্যাঁ, বলতে ভুলে গেছি, ঠগীর একটা দল বাঘিনীর বাচ্চাদের সঙ্গে আমাকে জন্মাতে দেখে নিজেদের দলে নেবার জন্যে তক্কে তক্কে ছিল, তার কারণ আমার মাথার চুলের রঙ ছিল আগুনের মতন, বাঘিনী মায়ের কাছ থেকে পাওয়া । একদিন ওদের দলটা আমাকে কম্বল চাপা দিয়ে ধরে নিজেদের আস্তানায় নিয়ে গিয়ে জেরা করে জানতে চেয়েছিল যে ওরা সবাই তো ওদের মায়ের সামনে দিক থেকে জন্মেছে,  তাহলে আমি কোন যাদুবলে বাঘিনীর পেছন দিক থেকে জন্মালুম ।

ঠগীর দল আরও অবাক হলো যখন দেখলো যে প্রতি বছর আমার বয়স চার বছর বেড়ে যায়, যার দরুণ আমি পাঁচ বছর বয়সে কুড়ি বছরের হয়ে গিসলুম । আঠেরো বছর বয়সে আমাকে শেখানো হলো কেমন করে সিল্কের হলদে রুমালে দুটো রুপোর সিক্কা  বেঁধে পেছন দিক থেকে মানুষ খুন করতে হবে, একজন পা চেপে ধরবে, একজন মাথা মাটিতে চেপে ধরবে আর একজন গলায় ফাঁস দেবে ।

ঠগীজন্মের রুপোর টাকাগুলো যদি লুকিয়ে রাখতুম, তাহলে এই জন্মে বিলেত আমেরিকার নিলামঅলাদের দিয়ে অনেক টাকা রোজগার করতে পারতুম ।

আমাদের ঠগী সর্দারের মোহোল্লা আর লোকাল কমিটির ক্যাডাররা  আশেপাশের গাঁয়েগঞ্জে লোক পাঠিয়ে খবর যোগাড় করতো, কোন পথ দিয়ে বানিয়ারা তীর্থযাত্রীরা যাবে, কখন যাবে, আর সেই খবর অনুযায়ী আমরা রাস্তার ধারে লুকিয়ে ওৎ পেতে থাকতুম, এখন যেমন মাওবাদীরা পুলিশ মারার জন্যে রাইফেল হাতে লুকিয়ে থাকে আর দনাদ্দন গুলি ছোঁড়ে । পাশের রাষ্ট্রের ছোঁড়ারা যেমন এদেশে কয়েকজনের ঘুমন্ত গোষ্ঠী তৈরি করে বোমা মারার জন্য প্যাঁচ কষে, তেমনি আমরা তিনজন ঠগীর ক্যাডার তৈরি করে তক্কে তক্কে থাকতুম ।

আমাদের ঠগী দলটা এক রাতে স্লিম্যান নামে একজন সাহেবের পাতা ফাঁদে ধরা পড়ে গেলুম । সকলের সঙ্গে আমারও ফাঁসি হয়েছিল, কিন্তু আমি যখন বললুম যে আমাকে কোনো বাঘের খাঁচায় হাতপা বেঁধে ফেলে দেয়া হোক তখন সাহেবরা তাই করেছিল । দুটো বাঘ আমাকে কেমন করে খাচ্ছে দেখার জন্য সাহেব মেমরা ঝিলমিলে চকরাবকরা পোশাক, পালকদেয়া রঙিন টুপি পরে সকাল থেকে জড়ো হয়েছিল । তাদের অমন জড়ো হতে দেখে পরে গোবিন্দপুরের বাইরে একটা চিড়িয়াখানা খোলা হয়েছিল, যেখানে শাদা চামড়ার সাহেব-মেমরা যেতো, পরে বাদামি চামড়ার সাহেব-মেমরা, আরও পরে ধুতি-শাড়ি শার্ট-প্যান্ট পরা দেশি পাবলিকরা, এতো পাবলিক হতে লাগলো যে তাদের তিতকুটে ঘামের গন্ধে চিড়িয়াখানার মাটি থেকে সব ঘাস লোপাট হয়ে গেল ।

ঠগীর দলে প্রথম দিন ছিল আমার খুনোখুনি-লুটপাটের শিক্ষানবিশির, তাই রাস্তার ধারে জঙ্গলের আড়ালে ওৎ পেতে তীর্থযাত্রীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে আমি খুন করিনি । যারা খুন করলো তারা তীর্থযাত্রীদের টাকাকড়ি সোনাদানা কেড়ে নিয়ে  মরা লোকগুলোর পেছন দিক দিয়ে আর মরা মেয়েমানুষদের সামনে দিক দিয়ে ঝর্ণাপতন খেলা খেললো, তারপর তাদের হাড়গোড় ভেঙে আগে থাকতে খুঁড়ে রাখা গর্তে কবর দিয়ে দিলে, তার ওপর এক বস্তা পাথুরে নুন ।

আমরা ঠগীরা পয়দা হয়েছিলুম মা-ভবানী, মানে মা কালীর ঘাম থেকে । দেবীমূর্তিই তিরিশ ইঞ্চির সিল্কের রুমালে বাঁধা সিক্কা দিয়েছিলেন ।

শিখে যাবার পর আমি শুধু মেয়েমানুষদের খুন করতুম, সে তার বয়স যতোই হোক, ওই পেছন দিক দিয়ে আমি কিছু করতে পারতুম না, কেননা আমি বাঘিনী মায়ের পেছন দিক দিয়ে জন্মেছিলুম, দলের ঠগী ক্যাডাররা  বলতো যে মেয়েমানুষদের ছেড়ে দেয়া উচিত, খুন করা তো এক্কেবারে অনুচিত, আর খুনের পরে সামনে দিয়ে ঝর্ণাপতন খেলা নোংরামির চূড়ান্ত । আমি বলতুম যে ঠগী কভাডারই যখন হয়েছি, তখন আবার নোংরামি নিয়ে ভাববো কেন, যতো রকমের নোংরামি হয় চালিয়ে যাবো ।

এখনকার দিনের ঠগীরা এই ধরনের খেলা ট্যাক্সিতে, বাসে, আড়ালে করে বেড়ায়, লুকিয়ে নয়, খোলাখুলি, বুক ফুলিয়ে । যে যতো নোংরামি করতে পারে, তার ততো বেশি ফোটো কাগজে ছাপা হয়, টেলিভিশনের পর্দায় দেখানো হয়, টেলিভিশনে দেখানো আর কাগজে ছাপা হবে জেনে তারা ছ্যাদলাপড়া দাঁত বের করে হাসে ।

এই যে লুট শব্দটা ইংরেজিতেও তিনশো বছর যাবত চালু,  শব্দটা তো আমরা, ঠগী ক্যাডাররাই, ইংরেজদের দিয়েছিলুম । ওরা কোনো শব্দ চুরি করতে কুন্ঠিত হয় না, যেমন কুন্ঠিত হয় না অন্য দেশের মালপত্তর হাতাতে। একে ওরা বলে ইউরোপিয় মূল্যবোধ ।

হায়, রাজকুমার দেখে যেতে পারলেন না, গরিবের টাকা লোটার লুচ্চাদের ।

তুই জানিস না, আমি আগাম দেখে যেতে পেরেছি, আর এরাই কিনা আমায় বদনাম করে দিয়েছিল।

হায়, রাজকুমার দেখে যেতে পারলেন না, বাড়ির চালে আগুন লাগিয়ে সর্বস্ব লোটার লাফাঙ্গাদের ।

তুই জানিস না, চোখ বুজে আমি জ্বলন্ত খেত-খামার আর চালাবাড়ি দেখেছি ।

এক বছরে চার বছর করে বাড়তে থাকার দরুন ষোলো বছর বয়সে আমার চৌষট্টি বছর বয়স হয়ে গেলে আমাকে সবাই মিলে ঠগীদলের হাইকমাণ্ড-পলিট ব্যুরোর নেতা করে দিলে, লুটপাটের সোনাদানা টাকাকড়ি আমিই ভাগ-বাঁটোয়ারা করে দিতুম । হুলিঠগী নামে আমি বিখ্যাত হয়ে উঠলুম, গাঁয়ে-গাঁয়ে আমার নাম নৈরাজ্যের নাট্যকার হিসাবে ছড়িয়ে পড়েছিল । আমার ভয়ে রাতের দিকে মানুষ দলবেঁধেও বেরোতো না ।

হুলিঠগীর মা-ভবানী নামে যে কালীবাড়িতে বউরা পাকা তাল  আর মুলো নিয়ে আজকাল পুজো দিতে যায়, সেই মন্দির আমিই প্রতিষ্ঠা করেছিলুম, লুটের টাকায় । লুটের টাকা না হলে মানুষ কিছুই প্রতিষ্ঠা করতে পারে না । প্রতিষ্ঠান মানেই লোটালুটির কারবার ।

এখন বুদ্ধিমান পাঁয়তাড়াবাজরা পনজি-স্কিম নামে লুটের টাকা যোগাড়ের খেলা আরম্ভ করেছে, অনেকে সেই খেলা খেলতে গিয়ে ল্যাংটো পোঁদে বাড়ি ফিরেছে, অনেকে আত্মহত্যা করে নিয়েছে, কিন্তু লুটের টাকা সেই যে একবার ওরা হাতিয়ে নিলে, তারপর সেসব টাকাকড়ি যে কোথায় ডানা মেলে উড়ুক্কু মাছ হয়ে গেল কেউই জানতে পারলে না । মূর্খগুলো ভাবলোই বা কী করে যে টাকা খাটিয়ে হুশহুশিয়ে ডবল করা যায় ! টাকার কি মানুষের মতন ফিবছর বাচ্চা হয় !

রাজকুমারের হৃৎপিণ্ড বললে, বাঙালি আর বাঙালি নেই, মহামূর্খের কৌম হয়ে গেছে ।

         আমার নাম হুলি, এখন আমি জাতে শুদ্দুর, না চণ্ডাল-শুদ্দুর নয়, গন্ধবেনে, আড়কাঠির লোকেরা মা-বাপকে পালতোলা জাহাজে চাপিয়ে কালাপানি পেরিয়ে আখকাটার জন্যে ভিনদেশে নিয়ে চলে গিয়েছিল,  আমি তখন ঝুপড়িতে ছিলুম না, খোসা ছাড়িয়ে বস্তায় পোস্ত ভরছিলুম, আফিম চাষ না হলে বাঙালি কি আর পোস্ত খেতে শিখতো, অ্যাঁ ?

বাঙালিরা পোস্ত খেতে ভালোবাসে, আলুপোস্ত, পেঁয়াজ পোস্ত, ধুঁধুল পোস্ত, কাঁচা পোস্তবাটা সর্ষের তেল মেখে, পোস্তর বড়া,  সেই থেকে আমি রাজকুমারের বাড়ির চাকর, আসলে রাজকুমারের খাস-চাকর, ওনার আফিম কারখানায় কাজ করতো বাবা আর মা, কারখানা মানে অনেক উঁচু ছাদের ঘরে আফিমের বস্তা সাজিয়ে রাখা, আমিও খাটতুম, কিন্তু বেগার, আমার চোখ কটা বলে ছোটোবেলা থেকে আমার নাম হুলি।

কোম্পানি পাঁচ হাজার চাষিকে দিয়ে আফিম চাষ করাতো, আফিমের হিসেব রাখা, রপ্তানি করা, রপ্তানির খরচ-খতিয়ান লেখা, এই সবের জন্যে কোম্পানি অঢেল কেরানি, হিসেবের খাতা লেখার লোক আর ছড়িদারদের চাকরি দিয়েছিল। দিকে দিকে গজিয়ে উঠল বাঙালি কেরানির দল, বাবুর দল, তারা ভদ্দরলোক হবার চেষ্টা করে করে হেদিয়ে কাঁকুড় হয়ে গেল, কিন্তু বাংলাদেশে কেরানির পাল পয়দা করে গেল, সরকারি চাকরির জাঁতিকল পেতে যেতে পারলো ।

রাজকুমারের  সঙ্গে আমিও কালাপানি পেরিয়ে পালতোলা ক্লিপার জাহাজে চেপে বিলেতে গেছি, পরপর দু’বার, আমি শুদ্দুর বলে কালাপানি পেরিয়ে জাত যায়নি, কিন্তু রাজকুমারের  জাত চলে গিয়েছিল, যখন প্রথমবার গেলেন, ফেরার পর গঙ্গাজলে চান করিয়ে কুলীন পুরুত ডাকিয়ে নিজের জাতে ফিরেছিলেন, তা সত্ত্বেও ওনার ভারিভরকম বউ আলাদা ঘরে থাকতেন-শুতেন, ফলে রাজকুমার বিলেতে গিয়ে আশ মেটাতেন । জ্ঞানীগুণিরা রাজকুমারকে গ্রিস দেশের রাজা ক্রিসাসের সঙ্গে তুলনা করতেন, যিনি গ্রিসদেশের মানুষকে অনেক কালের জন্যে বড়োলোক করে তুলেছিলেন ।

রাজকুমারের কাজকারবারের দরুনই তো সুতানুটি-গোবিন্দপুর আর্থিক লেনদেনের কেন্দ্র হিসাবে গড়ে উঠল, দেখা দিলো অন্য রকমের মানসিক জীবন । শহুরে জটিলতার হ্যাঙ্গামের সঙ্গে নিয়মানুবর্তীতা, হিসাবনিকাশ, নিখুঁত হবার চেষ্টাচরিত্তির । বাঙালির, যে বাঙালি তখন বাঙালি হিসেবে গড়ে উঠছিল, তার গঠন-বিগঠনের গলনপাত্র হয়ে উঠল সুতানুটি-গোবিন্দপুর । গাঁগেরাম থেকে জনে জনে মানুষ এসে জড়ো হতে লাগলো, যারা একে আরেকজনকে চেনে না, বোকা-হাবার মতন তারা দিন আনি দিন খাইতে চরকিনাচন দিতে লাগলো ।

হায়, রাজকুমার দেখে যেতে পারলেন না তাঁরই অবদান হিসাবে সুতানুটি-গোবিন্দপুরে তাৎপর্য পেয়েছে জেলখানার গিজগিজে ডিগডিগে বিচারাধীন কয়েদি , থানার পেটমোটা ওসি যেন সাত মাসের অন্তঃসত্বা, চিনের রঙিন আলোয় ঝলমলে বেশ্যালয়, ভাটিখানার ঠেলাঠেলি, মল, মালটিপ্লেক্স, ডিসকো, নাইট ক্লাব, পাগলা গারদ, দেওয়ানি আর ফৌজদারি আদালতের চাকুরে বিচারক, মোক্তার, অপরাধী, পাগল, দ্রোহী, বিরোধী ।

হায়, রাজকুমার দেখে যেতে পারলেন না শহর এখন সংঘাতক্ষেত্র ।

তুই কেমন করে জানলি, ক্লাইভের পোষা গুণ্ডারা তো দেখিয়েছিল, সেটাই রিপিট হতে থাকে, শুনিসনি নাকি, হিস্ট্রি রপিটস ইটসেল্ফ ?

হায়, রাজকুমার দেখে যেতে পারলেন না লাঠিবাজ ক্যাডারের দল, কে কাকে কেন পেটায় কেউই জানতে পারে না ।

তুই জানিস না, আমি যেসব লাঠিবাজ পুষতাম, এরা তাদেরই বংশধর, তারা ধুতি পরতো বা লুঙ্গি, এরা প্যাণ্টালুন পরে, এই যা তফাত ।

হায়, রাজকুমার দেখে যেতে পারলেন না গাঁয়ে  গঞ্জে শহরে বেকার ছেলেদের ক্লাব নামের অলস আড্ডাখানা, যেখানে তারা দিনভর ক্যারাম আর তাস খেলে ।

আমি জানি হুলি, দিনভর লোকে চণ্ডীমণ্ডপে বসে গ্যাঁজাতো, দাবা খেলতো, এরা তাদেরই চেলাচামুণ্ডা।

হায়, রাজকুমার দেখে যেতে পারলেন না অকর্মণ্য বুকনিবাজ দলনেতা, দলদাস, মন্ত্রী, আমলা, ট্রেড ইউনিয়ান, কেরানি ইউনিয়ান নেতাদের ।

দেখেছি, দেখেছি, হিন্দুদের নেতারা আমার বিরুদ্ধে কতো বদনাম দিয়ে বেড়াতো, সেই তাদেরই তো রক্ত বইছে এখনকার বুকনিবাজদের শিরায়, আর তুই বলছিস আমি দেখে যেতে পারলুম না । আমার শবের বদলে কুশপুতুল পুড়িয়ে শ্রাদ্ধের সময়ে হিন্দুদের চাঁইরা কতো হ্যাঙ্গাম করেছিল ; ওদের কথা মানা হয়নি বলে ওরা একঘরে করে দিলে, আমার ছেলেরাও চটে-মটে হিন্দুদের থেকে আলাদা হয়ে গেল, আর আমার ব্যবসাও লাটে উঠে গেলো ।

চিনে আফিম চালানের জন্যে রাজকুমারের দুটো ক্লিপার জাহাজ ছিল, একটার নাম এরিয়েল, সেই যে সিলভিয়া প্লাথ এরিয়েল নামে কবিতার বই ছাপিয়ে ছিলেন, তা তো রাজকুমারের কাছ থেকেই পাওয়া । সিলভিয়া প্লাথের সঙ্গে রাজকুমারের দেখা হয়নি, রাজকুমার অনেক আগেই জন্মেছিলেন তো । সিলভিয়া প্লাথের যেমন অকাল মৃত্যু হয়েছিল, তেমনই এরিয়েল জাহাজেরও অকাল মৃত্যু হয়েছিল, কেননা জাহাজটাকে চীন বাজেয়াপ্ত করে নিয়েছিল, বিলেতি কোম্পানির ওসকানিতে, যারা রাজকুমারকে এক্কেবারে পছন্দ করতো না, এদিকে বাইরে-বাইরে দেখাতো কতোই না রাজকুমারকে ভালোবাসে ।

রাজকুমারের দুর্ভাগ্য ছাড়া আর কীই বা বলি, অন্য জাহাজটা, যার নাম ছিল ম্যাভিস, তার ওপর সমুদ্রে বাজ পড়ল একদিন, জাহাজ পুড়ে ছাই, বিলেতি কোম্পানিরা সে খবর পেয়ে মাগি-মরদের মদ গেলার আর আস্ত পোড়ানো শুয়োর খাবার আর নাচানাচির পার্টি দিয়েছিল । ওয়ান টু থ্রি ফোর, হোয়্যার ইজ দি পার্টি টুডে ? অন দিস ডান্স ফ্লোর, ঝিংকিচিকিং ঝিংকিচিকিং ঝিংকিচিকিং ।

রাজকুমারের বাড়িতে কেউই ওনাকে পছন্দ করতো না, অথচ ওনার টাকাতেই সবাই ফুটানি মারতো । এই যে রাজকুমারের এক ছেলের বারোটা বাচ্চা হলো, সাত ছেলে আর পাঁচ মেয়ে, তার খরচ যোগানো কি সোজা কথা, সেসব খরচের টাকা তো রাজকুমারের কাজকম্মো থেকেই আসতো, এখন খরচের মজাও নেবে আবার  রোজগারের উপায়কে খারাপ ভাববে, এ কেমন ধারা কথা বাপু, অ্যাঁ । বারোটা বাচ্চা বিয়োতে বউটার যে কষ্ট হয়েছিল, তা কি রাজকুমারের বড়ো ছেলে অনুভব করতে পেরেছিল ? রাতে বিছানায় গেলেন, মশারি টাঙালেন আর ব্যাস, অ্যাঁ, কী মানুষ রে বাবা, ধন্যি মহাপুরুষ । দিনের বেলা সকাল থেকে নেই-ঠাকুরের পুজো ।

রাজকুমারের টাকাতেই তো একটা বাঙালি রাজবংশ গজিয়ে উঠলো ; রাজকুমারের দেখাদেখি নিজেদের নামে নাথ জুড়তে হলো ।

বাঙালি পাবলিক অবশ্য মনে করে যে ওনার এক ডজন বাচ্চাকাচ্চা জরুরি ছিল, নয়তো বাঙালিরা নোবেল প্রাইজ পাবার গর্ব করতে পারতো না, নোবেলের মেডেল চুরি যাবার গর্ব করতে পারতো না, এই পার ওই পারের জাতীয় সঙ্গীতের গর্ব করতে পারতো না, যদিও ওই পারের দাড়িয়াল টুপিয়াল লোকেরা চোপোর দিন চেল্লাতে থাকে যে ওনার লেখা জিম্মি মালাউন জাতীয় সঙ্গীত চলবে না, কোনো পাকিস্তানিকে দিয়ে জাতীয় সঙ্গীত লেখাও । পাকিস্তানের জাতীয় সঙ্গীতের শিরোনাম দিয়ে হুমায়ুন আজাদ নামে এক জ্ঞানীগুণী মানুষ একটা বই লিখেছিলেন, তার জন্যে তাঁকে রামদা-কাটারি মেরে-মেরে কোতল করলে সউদি আরবের বাঙালি চুটকিদাড়ি ট্যাংরাটুপি খিদমতগাররা ।

রাজকুমারের বড়ো ছেলে নিজের অতিবামুন কাল্টের জন্যে  লিটল ম্যাগাজিন বের করা আরম্ভ করলে, বন্ধুবান্ধবদের জড়ো করে কফিহীন কফিহাউস  তৈরি করলে, সবই তো রাজকুমারের টাকায় । সেই টাকাকে তোমরা ঘেন্না করোনি, অথচ রোজগারের উপায়কে ঘেন্না করলে । কী আর বলি, বড়োলোকদের ব্যাপার-স্যাপারই ভিতরঘুন্না। তবে তারপর থেকে লিটল ম্যাগাজিন বের করার আর অতিবামুনগোষ্ঠী হবার চল আরম্ভ হতে পেরেছিল । সবচেয়ে পেল্লাই যে অতিবামুনগোষ্ঠী গড়ে উঠল তা বিগ ম্যাগাজিন, দুর্গন্ধবনিকের দরিয়া।

রাজকুমারের পরিবারও বামুন, তবে উঁচু বামুন নয়, কায়েত আর বামুনের মাঝ-মদ্যিখানে, তবে বদ্যি নয় । ঋগ্বেদের পুরুষ সুক্তয় বলেছে যে পুরুষের মুখ থেকে ব্রাহ্মণ, বাহু থেকে ক্ষত্রিয়, উরু থেকে বৈশ্য আর পা থেকে শুদ্র লোকেরা জন্মেছিল । যদি তাই হয় তাহলে পুরুষের মুখ থেকে বেরিয়ে কোথায় আটকে গিয়েছিলেন রাজকুমারের পরিবার যে খাঁটি বামুনের ছাতার তলা থেকে সরে গেলেন ।

রাজকুমারের এতো টাকাকড়ি থাকা সত্বেও  বাড়ির ছেলে আর মেয়েকে খাঁটিমার্কা বামুনরা বিয়ে করতে চায়নি, রুপোর সিক্কার পুঁটলি দিতে চাইলেও তারা রাজি হয়নি, কনে  সুন্দুরী হলেও চায় নি, তাই ওনার ছেলেপুলেরা বামুন থেকে অতিবামুন কাল্ট হয়ে গিয়েছিল ।

আসলে ওনাদের বাপঠাকুদ্দার কেউ একজন মোচোরমানের বাড়ির রান্নাঘরের মম গন্ধে মাতোয়ারা হয়ে গিয়েছিলেন, তারা বোধহয় গোরুর শিককাবাব কিংবা দোপেয়াজা রাঁধছিল, রেগেমেগে রাজকুমার এখন বিদেশে গেলে অন্য  মাংসও খান ।

আমিও খেয়েছি, খুবই ভালো খেতে, আহা বিলেতের গোলাপি শুয়োরের তো তুলনাই হয় না, জড়িয়ে শুয়ে থাকতে ইচ্ছে করে, মাদি শুয়োরের গোলাপি থনে চুকুস-চুকুস করতে মন চায় । গোরুর মাংসের চেয়ে হাজার গুন সুস্বাদু, মোচোরমানরা তো শুয়োরের মাংস খায় না, হালাল করা যায় না বলে, কিন্তু হিন্দুর ঝটকাতেও শুয়োর  মরে না, বিলেতে শুয়োরের মাংস পাঁঠার মাংসের চেয়েও মোলায়েম, মুখে দিলেই গলে যায়, কিন্তু গোরুর মাংস তো ছিবড়ে, অ্যাহ, বিটকেল, ভাবা যায় না ।

রাজকুমার গোরুর মাংস খান না, রুচিতে বাধে ।

আমি তো শুদ্দুর হুলি, আমাদের কোনো রুচি রয়েছে দেখলে  বামুনরা চটে যায়, বামুন মানে জাতবামুন নয়, টাকাবামুন ।

ঢাকনা দেয়া ভেনিশিয়ান কাঁচের জারে ফরম্যালিনে চোবানো রাজকুমারের  হৃৎপিণ্ড নিয়ে আমি লণ্ডন থেকে পালতোলা জাহাজে চেপে সুতানুটি-গোবিন্দপুরে ফিরছি । ফরম্যালিন মানে একরকমের শরবত, তাতে মরা মানুষের হৃৎপিণ্ড  বেঁচে ওঠে, শরবত খায় আর অনেককাল তাতে আয়েশ করে শুয়ে থাকে, সেই হৃৎপিণ্ড ইচ্ছে হলে কথা বলতে পারে, হাসতে পারে, গাইতে পারে, কাঁদতে পারে ।

ওই শরবতে মরা মানুষের যে-কোনো অঙ্গ চুবিয়ে রাখা যায় । এই জন্মে যদি বিয়ে করে সংসার পাতি, আমি মরে গেলে আমার ছেলেপুলেদের বলে যাবো যেন ওরা আমার দুই অণ্ডকোষ আর লিঙ্গখানা শরবতে চুবিয়ে রাখে, পছন্দ হলে পরের জন্মে এসে ওটাই ফিট করে নেবো, যদি আগামি জন্মেরটা মনের মতন না হয় ।

প্রথমবার গিসলুম ‘দি ইন্ডিয়া’ নামের ক্লিপার জাহাজে, তিনটে মাস্তুল ।  অনেক ঘুরে যেতে হয়েছিল, আফ্রিকার পোঁদের তলা দিয়ে কেপ অফ গুড হোপ ঘুরে, আমার বেশ ভালোই লেগেছিল, তিন মাস   জাহাজে কাটিয়েছিলুম, কতো দেশ দেখতে দেখতে গিয়েছিলুম, কালো হাবশি, শাদা চামড়ার লোক, নানা রঙের শাদা চামড়ার মেম । দেখলেই লোভ হতো । হাবশি মেয়েদের দেখেও আমার খুব লোভ হতো, ওদের পাছা আর বুক বেশ উঁচু-উঁচু, টাটকা, বুক খুলেই ঘুরে বেড়ায়, সুতানুটি-গোবিন্দপুরের শুদ্দুর বউদের মতন ঢিলেঢালা নয়, বউবাজারের সন্ধ্যাবাজারে যদি অমন হাবশি মেয়েদের আনতে পারতো, আহা, জীবন সার্থক হয়ে যেত গো ।

দ্বিতীয়বার রাজকুমারের  সঙ্গে ‘বেন্টিঙ্ক’ নামের জাহাজে করে সুয়েজখাল পেরিয়ে বিলেতে গিসলুম, জাহাজখানা বিরাট, তাতে আশিজন যাত্রী ছিল আর রাজকুমারের  ছোটো ছেলে , ভাগ্নে , ইংরেজ সচিব আর আমরা তিনজন চাকর, অন্য দুজন আমার চেয়ে বয়সে বড়ো। । সুয়েজ খাল তৈরি হবার দরুন যাওয়া-আসার সময় অনেক কমে গিসলো ।

মিশরে ইব্রাহিম পাশার অতিথি ছিলেন রাজকুমার, আমি তো ওনার খাস চাকর, ওনার আদর-যত্নের ভাগ আমিও পেইচি । পাশা ওনাকে লাল মখমলের পোশাক আর নিজের খচ্চরঘোড়া দিয়েছিলেন ঘুরেফিরে শহর-বাজার দেখার জন্য । পাশা ওনাকে শাহজাদা অফ বেঙ্গল বলে ডাকতেন ।

মিশর দেশটা যে এতো পুরোনো তা জানতুম না, মরুভূমির মাঝখানে কী বিরাট বিরাট তিনকোনা বাড়ি, যাকে ওরা বলছে পিরামিড, ওর ভেতরে নাকি আগেকার রাজা রাজড়াদের অনেক গল্প আছে, তাদের মলম মাখানো সোনায় মোড়া বাক্সবন্দী লাশ আছে, কতো যে গয়নাগাটি আছে তার ঠিকঠিকানা নেই, সেকালের মানুষদের শক্ত শক্ত ভাষায় গল্প লেখা আছে দেয়ালে-দেয়ালে । মরুভূমির মাঝখানে কেন যে এমন তিনকোনা বাড়ি বানিয়েছিল সেকালের রাজারা তার খোঁজ-খবর নিচ্ছে সায়েবের দলবল ।

মিশরের লোকেরা তাদের মন্দিরকে বলে মসজিদ, তার ভেতরে ঠাকুর-দেবতা নেই, রাজকুমারের ছেলে যেমনধারা পুজো করে এরাও তেমনি ধারা পুজো করে, কিন্তু হাঁটু মুড়ে নানা রকম অঙ্গভঙ্গী করে সবাই মিলে কাতারে বসে পুজো করে, কোনো শুদ্দুর বামুন তফাত নেই । এখানে মরে গেলে কাউকেই পোড়ায় না, আমাদের দেশে নেড়েদের যেমন গোর দেয়া হয় এখানেও তাই ।  মেয়েদের দেখতে খুবই সুন্দর, জড়িয়ে চুমু খেতে ইচ্ছে করছিল, একজন স্বামী চারজন বউ রাখতে পারে, শুনে বড়ো ভালো লাগলো, চারজন বউই স্বামীর সঙ্গে থাকে, স্বামী মরলে বউদের কবরে পোঁতা হয় না । যারা অনেক বড়ো লোক, যেমন পাশা, বউ ছাড়া বাঁদিও রাখে, তাকে বলে হারেম, আমাদের দেশে সায়েবরা আসবার আগে নেড়ে সুলতানদের যেমন ছিল ।

মিশর থেকে আমরা গেলুম মাল্টা নামে একটা দ্বীপে, দিনকতক সেখানে থাকতে হল, আমাদের কারো ছোঁয়াচে রোগ আছে কিনা যাচাই করার জন্যে । দ্বীপটায় বিলেতের রাণী ভিক্টোরিয়ার রাজত্ব, মন্দিরকে বলে চার্চ, ওদের ঠাকুর-দেবতাকেও দেখা যায় না, তবে ওরা মনে করে কুরুশকাঠে পেরেক-বেঁধা পোশাক-খোলা লোকটাই ভগবানের ছেলে । সেই দিক থেকে রক্ষে । ঠাকুর-দেবতাকে দেখতে না পেলে সে আবার কেমনতর পুজো ! যা নেই তাকে পুজো করার বদলে এখানকার সায়েবরা চার্চে একজনকে আছে নাম দিয়ে পুজো করে, তা সে পোশাক পরে না থাকলেই বা ।

মাল্টা দ্বীপ  থেকে রাজকুমারের পুরো দল গেলুম ফরাসিদেশের বোর্দো নামে একটা জায়গায়, মদের উৎসব আরম্ভ হয়েছিল, এখানকার মদকে বলে ওয়াইন, রাজকুমার মদ খেতে ভালোবাসতেন, আর ওনার যে কোম্পানি ছিল, সেই সিটি কোম্পানি তো সুতানুটি-গোবিন্দপুরে, মায় তার বাইরেও,  যেখানে-যেখানে সাহেব-মেমরা বাসা বেঁধেছিল, সেখানেও মদ বিক্রি করতো । মদ খেয়ে মেমরা এতো হাসতো যে তাদের ঠোঁটের হাসি খাবার ইচ্ছে হতো আমার, মনের ভেতরেই চেপে রাখতুম, যদ্দিন না রানি ভিক্টোরিয়ার মুনশির সঙ্গে আলাপ হলো ।

বোর্দো থেকে আমরা রাজকুমারের সঙ্গে গেলুম প্যারিস নামে একটা শহরে, দশদিন ছিলুম, সেখানের লোকগুলো কী বোকা, প্যারিসকে বলে পেয়ারি ।  মেমদের দেখতে কী সুন্দর কি বলব, তাই বোধহয় প্যারিসকে পেয়ারি বলে, কচি মেমগুলো যেন নরম তুলতুলে পুতুলের মতন, দেখলেই চটকাতে ইচ্ছে করে । যে কচি মেমরা রাজকুমারকে পছন্দ করতো,  তারা রাত্তিরে ওনার হোটেলের ঘরে এসে ফুর্তি করতো, বিলিতি বাজনার তালে তালে ফরাসি নাচ নাচতো, কুঁচির থাক দেয়া ঘাগরা পরে । আমারও ইচ্ছে করত ফরসা মেমদের সঙ্গে ফুর্তি করার, রাজকুমারের দেয়া হাতখরচের টাকায় এখানকার বউবাজারে গিয়ে করতে পারতুম, কিন্তু আমি ওনার খাস চাকর বলে সাহসে কুলোয়নি, আর ভাষাও তো জানিনে, দরদস্তুর করতুম কেমন করে ।

অন্য দুজন চাকরের  মধ্যে যাকে আমরা হরিখুড়ো বলতুম, ঘুরে এসেছিল পিগালে নামের পাড়ায়, ওই ঘোরার জন্যেই দেশে ফিরে নুনুর রোগ দেখা দিয়েছিল, সেই রোগের যন্তন্না থেকে ছাড়ান পেতে দলা-দলা আফিম খেতো, এসব কথা আমি হরিপদ খুড়োর খুড়িকে বলিনি কখনও, খুড়ি টের পেয়ে গিয়েছিল নিশ্চই, খুড়িকেও তো ওই রোগে ধরল, খুড়ো-খুড়ি দুজনে আফিমের দলা খে্যে ভোম মেরে পড়ে থাকতো ।

মানুষের আনন্দের পথে কেন যে রোগের লাইন টেনে দেয় ভগমান তা বুঝতে পারি না । ভগমানই আনন্দ তৈরি করেছে, আবার ভগমানই আনন্দের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, এ কেমন বিচার, অ্যাঁ !

রাজকুমারের সঙ্গে আমরা সবাই ১৮৪৬ সালের ১৮ই মার্চ লণ্ডনে পৌঁছেছিলুম । ওনার ছোটো ছেলের লণ্ডন আর সেখানকার আদবকায়দা একেবারেই পছন্দ হলো না । রাজকুমার  আমায় বলেছিলেন, বেশ দুঃখ করে বলেছিলেন, পলকাটা মদের গেলাসে সোনালি রঙের মদে চুমুক দিতে দিতে, এরা বঙ্গদেশকে ডুবিয়ে দেবে, কিছুই শিখতে চায় না, বিলেতের লোকেরা কেমন দিকে দিকে কল-কারখানা বসিয়ে দেশটাকে সারা পৃথিবীর মালিক করে তুলছে, আর আমার নিজের রক্তই আমাকে বুঝতে পারলে না । ওরা আমিন, বানিয়ান, সেরেস্তাদার, বানিয়া, মুৎসুদ্দি কথাগুলোকে খারাপ মনে করে, ঘরের খেয়ে মিছিল দিয়ে রাস্তা জ্যাম করবে, আর নিজেদের ভদ্রলোক ছাপ্পা মেরে বারফট্টাই দেখাবে, দেখে নিস তুই, একদিন ভদ্দরলোক নামের  প্লেগ ছড়িয়ে পড়বে দেশময়, কেরানি হবার জন্যে মানুষ হত্যে দিয়ে কালীঘাটের কালীর দোরে পড়ে থাকবে ।

লণ্ডনে রাজকুমার  রোজই খানাপিনার ব্যবস্হা করতেন,  কিংবা অন্য বড়োলোক সাহেবরা ওনার জন্যে খানাপিনার ব্যবস্হা করতো । রাজকুমার যে কেন মদ খেতে এতো ভালোবাসতেন কে জানে, বরং আমাদের মতন আফিম আর তাড়ি খেলে ওনার স্বাস্হ্য ভালো থাকতো । শুধু তো মদ খাওয়া নয়, কচি সুইটহার্ট মেমদের নিয়ে আমোদ করতেন, সারারাত মেতে থাকতেন আমোদে, মেমগুলোরও লজ্জা শরম ছিল না, এমন পোশাক পরতো যে অনেক কিছুই দেখা যেতো, আমার মতন হেলাফেলার চাকরেরও পুঁইমেটুলি দেখে শরীর চিনচিন চিনচিন করতো, চাকরদের চানের ঘরে গিয়ে চিনচিন কমাতে হতো ।

৩০ জুন ডাচেস অফ ইনভেরনেসের প্রাসাদে রাতের খাবারের নেমন্তন্নয় খাবার টেবিলে বসে হঠাৎই রাজকুমারের তেড়ে কাঁপুনি দিয়ে জ্বর এলো । ওই অসুখেই উনি পয়লা  আগস্ট মারা গেলেন, মাত্র একান্ন বছর বয়সে। আমার আর হরি খুড়োর কাঁদতে কাঁদতে গলা বুজে গিয়েছিল ।

কলকাতায় লোক মুখে খবর পাঠানো হয়েছিল, সে খবর পৌঁছোলো আড়াই মাস পরে । ইতিমধ্যে ওনার অন্ত্যেষ্টিতে কী করা হবে কেউ ঠিক করতে পারল না বলে কবর দেয়া হলো ; একজন হিন্দুকে গোর দিয়ে দেয়া হলো, এতো বড়ো একজন মানুষ, লাখ লাখ টাকার মালিক, তাকে মুখে আগুন দেবার লোক পাওয়া গেল না ।      হাসপাতালের বিছানায় উনি যদি একবার বলতেন, হুলি, তুইই আমার মুখে আগুন দিবি, কেউ দিক বা না দিক, তাহলে আমিই দিতুম, হলেই বা শুদ্দুর ।

নিজের মা-বাপের মুখে আগুন তো দিতে পারিনি, কে তাদের মুখে আগুন দিয়েছিল তাও জানি না, গুজব আসতো যে যারা আড়কাঠির ফোসলানোয় বিদেশে আখখাটার মজুর হয়ে গেছে, তাদের সবাইকে ধরে-ধরে কেরেস্তান করে দিয়েছে সেখানকার পাদ্রিরা, মুখে আগুনের আর দরকার নেই, মাটি খুঁড়ে পুঁতে দিলেই কাজ শেষ, মাটিতে মিশে ভালো সার হয়ে যাবে, আখকে আরও মিষ্টি করে তুলবে, সায়েবরা সেই মিষ্টি আখ থেকে চিনি তৈরি করে চায়ের কাপে চামচের টুঙটুঙি বাজাবে, জন্মদিনের কেকে চিনির আরক দিয়ে লিখবে,, হ্যাপি বার্থডে টু  ড্যাডি রামু গাণ্ডুবনিক, হ্যাপি বার্থডে টু মাম্মি হরিমতি গাণ্ডুবনিক ।

রাজকুমারের গোর যেমন অনেককাল রোদ-বৃষ্টি-ঝড়ে অচেনা পড়েছিল, তেমন ছিল ক্লাইভ নামে সাহেবটার, কেউ জানতোই না কোথায় তেনাকে গোর দেয়া হয়েছিল ।

হায়, রাজকুমার দেখে যেতে পারলেন না সুতানুটি-গোবিন্দপুরের ভিড়, জঞ্জাল, জ্যাম, মারামারি, মিছিল, বিশৃঙ্খলা, হুমকি ।

তুই কেমন করে জানলি যে আমি জানি না, আমি সবই আগাম দেখতে পাই ।

হায়, রাজকুমার দেখে যেতে পারলেন না মোটর সাইকেলে চেপে মাঝরাতে কোটিপতি-বাড়ির যুবকদের হার ছিনতাই দল ।

জানি হুলি জানি, তোকে আর আপশোষ করতে হবে না ।

হায়, রাজকুমার দেখে যেতে পারলেন না ট্যাক্সিতে তুলে নিয়ে গিয়ে গণধর্ষণ ।

জানি হুলি জানি, ওরা তো আমার পোষা লাঠিয়ালদেরই ছেলেপুলে ।

এখন রাজকুমারের হৃৎপিণ্ড যত্নকরে সামলে দেশে নিয়ে যাবার দায়িত্ব আমাকেই দেয়া হয়েছে, ওনার তিনজন চাকরের মধ্যে আমাকেই সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করতেন উনি । আমি সব সময় নজর রাখছি যাতে সমুদ্রের ঢেউয়ে ফরম্যালিন শরবত চলকে না ওঠে, যাতে গোলাপি প্রজাপতির মতন  হৃৎপিণ্ডের কষ্ট না হয় ।

জাহাজে একদিন রাজকুমারের  হৃৎপিণ্ড আমাকে ডেকে বললেন যে একা-একা ভাল্লাগছে না, তাই একটু গল্প করতে চান । আমি তো থ । কোথায় আমার মালিক একজন রাজকুমারের হৃৎপিণ্ড, আর কোথায় আমি গৃহস্বামীর পরিবারের থাকা-খাওয়ার ছোকরা চাকর যাকে ওনারা বলেন ভৃত্য, কীই বা গল্প করব রাজকুমারের হৃৎপিণ্ডের সঙ্গে, রাজকুমার সামনে থাকলে না হয় তাঁর পায়ের কাছে বসে ওনার নানা দেশ ঘোরার গল্প শুনতুম, মোজরি জুতো খুলে পা টিপে দিতুম, সব দেশে তো আমি সঙ্গে যাইনি ।

রাজকুমারের  হৃৎপিণ্ড বললেন, জানি তুই আমাকে মনে-মনে হৃৎপিণ্ড বলছিস, কিন্তু হুলি, তুই তো আমার  খাস-চাকর, বিশ্বাস কর, এটা আমার হৃদয়, হৃৎপিণ্ড আর হৃদয়ের তফাত জানিস তো ।

আমি গলার ভেতরে জমে থাকা কুয়াশা সরিয়ে বললুম, মাফ করবেন হুজুর, আপনি তো আপনার মাথার জন্য বিখ্যাত ছিলেন, তবে হৃদয় কেটে নিয়ে যাচ্ছি কেন আমরা ?

রাজকুমারের হৃৎপিণ্ড বললেন, দ্যাখ, লোকে সামনাসামনি আমাকে যাই বলুক না কেন, তুই তো জানিস আড়ালে ওরা আমাকে বানিয়ান, মুৎসুদ্দি, মহাজনি সুদখোর, আবগারি ঘুষখোর, বউবাজারের বাড়িগুলোর মালিক, আফিমচাষি, কোম্পানির দালাল এইসব কথা বলে বেড়ায় ।

আমি ভেবে পেলুম না কী বলি, আমরা চাকররা তো এসব কথা আলোচনা করি না, করার সময় পাই না, তবু বললুম, ওরা বলুকগে, ওদের সংসারে যারা জন্মাবে তারা এইসব কাজ একেবারে ভুলে গিয়ে দেশটাকে ডোবাবে, বিলেতের লোকেদের তো দেখলুম, সকলেই বানিয়াগিরি করে কিংবা করতে চায় ।

রাজকুমারের হৃদয় বললে, তুই তো জানিস, হরিমোহনের ছেলে উমানন্দ, ওই যার আরেকটা নাম নন্দলাল, বলে বেড়িয়েছিল যে যৌবনের গরমে, টাকাকড়ি, ক্ষমতা-প্রতিপত্তির জোরে, আমি নাকি কুসঙ্গে পড়ে ধর্ম আর জনমতকে ভয় পাই না, টিকি কেটে ফেলে দিয়েছি, পৈতে ফেলে দিয়েছি, মদ খাই আর মুসলমান মেয়েদের সঙ্গে শুই, মুসলমানের হাতের রান্না খাই ।

আমি বললুম, হুজুর, আপনি যে মদ ইচ্ছে খাবেন, যার সঙ্গে ইচ্ছে শোবেন, তাতে অন্যলোকের মাথাব্যথা কেন হয় ? আপনার মুসলমান বাবুর্চি এতোভালো রাঁধে, যা বেঁচেখুচে থাকে, তা খেয়ে দেখেছি, আহা, মন ভরে যায় । আর কুসঙ্গ মানে তো চোগা-চাপকান পরা আপনার জমিদার বন্ধুরা ।

জাহাজের ক্যাপ্টেনের দেয়া মদ খেয়ে আমার গলায় লাল রঙের মেঘ জমে আছে, ঘড়ঘড়ানির দরুন টের পেলুম । আর সবাই যাবার সময়ে আর আসার সময়েও ঢেউ সামলাতে না পেরে বমি করেছিল, আমি করিনি, বরং নীল সমুদ্র আমার খুবই পছন্দ হচ্ছিল, দূর-দূর পর্যন্ত কিচ্ছু দেখা যায় না, দেখা পাওয়া যায় না বলেই আরও ভালো লেগেছিল ।

সমুদ্রে মাঝে মাঝে উড়ুক্কু মাছের ঝাঁক, তিমি মাছেদের ঘাই দেখতে দেখতে যেতুম ।

রাজকুমারের হৃৎপিণ্ড বললে, উনি বন্ধু নয় রে, ওই চোগা-চাপকান পরা জমিদার আমার পথদেখানোর লোক ছিলেন ; তবে ওনার দেখানো পথে চলতে গিয়ে আমার বড়ো ছেলেটা রাস্তা হারিয়ে ফেলেছে ।

পরের জন্মে তো দেখেছি রাজকুমারের  নিজের একজন নাতি বানিয়াগিরি-জমিদারি ভুলে গিয়ে পদ্য লিখে আর গান গেয়ে বাঙালি জাতটাকে ক্যাবলা করে দিলে, কতো লোকে চট দিয়ে ওনার নকল দাড়ি তৈরি করে বাড়িতে ঝুলিয়ে রাখে, যাতে ছেলেপুলেরা ক্যাবলা-টাইপ হয় । হয়তো সেই কারণেই চটকলগুলো একে একে বন্ধ হয়ে গেল, সায়েবদের থেকে কিনে নিয়ে মেড়োপার্টিরা চটের ফাটকা খেলে ডুবিয়ে দিলে ।

এখন সকলেই পদ্য লিখতে চায় আর গান গাইতে চায় । ছেলে-ছোকরারা যখন বিপ্লব আরম্ভ করলে তখনও পদ্য লেখা আর গান গাওয়া শুরু করলে, সেই সঙ্গে খুনোখুনি। ব্যাস দেশের দফারফা । সেসব নিয়ে সিনেমাও হয়েছে । যাক, বিপ্লব ফেল মারলেই বা, পদ্য আর সিনেমা তো পাওয়া গেছে ।

রাজকুমারের হৃৎপিণ্ড আমার মালিকের,  যিনি পয়লা আগস্ট ১৮৪৬ লণ্ডনের সেইন্ট জর্জ হোটেলে  একান্ন বছর বয়সে মারা গেলেন, আর ৫ আগস্ট তারিখে কেনসাল গ্রিন গোরস্তানে তাঁকে  এলেবেলে সমাধি দেয়া হলো ; হিন্দু, খ্রিস্টান ব্রাহ্ম কোনো রীতিই মানা হয়নি ।

ওনার শব তো কলকাতায় পায়নি পরিবারের লোকেরা, তাই গঙ্গার ধারে একটা কুশপুতুল তৈরি করে ওনার নামে শ্রাদ্ধশ্রান্তি করেছে । তাও আবার হিন্দু বামুন আর অতিবামুন কাল্ট মিলে ঝগড়া বাধিয়ে ফেলেছিল, কোন মন্তর পড়া হবে, পিণ্ডদান করা হবে কি না, বড়ো  ছেলে ন্যাড়া হবে কিনা । ছেলেরা তো বাপকে কেয়ারই করেনি কখনও, ওনাদের কথা না বলাই ভালো ।

সমাধি দেবার দু’মাস পরে কবর থেকে তুলে ওনার বুক থেকে হৃৎপিণ্ডখানা কেটে বের করে নিজের দেশে নিয়ে গিয়ে অন্ত্যেষ্টি করতে চাইলেন আত্মীয়স্বজন ছেলেপুলেরা, তাই নিয়ে যাচ্ছি সুতানুটি-গোবিন্দপুরে ।

প্রথমবার আসার সময়ে রাজকুমার নিজের সঙ্গে  ইংরেজ ডাক্তার , ভাগনে , বাঙালি সহকারী , আমাকে নিয়ে তিনজন চাকর আর মুসলমান বাবুর্চি আসলাম মিয়াঁকে এনেছিলেন ।

ডাক্তার বলেছিল যে রাজকুমারের স্বাস্হ্য ভালোই আছে, চিন্তার কারণ নেই । সেবারও রাজকুমার রোজই নানা হোটেলে খানাপিনার আয়োজন করতেন, কতো কতো বিলিতি সাহেব-মেমরা আসতো, রাজকুমার  অনেকের হাতে মুঠো-মুঠো হীরে-মুক্ত গুঁজে দিতেন ।

মেমদের দেখেছি, হাঘরে, আদেখলাপনার শেষ নেই, তারা ওনাকে দেখনদারি দিয়ে ভালোবাসতো, ঢলাঢলি করতো, জড়িয়ে ধরে, হাত ধরে হোটেলের ঘরে টেনে নিয়ে যেতো । একজন মেম তো রোজই আসতো রাজকুমারের কাছে, পরের দিন সকালে বাড়ি ফিরতো । নিশ্চই কোনো ইংরেজ  খোচর এই খবরগুলো সুতানুটি-গোবিন্দপুরে পৌঁছে দিয়েছে । বাঙালিরা তো কালাপানিতে জাত যাবার ভয়ে যায়না ।

যাক, ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি থেকে খোচর হবার শিল্পখানা বাঙালিরা শিগগিরই আয়ত্ত করে ফেললে ।

রাজকুমার যেদিন মারা গেলেন,  সেদিন এমন ঝড়বৃষ্টি হয়েছিল যা আমি বিলেতে কেন, সুতানুটি-গোবিন্দপুরেও আগে কখনও দেখিনি ; আবদুল করিম, রানি ভিক্টোরিয়ার মুনশি, উনিও বলছিলেন যে ব্রিটেনে এসে পর্যন্ত এমন ঝড়বৃষ্টি দেখেননি ।

মুনশি আবদুল করিমের সঙ্গে আমার ভালো আলাপ-পরিচয় হয়ে গিয়েছিল, মুনশিজি যেচে আমার সঙ্গে কথা বলেছিলেন, সেই যেদিন রাজকুমারকে রাতের ভোজে ডেকেছিলেন রানি, তারিখটা মনে আছে, আট জুলাই, সে রাতেও প্রচণ্ড বৃষ্টি হয়েছিল, রানির মতন করে রাজকুমারও কাঁটা-চামচ-ছুরি দিয়ে মাংস কেটে-কেটে খেয়েছিলেন, ছাগলের মাংস নয়, অন্য কিছুর, বেশ ভালো গন্ধ বেরিয়েছিল । তার আগে রানির সঙ্গে একদিন রাজকুমার  বিলেতের রাজা-রানিদের সেনাবাহিনীর সেলাম নিয়েছিলেন, ওদের পোশাক কেমন যেন বিটকেল, চোখ পর্যন্ত গোল টুপিতে ঢাকা, দেখতে পায় কেমন করে ভাবছিলুম ।

রানির পছন্দ হয়েছিল রাজকুমারকে, নিজের ডায়রিতে লিখে রেখেছিলেন, ‘ব্রাহ্মণ ভদ্রলোকটি বেশ ভালো ইংরেজি বলেন এবং তিনি একজন বুদ্ধিমান ও চমৎকার মানুষ।’

রানির মুনশিও বিশ্বাস করতে চায়নি যে আমি এর আগেও জন্মেছি, বলতো কাফেররা এরকম বিশ্বাস করে, তোরা মুরতাদ, তোরা মালাউন, তোরা জিম্মি, কাফেরদের তো জন্নতে যাবার নেই, আর কেয়ামত পর্যন্ত অপেক্ষা করারও বালাই নেই। রানি ভিক্টোরিয়ার জন্যে দুজন চাকর এদেশ থেকে গিয়েছিল, অন্যজনের নাম মোহম্মদ বক্স, তার সঙ্গে তেমন আলাপ হয়নি, রানির খাস-আর্দালি বলে তার পোঁদে খুব তেল ছিল । আবদুল করিমের তো কোমরে তরোয়াল ঝুলতো, বুকে রানির দেয়া মেডেল ঝুলতো, মোহম্মদ বক্স অমন তোল্লাই পায়নি, তাই হয়তো খিটখিটে মেজাজের  হয়ে গিয়েছিল ।

আবদুল করিম একটা গোপন খবর দিয়েছিল । রানি আর রাজবাড়ির সবাই নাকি জল দিয়ে ছোঁচায় না, পাতলা কাগজে পুঁছে নেয় । আবদুল করিম তাই রানির কাজ সেরে নিজের ঘরের চান করার ঘরে গরম জলে চান করে শুদ্ধ হয়ে নিতো, নইলে নামাজ পড়বে কেমন করে । শুদ্ধ হবার জন্যে পাশপকেটে ঢিলা কুলুপ রাখতো।

চাকরদের মুখ উঁচু করে তোলা অনুচিত, সব সময়ে মেঝের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়, তবুও আমি রানিকে দেখেছিলুম, দেখতে ভালো নয়, বড্ডো মোটা, জানি না মুনশির কেন পছন্দ হয়েছিল, হয়তো রানি বলে, হয়তো শাদা চামড়া বলে, সোনাদানা পেতো বলে ।

যদিও রানির পরিবারের সবাই বলাবলি করতো যে মুনশির সঙ্গে ৬৮ বছরের রাণির একটা গোলমেলে সম্পর্ক নিশ্চয়ই আছে, নয়তো একজন আরেকজনকে অতো চিঠি লেখালিখি করবেই বা কেন, বালটিমোর, বাকিংহাম, বালমোরাল প্রাসাদের সোনালি গলিঘুঁজিতে রানির সাতহাতি ঘাঘরার কাপড় ধরে পেছন পেছন হাঁটবে কেন, মাঝরাত পর্যন্ত রানির ঘরে থাকবে কেন !

মুনশি আমায় বলেছিল যে রানিকে উর্দু হিন্দি আর ফারসিতে সড়গড় করে তোলার জন্যেই ও চিঠি লিখতো আর রানিও ওকে চিঠি লিখতেন । সেসব চিঠিপত্তর অবশ্য রানি মারা যেতেই রানির পরিবারের লোকেরা হাপিশ করে দিয়েছে । রানিকে পাঠানো একটা চিঠিতে মুনশি করিম যে দু লাইন কবিতা লিখেছিল, তা আমার এই জন্মেও মনে আছে, ও পড়ে শুনিয়েছিল আমায়,

 

মোহব্বত মেঁ নহিঁ হ্যায় ফর্ক জিনে অওর মরনে কা

উসি কো দেখ কর জিতে হ্যাঁয় জিস কাফির পে দম নিকলে

 

তবে মুনশি আবদুল করিমের যে কেন গনোরিয়া হয়েছিল তা আমি জানি, রানির নিজের ডাক্তারই করিমের রোগ ধরে ফেলেছিল । রানি কেন জানতে চেয়েছিলেন করিমের যৌনরোগ আছে কিনা ! আসলে রাজারাজড়াদের ব্যাপারস্যাপারই আলাদা । রানির তো আর গনোরিয়া হতে পারে না, হলে পুরো বিলেতি সাম্রাজ্যে ঢি-ঢি পড়ে যেতো ।

বেচারা আবদুল করিম চব্বিশ বছর বয়সে ব্রিটেনে এসেছিল, ওর কি সাধ-আহ্লাদ হয়নি লণ্ডনের মেমদের সঙ্গে শোবার, দেশে ফিরে গেলে সেই তো বাদামি চামড়ার বউ বা আগ্রার কালো-বাদামি চামড়াউলিদের কোঠা । আবদুল করিমের সঙ্গে আমি লিডসের হলবেক শহরতলিতে গিয়েছি, ওটাই তখন মেমদের রমরমে বউবাজার  ছিল, পরে তো সোহো হয়ে উঠল বউবাজার, বউবাজার মানে বউদের বাজার নয়, মেমদের বাজার, যাকে এক রাতের জন্যে কিংবা কিছুক্ষণের জন্যে বউ করে নিয়ে ভালোবাসাবাসি করা যায়, আমাদের সুতানুটি-গোবিন্দপুরেও আছে, আমার এতোগুলো জন্মের আগে-পরেও আছে ।

রানির সঙ্গে ইউরোপের অন্য দেশগুলোয় যখন আবদুল করিম যেতো তখন এক ফাঁকে শহর দেখার নাম করে সেখানের মেমদের বউবাজারেও ঢুঁ মারতো, আমার সঙ্গে সেসব গল্প করতো, আমি ছাড়া তো দেশের আর কোনো মানুষ ছিল না যার সঙ্গে নিজের লুকোনো  ব্যাপারগুলো ভাগ করে নেয়া যায় ।

দশ বছর বিলেতে ছিল আবদুল করিম, নিজের লুকোনো জীবনের ঘটনাগুলো একটা ডায়রিতে লিখে রাখতো । আবদুল যখন দেশে ফেরার জন্য তৈরি তখন ওর বাক্স-প্যাঁটরা ঘাঁটাঘাঁটি করেছিল  রানির পরিবারের লোকেরা, ডায়রিটা পাবার জন্যে, কিন্তু আবদুল করিম তো মহা চালাক, আগেই ডায়রিখানা এক আত্মীয়ের হাতে আগ্রায় পাচার করে দিয়েছিল ।

যখন পাকিস্তান হলো তখন ওর ভাইপোরা সেই ডায়রিখানাকে বাঁচাবার জন্য লুকিয়ে পাকিস্তানে চলে গিসলো কেননা ভাইপোদের সন্দেহ ছিল যে জওহারলাল নেহেরু মাউন্টব্যাটেনের বউয়ের চাপে পড়ে ডায়রিখানা খুঁজে বের করবে আর নষ্ট করে ফেলবে, হয়তো জেলেই পুরে দেবে আবদুল করিমের আত্মীয়দের ; ওই ডায়রি বাঁচাবার জন্যেই ওদের পাকিস্তানে যেতে হয়েছিল নয়তো যেতো না, সেখানে গিয়ে ওরা মোহাজির নামে অনেককাল বদনাম ছিল, সে তো দাউদ ইব্রাহিম নামে এক মোহাজির পাকিস্তানে যাবার পর ওরা করাচিতে এখন শান্তিতে আছে ।

দেখি পরের জন্মে যদি মোহাজির হয়ে পাকিস্তানে জন্মাতে পারি, ওদের বউগুলো অপরূপ সুন্দরী হয় আর উপরি পাওনা হলো যে চারটে করে অমন কচি সুন্দরীকে বিয়ে করা যায় ।

বলেছি তো, আবদুল করিম বিশ্বাস করতো না যে আমি এর আগেও জন্মেছি । ওদের ধর্মে নাকি বার বার জন্মানো বারণ । যাক আমার তো অমন ধর্মের বালাই নেই, তাই জন্মাতে পেরেছি, মনেও রাখতে পেরেছি আগের জন্মের কথা । রাজকুমারও  বিশ্বাস করতেন না যে আমি এর আগেও জন্মেছি, আর আগের জন্মের বেশ কিছু ঘটনা আমার মনে আছে । এই যেমন জব চার্নকের হিন্দু বউয়ের কবরের ওপর যে মুর্গিটাকে বলি দেয়া হয়েছিল, সেটা তো আমিই গাঁ থেকে এনে দিয়েছিলুম । সিরাউদ্দৌলা যখন কলকাতা আক্রমণ করেছিল, তখন দুদলের সেনারাই ভাবলে আমি অন্য দলের, বর্শায় গিঁথে মেরে ফেললে, বর্শার ডগায় আমার মুণ্ডুটা রাস্তায় পোঁতা ছিল, সুন্দরবন থেকে একটা বাঘ এসে ধড় আর মুণ্ডু দুটোই চিবিয়ে-চিবিয়ে আয়েস করে খেয়ে নিলে , চিবোবার আওয়াজ এখনও আমার কানের খোলে রয়ে গেছে।

বাঘের পেটে দু’রাত এক দিন আমার মুণ্ডুটা ভালোই ছিল, তবে বাঘের পেটের ভেতরটা বড্ডো গরম।

 

হৃৎপিণ্ড : আর কতো দূর হুলি ?

আমি : আরও দুই মাস, রাজকুমার ।

 

আমি এপর্যন্ত চারবার জন্মেছি, যা আমার মনে আছে, বাকিগুলো তেমন মনে রাখতে পারিনি, অ্যালঝিমারের রোগের দরুণ,  আর চারবারই আমি পাঁচের নামতায় মারা গেছি, পঁচিশ থেকে পঁচাত্তরের মধ্যে, মানুষ হয়ে জন্মাবার কথা বলছি, হয়তো তার আগে কীট পতঙ্গ জন্তু জানোয়ার হয়ে জন্মে থাকবো, সেসব স্মৃতি ধরে রাখতে পারিনি, কেননা কীট পতঙ্গ জন্তু জানোয়ারের পূর্বজন্মের স্মৃতি হয় কি না জানি না, আগের জন্মে কালেজে পড়ার সময়ে ডারউইন সাহেবের বই পড়ে দেখেছি তাতে উনিও কিছু লিখে যাননি ।

আমার এখনকার জন্ম দিয়েই শুরু করি । আমি ছিলুম রাজকুমারের খাস-চাকর । উনি আমাকে হুকুম দিয়েছিলেন যেন আমি ওনাকে অন্য লোকের সামনে  হুজুর বলে সম্বোধন করি । উনি যেখানে যেতেন আমাকে সঙ্গে নিয়ে যেতেন, আমি না হলে ওনার গোপন ফাই-ফরমাস খাটার লোক ছিল না, সকলকে বিশ্বাস করতেন না, বলতেন ওরা সব হাফলিটারেট ইডিঅট ।

রাজকুমারের সঙ্গে থাকতে থাকতে আমি ইংরেজি শিখে নিয়েছিলুম । উনি ফারসি আর ইংরেজিতে বেশ তুখোড় ছিলেন, সুতানুটি গোবিন্দপুরের বিলেতি সাহেব-মেমরাও ওনার ইংরেজি শুনে মাথা দোলাতো, নিজের চক্ষে দেখা । আফিম, চিনি, নুন, নীল, রেশম, কয়লার ব্যবসায় ওনাকে টক্কর দেবার মতন কোনো বাঙালি মাই-কা লাল ছিল না ।

একটা মজার কথা তোকে বলি, রাজকুমারের হৃৎপিণ্ড বললেন, বাবর ওনার বাবরনামায় কতোকিছু লিখে গেছেন হিন্দুস্তান সম্পর্কে, উনি জানতেন না যে এদেশে কয়লা নামে এক রকমের পাথর মাটির তলায় পাওয়া যায় ; ওনারা কাঠকয়লার কথা জানতেন, গাছ পুড়িয়ে রান্নার জন্যে কাঠকয়লা তৈরি করতেন । আমিই তো ইরেজদের কয়লার কথা বললাম, এই বাংলার মাটির তলায় অঢেল কয়লা পাওয়া যায়, বিশ্বাসই করতে চায়নি ব্যাটারা ।

বললুম, হুজুর, আমি এর আগে একটা জন্মে হুলিকাঞ্চন গুপ্তা হয়ে বেনের বাড়িতে জন্মেছিলুম, তখন আমরাই বাবর আর ইব্রাহিম লোদিকে মাল সাপলাই করতুম । নেড়েরা কয়লার কথা জানতো না, যুদ্ধু করতে গিয়ে ওদের কাঠ কয়লার দরকার পড়তো, সেগুলো আমরাই সাপলাই দিতুম, শুকনো আর কাঁচা মাংস, সেনাদের জন্যে মদ, আফিম সাপলাই দিতুম । শ্মশান থেকে অঢেল কাঠ কয়লা পাওয়া যেতো, শ্মশানের পাশেই আমাদের কাঠ কয়লার গুদোম খুলতে হয়েছিল ।

হৃৎপিণ্ড কিম্বদন্তি হতে চাননি ।

রাজকুমার ইতিহাস হতে চাননি ।

ওনার পা ব্যথা করলে আমি অনেকক্ষণ পা-টিপে ঘুম পাড়াতুম ।

পুরুতের পরিবার কেন ব্যবসাদার হয়ে গেল, সবাই জানতে চায় ।

পুরুত না হয়ে কেন আমিন, মুৎসুদ্দি, সেরেস্তাদার, বানিয়ান, মহাজন, কোম্পানির দালাল, কমিশনখোর, গোমস্তা, আমলা, জাহাজের কারবারি হয়ে গেল, জানতে চায় ।

কেন আবার ! সমাজের দেয়া চোট-জখম থেকে উচ্চাকাঙ্খার বোধ, সমাজ একঘরে করে দেয়ায় গভীর চোট-জখম, পরিবারের সদস্যদের দেয়া আঘাত, স্বদেশবাসীর রক্ষণশীলতা । সুতানুটি-গোবিন্দপুরের কোনো বামুন রাজকুমারের বাড়ি গেলে, তার জরিমানা ধার্য ছিল, সেই বামুন পুরুতদের পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা দিয়ে নিজের ব্রাহ্মণ পিঁড়িতে ফিরতো, বিগট, বিগট, বিগট, বিগট ! কে এক পুরুষোত্তম পীর আলি খানের রান্নাঘর থেকে  বিরিয়ানি রাঁধার খাইখাই গন্ধ পেয়েছিল, ব্যাস, কিম্বদন্তি চালু ।

সুতানুটি-গোবিন্দপুরকে মেট্রপলিস কে বানালো ?

মফসসলগুলোয় গথিক স্হাপত্যের জমিদারবাড়িগুলো, যা ভেঙে-ভেঙে চুনবালিসুরকির চুরো হয়ে গেছে, কার বাড়ির নকল ?

দলপতির বিরুদ্ধতা কে করল ? রেনিগেড, রেনিগেড, রেনিগেড । দলপতির বাড়ি  থেকে নিজের বাড়ির দূরত্ব এক দুই তিন চার পাঁচ ছয় সাত আট নয় দশ করতে করতে একশো কোশ সরে গেলো।

মেট্রপলিসের প্রথম প্রেমিকবয় ।

হৃৎপিণ্ড : প্রেমিকবয় হওয়া ভালো, নাকি গুচ্ছের অ্যাণ্ডাবাচ্চা পয়দা করে দেশের জনসংখ্যা বাড়ানো ভালো, বল তুই ?

আর কেউ রাজকুমারের পরিবারের পেডিগ্রির সমকক্ষ করে তুলতে পারেনি নিজের পরিবারকে ।

রাজকুমার ব্যবসার কাজে বাইরে গিয়েছিলেন, সেই সুযোগে ওনার মাকে, যিনি রাজকুমারকে ছোটোবেলা থেকে নিজের ছেলের মতন মানুষ করেছিলেন, তাঁকে যখন গঙ্গার ধারে অন্তর্জলী যাত্রায় নিয়ে গিয়ে রাখা হল, বলেছিলেন, রাজকুমার বাড়িতে থাকলে তাঁকে এই জ্বালাযন্ত্রণা পোয়াতে হতো না, বাড়িতে নিজের ঘরেই মারা যেতাম ।

হৃৎপিণ্ড বলল, আমার সম্পর্কে তুই যেসব গুজব শুনিস, সবই সত্যি হুলি, তুই তো আমার খাস চাকর, সবই দেখিস । হ্যাঁ, নুনের মোলুঙ্গিদের আমি চাপ দিয়ে টাকা আদায় করতুম । নিলামে পড়ন্ত জমিদারদের জমিদারি কিনে নিতুম, কড়া জমিদার ছিলুম, গরিব হলেও নীলচাষিদের রেয়াত করতুম না, কিন্তু আমার আইনি পরামর্শতেই তো যশোরের রাজা বরোদাকান্ত রায়, বাগবাজারের দুর্গাচরণ মুখার্জি, কাসিমবাজারের হরিনাথ রায়, পাইকপাড়া রাজ পরিবারের রানি কাত্যায়নি নিজেদের জমিদারির নিলাম হওয়া থেকে বেঁচে গিয়েছিল। আমাকে কোম্পানির কমপ্রাডর বললে আপত্তি করব না ।

রাজকুমার চুপ করে গেলেন বেশ কিছুক্ষণের জন্যে ; সেই সুযোগে আমি ওনাকে আমার আগামি জন্মে ঘটে যাওয়া দেশভাগ, বাংলাদেশে বাঙলা ভাষার জন্যে লড়াই, মুক্তিযুদ্ধ, লক্ষ-লক্ষ উদ্বাস্তুর যশোর রোডে চ্যাঁচারির চালায় ঠাঁই, সেই যশোর রোডের ছায়াকে কেটে ফেলার ঠিকেদারি, বাংলাদেশকে স্বাধীন করার জন্যে ভারতীয় সেনার আক্রমণ, পাকিস্তানিদের নব্বুই হাজারের বেশি সেনা ভারতের হাতে বন্দী, বাংলাদেশের গদ্দার বাহিনী রাজাকর, আল বদর, তাদের ফাঁসি আর পাকিস্তানের বিফল হয়ে যাওয়া রাষ্ট, সব গল্প শোনালুম । এখনকার বাংলাদেশে হিন্দুদের দেবী-দেবতার মন্দির ভেঙে ফেলার, বাঙালি মুসলমানদের গোঁপ কামিয়ে দাড়ি রাখার, হিন্দুদের তাড়িয়ে-তাড়িয়ে পুরোদেশটাকে নেড়েভূমি করার ঘটনা বললুম ।

হৃৎপিণ্ড বলল, জানিস, কখনও ভাবিনি যে বাঙালিদের দেশটা পাকিস্তানের মতন একটা ফেলমারা এলাকা হয়ে যাবে, ইউরোপিয়রা যাকে বলে ফেইলড স্টেট ।

আমি তো পঞ্চাশ-ষাট বছর আগে কতো কমপ্রাডরকে দেখেছি, চীনের ঘুষ খেয়ে দালালি করতো, রাশিয়ার ঘুষ খেয়ে দালালি করতো, তারাও তো বেনিয়ান, রেনিগেড, ভিনদেশের দালাল, সব ভোঁভাঁ, হামবড়াই ফুসকি, দেয়ালে লেখালিখি ফুসকি, দলপতি ফুসকি, দল ফুসকি ।

আমিও যে একটা জন্মে প্রেমিকবয় ছিলুম, তা আর রাজকুমারকে বললুম না, মনে হবে ওনার সমকক্ষ হবার চেষ্টা করছি, প্রেমিকবয় মানে সেকেলে লোকেরা যাকে বলে দুশ্চরিত্র হওয়া, এই যেমন যারা চিরকুমার আর শাকাহারি তারা নিজেদের মনে করে সাত্বিক, তারা যদি কাউকে মদমাংস খেতে দেখে, বউ ভাড়ার কোঠায় যেতে দেখে, রেসের মাঠে যেতে, জুয়ার আড্ডায় যেতে, নাইট ক্লাবে গিয়ে নাচতে, কিংবা বছরে বছরে প্রেমিকা বদলাতে দেখে, তাদের মনে করে তামসিক, সোজা বাংলায় চরিত্রহীন, আমি তা-ই ছিলুম । দুর্গাপুরের বড়ো রাস্তায় মুখোমুখি সংঘর্ষে মোটরগাড়ি দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছিলুম, সেই যে জায়গাটা দুর্ঘটনার জন্যে তৈরি হয়েছে, ফি বছর দু’চারটে গাড়িতে মানুষ থেঁতো হয় ।

দুশ্চরিত্র জীবনে, আমার নাম হুলিই ছিল, পদবি ছিল শিট, পদবিটা আমার পছন্দ ছিল না, শিট মানে তো গু, তাই আমি সবাইকে নিজের পরিচয় দিতুম হোলি শেঠ  নামে ; বাবা হুমকিপতি দলদাস ছিলেন, প্রচুর টাকাকড়ি গ্যাঁড়াতে পেরেছিলেন, তোলাবাজি কমিশন ঠিকেদারি দালালি ঘুষ সিণ্ডিকেট থেকে, বাড়ির ওয়াশিং রুমের দেয়ালে যে আলমারি ছিল তা বাইরে থেকে দেখে টের পাওয়া যেতো না, রিমোট দিয়ে খুলতে হতো, সোনার বিস্কুটও সেখানেই রাখা থাকতো । আমি তখন বাঙালি গেস্টাপো গুণ্ডা-ক্যাডারদের পুষতুম ।

আমার সম্পর্কে এক মহিলা, যার সঙ্গে কিছু দিনের প্রেমিকবয় সম্পর্ক পাতিয়েছিলুম, কমপ্লিকেটেড, সে আমার সম্পর্কে এই কথাগুলো লিখে রেখে প্রচুর কোকেন নিয়ে  বাথটবে চান করার সময়ে ডুবে মারা গিয়েছিল :

“হে ভগবান, কোনো কিছুরই নিশ্চয়তা নেই ।”

“হে ভগবান, হীরের আঙটি পরিয়ে আটকে রেখেছে ।”

“হে ভগবান, কিনারায় নিয়ে গিয়ে রেখে দিয়েছে ।”

“হে ভগবান, আমিই একমাত্র নই ।”

“হে ভগবান, ছেড়ে চলে যাওয়া যে সম্ভব হচ্ছে না ।”

“হে ভগবান, এ যে এক নম্বরের ফ্লার্ট ।”

“হে ভগবান, কাজকর্ম ব্যবসা দেখার এর আগ্রহ নেই ।”

“হে ভগবান এর যে কী কাজ আর কী ব্যবসা তাও জানতে পারলাম না এতো দিনে ।”

“হে ভগবান, সম্পর্কের বনেদ কেবল যৌনতা ।”

“হে ভগবান, এ যে ঢ্যাঙা ফর্সা রূপবান জলের মতন টাকা খরচ করে ।”

“হে ভগবান, এর কাজের সঙ্গে কথার মিল নেই ।”

“হে ভগবান, এ মূল প্রশ্নের উত্তর দেয় না, এড়িয়ে যায় ।”

“হে ভগবান, এর বাড়ির চাকরানি এতো সুন্দরী যে চাকরানি বলে মনে হয় না ।”

“হে ভগবান, এ যে সব সময়েই নিখুঁত ।”

“হে ভগবান, এর সব সময়েই এতো তাড়া কেন যে ।”

“হে ভগবান, এ রোজই একটা ফুলের তোড়া পাঠায়, সঙ্গে হাল আমলের গানের ক্যাসেট ।”

“হে ভগবান, এ প্রতিদিন নতুন পোশাক পরে থাকে, নতুন পারফিউম লাগায় ।”

এই সব ভাবতে ভাবতে রাজকুমারের বন্ধুনি কবি ক্যারোলিন নরটনের কথা মনে পড়ছিল আমার, অপরূপ সুন্দরী, রাজকুমারকে ভালোবাসতেন । বজরায় ওয়াল্টজ, কোয়াড্রিলো, গ্যালপ নাচতেন দুজনে । ক্যারোলিনের বরের সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে গিয়েছিল, তালাক নয়, এমনিই ছাড়াছাড়ি, ক্যারলিন লর্ড মেলবোর্নের সঙ্গে ইশক ওয়ালা মোহব্বত করতো,  তা ধরে ফেলেছিল ওর বর, ফলে ছাড়াছাড়ি, ছাড়াছাড়ির দরুন ক্যারোলিনের টাকাকড়ির এমন খাঁকতি পড়েছিল যে রাজকুমার মণিমুক্তো বিলিয়ে দেন শুনে আঁকড়ে ধরেছিল, রাজকুমারকে ফুসলিয়ে অনেক সোনাদানা আদায় করতে পেরেছিল ।

রাজকুমার মারা যেতে মনের দুঃখে ক্যারোলিন একখানা কবিতা লিখেছিল, ‘আমার হৃদয় এক শুকনো বাদাম’ শিরোনামে, তার গদ্য করলে এরকম দাঁড়ায় :

 

আমার জীবন এক শুকনো বাদামের মতো

ফাঁকা খোলের ভেতরে ঝুমঝুমির মতো বাজে

তুমি আমার বুকের ভাঁজ খুলে তার ভেতরে রাখতে পারবে না

তাজা কোনো জিনিস যা সেখানে বাসা বাঁধতে পারে

আশা আর স্বপ্নে ভরা ছিল এক সময় যখন

জীবনের বসন্তগৌরব আমার দৃষ্টির সামনে দাঁড়িয়ে

বিদায় নিয়েছে আজ সেখানে আনন্দ নেই দুঃখ নেই

আর শুকনো হৃদয় কখনও উদ্বেলিত হবে না

 

আমার জীবন এক শুকনো বাদামের মতো

এক সময়ে প্রতিটি স্পর্শে জেগে উঠতো

কিন্তু এখন তা কঠিন ও বন্ধ হয়ে গেছে

আমি তার হয়ে ভিক্ষাবৃত্তি করতে পারবো না

প্রতিটি কন্ঠস্বরের আলো  আমার ভ্রুপল্লবকে কাঁপাতে পারতো

প্রতিটি মৃদু বাতাসে দুলে উঠতো গাছের ডাল

যে ডালে রোদের আলোয় দোল খেতো বাদামফল

এখন তা শীতে আক্রান্ত, আমার মতো কঠিন আর দুঃখী

 

আমার হৃদয় এক শুকনো বাদামের মতো

যে দেখতো সে-ই আকর্ষিত হতো এক সময়

কিন্তু যবে থেকে দুর্ভাগ্য আমাকে ভেঙেচুরে দিয়েছে

তেতো হয়ে গেছে মুখের স্বাদ গন্ধ

তার চঞ্চল যৌবনের নতুন পরাগ

শেষ হয়ে গেছে আর ফিরবে না কোনোদিন

আর আমি অনুভব করি আমার দুঃখী হৃদয়ের সত্য

রোদ নেই, হাসি নেই, যা আমাকে ঔজ্বল্য দেবে ।

 

চাকরদের মুখ তুলে অতিথিদের দিকে তাকানো অনুচিত, তবু আমি ক্যারোলিন নর্টন এলেই ওনার দিকে তাকিয়ে দেখতুম, কী ফর্সা গোলাপি চেহারা, এখানের মেমরা কেউই ওনার মতন বুকের খাঁজ দেখানো পোশাক পরে না, আমি আড়চোখে খাঁজের দিকে তাকাতুম, বুকের পুঁইমেটুলি দেখতুম ।

চাকরের দুর্বলতা শোভা পায় না, আমি বেশ দুর্বল বোধ করতুম, ওনাকে চোখ বুজে কল্পনা করতুম চান করার সময়ে । জমিদার আর কোম্পানি বাহাদুর ছাড়া মেমদের ছোঁয়াও অপরাধ, তবু আমি ছলছুতোয় ছুঁতুম ওনাকে, ফুলের তোড়া দেবার সময়ে, মদের গ্লাস এগিয়ে দেবার সময়ে ।

বিদেশিনীরা রাজকুমারকে ভালোবাসতেন বলে, বিদেশে গিয়ে নানা রকমের মাংস খেতেন বলে, সুতানুটি-গোবিন্দপুরে ওনাকে বামুনরা সমাজের বাইরে একঘরে করে দেবার তাল করেছিল, ওনার বাড়ির মেয়ে-বউরা যদি ওনাকে ছুঁয়ে ফেলতো,  তাহলে তারা গঙ্গাজলে চান করে পবিত্রতা ফিরে পেতো, রাজকুমার পবিত্রতার কেয়ার করেননি, বাড়িতে বৈঠকখানাঘর তৈরি করে সেখানেই থাকতেন, বন্ধুবান্ধবরা আর ব্যবসার লোকরা, দেশি হোক বা বিদেশি, সেই ঘরেই দেখা করতো, আরাম কেদারায় বসে হুঁকো টানতো ।

রাজকুমার মারা যাবার কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই প্রতিদিন ক্লিভল্যাণ্ডের ডাচেস এসে ওনার সঙ্গে সময় কাটাতেন ।

হৃৎপিণ্ড বহুক্ষণ চুপ করে ছিলেন, হয়তো সমুদ্রের ঢেউয়ের দোল খেতে খেতে শৈশবের কথা ভাবছিলেন, সৎমায়ের আদর-যত্নের কথা ভাবছিলেন, হঠাৎ বলে উঠলেন, বুঝলি হুলি, তুই যেমন ম্যাজিকে বিশ্বাস করিস, আমার বড়োছেলেও তেমন ম্যাজিকে বিশ্বাস করে, মঙ্গলকাব্যের কবিরা যেমন স্বপ্নাদেশ পেয়ে কবিতা লিখতেন, আমার বড়োছেলেও তেমন স্বপ্নাদেশ পায়, কোথা থেকে জ্ঞানের কাগজ ওর হাতে উড়ে এসে পড়ে, আর ও নিরাকার ব্রহ্মের খোঁজে লীন হয়ে যায়, তখনই  ব্রহ্ম ব্রহ্ম ব্রহ্ম জপতে থাকে, ব্যবসা লাটে উঠিয়ে দিলে ।

রাজকুমার রোমে গিয়ে পোপের সঙ্গে দেখা করেছিলেন, প্যারিসে গিয়ে রাজ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করেছিলেন, লণ্ডনে থ্যাকারে আর চার্লস ডিকেন্সের সঙ্গে দেখা করেছিলেন, প্যারিসে ম্যাক্সমুলারের সঙ্গে সংস্কৃত ভাষা নিয়ে আলোচনা করেছিলেন  । এই দেখা করার কায়দা ওনার কাছ থেকেই তো শিখেছিলেন ওনার ছোটো নাতি ।

আমি বললুম, হ্যাঁ, রাজকুমার, জানি, ব্রহ্ম ব্রহ্ম জপে জপে আলাদা স্বর্গে গেলেন  । বিষয়সম্পত্তিকে উনি মনে করতেন বিষ, মন বিষিয়ে দেয়, অনেক লোককে জড়ো করেছেন ওনার অতিবামুন কাল্টে । ওনার সময় থেকেই দিকে দিকে ভদ্রলোক বিয়োবার যুগ আরম্ভ হলো । বাঙালি আর ব্যবসাবাণিজ্য করবে না, কারখানা খুলবে না, শুধু ভদ্রলোক হয়ে কেরানিগিরি করবে । আপনার সময়ে উনিশ শতকের আশির দশক আর নয়ের দশকটুকুই বাঙালির এগিয়ে যাবার সময় ছিল, কেরানি হবার আর সরকারি চাকুরে হবার দৌড়ঝাঁপ ছিল না, শুধু আপনার ছোটোছেলে ওই লাইনে চলে গিয়েছিলেন ।

হৃৎপিণ্ড বললেন, দীর্ঘশ্বাস ফেলে, হ্যাঁ, আধ্যাত্মিকতাই এখন বাঙালির ব্যবসা হয়ে দাঁড়িয়েছে ।

আমি বললুম, এই আধ্যাত্মিকতা আপনার সময়ের আধ্যাত্মিকতা নয় । এই আধ্যাত্মিকতার কোনো দার্শনিক বনেদ নেই । দিকে-দিকে আকাট গুরুদেবের ছড়াছড়ি, গেরুয়া পোশাক পরে মাফিয়ারা বোকাদের ঠকিয়ে বিরাট বিরাট দল তৈরি করে সরকারি জমিজমা দখল করছে,  আর সেখানে মন্দির গড়ে মেয়েদের ফুসলিয়ে ধর্ষণ করছে । প্রতিদিন তার বিজ্ঞাপনও বেরোচ্ছে কাগজে, বাড়ি-বাড়ি হ্যাণ্ডবিল বিলি করছে তারা । এমন বাঙালি আর দেখতে পাবেন না যার হাতের আঙুলগুলোয় গ্রহরত্নের গোটা পাঁচেক আঙটি নেই, গলায় কিংবা বাহুতে মাদুলি নেই  ।

হৃৎপিণ্ড বললেন, আমি সারাজীবন এই গুরু ব্যাপারটার বিরোধী ছিলাম, আমার কোনো গুরুর দরকার হয়নি, নিজে ঠেকে শিখেছি, নিজে নিজের রাস্তা গড়ে তুলেছি ।

আমি জিগ্যেস করলুম, রাজকুমার আপনি শনিদেবতার নাম শুনেছেন ?

হৃৎপিণ্ড বললেন, শুনেছি, কখনও শনিদেবতার পুজো হতে দেখিনি বা শুনিনি, আমার জমিদারিতে কতো চাষি থাকতো, বিপদে পড়তো, আমি তাদের চাপ দিয়ে পাওনা আদায় করতাম, তবুও তো তারা শনি নামে কোনো দেবতার আশ্রয়প্রার্থী হয়নি ।

বললুম, আপনি জানেন না, মোড়ে-মোড়ে রিকশা স্ট্যাণ্ডে এখন শনি মন্দির, নাস্তিক মার্কসবাদীরা বসিয়ে দিয়ে চলে গেছে, এখন গান্ধিবাদীরা তাদের কাছ থেকে ফি-হপ্তায় চাঁদা তোলে । রিকশাস্ট্যাণ্ডগুলোয় আর মোড়ে মোড়ে আরেকটা পুজো হয়, বিশ্বকর্মা পুজো, আপনি জাহাজের মালিক হয়ে যে পুজো করেননি,  এখন কেউ রিকশা টানলে বা কোনো সাঁড়াশি নিয়ে কাজ করলেও লাউডস্পিকার বাজিয়ে পুজো করে, ইয়ে দুনিয়া পিত্তল দি, হো বেবি ডল ম্যায় সোনে দি, হো মেরে হুস্ন দে কোনে কোনে দি, বেবি ডল ম্যায় সোনে দি, জয় বাবা বড়োঠাকুর, তুমি ঠাকুরদের মধ্যে সবচে বড়ো, পেন্নাম হই ।

হৃৎপিণ্ড জানতে চাইলেন, শরবতের বয়ামের দেয়ালে এসে, হ্যাঁরে, লাউডস্পিকার কি জিনিস, স্টিম ইঞ্জিনে চলে ?

বললুম, না রাজকুমার, বিজলিতে চলে, তার ভেতরে একহাজারটা ষাঁড়ের গলার আওয়াজ লুকোনো থাকে, কেউ কোনো কথা বাজালে কিংবা গান করলে, সেই ষাঁড়েরা মানুষের মাথার ওপরে চেঁচাতে চেঁচাতে উড়তে থাকে। যে গান গায় বা বক্তৃতা দেয় তাকে তখন পাগলা ষাঁড় বলে মনে হয় ।

হুলি, তুই কি বলতে চাইছিস, ওগুলো আমার বড়ো ছেলের প্রভাবের কুফল ? জিগ্যেস করলেন হৃৎপিণ্ড ।

বললুম, একবার আধ্যাত্মিকতার গাড়ি চালিয়ে দিলে স্পেনের ধর্মধ্বজাধারীরা যে পথে সমাজকে নিয়ে গিয়েছিল, সেই পথেই সমাজটা দৌড়োতে থাকে, গড়াতে থাকে, জানেন তো । স্পেন ওই ধ্বজাগুলো লাতিন আমেরিকায় নিয়ে গিয়ে পুঁতেছে আর সেখানকার মানুষদের হতভাগ্য করে দিয়েছে, দক্ষিন আমেরিকা হয়ে গেছে উত্তর আমেরিকার চেয়ে গরিব ; এখন উত্তর আমেরিকা ভাবছে দক্ষিণ আমেরিকার লোকদের আসা বন্ধ করতে দেয়াল তুলবে ।

হৃৎপিণ্ড দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, ফরম্যালিনের শরবত দুলে উঠল, বললেন, আমেরিকায় যাবো ভেবেছিলুম, কিন্তু তার আগেই মারা গেলুম রে ।

আমি আমার বাকি কথাগুলো বললুম, আপনি বলুন না, এসব এলো কোথা থেকে, এই যে শীতলা পুজো, মনসা পুজো, কার্তিক পুজো, আরও কতো অজানা অচেনা দেবীদেবতার পুজো ? মাঝ রাস্তার ওপরে, লোকের বাড়িতে ঢোকার দরোজা বন্ধ করে, নর্দমার ওপরে পাটাতন পেতে, খেলার মাঠে খুঁটি পুঁতে ? বাজারগুলোয় লাটে-লাটে মূর্তি বিক্রি হয়, দরাদরি হয় ।

কিন্তু আমার বড়োছেলের প্রভাব তো কবেই মুছে গেছে, টিকে আছে শুধু আমার নাতির গান, বললেন হৃৎপিণ্ড, আর সবায়ের নামে লেজুড় হিসাবে নাথ আর ইন্দ্র জুড়ে দেবার রেওয়াজ ।

ঘণ্টাখানেক পরে রাজকুমার বললেন, কার্ল মার্কস লিখে গেছেন যে চিরস্হায়ী বন্দোবস্তের কারণে বাঙালিদের পুঁজি ব্যবসাবাণিজ্য আর শিল্পোদ্যোগ থেকে জমিজমায় নিবেশের  দিকে চলে গিয়েছিল ; আমি তা নিজের জীবন দিয়ে ভুল প্রমাণ করে দিয়েছি । আমি যেমন বেশ কয়েকটা জমিদারির মালিক ছিলাম, তেমনি ব্যবসাবাণিজ্যও করেছি, ব্যাঙ্ক খুলেছি, জাহাজ চলাচল শুরু করেছি,  খবরের কাগজ শুরু করতে সাহায্য করেছি, মেডিকাল কলেজ শুরু করার চেষ্টা করেছি, বিলেতে যাতে ভারতীয়রাও পার্লামেন্টে সিট পায় তার চেষ্টা করেছি, আরও কিছুকাল বেঁচে থাকলে দেখতিস গঙ্গায় স্টিম ইঞ্জিনের স্টিমার চলতো, বর্ধমান থেকে কলকাতা রেলগাড়ি চলতো, কলকাতায় জাহাজ তৈরির কারখানা বসাতাম, স্টিম ইঞ্জিন দিয়ে যে-যে কারখানা বসানো যায় তার চেষ্টা করতাম ।

আমি বললুম, হুজুর, কার্ল মার্কস তো আর জানতো না যে বাঙালিবাবু আর বাঙালি ভদ্রলোক নামে একরকমের জীব জন্মাবে যারা আস্তিক হয়েও দুর্গাপুজো-কালীপুজোয় পুরুতকে নাচতে বলবে, নিজেরা ধুনুচি নাচ নাচবে, মিষ্টি দই খেয়ে ডায়াবেটিসে ভুগবে, আর বলবে যে এটা ধর্মবিশ্বাস নয়, এটা হলো গণতন্ত্রে মানুষের কৌম আনন্দ ।

রাজকুমার বললেন, আমিই তো আমার পরিবারের পুরুতের বাংলা পদবিকে ইউরোপীয় করে তুলেছিলাম ; সেই পদবি নিজেদের নামে লেজুড় হিসেবে সেঁটে পরের প্রজন্মে সবায়ের কতো গর্ব দেখেছিস তো ? উপযোগীতাবাদ, খোলা বাণিজ্য, প্রবুদ্ধ করে তোলার উদ্যোগ, স্বাধীনতাবোধ, একেশ্বরবাদে বিশ্বাস, এসব আমিই তো এনেছিলাম।

আমি শুনছিলুম রাজকুমারের কথা, তার দুশো পঁচিশ বছর পরে দুনিয়ায় যা ঘটছে তা জানিয়ে ওনাকে ওয়াকিবহাল করতে চাইলুম, বললুম, যে পথে আপনার জাহাজ গিয়েছিল, সেপথে এখন জোর যুদ্ধু চলছে, মোচরমানরা দলাদলি করে কার ব্যাখ্যা কার চেয়ে বড়ো প্রমাণ করার জন্যে নিজেদের মধ্যে লড়ে মরছে, মিশর আর পাশাদের দেশ নয়, মিলিটারির দেশ, সেখানে খ্রিস্টানদের গির্জায়, খ্রিস্টান ছাত্রছাত্রীদের বাসে  বোমা মারছে মোচোরমান ধর্মের মানুষ, যতো বেশি পারে খুনোখুনির রেশারেশি চলছে ।

আমার মনে পড়ল যে ‘অপর’ বলতে হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় যে অর্থগুলো পুরোনো বাংলা কাব্য থেকে যোগাড় করেছেন, তার মানে অন্য, ভিন্ন পৃথক, ইতর, অর্বাচীন ,নিকৃষ্ট, অশ্রেষ্ঠ, বিজাতীয়, অন্যজাতীয়, প্রতিকূল, বিরোধী, শত্রু ইত্যাদি । অথচ উনি লিখেছেন যে অপর বলতে আত্মীয় স্বজন মিত্রও বোঝাতো ।

শত্রুও আবার মিত্র ।

একই শব্দের যে এরকম উলটো মানে  হতে পারে তা ইংরেজি-শেখা বাঙালিরা ভুলে গেছে । ইংরেজি শেখা বাঙালিরা নিজেদেরই ভুলে গেছে । মার্কস এঙ্গেলস লেনিন মাও তারা ইংরেজিতেই পড়েছে, বাংলায় অনুবাদ করে চল্লিশ বছর আগে দুর্গাপুজোর মণ্ডপে বিক্রি হতো সেসব বই । যারা বিক্রি করতো তারা সকলেই পেল্লাই বাড়ি তুলে ফেলেছে, গাড়ি হাঁকাচ্ছে, আর বই বিক্রির স্টল খোলে না, অপমান বোধ করে ।

একটা জন্মে যখন আমি সংস্কৃতের শিক্ষক ছিলুম তখন জেনেছিলুম, ভারতীয় দর্শনের সঙ্গে অপর ভাবনার কিছু মিল আছে । উপনিষদ বলছে, ব্যক্তির নিজস্ব বা অহংবোধ বহু কিছুকে অবলম্বন করে গড়ে ওঠে । আত্মন বলতে যদিও নিজেকেই বোঝায়, কিন্তু শুধু এইটুকু বললে তার যথার্থ সংজ্ঞা নির্দেশিত হয় না । আত্মন এমন এক অস্তিত্ব যা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সর্বত্র পরিব্যপ্ত । এই জায়গা থেকে উপনিষদ চলে গেছে অদ্বৈত দর্শনের দিকে ।

আশ্চর্য যে মানুষ নিজেকে মাপে বড়ো করে আর অপরকে মাপে ছোটো করে । এক পক্ষের অপর তৈরি হয় অপর পক্ষের অপরকে বাদ দিয়ে । অপরীকরণে তারাই সক্রিয় পক্ষ যাদের হাতে নির্ণায়ক ক্ষমতা থাকে । অপরীকরণে এক পক্ষ নিজ, আরেক পক্ষ অপর । এই নিজ যতোই ব্যক্তির সত্বা হোক, তার মূলে আছে সমাজ । মানুষ নিজের সমাজ, ও সম্প্রদায়ের সংস্কার, বিদ্বেষ, ভীতি, পছন্দ-অপছন্দ, ক্ষোভ, আশা-নিরাশা, ধর্মচেতনা, ন্যায়-অন্যায়বোধ, ঘৃণা-লালসা, পুরোনো ইতিহাস, বন্ধুতা-শত্রুতা, রাজনীতি দ্বারা সব সময়েই প্রভাবিত হয় । সমাজ মানুষকে যে-ছাঁচে গড়ে তোলে, সে তারই আকার নেয় । পরিবার, পরিবেশ, নানা রকমের মিডিয়া, সভা-সমিতি, সরকার, রাজনৈতিক দল, ধর্মীয় সঙ্গঠন, শিক্ষাব্যবস্হা, রাজনৈতিক আর সামাজিক মতবাদ, হুজুগ, ধর্মীয় উন্মাদনা, এ-সবেরই কিছু-না-কিছু ছাপ পড়ে তার ওপর — চেতনা-অবচেতনার নানা স্তরে তা ছড়িয়ে পড়ে ।

আমি তো শুদ্দুর, তাই বাদ দেয়া অপর ।

হৃৎপিণ্ড : আর কতো দূর হুলি ?

আমি : আর এক মাস, রাজকুমার ।

 

হায়, রাজকুমার দেখে যেতে পারলেন না বিয়ের আগেও ছেলে-মেয়েরা ট্যাবলেট খেয়ে যতোবার  যতোজনের সঙ্গে ইচ্ছে সেক্স করতে পারে । ইচ্ছে মেয়েদের স্বাধীনতা এনে দিয়েছে ।

তুই অতো ভাবছিস কেনো, দেখে যেতে পারিনি বটে, মেয়েদের স্বাধীনতা তো আমার জন্যেই সম্ভব হয়েছে, আমি যদি না অঢেল টাকা রোজগার করতাম, আমাদের বাড়ির মেয়ে-বউরা কি নারী স্বাধীনতা আনতে পারতো?

হায়, রাজকুমার দেখে যেতে পারলেন না কানির বদলে মেয়েরা স্যানিটারি ন্যাপকিন বাঁধে ।

তুই ভুল ভাবছিস, হুলি ।

হায়, রাজকুমার এতো সাহসী ছিলেন হয়তো নিজেই স্যানিটারি ন্যাপকিনের কারখানা বসাতেন ।

হ্যাঁ, আমিই কারখানা বসাতুম, ওতে বিশেষ লগ্নির দরকার হয় না ।

আমার মনে পড়ল যে বিশ শতকের সাতের দশক আমি একটা কলেজে সমাজবিজ্ঞান পড়াতুম, আমার নাম ছিল হুলিচরণ ভট্টাচার্য, স্নাতকোত্তর সিলেবাসে ‘ভুতবিদ্যা কামাখ্যাতন্ত্র’ নামে একটা বই ছিল, রাজকুমারের হৃৎপিণ্ড নিয়ে পৌঁছোতে মোটে এক সপ্তাহ বাকি,  আশঙ্কায়, কী করবে ঘাটে নেমে ঠিক করে উঠতে পারছিলুম না, কেননা রাজকুমারে এতো শত্তুর ছিল, তারা নিশ্চই জেটিতে এসে ব্যাগড়া দেয়া আরম্ভ করবে ।

চোখ বুজে আঁচ করতে পারলুম, জেটির খালি-গা হেটো ধুতি বামুনগুলো আর অতিবামুন কাল্টের কোরাধুতি কাঁধে চাদর লোকেদের নির্ঘাত ভুতে পেয়েছে, জানি আমি, রাজকুমারের হৃৎপিণ্ডের দিকে এক ঠায় তাকিয়ে এক্কেবারে নিশ্চিত হলুম ।

‘ভুতবিদ্যা কামাখ্যাতন্ত্র’ বইয়ের মন্তর মনে পড়ে গেল যা স্নাতোকোত্তরে ছাত্র-ছাত্রীদের মুখস্হ করাতুম যাতে ওরা জীবনে বাধাবিঘ্ন পেরিয়ে কেউকেটা হয়ে উঠতে পারে, আইআইটি আইআইম-এ ভর্তি হতে পারে, বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে পড়াশুনা করে সেদেশের মেম বিয়ে করে এদেশে মাবাপকে ভুলে যেতে পারে । জাহাজের জেটিতে পৌঁছে, যাদের ভুতে পেয়েছে, আর তাদের মগজে ঢুকে নানা উৎপাত করছে, তাদের কাছে গিয়ে চুপিচুপি এই মন্তরটা তিনবার পড়তে হবে আর ওদের শরীরে তিনটে ফুঁ দিতে হবে ।

জেটিতে নামার পরে তো কাছ-ঘেঁষতে দেবে না ওরা, আমি যে শুদ্দুর, তাই জাহাজের কেবিনে বসেই এই মন্তরটা তিনবার পড়লুম :

ভুত কে ? আমি কে ? কে বলতে পারে ?

ভুতের সন্ধান করি বেড়াই ঘুরে ঘুরে ।

ভুতের দেখা পেলাম হেথা ।

ভুতের সঙ্গে কই কথা ।

শুনাই কানে হরেকৃষ্ণ হরেরাম ।

সজীব ছিল নির্জীব হলো শুনে রামনাম ।

ভুতের রাজা মহাদেব রাম নামেতে খেপা ।

ভুতকে ডেকে নিলেন কাছে বুকে পেয়ে ব্যথা ।

দোহাই শিবের, দোহাই রামনামের ।

জেটিতে যারা দাঁড়িয়ে থাকবে তাদের ঘাড় থেকে শিগগির যা ।

জয় ভুতনাথ জয় জয় শিবশঙ্কর ।

মনে মনে মন্তরটা তিনবার আওড়ালুম ।

রাজকুমারের হৃৎপিণ্ড শুনতে পেলে চটে যাবেন, বলবেন তোদের এইসব ভুতপ্রেতে বিশ্বাস গেলো না, বিলেত ঘুরিয়ে নিয়ে এলাম, তবুও গেঁয়ো মুর্খ থেকে গেলি, সভ্য মানুষ হতে পারলি না ।

না, রাজকুমারের হৃৎপিণ্ড সেসব কিছুই বললেন না । বয়ামে ফরম্যালিনের শরবতে হয়তো উনি এখন ঘুমোচ্ছেন, সমুদ্রের এমন ঢেউ, এমনিতেই ঘুম পায়, মনে হয় মায়ের কোলে দোল খাচ্ছি । আর ওনার তো নিজের মা ছিলেন না, যদিও সৎমা ওনাকে খুবই ভালোবাসতেন ।

ভুত যার কিংবা যাদের ঘাড়ে ভর করে সহজে তাদের ছেড়ে যায় না । আমার মনে হতে লাগলো জেটিতে যারা হৃৎপিণ্ডের জন্য অপেক্ষা করছে, তাদের ঘাড়ের ভুতগুলো হয়তো তাদের ঘাড় থেকে নেমে তাদের ছেলেপুলের ঘাড়ে চাপবে, ছেলেপুলের ঘাড় থেকে নেমে তাদের ছেলেপুলের ঘাড়ে চাপবে, হয়তো কেন, নিশ্চই ঘাড়ের পর ঘাড়ে চেপে সব বাঙালির ঘাড়ে ভুতেরা ভর করেছে, তাদের আর যাবার নাম নেই, রাজকুমারকে হিংসে করার লোক কি কম আছে আজকের দিনে ? একজন আরেকজনকে হিংসে না করলে শ্বাস নিতে পারে না।

রাজকুমারের মতন রাজসিক আর জাঁকজমকঠাশা জীবন দেখলেই লোকেদের ভুতে পায়, ঈর্ষায় জ্বলে খাক হয়, কাউকে মুকেশ আমবানি হতে দেখলেই গালমন্দ করে, তার কারণ নিজেরা তো কুটোটি নাড়তে পারলেন না, যারা রাজকুমারের দেখানো পথে এগিয়ে গেল, যেমন গৌতম আদানি, তাদের হিংসে করে, তাদের প্যাঁচ-পয়জার তিকড়মবাজি শিখতে না পেরে ভুতের জিম্মায় নিজেদের ছেড়ে দেয়, যাতে ভুতেরা এক বছরেই টাকা ডবল করে দিতে পারে, যেন ভুতেরা দাউদ ইব্রাহিমের বংশধর, দাউদের বোন হাসিনার ছেলেপুলে ।

রাজকুমার জন্মেছিলেন ১৭৯৪ সালে আর আজ ২০১৭ সাল, কতো বছর হলো ? দুশো তেইশ বছর ! এরই মধ্যে বাঙালিরা ভুতের আক্রমণে আধপাগল হয়ে গেছে, কাজের বদলে বইতে লেখা বাক্যিকে মনে করে এগিয়ে যাবার রাস্তা । নিজেরা একা এগোতে চায়না, সঙ্গে সাঙ্গোপাঙ্গো চাই, মিছিল চাই, ধুলোট চাই, জুলুস চাই, যেন তাতেই রাজকুমারের স্বপ্নের বাঙালিরা পয়দা হবে ।

হায়, রাজকুমার,  কিছুই হয়নি, প্রতিটি বাঙালির ঘাড়ে চেপে বসেছে বুকনির ভুত, বাগাড়ম্বরের ভুত, লেকচারবাজির ভুত, দলবাজির ভুত, দলদাসের ভুত ।

ঘাড় থেকে ভুত না নামলে কী করতে হবে তা স্নাতকোত্তরের সমাজবিজ্ঞানের  সিলেবাসে ‘ভুতবিদ্যা কামাখ্যাতন্ত্র’ বইতে আছে, তখন অগ্নিবাণ উচ্চারণ করতে হবে, যাকে বা যাদের ভুতে পেয়েছে, তাকে বা তাদের ভুতছাড়া করার জন্যে  খড়ের মশাল তৈরি করে এই মন্তর আউড়িয়ে আগুনে জোরে ফুঁ দিতে হয় যাতে মশালের ধোঁয়া ভুতে পাওয়া মানুষদের গায়ে লাগে, লাগলে ভুত তাদের ছেড়ে যেতে বাধ্য । আমি তাই চুপি চুপি এই মন্তর আওড়ালুম যাতে রাজকুমারের হৃৎপিণ্ড শুনতে না পান, মশাল তো নেই, এমনিই ফুঁ দিলুম ।

 

অষ্টবজ্র করলুম এক অষ্ট্ দেবতার বরে

অষ্টবজ্রের তেজ নিলুম শক্তির শক্তি ধরে

অগ্নিবাণ সৃষ্টি হলো ব্রহ্মার দোহায়ে

হান হান শব্দে বাণ চল্লো আকাশ ছেয়ে

ওঁ হরি নারায়ণ বাণের মুখে জ্বলে

নাগ-মানব দেব-মানব কাঁপলো ব্যাকুল হয়ে

স্বর্গ কাঁপে, মর্ত্য কাঁপে, পাতাল কাঁপে ভয়ে

যা চলে বাণ গঙ্গাতীরের জেটির মানুষদের দিকে

যে দেহ আশ্রয় করে পুড়িয়ে ফ্যাল, কটি অঙ্গ তার

তেত্রিশ কোটি দেবতার হুকুম

লাগ লাগ শিগগির লাগ..

 

রাজকুমার : আর কতো দূর হুলি ?

আমি : আমাদের জাহাজ পৌঁছে গেছে রাজকুমার । ঘাটে কাউকে দেখতে পাচ্ছি না ।

জাহাজ গঙ্গায় ঢোকার আগেই আমার হাবশি সহচর উড়ুক্কু মাছ দুটো নিয়ে সমুদ্রে নেমে গিয়েছিল, সাঁতরে মার্টিন দ্বীপে চলে যাবে ; উড়ুক্কু মাছ দুটো ওকে সমুদ্রের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে  ।

আমি শরবতের বয়ামে রাজকুমারের হৃদয়  হাতে নিয়ে জেটির ঘাটে নামলুম । অপেক্ষা করলুম সন্ধ্যা পর্যন্ত, কাউকে আসতে না দেখে কুমোরটুলির দিকে রওনা দিলুম ।

[ রচনাকাল : মার্চ –  মে ২০১৭ ]

 

 

Posted in অরৈখিক গল্প, ভাঙা ন্যারেটিভ, মলয় রায়চৌধুরী | Tagged , | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

নরমাংসখোরদের হালনাগাদ – একটিমাত্র বাক্যে লেখা নভেলা : মলয় রায়চৌধুরী

         পাঠক বা পাঠিকা আপনি কখনও পুংযৌনাঙ্গের কাঠিকাবাব খেয়েছেন

লাবিয়াফ্রাই ইন অলিভ অয়েল

সে-ভূখণ্ডে পুরুষের অণ্ডকোষকে বলা হয় অলিভ

খাননি তো

উত্তরঐতিহাসিক এক ভূগোলের দুই পক্ষের লোকেরা মনে করে এই সমস্ত খেয়েই তারা মজায় আছে

সে-দু’এলাকা পৌরাণিকাধুনিক যুগের পর থেকে জলহীন হবার ফলে জাতিপ্রথা তাঁবাদি হয়ে গেছে কেননা সকলেরই পোঁদে টাটকা গু লেগে থাকে  আর কেউই জানে না চিন্তাভাবনা কাকে বলে কয়েকশো প্রজন্ম থেকে চান করা কাকে বলে কেউ জানে না কোনো মানুষের গায়ের রঙ টের পেতে হলে থুতু দিয়ে ঘষলে টের পাওয়া যায় চান করার ব্যাপার নেই বলে গায়ের তাড়িকুলকুল দুর্গন্ধই পারস্পরিক আকর্ষণের সেতু হয়ে উঠেছে চুলের রঙ হয়ে গেছে সোনালি বাদামি লাল নীল বেগুনি কালচে সেই পারের পুরুষ্টু আর আধখ্যাংরা জনগণ ওই পারের মানুষের জ্যান্ত বাসি শুকোনো শুঁটকি নোনা মাংস ছাড়া আর কিছু খায় না তাদের রক্ত খায় হাড়ের বোতলে ভরে হিসি খেয়ে নেশায় বুঁদ হয়ে ভৌগলিক-ভাষায় গালমন্দ করে  ওই পারের পুরুষ্টু আর আধখ্যাংরা জনগণ সেই পারের মানুষের জ্যান্ত বাসি শুকোনো শুঁটকি নোনা মাংস ছাড়া আর কিছু খায় না তাদের রক্ত খায় হাড়ের বোতলে ভরে হিসি খেয়ে নেশায় বুঁদ হয়ে ঝাউবনের ভাষায় গালমন্দ করে সেই পারের জনগণ অফুরন্ত বিকৃতিতে উচ্ছৃঙ্খলতায় স্বেচ্ছাচারিতায় দুর্বৃত্তিতে ভ্রষ্টতায় মর্ষকামে মন্দগ্রাহীতায় নিকৃষ্টতায় লুঠতরাজে নষ্টামিতে ধৃষ্টতায় অনৈতিকতায় অনিশ্চয়তায় অবৈধতায় আদিমতায় নিমিত্তবাদে ফিরে যেতে চায় যখন চাঁদের ওই দিক পৃথিবীর পানে পিঠ করে পূর্ণিমার রাতে গোল হয়ে ওঠে ওই পারের জনগণ বিকৃতিতে উচ্ছৃঙ্খলতায় স্বেচ্ছাচারিতায় দুর্বৃত্তিতে ভ্রষ্টতায় মর্ষকামে মন্দগ্রাহীতায় নিকৃষ্টতায় লুঠতরাজে নষ্টামিতে অনৈতিকতায় ধৃষ্টতায় অনিশ্চয়তায় অবৈধতায় আদিমতায় নিমিত্তবাদে ফিরে যেতে চায় যখন শুক্রগ্রহের আঙটি কি দিয়ে গড়া জানা ছিল না  পাঠক বা পাঠিকা আপনি দেখছেন তো তার ডিজেলরাঙা ভুষোকেলটে হাওয়ার ঘষাকাচ সেপার আর কসমোনটের চোখে দেখা দুনিয়ায় নেই দুনিয়ায় কেন টেলিসকোপে পাওয়া কোনো গ্রহেই নেই শুধু গ্রহেই কেন পুরো ব্রহ্মাণ্ডে কোথ্থাও নেই একই ব্যবস্হা ওপারের হাওয়ার যদিও ওপার-সেপার মিলিয়ে একই হাওয়া দুটো পক্ষকে হাওয়ার বদগন্ধ দিয়ে আলাদা করে রেখেছে তা আজ বহুকাল বহু বছর হল বৈকি তাছাড়া আর কোনো সীমানা নেই কাঁটাতার বলুন নদী বলুন সেপাইসান্ত্রি বলুন সিমেন্টের পিল্পে বলুন কোনো কিছুই নেই ব্যাস এই জমাট বদগন্ধ হাওয়া যা কখনও পূতপবিত্র নদী ছিল যার পিঠে চেপে ঝড় আসে বৃষ্টিহীন-মেঘ আসে পচা পাতারা আসে গ্রীষ্ম বর্ষা শরৎ হেমন্ত শীত বসন্ত আসে আর ফিরে যায় নাক উঁচু করে শুঁকতে হবে না জাস্ট নাককে ছেড়ে দিন নিজের কাজ করবার জন্য কি গন্ধ পাচ্ছেন বলুন তো খটখটে নর্দমার শুকনো নালির মরা নালার পাথুরে পাঁকের টাটকা গুয়ের বাসি গুয়ের আঁস্তাকুড়ে ফেলে দেয়া মরা ভ্রুণের রজঃশরাবের শুকনো রক্তের কানি  মাংসখোর নেমন্তন্নের হাড়ের থালায় হিসি-পানের হাড়ের ফাটা গেলাস পিটিয়ে মারা মেটেল মানুষ ফুটবল দলের চাককাটা ফিকে জার্সি জন্মদিনের নষ্ট আমিষ-কেক আইসক্রিমের পৌরাণিকাধুনিক কাঠি বোঁটা-টফির চিমচিম কয়েকরাতের কনডোম তাড়ির চুল্লু-টানা চামড়ার পাউচ ফসিল আলু পটল বাঁধাকপি ফুলকপি ফরাসবিন-জীবাশ্ম উবে-যাওয়া নদীতে ফেলেছিল সেই সময়ের মানুষজন নদী নিজের বিষাক্ত স্মৃতি থেকে মাঝেমধ্যে উগরে দিলে পাওয়া যায় পৌরাণিকাধুনিক যুগের খেলার নিদর্শন গোল্লাছুট হাডুডু কানামাছি জলকুমির ডাংগুলি বউছি দাড়িয়াবান্ধা বলিখেলা বাঘবন্দি জলকুমির চুকিতকিত কিন্তু এক কণা মাংস পাবেন না কেননা সেপারের লোকেরা ওপারের মানুষদের চামড়ার টবে বসিয়ে কিংবা দাঁড় করিয়ে বাঁশের বা হাড়ের ছুরি দিয়ে বেশ সাবধানে চামড়া ছাড়িয়ে কিংবা তালপাতার ডাঁইয়ে আগুন ধরিয়ে জ্যান্ত পুড়িয়ে স্মোকড মাংস খেতে ভালোবাসে চান করা কাকে বলে কেউ তা জানে না বলে চামড়ার ওপরের ময়লা মোম হয়ে জমে থাকে ঠিক তেমনিই ওপারের লোকেরা সেপারের লোকেদের দেখলেই বস্তাবন্দি করে বাঁশের মাচানে হুমহুনা ভাই হুমহুনা বেঁধে নিয়ে  যায় বস্তাসুদ্দু চামড়ার টবে রেখে দুরমুশ করে কাঁচা খায় কিংবা পুড়িয়ে খায় সেপার বা ওপারের কোনো উৎসব হতে পারে না পাঠক বা পাঠিকা আপনারা তো আমার চেয়ে ভালো জানেন যে হিংস্রতা বাদ দিয়ে কোনো উৎসব সম্ভব নয় এমনকি প্রথম রাতের ইল্লিতে গিল্লি করার ব্যাপারও মানুষের মাংস খাওয়া ছাড়া বাছবাছাই করার কোনো দরকার যে হয় না তা নয় যতো মোটা মানুষ ততো স্বাদ তার চর্বিতে মানবতার গুণে সে নিজেই নিজেকে স্বাদু করে তোলে তার শিরার স্নেহপদার্থ বাড়িয়ে তবে সেপারের আর ওপারের পুরুষদের মধ্যে জোয়ানদের অনেকেই গুদাকৃষ্ট গুদোন্মাদ তেমনই ঝক্কিমন্ত যুবতীদের মধ্যে অনেকেই পুংলিংপাগলি লিঙ্গোদকপ্রাণ তারা শিকার বাছাই করে আড়াল থেকে পাঠক বা পাঠিকা আপনারাই বলুন সেপার-ওপার এরা কি দুটো ভুঁই না দুটো রাষ্ট্র না দুটো সম্প্রদায় না দুটো জাতি না দুটো দল না এক পক্ষ উদারপন্হী আরেক পক্ষ মৌলবাদী এক পক্ষ বিশ্বাসী আরেক পক্ষ অবিশ্বাসী এক পক্ষ গুণ্ডারাজ আরেক পক্ষ জঙ্গলরাজ এক পক্ষ শ্রমিকদরদী আরেক পক্ষ বেকারদরদী আমি তো কিছু বুঝতে পারছি না পৌরাণিকাধুনিক যুগে সেপার আর ওপারের মানুষের মধ্যে ভাইরেভাইরেভাই  রকাড্ডায়যাই ছিল বটে এখনকার উত্তরঐতিহাসিক যুগের মতন মানুষখোর ছিল না যবে থেকে জলহীন এই এলাকায় জলের আকালের ক্ষেত্রসমীক্ষা করতে একদিন একজন আলটপকা এসে-পড়া কোথাকার-কোন-মেয়েকে সেপার ওপার কোনপার নেবে নির্ণয় করতে না পেরে তাকে পুড়িয়ে মেরে স্মোকড মেম খাওয়া হয়েছিল তারপর থেকে সেপার ওপার আলাদা দুটো পক্ষ হয়ে গেল সেই কোথাকার-কোন-মেয়েকে ধরে সেপার-ওপার উৎসব করে খেয়েছিল তারপর থেকে সেপার আর ওপার জমাট হাওয়ার দেয়ালের সেদিকে-ওদিকে আলাদা হয়ে গেল কোথাকার-কোন-মেয়েকে খাবার সময়েও আইন অনুযায়ী বখরা হয়েছিল একটা মাই টোঁটিসুদ্দু ওপার পেল একটা মাই টোঁটিসুদ্দু সেপার পেল একটা ঠ্যাঙ ওপার পেল একটা ঠ্যাঙ সেপার পেল একটা কান ওপার পেল একটা কান সেপার পেল ভাগ করতে অসুবিধে হয়নি কোথাকার-কোন-মেয়েকে উল্টো টাঙিয়ে এলোচুল ঝোলা মাঝখান থেকে হাড়ের চাপাতির কোপ মেরে-মেরে দুটুকরো করা হয়েছিল ফলে সোনালি কোঁকড়ারেশম চুলসুদ্দু হাফ-লাবিয়া অলিভতেলে ভেজে সেপারের লোকে খেলো হাফ-লাবিয়া অলিভতেলে ভেজে খেলো ওপারের লোকে প্রথম-প্রথম টোপ ফেলার জন্যে ওপার যেমন ল্যাংটো থলথলে অবিস্মরণীয় মেয়েদের তালগাছের তাড়ি নামাবার  নাম করে কোমরে হাড়ের হাড়ুহাজ-করা গয়না পরিয়ে ঝমঝমাঝম ঝমঝমাঝম কোঁচরঘণ্টা বাজিয়ে পাঠাতো এখনও পাঠায় বপুবেঢপ তেলচেকনাই পেছনতোলা পুরুষ পাঠাতো এখনও পাঠায় তেমন সেপারও থলথলে চর্বিদার গাবদাউরুৎ ঢেউদার মেয়েদের আর হোঁৎকা লোকেদের টোপ ফেলতো ওপারের ঢাকঢোল বাজিপোড়ানো নাচগান থেকে টের পাওয়া যায় সেপারের কাউকে ধরতে পেরেছে তাকে তারিয়ে খাওয়া চলছে অলিভতেলে রাঁধা হয়েছে মানুষের মাংসের হাড়িকাবাব রেজালা ধানশাক কাঠিকাবাব ডালচা কোরমা বিরিয়ানি কড়াইগোশ্ত ভুনা কাচ্চিবিরিয়ানি ভুনাখিচুড়ি রোগনজোশ ফ্রায়েডহিউম্যান রেশমিকাবাব এসব পদ রান্নার রাঁধুনির দুই পক্ষের একই নিয়ম তা হল যে মেয়েদের রজঃশরাব চলছে শুধু তারাই রাঁধতে পারবে কেননা তারাই একমাত্র পবিত্র সুবিধার জন্যে এখন বলা হয় সেপারপক্ষ আর ওপারপক্ষ নামের দুটো ব্যাণ্ড পার্টি ব্যাণ্ডে ওপারীয় সঙ্গীত হলে সেপার বুঝে যায় তেমনিই ব্যাণ্ডে সেপারীয় সঙ্গীত হলে ওপার বুঝে যায় ভিয়েন বসেছে যবে থেকে উত্তরঐতিহাসিক যুগ এলো দুপক্ষই মানুষমাংসখোর হয়েছে তবে থেকে সেপারের মানুষদের পপ-কালচার হল মরা আত্মীয়দের দুঃখে পূর্ণিমার রাতে সবাই মিলে হাড়ের বাঁশি বাঁশ-চামড়ার হারমোনিয়াম তালখোলের তবলা বাঁশ-হাড়ের তানপুরা পাখোয়াজ হাড়ের গিটার সেতার চামড়ার ড্রাম সরোদ মাইয়ের চামড়ার একতারা বাঁশের সানাই চামড়ার খোল দিলরুবা এস্রাজ তালগুঁড়ির মৃদঙ্গ ঢাক ঢোলক নাগড়া খরতাল মঞ্জীরা বাজিয়ে  সুর করে কাঁদা যাকে বলে কেঁদে শোকমাতন হওয়া আর জ্বর হলে কপালে জলপটি দেবার জন্য দুখু-কান্নার সেই নোনতা জল হাড়ের বোতলে ভরে রাখা ওপারের মানুষদের পপ-কালচার হল অমাবস্যার রাতে মরা আত্মীয়দের দুঃখে সবাই মিলে বঁশি হারমোনিয়াম তবলা তানপুরা পাখোয়াজ গিটার সেতার ড্রাম সরোদ একতারা সানাই খোল দিলরুবা এস্রাজ মৃদঙ্গ ঢাক ঢোলক নাগাড়া খরতাল মঞ্জীরা বাজিয়ে সুর করে কাঁদা যাকে বলে কেঁদে শোকমাতন হওয়া আর জ্বর হলে কপালে জলপটি দেবার জন্য দুখু-কান্নার সেই নোনতা জল হাড়ের বোতলে ভরে রাখা এক পক্ষের পপ কালচার নাচনকোদনে আরেক পক্ষ বিরক্ত হয় ভ্যাঙায় অপসংস্কৃতির বদনাম দিয়ে খেপায় সেপার আর ওপার দুই পারেরই নিজেদের চরচামচা আছে কামড়সমিতি আছে ঝাড়ঝাঁকুনি আছে জোকারচিত্ততা আছে মিথ্যেখোর সমবায় আছে তোলাবাজ সহমর্মীতা আছে তারা উঁকির অঙ্ক কষে ওই পারের ফি-বাড়ির ঘাঁতঘোতের খবর কালোকেলটে কুচকুচে চামড়ার সেরেস্তা খাতায় বাঁশপেনসিলে নথি করে রাখে সেই নথি অনুযায়ী কথাকাটাকাটি হয় সভাসন্মেলন হয় আলোচনা হয় সালিশি জমায়েতে ফয়সালা করা হয় কোন বাড়িতে শাঁষদার মাল আছে মাল মানে ইল্লিতে গিল্লি করার যুবতী নয় মাল মানে যে পুং বা স্ত্রীং-এর শরীরে মাংসের পরিমাণ বেশি তবে মধ্যবয়সী মহিলাদের মাই ঢাউস হয় মাইয়ের টোঁটি শক্ত আর মাপে বড়ো হয় বলে তাদের চাহিদা দুই পারেই বেশি ওগুলো কেটে নিয়ে নতুন নতুন রেসিপি বানানো হয় কারোর মাইতে যদি ধরা পড়ার পর দুধ পাওয়া যায় তো পক্ষের মাই-বিশেষজ্ঞ ফিট্টমফিট পাহারাদারেরা সেই দুধ টিপে বের করা রেখে দেয় সেপারের একনায়ক মোড়লচিফ বা ওপারের একনায়ক মোড়লচিফ ঝিনুকে করে খাবেন বলে যার মাইতে দুধ পাওয়া যায় তার কোলে শুয়েই ঝিনুকে করে দুধ খাবার রেওয়াজ ব্যাপারটা পৌরাণিকাধুনিক যুগ থেকে চলে আসছে তো সেই যখন সমুদ্র থেকে পাওয়া ঝিনুকে বাচ্চারা এখন-অবলুপ্ত বাঘের সিংহের বাইসনের শেয়ালের ভাল্লুকের চিতার জাগুয়ারের দুধ খেতো যবে থেকে দেশটা জলহীন হয়ে গেল সব জানোয়ার পাখিপাখালি উবে গেল শুধু মানুষের চরিত্রের সঙ্গে মেলে এরকম দুটো জীব মশা আর মাছি অফুরন্ত উড়ালে টিকে আছে তেমনই টিকে আছে মানুষের চরিত্রের বৈশিষ্ট্য নিয়ে দুটো গাছ বাঁশ আর তাল এখন উত্তরঐতিহাসিক যুগে ধরে-আনা মানুষকে মানবতাবাদী পিঁজরেপোলে বন্ধ করে রাখে তারপর খাবার সময়ে একজনকে বের করে জিইয়ে রেখে টুকরো-টুকরো কেটে কেটে খেতে চায় তখন তাকে সটানঢ্যাঙা তালগাছে বেঁধে রাখা হয় সবাই নিজের ইচ্ছেমতন ধরাপড়া শরীরের পোঁদের মাইয়ের গালের থুতনির উরুর পায়ের-গোছের গোড়ালির নাকের কানের আঙুলের চোখের অংশ কেটে কাঠের আগুনে পুড়িয়ে খায় অলিভতেলে ভেজে খায় বা বিশেষ পদ রেঁধে খায় কাটার সময়ে রক্ত বেরোলে তা চামড়ার টবে জমিয়ে রেখে পাকাতালের মালায় করে খায় নয়তো হাওয়ায় উড়ে-আসা নদী খুঁড়ে পাওয়া কাঁচকড়ার বোতলে ভরে রেখে দ্যায় পরে শুকনো মাংসের সঙ্গে খাবে বলে যন্ত্রণা উপভোগ করতে না পারলে কারোর ভালো ঘুম হয় না আর পাঠক বা পাঠিকা আপনারা তো ভালো করে জানেন যে ব্যক্তিগত বা নিজস্ব বলে কিছু টিকে নেই মাংস শুকোবার উৎসব হয় সেপার ওপার দুই পারেই রোদে তালপাতা পেতে তার ওপর মাংসের টুকরো রেখে শুকোনো হয় কিংবা বাঁশগাছের ডালে ঝুলিয়ে পাথুরে-নুন  মাখিয়ে যাতে আকালে কাজে লাগে আকাল মানে যখন মানবতাবাদী পিঁজরেপোল ফাঁকা একে অন্য পক্ষের কোনো মানুষকে হপ্তাখানেক ধরতে পারেনি আকালের দরুণ সেপার ওপার দুই পারের মানুষ বড়ো একটা বেরোয় না তখন শুকনো মাংস পুড়িয়ে রক্তের আচার টাকনা দিয়ে জমানো হিসির মদ দিয়ে খাওয়া হয় পৌরাণিকাধুনিক যুগে জন্তু-জানোয়ার খাবার চল ছিল গোরু ছাগল মোষ ভেড়া কুমির হাতি উট বাঁদর হনুমান চার পায়ের সবই খাওয়া হতো কিন্তু দুই পারের একনায়ক মোড়লচিফ একই সঙ্গে একই রাতে স্বপ্নাদেশ পেলো যে চারপেয়েদের খাওয়া অনুচিত তাতে নৈতিকতার ব্যামোয় ভুগে মানুষ কেরমে-কেরমে হাপিস হয়ে যাবার সম্ভাবনা আর তাছাড়া মানুষ যখন-তখন উঠলো বাই তো চাপতে চাই কায়দায় চুরাশি-আসন করতে পারে বিইয়ে-বিইয়ে নিজেদের বাকতাড়ুয়ার সংখ্যা বাড়াতে পারে জন্তুজানোয়ার তা পারে না কেননা তারা বাৎসায়ন পড়েনি রকে বসে সিটি বাজায়নি ভিড়ে পোঁদে গিল্লি ঠেকিয়ে দাঁড়ায়নি হাত গলিয়ে মাই টেপেনি তারা তাপে আসলে বছরে দিনকয়েকের জন্যে ইল্লিতে গিল্লি করে ফলে সংখ্যায় বাড়তে পারে না তা সত্ত্বেও জলের অভাবে তারা নিশ্চিহ্ণ হয়ে গেল এদিকে গাঁড়হাভাতে মানুষ তো পিলপিলিয়ে সড়সড়িয়ে বেড়ে চলেছে তাই মানুষের মাংস খাওয়া উন্নত সভ্যতার লক্ষণ কিন্তু নিজের পক্ষের কেউ মারা গেলে তার মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ বলে নিজের পক্ষের মানুষদের পোড়ানো হয় না পৌরাণিকাধুনিক যুগে অন্ত্যেষ্টিকালে পোড়ানো হতো বটে কিন্তু পোড়া-মাংসের গন্ধ পেয়ে কেউ-কেউ নিজেকে সামলাতে পারতো না পুড়তে থাকা বাবা বা মা বা বোন বা ভাইয়ের মাংস লোভে পড়ে চিতা থেকে তুলে কচর-মচর হাপুস-হুপুস খেয়ে নিতো মারা গেলে মাটিতে পোঁতাও হয় না কেননা পৌরাণিকাধুনিক যুগে যখন পোঁতা হতো তখন দেখা যেতো যে সমব্যথী মানুষজন নিজের বাবা বা মা বা বোন বা ভাইয়ের গলে যাওয়া মাংস মাটি খুঁড়ে গোধূলিবেলার রঙিন আকাশের তলায় বসে বসে আয়েসে চাকুসচুকুসিয়ে খাচ্ছে গিল্লিআইসক্রিম চুষছে নিজের পক্ষের কেউ মারা গেলে এখন তার শরীর ক্রুশবাঁশে হাড়ের গজাল দিয়ে গেঁথে হাওয়ার দেয়াল থেকে বেশ দূরে যে বাঁশবনের ক্যাম্পাস আছে তার মাঝখানের ফাঁকা চত্ত্বরে নিয়ে গিয়ে পুঁতে দেয়া হয় চারিদিকে বাঁশবন বলে ঝোড়ো হাওয়ায় ক্রুশবাঁশ উপড়িত হবার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে দুই পক্ষেই গাছ বলতে শুধু মুলি আর তল্লা জাতের বাঁশঝাড় আর তালগাছ কেননা নদী তো সেই কবেই পালিয়েছে মাটির তলার জল কোথায় যে লুকিয়ে পড়েছে কেউ জানে না একশো-দুশো প্রজন্ম থেকে দুই পক্ষের লোকেরা জানে না জল কাকে বলে তাই হিসি দেখিয়ে বাচ্চাদের পাঠশালায় বোঝানো হয় জল কেমন দেখতে ছিল নদী নেই বলে গতি করার জন্যে দুটো বাঁশকে ক্রস চিহ্ণের মতন বেঁধে তাতে হাতে পায়ে হাড়ের গজাল ঠুকে শবকে বাঁশবনের ক্যাম্পাসে টঙে দাঁড় করিয়ে দেয়া হয় সে মড়াকান্তি মানুষ আপনা থেকেই রোদে শিশিরে অন্ধকারে শুকিয়ে দেখতে দেখতে মিচকিহাসি-করোটি আর হাতপাবাঁধা কংকাল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে তারপর তার মাথার বগলের কুঁচকির চুল খসে গিয়ে ওড়ে করোটি আর হাড়গুলো একএক করে ঝরে পড়ে তারা মিচকিহাসি বজায় রাখে যাতে প্রমাণ হয় যে জীবন কতো আনন্দময় ছিল মানবজন্ম সার্থক যে পক্ষের মড়া বা মড়ানি সেই পক্ষের বাচ্চারা ছুটির সময়ে মড়াকান্তিদের এই সংগ্রহশালা দেখতে যায় বড়োরা তাদের বুঝিয়ে দেয় কোন ক্রুশবাঁসে কোন একনায়ক মোড়লচিফ আধঝোলা কার আত্মীয় লটকানো বা কোন কঙ্কাল কার বাড়ির বা ঝড়ে ঘাসে ঝরে পড়া করোটি কোন মোড়লচিফের কোন ঝক্কিমন্ত রাত-ফোসলানো আধ-বউয়ের যখন ক্রুশবাঁশ থেকে হাড় পড়ে-পড়ে ঢিবি  হয়ে যায় তখন সেই হাড়গুলো আর ধরে-আনা পুরুষদের হাড়গুলো পিষে-গলিয়ে খাঁটি নরোয়া ঘি তৈরি করা হয় ধরে-আনা মহিলাদের হাড় পিষে-গলিয়ে তৈরি হয় নারীয়া ঘি সেই খাঁটি নরোয়া-নারীয়া ঘিয়ে ভাজা মাংসের ফ্রাই খেতে সবাই ভালোবাসে ধরে-আনাদের পেটের টাটকা-তাজা নাড়িভুঁড়ির ছোটোঅন্ত্র দিয়ে টাটকাটাটকি চাউমিন হয় বড়ো অন্ত্র দিয়ে হয় পাস্তা বুড়োবুড়িরা গল্প করে পৌরাণিকাধুনিক যুগে শীতকালে যখন ফরফরিয়ে তুষার পড়ত তখন সেপার ওপার দুই পারেই মানুষকে ভবিষ্যতের জন্যে বরফের অনেক নিচে চাপা দিয়ে রাখা হতো যাতে ফাঁদ পেতে টোপ ফেলে ধরা না গেলে বরফে সংরক্ষণ করা মানুষ খাওয়া যায় বরফেতে জ্যান্তই পোঁতা হতো যাতে স্বাদ নষ্ট না হয় অনেক নিচে এই জন্যে পোঁতা হতো যে পোঁতার পরও দেখা যেতো মাটির তলা থেকে মানুষ পালিয়েছে তবে বেশি নিচে পোঁতা যেতো না কেননা মানুষের এমন আদরের শরীর যে মাটির তলায় গলে গিয়ে শুধু তার হাড়টুকুই পাওয়া যেতো অমন দুর্ঘটনা হয়েছে দু’পক্ষেই তখন হয় হাড় পুড়িয়ে জলে গুলে বাচ্চাদের স্বাস্হ্য ভালো করার জন্য খাওয়ানো হতো নয়তো হাড়ে লেগে থাকা সামান্য মাংস হিমক্রিমের মতন চেটে খেতো দুঃখের যে পৌরাণিকাধুনিক যুগের চব্বিশ ক্যারাটের সোনার দেশ হয়ে গেছে প্লাস্টিক-সোনার গাড্ডা এখন জ্যান্ত যুবক আর জ্যান্ত যুবতী ধরে আনার আরেক ফ্যাসাদ হলো যুবকেরা যুবতীকে খাবার আগে অনেকবার ইল্লিতে গিল্লি করে নিতে চায় যুবতীরাও ধরে-আনা যুবককে তালগাছের খরখরে গুঁড়িতে উলঙ্গ বেঁধে তাকে জড়িয়ে থাকে আর সে মরার আগেও মানবোচিত অভ্যাসবশত অত্যাচারের সন্মোহনে নব্বুই ডিগ্রি উত্তেজিত হয়ে উঠলে তার সঙ্গে এক বা দুই বা তিন সাধ আর সাধ্যমতো যুবতীরা ইল্লিতে গিল্লি করে দুই অঞ্চলের বহু তালগাছ তাদের ধাক্কুমধুক্কিতে হেলে পড়েছে এতে একটা সুবিধে হল যে বারবার ইল্লিতে গিল্লি করার ফলে যুবতী আপনা থেকেই টেঁসে যায় তার রক্ত অপচয় হয় না পুরুষরা সবাই মরে না তবে যুবতীরা তাকে কামড়ে আঁচড়ে চাবুকে পিটিয়ে অনেক সময়ে মেরে ফ্যালে চাবুক পেটাবার সময়ে লক্ষ্য রাখতে হয় যে চামড়া যাতে ব্যবহারযোগ্য থাকে যুবতীরা কখনওবা নিজেদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে যুবকের লিঙ্গ কেটে নিজের কাছে রেখে নেয় আর রোদে শুকিয়ে তার ভাঁড়ারের লইট্যা-শুঁটকিলিঙ্গের সংখ্যা অন্যদের থেকে বেশি হবার গর্বে ভোগে যুবকরাও তেমনিই ইল্লিতে গিল্লির পর যুবতী মারা গেলে তার মাইয়ের টোঁটি কেটে নিয়ে নিজের বাড়িতে মাইয়ের টোঁটির স্টক বাড়ায় রোদে শুকিয়ে শুঁটকিমাইয়ের টোঁটি দেয়ালে মটরমালার মতন টাঙিয়ে রাখে আর তার তলায় নামস্বাক্ষর করে রাখে যাতে পরিবারের লোকেরা বুঝতে পারে কোন প্রজন্মের পুরুষ এই বীরত্বের কাজ করেছিল একনায়ক মোড়লচিফ যদি শুঁটকি মাই খেতে চায় বা সেই মোড়লচিফের ফোসলান্তি আধ-বউ যদি লইট্যা-শুঁটকিলিঙ্গ খেতে চায় তাহলে পোড়ানো লিঙ্গ বা মাইকে কচি তালের ভেতরে পুরে মোড়ক উন্মোচন উৎসব হয় তাতে এলাকার সবাই হাততালি দেবার জন্য জড়ো হয় আর একনায়ক মোড়লচিফ গলায় তালপাতার মাদুরের চাদর নিয়ে তালগাছের গুঁড়ির ওপর দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দেন উত্তরঐতিহাসিক যুগের মানবসভ্যতায় নিজস্ব পক্ষের অবদানের জন্য উপস্হিত সবাইকে ধন্যবাদ দেন ভবিষ্যতে আরও অমন উৎসবের ডাক পাড়েন মানবতাবাদী পিঁজরেপোলের সংখ্যা বাড়াবার আশ্বাস দেন উপস্হিত গুদাকৃষ্ট ও ল্যাওড়াপ্রিয় পুং আর স্ত্রীং লোকেরা মানুষ জিন্দাবাদ মানুষ জিন্দাবাদ মানুষ যুগ যুগ খাও মানুষ যুগ যুগ চাটো স্লোগান মারতে থাকে র‌্যালি র‌্যালা করে কচি তল্লাবাঁশের বা মানুষের শিরদাঁড়ার বেত দিয়ে বোনা গামলায় বসিয়ে নিয়ে যায় মোড়লচিফকে কোনো একনায়কবাজ  মোড়লচিফ মারা গেলে তাকে দেখন-শ্রদ্ধার সঙ্গে নাকে তাড়ি ঢেলে সারা গায়ে গ্যাঁজানো তাড়ির অমরত্বের মলম মাখিয়ে একটা অন্ধকার ঘরে রেখে দেয়া হয় সেখানে সার বেঁধে বিখ্যাত একনায়ক মোড়লচিফরা চিৎ হয়ে শুয়ে থাকে আর চিন্তায়-চিন্তায় শুকিয়ে যেতে থাকে তারপর একশো বছর কি দেড়শো বছরে ছোয়ারার মাপের হয়ে গেলে সেটা নতুন একনায়ক মোড়লচিফ সেই ছোয়ারা চিবিয়ে চিবিয়ে বা চুষে চুষে যার যেমন অভিরুচি খেয়ে নেয় একনায়ক হবার জন্যে যে মোড়লচিফের চিফত্বকালে সবচেয়ে বেশি মানুষ ধরে মানবতাবাদী পিঁজরেপোলে রাখা হয়েছে আর তারিয়ে তারিয়ে খাওয়া হয়েছে তাকেই অমন শিরোপা দেয়া হয় নতুন মোড়লচিফ হবার জন্যে ধরা-মানুষের চামড়া ছাড়ানোর প্রতিযোগীতা হয় যে সবচেয়ে ভালোভাবে চামড়া ছাড়াতে পারে সে-ই নতুন মোড়লচিফ হয় প্রত্যেক প্রতিদ্বন্দীকে মানবতাবাদী পিঁজরেপোল থেকে হিঁচড়ে বের করে আনা একজন মানুষ বা মানুষীর একটা অঙ্গর চামড়া ছাড়াতে বলা হয় হাত বা পা বা উরু বা গাল বা বুক বা পিঠ এমন ভাবে ছাড়াতে হবে যে চামড়ায় এক রত্তি মাংস বা চর্বি লেগে থাকবে না যুবতীদের বুকের চামড়া এমনভাবে ছাড়াতে হবে যাতে শুকিয়ে বুকবাঁধুনি তৈরি করা যায় মোড়লচিফের অভিষেকে সেই পারের লোকেরা সেই পারে আর ওই পারের লোকেরা ওই পারে জমায়েত হয়ে জাগাঘুমে যুগ যুগ মাংস খাও খাওয়াও ধ্বনি দ্যায় চামড়া শুধু পোশাকের জন্যই নয় আরও বহু শিল্পের কাজে লাগে গ্রীষ্মকালে বাড়ির ছাদে রোদ্দুরের বর্শাফলক যাতে ঘরে না বেঁধে তাই ছাদের ওপরে মানুষের চর্বি দিয়ে সাঁটা হয় ধরে-আনা মানুষের গলার বেল্ট তৈরি করতে তাকে হামাগুড়ি দিতে বলার সময়ে তার হাঁটুর আর হাতের চামড়া যাতে নষ্ট না হয় তাই তার হাতের দস্তানা আর হাঁটুর নিক্যাপ তৈরি করতে হয় ছোটো মাপের থেকে এক্সট্রা লার্জ মাপের ভুলে নিজেরাই নিজেদের দলের কাউকে যাতে না খেয়ে ফ্যালে তাই দু’পক্ষই কপালে রঙ মেখে থাকে সেই পক্ষের কপালে তালপাতা পোড়ানো কালো আর ওই পাড়ের কপালে শুকিয়ে যাওয়া নদীর মাটি রক্ত দিয়ে মেখে রাঙানো রঙে এর ফলে একদিক থেকে যেমন ভুলবোঝাবুঝির ফলে নিজেদের পক্ষের লোকজন থেকে বাঁচা যায় তেমনই কপালের রঙ দেখে অপর পক্ষের লোকেরা সহজে চিহ্ণিত করে ফেলতে পারে অথচ দুই পক্ষই মনে করে যে এছাড়া অন্য উপায় নেই বাৎসায়নের উপদেশ ছাড়াই এতো গিজগিজে মানবসম্প্রদায় হয়ে গেছে যে কে কেমন করে বুঝবে কে কোন পক্ষের তবে অপর পক্ষের মানুষকে ধরতে যাবার সময়ে নিজেদের কপাল থেকে রঙ মুছে ফ্যালে যাতে অপর পক্ষের লোকেরা বুঝতে না পারে এমনকি ফাঁদে ফেলার জন্য অপর পক্ষের রঙ কপালে মাখিয়ে টোপ ফ্যালে তারা ভাবে বুঝি তাদের পক্ষের কিন্তু ফাঁদে পড়ে যখন বুঝতে পারে যে ব্রেকফাস্ট-লাঞ্চ-ডিনার হতে চলল তখন আর কোনো উপায় নেই সেই পক্ষ ওই পক্ষ দুই পক্ষে কেউ-কেউ জ্ঞানী-বিজ্ঞানী-দার্শনিক-শিল্পী হতে চায় তারা ধরে-আনা লোকেদের হিসি বোতলে সংগ্রহ করে রাখে আর ভাবনাচিন্তা করার সময়ে টেবিলঘরে বসে হাড়ের বা বাঁশের কাপে করে চুমুক দিয়ে খায় যাতে পর্যাপ্ত হিসি পাওয়া যায় মূর্খতাকে তারিয়ে চাগানোর জন্য লিঙ্গ শুকিয়ে চুরুট বানিয়ে টেবিলঘরে চিন্তাধোঁয়া ফোঁকে ধরে-আনা মানুষদের প্রচুর তাড়ি খাওয়ানো হয় গাছে বাঁধা জ্যান্ত পুরুষের লিঙ্গতে হাড়ের বা বাঁশের বা চামড়ার বোতল টাঙিয়ে রাখা হয় সেটা ভরে গেলে মোড়লচিফের আধ-বউ বা পৌনে-বউ নিয়ে যায় কেননা আইন অনুযায়ী পুরুষদের হিসির ওপর কেবল মহিলাদের অধিকার একইভাবে কিশোরী-তরুণী-যুবতী-প্রৌঢ়া ধরে আনলে তাকে গাছে বেঁধে বাঁশের সরু পাইপ গুঁজে রাখা হয় আর পাইপের তলায় চামড়ার বড়ো বয়াম রেখে দেয়া হয় প্রথম বয়াম একনায়ক মোড়লচিফের প্রাপ্য আইন অনুযায়ী পাইপ গোঁজার সময়ে নাড়ানাড়ি করা নিষিদ্ধ কেননা নাড়ানাড়ি করলে অরগ্যাজম হয়ে যেতে পারে আর আঠালো অরগ্যাজমের হিসির স্বাদ মোড়লচিফদের পান করা অবৈধ অনৈতিক সংস্কৃতিবিরোধী  দলবিরোধী তা একনায়ক হবার পথে কাঁটা অনেকসময়ে দেখা গেছে যে অরগ্যাজমের অন্ত্যমিল ছন্দের দরুণ বাঁশের সরু পাইপ বাঁশির মতন পৌরাণিকাধুনিক যুগের জনপ্রিয় গান আমি তোমারিই আমি তোমারই আমি তোমারই সুরে বেজে ওঠে পুরুষদের ক্ষেত্রে অবশ্য কোনো-কোনো ঝক্কিমন্ত যুবতী দুধ দুইবার মতন করে সজাগ লিঙ্গের ধাতুরস চ্যামচ্যামিয়ে দুয়ে চামড়ার বাটি করে পৌরাণিকাধুনিক যুগের নেশা হাড়িয়ার মতন চেটে-পুটে খায় যাতে যৌবন ধরে রাখা যায় আর ত্বক চকচক করে একনায়ক মোড়লচিফ ইচ্ছে করলে ধরে-আনা যুবককে খেয়ে ফেলার আগে তর-সইছেনা-এমন কোনো লিঙ্গাকাঙ্খিনী যুবতীকে সোপর্দ করতে পারে কোনো মানে ওয়েটিং লিস্ট অনুযায়ী একনায়ক মোড়লচিফ উপহার দেন যে যুবতী উপহার পায় সে যুবককে গলায় হাড়ের হাড়ুহাজ-করা চামড়ার ফেট্টিতে বেঁধে হাত দুটো চামড়ার রশি বেঁধে দু পায়ে চামড়ার শেকল বেঁধে সঙ্গে নিয়ে ঘোরে ইচ্ছে হলে কোনো গাছে তাকে বেঁধে চুমুকখানেক তাড়ি চাটিয়ে চামড়ার চাবুক দিয়ে চাবকায় যাতে পিঠে বুকে দাগ না পড়ে তার বন্ধুরা নিজেদের ঠোঁটে পাথুরেনুন মেখে হিহি হিহি হোহো হাহা খিকখিক খ্যাকখ্যাক হাসতে হাসতে চাবুকের সদ্যরক্তিমের ওপর ঠোঁট বোলায় সঙ্গে অবশ্য ফিট্টমফিট পাহারাদার থাকে যাতে না যুবক পালিয়ে যায় কিংবা যুবতী না তার ধাক্কুমধুক্কির প্রেমে পড়ে হাতবাঁধা অবস্হায় হাতে দস্তানা হাঁটুতে নিক্যাপ পরিয়ে যুবককে পৌরাণিকাধুনিক যুগের জানোয়ারের মতন চার হাতেপায়ে হামাগুড়ি দিয়ে যুবতীর পেছন-পেছন যেতে হয় লিঙ্গে ঝোলানো হিসির বোতল নিয়ে ধরে-আনা যুবকের পোঁদে সুড়সুড়ি দেবার জন্য যুবতী বাঁশপাতা দিয়ে মাঝেমাঝে তার পেছনে বোলায় কোনো যুবক যদি কোনো ধরে আনা যুবতীকে খাবার আগে পছন্দ করে তাহলে একনায়ক মোড়লচিফের ওয়েটিং লিস্ট অনুযায়ী নব্বুই ডিগ্রি গুদোন্মাদ যুবককে সোপর্দ করে পাঠক বা পাঠিকা আপনারা তো জানেনই যে দুর্ভাগা যুবতীরা অপরূপ সুন্দরী হয় আর শরীরে যন্ত্রণা এক লপ্তেই দিতে নেই একটু-একটু করে বেশ কয়েকদিন ধরে তারিয়ে তারিয়ে দিতে হয় পৌরাণিকাধুনিক যুগে অমন যন্ত্রণা দেবার জন্য ইঁদুরদের খেতে না দিয়ে যুবকদের পোঁদে বা যুবতীদের যোনিতে পুরে দেয়া হতো উত্তরঐতিহাসিক যুগে সে যুবতীর গলায় হাতে পায়ে হাড়ের হাড়ুহাজ-করা চামড়ার বেল্ট বেঁধে হাতে দস্তানা হাঁটুতে নিক্যাপ পরিয়ে নিজের সঙ্গে নিয়ে ঘুরে বেড়ায় ইচ্ছে করলে বাঁধা অবস্হাতেই যতোবার চায় ইল্লিতে গিল্লি করে সে যুবক যদি গুদোন্মাদ না হয়ে পোঙোন্মাদ হয় তাহলে সে ভিন্নছিদ্রান্বেষণে গিল্লির খেলা খেলতে থাকে তার কারণ উত্তরঐতিহাসিক যুগে যুবকেরা সৌন্দর্যকে চায় যাতে তাকে কলুষিত করা যায় যাতে তার অস্তিত্বের সীমা লঙ্ঘন করা যায় যাতে তার দেহাভিমানকে অবজ্ঞা করা যায় যুবকেরাও জানে তাদের সীমা আছে সেই সীমায় তারা বাঁধা যদি তাদের মনে হয় যে সেই সীমা ভেঙে পড়তে চলেছে তাহলে তারা সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে কোনো কোনো যুবক অমন সন্ত্রাসের নেশায় ভয় কাটিয়ে সীমা ভেঙে যুবতীর দেহে চাবুকের দাগ রাখতে চাইলে একনায়ক মোড়লচিফের নিষেধে তা করতে পারে না চামড়া নষ্ট হয়ে যাবার আশঙ্কায় মোড়লচিফের দর্শন অনুযায়ী যুবতীদের হৃদয়ে প্রবেশের পথ হল তাদের যোনি যুবকদের হৃদয়ে প্রবেশের পথ হল তাদের পোঙাপথ মোড়লচিফের মুখ ফসকে বলা কথাই আইন তাই মোড়লচিফ কোনো দুর্ধর্ষ জাঁদরেল মহিলা হলে তাকে সব সময় মাংসের নানা পদ খাওয়ানো হয় যেমন মাইয়ের চিংড়ি-কাটলেট উরুর ফিশ ফ্রাই পাছার মালাইকারি যাতে মুখ ফসকে কোনো আইন না বেরিয়ে পড়ে কেননা বচন হচ্ছে বাস্তব সত্তার চিত্র বা ছবি আর দার্শনিক সমস্যা ভাষাগত সমস্যার নামান্তর যদি ধরে-আনা যুবতীর মাই ঝোলা অবস্হায় দোল খেতে থাকে তাহলে লাকিবয় যুবক তাতে চামড়ার বুকবাঁধুনি বেঁধে রাখে যাতে দোল খেয়ে-খেয়ে তাকে দুধ খেতে উৎসাহিত না করে ফিট্টমফিট পাহারাদাররা হিসির বোতল সঙ্গে রাখে হিসি হতে দেখলেই বোতলে ভরে নেয় যুবকের তেষ্টা পেলে তাড়ির অভাবে হিসি খেয়ে নেশা করে  বেশি শীত পড়লে ধরে-আনা যুবতীকে হামাগুড়ি দেওয়ানোয় পাবলিক আনন্দ পায় যুবতী হিহি কাঁপতে থাকে মাইয়ের জমাটবাঁধা টোঁটি থিরথির করে আর সবাই তার কাঁপুনি বাড়াবার জন্যে তার গায়ে কোনো যুবকের জমা করে রাখা ঠাণ্ডা হিসি ঢেলে দ্যায় ধরে-আনা যুবতীর বা কিশোরীর বা তরুণীর বা প্রৌঢ়ার নাম যাই হোক তাকে সবাই উত্তরঐতিহাসিক পোস্টস্ট্রাকচারাল নান্দনিকতার খাতিরে সুন্দরী বলে ডাকে যদিও তার নামের কোনো দরকার নেই তবুও তাকে সেই পার ওই পার যে পারেই ধরা পড়ুক পৌরাণিকাধুনিক যুগে তার স্বনাম ধরে ডাকা হোতো বটে কিন্তু উত্তরঐতিহাসিক যুগ থেকে তাদের সুন্দরী বলে ডাকাই রেওয়াজ যাতে মাংসের আত্মপরিচয় সুন্দর হয় একই ভাবে কিশোর তরুণ যুবক প্রৌঢ় ধরে আনলে তাকে ফরম্যালিস্ট ভাবাদর্শের খাতিরে সুন্দর বলে ডাকা হয় যদিও তার নামের কোনো দরকার নেই তবুও নিজেদের মধ্যে কথা বলার সময় হয়তো বলতে হলে সুন্দরকে কখন পুড়িয়ে খাবো আমার যে খিদে পেয়ে গেছে কখন থেকে না খেয়ে আছি শুঁটকি মানুষ রোজ-রোজ খেতে ভাল্লাগেনা এবার সুন্দরের চামড়া ছাড়িয়ে তাড়াতাড়ি পোড়াবার ব্যবস্হা করো দিকিনি কথার গয়না পরিয়ে তাদের সুন্দর-সুন্দরীত্ব বজায় রাখা হয় যুবতীদের সঙ্গে শীতে যেমন আপ্যায়ন করা হয় তেমনই খুব শীতে যুবকরা যখন হামাগুড়ি দেয় তখন তাদের ঠাণ্ডা বাড়িয়ে দেবার জন্য সকালের তাড়ি বা বাঁশে জমে থাকা শিশির তার গায়ে ঢালে মেয়েদের হিসি ঢালে না কেননা তা দুর্লভ আর খেলে পরে নেশার খোঁয়ারি তিনচার দিন বজায় থাকে যা পৌরাণিকাধুনিক যুগের বাংলামদ খেলে হতো বসন্তকালে ধরাপড়া যুবতীর চুল বেঁধে খোঁপায় তালফুল বা বাঁশফুলের মালা পরিয়ে কোমরে পুংহাড়ের মালা পরিয়ে হামাগুড়ি দেওয়ানো হয় কোনো কোনো গুদাসক্ত যুবক এসব না করে যুবতীকে তাড়ির টবে ভিজিয়ে রাখে আর পুড়িয়ে খাবার আগে ইল্লিতে গিল্লি করে পোড়ালে মাংস থেকে তাড়ির মাদক-সুন্দর গন্ধ বেরোয় যা হাওয়ার দেয়ালে ধাক্কা মেরে তল্লাবাঁশের ভুলভুলাইয়া পেরিয়ে অন্য পারের মানুষদের জানিয়ে দ্যায় যে কয়েকদিন তাড়িতে চুবিয়ে রেখে পোড়ানো হয়েছে সমস্যা হয় মুণ্ডু খাবার সময়ে যদি নতুন পথজামাইরা রক্তে কব্জি ডুবিয়ে মুড়ো খেতে না চায় তাহলে তাদের বলা হয় মুণ্ডু নিয়ে ফুটবল খেলতে যে যতো বেশি গোল দিতে পারে সে মুণ্ডুটা নিয়ে গিয়ে নিজের বাড়ির বিপ্লবী ঝাণ্ডার ওপরে লাগানো হাড়ের বর্শায় গিঁথে বাঁশের সঙ্গে বেঁধে রাখে যাতে অপর পক্ষের নিবাসীরা দূর থেকে দেখতে পায় তাদের একজনের কেমনতর হাল হয়েছে দুই পক্ষেরই উদ্দেশ্য হল মানুষের পৌরাণিকাধুনিক যুগে ফিরে যাওয়া কিন্তু নানা বাধা বিপত্তির কারণে উত্তরঐতিহাসিক যুগ থেকে ফিরে যাওয়া অসম্ভব হয়ে গেছে তার মধ্যে প্রধান হল সময়কে কেমন করে পিছিয়ে নিয়ে যাওয়া যায় নিজেরা না হয় পিছিয়ে গেল কিন্তু সময়কে নিজেদের সঙ্গে পিছিয়ে নিয়ে যেতে পারছে না তার কারণ দুই পক্ষের মাঝের হাওয়া যার কাঁধে চেপে সময় হাতছাড়া হয়ে চলেছে বদগন্ধ বেড়ে চলেছে হাওয়াকে থামিয়ে রাখার জন্যে দুপক্ষের সবায়ের বাড়িতে ঝাণ্ডা ওড়ানো হয়েছে কিন্তু দেখা গেছে যে হাওয়াকে থামাবার বদলে ঝাণ্ডাগুলো তাকে আরও তোল্লাই দিচ্ছে নয়তো কুয়াশাতেও ঝাণ্ডাগুলো অমন করে হাওয়ার সঙ্গে তাল দিয়ে ফরফর করছে কেন পৌরাণিকাধুনিক যুগে হাওয়ার দেয়ালের জায়গায় একটা নদী ছিল কিন্তু মানুষেরা জন্তুজানোয়ারের চামড়ার কারখানা রাসায়নিক কারখানা মানব-সম্প্রদায়ের অঢেল গু আর নানা কারখানার হাইড্রোক্লোরিক সোডিয়াম হাইড্রকসাইড সালফিউরিক নাইট্রিক অগজ্যালিক ফসফরিক ফ্লুয়োরাস সেলেরিক সিলিসিক কারবোনিক অ্যাসেটিক ব্রোমিক টাংস্টিক ফেরিসায়ানিক গ্লুটামিক ল্যাকটিক ফলিক বারবিটুরিক তুঁতেরঙা গাদ নদীতে ফেলে-ফেলে নদীর সারা গায়ে এমন ঘা করে দিয়েছিল যে নদী বেচারী প্রাণ বাঁচাতে এক কালবৈশাখির রাতে পাত্তাড়ি গুটিয়ে সমুদ্রে পালিয়েছে অথচ প্রকৃতির তাতে কোনো হেলডোল দেখা যায়নি ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থেকেছে সকালে যারা নদীর পাড়ে হাগতে গিয়েছিল তারা নদীটাকে দেখতে না পেয়ে ছোঁচাবার উদ্দেশে আশেপাশের শহর গ্রাম গঞ্জ সব জায়গায় খুঁজেছে কিন্তু কোথ্থাও পায়নি তাই দুই পক্ষের টাকলা বা পাকাচুল জ্ঞানী-বিজ্ঞানী-দার্শনিক-শিল্পীরা মানুষের চর্বির লন্ঠনের বা কুপির আলোয় টেবিলঘরে শনিবার সন্ধ্যায় বা বেস্পতিবার দুপুরে বসে-বসে অনেক হেগে-পেদেও কুলকিনারা পায়নি তারা সকলে সুরাহার জন্যে নিজেদের মধ্যে পাদের প্রতিযোগীতা করেছিল কিন্তু জ্ঞানী হলে যা হয় পাদতে গিয়ে হেগে ফেলেছে  কিংবা বিজ্ঞানী হলে যা হয় পাদতে গিয়ে হিসি করে ফেলেছে কিংবা দার্শনিক হলে যা হয় পাদতে গিয়ে ঢেঁকুর তুলেছে কিংবা শিল্পী হলে যা হয় পাদতে গিয়ে কোঁৎ পেড়েও হাওয়া বা আওয়াজ কোনোটাই বের করতে পারেনি তারা বলেছে হাওয়ার দেয়াল আসলে পৌরাণিকাধুনিক যুগের পেছলা কালো মরা বেড়ালের সুখচিন্তা দিয়ে গড়া যাদের দেখা যায় না শুনে অনেকে চটে গেছে কেননা তারা কালো বেড়ালদের ভয় পাবার কাহিনি তাদের ঠাকুমা-দিদিমার কাছে শুনেছে কিন্তু প্রতিটি শিশুর ঠাকুমা-দিদিমা পরিবর্তনশীল যেহেতু উত্তরঐতিহাসিক যুগে বেজন্মা বলে কিছু হয় না কে কার বাচ্চা জানার উপায় নেই তাই রাতে হিসি পেলে একা কেমন করে অন্ধকারে মুততে যাবে এই ভয়ে আদ্দামড়া ছেলেরাও অনুমিত-বাবার ঘুম ভাঙিয়ে সঙ্গে নিয়ে যায় অনুমিত-বাবা বেচারা কি আর করবে সেও মুতে নেয় মুততে মুততে লিঙ্গ খসে ওখানেই পড়ে গেছে ভেবে ঘুমের ঘোরে আবার খুঁজতে যায় কিন্তু চৈত্রের ওসকানিতে লিঙ্গ চড়াং হলে টের পায় যে কোনো ক্ষতি হয়নি মুততে বসে মাথার ভেতরে কোনো একজন অনুমিত-বাবা শুনতে পেয়েছিল যে চাঁদের আলোয় হাওয়াকে বদগন্ধ মুক্ত করা যেতে পারে কিন্তু তাতে হাওয়া নিজেই হাওয়া হয়ে যেতে পারে তার মানে বুঝতে না পেরে মুততে বসা অনুমিত-বাবা কাউকে আর সেকথা বলেনি যদিও মুততে যাওয়া অনুমিত-বাবা সব যুবক যুবতীকে ফিসফিসিয়ে বলে দিয়েছে যে আনন্দ পেতে হলে যে-কোনো রকমে পেতেই হবে কারোর নিষেধ মানার দরকার নেই কেননা শরীরের চেয়ে বড়ো কিছু হয় না আর আনন্দ মানেই শরীরের আনন্দ শরীর যা চাইছে তা সে নিজের মগজকে বলতে থাকে মগজ ফিরতি শরীরকে বলে যে যাও যা চাইছ তাই করো কিন্তু এসব কথা মোড়লচিফকে না বলে জুইসঁ জুইসঁ জুইসঁ জুইসঁ বলতে বলতে দৌড়েছিল বলে দিনকতক তাকে টাটকা চামড়া ছাড়ানো যুবতীর মজ্জার হালুয়া খাওয়ানো হয়েছিল যাতে তার মাথা খারাপ না হয়ে যায় পাঠক বা পাঠিকা আপনি যদি জুইসঁ বলতে ঠিক কী বোঝায় এবং আনন্দ বলতে আপনি কী বোঝেন তা জানেন তাহলে দুই পক্ষের মোড়লচিফদের প্লিজ জানিয়ে আসবেন যাই হোক তারপর থেকে সে রাতে মুততে বেরোলে তার তাৎক্ষণিক-বউ মানুষের চর্বির লন্ঠন নিয়ে তার পেছন পেছন যায় তাই উপায় হিসেবে মোড়লচিফের বেতে-বোনা গামলার পুরোনো প্রৌঢ়ার চামড়ার চাদর পাল্টানো হয়েছে নতুন যুবকের পোঁদের চামড়ার টাটকা চাদর দিয়ে একনায়ক মোড়লচিফের বাবরি চুল বাড়ানো হয়েছে কেননা সে পোঁদ ছিল চুলে ভরা একনায়ক মোড়লচিফকে চামড়ার গামলায় বসিয়ে শুকিয়ে-যাওয়া কুয়োর চারিপাশে ঘোরানো হয়েছে তবুও সেপক্ষের লোকেরা সমস্যার সুরাহা করতে পারেনি ওপক্ষের লোকেরা মোড়লচিফকে ধরে-আনা চটকদার মেয়েদের চুলের কোঁকড়া পোশাক পরিয়েছে সেই চুলের বিছানায় আসল ঝক্কিমন্ত আধবউ আর নকল তাৎক্ষণিক-বউ দুজনের সঙ্গে শুইয়েছে হিসির পোখরাজি শরবত খাইয়েছে রক্তের টোকো আচার খাইয়েছে একনায়ক মোড়লচিফকে চামড়ার গামলায় বসিয়ে শুকনো কুয়োয় নামিয়েছে তবু কোনো উপায় খুঁজে বের করা যায়নি তবুও শুকনো কুয়োর অবসরপ্রাপ্ত এয়ারকাণ্ডিশনে সেই পারের মোড়লচিফ চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলেছিল যে হাওয়াতেই খুঁত আছে কারণ পৃথিবীতেই খুঁত আছে আর একথা বকবক করে বোঝানো যাবে না কেননা কথারা সবকিছু বলার জন্য যথেষ্ট নয় কথারা দিনকেদিন পচে যাচ্ছে কথা বলাবলিতেই খামতি রয়ে গেছে কথা ব্যাপারটা হলো টুলোপণ্ডিতের লাস্ট বেঞ্চার উপড়ে ফেলতে হবে সবরকমের জ্ঞানের ভাঁড়ার এতো জোরে জোরে চেঁচিয়েছিল সেই পারের মোড়লচিফ যে ওই পারের মোড়লচিফ তা শুনতে পেয়েছিল আর পেয়ে সেও চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলেছিল চুতিয়া শিশুর নঙ্কু কোথাকার বুঝতে পারা যায় না এমন হম্বিতম্বি করে হাওয়ার সুরাহা খুঁজছে শিশুর পাতলা পায়খানারও অধম বাঞ্চোৎ মোড়লচিফ হয়ে ব্যাটা ভাবছে হাওয়া কিনে নিয়েছে ওর দাদু তো মেয়ে মানুষের চামড়া ছাড়াবার পর হৃৎপিণ্ডের মেটেল-গোলাপি ধুকপুকুনি দেখে ঘামে কাহিল হয়ে যেতো কতো স্বাদু হয় ছাড়ানো মেয়েমানুষের জলজ্যান্ত হৃৎপিণ্ডের ধুকপুকুনি কানের কাছে নিয়ে শুনলে সেই ধুকপুকুনির প্রেমে পড়তে ইচ্ছে করে আর ওর বাপ তো বাঁহাতে লিংমেহন করতো আর তার ফলে পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি বেঁকে গিয়েছিল বলে নিজেকে বেঁকাপন্হী বলে দাবি করতো জানি না নাকি আমি ওদের পক্ষের সবাই বাঁহাতে ম্যাস্টারবেট করে এমনকি মেয়েরাও ক্লিটোরিসের টুনটুনি বাঁহাতেই বাজায় নিজেদের বেঁকাপন্হী তকমা বজায় রাখার জন্যে কয়েক কিলোমিটার দূর থেকেও সে টুনটুনির নিশিডাক শোনা যায় ঝিংকিচিকিং ঝিংকিচিকিং ঝিংকিচিকিং আমাদের সোজান্হীদের পক্ষে বাঁহাত ডানহাতের কোনো নির্দেশ নেই যে যেহাতে ইচ্ছে নিজেকে আনন্দের ওপারে টপকিয়ে নিয়ে যেতে পারে পাঠক বা পাঠিকা আপনারা যে হাতে করেন সেই হাতেই করবেন সরকার কোনো নির্দেশিকা এ-বিষয়ে এখনও জারি করেননি তবে শোনা গেছে যে আইনের খসড়া যাচাই করে দেখছেন লেজুড়পন্হী বুড়োহাবড়াগোষ্ঠী এই যে আমরা মানুষের মাংস খাই তা এই জন্যে তো যে আমরা আনন্দ টপকিয়ে পরমানন্দের আওতায় চলে যেতে পারি যাতে আত্মার উত্তরণ হয় যাতে নির্বাণপ্রাপ্তি হয় যাতে ব্রহ্মাণ্ডের সঙ্গে একাত্ম হতে পারি যাতে যার মাংস খাচ্ছি সে আমার ভেতরে বেঁচে থাকে যাতে তাকে আমার ভেতরে বাঁচিয়ে আমি তাকে সারাজীবন ভালোবাসতে পারি যতোজনের মাংস তুমি সারাজীবনে খাবে তুমি ততোজনকে নিজের অস্তিত্বের সঙ্গে মিশিয়ে ফেলতে পারবে মেয়েমানুষ পুরুষমানুষ দুরকমের মাংস খেয়ে তোমার মধ্যে তাদের অস্তিত্ব বজায় থাকবে কেননা মেয়েমানুষের মাংস হল রেড মিট তাতে আয়রন ক্রিয়েটিন দস্তা ফসফরাস ভিটামিন বি আর লিপোয়িক অ্যাসিড থাকে যা সবচেয়ে ভালো অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট পুরুষের মাংস হল হোয়াইট মিট তার ক্যালরি ফ্যাট কোলেস্টেরল কম হলেও আছে অ্যামিনো অ্যাসিড থিয়ামিন রিবোফ্ল্যাভিন যা স্বাস্হ্যের পক্ষে খুবই উপকারী হলেও তুমি যদি শুধু পুরুষের মাংস খাও তাহলে তোমার ভেতরে দোষ দেখা দেবে তোমার ভেতর থেকে ভালোবাসা উবে যাবে তুমি কোনো মেয়েমানুষের গলায় হাড়ের হাড়ুহাজ-করা চামড়ার বেল্ট বেঁধে হাতে চামড়ার দস্তানা পরিয়ে হাঁটুতে চামড়ার নিক্যাপ পরিয়ে হামাগুড়ি দেওয়াতে পারবে না তাকে পেছন থেকে ইল্লিতে গিল্লি করতে পারবে না তুমি উচ্ছন্নে চলে যাবে তোমার অধঃপতন হবে তুমি যা চাইছ তা আয়ত্ব করতে পারবে না যাকে খাচ্ছ তাকে এই জন্যেই তো খাচ্ছ যে সে চাইছে তাকে খাওয়া হোক নয়তো সে ধরা পড়বে কেন তার অবচেতনে ধরা দেওয়ার ইচ্ছে কাজ করেছে বলেই তো সে ধরা দিয়েছে ইচ্ছে ব্যাপারটা যে খাচ্ছে তার নয় যাকে খাওয়া হচ্ছে তার যাকে খাওয়া হচ্ছে সে তার ধরা পড়ার মাধ্যমে নিজের ইচ্ছেকে নরমাংসখোরের দায়িত্বে সোপর্দ করে দিচ্ছে মহিলার চামড়া ছাড়াবার আগে যদি যুবকেরা তাকে ইল্লিতে গিল্লি  করে তাহলে বুঝতে হবে ওই মহিলার দেহে ইল্লিত হবার ইচ্ছে কাজ করছিল যা সে যুবকদের গিল্লিবিকৃতিতে সোপর্দ করে দিয়েছিল পাঠক বা পাঠিকা আপনি কি মোড়লচিফের এই জীবনদর্শনকে মান্যতা দেন যদি না দেন তাহলে প্লিজ উত্তরঐতিহাসিক যুগের মিডিয়ার মাধ্যমে জানিয়ে দেবেন একনায়ক মোড়লচিফ বলা বজায় রাখে যাকে খাওয়া হচ্ছে তার ভাষাকে খাওয়া হয় তার অহংকারকে খাওয়া হয় তার চেতনাকে খাওয়া হয় তার মুখ ফসকে বলা কথা খাওয়া হয় তার অপূর্ণ আকাঙ্খা খেয়ে নিজেদের মাধ্যমে তা পূরণ করা হয় যে মরে যাচ্ছে তার শেষ ট্রমাকে খাওয়া হয় তার স্বপ্নকে খাওয়া হয় তার সুখদুঃখকে খাওয়া হয় আর এটাই হল বাস্তব জগতের নান্দনিকতা তাকে যতো তাড়াতাড়ি স্বীকার করে নেয়া যায় ততোই আমাদের পক্ষের মঙ্গল কেননা বাস্তব ব্যাপারটা অশ্লীল এসব হুমকি দেয়া বক্তৃতা শুকনো কুয়োর অবসরপ্রাপ্ত এয়ারকাণ্ডিশনে বসে শুনছিল সেই পারের একনায়ক মোড়লচিফ তাই উত্তর দেবার জন্যে নিজের লোকেদের বলল শুকনো কুয়োর অবসরপ্রাপ্ত এয়ারকাণ্ডিশন থেকে টেনে তুলতে যাতে গাঁকগাঁকিয়ে জবর উত্তর দিতে পারে কিন্তু মোড়লচিফের সঙ্গে চামড়া ছাড়াবার প্রতিদ্বন্দ্বিতায় যে পালোয়ান যুবক দ্বিতীয় হয়েছিল সে বললে তোমাকে উত্তর দিতে হবে না কত্তা আমিই ওই ল্যাওড়াকান্তি গবেটের হুমকিবক্তিমের উত্তর দিচ্ছি হ্যাঁহ্যাঁপন্হী পাবলিক বললে হুম হুম তাই হোক তাই হোক মোড়লচিফ ও-ই দিক তোমার তো চুলেদাড়িতে পাক ধরেছে কোমরের ঠাপচাপ অবসর নিয়েছে ষাট ডিগ্রির চেয়ে বেশি বেঁকে গেছে সেই তুলনায় ও এখনও ভার্জিন ষাঁড়ের গোলাপি লিং ঝুলিয়ে ঘোরে আর গলাটাও ষাঁড়ের মতন হ্যাঁহ্যাঁপন্হীদের এরকম রায় শুনে মোড়লচিফ মুষড়ে পড়লেও রাজি হয়ে গেল কেননা শুকনো কুয়োর অবসরপ্রাপ্ত এয়ারকণ্ডিশনে অনেকক্ষণ ঝুলে থাকায় গলা বসে গেছে ফলে ষাঁড়যুবক আরম্ভ করলে হাঁকহাঁকিয়ে লিংনাচিয়ে যাতে ওই পারের একনায়ক মোড়লচিফ আর তার হিসিপোষ্য জনগণ শুনতে পায় ওরে গাণ্ডুগোবর্ধন অহং ব্যাপারটা তো কাল্পনিক জানিস না কি যে সচেতন জীবনে আমরা নিজের সম্পর্কে একটা হেতুপূর্ণ সমন্বয়ী সুসঙ্গত ব্যক্তিএককের ধারণা গড়ে তুলি আর তা না করলে কর্মকাণ্ড অসম্ভব হয়ে যাবে কিন্তু এসবকিছুই অহংয়ের কল্পনার স্তরে যে ব্যাপারটা একজন মানুষের অস্তিত্বের সমুদ্রে ভাসতে থাকা পৌরাণিকাধুনিক যুগের বরফস্তুপের যেটুকু দেখা যেতো তার চেয়ে বেশি কিছু নয় বুঝলি অহং হল ব্যক্তিএককের সেই ক্রিয়াকলাপ বা কাজের ফলাফল যা সবসময় ছেৎরানো বুঝলি কখনও নিজের মতন নয় বুঝলি যে ডিসকোর্স দিয়ে তার শেকল তৈরি তাতে গাঁথা বুঝলি রে ইডিয়ট অস্তিত্বের এই দুটো স্তরে মূলগত বিভাজন আছে — একটা ফাঁক যা তুই নিজেকে আমি আমি আমি আমি বলার সময়ে কথায় নকল করছিলিস বলা কথার মধ্যে লোকটা মানে তুই লোকটা কখনই নিজের প্রতিনিধিত্ব করিস না কেননা তা সম্ভব নয় বুঝলি রে নিজের পুরো অস্তিত্বকে তুলে ধরার জন্যে মানুষের কাছে কোনো কলঙ্ক-দাগ থাকে না বা নেই বুঝলি ইডিয়ট তুই নিজেকে তোর কথার মধ্যে একটা সুবিধাজনক সর্বনাম বেছে আখ্যা দিতে পারিস আমি বলতে বোঝায় যে লোকটাকে আয়ত্ব করা যায় না যে ভাষার ফাঁক গলে পিছলে বেরিয়ে যাবেই তুই একই সঙ্গে তুই হতে পারবি না আর বলতে পারবি না যে তুই লোকটা তুই নিজে বুঝলি রে অবচেতনা বলতে তোর ভেতরের কোনো ফেনিয়ে তোলা বিক্ষুব্ধ ব্যক্তিগত এলাকা বোঝায় না বুঝলি যা বোঝায় তা হল একজনের সঙ্গে আরেকজনের সম্পর্কের প্রভাব অবচেতন মোটেই তোর ভেতরের ব্যাপার নয় তা তোর বাইরের ব্যাপার হ্যাঃ হ্যাঃ বাঞ্চোৎ মুকখুর অ্যাঁড় কোথাকার পালোয়ান-যুবকের ঝাড়বক্তিমে থামতেই তার হাতে ধরা গলায় হাড়ের হাড়ুহাজ-করা চামড়ার বেল্ট বাঁধা হাতে চামড়ার দস্তানা হাঁটুতে চামড়ার নিক্যাপ বুকে চামড়ার বুকবাঁধুনী ধরে-আনা উলঙ্গ কোঁকড়াচুল-যুবতী বলে উঠল আপনিই তো মস্ত ইডিয়ট যা বলছেন আর যা করছেন তার সঙ্গে কোনো মিল নেই আপনি কি ভাবছেন আপনার অবচেতনে আমার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি যদি না গড়ে উঠে থাকবে তাহলে এরকমভাবে বেঁধে রেখেছেন কেন তা তো এই জন্যে যে আপনি যখন তখন আমার সঙ্গে ইল্লিতে গিল্লি করছেন তার মানে গিল্লিকারীর সর্বনাম বেছে নিয়েছেন আর প্রতিনিধিত্ব করছেন আপনাদের পক্ষের আমার হিসি খাবার জন্য লালায়িত হয়ে রয়েছেন তার মাধ্যমে কি সম্পর্ক গড়ে উঠছে না যখন আপনারা আমার রক্তের আচার খাবেন আমার মাংস টাটকা শুকোনো লইট্যা-শুঁটকি নোনা করে খাবেন অলিভতেলে লাবিয়াফ্রাই খাবেন মজ্জার হালুয়া খাবেন তখন আপনাদের প্রত্যেক আমির সঙ্গে কি আমার সম্পর্ক গড়ে উঠবে না যখন বিগত সময়ের জন্তুদের মতন আপনি চার হাতেপায়ে আমার সঙ্গে ইল্লিতে গিল্লি করছেন তখন কি সেই জন্তুদের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক গড়ে উঠছে না যখন আপনারা আমার মাথার ওপরে তালপাতার চাটাইয়ের বস্তা ফেলে ধরে নিয়ে এলেন তখন কি পৌরাণিকাধুনিক যুগের চটকল শ্রমিকদের সঙ্গে আর সে-যুগের চাষিদের সঙ্গে আপনাদের সম্পর্ক গড়ে উঠল না যারা না খেতে পেয়ে বিলুপ্ত হয়ে গেছে জবাব দিন জবাব দিন চুপ করে থাকলে তো চলবে না জেনে রাখুন যে আমি ইচ্ছে করে ধরা দিয়েছি আপনাদের ফাঁদে পা রেখেছি আপনারা আমায় ধরে আনেননি জানি আপনারা আমার চামড়া ছাড়িয়ে আমার মাংস খাবেন ইল্লিতে গিল্লি করবেন যা আপনি তিনমাস যাবত করে চলেছেন আমার সঙ্গে আপনার পোষা জানোয়ার হয়ে আছি এখন আপনার মানবশাবক এসে গেছে আমার পেটে আমাকে খাবার সময়ে আপনি আপনার শাবককেও খুন করে খাবেন কি মুখ শুকিয়ে গেল কেন শুনে নিজের ছ্যানাকে খেতে ভয় অথচ অন্যের ছ্যানাদের দিব্বি খেয়ে চলেছেন কতোকাল হয়ে গেল আমি জানি আপনারা আমাকে খাবেন তাই আমার কোনো উৎকন্ঠা নেই উদ্বেগ নেই কোনো কাজ তো আমায় করতে হচ্ছে না শুধু আপনার অত্যাচার সহ্য করতে হচ্ছে যাকে খাবেন সে তার বন্দিদশায় থাকে তাই মরার আগে এই বাঁধন হল কারাগার যখন খেয়ে ফেলবেন তখন আমি এই কারাগার থেকে ছাড়া পেয়ে যাবো ফলে আপনাদের প্রতিশোধ নেয়া হবে না যে নেই তার সঙ্গে কিসের প্রতিশোধ প্রতিবার আমাদের পক্ষের কাউকে খান তাতে কোথায় পৌঁছোন আপনারা একইভাবে আপনাদের পক্ষের কাউকে আমরা খাই তাতে কোথায় পৌঁছোই আমরা বলুন বলুন কোথাও পৌঁছোই না আমরা দু’পক্ষই একই অবস্হায় থাকি কোঁকড়াচুল-যুবতীর কথা শুনতে-শুনতে হতভম্ব একনায়ক চিফমোড়ল বলল নাও এবার বোঝো যখন ধরা পড়েছিল তখনই বলেছিলুম একে খেয়ে ফেলা যাক তা তুইই চিফমোড়লকে টেক্কা দেবার ধান্দায় একে বাঁচিয়ে রাখলি মনের মতন ইল্লিতে গিল্লি করার জন্য বলেছিলি মন ভরে গেলে সবাই মিলে খাবি এখন তিনমাস ওকে দুপুর নেই রাত নেই চোপরসময় ইল্লিতে গিল্লি করে-করে ওর পেটে তোর শাবক এনে ফেলেছিস এখন তো ওকে খাওয়া যাবে না যতোদিন না তোর শাবকটার জন্ম হচ্ছে ইল্লিতে গিল্লিই যদি করার ছিল তাহলে তুই তো দুতিনটে দুর্গন্ধসুন্দরী আধবউ   একাধটা হড়হড়েত্বক ফুলবউ জুটিয়ে নিতে পারতিস তোর ভার্জিন গোলাপি নব্বুই ডিগ্রির ইশারার অপেক্ষায় কতো মেয়ে কোঁচড়ে ইল্লি পেতে বসে আছে তাদের ডেকে পাঠিয়ে বাঁশবনের ক্যাম্পাসে ঢ্যাঙাতালের ছায়ায় তাদের সঙ্গেই ইল্লিতে গিল্লি করতে পারতিস তারা তোকে চাইছিল তোর নব্বুই ডিগ্রির আকর্ষণে এখন তো তারা পার্টটাইম বরেদের সঙ্গে রয়েছে কী আর করবে তাদেরও তো ঘামবার-হাঁপাবার-ঠাপকাঁপুনির ইচ্ছা-অনিচ্ছা আছে তাও তুই বললি ওদের সঙ্গে তেমন জমবে না তোর মন ওরা টানতে পারেনি মন দিয়ে যে কোন কাজটা হবে তা তো বুঝলুম না শরীরের কাজকে মনের নামে চালানোটা ভিতুদের ফাঁকিবাজি ফলে সেই জোয়ান মেয়েরা যে যার নিজের টাটকা জোয়ান আধবর খুঁজে নিয়েছে তাই ওই পক্ষের এই নতুন মেয়েটাকে চোপরদিন নিয়ে ইল্লিতে গিল্লি করে ঘুরলি এখন যখন পেটে শাবক এসে গেছে তখন তো আর হামাগুড়ি দেওয়ানো যাবে না গলায় বেল্ট বেঁধে নিজের ঘরে নিয়ে গিয়ে নজরে নজরে রাখ কোঁকড়াচুল-যুবতী বলল নজরে নজরে রাখার কোনোই দরকার নেই কেননা পেটে আপনাদের পক্ষের শাবক এসে যাবার ফলে ওই পক্ষের মোড়লচিফ আমাকে একঘরে করে দেবে শাবক জন্মালে তাকে সেইদিনই খেয়ে ফেলবে যতোদিন না আমার শাবক হচ্ছে ততোদিন আমি এখানেই থাকবো আপনাদের ইচ্ছে হলে গলায় বেল্ট বেঁধে রাখতে পারেন বা খুলে দিতে পারেন যা ভালো বোঝেন আমি পালাবো না আপনারা শাবক হয়ে যাবার পর আমাকে খাবেন একনায়ক মোড়লচিফ বললে এ তো মহা মুশকিল হলো শাবক হবার পর এর বুকে দুধ এসে যাবে সে দুধ তো শাবককেই খেতে দিতে হবে অন্য পক্ষের হওয়া সত্ত্বেও আমাদের পক্ষের কেউ ওর দুধ খেতে পারবে না দুধ এলে তুই আবার লুকিয়ে চুসকি মেরে খেয়ে নিস না যেন যতোদূর বুঝছি এর হিসি খেয়ে নেশা হবে না কেননা এর পেটে আমাদের পক্ষের শাবক রয়েছে মোড়লচিফের ঠিকে-বউ বললে আমি তখনই তোমাকে বলেছিলুম যে এর রজঃশরাব বন্ধ হয়ে গেছে বলে মনে হচ্ছে তুমি কান দিলে না আরেক বউ যে আগে মোড়লচিফের আধবউ ছিল কিন্তু মন ভরে গেছে বলে আরেকজনকে আধবিয়ে করে নিয়েছে সে বললে মোড়লচিফ তো জানেই না কোনটা রাজপথ আর কোনটা গলিপথ হাত ধরে দেখালে টের পায় কোনটা রাজপথ মোড়লচিফ বললে আমি তো ওর ইল্লিতে মাছি উড়তে দেখেছিলুম তাই ভেবেছিলুম যে মাছিগুলো রজঃশরাবের রক্ত চাটতে এয়েছে এখন বুঝতে পারছি যে মাছিগুলো রাজপথের আকর্ষণে পেছনে লাগেনি গরম পড়েছে বলে গলিপথের নেশার জলে তেষ্টা মেটাতে মেতেছিল একনায়ক মোড়লচিফের কচি আধবউ বললে এ মাগি তো নিজের শরীরকেই কারাগার বানিয়ে তাতে আমাদের শাবককে সাজা দিচ্ছে এর মনও জেলখানা জানি না সেখানে কি ষড়যন্ত্র চলছে এর স্মৃতিও একটা জেলখানা তাতে ওই পক্ষের ঘটনার স্মৃতি পুরে রেখেছে আর সেগুলো পেটের শাবক সাঁতরে সাঁতরে ঠিকই জানতে পারছে কোঁকড়াচুল-যুবতী কিছু বলতে যাচ্ছিল একনায়ক মোড়লচিফ ওর গলা থেকে হাড়ের হাড়ুহাজ-করা ফেট্টি খুলে দাঁড় করাবার চেষ্টা করতে কোঁকড়াচুল-মেয়েটা দাঁড়াতে পারছিল না এতদিন যাবত চার হাতে পায়ে চলাফেরার দরুন পালোয়ান-যুবক কোঁকড়াচুল-মেয়েটিকে ধরে সামলালো আর মোড়লচিফ কোঁকড়াচুল-যুবতীর হাত থেকে দস্তানা আর হাঁটু থেকে নিক্যাপ খুলে পালোয়ান-যুবককে বললো নিয়ে যা নিজের ঘরে পালোয়ান-যুবক কোঁকড়াচুল-মেয়েটিকে পাঁজাকোলা করে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে বিছানায় শুইয়ে দেবার পর পালোয়ান-যুবকের দিকে তাকিয়ে কোঁকড়াচুল-যুবতী বলল আমি ছিলুম খালি পেটের ট্রোজান ঘোড়া আপনিই তাতে সৈন্য ভরে দিয়ে নিজেদের গেট দিয়ে তাকে নিয়ে আসতে বাধ্য হলেন আপনাদের দুর্গ এখন সুরক্ষাহীন আর মনে রাখবেন যতোদিন না আমার শাবক হচ্ছে ততোদিন আপনি আপনারা সবাই কল্পনার জগতে বসবাস করবেন আগামীর কল্পনা ভবিষ্যতের কল্পনা পাঠক বা পাঠিকা আপনার কি মনে হয় যে পালোয়ান-যুবক কোঁকড়াচুল-যুবতীর ফাঁদে পড়েছে এখানে বলে দিই যে পালোয়ান-যুবকের বয়স বাইশ বছর আর কোঁকড়াচুল-যুবতীর বয়স পঁয়ত্রিশ বছর তাছাড়া আপনার কি মনে হয় কোঁকড়াচুল-যুবতী সত্যিই গর্ভবতী আপনার কি মনে হয় যে কোঁকড়াচুল-যুবতী নিজে ধরা দিয়েছিল নাকি তাকে ফাঁদ পেতে ধরা হয়েছিল আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না পালোয়ান-যুবক কোঁকড়াচুল-যুবতীকে বলল আমি সব জানি কিন্তু আমি জানতে চাই না যে আমি জানি তাই হরেদরে আমি জানি না আমি জানি কিন্তু আমি তার ফলাফলের দায়িত্ব নিতে চাই না যাতে আমি প্রতিদিনকার মতন জীবন চালিয়ে যেতে পারি এই ভেবে যে আমি জানি না কোঁকড়াচুল-যুবতী বলল হাহা হাহা তর্কাতীত তর্ক বটে যারা সবচেয়ে ভালো তাদের আত্মবিশ্বাস নেই আর যারা অত্যন্ত খারাপ তাদের রয়েছে আবেগি ঐকান্তিকতা এটা দুই পক্ষেরই উত্তরঐতিহাসিক অসুখ দুই পক্ষেই রয়েছে রক্তহীন উদারপন্হী আর আবেগ-আক্রান্ত মৌলবাদী ফলে যারা সবচেয়ে ভালো তারা আত্মনিয়োজিত হতে পারে না আর যারা অত্যন্ত বাজে তারা জাতিবাদী সাম্প্রদায়িক যৌন গোঁড়ামির নেশায় চুর আপনারা আমাদের বিশ্বাস করেন না আমরাও আপনাদের বিশ্বাস করি না কিন্তু কেন ভেবে দেখেছেন কি কখনও কোনোও কিছুতে কি আমাদের বা আপনাদের বিশ্বাস আছে আসলে আমাদের পারস্পরিক অবিশ্বাসই আমাদের বিশ্বাস হয়ে দাঁড়িয়েছে আমি আমাদের একনায়ক মোড়লচিফকে কতোবার বোঝাবার চেষ্টা করেছি ওনার আর আমাদের পক্ষের সবারই ধারণা যে আমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে তাই পুরুষরা আমার কাছ-ঘেঁষতোনা আপনি হয়তো আমার কথায় বিভ্রান্ত হচ্ছেন কিন্তু এটা মনে রাখবেন যে অন্যের প্রতি অবিশ্বাসের মধ্যেই বিরোধিরা সত্যকে খুঁজে পেয়েছে বলে মনে করে তারা সত্যের উৎপাদক তারা মনে করে অন্য পক্ষের জীবনযাত্রা গ্রহণযোগ্য নয় কেননা তাদের নিজেদের জীবনযাত্রা আলাদা আপনি আমাকে বলুন যে অবিশ্বাসীদের ভয় পাবার দরকারটাই বা কি কেবল এই কারণেই এক পক্ষ আরেক পক্ষকে হিংসে করে চলেছে আপনি আমাকে ঘৃণা করছেন কেননা আমি অপর পক্ষের অথচ ইল্লিতে গিল্লি করছেন আমার দেহকে ভালোবেসে হ্যাঁ একে ভালোবাসা বলা অনুচিত কিন্তু আপনি তো অন্য পার্টটাইম মেয়েমানুষ ইশারা করলেই পেতেন দেখেছি তো মেয়েরা আপনার নব্বুই ডিগ্রির প্রতি কেমন আকৃষ্ট তা সত্ত্বেও টানা তিন মাস আপনি আমার সঙ্গেই ইল্লিতে গিল্লি করে গেলেন আপনি কখনও ভাবলেন না যে হয়তো আপনার সঙ্গে ইল্লিতে গিল্লির সময়ে আমারও ভালো লাগছে অথচ আপনি খেয়াল রাখলেন না যে আমারও ইল্লিখেলার চাহিদা আছে আমারও অরগ্যাজমের আঠা ওথলানোর দরকার আছে আপনি ভাবলেন আমি আপনার ইল্লি-গিল্লির কয়েদি বলে আপনার উচ্চতর পদমর্যাদা রয়েছে পালোয়ান-যুবক এতোক্ষণে মুখ খুলল বলল যে আমি ইল্লিতে গিল্লির সময়ে আঘাত না দিয়ে পারি না আক্রমণাত্মক হয়ে পড়ি অশ্লীল কথাবার্তা বলতে থাকি তাতেই আমি আনন্দিত হই কোঁকড়াচুল-যুবতী বলল আসলে আপনি ইল্লিতে গিল্লির সময়ে একা থাকলেও আপনার ভেতরে একটা ভিড় হইচই করতে থাকে যা আপনার আয়ত্বের বাইরে লক্ষ্য করবেন যে আমি আপনাকে হীনতর বা নিকৃষ্ট বলছি না অথচ আপনি এমনকি দুই পক্ষের মানুষেরা মৌলবাদীদের মতন ভেতরে ভেতরে জানে যে তারা নিকৃষ্ট মনে রাখবেন যে শত্রুপক্ষকের কথা না শুনলে আপনি নিজেকেও বুঝতে পারবেন না আপনি যখন প্রথমবার আমাকে চারহাতপা বেঁধে ইল্লিতে গিল্লি করেছিলেন তখন আমার ট্রমা ঘটেছিল কিন্তু প্রতিবারের ইল্লিতে গিল্লি আমার ট্রমা লাঘব করে আপনার কাছাকাছি নিয়ে গেছে ইল্লিতে গিল্লি  ক্রমে হয়ে দাঁড়িয়েছে সম্পর্ক তারপর যখন গর্ভবতী হয়ে গেলুম তখন বুঝতে পারলুম যে আমি আপনার শাবকের মা হতে চলেছি আপনি নিজেই নিজের ফাঁদে পড়ে গেছেন বললে বোধহয় ভুল হবে না যে আপনি আমার ইল্লির আসক্ত হয়ে পড়েছেন নয়তো তিন মাস বাঁচিয়ে রাখতেন না আমিও আপনার গিল্লিকে ভালোবেসে ফেলেছি হয়তো ক্রিতদাসীরা এমনি করেই তাদের প্রভূকে ভালোবাসতো কিন্তু ভালোবাসা এক ভয়ংকর দুর্দশা দুর্ভাগ্য অশুভ মগজের ভেতরের পৈশাচিক পরগাছা যতোক্ষণ থাকে ততোক্ষণ স্হায়ী সঙ্কট হয়ে যাবতীয় সুখ থেকে বঞ্চিত করে আমি আমার দুঃস্বপ্নের সঙ্গে আপনার দুঃস্বপ্নকে মিশিয়ে দিয়েছি যতোদিন আমি আছি ততোদিন এই দুঃস্বপ্ন থাকবে আপনার সঙ্গে কোঁকড়াচুল যুবতীর উষ্মায় উত্তেজিত বাইশ বছরের সুঠাপ পালোয়ান-যুবক হাড়ের হাড়ুহাজ-করা চামড়ার লুঙ্গি খুলে ঝাঁপিয়ে পড়ল চিৎশোয়া পঁয়ত্রিশ বছরের ইল্লিখোলা কোঁকড়াচুল-যুবতীর ওপর ঠোঁটে ঠোঁট রেখে বলতে লাগল হ্যাঁ ঠিকই আমার উচিত ছিল তোমাকে চুমু খাওয়া বুকের ওপর ঠোঁট নিয়ে গিয়ে বলল আমার উচিত ছিল বুকদুটো আদর করা নাভিতে ঠোঁট নিয়ে গিয়ে বলল আমার উচিত ছিল নাভিতে আদর করা কুঁচকিতে ঠোঁট রেখে বলল আমার উচিত ছিল জিভের প্রলেপ দেয়া আমিও চেয়েছিলুম পেটে বাচ্চা এসে যাক কেননা ভাষা দিয়ে কিচ্ছু প্রকাশ করা যায় না ভাষার ভেতরে সে ক্ষমতা নেই যা আমার শরীর বলতে পারে ঠোঁট বলতে পারে জিভ বলতে পারে ইচ্ছে ব্যাপারটা ভাষার নয় ইচ্ছে ব্যাপারটা শরীরের পঁয়ত্রিশ বছরের কোঁকড়াচুল-যুবতী দুহাতে পালোয়ান-যুবককে আঁকড়ে ধরে বলে ওঠে এই প্রথমবার আপনাকে আলিঙ্গন করছি আমি আমার বক্তব্য রয়েছে এই জড়িয়ে ধরায় এখন আপনি ঠোঁট দিয়ে যে অভিব্যক্তি প্রকাশ করছেন তা এতোদিন চার হাতেপায়ে জানোয়ারের মতন ইল্লিতে গিল্লির মাধ্যমে সম্ভব হয়নি অথচ সেই কুকর্মের মধ্যে দিয়েই আমরা দুজনে মা-বাবা হতে চলেছি ভালোবাসা শব্দটা কতোবার শুনেছি জীবনে পাঠশালায় বন্ধুদের মুখে বাড়িতে কিন্তু কখনও বুঝতে পারিনি তা ঠিক কি তা ছিল অন্যের অভিজ্ঞতা এখন টের পাচ্ছি যে ভালোবাসা আসলে এক অসহ্য অপ্রত্যাশিত সাক্ষাৎকার তার ভেতরে লুকিয়ে থাকা ব্যথার আনন্দের জন্য আর সেই আনন্দ আমাকে নস্যাৎ করে দিয়েছে আপনি আমার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা সত্ত্বেও একে অভিব্যক্তি দিয়ে প্রকাশ করা যাবে না আপনি আমার আকাঙ্খাকে এতোদিন অপমান করেছেন পালোয়ান-যুবক কুঁচকি থেকে জিভ তুলে বলল আমি কেবল বাসনাকে চরিতার্থ করায় থামতে চাইনি আমি উপভোগের আহ্লাদকে অতিক্রম করে যেতে চেয়েছিলুম যদিও তিন মাসে জেনে ফেলেছি যে মন কিছুতেই ভরে না সন্তুষ্ট হয় না কোঁকড়াচুল যুবতী বলল পৌরাণিকাধুনিক যুগের জঙ্গলে সিংহেরাও সিংহীর অনুমতি ছাড়া আর নির্দিষ্ট সময় ছাড়া ইল্লিতে গিল্লি করত না কিন্তু আপনি অবিরাম করে গেছেন মন ভরাবার জন্য যা কখনও ভরে না আপনি আমার অনুভূতির কথা কখনও ভেবে দেখেননি আপনার চরিত্রে যা কাজ করছিল তা কৃতজ্ঞতার অভাব আমরা দুটো পক্ষই এতোকাল যা করে চলেছি তা হল পেছন দিকে এগোবার প্রগতি কোঁকড়াচুল-যুবতী এবার পালোয়ান-যুবককে কষে জড়িয়ে ধরে তার ওপর উঠে গেল বলল আপনি তো তিনমাস যাবত অনেক কিছু করেছেন এবার আমার পালা কোঁকড়াচুল-যুবতী পালোয়ান-যুবকের পায়ের দিকে পেছিয়ে গিয়ে মুখে পুরে নিল মুখ ফেনায় ভরে উঠলে গিলে খেয়ে ফেলল তারপর মুখ তুলে নিয়ে বলল আমার হাগবার সময়ে আর হিসি করার সময়েও আপনি সামনে দাঁড়িয়ে থাকতেন যদিও আপনি দয়া করে চামড়ার রুমাল দিয়ে পুঁছে দিতেন কিন্তু হাগা পেয়েছে সেটাও বলতে হতো আপনাকে যেন আপনার অনুমতি ছাড়া আমি হাগতেও যেতে পারবো না আমার রজঃশরাব বন্ধ হবার পরও আপনি যখন প্রশ্ন তুললেন না বুঝলুম যে আপনি একেবারে আনাড়ি সম্ভবত ভার্জিন এমনকি প্রথমবারও আপনাকে অনেক চেষ্টা করতে হয়েছিল পালোয়ান-যুবক বলল তুমি হিসি করছ কিংবা হাগছ দেখতে আমার ভালো লাগে পেছন দিক থেকে তোমাকে দেখতেও ভালে লাগে তোমার গু থেকেও আমি বেশ মিষ্টি গন্ধ পেয়েছি যা পোড়ানো শোকানো শুঁটকি নোনা মাংসের থেকেও আকর্ষক তুমিই তো বলছ কথা নিজেকে ভাষায় প্রকাশ করতে পারে না কিন্তু আমি বুঝে গেছি তা হল নিঃশব্দ ঘোষণা কোঁকড়াচুল- যুবতী পালোয়ান-যুবকের ওপর সটান শুয়ে পড়ে ঠোঁটে ঠোঁট রাখল তারপর সামান্য তুলে বলল আপনি আপনার স্মৃতিতে আমাকে রাখবেন না বিপর্যস্ত হবেন কেননা আমার সঙ্গে কখন কি হবে আপনি জানেন না পালোয়ান-যুবক বলল কিছুই হতে দেবো না এই মোড়লচিফ মারা গেলে আমিই একনায়ক মোড়লচিফ হবো আমার মতন কেউই চামড়া ছাড়াতে পারে না উত্তরে কোঁকড়াচুল-যুবতী বলল হয়তো এমন অবস্হার সৃষ্টি হবে যে আপনাকে আমার চামড়াই ছাড়াতে হবে পালোয়ান-যুবক বলল তেমন অবস্হা হলে তখন দেখা যাবে এখন যতোদিন না শাবক পয়দা হচ্ছে ততোদিন আমরা বেঁচে নিই তাছাড়া কোনো কিছুতে বিশ্বাস করার দরকার নেই জাস্ট বেঁচে নেয়া প্রথমবারের ব্যথা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যেমন পৌরাণিকাধুনিক যুগের ফুলের জীবনে দুর্গা-টুনটুনির গভীর জিভ কোঁকড়াচুল-যুবতী বলল হ্যাঁ সেই ব্যথা আমাকে আপনি উপভোগ করতে দেননি শরীরের এই ব্যথা তো কেবল শরীরের নয় তা জীবনের সংজ্ঞাকে দেহের রসায়নের সাহায্যে শিরায় শিরায় ছড়িয়ে দেবার অবিস্মরণীয় ঘটনা কেননা মাংসহীন অস্তিত্ব সম্ভব নয় মাংসের প্রয়োজন এই জন্যে যে মাংসের সঙ্গে মাংসের সংঘর্ষে আর সেই সংঘর্ষজনিত রসায়নে নৈতিকতা সৃষ্টি হয় বিবিধতা গড়ে ওঠে বৈচিত্র্যের রকমফের পাওয়া যায় মাংস হল একই সঙ্গে ব্যথার বাহক আর ব্যথার আড়ালে আনন্দের উৎস আমাদের দুই পক্ষই এই উভয়সঙ্কট বুঝেও বুঝতে চাইছে না পালোয়ান-যুবকের গিল্লি আবার ষাঁড়িত গোলাপি হয়ে উঠেছিল কোঁকড়াচুল-যুবতী নিজের ইল্লি তার ভেতরে নিয়ে নিলে পালোয়ান-যুবক বলল আমাদের যৌথব্যথা ছিল কিন্তু ক্ষুধা তার সমাধান আমরা দুপক্ষই করে ফেলতে পেরেছি পরস্পরের মাংস খাওয়ার প্রথা দিয়ে এখন আশাহীনতাই একমাত্র আরাম আর জলহীনতার চিরখরার ধ্বংস থেকে বাঁচার উপায় হিসেবে পরস্পরের মাংস খাওয়া একটা বড়ো আবিষ্কার এর ফলে টেবিলঘরের জ্ঞানী-বিজ্ঞানী-দার্শনিক-শিল্পীদের মুখে সরাসরি কাঁচা-গু ছুঁড়ে মারা হয়েছে তাদের আর কোনো প্রয়োজন দুই পক্ষেই নেই কোঁকড়াচুল-যুবতী পালোয়ান-যুবকের দুই হাত নিজের দুই বুকের ওপরে এনে বলল আমরা কি করছি জানেন আমরা গোপনে আমাদের দুই পক্ষের সঙ্গে একটা খেলা খেলছি যা তারা জানে না এর ফলাফল শেষ পর্যন্ত কী হবে তা আমরা্ দুজনেও জানি না এই খেলা আমাদের দুজনকে দুই পক্ষ থেকে আলাদা করে তৃতীয় একটা বায়বীয় পক্ষ গড়ে তুলতে চাইছে কোঁকড়াচুল-যুবতীর দুই বুককে টেনে নিজের বুকের সঙ্গে মিশিয়ে পালোয়ান-যুবক বলল শারীরিক রসায়নের দুর্গন্ধের তুলনায় সৌন্দর্য আর নেই কেননা এই দুর্গন্ধিত রসায়নেই রয়েছে আমার তোমার আমাদের দুই পক্ষের সকলের নিদারুণ পীড়ার নিঃশব্দ গোঙানি যাকে পরস্পরের অক্ষমতা দিয়ে চাপা দেবার চেষ্টা হয়ে চলেছে বহুকাল বহুযুগ ধরে কোঁকড়াচুল-যুবতী বলল নাড়াবেন না নাড়াবেন না স্হির থাকতে দিন সময়কে দ্রুত করার চেষ্টা করবেন না সময়কে আহত হতে দিন শামুকের মতন এগোতে দিন শামুকের রাসায়নিক লালা নিয়ে এই যে এখন আমরা বন্ধ ঘরে আঠাবদল করছি এই ইল্লিগিল্লির মর্মার্থ পালটে দিয়েছে আমাদের আগেকার সম্পর্ক যখন আপনি আমাকে সবায়ের সামনে জানোয়ারের মতন ইল্লিতে গিল্লি করতেন পালোয়ান-যুবক বলল সেটাই আমাদের পক্ষের নৈতিক মানদণ্ড যে সবায়ের সামনে  করতে হবে যাতে কোনো মানসিক সম্পর্ক না গড়ে ওঠে যাতে মাংস খাবার সময়ে স্মৃতি ডুকরে না ওঠে কিন্তু আমি বুঝতে পারছি যে সেই সময়ের ইল্লিতে গিল্লি বা আশেপাশের গন্ধে ছেয়ে থাকা ইল্লিগিল্লির মধ্যে কোনো বার্তা ছিল না বরং তা আমাদের দুজনের মধ্যে দেয়ালের মতন কাজ করছিল বন্ধ ঘরে আমরা আমাদের দুই পক্ষের নৈতিক ঐতিহ্যে অন্তর্ঘাত ঘটাচ্ছি রীতি অনুযায়ী যা সবায়ের সামনে করার তা আমরা ঘরের ভেতরে করছি এমনকি লালাবদলের সময়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলাবলি করছি যা নিষিদ্ধই কেবল নয় যা শাস্তিযোগ্য আরও খারাপ এই জন্যে যে আমরা দুজনেই এতে সায় দিয়ে করছি নিজেদের ইচ্ছেমতন আঙ্গিক নিচ্ছি ফলে আমরা নারী-পুরুষ সঙ্গমকারী নয় আমরা দুজনে হয়ে উঠেছি সমাজবিরোধী কোঁকড়াচুল-যুবতী পালোয়ান-যুবকের মুখে ময়লার আস্তরণে ঢাকা ডান দিকের মাই প্রবেশ করিয়ে বলল বাইরে পৌরাণিকাধুনিক যুগের জানোয়ারের আঙ্গিকে ইল্লিতে গিল্লি করার সময়ে আমাদের দুজনের আত্মপরিচয় বজায় ছিল আমি ওই পক্ষের ধরে-আনা ক্রীতদাসী যাকে আপনারা বলেন সুন্দরী যদিও আমার নাম সুন্দরী নয় আর আপনার পরিচয় আপনি এই পক্ষের উচ্চাকাঙ্খী যুবক বন্ধ ঘরে সেই আত্মপরিচয় আমরা খুইয়েছি আমাদের শাবক মূর্ত হয়ে জন্মাবে বটে কিন্তু নিজের সঙ্গে নিয়ে আসবে বিশৃঙ্খলা আর জানেনই বিশৃঙ্খলামাত্রেই জারজ কোঁকড়াচুল-যুবতী ডান দিকের মাই পালোয়ান-যুবকের মুখ থেকে বের করে ময়লার আস্তরণে ঢাকা বাঁদিকের মাই ঢুকিয়ে দিয়ে বলল আর যে নৈতিকতার কথা আপনি বলছেন তা মিথ্যার বনেদে দাঁড়িয়ে থাকা বীক্ষা বাইরে পৌরাণিকাধুনিক জানোয়ারের মতন আঙ্গিকে মনের কোনো স্পর্ধা ছিল না এখন আমরা যা করছি তা পুরোপুরি মনের ভেতরের প্রক্রিয়া পাঠক বা পাঠিকা আপনি কি মনে করেন যে কোঁকড়াচুল যুবতী যা বলছে তা উদ্দেশ্য প্রণোদিত এবং কোঁকড়াচুল যুবতী কেনই বা পালোয়ান-যুবকের মুখ কায়দা করে বন্ধ করে দিচ্ছে যাতে পালোয়ান-যুবক প্রত্যুত্তর দিতে পারছে না আপনি কি মনে করেন যে পালোয়ান-যুবক কোনো উত্তর দিতে চাইলে মুখ থেকে মাই বের করে প্রত্যুত্তর দিতো আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না পালোয়ান-যুবক উত্তর না দিয়ে অন্য প্রসঙ্গে চলে গেল মুখ থেকে মাই বের করে নিয়ে বলল আমার কাছে একজনের ইল্লির লাবিয়া মেজোরা আর মাইয়ের দুটো টোঁটি শুকিয়ে রাখা আছে আমি তখন কিশোর ছিলুম খাইনি আমার ভাগে ওইটুকুই পড়েছিল মাঝে মাঝে কুলের আচারের মতন চুষতুম আর খেয়ে ফেলার ইচ্ছে সংবরণ করতুম ইল্লিলাবিয়া বিছানায় পেতে তার ওপর শুয়ে নিজেকে উত্তেজিত করতুম এতোদিন ভাবতুম যে আমি প্রতীকিভাবে সেই মেয়েটায় আসক্ত বলে খাচ্ছি না কিন্তু এখন তোমার ধুকপুকে জীবন্ত মাই আর দপদপে জীবন্ত ইল্লিতে মুখ দিয়ে বুঝতে পারছি যে তা ছিল বিভ্রম চোখ বুজেও তোমার মতন সুন্দরী করে তুলতে পারিনি কল্পিত মেয়েগুলোকে কোঁকড়াচুল-যুবতী ময়লার আস্তরণ থুতুতে মোছা নিজের ডান দিকের মাই পালোয়ান-যুবকের মুখে পুরে দিয়ে বলল না তা নয় তা বিভ্রম নয় তাও প্রেম এক বিশেষ ধরণের প্রেম যেখানে আপনি প্রতিদিন আপনার প্রেমিকাকে নতুন করে মগজে এঁকে নিচ্ছিলেন তার সুনির্দিষ্ট কোনো রূপ ফুটে উঠছিল না স্বমেহনের জন্য ওইটুকি ছবিই ছিল যথেষ্ট আপনার সামনে মূর্ত রূপ ফুটে উঠলে হয়তো আপনি তাকে খেয়ে ফেলবার তোড়জোড় করতেন আর হ্যাঁ আপনি আমাকে সুন্দরী বলে ডাকবেন না শুনলেই মনে হয় আমি আপনার চারপেয়ে ক্রীতদাসী আপনি আমাকে মা বলে ডাকবেন কেননা আমাদের পক্ষে যে মেয়েদের বয়স তিরিশের বেশি হয়ে যায় তাদের চেয়ে ছোটোরা তাদের মা বলে ডাকে তার কারণ বিয়ে বলতে বোঝায় নারী-পুরুষের এক সপ্তাহ বা মাস তিনেক বা বছর খানেকের সম্পর্ক মেয়েরা আর ছেলেরা ইচ্ছেমতন বউ আর বর যখন-তখন বদল করতে পারে বলে কে যে কার ছেলে বা মেয়ে তা নির্দিষ্ট করে বলা যায় না ফলে গাঁড়হাভাতে মানুষ মাত্রেই বেজন্মা যখন পুরুষ বা নারী আর কাজকম্মো আকর্ষণের যোগ্য থাকে না কেউই তাদের মিনিট পাঁচেকের জন্যেও বউ বা বর করতে চায় না তখন তাদের রাখা হয় বয়স্কখোঁয়াড়ে সেখানে তারা সুখেই থাকে গল্পগুজব পরচর্চা করে দাবা খেলে সমাজ তাদের খোরপোষ আর পা টেপাবার ব্যবস্হা করে মরে গেলে ঘটা করে ক্রুশবাঁশে টাঙানো হয় পালোয়ান-যুবক থুতুতে পরিষ্কার বুক থেকে মুখ সরিয়ে নিয়ে বলল আমাদের এখানেও একই রেওয়াজ তবে আমাদের এখানে মা বলার বদলে বলা হয় আন্টি আর যারা পুরুষসঙ্গ করার জন্য টার্গেট খুঁজছে তাদের বলা হয় মিস বা দিদিমণি তার কারণ বউ আর বরের মাঝে রতিসম্পর্ক বদলাতে থাকে যার ফলে একসময়ে এমনও হয় যে তোমার জন্ম দিয়েছিল সে তোমাকে পছন্দ করে ফেলল আর তুমিও তাকে পছন্দ করে ফেললে তাই যাতে মা বলে ডাকতে না হয় সেকারণে আন্টি ডাকের প্রচলন বলতে বলতে পালোয়ান-যুবক কোঁকড়াচুল-যুবতীকে জড়িয়ে ধরে পাক খেয়ে নিজের ওপরে তুলে নিল আর কোঁকড়াচুল-যুবতীর মুখের কাছে মুখ নামিয়ে চোখে চোখ রেখে বলল আমাদের এই সম্পর্ক রতির বুঝলে এটা নিছক ইল্লিগিল্লির সম্পর্ক নয় যে সম্পর্ক পৌরাণিকাধুনিক জানোয়ারদের মাঝে গড়ে ওঠত রতি ব্যাপারটা জ্ঞানের যে জ্ঞানের প্রতিফলন তুমি দেখতে পাবে কোণারক আর খাজুরাহোর মন্দিরগুলোয় তার মানে রতি কোনো ভুল নয় তা এই পক্ষের সঙ্গে ওই পক্ষের মাঝে ঘটলেও রতির রসায়ন তরল নান্দনিক তাতে রয়েছে ইন্দ্রিয়পরায়ণতা ছোঁয়া দেখা শোনা শোঁকা স্বাদ আসলে অনুভূতিই সব জ্ঞানের উৎস তাই রতিক্রিয়া জিনিসটা পবিত্র তা ইল্লিগিল্লির মতন নয় রতিক্রিয়া অবচেতন থেকে তথ্য তুলে আনে যা পৌরাণিকাধুনিক জানোয়ারদের স্মৃতিতে ছিল না সঙ্গমের পরেই সিংহীকে চিৎ হয়ে শুয়ে গড়াগড়ি দিতে হতো কেননা তা নিছক যৌনতা বাচ্চা পয়দা করার জন্য তুমি যে মুখে নিয়েছিলে তার সঙ্গে বাচ্চা পয়দা করার সম্পর্ক ছিল না আমার মুখে তুমি তোমার বুক এক এক করে দিয়েছিলে তার সঙ্গে বাচ্চা পয়দা করার সম্পর্ক নেই তুমি কম বয়সে স্বমেহন করেছ আমিও করেছি তা এই জন্য যে আমরা মানুষ তোমার সঙ্গে এর আগে তিন মাস পৌরাণিকাধুনিক জানোয়ারের মতন সঙ্গম করেছি তা বাচ্চা পয়দা করার জন্য নয় তা রতির আনন্দের জন্য যা-কিছু পবিত্র তা শেষ পর্যন্ত নষ্ট হয় দুই পক্ষের পৌরাণিকাধুনিক জানোয়ার ইল্লিতে-গিল্লি প্রথা পবিত্রতাকে নষ্ট করার উদ্দেশে মানুষের জ্ঞান রতির জন্য সে প্রয়োগ করে কিন্তু জানোয়ারদের জ্ঞানজগত নেই মানে যা বলতে চাইছি তা হল এই যে রতি আমার সঙ্গে পৃথিবীর মানুষের অন্তরজগতের সঙ্গে তার বহির্জগতের সম্পর্ককে ঘষেমেজে মুছে দ্যায় তাদের মাঝে বিদার ঘটিয়ে পুরুষের সঙ্গে নারীর যোগসূত্র তৈরি করে আসলে আমরা রতিপ্রাণী আর তাই জন্যেই আমরা পরস্পরের মাংস খেতে ভালোবাসি প্রত্যুত্তরে কোঁকড়াচুল-যুবতী বলল তিনমাস যাবত আপনি আমার সঙ্গে যে ব্যবহার করেছেন তাকে প্রায়ই মনে হয়েছে নোংরা কলঙ্ককর নিকৃষ্ট নীচ অসৎ স্বার্থপর শোষণ ঘৃণ্য জঘন্য অকরুণ নির্মম অথচ তাতে ছিল একই সঙ্গে অমিল আর দেহের প্রশ্রয়ে গড়ে ওঠা পরমানন্দ সমর্পণ পরাজয়বোধ দেহস্বত্বত্যাগ কর্তব্য সমবেদনা অনুগ্রহ আতঙ্ক লজ্জা তবে আমাদের দুই পক্ষের ঈশ্বরহীনতা আপনাকে বাঁচিয়ে দিয়েছে অনেক দেশে শুনেছি ঈশ্বর নামের একটা নকল নৈতিক বাঁধন তৈরি করে গাঁড়হাভাতে মানুষদের পৌরাণিকাধুনিক জন্তুজানোয়ারের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয় নিজেরাই নিজেরা সেখানে পরস্পরের সঙ্গে খুনোখুনি করে মেরে ফ্যালে কিন্তু খায় না যদিও তারা জন্তুজানোয়ার খেতো পাঠক বা পাঠিকা আপনার কি মনে হয় যে কোঁকড়াচুল-যুবতীটি ষড়যন্ত্র করে চলেছে পালোয়ান-যুবকের বিরুদ্ধে তাকে বশ করে সুযোগ খুঁজছে খুন করে রাতের অন্ধকারে রতিক্যালানে পালোয়ান-যুবকের পাশ থেকে উঠে চুপচাপ পালিয়ে যাবে ভাবছে  হঠাৎ তারস্বরে সমবেত কান্নার ভেউ ভেউ হাউ-হাউ ভ্যাঁ-ভ্যাঁ আরম্ভ হতে পালোয়ান-যুবক নিজের কাজ তাড়াতাড়ি সেরে যোনি থেকে লিঙ্গ বের করে নিয়ে ঠোঁটের ওপর থেকে ঠোঁট তুলে নিয়ে বুকের ওপর থেকে হাত তুলে নিয়ে বলল আরে আরে আজকে পূর্ণিমা নাকি আজকে কান্নার রাত গোল চাঁদ মেঘের ফাঁক গলে বেরিয়ে এসে থাকবে আমাকেও কান্নায় অংশ নিতে হবে বলতে-বলতে চামড়ার লুঙ্গি পরে বিছানা থেকে নেমে পালোয়ান-যুবক কোঁকড়াচুল যুবতীর দিকে তাকিয়ে বলল তুমি যদি আমাকে ছেড়ে চলে যেতে চাও তাহলে পেছনের বাঁশবনের ক্যাম্পাসের ভেতর দিয়ে পালাও ওই বাঁশবনে এখন রাতের বেলায় কেউ যায় না কেননা হাড়ের গজাল-ঠোকা ক্রুশবাঁশে টাঙানো আত্মীয়-স্বজনদের দেহ আর কঙ্কাল বাঁশপাতার হাওয়ায় কাঁদে গান গায় কথা-বলাবলি করে নাক ঝাড়ে কাশে তুমি বাঁশবনের ক্যাম্পাসের ভেতর দিয়ে দৌড়ে চলে যেও বুঝলে বাঁশবনের ক্যাম্পাস পেরোলেই দুর্গন্ধ হাওয়ার দেয়াল তার ভেতরে মাথা ঢুকিয়ে সোঁ করে নিজেদের পক্ষে চলে যেতে পারবে এখানে থাকলে শাবক পয়দা হবার পর তোমাকে মেরে ফেলা হবে তা আমি সইতে পারবো না যাবার আগে চর্বির প্রদীপটা জ্বেলে দিয়ে যেও বুঝলে বলতে বলতে পালোয়ান-যুবক সমবেত কান্নায় কাঁদার জন্য দরোজার চৌকাঠ থেকেই হাসির সঙ্গে কান্না মিশিয়ে এগোলো আসলে তার হাসি ছিল নিজের গিল্লির দৈর্ঘ্যের আনন্দে যা তাকে কোঁকড়াচুল- যুবতীর কতো ভেতরে নিয়ে যেতে পারে সেই সুখচিন্তা নিয়ে আর কান্না ছিল কোঁকড়াচুল-যুবতীকে ছেড়ে যাবার দুঃখে কোঁকড়াচুল-যুবতী থেকে গেলে তার নিশ্চিত মৃত্যুর দুঃখে কোঁকড়াচুল-যুবতী চলে গেলে মনের মতন রতি করতে না পারার দুঃখে এদিকে পালোয়ান-যুবক চলে যেতেই কোঁকড়াচুল-যুবতী ঘুমোবার কথা ভাবলো কতোদিন ঠিকমতো ঘুমোনো হয়নি হাড়ের হাড়ুহাজ-করা চামড়ার চাদর টেনে চাপা দিয়ে নিজেকে নিঃশব্দে বলল যাবো না এখান থেকে যতোদিন এই তাগড়া পালোয়ান-যুবককে সঙ্গমের জন্যে পাচ্ছি ততোদিন জীবন উপভোগ করে নিই একে দিয়ে নানা আঙ্গিকের সম্পর্ক সম্ভব এ এখনও আনাড়ি ভাগ্যিস একজন ঘোলাটে মগজের পালোয়ান-যুবককে পেলুম এর মাপও মনের মতন দীর্ঘ সুখদায়ী সরস ঝিলমিলে এর অনেকগুলো ঠোঁট আছে যেগুলো একই সঙ্গে আমার সারা শরীরে আদর নিয়ে নেমে আসে এর জিভের লালায় রয়েছে রামধনুর সাতরঙের সুগন্ধ এ আমার হৃদয়ের ধুকপুকুনির সঙ্গে ক্লিটোরিসের টুনটুনানির ঝিংকিচিকিং ঝিংকিচিকিং ঝিংকিচিকিং ছন্দ মেলাতে পারে এর ভাঁড়ারে দেবার মতন মৃদু ব্যথা প্রচুর রয়েছে এর ওজন কুস্তিগিরের মতন ডাকসাইটে এ গোপন পালক দিয়ে আমার শরীরে ঘুমিয়ে থাকা কাঁপুনি শিহরণ রোমাঞ্চ জাগিয়ে তুলতে পারে আমার মাংসের ধাঁধার সমাধান করতে পারে যা এর আগে আমার আধবর বা কাঁচাবর বা পার্টটাইম বররা কেউ দিতে পারেনি এ আমাকে মেরে খেয়ে ফেললেও আমার তা প্রাপ্তি এরা যদি আমাকে নিজের পক্ষের বলে মেনে নেয় তাহলে আমি ক্রুশবাঁশে বাঁধা অবস্হায় এর দিকে তাকিয়ে ক্রমশ কঙ্কাল হয়ে যেতে রাজি আছি ভাবতে ভাবতে কোঁকড়াচুল-যুবতী ঘুমিয়ে পড়ল আর নাক ডাকতে লাগলো কেননা ওই পারের একনায়কের অলিখিত বিধিবিধান অনুযায়ী নাক ডাকলে বদস্মৃতিরা উধাও হয়ে শুধু সুখস্মৃতি ধরে রাখে আর সদ্য-অতীতকে ভুলে যাওয়া যায় ওদিকে পালোয়ান-যুবক দৌড়োতে দৌড়োতে টের পেলো যে আজকে পূর্ণিমা নয় আর কেউই সমবেত কান্না কাঁদছেনা বাঁশবনের ক্যামপাসে ক্রুশবাঁশে বাঁধা মানুষের মাংস খুঁটে হাজার মাছির গ্যাঞ্জাম আর হাজার মশার দল ওপর দিকে মুখ তুলে খিদের কান্না কাঁদছে ভাগ্যিস ওদের কোনো শোবার বিছানা নেই নয়তো না খেয়ে শুতে যেতে হতো খিদে পেলে ওপরে মুখ তুলে কাঁদলেই চলবে না যেখান থেকে হোক খাবার যোগাড় করতে হবে সেই পক্ষের ক্রুশবাঁশে টাঙানো আত্মীয়স্বজনরা যাদের মাথা বা করোটি মশা-মাছিরা খায়নি বা পৃথিবীর টানে মাটিতে ঝরে পড়েনি অমাবস্যার রাতে তারা সমবেত গান গায় সবচেয়ে বয়স্ক শব বা কঙ্কাল কোনো একটা গান আরম্ভ করলে সবাই মিলে সেই গান গায় একইভাবে ক্রুশবাঁশে বাঁধা আত্মীয়স্বজনরা পূর্ণিমার রাতে গান গায় সেই পক্ষের যুবক ফেরার পথে দেখতে পেলো নিজের পক্ষের সোনালিচুল ডবকাছুকরি ফিট্টমফিট পাহারাদারদের নিয়ে বোধহয় ওই পক্ষের ছোকরার গলায় হাড়ুহাজ-করা চামড়ার ফেট্টি বেঁধে হাতে দস্তানা পায়ে নিক্যাপ পরিয়ে হামাগুড়ি দিইয়ে ঘাসের রাস্তায় টানতে-টানতে নিয়ে যাচ্ছে সঙ্গে ওর কমলা লাল নীল বাদামি চুলের দশ-বিশ চাঙ্গাউরুৎ ছুকরি বন্ধুনীরা হ্যাহ্যা হিহি হোহো খিকখিক করতে করতে যাচ্ছে পালোয়ান-যুবক কাছে গিয়ে দেখল বাঁধা ছোকরার সারা গায়ে চুল এমনকি পেছন দিকেও চুল ডবকাছুকরি যুবকের দিকে তাকিয়ে বলল ওর পোঁদের চুল দেখেছ আর স্বাস্হ্য দ্যাখো বুকে চুল পিঠে চুল যন্তরটা এতো লম্বা যে প্রায় মাটিতে ছুঁচ্ছে অলিভফল থেকে লিটার খানেক তেল বেরোবে এ আমার রিয়্যাল পৌরাণিকাধুনিক অ্যানিমাল সহজে পুড়িয়ে খাবো না এরা সবাই আমার সঙ্গ নিয়েছে একে কোনো তালগাছে বেঁধে কাজ সারার জন্য এরকম তাগড়া ছয়প্যাক শরীর এর কোনো অসুবিধা হবে বলে মনে হয় না তবে চুলেলছোকরা বলছে ও সেই পক্ষ ওই পক্ষ কোনো পক্ষের নয় ও বাইরের দেশ থেকে এখানে এসেছিল দলবাজি প্রচার করার জন্য পালোয়ান-যুবকের দিকে তাকিয়ে ডবকাছুকরির নীলচুল বন্ধুনি জিগ্যেস করল দলবাজি কাকে বলে তা তুই জানিস কি পালোয়ান-যুবক বলল না জানি না ওকেই জিগ্যেস কর দলবাজি কোন জিনিসের নাম যদি খাবার জিনিস হয় তাহলে আমাদের দরকার নেই কেননা আমরা উত্তরঐতিহাসিক যুগে পৌঁছে মানুষের মাংস ছাড়া কিছুই খাই না ছুঁচোবাজি বা তুবড়িবাজি বা ফুলঝুরিবাজি হলেও দরকার নেই অযথা আলোয় মগজ চিড়বিড়ে হয়ে যায় গলায় হাড়ের হাড়ুহাজ-করা ফেট্টি বাঁধা ছোকরা মুখ তুলে বলল আরে দলবাজি কোনো খাবার বস্তু নয় ব্যাপারটা আদর্শের মানুষ কেমন করে ভালোভাবে বেঁচে থাকবে তার আদর্শ কমলা লাল নীল বাদামি চুলের দশ-বিশ চাঙ্গাউরুৎ ছুকরিরা চুলেলছোকরার কথায় হিহি হাহা হোহো হেসে বলল আর কতো ভালোভাবে বাঁচবো তোমার মাংস খাওয়ার চেয়ে কাঠিকাবাব খাওয়ার চেয়ে অলিভফল খাওয়ার চেয়ে ভালো আর একটা বাঁচা আছে বটে যা তোমায় তালগাছে বেঁধে এক্ষুনি দেখানো হবে তুমি নিজেও তাতে অংশ নেবে বুঝলে কষ্টের সঙ্গে আনন্দ মিশিয়ে কেমন করে বাঁচা যায় তা জানতে পারবে তারপর তোমার যন্তরের কাঠিকাবাব যা জমবে না আহা তা আদর্শ জিনিসটা কি বলো দিকিন বুঝিয়ে তাহলে তোমাকে ততো যন্ত্রণা দেয়া হবে না যতো ওই পক্ষের লোকগুলোকে আমরা দিই চুলেলছোকরা দাড়িগোঁপসুদ্দু মুখ উঁচু করে বলল আদর্শ হল মহাপুরুষদের মতামত ফিরি করে বেড়ানো ডবকাছুকরি বলল তোর চেয়ে বড়ো মহাপুরুষ হয় নাকি রে মুকখু নিজের জিনিস কাজে লাগাবি তা নয় অন্যের বুকনি ফিরি করে বেড়াচ্ছিস তুই তো নিজেই মহান মাপের পুরুষ চুলেলছোকরা বলল ঠিক আছে আপনারা আমাকে নিয়ে গিয়ে তালগাছে বাঁধুন এখানে তো তালগাছ আর মুলিজাতের বাঁশগাছ ছাড়া কোনো গাছই দেখলুম না আমি বুঝিয়ে বলছি আদর্শ কাকে বলে এরকম পৌরাণিকাধুনিক যুগের ক্লাবপালিত কুকুরের মতন চার হাতেপায়ে হামাগুড়ি দিয়ে বোঝানো সম্ভব নয় এই যুগেও যে মানুষের মাংস খাওয়া হয় তার চামড়া জ্যান্ত অবস্হায় ছাড়ানো হয় তার চামড়ার পোশাক জুতো বেল্ট দস্তানা নিক্যাপ তৈরি করা হয় এটা তো অমানুষিক মানুষ তো কবেই সভ্য হয়ে গেছে আর আপনারা পড়ে আছেন প্রাগৈতিহাসিক যুগে ডবকাছুকরি বলল ঝাঁট জ্বলে যায় পৌরাণিকাধুনিক যুগের এইসব কথা শুনে ওরে গাড়লঘিলু চুলেলছোকরা সভ্যই যদি হবি তো মহাপুরুষের বুকনি ফিরি করতে হচ্ছে কেন আমাদের দ্যাখ উত্তরঐতিহাসিক যুগের মানুষ কিচ্ছু ফিরি করি না কতো সুখে আছি সবাই মিলে ওই পক্ষের মানুষদের ধরি আর খাই এছাড়া আর কোনো আদর্শ নেই আমাদের দেখতেই পাচ্ছিস কতো ভালো আছি আমরা এর চেয়ে ভালো আর থাকা যায় নাকি শুনতে-শুনতে পালোয়ান-যুবক তাড়াতাড়ি ফিরে গিয়ে কোঁকড়াচুল-সুন্দরীমা আছে না চলে গেল দেখবে ভাবছিল চুলেলছোকরাকে দাঁড় করিয়ে একটা তালগাছের সঙ্গে ঠেসে ধরে চামড়ার দড়ি দিয়ে বাঁধতে বাঁধতে  ফিসফিস করে বলল আমি তোমাকে পালাবার সুযোগ করে দেবো মাঝরাতে আজ হলে আজই তুমি তোমার সঙ্গে একজন কোঁকড়াচুল-যুবতীকে নিয়ে যাবে সে আমার সুন্দরীমা চুলেলছোকরা কেঁদে ফেলল সোনালিচুল ডবকাছুকরি পালোয়ান-যুবককে উড়ন্তচুমুর ধন্যবাদ জানিয়ে বলল ওকে তালগাছের গুঁড়িতে বেঁধে ফেলা হয়েছে এবার ব্যবহারযোগ্য করে তোলা যাক কমলা লাল নীল বাদামি চুলের দশ-বিশ চাঙ্গাউরুৎ ছুকরিরা চুলেলছোকরাকে কাছ থেকে খতিয়ে দেখল চুলেলছোকরার বুকের নাভির চুল নেমে এসে লিঙ্গ ঢেকে ফেলেছে ফিট্টমফিট পাহারাদাররা ঘাসের ওপর বসে পড়ল দেখে পালোয়ান-যুবক দৌড়োলো কোঁকড়াচুল-সুন্দরীমা আছে না চলে গেছে দেখতে ডবকাছুকরি বলল তা চুলেলছোকরা এবার বলো দিকিন তোমার আদর্শ জিনিসটা কি সেটাও কি চুলের অন্ধকারে ঢাকা কমলা লাল নীল বাদামি চুলের দশ-বিশ চাঙ্গাউরুৎ বন্ধুনিরা হ্যাহ্যা হিহি হোহো হেসে বলল আদর্শ হল বিভ্রম যা চুলে ঢাকা থাকে হ্যাহ্যা হিহি হোহো সোনালিচুল ডবকাছুকরি বলল যা বুঝছি আদর্শ হল পাগল হবার উপায় যা দিয়ে তুই ব্যাটা বিভ্রমে সন্ত্রাস ঘটাস তুই আসলে বাস্তব জগতকে ভালোবাসতে পারিসনি চুলেলছোকরা বলল আপনারা বোঝবার চেষ্টা করছেন না আদর্শ হল মানুষের ভালো করার মহৎ দূরদৃষ্টি কমলা লাল নীল বাদামি চুলের দশ-বিশ চাঙ্গাউরুৎ ছুকরি শুনে বলল হ্যাহ্যা হিহি হোহো আর সেই দূরদৃষ্টি হল একখানা ঝুলন্ত রক্তিম মরীচিকা সোনালিচুল ডবকাছুকরি বলল তোর পরিবেশে অবস্হায় যা খাপ খেয়ে গেছে তাকেই সারা পৃথিবীতে আদর্শ বলে চালাবার চেষ্টা করছিস তোর সমস্যা কি জানিস তুই নিজে ওই ভুয়ো জিনিসটার জেলখানায় আটকে আছিস স্বপ্ন দেখছিস যে যেখানে ছিলিস সেখানকার ব্যবস্হা ভালো নয় বলে বিকল্প ব্যবস্হা ফিরি করে বেড়ালে স্বপ্নপূরণ হবে আর ওই স্বপ্ন দেখার ধান্দাতেই এখানে মরতে এসেছিস কিচ্ছু হবে না কিচ্ছু হবে না কিচ্ছু হবে না এই উত্তরঐতিহাসিক যুগে তারপর ফিট্টমফিট পাহারাদারদের দিকে চেয়ে বলল তোদের কাছে কাঁচি আছে তো এর যন্তরের আশেপাশের চুলগুলো ছেঁটে ফ্যাল নইলে কেমন করে কী করব আমরা সন্ধে হলে দেখতেই পাবো না এতোজন লাইন দিয়ে রয়েছে ডবকাছুকরির কথা শুনে একজন ফিট্টমফিট পাহারাদার হাড়ুহাজ-করা হাড়ের কাঁচি দিয়ে ছাঁটা আরম্ভ করল চুলেলছোকরার কুঁচকির জঙ্গল আর গোধূলীলগ্নে হাসিমুখে বেরিয়ে এলো যন্তরখানা কমলা লাল নীল বাদামি চুলের দশ-বিশ চাঙ্গাউরুৎ ছুকরির মুখে হাসি ফোটালো একজন বলল এই তো একেই বলে আদর্শ সোনালিচুল ডবকাছুকরি পোশাক খুলে ঢলঢলে বুকে তপতপে গরম উরু চেপে চুলেলছোকরাকে কিছুক্ষণ জড়িয়ে ধরে থাকার পর তার মানবতাবাদী শরীরে থিরথির করে প্রাণ ফিরে এলো তার জড়িয়ে ধরার ইচ্ছে করল অথচ দুহাত বাঁধা সোনালিচুল ডবকাছুকরি তাকে চুমু দিয়ে চেটে নিজেকে চেপে ধরল চুলেলছোকরার পেশি-দপদপে দেহে আর ইল্লি-গিল্লি করে কিছুক্ষণেই যুবকের উত্তেজনা ঝরিয়ে ফেলল নিজের ইল্লির গুহায় তার আঘাতে তালগাছটা পেছন দিকে সামান্য হেলে গেল হেলতে গিয়ে গাছের টঙে বাঁধা চামড়ার হাঁড়ি থেকে কিছুটা তাড়ি চলকে চুলেলছোকরার মাথায় পড়তে সে চেটে নিয়ে কিছুটা তেষ্টা মেটাল বাকিটা সোনালিচুল ডবকাছুকরি চেটে তেষ্টা মেটালো সোনালিচুল ডবকাছুকরির পর কমলা লাল নীল বাদামি চুলের দশ-বিশ চাঙ্গাউরুৎ ছুকরিও পারাপারি করে একই কাজ শেষ করার পর তালগাছ আরও খানিকটা হেলে পড়ল তখন চুলেলছোকরার অবস্হা পচা ক্রুশবাঁশের মতন ঝুলে কাহিল তখন যেসব ঝক্কিমন্ত যুবতীরা লাইনে ছিল তারা মুখ দিয়ে বাকি কাজটা করল চুলেলছোকরা হেলে থাকা আশেপাশের তালগাছের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল তালগাছগুলোকে কতো অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে হেলা তালগাছে হেলে থেকে চুলেলছোকরা বলল আপনারা রোজই যদি আমার সঙ্গে এই কম্মোটি করেন তাহলে আমি এই কাজকেই আদর্শ বলে মেনে নেবো তবুও যেহেতু দলবাজির আদেশ তাই আদর্শ ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলি আপনাদের সোনালিচুল ডবকাছুকরি আর কমলা লাল নীল বাদামি চুলের দশ-বিশ চাঙ্গাউরুৎ ছুকরি ক্লান্ত হয়ে ঘাসের ওপর বসলে তালগাছে বাঁধা চুলেলছোকরা আদর্শ বোঝাবার চেষ্টা করতে লাগলো অথচ হাত না নাড়িয়ে কেমন করে বোঝাবে কুলকিনারা পেলো না দলবাজির আদর্শ প্রচারের জন্যে নানাভাবে হাত নাড়ানো আঙুল তোলা জরুরি এদিকে তার টলমলে শরীর আর ঝিমঝিমে মগজ থেকে যে কী কথা বের হচ্ছিল তা সে নিজেই টের পাচ্ছিল না তবু ঘোরের মধ্যে বলে চলল সব দলবাজ ছোকরাই আদর্শ প্রচারের জন্যে বাড়ি থেকে বেরোয় কিন্তু চুল ছাঁটিয়ে এখন আমি যে পরমানন্দ ভোগ করলুম সেই আনন্দপ্রাপ্তির জন্য বিভোর হয়ে যায় আদর্শের নামে কুর্সি-হোলডাররা দলবাজির ছোকরাদের শোষণ করে তাদের মনে করে পুরুষবেশ্যা অথচ ন্যায্য দাম চোকায় না আদর্শ জিনিসটা যদিও দুঃসাহস দাবি করে আর তার প্রয়োগ হওয়া উচিত সৎ উপায়ে কিন্তু তা বুদ্ধির গোঁজামিলের খেলায় নিজের নিয়মপ্রণালী দিয়ে বেকুব বেনে যায় তার কারণ ভাবনার তীক্ষ্ণ দূরদৃষ্টির বদলে মগজের জটিল ছুঁচোবাজিতে আত্মহারা হয়ে যায় এটা মানুষকে আকৃষ্ট করে বটে অথচ সেই প্রক্রিয়ায় তাকে অংশ নিতে দেয় না আদর্শ হলো পরম দুর্ভাগ্য দানবিক পরগাছা স্হায়ী বিপদকাল যা সমস্ত ছোটোখাটো আনন্দকে সমূলে বিনাশ করে চুলেলছোকরা বজায় রাখে নিজের কাহিল-বকবক শুনতে শুনতে সোনালিচুল ডবকাছুকরি আর দশ-বিশ চাঙ্গাউরুৎ ছুকরি বিরক্ত হয়ে উঠে পড়ল আর ফিট্টমফিট পাহারাদারদের একজনকে বলল এই তোর লুঙ্গিটা ওকে পরিয়ে দে নয়তো রাত্তিরে মশামাছির সমাবেশ এসে ওর যন্তর খেয়ে ফেললে অনেক লোকসান হয়ে যাবে একজন ফিট্টমফিট পাহারাদার নিজের লুঙ্গি খুলে পরিয়ে দিলে চুলেলছোকরাকে সেই পক্ষ ওই পক্ষ দুদিকেই যারা ন্যানো পুং নিয়ে জন্মায় তাদের ফিট্টমফিট পাহারাদারের কাজে লাগানো হয় ন্যানো পুং মানে যাদের গিল্লি দাঁড়ালে আধইঞ্চি বা বড়োজোর পৌনে-একইঞ্চি চুলেলছোকরাকে চামড়ার লুঙ্গি পরিয়ে দেবার পর সবাই বিদেয় হলেও চুলেলছোকরার মগজের মেশিন চলতেই থাকল বকবকিয়ে যেমন যেমন মানুষের বয়স বাড়ে সে তার আদর্শকে এমনভাবে অতিক্রম করে যে তা ধুলোয় মিশে চুরোচুরো হয়ে যায় আর যদি তার অন্য জীবন না থাকে তাহলে তাকে ওই ধুলোবালি থেকেই আবার নতুন করে গড়ে তুলতে হবে সেই ফাঁকে তার মনের মধ্যে অন্যকিছুর খোঁজ চলতে থাকবে সে বোকার মতন তার ভেঙে-পড়া স্বপ্নের ধুলোবালি ঘাঁটাঘাঁটি করবে এই ভেবে যে তা টুকরো-টাকরা আগুনের স্তুপ যেন সেখানে একটা অন্তত স্ফূলিঙ্গ পাওয়া যাবে তা সে কণামাত্র হোক না কেন চেষ্টা করবে আরেকবার দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠুক যাতে তার ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া রক্ত গরম হয়ে ওঠে আর তার আদর্শকে জাগিয়ে তোলে যে আদর্শকে সে কচি বয়স থেকে ভালোবেসেছিল যা তাকে ছুঁয়ে যেতো যা তার শিরায় শিরায় রক্তের সঙ্গে বইতো আর যা শেষ পর্যন্ত তার সঙ্গে প্রতারণা করেছে চুলেলছোকরাকে তালগাছে বাঁধা দেখে ওর সামনে গোল করে সার দিয়ে মশা আর মাছিরা বসেছিল কিন্তু চুলেলছোকরার বকবকানির ফলে টের পাচ্ছিল যে মরা মানুষ নয় কিন্তু এর আগে এভাবে তালগাছে বাঁধা মানুষ অনেক সময়ে মরে গিয়ে মড়ার গন্ধ ছেড়েছে বলে অ্যানোফিলিস কিউলেক্স ইডিস বোরাচিণ্ডা লুটজিয়া ম্যানসোনিয়া হেমাগগাস সোরোফোরা ফিকালবিয়া মশারা আর নীলমাছি গুয়েমাছি কানামাছি ভনভনেমাছি কুকুরমাছি ইঁদুরমাছি পেঁকোমাছি অপেক্ষা করছিল যে কখন চুলেলছোকরার বক্তৃতা শেষ হবে আর মরে গিয়ে মাথা ঝুলিয়ে চুপ মেরে যাবে কোমর থেকে খসে যাবে চামড়ার লুঙ্গি আর ওরা ছিঁড়ে-ছিঁড়ে চুষে-চুষে লবলবালব খেতে পারবে কিন্তু চুলেলছোকরার মুখ বন্ধ হবার কোনো লক্ষণ নেই সে বলতেই থাকলো পৌরাণিকাধুনিক যুগের গাঁড়হাভাতে মানুষদের কী এমন ছিল যা আমরা হারিয়ে ফেলেছি হ্যাঁ আমরা হারিয়ে ফেলেছি আত্মবিশ্বাস আদর্শ উত্তাপ স্বাতন্ত্র্যবোধ তুমি তোমার আদর্শকে কখনও প্রত্যাশায় পালটে ফেলো না যতো আদর্শবাদী ছিল সবাই নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছে বা প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি হয়ে গেছে তার কারণ তারা মানুষের গাদাগাদি ঠেলাঠেলি সামলাতে পারেনি তারা নিজেদের আদর্শবাদী ঠাওরালেও তাদের পোঁদে লড়বার দম ছিল না তাই লড়াইটাকেই ভেবে বসেছে মামুলি ইতর সাধারণ প্রচলিত অমার্জিত অসূক্ষ্ম  তারা সবাই ছিল চপল আর দাম্ভিক আদর্শ ছেড়ে পালিয়ে যাবার পরমুহূর্তে মানুষ খিটখিটে হয়ে যায় ফোঁপরা হয়ে যায় লোভী হয়ে যায় সে নিজে তা বুঝুক বা না বুঝুক যেমন আমার সঙ্গে কিছুক্ষণ আগে মহিলারা যা করে গেলেন আমার আদর্শকে চুষে বের করে নিয়ে গেছেন আমার সেই মহিলাদের কাজ ভালো লেগে গেছে আমি আর আদর্শবাদী থাকতে পারবো না একদল চিরকাল মনে করে অন্য দলটা খারাপ একের আদর্শ অন্যের আদর্শের চেয়ে উন্নত আদর্শবাদ তো স্রেফ একটা ভাঁওতা যে ধারণার বনেদ হল কোনো এক অভিপ্রায় আর সেই অভিপ্রায়টি যে ঠিক কী তা কেউই জানতে পারে না শুধু এটুকু জানে যে তা অবাস্তব কল্পনা থেকে পয়দা হয়েছে পৃথিবীকে নিখুঁত করে তোলার স্বপ্ন থেকে জন্মেছে আসলে আদর্শবাদী মানুষ তার ধারণার সীমা ঠাহর করতে না পেরে যাদের তার সঙ্গে মতের মিল নেই তাদের কচুকাটা করতে থাকে এক জায়গা থেকে তুলে আরেক জায়গায় চালান করে দ্যায় ভাবে যে বাস্তব জগতটাকে তার ঘোলাটে কল্পনার দেশে নিয়ে গিয়ে পুঁতে দেবে আদর্শবাদীদের ছেলেপুলেরা শেষ পর্যন্ত অবহেলিত পাগল হয় আদর্শবাদীরা নিজেরা হয়ে যায় জল্লাদ যতো গোঁড়া আদর্শ ততো পচনের অবিশুদ্ধতার কলুষের দূষণের বিকৃতির ঘুষের রমরমা আদর্শ হল দখলপ্রক্রিয়া অন্যের মগজ দখল অন্যের জীবন দখল অন্যের স্বাধীনতা দখল অন্যের অস্তিত্ব দখল অন্যের বৈভব দখল চুলেলছোকরার গালে একটা হাড়গিলে হাতের জবর চড় পড়তে মুখ বন্ধ করে কাউকে দেখতে পেলো না শুধু একটা বিশাল হাত লতিয়ে এসেছে বাঁশবনের দিক থেকে চড় মারা হাতটার মালিককে দেখতে পাচ্ছিল না চুলেলছোকরা কিন্তু তার গমগমে কন্ঠস্বর শুনতে পেলো শালা কুত্তির বাচ্চা তখন থেকে বকবক করে যাচ্ছিস একটু শান্তিতে থাকতে দিবি তা নয় আমরা মরে গেছি বলে ক্রুশবাঁশে বাঁধা আছি বলে আমাদের কি জীবন নেই আমাদের কি ঠায় বাঁধা অবস্হায় গা ব্যথা করে না ভাবছিস কবে শুকোবো কবে হাড় বেরিয়ে পড়বে কবে করোটি ঘাসের ওপর দড়াম করে পড়ে আমাদের মুক্তি দেবে তা কি আদর্শের ব্যাপার নয় সেই থেকে তোর ভ্যাজর ভ্যাজর শুনছি আমরা চুলেলছোকরা একফালি চাঁদের আলোয় তাকিয়ে দেখলো বিশাল একটা হাত এগিয়ে এসেছে বাঁশবনের ক্যাম্পাস থেকে আর তার সামনে তর্জনী নেড়ে-নেড়ে বকুনি দিচ্ছে দেখতে পেলো আরও গোটা দশেক হাড়গিলে হাড়ে মাংস লাগা হাত তার দিকে এগিয়ে এলো আর যে তালগাছে সে বাঁধা ছিল হাতগুলো সেই তালগাছকে উপড়ে তাকে বাঁশবনের ক্যাম্পাসে নিয়ে গিয়ে শেকড়সুদ্দু পুঁতে দিল চুলেলছোকরা দেখতে পেলো তার চারিধারে কাঁচা পাকা শুকনো ক্রুশবাঁশের টঙে গজাল দিয়ে ঠোকা পচা আধপচা কঙ্কাল মানুষ কারোর করোটি নেই কারোর কোমর থেকে হাড়ের ঠ্যাং খসে পড়েছে অথচ আকাশ থেকে নক্ষত্রগুলো ঝরে ঝরে তাদের শরীরে আটকে এমন করে তুলেছে যে বাঁশবনের অন্ধকারেও তাদের ঝিলমিলে আদল দেখা যাচ্ছে একটা কঙ্কালের হাত এগিয়ে এসে তার অন্য গালে কষে চড় মেরে বলল এতোক্ষণ যেমন আদর্শ নিয়ে কপচাচ্ছিলিস এবার মৃত্যু নিয়ে কপচা দিকিনি আমরা ঠিক বুঝতে পারছি না আমরা মরে গেছি না বাঁচা-মরার মাঝে লটকে আছি চুলেলছোকরা মনে মনে ভাবল এই সেরেছে দলবাজির ট্রেনিঙের সময়ে আমাকে তো নিজেরা মরে যাবার ব্যাপার নিয়ে কিছুই বলা হয়নি তবে জানি যে তোলা আদায় করতে গিয়ে অনেকসময়ে ত্যাঁদোড় লোকেদের পিটিয়ে মেরে ফেলতে হয়েছে যারা আমাদের কথা মেনে নেয়নি তাদের সাবড়ে দেয়া হয়েছে তাদের খেতের ধান পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে গ্রাম থেকে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে ওয়ানশটার দিয়ে উড়িয়ে দেয়া হয়েছে এই মড়াকান্তি পচার দল কি সেসব আদৌ বুঝবে যাকগে দলবাজি করে অন্তত কপচানি রপ্ত করে ফেলেছি কপচাই না হয় মৃত্যু নিয়ে চুলেলছোকরা বলতেই যাচ্ছিল হঠাৎ গম্ভীর স্বরে ক্রুশবাঁশে লটকানো একজন জাঁদরেল আধপচা পুরুষ বলে উঠল আমার গিল্লির ভেতরে যে ছয় ইঞ্চির কোলাপসিবল হাড় ছিল সেটা কোথায় গেল তার কথা শুনে অন্য মড়াপুরুষরাও একই প্রশ্ন তুলল হ্যাঁ হ্যাঁ আমরা যখন বেঁচে ছিলুম তখন উত্তেজিত হলে আমাদের গিল্লির ভেতরে পাঁচ-ছয়-সাত ইঞ্চির হাড় ফনফনিয়ে উঠতো সেটা কোথায় গেল আমাদের কারোর দেহেই তা দেখা যাচ্ছে না দিনের বেলা ঘাসের দিকে তাকিয়ে দিনের পর দিন খুঁজেও তেমন কোনো হাড় যে খসে পড়েছে তাও তো দেখতে পাইনি তাদের কথার সঙ্গে তাল দিয়ে ঝক্কিমন্ত মহিলা কন্ঠস্বরের মড়ানিরা জিগ্যেস করল ঠিকই তো তোমরা যখন বেঁচে ছিলে আর আমাদের ইল্লিকে আনন্দে আত্মহারা করতে তখন তো তোমাদের গিল্লির ভেতরে হাড় গজিয়ে উঠতো এখন তো দেখছি সেই জায়গাটা তোমাদের আর আমাদের প্রায় একই হায় রে হায় এ কি অলুক্ষুণে ব্যাপার মরে যাবার পর নারী-পুরুষের সাম্য দেখতে হচ্ছে গো এই ছোঁড়া তুই তো বেশ জ্ঞানী বলে মনে হচ্ছে বল দিকিনি মরার সঙ্গে সঙ্গে সেই হাড়টা কোথায় লোপাট হয়ে গেছে চুলেলছোকরা বলা আরম্ভ করল স্যার ওটা তো হাড় ছিল না ওটাকে পৌরাণিকাধুনিক যুগে বলা হতো প্রেমের বাঁশি সেই বাঁশিও মরে যায় যখন প্রেম মরে যায় মানুষ বুঝতে পারে না যে তার প্রেম মরে গেলে সে কেমন করে প্রেমের বাঁশির হাড় ফেরত পাবে ভুলবোঝাবুঝি বিশ্বাসঘাতকতা ক্লান্তি উদাসীনতা আর অন্ধপ্রেমের কারণেও ওটা অদৃশ্য হয়ে যায় ওটা হলো কঠিন জিনিস দিয়ে তৈরি এক ধরণের আলো সেই আলো যতো দিন জ্বালিয়ে রাখতে পারবেন ততোদিন হাড়টা যখন ইচ্ছে গড়ে নিতে পারবেন গুটিয়ে নিতে পারবেন ওই হাড় হলো ভালোবাসার আলো আপনারা যাকে বা যাদের ভালোবেসেছেন তাকে বা তাদের ওই আলো একটু একটু করে দিয়ে হাড়টা ক্ষইয়ে ফেলেছেন ওই হাড়ের ভেতরে আপনাদের হৃদয়ের ঢিপঢিপাঢিপ ঢিপঢিপাঢিপ ধুকপুকুনি ছিল আর সেই ধুকপুকুনির সঙ্গে আপনার প্রেমিকার টুনটুনুনি ঝিংকিচিকিং ঝিংকিচিকিং ঝিংকিচিকিং মিশিয়ে আপনারা হাড়টাকে আবার হৃদয়ের খোপে পুরে নিতেন এই যে খোপে পুরে নেয়া আর বের করা এই প্রক্রিয়ায় হাড়েরও বয়স হয় হাড়ও ক্রমশ খোপ থেকে আর বেরোতে চায় না আপনাদের হাড় ঠিকই বজায় আছে আপনাদের হৃদয়ের খোপে শুনতে শুনতে ক্রুশবাঁশে লটকানো এক গাঁড়হাভাতে মড়াকঙ্কাল কাঁদতে আরম্ভ করল বলতে লাগল আমি ওই পক্ষের কারুর সঙ্গে প্রেম করতে পারিনি আমাদের সময়ের সাড়ে পাঁচফিটের একনায়ক মোড়লচিফ সব সময় নিজের বেজন্মা ছেলেদের ওয়েটিং লিস্টে ওপরের দিকে রাখতো কেননা রাতের বেলায় ছেলেদের বদলে সে নিজেই চার হাতপা বাঁধা ওই পক্ষের মেয়েদের সঙ্গে ইল্লিতে গিল্লি করতো ওই তো ওই ব্যাটা যার করোটি খসে পড়ে গেছে কয়েক বছরের আগের ঝড়ে অথচ ওর গিল্লির হাড় তিন ইঞ্চিরও কম ছিল বেঁচে গেছে ব্যাটা ছেলেদের দৌলতে ছেলেগুলোর ছয় ইঞ্চি সাত ইঞ্চির হাড় ছিল ক্রুশবাঁশে লটকানো দুজন আধপচা মড়া একই সঙ্গে বলে উঠল হ্যাঁহ্যাঁ ঠিকই বলেছ আংকেল বাবার ন্যানোনুনু ছিল তাই আমরা সুযোগ পেতুম বাবা তো বুঝতেই পরতো না কোথায় গেল বা গেল কিনা আমরাই আবার নিজেদের কাছে এনে বাকি কাজটা পুরো করতুম তবে বাবা তাদের চামড়া ছাড়াতে ওস্তাদ ছিল যে-রাতে শুলো তার পরের সকালেই চামড়ার গামলায় দাঁড় করিয়ে লেগে যেত চামড়া ছাড়ানোর কাজে আর আমরা অপেক্ষায় থাকতুম কখন অলিভতেলে লাবিয়াফ্রাই খাবো সে খাওয়া প্রেম করার চেয়েও মন বেশি করে ভরিয়ে দিতো আহা বেঁচে থাকার সেই দিনগুলো মনে পড়লে বড়োই কষ্ট হয় চুলেলছোকরা বলল আপনারা ওখান থেকে আমায় উপড়ে নিয়ে এলেন মৃত্যু সম্পর্কে জানার জন্য আর এখন আলাদা প্রসঙ্গে চলে যাচ্ছেন ফলে মনে যা আসছে তা আবার প্রেমের হাড়ের মতন গুটিয়ে যাচ্ছে ক্রুশবাঁশে লটকানো মড়ারা আর মড়ানিরা একযোগে বলে উঠল আচ্ছা বলবল বল বল আর বাধা দেবো না চুলেলছোকরা আরম্ভ করতেই যাচ্ছিল একজন গাঁড়হাভাতে কঙ্কালমড়া যার করোটি ঝুলে পড়েছে কয়েকদিনেই ঝরে পড়বে ঘাসে সে বলে উঠল আমি মরে গেছি কিন্তু আমার মনে হয় আমার ইল্লিতে গিল্লির কোটা বেঁচে থাকার সময়ে পুরো হয়নি মৃত্যু আমার সঙ্গে জোচ্চুরি করেছে চুলেলছোকরা বলল কী আর করবেন বলুন আপনারা তো আপনাদের সংস্কৃতিতে আবার জন্মাবার প্রথা রাখেননি কিংবা আত্মঘাতী হয়ে স্বর্গে গিয়ে বাহাত্তরজন কুমারীর সঙ্গে ইল্লিতে গিল্লির নিয়ম তৈরি করেননি ক্রুশবাঁশে ঝোলাই ভবিতব্য জীবনে যা পেয়েছেন তাতেই সন্তুষ্ট থাকুন আমাকেই দেখুন না এখানে এসেছিলুম দলবাজির উদ্দেশে মানুষের ভালো করার কাজে কিন্তু আমার শরীরের সঙ্গে এমন ব্যবহার করা হলো যে এখন মনে হচ্ছে বেঁচে থাকার সেটাই একমাত্র আদর্শ নয়তো মরে গিয়ে আমাকেও আপনার মতন আপশোষ করতে হতো কে জানে কালকেই হয়তো আমার চামড়া ছাড়িয়ে তারাই খাবে যারা আমার সঙ্গে ইল্লিগিল্লি করল আমার গিল্লির কাঠিকাবাব খাবে বলে তারা লালায়িত ক্রুশবাঁশে লটকানো সদ্যমরা ঝক্কিমন্ত এক মহিলা বলল তাই বলে মরার জন্য এপিটাফ লিখোনা যেনো কেননা ভাষা নিজেই মরে যায় আর তুমি ভাষার তলায় চাপা পড়ে যাবে তার চেয়ে তোমার মাংস খেয়ে অনেকে তোমাকে বাঁচিয়ে রাখবে সেটাই ভালো তাদের ভাষা বংশ পরম্পরায় নতুন হতে থাকবে আর তুমিও তাদের বেজন্মা ছেলেপুলে নাতিনাতনির ভাষার ভেতর দিয়ে অনন্তকাল বেঁচে থাকবে আরেকজন কঙ্কালমড়া যার হাড়ের বেশিরভাগই পড়ে গেছে শুধু করোটি ঝুলে আছে সে কেঁদেকেঁদে বলল আমার তো ন্যানোনুনু ছিল বলে সারাজীবন ফিট্টমফিট পাহারাদার করে রাখলে চার হাতপা বাঁধা ওই পক্ষের একজনের সঙ্গে লুকিয়ে এক ফাঁকে সম্পর্ক গড়তে গিয়েছিলুম তা সে বলেছিল কি জিনিস নিয়ে জন্মেছো বাপু ঘুম ভাঙিয়ে যদি ইল্লিতে গিল্লি করতেই এলে তাহলে বরং আমার বাঁধন খুলে দাও পালাবার আগে তোমাকে দেখিয়ে যাই কি করে কি করতে হয় যেই তার বাঁধন খুলেছি সে এই বাঁশবনের ক্যাম্পাসের ভেতর দিয়ে নিজেদের এলাকায় দেদ্দৌড় এতোদিন কাউকে বলিনি মনের দুঃখে তোমাকেই বললুম ভার লাঘব হলো এতোদিন ধরে ভাবছিলুম কাকে বলি তা তুমি তো শুনছি ওই পক্ষের নও তাই তোমাকেই বললুম কী দুঃখের জীবন ছিল বলো সারাজীবনে একবারও সঙ্গম করার সুযোগ পেলুম না আর ওই ব্যাটা যেটার ক্রুশবাঁশও পচতে চলেছে কঙ্কালসুদ্দু আছড়ে পড়বে আগামী ঝড়ে ওই ব্যাটা মোড়লচিফ হয়ে কুড়ি হাজার বারের চেয়েও বেশি মেয়েদের সামনে থেকে আর আড়াই হাজারবার ছেলেদের পেছন থেকে করেছে ছি ছি ছি ছি  চুলেলছোকরা বলল আপনি আত্মহত্যা করলেই পারতেন ফিট্টমফিট পাহারাদারের করোটি বলল তা করলে তো আমায় ক্রুশবাঁশে ঝোলানো থেকে বঞ্চিত করে মশা-মাছিদের খেতে দিয়ে দিতো চুলেলছোকরা বলল মৃত্যু হল শিল্প তাই শিল্পের মৃত্যুর মাধ্যমে আপনি মৃত্যুর উৎসবে নাচন-কোদন করে মৃত্যুকে তার পাওনা মিটিয়ে দিতে বাধ্য হন সকলেই স্মৃতি হবার আশায় মরে যেতে চায় তবে মনে রাখবেন অন্যের আদর্শের জন্যে মরাকে মৃত্যু বলা হয় না তেমনই এক সঙ্গে দলবেঁধে মরাকেও মৃত্যু বলা যায় না তা হল আদর্শতাড়িত সমবেত পক্ষাঘাত মৃত্যুবোধ মানুষকে স্বার্থপর করে তোলে কেননা প্রতিটি জীবন্ত মাংস একদিন না একদিন মরবেই আপনি যদি ভাবেন যে অন্যের জন্যে প্রাণ দিচ্ছেন তাহলে আপনার মতন মূর্খ আর দ্বিতীয়টি নেই একজন মানুষের মরাটা ট্র্যাজেডি কিন্তু হাজার হাজার মানুষের একসঙ্গে মরার ব্যাপারটা নিছকই একটা সংখ্যা আপনি আপনাদের দেহের সঙ্গে যে সমস্ত গল্প বেঁচে থাকার সময়ে বয়ে বেড়ান তার মৃত্যু অবধারিত বেঁচে থাকার সময়ে আমরা কেউই গুনি না যে কতোবার কতোজনের সঙ্গে সঙ্গম করেছি আপনি আপনার সেই দেহের জন্যেই মারা যান কোনো উদ্দেশ্য আদর্শ দুঃখ ব্যর্থপ্রেম বা ঋণখেলাপির জন্য নয় যারা নরক আর স্বর্গে বিশ্বাস করে তারা মরে যাবার পর টের পায় তেমন কোনো এলাকা আদপে নেই মরে যাবার পর যদি মানুষটা জানতেই না পারলো যে তার শবের পেছন পেছন হাজার হাজার মানুষ কাঁদতে-কাঁদতে গাইতে-গাইতে গিয়েছিল তাহলে তার মরার সঙ্গে বাঁশবনের ক্যাম্পাসে ক্রুশবাঁশে লটকে থাকার কোনো পার্থক্য নেই ঘাসের ওপরে পড়ে থাকা কয়েকটা করোটি লাফিয়ে লাফিয়ে একে আরেকের সঙ্গে করোটি ঠুকে ঠকাং ঠকাং হেসে হেসে বলল ঠিকই বলেছো হে ছোকরা আমরা ক্রুশবাঁশ থেকে ঝরে ঝরে পড়ার পরও কেউ ভুত প্রেত শাঁকচুন্নি পেতনি হইনা মাটিতে পড়ার আগে মাছি আর মশার পেটে যাই আর পড়ার পর মাটির সঙ্গে মিশে ঘাস হই এমনকি পৌরাণিকাধুনিক যুগে হাতি শিম্পাঞ্জি বাদুড় টিয়াপাখি বেবুন জংলি-শুয়োর সেই মাটি খেয়ে নিজেদের শরীর থেকে অধিবিষ বের করতো এই দ্যাখো চারিদিকে তারা কতো রকমের রঙে হেগে গিয়েছিল সব আজ ফসিল বছর কয়েকের মধ্যেই প্রত্নত্ত্ববিদরা এসে ফসিলগু দেখে জানাবেন যে তা কোন ডায়নোসরের ডিম ছিল এখন পাথর হয়ে গেছে চুলেলছোকরা প্রত্যুত্তরে বলল আজ্ঞে হ্যাঁ মানুষও এতো রকমের রঙে হাগতে পারে না তা সে মানুষ মহাপুরুষ হোক আদিপুরুষ হোক গদিপুরুষ হোক পেঁকোপুরুষ হোক চোরপুরুষ হোক নেতাপুরুষ হোক গুণ্ডাপুরুষ হোক প্রেমিকপুরুষ হোক হঠাৎ একজন নাকচ্যাপ্টা হলদেটে মড়াকান্তি মানুষ চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলতে লাগল আমিই সবচে মহান মোড়লচিফ আমি সাড়ে ছয় কোটি মানুষকে সাফাচট করেছিলুম বিপ্লব কোনো রাত্রিভোজ নয় বিপ্লব হলো দ্রোহের জাগরণ বিপ্লব কোনো রাত্রিভোজ নয় বিপ্লব হল দ্রোহের জাগরণ বিপ্লব কোনো রাত্রিভোজ নয় বিপ্লব হলো দ্রোহের জাগরণ জোরে জোরে চেঁচাবার ফলে তার হলদেটে নাক খসে পড়ে গেল আর নাকি সুরে একই কথা বলতে লাগল রাত্রিভোজ শোনাচ্ছিল রাঁড়ের ভোজ আরেকজন কোতলকান্ত টাকমাথা চুটকিদাড়ি চেঁচিয়ে বলতে লাগল কোন শালা আমার চেয়ে বড়ো মোড়লচিফ হয়েছে আমি চমকচাঁদু রাজারাজড়া বাবাপুরুত আর গিল্লিটেঁটিয়াদের লাথিয়ে হাপিশ করেছিলুম বলেছিলুম আমায় একটা যুবক প্রজন্ম দাও আমি সারা পৃথিবী পালটে দেবো আমাকে একটা যুবক প্রজন্ম দাও আমি সারা পৃথিবী পালটে দেবো ইতিহাসের পোঁদে লাথি না মারলে এগোয় না ইতিহাসের পোঁদে লাথি না মারলে এগোয় না এতো জোরে চেঁচাচ্ছিল যে কেউই শুনতে পাচ্ছিল না তবু একজন টিঙটিঙে পচনবান্ধব মড়াকান্তি বলে উঠল তা পৃথিবীটা বদলে হলটাই বা কি সে তো পৌরাণিকাধুনিক যুগের কুকুরের ল্যাজ আবার যে কে সেই পাকিয়ে পাইকপাড়া মাঝখান থেকে মড়ার পর মড়া মড়ার পর মড়ার নথির লটবহর আরেকজন যার গা থেকে চামড়ার পোশাক খোলা হয়নি চেঁচাতে লাগল কৃতজ্ঞতা হলো এমন অসুখ যে রোগে কুকুরেরা ভোগে চেঁচাতে চেঁচাতে তার গোঁফ খসে পড়ে গেল বেঁটেখাটো হলদেটে আধবোজা-চোখ একজন ঘ্যানঘ্যানানির মতন করে বলতে লাগল দারিদ্র্যকে সমাজবাদ বলে না বড়োলোক হওয়াটা যশোদায়ক দারিদ্র্যকে সমাজবাদ বলে না বড়োলোক হওয়াটা যশোদায়ক বাঁশবনের ক্যাম্পাসে ঘাসে পড়ে থাকা করোটিগুলো চুলেলছোকরার পায়ের কাছে এসে ফিসফিসিয়ে বলল তোমার জ্ঞান তো দেখছি অঢেল এবার একটু ইল্লিতে গিল্লি নিয়ে বলো দিকিন মানে ওই আরকি দুজনে চাদরের তলায় ঘাসে তালপাতার চাটাইয়ে শুয়ে যা করে কিংবা তালগাছের গুঁড়িতে বেঁধে যা করে কিংবা চার হাতপা বেঁধে যা করে সামনে দিক থেকে পেছন দিক থেকে যা করে একটা করোটি বলল আমার এককালে ঢলঢলে বুদ্ধিদীপ্ত বুক ছিল চুলের রঙ আগুনের রঙে রাঙিয়ে রাখতুম কতো ছোকরা যুবক মদ্দামরদ আদ্দামড়ামরদ পাকতাড়ুয়ামরদ আমার সঙ্গে শুয়ে পুড়ে মরেছে কিন্তু তেমন রহস্য তৈরি করতে পারেনি তুমি একটু উপদেশ দাও তো তাহলে যারা বাঁশবনের মিউজিয়ামে আসে তাদের জ্ঞান দিতে পারবো চুলেলছোকরা বলল কাম-বাসনা-লালসাকে আবেগের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলবেন না রতিকর্মকে আকাঙ্খার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলবেন না যৌনতাকে খামখেয়াল ব্যক্তিগত-বাঁধন গভীর সম্পর্কের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলবেন না যৌনতায় থাকা দরকার বিস্ময়ের বুনন ক্ষণে-ক্ষণে তনুকৃত আঙ্গিকের রূপান্তর যা কামোদ্দীপনার উপাদান যৌনক্ষমতার উৎস হল কৌতূহল একঘেয়েমি যৌনতাকে শেষ করে ফ্যালে তাই প্রেমিক-প্রেমিকাকে খুঁজে নিতে হবে আবিষ্কার করতে হবে মেজাজ যৌনতার সঙ্গে মেশাতে হবে অশ্রু খিলখিলে হাসি কাতুকুতুর দেদোল মানেহীন কথা ঈর্ষা ভয় গালগল্প কল্পনার উড়াল প্রতিশ্রুতি মাদক সঙ্গীত নাচ মদ ঘাম গন্ধ মন ভরে গেলে এঁটুলির মতন আঁকড়ে থাকার দরকার নেই হারেম পালটে ফেলতে হবে বিশেষ করে মেয়েরা যতো তাড়াতাড়ি পারবেন সাধুপুরুষ পালটে ফেলবেন লুচ্চাপুরুষ খুঁজবেন যাতে অবিরাম গন্ধের চুলের ত্বকের ঘামের পেশিশক্তির আলিঙ্গন-ক্ষমতার ঠোঁটের লালার দেহতাপের রদবদল হতে থাকে নয়তো নির্ণয় নিতে গিয়ে যৌবন ফুরিয়ে যেতে পারে মনে রাখতে হবে ইল্লিগিল্লি হলো স্বেচ্ছাচারিতার শিল্প প্রত্যেক প্রেমিক বা প্রেমিকা তার নিজস্ব যৌনমগজের প্রতিনিধি জীবন গুটিয়ে যায় আবার ফেঁপে ফুলে ওঠে উদ্বেগ উৎকন্ঠায় ইল্লিগিল্লি মরে যায় যৌনতা হবে উদ্বেগ আর উৎকন্ঠাহীন আপনার শরীর নিয়ে নিরীক্ষা করার অধিকার আপনার আছে মনে রাখবেন যৌনকর্মীরা চিরকাল ভার্জিন হয় তাই আপনি বারবার বিস্ময়কে খুঁজতে যান আর বিস্ময় আপনার হাতছাড়া হয়ে যায় যৌনতায় রয়েছে অনন্ত পরিসর অনন্ত মর্