নেক্রোপুরুষ : মলয় রায়চৌধুরী

        আমি এতোকাল যা করেছি, তা আমার নিজস্ব আর্ট ফর্ম, আমার সৃষ্টিচেতনার বহিঃপ্রকাশ ।

আমি মেয়েদের শবের সঙ্গে শুতে ভালোবাসি ; এটাই আমার জীবনের উদ্দেশ্য । [১]

         তলপেটে বারবার ছোরা ঢুকিয়ে আপনি আমার গু-মুতকে রক্তের সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছেন, উচিত কাজই করেছেন, জানি ডাক্তাররা আমাকে বাঁচাতে পারবে না, তারা চেষ্টা চালালেও, পুলিশ চাইবে না যে আমি বেঁচে থাকি, আপনি এখন রেকর্ড করতে চাইছেন আমার জীবনের ঘটনাগুলো, কেমন করে আমি এই শিল্পবোধে আক্রান্ত হলুম  । করুন, করুন । তবে আপনি যদি আমার কথাগুলো ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করে পড়েন, তাহলে ভালো হয় ।

আমার ইংরেজি, শুনে টের পাচ্ছেন নিশ্চয়ই, ইনডিয়ান ইংলিশ নয়, ইস্ট আফ্রিকান ইংলিশ । মাঝে-মাঝে আমি শ্বাস নেবার জন্য জিরিয়ে নেবো ; আপনি ট্র্যান্সক্রিপ্ট নেবার সময়ে ঘটনাগুলোর ঠিকমতন সংযোগ তৈরি করে নেবেন ।

আপনি জানতে চেয়েছিলেন আমি কোথাকার লোক । বলেছিলুম, অখণ্ড বাংলার । তবু আপনি জোর দিয়ে জানতে চেয়েছিলেন আমি ‘অ্যাকচুয়ালি’ কোথাকার । কেউ কি বলতে পারে সে ‘অ্যাকচুয়ালি’ কোথাকার? বাবার কাছে শুনেছিলুম, আমাদের আদি বাড়ি ছিল চিটাগঙে । ইনডিয়ার পার্টিশানের পর কেউ কি চতুর্থ প্রজন্মে পৌঁছে বলতে পারেন যে তিনি ‘অ্যাকচুয়ালি’ চিটাগঙের বা বরিশালের বা ঢাকার বা কলকাতার বা দিল্লির ?

         হ্যাঁ, আমি মেয়েদের শবের সঙ্গে প্রেম করে পরমসন্তোষ পাই, নাঃ, পেতুম বলা ভালো । মেয়েদের শব মাত্রেই, হোয়াট ইউ কল, সচ্চিদানন্দময়ী, মানে যাদের বুকের বাইরে আর ভেতরে লেজার আলো কিং কোবরার মতন কুণ্ডলি পাকিয়ে ওৎ পেতে থাকে, আচমকা বেরিয়ে জাপটে ধরে, আলোয় আলো করে দ্যায় অস্তিত্বকে ।

এই প্রেমকে  বেআইনি ঘোষণা করার মানে হয় না ; যে মারা গেছে তার নির্বাক অনুমতি নিয়েই তো তার সঙ্গে প্রেম করি, করেছি, কেননা মৃত্যু মানেই তো কাম, প্রতিটি নারীর শবই চিরঘুমন্ত সুন্দরী, স্বপ্নের মৌতাতে ভেসে আসে, ডানা মেলে, তাকে দেখতে সাধারণের চোখে ভালো হোক বা না হোক, ওনারা তো নিজের উইলে লিখে যান না যে মৃত্যুর পর কারোর সঙ্গে প্রেম করবেন না । আর নেহাৎই যদি কারোর মনে হয়, যার সঙ্গে প্রেম করতে চলেছেন তার মুখ কুৎসিত, তাহলে তাকে সুন্দরীর স্বপ্ন পরিয়ে দিতে পারেন, বহু সুন্দরীর মুখ আপনারা পেয়ে যাবেন পোস্টারে, বিজ্ঞাপনে, চকচকে পত্রিকার পাতায়, চোখ বুজে ইচ্ছামতন তা থেকে নিজের কল্পনা বেছে নিতে পারেন ।

কুয়াশায় মোড়া সন্ধ্যা কি বেআইনি, ধানখেতের ওপর দিয়ে বেগে পেছু নেয়া  বৃষ্টি কি বেআইনি, শিমুলের কৌটো ফেটে উড়তে থাকা রোঁয়া কি বেআইনি, আঙুরঝুমকোয় লুকিয়ে থাকা মদ কি বেআইনি, সূর্যকে ঢেকে ফেলা গ্রহণের কালো কি বেআইনি, সমুদ্রের নীলে ধনুকের মতন তিমির নাচ কি বেআইনি, হরিণকে লক্ষ্য করে উড়ন্ত গতিতে ছুটতে থাকা চিতাবাঘ কি বেআইনি, মরুভূমিতে অতিদূরে ভেসে ওঠা মরিচিকার টলটলে জল আর খেজুরগাছের সবুজ সারি কি বেআইনি ! নয়তো ? তবে ? [২]

বুঝলেন তো ? আমি মৃত্যুর কালো নোংরা বোটকা বাসি মুখের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে চেঁচাই, মানে চেঁচাতুম, ‘ফেরত নিচ্ছি, ফেরত নিচ্ছি, ফেরত নিচ্ছি’; আমার চিৎকার শুনে মৃত্যু কালোকে ফর্সা করে তোলে, বোটকাকে সুগন্ধী করে তোলে, বাসিকে তরতাজা চনমনে করে তোলে । তার জন্য সাহস দরকার, ক্ষমতার সাহস, যে ক্ষমতা থাকে শরীরে, এই যে এইখানে, চেয়ে দেখুন, এইখানে ; কাপুরুষদের অমন সাহস থাকে না, কেননা তারা মতান্ধ, তারা নীতিবাদী, তারা আদর্শবাদী, তারা মৌলবাদী, তারা ফাঁকিবাজ, তারা কেবল অন্যের মগজে সুড়সুড়ি দেবার তালে থাকে । ক্ষমতা হল জ্ঞান, জৈব রসায়ন, ধৈর্য ধরে থাকতে হবে।

রাজনৈতিক দলরা দেশে দেশে ক্ষমতা চায় কেন ? ক্ষমতাকে সেই দলের কয়েকজন, বা কেবল একজন, কুক্ষিগত করতে চায় কেন ? অন্যের, মানে জনসাধারণের, ভালোর জন্য নিশ্চয়ই নয় । একবার কেউ ক্ষমতা দখল করলে জোঁকের মতন লেগে থাকে, রক্ত চুষে-চুষে খায় ; তারা ক্ষমতা প্রয়োগ করে কোথাও পৌঁছোতে চায় না, কেননা  ক্ষমতাই তাদের লক্ষ্য । বুঝলেন তো ? মৃত্যুর সঙ্গে যদি ক্ষমতাকে একাকার করে দেয়া যায়, তার চেয়ে কাম্য আর কিছু হতে পারে না । ইতিহাস ঘাঁটলেই টের পাবেন একনায়করা মৃত্যুকে কতো অনায়াসে ক্ষমতার সঙ্গে মিলিয়ে-মিশিয়ে শাসন করে গেছে বছরের পর বছর, আর জনসাধারণ তখন পিণ্ড পিণ্ড শব, অবাধে প্রতিরোধহীন প্রেম করে গেছে ক্ষমতাধরের সাথে, তার নামে স্লোগান দিয়েছে, পতাকা উড়িয়েছে । [৩]

হ্যাঁ, আমি মেয়েদের শবের সঙ্গে প্রেম করতে ভালোবাসি ; বারবার ভুল করে ফেলছি, মরে যাবো কিছু দিনের মধ্যেই জেনেও অভ্যাস ছাড়তে পারছি না । ভালোবাসতুম, ভালোবাসতুম । মেয়েমানুষের শব মাত্রেই মহানন্দময়ী, মানে রিডিমিং, অস্তিত্বের উত্তরণ ঘটায় ।

একনায়কদের দেখবেন, তারা নিজেদের ক্ষমতার প্রতি সৎ, জীবনকে সমুদ্রের মতন সাগরে সাগরে বয়ে যেতে দেয় । একনায়কের জন্য, দলের জন্য, সম্প্রদায়ের জন্য,  বিশেষ দর্শনের উদ্দেশে, যারা মরে যাবার জন্য সব সময় এক পা এগিয়ে, তারা ঘৃণ্য, তারাই ঘৃণ্য, ঘৃণ্য, ঘৃণ্য । দেখছেন তো সাদ্দাম হোসেনকে সরাবার পর সে দেশে কী ঘটছে, গাদ্দাফিকে সরাবার পর লিবিয়ায় কী ঘটছে, আফগানিস্তানে, সিরিয়ায় কী ঘটে চলেছে ! ভালোবাসা সে দেশগুলোয় বালির ঝড়ের সঙ্গে উড়ে চলে গেছে । এতো খুনোখুনি, যদি তারা নারীর শবকেও ভালোবাসা দিত, তাদের দেশে শান্তি নেমে আসতো । তারা তো নারীকে সম্ভ্রম জানাতেও কুন্ঠিত, আফগানিস্তানে ঢিল মেরে-মেরে যুবতীদের শাস্তি দেয়া হচ্ছে আজও, নারীর মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করা হচ্ছে । দেখে, আমার ইচ্ছে করেছে আমি ওই বোরখা-ঢাকা নারীদের শবদেহকে জড়িয়ে কাঁদি।

আমি কোনো তর্কেই ঘৃণার যোগ্য নই । আমি ভালোবাসাকে মাংসের গেঁতো নোংরামি থেকে শিল্পের পর্যায়ে উন্নীত করেছি ।

দেহের ক্ষমতা অবাধ, নিজেকে জানতে হলে সেই ক্ষমতার অপব্যবহার করতেই হবে, ক্ষমতা কেউ দেয় না, নিজের ভেতর ডুবে তুলে আনতে হয় । ক্ষমতা থাকলে ভয়ও ভয়কে ভয় পায় । কোনো একজন মহাত্মা  বলে গেছেন যে, যেদিন প্রেমের ক্ষমতা কাবু করতে পারবে ক্ষমতার প্রেমকে, সেদিন পৃথিবীতে নেমে আসবে শান্তি । আমি প্রেমের ক্ষমতা আর ক্ষমতার প্রেমকে মৃত্যুর বিন্দুতে মেলাতে পেরে শান্তির শীতল স্বর্গ গড়ে তুলতুম । প্রতিটি শবের সঙ্গে প্রেম করার সময় আমি নিজের কথা একেবারে ভুলে যেতুম, নির্বাকের সঙ্গে নির্বাক আলাপ দিয়ে শুরু করতুম, তার দুঃখযন্ত্রণায় তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতুম, প্রেম তো নির্বাক চিৎকার, যার সঙ্গে প্রেম করতুম, সে হাসিমুখে শুনে যেতো । সত্যকার ভালোবাসা কেবল মেয়েমানুষের শবের সঙ্গে সম্ভব । কোনো নারী যদি সত্যকার ভালোবাসা পেতে চায় তাহলে তাকেও পুরুষের শবের সঙ্গে প্রেম করতে হবে, অন্যথায় তাদের মাঝে যা ঘটবে তা ধর্ষণের নামান্তর ।

শবের দুঃখে আমি কষ্ট পাই, পেতুম , শবের যন্ত্রণায় আমি যন্ত্রণা ভোগ করি, করতুম ।

শরীর হলো সাম্রাজ্য , তার যাবতীয় গোপনতা অতিপবিত্র, সে চায় সত্যকে চূড়ান্তভাবে জয় করতে, শরীরের আনন্দ-আহ্লাদকে সিরিয়াসলি নিতে হবে, সিরিয়াসলি মানে জানেন তো, সে তো জানবেনই, আপনি ইংরেজি সাহিত্যে গ্র্যাজুয়েট, বলেছে পুলিশের অ্যাসিসট্যান্ট কমিশনার, যে আপনি বিদূষী, অনেক কিছুই জানবেন, তবে আপনি নাকি কোকেন জাতীয় রাসায়নিক মাদকও নেন, উত্তরাধুনিক জীবনযাপন করেন, আর সেই সূত্রেই এই ছেলেগুলোর সঙ্গে আপনার আলাপ ।

আমি ছোঁড়া চারটেকে বারবার বলেছি, বলতুম, নেশাটা একটু কম কর তোরা, নয়তো নিজেরাও ডুববি, আমাকেও ডোবাবি । শেষ পর্যন্ত তাই হল । ওদের কাছ থেকে আপনি আমার হদিশ পেলেন ।

আপনার দিদি আপনার মাদক নেবার অভ্যাস ছাড়াতে না পেরেই আত্মহত্যা করেছিলেন, তাও বলেছে পুলিশের ইনভেসটিগেটিং অফিসার । দিদিই আপনার অভিভাবক ছিলেন । আপনার উত্তরাধুনিক জীবনযাত্রা, রেভ পার্টিতে গিয়ে সারারাত ধুন্ধুমার নাচ, অচেনা-অজানাদের সঙ্গে ডিসকোয় মাতাল হওয়া, সপ্তাহান্তের উল্লাসে মাদকে আচ্ছন্ন হয়ে মাঝরাতে বাড়ি ফেরা, অনুমোদন করেননি আপনার দিদি । আপনি ওনার নিষেধ শোনা প্রয়োজন মনে করেননি, উঁচু পদের চাকরিতে প্রচুর রোজগার করেন আর ব্যয় করেন, শুনেছি আপনার গল্প।

জানি, ওদের, ছেলে চারটেকে,  আপনি নিজের সঙ্গে এনেছেন পুলিশকে অনুরোধ করে, আমার জীবনের ঘটনা যাতে ওরাও শোনে, ক্লাস টেন পর্যন্ত পড়ে ছেড়ে দিয়েছিল, আমার এই ইংরেজি আত্মজীবনী ওরাও বুঝতে পারছে নিশ্চয়ই । ওই তো মাথা নাড়ছে, বুঝতে পারছে দেখছি ।

আপনি অভিযোগ দায়ের করেছেন যে আমি নেকরোফাইল, ডাক্তাররাও বলেছে আমি নেকরোফিলিয়া রোগে ভুগি, পুলিশও দণ্ড সংহিতার সেই ধারায় আমাকে গ্রেপ্তার করে, হাসপাতালে চারজন সশস্ত্র পুলিশেকে এই ঘরে বসিয়েছে । কিন্তু বিস্বাস করুন, আমি নেকরোফাইল নই, নেকরোফিলিয়া নামে কোনো মানসিক রোগে ভুগি না, ইনসমনিয়া বা ডিমেনশিয়াতেও ভুগি না ।

আমি প্রেমের শিল্পবোধে ভুগি, নারীদেহের সঙ্গে প্রেমের শিল্পবোধে । প্রেম করা তো বেআইনি নয় । তাহলে কেন আপনি আমাকে ঘৃণার পাত্র বলে মনে করলেন ! ভুল, ভুল, ভুল, আপনাদের সবায়ের ভুল । যুদ্ধক্ষেত্রের মৃত্যু-মহামারীর মাঝে, গৃহযুদ্ধের খুনোখুনির মাঝেও, আমি খুঁজে পেয়েছি প্রেমের শান্তি, নারীদেহের শবকে জড়িয়ে, সারারাত জেগে থেকে । [৪]

মৃত্যু আমাকে ভালোবাসে, বলুন ঠিক কি না, নয়তো হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকব কেন ! আমি মৃত্যুকে ভালোবাসি, মৃতার শরীরকে ভালোবাসি, মৃত্যুর ঐন্দ্রজালিক গন্ধকে ভালোবাসি,আর তো কখনও ভালোবাসতে পারব না তাদের, তারাও, কৃষ্ণাঙ্গী শবদেহরাও, আমাকে ভালোবাসতো, তাই চোখ বন্ধ করে থাকতো, আমি চোখের পাতায় চুমু খেতুম, এই ভালোবাসা ছিল শর্তহীন, প্রেম করার সময়ে আমি সেই নারীদেহের বয়ফ্রেণ্ড, প্রেমিক, স্বামী, বন্ধু, অভিভাবক, তারা তা  জানে, আই মিন জানতো, জানতো কিনা বলুন, শবদেহ তো জানে যে ও মাত্র কয়েকদিনের অতিথি, দিনকতক পরেই কুৎসিত হয়ে যাবে, পচতে থাকবে, গায়ে পোকা ধরবে, হাড় চুণ হয়ে যাবে, বা ছাই হয়ে হাওয়ায় মিশে যাবে।

চোখের পাতায় বারবার চুমু খেয়ে আমি অনেকে শবদেহের চোখের পাতা মেলে ধরতে শিখিয়েছি, তারা অতিপরিচিতের মতন আমার দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে থাকতো, ধন্যবাদ জানাতো অপলক ।[৫]

মৃত্যুর পরের দিনও কেবল ঠোঁটেই থাকে বিশুদ্ধতার জীবাণু ; শরীরের সবচেয়ে অনাবৃত এরোগেনাস এলাকা হল মানুষের ঠোঁট, যেখানে গিয়ে কেন্দ্রিত অজস্র স্নায়ুর শেষবিন্দু, সেখানে সামান্য স্পর্শ আমাদের মস্তিষ্কে তথ্যের প্রপাত গড়ে তোলে, ক্যানভাসে হাজার রঙের তুলির ছোঁয়ার মতন । চুমুর ম্যাজিকের মাধ্যমে শরীরে হরমোন আর নিউরোট্র্যান্সমিটারের ঝড় ওঠে । চুমু থেকে যে স্নায়বিক অনুপ্রাণন গড়ে ওঠে তা ত্বক, মগজ, মুখের মাংসপেশী আর ঠোঁটে অবিরাম আনাগোনা করে, যতক্ষণ চুমু খাওয়া বজায় থাকে ততক্ষণ । প্রগাঢ় চুমুর ফলে স্নায়ুবার্তা সৃষ্টি করে ডোপামাইন রসায়ন, যে রসায়ন থেকে আসক্তি আর আকাঙ্খার উৎসার ঘটে, অক্সিটোসিন অর্থাৎ প্রেমের, হরমোন বয়ে যায় দেহের ভেতরে ভেতরে । মৃতার দেহেও তা ঘটে ।

মৃতার ঠোঁটেও একই প্রক্রিয়া ঘটে বলে আমি মনে করি; আপনার হয়তো বিশ্বাস হচ্ছে না । শিল্পবোধ না থাকলে এরকমই হয়, আপনার শিল্পবোধ নেই, কেবল কলেজে-পড়া জ্ঞান আছে, তাই আমার আর্ট ফর্মকে বুঝে উঠতে পারলেন না । প্রেমকে জাগতিক নোংরামির অন্তর্ভুক্ত করে ফেললেন । হয়তো যে সময়ে আপনি আমাকে হত্যার জন্য পরিকল্পনা করছিলেন, তখন আপনি মাদকে আচ্ছন্ন ছিলেন, আচ্ছন্নতায় আক্রান্ত আপনার মস্তিষ্ক আপনাকে চালনা করছিল, আপনি শবের অভিনয় করার জন্য ভ্যানগাড়িতে শুয়ে নিজেকে নোংরা তেরপলে ঢেকে চলে এলেন আমাকে খুন করতে, এমনকি মর্গের ডোমকে বলে পায়ের বুড়ো আঙুলে ভুয়ো নামের ট্যাগও ঝুলিয়ে নিয়েছিলেন । [৬] আপনার দেহের তাপ থেকে আমার অনুমান করা উচিত ছিল যে আপনি ভার্জিন নন ।

হ্যাঁ, আমি নারীর শবের সঙ্গে প্রেম করতুম । নারীর শব মাত্রেই সচ্চিদানন্দময়ী শিল্পমাধ্যম।

আমি কী করতুম ? আমি তার শরীরে প্রেম জাগিয়ে তুলতুম, আমার কাঁপুনিটুকু তাকে দিতুম, অন্ধকারে, বা গোধূলির আলোয়, ঘন জঙ্গলে, গৃহযুদ্ধে ফাঁকা গ্রামের রাস্তায়, পোড়া চালাবাড়ির পেছনে । দিনের আলোয় যা করতে সে-নারীর অস্বস্তি হয়েছে, বা মুখ খুলে বলতে পারেনি, আমি তাই দিয়েছি । আমি কোনো নারীর চরিত্রের কথা ভাবি না, ভাবিনি, সে যদি যৌনকর্মীর কাজও করে থাকে, তাতেও কিছু এসে যায় না, কেননা আমি আমার ভালোবাসা দিয়ে তাকে ওই ব্যবসা থেকে মুক্তি দিই, দিতুম । ওরাও আমার শরীরের দুর্গন্ধ, আমার গায়ের রঙ, আমার নাক-নকশা নিয়ে প্রশ্ন তোলে নি কখনও । ওদের কন্ঠস্বরহীনতাই ছিল ওদের ভাষা, বেঁচে থাকতে হয়তো আমার ভাষা আর ওদের ভাষা আলাদা ছিল, একজন আরেকজনকে কিছুই বুঝিয়ে বলতে পারতুম না, প্রেম করার সময়ে দিব্বি নিজেদের সঙ্গে ভালোবাসার দুটো কথা শোনাতুম, সদ্য পরিচিত দুই পেলিকান পাখির মতো, সমুদ্র থেকে উঠে আসা নিম্নচাপের বাতাসের মতো ।

আগে আমি এই ছেলেগুলোকে থ্যাঙ্কস দিয়ে নিই, প্রায় প্রতি রাতের উপহারের জন্য । ওরা চারজন তো প্ল্যাটফর্মের সিঁড়ির তলায় বসে পাতা ফুঁকতো আর ছিঁচকে চুরি করত । আমিই ওদের বিপথ থেকে বাঁচালুম । এই পোড়ো বাড়িটায় ওরা রাত কাটাতো, এখানে আলো নেই, জলের কল আছে, বাগান জংলি ঝোপে প্রায় অন্ধকার ছিল, সাফ করিয়েছি, চাপাকল কাজ করতো না, সারিয়েছি, তার আগে ওরা ভ্যানগাড়িতে চাপিয়ে আমায় মিনারাল ওয়াটারের ড্রাম  এনে দিত ; মিনারাল ওয়াটারের প্রয়োজন হয় না আমার, আমি ইমিউন। বাজার থেকে আমার জন্য খাবার এনে দিতো, নিজেরাও খেতো, ম্যাকডোনাল্ড, পিৎসা হাট, কেএফসি, ওদের কি খাবার ইচ্ছে হতো না । ওরা একটাই পোশাক পরে মাসের পর মাস চালাতো, আমি ওদের পছন্দের পোশাক কিনে দিয়েছি ।

আমি ওদের আমার সঙ্গে নিয়ে যাবো ভেবেছিলুম, আপনি সব ভেস্তে দিলেন ; ওদের পাসপোর্টও আমি করিয়ে নিয়েছিলুম, লেক ভিকটোরিয়াকে ঘিরে যে দেশগুলো, সেখানে গিয়ে হারিয়ে যাবার প্রচুর সুযোগ, প্রায়ই এথনিক গোষ্ঠীগুলো ক্ষমতা দখলের জন্য লড়ে মরে । সেখানে গিয়ে মিশে যেতে পারতো ভিড়ের ভেতরে ।

ছেলেগুলোর তো কোনো পরিচয়ই ছিল না, ভোটার কার্ড, আধার কার্ড, বিপিএল কার্ড, র‌্যাশান কার্ডের বাইরে যে জগত, ওরা ছিল সেই জগতের বাতিল নাগরিক । আমিই ওদের পরিচয়ের প্রতিষ্ঠা দিয়েছি। আমি চেয়েছিলুম, ওদের নিয়ে গিয়ে লেক ভিকটোরিয়ার ধারে কোনো একটা দেশে ছেড়ে দিই, তারপর ওরা নিজেদের জীবন আফ্রিকার মানুষদের মতন কাটাক, চাষে, জঙ্গলে, মাছ ধরায়, এথনিক গোষ্ঠীতে ঢুকে তাদের দল ভারি করতে, যা চায় ছেলেগুলো ।

আশেপাশের দেশগুলো হ্রদটাকে লেক ভিকটোরিয়া বলে না । লুয়ো ভাষায় বলে নামলোলওয়ে, লুগাণ্ডা ভাষায় বলে নালুবালে, বানটু ভাষায় বলে নেয়ানজা । বয়স ওদের কম, শিখে নিতো কোনো ভাষা । আবহাওয়াও ভারতের মতন, মানিয়ে নিতে পারত । ইচ্ছে হলে চলে যেতে পারতো পাশের দেশ রোয়াণ্ডা কিংবা রোয়াণ্ডা হয়ে কঙ্গোয় । প্রত্যেকে স্হানীয় মেয়েকে বিয়ে করে থেকে যেতে পারতো, গোষ্ঠী-যুদ্ধে অংশ নিতে পারত ।

লেক ভিকটোরিয়াকে নষ্ট করে দিয়েছে ব্রিটেন আর ফ্রান্সের উপনিবেশবাদীরা, তাতে বিদেশি মাছ ছেড়ে । পঞ্চাশ বছরে হ্রদটার জৈবিক চরিত্র পালটে গিয়ে নষ্ট হয়ে গেছে । জাহাজের নোংরায় জলের নীল পবিত্রতা ঘুচে গেছে ।

ওদের আমি বিপথগামী করিনি । কেবল বলতুম যে, বুঝলি, যার সঙ্গে শুচ্ছিস, তার বডি যতো ঠাণ্ডা হবে ততো আনন্দ, রিয়্যালি, আনন্দ, কেন জানিস, স্বর্গ কোথায় বল : ওপরে, ওই আকাশে তো ! ওখানটা কি গরম ? একেবারেই নয় ; ভীষণ ঠাণ্ডা, যতো স্বর্গের কাছাকাছি যাবি ততো ঠাণ্ডা । আমি যে বডির সঙ্গে শুতে চাই তাদের অমন ঠাণ্ডা চাই, বুঝলি, উর্বশী-মেনকাদের নাম শুনেছিস তো, স্বর্গে থাকে, তা ওদের বডি কতো ঠাণ্ডা ভেবে দ্যাখ তোরা, তাই তো প্রাচীন ভারতীয় মুনি-ঋষিরা হকচকিয়ে যেতো, তোরা বোধহয় মুনি-ঋষিদের পেছলাবার গল্পগুলো জানিস না, ফিল্মও তো আজকাল হিন্দু মুনিঋষিদের চরিত্র নিয়ে হয় না । [৭] ওরা অবশ্য টিভির কথা বলেছিল, কিন্তু তার পর্দায় তো অপ্সরাদের দেহের তাপ দেখানো সম্ভব নয় ।

ওদের সঙ্গে শেষবার কথা বলে নিই, আর তো বলা হবে না । এদেশ ছেড়ে চলে যাবো ভেবেছিলুম, কিন্তু ওদের সাহচর্যের কারণে কিছুদিন এই দেশে থাকার ইচ্ছা হল, আমার পূর্বপুরুষদের দেশ, সে দেশের নারীদের শবদেহের সঙ্গে শোবার ইচ্ছা হল, জড়িয়ে ধরে সারারাত কাঁদবার ইচ্ছা হল ।

এনার আগে যে বডিটা তোরা দিয়েছিলি, ওঃ, কচি আঠারো হবে, আর কতো ফর্সা, মরার পর বডি শক্ত হয়ে যায় বলে আরও আনন্দ, কোনো বডিপার্টস ঢলঢলে থাকে না, স্মল লিটল পুসি, বুঝলি । নারীর শব মাত্রেই ভার্জিন, এনট্রি শক্ত হয়ে গিয়ে ভার্জিনিটি ফেরত আনে, তা সে যতো বয়সই হোক, বুকও ফর্ম ফিরে পায়, শীতল, চুমুতে কোল্ড ড্রিংকস আর হাজার গোলাপি সারসের উড়াল। শবের সমস্ত শরীরে কৌমার্য ছেয়ে থাকে ।

জীবন্ত দেহ আমার একেবারে পছন্দ নয়, নিজের ইচ্ছেমতন হ্যাণ্ডল করা যায় না, জীবন্ত দেহের নিজের ইচ্ছে-অনিচ্ছে থাকে, তা মানতে হয়, অমন মানামানি করতে গেলে আনন্দটাই মাটি । তার ওপর জীবন্ত দেহের নিজের তাপ হয়, আমার তাতে ছ্যাঁকা লাগে, আনন্দ পুড়ে ছাই হয়ে যায়, যেন সদ্য বেরিয়ে আসা নীলাভ ধোঁয়া-ওড়ানো লাভার হল্কার ওপর শুয়ে আছি ।

পনেরো-ষোলো বছর বয়সে জীবন্ত দেহের সঙ্গে অনেক শুয়েছি, ভাল্লাগে না, কাদার চোরাবালিতে সেঁদিয়ে যাচ্ছি মনে হয়, সঙ্গে তার রস, কী কেলেঙ্কারি । দেহের যা নাম সেই নামেই সে আটকে থাকবে, আমি তার নাম প্রতি চুমোর সঙ্গে পালটাতে পারব না, ভাববে দেহের বদলে নামে অরগ্যাজম আনতে চাইছে । জীবন্ত দেহের অরগ্যাজম দরকার হয়, অনেক সময়ে বারবার ।

রোয়াণ্ডা থেকে জার্মানিতে যখন গিয়েছিলুম, ওখানে তো যৌনালয়গুলো লিগ্যাল, তাই যৌনরোগের ভয় কম, রেগুলার চেকআপ হয়, কাজের জন্য লাইসেন্স দরকার হয় । সেখানে যৌনকর্মীদের কতোবার বলেছি যে শব সেজে চুপচাপ পড়ে থাকো, তা তারা পারে না, তারা তো আফটার অল জীবন্ত দেহ । হেসে ফ্যালে কিংবা অভ্যাসমতো প্রেমিকার ভান করে, নকল অরগ্যাজমের অভিনয় করে । মেজাজ খারাপ করে দেয় ; আর জার্মান মেয়েদের গা বড্ডো গরম, ওরা, মনে হয়, হিটলারের রাজনৈতিক তাপ থেকে মনে মনে বেরোতে পারেনি এখনও। একজন তো প্রায় হুমকি দেবার মতন করে বলেছিল, অতোই যদি শখ তো চলো না ফুলের কোল্ড স্টোরেজে গিয়ে শুই আর প্রেম করি ।

নারীর শবদেহ ফোর প্লে চায় না, অরগ্যাজম চায় না, সে চায় স্বর্গীয় ভালোবাসা, দেবদূতের ভালোবাসা, চায় তার কৌমার্যের বন্দনা, অর্চনা।

শবদেহের সঙ্গে যে ভাবে ইচ্ছে শুতে পারি, সে খুঁতখুঁত করবে না, অভিনয় করবে না, নারীর শবদেহ হল অবিনশ্বর, শাশ্বত, ভালোবাসা দিয়ে উত্তরণে নিয়ে যায় । মৃত্যুর নিজের হাতে তৈরি করা আর্ট।[৮]

মৃত নারীদের প্রয়াত বলা ভুল. তারা চিরকাল অমর, নারীর শবে অজস্র স্বপ্ন লুকিয়ে থাকে, আমি সেই স্বপ্নগুলোর ভেতরে গিয়ে খেলা করি, জড়িয়ে ধরে নিয়ে যাই সমুদ্রের তলদেশে, শবের দেহ থেকে নানা রঙের রঙিন মাছ বেরিয়ে আসে ঝাঁক বেঁধে, আমাকে ঘিরে খেলা করে তারা,  কিংবা উড়িয়ে নিয়ে যাই মেঘের রূপালি কিনারায়, সে আমাকে তুলতুলে মেঘের চাদরে মুড়ে ঘুমোয় ।

স্যাঁতসেতে মাটি বলে সে, নারীর শবদেহ, কখনও অভিযোগ করবে না, বলবে না যে আমার ডানলোপিলোর বিছানা চাই, মখমলের চাদর চাই, সাটিনে মোড়া বালিশ চাই, স্কচ হুইস্কি চাই, পুরু চকোলেট চাই, সুগন্ধী রঙিন কনডোম চাই । দাঙ্গায় পোড়ানো বাড়ির মেঝেতেও সে সুখী, গৃহযুদ্ধে খুনোখুনির শেষে মাঠের অন্ধকারে মশার ঝাঁকের ভেতরে শুয়েও সে সুখী । [৯]

হ্যাঁ, আমি নারী শবের সঙ্গে প্রেম করে পরমানন্দ পাই । নারীর শব মাত্রেই সচ্চিদানন্দময়ী আর্ট ফর্ম।

নারীর শবদেহ ভালোবালা বিলিয়েই সন্তুষ্ট । তার সঙ্গে ফিসফিস করে অশ্লীল কথা বলা যায় । নারীর শবদেহ থেকে যে জ্ঞান পাওয়া যায়, তা জীবন্ত দেহ থেকে পাওয়া যায় না, জীবন্ত দেহ সব ব্যাপারে নাক গলায়, নিজেকে সবজান্তা মনে করে।

নারীর শবদেহ শোবার সময়ে বিশেষ ক্ষমতা দিতে থাকে, জীবন্ত দেহ উলটে ক্ষমতা শুষে নিতে থাকে। জীবন্ত দেহের জন্য নিত্যনতুন উপহার দিতে হবে । নারীর শবদেহ সেসব কিছুই দাবি করে না, সে বরং দেবার জন্য অপেক্ষা করে থাকে ।

নারীর শবদেহ কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে না যা জীবন্ত দেহ করে, হ্যান চাই, তেন চাই, এই দাও, সেই দাও, এই কোরো না, তাই কোরো না ।

নারীর শবদেহ ফিস ফিস করে কানে কানে বলে আমাকে নাও, আমাকে ভালোবাসো, আমাকে জড়িয়ে ধরো, আমাকে তোমার বুকে মিশিয়ে নাও ।

নারীর শবদেহ সমস্ত কাজকে অনুমোদন করে, মুখ বন্ধ করে বলে হ্যাঁ, যা করছ ভালো করে করো, ভালোবাসো, আমায় আগাপাশতলা ভালোবাসো, ভালোবাসো, ভালোবাসো , তুমিই আমার শেষতম প্রেমিক, আমাকে নাও, আমাকে পৃথিবীর যোগ্য করে তোলো, আকাশের যোগ্য করে তোলো, নীহারিকার যোগ্য করে তোলো, নক্ষত্রপূঞ্জের যোগ্য করে তোলো ।[১০]

নারীর শবদেহ হলো শক্তির পূজারি, আত্মত্যাগের পূজারি । নারীর শবদেহের কোনো ধর্ম হয় না । সে শবে রুপান্তরিত  হবার সঙ্গে-সঙ্গে ধর্মের নোংরামো তাকে ছেড়ে চলে যায় । কোনো ধর্মযুদ্ধে যোগ দিতে সে ওসকাবে না ।

নারীর শবদেহের সঙ্গে প্রেম তাকে আবার জৈব করে তোলে, তার শরীরে শিল্পের প্রাণ এনে দেয় ভালোবাসার মাধ্যমে ।

নারীর শবদেহ বলে ওঠে, উলটো রাস্তায় কেবল প্রতিভাবানরাই হাঁটে, হে প্রতিভাবান, তুমি আমাকে আগুনের সন্ত্রাসে বা মাটির কালো কারাগারে যাবার আগে চুটিয়ে ভালোবাসো, ভালোবাসো, ভালোবাসো ।

জীবন্ত দেহের প্রেম হল দু’পক্ষের পারস্পরিক সন্ত্রাস । আধুনিক সভ্যতা মানেই সন্ত্রাস । আমি আমার শবপ্রিয়াকে আধুনিকতার সন্ত্রাস থেকে বের করে আনি ।

জীবন্ত দেহরা কেউ কাউকে বিশ্বাস করে না । তারা ভালো সন্ত্রাসবাদী আর খারাপ সন্ত্রাসবাদীর কথা বলে, অথচ অসততার সন্ত্রাসবাদ ছাড়া রাজনীতি হয় না, রাজনেতা মানেই অসততা, কোনো রাজনেতা যুদ্ধাস্ত্র কমাবে না, যুদ্ধশিক্ষা বন্ধ করবে না ।

হ্যাঁ, আমি নারী শবের সঙ্গে প্রেম করি । তাদের সঙ্গে প্রেম করে পরমানন্দ পাই । আমার কাছে তা আমার নিজস্ব আর্ট ফর্ম ।

নারীর শবের সঙ্গে কথা বলার সময়ে শব্দগুলো মানেহীন আর ফাঁপা হয়ে গেলেও ক্ষতি নেই ; মানেহীন কথাবার্তাই তো ভালোবাসা, নয়কি ! তা হলেই বা ! মৃত্যু হল জীবনের ওপার থেকে আনা প্রেমের বীজ ।

নারীর শবদেহের অতীত বর্তমান ভবিষ্যত নিয়ে কোনো চিন্তা নেই, যা জীবন্ত দেহের থাকে, জীবন্ত দেহ বর্তমান আর ভবিষ্যতের চিন্তায় নিজেকে বিষাক্ত করে তোলে । যুবতী হলে সে যৌবন হারানোর আতঙ্কে আক্রান্ত হয়, প্রৌঢ়া হলে সে বৃদ্ধা অকর্মণ্য হবার দুশ্চিন্তায় সময় কাটায় ।

জীবন্ত দেহের সঙ্গে শুলে, কিছুক্ষণ পর যে একাকীত্ববোধ কামড়ে ধরে, তা শবদেহের সঙ্গে শুলে হয় না, শবদেহের বগলের খাঁজে জোনাকির ঝাঁক এসে বসলেও সে বিরক্তির অভিনয় করে না, খাঁজ থেকে জোনাকিগুলোর তরল পারা তুলে তার ভেতরে লুকিয়ে যেতে দেয় সে, লুকিয়ে যেতে দেয় তার গন্ধের ঢেউয়ে । বহুক্ষণ চোখ মেলে তার দেহের প্রতিটি ইঞ্চের, খাঁজের, ভাঁজের রহস্য খুঁটিয়ে দেখা যায়, অথচ জি-স্পট হাতড়ে খুশি করার সমস্যায় ভুগতে হয় না, তার সঙ্গে প্রতিটি অভিজ্ঞতা ভিন্ন, জীবন্ত দেহের মতন রিপিটিটিভ নয় ।[১১]

জীবন্ত দেহের সঙ্গে প্রেম হলো অর্থহীন অভিজ্ঞতা, কেননা আরেকজন সেই অভিজ্ঞতাকে থিতোতে দেয় না, বাগড়া দিতে থাকে, মাথা গলায়, অনেক সময়ে তো দু’পায়ের মাঝেও বকবক থামাতে পারে না, বোকার মতন হাসাহাসি করে । দুটি জীবন্ত দেহের মাঝে মূল সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় তাদের মস্তিষ্ক ।

নারীর শবদেহ জানে যে সতীত্ব হল সবচেয়ে গোঁড়া বিকৃতি । শবের তুলনায় বিছানায় কেউ সুশ্রী নয়, তাদের গর্ভবতী হবার আতঙ্ক নেই, গর্ভনিরোধক বড়ি খেতে হয় না ।

নারীর শবদেহরা আমাকে ভয় থেকে টেনে বের করে এনেছে ; আমাকে পাপ-পূণ্যের বিভাজন থেকে মুক্ত করে  জানোয়ারের মতন স্বাধীনতা দিয়েছে, সিংহের মতন, বাঘের মতন, চিতাবাঘের মতন, জাগুয়ারের মতন, হায়েনার মতন, যাদের কোনো কাজে পাপ নেই ।

কোনো কোনো শবের মুখ কি দুঃখি হয় না ? হয় । তাদের কষ্ট আমি নিজের ভেতর তুলে আনি, আর শবদেহের মুখে আমি হাসি ফোটাবার চেষ্টা করি । এমনকি সে শবের বুকে-পেটে পোস্টমর্টেমের কাটা-সেলাই থাকলেও । অবহেলার প্রশ্ন নেই, অবিচারের প্রশ্ন নেই। আমি তাকে বর্তমানে টেনে নিয়ে এলেও তারা নিজের নিজের অতীতের গল্পহীন কাহিনিকে লুকিয়ে রাখে, আমি সেই দুঃখের আলাদা গল্প তৈরি করে নিই, তার দুঃখে কাঁদি । কাগজে তার সম্পর্কে সাংবাদিকরা যে গল্প লেখে, আমি তা বিশ্বাস করি না, সে তো শবদেহ, তার কোনো দোষ থাকতে পারে না, সে অপরাধের, পাপের, গ্লানির ঊর্ধে ।[১২]

নারীর শবদেহ হলো পুরোনো গান যা হারিয়ে গেছে, যে মেলোডি আর ফিরবে না । জীবন্ত দেহ হল এই সময়ের ঝালাপালা গান, যা ক’দিনেই লোকে ভুলে যাবে । আমি নারীর শবের শরীরে আমার পছন্দের সঙ্গীতের ঝিলমিলে নক্ষত্রের পোশাক পরিয়ে দিই, প্রেম নিখুঁত হয়ে ওঠে, ভালোবাসা হয়ে ওঠে পূর্ণাঙ্গ ।

নারীর শবদেহ কখনও প্রেমের প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করে না, ডাক দিলেই আলিঙ্গনে সাড়া দেয় । জীবন্ত দেহ প্রত্যাখ্যান করে, অপমান করে ।

জানি, পছন্দের শবদেহের সঙ্গে আবার দেখা হবে না কোনোদিন । অথচ সারারাত চুমো খেয়েছি ঠোঁটে, বুকে মুখ গুঁজে থেকেছি বহুক্ষণ, অক্লান্ত মুখমেহন করেছি, তা অলৌকিক, তা এক অসেতুসম্ভব সেতু।

হ্যাঁ, আমি নারীর শবের সঙ্গে প্রেম করি । আমি একজন শিল্পী ।

মর্গের ডোমটাকে ড্রাগ অ্যাডিক্ট করাতে এই ছেলেগুলোর পনেরো-কুড়ি দিন সময় না লাগলে আগেই আনন্দ নিতে পারতুম, বুঝলেন, ওদের ড্রাগের টাকা অ্যাডভান্স দিয়ে রেখেছি, যদি আরও দরকার হোতো, দিতুম, ওদের বলেছিলুম আমার কথা কাউকে কক্ষনো বলিসনি যেন, তাহলে আমাকে তো বিপদে ফেলবিই, নিজেরাও বিপদে পড়বি, ডবল ফৌজদারি জুটবে, ড্রাগ নেবার আর মেয়েদের ডেড বডি তোলার ।

যে ভ্যানগাড়ি ওরা কিনেছে, শবকে চাপা দিয়ে আনার তেরপল কিনেছে, এটা প্রশংসার, পাবলিক দেখলে ভাবতো পুলিশের কাজেই যাচ্ছে, যদিও সন্ধ্যার অন্ধকারে কেউ অতো খেয়াল করতো না, তবুও। নারীর শব জানতে পারলে মানুষ তার দেহ দেখতে চায় না, অপয়া মনে করে, অথচ তার গল্পটুকু জানবার জন্য সতত উৎসুক থাকে ।

ওরা একদিন এক নারীর শবদেহের  ওপর পারফিউম ছিটিয়ে এনেছিল । বুঝিয়েছিলুম, শবের উঁচু জাত নিচু জাত হয় না, নোংরা-পরিষ্কার হয় না । শব হল শব, শিল্পমাধ্যম । সুগন্ধিত করার কোনও দরকার ছিল না । গরিব বাড়ির হলেই বা, হয়তো জীবনে কখনও সাবান মাখেনি, তাই বলে শরীরের গন্ধ চাপা দিতে পারফিউম ? ছিঃ । নারীর শবদেহের গন্ধই মাতনলাগানো, একটা আমেজ থাকে, যেন প্রাগৈতিহাসিক যুগের গুহাবাসিনী, জংলি জানোয়ারের কাঁচা মাংস খেয়ে গায়ে হাত পুঁছে নিয়েছে, সৌন্দর্যের ডিভাইন রূপ, পুঁজিবাদের শেকল থেকে মুক্ত ; তার তো ফ্যাশানিস্টা হবার দরকার নেই কোনো, সে তো ঈর্ষার কামড়ে দুমড়ে যায়নি, জীবন্ত দেহদের সঙ্গে প্রতিযোগীতায় নামে না । সে প্রতি মাসের মেন্সের কষ্ট থেকে মুক্ত । আইডিয়াল, কতো রোমান্টিক ভেবে দেখুন ।

এই শিল্পে, অর্থাৎ শবদেহের সঙ্গে প্রেমে, দরকার হয় শিভালরি, ড্রামা, ইশারা, সম্পর্কের গভীরতা, আসক্তি, কামোচ্ছ্বাস, অন্তরঙ্গতা, সমবেদনা, উপলব্ধি, সম্বন্ধ । তাতে “আমি তোমার তুমি আমার” ধরণের ভালগার ফিলমি ক্লিশের জায়গা নেই, আমি তাকে ঘর বাঁধতে বাধ্য করি না, সেও আমাকে সংসার পাততে অনুরোধ করে না । আমি জানি যে আমি প্রতি রাতে একটা তরোয়ালের ধারের ওপরে দাঁড়াই, কিন্তু আমি জানি যে আমার প্রেমিকা একজন শবদেহ, তাই আমার কিছুই হবে না । যে কোনো নতুন আর্ট শুরু করতে গেলে ঝুঁকি নিতে হয় বটে, তবে শেষ পর্যন্ত শিল্পীর কোনো ক্ষতি হয় না । [১৩]

জীবন্ত দেহের সঙ্গে বিয়ে করলে দেখবেন যে প্রেম তাদের জীবনের কেন্দ্র থেকে পরিধির দিকে চলে গেছে । নারীর শবদেহ হল ব্লিস, ইউ ক্যান গো অন কাউন্টিং ইওর ব্লিসেস, যতো দিন তাদের সঙ্গে প্রেম বজায় রাখবেন, ততোদিন আপনি ব্লেসেড । প্রেম হল ক্ষুধার মতন, ক্ষুধাও তো ব্লিস, নয়কি ?

নারীর শব কোনোরকম অন্তর্দ্বন্দ্বতে ভোগে না, তার কোনো উচ্চাকাঙ্খাও থাকে না । আমি তাকে গতকালের সঙ্গে আগামীকাল মেলাবার মুহূর্তে নিয়ে আসি । শবের ওপরে শব হয়ে শুয়ে পড়ি আর ক্রমশ দুজনেই মৃত্যুর ওপারের মানুষ হয়ে যাই । আমি তো তার আত্মপরিচয় হ্যাক করছি না । সে তো অনাত্মা । সে কচি হলেও ভিডিও গেম, কেবল টিভি, ফিল্মে সময় অপচয় করে না, কমপিউটার ভাইরাস নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে না । তার প্রণয়ের জগতে আমি মিষ্টি করে গ্লাইড করে যাই, যার দরুণ সম্পর্ক হয়ে ওঠে স্বতঃস্ফূর্ত ; সে জীবন্তকালের প্রেমিকের বিশ্বাসঘাতকতার জন্য আত্মহত্যা করে থাকলেও, আমি তার জীবনে বিকল্প ন্যারেটিভ যোগ করে প্রতিদানহীনতার গ্লানিকে মুছে দিই ।

জীবন্ত দেহদের প্রেমের কাছে বড় বেশি চাহিদা থাকে, তার ফলে সৃষ্টি হয় মোহভঙ্গ । একজন চায় আরেকজনকে ভোগদখল করার অধিকারী হতে, ফলে অন্যজন সেই বাঁধন কেটে বেরিয়ে যেতে চায় । দুজনের মধ্যে শুরু হয় গোপন লড়াই, যার দরুণ এক পক্ষ পরিত্যক্ত বোধ করে । একজন চালায় গোপন লড়াই, আরেকজন গোপনে বোধ করে পরিত্যক্ত থাকার একাকীত্ব। জীবন্ত প্রেমিক-প্রেমিকা গোপনে পরস্পরকে ঘেন্না করা আরম্ভ করে, আর ভাবে সেটাই বুঝি প্রকৃত প্রেম । জীবন্ত দেহরা সম্পর্ককে চাপাচুপি দিয়ে এমনি করেই যৌবন পার করে, প্রৌঢ় হয়, তারপর বুড়িয়ে যায় ।[১৪]

এই ফাঁকা বাড়িটা যে ওরা আইডেনটিফাই করেছিল, এটা দারুণ কাজ । শহরের ঝুটঝামেলার বাইরে, শাল আর শিমূল গাছে ঘেরা, চারিদিকে বৈঁচির ঝোপ, অসাধারণ, এই পোড়োবাড়ির সন্ধ্যা প্রতিদিন তার গন্ধ বদলে-বদলে অন্ধকারকে মোহিনী করে তোলে ।

এনার সঙ্গে দুর্ঘটনার আগের বডিটা ঠিকমতন ডোমটাকে হ্যাণ্ড ওভার করে দিয়েছিলিস তো তোরা? যেমন ড্রেস পরানো ছিল তেমন করে ? বুড়ো আঙুলে নামের যে ট্যাগ লাগানো ছিল তা আমি দেখিনি, দেখলেই সর্বনাশ, তার পরিচয় তার বডির সঙ্গে লেপ্টে যাবে, তার ধর্ম, তার ভাষা আমাকে ছিঁড়ে খেয়ে ফেলবে । আপনার বুড়ো আঙুলের ট্যাগও আমি চেয়ে দেখিনি ।

আপনি বিশ্বাস করতে পারছেন না যে আমি বাঙালি, রিয়্যাল ব্ল্যাক বেঙ্গলি ব্লাড । আমার পদবি কাঙালি হয়েছিল দাদুর বাবার কারণে, আমার নাম দীনেশ কাঙালি, ওরা, চার্চের পাদরিরা, উচ্চারণ করতে পারত না, করে দিলে ডেনিস কাংগালি । আমার দাদার নাম বাবা রেখেছিলেন রমেশ কাঙালি, পাদরিরা দাদাকে করে দিলে র‌্যামজে কাঙালি । পুরো গল্পটা শুনলে বুঝতে পারবেন ।

জানি একে, আমার শিল্পকর্মকে, আপনারা নেকরোফিলিয়া বলেন ; চেষ্টা করেও এই আকর্ষণ থেকে মুক্ত হতে পারিনি । এই দোষ আমার দাদুর বাবার ছিল । একজন মাসাই যুবতীকে খুন করে তার শবকে ধর্ষণ করেছিল কয়েকজন কুলি, দাদুর বাবা এক মাসাই যুবতীর শবকে জড়িয়ে রাতভর কেঁদেছিলেন । মাসাইরা দুই যুবতীকে ধর্ষণের জন্য তীর-ধনুক বর্শা নিয়ে কুলিদের ঘিরে ধরেছিল কিন্তু দাদুর বাবার আচরণে তারা অবাক হয়ে গিয়েছিল, তারা মেয়ে দুটির শব নিয়ে যখন চলে যাচ্ছিল, তখন তাদের ওপর গুলি চালিয়েছিল রেল কোম্পানির সশস্ত্রবাহিনী, ভবিষ্যতের বিদ্রোহ শুরুতেই দাবিয়ে দেবার উদ্দেশে ।

আমি সেই রোগে আক্রান্ত হলুম রোয়াণ্ডায়, যেসময়ে হুটু আর টুটসিদের খুনোখুনি আরম্ভ হল, আমার মা তো  টুটসিদের হাতে খুন হয়েছিল, বাবাও টুটসিদের হাতে খুন হয়েছিল, পরে দাদা আর দাদার বউ খুন হয়েছিল টুটসিদের হাতে । গৃহযুদ্ধের খুনোখুনির সময়ে আমি হুটু খুনিদের একটা ছোটো দলের নেতা ছিলুম ।

আপনি হয়তো ভাবছেন বাঙালি হয়েও আমি কেন এরকম কালো, পুরু ঠোঁট, থ্যাবড়া নাক, আমার পদবি কেন কাঙালি, বাঙালির তো এরকম পদবি হবার কথা নয়, এরকম চেহারা হবারও কথা নয় । ঠিকই অনুমান করেছেন । আমার দাদু, মানে ঠাকুর্দার নাম ছিল কাঙালি, পদবি কি ছিল তা জানি না, সবাই ওনাকে কাংগালি বলেই ডাকত, ওনার ছেলে হল, তার পদবি হয়ে গেল কাংগালি । [১৫]

দাদুর বাবা আর বউকে যখন ফুসলিয়ে আরও বত্রিশ হাজার কুলির সঙ্গে কেনিয়া-উগাণ্ডা রেললাইন পাতার জন্য ১৮৯৬ সালে আফ্রিকায় নিয়ে যাওয়া  হয়েছিল, তখন দাদুর বাবার বয়স আঠারো আর ওনার বউয়ের বয়স তেরো ।

আড়কাঠিরা ভেবেছিল ওনাদেরও দক্ষিণ আমেরিকায় আখচাষের খেতে মজুর হিসেবে পাঠাবে, কিন্তু আফ্রিকার রেল লাইনের জন্য মাথাপিছু কমিশন বেশি পাচ্ছিল বলে পাঠিয়ে দিলে রেল লাইন পাততে । ব্যাপারটা ভেবে দেখুন । আফ্রিকা থেকে,  জালের ফাঁদ পেতে, পালোয়ান মানুষ ধরে-ধরে দক্ষিণ আমেরিকা আর আমেরিকায় জাহাজে চাপিয়ে ইউরোপীয়রা চালান করে দিলে সেখানে কেনা গোলামের কাজ করতে, ওই যাকে বলে স্লেভ, অথচ সেই পালোয়ানগুলোর দ্বারা কিচ্ছু হবে না মনে করে এশিয়ানদের নিয়ে গেল রেল লাইন পাততে ।

স্লেভদের বাঙালিরা কেন ক্রীতদাস বলে জানি না ; স্লেভরা তো কেনা নয়, জোর করে কিডন্যাপ করে তুলে নেয়া, তারপর নিলাম ডেকে দল বেঁধে বিক্রি ।

রেল লাইন পাতার শ্রমিকদের কেন কুলি বলা আরম্ভ হল তাও জানি না ।

তখন তো পুরো আফ্রিকাকে ইউরোপীয়রা নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগির জন্য খেয়োখেয়ি করছে । ইনডিয়ায় যেমন ইস্ট ইনডিয়া কোম্পানি প্রথমে খুঁটি গেড়ে তারপর সরকারকে ডেকে আনলে, তেমনি কেনিয়া আর উগাণ্ডায় ব্রিটিশ ইস্ট আফ্রিকা কোম্পানি  মোমবাসার কিলিনডিলি বন্দর থেকে কেনিয়া-উগাণ্ডা রেললাইন বসিয়ে ব্রিটিশ সরকারকে আনার পোক্ত ব্যবস্হা করে ফেললে । ১৯০০ সালে লাইনটা পৌঁছেছিল নাইরোবি, ১৯০১ সালে কিসুমুর ফ্লোরেন্স বন্দরে । রেল লাইনকে এলডোরেট থেকে কামপালা পর্যন্ত বেছানো হয়েছিল, যাতে ভিক্টোরিয়া হ্রদে জাহাজে করে মাল চালান এড়ানো যায় । রেল লাইনের জন্যই ইথিওপিয়া থেকে মুসোলিনির  ইটালিকে তাড়াতে পেরেছিল ব্রিটিশ সৈন্যরা, নামে ব্রিটিশ সৈন্য, কিন্তু জওয়ানরা বেশির ভাগ ছিল ভারতীয় । প্রথম দিকে রেলের ইনজিন আর কামরা যেতো ভারত থেকে, যেগুলো প্রায় অকেজো হয়ে গিয়েছিল সেগুলো ।

দু লাখ লোক লেগে ছিল ওই রেল লাইন বসাতে, এমন রেল লাইন যে, বাবার মুখে শুনেছি, লোকে বলত লুনাটিক এক্সপ্রেস , মাসাইরা বলত ইস্পাতের অজগর । [১৬]

সাভো নদীর ধারে লাইন বসাবার সময়ে আঠাশ জন কুলিকে খেয়ে ফেলেছিল দুটো মদ্দা সিংহ । প্রথম যাকে খেয়েছিল, সে একজন শিখ সরদার, তার নাম উগন সিং । পরে যাদের খেয়েছিল সিংহ দুটো, তাদের নাম-সাকিন কেউ জানে না, অতো কুলির মধ্যে প্রায়ই তো কেউ না কেউ মারা যেতো । সিংহদের পালের ব্যাপারটা জানেন তো । সিংহীদের হারেম নিয়ে একজন সিংহই থাকতে পারে । সিংহীদের হারেমের দখল নিতে পালের গোদা বিগ ড্যাডি মদ্দা সিংহকে লড়াইতে হারিয়ে দখল করতে হয় । বাচ্চা হলে মাদিগুলো পালে থেকে যায় আর মদ্দাগুলোর ঘাড়ে কেশর উঁকি দিলেই তাদের তাড়িয়ে দেয়া হয় । তাড়ানো সিংহগুলো তালে থাকে কখন পালের গোদা বিগ ড্যাডি মদ্দাটা বুড়িয়ে যাবে, বা শিকার ধরতে গিয়ে আহত হবে । নতুন যে মদ্দাটা পালের দখল নেয়, সে যদি দ্যাখে যে পালেতে আগের বিগ ড্যাডির শিশু-সিংহ রয়েছে, তাহলে সেগুলোর টুঁটি টিপে মেরে ফ্যালে, যাতে মা-সিংহী আবার গর্ভবতী হবার জন্য তৈরি হয়ে ওঠে । কতো সুন্দর ব্যবস্হা, বলুন । কারোর কোনো পাপবোধ নেই । মরা শিশু-সিংহীর মায়েরাও নতুন মদ্দাকে আকৃষ্ট করার জন্য যা-যা করা দরকার তা করে।     অনেকটা বাড়ি থেকে তাড়ানো বজ্জাত ছেলের মতন । মদ্দা সিংহ দুটো অমনই বজ্জাতি করে বেড়াতো । চিফ ইনজিনিয়ার মিস্টার প্যাটারসন গুলি করে খতম করে দুটোকে ।

এখনকার যে নাইরোবি শহর তার জন্য খেটে মরেছিল ভারতীয় কুলিরা । তার আগে জায়গাটা ছিল বিশাল একটা ডোবা, বাবার ঠাকুর্দারাই নাইরোবিতে আকাশছোঁয়া বাড়িগুলোর বনেদ তৈরি করেছিল । ১৯২০ সালে কেনিয়াকে ব্রিটিশ কলোনি বানানো হয়েছিল । ভারতীয়রা সেখানে এখন পাত্তা পায় না ।

রেল লাইনের গল্প কেন শোনাচ্ছি জানেন ? তাহলে আমার ব্যাকড্রপ বুঝতে সুবিধা হবে । আমি ‘অ্যাকচুয়ালি’ কোন জগতের তা আপনার কাছে স্পষ্ট হবে ।

গুজরাটিরা তার আগে জাহাজে মাল চাপিয়ে আফ্রিকায় পাঠাত । রেল লাইন বসার পর আফ্রিকার ভেতরে মাল পাঠাতে সুবিধা হয়ে গেল, আর মুটের মাথায় চাপিয়ে, সিংহের পালের মুখে পড়ার বিপদ রইল না । একে একে গুজরাটিরা উগাণ্ডা আর কেনিয়ায় ব্যবসা আরম্ভ করে দিলে, ওদের আফ্রিকানরা আজও দুকানওয়ালা বলে ডাকে । ১৯৬০ সালের পর কেনিয়া, উগাণ্ডা, তানজানিয়ার স্বাধীনতার পর ওরা, গুজরাতিরা,  কেনিয়া-উগাণ্ডা থেকে আফ্রিকার অন্য দেশগুলোয় ছড়িয়ে পড়ল।

কাজ শেষ হয়ে গেলে পঁচিশ হাজার কুলি ভারতে ফিরে গিয়েছিল । আমার দাদুর বাবা আর মা উগাণ্ডায় থেকে গেল, উগাণ্ডা জানেন তো, সেই যে দেশে ইদি আমিন নামে একজন শাসক ছিল, পাঁচ লাখ লোককে মেরে ফেলেছিল, যেমন টিক্কা খান পূর্ব পাকিস্তানে বুদ্ধিজীবীদের বেছে-বেছে খুন করেছিল, আল বদর রাজাকর দল গড়েছিল, ঠিক তেমনিই ইদি আমিন নিজের দেশের বুদ্ধিজীবীদের, এমনকি নিজের বন্ধুদেরও, খুন করে লোপাট করে দিয়েছিল । লোকটা সুন্দরী আফ্রিকান দেখলেই জোর করে বিয়ে করত, একটা বউকে নাকি কেটে রেঁধে খেয়ে ফেলেছিল । তারপর ব্যাটা ভারতীয়দের ব্যবসা দখল করে আফ্রিকানদের মধ্যে বিলিয়ে দিলে, আর ভারতীয়দের উগাণ্ডা থেকে কেটে পড়ার হুমকি দিলে, যাদের ব্রিটেনের পাসপোর্ট ছিল তারা ব্রিটেনে পালালো । গুজরাটিরা চালাক-চতুর, ওদের ব্রিটিশ পাসপোর্ট ছিল । আশি হাজার ভারতীয় পালালো নানা দেশে ।

১৯৭৯ সালে আর ১৯৮৬ সালে উগাণ্ডায় গৃহযুদ্ধের সময়ে জঙ্গলের ভেতরের রেল লাইন উপড়ে বেচে দেয়া আরম্ভ করেছিল স্হানীয় আফ্রিকানরা । ভারত থেকে পাঠানো সেকেণ্ড হ্যাণ্ড ইনজিন আর কামরাগুলোও ততোদিনে ঝরঝরে হয়ে পড়েছে ।

আমার বাবা বোকার মতন ব্রিটেনের পাসপোর্ট নেয়নি, ভেবেছিল, জমিজমা খেতখামার রয়েছে, এদেশেই থেকে যাই, আমরা নাকি জাতে চাষি ছিলুম । বাবার মতনই আরও আটঘর বাঙালি পরিবার, যারা জমিজমা খেতখামার নিয়ে আনন্দে ছিল, তারাও থেকে গিয়েছিল । লোকে তাই আমাদের ইনডিয়ান ইস্ট আফ্রিকান বলে চেনে । আমাদের নিজেদের মধ্যেই বিয়ে-শাদি হতো, কেউ-কেউ অবশ্য আফ্রিকান মেয়ের প্রেমে পড়ে বিয়ে করে তাদের গোষ্ঠীতেও ঢুকে গিয়েছিল , যেমন আমার দাদা র‌্যামজে কাঙালি।

শেষে ইদি আমিনের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে আমরা আর ওই নয়টা পরিবার পাশের রাজ্য রোয়াণ্ডায় গিয়ে বসবাস শুরু করলুম । আমি তখন ছোটো ছিলুম, আমার বডি দেখছেন তো, আফ্রিকানদের চেয়ে কম নয়, হাতের মাসল দেখুন, বুকের মাসল দেখুন । ফাইটিঙে কেউ পারত না আমার সঙ্গে, রোয়াণ্ডার হুটুরাও নয়, টুটসিরাও নয় ।

আপনার বোর হচ্ছে না তো ? অনুবাদ করিয়ে ট্র্যান্সক্রিপ্ট নেবেন, অপ্রয়োজনীয় মনে হলে সেই অংশ বাদ দিয়ে পরের অংশ পড়া আরম্ভ করবেন ।

আপনি জামিন নিয়ে আপাতত ছাড়া পেয়েছেন । আমি জামিন নিইনি, ছাড়া পেতে চাই না, কেননা সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার সুযোগ পাচ্ছি । আপনি জামিন নিয়ে থাকলেও মামলা আরম্ভ হলে আপনার বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ প্রমাণ করতে পুলিশের অসুবিধা হবে না ; হত্যার ষড়যন্ত্র করেছিলেন, তাও মর্গের ডোম বলেছে পুলিশকে, এই ছেলেগুলোও তেমনই স্টেটমেন্ট দিয়েছে ; হত্যার জন্য ব্যবহৃত ছোরা, তাতে আপনার আঙুলের ছাপ, আর আমার রক্ত পাওয়া গেছে । জানেন তো তার সাজা কী, হয় যাবজ্জীবন কিংবা ফাঁসি । আমার বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ নেই, এই ছেলেগুলোকে থার্ড ডিগ্রি মার দিয়ে পুলিশ ওদের মুখ থেকে যে তথ্য আদায় করেছে, সে সমস্ত তথ্যের কোনো প্রমাণ নেই, কোনো শবের কিছুই পাওয়া যায়নি, তাদের কবেই পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে বা গোর দেয়া হয়েছে, পুলিশ ওদের কুকুর এনে শুঁকিয়েও পায়নি কিছু ।

আমি নিজে থেকে যাবতীয় তথ্য রেকর্ড করছি, এইটুকুই হয়তো আমার বিরুদ্ধে প্রমাণের জন্য যথেষ্ট । কিন্তু মামলা যখন আরম্ভ হবে তখন আমি এই শহরের কোনো গোরস্তানে মাটির তলায় ঘুমোচ্ছি, হয়তো এমন কোনো নারীর গোরের পাশে, যার শবের সঙ্গে শুয়েছিলুম ।

আপনি প্রকৃত সুন্দরী, ফর্সা, তা আমাকে ক্ষণিকের জন্য দুর্বল করে দিয়েছিল, নয়তো আপনার দেহের তাপ থেকে আমি কি সন্দেহ করতুম না, যে এর শব তো ঠাণ্ডা নয়, এর দেহে নিশ্চয়ই রক্ত চলাচল করছে, এখনও এর প্রকৃত মৃত্যু হয়নি । আপনাকে আপনার পোশাক পরিয়েই এনেছিল ছেলেগুলো, মর্গের ডোম সেভাবেই চাপিয়ে দিয়েছিল ওদের ভ্যানগাড়িতে, তেরপলের চাদর চাপা দিয়ে । আপনি যে শাড়ির ভেতরে ছোরা গুঁজে রেখেছেন তা খেয়াল করতে পারিনি,  আপনার চোখ বোজা অপরূপ কচি মুখের দিকে তাকিয়ে ।

শবকে আমার বিছানায় শুইয়ে দেবার পর আমি পোশাক খুলি, জেনে গিয়েছিলেন হয়তো, এও শিখে এসেছিলেন যে তলপেটে ছোরা মেরে তার বাঁটকে ঘুরিয়ে দিতে হয়,  তেমন করলেই নাড়িভুঁড়ি ছিঁড়ে যায়, বাঁচার সম্ভাবনা থাকে না । [১৭]

প্রতিশোধের জন্য পুরোপুরি তৈরি হয়েই এসেছিলেন । আমি কিন্তু মনে করতে পারছি না কোনটা আপনার দিদির শব ছিল, যার সঙ্গে শুয়েছিলুম বলে আপনি প্রতিশোধ নেবার ষড়যন্ত্র করলেন । আপনার মতন সুন্দরী তো কোনো শবই ছিল না । তাছাড়া আপনার দিদি আত্মহত্যা করে থাকলে শবের পোস্টমর্টেমের কাটা-সেলাই থাকতো বুকে পেটে, যদি না আপনারা কর্তৃপক্ষকে টাকা খাইয়ে আত্মহত্যার মামলা হাশাপ করিয়ে দিয়ে থাকেন । হয়তো তাই করেছেন, কেননা যে দুটি শবের পোস্টমর্টেম করা দেহ ওরা এনেছিল, তারা দুজনেই ছিল কালো ।

আমি আহত হবার পরও আপনার হাত থেকে ছোরাটা কেড়ে নিয়ে আপনাকে খুন করে, শুতে পারতুম আপনার সদ্যমৃত শবের সঙ্গে, আমার দেহে যথেষ্ট শক্তি ছিল । আমার অভিজ্ঞতাও আছে । তা করিনি, কেন জানেন ?

অতীতের এক ঘটনার ঝলক মাথায় আসার সঙ্গে-সঙ্গেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে টুটসিদের হাতে আমার দাদার হত্যা, আর দাদার হুটু বউকে খুন করার আগে  সেখানেই কয়েকজন টুটসি যুবক কী ভাবে বৌদিকে হাতপা বেঁধে ধর্ষণ করেছিল । বাবা-মা দাদাকে বারণ করেছিলেন, বলেছিলেন প্রচুর ভারতীয় মেয়ে আছে, তারা গেঁয়ো হলেই বা, চাষিবাড়ির হলেই বা । কিন্তু দাদা হুটু যুবতীর গভীর প্রেমে পড়েছিলেন ।

আমি হুটু বা টুটসি কোনো পক্ষেই ছিলুম না, আমি তো এথনিকালি ভারতীয়, কেনই বা থাকব কোনো একটা গোষ্ঠীতে, দাদা হুটু মেয়েকে বিয়ে করে সংসার পাতলেও । দাদার বাচ্চা ছেলেটার গলা চাপাতি দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছিল টুটসিরা । আমি পালিয়ে হুটুদের খুনী গোষ্ঠীতে যোগ দিই, বলতে পারেন প্রাণে বাঁচার জন্য ; তখন দুই পক্ষে আরম্ভ হয়ে গেছে তুমুল খুনোখুনি ।

বাবা-মা রোয়াণ্ডায় না গেলেই পারতেন । হুটু আর টুটসি প্রজাতির আফ্রিকানদের উৎস নিয়ে রোয়াণ্ডা আর বুরুণ্ডি আর হ্রদ এলাকায় বহুকালের বিতর্ক । ভারতীয়দের তো আফ্রিকা সম্পর্কে আগ্রহ নেই, তাই কোনো খবর রাখে না, কেবল আমেরিকা-ইউরোপে কি ঘটছে তা নিয়েই ব্যস্ত । রোয়াণ্ডায় হুটুরা সংখ্যাগরিষ্ঠ, তারা স্হানীয়, চাষবাস করে কাটাতো, টুটসিরা বাইরে থেকে এসেছিল, সাধারণত গরুর পাল চরাতো । বিরক্ত হচ্ছেন না তো ? আমার বিষয়ে জানার জন্য, আমার সৃষ্টিচেতনাকে বোঝার জন্য হুটু আর টুটসিদের খুনোখুনির ইতিহাসটা জানা জরুরি ।

আপনাদের ভারতে যেমন সাম্প্রতিককালে কে খাঁটি ভারতীয় তা নিয়ে দাঙ্গা হয়েছে, তেমনিই কারা খাঁটি ভূমিপুত্র তা নিয়ে গণহত্যা ঘটেছে ১৯৭২ সালে বুরুণ্ডিতে, ১৯৯৪ সালে রোয়াণ্ডায় আর ১৯৯৬ থেকে ২০০৩ পর্যন্ত কঙ্গোতে । প্রথমে ছোটোখাটো দাঙ্গা দিয়েই শুরু হয়েছিল, পরে যে ধরণের পারস্পরিক গণহত্যা হয়েছে তা বোধহয় হিটলারের জার্মানিতেও হয়নি ।  হিটলারের লোকেরা চাপাতি দিয়ে মানুষের হাত-পা কেটে ক্ষমতা দখলের লড়াই শুরু করেনি, যা হুটু আর টুটসিরা করেছিল । জেনোসাইড জানেন তো, জেনোসাইড, একজ্যাকটলি তাই, অনেক গ্রামে এখনও হাজার-হাজার মাথার খুলির পাহাড় পাবেন দেশগুলোয় গেলে। এর কারণ জানেন ? কারণ হল ইউরোপের সাম্রাজ্যবাদীদের আফ্রিকা নিয়ে ভাগ বাঁটোয়ারা । দেশগুলোকে কেটে তৈরি করার সময়ে ওরা খেয়াল করেনি যে আফ্রিকার উপজাতিদের প্রতিটি গোষ্ঠী নিজেদের ভৌগলিক এলাকায় থাকে, শান্তিতেই ছিল তারা, কিন্তু দেশগুলোকে গড়ে ওরা উপজাতিদের মধ্যে ক্ষমতার আর জমিজমার রেশারেশির সূত্রপাত ঘটিয়ে ফিরে গিয়েছিল, আড়াল থেকে শোষণ আর শাসনের জন্য । ম্যাপ খুললে দেখবেন বেশ কয়েকটা দেশের সীমা যেন স্কেল দিয়ে সোজা লাইন টেনে আঁকা ।[১৮]

প্রথমে বুরুণ্ডিতে হুটু বধ শুরু করে টুটসি সংখ্যাগরিষ্ঠ সৈন্যবাহিনী । প্রথম সাধারণ নির্বাচনে হুটুরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও রাজা মুয়ামবুটসা হুটু প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করার বদলে নিজের টুটসি সাকরেদদের নিয়োগ করেছিল, পূর্ব পাকিস্তানে যেমন শেখ মুজিবকে প্রধানমন্ত্রী করার বদলে ভুট্টোকে গদিতে বসানো হয়েছিল । পূর্ব পাকিস্তান আর পশ্চিম পাকিস্তান যদি পাশাপাশি হতো তাহলে পূর্ব পাকিস্তানকে বাঙালিমুক্ত করে দিত পশ্চিম পাকিস্তান, এখন যে চাপাতি কয়েকজনের ওপর চালানো হচ্ছে তখন তা হুটু আর টুটসিদের মতন বাঙালিদের ঘরে-ঘরে চালানো হতো ।

হুটু সৈন্যরা বিদ্রোহের চেষ্টা করেছিল, রাজা তখন ভয়ে পালায় । ১৯৭২ সালে হুটুরা সামনে যে টুটসিকে পেয়েছে তাকেই গুলি করেছে বা চাপাতি দিয়ে মুণ্ডু উড়িয়ে দিয়েছে, বাচ্চা ছেলে-মেয়েদের দুই হাত কেটে ছেড়ে দিয়েছে । টুটসি রাষ্ট্রপতির সৈন্যরা তখন পাইকারি হারে খুন করা আরম্ভ করলে হুটুদের । প্রাণ বাঁচাতে হুটুরা জাইরে, রোয়াণ্ডা আর তানজানিয়ায় পালালো । খুনোখুনির বিষ হুটুদের সঙ্গে পৌঁছোলো রোয়াণ্ডায় আর সেখানে প্রথমে দেখা দিল দাঙ্গা, তারপর পারস্পরিক খুনোখুনি, গৃহযুদ্ধ ।

১৯৯৪ সালের এপ্রিল থেকে জুলাই মাসের একশো দিনের মধ্যে রোয়াণ্ডার সংখ্যাগরিষ্ঠ হুটুরা প্রায় দশ লক্ষ টুটসিকে খুন করেছিল । আরম্ভ হয়েছিল রাজধানি কিগালিতে, আর সেই গণহত্যা দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল দেশের সর্বত্র, হুটুদের স্হানীয় সরকারি আধিকারিকরা তাদের  উসকিয়েছিল যাতে টুটসি প্রতিবেশিদের বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়, বাড়ির সবাইকে খুন করে, মেয়েদের গণধর্ষণ করার পর গলা কেটে উড়িয়ে দেয়, বাচ্চাদের হাত বা পা কেটে দেয় ।

টুটসিদের সেনাদল রোয়াণ্ডা প্যাট্রিয়টিক ফ্রণ্ট জুলাই মাসে প্রতিআক্রমণ করে কয়েক লক্ষ হুটুকে খুন করে, তাদের বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়, মেয়েদের গণধর্ষণ করে খুন করে, বাচ্চাদের হাত বা পা কেটে দেয় । কুড়ি লাখ মানুষ এই পারস্পরিক খুনোখুনিতে রূপান্তরিত হয় উদ্বাস্তুতে । ইউরোপ-আমেরিকা যখন নড়েচড়ে বসল তখন দেশটা ধ্বংসের পথে চলে গেছে । আসলে ইউরোপ-আমেরিকা যুগোস্লাভিয়ার ভাঙন নিয়ে যতো ব্যস্ততা দেখিয়েছিল, আফ্রিকার ক্ষেত্রে তারা চিরকাল চোখ বুজে থেকেছে কিংবা দেশগুলোকে ষড়যন্ত্র করে ধ্বংসের পথে পাঠিয়েছে, যাতে সেই দেশগুলোর খনিজের দখল নিতে পারে । রোয়াণ্ডায় সমস্যার বীজ পুঁতেছিল বেলজিয়াম, সংখ্যাগরিষ্ঠ হুটুদের বদলে টুটসিদের মসনদে বসিয়ে । [১৯]

আপনি হয়তো ভাবছেন কি আবোল-তাবোল আফ্রিকার খুনোখুনির ইতিহাস শুনিয়ে চলেছি । আমি, একজন ভারতীয়, যার সঙ্গে হুটু আর টুটসির খুনোখুনির কিছু করার  ছিল না, আমাকে মানসিক শান্তি খোঁজার পথ আবিষ্কার করতে হয়েছে, নিজেকে বাঁচিয়ে পালিয়ে বেড়াতে হয়েছে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মানুষহীন গভীর জঙ্গলে । খুনোখুনির দরুণ দেশের কৃষিব্যবস্হা এমন স্তরে গিয়ে পৌঁছেছিল যে জঙ্গলও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছিল, সব রকমের জন্তু-জানোয়ার ধরে খেয়ে ফেলতে বাধ্য হচ্ছিল মানুষেরা । ঝোপের খাটো হাতি, বাদুড়, লেমুর, ব্লু বাঁদর, গ্বেরেজা বাঁদর, জংলি লাল কাঠবিড়ালি, খরগোশ, জংলি ইঁদুর, হরিণ, জংলি বেড়াল, বেঁজি, অ্যান্টিলোপ, সাপ এমনকি গোরিলার মাংস, পুড়িয়ে, কাঁচা কাঠে পুড়িয়ে। আমাকেও খেতে হয়েছে সেই সব মাংস । জঙ্গলে বেশিদিন লুকিয়ে থাকা সম্ভব হয়নি । তাই ভিড়ে গেলুম হুটুদের সাথে, দাদার আর বৌদির হত্যার প্রতিশোধ নিতে ।

প্রতিশোধ নেবার জন্য আমি হত্যা, বাড়ি জ্বালানো, ধর্ষণের পথ বেছে নিইনি । আমি টুটসি নারীদের শবের সঙ্গে শোয়া আরম্ভ করেছিলুম, আমি তাদের সঙ্গে কেবল শুয়ে থাকতুম, আর জড়িয়ে ধরে কাঁদতুম, সারাদিন, সারারাত, ঘণ্টার পর ঘণ্টা । শব হলেও, একজন নারীকে জড়িয়ে বেশিক্ষণ ধরে থাকলে পুরুষের দেহ আপনা থেকেই জেগে উঠতে থাকে । ক্রমে আমার নেশা বা অভ্যাস হয়ে গেল শবের সঙ্গে শোয়া, তা হুটু নারীর হোক বা টুটসি নারীর । আমি বুঝতে পারছিলুম যে এই দাঙ্গা আর খুনোখুনি আরম্ভ হয়েছে আমার জন্যই, আমাকে এক নতুন শিল্পবোধে উন্নীত করার জন্য ।[২০] আমি গৃহযুদ্ধের আগুন থেকে বেরিয়ে এলুম সম্পূর্ণ এক নতুন মানুষ । কালো নারীর শবে আমি খুঁজে পেয়েছি ভাগ্যের দেবী তাইচেকে, ঔজ্জ্বল্যের দেবী পান্দিয়াকে, শান্তির দেবী আইরিনকে, শিকারের দেবী আর্টেমিসকে, প্রেম আর সৌন্দর্যের দেবী আফ্রোদিতিকে, জ্ঞানের দেবী আথেনাকে, জীবনমৃত্যুর দেবী ব্রিতোমার্তিসকে, প্রতিশোধের দেবী তিসিফোনেকে । অজস্র শব আমায় দিয়েছে নিরাময়, উপশম, সান্ত্বনা ।

আরে…কী করছেন…কী করছেন…শোবেন না…শোবেন না…আমার পাশে শোবেন না…নামুন…নামুন…

Posted in নেক্রোফিলিয়া | Tagged , | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

জঙ্গলরোমিও : মলয় রায়চৌধুরী

 

–কেন-কিঁ কেন-কিঁ কেন-কিঁ কবি লেখক নাট্যকার চিত্রকর অভিনেতা ভাস্কর স্হপতি এরা সবাই অসামাজিক গাধা…

–আরে…এই  মিশকালো নিনড় ভদ্রলোক বলেন কি… ছ’ফিটের হবেন বোধহয়…তাই বলে…

–নট মি…ইটস দি বার্ড’স সঙ…

–কথাগুলা উনার নয়…বাইঞ্চোত আমাগো টিয়াপাখির…উনি টিয়াপাখির কাছ থিকা শিখসেন…

–আপনি ওয়াঁকে নিগ্রো নিগার ব্ল্যাক মুলাট্টো যা ইচ্ছে বলতে পারেন…ওয়াঁর খারাপ লাগবে না…টু বি প্রিসাইজ…উনি আমেরিকান নন…আফ্রিকান…ওয়াঁর মা আফ্রিকা থেকে ইটালিতে গিয়েছিলেন…ওয়াঁর নামটা বিটকেল…ব্যঞ্জনবর্ণ দিয়ে শুরু… ওয়াঁর মতন জিভ মুচড়ে উচ্চারণ করতে হলে…বিদ্যাসাগর  মশায়কে তৃতীয়ভাগ লিখতে হতো…উনি কালু শুনতে অভ্যস্ত…জেলহাজতে ওয়ার্ডেনরা ওয়াঁকে কালু নামেই পেটাতো…আমরা ওয়াঁকে কালু না বলে শিস দিয়ে ডাকি…কালো মানে যে কয়লাটে তা উনি জানেন…অন্যদের জীবনের পাঁক তুলতে-তুলতে এদেশে এসে পৌঁছেচেন…ঠিকই… ওয়াঁর উচ্চতা সাড়ে ছ’ফিট…ব্লাডি ফাকিং হাইট…

–হ্যাঃ হ্যাঃ…কুড়ি কোটি দুর্যোধনের বাল…আমি সালা এগগালে নগসাল ছিলুম… মনে থাকে যেন…

–এই চুপ…যে মরে গেছে তার নকল করবেন না…

–বাংলা জানেন ?

–নাহ…টু বি প্রিসাইজ…ভাঙা-ভাঙা বাংলা…বাকিটা বোবামি দিয়ে বুঝিয়ে দেন…আপনি আমাদের সঙ্গে থাকতে থাকতে ব্লাডি ফাকিং ইউজড টু হয়ে যাবেন…আপনি ওয়াঁর মুখে এক্ষুনি যা শুনলেন…টু বি প্রিসাইজ…তা উনি শিখেছেন আমাদের টিয়াপাখির কাছে…টিয়াপাখিটা প্রতিদিন সকালে ওই কথাগুলো কপচে-কপচে আমাদের ঘুম চটকায়…জঙ্গলের এফ এম রেডিও বলতে পারেন…

–এখানে ডুয়ার্সের গভীর জঙ্গলে এসে জুটলেন কী করে…টিয়াপাখি আর কেলো দুজনেই ? টিয়াপাখি তো শুনেছি বাজার থেকে কিনে খাঁচায় না পুরলে মানুষের মাতৃভাষায় কথা বলেন না…জঙ্গল থেকে ধরে এনে সরাসরি কথা বলানো কঠিন…মানে…যায়ই না বলানো…কথা বলানোর জন্য খাঁচায় পোরা বা পায়ে শেকল বাঁধা জরুরি…দ্যাখেন  না…কাকাতুয়াদের পায়ে শেকল বেঁধে তারপর কথা বলানো হয়…উচ্চমাধ্যমিকে পড়েছিলুম…মানুষ হোমিনিড থেকে হোমোসেপিয়েন হতে পারতেন না…যদি না তাঁরা খাঁচা বা কারাগার আবিষ্কার করতেন…খাঁচা আবিষ্কার করে তাতে মানুষকে পোরবার পরই মানুষ গোঙাতে-গোঙাতে আমাকে ছেড়ে দাও… আমাকে যেতে দাও…আমি কিচ্ছু করিনি…ধরণের তোতলামি আওড়াতে বাধ্য হয়েছিলেন… লজ্জাস্হানে অশথ্থপাতা বাঁধা বা কোমরে ঝাউপাতা ঝোলাবার প্রথা তারপর ঘটেছিল…

–টু বি প্রিসাইজ…যেভাবে আপনি এখানে এসে জুটলেন… আমি এসে জুটেছি…উনি সেভাবেই এসে জুটেছেন…তবে ব্লাডি ফাকিং টিয়াপাখিটা একজন নেপোপ্রেমী চিৎফাঁদ পাঁজি টয়লেট কোম্পানির ঘ্যামচাঁদ মালিকের বাড়ি থেকে চুরি করে আনা…চোদ্দো হাজার কারখানা লাটে উঠে ওই একরকম কারখানাই তো টিকে আছে ধর্ষণমাতৃক দেশে…শ্বেতশুভ্র চিৎফাঁদ পাঁজির টয়লেট  রোল…নেপোপ্রেমী…দুটো টিয়াপাখি আমরা ওয়াঁর বাড়ি থেকে চুরি করে এনেছিলাম…অন্যটাকে গত বছর শেয়ালে বা কোনো জংলি জানোয়ারে পালকসুদ্দু খেয়ে ফেলেছে বলে মনে হয়…সেই পাখি অসামাজিক গাধার বদলে বলতেন সামাজিক চুতিয়া…

–মানে…কেন-কিঁ কেন-কিঁ কেন-কিঁ কবি লেখক নাট্যকার চিত্রকর অভিনেতা ভাস্কর স্হপতি এরা সবাই সামাজিক চুতিয়া ? তার মানে মরা পাখিটা জীবন্ত পাখিটার চেয়ে উচ্চশিক্ষিত  ছিলেন বলে অনুমান করতে পারা যায়…আই অ্যাম শিওর…তাঁকে নেপোপ্রেমী চিৎফাঁদ পাঁজি টয়লেট কোম্পানির বাড়িতে ওপরের খোপের খাঁচায় বেশিদিন থাকতে হয়েছে…

–চিৎফাঁদ পাঁজি টয়লেট  কোম্পানির নেপোপ্রেমী চৌখাম্বা মালিক প্রতি বছর যে খয়রাত দিতেন আর খাইখরচ… খোরপোষের সুপারিশ করতেন…তার জন্য পাখি দুটো পুষেছিলেন…পাখিদুটোর সামনে নাম লেখা গ্রিটিং কার্ড ফেলে দিতেন…টু বি প্রিসাইজ…যে পাখিটা চুতিয়া কপচে গান শোনাতেন…সেই পাখিটা যাঁর নামের কার্ড তুলতেন তাঁকে দশ গুণ…আর অন্য পাখিটা তুললে  চিৎফাঁদ পাঁজি টয়লেট কোম্পানির দশরঙা ক্যালেণ্ডারে তাঁদের ছবি ছাপিয়ে দিতেন…কাঁধে সিল্কের চাদর-গামছা দিয়ে…ঠাণ্ডা-মার্বোনাইটের দিওয়ানে-খাসে…সেসব ঐতিহ্যের কাহিনি ওনার চিৎফাঁদ পাঁজি টয়লেট নেপোপ্রেমী রোলেই নজরে পড়েছিল এককালে…আমরা যখন ওয়াঁর বাড়িতে ডাকাতি করতে গিয়েছিলাম…সেদিনকেই চিৎফাঁদ পাঁজি টয়লেট রোলে ছেপে  বেরিয়েছিল…কী অসাধারণ বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় উনি খয়রাত-খোরপোষ অনুদান প্রকল্প আবিষ্কার করেছেন…আমরা টয়লেট বা টিশ্যু ব্যবহার করার সুযোগ নমাসে-ছমাসে পাই… ওই যখন ব্লাডি ফাকিং ছোটো-ছোটো ঘটনা ঘটাতে বেরোই তখন সেদিনকার চিৎফাঁদ পাঁজি টয়লেট রোলগুলো কোনো ঠেক থেকে দুষ্টুমি করে তুলে নিই…যাতে প্রতিভাশালী গরুপাচারকারী আর সৃষ্টিশীল গাছ-মাছ-ঠিকেদার কত্তাদের খবরাখবর পাওয়া যায়…আর ডাকাতি করার নাব্যতা আছে এমন চিৎফাঁদ টয়লেট পাঁজি মালিকটালিকের নামসাকিন ঘাঁতঘোঁত জানা যায়…নয়তো ডুয়ার্সের এই গভীর জঙ্গলে বসবাস করে কী করেই বা জানা যাবে কারা কারা ব্লাডি ফাকিং ঘাপটি মেরে এদিক-ওদিক হাত ঢোকাচ্ছে…পাখিদুটোর সামনে  কেলো টয়লেট পেপারের টুকরো রেখে রেখে ওয়াঁদের এফ-এম বুকনির বদভ্যাসকে নিয়মিত করে ফেলেছিলেন…কার সঙ্গেই বা উনি কথা বলবেন বলুন…হয় পাখিদুটোর সঙ্গে…নয়তো নিজের প্রেমিকার সঙ্গে…ভালোই ফোঁড়তুলুনি প্রেমিকা পেয়েছেন…কথা আদান-প্রদানের অসুবিধা হয় না…

–খাঁচা থেকে কী করে খেলো জংলি জানোয়ার…আপনারা তো খাঁচাসুদ্দুই তুলে এনেছিলেন…নাকি ?

–হ্যাঃ হ্যাঃ…কুড়ি কোটি দুর্যোধনের বাল…আমি সালা এগগালে নগসাল ছিলুম…মনে থাকে যেন…

–এই চুপ…যে মরে গেছে তার নকল করবেন না…

–আমরা খাঁচাসুদ্দু চুরি করে এনেছিলাম বটে…কিন্তু টু বি প্রিসাইজ…জঙ্গলে উড়িয়ে দেবার পরও ব্লাডি ফাকিং পাখিদুটো  পালালেন না…থেকে গেলেন আমাদের সঙ্গে…বোধহয় মানুষদের সঙ্গে থাকার বদভ্যাস হয়ে গিয়েছে ওনাদের…ওই যে আপনি বললেন…একবার খাঁচায় ঢুকিয়ে বুলি শিখিয়ে দিলেই  তিনি হোমিনিড থেকে হোমোসেপিয়েনের রাস্তায় সরসরিয়ে নামতে শুরু করেন…লাল-গলা পাখিটাকেই খেয়ে ফেললেন কোনো নোলা-সকসকে জংলি জানোয়ার…সেই থেকে বেঁচে-থাকা সবুজগলা পাখিটা রাতের বেলায়  যাঁর ঘরে উড়ে গিয়ে বসেন ইউজুয়ালি সেই ঘরেই থাকেন রাতভর…মানুষ-ন্যাওটা হয়ে গেছেন পাখিটা…কুরুচকুনে টিয়া…

–যাক…জঙ্গলে আপনাদেরও টাইম পাস…ফুটপাতিয়া বাংলায় গালাগাল-গুঞ্জরিত এফ এম সঙ্গীত শোনেন…নয়তো…যা দেখছি…এখানে টিভি মোবাইল বা ওই ধরণের আমুদে গ্যাজেট জিইয়ে রাখার কোনো পরিষেবা নেই…এই সমস্ত ভেবেই আমি সন্ন্যাস নিয়ে হিমালয়ের কোনো গুহার জাঙালভিটে অ্যাডপ্ট করতে যাচ্ছিলুম…মরবার জন্য কারণ চাই তো…জেলে উদ্দেশ্যহীন ঘানি ঘোরাবার চেয়ে…

–আজকাল তো সন্ন্যাসীরাও ল্যাপটপ-পেন ড্রাইভ  আর মোবাইল ফোন…টু বি প্রিসাইজ…স্মার্ট ফোন রাখছেন… কুম্ভমেলায় হোমের আগুন জ্বেলে…ছিলিমে টান দিয়ে…ফোনে মিউজিকাল আশীর্বাদ দিচ্ছেন শিষ্যদের…মোবাইল টাওয়ারের আওতায় সন্ন্যাস নিলেই হল…টাওয়ারগুলো তো দিনকেদিন গ্রামগঞ্জের… শানপুকুরের…মঠের…বাউলদের…শ্মশানের…চিড়িয়াখানার কাছেপিঠে চলে যাচ্ছে…

–আইলেন কী কইরা বাইঞ্চোত এত দূর…ডুয়ার্সের জঙ্গলে…এত ভিতরে…ট্যুরিস্ট রুট ছাইড়া…ফেডেড জিন্স…সবুজ টিশার্ট…স্পোর্টস জুতা…মুক্তাছাগু দাড়ি…

–আমি তো আইনের চোখে আবির দিয়ে পালাচ্ছিলুম…ভেবেছিলুম হিমালয়ে কোনও পাথুরে আড়ালে ঠাঁই নিয়ে সন্ন্যাসীর জীবন কাটাবো…দমদম বিমান বন্দর থেকে ভুটানের পারো বিমানবন্দর…তারপর লোকাল বাসে করে গেলেফু…পারো থেকে গেলেফুও বিমানে আসতে পারতুম…পুলিশে ম্যানিফেস্ট দেখে তা থেকে ফলো করবে আঁচ করে লোকাল বাসে চাপলুম…গেলেফু থেকে হাঁটতে হাঁটতে বর্ডার পার করে শিলিগুড়ির দিকে না গিয়ে ডুয়ার্সের জঙ্গলে ঢুকলুম…তিন দিন হেঁটেছি…কী করব ভেবে পাচ্ছিলুম না…তারপর আড়াল থেকে আপনাদের চারজনকে দেখতে পেলুম…মাটির গর্তে কিছু করছেন…মনে হল আমার বয়সী একজন লোককে তাতে শুইয়ে দিয়ে মাটি ছড়িয়ে দিলেন… এরকম ঘন জঙ্গলে একজনের শবে মাটি ছড়িয়ে দিচ্ছেন দেখে মনে আশা জাগল যে হয়তো আপনারাও আমার মতন সামাজিক গাড্ডায় পড়ে গিয়ে থাকবেন…

[স্কাউন্ড্রেলগুলোর সঙ্গে ঠিকমতো কথা চালিয়ে যেতে পারছি মনে হয়…যা বলছে এরা…বেশ বিপজ্জনক লোকজন…পিওর ক্রিমিনাল না সন্ত্রাসবাদী যাচাই করে দেখা যাক…বেশ ঘাঁটি গেড়ে বসেছে জঙ্গলের ভেতরে…তবে রিপোর্ট ছিল কেবল একজনের উপস্হিতির…এরা তো একটা গ্যাঙ…]

–টু বি প্রিসাইজ…হয়তো ব্লাডি ফাকিং  গাড্ডা…কিন্তু সব গর্ত একই রকম হয় না…আপনার ব্লাডি ফাকিং গাড্ডার কথা বলুন…তারপর আমাদের গাড্ডার কথা শুনবেন…তবে…টু বি প্রিসাইজ…ব্যক্তিগত সাম্প্রতিকের কথাই কেবল বলবেন…আমাদের পারিবারিক বা সামাজিক অতীত নেই…বুদ্ধ বলে গেছেন… অতীত নিয়ে চিন্তা কোরো না…ভবিষ্যতের স্বপ্নে বিভোর হয়ো না…নিজের মনকে বর্তমান মুহূর্তের দিকে একাগ্র করো…বাই বুদ্ধ আই মিন গৌতম বুদ্ধ হু লেফ্ট হিজ ফ্যামিলি…নট দ্য ওয়ান হু ইজ লেফ্ট বাই দি লেফ্ট ফ্যামিলি…

–হ্যাঃ হ্যাঃ…কুড়ি কোটি দুর্যোধনের বাল…আমি সালা এগগালে নগসাল ছিলুম…মনে থাকে যেন…

–এই চুপ…যে মরে গেছে তার নকল করবেন না…

–যাঁর ওপর মাটি ছড়িয়ে দিলেন তিনি  আপনাদের কে ছিলেন… আত্মীয়… বন্ধু… বহিরাগত… চুকলিখোচর…দেহরক্ষী…

–না…না…তিনি আমাদের পঞ্চমজন…ভুল বলেছি…ষষ্ঠজন…ব্লাডি ফাকিং আত্মহত্যা করেছিলেন..টু বি প্রিসাইজ…নাম আমরা ব্যবহার করি না…পুরুষ মানুষের জীবনে সবচেয়ে ক্ষতিকর হল তার পোশাক আর নাম…আমরা নামহীন পুরুষদের নিয়ে পোশাকহীন সমাজ গড়ার পক্ষে…কেবল কোল-প্রেমিকাদের নাম থাকবে…আমাদের প্রেমিকাদের একটি করে নাম আছে…জঙ্গলে এসে আমরা বদলাইনি…জঙ্গলকেই বদলে দিয়েছি…সবাই মিলে যদি উলঙ্গ সমাজ গড়েন তাহলে ভয় শোক মায়া লজ্জা অপমান ঘেন্না অমর্যাদা সংশয় থেকে ছাড়ান পেয়ে যাবেন…প্রেমিকারা আমাদের মরমিয়া উদ্ধার…

–এখানে জঙ্গলে এসে আত্মহত্যা…স্ট্রেঞ্জ…সমাজ সংসার ছেড়ে এসেও আত্মহত্যার কারণ থাকে নাকি…

–এঁড়ে নেকুপুসু জিদ…ওয়াঁর  প্রেমিকার বিশ্বাসঘাতকতা সহ্য করতে পারেননি উনি…যে  প্রেমিকা ওয়াঁর ছিল…তাঁকে উনি বলতেন চাঁদবদনী…লিগালি ব্লণ্ড…

–ওঃ…প্রেমিকার  জন্য বিবাগী হয়ে চলে এসেছিলেন…তা সে তো ওনার বয়ঃসন্ধির রসকশের দিনকালে ঘটে থাকবে…যদিও দূর থেকে আবছা দেখে  মনে হল আমার-আপনার চেয়ে কচিনধর মানুষ…

–আমরা জঙ্গলে নিজের-নিজের সোহাগী প্রেমিকার সঙ্গেই বসবাস করি…ওয়াঁর প্রেমিকাও এখানেই থাকেন…

–প্রেমিকা…বিয়ে-শাদি-নিকা না করে সবাই লিভটুগেদার করছেন নাকি…চুল দাড়িও কামান না…আঁচড়ান না…সবাই…গায়ের দুর্গন্ধে মহিলারা অবজেক্ট করেন না ? সকলে এভাবে বাসি নোংরা লুঙ্গি পরেই কাটিয়ে দেন…খালি পায়ে…দাঁত মাজেন না…চোখে পিচুটি…নখে ময়লা…

[ প্রেমিকা…ডুয়ার্সের গভীর জঙ্গলে প্রেমিকা…তারা কারা…এদের মতোই নোংরা…এদের দলের মহিলা সদস্য…নাকি জোর করে তুলে এনেছে…বলছে লিগালি ব্লণ্ড…বিদেশিনী হবে…আরও খুঁচিয়ে এদের কাণ্ডকারখানা জানবার চেষ্টা করি…]

–না…কেন অবজেক্ট করবেন…ওয়াঁদের থেকেই আমাদের গায়ে…আপনি যাকে বলছেন দুর্গন্ধ…আর আমরা বলি সুগন্ধ…তা ছড়িয়ে পড়ে…মন দেয়া-নেয়ার ঢঙে গন্ধ দেয়া-নেয়া…দরকার পড়লে কেলো চুল দাড়ি কেটে দ্যান…ওয়াঁর কাছে খুর আছে ব্লাডি ফাকিং সেল্ফ ডিফেন্সের জন্য…মুর্গি-খরগোশ-বাদুড় কাটার জন্য অবশ্য ছুরি-চপার আছে…সেই খুর ব্যবহার করে সবাই নমাসে-ছমাসে গোঁপদাড়িভুরুবগলকুঁচকি কামিয়ে  চুলহীন হয়ে যাই…চুলের কোষাগারে জমা থাকে…পাথরে ঘষে খুরে শান দিয়ে রাখেন…কাঁচিও আছে…যদি দরকার পড়ে…আমরা কারোর জন্য স্মৃতি ছেড়ে যেতে চাই না…চুল ছাড়া…নাম থাকলেই স্মৃতির ঝুঠঝামেলা… ইতিহাস-ফিতিহাস…আমাদের প্রেমিকাদের মন আর হৃদয় টাইপের ফালতু ব্যাপারের ঝঞ্ঝাট নেই…কেননা ওনাদের রয়েছে পবিত্র প্রবৃত্তি…বিশুদ্ধ প্রেম…

— সব সময় সবাই খালি গায়ে এই চাককাটা লুঙ্গি পরেই থাকেন…নাকি প্যান্ট-শার্টও পরেন ?

–না…বাইঞ্চোত সাধারণত আমরা সবাই নাঙ্গা পোঙায় থাকি…নাঙ্গা চুকিতকিত খেলি…গাছের ডালে-ডালে নাঙ্গা চোর-পুলিশ খেলি…দোলনচেয়ারে নাঙ্গা দোল খাই…ছিলিমে পাতা ফুঁকি…নাঙ্গা দাবা খেলি…নাঙ্গা তাস খেলি…নাঙ্গা লুডো খেলি…আইজকা উনি মারা গ্যালেন বইলা সন্মান জানাইতে লুঙ্গি পইরতে হইল…জঙ্গলের প্রাণীগো পোশাক পরনের প্রয়োজন নাই…

–আপনি বাঙাল নাকি ?

–হ্যাঁ..উনি রায়টের পরের বাঙাল…রায়টের আগের হলে ওয়াঁর মুখে শুদ্ধ বাঙালেবুলি শুনতেন… বাবুয়ানি দেখতেন…

–আচ্ছা…

–টু বি প্রিসাইজ…আমরা জানি যে পুরুষের পক্ষে পোশাক ব্যাপারটা ক্ষতিকর…শুধু শীতকালে  ঠাণ্ডায় ব্লাডি ফাকিং প্যান্ট-শার্ট-সোয়েটার-কোট-জুতোমোজা না পরলেই নয়…বর্ষায় রেইনকোট…সিসিটিভি থেকে মুখ আড়াল করার ছাতা…যিনি মারা গেছেন তিনি টাকমাথা ছিলেন…ভাবুক ছিলেন তো…পাদতেন আর বলতেন সরি…কম বয়সে টাক পড়ে গিয়েছিল…শীতের সময় টুপি পরতেন…আর জঙ্গলের বাইরে ডাকাতি করতে যেতে হয়…যখন যেমন ডাকাতি তার তেমন পোশাক…আমরা টুকরো-টুকরো ঘটনা দিয়ে গড়া…গন্ধ তো হবেই… থাকতে-থাকতে আপনারও অভ্যাস হয়ে যাবে…ডোন্ট ওয়রি…অভ্যাস আমাদের দাস…যিনি মারা গেলেন তিনি ডাকাতিতে অংশ নিতেন না…সংসার পাহারা দিতেন…চাবির থোলো হ্যাণ্ডল করতেন… এক-তরকারি… দু-তরকারি ভাত রেঁধে রাখতেন…আপনাকে আপাতত ওয়াঁর ডিউটি দেয়া হবে…

–হ্যাঃ হ্যাঃ…কুড়ি কোটি দুর্যোধনের বাল…আমি সালা এগগালে নগসাল ছিলুম…মনে থাকে যেন…

–এই চুপ…যে মরে গেছে তার নকল করবেন না…

–আমার যা ঘেমো প্যাচপ্যাচে হাল…আজকেই চুলহীন হয়ে গেলে ভালো হতো…তিন-চার দিনের খোঁচা দাড়িও খচখচ করছে…

–এক্ষুনি হবার দরকার নেই…সবাই যেদিন হবো…আপনিও হবেন…তাড়াহুড়োর কী আছে…টু বি প্রিসাইজ…চুলহীন হওয়াকেও উৎসব বলে মনে করুন না…তা হলেই তো হল…চুলহীন দেহে সবাই মিলে উলঙ্গ নাচার আনন্দই আলাদা…সেদিন যদি বৃষ্টি পড়ে তো কথাই নেই…এই বয়সে নাচানাচি করেছেন কখনও…না প্রাইমারি স্কুলেতেই ঠ্যাঙের পাঁই-পাঁই ফুরিয়ে গেছে…উচ্ছৃঙ্খল না হলে নাচতে পারবেন না…

–শহরে এই বয়সে কি আর নিজে-নিজে নাচার অবসর থাকে…নানা রকমের সরকারি আর দলীয় বাঁশ নাগরিককে নাচাতে থাকে…নিজে উলঙ্গ হতে হয় না…ওনারাই খুলে নেন…

–তাহলে এখানে আমাদের সঙ্গে চুলহীন গায়ে…ব্লাডি ফাকিং বিনা বাঁশের ফ্রিস্টাইল নাঙ্গা নাচ নাচতে পারবেন… লকিং পপিং শিমিং বামিং…আর যা ইং ইং নাচ হয়…

–ব্যায়াম করেন না আপনারা ?

–করি…করি…সক্কালবেলায় সবাই আচ্ছা-করে কেজেল একসারসাইজ করি…প্রেম করার জন্য খুবই জরুরি…স্বাদের তার পাওয়া যায়…

–ওই যে দেখা যাচ্ছে…দূরে…সবাই মিলে ওই একটা পুরোনো তিনতলা  বাড়িতেই থাকেন ? নাকি রেড- ইনডিয়ান স্টাইলে প্রত্যেকে কুটির-টুটির ঝোপড়ি-টোপড়ি তৈরি করে তাতে প্রেমিকাদের সঙ্গে থাকেন ? চলেই বা কী করে ? জনপদ থেকে তো বেশ দূরে…গভীর জঙ্গলে…দোকান-বাজার…

–টু বি প্রিসাইজ…বলেছি তো…ব্লাডি ফাকিং চুরি-ডাকাতি করে…সাধারণত চিৎফাঁদ পাঁজি টয়লেট নেপোপ্রেমী শীর্ষকত্তা কিংবা  ভুঁড়োকাত্তিক গাছ-মাছ-ঠিকেদার ছাতুদাদা-লাটুদাদাদের বাড়ি বা অফিসে ডাকাতি করি আমরা… ব্যাঙ্ক-ট্যাঙ্কের গেঁও হাই-তোলা ছলঘুমন্ত কেরানিদের অফিসেও ডাকাতি করি…আমাদের একজন গিয়ে ঢুঁ মেরে দেখে আসে কারা কারা শীর্ষকত্তা হয়েছে বা মাছ-গাছ-ঠিকেদারিতে পেল্লাই…সিঁধ কাটা বা হামলে পড়া যাবে…অপরিচিত শহর হলে সেখানের পথের কোনো ষাঁড়ের পিছুপিছু একজন যান পুরুত সেজে…ষাঁড়েরা ধনীদের বাড়ির খবর রাখে…দামি ফলটা-আশটা পায়…বড়সড় দাঁও মারতে পারলে ভালো…নয়তো ফলটল…মুর্গি-টুর্গি রেঁধে-পুড়িয়ে খেয়ে  উলঙ্গ কাটিয়ে দিই যত দিন পারা যায়…তবে আমাদের প্রেমিকাদের খাওয়াবার দায়িত্ব প্রত্যেক প্রেমিক নিজে নেন…তাঁদের আমরা অভুক্ত রাখি না কখনও…তাঁদের ডিপ্রেশানে ভুগতে দিতে পারি না…প্রেম অবিনশ্বর…আট হাজার বছর আগের গুহার দেয়ালেও আঁকা পাবেন…

–তার মানে এই জঙ্গলেও পার্টিবাজি…কোন দল…এনি কালার হেটরেড…

–আমরা কাউকে অচ্ছ্যুৎ অস্পৃশ্য মনে করি না…টু বি প্রিসাইজ…আমাদের চোখে সবাই ব্লাডি ফাকিং ব্ল্যাক…চুলের মতন…

–দুর্যোধনের বাল…নট চুল…

–কালু ভদ্রলোক যা তাগড়া… ডাকাতিতে গাজোয়ারি বা ভয় দেখাতে সুবিধাই হয় ওনার সাহায্য নিয়ে…আফ্রিকার মানুষদের টেসটোসটেরনের মাত্রা বেশি…তাই তো ওনারা সব রকমের দৌড়ঝাঁপে এগিয়ে… কোন আফ্রিকার লোক ? আজকাল আফ্রিকা তো নানারকম…অবশ্য আফ্রিকার লোকেদের দেখে কে যে কোন আফ্রিকার  বোঝা কঠিন…ডাকাতি ব্যাপারটা প্রকৃতিও মেনে নিয়েছে…এই তো জঙ্গলে যে গাছ যতো উঁচুতে ওঠে সে তার শেকড়কে তত তলায় নামাতে থাকে…ওপরে উঠতে হলে শোষণের জন্য নিচে নামতেই হবে…গোড়ার কাছে কাউকে মাথা তুলতে দেয়া হয় না…প্রকৃতির রাজনৈতিক নিয়ম…

–টেসটোসটেরনের মাত্রা আমাগো কারোরই কম নয় দাদা…আমাগো প্রেমিকাদের সঙ্গে আলাপ হইলে জাইনতে পারবেন…কে কতটা ল্যাঞ্জাধারী…উনাদের হইলেই হইল…অরগ্যাজমের চাহিদা নাই…ইনফ্যাচুয়েশানের দুর্ভোগ নাই…

–হ্যাঃ হ্যাঃ…কুড়ি কোটি দুর্যোধনের বাল…আমি সালা এগগালে নগসাল ছিলুম…মনে থাকে যেন…

–এই চুপ…যে মরে গেছে তার নকল করবেন না…

–নিউকামার মোসাই…ওসব শোষণ-শাসনের ইশতাহারি বক্তিমেবাজি ছাড়ুন…বলেছি তো…আমাদের ব্লাডি ফাকিং পারিবারিক সামাজিক অতীত নেই…মানে আমাদের ওপরে ওঠা আর নিচে নামার সুচিন্তা বা দুশ্চিন্তা নেই… কেলোর কোনো দেশ নেই…ছিল এককালে…এদেশে যেদিন ঢুকেছেন সেদিনই উনি নিজের ব্লাডি ফাকিং পাসপোর্ট ছিঁড়ে ফেলে দিয়েছেন…টু বি প্রিসাইজ…ধরা পড়ার পর…আদালতে কয়েকবার তোলা হয়েছিল ওয়াঁকে…তুললে বলতেন যে উনি এদেশেরই লোক…সরকার প্রতিবার হিমসিম খেতো প্রমাণ করার জন্য যে উনি এদেশের নাগরিক নন…যারা ব্লাডি ফাকিং এদেশের নাগরিক তারা গুচ্ছের কাগজপত্র যোগাড় করতে হাল্লাক হয়ে যায় নিজেদের নাগরিক প্রমাণ করার জন্য…যারা নাগরিক নয় তারা যে সত্যিই নাগরিক নয় তা প্রমাণ করার জন্য সরকারকে হন্যে হয়ে ব্লাডি ফাকিং প্রমাণপত্র খুঁজে মরতে হয়…গায়ের রঙ দেখে তো আর দেশ বোঝা যায় না…

–আপনাদের সঙ্গে পরিচয় হল কী ভবে…

–যেভাবে আপনার সঙ্গে হল…চোখাচুখি…টু বি প্রিসাইজ…আমরা একই ব্লাডি ফাকিং কারাগারে বিচারাধীন কয়েদি ছিলাম…আদালতে নিয়ে যাবার পথে কন্সটেবলদের পেঁদিয়ে পালাই…কেলোই সাহায্য করেছিলেন…আমি এই অঞ্চলের লোক হওয়ায় ডুয়ার্সের ঘাঁতঘোঁত ছোটোবেলা থেকে চিনি…তাই সবাইকে নিয়ে ভুটানের সীমায় এই গভীর জঙ্গলে চলে এলাম…এটা রিজার্ভ ফরেস্টের প্রায় নো ম্যানস ল্যান্ড…পর্যটকরা ল্যাংচাতে-ল্যাংচাতে এখান পর্যন্ত পৌঁছোতে পারেন না…আট বছর হয়ে গেল…বললাম তো…আমরা আমাদের পারিবারিক সামাজিক অতীত  ডিলিট করে দিয়েছি…পরিবার হলো অতীতের পরানো আপনার পায়ের মরচেপড়া বেড়ি…আর ভবিষ্যত হল আপনার সামনে লোভের সরকারি সেতু…মানুষের মতন মানুষ হয়ে বাঁচতে হলে…বেড়ি আর সেতু দুটো থেকেই ছাড়ান পেতে হবে…স্মৃতিকে ডিলিট করে ফেলুন…অতীতকে ক্ষমা করলেই ডিলিট করে দিতে পারবেন… আমরা অতীতহীন…কবে যে স্মৃতিহীন হবো জানি না…আপনার নাম আমরা জানতে চাই না…আমাদেরও কারোর কোনো নাম নেই…আপনিও আপনার নাম-পদবি টুসকি বাজিয়ে ভুলে যান…

–হ্যাঁ…বাজালুম…ছেলেবেলায় আমায় ডাকনামে ডাকা হতো…তারপর ডাকনামটা একটু-একটু করে উবে গেল… ডাকনামে ডাকার লোকেরাও উবে যেতে লাগল…তারপর তাঁরা সবাই হাপিশ…ঠিকই বলেছেন…অতীত নিয়ে গর্ব করার মানে হয় না…তা নিজের হোক বা নিজেদের বা পরের…অতীত বললেই কেমন যেন একটা স্যাঁতসেঁতে প্যাচপেচে গন্ধ নাকে এসে লাগে…বিলডারে নিতে পারেনি…কাঙালিরা জবরদখল করতে পারেনি…এরকম… বনেদি কলকাতার নোনা ইঁটের ঝুরঝুরে কোম্পানি আমলের বাড়ি…

–আপনার সঙ্গে ব্লাডি ফাকিং অন্যদের পরিচয় করিয়ে দিই…ইনি…ইনি…ইনি… আর আমি…কেলোকে তো নিজেই চিনে নিয়েছেন…আর যিনি মারা গেছেন তিনি ওইখানে কবরে শুয়ে ঘুমোচ্ছেন…আই মিন চিরনিদ্রায়…

–আপনিই নেতা ? আপনিই শুধু কথা চালিয়ে যাচ্ছেন…বুলির থান-থিত্তি ভালো…অথচ সকলের চেয়ে আপনিই বোধহয় বেঁটে… বেশ সখিমুখো আর ফর্সা…উকিলি ছিরিছাঁদও আছে…গাঁট্টাগোট্টা নেপোলিয়ানিক মুশকো জোয়ান…সিক্স প্যাক বুকপেট করে নিতে পারতেন…

–আমাগো বাইঞ্চোত ফ্যামিলি প্যাক গোদলা তলপেটই কাজে দেয়…আমরা কুস্তি-প্রেম…নখরা-প্রেম করি না…

–হ্যাঃ হ্যাঃ…কুড়ি কোটি দুর্যোধনের বাল…আমি সালা এগগালে নগসাল ছিলুম মনে থাকেন যেন…

–এই চুপ…যে মরে গেছে তার নকল করবেন না…

–টু বি প্রিসাইজ…আমার হাইট চার ফিট সাত ইঞ্চি…আপনি তো আমার মুখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে চলেছেন…তাই ব্লাডি ফাকিং উত্তরও আমিই দিচ্ছি…সবাইকে পথ দেখিয়ে গভীর জঙ্গলে এনেছি…সবাই আমায় অনুসরণ করেছে…সুতরাং আমিই আমাদের স্বরাষ্ট্র  আর খুনোখুনির কর্ণধার…ইনি যানবাহন আর ছিনতাই… ইনি অর্থ আর চুরিডাকাতি…যিনি মারা গেলেন তিনি সংস্কৃতি আর রান্নাবান্না…ইনি…

–এবার তাহলে ওনাকে জিগ্যেস করি…উনি আমার মতনই তামাটে আর মাঝারি…তবে টিঙটিঙে রোগা…আর ট্যারা চোখ… কোঁকড়া চুলও আছে আমার মতন…স্যার…আপনি আমাকে মারতে চাইছিলেন কেন…গুলি চালালেন আমাকে লক্ষ্য করে…ভাগ্যিস টিপ ফসকে গিয়েছিল…নয়তো মারা পড়তুম…রাইফেলটা নামিয়ে রাখুন…প্লিজ…

–টিপ ফসকায় নাই…আপনারে বাইঞ্চোত সতর্ক করার জন্য গুলি চালাইয়াসিলাম…তাছাড়া বুইঝলেন কিনা… আপনে বন্দুক তাক করা হতেসে দেইখা দুইহাত উপরে তুইলা হ্যাণ্ডস আপ কায়দায় স্হির হয়্যা দাঁড়াইয়া পড়সিলেন… বুইঝতে পারলাম যে আপনে বাইঞ্চোত ট্রেসপাসার নন…কুনো ভিতু-ছাপ পথভুলা ট্যুরিস্ট বা ভুলাক্কড় বনবিজ্ঞানী…আপনের কাঁধে বইমেলার কবি টাইপের এই ঝোলা সাড়া আর কিসু নাই দেইখাও আস্বস্ত হইসি… বাইঞ্চোত  ঝোলা সার্চ কইরা কেবল আখরোট কাগজি বাদামের প্যাকেট জলের বোতল আর দুটা পেনসিল টর্চ… বুইঝলেন কিনা…সুতরাং আপনে পুলিসের টিকটিকি কিংবা বনবিভাগের গিরগিটি নন বইলা অনুমান করতে পারলাম…মিনারাল ওয়াটারের বোতল নিয়া সন্ন্যাসজীবন বাইছা নিয়াসেন…

–জামা-প্যান্ট সার্চ করার সময় কাতুকুতু দিচ্ছিলেন কেন…

–আপনের বেবি-কচ্ছপ চেক কইরা নিতে হইল… যে আপনে ব্যাটাছেলে না মেয়্যাছেলে…আর কুঁচকির ভাঁজে ছোরা-পিস্তল লুকায়ে রাখসেন কিনা তাও যাচাই করা বাইঞ্চোত জরুরি আছিল…

–রাতে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে হাঁটার সময় আওয়াজ শুনলেই টর্চ দুটো দুহাতে নিয়ে জ্বেলেছি…যাতে জংলি জীবজন্তুও আমাকে কোনো জানোয়ার মনে করে পালায়…দিনের বেলায় একটা হিজল গাছের তলায় ঘুমিয়ে নিয়েছিলুম…ওই যে নিচের দিকে জলের সোঁতামতন আছে…সেখানে…

–দূর থেগে আবনাগে হারামি বলেই মনে হচ্ছিল…

–হ্যাঁ…ওনার লক্ষ্য অব্যর্থ…আর্মি সেপাই ছিলেন তো…আর্মির ব্লাডি ফাকিং ডেজার্টার…

–রোজরোজ বাইঞ্চোত লেফট রাইট ভালো লাগত না আমার…বুইঝলেন কিনা…সৈন্যবাহিনীর কাজ যুদ্ধ করা…বেয়নেট দিয়া খোঁচানো…বিপদের ঝুঁকি ছাড়া বেঁচে থাকার কুনো মানে নাই…তা নয় আজ বইন্যা তো কাল ভূমিকম্প তো পরশু দাঙ্গা তার পরের দিন ট্রেন দুর্ঘটনা…এই সব কাজে লাগাইয়া জীবনটারে নষ্ট কইরা দিতে আছিল…তাতে গাঁইগুঁই কইরবার ফলে…বুইঝলেন কিনা…আমারে একজন কর্নেলের বাড়ির চাকর কইরা দিলে… ব্যাটম্যান…আজকাল যারে কয় সহায়ক…সায়েবের জুতার গু-গোবর  পরিষ্কার করা থিকা ম্যাডামের ঝুলঝাড়া পর্যন্ত সবই কইরতে হইত…একদিন পুরা বোতল ব্র্যাণ্ডি-টানা বেহেড ম্যাডাম আর কেইলে-পড়া কর্নেলের ঢলে পড়ার সুযোগে…উনার রিভলভার…রাইফেল আর বেশ কিছু কার্তুজ নিয়া বুইঝলেন কিনা… বাইঞ্চোত সটকে পইড়লাম…মিলিটারি পুলিস ধইরতে পারে নাই…ধইরলে কলকাতার পুলিস…রিভলভারটারে বিক্রি করার সময়ে…শালা যে গুণ্ডারে বিক্রি করতে গেলাম সে বাইঞ্চোতই পুলিসের ফাঁদ পাইতা ধরাইয়া দিলে…বাইঞ্চোত খোচর ছিল কী কইরাই বা জানুম…আইজকাল ভোটার-নাগরিকের চাইতা খোচর-ভোটারের সংখ্যা বেশি তা জাইনতাম না…তারপর তো শুইনলেন… কেলোদের সঙ্গে একই প্রিজন ভ্যানে  যাইবার সময়ে…বুইঝলেন কিনা…আমরা প্যাঁচ কইষা নিয়াসিলাম যে কন্সটেবলগুলারে পিটাইয়া পলাইমু… পলাইলাম…আর উনার ডুয়ার্সের অভিজ্ঞতার পিছন-পিছন…বুইঝলেন কিনা…নানা পথে বাইঞ্চোত পৌঁসাইলাম এই জঙ্গলে…সেসব আট বৎসর আগের গল্প…আপনে তো আমাদের ঘটনা শুনতে ব্যস্ত…নিজেরটা বলেন… কী কাজ কইরা পলাইতে আছিলেন…

–ডাক্তারি করতুম…নার্সিং হোম খুলেছিলুম…যা হয় নার্সিং হোমে…অ্যাবরশানের কেস আসত…প্রথম দিকে আইনি গর্ভপাত করতুম…ক্রমে বেআইনি অ্যাবরশানও করতে আরম্ভ করলুম…তা বেশি রোজগারের লোভে মেয়ে পাচার দলের পাল্লায় পড়ে গেলুম…মেয়ে পাচারে সরাসরি যুক্ত ছিলুম না…পাচারকারীরা যেসব মেয়েদের ধরে আনত তাদের অপারেট করে ফ্যালোপিয়ান টিউব বাদ দিয়ে দিতুম যাতে ব্যবসায় নেমে পেটে বাচ্চা না আসে…কারোর ভালো করার দিনকাল আর নেই…আমি তো মেয়েগুলোর ভালোর জন্যই কাজটা করছিলুম…কোথায় অন্য রাজ্যের রেডলাইট এলাকায় বা আরব দেশ-টেশে গিয়ে যাতে বিপদে না পড়ে… হরিয়ানায় বিয়ে করার মতন মেয়ের সংখ্যা কমে যাবার ফলে পাচার বেড়ে গেছে…একই পরিবারে বাবা-কাকা-দাদা-ভাই-ছেলে-ভাইপো সবাই মিলে একটা মেয়ে কিনে পারাপারি করে কাজ চালাচ্ছে…কেনার আগে ওদের শিওর হতে হয় যে ফ্যালোপিয়ান টিউব কেটে বাদ দেয়া আছে কিনা…

[ যাক…স্কাউন্ড্রেলগুলোর কাছে বিশ্বাসযোগ্য গল্প নিজের সম্পর্কে বানিয়ে ফেলতে পেরেছি…নিজেকে ফেরারি অপরাধী না বললে এদের সন্দেহ হতে পারে…দেখা যাক…সাবধানে কথা বলতে হবে যাতে না বেফাঁস কিছু বলে ফেলি…ইনটেলিজেন্সের রিপোর্ট ছিল যে হেলিকপ্টার থেকে এই জঙ্গলে কেবল একজনকেই টার্গেট প্র্যাকটিস করতে দেখা গেছে…লঙ্গিচুড-ল্যাটিচুড ক্যালকুলেট করে লোকেট করেছিল ডিপার্টমেন্ট…বাড়িটা গাছে ঘেরা বলে বোধহয় দেখতে পায়নি…পাঁচ-ছয়জন রয়েছে জানা থাকলে সম্পূর্ণ টিম নিয়ে আসা যেত…আট বছরের পুরোনো ফেরারি বলেই হয়ত এদের ফাইলগুলোয় ধুলো জমেছে…কেস ডরম্যান্ট হয়ে আছে… ]

–তা করতে গিয়ে ব্লাডি ফাকিং মেরেও ফেলেছেন হয়তো…কোথায় আপনার নার্সিং হোম…কোন পাড়ায়…কত নম্বর বিল্ডিং…

–হ্যাঁ…একটা মেয়ে মরে গেল…তার পেটে আগেই বাচ্চার জেলি তৈরি হওয়া আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল…হাওড়ার ভোজপুরি মিউজিক রোডে…পাবলিক আমার নার্সিং হোম ভাঙচুর করলে…ঘুষের টাকা খেয়েও কন্সটেবলরা হাজতে ঠ্যাঙালে… জামিনে ছাড়া পেয়ে…ব্যাস…ভাবলাম সন্ন্যাসী হয়ে যাব হিমালয়ে গিয়ে…নয়তো জেল খাটতে হত…

–দুর্যোধনের বাল…চলুন…আমাদের জাঙাল-বাড়িতে যাওয়া যাগ…বুজে ফেলেচেন নিশ্চই যে আমাদের সঙ্গে আবনাগে থাগতিই হবে…পালাবার চেষ্টা করবিন না…নো এগজিট…পালাবার চেষ্টা করলিই পকাৎপঙ…

–বুইঝলেন কিনা…আমরা কেউই পলাইবার চেষ্টা করি না…একসঙ্গে থাইকবার বাইঞ্চোত শর্ত হইল যে কেউ যদি পলাইয়া যাইবার চেষ্টা করে…আর যদি সে ধরা পইড়া যায়…তাইলে অন্যেরা সালিসি সভা ডাইকা তার বিচারের নাটক কইরা…সামারি এগজিকিউশান করবে…মইরা যাইবার পরে যেইহানে তারে গোর দিয়া হইবে সে জায়গাটা তারে দিয়া আগে থিকা খুঁড়াইয়া রাইখা হইবে…মেজরিটি ডিসিশান ইজ ফাইনাল…ফলে কেউ কারোর নজরদারি করি না…তবে…বুইঝলেন কিনা…বাইঞ্চোত একটা ঘটনা ঘইটা যাইবার পর প্রতিরাতে একজন জাইগা পাহারা দেই…কেননা পুলিস বা পোচার বা ফরেস্টের পাহারাদার এখানে পৌঁছে গ্যালেই ক্যাওড়া…

–হ্যাঃ হ্যাঃ…কুড়ি কোটি দুর্যোধনের বাল…আমি সালা এগগালে নগসাল ছিলুম…মনে থাকে যেন…

–এই চুপ…যে মরে গেছে তার নকল করবেন না…

–আর কোথাও পালাবার জায়গা নেই দাদা…ভেবেছিলুম  নেপাল-ভুটানের জঙ্গলে একাই কাটিয়ে দেব… ভাগ্য ভালো যে আপনাদেরও পেয়ে গেলুম…নজরদারির কথাটা তুলে ভালো করলেন…পশ্চিমবঙ্গের শহরে থাকুন বা গাঁয়ে…আসেপাশের মানুষ সব সময় আপনাকে নজরে-নজরে রেখেছে…পাড়ায় পাড়ায়…দুই দলের দুটো করে ডোসিয়ার তৈরি হয়ে গেছে আপনাকে নিয়ে…কোথায় যাচ্ছেন…কার সঙ্গে মিশছেন…কোথায় চাকরি করেন… কত টাকা রোজগার করেন…কোন ব্যাঙ্কে আপনার অ্যাকাউন্ট…পোস্ট অফিসে কত টাকা আছে…নিজের বাড়ি না ভাড়া…কত ভাড়া দেন…কার কাছে সবজি কেনেন…কোন মাছ কেনেন জিওল না কাটাপোনা…বাঙাল ছিলেন না ঘটি…জবরদখল না নিজের জমি…মলে-মালটিপ্লেক্সে যান কিনা…পিওন কার চিঠি এনে দিল…কাকে চিঠি লিখছেন…কাগজের সম্পাদকদের নালিশ-চিঠি লিখছেন কিনা…কার বাড়ির দিকে তাকিয়ে বেশি দ্যাখেন… কোন দিকের জানলা খুলে রাখেন…কোন টয়লেট রোল পড়েন… ইত্যাদি…কত্তাবাবা বা কত্তামা নয়… চুনোটেঁটিয়ারা নজরে নজরে রেখেছেন…সবাইকে…কত্তাবাবা বা কত্তামা নজরে রাখেন চুনোটেঁটিয়াদের…

–তা যা বলেচেন…আমাদের জাঙালে অমন বাবা-মা সিস্টিম নেইকো…দুর্যোধনের বাল…আবনাগে পেয়ে…আমরাও মরা সহখুনির জায়গায় আরেগজন সহখুনি পেয়ে গেলুম…ওনার শোবার ঘর আর জিনিসপত্তর আবনার কাজে লাগবি…যদিও উনি আমাদের সঙ্গে জাঙালের বাইরে যেতিন না…মুর্গি খুন…খরগোশ খুন…এই কাজগুনোর ভার নিয়েছিলিন…রান্নাবান্না…সংসার…দেকাশোনা…ফ্লিট মারা…সদর দরোজা বন্দ করা…রোদলন্ঠন রোদে রাখা…

–সহখুনি…আপনারা সবাইই কি খুন করেছেন নাকি…আমি তো বেশ ডিজেক্টেড ফিল করছিলুম যে সমাজের একটা আউটকাস্ট ক্যাটগরিতে চলে যেতে হল…ওই যাকে বলে অমরতা…অমর হয়ে ওঠা…লোকের মুখে-মুখে নাম হয়ে ঘোরা…মিডিয়ায় হেডলাইন…সম্পাদকীয়…টিভি-আলোচনার রসেড়া…যাক…আপনারাও খুনি হয়ে উঠেছেন…

–বাইঞ্চোত…আপনে নামহীন হইলে সে সমস্যায় পড়তেন না…

–টু বি প্রিসাইজ…আপনাকে তো একটু আগে উনি বললেন যে আমরা ডাকাতি করে জীবন চালাই… আই মিন অতিবাহিত করি…তাই করতে গিয়ে সকলেই খুনি হয়ে উঠেছি…এই হয়ে ওঠা ব্যাপারটাকে গুরুত্ব দিতে হবে…তবে যাদের যাদের লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছি তারা ব্লাডি ফাকিং মরে গেল কি না…তা চেক করার জন্য সেখানে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করিনি কখনও…অনুমান করা যায় যে বুকে বা মাথায় গুলি মারার পর ওয়াঁদের বাঁচার সম্ভাবনা ক্ষীণ…দেশের স্বাস্হ্য ব্যবস্হার প্রতি আমাদের আস্হা আছে…

–হ্যাঃ হ্যাঃ…কুড়ি কোটি দুর্যোধনের বাল…আমি সালা এগগালে নগসাল ছিলুম…মনে থাকে যেন…

–এই চুপ…যে মরে গেছে তার নকল করবেন না…

–এর পর আর হয়ে ওঠা নেই…এটাই হয়ে ওঠার শেষ ধাপ…খুন করা…মানুষকে খুন করা…আমার হাতে মেয়েটা যখন মরে গেল তখন এই কথাই উপলব্ধি করলুম…যে হত্যাই হল মানব সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যাবার অভিমুখ…যত হত্যা…তত উন্নতি…গণহত্যা হলে তো কথাই নেই…তবে আরেকটা কথাও মনে হয়েছিল… বুঝলেন…

–কী ? তাও বাইঞ্চোত উপলব্ধি ?

–নারী আর পুরুষের সম্পর্ক নষ্ট করে দ্যায় তাদের শরীরের ডিসগাসটিং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ-রস-রসায়ন…

–তার ব্লাডি ফাকিং মানে…

–ওই যেমন ফ্যালোপিয়ান টিউব…তেমনই জরায়ু… ওভুলেশান… বীর্য… টেসটোসটেরন… প্রজেস্টেরন…হরমোন… টেসটিকাল্স… আড্রেনালিন… অ্যান্ড্রোজেন…এসট্রোজেন…ফলিকল… ইউরেথরা…ফেরোমোন…অরগ্যাজম…এটসেটরা এটসেটরা…কত মানুষ যে এগুলোর জন্য খুন হয়…হেরে যায়…ভেস্তে যায়…নিজেই নিজের জীবন নষ্ট করে ফ্যালে…তার ইয়ত্তা নেই…নারী-পুরুষে প্রেমের পথে প্রধান বাধা হলো এই সমস্ত রস-রসায়ন-অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ…প্রেমকে সাংস্কৃতিক ব্যাপার করে ফ্যালে…পদ্যমদ্যখাদ্যবাদ্য…

[ স্কাউন্ড্রেলদের সঙ্গে কথা চালিয়ে যাবার অপমানজনক দুর্গতি হল নিজেকেও স্কাউন্ড্রেলের স্তরে নামিয়ে নিয়ে যেতে হয়…জীবনে কতবার যে এভাবে নামতে হয়েছে…সেসব স্কাউন্ড্রেলরা নিজেদের কেউকেটা প্রমাণ করতে চাইলে আরও ঝামেলা…মানসিক অশান্তি…এই স্কাউন্ড্রেলটার মুণ্ডু গিরগিটির মতন ঘুরতে থাকে…কেলো লোকটা যেন চৌমাথায় কাকে-হাগা নিশ্চল মূর্তি…]

–কথাগুনো সত্যি…আমরা আমাদের প্রেমিকার সঙ্গে নারী-পুরুষ  নোংরা মিশনারি প্রেম করি না…অন্য উপায় আবিষ্কার করে ফেলতে বাধ্য হয়েছি…পবিত্র প্রবৃত্তি…বিশুদ্ধ…লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট…গোইং স্টেডি… প্রেমিকারা আমাদের সোল মেট…মর্ম বিনিময় করি…

–কেন-কিঁ কেন-কিঁ কেন-কিঁ কবি লেখক নাট্যকার চিত্রকার অভিনেতা ভাস্কর স্হপতি এরা সবাই অসামাজিক গাধা…

–ওঃ কেলো…প্লিজ স্টপ রিপিটিং দি প্যারট’স সঙ…

–দেন হোয়াই দিস স্ট্রেঞ্জার ইজ নট টকিং টু মি…

–টু বি প্রিসাইজ…লেট আস ফার্স্ট গেট এ ফিল অফ ইচ আদার দেন ইউ মে ব্লাডি ফাকিং  টক টু হিম… হি ইজ টেলিং আস অ্যাবাউট হিমসেল্ফ…উই আর টেলিং হিম অ্যাবাউট আওয়ারসেল্ভস…হোয়েন ইওর টার্ন কামস ইউ টক অ্যাবাউট ইওরসেল্ফ…

–ওকিপোকি…

–কালোর কন্ঠস্বর বেশ খসখসে…ভারিক্কি বাঁশড়া…

–ব্লাডি ফাকিং কী কথা হচ্ছিল যেন..

–হত্যা করা নিয়ে কথা হচ্ছিল…মানুষ খুন করাই মানব সভ্যতার উত্তরণ…আর তা-ই হল প্রথম আর শেষ রাজনীতি…

–ইউ আর রাইট…মাই মম সেড সো…

–তা যা বলেছেন…তাছাড়া নৈতিকতা আর কী…

–একজন মানুষ খেতে পাচ্ছে না…ফুটপাথে দুমড়ে পড়ে আছে…অথচ আশেপাশে সবাই খেয়েদেয়ে ঢেঁকুর তুলতে তুলতে রাস্তা দিয়ে হেঁটে সূর্যোদয়ের দিকে মিছিল করে এগিয়ে যাচ্ছে…মুখে গান…হাতে  পতাকা পতপতাচ্ছে…রাতের বেলা হলে হাতে চর্বিজ্বালা মশাল…যেতে যেতে তাদের ভুঁড়ি ক্রমশ ঢাউস হয়ে চলেছে…গাল ফুলে মোদো গোলাপি…দ্যাট ইজ দি আলটিমেট অ্যাচিভমেন্ট…

–তা যা কইসেন…বাইঞ্চোত…খাইতে না পাইলে দুমড়াইয়া পইড়া থাকা সালা উপায় নাই…

–ইউ আর রাইট…মাই মম সেড সো…

–আপনারা সিগারেট-টিগারেট লুটে-কিনে আনেন না ? আমার কাছে কয়েকটা বিড়ি আছে…অনুমতি দেন তো ফুঁকে নিই…একটু ফুঁকে নিলে পেটটা হালকা করতে পারব…আখরোটের মোচড় দিচ্ছে মাঝে-মাঝে…

–ফুঁকুন…কিন্তু দেশলাই কাটি নষ্ট করবিন না…আমাদের জাঙাল-সমবায়ে ওটি বেশ জরুরি… এখেনে কারোর কোনো কিচুর অনুমতি নিতি হয় না…প্রেমিকার ব্যাপার ছাড়া…আমরা কেউই চা-কফি সিগারেট-বিড়ি খাই না…শুদু গ্যাঁজা ফুঁকি…এবার ডাগাতি করতি বেরোলি আবনি আবনার দরকারি বিড়ি-সিগারেট-দেসলাই  কিনি কিংবা তুলি নিবেন…বা যদি সঙ্গি না যান থালে আমরাই নিয়ে আসব…কোন ব্র্যাণ্ডের বিড়ি ফোঁকেন ? আমরা যে যার প্রেওজনের জিনিস ডাগাতির সময়ে ব্র্যাণ্ড মিলিয়ে তুলি নিই…নয়তো বেশ দূরে-দূরে গিয়ে কিনতি হয়…পাশের রাজ্যে…চাদ্দিকে আজগাল সিসিটিভির ঝুটঝামেলা…আমার মতন উনিও মদ খেতে ভালোবাসেন বলে মাজে-সাজে বেসবল ক্যাপ পরে মাঝরাতে মদের দোগানে গ্রিল ভেঙি ঢুঁ মারতি হয়…

–চলুন আস্তানার দিকে হাঁটা যাক…আপনাকে আপনার ব্লাডি ফাকিং ঘরটা দেখিয়ে দিই…ঘরটা তিনতলায়…সিঁড়িটা ঘোরানো…আগেকার কালের…সামলে-সুমলে ওঠানামা করতে হয়…রাতের বেলায় বেশ রিস্কি…রোদলন্ঠন আছে অবশ্য…কনেলন্ঠন…

–তার চেয়ে বরং একটু জিরিয়ে নেয়া যাক এখানে বসে…সেই তিন দিন থেকে হাঁটছি… আপনারাও তো গোর দেবার জন্য খোঁড়াখুঁড়ি করে ক্লান্ত হয়ে গেছেন বলে মনে হচ্ছে…দূরে ওই গুঁড়িটার ওপর বসে গ্যাঁজানো যাক… কী বলেন…ছায়ায়…

–হ্যাঁ…কি বলে গিয়ে…ভোঁসড়ির ছ্যানা আমি বেশ ক্লান্ত হয়ে গেছি…

–আপনি কি ছোটোবেলা থেকেই এরকম গৌরবর্ণ-খ্যাংরাটে…কন্ঠস্বরও বেশ মিহি ধরণের…জাপানিদের মতন দেখতে অনেকটা…চিন-জাপানে ছিলেন নাকি…

–কি বলে গিয়ে…আমি বাগবাজারের বনেদি পরিবারের…ভোঁসড়ির ছ্যানা কেন যে অমন তিরিক্ষি স্বর তা জানি না…প্রথম থেকেই রোগাটে ছিলাম না…বসে কথা বলি…কী বলেন…আসুন…সবাই এখানেই বসি…আপনি এদিকে মুখ করে বসুন তাহলে কথা কইতে সুবিধে হবে…তা…হ্যাঁ…বাবা ব্যাঙ্গালোরে চাকরি করতেন…আমি স্কুলে পড়ার সময় মোটাসোটা ছিলাম…কি বলে গিয়ে…স্কুল থেকেই ঘোড়দৌড়ে আকৃষ্ট ছিলাম…বাংগালোরে  বাড়ির কাছেই হর্স ব্রিডারের ফার্ম ছিল…ভোঁসড়ির ছ্যানা… হ্যাণ্ডলারদের সঙ্গে আলাপ-পরিচয়ের ফলে ঘোড়ায় চড়া শিখে ফেললাম…ঘোড়ার জাত…কোন ঘোড়া কেমন দৌড়োয়…সব শিখতে শিখতে জকি হবার শখ হল…জকি হবার জন্য ট্রেনিং নিতে হয়…বাংগালোরে যে ব্রিডিং সেন্টারে ট্রেনিং নিচ্ছিলাম তার মালিক সাফারিওয়ালা আমায় একদিন ঘোড়া হ্যাণ্ডলিং করতে দেখে ট্রেনারের কাজে লাগিয়ে দিলেন…ইলেকট্রিকাল ইনজিনিয়ারিং পড়া ভোঁসড়ির ছ্যানা লাটে উঠে গেল…ঘোড়ার ট্রেনারের পাশাপাশি জকির ট্রেনিংও নিতে লাগলাম…উনি আমাকে একটা ঘোড়া দিয়ে বললেন যে তাকে দুবছরের মধ্যে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে যাতে আগামী রেসে ভালো ফল করে…কি বলে গিয়ে…দুবছর পরে ভোঁসড়ির ছ্যানা ঘোড়াটা সত্যিই ভালো ফল করল…দৌড়ে প্রথম হল না…কিন্তু দ্বিতীয় হল…

— মেয়ে-ঘোড়া না ছেলে ঘোড়া ?

–মেয়ে-ঘোড়া…মেয়ে-ঘোড়া…ছেলে-ঘোড়ারা সামলে-সুমলে দোলাতে-দোলাতে তেমন ছুটতে পারে না…ঘোড়াদের তো আর ল্যাঙোট পরানো যায় না…তা ঘোড়াকে জেতানোর বিশেষ একটা ট্রিক আবিষ্কার করে ফেলেছিলাম আমি…পরের বছর কিন্তু ঘোড়াটা সবকটা রেস জিতে সাফারিওয়ালাকে এত খ্যাতি আর টাকাকড়ি এনে দিলে যে উনি ভোঁসড়ির ছ্যানা আমাকে ওনার চিফ ট্রেনার করে নিলেন…বেশ চলছিল…হুসেইনি কাওয়াসজিরা ওদের স্টাডফার্মে আমাকে ট্রেনার হিসাবে নেবার জন্য চারগুণ মাইনে দিয়ে নিয়ে যেতে চাইলে…সে একেবারে টানাহেঁচড়া…আমি রাজি হইনি…আমার ঘোড়ার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা কেন করব… বলুন… কাওয়াসজিরা আমার কয়েকজন হ্যাণ্ডলারকে হাত করে একদিন আমার রেসের ব্লু আইড গার্ল নামের ঘোড়াকে লুকিয়ে বোলডেনোন  আর স্ট্যানোজোলল অ্যানাবলিক স্টেরয়েড ঠুঁসে দিলে…কলকাতায় রেস হয়েছিল…ঘোড়দৌড়ে ভোঁসড়ির ছ্যানা কেমিকাল দুটো নিষিদ্ধ…কি বলে গিয়ে অ্যাথালিটদের যেমন স্টেরয়েড অচল তেমন ঘোড়ার দৌড়েও নানা স্টেরয়েড নিষিদ্ধ…

–স্টেরয়েড ?

–অ্যাথালিটদের মতনই…দৌড়ের আগে ঘোড়াদের রক্ত কালেক্ট করে পরীক্ষা করা হয় যে তাকে নিষিদ্ধ স্টেরয়েড দেয়া হয়েছে কি না…কিন্তু শালারা আমাকে ফাঁসাবার জন্য ঘোড়ার পেচ্ছাপও চেক করেছিল…পেচ্ছাপে স্টেরয়েড পাবার পর ভোঁসড়ির ছ্যানা চারজনের অনুসন্ধান কমিটি গড়া হয়েছিল…কিন্তু ল্যাবরেটরির প্যাথলজিস্ট সান্তনমের সঙ্গে আমার খাতির ছিল…সে  আমাকে বললে যে ঘোড়ার পেচ্ছাপে আরও এক্সট্রানিয়াস এলিমেন্ট পাওয়া গেছে…আমি বুঝতে পারলাম কী এলিমেন্ট…কেননা সেই রসায়নেই জিতে যেত আমার ঘোড়া…নিষিদ্ধ স্টেরয়েড ব্যবহার করার জন্য আমি প্রথমে সাসপেন্ড আর তার কয়েকদিন পর অ্যারেস্ট হলাম…জানতাম…ভোঁসড়ির ছ্যানা যে এলিমেন্ট পাওয়া গেছে তা জানাজানি হলে অনেক বছরের জেল খাটতে হবে…আদালতে যেদিন নিয়ে যাচ্ছিল সেদিন আমাদের সঙ্গে পুলিশের গাড়িতে  কেলো… ইনি… ইনি… ইনি… ইনি…আর যিনি মারা গেছেন তিনি ছিলেন…যিনি মারা গেছেন মানে আমাদের যে সঙ্গী ভোঁসড়ির ছ্যানা আত্মহত্যা করে নিলেন…কেলো মারামারি আরম্ভ করতেই ওনারাও মারামারি আরম্ভ করে দিলেন… কন্সটেবলগুলো মার খেয়ে অন্যমনস্ক আর আধথেঁতলা হতেই সবায়ের সঙ্গে আমিও পালালাম…ওনারা না থাকলে পালাতে পারতাম না…আমাকে দেখছেন তো ভোঁসড়ির ছ্যানা একেবারে প্যাংলা টিঙটিঙে…

–হ্যাঃ হ্যাঃ…কুড়ি কোটি দুর্যোধনের বাল…আমি সালা এগগালে নগসাল ছিলুম…মনে থাকে যেন…

–এই চুপ…যে মরে গেছে তার  নকল করবেন না…

–এলিমেন্ট বলছিলেন…কী এলিমেন্ট…ভেটেরিনারি ডাক্তার নই…তবু কিছুটা আইডিয়া করতে পারব…

–কি বলে গিয়ে…ভোঁসড়ির ছ্যানা সে আরেকদিন শুনবেন না হয়…

–নিউকামারবাবু…উনার কথাগুলা আমিই বলতেসি…বুইঝলেন কিনা…না শুইনা আপনের মন বাইঞ্চোত খচখচ কইরবে…তার চাইতা এখনই শুইনা নেয়া ভালো…উনি রেসের আগের দিন বাছাই ঘোড়ার সঙ্গে বাইঞ্চোত একাত্ম হইতেন…

–হোয়াট ডু ইউ মিন বাই একাত্ম…দ্যাট অলসো উইথ এ ফিলি…মানুষের আত্মা হয় বলে শুনেছি… যাদের প্ল্যানচেট করে ডেকে আনা যায়…ঘোড়ার আত্মার কথা তো শুনিনি মশায়…অশ্বমেধ যজ্ঞের জন্য যে ঘোড়া ছাড়া হতো তাদেরও আত্মা হতো বলে পড়িনি…মানে গল্প-টল্পতে পড়িনি…অনেক বড়ো পেনিসের শাদা ধবধবে ঘোড়া বাছাই হতো তা শুনেছি বটে…

–ব্লাডি ফাকিং…শাদা ঘোড়ার  শাদা পেনিস হয় না…পুরাণলেখকদের এত ক্ষমতা ছিল…শাদা করে দিলেই পারতেন…

–ছোটোদের পুরাণ বইতে কিন্তু যে ছবি আঁকা ছিল তাতে পেনিস শাদা রঙের ছিল…মনে আছে…সেই কবে পড়েছিলুম…

–মানুষ যতই ফর্সা হোউক পেনিস বাইঞ্চোত কালো হয়…যতই আপনে ফেয়ার অ্যাণ্ড লাভলি লাগান…

–উনি আকস্মিক ভাবে আবিষ্কার করেছিলেন এলিমেন্ট প্রয়োগ করার ব্যাপারটা…এই ব্যাপারে উনি পথ প্রদর্শক…ওয়াঁর কাছ থেকেই আমরা শিখলাম…এলিমেন্ট প্রয়োগ করার কৌশল…আপনিও শিখে ফেলবেন…একবার শিখে ফেললে আর অভ্যাস ছাড়তে পারবেন না…জঙ্গল ছেড়ে বেরোতে ইচ্ছে করবে না…বাইরে বেরিয়ে পৃথিবীকে মনে হবে আনসিভিলাইজড…বর্বর…প্রাগৈতিহাসিক…অশিক্ষিত…

–এলিমেন্টকে আপনি উপাদানও বলতে পারেন…রেসে ব্লাডি ফাকিং ঘোড়াদের জিতিয়ে আনার ট্রিক…

–কি বলে গিয়ে…উপাদান বলতে ভোঁসড়ির ছ্যানা যা বোঝায় আরকি…ও আপনি আমাদের সঙ্গে থাকতে-থাকতে জেনে যাবেন…উপাদান প্রয়োগ করতে শিখে যাবেন…

–অন্য কোনো রসায়ন ?

–নিউগামার স্যার…আবনি এত ইনগুইজিটিভ কেন…এত তাড়াতাড়ি…এই তো সবি এস্চেন…এখুনও তো আমাদের আস্তানায় ঢুকি অতিথি তগমাও পাননি…আবনাকে বিশ্বাস করব তবি তো…

–বিশ্বাস ব্যাপারটাকে কেউ আর বিশ্বাস করে না…ভোটাররাও করে না…পুরুতদের কথা না তোলাই ভাল…

–ভোঁসড়ির ছ্যানা রেসের আগের দিন সন্ধ্যায়…অন্য হ্যাণ্ডলারদের সবাইকে বাড়ি পাঠিয়ে দিতাম… তারপর যে ঘোড়া রেসে যাবে সেই ঘোড়াকে ওই ট্রিকটায় বশীভূত করে নিতাম…

–কী করতেন ?

–বশীভূত করে  ফেলতাম…হিপনোটাইজ…সন্মোহন…

–ঘোটকীকে বশীভূত ? ঘোড়ার তো আঙুলও হয় না যে বেণিমাধব শীলের পাঁজি দেখে বশীকরণের আঙটি কিনে পরাবেন…অ্যাবসার্ড…

–চোখ বুইজা বাইঞ্চোত কল্পনাজগতের পিঠে দুইহাত রাইখা কিছুক্ষণ শান্তিতে কাটানোর চাইতা অ্যানজেলিক স্হিতি আর কী-ই বা হইতে পারে…বাইঞ্চোত ইউ ফিল ইউ আর গডস বায়োলজিকাল ফাদার…

–মারহাবা…ভোঁসড়ির ছ্যানা…ঘোড়া আমার..ফিল করছেন উনি…

–মশায় আমি তো গডই জানি না…তার বাপকে কি করে জানব…কিন্তু ঘোটকীর মসৃণ পিঠে হাত বোলাবার অভিজ্ঞতা ফিল করতে পারি…স্মুথ…সিলকি…লিসাম…ডিলিরিয়াস…

–আমরা বাইঞ্চোত যে যার প্রেমিকাগো আগাপাশ হাত বুলাই…তার জন্য চরিত্রের ভিতরে নাইমা পড়তে হয়…টুপ…ঝুপুস…আলোকিত হয়্যা উঠবেন আপনে…

–কেলোর একটা গড আছে…তার নাম ভোদুন…উনি তো অ্যানিমিস্ট…ওনাদের ট্রাইবটা ইসলাম বা খ্রিশ্চিয়ানিটিতে কনভার্ট হয়নি…ওয়াঁর গডের কাছে হ্যাঁ বললে যা বোঝায়…না বলতেও তা-ই বোঝায়…

–এখানেও সেই গডকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন নাকি উনি…আপনারা সবাই অ্যানিমিস্ট হয়ে গেছেন ?

–না…আমরা ফাকড বাই গড…

–ভগবানের ভবিষ্যৎ অন্ধকার…

–আপনার ভয়েসটা বেশ স্টিরিওফোনিক…

–হ্যাঁ…আমি চেঁচিয়ে ভগবানের অন্ধকার  কালা কানও খুলে দিতে পারি…কেউ এদিক-ওদিক চলে গেলে আমিই বাইসন ষাঁড়ের হাম্বা পাড়ি…মুশকিল হল হাম্বা শুনে অনেক সময়ে ঋতুমতি মাদি বাইসন চলে আসে…আমরা পারভার্ট হতে পারি…লম্পট নই…ষাঁড়ের মতন একপন্হী…ওয়ান অ্যাট এ টাইম…ফলো টু দি এন্ড অব দি আর্থ টু লাভ ইওর প্রেমিকা…শাশ্বত প্রেম…নিঃস্বার্থ ভালোবাসা…

—পার্ভারসান ইজ এ ফর্ম অফ আর্ট…নেপোপ্রেমী চিৎফাঁদ টয়লেট কোম্পানির  টিয়াপাখিটা ঘুরিয়ে সে কথাই বলে বলে টিকে গেল…অথচ অন্যটাকে জংলি বেরাল-শেয়াল-ভাম খেয়ে ফেললে…

–হ্যাঃ হ্যাঃ…কুড়ি কোটি দুর্যোধনের বাল…আমি সালা এগগালে নগসাল ছিলুম…মনে থাকে যেন…

–এই চুপ…যে মরে গেছে তার নকল করবেন না…

–অমন অ্যানোরেকসিক আঁকালো বাঁশ চেহারা নিয়েও এখানে এসে নতুন প্রেমিকা যোগাড় করে নিতে পারলেন ?

–হ্যাঁ…পারব না কেন…প্রেম ছাড়া তো ভোঁসড়ির ছ্যানা গুহার দেয়ালে আঁকাই সম্ভব ছিল না…আমি আমার প্রেমিকার সঙ্গে রোমান্টিক রিলেশানশিপে আছি…আপনাকেও পাইয়ে দেব…সুইট অ্যান্ড সালট্রি… কচিকচি…ভেজা ভেজা…ধারা চারশো আটানব্বুই এ-র ভয়ভাবনা নেই…

–আপনারা বলছেন আপনারা ডাকাত আর খুনি…একই সঙ্গে প্রেমেরও খোল-করতাল বাজাচ্ছেন… পারভারসানকে বলছেন আর্ট…আধুনিক সমাজে থাকলেই তো হতো…যেমন হাফ-অপরাধীরা আর মহাঅপরাধীরা থাকেন…সামাজিক লোকজন তো এই ধরণেরই কথাবার্তা সভা-সমাবেশে মাঠে-ময়দানে র‌্যালির‌্যালায় বলেন…

–টু বি প্রিসাইজ…আমরা ব্লাডি ফাকিং কমিটেড সোলস…নিদার গুড নর ইভিল…আমরা দায়বদ্ধ… আপোষহীন…আমরা উইকেড…ইন লাভ অ্যান্ড লুট…

[ কতগুলো যুবতীকে কিডন্যাপ করে এনেছে এরা…কোথায় লুকিয়ে রেখেছে…ক্রীতদাসী হিসেবে কোথাও বন্ধ করে রেখেছে…সেসব তো কিছুই বলতে চাইছে না…কেবল প্রেমিকা-প্রেমিকা ভেঁজে চলেছে…একা না এসে পুরো টিম নিয়ে আসা উচিত ছিল…]

–নাঃ…কিছুই মাথায় ঢুকছে না…আপনারা বেশ শিক্ষিত সংস্কৃতিমান মজাজীবি বলেই তো মনে হচ্ছে…আমি নিছক ফিকে ছিঁচকে…এই জঙ্গলে কি করেই বা সাসটেন করেন…জ্ঞানের জন্য তো শহরে থাকা জরুরি…নয়কি…বই…সংবাদপত্র…টিভি…স্মার্টফোন…ইনটারনেট…চায়ের টেবিল…কফি… কলম-ডায়েরি… মদের বোতল-টাকনা…পরচর্চা…অক্কাদেমি…সম্বর্ধনা…বক্তৃতা…বিতর্ক…বিদেশি  ফিল্ম…পিঠচুলকানি…এসব ছাড়া জ্ঞানের অ্যালঝিমার হবার চান্স বেশি…

–ওই যে তিনতলা পুরোনো বাড়িটা দেখছেন…ভেতরে দেয়ালগুলোয় বার্মিজ টিক উডের প্যানেলিং…যে বাড়িতে আমরা আজ প্রায় আট বছর আছি…ওটা কখনও কোনো ব্রিটিশ চা বাগান বা চটকল মালিকের ব্লাডি ফাকিং  আস্তানা ছিল…সিপিয়া হয়ে যাওয়া মহিলাদের ফোটো আছে…মহিলারা শুয়ে…হেলান দিয়ে..নানা খেলা খেলছেন… পেরেকে-পেরেকে…ওপরের ঘরে…যে ঘরটা…যিনি মারা গেলেন তাঁর ছিল…আর এখন আপনাকে অ্যালট করা হচ্ছে…ওয়াঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহের বইপত্র আছে…কয়েকজন প্রিন্সলি স্টেটের রাজারাজড়ার জাঁকজমকদার ফোটো আছে…টু বি প্রিসাইজ…বহু পুরানো বইপত্র…ঘাঁটলে হাঁচি পায় এমন বই…হেঁচে নাক দিয়ে জল পড়ে এমন বই…তাঁমাদি শতকের বইও আছে…হাতে লেখা বই… কাঠখোদাই করা বই…নেগলেক্ট…পোকা… আর সময়ের ধুলোয় অবশ্য অনেক বই নষ্ট হয়ে গেছে…যখন আমরা জঙ্গলে ঢুকি তার প্রায় মাস চারেক পরে ঘোরাঘুরি করতে-করতে ব্লাডি ফাকিং বাড়িটা আবিষ্কার করি…  ওই যে গাছগুলো দেখছেন…বাড়িটাকে ঘিরে রয়েছে…লক্ষ্য করে দেখুন…ওগুলো এই জঙ্গলের গাছ থেকে আলাদা…ডুয়ার্সে এলম পপলার সিলভার-বার্চ ওক উইলো অ্যালডার হয় না…ওই গাছটা দেখছেন…লাল রঙের ফুল ওটা রোয়ানে…তার থেকে দূরে বাঁদিকে ওই গাছটা হথর্ন ওর ফলন থই-থই ফলগুলো পাকা লিচু বলে মনে হতে পারে…তা থেকে আরও পেছনে কয়েকটা গাছ দেখা যাচ্ছে…ডালে ডালে লাল রঙের ফুল…ওগুলো পলাশ নয়…রেড মেপল…ওই মানে ইয়ে…ব্লাডি ফাকিং ইংরেজরা পপলার গাছে মিসলটো পরগাছা লাগায়…সেই মিসলটো রয়েছে দেখুন পপলার গাছে…উনি অনেক ফুলের গাছও পুঁতেছিলেন…অনাদরে সেগুলোর বীজ পড়ে-পড়ে শীতের পর ফুটতে শুরু করে…ওয়াইল্ড রানঅ্যাওয়ে ফ্লাওয়ার্স…

–ইংরাজরা আসবার আগে থেকেই বাঙালিরা পরগাছাপ্রেমী…নেপোপ্রেমী…মোসায়েবপ্রেমী…

–গাছপালা ফুলফলের বিশেষজ্ঞ ছিলেন নাকি স্যার…আপনার গলার স্বরও দালের মেহদির মতন রোমান্টিক…গানও গান বা গাইতেন নিশ্চয়ই… এত ভালো গলাকে অপচয় করে বুড়িয়ে দেবার  মানে হয় না… বাকচালাক নেতা নেপোলিয়ানের কন্ঠস্বরও নাকি গমগমে ছিল…

–হ্যাঁ…বুইঝলেন কিনা…ওয়ান্স ইন এ হোয়াইল উনি বাইঞ্চোত ভাঙা গলায় গান গাইয়া শোনান আমাদেরকে…যিনি মারা গ্যালেন তিনি গিটার বাজাইয়া ভাটিয়ালি গান গাইতেন…দালের মেহদি কি স্কচ ভাষার গান করেন…তুরুত্তু  তুরু তুরু গানটা স্কচ…আইজকাল অবশ্য বাঙালি গায়ক-গায়িকারাও বাংলা ফিল্মে স্কচ গান প্লেব্যাক কইরা শোনান…চিৎফাঁদ বানাইল তোরে…তুরুত্তু তুরু তুরু…কেন-কিঁ তুরু তুরু…কেন-কিঁ তুরু তুরু…

–ভালোই হল…আমিও গিটার বাজাতুম…তবে বাংলায় গাইতে পারি না…যে ঘরটা অ্যালট করলেন সেখানেই আছে গিটারটা তো…নাকি…

–হ্যাঁ…যিনি মরি গেলেন…তাঁর ঘরিই রাকা আচে…আবনি মনের সুখে ড়িং ড়াং টিং টাং কত্তে পারবেন…আমরা যখুন আমাদের প্রেমিকার সঙ্গে প্রেম করব…তখুন বাজাবেন…বেশ প্রেম-প্রেম আবহাওয়া গড়ে উটবে… টেসটোসটেরনে টইটুম্বুর…চকাচক…জাঙাল জবজবে…

–আগে চলুন…কি বলে গিয়ে…ভোঁসড়ির ছ্যানা ফুলের গাছগুলো দেখিয়ে দিই…আপনাকে…ফুলের বাগান নয়…আমরা ওদের জীবনে পদক্ষেপ করিনি…জঙ্গলে ওরাও জংলি হয়েই থাকুক…আমাদের মতন…কিন্তু সবাই মিলে খেয়াল রাখি যাতে পোকা-মাকড় না লাগে…মাঝেসাঝে ফুলের মালা গড়ে প্রেমিকাদের পরাই…পেছন দিকে ফলের গাছও আছে…রান্নাবান্না না হলে যা খেয়ে আমরা টিকে থাকি…মানে যখন চুরি-ডাকাতি করতে যেতে ভালো লাগে না…ভোঁসড়ির ছ্যানা আরও অনেক ব্যবস্হা করেছিলেন  সায়েব…

–টু বি প্রিসাইজ…সবুজ আপেল…লাল নাসপাতি…ফলসাগাছ বা ব্লুবেরি…স্ট্রবেরির ঝোপ…টেঁপারি ঝোপের মতন লাল আর সোনালি রাস্পবেরি…কালো আঙুরের মতন দেখতে প্রুণ…ব্লাডি ফাকিং অনেক ফলের গাছ আছে…জংলি টোমাটো আর ঢেঁড়স ঝোপও আছে…

–এরকম ঘন জঙ্গলে কাঠের প্যানেল দেয়া বাড়ি বাগান ফুল-ফল করলেন কেন তা জানতে পেরেছেন…

–না…বুইঝলেন কিনা…বাইঞ্চোত কোনোরকম লিখাজোখা সূত্র নাই….বাড়িটা বাইরে থিকা চুণসুরকির…ভিতরে বার্মিজ টিক উডের প্যানেল…চুসকিমার ধনী আছিলেন নিশ্চয়ই…বর্মা থিকা সেগুনকাঠ আনাইয়া ডুয়ার্সের জঙ্গলে রেস্ট হাউস তৈরি কইরাছিলেন মানেই অঢেল ফরফরানো ট্যাকা…নীলকর-টিলকর বিজনেস আছিল বোধ হয়…দেয়ালে একটা কম্পাস আছে..কোন দিকে ইংল্যাণ্ড… ভুটান… বাংলাদেশ… বিহার…হদিশ পাইবেন…

–লোগটা বইটইতে নিজের নাম…  লিকি যাননি…আমরা অবশ্যি সব বই ঘাঁটিনি…এতো ধুলো…আচে হয়তো একধটায়…যিনি মরি গেলেন তিনি ঘাঁটতেন…আর হাঁচতেন…ক্লাসিক বই হলি মানুষেরা হাঁচে…যদি না হাঁচেন থালে ক্লাসিক নয়…হাঁচির সঙ্গে নাক থেকি জল পড়লি বুজবেন তা কালোত্তীর্ণ…ইংরেজরা  যা পেতো সেখানিই নিজের নাম খোদাই করে দিত…মরি যাবার পরি কবরে…অবৈধ বাচ্চাদের পদবিতে…কিনেকেটে পাওয়া চাগর-চাগরানির নামি…

–হ্যাঁ…তা যা বলেছেন…অনেকটা কুকুরদের পেচ্ছাপ করে এলাকা দেগে দেয়ার মতন…

–হ্যাঃ হ্যাঃ…কুড়ি কোটি দুর্যোধনের বাল…আমি সালা এগগালে নগসাল ছিলুম…মনে থাকে যেন…

–এই চুপ…যে মরে গেছে তার নকল করবেন না…

–বা…কি বলে গিয়ে…ভোঁসড়ির ছ্যানা পাড়ার দেয়াল দখলের মতন…

–এগুলো কী মশায়…যেন মাটিতে চাপড়া-কবর দিয়ে জায়গাটাকে দেগে রাখা হয়েছে…একটা একটু উঁচু…ফুল ছড়ানো…

–যেটা উঁচু…ভোঁসড়ির ছ্যানা সেটা আমাদের প্রথম প্রেমিকার সমাধি…তখন আমরা একজন প্রেমিকাকেই সবাই মিলে শেয়ার করতাম…উনি মারা গেলেন…তার পর থেকে সকলে আলাদা প্রেমিকার সঙ্গে প্রেম করি…

–ওহ..মনটা ভার হয়ে গেল শুনে…আর এই দুটো…

–উই দুটা…বুইঝলেন কিনা…বাইঞ্চোত সত্যই কবর…একটা সম্ভবত পোচার আর অন্যজন তার সঙ্গী…বোধহয় ফরেস্ট গার্ড…ইদিকে আইসা পইড়াসিল…তাদিগে আমরা গুলি কইরা মাইরা ফেলতে বাধ্য হই…তারা তো আপনের-আমার মতো সমাজ-খ্যাদানে আছিল না…তাদিগে মাইরা ফেলার পর বাইঞ্চোত গোর দেয়া হইসিল…ত্যাখন অভিজ্ঞতা আছিল না বইলা বেশি গভীরে কবর দেয়া হয় নাই…পরের দিন সকালে উইঠা দেখি বাইঞ্চোত জংলি জানোয়াররা মাটি খুঁইড়া লাশ বের কইরা মাংস খাইসে…হাড়গোড়গুলা আবার নতুন কইরা গোর দিয়া অনেকটা মাটি চাপা দিতে হইসিল…তাদিগের সঙ্গে যে মোবাইল আছিল তা পাথর দিয়া গুঁড়াইয়া ফেলসি…রেঞ্জারের ডায়েরিটারে বাইঞ্চোত পুড়াইয়া দেয়া হইসিল…সেই ঘটনার পর থিকা আমরা রাতে একজন  জাইগা পাহারা দেই…দিনের বেলাতেও একজনের হাতে বন্দুক থাকে…

–বন্দুক তাক করতেই ভোঁসড়ির ছ্যানা  ঝুঁঝকো দুটো পালাতে আরম্ভ করল…তখনই আমাদের সন্দেহ হল যে ব্যাটারা নিশ্চয়ই টিকটিকি…কিছুটা ধাওয়া করে দুটোকেই পায়ে গুলি করে কাবু করে দিই…মুখ খুলতে ওদের নাম-সাকিন বেরিয়ে পড়ল…একবার এখানে এসে পড়ার পর…আমাদের দেখে ফেলার পর…আর তো ফেরত যেতে দেয়া যায় না…ফেরত গিয়ে  ভোঁসড়ির ছ্যানা আমাদের ডেরার কথা ফাঁস করে দিত আর আমরা…আবার জেলে ঢুকতুম…ধরে এনে সেদিনকেই নিকেশ করে দিতে হয়েছিল…কেননা এত কান্নাকাটি করছিল আর পায়ে পড়ছিল যে শেষে ভোঁসড়ির ছ্যানা আমাদের মধ্যে কারোর মনে দয়ামায়া উঁকি দিলেই হয়েছিল আরকি…যিনি মারা গেলেন তাঁর বড্ডো দয়ার শরীর ছিল…বলছিলেন যে পায়ে গেঁদাপাতা থেঁতো মাখিয়ে পেছনের জেলগারদে বন্ধ করে রেখে দেয়া হোক…সারাজীবন জেলেই থাকুক যাবজ্জীবন কয়েদির মতন…উঁকিঝুকি মেরে  আমরা অ্যামিউজমেন্টের মজা নেবো…খাবার জিনিস ছুঁড়ে-ছুঁড়ে দেবো…

–রেঞ্জারটা বাঙালি ?

–ব্যানার্জি আছিল …গায়ে পৈতাও আছিল বাইঞ্চোত…পৈতাসুদ্ধু  ওরে গোর দিয়াসিলাম আমরা…বেচারা ব্রাহ্মণবাচ্চা…জন্তুজানোয়ারগুলা মাংস খুবলাইয়া খাইবার পর পৈতাটাও খাইয়া থাকবে…পুলিস ওই মোটা ডায়েরিটারে পাইলে বাইঞ্চোত  কয়েকজন ঘোড়েলঘাগুর নামধাম জাইনতে পারত…

–বন্দুক-পিস্তল কোথা থেকে জোগাড় করলেন…বেশ করিৎকর্মা লোক আপনারা…

–সরকার জেল-হাজতে পাঠাইয়া  বাইঞ্চোত আমাগো জীবনে অনেক সুযোগ-সুবিধা কইরা দিসে…কত মানুষের সঙ্গে মেলামেশা আলাপ-পরিচয় কইরতে পারসি…এই পাশের রাজ্যের ল্যাঞ্জাধারীদের আর উই পাশের রাষ্ট্রের কেল্লাছাগুদের সঙ্গেও যোগসাজস কইরা দিসে…তাদিগের ঘাঁটিতে আগাম টাকা আর তালিকা দিয়া আসি…পরে কেউ গিয়া নিয়া আসি…তারা ভাবে আমরা লেখাপড়া-শিখা মানুষ…নিশ্চয়ই বিপ্লব করি…ওরা তো  জানে না যে আকাট না হইলে আইজকার দিনে নেতাগিরিতে মাথা গলানো মুসকিল…হিঁঃ হিঁঃ…

–ওপাশের রাষ্ট্রের ছাগুদের কাছ থেকে পেন ড্রাইভও আনি…গানের…ফিল্মের…কাঁচাছাগুরা শারুখ খান সালমান খান আমির খান ফারহা খান ইরফান খান ইমরান খান সাজিদ খান সইফ আলি খানদের পছন্দ করেন…পাকাছাগুরা সেই ইউসুফ খানেই আটকে গেছেন…অনেক সময়ে ফিল্মের পেন ড্রাইভ এনে দেখি ভুল করে ওয়াঁরা আফগানি ছাগু…পাকিস্তানি ছাগু…আরব ছাগুর চামসানি বোমাকেত্তন দিয়ে ফেলেছেন…মুখে কালো মোজা পরে আলজিভ নেড়ে ভুজুংভড়কি…

[ স্কাউন্ড্রেলগুলো ভেতরের সব কথা বলে দিচ্ছে…হয়তো আমাকে খুন করার ষড় কষছে…যা জানতে চাইছি সবই তো বলে দিচ্ছে…শুধু প্রেমিকাদের আড়াল করে রেখেছে…হয়তো ভাবছে আমি কোনো তরুণীকে চিনে ফেলতে পারি…]

–ওহো…এই ফুলগুলোর কথা বলছিলেন…কয়েকটা ফুল তো কলকাতার বাজারে পাওয়া যায়…

–ড্যাফোডিলস ফুল দেখেছেন ? ছোটোবেলায় ওয়র্ডসওয়র্থের কবিতা পড়ার সময় যে ফুল কল্পনা করে নিতে হতো…এই যে দেখুন…এইটেই ব্লাডি ফাকিং ড্যাফোডিল্স…ডুয়ার্সের জঙ্গলে এসে কান্তি নষ্ট হয়ে গেছে… বাঙালিত্ব পেয়ে বসেছে ফুলটাকে…ছিৎরে আদেখলা…

–ওঃ…আমি ভাবছিলুম লিলিফুল…বেঁজিও রয়েছে…যাক সাপখোপের ভয় নেই…

–আমরাই তো শঙ্খ লাগি…লাগাই…সাপের আবার কি দরকার…

–দেখুন…শাদা সামার স্নোফ্লেক…গোলাপি ফক্সগ্লোভ…নীল স্প্রিং জেনেশিয়ান…বেগুনি জেকবস ল্যাডার…হলুদ প্রিমরোজ…গোলাপি ডরসেথ হিথ…শালুকের মতন উড অ্যানামোন…হলুদ মাঙ্কি ফ্লাওয়ার…

–স্যার…আপনি ইংল্যাণ্ডের গাছপালা ফুলফল সম্পর্কে এত কথা জানেন…ইংল্যাণ্ডে ছিলেন নাকি… আসলে জানতে ইচ্ছা হল…যদিও অতীতের কথা তুলতে নিষেধ করেছেন…

–হ্যাঁ…ইংল্যাণ্ডে ছিলাম…টু বি প্রিসাইজ স্কটল্যাণ্ডে…উচ্চমাধ্যমিক করে গ্ল্যাসগো গিয়ে কেমিকাল ইনজিনিয়ারিং নিয়ে পড়েছিলাম…চাকরিও পেয়েছিলাম ভালো…অভিজ্ঞতা থেকে আমার মনে হয় এই কাঠের বাড়ি যিনি তৈরি করেছিলেন তিনি স্কটল্যাণ্ডের লোক…আমরা এসে একটা বিশেষ ব্র্যাণ্ডের ব্লাডি ফাকিং সিংগল মল্টের বোতল পেয়েছি…বাজারে বিক্রি করলে অত পুরোনো মল্টের দাম অন্তত লাখখানেক কি লাখদুয়েক টাকা হতো…বইয়ের সংগ্রহে স্কটল্যান্ড সম্পর্কে আর স্কটদের সম্পর্কে লেখা বইয়ের সংখ্যাই বেশি…হাঁচির ভয়ে একদুটোই দেখেছিলাম…রবার্ট বার্নসের স্কটিশ ডায়ালেক্ট পোয়েমস…জর্জ ম্যাকডোনাল্ডের এ ফেয়ারি রোমান্স অফ মেন অ্যন্ড উওমেন আর দি প্রিন্সেস অ্যান্ড দি গবলিন…এই সব বইয়ের মলাট দেখেছি…স্কটল্যাণ্ডে একটা সিংগল মল্ট ডিসটিলারিতে বিশেষজ্ঞের কাজ করতাম…মদ খাবার অভ্যাস হয়ে গেল…ডিসটিলারির সেলারে রাখা তিনশ বছরের একটা বোতল দেখে লোভ সামলাতে পারিনি… সেলারে দাঁড়িয়েই ঢকঢকিয়ে মেরে দিয়েছিলাম…মিস্টার ম্যাকফেল্টেন…মানে ডিসটিলারির মালিক…এমন বাপ-মা তুলে অপমান করেছিল যে  রাগের মাথায় ওই বোতলের পোঁদ ভেঙেই খুন করে দিলাম…খচাখচ…খচাখচ…পেটের নাড়িভুঁড়ি বাইরে…রক্তারক্তি…তারপর সেদিনকেই ব্যাক টু ইনডিয়া…ইনডিয়ায় পালিয়ে আসার পর ভেবেছিলাম যে সব চাপা পড়ে গেল…তা হয়নি…ব্লাডি ফাকিং ইংল্যান্ডের পুলিশ ভারত সরকারকে লেটার রোগেটারি লিখে আমার অনুসন্ধানে লাগিয়ে দিলে…ধরা পড়ে গেলাম… অবধারিত এক্সট্রাডিশান থেকে বাঁচার জন্য কেলোর সাহায্য নিয়ে অন্যদের সঙ্গে আমিও পালালাম…সবাই মিলে ভাগলবা…

[ আবার স্কাউন্ড্রেলসুলভ কথা চালাচালি করি…কতক্ষণ নিজেকে স্কাউন্ড্রেলের অভিনয় করতে হবে কে জানে…কি করে এদের জালে তুলব…মহিলাদের উদ্ধার করব…মহিলারা যেতে চাইবেন কি না তাও অজানা…একজন বিদেশিনীও আছেন বোধহয়…তাঁরাও হয়ত এদের দলের সদস্য…অন্য প্রসঙ্গে যাই…যৌনতার প্রসঙ্গে… ]

–আপনি ওদেশে বিদেশিনীদের সঙ্গে শুয়েছেন ? নাকি ওদেশে গিয়েও ভার্জিন রয়ে গেলেন ? ওখানে তো শুনেছি মেয়েদের সঙ্গে শোবার দেদার সুযোগ পাওয়া যায়…না…মানে আপনার হাইটের জন্য প্রশ্নটা মনে এলো…

–না না…ব্লাডি ফাকিং ফ্রি ফর অল নয়…বেশ্যালয়ে পাওয়া যায়…

–যাননি একদিনও ?

–বাঃ অগো যাইবে না আবার…বাইঞ্চোত মেম পাইলে কে সাড়ে…দুধ-আলতা দুটা ঢাউস-ঢাউস বুক…

–যেতাম…যাবার জন্য আমার ব্লাডি ফাকিং ডিসটিলারি থেকে বেশ দূরে যেতে হতো…ট্রেনে করে এডিনবরা কিংবা গ্ল্যাসগো…বেশিরভাগ বেশ্যাই ছিল পূর্ব ইউরোপের…ভাঙা কমিউনিস্ট দেশগুলোর ব্লাডি ফাকিং মেয়ে…সকলেই আমার চেয়ে ঢ্যাঙা আর চওড়া…আমি ফাকিং-সাকিং করতাম না…জাস্ট বুকের ওপর শুয়ে ঢাউস দুটো গোলাপি মাইতে মাথা গুঁজে থাকতাম…বুকে মাথা গুঁজেই বুঝতে পারতাম কেন কম্যুনিস্ট দেশগুলো টিকলনা…আপনি কারোর ভালো করতে চেয়েছেন কি টিকবেন না…ব্লাডি ফাকিং কী হল শেষ পর্যন্ত ? মেয়েগুলোকে বেশ্যাগিরি করতে হচ্ছে…নিজেদের দেশগাঁ থেকে পালিয়ে…যে যুবতীর ঘরে যেতাম তাকে আগে থেকেই বলে দিতাম যে আমি কিসিংও করব না…ফাকিংও করব না…জাস্ট  বুকের ওপর শুয়ে থাকব…দেহের গরম-গরম আমেজ নেবো…ডুবে থাকব হারিয়ে যাওয়া সাম্যবাদের স্বপ্নে…ঘুমিয়ে পড়লে জাগিয়ে দিও…আর পুরো সময়ের বিল বানিয়ে পেমেন্ট নিয়ে নিও…মেয়েগুলো কিন্তু সৎ…একবার তো ট্রেন জার্নি করে ক্লান্তিতে বুকের ওপর শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম… ঘুম ভাঙতে মেয়েটা বললে যে আরেকজন বাঁধা খদ্দের এসে গিয়েছিল বলে আমাকে না জাগিয়ে আমার তলা থেকে বেরিয়ে খদ্দেরের আশ মিটিয়ে…পোঁছাপুঁছি করে…আবার আমার তলায় এসে আমায় জড়িয়ে শুয়ে পড়েছে…সেই বাবদ ডিসকাউন্ট দিয়ে দিলে…

–তা কেন ? ফাক আর সাক  করতে অসুবিধা কোথায় ? ডিসফাংশানের সমস্যা আছে নাকি…

–আমার ব্লাডি ফাকিং যৌনরোগের ভয় আছে…কমিউনিস্টদের নাকি যে প্রেমরোগ ধরে তা সহজে ছাড়ে না… আমাদের দেশেই  দেখুন না…কমিউনিস্টরা চলে গেলেন…কিন্তু ওয়াঁদের দেয়া ভালোবাসার গণরোগ যেমনকার তেমন রয়ে গেছে… দগদগে…ছাতাপড়া…ও রোগ সারতে সময় লাগে…অনেকসময় অবশ্য ব্লাডি ফাকিং ইউটোপিয়ার স্বপ্নে আপনা থেকেই ঘুমের মধ্যে ইজাকুলেশানের টুরুর-টুরুর হয়ে যেত…উত্তেজনা হলেও আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতাম…নিজেকে বোঝাতাম…লিটল গাই…ডু নট গো ইনসাইড…কাম ডাউন…কাম ডাউন…ডু নট বিহেভ লাইক এ কমিসার…

–দেশে ফিরে আর বেশ্যালয়ে যান না যান না…

–আমরা কেউই বেশ্যালয়ে যাই না…কোনো মেয়ে আমাদের প্রেমিকাদের ধারেকাছে আসতে পারবে না…এখন যেমন শান্তিতে আছি তা দিতে পারবে না…আমাদের প্রেমিকারা কোনো সাংসারিক অশান্তি করেন না…পবিত্র প্রেম…অবিনশ্বর সম্পর্ক…তুলতুলে…চুলবুলে…

–বিদেশে বেশ্যালয়ে যেতেন যে…

–তা যেতাম…আগেকার সংসার জীবনে সকলেই যেতাম…

–আপনাদের যে প্রেমিকারা এখানে রয়েছেন তাঁদের বলেছেন…সকলেরই তো প্রেমিকা রয়েছেন এখানে…

–তাঁদের বলাও যা না বলাও তাই…প্রেমিকার সঙ্গে আমার কোর্টশিপ চলছে…শুনলেন না একটু আগে…কেলোর ভোদুন ভগবানের কাছে হ্যাঁ মানে যা বোঝায়…না মানেও তাই বোঝায়…এখানে জঙ্গলের ব্লাডি ফাকিং জীবনে আমাদের ওইটাই মূলমন্তর…চলুন বাড়ির পেছন দিকটাও দেখে নিন…

[ একজন তরুণীকে গণধর্ষণ করে মেরে ফেলেছে স্কাউন্ড্রেলগুলো…অন্য তরুণীদের কিডন্যাপ করে এনে বন্ধ করে রেখেছে নিশ্চয়ই…দেখতেও পাচ্ছি না…গলার আওয়াজও শুনতে পাচ্ছি না…তাদের শাড়ি-ব্লাউজও তো কোথাও দেখছি না…বাইরে শুকোবে…তারাও কি ক্রিমিনাল নাকি…অন্য কোথাও ঘর-টর আছে মনে হয়…]

–চলুন…আমাকেও তো কাজ শেয়ার করে নিতে হবে…দেখে রাখি…আরে…আপনারা তো মুর্গিও পুষেছেন দেখছি…তা দিশি মুর্গি পুষলেন কেন ? ব্রয়লার পুষতে পারতেন…পোলট্রি ফার্মের মতন…

–দিশি মুর্গি নিজের খেয়াল নিজেরা রাখে…ভোঁসড়ির ছ্যানা মোরগ নিজের হারেমে বাদশার ডিউটি সমাধা করে ডিমের ব্যবস্হা করে দ্যায়…হারেমের ডিম থেকে অনেক কনেমুর্গি আর দামড়া-মোরগ সাড্ডল্য হয়… ব্রয়লার রাখলে তাদের স্বাস্হ্যের খেয়াল রাখতে হতো…ছ্যানা কিনে এনে মানুষের মতন মানুষ করতে হতো…বিশেষ খাবার দিতে হতো…ব্রয়লাররা তো মোরগের ভালোবাসার ডিম পাড়ে না…ওটা ওদের মেন্সটুরেশান…ভোঁসড়ির ছ্যানা যথেষ্ট দিশি মুর্গি আছে…পালক ছাড়িয়ে…আগুনে পুড়িয়ে খেলেই হল…নো তেল নো মশলা…নুন মাখান আর কাঁচা লঙ্কা দিয়ে খান…তবে রোজ-রোজ খেলে কোষ্ঠকাঠিন্যের জ্যামে দুঘন্টা তো লাগবেই…পেট পোষ্কার রাখার জন্য পায়খানার মাঠের গাছে-গাছে পঞ্চধাতুর ফাং শুই ঘণ্টি টাঙানো আছে…লঙ্কার গাছও আছে চৌহদ্দির মধ্যে…ওগুলো আমরাই পুঁতেছি…বীজ এনে…ভোঁসড়ির ছ্যানা লঙ্কা পেকে শুকিয়ে গেলে তা থেকেই আবার বীজ তৈরী হয়ে যায়…যিনি মারা গেলেন তিনি মাঝেমধ্যে বাটার চিকেন রাঁধতেন…তাতে বাটার থাকত না অবশ্য…

–বুইঝলেন কিনা…বাইঞ্চোত মুর্গিগুলারে জংলি জানোয়ারে তুইলা নিয়া যায় না…দূরে সইলা গেলে সে সম্ভাবনা থাকে…দিনের বেলায় ছাইড়া দেই…রাতের বেলায় উই খাঁচা দেখতাসেন…প্রায়  ঘরের মাপের… তাতে ঢুকাইয়া দেয়া হয়…ইন ফ্যাক্ট ওরা নিজেরাই সন্ধ্যা হইবার আগে আইসা ঢুইকা পড়ে…বাইঞ্চোত খাঁচাটা বোধহয় স্কট সাহেবে পাখি পোষার জন্য তৈরি করতেসিল…

–আর এটা কী ? এটা তো জেলখানা বা থানার লক-আপের মতন সামনে দিকে  গরাদ দেয়া…

–এটায় হয়তো সায়েব জংলি জানোয়ার পুষত…বা পোষা কুকুর রাখত…কিংবা তখুনকার দিনি ভারতীয়দের সাজা দেবার জন্যি  সায়েবরা ব্যক্তিগত কারাগার রাখত…তাও হতি পারে…ওটাকে আমরা ভাঁড়ার ঘর হিসাবে ব্যবহার করি…যখুনই চাল… আটা… ডাল… আলু… পেঁয়াজ… তেল… আনাজ… মশলাপাতি… বাসন-কোসন…পেটরল…ডিজেল…হ্যানত্যান জিনিস বাল্ক আনা বা হাতানো হয়…তখুন ওর ভেতরে রাখি…ইঁদুরে কাঠবিড়ালিতে খরগোশে নষ্ট করে…তা করুক…তার পরেও যা বাঁচে আমাদের জন্য যথেষ্ট…

–জঙ্গলে গিয়ে টয়লেট করতে হয় নাকি ? সাহেবরাই তো টয়লেটকে বাড়ির ভেতরে নিয়ে আসতে শিখিয়ে গেছে…

–রামায়ণ-মহাভারতে টয়লেটগুলা কি রাজপ্রসাদেই আছিল ? কুরুক্ষেত্রে কুথায় হাইগতে যাইত শতশত কৌরব-পাণ্ডব সৈন্য…যুদ্ধক্ষেত্রে সুলভ শৌচালয় আছিল কি…কৌরবদিগের প্রাসাদে কয়খানা টয়লেট আছিল…অ্যাটাচড ওয়াশরুম…পঞ্চবটি বনে…আকবরের সৈন্য রাজস্হানে লইড়বার সময় কুথায় হাগিত…জলের বদলে বালি দিয়া পুঁছিত কি…

–এই…চুপ করুন…এখন ব্লাডি সিরিয়াস ইশ্যু তুলবেন না…টু বি প্রিসাইজ…প্রত্যেক তলায় ঘরের ভেতরেই একটা করে পায়খানা আছে…পায়খানা মানে চেয়ারের মাঝে গোল করে কেটে এনামেলের গামলা বসানো…তাইতে সায়েব-মেমরা মনে হয় হাগতেন-মুততেন…আর ভারতীয় মেথররা নিয়ে গিয়ে ফেলে আসতেন…এনামেলের পাত্রগুলো আমরা মুর্গিদের খাবার দেবার কাজে লাগাই…

–হ্যাঃ হ্যাঃ…কুড়ি কোটি দুর্যোধনের বাল…আমি সালা এগগালে নগসাল ছিলুম…মনে থাকে যেন…

–এই চুপ…যে মরে গেছে তার নকল করবেন না…

— আপনি এই বয়সেই ফোকলা হয়ে গেলেন কী করে ?

–বুঝলেন কিনা…প্রেমিকার থন চুষে…

–থন না স্তন…

–থন…থন…উনি আপনারে আনন্দদায়ী হুরিপরির কথা কইলেন কৎখন আগে…তা হুরুপরির থন চুষলে দাঁত একটু আইলগা তো হইবেই…হেথায় থাইকতে-থাইকতে প্রেমিকার সঙ্গদানে আপনেরও হইবে…উইটাই বাইঞ্চোত আমাগো দাঁত মাজার পদ্ধতি বইলা মনে লইতে পারেন…

–এখন কোথায় হাগতে যান আপনারা…

–ওই যে ওই দিকে…বাস্তু শাস্ত্র অনুযায়ী ওই দিকটাই সঠিক…যেখানি আবনি গুলি খেয়ে মরার ভয়ে হ্যাণ্ডস আপ করি দাঁড়িয়ে পড়িছিলেন…তার পাশ দিয়ে এক ফার্লংটাক এগিয়ে  আগাছাঘেরা জায়গাটায় ফাঁকা দেখে বসতে হয়…কুয়োটাও ওই দিকেই…আগি কুয়ো থেকে জল তুলি মগি করি নে যাবেন…কুয়োর কাচেই মগ আচি…মাজে-সাজে সবাই মিলে হাগতি বসি গল্পগুজব করার ইচ্ছে হয়…তাই অনেকগুনো মগ আচি…আবনার যদি বড় মাপের বা ফুলআঁকা মগ দরকার হয় তো তাও আচি…যিনি মরি গেলিন তিনি  মুর্গিদের ঠেঙে চেয়ে এনামেলের গামলা নিজের ঘরে নিয়ে গিয়ে রেকেচিন… রাতবিরেতে তিন তলা থেকি নাবতি চাইতেন না…সকালি রোদ উটলে মাটি খুঁড়ি পুঁতি আসতেন…আবনাকে তিন তলার ঘর অ্যালট করা হয়েছে…আবনিও ইচ্ছে হলি চেয়ারে বসি গামলায় হাগতি পারেন…যিনি মরি গেলিন তাঁর রাকা একাধটা গামলা আচি মনে হয়…আমরা তো ওনার ঘরে যখুনতখুন যেতিম না…পচন্দ করতিন না…

–কুয়োটাও সাহেবেরই খোঁড়ানো ?

–ভোঁসড়ির ছ্যানা আমরা মাটি খুঁড়ে লাশকে মাটি চাপা দিতে পারি মানে এই নয় যে জঙ্গলে বসবাস করার জন্য কুয়োও খুঁড়ে ফেলব…

–আমি একটু হেগে আসতে চাই…সকালে পেয়েছিল…কিন্তু জলের অভাবে চেপে গিয়েছিলাম…তারপর ভেতরে সেঁদিয়ে গেছে…

–একটু কেন…বাইঞ্চোত পুরাটাই হাইগা আসুন না…ফুল কোর্স…

–যেখানে হ্যাণ্ডস আপ করে দাঁড়িয়েছিলেন ভোঁসড়ির ছ্যানা সেখান পর্যন্ত সটান চলে যান…তারপর এক-দু ফার্লং এগিয়ে ফাঁকা দেখে বসে পড়ুন…গাছের ডালে-ডালে ফাং শুই বাজনা আছে…কোঁৎ পাড়তে না হয় যাতে…

–বুঝলেন কিনা…হাইগবার জন্য আগে থিকা বাইঞ্চোত এক ফুট গভীর গর্ত কইরা রাখি আমরা…হাইগা চাপা দিয়া দেই…নয়তো জঙ্গলের নিবাসীরা  কেউ কেউ গু খাইবার লোভে নানাদিকে ছড়াইয়া ফ্যালে… ফেলাইয়া-ছড়াইয়া খাইবার অভ্যাস…কয়েকটা গর্ত করা আসে…তারই একটায় আপাতত হাগুন…পরে আপনেও নিজের হাইগবার গর্ত খুঁইড়া রাখবেন… খুরপি-টুরপি আসে…বৎসরখানেক পরে ফার্টিলাইজার হইয়া যায়… অরগ্যানিক সব্জি পাওয়া যায়…স্বাস্হ্যের পক্ষে ভালো…

–এইখানে রেখে যাচ্ছি ঝোলাটা…

–যান…হয়ে আসুন…

–ওকে…সি ইউ…হ্যাভ এ গুড টাইম…

–[ মানুষের গুয়ের গন্ধ পেয়ে তবেই জায়গাটা পিনপয়েন্ট করেছিলুম…রেলে যেতে-যেতে গুয়ের গন্ধ থেকে যাত্রীরা টের পায় এবার শহর এলো…ওদের দিকে এগিয়ে গিয়ে…হ্যাণ্ডস আপ করার আগে এখানেই অটোম্যাটিক পিস্তল  ঝোপের ভেতরে লুকিয়ে রেখেছিলুম…যাতে স্কাউন্ড্রেলগুলো জানতে না পারে…ওই তো…ঝোপের ভেতরে…কাজে দেবে…সবকটা কোনো এক ফাঁকে আনআর্মড থাকলে হাতে-পায়ে গুলি মেরে ঘায়েল করে দেবার সুযোগ খুঁজতে হবে…দুজন অফিসারকেই স্কাউন্ড্রেলরা মেরে ফেলেছে…দুজন ছিল তো ওদের হ্যাণ্ড উইপনস নিয়ে বেরোনো উচিত ছিল…যাক নিজেদের আত্মপরিচয় দ্যায়নি ওরা…স্কাউন্ড্রেলগুলো ভাবছে ওরা পোচার আর ফরেস্ট গার্ড ছিল…হেগে নিই…কখন থেকে চেপে আছি এই স্কাউন্ড্রেলগুলোর পাল্লায়…শালারা ঘোড়েল ক্রিমিনাল…নিজের সঙ্গীকেই মেরে ফেলল কি না কে জানে…মেরে ফেলে হয়ত বলছে আত্মহত্যা করে নিয়েছে…এদিকে প্রেমিকাদের দেখা নেই…কিছু একটা গোলমাল আছে নিশ্চয়ই…প্রেমিকা প্রেমিকা বলে চলেছে…তাদের তো দেখা নেই…কন্ঠস্বরও শোনা যাচ্ছে না…কোথাও নিশ্চয়ই বন্ধ করে রাখে দিনের বেলায়…স্কট সাহেবের হয়ত মাটির তলায় সেলার-টেলার আছে কোথাও…পিস্তলটা এবার কাজে দেবে…জাঙিয়ার ভেতরে ঢুকিয়ে রাখি…ব্যাটারা যদি আবার সার্চ করে তাহলে বিপদ…হাগা…হাগা শব্দ হিব্রু ভাষায় আছে…ওল্ড টেস্টামেন্টে…হাগা মানে হিব্রু ভাষায় মেডিটেশান…লাতিনে অনুবাদ করার সময়ে হাগাকে করে দিয়েছিল মেদিতেশিও…হাগবার জন্য কনসেনট্রেশান জরুরি…মেডিটেট করে…মেডিটেট করে নিচে নামাতে হয়…তিনদিন যাবত এত আজেবাজে খেয়েছি যে কোষ্ঠকাঠিন্য হয়ে গেছে…যাক নামছে…নেমেছে…যাই এবার দেখি স্কাউন্ড্রেলগুলো কি পাঁয়তাড়া কষছে…ইনটেলিজেন্সের ইনফরমেশান ভুল ছিল…এরা সন্ত্রাসবাদী নয়…বইপড়া বিপ্লবী নয়.. ক্রিমিনাল…ঘাগু ক্রিমিনাল…পড়াশোনা করে এই লাইনে ঢুকলে যা হয়…রাজনীতিতে গেলেই পারত…]

–কি বলে গিয়ে, অনেকখুন তো গেচি লোকটা…দুর্যোধনের বাল…এখুনও পেট পোষ্কার হল না ?

–দেকুন তো ওনার  ঝোলার ঘাঁতঘোঁতে লুকোনো কিছু আছে কিনা…বিশ্বাস নেই লোকটাকে… গেলেফু থেকে বড় রাস্তা ধরে জঙ্গলের দিকে নেমে ডুয়ার্সে ঢুকতে বুকের পাটা দরকার…ফেডেড জিন্স…স্পোর্টস জুতো…

–দ্যাখতাসি…

–দুর্যোধনের বাল…টর্চ দুটো দেকুন…পেন-পিস্তল নয়তো…

–নাঃ…ইলেকট্রনিক টর্চ…বাইঞ্চোত ব্যাটারিও নাই…

–দুর্যোধনের বাল…আরেগবার চেগ করি নিন…

–নাঃ…কিসুই তো নাই…

–আমি বলি কি…দুর্যোধনের বাল…ব্যাটাকে উড়িয়ে দেয়া যাগ… ফালতু রিস্ক নিয়ে কি দরকার… কোতাগার কে…সালা মরল না বাঁচল তাতি আমাদের কি…

–কী কন আপনে…আমরাও উনার মতই বাইঞ্চোত বিপদে পড়সিলাম…সকলে এককাট্টা হইয়া স্বাধীন হইলাম… উনাকেও স্বাধীন জীবন কাটাইতে দেয়া উচিত নয় কি…যিনি মারা গ্যালেন তাঁর চাকরিতে একজন বদলিও চাই…আমরা বাইরাইলে এখানে থাইকবে…রাইনধা রাইখতে পারবে…

–দুর্যোধনের বালের স্বাধীনতা…সালা সারা জীবন ল্যাংটো পোঁদের ক্লিভেজ দেখিয়ে চুকিতকিত খেলতি হবি…গাছি চড়ি চোর-পুলিশ খেলতে হবি…লুঙ্গি পরি কাটাতে হবি…শহরের মজা নেই…কিছু নেই…মিছিলে যাবার জো নেই…কোতাও দেয়াল নেই যে তাতি স্লোগান লিগব…মল-মাল্টিপ্লেক্স নেই…ডিসকো নেই…নাইটক্লাব নেই…ডমিনোজ পিৎজা নেই…কোকাকোলা নেই…ম্যাকডোনাল্ডের বার্গার নেই…কেএফসির চিকেন ঠ্যাং নেই…স্টারবাক্স নেই…এ কোন দুর্যোধনের বালের স্বাধীনতা…

–কোন দ্যাশে যে কে বাইঞ্চোত স্বাধীন থাকে…সে দ্যাশ আর সে স্বাধীনতা…বাইঞ্চোত আহা…

–যিনি মারা গেলেন তাঁকে তাহলে মাথায় ঘুষি মেরে বেলেত ফেরত কোতল করলেন কেন…ওনার কি মজার দরকার ছিল না…

–উনি ব্লাডি ফাকিং আমার প্রেমিকার সঙ্গে শুয়েছিলেন…

–শুলেই বা…ওনার  ইরেকশান হতো না…আমরা নিজের চোখে আর হাতে দেখেছি…নাড়িয়ে-চাড়িয়ে দেখেছি…ডিসফাংশানাল…নকশাল করতে গিয়ে পুলিশের লাথিতে বিচি ফেটে গিয়েছিল…

–ব্লাডি ফাকিং উনি আবার নকশাল করতেন নাকি…নকশাল হ্যাঙ্গাম যখন হয়েছিল তখন উনি বাপের টেস্টিকল্সে লিকুইড ছিলেন…উনি যে নেতার  স্যাঙাত ছিলেন সে নকশাল করত…খোকাবয়সে…তাই যিনি মরে গেছেন তিনি নিজেকে ওই লেবেল লাগিয়ে নিলেন…ওই নকশাল ব্যাপারটার জন্যই মাথা গরম হয়ে যেত…তার ওপর বারবার কপচাতেন যে আমাদের আত্মসমর্পণ করা উচিত…ঘানি ঘোরাবার কোটা পুরো করা উচিত…যখনই দেখুন… ব্লাডি ফাকিং আউড়ে চলেছেন…হ্যাঃ হ্যাঃ…আমি নকশাল ছিলাম মনে থাকে যেন…চলুন সবাই মিলে আত্মসমর্পণ করি…নকশাল ছিলেন বলে কোন বাল উপড়ে তিস্তার জল উদ্ধার করেছেন শুনি…

–বাল নয়…বাল নয়…দুর্যোধনের বাল…

—ওকে…ওকে…এনটায়ার কৌরব ক্ল্যানের বাল…এমন ভাবে কথাগুলো বলতেন যেন নকশাল হওয়া মানে মনীষী বা ঋষিমুনি হয়ে যাওয়া…আমাদের চেয়ে উঁচুতে উঠে যাওয়া…ওয়াঁর নেতা তার গুরুঠাকুরের কথামৃত শুনে…বই পড়ে সেই কেতাবের নকশা অনুযায়ী খুন করে ছেলেবেলায় হাত পাকিয়েছিল…আমরা কোনো গুরুঠাকুরের বইটই না পড়েই…হাত না পাকিয়েই…মাঝবয়সে খুন করে চলেছি…তফাতটা কি শুনি…ওয়াঁরা তালিকা মেনে টিক দিয়ে গলা কাটত…আমরা বাধা পেলে দনাদ্দন উড়িয়ে দিই…আমরা যাদের অ্যাট দি স্পট শত্রু হিসাবে বেছে নিই..ওয়াঁরা আগে থাকতে তালিকা লিখে  তাদের গণশত্রু হিসাবে বেছে নিতেন…শালা…রোজ রোজ আমি নকশাল ছিলাম আমি নকশাল ছিলাম…চলুন আত্মসমর্পণ করি…সাজা ভুগে নিই… শুনতে-শুনতে ব্লাডি ফাকিং মেজাজ একদম খিচড়ে গিয়েছিল…আসলে উনি নেতার বিদ্যাধরী স্যাঙাতগিরি করার সময়ে মাগিবাজিতে ফেঁসে গিসলেন…যিনি মরে গেছেন…তখন ওয়াঁকে পুলিশ তুলে নিয়ে গিয়ে মাগিবাজি করার যন্তর থেঁতলে-দুমড়ে দিয়েছিল… টু বি প্রিসাইজ…সেসব নকশালরা রিটায়ার করেছে…চুল পাকিয়ে সরকারি খোরপোষ ফ্ল্যাট-ট্যাট নিয়ে গুছিয়ে বসেছে…সরকারি-বেসরকারি পুরস্কার হাতিয়ে প্রতিষ্ঠানবিরোধী বই লিখে কামাচ্ছে…নয়তো ল্যাপটপ নিয়ে জঙ্গলে গিয়ে তালিকা অনুযায়ী টিক দিচ্ছে…তা করলেই পারতেন…তা নয়…কেতাবি ভেড়ুয়াগিরি আর ফিসফিসবাজি ছাড়তে পারেননি…জেলহাজতে তো ব্লাডি ফাকিং পচে মরছিলেন…ওয়াঁর রিটায়ার্ড নকশালদাদা জামিন দিয়ে ছাড়াতে পারত…তার বদলে ওয়াঁকে আরও অনেক আই পি সি ধারায় ফাঁসাবার জন্য পুলিশকে টিপস দিয়ে দিলে…আমাদের সঙ্গে যদি না পালিয়ে আসতেন…তাহলে আন্ডারগ্রাউন্ড সাকরেদদের ঠিকানা আদায় করার জন্য পুলিশ ওনার ব্লাডি ফাকিং চোদ্দপুরুষের গুষ্টিকেও ক্যাওড়ায় পাঠিয়ে দিত…

–তাইতে টাকমাথায় ঘুষি মেরে খুন করতে হবে ? তাছাড়া আমাদের মতন…যিনি মরে গেছেন তাঁরও ফ্যামিলি-ট্যামিলির টান ছিল না…আর লিগ্যালি ব্লণ্ড চাঁদবদনীকে…যিনি মরে গেছেন তিনিই নিজের সঙ্গে এনেছিলেন…আপনিই চাঁদবদনীকে… যিনি মরে গেছেন তাঁর কাছ থেকে কেড়ে নিলেন…

–দুর্যধনের বাল…আমার তো মনি হচ্চিল ঘুষি খেয়ি অজ্ঞান হয়ে গিসলেন…মরি যাননি…

–আরে মরে গিসলেন…আমি নিজে নাকের কাছে হাত রেখে দেখেছি…চাঁদবদনী আমার প্রেমিকা…আমাকে চাঁদবদনী ভালোবাসেন না তো কি হয়েছে…আমি তো বাসি…আমি চাঁদবদনীকে ভীষণ ভালোবাসি…আমার ঘর থেকে  ফুসলিয়ে নিজের ঘরে নিয়ে গিয়ে জড়িয়ে শুয়েছিলেন…নিজের চোখে দেখেছি…ওখানেই ওয়াঁর লুঙ্গির খুঁট খুলে নড়া ধরে মাথায় দিলাম এক ঘুষি…ছিটকে গিয়ে পড়লেন…তারপর আর ওঠেননি…আপনারাও দেখেছেন…লুঙ্গি খসে ল্যাংটো পোঁদে উপুড়…

–চাঁদবদনী ওনার সঙ্গেই শুতে চাইতেন…দুজনে একে আরেকজনকে জড়িয়ে শুয়েছিলেন…চাঁদবদনীর পায়ে ওনার পরানো নূপুর ছিল…মাটি চাপা দেবার আগে মারা গেছেন কিনা হানড্রেডপারসেন্ট শিওর হওয়া উচিত ছিল…আপনি আপদ বিদায় করার ধান্দায় তাড়াতাড়ি মাটি খুঁড়ে গতি করার কথা ভাবলেন…

–ব্লাডি ফাকিং আপনারাও তো মাটি ফেললেন…

–আমরা জাস্ট রিচুয়াল ফলো  করতেসিলাম…মাটি সড়াইয়া দিতেসিলাম…মইরা গেসেন কিনা…বাইঞ্চোত শ্বাস-প্রশ্বাস চলতাসে কিনা তাতো আপনে চেক করলেন…

–ওপরের ঘরে…বোধয়…যিনি মারা গেছেন… তাঁর  একা-একা ভোঁসড়ির ছ্যানা শীত করছিল…তাই নিয়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরে তাপ নিচ্ছিলেন…চাঁদবদনীর শরীরের তাপের ওপর আপনার চেয়ে বেশি অধিকার ছিল যিনি মরে গেছেন তাঁর…

–আরে তো ব্লাডি ফাকিং আমার প্রেমিকাই বা কেন…আপনাদের প্রেমিকাও তো ছিল…আপনাদের প্রেমিকাদের দেহেও তো তাপ আছে…

–দুর্যোধনের বাল…আবনাদের জয়েন্ট প্রেমিকাকে হ্যাণ্ডেল করা সহজ…পিঙ্কি-পিঙ্কি বোঁটা…নরম নরম গোলাপি থলথলি…আর ওনার অধিগার ছিল চাঁদবদনীর ওপর…উনি নিয়ে এস্ছিলেন মানি উনিই চাঁদবদনীর সোয়ামী…তাছাড়া ইরেগসান হয় না বলি কি আর দুর্যোধনের বাল প্রেম করে না লোকি…থার্ড সেক্সের মানুষও তো প্রেম করে…প্রেম করার সঙ্গে ইরেগসানের কোনো সম্পর্ক আচি বলি আমি মনে করি না…

–না…আমি প্রথম থেকেই সবাইকে হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছিলাম যে আমার চাঁদবদনীকে ফুসলিয়ে নিয়ে গেলে ক্ষমা করব না…যিনি মরে গেছেন তিনি ভেবেছিলেন যে ব্লাডি ফাকিং জাস্ট ফাঁকা হুমকি দিচ্ছি…আপনারা নিজেদের মধ্যে প্রেমিকা এক্সচেঞ্জ করেন… আমি কি করেছি কখনও…আমার প্রেমিকা  এক্সক্লুসিভলি আমার…

–চুপ চুপ…

–ওই যে আসচেন দুর্যোধনের বাল…হেগেমুতে…হেলতে-দুলতে…

[স্কাউন্ড্রেলগুলোর কথা কাটাকাটি শুনে ফেলেছি…তার আঁচ একদম দেয়া চলবে না…মেরে ফেলে বলছে মারা গেছেন…প্রেমিকাকে নিয়ে দ্বন্দ্ব…সুন্দরী প্রেমিকার কথা হচ্ছিল…নিশ্চয় বিদেশিনী… ]

–হাগতে বসে  চারটে পাকা কবর চোখে পড়ল…ওগুলোও কি আপনাদের পোঁতা লাশ ?

–কি বলে গিয়ে…ওগুলো বহুকাল আগের…ভোঁসড়ির ছ্যানা… যে সায়েব এই বাড়ি তৈরি করেছিলেন… ওনারই আত্মীয়-ফাত্মীয় হবে হয়তো…

–বুঝলেন কিনা…জাস্ট গেস ওয়র্ক…ক্রিশ্চান সায়েবদের কবরে নাম আর জন্ম-মৃত্যু লেখা থাকে…ক্রশ চিহ্ণ থাকে…সেসব কিছুই নেই কবরগুলোয়…অমিত্রাক্ষর ছন্দে লেখা এপিটাফ থাকে…

— কে অত বাইঞ্চোত খাটবে…ফালতু শ্রমদান…

–কি বলে গিয়ে…চলুন…আপনার  ঘরটা দেখিয়ে দিই… টু বি প্রিসাইজ…আপনার বয়স আমাদের থেকে কম…তিনতলায় ওঠানামা করতে অসুবিধা হবে বলে মনে হয় না…জঙ্গলের ভালো ভিউ পাবেন…পূর্ণিমার চাঁদ-টাঁদও নজরে পড়তে পারে…শীতের সকালে ছিলিমে কুয়াশা নিয়ে ফুঁকতে পারবেন…আমরা ডাকাতি করতে বেরোলে চাঁদের দিকে তাকিয়ে আয়েস করতে পারবেন…দু-এক তরকারি ভাত বা মুর্গি ছাড়িয়ে-পুড়িয়ে রেঁধে রাখতে পারবেন…

–নাঃ…কলকাতায় তো তিনতলাতেই থাকতাম…একতলা-দোতলায় আমার নার্সিং হোম…

–ফ্যামিলিকে ফেলে পালিয়ে এলেন ?

–ফ্যামিলি কোথায় স্যার…ভূবাংলায় কেউ নেই…বাবা মারা গেলেন সাত বছর আগে আর মা মারা গেলেন পাঁচ বছর আগে…বিয়েটিয়ে করিনি…মেয়েদের যৌনাঙ্গ ঘেঁটে-ঘেঁটে মেজাজ একেবারে তেতো হয়ে গিয়েছে…বিয়ে মানে তো সেই একই ঘাঁটাঘাঁটি…বললাম না একটু আগে…প্রেম ব্যাপারটাকে নষ্ট করে দিয়েছে মানুষের শরীরের রস-রসায়ন-অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ…মা অনেক করে বিয়ে করার কথা বলতেন…কিন্তু ও বিষয়ে চিন্তা করলেই বমি পেয়ে যেত…চোখে ভেসে উঠত নানা মাপের নানা ত্বকের যোনি…একাই বেশ আছি…আর এখন তো আপনাদের সঙ্গ পেয়ে গেলাম…একই জঙ্গলের জীব…আরে…আকাশে হেলিকোপ্টার উড়ছে…ওড়ে নাকি মাঝে-সাঝে…

–যোনি…বাইঞ্চোত দারুণ ছবি…যোনি যোনি রে যোনি রে…হিঁঃ হিঁঃ…

–ওই মানে ইয়ে…বোড়োল্যাণ্ড…কামতাপুরি…মুজাহিদিনের নেড়ে…পারবাংলার ছাগু…আসামের অলিভ-পাতলুন ছেলে-ছোকরারা বিপ্লব-টিপ্লব করছে তো…তার সঙ্গে মুখে-গামছা মাওবাদিরাও আছে…আর্মির লোকেরা তাদের মৌচাক খুঁজে বেড়ায়…তবে বহুকাল পরে আবার হেলিকোপ্টার উড়তে দেখছি…গণ্ডোগোল হয়ে থাকবে…বাইরে বেরিয়ে… নেপোপ্রেমী চিৎফাঁদ টয়লেট  পাঁজি দেখলে জানা যেত… আপনি তো দিনকতক আগেই বেরিয়েছেন…ঘটেছে নাকি কিছু…

–ঘটনা তো আকছার ঘটতে থাকে…আপনারা উলঙ্গ বিপ্লব করছেন…ছেলেছোকরারা মার্কামারা পোশাক পরে আরেক ধরনের বিপ্লব করছেন…বিপ্লব ছাড়া মিডিয়া একেবারে জোলো…সোশাল মিডিয়া পানসে…

[ স্কাউন্ড্রেলগুলো আমার বানানো আত্মজীবনী বিশ্বাস করে নিয়েছে…আরও নৈকট্য গড়ে তুলতে হবে…যাতে এদের পুরো কাজকারবার জানা যায়…আমাকে খুন করবে না বলেই মনে হচ্ছে…কিন্তু প্রশ্ন হল তরুণীরা কোথায়…কোথাও বন্ধ করে রেখেছে নির্ঘাত…দেখা যাক…]

–হ্যাঃ হ্যাঃ…কুড়ি কোটি দুর্যোধনের বাল…আমি সালা…

–এই চুপ…যে মরে গেছে তার কথা আর মনে করাবেন না…

–হাগতে-হাগতে আরেকটা আশঙ্কা হল…পেট খারাপ করে যদি রাতের বেলায় হাগতে যেতে হয় তাহলে কি জংলি জানোয়ারের হাতে পড়ার ভয় থাকে…

–তা থাকে…বাঘ…বাইসন…হাতির পাল…বুনো দাঁতাল শুয়ার দেখা গিয়াসে বটে…জংলি শুয়ারের মাংস পুড়াইয়া খাইতে…আহা…বুইঝলেন কিনা…তবে কাইটবার ঝামেলা এই যে…শুয়ারগুলা কাইটবার সময় এমন বাবাগো…মাগো…বইলা চ্যাঁচাতে থাকে…যেন সালিসি সভায় গণপিটুনি…কান্ট ইম্যাজিন…হাইগতে বইসলে বাইঞ্চোত অমন অবস্হায় একজন তাকে বন্দুক হাতে পাহারা দেয়…আপনারে যে ঘর অ্যালট করা হইসে  সেখানে পোর্টেবল টয়লেট আসে…

–তাহলে তিনদিন জঙ্গলে একা-একা হেঁটে খুব জোর বেঁচে গেছি…

–তা যা বলেছিন…আমিও ভাবছিলুম যে আবনি কি করি গেলেফু থেকি ঘন জাঙালে ঢুগলেন… দুর্যোধনের বাল ওদিকি হাতির পাল ছাড়াও বাঘ দেখা যায়…হরিণ খাবার লোভে বাঘ নেবি আসি…

–আচ্ছা…হাগতে-হাগতে  ছাগলের নাদিও চোখে পড়ল…ছাগলও আছে নাকি জঙ্গলে…

–বাঘের…হাতির…বাইসনের নাদি হবে হয়তো…শুয়োরের নাদিও হতে পারে…ডুয়ার্সে সকলেরই নাদি হয়…খরগোশ মারতে পারলে মাঝেমধ্যে পুড়িয়ে খাবার সুযোগ হয়…ভ্রমর দেখতে পাননি ? শহরে তো ভ্রমর দেখা যায় না…অন্য কোথাও আপনি হাগতে বসে ভ্রমর দেখতে পাবেন না…এখানেই লাইফ টাইম এক্সপিরিয়েন্স…ন্যাশানাল জিওগ্রাফিকের চেয়েও বাস্তব…

–বোলতা…ভিমরুল…মৌমাছিই আর দেখা যায় না শহরে…তো ভ্রমর…চলুন…ওঠা যাক ওপরে… আপনারা  বোধহয় প্রতিদিন স্নান করেন না…

–প্রেওজন হয় না…চান করে হবেটাই বা কী…সেই তো রাত নাবলিই প্রেম করতি হবি…প্রেমিকাদের আদর করতি হবি…চুকুস চুকুস করতি হবি…

–এ তো দেখছি কাঠের পাকানো সিঁড়ি ওপরে উঠে গেছে…দারুণ ব্যাপার…সেগুনকাঠের সিঁড়ি… তখনকার দিনের…ভেবে দেখুন…গভীর জঙ্গলের ভেতরে…চারিদিকে সবুজ…

–তা যা বলেছেন…ফেভিকল ছিল না…জোড়…তারপর হাত-রেলিং…ব্যালাসট্রেড…হাতল…নিউঅ্যাল পোস্ট…রাইজার এগুলো করার জন্য ভোঁসড়ির ছ্যানা উপযুক্ত ছুতোর জোগাড় করে আনতে হয়েছে…

–জঙ্গলের ভেতরে তখনকার দিনে যদি রাস্তা ছিল তো তা কোথায় গেল ?

–বুইঝলেন কিনা…বাইঞ্চোত রাস্তা তো আছে…আমরা যে ট্রিপ মাইরতে বাইরাই…সেই রাস্তা দিয়াই যাই…আগের মতন চওড়া  আর নাই…কিন্তু চলার পথ আছে…বাইকেবল রোড…গোপন…

–কই দেখতে পেলাম না তো…

–ওদিকে নয়…রাস্পবেরি ঝোপের পাশ দিয়ে পেছনে যেতে হবে…সেখানেই আছে মোটর সাইকেলগুলো…

–মোটর সাইকেল…দেখতে পাইনি তো…আমি তো আসার সময়ে আমার মোটর সাইকেলটা বেচে দিয়ে এলুম…

–ছটা মোটর সাইকেল রাখা আছে…ছচ্ছটা…এই সায়েবের সার্ভেন্টস কোয়ার্টারে…সায়েবরা এদেশে এসে চাকর-বাকর ছাড়া নড়া-চড়া করতে পারত না…জঙ্গলে বাগানবাড়ি করেছিল মানেই চাকরবাকরদের কোয়ার্টারও করেছিল…স্ট্রবেরি রাস্পবেরি বাগানের দিকে গেলে আপনি দেখতে পেতেন…সেটাও কাঠের…তবে বার্মিজ টিক উড নয়… লোকাল সেগুনকাঠ…

–ছ’টা মোটর সাইকেল…ওগুলোও কি লিফ্ট করা ?

–তা নয়তো কি…জঙ্গলে আমরা এসেছিলাম ঝাড়া হাত-পা…তারপর সবাই মিলে সংসার গুছিয়ে নিয়েছি…

–সংসার…

–সংসার ছাড়া কীই বা বলবেন একে…সঙ্গিনী…সঙ্গম…আর রুটিন মানেই তো সংসার…আমাদের সকলেরই সঙ্গিনী আছে…কমপ্লিকেটেড রিলেশানশিপ…আপনাকেও যোগাড় করে দেব…প্রেম ছাড়া বাঁচতে পারবেন না এই গভীর জঙ্গলে…

–কেন-কিঁ কেন-কিঁ কেন-কিঁ কবি লেখক নাট্যকার চিত্রকর অভিনেতা ভাস্কর স্হপতি এরা সবাই অসামাজিক গাধা…

–কেন-কিঁ কেন-কিঁ কেন-কিঁ কবি লেখক নাট্যকার চিত্রকর অভিনেতা ভাস্কর স্হপতি এরা সবাই অসামাজিক গাধা…

–কেন-কিঁ কেন-কিঁ কেন-কিঁ কবি লেখক নাট্যকার চিত্রকর অভিনেতা ভাস্কর স্হপতি এরা সবাই অসামাজিক গাধা…

–সি…ইট ইজ নট মি দিস টাইম…ইট ইজ দি বার্ড রিপিটিং…

–ইয়েস…উই নো…ইউ বেটার ফাইন্ড আউট দি বার্ড অ্যান্ড প্যাসিফাই ইট…

–আমার কথা তো শোনালাম…কেলো আর ওনার…দুর্যোধনের বালের…ওনাদের কাহিনি তো শোনা হল না এখনও…

–ইয়েস…আই শ্যাল টেল ইউ মাই স্টোরি…

–কেলো বাংলা ভালোই বোঝেন দেখছি…

–তা বুঝবে না কেন…কতকাল যাবত আনডারট্রায়াল অতিথি হয়ে জেল আর আদালত পরিভ্রমণ করেছেন…লাথি আর লপসি খেয়েছেন…

–ব্লাডি ফাকিং আমিই বলছি কেলোর কাহিনি…কেননা বলতে-বলতে ওয়াঁর ইংরেজির স্টক ফুরিয়ে যাবে…তখন ইটালিয়ান…ইয়োরুবা…হাউসা আর ইবো ভাষা ঢুকে পড়বে ওয়াঁর কথাবার্তায়…আমি টুকরো-টুকরো শুনে মোটামুটি একটা গল্প গড়ে তুলতে পেরেছি…সেটাই বলছি…

–দুর্যোধনের বাল…গল্প বলচিন কেন…ওগুনো তো ওনার জীবনের ঘটনা…

–ব্লাডি ফাকিং সেই ঘটনাগুলো গুছিয়ে বলতে গেলে গল্প হয়ে যায়…গুছিয়ে না বললেও নতুন-রীতির গল্প হয়…খাবলা-খাবলা ঘটনা জুড়ে-জুড়ে শেকল বানিয়ে দিন…ব্যাস…যেমন আমাদেরগুলো গল্প করেই তো বললাম ওনাকে…

–বলুন বলুন…খাবলে বা রসিয়ে…

–ওয়াঁদের আফ্রিকায় ওলে সোয়েঙ্কা নামে একজন কলেজ ছাত্র ছয় বন্ধুর সঙ্গে একটা গোষ্ঠী গড়েছিলেন আর তার নাম দিয়েছিলেন পাইরেটস কনফ্র্যাটারনেটি…

–তার মানে পশ্চিমবাংলা কত পেছিয়ে আছে ভাবুন…এতকাল পরে এখানকার ঘরকুনো ছাত্ররা পাইরেটস হতে পেরেছে…

–কনফ্রেটারনিটি ? বলেননি তো আগে…

–কনফ্র্যাটারনিটি আসলে খ্রিশ্চানদের বেরাদরি…ব্রাদারহুড…মানে ভাতৃসঙ্ঘ…টু বি প্রিসাইজ…ছাত্রদের দাবিদাওয়া… সুযোগসুবিধা ইত্যাদির জন্য আরম্ভ হয়েছিল…পশ্চিমবাংলার ছাত্র ইউনিয়ানের মতন বলতে পারেন…ওয়াঁদের লোগো ছিল মাথার খুলি আর তার তলায় দুটো পাঁজরের হাড়ের গুণচিহ্ণের ক্রস…আমাদের দেশেও ছাত্রছাত্রীদের উচিত ওই লোগোটা অ্যাডপ্ট করা…কনফ্র্যাটারনিটির সদস্য সংখ্যা বাড়তে লাগল… সদস্যরা ব্লাডি ফাকিং লোগোর চাপে নানারকম জলদস্যু নাম রাখা আরম্ভ করলে…কেউ নিজেকে বলত ক্যাপ্টেন ব্লাড আবার কেউ জন লং সিলভার…সকলেই যেন এক-একজন পাইরেট…বেগতিক দেখে ওলে সোয়েঙ্কা ওয়াঁর গোষ্ঠী ভেঙে দিলেন…তা দিলে কী হবে…ততদিনে প্রায় তিনশো স্কুল-কলেজে ব্লাডি  কনফ্র্যাটারনিটি গজিয়ে গেছে…আমাদের দেশের রাজনৈতিক নেতারা যেমন ছাত্রদের মাথা মুড়োয় ওয়াঁদের আফ্রিকায় তেমন মিলিটারি নেতারা ছাত্রদের কনফ্র্যাটারনিটি দখল করতে লাগল…কারা নতুন ছাত্রদের নিজের তাঁবেদার সদস্য বানাবে তার জন্য মারামারি…ধস্তাধস্তি…টানাহেঁচড়া…আমাদের দেশের মতনই ওয়াঁদের দেশেও ছাত্রদের দলে ঢুকে গেল মাফিয়ারা…ঠগিরা…ব্যাস…আরম্ভ হয়ে গেল খুনোখুনি…ছাত্রি ধর্ষণ…বাজি রেখে অধ্যাপিকা ধর্ষণ এটসেটরা…বদলা নিতে ছাত্রিরাও কনফ্র্যাটারনিটি গড়তে লাগল…নানা নামে…যেমন ব্ল্যাক ব্রা যার সদস্যরা কালো রঙের ব্রেসিয়ার পরত…ভাইকুইনস…জেজেবেলের মেয়ে আরও নানা নামের… বেশ কয়েকটা কনফ্র্যাটারনিটি অ্যানিমিস্ট হয়ে গিয়েছিল…ভোদুন নামে এক দেবতার পুজো করত…

–ডেঞ্জারাস ব্যাপার…ওলে সোয়েঙ্কাও তো আমেরিকায় পালিয়ে গিয়েছিলেন…তারপর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান…নিজের দেশ ছেড়ে আমেরিকা-ইউরোপে পালিয়ে না গেলে নোবেল পাওয়া মুশ্কিল…তা আপনি যতোই বাংলা থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করান…

[ এরা নিজেরাই চুরি ডাকাতি খুন করে চলেছে আর স্কাউন্ড্রেলগুলো অন্যদেশের মাফিয়াদের বলছে খুনি… ধর্ষক…ঠগি…নিজেরা তরুণীদের কিডন্যাপ করে এনে ধর্ষণ করছে…রেপিস্টের দল…এত কাণ্ড করে বেড়াচ্ছে অথচ ধরা পড়ল না আট বছরে…]

–ও…তাই নাকি…ভোঁসড়ির ছ্যানা…আমরা পালিয়ে এসে সায়েবের তিনতলা কাঠের বাড়ির আশ্রয় পেয়েছি পুরস্কার হিসাবে…

–আফ্রিকার মেয়ে…তাঁরাও হয়ে দাঁড়ালেন মাফিয়া আর ঠগির দল…কেলোর মা অমনই একটা কনফ্র্যাটারনিটির সদস্য ছিলেন…ছাত্ররা তাঁকে তুলে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করেছিল…যারা ধর্ষণ করেছিল তাদের গ্রেপ্তারও করেছিল ওদেশের ব্লাডি ফাকিং পুলিশ…আদালতে তারা বললে যে শয়তান ওদের ফুসলিয়ে কুপথে নিয়ে গিয়েছে বলে তারা ওই কাজ করে ফেলেছে…

–তাই ?

–হ্যাঁ…তারা দাবি করেছিল যে অসৎ আত্মা থেকে নিষ্কৃতি পাবার জন্য তারা অমন কাজ করতে বাধ্য হয়েছিল…ছাড়া পেয়ে নিজেদের কাল্টে ফিরে গেল ছোঁড়াগুলো…যেমনটা আমাদের দেশে হয়…ফিরে যায়…আবির মাখে…মোটর সাইকেল চাপে…

–আচ্ছা…

–কেলো বলতে চান না কনফ্র্যাটারনিটিটার নাম…আমরাও জানতে চাইনা…মিলিটারির কোনো অফিসারের বউ সেজে ওয়াঁর মা চলে গেলেন ইটালি…ব্লাডি ফাকিং সে ব্যাটা মিলিটারি অফিসার মনে ভরে গেলে ওয়াঁর মাকে বিদেয় করে দিলে…ইটালিতে ওয়াঁর মা বেশ্যাগিরি করে কেলোকে মানুষ করেছেন…কেলোও যোগ দিয়েছিলেন একটা ড্রাগ সিন্ডিকেটে…যারা ক্যাপসুলে কোকেন ভরে এশিয়ার বাজারে পাঠায়…

–সিন্ডিকেট শব্দটা শুনলেই তো ভয়ে পেট গুড়গুড় করে মশায়…

–শুনুন না গল্পটা…পরে আরেকবার ব্লাডি ফাকিং হাগতে যাবেন না হয়…মাঝখানে বাধা দিলে গল্পের মই হারিয়ে ফেলব…উপসংহারে নামতে পারব না…তা যারা ইনডিয়ায় মালগুলো আনে…তারা প্রায় পঞ্চাশটা করে ক্যাপসুল ভরা স্যাশে খেয়ে এখানে এসে হেগে…গু থেকে বেছে নিয়ে যাকে দেবার তাকে হ্যান্ডওভার করে দ্যায়…ভারতের বিমানবন্দরে মাফিয়াদের এজেন্ট অপেক্ষা করে…যাতে যে ক্যাপসুল নিয়ে আসছে সে অন্য কোথাও গিয়ে আগেই হেগে নিয়ে একদুটো ক্যাপসুল সরিয়ে না রাখে…কেলোর সঙ্গে আরেকজন কেলো ছিল…তার পেটে একটা ব্লাডি ফাকিং ক্যাপসুল ফেটে গিয়ে স্যাশে লিক করে ফুখে ফেনা উঠে বিমানবন্দরে নেমেই পকাৎপঙ অক্কা…চার বছর যাবত তার ঠাণ্ডাকাঠ লাশ মরচুয়ারিতে পড়েছিল…কোনো দাবিদার যখন নেই…তখন কাকেই বা দেবে পুলিশ…তার ওপর অ্যানিমিস্ট না পেসিমিস্ট টের পাবার উপায় ছিল না…শেষে নাকি আদালতের অনুমতি নিয়ে দাহ করে দিয়েছে…আসলে নুনুর খোসা অটুট ছিল বলে গোর দেবার দরকার মনে করেনি থানাপুলিশ…জানেন তো…কাশ্মীরে কোনো সন্ত্রাসবাদী মরলে সবচে আগে তার নুনু চেক করা হয়…আমাদের জঙ্গলে অবশ্য যে-ই মরুক না কেন…দাহ করা হবে না…তা সে তার নুনুর খোসা আস্ত থাকুক বা ছাড়ানো… কেবল গোর দেয়া হবে…দাহ করতে গেলেই আকাশে ধোঁয়া উঠে যাবে আর আমাদের আস্তানার কথা ফাঁস হয়ে যাবে… আপনি কি ভাবছেন পুলিশ আমাদের খুঁজছে না…আপনি মরলে আপনাকেও গোর দেয়া হবে…আপনার নুনুর খোসা তো আস্ত…অ্যাঁ…সাধু হবার ষড় করেছিলেন…

–আজ্ঞে হ্যাঁ…আমার কচ্ছপের মাথা ভেতরে…উনি তো স্বহস্তে ভেরিফাই করেছেন…তারপর…

–এই কেলো তো সেই কেলোর আগেই বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছিলেন…ক্যাপসুলগুলোর স্যাশে গু থেকে নিয়ে হ্যাণ্ডওভারও করে দিয়েছিলেন…যাতে আবার না ইতালিতে ফিরে যেতে হয় তাই ব্লাডি ফাকিং পাসপোর্ট ছিঁড়ে ফেলে দিয়ে মিশে গিয়েছিলেন একশো তিরিশ কোটির ভিড়ে…ইতালির মাফিয়া আর এদেশের এজেন্টরা খুঁজে বেড়াচ্ছে ওয়াঁকে…তাই উনি জেল থেকে পালাবার ষড় করেছিলেন…আমরাও তাতে যোগ দিলাম…

–উইডো…উইডো…

–হ্যাঁ…কেলোর মাকে ধর্ষণ করার পর একটা ব্লাডি ফাকিং বুড়োর সঙ্গে জোর করে বিয়ে দেয়া হয়েছিল… সে মরে যেতে মহাবিপদে পড়ে গেলেন ওয়াঁর মা…ওয়াঁর মায়ের ট্রাইবে বিধবাদের দুবছর স্নান করা…পোশাক পালটানো…চুল কাটা নিষিদ্ধ…সেই দুবছর গায়ে গোবর আর পাম অয়েল মাখতে হয়…মাটিতে শুতে হয়… কালো কাপড় পরে থাকতে হয়… স্বামী মারা গেলে বিধবা তখন স্বামীর বাড়ির বয়োজেষ্ঠ্য পুরুষের সম্পত্তি…ওয়াঁদের দেশে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে পাঠানোর মতন তো মথুরা-বৃন্দাবন নেই…বয়োজেষ্ঠ্য পুরুষ মানে বুড়োর বড় ছেলে…সে ছিল মিলিটারির লোক… সে ওয়াঁর মাকে নিজের রক্ষিতা করে নিলে আর ইতালিতে পোস্টিঙের সময়ে নিয়ে গেল সেদেশে…

–ডুয়ার্সে এসে আপনারাও নিজেদের কনফ্র্যাটারনিটি প্রতিষ্ঠা করলেন…

–ভোঁসড়ির ছ্যানা… কনফ্র্যাটারনিটি অফ চুকুম-চাকুম…

–যোনি-যোনি রে যোনি রে যোনি…ছবি দেখতাসি…হিঁঃ হিঁঃ…

–থাক থাক….আমাদের কনফ্র্যাটারনিটির বয়স্ক সদস্যের কাহিনিটা হয়ে যাক…

–এই দুর্যধনের বাল…বয়স্ক বলবিন না…চুল আবনাদের চেয়ে বেশি পাগলিও বয়সে আমি সবারচে ছোটো…ইনক্লুডিং দিস নিউকামার  সদস্য…যিনি মরি গেচেন শুদু তিনি আমারচি ছোটো ছিলেন…

–স্যার…বলুন বলুন…আপনার কাহিনি বলুন…

–দুর্যধনের বাল…আমার গল্প অত খোচ্চুরে মড়াপোড়া নয়… আমার একটা মোটর সাইকিল মেরামতের গ্যারাজ ছিল…ভালোই চলত…তিনজন মেগানিগ রাত্তির বেলায় গ্যারাজেই শুতো…মাজ রাত্তিরি গ্যাস সিলিণ্ডার ফেটি মরি গেল তিনজনি…পুলিস আমাগে ধরলে…বেআইনি গ্যাস সিলিণ্ডার ব্যওহার করার অপরাধে… তাপ্পর পাবলিকের আঙুল আর মিডিয়ার বাঁশে মার্ডার চার্জ জুড়ি দিলে…আমার উগিল বললে যে পার পাওয়া মুশ্কিল…দুর্যধনের বাল…পুলিশের ভ্যান থেকি মারপিট করি এনারা পালাচ্চিন দেকি আমিও ওনাদের পেচন-পেচন দৌড় লাগালাম…নয়তো  জেলি গিয়ে ঘানি ঘোরাতি হতো…তাপ্পর দুর্যধনের বাল…এখেনে কেটে গেল আট বচর…ভাগ্যিস মাটা আর বাবাটা গত হয়েচে…দুর্যধনের বাল দিব্বি আচি এখেনে…মাজখান থেগি যে মরি গেলন সে মরি গেলন…ঘেঙিয়ে ঘেঙিয়ে গিটার বাজাতিন…বেচ্চারা…গান শোনাতিন…

–ফুঃ…কাঁদো কাঁদো খইরিমুখো গান…উঁয়াউ উঁয়াউ…

–ব্লাডি ফাকিং পুরোটা বলুন না…অটোমোবাইল ইনজিয়ারিঙে তিন বছর গাড্ডুস মেরে আটকে গিয়েছিলেন আর তারপর…

–হ্যাঁ…দুর্যধনের বাল…অনেকে আটবচর দশবচরও ইনজিয়ারিঙে আটগি থাগে…প্রবলেম হল যি আমাকে ইনজিনিয়ার করার দুঃস্বপ্ন দেখত মাটা-বাবাটা…মাটা-বাবাটাকে হাতি পেলি আজগি হয়ি যেত  দুচার রাউন্ড…আমার কাচে কখুনি জানতে চায়নি যে আমি ইনজিনিয়ার হতি চাই কি না…আমি কিছুই হতি চাইনি…যা আছি তা-ই থাকতি চাই…বাবাটা ইস্কুলে থাকতিই সগগে চলি গেল…বাবাটার দুঃস্বপ্ন পুরো করার জন্যি বাবাটার প্রভিডেন্ট ফাণ্ডের টাকার আদ্দেক ডোনেশান দিয়ে মাটা ভত্তি করি দিল তামিলনাডুর শ্রীরামুলু ইনজিনিয়ারিং কলেজে…পরপর দুবার ফেল মারার খপরে মাটার হার্ট অ্যাটাক হল…মাটা যে ফ্যামিলি পেনসান পেত তা বন্দ হয়ি গেল…থার্ড বছরে ফেল মেরি বুজলুম আমার দ্বারা হবি না…যেটুকু সিকেছিলুম আর যতটুকু প্রভিডেন্ট ফাণ্ড বেঁচেছিল তা খরচ করি দুর্যধনের বাল মোটরসাইকেল সারাবার আর পার্টস বিক্রির গ্যারাজ খুললুম…দুর্যধনের বাল কে-ই বা জানত যে গ্যাস সিলিণ্ডার ফেটি তিন তিনটে ছোকরা মরি যাবে… তাদের এগজন আবার মাইনর…

–ওঃ…আপনিই ওই মোটরসাইকেল ফ্লিটের কমাণ্ডার…

–দুর্যধনের বাল…চলুন না দেকিয়ে আনি…তবে তো বুজতি পারবেন…কেন এখুনও আমাদের কোঁকের পুঁইবিটুলি  অব্দি খুঁজে পায়নি হুকুমবরদারেরা… আট বচর হতে চলল…

–চলুন…

–চলুন চলুন… আপনারাও চলুন…দুর্যধনের বাল…এনাকে ফাইটার মেসিনগুনো দেকিয়ে আনি…

–চলুন…বাইঞ্চোত…

–দেখে হাঁটবেন…ব্লাডি ফাকিং বিছুটিগাছ সামলে…বিছুটিঝোপ খাঁটি সাম্যবাদী…সবাইকে সমান মনে করে…

–কোনগুলো বিছুটি…

–চুলকাইলে বাইঞ্চোত বুইঝতে পারবেন…যোনি-যোনি রে যোনি রে…ওই দিকেরগুলা বিছুটি নয়…ওগুলা গাঁজাপাতার দঙ্গল…সায়েবের চাকররা পুঁইতাসিল আমাগো লগে…অহন আমরা ফুঁকি…হিঁঃ হিঁঃ…

–এই দেকুন…আমাদের ফ্লাইং মেসিন…দুটো রয়াল এনফিল্ড…এগবারে সাইলেন্ট রয়াল এনফিল্ড… লোকি রয়াল এনফিল্ড চাপি যাতি তার আওয়াজে পাবলিক মোটর সাইকেলের দিকি হিংসেতে তাকায়… আমার মেসিন দুটো এমন যে মাছেরা জলি যেমন  সাঁতার কাটি…এই গাড়ি তেমনিই নিঃশব্দে রাস্তায় দৌড়োয়…গাড়ি দুটোয় কি-কি আচে জানেন…ব্যাটারি চার্জার…ইনভার্টার…ল্যাপটপ রাকার বুট…অ্যান্টি-স্লিপ টিউবলেস টায়ার…বাকি চারটে বাজাজ পালসার দুশো এসএস…সুজুকি গিক্সার…হণ্ডা ড্রিম নিও আর ডুকাটি মন্সটার…দুর্যধনের বাল আমি আর কেলো রয়াল এনফিল্ড হ্যাণ্ডেল করি…অন্যগুনো এনারা করেন…রোঁদে বেরোবার সময়ে দুর্যধনের বাল ইচ্ছেমতন নম্বর প্লেট লাগিয়ে নিই…পোস্চিমবাংলা ছাড়াও অনধ্র…উড়িসসা…বিহার…আসসাম আর ঝাড়খণ্ডের নম্বর প্লেটও গেলেফুর এক পেইনটারকে দিয়ে আঁকিয়ে রেকেচি…পুরো মোটরবাইক ওয়র্কসপ আমাদের…

[ এই ক’জন মিলেই পুরো অরগ্যানাইজড গ্যাঙের মতন কাজ করে যাচ্ছে…ধরা পড়ল না কি করে… বন্দুক…পিস্তল সরবরাহকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে…বাইরে ডাকাতি করতে যায়…ব্যাঙ্ক ডাকাতিও করে …কাঁচা টাকা…বেশ বেপরোয়া…তরুণীদের তুলে এনে ক্রীতদাসী করে রাখে…এরা জঙ্গলের ভেতরে সবসময়ে উলঙ্গ ঘুরে বেড়ায়…অদ্ভুত…শীতকাল ছাড়া…]

–তবু তো দেখছি আপনারা মোবাইল ফোন রাখেন না…

–দুর্যধনের বাল…মহাপাগলু না রংবাজের বং…মোবাইল বা ইনটারনেট…ওয়াই ফাই হলেও…ট্রেস থেগি যায়…ইনটেলিজেন্সের টিকটিকি ঠিগ ধরি ফেলবি…কত রকুমের খাকি-নজর যে গড়ি উটিচে…পুলিস… মিলিটারি পুলিস…সি আর পি এফ…আইটিবিপি…আর পি এফ…এটিএস…বিএসএফ…আরপিএফ…আসাম রাইফেলস…স্পেসাল ফ্রন্টিয়ার ফোর্স…সিবিআই…সিআইডি…আইবি…আরএডাবলু…রাসট্রিয় রাইফলস… হোমগার্ড…সাগর প্রহরি বল…এনএসজি…নারকটিকস কন্ট্রোল ব্যুরো…এয়ার ইনটেলিজেন্স…নেভি ইনটেলিজেন্স…সাইফার ব্যুরো…আরও কত কি…তার ওপর পার্টিদের সাদাপোশাগ ক্যাডারপুলিস…ক্লাবপুলিস… পাড়াপুলিস…নজরদার-পুলিস তো আচিই…

–ওটাও বলুন…আপনার বাড়ি ফেরার স্কোপ ছিল…তবু ফেরেননি…এখানে একবার চলে এলে আর ফেরা যায় না…

–একবার রোঁদে বেরিয়ে লুকিয়ে রাতির বেলায় গিসলুম দেকার জন্য যে কি অবোস্তা আমার গ্যারাজের…গিয়ে দেকি পার্টির দাদারা দকল করি পার্টি অফিস বসিয়েচে..আমার দোকানের বোর্ডেই রঙটঙ করি পার্টির নাম লিকে তার পাসি ঝাণ্ডা পঙপঙাচ্ছে… মোড়ের পানির দোকানে পানঅলা ছিল না… একটা বছর দশের ছেলি দোকান বন্ধের তোড়জোড় করছিল…আমাকে দ্যাকেনি আগে…তার  ঠেঙে জানতে পারলুম যে পার্টির দলচামচারা সিলিণ্ডার ফাটার কেস ক্লোজ করিয়ে দিয়িচে…ছেলেটা বললে…যার মোটর সাইকেল সারাবার গ্যারাজ ছিল সে বিদ্যাসাগর সেতু থেকি লাফিয়ে আত্মহত্যা করি নিয়েচেন…পার্টির বাবুরা গ্যারাজে ওনার শ্রাদ্ধশান্তি করার পর দলখুড়োখুড়িদের আড্ডাখানা বসিয়েচিন…শুনি ভালো লেগেছিল যে যাক… সরকারি রেকর্ডে মরি গেচি…বেঁচে থাগতে নিজের মরি যাবার খপরই পরমানন্দ…আমি তো বেঁচি নেই…বাবাটা-মাটা দুজনেই গত…সুতরাং ফিরি যাবার  প্রশ্নও ওটে না…তাছাড়া আমায় আবার জ্যান্ত করি দিয়ে পুলিস ধরলি প্যাঁদানির চোটে হয়তো দুর্যধনের বাল এই জঙ্গল সমবায়ের কথা বলি ফেলতুম…আর সবাইকে বিপদে ফেলি দিতুম…

–নানা রজ্যের নম্বরপ্লেটের সঙ্গে বিভিন্ন পার্টির ঝাণ্ডাও রেখেছেন দেখছি…নেতাদের মুখোশও রেখেছেন…আপনারা সত্যিই অত্যন্ত বুদ্ধিমান মজাজীবি মশাই…জানি না কতদিনে আপনাদের মতন স্মার্ট হয়ে উঠব…

–হিঁঃ হিঁঃ…যোনি-যোনি রে যোনি রে…

–সব রাজ্যে তো একই দলের রাজত্ব নেই…ভোঁসড়ির ছ্যানা অন্য রাজ্যে ঢুঁ মারতে চাইলে সেই রাজ্যের সাসকদলের ঝাণ্ডা মোটর সাইকেলে লাগিয়ে নিলে কেল্লা ফতে সহজ হয়…নিজেদের রাজ্যে অবস্হা বুঝে ব্যবস্হা…আজগাল মোটর সাইকেল গ্যাঙ তো হেঁজিপেঁজি নেতারাও পুসচে…আমরাও অমন গ্যাঙ সেজে ঝোপ বুঝে কোপ মারি…তবে নেতাদের মোটর সাইকেল গ্যাঙের মতন আমরা গাঁয়ে-গলিতে খেতে-মাঠে ধরসন-টরসন করি না… আমরা নিজের-নিজের প্রেমিকার সঙ্গে শুয়ে-বসে-দাঁড়িয়ে ভালোবাসাবাসিতে তৃপ্ত…

–ভালো আইডিয়া বের করেছেন…

–এখানে টোটাল ডেমোক্র্যাসি…বুঝলেন…সবাই নিজের-নিজের আইডিয়া দ্যায়…তাতে কাজের কাজ হয়… কেবল ব্লাডি ফাকিং অনুমতি না নিয়ে প্রেমিকা শেয়ার করা চলবে না…ওসব মেট্রোপলিসে হয়…

–কোনের ওই বাক্সটারে দেখতাসেন…সায়েবের কুনো কাজে লাইগত উনার সময়ে…আমরা বাইঞ্চোত উইতে টুপি রাখি… যাতে সিসিটিভিগুলা থিকা মুখ আড়াল কইরা কাজ করা যায়…আর সার্জিকাল গ্লোভ…যাতে কুথাও অ্যাকশানের সময় আংগুলের ছাপ  না থাইকা যায়…

–টুপি ?

–হ্যাঁ…এই দেখুন…বেসবল ক্যাপ…বেরেট…বিনক্যাপ…বুনিন হ্যাট…ক্রিকেট ক্যাপ…নেপালি টুপি… কারাকুল টুপি…টাম…রেডিমেড পাগড়ি…সবকটাই তিনচারটে করে আছে…জৈষ্ঠ্য মাসে রোদ দেখিয়ে নিতে হয়…যাতে ছাতা না পড়ে…এখন থেকে এই কাজগুলো আপনাকে করতে হবে….

–ফুটবল খেলোয়াড়দের জার্সিও রেখেছেন দেখছি…বেশ গুছিয়ে…ন্যাপথালিনের গন্ধও পাচ্ছি…

–হ্যাঁ…ম‌্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেড…বার্সেলোনা…রিয়াল মাদ্রিদ…ব্রাজিল…আরজেনটিনা…জার্মানি…রাশিয়া নানা দেশের আর দলের…তবে মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গলের রাখিনি…অযথা ঘটি বাঙালের ঝামেলায় পড়তে হয়… কোন পাড়ায় কোন দলের ঢাকিরা থাকে তা তো জানা যায় না…হয়তো দেখবেন ঝেড়ে কলকাতিয়া খিস্তি ঝাড়ছে অথচ কেঠো ইস্টবেঙ্গল…বিদেশি দল বা দেশের জার্সি হলে নিশ্চিন্তে কাজ সেরে আস্তানায় ফিরে আসা যায়… কারোর ইচ্ছা হলে তিনি প্রেম করার সময়ে নিজের প্রেমিকাকে ঝাণ্ডা পরিয়ে দেন…নেতার মুখোশ পরিয়ে দেন…যিনি যে নেতাকে পছন্দ করেন…ফিল্ম অ্যাকট্রেসদের মুখোশ অনেক খুজেছি…পাইনি…

–এইটুকু ঝাণ্ডা…শাড়ি-চুড়িদারের মতন পরা যায় নাকি…

–যায় যায়…বুকে-পিঠে বেঁধে দিলেই হল…

–আর তলার দিকটা ?

–তলায় আবার কেন…বাইঞ্চোত প্রেম করবেন কি কইরা তলায় বাঁনধলে…

–নেতার মুখোশ পরান কেন…সবই তো দেখছি নেতানেতিদের কম বয়সের মুখোশ…

–ওইগুলোই ফ্রি বিলি হয়…আপনি যাকে ভালোবাসেন তার মুখোশ আপনার প্রেমিকাকে পরিয়ে প্রেম করুন…শঙ্খ লাগিয়ে সাপের ঢঙে রাত কাবার করুন…মানুষকে ভালোবাসুন…মানুষের জয় জয় করুন…

–ভোঁসড়ির ছ্যানা…উনি প্রেমিকা শেয়ার নিষেধের কথা বলছিলেন…যদি চান… নিউকামারবাবু… আমাকে বলবেন…আমি আমার প্রেমিকাকে একরাতের জন্য লোন দেব…আমার প্রেমিকা ভিষণ ইউজার ফ্রেণ্ডলি…বোঁটায় মুখ দিলেই ফিল গুড আরাম পাবেন…স্লিপিং পিল ছাড়াই ঘুম পেয়ে যাবে…চুকচুকিয়ে স্বপ্নও এসে যেতে পারে…ইন এক্সচেঞ্জ আপনি আপনার প্রেমিকা পেয়ে গেলে আমায় লোন দেবেন…

–থ্যাংকস ফর দি অফার…কিন্তু আমি তো বলেছি যে আমি মেয়েমানুষের ওসব ঘাঁটাঘাঁটি করতে চাই না…ওদিকে একটা ঘর রয়েছে বলে মনে হচ্ছে…ওই যে দূরে…

[ তরুণীরাও কেমনতর…যার তার সঙ্গে শুয়ে পড়ে…প্রেমিকের অনুরোধ রাখতে অচেনা মানুষের সঙ্গেও শুতে রাজি…জঙ্গলের ভেতরে আলট্রামডার্ন মহিলার দল…নাকি জোরজবরদস্তি করানো হয়…]

–ওইটা পরে দ্যাখবেন অখন…আইজকা বাইঞ্চোত সব দ্যাখলে আগ্রহ ফুরাইয়া যাইবে…

–আপনি একজন ডাক্তার…এখানে এসে পড়েছেন…ভালোই হল…আমাদের ব্লাডি ফাকিং জ্বরজারি হলে একজন ডাক্তারের প্রয়োজন প্রায়ই খটকাতো…

–গোছা-গোছা অ্যান্টিবায়টিক আর অ্যান্টিএলার্জিক এনে রাখলেই হল…দুটো খেলে একটা কাজে লেগে যায়…তালিকা দিয়ে দেব…

–কেন-কিঁ কেন-কিঁ কেন-কিঁ কবি লেখক চিত্রকর নাট্যকর অভিনেতা ভাস্কর স্হপতি এরা সবাই অসামাজিক গাধা…

–ইটস নট মি…ইটস দি বার্ড…

–বাইঞ্চোত পাখিটা উইড়া যায় না কেন জানি না…

–এবার যখন বেরোব তখন এটাকে নেপোপ্রেমী চিৎফাঁদ টয়লেট  কোম্পানির কাছে উড়িয়ে আসতে হবে…হয়তো ওনার দানদাদন আটকে গেছে পাখিটা নেই বলে…

–নো নো…উইথ হুম শ্যাল আই টক দেন…

–ইউ আর টকিং এনাফ উইথ ইওর লাভার ইন দ্য নাইট…ইন ইওর ট্রাইবস ল্যাংগুয়েজ…ইন ইটালিয়ান…ইন সাইন ল্যাংগুয়েজ…

–ইভন দেন…লেট ইট লিভ ইন ফ্রিডাম…

–চলুন…আজকের মতন যথেষ্ট ব্লাডি ফাকিং জ্ঞানপ্রাপ্তি হয়েছে…

–চলুন…

–এক তলায় এটা বোধহয় সেই স্কটিশ সাহেবের ড্রইং রুম…পেল্লাই ঘর মশায়…সেই যে ছবির কথা বলছিলেন তখন…এইগুলো…

–বাইঞ্চোত…এই ছবিটা দ্যাখতাসেন…সায়েব বাঘ মাইরা তার পিঠে পা দিয়া দাঁড়াইয়া…হাতে দোনলা…

–আজকাল তো দেশে আর বিশেষ বাঘ নেই…চিনের টাইগারচাউতে আর টাইগ্রেস-মানচুরিয়ানে ওখানকার মিলিটারির বড়বাবুরা বাঘের হাড়ের গুঁড়ো কিংবা বাঘিনীর মাংসের আচার ওপর থেকে ছড়িয়ে দিয়ে দুটো কাঠি দিয়ে খায়…টেসটোসটেরন বাড়াতে পারে…দেশের সীমাও বাড়াতে পারে…

–তার মানে সায়েব বোধহয় জঙ্গলে শিকার করতে আসার জন্য বার্মা টিক উডের এই বাড়িখানা তৈরি করেছিলেন…

–ছবিগুলো দেখতে থাকুন…সাঁইত্রিশটা অক্ষত ফোটো আছে এই ঘরটায়… অন্যগুলো খারাপ হয়ে গেছে…যিনি মারা গেলেন তাঁর ঘরে অনেক ফোটো আছে… সায়েব সম্পর্কে একটা আইডিয়া করতে পারবেন…এই সায়েব আমাদের ডিভাইন গাইড…উনি স্বর্গ থেকে আমাদের পথ দেখান…

–হ্যাঃ হ্যাঃ…কুড়ি কোটি দুর্যধনের বাল…আমি সালা এগগালে নগসাল ছিলুম…মনে থাকে যেন…

–এই চুপ…যে মরে গেছে তার নকল করবেন না…

–আরে…এই ছবিতে সাহেবের সঙ্গে এই চারজন মহিলা তো ইনডিয়ান বলে মনে হচ্ছে…দেখুন… দেখুন…নাক-নকশা…গায়ের রঙ…গয়না…এনারা মোটেই মেম নন…

–টু বি প্রিসাইজ…বেশ কিছু গয়না আমরা  সিন্দুকে পেয়েছি…ডাকাতির টাকাকড়ি ওই সিন্দুকেই রাখা হয়…লুটে আনা হাতঘড়ি এটসেটরা…

–গয়না… বেচে দিয়েছেন নাকি ?

–বেচতে গিয়ে ধরা পড়ি আরকি…আমরা ডাকাতি করি মেইনলি প্রয়োজনের মাল আর ক্যাশ… গয়না-ফয়না তুলি না…বিক্রির ধান্দা করতে গেলেই পুলিশের ফাঁদে পড়তে হতো…সংসারের জিনিসপত্র তুলি…যেমন মোটর সাইকেলগুলো…ল্যাপটপ…ফিল্মের সিডি… পোশাক… খাবার-দাবার…এইসব…

–ল্যাপটপ ?

–বুঝলেন কিনা…মোটর সাইকেলে ব্যাটারি রিচার্জ করে ফিল্ম-টিল্ম দেখি…প্রেমদেহ রিনিউ করার জন্য ল্যাংটো মেমদের সিডি দেখে  কালাতিপাত করি…

–সাহেবের ইনডিয়ান সঙ্গিনীদের গয়নাগাটি কী করলেন…

–কেন…আমাদের প্রেমিকাদের পরাই…আপনাকে যখন প্রেমিকা পাইয়ে দেব আপনিও পরাবেন…

–ওঃ…হ্যাঁ…আপনাদের প্রেমিকাদের কথা তো ভুলেই গিয়েছিলাম…তাঁরা এখনও ফিরলেন না…

–ফিরবেন ফিরবেন…সন্ধ্যা নাগাদ ফিরবেন…ওনাদের আদর করে ডেকে আনতে হয়…প্রেমিকা বলে কথা…

–যান কোথায় ওনারা ?

–সবাই মিলে দিনের বেলাতেই খাওয়া-দাওয়া সেরে ফ্যালেন…যাতে রাতের বেলায় আমাদের সঙ্গদানে সময় নষ্ট না হয়….তাই ওয়াঁদেরও তা নিয়ে ব্লাডি ফাকিং ভাবনাচিন্তা করতে হয় না…বাইরে যখন বেরোই না তখন কিছু রেঁধে খেতে হলে…যিনি মারা গেলেন তিনি রেঁধে রাখতেন…দিনের বেলায় কেরোসিন স্টোভে রাঁধি যাতে আকাশে ধোঁয়া উঠে আমাদের আস্তানা ফাঁস না হয়…রাতের বেলা রাঁধলে উনোনের আলো দেখা যাবে বলে রাঁধি না…বাড়ির ভেতরে জানলা বন্ধ করে ব্যাটারি-কনেলন্ঠন বা রোদলন্ঠন জ্বালি…সবায়ের ঘরে আছে…যিনি মারা গেলেন তাঁর ঘরেও…

–এই ছবিটা দেখেছেন তো…চারজন ভারতীয় মহিলা…নিশ্চয়ই সাহেবের রাখেল…প্রথম দিকে পাদরিদের বারণ ছিল বলে সাহেবরা খোলাখুলি হিদেন মহিলাদের বউ করতে পারত না…বউ করার আগে ধর্ম পালটিয়ে নিতে হতো…মানে আমি সেরকমটাই অনুমান করছিলুম…সাহেব ভারতীয় সঙ্গিনীদের এখানে লুকিয়ে রেখেছিল…শহরে কিংবা স্কটল্যাণ্ডের বউকে না জানিয়ে ভারতীয় মহিলাদের সঙ্গে সম্পর্ক পাতিয়ে ফেলেছিল…

–সব ফোটোগুলো দেখুন…সায়েবের গল্প স্পষ্ট হবে…আপনি হয়তো ঠিকই অনুমান করেছেন…স্কটল্যাণ্ডের বেশ্যালয়েও দেখেছি যে ফর্সা সায়েবরা রোগাটে আফ্রিকান বেশ্যাদের চৌকাঠেই বেশি ঢুঁ মারেন…ইনডিয়ানরা যেমন ফর্সা মেমদের চৌকাঠে ঢুঁ মারতে ভালোবাসেন…

–ইয়েস ইয়েস…ইন রোম অলসো দোজ বাগার্স লাইকড টু পিক আপ ব্ল্যাক হুকার্স…

–হ্যাঁ…তাই তো দেখছি…দাঁড়ান সবকটা ছবি একবার দেখে নিই…এটা মনে হচ্ছে লণ্ডনের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দপতরের বিলডিং…আর এটা ওদের ঝাণ্ডা…ক্রস আর লাইন… ব্ল্যাক অ্যাণ্ড হোয়াইট ফোটো বলে ফ্ল্যাগের রং যে লাল তা বোঝা না গেলেও…লাল ঝাণ্ডার রাজত্ব  সেই তখনই…লর্ড ক্লাইভের আমল থেকে শুরু হয়েছিল…

–আর কই…ভোঁসড়ির ছ্যানা…বুঝলেন কিনা…সে কোম্পানিও নেই…শাদাসায়েবও নেই…তামাটে সায়েবও নেই…রয়ে গেছে তাদের হেগে রাখা এনামেল গামলা…আর কুমড়োভুঁড়ি আমলা…

–আর নেপোপ্রেমী চিৎফাঁদ টয়লেট পাঁজি কোম্পানি…

–খুঁটিয়ে দেখি মহিলাদের…এসব ফোটো বেশ দুষ্প্রাপ্য…বাজারে ঝাড়লে প্রচুর টাকা পাওয়া যাবে…যারা ইতিহাসের বইটই লেখে তারাও গবেষণার নতুন নতুন গপপো-টপপো পাবে…আমার মনে হয় চটকল বা চাবাগান নয়…এই সাহেবের কাজকারবার তারও আগের…এই মহিলারা আফিমচাষিদের বউ বা মেয়ে হতে পারেন… আপনারা যেমন টাকাকড়ি-মালপত্র তুলে আনেন…ওনারা তেমনি আফিমচাষিদের বউ-মেয়ে তুলে নিয়ে যেত…

–মেট্রপলিসের বাঙালি সাকরেদরা কিন্তু এদান্তি আর তুইলা নিয়া যাইবার হ্যাঙ্গাম করে না…যেথায় পায় ধরেবেঁধে সেথায়ই কাজ সাইরা ফ্যালে…পকাৎপঙ…গ্রাম হইলে সালিসি সভার বাছাই করা পোলারা লাইন দিয়া একে-একে পকাৎপঙ করে…বাইঞ্চোত আমরা তা করি না…নিজের নিজের প্রেমিকার সঙ্গে হেভেনলি রিলেশানশিপ নিয়া স্যাটিসফায়েড…পবিত্র প্রেম…

–বাঘ ছাড়া সাহেব হরিণ…বাইসনও মেরেছিল…বাইসনের পিঠে পা রেখে দাঁড়িয়ে ফোটো তুলিয়েছে…

–দেখুন দেখুন…আপনি ঘুরেফিরে দেখতে থাকুন…আমরা ততক্ষণ সায়েবের সেগুনকাঠের দোলন-চেয়ারে বসে দোল খাই…আর আরাম করি…এই দোল খাওয়াই আমাদের প্রধান পাসটাইম…পাঁচটা চেয়ার রয়েছেই…

সকলে ল্যাংটো পোঁদে দোল খাই আর নাস্তা-খাস্তা খাই…হাতে হাতে ছিলিম ঘোরে…ওই কোনের সিন্দুকটা খুলবেন না যেন…ওতেই ডাকাতির টাকাকড়ি আর প্রেমিকাদের গয়নাগাঁটি রাখি আমরা…

–মাই গড…এই ছবিগুলোয় মহিলাদের গায়ে পোশাক নেই…শুয়ে…হেলান দিয়ে…কুকুরে ওনাদের…সাহেব কুকুর পুষেছিল…কুকুর দিয়ে মহিলাদের…এবার অনুমান করতে পারছি…ওই চারটে কবর নিশ্চয়ই চারজন মহিলার…কুকুরদের পেনিস আর পেচ্ছাপ থেকে মানুষদের লেপ্টোসপিরোসিস রোগ হয়…ফুসফুসের রক্তক্ষরণ থেকে রোগি মারা যায়…মহিলারা হয়তো ওই রোগে মারা গিয়েছিলেন…তারপর সাহেব সব ছেড়েছুড়ে সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে পালিয়েছে…দে পিটটান…কুকুরগুলোকে বোধহয় জ্যান্ত কবর দিয়েছিল…

–সায়েবের বোধহয় ডিসফাংশান রোগে ধরেছিল…আর মহিলা চারজন…সায়েব থার্ড সেক্সের লোক ছিল…নয়তো…কেন…আ্যাঁ…

–এটা কি দেয়ালে ? কাঁচাপাকা চুল দিয়ে আঁকা ইন্সটলেশান মনে হচ্ছে…

–যিনি মারা গেছেন তাঁর তৈরি শিল্প…আমাদের সকলের শরীরের চুল ফেভিকল দিয়ে টিক উডের ওপর সেঁটে উনি একখানা অবিনশ্বর পেইনটিঙ তৈরি করে দিয়ে গেছেন…বিপ্লবের জয়গান…

[না…এটা সত্যিই কাঁচাপাকা চুল সেঁটে আঁকা…উত্তরাধুনিক ইন্সটলেশান হয়তো…লণ্ডনে নিলাম হলে অনেক টাকা দর উঠতো…সেলারে যাবার গোপন দরোজা নয়…ফ্লোরটা তো কাঠের নয়…ফ্লোরের ওপরে কোনো পাটাতন দেখছি না…তাহলে তরুণীরা কোথায়…এতগুলো তরুণী…একটু জোরে-জোরে কথা বলি যাতে তরুণীরা শুনতে পান…]

–দোতলায় আমরা যে ঘরগুলোয় থাকি সেখানে মাটিতে বাঘের চামড়া…হরিণের চামড়া…বাইসনের চামড়া পাতা আছে…ওগুলোর ওপরেই মহিলাদের শুইয়ে…কুকুর দিয়ে…শীতকালে তার ওপরে শুলে ঠাণ্ডা কম লাগে…ওই যে উনি যিনি বিলাত থেকে পালিয়ে এসেছেন…ওনার  ঘরে দেয়ালে বাঘের মুণ্ডু ঝোলানো আছে…আমার আর এনার ঘরে বাইসনের শিং-উঁচু মুণ্ডু আর আর্মি ডেজার্টার…ওনার ঘরে হরিণের মুণ্ডু…দুটো হরিণের…সামবর আর বার্কিং…

–আমি যে ঘরটায় থাকব তাতে নেই তো…ভাগ্যিস..

–না…তাতে চারজন মানুষের করোটি দেয়ালে টাঙানো আছে…আর যিনি মারা গেছেন তাঁর টাঙানো দাড়ি-টেকো-গুঁফো বিদেশিদের রঙিন ছবি…ঘরে ধুপকাঠির গন্ধ পাবেন…

–করোটি…উরেব্বাপ…আই অ্যাম শিওর নিশ্চয়ই ওই চার মহিলার…মারা যাবার পর সায়েব ধড় থেকে মুণ্ডু আলাদা করে করোটি বানিয়ে টাঙিয়ে রেখেছিল…ওই ঘরেই থাকত নিশ্চয়ই…মহিলারা মারা যাবার পর স্কচ খেতে খেতে তাদের করোটির দিকে তাকিয়ে কাঁদতো…ওই ঘরে কি অন্ধকারে কান্না দোল খায়…

–ওই ঘরেই তো যাবতীয় বইপত্র…ম্যাণ্টলপিস…পালঙ্ক…ক্যাণ্ডলস্ট্যান্ড…সোনালি ফ্রেমে বাঁধানো আয়না…আরও টুকিটাকি নানা জিনিস আছে…

–হ্যাঁ…স্কাল…হিউমান স্কাল…সায়েবরা নিজেদের বাড়ির দেয়ালে হিউমান স্কাল ঝোলায়…স্কটল্যাণ্ডে যে ব্লাডি ফাকিং  ডিসটিলারিতে কাজ করতাম তার মালিকের বাড়িতে দেখেছি…পালিশকরা কাঠের বোর্ডে বসানো…বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির মাঠ থেকে কুড়িয়ে পেয়েছিল…যুদ্ধ জেতার মেমেন্টো…আমেরিকানরা ইরাক থেকে ফোটো তুলে যেমন মেমেন্টো নিয়ে গেছে…কেউ শবের ওপর মুতছে…কেউ পোঁদে চোঙ ঢোকাচ্ছে…

–ব্যাবিলনের আমলের সোনাদানাও মিউজিয়াম থেকে নিয়ে গেছে…আমরা সোনাদানা নিই না…

–তাহলে এগোই…দেখি আমার ঘর…দুপুরের ন্যাপ নিয়ে নিই…

–যিনি মারা গেছেন তিনি অনেক টিপটপ লোক ছিলেন…পাউডার…পারফিউম…চুল না থাকলেও চিরুনি…নারকেল তেল…সাবান পাবেন…আমরা ওনাকে এনে দিতাম…এখন দুপুরে আপনার বাদাম খেয়েই কাটান…সন্ধ্যা বেলায়  দেখা যাবে…যিনি মারা গেছেন তাঁর ঘরে জলের ব্যবস্হাও আছে…কুয়োর জল হলেও প্লাস্টিকের ফিল্টারে প্রত্যেকদিন ভরে রাখতেন…পরশুও ভরে রেখেছিলেন…ফিলটার ক্যান্ডলটা অবশ্য বদলানো হয়নি… এবার বেরোলে মনে করে কয়েকটা ফিলটার ক্যাণ্ডল আনতে হবে…

–কেন যে আত্মহত্যা করলেন ভদ্রলোক…

–বেচারা…বাইঞ্চোত প্রেমিক মানুষ…

–তাহলে যাই তিনতলায়…

–হ্যাঁ…ঘুমাইয়া ন্যান…তিনদিন জঙ্গলে ঘুমাননি…একখান ঘুম দ্যান…যোনি-যোনি রে যোনি রে…হিঁঃ হিঁঃ…

–দাঁড়ান…দাঁড়ান…এক মিনিট…আপনি তো এখনও পুরোপুরি বিশ্বাসযোগ্য নন…চলুন…আপনাকে আপনার ঘরে পৌঁছে দিই…বাইরে থেকে বন্ধ করে দেবো আপনার ঘর…আপনি ইচ্ছে করলে ভেতর থেকে বন্ধ করে নেবেন…  হাগা-হিসি পেলে চেয়ারে এনামেলের গামলা আছে…টয়লেট পেপার রোল আছে…যিনি মারা গেছেন তাঁর রাখা…ব্যবহার করতে পারেন…

–ঠিক আছে…চলুন…বন্ধ করে দেবেন…নো প্রবলেম…

–সন্ধ্যায় দেখা হবে…

–[ ঘুমটা ভালোই হল…খাটের ওপর উঠে দেখি দেয়ালে টাঙানো মাউন্ট করা করোটিগুলো…এদের তলায়

তো ইংরেজিতে নাম লেখা রয়েছে  প্রত্যেকের…রাজরাজেশ্বরী… সন্ধ্যারাগিনী… চপলচারিণী… সুখশ্বেতাম্বরী…এনারাই তাহলে সাহেবের রাখেল…আগেকার কালে ঘোমটা দিতেন বলে ওনাদের রক্ষিতা বলা হতো…স্কাউন্ড্রেলগুলো বলে চলেছে যিনি মারা গেছেন…যিনি মারা গেছেন…শুনতে তো পেলুম যে বিলাত ফেরত স্কাউন্ড্রেলটাই মাথায় ভোঁচকানির চোটে মেরে ফেলেছে…তারই প্রেমিকাকে দখল করে…আজকাল অবশ্য একজন তরুণী দুই-তিনজনকে ফাঁসিয়ে একই সঙ্গে প্রেম করে…সাইজ ম্যাটার্স…কয়েকজনের সন্দেহও রয়েছে যে হয়তো অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন…যিনি মারা গেছেন  তাঁর ঘর তো বেশ সাজানো-গোছানো…প্রচুর বইপত্র…বাংলা বই…বাংলা ফিল্মের পত্রিকা…কবিতার বই…লোকটা পড়ুয়া ছিল বোধহয়…খাটও রয়েছে…সাহেবের …ড্রয়ারের মধ্যে এটা কি প্লাসটিকের প্যাকেটে…এটাই তো লাল-গলা টিয়াপাখিটা…ইনিই তাহলে লাল-গলাকে মেরে ফেলেছেন… চুপচাপ…স্কাউন্ড্রেলগুলোকে জানতে দেননি…কেন…কোনো কারণ ছিল নিশ্চয়…কয়েকটা বই উলটে পালটে দেখি…যিনি মারা গেছেন তাঁরই হাতের লেখা মনে হচ্ছে…লিখেছেন…ঘরে এনামেলের বালতিতে হিসি করার কী যে আনন্দ… অন্য বইতে দেখি…কয়েকটা বইতে দেখছি লিখে রেখেছেন…চাঁদবদনী আমি তোমায় ভালোবাসি…আসকাতুরে মাতালটা তোমার অযুগ্যি…কে এই চাঁদবদনী…সেই মহিলাই বা দুজন প্রেমিককে খেলাচ্ছেন কেন…যিনি মারা গেছেন তিনি কি ভিতু-ভাবুক ছিলেন…সমকামীরা কি ভিতু-ভাবুক হয়ে যান সমাজের চাপে…নাকি এখানে এই স্কাউন্ড্রেলগুলোর মধ্যে পড়ে ভিতু-ভাবুক হয়ে গিয়েছিলেন…যিনি মরে গেছেন তিনি… অন্য ক্রিমিনালগুলোর কাছে বন্দুক-পিস্তল ছিল মানে যিনি মারা গেছেন তাঁর কাছেও হয়তো ছিল….আগেই উড়িয়ে দিতে পারতেন…করেননি কেন কে জানে…দেখি…নাঃ…ঘরে কোথাও বন্দুক বা পিস্তল নেই…গিটার রয়েছে তো…টিউনিং করে রাখি…সন্ধ্যাবেলা বাজাবো…বইমুখখু স্কাউন্ড্রেলগুলোকে কোনোরকমে অন্যমনস্ক করে ফেলতে হবে…হাতে-পায়ে গুলি মেরে ঘায়েল করে দেয়া গেলে চলতে-ফিরতে পারবে না…দেখা যাক…ওদের প্রেমিকাদের সঙ্গে আগে পরিচিত হই…লিগ্যালি ব্লণ্ড চাঁদবদনীর বদনখানা দেখি…পিস্তলটা জাঙিয়া থেকে বের করে পাশ পকেটে ঢুকিয়ে রাখি…বলা যায় না…হঠাৎ দরকার হতে পারে…কেউ দরোজা খুলছে বোধহয়…আওয়াজ হচ্ছে…]

–শশশশশ…ভোঁসড়ির ছ্যানা…বেড়ে গিটার বাজান তো…যিনি মারা গেলেন তাঁর চেয়েও ভালো…তাহলে সন্ন্যাস নিচ্ছিলেন কেন…সন্ন্যাসী হয়ে গিটারের জন্য মনকেমন করলে কী করতেন…আ্যাঁ…প্রাণায়ামের একনাক টেপা গিটার বাজাতে হতো…

–কে…আরে…আপনি তো উলঙ্গ…এক্কেবারে উদোম…

–আমি…আমি…প্রেম করতে হবে তো…পোশাক পরে তো আর করা যায় না…বিলিতি গান বেড়ে বাজান…ভালো…চাঁদবদনীর প্রেমিকের ভালো লাগবে…বিলেতে ছিল বলে বড়াই করে ভোঁসড়ির ছ্যানা…

–তাই ওনাকে নেতা করেছেন আপনারা…

–কোন ভোঁসড়ির ছ্যানা নেতা…এখানে কেউ কারোর চামচা নয়…আমার কাছে নেতাগিরি ফলাতে আসলে বাঁটকুলকে দেবো এইসান লাফা…মাটির তলায় ঢুকে রামায়ণের সীতার পা টিপবে… যাকগে… চলুন…সেরিমনি চালু করে দিয়েছে সবাই যে যার ঘরে…অন্ধকার হয়ে এলো…সবাই এক জায়গায় জড়ো হয়ে সেরিমনি করলে জমবে…যিনি মারা গেলেন তিনিও মাঝে-মধ্যে জমায়েতে গিটার বাজাতেন…ওই বাংলা গান আরকি…একটাই গান জানতেন…সেটাই বাজিয়ে-বাজিয়ে গাইতেন…আট বছর যাবত…আর চাঁদবদনী আসার পর চাঁদবদনীকে শোনাতেন…চাঁদবদনীর পায়ে নূপুর বেঁধে দিতেন…গিটার বাজিয়ে গাইতেন…বিলাত ফেরতের তো গা জ্বলে যেত…

–কি গান…

— শুনে শুনে কুলকুচির মতন মুখস্হ হয়ে গেছে…শুনুন..গাইছি…একটু নাকি সুরে গাইতে হয়…

আঁমায় এঁত রাঁতে ক্যাঁনে ডাঁক দিঁলি প্রাঁণ-কোকিঁলা রেঁ

আঁমায় এঁত রাঁতে ক্যাঁনে ডাঁক দিঁলি

নিঁভা ছিঁল মঁনের আঁগুন জ্বাঁলাইয়াঁ গেঁলি প্রাঁণ-কোকিঁলা রেঁ

আঁমায় এঁত রাঁতে ক্যাঁনে ডাঁক দিঁলি…

–চারটে নূপুর রয়েছে দেখলুম ড্রয়ারে…

–চারটেই তো…

–ম্যান্টলপিসের ভেতরে একটা প্যাকেটে আপনাদের লাল-গলা পাখিটার দেহ রয়েছে…

–দেখি…দেখি…হ্যাঁ…তাইতো…কখন এক ফাঁকে এনে গলা টিপে মেরে ফেলেছেন…

–কিন্তু কেন…পাখিটাতো দেখতে কত সুন্দর…

–আরে…চিন্দিচোর…উনি ভাবতেন যে পাখিটা ওনাকেই গালাগাল দিচ্ছেন…ওনার এইসব বইফই… পদ্যটদ্য… গানফান নিয়ে পরাণপাতলা ছিলেন…হয়তো অন্য পাখিটাকেও মেরে ফেলতেন…ওটাও তো গালাগাল দিয়ে এফ এম রেডিওর গান শোনান…তার আগেই উনি নিজেই কোতল হয়ে গেলেন…

–কোতল…

–হ্যাঁ…টকিট্যারচা বিলাত ফেরতের সঙ্গে চাঁদবদনীকে নিয়ে ঝগড়াঝাঁটি এমন গর্মাগর্মিতে চলে গিয়েছিল যে দুজনের মধ্যে একজনকে কোতল হতেই হতো…অবশ্য সত্যিই মারা গেলেন কি না সে বিষয়ে আমার এখনও খটকা আছে…হয়তো চাঁদবদনীকে দখল করার জন্য তাড়াতাড়ি মাটি চাপা দিয়ে দিলেন…অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন না মারা গিয়েছিলেন…আমার তো সন্দেহ যায়নি…

–আচ্ছা…আমি তাই ভাবছিলুম যে খামোখা আত্মহত্যা করতে গেলেন কেন…

–যাকগে…যেতে দিন…যা হবার হয়ে গেছে…আপনি কী গান বাজাচ্ছিলেন…একেবারে ঝমাঝঝম… মারিকাটারি…গাইছিলেনও…শুনতে পেলুম…ঝিনচাক…শালা জমে যাবে…

–শুনুন…কেমন লাগে বলুন…হেভি মেটাল…স্যামি হ্যাগারের গান…

–শোনান…বসি একটু…ওসব হাগাহাগি নাম তো শুনিনি…নামের কোনো দরকার নেই…

–হেড ব্যাঙার্স ইন লেদার

স্পার্কস ফ্লাইং ইন দি ডেড অফ নাইট

ইট অল কামস টুগেদার

হোয়েন দে টার্ন আউট দি লাইট

ফাইভ থাউজেন্ড ওয়াটস অফ পাওয়ার

অ্যাণ্ড ইটস পুশিং ওভারলোড

দি বিস্ট ইজ রেডি টু ডিভাওয়ার

অল দি মেটাল দে ক্যান হোল্ড

রকিং ওভারলোড

স্টার্ট টু এক্সপ্লোড…

–ভোঁসড়ির ছ্যানা…দারুন…ফাটাফাটি…জমে যাবে…মাতিয়ে দেবে…চকাচক ধকাধক প্রেম করা যাবে…

–[ যাক…এই স্কাউন্ড্রেলটাকে প্রভাবিত করতে পেরেছি মনে হচ্ছে…অসতর্ক থাকবে হয়ত…অন্য স্কাউন্ড্রেলগুলোকেও এক জায়গায় জড়ো করতে হবে…কিন্তু এদের প্রেমিকাদের সামলাব কী করে সেটাই সমস্যা…তাদের যদি কিডন্যাপ করে এনে থাকে তাহলে তাদের সাহায্য পেতে পারি…দেখা যাক কতদূর কি করতে পারি…]

–চলুন…গিটার নিয়ে নিচে চলুন…

–কী…খাওয়া-দাওয়ার জোগাড় হয়ে গেছে নাকি…চলুন…তিন দিন হেঁটে ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলুম…সন্ধ্যা হয়ে গেল…অন্ধকার…

–সিঁড়িতে রোদলন্ঠন রেখে এসেছি…চলুন…আজকে তো বেশ বড়ো চাঁদ দেখা যাচ্ছে আকাশে…পূর্ণিমায় টেসটোসটেরনের জোয়ার ডাকে…ষাঁড়াষাঁড়ি…সেরিমনি চলছে…যে যার নিজের ঘরে সেরিমনি করছে…দেখবেন আসুন…আওয়াজ করবেন না…আসুন…সেররিমনির পর আফটার পার্টি…

–ছমছমে আধো-অন্ধকারে কিছুই তো ভালো দেখতে পাচ্ছি না…পাকানো সিঁড়ি…

–আমার হাত ধরুন…ধাপগুলো সামলে নামুন…

–কোথায় হচ্ছে সেরিমনি…কিসের সেরিমনি…আপনারা ক্যালেণ্ডারও রাখেন না যে জন্মদিন-টিন পালন করবেন…

–আরে ভোঁসড়ির ছ্যানা…সেসব নয়…আমাদের প্রেমিকাদের সঙ্গে আপনার পরিচয় হয়নি তো…চলুন… পরিচয় করিয়ে দিই…প্রেমিকার সঙ্গে যে যার নিজের ঘরে…বুঝলেন কিনা…হ্যাঃ হ্যাঃ…

–কার ঘরে হচ্ছে… সকলে যে যার আলাদা সেরিমনি করছেন…না ড্রইংরুমে জড়ো হয়েছেন…ড্রইংরুমে একজোট হয়ে করলে আরও মজার হবে…আমি গিটার বাজিয়ে গাইতে থাকবো…আপনারা প্রেমিকাদের সঙ্গে নাচতে থাকবেন…ডুয়ার্সের জঙ্গলে ডিসকো…

–আরে চলুন না ভোঁসড়ির ছ্যানা…নিজের চোখে দেখুন…কানে শুনুন…তবে তো…আস্তে…আওয়াজ করবেন না…হ্যাঁ…এই ঘরের দরোজাটা  ফাঁক করা আছে…উঁকি দিন…কেলোর ঘর…ব্যাটারি-লন্ঠন জ্বলছে… কেলোর প্রেমিকার নাম সন্ধ্যারাগিনী…

–সন্ধ্যারাগিনী…কেলো উচ্চারণ করতে পারেন কি প্রেমিকার নাম…

–উচ্চারণ করার দরকার হয় না…

–কেলো তো পুরো ল্যাংটো…কী করছেন উনি…প্রেমিকা কোথায়…কোনো মহিলাকে দেখছি না তো… একটা হরিণ বলে মনে হচ্ছে…ছাই রঙের…সামবর হরিণ…সামবরের গলায় সোনার হার পরিয়েছেন…অন্ধকার অন্ধকার…গলা জড়িয়ে ধরেছেন…তার মানে সামবর হরিণই ওনার সঙ্গিনী…সন্ধ্যারাগিনী…হ্যাঁ…তাই তো…কি করছেন কী…দেখলুম ওনার সেরিমনি…অন্ধকার এগোচ্ছে…অন্ধকার পেছোচ্ছে…অন্ধকারে মেশাচ্ছেন  অন্ধকার…বিড়বিড় করছেন…

–দুচার ছিলিম ফুঁকে…নিজের ভাষায় প্রেম নিবেদন করছেন…আমি তোমায় ভালোবাসি…আমাকে ছেড়ে যেও না…তোমায় ছাড়া বাঁচব না…প্রেমে পড়লে লোকে যাসব ভুজুং-ভাজুং দ্যায় আরকি…ঘরের মেঝেতে গাঁজা পাতার ডাল দেখছেন তো…ওনার প্রেমিকা ওই পাতা চিবুতে ভালোবাসে…

–এরকম প্রেম নিবেদন আগে দেখিনি কখনও…পাশের ঘরটা কার…

–আসুন…পাশের ঘরে আসুন…আর্মি ডেজার্টারের ঘর এটা…উঁকি দিন…চুপচাপ…এনার প্রেমিকার নাম চপলচারিণী…

–এনার প্রেমিকাকে…দেখি…গুমো গন্ধ আসছে…হরিণ…গায়ে ছিটে…চিতল হরিণ…গলায় সোনার হার… দুটো কানে মাকড়ি…ছ্যাঁদা করেছেন নাকি কানে…কোমরে লুঙ্গি নেই…একই কাজে মগ্ন… এগোচ্ছেন… পেছোচ্ছেন…গলা জড়িয়ে ধরে আছেন…কোথা থেকে এলো…সামবর…চিতল…ইনি অবশ্য প্রেম নিবেদন-টিবেদন করছেন না…একমনে নিজের কাজে মগ্ন…

–কেন…জঙ্গলে ফাঁদ পেতে…মাটি খুঁড়ে তাতে ওপর থেকে ডালপালা চাপা দিয়ে…আপনাকে বলেছিলাম ভোঁসড়ির ছ্যানা হর্স রেসে ঘোড়াকে জিতিয়ে আনার রসায়ন…ম্যাজিক এলিমেন্ট…ঘোড়াকে আমি এই ভালোবাসার রসায়নে সন্মোহিত করতুম…কেলোর প্রেমিকা…আর্মি ডেজার্টারের প্রেমিকা…দেখলেন তো কেমন সন্মোহিত…আত্মসমর্পণ করেছে প্রেমিকের কোলে…এবারে আমার প্রেমিকার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই…পাশের ঘরে আসুন…আজকে ও আপনার…

–কিন্তু ঘোড়া তো বেশ উঁচু…

–একটা টেবিলের ওপর দাঁড়াতাম…

–সব সময় কি মাদি প্রেমিকা পড়ত ?

–না না…এঁড়ে না নৈ ল্যাজ তুলে দেখে নিয়ে…রেখে বা ছেড়ে দেয়া হয়…

–দেখি…কে আপনার প্রেমিকা…বেশ বড়সড় উঁচুগলা ছাগল…ইনিই আপনার সঙ্গিনী…এরকম ছাগল কোথায় পেলেন…জঙ্গলে তো হয় না…শাদা ধবধবে ছাগল…ছাগলের সঙ্গে…তাই আপনার গা থেকে রামছাগলের গন্ধ বেরোচ্ছে…আপনিও গলায় সোনার হার পরিয়ে রেখেছেন…আপনার ঘরের মেঝেতেও গাঁজাপাতার ডাল রয়েছে…আরে…সত্যিই…আপনাকে দেখে দৌড়ে চলে এলো…

–হ্যাঁ…গাঁজাপাতা চিবুতে আমার প্রেমিকারও ভালো লাগে…আমি ওনাকে স্নান করিয়ে দিই রেগুলারলি…নিজে স্নান করি না তো কি হয়েছে…আজকে আপনার জন্য দিচ্ছি ওকে…ওনার নাম রাজরাজেশ্বরী…এখনই প্রেম করবেন…না পরে…রাজরাজেশ্বরীর সঙ্গে প্রেম করার সুবিধা আছে…দুহাত দিয়ে শিংদুটো আঁকড়ে ধরুন আর মনের সুখে সেরিমনি করতে থাকুন…উনি তখন গাঁজাপাতা খাওয়ায় মগ্ন থাকবেন…ওনাকে চুরি করে এনেছি…মোটর সাইকেলে চাপিয়ে…একটা বাড়ির বাইরে বহরমপুর শহরে বাঁধা থাকতেন…বেলেত ফেরত কোলে নিয়ে বসলেন…আর পোঁ পাঁ…হ্যাঃ হ্যাঃ…রাজরাজেশ্বরীকে খাবে বলে পুষেছিল হয়তো…এ কি কেটে-কেটে খেয়ে ফেলার প্রাণী…বলুন…থন দেখুন…মুখে নিয়ে স্বর্গে পৌঁছে যাবেন আপনি… আপনার ঘরে নিয়ে যাবেন না এখানেই আমার ঘরে…আমার আপত্তি নেই…রাজরাজেশ্বরীও কারোর সঙ্গে প্রেমে আপত্তি করেন না…সবাই ওনার সঙ্গে প্রেম করেছেন…মুখোশ পরিয়ে বা বিনা মুখোশে…মুখ বদলাবার ইচ্ছা হয় তো…

–আমার মনকে প্রথমে মানিয়ে নিতে হবে…তারপর…কয়েকদিন সময় লাগবে…তাছাড়া ছাগলের মাংস খেতে ভালো লাগে…চুমু খেতে আপাতত ভালোলাগবে না…আজকে আপনিই আপনার প্রেমিকার সঙ্গদান করুন…বিলেত ফেরতের ঘর কোনটা…ওনার প্রেমিকাকেও দেখি…

–এর পাশের ঘরটা…

–মাই গড…উনি তো…বিলেত ফেরত…পুরোপুরি পোশাকহীন…মদের বোতল গড়াচ্ছে মেঝেয়…মাতাল হয়ে গেছেন…মুখ ব্যাজার করে টলছেন…ওটা কি…ওটা তো গোলাপি রঙের বিদেশি শুয়োর…ইয়র্কশায়ার পিগ…মাদি বলেই মনে হচ্ছে…গলায় গয়না-টয়নাও পরানো হয়েছে…পেছন-পেছন দৌড়োচ্ছেন বিলাত ফেরত…

–শশশশশশ…চুপচাপ দেখতে থাকুন…প্রেমের গন্ধ অনেকটা মড়াপোড়ার মতন…তা যে প্রাণীই বাছুন… হিংসের গন্ধের মতন…ঈর্ষার গন্ধের মতন…

–ওনার কাছে যাচ্ছে না তো…পালিয়ে বেড়াচ্ছে সারা ঘরময়…এই কাজে…রাজি হচ্ছে না তো…কাছে যেতে রাজি  নয়…সমবর…চিতল…ছাগলের মতন…

–শুয়োর নয়…শুয়োর বলবেন না…চাঁদবদনী ওনার প্রেমিকার নাম…দেখুন…চাঁদের আলোর মতন…লিগালি ব্লণ্ড…অন্ধকারেও দেখতে পাচ্ছেন…গোলাপি…তাই তো ওনাকে নিয়ে এত টানাটানি…চাঁদবদনীর গোলাপি ঠোঁটের পাউট দেখুন…কোনো ফিল্ম অ্যাকট্রেস ওনার ধারেকাছে আসতে পারবেন না…

–প্রেমিকা…এই প্রেমিকার কথাই বলছিলেন…তাই চারটে নূপুর…

–হ্যাঁ…তাই তো…যিনি মারা গেছেন তিনিই সরকারি অ্যানিমাল হাজবেণ্ডারি ফার্ম থেকে চুরি করে এনেছিলেন…প্রথম অধিকার তাঁরই ছিল…মোটর সাইকেল চালিয়েছিলেন আর্মি ডেজার্টার…আমরা সবাই মিলে গার্ড অফ অনার দিয়ে এনেছিলাম চাঁদবদনীকে…কিন্তু আনার পরেই দাবি করে বসলেন বেলেত ফেরত…বললেন উনি কোলে বসিয়ে এনেছেন বলেই ওনার হতে পারে না… কেননা ওনার সঙ্গদানের ক্ষমতা নেই…শরীরে… জঙ্গলরোমিও হবার মতন রসায়ন নেই…ভালোবাসার প্রতিদান দেবেনই বা কী করে…উনি বেলেত ফেরত…চাঁদবদনীর দাদু-দিদাও বেলেতের…তাই উনি নিয়ে নিলেন…

–উনি তো ঘরের কোনে নিয়ে গিয়ে ভালোবাসাবাসি  করার চেষ্টা করছেন…জোর করে..এটা তো অন্যায়…পারস্পরিক অনুমতি ছাড়াই…উইদাউট কনসেন্ট…

–দেখলেন তো…ওই কাজটাই সেরিমনি…উনি আপনার সঙ্গে চাঁদবদনীকে শেয়ার করবেন না…যিনি মারা গেছেন তিনি চাঁদবদনীকে নিজের ঘরে নিয়ে গিয়ে…পায়ে নুপূর পরিয়ে…জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন… বিলাত ফেরত হয়তো  চাঁদবদনীকে বিশ্বাসঘাতকতার জন্য মেরে ফেলতেন…মত বদলে যিনি মারা গেছেন তাঁকে এক ঘুষিতে মেরে ফেললেন…তাঁর দেহ কাঁধে চাপিয়ে নিচে নিয়ে এলেন…মাটি খোঁড়ার তোড়জোড় করলেন… বললেন…যিনি মারা গেছেন তিনিই বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন…

–এটা অন্যায়…যিনি মরে গেছেন তিনি প্রেম করার জন্য এনেছিলেন…এটা চলতে দেয়া যায় না…

–কী আর করবেন…যিনি মারা গেছেন তিনি তো মারাই গেছেন…তিনিও তো..আপনিই খুঁজে পেলেন… লাল গলা টিয়াপাখিকে মেরে নিজের ঘরে লুকিয়ে রেখেছিলেন…তা কি অন্যায় নয়…

–আরেকজন কই…উনি কোন প্রেমিকাকে ভালোবাসেন দেখি…

–ভোঁসড়ির ছ্যানা…চলুন..ওই ঘরটার দিকে…আওয়াজ করবেন না…কাঠের ওপর আলতো পায়ে না হাঁটলে আওয়াজ হবে…দরোজা ফাঁক করাই আছে…উঁকি দিন…

–যাক…উনি ব্যাটরি লন্ঠন জ্বালিয়েই সেরিমনি করছেন…আরে…এনার কোমরেও লুঙ্গি নেই…

–শশশশশ…আস্তে…

–এনার প্রেমিকা তো একটা ভেড়া…শাদা রঙের ভেড়া…কোথায় পেলেন…ইনিও কয়েক ফুঁক ছিলিম টেনেছেন বোধহয়…দেখে যা মনে হচ্ছে…

–কেন…পাহাড়তলি থেকে…একজন পাহাড়ি একপাল ভেড়া চরাতে নিয়ে যাচ্ছিল…ধবধবে শাদাটাকে তুলে নিলাম…বেলেত ফেরত চালাচ্ছিল…হাওয়াই জাহাজের মতন উড়িয়ে দিলে গাড়িটা…পাথর পাতা রাস্তায়…

–কী নাম ওনার প্রেমিকার…

–সুখশ্বেতাম্বরী…

–ভেড়াদের তো লোম কামিয়ে দিতে হয়…নয়তো ওদের গ্রীষ্মকালে গরম লাগে…

–গরমকালে কুয়োতলায় নিয়ে গিয়ে প্রতিদিন চন্দন সাবান মাখিয়ে স্নান করান…তারপর তোয়ালে দিয়ে বেশ করে পুঁছে দেন…তবেই না সুখশ্বেতাম্বরী ওনাকে এত ভালোবাসে…নিজের চোখেই দেখুন না দুজনে কেমন গায়ে গা…মেড ফর ইচ আদার…

–লোম বেড়ে গেলে গরমকালে তো গরম লাগবে…

–কেলো ওনার কাঁচি দিয়ে কেটে দ্যান…আমরা সুখশ্বেতাম্বরীর লোম মাথায় দেবার বালিশে ব্যবহার করি…শিমুল তুলোর চেয়েও নরম…কেন…আপনার ঘরে বালিশে মাথা দিয়ে টের পাননি..

–তা সত্যি…আপনারা আপনাদের প্রেমিকার জন্য মেড ফর ইচ আদার…প্রেমিকাদের গলায় বেল্ট পরিয়ে রেখেছেন…চাঁদবদনী ছাড়া…প্রেমিকাদের নামগুলো কি সবাই মিলে ঠিক করেছেন..

–না…যিনি মারা গেছেন তিনি প্রেমিকাদের নাম দিয়েছেন…বইফই পড়াপড়ি করতেন তো…কেলো তো অমন নাম দিতে পারতেন না…উনি অবশ্য ওনার নিজের ভাষায় নামকরণ করেছেন…তা উচ্চারণ করতে গেলে জিভ জড়িয়ে যায়…ব্যঞ্জনবর্ণ দিয়ে শুরু…বেল্ট থাকলে আলিঙ্গনের সুবিধা হয়…চাঁদবদনীকে ওনারা দুজন পরাতে চাননি…দেখলেন তো মাতালটা পেছন-পেছন দৌড়োচ্ছে…

[ যিনি মারা গেছেন তিনি এদের প্রেমিকার নামগুলো সাহেবের রাখেলদের নামে নামকরণ করেছেন…কেবল নিজের প্রেমিকার বেলায় নতুন নামকরণ করেছেন…স্কাউন্ড্রেলগুলো এটুকুও বোঝেনি…আট বছর হয়ে গেল…ওপরের ঘরটা সম্পর্কে এদের আগ্রহ ছিল না বোঝাই যাচ্ছে…গ্রন্হভীতি সম্ভবত…কিংবা যিনি মারা গেছেন তাঁকে এড়িয়ে চলত…]

–কেউ বাঁদর বা হনুমানের সঙ্গে সম্পর্ক পাতালেন না কেন…জঙ্গলে তো প্রচুর রয়েছে…

–আমরা ইনসেসচুয়াস সম্পর্ককে অনৈতিক মনে করি…তাই…

–সবাই আট বছর যাবত…

–না না না না…যিনি যখন তাঁর মনের মতন প্রেমিকা পেয়েছেন…তবে পাঁচ বছরের বেশি তো হবেই…

–প্রতিদিন তো আপনারা একা-একা সেরিমনি করেন…আজকে ড্রইংরুমে সকলে মিলে অরজি করা যাক…আমি গিটার বাজাব…আপনারা তালে তাল মিলিয়ে সেরিমনি করবেন…

–অরজি মানে…

–হইচইভরা উত্তেজনার উৎসব…এপিফ্যানি বোধ করবেন…

–ভালো আইডিয়া দিয়েছেন ভোঁসড়ির ছ্যানা…

–আমি নিচের তলায় গিয়ে গিটার বাজিয়ে শুরু করছি…আপনারা চাঁদবদনী রাজরাজেশ্বরী সন্ধ্যারাগিনী চপলচারিণী সুখশ্বেতাম্বরীকে নিয়ে আসুন…সকলের সামনে সকলে প্রেম করবেন…লজ্জা করবে না তো…

–কেন লজ্জা করবে শুনি মোসাই…চপলচারিণী বা সন্ধ্যারাগিনীর কি লজ্জা করে যে আমাদের করবে… আমরা তো গরমকালে এমনিতেই ল্যাংটো থাকি… সবাই মিলে এর আগেও এক জায়গায় জড়ো হয়ে প্রেম করেছি…খেলা খেলেছি…কিন্তু ইংরেজি গানের সুরে ইংরেজি গান গেয়ে…যাকে বলছেন অরজি… এপিফ্যানি… তেমন লীলেখেলা করিনি…ইংরেজি গানে একটা ফাস্ট পেস আছে…ওই হিন্দি গানটাতেও আছে…রাজভাষার গান তো…

–কোন গান…

–পানি পানি পানি পানি পানি পানি পানি পানি পানি…ফাস্ট পেস প্রেম করা যায়…তালে তাল মিলিয়ে… গান ফুরোবার আগেই ক্লান্ত হয়ে যাবেন…ব্যাস প্রেমিকাকে জড়িয়ে শুয়ে পড়ুন…নাক ডাকুন…

[ আমার চাকরিতে এরকম ক্রিমিনাল পাইনি…এরা কেবল চুরি ডাকাতি খুন করেই ক্ষান্ত দেয়নি…তার সঙ্গে নতুন অভ্যাস আবিষ্কার করেছে যা চাষিবাড়ির বয়ঃসন্ধির ছেলেরা লুকিয়ে একা চাষের খেতে বা আমলিচুর বনে করে…এমন নয় যে নারীর অভাব মেটাতে এই পথে গেছে এরা…কত জায়গায় ঢুঁ মারে কিন্তু কোনো শহরে বেশ্যালয়ে যায় না…পশুরতিকে সাংসারিক করে ফেলেছে…এখান থেকে আমার পালাবার উপায় নেই…এদের কেউ একজন রাতে বন্দুক হাতে পাহারা দেবে…ড্রইংরুমে নিজেদের কাজে মত্ত থাকবে যখন…তখনই হাতে-পায়ে গুলি মেরে এমন জখম করে দিতে হবে যাতে চলতে-ফিরতে না পারে…বেশি ব্লিডিং হলে মুশকিল…জীবিত ধরে নিয়ে যাওয়া যাবে না…আগে ভেবেছিলুম প্রেমিকা মানে কিডন্যাপ করে আনা তরুণী…তা নয়…]

–ঠিক আছে…আপনি ওনাদের নিয়ে নিচে আসুন…

–আপনি এগোন…আমি সবাইকে আনছি…

[এত দেরি হচ্ছে কেন…গিটার বাজিয়ে গান গাওয়া আরম্ভ করে দিয়েছি…প্ল্যান গোলমাল হয়ে যাবে…কেউ একজন বেঁকে বসলেই ঝামেলা…যাক…নামছে প্রেমিকাদের পেছন পেছন…সবাই উলঙ্গ…কারোর হাতে আগ্নেয়াস্ত্র নেই…গুড…]

–কি হল…গুলির আওয়াজ কেন…

–চাঁদবদনী নিচে নামতে চাইছিল না…জোর করে টানতে টানতে নামাচ্ছিল বিলাত ফেরত…গুলি চালিয়েছে চাঁদবদনীকে মারবে বলে…

–চাঁদবদনীর গায়ে না লেগে কেলোর মাথায় গুলি লেগেছে…ঘিলু বেরিয়ে গেছে…আরে ভোঁসড়ির ছ্যানা…সন্ধ্যারাগিনীর ওপর গিয়ে পড়ল…

[ এই লোকটা আবার কে…দুহাতে পিস্তল চালাতে-চালাতে বাড়ির সদর দরজা দিয়ে ঢুকছে…আমি তো রিইনফোর্সমেন্টের জন্য অনুরোধ করার সুযোগ পাইনি…অন্য আরেকটা টিম নাকি…নাঃ…ইনিও উলঙ্গ…আমার গায়ে না লাগে…সিন্দুকের পেছনে লুকোই…হরিণদুটো…ভেড়া…ছাগল…বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিয়ে সদর দিয়ে পালাচ্ছে…পালালো…ইয়র্কশায়ার পিগটা পালালো না তো…পিস্তলধারী আগন্তুকের দুই পায়ের মাঝে গিয়ে লুকিয়েছে…যিনি মারা গেছেন ইনিই সেই লোক…আই সি…শুয়োরটা তাহলে সত্যিই ভালোবাসে লোকটাকে…]

–মর শালা…মর তোরা…নে নে নে নে…এতদিন আমাকে হিজড়ে…ইরেকশান হয় না… মেয়েলি… ভেড়ুয়া… ঢ্যামনা…কুরুণ্ডে…মেনিমুখো…এই সব বলতিস…এবার মর… মর… মর… মর… মর… মর… মর…ল্যাংটো পোঁদে মরে পড়ে থাক…তোদের লাশ পচুক জঙ্গলে…

–কে আপনি…ডিপার্টমেন্টের…না…দেখিনি তো…আমার পুরো পরিকল্পনা ভেস্তে দিলেন…আমি এদের জ্যান্ত পাকড়াও করার চেষ্টা করছিলুম…আপনি কোথা থেকে এসে গোলমাল করে দিলেন…আপনি বরং সাহায্য করতে পারতেন আমাকে…এদের ধরে নিয়ে গিয়ে আইনের হাতে সোপর্দ করতুম…এদের অপরাধের ফিরিস্তি অনুযায়ী বহু কেসের সমাধান করা যেত…আট বছর যাবত কত অপরাধ এরা করেছে…নাঃ…সব গুবলেট করে  দিলেন…

–আমি মরিনি…ঘুষি খেয়ে মরে যাবার ছল করে ছিটকে পড়েছিলাম…এক ফাঁকে পালাবো ভেবেছিলাম…কিন্তু প্রতিশোধ নেয়া জরুরি ছিল…তাছাড়া চাঁদবদনীকে ফেলে পালিয়ে যাওয়া উচিত হতো না…ওরা ভেবেছিল আমাকে জ্যান্ত পুঁতে দিয়ে মেরে ফেলবে…আমি মাটি তুলে বেরিয়ে এসেছি…আপনি যখন হেগে ফিরছিলেন সেসময় মাথা উঁচিয়ে দেখে নিয়েছিলাম…পিস্তল কুড়োলেন ঝোপ থেকে…জাঙিয়ায় ঢোকালেন…তখনই অনুমান করেছিলাম যে আপনি এদের ধরতে এসেছেন…আমিও দুটো পিস্তল লুকিয়ে রেখেছিলাম…ওরা জঙ্গলের বাইরে বেরোলে…কোনো ফল লক্ষ্য করে…চালানো প্র্যাকটিস করে নিতাম…মরেছে সবকটা…এদের কারোর বেঁচে থাকার অধিকার নেই…এবার চাঁদবদনী আমার একার…আমি এদের সঙ্গে থাকলেও কোনো ডাকাতি বা খুনে অংশ নিইনি…চাঁদবদনীকে তুলে আনা কি অন্যায়…নিজের চোখেই দেখুন… চাঁদবদনী আমায় ভালোবাসে…ওদের কোনো বেআইনি কাজে অংশ নিইনি…এদের সঙ্গে থাকতে বাধ্য হয়েছিলাম…এর আগে শুধু একটাই খুন করেছি…লালগলা টিয়াপাখিকে মেরে ফেলে…অন্য টিয়াপাখিটা কোথায়…ওটারও গতি করতে হবে…

–ওই যে গান গাইতে গাইতে উড়ে বাইরে বেরিয়ে  যাচ্ছে…

–কেন-কিঁ কেন-কিঁ কেন-কিঁ কবি লেখক নাট্যকার চিত্রকর অভিনেতা ভাস্কর স্হপতি এরা সবাই অসামাজিক গাধা…

 

 

 

 

Posted in বিসটিয়ালিটি | Tagged , | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

আঁস্তাকুড়ের এলেকট্রা : মলয় রায়চৌধুরী

রেজিস্ট্রেশানের সময় বানান ভুল করে ফেলেছিল ক্লার্ক নবীন খান্না, মুখে পান সত্ত্বেও পরশ্রীকাতর ফিকে হাসি,  ঠোঁটের কোনায় লালচে ফেনা, পেটের ভেতর কৃষ্ণচূড়া ছড়িয়ে চলেছে ফিনফিনে পাপড়ি, টাকের জেদি কয়েকটা চুল ফ্যাকাশে,  আলস্য দেখে মনে হয় যেন ঠাকুমার পালঙ্কের পাশে হাঁটু গেড়ে সম্পত্তির আশায় সময় কাটাচ্ছে ।

তখনও পর্যন্ত জংধরা টাইপরাইটার সরিয়ে ঝকঝকে কমপিউটার আর ঝুলেল টুনিবালব নিভিয়ে কুয়াশাময় সিএফএল ঢোকেনি সরকারি দপতরে ।

##

রাস্তায় কুড়িয়ে পাওয়া মেয়ের জন্মদিন কে নিশ্চিত করবে ; করল একটা ভুল, যেমন নামের ভুল, ভুল লেখা হল বার্থ সার্টিফিকেটে, তোর জন্মদিন পয়লা জানুয়ারি, হ্যাপি নিউ ইয়ার আর হ্যাপি বার্থডে ।

কত মজার, না ? উঁহু, তুই বলবি, মোটেও মজার নয় ।

দিল্লিতে প্রথম আষাঢ়ের ফোঁটায় ফোঁটায় ভেজা সকাল,  গাড়ির কাচে ওয়াইপার নিজের মনে গাইছে , মুছে দাও মুছে দাও মুছে দাও ।

##

চিরুনিধার বৃষ্টিতে, ভুরুকোঁচকানো হাওয়ায়, সমস্ত ডানা সরিয়ে ফেলা হয়েছে আকাশ থেকে ।

রুলটানা শুকনো অশথ্থপাতা ওড়ে । নারকেল পাতার ওপর কাকগৃহিণীর বলশয় ।

ফুটপাতের বালিতে জল সেঁদোবার রিনরিন রিনরিন রিনরিন রিনরিন ।

শোনা গিয়েছিল অন্ধের পা রাখার আওয়াজ । বৃষ্টির টুপটাপে সময় পড়ার শব্দ ।

ভাসিয়ে নিয়ে গেলি ধাঁধার উড়ন্ত মেঘের পালকে শুয়ে চাই চাই চাই চাই, তোর দাবি ।

##

 

যায়নি মোছা, মুছতে পারিনি রে ।

কত জরুরি ছিল মুছে ফেলা ।

জগদীশ ব্যানার্জি তখন পানিপতে পোস্টেড, এজিএমইউ ক্যাডার বলে হার্ড পোস্টিঙ ঘুরে এসে আমি দিল্লিতে প্রথম পোস্টিঙে, ওকে বলেছিলাম আসতে, তোকে পছন্দ করার জন্য ।

জগদীশ ব্যানার্জির নতুন টাকের ফিকে উঁকির ওপর বৃষ্টি, খবরের কাগজ দিয়ে আড়াল করছে বৃষ্টির ফোঁটা । বৃষ্টি আমার ভালোলাগে, মাত্র কয়েকটা তো  ফোঁটা, আদর করতে করতে গড়িয়ে চলে যায় বুকে, পেটে বা আরও তলায় ।

আমরা দুজনে, বৃষ্টির পিছুধাওয়া এড়াতে, প্রায় দৌড়ে ওদের হলঘরে ঢুকতেই, প্রথমে তুই-ই চোখে পড়লি, তোর খিলখিল হাসি, এক বছর বয়সেই। অন্য বাচ্চাদের চেয়ে তোর পা লম্বা, নজরে পড়ে গিয়েছিলি, সবার চেয়ে ঢ্যাঙা ।

কোলে তুলে নিলাম তোকে ।

এটা সেই মুহূর্ত, যা সবায়ের জীবনে আসে, এমনই এক মোড়, যেখান থেকে ফিরে যাওয়া যায় না, সবুজ প্রতিভা, সুরের গমক, মায়া ;  নিজের অবস্হান এক মুহূর্তের মধ্যে নির্ণয় করে ফেলতে হয় । আমি অনুপ্রাণনা-তাড়িত পুরুষ, ঠিক সময়ে যথার্থ নির্ণয় নিতে না পারলে জীবনের ভারসাম্য গোলমাল হয়ে যেতে পারে, এরকমটা মনে হয়, শেষে জমে-থাকা হতাশা হয়ে উঠবে অত্যন্ত কষ্টকর, ভবিষ্যতে কি হবে আঁচ করে নির্ণয় ঝুলিয়ে রাখতে পারি না।

##

স্পর্শের মর্মার্থ হয়, মর্মার্থের রসায়ন, রসায়নের সম্পর্কে, রেণু, পরাগ, উড়াল, জীবন ।

চাউনির কোলাহল, উতরোল শ্বাস । প্রতিরোধে ক্ষয়ে অনড় ঝর্ণাপাথর । জিওল মাছের নিঃশব্দ ছটফট । তোর মতো তোর মতো তোর মতো করে নিয়ে গেলি আমাকে আমার আমি থেকে ছিঁড়ে ।

##

এর মতো, ওর মতো, তার মতো, কারো মতো নয় ।

যেন এমন, যেন অমন, যেন তেমন নয় ।

##

তোর নাকে নাক দিয়ে আদর করেছিলাম, গালে আর নাভিতে চুমো খেয়েছিলাম, উসকে দিয়েছিলাম তোর খিলখিল, পাখিদের গান শুধরে দেবার হাসি, খাঁজকাটা রোদ্দুরের ডালে-ডালে দোয়েল-কিশোরীরা স্বরলিপি ভুলে যায়, পায়ের তলায় আদর করতে পা গুটিয়ে নিয়েছিলি, ওঃ, তোর সেই মিডাস টাচ ।

তোর নাম আমি রাখতে চেয়েছিলুম নীতি, আসলে ওটা আমার ঠাকুমার নাম; উনি আমায় সবচেয়ে বেশি আদর করতেন, খাওয়ার পরও জানতে চাইতেন, কি রে খাওয়া হয়েছে ?

##

নকশিকাঁথা, আমসত্ব, শেতলপাটি, তামার পয়সা, গোবিন্দভোগ, কুমড়োবিচির মেঠাই, রেড়ির তেলের গন্ধ, কুপির আলো, পুকুর, ধানখেত, টিয়াপাখি । রামধনু গড়তে শিখছে আকাশ । গাছের ছায়া কিনে নিয়ে গেছে পাইকার । পায়ের শিরায় মাইল-পাথরের স্হায়ীত্ব । ঠাকুমা ।

##

একটা ইংরেজি ই বাদ পড়ায় তোর নাম হয়ে গেল নেতি ; শুনেছি, বন্ধুরা তোকে নেটি নাটি নাট করে দিয়েছে, তা তো আমার দোষ নয় ।

শুনেছি, তোর একাধজন  ক্লাসমেট খুনসুটি করে  নেটা বলে ক্ষ্যাপায়, নেটা মানে শিকনি । তুই একেবারে গা করিস না, তাও শুনেছি, তোর এক সহপাঠিনীর অভিভাবকের কাছে, আমার সঙ্গে সেও তখন পুডুচেরিতে পোস্টেড, কাঁধ শ্রাগ করে নাকি বলিস, সো হোয়াট , আই’ল স্টিক ইট টু ইওর আস, ক্লাস ফোর থেকেই ।

জগদীশের স্ত্রী অমরিন্দর, কখনও হরিয়ানভি জাঠ ছিল, বিয়ের পর মাছভাত খেয়ে, জামদানি পরে, দুর্গাপুজোয় গরদের শাড়িতে সিঁদুর খেলে, জলসায় গলাকাঁপা বাংলা গান গেয়ে, পুরোপুরি বাঙালি, তোকে নিত্তু বলে ডাকে, জানি,  নিত্তু বেটি, কি খাবি, বাংলা না পানজাবি রেসিপি, সরসো কা সাগ উইথ মক্কি কি রোটি, ছোলে ভাটুরে, রাজমা চাওয়ল । বলেছে জগদীশ, চেককাটা লুঙ্গিতে বাইফোকাল পুঁছে ।

তুই বলতিস, নো নো, আন্টিমা, আমি মাছ ভাত খাবো, মুড়িঘন্ট বানাও না, আঙ্কলবাপির ফেভারিট। শুনেছি ।

জগদীশের বড় মেয়ে বৈদেহী বিরক্ত হতো, এতো সাধাসাধি কিসের ? যা সবাই খায় তা-ই খাবে । পরে মানিয়ে নিয়েছিল, তোর আপন করে নেবার বৈশিষ্ট্যের আদরে । তোর আয়ত্বে আছে গোপন উষ্ণমণ্ডল, শুনেছি।

##

অমরিন্দরের বিয়ের সময়ে ঝামেলা করেছিল ওদের  এক ভঁয়সাপেটা জাঠ পঞ্চায়েত কর্তা ; জগদীশ সিলকের পাঞ্জাবি খুলে, পৈতে দিখিয়ে হেঁকেছিল , আমি হলুম বাঙালি ব্রাহ্মণ, স্যারজি, ব্যানার্জি, সবচেয়ে উঁচু ব্রাহ্মণ ।

ওদের ষণ্ডাদের ব্যানার্জির হাঁটু ছুঁয়ে সে কি পরনাম, পরনাম, পরনাম । এও শোনা, বলেছে অমরিন্দর ।

পৈতেতে বুড়ো আঙুল জড়িয়ে বাপের বয়সী ভুঁড়োদের পাগড়িতে হাত রেখে জগদীশ বলেছিল, জিতে রহো পুত্তরজি , ফুলো ফলো, পিও পিলাও ।

বিয়ে হল, বিয়েতে মদ খেয়ে ব্যাণ্ডবাজিয়েদের তালে-তাল  নাচ হল, জগদীশ যৌতুকে পেল গুড়গাঁওয়ে জমি, যার ওপর ও দোতলা বাঙলো তুলেছে, আর ঘুষের টাকায় তাকে ক্রমশ ফিল্মসেটের মতন করে ফেলেছে, মায়াবি। ঘুষের টাকায় কলকাতায় নিউটাউনে ফ্ল্যাট কিনে রেখেছে, অমরিন্দরের নামে,মায়াবি । চণ্ডীগড় ছেড়ে বেরোতে চায় না, তাই । ছুটিতে বোতলক্রেট গুড়গাঁও কিংবা যেখানে আমি বা কোনো বাঙালি কলিগ পোস্টেড ; থ্রি চিয়ার্স ।

ঘুষের টাকা নেবার জন্য ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলে আর বছর দুয়েক পরে বন্ধ করে আবার অন্য অ্যাকাউন্ট খোলে ; কখনও নিজের নামে, কখনও অমরিন্দরের নামে, কখনও শিডুল্ড ব্যাঙ্ক, কখনও প্রায়ভেট ব্যাঙ্ক, কখনও আরবান কোঅপারেটিভ ব্যাঙ্ক, কখনও টয়লেটের লফ্ট ব্যাঙ্ক, কখনও পুজোর ঘরের ফাঁপা দেয়ালে আনারকলি ব্যাঙ্ক ।

##

গলা অব্দি কুয়াশায় ডোবা মানুষের নাম না-পালটাতে পারার মজাদার অসুখের আনন্দ । চাঁদবণিক প্রায়ভেট লিমিটেড বললে, হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ । প্রতি বদলির বিদায় সম্বর্ধনায় একই বক্তৃতা দ্যায়, লিখে রাখা আছে ।

##

সকালে স্নানের পর গামছা-কোমর জগদীশ, টাকের চুল ফুরিয়ে গিয়ে করোটিতে রূপান্তরিত, বাঁহাতে পেতলের ছোটো ঘন্টিতে টুংটাং, ডানহাতে দুশো এম এল গঙ্গাজল, গ্যাঁদাপাপড়ি, দরোজায় দরোজায়, সংস্কৃত মন্তরের ফিসফিস, বৈশাখ জৈষ্ঠ আষাড় শ্রাবণ ভাদ্র আশ্বিন কার্তিক অঘ্রাণ পৌষ মাঘ ফাল্গুন চৈত্র, কিছুটা ঝুঁকে, যেন সময়ের সঙ্গে বেমানান আধ্যাত্মিক কোনো ষড়যন্ত্রের শিকার ।

পুজোর ঘর পাথর-মাটি-কাঠ-পেতলের দেবী-দেবতায় ছয়লাপ, দেয়ালের পেরেকে-পেরেকে কুড়ি-পঁচিশ বছরের পুরোনো বাংলা ক্যালেণ্ডারের দেবী-দেবতা, থাক-থাক পাঁজি, পুজোর বই, পাঁচালি, পিলসুজ, পুজোর ন্যানো সাইজের থালা-ঘটি-বাটি, রুপোর ; হেসে, গলার লাল শালুতে শালিগ্রামশিলা ঝুলিয়ে, বলেছিল ওর পার্টটাইম পুরুত অবিনাশ ভট্টচাজ্জি, যে নিজেই গজগজ করে দেবী-দেবতারা সংস্কৃত মরা ভাষা থেকে আজও বেরোতে পারেনি, বুঝতে পারে না কোন বিসর্গের কি অর্থ ।

জগদীশের জ্বরজারি হলে, অমরিন্দর, কালোর চেয়ে কালো কলপে ভেজা চুল, কোমরে এক গামছা বুকে আরেক, আজও জিগ্যেস করে, এর পর কোন মন্তর ? গামছা যায় কলকাতা থেকে, বাঙালি জুনিয়ার অফিসারদের দৌলতে । অবশ্যই লাল, অবশ্যই সবচেয়ে বড় মাপের, যদিও অমরিন্দরের জাঠনি বুক ঢাকতে পারে না সে-গামছা, পেটে সিজারিয়ানের কাটার দাগ উঁকি দিয়ে ঝোলে । তিন বছর লেগেছিল শাঁখ-বাজানো শিখতে, শুনেছি।

কী করে আপনাদের পরিচয় হল, অমরিন্দর তো দু-এক ইঞ্চ লম্বা, জানতে চেয়েছিলাম ।

জগদীশ বলেছিল, ভাঁজের প্রতিভায় ছিল সীমাভাঙার টান, জগদীশেরই দপতরে, পানিপতে, এসডিও অফিসে এসেছিল কোনো কাজে । ব্যাস, বাস্তববাদিনীর উদ্যমের  সঙ্গে বলগাছেঁড়া কল্পনা ; দেহের আনাচে-কানাচে টই-টই জাঠনির অবিমিশ্র উপঢৌকন ; ধুলোয় মোচড় দেয়া গন্ধ । জাঠনির মতো উরু পাবেনা ভারতে ; মোষের দুধ-দই খায়, গোরু একদম নয়।

পানিপতের রঞ্জক গোলাপ, সাদা গোলাপ, লাল গোলাপ, হলুদ গোলাপ, কমলা গোলাপ, গোলাপি গোলাপ, কালো গোলাপ, ইরানি গোলাপ, মিরিন্ডা গোলাপ ; শাখা কলম, দাবা কলম, গুটি কলম, চোখ কলম । আহাআহা। দেহজুড়ে চুমুর দাঙ্গা ।

##

সংবেদনশীল আলোড়ন, জলসিক্ত উড়ন্ত ছাতা ।

শান্তির মৌনতা হাওয়া থেকে হাওয়ায়, স্হান থেকে স্হানান্তরে ।

উতরোল কোলাহল ।

##

অমরিন্দর: যাক ওই করওয়া চৌথের জুঠঝামেলা থেকে বাঁচলুম, না খেয়ে থাকো সারাদিন, ওসব আমার দ্বারা হবে না, চালুনি দিয়ে বরের মুখ দেখে তাকে বাঁচিয়ে রাখার চেয়ে আমি সিঁদুর-খেলা খেলে তাকে বেশিদিন বাঁচিয়ে রাখব । বরকে বরং আলুর পরোটা, মেথি-শাকের পরোটা, পুদিনার পরোটা, বেসনের পরোটা, কিমার পরোটা খাওয়াবো, সিঁদুর খেলা থেকে ফিরে, ঘিয়ে চপচপে পরোটা । করওয়া চৌথ হল চালুনি কারখানাগুলোর কারসাজি ; নয়তো কবেই বন্ধ হয়ে যেত, পুরোনো কারখানা বন্ধ হয়ে এখন বের করেছে প্লাস্টিকের চালুনি ।

সাহেবরা চাঁদে গিয়ে গোসল করে এলো, সেই চাঁদের দিকে তাকাও, মানে হয় কোনো, অ্যাঁয়জি !

জগদীশ : কিন্তু তুমি লাঞ্চ আর ডিনারে কাঁচা পেঁয়াজ কামড়ে খাবার অভ্যাস ছাড়তে পারলে না ।

অমরিন্দর : তোমার শুঁটকি মাছের গন্ধ সহ্য করতে পারি, আর তুমি কাঁচা পেঁয়াজের গন্ধ সহ্য করতে পারো না ? প্যার মোহব্বত প্রেম ভালোবাসা হল গন্ধের আপোস । বাজারে পেঁয়াজ না এলে হরিয়াণার সরকার উলটে যায় । পশ্চিমবঙ্গের বাজারে মাছ না এলে কি সরকার ওলটায় ?

জগদীশ : অমন কখনও হয় না, মাছ আসবেই, বাঙালি মাছ খাবেই, যত দামই হোক, সরকারকে ফেলবে না । সেখানে সরকার পড়ে মাৎস্যন্যায়ে ।

অমরিন্দর : তোমরা বাংগালিরা পরৌনঠাকে পরোটা বলো কেন, অ্যাঁয়জি ?

##

চাবির ঘোলাটে ফুটোয় যাবৎজীবন চোখ । অন্ধকারকে খুঁচিয়ে বের করে-আনা সকালের বিকল্প ।

সান্নিধ্যের নৈকট্য ঘিরে অফুরন্ত অবসর । প্রেম-টিকলিং নিড়ুনি ।

কৃষ্ণবিবরের অচিন্ত্যনীয় ভর, আলো পর্যন্ত বেরোতে পারেনি ।

##

জগদীশ আর অমরিন্দর আমাকে ব্রো-প্রো বলে ডাকে, এল বি এস ন্যাশানাল অ্যাকাডেমি অব অ্যাডমিনিস্ট্রেশানে ট্রেনিঙের সময় থেকে আমাকে সকলে ব্রো-প্রো করে নিয়েছে, ব্রাদার প্রভঞ্জন । জগদীশ আমার চেয়ে পাঁচ বছরের সিনিয়র, ঘোঁৎঘাঁত বিশেষজ্ঞ । ও ঠিক খবর রাখে  কখন বিরোধীদলে চলে যাবার কথা চিন্তা করছে সকালবেলার সূর্য ।

##

তুই কি কখনও আমার নাম জানতে পারবি নেতি ?

আমার গোপন কোষাগারে তোর নাম নেতি থেকে ইতি করে নিয়েছি ; তুই জানিস না, জানতে পারবি একদিন, যখন আমার উইলে তোর নাম থাকবে, আমি এতদ্বারা আমার স্হাবর ও অস্হাবর সমস্ত সম্পত্তি নেতি ওরফে ইতি ব্যানার্জিকে । তেমনই তো ভেবে রেখেছিলাম রে ।

পরিকল্পনা ভেস্তে দিয়ে তার আগেই সব জেনে ফেলেছিলি ; তোর গায়ে  গোখরোর ঠাণ্ডা রক্ত। কোনো যুবতীর গা এত ঠাণ্ডাও হয় ! প্রতিশোধ নেবার ষড়যন্ত্র শিরায়-শিরায়, রসতরঙ্গিনী তুই । তোর দুই হাতে অ্যানাকোণ্ডার দমবন্ধ করা পাকের পর পাকের পর পাকের পর পাক, উফ কি ঠাণ্ডা, আঁস্তাকুড়ের হেমন্তের শীতেল জঞ্জালের জাপট ।

##

চব্বিশ বছরের শ্যামলী দীর্ঘাঙ্গী, জানি না কেমন দেখতে হয়েছে তোকে, খুঁজে বেড়াচ্ছিস তোর নামকরণকারীকে, জন্মদিন নির্ধারণকারীকে, যেন তোর অস্তিত্বকে সেই লোকটা করায়ত্ব করে গুমখুন করে লুকিয়ে রেখেছে নিশুতি রাতের পোড়োবাড়ির সিঁড়ির স্যাঁতসেঁতে অন্ধকারে ।

##

শিমুলের পাকা ফল ফেটে রোঁয়া উড়ছে, তুই তাদের ধরতে চাইছিস, শিমুলের লাল টকটকে ফুলগুলো শুকিয়ে তৈরি করেছে রোঁয়াবীজ, সেগুলোকে উড়িয়ে চলেছে দূরান্তরে, কোথাও গিয়ে অঙ্কুর তুলে লুকিয়ে গাছ হয়ে উঠবে, বসন্তের আকাশকে রাঙিয়ে দেবে ।

তুই কি চাস না যে বিশাল একটা শিমুলগাছ সবুজ মুকুট মেলে আকাশের চিরনবীন শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা ছুঁয়ে দেখুক, মেখে নিক বসন্তের উদাসীন রক্তাক্ত তাড়না , বল তুই ?

আমারই মস্তিষ্কে ওই গাছ পুঁতে দিবি, রোঁয়া উড়বে, আঁচ করিনি । তুই মারাত্মক । বৃষ্টি ফোঁটারা কি হলুদ পাতার রঙ তুলতে পারে, বল তুই ? মোম-আলোয় শ্যামাপোকা নাচতে ভোলে না ।

##

প্রেপ থেকে তোকে ভর্তি করা হল নৈনিতালের সেইন্ট মেরি কনভেন্ট হাই স্কুলে, বোর্ডিঙের অঢেল, সিসটাররা ছাত্রীদের সুখসুবিধা-অসুবিধার খেয়াল রাখেন, স্কুলের রেজাল্টও ভালো হয় প্রতিবছর । ফিস বেশি হলেই বা, আমার মাইনেটা আছে কি জন্য ! ক্লাস টুয়েলভ পর্যন্ত টানা পড়লি সেখানে । ব্যাস, জিভে সেই যে কনভেন্টি অক্সব্রিজ ইংরেজি ঘাঁটি গাড়ল, তা কখনও ছাড়ল না তোকে । এও শোনা, সূত্র অমরিন্দর, টেলিফোনে, আমি তখন পোর্ট ব্লেয়ারে ।

জগদীশের মেয়ে তোর চেয়ে চার বছর সিনিয়র, ও কি  জিভে অক্সব্রিজ কনভেন্টি ইংরেজি জড়াতে দিয়েছে ? বলেনি কেউ, কেনই বা জানতে চাইব, বল ? আমার আগ্রহের কেন্দ্রে তো তুই । ওই স্কুলের বোর্ডিঙেই তো ছিল বৈদেহী ।

কত ইচ্ছা করছিল, তবু ভর্তির সময়ে আমি স্কুলে যাইনি, কিন্তু নৈনিতালে গিয়েছিলাম, উদ্বেগ, উদ্বেগ, যাতে তোর অ্যাডমিশানে অসুবিধা না হয় । এডুকেট এ গার্ল চাইল্ডের দপতরের পর আমি তোকে আর চাক্ষুষ দেখিনি, কেবল ফোটোতে যা । তারপর থেকে, জগদীশের মেয়ে আর ছেলেকেও দেখিনি । ওদের বাড়িতে আমি যাই না, তোর কারণেই যাই না ।

এনজিওর মনোবিদ তনজিম হায়দার বলেছিল, আপনি  নেতির সামনে কখনও যাবেন না, স্মৃতিতে আপনার মুখ থেকে যাবে, খুঁজবে আপনাকে, শেষে আপনাকে না পেলে ডিসগ্রান্টলড আর রিভেঞ্জফুল ফিল করবে ; আপনি তো তা চাইছেন না । অচেনা একজন মানুষ ওর সমস্তকিছু ফানডিং করছে জানতে পারলে হীনম্মন্যতার দোষ ফুটে উঠবে চরিত্রে ।

আমি চেয়েছি তুই বোল্ড হয়ে ওঠ । তাই বলে এরকম বোল্ড, অ্যাঁ ?

##

শাদা ঘোড়া, কেশর হাওয়ায়, দৌড়োচ্ছে, সবুজ মাঠের ওপর দিয়ে, ওই দূরে সূর্য, ওই দূরে পূর্ণিমার চাঁদ, দৌড়চ্ছে ঘোড়া, ওই দূরে ঝড়, ওই দূরে বৃষ্টি ।

ক্লপ ক্লপ ক্লপ ক্লপ ক্লপ ক্লপ ক্লপ ক্লপ…….মরুভূমিতে ঘোড়ারা দৌড়োলে বালি ওই শব্দকে শুষে নেয়।

##

নৈনিতাল তোর পছন্দ হল । কত সুন্দর না ? জায়গাটা ? বিশেষ করে শীতের সময়ে, তুষার দেখতে দেখতে তোর স্কুল ছুটি  । বৈদেহীরও প্রিয় ছিল স্কুল আর শহরটা, শুনেছি ।

সতীর নয়ন পড়েছিল বলে নৈনিতাল, শুনেছি ।

সতীর চোখ, ভেবেছিস কখনও !

অমরিন্দরের মতে সতীর মতন চোখ কোনো মহিলা পেতে পারে না; ওই তিনটে চোখই তৈরি হয়েছিল।

আইডেনটিটিকার্ডে তোর ফোটো, আইগ্লাস দিয়ে এনলার্জ করে দেখে,  অনুমান করতে পারি, চোখ দুটো কত সুন্দর, যতো তোর বয়স বেড়েছে, ঠিক জানি,  তত সুন্দর হয়েছে তোর চোখ, কালো গভীর আর বেশ বড়ো, যেমন বাঙালি মেয়েদের হয়। কাঁদলে কেমন হয় তোর চোখজোড়া ? হাসলে কেমন হয় ? কারোর সঙ্গে ঝগড়া করলে কেমন হয় ? তোর এখনকার জীবন্ত চাউনিগুলো দেখার বড়ো ইচ্ছা হয় রে ।

কবে দেখলাম তোর চোখ ? দেখেছি বৈকি । চোখ বুজলেই দেখতে পাই আর ভাবি কত ভুল যে করেছিল তোর মা তোকে ডাস্টবিনে  ফেলে দিয়ে । আমার মনে হয় দূর থেকে লক্ষ্য রেখেছিল, তোকে কেউ তুলে নিয়ে যাচ্ছে কিনা দেখার জন্য ; তখনই তোর চোখের টান এড়ানো ছিল অসম্ভব ।

আমি তোর চোখের টানেই সন্মোহিত হয়েছিলাম । তোর গন্ধে । কেন বল তো ? কারণ তোর গন্ধ অন্য শিশুদের থেকে আলাদা ছিল, তুই তোর মায়ের দুধ খাসনি, বোতলের দুধ খেয়ে বড়ো হয়েছিস ।

##

এর মতো, ওর মতো, তার মতো, কারো মতো নয় ।

যেন এমন, যেন অমন, যেন তেমন নয় ।

বড়ো হয়ে উঠলি, বড়ো হয়ে উঠলি, অমাবস্যাকে একরাতে পরিযায়ী করে চলে যাবি বলে !

##

তোর ক্লাস সেভেনের ডায়রিতে, হস্টেলের ওয়ার্ডেন দেখেছিলেন, একটা পৃষ্ঠায় তুই লিখে রেখেছিস, লাল ডটপেন দিয়ে, “আই নো, সামওয়ান ওনস মি, বাট ইজ সিক্রেটলি ট্রাইং টু ডিজওন মি ।” পৃষ্ঠাখানা ছিঁড়ে অমরিন্দরেকে দিয়েছিলেন ওয়ার্ডেন, এই ভেবে যে তুই কোনো ছেলের সঙ্গে প্রেম করছিস ।

ওই স্কুলে ছেলেরা পড়ে না, কি করেই বা কোনো ছেলের সঙ্গে তোর যোগাযোগ হবে, তা নিজেও চিন্তা করেছিলেন ওয়ার্ডেন ।

জগদীশ বুঝিয়েছিল অমরিন্দরকে, না, না, ও জেনে ফেলেছে, যে ওর পড়াশুনা থাকা খাওয়া পোশাক আর জীবনে যা প্রয়োজন তা কেউ একজন অলক্ষ্যে যুগিয়ে যাচ্ছে, আর তার জন্য তুমিই দায়ি অমরিন্দর, আমাদের ছেলে আর মেয়ের চেয়ে দামি জুতো জামা উপহার ইত্যাদি কিনে  ওর মনে সন্দেহ তৈরি করে দিয়েছ । ও ভাবে, ওকে কেন স্পেশাল ট্রিটমেন্ট দেয়া হচ্ছে ।

মেয়ে বৈদেহী আর ছেলে আরিয়ানও প্রশ্ন তোলে, কেন স্পেশাল ট্রিটমেন্ট । শুনেছি ।

অমরিন্দর উত্তরে বলেছিল, আর ব্রো-প্রো যে অন্যদের দিয়ে নেতিকে বাংলা-ইংরেজি বই পাঠায়, প্রতি বছর দূর্গাপুজোয় দামি টোম্যাটোরেড পোশাক পাঠায়, তার বেলা ?

যাতে ওর জ্ঞান বাড়ে, কালচার্ড হয়, সেজন্য পাঠায় ; ব্রো-প্রোর মগজে আঁস্তাকুড়ের ভয় কি আর নেই !

তা বইগুলো বৈদেহী আর আরিয়ানই বেশি পড়ে, নেতি স্কুল থেকে ছুটিতে এলেও ম্যাথস ফিজিক্স কেমিস্ট্রিতেই বসবাস । বৈদেহী বইগুলো পেয়ে সাহিত্যের পোকা হয়ে গেছে ; বাংলা সিডি এনে গান শোনে। শুনেছি।

আমি চেয়েছিলুম তোকে সবচেয়ে ভালো পোশাক আর জুতো কিনে দেয়া হোক ; বই কিনে দেয়া হোক। কিন্তু কি করেই বা তুই জানলি, বিশ্বাস করলি ? বিশ্বাস আর সন্দেহ  তো একই ব্যাপার নয় । জানিস তো, মানুষের সন্দেহ হল বিশ্বাসঘাতক প্রক্রিয়া, কিন্তু নিজের ভেতরের আলো-অন্ধকার খুঁজে পেতে হলে সন্দেহ ছাড়া উপায় নেই, না রে ?

তোর কি মনে হয় না যে বিশ্বাস ব্যাপারটা জঘন্য, দূষিত, মন্দ ? বিশ্বাসের বিপরীত হল সন্দেহ, কিন্তু তা যদি বিশ্বাসের উপাদান হয়, তাহলে কি করবি ? তোর মাথায় নিশ্চয়ই এই দোনামনা দোল খেয়েছে, টিং টুং টিং টুং, জানি আমি, ফর শিওর ।

##

পথপ্রদর্শকের হাত ধরে প্রতিবিম্ব পালটে যায়, পাহাড় ফাটিয়ে বের করে আনে প্রতিধ্বনি ।

রোদে নিকানো আকাশে তখন ঝুলে থাকে পরিযায়ী পাখির একাকীত্ব ।

রোদ্দুর উত্তরায়ন মেনে চললে কী-ই বা করার ! অপেক্ষা করো, অপেক্ষা করো ।

##

সেভেনথ স্ট্যাণ্ডার্ড থেকে তোর প্রতিটি ক্লাসের আইডেনটিটি কার্ড রেখেছি যত্নে, চণ্ডীগড় থেকে ডাকে আমাকে পাঠিয়ে দিয়েছিল তোর অভিভাবক পরিবার , যখন তোর বারো ক্লাস শেষ হল, আমি তখন সিলভাসাতে পোস্টেড ।  তুই কি টের পাসনি যে কোথায় গেল স্কুলের আইডেনটিটিকার্ডগুলো ? ওগুলো দেখি মাঝেসাজে, কেমন একটু একটু করে ডাগর হয়ে উঠেছিস; ফিচার্স স্পষ্ট হয়ে উঠছে । জগদীশের বাড়িতে আছিস বলে তোকেও নাকি বৈদেহী আর অমরিন্দরের  মতো দেখতে হয়ে যাচ্ছে, শুনেছি ।

জাঠনি ! ভাবা যায় !

তুই তো বাঙালি ; মোষের দুধ হজম করতে পারিস তো ?

আশ্চর্য না ? তুই কলকাতার আঁস্তাকুড় থেকে এসে যাদের বাড়ির সদস্য হলি, তাদের মা-মেয়ের মতনই দেখতে হয়ে গেলি ক্রমশ, বারো ক্লাস পর্যন্ত তোর আইডেনটিটি কার্ডের ফোটো দেখে তেমনটা অনুমান করতে ভালো লাগে।

তুই কি ঢ্যাঙা হয়েছিস,  তোর পাদুটো লম্বা হয়ে চলেছে নাকি, বৈদেহী-আরিয়ানের মতন, জাঠদের মতন?  নাচ শিখতে পারতিস, তা নাচ তোর প্রায়রিটিতে নেই, শুনেছি।

ক্লাস টেনে যখন ফার্স্ট হলি, সিস্টার অ্যানি তোর সাক্ষাৎকার নিয়ে ছাপিয়েছিলেন স্কুল ম্যাগাজিনে, তার কপি আছে আমার কাছে, পড়ে পড়ে মুখস্হ হয়ে গেছে প্রশ্ন আর উত্তরগুলো ; শুনবি ?

তুই তো এখন আমেরিকায়, চাকরি করিস, শুনেছি গাড়িতে অফিস যাস, তবু শোন, তোরই ইনটারভিউ।

সিসটার অ্যানি : তোমার নাম নেটি, এর অর্থ কী ?

তুই : নেটি মানে নিও টেরেস্ট্রিয়াল, শর্টে নেটি রেখেছিলেন আমার ফসটার ফাদার । বাংলায় নেতি।

সিসটার অ্যানি : তুমি বড়ো হয়ে কী হতে চাও ?

তুই : আমি অ্যাস্ট্রনট হতে চাই, স্পেস সাইন্টিস্ট হতে চাই । চাঁদের মাটিতে, মঙ্গলগ্রহের মাটিতে হাঁটতে চাই ।

সিসটার অ্যানি : কেন ? তোমার সহপাঠিরা বেশির ভাগই ডাক্তার হতে চাইছে, বা কমার্স পড়ে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট হতে চাইছে, পলিটিশিয়ান, উকিল, বিজনেসউওম্যান হতে চাইছে ।

তুই : জানি । আমার ম্যাথেম্যাটিক্স খুব ভালো লাগে, ফিজিক্স ভালো লাগে; সীমাহীনতার বিস্ময় আমাকে মোটিভেট করে । আমি আইআইটিতে কমপিট করতে চাই ।

সিসটার অ্যানি : তোমার প্রিয় ফিল্ম নায়ক কে ?

তুই : ব্র্যাড পিট ।

সিসটার অ্যানি : কেন ? দেখতে অ্যাট্রাকটিভ বলে ?

তুই : শুধু তাই নয়, উনি আর অ্যানজেলিনা জোলি বেশ কয়েকজন শিশুকে অ্যাডপ্ট করেছেন । একিলিসের ভূমিকায় মানিয়েছিল ওনাকে ।

সিসটার অ্যানি : তুমিও বড়ো হয়ে কোনো শিশুকে অ্যাডপ্ট করার কথা ভাবো কি ?

তুই : হ্যাঁ, আমি বিয়ে করব না । কয়েকটি শিশুকে অ্যাডপ্ট করব ।

সিসটার অ্যানি : যদি কাউকে তুমি ভালোবেসে ফ্যালো ? কিরকম সঙ্গী চাও ?

তুই : আমি চোখ বুজে তাকে দেখতে পাই, কিন্তু বর্ণনা করতে পারব না । আমি আমার ফসটার ফাদারকে আজও দেখিনি, তাঁকে আমি আমার ফাউনডিং ফাদার মনে করি, আমার প্রতিষ্ঠাতা, তাঁর মতো পুরুষ আমার পছন্দ, তাঁকেই পছন্দ ।

সিসটার অ্যানি : তোমার উড বি হাজব্যান্ড কোথায় তোমাকে প্রোপোজ করুক, তুমি চাও ?

তুই : যদি বিয়ে করি, চাঁদের মাটিতে দাঁড়িয়ে প্রোপোজ করলে ভালো । তবে আমি ওই পুরোনো প্যাট্রিয়ার্কাল রিচুয়াল রিভার্স করতে চাই, আমিই প্রপোজ করব, সে গ্রহণ করবে । বিয়ে আমি করব না বলেই মনে হয় ।

সিসটার অ্যানি : ফিল্ম দ্যাখো, মুভিজ ?

তুই : না, ফিল্ম দেখতে আমার তেমন ভালো লাগে না, ওয়েস্টেজ অফ টাইম মনে হয় ।

সিসটার অ্যানি : কোন ধরণের ফিকশান তোমার ভালো লাগে ?

তুই : ফাইভ সিক্সে পড়ার সময়ে হ্যারি পটার সিরিজের  বইগুলো ভালো লাগত ; এখন ট্র্যাশ মনে হয় । এখন আমার সিমপ্লিফায়েড শেক্সপিয়ার ভালো লাগে, বিশেষ করে ট্র্যাজেডিগুলো ।

সিসটার অ্যানি : কমিকবুকের কোন চরিত্র তোমার পছন্দ ?

তুই : অ্যাস্টারিক্স আর ওবেলিক্স । ওতে আমি নিজের একটা চরিত্র কল্পনা করে নিই, নেটিফিক্স, যে নেটওয়র্কিং করে সকলের সমস্যা সমাধান করে, কেননা ওই কমিকবুকে চরিত্ররা কেবল একের পর এক সমস্যা গড়ে তোলে ।

সিসটার অ্যানি : কোন খেলা ভালো লাগে ?

তুই : ফুটবল ।

সিসটার অ্যানি : কোন টিমকে সমর্থন করো ?

তুই : ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ।

সিসটার অ্যানি : কার কবিতা ভালো লাগে ?

তুই : টি এস এলিয়ট, কবিতায় গল্প না থাকলে ভালো লাগে না ।

সিসটার অ্যানি : ওনার কবিতা তো বেশ কঠিন, বুঝতে পারো ?

তুই : বুঝতে বিশেষ পারি না, অনুভব করতে পারি ।

সিসটার অ্যানি : বেঙ্গলি পোয়েট্রি পড়ো না ?

তুই : না, পড়ি না , পড়তে ইচ্ছা করে না। আমার বেঙ্গলি বার্থ পোয়েটিকাল নয়, আই অ্যাম এ ডিসাকার্ডেড বেঙ্গলি । তবে একজন বেঙ্গলি কবির আত্মহত্যার ঘটনা আমায় সন্মোহিত করেছে ।

সিসটার অ্যানি : তোমার প্রতি বছরের ডায়েরিতে একটা লাইন লেখো, “ আই নো, সামওয়ান ওনস মি, বাট ইজ সিক্রেটলি ট্রাইং টু ডিজওন মি।” তুমি কি ঈশ্বরের কথা ভেবে লেখো ? নাকি তুমি কবিতা লিখতে চাইছ?

তুই : হ্যাঁ, উনি আমার ব্যক্তিগত ঈশ্বর, আমার ফাউনডিং ফাদার । ওই লাইনটা লিখে ওনার আরাধনা করি, সম্পর্ক পাতাই । আই লাভ হিম ইন অ্যাবসেনশিয়া ।

##

এর মতো, ওর মতো, তার মতো, কারো মতো নয় ।

যেন এমন, যেন অমন, যেন তেমন নয় ।

##

জগদীশ একবার বলেছিল,  নিজের ছেলেমেয়ের চেয়ে তোকে বেশি ভালোবাসে, ও যা চায়, তুই তেমন করেই গড়ে তুলছিস নিজেকে, কখনও অবাধ্যতা করিস না । প্রায় তোর মতনই ওদের গায়ের রঙ ; জগদীশের রঙ পেয়েছে দুজনেই । হাইট পেয়েছে অমরিন্দরের । ফর্সা হলে তিনজনের মধ্যে কমপ্লেক্স গড়ে উঠত, সে আরেক হ্যাঙ্গাম। কী করে এরকম মানিয়ে নেবার চরিত্র পেলি রে ?

বৈদেহী আর আরিয়ানের খারাপ লাগতে পারে, তুই ওদের বাবা-মায়ের ওপর ভাগ বসাচ্ছিস ভাবতে পারে বলে, জগদীশকে আঙ্কলবাপি আর অমরিন্দরকে আন্টিমা সম্বোধন আবিষ্কার করে ফেললি । সবই অবশ্য শোনা, একবছর বয়সের পর  তো আজও দেখিনি তোকে, আর ওদের ছেলেমেয়েকে ।

জগদীশ জানিয়েছিল, বৈদেহী আর আরিয়ান নাকি চাইত না  যে তুই বাপি আর মা বলে সম্বোধন করিস ওনাদের, বাপি আর মা কেবল ওদের ।

##

তুই জেনে ফেলেছিস যে তোর জন্মের পরেই তোর মা তোকে অনাথ করে দিয়েছিল ; অনাথ শিশুদের হামাগুড়ি থেকে কেউ একজন তোকে পছন্দ করে তুলে দিয়েছিল  ‘এডুকেট এ গার্ল চাইল্ড’ সংস্হার হাতে।

বৈদেহীর সঙ্গে ঝগড়ায় ওর আলটপকা মন্তব্যে সন্দেহ হয়েছিল তোর ; তারপর জগদীশ-অমরিন্দরের কথাবার্তা শুনে ফেলে থাকবি কখনও । ওরা দুজনেই মদ খাবার পর বড্ড বকবক করে, বিছানায় শুয়েও গ্যাঁজায়, ব্রো-প্রোর টাকা এসে পড়ে আছে রেলিভ্যান্ট অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করে দাও, এই ধরণের কথাও বলাবলি করে থাকবে।

আমি তোকে দিতে চেয়েছিলাম কোপাকাবানা সমুদ্র সৈকতের বসন্তকাল, শীতের পশ্চিমবাংলার ফিনফিনে গ্রামীণ রোদ, চিরসবুজ অ্যামাজন অরণ্যের ব্লু-গোল্ড ম্যাকাও পাখিদের রঙিন উড়াল ।

তুই চাইলি আরও ওপরের আকাশে ভেসে বেড়াবার স্বাধীনতা, আরও উঁচু, আরও উঁচু, আরও উঁচু, বাধাবন্ধনহীন  নীল, যেখানে পাখিদের ডানার রঙ কালো বা ধূসর ।

যে আঁস্তাকুড়ে অবহেলায় ভোররাতের শিশিরে ভিজছিলিস তা পশ্চিমবাংলায়; তোর  রোষ চাপিয়ে দিলি পশ্চিমবাংলার ওপর, কলকাতা শহরের ওপর ।

##

জানি, ব্লু-গোল্ড পোশাকে তোকে মানায় । কিন্তু আমার পছন্দ টোম্যাটোরেড লাল রঙের পোশাক ।

কোপাকাবানা সমুদ্র সৈকতের কথা  কেন বলছি বলতো ? তোর গায়ের রঙ শ্যামলা, বৈদেহীর চেয়ে এক পোঁচ বেশি,শুনেছি । ব্রাজিলের রিও ডি জেনেরিওর ওই সমুদ্র সৈকতে পয়লা জানুয়ারি অজস্র মানুষ-মানুষীর ভিড় হয় ; অন্য সময়েও নগ্নিকারা শুয়ে থাকেন বালির ওপর নরম ম্যাট বিছিয়ে । তারা তোর মতোই শ্যামলী, অনেকে কৃষ্ণাঙ্গীও । কেবল শেতাঙ্গিনি আর শেতাঙ্গদের জমায়েত তোকে বিব্রত করত, যেমনটা ইউরোপের সমুদ্র সৈকতগুলোয় হয় । গোয়ার সমুদ্র সৈকতের কথাও বলতে পারতাম, সেখানে রাশিয়ার নগ্নিকারা ভারতীয় চোরাদর্শকদের হাতছানি দ্যায় ।

যখন রিও ডি জেনেরিও আর সাও পাওলো যাবি, দেখিস সেখানকার কার্নিভাল, চোখ জুড়িয়ে যাবে, ইচ্ছা করবে কার্নিভালের নর্তকীদের সঙ্গে নাচতে ।

আমি তো ছিলাম রিও ডি জেনেরিওর ভারতীয় এমব্যাসিতে, ট্রেনি হিসাবে, প্রোবেশানারি  পোস্টিঙের আগে। সেসময়ে পরিচয় হয়েছিল দূতাবাসের অফিশিয়াল ট্রানস্লেটর-ইনটারপ্রেটার কণিকা হালদারের সাথে, হৃদ্যতা বলতে পারিস; দজনেই বুঝতে পারছিলাম একে অন্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ছি, বাঙালি বন্ধুর অভাব মেটাতে, বাংলায় কথা বলার লোভে । আমরা দুজনেই টের পেয়েছিলাম যে প্রেম বিয়ে সংসার করা টাইপের নই, দুজনেই, ক্যারিয়ারের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে শেষকালে, জীবনকে রুদ্ধ করে দেবে, পরস্পর আলোচনা করে আর এগোইনি।

কোপাকাবানা সমুদ্র সৈকতে অন্য যুবক-যুবতীরা চুমু খাচ্ছিল, দেখাদেখি বলতে পারিস, আমরাও খেলাম, কণিকা হালদার বলল, ছিঃ, চুমু জিনিসটা নোংরা, স্মেলি, কি যে হয় চুমু খেয়ে ।

আমারও মনে হয়েছিল, একে তো ভালোবাসি না, কেনই বা একে চুমু খাচ্ছি, এর মুখে ক্যাণ্ডললাইট শুয়োর-ডিনার খাবার দুর্গন্ধ । ব্যাস, আমার জীবনে শেষ তরুণী ।

এখন ভেবে দেখলে, মনে হয়, ভাগ্যিস কণিকা আর আমি জড়িয়ে পড়িনি । পড়লে, তোকে অন্য কেউ স্পনসর করত, আর আমার জীবনের অভিমুখ থাকত না কোনো ।

অভিমুখ সব সময় যে নিজের নির্ণয়ের ওপর নির্ভর করে না, তাও জেনেছি, পরে ।

##

পূর্বপুরুষ না থাকলেও উত্তরাধিকার বর্তায়, পাখিরা ওড়ে তবু কিন্তু হাওয়ায় দাগ পড়ে না ।

মাঘ মাস আসতে না আসতেই পাতারা সবুজ রঙ খরচ করে ফ্যালে । ধুলো, ধুলো, ধুলো ।

মুখমেহনের স্বাদ, উল্লাসধ্বনি, স্ফীতির কনকনে চড়াই-উৎরাই, কেবল ঘণ্টাখানেকের উগ্রতা ।

তোর মতো তোর মতো তোর মতো অনুচক্রিকা, ভাবতে পারিনি আমিই ঘুটি, আমিই জুয়া ।

##

জগদীশ আর ওর বউ একবার দুজনে এসেছিল লাক্ষাদ্বীপে, কাভারাত্তিতে, আমার কাছে, তোরা দুজনে নৈনিতালে আর আরিয়ান আজমেরের হোস্টেলে । বৈদেহী ক্লাস টুয়েলভে, পরীক্ষায় টেন্সড আপ ।

অমরিন্দর কয়েক পেগ টানার পর রোজই সন্ধ্যায় বলত, প্রধান ইউ হ্যাভ স্পয়েল্ড ইওর লাইফ, জীবন নষ্ট করে ফেললে, এখনও চান্স আছে, লাইফ পার্টনার যোগাড় করে নাও, নয়তো চুল পেকে গেলে ভিষণ লোনলি ফিল করবে ।

বিয়ে করার জন্য আমাকে চাপ দেবার পেছনে যে অন্য উদ্দেশ্য আছে, তা তখন বুঝতে পারিনি ।

লোনলি ? একা ? নিঃসঙ্গ ? নাঃ, মনে হয়নি কখনও যে আমি একা । এইজন্য নয় যে তুই আছিস আমার জীবনে, আমি তোর পালক পিতা, তোর কথায় ফাউনডিং ফাদার, আসলে আমার চরিত্রে একাকীত্বের বিষ নেই রে, একেবারেই নেই । ফাইল খুললেই মানুষের ভিড় দেখতে পাই, তারা আমার দিকে ফ্যালফ্যাল চেয়ে থাকে ।

##

পালক পিতা বলতে পারব কি নিজেকে, ধাত্রীবাবা  ?

একরাতের ঘটনা বলি তোকে ; তখন আমি পুডুচেরিতে । তোর বারো ক্লাসের আইডেনটিটি কার্ডের ফোটো দেখে অব্দি পরাভূত টান অনুভব করেছি । কার্ডটা পাবার পর কতবার যে দেখেছি ফোটোটা। আর তার ফলে কী হল জানিস ? স্বপ্ন দেখলুম তোকে, স্বপ্নে পেলুম তোকে,  ভরাট শরীর, আর আমার, বহুদিন পর, এই বয়সে, ভেবে দ্যাখ, এই বয়সে আমার নাইটফল হল ।

উড়তে লাগলাম, ঝড়ের চক্রব্যুহে থেকে অতিঝড়ের চক্রব্যুহে, বাজপাখি হয়ে, ঈগল হয়ে, নখের রক্ত চাটছি, নিচে চোখ মেলে দেখছি উপত্যকায় তুই দৌড়োচ্ছিস দু-হাত দুই দিকে মেলে, পোশাক পরিসনি, নামছি, নামছি, নামছি, ব্যাস, ছোঁ মেরে তুলে নিলাম তোকে ; কিন্তু তুই-ই আমাকে খেতে লাগলি, বললি, বদলা, বদলা, প্রতিশোধ, কারাগারে আটক রাখার প্রতিশোধ ।

তোর কনকনে দেহ, বললি, আগুনের ফোয়ারা দিন, বরফকে গলিয়ে ফেলুন, গলিয়ে ফেলুন, দ্রুত নয়, দ্রুত নয়, এক ঘণ্টা মানে ষাট মিনিট, প্রচুর সময় রয়েছে, অন্ধকারকে রোমশ হতে দিন, হাতের আঙুলের ডগায় দৃষ্টি নিয়ে যান, প্রচুর সময় আছে, সময়ই সময় ।

##

ঘরের ভেতরে ঢুকে ঝোড়ো ঝড় যদি নিজের হাতে চুপিচুপি দরোজা বন্ধ করে দ্যায়, অন্ধকার পোড়োবাড়িতে আটক প্রতিধ্বনির ঢঙে, যেন গর্তের হৃদয়ে ইঁদুরের ধান জমা করার রাত ।

##

বলা যাবে কি জীবন নষ্ট ?

স্বপ্নে তুই যবে থেকে আসা আরম্ভ করেছিস, তোর আইডেনটিটি কার্ডের ফোটোগুলো আর দেখি না । তোকে স্বপ্ন থেকে চলে যেতেও বলেছি একদিন স্বপ্নের ভেতরেই, তুই-ই আষ্টেপৃষ্টে  শরীরের ফেরোমোন দিয়ে জড়িয়ে ধরলি, আমি ছাড়াতে পারলাম না, সারা স্বপ্ন ছেয়ে গিয়েছিল তোর উড়ালক্লান্ত সুগন্ধে।

আসলে নষ্টামির স্বপ্ন দেখি ; ভালো লাগতে আরম্ভ করেছে রে,  স্বপ্ন, উঞ্ছমজুরিতে-পাওয়া সম্রাজ্ঞীর প্রেরণার অপ্রত্যাশিত আক্রমণে কাহিল । এছাড়া অন্য উপায় আমার জানা নাই, আয়ত্বে নেই ।

আহ, কি আরাম, কি আরাম, কি আরাম ।

##

জীবন নষ্ট কাকে বলে ? জগদীশের ছোটোবোন চিন্ময়ীর বর অর্নব চ্যাটার্জি প্যাংক্রিয়াটিক ক্যানসারে মারা গেল, যেদিন চিন্ময়ীর শাশুড়ির শ্রাদ্ধের ভোজ, সেই দিনকেই । রান্নাবান্নাও আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল শাশুড়ির শ্রাদ্ধের ভোজের জন্য । অতিথিরাও বাইরে থেকে এসে পড়েছিল অনেকে । আমিও গিয়েছিলাম জগদীশের সঙ্গে । শ্মশান থেকে যখন আমরা ফিরে এলাম, চিন্ময়ী কান্না থামিয়ে বলেছিল, কী পেলুম সারা জীবন ? আইবুড়ো নাম ঘোচাবার জন্যে একটা বর, আর বাঁজা নাম ঘোচাবার জন্যে দুটো বাচ্চা, সারাজীবন তো ও নিচের তলায় মায়ের সেবা করায় ম্যা ম্যা ম্যা ম্যা করে কাটিয়ে পাড়ি মারল ; এত বড় বাড়িটার কী হবে এখন, বাগানের, গাছগুলোর, গাছের ফলের, ফুলের ? ছেলে আর মেয়ে বিদেশেই থাকবে । আমি দোতলায় শুচ্ছি দ্বিতীয় বাচ্চাটা হবার পর থেকে । আমি যে পৃথিবীতে আছি তা ওর খেয়াল ছিল না কখনও । বিধবা শাশুড়ির জন্যে চারবেলা টাটকা নিরামিষ রেঁধে কেটে গেল; তিনি চলে গেলেন, ছেলেকেও সঙ্গে নিয়ে গেলেন, সগগে গিয়ে স্যাবা নেবার জন্য ।

কী বলবি তুই ?

##

আমি তো উচ্চিংড়ের স্বরলিপিতে গাওয়া ফুসফাসুরে গান ; বেড়াজালের হাজার যোনি মেলে ধরে রেখেছি ইলশে ঝাঁকের বর্ণালী । তাকিয়ে-তাকিয়ে যে যুবতীর কৌমার্য নষ্ট করেছি, তারই অদৃশ্য হাতের মাংসল আলিঙ্গনে চোখে পড়েছে কাঁকড়ার আলোতরল বুকে আমার ছককাটা ঠিকুজি, শনি বক্রি, কালসর্পযোগ, কপালের বলিরেখায় গৃহত্যাগী বিষপিঁপড়ের সার । সে যুবতী স্বপ্ন ছেড়ে যেতে চায় না ।

##

জগদীশ ব্যানার্জিকে বলেছিলাম তোর নামটা স্কুলেই সংশোধন করে এফিডেভিট আর গেজেট নোটিফিকাশান দিয়ে নেতি থেকে ইতি করিয়ে নিতে । জগদীশের স্ত্রী অমি,  রাজি হয়নি, বেশ হ্যাঙ্গাম বলে নয়, স্পনসর যে করেছে তাকেই করতে হতো, আর আমি চাইছিলাম না যে তুই কখনও আমার উপস্হিতি তোর জীবনে টের পাস । আমার সাহায্যের ভারে ঝুঁকে পড়িস ।

জগদীশের মেয়ে আর ছেলেও মত দিয়েছিল, নেতি নতুন ধরণের নাম, বদলাবার কোনোই প্রয়োজন নেই।

তেইশ বছর বয়সে নিজেকে পালক পিতা, ফসটার ফাদার, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে, বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছি, জাস্ট ইডিয়টিক, ভাবতেই পারিনি আমি একজন মুকুটপরা বাবা, তোর কুড়িয়ে পাওয়া বাবা । ফসটার মাদারদের বলে ধাই-মা ; আমি তার মানে তোর ধাই-বাবা ।

আমার মা যখন হাসপাতালের বিছানায়, তখন তাঁকে বলেছিলাম যে আমি বিয়ে এইজন্যই করিনি, কেননা আমি একটি শিশুর পালক পিতা । সংবাদপত্রের কাটিংটা দেখিয়েছিলাম মাকে, একজন নার্সের কোলে তুই, সদ্য আঁস্তাকুড় থেকে থানা হয়ে হাসপাতালে পৌঁছেছিস ।

নিয়ে আয় না, যাবার আগে চাক্ষুষ করে যাই, মার নাক থেকে কেরালিয় নার্স ভেন্টিলেটার সরিয়ে দিতে, বলেছিলেন ।

আমি ওকে জানতে দিতে চাই না মা, যে আমি ওর জীবনে ঈগলপাখির মতন ডানা মেলে আছি; জগদীশ আর ওর বউ অভিভাবকের দায়িত্ব নিয়েছে ।

##

সত্তা, মুহূর্ত, ভাষা, বীর্য, স্পন্দন, উৎসমুখ, কচুর জঙ্গলে ফড়িং, কলার মান্দাস, কাপড়ের খুঁট ।

বরফঝুরির গ্রন্হি শুভ্রবিষ অনন্ত শিকড়ে । কাদায় কলকা এঁকে রেখে গেছে কীট ।

কাঠঠোকরার বাসার ফুটোয় সাইক্লোনের মতন ফুঁ দিয়ে বাজানো বাঁশির সুর । বাজাও হে বাজাও

বুদবুদেরা জাতিস্মর হয়, তা এক মাদারির ইন্দ্রজাল ।

##

এর মতো, ওর মতো, তার মতো, কারো মতো নয় ।

যেন এমন, যেন অমন, যেন তেমন নয় ।

##

ব্যানার্জি পরিবারকে তোর স্হানীয় অভিভাবক করতেও চাপ দিতে হয়েছিল । ওরা প্রথমে রাজি হয়নি । অযথা ঢুকতে চাইছিল না আমার আর তোর জীবনের আগাম জটিলতায় । ব্যানার্জি যখন হরিয়ানায় হিসারের এসডিও ছিল তখন আমিই ওকে বাঁচিয়েছিলা জাঠদের গোঁসা থেকে ।

ব্যানার্জি কীই বা করত ! মারোয়াড়ি আর গুজরাতিদের ছেড়ে দেয়া ধর্মের ষাঁড়গুলো হেলতে দুলতে হরিয়ানায় পৌঁছে মাদি মোষদের সঙ্গে সঙ্গম করছিল আর মোষগুলোর কিছুদিনেই গর্ভপাত হচ্ছিল, শরীর খারাপ হচ্ছিল, দুধের ঋতু হাতছাড়া হচ্ছিল । ষেঁড়োমোষগুলোকে ওরা বেঁধে রাখে, প্রজননের ঋতুতে মাদিমোষদের চাষিরা নিয়ে যায় ষেঁড়োমোষদের মালিকের গোয়ালে ; মালিকদেরও রোজগার হয় ।

জাঠ পঞ্চায়েতের কর্তা জগদীশকে টিটকিরি মেরে বলেছিল, বাঙালি ষাঁড় চাপছে হরিয়ানার মাদিমোষের ওপর, সে আর কি করে বুঝবে যে গোরু আর মোষ একই প্রজাতির প্রাণী নয় ।

ষাঁড়গুলো গরু খুঁজে পায় না হরিয়ানার পথে আর খেতে । তারা তাড়নায় এলে সামনে মাদিমোষ পেয়ে তাদের ওপরই চাপে ।

আমি হিসারের জাঠসভার কর্তাদের সঙ্গে কথা বলে, গ্রামীণ উন্নয়ন বিভাগের বাজেট থেকে  লোকসানের টাকার সরকারি ব্যবস্হা করে মন্ত্রীর রোষ থেকে বাঁচিয়েছিলুম ব্যানার্জিকে । তখন আমি ওই বিভাগে ।

##

পৌরুষের গরিমা, মৌমাছিদের প্রত্যাখ্যাত ফুলের মধু ।

অন্ধকারে স্পর্শের মর্মার্থের সাথে আলোয় স্পর্শের মর্মার্থের প্রভেদ, সব দেশের সন্ধ্যায় শঙ্খ বাজে না।

##

পশ্চিমবঙ্গের ক্যাডারের জগদীশ হারিয়ানাতে পোস্টিং নিয়েছিল  । না, অমরিন্দরকে হাসিখুশি রাখার জন্য নয় ; নয়তো সরকারি আধিকারিকদের তো শাসকদলের হ্যাঁ-তে হ্যাঁ আর না-তে না মেলানো ছাড়া কোনো কাজ নেই, পুঁজিবাদ হোক, সাম্যবাদ হোক, গান্ধিবাদ হোক, খিচুড়িবাদ হোক, হিন্দুবাদ হোক, মুসলমানবাদ হোক, গণতন্ত্র হোক, আমিরতন্ত্র হোক, একনায়কতন্ত্র হোক, দেশে-দেশে তা-ই তো ঘটে চলেছে ।

না, না, বউয়ের জন্য নয়, হরিয়াণায় উপরি রোজগার করাকে সমাজ স্বাভাবিক  মনে করে, তাই। পশ্চিমবাংলায় ঘুষও খায় আবার সৎসন্ন্যাসী সেজে থাকে, প্যাঁচ-পয়জার মারতে হয়, বুঝিয়েছিল জগদীশ, অমরিন্দরের সামনেই,  ওদের অ্যানিভার্সারির ককটেল পার্টিতে, হোটেলের ব্যাঙ্কোয়েট হলে, চণ্ডীগড়ে । পশ্চিমবাংলায় ঘুষের গুড় খেয়ে ফ্যালে নেতারা । ব্যুরোক্র্যাটদের তোল্লাই দেয় না । হরিয়াণায় খাও আওর খিলাও, পেয়ারে, মজাদার চানা জোরগরম ।

পশ্চিমবাংলাকে জগদীশ বলে ওয়েএএএএস্ট বেঙ্গল, বামপন্হীরা সুযোগ ওয়েএএএস্ট করেছে, তারপর যারা এলো তারা ওয়েএএএস্টকে সুযোগ দিয়েছে, যারা জঙ্গলে লুকিয়ে বিপ্লব করছে তারা নিজেদের জীবন ওয়েএএএস্ট করছে । কোথায় খাবে, খাওয়াবে, তা নয়, কেবল বাকতাল্লা । জগদীশের ওয়েস্টলাইন পাছার দ্বিগুণ হতে চলল ।

প্রেগনেন্ট বলে অমরিন্দর তিন পেগ মাত্র সিঙ্গল মল্ট  খেয়েছিল, ঘুষের । জাঠনি, মাতাল হয় না, মাতন লাগে ।

আমি বাড়ির বাইরে ড্রিংক করতে পারি না, যুৎসই মনে হয় না, নিজেকে অগোছালো না করে, লুঙ্গি পরে, ঠ্যাঙ ছড়িয়ে, একা-একা, চুপচাপ, বসে  ড্রিংক করি ।

##

জগদীশ আর অমরিন্দর প্রথমে গররাজি থাকলেও, নেতি, তোকে ওনারা  ডানার আড়ালে নিয়েছিলেন, তা তুই স্বীকার করিস কিনা জানি না ।

আমি ব্যানার্জির বলে-দেয়া অ্যাকাউন্টে প্রতিবছরের শুরুতে টাকা জমে করে দিয়েছি, আজও করি। ওরা যে অ্যামাউন্ট বলে, জমা করে দিই । বারবার নতুন অ্যাকাউন্ট খোলে, বড্ড মনে রাখার ঝামেলা । তুই অ্যাডাল্ট হলে তোর নামে খুলবে হয়ত, কিন্তু তখন তো তুই স্বাবলম্বী । আমাকে কি বিদায় করে দিবি স্বাবলম্বী হলে ?

এনজিওকে সাহায্যের রিবেট পায় আয়করে, তাই ব্যানার্জিও মেনে নিয়েছিল বন্দোবস্তটা ।

ব্যানার্জিকে স্হানীয় অভিভাবকই শুধু নয়, ওদের পদবীটা্ও আমি তোর নামে জুড়ে দিতে চেয়েছিলাম । আমি তো ব্রাহ্মণ নই, জানি অব্রাহ্মণদের নিয়ে কেমন ঠেলাঠেলি চলে বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজে ।

আমার পদবি তো প্রধান, প্রভঞ্জন প্রধান । গুজরাতি, কর্নাটকি, মারাঠিদের মধ্যেও প্রধান পদবি আছে ।

আমি তোকে বাঙালি করে তুলতে চেয়েছি ; তাতেও তোর চাপা অস্বস্তির কথা অমরিন্দর জানিয়েছিলেন একবার । তখনও পর্যন্ত তুই জানতিস না যে তোকে কলকাতা শহরের এক আঁস্তাকুড়ে ফেলে চলে গিয়েছিল তোর মা । যখন জানলি তখন তোর গোঁসা গিয়ে পড়ল পশ্চিমবাংলার ওপর ।

বৈদেহী আর আরিয়ানের চরিত্রে, শুনেছি, বাঙালি হয়ে ওঠার  গোঁ, সব দ্রুত সেরে ফেলতে হবে, শিখে ফেলতে হবে, ক্লাস ফাইভ থেকে, গান, নাচ, বইপড়া, শাড়ি, নলেন গুড়, ছানার মুড়কি, পলাশ ফুল, মাছরাঙা, শুঁটকি মাছ, রাধাবল্লভি, পান্তুয়া-লুচি, ভাপা ইলিশ, সরস্বতী পুজো, বলেছিল অমরিন্দর ।

পদবি ব্যাপারটা কত  গুরুত্বপূর্ণ তা তোকে স্পনসর করতে গিয়ে টের পেয়েছিলাম ।

আঁস্তাকুড় তো পদবি দিতে পারে না, নাম দিতে পারে না, জন্মদিনও দিতে পারে না ।

##

ব্যানার্জি, বন্দ্যোপাধ্যায়, চ্যাটার্জি, চট্টোপাধ্যায়, মুখার্জি, মুখোপাধ্যায়, গাঙ্গুলি, গঙ্গোপাধ্যায় ।

কারা তুলে নিয়ে যাবে পথপার্শে পড়ে থাকা কয়েকদিনের বাসি লাশ ?

মৃতদেহে পোকা ? মৃতের দেহ থেকে তাহলে প্রাণও জন্মায়, অবাক অবাক হও ।

শ্মশানে কাদের হাতে নিজেকে তুলে দিয়ে চলে যেতে চাও !

শকুন, পদবি বলো, কাদের মাংসপিণ্ড অসীম আকাশে গিয়ে খাও ।

##

তুই বেশ পরে সুস্পষ্টভাবে জানতে পেরেছিলি,  যে তোকে ডাস্টবিনে কুড়িয়ে পেয়েছিল কলকাতার যাদবপুর থানার পুলিশ, ভোররাত থেকে যারা বাঁশদ্রোণী বাজারের সামনে বাঁধাকপির সবুজ পাহাড় গড়ে তোলে, একের পর এক দূরপাল্লার ট্রাক থেকে, তখনই ওরা তোর কান্না শুনতে পেয়েছিল ।

এত জায়গা থাকতে ডাস্টবিনেই কেন ? তুই বার বার নিজেকে আর তোর  অভিভাবকদের প্রশ্ন করেছিস, শুনেছি । তারাই বা এর উত্তর কী করে দেবে । হয়ত তোর মা চেয়েছিলেন যে তুই বেঁচে থাক, বাজারের সামনে ভোর রাত থেকেই সবজির ট্রাক আসে একের পর এক ।

তোর মায়ের হয়তো আশা ছিল যে ট্রাকচালদের কেউ যদি সন্তানহীন হয়, সে তোকে কোলে তুলে নেবে । নেয়নি রে, নেয়নি । ওরা কাছের ক্লাবের ছেলেদের খবর দিলে, তারা থানায়, আর থানা তুলে নিয়ে গিয়ে সরকারি হাসপাতালে, নয়তো তুই সত্যিই মরে যেতিস ।

হাসপাতাল থেকে সমাজসেবীদের চ্যানেল হয়ে এডুকেট এ গার্ল চাইল্ড এনজিওতে পৌঁছোলি ; আরও বহু পরিত্যক্ত শিশুদের একজন  ।

সংবাদপত্রে তোর ওই সময়ের যে ফোটো বেরিয়েছিল, তা আমার সংগ্রহে আছে ; হলুদ হয়ে গেছে, ভাঁজে-ভাঁজে ছিঁড়ে গেছে, কতোবার যে দেখেছি । তোর এখনকার মুখের সঙ্গে একেবারে মেলে না, ভাগ্যিস মেলে না ।

তোর চোখমুখ, এডুকেট এ গার্ল চাইল্ড দপতরে, ওই বয়সেই এমন আকর্ষক মনে হয়েছিল যে চব্বিশটা শিশুর মধ্যে থেকে তোকেই স্পনসর করার জন্য বেছে নিয়েছিলাম আমি ।

##

বাঁশদ্রোণী বাজার যে  কোথায় স্পষ্ট করে বলতে পারেনি পরিচিত বাঙালি অফিসাররা, দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা যেতে পড়ে, বলেছিল কেউ । কলকাতায় গিয়ে, জিপিএস নিয়ে, পৌঁছেছিলাম । আঁস্তাকুড় বা ডাস্টবিন বলা উচিত হবে না; জায়গাটা আসলে ভ্যাট, সারাদিনের বাতিল পচাগলা শাক-সবজি আর মাছের আঁশ-পোঁটা ওখানে ফেলা হয়, হয়তো সবজির নরম সবুজ পাতার ওপরে শুয়েছিলি, হেমন্তের রাতে ।

বাজারের ভেতরে গিয়ে দীর্ঘদেহী কোনো বিক্রেতাকে দেখিনি, সবজিঅলারা অধিকাংশই মুসলমান,  চাষি পরিবারের ।

অন্য কোনো এলাকা থেকে তোকে এনে ওখানে ফেলে গিয়ে থাকবে তোর মা কিংবা বাবা, যাতে সহজে তাদের  খুঁজে পাওয়া না যায় ।

আঁস্তাকুড়ের প্রসঙ্গ উঠলেই তুই বিব্রত হতিস, তোর মনে হতো সারা গায়ে নোংরা, কখনও উৎসাহ প্রকাশ করিসনি জায়গাটা দেখে আসার, শুনেছি । বরং বিরক্ত হতিস প্রসঙ্গটা উঠলে ।

জগদীশ বলেছিল আমাকে, ক্লাস সেভেন থেকে পড়াশুনার শেষ ধাপ পর্যন্ত তুই প্রতিবছরের ডায়রিতে একটা বাক্য অবশ্যই লিখেছিস, “আই নো সামবডি ওনস মি, বাট হি ইজ সিক্রেটলি ট্রাইং টু ডিজওন মি ।” তোর সেই সব ডায়রির ওই পাতাটা ছিঁড়ে আমাকে দিয়েছে অমরিন্দর ।

শেষে, বাঁশদ্রোণী বাজার তুই গেলি দেখতে, আমাকে সঙ্গে নিয়ে ।  যৌবনের শীর্ষে তখন তুই, আঁস্তাকুড়ের কথা শুনলেই যার সারা গায়ে র‌্যাশ বেরোতো ? শুনেছি,  অমরিন্দরের মুখে ।

 

 

দুই

ইলেকট্রিক ? এরকম নাম হয় নাকি !

তাই তো বললেন ।

অনুমান করিনি তুই কখনও আমার শান্তি ইনভেড করবি, এইভাবে, হাতে লাল সুটকেস, কাঁধে হলুদ ব্যাগ, ফেডেড জিন্স, লাল ঢিলেঢালা টপ কিংবা জার্সি, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের জার্সি মনে হল, তার ওপর শাদা ব্লেজার, পায়ে সাতরঙা ফ্ল্যাপার, ডান হাতে গোটা পাঁচেক স্লোগানচুড়ি, কানে চুড়ির মাপের লাল রঙের মাকড়ি, হাতের আর পায়ের নখে ব্রাউন-লাল নখপালিশ, হাতের নখ ততো বড়ো নয়, পোশাক অত্যন্ত দামি, আঁচ করতে পেরেছিলাম, ঘাড় পর্যন্ত কোঁকড়া চুল । অথই আলগা চটক, অথই ।

দেখছি দেখছি দেখছি দেখছি দেখছি দেখছি ; সন্মোহনকে অনুবাদ করা নির্বাক দৃষ্টি; আজ দশটা বেজে তিন মিনিটে সময় কিছুক্ষণের জন্য স্হির, অবিচল, পৃথিবী শুরু হল, রাতে  ঘুমিয়েছিলাম কিনা মনে করতে পারছি না, ধুনুরিরা কি আমাকে পিটিয়ে মেঘ করে উড়িয়ে দিয়েছে !

তুই ছাড়া আর কে-ই বা এভাবে শান্তিভঙ্গ করতে চলে আসবে নিজের বাক্সপ্যাঁটরা নিয়ে ?

দুই হাতে মেহেন্দির নকশা !

মেহেন্দি ? কেন ? প্রশ্নের উদ্বেগে আক্রান্ত হল মস্তিষ্ক ; মরুভূমির বালিতে মাকড়সাপায়ে আঁকা মানচিত্র ।

তুই তো চাকরি নিয়ে আমেরিকায় চলে গিয়েছিলি, নিঃশব্দে নিজেকে বললাম, নিশ্চিন্ত হয়েছিলাম শুনে, যাক, সেটল হলি, আমার মিশন সাকসেসফুল, ভাবছিলাম, ভাবছিলাম, ভাবছিলাম, তোকে দেখতে দেখতে, তোকে দেখে যে চিনতে পারিনি তা বলব না, চিনতে পারার আক্রমণে বিপর্যস্ত, সেই ক্লাস টুয়েলভের পর তোর ফোটো দেখার সুযোগ হয়নি । কিন্তু ঝলকানি, ঝলকানি, ঝলকানি ।

কেবল স্বপ্নে যেটুকু আবছা ঢেউ ।

আমার সমান ঢ্যাঙা হয়ে উঠেছিস ।

আমি স্তব্ধ হতবাক থ দেখে তুই বলে উঠলি, ঠিকই বলেছে তোমার পিওন না অর্ডারলি, হোয়াটএভার, আমি এলেকট্রা, মহাকাব্যের নায়িকা, কবিকল্পনার মেয়ে ।

মগজের ভেতরে বিস্ফোরণ ঘটল, এলেকট্রা, কবিকল্পনার নায়িকা, অপার্থিব, রহস্যময় ?

একটা শব্দের ভেতরে কতটা বারুদ যে লুকিয়ে থাকতে পারে তা আমিই জানি । নিজেকে বললাম, হ্যাঁ, স্বপ্নের ভেতরে তোকে, যার পালক পিতা আমি, যাকে তুই বলেছিস ফাউনডিং ফাদার, পেয়েছি, এলকট্রার মতনই নিষিদ্ধ সম্পর্ক পাতিয়েছি ।

সেই সম্পর্কের প্রতিষ্ঠা দিতে এলি নাকি, মুখ দিয়ে কথা বেরোলো না, গলা শুকিয়ে গেছে ।

##

আমার চাঞ্চল্য গোপন করতে গিয়ে প্রবল আবেগে আপ্লুত হলাম, টের পাচ্ছিলাম যে প্রতিক্রয়ার বিস্ফোরণ ঘটছে নিঃশব্দে, তোকে ঘিরে তেজোময়তার দুর্নিবার জ্যোতি, তুই এই মুহূর্তে যদি না আসতিস তাহলে আমি পচনে ধ্বসে পড়তাম – এরকম মনে হল, বাসনার , চকিত দ্যুতি দিয়ে আমাকে নতুন দৃষ্টি দিলি তুই, এতদিন পর্যন্ত আমি বন্দি ছিলাম ফালতু জাগতিক জীবনে, তুই মুক্ত করে ছড়িয়ে দিলি মঙ্গলময় লিবিডোর গোপন রঙ্গ । উচ্ছ্বাস ।

##

এর মতো, ওর মতো, তার মতো, কারো মতো নয় ।

যেন এমন, যেন অমন, যেন তেমন নয় ।

##

ইতি, তুমি, আমার মুখ দিয়ে এইটুকই বিস্ময় ক্ষরিত হয়েছিল, সন্তর্পনে, নিয়ন্ত্রিত শ্বাসে ।

কান থেকে ইয়ার-প্লাগ বের করে বললি, ইতি, এখন ইতি, নেতি নাম রেখেছিলে তো ! নেটি, বাঃ, কি একখানা নাম রেখেছিলে ! আশ্চর্য লাগছে না? কী করে তোমায় খুঁজে বের করলুম ? এনিওয়ে, আজ তো রবিবার, তোমার কর্মীদের দিয়ে আজও খাটাচ্ছো? ওদের তো পরিবার পরিজন আছে । টেল দেম টু গো হোম ।

বোধহয় বাবলগাম খাচ্ছিস, কথাগুলো চিবিয়ে বললি, চিবিয়ে বলা সংলাপে থাকে বেপরোয়াভাব, জানি । ইয়ার-প্লাগ  জিন্সের সামনের পকেটে ঢুকিয়ে রাখতে-রাখতে বললি, তোমাদের ঈশ্বরগুলো সব কালা হয়ে গেছে, কেউ তাকে ছাদে দাঁড়িয়ে লাউডস্পিকারে ডাকছে, কেউ আবার দল বেঁধে জগঝম্প বাজিয়ে ডাকছে, ডিসগাস্টিং টোটালিটেরিয়ানিজম । ঈশ্বরগুলোও আমার মতো সকাল থেকে বিরক্ত হয়ে গিয়ে থাকবে জগঝম্পের ঝালাপালায় ।

অ্যাটিট্যুড, অ্যাটিট্যুড, আই অ্যাম কুল, আই অ্যাম গার্লি, আই অ্যাম ফেমিনিন, অ্যাটিট্যুড । তোর দিকে, চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত এক পলক তাকিয়ে, নিজেকে নিঃশব্দে বললাম আমি।

আমার উত্তরের অপেক্ষা না করে, স্লোগানচুড়ির ঝিনঝিন বাজিয়ে, নিজেই হুকুম দিলি, আপ লোগ ঘর যাইয়ে, আজ কিঁউ কাম কর রহেঁ হ্যাঁয়? ছুট্টি হ্যায় না আজ ।

সেকশান অফিসার পেনডিং ফাইলগুলো দিতে, আর রাতে যেগুলো ক্লিয়ার করে দিয়েছি সেগুলো নিতে এসেছিল । পিওন রবিন্দর সিং ওর সঙ্গে  । ওরা আমার দিকে তাকিয়ে নির্দেশের অপেক্ষা করছে দেখে তুই বললি, হাঁ, হাঁ, যাইয়ে, ঘর যাইয়ে, ম্যাঁয় ইনকি রিশতেদার হুঁ, বিদেশ সে আয়া হুঁ বহুত দিনোঁ বাদ ।

আমি তো জাস্ট বোবা, মাথা নাড়িয়ে, ঠোঁটে জিভ বুলিয়ে, বললুম, করিম সাহব, যাইয়ে, ফাইলোঁ কো লে যাইয়ে, কল অফিস যাকর হি দেখুংগা ।

হুকুম করার কন্ঠস্বরে তুই বললি, চাপরাশি কুক আর কে কে আছে, সবাইকে যেতে বলো, আমি রাঁধতে পারি, ইনডিয়ান, ওয়েস্টার্ন, চাইনিজ, থাই, মেক্সিকান, টার্কিশ, যা খেতে চাও । টেল অল অফ দেম টু গো ; আমি চাই না যে তোমার কোনো কর্মচারী আজ বাড়িতে থাকে।

চাপরাশি নানকু প্রসাদ তোর সুটকেসটা তুলে আমাকে জিগ্যেস করল, গেস্ট রুমমেঁ রখ দুঁ ?

তুই তাকে বললি, আপকো কুছ করনে কি জরুরত নহিঁ হ্যায়, আপ ভি ঘর যাইয়ে, রসোই বনানেওয়ালে অওর মালি কো ভি বোলিয়ে আজ সবকি ছুট্টি ।

তোর হুকুমে সন্মতি দিলাম, চলে গেল ওরা ।

##

ফেনিল কথার ঢেউ, আলোকোজ্জ্বল চাউনি, উসকে-দেয়া রক্তসঞ্চালন ।

চৌম্বকীয় আঠা, আকস্মিকতার টান, অমেয় চিরন্তন ।

##

ইলেকট্রিসিটি নয়, আমি এলেকট্রা । জানো তো এপিকের নায়িকা এলেকট্রা ? গ্রিক মহাকাব্যের এলেকট্রা ? এলেকট্রা কমপ্লেক্সের এলেকট্রা । আমি সেই এলেকট্রা কমপ্লেক্সের এলেকট্রা, মহাকবির কল্পনা দিয়ে গড়া । তুমি তো ইংরেজি সাহিত্যে ফার্স্টক্লাস পেয়েছিলে !

আমি চুপ করে আছি, দেখছি তোকে, অবাক, কুয়াশা, অঝোর বৃষ্টি, বাতাসে শিউলিফুলের গন্ধ বলে চলেছে উৎকীর্ণ করো, শিহরিত করো, উষ্ণ করো ।

ভাবছি, তুই কি করে এলেকট্রার গল্প জানলি, তুই তো ম্যাথামেটিক্স, ফিজিক্স আর কেমিস্ট্রির বইপোকা ছিলিস, ইলেকট্রনিক্স পড়েছিস । আমি যেসব বইপত্র তোর নামে জগদীশের বাড়ি পাঠিয়েছিলাম, তাতে কি এলেকট্রা প্রসঙ্গ ছিল, মনে পড়ছে না, উঁহু, মনে পড়ছে না  । থেকে থাকবে, বইগুলো বাছাই করত পড়ুয়া জুনিয়ার অফিসাররা, আমি পেমেন্ট করে দিতাম ।

##

ভাবছ কী করে তোমাকে লোকেট করলুম, তাই না ? না, বাপি, আই মিন আঙ্কলবাপি, বা আন্টিমা বলেননি, ওনাদের কাছে জানতে চাইনি কখনও ; জানতে চাইলে ওনারা তোমাকে নোটিফাই করে দিতেন, আর তুমি তোমার পায়ের ছাপ মুছে ফেলার চেষ্টা করতে ।

হাত ঝাঁকিয়ে স্লোগানচুড়ি বাজিয়ে বললি, তোমাকে লোকেট করা ছিল বেশ সিম্পল । প্রায়ভেট ডিটেকটিভ এজেন্সিকে বলেছিলুম, আঙ্কলবাপির অ্যাকাউন্টের ফিনানশিয়াল ট্রেইল ফলো করতে, কোথা থেকে টাকা আসত ওনার অ্যাকাউন্টে আর যেত আমার স্কুলে,  এডুকেট এ গার্ল চাইল্ড সংস্হায়, যাদের আজও সাহায্য করে চলেছ । আর যিনি ফানডিং করতেন তাঁর নাম কি, এখন কোথায় থাকেন । বাপির, আই মিন আঙ্কলবাপির, বড্ড বদভ্যাস ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট অহরহ বন্ধ করা আর খোলা । প্রতিটি অ্যাকাউন্ট নম্বর জানি ।

গত রবিবার তোমার লোকেশান জানতে পেরেছি, সঙ্গে সঙ্গে ফ্লাইট নিয়ে চলে এসেছি ।

তারপর তুই যা বললি, তা আরও আক্রমণাত্মক, বললি, তোমার বেডরুমটা কোথায়, জিনিসগুলো রাখি ।

বললুম, ওদিকে নয়, ওই রুমটা জিম, এক্সারসাইজ করি ।

ওউ-ওউ-ওউ-ওউ, জিম, রিয়ালি ? তাই এমন পেটা মাসকুলার বডি রেখেছ, ব্রোঞ্জপুরুষ, হি-ম্যান । ভালো, ট্রেডমিলও রেখেছ দেখছি, কাজে দেবে । ঘুষের টাকায় নয়তো ?

জিমঘরটা আমার আগে যিনি এই বাংলোয় ছিলেন, তাঁর ।

জানি, তুমি ঘুষ নাও না, তবু জিগ্যেস করতে ভালো লাগল । তুমি তো জ্ঞানবৃক্ষ, বোধিবৃক্ষ, তাই না ? ফাঁসিবৃক্ষ বলা যাবে কি ? ঘুষ নিতে ভয় পাও ? না এথিকসে বাধে ? ঘুষ ছাড়া দিল্লি শহরে সৎ থাকা শুনেছি অলমোস্ট ইমপসিবল, টিকে আছ কেমন করে ? মন্ত্রীদের প্লিজ করতে হলে তো ঘুষ ছাড়া উপায় নেই ! ঘুষ নেয়া হল এ ফর্ম অফ আর্ট, দুর্বলহৃদয় মানুষ রপ্ত করতে পারে না, বিশেষ করে ডুগুডাররা । দিল্লিতে কতদিন আছো ? ট্রান্সফার অর্ডার এলো বলে, ঘুষ না খেলে আর তা শেয়ার না করলে ট্রান্সফার অনিবার্য, তাও তুমি আবার এজিএমইউ ক্যাডারের, পাঠাবে সিলভাসা, পোর্ট ব্লেয়ার বা পুডুচেরি ; অরুণাচল প্রদেশ বা সিকিমেও পাঠিয়ে দিতে পারে ।

##

শিশিরে কেউটের গন্ধ ।  উতরোল কোলাহল ।

স্ফিংক্স, মরুভূমি, পিরামিড, মমি । চাউনির অতিশয়োক্তি ।

এর মতো, ওর মতো, তার মতো, কারো মতো নয় ।

##

আমি সুটকেসটা তুলে নিচ্ছিলাম, তুই নিজেই তুলে নিয়ে বললি, যথেষ্ট শক্তি আছে গায়ে, ড্যাডি ডিয়ারেস্ট, আই নিউ, সামওয়ান ওনস মি, অ্যান্ড ওয়াজ সিক্রেটলি ট্রাইং টু ডিজওন মি ।

এক পলকে দেখলাম, তোর সোনালি আর রুপালি স্লোগান-চুড়িগুলোতে গোলাপি রঙে লেখা লাভ ইউ, কিস ইউ, ইউ আর মাইন, ইংরেজিতে । দু-হাতে কনুই পর্যন্ত মেহেন্দির নকশা । আমেরিকায় মেহেন্দির ব্যবসা পৌঁছে গেছে, আশ্চর্য লাগল দেখে ।

বললাম, কি মাথামুণ্ডু বকছিস ! আমার গলায় শ্লেষ্মার বদলে অবাক হওয়ার শেষে অতিপরিচিতির স্ফূর্তি ।

এই তো, এই তো, তুমি থেকে তুইতে এলে তো ? তুই বললি ।

আমার কাছে এসে, নিঃশ্বাস ফেলা দূরত্বে দাঁড়িয়ে বললি, প্রায় ফিসফিস করে বললি, ফ্রম টুডে অনওয়ার্ডস, আই ওন ইউ ইন দ্য সেম ওয়ে অ্যাজ ইউ ওনড মি ওয়ান্স আপঅন এ টাইম । হ্যাঁ, তুমি আমার অস্তিত্বের মালিক ছিলে এতকাল, এখন আমি তোমার অস্তিত্বের মালিক, বা মালকিনি, হোয়াটএভার । অদৃশ্য রিমোট কন্ট্রোল এবার আমার মুঠোয় ।

##

এগোলুম বেডরুমের দিকে, তোর হাত থেকে সুটকেসটা কেড়ে নিয়ে, পেছন-পেছন তুই । আবৃত্তি করতে লাগলি, খোশমেজাজি কন্ঠস্বরে, কোনো পরিচিত গায়িকার মতন গলা, কার গলা যেন, কার গলা যেন :

You do not do, you do not do

Any more, black shoe

In which I lived like a foot

For thirty years, poor and white,

Barely daring to breathe or Achoo

#

Daddy, I have had to kill you

You died before I had time

Marble-heavy, a bag full of God

Ghastly statue with one gray toe

Big as Frisco seal

#

And a head in the freakish Atlantic

Where it pours bean green over blue

In the water of beautiful Nauset.

I used to pray to recover you

Ach, du

#

পেছন ফিরে জিগ্যেস করলাম, কার কবিতা  ।

তোর মুখেচোখে কেমন যেন পরিতৃপ্ত ব্যঙ্গের ছায়া ।

তুই বললি, জাস্ট দ্যাট ? কবিতাটা সম্পূর্ণ মুখস্হ ; আমার সবচেয়ে প্রিয় কবিতা । যিনি লিখেছেন তিনি বলেননি কি যে কবিতাটা একজন মেয়ের এলেকট্রা কমপ্লেক্স ? আর হলোকস্টের মেটাফরগুলো ? ভয় পাচ্ছ কেন?  শোনো না পুরোটা । তোমাকে তো আউশউইৎসে পাঠাচ্ছি না । আর হ্যাঁ, বইগুলো তুমিই বাপির, আই মিন আঙ্কলবাপির, ঠিকানায় আমার জন্য পাঠিয়েছিলে । মনে করো, মনে করো, মনে করো ।

ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর করেছি, কবিতাটা কার লেখা মনে করতে পারলাম না ; সিলেবাসে ছিল না, বোধহয় । এমিলি ডিকিনসন কি ? নাহ, অন্য কারোর । ক্রিস্টিনা রসেটি, এলিজাবেথ বিশপ, এডিথ সিটওয়েল? মনে আসছে না । এই কবির বই তো পাঠাইনি বলেই মনে হয়, কে জানে হয়তো ভুলে গিয়ে থাকব, আমি নিজে তো পাঠাইনি, জুনিয়ার অফিসারদের দিয়ে কিনিয়ে পাঠিয়ে দিতাম ।

অফিসের ফাইলের জগতে ঢুকে গিয়ে সাহিত্য উধাও হয়ে গেছে মগজ থেকে ; সরকারি ফাইলের আঁকশি হয়, অক্টোপাসের মতন ।

##

বাবলগাম ফুলিয়ে ফাটালি, বললি, নিও-ফ্রয়েড মনস্তত্ব, কার্ল গুস্তাভ ইয়ুং, মনে পড়ছে? তুমি তো ইংরেজিতে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্স্ট ক্লাস এম এ ! কবির নাম মনে পড়ছে না ? তোমার স্নাতকস্তরে সাইকোলজি ছিল, তাও জানি।  না, আমি পেনিস এনভির প্রসঙ্গ তুলছি না, ন্যাটালি অ্যানজিয়ার তো বলেই দিয়েছেন, পেনিস এনভি আবার কি, শটগান নিয়ে কী হবে, যখন মেয়েদের রয়েছে অটোম্যাটিক অস্ত্র ।

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে, বোধহয় আমার উত্তরের প্রতীক্ষা করে, জবাব না পেয়ে, বললি, লিবিডোও নয়, জাস্ট ফ্যাসিস্ট ড্যাডি আর মহাকাব্যের এলেকট্রার সম্পর্কের প্রসঙ্গ, ইনসেস্ট, ইনসেস্ট, ইনসেস্ট।

পেনিস শব্দটা এমনভাবে বললি, যেন প্রায়ই বলিস ; হতে পারে, আমেরিকানদের তো কথার আড় নেই। আর ইনসেস্ট ? রক্তচাপে শিবের তাণ্ডবনাচ শুনতে পাচ্ছি ; হলোকস্ট ? আউশউইৎস ? রগের দপদপ কানের ইয়ারড্রামে ।

কবিতাটা আবৃত্তি করে কী বলতে চাইছিস বুঝতে পারছি না, তবে তোর কন্ঠস্বর বেশ মধুর, বললাম, শুকনো গলায় খাঁকারি দিতে না হয়, তাই ঢোঁক গিলে ।

বেডরুমে ঢুকে তোর সুটকেস নামিয়ে রাখতে, তুই দেখলি সেন্টার টেবিলের ওপর ব্ল্যাক ডগ স্কচ আর একটা গেলাসে সামান্য মদ, কাল রাতে অর্ধেক খাইনি, কাজে মশগুল ছিলাম, বেঁচে গেছে কিছুটা ।

তুলে খেয়ে নিলি, এক চুমুকে,বললি, বড়ো ক্লান্ত হয়ে গেছি, জেট ল্যাগ, এত দীর্ঘ ফ্লাইট, কই আরেকটু দাও তো, গিলে বাকি অংশ শোনাই তোমায় । ভাবছ নাকি, যে ইলেকট্রনিক্স ইনজিনিয়ার কি করে কবিতা শোনাচ্ছে? তোমার দেয়া লিরিকাল ব্যধি । হ্যাঁ, তোমারই দেয়া, থরে-থরে বই, তাক-তাক বই, এনজয় করতুম, স্যাডনেস এনজয় করতুম, গ্রিফ এনজয় করতুম, তোমার অদৃশ্য বন্দিত্ব এনজয় করতুম, আর প্যাঁচ কষতুম, কে লোকটা, আমাকে নিয়ন্ত্রণ করে চলেছে, আমার হাঁটবার রাস্তায় অ্যাসফাল্ট পেতে সুগম করে দিচ্ছে, জীবনে একবারও হুঁচট খেয়ে পড়তে দিল না ।

এক পেগ মতন ঢালার পর সোডার বোতল খুলতে যাচ্ছিলুম, বললি, নো, নো, মাতন লাগতে দাও, খাবো তবে তো মনের কথা বলতে পারব, কতকাল যাবত চেপে গুমরে উঠেছে কথাগুলো ।

এক চোঁয়ে খেয়ে, ফ্ল্যাপার ছুড়ে ফেলে দিলি দীর্ঘ ঢ্যাঙ নাচিয়ে, বিছানায় চিৎ শুয়ে-শুয়েই আবৃত্তি করতে লাগলি, চোখ বুজে :

In the German tongue, in the Polish town

Scraped flat by the roller

Of wars, wars, wars.

But the name of the town is common

My Polack friend

#

Says there are a dozen or two

So I never tell where you

Put your foot, your root,

I never could talk to you.

The tongue stuck in my jaw.

আবৃত্তি থামিয়ে, আরও বারোটা স্তবক আছে, বললি,  মনে রেখো আই ওন ইউ, আমি তোমার অস্তিত্বের সত্বাধিকারিণী । কবির নাম জানো না ? খুঁজো , খুঁজো, খুঁজো ।

আমি : ঘুমিয়ে পড়, ক্লান্ত হয়ে গেছিস, দেখাই যাচ্ছে, রেস্ট নিয়ে স্নান করে, লাঞ্চ সেরে তারপর কথা হবে।

তুই : না, না, না, না, পালিও না, বসে থাকো, আমি ঘুমোবো আর তুমি এদিক ওদিক টেলিফোন ঘোরাবে, সেটি হচ্ছে না, মোবাইল কোথায়, অফ করে দাও বা সাইলেন্ট মোডে করে দাও । বসে থাকো, চুপটি করে বসে থাকো, আমি ঘুমোবার চেষ্টা করছি, ঘুম ভেঙে যেন তোমাকে বসে থাকতে দেখি । নয়তো, এতক্ষণে জেনে গিয়ে থাকবে আমার বিহেভিয়ার কেমন রাফ, আনকালচারড, মোটেই ভদ্রজনোচিত নয় , জাস্ট রিক্লাইন অন দ্যাট সোফা ।

বিছানা থেকে উঠে, সেন্টার টেবিলের ওপরে রাখা মোবাইল তুলে সুইচ অফ করে দিলি, ল্যাণ্ডলাইনের রিসিভারটা নামিয়ে রাখলি , আর চিৎ হয়ে শুয়ে পড়লি আবার, চোখ বুজলি ।

তুই চোখ বুজতেই খুঁটিয়ে দেখতে লাগলাম তোকে ।  তোর বারো ক্লাসের আইডেনটিটি কার্ডের ফোটোর সঙ্গে যৎসামান্য মিল আছে, ভরাট হয়ে উঠেছিস, ডেলিবারেটলি সেক্সি।

তোর আদেশ শুনে আশ্রয়ের ভালোলাগায় পেয়ে বসল আমায়, অথচ অতিথি তো তুই । আমার শরীর থেকে ব্যুরোক্র্যাটের পার্সোনা ছিঁড়ে ফেলে দিলি যেন ।

##

প্রজাপতিদের ফ্রিল-দেয়া শালুকের কোঁচকানো ঢেউ । আমি ? পাগলের ওড়ানো ঘুড়ি ।

বুকে, বিজয়ের আহ্লাদে মিশেছে জয়ের আছাড়, স্বপ্ন দেখার জন্য গড়ে-নেয়া দ্যুতিময় অন্ধকার ।

##

এর মতো, ওর মতো, তার মতো, কারো মতো নয় ।

যেন এমন, যেন অমন, যেন তেমন নয় ।

##

প্রায় দুঘণ্টা বসেছিলাম সোফায় হেলান দিয়ে, চোখ লেগে গিয়ে গিয়েছিল । চোখ খুলতে দেখি তুই পাশে বসে, আমার মুখের কাছে মুখ এনে, ল্যাভেণ্ডার আইসক্রিমের গন্ধের দূরত্বে, গভীর কালো চোখ মেলে, আমাকে তারিয়ে দেখছিস,  হাতে স্মার্টফোন । এত কাছে একজন যুবতীর মুখ, সুগন্ধ পাচ্ছি হাঁ-মুখের, ল্যাভেণ্ডার মাউথ ফ্রেশেনার ইনহেল করে থাকবি ।

কি গভীর চোখজোড়া, আমার ভেতর পর্যন্ত তিরতিরিয়ে সেঁদিয়ে গেল । কোথা থেকে পেলি এরকম চোখ, চোখের পাতা? তোর মা তোকে আঁস্তাকুড়ে ফেলে দেবার সময়ে জানত কি যে  তুই এরকম সুশ্রী আর স্মার্ট যুবতী হয়ে উঠবি, সেক্সি অ্যাটিট্যুড ঝলকাবে !

বললি, দেখছি, তোমার ভেতরের সোকল্ড ঈশ্বরের চেহারাটা কেমনতর, কত পার্সেন্ট হিউমান আর কত পার্সেন্ট গডলি, কিংবা কোনো গডজিলা বা কিংকং লুকিয়ে রয়েছে কিনা ।

গম্ভির হবার অভিনয় করলাম ।

তুই : ওউ-ওউ-ওউ-ওউ, দুচারগাছা পাকাচুলে রোমের গ্ল্যাডিয়েটারদের মতন দেখাচ্ছে তোমায় ; হেয়ার ডাই করা আমি একেবারে পছন্দ করতে পারি না । তোমার ঘুমন্ত পোজের গোটা দশেক ফোটো তুলে নিয়েছি, ইন্সটাগ্রাম, পিন্টারেস্ট, গুগল প্লাস আর আমার ফেসবুক পাতায় পোস্ট করে দিয়েছি, যাতে ফোটো তুলছি দেখে ডিলিট করার চেষ্টা না করো । একটা সেলফি তুলি, কি বলো, বলে আমার গলা বাঁহাতে জড়িয়ে সেলফি তুলে নিলি, বললি, এটা আপলোড করছি না, আপাতত করছি না, কখনও করব ।

তোকে প্রশ্রয় দিতে আমার ভালো লাগছিল । আর স্পর্শ ? অবর্ণনীয় । নবীকরণ, নবীকরণ, নবীকরণ ।

নারীশরীর, নারীশরীর, নারীশরীর । সুগন্ধ সুগন্ধ সুগন্ধ ।

##

স্পর্শের মর্মার্থ, মর্মার্থের রসায়ন, রসায়নের সম্পর্কে, রেণু, পরাগ, উড়াল, জীবন ।

শিশিরে কেউটের গন্ধ । উতরোল কোলাহল ।

##

তুই ফ্রেশ হয়ে নিয়েছিলি, আমি যখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, পারফিউম মেখেছিস, সিল্কের নাইটগাউন পরে নিয়েছিস, হালকা গোলাপি লিপ্সটিক লাগিয়েছিস, কাঁধ পর্যন্ত কোঁকড়া চুলে হয়ে উঠেছিস আকর্ষক, বললুম, ব্রেকফাস্ট করে নিয়েছিস ?

তুই জানালি ফ্রিজ থেকে ব্রেড নিয়ে টোস্টারে টোস্ট করে খেয়েছিস, কিচেনে গিয়ে দুমুঠো অ্যাসর্টেড বাদাম খেয়েছিস ।

তুই : হ্যাজেলনাট দেখলুম, ইনডিয়ায় আজকাল সবই পাওয়া যায় দেখছি, বললি ।

আবার ব্যঙ্গের পরিতৃপ্তি তোর কথায় ঝরল, বললি, তোমার প্যানিকড হবার প্রয়োজন নেই, ওয়াচম্যান না কি সেন্ট্রি, তাকে বলে দিয়েছি কেউ এলে বলে দিতে যে আজ সাহেব কারোর সঙ্গে দেখা করবেন না, ওনার এক আত্মীয় এসেছেন বিদেশ থেকে, সদর দরোজা বন্ধ করে এসেছি, এই ঘরের পর্দাও টেনে দিয়েছি, আর তুমি যা চাইছিলে, আমাকে অন্য ঘরে স্হানান্তরিত করতে, পাশের ঘরে আমার বিলংগিংস রেখে এসেছি, দেখলুম ঘরটাতে অ্যাটাচড বাথ রয়েছে, টিশ্যু পেপারের রোলও রয়েছে, আমার এখন রোল ইউজ করার অভ্যাস হয়ে গেছে । ডেস্কটপটা ইউজ করে নিলুম, বেশ কয়েকটা ই-মেল লেখা জরুরি ছিল । একটা শাঁখ দেখে ভাবলুম বাজাই জোরে আর তোমার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাই, তারপর মনে হল, নাঃ, বেচারা ব্যুরোক্র্যাট, সরকারি চেস্টিটি বেল্ট পরে বসে আরাম করছে ।

##

স্মার্টফোনটা বিছানার ওপর ছুঁড়ে ফেলে , তুই আমার কাঁধের ওপর দিয়ে দুটো হাত বাড়িয়ে আমাকে কাছে টেনে নিয়ে বললি, আই লাভ ইউ, আমি তোমায় ভালোবাসি, ইউ আর মাই লাভার, আই অ্যাম ইওর বিলাভেড, ওই ব্যুরোক্র্যাটিক চেস্টিটি বেল্ট খুলে ফ্যালো, আর স্বচরিত্রে এসো ।

আমি : কী বলছিস কি, আবোল তাবোল, বললুম।

তুই : ডোন্ট ট্রাই টু বিহেভ লাইক অ্যান ওল্ড বাবা । বাবা সাজার চেষ্টা কোরো না, আমি সবচেয়ে বেশি অপছন্দ করি বাবা অভিনয়কারীদের ।

আমি : আবার মদ খেলি ?

তুই : হ্যাঁ, মেরে দিলুম এক পেগ তুমি ঘুমোচ্ছ দেখে, কিছু করার নেই, মদের খোঁয়ারিতে তোমাকেই দেখছি কতক্ষণ হয়ে গেল, তোমাকে দেখার মাদকতার সঙ্গে ব্ল্যাক ডগের নেশা, আইডিয়াল । কতকাল তোমাকে দেখার কথা ভেবেছি, কেমন দেখতে ভেবেছি, দেখা পেলে কতগুলো টুকরো করব ভেবেছি, কোন টুকরোটা আগে খাবো ভেবেছি । বিছানায় রুবিক কিউব রয়েছে দেখলুম, ও আমি চেষ্টা করেও পারি না, আমার বোন অবশ্য এক মিনিটে করে ফেলতে পারে ।

আমি : ছাড় দিকি, গলা ছাড় ।

তুই : আবার অ্যান ওল্ড বাবা সাজার চেষ্টা করছ, ভুলে যেওনা মিস্টার প্রভঞ্জন প্রধান, আমার নাম ইতি প্রধান নয়, আমার নাম নেতি ব্যানার্জি । তারপর নাকে নাক ঠেকিয়ে, চোখে চোখ রেখে বললি, বলিউডি ফিল্মে যেমন দেখায়, সেই কাঁথাটা রাখোনি, যেটায় আমাকে মুড়ে ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে গিয়েছিল আমার রেপিস্ট বাবা আর ভিতু মা । রেপিস্ট ছিল নিশ্চয়ই, দেখছ তো আমি কতো ওয়েল বিল্ট লম্বা চওড়া, বায়োলজিকাল বাবা গায়ের জোর খাটিয়ে রেপ করেছিল বায়োলজিকাল মাকে, মা হয়ত কাজের বউ ছিল কিংবা চাষি বউ বা পরিচারিকা বা হোয়াটএভার, হু কেয়ার্স ।

আমি : ঠিক আছে, গলা ছাড় ।

তুই : মিস্টার প্রভঞ্জন প্রধান, গলা ছাড়ব বলে অত দূর থেকে উড়ে আসিনি । থাকব এখন, একমাস, দুমাস, তিনমাস, যত দিন না আমার উদ্দেশ্যপূরণ হয় । ছাড়াবার চেষ্টা কোরো না, আমার গায়ে তোমার চেয়ে বেশি জোর আছে বলে মনে হচ্ছে, তোমার হাইটের সমান আমি, হাতও তোমার চেয়ে দীর্ঘ ।

তোর চোখের আইল্যাশ কি নকল, এত বড়ো দেখাচ্ছে ? এড়াতে চাইলাম ।

আমার কিচ্ছু নকল নয়, বলে, উঠে দাঁড়ালি তুই, ফাঁস খুলে গাউনটা ফেলে দিলি কার্পেটের ওপর, নগ্ন, জড়িয়ে ধরলি আমাকে, বললি, দেখে নাও, আগাপাশতলা খাঁটি ।

কী করছিস কি ! আমি চড় কষিয়ে দিলাম তোর গালে ।

তুই আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরলি, ঠোঁটের ওপর ঠোঁটের আলতো ঠোক্কোর মেরে মেরে বলতে লাগলি, আই লাভ ইউ, আই লাভ ইউ, আই লাভ ইউ, আই লাভ ইউ ।

আচমকা দুহাত দিয়ে আমার পাঞ্জাবির বোতামের জায়গায় টান দিয়ে ছিঁড়ে ফেললি, মুখ গুঁজে দিলি আমার বুকে, ঠোঁট ঘষতে লাগলি, বলতে লাগলি, আমি এখনও ভার্জিন, তোমার জন্য, তোমার জন্য, তোমার জন্য, কবে থেকে খুঁজছি তোমায়, সেই ক্লাস এইট থেকে, আমি তোমাকে ভালোবাসি । শুইয়ে দিলি সোফার ওপরে, টান মেরে খুলে দিলি আমার লুঙ্গি, বললি, তবে, ইউ আর গেটিং ইনটু ফর্ম, নাউ মেক লাভ, আমাকে টেনে নামিয়ে দিলি কার্পেটের ওপর, মেক লাভ, প্রভঞ্জন, তোমার অদৃশ্য ব্যুরোক্র্যাটিক চেস্টিটি বেল্ট খুলে ফ্যালো ।

##

শিশিরে কেউটের গন্ধ । উতরোল কোলাহল ।

স্ফিংক্স, মরুভূমি, পিরামিড, মমি । চাউনির অতিশয়োক্তি ।

স্পর্শের মর্মার্থ, মর্মার্থের রসায়ন, রসায়নের সম্পর্কে, রেণু, পরাগ, উড়াল, জীবন ।

##

আমি উঠে বসে আরেকবার চড় মেরে বললাম, স্টপ দিস।

চড় মেরে ফিলগুড অনুভূতি হাতের তালু বেয়ে ছড়িয়ে পড়ল শিরা-উপশিরায়, নেমে গেল বুক-পেট-জানু হয়ে পায়ের দিকে, শিউরে-ওঠা কাঁপুনির  এক ভালো লাগা ।

তুই : স্টপ ? তোমার শরীর তো রেসপণ্ড করছে, লুকোচ্ছ কেন যে তুমিও আমাকে ভালোবাসো । বাবাগিরি ফলিও না, যথেষ্ট বাবাগিরি ফলিয়েছ, এবার প্রভঞ্জনে এসো মিস্টার প্রধান, আমি নেতি ব্যানার্জি, এসো, আমার চোখের দিকে স্পষ্ট করে তাকাও । তাকাও, চোখের পাতা ফেলবে না, তাকাও, আমার মুখের দিকে তাকাও। তুমি যে আমার সো কল্ড বাবা নও, ভুলে যাচ্ছ কেন ? আর হলেই বা বাবা, সম্পর্ক পাতাও, ইনসেস্টের সম্পর্ক, প্রিহিসটরিক যুগে যেমন মেয়েদের সঙ্গে বাবাদের সম্পর্ক হতো, যেমন বাঘ সিংহ হাতি ঘোড়ার হয় ।

বলতে লাগলি আই ওয়ান্ট ইওর বেবি, আমি তোমার বাচ্চা কনসিভ করতে চাই, ডোন্ট রেজিস্ট, তোমার মুখে আঁচড়ে-কামড়ে বাইরে বেরোনো বন্ধ করে দেবো কয়েক দিনের জন্য । নখ দেখেছ, যৎসামান্য ছুঁচালো ; দাঁতও ব্যবহার করতে পারি । আমার সেক্সের চাহিদা নেই ; আমি বাচ্চা চাই ।

দুহাতের চেটো দেখিয়ে বললি, এই দ্যাখো, মেহেন্দির নকশায়  ডান হাতে লেখা রয়েছে ড্যাড আর বাঁহাতে ব্রো-প্রো ; আমার উদ্দেশ্য পরিষ্কার ।

##

প্রলোভনের সমস্যা চিরকাল এই যে জীবনের তাৎক্ষণিক সুযোগ আর পাওয়া যায় না ।

ছেড়ে দিলাম শরীরকে তোর হাতে, টেনে তোকে বিছানায় নিয়ে যেতেই বুঝতে পারলাম যে  তোকে এই ভাবেই পেতে চেয়েছি, বড়ো করে তুলেছি, অপেক্ষায় থেকেছি যে একদিন না একদিন তুই আসবি ; নেতি ব্যানার্জি আমার, আমিই তাকে আঁস্তাকুড় থেকে তুলে আনার পর নারীত্বে প্রতিষ্ঠা দিয়েছি ।

আমাকে জড়িয়ে তুই নিজের ওপর তুলে নিলি  । তোর বুকে মুখ গুঁজলুম, কী তপ্ত তোর বুক । উত্তেজনায় জড়িয়ে ধরলুম তোকে ।

বললুম, আমিও ভার্জিন রে, সেক্স করিনি এখনও । দুবছর আগে পর্যন্ত আমার নাইট ফল হতো, স্বপ্নে তোকে পেয়ে, চটকে-মটকে  । ইউরোলজিস্টকে কনসাল্ট করেছিলাম, সে বললে ম্যাস্টারবেট করে বের করে দিতে । কম বয়সে করতাম, তোর মুখ মনে করেই করতাম, কিন্তু এত বয়সে কেউ কি ম্যাস্টারবেট করে ; ইচ্ছে করেছে, কিন্তু করিনি, কেমন নোংরা মনে হতো, ওই যে তুই চেস্টিটি বেল্টের কথা বলছিস ।

আমিও করিনি, ইন দ্যাট সেন্স করিনি, তোমাকে ইম্যাজিন করে ডিজিটালি যতটুকু  আনন্দ পাওয়া যায় ; ননডিজিটালি করলে নাকি ভার্জিন থাকা যায় না, জাঠনি বাড়ির ভিতু মেয়ে বলতে পারো । এই তো তোমার বেডশিটে দ্যাখো, ব্লাড । চাদরটা তুলে দিতে হবে, আমি এই অংশটা কেটে নেবো, মেমেন্টো হিসাবে, নয়তো তোমার সারভেন্ট সকালে এসে সন্দেহ করবে ।

মগজে প্রশ্ন উঠল, কত স্বাভাবিক বোধ করছি এখন, কেন, এই দৈহিক সম্পর্ক ঘটে গেল বলে ? আড়ষ্ট লাগছে না তো ! আমাদের দেখা হয়নি কত বছর, অথচ দুজনেই দুজনের অতিপরিচিত ছিলাম ।

বললাম, তুলে দিস, অনেক চাদর আছে, কালারড প্রিন্টেড চাদরও আছে । জাঠদের সংস্কৃতি থেকে পেয়েছিস নাকি এই বিদকুটে প্রদর্শনী ?

তুই : হতে পারে, অভিভাবক মা যখন জাঠনি, কিছু তো পাবো । যাকগে, এবার এলেকট্রা বলে ডাকো ।

আমি : এলেকট্রা, মাই ডিয়ার চাইল্ড, জানি তুই নিও টেরেস্ট্রিয়াল ।

তুই : জানলে কি করে ?

আমি : আন্দাজে, নেটি যখন, তার মানে নিও টেরেস্ট্রিয়াল । আমি মনে মনে তোকে ইতি নাম দিয়েছি ।

তুই :না, তুমি হলে ইটি,  এক্সট্রা টেরেস্ট্রিয়াল । মঙ্গলগ্রহের সরকার তোমায় চেস্টিটি বেল্ট পরে পাঠিয়েছে।

আমি : কিন্তু তুই আনওয়েড মাদার হয়ে সমাজে থাকবি কী করে ?

তুই : ধ্যুৎ, আমি আমেরিকায় থাকি । তুমি কি আমাকে রিচুয়ালি বিয়ে করতে চাও ?

আমি : হ্যাঁ ।

তুই : আমি কনসিভ করতে চাই, বিয়ে-ফিয়ে আবার কি ? এক পাকেই বাঁধতে চাই না নিজেকে তো সাত পাকে । তোমার রিমোট কন্ট্রোল যথেষ্ট প্রয়োগ করেছ, এবার আমার পালা, ড্যাডি ডিয়ারেস্ট । বাট আই উড  থিংক ওভার ইয়র প্রোপোজাল ।

আমি : কি করে জানলি যে বাচ্চা পেতে হলে এই সব করতে হয় ?

তুই : আঁস্তাকুড়ে শুয়ে শুয়ে শিখে ফেলেছি ; তুমি কি করে শিখলে ?

আমি : শরীরের জিপিএস কাজ করল ; উ উ উ উ উ উ করছিলিস কেন ? অরগ্যাজমের উত্তেজনা রিলিজ করার জন্য ?

তুই :হাঃ, এতক্ষণ তোমাকে কবিতা শোনালুম, রাইমিং মার্ক করোনি ? উ উ উ উ ? মহাকাব্যের এলেকট্রার স্বপ্নপূরণ হল বলে মনে হচ্ছে ।

আমি : না, মার্ক করিনি, টেন্সড আপ ছিলাম, তুই হঠাৎ এসে পড়েছিলিস, কী করব ভেবে পাচ্ছিলাম না, লস্ট ফিল করতে আরম্ভ করেছিলাম ।

তুই বললি, লস্ট ? নিজের মধ্যে নয়, আরেকজনের মধ্যে হারিয়ে যেতে হয়, ইতস্তত করতে নেই, সব সীমা মানুষের বানানো, ভাঙো যেদিন যখন চাও, নেভার গেট লস্ট  । তারপর আরম্ভ করলি তোর গায়িকাসুলভ কন্ঠস্বরে :

It struck me a barbed wire snare

Ich, ich, ich, ich,

I could hardly speak

I thought every German was you

And the language obscene

#

An engine, an engine

Chuffing me off like a Jew.

A Jew to Dachau, Auschwitz, Belsen.

I began to talk like a Jew.

আমি : আমাকে শোনাবি বলে মুখস্হ করে রেখেছিস ? কার কবিতা বললি না তো ?

তুই : খুঁজো, খুঁজো । হ্যাঁ, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আবৃত্তি করেছি, কল্পনা করেছি তোমাকে কেমন দেখতে।

আমি : কেমন ? ফানুসনাভি ব্যাঙ-থপথপে শুশুকমাথা আমলা, চোখে-চোখে শেকল আঁকা ভিড়ের মধ্যে এঁদো বিভাগের কেঁদো ?

তুই : হা হা, সেল্ফডেপ্রিকেট করছ কেন, লেডিজ টয়লেটের দেয়ালে আঁকা ড্রইংয়ের মতন । কোরো না, শিরদাঁড়া ঘিরে তালের আঁটির মতন শুকিয়ে যাবে ।

আমি :কত কথা বলতে শিখে গেছিস ।

তুই : থ্যাংকস ফর দি কমপ্লিমেন্ট, সবই মোর অর লেস বরোড ফ্রম বাঙালি ক্লাসমেটস  ।

আমি : তাহলে কি করব ? পোলকাফোঁটা পুঁইফুলে দুভাঁজ করা হেঁইয়োরত বাতাস হয়ে উড়ব?

তুই : হ্যাঁ, হেঁইয়ো করাতেও তো পাল তুলতে হল আমাকেই ।

আমি : এখন দ্যাখ, চিংড়িদাড়া আঙুল দিয়ে খুলছি বসে জটপাকানো মুচকি-ঠোঁটের হাসি ।

তুই : ইয়েস, বেটার দ্যান আই এক্সপেক্টেড ; আমি ভেবেছিলুম তুমি সত্যিই ড্যাডি টাইপের হবে, পেট মোটা, আনস্মার্ট, লেথারজিক, বুকে চুল নেই, বগলে চুল নেই, কুঁচকিতে চুল নেই ।

আমি : কী করতিস অমন হলে ।

তুই : এখন যা করলুম, তা-ই করতুম, তোমাকে কেমন দেখতে ওটা ইররেলিভ্যান্ট ।

আমি : আমি তো আরোহী-ফেলা পুংঘোড়ার লাগাম-ছেঁড়া হ্রেষা ।

তুই : হ্যাঁ, আই ওয়ান্টেড ইউ, দি পার্সন হু ওনড মি । নাউ আই ওয়ান্ট দি সোয়েটিং স্ট্যালিয়ন, প্রত্যেকদিন , অফিস থেকে ফিরতে দেরি করবে না, আর, আমি সকালেও তোমাকে চাই, দি মর্নিং গ্লোরি । আমার কাছে সেক্স অত গুরুত্বপূর্ণ নয়, আমি তোমাকে আমার জীবনে কখনও অতীত হতে দিতে চাই না, তাই আমার বেবি চাই, সম্পর্ককে যে বাচ্চা অতীত হতে দেবে না, যতদিন সে বেঁচে থাকবে ততদিন, আর তারপর তোমার সঙ্গে আমার সম্পর্ককে নিজের ছেলেমেয়ের মাধ্যমে বর্তমান থেকে ভবিষ্যতের দিকে বয়ে নিয়ে যাবে । ক্যারি অন অ্যাণ্ড অন অ্যাণ্ড অন ইনটু ইটারনিটি, ইনটু নিউ সানরাইজ এভরি ডে ।

তোকে বললুম, এত ফ্যাক-ফ্যাক করে কনভেন্টি ইংলিশ বলিসনি, দিল্লিতে এখন হিন্দিঅলাদের রাজত্ব শুরু হয়েছে, ওপরে উঠতে হলে হিন্দির বাঁশের মই বেয়ে উঠতে হবে, নেহেরুভিয়ান অক্সব্রিজ বাবু-মন্ত্রীদের যুগ ফুরিয়েছে । মোগল সম্রাট আকবরের বংশধররাও ক্যারি অন করে পোঁছেছিল ক্যাবলা বাহাদুর শাহ জাফরে, যত ক্যারি অন হয় তত ফিকে হতে থাকে ভবিষ্যত । মোতিলাল নেহেরু পৌঁছেচে রাহুল আর বরুণ গান্ধিতে ।

তুই : ভালো বলেছ, ফাক-ফাক হিন্দির বাঁশ; এ হল অকলোক্র্যাসি বা টির‌্যানি অফ দি মেজরিটি, মেজরিটি সেক্টের পুরুষরা পাকিস্তানে কি করছে দেখতেই পাচ্ছ, তুই খিলখিলিয়ে বললি । যোগ করলি, কাঁধ শ্রাগ করে, হিন্দি সাবজেক্টেও প্রতিটি ক্লাসে সবচেয়ে বেশি মার্কস পেতুম, সো আই ডোন্ট কেয়ার ; আই ওন ইউ ইন অল দি ইনডিয়ান ল্যাঙ্গুয়েজেস । আমার জিভে আছে তোমার অস্তিত্বের মালিকানা ।

##

 

এর মতো, ওর মতো, তার মতো, কারো মতো নয় ।

যেন এমন, যেন অমন, যেন তেমন নয় ।

##

আমি : আই ডিডন্ট ওন ইউ ; তুই তোর নিজের মালিক, কেউ কাউকে ওন করে না ।

তুই : করে, সম্পর্ক হল অন্যের আত্মার মালিকানা । তুমি আমার আত্মার মালিক, আমি তোমার ।

আমি : আত্মা ? হয় নাকি সেরকম কিছু ?

তুই : কেন হবে না ! না হলে কী করে তোমাকে খুঁজে বের করলুম, কাঠঠোকরা যেমন গাছের বাকলে ঠোঁটের ঠোক্কোর মেরে মেরে পোকা বের করে আনে ।

আমি : পোকা ?

তুই : ওউ-ওউ-ওউ-ওউ, দি মেল অরগ্যান লুকস লাইক এ বিগ ক্যাটারপিলার, উত্তুঙ্গ গুটিপোকা, প্রজাপতির নয়, টাইগার মথের । টু বি ফ্র্যাংক, আজকেই আমি স্পষ্ট করে দেখলুম প্রত্যঙ্গখানা কতটা আর্টিস্টিকালি বিল্ট । তোমার প্রত্যঙ্গখানা বোধহয় গ্রিসে বা রোমে তৈরি, খাজুরাহোয় নয় ।

##

আমি : চণ্ডীগড়ে, জগদীশের বাড়িতে আগে যাওয়া উচিত ছিল তোর ।

তুই : দুটো কারণে যাইনি ; উনি তোমাকে ইনফর্ম করে দিতেন আর তুমি নির্ঘাত লুকিয়ে পড়তে, আমার পরিকল্পনা, জীবন নিয়ে ভাবনা, তোমাকে আগাপাশতলা খেয়ে ফেলার ইচ্ছে, সব গোলমাল হয়ে যেত ।

আমি : আর দ্বিতীয় ?

তুই : বৈদেহী ওর বরকে ডিভোর্স দিয়েছে, বরটা গে, নেশাভাঙ করে, বাস্টার্ড, কোনো গে ছেলেকে বিয়ে করলেই পারত, কোর্ট তো অ্যালাউ করে দিয়েছে । স্কাউন্ড্রেলটা বৈদেহীকে কামড়ে দিয়েছিল, হাতে, কাঁধে। ওর বিধবা শাশুড়ি আর ওর বর দুজনে মিলে এক রাতে, তখন রাত দুটো, বৈদেহীকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিল, ওর মোবাইল কেড়ে নিয়ে, হায়দ্রাবাদের  রাস্তায় ভেবে দ্যাখো ; সাইবারাবাদ আইটি ইনডাস্ট্রির এক এমপ্লয়ি স্কুটারে ফিরছিল, তাকে থামিয়ে বাড়িতে ফোন করতে বাপি, আই মিন আঙ্কলবাপি, ওনার আইএস বন্ধুকে জানায়, তিনি বৈদেহীকে নিজের বাড়ি নিয়ে গিয়ে রাখেন, আর পুলিসে এফ আই আর করেন ।

আমি : জানি, আমাকে আবার কি বলছিস, আমিই তো পরিচিত একজন আন্ডার সেক্রেটারিকে বলে বৈদেহীর চণ্ডীগড় ফেরার ব্যবস্হা করেছিলাম । জগদীশের তো শুনেই ব্লাড প্রেশার লো হয়ে গিয়েছিল ; সারাজীবন হরিয়ানায় কাটাল, বাইরের ক্যাডারের অফিসারদের সঙ্গে ওর যোগাযোগ প্রায় নেই ।

তুই : ওউ-ওউ-ওউ-ওউ, তুমি ? তুমি ? তুমি ? তোমার ভূমিকা, অ্যাজ ইউজুয়াল, ওনারা চেপে গিয়েছিলেন, বলেননি আমাকে । বলতে পারতেন, আমি তো আর তক্ষুণি আমেরিকা থেকে উড়ে তোমায় কবজা করতে আসতুম না ।

তুই : আরিয়ানও আঙ্কলবাবা আর মাকে, আই মিন আন্টিমাকে, না জানিয়ে বিয়ে করে চলে গেছে ছত্তিশগড়ের রায়পুরে । ওনারা যথেষ্ট ডিপ্রেসড, আই অ্যাম শিওর । যাবো না ওনাদের বাড়ি, জানতে দিতেও চাই না যে আমি ইনডিয়ায় এসেছি।

আমি : জানি, আমি জগদীশকে বলেছিলাম যে বৈদেহীর পাত্র বিশেষ সুবিধার বলে মনে হচ্ছে না, একটা পুলিশ এনকোয়ারি করিয়ে নিই, তা ওর আর অমরিন্দরের টাকাকড়ি সম্পর্কে এমন লোভ যে কানে হিরের টপ-পরা পাত্রের বানজারা হিলসের বাড়ি, বিএমডাবলিউ গাড়ি  আর ব্যবসার সাইনবোর্ড দেখে ভিরমি খেয়ে গিয়েছিল, শেষে এই বিপদ ডেকে এনেছে ।

তুই আচমকা বললি, আমি তো শুনেছিলুম, বৈদেহী অব্রাহ্মণ কাউকে পছন্দ করত, তার বয়স নাকি ওর চেয়ে চোদ্দো-পনেরো বছর বেশি, ওনারা তাতে রাজি হননি, সেই লোকটি সুদর্শন, ওয়েল বিল্ট, আইএএস, তোমার মতো এজিএমইউ ক্যাডারের ।

আমি : তা জানি না, ওরা বলেনি কখনও এ-ব্যাপারে, বললে মধ্যস্হতা করতাম ।

তুই : করতে ? আর ইউ শিয়র ?

আমি : আরিয়ানের পছন্দ করা মেয়েটাকে অ্যাকসেপ্ট করে নিতে বলেছিলাম, করল না, ট্রাইবাল ফ্যামিলির বলে । আরিয়ান হল অ্যানথ্রপলজিস্ট, যে মেয়েটিকে বিয়ে করল তাদের সমাজে ঢুকে বিস্তারিত জেনে নিতে চাইছে, তাতে দোষের কি? শুনতে ট্রাইবাল, আমি ফোনে কথা বলেছি মেয়েটির সঙ্গে, স্কুলে পড়ায়, প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্রী ছিল । জগদীশ ভাবল যে ওর ভবিষ্যৎ প্রজেনির ব্রিড নষ্ট হয়ে গেল । ব্রিড বলে কিছু হয় নাকি, তোকে দেখে শেখা উচিত ছিল ওদের, তোর ব্রিড কেউ জানে ? আজ কোথায় পৌঁছে গেছিস ।

##

লোকে বলে, বলেরে, ঘরবাড়ি ভালা নয় আমার….

মাটির পিঞ্জিরার মাঝে বন্দি হইয়ারে…..

কানাই তুমি খেইর খেলাও কেনে….

নিশা লাগিল রে, নিশা লাগিল রে, নিশা লাগিল রে….

##

তুই : ধ্যুৎ, এইসব প্রসঙ্গ তুলছ কেন ! আমার তো অ্যাপ্রিহেনসান ছিল, আতঙ্কও বলতে পারো, এসে দেখব, একজন হাড়গিলে টাকমাথা চশমাচোখ বুড়ো অন দি ভার্জ অফ রিটায়ারমেন্ট । আমার ডিটেকটিভ এজেন্সি প্রচুর সময় নষ্ট করে দিলে তোমায় লোকেট করতে, আমিই ওদের আঙ্কলবাপি আর মা, আই মিন আন্টিমায়ের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নম্বর দিয়ে বললুম ফাইনানশিয়াল ট্রইল ধরে এগোতে । আঙ্কলবাপি তো এতো ঘুষ খায় যে ওরা ডাইভার্টেড হয়ে যাচ্ছিল ; তখন ওদের বললুম পুরোনো ট্রেইল ধরে এগোতে, যখন আমি আইআইটিতে  পড়তুম, আর আমার অ্যানুয়াল ফিস এটসেটরা পে হচ্ছে, সেই সময়ের ট্রেইল ।

আমি : বুড়ো হলে কি করতিস ।

তুই : সুইসাইড, জোক করছিনা, বুড়ো হলে তার কোঁচড় থেকে ফুলঝুরির বদলে কুয়াশা উড়ত । কুয়াশায় বাচ্চা হয় না ।

আমি : ইশারার সাহায্যে বেশ পোয়েটিক কথাবার্তা বলতে শিখেছিস দেখছি ।

তুই : বাঙালি ব্যাচমেটদের কনট্রিবিউশান । প্রচুর বাংলা গালাগাল জানি । বলব ? হিন্দিও জানি, গিগলিং টাইপ । হরিয়ানভি গালাগাল কিন্তু বেশি ইউজার-ফ্রেণ্ডলি ।

আমি : না না, বলতে হবে না । বুড়োর বদলে কি পেলি ?

তুই : কোঁচড় থেকে বকুল ফুলের ঝরণা ঝরাতে পারে এমন মাসকুলার স্ট্যালিয়ন । এসো, বুলশার্ক, আরেকবার হয়ে যাক ।

নিজেকে নিঃশব্দে বলতে শুনলাম, প্রভঞ্জন, তুমি কতোকাল নেতির জন্য অপেক্ষা করেছ, আর লজ্জায় বিব্রত বোধ কোরো না, নিয়ে নাও, যতো পারো নিয়ে  নাও, একেই যদি প্রেম বলে তাহলে চুটিয়ে ভালোবেসে নাও, প্রেমকে গোপন রেখো না, একেই তো চাইতে তুমি, নিজেকে এই মেয়েটির বাবা বলে মনে কোরো না।

এতকাল যুবক-যুবতীদের পারস্পরিক সান্নিধ্য আর প্রেমের প্রদর্শনী দেখে হিংসে করতাম, আড়চোখে,   ভুলেই গিয়েছিলাম যে আমি প্রভঞ্জন প্রধান, নিজেকে নিজে ভাবতে আড়ষ্ট বোধ করতাম, ভয়ও পেতাম, মনে মনে তোকে ধন্যবাদ দিলাম, নিজেকে প্রভঞ্জন প্রধান হিসাবে নিজের কাছে তুলে ধরার যোগ্য করে তোলার জন্য, আমার ভেতর থেকে আমাকে প্রসব করার উপযুক্ত করে তোলার জন্য, বুঝতে পারলাম রে, যে আমি কোনও স্হাবর-স্হির বস্তুপিণ্ড নই, তোর শিশুকাল থেকে আমিও তোর পাশাপাশি গড়ে উঠেছি, তুই না এলে আমার অতীত থেকে যেত একেবারে ফাঁকা , ব্যথার মোড়ক খুলে আরেক ব্যথার সাথে মেশানো হয়ে উঠত না ।

বললাম, হোক, উ উ উ উ করিসনি, প্লিজ ।

তুই : ওউ-ওউ-ওউ-ওউ, তুমি এক্টিভ হও, আমি তোমাকে কবিতাটার একটা রেলিভ্যান্ট প্যারা শোনাচ্ছি, বেশ মজার হবে, না ? কবি কখনও ভাবতেও পারেননি যে ওনার কবিতা এইভাবে কাজে লাগানো হবে, স্টার্ট ।

No God but a swastika

So black no sky could squeak through

Every woman adores a Fascist,

The boot in the face, the brute

Brute heart of a brute like you

পাশে শুয়ে পড়লাম, বললাম, আমাকে ফ্যাসিস্ট বলছিস, ব্রুট বলছিস, অতদূর থেকে উড়ে এই কথা বলতে এলি ?

তুই : ব্রুট ফ্যাসিস্ট ছাড়া আর কি ? আমার জীবনকে একেবারে আয়রন গ্রিপে রেখেছিলে, গেস্টাপো কেজিবি সিআইএর মতন নজর রেখেছো সদাসর্বদা । আমি ভিতু টাইপের নই, তুমি যদি বিদ্রোহ না করো তাহলে ভালোবাসা পাবে না, ভালোবাসতে গেলে গায়ে আঁচড়-কামড়ের রক্ত ঝরবে, ভালোবাসায় মাংসের সঙ্গে মাংসের জখমগুলো খুবই সুন্দর, এমনকি মধুময় বলা যেতে পারে, প্যাশনে রক্ত গরম হয়ে উঠবে, তবেই তো ভালোবাসার আমেজ নিতে পারবে । ভয়ও যদি করে, ঝাঁপাতে হবেই ।

আমি : এলি কেন তাহলে ?

তুই : আমি ঝাঁপিয়ে পড়লুম । তোমার গ্লোরি দখল করে তোমার প্রথম রক্ত প্রথম স্পার্ম নেবো বলে ; এখন তোমার মাথার পেছন থেকে হ্যালো ঝরিয়ে দিয়েছি, তোমার রক্ত পালটে দিয়েছি, তোমার যিশুখ্রিস্টগিরি শেষ করে দিয়েছি । তুমি আর আগের প্রভঞ্জন প্রধান নও, না ব্রো-প্রো ?

আমি : জানিস ব্রো-প্রো ?

তুই : জানিতো, আঙ্কলবাপি আর আন্টিমা ওই নামেই তো উল্লেখ করেন তোমায়, তুমি সামনে কোনোদিন না এলেও আমি অনুমান করেছিলুম যে এই ব্রো-প্রো লোকটাই আমাকে কনট্রোল করছে, দি ব্লাডি ফ্যাসিস্ট ড্যাডি, দি ডিকটেটরিয়াল পালক পিতা, অ্যাবরিভিয়েট করলে হয় পাপি । তোমার ব্যাচমেটরা আর পরের আগের ব্যাচের সবাই তোমাকে ব্রো-প্রো মানে ব্রাদার প্রভঞ্জন বলে ডাকে, জানি ।

আমি : বিয়ের মেহেন্দি-নকশা কোথায় করালি ?

তুই : হোটেলে রিসেপশানিস্ট কে বলতেই ও পাঠিয়ে দিলে ঘরে ; লাগিয়ে বসে রইলুম চার ঘণ্টা, তোমার প্রতি ডিভোটেড, একা-একা আমার মেহেন্দি সেরিমনি, পরে দুজনে মিলে সঙ্গীত সেরিমনি করব ।

##

 

স্পর্শের মর্মার্থ, মর্মার্থের রসায়ন, রসায়নের সম্পর্কে, রেণু, পরাগ, উড়াল জীবন ।

চাউনির কোলাহল, উতরোল শ্বাস ।

##

এর মতো, এর মতো, তার মতো, কারো মতো নয় ।

যেন এমন, যেন অমন, যেন তেমন নয় ।

##

 

আমি : ওই স্টিলের আলমারিটা খোল, বাঁদিকে একটা সেফ আছে, সেটাও খোল, চাবি সামনের ড্রয়ারে আছে ।

তুই : কী আছে সেফে ? আমার গয়না-ফয়না টাকাকড়ি সম্পত্তি-ফম্পত্তি চাই না ।

আমি : খুলে তো দ্যাখ, যা আছে নিয়ে আয় বিছানার ওপর ।

তুই সম্পূর্ণ নগ্ন,  ড্রয়ার থেকে চাবি নিয়ে আলমারি খুলে সেফ থেকে কাগজপত্র বের করে প্রায়-স্তম্ভিত হয়ে গেলি, বললি, এতো আমার স্কুলের আইডেনটিটি কার্ডগুলো, ফাইনালের রেজাল্টগুলো, আর এটা, আরে, মাই গড, এতে তো আমার ইনটারভিউ বেরিয়েছিল, সিসটার অ্যানে নিয়েছিলেন, আর এটা, এটা তুমি ?

আমি : হ্যাঁ, আমি, তোকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি, তুই তখন এক বছরের ।

তুই : তুমি তো দারুন দেখতে ছিলে গো , পালক পিতা হের হিটলার, ওয়ান হু ওনস মি । ফোটোতে তোমার মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে, পুরো সূর্যের গুঁড়ো মুখে মেখে হাসছ । ডানহাতে ওটা তোমার কনট্র্যাক্ট, তাই না, আমার লাইফ লং এডুকেশান স্পনসর করার ?

আমি : দুটো কনট্র্যাক্ট রে, একটা তোর স্বনির্ভর না হওয়া পর্যন্ত এডুকেশান স্পনসর করার, আরেকটা তোকে অ্যাডপ্ট করার ? তোর পদবির এফিডেভিট জগদীশের কাছে ছিল, তোর স্কুল লিভিং সার্টিফিকেট পাবার পর হয়তো ডেসট্রয় করে দিয়েছে ।

তুই : মাই গড, তুমি অ্যাডপ্ট করেছিলে ? আমি ভাবতুম বাপি, মানে আঙ্কলবাপি, করেছিল, আমার নামে তোমার পদবির বদলে তাহলে আঙ্কলবাপির পদবি জুড়লে কেন ? অ্যাডপ্ট করেও ডিজওন করতে চাইলে, আমি তোমার কনট্র্যাকচুয়াল ডটার বলে ?

আমি : না, আমি তো মোড়লচাষার ছেলে, প্রধানরা মাহিষ্য হয় ; তোকে ব্রাহ্মণ করার জন্যে জগদীশকে দিয়ে এফিডেভিট করিয়ে তোর পদবি ব্যানার্জি করিয়ে নিয়েছিলাম ।

তুই : ধ্যুৎ, আমার ওবিসি হবার সুযোগটাই কেড়ে নিয়েছিলে, কত সুযোগ-সুবিধা পেতুম, তা নয়, বামুন, শ্যাঃ। অবশ্য একদিক থেকে ভালো যে আমি তোমার মেয়ে নই, জাস্ট অ্যান অ্যাডপ্টেড বেবি, এলেকট্রা অফ দি এলেকট্রা কমপ্লেক্স লাস্ট । দি ইনফেমাস এলেকট্রা, বুকের মধ্যে পুষে রাখা ইনসেসচুয়াস ব্যাটলক্রাইয়ের এলেকট্রা, ফসটার ফাদারের  প্রতিষ্ঠিত সন্তান । ইইইইইএএএএএ।

আমি : সিচুয়েশান ভিলিফাই করছিস কেন ?

তুই : তোমার সংগ্রহের কাগজপত্রগুলো দেখব পরে সময় করে ।

আমি : হ্যাঁ, পরে সময় করে বসে বসে দেখিস, যখন অফিস চলে যাব । একটা পেপার কাটিং আছে, দেখতে পারিস, তুই যে ডাস্টবিনে পড়েছিলিস, তার সংবাদ ।

তুই : তোমার বাঁহাতের কাটা দাগটা সেই বালি মাফিয়াদের আক্রমণে পাওয়া, না ?

আমি : তুই কি করে জানলি ? ও তো অনেককাল আগের ঘটনা । হ্যাঁ, বেআইনিভাবে নদীর বালি তুলে নিয়ে গিয়ে বেচত বালিমাফিয়ারা, তাদের ট্রাক ক্রেন লোডার সিজ করার অর্ডার দিয়েছিলাম, তারই পরিণতি ।

তুই : জানি, তার পরের দিনই তোমার বদলি হয়ে গেলে ।

আমি : আর টিভিতে দেখালো মাফিয়াকর্তা জেল থেকে বেরিয়ে দু-আঙুলে ভি এঁকে হাসছেন ; সাঙ্গোপাঙ্গোরা তার জয়ধ্বনি করছে ।

 

প্রদাহ, যন্ত্রণা, আশঙ্কা, আতঙ্ক, উদ্বেগ, মুখের ভিতরে জিভে ।

তোর মতো, তোর মতো, তোর মতো, তোর মতো  ঐশিতা, উপলব্ধি, সান্ত্বনা, অনুবোধ ।

 

তুই : আমি তোমাকে তিনটে চিঠি লিখেছিলুম, জানো ?

আমি : চিঠি ? কই পাইনি তো ? স্কুল কি সেন্সর করে দিয়েছিল ? নাকি জগদীশ-অমরিন্দর ?

তুই : ধ্যুৎ, সেসব চিঠি পাঠাই-ইনি তোমায়; তুমি তো ইনভিজিবল ডুগুডার, জাস্ট অ্যান্টিসিপেট করে যে তুমি আমার জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করছ, আমি দশ, এগারো আর বারো ক্লাসে তোমায় চিঠিগুলো লিখেছিলুম।

আমি : রেখে দিতে পারতিস তো ! পড়তাম ।

তুই : তোমাকে প্রেমিকড্যাডি মনে করে লিখেছিলুম ।

আমি : ডেসট্রয় করে দিলি কেন ?

করিনি, আমার সঙ্গেই এনেছি ।

তুই : কই, দে দে দে, কেউ তো কোনো কালে আমাকে চিঠিই লেখেনি, প্রেমপত্র তো বাদ দে ।

আমি : ওই তো টেবিলের ওপরে রাখা খামে আছে, চাইলডিশ যদিও, পড়ে দ্যাখো । বাংলায় লিখেছি, তার কারণ স্কুলে সিসটার আর ওয়ার্ডেনরা বাংলা জানতেন না ।

আমি : কার কাছে শিখলি বাংলা ?

তুই : কেন , আঙ্কলবাপির কাছে, উনি ভিষণভাবে বেঙ্গলি, দেখছ না আন্টিমাকে কত তাড়াতাড়ি বাঙালি বানিয়ে দিয়েছিলেন, আণ্টিমাও বাংলা পড়তে-লিখতে পারেন, তাই স্কুলের পর্ব শেষ হলে গুড়গাঁওয়ের বাড়িতে চিঠিগুলো লুকিয়ে রেখেছিলুম, তারপর নিজের সঙ্গেই রেখেছি । তোমার খবর পেতেই সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি, যাতে আমার ফিলিংস বুঝতে পারো, চিঠিগুলোর এমোশান দেখেই বুঝতে পারবে কত পুরোনো আনুগত্য আর ডিপরুটেড ফিলিংস ।

তোর চিঠি আমি এক -এক করে পড়া আরম্ভ করলাম, পড়তে-পড়তে তোর মুখের দিকে তাকিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখছিলাম, বুঝতে পারছিলাম বিব্রত বোধ করছিস, আবার আহ্লাদিতও হচ্ছিস, ঠোঁট বন্ধ রেখে গিগল করছিস ।

##

 

ক্লাস টেন ( ২৫ ডিসেম্বর )

ডারলিং ড্যাড,

তুমি সান্টাক্লজের মোজায় লুকিয়ে চলে এসো, আমি স্লেজগাড়ি পাঠাচ্ছি । আমরা দুজনে শীতের এই ঠাণ্ডায় মোজার ভেতরে ঢুকে বেশ মজা করব । আমি তোমার পোশাক খুলে মোজার বাইরে ফেলে দেব আর বলব, ড্যাড, এই দ্যাখো, তোমার বুকে মিথ্যা কথা বলার জন্য লোহা গরম করে ডেভিল তোমায় নরকে পাঠাবার বন্দোবস্ত করে দিয়েছে । তুমি কেমন লোক ড্যাড, আমার জন্যে তোমার একটুও মনকেমন করে না ? কেন তুমি লুকিয়ে আমাকে নিয়ন্ত্রণ করছ ? যদি নিয়ন্ত্রণ করছই, তাহলে আমার সামনে আসার তোমার সাহস নেই কেন ? আমি তোমাকে ভালোবাসি ড্যাড, তুমি মনে কোরো না যে তুমি দূর থেকে আমাকে নিয়ন্ত্রণ করে চিরকাল আড়ালে থেকে যাবে । আমি তোমাকে একদিন নিশ্চিত খুঁজে বের করব । আর যেদিন তোমায় খুঁজে পাবো, সেদিন তোমায় আমি খুন করে চিবিয়ে খেয়ে ফেলব । ইয়েস, আই উইল কিল ইউ অ্যাণ্ড ইট ইউ । সামনে এসো, দেখা দাও, প্রক্সি দিও না । তুমি কি বুড়ো, ফোকলা দাঁতে হাসো, গুটকা খাও, ছাতা মাথায় অফিস যাও ? তোমার কি বিয়ে হয়ে গেছে, ছেলে-মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিয়েছ ? তোমার নাতি-নাতনি কয়টা ? যতই যাই হোক, তোমাকে আমি ছাড়ছি না, ছাতা উড়িয়ে তোমায় টেনে নিয়ে আসব ঝাঁঝা রোদ্দুরে, কাদা-জমা বৃষ্টিতে, মনে রেখো, হুশিয়ারি দিয়ে রাখছি। পুরাণের ঋষিমুনিরা তো বুড়ো হয়েও কত কি করতেন, যেখানে সেখানে সিমেন ফেলতেন, সেই সিমেন থেকে শিশুরা জন্মাত, যা ঋষিমুনিরা জানতেও পারতেন না । পুরাণ অনুযায়ী ওল্ড এজ ইজ নট এ ফ্যাক্টর ইন ইমমরাল লাভ অ্যান্ড ইনহিউম্যান ওয়ার । কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের কথা চিন্তা করেছ কখনও, কিংবা হেলেন অফ ট্রয়ের জন্য যুদ্ধ ? এপিকগুলোয় বুড়োরাই যুদ্ধ করেছে, চিরকাল । এপিক লেখা তাঁমাদি হয়ে গেলেই বা, আমি আর তুমি তো আছি, আমাদের এপিক প্রোপোরশানের সম্পর্ক তো আছে, ইন পারপেচুইটি ? আরেকটা কথা । তুমি গোপন থাকতে চাও কেন ? তোমার গোপন জীবন আমি একদিন ঘা মেরে আখরোটের মতন দুফাঁক করে দেবো । তবে গোপনীয়তা তোমাকে বেশ রহস্যময় করে তুলেছে ; তোমার কি মনে হয় না যে গোপনীয়তাও একরকমের ভার, যা অত্যন্ত বিপজ্জনক, তাকে রিলিজ করার পথ করে না দিলে উন্মাদ হয়ে যাবে? ইনসেস্টকে অস্বাভাবিক মনে কোরো না । তোমার সন্মোহনপ্রবৃত্তিকে এবার ক্ষান্ত দাও।

তোমার মেয়ে ও প্রেমিকা

নেতি ( দি আগলি নেম ইউ গেভ মি )

##

 

ক্লাস ইলেভন ( দুর্গাপুজো, বিজয়া দশমী )

ডিয়ার ড্যাড দি মহিষাসুর

আমার আগের বছরের চিঠি তুমি পাওনি বলেই মনে হচ্ছে, তুমি এই এক বছরে নিজেকে অসুর হিসাবে প্রমাণ করেছ ; বৈভবী আর আরিয়ানের জন্য কমদামের পোশাক , আর আমার জন্য দামি পোশাক । আমার তা একেবারে পছন্দ নয় । জানি তুমি পাঠাওনি,  আন্টিমা কিনেছেন, কিন্তু আন্টিমা এই কাজ করে ফাঁস করে দিলেন যে তুমি আছ কোথাও । এরকম করার উদ্দেশ্য ? তুমি কি আমাকে এনটাইস করার চেষ্টা করছ ? সিডিউস করতে চাইছ? করো, করো, যতো পারো করো । তুমি অমন না করলেও আমি তোমাকে ভালোবাসি । আগের চিঠিতে লিখেছিলুম যে আমি তোমার প্রেমিকা । তুমি কি জানো প্রেমিকা কাকে বলে ? জীবনে কখনও প্রেম করেছ ? নাকি এরকম আড়ালে থেকেই মদনের শর চালিয়েছ । মদনের কথা কার কাছে জানলুম । আন্টিমায়ের কাছে । উনি পুরানের গল্প আমাকে শোনান যাতে আমি বাইবেলের কাহিনিতে নিজেকে গুলিয়ে না ফেলি । আমি কিন্তু মেরির চেয়ে বেশি ভার্জিন । তোমাকে ছাড়া আর কাউকে চাইনি, চাইবো না কোনোদিন, দেখে নিও । আগের চিঠিতে তোমার ফ্যামিলির কথা জানতে চেয়েছিলুম, বললে না তো কিছু, তুমি এরকম ভিতু কেন ? ফ্যামিলি থাকলেই বা, তুমি যদি কাউকে বিয়েও করে থাকো, তবু আমি তোমার সঙ্গে প্রেম করব, আর প্রেম করার পর পুরুষ মাকড়সাকে যেমন প্রেমিকা মাকড়নি মেরে ফ্যালে, তেমন করে কুচিয়ে মেরে ফেলব । তোমাকে কিন্তু বলে রাখলুম, আমি সবকয়টা ঋতু তোমার কাছ থেকে চাই, শুধু বসন্তকাল নয় । তুমি আমার শরীরের সঙ্গে কথা বলে দ্যাখো, ও তোমাকে খাঁটি সত্য কথা বলবে ; আমার ঠোঁট, জিভ, মুখের ভিতরটা তোমার। চিঠি লিখো । লিখে না পাঠালেও আমি পেয়ে যাব । গুড নাইট ডিয়ার ব্রহ্মা, ইট ইজ পদ্মা হেয়ার ফ্রম হেভেন। তুমি আমার নাম নেতি কেন রেখেছ, আমি জানি । কারণ ইমমরাল প্রেমের মতন স্বর্গীয় সুষমা আর নেই ; প্রেমে ইমমরাল না হওয়া হল নৈতিক শূন্যতা, ব্যানালিটি । আমাদের বয়স প্রতি বছর বাড়ে কেন ? যাতে আমরা ক্রমশ ইমমরাল হতে পারি, প্রেমকে মেনে নিতে পারি । হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ । তুমি আমার ইনটারভিউটা কি করে পড়লে । নিশ্চয়ই পড়েছ । ছুটিতে বাড়ি ফিরে দেখলুম, আঙ্কলবাপি দেখালেন, আমার আলমারিতে নতুন বই, বাংলা কবিতার, ইংরেজি কবিতার । ঘরে ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডের জার্সি ঝুলছে । আন্টিমাকে জিগ্যেস করতে উনি বললেন, ফার্স্ট হয়েছি বলে গিফ্ট এসেছে । কার গিফ্ট, তা উনি জানেন না, যে পাঠিয়েছে সে ঠিকানা লেখেনি । তুমি কেমন পাগল গো ? ধ্যুৎ, এত এত বই আমি পড়তে পারব না, বড় হলে পড়ব । রিমাইন্ড করিয়ে দিই, ইনসেস্টকে অনৈতিক মনে কোরো না ।

ফাক ইউ অ্যান্ড লাভ ইউ ।

তোমার নেতি ( ইওর এলেকট্রা অফ দি ম্যাজিকাল এপিক )

##

 

ক্লাস টুয়েলভ ( দোলযাত্রা )

ইউ ফ্যাসিস্ট বাস্টার্ড বাবা

আজকে দোলযাত্রা, আমাদের ছুটি নেই। সিজনটা ভিষণ খারাপ । বাজে হাওয়া দিচ্ছে । আমার রুমমেট পামেলা ঝিংরণ পারমিশান নিয়ে বাড়িতে দোল খেলতে গেছে । সুতরাং দুই দিনের সুযোগ । তোমাকে ইম্যাজিন করে কী করলুম জানো ? রাতের বেলায় আলো নিভিয়ে, জামা-কাপড় খুলে ফেলে পুরো উলঙ্গ হয়ে বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে পড়লুম । চোখ বুজে নিজেকে বিছানার ওপর ঘষতে লাগলুম, এগোলুম, পেছোলুম । তোমার জন্যে আমি আমার জীবনের প্রথম অরগ্যাজম ডেডিকেট করলুম । হস্টেলে আমার ক্লাসে সবাই করে, আমিও শিখে নিয়েছি । আমি কিন্তু হাত দিয়ে বা কোনো জিনিস দিয়ে ম্যাস্টারবেট করি না । করলে আমি ভার্জিন থাকব না । ডিয়ার ফ্যাসিস্ট ফাদার অলমাইটি, তোমার জন্য আমি নিজেকে ভার্জিন রেখেছি । তুমি কি চাও যে আমি ভার্জিন হয়েই মরে যাই ? কবে দেখা দেবে তুমি ? কেমন দেখতে তোমায় ? তুমি বুড়ো নও তো ? বুড়ো হলে ভিষণ খারাপ হবে কিন্তু, ছিঁড়ে খেয়ে নেবো । তুমি কি আমার জন্যে তোমার ইম্যাজিনেশান ডেডিকেট করো ? কালকেও আরেকবার ডেডিকেট করব । আমি কি তোমার স্বপ্নে আসি, যেমন তুমি আমার স্বপ্নে আসো ? স্বপ্নে আমাকে কষে জড়িয়ে ধোরো, আমি তোমার বুকের চাপ অনুভব করতে পারব । তুমি যে মিথ্যাবাদী তা ধরে ফেলেছি, প্রেমিকরা অমন মিথ্যাবাদী হয় ; আসলে প্রেম তো এক ধরণের সন্ত্রাস, তাই না? তুমি কি নিজের প্রতি বিশ্বস্ত । চিন্তা কোরো না, ইনফেডেলিটি প্রেমিকদের সাহসী করে তোলে । আমি বলছি তুমি খোলোস থেকে বেরিয়ে এসো, আমি তোমাকে আগাপাশতলা চাই, এই চাওয়াকে যেন সেক্সুয়ালি ইনটারপ্রেট কোরো না । যেদিন দেখা হবে সেদিন আমি তোমার মাথায় এমন ঠুসে-ঠুসে উদ্বগ, অশান্তি, আশঙ্কা, আতঙ্ক, যন্ত্রণা ভরে দেব যে যতদিন বেঁচে থাকবে মাথার জায়গায় এক কুইন্টালের বাটখারা বইবে । আমি নিশ্চিত যে সবাই, তোমার পরিচিত মানুষেরা, তোমাকে ভিষণ নিরাশ করেছে, তাই তুমি আমার সঙ্গে বায়বীয় সম্পর্কে পাতিয়েছ ; ওভাবে স্মৃতিকে ধরে রেখো না, পশ্চাত্তাপ হবে, আমি তো রয়েছি, তোমার নিঃসঙ্গতার একমাত্র নিরাময় । মনে আছে তো যে ইনসেস্ট ব্যাপারটা প্রকৃতির অবদান ?

নেতিস্মর ( যার  স্মৃতি নেই)

##

 

চিঠি তিনটে পড়ার পর দুজনেই চুপচাপ বসেছিলাম কিছুক্ষণ । দুজনেই জানতে পারছিলাম কে কি ভাবছে। আমিই প্রথমে কথা বলা আরম্ভ করলাম।

আমি : তোর বাংলা হাতের লেখা খুব স্পষ্ট, স্ট্যাণ্ডার্ড টেন থেকেই রবীন্দ্রনাথের মতন হাতের লেখা রপ্ত করে ফেলেছিস।

তুই : হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ ; আসল প্রসঙ্গে এসো, কনটেন্টে, বিষয়ে, হ্যান্ডরাইটিঙের প্রশংসা করে পাশ কাটিয়ে বেরোতে চাইছ কেন, টেক্সট ডিকন্সট্রাক্ট করো, সম্পর্ক, রিলেশানসিপ, রক্তের খেলা ।

আমি : ডিকন্সট্রাক্ট আবার কি করব, জানি তো, তুই কোল্ড ব্লাডেড রিভেঞ্জ নেবার ফাঁদ পাতছিলিস, আমি তো তোর ভালোর জন্যই সবকিছু করেছি, আর নেতিস্মর লিখে জানিয়ে দিয়েছিস তুই কি বলতে চাস , ওয়ার্ডটা শুনিনি আগে ।

তুই :নেতিস্মর শব্দটা আঁস্তাকুড়ে পেয়েছিলুম, ইউ লায়ার লাভার, লুকিয়ে রিমোট কনট্রোল করে গেছ, আর এখন অ্যালিবাই খাড়া করছ, ইউ আর এ কাওয়ার্ড।

আমি : বলে নে, বলে নে, মেটা তোর ঝাল, আমি ছাড়া কার কাছেই বা পুষে রাখা ক্রোধ, ক্ষোভ, আক্রোশ, দুঃখ, নিঃসঙ্গতা রিলিজ করতিস ।

তুই আহত হলি আমার কথায়, কাঁদতে আরম্ভ করলি, ফুঁপিয়ে, সামলে নিলি, তারপর বললি, আমাকে ফেলে যাওয়া হয়েছিল কলকাতার এক আঁস্তাকুড়ে, আমি দিল্লির এনজিওর হাতে গেলুম কেমন করে গো, তুমি তো আমাকে দিল্লির সংস্হা থেকেই সেলেক্ট করেছিলে ?

আমি : ওঃ, বেশিরভাগ এনজিও বিদেশ থেকে ডলার-ইউরোর ধান্দায় যতো পারে আনওয়ান্টেড বেবিদের নিজেদের আওতায় আনতে চায় ; বিদেশীরা অ্যাডপ্ট করার জন্য ওদের কাছে আসে বা ওদের ফাণ্ডিং করে, বাচ্চাদের পড়াশুনা করাবার জন্য, স্বাস্হ্যের জন্য । দিল্লির এডুকেট এ গার্ল চাইল্ড  চালায় একজন অবসরপ্রাপ্ত আই এ এসের স্ত্রী। ওরা অ্যাবানডণ্ড চিলড্রেনদের সংবাদের দিকে লক্ষ্য রাখে , তোর সংবাদ কাগজে পড়ার পর ওদের প্রতিনিধি কলকাতা পুলিসের সঙ্গে কথা বলে দিল্লি এনেছিল ।

তুই : তুমি মাঝখান থেকে কি করে উদয় হলে ? তুমি স্পনসর করলেই বা কেন ? তুমি তো ব্যাচেলার ছিলে, ফ্যামিলি লাইফ শুরু করোনি, নেহাতই কাঁচা অভিজ্ঞতা তখন ।

আমি : আমার কাছে চিঠি এসেছিল একটি গার্ল চাইল্ডকে স্পনসর করার জন্য । জানি না কে আমার ঠিকানা ওদের দিয়েছিল । আমি কিছু একটা ভালো কাজ করতে চাইছিলাম, চাকরিতে ঢুকেই তো চারিদিকে দেখছিলাম রাজনীতিকদের জোচ্চুরি আর লোকঠকানো, আমার কলিগরাও এই ধান্দায় প্রথম থেকেই ফেঁসে যাচ্ছিল, যেচে ফেঁসে যাচ্ছিল, যারা বিয়ে করেনি তারা মোটা ডাউরি হাঁকছিল, সে এক বিরাট নরক, আমি সেখানে এক টুকরো স্বর্গ গড়তে চাইছিলাম, আর ব্যাস, পেয়ে গেলাম তোকে। জগদীশও পড়েছে গিয়ে ওই নরকে, তাই জন্যেই ও হরিয়ানা ছেড়ে যেতে চায় না ; মন্ত্রিদের তেল দাও, তাদের কথামতো চলো আর আনলিমিটেড কালোটাকা রোজগার করো।

তুই : ভাগ্যিস দিয়েছিল ; নয়তো বাচ্চাগুলো কোথায় যাচ্ছে, তাদের শেষপর্যন্ত কি হচ্ছে, তার ফলো আপ হয় না। আমিও পড়তুম কোনো বাজে ফ্যামিলির খপ্পরে ।

আমি : হ্যাঁ, তুইও তো নিজেই যেচে আমার খপ্পরে পড়তে এলি । নীতি আমার ঠাকুমার নাম, তাই আমি ওই নামটা বেছেছিলাম, কিন্তু রেজিস্ট্রেশানের ক্লার্কটা গোলমাল করে একটা ই বাদ দিয়ে তোকে করে দিলে নেতি।

তুই : স্বর্গে সামান্য নরকের নুন-মিষ্টি থাকা দরকার, নয়তো বিস্বাদ লাগতো, তোমার আমার দুজনের রসায়নই। আমি নেতি আর তুমি ইতি, ব্যাস, প্লাস-মাইনাসের যোগফল যা হয়, কী বলো ।

আমি : ইতি বলিস বা ইটি বলিস, যা ইচ্ছে হয় বলিস । ওগো, হ্যাঁগাও বলতে পারিস ।

তুই : ওউ-ওউ-ওউ-ওউ, দ্যাট ইজ এ গুড ওয়ান । না, তুমি আমার ড্যাডি, আমি তোমার বেবি এলেকট্রা, ড্যাডি বলেই ডাকব ।

##

 

এর মতো, ওর মতো, তার মতো, কারো মতো নয় ।

যেন এমন, যেমন অমন, যেন তেমন নয় ।

##

 

তুই : ওউ-ওউ-ওউ-ওউ, আরে, ফোটো দ্যাখো দ্যাখো, তুমি কোলে নিয়ে আমার গালে চুমো খাচ্ছ ? তখনই চুমো খেয়ে নিয়েছিলে তাহলে ?

আমি : খেয়েছিলাম, অনেক চুমো খেয়েছিলাম, গালে, পেটে । পেটে ফুঁ দিয়ে হাসিয়েছিলাম , কত হাসতিস খিলখিল,  আমি তোর ন্যাপিও চেঞ্জ করেছি কয়েকদিন ।

তুই : ওঃ, সব জায়গায় হাত দেয়া হয়ে গেছে ; তাই মনে হচ্ছিল, হাতটা, ঠোঁটটা যেন চেনা-চেনা লাগছে। এখন আরেকবার পেটে ফুঁদিয়ে হাসাতে পারতে ।

আমি : তুই অ্যাস্ট্রনট হতে চাইছিলি, স্পেস সাইন্টিস্ট হতে চাইছিলি, বাচ্চা নিয়ে কি করে সামলাবি?

তুই : সব ব্যাপার ইনডিয়ান পার্সপেক্টিভে ভাবো কেন ? যারা অ্যাস্ট্রনট তাদের কি ওয়াইফ বা হাজব্যাণ্ড বা বেবিজ নেই ? আমার ইনটারভিউটা পড়ে বলছ, বুঝেছি । কয়েকটা রিসার্চ পেপার পাবলিশ করেছি, পিয়ার অ্যাপ্রুভড, আরও কিছু করতে হবে।

আমি : তুই স্নান করে নিয়েছিস ?

তুই : পাগল নাকি ! প্রেম করব বলে প্ল্যান করে তোমার ঘুম ভাঙার অপেক্ষা করছিলুম, পাউডার পারফিউম মেখে নিয়েছিলুম, লিপ্সটিক লাগিয়ে নিয়েছিলুম, ব্যুরোক্র্যাট বিশ্বামিত্রের চেস্টিটি বেল্টের তালা খোলার পণ করে বসেছিলুম । চলো তোমাকে চান করিয়ে দিই । তুমি আমার ডায়াপার চেঞ্জ করতে, আমি তোমার গায়ের ময়লা ঘষেমেজে তুলি । তোমার পিঠে যথেষ্ট ময়লা জমে আছে, নাকের দুপাশে ব্ল্যাকহেড ফুটে উঠেছে, তোমার পাও বেশ নোংরা ।

আমি : চল, ওই ঘরের বাথরুমে চল, ওটা বড়ো । স্ক্রাবার আছে । ভাগ্যিস তুই আমেরিকান মেয়েদের মতন গায়ে ট্যাটু করাসনি ; আমার একেবারে ভালো লাগে না কারোর গায়ে উল্কি আঁকা দেখলে ।

তুই : ধ্যুৎ, ট্যাটু আবার কি করাব ! তামাটে চামড়ায় কেউ ট্যাটু করায় না ।

আমি : তামাটে নয়, তোর ত্বক হল উজ্জ্বল ।

তুই : থ্যাংকস ফর দি মিথ্যেকথা । চুলটুল না কামিয়ে তুমি কিন্তু রিয়্যাল হিম্যান । আজকাল বুকে বগলে কুঁচকিতে পুরুষরাও চুল রাখছে না; পুরুষের গা থেকে পুরুষ হরমোনের দুর্গন্ধ না বেরোলে আকর্ষণ গড়ে ওঠে না, মনে হয় ডলফিন ।

ঘরে ঢুকে, দেখলুম তোর বাক্স খুলে বিছানার ওপর পোশাক টুকিটাকি ছড়িয়ে রেখেছিস, জিগ্যেস করলি, দেয়ালে ওটা কার ফোটো গো ?

বললুম, চিন্তা করিসনি, ওটা আমার মায়ের ।

তুই : কোনে রাখা গিটারটা ?

আমি : ওটা আমার, কলেজে বাজাতাম ।

তুই : দারুণ হবে, তুমি গিটার বাজাবে আর আমি গাইব, আমার পেনডিং সঙ্গীত সেরিমনি ।

আমি : গিটার বাজালে আর গান গাইলে পাশের বাংলোয় ‌ভাণ্ডারির মেয়েরা শুনতে পাবে,  আর ওরা দেখতে আসবে, যে আজ অচানক প্রধান সাহেবকো হো কেয়া গয়া, এক লড়কি গা রহি হ্যায় অওর গিটার বজা রহি হ্যায়, কৌন হ্যায় ইয়ে লড়কি ? আমার বাংলোয় তরুণী কেউ তো কখনও আসেনি ।

তুই : তাহলে নেক্সট হলিডেতে কোথাও বাইরে চলো, দূরে, ধানক্ষেতের পাশে দাঁড়িয়ে গিটার বাজিও আর আমি গান গাইব ।

আমি : মার্কিন গান ? এদিকে ধানের খেত পাবি না, পাবি কালো টাকায় কেনা ফার্মল্যাণ্ড ।

তুই : না, না, আমি রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতে পারি, আমেরিকায় বাঙালিদের অনুষ্ঠানে গাই ।

আমি : বারবার আমেরিকা বলছিস, শহরের নাম বলছিস না তো ? কোন রাজ্যের কোন শহর,  কোন রাস্তা, অ্যাঁ?

তুই : হুঁ হুঁ, আমি যেমন তোমাকে লোকেট করার জন্য খেটে মরেছি, আমি চাই আমি চলে যাবার পর তুমিও সেরকম মরো, তোমার তো লোকবল আছে, কানেকশান আছে, সরকারি যন্ত্র আছে, চেষ্টা চালিও ; আমার ডিসপোজালে কিছুই ছিল না মিস্টার আগামেমনন, কিছুই ছিল না, কাঠের ঘোড়ায় লুকোনো সৈন্যসামন্তও নয়, জাস্ট একা, বুঝেছ, জাস্ট একা । আর আরশুলাকে ঠিক ধরে ফেলেছে টিকটিকি । খুঁজো, আমাকে খুঁজো ।

আমি : কেনই বা খুঁজব তোকে ?

তুই : যেদিন যাব সেদিন বলব । রিভেঞ্জ, রিভেঞ্জ, প্রতিশোধ হল সবচেয়ে সুন্দর শিল্প ; প্রত্যেক মাসে আমি রক্ত ঝরাই, কেন ? প্রতিশোধ হল নলেন গুড়ের সন্দেশ ।

##

এর মতো, ওর মতো, তার মতো, কারো মতো নয় ।

যেন এমন, যেন অমন, যেন তেমন নয় ।

##

 

আমি :আচ্ছা, বাথরুমে চল আপাতত । আমি কিন্তু শর্টস পরে নিচ্ছি, বেশ এমব্যারাসড ফিল করছি এভাবে, অভ্যাস নেই তো ।

তুই : তুমি যাও, আমি একটা জিনিস নিয়ে আসছি । আমারও অভ্যাস নেই, তো তাতে কি । যা-যা করলুম, তার কি অভ্যাস ছিল নাকি, করলুম তো, বিন্দাস, তোমার জন্য ।

আমি শাওয়ারের তলায় টুলের ওপর বসেছিলাম, তুই হাঁটুগেড়ে আমার সামনে বসলি, নেকেড, শাওয়ারের তলায়, একটা আঙটি হাতের তালুতে রেখে বললি, আমি নেতিস্মর আঁস্তাকুড়বাসিনী, আজ দ্বিপ্রহরের এই ঝরণাতলায়, তোমায় প্রোপোজ করছি, তুমি কি আমাকে গ্রহণ করবে ?

বলে, আমার উত্তরের অপেক্ষা করলি না, বাঁহাতখানা নিয়ে অনামিকায় পরাবার চেষ্টা করলি আঙটিটা, ঢুকল না, তর্জনীতে ঢুকল, বললি, ভালো হল, ওয়েডিং ফিংগারের চেয়ে ডিজিটাল ফিংগার উপযুক্ত, ডিজিটাল ফিংগার ছাড়া প্রেম হয় না, অর্জুনের ডিজিটাল ফিংগার ছিল সবচেয়ে ইমপরট্যান্ট ; অতগুলো মহাকাব্যিক প্রেমিকাকে হ্যাণ্ডল করা সহজ ব্যাপার ছিল না ।

উঠে দাঁড়িয়ে, বললি, কি কোলে তুলে নিলে না, ছোটোবেলায় তো নিয়েছিলে, নাকে নাক, গালে ঠোঁট ঠেকিয়েছিলে ।

ডিবেতে দেখলাম তনিষ্ক লেখা ।

পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে জিগ্যেস করলাম, কখন কিনলি, যখন এসেছিলি তখন তো দোকান খোলার টাইম হয়নি ।

গলা জড়িয়ে ধরলি, আমি তোর নাকে নাক গালে ঠোঁট ঠেকাতে, হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ, হাসতে হাসতে বললি, আমি পরশু এসেছি, হোটেলে উঠেছিলুম, তোমার লোকেশান সম্পর্কে নিশ্চিত হবার জন্য রিকনাইসান্স ভিজিট করে গেছি, গেটে দেখে গেছি প্রভঞ্জন প্রধানের নাম ।

ডিটেকটিভ এজেন্সি বাপির, আই মিন আঙ্কলবাপির, আর আন্টিমায়ের অ্যাকাউন্ট ট্রেইল করার সময়ে, তোমার অ্যাকাউন্টও ট্রেইল করেছিল, আর সেখান থেকে এডুকেট এ গার্ল চাইল্ডকে আজও যে টাকা পাঠিয়ে চলেছ তা জানিয়েছিল আমায়; আমি কালকে এডুকেট এ গার্ল চাইল্ড-এর পরিচালক মিসেস সোমপ্রীত কৌরের সঙ্গে দেখা করেছি, পরিচয় দিয়েছি, কিন্তু ওনারা তোমার সঙ্গে হওয়া কনট্র্যাক্ট আর আঙ্কলবাপির এফিডেভিট দেখতে দিলেন না, সিক্রেট ডকুমেন্ট ।

ফোটো দেখালেন, ফাইলে, তোমার কোলে, যে ফোটোর কপি রয়েছে তোমার আলমারিতে, প্রায় সেইরকম কয়েকটা ফোটো, নাকে নাক, গালে ঠোঁট । অ্যাকাউন্ট ট্রেইল না করলে তোমার পরিচয়, বাড়ি, এনজিওর ঠিকানা পেতুম না । সরি ফর দি ইনট্রুজান । তুমি আমার লাইফে ঢুকেছ, আমি তোমার লাইফে ঢুকলুম, শোধবোধ । ওকে ?

ওরকম হাসিসনি, হাসলে তোর বুক দুলে দুলে উঠছে, আর আমি ডিস্টার্বড ফিল করছি, ওদের বাড়িতে থাকার ফলে তোর বুক-পাছাও হয়ে গেছে জাঠনিদের মতন, নিয়ন্ত্রণহীন ।

থ্যাংকস ফর দি কমপ্লিমেন্ট ড্যাড ।

আঙটিটা দামি, হিরের, কত ক্যারাট রে ? কিন্তু আমার কাছে তোকে দেবার মতন আঙটি তো নেই, কিনে দেবো, কি বল ?

না, না, ধ্যুৎ,ওসব করতে হবে না, আমরা এনগেজমেন্ট করছি না, ইউ আর মাই ফ্যাসিস্ট ড্যাডি, দি রিমোট কনট্রোলার, ওই আসনেই থাকো ।

নামিয়ে দিলাম তোকে শাওয়ারের তলায় ।

হঠাৎ জিগ্যেস করলি, এর আগে চুমো খেয়েছ কাউকে ?

বেফাঁস বলে ফেললুম, হ্যাঁ । স্মৃতির চোট খেয়ে কোপাকাবানা সমুদ্র সৈকত ভেসে উঠেছিল।

তোর মুখ দেখে বুঝতে পারলাম, কথাটা শুনে চকিতে বদলে গেল অভিব্যক্তি, এক বর্ণনাতীত ক্রোধ ফুটে উঠল, কোমরে দুহাত দিয়ে, নেকেড, তুই জিগ্যেস করলি, কে সে ?

টের পেলাম, মারাত্মক ভুল  করে ফেলেছি, যৌনসম্পর্কে মিথ্যা কথা বলা কত যে জরুরি ।

এসে পর্যন্ত তোর এই রূপ যে লুকিয়ে রেখেছিস, জানতে দিসনি, রগের পাশে উঁচু হয়ে উঠেছে শিরা ।

কাছে এসে, বাঁহাত দিয়ে আমার বুকে ঠেলা মেরে বললি, কে সে, অ্যাঁ, কে সে ?

আমি দ্রুত কি উত্তর দেব ভাবছি, ডান হাত দিয়ে বুকে ঠেলা মারলি, বললি, কে মেয়েটি ?

আবার বাঁহাতে ঠেলা মারলি, আমি দেয়ালে পিঠ, দ্রুত একটা উত্তর খুজছি, মগজকে বলছি, দাও দাও, তাড়াতাড়ি যোগাও মনের মতন উত্তর । তোর ঠেলাও উপভোগ করছি, দেয়ালটা আরেকটু পেছনে হলে আরও কি-কি বলতিস জানতে পারতাম ।

তুই, আরও ক্রুদ্ধ, আবার বুকে ঠেলা মেরে বললি, আর কি-কি করেছ ?

নাম কি ?

অপেক্ষা করতে পারোনি ?

আমি তো বড়ো হচ্ছিলুমই, না কি, অ্যাঁ ? হলেইবা বয়সের ডিফারেন্স !

তিন তিনটে চিঠি লিখেছিলুম, পড়লে তো, তবে ?

এত তাড়া কিসের ছিল ?

তোমার জন্যই যে আমি তা কি জানতে না ?

তোমার নামের মেহেন্দি লাগিয়েছি কেন দুহাতের চেটোয় ?

দ্যাখোনি লাভ ব্যাঙ্গলস পরে এসেছিলুম ?

তোমার কাছে এলুমই বা কেন, অ্যাঁ ?

হোয়াই আই ওয়াজ সিইং ইউ উইদাউট সিইং ইউ ফর মোর দ্যান টু ডিকেডস, বলো, বলো?

বলো, বলো, বলো, বলো,বলো, চুপ করে থেকো না, কি কথা নেই কেন ?

প্রথম রক্ত আর প্রথম স্পার্মের বেবি চেয়েছিলুম আমি, জানতে না ? সেক্স নয়, বেবি, তোমার বাচ্চা চেয়েছিলুম, উইদাউট ব্লেমিশ, জানতে না ?

##

এর মতো, ওর মতো, তার মতো, কারো মতো নয় ।

যেন এমন, যেন অমন, যেন তেমন নয় ।

অন্ধকারে, অন্ধকারে, অন্ধকারে, কেননা তোর দেহ থেকে আলো বিচ্ছুরিত হয় ।

বানভাসি, বানভাসি, ভাসিয়ে নিয়ে সাগরে, কূলকিনারাহীন ।

##

তোর অভিব্যক্তির ভেতর যে বার্তা আবিষ্কার করলুম, তা হল, আমি হাতছাড়া হয়ে যেতে পারি ভেবে তুই সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে গেছিস, যেন  কখনও কেউ তোকে আমার কাছ থেকে আলাদা করে দিয়েছিল, আর তাদের কারাগারের কথা চিন্তা করলেই মগজে ছড়িয়ে পড়ছে উষ্মা ।

আমার মুখের কাছে তোর ঠোঁট হুইস্কির গন্ধের কাছাকাছি নিয়ে এলি, একটা উত্তর আপনা থেকে বেরোলো, দুর্গন্ধের স্মৃতি থেকে, প্রথম চুমুতে ছিল ইনটারপ্রেটার-ট্রানস্লেটারের হাঁ-মুখের দুর্গন্ধ, ক্যাণ্ডললাইট শুয়োর খাবার পরিণাম, বললাম, হ্যাঁ, আমি একটা ছোট্ট মেয়েকে চুমু খেয়েছিলাম, বহুকাল আগে তাকে কোলে তুলে, নাকে নাক ঠেকিয়াছিলাম, নাভিতে ফুঁ দিয়ে কাতকুতু দিয়েছিলাম ।

আশ্চর্য, যত দ্রুত রেগে গিয়েছিলি, তত দ্রুত তোর উগ্রতা প্রশমিত হয়ে গেল; ফিরে এলি দ্যুতিময়তায় ।

হাত ধরে শাওয়ারের তলায় টেনে নিয়ে গিয়ে বললি, সরি, তোমার ওপর আর কারো অধিকার, তা আংশিক হলেও, আমি মোটেই বরদাস্ত করব না, যথেষ্ট নিষেধ মাথা পেতে নিয়েছি, আর নয় ।

শান্ত গলায় বললি, জানো কি সাইক্লোনের নাম মেয়েদের নামে হয় ? ক্যাটরিনা, লায়লা, নিলম, হেলেন, নিশা ? আমার নামে আছে তোমার দেয়া সুপার সাইক্লোন ।

টুলের ওপরে গিয়ে বসলাম ; মগজে তখন ভাবনার জেলি তৈরি হয়ে চলেছে, তাহলে কি আমি হেরে গেলাম, তোর সামনে কখনও না গিয়ে তোর ওপরে উল্টে এক কুইন্টালের বাটখারা চাপিয়ে দিয়েছি, যা তুই জীবনে মাথার ওপর থেকে সরাতে পারবি না ? তোকে বড়ো করে তুলে নিজস্ব নারী হিসাবে পেতে চাই বলেই কি এডুকেট এ গার্ল চাইল্ডের আহ্বানে সাড়া দিয়েছিলাম, আমার একজন তরতাজা মানস-ক্রীতদাসীর প্রয়োজন মেটাবার জন্য ?

মুষড়ে পড়লাম ।

তুই বুঝতে পারলি না কেন মুষড়ে পড়েছি, কিন্তু ভাবলি যে তোর কথায় আর বুকে থাবড়ানিতে  অপমানিত আহত হয়ে বাকরুদ্ধ ।

ক্রোধ নয়, তুই ক্ষিপ্ত হয়ে গিয়েছিলি, বজ্রপাত ঘটিয়ে দিলি, এটাই বোধহয় আমাকে টুকরো-টুকরো করে খেয়ে ফেলার আগাম ইশারা । আমাকে বাদ দিলেই যেন তোর সামনে কালো গহ্বর, যেন ওই গহ্বরে তোকে কেউ ঠেলে দিয়েছিল, সেখান থেকে বেরোবার জন্য আমার হাত আঁকড়ে ধরেছিস ।

বললুম না যে তুই অকারণে ক্ষিপ্ত হয়ে গিয়েছিলি । বললুম ঠিকই করেছিস, ক্রোধ ধরে রাখলে ভেতরটা পচতে আরম্ভ করে, দেখেছিস তো অ্যানিমাল প্ল্যানেটে, বাঘিনীর ক্রোধে তার থাবা থেকে নখগুলো বেরিয়ে আসে, শিকারকে ধরার সময়ে আসে, খাবার আয়োজন করার সময়ে আসে । গোরিলারা নিজেদের বুক থাবড়ায়, তুই আমার বুক থাবড়ালি ।

প্রায়শ্চিত্ত করার বা পারস্পরিক দায়মোচনের তরল কন্ঠস্বরে, তুই বললি, ডিয়ার সিলভার-ব্যাক আলফা মেল, এসো, তোমার পায়ের নোংরা ঘষে তুলি, নখে আর পায়ের আঙুলে এতো নোংরা, কখনও কি সাবান লাগাও না ? এত রোজগার করো, স্পাতে গিয়ে পেডিকিওর করালেই তো পারো, কতো স্পা চোখে পড়ল কালকে, এক্সক্লুসিভলি পুরুষদের জন্যে । আমার জন্য তো অনেক কিছু করেছ, এবার না হয় নিজের জন্য করলে

শাওয়ারের তলায় আমাকে জড়িয়ে ধরে তুই আবার কবিতাটার আরেক স্তবক আরম্ভ করলি, বললি, লিসন ইউ লাভিং বাস্টার্ড:

There’s a stake in your fat black heart

And the villagers never liked you

They are dancing and stamping at you.

They always knew it was you

Daddy, daddy, you bastard, I’m through.

#

সাবান মাখাবার সময়ে তুই চেঁচিয়ে উঠলি, ওউ-ওউ-ওউ-ওউ, আইডিয়া ।

আমি জিগ্যেস করলাম, কী, শুনি ? জারজপুরুষ হিসাবে আমার নামকরণ ?

তুই বললি, ধ্যুৎ, আরে নাঃ , চলো, আমার জন্মস্হান সেই আঁস্তাকুড়টা দেখে আসি, ফোটো তুলে নেব, আমি ওখানে বসব, তুমি ফোটো তুলে নিও, যদি নোংরা না হয় তাহলে শুয়ে পড়ব, আর শুয়ে থাকার ফোটো তুলে নিও  ।

দাঁড়িয়ে ফোটো সম্ভব, বসে বা শুয়ে সম্ভব কি না জানি না ; কর্পোরেশানের গাড়ি জঞ্জাল তুলে নিয়ে যাবার পর হয়ত বসতে পারবি ।

নোংরা তো কি হয়েছে, শুয়ে ছিলুম এককালে, কতক্ষণ শুয়েছিলুম কেউ কি জানে ? ফোটো তুলতে তো কয়েক মিনিট ।

আটপৌরে পোশাক আছে কি তোর ? শাড়ি-ব্লাউজ, চুড়িদার ? আঁস্তাকুড়ে বসতে বা শুতে হলে মার্কিন পোশাক তো চলবে না ।

স্ট্রেঞ্জ, না ? আমেরিকায় বহু আফ্রিকান-আমেরিকান গারবেজ ডাম্প থেকে খাবার তুলে খায়, তারা কেউ-কেউ রাতে ড্রাগ ফুঁকে শুয়েও থাকে গার্বেজ ডাম্পে । দেখেছ তো হলিউডের ফিল্মে ?

যাক, সে তুলনায় আমাদের আঁস্তাকুড় বেশি ডেভেলাপড, অনেকের রুজি-রুটির ব্যবস্হা হয়, বাতিল জিনিস  কুড়িয়ে-বাড়িয়ে ।

যাই, দেখি গিয়ে, কবে যাবে ?

ঠিক আছে, চল যাওয়া যাক, সেই কতকাল আগে গিয়েছিলাম, দেখে আসি আরেকবার ।

তুই বললি, আবদারের কন্ঠে, এই প্রথম তোর কন্ঠে ড্যাডের প্রতি মেয়ের কন্ঠস্বর শুনলুম, বললি, চলো না তোমার গ্রামেও একটা ট্রিপ মারি, তোমাদের জমিজমা আছে তো সেখানে ? কোথায় তোমাদের গ্রাম, একটু কানট্রিসাইড ঘুরে নেবো, তোমার জ্ঞাতিদের সঙ্গে তোমার বউয়ের পরিচয় করিয়ে দিতে পারবে ।

আমার বাবা স্কুল টিচার ছিলেন, হুগলি জেলার আরামবাগে, মাধবপুর গ্রামে জমিজমা ছিল । সম্পত্তি নিয়ে কখনও ভাবনা-চিন্তা করেননি বাবা-কাকারা ; অনেক জমি ছিল, সবই বেদখল হয়ে গেছে, বাবা রাজনীতি করতেন না, হাতছাড়া জমিজমা আর ফেরত পাননি । কাকারা বাবার আগেই গ্রাম ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন, কোথায় ওনারা থাকেন, খুড়তুতো ভাইবোনরা কে কোথায়, তাও জানি না ।

আমি আইএএস হবার পর মা-বাবাকে নিজের সঙ্গে নিয়ে ঘুরেছি প্রতিটি পোস্টিঙে; আমরা আর ওমুখো হইনি কখনও ।

তুই বললি, তোমার বাবা অমন সাধাসিধে মানুষ ছিলেন বলে তুমি এরকম নিষ্ক্রিয় টাইপের হয়েছ, প্রিহিসটরিক মরালিটির মানুষ, বর্তমান ভারতবর্ষের অনুপযুক্ত । আন্টিমা বলেন যে একটা ফ্ল্যাটও কিনে রাখতে পারোনি প্রভঞ্জন প্রধান, এমনই ফুলিশ।

আমি তোকে জিগ্যেস করলাম, কি করে সন্দেহ করলি যে তোর জীবনের আড়ালে আমি আছি ? আর আমি তোকে সাড্ডল্য সুন্দরী করে তুলছি একদিন তোকে পাবো বলে ? আমার ডারলিং ডটার গ্রোইং আপ ফর মি !

তুই বললি, ক্লুটা পেয়েছিলি  কবিতার লাইন থেকে, “আই টক টু গড বাট দি স্কাই ইজ এম্পটি।” তারপর আমার গা তোয়ালে দিয়ে পুঁছতে-পুঁছতে বললি, আমি লেগহর্ন মুর্গি তো, তুমি একদিন যে খাবে আমাকে তা জানতুম ।

আর তুই ?

রয়াল বেঙ্গল টাইগ্রেস, টুঁটি ধরে ঝুলিয়ে জঙ্গলের ভেতরে নিয়ে গিয়ে খাবার পরিকল্পনা চালিয়ে গেছি, ঘ্র্যাঁওওওওও । কাল অফিস যাবার সময়ে সরোজিনি নগর মার্কেটে ড্রপ করে দিও, কটা দরকারি জামাকাপড় কিনে নেবো ।

সরোজিনি নগর মার্কেটে পৌঁছে তোর নজরে পড়ল এক প্রৌঢ় দম্পতি, বললি, পাল্কি ফ্যামিলি, চেনো না বোধহয় । ওনাদের মুখের ভেতর সদাসর্বদা পাঁকের ল্যাণ্ডস্লাইড চলতে থাকে, সাবধান না হলেই ডুববে সেই পাঁকে ।

পাল্কি ?

মিস্টার পাল আর মিসেস পাল, এত গুলগল্প ঝাড়েন যে ওনাদের আরিয়ান নাম দিয়েছে পাল্কি, লিপিকা-কিরণশঙ্কর থেকে খামচে তোলা ; দুজনেই বুদ্ধি আর কল্পনায় দেউলিয়া । ওই যে এদিকেই আসছেন, তুমি চেনো না, কাচ তুলে দাও, কাচ তুলে দাও, শিগগির, শিগগির, দেখে ফেললেই কেলেঙ্কারি ।

গেছেন ওনারা, তোর ভয় পাবার কারণ বুঝতে পারলাম না, আমি যখন তোকে অ্যাকসেপ্ট করে নিয়েছি, তখন যার যা ইচ্ছা হয় বলুক, কিচ্ছু এসে যায় না ।

ও তুমি বুঝবে না, ওনারা আমাকে তোমার সঙ্গে দেখে ফেললে ভিষণ বিপদ হতো ।

এখন যা, কি-কি কিনবি কিনে নে । তুই ওই গাছটার তলায় দাড়িয়ে থাকিস, আমার ড্রাইভার আমাকে পৌঁছে তোকে পিক আপ করে নেবে । তোদের বাড়ি যেতে চাস তো গুড়গাঁও হয়ে আয়, বৈদেহী আছে; জগদীশ-অমরিন্দর তো চণ্ডীগড়ে । নয়তো কলকাতা থেকে ফিরে তারপর যাস ।

যাবো’খন, তাড়া নেই, তোমার সঙ্গে তো তিনমাস কাটাবো, তোমার বিছানার চাদর থেকে মেমেন্টোটা কেটে রেখে নিয়ে চাদরটা  তোমার আলমারিতে ঢুকিয়ে রেখে দিয়েছি, তোমার সংরক্ষণের মেমেন্টো হিসাবে ; একটা নীল ফুলফুল বেডশিট বিছিয়ে দিয়েছি, রাতে আকাশে বিচরণ করব ।

##

স্পর্শের মর্মার্থ, মর্মার্থের রসায়ণ, রসায়নের সম্পর্কে, রেণু, পরাগ, উড়াল, জীবন ।

চাউনির কোলাহল, উতরোল শ্বাস ।

##

এর মতো, ওর মতো, তার মতো, কারো মতো নয় ।

যেন এমন, যেন অমন, যেন তেমন নয় ।

##

 

রাত দুটো নাগাদ ঘুম ভেঙে গেল । উঠে, তোর দেহের পাশে বসে, নাইটল্যাম্পের ফিকে নীল আলোয়, দেখছি , চিৎ হয়ে ঘুমোচ্ছিস, নেকেড । আমি তো পায়জামা বা শর্টস না পরে ঘুমোতে পারি না ।

তোর ভুরু দেখছি, সরু করিয়েছিস । ভ্রুযুগল, ভ্রুযুগল ।

তোর দুজোড়া ঘুমন্ত চোখ দেখছি, আইলাইনার বোধহয় স্মাজফ্রি, রয়েছে এখনও, পাতার তলায় ।

তোর চোখের পাতা দেখছি । সত্যিকার পক্ষ্ম, পক্ষ্ম, পক্ষ্ম । চাপা দিয়ে রেখেছিস, স্বপ্ন, স্বপ্ন ।

তোর নাকের পাটা দেখছি, নাকছাবির দাগ রয়েছে, পরতিস হয়তো শখ করে ।

তোর কান দেখছি, মাকড়ি খুলে রেখে দিয়েছিস ।

তোর ঠোঁট দেখছি, স্নানের পর আর লিপ্সটিক লাগাসনি । ওষ্ঠ, অধর, ওষ্ঠ, অধর ।

তোর কোঁকড়া চুল দেখছি, আঁচড়াসনি মনে হল ।

তোর গলা দেখছি, বেশ লম্বা, ঢ্যাঙাদের গলা বোধহয় এরকমই হয় ।

তোর বুক দেখছি, শ্বাস নিচ্ছিস, আলতো উঠছে-নামছে ।

তোর শরীরের গন্ধ নিলাম ঝুঁকে, শোবার আগে পারফিউম মেখেছিস ।

দেখছি, মানুষীর মাংসল নির্যাস, নীলতিমিরে আচ্ছন্ন প্রতিমা, সেই কবেকার শিশু,  যাকে ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগ করছি, চিন্তা করা বন্ধ করে নিজেকে ছেড়ে দিয়েছি ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের দখলে, উদ্বেল হয়ে উঠছি । প্রেম করার সময়ে এভাবে চোখ বন্ধ রাখিস না কেন যাতে তোকে ভালোভাবে দেখে নিতে পারি, তখন তো হাসিস, কবিতার লাইন বলিস, গানের কলি গেয়ে উঠিস, মাংসের সঙ্গে মাংসের সম্পর্ককে চরমে নিয়ে যাবার নিজস্ব পদ্ধতি আবিষ্কার করে ফেলেছিস নাকি ?

বাস্তবকে অবাস্তব করে দিচ্ছিস, তোর জাদুতে আবিষ্ট হই । ঘুমও প্রেমের স্ফূরণ ঘটিয়ে দিল, ঘুমন্ত শরীরও ভালোবাসার জ্যোতি বিকিরণ করতে পারে । কত কিছু জানা ছিল না, তুই এলি, জানতে পারছি ।

##

ইচ্ছে হল তোর গলা টিপে ধরি, মেরে ফেলি তোকে, যাতে তুই আমাকে ছেড়ে চলে না যাস ।

তোর দেহের দিকে হাত নামালাম, গলায় নয়, বগলের পাশ দিয়ে দুহাতে তুলে নিলাম তোর ঘুমন্ত শরীর, ঘুমের ঘোরে বললি, আই লাভ ইউ ব্রো-প্রো, আমি অন্যের ভূমিকায় অভিনয় করছি না, আমি রক্তমাংসের জেনুইন প্রেমিকা ।

অনেকসময়ে তোকে প্রশ্ন করলে কেন চুপ করে থাকিস, তক্ষুনি উত্তর দিস না, কিসের ইঙ্গিত দিস অমন করে, নাকি নিজের মস্তিষ্কে কোনো উত্তর গড়ে ওঠে না ।

স্বপ্ন দেখছিস, দ্যাখ, দেখে নে স্বপ্নসংকটের স্বপ্ন, ঘুম ভাঙাবো না ।

আলতো শুইয়ে দিলাম তোকে ।

 

 

তিন

তোর আবদার ছিল আমরা ফার্স্ট ক্লাস এসির একটা ক্যুপে রিজার্ভ করে ট্রেনের চাকার তালে-তালে প্রেম করতে করতে যাই, তাতা ধিন না, তাতা ধিন না, দ্রিদিম দ্রিদিম দ্রিদিম দ্রিদিম ব্রিজের ওপর দিয়ে, প্লিজ প্লিজ প্লিজ প্লিজ ।

তা সম্ভব ছিল না, আমার পক্ষে অতদিন ছুটি কাটানো অসম্ভব, জানাজানি হলে ঘুষখোর অফিসাররা টানাহেঁচড়া করবে ; তারা ওৎ পেতে আছে বহুকাল যাবত ।

আমি আমার ক্রেডিট কার্ড দিয়ে দুটো এয়ার টিকিট কাটলাম, মিস্টার প্রভঞ্জন প্রধান, মিসেস নেতি প্রধান, দমদমের, ভোরের ফ্লাইট ।

আট নম্বর রোতে সিট বেল্ট বাঁধতে বাঁধতে তুই বললি, ড্যাড, প্লেনটা যদি ক্রাশ করার মতো হয়, আমি তোমাকে জড়িয়ে ধরব, তুমিও তক্ষুনি জড়িয়ে ধোরো আমায় ।

ছি ছি, কি বলছ গো, যাত্রা আরম্ভ হবে, এখন ওসব কি অলুক্ষুনে কথা । পেছন ফিরে দেখলাম, রিমলেস  বৃদ্ধা । আমি পেছন ফিরেছি দেখে বললেন, আপনার মেয়েকে যথাযথ শিক্ষাদীক্ষা দেননি, এতগুলো মানুষ, আপনার মেয়ে চাইছেন সবাই এক সঙ্গে মরি ।

উনি আমার মেয়ে নন, স্ত্রী ।

পেছন থেকে ফিসফিসগুলো ভেসে আসতে লাগল ।

ফাঁসিয়েছে মালদার আসামী।

না, তেমন বুড়ো নয় লোকটা, বেশ স্মার্ট, পঁয়তাল্লিশ হবে মনে হয় ।

মেয়েটা তো তার অর্ধেক, দেখছিস না, তাও আধুনিকা, খাঁজ দেখা যাচ্ছে ।

বাপের সঙ্গে বেরোলেও মেয়েরা খাঁজ দেখায়, খাঁজ তো আর বাপকে দেখাচ্ছে না, পাবলিককে দেখাচ্ছে; নতুন কি এতে ?

আমি তো বলব লোকটা টাকার টোপ দেখিয়েছিল, মেয়েটা তো কম স্মার্ট নয়, সুশ্রী ।

ম্যাট্রিমোনিয়াল ডট কমে দিয়েছিল হয়ত, সেখান থেকে খুঁটে তুলেছে রে ।

দুটোই ডিভোর্সি হবে বোধহয় ।

ঘাটে-ঘাটে জল খেতে গিয়ে নদীকূলে পরিচয় ।

মেয়েটা ভাবছে ক্র্যাশ হলে ও বেঁচে যাবে আর আমরা সবাই থেঁতলে ছড়িয়ে থাকব সর্ষের খেতে ।

হ্যাঁ, গায়ে পড়া টাইপের, হাই-হ্যালো করেছে, ক্যান্ডললাইট ডিনার খেয়েছে, ডিসকোয় নেচেছে, আর ব্যাস, আঙটি বদল আর লেংটি দখল ।

আমি পেছন ফিরে বলতে চাইছিলাম, না সেসব কিছুই হয়নি, নেতি আমার হাত চেপে বলল, দাও না বলতে, এনজয় করছি, আলোচনার পাত্রী হয়ে উঠেছি, ল্যাজটা না হয় খানিক মোটা হল, বাজেট এয়ারলাইন্সে চাপার এটাই প্লাস পয়েন্ট ; অন্য এয়ারলাইন্সে গেলে বিজনেস ক্লাসে সবাই মুখ গোমড়া করে দার্শনিক সেজে থাকে, বাঞ্চ অফ ওল্ড হ্যাগার্ডস, যেন আইনস্টাইনের পেট থেকে জন্মেছে ।

ফিসফিস বিরক্তিকর হয়ে উঠছিল, পেছন ফিরে বললাম, আমি সাতচল্লিশ আর উনি চব্বিশ, প্রেম করে বিয়ে করেছি । উনি আমেরিকা থেকে আমাকে বিয়ে করার জন্য এসেছেন ।

তা উনি আপনাকে ড্যাড বলছিলেন যে, একজনের যুক্তিপূর্ণ প্রশ্ন ।

উত্তরটা তুইই দিলি, আমেরিকায় এই কিছুকাল আগে অব্দি হাজব্যাণ্ড আর প্রেমিককে মেয়েরা বেবি বলে ডাকত, এখন বেবি পুরোনো হয়ে গেছে, ড্যাডি বলে ডাকা হয়, আদর করে ডাকতে হলে ব্যাড ড্যাড, শোনেননি সেই গানটা, ব্যাড ড্যাড, ডোন্ট ফিল স্যাড, ইউ আর এ ল্যাড, লে মি ওন ইওর প্যাড, স্নুপি বিচের গাওয়া ?

##

 

এলোচুলে ঢাকা রাজকন্যার মুকুটের ঝিলিক থেকে গানের টুকরো ।

কিছুটা অপরিচিত থাকার আহ্লাদ ।

##

এয়ারপোর্টের কাছের হোটেলে বাক্স-ব্যাগ রেখে তোকে পাশে বসিয়ে বাঁশদ্রোণী বাজারের দিকে চললাম, হোটেলের নির্ধারিত গাড়িতে । তুই চুড়িদার পরে নিয়েছিস ;  বাচ্চাদের মতো চারিদিকে মাথা ঘুরছে তোর । গাড়ির ভেতর থেকে স্মার্টফোনে ছবি তুলছিস, ডাবের ঠেলা, মিনিবাস, রাজনৈতিক দলের ছেঁড়া পোস্টার, মোড়ের হিজড়ে, রাস্তা পেরোনো অলস ভিড়, যা  তোকে অবাক করছিল, তারই ।

একটাও আঁস্তাকুড় দেখলুম না এখনও, বললি ।

সমবেদনার মুচকি ঠোঁটে খেলিয়ে, ড্রাইভার বলল, আঁস্তাকুড়ের ফোটো তুলবেন নাকি, দিদি । একটু অপেক্ষা করুন, সকাল এদেশে কুঁড়ে-স্বভাবের, সূর্য একটু জোর পাক গায়েগতরে, দেখতে পাবেন ।

তুই উত্তর দেয়া দরকার মনে করলি না , ঘাড় নাড়াটা সন্মতিসূচক কিনা বুঝতে পারলাম না।

আচমকা উচ্ছ্বসিত, বললি, এটা আমার দেশ, ওই বউটা কি বাচ্চা-ফেলে দেয়া মা, আরে ওই লোকটা আমার মতন ঢ্যাঙা, ও নিশ্চয়ই ফেলে দেয়া বাচ্চার বাবা, নাঃ, রাসকেলটা  বুড়ো হয়ে গিয়ে থাকবে, কিংবা নরকে গিয়ে গরম তেলে ঝলসে মরছে । কে জানে, মুসলমানও হতে পারে, মুসলমানরা বেশ লম্বা-চওড়া হয়, তা যদি হয় তাহলে জাহান্নমে অপেক্ষা করছে কয়ামতের জন্য ।

বেশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে উঠলি, যতই যাই হোক, আঁস্তাকুড়ে জন্মে থাকি বা না থাকি,  এটা আমার মাতৃভূমি, আই লাভ ইট।

তোকে চিমটি কাটতে হল, ড্রাইভার তো আমেরিকা বা গুড়গাঁওয়ের নয়, যে বাংলা বুঝতে পারবে না!

তোর মুখের দিকে তাকিয়ে বললাম, মাতৃভূমি মানুষকে মূর্খ করে তোলে, আবেগের গাধা বানায় ; মাতৃভূমির প্রেমে পড়ে রাশিয়ানরা কার্ল মার্কসকে বদনাম করে দিলে । শুনেছিস তো মার্কসের নাম ।

শুনেছি, শুনেছি, দাড়িগোঁপ ছিল, তোর কন্ঠস্বরে অন্য চিন্তাকে বিপথগামী করে দেবার অভিযোগ ।

ড্রাইভার শুনছিল তোর কথা, বলল, দিদি, মাতৃভূমি আর নেই, এখন যে দল সরকার চালায় সেই দলকে ভালোবাসতে হয় । দেশটাকে তো সবাই মিলে  আঁস্তাকুড় বানিয়ে ফেলেছে । যে লোক নেতা হয়, সে মনে করে সে-ই বুঝি সরকার, তার হুকুম সবাইকে মানতে হবে, নইলেই কেলেঙ্কারি, খুনোখুনি, মাটির তলায় হাড়পাঁজর, ছেলেপুলে কাঁখে গ্রাম ছেড়ে পালাতে হবে ।

তুই বললি, কী যে বলছেন, সরকার আর মাতৃভূমি তো এক নয় ।

এখন লোকে মাতৃভূমির জন্য জান দেয় না গো দিদি, দলের জন্য দেয়, শহিদ হয়, যারা মরে আর যারা মারে, সবাই তা দলের জন্য করে, মাতৃভূমির জন্য নয়, বলল ড্রাইভার , নিজের মাকেই বুড়ো বয়সে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দ্যায়, আর আপনি মাতৃভূমির কথা বলছেন । এই তো সেদিন পড়লুম,  মাকে খুন করে তার সম্পত্তি হাতিয়েছে চার ছেলে ষড়যন্ত্র করে, মুখে অ্যাসিড ঢেলে তারপর পুড়িয়ে মেরে ফেলেছিল, যাতে পুলিশ চিনতে না পারে ।

যাক, ড্রাইভারটা অন্তত তোকে চুপ করিয়ে দিতে পারল, নয়তো কি-কি বকে যেতিস মাথামুণ্ডু ।

নাঃ, তুই দমবার নয়, আবার আরম্ভ করলি কিছুক্ষণ চুপ থেকে, ওরা সব প্যারানয়েড, বুঝলেন, পশ্চিমবাংলা হল আমার আর আপনার, আমাদের, আমি নলেন গুড়ের সন্দেশ ভালোবাসি, পাটালি গুড়, পাটি সাপটা, জামদানি শাড়ি, দুর্গাপুজো, সরস্বতী পুজোর অঞ্জলি, রবীন্দ্রসঙ্গীত, ভাপা ইলিশ, ট্যাংরা মাছের ঝোল, শিষপালঙের চচ্চড়ি, চালতার অম্বল, আমার চাষি-ড্যাডিকে ভালোবাসি, এইগুলোতে কি পশ্চিমবাংলা নেই ?

এবার ড্রাইভার যা বলল, তাতে তুই একেবারে চুপ করে গেলি, জিগ্যেস করল, আপনি কোথায় থাকেন?

তুই বললি, আমেরিকা, আর সামনের আয়নায় দেখতে পেলি ড্রাইভারের ঠোঁটে মৃদু শ্লেষের হাসি ।

হঠাৎ বলে উঠলি, আচ্ছা, জোনাকি কোথায় দেখতে পাবো ? আমি আজ অব্দি জোনাকি দেখিনি ।

ড্রাইভার এবারে তোকে বিপদে ফেলল ওর অনুসন্ধিৎসা প্রয়োগ করে, দিদি, কোথায় জন্মেছেন, পশ্চিমবাংলায় কোথায়, যে জোনাকি দেখতে চাইছেন ?

আঁস্তাকুড়ে, বললি তুই ।

ড্রাইভার ভাবল ঠাট্টা করছিস, আমাকে জিগ্যেস করল, স্যার কোথাকার লোক আপনারা, আপনার মেয়ে এখনও পশ্চিমবাংলা দেখেননি ?

উনি আমার মেয়ে নন, আমার স্ত্রী, বললুম, তারপর যোগ করলুম, তুমি আমাদের যেখানে নিয়ে যাচ্ছ, বাঁশদ্রোণী বাজার, সেই বাজারের বাইরে জঞ্জাল ফেলার যে আঁস্তাকুড় আছে, সেখানে এনাকে ফেলে গিয়েছিলেন এনার বাবা কিংবা মা, তখন এনার কয়েকদিন মাত্র বয়স, তারপর স্হানীয় ক্লাব, যাদবপুর থানা, হাসপাতাল, স্হানীয় এনজিও  হয়ে ইনি দিল্লির জনসেবামূলক এক সংস্হায় পৌঁছোন, একটি বাঙালি পরিবারে পড়াশুনা করে আমেরিকায় বড়ো চাকরি করছেন ; ওনার সঙ্গে আমার পরিচয় দিল্লিতে ।

দিদি, আপনাকে দেখে বাংলা ফিলিমের  নায়িকা মনে হয়েছিল, এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না যে ঘটনাটা সত্যি ।

তুই বললি, গ্রেট, সিনেমা হলে বসে বাংলা ফিল্ম জীবনে দেখিনি, একটা ফিল্মও দেখব ড্যাড । হিরোরা কি বলিউডের মতন মারামারি করে ? নাচে ? ঝিনচাক ঝিনচাক ? আইটেম ডান্স হয় ? বিড়ি জালাইলে ? ঝাণ্ডুবাম ? বেবি ডল ম্যায় সোনে দি হয় ?

ড্রাইভার বলল, সব শিল্প পশ্চিমবাংলা ছেড়ে চলে যাচ্ছে ।

শিল্প আবার চলে যাবে কেন, কোটি-কোটি টাকায় আজকাল বাঙালি শিল্পীদের পেইনটিং বিক্রি হচ্ছে ; যারা আর্টিস্ট নয় তাদের পেইনটিংও অনেক দামে বিক্রি হচ্ছে, পশ্চিমবাংলার আর্ট জগদ্বিখ্যাত ।

আর্টের কথা বলছে না, বলছে কলকারখানার কথা, ইনডাসট্রির কথা । আমি বললুম ।

ইনডাসট্রিকে আর্ট মনে করা ভুল, মনে হবে রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে কলকারখানা বসিয়ে গেছেন ।

তাই করলেই ভালো হতো দিদি, ড্রাইভার বলল ।

তুই বললি, এখন তো তাই মনে হয় ; শান্তিনিকেতনে যাবার কথা ভাবি , এবার হবে না ।  রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করব ।

রবীন্দ্রনাথ বহুকাল আগে মারা গেছেন, বললাম আমি ।

মারা গেলেই বা, মারা গেলেই তো আর মানুষ মরে যায় না, আমি শান্তিনিকেতনে গেলে রবীন্দ্রনাথের অবশ্যই দেখা পাবো ; জোড়াসাঁকোয় গিয়ে রবীন্দ্রনাথের পরিবারের সবাই কে কেমন আছেন খোঁজ নেবো। দক্ষিণেশ্বরে গিয়ে রামকৃষ্ণদেব আর স্বামী বিবেকানন্দর সঙ্গে দেখা করব । সুভাষচন্দ্র বসু তো বাড়ি ফেরেননি, নয়তো ওনার সঙ্গেও দেখা করতুম । লোকে বোধগয়ায় যায় কেন ? গৌতমবুদ্ধের সঙ্গে কথা বলবে বলে, ওওওওউউউম মণিপদ্মে হুমমমমমম ।

তুই ইনকরিজিবল, বললাম গলার স্বর নামিয়ে ।

##

এর মতো, ওর মতো, তার মতো, কারো মতো নয় ।

যেন এমন, যেন অমন, যেন তেমন নয় ।

##

বাঁশদ্রোণী বাজারের কাছে পৌঁছে ড্রাইভার বলল, এখানে পার্কিং নেই, আপনারা যা কেনাকাটা বা দরকারি কাজ সেরে আমায় ফোন করে দেবেন, এসে যাবো, দেখি কোথায় গাড়ি পার্ক করা যায় ।

গাড়ি থেকে নামলি, সামনেই সেই জঞ্জালের ভ্যাট বা আঁস্তাকুড়, তুই একেবারে কাছে গিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিস, তোর মায়ের স্মৃতি টিকে আছে কিনা, হয়তো সেকথাই ভাবছিস, কিংবা কি করে এরকম নোংরা জায়গায় পড়ে থেকেও বেঁচে রইলি ।

আমি দাঁড়িয়ে রইলাম দূরে, যাতে তুই নিজের সঙ্গে কথা বলতে পারিস, বোঝাপড়া করতে পারিস । ফোটো তুলছিস না কেন, বলেছিলিস ফোটো তুলবি, মনে করিয়ে দেব কিনা ভাবছিলাম, তখনই তুই আঁস্তাকুড়ের ভেতরে ঢুকে পচা সবজি, ছাই, মাছের আঁশপোঁটার ওপর চিৎ হয়ে শুয়ে পড়লি, নানা ভঙ্গীতে একের পর এক সেলফি তুলতে লাগলি, আর লোক জড়ো করে ফেললি ; আমি দৌড়োলাম তোর দিকে, পরিস্হিতি সামলাবার জন্য ।

হাত ধরে তোকে টেনে তুলতে যাব, তুই বললি, আমি চিৎ হয়ে, পাশ ফিরে, নানা পোজে শুচ্ছি, তুমি ফোটো তুলে নাও তো ।

তুই পোজ দিতে লাগলি, আমি ক্লিক করতে লাগলুম । হলুদ রঙের কুর্তার ওপর সবুজ ফুল, সবুজ চুড়িদার, ওড়না নেই ।

যখন উঠে দাঁড়ালি, ঠাকুমার ঝুলি বইয়ের গাছপাতা-চরিত্র, তোর পোশাকে  ডাস্টবিনের নোংরা জঞ্জাল জেঁকে বসেছে, মাছের আঁশ ঝরছে ।

দুহাত দুপাশে ছড়িয়ে বললি, এই দ্যাখো, জঞ্জালমাতা হয়ে গেছি, বিশ্বসুন্দরী প্যাজেন্টে চললুম ।

কোনো প্রতিযোগীতা আছে কি ম্যাডাম, আঁস্তাকুড়ে সেলফি নেবার ? জানতে চাইল এক পথচারী ।

অনেক ভালো সেলফি উঠত, আপনার কাছে যদি সেলফি স্টিক থাকত, বলল একজন যুবতী, থলে থেকে লাউ, পালং শাকের আঁটি, সজনে ডাঁটা  বেরিয়ে রয়েছে ।

আরেকজন জানতে চাইল, কিসের বিজ্ঞাপনের মডেলিং করছেন ম্যাম, হার্বাল প্রডাক্টের ? দেখিনি তো আগে  আপনাকে টিভিতে বা কাগজে ।

চব্বিশ বছর আগে ওনার মা বা বাবা ওনাকে এই আঁস্তাকুড়ে ফেলে চলে গিয়েছিলেন, বললাম আমি, অগত্যা  ।

ভিড়ের মেজাজ বোঝা বেশ কঠিন, কখন কোন দিকে মোড় নেবে বলা যায় না । তোর বাহু ধরে একটু এগিয়ে ড্রাইভারটাকে ফোনে ডাকলাম । তোকে বললাম, কি করলি কি, এখন এগুলো পালটাবি কি করে?  ইনফেকশান হয়ে যাবে ।

হাত ছাড়িয়ে নিয়ে তুই বললি, কিছুই হবে না, দেখে নিও, আমি জঞ্জালপ্রুফ, লাথিপ্রুফ, ঘেন্নাপ্রুফ, গলাধাক্কাপ্রুফ, নয়তো বাঁচতুম না, তখনই মরে যেতুম । তোমার কি মনে হয় জীবনে ধাক্কা খাইনি ? শুনলে তোমার মাথায় রক্ত উঠে যাবে ।

একটি লোক আমাদের পেছু নিয়েছিল, বলল, স্যার, আমাদের দোকানে ওনার মাপের চুড়িদার আছে, পোশাক পালটাবার ঘরও আছে ।

দারুণ তো, বলে লোকটার সঙ্গী হলি তুই, আমি পেছন-পেছন, ড্রাইভারকে বললাম, এক্ষুনি আসতে হবে না, একটু পরে এসো ।

লাল রঙের কুর্তা কিনলি, তাতে কালো ডোরা লম্বালম্বি, চুড়িদারও লাল । তোকে ঘিরে থাকা ভিড়ে দশ-বারো বছরের একটা ছেলে তোর মুখের দিকে বিস্ময়ে তাকিয়েছিল, তুই তাকে নোংরা পোশাকের প্যাকেটটা দিয়ে বললি, খোকাবাবু, এটা ওই আঁস্তাকুড়ে ফেলে এসো তো ।

ছেলেটি বলল, আমার নাম খোকাবাবু নয় ।

তুই বললি, আচ্ছা নবীনকিশোর, ফেলে এসোতো এটা ।

ছেলেটি : আপনি কি করে জানলেন আমার নাম নবীনকিশোর ?

তুই : তোমার গোল মুখ দেখে ; যাদের মুখ গোল হয়, তাদের নাম সাধারণত নবীনকিশোর হয় ।

বৃদ্ধ কেশিয়ার টাকা গুণতে-গুণতে বলল,  শুনলাম আপনাকে আঁস্তাকুড়ে পাওয়া গিয়েছিল, আমি জানি ব্যাপারটা, অষ্টম সন্তানকে ত্যাগ করার ঘটনা, হইচই হয়েছিল বেশ । শান্তনুর বাচ্চাদের গঙ্গাদেবী জলে ভাসিয়ে দিতেন, গল্প শুনেছেন তো ? শেষে অষ্টম সন্তানকে ভাসাতে গেলে শান্তনু বাধা দিয়েছিলেন, সেই অষ্টম সন্তান ছিলেন মহাভারতের ভীষ্ম ; কত কষ্ট ভোগ করতে হয়েছিল ওনাকে, বিয়ে করতে পারেননি, সংসার করতে পারেননি ।

তুই আমার দিকে তাকিয়ে বললি, ভাগ্য ভালো যে জোর করে দখল করে নিয়েছি পছন্দের লোকটাকে।               গেঞ্জি কিনছিল এক প্রৌঢ়, বলল, ভাদ্রমাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টম তিথিতে মথুরার রাজপরিবারে বাসুদেব আর দেবকীর অষ্টম পুত্র হয়ে জন্মেছিলেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ, জানেন কি ?

তুই বললি, গল্পটা জানি, অষ্টম গর্ভের কথা জানতুম না, জানা ছিল না, শ্রীকৃষ্ণের চেয়ে যেমন বয়সে অনেক বড়ো ছিলেন ওনার প্রেমিকা রাধা, তেমনি আমার আর আমার শ্রীকৃষ্ণের বয়সের পার্থক্য ; আমি ওনার এলেকট্রারাধা । আমার দিকে তাকিয়ে তোর উক্তি, কি ঠিক বলেছি না, ড্যাড ?

বৃদ্ধ বলল, আমরা শুনেছিলাম সেই বাচ্চাকে কোনো বিদেশি কোল নিয়েছে । নিচের তলায় যান, মাছের বাজারে, অনন্ত নামে একজন মাছ বিক্রি করে, ওর কুটুমের গ্রামের ঘটনা, অবশ্য অনন্ত তখন ছোটো ছিল, গ্রামের এবং পরিবারের তো হালহদিশ দিতে পারবে ।

শুনেই তুই দৌড়োলি নিচে, মাছের বাজারে, ঢুকেই চেঁচালি, অনন্ত, অনন্ত কে, আপনাদের মধ্যে কার নাম অনন্ত ?

আঁশবঁটিতে ধড় থেকে তিন কেজি রুইয়ের মুড়ো আলাদা করছিল, লুঙ্গি-পরা মাঝবয়সী মাছবিক্রেতা, সে বলল, আমিই অনন্ত, বলুন, কবেকার অর্ডার, যত ওজনের চাইবেন এনে দেবো, বিয়ের সিজন, দিন পাঁচেক আগে অর্ডার দিতে হবে ।

আমাদের পেছনে যারা জড়ো হয়েছিল, তাদের একজন বলল, উনি তোমার কুটুমের গ্রামে যাবেন, তোমার কোন এক জ্ঞাতি তার অষ্টম মেয়েকে ফেলে গিয়েছিল বাজারের জঞ্জাল ফেলার জায়গায়, সেই যে কত থানা-পুলিশ কাগজ-কিচাইন হয়েছিল, তারপর যাদের বাচ্চা তারা ধরা পড়ার পর বললে যে, না, তাদের নয়, মনে নেই ? কত কচাল করেছিল লোকেরা । উনি বলছেন যে উনিই সেই বাচ্চা ।

লুঙ্গিতে হাত পুঁছে উঠে দাঁড়াল চশমা-পরা তেলালো টেরিকাটা অনন্ত, যেন মাছেদের নিশিডাক দিয়ে জালে তুলতে চলেছে । বাকরহিত বলতে যা বোঝায় । বসল, কাৎ করে রাখল মেগাসাইজ বঁটি । বলল, আজকে হবে না দিদি, আজকে আমার ছেলে আসতে পারেনি, আপনি কালকে ভোরবেলা আসুন, ভোর-ভোর না বেরোলে  ফিরতে অনেক রাত হয়ে যাবে আপনাদের, দিনকাল ভালো নয় জানেনই তো । গ্রামর নাম লক্ষ্মীপুর, ঈশ্বরপুরের কাছে, জীবনপুরে যাবার পথে, রাজপুর-সোনারপুর বা বারুইপুর হয়ে যেতে হবে । আজকে আপনি ক্লাবে হয়ে আসুন বরং, ওনারাই আপনাকে থানায় নিয়ে গিয়েছিলেন ।

তুই : ঈশ্বরপুর, জীবনপুর, লক্ষ্মীপুর, বাঃ, পারফেক্ট নাম, গডলি-গডলি । ঠিক এই কথাই রইল তাহলে, কাল সকাল সাতটায় এসে যাবো, গাড়ি ভাড়া নিয়েই আসব, আমার বরের সঙ্গে ।

অনন্ত : বিয়েও হয়ে গেছে আপনার ? বর পক্ষ ব্যাপারটা জানে ?

তুই : ওই তো আমার সুপুরুষ বর দাঁড়িয়ে আছেন ।

অনন্ত : বড়লোক বর পেয়েছেন দিদি, কি ভাগ্যি আপনার । গিয়ে আপনার বোনেদের দেখবেন, দু-বেলা খেতে পায় না, সবায়ের অ্যাণ্ডাগ্যাণ্ডা  ছেলে-মেয়ে ।

তুই : বোন ? কতগুলো বোন ? জিগ্যেস করে আমার দিকে ফিরে জয়ের হাসি খেলালি ঠোঁটে ।

অনন্ত : আপনি অষ্টম গর্ভের সন্তান তো, আপনার আগে আরো সাত বোন, সবাই হয়তো বেঁচেবর্তে নেই, কারা আছে কারা নেই বিশেষ জানি না গো, ছেলেপুলেরা থাকবে । দশ-বারো বছর হয়ে গেল ওমুখো হইনি । ছেলে হয়েছিল ওদের,  আপনার পর, শুনেছি, সেই ছেলে বিয়োতে গিয়ে আপনার মা মরে গিসলো । কি করবে বলুন, খাওয়াতে পারে না, বাচ্চা বিইয়ে চলেছে, গেল শেষে সগগে ।

তুই : বিইয়ে চলেছে, শুনতে কতো ভালো লাগে, তাই না ? অষ্টম গর্ভ ? এইটথ চাইল্ড ! হুউউউশ ওয়ান, হুউউউশ টু, হুউউউশ থ্রি, হুউউউশ ফোর, এই করে আটবার । ঈশ্বরপুরের মেয়ে, যেতেই হবে, আপনি রেডি থাকবেন, আমরা সাতটায় পোঁছোচ্ছি।

বিশাল ভেটকি কেটে খদ্দেরের জন্য ফিলে বানাচ্ছিল যে, সে বলল, কিন্তু ক্লাব তো এখুন তৃণমূল নিয়ে নিয়েচে ।

শিঙিমাগুর বিক্রেতা : আরে ঘেঁচুবাবু সিপিএম ছেড়ে তৃণমূলে চলে গেচেন, ফুটানিবাবুও ওনার পেচন পেচন গেচেন, ভালোবাবু তো তৃণমূলের কি একটা পুরস্কারও পেলেন, ওনার হ্যাদানে ফোটো আছে ক্লাবঘরে, দুহাতে সেই কেঠো তকতিখানা ধরে আচেন, মুচকি হাসিতে গুটকা-দেঁতো ফোকলা ঢেকে ।

ভেটকি : তখুন তো অ্যামবুলেন্স পায়নি ওঁয়ারা, চাঁদুচৈতনের বউ রিকশায় চেপে আপনাকে কোলে করে থানায় নিয়ে গিসলো ।

রুই : চাঁদুচৈতনকে পাবো কি ক্লাবঘরে ?

শিঙি : না ওনারা দুজনেই গত হয়েছেন ।

তুই : ক্লাবটা কোথায় ?

কুচোমাছ বিক্রেতা : অ্যাই বদনা মাছ বাচা বন্ধ রেখে এনাদের নিয়ে যা তো ক্লাবঘরে, ক্যারাম খেলছে বোধহয় ঘেঁচুবাবুর ছেলেরা । তোকে মাছ ছাড়াবার ভরতুকি দিয়ে দেবেন দিদি ।

তুই : কত দূরে ?

কুচো : ওই তো রাস্তায় বেরিয়ে দু’পা হাঁটলেই বাঁদিকে ।

তুই : এটা কি মাছ ?

অনন্ত : ফলুই ।

তুই : ওউ-ওউ-ওউ-ওউ, কত্তো রকমের মাছ, কত টাটকা, পাবদা, পারসে, খয়রা, বাটা, গুড়জাওলি, কাজরি, আহা, মনে হচ্ছে কাঁচাই খেয়ে নিই । বাসি মাছ খেয়ে বোর হয়ে গেছি । যে মাছে কাঁটা থাকে না, সে মাছে বোধহয় স্বাদ হয় না ; কাঁটাহীন ইলিশ কি ভাবা যায় ?

অনন্ত : যা বলেছেন, এদেশে একবার আসে হেঁটে কাঁটার দল, তারা গিয়ে আসে ওপরে কাঁটার দল ।

তুই : মানে ?

অনন্ত : মানে ওই ওপরে কাঁটা হেঁটে কাঁটা, এদেশে থাকলে টের পেতেন ।

নবীনকিশোর ছুটতে ছুটতে এসে জানাল, ক্লাবঘর বন্ধ, তালা দেয়া, ঘেঁচুকাকু আর ফুটানিকাকু দুজনেই কলেজ ইউনিয়ানের নির্বাচন সামলাতে গেছেন ।

তুই : ধ্যুৎ, এই বয়সে কলেজে পড়েন নাকি তাঁরা ?

নবীনকিশোর : দিদি, ঘেঁচুকাকু-ফুটানিকাকুকে বাদ দিয়ে এই এলাকায় কোনো ছাত্রের ইয়ে ঝরে না আর কোনো ছাত্রির উয়ো পড়ে না ।

অনন্তর দিকে তাকিয়ে বললি, সেই কথাই রইল, কাল সকাল সাতটা ।

আমার দিকে তাকিয়ে বললি, ইয়ে ঝরার পর কিন্তু উয়ো পড়া বন্ধ হয়ে যায় ; ড্যাড, অবসিনিটি ব্যাপারটা জেনারেশান গ্যাপের সঠিক মেজারমেন্ট করে ।

আমাদের বয়সের পার্থক্যকে টিটকিরি মারলি কিনা বুঝতে পারলাম না, বললাম, জানি, ওসব কুকথা শুনে-শুনেই এখান-ওখানের চুল পাকিয়েছি ।

তুই কাপড়ের দোকানটায় গিয়ে আবার ঢুকলি, বললি, শুনলুম আমার সাত বোন আছে, তাদের ছেলেপুলে আছে, কতজন তা তো জানি না, আপনি গ্রামে পরা যায় এমন কুড়িটা শাড়ি প্যাক করে দিন, আর আমার মাপের যেকোনো রঙের ব্লাউজ দিন, গ্রামে পরা যায় এমন ।

দেখলিও না ব্লাউজ আর শাড়িগুলো, দাম যা চাইল মিটিয়ে দিলি । আমি দিতে পারতাম, কিন্তু তোর তো মুখের আগল নেই, বেফাঁস কি বলে ফেলবি, পকেটে হাত ঢুকিয়েও বের করে নিলাম ।

বাজার থেকে বেরিয়ে দেখলাম আঁস্তাকুড় ঘিরে ভিড় ; একজন করে তার ভেতর ঢুকে জঞ্জালের ওপর শুয়ে সেলফি তুলছে, আরেকজন দ্রুত ঢুকতে চাইছে, বেশ ঠেলাঠেলি, বুম হাতে একজন সাংবাদিকা আর কাঁধে ক্যামেরা তার আধাযুবক সঙ্গী । জঞ্জালের ওপর শুয়ে যে প্রৌঢ়া সেলফি নিচ্ছে, তাকে জিগ্যেস করল, কেমন লাগছে আপনার ?

সে বলল, ওঃ অসাধারণ অভিজ্ঞতা, কি যে ভালো লাগল, দারুণ দারুণ !

তোর বাহু ধরে ছুটলাম গাড়ির দিকে ।

##

 

মায়ের ঘরেই শুয়েছিলি তুই, আমাকেও টেনে নিয়ে গিয়েছিলি, দুজনের বেশি আঁটে ওই খাটে, বলেছিলি। মোবাইলে অ্যালার্ম দিয়েছিলি ভোর পাঁচটার, উঠতে যাবো, বললি, অ্যালার্মটা মরনিং গ্লোরির জন্য, বিছানা থেকে বেরোবার জন্য নয়, ভোরের স্পার্ম অব্যর্থ, ঠিক পথ কেটে পোঁছে যায় গন্তব্যে ।

তোর নির্দেশ অনুযায়ী গন্তব্যে পাঠিয়ে উঠে পড়লাম, মিনিট তিরিশেক জিমে কার্ডিও না করলে শরীর বেশ ঢিলেঢালা ঠ্যাকে ।

##

 

বেরোবার সময় দেখলাম তুই তোর ব্যাগে একশো টাকার বেশ কয়েকটা প্যাকেট ঢোকালি ; আমিও নিয়েছি, সঙ্গে, যদি দরকার পড়ে । শাড়িগুলো নিয়েছিস প্লাসটিকের প্যাকেটে ।

তুই পারফিউম লাগাসনি, লিপ্সটিক বোলাসনি ঠোঁটে, নখপালিশ তুলে ফেলেছিস, হাফহাতা সবুজ ব্লাউজ পরেছিস, তার সঙ্গে মানায় না এমন  খয়েরি সিনথেটিক শাড়ি । পায়ে ফ্ল্যাপার । কিন্তু একবার আধুনিকতা যদি আঁকড়ে ধরে, যতই পোশাক-আশাক পালটাও, ছাড়াতে পারবে না ।

##

সকালে বাজারের সামনে অনন্ত ধুতি পাঞ্জাবিতে, টেরিকাটা তেলালো চুল, হাতে থলে, সম্ভবত আত্মীয়ের জন্য উপহার নিয়ে যাচ্ছে ।

ভাজা হচ্ছে দেখে, তুই চেঁচিয়ে উঠলি, জিলাপি জিলাপি জিলাপি জিলাপি ।

এক চ্যাঁচারি জিলিপি আর রাধাবল্লভি-আলুর দম কিনলাম । তোর বোনেদের জন্য সন্দেশ আর রসগোল্লার হাঁড়ি ।

অনন্ত ড্রাইভারকে বলল, দুধানি, সাহেবপুর, বোদরা, হয়ে চলুন, বারুইপুর থেকে টার্ন নেবেন, নেত্রা পর্যন্ত ভালো বাঁধানো রাস্তা ছিল, এখন কেমন বলতে পারব না ; জানেন তো রাস্তটা ?

ড্রাইভার ঘাড় নাড়ল, যারা ভাড়া নিয়েছে তাদের বদলে একজন সামান্য লোক হুকুম দিল বলে ওর মুখের অস্বস্তি তুই দেখলি আয়নায়, সামলাবার জন্য আমাকে জিগ্যেস করলি, তুমি জানো ?

বললাম, না, এদিকে কখনও আসিনি, সুন্দরবনে যাবার পরিকল্পনা একবার করেছিলাম, সঙ্গী পেলাম না।

মুখে জিলিপি নিয়ে বললি, এবার তো সঙ্গিনী রয়েছে, চলো না ঘুরে আসি, দারুণ হবে, টাইগ্রেস অ্যাণ্ড দি টাইগার ইন টাইগারল্যাণ্ড, ঘ্র্যাঁআওওওও ।

যে কয়দিন ছুটি, তার ভেতরেই সেরে ফেলতে হবে তোর মিশন ; প্রথম মিশন সফল, সেলফি তুলে নিয়েছিস, জেনেও ফেলে থাকবে তোর বন্ধুবান্ধব, নেট থেকে ।

গ্রামে আমার আত্মীয়স্বজন কারা আছে দেখি, তাদের ফোটো আপলোড করা যাবে কিনা গিয়ে দেখা করলে টের পাবো , গ্রামের ফোটো তুলে নেব।

গাড়ি বারুইপুর ছাড়ার পর মেঠো সবুজ বাতাসে তন্দ্রা এসে গিয়েছিল । তুই ঠেলে তুললি, বললি, দ্যাখো-দ্যাখো ধানখেত, খেজুর গাছ, কতো গাছের সারি রাস্তার দুপাশে, আমার মাতৃভূমি । এটা কি গাড়ি, অন্য কোথাও দেখিনি তো, গাদাগাদি মানুষ ?

মোটরসাইকেলভ্যান, ভটভটিরিকশা ।

ড্রাইভার মনে রেখেছে তোর কালকের কথোপকথন, পেছন ফিরে হাসল, সমবেদনার মুচকি  ।

পাখি দেখে চেঁচিয়ে উঠলি, মাছরাঙা, মাছরাঙা ।

অনন্ত বলল, দিদি ওটা নীলকন্ঠ পাখি ।

বেশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে অবাক করে দিয়ে আরম্ভ করলি, তোর চরিত্রের এই দিকের সঙ্গে পরিচিত ছিলাম না, এত বেশি কনভেন্টি অক্সব্রিজ ইংরেজি দিয়ে আমার বাংলা-টানের ইংরেজিকে আঘাত করছিলি এসে পর্যন্ত, জানতে পারিনি যে আঁস্তাকুড়ে পড়ে থাকার স্মৃতি তোকে এভাবে সমৃদ্ধ করে তুলেছে, শুনতে-শুনতে কাঁটা দিতে লাগল গায়ে :

##

 

আবার আসিব ফিরে ধানসিড়িটির তীরে– এই বাংলায়

হয়তো মানুষ নয়– হয়তো বা শঙ্খচিল শালিকের বেশে;

হয়তো ভোরের কাক হয়ে এই কার্তিকের নবান্নের দেশে

কুয়াশার বুকে ভেসে একদিন আসিব এ কাঁঠাল ছায়ায় ;

হয়তো বা হাঁস হব — কিশোরীর — ঘুঙুর রহিবে লাল পায়,

সারা দিন কেটে যাবে কলমীর গন্ধ ভরা জলে ভেসে ভেসে ;

আবার আসিব আমি বাংলার নদী মাঠ ক্ষেত ভালোবাসে

জলাঙ্গীর ঢেউয়ে ভেজা বাংলার এ সবুজ করুণ ডাঙায় ;

##

হয়তো দেখিবে চেয়ে সুদর্শন উড়িতেছে সন্ধ্যার বাতাসে ;

হয়তো শুনিবে এক লক্ষ্মীপেঁচা ডাকিতেছে শিমুলের ডালে ;

হয়তো খইয়ের ধান ছড়াতেছে শিশু এক উঠানের ঘাসে;

রূপসার ঘোলাজলে হয়তো কিশোর এক শাদা ছেঁড়া পালে

ডিঙা বায় ; — রাঙা মেঘ সাঁতরায়ে অন্ধকারে আসিতেছে নীড়ে

দেখিবে ধবল বক : আমারেই পাবে তুমি ইহাদের ভিড়ে–

##

 

ড্রাইভারই প্রথম মন্তব্য করল, দেখছেন তো আপনিও মানুষ হয়ে আসতে চাইছেন না, শালিক, কাক, হাঁস, লক্ষ্মীপেঁচা, বক হয়ে আসতে চাইছেন, কেউই আর মানুষ হয়ে জন্মাতে চায় না এই পোড়া দেশে ।

অনন্ত বলল, আপনার গলাটা বেশ মিঠে, শুনতে শুনতে বিভোর হয়ে গিসলুম, ঠিকই বলেছেন আপনি, কেউই আর মানুষ জন্ম চাইছে না , আমি মাছ হয়েও জন্মাতে চাই না, শেষে এই পাপীদের পেটের খিদে মেটাতে হবে, তারচেয়ে মাছরাঙা হব, পানকৌড়ি হব, শকুন হতেও রাজি আছি ।

তুই বললি, কবিতাটা আমার নয় ।

আমি জানতে চাইলাম, কার ?

তুই বললি, বইগুলো তো তুমিই পাঠিয়েছিলে, ভুলে গেলে কি করে ।

বললাম, আমার এক জুনিয়ার অফিসার, কলকাতায় বাড়ি, তাকে বলেছিলাম, বাংলা সেলেকটেড বইয়ের অর্ডার দিয়ে দিতে, যাতে তোর নামে ওরা জগদীশের গুড়গাঁয়ের বাড়িতে পাঠিয়ে দ্যায় । এরকম যে কবিতা হয় জানতাম না, স্কুলের পর তো আর পড়া হয়নি কবিতা । কার লেখা ?

তুই বললি, খুঁজো ।

##

 

এর মতো, ওর মতো, তার মতো, কারো মতো নয় ।

যেন এমন, যেন অমন, যেন তেমন নয় ।

##

পথের বোর্ড দেখে বুঝলাম আমরা ঈশ্বরপুরের  কাছাকাছি এসে পড়েছি । অনন্ত বলল, এবার নাবুন, লক্ষ্মীপুর যেতে কিছুটা কাঁচা রাস্তায় হাঁটতে হবে ।

গাড়ি আসছে দেখে দূর থেকে গ্রামের কিশোর-কিশোরীরা ছুটে এইদিকেই আসছিল ।

অনন্ত তাদের দিকে তাকিয়ে বলল, মানিক সর্দারের বাড়িটা কোন দিকে রে, নিয়ে চল তো আমাদের।

মানিকবুড়ো তো কবেই মরে গেচে, বলল একটি কিশোরী, বেশ কয়েকদিন স্নান করেনি বোধহয়, চুল শুকনো, বাসি বিনুনি, বয়সের চেয়ে বড়ো মাপের ফ্রক ।

তা জানি, অনন্ত বলল, বাড়ি তো আছে, বাড়ির লোকজন তো আছে ?

তুই আমার দিকে তাকিয়ে বললি, সি, আই নিউ আই অ্যাম এ সরদারনি । দুহাত তুলে চেঁচিয়ে উঠলি, জো বোলে সো নিহাল, সত শ্রী অকাল ।

কয়েকজন বাচ্চা তোর দেখাদেখি দুহাত তুলে চেঁচালো, অকাল অকাল অকাল অকাল, কি মজা, অকাল অকাল, চেঁচাতে চেঁচাতে দৌড়োলো খড়ের চাল দেয়া  কুঁড়েঘরগুলোর দিকে ।

এরা না চেঁচানো পর্যন্ত মনে হচ্ছিল গ্রামটা মৌনতায় ঝিমিয়ে , দুঃখি-দুঃখি, চুপচাপ শোক পালন করছে ।

কাপড়ের থলেটা আমার হাতে ধরিয়ে বাচ্চাদের ফোটো তুললি, আমাকে বললি, এদের সঙ্গে কয়েকটা গ্রুপ ফোটো তুলে দাও তো । দিলুম । তুই দুই কিশোরীকে জড়িয়ে উবু হয়ে পথের ওপর । একটি কিশোরী কেঁদে ফেলল, তুই তাকে জড়িয়ে ধরিসনি বলে ; সবাইকে জড়িয়ে সাতটা ফোটো তোলালি । জিলিপি আর রাধাবল্লভির চ্যাঁচারিটা একটি কিশোরীর হাতে দিয়ে বললি, তোমাদের জন্য ।

আমার দিকে তাকিয়ে বললি, জড়িয়ে পাঁজরের হাড় ঠেকলো, এই পশ্চিমবাংলা দেখতে পাইনি, বাইরে-বাইরে সবুজ দেখছি তখন থেকে, গুড়গাঁওয়ের ময়লাকুড়ুনিয়াদের হাড়পাঁজর দেখি না তো  । এত এত সবুজ অথচ হাড়পাঁজুরে ছেলেমেয়ে ! ম্যালনিউট্রিশান, দেখেই বুঝতে পারছি ।

বললুম, আঁস্তাকুড়ে সেলফি তুললি আর এখন দারিদ্র দেখতে পাচ্ছিস গ্রামে এসে ?

তুই বললি, জানি জানি, গরিবের মাংস খেয়ে লোকে ধনী হয়, ধনীর মাংস যদি খেতে না পায় তাহলে গরিব কি করেই বা স্বাস্হ্যবান হবে ! এসে পর্যন্ত যা দেখছি, খাওয়া যেতে পারে এমন ধনী চোখে পড়ল না ।

অনন্ত বলল, আচে আচে দিদি, তেনারা সব নেতা, গরিব সেজে থাকেন, গরিবেরই মাংস হাপুস-হুপুস করে খান, খেয়ে পিচ করে রক্তের পিক ফ্যালেন ।

##

মানিক সর্দারের বাড়ি, খড়ের চালা, বাঁশের বেড়া ভেঙে পড়েছে, একটা খুঁটিতে বাদামি রঙের শিড়িঙে গাইগোরু, পৌঢ়া বেরিয়ে এলেন ডাক শুনে, তোমরা কারা, কাকে খুঁজচ ? কন্ঠস্বর বুড়িদিদিমার মতন, যেন জীবন আর মৃত্যু সম্পর্কে  জানার কিছু বাকি নেই, চোখে বিষন্ন দৃষ্টির অপ্রতিরোধ্য টান, ছানির আড়ালে ।

অনন্ত বলল, তোমায় তো চিনতে পারলুম না, আমি প্রমথ মাঝির নাতজামাই, অনন্ত ।

ইনি যে তোর বোন, সন্দেহ নেই, প্রায় তোর মতোই দেখতে, ঢ্যাঙাও তোর মতন , দাঁড়াবার ধরণে যৎকিঞ্চিত টিকে আছে যৌবনকালের মহনীয়তা ।

নাতজামাই ? অনন্ত ? না গো, মনে পড়তেছে না । প্রমথ নেই, মারা গেচে, দ্যাকো কারা আচেন ওনার বাড়ি, আর তো কোতাও যেতে পারিনে, ভালোও লাগে না ।

ভবিষ্যতকে অবিশ্বাস করার বয়সে প্রৌঢ়া, যখন জীবন বললে অতীতের কালো গহ্বর বোঝায়, যাদের চাই না, অতীত থেকে তাদের ঝেড়ে ফেলে দিতেও অনিচ্ছা ; এখন আর অতীত থেকে খুঁটে-খুঁটে আহ্লাদের স্মৃতিগুলো তুলে নেবার অবসর নেই ।

তুমি মানিক সর্দারের কে হও ?

আমি ? আমি বিন্তি, আমিই আচি শুদু । বাবা তো সব জমিজমা বেচেবুচে বিয়ে দিলে আমার বোনগুনোর, এখন এই এগারো কাটা জমিই বেঁচেচে আর পুকুরটা, এতেই যা হয়, চলে যায় । আমি বাবার বড় মেয়ে, এই যে দুহাতে বাবার ছেঁকা দেয়া বিড়ির দাগ ; সব কান্নাই তো আর দ্যাকা যায় না, শোনা যায় না । দাগ দেকে ভেবোনি যে রক্ত শুকিয়ে গেচে । ছেলে তো হয়ে বাঁচেনে, ছেলে-ছেলে করে মাটাকে মেরে ফেললে ।

ভাবলাম, বিড়ির ছেঁকায় রয়ে গেছে অতীত ; দাগগুলোকে গোপনে ভালোবাসেন বলেই তো মনে হল । আহত বোধ করাও মানুষের অধিকার বৈকি ।

তুই জিগ্যেস করলি, বোনেদের কোথায় বিয়ে হয়েছে ? কারোর সঙ্গে দেখা করা যাবে কি ?

না গো, দুই বোন রিমি আর ঝিমি পাকা সড়কের ওই পারের গাঁয়ে ছেল, এখন সব গ্রামছাড়া, পার্টি করত তো ওদের বরেরা, ওরাও তাতে পোঁ ধরত । ফেলি, কুমু আর চিনুর  বীরভূম-মালদায় বিয়ে হয়েছে, খবরাখবর নেয় না, কোতায় ওদের শশুরবাড়ি, তাও জানিনে । দাঁড়াও তোমাদের বসার মাদুর আনি, আমি বেশিক্ষুণ দাঁড়িয়ে কতা বলতে পারিনে ।

গ্রাম ছাড়া ? গ্রামও ছেড়ে চলে যেতে হয় নাকি, পার্টি করলে ; পাঞ্জাবের ডিভিশানের সময়ে নিজেদের গ্রাম ছেড়ে চলে এসেছিল আণ্টিমায়ের আত্মীয়রা, এখানে এখনও সেই ডিভিশান চলছে ?

বললাম, ঠিক ধরেছিস, ওই সোয়াইনফ্লুটাই ছড়িয়ে পড়েছে পশ্চিমবাংলার গ্রামে-গ্রামে, পাড়ায় পাড়ায় ।

##

 

মেঘেদের গায়ে খোসপাঁচড়ার দাগ, শূন্যতা চলেফিরে বেড়ায়, অপূরণীয় গহ্বরে একফোঁটা জলের বীজ ।

জোঁকেদের তুলতুলে ব্যক্তিত্ব, হাওয়ায় মানুষের খোসা উড়ছে ।

যে মরে যাচ্ছে তার সঙ্গে কথা বলতে শেখানো হয়নি কোনো স্কুলে কলেজে ।

তলিয়ে যাবার মাধুর্য, সৌষ্ঠব, সদগুণ, কৃপা, প্রসন্নতা, করুণা ।

##

গোবর নিকোনো মাটির দাওয়ায় বসে তুই বললি, মাদুরের চেয়ে মাটিতে বসে বেশি আনন্দ । মামারবাড়ি পানিপতে ছোটোবেলায় গিয়েছিলুম একবার, এরকমই দাওয়া ছিল ।

কি বলতে কি বলে ফেলবি, তোর দিকে তাকিয়ে গম্ভীর মুখে বলতে হল, ডোন্ট টক অ্যাবাউট দোজ থিংস, দিস ইজ ইয়র ফাদার্স হাউস ।

তুমি কে গা ? তোমাদের তো চিনতে পারচিনে । প্রৌঢ়ার শাদা শাড়ি অতিব্যবহারে ময়লা, মুখও দারিদ্র্যের অন্তর্ঘাতে  বয়সের তুলনায় কুড়ি বছর বেশি বলেই মনে হল ।

তোমার সবচেয়ে ছোটো বোন কোথায় আছ জানো ?

বাবা তো কলকাতা যাবার সবজির গাড়িতে চেপে তাকে ফেলে দিয়ে এস্ছিল কলকাতার বাজারের আঁস্তাকুড়ে । থানা-পুলিশ হয়েছেল, বাবা বললে, না, বাচ্চাটা আমাদের বাড়ির নয় । জানিনে সে মরে গেল না বেঁচেবর্তে আচে কোতাও ।

তুই ফোঁপাতে আরম্ভ করে সামলে নিলি ।

তোর মুখের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ মনে পড়ে গেল, ক্লাস টেনের ইনটারভিউতে তুই সিসটার অ্যানিকে বলেছিলি টি এস এলিয়টের কবিতা ভালো লাগে।  আশ্চর্য, হঠাৎ মনে পড়ে গেল সিলভিয়া প্লাথের নাম আর তাঁর ড্যাডি কবিতাটা, তুই আবৃত্তি করছিলি ; তখন তোর কন্ঠস্বরে আপ্লুত হয়ে গিয়েছিলাম বলে মনে পড়েনি, এখন তোর ক্ষণিক ফোঁপানির জন্য মনে পড়ে গেল ।

তোর কাঁধে হাত রেখে বললুম, খুঁজে পেয়ে গেছি, সিলভিয়া প্লাথের ড্যাডি ।

জানতুম ড্যাড, পাবে, বাংলা কবিতার কবির নাম এখন খোঁজো, তুই চোখের মৃদু হাসি খেলিয়ে বললি ।

মানিক সরদারের বড় মেয়ে জিগ্যেস করলে, আপনি ওনার বাবা ?

তুই বললি, না, উনি আমার ড্যাড, মানে বর । আর আপনি আমার দিদি, আমাকেই আঁস্তাকুড়ে ফেলে দিয়েছিল আপনার বাবা ।

পৌঢ়া স্তম্ভিত । ঠোঁটের ওপর বেশ কয়েকবার জিভ বুলিয়ে বললে, আপনি আমার বোন ? তুমি আমার ছোটো বোন ? সবচেয়ে ছোটো বোন ? বাবা ভেবেছেল তুমি ছেলে হবে, যখন মেয়ে হয়ে জন্মালে তখন অষ্টম গর্ভের দোহাই দিয়ে, মাকে ভুজুংভাজুং বুঝিয়ে, ফেলে এলো কলকাতার আঁস্তাকুড়ে, গোলোকধাঁধায় ।

প্রৌঢ়াকে তুই জড়িয়ে ধরতে, উনি কাঁদতে লাগলেন, বলতে আরম্ভ করলেন, আমাদের সবকটা বোনকে ফেলে আসতে পারত কলকাতার জঞ্জালে, কলকাতায় তো ভাগাড়ের অভাব নেই, তাহলে আমরা কেউই এই দুঃখের দিন দেখতুম না, বোনরা সোয়ামি পুত্তুর নিয়ে গা ঢাকা দিয়ে পালিয়ে পালিয়ে বেড়াত না । বাবা-মায়েরা ছেলেমেয়ের জীবনকে তালগোল পাকিয়ে অগোছাল করে ফ্যালে, এর কোনো নিদান নেই গো, কাচের বাসনের মতন ভেঙে এমন টুকরো করে দ্যায় যে জুড়লেও ফাটলের দাগ রয়ে যায়, জল খেতে গেলে চুয়ে পড়ে, খাবার খেতে বসলে হাত কেটে যায় ।

তুই বললি, তবুও তো বাবা-মাকে ভালো না বেসে পারা যায় না ।

যা মনে রাখার প্রয়োজন নেই, তাকেই কেন মনে রাখা ? হয়ত মনে রাখার আনন্দের দুর্ভোগ রসিয়ে উপভোগ করতে ভালো লাগে, অতীতের সেই মুহূর্তগুলো বর্তমান হয়ে টিকে থাকে, অতীত হয় না, ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যায় । অন্যের স্মৃতিতে বেঁচে থাকতে চায় মানুষ, ভুগতে চায় স্মৃতির যাতনার টিমটিমে আনন্দে, অদ্ভুত ।

##

স্পর্শের মর্মার্থ, মর্মার্থের রসায়ন, রসায়নের সম্পর্কে, রেণু, পরাগ, উড়াল, জীবন ।

চাউনির কোলাহল, উতরোল শ্বাস ।

মনে রাখার মন । ভুলে যেতেও তো মন । স্মৃতি কোথায় থাকে ? কোন রঙে ? রক্তের লাল রঙে ?

খসে পড়ে হলুদ পাতারা, খসে পড়ে পাকা হিমসাগর, ঝড়ে খসে পড়ে কচি-কচি আম ।

গাছের স্মৃতিতে কে থেকে যায় ? দূরের ওই ফলবণিক ? দূরের ওই কাঠুরে ?

##

কাঁদবেন না, তুই বললি, আপনার এক বোনকে তো দেখতে পেলেন যে সে ভালো আছে ।

সে ভালো আচে ; বাপের ফাটা থালায় খেয়ে সে রক্ত ঝরায়নে । যাঁরা তোমায় মানুষ করেচেন, নিশ্চই খুব ভালোবাসেন তোমায়, দেখেই বুঝতে পারচি ; বরও তো ভালো পেয়েচ । তা তোমার নাম তো বললে না ?

আমার নামটা একটু অন্যরকম ; আমার নাম এলেকট্রা ।

বেশ ভালো নাম রেকেচেন যাঁরা তোমায় পোষ্য করেচেন, বড় করেচেন । আমাদের ক্ষয়ে ন্যাতাজোবড়া হয়ে যাওয়া একঘেয়ে নামের চেয়ে অনেক ভালো ।

প্লাসটিকের থলেটা এগিয়ে দিয়ে তুই বললি, আমার বোনেদের জন্য শাড়ি এনেছিলুম, আপনি নেবেন যেগুলো আপনার পছন্দ, যদি অন্য বোনেরা কখনও আসেন, আমার কথা বলবেন, তাঁদের দেবেন । আর কিছু মিষ্টি, খাবেন যখন ইচ্ছা হবে ।

প্রৌঢ়া বললে, একটা চিরুনি আনতে পারতে গা, কতকাল যে চুল আঁচড়াইনে ।

শুনে, তুই হেয়ার ব্রাশ বের করে দিতে গেলি, তোর দিদির প্রতিক্রিয়ায় অপ্রস্তুত হলি, বললি, দিন আমি আঁচড়ে দিচ্ছি আপনার চুল ।

তোর ইশারায় ফোটো তুলে নিলাম, দিদির চুল বেঁধে দিচ্ছিস ।

আপনার ঘরের ভেতরটা তো দেখা হল না, চলুন না দেখি, কোথায় থাকতেন আপনার বাবা-মা ।

চলো । তুই প্রৌঢ়ার হাত ধরে সাহায্য করলি উঠে দাঁড়াতে, আমার দিকে মুখ করে বললি, আই অ্যাম গিভিং হার এ লিটল মানি টু ক্যারি অন ফর সাম টাইম ।

কাঁধে ব্যাগ নিয়ে ভেতরে ঢুকলি, ঝোপের আড়ালে গিয়ে হিসি করে এসে বসে রইলাম বেশ কিছুক্ষণ ।

অনন্তর পাত্তা নেই ।

আমার বাবা-মায়ের অনুপস্হিতি মাঝে-মাঝে আমায় নিঃসঙ্গ করে, অথচ জীবনে একটা এমন সময় এসেছে যখন নিজের অজান্তে বাবা-মাকে ছলনা করেছি, সেই স্বরূপের সঙ্গে পরিচয়ে অবাক আর পরাজিত লাগে, নিজেকে বিশ্বাসঘাতক মনে হয়, তাঁদের কাছে আমি যেন আগন্তুক ।

ছোটো চুবড়ি করে পানিফল নিয়ে এলেন প্রৌঢ়া, বললেন, তোমাদের খাওয়াবার মতন কিচুই নেই গো, এইগুলো খাও পেট ভরে যাবে, অতটা রাস্তা, সন্ধে হয়ে যাবে, খিদে পেয়ে যাবে ।

প্রৌঢ়ার পেছনে তুই, শাড়ি-ব্লাউজ, দেখেই বুঝলুম, খুলে দিয়ে দিয়েছিস, এই পরিকল্পনা করেই এসেছিলিস তাহলে, ব্যাগের ভেতরে একটা নীল টপ নিয়ে আর শাড়ির তলায় ডেনিম জিনস পরে ।

শায়া নেই, কি করব, শাড়ির তলায় এটাই পরে এসেছিলুম, বললি । তারপর যোগ করলি, দেয়ার ইজ নো টয়লেট, শি অ্যালাউড মি টু ইউজ দি কর্নার অফ এ রুম শি ইউজেস ডিউরিং নাইট ।

প্রৌঢ়াকে জিগ্যেস করলি, আঁতুড়ঘরটা কোথায়, যেখানে আমি জন্মেছিলুম ?

সেসব আর কিচুই নেই গো, যেটুকু ছিল তাও আয়লার ঝড়ে খেয়ে ফেলেচে, ওই দেকচ মাটির ঢিবি, ওইটে ছিল আঁতুড়ঘরের দক্ষিণদিকের দেয়াল, ওই ঘরে আমার মা মারা গেসলো, তোমার পরের বাচ্চাটা বিয়োবার সময়ে ; উচিত শিক্ষে পেয়েছিল বাবা, ছেলে হয়েছিল, মরা, মাও মরে গেল তার সঙ্গে, সেই বাচ্চাটা মাকে নিতেই এস্ছিল । তারপর বাবা ভেউভেউ করে কাঁদত আর মদ খেতো, ধেনো মদে ঝাঁঝরা হয়ে মরল দশাসই লোকটা, অ্যাগবারে দড়িদঙ্কা ।

তুই বললি, দিদির সঙ্গে আর এই বাড়ির ব্যাকগ্রাউণ্ডে কয়েকটা ফোটো তুলে দাও তো, ধুলোয় মেশা আঁতুড়ঘরেরও, তুলে দিলাম ।

স্মার্টফোন হাতে নিয়ে বললি, নাঃ, এখানে টাওয়ার নেই, এক্ষুনি আপলোড করা যাবে না ।

ভারচুয়াল জগতের মাধ্যমে তুই আত্মীয়তা গড়তে চাইছিস, দেখাতে চাইছিস যে তোরও শেকড় রয়েছে পশ্চিমবাংলার মাটিতে । কখনও কি ভেবে দেখেছিস, যারা চোদ্দোপুরুষের শেকড় বেয়ে ডালে-ডালে দোল খাচ্ছে, অসময়ে খসে পড়ছে, তাদের কোনো পরোয়া নেই ।

তোর দিদি তোর হাতে গুঁজে দিলে রুপোর টাকা, বললে এটা আমার জন্মের সময়ে মুখদেখানি দিয়েছেল আমার বাপের বাপ গৌরহরি সরদার, কাকেই বা দেব যত্ন করে রাখতে, তোমায় দিলুম । তুই পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলি, জাঠদের মতন হাঁটু ছুঁয়ে নয় ।

হাতের তালুতে রাখা টাকাটা দেখালি আমায়, ভিক্টোরিয়ার মুখ । চেঁচিয়ে উঠলি, দু হাত উঁচু করে, ইইইইএএএএ, তোর দিদির মুখে হাসি ফুটল, আমরা আসার পর প্রথম ।

খিদে পেলে আমরা পথে কোথাও খেয়ে নেব, অনন্তর কন্ঠস্বর শোনা গেল ।

পেলে কাউকে ?

শালার ছেলেবউরা ছিল, তারা তো আমায় প্রথম দেখল । কলকাতায় প্রায়ই সবজি নিয়ে যায়, মাছের ব্যবসা আর করে না, মাছ নিয়ে বড্ড দলাদলি ইদিকে । বলেছি এবার এলে আমার বাসায় আসতে । ওদের অবস্হাও বিশেষ ভালো নয়, কে যে কোথায় সুখে আছে তা-ই তো বুঝিনে ।

পানিফলগুলো তুই তোর কাঁধের ব্যাগে পুরে নিলি । আরেকবার প্রণাম করলি তোর দিদিকে । তোর দিদি আরেকবার তোকে জড়িয়ে কাঁদতে লাগল, তোরা দুজনেই জানিস আর কখনও দেখা হবে না । না হওয়াই ভালো, তুই গাড়িতে বসে বলেছিলি, এই স্মৃতি অনেক দামি, একে নষ্ট করতে দিতে চাস না, স্মৃতিকে গন্ধের মতন ছড়িয়ে দিতে চাস  ।

##

জোনাকিরা চলে গেছে ফিনফিনে এনডোসালফিনে ।

সন্ধ্যাকে আলোময় করে তুলছে অন্ধকারের ধুলোট সোঁদা অভিপ্রায় ।

##

গাড়িতে সকলেই বহুক্ষণ চুপচাপ, অনন্ত বলল, মনটা বেশ খারাপ হয়ে গেল কুটুমের বাড়ি এসে, আপনাদের মনও তো ভার হয়ে রয়েছে, দিদি, আপনি একটা গান ধরুন না, যাতে পথটা কেটে যায় ।

গান ? তুই বোধহয় অন্য চিন্তায় ছিলি, দিদির কি হবে, অন্য বোনেদের সঙ্গে দেখা হল না, এইসবই ভেবে চলেছিস হয়তো ।

গুনগুন করে, মনের ভেতরে গেয়ে নিয়ে, আরম্ভ করলি, আমার দিকে তাকিয়ে বললি, রবীন্দ্রসঙ্গীত, আই অ্যাম সিংগিং ফর ইউ, সাতরঙা ফ্ল্যাপার খুলে খালি পায়ে আমার জুতোর ওপর পা রেখে, হাতের কবজি ধরে তালের সঙ্গে চাপ দিয়ে, ইশারা করতে লাগলি:

##

তোরা যে যা বলিস ভাই, আমার সোনার হরিণ চাই।

মনোহরণ চপলচরণ সোনার হরিণ চাই ।।

সে যে চমকে বেড়ায় দৃষ্টি এড়ায়, যায় না তারে বাঁধা ।

সে যে নাগাল পেলে পালায় ফেলে, লাগায় চোখে ধাঁদা ।

আমি ছুটব পিছে মিছে মিছে পাই বা নাহি পাই–

আমি আপন মনে মাঠে বনে উধাও হয়ে ধাই ।।

তোরা পাবার জিনিস হাতে কিনিস, রাখিস ঘরে ভরে–

যারে যায় না পাওয়া তারি হাওয়া লাগল কেন মোরে ।

আমার যা ছিল তার গেল ঘুচে যা নেই তার ঝোঁকে–

আমার ফুরোয় পুঁজি, ভাবিস বুঝি মরি তারি শোকে ?

আমি আছি সুখে হাস্যমুখে, দুঃখ আমার নাই ।

আমি আপন মনে মাঠে বনে উধাও হয়ে ধাই……

##

অনন্ত নেমে গেল গড়িয়ায়, বলল, মাছের দরকার হলে বলবেন, আবার এলে, ওই বাজারেই দেখা হবে দিদি ।

হোটেলের লিফ্টের ভেতরে তুই আর আমি একা, লিফ্টম্যান নেই, চুমু খেলুম তোকে, বললুম, এই গান আগেও অনেকবার শুনেছি, কিন্তু গানটায় তোর মতন কেউ সেনশুয়ালিটি আনতে পারেননি ; রবীন্দ্রনাথও নিশ্চয়ই আঁচ করেননি যে এই গানে যৌনতার সঞ্চার করা যেতে পারে ; ইউ আর ইনক্রেডিবল ।

যাবার ছিল সেকেন্ড ফ্লোর, ডান হাতে আমার কোমর জড়িয়ে, বাঁহাতে তুই টপ ফ্লোরের বোতাম টিপে বললি, ওউ- ওউ-ওউ-ওউ, ড্যাড, থ্যাংকস, লিফ্টে সিসিটিভির ক্যামেরা আছে । ইইইইইইএএএএএ ।

##

এর মতো, ওর মতো, তার মতো, কারো মতো নয় ।

যেন এমন, যেমন অমন, যেন তেমন নয় ।

 

চার

ইলেকট্রিক ? ঠিক শুনেছিস ? এলেকট্রা বলেছেন বোধহয় ।

হ্যাঁ হ্যাঁ স্যার, এলেকট্রা নামই বললেন , কিন্তু ইনি আগের ম্যাডাম নন , চাপরাশি নানকু প্রসাদ জানাল, ওর অনুসন্ধিৎসা স্বপ্রকাশ ।

##

কিন্তু নেতি, মহাকাব্যের এলেকট্রা, তো চলে গেছে,  মেসেজ করেছিল, ফ্র্যাংকফুর্টের পথে, ওখানে ফ্লাইট চেঞ্জ করে আমেরিকার প্লেন ধরবে । আমি তখন অফিসে, সকালেও জানতে দেয়নি যে সেইদিনকেই ও চলে যাচ্ছে, যেমন উদয় হয়েছিল হঠাৎ, তেমনই উধাও হয়ে গেল ।

আমি মেসেজ করেছিলুম, পৌঁছে জানাস, দেখাল পেনডিং , আজ সকালে এলো ডেলিভার্ড ।

ওর মেসেজ পেলাম, খুঁজো আমাকে ; তোমার জন্য ব্যবস্হা করে এসেছি ।

ব্যবস্হা ? তুই তো রাতে চাইতিস ব্রাউন স্ট্যালিয়ন আর ভোর বেলা মরনিং গ্লোরি ।

আমি বলেছিলাম, তুই এভাবে আমার জীবনে ঢুকে সব নয়ছয় করে দিলি, সিম্পল লাইফ লিড করছিলুম, রুটিন, সেক্সের আর্জ বলতে গেলে, তেমন হতই না, অফিসে কাজ, বাড়িতেও কাজ এনে সকাল-রাত ফাইল ক্লিয়ার করতাম, ড্রিংক করতাম, বাংলা-হিন্দি-ইংরেজি নিউজ চ্যানেল দেখতাম, চারটে নিউজপেপারে চোখ বোলাতাম, চলছিল এইভাবে; চাকরিতে যোগ দেবার পর যেখানেই পোস্টিং হয়েছে, পোর্ট ব্লেয়ার,  সিলভাসা, দমন, পুডুচেরি, লাক্ষাদীপের কারাভাত্তি আর এখন দিল্লিতে, রুটিন, রুটিন, রুটিন, রুটিন, সকাল-অফিস-বিকেল-সন্ধ্যা-রাত ।

এজিএমইউ ক্যাডারের, তাই অমন পোস্টিং, ভালোই তো ছিলাম ।

তোর তো বেবি চাই, আমাকে যে সঙ্গদানের অভ্যাস করে দিয়ে গেলি, প্রতিদিনের অভ্যাসে অভ্যস্হ প্রাণী বানিয়ে দিলি, প্রতিদিনের, কেননা, তুই যেদিন এসেছিলি তার কুড়ি দিন পরের প্রেগনেন্সি টেসটিং কিট দেখিয়ে খিলখিলিয়ে বলেছিলি, অ্যাচিভড, গন্তব্যে পৌঁছে গেছি, এখন একমাস পর আবার টেস্ট করাব, ইইইইইএএএএ ।

আমার কর্মচারীদের তুই কখনও টের পেতে দিসনি যে আমরা রাতে একসঙ্গে শুই ; অ্যালার্ম দিয়ে মরনিং গ্লোরি নিয়ে তুই বলতিস, এবার যাও, ঘুমিয়ে নাও ঘণ্টা দুয়েক ।

##

মাংসে বুনে-দেয়া মৌনভাঁজের উল্লাস ; তাপের অদৃশ্য শিখা ।

ষাঁড় হয়ে ওঠার মনোবাঞ্ছা। খুরের দ্রুততায় ছুটন্তের নির্বাণধ্বনি ।

গর্তের ভেতরে পোকাদের গানের প্রতিধ্বনি; খোলোসের সঙ্গে সাপ  ব্যথা ফেলে যায় না !

##

একদিন কেবল শাঁখ বাজিয়ে ঘুম ভাঙিয়েছিলি ; আমার মায়ের শাঁখ ।

বাজাতে পারিস ?

বাড়িতে পুজোটুজো থাকলে বাজাতে হয়, মা, মানে আন্টিমা, একনাগাড়ে বাজাতে পারেন না, হাঁপান ।

তুই চলে গেলে আমি কি করব ?

তার ব্যবস্হাও হয়ে যাবে ।

অমন ব্যবস্হা আবার হয় নাকি ; ওসব কল গার্লের পেছনে পড়ার হলে আমি কয়েকজন কলিগের নাইটগ্রুপে কবেই ঢুকে যেতাম, প্রতিটি ইউনিয়ান টেরিটরিতে অমন গিভ-অ্যাণ্ড-টেক ব্যবস্হা আছে, ঠিকাদাররা সবসময়েই খুশি করার জন্য মুখিয়ে ।

তুই বলেছিলি, চিন্তা কোরো না ; অনেক কিছু যোগাযোগের ফলে ঘটে যায়,  তোমার ক্ষেত্রেও তাই হবে, কে বলতে পারে ? তুমি আমাকে চাইতে, কিন্তু যোগাযোগ করতে ভয় পেতে । আমি যাবার পর তোমার সেক্সের প্রয়োজন হবে, কেউ হয়ত উদয় হবে ।

হতে পারে, হয়তো হতে পারে, সে তো আর এলেকট্রা হবে না, তোর মতন উড়ন্ত জাজিম হবে না, ওউ-ওউ-ওউ-ওউ করে ঠোঁটে ইশারা খেলাবে না  ।

মহাকাব্যে হয়ত একজন এলেকট্রা ছিল । এলেকট্রা কমপ্লেক্সে ভোগার মেয়ে তো কেবল একজন নয়, নিও ফ্রয়েডিয়ান ইয়ুংগিয়ান কমপ্লেক্স নিয়ে কেউ হয়তো দেখা দেবে, তখন অবাক হয়ে আমার ভবিষ্যবাণীর কথাটা মনে কোরো, অন্য ইশারে খেলাবে, প্রতিটি যুবতীর জাদুবাক্সে অমন হামিংবার্ড থাকেই ।

এ তো বিশ্বাসঘাতকতা করলি ।

বিশ্বাসঘাতকতার কথা বলছ কেন, আমি তো প্রথম থেকেই বলেছি তোমাকে,  আমি তোমার কাছে কি চাই।

তুই যা চাইছিলি, তা পেয়ে গেলি ; আমি যা চাইছিলাম, তা এই কয়দিনের জন্য নয়, দিনের পর দিন রাতের পর রাতের জন্য, ছুটির দিনে দুপুরের জন্য, সারাজীবনের, দুজনে একসঙ্গে বুড়ো-বুড়ি হবার ।

আমি চলে গেলে দেখবে সব ব্যবস্হা হয়ে যাবে ।

তুই এইসব কথা বলতিস । জানতাম না যে তোর আইডেনটিটিকার্ডগুলো, স্কুলের রিপোর্ট, ইনটারভিউ, তোর যত স্মৃতি আমি যত্ন করে তুলে রেখেছিলাম, সব তুই নিজের সঙ্গে নিয়ে চলে গেছিস ।

তুই চলে যাবার পর এত মনখারাপ হয়ে গিয়েছিল যে আলমারি খুলে দেখি কিছুই নেই, ব্যবহৃত তিনটে প্রেগনেন্সি টেস্টিং কিট আর গায়নাকলোজিস্টের রিপোর্টও সঙ্গে নিয়ে গেছিস , ওগুলো দেখিয়েছিলি স্তোক দেবার জন্য যে আমি তোর বাচ্চার বাবা হতে চলেছি ।

রয়ে গেছে আমার মোবাইলে তোর খোলা-বুকের ফোটো ; তাতে আরও মনখারাপ হয় । কেবল বুক, নিজেই তুলেছিলিস বুকের সেলফি, তোর মুখ নেই ।

তুই বলেছিলি তোর বেবিকে গিটার বাজিয়ে শোনাতে । নিজে ড্রাইভ করে ছুটির দিনে তোকে নিয়ে গিয়েছিলাম কুতুব মিনারের চত্বরে, শুনিয়েছিলাম গিটার, ওঃ কতদিন পর বাজিয়েছিলাম , তোর দেয়া আঙটি পরেই বাজিয়েছিলাম ।

আমাকে গিটার বাজাতে দেখে জেএনইউয়ের কয়েকজন যুবকযুবতী, যারা গিটার নিয়ে যুৎসই জায়গা খুঁজছিল, এসে বসে পড়ল আমাদের ঘিরে, আর তখনই তুই আরম্ভ করলি এমন এক গান, যা আমার মনে হল, আঁস্তাকুড়ে পড়েছিলেস বলে খুঁজে চলেছিস, তুই কে, তুই কে, তুই কে ? ওরাও অবশ্য যোগ দিল তোর গানে, আমার গিটারে  :

#

বুল্লা কি জানা ম্যায় কওন

না ম্যায় মোমন ভিচ মাসিতা

না ম্যায় ভিচ কুফর দিয়া রীতাঁ

না ম্যায় পালন ভিচ পাকিতাঁ

বুল্লা কি জানা ম্যায় কওন

#

না ম্যায় অন্দর বেদকিতাবাঁ

না ম্যায় রেহেন্দা ফাঙ শরাবাঁ

না ম্যায় রহন্দা মস্ত খারাবাঁ

বুল্লা কি জানা ম্যায় কওন

#

না ম্যায় শাদি না ঘমনাকি

না ম্যায় ভিচ পলিতাঁ পাকিঁ

না ম্যায় আবি না ম্যায় খাকি

না ম্যায় আতিশ না ম্যায় পওন

বুল্লা কি জানা ম্যায় কওন

#

না ম্যায় আরবি না লাহোরি

না ম্যায় হিন্দি শেহর নাগোরি

না হিন্দু না তুর্ক পাশাওরি

বুল্লা কি জানা ম্যায় কওন

#

না ম্যায় ভেত মজহব দে পায়া

না ম্যায় আদম হব্বা যায়া

না কোই অপনা নাম ধরায়া

বুল্লা কি জানা ম্যায় কওন

#

অওয়ল আখর আপনু জানা

না কোই দুজা হোর পছানা

ম্যায় তো না কোই হোর সেয়ানা

বুল্লে শাহ খড়া হ্যায় কোন

বুল্লা কি জানা ম্যায় কওন

#

না ম্যায় মুসা না ফারাওয়া

না ম্যায় জগন না ভিজ সওন

না ম্যায় আতিশ না ম্যায় পওন

না ম্যায় রহান্দা ভিচ নাদাওন

না ম্যায় বৈঠা না ভিচ ভাওন

বুল্লে শাহ খড়া হ্যায় কওন

বুল্লা কি জানা ম্যায় কওন

#

গানের শেষে ছেলেমেয়েগুলো দাঁড়িয়ে নাচতে লাগল, তুইও দুহাত তুলে যোগ দিলি তাদের সঙ্গে । গানটা শুনে আমার তো মনখারাপ হয়ে গিয়েছিল ; অথচ তোর প্রকৃত আবেগ ধরতে পারলাম না, কেনই বা হঠাৎ এই গানই গাইবার ইচ্ছা হল তোর ! বুল্লে শাহের বেশি প্রচলিত গান তো দমাদম মস্ত কলন্দর ।

আমি এই নই, আমি ওই নই, আমি সেই নই । আমি কে ? আমি এই নই, আমি ওই নই, আমি সেই নই । আমি কে ? আমি এই নই, আমি ওই নই, আমি সেই নই । আমি কে ? সত্যিই তো, তুই কে ? মহাকাব্যের এলেকট্রা !

কেন এই প্রশ্ন তোকে ঘিরে ধরল কুতুবুদ্দিন আইবেক আর ফিরোজ শাহ তুঘলকের তৈরি এই মিনার চত্বরে ! অন্তর্দ্বন্দ্বের সঙ্গে শীতযুদ্ধ ? কেন ? দ্রুতির হাতিয়ার চালিয়ে যা আয়ত্ব করতে চাইছিলি, তা করলি । তাহলে ? মস্তিষ্কে লুকিয়ে থাকা প্রশ্নদের লাই দিলেই ঝামেলা, আমার চেয়ে তুই তা ভালো করে জানিস, তোর সমবেত নাচ দেখতে-দেখতে মনে হল ।

অনিশ্চয়তার উত্তর হয় না, না রে ? অনিশ্চয়তাকে সবাই গোপনে ভালোবাসে, এরকম মনে হচ্ছিল ; প্রেমের মতন অনিশ্চয়তা আর নেই ।

এই কখন, এই কখন, এই কখন, এই কখন ! যাঃ ।

অনিশ্চয়তার সুস্বাদু বিষ জিভে লেগে থাকুক সবসময়, এরকমই ভাবিস কি ?

টিভিতে রাব্বি শের গিলকে গাইতে শুনেছি গানটা, তখন বেশ ভালো লাগত । যত বয়স বাড়ে তত অনিশ্চয়তার মাত্রা বৃদ্ধি পায়, তার প্রকৃতিতে রদবদল ঘটে ।

জীবনযাপনের  নিত্যকর্মপদ্ধতি হয় না, যতই না কেন দিনযাপনের রুটিন থাকুক !

তুই চলে যাবার পর খুলে রেখে দিয়েছি আঙটি । সৎ সৎ সৎ সৎ বলার আড়ালে বোধহয় বলেছিস বোকা বোকা বোকা বোকা ।

আমার পুরোনো আমিকে এখন কি করে ফিরে পাবো , রক্তমাংসের যান্ত্রিক আমি ? তুই আমাকে বিধ্বস্ত করে চলে গেছিস, ধ্বংস করে, চুরমার করে ।

সিনিয়ার-জুনিয়ার কলিগরা ভেবেছিল যে মালদার পোস্টিঙের জন্য তর্জনীতে পোখরাজের আঙটি পরেছি। হ্যাঁ, তোর দেয়া আঙটি পরে সেরকম উন্নতি হয়েছে আমার, ঘুষের রাজত্বের অংশীদার হয়েছি । অভ্যাস নেই বলে বিভ্রান্ত বোধ করছি ।

মিস করছি তোর রাঁধা মেক্সিকান কোচিনিতা পিবিলি, শুয়োরের মাংসও তোর হাতে ছোঁয়া পেয়ে ভিনচরিত্র পায়, আমি তো আগে শুয়োর তেমন রেলিশ করতুম না, অ্যালবোনডিগা মিট বল, ভেড়ার মাংসের বার্বাকোয়া, কালদে দ্য পোলো মুর্গির স্যুপ ; টার্কিশ বিরিয়ানি এতলি পিলাফ, টোমাটো পিলাফ ; থাই এঁচোড়ের ডালনা কায়েং কানুন ।

কুকটা কত চেষ্টা করল, তোর মতন রাঁধতেই পারেনি ; ও বলছে তুই মশলাগুলো সিক্রেট রেখেছিলি । তোর কি সবই সিক্রেট ?

##

পিওনকে বললাম, পাঠিয়ে দাও ।

তোর মতনই হাতে লাল রঙের স্যুটকেস, কাঁধে হলুদ ব্যাগ, ফেডেড জিন্স, লাল ঢিলেঢালা ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডের জার্সি, তার ওপর সাদা ব্লেজার, পায়ে রঙিন ফ্ল্যাপার, ডান হাতে গোটা-পাঁচেক স্লোগানচুড়ি, কানে চুড়ির মাপের লাল রঙের মাকড়ি, হাতের আর পায়ের নখে ব্রাউন-লাল নখপালিশ, হাতের নখ ততো বড় নয়, কাঁধ পর্যন্ত কোঁকড়া চুল, তোর সমান ঢ্যাঙা ।

আমার চাউনি তোতলাতে থাকে, মগজের ভেতরে লুডোর ঘুটি পড়ার শব্দ, বুকময় স্টেথোস্কোপের স্মৃতি ।

##

সেই নারঙ্গঠোঁট কুচকুচে হাঁস । মাছেদের দেখা স্বপ্নে ভারাতুর নদীতে ।

ঘাসে-ঘাসে তাঁবু ফেলেছে ফড়িঙেরা । সবুজ পৃথিবীকে মৌমাছিদের প্রণাম ।

##

কি করে সম্ভব ! যেন তোর পোশাক আর অ্যাকসেসরিজ পরে চলে এসেছে মেয়েটি, কেবল মুখ আলাদা । সুস্পষ্ট ফিচার্স, বেশ সুশ্রী ।

আমি :তুমি এলেকট্রা ?

যুবতী : হ্যাঁ স্যার, আমি আঁস্তাকুড়ের এলেকট্রা । আমিই আঁস্তাকুড়ের প্রকৃত এলেকট্রা, যে নিজেকে এলেকট্রা বলে আপনার বাড়ি এসে আপনার জীবনে ঢুকে পড়েছিল, সে মহাকাব্যের এলেকট্রা, তাকে আমি আমার স্বপ্ন প্রায় সম্পূর্ণ দান করে দিয়েছি ।

আমি :কি বলছ তুমি ? স্পষ্ট করে বলো , হেঁয়ালি কোরো না, আমি বেশ ডিসটার্বড ।

আঁস্তাকুড়ের এলেকট্রা : স্যার আপনার পিওন বা সার্ভেন্টদের বলুন আমার স্যুটকেস এটসেটরা  পোর্টিকো থেকে নিয়ে আসতে ।

আমি : বিলংগিংস নিয়ে চলে এসেছ ? আই অ্যাম ব্যাফলড , চলো, ভেতরে চলো, ডিসটার্বড মনে হচ্ছে তোমাকেও, ড্রিংক করো, তাহলে একটু ড্রিংক করে নাও, কিংবা যদি ট্র্যাংকুলাইজার চাও, আছে আমার কাছে ।

আঁস্তাকুড়ের এলেকট্রা : না, আমি ঠিকই আছি, জিনিসগুলো বাইরে থেকে আনিয়ে নিন আর ভেতরে চলুন।

আমি : তোমার বাড়ির লোক জানে ?

আঁস্তাকুড়ের এলেকট্রা : বাড়ির লোক কয়েকবছর থেকে জানে যে আমরা  দুজনেই আপনাকে ভালোবাসি, কিন্তু দুজনের ভালোবাসায় যথেষ্ট পার্থক্য আছে ।

আমি : কি বলছ কি বোকার মতন, নেতি নাম তো আমিই নেতিকে দিয়েছিলাম ।

আঁস্তাকুড়ের এলেকট্রা : সেই নেতি, যে নেতিকে আপনি এতদিন নেতি মনে করে ভালোবাসলেন, সে নেতি নয় স্যার । আমি আছি নেতিতে।

আমি : দুজন ? স্ট্রেঞ্জ, মেলাতে পারছি না । স্বপ্নদান ? বুঝিয়ে বলো, বুঝিয়ে বলো । ভেতরের ঘরে বসবে চলো ।

মনের ভেতরে সমান্তরাল চিন্তার স্রোত বইছিল, আমি কি তাহলে আমার দেয়া নামকেই ভালোবেসে গেছি, সেই নামের বাস্তব যুবতীটিকে নয় ? নামের প্রচণ্ড ক্ষমতা হয়, জানি, ভয় উদ্রেক করা নাম, এড়িয়ে যাবার নাম, রাখা যায় না এমন নাম, কিন্তু ভালোবাসবার নাম ?

নেতি বলেছিল একদিন স্নানের সময়, সাইক্লোনের নাম মেয়েদের নামে হয়, তা কি ওর ইঙ্গিত ছিল ? মেয়েদের নাম, কই, বিয়োগিনী রাখা হয় না তো ! ভালোবাসবার আগে শোনা নামের সঙ্গে ভালোবাসবার পরে শোনা নামের তফাত আছে নাকি ! মানুষটা বাস্তব না তার নাম ! গুলিয়ে ফেলছি সবকিছু ।

নানকু প্রসাদকে বললাম মেয়েটির জিনিসপত্র বাইরে থেকে নিয়ে আসতে ।

যুবতীটি বলল, স্যার আপনি দিল্লিতে এসেছেন বহুকাল পরে, যখন প্রথমবার আপনার পোস্টিং দিল্লিতে হয়েছিল, ইয়াং ছিলেন,আমার দিদি, যে এতদিন রইল আপনার সঙ্গে, তার ক্রাশ হয়েছিল আপনার সম্পর্কে, মনে করে দেখুন, আপনি কোনো দুর্গাপুজোয় অভিনয় প্রতিযোগীতার বিচারক ছিলেন, তারপর ও আপনাকে  দূর থেকে যখনই দেখেছে, ততো আকৃষ্ট হয়েছে, আপনি তো আমাদের পরিবারের দৃষ্টি এড়িয়ে যেতেন, ও কিন্তু ঠিক লক্ষ্য রাখত আপনার ওপর, ও আপনার ব্যক্তিত্ব, ম্যাগনানিমিটি আর সততার প্রেমে পড়ে গেল । আঙ্কলবাপি-আণ্টিমা আপনার পোস্টিঙের শহরে ছুটি কাটাতে গেলে, অবভিয়াসলি, আমাদের নিয়ে যেতেন না, কিন্তু অসংখ্য ফোটো তুলে আনতেন ; সেই ফোটোগুলো থেকে আপনার মহাকাব্যের এলেকট্রা,  যাকে নেতি মনে করে সঙ্গ দিলেন, সে আপনার ফোটোগুলো বেছে নিয়ে পার্সোনাল অ্যালবাম তৈরি করেছে ।

আমি : বসো, বসো, ওই সোফাতে বসে বলো । তুমি কে ?

আঁস্তাকুড়ের এলেকট্রা : বসছি স্যার । আমি নেতি, আঁস্তাকুড়ের এলেকট্রা । যে এসেছিল সেও এলেকট্রা, এলেকট্রা কমপ্লেক্সের মেয়ে, মহাকাব্যের নায়িকা  । পার্থক্য এই যে আমি আপনাকে ঐশ্বরিক বলে মনে করি ; আপনাকে ভীষণ ভালোবাসি, আপনি আমার জীবনে না থাকলে যেখানে আমি আজ পৌঁছেছি, সেখানে পৌঁছোতে পারতুম না । আপনি গিফ্টপ্যাকের মতো করে গড়ে দিয়েছেন আমার জীবন ।

আমি : মানে ?

আঁস্তাকুড়ের এলেকট্রা : আমাকেই আমার বাবা আঁস্তাকুড়ে ফেলে চলে গিয়েছিলেন । আমি কোনো দিন ওই আঁস্তাকুড় দেখতে যাবো না, আমি জীবনে কখনও কোনো আঁস্তাকুড়ে শুয়ে সেলফি তুলব না, আমি কখনও সেই পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করতে যাবো না, যারা আমাকে আঁস্তাকুড়ে ফেলে দিয়েছিল, আমি কখনও সেই আঁতুড়ঘর দেখতে যাবো না, যেখানে আমি জন্মেছিলুম । আমি ওই গ্লানি থেকে মুক্ত করে নিয়েছি নিজেকে, আর পিছন ফিরে তাকাতে চাই না।

আমি : তুমি বলতে চাইছ যে তুমিই নেতি ?

আঁস্তাকুড়ের এলেকট্রা : বললুম তো, আমিই নেতি ব্যানার্জি, আমিই সিলিকন ভ্যালিতে অ্যাডভান্সড মাইক্রো সিস্টেমসে চাকরি করি, আজকে রাতের ফ্লাইটে ফিরে যাচ্ছি, যাবার আগে আপনার সঙ্গে আমার যে সম্পর্ক তাকে স্হায়ীত্ব দেওয়া  আমার কর্তব্য। বিশ্বাস না হয়, এই দেখুন স্যার, আমার পাসপোর্ট আর ওয়ানওয়ে এয়ার টিকেট ।

যুবতীর পাসপোর্ট দেখলাম, নেতি ব্যানার্জির নামে, গুড়গাঁওয়ের বাড়ির ঠিকানা, বাবার নাম জগদীশ ব্যানার্জি, ফোটোও এই মেয়েটির, এইচ ওয়ান বি ভিসা  । নেতি ব্যানার্জির নামে এয়ার টিকেট, আজ রাতের ।

টেবলের ওপরে রাখা ব্ল্যাক ডগের  গ্লাস থেকে এক ঢোঁক খেয়ে বললাম, আমি এখনও কনফিউজড, পাজলড ।

আঁস্তাকুড়ের এলেকট্রা : আপনি কনফিউজড এই জন্য যে আপনি কখনও জগদীশ ব্যানার্জির বাড়িতে যাননি, তাঁর ছেলেমেয়েদের এড়িয়ে গেছেন, বইপত্র পাঠিয়ে খোঁজ নেননি যে সেগুলো কে পড়ছে, কার কিসে আগ্রহ । আমি বিজ্ঞানের ছাত্রী, বিজ্ঞানের বই আপনি পাঠাতেন না, ইংরেজি আর বাংলা সাহিত্য, রাজনীতি, দর্শন, ভারত আর বিশ্বের ইতিহাস বিষয়ে বই পাঠিয়েছেন । এই বইগুলো পড়েছে বৈদেহী আর আরিয়ান । বৈদেহীও ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্রী ছিল। জামিয়া মিলিয়াতে অধ্যাপনা করত বিয়ের আগে ।

আমি : কেন জানি না মনে হচ্ছে আমাকে ডেলিবারেটলি আঘাত দিয়ে কনফিউজ করতে এসেছো ।

আঁস্তাকুড়ের এলেকট্রা : ছি ছি, আপনার জ্বর হয়েছে বা শরীর খারাপের সংবাদে আমরা বিপর্যস্ত বোধ করেছি । কিন্তু আপনার নিষেধাজ্ঞার জন্য দেখা করতে আসা বা সেবা করা সম্ভব হয়নি ।

আমি : স্পষ্ট করে বলছই না । যে এসেছিল, মনে হচ্ছে তার পোশাক পরেই এসেছ, এমন জটিলতায় ফেলেছ যে সমাধান করতে পারছি না, যেমন রহস্যময়ী তুমি, তেমনই নেতি, আমাকে একা ফেলে চলে গেল ।

আঁস্তাকুড়ের এলেকট্রা : না, স্যার, এই পোশাকটা আমারই, দিয়েছিলুম বৈদেহীকে । আমি তখন থেকে বৈদেহীর কথাই বলছি, ওর ক্রাশ ছিল আপনার সম্পর্কে, আপনি ছয় বছর আগে দিল্লি সরকারি কর্মচারি ম্যারাথনে প্রথম হয়েছিলেন, টিশার্ট খুলে বিজয় পালন করেছিলেন, তখন আরও কয়েকজনের সঙ্গে বৈদেহীও ফুলের তোড়া দিয়েছিল আপনাকে, বেশ কাছ থেকে দেখেছিল আপনাকে । সেই থেকে ও বিয়ে করতে চেয়েছে আপনাকে, আঙ্কলবাপি আর আন্টিমা বলেছিলেন আপনি ওনাদের চেয়ে নিচু জাতের, তা যে কি করে হয় আপনিই বলুন, আন্টিমা তো নিজে জাঠ পরিবারের ; তাছাড়া ওনারা আপত্তি করেছিলেন আপনাদের দুজনের মধ্যে বয়সের পার্থক্যের কারণে, বেশি তো পার্থক্য নয়, কুড়ি  বছর বোধহয়, আর তৃতীয় আপত্তি ছিল আপনি অত্যন্ত সৎ বলে আপনার স্ট্যাণ্ডার্ড অফ লিভিং ওনাদের তুলনায় ভালো নয়, আপনি ঘুষ নেন না, নেন না বলে আপনাকে ইউনিয়ান টেরিটরির যেখানে-সেখানে শর্ট নোটিসে পাঠিয়ে দেয়া হয়, অবসর নেবার পর থাকার জন্য ফ্ল্যাটও কিনে রাখেননি ।

আমি : বৈদেহীই এসেছিল ? সেই জন্যই কি জগদীশ আর অমরিন্দর আগের মতো তেমন যোগাযোগ রাখে না, মনে হতো যেন অ্যাভয়েড করে, কারণ বুঝতে পারিনি এতকাল ।

আঁস্তাকুড়ের এলেকট্রা : হ্যাঁ, বৈদেহী যখন জোরাজুরি করছিল আপনাকে বিয়ে করার জন্য তখন ওনারা ওকে কয়েকদিন ঘরে বন্ধ করে রেখেছিলেন, তারপর পঞ্চাশ লাখ টাকা আর দু-কিলো সোনার গয়না যৌতুক দিয়ে, এক সমকামী নেশাখোরের সঙ্গে  বিয়ে দিলেন । যখন ডিভোর্স নিয়ে ফিরে এলো তখন ওনারা বিপদে পড়লেন । ডিভোর্সিকে বিয়ে করার পাত্র, প্রচুর যৌতুক দিতে রাজি থাকলেও, পাচ্ছেন না ওনারা, সবায়েরই ভার্জিন মেয়ে চাই । পাত্রপক্ষরা বিশ্বাস করতে চায় না যে বৈদেহী ভার্জিন, ওর বর ওর সঙ্গে শুতেই চায়নি কখনও । ও যখন বরের সঙ্গে বিয়ে কনজিউমেট করার জন্য প্রেশার দেয়া আরম্ভ করল, তখন শাশুড়ি আর স্বামী দুজনে মিলে বৈদেহীকে দৈহিক যাতনা দিতে লাগলেন ।

বললাম, জানি ।

আঁস্তাকুড়ের এলেকট্রা : তবে ! কী হত ওর জীবন, বলুন স্যার ? যদি আপনি ওকে অমনভাবে ভালো না বাসতেন ! আমিই ওকে পাঠিয়েছিলুম আপনার কাছে, জোর করে, আমার ড্রেস ওকে পরিয়ে, হাতে মেহেন্দি লাগিয়ে , যা ও চায় তা যদি বাবা-মা না চান, তাহলে, এত বয়সে কেন মেনে নেবে মেয়ে, কেন বিদ্রোহ করবে না, কেন জীবন নষ্ট হয়ে যেতে দেবে, বলুন? বৈদেহী এখানে গুড়গাঁওয়ের বাড়িতে একা, আঙ্কলবাপি আর আন্টিমা চণ্ডীগড়ে, কতদিন চলতে পারে এভাবে ?

এরপর মেয়েটি যে কথাগুলো বলল, তাকে স্টানিং বললেও কম বলা হবে ।

মেয়েটি বলল, সকলেই সমাজবিপ্লবের কথা বলে, তারাই আবার একজন তরুণীর ব্যক্তিগত বিদ্রোহকে খারাপ মনে করে ; বৈদেহী নিজে যা হতে চায় সেটা কি জরুরি নয় ? কেন সারাজীবন মুখোশ পরে কাটাবে ? নিজের ভেতরের নাচকে অমন বেড়ি পরিয়ে রাখার চেয়ে আত্মহত্যা করা শ্রেয় । নিজের জীবনে বিদ্রোহ করব না,  অথচ সামাজিক বিদ্রোহের ঢাকঢোল পেটাব, এটা তো নিছক জোচ্চুরি ।

আমি তখনও স্মৃতির হাজতে, বললাম, তাহলে স্কুলের আইডেনটিটিকার্ড ?

আঁস্তাকুড়ের এলেকট্রা : কার্ডগুলো আমার কিন্তু তাতে বৈদেহীর ফোটো লাগানো আছে, তাই তো স্ট্যাণ্ডার্ড সেভেন্হ থেকে কার্ডগুলো, যেগুলো দেখে আপনি চিনতে পারেননি যে কার্ডে আমার মুখ না বৈদেহীর মুখ ।

আমি : তিনটে ক্লাসের প্রেমপত্র ? ওগুলো তোমার নয় ? তুমিই তো স্বাক্ষর করেছ !

আঁস্তাকুড়ের এলেকট্রা : না, স্যার, তিনটে চিঠিই বৈদেহীর লেখা, আপনাকে ইমপ্রেস করার জন্য, দ্যাখেননি কি একই রকম হাতের লেখা, তার কারণ ও একই দিনে বসে লিখেছিল ওগুলো ।

আমি : আর ইনটারভিউ ?

আঁস্তাকুড়ের এলেকট্রা : ওটা আমার ।

আমি : তো ও আমাকে ছেড়ে চলে গেল কেন ? মিথ্যা কথা বলে গেল কেন ?

আঁস্তাকুড়ের এলেকট্রা : ও আপনাকে ছেড়ে যায়নি স্যার । ও বাড়ি ফিরে গেছে আঙ্কলবাপি আর আন্টিমাকে শেষ পর্যন্ত বাধ্য করার জন্য । প্রেগন্যান্ট হয়েছে জানার পরই ও ফিরেছে । বৈদেহী বাড়িতে বলে এসেছিল যে ও আপনার সঙ্গে লিভটুগেদার করতে যাচ্ছে । আমিই বৈদেহীকে ফোর্স করেছিলুম, আপনার কাছে সরাসরি পৌঁছে আপনাকে দখল করতে, আমি জানি আমার ফাইনানশিয়াল ফাদার হিসাবে আমার প্রতি আপনার সমর্পিত অধিকারবোধ আছে, নয়তো প্রতি ক্লাসের প্রতি বছরের ফিস, অমন রেগুলার বইপত্র, দুর্গা পুজোর পোশাক পাঠাতেন না আপনি । আমি সেকারণেই বলেছি যে আমি ওকে আমার স্বপ্ন প্রায় সম্পূর্ণ দান করে দিয়েছি । আপনার বাড়িতে আমিই বৈদেহীকে আমাদের গাড়িতে করে পৌঁছে দিয়েছিলুম । আজকে আমাকে পৌঁছে দিয়ে গুড়গাঁও ফিরে গেল বৈদেহী ।

আমি :  বৈদেহীকে ফোন করছি এক্ষুনি চলে আসার জন্য, ওর অভাবে আমি বেশ ডিপ্রেশানে আছি । এখন খেয়াল হচ্ছে, বৈদেহী মাঝে-মাঝে  আঙ্কলবাপির বদলে বাপি আর আণ্টিমার বদলে মা বলে ফেলত । একদিন রাতে ঘুমের ঘোরে বলেছিল যে ও অভিনয় করছে না, ও জেনুইন ।

আঁস্তাকুড়ের এলেকট্রা : আপনি দুদিন অপেক্ষা করুন, বৈদেহীকে সঙ্গে নিয়ে আঙ্কলবাপি আর আন্টিমা সোমবার নিজেরাই আসবেন, আমি ওনাদের ইনফর্ম করে দিয়েছি । বৈদেহী আমাদের গুড়গাঁওয়ের বাড়িতে, আঙ্কলবাপি আর আন্টিমা চণ্ডীগড়ের কোয়ার্টারে ।

আমি : তোমার ভূমিকায় ও তো দারুণ অভিনয় করে গেল তাহলে ।

আঁস্তাকুড়ের এলেকট্রা : আমার ভূমিকায় নয় স্যার, ও ওইরকমই, আগল নেই  বলতে যা বোঝায়, অ্যাগ্রেসিভ, আনইনহিবিটেড, হ্যাঁ, দিল্লিতে ইংরেজি আর বাংলা নাটকে অভিনয় করত, ছাত্র ইউনিয়ান করত। আমাকে দেখছেন তো, আমি ওর বিপরীত, রিজার্ভড, ইনহিবিটেড, কম কথা বলি, বিশেষ মিশি না, হইচই ভালো লাগে না, ড্রিংক করি না । আপনাকে লোকেট করার আইডিয়াটা আমার ; আমি আর বৈদেহী দুজনেই এডুকেট এ গার্ল চাইল্ড সংস্হায় গিয়েছিলুম ।

আমি : তোমরা দুজনেই দাবি করছ কেন যে তোমরা এলেকট্রা ।

আঁস্তাকুড়ের এলেকট্রা : ও এলেকট্রা কমপ্লেক্সের এলেকট্রা, মহাকাব্যের নায়িকা ; আপনাকে সিলভিয়া প্লাথের ড্যাডি কবিতাটা শুনিয়েছে তো, বলেছে আমায় ; অনেকদিন ধরে ও মুখস্হ করেছে দীর্ঘ কবিতাটা, স্রেফ আপনার জন্য, জীবনানন্দ দাশের কবিতাও বেশ কয়েকটা মুখস্হ করেছে, আপনাকে শোনাবে বলে । ও পশ্চিমবাংলাকে ভালোবাসে, নিজেই তার পরিচয় পেয়েছেন। ওর প্রেমকে রুদ্ধ করে রাখা হয়েছিল, হয়তো আপনার প্রতি ওর উন্মাদ ভালোবাসাও ওকে বেপরোয়া করে থাকবে, ওর পক্ষে মেনে নেয়া সম্ভব নয় যে আপনি অন্য কাউকে জীবনসঙ্গিনী করুন ।

আমি : জীবনানন্দ দাশের কবিতা ? তো উনি বাংলার মানুষ হয়ে জন্মাতে চাননি কেন ?

আঁস্তাকুড়ের এলেকট্রা : উনি জীবনে কাউকেই বিশ্বাসযোগ্য পাননি, আইআইটিতে শুনেছি বন্ধুদের কাছে, ট্রামের ঘণ্টির ছন্দে বিভোর হয়ে মারা গিয়েছিলেন, ট্রামলাইনে শালিক, কাক, পায়রা, শঙ্খচিল  বসেছিল, উড়তে চায়নি ।

আমি : তুমি ?

আঁস্তাকুড়ের এলেকট্রা : আমি  আঁস্তাকুড়ের এলেকট্রা, ড্যাডিজ লিটল গার্ল । আমার নাম নেতি রাখার জন্য, আর জন্মদিন পয়লা জানুয়ারি করার জন্য আমি কৃতজ্ঞ স্যার, নামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে আমার জন্মের ইতিহাস, আর বছরের প্রথম দিনে তা আমায় আমার জন্মের কথা মনে করিয়ে দ্যায় । আমি পশ্চিমবাংলাকে বৈদেহীর মতন ততো ভালোবাসি না । আমার সমস্ত আপনাতে কেন্দ্রিত ।

পরাজিত বোধ করছি মনে হল ।

আঁস্তাকুড়ের এলেকট্রা : আমি আজ  চলে যাচ্ছি স্যার, আর কখনও ফিরব কিনা জানি না । আপনার সঙ্গে অন্তত একবার দেখা করা জরুরি ছিল । আপনি চেয়েছিলেন নৈনিতালের বোর্ডিং স্কুলে পড়ি, পড়েছি । আপনি চেয়েছিলেন সায়েন্স স্ট্রিম নিয়ে পড়ি, পড়েছি । আপনি চেয়েছিলেন আইআইটির জন্য প্রতিযোগীতা করি, করেছি আর পড়েছি । আপনি চেয়েছিলেন ইলেকট্রনিক্স পড়ি, পড়েছি । আপনি চেয়েছিলেন ভালো চাকরি করি, করছি । আপনার প্রতিটি নির্দেশ পালন করেছি । আপনার পছন্দ বলে চিরকাল টোমাটোরেড লাল রঙের পোশাক পরেছি। প্রতিদান হিসাবে আমি কি আপনার একঘণ্টা সময় পেতে পারি ?

আমি : হ্যাঁ, হ্যাঁ, বসেই তো আছ, রেস্ট নিয়ে নাও, বহুক্ষণের জার্নি ।

আঁস্তাকুড়ের এলেকট্রা : না, স্যার । আপনি আমার প্রতিষ্ঠাতা, আপনার শরীরের ওপর আমার তেমনই অধিকার আছে, যেমন আমার অস্তিত্বের ওপর আপনার ; আমি যাবার আগে আপনার সঙ্গে একবার মনের মতন যৌনসম্পর্ক পাতিয়ে যেতে চাই, আমি মহাকাব্যের এলেকট্রার সঙ্গে প্রতিযোগীতা করছি না, আমার বাচ্চা চাই না, কেবল এক ঘণ্টা আপনাকে সেক্সুয়ালি পেতে চাই, আর তার জন্য এই নিন রানি ভিক্টোরিয়ার সময়ের রূপোর টাকা, আমার দিদি বৈদেহীকে আমি মনে করে দিয়েছিলেন । আপনার সঙ্গে সম্পর্কের  গোটা বেডশিটই মেমেন্টো হিসাবে নিজের কাছে রাখব আমি, সারাজীবন ।

##

শিশিরে কেউটের গন্ধ । উতরোল কোলাহল । গাছে-গাছে না-খোলা কাঁচা দরোজার আড়াল ।

স্ফিংক্স, মরুভূমি, পিরামিড, মমি । চাউনির অতিশয়োক্তি । জলের গভীরে রুপালি মৃগেলতন্বী ।

পদশব্দ থেকে মুক্ত হয়ে যায় পায়ের পাতা ।

কৃষ্ণবিবরের অচিন্ত্যনীয় ভর, আলোকেও হয়তো শেষাবধি আটক করে নিয়েছিল ।

##

আরেকটা কথা স্যার , বৈদেহী আপনারই মেয়ে ; আপনি যখন দমন-এ পোস্টেড ছিলেন, তখন আপনার কোয়ার্টারে গিয়েছিলেন আন্টিমা আর আঙ্কলবাপি, হানিমুন আর অফুরন্ত মদ খাবার লোভে । আন্টিমার সঙ্গে পর-পর কয়েকরাত আপনার দৈহিক সম্পর্ক হয়েছিল । আন্টিমা নিজে আমাকে বলেছিলেন, একদিন কান্নামেশা মাতাল অবস্হায়, আপনিই ওনার ভার্জিনিটি ডিফ্লাওয়ার করেছিলেন । সো লেট আস গো ইউ অ্যাণ্ড আই, লাইক টু পেশেন্টস ইথারাইজড আপঅন এ বেড…..

 

Posted in যৌনতা ও প্রেমের গল্প | Tagged , | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

আওয়ার লেডি অফ দি জিজুয়া : মলয় রায়চৌধুরী

স্কুলে ভর্তি হইয়াছিলাম অত্যন্ত অল্প বয়সে, জনৈক পাদ্রির বদান্যতায়, তাঁহার নাম ফাদার হিলম্যান, সম্পূর্ণ নাম জানা হয় নাই, কী করিয়াই বা জিজ্ঞাসা করিব যে, ফাদার আপনার নাম কি । তিনি জার্মানি হইতে ভারতে আসিয়াছিলেন, তাহা তিনি আমার পিতৃদেবকে একদা বলিয়াছিলেন, এবং ভারতের বৈচিত্র্য ও বৈভিন্ন্যের বহুমাত্রিকতা তাঁহাকে অত্যন্ত মুগ্ধ করিয়াছিল ; তিনি মনে করিতেন যে এই দেশ সূর্যরশ্মির সাতটি রঙের বিস্ফোরণ হইতে জন্মগ্রহণ করিয়াছে  ।

পাদ্রিসাহেবকে প্রথমবার দেখিয়া আমি অবাক হইয়া গিয়াছিলাম, কেননা তৎপূর্বে এই প্রকার ধবলত্বক মানুষ আমি দেখি নাই । তাঁহার দেহ একটি শ্বেত বস্ত্রে ঢাকা, কেবল মুখ ও দুইটি হাত কনুই হইতে ঢাকা নহে। এইরূপ পোশাকও পূর্বে দেখি নাই ।

গীর্জার যাযক ফাদার হিলম্যান তাঁহার মুগ্ধতাকে জাগতিক রূপ দিবার নিমিত্ত  ফোটো তুলিতে ভালোবাসিতেন । সেসময়ে ডিজিটাল ক্যামেরা ও হাই রেজোলিউশান ফোটোগ্রাফি আবিষ্কার হয় নাই । কাঁচকড়ার রোল ফিল্মে ফোটো তোলা হইত, এবং একটি ফিল্মে বারোটি অথবা ষোলোটি ফোটো তোলা যাইত । কাঁচকড়ার ফিল্মটি  অন্ধকার ঘরে রক্তবর্ণ আলো জ্বালাইয়া, রসায়নে চোবাইয়া প্রস্ফূটিত করা হইত, এবং তাহা শুকাইয়া গেলে সেই অন্ধকার ঘরে সেগুলি হইতে ফোটোগ্রাফির কাগজের উপর প্রিন্ট করা হইত । অজস্র ফোটো তুলিতেন তিনি, এবং ফোটোগ্রাফির সূত্রেই পিতৃদেবের সহিত তাঁহার পরিচয় । অজস্র ফোটো তুলিতেন বলিয়া প্রায়ই পিতৃদেবের সন্নিকটা আসিতেন ও কোথায় কী তাঁহাকে অবাক করিয়াছে তাহার গল্প করিতেন ।

পিতৃদেবের কৈশোরে তাঁহার পিতা, অর্থাৎ আমার পিতামহ, হৃদরোগে আক্রান্ত হইয়া  দেহত্যাগ করিয়াছিলেন । পিতৃদেব এবং তাঁহার ভাইবোনগণ কেহই স্কুলে পড়াশোনা করার সুযোগ পান নাই । পিতামহ ফোটোগ্রাফি ও ছবি অঙ্কনের একটি ভ্রাম্যমাণ সংস্হা স্হাপন করিয়াছিলেন, এবং তৎকালীন রাজা ও নবাবদিগের আহ্বানে সাড়া দিয়ে রাজপরিবারের সদস্যদিগের ফোটো তুলিয়া তৈলচিত্র অঙ্কনের উদ্দেশে বিভিন্ন রাজদরবারের অতিথিরূপে এক-একটি শহরে সপরিবারে আশ্রয় লইতেন, এবং বহুদিবস অতিথিরূপে অতিবাহিত করিতেন । পিতৃদেব ও ভাইগণের যেটুকু পড়াশুনা, তাহা রাজপরিবারের শিক্ষকদের অবদান । বাংলা ভাষার তুলনায় তাঁহারা ইংরেজি ও ফার্সিতে সড়গড় হইয়াছিলেন ।

পিতৃদেবের নিকট তাঁহার জীবনের বহু আকর্ষণীয় কাহিনি শুনিয়াছি । তাঁহাদের আতিথ্য সম্পর্কিত, খাদ্য ও ভ্রমণ সম্পর্কিত । এক্ষণে যাহাকে পাকিস্তান বলা হইয়া থাকে,  পিতামহ ও ভাইগণের সহিত তিনি তথাকার প্রতিটি রাজ্যে নবাব ও রাজাগণের আতিথ্য লইয়াছিলেন এবং রাজপরিবারের বিলাসিতা তাঁহাদের উপরও কিঞ্চিদধিক বর্ষিত হইত । কিন্তু পিতামহের মৃত্যুর কারণে আমরা অকস্মাৎ আর্থিক দারিদ্র্যে আক্রান্তি হইয়াছিলাম, শেষে ভাইগণ পাটনা শহরের মহাদলিতগণের পাড়ায় আশ্রয় লইতে বাধ্য হইয়াছিল ।

ফাদার হিলম্যানের সহিত ইংরেজিতে বার্তালাপ করিতে পিতৃদেবের অসুবিধা হইত না । কোনো এক দিবসে পিতৃদেব আমাকে তাঁহার স্টুডিও-দোকানে লইয়া গিয়াছিলেন । ফিল্মের কাঁচকড়া মুড়িবার যে লাল কাগজ থাকিত, তাহাকে লাঠির মতো পাকাইয়া দিয়াছিল রামখেলাওন সিং ডাবর, বাবার স্টুডিও-দোকানের কাজের লোক । আমি সেই লাঠিটিকে তরোয়ালের ন্যায় আমার চারিধারে ঘুরাইতে ছিলাম ও অদৃশ্য শত্রুদিগকে অসিযুদ্ধে পরাজিত করিতে ছিলাম । অকস্মাৎ ফাদার হিলম্যান স্টুডিও-দোকানে প্রবেশ করিলে, তাঁহার দিকেও অসি চালনা করিলে, ফাদার হিলম্যান পিতৃদেবকে প্রশ্ন করিলেন, এই বালকটি কি আপনার সন্তান , এখনও স্কুলে দেন নাই কেন, এই বয়সে যাহা শিখিবে তাহা সম্পূর্ণ জীবন স্মরণে রাখিতে পারিবে ।

ফাদার হিলম্যান ও পিতৃদেবের পরস্পরের কথোপকথন আমি তৎক্ষণে বুঝিতে পারি নাই, কিন্তু রাত্রে খাইতে বসিয়া পিতৃদেব মাকে যাহা বলিয়াছিলেন তাহা এইরূপ:-

পিতৃদেব ফাদার হিলম্যানকে কহিলেন, এতো কম বয়সে কি স্কুলে ভর্তি লয় ? দুই বৎসর পর দিব মনস্হ করিয়াছি, আমার প্রথম পুত্র যে সরকারি স্কুলে শিক্ষালাভ করিতেছে, সেই স্কুলেই দিব, তথায় এতো কম বয়সের বালকদের ভর্তি লয় না ।

ফাদার কহিলেন, আপনি আমার স্কুলে এই বালককে ভর্তি করিয়া দিতে পারেন, আমাদের স্কুলে একটি প্রাথমিক ক্লাস আছে, আপনার সন্তানের বয়সী বালক-বালিকাদের জন্য ।

পিতৃদেব কহিলেন, আপনাদের ক্যাথলিক স্কুলের মাসান্তিক ফিস তো আমি গণিতে পারিব না, আমাকে আমার ভাতৃগণের সংসারও প্রতিপালন করিতে হয় ।

ফাদার পিতৃদেবকে কহিলেন, আমি ওই স্কুলের সর্বময় কর্তা, ফিস মুকুব করিবার বন্দোবস্ত করিব, আপনি নামমাত্র টাকা দিয়া উহাকে আমাদের স্কুলে ভর্তি করিয়া দিন । কল্য আপনার ছেলেটিকে সঙ্গে লইয়া নয়টার সময় আসিবেন, দরখাস্ত পূরণ করিয়া কর্ম সমাধা করিলে কল্য হইতেই ক্লাস করিতে পারিবে ।

পরের দিন পিতৃদেবের সহিত ক্যাথলিক স্কুলে গিয়া ভর্তি হইয়া গেলাম । ফাদার হিলম্যানের ঘরের ছাদ বহু উচ্চ এবং চারিদিকের প্রতিটি দেয়ালে বিশালাকায় তৈলচিত্র, দেখিয়া মনে হইল চিত্রগুলি সন্তদিগের, যাহাদের গল্প বড়োজ্যাঠাইমা সন্ধ্যাবেলায় লন্ঠনরশ্মির চারিধারে বসিয়া শোনাইয়া থাকেন । সকলেই আলখাল্লা-পরা মানুষ, দাড়ি রহিয়াছে, মাথার পিছনে গোল রশ্মি । বিশাল ঘরটি তাঁহার একার ; আমরা যে গৃহে বসবাস করি তাহার দ্বিতলের সবকয়টি ঘরের ক্ষেত্রফল এই ঘরটির মাপের হইবে ।

স্কুলে প্রবেশ করিবার পর সিংহদ্বারের সন্মুখেই একটি শ্বেতপাথরের মূর্তি দেখিয়াছিলাম, জনৈক মা তাঁহার সদ্যোজাত সন্তানকে কোলে লইয়া বসিয়া আছেন, তাঁহার পিছনে লম্বা-দাড়ি একজন মানুষ, গায়ে আলখাল্লা, পায়ের নিকটে দুইটি মেষ শাবক লইয়া , দাঁড়াইয়া আছেন । সিংহদ্বার হইতে ভিতরে প্রবেশ করিবার পর, দক্ষিণ দিকে বিশাল সবুজ মাঠ, বালক বালিকারা খেলা করিতেছে, তাহাদিগের মধ্যে বেশ কয়েকজন ফাদার হিলম্যানের ন্যায় ধবলত্বকের বালক ও বালিকা, চুলগুলি স্বর্ণবর্ণ । বাম দিকে একটি ফুলের বাগান, বালক বালিকারা কেহই ফুলগুলি তুলিতে আগ্রহী নহে । আমার পাড়ার বালকেরা যদি এই ফুলগুলি দেখিত তাহা হইলে তৎক্ষণাত তুলিয়া পূজার জন্য বাড়ি লইয়া যাইত অথবা মন্দিরের সামনে বসিয়া বিক্রয় করিত ।

ঢং ঢং করিয়া কয়েকবার কাঁসরের ন্যায় ঘণ্টা বাজিলে, বালক বালিকারা বিভিন্ন ঘরের দিকে দৌড়াইয়া চলিয়া গেল, নিমেষে মাঠ ফাঁকা ।

পিতৃদেব আমাকে কহিলেন, ভালো করিয়া ক্লাস করিবে, দ্বিপ্রহরে স্টুডিও-দোকানের কাজের লোক রামখেলাওন সিং ডাবর টিফিন লইয়া আসিবে, তাহা ভক্ষণ করিয়া লইও, কল্য হইতে স্কুলে আসিবার সময়ে তুমি নিজের সঙ্গে টিফিন লইয়া আসিবে । স্কুল ছুটির সময়ে দ্বারপ্রান্তে ডাবর তোমার জন্য অপেক্ষা করিবে, তাহার সাইকেলে বসিয়া গৃহে ফিরিও ।

যে ক্সাসঘরে আমাকে লইয়া যাওয়া হইল, তথায় বালক বালিকারা সকলেই আমার বয়সী ; আমার চেয়ে কম বয়সীও রহিয়াছে কয়েকজন । আমি অদ্য প্রথম ক্লাস করিতেছি বলিয়া ক্লাসের শিক্ষিকা আমার নিকটে আসিয়া নিচু হইয়া আমার মুখের নিকট মুখ আনিয়া কিছু প্রশ্ন করিলেন, ইংরাজি প্রশ্নের কিছুই বুঝিতে পারিলাম না ; তিনি আমার হস্তা কয়েকটি কার্ড দিলেন, যাহাতে সন্তদিগের ছবি এবং তুষারের ভিতর দিয়ে হরিণের যান লইয়া একজন লালপোশাক বৃদ্ধ, শাদা দাড়ি, ছুটিয়া চলিয়াছে । ইহার পর তিনি আমাকে কয়েকটি গ্রন্হ দিলেন, একটিকে গ্রন্হ বলা চলে অন্যগুলি পুস্তিকা, ইংরেজি অক্ষর সম্বলিত ।

ক্লাসের শিক্ষিকাও ধ্ববলত্বক, কেবল তাঁহার মুখ দেখা যাইতেছে । পোশাককে এতো বেশি শ্বেত কি করিয়া রাখেন বুঝিয়া পাইলাম না । আমার মা কাপড় কাচেন, সোডা দিয়া কাচিলেও শ্বত বস্ত্র এতো বেশি শ্বেত হয় না । শিক্ষিকা আমার মুখের নিকটা তাঁহার মাথা নামাইয়া আনিলে, তাঁহার গভীর দৃষ্টিতে অভয় দর্শন করিয়া আশ্বস্ত হইলাম ।

ক্রমে স্কুলে কার্যক্রমে অভ্যস্ত হইয়া গেলাম । আমার ন্যায় একটি বালিকা ইংরেজি জানিত না, সে ফিসফিস করিয়া বাংলায় বলিয়াছিল যে সুযোগ পাইলে আমরা দুইজনে লুকাইয়া বাংলায় কথা কহিব, ইংরেজি শিখিয়া গেলে তৎক্ষণে ইংরেজিতে বার্তালাপ করিব । আমি একজন বন্ধু পাইলাম । প্রতিদিন দ্বিপ্রহরে আমরা আমাদের জলখাবার দুইজনে অর্ধেক বিনিময় করিয়া লইতাম । তাহার খাদ্যবস্তু দেখিয়া বুঝিতাম সে কোনো ধনী গৃহের সন্তান ; তদ্যপি আমার টিফিন খাইতে তাহার আনন্দ হইত, বলিত যে এইপ্রকার স্বাদু খাবার সে খায় নাই ।

প্রথম সপ্তাহের পর একটি আনন্দের ঘটনা ঘটিল । ফাদার হিলম্যান আমাদের সবাইকে বলিলেন গ্রন্হের মতো দেখিতে যাহা, তাহা লইয়া অন্য একটি ক্লাসে শিক্ষণের জন্য যাইতে হইবে । আমাদিগের সকলকে তাঁহার পিছন-পিছন লইয়া চলিলেন স্কুল সংলগ্ন একটি বিশাল অট্টালিকায়, তাহার গম্বুজ অতিউচ্চ । ভিতরে প্রবেশ করিয়া অবাক হইয়া গেলাম । একটি দালানঘর, দুই পাশে বসিবার বেঞ্চ ও তাহার সামনে টেবিলের ন্যায়, ঝকঝকে পালিশ করা  । সন্মুখে একটি পাথরের মূর্তি, একজন মানুষের দুই হাত দুইদিকে করিয়ে পেরেক দিয়া কাষ্ঠখণ্ডে পোঁতা হইয়াছে, তাহার পদদ্বয়ও সেইরূপে পেরেকে বিদ্ধ করা হইয়াছে, আরেকটি লম্বালম্বি কাষ্ঠখণ্ডে ।

আমাদিগকে আশ্বস্ত করিয়া ফাদার হিলম্যান প্রথমে ইংরেজিতে কিছু বলিয়া কহিলেন যে উনি ইরেজিতে যাহা কহিবেন তাহাকে হিন্দিতেও বলিবেন । বড়োই আনন্দ হইল । উনি বলিলেন যে প্রতিদিন একটি ক্লাস হইবে যাহার নাম বাইবেলের গল্পের ক্লাস । যে গ্রন্হটি আমাদের দেয়া হইয়াছে তাহাতে বাইবেলের কয়েকটি গল্প রহিয়াছে, এবং তিনি সেইগুলিই শোনাইবেন । যাঁহাদের গল্প তিনি বলিবেন তাঁহাদের তৈলচিত্র এই গীর্জাঘরটিতে আছে । ইংরেজিতে এই ঘরটিকে বলে চার্চ এবং হিন্দিতে গির্জাঘর ।

পোশাকহীন যে মানুষটিকে কাষ্ঠখণ্ডে পেরেক দিয়া ঝুলাইয়া রাখা হইয়াছে, তাহার গল্প দিয়া তিনি আরম্ভ করিলেন । কাষ্ঠখণ্ডে ঝুলাইবার পূর্বে তাঁহাকে ঐ ভারি কাষ্ঠখণ্ড বহু পথ পরিভ্রমণ করিয়া বহন করিতে হইয়াছিল, তাঁহাকে শান্তির ধর্ম প্রচারের জন্য ঐরূপ শাস্তি প্রদান করা হইয়াছিল । যে কাষ্ঠখণ্ডে তিনি বিদ্ধ তাহার নাম ক্রস এবং যাঁহাকে বিদ্ধ করা হইয়াছে তাঁহার নাম জিজাস খ্রাইস্ট ।

আমাদের গৃহে বহু কাষ্ঠখণ্ড আছে যাহা প্যাকিং বাক্সের রূপে পিতৃদেবের স্টুডিও-দোকানে প্রায়ই বিক্রয়ের সম্ভার লইয়া ভারতের বিভিন্ন স্হান হইতে আসে । প্যাকিং বাক্স খুলিয়া বিক্রয়ের দ্রব্যাদি স্টুডিও-দোকানে রক্ষিত হয় এবং প্যাকিং বাক্স হইতে পেরেকগুলি খুলিয়া রাম খেলাওন সিং বিক্রয় করে, নিজ খইনি খাইবার দাম সংগ্রহের নিমিত্ত । কাষ্ঠখণ্ডগুলি ক্রয়ের জন্য কয়েকমাস অন্তর ক্রেতা আসিলে তাহাকে বিক্রয় করিয়া জঞ্জাল পরিষ্কৃত হয় ।

জিজাস খ্রাইস্টের জীবনকাহিনীতে উৎসাহিত হইয়া স্কুলের ছুটির পর গৃহে প্রত্যাবর্তনান্তে  বৈকাল বেলায় দুইটি কাষ্ঠখণ্ডকে দড়ি দিয়া বাঁধিয়া ক্রস তৈয়ারি করিয়া লইলাম, পাড়ায় পথে বাহির হইলে সমবয়সী বালক-বালিকাগণ জানিতে চাহিল ইহা কী বস্তু, কোনো নূতন ধরণের খেলা ? বলিলাম, ইহা কাঁধে লইয়া পথে-পথে ভ্রমণ করিতে হয় এবং যাহারা পিছনে আসে তাহারা চিৎকার করিয়া জনগণকে সংবাদ জানাইতে থাকে ।

পাড়ার বালক অথবা কিশোর ফুটবল দল জিতিয়া ফিরিলে যদ্রুপ ‘হিপ হিপ হুররে’ চিৎকারধ্বনিতে উল্লাস প্রকাশিত হয়, আমার পিছনের বালক-বালিকাগণ তদ্রুপ ‘হিপ হিপ হুররে’ চিৎকার করিতে লাগিল । আমি পাড়ার বিভিন্ন গলির ভিতর দিয়া পরিক্রমা করিতে লাগিলাম ।

বিরজুর মা, যিনি ছোলাভাজা বিক্রয় করিয়া জীবন অতিবাহন করেন, তাঁহাকে দেখিলাম গালে হাত রাখিয়া অত্যন্ত দুঃখী মুখে চুপচাপ বসিয়া আছেন । তাঁহার মাটির গৃহের দ্বারপ্রান্তে বসিয়াছিলেন । ইহা তো বিরজুর মায়ের ছোলা বিক্রয়ের সময় । কাষ্ঠখণ্ডের ক্রস কাঁধ হইতে মাটিতে নামাইয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, কী হইয়াছে, বিরজু কি আবার কোনো অপকর্ম করিয়াছে ?

বিরজুর মা কহিলেন, বিরজুকে আবার পুলিশ ধরিয়া লইয়া গেছে ; চুরি করিতে গিয়া ধরা পড়িয়া গিয়াছিল, এক্ষণে গৃহে কাষ্ঠ নাই যে আগুন ধরাইয়া ছোলা ভাজিব ।

তাঁহার কথা শুনিয়া আমি আমার ক্রস মাটি হইতে তুলিয়া বিরজুর মাকে দিয়া দিলাম । উনি প্রশ্ন করিলেন, ইহা কী বস্তু, তুই  কী লইয়া খেলা করিবি ।

আমি বলিলাম, ইহা জিজাস খ্রাইস্টের কাষ্ঠখণ্ড, তিনি মহাপুরুষ ছিলেন, স্কুলে শিখাইয়াছে ; বিরজুকে পুলিশ যতদিবস ধরিয়া রাখিবে, আমি বৈকালে পরিক্রমার পর একটি করিয়া ক্রস তোমাকে আনিয়া দিব ।

বিরজুর মা আমাকে জড়াইয়া ধরিলেন ও আদর করিয়া কহিলেন, তুইই আমার জিজুয়া মহাপুরুষ ।

বুঝিতে পারিলাম স্হানীয় ভাষায় নামের সংক্ষিপ্তকরণ প্রক্রিয়া প্রয়োগ করিয়া বিরজুর মা জিজাস খ্রাইস্টকে জিজুয়া নামে অভিহিত করিয়াছেন ।

বিরজু গৃহে প্রত্যাবর্তনের দিন পর্যন্ত আমি প্রতিদিন বৈকালে ছোলাউলিকে দুইটি করিয়া কাষ্ঠখণ্ড দিয়াছি, এবং  জিজুয়া মহাপুরুষরূপে আদৃত হইয়াছি ।

 

 

 

Posted in মলয় রায়চৌধুরী, স্যাটায়ার | Tagged , | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

এই রোগের নাম চাই : মলয় রায়চৌধুরী

—তুমি পুলিশে চাকরি পেলে কী করে ? তোমার নামে তো অনেককিছু শোনা যেতো, মানে তোমার অসামাজিক কাজকারবারের ব্যাপারে ।

—না স্যার, আমি প্রথম থেকে এরকুম ছিলুম না ; রোজগারপাতির জন্যে, বাবা-মা আর সংসারের ব্যাগার ঠেলতে  আমাকে নানা কাজ করতে হয়েচে, এখুন অবশ্য নানুদি আমার টাকায় সংসার চালাতে দিতে চান না, বলেন ও হোলো রোগের ট্যাকা । আপনি তো জানেন আমার বাবা-মা দুজনেই অন্ধ। অন্ধ ছিলেন না, সুদু ক্যাটারাট ছিল ওনাদের ; বিনে পয়সায় অপারেশান করাতে গিয়ে চোখ খুইয়েচেন, ক্যাম্প বসিয়েছিল ক্লাবের গেঁড়ে-কাত্তিকরা,  চোখের ডাক্তারদের এনে, ক্লাবেই চল্লিশ জনের অপারেশান হয়েছিল, সকলেই অন্ধ হয়ে গেচে । হেমুদা মারা যাবার পর ওনার অন্ধ বাবা-মা ভিককে করে খাচ্চেন, খাচ্চেন আর কি বলব, ওই কোনো রকুমে টিকে আচেন । ক্লাবের কত্তাদের ধরেছিলুম আমরা, তা ওয়াঁরা বললে সরকারের কাচে আবেদন করা হয়েচে । সরকার আর কী করবে বলুন, তাদের কি হেগে-পেদে কাজ নেই যে অন্ধদের পেচনে দৌড়ুবে, অন্ধ বলে তো ভোটও দিতে যেতে পারেনি ওয়াঁরা, শেষে আমরাই ব্যবস্হা করে ওয়াঁদের ভোটগুনো দিলুম, তার বদলে নেতাটা যতো টাকা দেবে বলেছিল, তা দিলে না, ঘাগুর মেসো ।

—কিন্তু পুলিশে চাকরি পেলে কেমন করে, তোমার তো লেখাপড়াও ঢুঢু ।

—বলচি স্যার । ইসকুলে টেন পর্যন্ত পড়েছিলুম, টেনে-টুনে, ক্লাস টিচারদের ভয় দেখিয়ে ; ক্লাস টিচাররা কেউই চাইতো না যে আমি ওয়াঁদের ক্লাসে পরের বচরও থাকি । আর না পড়েও তো বারো ক্লাসের সার্টিফিকেট পাওয়া যায়, জানেন তো । ক্লাবের কত্তা অন্তত এটুকু খয়রাত তো করেছিলেন । বাবা-মায়ের চোখ ফিরিয়ে দিচ্চি, বলেছিলেন উনি সার্টিফিকেটের কাগচটা দেবার সময়ে । ইংরিজি বলতে পারি না, নয়তো উকিল হবার ডিগ্রিও যোগাড় করে ফেলতুম । শালা ইসকুলের মাস্টাররাই ইংরিজি জানে না, পড়াবে কি ! ঝণাদা উকিল হবার ডিগ্রি পেয়েচে বাবা-মায়ের চোখের বদলে, তবে ঝণাদা বাবা-মাকে দেখার বদলে বিয়ে করে অন্য শহরে ওকালতি করতে চলে গেচে, ওয়াঁর মা-বাপ ভিককে করে চালাচ্চেন ।

—ইনটারভিউ তো ইংরেজিতে হয় ?

—না, স্যার, কন্সটেবলদের ইনটারভিউ ইংরিজিতে হয় না । তাই রক্ষে ।

—কিন্তু তুমি তো ইন্সপেক্টার ।

—হ্যাঁ, স্যার, ধাপে-ধাপে হয়েছি ।

—ধাপে-ধাপে ? না লাশে-লাশে ?

—আমার কোনো দোষ নেই স্যার । আমি হুকুম পেয়েছি, হুকুম তামিল করেছি ।

—তোমার দাদা তো রাজনীতি করতেন ?

—দাদা নয় স্যার, উনি আমার কাকা । সংসারটা উনিই টানতেন । রাজনীতি করতেন না উনি, লেকালিকি নিয়ে থাকতেন । তখন  খতমের যুগ চলছিল, ওয়াঁদের কোটা পুরো করার জন্যে কাকাকে বদনাম দিয়ে তুলে নিয়ে গেল, তারপর কয়েকদিন পাওয়া যায়নি ; পাওয়া গেল একটা নৌকো ডুবে যাবার পর।

—বদনাম ?

—বদনামইতো । সব সরকারেরই একদিকে থাকে যারা বদনাম, আরেক দিকে নাম । এ এক গোলকধাঁধা আমি আজও বুঝে উটতে পারিনি । কে যে কখুন নাম থেকে বদনামের দলে চলে যাবে আর কে যে কখুন রঙ পালটে বদনাম থেকে রাতারাতি নামের দলে চলে যাবে, তার কোনো ঠিকঠিকানা নেই ।

—তুমি তো বদনামেও নেই নামেও নেই ।

—হ্যাঁ, স্যার, আমি ওই যারা দোল খায় তাদের দলে । আমি চিরকাল সিংহাসনের পক্ষে, যে বসবে তার থুতু চাটবো, এই আমার জীবনের লটারি ।

—এখন হঠাৎ মুখ খুলতে চাইছ কেন ?

—কালা করতুত করেচে যারা তারা এবার ফেঁসে যাবে । তারা আমাকে ফাঁসাতে চাইচে । আমাকে সরিয়ে দিতে লোক লাগিয়েচে , কাকার মতন আমাকেও লোপাট করার তালে আচে ।

—তুমিও তো ওই যাকে বলছ কালা করতুত, সেই সব কাণ্ড নিজেও করেছ ।

—নিজের ইচ্ছেয় তো করিনি স্যার । হুকুম পেইচি, হুকুম তামিল করিচি ।

—কিন্তু করেছ তো তুমি ?

—আমি কি আর একা করিচি ? ওয়াঁরাও করেচেন । ওয়াঁরাই বেশি করেচেন । আপনি শুনে দংগ রয়ে যাবেন ওয়াঁদের কালা করতুত শুনে । কন্সটেবলের চাকরি তো এমনি-এমনি পাইনি, ওয়াঁদের কালা করতুত ঢাকার জন্যে মনহুস একজন লোকের দরকার ছিল যে কখুনও না বলবে না, মুখ বুজে অর্ডার শুনবে ।

—তোমার ভয় করে না ? একদিকে তোমার ওপরওয়ালারা আরেক দিকে যাদের খতম করেছ তাদের লোকেরা এবার তোমাকে সরিয়ে দিতে চাইবে, মুখ খোলার জন্য ।

—আমি ওয়াঁদের সব কালা করতুত একটা ভিডিওতে রেকর্ড করে রেকিচি ।

—মানে ? সবকটা মার্ডারের ভিডিও তুলে রেখেছ ?

—না, কারা কাকে আর কাদের মার্ডার করার হুকুম দিয়েছিল, তা বলিচি আর সেই সঙ্গে কিছু ফোটুও আচে।

—তোমার ওপরওয়ালারা তো নিজেদের ইচ্ছেয় করেননি । তাঁরাও নেতাদের হুকুমে করেছেন ।

—সে সব নেতাদের নামও রেকর্ড করিচি ভিডিওতে ; সহজে কেউ আমার গায়ে হাত দিতে পারচে না তাই । জানে যে আমার গায়ে হাত দিলেই ভিডিওর কপি পৌঁছে যাবে নিউজ চ্যানেল আর খবরের কাগচের দপতরে, সেরকম ব্যবস্হা করে রেকিচি । আপনি আগে আমাদের পাড়ায় থাকতেন, ছোটোবেলা থেকে চেনেন আমায়, তাই আপনাকেই সব খুলে বলচি, আমাকে লোপাট করে দিলে আপনি সব জানিয়ে দিতে পারবেন । আপনাদের চ্যানেল দেখি তো, বেশ চেঁচামেচি করে খবর পড়েন সবাই, দিল খুশ হয়ে যায় ।

—আমি তো নিউজ চ্যানেলে আগে কাজ করতাম, এখন করি না, এখন আমি তোমাকে নিয়ে একটা বই লিখতে চাইছি । বইটা লিখে রেডি রাখব, তোমাকে সরিয়ে দিলেই প্রকাশ করব । তুমি একটা কনট্র্যাক্ট সই করে দেবেন ।

—হ্যাঁ, স্যার, তখুন বিক্কিরি বেশি হবে । আমি বেঁচে থাকতে বইটা তেমন বিক্কিরি হবে না । বইতে ফোটুগুনোও দেবেন স্যার । আর এই ডায়েরিটা রাখুন, এটা আমার কাকার, উনি লেকালিকি করতেন ।

—কই দেখি । বাঃ, প্রচুর কোটেশান দেখছি, ওনার নিজের ?

—হ্যাঁ, স্যার ।

—যাক ভালো হলো । বইটায় কিছু জ্ঞানগর্ভ ব্যাপার রাখতে পারব, নয়তো সমালোচকরা ভাববে পাল্প ফিকশান । আগের বইটাকে কেউ ননফিকশান বলে মানতে চায়নি ।

—রাখবেন স্যার, কাকা সারা রাত পড়তেন আর লিখতেন, পায়ে পোলিও ছিল তো, ক্রাচ নিয়ে অফিসে যেতেন । বাড়িতে হুইল চেয়ার ব্যবহার করতেন, এঘর-ওঘর করার জন্যে, লেখালিখির জন্য ।

—দাঁড়াও, একটু পড়ি কোটেশানগুলো ।

*শত্রুতাও সম্পর্কে, যা কেউ চায় না।

*জলাতঙ্ক রোগটা মানুষেরা কুকুরের কাছ থেকে পেয়েছে ।

*জীবনে অন্তত একবার কেউ না কেউ না কেউ পিঠে ছুরি মারবেই, আর সে আঘাত কখনও সারবে

না।

*সঙ্গমের চেয়ে যোনির দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকার আনন্দ বেশি ।

*তুমি যদি কাউকে ঘৃণা করো, সে যদি তা জানতে না পারে, তাহলে ঘৃণা করাটা উদ্দেশ্যহীন ।

*যদি না চোখে-চোখে রাখা হয়, তাহলে পুলিশ স্টেট হয়ে ওঠার জন্য গণতন্ত্রের মাটি সবচেয়ে নরম ।

*আমার কখনও ‘লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট’ হয়নি ; প্রতিবার ‘লাভ অ্যাট ফার্স্ট টাচ’ হয়েছে ।

*সৃজনশীল মানুষের অধঃপতনের অভিজ্ঞতা হওয়া জরুরি, কেননা তা জ্যোতিষ্কদের হয়, পশুদের

হয় না ।

*অতীতকে কারাগার মনে করলে সমস্ত স্মৃতি নোংরা হয়ে যায় ।

*যে মেয়েকে দেখতে এসে পাত্র পক্ষ পছন্দ করল না, সে জীবনকেই রিজেকশান বলে মনে করবে ।

*কবিতার জন্য নিয়তিকে বশে আনতে হয় ।

*মানুষ পৃথিবীর প্রতি অপার বিরক্তি নিয়ে জন্মায় ; তাই সে জন্মেই কাঁদতে আরম্ভ করে ।

*অপবাদ আকর্ষণ করার ক্ষমতা না থাকলে জীবদ্দশায় একজন কবির খ্যাতি মেকি হবার সম্ভাবনা ।

*মানব সম্প্রদায়ের মুক্তির তাত্বিকরা শেষ পর্যন্ত গণহত্যাকারীতে রূপান্তরিত হয় ।

*এককালে যারা অবক্ষয়-বিরোধী ছিল, তারাই বঙ্গসমাজে অবক্ষয় নিয়ে এলো ।

*ভদ্রলোক কাদের বলে ? যারা ক্লিটোরিস উচ্চারণ করতে লজ্জা পায় ।

*বিশ্বাসঘাতকেরা মরার আগে আত্মসন্মানহীন শিষ্যদল তৈরি করে যায়, যারা মৃতের গোলামি করে

বেঁচে থাকে ।

*রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং গুণ্ডামি হল বিশুদ্ধ ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বীতার পরিসর ।

*”পবিত্র বই” আর “অপবিত্র বই”-এর পার্থক্য হল যে “অপবিত্র বই” কেবল মানুষরাই লিখতে পারে ।

*এক-একজন মানুষকে একবার দেখেই টের পাওয়া যায় তার মগজে সাভানার কোন জন্তুদের

উৎপাত চলছে ।

*যে লোকটা কখনও কোনো মাদক জীবনে নেয়নি, সে গাঁজা ফোঁকার বিরোধিতা করবেই ।

*আশাবাদ : একটা নক্ষত্র কয়েক লক্ষ বছর আগে মরে গেছে ; তার আলো এখন পৃথিবীতে এসে

পৌঁছেচে ।

*বিছানাকে অন্ধকারে আরণ্যক করে তোলাই ফুলশয্যা ।

*কবিতার উৎস কোনো না কোনো রহস্য যার উন্মোচন অন্য উপায়ে সম্ভব নয় ।

*কোথায় জায়গাটা ঠিক কোথায় ?

*পশুরা জানতে পারল না যে মানুষ হল সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী ।

*ঈশ্বর কেবলমাত্র একজন এবং তাঁর নাম যৌনতা ।

*প্রতিশোধের ষড়যন্ত্র করা জরুরি কেননা তা জখমকে শুকোতে দ্যায় না ।

*জীবন সম্পর্কে কথা বলা প্রায় অসম্ভব কেননা তার জন্য যথার্থ অভিব্যক্তি কোনো ভাষায় নেই।

*ব্যর্থ বিপ্লবী মার্কসের কবর দেখতে যান ; ব্যর্থ কবি দেখতে যান বদল্যারের কবর ।

*প্রেম তখনই সফল যখন তা প্রেমিক ও প্রেমিকা দুজনকেই ধ্বংস করে দ্যায় ।

*বর্ণবিভাজিত সমাজব্যবস্হায় শ্রেণিহীন সমাজের কল্পনা অবাস্তব ; মনুস্মৃতির পাহাড় মাথায়

চাপিয়ে বিপ্লবের কথা ভাবা বাতুলতা । নির্বাচন প্রক্রিয়া বর্ণবিভাজনের শেকড় সমাজের আরও

গভীরে পৌঁছে দিয়েছে ।

*স্মৃতির জ্বলন্ত শবকে শ্মশানের ডোমেদের মতন খুঁচিয়ে আগুনের ফিনকি উড়িয়ে চলেছি।

—তোমার কাকা বোধহয় প্রেম করতেন ? কবিতার বইও লিখে থাকবেন ।

—হ্যাঁ, করতো তো , কবিতার বইতে লেখা আছে, যাকে ভালোবাসতো তার নাম , সংস্কৃততে কি সব লেখা তাকে নিয়ে।

—কই দেখি ।

—এক-আধ কপি আছে হয়তো । বিক্রি হয়নি তো, আমিই বইয়ের দোকানে দিয়েছিলুম, এক কপিও বিক্রি হয়নি । বইগুলো একে-তাকে ডাকে পাটাত, একআধজন চিটি লিকে জানাতো কেমন লেগেচে । ব্যাস । আমিই তো পোস্টাপিসে গিয়ে ডাকবাক্সে ফেলে আসতুম । এই নিন, রেখে-রেখে উইয়ে কেটে দিয়েচে ।

—বাঃ, ওনার প্রেমিকার নাম তো বেশ, নয়নসুন্দরী  । কোথায় থাকেন উনি ? বেঁচে আছেন এখনও?

—ও তো আমাদের নানুদির ভালো নাম । একটু আগে দেখলেন না, আমাদের বাড়িতেই থাকে এখুন, আগে কম বয়েসে আমাদের কাজের বউ ছিল । উনিই নানুদি, এখন বয়স হয়ে গেচে একটু, তবু চোখ দুটো দেখলেন তো কেমন বড়ো-বড়ো । নানুদির বরকেও পুলিশ মেরে ফেলেছিল, ফালতু ছিঁচকে কাজ করতো, পাউচে মাল ভরে বিক্রি, ড্রাগ নিয়ে এখান-সেখান, ঠ্যাঙানির চোটে মরেই গেল বেচারা । নানুদি আর কাকা তার আগে থেকেই ঘরের দরোজা বন্ধ করে নিজেদের ভালোবাসতো । একবার দরোজার ফাঁক দিয়ে দেখেছিলুম, নানুদি শাড়ি-ব্লাউজ খুলে দাঁড়িয়ে আচে আর কাকা একেবারে কাচ থেকে হুইলচেয়ারে বসে নানুদির দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আচে, দুপায়ের ফাঁকের দিকে, বুঝচেন তো কী বলচি । তারপর নানুদি হাঁটুগেড়ে কাকার কোলে মুখ রাখলে, জানেন তো, মুখ দিয়ে যা করবার করলে । কাকাও মুখ দিয়েই যা করার করতো । নানুদি কাকাকে চান করিয়ে দিতো, সাবান মাখিয়ে দিতো, গা পুঁচে দিতো । কাকা মরে যাবার পর নানুদি বিধবার সাদা সাড়ি ধরেচে । বর মরার পর সাদা সাড়ি ধরেনি ।

—উনি তোমাদের বাড়িতে এসে রয়ে গেলেন তোমার মা-বাবা অবজেকশান নেননি ?

—মা-বাবা দেখতেই পায় না ; নানুদি হাল না ধরলে ওয়াঁরা অক্কা পেয়ে যেতো অ্যাদ্দিনে, ওয়াঁদের কে দেখতো ।

—তুমিই খরচ যোগাও ? প্রচুর টাকা করেছ শুনেছি, জমিজমাও কিনেছ ।

—নাহ, নানুদি আমার টাকা নেন না । উনি বলেন এই রোগের টাকা নেবেন না । রোগের কী আচে বলুন আপনি? নানুদি নিজের বর থাকতেই কাকাকে ভালোবাসতো, ঘর বন্ধ করে কতো কি করতো, অথচ আমার কাজকে বলে রোগ ।

—তুমি খুনি বলে, কতো খুন করেছ তার হিসেব রেখেছ ? খুন করা আর ভালোবাসার মধ্যে মেরে ফেলা আর বাঁচিয়ে রাখার তফাত । তোমার কাকাকে উনি ভালোবেসে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন । তোমাদের সংসারে রয়ে গেলেন তোমার কাকাকে ভালোবাসতেন বলে ।

—না, স্যার, কোনো হিসেব রাখিনি, রাখলে মাথা গোলমাল হয়ে যেতো ।

—তোমার কাকাকে কী ভাবে খুন করা হয়েছিল তা জেনেছ নিশ্চয়ই ওই চাকরিতে যোগ দিয়ে ?

—কাকাকে ওনার হুইল চেয়ারের সঙ্গে নাইলন দড়ি দিয়ে বেঁধে নৌকোয় চাপিয়ে মাঝনদীতে নিয়ে গিয়ে ফেলে দিয়েছিল । গুলি মেরে বা গলা কেটে ফেলে দিলেও কথা ছিল ; তা নয়, একেবারে জ্যান্ত মানুষটাকে তার হুইল চেয়ারের সঙ্গে বেঁধে জলে ফেলে দিলে ।

—তুমি সেই থেকে তোমার কাকার মৃত্যুর প্রতিশোধ নিয়ে চলেছ নানা মানুষকে মেরে ।

—তা জানি না, ভেবে দেখিনি । কাকাকে ছেদ্দাভক্তি করতুম, কিন্তু ওয়াঁর জন্যে জান লড়িয়ে দেবার কতা ভাবিনি কখুনও । মানুষ মারি মারার জন্যে । একজন মানুষকে দনাদ্দন গুলি চালিয়ে উড়িয়ে দেয়াটা যেন নিজেই পাখনা মেলে ওড়ার মতন । মানুষকে মেরে ফেলার আনন্দ বাঘ-সিংহ মারার চেয়ে ঢের ঢের বেশি। আপনাকে বোঝাতে পারব না ।

—প্রথমবার যখন একজনকে মেরেছিলে তখন হাত কাঁপেনি ?

—না স্যার, হাত কাঁপবে কেন ? আমি তো চুরি করছি না বা পকেট মারছি না যে প্রথমবার হাত কাঁপবে।

—চালাঘরসুদ্ধ পুড়িয়ে কয়েকজনকে মেরেছিলে বলে শুনেছি ।

—একা করিনি তো ! আমাদের সিনিয়র সঙ্গে ছিল । বাড়ির ভেতর থেকে মেয়েমানুষ-পুরুষমানুষের বাঁচাও বাঁচাও চিৎকার শুনতেন যদি আপনি । কী যে মজা পাচ্ছিলুম আমরা সবাই বুঝিয়ে বলতে পারব না। সিনিয়ররা আমাদের দামি মদ খাইয়ে নিয়ে গিসল, ভেবেছিল যে আমরা ঘাবড়ে যাবো, ভয় পাবো । আমরা যে ওয়াঁদের মাতায় হাগি তা দুচার মাসেই বুঝে গিসলেন ওয়াঁরা ।

—কেউ বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেননি ?

—চেষ্টা আবার কী করবে । আগুন লাগাবার পর গুলি চালিয়ে চিৎকার-চেঁচামেচি বন্ধ করে দিয়েছিলুম ।

—ধর্ষণের মোটর সাইকেল গ্যাঙ হয়েছে, তুমি তার সদস্য তো ?

—না স্যার, আমি কোনোরকুম রাজনীতিতে নেই ; ওসব রাজনীতির ব্যাপার-স্যাপার, বুঝিও না ভালো।

—সেক্সে তোমার আগ্রহ নেই ।

—আজকাল উঁচু দরের কল গার্ল পাওয়া যায়, টাকা ঢাললে ; রাজনীতির নোংরামিতে কেন যাব মিছিমিছি ।

—উঁচু দরের মানে । অনেক টাকা খরচ করতে হয় ? মধুচক্র ?

—ঠিক তা নয় । নেটওয়ার্ক আছে, তাদের বললে হোটেলে রুম বুক করে সাপলাই দ্যায় । বেশ্যাদের চেয়ে আমার কলগার্লদের পছন্দ । রেট যে বেশি তা ঠিক । উজবেকিস্তানের মেয়েদের ভালো নেটওয়য়র্ক ছিল, মাঝখান থেকে দুজন খুন হয়ে কলগার্লের বাজারটাকে সামনে এনে গোলমাল বাধিয়ে দিয়েছে । ওদের সঙ্গে বিকিনি পরা সেলফি তোলাতেও এক হাজার টাকা চায় । শোবার জন্যে পনেরো হাজার থেকে এক লাখ, মালের বডি অনুযায়ী । তাজাকিস্তানের এক আধবুড়ি ওদের নেটওয়ার্কের আন্টি, তাকে আগাম জানাতে হয়, টাটকা মাল চাইলে আনিয়ে দ্যায় । ট্যুরিস্ট ভিসা নিয়ে আসে, কুড়ি-পঁচিশ লাখ কামিয়ে এক হপ্তায় নিজের দেশে ফিরে যায়। । হিন্দি  ফিলিমে নাচের দলে ঢোকার জন্যে যারা আসে, তাদের রেট আরও বেশি, দেখেছেন তো, সকলেই বলতে গেলে সুন্দুরী আর কী ফসসা, গোলাপি মাখন অ্যাগবারে। আপনার দরকার হলে বলবেন, অ্যারেঞ্জ করে দেব ।

—বলব ।

—ওদের আসা-যাবার গাড়ির ব্যবস্হা করতে হয় ।

—তোমার কাকা কবিতার বইটার নাম রেখেছেন “নয়নতারা”, হ্যাঁ, সংস্কৃতেই উৎসর্গ করেছেন নয়নতারাকে ।

—নানুদি কাকার হুইল চেয়ার ধরে নিজের চারিধারে হাসতে-হাসতে ঘোরাতো আর কাকা ওই সংস্কৃত কবিতাটা পড়ে-পড়ে নানুদিকে শোনাতো । নানুদি তো বাংলা পড়তেই জানে না, সংস্কৃত আর কি বুঝবে, কাকা তবু শোনাত আর নানুদি ওনার চেয়ার নিজের চারিধারে ঘোরাতো ।

—আরে না হে, এটা সংস্কৃত কবিতা নয় । তুমি ভালো করে শোনো, তাহলে বুঝতে পারবে নানুদি কেন নিজের চারিধারে তোমার কাকাকে ঘোরাতেন আর কাকা এটা ওনাকে শুনিয়ে-শুনিয়ে পড়তেন :

 

ওম ইষ একপদী ভব,

সা মামনুব্রতা ভব,

বিষ্ণুস্ত্বা নয়তু পুত্রান বিন্দাবহৈ,

বহূং স্তে সন্তু জরদষ্টয়ঃ

ওম ইষ একপদী ভব ইতি প্রথমন ।।

 

ওম ঊর্জে দ্বিপদী ভব,

সা মামনুব্রতা বভ,

বিষ্ণুস্ত্বা নয়তু পুত্রান বিন্দাবহৈ,

বহূং স্তে সন্তু জরদষ্টয়ঃ ।

ওম ঊর্জে জরদষ্টয়ঃ ।।

 

ওম বায়স্পোষায় ত্রিপদী ভব,

সা মামনুব্রতা ভব,

বিষ্ণুস্ত্বা নয়তু পুত্রান বিন্দাবহৈ,

বহূং স্তে সন্তু জরদষ্টয়ঃ ।

ওম রায়স সন্তু জরদষ্টয়ঃ ।।

 

ওম মায়োভব্যাস চতুষ্পদী ভব,

বিষ্ণুস্ত্বা নয়তু পুত্রান বিন্দাবহৈ,

বহূং স্তে সন্তু জরদষ্টয়ঃ ।

ওম মায়োভব্যাস জরদষ্টয়ঃ ।।

 

ওম প্রজাভ্যঃ পঞ্চপদী ভব,

সা মামনুব্রতা ভব,

বিষ্ণুস্ত্বা নয়তু পুত্রান বিন্দাবহৈ,

বহূং স্তে সন্তু জরদষ্টয়ঃ ।

ওম প্রজাভ্যঃ সন্তু জরদষ্টয়ঃ ।।

 

ওম ঋতুভ্যঃ ষষ্টপদী ভব,

বিষ্ণুস্ত্বা নয়তু পুত্রান বিন্দাবহৈ

বহূং স্তে সন্তু জরদষ্টয়ঃ ।

ওম ঋতুভ্যঃ সন্তু জরদষ্টয়ঃ ।।

 

ওম সখে সপ্তপদী ভব,

সা মামনুব্রতা ভব,

বিষ্ণুস্ত্বা নয়তু পুত্রান বিন্দাবহৈ,

বহূং স্তে সন্তু জরদষ্টয়ঃ ।

ওম সখে জরদষ্টয়ঃ গা ।।

 

—বুঝলুম না স্যার । সংস্কৃত বইয়ের স-ও দেখিনি কখুনো ।

—এটা বিয়ের মন্ত্র, যা আগুনের চারিধারে বর-বউ ঘোরার সময়ে বর উচ্চারণ করে । বউয়ের দায়িত্ব নেবার মন্ত্র । সপ্তপদী শুনেছ তো, তার মন্ত্র । আমি নিজের বিয়েতে পুরুতের কথামতো এই মন্তর আউড়ে ছিলাম, আজকে ভালোভাবে পড়ে বুঝতে পারলাম । তোমার নানুদিকে উনি নিশ্চয় জানিয়েছিলেন যে এটা বিয়ের মন্ত্র ।

—আচ্ছা, তাই কাকা মারা যাবার পরে নানুদি এক কপি নিজের টিনের সুটকেসে যত্ন করে রেখেচে । আর কাকার ঘরে টোপোর-মুকুটও আচে একটা তাকের ওপরে । নানুদি কাকাকে টোপর পরিয়ে, নিজে মুকুট পরে, হুইল চেয়ার ঘোরাতো, তখুন অতো খেয়াল করিনি যে কাকার ছুটির দিনে চান করাবার আগে দুজনে মিলে বিয়ে করত টোপোর-মুকুট পরে ।

—নানুদি তোমার টাকা নেন না তো সংসার চলে কেমন করে ?

—কাকা ওনার বীমা, পেনসনের আর প্রভিডেন্ট ফাণ্ডের নমিনি করে গিসল নানুদিকে, ভাগ্যিস কাকার বডি পাওয়া গিসল, তাই তো ক্লেম করতে পারলো নানুদি ।

—বডি ? কী করে ? তুমি বলছ রাতে নৌকোয় চাপিয়ে মাঝনদীতে ফেলে দেয়া হয়েছিল । স্টিলের চেয়ারে বাঁধা বডি, ভেসে ওঠার তো কথা নয় ।

—সেও এক ভগবানের ম্যাজিক স্যার ।

—ভগবানের ম্যাজিক ?

—পরের দিন সকালে একটা ভুটভুটির মেশিন ফেটে গিয়ে কেলেঙ্কারি হয়েছিল । কাটা তেল মিলিয়ে চালায়, কখুন যে ফাটে কেউ বলতে পারে ?

—তারপর ?

—যারা সাঁতার জানতো তারা সাঁতরে পারে উটে যেতে পেরেছিল কিন্তু বেশ কয়েকজন বউ আর বাচ্চা তলিয়ে গিসল । তাদের খোঁজে ডুবুরি নাবল । ডুবুরিরা সবচেয়ে আগে কাকার বডিটাই তুলে আনল । পুলিশের নথিতে লেখা আছে যে কাকাও ওই ভুটভুটি করে যাচ্ছিল । ভালোই হল, কি বলুন ? কেন যে দড়ি বাঁধা তা আর কেউ জিগ্যেস করলে না ; করলে নিজেরাই বিপদে পড়ত । আত্মহত্যা বলেও চালাতে পারেনি বীমা কোম্পানি ; বীমার টাকাটা ব্যাংকে রেখেচে নানুদি, তারও সুদ পায় ।

—নানুদি রোজগার করে তোমাকে খাওয়াচ্ছেন তাহলে ।

—না, স্যার, আমি এখানে থাকি না, আমার নিজের ডেরা আচে, এখেনে আপনার সঙ্গে কথা বলার জন্য ডেকেছিলুম । নিরিবিলি পাড়া, বাড়িতেও কোনো কিচাইন নেই ।

—থ্যাংক ইউ, তুমি এই কনট্র্যাক্টটায় সই করে দাও, তোমার জীবনী লেখার গল্পের সত্ত্ব আমাকে দিচ্ছ, আর কেউ লিখতে পারবে না ।

—একটু হিরোগিরি দেখাবেন স্যার ; আমার কয়েকটা ফোটো আছে, দিচ্ছি আপনাকে । কিছু কেচ্ছা জুড়ে দেবেন, কাটবে তাহলে, বিকোবেও ভালো ।

—হ্যাঁ, দেখাবো, রবীন্দ্রনাথকে নিয়েই  গাঁজাখুরি উপন্যাস লিখে বাজার মাৎ করছে লিখিয়েরা । তোমার রোগের তো একটা নাম দিতে হবে, দেবো খুঁজেপেতে একখানা ।

 

 

 

 

 

 

Posted in ছন্নছাড়া সময়ের গল্প, মলয় রায়চৌধুরী, স্যাটায়ার | Tagged , | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

খাওয়াশেকল – অণুগল্প : মলয় রায়চৌধুরী

 

কেষ্টর বাবা মারা যাবার পর থেকেই আমায় এই রোগে ধরেছে, আমি নিজে একে রোগ মনে করিনা, বাড়ির সবাই মনে করে, কেষ্ট, কেষ্টর বউ, কেষ্টর ছেলে, ছেলের বউ, এমন কি নাতি আর নাতনিও, যাদের কোলে-পিঠে করে মানুষ করলুম, মনে করে লোকটার, মানে কেষ্টর বাপের, অভাব আমি এই রোগ দিয়ে পুষিয়ে নেবার চেষ্টা করছি । এরা কেউ আমাকে বুঝতেই পারে না, নিজেদের যুক্তি দিয়ে আমায় যাচাই করে, এই যে তালিবানরা বামিয়ানে বুদ্ধমূর্তি বোমা মেরে উড়িয়ে দিলে, তাকে কি রোগ বলা যাবে, তালিবানদের আগেও তো আফগানিস্তানে মুসলমানরা আছে, কই তারা তো মূর্তিটা নষ্ট করেনি, লোকে এখন বলছে ওটা তালিবানদের রোগ, আমাদের দেশে যখন তুর্কি আফগান আরব রাজারা এলো, তখন তারাও এখানকার কতো মূর্তির নাক মুখ পা ভেঙে দিয়েছিল, এখন এদেশে তাদের বংশধররা রয়েছে, কই তারা তো ভাঙাভাঙি করে না, আগেকার লোকগুলোর কি রোগ ছিল, নাকি এখনকার বংশধরদের রোগ নেই, এই কিছুদিন আগে বাংলাদেশে দুর্গা কালীর মূর্তি ভাঙলে লোকেরা, যারা ভাঙলে তাদের কি রোগে ধরেছিল, তারা কি বংশধর নয়, তারাও তো বংশধর, এদেশের বংশধরদের সঙ্গে ওদেশের বংশধরদের তফাত আছে নাকি, আমি বাবা ওসব রোগটোগ বুঝিনে, ওদের কি কেউ কাছের মানুষ মনের মানুষ মারা যাবার অভাবে ভুগছে, কেষ্ট যেমন আমাকে বলে, প্রায়ই বলে, যে, ওর বাবা মারা যাবার পর থেকে, ওর বাবার উপস্হিত না থাকার অভাব, আমি নাকি আমার খাই-খাই রোগ দিয়ে পুষিয়ে নিই, সত্যিই, আমার সবসময় বড্ডো খেতে ইচ্ছে করে, মনে হয় পেট ভরেনি, সকালের খাবার পরও সামনে যা পাই খেয়ে নিই, রান্নাঘরে ঢুকে আরেকবার ভাত বেড়ে খেয়ে নিই, আমি পুরো ভাতই খেয়ে নিই, এমন নয় যে ফেলে ছড়িয়ে উঠে পড়ি, তা ওদের পছন্দ হয় না, বলে সকালে অতো খেলে, তারপরও তোমার খাই-খাই বাই, টেবিলের ওপর থেকে ফলগুলো খেয়ে নিলে, বললেই তো হতো ধুয়ে কেটে সবাই মিলে খেতুম, কী বোকা, সবাই মিলে কেন খাবো, ফলগুলো আমায় ডাকছিল, খাবার জিনিস আমায় ডাকে তাই খাই, তোদের ডাকে না বলে তোরা খাস না, তোদের ঘড়িগুলো ডাকে, সকালে আটটা বাজলে খাবি, দুপুরে দেড়টা বাজলে খাবি, চারটে বাজলে চা-চানাচুর খাবি, দশটা বাজলে আবার রাত্তিরের খাবার খাবি, তোরা বিশ্বাস করতে চাস না খাবার জিনিস আমায় ডাকে, রান্নাঘরের তাকে রাখা বিস্কুট আমায় ডাকে, দুটো বিস্কুটের মাঝে যে গোলাপি মিষ্টি মাখানো থাকে তা চাটতে আমার ভাল্লাগে, হলেই বা আমার ছেষট্টি বছর বয়স, নিমকির জার আমায় ডাকে, তা আমি কী করব, তোরা ঘড়ির ডাক শুনতে পাস, আমি খাবারের ডাক শুনতে পাই, তোরা ভাবিস কেষ্টর বাপ খাবারের ভেতরে লুকিয়ে থাকতে পারে না, সে স্বর্গে চলে গেছে, স্বর্গে গেলেই বা, স্বর্গ থেকে নেমে এসে আমাকে ইশারায় বলে যে তিলের নাড়ু রাখা আছে, বয়ামে, কেষ্টর ছেলের বউ লুকিয়ে রেখেছে, নারকেলের নাড়ু লোকানো আছে টিনের ডিবেতে, তোমার নাতবউ বাপের বাড়ি থেকে এনেছে, আমি ঠিক ওনার ফিসফিস শুনতে পাই, আর তোরা যখন সামনে থাকিস না তখন লুকিয়ে খেয়ে নিই, তোরা বকাঝকা করিস, যেমন ওই তালিবানদের পৃথিবীর লোকে বকাঝকা করলে, বাংলাদেশে যারা দেবী-দেবতার মূর্তি ভাঙলে তাদের বকাঝকা করলে, কিন্তু তারা তো কোনো ইশারা পেয়েছিল, আরবি ভাষায় লেখা বইয়ের ইশারা, সরকম ইশারা কেষ্টর বাপ আমায় করে, তখন আমি কী খাবো কী খাবো করতে থাকি, কিছু খেতে না পেলে মন খারাপ হয়ে যায়, তোরা সব লুকিয়ে রাখা আরম্ভ করেছিস, তালাচাবি দিয়ে রাখা আরম্ভ করেছিস, আমি কি আর জানিনে, তোরা ভাবছিস বুড়িটা আগেকার কালের, অতো বুঝবে না, আমি সব বুঝি, এখন তোদের পাল্লায় পড়ে আমি যখন আমার সামনে কোনো খাবার জিনিস দেখতে পাই না তখন রান্নাঘর থেকে চিনি খাই, তাও তোরা তালা বন্ধ করে রাখা আরম্ভ করলি, কেষ্টর বাবা রোজ আপিস ফেরত আমার জন্য হয় রসমুণ্ডি, নয় মোয়া, নয় রসগোল্লা, নয় মুড়কি, নয় সন্দেশ কিনে আনতো, আমি পরের দিন বিকেল পর্যন্ত খেতুম, তোদেরও দিতুম, কেষ্টর বাপ তোদের মতন কিপটে ছিল না, কতো কি আনতো খাবার জন্যে, আমার পছন্দের ফল, আমার পছন্দের মিষ্টি, আর তোরা, আমাকে তোদের মতন করেই খেতে দিস, বুঝতেই পারিস না যে কেষ্টর বাপের ভাগের খাওয়াটাও আমাকে খেতে হয়, ওই করেই তো কেষ্টর বাপকে বাঁচিয়ে রেখেছি আমার মধ্যে, তা তোদের পছন্দ হলো না, তোরা আমার ডবল খাওয়া বন্ধ করে দিলি, আমি আর কী করব, আমি এখন মুখ চোকাই, মুখে কিছু না থাকলেও খাবার ভান করি, তাও কেষ্টর পছন্দ হল না, ওর বন্ধুবান্ধব নাকি হাসাহাসি করে, আমার খাইখাই বাই দেখে, আমি কী করেছি বলো, আমি ওর বন্ধুদের জন্যে বৈঠকখানা ঘরে মিষ্টি সিঙাড়া দেখে তুলে খেয়ে ফেলি, কেষ্ট নাকি তাতে অপমানিত বোধ করতে লাগল, যারা আসে তারাও নাকি ওর মাকে দেখে অবাক হয়, কোথায় কেষ্ট বন্ধুদের বোঝাবে যে আমার মা ঘড়ির নির্দেশে চলে না, স্বর্গীয় বাবার ইশারায় চলে, তা নয়, কেষ্ট এখন বৈঠকখানা ঘরে বিছানা পেতে, খাটের সঙ্গে আমার পায়ে শেকল বেঁধে রেখেছে, যাতে সারাক্ষণ নজরে-নজরে রাখা যায়, ওদের ঘড়ি যখন বলে, ওরা তখন খায়, তখন আমার খাবার নিয়ে আসে কেষ্টর বউ কিংবা কেষ্টর ছেলের বউ, আমি রাগ দেখালেও ওদের কিছু যায় আসে না, বলেছে, ডাক্তার দেখাবে, তা ডাক্তার এসে বলে গেল আমার খাই খাই রোগে ধরেছে, এ সারানো যাবে না, উনি যেমন শেকলবাঁধা আছেন, তেমনই থাকুন, এখানেই বেডপ্যান রেখে দিন, আর দুজন সেবিকা নিয়োগ করুন যারা ওনার পেচ্ছাপ-পায়খানা পেলে বেডপ্যানে করাতে পারবেন, এ কেমনতর ডাক্তার বুঝিনে, একজন সুস্হ সবল মানুষকে হাসপাতালের রোগির মতন চোপোরঘণ্টা বিছানায় শুইয়ে রেখেছে, তাও সময়ে অসময়ে ওষুধের বড়ি খাওয়ালে খেতুম মাঝে-সাজে, রোগিদের যেমন বেদানা আপেল দ্যায় তেমন দিলে খেতুম, কিন্তু সেবিকারা সারাদিন আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে, আর হাসি পেলে পেছন ফিরে হাসে. বলি যে, এই তোরা আমার পায়ের শেকলের তালা খুলে দে দিকিনি, আমার কাছেও লুকোনো টাকাকড়ি আছে, তোদের দিয়ে দেবো, তা ওরা শুনবেনে, আমি এই খাওয়াশেকল বাঁধা অবস্হায় সারা দিন বিছানায় শুয়ে থাকি আর মুখ চোকাই..

Posted in অণুগল্প, মলয় রায়চৌধুরী | Tagged , | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

প্ল্যানচেটে ঝিংচাক – পোস্টমডার্ন গপপো : মলয় রায়চৌধুরী

পোথোম পড়বো ( কুমিল্লা স্পেশাল )

         আমরা, আমরা মানে আমিপাদ আর হুবহু আমার মতন সিদ্ধাচার্য আরও কয়েকজন,  মানে লুইপাদ, কাহ্ণপাদ, ভুসুকপাদ, সরহপাদ, শবরীপাদ, বিরূপাদ, লাড়ীডোম্বীপাদ, কুম্বলাম্বপাদ, ঢেন্ডনপা, কুক্কুরীপাদ, কঙ্ককপাদ, গুণ্ডরীপাদ, চাটিলপাদ, ডোম্বীপাদ, শান্তিপাদ, মহিত্তাপাদ, বীণাপাদ, আজদেবপাদ, দারিকপাদ, ভাদেপাদ, তাড়কপাদ, জঅনন্দিপাদ, ধামপাদ, আর তান্তিপাদ মাঝরাতে, এই নাইটক্লাবে জড়ো হয়েছি, প্ল্যানচেটে যে বা যারা আসতে চায় বা চান তাদের আদর-আপ্যায়ন করার জন্য, প্রমাণ করার জন্য যে আধুনিকরা যে প্ল্যানচেটে বিশ্বাস করতো না তা তাদের রদ্দি মগজের ফসল, আমরা এখন উত্তরাধুনিক যুগে, প্ল্যানচেটে বিশ্বাস করি আর যেদিন যখন ইচ্ছা একত্র হয়ে মৃত হোক বা জীবিত, মানুষ-মানুষীদের নামিয়ে আনি, তাদের আমরা খাই, খেয়ে আবার ফুৎকারে উড়িয়ে দিই যাতে তারা যে যার দেশে সংসারে সমাজে ফিরে যেতে পারে ।

আমাদের নামের শেষে পাদ আমাদের পদবি, আমরা শাসক আর শোষকের মুখে অনন্তকাল যাবত পাদছি বলে বেদের সময়কার মুনীঋষিরা আমাদের এই পদবি দিয়ে গেছেন। কিছুকাল শাসক-শোষকের আওতার বাইরে গিয়ে লুকিয়ে পড়তে হয়েছিল, সেই তখন থেকেই আমাদের হাবভাব চল-চলন আচার-আচরণ কাজ-কম্মো পোশাক-আশাক হয়ে গেছে ঐন্দ্রজালিক ।

সংসারজীবনে সিদ্ধাচার্যদের নাম ছিল যা ওনাদের পিতৃদত্ত নাম, কয়েকজনের ইতিহাস লুম্বিনি পার্কের নথিতে আছে, যেমন ঋত্বিক ঘটক, বিনয় মজুমদার, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সঞ্জয় ভট্টাচার্য, মলয় রায়চৌধুরী প্রমুখ ।

নাইটক্লাবের নাচ-গান যেমন চলে তেমন চলছে, ডিজের ঝপ্মকঝিলু বাজনার সঙ্গে  আধা-ল্যাংটো মেয়েদের নাচ, বিদেশিনি উলঙ্গিনিরাও আছে , বিদেশিনি মানে চিন আফ্রিকা ইউরোপ আমেরিকা মোঙ্গোলিয়ার যুবতীরা, আর ভারতীয় যুবতীরা তো আছেই, নাইটক্লাব মানেই তো যুবতীদের গায়ের সুগন্ধে ম-ম, আর নাচিয়ে যুবকদের তাগড়া ঘামের দুর্গন্ধে ছ্যাছ্যা ।

এতোদিন লোকে অন্ধকারে একজোট হয়ে বসে প্ল্যানচেট করতো, তা ছিল প্রাগাধুনিক যুগের বোকামি, এখন বিজ্ঞানের সঙ্গে যখন উত্তরাধুনিক যুগ এসে পড়েছে তখন, বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে আমরা এই লেজার আলোর ঝিলমিলে অন্ধকারে নাইটক্লাবের একেবারে মাঝখানের বিশাল টেবিলটা আগে থাকতে অর্ডার দিয়ে সংরক্ষণ করে রেখেছি, নাইটক্লাবের কর্তা জানেন যে আমরা সিদ্ধাচার্য, বিশেষ ক্ষমতার অধিকারী, তাই ছয় মাস অন্তর আমাদের জন্য বিশেষ ব্যবস্হা করেন ।

হুইস্কিতে চুমুক দিয়ে, সাজানো বাগানের পরের স্টপের নাইটক্লাবের উত্তেজনাপ্রবণ ঝিলঝিলে আলোয়, গোরা, মানে যার নাম লুইপাদ, আমার দিকে না তাকিয়েই, জিগ্যেস করল, আচ্ছা, আপনি লুইপাদের কাছেই বা এসেছেন কেন ? জানলেনই বা কেমন করে যে লুইপাদ প্রতিদিন সন্ধ্যায় এখানে আসে ?

আমি মানে আমিপাদ বলল, তুমি ক্লাসিক পর্যায়ের যুবক বলে ; তোমাকে দেখতে শুনতেও ভালো, টকটকে গায়ের রঙ, এখনকার ইনডিয়ানদের মতন ল্যাদখোর নও, মাথায় ছ’ফুট লম্বা, হাড় চওড়া. দু’হাতের মুঠো যেন বাঘের থাবার মতন ; তাছাড়া তোমার চরিত্রের তো কপিরাইট আর নেই । কপিরাইট শেষ হয়ে গেলেই ক্লাসিক পর্যায়ে চলে যায়, আই মিন ধ্রুপদি । আর এই ভাষায় যারা ধ্রুপদি ভাবুক তারা সন্ধ্যায় এখানেই নিজের সঙ্গে নিজে মজে থাকে । তুমি তো হিন্দুহিতৈষী সভার সভাপতি ছিলে, কপালে সিঁদুরের তেলক কেটে বেরোলে খোট্টা ভামরাও ভড়কে যেতো ।

হ্যাঁ, লুইপাদের বাপ ছিল আইরিশম্যান, মিউটিনির সময়ে পিরালির ঠাকুর রাস্তায় কুড়িয়ে পেয়ে দু’মলাটের সংসারে ঢুকিয়েছিলেন, আর লুইপাদ মানে আমি যে কেবল হিন্দু নই তা তো পরেশচন্দ্র ভট্টাচার্যের বাড়ি গিয়ে ওনাকে প্রণাম করে জানিয়েছিলাম, জানেন তো আপনি, লুইপাদের বন্ধু বিনয়ের কাছে খোঁজ নিয়ে জেনেছেন, বিনয় বলেছিল আমাকে ; বিনয়কে জানেন তো ? ‘ফিরে এসো, চাকা’ বইয়ের বিনয় নয়, হিন্দুহিতৈষী সভার সেক্রেটারি বিনয়ভুষণ চট্টোপাধ্যায়। সে যাকগে যাক । ‘ফিরে এসো, চাকা’র বিনয় তো নামকরা সিদ্ধাচার্য, ওই তো, কুম্বলাম্বপাদ, গণিত নিয়ে নিজের সঙ্গে নিজে কথা বলতে ব্যস্ত ।

আমি, মানে আমিপাদ, মনে-মনে ভাবছিল, পিরালির ঠাকুর লুইপাদ মানে গোরার লেংটু নিয়ে দুচারকথা লেখেননি কেন ? আইরিশম্যানের ছেলে, লম্বা-চওড়া জোয়ান, লেংটু তো সাধারণ বাঙালি ছেলে-ছোকরার চেয়ে মাপে বেশ বড়ো আর ফর্সা তো হবেই । কে জানে, হয়তো মাধবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে দুচারটে ছাত্রীকে টোপ দিয়ে ফাঁসিয়েও থাকতে পারে। ছাত্রীদের কি ইচ্ছে করে না ধবধবে ফর্সা লেংটু নিয়ে খেলা করবার, একবার এই পাশ একবার ওই পাশ, তারপরে মেমসাহবকো সেলাম দেও, ট্যানট্যাট্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যান !

গোরা মানে লুইপাদ শুধোলো, আপনি তো দেবদাসের কাছে গেলেই পারতেন, ওনারও তো কপিরাইট নেই, উনি আমার চেয়েও বেশি ধ্রুপদি, যাঁর যেমন ইচ্ছে ওনার মুখে সংলাপ গুঁজে দিতে পারেন ; আপনিও আপনার যা ইচ্ছে গুঁজে দেবেন, তবে যতোটা জানি দেবদাস সমকামী ছিলেন না । দেবদাস মানে কুক্কুরীপাদ, ওই যে বোতলের সঙ্গে কথা বলছেন সন্ধেবেলার সান্ধ্য ভাষায় ।

নাইটক্লাবের এলজিবিটিরা জোড়ায় জোড়ায় নাচছে চুমু খাচ্ছে, ভাগ্যিস শুনতে পায়নি লুইপাদের কথা।

লুইপাদ মানে গৌরমোহনের কথা শুনে চটে গেলুম । বললুম, আরে ওই মাগিবাজটার কথা বোলো না, আমড়াগাছিতে গিয়ে সারাদিন বাংলা টেনে পড়ে থাকে, এরেকটাইল ডিসফাংশানে ভোগে, দিনভর পারো পারো বকতে থাকে, আমার কাছে ভায়াগ্রার টাকা চাইছিল সেদিন । একদিন গিয়ে দেখেছিলুম । চন্দ্রমুখী নামের সেয়ানা ডবকাবুকো মেয়েটা যতো বলছে হ্যাঁ পারি পারি, পারব না কেন, বিছানায় তো এসো, শুধু বোতল নিয়ে মাটিতে গড়াগড়ি খেলে চলবে নাকি ।

লুইপাদ আমার দিকে ঝিমধরা চাউনি মেলে তাকিয়ে আছে দেখে বললুম, অর্থাৎ আমিপাদ বলল, মানে কুক্কুরিপাদ সম্পর্কে বলল, ব্যাটার অতো বয়স হয়ে গেল তবু কচি খোকার মতন ছোটোবেলাকার কোন এক গেঁয়ো প্রেমিকার জন্য সিরোসিস বাধিয়ে ফেললে । ওকে দিয়ে কাজ হবে না ; সোজা হয়ে দাঁড়াতেই পারে না । তোমার সঙ্গে একই আশ্রমে থাকেন নাকি ? এড়িয়ে যেও, মাতাল-সিদ্ধাচার্যদের এড়িয়ে যাওয়াই মঙ্গল । পালিয়ে গিয়ে যখন তিব্বত, নেপাল আর চীনদেশে শুধু কুক্কুরীপাদ কেন, আমিপাদসহ সকলেই খেতুম ছাঙ, রাকসি আর তোঙবা মদ, নিষেধ ছিল না । নিষেধের ব্যাপারটা নিয়ে এলো আধুনিকতাবাদীরা । এখন উত্তরাধুনিক যুগে আর কোনো নিষেধের বালাই নেই ।

গোরা, মানে লুইপাদ, এক চুমুকে হুইস্কি শেষ করে বললে, দোষটা কুক্কুরীপাদ মানে দেবদাসের নয়, আফিমসায়েবের, সতেরো বছর যদি আফিম খাইয়ে ট্যাঁকের ডিবেতে বন্ধ করে রেখে তারপর বাইরে বেরোতে দেন তো বয়স বেড়ে যাবেই, সতেরো প্লাস সতেরো চৌত্রিশ বছর বয়স । চন্দ্রমুখীর উচিত ছিল দেবদাসের ভুট্টায় জাপানি তেল মাখানো ।

কথাটা শেষ হবার আগেই, বোধহয় প্ল্যানচেটে আদর আপ্যায়নের নেওতা দেয়া  হয়েছে বলে, একাবারে খালি গায়ে উদোম ধবধবে স্কারলেট জোহ্যানসন, জেনিফার লরেন্স, চারলিজ থেরন, ন্যাটালি পোর্টম্যান, অ্যাঞঞ্জেলিনা জোলি, স্যাণ্ড্রা বুলোক, এমা স্টোন, কেট ব্ল্যানচেট, কিয়েরা নাইটলি, জেনিফার অ্যানিসটন নিকোল কিডম্যান আর জুলিয়া রবার্টস দুই বুকে দুহাত রেখে নেচে-নেচে গাইতে আরম্ভ করলে, মাই গড, বাংলা গান, আর সেকি বুকদোলানি কোমরানাচানি, মেমদের বুক দুটোকে যে লাউ বলে তা আগে সন্দেহ থাকলেও আজ যাকে বলে নিরসন হওয়া, তাই হলো, এর আগে, সত্যি, নিরসন বলতে যে কী বোঝায় জানতুম না, যখন কিনা আমি একজন আমিপাদ । গোরা, মানে লুইপাদ, মাথা দোলাতে লাগল গানের তালে তালে :

 

সাধের লাউ বানাইল মোরে বৈরাগী

লাউয়ের আগা খাইলাম

ডোগা গো খাইলাম

লাউ দি বানাইলাম ডুগডুগি

লাউয়ের এতো মধু

জানেগো জাদু

লাউ ধরলাম সঙ্গের সঙ্গী

আমি গয়া গেলাম

কাশি গো গেলাম

সঙ্গে নাই মোর বৈষ্ণবী

 

সিদ্ধাচার্য আমিপাদ উঠে দাঁড়িয়ে ওদের কয়েকজনকে টকাটক খেয়ে ফেলতে লাগল,  সবই ফসকা, রঙিন বাতার দিয়ে গড়া, কোনোই অসুবিধা হলো না ওদের পুরো গিলে ফেলতে । আমিপাদের দেখাদেখি আরও কয়েকজন বয়োজ্যেষ্ঠ সিদ্ধাচার্য বিরাট হাঁ করে চুমুক দেবার মতন করে খেয়ে ফেললেন বিদিশিনি উলঙ্গিনিদের, পেটে হাত বুলিয়ে ঢেঁকুর তুলতে লাগলেন । শ্বেতাঙ্গিনিদের খেয়ে ফেলার পর সিদ্ধাচার্যরা সকলেই গৌরবর্ণের হয়ে উঠলেন । নাইটক্লাবের মালিকের আনন্দ ধরে না, গিয়ে সব আলো নিভিয়ে দিলেন, গৌরবর্ণের মানুষের দেহের আলোয় পুরো নাচঘর আলোয় আলো হয়ে গিয়েছিল ।

উপস্হিত সিদ্ধাচার্যরা, আমিপাদসহ, লুইপাদ, কাহ্ণপাদ, ভুসুকপাদ, সরহপাদ, শবরীপাদ, বিরূপাদ, লাড়ীডোম্বীপাদ, কুম্বলাম্বরপাদ, ঢেন্ডনপাদ, কুক্কুরিপাদ, কঙ্ককপাদ, গুণ্ডরীপাদ, চাটিলপাদ, ডোম্বীপাদ, শান্তিপাদ, মহিত্তাপাদ, বীনাপাদ, আজদেবপাদ, দারিকপাদ, ভাদেপাদ, তাড়কপাদ, জঅনন্দিপাদ, ধামপাদ, তান্তিপাদ প্রমুখ সবাই বলে উঠলেন, সাধু সাধু, আজ প্রমাণ হয়ে গেল যে আধুনিকতা ছিল একটা বুজরুকি, এখন উত্তরাধুনিক যুগে প্ল্যানচেটে আদরের নেওতা দিলে সুন্দরীতমা সুপারস্টাররাও সাড়া দেন, তাঁদের খেয়ে ফেলার আপত্তি করেন না ।

প্ল্যানচেট করার এই সুবিধা, সুন্দরীদের না চাইতেও পাওয়া যায়, হাওয়াকে জড়িয়ে ধরার অভিজ্ঞতা হয়। আমিপাদ বসে পড়ল  নিজের চেয়ারে, আরেকটু হলেই পড়ে যাচ্ছিল, অন্ধকারে তো কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। অন্ধকার ব্যাপারটা এমন যে কেউ যদি যেচে দেখা দেয় তাহলেই দেখা যায় । সমীর রায়চৌধুরীর ‘মেথিশাকের গন্ধ’ গল্পে আছে ।

গোরা, মানে লুইপাদকে আমিপাদ বলল, তুমি মদ খাওয়া শুরু করলে কবে ? পিরালির ঠাকুর তো অ্যালাউ করেননি ।

লুইপাদ বললে, পিরালির ঠাকুরের কথা ছাড়ুন, উনি ছিলেন নাচিয়ে-গাইয়ে, বব ডিলানের মতন মোটা টাকা পেয়েছিলেন, মেডেল পেয়েছিলেন । সে মেডেলখানাও চাটগাঁর চোরের দল নিয়ে চমপট, কপিরাইট ফুরোলে ছাড়াবে বাজারে, কিংবা সেখানের মিউজিয়ামকে বেচবে । উনি যাকে বলেছিলেন মিউটিনি তা তো প্রথম স্বাধীনতা আন্দোলন । আমি সেই স্বাধীনতার প্রডাক্ট । বাহাদুর শাহ জাফরকে মনে আছে আপনার ? চেঙ্গিজ খানের বংশধর ? আটটা বউ আর সাতাশিটা হারেমের বাঁদির সঙ্গে শুতো আর কবিতা লিখতো, শেষে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির সাহেবদের সামনে কেলিয়ে পড়লো । কবিতা লিখিয়েদের শেষ পর্যন্ত বাহাদুরশাহ জাফরের অবস্হা হয় । আমাদের কুক্কুরিপাদ মানে দেবদাসও তাই, বুঝলেন কিনা, প্রেমে পাগল হয়ে সংলাপ আউড়েই ফেঁসে গেল । আপনিপাদ যেমন জানেন যে লুইপাদ প্রতি সন্ধ্যায় এখানে আসে, কুক্কুরীপাদ মানে দেবদাসও জানে, হয়তো এসেও পড়েছে অন্ধকারে, একাধজন সুন্দরীতমাকে নিঃশ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে রেখে নিয়েছে, কেই বা বলতে পারে, ওর কোনো ঠিক নেই ।

বললুম, তাই তো তুমিপাদকেই যেতে বলছি আমার কাজে ।

এই সময় এক গ্রিক দার্শনিক  আমিপাদদের টেবিলে চেঁচিয়ে উঠলো, দার্শনিককে  চেনে আমিপাদ, বেহালা না ওই দিকে কোথাও থাকে, নাম ভুসকুপাদ মানে পণ্ডশ্রম সেন, সব সময় গ্রিক দেবতাদের পোশাক পরে থাকে, সারা পোশাকে মার্কস, এঙ্গলস,  লেনিন, স্ট্যালিন, মাও, চে-গ্বেভারা, রোজা লুক্সেমবুর্গ, হো চি মিন, ম্যালকম এক্স, কাস্ত্রোর মুখের ছাপ, অনেক সময়ে ফ্যানের হাওয়ায় বা ঝড়ে মুখের ছাপগুলো ওর গ্রিক পোশাক থেকে খসে উড়ে যায়,  নিজেকে বলে প্ল্যাটোর সময়কার সিদ্ধাচার্য, হতেও পারে, এই উত্তরাধুনিক যুগে তো সবকুছ চলতা হ্যায়, কোনো এক সুন্দরীতমাকে অর্ধেক খেয়েছে, তার উরু থেকে পা পর্যন্ত বেরিয়ে রয়েছে মুখ থেকে, কোঁৎ পেড়ে অ্যানাকোণ্ডার মতন গিলে ফেলল আর বসেই নিজেকে নিজে জ্ঞান দিতে দিতে লাগল, লুইপাদ মানে গোরার শুনতে ভালোই লাগছিল, দার্শনিকদের ও বড্ড ভালোবাসে, ওর মতে দার্শনিকদের মতো প্রতিভা-ঝিংচাক আর নেই ।

ভুসকুপাদ, মানে পণ্ডশ্রম  সেন সবাইকে একটা করে সোভিয়েত আমলের ঘুষি পাকিয়ে স্যালু্ট ঠুকলো, তেমনটাই মনে হলো অন্ধকারে, ওটা আসলে অন্ধকারকে সেলাম, ভুসকুপাদের ঢেঁকুরের গন্ধে  অ্যাঞ্জেলিনা জোলির ছাড়া হাওয়া বেরিয়ে এলো,তারপর বলা আরম্ভ করল, একটা কথার সঙ্গে আরেকটা কথার সম্পর্ক ভুসকুপাদ মানে পণ্ডশ্রম সেন নিজে, আমরা আর কীই বা করি, শুনলুম বসে-বসে : “কিছুই আসে-যায় না, তাই-ই করা ; একটা ফুলের দিকে তাকিয়ে ভাবি ফুলটা আমায় পছন্দ করছে তো ; প্রতিবাদ এক ধরণের বিশ্বাস, আর পাঁচটা বিশ্বাসেরই মতো, যা সন্দেহের উর্দ্ধে নয় ; নিজের চোখে দেখা, নিজের কানে শোনা, নিজের হাতে ছোঁয়ার দৌরাত্ম্য ততদিন চলবেই যতদিন না নিজের ভাবনার লেজটা খসে পড়ছে ; এখানেই শেষ, তবে ভাষার কথাটা মনে করিয়ে দেওয়াটা বাদ দেওয়া গেল না, জীবনের হাত থেকে বাঁচতে চাওয়ায় আশ্চর্যের কী আছে ; লেখা শুরু হয়, আপত্তি কাজ শুরু করে তন্মুহূর্তে ; তবেই এই দাঁড়ায়, তা সে তিনি যে পথিকবরই হন না কেন, যখন পথ যাচ্ছে রোগ আর যুদ্ধ আর অসহায় ধ্বংসের দিকে, পথ দেখাচ্ছে অবলুপ্তির ইশারা, তোমাকে তো পা টিপেটিপেই চলতে হবে নাকি ; আলো জ্বলতেই সে হাত দিয়ে চোখ আড়াল করে, খানিক যাতে দেখতে পায় ; যাই, থেকেই যাই ; যিনি দেশ ও দশের উপকারের কথা ভাবছেন তাঁর থেকে সাবধানে থাকাই ভালো, যদিও তাহলেই, কামড় থেকে নিস্তার পাওয়া নিশ্চিত হচ্ছে না।”

আমিপাদ বলল, ভুসকুপাদবাবু, একটু থামুন, পরে আবার বলবেন আপনার ট্র্যাজেডির কথা, ঠোঁটের কোনে অ্যাঞ্জেলিনা জোলির থুতু চলে এসেছে । পণ্ডশ্রম সেন থামলেন, আমিপাদ এক পেগ জিন-মেশানো ভোদকা আনিয়ে দিতে, এক চোঁয়ে মেরে দিয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে বসে রইলেন । বোধহয় এর পর যা বলবেন তা ফেঁদে নিচ্ছেন সিদ্ধাচার্য সেন ভুসকুপাদবাবু । পেসিমিস্টদের আমিপাদের ভালো লাগে, তারা অন্তত নিজেদের হার স্বীকার করে না, সেই চর্যাপদের দিনকাল থেকে দেখছে তো আমিপাদ ।

লুইপাদ, মানে গোরা এমন টলছিল যে  আমিপাদ টের পেলো ওকে শক্তিমাতাল মানে লাড়ীডোম্বীপাদের  রোগে ধরেছে, যিনি ঝর্ণাকলমে রাম ভরে একের পর এক প্রেমের কবিতা লিখে চলেছেন । মাতাল অবস্হাতেই লুইপাদ বলল, আপনি এক কাজ করুন, ওই যে দেখছেন ধুতি-পাঞ্জাবি পরা সিদ্ধাচার্য, উনি শান্তিপাদ, চুপচাপ লেমোনেড খাবার ভান করছেন, কিন্তু খাচ্ছেন না, ওনার পাশে যে ছোকরাগুলো বসে আছে তাদের গ্যাঁজানি শুনছেন, উনি মাল্যবান, মানে শান্তিপাদ, ওনার কাছে যান, উনি  ইজিলি অ্যাভেইলেবল, যদিও ওনার কপিরাইট ফুরোয়নি, কিন্তু যার ইচ্ছে সে-ই ওনাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে ।

লুইপাদ কথা বজায় রাখল,  উনি শান্তিপাদবাবু, আমার কাছে টাকা ধার চাইতে এসেছেন, প্ল্যানচেটে যোগ দেয়া জোর করে, সংসারে বেশ টানাটানি, আমাকে বলছিলেন কয়েকটা কবিতার বদলে কিছু টাকা দাও, একটা উপন্যাসও দিতে চাইছিলেন, বেনামে ছাপতে হবে, কেননা ওনার বউ পড়লে একসঙ্গে বিছানায় শোয়া হবে না আর এই জীবনে ।  লেমোনেড ধরিয়ে বসিয়ে রেখেছি, বেচারা শান্তিপাদ, হুইস্কি খাবার প্রস্তাব দিতেই আঁৎকে উঠেছিলেন । এমনিতেই বউ পাত্তা দেয় না, তার ওপর মুখ থেকে মদের গন্ধ বেরোলে হয়তো বাড়িতে ঢোকাই মুশকিল হবে । শান্তিপাদের পাশের ছোকরাগুলোকে চেনেন তো, নাকি, তাড়কপাদ, তান্তিপাদ আর আজদেবপাদ?  কেনারাম স্ট্রিট কফিখানায় আড্ডা মারে, আজকে শনিবার তো, ওদের মদ খাবার দিন, চাপলুসিটোলায় যায় না, সেখানে অভিজাত লেখকরা যায় না, তাই এই নাইটক্লাবের অন্ধকারে এসেছে, তিনজনই সিদ্ধাচার্য ইন দি মেকিং। আর আপনি তো ডেকেই এনেছেন প্ল্যানচেটের লোভ দেখিয়ে। এবার দেখুন কোথাকার সুন্দরীরা এসে ফুল-মন্টি দোলান ।

আমিপাদ বলল, কী যে বলো ! শান্তিপাদ, মানে মাল্যবান মানুষটা সাহিত্যিক, এক্কেবারে শান্তিপাদ, ক্যাবলা, তোমার মতন স্মার্ট নয়, নিজের মনে ঘেঙিয়ে মরে, দেখে তো মনে হয় পৃথিবীর ‘প’ও জানে না, নিজের সঙ্গে নিজে কথা বলে, কে জানে স্কিৎসোফ্রেনিয়া আছে কিনা । আর তুমি যা বলছ, আমিপাদেরও তাই মনে হয়, বাড়িতে সদর দরোজা বন্ধ দেখে ডাকাডাকি না করে রাতভর কলকাতা চষে বেড়ায় ।

মাতাল হলে কী হবে ; লুইপাদ অর্থাৎ গোরা উল্টে আমাকেই চার্জ করল, আপনি সাহিত্যের কী বোঝেন ? সাহিত্য কাকে বলে জানেন ? তখন থেকে ভ্যাজর ভ্যাজর করে আমার নেশাটা মাটি করে দিলেন । এই বোতলটা দেখছেন তো? ১৯৩০  সালের শিভাস রিগাল, যত্ন করে রেখে দিয়েছিলুম, লাতিন আমেরিকার মেমবউ পিরালির ঠাকুরকে দিয়েছিলেন, প্যারিসে চিত্রপ্রদর্শনীর সময়ে, আজকে আমার জন্মদিন বলে খেলুম, আপনি একটু আগে এলে এক পেগ খেতে পারতেন । এই নাইটক্লাব বাইরের মাল এনে খেতে দেয় না, নেহাত আমি রেগুলার কাস্টামার বলে অ্যালাউ করেছে, বলেছে খালি বোতলটা দিয়ে যাবেন । ওই আপনাদের যুগের ডবল ডেকার উপন্যাস লিখিয়েদের মতন আরকি, এই পার আর ওই পার দুই পারেই, পুরোনো বোতলে চাপলুসটোলার মাল ঢুকিয়ে ধ্রুপদি বলে চালিয়ে দেবে । ছাঙ, রাকসি, তোঙড়ার যুগ, যাকে বলে অবসিত ।

আমি, মানে আমিপাদ বলল, না মিস্টার পাদ, আমিপাদ কেবল সিঙ্গল মল্ট খায়, আর ওনাদের, মানে ডবল ডেকার লেখকদের  বইপত্তর পড়ার সুযোগ হয়নি আমিপাদের, বড্ডো দাম, যদিও কেনারাম স্ট্রিট ফুটপাতে পাওয়া যায়, কিন্তু কাদের বাড়ির বই, কতোজনের কতোচামের রোগের জার্ম, শুকনো বীর্য, তাই ফুটপাতের বই কিনিনা, তাছাড়া সময় কোথায়  ।

ওই যে বললুম, রূপসী বাংলার প্রেমিক শান্তিপাদ, মানে মাল্যবান লোকটাকে নিয়ে যান, বললে লুইপাদ, মানে গোরা, কথা জড়িয়ে যাচ্ছিল ।

আরে, ওসব সাহিত্যিকদের দিয়ে হবে না । কাজটা বেশ রিসকি। তুমিপাদের মতন তাগড়া লোকই চাই । তাছাড়া  লুইপাদের ধর্মের মা-বাপ নেই, যদিও এককালে নিজেকে গোঁড়া ব্রাহ্মণ ভাবতে ।

লুইপাদ, মানে গোরা এবার চটে গেল, বলল, সাহিত্যের আপনি কী বোঝেন ? যত্তো প্রতিক্রিয়াশীল তত্ত্ব দিয়ে চাপা দিয়ে দিয়েছেন সাহিত্যকে, কোনো মূল্যবোধ নেই, মানদণ্ড নেই, বিদ্যায়তনিক অনুমোদন নেই ।

আমিপাদও চটে গিয়ে ঝাঁঝিয়ে উঠল, বলল, আমি আমিপাদ, বুঝলে, সার্টিফায়েড সিদ্ধাচার্য, যে সে লোক নয়, তুমিপাদ বলো, যেমন ? যেমন ?

গোরা, মানে লুইপাদ বললে আপনাদের তো শুধু নারীবাদ, মার্কসবাদ, বিনির্মাণবাদ, উত্তরঔপনিবেশিকতাবাদ, অপরবাদ, চিহ্ণবাদ, কালচারাল মেটেরিয়ালিজম, সবই সরকারদের পোঁদে বাঁশ করার তত্ব । সমীর রায়চৌধুরী নামে একজন ভাবুক ‘হাওয়া৪৯’  পত্রিকা যেদিন থেকে প্রকাশ করা আরম্ভ করেছেন, সেদিন থেকে ছেলে-ছোকরারা ঢুকে গেছে মহাদর্শনের ভুলভুলাইয়ায়, ওনার সঙ্গে আছে ব্রহ্মপুরের মুর্শিদ আলি মণ্ডল, আর আজকাল জুটেছে বৈদ্যনাথ মিশ্র নামের মালদা জেলার এক বামুন , একেবারে রাষ্ট্রের তিন সিংহের  ছাপ্পা । এগুলো এসেনশিয়ালিজম । সাহিত্যের জন্যে ওসব তত্ত্ব-ফত্ত দরকার হয় না ।

গোরা, মানে লুইপাদের কথা শুনে মনে হল, আইরিশম্যান নয়, ও বোধহয়, ফরাসি দেশের ষোড়শ লুই-এর বংশধর । মিউটিনি নয়, ফরাসি বিপ্লবের সময়ে ফুটপাথে কুড়িয়ে-পাওয়া ।

গোরা, মানে লুইপাদ,  তারপর একটু শান্ত হয়ে জিগ্যেস করল, তা আমাকে কী জন্যে চাই সেটাই খোলোসা করে বলুন ।

বললুম, এক ট্রাক গোরু পাচার করতে হবে ।

গোরা, মানে লুইপাদ, আমার মুখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে শ্লেষের মুচকি হাসি দিলো, যেন বলতে চাইছে যে গোরু পাচারের জন্যে গেরুয়াল্যাণ্ডে নানা জায়গায় চালক-বাহকদের পিটুনি দিয়ে ঠগিরা ঠেঙিয়ে মেরে ফেলছে বটে, কিন্তু লুইপাদের দিকে দশ জন লোক লাঠি হাতে এগোলেও ও তাদের ক্যাঁৎকা কোঁৎকা দিয়ে কুপোকাৎ করে দিতে পারবে ।

মাল্যবান, মানে শান্তিপাদ লোকটা বোধহয় আমাদের আলোচনা শুনতে পাচ্ছিল, নিজের অন্ধকারেই নিজের চেয়ার থেকে সঙ্গে অন্ধকার নিয়ে উঠে এসে বসল আমাদের দুজনের মাঝের অন্ধকার  চেয়ারে, হাতে লেমোনেডের গেলাস, বোঝা যাচ্ছে খায়নি, হয়তো মনে করে লেমোনেড খেলেও নেশা হবে, কবিতার লাইন মগজ থেকে হাপিশ হয়ে যাবে, কিংবা জেনিফার অ্যানিস্টনকে খেয়েছে, ওর বুক দুটো জেনিফার নিজের দুই কাঁধে ফেলতে পারে বলে চকচকে পত্রিকায় কতোবার যে রসিয়ে লিখেছে । চেয়ারে কুন্ঠিত বডি ল্যাঙ্গুয়েজে বসে মাল্যবান, মানে শান্তিপাদ,  বললে, আপনাদের আলোচনা কানে আসছিল, এই যে আপনি গোরু পাচার করতে চাইছেন, গোরুদের প্রত্যেকের পাসপোর্ট করিয়েছেন কি, তাদের ভিসা পেয়েছেন কি ?

আমিপাদ বলল, মশায়, পাচারের ব্যাপারে পাসপোর্ট ভিসা লাগে না ; তাছাড়া আমিপাদ গোরুগুলোকে এক দেশ থেকে আরেক দেশে পাচার করবে না, বুঝলেন । আমি হলুমগে আমিপাদ, হেলাফেলার লোক নই ।

মাল্যবান, মানে শান্তিপাদ, অপ্রস্তুত । লেমোনেড এক চোঁয়ে খেয়ে নিয়ে, গলায় আটকে থাকা জেনিফার অ্যানিস্টনকে ধুয়ে পাকস্হলিতে নামিয়ে,  ফ্যালফ্যালিয়ে জিগ্যেস করল, তাহলে ? পাচার তো এক দেশ থেকে আরেক দেশেই হয় বলে জানি । আমাদের ক্যানিঙ আর বাংলাদেশ থেকে কতো কচি-কচি মেয়ে যে আরব দেশগুলোয় পাচার হয়ে যাচ্ছে, রোজ কানে আসে, আমাদের কাজের বউ তো ক্যানিঙে থাকে, খুলনা থেকে এসেছে মাস তিনেক হলো, ছি-ছি, এই জন্যেই আমি রূপসী বাংলার পাণ্ডুলিপি লুকিয়ে রেখেছিলাম, জানতাম, একদিন বাঙালির এই দশাই হবে ।

আমিপাদ বলল, শান্তিপাদবাবু,  গোরুগুলোকে এক ভাষা থেকে আরেক ভাষার রাজ্যে পাচার করা হবে, বুঝলেন, তাতে পাসপোর্ট লাগে না, কিন্তু পথের আনাচে কানাচে আজকাল ঠগিদের বংশধররা লাঠিসোঁটা নিয়ে লুকিয়ে থাকে, কোনো কোনো ভাষার ঠগিরা এই কিছুদিন আগেই কয়েকজনকে পিটিয়ে মেরে ফেললে ।

গোরা, মানে লুইপাদ, শান্তিপাদ মানে মাল্যবানের কথা একাগ্র হয়ে শুনছিল, বললে, ওর গমগমে মোদো গলায় বললে, শান্তিপাদবাবুর পাসপোর্ট ভিসার আইডিয়াটা মন্দ নয়, হয়তো এক ভাষার লোকেরা মনে করে তাদের ভাষার এলাকা আর সংস্কৃতি হলো আলাদা দেশ, তাদের ভাষা শ্রেষ্ঠ, তাদের ভাবনাচিন্তা সবচেয়ে শ্রেয় আর কল্যাণকর । সেক্ষেত্রে প্রতিটি গোরুর পাসপোর্ট-ভিসা না থাকলেও, অন্তত ফোটো আইডেনটিটি কার্ড যদি থাকে তাহলে হয়তো বিপদের সম্ভাবনা কম ।

মাল্যবান, মানে শান্তিপাদবাবু লোকটি তার প্রস্তাবের প্রশংসা শুনে উত্তেজিত, বললে, আপনারা সাহিত্য নিয়ে কথা বলছিলেন, তা থেকে গোরুতে চলে গেলেন, অ্যাকচুয়ালি আমি সাহিত্যের কথাবার্তা শুনেই এসেছিলাম আপনাদের নিকটে বসব বলে, গলায় জেনিফার অ্যানিস্টন আটকে গিয়েছিলেন বলে বিলম্ব হলো । জানি, গোরু দুধ দেয় এবং সাহিত্য থেকেও পুষ্টিকর দুধ দই মাখন ঘি ছানা পনির খোয়া পাওয়া যায় ।

আমিপাদের দিকে ইশারা করে শান্তিপাদকে লুইপাদ বললে, এই মালটা তখন থেকে আমাকে জপাচ্ছে গোরু পাচারের ব্যাপারে, তারপর হঠাৎ সাহিত্য নিয়ে পড়ল । এরা কী জানে সাহিত্যের, বলুন শান্তিপাদবাবু, আরে নিজেদের বিকিকিনির বাজার নিয়ে মজে আছেন তাতেই থাকুন দিকি, সাহিত্য নিয়ে মেলা ফ্যাচ-ফ্যাচ করবেন না । লেখালিখির একটা মানদণ্ড আছে, সৌন্দর্যের সেই মানদণ্ড প্রয়োগ করেই বোঝা যায় একটা লেখা সাহিত্য হলো না হলো না । মানদণ্ড, যাকে ইংরেজিতে বলে ক্যানন, তা আমার পুর্বপুরুষ ইংরেজরাই এনেছিল এদেশে ।

শান্তিপাদবাবু অবাক চাউনি মেলে ধরল লুইপাদের দিকে । জিগ্যেস করল, আপনি তো গৌরচন্দ্র মুখোপাধ্যায়, বোধহয় পরে আমার বাবার মতন  ব্রাহ্মধর্ম নিয়েছিলেন, তা ঠিক জানি না, কিন্তু ইংরেজরা আবার কবে আপনার পূর্বপুরুষ হলো ? তা যাক আপনার জন্মের উৎস জানতে চেয়ে বিব্রত করতে চাই না । বরং সাহিত্যের আলোচনায় ফিরে যাওয়া যাক ।

লুইপাদ কথা বলতে আরম্ভ করে ক্রমে গলার স্বর উচ্চগ্রামে নিয়ে গেলো, সাহিত্যের মানদণ্ড বা ক্যানন এলো কোথ্থেকে, বলুন, বলুন, আপনারা, এই তো এক্ষুনি আমায় জ্ঞান দিচ্ছিলেন । লাতিন আর গ্রিক সাহিত্য থেকে, ধ্রুপদি সাহিত্য থেকে, আপনারা বাঙালিরা সেইটাই লুফে নিলেন আর ভাবলেন মানদণ্ডটা আপনাদের অধ্যাপক অচ্যুত গোস্বামী, নীহাররঞ্জন রায়, অক্ষয়চন্দ্র সরকার, অতল সুর, সুকুমার সেন, শ্রীকুমার মুখোপাধ্যায়, অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায়, অচিন্ত্য বিশ্বাস, শশিভূষণ দাশগুপ্ত, উজ্জ্বল মজুমদারদের তৈরি । ক্যানন হলো মানবের জীবনাবস্হার অভিপ্রকাশ ; তা হলো শুভচিন্তা যা মানবসমাজে ক্রিয়ান্বিত, আর লেখালিখির বিষয়বস্তু হিসাবে তুলে ধরা হয়েছে, তাকে সঠিক প্রকাশ করার জন্যই লেখার মানদণ্ড বা ক্যানন, প্রেমের আহ্লাদ, মৃত্যুর দুঃখ, দায়িত্বের ব্যথা, যুদ্ধ আর দাঙ্গার আতঙ্ক, আর সবচেয়ে যা গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, নিজেকে আর নিজের আত্মাকে স্বীকৃতিদান ।

শান্তিপাদবাবু যে ছোকরাদের পাশে এতক্ষণ বসেছিলেন, তাদের মধ্যে থেকে এক ছোকরা, যার নাম আজদেবপাদ,  চেঁচিয়ে বলে উঠল, লুইপাদদা, এই বিষয়ে আমাদিগেররও বক্তব্য আছে ; জানেনই মদ খাইলে আমাদিগের চিন্তা চাগাড় দিয়া উঠে ।

বুঝতে পারলুম, ওল্ড মঙ্ক টেনে  আজদেবপাদ ওল্ড বাংলায় ফিরে গেছে, মুখ দিয়ে সাধু বাংলায় ভকভক করে সংলাপ বেরুচ্ছে, ভাগ্যিস চর্যাপদের সময়কার ভাষা ভুলে গেছে ।

শান্তিপাদবাবু একাগ্র হয়ে শুনছিলেন । লুইপাদের কথা শেষ হতেই বলে উঠলেন, ওগুলো অবাস্তব আর দমনের তর্ক । বলেই তিনি বেশ বিব্রত, অন্ধকারে অন্ধকারাচ্ছন্ন মুখ দেখে, বডি ল্যাঙ্গুয়েজ দেখে বুঝলুম, কেননা লুইপাদ যদি টাকাটা না দেয় তাহলে উনি হাতটানে পড়বেন । ধুতির কোঁচা দিয়ে লেমোনেড আর জেনিফার অ্যানিস্টন  খাওয়া ঠোঁট মুছে বললেন, গতানুগতিক লেখকরা ভাষাবিদ্যাগত হাসিখুশির আড়াল তুলে এই তর্কটিকে তোল্লাই দিতেন বটে, তবে অনেকেই তাঁদের অভিজ্ঞতাকে সুবেদী এবং অতিসূক্ষ্ম তারতম্যের মাধ্যমে উপস্হাপন করতে ভালোবাসতেন, আজও বাসেন ; এবং বইগুলো ছিল জায়মান আলোচনার অংশ, যার বদলরত যোগফল, আর কিছুই নয়, ছিল এবং আছে, আইডিয়ার ইতিহাস হিসাবে । আপনি যদি মানদণ্ডের বিশৃঙ্খলা ঘটান তাহলে লোকে বলবে আপনি মানব সভ্যতায় বিশৃঙ্খলা ঘটাতে চাইছেন । অথচ মৌলিক লেখা লিখতে গেলে বিশৃঙ্খলা ঘটানো ছাড়া উপায় নেই, লুইপাদবাবু আপনি যদি সমীর রায়চৌধুরীর গল্পের বই ‘খুল যা সিমসিম’ পড়ে না থাকেন, তাহলে এক কপি সংগ্রহ করে পড়ে দেখবেন ।

আমিপাদ আর লুইপাদ দুজনেই টের পেলুম শান্তিপাদবাবুর ছোঁড়া তীর কোন দিকে । আসলে লুইপাদ যতোই বলুক ওর বাপ একজন আইরিশম্যান, পাবলিক মনে করে যে লুইপাদ আসলে পিরালি ঠাকুরের  আইভিএফ সন্তান । কোন যুবতী যে মিউটিনির সময়ে ফ্রোজন স্পার্ম নিয়েছিলেন তা কিছুটা রহস্য থেকে গেছে, কিছুটা এইজন্য যে মির্জা গালিব যৎসামান্য ইশারা দিয়ে গেছেন বলে গুজব শোনা যায় ।

শান্তিপাদবাবুর কথায় লুইপাদ কিছুটা আহত হয়েছে বুঝতে পারলুম, মাতাল হলে কী হবে, বাংলা টানার পর চাপলুসটোলায় জঅনন্দিপাদ মানে বাসুদেব দাশগুপ্তকে দেখেছি সত্যি কথায় টলে গেছে ।  ঘোষভাইদের পোঁদে-পোঁদে ঘুরতো, আমড়াগাছিতে বেবি-মীরা-দীপ্তির ন্যাওটা ছিল, সমীর রায়চৌধুরীর কাছ থেকে টাকা কড়ি চাইতো মাঝে-মধ্যে । ব্যাগপাইপার হুইস্কিকে মনে করতো অমৃত, অথচ সব কয়টা ভারতীয় মদই তৈরি হয় মোলাসেস থেকে, শুধু রঙ আর ফ্লেভার পালটিয়ে দেয়া হয় , প্যাকিঙ আলাদা হয়, তার চেয়ে রাম খাওয়া ভালো, ওটা খাঁটি মোলাসেস । আজকাল তো লোকে বেশ রামভক্ত হয়ে পড়েছে ।

লুইপাদ বলল, আপনি কী ভাবছেন আমি আঁচ করতে পেরেছি ; সব ভারতীয় মদই তৈরি হয় মোলাসেস থেকে, তাদের সঙ্গে দেশি বাংলা মদের বিশেষ তারতম্য নেই । আপনি কি ভাবছেন পিরালি ঠাকুরের আস্তাবলের লোক বলে এসব জানি না ? বিলকুল জানি । ওদের দেশে হুইস্কি তৈরি হয় শষ্য আর মল্টেড শষ্য থেকে, শাদা ওকগাছের কাস্কে রাখা থাকে অন্তত তিন বছর ; মল্টকে কাঠের আগুনে শুকিয়ে নেয়া হয় বলে ধোঁয়ার সোঁদা গন্ধ হয় যা এখানের হুইস্কিতে পাবেন না ; তার কারণ এখানের হুইস্কি তৈরি হয় গুড়ের চাসনি থেকে । ওদের দেশে ব্র্যাণ্ডি তৈরি হয় গ্যাঁজানো আঙুরের সঙ্গে চোলাই করা পোমেস মিশিয়ে । আমাদের দেশের ব্রাণ্ডি মোলাসেসের সঙ্গে সামান্য আঙুরের গ্যাঁজলা  মিশিয়ে তৈরি । সুচরিতার পালক পিতাকে দুধের সঙ্গে যে ব্র্যাণ্ডি খাইয়ে বিনয় তরতাজা করে তুলেছিল, তা বিদেশের ।ওদের দেশে জিন তৈরি হয় শষ্যের অ্যালকোহলে জুনিপার মিশিয়ে, তাই ওদের জিনে জুনিপারের সুগন্ধ থাকে ; আমাদের দেশে মোলাসেসের অ্যালকোহলের সঙ্গে জুনিপারের পারফিউম মেশানো হয় । ওদের দেশে ভোদকা তৈরি হয় আলু আর অন্য আনাজের অ্যালকোহলের সঙ্গে আখের রসের পচাই মিশিয়ে । আমাদের দেশে মোলাসেসের সঙ্গে যেকোনো কারবোহাইড্রেটকে গেঁজিয়ে তৈরি হয় ।

শান্তিপাদ শুনছিলেন চুপ করে, বলে উঠলেন, দীর্ঘশ্বাস মিশিয়ে, বাংলা সাহিত্য আজ সবই মোলাসেসের পচাই, মহৎ সাহিত্য বলে আর কিছু রইলো না । মোটা-মোটা ডবল-ডেকার উপন্যাসগুলো খুললেই ভক করে চিনিকলের পচা মোলাসেসের দুর্গন্ধ বেরোয়, মনে হয় টেরিটিবাজারের নর্দমা ।

আমিপাদ বলল, তোমরা দুজনেই গড়বড়ঘোটালা করে ফেলছ । মহৎ সাহিত্য সৃষ্টি এইজন্য হয় যে মহৎ লেখক আর কবিরা যা লিখতে চান তার টান দিয়ে তাড়িত হন । মানদণ্ড বা ক্যানন  হলো মধ্যবিত্তের নিজেদের মূল্যবোধের প্রতিফলনের আকাঙ্খার ফল । ফলে দেখা গেল সাহিত্যিক মানদণ্ডকে শিক্ষার প্রসারের সঙ্গে জুড়ে দেয়া হয়েছে, বইয়ের বাজারের ফুলে-ফেঁপে ওঠা, উপন্যাসের চাহিদার রমরমা, কফিহাউস আর সাহিত্যিক আড্ডার প্রসার, রিভিউ আর পত্রিকার ছড়াছড়ি, গ্রামেগঞ্জে বেসরকারি গ্রন্হাগারের সংখ্যা বৃদ্ধি, ধারাবাহিক উপন্যাসের জনপ্রিয়তা, ডাবল-ডেকার উপন্যাস লিখিয়েদের ঝড়তি-পড়তি দোল-দুর্গোৎসবের ফিকশান আর শয়ে-শয়ে কবিতা, আর সবশেষে সাহিত্যকে বিদ্যায়তনিক সংস্হাগুলোর কুক্ষিগত করার প্যাঁচপয়জার ।

লুইপাদ বলল, বলুন বলুন, শুনছি, ভাববেন না পুরো শিভাস রিগ্যাল বোতলটা ফাঁকা করে দিয়েছি বলে নেশা হয়ে গেছে । গোরু পাচারের প্রস্তাবটাও মনে আছে । ইউ ক্যারি অন । কিন্তু যে জন্য আমরা এখানে জড়ো হয়েছি, প্ল্যানচেটে ঝিংচাক শ্বেতাঙ্গিনি-শ্যামাঙ্গিনি-পীতাঙ্গিনিদের আদর আপ্যায়ন করব বলে, তাঁরা এখনও এলেন না ।

আমিপাদ বললে, আসবেন আসবেন, অপিক্ষে করো দিকিন । শ্বেতাঙ্গিনিরা এসেছিলেন, এবার অন্যরাও নাচতে-নাচতে আসবেন ।

আমরাও শুনছি, বলল আজদেবপাদ আর ওর সঙ্গি দুই পাদছোকরা ।

আমিপাদ কথা বলা বজায় রাখল, বলল, ইউরোপ থেকে আনা ওই যাকে তুমি বলছ মানদণ্ড বা ক্যানন, সেগুলো তিরিশের দশক থেকে পত্র-পত্রিকায় রিভিউকার আর সমালোচকদের দখলে গেল, সেগুলো অধ্যাপকরা হাতিয়ে নিয়ে স্নাতক আর স্নাতকোত্তরের সিলেবাসে ঢুকিয়ে দিতে লাগল, বুঝতেই পারছ, তারপর থেকে মানদণ্ড বা ক্যানন মানেই সিলেবাস, যার লেখা সিলেবাসে ঢুকতে পারল সে ধ্রুপদি হিসাবে গজিয়ে গেঁজিয়ে ওঠার সুযোগ পেল। অবশ্য সিলেবাসে ঢোকার জন্যেও বেঁচে থাকতেই বেশ কাঠখড় পোড়াতে হয়, ঘাপটি মেরে শাসক আর শোষকের পা চাটতে হয়, পা না পেলে অন্য কিছু চাটতে হয় ।

শান্তিপাদবাবু উত্তেজিত হয়ে প্রায় চেঁচিয়ে বলে উঠলেন, যা ওনার চরিত্রের সঙ্গে খাপ খায় না, বললেন, একথা একেবারে সত্যি, ওনারা আমার কবিতা নিয়ে কতোই না রঙ্গরসে রসোগোল্লার মতন ভাসেন, অথচ আমার উপন্যাসগুলোকে অবহেলা করেন, বলেন বাক্যগুলো বড্ডো জটিল, ছাত্ররা বুঝতে পারে না, অথচ তারা দিব্বি জেমস জয়েস আর প্রুস্ত বোঝে ।

আমিপাদ মাল্যবানবাবুর কাঁধে হাত রেখে বলল, আপনি চিন্তা করবেন না, মানদণ্ডের গেটকিপাররা প্রায় সকলেই অবসর নিয়েছেন, এখন নতুন যুবকদের প্রজন্ম এসেছে বাংলা আর তুলনামূলক বিভাগগুলোয়, তারা আপনার ফিকশানগুলোকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয় । তারা যখন সিলেবাস তৈরি করবে তখন অনেককিছু পালটে যাবে। গেটকিপাররা যতোদিন ছড়ি ঘোরাবে ততোদিন তারা একশো শ্রেষ্ঠ কবি আর একশো শ্রেষ্ঠ গল্পকার বা একশো শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিকের পাঁজি তৈরি করতে থাকবে । পাঁজিগুলোর জন্য গেটকিপাররা একটা চার্জ ধার্য করে রেখেছে, কার পদ্য বা গল্প ঢুকলো তা প্রকাশক বাছাই করে দেয় আর গেটকিপারদের চেক ধরিয়ে দেয়।

শান্তিপাদ  বললেন, তা জানি, ওটা ওনাদের রুজিরুটির ব্যাপার, মেয়ের বিয়ে দিতে হয়, বাপের শ্রাদ্ধ করতে হয়, ছাদের ফাটল সারাতে হয়, ছেলেকে ডাক্তারি কিংবা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াতে হয়, পাড়ার পুজোয় মোটাটাকা চাঁদা দিতে হয়, বউয়ের মেনোপজের হরমোনের খরচ তুলতে হয় ।

আমিপাদ বলল, দেখেছেন তো কমার্শিয়াল পত্রিকার শারদ-ঈদ সংখ্যা বা লেখনপঞ্জিকায় নিজেদের অন্তর্ভুক্ত করাবার জন্য কবিরা ছোটো মাপের কবিতা আর গল্প লেখেন, আগে থাকতে লিখে রাখেন, ঠিক সময়ে ছাড়েন ।

যে চেয়ারে শান্তিপাদবাবু আগে বসেছিলেন, সেই চেয়ারের পাশের আজদেবপাদ, তাড়কপাদ আর তান্তিপাদ নামের  যুবকপাদ সিদ্ধাচার্যরা চেঁচিয়ে উঠল, পাল্টাইতেছে কোথায় অগ্রজপাদগণ, এখনও হাংরি আন্দোলনের নাম শুনিলে এই বাংলা এবং ওই বাংলা, দুই বাংলার অধ্যাপক আলোচকগণ কাপড়ে-চোপড়ে করিয়া ফ্যালেন ।

যুবকপাদদের বক্তব্য  শুনে দূর থেকে মনে হচ্ছিল ওরা বিশ শতকের প্রথম দিকের ভদ্রতা বজায় রেখেছে, হয়তো প্রাগাধুনিক যুগে গঙ্গাজলের সঙ্গে রাম মিশিয়ে খেতো ।

আমিপাদ, মানে  আমি ওদের দিকে তাকিয়ে বললুম, অপেক্ষা করো, সবই সময়ের ব্যাপার ।

অপেক্ষা করতে হলো না । হ্যালি বেরি, জেনিফার হাডসন, ভায়োলা ডেভিস, কেকে পামার, রেজিনা কিং  উদোম শ্যামাঙ্গিনি সুন্দরীদের দল খোলা বুকে দু’হাত চেপে বুক আর পাছা দুলিয়ে নাচতে-গাইতে লাগল :

 

মধু হৈই হৈই বিষ খাওয়াইলা

হন কারণে

ভালোবাসার দাম নও দিলা হন দোষ আন পাই

আশা আছিল তোয়াতে লই

বাইন্দুম একখান সুখের ঘর

সুখের বদলে দুৎখ দিলা

হন কারণে

মধু হৈই হৈই বিষ খাওয়াইলা

হন কারণে

 

শ্যামাঙ্গিনি বিদেশিনিদের সঙ্গে আজদেবপাদ আর বাকি দুই পাদও নাচতে আরম্ভ করেছিল, গানটা ওরা জানে মনে হলো, সব যুবতীদের ওরাই খেয়ে ফেলবে আঁচ করে বাকি সবাই উঠে শ্বাস টেনে খেয়ে ফেলতে লাগল যার ভাগে যেটুকু পড়ে। আমিপাদের ভাগ্য ভালো যে জেনিফার হাডসনের সিলিকন জেল-ভরা বুক দুটো খেতে পেলো । আগের বার শ্বেতাঙ্গিনিদের খাবার ফলে সিদ্ধাচার্যরা সবাই গৌরবর্ণের হয়ে উঠেছিলেন, নাইটক্লাবের মালিক আনন্দে হাততালি দিয়ে সব আলো নিভিয়ে দিয়েছিলেন সারাঘর গৌরবর্ণ পুরুষের আলোয় জ্বলজ্বল করছিল বলে । এবার উনি গিয়ে আবার লেজার আলো জ্বালাবার হুকুম দিলেন, কেননা শ্যামান্ধকারে কে কার সঙ্গে কী করবে শেষে পুলিশ কোর্ট কাছারির ঝামেলা ।

আমিপাদসহ লিউপাদ, কাহ্ণপাদ, ভুসকুপাদ, সরহপাদ, শবরীপাদ, বিরূপাদ, লাড়ীডোম্বীপাদ, কুম্বলাম্বপাদ, ঢেণ্ডনপাদ, কুক্কুরীপাদ, কঙ্ককপাদ, গুণ্ডরীপাদ, চাটিলপাদ, ডোম্বীপাদ, শান্তিপাদ, মহিত্তাপাদ, বীণাপাদ, আজদেবপাদ, দারিকপাদ, ভাদেপাদ, তাড়কপাদ, জঅনন্দিপাদ, ধামাপাদ, তান্তিপাদ প্রমুখ সিদ্ধাচার্যরা বলে উঠলেন, সাধু, সাধু, উত্তরাধুনিক যুগে প্ল্যানচেটে যে ঝিংচাক করে সুন্দরীতমাদের ডেকে এনে আদর-আপ্যায়ণ করা যায় তা গোমাতামুখখু আধুনিকরা খাটো চিন্তার ফলে বুঝতেই পারেনি, ছি-ছি ।

লুইপাদ যুবক সিদ্ধাচার্যদের  দিকে তাকিয়ে বলল, এই আদিত্যপাদ, মন্মথপাদ, নগেন্দ্রপাদ, তোরা যে-যার গেলাসের ওল্ড মঙ্ক শেষ করে নে, আরেকটা বোতলের অর্ডার দিচ্ছি, অন দি রকস খা, গোরু পাচারের আলোচনা জমে গেছে, অংশ নিবি ।

লুইপাদ যাদের সন্ন্যাস জীবনের আগের নামে সম্বোধন করল, আজদেবপাদ, ভাদেপাদ, তাড়কপাদ, তারা টলছিল, যেমন একটু আগে লুইপাদ নিজেই টলছিল । ভাদেপাদ জানতে চাইলে, গোরুপাচারের আলোচনাটা ঠিক ঠাহর করিতে পারিলাম না, আমাদিগের সুবিধার্ধে যদি ব্যখ্যা করেন ।

আমি বললুম, প্রথমে তো গোরু বাছাই, তারপর পাচার । বাছাই মানে মানদণ্ড, লুইপাদ যাকে বলছে ক্যানন, ‘হাওয়া৪৯’এর সম্পাদক সমীর রায়চৌধুরীও ক্যানন নিয়ে যুক্তিতর্ক দিয়ে গেছেন । উনি বলেছিলেন সাহিত্যের মানদণ্ডে রদবদল ঘটতে পারে সময় এবং পরিসর, কিন্তু সাহিত্য বলতে কী বোঝায় তা নিয়ে মতান্তর বড়ো একটা হয় না । বার্টান্ড রাসেলের মতো আরও অনেককে সাহিত্যের জন্য নোবেল প্রাইজ দেয়া হয়েছে যাঁদের নাম শুনে আমরা অবাক হয়েছি, সাহিত্য বলতে উন্নতামানের লেখাই বোঝায়, তা উন্নত কি না সেটা পাঠক নিজেই নির্ণয়  নেয় । সে যদি উন্নত মনে করে তাহলে বাড়িতে রাখবে, নয়তো বাজেকাগজঅলাকে বেচে দেবে, তার ছেলে বা নাতি উন্নত মনে না করলে, তারা নিয়ে গিয়ে ফুটপাথে বেচে দেবে। বিদ্যায়তনিক সংস্হাদের ষড়যন্ত্র সত্ত্বেও, বই বিক্রির ব্যবসাদারদের লবি সত্ত্বেও, মানদণ্ড আসলে এক ব্যক্তিগত নান্দনিকতার এলাকা, যা ক্রমে কৌমের এলাকা হয়ে যায় । অবশ্য সে-বাগানে যে চোরকাঁটা গজাবে না তা জোর দিয়ে বলা যায় না । প্রবাল দাশগুপ্ত, সমীর রায়চৌধুরীকে সাজানো বাগানের পরের স্টপের কথা বলেছিলেন ।

লুইপাদ শুনছিল, দুহাতে গাল রেখে, হয়তো শুনতে-শুনতে সুচরিতার কথা ভাবতে আরম্ভ করেছিল, সুচরিতা মুখোপাধ্যায়, ৭৮ নম্বর বাড়ির পরেশচন্দ্র ভট্টাচার্যের পালিতা কন্যা । কিংবা নিজে কোনো আইরিশম্যানের ছেলে, অতএব জারজ, তাই হয়তো ভাবছিল, পিরালি ঠাকুরের ল্যাখা উপন্যাসে এতো বামুনের ছড়াছড়ি কেন । কিংবা পিরালি ঠাকুর হয়তো বলতে চেয়েছিলেন যে যারা ধর্ম নিয়ে বেশি হামবড়াই করে তারা সাধারণত জারজ হয় । আফিমবাবুও কুক্কুরীপাদবাবুকে বামুনবাড়িতেই খুঁজে পেলেন ।

আমি ওর মুখের দিকে তাকাতে, লুইপাদ মানে গৌরমোহনের হুঁশ হলো, বলল, সাহিত্যের মানদণ্ড ব্যাপারটা অনেকটা গাছের মতন, যাদের শাখা কখনও ছিল মহাকাব্য, সংস্কৃতের ট্র্যাজিক কাব্য, তামিলভাষার কাব্য, কিছু ধর্মশাস্ত্র আর পুরাণের কাহিনি । গাছটা যেমন যেমন বড়ো হতে লাগল, তার ডালে বিদেশ থেকে আনা ফলের কলম লাগিয়ে নাটক, উপন্যাস, বিভিন্ন আঙ্গিকের কবিতা, ছোটো গল্প ইত্যাদি পাওয়া যেতে লাগলো।  কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেমন যেমন মানদণ্ডের গেটকিপারদের কব্জায় যেতে লাগলো, বাংলা ভাষার সিলেবাসটাই হয়ে দাঁড়ালো সবচেয়ে বড়ো বাধা । অনেক আলোচকদের দেখলাম যে তাঁরাও বিরক্ত বোধ করতে আরম্ভ করেছেন, ভালো বই বনাম খারাপ বইয়ের তরজায় । সমীর রায়চৌধুরীর সঙ্গে ওনার বাঁশদ্রোণীর বাড়িতে একবার আলোচনার সময়ে উনি বলেছিলেন যে টেরি ইগলটন প্রশ্ন তুলেছেন যে সাহিত্য বলে আদপে কিছু হয় কিনা । একটা সাহিত্যকর্মের বিশেষ কোনো চি্হ্ণ থাকে না যা দিয়ে কোনো লেখাকে দেগে দেয়া যাবে, তার চেয়ে বাংলা বিভাগগুলোকে ডিসকোর্স ডিপার্টমেন্ট বলা উচিত । কোনো একটা লেখাকে একই মানদণ্ড দিয়ে মাপা হয় না, নানা বোমক্যাওড়ার নানা মত । সমীরবাবু বলছিলেন যে কোনো উপন্যাস নিয়ে ভালো ফিল্ম হলে সেই উপন্যাসে আলোচকরা হঠাৎই উন্নতমানের বৈশিষ্ট্য খুঁজে পান ; বোঝো শ্যামপিয়ারির ঠেলা ।

মন্মথ নামের যুবক সিদ্ধাচার্য, মানে তাড়কপাদ,  বলে উঠল, তার গেলাসে রাম ঢালতে-ঢালতে, কবি-লেখক-চিত্রকরগণ মাঝে-মাঝে পিছন ফিরিয়া তাকান, সন্মুখে অগ্রসর হইবার সুবিধার জন্য । পিছন ফিরিয়া, যাঁহাদের শিল্পকর্মকে হিংসা করেন, সেগুলিই সম্ভবত উন্নতমানের ।

শান্তিপাদ সিদ্ধাচার্য মাল্যবান বললেন, তা নয়, তা নয়, আমি পেছন ফিরে তাকানো পছন্দ করি না, হিংসেও করি না কাউকে। মহৎ রচয়িতার সংজ্ঞা যেমন যুগে যুগে পালটে যাচ্ছে, তেমনই সাহিত্য কাকে বলে তাও পালটে যাচ্ছে। তবে একথা ঠিক যে সমালোচনামূলক বিচারপদ্ধতিতে যৎসামান্য বিদ্বেষ থেকে । বুদ্ধদেব বসুকে দেখেছি বিদ্বিষ্ট হতে, তাকে হিংসে করা বলব না, তিনি সেইজন্য সিদ্ধাচার্য হতে পারেননি । মানুষ নিজের ছায়ার বাইরে যেমন লাফিয়ে বেরোতে পারে না, তেমনই নিজের মনের গড়নের বাইরে যেতে পারে না ।

আমিপাদ বুকপকেট থেকে গোরুর তালিকা বের করে লুইপাদ অর্থাৎ গৌরমোহনকে দিতে, শান্তিপাদ অর্থাৎ মাল্যবান জানতে চাইলে, গোরুগুলোর মাতৃভাষা লেখা আছে তো ? নয়তো এক ভাষা থেকে আরেক ভাষায় পাচার করতে গেলে জাগতিক সংকট উৎপন্ন  হতে পারে ।

 

দিতিয় পড়বো ( ময়মনসিংহ স্পেশাল )

তালিকায় চোখ বুলিয়ে গৌরমোহন অর্থাৎ লুইপাদ বলল, আছে আছে, এই নিন হয়তো আপনার ব্রায়ান জিসিন টেকনিকে কাজে দিতে পারে ।

শান্তিপাদ অর্থাৎ মাল্যবান তালিকাটা হাতে নিয়ে সবাইকে শুনিয়ে পড়তে লাগলেন :-

গোরুর প্রজাতি এবং তার মাতৃভাষা

১) গির — গুজরাতি  ( মা, মাঁ, মাতাশ্রী, মাম্মি  )

২ ) সাহিওয়াল — পাঞ্জাবি, হরিয়ানভি, হিন্দি ( মাই, পাব্বো, মাঁ, মাতাশ্রী, মাম্মিজি  )

৩ ) লালসিন্ধি — সিন্ধি, উর্দু ( অম্মি, অম্মা, মাতাশ্রী, মাম্মি  )

৪ ) রাঠি — রাজস্হানি-হিন্দি, মারোয়াড়ি, পাঞ্জাবি, হরিয়ানভি ( মা, মাই, মাতাশ্রী, পাব্বো, মাম্মিজি )

৫ ) থারাপারকর — উর্দু, কচ্ছি, রাজস্হানি-হিন্দি ( অম্মি, আম্মা, মাই, মাতাশ্রী, মাম্মিজি )

৬ ) দেওনি — মারাঠি ( আঈ, মাম্মি )

৭ ) হরিয়ানা — হরিয়ানভি, হিন্দি, ভোজপুরি, মৈথিলি ( মায়, মাঁ, মইয়া, মাতৃ, মাতাশ্রী, মাম্মিজি )

৮ ) কঙ্করেজ — গুজরাতি, রাজস্হানি-হিন্দি ( মা, মাঁ, মাতাশ্রী, মাম্মিজি  )

৯ ) ওঙ্গোল — তেলুগু ( আম্মা, অম্মা, মাম্মি )

১০ ) লাল কান্ধারি — মারাঠি ( আঈ, মাম্মি )

১১ ) নিমারি — ছত্তিশগড়ি হিন্দি ( মায়, মইয়া, মাঁ, মাম্মিজি )

১২ ) মালবি –মধ্যপ্রদেশি হিন্দি, রাজস্হানি হিন্দি ( মায়, মাঁ, মইয়া, মাতাশ্রী, মাম্মিজি )

১৩ ) দাঙ্গি — মারাঠি ( আঈ, মাম্মি  )

১৪ ) খিল্লারি — মারাঠি, কন্নডিগা ( আঈ, অম্মা, মাম্মি  )

১৫ ) হালিকার — কন্নডিগা ( অম্মা, মাম্মি  )

১৬ ) নাগোরি — রাজস্হানি হিন্দি ( মাঁ, মাতাশ্রী, মাম্মিজি  )

১৭ ) বারাগুরু — তামিল ( অম্মা, মম্মি  )

১৮ ) সিরি — নেপালি, ভুটানি, কোচ ( মাঁ, মইয়া, মায় )

১৯ ) বাচ্ছৌর — ভোজপুরি, মৈথিলি ( মায়, মইয়া, মাম্মিজি )

২০ ) খেরিগড় — উর্দু, হিন্দি, পাঞ্জাবি ( অম্মি, মাঁ, মাতাশ্রী, পাব্বো, মাম্মিজি )

২১ ) মেওয়াতি — রাজস্হানি হিন্দি ( মাঁ, মাতাশ্রী, মাম্মিজি )

২২ ) উমব্লাচেরি — তামিল ( অম্মা, মাম্মি  )

২৩ ) কৃষ্ণা — মারাঠি, তেলুগু ( আঈ, অম্মা, মম্মি  )

২৪ ) পোনওয়ার — হিন্দি ( মায়, মাঁ, মাতাশ্রী, মইয়া, মাম্মিজি )

২৫ ) ভেচুর — মালায়ালি ( অম্মা, মাম্মি  )

২৬ ) মালেন্দু গিদ্দা — কন্নডিগা, তুলু ( অম্মা, মম, মাম্মি  )

২৭ ) কাসারগড় — মালায়ালি ( অম্মা, মম, মাম্মি  )

২৮ ) জার্সি ক্রস — বাংলা – ঘটি ও বাঙাল ( ওয়াঁ, মা, মাগো, আম্মা, মম, মাম্মি )

২৯ ) হলস্টিন ফ্রিজিয়ান ক্রস — বাংলা – ঘটি ও বাঙাল ( ওয়াঁ, মা, মাগো, আম্মা, মম, মাম্মি )

পড়া শেষ হলে, সিদ্ধাচার্য শান্তিপাদের  মুখে হাসি ফুটলো, বললেন, যাক, দুই বাংলার ভাষাই আছে ।

ওনার কথা শুনে আমিপাদ বললু, আজকাল পৃথিবীতে সর্বত্র মার্কিন প্রভাব । বাঙালির গোরুর ওপরেও না হয় মার্কিন প্রভাব পড়লো, দুধ তো পাওয়া যাবে মাদার ডেয়ারির প্যাকেটে, একটা কোনে ছ্যাঁদা করে জেনিফার লোপেজ বা ব্রিটনি স্পিয়ার্সের দুধের মার্কিন স্বাদ পাবেন ।

শান্তিপাদ বললেন, গোরুর গায়ে তার ভাষা লিখে দেবেন যাতে আবগারি বিভাগ তাদের দুধে ভাষানুসারি ট্যাক্স বসাতে পারে । নয়তো গোরু পাচারে ওরা মোষের ট্যাক্স ধার্য করতে পারে । আমাদের বাংলাদেশে দেখেছি পাচার করা গোরু-মোষের গায়ে আমদানিকারকের নামের আদ্যাক্ষর আর গোরু-মোষ-বলদের গায়ে নম্বর দেয়া থাকে, যাতে কমিশনদারদের ভাগবাঁটোয়ারায় অসুবিধা না হয় ।

উঠে পড়ব ভাবছিলুম । সিদ্ধাচার্য পণ্ডশ্রম  সেন অর্থাৎ ভুসকুপাদ নিজের বকবকানি আরম্ভ করে দিলেন । দার্শনিক বলে তো আর ছেড়ে দিয়ে উঠে পড়ে নাইটক্লাবের নাঙ্গা নাচে ভিড়ে যাওয়া যায় না । তাছাড়া শান্তিপাদ আর লুইপাদ দুজনেই বেশ আগ্রহী মনে হল । শান্তিপাদ  তো জানি পেসিমিস্ট কিন্তু লুইপাদের আগ্রহের কারণের হদিশ পেলুম না ।

পণ্ডশ্রম সেন অর্থাৎ ভুসকুপাদ মাথা ঝুঁকিয়ে রেখেই বলতে লাগলেন, “আয়নার মানুষটিও আজ আর তেমন বন্ধু নয় ; বলি না, বিড়বিড় করি, ভয় হয়, পাছে এ-ও ‘বক্তব্য’ না হয়ে ওঠে ; ভরসা নেই, সময়ও কম, আগামীকালের স্মৃতিগুলো এখনই গুছিয়ে নেওয়া ভালো ; রাজা আজও উলঙ্গ, আজও সব্বাই পটাপট হাততালি দিচ্ছে, ওইই জন্যই, আহ রাজা ট্রুলি সৎ, রাজা বোল্ড অ্যাণ্ড বিউটিফুল, রাজা লিবারেল, রাজা ইকোলজিকালি এনলাইটেনড, রাজার ন্যুডিটিই রাজার ফ্যাশান স্টেটমেন্ট, শিশুটি আজ বৃদ্ধ, অনেককালের ব্যাপার, কোমরের ব্যথাট্যাথা সামলে, আলস্য ঝেড়ে, অবশেষে সে পোস্ট করতে বসে, ডিয়ার রাজাসাহেব, নগ্নতার পোশাকটি তোমায় ঢেকে ফেলেছে হে, ভাষাকে জিততেই হয়, সেটাই ভাষার দুর্বলতা ; লেখা লিখি, ছেঁড়া লেখা লিখি, লেখালিখি ছিঁড়ি ; পা পিছলে লেখক হলাম, দাঁড়াতে আর পারলাম কই ; এমনই তার গোগ্রাসে পড়ার ধরন, মনে হয় পাঠশেষে বইটা ডাইরি হয়ে উঠবে ; লেখা লেখে লেখাকেই ; আজ পর্যন্ত লিখিত সমস্ত শব্দের উত্তরাধিকার তোমার, সেটিই তোমার বোঝা, আজ পর্যন্ত লিখিত সমস্ত সাহিত্য তোমার, সেটিই তোমার বাধা।”

পণ্ডশ্রম সেন অর্থাৎ ভুসকুপাদ মাথার চে-গ্বেভারা টুপি দুহাতে একটু চেপে, গ্রিক পোশাকের খাঁজে হাত ঢুকিয়ে আচমকা চুপ করে গেলেন । উঠে, নাইটক্লাবের গেটকিপারকে মুঠোকরা স্যালুট ঠুকে দরোজা খুলে শীতকাল থেকে গ্রীষ্মকালে বেরোলেন, পেছন ফিরে তাকালেন না। ঘোড়ার খুরের আওয়াজ শুনে টের পাওয়া গেল, উনি জুড়িগাড়িতে উঠলেন, যাবেন ঢপের রাজত্বে । কিন্তু কিছুক্ষণেই ফিরে এলেন, মেঝেয় কিছু পড়ে গেছে সম্ভবত, লাড়ীডোম্বীপাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, সব কয়টা মুখই পোশাক থেকে কোথায় যে খসে পড়ে গেল, খুঁজে পাচ্ছি না, শেষে ঢপাচার্য না চটে যায় ।

আগে দু’বার নাচিয়েরা যেমন ল্যাংটো হয়ে গাইতে-গাইতে এসেছিলেন, এবার অন্ধকারের সঙ্গে মিশে মোঙ্গোলয়েড আদল-আদরার তরুণীরা দেখা দিলেন, তাঁদের চিনতে মোটেই অসুবিধে হলো না, হাজার হোক আমিপাদরা সিদ্ধাচার্য, গায়ের রঙ হলদেটে, ছোটো-ছোটো বুক, গোলাপি ছোট্টো বোঁটা, তার ওপর হাত রেখে কোমরা দোলাচ্ছেন লুসি লিউ, ফ্যান বিংবিং, ঝাঙ ঝিয়ি, গঙ লি, ঝাঙ ইউকি, ডঙ জিয়ি, জিঙ তিয়ান :

 

যদি সুন্দর একখান মুখ পাইতাম

যদি নতুন একখান মুখ পাইতাম

মইশখালির পানের খিলি

তারে বানাই খাবাইতাম

নয়া মুখের নয়া কথা হুনিতে সুন্দর

মাঝে-মাঝে পান চিবাইত

হাসিরও ভিতর

প্রেমের মালা দোখনো হাতে

তার গলাৎ পরাইতাম

মইশখালির পানের খিলি

তারে বানাই খাবাইতাম

 

আমিপাদসহ অন্য সিদ্ধাচার্যরা, ভুসকুপাদ ছাড়া, উনি তো আবার বেরিয়ে গেলেন পোশাক থেকে খসে যাওয়া মুখ খুঁজতে, চান্স মিস করলেন, আগের বারের মতনই শ্বাস টেনে-টেনে পীত সুন্দরীদের উদোম দেহকে নিজেদের ফুসফুসে ভরে নিতে লাগলেন চিরযুবক সিদ্ধাচার্যরা, আর ক্রমশ শ্যামাঙ্গ থেকে পীতাঙ্গ হয়ে উঠতে লাগলেন, তাঁদের চোখ ছোটো হয়ে এলো, তাঁদের দাড়ি আর গোঁফের চুল সংখ্যায় কমে  গেল, নাক চাপা হয়ে উঠলো, তবু তাঁরা আনন্দে মাতাল তরণী, প্ল্যানচেটে ঝিংচাকে টালমাটাল ।

আমিপাদসহ অন্য সিদ্ধাচার্যরা, ভুসকুপাদ আর জঅনন্দিপাদ বাদ দিয়ে, লুইপাদ, কাহ্ণপাদ, সরহপাদ, শবরীপাদ, বিরূপাদ, লাড়িডোম্বীপাদ, কুম্বলাম্বরপাদ, ঠেণ্ডনপাদ, কুক্কুরীপাদ, কঙ্কপাদ, গুণ্ডরীপাদ, চাটিলপাদ ডোম্বীপাদ, শান্তিপাদ, মহিত্তাপাদ, বীণাপদ, আজদেবপাদ, দারিকপাদ, ভাদেপাদ, তাড়কপাদ, ধামপাদ, তান্তিপাদ প্রমুখ একসঙ্গে বলে উঠলেন, সাধু, সাধু, আধুনিকরা নিজেদের মূর্খতার কারণে প্ল্যানচেটে বিশ্বাস করেনি, আর আজ আমরা দেখিয়ে দিয়েছি যে প্ল্যানচেটে ঝিংচাক করলেই পৃথিবীর মৃত ও জীবিত সুন্দরীদের নিজের শ্বাসের সঙ্গে বুকের ভেতরে ভরে নেয়া যায় ।

 

তিতিয় পড়বো ( বগুড়া স্পেশাল )

লুইপাদ অর্থাৎ গোরার কাছ থেকে এক তাড়া দুহাজার টাকার গোলাপি নোট  নিয়ে শান্তিপাদ অর্থাৎ মাল্যবান চলে গেলেন । লুইপাদ অর্থাৎ গোরা, আমিপাদ  আর অন্য সিদ্ধাচার্যরা মাথা ঝুঁকিয়ে শুনতে লাগল আদিত্য-নগেন্দ্র-মন্মথদের তক্কাতক্কি, মানে আজদেবপাদ, তাড়কপাদ আর তান্তিপাদের গর্মাগরম মাতলামি । শুনতে শুনতে আমিপাদ ভাবছিল, এরা বন্ধু অথচ তুই-তোকারি করে না কেন ? মনে পড়ে গেল  ‘অরণ্যের দিনরাত্রী’ আর ‘জঙ্গলের দিনরাত্রী’ বইগুলোর গপপো— কেমন ধরনের বন্ধুর দল যে নিজেদের মধ্যে অশ্লীল গালমন্দ করে না, নোংরা ইশারা করে না, স্নান করার সময়ে কোনো যুবতী দেখে ফেললে কুয়োর পেছনে লুকিয়ে পড়ে, অথচ তারা মদ-টদ টানে, কলকাতায় মাগিবাজি করে । তারাও আসলে পিরালি ঠাকুরের বাচ্চাকাচ্চা, এই আদিত্য-নগেন্দ্র-মন্মথ অর্থাৎ আজদেবপাদ, তাড়কপাদ, তান্তিপাদের মতন, দুমিনিট ম্যাগি দিয়ে গড়া চরিত্তির ।

আজদেবপাদ : সাহিত্য জিনিসটা বিষয়ের উপর বেশি নির্ভর করে না রচনার উপরে ? লক্ষ্যের উপরে না লক্ষণের উপরে ?

তান্তিপাদ : তুমি তো একথাও জিজ্ঞাসা করিতে পার, মানুষ বাম পায়ের উপর বেশি নির্ভর করে, না ডান পায়ের উপরে ?

আজদেবপাদ : মানুষ দুই পায়ের উপর সমান নির্ভর করে, এ যেমন স্পষ্ট অনুভবগোচর, সাহিত্য তার বিষয় এবং রচনাবলীর উপর সমান নির্ভর করে সেটা তেমন নিশ্চয় বোধগম্য নয় এবং এই কারণেই সাহিত্য আজকাল কেহ-বা নীতিকে প্রাধান্য দেন, কেহ-বা সৌন্দর্যকে, কেহ-বা বৈজ্ঞানিক তত্ত্বপ্রচারকে । সেই জন্যই আলোচনা উথ্থাপন করা গেল ।

তাড়কপাদ : বেশ কথা । তা হইলে একটা দৃষ্টান্ত অবলম্বন করিয়া আলোচনা শুরু করা যাক । ভ্রমণকারীদের সুবিধার জন্য যে গাইড-বই রচনা করা হয় এবং ভ্রমণবৃত্তান্ত, এ-দুইয়ের মধ্যে কোনটা সাহিত্য লক্ষণাক্রান্ত সে বিষয়ে বোধকরি কারও মতভেদ নাই ।

আজদেবপাদ : ভালো, মতভেদ নাই — গাইড বই সাহিত্য নহে । কিন্তু ওই কথাতেই আমার সাহিত্যের উত্তর পাওয়া যায় । গাইড-বই এবং ভ্রমণবৃত্তান্তের বিষয় এক, কেবল রচনাপ্রণালীর প্রভেদ ।

তান্তিপাদ : আমার মতে দুয়ের বিষয়েরই প্রভেদ । ফিজিক্স এবং কেমিস্ট্রি যেমন একই বস্তুকে ভিন্ন দিক দিয়া দেখে এবং সেইজন্য উভয়ের বিষয়কে স্বতন্ত্র বলা যায়, তেমনি গাইড-বই এবং ভ্রমণবৃত্তান্ত দেশ-বিদেশকে ভিন্ন তরফ হইতে আলোচনা করে ।

তাড়কপাদ : গাইড-বইয়ে কেবলমাত্র তথ্যসংগ্রহ থাকে, ভ্রমণবৃত্তান্তে লেখকের ব্যক্তিগত প্রভাব বিদ্যমান এবং তাহাতেই সাহিত্যের বিকাশ । ব্যক্তিত্ববর্জিত সমাচারমাত্র বি্জ্ঞানে স্হান পাইতে পারে, সাহিত্যে নহে ।

আজদেবপাদ : তাহা হইলে দেখিতে হইবে কিসে ব্যক্তিত্ব প্রকাশ করে । কেবল মাত্র তথ্য নিতান্ত সাদা ভাষায় বলা যায়, কিন্তু তাহার সহিত হৃদয়ের ভাব ব্যক্ত করিতে গেলেই ভাষা নানা প্রকার আকার-ইঙ্গিতের সাহায্যে নিজের মতো করিয়া গড়িয়া তুলিতে হয় । তাহাকেই কি ইংরেজিতে ম্যানার এবং বাংলায় রচনাভঙ্গি বলা যায় না?

তাড়কপাদ : কেবল রচনার ভঙ্গি নহে, দেখিবার সামগ্রীটাও বিচার্য । এমন-কি কেবলমাত্র হৃদয়ের ভাবও নহে, কে কোন জিনিসটাকে বিশেষ করিয়া দেখিতেছে তাহার উপরেও তাহার ব্যক্তিত্বপ্রকাশ নির্ভর করে । কেমন করিয়ে দেখিতেছে, এবং কী দেখিতেছে এই দুটা লইয়াই সাহিত্য । কেমন করিয়া দেখিতেছে সেটা হইল হৃদয়ের এলাকা এবং কী দেখিতেছে সেটা হইল জ্ঞানের ।

আজদেবপাদ : তুমি কি বলিতে চাও, সাহিত্যের উপযোগী কতকগুলি দেখিবার বিষয় আছে ? অর্থাৎ কতকগুলি বিষয় বিশেষরূপে সাহিত্যের কতকগুলি তাহার বহির্ভূত ?

তাড়কপাদ : আমি যাহা বলিতে চাই তাহা এই — জ্ঞানস্পৃহা সৌন্দর্যস্পৃহা প্রভৃতি আমাদের অনেকগুলি স্বতন্ত্র মনোবৃত্তি আছে, বিজ্ঞান দর্শন এবং কলাবিদ্যা প্রভৃতিরা সেগুলোকে স্বতন্ত্ররূপে চরিতার্থ করে । বিজ্ঞানে কেবল জিজ্ঞাসাবৃত্তির পরিতৃপ্তি, সংগীত প্রভৃতি কলাবিদ্যায় কেবল সৌন্দর্যবৃত্তির পরিতৃপ্তি, কিন্তু সাহিত্য সমস্ত বৃত্তির একত্র সামঞ্জস্য । অন্তত সাহিত্যের সেই চরম চেষ্টা, সেই পরম গতি ।

তান্তিপাদ : সাহিত্যের উদ্দেশ্য সম্মন্ধে আর-একটু খোলসা করিয়া বলো, শুনা যাক ।

তাড়কপাদ : ম্যাথ্যু আর্নলড বলেন, সাহিত্যের উদ্দেশ্য মনুষ্যত্ব বিকাশ করা । জ্ঞানস্পৃহা সৌন্দর্যস্পৃহা প্রভৃতি মানুষের যতগুলি উচ্চপ্রবৃত্তি আছে তাহার প্রত্যেকটার পরিপূর্ণ পরিণতির সহায়তা করা । আমার মতে শিক্ষাবিধানকে গৌণ করিয়া আনন্দ-উদ্রেককে মুখ্য করিলে সেই উদ্দেশ্য সাধন হইতে পারে ।

তান্তিপাদ : বেশ কথা । তাহা হইলে শেষে দাঁড়ায় এই যে হৃদয়ের প্রতিই সাহিত্যের প্রধান অধিকার, মুখ্য প্রভাব । এস্হলে নীতিবোধকেও আমি হৃদয়বৃত্তির মধ্যে ধরিতেছি । কারণ সাহিত্য হৃদয়পথ দিয়াই ধর্মবোধের উদ্দীপন করে, তর্কপথ দিয়া নহে ।

তাড়কপদ : এই সম্বন্ধে বক্তব্য আছে । সত্যকে দুই খণ্ড করিয়া দেখা যায় । প্রথম, চিন্তার বিষয়রূপে ; দ্বিতীয়, অনুভবের বিষয়রূপে । কিন্তু সাহিত্য সত্যকে আমাদের কাছে জীবন্ত অখণ্ড সমগ্রভাবে উপনীত করে । প্রাকৃত বিজ্ঞানের নির্দেশ অনুসারে আমরা প্রকৃতিকে কেবলমাত্র বস্তু ও ক্রিয়ার সমষ্টিরূপে মনে করিতে পারি ; কিন্তু প্রকৃতিকে তার সমগ্র বস্তু ও ক্রিয়া এবং সৌন্দর্য সহযোগে একটি অখণ্ড সত্তারূপে অনুভব করাইতে পারে যে একটি একীভূত মানসিক শক্তি, সাহিত্য সেই শক্তিরই বিকাশ ।

তান্তিপাদ : সত্য হৃদয়ের দ্বারা কিরূপে অনুভব করা যায় বুঝিলাম না । প্রকৃতির সৌন্দর্যকেই বা কী হিসাবে  সত্য বলা যায় ধারণা হইল না । সৌন্দর্য বিশেষরূপে আমাদের হৃদয়বৃত্তিকে উত্তেজিত করে, এই কারণে তাহা বিশুদ্ধরূপে হৃদয় সম্পর্কীয় । ইহাকে যদি সত্য নাম দিতে চাও তবে ভাষার জটিলতা বাড়িয়া উঠিবে । নদী-অরণ্য-পর্বতের যে সমষ্টিকে আমরা প্রকৃতি বলি তাহার একটা বিভাগ হৃদয়-সম্পর্ক-বর্জিত, এইজন্য সেই বিভাগটাকে আমরা কেবলমাত্র বৈজ্ঞানিকভাবে আলোচনা করিতে পারি । কিন্তু তাহার যে দিকটা আমাদের হৃদয়ভাবকে উত্তেজিত করে, সেদিকে সত্য-মিথ্যা উচিত-অনুচিত নাই । এটা সুন্দর হওয়া উচিত বা উচিত নয় এমনও কোনো কথা নাই । সৌন্দর্য মানুষের মন এবং বহিঃপ্রকৃতির মধ্যগত একটা সম্বন্ধমাত্র । সে সম্বন্ধ সর্বত্র ও সর্বকালে সমান নহে, সেইজন্যই সাধারণত তাহাকে বৈজ্ঞানিক কোঠা হইতে দূরে রাখা হয় ।

তাড়কপাদ : অনেক কথা আসিয়া পড়িল । আমার মোট কথা এই, সাহিত্যের বিষয় সুন্দর , নৈতিক এবং যুক্তিসঙ্গত । ইহার কোনো গুণ বাদ পড়িলে সাহিত্য অসম্পূর্ণ হয় ।

তান্তিপাদ : সাহিত্যের লক্ষ্য হইতেছে সৌন্দর্য । তবে যাহা আমাদের ধর্মবোধকে ক্ষুণ্ণ করে তাহা আমাদের সৌন্দর্যবোধকেও আঘাত করে ; কতকগুলো যুক্তির নিয়ম আছে, তাহাকেও অতিক্রম করিলে সৌন্দর্য পরাভূত হয় । সেইজন্যই বলি, হৃদয়বৃত্তিই সাহিত্যের গম্যস্হান, নীতি ও বুদ্ধি তাহার সহায়মাত্র । অতএব, বিষয়গত সত্য এবং বিষয়গত নীতি অপেক্ষা বিষয়গত সৌন্দর্যই তাহার মুখ্য উপাদান ; এবং সেই সৌন্দর্যকে সুন্দর ভাষা সুন্দর আকারদানই তাহাতে প্রাণসঞ্চার ।

আজদেবপাদ : পুঁথির গহনা এবং হীরার গহনা গঠনসৌন্দর্যে সমান হইতে পারে কিন্তু ভালো গহনার উপকরণে পুঁথি দেখিলে আমাদের চিত্তে একটা ক্ষোভ জন্মিতে পারে ; তাহাতে করিয়া সৌর্ন্দযের পূর্ণফল নষ্ট করে । কবি বলিয়াছেন — ‘বীর রমণী রতন আর কারে শোভা পায় রে’, তেমনি পাঠকহৃদয় সাহিত্য ও সৌন্দর্যের সমাবেশ না দেখিলে সেই অসংগতিতে পীড়া এবং ক্রমে অবজ্ঞা উৎপাদন করিতে পারে ।

তাড়কপাদ : ইহার মধ্যে বিপদের সম্ভাবনা এই যে, গঠনের মূল্য অপেক্ষা হীরার মূল্য নির্ণয় করা সহজ, সেইজন্য অধিকাংশ লোক অলংকারের অলংকারত্ব উপেক্ষা করিয়া হীরার ওজনেই ব্যস্ত হয় এবং যে রসজ্ঞ ব্যক্তি মূল্যলাভ অপেক্ষা আনন্দলাভকেই গুরুতর বলিয়া গণ্য করেন, নিক্তির মানদণ্ড দ্বারা তাঁহাকে অপমান করিয়া থাকে । এই সকল বৈষয়িক সাংসারিক পাঠক-সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্রোহী হইয়াই এক এক সময় রসজ্ঞের দল সাহিত্যের বিশ্বগৌরবকে একান্ত অবহেলাপূর্বক নিরালম্ব কলাসৌন্দর্য সম্বন্ধে অত্যুক্তি প্রকাশ করিয়া থাকেন ।

আজদেবপাদ, তাড়কপাদ আর তান্তিপাদের তক্কো তখনও ফুরোয়নি, নাইটক্লাবের নাচঘরে আচমকা ফ্ল্যামেঙ্কো নাচের পোশাকে এসে পড়লেন নন্দনা সেন, তনুশ্রী দত্ত, শুস্মিতা সেন, ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, রানি মুখার্জি, বিপাশা বসু, কাজোল দেভগণ, কোয়েল মল্লিক, মনামি বসু, কোয়েনা মিত্র, কোঙ্কনা সেনশর্মা, রাইমা সেন, রিয়া সেন, স্বস্তিকা মুখার্জি, ইন্দ্রানী হালদার, শ্রেয়া ঘোষাল আর তাঁরা আরম্ভ করে দিলেন ফ্ল্যামেঙ্কো নাচ, ওফ সেকি তাতে তাল মিলিয়ে ভাঁজকরা লালকালো ফ্রক উড়িয়ে তাঁদের নাচ আর গান :

 

এম্বে এম্বে পঁ, বাঙালি য্যাম্নে কবি ক

অ আ ক খ গ লইয়া ডাইনে বাঁয়ে ক

হেইল্লা দুইল্লা কোরে তোরা য্যাম্নে খুশি ক

বাঙালি এম্বে এম্বে পঁ, হাইস্যা কাইন্দা ক ।

 

প্রমিত রঙ্গ কইরা তোরা কইথ্থ ভাষায় ক

মনের সুখে বাংলা ভাষা পরাণ ভইরা ক

চাষাভুযা কামার-কুমোর ক্ষ্যাতে বইয়া ক

য্যাম্বে কবি ক বাঙ্গালি বাংলায় কথা ক ।

 

মানুষ লইয়া করে তোরা মাটি লইয়া ক

বলে যারা বাংলা ভাষা বুইজ্জ্যা লইব ক

দখলদারের চাবুক ভাষা ফিক্ক্যা দিয়া ক

তোরা বাংলা কথা কয়ে মানুষ বাংলাডারে ক ।

 

সাহেব টুপি পাগড়ি হগল গাঙ্গে ফেলায় ক

ঢ্যাপের খই আর মোয়ামুড়ি মিঠাই খায়া ক

গ্যান্দামালা আলতা পইরা নাইচ্চা কুইদ্দা ক

‘বাংলা তোমায় ভালোবাসি’ তোরা য্যাম্নে খুশি ক ।

 

আমিপাদসহ অন্যান্য সিদ্ধাচার্যরা, ভুসকুপাদ আর জঅনন্দিপাদ ছাড়া, অন্য সবাই, লুইপাদ, কাহ্ণপাদ, সরহপাদ, শবরীপাদ, বিরূপাদ, লাড়ীডোম্বীপাদ, কুম্বলাম্বরপাদ, ঢেণ্ডনপাদ, কুক্কুরীপাদ, কঙ্ককপাদ, গুণ্ডরীপাদ, চাটিলপাদ, ডোম্বীপাদ, শান্তিপাদ, মহিত্তাপাদ, বীণাপাদ, আজদেবপাদ, দারিকপাদ, ভাদেপাদ, তাড়কপাদ, ধামপাদ, তান্তিপাদ প্রমুখ একস্বরে বলে উঠলেন, সাধু, সাধু, উত্তরাধুনিক যুগের এটাই সফলতা যে আমরা প্ল্যানচেটে ঝিংচাক করে জীবিত সুন্দরীতমাদের ডেকে এনে আদর আপ্যায়ন করতে পারি, যা আধুনিকদের কালে সম্ভব ছিল না ।

 

চতুৎথো পড়বো ( বরিশাল স্পেশাল )

ফ্ল্যামেঙ্কো নাচ সেরে সুন্দরীরা হাওয়ায় মিলিয়ে যাবার পর সিদ্ধাচার্যরা উনত্রিশটা গোরুর কাঁধে ডানা তৈরি করে দিলেন, গোরুরা কি খুশি ডানা পেয়ে, যে যার মাতৃভাষায় হোঙ্গা হোঙ্গা করে গান গাইতে গাইতে আকাশে উড়ে চলল, তাদের পাশে এক টুকরো মেঘের জাজিমে বসে শিভাস রিগাল খেতে খেতে গোরুগুলোকে আকাশের ঘাস খাওয়াবার জন্য লুইপাদ মানে গৌরমোহন সবুজ মেঘ ছিঁড়ে ছিঁড়ে যা করল তা পরের বার যখন সবাই নাইটক্লাবে জড়ো হবে তখন শোনাবে । আমি, মানে আমিপাদ, এতো নেশা করে ফেলেছিল যা মেঝে থেকে পণ্ডশ্রম সেন মানে ভুসকুপাদের খসিয়ে যাওয়া মুখগুলোকে তুলে তুলে নাইটক্লাবের মালিককে দিয়ে দিলে, ভুসকুপাদ যদি পরের বার দর্শন ফলাতে আসে তাহলে তাকে দেবার জন্য ।

ভুসকুপাদ এসেছিল, খরগোশের চামড়ার মুকুট পরে, বললে, দেশপ্রেম আর জাতীয়তাবাদকে মিশিয়ে ফেলে এক রকমের আইসক্রিম তৈরি করেছে, ইংরেজিতে যাকে বলে জিঙ্গোইজম, একরকমের আদর্শ, সবাইকে পিটিয়ে সমান করার আদর্শ, যেমনটা স্ট্যালিনের রাশিয়ায় ছিল, মুসোলিনির ইতালিতে ছিল, হিটলারের জার্মানিতে ছিল, পিনোশের চিলিতে ছিল, ইন্দিরা গান্ধীর ছেলে সঞ্জয় গান্ধির ইনডিয়ায় ছিল — ওনার বুড়ো-হাবড়া চেলারা চেঁচাতো ইনডিয়া ইজ ইন্দিরা, ইন্দিরা ইজ ইনডিয়া, এখন ভুসকুপাদ ভাবেন উনি কেন ইনডিয়া নন, ইন্দিরা কে হে, চর্যাপদের ডোম্বি কেন ইনডিয়া নন, শ্রীকৃষ্ণের গোপীরা কেন ইনডিয়া নন, রামায়ণের সীতা কেন ইনডিয়া নন, মহাভারতের দ্রৌপদী কেন ইনডিয়া নন !

 

 

Posted in পোস্টমডার্ন-গল্প, মলয় রায়চৌধুরী, স্যাটায়ার | Tagged , | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

হৃৎপিণ্ডের সমুদ্রযাত্রা : রবীন্দ্রনাথের দাদুর মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ ও দেবেন্দ্রনাথের সমালোচনা মলয় রায়চৌধুরীর উপন্যাস

 

        হৃৎপিণ্ড : আর কতো দূর হুলি ?

আমি : আরও চার মাস, রাজকুমার ।

 

        আমি, হুলি গন্ধবণিক, রাজকুমারের ভৃত্য, আমার সমস্যা হলো যে, মাথায় চুলের জঙ্গলে ভাববার কুয়াশা গড়ার দরকার হয় না, মুখ খুললেই নর্দমার পাঁকের তোড়ের মতন কথা ওগরাতে থাকি, গাঁয়ের নর্দমা নয়, সুতানুটি-গোবিন্দপুরের  বর্ষাকালের আধকাঁচা নর্দমা, যে নর্দমায় জোব চার্নক দাঁড়িয়ে হিসি করে গেছেন, লর্ড হবার আগে পোঁদপোঁছা টয়লেট-কাগজ ফেলে গেছেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাহি লুটেরা রবার্ট ক্লাইভ, চার্লস স্টুয়ার্ট যাকে আমরা বলতুম হিন্দু স্টুয়ার্ট যিনি প্রতিদিন গঙ্গাস্নান করতেন আর নিজের হিন্দু বউকে পাল্কিতে বসিয়ে নিজের সঙ্গে স্নান করাতে নিয়ে যেতেন,  ব্রিটিশ আমল থেকে জেরা করার মতন করে বকবক, বর্ষা ফুরোলেই কথা বন্ধ, পচা গন্ধের সঙ্গে আমোদে ফুলতে থাকে, এখন, কয়েকশো বছর পরে, বাতিল প্লাসটিকের থলে, নেতাদের হাসিমুখের পোস্টার আর কন্ডোমে জ্যাম ।

আমার কথা বলতে হলে বলতে হয় যে, গ্রামসমাজ, ধর্ম আর গোষ্ঠীজীবন কিংবা বয়োজ্যেষ্ঠ লোক, যাঁদের মতামত আদ্যিকালে সমাজের সব স্তরে প্রভাবী ছিল, সেই লোকগুলোর পরের প্রজন্মকে দেয়া একপ্রস্হ আচার আচরণকে  ঐতিহ্য আর পরম্পরা বলে মেনে নিতে খটকা লাগে ; সেসব আজ উপড়ে ফেলে দেয়া হয়েছে, আর তার জায়গায় এসেছে কারখানার পাতিমার্কা জীবন, সেই সঙ্গে জটিল আমলাবাজির বাড়বাড়ন্ত, নিয়মকানুন, হ্যান কোরো না, ত্যান কোরো না, ওখানে ঢুকতে পারবে না, সেখানে অনুমতি নিয়ে যেতে হবে । তাহলেই বুঝুন ।

আইডেনটিটি কার্ড হাতে, দরোজার বাইরে দাঁড়িয়ে বিচি চুলকোন ।

যাকগে যাক,  এখন রাজকুমারের ব্যাপারটাই বলি ; পরে অন্য ।

         আমি একজন রাজকুমারের হৃৎপিণ্ড, ক্লিপার জাহাজে করে সুতানুটি-গোবিন্দপুরে, রাজকুমারের নিজের বাড়িতে ফিরছি, তাঁর ছেলেদের জিম্মায় হৃৎপিণ্ড বা হৃৎখণ্ডখানা হিল্লে করে আমার ছাড়ান, ওনাদের হাতে তুলে দিয়ে নিশ্চিন্তি , এর আগে আফ্রিকার পোঁদের তলা দিয়ে ফিরতে হতো, সেই যে-জলরাস্তায় ভাস্কো ডাগামা এসেছিল, আর তার পেছু-পেছু পর্তুগিজ জলদস্যুর দলবল, ওরা অবশ্য আলু, বাঁধাকপি, ফুলকপি, টোমাটো এনেছিল, তার আগে আমরা সেসব খেতুম না, রাজকুমারের বাড়ির লোকজনও খেতো না, জাত যাবার আঁৎকানির দরুন, রাজকুমার নিজে কিচ্ছু মানতেন না, বলতেন ওরা সময়-অন্ধ, নিজের সময়কে চিনতে পারছে না, বাইরের জগতের বদলে নিজেদের মাথার পাঁকে সাঁতরায় ।

রাজকুমার ছিলেন আত্মগর্বী, বেপরোয়া, রুচিবাগীশ, কড়া-মেজাজের, বেয়াদপি করলে চাবকাতে কুন্ঠিত হতেন না, আয়েশি, ধবধবে ফর্সা, আদেশ না শুনলে বরখাস্ত করতেন, টাকা রোজগারের আর খরচ করার ঘাঁতঘোঁত খুঁজতেন, অন্নসত্র খুলে কাঙালিভোজন করাতেন, যোয়ান বয়সে খড়াদার গোঁসাইয়ের শিষ্য ছিলেন, পেঁয়াজও ছুঁতেন না,  কিন্তু ‘চৈতন্য মঙ্গল’ পড়া সুতানুটি-গোবিন্দপুরের বামুনরা ওনাকে ঠ্যাটা করার পর উনি বললেন, আচ্ছা দাঁড়া তোদের দেখাচ্ছি, আমি তোদের চেয়ে কতো বড়ো হই, কতো উঁচু হই, সেই যে উনি পালটে গেলেন, তারপর ওনার উন্নতি শুধু মরণই থামাতে পেরেছে । রাজকুমারের ভেতরে যে একজন সম্রাট রাজত্ব করছে, তা উনি বামুনদের খেলো-করা কথা শোনার পরই টের পেলেন ।

ওনার বংশে কেউই ওনার মতন  শ্বেতাম্বর টাইকুন হতে পারেননি, দিগম্বর হয়ে গেছেন ।

রাজকুমার বলতেন, বাঙালিরা এমন জায়গায় গিয়ে ঠেকেছে যে, যেকোনো নতুন ধারণাকেই মনে করে বিপজ্জনক, যেকোনো নতুন আবিষ্কার দেখলেই ভাবে আবার সেই খেটে মরতে হবে, সমাজে এগিয়ে যাবার নতুন পদক্ষেপকে মনে করে বুঝি বিদ্রোহ করে ফেলছে, তাই যখানে বসে আছে সেখাইনেই পাথরের মতন বসে থাকতে চায় ।

রাজকুমারের বড়ো ছেলে ঠাকুর-দেবতা দেখতে পান না, ওনার ঠাকুর-দেবতা নাকি নিরাকার, যেমন মোচরমানদের হয়, বলেছিলেন আমায় রাজকুমার ।

এই সমুদ্রযাত্রা  আমার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের, শান্তি আর অশান্তির জগাখিচুড়িতে ডুবে অদ্ভুত আনন্দ গড়ে ফেলতে পেরেছি, রাজকুমারের জন্য, চোখ বুজলেই আকাশে প্রায় কুড়িটা পূর্ণিমার চাঁদ দেখতে পাই ।

আমার প্রতিটি জন্মে থেকে গেছে এই নাতিশীতোষ্ণ বোধ, থেকে গেছে সমুদ্রে দেখা উড়ন্ত মাছেদের নোনা হাওয়া, ঢেউদের ওপরে ফেনার গান ।

সেইন্ট মার্টিন দ্বীপের একজন হাবশিকে, সে বলতে গেলে বাঙ্গাল হয়ে গেছে, পর্তুগিজরা আফ্রিকার সিমলোপা প্রদেশ থেকে আরও অনেক ছেলে-ছোকরার সঙ্গে ওকে জাল ফেলে চুরি করে এনেছিল, যাতে যুদ্ধে কাজে লাগাতে পারে, তা সে যাদের সঙ্গেই যুদ্ধ হোক না কেন, রণে বনে জঙ্গলে, রাজকুমার পর্তুগিজদের মোটা টাকা দিয়ে হাবশিটাকে ছাড়িয়ে নিয়েছিলেন, এখন ব্যাটা নিজের দেশে ফিরতে চায় না, গিয়ে করবেটাই বা কী, নিজের ভাষাও তো ভুলে গেছে । সমুদ্রপথে আঁকশি দিয়ে, ও দুটো উড়ুক্কু মাছ ধরে লোহার চৌবাচ্চায় ঢাকা দিয়ে রেখেছে, এই জাহাজে, মাংসের টুকরো খেতে দেয়, শুকনো মাংস, উটের, ভেড়ার, হলুদ আর লঙ্কাগুড়ো মাখানো, যাতে পচে না যায়, জাহাজের খালাসি ক্যাপ্টেন সকলেই ওই মাংস খায় ।

হাবশিটা আমার দেখাশোনা করে, আমি তো চাকর, ও হলো চাকরের ভৃত্য । সেইন্ট মার্টিন দ্বীপ এখন বাংলাদেশে । রাজকুমারের সময়ে বাংলাদেশ ছিল না, অখণ্ড বঙ্গদেশ ছিল, সেখানে ওনার জমিদারি ছিল, সে অনেক জমিজমা ছিল, মোচোরমানরা ভেন্ন হয়ে যেতে চাইলো, তাই আলাদা হয়ে গেছে, তারপর নিজেদের মধ্যে কচুকাটা খুনোখুনি করে আলাদারও আলাদা হয়ে গেছে, এখন সেই আলাদার আলাদার মধ্যেও আলাদা হবার মারিকাটারি চলছে, আদালত চত্বর থেকে গ্রিক দেবীর মূর্তি হাপিশ করে দিয়েছে, নেড়ে সালাফিস্টদের যা তে মন ভরে।

সুতানুটি-গোবিন্দপুরের এখনকার লোকেরা বলে যে ওরা আলাদা হয়ে ভালোই করেছে, নয়তো ছেচল্লিশের খুনোখুনি  বজায় থাকতো, এখন নিজেরা লড়ে মরছে, সে-ই ভালো ।

রাজকুমার চোগা-চাপকান পরতে ভালোবাসতেন, কাঁধে কাশ্মিরি কাজ করা শাল, নাগরা জুতোয় মুক্ত বসানো, সবই বিলেতে ছেড়ে আসতে হয়েছে, ওনার সুইটহার্টরা কেউ-না-কেউ হাতিয়ে নিয়ে থাকবেন । এখন যাকে অ্যাটিচিউড বলে, ওনার চাল-চলন থেকে তা গর্বের গুঁড়ো হয়ে ঝরে-ঝরে পড়তো, হাওয়ায় উড়তো ওনার জ্যোতি ।

ক্লিপার জাহাজ মানে তিন মাস্তুলের জাহাজ, সবকটা মাস্তুলে চারচৌকো নস্যি রঙের ছোটো-ছোটো পাল,  সবচেয়ে উঁচু মাস্তুল মায়িস, দ্বিতীয়টা ফোরমাস্ট, তৃতীয় মেজ্জিন ; দুবার বিলেত যাওয়া আর দুবার আসায় ক্লিপার জাহাজের অনেক ব্যাপার জেনে ফেলেছি ।

আমি পেয়েছি চারচৌকো কেবিন, কাঠের মেঝেয় নীল রঙের কার্পেট, বার্নিশ-করা সেগুনকাঠের দেয়াল, ল্যামিনেশানে চকচকে, রাজকুমারের হৃৎপিণ্ড নিয়ে যাচ্ছি বলে আমার দেখাশোনার জন্যে হাবশিটা রয়েছে, সে আফ্রিকার মোচোরমান ছোঁড়া, কিন্তু বাঙ্গাল হয়ে গেছে, না ও আমার ঘটি ভাষা বোঝে আর না আমি ওর বাঙ্গাল ভাষা বুঝি । সঙ্গে ঢিলা কুলুপ আনেনি, সমুদ্রের নোনতা জল ব্যবহার করে-করে নুনুতে নুনের পলি জমে হেজে যেতে বসেছে, নোনতা জল মানে যে জলে উড়ুক্কু মাছ দুটো পুষেছে, ফিদিন বদলাতে হয়, ক্যাপ্টেন বলেছে খাবার জল ব্যবহার করতে পারবে না । সুতানুটি-গোবিন্দপুর না পৌঁছানো অব্দি বেচারার অঙ্গখানা আস্ত থাকলে হয় ;  নুনুর খোসা ছাড়ানোয় যেমন সুবিধে আছে, তেমন অসুবিধেও আছে।

রাজকুমারের এক মেয়ে আর পাঁচ ছেলে , ওনাদের পরিবারে বছর বছর বিয়োবার রীতি,  তা সত্বেও উনি বেশি ছেলেমেয়ে পয়দা করতে পারেননি কেননা ওনার বউ, ব্রাহ্মণ পুরুতদের পরামর্শে, ওনাকে ছুঁলে সাতবার পাল্কিসুদ্দু গঙ্গায় চান করতেন, তখন অবশ্য গঙ্গা এরকম গুয়ে গোবরে পাঁকে নর্দমার-কারখানার  জলে দুর্গাকালীর মূর্তি-ভাসানো খড়ে কালোকেলটে হয়ে যায়নি, মাদি ইলিশরা দুরছাই করে বর্মায় বিয়োতে পালায় নি, শুশুকরা এই নদীতে যাতে না সেঁদোতে হয় তার প্রতিজ্ঞা করেনি, দলদাসদের খুন করা মুন্ডুহীন ধড় ইয়ে আজাদি ঝুটা হ্যায় গাইতে-গাইতে ভাসতো না।

ওনার বউ ছিলেন গোঁড়াবামুন- বাড়ির মেয়ে, বরের দেহের  চেয়ে বেশি গঙ্গার জলকে পবিত্র মনে করতেন ।

রাজকুমার বলতেন, যারা গোঁড়া তারা অজানার চেয়ে পরিচিতকে পছন্দ করে, যা পরখ করা নয় তার চেয়ে বেশি পছন্দ করে যা আগে থাকতে পরখ করা, রহস্যের চেয়ে ঘটনাকে পছন্দ করে, সম্ভাব্যের চেয়ে যথাযথকে পছন্দ করে, অসীমের চেয়ে সীমিতকে পছন্দ করে, দূরের চেয়ে কাছেরকে পছন্দ করে, প্রাচুর্যের তুলনায় যা যথেষ্ট তাকে পছন্দ করে, নিখুঁতের হবার চেষ্টার চেয়ে যা সুবিধাজনক তাকে পেতে চায় ।

একটা উড়ুক্কুমাছ লাফিয়ে উঠে বললে, গুড স্পিচ ।

রাজকুমারকে  বিদেশিনী বন্ধুনিরা এতো চাইতো যে বউয়ের দরকার পড়