সুন্দরীতমা, আবার কবে তোমার সঙ্গে দেখা হবে ?

49373569_359716581246383_2875688158966579200_n

—জানলা দিয়ে কি দেখছেন ? বৃষ্টি ? বর্ষা ?

—না, না, বর্ষাকাল উপভোগ হলেলঞ্চ বস বৃষ্টিতে -ভিজতে নদীগুলোয় । দিনের বেশ, মতন বৃষ্ট ভিজ । শহরে বৃষ্টির শব্দ বেশ ভালগার আর, ধানখেতে বা জঙ্গলে বৃষ্টি তার নিজের শব্দকে নষ্ট হতে দেয় না, ভারজিন শব্দ শুনতে পাওয়া যায় ।

—তাহলে ?

—না, দেখছি সামনের ওই গাছটা একবছরেই শুকিয়ে মরে গেল ।

—তার জন্য কষ্ট ?

—কষ্ট ? নাহ । বৃষ্টিও তো দিনকতক হল পড়ছে না । বর্ষাকাল বলে গাছটার শব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে । ছাল-চামড়া উঠে গেছে । গাছটা আমার জন্যেই মরে গেল ।

—আপনার জন্যে ? বিষ দিয়েছিলেন নাকি ? গাছ মারার তো মাফিয়া আছে । কর্পোরেশানের আর ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের লোকেদের টাকা খাওয়ায়, তা সে তো কোনো হোর্ডিঙের বা ব্যানারের বিজ্ঞাপনকে যদি আড়াল করে, তাহলে ; কিংবা কোনো বড়ো দোকানের শোরুমের সামনে থাকলে। এই গাছ তো আপনাদের আবাসনের চৌহদ্দিতে রয়েছে, কোনো বিজ্ঞাপনের ফলাও করা নিয়নসাইনও নেই , আপনাদের বিলডিঙের তলায় মোটরগাড়ির বা মহিলাদের পোশাকের শোকেসও নেই । 

—এই গাছটা কোনো জংলি গাছ, নাম জানি না ; গোলাপি রঙের ফুল হতো বসন্তকালে, থোকা-থোকা, দেখতে সুন্দর, কিন্তু সেই ফুলগুলো থেকে প্রচুর পরাগ উড়তো একটু হাওয়া দিলেই, আর আমার হাঁপানি, সব জানলা-দরোজা বন্ধ থাকা সত্ত্বেও, বেড়ে যেতো, দুবেলা ফোরমোস্ট ফোর হানড্রেড ইনহেল করতে হতো । বছর পঞ্চাশ আগে এটা জঙ্গল ছিল, শহর এগিয়ে এসে দখল করে ফেলেছে ।

—তাই গাছটার মৃত্যু চাইছিলেন ?

—আমি চাইনি তো । আমার সঙ্গে শত্রুতা করলেই, কেবল মানুষ নয়, গাছপালা আর প্রাণীরাও মারা যায় । অথচ আমি কারোর সঙ্গে কখনও শত্রুতা করিনি । আমি চাইনি গাছটা মরে যাক । শত্রু বলা বোধহয় উচিত হল না, ইনটিমেট এনিমিজ বললে ভালো হয় ।

—তাহলে ছয় তলায় দাঁড়িয়ে জানলা দিয়ে কি দেখছিলেন, ওই মরা গাছ ? ওটা তো বছরখানেক হল মরে গেছে বলছেন ।

—গাছটা মারা যাবার দরুণ পায়রাদের সঙ্গমের সুবিধা হয়ে গেছে ।

—পায়রাদের সঙ্গম দেখছিলেন ?

—ঠিক সঙ্গম নয়, দেখছিলুম যে পুরুষ পায়রা প্রতিবার সঙ্গম করছে আর ডালের এধার থেকে ওধার পর্যন্ত নেচে আসছে, গর্বের সঙ্গে ঘাড় নাড়াচ্ছে । মাদি পায়রাটাও একটু খেলিয়ে নিচ্ছে । মানুষ অমন করে না, তার কারণ পুরুষ মানুষের অমন পায়রাক্ষমতা নেই, একবারেই কেলিয়ে পড়ে, তারপর আবার দম নিয়ে পায়রাবাজি করতে হয় । মানুষকে কেন এমন দুর্বল করে দেয়া হয়েছে, তা এখনকার গণধর্ষণ, সোলোধর্ষণ, গ্রুপধর্ষণ, মেঠোধর্ষণ, মাচাধর্ষণ  ইত্যাদি দুঃসংবাদ থেকে আঁচ করতে পারি । মানুষকে সিংহের ক্ষমতা দিলে তারা ওই কাজকেই শিল্প বলে চালাতো । শিল্প নামের ভাঁওতাটাকে মানুষ বড়ো ভালোবাসে । 

—সিংহের কথা বলছিলেন যে ?

—হ্যাঁ, সিংহেরা পনেরো মিনিট অন্তর করে । ইম্যাজিন, পনেরো মিনিট অন্তর !

—আপনার আপশোষ হচ্ছে যে অমন সিংহত্ব আপনি পাননি । আপনি তো সিংহরাশি !

—যখন যোয়ান ছিলুম তখন হতো বটে ; এখন তো বুড়িয়ে গেছি । এমনিতেই হাঁপানি হয়, পনেরো মিনিট অন্তরের ব্যাপার হলে ফুসফুস গলার কাছে উঠে আসতো ; অবশ্য ছোটোবেলায় বাবা যদি সুন্নৎ করিয়ে দিতেন, তাহলে মনে হয় এলেমটা সময় বাড়িয়ে দিতে পারতো । যাকগে, পায়রাদের কথায় আসুন । পায়রা হল এই শহরের প্রাণী, যে পাড়াতেই যান, ঝাঁক-ঝাঁক পায়রা দেখতে পাবেন । অন্য ভারতীয়  শহরে এমন গোলা পায়রার পপুলেশান পাবেন না । সব শহরেরই নিজস্ব প্রাণী থাকে, সেখানকার মানুষেরা সেই প্রাণিদের চরিত্র পায়, প্রাণী না বলে রাজ্যেশ্বর-রাজ্যেশ্বরীও বলতে পারেন । এখানকার কবি আর ছবি আঁকিয়েদের দেখুন, পায়রা । ঝাঁকের মধ্যে জোড়ায়-জোড়ায় ; পায়রার তো সিংহদের মতন আলফা মেল নেই । দুটো পুংপায়রা গুঁতোগুঁতি করে ডিসাইড করে মাদি পায়রাটাকে কে পাবে; মাদি পায়রাটা আবার পরের গুঁতোগুঁতিতে জেতা পুংপায়রার সোহাগ খেতে ঢলে পড়ে । কবিতার চরিত্রও পায়রাদের মতন, দেখে বুঝতে পারবেন না কোন পায়রাটাকে সকালে সঙ্গম করতে দেখেছিলেন ।

—পায়রা ছাড়াও ইঁদুর তো প্রচুর এই শহরে ? বেরালের সঙ্গে তারা যুঝে যায়, এমন তাদের সাইজ ।

—হ্যাঁ, এই ইঁদুরগুলো পায়রাদের আক্রমণ করে, খায় । কর্পোরেশানের ইঁদুর মারার কর্মচারী আছে । এই বছর তারা নাকি প্রায় তিন লাখ ইঁদুর মেরেছে ; বর্ষায় ইঁদুরগুলোর জন্যে লেপ্টোস্পিরোসিসে প্রতিবছর শতখানেক লোক মারা যায় । ইঁদুরকেও প্রতিনিধিত্বকারী দেবী-দেবতার সিংহাসন দেয়া যায় পায়রাদের পাশাপাশি । জৈন আর গুজরাতি দোকানদাররা ইঁদুরগুলোকে মারে না ; তার ওপর প্রতিদিন আট হাজার টন জঞ্জাল খেয়ে ইঁদুরগুলোর সাইজ বেড়েই চলেছে, এই শহরের বৈভবশালীদের মতন ।

—পায়রাগুলো ঘরের ভেতরে যাতে না ঢুকতে পারে, ঘরের ভেতরে পিজনসেক্স করতে না পারে, তাই জানলায় গ্রিলমেশ লাগিয়েছেন ? পায়রাদের কারণে অ্যালার্জি হচ্ছিল বলে ? কিন্তু পায়রা তো শান্তির প্রতীক। 

—গ্রিলমেশ বিল্ডারের বসানো । শান্তির প্রতীক ছিল হয়তো এককালে ; এখন স্হানীয় লোকেরা অসৎ কাজকে বলে ‘ফাকতা ওড়ানো’ বা পায়রা ওড়ানো ; সম্ভবত মাগিবাজি করা থেকে এসেছে উক্তিটা । তবে পায়রা ঘরে ঢুকে পড়লে হয়তো নিজেই বসাতুম । তা ওদের সঙ্গমে বাগড়া দিতে নয় । ওরা তো দুই ইঞ্চ জায়গা পেলেও চট করে সেক্স সেরে নিতে পারে । হাঁপানিতে কাহিল হয়ে গেছি ।

—আপনি কি নিজেকে কখনও প্রশ্ন করে দেখেছেন যে আপনার শরীরের যাবতীয় রোগের, ইনক্লুডিং হাঁপানি, আসলে যৌবনে বেহিসাবি জীবনযাপনের কারণে ঘটেছে । যে সমস্ত মাদক নিতেন তা তো শ্বাসকে প্রভাবিত করে দেহের ভেতরে পৌঁছে প্রতিক্রিয়া ঘটানোর জন্য । নয়কি ? তখনকার বেলেল্লাপনার মাশুল দিচ্ছেন বলে মনে হয় না ?

—বলা কঠিন । হাঁপানির ডাক্তারকে বলেছিলুম আমার মাদকপ্রিয় যৌবনের কথা । উনি বললেন,  ধোঁয়ার কারণে আমার ফুসফুস আর হার্ট প্রভাবিত হয়ে থাকতে পারে । আমার হাঁপানির কারণ, ওনার মতে, সুগন্ধ । আমার শরীর সুগন্ধ সহ্য করতে পারে না । উনি ফুল শুঁকতে, যে ফুলেরা পরাগ ছড়ায় তাদের কাছে যেতে, সুগন্ধি সাবান আর পাউডার মাখতে, দেহে আর পোশাকে পারফিউম লাগাতে, রুম ডেওডোরেন্ট ব্যবহার করতে,  বারণ করেছেন । এমনকি রান্নার সময়ে ফোড়নের গন্ধ থেকে দূরে থাকতে বলেছেন । ফুসফুস ভালোই আছে, অকসিজেন ইনটেক চেক করিয়ে দেখেছি । দ্বিতীয়ত আমার গা থেকে হরমোনের তিতকুটে গন্ধ বেরোয়না বলে আমায় পারফিউম ব্যবহার করতে হয় না । লিফটে অনেকসময়ে যুবতীদের গা থেকে একই সঙ্গে তিতকুটে হরমোনের দুর্গন্ধ, আর তার ওপর চাপানো বডি ডিওডেরেন্টের সুগন্ধ আমায় হাঁচিয়ে-হাঁচিয়ে কাহিল করে দেয় বেশ ; তরুণী দেখলে এড়িয়ে গিয়ে বলি, আপনি যান, আমি পরে যাবো । এই জন্যে কাঠমাণ্ডুতে হিপিনীদের আমার ভালো লাগতো ; ওরা দিনের পর দিন স্নান করতো না, গা থেকে স্বাভাবিক নারীগন্ধ পেতুম ।

—একটু আগে বলছিলেন, আপনার সঙ্গে যারা ইনটিমেট শত্রুতা করে তারা মরে যায় ? আপনি কি তার জন্য অনুতপ্ত বোধ করেন ?

—নাহ, করি না । কারণ যারা মারা যায় তারা নিজের দোষেই মরে, আমার উপস্হিতি তাদের জীবনে আপনি  পাবেন না । যেমন এই গাছটা । আমি কিছুই করিনি, অথচ মরে গেল । গাছটাকে সারা বছর পছন্দ করতুম ওর সবুজের কারণে, কতোরকম সবুজ ছিল গাছটার স্টকে, প্রচণ্ড বৃষ্টি হলে বাফারের কাজ করতো, সামুদ্রিক ঝড়গুলোকে সামলাতো । কিন্তু বাধ সাধল ওর অত্যাকর্ষক ফুল আর তার সুগন্ধজনিত পরাগ ।

—আরও উদাহরণ আছে ?

—হ্যাঁ, ইনটিমেট বন্ধুবান্ধব যারা শত্রুতা করেছিল, এমনকি অগ্রজ সাহিত্যিকরা, তারাও একে-একে মারা গেল । অনেক সময়ে পরিচিত  ইনটিমেট কেউ মারা গেলে, অমি দুশ্চিন্তায় পড়ে যাই, ভাবি যে, ইনি কি আমার সঙ্গে শত্রুতা করেছিলেন, যে মারা গেলেন ? ব্যাপারটা অদ্ভুত, কেননা আমি তো শত্রুতা করিনি, করছি না, কারোর সঙ্গে, কেনই বা করব । তারা করছে, তারা মারা পড়ছে । আমি প্রথম যে চাকরিটার ইনটারভিউ দিতে যাচ্ছিলুম, তা ছিল লেকচারারের । যাবার সময় একটা কাক গাছ থেকে হেগে দিয়েছিল আমার শার্টে ; উড়ে যেতে গিয়ে কাকটা ইলেকট্রিকের তারে ঠেকে গিয়ে ছিটকে পড়ল রাস্তার ওপর , অথচ কাকেরা সাধারণত ইলেকট্রিকের তার এড়িয়ে ওড়ে। তারপর থেকে আমি লেকচারারের আর স্কুল শিক্ষকের জন্য আর দরখাস্ত দিইনি ।

—আপনার মস্তিষ্কে এই দুর্ভাবনা এলো কোথ্থেকে ?

—আমি একবার গোরখপুরে ট্যুরে গিয়েছিলুম । সহযোগী আর স্হানীয় হোস্ট নিয়ে গেলেন গোরখনাথ মন্দিরে, ওই যেখানে পূণ্যার্থীরা ত্রিশূল দেয় পুজোয় । সেখানের চত্তরে একজন নোংরা জটাধারী সাধু হঠাৎ আমায় জড়িয়ে ধরে, মুখে দাড়ি ঘষে বলেছিল, “তোর সঙ্গে যে শত্রুতা করবে সে তোর আগে মরে যাবে।”

—আপনি এই সব কুসংস্কারে বিশ্বাস করেন ?

—করি না, তবে মৃত্যুর ব্যাপারে দেখছি, এই ব্যাপারটা হ্যারি পটারীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ।

—মৃত্যু নিয়ে কবিতা লেখেননি কেন এখনও ?

—যাঁরা জানেন যে তাঁরা কালক্রমে অমর হবেন, তাঁরা সাধারণত লেখেন । খ্রিস্টধর্মীদের মধ্যে এপিটাফ লেখার চল আছে । সেই দেখাদেখি হয়তো আমাদের কবিরা মৃত্যুবোধ এনেছেন । আমি তো জানি আমি নশ্বর, তাই লিখিনি । তবে শবযাত্রা নিয়ে লিখেছি । একটা কবিতা লেখার ইচ্ছে আছে, সেটাও আমার শব নিয়ে । আমার অনুমান যে আমি এই ফ্ল্যাটটায় মরে পড়ে থাকবো, লোকে পচা গন্ধ পেয়ে পুলিশে খবর দেবে, পুলিশ এসে দরোজা ভেঙে দেখতে পাবে যে শবেতে ম্যাগটস ধরে গেছে আর তারা আমার পচা মাংস খেয়ে কিলবিল করছে । মানে, আমার মৃতদেহ থেকেও প্রাণের উদ্ভব সম্ভব । 

—তা লিখে ফেললেন না কেন ?

—ম্যাগটের সঠিক বাংলা প্রতিশব্দ খুঁজে পাইনি এখনও ।

—সব শহরের নিজস্ব প্রাণী থাকে বলছিলেন, আর সেই প্রাণীরা সেই শহরের চরিত্র নির্ণয় করে, সাহিত্যের গতিপ্রকৃতির ঝোঁক গড়ে তোলে, কবি-শিল্পীরা তাদের চরিত্র পায়, মুম্বাইয়ের অভিনেতা-শিল্পী-কবিরা যেমন ইঁদুর আর পায়রার চরিত্র পেয়েছে, বলছিলেন । আপনার শৈশবের ইমলিতলায় কোন প্রাণী ছিল ?

—বিহারের পাটনা শহরের কথা বলছেন ? ইমলিতলার বাড়িতে বাঁদর আসতো, লালমুখো-লালপোঁদ বাঁদর, যাদের ওপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে মানুষ, ওষুধ আর রোগের কারণ-নিদান আবিষ্কার করে । বাঁদরদের ব্যবহার করা হয়, মেরে ফেলা হয়, রোগে ভোগানো হয়, যাতে মানুষেরা ভালোভাবে বাঁচতে পারে । তারা অনেকটা কবিতার মতন রক্ত ঝরায়, কান্নাকাটি করে, ব্যথার সময়ে নিরাময়ের অভয় দেয়, দাঙ্গা আর যুদ্ধের সময়ে কাজে লাগে, তাদের পেট চিরে স্লোগান বের করা যায় ; তারা নিজেদের সমাজে সামাজিক প্রাণী, একে আরেকজনকে চুমু খায়, উকুন বেছে দেয় ; তারা একে আরেকজনকে বড়ো একটা খুন করে না যদি না তা দুজন আলফা মেলের জিজান লড়াই হয়, একপাল মাদি বাঁদর দখলের জন্যে । ওখানকার রাজনীতিকদের দেখুন, মেলাতে পারবেন । এক জাতের বাঁদরের সঙ্গে আরেক জাতের বাঁদরের তফাত বজায় রাখার চেষ্টা করে যায় তার আলফা গোষ্ঠীপতি ।

—কিন্তু আপনি যা বলছেন তা তো অন্য রাজ্যগুলোর ক্ষেত্রেও প্রযোয্য ।

—ওই যে বললুম, বাঁদর নানা জাতের হয় । ভারতে নাকি সাত রকমের বাঁদর আর ছয় রকমের হনুমান হয় । বাঁদরগুলো আপনি জানেন নিশ্চয়ই : রেসাস ম্যাকাক, বনেট ম্যাকাক, আসাম ম্যাকাক, অরুণাচল ম্যাকাক, বেঁটেলেজ ম্যাকাক, সিংহলেজ ম্যাকাক আর শুয়োরলেজ ম্যাকাক । আপনি খুঁজলেই এদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ভারতীয় রাজ্যগুলোর মানুষে পাবেন । এদের নিজস্ব রাজনৈতিক চিন্তাধারা আছে । আপনি একে ঠাট্টা-ইয়ার্কি বলে মনে করবেন না ।

—যারা আলফা হতে পারে না সেই সব বাঁদরেরা কি স্বমেহন করে ?

—হ্যাঁ, এছাড়া আর উপায় কি বলুন ? স্বমেহন ছাড়া পুংবাঁদেরেরা পরস্পরকে ধর্ষণ করে, যাতে পরবর্তীকালে আলফা হয়ে উঠলে যন্তরটা অকেজো না হয়ে পড়ে ।

—বাঁদরদের কি নাইটফল হয় ?

—হয় না বলেই তো জানি । কিন্তু হওয়া তো উচিত । পুরুষমানুষের নাইটফল হয় শুক্রকীটগুলো মরে গেলে তাদের জেটআউট করার জন্য, স্টকে নতুন শুক্রকীট আনার জন্য । মানুষের যখন হয় তখন প্রাইমেটদেরও হওয়া উচিত ।

—নাইটফল নিয়ে কবিতা লেখেননি ?

—না, লেখা হয়নি । প্রেমিকার জন্য প্রেমের কবিতা লেখার দিকে খেয়াল যেতো । তবে আমার এক পাঠিকা, যিনি ‘মায়াজম’ নামে একটি ওয়েব পত্রিকা চালান, তিনি নাইটফল নিয়ে একটা অসাধারণ কবিতা লিখেছেন । তাঁর নাম সোনালী মিত্র । কবিতাটার নাম ‘নাইটফল অথবা সমুদ্রযাত্রা’ । পড়ে দেখুন :

 

তখন রাতগুলো পরী-ভালোবাসায় ভরপুর

হরিদার চায়ের দোকানে সন্ধ্যায় ফেলে আসা

মিঠু বউদি আর ঝিলিক সেনের দুই চাঁদ

রাতে নাড়িয়ে দিলে গো । ঘুম, ঘুম  আসে না

অস্হির, বুকের ভিতরের হ্যাংলা কুকুরটা বনেদি নয়

ঠিক, ঠিক যেন ভাদ্রের মতো অবস্হান

আর কুকুর ঝাঁপিয়ে পড়ল মিঠু না ঝিলিক সেনের বুকে

বুঝলাম না……

আর নাভি খাচ্ছে, আর কোমর ভেঙে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে দাঁতে

দরদর ঘাম ভিজে উঠছে গা

থামবে না, এ-খাওয়া থামবে না

সমস্ত বেডকভার ড্রেনড্রাইট চটচটে, আহা মায়াবী আঠা

ক্রমশ কুকুরের গা-মোচড়ানো শিথিল হয়ে ওঠে

ঘুম, ঘুম, ঘুম

সকালে ভুলে যায় আস্ত একটা কুকুর নিয়ে আমার রাতের সংসার

 

কেননা তখন আমাদের রাত্রির বুকে অবিবাহিতকলা

কেননা তখন পায়জামার অন্ধকারে হাজার ওয়াট

তখন আমার নিজস্ব রাতের নাম ছিল

নাইটফল মেমারি

 

—তরুণীরা এই ধরণের কবিতা লিখতে পারছেন । আপনার কি মনে হয় যে আপনারা, মানে হাংরি আন্দোলনকারীরা,  ততোটা বোল্ড হতে পারেননি, যতোটা এখনকার যুবক-যুবতীরা পারছেন ।

—প্রতিদিনের জীবনযাপন আমার ভিন্ন ছিল । আমি তো আদপে একজন কালচারাল বাস্টার্ড । এখনকার তরুণ-তরুণীরা কবিতা লেখার সঙ্গে আমার মতন খোট্টাই জীবনযাপনকে মেলাতে চান না কিংবা হয়তো পারেন না । ইমলিতলায় বসবাসের ফলে আমার চরিত্রে বহু অবাঙালি বৈশিষ্ট্য বাসা বেঁধে ছিল, যাকে কেউ বলত বোহেমিয়ান, কেউ বলত ভ্যাগর‌্যান্ট ইত্যাদি । আমার বাল্যস্মৃতি “ছোটোলোকের ছোটোবেলা” পড়লে বুঝতে পারবেন । আমি বাড়ি থেকে কয়েকবার পালিয়ে গিয়েছিলুম স্কুলে পড়ার সময় ।

—আপনার বইগুলোয় এই “ছোটোলোক” শব্দটা জুড়ে দেন কেন ?

—ইমলিতলা পাড়াটাকে স্হানীয় বাঙালিরা বলতেন ছোটোলোকদের পাড়া ; তাঁরা সাধারণত আমাদের বাড়িতে আসতেন না, এমনকি আমার স্কুলের বন্ধুরাও আসতো না, বলতো, শালা, তুই ওই ছোটোলোকদের পাড়ায় ক্রিমিনালদের সঙ্গে থাকিস ? পরে বাবা দরিয়াপুরে বাড়ি করলে আমাদের গা থেকে ছোটোলোক খেতাবটা খসে । কিন্তু মগজের ভেতরের ছোটোলোকটা তার ছোটোলোকমি নিয়ে রয়ে গেছে ।

—আমার ধারণা ছিল নিজের যৌবলাম্পট্যকে তুলে ধরার জন্য ছোটোলোক শব্দটার প্রয়োগ ।

—যৌবলাম্পট্য বলতে যা বোঝাতে চাইছেন, তেমনভাবে যৌবন কাটাইনি আমি । আমি লম্পট ছিলুম না কখনও, যদিও আমার এক প্রেমিকা আমাকে লেচার বলে ঘোষণা করেছিলেন । অথচ সে নিজেই আমাকে লাথি মেরে চলে গিয়েছিল ।

—তারপর ?

—তারপরও আমি কখনও ফার্স্ট মুভ করিনি । প্রেমিকারা করেছিল ।

—প্রেমে টেকেননি তার মানে ?

—অনেক কারণে ছাড়াছাড়ি হয়েছে । আমিও ছেড়েছি, ঠিকই, একজনকে তার সুগন্ধ বিলাসীতার জন্য, আমার হাঁপানি রোগের দিকে তার খেয়াল ছিল না, সে নিজেকে এতো ভালোবাসতো যে নিজেতেই আটক থেকে গেল । বিদেশিনীও ডাক দিয়েছিলেন, আমি নিজে থেকে যাইনি । একজন অবাঙালি তরুণী হাত আঁকড়ে বলেছিল, “চলুন পালাই” । আমি পালাইনি বলে তিনি আত্মহত্যা করেন । যৌবলাম্পট্য থাকলে তাকে নিয়ে পালিয়ে গিয়ে, ব্যবহার করে, ফেলে চলে আসা যেতো । আমি সবকিছু ছেড়ে দিতে পেরেছি, যখন ইচ্ছা হয়েছে, তখন । এমনকি, কবিতা লেখাও দেড় দশক ছেড়ে দিয়েছিলুম ।

—সোনাগাছি ?

—বন্ধুদের সঙ্গে গেছি, কিন্তু তা মূলত এলাকাটা সম্পর্কে অভিজ্ঞতার জন্যে । আমি কখনও কোনো যৌনকর্মীর সঙ্গে শুইনি । যৌনরোগ সম্পর্কে আমার প্রচণ্ড ভীতি আছে । আমার ‘রাহুকেতু’ উপন্যাসে আমি লিখেছি ব্যাপারটা । বাসুদেব দাশগুপ্তকে নিয়ে লিখতে বলেছিল ‘বাঘের বাচ্চা’ পত্রিকা, তাতেও একটা ঘটনা লিখেছি । ডেভিড নামে একজন বিদেশী এসেছিল ষাটের দশকে ; সে বললে বাঙালি মেয়ের সঙ্গে প্রেম করতে চায় ; কয়েক দিনের মধ্যে তো প্রেমিকা পাওয়া সম্ভব নয়, তাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল । 

—এই আলোচনাকে বিরতি দেয়া যাক । এবার বলুন, পশ্চিমবঙ্গের প্রাণীদেবতা আইডেনটিফাই করতে পেরেছেন ।

—ওটা তো সেল্ফডিক্লেয়ার্ড প্রাণীদেবতা ।

—কোন প্রাণী ?

—কেন ? বিড়াল, ষষ্ঠীর বাহন ।

—একটু বুঝিয়ে বলুন প্লিজ ।

—টি এস এলিয়ট বলেছেন বিড়ালেরা স্বভাবে খুঁতখুঁতে, ব্যস্ততার ভানকারী, আর দলবদলু । রয়াল ভেটেরিনারি কলেজের অধ্যাপক ডক্টর অ্যালান উইলসন পঞ্চাশটা বিড়ালকে জিপিএস আর কলার ক্যাম বেঁধে যে তথ্য যোগাড় করেছেন তা থেকে জানা যায় যে বিড়ালেরা অত্যন্ত চতুর আর বিশ্বাসঘাতক । যে পুষেছে তার কোলে বসে যেমন আদর খেতে-খেতে এপিগ্লোটিস-ল্যারিংস ব্যবহার করে আরামের গরগরানি ওগারায়, তেমনই ওগরাবে অন্য কেউ কোলে তুলে নিলে ; অন্যের আদর আর খাবার পেয়ে ততোটাই খুশি হয়, যতোটা মালিকের । মালিক যদি টেবিলের ওপরে মাছ আর দুধ রেখে নিজের পোষা বিড়ালকে খেতে বারণ করে বাইরে বেরোয়, তবুও খেয়ে নেবে । আজ্ঞাবাহক পোষা কুকুরের বিপরীত চরিত্র ।

—এগুলো বাঙালির চরিত্রে পাওয়া যায় বলছেন ?

—দেখুন না, শিল্পগুলো বন্ধ হয়ে গেল কেন ? ডিসলয়ালটির কারণে । চটকলগুলো লাটে তুলে দিলে বিড়াল-শ্রমিকনেতারা । নতুন দল সিংহাসনে বসতেই লুমপেনরা লাল থেকে সবুজে চলে গেল কেন ? শুধু লুমপেনরা নয়, কবি-লেখক-নাট্যকার-অভিনেতারাও । স্লোগানের গরগরানিতে কোনো পরিবর্তন নেই । গরিবের রাখা মাছ-দুধ খেতে কোনো আপত্তি নেই বিড়ালদের, পনজি স্কিমগুলোর কর্তাদের কাজকারবারের দিকে তাকালেই বুঝতে পারবেন । পশ্চিমবঙ্গের সমাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে লুমপেনদের পিরামিড ।

—কিন্তু কুকুরেরা কি অন্যের দেয়ালে গিয়ে মোতে না ? মুতে-মুতে এলাকা চিহ্ণিত করে, রাজনৈতিক দলগুলোর মতন । দেয়ালে স্লোগান লেখার জন্য আগাম হুঁশিয়ারি বলতে পারেন একে ।

—করে কিন্তু তারা নিজের মালিকের প্রতি লয়াল থাকে । বিড়ালের মতন দলবদলু নয় ।

—আপনি তো পশ্চিমবঙ্গের, আপনার মধ্যেও তাহলে বিড়ালের বৈশিষ্ট্য আছে ?

—একটু আগেই বলেছি যে আমি হাইব্রিড, বর্ণসংকর, কালচারাল বাস্টার্ড । আমার মধ্যে সবরকম প্রাণীর বৈশিষ্ট্য পাবেন । বাঘ সিংহ হাতি গণ্ডার জিরাফ জেব্রা জাগুয়ার চিতা হায়েনা অক্টোপাস অ্যানাকোণ্ডা প্যাঁচা উটপাখি চিল শকুন, সমস্ত প্রাণীর ।

—হাতি ? হাতির মতন লিঙ্গ পেয়েছেন তাহলে । মাটিতে ঠেকেছে কি কখনও ?

—তাহলে একটা ঘটনা বলি আপনাকে । হাংরি আন্দোলনের সময়ে একজন বিদেশি এসেছিলেন, আমাকে আগেই জানিয়েছিলেন । আমি তা সুবিমল বসাক, বাসুদেব দাশগুপ্ত, শৈলেশ্বর ঘোষ আর সুভাষ ঘোষকে জানিয়ে ওদের বললুম যে চলে এসো হোটেলটায় । টাইম ম্যাগাজিনে আমাদের সংবাদ প্রকাশিত হবার পর বিদেশি কবিলেখকরা প্রায়ই আসতেন আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে । সেসময়ে তো স্নানের অসুবিধা ছিল আমার, কেননা কলকাতায় মাথা গোঁজার ঠাঁই ছিল না । কখনও সুবিমল বসাকের জ্যাঠামশায়ের স্যাকরার দোকানে থাকতুম, কখনও হারাধন ধাড়ার হাওড়ার বস্তিবাড়িতে, আবার কখনও আমাদের উত্তরপাড়ার আদিবাড়ির খণ্ডহরে । হোটেলটায় বাথরুমটা বেশ বড়ো ছিল । আমি পোশাক ছেড়ে উলঙ্গ ঢুকে পড়লুম ; আমার পেছন-পেছন, সেই বিদেশি ছাড়া, সবাই পোশাক ফেলে উলঙ্গ ঢুকে এলো । ভালো সাবান শ্যাম্পু ছিল, একে আরেকজনকে মাখিয়ে হুল্লোড় করে স্নান করা হলো । সবাই স্বীকার করল যে আমার লিঙ্গই মাপে সবার চেয়ে বড়ো । সুভাষ ঘোষের লিঙ্গের দিকে তাকিয়ে বাসুদেব দাশগুপ্ত বলেছিল, “যাক সুভাষের লিঙ্গ আমার চেয়ে ছোটো”, তার জবাবে সুভাষ বলেছিল, “আমি এখনও ভার্জিন, বুঝলে, এখনও ফুল খোলেনি, একবার খুলে যাক, তারপর সবাইকে দেখিয়ে দেবো”।

—তাহলে তো স্বীকার করতে হয় যে কবিতা, কল্লোল, কৃত্তিবাস, ধ্রুপদি, শতভিষার কবিদের থেকে আপনারা একেবারেই আলাদা । ওই দশকগুলোর কবিরা অমন চিন্তা করলেও আঁৎকে অজ্ঞান হয়ে যেতেন । সরকার যে আপনাদের আলাদা করে চিহ্ণিত করেছিল, তা অন্তত চিহ্ণিত করার ব্যাপারে ভুল করেনি ।

—আরেকবার, সুবো আচার্যের বাড়ি গিয়েছিলুম, বিষ্ণুপুরে, আমি, ত্রিদিব মিত্র আর সুবিমল বসাক । আমরা হাঁটতে-হাঁটতে বেরিয়ে পড়লুম, ধানখেতের মধ্যে দিয়ে, একটা নদী এলো, নাম ভুলে গেছি, কোমর পর্যন্ত জল, প্যাণ্ট-শার্ট-গেঞ্জি খুলে উলঙ্গ পার হলুম নদী, পেরিয়ে একটা গাছতলায় বসে পাতা ফোঁকা হলো । তখনও ওরা স্বীকার করেছিল যে আমার সাইজ বড়ো ।

—ভাগ্যিস নিজেদের নিয়ে ‘অরণ্যের দিনরাত্রী’ টাইপের উপন্যাস লেখেননি । অভিনেতাদের উলঙ্গ হয়ে অভিনয় করতে হতো । 

—আমার মনে হয়, আপনি পরের প্রজন্মগুলোতেও আমাদের মতন চরিত্র পাবেন না । স্বমেহন-মুখমেহন প্রসঙ্গ তাঁদের লেখায় আসে বটে, কিন্তু নিজেরা করেছেন কিনা জানতে দেন না । জোট বেঁধে উলঙ্গ হুটোপাটিও করেননি বা করেন না বলেই মনে হয় ।

—আপনি ম্যাস্টারবেট করেছেন ?

—অবশ্যই করেছি । নিজেকে ভালোবাসবার কায়দাটা বাৎসায়ন শিখিয়ে দিয়ে গেছেন । খ্রিস্টধর্মাবলম্বী আর ইসলামধর্মাবলম্বীরা আসার পর স্বমেহন “খারাপ কাজ”-এর তকমা পেয়ে গেল । আমরা বলতুম “হাত-মারা” । এখন তো হাত-মারার সুবিধের জন্য বাজারে গোপনে সিনথেটিক নারী-অঙ্গ বিক্রি হয় ; পকেটে নিয়ে ঘোরা যায় । মেয়েদের জন্য ডিলডো আর ভাইব্রেটর বিক্রি হয় । যদিও আইনি পথে ওগুলোর আমদানি নিষিদ্ধ । জেমস জয়েসের সময়ে বাজারে এলে ‘ইউলিসিস’-এ উনি হাত-মারার দৃশ্যটায় প্রয়োগ করতেন হয়তো ।

—শুরুর দিকের কথায় আসি । সেসময়ে আপনার যেমন বিরোধীতা হয়েছিল তেমন কি এখনও হয় ?

—হয় বৈকি । তবে সারেপটিশাসলি । যাঁরা বিরোধীতা করেন তাঁরা দেখছেন যে বিবিসি থেকে, ইতালি থেকে, জার্মানি থেকে, আমেরিকা থেকে সাংবাদিক আর গবেষকরা আমাদের খোঁজে আমার কাছে আসছেন, অন্য গোষ্ঠীদের কাছে যাচ্ছেন না, তাই বিরোধীতাটা সাবডিউড ? অনেকে আবার তাঁদের মনগড়া ইমেজের সঙ্গে আমাকে মেলাতে না পেরে বিরোধীতা করেন ; তাঁরা ফেসবুকে নিজেদের মগজ থেকে গোবর বের করে আমার দেয়ালে সুযোগ পেলেই ঘুঁটে দিয়ে যান ।

—যেমন ?

—কয়েক মাস আগে আনন্দবাজার পত্রিকায় শৈলেন সরকার নামে এক ছোকরালোচক প্রতিভাস থেকে প্রকাশিত আর প্রণবকুমার চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত “হাংরি সাহিত্য আন্দোলন, তত্ব, তথ্য, ইতিহাস” বইটা রিভিউ করার সময়ে আমাকে উদ্দেশ্য করে শিরোনাম দিলেন, “তিনিও কি সুবিধাবাদের প্রশ্রয় নেননি” । শৈলেন সরকারের বক্তব্য ছিল যে, “তিনি জানতেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর রচিত ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক কুঠার’ কবিতাটিকে পছন্দ করেননি এবং সব জেনেও কেন মলয়বাবু সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে মিথ্যে করে তাঁর খারাপ লাগা কবিতাটিকে বিচারকের সামনে ভালো বলে শংসাদানে অনুরোধ করেছিলেন ? নিজে বাঁচার জন্য বন্ধুত্বের সুযোগ নিয়ে অন্যকে মিথ্যে সাক্ষী দিতে বলাটা কি কম সুবিধাবাদ ?” ছোকরালোচক শৈলেন সরকার ওই বইতেই আমার দাদা সমীর রায়চৌধুরীকে লেখা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের চিঠিটা ( পৃষ্ঠা ১৪৭ ) পড়ে দ্যাখেনি যেখানে সুনীল বলছেন যে কবিতাটি উনি প্রথম পড়লেন কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে । তার আগে তিনি কবিতাটি পড়েননি ।

—প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক কুঠার ? কুঠার নাকি ! কবিতার শিরোনাম তো প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার ।

—শৈলেন সরকার বারবার কবিতাটাকে প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক কুঠার বলে উল্লেখ করেছেন । কিছুদিন পরে নদীয়া থেকে একজন পাঠক প্রতিবাদ করে সম্পাদকের চিঠিতে লেখেন যে কবিতাটার শিরোনাম প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার । প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক কুঠার নয় । ছোকরালোচক শৈলেন সরকার যে ইচ্ছাকৃতভাবে বিকৃত করেছেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই । এই কবিতাটির নাম জানেন না এমন  কবিতা পাঠক নেই বলেই মনে হয় ।

—এমনও তো হতে পারে যে পাঁচশো পৃষ্ঠার বই পড়ার মতন সময় ছিল না ওনার হাতে । 

—তা ঠিক । উনি বইটা পড়েনইনি । কেননা বইতে স্পষ্ট লেখা আছে যে ‘হাংরি’ শব্দটা আমি পেয়েছিলুম জিওফ্রে চসারের ‘ইন দি সাওয়ার হাংরি টাইম’ বাক্যটি থেকে । ছোকরালোচক শৈলেন সরকার লিখে দিলেন যে, “ইতিহাসের দার্শনিক স্পেংলারের এই বইয়ের একটি লাইন ‘ইন দ্য সাওয়ার হাংরি টাইম’ থেকেই পাটনার মলয় রায়চৌধুরী তাঁদের আন্দোলনের নাম ঠিক করেন ‘হাংরি জেনারেশন’ ।” আমরা ১৯৬১ সালে ঘোষণা করেছিলুম “শিল্পের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা কবিতা রচনার প্রথম শর্ত” ; ছোকরালোচক শৈলেন সরকার তার দু দশক পরে প্রকাশিত ল্যারি সিনারের ‘দ্য মডার্ন সিস্টেম অব আর্ট’ বইতে আমাদের ঘোষণার সমর্থন যোগাড় করেছেন, কেন জানি না ।

—আরও উদাহরণ ?

—এই কয়েকদিন আগে আবীর মুখোপাধ্যায় নামে জনৈক ছোকরালোচক শক্তি চট্টোপাধ্যায় সম্পর্কে লিখতে গিয়ে, ওই সংবাদপত্রেই, লিখে ফেলল যে হাংরি ম্যানিফেস্টোগুলো শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের লেখা ! ছোকরালোচক অ্যালেন গিন্সবার্গকেও হাংরি আন্দোলনকারী ঘোষণা করে দিলেন ।

—রিয়ালি ? কেউ কেউ আপনার সম্পর্কে ইমেজ গড়ে ফেলে আপনার আচরণের সঙ্গে তাকে মেলাতে পারছেন না বলছিলেন যে ? মগজের গোবর দিয়ে ঘুঁটে মারার কথা ?

—আমার বই তো এতোকাল পাঠকের হাতে পৌঁছোতোই না । বাংলাদেশে এই সবে পৌঁছোতে আরম্ভ করেছে, তাও কেবল ঢাকায়, আমি ফেসবুকে আমার বইয়ের প্রচার চালাবার পর । কলকাতায় ধ্যানবিন্দুর দরুণ পাঠকদের হাতে পৌঁছোচ্ছে, মফসসলে এখনও পৌঁছোয়নি । যেহেতু আমি আমার বইগুলোর প্রচার করি তাই তাঁরা চটা । তাঁরা বুঝতে পারেন না যে আমার সঙ্গে কলকেতিয়া মধ্যবিত্ত কবি-লেখকদের  তুলনা হতে পারে না । আমার বাবা-মা কখনও স্কুলে পড়েননি, কার্ল মার্কসের একটা ছবি প্রথমবার দেখে বাবা জিগ্যেস করেছিলেন, “এই বুড়োটা আবার কে রে ?” কুড়ি জনের সংসারে বাবা ছিলেন প্রধান রোজগেরে ; বড়োজ্যাঠা জীবন আরম্ভ করেছিলেন ক্লাস ফোর স্টাফ হিসাবে । ইমলিতলা থেকে আমি মধ্যবিত্ত বাঙালি সংস্কৃতি নিয়ে বেরোইনি । বেশ হাতপা ছুঁড়ে ফুঁড়ে বেরোতে হয়েছে সেখান থেকে ।

—উনি সোভিয়েত দেশের সংবাদ রাখতেন না ?

—উনি রাশিয়ার কথা জানতেন, সোভিয়েত দেশ বলে যে কিছু আছে তা-ই জানতেন না । বাবার দৌলতে বা দলের দৌলতে আমি রাশিয়া-চিন-কিউবা যাইনি, বিদেশীদের টাকায় কোথাও যাইনি ।    

–এখন তো আর আপনার বিরোধীতা হয় না । আপনার লেখার একটা পাঠকসমাজ গড়ে উঠেছে ।

–কে বললে হয় না ! ‘কৃত্তিবাস’ পত্রিকা কবিতা চেয়েছিল ; আমি এই কবিতাটা পাঠিয়েছিলুম, ওনারা রিজেক্ট করে দিলেন । শুনুন, কবিতাটার শিরোনাম ‘আমার ঠাকুমাকে যেন বলবেন না’ ।

 

উনি আমাকে পছন্দ করতে বারণ করেছিলেন

আপনি কেন করছেন, নীরা ?

আমি আজো শুঁয়োপোকা-ঠাশা ঈশান মেঘে চিৎসাঁতার দিই

উনি পঞ্চাশ বছর আমার কাছে কবিতা চাননি

আপনি কেন চাইছেন, নীরা ?

আমি আজো জলের দশপা গভীরে দাঁড়িয়ে বরফের লাঠি চালাই

উনি আমার সাবজুডিস মামলায় সম্পাদকীয় লিখেছিলেন

আপনি সম্পাদক হয়ে কেন লেখা চাইছেন, নীরা ?

আমি আজো স্মোকড পেংগুইনের চর্বির পরোটা খেতে ভালোবাসি

উনি আমার কবিতার বইয়ের প্রকাশক হয়েও স্বীকার করেননি

আপনি কেন স্বীকৃতি দিচ্ছেন, নীরা ?

আমি আজো দুপুর গেরস্হের হাঁমুখে সেঁদিয়ে ফ্যামিলিপ্যাক হাই তুলি

উনি আমার নাম উচ্চারণ করতে চাইতেন না

আপনি কেন তরুণদের কাছে করছেন, নীরা ?

আমি আজো রক্তঘোলা জলে টাইগার শার্কদের সঙ্গে বলিউডি নাচে গান গাই

উনি বলেছিলেন ওর মধ্যে সত্যিকারের লেখকের কোনো ব্যাপার নেই

আপনি কেন মনে করছেন আছে, নীরা ?

আমি ইমলিতলায় জানতুম কাঠকয়লা ছাড়া ইঁদুরপোড়ায় স্বাদ হয় না

উনি বলেছিলেন ওর কোনো ক্রিয়েটিভ দিক নেই

আপনি কেন মনে করছেন আছে, নীরা ?

আমি অন্তত পাঁচ হাজার কোটি টাকার ব্যাঙ্কনোট পুড়িয়ে মড়ার গন্ধ পেয়েছি

উনি বলেছিলেন ওর দ্বারা কোনোদিন কবিতা লেখা হবে না

আপনি কেন মনে করছেন হয়েছে, নীরা ?

আমি আমস্টারডমের খালপাড়ে দাঁড়িয়ে হাঁকরা বুড়োদের লিরিক শুনেছি

উনি সেসময়ে দুঃখ থেকে রাগ আর রাগ থেকে বিতৃষ্ণায় উঠছেন

আপনি এত উদার কেন, নীরা ?

আমার ঠাকুমাকে যেন প্লিজ বলবেন না ।

 

—এটা তো রিজেকশান নয় ; এটা চ্যালেঞ্জ ছিল, ওনারা অ্যাকসেপ্ট করতে ভয় পেয়েছিলেন । আদারওয়াইজ, সুরজিত সেন যেমন আপনাকে বলেছিলেন, ‘এই সময়’ সংবাদপত্রের জন্য আপনার একটা হিরোমার্কা ফোটো দিতে, এই কারণে যে পাঠকদের চেয়ে আপনার নাকি পাঠিকার সংখ্যা বেশি, দুই বাংলাতেই । ‘কবিতীর্থ’ সম্পাদক উৎপল ভট্টাচার্যও বলছিলেন যে বই মেলায় আপনার বই কিনতে ওনার স্টলে পাঠিকা-ক্রেতাই বেশি আসেন । 

—শুনেছি ।

—আপনি এই বয়সেও ফ্লার্ট করেন ?

—তা করি, ভালো লাগে, রিডিমিং মনে হয় ।

—ওপার বাঙালির তরুণীদের সঙ্গেও ?

—হ্যাঁ, ওপার বাংলায় সুন্দরী পাঠিকাদের সংখ্যা বেশি । যৌবনে যদি ওপার বাংলায় যেতুম তাহলে আমিও বোধহয় কবীর মলয় হয়ে ন্যাড়া মাথায় ফিরতুম । প্রথমত সুন্দরী আর দ্বিতীয়ত ওনারা রাঁধেন ভালো ।

—আপনি কি পেটুক ?

—এককালে ছিলুম, এখন দেখে লোভ হয় কিন্তু শরীরের দরুণ ডাক্তারের নানা বিধিনিষেধের কারণে কুরে-কুরে খেয়ে সন্তুষ্ট হতে হয় । ভূমেন্দ্র গুহ অবশ্য বলেছেন যে এক-আধ বার খাওয়া চলে ; তাই খেয়ে নিই । ইউরোপে গিয়ে সব রকমের মদ আর বিয়ার খেয়ে এসেছি । 

—আপনারা দল বেঁধে খালাসিটোলায় যেতেন, মাতাল হতেন কি ?

—আমি কখনও মদ খেয়ে মাতাল হইনি । একবার শুধু অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলুম বেনারসে, করুণানিধান মুখোপাধ্যায় গাঁজা-চরস-আফিমের কনককশান তৈরি করে ফুঁকিয়েছিল, তখন । তাছাড়া আমি কখনও নেশা করে পোঁদ উল্টে পড়িনি, সুভাষ ঘোষ যেমন পড়ত । আটের দশক পর্যন্ত গাঁজা-চরস-আফিম সরকারি দোকানে পাওয়া যেতো, সত্যমেব জয়তে ছাপ মারা । আমেরিকার চাপে বেআইনি হয়ে গেল । কুম্ভ মেলায় কিন্তু যতো ইচ্ছে কিনতে পাওয়া যায় ।

—আপনার কোন নেশা ভালো লাগে ? মদ না গাঁজা-চরস-আফিম ইত্যাদি ?

—এগুলোকে নেশা বলা ভুল । এই জিনিসগুলো মগজে ঢুকে মধ্যবিত্ত রাবীন্দ্রিক ভাষার একচেটেপনাকে ভেঙে দিতে পারে , এমনিতেই কালচারাল বাস্টার্ড হবার দরুণ ভাষার মনোপলি আমার ওপরে তেমন কাজ করে না । এখন শুধু সিংগল মল্ট খাই, কিন্তু মাদকের ব্যাপারে এককালে আমার প্রিয় ছিল গাঁজা আর চরসের মিক্সচারের ধোঁয়া । যাবতীয় সামাজিক মনোপলিকে মগজের মধ্যে ভেঙে ফেলতে পারে ওটা । ধোঁয়া ফুঁকে রাস্তায় গিয়ে দাঁড়ান, মিছিল দেখলে মনে হবে ভেড়াদের চরাতে নিয়ে যাচ্ছে তাদের মালিক, এটাই মাদকের ক্রিয়েটিভ দিক ; বহু মানুষের মুখকে মনে হবে কুমিরের হাঁ-করা মুখ, ভাষণকে মনে হবে হায়েনার ডাক ।

—মাদকের অভ্যাস কেমন করে হয়েছিল ?

—কেন ? ইমলিতলা পাড়ায় । কেউই ব্যাপারটাকে খারাপ মনে করত না । পাড়ার অগ্রজরা তাড়ি সোমরস গাঁজা ভাঙ সবই শেয়ার করতে চাইতেন । এমনকি বিয়ের বরযাত্রিদেরও তাড়ি দিয়ে আপ্যায়ন করা হতো । দোলের দিন তো সমস্ত সীমা ভেঙে পড়ত । সেই দিনগুলো দারুন ছিল ।

—ছাড়লেন কেন ?

—মাদক নিয়ে সিরিয়াসলি লেখালিখি করা যায় না । এমনকি সিংগল মল্ট খেয়েও লিখতে ব্যাঘাত হয় ।

—ভাষার মনোপলির কথা বলছেন । সংবাদপত্রগুলো আর কমার্শিয়াল পত্রপত্রিকারা ভাষাকে মনোপলাইজ করে ফেলেছে, সাধারণ মানুষের ভাবনাচিন্তাকেও ওই ভাষা দিয়ে দখল করে নিচ্ছে । তাই না ? 

—আমি তাই সংবাদপত্র আর কমার্শিয়াল পত্রিকা পড়ি না । তিরিশ বছরের বেশি হয়ে গেল । কোনো কিছু জানাবার থাকলে কলকাতা থেকে কোনো পাঠক বা সম্পাদক কাটিং পাঠিয়ে দেন । 

—টিভি দেখেন না ?

—অ্যানিম্যাল প্ল্যানেট, ডিসকভারি, ন্যাশানাল জিওগ্রাফিক ইত্যাদি দেখি ।

—ফিল্ম দেখেন না ? এক্সপেরিমেন্টাল কবি-লেখকরা তো ফিল্ম টেকনিকের সাহায্য নেন ।

—না, আমি ফিল্ম বড়ো একটা দেখি না । বই পড়ার সময় যেমন কোনো চিন্তাভাবনা এলে মুড়ে রেখে চিন্তাটার প্রসার ঘটাতে থাকা যায় মগজে, ফিল্মে তেমন হয় না । ফিল্ম আমি দেখেছি যৌবনে, মূলত নায়িকাদের যৌন আকর্ষণের কারণে । সুতরাং ফিল্মের কোনো টেকনিক আমার লেখায় প্রয়োগ করার প্রশ্নই নেই । 

—আপনার লেখার আঙ্গিকে যথেচ্ছাচার তাহলে আনেন কী করে ?

—যা মনে আসে তাই করি, আর তার জন্য কোনো যুক্তি খাড়া করার দরকার আছে বলে মনে করি না । অনেকসময় ওটা আপনা থেকে মাথায় চলে আসে, যেমন “নখদন্ত” বা “ঔরস” ফিকশানে, কিংবা “টাপোরি”, “ইচ্ছাপত্র”, “গুমরাহীবাঈ-এর সন্ধ্যা” আর “ব্লাড লিরিক” কবিতায়।

—কোন অভিজ্ঞতায় আপনি সবচেয়ে বেশি থ্রিলড ?

—গুলি চালানোয় । আমি এনসিসিতে থ্রিনটথ্রি, বারো বোর আর স্টেনগান চালিয়েছি । তখন এখনকার মতন রেসট্রিকশান ছিল না । প্রতিদিন চালানো যেতো । বিন্দেশ্বরী প্রসাদ নামে এক বিহারি বন্ধুর গ্রামে গিয়ে ডাবল ব্যারেল গান আর পিস্তল চালিয়েছি । 

—আপনি নাকি বেহালা বাজাতেও শিখেছিলেন ?

—হ্যাঁ, বেহালা শিখছিলুম, প্রেমে পড়ে সব গোলমাল হয়ে গেল । তার চেয়ে গিটার বাজাতে শিখলে ততো দিনে শিখে ফেলতুম । 

—কিন্তু আপনার বাবা ওনার বন্ধুদের নাকি বলতেন যে কুসঙ্গে পড়ে আপনি বেহালা বাজানো ছেড়ে দিয়েছিলেন ।

—বাবা কুসঙ্গ বলতে নমিতাদির কথা বলেছেন, নমিতা চক্রবর্তী, যিনি আমার ‘রাহুকেতু’ উপন্যাসে সুমিতাদি । মা মনে করতেন যে আমার কুসঙ্গ হল বিহারি বন্ধুরা, যাদের ফোটো আপনি দেখতে পাবেন বিবিসি রেডিও প্রোগ্রামের ফোটোটায় ; তাদের প্রায় সকলের গ্রামে গাঁজা আর পোস্তর গাছ ছিল, সহজেই পাওয়া যেতো ভালো কোয়ালিটির গাঁজা আর আফিম । এরা সকলেই হাইকোর্টের জজ, অধ্যাপক, আই এ এস, আই পি এস, ডাক্তার, ইনজিনিয়ার, গবেষক ইত্যাদি হয়ে অবসর নিয়েছে ; আমার স্নাতকোত্তর রেজাল্ট কিন্তু ওদের সবায়ের চেয়ে ভালো ছিল । আসলে আমার কোনো উচ্চাকাঙ্খা ছিল না । আমি কবিতার কুসঙ্গে পড়ে গিয়েছিলুম, ওরা পড়েনি । উল্টোটাও হয়েছে, ফালগুনী রায়ের দিদি এসে আমার মাকে বলে গিয়েছিলেন যে আমার কুসঙ্গে পড়ে ফালগুনী রায় খারাপ হয়ে যাচ্ছে ।

—আচ্ছা, কবিতা বললে আপনার মনে কোন ছবি ভেসে ওঠে ?

—এটা ভালো প্রশ্ন । কবিতা বললেই একটা ঘটনা মনে পড়ে । হাংরি আন্দোলনের সময়ে কবিতা ভবনের সিঁড়ি দিয়ে উঠে দরোজায় রিং দিয়েছি । বুদ্ধদেব বসু দরোজা খুলতেই আমি বললুম, আমার নাম মলয় রায়চৌধুরী, উনি সঙ্গে-সঙ্গে দড়াম করে দরোজা বন্ধ করে দিলেন । আমি ভাবলুম হয়তো খুলবেন, প্রায় মিনিট দশেক দাঁড়িয়ে রইলুম, খুললেন না । ওনার সঙ্গে ওটাই আমার প্রথম আর শেষ দেখা । অথচ তার আগে উনি বদল্যার সম্পর্কে বই লিখে ফেলেছেন, বিট আন্দোলন সম্পর্কে লিখেছেন বাঙালি পাঠকদের জন্য ।

—বদল্যার, ভেরলেন, র‌্যাঁবোও যদি ওনার কবিতাভবনের দরোজায় অমন আনইনভাইটেড টোকা দিতো, তাহলেও হয়তো ওই ভাবেই তাদের বিদায় করতেন ।

—হয়তো । নিজেকে প্রস্তুত করে উনি বোধহয় ওনাদের মুখোমুখি হতেন । চরিত্রের দিক থেকে বিদেশি ছিলেন ভদ্রলোক, আগে অ্যাপয়েন্টমেন্ট দিয়ে তারপর দেখা করতেন । তাছাড়া, তখন তো প্রতিদিন স্নান করতুম না, জামাও পালটাতুম না ।

—এরকম অভিজ্ঞতা আরও হয়েছে ?

—মিছিলে উৎপল দত্তের হাতে একটা হাংরি বুলেটিন দিয়ে নিজের নাম বলতেই উনি আঁৎকে উঠে বুলেটনটা রাস্তায় ফেলে দিয়ে বলে উঠলেন, “হাংড়ি জিন্নাড়েশন !” তারপর হনহনিয়ে মিছিলে এগিয়ে গেলেন ।

—আর ?

—আবু সয়ীদ আইয়ুবের বাড়ি গিয়েছিলুম । তখন জানতুম না যে পুলিশে যারা কমপ্লেন করেছেন উনি তাঁদের অন্যতম । উনি আমাদের আন্দোলন নিয়ে বিশেষ আলোচনা করতে চাইলেন না ; ভারতের মুসলমানদের প্রসঙ্গে আমাদের মতামত জানতে চাইলেন । আমি কুলসুম আপার সঙ্গে আমার শৈসবে যে ঘটনা ঘটেছিল সেটা বলতে গম্ভীর হয়ে গেলেন । 

—এগুলো আপনাকে প্রভাবিত করেনি ?

—এর চেয়ে বরং এক ন্যুড মডেল অ্যাপ্রুভ করার জন্য সমীর রায়ের সঙ্গে গিয়ে প্রভাবিত বোধ করেছিলুম। বয়স পঁছিশ-ছাব্বিশ হবে । একজন আর্টিস্ট তার স্তনে সবুজ রঙ করে দিয়েছিল । মনে হচ্ছিল খাবার মতন হিমসাগর । 

—আপনি তো সেক্সিস্ট বুল, দেখেই আপনার দাঁড়িয়ে গিয়ে থাকবে ?

—হ্যাঁ, কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে দাড়িয়ে গেল, বুঝতে পারলুম যে আমার দ্বারা পেইনটিঙ সম্ভব হতো না । একই অভিজ্ঞতা হয়েছিল অনিল করঞ্জাইয়ের বেনারসের স্টুডিওয় এক নিউড বিদেশিনীকে দেখে । এই বিদেশিনীকে আপনি পাবেন আমার “অরূপ তোমার এঁটোকাঁটা” উপন্যাসে । 

—ওটা তো অলমোস্ট পরনোগ্রাফি ।

—অনেকে তাই বলেন বটে । ওতে একটা প্যারা ছিল লাবিয়া ম্যাজোরায় হিরের মাকড়ি পরানো সম্পর্কে ; তা বাদ দিয়ে দিই কেননা ওটা তাহলে খোলার ঘটনা বর্ণনা করতে হতো । উপন্যাসটা লিখতে বসে, তখন হাতে লিখতুম, কমপিউটারে নয়, আমি দৈহিক আনন্দ উপভো্গ করছিলুম । ঠিকই বলেছেন, সেস্কিস্ট বুল হয়ে গিয়েছিলুম লিখতে বসে । হিমসাগর স্তনের যুবতীকে নিয়ে একটা লেখা ঘুরছে মাথায় ।

—আপনার রেপ করতে ইচ্ছে হয় না ?

—না, না । আমি অত্যন্ত ডেলিকেট আর সেনসিটিভ; যার তার সঙ্গে শুতে পারি না । ফার্স্ট মুভ আমি কখনই করিনি । রেপ ব্যাপারটা শরীরের দিক থেকে নোংরা । আজকাল দিকে-দিকে এতো রেপিস্ট গজাচ্ছে শরীর নোংরা হবার দরুণ । নোংরা শরীরে ভরে গেছে সমাজ । পুরুষ মানুষ ভুলেই গেছে যে শরীর একটা ইন্দ্রজালের ওয়র্কশপ । বেশিরভাগ দম্পতি মিশনারি পোজের বাইরে কিছুই জানে না । 

—আপনি হাংরি আন্দোলনের আগে ফাক, শিট, আসহোল, সান অফ এ বিচ, মাদারফাকার, কান্ট, ডিকসাকার ইত্যাদি গালাগাল দিতেন বন্ধুদের ?

—হ্যাঁ দিতুম । তবে ইমলিতলায় গ্রুমিঙের কারণে হিন্দি গালাগালই বেশি প্রয়োগ করতুম । সবচেয়ে বেশি প্রয়োগ করতুম “চুতিয়া” আর “ভোঁসড়িকে জনা” । আমি কখনও রাগিনি, তাই রেগে গিয়ে গালপাড়ার স্তরে উঠিনি কখনও । বন্ধুরা রাজসাক্ষী হয়ে গেলেও ওদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে চেয়েছিলুম, ওরাই পালিয়ে গিয়ে দল বেঁধে ওদের পত্রিকা থেকে আমাকে বাদ দিয়ে দিলে । আমার পাশাপাশি সুবিমল বসাক, ত্রিদিব মিত্র আর দেবী রায়কেও বাদ দিয়ে দিলে । অথচ সম্পাদক বাসুদেব দাশগুপ্ত ঘোষণা করেছিল “আমার ক্ষুধা ছিল মানুষের সার্বিক মুক্তির ক্ষুধা”। সার্বিক মুক্তি কেমন করে সম্ভব কে জানে যখন আপনি নিজের বন্ধুদেরই আপনার পত্রিকায় ল্যাঙ মেরে বের করে দিচ্ছেন । হাংরি আন্দোলন তো কাউকে বাদ দেবার আন্দোলন ছিল না ।

—আপনার কি মনে হয় ওনাদের এই বিভাজন প্রচেষ্টা হাংরি আন্দোলনের ক্ষতি করেছে ?

—নিশ্চয়ই, অনেকে এটাকেই আলোচনার বিষয়বস্তু বানিয়ে ফ্যালে । যাকগে, বিষয়ান্তরে যাওয়া যাক ।

—আপনি হোমোসেক্সুয়ালিটিতে আকর্ষিত হয়েছেন ? বিহারে তো লৌণ্ডাবাজির জন্য বিখ্যাত ।

—না, হইনি । কম বয়সেই নারীসঙ্গের কারণে ওই দিকটা অবহেলিত থেকে গেছে । লৌণ্ডাগুলোও তো বিটকেল দেখতে লাগতো । স্কুলে আর কলেজে লৌণ্ডাটাইপ ছিল না কোনো সহপাঠী ; থাকলে হয়তো ব্যাপারটা বুঝতে পারতুম । তবে শুনতুম বটে যে অমুক হোস্টেলে দুজন ছাত্র মশারির ভেতরে ওয়ার্ডেনের হাতে  ধরা পড়েছে । প্রাইমারি স্তর থেকেই কোএজুকেশান ছিল, খুকি থেকে তরুণীরা স্কুল-কলেজে আশেপাশে ছিলই, ছাত্রও খারাপ ছিলুম না, কুসঙ্গ সত্ত্বেও । দেখতেও মন্দ ছিলুম না । গরিব বলে পোশাক একটু বেখাপ্পা থাকতো, এই যা । 

—অনুবাদের জন্য সাহিত্য অকাদেমির পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করলেন কেন ?

—আমি কোনো পুরস্কার নিই না, লিটল ম্যাগাজিন পুরস্কারও নয় ; কোনো সম্বর্ধনা নিই না, কোনো সাহিত্য সভায় গিয়ে বক্তিমে ঝাড়ি না । আমার মনে হয় অন্যের নোংরামি আমার ওপরও চেপে বসবে, তাদের মূল্যবোধে আটকে পড়ব । দেখুন না, কতো সাহিত্যিক, নাট্যকার, আঁকিয়ে কেমন নোংরামিতে আটকে পড়েছেন । পনজি স্কিমে গরিবের টাকা মেরে দেবার খেলা চলছে তা তাঁরা টের পেলেন না কেমন করে ? 

—উপায় ?

—উপড়ে ফেলতে হবে ; পুরো এসট্যাবলিশমেন্টকে উপড়ে ফেলতে হবে, আর তা করার জন্যে বাইরে থেকেই চাড় দিতে হবে, থুতু ছেটাতে হবে, মুতে দিতে হবে, হেগে দিতে হবে মাথায়, যারা তেল দিতে একত্র হয়েছে, পুরস্কারের জন্য লালা ঝরাচ্ছে তাদের ছিঁড়ে বাঘের খাঁচায় ফেলে দিতে হবে, বামপন্হা-দক্ষিণপন্হা সবই তো দেখা হল, এগুলো চলবে না, নতুন কোনো ব্যবস্হার কথা ভাবতে হবে, অসৎদের ঝোলাতে হবে, অনেক-অনেক কাজ করতে হবে, তবে যদি মানুষের কিছু হয় । আবার ট্রাইবাল হয়ে যেতে হবে, যেমন আদিবাসীরা থাকেন ।

49404319_358182568066451_9176611151650226176_o

 

Posted in মলয় রায়চৌধুরী, যৌনতা ও প্রেমের গল্প | Tagged , , , | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

আরব্য রাতের আভাঁ গার্দ গল্প : মলয় রায়চৌধুরী

Image result for arabian nights

হইচই আর হিহিহাহায় ;কলিগ কতগুলা মোবাইল নিয়া টয়লেটে ঢুকে আর সেইরকম একটা সুদীর্ঘ সুন্দর সময় কাটায়ে আসে।১৯১৭ সালে রাশিয়ার বিপ্লবের বিজয়ের পর বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তের মতই ভারতীয় বিপ্লবীদেরও অনুপ্রেরণার উৎসে রূপান্তরিত হয়। এই দুই কারণই সেই সময় ভারতীয় বিপ্লবীদের কমিউনিস্টে পরিণত হতে অনুপ্রাণিত করেছিল।এটা একটু চোরের মায়ের বড় গলা কেস হয়ে গেলোনা? আমাকে জ্ঞান দিচ্ছিলেন।। আপনি নিজে মলয় রায়চৌধুরীরর অনুমতি নিয়েছেন শেয়ার করার জন্য? সৎ সাহস থাকলে এখানে প্রত্যেকের প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যাবেন। খোলসের মধ্যে ঢুকে থাকবেন না। নয়তো এমন ডুগডুগি বাজিয়ে দেব পরবর্তী কালে নিজে দোষ করে অন্যের দিকে আঙ্গুল তোলার আগে বার বার ভাববেন।জীবনে বেশ কিছু বার এই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হইছি। ভাগ্যের ফেরে গিয়ে পড়তে হয়েছে কোন এক বড়লোকের বাসায়। হইতে পারে আত্মীয় কিংবা অনাত্মীয়। তারা কিছুতেই দুপুরে না খেয়ে আসতে দিবেনা। আবার সহসা খাবারও দিবেনা। অবশেষে বেলা গড়ায়ে আসলে সুলতান কুতুবউদ্দিন আইবেক সমীপে বাগদাদের খলিফা যেই পাঠার পিঠে আরোহন করিয়ে তিনটি মূল্যবান পঙখীরাজের অণ্ডকোষ পাঠিয়েছিলেন, সেই পাঠার তিন পিস মাংস পরিবেশন করবেন।

শত শত রাজাধিরাজের দরবার ঘুরে এই পাঠা অবশেষে শ্যামলীর এই মহামান্য উচ্চ-মধ্যবিত্ত রাজার দরবারে এসে থমকে দাঁড়িয়েছে। রোদে পুড়েছে, বৃষ্টিতে ভিজেছে, মরুভূমির লু হাওয়ায় পুড়ে খাক হয়েছে। সহস্র বছর ডিপ ফ্রিজের অতল গহবরে পচেছে, লোডশেডিংয়ে বরফ গলেছে। তারপর দুপুরের রিজিক হয়ে এসেছে সৃষ্টির অধম এই ‘খাকসার’ বান্দার টেবিলে ।ওরা জানে তুমি আমার ব্রা জোর করে খুলে কামড়ে ধরেছিলে আমার বুক, কোমরের নীচে আঁচড়ে কামড়ে বসিয়ে দিয়েছিলে ভালোবাসার জঘন্য থাবা! আর কানে কানে বলেছিলে তুমি নাকি বিছানায় নারীদের দমিয়ে রাখতেই বেশি ভালোবাসো?অন্ধকারকে দেখতে পাচ্ছি না অন্ধকার ও আমাকে না ;শরীর নড়াচড়ার শব্দ … বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়লুম…জম্পেশ একটা ঢেঁকুর তুলেছি কি তুলিনি … সাংবিধানিক সঙ্কট নেই ত। দেশ দিব্বি চলছে। অর্থনীতির তো টগবগে টাট্টু অবস্থা। সঙ্কট ফঙ্কট হলে তখন ওঁদের কাজ বাড়ে। তাছাড়া যাঁর নাম নিয়ে কথা তিনি ফট করে মেম বিয়ে করে নোবেল পেয়ে গেলেন। কিছু নিয়ে তো বলতেই হতো। অনেকে ইকোনমিক্স নিয়ে বলছে। তা, দেখা গেল মিডল নেম টা নিয়ে কেউ বলছে না। কেউ অভিজিৎ বলছে। কেউ বলছে বন্দ্যো। উনি দেখলেন বিনায়ক টা সকলের চোখ এড়িয়ে যাচ্ছে। খপ করে ধরলেন। কালিদাস দ্য গ্রেট আর নাই! এ বেদনায় উপোস করব আজ।

ধরলেন বলে ধরলেন, এক্কেবারে মৌলিক ধরেছেন।এ তো পুরো “অ্যাই গরু ফুল ছুঁড়ে মারবো কিন্তু” স্টাইলের অভ্যর্থনা লিলির মতন। লিলি, কিন্তু, চক্রবর্তী না। ডেনিস। ডেনিস লিলির বোলিং একশনেই এই মৌলিকতা ছিল। আমি বলি কি পর্যায় সারনীতে চাঁদ থেকে একটা মৌলিক পদার্থ আসুক। নাম হোক বিনায়ক। আমি এখন রোবটের মতো যন্ত্রস্থ। পুতুলের মতো নির্ধারিত। মা ছিলেন একেবারে গ্রামের মেয়ে, শহুরে মেয়েদের মতো ঘন ঘন বয়ফ্রেন্ড বদল তার কাছে ছিল পাপ। বিয়ে করেছিলেন সামাজিক নিয়ম আচার মেনেই। এক দুই বছরও যখন টিকছে না সম্পর্ক, সম্পর্ক ঘন ঘন হাই তুলছে, পাখির বদলে মেশিনের টকিং বার্ড । গরুর মতো তৃপ্ত। হতাশা, ক্লান্তি আর অবসাদের থকথকে কাদার দলা হয়ে শুচ্ছি।যেটুকু খবরে জেনেছি এবং যদি ভুল না হই, দীপক দাশগুপ্ত এবং নৃপেণ চৌধুরি— না তোমার একার নয় আমাদের সবারই ঠাকুমা দিদিমারা অনেক ডিগ্রি না থাকলেও অনেক কিছুই জানতেন।হয়ত করো বা করোশন বলতেন না তবে রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে এটা জানতেন। যেমন খালি পেটে জল আর ভরা পেটে ফল খাওয়া ইত্যাদি।সিপিএমের নব্য গঠিত রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীতে ঠাঁই পেলেন না কংগ্রেসের সঙ্গে জোটের বিরোধী এই দুই নেতা। বস্তুতপক্ষে শ্রমিক নেতা এবং কৃষক নেতা শূন্য হল রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলী। অবশ্য এই দুজনকেই রাখতে হবে এমন কোনো মাথার দিব্যি কেউ দেয়নি। আমাদের অনেকেরই অন্তরে রক্তক্ষরণ চলছে।বিবর্তন হয়নি বলেই তো ওরা আজও হনুমান।

কিন্তু,এবার মানুষেরও উচিত পালটা দাঁত খেঁচানো ;এবার আমি সত্যিই আমার নিজের হাত আর পা দুটো কেটে ফেলব। আর সহ্য করতে পারছি না।বিদায় বার্লিন। ফ্রাঙ্কফুর্টের পথে।একদল লালনকে হিন্দু বানানোর পায়তারা করে যাচ্ছে। অন্যদিকে লালন মুসলমান ছিলেন এটা প্রতিষ্ঠা করতে চায় আরেকদল। বৈষ্ণবধর্মেরও বানাতে চায় কেউ কেউ। কিন্তু লালন তো তার বাণীতে তার দর্শনে বলেই গেছেন লালন আসলে কোন জাত। সাঁইজি বলেন, ‘লালন বলে জাতের কী রূপ দেখলাম না এই নজরে’। বেদনা,ঘৃণা,ক্রোধ সব একসঙ্গে মিশে এক অদ্ভুত স্থবিরতা ।তাই বলে কৃষক এবং শ্রমিকদের তরফে কোনো প্রতিনিধি থাকবে না? এরপর বরফে মুড়ে থাকা পাহাড়ে পাহাড়ে বেজে উঠছে প্রবল ঝড়ো হাওয়া। উদ্দাম দৌড়ের পাশে বোতলে ফিরে যাচ্ছে গেলাসের স্কচ। এইসব শুয়োরের বাচ্চারা কি শিক্ষক হবার যোগ্য! এরা সারাজীবন রাজনীতি করেই ভিসি পর্যন্ত গিয়েছে,এদের আরোও চাই,সামান্য এমপি বড় না একজন উপাচার্য বড় সেটা তিনি দলীয় অন্ধতায় ভুলে গেছেন ।বাঘের জিভের মতো একটা কর্কশবুক নদী… তার এপারে উপর্যুপরি ঝোপ আর লেলিহান উঁচু বৃক্ষের পড়শিদারি… মাঝে মাঝে একেকটা গাছ লকলকে লম্বা হয়ে গিয়ে আকাশে তালু মেলে ধরে… ফাঁকে ফাঁকে সদ্যোজাত নীল রঙ ছ্যাঁত করে এসে লাগে চোখে… নদীর ওপারে পাথর পৃথিবী।বুকের মইধ্যে কি এক ডাকাত পুষি!শুনে মজা লাগলেও ব্যাপারটা আসলেই তাই। বড় মানুষ যারা হন, তাঁদের বিচার করার যোগ্যতা আমাদের নেই। কিন্তু না করলেও কেমন একটা লাগে। আর তাই বড় মানুষদের আমরা আমাদের নিজেদের স্তরে নামিয়ে আনি, আর তারপর বিচার করি।..শুনে মজা লাগলেও ব্যাপারটা আসলেই তাই। বড় মানুষ যারা হন, তাঁদের বিচার করার যোগ্যতা আমাদের নেই।

কিন্তু না করলেও কেমন একটা লাগে। আর তাই বড় মানুষদের আমরা আমাদের নিজেদের স্তরে নামিয়ে আনি, আর তারপর বিচার করি।..ছিলেন এক আমেরিকান হাই সোসাইটির নারী। দুই বিয়ে দুই তালাক হওয়ার পর, তাকে বিয়ে করতে পাগলপারা বৃটিশ রাজা অষ্টম এডওয়ার্ড। রাজ্য জুড়ে ধুর ধুর ছেই ছেই। গুজব ছড়ানো হল, ওয়ালিস নাৎসিতদের গুপ্তচর। তাছাড়া তখনের নিয়ম মোতাবেক আমেরিকান নারী বৃটেনর কুইন হতে পারবেন না। একটা বিশ্রী দাঁতে ব্যাথা নিয়েও বিসর্গ নাট্যদলের ক্ষেপা ক্ষেপীদের বারবার ডাক উপেক্ষা করতে পারলাম না।পেত্রায় সারাদিন ঘুরে ঘুরে খুব ক্লান্ত তখন। ফিরে আসার পথে বাসের পেছনের সিটে বসে ঢুলছি রীতিমতো। কিন্তু ঘুমোতে পারলে তো! আমার ঠিক পাশেই বসে বকর বকর করে চলেছে এক ঝকঝকে চনমনে মেয়ে। মধ্য তিরিশ বয়স হবে বোধহয়। চমৎকার হাসি। কথায় কথায় উচ্ছ্বাস। সারাদিন অমন রোদ্দুরে হেঁটে আসার পরেও ছটফটানির ঘাটতি নেই। লালচে বাদামী চুলে সারাদিনের ধূলো লাগলে কি হবে, আকুলিবিকুলির বিরাম নেই। অন্যপাশের এক দম্পতির সঙ্গে তুমুল আড্ডায় মেতে আছে সে মেয়ে। স্প্যান…পড়তে থাকুন…কিন্তু রাজা এডওয়ার্ড বেকারার বেচৈইন। সামলানো দায়। অতঃপর ঘোষণা দিলেন রাজাগিরি ছেড়ে দিবেন। কারণ জানালেন, ওয়ালিস তার পাশে না থাকলে তিনি রাজকার্য চালাতে পারবেন না।

ভাইয়ের কাছে দিয়ে দিলেন রাজাগিরি। ছারখার কইরা দেয়- পাচার কইরা দেয় ।বিনিময় কইরা দেয় যখন যেখানে খুশী ।বুড়ো ঘোড়ায় চেপে যুদ্ধ জয়ের স্বপ্ন… সঙ্গে কিছু ছাগশিশু… থাক, আর বিশেষ কিছু বললাম না। ঘুমোচ্ছি। কপি লিখছি। তবে আমি একদিন লিখব। যেসব লেখা লিখব বলে ভেবেছি সেসব লেখা নয়। যা ভাবিনি, ভাবতে পারিনি, পালাজ্জো আর ঢোলা টিশার্ট রে জাতীয় পোশাকের স্বীকৃতি দেওয়া এখন সময়ের দাবী ; সে লেখা লিখব। অস্ত্রাগার লুঠ হবেই একদিন। সেদিন কিবোর্ড লিখবে না। কলম লিখবে না।নিজের ঢাক নিজে পেটানো আঁতেল ক্রমশঃ দখল করে নিচ্ছে সাহিত্যের শতরঞ্জ্।  আমার হড়হড় বমি লিখবেতাছাড়া ওই ফেরাস, কপার, ইউরেনিয়াম, সবগুলোয় কেমন বিদেশী বিদেশী চান না করা দাঁত না মাজা গন্ধ।প্রিয় রমাদার কাছে অভিনয় শিখতাম। রমাদাই শিখিয়েছিলেন, অঙ্গস্পর্শ হবে না, অথচ ভাবখানি চূড়ান্ত অঙ্গস্পর্শের, তবেই তো তা অভিনয়। মাইরি ;এই খাকি কুত্তার বাচ্চারা আমাকে টানতে টানতে …আপনি একবার ভাবুন জজসাহেব , চোখ বন্ধ করে শুধু একবার কল্পনা করুন ;এই কলকাতা শহর একটা ডবকা যুবতী আর এই কেঠো আদালতটা মিশমিশে আমিষ …আর কেউ নেই কোথাও … মনে করুন আপনিও আমার মতো ভুখা …কাঁচা মিছিল আর হরতাল চিবিয়ে চিবিয়ে ক্লান্ত ..যদিও বলা হয় সিনেমা হলো জীবনের প্রতিচ্ছবি কিন্তু বাস্তবে কখনো কাহিনীর মাঝখানে নাচ গান থাকেনা।যতবার হোঁচট খেয়েছ , ততবার আমিও ।কারো বাবাই আজীবন থাকেনা এটা জানতাম, মানতাম।কিন্তু আমার বাবা এভাবে হুট করে নাই হয়ে যাবে এটি এখনো মানতে পারছিনা।

যতবার মাঝরাতে বারান্দায় , ততবার খাট ছেড়ে আমিও জানলায়। কি কারণে এইসব! তুমিও তো চুকিয়ে দিয়েছিলে। যেভাবে অটোর ভাড়া , বিহানের শেষ তরীটিকে— হয়তো আমার ভুল ছিল। হঠাৎ আকাশী থেকে অরণ্য আড়ালে। ছত্রাকের মতো অধিগ্রহনের উদ্বাস্তু নিয়ম । সে সময়ে চাঁদও থাকেনা । সিনেমাটা যখন দর্শক এক জায়গায় অস্হির হয়ে বসে দেখে তখন মনোরঞ্জনের জন্যেই শুধু গানগুলো ভিতরে দেওয়া হয়। আপনার এইটা বয়সেরই দোষই স্যার ধর্মাবতার ,এমন নিঝুমে আপনার খিদে পাবে না ?কয়েকজন ভারতীয় বিপ্লবী বিশ্বের প্রথম সর্বহারা বিপ্লবের ভূমিতে পৌঁছানোর জন্য অত্যন্ত কঠিন ভ্রমণের পথ নিয়েছিলেন। এই প্রবাসী-ভারতীয় বিপ্লবীরাই  তাসখন্দে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এই পার্টিই প্রথমবার ভারতজুড়ে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে থাকা বিপ্লবীদের বিভিন্ন গোষ্ঠীকে মার্কসবাদ-লেনিনবাদের একটি তাত্ত্বিক মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের কন্ঠ আর গায়কী শুনতে চান?

এবং ব্যবহারিক শিক্ষা প্রদান করেছিল। বোম্বাই, কলকাতা, মাদ্রাজ এবং সংযুক্ত প্রদেশ-পাঞ্জাব অঞ্চলে থাকা ছোটো ছোটো গোষ্ঠীগুলি সালে কানপুরে একটি কমিউনিস্ট সম্মেলনে মিলিত হয় কৈ মাছ খুব বেপরোয়া, কিভাবে সারি বেঁধে কানে হাঁটে, নিজের চোখেই দেখা, কানে হাঁটা নিয়ে আমি সবসময়ই উৎসাহিত ভারী, কিভাবে ঐশ্বর্য রাই কানে হাঁটে, অবাক হয়ে দেখি কৈ মাছের একটা বিরাট দল লম্বা সারিতে এগিয়ে আসছে, আমিও গামছা বাগিয়ে প্রস্তুত, হয়ে যাবে একটা এসপার কি ওসপার, নিবিড় মনোযোগে দেখে যাচ্ছি কিভাবে মাছগুলি এগোচ্ছে, সহসা…….. এবং দেশের অভ্যন্তরে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির কাজকর্ম শুরু হয়। এম এন রায় এবং একজন ব্রিটিশ কমিউনিস্টদের একজন নেতা রজনী পাম দত্ত, যে তাত্ত্বিক-মতাদর্শগত উপকরণ সরবরাহ করেছিলেন, তা একজন ভারতীয় কমিউনিস্টের ধারণা তৈরি করতে অনেককে সাহায্য করেছে’’।শুয়োরের বাচ্চা-খেকো দের মুখের দুর্গন্ধ ছড়িয়ে সংবাদমাধ‍্যমগুলো কেন যে পরিবেশ বিষাক্ত করে….

হাজার গল্প শোনাইবার পর রাজকন্যা রাজপুত্রকে বলিলেন : এইবার আপনের বাঁড়াডা কাইট্যা দ্যান কর্তা, আমি রান্দুম আপনি খাইবা ।

Image result for arabian nights

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

ইলিশের কাটলেট : মলয় রায়চৌধুরীর আভাঁ গার্দ গল্প

Image result for hilsa fish

অন্যায়ের বিচার কোথায় গিয়ে চাইতে হয়?কালিবাউশের ডিম, কাডলের বিচি,চিঙ্গইড় মাছ দিয়া কচুর লতি।চালকুমড়া ইলিশঃ ফুল নয় প্রাণ ভরে নিই বাতাসের গন্ধ চোখ থেকে যারা ঘুম মুছে আমাদের খিদে সাজিয়ে রাখে হাটে বাজারে কিংবা পথের ধারে হাসতে হাসতে…কচি চালকুমড়া চাকচাক কইরা খেজুর কাঁটা দিয়া কেইচা নেওয়া লাগে। এরপর হলুদমরিচ মাখায়া ভাজেন। তারপর নরমাল তরকারির মতই। সোয়াদ ই সোয়াদ!কবিতায় ব্যবহৃত কোনো শব্দ কখনোই কারো মালিকানার নয়। কোনোই রোদ্দুর আর ব্যক্তিগত থাকছে না কোন এক গর্ভিণী কাছিম ধীরে,অতি ধীরে মেঘ দর্শনকালে, ফসিল হয়েছে দ্রুত,লাভাস্রোতকে ভ্রমে নদী কল্পনায় । ছাদের উপর, আমশি শুকোনোর আমন্ত্রণ থাকছে না তার অ্যারাইভাল ডিপারচারের নিঃশব্দ দরজা, কিসের সেন্সর নিয়ে খুলছে ডুবছে উড়ছে পর্দা, আর পিঠে হাত, পিঠে নেই হাত বন্দর বন্দর ক্যাব ক্যাব কার্ড কার্ড আকাশের অনেক উপরে বমি বমি করলেই খোঁপা বাঁধা ট্রেতে পিল, মুখে হাসি, ভিতরে গুলিয়ে ওঠা সহজাত টকজল হাওয়ার কম্প্রেশনে, কমোডের মধ্যে দিয়ে দুমড়ে মুচড়ে চলে গেল যেন, অর্থহীন রাগে কুঁকড়ে ওঠা প্রিয়মুখ কোন ব্রাণ্ড কণ্ডোম স্বাদহীন স্মৃতিহীন মনে আছে, তার মধ্যে কেমন শীৎকার মনে পড়ছে না আর। হঠাৎ ভীষণ শব্দ কী হল কী হল? “জোব্বাখানা পড়ে গেছে” “এত শব্দ তাতে?”

 

শব্দ রাবীন্দ্রিক বা জীবনানন্দ দাশীয় হয় না। রবীন্দ্রগিরি, জীবনানন্দগিরি থাকে কবিদের লেখায় শব্দ ব্যবহারের কোনো নির্দিষ্ট ভঙ্গিতে। আমাদের আত্মবিশ্বাস,দৃঢ়তা,আত্মশক্তি রূপে থেকে যান অন্তরে। বাহ্যিক এই নিরঞ্জন শুধু একথা মনে করিয়ে দেয় জীবন অনিত্য,স্থায়ী নয় কোনো মায়ার বন্ধনই।আমি নিজেকে পশ্চিমবঙ্গের একমাত্র ইন্টেলেকচুয়াল বলছি এই কারণে নয় যে, আমি সবার থেকে শিক্ষিত, বা আমার সংগ্রহে প্রচুর বই আছে। এ কারণে নয় যে আমি ফুকো, নীটসে, বেগম রোকেয়া, অবনীন্দ্রনাথ, সেরভেন্তিসকে নিয়ে অনর্গল কথা বলতে পারি। এসব অনেকেই পারেন। আমার চেয়েও কেউ কেউ ভাল পারেন। পেরে অশ্বডিম্ব প্রসব করেন, দামি প্রকাশনা থেকে। আমি এ কারণে নিজেকে একমাত্র ইন্টেলেকচুয়াল বলছি যে, আমি এই রাজ্যে সবচেয়ে কম রেফারেন্সে সবচেয়ে বেশি বুঝতে পারি, ও বলতে পারি। বন্ধুরা আমাকে ভালোবাসেন সন্দেহ নেই, ফলে আমি তাঁদের কাছ থেকে নানা উপলক্ষ্যে শুভেচ্ছা পেয়ে কৃতার্থ হই। কিন্তু বলি যে, আমি এখন যে জায়গায় দাঁড়িয়ে, তাতে কোনও ধর্মীয় দিনক্ষণের বা উপাস্যদের কোনও বিশেষ মাহাত্ম্য আমার কাছে নেই।তাত্ত্বিক দিক আপনার কথা একশো ভাগ সত্য, সেটা মেনে নিতে বাধ্য।

 

কিন্তু নির্বিকার ব্রহ্ম স্থির এবং অপরিবর্তনীয় থেকেও জগতের সব পরিবর্তন এবং সৃষ্টির মূলে থাকে এটাও তো সত্য। সমগ্র সৃষ্টিই তো ব্রহ্ম, শব্দ সমগ্র ব্রহ্মরই অংশ। এক অর্থে তাই সমগ্র ব্রহ্মর অংশ শব্দ গতিশীল। তা যদি না হতো শব্দের পর শব্দ বসিয়ে নতুন কিছু সৃষ্টি করতে হয় কেন? যেহেতু শব্দ ব্রহ্মর অংশ সেই হেতু শব্দও নির্বিকার, কিন্তু জড় নয়, তার চালিকা শক্তি আছে। ফলে আপনারা দয়া করে কোনও তিথিভিত্তিক শুভেচ্ছা আমাকে পাঠাবেন না, দেবদেবীর ছবিও পাঠাবেন না। শুধু শুভেচ্ছা পাঠাবেন, তাইই কৃতজ্ঞচিত্তে গ্রহণ করব।এই সময় ছাড়াও, আজ থেকে সহস্র বছর আগেকার, ও শত বছর পরবর্তী সময় ও স্থান নিয়ে একটা স্থির ভাবনা আমার আছে। সংস্কারবদ্ধতা ও সংস্কারবিমুখতার বাইরে থেকে, মধ্যপন্থায় আমি কথা বলতে পারি। মোকামতলায় আমার দাদাবাড়িতে একটা বিয়া হইতেছিলো, আমার যতদূর মনে পড়ে। শ্যাওলা ধরা একটা কুয়ারে ঘিইরা একদল মহিলা গীত গাইতেছে, নতুন বউ-জামাই দুইজনই কুয়ায় ঝুইকা আছে। গীতের বেশীরভাগ শব্দই অস্পষ্ট , একটা লাইন বার বার ঘুরে আসতেছে– ‘পান দিয়া গুয়া দিয়া লো…’ আমার খুবই হাসি পাইতেছিলো, এই গুয়া জিনিসটা আসলে কী হইতে পারে সেইটা অনুমান করতে করতে।

 

সবাই উলু দেওয়া শুরু করলো,আশ্চর্য! এইটা হিন্দু বিয়া না, অথচ সবার সিঁথিতে সিন্দূর অল্প কইরা। আমি কুয়ার পানিতে তাকায়ে আছি, পানি থিক্ থিক্ করতেছে। ছাই দিয়া বাসন মাজার পর ঘাটলার পানি যেমন ছাইরঙা হয়, ঠিক তেমন সুরমারঙ্গা কুয়ার পানি।তবু পানিতে স্পষ্ট দেখলাম নতুন বউ-জামাই নিজেদের মুখ জোড়-পান দিয়া ঢাকছে। আম্মু আমারে টাইট করে জড়ায়ে রাখছে, যাতে কুয়ায় না পড়ি। আমি আম্মুর তখনকার চেহারা মনে করার চেষ্টা করি, মনে পড়ে না। নতুন জামাই-বউরের চেহারাও মনে নাই। সন্ধ্যার আগ দিয়া এই শুভদৃষ্টি হইতেছিলো। এই হইহল্লার মধ্যে কে যানি চিৎকার দিলো –বরখা কই! বরখা কই! কয়েকজন ডাকতেছে, বরখা… বরখা! বরখা কোথাও নাই। একটা কানা বুড়ি(সম্ভবত বরখার দাদী ছিলো সে ) বলতেছিলো, গোরস্থানের দিকে দেখ, বরকীর খুডাটা জঙ্গলে জড়ায়া যায়। ব্যা ব্যা শুইনা কইছিলাম ঐডারে ছুটায়া আনতে। সেই রাত্রে বিয়াবাড়ির আনন্দ পণ্ড হইছিলো।বরখারে আর বাঁচানো যায় নাই। অনেক রাত্রে আম্মু আব্বুরে ধইরা বলতেছিলো, কোনো কবরে একটা ফাটল আছে, সেইটার ভিতরে বরখা পইড়া কাৎরাইতেছিলো। ওরে তুইলা আনার পর দেখা গেল সারা শরীর সাদা।

 

রক্ত পড়তে পড়তে সাদা হয়ে গেছে ও। সবাই নাকি বলতেছিলো পিশাচ রক্ত চুইষা নিছে। আম্মা বার বার বলতেছিলো, পিশাচ রক্ত চুষলে ওই জায়গা দিয়া রক্ত পড়বে কেন? আমি ঘুমের মধ্যেই এই কথাগুলি শুনতে পাইতেছিলাম। বরখার জন্য খুব খারাপ লাগতেছিলো আমার। ইশারা আর গোঁ গোঁ করতো, কথা বলতে পারতো না মেয়েটা।কানেও কম শুনতো। আমার এখনও মনে আছে একটা ছাগলের বাচ্চা কোলে নিয়া সারা উঠান ঘুরতো মেয়েটা, বয়স তেরো-চোদ্দ। সেই বিয়াটার দিন সে কালোর মধ্যে ছোট ছোট সাদা ফুলের একটা কামিজ পরা ছিলো। একটু বড় হওয়ার পর আম্মুরে আমি প্রায়ই প্রশ্ন করতাম, আম্মু, বরখায় কোন জায়গা দিয়ে রক্ত বের হইছে? আম্মু নিশ্বাস ফেইলা অন্য কোনো কথা বলতে চাইতো, বেশী জ্বালাইলে বলতো– কে তোমারে এইসব বলছে? কই থিকা এই গল্প শুনছো তুমি?

 

একদিন আম্মু খুবই বিরক্ত হইলো, বললো এই অত্যাচার আর সহ্য হয়না। ওকে, শোনো তাইলে– মুতু কর যে দিক দিয়া, সেই দিক দিয়া। এইবার শান্তি হইছে? কিন্তু এখন তুমি আমারে বলো, এই গল্প তোমারে কে শোনাইছে? তোমার আব্বু? আমি বললাম, না! আমি তো দাদাবাড়ির সেই বিয়াতে ছিলাম, তুমিও ছিলা। একটা কুয়ার সামনে মুখের উপর দুইটা পান একটু কোনা করে ধরে রাখছে নতুন বউ আর জামাই। মহিলারা গীত করতেছে। কুয়ার পানিতে ওরা ঝুইকা আছে। শুভদৃষ্টির পর ওই পান আর সুপারি কুয়ার পানিতে ফেলা হইলো। তখন সবাই বলতেছিলো– বরখা কই, বরখারে পায় না। আম্মা আমারে থামায়ে বললো, এইসব কী বলস তুই? এইসব ঘটনা কে বলছে তোরে! তোর বাপেও তো তখন ঐখানে ছিলোনা। আর সবচাইতে বড় কথা তুইও ত ছিলিনা তখন! আমিই তাইলে বলছি মনেহয় এইসব, না? আম্মুরে কোনোভাবেই বুঝাইতে পারিনাই(এখনো পারি না) যে,এই গল্প আমার কারো কাছে শোনা না। আমি তারে বললাম, তুমি বরখারে অনেক আদর করতা, সে ছাগল নিয়া তোমার পিছে পিছে ঘুরতো।

 

তোমার গলায় আর কানে একটা গোলাপ গোলাপ রূপার সেট ছিলো, তুমি ওরে সেইটা ওই বিয়ার দিন পরায়ে দিছিলা। মনে আছে? ও তোমার চুলে বিলি দিয়া দিতো, কথা বলতে পারতো না এইজন্য উকুন পাওয়ার পর মুরগীর মত খুট খুট শব্দ কইরা তোমার হাতের তালুতে উকুন ছাড়তো।মনে নাই? আম্মা এইসব শুইনা চিৎকার দিয়া আমারে জড়ায়ে ধরলো। বাবারে! আর কইস না। এগুলা তুই কোনোদিনও দেখস নাই। বাবারে, তুই তখন হসই নাই। তুই তখন আমার পেটে, বাবা! আম্মুর এই কথায় আমি যারপরনাই বিরক্ত হইছি। মাঝেমইধ্যে বরখার কথা খুব মনে পড়ে আমার, আজকে যেমন মনে পড়তেছে। বৃষ্টিতে হাঁটতে হাঁটতে রাস্তার শেষমাথায় চলে গেছিলাম। বৃষ্টির তোড়ে একটা কবর দেখলাম ফাইটা গেছে, মনে হইলো উঁকি দিলেই বরখারে দেখতে পাবো।  সেই প্রথম উপলব্ধি করলাম ছাত্র নামধারী এই দলের ছাত্রগুলা আসলে কি। এরা কোন যুক্তিতর্ক বুঝে না। মতাদর্শের ভিন্নতা কি জিনিস তাও বুঝে না।

 

রাজনীতি তো অনেক দুরের ব্যাপার। শুধুই বুঝে ক্ষমতা। দখল নেয়ার জন্যে এরা করতে পারে না এমন কিছু নাই। কামরুল স্পটে মারা যায় নি। তবে কয়েক মাস নাকি হাসপাতালে ছিলো। তারপর তার কি হয়েছিলো জানি না। কামরুলরা এভাবেই আস্তে আস্তে কত কত আবরার হয়, আমরা কয়জনেই বা তার খবর রাখি। ফেইজবুকে মাঝে মাঝে ঘাইঘুই তারপর একদম নিশ্চল। কিন্তু হায়েনা’রা বসে থাকে না। তাদের রক্ত খাইখাই ভাব বাড়তেই থাকে। বাড়তেই থাকে……আমি পলিটিকাল পক্ষপাতিত্ব থেকে মুক্ত থেকেও মানবতাবাদী হতে শিখেছি। দেহ আর আত্মার ভেদ নিয়ে ভাবিত নই। শ্লীল অশ্লীল নিয়ে চিন্তিত নই। অধ্যাপক ও রিক্সাচালকের পাশে আমি সমান মানানসই। আমি এতটাই স্বনির্ভর হতে পেরেছি যে কেউ চটে যাবে এই ভয়ে কোনো কথা বলা থেকে বিরত হতে হয় না। সর্বোপরি, সবচেয়ে কম প্রভাবিত হয়ে সবচেয়ে বেশি কথা বলার সামর্থ্য রাখি। প্রগতির ধার ধারি না। উন্নতিতে বিশ্বাস করি না।

 

সম্প্রসারণ ও বিকাশের প্রতি আমি আস্থাবান, ও প্রচারক। মেয়েদের শরীর, সাহিত্য পুরস্কার, মঞ্চের আলো এগুলো আমাকে আর পথভ্রষ্ট করতে পারে না। এই জায়গায়, এই চরম জায়গায় আমি নিজেকে ছাড়া জীবিত কাউকে দেখতে পাচ্ছি না।। আমি আমার কবিতায় রবীন্দ্রনাথ ও জীবনান্দ দাশ ও আরো অনেকরেই নিয়া আসার চেষ্টা করি। তাদের কবিতার রূপ, রঙ্গ ও নানান ভবিষ্যৎসহ। যারে প্রভাবিত হইতে না-চাওয়ারা বলবেন—”ব্যবহার করলুম!”তো আমি আমার কবিতায় কবিদের ব্যবহার করি। সব কালের সব কবিদের।সুতরাং কোনো কবির পরিচিতি দখল করা শব্দও খুব সামান্য ঘটনা।তাই আপনি এখন যখন ও আরো পরেও যখন ‘তবু’ দিবেন কবিতায় তা জীবনানন্দের ‘তবু’ হবে না যদি না তা জীবনানন্দের ‘তবু’ হয়।বর্তমানে উভ-নয়ন দৃষ্টি সম্পন্ন বাঙালি ক্রমশ বিরল হতে দেখা যাচ্ছে। তবে এক চোখ বিশিষ্ট এবং এক কান বা দু কান কালা হতভাগ্য প্রজাতির সংখ্যা আকাশ ছোঁয়া হয়েছে। তাঁরা যখন দ্যাখে খুনি এবং শয়তান ঘরের কেউ, তখন তাঁরা জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকায়, কবিতা লেখে, চিঠি লেখে, সেলফি তোলে, উৎসবে মাতে, মলে যায়, পাহাড় সমুদ্র দর্শনে বেরোয়।

 

কিন্তু যখন দ্যাখে খুনি বা শয়তান বাইরের দূরের কেউ, বা এমন কেউ যে তাঁর হিপোক্রেসির মুখোশ টেনে ছিঁড়ে ফেলতে পারে, তখন তাঁরা মাঠে ঘাটে রাস্তায় নির্বাচিত প্রতিবাদের কলম তাক করে আকাশ বাতাস আন্দোলিত করে।ডিটেনশন ক‍্যাম্পে ইতিমধ্যে আটজন মহিলার গর্ভপাত হয়েছে।প্রায় ষাটজনের কাছাকাছি মহিলা ধর্ষিত!লড়াই যেখানে হোক,যেভাবে হোক জারি রাখুন বন্ধুরা।ধ্বংসের মুখোমুখি আমরা! যেখানে প্রতি মুহূর্তে সম্পর্ক ভাঙে,সেখানে একটা মানুষকে গোটা জীবন আগলে রাখা মানেই তো প্রতিদিন দুগ্গাপুজো,প্রতিদিন ঈদ,প্রতিদিন উৎসব।নবমী নিশি আগতপ্রায়। সম্বচ্ছরের দুরন্ত মেগা রাত। ক্লান্ত মাইক গত পাঁচ দিন বেদম চিল্লিয়ে শিশির মেখে জিরোবেন তখন। মাইকবিহীন মন্ডপে থোকা থোকা আনন্দ-ভীড়। ছোট্টো ছোট্ট চৌকো-গোল-তেকোণা জটলা আবার চলমান জনস্রোতে মিশে যাবে— যাচ্ছে, তৈরী হচ্ছে, ভাঙছে—- ঢেউয়ের মতো। বলা বাহুল্য ওনার পরিহিত জামাটি আসলে আমার।বাবাটিও আমার।আমার সব কিছু হস্তগত করতে হবে ওনাকে। আমি কখনো যশো দেহিং,পুত্রং দেহি বলিনি সাদা বাংলায় কথা বলেছি।আমার রাজেন্দ্রানী তাই সারা বাড়ি র আদরের ধন।আরে দর্পণে মুখটা ঠিক করে দেখতে দে রে অনামুখোরা-এখনই তাড়াচ্ছিস কেনো?”বর্তমান সময়ের একটি অত্যন্ত মূল্যবান গবেষণার বিষয় হল বাঙ্গালির পুরুষার্থ কোথায় থাকে– অণ্ডকোষে? না কি সেখানেও থাকে না…?

 

অ্যান্ড, আমাদের বাংলা কবিতারে আমাদের মধ্য দিয়াই আগাইয়া নিয়া যাইতে হবে। অবশ্যই আগানো মানে যা ছিল না, আগে যা সম্ভব ছিল না ভাষায় কবিতায় তাকে ধরতে ধরতে যাব।কেউ কেউ নিজের ব্যক্তিত্ব লইয়া তিনিরোধকের প্রতিভায় সামনে খাড়াইবেন। তার থিকাও যা নিবার আমরা নিব। আমরা মানে শত রূপ বাংলা কবিতারা।অর্থাৎ যদি বাংলা তার নিজের কালের যাত্রায় অগ্রসরমান থাকে তবে সব বিশিষ্ট কবিও ভঙ্গি, ভাব, অবশিষ্ট, টীকা আর বিবিধ না-পারাসহ আমাদের সঙ্গে সঙ্গে যাবেন।বড় কবিদের কাজ তাই—ভাষার ভিতরে মিশে যাওয়া।ছোট কবিরা ছন্দ-অছন্দ, মাপজোক, যাপন-টাপন, সুখ-দুঃখের বেদনা-মেশিন!যখন আবার আসবো না আর এই ধরাতেহয়তো শতেক বছর পরেইতখন যারা ধানের খেতে…বুদ্ধিজীবীর কী কাজ ~‍লাঞ্ছিত-বঞ্চিতের পক্ষে লড়া মানে অভিজাতের পক্ষে লড়া। আমাদের বুদ্ধিজীবীরা বহুদিন যাবৎ এই লড়া লড়তেছেন। যদিও নিষ্ফল। ‘সমাজতন্ত্রই অভিজাততন্ত্র’–বোধগম্য হইলো না! সমাজতন্ত্রের ধারণার সাথে অাপনার এই অভিজাততন্ত্রের ধারণা মিলাইতে পারতেছি না।
তাদের কাজ অর্থের বা টাকার বা সম্মানের মূল্য বা মিনিং বদলাইয়া দেওয়া।কথাটা ভালো লেগেছে।অয়ি তাবাসসুম ~আপেক্ষিক দরিদ্র বন্ধু তাবাসসুম আমার নতুন বন্ধু ‘অগো লগে মিশবা না’ ~ ফেসবুকে যেইটা বুঝলাম কে কার লগে মিশলে কে কার লগে আর মিশবে না, বুদ্ধিজীবী বা অ্যাকটিভিস্টদের মধ্যে এই জিনিসেরই চর্চা চলে, ধুমাইয়া।এই ‘চৌহদ্দি তৈরি ও তার মধ্যেই ঘাস খাইতে হবে’ দিয়া চলতেছে বুদ্ধিরা। কারণ কী এর?     খুব মজা। আমি রান্দি, তয় খেজুরের কাঁটা দিয়ে মোরব্বাক্যাচা করি না। আবার রনলে কইরা দেহুম।আমের আঁচার, পেপে দিয়া পাতলা ডাইল, কলমি শাক, নলামাছ ভাজি, আর মুরহাটিপস্ঃ শাক বটি দিয়া কুচি করবেন না, সবসময় হাত দিয়া ছিঁড়বেন।

 

পেপে ভর্তা, চালকুমড়া পাতা ভর্তা আর কলা ভর্তা।কেন কলকাতার বাংলা হইতে ঢাকার বাংলা আগাইন্না ~সব ভাষা বা ভাষার সব ধরনই এক—এ রকম চিন্তা ছাগলদের।ইংরাজি ভাষা অন্য সব ভাষার চাইতে উপরে। কেন উপরে?যেহেতু সব ভাষা এক না।ভাষা অস্ত্র, ভাষা কৌশল। অর্থাৎ ভাষা ও ভাষার ধরন মাত্রই একই মর্যাদা বা মাপে অবস্থান করে না। একই ভাষা একেক কালে একেক দশা প্রাপ্ত হয়।যেমন কলকাতার আর ঢাকার বাংলা এক বাংলা না।আমরা যারা নিজেদের থেকে অনেকটা বয়সে বড় কারোর প্রেমে পড়ি, তারা কিন্তু আদতে একটা আশ্রয় খোঁজার জন্য প্রেমে পড়ি। কাইন্ড অফ তাদের মধ্যে আমরা একটা ফাদার ফিগার বা মাদার ফিগার খুঁজি, কথায় কথায় আমরাই বলি তো সবসময়, যে আমাদের প্রেমিক প্রেমিকারা আমাদের মায়ের বা বাবার মতো আগলে রাখে।

ব্যাপারটা হলো ঠিক সেখানেই, আমরা যত বেড়ে উঠি ততই মা বাবার থেকে একটা দূরত্ব তৈরি হতে থাকে, ঠিক সেই মুহূর্তে আমরা এমন কাউকে খুঁজি যে বাবা মার মতো হবে অনেকটা, পুরোটা না হলেও।যে কিনা আমাদের আগলে রাখবে, একটু বকাঝকা দেবে ভুলভাল কাজ করলে, খুব একটা বেশি পজেসিভ হবেনা, আমরা মুক্ত ভাবে স্বাধীন হয়ে ঘুরতে পারবো, কোনো রিলেশনশিপ স্ট্যাটাসের ঝুট ঝামেলা থাকবে না।হুটহাট আমাদের ফোন করবে, খোঁজ খবর নেবে, শরীর কেমন আছে, জিজ্ঞেস করবে! সময়মতো না স্নান খাওয়া দাওয়া করলে একটু টোন কেটে কথা বলবে “তোমার তো অনেক মানুষ আছে, তাদের সময় দিতে দিতেই তোমার দিন পেরিয়ে যায়”….স্বদেশে পূজ্যতে গরু ;বিদ্বান্ সর্বত্র পূজ্যতে । একটা খোঁড়া ছেলে…..কথাটা ধক করে বুকে লাগে। কেন রমিতা একটু শান্তি দেয় না।ছোট্ট শিশুরা খেলে বেড়ায় বাবলা টা ফ্যালফ্যাল করে দেখে। রুদ্র সহ্য করতে পারে না। মদ খেতেই থাকে। কাজ করে না। কী হবে আর।মা পেনশন পায়। তার দায় নেই।রমিতা ভালো মাইনের চাকরি করে নিজের বাড়ি ঘর। তার কী আছে।কিছু না।কিছুই না। সব শেষ। আরো পাথর হয়ে যাচ্ছে সে দিনকে দিন। কেউ কখনো বোঝেনি তাকে। বুঝবে না। ভালোবাসা বলে কিছু হয় না। অর্থহীন শব্দ।শুনলাম এক ঐতিহ্যবাহী কলেজের এক পিএইচডিখচিত অধ্যাপিকা এতটাই গুরুর প্রেমে মশগুল যে, তিনি ছাত্রদের ধরে ধরে সাপ্তাহিক সফরে এই গুরুর একটি নিকটবর্তী আশ্রমে নিয়ে যান দীক্ষা নেওয়াতে। নম্বরপ্রত্যাশী ছাত্রদল আর কী করে! অগত্যা! এইসব ঘটনায় এই ‘শ্রী শ্রী’ (প্রয়োজনমতো আরও শ্রী লাগানো যেতে পারে) ঠাকুরের প্রতি আগ্রহ আমার দিন দিন বৃদ্ধি পেয়েছে।

কত রাত কেটে যায় একা একা।আবার গৃহহীন আবার বিতারিত। ওই যে মধ্যরাতে শুনশান রাস্তাটা আর সে জেগে আছে,ওই যে রাস্তার কুকুরের মতো জীবনটা তার।কে বোঝে। দিঘার সমুদ্রতটে শরীর ঘেঁষে বসে আছে রমিতা আর সে। একশ অশ্বারোহী র মতো ছুটে আসছে ঢেউ,তারা ভরা আকাশ। কী অপূর্ব নির্জন ।ক্রমাগত মা ফোন করছে মোবাইলে।বিরক্তিকর নিম্নচাপের মত ঘ্যানঘেনে অভিযোগ, কান্না। শরীর থেকে উঠে আসছে অব্যক্ত ক্রোধ। সব কিছু বিরক্তিকর হয়ে যাচ্ছে। রমিতা জড়িয়ে ধরে,আদর করতে চাইছে।এক ঝটকায় সরিয়ে দেয় হাত। নিষ্ফল আক্রোশে ফুঁসতে থাকে তার ভেতরের জন্তু টা। রমিতা দুঃখ পেয়েছে।মোবাইল টা বন্ধ করে দিলে যে আরো বড়ো আর বিশ্রী ব্যাপার ঘটাবে মা তা কেন বোঝে না রুম।পৃথিবী আসলে এক সারি সারি বিষণ্ণ মুখের শপ। দোকানি গিয়েছে খেতে। অরক্ষিত ক্যাশ।কে নেবে বিষণ্ণতা?বাজারে মন্দা বড়।বিক্রিবাটা কম। সারি সারি বসে আছে বিষণ্ণ সেলসবয়। ক্ষয়াটে চোখগুলি কাস্টমার খোঁজে। কেউ নেই। শুধু র‍্যাকে র‍্যাকে র‍্যাপ করা মুখেদের স্যাক।

আর কিছু ভালো লাগছে না । ছোটো থেকেই তার রাগ চণ্ডাল। হিতাহিতবোধশূন্য হয়ে যায় রাগ হলে।আমরাও লজ্জা পেয়ে হেসে উঠবো, একটু ন্যাকামি করবো, কোনো একটা বৃষ্টির বিকেলে দেখা করবো, মেঘ জমে থাকবে ঘন কালো মেঘ। একটা কফিশপে বসবো, দু কাপ কফি নিয়ে দু ঘন্টা কাটিয়ে দেবো। ফিরে আসার সময় একবার ঘুরে তাকাবো, চোখে চোখ পড়বে, ব্যস এটুকুই।বাড়ি ফিরে এসে একটা টেক্সট করবো “আজকের দিনটা আমি মনে রাখবো গোটা জীবন, আপনি বাড়ি ফিরলেন তো, আবার কবে দেখা হবে আমাদের?”….আমরা কিন্তু আমাদের থেকে অনেক বড় বয়সের মানুষের প্রেমে যতটা না সেক্সুয়াল ডিমান্ড বা ওই দেখেই উফফ ক্রাশ খেয়ে গেলাম, ইত্যাদি ইত্যাদি থেকে পড়ি তার চেয়ে অনেক বেশি একটা শান্তির ঘর একটা আলোছায়া মাখা বারান্দার খোঁজে পড়ি। আজও সেই দ্বিতীয় বিয়ে, একাধিক পুরুষ সঙ্গী, একাধিক নারী সঙ্গী, বিবাহের পূর্বে সন্তান এসব নিয়ে কেচ্ছা করি। আবার মন্দিরের গায়ে খোদাই করা সাধারণ ও অসাধারণ যৌনজীবন ও তখনকার মানুষের যৌন অভ্যাস নিয়ে ফোটোগ্রাফি, শিল্পচর্চা ইত্যাদি ইত্যাদি করে থাকি। মাঝে মাঝে ভাবি আমরা কী লেভেলের প্রগতিশীল! তাই না?কার ঘরের কোণে কতোটা ঝুল, গত পরশু পর্যন্ত জানতে ক’জন?

ঢাকারটা আগানো।চিন্তা বা বুদ্ধি এর কারণ না। তবে যে ভাষা আগানো তার চিন্তা অগ্রসর হইয়া থাকে ভাষার কারণে। ভাষা অগ্রে, চিন্তা না। লোকে চিন্তা দিয়া ভাষা করে না, ভাষা দিয়া চিন্তা করে। ঢাকার ভাষা আগায় থাকার একটা কারণ, ঢাকার লোকেরা পূর্ণ বাক্যে কথা বলে কম। যেইটা কলকাতার কেরানি বাংলার শিক্ষিত বৈশিষ্ট্য।পূর্ণ বাক্য মানে ইঙ্গিত বা সংকেতের বিলোপ।ইঙ্গিত বা সংকেত হ্রাস পাইলে ভাষাও ক্রমে অর্থ হারাইতে থাকে।রান্দনের সময় ঘুটনি দিয়া বাইরায়া রান্দবেন, নরম হইয়া মিশ্যা যাইবো মুখে।এইটা হইলো আমার পছন্দের শাক কলমি, সাথে ইঁচাগুড়া।এইটারে তো পরোটা না লুচি মনে হইতাছে..নাইল্যা শাক / পাট শাক, বেশী কইরা রসুন কুচি দিয়া।এইটা তেল না, ফ্রেশ পাতাগুলি গ্লেস মারতেছে। পাটশাকে আমি তেল দিই না। সামান্য ঘি দিয়া রান্দি। রান্দা শেষে উপরে লেবুর রস চিপ্পা ..খিচুরী, লোচা(কইতরের ছাও) ভুনা, ইলিশ ভাজা, আমের আচার… আহ্ দুই রকমের শাক। একটা পালং আরেকটা খুদুইরা(আঞ্চলিক নাম)। বেগুন ভাজা তো আমার সবচে প্রিয়। রুই মাছটা না রানলেও চলতো। হিহিহি শুকনা মরিচ ভাজা দিয়া ।দুদক চেয়ারম্যান বলছেন, ঘুষ খাওয়া আর ভিক্ষাবৃত্তির মধ্যে পার্থক্য নাই। কথাটা সম্পূর্ণ ভুল।

 

ঘুষ খাওয়ার বিনিময়ে লোকে কাজ কইরা দেয়। ভিক্ষা নেওয়ার বিনিময়ে ভিক্ষুকরা কী কাজ করে? কিছু না।কাজেই ভিক্ষাবৃত্তি ঘুষ খাওয়ার চাইতে মহৎ পেশা। পেশা যত মহৎ কাজ ততই কম। আমরা ভাত খাইতে ভাত পাই না পণ্ডিতে খায় নারিকেল চল যাই মেশিনে ভাঙ্গাই শুক্রবারে সইষ্যা তেল পণ্ডিতের মা’য় করাতে ধার দিল ওরে পণ্ডিতের মা’য় ঝং ধরা করাতে… আমরা খালের পানিত বেইন্না বেলায় মাছ নি মারি আর আমরা হাত পাইত্তা বইয়া থাহি পণ্ডিতেরই ধার দেয় না নারিকেল হেয় দেয় না টেহাপয়সা বিদ্যাবুদ্ধি কিছু আমরা পুটকি মারমু পণ্ডিতেরে খালের ধারত নিয়া… হের মা’য় বুঝতে পাইরা পাহারা দেয় করাতে ধার দিয়া হেয় খায় নারিকেল, নারিকেল আর চারা ছিটায় চাইরো ধারদা দিয়া…আমরা চারা টোহাই ভাত খাই না পণ্ডিতে খায় নারিকেল চল যাই মেশিনে ভাঙ্গাই শুক্রবারে সইষ্যা তেল ওরে পণ্ডিতের মা’য় কবরে পাও দিল… সত্য ও আমি ~সত্য, তথ্য ও প্রমাণ—এসব প্রাইভেসি বিরোধী জিনিস। এসব নিয়েই উত্তেজিত আধুনিক অ্যাক্টিভিস্ট সমাজ। যদি প্রাইভেসি চাইবেন তবে কেন সত্যের দরকার?

 

লুটেরা ও পাহারাদার ছোটলোকগুলির মাধ্যমে নিজেদের লুটপাটের নিরাপত্তা ধইরা রাখার দরকার এক সময় ছিল রাজনৈতিক দলসমূহ ও তার বড়লোক বড়লোক অভিভাবকদের। কিন্তু এখন পুলিশ সে দায়িত্ব পুরাই নিয়া নিছে। আবার ছোটলোক পাহারাদাররা এখন যেহেতু বড়লোকদের চাইতেও বড়লোক হইছে কাজেই এরা পুরানা বড়লোক ও তাদের সন্তান-সন্ততিদের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা গ্রহণের পথে একটা একটা সন্দেহ হিসাবে খাড়া থাকতেছে। আমার তো মনে হয় “আসিতেছে ভবিষ্যত”-কে নিষ্কটক করার লক্ষ্যে নবীন লুটেরাদের সাইজ করা উদ্দ্যেশ্য নয়, উদ্দ্যেশ্য রাজনৈতিক স্ট্যান্টবাজি। দন্দ্বটা নবীন-প্রবিণের নয়—ক্ষমতাকে মাঝে মাঝে নৈতিকতার মোড়কে হাজির করা–জনগণকে এমন বার্তা দেয়া যে, দেখ দেখ আমরা নীতির ক্ষেত্রে কত আপোষহীন।   আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যাররে আমিই কি জিগাইছিলাম নাকি উনি নিজেই বলতেছিলেন মনে নাই। কোনো সভায় না আলাপে তাও মনে নাই। আমি তখন বাংলাবাজার পত্রিকায়। স্যারের উত্তরার বাসায় ডিকটেশন নিতে যাইতাম। উনি ধীরে ধীরে বলতেন, আমি শুইনা শুইনা কাগজে তুলতাম। সে অনেক দিন আগের কথা। কত, বিশ চব্বিশ বছর হবে বা। যে এই যে লুটপাট করে সরকারের লোকেরা, বিজনেসম্যানরা এগুলি কি বন্ধ হবে না? সত্যি বলতে আমার ব্যক্তিগত জীবনে আমি ভীষণ পজেসিভ একজন মানুষ, কাউকে একবার কাছের মনে করলে তা সে মেয়ে হোক বা ছেলে, আমি তাকে অন্য কারোর সাথে শেয়ার করতে পারিনা।

 

তখন সায়ীদ স্যার বলতেছিলেন যে, লুটপাট যারা করতেছে তাদের যখন নিরাপত্তার প্রয়োজন হবে তখন অপেক্ষাকৃত চুনোপুটিদের লু…ক্যাসিনোর কেন মালিক হইতে হবে ~পুরানা ক্ষমতাশালী ও অর্থবানরা নতুন ক্ষমতাশালীদের ততক্ষণই গ্রহণ করে যতক্ষণ নতুনদের ‘তুলনায় বেশি ক্ষমতা কিন্তু কম অর্থ’ নামের দারোয়ানগিরি বজায় থাকে।ক্যাসিনোর মালিক হওয়া মানে নতুন ক্ষমতাবানরা নতুন অর্থেরও মালিক হইতে শুরু করছেন!পুরানাদের জন্যে এই রকম ক্ষমতা ও অর্থেরা যথার্থ হুমকি হইয়া দাঁড়াইতে পারে, সেই ভয় আছে, পুরানাদের।কাজেই ক্যাসিনোরা যতই নিজের লোক হউক না কেন, নিজের উত্তরাধিকাররা যেই দিনই ক্ষমতার গোল টেবিলে বসা শুরু করছেন সেই দিন থিকাই নতুন অর্থ ও ক্ষমতার মালিকদের সাইজ করার আন্তঃদলীয় রাজনীতি জরুরি হইয়া দাঁড়াইছে। এই হিসাবটা বোঝা দরকার।ক্ষমতার পাহারাদাররা যেন চিরকাল পাহারাদারই থাকে, ওদের কেন মালিক হইতে হবে! ভিড়ের মধ্যে বসে আছি একা ডাবুহাতা করে তুলে দেওয়া হচ্ছে স্বপ্ন, একটা নোংরা হাত, লঙ্গরখানা সবাই পাত পেড়ে খাচ্ছে আমি ক্রমশ ডুবে যাচ্ছি অন্ধকারে, হাতঘড়িটা হারিয়ে ফেললাম এইমাত্র, ঘরে ফেরার দায় নেই, দারুণ ব্যস্ততা, অন শপ থেকে ছিটকে আসছে বমির শব্দ, অপরিচিত মেয়েটার গায়ে বেড়ালের গন্ধ, ভোর না হওয়া পর্যন্ত শুয়ে থাকবো এখানেই, রাত্রির লঙ্গরখানা কিম্বা পানশালা এখন, ধর্মের হাট-বাজার

 

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

একটি আভাঁ গার্দ গল্প : মলয় রায়চৌধুরী

ভাবসো আমি কিছু বুগিনা? আমি খুব মিউমিউ কইরা কইলাম, ভাবি গো ছয় দিন হইলো বিছনায় পইড়া আছি। ওষুধ চলে, খুব ঘুম আসে, ঘুম আইলেই ভাইঙ্গা যায় পাখপাখালির আওয়াজে।তুই আর নেই!!!!ভাবতেই পারছি না, কি থেকে কি হল রে, অভিমান ছিল জানি। এই তো সেদিনও কথা হোলো, বাড়ি করবি বলছিলি, তাই বলে এমন জায়গায় বাড়ি করলি রে দীপান্বিতা… সবসময় হাসিমুখটা খুব মনে পড়ছে রে, মন তোর জন্য ভালো নেই।বেসিক্যালি আপনার কোনো বন্ধু নেই। আপনি পেঁচার মতো মুখ করে থাকলেও কেউ বিশ্রীরকম জোক করে আপনাকে জ্বালাতন করার নেই। স্কুলের বন্ধুদের যারা নাগালে আছে তাদের ফোন রিঙ হয়ে যাবে। পকেটে তিরিশটাকা পড়ে থাকবে যা দিয়ে একটা নিপও হয় না। অনেক ভেবে পুরোনো এক নেশাখোর কে ফোন করলে দেখবেন সে অসুস্থ এবং তার মা ফোন রিসিভ করে আপনার কুশল সংবাদ নিচ্ছে। পৃথিবীর যাবতীয় বন্ধু ভাবাপন্ন সম্পর্ক গুলো সময়ের সাপেক্ষে বদলে গেছে। এবং আপনার একমাত্র বন্ধু, আপনার প্রেমিক ড্যাং ড্যাং করে অনুমতির তোয়াক্কা না করেই মরে গেছে। এবং আপনি ঠিক বুঝতে পারছেন না আপনি ঠিক কী কেশোৎপাটিত করছেন। তাকে বলে বাঁশ। সবকা বাপ। এই সময়ে ঘরে কিচ্ছু নেই। না মদ, না তামাক, না ওষুধ ;যেখানে থাকিস ভালো থাকিস রে….দীপু.. বেশি না খালি সালাউদ্দিনরে সরায়া আর ৪০০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ কইরা (স্টেডিয়াম ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মান, কোচ প্রশিক্ষন, বিজ্ঞাপন আর বিপনন) খেলাটারে বিলিয়ন ডলার ব্যবসার জায়গা বানানো যায়। তাও মাত্র পাচ বছরে। পরিমান মত রান্নায় স্বাদ হয় বেশ, মহাকাব্যে আছে অতিদর্পে শেষ।ক্লাব ফুটবলে চল্লিশটা দলকে অনুদান (স্বল্প সুদে ঋণ, শেয়ার বিক্রি) দেন। হিড়িম্বা মন্দির ।ভালো লাগলো,হিড়িম্বা অর্থাৎ মহাভারতের ভীমসেনের ঘরনির নামে মন্দির আছে।অন্য কাস্টের হওয়ার দরুণ মা কুন্তী তাঁকে পরিবারে ঠাঁই দেননি,ঘটৎকচ যুদ্ধে প্রাণ দিলেন,বংশের পুত্র।নিঃসঙ্গ হিড়িম্বার স্মৃতি চিন্হ দেখে সত্যি ভালো লাগলো।কড়া অডিটের ব্যবস্থা করেন যাতে টাকা মাইরা যাইতে না পারে।ধরেন গিয়া, এতো ইস্যু, ঘটনা, দুর্ঘটনা, প্রায় সবকিছু এড়াইয়া, তাকডুম-বাগডুম করি! তো ক্যান করি তাকডুম-বাগডুম! হ হালকা স্বভাবের মানুষ আমি! হা হা হি হি লইয়া আছি! ‘অথচ্চো’ আপ্নেরা দেণ উদ্ধার করিতেছেন (কতিপয়), খুউব ‘সিরিকাস’ স্বভাব আপনোগো, তো ঘটনা হইলো গিয়া, বাচ্চাগো মতো হইয়া, বাচ্চাদের মতো কইরা, একটা দুইটা গান, কবিতা, ছড়া কইরেন দেহি, ক্যামন লাগে! সহজ কইরে সহজ সুরে দুই একখান গান কইরালান দেহি! একেকজন একেক পরিবেশে একেকরকম আচরণ করে। আমি বাচ্চাদের সাথে বাচ্চা, সিরিয়াস ইস্যুতে সিরিয়াস! তবে ফেসবুকিয় দেশপ্রেমের সয়লাব প্রবণতায় বেশিরভাগ ইস্যু থেকে দূরে থাকি এখন! শিশুদের জন্য মননশীল কাজ করাও গুরুত্বহীন নয়! আমি জানি আমি কী! ধন্যবাদ। ফেডারেশনটারে জুয়ারিদের হাত থেকে রক্ষা করে প্রকৃত সংগঠকদের হাতে দেন। বাইরের খেলোয়ার, কোচ, ফিজিও আনেন।আমার বোন আমাকে বলে ‘ তুমি এত সংক্ষেপে এক দুই লাইনের মধ্যে কথা শেষ করো না। তুমি কী বলতে চাইছো, তা অনেকে বুঝতে পারে না। তুমি ইমতিয়াজ মাহমুদের মতো সুন্দর করে বুঝিয়ে লিখো’। “আজি রজনীতে হয়েছে সময়, এসেছি বাসবদত্তা!”বাতাবী লেবুর গোড়ায় বল্মীকের প্রাসাদ, পাশে পুরনো ঘাসের গন্ধ আর একটা লাল ফিতে পড়ে রয়েছে। আজ বড়ো বৃষ্টি নেমেছে, কলকাতার রাস্তায় জলকবরের সন্ধান পাওয়া গেছে। পিরিয়ডিক ন্যাপকিনে জড়ানো গীতার পাণ্ডুলিপি কিছুতেই খুজে পাওয়া যাচ্ছে না।অসাধারণ ‌লাগততততেছে…লাহোরে সিভিল সার্ভিস একাডেমিতে প্রশিক্ষনের অংশ হিসেবে আমাদের ঘোড়ায় চড়তে হত। সহিশ চন্নন খান বলতেন,কক্ষনো শিক্ষকের সামনে আর ঘোড়ার পেছনে যাবে না। শিক্ষক তিরস্কার করেন আর ঘোড়া লাথি মারে। কলকাতার টলিগঞ্জ ক্লাবে ডিনকুর ছেলে রওনাকের ঘোড়াটা এত বিশাল যে সামনে অনেক দূরে দাঁড়িয়েও নিরাপদ অনুভব করি নি।সামনা-সামনি এমন দুর্ধষ্য ঘোড়া আমি আগে কখনো দেখি নি। কই কেউ তো এখনো লালবাজারে মিসিং ডায়েরি করে নি…!আমগো পোলাপান ধানক্ষেতের মেসি, রোনালদো। আন্তর্জাতিক মানের মাঠ আর ভালো টুর্নামেন্টের আয়োজন করতে পারলে ঘরে ঘরে রোনালদিনহো জন্ম নেবে।রক্তের সুরা হচ্ছে আরো গাঢ়; ও নদী! ভুলে যাও মরাল গ্রীবাজুড়ে কবে মাখিয়েছিলে রোদ্দুর, তার গান- আর খুব কলতান ভুলে এই জীবনে শ্বাসকষ্ট শুরু হলো।আহত পাখির গান শুকায়ে গেলে, চশমা জুড়ে বাষ্প আসে এতো, বিষ! জুড়ছে না জীবন, ছাড়ছে আশ, কী বল্লম বুকে…এই ছবি দেইখা তো আমিই আমার প্রেমে পড়ে যাইতেসি। চোখ কী শাইনি! চোখের ভেতর চাঁদ তারাও আছে… আমার চোখ গুলা যদি সত্যি এত্ত সুন্দর হইতো! আমার বিয়ে হয়েছিল মাত্র এক বছর, তারপর ডিভোর্স, আমি ওর সাথে কোনোদিনই শারীরিক হতে পারিনি সে অর্থে, আমি ওকে ঘেন্না করতাম।নিজের বিয়ে নিয়ে মেয়েদের স্বপ্ন থাকে অন্যরকম, যা ছেলেরা অনেক সময় বুঝতে বা কল্পনাও করতে পারে না। আমিও সেই ছেলেদের দলেই।বাঙাল তো কি হয়েছে বাপু, তা বলে আমাদের বংশে কখনো ওসব গাড়ু বা বদনা করে ডাল খাওয়ার নিয়ম চালু হয় নি।না তেমন কোনো কারণ নেই ঘেন্না করার, জানেন তো ও খুব ভালো রান্না করতে পারতো, ওর হাতের খাসি মাংসের ঝোল আমার ফেভারিট ছিল।কচুরিপানা সাতটি প্রজাতি আছে এবং এরা মিলে আইকরনিয়া গণটি গঠন করেছে। কচুরিপানা মুক্তভাবে ভাসমান বহুবর্ষজীবী জলজ উদ্ভিদ। এর আদি নিবাস দক্ষিণ আমেরিকা। পুরু, চকচকে এবং ডিম্বাকৃতির পাতাবিশিষ্ট কচুরিপানা পানির উপরিপৃষ্ঠের ওপর ১ মিটার পর্যন্ত বাড়তে পারে ; এইটা আমার হারিকেন।ও প্রধানমন্ত্রীদা.. এসএসসি পর্যন্ত গ্রামে পড়াশোনা করেছি।রাতে এই হারিকেনের আলোয় পড়তাম।তাদের তো আমিও জিগাই, যারে ৩.৭৫ দিলেন, তারে চাকরি না দিয়া ৩.২৫-ওয়ালারে দিলেন ক্যান? কোনটা ঠিক? ৩.২৫, নাকি ৩.৭৫-ওয়ালা? যারে ৩.২৫ দিছেন তারে কি কম দিছিলেন? নাকি ৩.৭৫-ওয়ালারে বেশি দিছিলেন? রেজাল্টের পরে কি আচমকা মেধা বাড়ে-কমে?সিনেমাটি ভয়াবহ সুন্দর। পুঁজিবাদী ফাটকা ব্যবস্থার মধ্যে কীভাবে মানুষ ঠকিয়ে বিলিয়নর হওয়া যায়, কীভাবে সেই বিলিয়নর আবার আইকন হয় সেটাই সিনেমার মূল বিষয়। সিনেমাটিতে একটি রাজনৈতিক ডায়ালগ নেই। কিন্তু যারা খুব ভেবে চিন্তা সিনেমা দেখেন তারা বুঝবেন, এটি পুঁজিবাদ ব্যবচ্ছেদের অসাধারণ একটি সিনেমা। যারা বিপ্লব করবেন তারা এই সিনেমা দেখে পুঁজিবাদের দুর্বলতাগুলো নিয়ে কাজ করতে পারবেন। চাকরির বেলায় মেধা বাড়া-কমা নিয়া চমকাইতে হয়। কারণ তারা বলেন, অমুক তো সুপার ফাইন ভাইভা দিছে, শুনে টাস্কি খাইতে হয়। শুনে আমিও টাস্কি খাই… বেইনসাফি! ইনসাফ কায়েম করেন, মূল্যায়নের তরিকা পাল্টান… যার যা প্রাপ্য, তা-ই তারে দেন!কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই সব লাশ আমরা হজম করে ফেলি। তারপর অনেক অনেক দিন পর আরেকটা লাশ পড়ে।নুনটা, ঝালটা, মিষ্টিটা সব সব মেপে মেপে দিতো, ঈশ্বরকে মানুষ যেমন পুজো করে, ও তেমন ভাবেই রান্নাটা করতো, আর খুন্তি নাড়ার সময় পুরোনো বাংলা গান গুনগুন করে গাইতো….অসমের শোণিতপুর জেলার ঢেকিয়াজুলির কাছে আলিসিঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা দুলাল পালের মৃত্যু ঘটেছে ডিটেনশন ক্যাম্পে, তেজপুরে। মৃত্যুর পাঁচদিন পরেও তাঁর দেহ পড়ে আছে গুয়াহাটি মেডিক্যাল কলেজ হাসপালের পেছনে ফুলে ভরা দুটো কাঞ্চন গাছের মাঝে, মর্গে। কেন? আমি সাধারণ মানুষ।অতি সাধারণ।ধরুন পৃথিবীতে আছে একশো টাকা।একশো জন লোক।দশ জনের হাতে আছে পঁচানব্বই টাকা।বাকি পাঁচ টাকা।নব্বই জন খাবে কিভাবে!গতকাল কিছু সাধুদের সংস্পর্শে গিয়েছিলাম লালনের ধামে। অবাক হয়ে সাধুদের মুখগুলো দেখছিলাম, কী ভীষণ শান্ত সব মুখ। দুনিয়ার কোন ধরনের উত্তেজনা তাদের ধারে কাছে যেন আসতে পারেনা।পাগল হয়ে গেলাম এদের হিন্দীঘেঁষা উচ্চারণের জালায়। এদের সঙ্গে ঠিক করে হিন্দী বলতে শুরু করলে ইংরেজিতে চেষ্টা করবে, তারপর তো আস্তে আস্তে…. অথচ কী সরল তাদের হাসিমাখা মুখ সব।আবার পৃথিবীতে ক্রমশ বাড়ছে এই পাঁচ টাকা কেড়ে নেওয়ারও প্রতিযোগিতা।ধনী দশ জনের প্রতিযোগিতা।আমি এভাবে শূন্যতে আছি।তোমরা নোবেল জয়ী। আজ দুপুরে বানালাম ১০টা নারকোলের নাড়ু…যারা বলেন এখনকার মায়েরা কিছু পারেনা… তারা একটু ভালো করে দেখুক..হে মহামানব সব,এই দশ জনের নব্বই টাকা একশো জনকে দাও।প্রয়োজনে কেড়ে নাও।পুনরায় সম্পদ বণ্টন হোক।গোড়া থেকে শুরু হোক অর্থনীতি।তোমাদের যে সূত্রে নোবেল,ঐ পাঁচ টাকার সাদা কাগজটি।আর কিছু অনাবাদী জমি নিয়ে।দুত্তুর কদিন হোলো শরীরটা ভালো নেই,, জ্বর, বমি, মাথাব্যথা,, আমাদের মা ছায়ের তাই মনমেজাজ ভালো নেই,, তাই দুত্তুর সাথে সারাদিন সময় কাটাচ্ছি,, ছবি তুলছি,, গল্প, আড্ডা, মারপিট সব চলছে….কস্তুরীর কৃতিত্ব।চুমু,কস্তুরী।সারারাত কেটে যাচ্ছে,কি মন্ত্রে,কি আনন্দে…পঁচানব্বই টাকার কোন সূত্র নেই কেন আপনাদের ?  একাই লড়েছিলুম ;কেউ বলেনি ‘হোক কলরব’;একাই নেমেছিলুম;ব্যাংকশাল কোর্টের সিঁড়ি বেয়ে;সেদিন একাই;কলকাতার পথে ঘুরেছিলুম;সকাল পর্যন্ত ; কোন হালায় কয় বাঙ্গালী গরীব ? ধানের থোর ধরলে মনে করা হয় ক্ষেতের লক্ষ্মী গর্ভবতী হয়েছেন। তাই তার সাধ দেওয়া হয় আশ্বিন মাসের শেষ দিনে। গর্ভবতী মহিলাদের যে সাধ দেওয়ার প্রচলন আছে সমাজে, তেমনি। “আশ্বিনে রাইন্ধি কাত্তিয়ে খায়, যেই বর মাগে হেই বড় হায়!” আশ্বিনে রান্ধুম কাত্তিয়ে খামু ;যে বর চামু সেই বর পামু! অন্নহীন ব্রাহ্মণের মত বাংলার আকাশ। ঝিমঝিমে দুপুর ;এক-দু’টুকরো মেঘ ছায়া ফেলে পেরিয়ে চলেছে নিম্ন-দামোদর ;একটু পরেই দিগন্তের দিকে ঢলে পড়বে রক্তসন্ধ্যামেঘ, শ্মশানের পাশে জ্বলে উঠবে ধুনি, কুলীনের সধবা-রমনী অশ্রু ঝরাবে একা অমোঘ চুল্লির থেকে পাকিয়ে উঠবে ধোঁয়া লালাভ স্ফূলিঙ্গ, বাচস্পতির বেড়া-ঘেরা টোলে কুলদেবতার হাসি। কোন দূরে ফরাসডাঙায় কৃষ্ণনগরে রাজার প্রাসাদে জ্বলবে ঝাড়ের বাতি। মাধুকরী ছেড়ে গৃহস্থের অন্নহীন দিনে ঢুকে পড়ে ভূর্জপত্র বুঝে নেবে কার নামে কাব্য শুরু হয়, কার দিকে বন্দনা ছোটে আমার বন্দনা তুমি প্রিয় অর্ধাঙ্গিনী, তুমি তো দেখেছ রোজ নিজেকে অর্ধেক করে আমি মুনশির কাছে যাই। বাকী অর্ধেক বাংলার মাঠঘাটে ক্ষুধিত হেঁসেলে ঘুরে ঘুরে মরে। কোথাও অন্নপূর্ণা নাই; এখন আরেক যন্ত্রণা । না চাইলেও কিছু দায়িত্ব এসেই পড়ে কাঁধে। শাশুড়ি মা বেঁচে থাকতে যা হয়তো হতোনা। যতই ভাবি, বলি তোমরা সবাই স্বাধীন এখন। ভোগ কর স্বাধীনতা যে যার মত। গুছিয়ে নাও যে যার সংসার । তবুও কেন জানি তা মানতে চায় না কেউ।তবে কি এই পরাধিনতা টুকুতেই শান্তি সবার ! নাই ভাইদের স্নেহ, লেখবার অবসর। শুধু অবনত শ্রাবণ-গারদ; ভাঁড়েদের উল্লাস, মোহরের ঝনঝন।যাউকগা, আজ সন্ধ্যায় মিসেস চ্যাটার্জী কষাইয়া কষাইয়া মাটন রান্না করিবেন বলিয়া মনস্থির করিয়াছেন। কারণ, তাহার ডাক্তারবাবু খুব সম্প্রতি উহাতে নিষেধাজ্ঞা বসাইয়াছেন। বারবার গৃহত্যাগ বারবার ঘরে ফিরে আসা। সারা দুনিয়া জেনে গেছে আমার দালায় প্রেম – ভালোবাসা টা হবেই না ;আমিও হার মেনে নিয়েছি কারণ সত্যি ওটা আমার টপিক নয়।কারণ গুলো এই যে – ন্যাকামি করবে প্রেমিক,যেটা আমার সবচেয়ে অপচ্ছন্দের ঠাস করে দুমদাম চড়িয়ে দেবো তারপর ছেলের মা এসে বলবে তুমি আমার বাবু কে মেরেছো? লে হালুয়া এসব ঝামেলায় আমি নেই বস। ঝোলাগুড়ে চিতইপিঠার নাহাল এ কলিজা খাবি খায়। বলছিলা ঘরের গল্প একখান, বলছিলা জোনাকি সাজানো ঘর। বাবুইয়ের বাসা লাট খায়। কী দিবা, কাকে দিবা, আমি বলতেছি শোনো, নদীপাড়ে শোক জমা হয়। তুমি বলো শোক নয়, পলিমাটি, চর। ঐ চরটুকু দিবা, ঐ পলিটুকু? দেহ দিছি, প্রাণ দিছি, রইয়া গ্যাছে সংসারখান, তুমার বিধায় লাগে আগুনের খাপরা লাহান ; চিক্খইর পাইড়া তাই ছুটসি তুমার পাছ পাছ, এ জনমে, তুমি সাঁই, যত দূর লইয়া যাও,… যাই…সারারাত শরীরে কালাজ্বর। মনে হয়েছে কেউ আমাকে বাক্স বন্দি জোঁকের ভিতর আঁটকে রেখেছে। গলা শুকিয়ে গেছল, একঢোঁক জল চেয়েছি জোঁকের কাছে। খুইট্যা টেঙর ; কিছু সত্যি কথা, কিছু ভয়ের কথা, কিছু অপমানের কথা, কিছু গ্লানির কথা বলছি আজ। আমার বিয়ে হয়েছিল মাত্র এক বছর, তারপর ডিভোর্স, আমি ওর সাথে কোনোদিনই শারীরিক হতে পারিনি সে অর্থে, আমি ওকে ঘেন্না করতাম।না তেমন কোনো কারণ নেই ঘেন্না করার, জানেন তো ও খুব ভালো রান্না করতে পারতো, ওর হাতের খাসি মাংসের ঝোল আমার ফেভারিট ছিল।ওদের কান নেই, শোনেনি আমার ডাক। এঁর এককালে টিউশনের রমরমা বাজার ছিল আমাদের স্কুলে। কানিং এবং বাতেলাবাজ হিসেবেই পরিচিতি ছিল। মুশকিল হচ্ছে, বাতেলাবাজ টিচারদের ছাত্ররা খুউব পছন্দ করে। কারণ বাকিরা নেসেসারিলি শুধু ভয়ই দেখান। সমব্যথী বোতল নিজেই এগিয়ে এসেছে, কম্পনরত হাত তবু খুলতে পারেনি ছিপি ;এই যে এক ফোঁটা ঘর। বাড়ি জানালা যমুনামায়ের দু’ফোঁটা বালক। এই তো নিরীহ বালিকা দরজা। ভোর হয়ে এলো দুগগাপুজার হুল্লোড়।একটু ঘিয়ে ভাজা মুরগি, একটু ঘিয়ে ভাজা আলু, একটু ঘিয়ে ভাজা অ্যাস্পারাগাস ;গরিবের লাঞ্চ ;ঠিক এইখানেই তোমার বাড়ি। এখানে ঘুম ডাকো তুমি। জাগো প্রাণায়াম থেকে। তারাদের উচ্চারণে কথা বলো। এখানেই নদীটির সিঁথি। সিঁদুরখেলার প্রতিমা।আরো ভাল লাগল, সোজাসাপ্টা বললেন, নিজেদের কেরিয়ার পড়াশুনা নিয়ে থাকতেন, ছেলে নিজের কত পড়াশুনা বা অন্যান্য কাজ করেছে। মায়েরও যে নিজস্ব জগত, আইডেন্টিটি থাকতে পারে, আর সেটা যে রেঁধেবেড়ে সংসারকে খাওয়ানোর বাইরেও অন্য কিছু করার আছে, সেটা এত স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ। দু:খ, এসব বোঝাতে হল সেই সাংবাদিককে যিনি আবার কিনা মহিলাই। স্টিরিওটাইপিং, তোমার শেষ যে না পাই!! তো আমি জানি ঘটনা, পাশে থাকার সুবাদে উনার কিন্নর কণ্ঠের বজ্রনিনাদ আমি কী দিনে, কী রাতে শুনি ডেইলি। এই তো গেল ভাবি, ভাইয়ের ভাষা শুনলে আগে ছাদের তালা ভাঙতে মন চায়, তারপর উপ্রেত্থে লাফ দিয়া পইড়া মইরা যাইতে মন চায়।

 

Posted in Avant Garde Story | Tagged | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

উংলি


অলংকরণ- তৌসিফ হক

–ব্যাস ! দুমিনিটেই রোগি পরীক্ষা হয়ে গেল ?
–হ্যাঁ, উনি তো তবু নুনু আর পোঁদ ভালো করে দেখলেন, আগের ডাক্তার নিতিন ধাবালিয়া তো কিছুই এগজামিন করেনি ; ঘসঘস করে প্রেসক্রিপশান লিখে বলে দিল পেচ্ছাপের ফ্লো-চার্ট আনতে, রক্তের পিএসএ রিপোর্ট আনতে , আর ক্যানসারাস গ্রোথ হয়েছে কিনা জানার জন্য ডক্টর সুমন্ত ব্যানার্জির ক্লিনিকে গিয়ে একটা টেস্ট করিয়ে আনতে । ডক্টর ব্যানার্জি বললেন, নিডলটা আপনার অ্যানাসের ভেতর থেকে এলিমেন্ট আনার সময়ে ব্লিডিং হতে পারে, মেডিকাল ইনশিওরেন্স করিয়ে তারপর আসুন । তুমি তো জানোই, তোমার সামনেই তো ডক্টর ব্যানার্জি উপদেশ দিয়ে সাতশো টাকা ফিস নিয়ে নিলেন । ডোনেশান দিয়ে ডাক্তারি পড়েছে যত চুতিয়ার দল, এখন টাকাগুলো রিকভার করে চলেছে ।
–আস্তে বলো, শুনতে পাবে অন্য পেশেন্টরা ।
–শুনতে পেলে ওদের ভালোই লাগবে, মনে-মনে ওরাও এইসব কথাই আউড়ে চলেছে । মধ্যবিত্ত কুন্ঠায় মুখে আনতে পারে না, এই যা ।
–সেসব তো ঠিক আছে । ইনি কী করলেন ? দুঘণ্টা অপেক্ষা করে, তারপর নম্বর এলো, ব্যাস দুমিনিটে পরীক্ষা হয়ে গেল ! মহিলা ইউরোলজিস্ট তো এর আগে দেখিনি বাবা । মহিলাকে দেখাবার জন্যে বুড়োদের লাইন লেগে গেছে । বসার জায়গাও নেই ।
–নন্দিনী দেবরায়ের ভালো পশার ; ঠকান না, তাই রোগিদের লাইন ।
–ভালো হলেই ভালো । কী করে চেক করলেন, পর্দা টেনে দিলেন বলে দেখতে পেলুম না ।
–উনি সার্জিকাল গ্লোভস পরে তর্জনীতে কী একটা মলম লাগিয়ে পোঁদের মধ্যে ঢুকিয়ে ফিল নেবার জন্য আঙুলটা ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে দেখলেন, এমন ঘোরাচ্ছিলেন যে আরেকটু হলেই পেচ্ছাপ করে ফেলতুম । তারপর চিৎ হতে বলে নুনু বিচি উল্টেপাল্টে দেখলেন, তলপেট টেপাটিপি করলেন ; বললেন, ওকে, উঠে বসুন। আন্ডারউইয়ার দেখে বললেন, এটা তো রাজনৈতিক দলের পতাকা বলে মনে হচ্ছে ।
–শশশ, শুনতে পাবে লোকে । রাজনৈতিক দলের পতাকা আবার কোথায়, তোমার জামাই-ই তো এনে দিয়েছিল দুবাই বেড়াতে গিয়ে, রাজনৈতিক দলের পতাকার সঙ্গে রঙের মিল আছে, সে যাহোক ।
–আরে, শুনবে তো কী হয়েছে ? সবকটা বুড়োর পোঁদেই আঙুল করবেন আর তাদের নুনু-বিচি উল্টেপাল্টে দেখবেন । অনেকে তো বোধহয় সেকেন্ড টাইম এসেছে, দেখছ না প্লাসটিকের প্যাকেটে রিপোর্ট-টিপোর্ট নিয়ে বসে-বসে গোমড়ামুখে হাই তুলছে ।
–তোমাদের বুড়োদের অমন ছুঁড়ি ডাক্তার না হলে রোগ সারে না । তাও যেচে হাগার জায়গায় আঙুল করতে দেয়া । কী যে রোগ ধরিয়েছ । ডাক্তারগুলোও ভাবছে বুড়োগুলোর কাছে প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা গচ্ছিত রয়েছে, তা থেকে দুয়ে নিই ।
–ছুঁড়ি আবার কোথায় । পঁয়তাল্লিশ-পঞ্চাশ বয়স হবে । চেহারা মেইনটেইন করছেন, বাড়িতে হয়তো জিম-টিম আছে ওনাদের ।
–কত ফিস নিল জানো ?
–কত ?
–এক হাজার টাকা ।
–এক হাজার ? বাপরে, আমাকে তো মিস্টার ঘোষ বলেছিলেন পাঁচশো টাকা ফিস ।
–পাঁচশো টাকা রিপিট ভিজিটের জন্য । রিসেপশানিস্ট বলল, রিপোর্ট দেখাবার সময়ে ফিস দিতে হবে না।
–যেচে পোঁদে আঙুল করাবার জন্য একহাজার টাকা !
–যেমন রোগ বাধিয়েছ । আচ্ছা, তোমাদের অঙ্গটা তো সামনে, তা পোঁদে আঙুল ঢোকাবার কী দরকার?
–পোঁদে আঙুল দিয়ে গ্ল্যাণ্ডটা টের পাওয়া যায় । গ্ল্যাণ্ডটা পেছনে ।
–আপাতত ওষুধ দিলে ভালো হতো । মিসেস বটব্যালের হাজবেন্ডকে প্রথমবার দেখেই ওষুধ চালু করে দিয়েছিলেন ।
–মিস্টার বটব্যালের গ্ল্যাণ্ড বড় হয়ে গেছে, নেগলেক্ট করেছেন, ডাক্তার পোঁদে আঙুল করবে এই দুশ্চিন্তায় লজ্জাও পেতেন । যাক, ইনি অন্তত পেচ্ছাপের ফ্লোচার্ট আনতে বলেননি, ক্যানসারের ভয়ও দেখাননি । বললেন যে আঙুল দিয়ে যা ফিল করতে পারলেন মনে হচ্ছে এখনও দশ আউন্সের মতন আছে, চল্লিশ আউন্সের মতন হলে তারপরে ওসব ফ্লোচার্ট এটসেটরার কথা ভাবা যাবে ।
–রিসেপশানিস্টকে জিগ্যেস করেছিলুম ফ্লোচার্টের ব্যাপারটা । এখানেও হয়, ওই দিকে, যেদিকে আইভিএফ সেন্টার । চারপাঁচ লিটার জল খেয়ে যখন পেচ্ছাপ পাবে তখন একটা ফানেলের ভেতরে পেচ্ছাপ করলে তা ইমিডিয়েটলি কমপিউটারাইজ হয়ে ঢেউয়ের একটা প্রিন্টআউট তৈরি করে দ্যায় ; যারা সুস্হ তাদের ঢেউটা পাহাড়ের মতন হয়, চূড়ায় উঠে গিয়ে নেমে যায় । যারা অসুস্হ তাদের একগাদা ছোটোছোটো ঢিবি গড়ে ওঠে কিংবা সমতলভূমি আর একটাআধটা ঢিবি আঁকা হয়ে যায়।
–আমার ওসব প্রবলেম নেই; যথেষ্ট ফ্লো আছে । কেবল এয়ার ট্র্যাভেল করলে ফ্লোটা ডিস্টার্ব হয়ে যায় । বলেছি ডাক্তারকে । উনি বললেন, এয়ারট্র্যাভেল করার সময়ে কমোডে বসে করবেন, বাড়িতেও দাঁড়িয়ে করা অ্যাভয়েড করুন ।
–তো ওষুধ দিলেন না যে ।
–বললেন, একটা সোনোগ্রাফি করিয়ে কুড়ি দিন পর আসুন ।
–পুরুষদেরও সোনোগ্রাফি হয় নাকি ?
–বললেন তো হয়, লিখে দিয়েছেন, ওনাদের এই ক্লিনিকেই হবে । পাশের ডিপার্টমেন্টে গিয়ে ডেট আর টাইম নিয়ে নিতে বলেছেন ।
–মেয়েরা পোয়াতি হলে তখন সোনোগ্রাফি করে । পুরুষদের আবার কী দেখবার আছে ?
–ব্লাডার, ব্লাডার । তিন লিটার জল খেয়ে সোনোগ্রাফি, ঠিক তারপরেই পেচ্ছাপ করে সোনোগ্রাফি, যাতে বোঝা যায় যে ব্লাডারে কতটা পেচ্ছাপ থেকে যাচ্ছে ।
–নন্দিনী দেবরায় ইউরোলজিস্ট, ওনার স্বামী অশেষ দেবরায় আইভিএফ বিশেষজ্ঞ, ছেলে আর ছেলের বউ গায়নাক, কতটাকা যে প্রতিদিন রোজগার করে ।
–পুরো পরিবারটা মানুষের যৌনাঙ্গসেনট্রিক ।
–এত বড়ো হাসপাতাল খুলে ফেলেছে ।
–প্রসংশা করতে হয় ওনাদের বাবা-মার । বাঙালিদের যৌনাঙ্গ যে সমাজে ক্রমশ রুগ্ন অথচ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে তা ছেলেমেয়েদের ডাক্তারি পড়াবার সময়েই আঁচ করে ফেলেছিলেন; ভবিষ্যৎদ্রষ্টা বলতে হবে । অত প্রেমের কোবতে লিখলে আর প্রেমের গান ভাঁজলে অঙ্গটা রুগ্ন হবেই, তা প্রেমিকের হোক বা প্রেমিকার হোক ।
–ওইদিকটায় গিয়েছিলুম, যেদিকে আইভিএফ বিভাগ । রিসেপশানিস্ট মেয়েটাকে চিনতে পারলুম, আমরা যখন বাগবাজারে থাকতুম তখন আমাদের ওপরের ফ্ল্যাটে থাকতেন দত্তগুপ্ত পরিবার, তাদেরই ছোটো মেয়ে অনিন্দিতা, ডাকনাম অনু। প্রতিবার আইভিএফ করতে কত টাকা লাগে জানো ? চোখ ছানাবড়া হয়ে যাবে।
–কত ?
–আড়াই লাখ টাকা মিনিমাম । তাও প্রথমবারেই যে সফল হবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই ।
–এসব আমাদের সময়ে থাকলে তুমি প্রতিবার ওভাম বেচে পঞ্চাশ হাজার রোজগার করতে পারতে ।
–ছিঃ, অন্য কার স্পার্মের সঙ্গে মেশাতো । ভাবলেও ঘেন্না করে ।
–তাতে কি ! আমিও স্পার্ম বেচতুম । কারোর ওভামের সঙ্গে মেশাতো ।
–আমার ওভামের কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে । আর তোমার দুর্বল স্পার্ম আর নেবে না ওরা ।
–হ্যাঁ, ডাক্তার নন্দিনী দেবরায় জানতে চাইছিলেন যে এখনও সেক্স লাইফে অ্যাকটিভ আছি কিনা ।
–তুমি কি বললে ?
–বললুম যে না, আর মগজ কাজ করে না । সবই তো মগজের ব্যাপার । তা উনি বললেন, ভালো, ওষুধ চালু করে দেবার পর স্পার্ম তো যেমন তৈরি হয় তেমন তৈরি হতে থাকবে, কিন্তু তার জেট-ফাংশানের জন্য যে ফ্লুইড দরকার তা ব্লক হয়ে যাবে, কেননা গ্ল্যাণ্ডটার কাজ রেসট্রিক্ট করে দেবে ওষুধটা ।
–সেরে গেলেই ভালো, অন্তত আর যাতে গ্রোথ না হয় । সবাই এমন ক্যানসারের ভয় দেখাল ।
–অনেকে লজ্জায় দেখায় না আর শেষে ক্যানসারে আক্রান্ত হয় । কী আর এমন, না হয় পোঁদে আঙুল করবে। সারা জীবন তো প্রতীকিভাবে কতজন যে কত কাজে বাগড়া দিয়ে আঙুল করেছে তার ইয়ত্তা নেই , এখনও করে চলেছে।
২.
সোমেন দত্ত সমস্যাটা টের পেয়েছিলেন ফ্রাংকফার্ট থেকে ফেরার পথে, ফ্লাইটে, পেচ্ছাপ পাওয়া সত্ত্বেও, কয়েকবার টয়লেটে গিয়েও পেচ্ছাপ হল না । ক্রিউরা সন্দেহের চোখে দেখছিল ওনার টয়লেট যাওয়া-আসা ; হয়তো দাড়ি আছে বলে সন্ত্রাসবাদী ভেবে বসে আছে ।
অমন বারবার টয়লেটে যাচ্ছেন দেখে জনৈকা এয়ারহোস্টেস জানতে চাইলেন যে কোনো কিছু কি ভুলে গেছেন । সোমেন দত্ত সরাসরিই বললেন যে না, হারায়নি কিছু, কিন্তু এর আগে এয়ার ট্র্যাভেল করার সময়ে তাঁর এই সমস্যা হয়নি যা এখন হচ্ছে ।
–কী সমস্যা ?
–পেচ্ছাপ হচ্ছে না ; বেশ জোরেই পেয়েছে, অথচ হচ্ছে না । কতক্ষণ দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করলুম তবু হল না।
–আপনি এক কাজ করুন । আরও কয়েক গ্লাস ঠান্ডা জল খেয়ে নিন । টয়লেটের কাছে এই সিটটা খালি আছে, এটায় বসুন । নিশ্চয়ই পাবে । টেনশান নেবেন না ।
ঠান্ডা জল খেয়ে কিছুক্ষণেই সোমেন দত্তর মনে হল যে এই বুঝি টপ-টপ করে আরম্ভ হয়ে গেল । আবার ঢুকলেন টয়লেটে । কিছুক্ষণ প্রয়াসের পর বেরিয়ে আসতে অন্য একজন এয়ার হোস্টেস বলল, কী স্যার, ইউরিনেট করতে পারলেন ?
–না, হল না ।
ওনার সমস্যা নিয়ে এয়ার হোস্টেসগুলো নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করেছে নাকি ! এই মেয়েটা কোথা থেকে জানতে পারল যে ওনার পেচ্ছাপ আটকে গেছে ।
মেয়েটি বলল, স্যার, আমার বাবারও একই সমস্যা, আপনি কমোডে বসুন, আমি এক গ্লাস ঠাণ্ডা জল দিচ্ছি, আপনি ঢালুন আর কিছুক্ষণ ওয়েট করুন, দেখুন হবে, জোর দেবেন না, রিল্যাক্সড হয়ে ইউরিন পাস করার চেষ্টা করুন ।
–জল কোথায় ঢালব ?
–কেন, যেখান দিয়ে ইউরিনেট করবেন, কুল ডাউন হলে দেখবেন আপনা থেকেই নেমে আসছে । আপনি টয়লেট ডোর লক করবেন না ।
লিঙ্গের ডগায় ঠাণ্ডা জল ঢেলে মিনিট পাঁচেক চোখ বুজে বসে রইলেন সোমেন দত্ত । হল । অনেকক্ষণ ধরে হল । আহ, কী আরাম । বাইরে বেরোতেই তিনজন এয়ার হোস্টেস তাঁর দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসির মাধ্যমে জানতে চাইলে সোমেন দত্ত তাদের ধন্যবাদ দিলেন সুপরামর্শের জন্য ।
–আপনি গিয়েই একজন ভালো ইউরোলজিস্টকে কনসাল্ট করবেন স্যার, বলল প্রথম এয়ার হোস্টেস ।
দ্বিতীয় এয়ারহোস্টেস বলল, আপনি ফ্লাইটে কয়েক পেগ হুইস্কি খেয়েছেন বলে সমস্যাটা দেখা দিয়ে থাকবে, ফ্লাইটে রক্তে অক্সিজেন কমে গিয়ে প্রবলেমটা হয়েছে । একজন ভালো ইউরোলজিস্টকে দেখাবেন, কোনো চিন্তার নেই ।
বিদেশিনী এয়ারহোস্টেসরা বেশ হেল্পফুল । ফ্রি অ্যান্ড ফ্র্যাংক । অবশ্য ইংরেজিতে কথাগুলো বলার সুবিধা আছে । বাংলায় হলে বলতে হতো ওইখানে জল ঢালুন , ওইখানে মানে কোনখানে, যেখান দিয়ে হিসি করেন ! হিসি বা পেচ্ছাপ কি বলতে পারতো বাংলায়, একজন যুবতী, ইতস্তত করত । নিজেকে মনে মনে বললেন সোমেন দত্ত।
পাড়ার অকিঞ্চন সান্যাল, যাঁর সঙ্গে প্রতি শনিবার হুইস্কি নিয়ে বসেন, তাঁকে জিগ্যেস করতে, তিনি বলেছিলেন, তাঁর তো এখনও সমস্যাটা দেখা দেয়নি । রাসবেহারিতে একজন ইউরোলজিস্টের বোর্ড দেখেছেন বটে, তার নাম ডক্টর নিতিন ধাবালিয়া । সোমেন দত্ত ধাবালিয়ার ফোন নম্বর ইনটারনেট ঘেঁটে যোগাড় করে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়েছিলেন । ধাবালিয়ার বিরাট ক্লিনিক, সিসিটিভি লাগানো, চেম্বারে বসে দেখতে পান কতজন রোগি অপেক্ষা করছে । রোগি বেশি হলে প্রত্যেককে তাড়াতাড়ি দেখে ছেড়ে দেন । সোমেন দত্ত যেদিন দেখাতে গিয়েছিলেন সেদিন অমনই ভিড় ছিল । ডক্টর ধাবালিয়া নাম জিগ্যেস করলেন, সমস্যা জিগ্যেস করলেন, তারপর বললেন পেচ্ছাপের ফ্লোচার্ট, রক্তের পিএসএ রিপোর্ট আর ক্যানসারাস গ্রোথ হয়েছে কিনা তার জন্য ডক্টর ব্যানার্জির কাছে রেফার করে দিয়েছিলেন ।
সোমেন দত্তর স্ত্রী ধাবালিয়ার চেম্বার থেকে বেরিয়েই বললেন, নিকুচি করেছে এই ডাক্তারের, আগেই ভয় পাইয়ে দিচ্ছে ক্যানসারের । সবকটা কমিশনখোর মিলে নেটওয়র্কিং করে রেখেছে ; আমিই বরং ভালো ইউরোলজিস্টের খোঁজ নিচ্ছি । মিসেস ঘোষ, যাঁর স্বামী এমবিবিএস ডাক্তার, সকাল-সন্ধে গরিব রোগিদের দেখেন, তাঁর কাছে খোঁজ নিয়ে সোমেন দত্তর স্ত্রী আইভিএফ সেন্টারের ঠিকানা আর ফোন নম্বর পেয়েছিলেন ।
–আরে, আইভিএফ করার ডাক্তারকে দেখিয়ে কী করব ? তুমিও আর ডাক্তার পেলে না । স্ত্রীকে বলেছিলেন সোমেন দত্ত ।
–এটা শুধু আইভিএফ সেন্টার নয় । এটা একটা হাসপাতাল । স্বামী আইভিএফ করেন, স্ত্রী ইউরোলজিস্ট আর ওনাদের ছেলে-বউ গাইনাকলোজিস্ট ।
–মহিলা ইউরোলজিস্ট !
–হ্যাঁ, বেশ নামকরা, ডক্টর নন্দিনী দেবরায় । আমি ডেট নিয়ে রেখেছি । একমাস পরে ডেট দিয়েছেন ।
–দিনের বেলা অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়েছ তো ? রাত্তিরে পথঘাট ঠিকিমতন দেখতে পাই না, গাড়ি চালাতে অসুবিধা হয় ।
–হ্যাঁ হ্যাঁ, পরের মাসে সাত তারিখে, সকাল দশটায় । এনার কাছে ধাবালিয়ার প্রসঙ্গ তোলার দরকার নেই, কী বল ?
–তা ঠিক ।
৩.
ডক্টর নন্দিনী দেবরায়ের হাসপাতালে দেখিয়ে পাশের আইভিএফ সেন্টারে সোনোগ্রাফির অ্যাপয়েন্টমেন্টের জন্য ঢুকে অপেক্ষারতাদের সোফায় বসে-থাকা একজন পোয়াতি যুবতীর মুখটা মনে হল পরিচিত । এই বয়সে স্মৃতি কাজ করে না । স্ত্রীকে জিগ্যেস করলেন। স্ত্রীও মনে করতে পারলেন না ।
বাড়ি ফিরে মনে পড়ল সোমেন দত্তর । ঠিক, মেয়েটার নাম মধুবন্তি বণিক, ওনার ছাত্রী ছিল , ইংরেজিতে সান্মানিক স্নাতক পড়ত, কোর্স পুরো না করেই উধাও হয়ে গিয়েছিল, প্রেমে পড়ে। যে যুবকের সঙ্গে উধাও হয়ে গিয়েছিল সে, অরিজিৎ কর, ছাত্রদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয় ছিল, বিপ্লবের কথা বলত, সমাজবদলের কথা বলত, কলেজের সামনে দিয়ে যে মিছিল যেত তাতেও যুবকটিকে দেখেছেন কয়েকবার, মুঠি উঠিয়ে স্লোগান দিতে-দিতে যাচ্ছে, সঙ্গে মধুবন্তি । ছেলেটি নিশ্চয়ই নেতৃস্হানীয়, সামনে-সামনে যাচ্ছে যখন, মনে হয়েছিল সোমেন দত্তর ।
তা তো সাত-আট বছর আগের কথা । মধুবন্তি বণিক আইভিএফ সেন্টারে কেন ? অনিরুদ্ধ করই বা কোথায় গেল । বিপ্লবের ঘুটি ওলোটপালোট হয়ে যাবার দরুণ কি ওদের দুজনের জীবনেও ওলোটপালোট ঘটে গেছে ! মধুবন্তি কি বিয়ে করেছিল অনিরুদ্ধ করকে ? বিয়ে করে ছেড়ে দিয়েছে ? নতুন বরের স্পার্ম থেকে বাচ্চা হবার সম্ভাবনা নেই ?
মধুবন্তি বণিকের বাবা ধনী ছিলেন, ব্যবসা আছে, কয়েকটা মল-এ দোকানও আছে ওনাদের কারখানার জিনিসের । আড়াই লাখ টাকা করতেই পারেন খরচ । একবার কেন কয়েকবার খরচ করতে পারেন । অনিরুদ্ধ কর গরিব পরিবারের ছেলে ছিল । সে কি আর বিপ্লব করে অত টাকা করতে পেরেছে ? অনেক বিপ্লবী অবশ্য নানা ফন্দিফিকির চালিয়ে অঢেল টাকা করে ফেলেছে — গাছ, মাছ, ঠিকেদারির পথে । অনিরুদ্ধও কি সেই পথে গেল শেষ পর্যন্ত ! মিছিলে-মিছিলে পুঁজিবাদ, আমেরিকা, সাম্রাজ্যবাদ, ওয়ালস্ট্রিট, কালো হাত, কায়েমি স্বার্থ, কত রকমের স্লোগান শোনা যেত ওর শিরা-ফোলানো গলায় ।
সোনোগ্রাফি করাতে গিয়েও বসে থাকতে হল বেশ কিছুক্ষণ, এক ঘণ্টার বেশি । প্রচুর জল খেয়ে সোমেন দত্তর হিসি পেয়ে গিয়েছিল বলে টয়লিটের দিকে পা বাড়িয়েছিলেন, রিসেপশানিস্ট মেয়েটি, অনিন্দিতা দত্তগুপ্ত বলল, আংকল যাবেন না যাবেন না, ব্লাডার ফাঁকা হয়ে গেলে চলবে না ।
–চেপা রাখা কঠিন হয়ে গেছে গো, বললেন সোমেন দত্ত ।
–আরেকটুক্ষণ আমাকে টাইম অ্যালাউ করুন, এর পরেই আপনাকে পাঠাবো, বলেছিল অনিন্দিতা ।
সোমেন দত্তর স্ত্রী সোনোগ্রাফি চেম্বারের দিকে নজর রেখেছিলেন । একজন পোয়াতি বউ বেরিয়ে আসতেই সোমেন দত্তকে ঠেলা দিয়ে বললেন, যাও যাও, বেরিয়েছে, নয়তো অন্য কাউকে পাঠিয়ে দেবে ।
সোমেন দত্ত সোনোগ্রাফির চেম্বারে ঢুকে দেখলেন, সেখানের ডাক্তারও মহিলা । এবার আর আন্ডারউইয়ার পরে আসেননি, জানতেন খুলতে বলবে, অহেতুক পরে এসো, আবার খোলো, এসব হ্যাঙ্গাম এড়াতে পরেননি । নিজেই ট্রাউজার খুলে শুয়ে পড়লেন । ডাক্তার তলপেটে আর পাশ ফিরিয়ে যন্ত্র চালিয়ে চলমান ফোটোতে দেখতে লাগলেন । হয়ে গেলে বললেন, যান ইউরিনেট করে আসুন, দাঁড়িয়ে নয়, কমোডে বসে, যতটা পারবেন ইউরিনেট করে নেবেন । টয়লেটে ঢুকে সোমেন দত্ত, ক্লিনিকের হাওয়াই চপ্পল পরে থাকা সত্ত্বেও, টের পেলেন যে পোয়াতিরা অনেকে কমোডেও বসতে পারেনি বলে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়েই সেরে ফেলেছে । পুরো ফ্লোর পেচ্ছাপে ভাসছে ।
আরেকবার সোনোগ্রাফি চেম্বারে ঢুকলে সোমেন দত্তর স্ত্রীও ঢুকেছিলেন । ডাক্তারকে জিগ্যেস করলেন, সব ঠিক আছে তো ? চিন্তার কিছু নেই তো ? ডাক্তার বললেন, এবিষয়ে ডক্টর নন্দিনী দেবরায় পরামর্শ দেবেন ।
সোমেন দত্ত আর ওনার স্ত্রী কাউন্টারে টাকা জমা করার সময়ে মধুবন্তি বণিককে দেখতে পেলেন, আইভিএফ সেন্টার থেকে বেরোচ্ছে, কোলে গোলগাল বাচ্চা, ফর্সা, ভালো দেখতে ।
–তুমি মধুবন্তি না ? জিগ্যেস করলেন সোমেন দত্ত ।
–হ্যাঁ, স্যার ; আপনি ভালো আছেন ?
–ভালো আর কই । ইউরোলজিস্ট নন্দিনী দেবরায়কে দেখাচ্ছি । তোমার বাচ্চাটা দেখতে-শুনতে বেশ ভালো হয়েছে । কি নাম রেখেছ ?
–ছেলে না মেয়ে । জানতে চাইলেন সোমেন দত্তর স্ত্রী ।
–থ্যাংকস স্যার । ছেলে মাসিমা । নাম রেখেছি অপূর্ব ।
–তা তুমি একা ? অরিজিৎকে দেখছি না । সে কোথায় ।
সোমেন দত্ত আর ওনার স্ত্রীকে স্তম্ভিত করে মধুবন্তি বলল, নরকে ।
দুজনেই ভুরু কুঁচকে রইলেন, ভ্যাবাচাকায় আক্রান্ত, এরপর প্রসঙ্গটা শেষ করবেন না অন্য প্রসঙ্গে যাবেন এমন দোটানা থেকে মধুবন্তিই ওনাদের মুক্তি দিল । বলল, বাচ্চাটা যদিও আমার, কিন্তু অনিরুদ্ধ এর বায়ালজিকাল বাবা নয়, এর বায়ালজিকাল বাবা যে কে তা আমিও জানি না, কেননা অপূর্ব আইভিএফ করে হয়েছে । অনিরুদ্ধ এর লিগাল বাবা ।
প্রসঙ্গটা গোলমেলে পথে চলে যাচ্ছে আঁচ করে সোমেন দত্ত বললেন, আচ্ছা চলি, অপূর্বকে ভালো করে মানুষ কোরো।
হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে গাড়িতে বসে সোমেন দত্তর স্ত্রী বললেন, স্পার্মের জৌলুশ না থাকা একদিক থেকে ভালো । বুড়ো বয়সে অনিরুদ্ধর পোঁদে কোনো ডাক্তার তো আর আঙুল করবে না ।

Posted in উংলি | Tagged , | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

লাবিয়ার মাকড়ি : মলয় রায়চৌধুরী

 

         চিনেবাদামের খোসার রঙের দশতলা আদালত-বাড়িটা  ঘন পাইন জঙ্গলের ভেতরে, যেখানে আসতে হলে সোঁদা গন্ধের সুড়ঙ্গ বেয়ে পায়ে হেঁটে আসতে হয়, হাজার হাজার লোক দুশো ছেচল্লিশ বছর যাবত এই পথে চলে চলে বর্ষার পরেও চোরকাঁটা গজাতে দেয় না, জঙ্গলের ভেতরে বলে পেশকার-মুহুরি আর উকিল-মক্কেলরা ক্লান্ত হয়ে গেলে,  শুকনো পাতার ওপর বসে কিংবা শুয়ে জিরিয়ে নেয়, ঝোপঝাড়ের সবুজ আড়ালে পুরুষরা দাঁড়িয়ে আর মহিলারা উবু হয়ে হিসি করে, হাগে, তার কারণ আদালতবাড়ির প্ল্যান অনুমোদন করার সময়ে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ, পায়খানা রাখাকে আইনের পক্ষে ক্ষতিকর মনে করে বাদ দিয়েছিলেন ।

জঙ্গলের ভেতরে অনেকে দল বেঁধে এলে টিফিন বাক্স খুলে মান্দ্রাজি  চাদর পেতে বাজরার রুটি আর বাকরখানি খিচুড়ির পিকনিকও করে নেয় । যে আসামীরা জেল হাজত থেকে আসে, তারা একের পেছনে আরেকজন হাঁটতে হাঁটতে যায়, পালাবার উপায় নেই, কেননা সবার কোমর দড়ি দিয়ে বাঁধা, হাতে হাতকড়া, সামনে একজন পুলিশের হাতে দড়ির এক দিক, পেছনের পুলিশের হাতে আরেক, পাহারা দেবার বন্দুকধারীরা পাশে-পাশে লেফ্ট-রাইট ।

এই আদালত বলতে যে বিচারালয় বোঝায় না তা জজ সাহেব নিজেই এজলাসে বসার সময় প্রতিদিন ব্যাখ্যা করে দিতেন । তিনি এও বুঝিয়ে দিতেন যে জেল বলতে কারাগার বোঝায় না । উনি বলেছিলেন, এগুলো সিস্টেমের অংশ, সার্বভৌম প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা প্রকাশের আধার, ব্যাস, মেনে নিতে হয়, মেনে নিতে হবে, জয়ো হে ।

আদালতে যাবার পথে কোমরে-কোমরে দড়ি-বাঁধা, হাতে হাতকড়া, তরুণ তরুণী যুবক যুবতী প্রৌঢ় প্রৌঢ়া বুড়ো বুড়ি সব রকমের মদ্দামাগি আসামীরা সার দিয়ে ট্যাগোর-রক সুরে বাঁধা এই গানটা গাইতে গাইতে যায়, গানটা অনেকটা অ্যাসিড রকের মতন :

“হা রে, রে রে, রে রে, আমায় জেলে পুরে, দে রে–

যেমন বন্ধ খাঁচার পাখি মনের আনন্দে রে ।

ঘন পাঁকের ধারা যেমন বাঁধন-হারা,

ডিজেল বাতাস যেমন আকাশ লুটে ফেরে ।

হা রে, রে রে, রে রে, আমায় জেলে পুরে দে রে —

দলদাসের নাচন যেমন সকল রাস্তা ঘেরে,

বংশ যেমন বেগে ঢোকে পিছন ফেড়ে,

অট্টহাস্যে সকল পাড়ার শান্তির বুক চেরে ।

হা রে, রে রে, রে রে, আমায় জেলে পুরে, দে রে…..”।

 

যখন আমি জামিনে ছাড়া পাইনি তখন আমিও অমনভাবে সকলের সঙ্গে সারি দিয়ে গলা ছেড়ে গাইতে গাইতে যেতুম । পাহারাদাররা সুরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের পোঁদে লাথি মারতে-মারতে যেতো, ডানদিকের পাহারাদার বাঁ পা দিয়ে আর বাঁ দিকের পাহারাদার ডান পা দিয়ে ।

লাথি খেতে-খেতে আমাদের গাইতে আরও ভালো লাগত, উৎসাহ পেতুম , তার কারণ এই অনুন্দ্যসুন্দর দেশে লাৎখোররাই সবচেয়ে বেশি আনন্দে থাকে, তাদের ভবিষ্যত স্হিতিস্হাপক হয়ে ওঠে ।

আমার মতন যারা জামিনে ছাড়া পেয়ে কেস লড়ছে, তারা বাসা থেকে বা হোটেল থেকে বা জ্ঞাতির বাড়ি থেকে হাঁটতে হাঁটতে পোঁছোয়, উকিল মুহুরি মোক্তার জজ কেরানিদের সঙ্গে পাশাপাশি ।

কাঠিকাবাব আর শোনপাপড়ির দোকানদাররা আদালত চত্বরেই বউ-বাচ্চা নিয়ে থাকে, তাদের ভুঁড়ি-ফোলা বাচ্চারা কেমন করে স্কুলে বা কলেজে পড়তে যায় জানি না । কে জানে, হয়তো বড়ো হয়ে তারাও কাঠিকাবাব আর শোনপাপড়ির দোকানদারি বা মুহুরিগিরি করবে বলে স্কুলে যাওয়া দরকার মনে করে না।

জংলি ঝোপঝাড়ের বদান্যতা, আর ফেলে ছড়ানো ঢ্যাঙা গাছে, সব্জেটে অন্ধকারে জঙ্গলটা ঠাণ্ডা হলেও, গথিক ঢঙের আদালতবাড়িটা বেশ গরম, শীতকালেও বিশেষ হেরফের হয় না । প্রতিষ্ঠানের মালিকরা ভেবেছিল শহর থেকে দূরে জঙ্গলের ভেতরে হলে শহরের ভোঁচকানি তিকড়মবাজি আদালতে এসে পৌঁছোবে না । কিন্তু সে ভাবনার পোঁদে হুড়কো দিয়ে শহর ঠিক পৌঁছে গেছে তার নচ্ছারমো নিয়ে । মাকড়সাদের না মেরে শুধু তাদের জাল আর ঝুল ঝাড়ার ঠিকে দেয়া হয় এক নম্বর পিন্ডিকেটকে ; আরশোলাদের না মেরে কেবল মশা তাড়াবার ঠিকে দেয়া হয় দুই নম্বর পিন্ডিকেটকে ; পানের পিক বাঁচিয়ে চুনকাম করার ঠিকে দেয়া হয় তিন নম্বর পিন্ডিকেটকে ; ছারপোকাদের বাঁচিয়ে আসবাব পালিশের ঠিকে দেয়া হয় চার নম্বর পিন্ডিকেটকে ; পাঁচ ছয় সাত আট নয় দশ কতোগুলো যে পিণ্ডিকেট আছে তার ঠিকঠিকানা নেই ।

প্রতিষ্ঠান আদমসুমারি করে দেখেছে যে যারা আদালতবাড়িতে আসে তাদের শতকরা নিরানব্বুই জন দুঃস্বপ্ন দেখতে ভালোবাসে ; আর, কে না জানে, পিণ্ডিকেটের সাহায্য  না পেলে দুঃস্বপ্ন গড়া সম্ভব নয়।

প্রতিষ্ঠানের চেয়ে কড়া মাদক আর নেই ; অভ্যাস, লোভ আর নেশায় আকাশের দিকে পোঁদ করে সাষ্টাঙ্গ হয়ে যায় অমন নেশাখোররা। ডারউইন নামে একজন সাহেব নাকি ওনার ‘অরিজিন অফ টার্নকোটস’ গ্রন্হে লিখে গেছেন যে অমন নেশায় বাঁদরদের লাল পোঁদও রাতারাতি হলুদ নীল সবুজ কমলা বেগুনী হয়ে যাবার সম্ভাবনা থাকে ।

         আদালতের নয়তলায় নয় নম্বর এজলাসের গুমোট গরম, বেঞ্চে ছারপোকার চামড়া-চাটা হুল, দেয়ালে বারোয়ারি পিকের থুতুর সাতবাস্টে দরানি, বদবুদার ঘামের চটচটে হলকায়, যখন আমার মামলা চলছিল, সপ্তাহে পনেরো মিনেটে মুখে-তাম্বাকু উকিল দাঁড়িয়ে কিছু বললে, আবার পরের সপ্তাহে দশ মিনিট  কুঁজোকেল্টে কেউ গলাখাঁকারি-সাক্ষ্য দিলে, ঢিকিয়ে-ঢিকিয়ে এই ভাবে চলছিল, ক্ষয়াটে সিঁড়ি পাকিয়ে একবার ওপরে, আবার হুড়হুড়ে ভিড়ের ঠেলায়, পাক খুলে নিচের তলায়, তখন আরও অনেক বিচারাধীনের মামলার মারপ্যাঁচ শুনতুম আর ভাব করার চেষ্টা করতুম, বিশেষ করে যারা খুন করে জামিনে রয়েছে, তাদের সঙ্গে ; কেউ পাত্তা দিত না, কেননা আমার মোটর সাইকেল চুরির মামলাটা ওদের ওজনদাঁড়িতে ছিল খবরের কাগজ কিনিয়েদের ওজনমারার মতন ছিঁচকান্তি।

তবু বিশেষ একজনের মামলার ডেট পড়লে, পেছন থেকে যার অন্যমনস্ক হাঁটা দেখলে ঘুষঘুষে জ্বর এসে যায়,  আমি তার শুনানিতে পৌঁছে কান পাততুম পক্ষে-বিপক্ষে কিরকম বেলাগাম তক্কাতক্কি চলছে, এতই প্যাঁচানো ছিল তার কেস, আর সেই তক্কে খুনের দায়ে মামলাটা যে লড়ছে তার সঙ্গে আলাপ হয়ে গেল, প্রথমদিকে ভয়ে-ভয়ে, কেননা খুনি যখন খুনি, একটু শ্রদ্ধা তো তাকে করতেই হবে, আমি যা কোনোকালে পারব না তা সে করে ময়ুরকন্ঠী গলা উঁচিয়ে, বুক ফুলিয়ে, খোঁপার বাঁধন নামিয়ে, আদালত চত্বরে ঢেউ তুলেছে ।

সমাজের ভেতরে-বাইরে খুনিরা সবচেয়ে বেশি শ্রদ্ধার পাত্র বা পাত্রী, অন্য আসামীরা তার তলায় । আমি ছিলুম সবচেয়ে তলার পাদানিতে, ফেকলু মোটর সাইকেল লিফটার । উকিলকে বলেছিলুম, যে বারবার মোটর সাইকেল না বলে বাইক বলুন না, তা উনি বললেন বাইক বললে লোকে ভাববে সাইকেল ।

সরকারি উকিল, চাকরিতে ঢোকার সময়ে যে কালোকোট ছিল তাইতেই চালিয়ে যাচ্ছে, আমার কেস উঠলেই, আমার দিকে হাড়গিলে আঙুল তুলে বলত, বাংলা ভাষাসাহিত্যে স্নাতকোত্তর মোটর সাইকেল রেপিস্ট, তার কারণ নতুন মোটর সাইকেল দেখলে নিজেকে আজও সামলাতে পারি না, মনে হয় লিফ্ট করে নিয়ে পালাই, আর উড়িয়ে রেপ করি, কোনোটা লাল, কোনোটা হলুদ, কোনোটা ঝকঝকে কালো, দেখলেই মাঝরাতের কুয়াশায় তুলে নিয়ে ছুটিয়ে বেড়াই দূর দূর হাইওয়ের ওপর । কিন্তু একসময়ে, রাতকয়েকে মন ভরে গেলে, কিংবা আরও চিকনতনু মোটর সাইকেল দেখতে পেলে, যেখান থেকে তুলে নিয়ে গিয়েছিলুম, তার কাছাকাছি রেখে দিয়ে কেটে পড়ি ।

জজ সাহেব আমার কাছে জানতে চেয়েছিলেন যে আসল রহস্যটা কী ।

আমি সহজ উত্তর দিয়েছিলুম, যে, জগতসংসারের কাণ্ডজ্ঞানহীনতার দমক আর যুক্তিপূর্ণ জীবনের চাহিদার টানাপোড়েনের বিকৃত ভারসাম্যের টাল সামলাবার জন্যে আমাকে নতুন-নতুন মোটর সাইকেল চুরি করে চার-পাঁচ শো কিলোমিটার চালাতেই হয়, এছাড়া এই নির্মম পৃথিবীর প্রতি অনুশোচনাহীন রোষ, আর মানুষে-মানুষে সম্পর্কের প্রতি অবিশ্বাস প্রকাশের উপায় জানি না ; নান্দনিক বিশুদ্ধতা অর্জনের জন্য ভার্জিন মোটর সাইকেল চাপতেই হয় আমাকে, নইলে নিজের ছেৎরানো আত্মপরিচয়কে সামলাতে পারা অসম্ভব হয়ে উঠবে।

জজ জানতে চেয়েছিলেন, কোন ব্র্যাণ্ডের জাঙিয়া পরে চালান ?

আমি যা সত্যি তাই বলেছিলুম, মি লর্ড, আমি সারা জীবনে কখনও জাঙিয়া পরিনি, এখন এই যে আদালতে দাঁড়িয়ে আছি, কোনো আণ্ডারওয়্যার নেই ; মনে-রাখা-অভিজ্ঞতাকে নষ্ট করে দ্যায় আণ্ডারওয়্যার।

জজ বলেছিলেন, এ হল নৈরাত্মসিদ্ধিরর প্রকোপ, মেশিন আপনার মগজকে মিউটিলেট করে দিয়েছে ; সে কারণেই আপনি ভার্জিন মোটর সাইকেলে চেপে গর্ববোধ করেন, মগজ অসুস্হ হলে মানুষের শরীর চাঙ্গা হয়ে ওঠে, যতো কলঙ্ক ততো বিহ্বলতার অসুস্হতা আপনার মগজকে পেয়ে বসে ; প্রেম, মানুষ পশু বা যন্ত্র, যার সঙ্গেই হোক, তা এক আতঙ্কদায়ী অনুভব ।

আমি বলেছিলুম, আপনি যথার্থ বলেছেন হুজুর, যে সব লোকেরা নিজেদের সঠিক জন্মদিন জানে তাদের সম্পর্কে আমার ঘেন্না হয়, মোটর সাইকেল তো কবে জন্মায় কেউই জানতে পারে না, অথচ দেখুন হুজুর, তার জন্মদিনের নথি তৈরি হয় বিক্রির দিন ।

জজ বলেছিলেন, হুম । সমাজকে বাধ্য হয়ে আপনার মতন নিহিলিস্ট, অ্যানার্কিস্ট আর দিবাস্বপ্নদ্রষ্টাদের প্রশ্রয় দিতে হবে, নয়তো এই সমাজের অবসান থামানো যাবে না  । তারপর জজ সাহেব জানতে চেয়েছিলেন, নারীদের অপছন্দ করেন কেন?

যা সত্যি তাই বলেছিলুম আমি, পোশাক খুললেই ম্যানেক্যুইন বেরিয়ে পড়ার ভয়ে, মি লর্ড ; আর তাছাড়া, স্ত্রীলোকদের গোপনাঙ্গকে বড়ো গ্রটেস্ক স্থাপত্যের ব্যাপার মনে হয় । শোবার ঘরের চারটে দেয়ালে যদি আয়না লাগানো থাকে তাহলে প্রেমকর্মকে কি হাস্যকর মনে হবে না ? বলুন আপনি !

বুড়ো জজ, কাঁচাপাকা না-আঁচড়ানো চুল, নাকে ঝোলানো চশমা, আমাকে, যেহেতু একশো বছর পর কুড়ি টাকার নোট লুপ্ত হয়ে যাবে, কুড়ি টাকা জরিমানা করেছিলেন, আর সাবধান করে দিয়েছিলেন যাতে ভবিষ্যতে এরকম কাজ প্রমাণসাপেক্ষে না করি, উপদেশ দিয়েছিলেন, বাংলা ভাষাসাহিত্যে স্নাতকোত্তর হলেও, আমি যদি ইংরেজিতেও স্নাতকোত্তরটা করে নিই, তাহলে বুকার প্রাইজের যোগ্য ‘বাইসাইকেল রেপিস্টস সিকরেট লাইফ’ নামে একখানা বেস্ট সেলার লিখতে পারব ; জজসাহেবও জানেন যে বাংলার বেস্ট সেলার লিস্টটা চারশো বিশ, সে কথা উনি ওনার রায়ে লিখেছেনও ।

পুলিশের যে দুজন সাক্ষ্য দিয়েছিল, আমার বিরুদ্ধে, তারা কখন যে শোরুমের পাশের দেয়ালে  যখন দাঁড়িয়ে পেচ্ছাপ করছিলুম, সে সময়ে, আড়চোখে মোটর সাইকেল দেখতে থাকা আমার ফোটো তুলে নিয়েছিল, ক্লিক শব্দ শুনেও,  জানতেও পারিনি । সাক্ষ্য দেবার সময়ে তারা বলেছিল, আমি নাকি জেলহাজতে কুন্দনলাল সাইগল গাইতুম ।

রায় দেবার পরে জজসাহেব জানতে চেয়েছিলেন, ভোট দিই কিনা ।

আমি সত্যি কথাটাই বলেছিলুম, যে স্যার, ভোট ব্যাপারটা তো বুমেরাং, তাই ভয়ে দিই না, মানবতার মতন চালাকি আর নেই ।

নাকের একটা চুল উপড়ে জজ সাহেব বলেছিলেন, ভালো নির্ণয়, আমিও তাই মনে করি । আদর্শের ভেতরে যতো তাড়াতাড়ি ম্যাগট জন্মায় ততো তাড়াতাড়ি ডাস্টবিনের পচা কুকুরের শবেও জন্মায় না। আমাদের মনে রাখতে হবে যে মানুষ তত্ব ফাঁদে কোনো-না-কোনো পরাজয় বা অসফলতাকে ব্যাখ্যা করার জন্যে ।

আমি বলেছিলুম, জি হুজুর, কম বয়সে যা লাল সেলাম ছিল তা বুড়ো বয়সে ফোকলা দাঁতে ঘোলাটে চোখে অ্যাঁড় খেলাম হয়ে গেছে।

জজ জিগ্যেস করেছিলেন, বিদেশ ভ্রমণ করেছেন ।

বলেছিলুম, হ্যাঁ স্যার, কিন্তু মোটর সাইকেলে নয়, হাওয়াই জাহাজে করে ।

বিশেষ কোনো অভিজ্ঞতা হয়েছে ? কানে কড়ে আঙুল ঢুকিয়ে আরামের পরশ দিতে-দিতে জজ সাহেব জানতে চেয়েছিলেন ।

যা সত্যি আমি তা-ই বলেছিলুম, দিশি পায়খানায় বসে জলে ছোঁচাবার অভ্যাস থাকায়, বিদেশে গিয়ে টয়লেট পেপার ব্যবহারের দরুণ, টাইমস স্কোয়ারে রঙ-করা মাই-খোলা মেমদের সঙ্গে ফোটো তোলাবার সময়েও হাসি মুখ করতে পারতুম না, সব সময় মনে হতো পোঁদে গু লেগে আছে ।

জজ সাহেব বলেছিলেন যে উনি  ব্যারিস্টারের পরিবারের বলে ছোটোবেলা থেকে কমোডে বসে টয়লেট পেপার প্রয়োগ করে হেগে চলেছেন, এমনকি প্রতিদিন রায় দেবার সময়েও উনি নিজের পশ্চাদ্দেশ সম্পর্কে চিন্তা করেন না ; তবে এর পর টাইমস স্কোয়ারে গেলে রঙ-করা উন্মুক্ত-স্তন মেমদের সঙ্গে অবশ্যই ফোটো তোলাবেন ।

আসলে যে টিভিতে জাপানি তেল, বুলেট তেল আর হনুমানের মালা বিক্রি করে তারাই মোটর সাইকেল ধর্ষক লিখে লিখে আমার কেসটাকে গুবলেট করে দিয়েছিল, ওদের কাগজেই রসিয়ে রসিয়ে লিখত, পাবলিক পড়ে নিজেদের টাকে হাত বুলিয়ে ভাবত, এ শালা মোটর সাইকেলকে কেমন করে রেপ করে, নাকি ছুটন্ত মোটর সাইকেলের ওপর কোনো মেয়েমানুষকে চিৎ করে শুইয়ে রেপ করতে করতে গাড়ি ওড়ায় । ওদের সাংবাদিক আমায় জিগ্যেস করেছিল যে মেয়েদের দিকে তাকালে আমার যৌনতার উদ্রেক হয়, নাকি মোটর সাইকেলের দিকে তাকালে ।

আমি সত্যি কথাটাই বলেছিলুম ওনাদের যে, ধোয়া সত্য, লালচে তুলসী পাতায়, নতুন ঝকঝকে মোটর সাইকেল দেখলে আমার লিঙ্গোথ্থান হয়, কিন্তু কোনো যুবতী আমাকে জড়িয়ে চুমুখেলেও আমার দেহে কোনো প্রতিক্রিয়া হয় না ; মনে হয় পাঁঠার মাংসের কার্টিলেজ চুষছি, আমি মেয়েদের স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে সিটি বাজাইনি কখনও, শোরুমের সামনে দাঁড়িয়ে নতুন মোটর সাইকেলের দিকে ঠায় তাকিয়ে হুইসল দিয়ে গান করি ।

জজসাহেব, কানের ঝুলঝুলে লতিতে পাকাচুল, ভুরুতে পাকাচুল, ঝাবড়া গোঁফের চুলও পেকে ঝুলে পড়েছে, আমার মামলার যে আদেশপত্র লিখেছেন, লিখতেও মাস দুয়েক সময় নিয়েছিলেন, তার সঙ্গে আমার মামলার যে কী সম্পর্ক বুঝতে পারিনি বলে আমার রাশভারি উকিল চটে গিয়েছিলেন । উনি বলেছিলেন, মহাশয়, আপনি যদি কাউকে বুঝতে না পারেন তাহলে সেটা আপনার চরিত্রদোষ ।

জজ সাহেব লিখেছেন, “মোটর সাইকেল বহু ভাষায় স্ত্রীলিঙ্গ, আসামী মোটর সাইকেল চুরি করেননি, তার কারণ ধারা তেইশের বারো বি অনুযায়ী, কোনো মহিলাকে চুরি করা যায় না, কিডন্যাপ করা যায়, আসামী কাউকে কিডন্যাপ করেননি, কোনো ক্ষতি করেননি, যেমন চুরি করেছেন তেমনই বিনা আঁচড়ে ফেরত দিয়েছেন, যদিও চুরি করা মহাপাপ নয়, কিঞ্চিদধিক পূণ্য-মিশ্রিত পাপ, তাই মোটর সাইকেলে চাপা পাপ নয়, আদি মানব সমাজে পাপ নামে কিছুই ছিল না, থাকার কারণ নেই, তখন মোটর সাইকেল ছিল না, আদি মানবীদের আমরা মহিলা বলি না, মহিলা বা তরুণী বললে, কিডন্যাপের প্রশ্ন উঠবে, তখনকার দিনে মাতৃতান্ত্রিক ব্যবস্হা ছিল, পুরুষদের সিডিউস করার প্রথা ছিল, মোটর সাইকেলকে সিডিউস করা সম্ভব নয়, যদিও বহু মোটর সাইকেলের বিজ্ঞাপনে প্রায় ল্যাংটো মেয়েমানুষের শরীর ব্যবহার করা হয়ে থাকে ; ধারা একচল্লিশের উপধারা তিন অনুযায়ী বিজ্ঞাপনে নগ্ন নারীর ব্যবহার নিষিদ্ধ নয়, সেহেতু আসামীকে নগ্ন নারী বিজ্ঞাপনে ব্যবহারের জন্য দায়ি করা চলে না, আসামী জাঙিয়া পরে মোটর সাইকেলে চাপেন না, সমাজের উন্নতির জন্য প্রত্যেক নারী-পুরুষের উচিত জাঙিয়া না পরা । একথা ঠিক যে মোটর সাইকেলেও ছিদ্র থাকে যার ভিতরে পেটরল নামের ধাতুরস ফেললে তা উত্তেজিত হয়, এবং কেবল সেকারণেই তাকে নারীছিদ্রের সঙ্গে তুলনা করা যায় না । নারীছিদ্রে পৌরুষের পেট্রল ফেললেই যে তা উত্তেজিত হয়ে উঠবে, তার প্রমাণ নেই । পুরুষ হলেই যে তার পৌরুষ থাকবে তা অকাট্য নয় । যাহা হউক, আসামী যেহেতু আসামী, এবং টাকার দাম বিশ্ববাজারে পড়ে যাচ্ছে, আসামীকে কেবল পড়ে যাওয়া টাকায় দণ্ডাজ্ঞা দেয়া হল । আমাদের মনে রাখতে হবে যে টাকার কোনো লিঙ্গ হয় না, তা হেটেরোসেকসুয়ালও নয় এবং হোমোসেকসুয়ালও নয় ।”[১]

যাক, সিঁড়ির পাকে ঠ্যাঙ পাকিয়ে আর খুলে, আমার মামলাটা চুকেছে, কিন্তু আদালতে আমি চান করে চুল আঁচড়ে একগাল ভাত খেয়ে, নতুন ধুতি-শার্ট পরে, নিয়ম করে আসি, খুনি ময়ূরকন্ঠীর মামলার চাপানওতোর শুনতে ।

         খুনিকে বউ বলব না তরুণী না যুবতী না মহিলা বুঝতে পারতুম না, কেননা বুক দেখে না পাছা দেখে না কোমর দেখে না মাথার চুল দেখে কেমন করে যে ঠাহর করতে হয় তা তখন জানতাম না,কিন্তু তার সঙ্গে, পারস্পরিক ক্লান্তির কারণে ভাব হয়ে গিয়েছিল, উকিল মক্কেল ফরিয়াদি বাদি আসামীদের তেলচিটে জমঘটে যৎসামান্য পোঁদ রাখার মতন  তো আর জায়গা থাকত না, আমরা গিয়ে আদালতের গুটকা ছেটানো জংধরা আধঝোলা লোহার গেটের সামনে ইঁটের দাঁত বেরোনো আদালতভোগান্তি পাবলিকের ছিরিচরণ ঠ্যাঙানো ফুটপাতে বসে গ্যাঁজাতুম, প্রথম-প্রথম ছোঁয়া বাঁচিয়ে, ওই যে, ভাটাম গাছটার তলায়, পানের দোকানের ডান দিকে, গাছের ঝগড়ুটে কাকেদের গু ফেলার এলাকার বাইরে। মেয়েটা বেশ ঢ্যাঙা, চোখ দুটো এতই বড়ো যে সরাসরি তাকালে, খুনির চোখ যখন, তখন বিঁধবেই,  বুকের ভেতরে সেঁদিয়ে চোখ দুটো আমার সারা শরীর ছানবিন করে বেরিয়ে আসতো গলার কাছে, টের পেতুম ।

ময়ূরকন্ঠীর কোনো মুখোশ নেই, আনন্দেরও নেই, দুঃখেরও নেই, নয়তো আদালতে যারা একতলা থেকে নয় তলা, উকিলদের ঘরে গোমড়া মুখে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে থাকে, পেশকারদের আড্ডায় হাই তোলে, কোর্টপেপারের লাইনে আড়মোড়া ভাঙে, তাদের চুপসে মুখের দিকে তাকালেই টের পাওয়া যায়, এককালে আনন্দের অসুখে ভুগেছিল, এখন দুঃখের পোঁচড়ে খানিক ঝুলে আছে, লুকিয়ে রেখেছে যে যার নুনের ছিটে ।

ময়ূরকন্ঠীর কথা শুনে-শুনে আমি ওর মনের অশান্তির ঝড়ঝাপটা টের পাচ্ছিলুম, যা চলে গেছে আর যা চলছে, বাস্তব কিংবা ফেনানো, কোনটা আগে কোনটা পরে তা যদিও বুঝতে পারছিলুম না, তরতরিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল আমার সামনে ছবি এঁকে-এঁকে, কন্ঠস্বর যেন জানে সে কি ঘটিয়ে ফেলেছে, যাতে সারল্য সম্পর্কে সন্দেহ গড়ে ওঠে ।

একদিন হঠাৎই ময়ূরকন্ঠী বলেছিল, প্রেম জিনিসটা স্হূল, অশিষ্ট, রূঢ়, বর্বর, অমার্জিত ; মানুষকে ভালোমন্দজ্ঞানশূন্য করে তোলে, বিচারবুদ্ধিহীন ফানুসে পালটে দ্যায় ; কাউকে যতো বেশি ভালোবাসবে তার প্রতি ততো রূঢ়, বর্বর, অশিষ্ট, অমার্জিত, হতে হবে তোমায় ; তুমি যখন কারোকে ফাকিং করবে তখন তোমায় নিজের যন্ত্রণাবোধকে, যার সঙ্গে সঙ্গম করছ তার যন্ত্রণাবোধের সঙ্গে মিশিয়ে অনুভব করতে হবে । একজনের সঙ্গে যদি প্রতিদিন সঙ্গম করো তাহলে প্রেম লোপাট হয়ে যাবে ; মগজ তো হিসাব রাখে, ক্যালেণ্ডারে টিক দ্যায় । একথাও মনে রাখতে হবে যে প্রেমে লাৎ না খেলে প্রেম সম্পর্কে প্রকৃত উপলব্ধি হয় না, কেননা প্রেমের নিষ্ঠুর নোংরা বুনো ধ্বংসাত্মক নিহিলিজমের আরাম উপভোগ করার পরেই প্রেম সম্পর্কে সঠিক ধারণা গড়ে ওঠে ।

জবাবে আমি বলেছিলুম, আমি তো নতুন মোটর সাইকেল ছাড়া আর কারোর সঙ্গে কখনও প্রেম করিনি, তাই হয়তো ঝাড়পোঁছ করে ফেরত রেখে এসেছি ; একে আরেকজনকে পণ্ড করিনি, প্রেমিক-প্রেমিকাদের মতন ।

        আমার মামলার ডেট না থাকলেও ওর যদি ডেট থাকতো, পৌঁছে যেতুম ওর এজলাসে, হাত তুলে অপেক্ষা করার ইশারা করলেও, আর দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে ওর মামলার প্যাঁচগুলো শুনতে থাকলেও, বুঝতে পারতুম না যে কেন ও খুন করেছে, নাকি করিয়েছে, বেশ কয়েকজনকে, আর কোনো সাক্ষী নেই যে বলবে  খুনের জন্যে ময়ূরকন্ঠীই দায়ি । পুলিশ যে দুটো লোককে থার্ড ডিগ্রি দিয়ে সাক্ষীর কাঠগড়ায় তুলেছিল তারা ঘাবড়ে গিয়ে বেমালুম বলে দিয়েছে যে মেয়েটাকে তারা চেনে না, দেখেনি কখনও। ভালো দেখতে এরকম একজন যুবতী কী করে আর কেন যে খুনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ল হদিশ পেতুম না । সত্যিই খুন করেছে, নাকি নিজের সম্পর্কে গল্প বানিয়ে আসামীত্বের আনন্দ নিচ্ছে, তা্‌ও সন্দেহ হতো আমার ।

আমি ওকে ওর নাম জিগ্যেস করেছিলুম, বলতে চায়নি, আদালতে পেশকার কেস নম্বরের লোক হাজির কিনা চেঁচায়, যেমন আমার মামলায়, আমার নাম উঠতোই না কখনও, পেশকার কেস নম্বর হাঁকতো। যখন আমরা ফুটপাথে বসা আরম্ভ করলুম, ছোঁয়াছুঁয়ির দূরত্ব কমে এলো, মেয়েটি বললে, ঠিক আছে, আমি তোমাকে ৬১৪ বলে ডাকবো আর তুমি আমাকে ৩৯০ বলে ডেকো, যেমনটা আমাদের কেস নম্বর । প্রস্তাবে সঙ্গে-সঙ্গে ঘাড় নাড়িয়ে সায় দিয়েছিলুম মনে আছে, আমার দরকচা বয়সে নম্বরদার খুনি বন্ধুনী পাওয়া চোদ্দোপুরুষের ভাগ্য, তাও এরকম চুলবুলে তরতাজা স্তন ফোলানো, খোঁপা নামানো, পিঠে বাংলা আঁচল-ফেলা মেয়ে, কোনো কোনো দিন ডেনিম জিনসে, পায়ে রঙিন কেডস, হাতে প্লাসটিকের বালা । খুনি মেয়ের স্টাইল স্টেটমেন্ট বেশ ভালো লাগত, দিল খুশ করে দিত ।

একদিন আমি বলেই ফেললুম, যেদিন ও লাল ফুলের চুড়িদার পরে এসেছিল, তোমার মামলার কিছুই তো বুঝতে পারলুম না, তোমার বিরুদ্ধে শুনছি প্রমাণ নেই, তবু তোমায় গ্রেপ্তার করা হল, পুলিশ হাজতে ছিলে, তারপর জেল হাজতে ছিলে কতো দিন, আর এখন দু বছর যাবত মামলা চলছে । হেসে বলেছিল, যেন স্কুলের বন্ধুদের সঙ্গে অশ্লীল জোকস শেয়ার করছে, সব জানতে পারবে একদিন, আমি এটা নিয়ে একটা লেখা জড়ো করেছি, কয়েকজনের লেখা,  সেই কাগজগুলো তোমায় দিয়ে যাবো, তুমি সাজিয়ে নিও ।

যেদিন ওর দশ বছরের জেল হয়ে গেল, সেদিন আমাকে একটা প্লাসটিকের ব্যাগ আর সোনার গয়নার ডিবে দিয়ে বললে, এতে আছে কাগজগুলো, আর সোনার ডিবেতে আছে মুক্তোর মাকড়ি । ডিবে খুলে দেখলুম তিনটে মাকড়ি । আমার কোঁচকানো ভুরুর দিকে তাকিয়ে ময়ূরকন্ঠী বলেছিল, তিনটে মাকড়ি কেন জানতে চাইছ তো, লেখা আছে, তিনটেই করিয়ে ছিলাম অর্ডার দিয়ে ।

জজ সাহেব ময়ূরকন্ঠীর রায়ে যা লিখেছেন, তাও যে বড়ো একটা বুঝতে পেরেছি, তার দাবি করব না।

দণ্ডাদেশ দেবার সময়ে অপারেটিভ প্যারায় উনি লিখেছেন, “যাকে বা যাদের খুন আপনি করেছেন, সে বা তারা তখনই আপনার ভেতরে ঢুকে পড়েছে, আর সারাজীবন থাকবে, সাজা শেষ হবার পরও থাকবে, আপনি তাকে বা তাদের নিজের ভেতরে বইতে-বইতে অনাথ হয়ে যাবেন । এটা ঠিক যে বাজে লোকেদের সঙ্গে মিশলে জ্ঞান বাড়ে, আপনাকে সেই সমস্ত মানুষই ঘিরে থেকেছে শৈশব থেকে । ইস্কুল মাস্টার টাইপের ভালোমানুষরা বড্ডো পানসে, অভিজ্ঞতাহীন, তা আপনি জানেন । শুধু টাকা রোজগার করে কেউ সারভাইভ করে না, তাই খুন চুরি ডাকাতি রাহাজানি লুটপাট গুণ্ডামি মারপিট ইত্যাদির মাধ্যমে সমাজের মিথ্যা জোচ্চুরি ছলনা প্রতারণা  অসাধুতা ভণ্ডামিকে প্রতিরোধের পথ হিসাবে এই সমস্ত কাজ জরুরি হয়ে ওঠে, নইলে তো সারা জীবন বমি করতে করতে কেটে যাবে ; আপনার তো বটেই, সকল অপরাধীরই, বোধ ব্যাপারটা আংশিক, গানের সুরের মতন তা কোনো একটি লাইন ধরে এগোয় না । হত্যা করা মোটেই হিংস্রতার প্রকাশ নয় । আপনি জানতেন যে যা করবেন মন দিয়ে করবেন, ফলাফলের জন্য ভাবতে গেলে সব গুবলেট হয়ে যাবে, কেঁচে যাবে । একথা সত্য যে, সব সুড়ঙ্গের শেষে আলো থাকলেও সে আলো সকলের ভাগ্যে জোটে না ; লক্ষ শুক্রাণুর মধ্যে একটিই কেবল ডিম্বাণুর আলো পায় । একথাও সত্য যে এক-এক সময়ে বেঁচে থাকা অসহ্য হয়ে ওঠে, আর কিছুকাল পর তা ভালো লাগতে আরম্ভ করে, অসহ্যের নেশা হয়ে যায় । আপনার বিরুদ্ধে খুনের প্রমাণ অকাট্য নয়, আনুষঙ্গিক,  এবং আপনি একজন আসামী । আসামী মাত্রেই সাজার পাত্র । অপরাধী-সমাজে খুন যেহেতু সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় বলে পরিগণিত, তাই ধারা একশো সাঁইত্রিশের উপধারা সাত অনুযায়ী আমি আপনাকে শ্রমবর্জিত কারাদণ্ড দিচ্ছি । দণ্ডভোগের জন্য আপনি বেনারসি কটকি মুর্শিদাবাদি বালুচরি যেমন শাড়ি ইচ্ছা পরতে পারেন, আরামকেদারায় বসে সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত দেখতে পারেন ।”[২]

পাঁচজন আসামীকে জজ সাহেব ফাঁসির হুকুম দিয়েছিলেন, মনে আছে, তারা সবাই দলীয় পতাকাকে লুঙ্গির মতন করে পরে একজন পোয়াতি বউকে ধর্ষণ করে খুন করেছিল । জজ সাহেব রায়ে লিখেছিলেন, “মানুষ একদিন মরে যাবে বলেই বেঁচে থাকে, এবং মরে যাবার পর চিতায় ওঠাই ভালো, কেননা তাহলে কাউকে আপনাদের পঁচাশি কুইন্টালের স্মৃতি বইতে হবে না । ফাঁসির মঞ্চে আপনাদের মুখে লিউকোপআস্ট লাগিয়ে দুপুর বারোটায় আধঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রাখা হবে, তার কারণ হল আপনারা ধর্ষণ ও হত্যাকে জীবনের উদ্দেশ্য করে তুলেছেন, অন্তত উদ্দেশ্য তো ছিল আপনাদের । ফাঁসির হুকুম দিয়ে কলমের নিব ভাঙা নিয়ম, কিন্তু আমি বল-পেন ব্যবহার করি।”[৩]

সেন্ট্রাল জেলের জেলার সরসিজ বসু, বেশ  ঢ্যাঙা ভদ্দরলোক, হাসির গমকে কয়েদিরা কুঁকড়ে যায়,  কড়িকাঠ থেকে আরশোলা-টিকটিকি খসে পড়ে, আমি যখন জেল হাজতে চোদ্দদিন পচছি, বাংলা ভাষাসাহিত্যে স্নাতকোত্তর মোটরসাইকেল রেপিস্টের পুলিশি প্রতিবেদন পড়ে, আর টিভিতে গরমাগরম কানার-বচন শুনে,  বলেছিলেন, বোঝা-যায়-না এরকম একখানা গম্ভীর স্বকপোলসত্য কাহিনি জেলের সুভেনিরের জন্যে তৈরি করে দিতে, যা লোকে পড়ে বুঝতে পারবে না, ভাববে বাংলায় বিদেশি ভাষা পড়ছি, অথচ ঘাড় কাৎ করে বাহবা দেবে । ঠিকই, বাংলায় লিখে অমনটা করতে পারব, ইংরেজিতে লিখলে যতোই প্যাঁচালো হোক, যারা পড়ে তারা উজবুক হলেও বুঝে ফ্যালে।

আমি ওনাকে বলেছিলুম, স্যার আমি লিখনদার কিংবা বেচনদার কিছুই হতে চাই না, চাইনি, হবো আবার কি, যা আছি, তা-ই আছি, এই প্যান্ট-জামায়, ব্যাস, লিখে হবেই বা কি ! আপনি হয়তো বলবেন, লেখালিখি অনেক ভালো কাজ, কিন্তু স্যার ভালো কাজ মানেই তো পারভারশান, প্রেম করার মতন আঠালো, ঠাণ্ডা মাথায় আরেকজনের আত্মপরিচয়কে মুছে নস্যাৎ করে তার কল্পনাকে জবরদখল করা ছাড়া প্রেম আর কি হতে পারে বলুন ?  লেখালিখিও তাই নয় কি !

জেলার সরসিজ বসু বললেন, আপনি না চাইলেই বা, হেরে যাবে জেনেও মানুষ একে আরেকজনকে ভুল বুঝিয়ে ঝগড়ার মাধ্যমে কি সম্পর্ক তৈরি করে না ? তবে ! আপনার কতো লোকের সঙ্গে বুনো মাকড়সার জালের মতন অদৃশ্য সম্পর্ক গড়ে উঠবে, দেখবেন । মনে রাখবেন যে যুদ্ধ হল চরম আনন্দের বহিঃপ্রকাশ ; লেখালিখিও যুদ্ধ । আর প্রকৃত প্রেম বলে কিছুই হয় না, সবই মানবদেহের রসায়ন । আমরা তো কতো লোককে ঘৃণা করি, আবার তাদেরই যারা ঘৃণা করে, এমন লোকের সঙ্গে দেখা হলে গর্বে হাসাহাসি করে ফুলে উঠি, নয়কি ! আসলে ঘৃণা করাটা হল এক ধরণের সহিষ্ণুতা । যাক, আপনি লিখুন, এখনও তরতাজা যুবক, নয়তো যতো বয়স বাড়বে, ততো বেশি অবাঞ্ছিত লোকেদের পাবেন আপনার চারিপাশে, আসল শত্রুদের চেয়ে কাল্পনিক শত্রুদের সংখ্যা বাড়তে থাকবে । এখন আমার কাজ আছে, কয়েদিরা স্বমেহন করে-করে জেলের নর্দমা জ্যাম করে দিয়েছে, ইলিশের ডিম উপচে পড়ছে নর্দমাগুলো থেকে ।

কিন্তু স্যার, আমি তো কখনও লেখালিখি করিনি, বলেছিলুম জেলার সাহেবকে ।

উনি বললেন উনি যখন চাকরিতে সবে ঢুকেছিলেন, পায়ে পালিশ-করা বুটজুতো, টানটান উর্দি, তখন জানতেনই না আসামীদের টর্চার করার কাজটা কীভাবে আরম্ভ করতে হয়, প্রথমবার একজন আসামীকে টর্চার করে মুখ খোলাতে গিয়ে কেমন গলদঘর্ম হয়েছিলেন, আসামীটা নিজেই হাসাহাসি টিটকিরি ইয়ার্কি করছিল ; তারপর ধাপে ধাপে সব শিখে নিয়েছেন, সব রকমের টর্চার । টর্চার করে করে মন ভরে গেছে বলে প্রতিষ্ঠানে কাঠখড় পুড়িয়ে জেলার হয়েছেন । টর্চার ব্যাপারটা অনেকটা সঙ্গম করার মতন, মিশনারি আঙ্গিক থেকে এগোতে এগোতে চুরাশি আঙ্গিকের চেয়েও বেশি আঙ্গিক দখলে চলে আসে, নতুন নতুন আবিষ্কার, এই আরকি । টর্চার করা যেমন কেউ শিখিয়ে দেয় না, তেমনই সঙ্গম করা । ইউ জাস্ট ডু ইট অ্যাণ্ড এনজয় দি ফার্স্ট ব্লাড ।

জেলার সাহেবের আদেশ মেনে নিয়েছি । তবে আমি ওনাকে বলেছি যে বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের গম্ভীর-গদ্য থেকে মশলা টানবো না স্যার, তাতে লোকে আমাকে মুকখু মনে করবে, আমি তাই বিটকেল নামের বিদেশীদের গিঁট দেয়া ড্যাংগুলিই খেলবো, তাহলে লোকে আমাকে অন্তত বিদ্বান তো মনে করবে ।

Double space

আজকে দুপুরবেলা আকাশ কালো করে যখন বৃষ্টি হবো-হবো করেও হল না, অনেক খুঁজে ময়ূরকন্ঠীর দেয়া কাগজগুলো বের করে সাজিয়েছি, দেখি খুনের কারণ জানতে পারি কিনা, ঢুকে যেতে পারি কিনা ওর ভেন্ট্রিল্যাকুইস্ট বিবেকে, জানতে পারি কিনা ওর অসুখ আর কর্তৃত্বের ইতিহাস, যা ময়ূরকন্ঠীকে আত্মধ্বংসের মোহনায় ভাসিয়ে দিয়েছে, নিজের ভেতর যে তাঁবু ফেলেছে তার রহস্য কি । হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকতে হবে ওর তাঁবুর লন্ঠনালোকে আনন্দালোকে ।

ময়ূরকন্ঠী যখন জেল থেকে সেজেগুজে বেরোবে তখন তো আমি কোথায় কোন মোটর সাইকেল উড়িয়ে নিয়ে চলেছি তার ঠিকঠিকানা নেই, তাই জেলার সরসিজ বসুকে বলেছি,  ২০২৪ সালের ২৮শে অক্টোবর বারোটা তিরিশ মিনিটে ময়ূরকন্ঠী যখন ছাড়া পাবে, ওর হাতে ছাপা সুভেনিরের একখানা কপি তুলে দিতে । উনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, দেখবেন লেখাটা যাতে খুনির প্রতি পক্ষপাতপূর্ণ হয় ।

আদালতবাড়ি পাইন বনের জঙ্গলে বলে প্রতিষ্ঠানের ঠিকেদাররা জেল তৈরি করিয়েছে সেগুন বনের জঙ্গলে। সে অনেকটা হাঁটা পথ ।

লিখতে বসে যে চিন্তাটা প্রথমে এলো তা এই যে প্রেমের সফলতার জন্যে রঙিন কনডোম কেন, সুগন্ধি কনডোম কেন ? তাহলে কি প্রকাশ্য দিবালোকে প্রেম করা উচিত ! প্রেমের প্রকৃত গন্ধ কেন নেবে না প্রেমিক-প্রেমিকা, প্রেমযন্ত্রের প্রকৃত স্বাদ কেন নেবে না প্রেমিক-প্রেমিকা ! বাস্তব থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে না কি প্রেমিক-প্রেমিকারা !

আমি কি বাস্তবকে কল্পনায় পালটাতে পারব, এত বিশৃঙ্খলার ভেতর জীবন কাটিয়েছি, একজন মানুষকেও দেখলুম না যে অসৎ নয়, যে লোকগুলো ঈশ্বরের কাছে পৌঁছে গেছে বলে দাবি করেছে,  সবচেয়ে অসৎ হবার সম্ভাবনা তাদের মধ্যেই পাই ।

 

Double space

ওম নাস্তি, ওম নাস্তি, ওম নাস্তি লিখে, ঘুমোতে যাবার আগে কাগজগুলো সাজানো শুরু করলুম । জানি ব্যর্থ হবো, তবু আরম্ভ করতে দোষ কোথায় !

সবায়ের জন্যে তো লিখছি না,  যারা সাজা পেয়ে ভুগছে আর ভবিষ্যতে এসে ভুগবে, শুধু তাদের জন্যে লিখছি । যারা বিনা কারণেই সাজা পেয়েছে আর ভবিষ্যতে অকারণে সাজা পাবে, তাদের পড়ে আনন্দ হবে।

জেলার বলেছিলেন, রাতে ঘুমোবার সময় যখন স্বপ্ন দেখবেন, তখন স্বপ্নের ঘোরে লিখবেন, মনে রাখবেন যে জন্মাবার সময়ে আপনার সারা শরীর রক্তে ভাসছিল, তার স্মৃতি নষ্ট হতে দেবেন না ।

আমি বলেছিলুম, যা সত্যি তাই বলেছিলুম, হ্যাঁ স্যার, খুনখারাপি ছাড়া প্রতিষ্ঠানের বদল হয় না, প্রথমে সাফাই করতে হয় ওপরতলার লুম্পেনদের, তারপরে এক এক সিঁড়ি লুম-লুম-পেন-পেন করে নামতে হয়, তবে গিয়ে মহাকাব্য  ।

Three line space

 

জগার্স পার্কে ছয়টা দৌড়-পাকের পর সিমেন্টের ফিকে লাল বেঞ্চে, পাখিদের যৌথ গু এড়িয়ে, অর্ধেক ফাঁকা জায়গায় শাদা শর্টস আর লাল টিশার্ট স্পোর্টশ শু, যুবক বসল, ইউ ডি কোলোনিত একহাতি গামছা পকেট থেকে বের করে মুখ মুছে, তাকালো আগে থাকতে বসে থাকা যুবতীর দিকে, যুবতীর পাছার দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে চাইছিল যুবক, তার আগেই যুবকের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে যুবতী কথা বলা আরম্ভ করল, এমন ঢঙে যেন মৃত্যুর উনি মালকিন ।[৪]

এই বোকাচোদার মরণ, জানিস না যে মেয়েদের দিকে একনাগাড়ে তাকানো অশ্লীল, তাকে দখল করে যৌনতায় কয়েদ করার ইচ্ছে…তখন থেকে দেখছি…কুমিরের কুতকুতে চোখ মেলে স্টকিং করছিস…আর মেয়েমানুষ পাসনি…যা না…ওই তো অতো কচি কচি মেয়েরা মাই দুলিয়ে পোঁদ নাচিয়ে জগিং করছে…ওদের পেছন পেছন গিয়ে দৌড়োতে পারিস না বানচোদের মরণ…আমার পাশে এসে বসার  কি দরকার…আমার চোখ দুটো বড়ো আমার ঠোঁট বেশ পাতলা… আমার স্কিন বেশ ঝকমকে…আমার মাই দুটো হইচই মার্কা…এইসব এক ফাঁকে বলবি বলেই তো পেছু নিয়েছিস…নাকি…আর ইউ ডেফ…ইউ মরণের মাদারফাকার…হোয়াই ডোন্ট ইউ স্টপ স্টকিং…এছাড়া… আর কোনো কারণ আছে তো বল…শুতে চাস এক্ষুনি…নাকি…রাস্তায় চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ি আর তুই চাপ আমার ওপর…আমি শাড়ি তুলে ধরি আর তুই তোর কম্মো করে কেটে পড়…এই চাইছিস তো…কি রে… মুখে কথা সরছে না যে…রাসকেলের মরণ…হাঁ করে তাকিয়ে আছিস…মাই টিপবি…চল তাহলে পার্কের ঘাসে  গিয়ে বসি…ছাতা-টাতা এনেছিস…আড়াল করার জন্য…যত্তো বোকাচোদাগুলো আমার পেছনেই লাগে…ক্ষমতার কেন্দ্রে জরায়ু থাকবেই…

যুবক নিঃশব্দে নিজেকে কানে কানে বলল, একজন মেয়ের সঙ্গে প্রথমবার শোবার কথা ভাবলেই বুক ধড়ফড় করে ; সাজগোজ করে সময় নষ্ট করার মানে হয় না, সেই তো চটচটে ঘাম, যতো সব আঠালো ক্লান্তি, জখমের খোসা, প্রথমবার পাতপাড়ার মতন বসে হলে সবদিক থেকে ভালো । কিন্তু মানতে হবে, এই মেয়েটা শ্রোতার সন্মানহানির কায়দা আলজিভে রপ্ত করে ফেলেছে । [৫]

যুবতী : যা যা… কেটে পড়…বাড়ি যা…তোর মা ব্রেকফাস্ট নিয়ে অপেক্ষা করছে…তবু ফলো করিস…চটি খুলে পেটাবো নাকি…না হাঁক পেড়ে লোক জড়ো করব…আপনি কি ভাবছেন…আপনি স্মার্ট আর হ্যাণ্ডসাম বলে পার পেয়ে যাবেন…উরুর চুল পায়ের গোছের চুল দেখিয়ে হিম্যান প্রমান করতে চাইছেন..আপনার গৌরবর্ণ দোহারা ঢ্যাঙা চেহারা…একমাথা কোঁকড়া চুল দেখে ফেঁসে যাব আমি…অতই সস্তা পেয়েছেন নাকি আমাকে…যান নিজের পথে যান…বিরক্ত করবেন না…ভালো করে কথা বলছি…এর পর চটি পেটা করব সত্যি-সত্যি…কোথা থেকে যে জুটলো এই গবেটটা…নেড়ি কুকুরের মতন লেগেই আছে পেছনে…এই ঢ্যামনা রোমিওর মরণ…নিজের পথ দ্যাখো…আমার পঁচিশ বছর বয়স হয়ে গেছে বলে ভেবো না যে শোবো বলে মুখিয়ে আছি…বারো বছর বয়স থেকে এই বোকাচোদাগুলোকে ফেস করতে হচ্ছে…বাসে চাপো তো পোঁদে বডি ঠেকিয়ে মরণের ল্যাওড়া ফোলাবে…উৎসবে যাও তো ভিড়ের সুযোগ নিয়ে মাই চটকে বেরিয়ে যাবে…বেশ্যালয়ে যাবার মুরোদ নেই মরণের বানচোদগুলোর…রাস্তায় বিনিপয়সার মাগ পেলেই লেগে যাবে পেছনে…আমাকে স্টকিং করার হলে হিটলার করবে…জোসেফ স্ট্যালিন করবে…জুলিয়াস সিজার করবে…

যুবক নিঃশব্দে নিজেকে কানে কানে বলল, রোমান্টিক শব্দটা ইংরেজি, এর বাংলা প্রতিশব্দ  নেই, মেয়েটা যে কথার ঝাড়ের মাঝে শ্বাসের সময় নিচ্ছে, তা ক্রমশ ভয়াবহ হয়ে উঠছে, কথাগুলোর চেয়ে মাঝের নিঃশব্দ ফাঁকটাই আতঙ্কের।

যুবতী : তা সে তুমি যতই নায়কের মতন হাবভাব করো…চলো…চলো…যাও…যাও…কী ভাবছ…আমি ভার্জিন কিনা…হ্যাঁ…আমি ভার্জিন…কারোর সঙ্গে শুইনি…আগে ম্যাস্টারবেট করতুম… এখন অটোমেটিক অরগ্যাজমের টেকনিক রপ্ত করে ফেলেছি…লাবিয়ায় মুক্তো লাগানো একটা মাকড়ি লাগিয়ে নিয়েছি…এই যে দুই কানে যেমন দেখছিস, তেমনই…সেই মাকড়িটা….পার্কে এক পাক হাঁটলেই…বুঝেছিস তো…কিছুক্ষণের ঘষটানিতে আপনা থেকেই অরগ্যাজম হতে থাকে…সেটাই এনজয় করি পার্কের বেঞ্চে বসে…কোনো মরণের কুত্তাপুরুষের দরকার হয় না…হাঃ হাঃ…কি বুঝলি…মাকড়ি তো…দুই কুঁচকিতে উল্কিও করিয়েছি…প্রজাপতি উড়ছে…উল্কি জানিস তো…ট্যাটু…অরগ্যাজমে উড়তে থাকে প্রজাপতি দুটো…বুঝলি…কি হাঁ করে তাকিয়ে আছেন যে…বিশ্বাস হচ্ছে না…ভাবছিস কে কে আছে আমার যে এই সব মজা নিই লাইফের…আছে রে দু দুটো বাপ…একজন অন্ধ…পিটুনির চোটে অন্ধ হয়ে গেছে…আরেকজন অ্যালঝিমার রুগি…ভাবছিস মাটা কমনে আছে…সে বেটি পালিয়েছিল আরেকজন কচি কচকচের সঙ্গে…ছোঁড়াগুলোর টেস্টও বলিহারি…টিভিতে মাকে দেখে প্রেম করে বসল এক ছোঁড়া…মা তার সঙ্গে লিভ-টুগেদার বেঁধেছে…টিভির গল্পটাকেই নিজের জীবনে অ্যাডপ্ট করে নিয়েছে…তুই এখনও তাকিয়ে আছিস যে…কুঁচকির প্রজাপতি দেখতে চাইছিস নাকি…তাহলে তোকে বলি যে আমার বুকের খাঁজে কাঁকড়ার উল্কি আছে…তোরা তো হাজার হাজার বছর আগে গুহায় যেমন থাকতিস এখনও তেমনই আছিস…তুই কি ভাবছিস আমি কারোর সঙ্গে শুতে চাই না…চাই…চাই…চাই…স্ট্যালিনের সঙ্গে শুতে চাই…মাওয়ের সঙ্গে শুতে চাই…হিটলারের সঙ্গে শুতে চাই…সিরাজউদ্দৌলার সঙ্গে শুতে চাই…লর্ড ক্লাইভের সঙ্গে শুতে চাই…আর এন ট্যাগোরের সঙ্গে শুতে চাই…রামকিঙ্কর বেইজের সাথে শুতে চাই…এক এক রাতে এক এক স্বপ্নে শুতে চাই…ফর মি লাভ ইজ ইনসারেকশান…স্টকিং হল প্রতিবিপ্লব…[৬]

যুবক নিঃশব্দে নিজেকে কানে কানে বলল, এরা এক এক সময়ে এক একটা মানুষকে পছন্দ করে, তারপর সারাজীবন একজনকে  নিয়ে কেমন করে কাটায় ! আসলে অন্ধকার জমাট বাঁধতে থাকে, সম্পর্ক গলতে থাকে । সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ শিল্প হল কনফিউজন ক্রিয়েট করা । সেটাই করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে , যেন কোনো আক্রমণ থেকে প্রাণপণে ছিটকে বেরিয়ে এসেছে ।

যুবতী : তোর এখনও শুনে আশ মেটেনি…যা দিকিন এখান থেকে…কার কাছে ট্যাটু করিয়েছি তাই ভাবছিস তো…কোনো মহিলা-টহিলার পারলরে নয়, পুরুষেরই ট্যাটু পারলরে, প্রজাপতি দুটোর গায়ে তিন রকমের রঙ আছে…কাঁকড়াটা লাল করিয়েছি…কোনো মরণের বানচোদ ধর্ষকের পাল্লায় যদি পড়ি কখনও তো তাকে লাল কাঁকড়া ফেস করতে হবে…যদিও জানি যে লাবিয়ার মাকড়িতে তার নুনু আটকে ফর্দাফাঁই হয়ে যাবে…বুঝলি…কী…শুনে ভয় পেয়ে গেলি…এতক্ষণে ধারণা করে নিয়েছিস নির্ঘাত যে আমি বেহেড পাগল…তা ঠিক…আমি কম কথার মেয়ে…বেশি বক বক করতে পারি না…আমি কি করে দুটো বাপকে চালাই ভাবছিস…অন্ধ বাপের পেনশন জোটেনি…কেস চলছে…শালা কবে যে ফয়সালা হবে…তাও আমাকেই সামলাতে হয়…বাপের দপতরে গেলে মরণের কেরানিগুলো আমার খাপেখাপ দেখতে থাকে…অরগ্যাজমের উত্তেজনা-আনন্দ উপভোগ করব…তা নয় মাকড়ি খুলে দৌড়োও আদালতে…জানতে চাইছিস বোধহয় যে দুটো বাপ কেমন করে হতে পারে…হতে পারে..হতে পারে…এই ধরো আমি তোমাকে বিয়ে করে নিলুম…তারপর তোমায় ডিভোর্স না দিয়ে চুপচাপ আরেকজনকে বিয়ে করে নিলুম…একজনের সঙ্গে শুয়ে কি আশ মেটে..বলো তুমি…মেটে না…মেটে না…সব মিথ্যে…ইউ লিভ ফর ওয়ান্স ওনলি…জানতে পেরে আমি দুজনকে এক ছাদের তলায় এনেছি…ভাবছ বাপেদের ককটেল চরিত্র পেয়েছি আমি…তা ঠিক ধরেছ…দুজনের চরিত্র আমার ওপর একসঙ্গে বর্তেছে…কোন বাপের মেয়ে আমি জানি না…বিজ্ঞানের সাহায্য নেয়া যেতে পারত…নিইনি…শেষে হয়তো দেখব এদের দুজনের কেউই আমার বাপ নয়…পুরো টাকা গচ্চা…তাছাড়া জেনেই বা কী হবে কোনটা আমার বাপ…বলো…

যুবক নিঃশব্দে নিজেকে কানে কানে বলল, এই মেয়েটা, সব মেয়ের মতনই, বিভ্রমের বাস্তবতায় বাস করে, যেন ঘুম ভেঙে দেখছে এতোকাল খরগোশের গর্তে ঘুমোচ্ছিল আর হঠাৎ উঁকি দিয়েছে শেয়ালের হাসিহাসি হাঁ-মুখ।[৭]

যুবতী : তুই ভাবছিস আমি কি করি…হ্যাঁ…রান্নাবান্না করি…আমি আসলে ওই হাসপাতালটায় রিসেপশানিস্ট ছিলাম…বুঝলি…তোর জন্যেই তো চাকরিটা গেল…আমি কিই বা করেছি…আমার কোনো দোষ ছিল না…পুরো বিজ্ঞানের দোষ…বিজ্ঞান মানেই ফাঁদ…ফেলে দিল আমাকে ফাঁদে…তুই তো জানিস…দেখেছিলেন তো কী হয়েছিল সেদিন…নার্সটাকে বলেছিলাম এম আর আই রুমে ডাক্তারকে অক্সিজেন মাস্ক দিয়ে আসতে…তাকে বলা হল কিছু সে শুনলো আরো কিছু…সে বেটি কি করলে…সে করিডরে রাখা অক্সিজেন সিলিণ্ডারটা নিয়ে রাখতে চলে গেল এম আর আই রুমে…তারপর যা হবার তাই হলো…এম আর আই মেশিনের রাক্ষসি ম্যাগনেটিক ফিল্ডকে অ্যাক্টিভেট করে দিলে মেটাল সিলিণ্ডারটা…সেকেন্ডের মধ্যে নার্সটাকে আর যে টেকনিশিয়ান সেখানে দাঁড়িয়েছিল দুজনকেই খেলনার মতন টেনে নিলে মেশিনটা…সে কি আওয়াজ…আর চিৎকার… চার ঘণ্টা ধরে আটকে ছিল ওরা…তাতে আমার কি দোষ…ওই দুর্ঘটনার জন্যে নাকি আমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে…দিনকাল খারাপ যাচ্ছে মনে করলে তাকে আরও খারাপ করে তুলে পার পাওয়া যায়…

যুবক নিঃশব্দে নিজেকে কানে কানে বলল, এই যুবতী ভবিষ্যতের কলোনিতে ডেরা ডেলে আছে, সময়কে নষ্ট করে-করে অতীতে পৌঁছোতে চাইছে মনে হয় । এর মগজ সময়কে ভুলে গিয়ে থাকবে, কিন্তু মগজ দাগ রেখে গেছে এর সময়ে । তাই সময়কে নষ্ট করে চলেছে , আর কতো পাক খুলবে কে জানে, নষ্ট হওয়া ছাড়া সময়ের তো অন্য কোনো গতি নেই । হঠাৎ কথা বন্ধ করে আবার আরম্ভ করে, বোধহয় এই নৈঃশব্দের সময়টায় ওর অরগ্যাজমের তুলতুলে বিস্ফোরণ হয় ।

যুবতী : জেনেরাল ইলেকট্রিক থেকে একজন ইনজিনিয়ার এসে মেশিনটা ডিঅ্যাক্টিভেট করার পর ম্যাগনেটিক ফিল্ডটা গেল…মরণের নার্সের তো কনুই ফ্র্যাকচার…টেকনিশিয়ান বেচারা একদিকে নার্স আর সিলিণ্ডারের মাঝে…দুই হাত নার্সের দুই বুকে অথচ টিপতে পারার মতন জ্ঞান নেই…অন্যদিকে মেশিনের হাঁ-মুখে…বেচারার ইউরিনারি ব্লাডার ফুটো হয়ে রক্তারক্তি কাণ্ড…ওদের দুজনকে সারিয়ে তুলতে নিউরোলজিস্ট, নিউরোসার্জন, অরথোপেডিক সার্জন, নেফরোলজিস্ট, প্লাসটিক সার্জন, ইনটেনসিভিস্ট কতো ডাক্তারের যে সময় গেল…নার্সটা কখনও কাজ করেনি এম আর আই রুমে…জানতো না যে এম আর আই রুমে মেটাল নিষিদ্ধ…তোকে এসব কেনই বা বলছি…তুই জেনে কিই বা করবি…মেশিন সুইচ অফ করলেই ওর ম্যাগনেটিক ফিল্ড ডিঅ্যাক্টিভেট হয় না…আমি তো দৌড়ে গিয়ে সুইচ অফ করে দিয়াছিলাম…তারপরেও ওদের দুজনকে টেনে বের করা যাচ্ছিল না… ম্যাগনেটকে মেশিন থেকে আলাদা করতে সময় লেগে গিয়েছিল…চার ঘণ্টা ওইভাবে আটকে…নার্সের দুই মাইয়ে দুই হাত…টিপবে তেমন জ্ঞান নেই…কত দিন হাসপাতালে ভর্তি ছিল…ইনটারনাল এনকোয়ারিতে আমাকেই বলির-ছাগলি করা হল…চাকরি খোয়ালাম…নতুন চাকরি পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে…হসপিটালিটি কোর্সটা না করে কমার্স পড়লে বরং ভালো ছিল…

যুবক নিঃশব্দে নিজেকে কানে কানে বলল, যাক এর বকবকানির কারণ জানা গেল । অ্যাদ্দিনে প্রগতির সহজাত তোতলামির সঙ্গে পরিচয় হয়েছে, হয়তো সেই থেকে যারা ওকে পছন্দ করে তাদের ও অপছন্দ করে । এ যখন জানতে পারবে যে আমি একটা বুনো জানোয়ার, তখন কি হবে !

যুবতী : প্রথম বাপটা আমার জন্যেই অন্ধ হয়ে গেল…পিটুনি খাবার পর যে হাসপাতালেই নিয়ে গেছি…আমার মুখ আর নাম দেখেই নার্সগুলো দুর্দুর করে তাড়িয়েছে…ট্রিটমেন্ট হল না ঠিকমতন…প্রথম বাপটা অন্ধ হয়ে গেল…সেই থেকে পৃথিবীটাকে জুতোতে ইচ্ছে করে…হাসপাতালগুলোকে রাতের অন্ধকারে একদিন পেটরল ঢেলে আগুন লাগাব…তুই তো পেছনে লেগেছিস…হেল্প করবি…নাকি…শুনেই মরণের গাঁড় চুপসে গেল…আমি এক বাক্যির মেয়ে…কাউকে রেয়াত করি না…বদলা নেবোই…বলির পাঁঠা বানালো কিনা আমাকে…আমার কি দোষ…নার্সটাকে বলেছিলাম ডাক্তারকে অক্সিজেন মাস্ক নিয়ে গিয়ে দিতে…উনি অক্সিজেন সিলিণ্ডার নিয়ে ঢুকে পড়লেন…মানুষকে আর বিশ্বাস করি না…কথা বলাকেও বিশ্বাস করি না…বলা হয় কিছু…আরেকজন শোনে কিছু…শেষে কাণ্ড ঘটে অন্যকিছু…দুর্বাঁড়া তোকে কেনই বা বলছি এসব…

যুবকের দিকে পাশ ফিরে বলতে থাকল  যুবতী, বড়ো টানা স্মাজফ্রি কাজলচোখ কুঁচকে ।

যুবক নিঃশব্দে নিজেকে কানে কানে বলছিল, সাতসকালে জগিং পার্কে কাজলটানা চোখ ! হলুদ ব্লাউজের সঙ্গে ম্যাচিং ফিকে হলুদ প্রজাপতি ওড়ানো সিনথেটিক শাড়ি । চুলে হলুদ ক্লিপ । পায়ে হলুদ ফুল  ফ্লিপ-ফ্লপ, জগিং শু নয় । প্রতিদিন আসে না, সপ্তাহে দিন তিনেক । কোনো দিন টপ আর স্ল্যাক্স, কোনোদিন ডেনিম জিনস, কোনোদিন চুড়িদার, ওকে দেখতে পেলে টানের দরুণ কোনো না কোনো যুবক বসে ওর পাশে গিয়ে ।

আজকের যুবকের  দেখে মনে হল মেয়েটা হাঁ করে কুয়াশা খায় আর সেগুলো কথার মোড়কে পুরে ওড়ায়, সেটাই বোধহয় ওর নিজের নিয়ন্ত্রণ খোলার তরকিব, জানে যে ওর কথাগুলো ভাইরাসে আক্রান্ত, ওর ভেতরের পরগাছাগুলোকে কথা শুনিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করছে ।

Double space

 

হাঁটতে বেরিয়ে এই পার্কে কেবল বুড়িদেরই  শাড়িতে দেখেছে যুবক, বা চুড়িদার পরে আসতে । যুবতীরা টপ আর ডেনিম জিন্স, কানে গান, অনেকে ব্রেজিয়ারহীন, মাই থলথলে, কুছ পরোয়া নেই গর্ব । এই যুবতীকে জগিং করতে দেখেনি যুবক, হাত দুলিয়ে হাঁটে, স্রেফ এক পাক, মানে আধ কিলোমিটার , তারপর গিয়ে ওই নির্দিষ্ট সিমেন্টের সিটে ।

যুবক শুনে থতমত, কোনো তরুণীর মুখে এরকম কিলবিলে কথার তোড় শোনেনি এর আগে, মানে সাজুগুজু শিক্ষিতা টাইপের মুখে, তুইতোকারির সঙ্গে আপনি-তুমি মিশিয়ে কী বলতে চাইছে বুঝতে পারছিল না যুবক, সন্দেহও হচ্ছিল যে ইচ্ছে করেই বলছে, আধপাগলি সাজছে ।

সকালে জগিং করার সময়ে তৃতীয় পাক দেবার পর আজ তৃতীয়বার দেখল মেয়েটাকে, সিমেন্টের বেঞ্চে ঠেসান দিয়ে কাঁপছে । জগিং করে না, কেবল হাঁটে মেয়েটা, এক পাক দিয়েই বসে পড়ে বেঞ্চে আর কাঁপে, তিনচার বার কেঁপে বসে থাকে মিনিট দশেক, তারপর উঠে পড়ে । যে যুবকরা টান খেয়ে বসে তাদের কেউ কেউ ওর পেছন-পেছন যায়, কে জানে কোথায় যায় । সত্যিই তাহলে যুবকেরা একে স্টকিং করে।

কথার তোড়ের পর, শুয়ে থাকা বাছুরের ভয় পাওয়ার ঢঙে, আচমকা উঠে দাঁড়াল যুবতী, বলল, ফলো করবি না, তোদের সবকটাকে চিনি ।[৮]

মেয়েটি উঠে পড়ার পর ওকে সতর্ক করার জন্যে, স্টকিঙের উদ্দেশ্যে নয়, এই মেয়েকে দেখে দেখে আশ মিটে গেছে, এখন ছুঁয়ে দেখতে দিলে প্রস্তাবটা লুফে নেবে ।  আজকে যুবতীর সমস্যার কথা বলবে বলে, পিছু নিয়েছিল যুবক, লোকজন বিশেষ নেই এরকম ফাঁকা দেখে বলবে, কিন্তু চারিদিকে ব্যস্ত পথচারীদের আনাগোনার দরুণ, যদিও কেউ পথে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেও এদের কারোর কিছু এসে যাবে না,  বলতে না পেরে, পেছন-পেছন যাচ্ছিল । জগিং পার্ক থেকে বেরিয়ে বাঁদিকে লাল থোকায় ঝিলমিলে গুলমোহর গাছের পাশ দিয়ে যাবার সময়ে, খসে পড়া পাপড়ি মাড়াতে-মাড়াতে, যুবতী যুবকের দিকে পেছন ফিরে বলল, মাদারচোদ ।

গালাগালটা শুনে, আশ্চর্য, যুবকের বেশ ভালো লাগল, জাস্ট হিল্লোল । একজন যুবতীর মুখে এই গালাগাল যে মধুমাখানো রহস্যময় হেঁয়ালি হতে পারে, তা এর আগে জানত না, হৃৎপিণ্ড জিনিসটা রক্তের স্রোতকে ইশারা করে  মগজে পৌঁছে দিয়ে প্রশ্ন করতে থাকল, ইহার পর কী ইহার পর কী ইহার পর কী । বলতে চাইল, শোবেন নাকি আমার মায়ের ভুতাত্মার সঙ্গে, উনি তো স্বর্গে। তার বদলে চুপ করে রইল, আরও হেঁয়ালির গোলকধাঁধার আশায় । [৯]

Double space

 

যুবতী জানতো গালাগাল শুনেও এই যুবক ফলো করায় বিরতি দেবে না। আগেও এরকমই হয়েছে । স্মাজফ্রি কাজলটানা আড়চোখে দেখে নিয়ে, মেয়েটি এবার সরাসরি পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে পড়ল, যুবকের মুখোমুখি হবার জন্য, আর বলল, কি রে মরণের বানচোদ, বললাম না, তা সত্ত্বেও পিছু ছাড়ছিস না দেখছি, লোক জড়ো করব নাকি, অ্যাঁ, মারের চোটে বাপের নাম ভুলে যাবি, যদি না অলরেডি ভুলে গিয়ে থাকিস ।

মেয়েটি যে সিমেন্টের বেঞ্চে বসেছিল, সেখানে আজ রক্তের দাগ দেখেছিল যুবক । দাঁড়িয়ে উঠতে, ফলো করে বুঝতে পারছিল, যুবতীর শাড়ির আঁচল আর পাছায় রক্ত লেগে । প্রতিদিন কাঁপে, নিশ্চয়ই কোনো অসুখ অনুমান করে, যুবক ভাবছিল, ফাঁকা পেয়ে বলবে যে, আপনার আঁচলে আর শাড়িতে রক্ত লেগে । বলতেই যাচ্ছিল, আপনি বোধহয় আজকে ফিসফিস বেঁধে আসেননি ।

দাঁড়িয়ে আছিস, বোকাচোদার মরণ, ফাক অফ, স্টকিং করবেন না, আমি ডিসগাস্টেড ফিল করি, স্কুলের সময় থেকেই আপনাদের মতন রোমিওদের আচরণে বিরক্ত হয়ে-হয়ে ক্লান্ত হয়ে গেছি । কাইন্ডলি ফলো করবেন না । কেন ফলো করছেন জানি, আপনাকে আমি চিনতে পেরেছি, সিরিয়াল স্টকার।

যুবক বলল, আপনাকে যে কথাটা বলতে চাইছি, সেটাই সরাসরি বলি, তাহলে বুঝতে পারবেন কেন স্টকিং করছি । আপনার মাকড়ি ছিঁড়ে গিয়ে থাকবে, ব্লিডিং হচ্ছে বুঝতে পারেননি, তাকেই বোধহয় অরগ্যাজমের আঠা মনে করছেন । আঁচলে আর পেছনে হাত দিয়ে দেখুন ।

যুবতী তক্ষুনি  পেছন হাত দিল না, চোখে এক চিলতে নকল ভয় খেলিয়ে,  আঁচল সামনে এনে রক্ত দেখতে পেয়ে পেছনে হাত দিয়ে টের পেল  চুপচুপে । বলল, সরি, বুঝতে পারিনি, আজকে তো ডিউ ডেট নয়, ডিউ ডেটের আগেই হয়ে গেছে, ডিউ ডেটের একদিন আগেই মাকড়ি খুলে ন্যাপকিন বেঁধে রাখি ।

এই ভাবেই পথ দিয়ে হেঁটে যাবেন ? আমার মোটর সাইকেল আছে, চলুন আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দিই। চিন্তা করবেন না, দরোজা পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে নিজের বাড়ি চলে যাবো । ভাগিয়ে ধর্ষণ করতে নিয়ে যাব না কোথাও, তাছাড়া আপনার লাবিয়ায় মাকড়ির প্রটেকশান তো আছেই ।

চল চল চল চল চল, ভালো আইডিয়া দিয়েছিস , এই ভাবে তো পথে হাঁটা যাবে না, মাছিতে পেছন ঝালাপালা করে দেবে ।

Double space

 

মোটর সাইকেলের পেছনের সিটে বসে যুবককে দুই হাতে জড়িয়ে ধরল যুবতী, বলল, যাগগে, এবার তুই তোর গল্প বল ।

স্টার্ট দিয়ে যুবক বলল, এতোক্ষণ আমার চোদ্দোপুরুষ উদ্ধার করে, গালমন্দ করছিলেন, এখন আমার পিঠে বুক চেপে আছেন কেন, অস্বস্তি হচ্ছে , পিঠে আপনার ডাবল ব্যারেল মাংসের পিস্তল ঠেকাবেন না, আনইজি ফিল করছি । আর আমার গল্প বলতে আমার জীবনের কোনো গল্প নেই, তাতে অন্য কেউ-না-কেউ আছেই।[১০]

যুবকের ঘাড়ে গরম ভাপের শ্বাস ফেলে যুবতী বলল, অস্বস্তি হচ্ছে কেন শুনি ? যখন স্টকিং করছিলিস তখন তো অস্বস্তি হয়নি, দেখি দেখি, হ্যাঁ, তোর তো ফুলে উঠছে রে ! একটুকু ছোঁয়াতেই এই অবস্হা ! এক পরশেই শহিদ মিনার তুলে ফেলতে পারিস, আগের জন্মে গাধা ছিলিস নাকি রে ! অক্টারলুনির তো অনেককাল লেগেছিল ।

মোটেই ফোলেনি, হাত সরান, হাত সরান, কী করছেন কী ? লোকজন যাতায়াত করছে ; দেখতে পেলে তারাই এবার চটি পেটা করবে আমাদের দুজনকে । কোন মাংসের মেয়ে আপনি !

দুজনে একসঙ্গে মার খেলে কী হবে জানিস  তো ? আমরা একজন আরেকজনের সঙ্গে জুড়ে যাবো, সাপের মতন, লোকেদের চোখে, নিজেদের চোখেও । আমি তোর পরগাছা, তুই আমার পরগাছা, ওই দম্পতি বলতে যা বোঝায়, দুজনে দুজনকে চুষতে থাকো ছিবড়ে না হওয়া পর্যন্ত , চকাস-চকাস।

আবার হাত দিচ্ছেন, আমি অকওয়ার্ড ফিল করি এসব ব্যাপারে । প্লিজ । গাড়ি চালাতে অসুবিধা হচ্ছে। তার চেয়ে আপনার গালাগালের বক্তৃতা শুরু করুন বরং, আমার শুনতে ভালো লাগছিল, সেক্সুয়াল থ্রিল পাচ্ছিলাম ।

তোর নাম কি হার্দিক ? এতো হৃদয়বান ড্যাংগুলি । আই মিন হার্ড ডিক ! তোর ডিক তো একটু ছোঁয়াতেই হার্ড হয়ে গেল রে । ম্যাস্টারবেট করিস তো ? তবে এতো সেনসিটিভ কেন, লজ্জাবান লন্ঠন ?

মোটেই হার্ড হয়নি, ওটা আপনার কল্পনা ; আমি যদি হার্ডিক হই তাহলে আপনি তো লাবিয়া কুইন । আগে কখনও শুনিনি যে অরগ্যাজমের জন্যে কেউ লাবিয়ায় মাকড়ি পরে । বাজারে কি কলা-বেগুন-মুলোর অভাব ?

তুই যে আকাট তা তো তোকে ঝাড় দিয়েই বুঝতে পেরেছি । স্বয়ংক্রিয় ব্যাপারটা বুঝিস না । পিস্তলের কথা বলছিলিস একটু আগে, তা বিছানায় হোক বা প্রতিষ্ঠানের সিংহাসনে, না ঠেকালে নড়ে না রে, ঠেকাও আর গুড়ুম । দুঃখের কথা কি জানিস, সিংহাসনটা কখনও খালি থাকে না, ল্যাংড়া গিয়ে নুলো আসে।

বাঁ হাত দিয়ে যুবতীর হাত নিজের বুকের কাছে এনে যুবক বলল, তুই তুই করবেন না । আমিও যদি আপনাকে তুই তুই করি তাহলে কাজের বউ হয়ে উঠবেন । আমার এক ক্লায়েন্ট অবশ্য কাজের বউয়ের সঙ্গেই সংসার করে ।

এবার ডান দিক, হ্যাঁ, সোজা গিয়ে প্রথম রাইট টার্ন ।

এতো দূর থেকে পার্কে হাঁটতে যান, নিজের বাড়ির কাছে বাগান টাগান নেই ? তাছাড়া মাকড়ির আনন্দ তো রাস্তায় হাঁটলেও পেতে পারেন ।

তিন গলির মোড়ের মুখে দুজন যুবক, প্রায় ষণ্ডাগোছের, ডোরাকাটা ফুলশার্ট, শার্টের কলারে লাল টাই, কালো ট্রাউজার,  রাস্তার মাঝে দাঁড়িয়ে হাত তুলে থামতে বলল ওদের ।

এরা যদি মেয়েটার পেছনে লাগে, তাহলে, যুবক পরিকল্পনা ছকে নিল, মেয়েটাকে এদের কব্জায় ফেলে বাঁ দিকের গলিতে ঢুকে শর্টকাট মারবে নিজের আস্তানার দিকে ।

মোটর সাইকেল থামতে, আপনি একটু অপেক্ষা করুন , শহিদ মিনারকে পড়ে যেতে দেবেন না যেন, দু সেকেণ্ডেই ফুসকি হয়ে গেলে ফিরে আরো ভয়ংকর গালাগাল দেবো, বলে, মেয়েটা নিজেই নেমে এগিয়ে গেল স্মার্ট যুবক দুজনের দিকে ।

এরা মেয়েটার বডিগার্ড বা বাউন্সার নাকি  ! যা গালাগাল ছাড়ছিল, আর যাদের সঙ্গে এর মেলামেশা, কোন লাইনের মেয়ে রে বাবা ! হুকার ইন ডিসগাইজ নয়তো ! যুবক কয়েকটা শব্দ ভাসা ভাসা শুনতে পেল, সুপারি,  টাকা, কাট ডাউন, ক্যারি, মিডনাইট। ওদের একজন মেয়েটাকে একটা কাঁধে ঝোলাবার চামড়ার স্লিং ব্যাগ দিল । অন্যজন একটা পুরিয়া দিল, মোড়ক খুলে শুঁকে, হাতে রেখে নিল যুবতী।

অ্যাক্সিলাটারে স্পিড নেবে ভাবছে যখন, ফিরে এসে সিটে বসল যুবতী । ওকেই মেরে ফেলার প্ল্যান করছে নিশ্চই ; রোজ একটা ছেলেকে ফাঁসায় আর খুনের হুমকি দিয়ে র‌্যানসাম আদায় করে বোধহয় । স্পিড নিয়ে এঁকে বেঁকে মেয়েটাকে ফেলে দেবার কথা মনে এসেছিল যুবকের, তখনই যুবতী আবার দুহাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল যুবককে, নিজের বুক যুবকের পিঠে চেপে ধরে । ডান হাত এগিয়ে যুবকের কুঁচকিতে রেখে মেয়েটি বলল, কেমন যুবক আপনি, হার্ড ডিক এক সেকেন্ডেই সফ্ট চিক হয়ে যায়, বাঁ হাতে পুরিয়া খুলে নিজের ঠোঁটে মাখিয়ে যুবতী বলল, এদিক ফের, এদিক ফের, তোকে একটা চুমু খাই ।

গাড়ি থামিয়ে পেছন ফিরল যুবক, এমন সুযোগ ছাড়ার মানে হয় না । লোকজনের যাতায়াতকে ডোন্টকেয়ার করে যুবককে চুমু খেল যুবতী, ঠোঁটের গুঁড়ো যুবকের মুখের ভেতরে জিভ দিয়ে পাঠিয়ে ।

এটা কি জিনিস, জানতে চাইল যুবক, বলল, এ তো চিনি নয়, বেকিং সোডার স্বাদও নেই, হেরোইন -কোকেন খাইয়ে দিলেন নাকি, গাড়ি চালাতে গিয়ে দুজনেই ডিগবাজি খেয়ে পড়ব । আর কতো দূরে আপনার বাসা ?

যা চাটলি তাকে বলে মেয়াও-মেয়াও-কিস, সায়েন্স পড়েছিস না আর্টস ? চাটার অভিজ্ঞতা আছে, নাকি নউশিখিয়া আনাড়ি ! চাটতে না পারলে কোনো প্রেম টেকে না, তা সে নেশা হোক বা সেক্স ।[১১]

আবার তুই তুই করছেন, সসেজ-পোড়া গন্ধের চুমু খেলেন যখন,  অন্তত তুমি তুমি তো করতে পারতেন । না, আমি দর্শনে সান্মানিক স্নাতক  পড়তে পড়তে ছেড়ে দিয়েছিলাম ।

মুকখু ? ওঃ, তাই গালাগাল খেয়েও মুখ বন্ধ করে ছিলিস , বলবি তো যে তুই আকাট , দর্শন আবার বিষয় নাকি, অন্য সাবজেক্টে সিট না পেয়ে শেষে দর্শন, তারপর দার্শনিক হয়ে ঘোলা জলে সাঁতার, বোমক্যাওড়া সাতল্যাওড়া বক্তিমে, যা কখনও কারোর কাজে লাগে না ! চোখ কান নাক মুখ হাত থাকতেও লোকে কেন দার্শনিক হয় জানিস ? দুনিয়ার বাদবাকি মানুষকে তারা মনে করে বোকাচোদার মরণ, তাদের চোখ কান নাক মুখ হাত নেই । তোরও সেই অবস্হা ।

আকাট নই, ভালো রেজাল্টই করতাম, দাদা ক্যানসারে মারা যাবার পর দোকানটা আমাকেই চালাতে হচ্ছে । বাবা মারা যেতে মা চালাতেন, মা মারা যাবার পর দাদা চালাতো, দাদাও মারা গেল, এখন আমি চালাই । যে মেয়েটার সঙ্গে দাদার বিয়ে ঠিক হয়েছিল তাদের বাড়ির লোক তো আমার সঙ্গে তার বিয়ে দেবার জন্যে ঝুলোঝুলি করছিল । আমার চেয়ে চার-পাঁচ বছরের বড়ো মেয়ে তাকে বিয়ে করা যায় নাকি ! ভেতরে ঢুকে কি সাঁতার শিখব ? তাছাড়া মেয়েদের চেয়ে আমার নতুন মোটর সাইকেল বেশি পছন্দ ।

দোকান ? কিসের দোকান ?

দশকর্মভাণ্ডার । জন্ম থেকে নিয়ে চিতায় চড়া পর্যন্ত সব রকমের ফর্দ মেনে সাপলাই দিই ।

ওঃ, যতো অশিক্ষিত সুপারস্টিশাস লোকেদের সঙ্গে তোমার কারবার, ঘোমটাদেয়া সিঁথিতে সিঁদুর শাঁখাপলা বউ, খাটো ধুতি পৈতে ঝোলা পেটমোটা বামুন, খ্যাংরাকাঠি কায়েত, দশ আঙুলে দশ রত্নের আঙটি বদ্যি বামুন, তাদের গঙ্গাজলের নামে কলের জল বিক্রি করো, থার্মোকোলের শালপাতা, কাগজের মাটির ভাঁড়, হলদে রঙের কাঠের গুঁড়োকে হলুদ, কৃষ্ণচূড়ার ডালকে বেলকাঠ, জানি জানি । ওসব ছাড়তে হবে তোমায় । আমি শিখিয়ে দেবো যে মেয়াও-মেয়াও-কিস থেকে কতো বেশি রোজগার করা যায় ।

আপনার কেউ মরে গেলে বলবেন । আমি নিজে ঈশ্বর ঠাকুর্দেবতায় বিশ্বাস করি না, এই সব দশকর্মতেও বিশ্বাস করি না, অন্যেরা বিশ্বাস করছে বলে তাদের জ্ঞান দিতেও যাই না । লোকে যেমন আলু-পটল মাছ-মাংস বিক্রি করে, আমি ঐতিহ্য বিক্রি করি ।

ঐতিহ্য ? গুড ওয়র্ড । ভালো করিস । কেউ মরে গেলে আমি ভালোবাসায় সোপর্দ করি । তারপর যুবতী যোগ করল, এখানে এক মিনিট দাঁড়া, ওই পেটমোটাকে এই ব্যাগটার মাল দিয়ে আসি, বলে, নেমে, রাস্তার পাশে ভিড়ের দিকে এগিয়ে গেল যুবতী ।

Double Space

 

আম কাঠের পালিশ-ওঠা আরাম চেয়ারে হেলান দিয়ে কোলে বন্দুক রেখে বসে থাকা লোকটার হাতে স্লিং ব্যাগ থেকে দুটো হাফ কিলো ময়দার প্যাকেট দিতে, সে পেতলের হাতবাক্স থেকে নোটের তাড়া বের করে যুবতীকে দিল । কোনো কথাবার্তা হল না । এই দেয়ানেয়াও এক ধরণের কথা । সেক্স করার মতন, কথা বলার দরকার হয় না, নাক মুখ দিয়ে নানা রকমের শ্বাস আর আওয়াজ বের করে আনন্দ দেয়ানেয়া করে, ছেলে-মেয়ে, মেয়ে-মেয়ে, ছেলে-ছেলে।

যুবতী তাড়াতাড়ি হেঁটে ফিরে এলে, যুবক কন্ঠস্বর নামিয়ে, যুবতীর খোলা নাভির দিকে তাকিয়ে বলল, বুঝেছি, এই নেশার গুঁড়োর ব্যবসা করেন । নিজেকে কানে কানে জিগ্যেস করল, নাভিতে কি সাবান লাগায় ? নাকি সব সাবান মুখে? নাভিতে বোধহয় লিন্ট জমে গেছে ।

তা খারাপ কি ? তুই দশকর্মের গাঁজা বেচিস, আমি মেয়াও মেয়াও বেচি, বলল যুবতী, যুবকের চোখ অনুসরণ করে নিজের নাভি শাড়িতে আড়াল করল ।

আপনার নাভিতে বোধহয় লিন্ট জমেছে, ওখানেও সাবান লাগাতে হয়।

আমি ওয়াশিং মেশিন নই যে লিন্ট জমবে ; আর যদি জমেও থাকে, তা থেকে কি উল বানিয়ে তোর জন্যে সোয়েটার বুনে দেবো ?

ফ্রি রাইড দেবার বিনিময়ে একটা ফ্রি প্রশ্ন করছি, দশাশই পেটমোটাটা কে ? অমন আরও পেটমোটা আছে নিশ্চয়ই তোমার ক্লায়েন্ট লিস্টে ? কথাগুলো বলে, নিজের কানে কানে যুবক বলল, এ ব্যাটা এতো মোটা, ছোঁচায় কেমন করে ! ছোঁচাবার লোক রাখতে হয়েছে নিশ্চয়ই । যতো বজ্জাত তাদের পোশাক ততো ধবধবে সাদা হয় আজকাল ।

তোরও তো পেটমোটা-ঢাউসবুক বউরা আছে ক্লায়েন্ট লিস্টে ।

তা আছে, তাদের কাকিমা মাসিমা জেঠিমা বলে ডাকতে হয় । তোমার এই পেটমোটাটা কি কাকু জেঠু দাদু মেসো পিসে ।

পেটমোটাটা নেতা, নেতার বয়স আর বডির ওজন যতই হোক, তাদের দাদা বলে ডাকতে হয়।  মিছিলের লোকেদের মেয়াও মেয়াও খাইয়ে মাইলের পর মাইল হাঁটাতে পারে, র‌্যালি-র‌্যালায় মাঝরাত পর্যন্ত না-খাইয়ে বসিয়ে রাখতে পারে । অন্য টাইমে রঙচঙে ঝিলমিলে টুনি জ্বালিয়ে হিজড়েনাচের অনুষ্ঠান করে ওর বাংলা-মাতাল চেলাদের জন্যে, ভাই-বেরাদরদের জন্যে বার-ডান্সার আনিয়ে ঝিনচাক একশো ডেসিবেল অনুষ্ঠান করে । নেতাগিরির জন্য যা যা করা দরকার সবই করে । দেখছিস না, নিজের কোলে রাইফেল, পাশে বডিগার্ডদের পকেটে-কোমরে পিস্তল । গুণ্ডা-মাস্তানের দল ছাড়াও, ওর স্টকে অনেক ভিখিরি আছে, প্রায় শ’দুয়েক হবে, সবাই ভালো অভিনেতা, দরকার পড়লে টিভি-সিনেমার পরিচালকরা ওর কাছ থেকে ভাড়া করে নিয়ে যায়, বেশ্যার ব্যবসাও আছে ওর, তিন চারটে পাড়ায় বেশ্যা বসিয়েছে, তা প্রায় শ’তিনেক হবে । ধর্ষণের মোটর সাইকেল গ্যাঙ আছে, তাদের মেয়াও-মেয়াও চাটিয়ে পাঠিয়ে দ্যায়, পার্টির র‌্যাশান  কার্ডের ঠিকানা জানিয়ে ; তুই জয়েন করতে পারিস, তোর তো মোটর সাইকেল রয়েছে ।

নিশ্চয়ই ডোনেশান দ্যায় সৎ কাজের জন্যে ? জানতে চায় যুবক, কন্ঠস্বরে শ্লেষ ।

শ্লেষকে পাত্তা দেয় না যুবতী, শর্টস-পরা যুবকের চুলে-ভরা উরুতে হাত রেখে বলে, হ্যাঁ, কতো ছেলেমেয়ের পড়াশুনার খরচ মেটায়, বিধবাশ্রমকে দান করে, স্কুল-কলেজে ভর্তি করায়, ওর নিজেরই আছে ইনজিনিয়ারিং আর মেডিকাল কলেজ ।

শুকোতে থাকা ঠোঁট জিভ দিয়ে চেটে যুবক পেছন ফিরে বলল, হাত সরান, গুঁড়োয় কিন্তু আমার নেশা আরম্ভ হয়েছে, অ্যাকসিডেন্ট হতে পারে ; এ-রাস্তাও কতোকাল সারানো হয়নি, জানি না, তার ওপর পিঠে আপনার দোনলার গুঁতো দিয়ে চলেছেন, এরকম ছুঁচালো নকল বডিস পরেন কেন ।

যুবতী বলল, কন্ঠস্বরে আত্মাভিমানের ঝিলিক, নকল নয়, আসল, ছুঁচালো বলে নকল মনে করার কারণ নেই । বডিসও পরে নেই আমি, এখনও ঝুলে যাবার বয়স হয়নি, কেবল ব্লাউজের ওপর শাড়ি ।

গর্বের ব্যাপার বলুন ? আর কতো দূর আপনার গর্বের খোঁচা খেতে খেতে যেতে হবে ?

ওই যে, শ্মশানকলোনির সামনে,  পুরোনো আমলের একতলা বাড়ি দেখছো, ওটাই আমার ঠেক ।

তুমি এতো ঘোরালে কেন তাহলে ? এটা তো জগার্স পার্কের পেছনের শ্মশানকলোনি , এই শ্মশানের ধারে বাড়ি, কাদের বাড়ি এটা, ভাড়া না নিজেদের, এরকম ফাঁকা জায়গায় বাড়ি, রাতের বেলায় মড়া এলে কান্নাকাটিতে ঘুমের দফারফা । এই শ্মশানকলোনি আমি তো চিনি, বাবা, মা দাদাকে এখানের চিতাতেই তুলেছি । একটামাত্র বাড়ি তবু লোকে একে শ্মশানকলোনি কেন বলে জানি না ।

ফর ইওর ইনফরমেশান, আজকাল শবযাত্রীরা আর কান্নাকাটি করে না, গান গাইতে গাইতে আসে, গান গাইতে গাইতে যায় । কান্নাকাটি আগের প্রতিষ্ঠানের সময়ে ছিল, এখন তামাদি হয়ে গেছে । আর কি জানিস, তোর উরু-পায়ের গোছে চুল দেখে তোকে  এতো ভালো লেগে গেল, ওই যাকে খারাপ লোকেরা বলে চিত্তচাঞ্চল্য, ভাবলাম আজকে এই ছেলেটাকেই ধরি । তোকে দেখেই জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করল । আর এই বাড়িটা আমার নিজেরও নয় ভাড়ারও নয়, জবরদখল করা, কখনও কোনো জমিদারের বাইজি-নাচাবার জন্যে তৈরি হয়েছিল ।

জবরদখল ? মানে ?

অন্যের আচার-বিচার, আদর্শ, মতামত, দর্শন, পাঁচালি যদি দখল করে নিজের বলে চালাতে পারিস, বিক্রি করতে পারিস, তাহলে বাসা জবরদখলের দোষ কোথায়, বল তুই আমায় ! ব্রিটিশরা তো এই দেশটাকে জবরদখল করে কলোনি বানিয়েছিল ; আমরা এটাকে শ্মশানকলোনি বানিয়েছি। [১২]

গান গাইতে-গাইতে ?

হ্যাঁ, সেই যে একজন সামাজিক সুপারম্যান মারা গেল, শহরচত্ত্বরে যার ডেডবডি রাখা হয়েছিল পাবলিকের দুখদর্শনের জন্যে, নাকে ভ্যানিলাগন্ধের তুলো গুঁজে, তার শবযাত্রী চেলারা গান গাইতে গাইতে এসেছিল, গাইতে গাইতে ফিরে গিয়েছিল, তখন থেকেই ক্রেজটা ধরে নিয়েছে পাবলিক ।

ক্রেজ ?

হ্যাঁ, ভদ্রমহোদয়, দেখিসনি, সঙ্গে বাজনা-টাজনাও থাকে অনেক শবযাত্রার , একবার একজন বাজিয়ের শব এসেছিল, তার শবযাত্রীরা হেভি মেটাল বাজাতে বাজাতে এসেছিল । বছর দশক হয়ে গেল, নিরীক্ষামূলক শবযাত্রার চল হয়েছে । তোর মা-বাপ-দাদা পটল তুলেছেন অলরেডি, নয়তো তুইও কোনো রক ব্যাণ্ড ভাড়া করে আনতে পারতিস , শ্মশানের অফিসঘরে কানট্রি রক, ফোক রক, পাওয়ার মেটাল, থ্র্যাশ, গ্রাঞ্জ, পাঙ্ক রক, গ্ল্যাম মেটাল, হেভি মেটাল, সকলের ফোন নম্বর আর রেটচার্ট আছে । তবে আজকাল ট্যাগোর রকের চল বেশি ।

 

Double space

আচ্ছা, আপনি যান, আমি চলি । আপনার গা থেকে আমার দোকানের দশকর্মের জিনিসপত্রের গন্ধ বেরোচ্ছে, আশ্চর্য । নিজের অনিশ্চয়তাকে বোঝার চেষ্টায় বলে ফেলল যুবক, যদিও টের পেল যে বলে ফেলাটা বোকামি হয়েছে, কেননা এই যুবতীর গা থেকে যে গন্ধ বেরোচ্ছে তা আঁশটে, যেন লইট্যা মাছ লুকিয়ে রেখেছে কোঁচড়ে ।

ভেতরে চল, দেখতে পাবি, আমার অ্যাঁড়গোবিন্দ ড্যাডি, অন্ধ হয়ে গেছে আড়ং ধোলাইয়ের চোটে, স্রেফ গোটাকতক টাকিয়াল গোঁপুড়ে দাড়িয়ালের দর্শনকে নিজের বলে চালাতে গিয়ে । শেষে ওর শিষ্যরা খুনোখুনি, ব্যাংকলুঠ, ঠিকেদারি, হুমকিটাকা, দালালি, লাশলোপাট, বোমাবাজি, মেয়ে পাচার, এই সব কাজে ঢুকে পড়ল আর বাপের দর্শন-আদর্শের দফারফা করে ছাড়লে ।

বাড়িটার দাবিদার আসেনি, কোনো টেকো বা দাড়িয়াল, সিনডিকেটের লাঠিয়াল, কিংবা মাগি-ধুমসিদের মাফিয়া ? জানতে চায় যুবক, এমন কন্ঠস্বরে যেন আগে জানলে সে-ই দখল করে নিতো ।

কতোকাল হয়ে গেল কোনো দাবিদার আসেনি । সেসময়ে কান্নাকাটি শুনতে আমার ভালো লাগত । মড়া এলেই জানলা খুলে দিয়ে কান্নার রোল শুনতুম । মড়াপোড়ার অমায়িক সুগন্ধ ভালো লাগে । মানুষের হাসি প্রায় সবায়ের একই রকম হয়, কিন্তু কান্না সবায়ের আলাদা-আলাদা, যাকে দেখতে যেমন তার কান্না ঠিক তার উল্টো, যতো ভালো দেখতে, ততো কুচ্ছিত তার কান্না । আজকাল অবশ্য কাঁদবার প্রথা তামাদি হয়ে গেছে।

যুবতী মোটর সাইকেল থেকে নামতে, যুবক পকেটের  রুমাল-ধরণের ছোটো গামছা বের করে সিটের রক্ত পুঁছে শুঁকলো, আর রুমালটা পকেটে রেখে নিল ।

কি, স্বর্গীয় সুগন্ধ না ? থুতনি উঁচিয়ে, জিগ্যেস করল যুবতী, থুতনির কালো তিলে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তারপর পাতলা ঠোঁটে শ্লেষ খেলিয়ে যোগ করল, রুমালের বদলে গামছা ?

যুবক বলল, পৌঁছে দিলাম তো, তার মাশুল হিসেবে রক্তগন্ধা রেখে নিলাম । এই মাপের গামছা দশ রকমের সংস্কারের সব কয়টায় ইউজ হয়, আমি তাতে তোমার রক্ত পুঁছে এগারো নম্বর যোগ করলাম ।

ব্যাস এইটুকু ? চলো চলো বাড়ির ভেতরে চলো, এখনও তো মেয়াও-মেয়াও-কিস সম্পর্কে জ্ঞান দিইনি ।

যুবক চোখ মেরে বলল, জ্ঞান নেবো, একটা শর্তে ।

বোকাচোদার মরণ,  মুকখুর আবার শর্তও আছে, প্রথম আলাপেই চোখ মারে ! কী, শুনি ? চোখ মারার মাশুল হিসাবে কথায় স্ল্যাং মিশিয়ে বলল যুবতী ।

লাবিয়ার মাকড়িটা আমি নিজে হাতে খুলে দেবো, তোমাকে খুলতে তো হবেই, স্যানিটারি ন্যাপকিন বাঁধার জন্য । সেই সুযোগে প্রজাপতি দুটোকেও দেখে নেবো, আমি অমন প্রজাপতি জীবনে দেখিনি, লাবিয়ার মাকড়িও জীবনে দেখেনি, পুরুষ্টু লাবিয়ার ঠোঁটই দেখিনি তো তার মাকড়ি আর কোথ্থেকে দেখবো। ব্যাস, মাকড়ি খুলব, আর কোনো আগ্রহ নেই, বলেছি তো আপনাকে, মেয়েদের চেয়ে নতুন মোটর সাইকেলের বডি আমাকে বেশি টানে, কতো মসৃণ হয় মোটর সাইকেলের ত্বক ।

চলুন, ভেতরে চলুন, একদম আওয়াজ করবেন না দাঁড়ান, তালা খুলি, বাপেদের তালা দিয়ে যেতে হয় । একবার তালা দিয়ে যাইনি, আলঝিমার বাপ গিয়ে আধসাজানো চিতার ওপর শুয়ে পড়েছিল, যারা লাশ নিয়ে এসেছিল তারা চ্যাংদোলা করে গান গেয়ে গালাগাল দিতে-দিতে ফেরত দিয়ে গিয়েছিল ।

তালা খোলার পর অন্ধকার বাড়ির ভেতরে ঢুকে দুর্গন্ধে হেঁচে ফেলল যুবক, ওয়াক সামলে নিল ।

আওয়াজ শুনে চেঁচাতে শুরু করল কোনো বুড়ো হাঁফ-ধরা কন্ঠস্বর ।

মার শালাকে মার শালাকে….

মার মার মার মার মাথা ফাটিয়ে দে, ছাড়িসনি, চুলের মুঠি ধরে উপড়ে নে…

লাগা ক্যাঁৎকা… লাগা, বানচোদ নিজেকে ভেবেছে জ্ঞানের পাতকো…

মার শালাকে মার মার মার মার মার মার বোকাচোদাটাকে….

আমাদের দলের সঙ্গে পাঙ্গা, বুঝিয়ে দিচ্ছি কাদের চটিয়েছে বানচোদ…

টেবিলের কাঁচটা ভেঙে দে, লাঠি দিয়ে হবে না, লোহার রড দিয়ে ভাঙ ভাঙ ভাঙ…

আবার কমপিউটার রাকা হয়েছে, কতো লোকের চাগরি খেয়ে নিলে কমপিউটারগুনো…

মার মার মার মার বানচোদকে…

দেয়ালে ওগুনো কাদের ছবি টানিয়েছে গাণ্ডুটা, আমাদের কোনো নেতার নয়…

মার ডাণ্ডা…ভাঙ ভাঙ…কি পারছিস না…আমাকে দে…

মাথা ফাটিয়ে দে ল্যাওড়ার বাচ্চার…

চোখে মার, নাক ফাটিয়ে দে..

মার মার মার মার মার, টেলিফোনের তার ছিঁড়েছিস…ছেঁড় ছেঁড়…

টাবিলের কাঁচ তুলে ফেলে দে…

শালা পুলিশের ভয় দেখাচ্ছিল আমাদের…

জানে না আমরা কার পোষা…

মার মার জামা ছিঁড়ে দে…পারছিস না…কেটে বের করে নে…

খালি পিঠে বাড়ি না মারলে বোকাচোদার মনে থাকবে না..

দে রদ্দা দে রদ্দা…

মার পেটা পেটা কামিনাটাকে…ল্যাখাপড়ার হিরোগিরি বের করছি বানচোদের…

ইনজিরি ঝাড়ছিল চুতিয়ার বাচ্চা…

বাল উপড়ে নে…

ড্যাডি, কী হচ্ছে কি, আমি আমি, এসেছি, চেঁচিও না, বলে বারণ করল যুবতী ।

অন্ধকারে যে লোকটা চেঁচাচ্ছিল, আবছা বোঝা গেল সেই ড্যাডি নামের বাবা, আরেকটা লোকও বসে আছে, গুম হয়ে, তাকে কী বলে ডাকে তার জন্য অপেক্ষা করছিল যুবক । দুজনের চোখেই কালো চশমা, কাঁধ পর্যন্ত চুল, লম্বা দাড়ি, ঝাবড়া গোঁফ, মনে হয় চুল কেটে দেবার, দাড়ি কামাবার, গোঁফ ছাঁটার সুযোগ থেকে এরা বঞ্চিত ।

বিরাট হলঘরে, যেখানে কখনও মোসাহেবদের নিয়ে পাশবালিশ জড়িয়ে বিলিতি মদ খেতো জমিদার, চারটে বেতের চেয়ারের দুটোয় সামনা সামনি বসে, দুজনেই উলঙ্গ, দুজনেই নিজের লিঙ্গ বই দিয়ে চাপা দিয়ে রেখেছে ; বইগুলো বোধহয় ক্লাস ফাইভ-সিক্সের ভুগোলের শক্ত মলাটের অ্যাটলাস । দুজনের মাঝে কোনো টেবিল নেই । ড্যাডি লোকটা একটা পাইপ ফুঁকছে, কিংবা ফোঁকার ভান করছে ।

যুবতী, বাঁ দিকে তাকিয়ে, স্লিং ব্যাগ থেকে, ইলেট্রনিক টর্চ বের করে ড্যাডি নামের বাবার ওপর ফোকাস করে জিগ্যেস করল, ব্রেকফাস্ট করেছ । বাঁদিকে ফেরার সময়ে বুক দুটো যুবকের দিকে তাক করা ছিল , নিঃঃশব্দে গুড়ুম শুনতে পেল যুবক, অদৃশ্য ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ল ।

ড্যাডি ঘাড় নাড়ালো, আলোয় চিকচিক করে উঠলো মলম লাগানো খোসপাঁচড়া, তারপর বলল, ভালোবাসা খায়নি  মনে হয় , তুই ওদের খেতে দিয়ে যাসনি বোধহয়, গান তো গায়নি ওরা , ভালোবাসা জানে, মাংসই সর্বজনীন ।

অন্য বুড়োটার দিকে মাথা নিচু করে,  যুবতী জিগ্যেস করল, তোমার কফি খাওয়া হয়েছে ?

বুড়ো, যাকে যুবতী জিগ্যেস করেছিল, চকচকে মোদো মুখ তুলে যুবতীর দিকে চুমু ওড়ানোর ঢঙে বলল, তোর ড্যাডির যখন চোখ ছিল, জ্ঞানচক্ষু নয়, চামড়ার চোখ, জ্ঞানচক্ষু তো ওর নেইই,  তখনও নিজের অন্ধত্বকে ছাপিয়ে যেতে পারিনি ।

ড্যাডি, গুমরে উঠে, বলল, একদিন পৃথিবীর বদল ঘটবেই, আর তা ঘটাবে অন্ধ, কালা আর বোবারা, দেখে নিস নর্দমার পোকা ; চোখ আছে বলে গোমরে ফেটে পড়ছিস স্কাউন্ড্রেল । শোন বানচোদ, পুরোনো সমাজের একেবারে নিচু স্তর থেকে ছিটকে পড়া যেসব লোক বেকার হয়ে পচছে, সেই লুম্পেনদের সুপারলুম্পেনরা  বিপ্লবের খাতিরে এখানে-ওখানে আন্দোলনের মধ্যে ঝেঁটিয়ে নিয়ে আসবে একদিন, কিন্তু এদের জীবনযাত্রার ধরণটা এমনই যে, তা প্রতিক্রিয়াশিল ষড়যন্ত্রের ভাড়াটে হাতিয়ারের ভূমিকার জন্য তাদের অনেক বেশি করে তৈরি করে তুলবে । আর তা করছিস তোরাই । একদিন সব বদলে যাবে, দেখিস, নতুন দিগন্ত দেখা দেবে ।

বাপি নামের বুড়ো বলল, বকওয়াস শালা, কি যে মাথামুণ্ডু বাংলিশ বকছে, নিজেই লুম্পেনদের পুষেছিল, তারাই তোর পোঁদে বাশ করে অন্ধ করে দিলে । লুম্পেনদের নিয়ে তত্ববাজি হয় না, এই লুম্পেনরা ইউরোপের লুম্পেন নয়, খাঁটি দেশি লুম্পেন, পিওর দেশি ব্রিড । যখন চোখ ছিল তখন দেখেছিলিস তো এদেশের রাস্তার কুকুর আর ওদের দেশের রাস্তার কুকুররা কতো আলাদা ।

তারপর যুবতীর দিকে তাকিয়ে বাপি জিগ্যেস করল,ভালোবাসার জন্যে  আর খোরাক পাওয়া যাচ্ছে না বুঝি রে ?

ড্যাডি দিল কথাটার উত্তর, খুনখারাপি না করলে উত্তরণ ঘটবে না ; মনে করো পোল্যাণ্ডের জঙ্গলের মাটির তলাকার হাড় ,খুনখারাপি হল মানুষে মানুষে যোগাযোগের প্রধান বার্তামাধ্যম, রক্ত রক্তের সঙ্গে কথা বলে ।

বাপি পোঁদ উঁচু করে জোরে পাদল, ড্যাডির কথার উত্তর হিসাবে, বোধহয় আটকে রেখেছিল, সঠিক সময়ে ছাড়বে বলে ।

বাপির কানে ফিসফিসিয়ে যুবতী বলল, যুবক শুনতে পায় এমন কন্ঠে, একটাকে ফাঁসিয়ে এনেছি, মেয়াও মেয়াও গিলিয়েছি, আরও কয়েকবার মুখে ঠুশে দেবার পর গতি করতে হবে ।

বাপি সে কথায় ততো গুরুত্ব না দিয়ে সামনের বুড়োকে বলল, গামবাট অন্ধ ল্যাঁড়টা আবার জ্ঞান দিতে লেগেছে, শালার চোখ গেলে দিয়েছে পিঁজরেপোলের বাছুর ছেলেছোকরারা, তবু পুঁথির গুদলেট চোরাপাঁক থেকে বেরোতে পারল না। জীবন থেকে আর কিছু পায় না, পায়নি, বিদেশিদের লেখা অনুবাদ করা বদগন্ধের  বই পড়ে-পড়ে বস্তাপচা বুকনি ঝাড়ে । ম্যাকলে যদি ইংরেজি চালু না করত, তাহলে বুকনি ঝাড়ার, বই পড়ার, এলেমও থাকত না গেঁড়েগুলোর ।

এই চোপ ।

তুই চুপ কর অন্ধ ; তোর তো কোথাও যাবার যো নেই ।

তুই পড়ে আছিস কেন, এখানে, পোঁদ মারাতে ?

আমি আসতে চাইনি । আমি এই খুনশ্মশানের  অংশ হতে চাইনি, মেয়েটাই জোর করে নিয়ে এলো, ওর মায়ের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেবার জন্যে, নয়তো ওর মায়ের চাকর হয়ে ভালোই ছিলাম, ওর মায়ের কচি কচকচে বরকেও মেনে নিয়েছিলাম ।

যুবতী বলল, মাকেও যে কবে ভালোবাসায় সোপর্দ করব তার অপেক্ষায় আছি ।

অন্ধ সামনের বুড়োর উদ্দেশে বলল, শালা, মাগের নাঙ কোথাকার । এই ভেড়ুয়াটাকে দেখলেই বঙ্কিমের সেই কথাগুলো মগজে বাজতে থাকে, সেই যে সাম্যতে উনি লিখেছিলেন, রাম সেলাম করিয়া, গালি খাইয়া, কদাচিৎ পদাঘাত সহ্য করিয়া, অথবা ততোধিক কোনো মহৎ কার্য করিয়া, কোনো রাজপুরুষের নিকট প্রসাদপ্রাপ্ত হইয়াছে । রাম চাপরাশ গলায় বাঁথিয়াছে — চাপরাশের বলে বড়োলোক হইয়াছে । আমরা কেবল বাঙ্গালির কথা বলিতেছি না — পৃথিবীর সকল দেশেই চাপরাশবাহকের একই চরিত্র — প্রভূর নিকট কীটানুকীট, কিন্তু অন্যের কাছে ? ধর্মাবতার !! তুমি যে হও, দুই হাতে সেলাম করো, ইনি ধর্মাবতার । ইঁহার ধর্মাধর্ম জ্ঞান নাই, অধর্মেই আসক্তি — তাহাতে ক্ষতি কি ? রাজকটাক্ষে ইনি ধর্মাবতার । ইনি গণ্ডমূর্খ, তুমি সর্বশাস্ত্রবিৎ — সে কথা এখন মনে করিব না, ইনি বড় লোক ইঁহাকে প্রণাম করো । বলে, পেট নাচিয়ে হাসতে লাগল লোকটা ।

দেড়ফুটিয়াটা বঙ্কিম চুরি করে আমায় জ্ঞান দিচ্ছে, আর এতক্ষণ বলছিল আমিই নাকি অন্যের মতাদর্শ নিজের বলে চালাই । ম্যাকলের ধোলাই খেয়ে বঙ্কিম বেরোচ্ছে মুখ দিয়ে, এর শিষ্যগুলোর তো বঙ্কিম পড়তে হলে ভয়ে বিচি শুকিয়ে যায় । সংস্কৃতকে তুলে দিয়েছিল, এখন বোঝো ।

চালাস তো । লেখালিখি আর ছাপানোর ব্যাপার না থাকলে তোরা কি আর পৃথিবীটাকে এরকম বদনাম করতে পারতিস ?

আমি যে আলো দেখতে পাই তুই তা পাস না, তুই এক রকমেরই আলো দেখিস, যার নাম অন্ধকার ।

যুবতী চেঁচিয়ে উঠল, আঃ, একদণ্ড শান্তিতে থাকতে দাও না তোমরা দুজনে । আমি তো তোমাদের সমস্যার সমাধান করছিই, ধৈর্য্য ধরতে পারো না !

Double space

 

যুবকের মাথা ঝিমঝিম করছিল, ঘুমও পাচ্ছিল, জিগ্যেস করল, ভালোবাসা ? মেয়ে না ছেলে ?

হ্যাঁ, ভা, লো, বা আর সা, আমার পোষা চারটে শকুন, আপনি যে বদগন্ধে হাঁচতে লাগলেন, আরেকটু হলেই বমি করে ফেলতেন, তা ওদের জন্যে, ওদের জন্যে লাশের বন্দোবস্ত করতে হয়, কিংবা শ্মশান থেকে আধপোড়া  মাংস যোগাড় করে আনি, বাঁচে না কিছুই, কিন্তু সবটা এক লপ্তে খায় না, আরও পচিয়ে খায়, যার যেমন রুচি ।

শকুন ? পেলেন কোথায় ? ভা-লো-বা-সা ? সা-বা-লো-ভা । সা-রে-গা-মা-পা-ধা-নি-সা ! বেশ সঙ্গীতময় নাম তো ! যুবক গঙ্গাজল ছেটাবার মতন করে হাত নাড়িয়ে বলল, ওম নাস্তি, ওম নাস্তি, ওম নাস্তি । নিজেকে শুনিয়ে নিঃশব্দে বলল, এই লোকগুলো যা বলছে তা সত্যিই ভেবে বলছে কিনা কে জানে, এরা আদপে ভাবেই না হয়তো, কথা বলাটা এদের জীবনযাপনের টাইমপাস ; কিংবা হতে পারে এদের মগজটা বিকৃত বা ফাঁকা ।

এই শ্মশান থেকেই টোপ দিয়ে ধরে এনেছি, ভালো গান গাইতে পারে ওরা, অনেকে মড়া আধপোড়া হয়ে গেলেই কেটে পড়ে, মুদ্দোফরাস আর ডোমগুলোও লোকজন নেই দেখে, নদীর জলে ফেলে, চিতা নিভিয়ে, আধপোড়া লাশ ভাসিয়ে দিয়ে বাড়ি কেটে পড়ে । ওদের প্রিয় গান গাইতে-গাইতে  অমনই এক লাশ খাচ্ছিল কয়েকটা শকুন, তারা রোজ আসত খাবারের লোভে, বাজার থেকে মাংস কিনে এনে পচিয়ে ফাঁদ পেতে ধরে ফেললাম এক এক করে চারটেকে । আধপোড়া লাশ পেলে বেশ কিছুকাল চলে যায়, নয়তো বন্দোবস্ত করতে হয় । ওই ঘরটা শকুনদের নাচমহল, জমিদার ব্যাটা ঝাড়লন্ঠনের মিহি আলোয় বাইজিদের ঠুমরি শুনতো , কয়েকটা বাইজির ফোটো আছে দেয়ালে।

লোকে সুন্দর দেখতে পাখি পোষে, আর তুমি শকুন পুষেছ ? যুবক সত্যিই অবাক ।

শকুনদের আমার ভালো লাগে, আই লাভ দেম, কি বিউটিফুল ওদের দেখতে । তাই তো নাম দিয়েছি ভালোবাসা । ভেবে দেখুন, ভালাবাসা কি শকুনের মতন ছিঁড়ে ছিঁড়ে খায় না প্রেমিক প্রেমিকাদের ? জমিদার মশায়ের ভালোবাসাবাসির বিশাল ঘরেই ওদের ঠাঁই দিয়েছি । ওদের সেক্স করা দেখেছেন ? প্রাণ জুড়িয়ে যাবে দেখলে, পায়ের আর ডানার কী অসাধারণ ভারসাম্য ।

শকুনদের নাম ভালোবাসা রাখাটা কি হিংস্রতা নয় ? বলল যুবক ।

যুবতী বলল, ভায়োলেন্স হবে কেন ! মানুষের মতন ওরাও লেগ পিস চায়, বোনলেস চায়, থাই পিস চায় , ডাবল-ব্রেস্ট চায়, সসেজ-পেনিস চায়। বরং শকুনঘরে ঢুকলে সেই সময়টুকুর জন্যে পৃথিবীর টান চলে যায়, দেখবেন একবার ঢুকে। দুঃখ বিষাদ প্রেমের গ্লানি  কষ্ট যন্ত্রণার মানসিক দুর্দশা থেকে মুক্তি দেয় । ক্ষণিকের জন্যে হলেও কম প্রাপ্তি তো নয়।

বিদেশি সিনেমায় দেখেছি বটে, যেগুলোর তলার দিকে ইংরেজিতে সংলাপ দৌড়োয়, সত্যি কিনা জানি না, ফর্সা মেয়ের লেগ পিস, থাই পিস, ডাবল ব্রেস্ট নিয়ে খেলছে ফর্সা ছেলে, ফর্সা মেয়েটা ছেলেটার সসেজ-পেনিস নিয়ে খেলছে । ওসব সিনেমা বেশি দেখার সুযোগ পাই না, এতো বড়ো লাইন পড়ে টিকিটের জন্যে, ল্যাংটো বডি দেখতে কার না ভাল্লাগে, বলুন ?

আর তো দেখতে পাইনে, কাঁদো কাঁদো গলায় হেঁচকির মতন বলে উঠল ড্যাডি আমের বাবা ।

যুবক নিজের কথা চালিয়ে গেল, পাড়ায় তো দেখেছি একজন মেয়ে অনেকের সঙ্গে ভালোবাসাবাসি করছে । পাড়ার পেছনদিকে একটা জঙ্গলমতন আছে, সেখানের ঝোপগুলো দুললে বুঝতে পারি ভালোবাসাবাসি চলছে । আজকাল তো বাহাত্তুরে বড়ি বেরিয়েছে, একটা বড়ি খেয়ে নাকি বাহাত্তরজন ছোঁড়ার সঙ্গে তিন দিন ধরে একের পর এক  শোয়া যায় । চোদ্দ বছর বয়স হলেই, ওই যে তুমি যাকে বলছ হার্ড ডিক, শহিদ মিনার, তা হয়ে যায় । আমি ওই লাইন পছন্দ করি না । যাকে জানি না, চিনি না, অমন মেয়ের সঙ্গে শুতে আমার ভীষণ ভয় । কারোর সঙ্গে শুতেই চাই না তাই । শুলেই আমার ভেতরের ফাইটারটা সেদিনকেই মরে যাবে । আমি দিনের বেলায় দশকর্মভাণ্ডার চালাই আর রাতে নতুন মোটর সাইকেল লিফ্ট করি, বেচি না, জাস্ট চুরি করে চালাই আর কাছাকাছি রাস্তায় রেখে দিই ।

যুবতী এবার খুঁটিয়ে দেখল যুবককে, বাইসেপ আছে, চোখে প্রশ্নের খোঁচা,  বলল, ওঃ, তুমি তো আমাদের লাইনেরই দেখছি, ভালোই হল, তোমায় আর মেয়াও মেয়াও দেবো না, নিজের কাজে লাগাব । তোমাকে শুতে হবে না, বসে-বসেও জীবনের আনন্দ নেয়া যায় ।

কাজ ? কী কাজ ?

প্রথম কাজ হল আমার মায়ের লিভটুগেদার ছোঁড়াটাকে ভালোবাসায় সোপর্দ করা ।

যত্তো সব ক্রিমিনাল চিন্তা ।

আমার আশঙ্কা ছিল যে কেমন করে তোমাকে আমাদের নোংরায় টেনে আনি ।

মোটর সাইকেল চুরি করে চালানো মোটেই নোংরা কাজ নয় ; এটা আমার হবি ।

যুবতী অন্য বুড়োটাকে জিগ্যেস করল, বাপি, তোমার ব্রেকফাস্ট হয়েছে ? সে কোনো উত্তর দিল না । যুবতী তার মুখের ওপর ইলেকট্রনিক টর্চের আলো ফেলে উঁচু গলায় জানতে চাইল ব্রেকফাস্ট হয়েছে কি না, কোনো উত্তর পেলো না । তার বদলে নাটুকে ঢঙে বুড়ো বলতে লাগল

নাম তো সুনা হোগা, রাহুল

আকাশের দেবতা সেইখানে তাহাকে দেখিয়া কটাক্ষ করিলেন

নাম তো সুনা হোগা, রাজ

কাঁটা ফুটিবার ভয়ও কি নাই কুসুমের মনে

নাম তো সুনা হোগা, দেবদাস

সইতে পারি না ছোটবাবু

নাম তো সুনা হোগা, বাজিগর

শরীর ! শরীর ! তোমার যোনি নাই কুসুম

নাম তো সুনা হোগা, চার্লি

আমি এক মাতাল, ভাঙা বুদ্ধিজীবী, ব্রোকেন ইন্টেলেকচুয়াল

নাম তো সুনা হোগা, ভিকি

প্রতিবাদ করা শিল্পীর প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব ; শিল্প ফাজলামি নয়

নাম তো সুনা হোগা, অর্জুন

বাংলা ভাগটাকে আমি কিছুতেই গ্রহণ করতে পারিনি — আজও পারি না

নাম তো সুনা হোগা, ম্যাক্স

ইউ আর অলওয়েজ এ পার্টিজান, ফর অর এগেইনস্ট ইট

নাম তো সুনা হোগা, ওম কাপুর

সব মাতাল ; আমাদের জেনারেশনের কোনো ভবিষ্যত নেই

নাম তো সুনা হোগা, কবির খান

আমি প্রতি মুহূর্তে আপনাকে ধাক্কা দিয়ে বোঝাব, ইট ইজ নট অ্যান ইম্যাজিনারি স্টোরি

নাম তো সুনা হোগা, জি ওয়ান

এদেশে শ্রমিক আন্দোলন করতে গেলে খৈনিই ধরতে হবে

লাৎ খাও হুমড়ি খেয়ে পড়ো উঠে দাঁড়াও…লাৎ খাও হুমড়ি খেয়ে পড়ো উঠে দাঁড়াও…লাৎ খাও হুমড়ি খেয়ে পড়ো উঠে দাঁড়াও…লাৎ খাও হুমড়ি খেয়ে পড়ো উঠে দাঁড়াও…লাৎ খাও হুমড়ি খেয়ে পড়ো উঠে দাঁড়াও…লাৎ খাও…ধর্ম ফিরছে…ধর্ম ফিরছে…ঈশ্বর ফিরছে না…ধর্ম ফিরছে…কেউ বাঁচবে না…সব…কচুকাটা…খুন…ধর্ষণ…পালাও…পালাও…চাপাতি রাখো….ত্রিশূল রাখো…ধর্ম ফিরছে…ঈশ্বর ফিরছে না…বোমাবারুদ তাজা করো…ধর্ম ফিরছে…ট্যাঙ্ক…ফাইটার জেট…কার্পেট বোমা…সভ্যতার সঙ্কট কেটে গেছে…গরিব-ধনীর ফারাক মিটে যাচ্ছে…ধর্ম ফিরছে…হাহা…হাহা…হাহা…ঈশ্বর ভাগলবা…বিনা ঈশ্বরের জবরদস্ত ধর্ম ফিরছে…

ঢেঁকুর তোলার মতন করে মুখ উঁচিয়ে, ঠোঁটের কোন দিয়ে, যেন বিড়ি খেয়ে ধোঁয়া ছাড়ছে, অন্ধ বলল, ধর্ম হল আফিম আর ঈশ্বর হল কালো গর্ত।

অন্য বুড়ো প্রত্যুত্তর দ্যায়, মুখের ভেতর জিভ খেলিয়ে, আর তোদের বৌড়াহাগুলো যে ভোদকা খেয়ে, হুইস্কি টেনে পোঁদ উল্টে রাস্তার পাশের ডাস্টবিনে  পড়ে থাকে, ওগুলো ধর্ম নয় বুঝি ? উপনিবেশের লোকেরা আফিম চাটে বলে ধর্ম হল আফিম, আর শাদা চামড়ারা হুইস্কি রাম ভোদকার নেশা ছাড়তে পারে না, তবু তা নেশা নয়, অ্যাঁ, শাদা চামড়ার ক্যারদানি শোনো, যতোই জ্ঞান থাকুক, মগজের ভেতরে কালো চামড়াদের ঘেন্না করবেই । শালারা ভোদকা পেঁদিয়ে দেশের কাঠামোটাই ভেঙে ফেললে, ঠিক মতন দাঁড়াতে পারে না, ভোদকার নেশায় হেলে পড়ে, বলে কিনা আফিম হলো খারাপ নেশা ।

অন্ধ বলল, ব্ল্যাক হোল, দি সুপ্রিম হোল, পবিত্র জ্বালাময়ী ছ্যাঁদা, পালসেটিং, থ্রবিং ।

মাংসের গর্তে ঢোকবার ধান্দায় চোখ খোয়ালো আর এখন গর্ত খুঁজে বেড়াচ্ছে আকাশে, বলল অন্য বুড়ো ।

অন্ধ বলল, যখন চোখ ছিল তখন অনেককিছু দেখেছি, বুঝলি গাড়ল, কাফকা কতো মনস্তাপ ঝেড়ে গেলেন, প্রাগে গিয়ে নিজের চোখে দেখে এসেছি ইহুদি গোরস্তানে ওনার কবর, কেন, সবই যদি মুছে ফেলার ছিল তবে নিজের শবকে চিতায় তুলতে বলা উচিত ছিল ; এ হল জীবনের সামঞ্জস্যহীনতা, আমার মতন, চোখ নেই, তবু যা আগে দেখেছি তা দেখতে পাই ।

অন্য বুড়ো, তুলোট জিভ নাচিয়ে বলল, আরে আমিও ডস্টয়ভস্কির কবর দেখে এসেছিলাম সেন্ট পিটার্সবার্গের টিখিন গোরস্তানে, আলেকজান্ড্রা নেভেসকি মঠে ।

যুবকের মনে হল, এরা দুজনে দুঃস্বপ্নের ভেতর দিয়ে নিজেদের বেঁচে থাকাকে হিঁচড়ে টেনে নিয়ে চলেছে।

অন্য বুড়ো বলল, কী বলছি আর তেলচাট্টা ব্যাটা কী বুঝছে ! আই কিউ ঠেকেছে গাড্ডুসে ।

যুবতী ঝাঁঝিয়ে ওঠে, ভুরু কোঁচকায়, বলে, তখন থেকে এক নাগাড়ে বকর বকর করে চলেছ, তোমার এই বাজে অভ্যাসটা গেল না বাপি, কোন শাঁখচুন্নি-পেত্নি তোমার কানে কী সংলাপ যে ঝাড়তে থাকে, তারা কারা যাদের কন্ঠস্বর শুনতে পাও আর ওগরাও, মগজের ময়লা জমেছে তোমার কানে ; একই সঙ্গে স্কিৎসোফ্রেনিয়া আর অ্যালঝিমার রোগের খিচুড়ি বাধিয়েছ । ড্যাডির ব্যাপারটায় যুক্তি আছে, পিটুনি খেয়ে মাথা আর চোখ দুটোই গেছে, তুমি এরকম ডায়ালগবাজি কেন ধরলে জানি না, ব্রেকফাস্ট খাওনি কেন জানি না, নাও হাঁ করো, মেয়াও মেয়াও খাও আর ঝিমোও ।

বাপি নামের বুড়োর মুখে সেই একই পুরিয়া থেকে এক চিমটি পুরে দিল যুবতী । বাপি নামের বাবা চুপ করার আগে যুবকের দিকে তাকিয়ে বলল, এক চুটকি সিন্দুর কি কিমত তুম কেয়া জানো রমেশবাবু, দি লাভার ইজ এ টারমিনাল ইডিয়ট, রমেশবাবু ।

যুবক বাপি নামের বুড়োর দিকে তাকিয়ে বলল, স্যার, আরব ভাষায় প্রেম শব্দটা নেই, তাই ওনারা চারটে করে বউ আর দশ-বিশটা বাঁদি রাখেন, বোরখায় ঢাকা দিয়ে তাদের আড়ালে নিয়ে গিয়ে খোলেন ।

যুবতী চলে গেল রান্নাঘরে, ফিরে এলো, সুপ-স্পুন দেয়া দুটো সুপ বাউল নিয়ে, বাবা দুজনের কোলে রাখা অ্যাটলাসের ওপরে রাখতে, দুজনে একই সঙ্গে জিগ্যেস করল এটা কিসের সুপ রে ? স্বাদ আছে তো ?

যুবতী বলল, এটা তোমাদের প্রিয় নোজবুফোঁ ইন ম্যারো ব্রাইন উইথ নিপলচেরি ।

এ আবার কী সুপ, শুনিনি তো কখনও, বলল যুবক ।

ড্যাডি নামের বাবা জিগ্যেস করল, যে হেঁচেছিল সে তো তোর বাপি নয়, এই লোকটাই কি ? কাকে সঙ্গে নিয়ে এলি? তোর দলের কেউ? নাকি ভালোবাসার জন্যে ?

যুবতী বলল, হ্যাঁ, একজনকে এনেছি, দেখি কি হয়, ওর নাম হার্ড ডিক, শহিদ মিনার । সুইচ টিপে আলো জ্বালিয়ে যোগ করল ।

ড্যাডি বলল, আমরা শ্মশানের মুদ্দোফরাসকে বলে রেখেছি, নামকরা লোকের শব এলে তার আধপোড়া নাকটা কেটে আমাদের জন্যে রাখতে, যতো নামকরা মানুষ, তার নাক ততো উঁচু, তাই তার পোড়া নাক ততো সুস্বাদু হয়, খেয়ে দেখতে পারো । আধপোড়া নাক দিয়ে নোজবুফোঁর স্বাদ অসাধারণ । এর মধ্যে আধপোড়া নিপল দিয়ে ড্রেসিং করলে, আহা, এর তুলনায় আর ডিশ হয় না। মড়াদের আমরা পছন্দ করি, কেননা মড়ারা মনে করিয়ে দ্যায় যে, হ্যাঁ, দোর্দণ্ডপ্রতাপ প্রতিষ্ঠান কোথাও না কোথাও লুকিয়ে লুকিয়ে প্রতিটি নাক আর নিপলের দিকে নজর রেখেছে ।[১৩ ]

নিপলও কি শ্মশানের চিতা থেকে ? জানতে চায় যুবক । তারপর যোগ করে, আপনাদের কোলের অ্যাটলাস টেবিলের আইডিয়াটা প্রশংসাযোগ্য ।

যুবতী জবাব দ্যায়, অফ কোর্স, কুড়ি থেকে পঁয়তাল্লিশের রেঞ্জে ।

বাপিবাবাটা বলল, নিপল হল আফ্রিকার, আহা, মুখে নিলে পুরো মুখ ভরে ওঠে, ঠিক যেন চুরাশিভোগ দোকানের কালোজামের মিষ্টি ।

ড্যাডিবাবাটার পছন্দ হল না, কিংবা হলেও, বিরোধীতা করতে হবে বলে বলল, দুর্বাঁড়া, নিপল হল আইসল্যাণ্ডের, কী গোলাপি, যেন গোলাপের পাপড়ি দিয়ে তৈরি, মুখে নিলেই ফিরে যাবে শৈশবে, ওঁয়াউ-ওঁয়াউ করে হাত-পা নাড়াতে ইচ্ছে করবে ।

আপনারা তো নিপলের চরিত্র বদল করে দিচ্ছেন, চোষবার বস্তুকে পুড়িয়ে খেয়ে ফেলছেন ! কতো আদরের মাংসল বোতাম, যা দুটি হৃদয়কে জোড়ে, মুখে গিয়ে কথাহীন বার্তারস গড়ে তোলে ! হতাশ্বাসে আড়ষ্ট  গলা থেকে হাওয়া দিয়ে বাক্য বের করে বলে ওঠে যুবক ।

প্রতিষ্ঠান নির্দেশ দিয়েছে বদলানোর, তাই চোষবার বস্তুকে খাবার বস্তু করা হয়েছে, মানুষের মতন বাঁচতে হলে আত্মসন্মান খুইয়ে টিকে থাকতে হবে, বুঝলে, এটা বদলের প্রধান রহস্য । মাঝেসাঝে দুঃখের খেপ এসে ল্যাঙ মারে, সো হোয়াট ! তখন বোলো যে বিষাদে ভুগছি, ব্যাস ।

বাপি নিজের মনে বলল, একদিন জয় মা জবাই, তোমাকে আমি পাবই করব সবকটাকে, সবচেয়ে আগে এই চকরলস বুঢ়ুয়াটাকে ।

চামচ দিয়ে খাবার বদলে চুমুক দিয়ে সুপ খেল বুড়ো দুজন, সুড়ুপ সুড়ুপ আওয়াজ করে, আওয়াজে ছিল অবসরপ্রাপ্ত যৌনজিভের ইশারা,খাওয়া হয়ে গেলে পরস্পরের দিকে ছুড়ে মারল সুপের বাউল । দুজনেই লক্ষ্যভ্রষ্ট হল ।

আলোয় বাড়ির ভেতরটা  আর দুটো বুড়োকে আরও বীভৎস, নোংরা আর দুর্গন্ধময় মনে হল যুবকের, কিছুক্ষণ সময় লাগল আবহের সঙ্গে সমঝোতা করতে ।

আচ্ছা, এখনও হার্ড ডিকের মানুষ পাওয়া যায় ? আমি তো ভেবেছিলুম সেসব আমাদের কালের সঙ্গে ফুরিয়েছে । চোখ থেকে কালো চশমা খুলে বলল ড্যাডি নামের বাবা ।

যুবক দেখল লোকটার দুচোখ গলে সাদা হয়ে বাইরে প্রায় বেরিয়ে এসেছে ; বীভৎস ।

না ফুরোয়নি, তোমার ওই হার্ড ডিকের নিসপিসুনির জন্যেই মার খেয়েছিলে । বলল যুবতী ।

যুবক শ্লেষ্মা জড়ানো গলায় বলল, কি যে খাওয়ালেন, এখন বাড়ি যেতে পারব কি না জানি না ; বাইরে মোটর সাইকেলটা আছে কেউ না নিয়ে পালায় ।

কেউ নেবে না, কিছু চুরি যায় না শ্মশানকলোনিতে, মড়ার হাফ-বেকড নাক আর মড়ানীর সিজলিং নিপল ছাড়া । তোমাকে যে মেয়াও মেয়াও কিস দিয়েছি, তার নাম হল মেফিড্রোন, এটা এক ধরণের কেমিকাল, এর নাম মেথিলমেথাক্যাথিনোন, তোমাকে এই জন্য বলছি যে তুমি আকাট মুকখু, আর এখন নেশায় তোমার মাথা কাজ করছে না ; কিছুদিন আগে পর্যন্ত বাজারে কেমিকালের দোকানে সহজেই পাওয়া যেত, এখন সরকার ব্যান করে দিয়েছে, ছাত্রদের মধ্যে পপুলার নেশা, এতে গাঁজা চরসের মতন ফোঁকাফুঁকির বালাই নেই, বদগন্ধও নেই, অতটা নেশাও হয় না, অথচ ফুরফুরে নেশা হয়,  লোয়ার ক্লাস নেশা মনে হয় না, আমি একটা ফ্যাকট্রি থেকে সরাসরি কিনি ।

আমাকে এসব বলছেন, তারপর যদি  প্রতিষ্ঠানে ফাঁস করে দিই ।

তুমি করবে না জানি । তুমি তো নিজেই স্বীকার করলে দিনে সাধু রাতে চোর ।

কী করে জানলে ? কিন্তু চোর ঠিক নই, আমি মোটর সাইকেল ফেরত দিয়ে আসি চালাবার পর।

যে একবার আমার লাবিয়ার মাকড়ি খুলেছে সে আমার কেনা গোলাম হয়ে গেছে ।

দুজন বুড়োই এক সঙ্গে বলে উঠল, একে তোর লাবিয়ার মাকড়ি খোলানোর জন্যে এনেছিস ?

যুবতী বলল, হ্যাঁ, মত বদলাতে হল, খোলাবো সময় হলে ।

বুড়ো দুজন একই সঙ্গে বলে উঠল, তোর মা আমাদের দিয়ে নিজের লাবিয়ার মাকড়ি খোলাবে বলে লোভ দেখিয়ে বিয়ে করেছিল, তারপর ল্যাঙ মেরে দিলে, তাই আজকে আমাদের এই দশা । এর ভাগ্যে যে কী লেখা আছে তা জানি না ; শেষে তোর মা এসে একে তোর কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে না যায় । বুঝলে মিস্টার হার্ড ডিক, মাকড়িটা হল সূর্য আর তাকে ঘিরে পাক খায় যে মুক্ত সেটা হল পৃথিবী । মাকড়িটা যেখানে ঝোলানো, তা হল আকাশগঙ্গা, ছায়াপথ, ওই পথে যদি একটু ভুল করেছ, পিছলে পড়েছ, আমার মতন অন্ধ বা বাপিবুড়োর মতন অ্যালঝিমার রুগি হয়ে মরবে ।

ছিনিয়ে নিলেই হল ! ভালোবাসা আছে কী জন্য ? মাকে থেঁতো করে ভালোবাসার ঘরে ছেড়ে দেবো, ওদের প্রিয় গানের মাঝে ।

যুবক বলল, আমি শুধু খুলে দিতে চাই, জাস্ট অনুসন্ধিৎসা, আপনাদের মতন আকাশগঙ্গায় সেঁদিয়ে সাঁতরাতে  চাই না ।

প্রেম আর মৃত্যুর মধ্যে বিশেষ ফারাক নেই হে, মিস্টার হার্ড ডিক, বলল ড্যাডি নামের বাবা, পাইপের ধোঁয়া উড়িয়ে, দুটোই এক ধাক্কায় কাজ সাঙ্গ করে ফ্যালে ; আদিরস আর অন্তরস।

Double Space

 

যুবক বলল, এমন নেশা করে দিয়েছ যে এখন আমি কিছুই করতে পারব না । আমি ভালো করে দেখতে চাই ।

তুমি ভাবছিলে আমার মেনসের ব্লিডিং হচ্ছে, এখন সে কথা জানতে চাইছ না ?

হ্যাঁ, তাইতো, তুমি অমন অবস্হাতেই রয়েছ দেখছি, যাও চেঞ্জ করে এসো ।

ফর ইয়োর কাইন্ড ইনফরমেশান, আমিই আপনাকে এত দিন ধরে স্টকিং করেছি, আপনি আমাকে স্টকিং করেননি । আমি জানি আপনি রেড বেল্ট কারাটে, ফ্রি স্টাইল বক্সিংও জিতেছেন বেশ কয়েকটা ।

মানে ?

মানে ওটা নকল রক্ত, আমার রক্ত নয় ।

ড্যাডি চিৎকার করে উঠল, রক্ত ? কোথায় রক্ত ? মার শালাকে মার মার মার মার বানচোদকে, দে প্যাঁদানি, মার মার মার মার…বাল উপড়ে নে…

আঃ, কী হচ্ছে ড্যাডি, কোথ্থাও রক্ত নেই, বলল যুবতী ।

ড্যাডি কাঁদতে আরম্ভ করল, আর জড়ানো গলায় বলতে লাগল, আমার কেউ নেই, ওগো আমার কেউ নেই, কেন আমাকে পেটানো হয়েছিল কেউ জানতে চায়নি, আমি নিজেও জানি না কেন আমার নাক থেঁতো করে চোখ গেলে দেয়া হয়েছিল, প্রতিষ্ঠান আসেনি, প্রতিবেশি আসেনি, সংস্হার লোক আসেনি, কোনো এনজিও আসেনি, আমি অন্যগ্রহের প্রাণী হয়ে গেলাম…হায়…

চুপ করো, চুপ করো, চুপ চুপ চুপ, হাঁ করো, ড্যাডি নামে বাবাকে বলল যুবতী ।

ড্যাডি নামের বাবা হাঁ করলে, মুখের মধ্যে এক টিপ মেয়াও মেয়াও গুঁড়ো ঢুকিয়ে দিতে চুপ করল বুড়ো ।

মেয়াও মেয়াও ওনাদেরও ? জিগ্যেস করল যুবক ।

যুবতী বলল, হেসে নয়, গম্ভীর হয়ে গিয়ে, হঠাৎই, দিনের বেলা ঝগড়া করছে তো দুজনে, সন্ধ্যে হলেই একজন আরেকজনের ওপর চাপা আরম্ভ করবে, হোমোসেক্সুয়াল ওল্ড লাভার্স, মায়ের লাথি খাবার পর এখন বিছানাই ওদের স্বর্গ আর নরক, তারপর মুখে হাসি ফিরিয়ে এনে বলল, ঘুরিয়ে বলতে হলে, সত্য বলে কিছু হয় না, যা হয় তা হল অসামঞ্জস্য, অ্যাবসার্ডিটি ।

প্রসঙ্গ পালটে, যুবতীকে যুবক বলল, আমাকে স্টকিং করছিলেন কেন, আমি রেড বেল্ট, ফ্রি হ্যাণ্ড কিক বক্সিং লড়ি, তাতে আপনার কী লাভ ।

ভুরু কুঁচকে যুবতী বলল, তোমার সাহায্য আমার চাই, তুমি রেড বেল্ট, কিক বক্সিং এক্সপার্ট ।

যুবক বলল, আমার নেশা গাঢ় হয়ে চলেছে…জীবনের মানে বা উদ্দেশ্য খুঁজতে যেও না কখনও…আমি এর আগে কী বলেছি মনে করতে পারছি না…আহা কি আনন্দের…নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে ব্যর্থতা ডেকে এনেছি জীবনে…আনবিক বোমা ফাটার পর যে ফুল আকাশে গিয়ে খোলে তার চেয়ে সুন্দর কোনো ফুল আর নেই…সৌন্দর্য চিরকাল ধ্বংস ছাড়া আর কিছু করতে পারে না…মানুষ জাতটাই তো ব্যর্থ…তাহলে নিজের ব্যর্থতা নিয়ে ভাববো কেন…আমি কখনও অপমানিত হই না সে তুমি আমাকে গালমন্দ করো বা জুতোপেটা করো…আমি রাস্তায় পড়ে থাকা ঝিকমিকে থুথু…কতো লোক তো পোঁদে মৌমাছির চাক নিয়ে সারাজীবন মধু বেচার চেষ্টা করে যায়…কোনো আগাম পরিকল্পনা করি না…জানি ব্যর্থ হবো…সবাই পৃথিবীটাকে বদলাবার তালে আছে…তার প্রমাণ তো দেখতেই পাচ্ছি…কোনো বাঞ্চোৎ উদ্দেশ্যসাধনে সক্ষম হয়নি…আমার নেশা হয়ে গেছে…কোথায় গেলে গো লাবিয়া রানি…মাকড়ি কই…আছে…নাকি বানানো গল্প…আমার মায়ের তো কোনো মাকড়িই ছিল না… কানেও নয়…লাবিয়াতেও নয়…আমিই তো মায়ের শবের শাড়ি খুলে নতুন শাড়ি পরিয়েছিলাম চিতায় তোলার আগে…গায়ে গাওয়া ঘি মাখিয়েছিলাম…মায়ের গর্ভে ফিরে যেতে চাই…মা বলেছিল আমি গিরগিটির মতন রং বদলাতে পারি বলে জীবনে কখনও বিপদে পড়ব না…তবে নেশা হচ্ছে কেন…মা মারা যাবার পর কোনো রান্নাই ভাল্লাগে না…

যুবতী : বুড়ো দুটোর মুখ বন্ধ করালাম তো ইনি শুরু হয়ে গেলেন , মেয়াও মেয়াও কিসের উল্টো প্রতিক্রিয়া এই প্রথম দেখছি ।

যুবক : শুরু হলেই শেষ হবে এমন কোনো কথা বিজ্ঞান বলে নি…বিগ ব্যাঙ…বিগ ব্যাঙ…বোবা অন্ধকার…বাবা তো আমার জন্যে গর্ব বোধ করত…আমিও বাবার জন্য গর্ব বোধ করি…দুজনে দুজনের সব গোপন কথা জানতাম…মাস্টারপিস বাবা…বাবা ছিলেন যাদুকর…নেগেটিভকে পজিটিভ করা ছিল ওনার নেশা আর পেশা…আমার ভেতরে অনেক রকমের জন্তুজানোয়ার সাপ-বিছে আছে…তাদের বেরোতে দিই না…কেউ কেউ কেন এতো সুন্দর হয়…ধাঁ করে এসে লাগে…কিন্তু খুঁত থাকবেই…আমি একাই ভালো আছি…কোনো সম্প্রদায়ে থাকতে চাই না…সম্প্রদায়ে গেলেই সবাই মিলে ঘেন্না করার আনন্দে ভুগতে হবে…সম্প্রদায়ও তো নেশা…তার চেয়ে মেয়াও মেয়াও কিসের নেশা বেশ ভালো…কারোর ক্ষতি তো করছি না…যে কথাগুলো পেছনের সিটে বসে বলছিল…হাটতে হাঁটতে আমাকে উদ্দেশ্য করে বলছিল…তার মাধ্যমে কিছুই বলছিল না…সব মিথ্যে…বানানো…এখন আমার যাবতীয় দ্বিধা উবে গেছে…এই বুড়ো দুটো যেচে কেনা গোলাম হয়েছে…কার ক্রীতদাস জানি না…দাসত্ব উপভোগ করছে…যৌনরোগের মতন…আমি তো মেয়েটার দুঃখময় রাগি দৃষ্টিকে ব্যাখ্যা করে বিশেষ কিছু পেলাম না…এদের এই জবরদখল শ্মশানকলোনির বাড়ির মতন বাড়ি দেখিনি জীবনে…অচেনা…আতঙ্কজনক…দুর্দশার আড্ডাখানা…যন্ত্রণা চিরকাল নবীন…প্রত্যেক মেয়ের জ্যামিতি আলাদা অথচ আমি গণিতজ্ঞ নই…অসৎ মেয়েরা কুচ্ছিত হলেও সুন্দরী হয়…তাদের ভেতরের অন্ধকার তাদের সুন্দরী করে তোলে…

এ মাল তো দেখছি যা ভেবেছিলাম তার চেয়ে কয়েককাঠি সরেস ; যুবকের মুখের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে প্রায় চিৎকার করে ডাকে যুবতী, এই হার্ড ডিক, ঠোঁটে এক চুমুতেই নেশা হয়ে গেল ? তাহলে ক্রিটিকাল জায়গায় চুমু খেলে তোকে তো পাগলাগারদে ভর্তি করতে হবে ।

যুবক : বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যে কথা বলে চলেছি…মিথ্যে কথা বলার একটা আনন্দ আছে…দশকর্মের জিনিসপত্তর বেচতে গিয়ে এইটাই সবচেয়ে জরুরি অভিজ্ঞতা….প্রেমের কথা আউড়ে সময় নষ্ট করা উচিত নয়…মরার জন্যে আর সেক্স করার জন্যে ভালো নরম বিছানা খুবই দরকার…সেক্স বাইরে বেরোয়…প্রেম ভেতরে ঢোকে…দুটো উলঙ্গ দেহের মিশ খাওয়া জরুরি…দীর্ঘ জীবনের জন্যে…এর আগে সব বানিয়ে বলেছি…বাপি আঙ্কল…ড্যাডি আঙ্কল…দীর্ঘক্ষণ ধরে চুমুখাওয়া অত্যন্ত কষ্টকর…প্রেমেও মাঝে মাঝে গ্যাপ দিতে হয়…সেক্স হল দুটো উলঙ্গ শরীরের সবচেয়ে উচ্চাঙ্গের নাচ…কোনো মিউজিকের দরকার নেই…শরীরই সঙ্গীত…বাবা বলে দিয়েছিলেন…দশকর্মের মাল বেচছো বলে ঠাকুর্দেবতায় বিশ্বাস কোরোনি যেন…মন্দির-টন্দিরেও যেওনি…ওনারা বশ্যতা দাবি করেন…একবার কারোর অনুগত হলেই জীবন তালগোল পাকিয়ে যাবে…হতবুদ্ধি…বিভ্রান্ত…কিংকর্তব্যবিমূঢ়…রাজনীতিকদেরও ঘেন্না করবে…ওরাও বশ্যতা দাবি করে…সুন্দরীদের সঙ্গে সেক্স করে কখনও মন ভরবে না…তুমি দোটানায় পড়ে যাবে যে বাদবাকি অঙ্গগুলো নিয়ে তখন কী করব…জুলিয়াস সিজার হিটলার স্ট্যালিনের মতন পাছার জোর নিয়ে আর কোনো রোল মডেল পৃথিবীতে জন্মাবে না…মোমবাতি জ্বালিয়ে মিছিল করে রাস্তায় হাঁটলে বিপ্লব পালিয়ে যাবে…বাবা বলেছিলেন ঠাকুর্দেবতা হল অর্শের মতন…শান্তিতে বসে থাকতে দেবে না…

যুবতী বলল, এ তো দেখছি প্রথমবারেই কুপোকাৎ । এরকম হলে তো এর শহিদ মিনার এক মিনিটেই ধ্বসে পড়বে ! বাবা আর কী-কী বলেছিলেন শুনি ?

যুবক : বাবা বলেছিলেন…গরম মাংসের শরীরের সঙ্গে সেক্স করার চেয়ে স্বপ্নদোষে আনন্দ বেশি…কতো হীরে মুক্তো পান্না পোখরাজ তরল আকারে বেরিয়ে ঘুমকে নদীতে পালটে দ্যায়…প্রেম আনন্দও নয় বিষাদও নয়…প্রেম হল মুহূর্তদের চিরকালীন বানাবার অসফল ম্যাজিক…আমরা সবাই নিজেকে শাস্তি দিতে বাধ্য…যুদ্ধ দাঙ্গা খুনোখুনি লুটপাট চলতে থাকবে নয়তো প্রতিষ্ঠানগুলো টিকবে না…মানবসভ্যতা রসাতলে চলে যাবে…

এ মরণের পাবলিক কোন জগতের চুতিয়া রে, বলে ওঠে যুবতী ।

যুবক আধখোলা চোখে চেয়ে বলে, আরেকটা মেয়াও মেয়াও চুমু হবে ?

না, হবে না, বলল যুবতী, শেষে ওভারডোজের বাওয়ালে মরবে । যুবকের মাথা দুহাতে ধরে ঠোঁটে ঠোঁট চেপে বলে ওঠে, ক্লিন সেক্সুয়াল  ভিজে চুমু নাও ।

আরে ! তোমার সেক্সুয়াল চুমু নিয়ে কী করব ? তুমি তো স্তালিন, হিটলার, জুলিয়াস সিজার, প্রতাপাদিত্য,  ট্যাগোরের সঙ্গে শুতে চাও । নেশার ঘোরেও যুবক দেখল যে যুবতী কখন শাড়ি পালটে, চান করে, চুলে শ্যাম্পু করে,  কালো স্ল্যাক্স আর মিলিটারি টপ পরে এসেছে । আঁশটে বদগন্ধের বদলে যুঁই ফুলের সুগন্ধ ।

এতক্ষণ ধরে নেশার ঘোরে আছি ? তোমার স্ল্যাক্সের তলায় লনজারি নেই তো ? থাকলে অসুবিধা হবে কি ? জিগ্যেস করল যুবতীকে । তারপর যোগ করল, আচ্ছা, সারাদিন জানলায় বসে শাহ জাহান কী করতেন, শুধু একটা দেহই কি ভেসে উঠত ওনার চোখে ? আরও যাদের সঙ্গে শুতেন, তাদের মাংসের স্মৃতি কি কিছুই ছিল না ? তাদের বুকের মাপ, মাইয়ের বোঁটা, উরুর তাপ, চুলের মুঠি, বগলের গন্ধ, ফোরপ্লের অরগ্যাজম, মনে পড়ত না ? তাদের দুই পা কি জাহাঁপনার কাঁধে উঠে গহ্বহের নিশিডাক দিত না ?

জবাব দিল বাপি নামের বাবা, বলে উঠল, নেশার ঘোরে ছিলে বলে বেঁচে গেছ, নয়তো আমাদের সম্পর্কে যে বাজে বকছিলে তুমি, তোমার লিঙ্গ কেটে ফেলতুম আমরা । অনেকের লিঙ্গ কেটে ফরম্যালিনে চুবিয়ে রেখেছি, ওই দিকে, বইয়ের তাকের ওপরে, দ্যাখো । আর তোমার প্রশ্নের উত্তরে বলি, প্রেম-ফেম তো এনেছিল কেরেস্তানগুলো, তার আগে ছিল বিশুদ্ধ যৌনতা, আগুনের মতন টাটকা, খাজুরাহো আর কোণারক দেখেছ কি ; আহা, আমাদের ছিল বাৎসায়ন, আম্রপালী, বহুবিবাহ, বহুগমন, সমকাম, বহুস্বামীর সুখের শান্তির স্বস্তির দেশ, প্রেম করতে শিখিয়ে সব নষ্ট করে দিলে কেরেস্তানগুলো । [১৪] হ্যাঁ, তুমি জিগ্যেস করতে পারো যে তাহলে প্রেমিক কেন প্রেমিকার মুখে অ্যাসিড ছুঁড়ে মারে !

ড্যাডি নামের বাবা  বলল, আমি মারতে পারতুম, মারিনি, এতো সুন্দর মুখ, আহা চোখ জুড়িয়ে যায়, মগজের ভেতরের বিবেক সব পরিকল্পনা ফুরফুরিয়ে ভণ্ডুল করে দিলে ! মারলে কিন্তু ওর সুন্দর মুখ আমার কব্জায় চলে আসতো, আমিই শেষবারের মতন ওর সুন্দর মুখ দেখতাম, তারপর যারা দেখত তারা কুচ্ছিত দেখেই চোখ ফিরিয়ে নিতো, যেমন আমায় দেখে ঘেন্না করে সবাই । তারপর নিজেকে শুনিয়ে বলল, মানুষ জন্ম থেকেই দয়াহীন নিষ্ঠুর, মৃত্যুকে সৃষ্টি করে ।

ও, তাই কেনা গোলাম হয়ে গেলেন ? জানতে চায় যুবক ।

ড্যাডি নামের বাবা বলল, আমরা কিনা ক্রীতদাস, কেনা গোলাম ।

বাপি নামের বাবা ড্যাডি নামের বাবাকে বলল, ওই গানটা ধর, আমরা সবাই খোজা গানটা, দুজনে মিলে গাই, আমাদের রানিকে উৎসর্গ-করা গান । বলে উরু পেটা আরম্ভ করল, তবলার ঢঙে ।

বুড়ো দুজন আরম্ভ করল গান : [১৫]

 

আমরা সবাই খোজা, আমাদের এই রানির রাজত্বে

নইলে মোদের রানির সনে মিলব কী শর্তে ?

আমরা হুকুম তামিল করি, তাঁর আঙুল নাড়ায় চরি,

আমরা মজায় আছি দাসের রানির ত্রাসের রাজত্বে–

নইলে মোদের রানির সনে মিলব কী শর্তে ?

রানি সবারে দেন মার, সে মার আদর করে দেন,

মোদের খাটো করে রাখলেই বা হাজার অসত্যে–

নইলে মোরা রানির সনে মিলব কী শর্তে ?

আমরা চলব তাঁরি মতে, শেষে মিলব তাঁরি পথে,

মোরা মরলেই বা বিফলতার বিষম আবর্তে–

নইলে মোরা রানির সনে মিলব কী শর্তে ?

 

গানটা আরও ছিল কি না যুবক জানে না, বুড়ো দুটো চুপ করে যেতে শুনতে পেল দরোজায় বাইরে থেকে তালা খোলার শব্দ, এদেরই কেউ হবে, নয়তো চাবি পাবে কোথ্থেকে ।

Double Space

 

যুবক দেখল সেই দুজন বডিবিলডার ধরণের স্মার্ট লোক, যাদের সঙ্গে যুবতী, ফিসফিস করেছিল, সুপারি, খুন, বডি এই সব নিয়ে, তারা একটা লোককে কাঁধে নিয়ে ঢুকল ।

যুবতী জিগ্যেস করল, কেউ দ্যাখেনি তো ? বেঁচে আছে না কাজ শেষ করে এনেছিস ।

একজন ষণ্ডা, যে খয়েরি স্ট্রাইপের ফুলশার্ট  পরেছিল, গলায় টাই, সে বলল, মনে হয় কাম তামাম হয়ে গেছে । তারপর অন্যজনকে আদেশ দিল, ভালোবাসার ঘরে রেখে দে । দুর্মুশ দিয়ে মাথাটা নরম করে দিস নয়তো ভালোবাসার ভালোবাসতে সময় লেগে যেতে পারে ।

কোথায় পেলি ? জিগ্যেস করল যুবতী ।

খয়েরি ফুলশার্ট বলল, ওই যে, সাতটা গাছ মেরে ফেলেছে, মিলি বাগ, জিপসি মথ, লঙহর্ন বিটলস, বোরার, আর টেন্ট ক্যাটার পিলার ছড়িয়ে, সেগুলোকে মারার কনট্র্যাক্টের টাকা তুলতে গিয়েছিল বিজ্ঞাপন কোম্পানির দপতরে, ওই যে, গাছগুলোর জন্যে যাদের হোর্ডিং ঢাকা পড়ে গিয়েছিল । চালু চিজ বানচোদ, কতো তাড়াতাড়ি গাছগুলোকে মারলে । বিজ্ঞাপনের দপতর থেকে যেই বেরিয়েছে ক্লোরোফর্ম করে কাৎ করে ফেললাম । চ্যাংদোলা করে আনতে হলো ; কয়েকজন শবযাত্রী মড়া পুড়িয়ে হাঁড়ি ফাটিয়ে ন্যাড়া মাথায় চান সেরে গান গাইতে গাইতে বাড়ি ফিরছিল, সমবেত গান থামিয়ে  জানতে চাইছিল যে, কী হল, বাঁশের মাচা পাওয়া গেল না, প্যাকিং বাক্সের মাচা তো সস্তায় পাওয়া যায় ফুটপাথে, ফুলের বাজারের কাছে ?

ওদের বললাম যে পকেট ফাঁকা, কী আর করা যাবে, অগত্যা চ্যাংদোলা করে পোড়াতে নিয়ে যাচ্ছি । ন্যাড়ামাথা শ্মশানফের্তারা শুনে বাহবা দিলে, একজন বলেছে প্রতিষ্ঠানের বারোয়ারি সভায় প্রস্তাবটা লিখিত আকারে তুলবে ।

এই চ্যাংদোলা করে শ্মশানে নিয়ে আসা অনুমোদন করা উচিত প্রতিষ্ঠানের, অনেক খরচ বাঁচবে, খাট-তোষক নষ্ট হবে না, কাঠ নষ্ট হবে না, ফুল নষ্ট হবে না, ফুলবাগানে মৌমাছিরা ডানা-মিউজিকে ফুলেদের ফোসলাতে পারবে, বরেরা মদ খেয়ে বাড়ি ফিরে বউয়ের খোঁপায় ফুল গুঁজতে পারবে, শ্মশানে মন দিয়ে গান গাইতে গাইতে লোকে আসতে পারবে, ফিরতে পারবে । তারপর ঝিমধরা অথচ অবাক যুবকের দিকে তাকিয়ে যুবতী বলল,মায়ের কাছ থেকেই গাছ মারার সিক্রেটটা শিখেছিল কচি-কচকচে স্কাউন্ড্রেলটা।

অন্ধ বুড়ো বলল, হ্যাঁ, কখন থেকে ভালোবাসা অপেক্ষায় রয়েছে, প্রায় দুতিন দিন ওদের খাওয়া জোটেনি। কার লাশ আনলি ?

যুবতী বলল, আমার মায়ের কচকচে-কচি প্রেমিকের ।

অন্ধ বুড়ো বলল, মেমেন্টো হিসাবে ওর নুনু কেটে রেখে নে, তাকে ফরম্যালিন আছে, তাতে চুবিয়ে রাখ, অনেককাল থাকবে, কিন্তু বিচি দুটোর সুপ রাঁধিস, রান্না হলে ওগুলো খেতে বেশ ভাল্লাগে, সুইট অ্যান্ড সাওয়ার টেসটিকলস । তারপর নিজেকে শুনিয়ে বলল, মৃত্যু হল ভাগ্যের ব্যবসাদার ।

অন্ধকে উদ্দেশ্য করে যুবতী বলল, তোমাকে দুশ্চিন্তা করতে হবে না, আমাদের কাজ মৃত্যুর পরের, সারা দিন ধরে বসে বসে মানুষের মাংস পোড়ার উজ্জ্বল চিড়চিড়ে-ফটর ফটর স্বরলিপিতে লেখা গান শোনো, তার বেলায় !

অন্য বুড়ো বলল, দারুন খবর, দারুন, দারুন, এতদিনে একটা কাজের কাজ হল ; ভালোবাসার খাবার সময় ওদের প্রিয় গানটা জোর গলায় গাইবার শিস দিয়ে দিস । তারপর যোগ করল, হ্যাঁ, একটা বিচি আমায় খেতে দিস আর আরেকটা ওই বুড়োকে, কতোকাল যে মানুষের বিচির সুপ খাইনি । শ্মশানে যতো মাল আসে, আত্মীয়রা আনতে এতো দেরি করে, চন্দন মাখানো আর ধুপ জ্বালানো আর গোলাপজল ছেটানোয় যে, সব বিচি ততক্ষণে পচে যায় ।

যারা চ্যাংদোলা করে এনেছিল তারা দুজনে একসঙ্গে বলে উঠল, তাছাড়া আজকাল বিচি ট্রান্সপ্লান্ট করা হচ্ছে তো, কোল-কমপিউটারের জন্যে শুক্রাণু কমতে লেগেছে, তাই বেশ কিছু লাশ বিচি খুইয়ে আসছে।

অন্ধ বুড়ো বলল, হ্যাঁ, মনে আছে, একবার এক সুপারম্যান মড়া-নেতার বিচি সুস্বাদু হবে বলে ডোমের কাছ থেকে চেয়ে আনিয়েছিলাম, এঃ, বানচোদের বিচিতে কি পচা গন্ধ, বমি করতে করতে কাহিল হয়ে গিয়েছিলাম, শালার যতো রাজনীতি, বিচি দুটোতেই জমিয়ে রেখেছিল, মানুষ কতো নীচে নামতে পারে, ভাবো, কতো খারাপ দিনকাল এসে গেল ।

তোমার ভয় পাবার দরকার নেই, নেশায় প্রায় আচ্ছন্ন যুবকের দিকে মুখ নিচু করে বলল যুবতী ।

যুবক শুনতে পেল গান শুরু হয়েছে, ওঃ, এটাই ভালোবাসার খাবার সময়ের গান, শুনেছে কোথাও, পুজোটুজোয় তো নয়, পাঁচালিও নেই কোনো এই গানের ; ফিরে এই গানের একটা পাঁচালি ছাপিয়ে নিতে হবে, বাজার আছে নিশ্চয়ই । শুনতে লাগল গানটা, নেশাঝিমোনো পায়ের তাল দিয়ে । ওকে দেখে অন্যেরাও গানের সঙ্গে পায়ের তাল দিতে লাগল ।

“আমরা করব ভয়,

আমরা করব ভয়,

আমরা করব ভয়, প্রতিদিন…

আহা, বুকের গভীরে আছে বেশ ভয়,

আমরা করব ভয়, প্রতিদিন…

প্রতিদিন সূর্যগ্রহণ,

প্রতিদিন স্বপ্নভাঙন,

কোনোদিন সত্যের ভোর, আসবে না…

এই মনে নেই বিশ্বাস,

আমরা করি অবিশ্বাস,

সত্যের ভোর আসবে না, কোনোদিন…

পৃথিবীর মাটি হবে খটখটে,

বাতাস হবে তিতকুটে, প্রতিদিন…

এই মনে নেই বিশ্বাস,

আমরা করি অবিশ্বাস,

আকাশ হবে গনগনে, প্রতিদিন…

আরো হোক ধ্বংসের গান,

পাবলিককে ধরে পেটান,

ধ্বংসের সুরে হবে গান, প্রতিদিন…

আমরা মানি সব বাধাবন্ধন,

হাতে বাঁধা শেকলের ঝনঝন,

সামনে মিথ্যার জয়, প্রতিদিন…

এই মনে নেই বিশ্বাস,

আমরা করি অবিশ্বাস,

সামনে মিথ্যার জয়, প্রতিদিন…

আমরা করব ভয়,

আমরা করব ভয়, প্রতিদিন…

আহা, বুকের গভীরে আছে বেশ ভয়,

আমরা করব ভয়, প্রতিদিন…

আমরা করব ভয়, প্রতিদিন…”

গানটা শেষ হলে আবার শুরু থেকে রিওয়াইণ্ড হয়ে বাজতে লাগল ।  যুবক জানতে চাইল, এটা কোন বাংলা ব্যাণ্ডের গান ?

অন্ধ ড্যাডি বলল, এটা ভালোবাসার গান, ওরা নিজেরাই গাইছে, এ গানের শেষ নেই, যতক্ষণ লাশ ততক্ষণ আশ ।

বাপি, যার কপালের ডানদিকের আব চকচক করছিল, যুবকের দিকে তাকিয়ে বলল, ঠিকেদারদের জয়ের যুগ চলছে হে, বুঝলে ? ফর ঠিকেদার, অফ ঠিকেদার, বাই ঠিকেদার, নো চেঞ্জ, নো বদল । তাই ভালোবাসার এই গান এখন বেশ জনপ্রিয় ; শ্মশানে যারা আসে তাদের অনেকেই আর হরিবোল দেয় না, এই গান গাইতে গাইতে আসে, গাইতে গাইতে ফিরে যায়, তাদের কাছে শুনে-শুনে শিখে নিয়েছিল শকুনগুলো ।

ড্যাডি, নখ-ওঠা বাঁ পায়ের বুড়ো আঙুল দিয়ে খোদরানো সিমেন্টের মেঝেতে অদৃশ্য কোনো শব্দ লিখতে লিখতে বলল, প্রায় কাঁদো-কাঁদো গলায়, আমার সব বইগুলো হেলায় পড়ে আছে, পড়বার কেউ নেই, বইগুলো অভাগা, পড়ুয়া না পেয়ে ওরাও মরে যাবে একদিন, অনেকগুলো বই তো অলরেডি মরে গেছে, মরা বইদের যে শ্রাদ্ধশান্তি করব, তারও উপায় নেই, দেখতেই পাই না । তারপর সত্যিকারের দীর্ঘশ্বাস ফেলতে ফেলতে বলল, শুনেছি ফুটপাথের বইঅলারাও বিনে পয়সায় দিলে নিতে চায় না, বলে এইসব মরা বইয়ের চেয়ে ছুকরি-ছোকরাদের বেচা কাঁকড়াটে কবিতার বই বরং বেশি বিক্রি হয় ।

যুবক জানতে চাইল, কেন, আমার দোকান থেকে তো নানা দেবী-দেবতার পাঁচালিও বিক্রি হয় রেগুলারলি ; বিয়েতে আজকাল ভোজ খেতে গিয়ে লক্ষ্মীর পাঁচালিই গিফ্ট দ্যায় নিমন্ত্রিতরা, কেননা ছিঁড়ে গেলেও যেখানে সেখানে ফেলে দেয়া যায় না, নদীতে বিসর্জন দিতে হয় ।

ফুটপাথের বই-বেচিয়েরা কেনে তোমার পুরোনো পাঁচালি ? জানতে চাইল অন্ধ ।

না, পাঁচালি সেকেণ্ড হ্যাণ্ড কেনা অশুভ । বিয়েতে সেকেণ্ড হ্যাণ্ড পাঁচালি দেয়া যায় না ; বিয়েতে পাঁচালি দিলে সে বিয়েতে নাকি প্রেমের বদলে সেক্স গুরুত্ব পায় আর গণ্ডায় গণ্ডায়  পিল-পিল করে বাচ্চা হয় বছর-বছর ।

অন্ধ বলল, আগে জানলে একখানা সেকেন্ড হ্যাণ্ড পাঁচালি কিনতাম এই সব জ্ঞানের বই না কিনে ।

বাপি নামের বুড়োর দিকে তাকিয়ে, কেন, আপনি তো দেখতে পান, পড়লেই পারেন, দেয়ালের তাকে, ধুলো পড়ে আবছা, ফ্যাকাশে রঙের মলাট,  সারি দিয়ে রাখা বইয়ের তাকের দিকে ইশারা করে বলল যুবক ।

চক্ষুষ্মান বুড়ো নিজের কালো চশমা খুলে, বলল, আরে ওসব  মরা বিপ্লবের বই পড়ে কিছু হয় নাকি! তাছাড়া বইগুলো ধার নিয়ে আর ফেরত দ্যায়নি, বলে বেড়াতো যে সারাজীবন ঋণী থাকতে চায়, জ্ঞানের প্রতি ঋণী, আসলে গেঁড়িয়েছে বলে ঋণী, সে কথা তো আর সকলে জানছে না । আর জ্ঞান ? ওই তো ও জ্ঞান ফলাতে গিয়ে আগতখোকা-বিগতখোকা-বহিরাগতখোকাদের ঠ্যাঙানি খেয়ে মাশুল দিল ; জ্ঞান ফলাবার জন্যে শেষে অন্ধ হতে হলো । দিকে দিকে অন্ধদের পাকাচুল পঙ্গপাল, ফি-দিন ‘আমরা করব ভয়’ গাইতে গাইতে শ্মশানে আসছে আর আগুনে ছাই হয়ে যাচ্ছে । একটু-আধটু যা বাঁচে ভালোবাসায় খায় ।

আবের ওপর হাত বুলিয়ে আদর করতে করতে বলল, আত্মআবিষ্কারের গুরুত্ব বুঝতে হলে, নিজেকে যে অপরিহার্য তথ্য ঠেশে-ঠেশে খাওয়ানো হয়েছে আর যা থেকে ওই আবিষ্কার বেরাস্তায় চলে গেছে, তার ওপর জবরদস্ত দখল থাকতে হবে । আর বেশি দিন নেই ; ইউরোপে লক্ষ লক্ষ মানুষ আফ্রিকা আরবদেশ আফগানিস্তান থেকে ঢুকে ফাটিয়ে চৌচির করে দেবে, যতো বেগড়বাঁই তত্ব ওরা পৃথিবীর ওপর এতোকাল ফলিয়েছে সেগুলোকে, জাস্ট ওয়েট অ্যাণ্ড ওয়াচ । একসঙ্গে দুটো স্বপ্ন দেখার ক্ষমতা রাখি, বুঝলি ?

পাইপের ধোঁয়া উড়িয়ে, অন্ধ বলল, তুমি চুপ করো দিকিনি ; নিজে তো বিগত সংস্কৃতি আর উদারতার অতিশয়োক্তির বানাউটি আর সর্বনাশী সম্পর্কে ফেঁসে আছো জীবনভর । দেশভক্তি, সামাজিক সাজগোজ, গোমর, মুখখানা দেখেছো নিজের ? ঠিক যেন যোগেন চৌধুরীর আঁকা, ওপর থেকে নিচে ওব্দি নেতিয়ে গলে গলে চুইয়ে পড়ছে ।

চক্ষুষ্মান বুড়ো, খেপে গেছে বোঝা যাচ্ছিল, উত্তেজনায় কাপতে-কাঁপতে বলল, তোমার মুখ দেখেছ, কালো চশমা খুললেই প্রকাশ কর্মকারের আঁকা মুখের মতন দেখায় । চারিদিকে অন্ধকার দেখতে পাও, যা নিজেরাই বানিয়েছ, সুখে থাকার ভান করো, চারিদিকে জোচ্চুরির আর অন্যায়ের দানা পুঁতেছ, এখন প্যারানয়ায় ভোগা ছাড়া তোমার উপায় আছে নাকি, শালা অন্ধ কোথাকার, অন্যের মতাদর্শ ভাঙিয়ে খেয়েছে এতোকাল । ব্যাটা বোঝেই না যে মানুষের সমাজে মানুষের জীবন কাটাতে হলে লাথালাথি হবেই । ইতিহাস-খ্যাদানো ভূগোল-তাড়ানো গাণ্ডু, যার কথা ধেবড়ে গিয়ে মানে বেরোয় না , ভেতরে ঢু ঢু, অন্যের বুকনি কপচায়, সারাজীবন ফাকতা উড়িয়ে লেকচারবাজি করে তোমার জীবনের অ্যাচিভমেন্ট কী ?  লাবিয়ার মাকড়ি খোলার শর্তে সারাজীবন হ্যাঁ আর না, হ্যাঁ আর না, হ্যাঁ আর না, তামিল করে গেল। কথাগুলো দ্রুত বলে পেট নাচিয়ে হাসতে লাগল চক্ষুষ্মান বুড়ো । আবের বদলে আদরের হাত নাভিতে ।

হাসির দমকে কোলের অ্যাটলাস মেঝেয় পড়ে গেলে, যুবক দেখল, বাপির কুঁচকির সব চুল পেকে গেছে । ওর মনে হল, এরা কথা বলে একে আরেকজনের সম্পর্কে যা ঠিকমতন বোঝাতে পারছে না, তা দুজনের আঁকা দিয়ে সঠিক বোঝাতে পেরেছে । কথাদের পেট থেকে মানে উধাও হয়ে গেছে এদের দুজনের, কথাদের বোধহয় পেটখারাপ বা আমাশা হয়েছে, ভ্যাজর-ভ্যাজর দিয়ে পরস্পরের যন্ত্রণাভোগের কারণ বুঝতে চেষ্টা করে চলেছে । নিজেকে নিঃশব্দে বলল, মানুষের কথারও জোলাপ হওয়া উচিত ছিল, সব বেরিয়ে যেতো হড়হড়িয়ে ।[১৬]

Double Space

 

অন্ধ বুড়ো চক্ষুষ্মানের কথা লক্ষ করে ঝাঁপিয়ে পড়ল তার ওপর ।

যুবতী, যুবক, দুজন স্মার্ট ষণ্ডা কিছু বুঝে ওঠার আগেই চক্ষুষ্মান বুড়ো পাছার তলা থেকে মাংসকাটার ভারি চপার বের করে অন্ধের গলা বুক পেট মুখ লক্ষ্য করে চালাতে থাকল একের পর এক, চিৎকার করতে থাকল, করব এদের জবাই, তোমাকে তো পাবই, করব এদের জবাই, তোমাকে তো পাবই ।

অন্ধ বুড়ো পড়ে গেল মেঝেয়, রক্তারক্তি, মুন্ড ধড় থেকে আলাদা । টিকটিকির ল্যাজের মতন নাচতে থাকে মুণ্ডহীন ধড় ।

চক্ষুষ্মানের হাত থেকে চাপাতি কেড়ে নেবার চেষ্টায় স্মার্ট ষণ্ডা দুজন এগোতে, তাদের লক্ষ্য করে এলোপাথারি চপার চালানো আরম্ভ করল বুড়ো ; দুজনেরই গলা থেকে মুণ্ড আলাদা হয়ে ছিটকে পড়ল মেঝের ওপর ।

চক্ষুষ্মান উলঙ্গ বুড়ো মাটিতে পড়ে গিয়েছিল ; সেই অবস্হাতেই  নিজের গলায় কোপ দিয়ে মুন্ডু ধড় থেকে আলাদা করে ছটফট করতে লাগল । মরে গিয়েও দুজনের ধড়ের পারস্পরিক লাথালাথি থামেনি, মুণ্ড দুটো একে আরেকের দিকে তাকিয়ে মরণোত্তর গালমন্দ করে চলেছে ।

যুবকের মনে হল, কাটা মুণ্ডগুলো ওর দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে অট্টহাসি হাসছে, বোধহয় বলছে, কোথায় গেল হে তোমার রেড বেল্ট আর কিক বক্সিং !

মুণ্ডগুলোর দিকে তাকিয়ে যুবকের মনে হল, কোন পাগলদের পাল্লায় পড়েছিলাম, নিজেরা কাটাকাটি না করলে এই শ্মশানকলোনি থেকে বেরোনো কঠিন হয়ে পড়ত ; দুটো বুড়ো আর দুটো পালোয়ান মিলে আমায় সোপর্দ করে দিত ভালোবাসায় ।

চক্ষুষ্মানের কাছে হাঁটু গেড়ে বসে নাড়ি দেখে, তারপর অন্ধের, বুকে কান রেখে, রগের পাশে আঙুল রেখে দেখল যুবক, বলল, এনারা গেছেন, মুণ্ডু আর জোড়া লাগানো যাবে না ; ভালোবাসার ওভার ফিডিং হয়ে যাবে । মেঝে থেকে চপার তুলে সকলের লিঙ্গ এক এক করে কেটে , সেগুলো তাকের ফরম্যালিনের কাচের জারে ফেলে দিল, দেখল জার ভরে গেছে নানা মাপের লিঙ্গে । বইগুলোর সঙ্গে জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতার প্রতিযোগীতা করছে  অজানা লিঙ্গগুলো, সন্দেহ নেই !

যুবতী জিগ্যেস করল, সত্যিই মরে গেল বাপিবাবাটা আর ড্যাডিবাবাটা ? ওদের জন্যেই আমি নিজের জীবন নষ্ট করে এতকিছু করে চলেছি কতোকাল যাবত, সব পণ্ড করে দিল । এরা না থাকলে তো লাবিয়ার মাকড়ি পরতাম না, বিয়ে করে নিতাম তোমার মতন কোনো হাট্টাকাট্টা গাবরু জোয়ানকে।

এখন কী করবে, জানতে চাইল যুবক।

চলো হেল্প করো, এদের চ্যাংদোলা করে ভালোবাসার ঘরে রেখে আসি ।

দুজনে চ্যাংদোলা কর ধড়গুলো রাখলো নিয়ে গিয়ে ভালোবাসার ঘরে ।

দুজন বাবার  কাটামুণ্ডগুলো চুল ধরে ঝুলিয়ে, বইয়ের তাকের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল যুবতী, মুণ্ডুগুলো মেঝেয় রেখে, ছুটে গিয়ে তাকে রাখা কথ্থক নাচের ঘুঙুর নিয়ে দুই পায়ে স্ল্যাক্সের ওপরে বেঁধে নিল, ফিরে এসে দু হাতে দুই বাবাদের দুই মুণ্ডের চুল ধরে ঝুলিয়ে, দুর্বার উন্মাদনায়, অদৃশ্য আগুনশিখার বিশুদ্ধ হল্কা উড়িয়ে, নাচতে লাগল ।

যুবকের নেশা কেটে গিয়েছিল, দেখল  যুবতীর হাতে ঝোলানো মুণ্ড দুটো নাচের তালে তালে চোখ মেলে রশ্মি বিকীর্ণ-করে ওকে ইশারা করছে ।

যুবতীর বেপরোয়া নাচে যুবক ভ্যাবাচাকা, কোনো আড়ষ্টতা নেই গনগনে মুখ যুবতীর, বের করে এনেছে ভেতরের তেজ, সঞ্জীবনী, তাদের পালটে ফেলেছে নাচে ।

নাচের তালে যুবতী গান গাইতে আরম্ভ করল, কন্ঠস্বর  বেশ মশলাদার, পাশা-খেলায় জেতা দুর্যোধনের মামার কাজের বউয়ের মতন, ওদের কাটা গলা থেকে মেঝেয় রক্ত পড়ার সরোদ বাজনা বাজছে, গলা থেকে যে নলিগুলো ঝুলে আছে, লাল লাউডগা সাপের মতন মাথা উঁচিয়ে নিজেদের মধ্যে খেলছে :[১৭]

মম চিত্তে নিতি নৃত্যে কে যা নাচে

তাতা থৈথৈ তাতা থৈথৈ তাতা থৈথৈ

আমি সঙ্গে কী মৃদঙ্গে সদা বাজে

তাতা থৈথৈ তাতা থৈথৈ তাতা থৈথৈ

হাসি কান্না হীরাপান্না দোলে ভালে

কাঁপে ছন্দে ভালো মন্দ তালে তালে

নাচে জন্ম নাচে মৃত্যু পাছে পাছে

তাতা থৈথৈ তাতা থৈথৈ তাতা থৈথৈ

কী আনন্দ কী আনন্দ কী আনন্দ

দিবারাত্রি নাচে মুক্তি নাচে বন্ধ

সে তরঙ্গে ছুটি রঙ্গে পাছে পাছে

তাতা থৈথৈ তাতা থৈথৈ তাতা থৈথৈ

যুবতী নাচ থামাতেই বাবাদুটোর মুণ্ড  চেঁচিয়ে ওঠে, আরে, নাচ থামালি কেন রে, বেশ তো নাচের তালে তাল দিচ্ছিলাম ।

নিকুচি করেছে, আমি নাচছিলাম নিজের আনন্দে, তোমাদের গান শোনাবার জন্যে নয়, তোমাদের ভালোবাসার ঘরে রেখে দিচ্ছি, ওখানে যতো ইচ্ছে গান শুনতে থেকো, বলে, যুবতী মুণ্ড দুটো ঝুলিয়ে ভালোবাসার ঘরে দৌড়ে ঢুকল, পেছনে পেছনে যুবক ।

বাকি মুণ্ডগুলো নিয়ে গিয়ে যুবক দেখল ভালোবাসা  দুর্মুশ করা শবের ভেতরে মাথা পুরো ঢুকিয়ে তারিয়ে তারিয়ে খাচ্ছে, ছিঁড়ে বের করছে, আর গপ গপ করে গিলছে ।

যুবক ভাবল, আচ্ছা, আমরা কেন খাবারের ভেতরে গলা পর্যন্ত মাথা ঢুকিয়ে খেতে পারি না !

যুবতী বলল, এই মুণ্ডগুলোকেও দুর্মুশ করে দিন, নয়তো খেতে সময় লাগবে ওদের ।

—নিজের বাবাদের পিটিয়ে দুর্মুশ করবে ?

—মরে যাবার পর বাবারা কি আর বাবা থাকে ? স্মৃতি হয়ে যায় । স্মৃতির স্টক তো আর অসীম নয়, তাই বাবারাও নতুন স্মৃতিকে জায়গা করে দিয়ে লোপাট হয়ে যাবে । বাবা শব্দটা ফোঁপরা হয়ে যাবে দুচার বছরে ।

—তা ঠিক, আজকাল তো মা-বাপদের ফুটপাতে ফেলে ছেলেমেয়েরা আধুনিক জীবনে উধাও হয়ে যায় ।

দুর্মুশ করার সময়ে রক্তের ছিটে লাগল যুবকের পায়ের উরুর চুলে, শর্টসে, জামায়,  মুখে-চোখে । মাথার ঘিলু ছড়িয়ে পড়তেই শকুনগুলো মুণ্ডু উঁচিয়ে গান গাইতে গাইতে দৌড়ে এলো তরতাজা জ্ঞান খাবার জন্যে ।

—এখন কী করবে ?

—বাবাদের লায়াবিলিটি তো চুকলো, কিন্তু বাড়লো পালিয়ে বেড়াবার লায়াবিলিটি । ভালোবাসা তো ততো তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে ফেলতে পারবে না, পচা গন্ধে শববাহকদের টানবে । পচা গন্ধ কার না ভালোলাগে, বলো ? পচা গন্ধ হলে লোকে টেনে টেনে শোঁকে, তারপরে ইঁহি ইঁহি করে নাকে রুমাল চাপা দ্যায়, তা সে শিকনির রুমাল হলেও । পচা গন্ধের টানে নাকে রুমাল চাপা দিয়ে পাবলিক এদিকে আসবেই । নিজেরা তালা ভাঙবে কিংবা প্রতিষ্ঠানকে ডেকে তালা খোলাবে ।

ভালোবাসার জানলাগুলো খুলে দিই, এতকাল বন্ধ করে রেখেছিলাম যাতে পালিয়ে না যায়, এখন তো আর দরকার নেই, পালাবার হলে পালাক উড়ে ।

—এখানে তোমার কোনো প্রমাণ রয়ে গেল ?

—প্রমাণ বলতে বাবাদের আধখাওয়া শব । আর মেয়াও মেয়াও ভরা বস্তাগুলো ।

—তাহলে কী করবে ?

—পালাতে হবে ।

—চলো আমার বাসায় । আমি তো একা থাকি ।

—দুজনেই ধরা পড়ব । তোমাকে যে কাজে লাগাব বলে এনেছিলুম, তার তো আর দরকার হল না । তুমি চুপচাপ বেরিয়ে পড়ো ।

—কিন্তু লাবিয়ার মাকড়ি খুলিনি যে এখনও ? তোমাকে ফেলে পালাতে পারব না ।

যুবতী তাড়াতাড়ি নিজের পোশাক খুলে মেঝেয় ফেলে দিল ।

যুবক বেশ কাছ থেকে তারিয়ে দেখে নিয়ে মাকড়িটা খুলল, খুলেই, মাকড়িতে চুমু খেল, মাকড়ির জায়গাতেও জিভ বুলিয়ে বলল, স্বর্গ যদি থাকে তা এইখানে, নরক যদি থাকে তা এইখানে ।

যুবতী বলল, যথেষ্ট কাব্যি হয়েছে, পরে ওসব নাটুকেপনার অনেক সময় পাবে, এখন যা করা জরুরি, তা-ই করো ।

যুবক দাঁড়িয়ে জড়িয়ে ধরে বলল, লাবিয়ার মাকড়িই ছিল তোমার তিন বাপের বীশ্ববীক্ষা, বাস্তবের ব্যাখ্যা । এখন এই নাও, রেখে নাও মাকড়ি, পরে দরকার হতে পারে ।

যুবতী বলল, মনে থাকবে, থ্যাংকস ।  ওই ঘরে পেটরলের জেরিক্যান আছে গোটা দশেক, চলো, ছড়িয়ে দিই পুরো বাড়িটায় ।

দুজনে মিলে সারা বাড়িতে পেটরল ছড়াতে লাগল । স্ল্যাক্স পরে নিল যুবতী । দেশলাই কাঠি জ্বেলে ফেলে দিতে, আগুন ছড়িয়ে পড়ল ।

দুজনে হাত ধরাধরি করে পালালো বাড়ির বাইরে ।

চলো, পালাও, বিস্ফোরণ হবে, যুবকের হাত ধরে টান মেরে বাইরে বেরোয় যুবতী, বলে তাড়াতাড়ি করো, কুইক কুইক, জিপ খুলে মোটর সাইকেলে বসো, আমি স্ল্যাকস নামিয়ে বসছি তোমার কোলে, চালাও মোটর সাইকেল, স্টার্ট দাও, উঁচু-নিচু রাস্তা আপনা থেকেই আমাদের পৌঁছে দেবে মহা-আহ্বাদের গন্তব্যে, রসের তীর্থ । ডেথ টু মোনোগ্যামি । বুঝলি, প্রেম হল সবচেয়ে অন্তর্ঘাতী ব্যাপার ।

মোটর সাইকেল স্টার্ট দ্যায়, যুবকের কোলে যুবতী, লাবিয়ার মাকড়ি খুলে এই প্রথম আরেকজনের সাহায্যে । তারপর হাইওয়ে, উড়ে চলে মোটর সাইকেল । দুপাশের গাছের ডালপালারা ওদের কোলপ্রেম দেখে হাততালি দিয়ে পেছন দিকে দৌড়োচ্ছে ।

যুবতী দুহাত ওপরে তুলে চিৎকার করে ওঠে, ইয়াআআআআহাহাহাহা, ধন্যবাদ গ্যালিলিও গ্যালিলি, নড়ে চলেছে, নাড়া দিয়ে চলেছে, নিজেও ওঠানামা করে হাইওয়ের হাওয়ায় ।

দুজনের কেউই পেছন ফিরে দ্যাখে না যে বাড়িটা বিস্ফোরণে উড়ে গেল ।

ফরম্যালিনে চোবানো লিঙ্গগুলো জার ফেটে ছিটকে বেরিয়ে দেবশিশুর ফিনফিনে গঙ্গাফড়িং-ডানা মেলে মেঘ-টুসটুসে হাওয়ায় ছুটে চলল, যাতে খরায় মার খাওয়া দেশটায় বৃষ্টি শিগগির আসে ।[১৮]

তাকে রাখা বইগুলোও মলাটকে ডানা বানিয়ে উড়ে চলল লিঙ্গগুলোর পেছন পেছন ।

ভালোবাসা ততক্ষণে অনেক উঁচু ধোঁয়াটে নীল আকাশে গান গাইতে গাইতে পাক খেয়ে উড়ছে ।

সুনসান হাইওয়েতে , একটা জঞ্জালস্তুপের উদ্দেশ্যে যুবতী আরেকবার চিৎকার করে, মা, এই নাও, টু হেল উইথ তোমার লাবিয়ার মাকড়ি, আমার মেয়ে হলে তাকে লাবিয়ায় মাকড়ি পরতে শেখাব না , এই জঞ্জালেই তুমি আমাকে এক দিনের মাথায় ফেলে দিয়েছিলে, আজ তোমাকে ক্ষমা করে দিচ্ছি ।

 

————————————————————————————————————-

সূত্র

[১] The Four Fundamental Concepts of Psychoanalysis. Jaques Lacan. W.W.Norton & Co. New York, 1977.

[২] Ethics : An Essay on the Understanding of Evil. Alain Badiou. Verso, New York 2000.

[৩] Living in the End Times. Slavoj Zizek, Verso, London 2010.

[৪ ] Eros and Civilization. Herbert Marcuse. Beacon Press. Boston. 1955.

[৫] Terra Nostra. Carlos Fuentes. Farrar, Straus and Giroux. New York. 1976

[৬] Delta of Venus. Anais Nin. Penguin Books. 2008.

[৭] Anti-Oedipus : Capitalism and Schizophrenia. Gilles Deleuze and Felix Guttari. Viking Penguin. New York. 1977.

[৮] Fear of Flying. Erica Jong. Holt, Rinehart and Winston. New York. 1973

[৯] Foucault’s Pendulum. Umberto Eco. Sacker & Warburg. 1988.

[১০]S. Charles and G. Lipovetsky. Hypermodern Times. Polity Press. 2006.

[১১]Thomas de Quincey. Confessions of an English Opium Eater. Taylor & Hessey. London. 1823.

[১২]Emile Durkheim. Suicide. The Free Press. Paris. 1897.

[১৩] Alexander Artievsky. Life Death Whatever : How to Achieve a Bliss Without Trying. Createspace. London.2010

[১৪] Zacharias P Thundy. Courtly Love and Ancient India. East West Literary Relations. Michigan. 1981

[১৫] Ingeborg Hoestery. Pastiche: Cultural Memory in Art, Film, Literature. Indiana University Press. Bloomington.2001

[১৬] C.Castoriadis. The Imaginary Institutions of Society. Polity Press. Cambridge. 1975.

[১৭] S.Banes. Terpsichore in Sneakers : Postmodern Dance. Weslyan University Press. Connecticut. 1987

[১৮]Gunther von Hagens. Body Worlds : The Anatomical Exhibitions of Real Human Bodies.Institute for Plastination, Heidelberg, 2006.

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

Posted in উত্তর-আধুনিক রূপকথা, ছন্নছাড়া সময়ের গল্প | Tagged , , | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

প্রাকার পরিখা ; মলয় রায়চৌধুরী

 

এক

যোনি কাকে বলে জানিস ?

জানি-জানি, বললো অমিত, রোজ একঘেয়ে লেকচার শুনে-শুনে ওসব আংরেজি তাকিয়া-কালাম মুখস্হ হয়ে গেছে, ইসকুলে যদি রোজ কেউ অমন লেকচার দিতো তাহলে দেখতে, সব সাবজেক্টে চৌয়া-ছক্কা পেটাতুম ।

বল তাহলে, কাকে যোনি বলে ?

ওফ অনেক আংরেজি ঝালরবাজি, মানে-ফানে জানি না, সব ক্রান্তিকারি ঘসিটারাম,  বলছি শোনো, অ্যালিয়েনেশান, অ্যাণ্টাগনিজম, অ্যারিসট্রোক্র্যাসি, বারটার, বুর্জোয়াজি, বুরোক্র্যাসি, ক্যাপিটাল, ক্যাপিটালিজম, ক্লাস, কমোডিফিকেশান, কমোডিটি, কমোডিটি ফেটিশ, কনজাম্পশান, প্রোডাকশান, কনট্রাডিকশান, ক্রেডিট, ডেমোক্র্যাসি, ডায়ালেকটিকাল মেটেরিয়ালিজম, ডায়ালেকটিকস, ডিভিজন অফ লেবার, ইকুইভ্যালেন্ট ফর্ম, এমপিরিসিজম, এক্সচেঞ্জ ভ্যালু, ইউজ ভ্যালু, ফল্স কনশাসনেস, ফিউডাল সোসায়টি, গ্লোবালাইজেশান, হেজিমনি, ইনটারেস্ট, আইডিওলজি, লেবার পাওয়ার, লুম্পেন প্রলেতারিয়েত, ল্যাণ্ড, মারকেট, মেটেরিয়ালিজম, মিনস অব প্রোডাকশান, মিডল ক্লাস, মোড অফ প্রোডাকশান, মানি, নেশান স্টেট, পিজ্যানট্রি, পেটি বুর্জোয়া, পলিটিকাল ইকোনমি, প্রোলেতারিয়েত, প্রপারটি, প্রফিট, রেন্ট, র‌্যাডিকাল ডেমোক্র্যাসি, সোশালিজম, স্টেট, সাবলেশান, সুপারস্ট্রাকচার, সারপ্লাস ভ্যালু, সিনথেসিস, প্র্যাকসিস, ট্রেড ইউনিয়ান, ট্রাইবাল সোসায়টি, ইউজুরি, ইউটিলিটেরিয়ানিজম, ইউটিলিটি, ইউটোপিয়া, ওয়েজ লেবার ।

এক নাগাড়ে বলে দম ফুরিয়ে গিয়েছিল অমিতের, কাতলা মাছের মতন জলের ওপরে ওঠার ঢঙে শ্বাস নিয়ে বলল, কী, ঠিক বলিনি ? আরে সব তাকিয়া-কালামের মানে ওই একই, যাহাঁ সঠিয়া তাহাঁ ঘটিয়া, যোনি বলো আর আলুকাবলির ঘুগনি বলো ।

কিস্যু জানিস না তাহলে, অবশ্য শব্দ না জানলেও চলে, কাজটা জানলেই হলো, বললে কমরেড ডিবি বা ডাক্তার বর্মণ বা ডাক্তার ঘোষ ।

ধুলো-পড়া কালো পলিথিন-তেরপল দিয়ে তৈরি, ঘনসবুজ জংলি বাঁশঝোপের ঝিরিঝিরি আড়ালে ঘেরা,  মাথায় বিকেলের রোদমাখা শাল শিশু খয়ের গাছের মাঝখানে সামান্য ফাঁকা জায়গায়, তাঁর ভ্রাম্যমান ডাক্তারখানায় , ওষুধ আর আঘাতের রক্তের ফেলে যাওয়া ভিনিভিনি গন্ধে, জঙ্গলের বুনো প্রকৃতিকে  অস্বীকার করার প্রয়াসের মাঝে, আসন্ন গোধুলীর ঝিঁঝিপুরুষের ডাকে উতরোল প্রায়ান্ধকারে তাঁর সামনের ফোল্ডিং চেয়ারে তাঁর স্ত্রীর গর্ভজাত ছেলেকে বসিয়ে, প্রশ্নটা করলেন ডাক্তার ঘোষ, যাঁকে সকলে ডাক্তার বর্মণ বা কমরেড ডিবি বলে ডাকে, কেননা ওঁর স্ত্রীর নাম মানসী বর্মণ বা কমরেড জ্যোতি।

প্রশ্নটা করার জন্য বেশ কিছুকাল যাবত নিজেকে তৈরি করেছে কমরেড ডিবি, মানে ডাক্তার,  নিজের সঙ্গে তর্কাতর্কি করে নির্ণয়টা নিয়েছে, আর এখন, আজকেই সুযোগ, মনে হল , কেননা ওর স্ত্রীর গর্ভের ছেলের তাঁবু-গার্জেন, যে কিনা ছেলেটার বাবা হিসাবে ক্রান্তিকারিদের মধ্যে প্রচারিত, মানে কমরেড দীপক, প্রকৃত নাম অতনু চক্রবর্তী, পাশের তাঁবুতে যাঁর ক্রান্তিকারি দপ্তর, অতনু আর তার প্রেমিকা কমরেড জ্যোতি, মানে ডাক্তার বর্মণের স্ত্রী মানসী বর্মণ, দুজনেই কাছাকাছি বিধাবৌড়িয়া  গ্রামে সিআরপিএফ-এর গুলিতে আহত তরুণ-তরুণীদের জমায়েতে গিয়েছে, কিছুক্ষণেই হয়তো এসে পড়বে ।

নিজেকে স্তোক দেয় ডাক্তার, মানে, কমরেড ডিবি : সকলেই জীবনে অন্তত একটা মিথ্যাকে আশ্রয় করে বাঁচে, অনেকে একাধিক মিথ্যাকে আঁকড়ে থাকে জীবনভর, আমি না-হয় একটাই ।

দোহারা, ফর্সা, সামান্য টাক, বাইফোকাল চশমা, অলিভ-মুফতি বোতামখোলা শার্ট, গেঞ্জি নেই,  ডাক্তার পরে আছেন লুঙ্গি, যার রঙ বাগবাজার ক্লাবের দেয়ালে গত বিশ্বকাপ ফুটবলের সময়ে আঁকা ব্রাজিলের পরাজিত জার্সির মতন, কালবৈশাখির ফ্রি-কিক ভলি খেয়ে ফ্যাকাশে । নিজেকে নিজে নিঃশব্দে শুনিয়ে বললে, এখানে আর থাকা যাবে না, এ আমার স্বপ্নের ক্রান্তিকারি রাস্তা নয়, কেউই কোথাও পৌঁছোচ্ছে না । অবিচারের মধ্যে দিয়ে অবিচারের বিরুদ্ধে লড়া যায় না ।

ব্যাস, ওইটুকুই জানিস । ওটুকু তো যোনির রস রে, ক্রান্তির ঝর্ণা । তুই তো আসল অরগ্যাজমের কথা বললি না ? শেখায়নি তোর সোকলড মা-বাপ ? অরগ্যাজম জানিস তো, নাকি ? রিয়াল ক্রান্তি ? শরীর আর মনের সুনামি,  জিগ্যেস করলে ডাক্তার ।

না, জানি না, সুনামি শুনেছি কোথাও, এখন যা আংরেজি বললুম, তা কনকদুর্গা শিখিয়েছে, বলেছে মুখস্হ করে রাখ, পরে বুঝতে পারলে আওড়াস ।  অ্যালুমিনিয়ামের নড়বড়ে চেয়ারে নড়াচড়ার মাধ্যমে অপ্রস্তুতভাব লুকোবার চেষ্টা করে, ডান হাতের মধ্যমার নখ খেতে-খেতে বলল অমিত বর্মণ যে, ওর বোন মানে  প্রেমিকা ইতুকে ছত্তিশগড়ের রায়পুরে, নারায়ণপুর যাবার নৌকরওয়ালা বাসে তুলে দিয়ে, সেখানেই একটা আয়নাভাঙা সস্তা সেলুনে ন্যাড়া হয়ে গিয়েছিল ; চুলদাড়ি আর রাখবে না ঠিক করেছে ।

ইতু পাছা অব্দি দীর্ঘ কোঁকড়াটে  চুল ববছাঁট করিয়ে নিলে, বাড়ি ছেড়ে উধাও হবার সময়ে নিজের খাটে চুলের কাটা আংশ দুজনের একসঙ্গে বাড়ি থেকে কেটে পড়ার গর্বোদ্ধত ইঙ্গিত  হিসাবে ফেলে রেখে । ঘাড়ের ওপর নিঃশ্বাসের তাপ দিয়ে, অমিতই কেটে দিয়েছিল ইতুর চুল, কেননা ইতু বলেছিল, যা আমার গর্বের, তা কেটে বাদ দিয়ে দে, যতটা পারা যায় গর্বহীন করে তুলি বেঁচে থাকাকে ।

জানিস না কি রে ! জোয়ান ছেলে, সমাজে ক্রান্তি আনার জন্য রোজ কতো পাঁয়তাড়া ভাঁজছিস, আর অরগ্যাজম কাকে বলে জানিস না ? ডাক্তার ঘোষ ওরফে ডাক্তার বর্মণ, যে প্রায় প্রাগৈতিহাসিক আড়ম্বরহীনতায় বসবাস করে, বসে আছে  অ্যালুমিনিয়ামের ফোল্ডিং চেয়ারে, জেনেশুনে, যে কমরেড জ্যোতি লুঙ্গি পরা বরদাস্ত করতে পারে না ; সামনে এক ফুট চওড়া দু ফিট লম্বা হালকা অ্যালুমিনিয়াম টেবিল, সেটাও ফোল্ডিং, ফোল্ডিং খাটে টাঙানো মশারি চব্বিশঘন্টা পাতা, খাটে একটা চাদর, বালিশ নেই।

কিছুক্ষণের নোটিসেই পুরো পাত্তাড়ি গুটিয়ে অন্য কোথাও গিয়ে তেরপল খাটাবার সুব্যবস্হা হিসাবে সব কিছুই ফোল্ডিং আর অস্হায়ী, ডাক্তার  নিজেও নিজেকে পাটে পাট ভাঁজ-করা মানুষ বলে মনে করে, অস্হায়ী । প্রতিদিন উঠে পড়ে ঘষাকাচ ভোরে, তবু তখনই মশারি থেকে বেরোয় না। তাঁবুতে সৌরলন্ঠন আর ব্যাটারিলন্ঠন দুইই  আছে, পোকাদের অনাহুত উড়াল আর ডানাসঙ্গীতের ভয়ে জ্বালে না সচরাচর ।

বাংলা কথনি  ? না সংস্কৃত ? হিন্দিতে কী ? নখ খাওয়া মুলতুবি রেখে জানতে চাইল অমিত ।

হিন্দি আর সংস্কৃততে ইয়োনি আর বাংলায় যোনি, সেই যোনি যখন মুগ্ধ হয় তখন তাকে বলে অরগ্যাজম, আসল ক্রান্তি, ডিকটেটরশিপ অব দি রেজিং ফ্লেশ, বুঝলি, বললে ডাক্তার, ওছাড়া বাদবাকি ক্রান্তি ফালতু, বুকনির বাতাসা, অরগ্যাজমের বাংলা নেই, হয়তো বাৎসায়নে সংস্কৃততে আছে, ঠিক জানি না ।

নাঃ, কোনো ক্লাসের বইতেই কথনিটা ছিল না ; ক্লাসমেটরাও কখনও বলাবলি করেনি ; কী করেই বা জানব ! তাছাড়া আমাকে তো সবচে রদ্দি স্কুলে পাঠানো হয়েছিল : গাঁঠরিচোর টিচাররা ঘুষ দিয়ে চাকরিতে ঢুকেছে, নিজের ভাই হলেও ঘুষ ছাড়া কাজ হয় না, নিজেরাই কিছু জানে না, সব রগড়ঘস, টিউশানির চকরলস কেটে বেড়ায় । কোনো টিচারের মুখেও শুনিনি কথাটা । বাংলা তো আর পড়ানো হয় না কোনো স্কুলে ; সংস্কৃতের টিচার নেই । হিন্দি টিচার আছে,  সেও কখনও ইয়োনি কথাটা ব্যবহার করেনি ।

টিচাররা অমন শব্দ বলে না, বুঝলি, টিচাররা কি ছাত্রদের ক্রান্তির কথা শেখায় কখনো, গোরু হতে শেখায়, চাকরি-বাকরি করে লিটার-লিটার দুধ দেবে, জেইই, আইআইটি, আইআইএম, রাজস্হানি কোচিং, ধাঁআআআ, নিউ ইয়র্ক । যোনি, অরগ্যাজম যে ধরণের ক্রান্তিকারি বুলি, যাকে তুই কথনি বলছিস, দশ-বারো বছর বয়স থেকে বন্ধুবান্ধবরা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করে ।   টেবিলের ওপর বাইফোকাল চশমা খুলে রাখতে রাখতে বললে ডাক্তার ঘোষ, মানে কমরেড ডিবি ; কন্ঠস্বরে স্বনিত হল এক ভিন্ন সুর, নিজেকে বললে, চশমাটা বদলানো দরকার, কিন্তু কী-ই বা হবে বদলে, বদলাতে হলে চোখ দেখাতে হবে, হয়তো নাম ভাঁড়িয়ে, দূরের কোনো রাজ্যে গিয়ে, সে অনেক হ্যাঙ্গাম, যা পোশায় না । প্লাসটিক লেন্সের চশমা, স্ক্র্যাচ পড়ে লেন্সদুটো নিজেরাই  মায়োপিয়ায় আক্রান্ত ।

ডাক্তার, কমরেড ডিবি, এখন হাত দিয়ে তাকায়, চোখের প্রয়োজন হয় না, হাত দিয়ে নাড়ি পরখ, হাত দিয়ে ওষুধের বড়ি বের করা, হাত দিয়ে ঘায়েল শরীর থেকে বুলেট বের করা, হাত দিয়ে ব্যাণ্ডেজ  বাঁধা । হাত যে নারীকে আদরও করতে পারে তা ভুলে গেছে হাতেরা । হাতদুটো ওর মতনই হয়ে গেছে, রুটিনবাঁধা । নতুন ওষুধের জন্য মেডিকাল ম্যাগাজিন পড়া জরুরি বলে কমরেডদের আদেশ দিয়ে ভারতীয় মেডিকাল জার্নাল আনায়, ইংরেজি জানে এমন কাউকে পড়তে বলে আর শুনে-শুনে মনে রাখে, কিংবা নিজেই পড়ে নেয়, এখানে তো মেডিকাল রিপ্রেজেনটেটিভ এসে ওষুধের বাখান করে ডাক্তারকে এটা-সেটা ঘুষ দিয়ে যাবে না, জার্নাল পড়া হয়ে গেলে ওষুধের জেনেরিক নামগুলো স্মৃতির আলমারিতে তুলে রাখে, তারপর ম্যাগাজিনগুলো সমবায়িক রান্নার উনোনে পোড়াতে পাঠিয়ে দেয় ; ওষুধের কেবল স্ট্রিপ আনায়, বাক্সে প্যাক করা নয়, কাগজে মোড়া  ।

টেবিলের ওপর পড়ে আছে আগের বছরের মেডগেট টুডে আর ইনডিয়ান জার্নাল অফ মেডিকাল সায়েন্সের সংখ্যা, অতিব্যবহারে ময়লা, পাতাগুলো নিজেরাই কোনাগুলো ভাঁজ করে আরাম করছে । সকাল থেকে দুপুরের খাওয়ার রুটিন বাদে  বেশির ভাগ সময় মশারিতে ঢুকে শুয়ে থাকে, ম্যাগাজিন পড়ে, রোগীরা এলে বা কোনো বেয়ারফুট কমরেড কিছু জানতে এলে মশারির ভেতর থেকেই নির্দেশ দেয়, কেবল ঘায়েল কমরেড এলে ওর দৌড়ঝাঁপ হয় দেখার মতন, বিশেষ করে সে যদি বুলেটফোঁড় হয়, যেন ওর কাছে পাঠাবার জন্যই আধামিলিট্রি জওয়ানরা রাইফেল চালিয়েছিল ।

মানুষকে বাঁচিয়ে আবার জীবনের লাথি খেতে পাঠানোর চেয়ে বড়ো প্রাপ্তি আর নেই, মনে করে কমরেড ডিবি, যাকে কমরেড বললে মনে-মনে চটে যায় বটে, কিন্তু মৃদূ শ্লেষহাসিতে মনের অন্ধকার দমিয়ে রাখে লোকটা।

বন্ধু বলতে যা বোঝায় তা আমি কোনো ক্লাসেই পাইনি, পাড়াতেও কেউ বন্ধু করতে চায়নি ; নিজের বাড়িতেই বোলতিবন্ধ ফেকলু, ওরা তো দেখতেই পেতো, বন্ধু করবে কেন, তাই ভিতরঘুন্না হয়ে বড়ো হয়েছি ! বন্ধু বলতে শুধু ইতু । চেয়ারে দুই পা তুলে হাঁটু মুড়ে বসতে বসতে বলল অমিত ।

নামিয়ে রাখলে অমিতের পা নাচাতে ইচ্ছা করে। সামনে যে বসে আছে সে মনে করে ওর পায়ে ব্যথা, ইতুও তাই মনে করে বলত, এই ডাফার, পা নাচাসনি, পা ব্যথা করছে তো পা তুলে বোস । পা নাচানোটা ওর অস্বস্তি কাটিয়ে ওঠার উপায় । পা নাচাতে নাচাতে জিন্সের ঘসটানি খেয়ে বসন্তকালের হাওয়ায় ওর লিঙ্গ দাঁড়াতে আরম্ভ করেছিল বলে থামিয়ে চেপে বসল । বলে উঠলো, দাঁড়াও দাঁড়াও, মনে পড়েছে, একটা কাগজে লিখে নিয়ে মুখস্হ করেছিলুম, এক্ষুনি মনে পড়ে গেল । বলব ?

ডাক্তার হাই তুলতে তুলতে বললেন, বল, দেখি অরগ্যাজম বলতে কী বোঝায়, জানিস কিনা ।

অমিত যতক্ষণ নিজের মগজে মুখস্হ করছিল, ডাক্তার একটা বাংলা লিফলেট টেবিল থেকে তুলে নাকের সঙ্গে সাঁটিয়ে, পড়া আরম্ভ করলে, বোধহয় ওষুধের মোড়কে এসেছিল, চোখ কুঁচকে, টাকে হাত বোলাতে বোলাতে,  পড়তে বেশ ভালোই লাগছিল, সরেস লিখেছে, লাথি খাচ্ছে আর লিখে যাচ্ছে ব্যাটা বাঙালির দল, লেখা ছাড়া আর তো কিছু করার নেই, “সম্প্রতি রাজ্যে রামনবমীতে তরোয়াল নিয়ে শোভাযাত্রাকে কেন্দ্র করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে । বলা হচ্ছে, ধর্মীয় শোভাযাত্রায় অস্ত্র নিয়ে মিছিল বাঙালি সংস্কৃতি নয় । অস্ত্র হাতে যুদ্ধংদেহী মেজাজে নগরের মিছিল শাসক থেকে আম জনতাকে বিস্মিতই করেনি, পাল্টা কিছু করতে শাসক দলকে প্ররোচিতও করেছে । রাজ্যের শাসক দল রামনবমীর পাল্টা হনুমান জয়ন্তী পালন করেছে। এলাকায় এলাকায় হনুমানের প্রতিকৃতি নিয়ে শোভাযাত্রাও করেছে । মিছিল ও পাল্টা মিছিলে ভক্তিরসের তুলনায় রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীতায় বিদ্বেষের বীজ বপন করা হয়েছে । এই সংস্কৃতি কোনো কালেই ধর্মগুরুদের সংস্কৃতি নয়, এমনকি বাঙালিদেরও সংস্কৃতি নয় । কৃত্তিবাস ওঝা তাঁর ‘শ্রীরাম পাঁচালী’তে বিষ্ণুর অবতার হলেও সেখানে বীররসের প্রাধান্য ছিল না । ছিল ভক্তিরসের প্রাধান্য । কৃত্তিবাসের কাব্যের মূল সুরের সঙ্গে বৈশাখের গরমে টিনের প্যাঙপ্যাঙে তরোয়াল হাতে ছেলে-মেয়ে বুড়ো-বুড়িদের মিছিল খাপ খায় না । কৃত্তিবাস ওঝার যাঁরা অনুগামী তাঁদের সংস্কৃতির সঙ্গেও এই সংস্কৃতি মেলে না । অথচ কলকাতা মহানগরীতে রামনবমী উপলক্ষে অস্ত্র-মিছিলে কাতারে-কাতারে মানুষজন নগর দাপিয়ে বেড়ালো । কপালে লাল তেলক কেটে, কাঁধে চাদর, হাতে চিৎপুর অপেরার তরোয়াল,  আর মুখে ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনিতে রোদ্দুরের ভিড়কে মাতালো । বিদগ্ধজন থেকে সচেতন আমজনতা বলছেন, এটি বাংলার সংস্কৃতি নয়, এই সংস্কৃতি উত্তর ভারতের সংস্কৃতি; বিদগ্ধজন মানে যারা অণ্ডকোষ চুলকোয় আর টিভির তর্কাতর্কিতে জ্ঞান দেয় । মিছিলে বাঙালিদের সংখ্যাধিক্য ছিল না । অংশগ্রহণকারীদের অধিকাংশই ছিল অবাঙালি । মিছিলে ওড়ানো ঝাণ্ডাগুলোতেও বাংলা হরফে কিছু লেখা ছিল না, যা লেখা ছিল তা কেবল নাগরি হরফে । সেগুলো সংস্কৃত না হিন্দিতে লেখা তা বোঝার উপায় ছিল না । প্রশ্ন উঠেছে, এই ব্যাপক জনসমাগম কী ভাবে ঘটল ? এঁরা নিশ্চয়ই পাশের রাজ্য উড়িষ্যা বা অন্ধ্রপ্রদেশ-তেলেঙ্গানা বা উত্তরপ্রদেশ থেকে আসেনি । এঁরা সকলেই এই পশ্চিমবঙ্গের। এঁরা বাঙালি হোন বা নাই হোন, পশ্চিমবঙ্গেরই নাগরিক । আমাদের এই রাজ্যে বাঙালি সংস্কৃতির ঘোর সংকট; বাঙালি বলতে যে কী বোঝায় তা বাঙালি নিজেই ভুলে গেছে। বিশেষ করে আমাদের রাজধানী যে কলকাতা, সারা রাজ্যের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কর্মস্হল, খোদ সেখানেই বাঙালিরা এখন সংখ্যালঘু । উনিশ শতকের মতন মণীষীরা আর জন্মান না এই শহরে, শুধু মাস্তান গুণ্ডা আর দলদাসরা জন্মায় । কেউ কেউ হয়তো ‘আমরা বাঙালি’ প্রাদেশিকতাবোধে উষ্মা প্রকাশ করতেই পারেন । কিন্তু বর্তমান সংস্কৃতি সুকুমার রায়ের ভাষায় ‘হাঁসজারু’ সংস্কৃতি হয়ে উঠেছে । কলকাতার চারিদিক ধরলে মধ্য কলকাতা বরাবরই জারজ সংস্কৃতির কেন্দ্র । এর মধ্যে অ্যাংলো ইন্ডিয়ান প্রভাব কিছুটা আছে। উত্তর কলকাতা বা পূর্ব কলকাতা, বিশেষ করে সল্ট লেক, এখন হিন্দিভাষী অবাঙালিদের প্রাধান্য, যা ঘটেছে বাঙালি মধ্যবিত্তের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে । বিধান রায় বাঙালিদের জন্য সল্ট লেক কলোনি তৈরি করেছিলেন ; বাঙালিরা সেখানে জমি কিনে বাড়ি তুলেছিল, তারপর সেই লোভী বাঙালিরা একে একে মারোয়াড়িদের বিক্রি করে শহরতলির দিকে পেছিয়ে গেছে । কলেজ স্ট্রিটের ফুটপাথ বামপন্হীদের প্ররোচনায় বাঙালি উদ্বাস্তুরা দখল করে বইয়ের আর নানা জিনিসের দোকান দিয়েছিল ; তারা সেসব দোকান অবাঙালিদের বিক্রি করে একইভাবে শহরতলিতে পেছিয়ে গেছে । বাকি রইলো দক্ষিণ কলকাতা, যেখানে উচ্ছিন্ন হিন্দু বাঙালির জীবন সংগ্রামের মূল জায়গা । এককালে মুসলমানরা এই অঞ্চলে চাষবাস করতো, তাদের সরিয়ে, দাঙ্গায় মেরে ফেলে, অজস্র উদ্বাস্তু কলোনি গড়া হলো, সেসব নিয়ে প্রচুর কাঁদো-কাঁদো বেস্টসেলার লেখা হয়েছে। এক সময়ে দক্ষিণ কলকাতার উপনিবেশগুলো থেকে সংসদীয় বামপন্হীরা তাঁদের আন্দোলনের রসদ পেয়েছিলেন, তাঁরা জোর খাটিয়ে আর ভয় দেখিয়ে এই উদ্বাস্তুদের আন্দামানে যেতে দেননি, নয়তো আন্দামান আজ বাঙালি উপনিবেশ হয়ে উঠতো । সেই সমস্ত সংগ্রামের জায়গাও মুছে ফেলে প্রাক্তন উদ্বাস্তুরা জমিবাড়ি অবাঙালিদের বেচে শহরতলিতে পেছিয়ে যাচ্ছেন । বৃহত্তর কলকাতা শহরে এখনও বাঙালিদের প্রাধান্য থাকলেও, দুই প্রজন্ম জুড়ে বাঙালির পোলারা এখন বাংরেজি ও বাংদি — বাংলা-হিন্দি মেশানো — সংস্কৃতির ধারক ও বাহক, হিন্দি ফিল্ম দেখার জন্য হুড়োহুড়ি করে মরে, বেরিয়ে এসে সালমান শাহরুখ আমির খানের সংলাপ ভাঁজে, আনোয়ার শা রোড আর মেটিয়াবুরুজ তো নবাবদের হারেমের বংশধরদের গুণ্ডামিতে থরহরি, তাদের ধারণা তাদের রক্তে বইছে টিপু সুলতান আর ওয়াজেদ আলি শাহের রক্ত । মহরমের সময়ে পাকিস্তানি ধরণের পতাকা উড়িয়ে তাজিয়া বের করে ঝাঁপাই ঝোড়ে ।  বড়বাজারে বরাবরই মারোয়াড়ি আর গুজরাটিদের রবরবা, ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির সময় থেকে । হাওড়া শহর দখল করে নিয়েছে বিহারি আর উত্তরপ্রদেশের মাফিয়া, তাদের বিরোধিতা করলেই মুঙ্গরের দিশি পিস্তলের গুলি । সুতরাং বাংলা সংস্কৃতির অবশিষ্টাংশ সত্যিই কি পারবে এই ‘হাঁসজারু’ সংস্কৃতি রুখতে ? দেড়শো বছর আগে কালীপ্রসন্ন সিংহ লিখে গিয়েছিলেন, ‘হুতোম পেঁচার নকশা’ । রামনবমী বা রামলীলা সম্পর্কে যা বিতর্ক থাকুক না কেন, তা যে বাঙালি সংস্কৃতি নয়, তা তিনিও জানিয়েছেন । রামলীলা সম্পর্কে সেই কবে তিনি বলে গিয়েছেন, এ সংস্কৃতি আমাদের সংস্কৃতি নয় । বাঙালি সংস্কৃতি জানতে হলে আজও ‘হুতোম পেঁচার নকশা’ পড়া দরকার।”

পড়া শেষ হলে, যে শব্দটা নিজের মনে নিজেকে শোনাবে ভেবেছিল ডাক্তার, তা দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে মুখ দিয়ে বেশ জোরেই উচ্চারিত হলো, “মাদারচোদ, গাণ্ডু কা জনা” ।

অমিত চমকে বলে উঠলো, আরে, আমাকে গালাগাল দিচ্ছ নাকি গো ? মায়ের সঙ্গে ওইসব করেছিলে বলে আমাকেই নোংরা করে দিচ্ছ !

ডাক্তার বললে, না রে, তোকে বলিনি, ওই চুতিয়াগুলোকে বলছি, যাদের পোঁদে সোভিয়েত দেশ এককালে রুবল গুঁজে দিতো, তারপরে চীন কিছুদিন লাখ লাখ রেমনিমবি ইয়ান গুঁজেছে ওদের পোঁদে, তারপর মার্কিন কোম্পানির মারোয়াড়ি এজেন্টরা গুঁজেছে, গুঁজেই চলেছে, চটকলগুলোর লালবাতি জ্বেলে, বাঞ্চোৎরা পোঁদ ফাঁক করে দাঁড়িয়ে ডুবিয়ে দিল পশ্চিমবাংলাকে, ময়দানে র‌্যালির‌্যালা করে ভাড়াটে পাবলিক এনে,  আর লাউডস্পিকার লাগিয়ে নিজের নুনু নিজের পোঁদে ; আর কিচ্ছু হবে না, তোর মা-বাপের ক্রান্তিও পাঁক থেকে তুলে আনতে পারবে না । যাকগে, তোর মনে পড়েছে কি অরগ্যাজম কাকে বলে ?

হ্যাঁ, হ্যাঁ, মনে পড়ে গেছে, কনকদুর্গা আংরেজি মুখস্হ করতে শিখিয়েছে, ওই যে কমরেড কুনকি, অমিত বলা আরম্ভ করলো, ডিকটেটারশিপ অফ দি প্রলেটারিয়েট, ইনটারপেলেশান, মেটাবলিক রিফ্ট, পারমানেন্ট রিভলিউশান, প্রিমিটিভ কমিউনিজম, রিলেটিভ ডিপ্রাইভেশান, রেনটিয়ার ক্যাপিটালিজম, রিভলিউশানারি সিচুয়েশান, আলট্রা ইমপিরিয়ালিজম, বলশেভিক, বোনাপার্টিজম, ক্যাডার, শভিনিজম, ডুয়াল পাওয়ার, ইকোনমিজম, মেনশেভিক, ফ্যাসিজম, মেটাফিজিক্স, নিও লিবারালিজম, অপরচুনিজম, প্ল্যান্ড ইকোনমি, পলিটিকাল স্ট্রাইক, রিঅ্যাকশানারি। বলা শেষ করে গলা ছেড়ে হাসতে লাগলো অমিত, তারপর বললো, বুঝলে, আংরেজি ঝাড়তে পারলে এই জঙ্গলেও কদর বাড়ে । অরগ্যাজমও তো আংরেজি, ঝেড়ে দিলেই হলো সময় বুঝে, লেকচারবাজি আমি পারি না, ওরা কতো শেখাচ্ছে, আমার ভালোই লাগে না, কেন যে এলুম এখানে, ধুৎ শালা, ইসকি মাকা,  বুড়মে পেল দেঙ্গে রামরতিয়া চুতিয়াপা ।

কমরেড ডাক্তার বললে, অমিতের দিকে তাকিয়ে নয়, আস্তানার বাইরে প্রায়ান্ধকারের দিকে চোখ মেলে, আসল বয়সের আনন্দটাই পাসনি দেখছি । কথা বলাবলিরও আনন্দ আছে, নিজেদের মধ্যে সমবয়সী মেয়েদের নিয়ে ফিসফিস করার, নোংরা  হাসাহাসি করার বুক-ঢিপঢিপ আনন্দটাই মিস করেছিস । মেয়েদের নিয়ে ফিসফিস করে কথাবার্তা হতো না ? নাইন টেন টুয়েলভে ? টাচিফিলি খেলাখেলি ? অমিতের দুই পায়ের দিকে তাকিয়ে বললে ডাক্তার ঘোষ, যে, পিঠে ব্যাকপ্যাকে দাতব্য ওষুধ, যা  নিজে কখনও খায় না যতই জ্বরজারি হোক, তাতে নিজের সিনথেটিক মশারি ঢুকিয়ে, কিলোমিটারের পর কিলোমিটার ক্যাডারদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে হাঁটে, তাকালো অমিতের দিকে, পেশার গাম্ভীর্যের সঙ্গে কথা বলার শৈলী মিশিয়ে ; বছরের কতদিন হতে চলল এই একটা  ছেঁড়া রঙওঠা জিনস পরেই চালিয়ে দিচ্ছে ছেলেটা, ক্যাডারদের মতন মুফতি পরতে ওর ভালো লাগে না, তা জানে ডাক্তার ।

ছেলেটা ওর, মানে ডাক্তার কমরেড ডিবির ছেলে, না অতনু চক্রবর্তীর ছেলে তা মানসী বর্মণ, যে অমিতের মা, সেও নিশ্চিত নয়, ওর বউয়ের ছেলে, তবু ছেলেটা ওর মতই হয়ে চলেছে, যেমন চলছে তেমনই চলুক টাইপের । লোকে বলবে বাপ-ছেলে যেন যময ভাই ।

এই জীবন নিজে বেছে নিয়েছে ডাক্তার, স্রেফ মানসী বর্মণের খাতিরে । মানসী যেদিন আধামিলিট্রির গুলিতে মরবে, সেদিন ওর ছুটি । ডাক্তার নিজেও উড়িয়ে দিতে পারে মানসী বর্মণ আর ওর বিয়ে-না-করা বর অতনুকে, নাইন এম এম একটা লোডেড থাকেই ওর কাছে, সাইলেন্সার লাগানো, যাতে আধামিলিট্রির কাছে আত্মসমর্পণ করতে না হয় । কিন্তু মানসী মরে গেলে  বেঁচে থাকার কোনো উদ্দেশ্য থাকবে না, মানসী তা জানে, তাই অস্তিত্ব দিয়ে আটক করে রেখেছে ডাক্তারকে ।

অমিতকে ডাক্তার বললে, কী হলো ? কী জিগ্যেস করেছিল, সেটা মনে করার চেষ্টায় বললে, কী হলো  ।

নাঃ, জানি না, হতো হয়তো, আমার সঙ্গে হয়নি । যাকগে যাক, তুমিই বলো না যোনি আর অরগ্যাজম ব্যাপারগুলো আসলে কী,  আর কেনই বা জিগ্যেস করছ, আমাকে এই ক্যাম্পে বাবা-মা আর ক্যাডাররা যা শিখিয়েছে, তা তো এতক্ষণ বললুম, তোমার মুখ দেখে বুঝতে পারছি বিশ্বাস করোনি ।  জানতে চাইল অমিত, চেয়ারে বসে হাঁটু নাচাতে নাচাতে, লিঙ্গকে কাবু করে পোষ মানিয়ে নিয়েছিল ।

সেক্স করেছিস কোনো মেয়ের সঙ্গে ? আই মিন কোনো ছেলের সঙ্গে করিসনি বলেই মনে হয়, বিহারে অবশ্য লালটুশ ছাত্ররা হোমো টিচারদের পাল্লায় পড়ে। ডিজিটাল সেক্স হোক বা রিয়াল পেনিট্রেটিভ সেক্স, করেছিস কোনো মেয়ের সঙ্গে ? কথাগুলো বলতে বলতে নিজের কাছে হাসলো, কমরেডরা ওকে সাধুসন্ত মনে করে, সংসারত্যাগী সংসারী-ক্রান্তিকারি । অন্তর্লীন হাসি, যা মুখে ফোটে না সচরাচর । কেবল তখনই  মুখে মৃদু হাসি খেলে যায় যখন কোনো উপজাতি তরুণ বেয়ারফুট ডাক্তার হবার জন্য ডাক্তারের কাছে প্রথমদিন শিখতে আসে । হবু শিক্ষার্থীকে প্রথম প্রশ্ন, ‘ইমপিরিয়ালাইস্টস, কমপ্রাডর বুর্জোয়াজি আর ফিউডাল লর্ডস কাকে বলে জানিস’, আর সে, বলা কথাই যে শোনেনি, ঘাড় নাড়ে, ডাক্তার ঘোষ তাকে মাথায় হাত রেখে আদর করে বলে ‘ভালো ডাক্তার হবি তুই’ ।

ডিজিটাল ? সেটা কী ? থুতনি ওপরে তুলে প্রশ্ন করল অমিত ।

গণিত নয়, ইলেকট্রনিক্স নয়, আঙুল আঙুল, তর্জনী, এই দ্যাখ, এই আঙুলটা,  ঢুকিয়ে । রাশভারি কন্ঠস্বর ডাক্তারের ।

ওসব জানতে চাইছ কেন ? ওর সঙ্গে তোমাদের  ক্রান্তির সম্পর্ক আছে নাকি ? জিগ্যেস করল অমিত, ডান হাতের কড়ে আঙুলের নখ খেতে-খেতে । নখের টুকরোটা থুঃ করে ফেলে বলল, যোনি নিয়ে আমার হবেটাই বা কি, আমি তো ক্রান্তি করতে আসিনি ! সুযোগ বুঝলেই কেটে পড়ব, তোমার পিস্তলটা গেঁড়িয়ে ।

তোমাদের মানে ? তোর বাপ-মা তো তোকে রাইফেল আর পিস্তল চালাতে শিখতে পাঠায় মাঝে-মধ্যে । তুইও তো একজন ক্রান্তিকারি ! আমি তো ক্রান্তিকারি নই ; আমি ওদের, হো-মুণ্ডা-সাঁওতাল, বিরহোর-কোরওয়া-মাহলি আর মাড়িয়া-গোণ্ড-লোহরা চিকবারিকদের ডাক্তার ।

বাপ-মা ? ওনারা ? তোমার বউ আমার মা,  আর তোমাকে আমার মা বিয়ে করেছিল, তা-ই তো জানি।

কিন্তু তোর মা যার সঙ্গে সেক্স করে তোর জন্ম দিয়েছিল  সে তো কমরেড দীপক, আই মিন অতনু চক্রবর্তী, আমি নই । তোর মার সঙ্গে সেক্স করে আমি  যে বাচ্চাটার বাবা হতাম সে তো জন্মাবার আগেই মারা গিয়েছিল বলে শুনেছি ।

অমিত ছেলেটা তারও হতে পারে, অতনুরও হতে পারে, কিন্তু অমিতের জন্মের কাহিনি যেভাবে চাউর করা হয়েছে, সে গল্পকে অমিতের মনে চারিয়ে আপাতত সন্দেহে ভারাক্রান্ত হতে দিলো না ডাক্তার ।

তোমাকে বিয়ে করলেন আর প্রেমে পড়লেন ওই লোকটার ! সেক্স করার ছিল তো সেক্স করলেই হতো, আমাকে জন্ম দেবার কি দরকার ছিল ? টোপি পরে নিলেই হতো, ইতু বলেছিল টোপি পরে করলে বাচ্চা-ফাচ্চার জুঠঝামেলা হয় না ।

তোকে জন্ম দেবার জন্যই সেক্স করেছিল, বুঝলি, তুই হলি ওদের ভালোবাসার ফসল, ভালোবাসার প্রতীক, রাশিয়া চীন কিউবা ভিয়েৎনামে এই ধরণের অনেক প্রেমের গল্প আছে, বললো ডাক্তার, যে আজও বুঝে উঠতে পারেনি, কেন দুজনের সঙ্গে ইচ্ছানুযায়ী সেক্স করতো ওর স্ত্রী, অথচ ওকে ডিভোর্সও দিতে চায়নি, কেননা মানসী বর্মণ বা কমরেড জ্যোতি বলেছিলো, আমার দুজনকেই চাই, আমি তোমাদের দুজনকেই ভালোবাসি, শুধু একজনকে নিয়ে আর থাকতে পারবো না, দুজনের কেউ একজন যদি আমাকে ছেড়ে যাও তাহলে আত্মহত্যা করে নেবো, সে অনেককাল হলো ।

ফিল্মি তক্কো দিও না । এদিকে ক্রান্তি করছি আবার ভালোবাসাবাসিও করছি, হ্যাক থুঃ। হ্যাক থুঃ করলেও, থুতু ফেলল না অমিত, গলা শুকিয়ে এসেছে বলে জিভ দিয়ে ঠোঁট চেটে নিল ।   টেবিলের ওপর থেকে দুশো এমএল জলের বোতল এগিয়ে দিলো ডাক্তার ঘোষ । এক ঢোঁক খেল অমিত, জেনে গেছে যে জল এখানে, জঙ্গলের ভেতরে, মহার্ঘ ।

ক্রান্তির সঙ্গে ভালোবাসার কোনো বিরোধ আছে নাকি রে ? ভালোবাসাবাসি কোনো ইজম নয় । ওটার জন্যেই মানুষরা জন্তু-জানোয়ার বা কীটপতঙ্গ  হয়নি, মানুষ হয়েছে । এখন তোর বয়স কম, তাই জেনে রাখ, ভালোবাসা হল মানবজীবনের মিথ্যেগুলোর প্রধানতম ।

আবার জ্ঞান দিচ্ছ, ভঁয়সালোটন টিচারদের মতন । টিচাররা যা বলে নিজেরা তা মানে না, ক্লাস ফোর থেকে দেখেছি। বলে এক করে আরেক । ওই তোমার বউ আর তোমার বন্ধুর মতন ।

তা তুই সেক্স করেছিস কিনা বললি না তো ।

তুমিও তো বললে না যোনি কাকে বলে ।

আগে বল সেক্স করেছিস কি না ।

করেছি ।

রেডলাইট এরিয়ায় যাসনি তো ? গিয়ে থাকলে ব্লাড টেস্ট করিয়েছিস ? আমার কাছে যে ব্লাড টেস্ট কিট আছে তা দিয়ে যৌনরোগ ধরা পড়ে না । একটু থেমে বললো, নাঃ, কী করেই বা যাবি, সেখানে তো টাকা ছাড়তে হবে, আর তুই বলছিস তুই ছিলি ইতুদের বাড়ির চাকরের মতন ।

ফিরকি নিও না ; কি আবোল তাবোল বকছ । যারা আমাকে ভালোবেসেছে আর আমি যাদের ভালোবেসেছি তাদের সঙ্গে সেক্স করেছি ।

তাদের ফেলে পালিয়ে এলি এই জঙ্গলে ?

না, তাদের প্রথম জনকে তোমরা ছত্তিসগড়ের অবুঝমাড় জঙ্গলে পাঠিয়ে দিয়েছ, ডাক্তারি করার জন্য, ক্রান্তিকারিদের রোগ-জখমের চিকিৎসা করার জন্য ।

ইতু ? ইতু ঘোষ তোর প্রেমিকা ? সে তো তোর বোন হয়, তার সঙ্গে সেক্স করলি ।

বোন আবার কোথায় । তবে ইতু বলেছিল যে ও যদি আমার নিজের বোন হতো তাহলেও আমাকে ভালোবাসতো, আমার সঙ্গে সেক্স করতো । আমি কিছুই করতে চাইনি । ইতুই যাবার আগে আমাকে ওর ভার্জিনিটি উপহার দিয়ে গেল, ও-ই বলেছিল যাবার আগে আমাকে আমার প্রাপ্য দিয়ে যাচ্ছে । ও কিন্তু প্রিকশান নিয়েছিল । ভার্জিনিটি, উপহার, প্রাপ্য, প্রিকশান এইসব কথা ইতুর, আমি জানতুমই না এগুলো কী ব্যাপার! আরেকজন এখানেই আছে, কনকদুর্গা, কমরেড কুনকি, ছবিলি নম্বর ওয়ান ।

এবার বুঝেছি । শুনলে কেমন যেন কাব্যি-কাব্যি মনে হয় ।

কী বুঝেছ ?

ইতুকে তোকে দিয়ে ফুসলিয়ে কেন অবুঝমাড়ের জঙ্গলে পাঠিয়ে দেয়া হল । কনকদুর্গা কি করে তোর প্রেমে পড়ল রে ? আগে ইতুর গল্প করি, তারপর কনকদুর্গার করব, কী বল ?

কেন ? ইতু তো মানুষের সেবার জন্যে নিজেই গেল । ফোসলাবো কেন ? আর কনকদুর্গাকেও আমি ফোসলাইনি, ও একদিন আমাকে ম্যাস্টারবেট করতে দেখে ফেলেছিল, তারপর হাত ধরে জঙ্গলের ভেতরে নিয়ে গিয়ে আমার গালে দুই চড় কষিয়ে মাটিতে ফেলে আমার উপর শুয়ে পড়েছিল, ওর গতর দেখেছো তো, ইয়া সলিড মাল, জড়িয়ে ধরলে ছাড়ানো যায় না, ভাঙা-ভাঙা বাংলা মিশিয়ে তেলেগু আর আংরেজি ভাষায় কি-কি সব বলতে থাকে সেক্স করার সময়ে, সারা গায়ে থুতু মাখিয়ে দেয়, ওর কাছ থেকেই তো ছিলিম টানতে শিখেছি । বলে ছিলিম টেনে সেক্স অনেকক্ষণ করা যায়, সত্যিই তাই, মাটির ছিলিম গরম হয়ে গেলে নিজের সেক্সের জায়গায় ঢুকিয়ে ঠেলাঠেলি করে বলে, নে এবার টান, ঠাণ্ডা করে দিয়েছি।

ম্যাস্টারবেট করা খারাপ নয়, যদি না করিস তাহলে আপনা থেকে মরা ধাতুরস রাতের বেলা বেরিয়ে যাবে, কম বয়সে সব ছেলেরই তাই হয় । তুই একেবারে লবড়ধোধো থেকে গেলি, পড়লিও তো কনকদুর্গার পাল্লায়, ও তো বাচ্চা হাতি, তবে দয়ামায়া নেই, ঘায়েল কমরেডদের হ্যাঁচড়াতে-হ্যাঁচড়াতে নিয়ে আসে । ওই যে তুই বললি ছিলিমটা ঠেলাঠেলি করে কনকদুর্গা, ওই ঠেলাঠেলিটা ওর আনন্দের জন্যে জরুরি, ও নিজের অরগ্যাজমের জন্যে সেটা করে, এখানকার উত্তেজনার চাপ থেকে ছাড়ান পায় ।

আমায় আবার কি বলছ, নিজেও তো খাড়ুস থেকে গেছো, গুরুঘণ্টাল । মরা না জ্যান্ত ধাতু অতোশত জানি না, ম্যাস্টারবেট করতে ভাল্লাগে বলে করি, তবে এখানে জলের অভাবে ধোয়াধুয়ির ঝামেলা, কনকদুর্গা বলেছে ও যতোদিন এখানে আছে ম্যাস্টারবেট করার দরকার নেই । আসলে দলমের কেউই ওকে দেখে টান পায় না । ও আমাকে চুসকিও শিখিয়েছে । চুসকি জানো তো ? অন্ধকারে টের পাই না কোথায় মুখ দিয়ে চুসকি মারছি, এমন কালো রঙের আঙুর ।

ফাজলামি রাখ, যা করার করিস, আমাকে হিসেব দেবার দরকার নেই । ইতুকে তো তোর সঙ্গে এখানেই রাখতে পারত, যেমন তোর মা-বাপ রয়েছে । তোদের দুজনকে আলাদা করে দেবার প্যাঁচ মেরে ইতুকে ওই ফিল্ডে, আর তোকে এই ফিল্ডে রাখা হল ।

ওই লোকটাকে আমার বাপ বানিও না । ওটা একটা স্কাউন্ড্রেল, চুতিয়া, মাদারচোদ কোথাকার । ও তো এক নম্বরের লুচ্চা-লোফার, বন্দুকবাজ লাফাঙ্গা কাঁহিকা,  জানো তুমি । যেদিন আমাকে আর ইতুকে বাড়ির লোকেরা বকুনি দিচ্ছিল, সেদিন ওরা অতনু চক্রবর্তী সম্পর্কে যা-যা বলছিল , শুনলে তোমার কান লাল হয়ে ঝলসে শিক কাবাব হয়ে যেতো, বুঝলে ।

অমিত বলল, ওদের, মানে অতনুদের,  একটা গ্যাং ছিল যাকে ওদের অফিসের লোকেরা বলত নারী-নারকো গ্যাং, যতো তিলেখচ্চররা ছিল ওই দলে, এরিক পেজ, মাহমুদ জোহের, মলয় রায়চৌধুরী, অসীম পোদ্দার, দেবেন্দ্রবাবু, অভিজিৎ বাবু, দাশগুপ্ত সায়েব, মুদালিয়ার সায়েব, বাঙালি বিহারি পাঞ্জাবি ওড়িয়া মিলে  সে নাকি লম্পটদের বিরাট কিচাইন । ওরা সবাই অফিস ছুটির পর পেছনের গলির ঝোপড়িতে বসে ভাঙ, কানট্রি লিকার, তাড়ি, চরস, স্ম্যাক নিতো । মাহমুদ জোহেরের ছিল জানলায় পর্দাটানা ম্যাটাডর ভ্যান, পেছনের দুদিকের সিট টানলে বিছানা হয়ে যেতো, আর ছুটিছাটায় ওদের পিকনিক হতো, লটারি করে যে জিততো সে ভাড়াকরা মাগিকে ওই বিছানার ওপর শুইয়ে এপিঠ-ওপিঠ যা ইচ্ছে তাই করত ।

যতই যাই হোক, হি ইজ ইওর বায়োলজিকাল ড্যাড । বললো ডাক্তার, যে কথায় ওর নিজেরই সন্দেহ আছে ।

 

দুই

এই ঘটনাগুলো যে ঘটছে, তা ওই তোর বাপের বন্ধু মলয় রায়চৌধুরী ঘটাচ্ছে, ঘটিয়ে চলেছে লোকটা, লিখেও রেখেছে । তুই যদি মলয় রায়চৌধুরীর লেখা ঘটনাগুলো একের পর এক পড়িস তাহলে অতনু চক্রবর্তী আর ওর বন্ধুদের কেলোর কিত্তি জানতে পারবি । এর আগে মলয় রায়চৌধুরী চারটে পার্ট লিখে ফেলেছে, ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস, জলাঞ্জলি, নামগন্ধ আর ঔরস । কলকাতায় গেলে খতিয়ানগুলো পাওয়া যাবে, ডাক্তার এক নাগাড়ে বলে থামলো, তারপর বললো, আমার কাছে মলয় রায়চৌধুরীর ওই সব ঘটনার হাতে লেখা পাণ্ডুলিপি আছে, এখন তো লোকটা বুড়ো হয়ে গেছে, আঙুলে আরথ্রাইটিসের কারণে কমপিউটারে এক আঙুলে টাইপ করে লেখে, এই যে এখনকার ঘটনাগুলো, আঙুলে টাইপ করতে-করতেই লেখে, লিখতে বসে ভাবে যে এক্ষুনি যদি মরে যায় হার্টফেল করে, কিংবা হার্নিয়া বার্স্ট করে কিংবা হাঁপানির টানে, তাহলে এই শেষ পার্টটা কমপিউটারেই থেকে যাবে, আমরা সবাই মলয় রায়চৌধুরীর কমপিউটারে থেকে যাবো, কেউ আর জানতে পারবে না, তোর, আমার, তোর মা-বাপের, ইতুর,  কনকদুর্গার শেষ পর্যন্ত কী হলো । আমরা সবাই সমুদ্রের ডুবজলে লাশ হয়ে মাংসখোর মাছেদের খোরাক হয়ে যাবো ।

চলো না দুজনে মিলে পাটনায় পালাই, বলল অমিত, ওখানে ভিড়ের ভেতরে ঢুকে গেলে কেউ তোমাকে খুঁজে পাবে না, আর আমাকে তো কেউই তেমন চেনে না । আমি কিন্তু পাটনার গরিববস্তিগুলো চিনি । যাবার সময় কলকাত্তা হয়ে যাবো ; কলকাত্তা ঘুরে দেখার খুব শখ আমার, এখানে একদিন আধামিলিট্রির হাতে মরার চেয়ে কলকাত্তায় গিয়ে গাড়িতে চাপা পড়ে মরা ভালো । তোমার পিস্তলটা গেঁড়িয়ে কমরেড দীপক আর কমরেড জ্যোতিকে খাল্লাস করে  চুপচাপ কেটে পড়ব, একদিন রাত্তিরে । আমি আর কণকদুর্গা এসে দেখে গেছি, নাক ডেকে ঘুমোও ।

গেঁড়াতে হবে না ; যেদিন কাজটা করবি, চেয়ে নিস ।

মনে থাকে যেন, সেদিন আবার টাঁয় টাঁয় ফিস কোরো না ।

কলকাতার পুলিশ মলয় রায়চৌধুরীকে ওদের ভ্যানে বসিয়ে কলকাতার অন্ধকার জগত দেখাতে নিয়ে যেতো রে । ওরা পুরোনো কলকাতার পরিবার, সেকালের ঘাঁত-ঘোঁত জানে । আর জন্মেছিল পাটনায়,  তোকে ঠিক খুঁজে বের করবে, আর কী-কী করলি তা লিখে রাখবে ।

 

তিন

অতনু চক্রবর্তী তোর বায়োলজিকাল ড্যাড, বুঝলি ?

তার কোনো প্রমাণ নেই, ওটা বানানো গল্প, আমি যা জানি, আমি তোমার ছেলে, আমাকে দেখতে তোমার মতন । কী করে যে ওই লোকটা ক্রান্তিকারি কমরেড দীপক হয়ে গেল তা-ই ভাবি ।

মানসী বর্মণের প্রেমে পড়ে । ওরা একে আরেকজনকে ভালোবাসে । তোর মা তো ভালো চাকরি করতো, আমিই ওকে ক্রান্তি দিয়ে সমাজবদলের স্বপ্ন দেখিয়ে এই রাস্তায় এনেছিলুম, এখন বুঝতে পারছি কতো ভুল করেছিলুম সেসময়। সমাজটা বদলায় না, মানুষগুলো বদলে যায় ।

প্রেম না ঘেঁচু. যত্তো সব ঢাকোসলা । কেমন করে যে একজন লোক আরেকজন লোকের বউকে ফাঁসায়, বুঝতেই পারিনা শালা। যখন এখানে প্রথমবার এসেছিলুম, তখন মনে হয়েছিল অতনু চক্রবর্তী লোকটা আমাকে মায়ের চেয়ে বেশি পছন্দ করে, এত দিনে বুঝে ফেলেছি যে ও ভালো নৌটাঙ্কি করতে পারে, ড্রামাবাজ শালা চাপলুস চুকন্দর ।

বাবার সম্পর্কে এরকম কথা বলিসনি । এইসব গল্প কক্ষনো কাউকে বলিসনি । তোর বাবাকে ক্রান্তিকারিরা শ্রদ্ধা করে ।

তুমিই আমার বাবা । ইতুই তো আমাকে বলল যে তুই তোর বাবা-মার কাছে চলে যা, বাবা-মাকে যদি বাবা-মা না মনে করিস, তাহলে মনে করিসনি, কিন্তু ওনাদের সঙ্গেই থাকগে যা । আমি চলে এলুম কারণ তুমি, আমার বাবা, এখানে রয়েছ, আমার মাও এখানে রয়েছে । জানি না ওদের বাবা-মা বলে মনে করি কি না, এখনও তো আপনি থেকে তুমিতে যেতে পারছি না । তোমাকে তো প্রথম থেকেই তুমি বলছি, তুমি আমার সঙ্গে তুই-তোকারি করছ, অথচ ওরা আমার সঙ্গে তুই-তোকারি করে না, তুমি-তুমি করে, নিজেদের ছেলে বলে মনে করে না, আমার এখানে আসাটাও ওরা ভালো চোখে নেয়নি, বুঝতে পারি, অথচ ওদের ফোসলানোতেই এলুম, ইতুটাও চলে গেল অবুঝমাড়ের জঙ্গলে ।

আমি তোর লিগাল বাবা, তোর বায়লজিকাল বাবা হল অতনু চক্রবর্তী মানে কমরেড দীপক । তোর নাম অমিত বর্মণ কেন? কারণ তোর মায়ের পদবি বর্মণ । তোর মাও আমায় বিয়ে করে বর্মণ পদবি ছাড়েনি, ওটা ওর বাপের পদবি, আমার পদবি ও কোনো কালেই নিজের নামের সঙ্গে জোড়েনি ।

ভালোই করেছে, আমি অন্তত ওর পদবীটা পেয়েছি, আর তো কিছু পাইনি । তোমার পদবি যদি পেতুম তাহলে অমিত ঘোষ হয়ে যেতুম আর লোকে ভাবত যে অমিত ঘোষ আর ইতু ঘোষ সত্যি-সত্যি ভাই-বোন । এমনিতেই ওদের বাড়িতে আর পাড়ায় ভাই-বোন ভাই-বোন বলে-বলে ঘিনিয়ে দিয়েছিল আমাদের, যত্তো শালা আনপড় ঘড়িয়াল-কুত্তা । আমি সেই জন্যেই আরও পালিয়ে এসেছিলুম ওই বাড়ি থেকে । ইতুও তাই অবুঝমাড়ের অজানা জঙ্গলে যেতে রাজি হয়ে গেল। মায়ের সঙ্গে তোমার সম্পর্কটা কী ?

ডিভোর্স তো করিনি আমরা, সেপারেটও হইনি। ওদের মা-বাবা বলার অভ্যাসটা এবার ছাড় । অতনু চক্রবর্তী হল কমরেড দীপক, আর মানসী বর্মণ হল কমরেড জ্যোতি । তোর উচিত সবায়ের মতন ওই ভাবেই ওদের নাম উচ্চারণ করা । যা সত্য আর বাস্তব তাকে ওদের অবিশ্বাস সত্ত্বেও ওরা তো আফটার অল ক্রান্তিকারি, হ্যাঁ কিনা বল ?  আর আমাকে বাবা বলবিনা, কমরেডও বলবি না, ডকটর বা ডাগডার সাহাব বলবি, সবাই যেমন বলে ।

ধুসসসসস, ছাড়ো, বাবা বলে ডাকিই না লোকটাকে, তোমাকেও তো ডাকি না বাবা বলে, মনে-মনে বলি । যাকগে যাক । হওনি কেন ? তুমি হওনি না ও হয়নি ? আজব বর-বউ তোমরা । পাশাপাশি রয়েছ, কথাবার্তাও বলছ নিজেদের মধ্যে, ওই অতনু চক্রবর্তী লোকটাও রয়েছে এখানে । তোমাদের কাউকেই আমি বুঝতে পারছি না, আজ চার বছরের বেশি হয়ে গেল, তোমরা অ্যালজেব্রা না ট্রিগনোমেট্রি, ফেল মারার সাবজেক্ট ?
ও তুই বুঝবি না, এখন বুঝবি না, পরে, আরেকটু বয়স হলে, কপালে বলিরেখা পড়া আরম্ভ হলে, লিঙ্গ অভিজ্ঞ হয়ে উঠলে,  বুঝতে পারবি, হয়তো বুঝতে পারবি । তোর আর ইতুর মাঝে হঠাৎ কেউ এসে যদি শুয়ে পড়ে তখন টের পাবি কোথা থেকে কী ঘটে যায় মানুষের জীবনে ।

হুঁঃ । যোনি কি বললে না তো ? আমরা আর পাশাপাশি শোবো না, সুযোগ হবে বলে মনে হয় না, ওই জঙ্গলে পুলিশ এত বেশি হানা দেয় যে ইতু কত দিন ওখানে বেঁচে থাকবে কে জানে, বেঁচে আছে কিনা তাও জানি না । যোনি কী তা-ই বলো ।

ওকে রাইফেলধারী দেহরক্ষী দেবার কথা, বেঁচে আছে বলেই মনে হয় । শোন, যেখান দিয়ে তুই সেক্স করেছিস আর যেখান দিয়ে তুই জন্মেছিস, তাকে বলে যোনি ।

যোনি বলে ? ওকে তো কোক বলে, গালাগাল দেবার সময়ে বুড় বলে, জানতুম । কতো ডায়ালগ শুনেছি, মেরে কোক সে যো পয়দা হুয়া, মা কি কোক কি কসম, হিন্দি ফিলিমে, হিন্দি টিভিতে । স্কুলে গালাগালি দেবার সময়ে যোনি বলতো না কেউ, বলতো বুড়, রেণ্ডিদের বলতো বুড় মারাউনি । তো হঠাৎ এই সন্ধেবেলা যোনির লেকচার মারছো কেন ? পুরোনো দিনের কথা চোখে ভাসছে বুঝি ? চোখের সামনে যোয়ান বয়সের গোলাপি যোনি, ফরফরাতি বুড় কি চকাচৌঁধ আঁধি ভেসে উঠছে ?

বাপের বয়সী লোকের সঙ্গে ফাজলামি করছিস ? প্রশয়ের চিলতে হাসি ঠোঁটে খেলিয়ে বললো ডাক্তার।

ওসব ছাড়ো, যোনির কথা বলো, জানি ভাসছে তোমার চোখের সামনে, কেন যোনির কথাটা হঠাৎ পাড়লে সেটাই বলো, কার যোনি, বুড়কে ভমচৌলা ঢাকোসলা  ?

একটা বাচ্চা যার যোনি থেকে জন্মায়, সেই মায়ের বুকের দুধ খাওয়া শিশুটার মানুষের মতন মানুষ হয়ে ওঠার জন্য খুবই জরুরি, তাই প্রসঙ্গটা তুলেছি । তুই যে একটুতেই ভয় পাস, ডেড বডি দেখলে কেঁদে ফেলিস, কোনো ক্রান্তিকারি সামান্য জখম হলে তার দিকে তাকাতে পারিস না, চোখ ছলছল করে, একবার রক্তক্ষয় দেখে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলিস, অনবরত নখ খাস, পা নাচাতে থাকিস, তা সেই কারণেই । তুই তোর মায়ের বুকের দুধ খাবার সুযোগ পাসনি, বোতলের দুধ খে্য়ে, কিংবা দুধ না খেয়েই বড়ো হয়েছিস  ।

অমিত বলল, তোমাকে একটা মনের কথা বলব ? যবে থেকে মানসী বর্মণকে দেখেছি, ওনার ফর্সা মাইতে চুসকি দেবার ইচ্ছে ধরে রাখতে পারিনি, স্বপ্নেও দেখেছি, ওনার গোলাপি মাইতে চুসকি দিচ্ছি, আর প্যাণ্ট ভিজে গেল । তোমার তো বউ ছিল এককালে, নিশ্চই অনেক চুসকি দিয়েছিলে ? কনকদুর্গা আমার চুসকি খুব পছন্দ করে, চুসকি দিতে-দিতে দম বন্ধ হয়ে যায় ।

তক্ষুনি কোনো উত্তর দিলো না ডাক্তার । একটু পরে বলল, ক্রান্তি হলো তার সামনে একজন উলঙ্গ সুন্দরী, তোর ইচ্ছে করবে গিয়ে জড়িয়ে ধরি, চুমু খাই, কিন্তু আমরা ক্রান্তি করছি না, নিজেদের মতন করে রাষ্ট্রের বিরোধিতা করছি, যদিও ক্রান্তিকারিরা জানে না যে রাষ্ট্রটা কোথায়, এই জঙ্গলে নিশ্চই নয় ।

অমিত বলল, যাদের বাড়িতে কোলের শিশুকে মানসী-অতনু ফেলে দিয়ে এসেছিল, তাদের বাড়িরও কারোর বুকের দুধ খাবার সুযোগ পাইনি, রাঙাবাবা আর রাঙামা আমাকে নিজেদের ছেলে হিসেবে নিয়েছিল বলে শুনেছি, রাঙামার তো বাচ্চাই হয়নি, কতবার কাঁড়ি-কঁড়ি টাকা খরচ করে আইভি এফ করিয়েও হয়নি, বুকে দুধ আসবে কোথ্থেকে ? দুধ খাওয়াবার মাসিও রাখেনি যে তার বুকের দুধ খাবো । তাদের বাড়িতে তো চাকরের মতন ছিলুম ; সেকারণেই তো গর্দানিবাগের ঘোষবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে এসেছিলুম, তারপর কতো চাপ খেয়ে এখানে এসে জুটেছি । শালা, ইঁদুরকল যেন । ইতু বলত, ফাকিং একান্নবর্তী পরিবার ।

না, যার যোনি থেকে জন্মেছিস, তারই বুকের দুধ জরুরি, চরিত্র গড়ার জন্য জরুরি । আমি কথাটা ডাক্তার হিসেবে বলছি । মায়ের দুধে করটিজল থাকে, তার কাজ প্রায় ফেরোমোনের মতন । ফেরোমোনের মাধ্যমে একজন মানুষ আরেকজনকে সংকেত পাঠায় । ঠিক সেভাবেই করটিজলের মাধ্যমে মা শিশুকে আর শিশু মাকে সংকেত পাঠায় । করটিজল হল স্ট্রেস হরমোন । শরীরের ভেতর দিয়ে যখন করটিজল যাতায়াত করে তখন তা মানুষের মগজে ভয়, আতঙ্ক, ক্ষোভ, অপমানবোধ, গ্লানি, পরাজয়বোধ, ক্রোধ  এই ধরণের প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হবার জন্য তাকে আগেভাগে তৈরি করে দেয় ; মগজের গ্লুকোজ কনজাম্পশান কমিয়ে পাচনশক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে । মাসি-পিসির দুধ খেলে হবে না, কৌটোর দুধ খেলে হবে না, শৈশবে নিজের মায়ের দুধ খেতে হবে । প্রাণীর শরীরের সবরকমের লিকুইডের মাধ্যমে বার্তা গড়ে ওঠে ।

কী যে মাথামুণ্ডু বোঝাতে চাইছ কিছুই বুঝতে পারছি না, খোলোসা করে বলো, খাড়ুসকে খাড়ুসই রয়ে গেছো ।

সেক্স করার সময়ে কী করলি ? তুই তোর আর ইতু কিংবা তুই আর কনকদুর্গা যে যার নিজের লিকুইড ব্যবহার করলি , পরস্পরকে খবর পাঠালি যে একজন আরেকজনের দেহকে ভালোবাসছিস ।

শুধু দেহকে ভালোবাসিনি আমরা, নিজেদের পুরোটা দিয়ে ভালোবেসেছি । ইতু বলত, কারনিভোরের মতন রক্তমাংস দিয়ে ভালোবাসা ।

পুরুষ-মানুষের শরীরের ষাট ভাগ লিকুইড, বুঝলি । মেয়েদের অবশ্য একটু কম, পঞ্চান্ন ভাগ । আমাদের মগজ আর হৃদয়ে আছে তার সত্তরভাগ ; হাড়কে মনে হয় শুকনো খটখটে, তাতেও লিকুইড আছে একত্রিশ ভাগ । বাচ্চারা যখন জন্মায়, তাদের শরীরে আটাত্তরভাগ লিকুইড থাকে, মাকে খবর পাঠাবার জন্য, নাল ফ্যালে, দুধ তোলে, মাকে বার্তা পাঠায় ।

শুনছি তোমার গ্যাঁজাবিদ্যে,  হুলোকুমির লবডঙ্কায়, জানি আমাকে তুমি লাল্লোচাপ্পো মনে করো, লবড়ধোধো । আমার তো মা ছিল না, দুধ খাইনি, অতএব তুলিনি, নাল ফেলতুম কিনা জানি না ।

তাহলে তোকে বলি, মানুষ নানারকম মিথ্যেকে আশ্রয় করে বেঁচে থাকে, একটু আগেই তো বললুম,তার মধ্যে প্রধান হল প্রেম । এই মিথ্যেটা বেঁচে থাকার প্রাণশক্তি । সব রকমের প্রেমই কোনো না কোনো মিথ্যাকে আঁকড়ে নিজের সততা প্রমাণের চেষ্টা করে , দেশপ্রেম, সংসারপ্রেম, মানবপ্রেম, সমাজপ্রেম, ধর্মপ্রেম, ঈশ্বরপ্রেম এটসেটরা । দেখছিস না এখানে যেমন ক্রান্তিকারিরা, তেমনি বর্ডারে জওয়ানরা মারা যাচ্ছে, আর আরামে ঠাণ্ডাঘরে মজা নিয়ে চলেছে নেতারা । মুসলমানদের দেশে এখন জোর লড়াই চলছে স্বর্গে যাবার, শয়ে-শয়ে মানুষ বোমাবুমি করে মারা যাচ্ছে বা আত্নহত্যা করছে রোজ রোজ । বুঝিয়েও কিছু হবে না ; মিথ্যাই সত্য হয়ে দেখা দিয়েছে ।

মারো গোলি ; যে যার লুঙ্গি তুলে পুঙ্গি বাজাক, আমার তাতে কি !

চুমু খাবার সময়ে লিকুইড আদান-প্রদান করেছিলিস, খবর পৌঁছে দেবার জন্য , মুখে থুতু না থাকলে কথা বলতে পারবি না , আমি তোমায় ভালোবাসি বলতে হলেও মুখের ভেতরটা ভিজে থাকা দরকার , জড়িয়ে ধরার সময়ে  ঘাম দিয়ে ফেরোমোনের দেয়া-নেয়া করেছিলিস । লোকে কাঁদে, তাতে চোখের জল কেন বেরোয়? জানাবার জন্য যে মনের অবস্হা তখন কেমন ।

ডাক্তার ঘোষ  পেশার মর্যাদা আর স্ত্রীর ছেলের প্রতি পিতৃত্বসুলভ আদরের মাঝে মনে-মনে দোল খেতে লাগলো । অমিতের ওপর  দখল প্রসারিত করার খেলায় ছেলেটাকে জ্ঞানের জাল দিয়ে আটকে নেবার প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে সে এসে অব্দি ।

তুমি এখানে পড়ে আছ কেন ? এই জঙ্গলে ? জ্ঞান তো মাঠে মারা গেল । বিপ্লবের ব-নিয়েও তোমার একরত্তি আগ্রহ নেই, তা এতদিনে বুঝে গেছি, ঝাঁটের বাল তোমার কাছে এই ক্রান্তিকারি খুনোখুনি । ক্রান্তি-ফান্তিতে তুমি বিশ্বাসই করো না, তবু এখানে পড়ে আছো ! শহরে থাকলে মারোয়াড়ি হাসপাতালে ডাক্তারি করে পেল্লাই বাড়ি করে ফেলতে পারতে, গাড়ি হাঁকাতে, এখানে ফালতু জীবন নষ্ট করে ফেললে ।

ক্রান্তি ? নিজেকে চুপিচুপি প্রশ্ন করলো ডাক্তার, ক্রান্তির হাতছানি তো আমিই দেখিয়েছিলুম মানসীকে, সেই হাতছানির ডাকে যে আরেকজন এসে ক্রান্তির স্বপ্নটাকে হাতিয়ে নেবে, মানসীকে হাতিয়ে নেবে, তা তো তখন ভাবিনি । এখন আর সমাজবদলে বিশ্বাস করি না, জানি সমাজ কোনো দিনই বদলাবে না, বইতে সমাজ বদলের যতো গপ্পো আজ পর্যন্ত লেখা হয়েছে, সব গাণ্ডুগর্দি । সোভিয়েত রাশিয়ার মতন শেষ পর্যন্ত মাফিয়ারা হাতিয়ে নেয়, চীনের মতন পুঁজিপতিরা হাতিয়ে নেয় ।

তুই যা জানতে চাইছিস তার উত্তর তুই জানিস । আমি এও জানি যে তুই সেই একই মহিলার জন্য এখান থেকে যেতে পারছিস না, যে মহিলার জন্যে আমি নিজের তৈরি করা ফাঁদে আটক পড়ে গেছি ।

কে ? কমরেড জ্যোতি ? কমরেড দীপকের জ্যোতি ? ওই মহিলা তো তোমাকে ভালোবাসে না । আমাকেও পছন্দ করে কিনা তাও নিশ্চিত নই । তবে বদলা একদিন নেবোই নেবো, ইসপার ইয়া উসপার।

না বাসলেই বা, আমি তো…যাকগে, তুই জেনে কীই বা করবি ।

হুঁঃ, ছুঁতে পর্যন্ত পাও না, শেষ বোধহয় পঁচিশ বছর আগে ছুঁয়েচো ।

তেইশ বছর তিন মাস আট দিন । তারপর কমরেড দীপক একবস্তা টাকা নিয়ে এসে শুয়ে পড়ল আমাদের মাঝে । আর তুই পয়দা হয়ে সব লণ্ডভণ্ড করে দিলি ।

হুঁঃ, এই জঙ্গলে ক্যালেন্ডার-ট্যালেণ্ডার না থাকা সত্ত্বেও এত হিসেব রেখে চলেছ । দেবদাস সেজে থাকো, চুল আঁচড়াও না, রেগুলারলি দাড়ি কামাও না, লুঙ্গিটা বোধহয় একসপ্তাহ হয়ে গেল ছাড়োনি, বুশশার্টে সবকটা বোতাম নেই । নিজেই নিজেকে লণ্ডভণ্ড করে রেখেছ, এসে থেকে দেখছি । শুধু দিনের বেলা খাও, রাতে কখনও খেতে দেখিনি তোমাকে ।

ভালোবাসার জন্য ছুঁতে হয় নাকি !

আমি তো ভালোবাসি না । আমি ওই মহিলাকে আর ওনার সঙ্গীকে ঘেন্না করি বলে এখানে আছি । একটা দুহাজার টাকার প্যাকেট তো আমিও এনে দিয়েছিলুম কমরেড জ্যোতিকে, সুশান্তজেঠু দিয়েছিলেন, কীই বা করব অত টাকা, তাই দিয়ে দিলুম, একটা অবশ্য নিজের কাছে লুকিয়ে রেখেছি, বলা তো যায় না, যেদিন পালাবো সেদিন কাজে দেবে । কমরেড জ্যোতি কি বলেছিলো  জানো ? বলেছিলো যে যাক, কয়েকটা হ্যাণ্ড উইপন কেনা যাবে । ওইসব ফালতু জিনিস কেনার প্ল্যানের কথা আমি যদি আগে জানতুম, তাহলে এক পয়সাও দিতুম না । ওই বিধাবৌড়িয়া গ্রামে একটা টিউকল বসালে বরং ভালো হতো, জল আনার জন্য কত দূর যেতে হয় বউগুলোকে, মেয়েগুলোকে ; ঘামে ভিজে জবজবে হয়ে যায় ওদের শাড়ি, কুড়ি হাত দূর থেকেও সেই মেয়েলি ঘামের গন্ধ পাওয়া যায়, জানো তুমি ?

একটা গ্রামে বসালে অন্য গ্রামগুলোর মানুষ মনে করবে তাদের অবহেলা করা হচ্ছে ; সরকার অমন অবহেলা করলে গ্রামবাসীরা তেমনকিছু মনে করে না, কিন্তু ক্রান্তিকারিরা যদি করে তো সন্দেহ করবে ।    ছেলে-মায়ের সম্পর্কটা ভালোবাসাবাসির নয়, ওটা জৈবিক, দুজনে একে আরেকজনের প্রতি চৌম্বকক্ষেত্র গড়ে তোলে ; সে-সম্পর্ক কিন্তু মিথ্যা নয় । কথা বলতে বলতে ডাক্তার নিজের মনে বলতে থাকলো, এ নিউজপেপার ইজ নট ওনলি এ কালেকটিভ প্রোপাগাণ্ডিস্ট অ্যাণ্ড এ কালেকটিভ এজিটেটর, ইট ইজ অলসো এ সোশ্যাল অরগ্যাজম ।

অমিতের জানা আছে, কথা বলতে বলতে মগজের আরেকটা ঘরে সেঁদিয়ে যায় ডাক্তার, মগজ যেন হাজারখানেক পাকানো কেঁচো দিয়ে তৈরি । সে দিকে খেয়াল না দিয়ে বলল, হবেও বা, আমার কোনো চুম্বকটান আছে কি না জানি না । যাকগে যাক,  এমন কোথাও টিউকল বা কুয়ো বসালেই তো হল যেখানে কয়েকটা গ্রামের বউরা জল তুলতে আসতে পারবে । আমি নিজের চোখে দেখেছি ঘামে মুখ একেবারে থমথমে হয়ে থাকে মেয়েগুলোর ।

দ্যাখ, এটুকু কথা বলতে গিয়েও তুই কাঁদো-কাঁদো হয়ে যাচ্ছিস । দেখেছিস কখনও যে তোর মায়ের ঘামের ফোঁটা কেমন জোনাকির মতন জ্বলজ্বল করে, অন্ধকারে উড়তে থাকে, তাঁবুর ভেতর আলো হয়ে থাকে ?

হ্যাঁ, দেখেছি, এখন আমি ওর তেরপলে শুই, অতনু চক্রবর্তীর তেরলে শুই না । বলেছিলুম যে আমাকে ক্রান্তিকারিদের কোনো একটা তাঁবুতে শুতে দেয়া হোক, দুজনে রাজি হল না কেন কে জানে, কনকদুর্গাও ওদের বলেছিল যে অমিতের বয়স তো কম, মেয়েদের তেরপলে শুতে পারে । ওরা রাজি হয়নি, বোধহয় কনকদুর্গার হামলেপড়ার ব্যাপার ওরা জানে, দলে এতো ছিপকিলি পুষে রেখেছে ।

বলার পর, অমিতের মনে হল, মায়ের সঙ্গেই বা কেন শোবে না ! মায়ের পাশে শোবার জন্মগত অধিকার থেকে কেন বঞ্চিত হবো, মায়ের বুকের দুধ খাবার অধিকার থেকে কেন বঞ্চিত হবো, একদিন না একদিন মায়ের বুকের দুধ আমি নির্ঘাৎ খাবো, দুধ থাকুক বা না থাকুক । গোঁফের রেখা দেখা দেয়া শুরু হয়েছে তো কি হয়েছে, আমিই তো মায়ের একমাত্র সন্তান । নিজের ফোল্ডিং খাটকে মায়ের খাটের পাশে নিয়ে গিয়ে শোবো। কোনটা বাবা তা গোলমেলে হলেও মা তো মানসী বর্মণ, এতো সুন্দরী মা, আমার পুরো ছোটোবেলা নষ্ট করে অতনু চক্রবর্তীর পেছন-পেছন ঘুরে বেড়াচ্ছে।

ওরা একাধজন মেয়ে ক্রান্তিকারিকে সন্দেহ করে । বিশেষ করে কনকদুর্গাকে ।

সন্দেহ করার তো দরকার ছিল না ; ওরা জানে আমি ইতুকে ভালোবাসি । যদিও জানে না যে কনকদুর্গাকেও ভালোবাসি। দুজনকে কি একসঙ্গে ভালোবাসা যায় না ? আমাকে বললে আমি দুজনকেই বিয়ে করে কিংবা না করেও, ঘর করতে পারি । কমরেড মানসী বর্মণ তো তোমাকে আর অতনু চক্রবর্তীকে একই সঙ্গে ভালোবাসে ।

কনকদুর্গা, মানে কমরেড কুনকি একজন ইমপরট্যাণ্ট ক্রান্তিকারি, বুঝলি ।  ভীষণ ডেনজারাস মেয়ে, মনে রাখিস, ওকে দল ছাড়বে না, তোকেও জোর করে ওর কাছ থেকে ছাড়াতে পারবে না । তবে কী জানিস ? ডেনজারাস মেয়েরাই ভালোবাসার জন্যে জি-জান লড়িয়ে দ্যায় ।

জানি, ঝাড়খণ্ড থেকে পালিয়ে কলকাতায় ফিরে সারেণ্ডার করবে ভেবেছিল, তাইতে নাকি দুজন ক্যাডারকে দিয়ে ওকে বডি-প্যাঁদানি দেয়া হয়েছিল, সেই দুজনকে আধামিলিট্রি মেরেছিল না কনকদুর্গা, তা জানা যায়নি । আমি তবুও ওকে ভালোবাসি, ও আমার কান্নার ওষুধ । বললে না তো, দুজনকে একসঙ্গে নিয়ে ঘর করা যায় কিনা ।

জানি না যায় কিনা , ওটাই আমার জীবনে প্রধান প্রশ্ন হয়ে আছে আজও । অন্য কাউকে ভালোবাসলেও, যদি কোনো তরুণী তোকে রাতের বেলায় আঁকড়ে ধরে, বুঝলি, তুই ছাড়াতে পারবি না নিজেকে, দেখবি তোর শরীরে আপনা থেকে সাড়া জেগে উঠছে, কনকদুর্গা ঠিক তাই করেছে তোর সঙ্গে, তার ওপর গাঁজা ফোঁকার নেশা ধরিয়ে দিয়েছে । ক্রান্তিকারিদের কি আর দেহ-মন নেই ? তোর পাশে যদি কোনো মেয়ে শোয়, তাহলে তার মাথায় সেসময়ে ক্রান্তির কথা থাকার কথা নয় , তোকে দেখতে-শুনতে যথেষ্ট ভালো, তোর বাবার হাইট, চোখ-মুখ-নাক আর তোর মায়ের গায়ের রঙ পেয়েছিস । মাঝরাতে তোর শ্বাস যদি কোনো যুবতীর মুখের ওপরে অনবরত পড়তে থাকে, ফেরোমোনের ঝাপটায় তার পক্ষে নিজেকে কনট্রোল করা কঠিন হতে পারে । ক্রান্তিকারিদের তাঁবুতে হয়, এমনকি ক্রান্তিকারিরা যখন অপারেশান করতে যায়, তখনও ক্লান্তি আর টেনশান কাটাবার জন্যে লিঙ্গ-যোনির স্মৃতিতে জড়িয়ে পড়ে, জানাজানি হলে তাদের আলাদা করার জন্য বিভিন্ন ফিল্ড-এরিয়ায় পাঠানো হয়, যেমন তোকে আর ইতুকে পাঠানো হয়েছে । তোর লিঙ্গের স্মৃতি তোর নিজের নয় রে, তা যুগ যুগ ধরে স্মৃতি ধরে রেখেছে, ডায়নোসরদের সময় থেকে । তুই না চাইলেও তোর লিঙ্গের স্মৃতি তোকে বিগড়োবার রাস্তায় নিয়ে যাবে, ইউ মে কল ইট ভালোবাসা কিংবা  সেক্স বা ভালোবাসা উইথ সেক্স। কনকদুর্গার সঙ্গেও সেক্স করেছিস, আই মিন কুনকি তোর সঙ্গে সেক্স করেছে, ওতো ভীষণ ডিমাণ্ডিং ? কপালে নাইন এমএম ঠেকিয়ে তোকে দিয়ে কাজ আদায় করে নেবে ।

হ্যাঁ, প্রথমবার মুখ দিয়ে, ও-ই শিখিয়েছে, এখানে প্রিকশান নেবার কোনও ওষুধ ছিল না , তাই আমরা সেক্স দিয়ে সেক্স করতে পারিনি, ও বলে ওটা ব্লোজব, মজা একই, বরং বেশি মজা । তুমি ওকে প্রিকশানের  ট্যাবলেট দাও না কেন ? ওর মান্হলি ব্লিডিঙের সময়ে আমরা রোজই সেক্স করেছি, ঘাসের ওপর, বুঝলে, জোনাকি উড়তে থাকে, ঝিঁঝি ডাকতে থাকে , জঙ্গলের গন্ধর সঙ্গে ওর বুনো গন্ধ মিশে যায়, যাকগে যাক, যে কথা হচ্ছিল, কমরেড দীপক তোমার চেয়ে বেঁটে আর তুমি কমরেড জ্যোতির চেয়ে ফর্সা, অমন যুক্তি অনুযায়ী তাহলে আমি তো তোমার ছেলে, কী, কেমন দিলুম, বেশি পাঙ্গা নিও না । কিন্তু কান্না এসেই যায়, আসলে আমি একজন ইডিয়ট বাফুন, কতবার কনট্রোল করার চেষ্টা করেছি, পারি না। ইতু বকুনি দিত, কনকদুর্গা ডরপোকি কমজোর মরদ বলে চড় মেরেছিল । কনকদুর্গাকে বলে দিয়েছি যে আমি জন্মাতে ভয় পেয়েছিলুম, জন্মেও ভয় পেয়েছিলুম, সবেতেই আমি ভয় পাই ।

অমিতের মনে পড়ল, প্রথমবার ও ছাদে বসে একা-একা কেঁদেছিল, পাড়ার গুণ্ডা রফিক মাসুম একটা ষণ্ডা মার্কা লোককে দশ হাজার টাকার সুপারি দিয়ে বলছিল কাউকে সাফায়া করে দিতে, ভয়ে গলা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল অমিতের, কথাটা ইতুর সঙ্গেও শেয়ার করতে পারেনি, যা সাহসী ইতু, গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ত রফিক মাসুমের ওপর, আর ওরা ওকে মুখ বেঁধে তুলে নিয়ে গিয়ে কী করত তা তো আর ইতু জানে না, মনে হয়েছিল অমিতের।

একদিন রাতের বেলায় আওয়াজ শুনে জানলা দিয়ে দেখেছিল অমিত , পাড়ার ফুটপাতের ওপর যে গাছগুলো ছিল তাতে ছেঁদা করে কিছু করছিল ষণ্ডাটা আর তার সাকরেদরা । অমন কেন করছে তখন বুঝতে পারেনি অমিত। সপ্তাহখানেক পরে দেখল সবকটা গাছ মরে গেছে, একেবারে শুকনো, তার কিছুদিন পরেই কর্পোরেশানের লোকদের সঙ্গে এনে গাছগুলোকে কেটে কয়েকটা লরিতে চাপিয়ে নিয়ে গিয়েছিল রফিক মাসুম । ইতুকে বলতে, ও বলেছিল, ইডিয়ট, তখনই বলতে হত, পাড়ায় যাদের গাড়ি আছে তারা রফিক মাসুমকে দিয়ে কাজটা করিয়েছে; গাছের ডালে বসে পায়রা আর অন্য পাখি গাড়িগুলোর ওপর হাগত , গাড়ি খারাপ হয়ে যাচ্ছিল, সুপারি দিয়ে গাছগুলো কাটিয়ে নিলে রফিক মাসুম, দুদিক থেকেই টাকা খেলো ব্যাটা । শুনে অব্দি কেঁদেছিল অমিত, লুকিয়ে লুকিয়ে ।

দ্বিতীয়বার কেঁদেছিল ব্যানার্জি দিদা মারা যেতে । ব্যানার্জি দিদা বলতেন ওনার ছেলেরা দিল্লি মুম্বাই আর লখনউতে থাকে । নাতিদের স্কুলের আর কলেজে ফলাফল ভালো হলে মিষ্টির বাক্স এনে বাড়ির সবাইকে খাওয়াতেন ; অমিতকে বলতেন, আমার নাতিদের মতন লেখাপড়া করে বড়ো হ, কতদিন এইভাবে চালাবি। কয়েকদিন ধরে পাড়ায় কুকুর মরে পড়ে থাকার মতন পচা গন্ধ আসতে জানা গেল যে ব্যানার্জি দিদার বাড়ি থেকে আসছে । সদর দরোজায় ধাক্কাধাক্কি করা সত্ত্বেও ব্যানার্জি দিদা যখন দরোজা খুললেন না, তখন পুলিশ এসে দরোজা ভেঙে কয়েকদিন আগে মরে পড়ে থাকা ব্যানার্জি দিদার লাশ পেয়েছিল, চেয়ারে বসে বসে পচে গেছেন । কতদিন যাবত টয়লেটে যেতে পারেননি, ঘরের  কার্পেটের ওপর হেগেমুতে রেখেছেন, শেষে নড়তে না পেরে রকিং চেয়ারে বসে বসে কখন যেন মরে গেছেন, কোলে হাত রেখে । সারা ঘর অগোছালো, নোংরা । পুলিশ পরে জানিয়েছিল যে ওনার স্বামী বাংলাদেশ স্বাধীন করার যুদ্ধে মারা গিয়েছিলেন । ওনার কেউই নেই । নাতিদের গল্প সব বানানো । শুনে অনেক কেঁদেছিল অমিত । অকারণে কান্না পায় ওর ।

অমিত বলল, কোনো মানে হয়, ভেবে দ্যাখো, বাংলাদেশ স্বাধীন করতে গিয়ে কী পেলেন ব্যানার্জিদাদু? নেড়েগুলো তো দিনকেদিন হেফাজতে ইসলামি না কী যেন হয়ে যাচ্ছে, হিন্দুদের আর থাকতে দেবে না ওদের দেশে, কতো লোক পালিয়ে আসছে, আর ফিরছে না, মন্দির-টন্দির দুর্গা কালীর মূর্তি ভেঙে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে । ওসব গল্প শুনি আর আমার কান্না পেয়ে যায় ।

ওটা তোর পারসোনালিটি ট্রেট হয়ে গেছে, আর তার কারণ হল তুই তোর মায়ের দুধ খাসনি, মায়ের আদর খাসনি, মায়ের গায়ের গন্ধ জানিস না ।

আমাকে ওরা ডাস্টবিনে ফেলে দিলেই পারত । যে বাড়িতে ফেলে দিয়ে এসেছিল, সেখানে আমি ডাস্টবিনেই থাকতুম, নয়তো আর কি ! আমার তিনটে বাবা, ডাক্তার বাবা, কমরেড বাবা, রাঙা বাবা আর দুজন মা, কমরেড মা আর রাঙা মা, কিন্তু আপন বলতে আমার কেউই নেই । বলে, অমিতও ডাক্তার ঘোষের আদলে ষেঁড়োহাসি হাসল, তারপর বলল, আমি যদি তিনজন বাপের আর দুজন মায়ের কমবাইন্ড লিকুইড দিয়ে জন্মাতুম তাহলে বোধহয় আই ইডি বানাতে পারতুম, মাইন পুঁততে পারতুম, ক্রান্তি করার জন্যে গুলি ছুঁড়তে পারতুম, বলে, অমিত চোখ মুছল দুহাতের চেটো দিয়ে ।

চোখে জল আনিসনি, ট্রাই টু কনট্রোল ইওরসেল্ফ । ডাস্টবিনে কেন ফেলবে ? বোকা নাকি ! তোকে নিজের প্রিয় বন্ধুর বাড়িতে রেখে এসেছিল, যাতে তারা নিজের পরিবারের সদস্যের মতন গড়ে তোলে তোকে, শিক্ষিত করে তোলে । ওদের বাড়িতে পর পর এত দুর্ঘটনা ঘটে গেল যে ওরা দিশেহারা হয়ে পড়ল । ডাক্তার নিজেকে শুনিয়ে বললে, ওরা অতনুর বন্ধু, আমার বন্ধু তো নয় ; মা বেঁচে থাকলে মানসীর বাচ্চাটাকে মায়ের কাছেই দিয়ে আসতুম, কত বাচ্চা তো ঠাকুমার কোলে মানুষ হয় ।

সবই জানো দেখছি, এই জঙ্গলে বসেও সব খবর রাখো । কিন্তু বন্ধু সুশান্তজেঠুই তো কিডন্যাপ হয়ে চলে গিয়েছিলেন, একজন বিহারি মেয়েকে বিয়ে করে সেখানেই থেকে গেছেন সুশান্তজেঠু । আমি আর ইতু বাড়ি থেকে পালিয়ে ওনার আস্তানাতেই প্রথমে ডেরা ডেলেছিলুম । টাকার বাণ্ডিল সুশান্তজেঠুর বিহারি বউ দিয়েছিল আমাদের ।

কানে আসে । আরও অনেককিছু জানি, যা তুই চলে আসার পর ঘটেছে, সুশান্ত জেঠু আত্মহত্যা করে নিয়েছে, আর ওনার ছেলে অপু খুনোখুনি করে ফেরার হয়ে গেছে ।

ওফ, আর বলতে হবে না ।

এখন যোনির প্রসঙ্গটা জরুরি  । তুই একটুতেই ভেঙে পড়িস ।

তা নয়, মানসী বর্মণের ছেলেটার জন্য অতনু চক্রবর্তীর চেয়ে তোমার টান বেশি ।

হতে পারে । এখন যা, তোর মা-বাপ দুশ্চিন্তা করবে, ভাববে আমি তোকে  রিঅ্যাকশানারি বক্তৃতা দিচ্ছি। আমার ডাক্তারিটা ওদের দরকার, আমাকে তো ওদের দরকার নেই । আমি বেয়ার ফুট ডাক্তার তৈরি করে চলেছি, যারা শিখে-পড়ে মেডিকাল স্কোয়াডের কাজ করছে । তোকেও করতে চেষ্টা করেছিলুম, কিন্তু তুই বন্দুক-পিস্তল চালিয়ে ক্রান্তিকারিগিরিতে অংশ নিতে চাস, অথচ ভিতুর ডিপো । শেখ শেখ । শিখে নে বন্দুক-টন্দুক চালানো । তোকে কিন্তু  যেতে দেবে না, দেখে নিস, তোকে প্রোটেক্ট করে রাখবে।

ক্রান্তিকারিগিরিতে যেতে তো আমাকে হবেই । নয়তো আমি এরকম কাওয়ার্ড ইডিয়ট থেকে যাবো । আমি ভেবে রেখেছি । তবে ওই মুফতি-পরা ক্রান্তিগিরিতে নয়, কাউকে অযথা খুন করতে পারব না । মারার জন্য কারণ থাকা দরকার । কনকদুর্গার কারণ আছে, ও পৃথিবীর সব পুরুষ মানুষের ওপর ও চটা, সবাইকে এক লাইনে দাঁড় করিয়ে খুন করতে পারে ; বলেছিল গুলি চালিয়ে দনাদ্দন ওড়াতে ওর বেশ মজা লাগে ।

জানি, তুই কী ভেবে রেখেছিস ।

জানো ? হুঁঃ !

জানি । তুই যা মনে মনে ভাবছিস আমি তা বহুকাল যাবত ভেবেছি ।

তার মানে তুমিও আমার মতনই কাওয়ার্ড বলো ?

না, আমি আহাম্মক ।

আহাম্মক মানে ?

বাংলা ভাষাটাও জানিস না ? আহাম্মক মানে এক্সট্রিমলি ফুলিশ, ল্যাকিং ইন কমন সেন্স ।

তা ঠিক । নয়তো এখানে জঙ্গলে  দেবদাস হয়ে পড়ে থাকতে না ।

দেবদাস ? শরৎচন্দ্র পড়েছিস দেখছি ।

না, পোড়বো কোথ্থেকে ! শাহরুখ খানের ফিল্ম দেখেছি । অইশরিয়া রায় আর মাধুরী দিকছিত ছিল । ইতু ওর ল্যাপটপে পেনড্রাইভে ফিল্ম আনতো মাঝেমাঝে ।

আমি দিলীপ কুমারেরটা দেখেছিলুম । সুচিত্রা সেন আর বৈজয়ন্তীমালা ছিল ।

যে-ই থাকুক, রেজাল্ট একই । এক্সট্রিমলি ফুলিশ , ওই যে তুমি বললে । ল্যাকিং ইন কমন সেন্স ।

অন্ধকার হয়ে যাবে । আলো তো জ্বলবে না কারোরই তেরপলে । তোর মায়ের আস্তানায় যাবি কি করে ?

কথা ঘোরাচ্ছো কেন ? আমি কয়েকজন ক্রান্তিকারির  সঙ্গে কথা বলে দেখেছি; ওরা বিশ্বাস করে যে তুমিই মানসী বর্মণের আসলি বর, কমরেড দীপকটা নকলি স্বামী । এতদিন রয়েছ পাশাপাশি । রেপ করার মতনও সাহস যোগাতে পারোনি, আর আমাকে বলছ কাওয়ার্ড । তুমি তো তোমার মায়ের দুধ খেয়েছিলে, নাকি?

কি আজেবাজে কথা বলছিস নিজের মায়ের সম্পর্কে । মানসী বর্মণ বাইরে ক্রান্তিকারি, ভেতরে ঠুনকো । আমি ওকে জড়িয়ে ধরলে ও ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে ।

একদিন মাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমোবো নিশ্চই, দেখে নিও । শ্বাস ফেলবো ওনার মুখের ওপর, শুঁকবো ওনার ঘামের গন্ধ, বুকের দুধের হারিয়ে যাওয়া গন্ধ, জবাবদিহি চাইব যে ক্রান্তি করাটা আমার চেয়ে কেন জরুরি, মায়ের দায়িত্ব আগে সন্তান না ক্রান্তি, কেন আমাকে দুধের বয়সেই ফেলে চলে এসেছিলো, তারপর কেন খোঁজ নেয়নি, প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে করে পাগল করে দেবো ।

ঘুমোস । ওই যে কমরেড কনকদুর্গা  তোকে ডাকতে এসেছে ; তোর খাবার সময় হয়ে গেল ।

কনকদুর্গা মেয়েটা বাঙালি নয়, কিন্তু মহা ধাকড়নি । ওর সঙ্গে কথা বলে বুঝতে পারি না, তেলেগুতে, হিন্দিতে, বাংলায়, ইংরিজিতে, সব ভাষায় কথা বলতে পারে । আমি কোনো ভাষাতেই ঠিকমতন কথা বলতে পারি না । ওকে এখানে কেন এনে ফেলল বলোতো ?  বোধহয় কমরেডদের চুল কাটার জন্য আনিয়েছে এখানে ।

অমিতের উক্তি শুনে বেশ কিছুক্ষণ যাবত অট্টহাসি হাসলে ডাক্তার ঘোষ, যা ওর চরিত্রে বিরল । অমিত বলল, হ্যাঁ, হাসো তোমার ষেঁড়ো হাসি, কতোদিন যে হাসোনি, স্টক খালি করো ।

অনেকের চুল ও-ই কাটে বটে, আমার চুল আমি নিজেই কাটি, জঙ্গলে আবার চুলের কোনো দরকার আছে নাকি । যা, খেয়ে নিবি যা ।

তোমাদের এইসব ফালতু ক্রান্তিকারি খাবার-দাবারের চেয়ে কিন্তু ইতুদের বাড়িতে ভালো খাবার পেতুম, চাকরের জীবনে ভালো পেটপুজো ।

তুই-ই তো বোকার মতন চলে এলি ।

চলে আসিনি; ওরা তাড়িয়ে দিলে ।

মোটেই তাড়ায়নি ওরা । তুই আর ইতু ছাদের অন্ধকারে জড়াজড়ি করে কিছু একটা করছিলি বলে শুনেছি, মারিহুয়ানাও ফুঁকছিলি । জানি তোরা ভাইবোন নোস ; কিন্তু ওনাদের বাড়িতে ছোটোবেলা থেকে যেভাবে দুজনে বড়ো হয়েছিস, ওনাদের চোখে ভাইবোন হয়েই ছিলিস । আত্মমগ্নতার বিরতি মিশিয়ে-মিশিয়ে কথাগুলো বললে ডাক্তার ঘোষ ।

এসব খবরও এসে গেছে তোমাদের কাছে ? তোমাদের ছিপকিলি জাসুস ওই বাড়িতেও আছে ?

আমাদের খোচর সর্বত্র আছে ; পুলিশে, প্রশাসনে, গ্রামে, হাটে, সব জায়গায় । যাকগে এখন যা, কনকদুর্গা  অপেক্ষা করছে । ওর আসল নামটা জিগ্যেস করে নিস ।

যাবো যাবো, তাড়া কিসের ? কমরেড জ্যোতিকে ভয় পাও !

পেলে তো ভালোই হতো রে । তা তুই  সেক্স-টেক্স করলে নিজেকে ক্লিন করিস তো ? ক্লিন করবি, আনহাইজেনিক থাকলে যার সঙ্গে সেক্স করবি তার ইনফেকশান হয়ে যাবে ; পেনিসে লিন্ট বা ম্যাগমা জমে, এক ধরণের মোম ।

কি উল্টাসিধা পাঠ পড়াচ্ছ, ফালতু ।

ইহুদিরা আর মুসলমানরা সুন্নত করে কেন ? যাতে ক্লিন থাকে, নোংরা না জমে ।

আমার ক্লিনই থাকে । প্রায়দিনই তো মিষ্টিবিষ্টি করি, কনকদুর্গাই বলেছে, পরিষ্কার রাখতে, নয়তো ওর মুখে ঘা হয়ে যাবে তো ! পুরোনো পোশাক সঙ্গে রাখে ও, তাই দিয়ে নিজেই পুঁছে দেয় ।

হোয়াট ইজ দ্যাট ? শুনিনি তো, মিষ্টিবিষ্টি !

ইতুদের কোড ওয়র্ড, ওর বন্ধুর সঙ্গে মোবাইলে কথা বলছিল, তখন শুনেছিলুম । ওরা ম্যাস্টারবেশনকে বলে মিষ্টিবিষ্টি ।

আই সি । হ্যাঁ, এই বয়সে ওটা করা জরুরি, বাৎসায়নও বাতলে গেছেন কী ভাবে মিষ্টিবিষ্টি করতে হবে । দ্যাখ, ওই কাজের মাধ্যমে তুই পৃথিবীকে জানাচ্ছিস যে তোর একজন নারীর দরকার, মাটিতে বার্তা ফেলছিস, মাটি তো প্রতিদান দেবে । যাকগে, কনকদুর্গা দাঁড়িয়ে রয়েছে তোর জন্য ।

ওকেও যোনি-ফোনি এইসব বুঝিও না যেন ।

আবার তুই বাপের বয়সী লোকের সঙ্গে ফাজলামি করছিস ।

পরে আসবো, আরও কি খবর জানো খোলোশা করে বোলো ।

ডাক্তার নিজেকে নিজের মনের ভেতর বললে, হয়তো এ আমারই ছেলে । এ যদি জেনে যায় যে এ নিশ্চিত আমার ছেলে, তাহলে এর সঙ্গে এমন খোলাখুলি কথা বলা যেতোনাকো ; এই বরং ভালো, কমরেড দীপকের চেয়ে কাছে টেনে আনতে পারছি ।

টাঙানো তেরপলের বাইরে, ক্রেয়নে বাচ্চাদের বসে আঁকো প্রতিযোগীতায় জেতা  গোধুলীর খাপচা কমলা-হলুদ রঙ নেমে আসছে ঘন সবুজ গাছগুলোর ওপরে ।

অমিতের হাত ধরে ওর কোমর বাঁহাতে জড়িয়ে, আলো-অন্ধকারের ভেতরে সেঁদিয়ে   কমরেড কনকদুর্গা বলল অমিতকে, চল ডাক্তারকেও কনফিউজ করি, উনি এখনও দেখতে পাচ্ছেন আমাদের, বলে অমিতের দিকে ফিরে ওর ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ধরল ।

আরে আমি এরকম আদ্দেক-প্রেম পারি না, অমিত জড়িয়ে ধরেই বলল, চুমু খাবার সময় আমার শরীর চিনচিনিয়ে সাড়া দিতে থাকে, মুখ দিয়ে আমার আশ মেটে না ।

তাহলে তুই মুখ খোল, জিভ ঢোকাই ।

কী করছিস কি ? উত্তেজিত করে দিচ্ছিস ।

চল, ওই বাঁশঝাড়ের পেছনে যাই ।

চল, ডাক্তার এগিয়ে এসে উঁকি মেরে দেখছেন, পরের বার নিশ্চয়ই অন্য লেকচার শোনাবেন, সারাদিন নিজের মনে ইংরেজিতে বিড়বিড় করতে থাকেন, পাগল হয়ে যাবেন বুড়ো বয়সে ।

বিড়বিড় নয়, মার্কস লেনিন মাও ওনার মুখস্হ ; ঠিকই, বুড়ো হয়ে গেলে কমিউনিস্টরা পাগল হয়ে যেতে থাকে, স্বপ্ন ধ্বসে পড়ার বিষে ক্ষয়ে যান ওনারা । উনি কমিউনিজমে বিশ্বাস করেন না, বোধহয় মানুষের সমাজকেই বিশ্বাস করেন না ।

অমিত বলল, আমিও করি না ।

ডাক্তার ঘোষ তাকিয়ে রইলো কনকদুর্গার চুল-চিকচিকে খোঁপার দিকে, নিজেকে শুনিয়ে ফিসফিসিয়ে বললে,  ‘প্রোট্র্যাক্টেড আর্মড স্ট্রাগল টু আনডারমাইন অ্যান্ড টু সিজ পাওয়ার ফ্রম দি স্টেট, স্বপ্ন দেখে যাও দেখে যাও দেখে যাও, যতদিন না ডিমেনশিয়া বা অ্যালঝিমার হয়’ ।

কনকদুর্গা বলল, তোকে একটা ভয়ের খবর দেবো ।

অমিত : আমি তো চিরকেলে ভিতু । কী খবর ?

কণকদুর্গা : আমি প্রেগনেন্ট হয়ে গেছি, তিন মাস হয়ে গেল । ওরা জানতে পারলে রাখবে না । বলবে সারেণ্ডার করতে ।

অমিত জড়িয়ে ধরল কণকদুর্গাকে, যাক, রোজকার ধস্তাধস্তির ফল ফলল তাহলে । এবার এখান থেকে পালাবার পথ তুই তৈরি করে দিলি কণকদুর্গা, দুজনে পালাবো । পালাবার আগে ওই দুটোকে ওড়াতে হবে ।

কণকদুর্গা : আমি ভেবেছিলুম শুনে তোর মুখ শুকিয়ে যাবে ।

অমিত : আরে নাহ, এখন নিজেকে আসলি ষাঁড়  মনে হচ্ছে ।

কণকদুর্গা অমিতের কোমর ধরে তুলে নিয়ে জঙ্গলের ভেতরে ঘাসের ওপর নিয়ে গিয়ে ফেলল, বলল, এবার থেকে সাবধানে, নয়তো বাচ্চা নষ্ট হয়ে যেতে পারে, পাশাপাশি শুতে হবে ।

মশারির ভেতরে শুয়ে, ডাক্তার ঘোষের মনে পড়ল, মানুষের মুখের দিকে তাকিয়ে তার শারীরিক অবস্হা বোঝার ক্ষমতা  মায়ের কাছ থেকে পেয়েছিলো, আর শিক্ষনবীশ বেয়ারফুট ডাক্তারদের সেই ক্ষমতাটি দেবার প্রয়াস করে, যাতে উপজাতি রোগিকে নানা প্রশ্নের মুখে পড়ে বিমূঢ়াবস্হায় না পড়তে হয় । মেয়ে শিক্ষানবীশরা তা দ্রুত শিখে ফেলতে পারে, কেননা তারা জানে যে রোগীরা কোথায় হাগতে যায়, জঙ্গলে না ঘাসের ওপর না নদীর বালিতে ।

মশারির ভেতরে ঢুকলেই মায়ের ঘুমপাড়ানি গানের সুর ভেসে আসে ডাক্তার ঘোষের কানে, একের পর এক, যার সাহায্যে জখম বা বুলেটফোঁড় ক্রান্তিকারিদের কান্না-কাতরানির অসহ্য স্মৃতিকে সামলায়, কিন্তু গানের কথাগুলো ইংরেজিতে, সেই একই, অ্যানিহিলেশান অফ ক্লাস এনিমিজ অ্যান্ড এক্সট্রিম ভায়োলেন্স অ্যাজ এ মিন্স টু সিকিয়র অরগানাইজেশানাল গোলস, মায়ের মুখ ভেসে ওঠে ।

ইংল্যাণ্ডে ডাক্তারি পড়তে গিয়েছিলো,  রেডিওলজি । যাবার আগে, মায়ের কথা মেনে, কচি বয়সেই উচ্চমাধ্যমিকের পর বিয়ে করে নিয়েছিলো উচ্চমাধ্যমিকেরই মানসী বর্মণকে, যাকে প্রথম দেখাতেই পছন্দ হয়ে গিয়েছিল  । মেয়েটি দৃষ্টিকটুভাবে সুশ্রী, আকর্ষণীয়ভাবে উন্নাসিক, ফুলোফুলো আঙুল, ঢাউস বর্তুল বুক, গভীর কালো চোখ, পাতলা কোমর আর হ্যাঁ, বেশ ফর্সা ।

ফুলশয্যার রাতে, ফোম লেদারের একটা ব্যাগের জিপ খুলে বিছানার ওপর অজস্র চিঠি, তার অধিকাংশ  খাম আর ইনল্যাণ্ড, খোলা হয়নি, ছড়িয়ে মানসী বর্মণ বলেছিলে, এই নাও, কোনোও যৌতুক চাই না বলেছিলে, এগুলো ক্লাস এইট থেকে আমাকে লেখা ঘাড়েপড়া প্রেমিকদের প্রেমপত্র ; আমি কাউকে পাত্তা দিইনি । আজ রাতে তুমি যাচাই করে দেখে নাও যে আমি ভার্জিন, নয়তো পরে তোমার মনে হবে এর তো প্রেমিকদের লাইন ছিল, নিশ্চয়ই কারোর সঙ্গে সম্পর্ক পাতিয়ে তার সঙ্গে শুয়ে থাকবে । শুইনি কারোর সঙ্গে । শুতে হলে ডিজায়ারেবল হওয়া অতি আবশ্যক, তোমাকে ডিজায়রেবল মনে না হলে বিয়ে করতুম না । তুমি শোওনি তো কোনো মেয়ের সঙ্গে, খোলাখুলি বলো, আমি সবকিছু স্পষ্ট বলি, কোনো হাইড অ্যাণ্ড সিক নেই ।

এই বয়সেই বিয়ে করতে রাজি হলাম ওই কারণেই, কৌমার্যটা তোমাকে সঁপে বিদেশে যাই । তাছাড়া তোমাদের বাড়ির লোকেরা খোঁজ নিয়ে জেনে গেছেন যে আমার বেশির ভাগ সময় কাটতো ছাত্র-রাজনীতি করে, দেয়ালে পোস্টার মেরে ; ভালো রেজাল্ট করতে পারিনি ক্রান্তিকারি রাজনীতির স্বপ্নে, নয়তো ভারতে কোনো মেডিকাল কলেজে সিট পেয়ে যেতাম । এখন কথা বন্ধ করে কাজে নেমে পড়া যাক, ফুলশয্যাকে বক্তৃতার মঞ্চ করে ফেলছ ।

 

চার

মলয় রায়চৌধুরীই অতনুকে শেষ পর্যন্ত ঠেলে দিয়েছিল চৌমাথার দিকে, যাতে ব্যাটা সেখানে পৌঁছে ভ্যাবাচাকা খেয়ে মরে, এবারে কোন দিকে যাবে, কোন রাস্তা বেছে নেবে, বন্ধু তো, দিয়েছে ঠেলে শুকনো কুয়োর ভেতরে । অসীম পোদ্দারের দেয়া পোর্টম্যান্টো ব্যাগের ভেতরে যে গাদা গাদা টাকা ঠাসা আছে, অফিস থেকে গেঁড়িয়ে জমিয়ে রেখেছিল আর সেই টাকায় রেণ্ডিবাজি করে বেড়াতো, পুলিসের রেইড পড়তেই মানসী বর্মণের হাতে ব্যাগটা ধরিয়ে দিয়ে নিজে নৌকো থেকে ঝাঁপ মেরে পটল তুলেছিল বাঞ্চোৎ । মানসী বর্মণ চাকরি ছেড়ে চলে যাবার আগে সেটা ধরিয়ে দিলে অতনু চক্রবর্তীকে ।সহকর্মী বন্ধুদের একের পর জেরার শেষে অতনুর বিরুদ্ধে পুলিশ কোনো প্রমাণ পেলো না, তখন, সেই দিনই, সন্দেহ হওয়াতে অতনু বাড়ি ফিরে ব্যাগটা খুলে দ্যাখে টাকায় ঠাশা, হাজার-হাজার টাকা । ব্যাস বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েছিল, কোথায় যাবে ভেবে পাচ্ছিল না । মলয় রায়চৌধুরী ওকে পাঠিয়ে দিল মানসী বর্মণের কাছে, ক্রান্তির মাংসল ঘুর্ণিতে ।

মলয় রায়চৌধুরী এবার অমিতের জীবনকে জড়িয়ে দিল কণকদুর্গার সঙ্গে, যে অমিতের চেয়ে পনেরো বছরের বড়ো । ওরা দুজনে পাটনায় পালাবে তা মলয় রায়চৌধুরী জানে, এখন দেখার যে কাদের খুন করে ওরা পালাবে ।

 

পাঁচ

ডাক্তার মশারির ভেতরে ঢুকে পড়লো, পায়ের ওপর পা চাপিয়ে, মাথার তলায় দুহাত রেখে মলয় রায়চৌধুরীর বই চারটে সম্পর্কে ভাবতে লাগলেো ।

ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস, জলাঞ্জলী, নামগন্ধ, ঔরস, চারটে বইতে কোথাও মলয় রায়চৌধুরী এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেয়নি কেন ?

১. মাও সে তুঙ আর হেনরি কিসিঞ্জার, এই দুজনের দাঁত বের করা হাসি দেখার জন্যেই কি সাংস্কৃতিক বিপ্লবে হাজার হাজার মানুষ মারা গিয়েছিল ? কিসিঞ্জার তো ওই ফোটো তোলাবার সময়েও ভিয়েৎনামে নাপাম বোমা আর কমলাবিষের ধোঁয়ায় মানুষকে পুড়িয়ে মারছিল, মনে নেই ?

২. মাও সে তুঙ আর হেনরি কিসিঞ্জার দুজনেই বুঝেছিল দু দেশের বাজারের মালপত্তরের বেচাকেনা দুই দেশের জন্যে জরুরি । বাজার যতো বাড়বে, ততো জিনিস বিক্রি হবে, ততো চাকরি বাড়বে, ততো দেশ উন্নতি করবে। তাহলে লেনিন কেন আগ বাড়িয়ে বলেছিল, ফ্রিডাম ইন ক্যাপিটালিস্ট সোসায়টি অলওয়েজ রেমাইনস অ্যাবাউট দি সেম অ্যাজ ইট ওয়াজ ইন অ্যানসিয়েন্ট গ্রিক রিপাবলিকস ? ছ্যাঃ ।

৩. ভারতে নকশাল আন্দোলন ঘটছে জেনে তাকে বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ বলার সময়ে চীন কেন পাকিস্তান আর শ্রীলংকায় অমন ক্রান্তি ঘটাবার চেষ্টা করেনি ?

৪. বিদ্যাসাগর, রামমোহন রায়ের মূর্তির মাথা কেটে কোন ক্রান্তি ঘটাবার চেষ্টা হয়েছিল ? ভারতবর্ষ মানে কি শুধু কলকাতা, শুধু পশ্চিমবাংলা ? বিদ্যাসাগরের গড়ে দেয়া ভাষায় কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো, রেড বুক,  অনুবাদ করার সময়ে মনে ছিল না ? সোভিয়েত দেশে বসে রুবল আর ভোদকা খেতে খেতে রুশভাষার বইগুলো বাংলায় অনুবাদ করার সময়ে কেন মনে পড়েনি, ভাষাটা কারা তৈরি করে দিয়ে গেছেন ! চটকলের গেটে আর গড়ের মাঠে ভাষণ দেবার সময়ে মনে ছিল না ভাষাটা কারা গড়ে দিয়ে গেছেন ?

৫. বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময়ে চীন কেন পাকিস্তানকে সমর্থন করেছিল, নিক্সনের চামচাগিরি ছাড়া আর কীই বা বলা যায় একে ? এদিকে তো গায়ে পড়ে সবাইকে মানবমুক্তির লেকচার দিতো মাও সে তুঙ ! চৌ এন লাই কি ইয়াহিয়া খানের গণহত্যা আর গণধর্ষণের প্রশংসা করে প্রেমপত্র লেখেনি ? তাহলে ?

৬. ১৯৭১ সালে লক্ষ লক্ষ মানুষ ভারতে পালিয়ে এসে ভিখিরির মতন রাস্তার দুধারে জীবন কাটিয়েছিল, কতো মেয়ে ধর্ষিত হয়েছিল, তার হিসেব নেই । মাও সে তুঙ আর মাওবাদীরা এ-ব্যাপারে মুখ খোলেনি কেন ? চীনের সংবাদপত্রে বাংলাদেশে গণহত্যা আর গণধর্ষণের খবর চেপে যাওয়া হয়েছিল কেন ?

৭. আমাকে এই জঙ্গলে মাওবাদীদের ডাক্তার বানিয়েছে মলয় রায়চৌধুরী । এতে আদিবাসীদের কোন উপকারে লাগছি আমি ? ইতি গেছে অবুঝমাড়ের জঙ্গলে, সেখানে গিয়ে কোন কাজে লাগছে ? তার চেয়ে অমিতের সঙ্গে ঘর বাঁধতে পারতো, সুখী হতো ।

৮. ১৯৭০ সালের শীতে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপচার্যকে কেন খুন করা হয়েছিল ? মতাদর্শ যে বুদ্ধিকে ভ্রষ্ট করে তা টের পেতে প্রজন্মকে নস্যাৎ করে ফেলতে হয়েছিল কেন ?

৯. চীনের কমিউনিস্ট পার্টির চরিত্র পালটে যাচ্ছে তা বুঝতে এতো দেরি হয়েছিল কেন ?

কই, মলয় রায়চৌধুরী, জবাব দাও, জবাব চাই ।

কই, ভাকপা, জবাব দাও, জবাব চাই ।

কই, ভাকপামে, জবাব দাও, জবাব চাই ।

কই, অইফব, জবাব দাও, জবাব চাই ।

কই, বিসপামা, জবাব দাও, জবাব চাই ।

কই, ভাকপামালে লিবারেশান, জবাব দাও, জবাব চাই ।

কই, ভাকপামালে রেড ফ্ল্যাগ, জবাব দাও, জবাব চাই ।

কই, ভাকপামালে নিউ ডেমোক্র্যাসি, জবাব দাও, জবাব চাই ।

কই, ভাকপামালে অরগ্যানাইজিং কমিটি, জবাব দাও, জবাব চাই ।

কই, ভাকপামালে শান্তি পাল, জবাব দাও জবাব চাই ।

কই, ভাকপামালে নয়ি পহল, জবাব দাও, জবাব চাই ।

কই, ভাকপামালে নিউ প্রলেতারিয়ান, জবাব দাও, জবাব চাই ।

কই, ভাকপামালে সত্যেন্দ্র সিংহ, সন্তোষ রাণা, জবাব দাও জবাব চাই ।

কই, ভাকপামালে নকশালবাড়ি রউফ, জবাব দাও, জবাব চাই ।

কই, ভাকপামালে জনশক্তি কুরা রঞ্জনা, জবাব দাও, জবাব চাই ।

কই, ভাকপামালে জনশক্তি রণধীর, জবাব দাও, জবাব চাই ।

কই ভাকপামালে জনশক্তি চন্দপুলা রেড্ডি, জবাব দাও, জবাব চাই ।

কই, ভাকপামালে মাধব মুখার্জি, জবাব দাও, জবাব চাই ।

কই, ভাকপামালে কেন্দ্রিয় টিম, জবাব দাও, জবাব চাই ।

কই, ভাকপামালে জনসংবাদ, জবাব দাও, জবাব চাই ।

কই, ভাকপামালে ভাইজি, জবাব দাও, জবাব চাই ।

কই, ভাকপামালে প্রজাশক্তি, জবাব দাও, জবাব চাই ।

কই, ভাকপামালে প্রজাপতিঘটনা, জবাব দাও, জবাব চাই ।

কই, ভাকপামালে প্রতিঘটনা, জবাব দাও, জবাব চাই ।

কই, ইউনিটি সেন্টার মালে ডিভি রাও, জবাব চাই, জবাব দাও ।

কই, ইউনিটি সেন্টার মালে আজমের গ্রুপ, জবাব চাই, জবাব দাও ।

কই, কপাভারত রঞ্জন চক্রবর্তী, জবাব দাও, জবাব চাই ।

কই, লাল ঝাণ্ডা দল, জবাব দাও, জবাব চাই ।

কই, সুসিক, জবাব দাও, জবাব চাই ।

কই, রিকপাই, জবাব দাও, জবাব চাই ।

কই, সিএমপি অরবিন্দাকশন, জবাব দাও, জবাব চাই ।

কই, ইউনাইটেড ভাকপা মোহিত সেন, জবাব দাও, জবাব চাই ।

কই, কমাপা সিপি জন, জবাব দাওম জবাব চাই ।

কই, গসপা সৈফুদ্দিন চৌধুরী, জবাব দাও, জবাব চাই ।

কই, ওড়িশা কপা অজয় রাউত, জবাব দাও, জবাব চাই ।

কই, কপাবিমা দার্জিলিঙ, জবাব দাও, জবাব চাই ।

কই, সিআরএলআই অসীম চ্যাটার্জি, জবাব দাও, জবাব চাই ।

কই, ত্রিপুরা গণমঞ্চ অজয় বিশ্বাস, জবাব দাও, জবাব চাই ।

কই, লাল নিশান দল লেনিনবাদী, জবাব দাও, জবাব চাই ।

কই, মার্কসবাদী মঞ্চ আসাম জবাব দাও, জবাব চাই ।

কই, পিআরপিআই সুমন্ত হীরা, জবাব দাও, জবাব চাই ।

কই, ভাকপা মাওবাদী, মুপ্পলা লক্ষ্মী রাও, জবাব দাও, জবাব চাই ।

কই, কলিভামালে রামনাথ, জবাব দাও, জবাব চাই ।

কই, কলিভামালে প্রতোকল্পনা, জবাব দাও, জবাব চাই ।

কই, কলিভামালে রিভিশানিস্ট, জবাব দাও, জবাব চাই ।

কই, মলয় রায়চৌধুরী, জবাব দাও, জবাব চাই ।

 

ছয়

মশারির ভেতরে শুয়ে ডাক্তার স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিলো ঝিঁঝি-পুরুষরা ডানা কাঁপিয়ে বলে চলেছে, জবাব নাই ঝিঁঝিঝিঁঝি জবাব নাই ঝিঁঝিঝিঁঝি জবাব নাই ঝিঁঝিঝিঁঝি জবাব নাই ঝিঁঝিঝিঁঝি জবাব নাই ঝিঁঝিঝিঁঝি জবাব নাই ঝিঁঝিঝিঁঝি জবাব নাই ঝিঁঝিঝিঁঝি জবাব নাই ঝিঁঝিঝিঁঝি জবাব নাই….

১৭৮৯ সাল থেকেই তো যুবকেরা, যখন মানুষ যুবক থাকে, সেই বয়সে, প্রতিষ্ঠানকে বদলাবার জন্যে মতাদর্শের আশ্রয় নিয়ে খুনোখুনি করবেই, তুমি কোন বদলকারীর দলে তাতে কিচ্ছু এসে যায় না । তুমিও তোমার শত্রুর আদলে গড়ে উঠবে । তোমার প্রজন্ম চলে যাবে, তারপর আরেক প্রজন্ম এসে বদলাবার চেষ্টা করবে । অথচ দুই পক্ষই জানে যে প্রথিবীর একটা বালও তুমি ওপড়াতে পারবে না ।

বিপ্লব হলো একধরণের বৃত্ত, সুতো দিয়ে তৈরি ।

বিপ্লব হলো শাঁখের করাত, দুদিকেই কাটে ।

চিন্তার কুয়াশায়, ডাক্তার ঘুমিয়ে পড়লো  বুকে দুই হাত রেখে, যেমনটা লেনিনের দেহকে মলম মাখিয়ে শুইয়ে রাখা হয়েছে, যাতে রুশ দেশের মানুষ, তাঁর পেল্লাই মূর্তিগুলো উপড়ে ফেলে দিলেও, তাঁকে না ভুলে যায়।

মানসী ঈশ্বরে বিশ্বাস করে ; বন্দুকের নলের ক্ষমতায় বিশ্বাস করে ; একই সঙ্গে দুজন পুরুষকে ভালোবাসায় আর বিশ্বাস করে, এককালে দুজনের সঙ্গে একই দিনে সেক্স করায় বিশ্বাস করতো ।

 

সাত

 

ফুলশয্যার বিছানায়, ডাক্তারের ডাক, ওকে, শুরু করা যাক ।

কাজ হয়ে গেলে স্বামী পাশ ফিরে শোবার তোড়জোড় করছে দেখে মানসী বলল, দাঁড়াও, এক্ষুনি ঘুমোতে চললে কেন । পিঁড়িতে বসে তো অনেক সংস্কৃত মন্ত্র আউড়ে ছিলে পুরুতের কথামতো ; তারপর আমার শরীরের পিঁড়িতে বসে দেহের মন্তর ভাঁজলে । এবার আমার মন্তর ভাঁজার পালা, তোমার দেহের পিঁড়িতে বসে । তোমার হয়ে গেলেই হলো ? আমারও তো হওয়া দরকার, নাকি ?

ঠিক আছে, বোসো, বলো কী মন্তর বলতে চাও ।

বসি আগে ; একি ফসকে যাচ্ছে কেন ? মন ভরে গেল আর ব্যাস, তোমার মন অন্য দিকে চলে গেল।

আমি ফসকাচ্ছি নাকি ? পিঁড়িতে তো তুমি বসে আছো ।

দাঁড়াও, যুত করে বসি, হ্যাঁ, এইবার, আমার চোখে চোখ রেখে দ্যাখো ।

সক্রিয় হও, নয়তো ফসকাবে ।

এখানে যে ফিসফিসিনি-গুজগুজুনি ছাত্র-রাজনীতি করো, তা বিদেশে গিয়ে করা চলবে না, ফিরে এসে যে দলের ঝাণ্ডা চাও দেশে এসে ওড়াবে, ওদেশে নয় ।

ফসকে যাচ্ছে, বক্তৃতা দিতে গিয়ে ভুলে যাচ্ছ, এখন সক্রিয় হও , পরে না হয় বক্তৃতা দিও । মনে করো দিকিনি যে তুমি ঘোড়ায় চেপে বেড়াতে যাচ্ছ আর ঘোড়াটা দুলকি চালে হাঁটছে ।

ইশশ…দুলকি চাল চাই ওনার, এই নাও রাজধানী এক্সপ্রেসের চাল । কী ? হল তো ?

কই ! হয়নি । ওপর থেকে নামো, আমি ট্রাই করি ।

না, ওপরে বসে কথাগুলো বললে তোমার মনে থাকবে, নয়তো বিদেশে গিয়ে ভুলে মেরে দেবে কী কী বলেছি, ওদেশে মেমগুলো আদেখলা ।

বলো, হেল্প করব ?

না, আমার গায়ে যথেষ্ট জোর আছে, তুমি পিঁড়ি হয়ে চুপ করে থাকো । টগবগ টগবগ, টগবগ টগবগ, টগবগ টগবগ,  টগবগ টগবগ, কী ? এখন কেমন । এবার ঘোড়াকে ছোটাচ্ছি কিন্তু, রেডি স্টেডি গো । আমার সঙ্গে ইয়ার্কি, না ? স্হির থাকো, নট নড়ন-চড়ন ।

রইলাম ।

মারো জোয়ান হেঁইও, জোরসে মারো হেঁইও, সাবাশ জোয়ান হেঁইও, মানসী জড়িয়ে ধরে ডাক্তারকে ।

ডাক্তার বলে ওঠে, কী হলো, ও মাঝি তোর হাল শক্ত করে ধর ।

ঠিক আছে, আবার মর্নিং শো ।

অ্যাজ ইউ প্লিজ ।

বিদেশে ঠিক মতন পড়াশুনা কোরো, রাজনীতি করার লোভে কোনো মেয়ের পাল্লায় পোড়ো না যেন, শেষে রোগবালাই হবে, আমি সামলাতে পারব না । রাজনীতি করতে হয় তো কার্ল মার্কসের কবরে গিয়ে প্রার্থনা কোরো যে মেডিকাল পরীক্ষায় যেন ভালো রেজাল্ট হয়, দেশে বউটা একা পড়ে আছে, দেশে ফিরে প্রয়োজন হলে ফিসফাস-রাজনীতি বা দলীয় রাজনীতি যা হয় করব ।

যাই তো আগে ; সত্যি ওখানে গিয়ে ফলাফল ভালো করতেই হবে, নয়তো বাবার রেখে যাওয়া টাকা নয়ছয় করা হবে, মা তা সহ্য করতে পারবেন না ।

প্রেমপত্র লিখো না ; প্রেমপত্র পেয়ে-পেয়ে ঘেন্না ধরে গেছে । সাদামাটা কথা লিখবে, ফোন করবে।

পিঁড়ির কাজ সমাধা করে ফেলেছ ? কাঁপছো দেখছি ! আর কিছু বলার আছে ?

যাওয়া না পর্যন্ত প্রতিরাতে একবার আমি পিঁড়ি হব, একবার তুমি পিঁড়ি হবে ।

একবার কেন ?

একবার হল কথার কথা ।

ভার্জিনিটি যাচাই করে, একে আরেকের কৌমার্যের সিল ভেঙে, হবু ডাক্তার চলে গেলো লণ্ডনের রয়াল কলেজ অফ রেডিওজিতে ডাক্তারি পড়তে ।

কোর্স পুরো করে ফেরার আগেই লণ্ডনে বসে শুনলো,  স্ত্রী মানসী একাকীত্ব কাটাবার, আর শাশুড়ির উঠতে-বসতে উপদেশ এড়াবার জন্য  চাকরি নিয়ে চলে গেছে পাটনা । শুনে, ডাক্তারের মনে হল, মানসীর কথা না শুনে, একটা বাচ্চা পয়দা করে বা বউকে প্রেগনেন্ট করে বিদেশে গেলে, বউয়ের একাকীত্বের নিদান দিয়ে যেতে পারা যেতো। বউ একা কী করে প্রেগনেনসি সামলাবে, ওর অবর্তমানে বাচ্চা হলে, কোলের শিশুকে কে সামলাবে, মাকে কে দেখবে, কচি বয়সের দুশ্চিন্তায় আক্রান্ত হয়ে মানসীর কথামত বাচ্চা মুলতুবি রাখার প্রস্তাবে রাজি হয়ে গিয়েছিলো ।

শাশুড়ির সঙ্গে সংঘর্ষ হবারই ছিল, দুজনেই বড্ডো বেশি কথা-কইয়ে ।

ডাক্তার কলকাতায় ফিরলো, মানসী কলকাতায় ফিরলো না, করকরে মাইনের এমন অভ্যাস হয়ে গিয়েছে, বলেছিলো মানসী, তুমিই এসো যখন মন কেমন করবে, শরীর ছোঁকছোঁক করবে । দেড় বছরের মাথায় মা মারা গেলেন, তবুও মানসীর ফেরার ইচ্ছা হল না, বললো, এই তো বেশ চলছে, তুমি তো সপ্তাহে একদিন আসছ, আমিও বড়ো ছুটি পড়লে যাচ্ছি , কারোর তো অসুবিধা হচ্ছে না । মানসীকে ডাক্তার বলে ফেলেছিলো যে সপ্তাহে একদিন এসে  মন ভরে না, রোজ দুবেলা সেক্স করার ইচ্ছে হয় ।

মানসী বলেছিলো, ডাক্তারের থুতনি ধরে, যে ওরও অমন ইচ্ছে হয়, কিন্তু কি আর করা যাবে, উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে এমন মাইনের চাকরি পাওয়া যায় না, অফিস কোয়ার্টার দিয়েছে, চাইলে নানা রকম লোন দ্যায়, কতো সুবিধা । ডাক্তার যে রাতটা থাকতো, যতবার পারতো  সেক্স করতো দুজনে । সপ্তাহ-শেষে, প্লেনে সন্ধ্যায় পোঁছে পরের রাতে ট্রেনে যাতায়াত, ক্লান্ত দেহে আনন্দ নেবার মতন আহ্লাদ ভরপুর থাকত না ।

একটা রাত আর দিনের জন্য ঢুঁ মারতো, লুকিয়ে, যাতে কেউ না ওকে দেখে ফ্যালে । ইনটারভিউ দেবার সময়ে টেবিলের ওদিকে বসে থাকা তিন মাঝবয়সী সাক্ষাৎকার-গ্রহণকারীর মুখ দেখেই মানসী আঁচ করে ফেলেছিল যে এরা যেভাবে তাকাচ্ছে, টেবিলের তলা দিয়ে নিজেদের বিরাট বিরাট অ্যানাকোণ্ডা সাপকে ওর দিকে পাঠিয়ে  সাপটে জড়িয়ে ধরার জন্য লড়ে মরছে । চাকরিটা পেতে হলে বিয়ে হয়ে গেছে বলা চলবে না, চাকরির দরখাস্ততেও জায়গাটায় তাই টিক দেননি, এর আগের ইনটারভিউয়ের অভিজ্ঞতা থেকে । অ্যানাকোণ্ডা তিনটে ওর গলা জড়িয়ে ধরে দমবন্ধ করে বলিয়ে নিল যে, না, বিয়ে করিনি এখনও । অফিসের সকলে জানে মানসী বর্মণ অবিবাহিত । বর লুকিয়ে এসে জমানো ফোঁটাগুলো ফেলে লুকিয়ে চলে যায়, তা কেউ জানে না।

মানসী যখন প্রেগন্যান্ট হলো, তখন অফিসের ননীগোপাল বসু আর তাঁর মুসলমান স্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করে রটিয়ে দিতে হল যে ননীবাবুর স্ত্রীর জরায়ুর সমস্যার কারণে মানসী ওনাদের বাচ্চার সারোগেট মা হতে রাজি হয়েছে । প্রেগন্যান্ট হয়েছে শুনে আনন্দে আটখানা আর কাজে অন্যমনস্ক ডক্টর ঘোষ তার হাসপাতালে এক বিপর্যয় ঘটিয়ে বসলো, আর মানসীর নির্দেশমতো কলকাতার বাড়িতে তালা ঝুলিয়ে, মানসীর অফিসের চাপরাসি রাজনৈতিক কর্মী  রসিক পাসোয়ানের সঙ্গে পাটনা স্টেশানে যোগাযোগ করে ডাক্তার পালালো ওয়ারিস আলি গঞ্জের দাতব্য চিকিৎসালয়ে । রসিক পাসোয়ান লোকটা মানসীর অফিসেরই চতুর্থ শ্রেণির কর্মী, গরমকালেও মাথায় সর্ষের তেল চুপচুপে, অফিসের দেয়া পোশাকেও কলার তেলে চিটচিটে, মুখময় পানিবসন্তের শ্রীছাঁদ, ডান হাতের তর্জনী অর্ধেক কাটা । পরে জেনেছিলো ডাক্তার ঘোষ, আঙুল সে নিজেই অফিসের মেশিনে কাটিয়ে ফেলেছিল, অফিসের কাছ থেকে বীমার টাকা পাবার জন্য, যা ও ক্রান্তির কাজে লাগিয়েছিল ।

 

আট

         রায়পুর থেকে নারায়ণপুর যাবার বাসে ইতুকে  তুলে দিয়ে অমিত বলে দিয়েছিল, বাস থেকে নেমে সোজা গিয়ে রামকৃষ্ণ মিশনের গেটের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে থাকবি ; সুশান্ত জেঠুর দেয়া তোর মোবাইল থেকে, একটা ছেলেকে ফোন করে দিয়েছি । তুই মিশনের গেটের কাছে পোঁছে এই নম্বরে একটা মিস কল দিবি । নারায়নপুরে নেটওয়র্ক ততো ভালো কাজ করে না । ছেলেটা রেসপণ্ডড করে বলবে, ওর নাম বীরবল মাড়িয়া । হিরো হণ্ডার কালো রঙের স্পেলণ্ডার মোটর সাইকেলে আসবে । ও তোকে নমস্তে ইতুদিদি বললে, কোনো কথা না বলে পিলিয়নে বসে পড়িস । ও তোকে যেখানে পৌঁছে দেবে, সেখানে তোর সঙ্গে আমার পরিচিতদের দেখা হবে, হয়তো তোর পরিচিতও থাকতে পারে কেউ । চিন্তা করিসনি, মনে রাখিস, যেখানে ঢুকতে যাচ্ছিস সেটাকে প্রশাসনের লোকেরা বলে জংলি পাকিস্তান ।

বাস ডিপোয় ইতুর কান্না পায়নি, নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল । কেঁদে ফেলেছিল অমিত, রুমাল দিয়ে চোখ পুঁছে নিচ্ছিল যাত্রীদের এড়িয়ে । বলেছিল, আর দেখা হবে না জানি, তোকে শেষবার দেখে নিচ্ছি । উত্তরে ইতু বলেছিল, আমি আমার অতীতকে কলকাতা বিমানবন্দরে প্লেনে ওঠার সময়ে কাট অফ করে দিয়েছি, তুইও তাই করে ফ্যাল । সবাইকে ভুলে গিয়ে যা করবার কর, বাবা-মায়ের সঙ্গে থাক, থেকেও তাদের ভুলে থাক । গেট রিড অফ অল মেমরিজ ।

ডেনিমের ট্রাউজার আর ঢিলেঢালা টপ পরেছিল ইতু, পায়ে জগিং করর কেডস, কাঁধে ওর রাকস্যাক। রায়পুরে দুবোতল মিনারেল ওয়াটার আর বিস্কিটের প্যাকেট নিয়ে নিয়েছে ।

যে বাসটায় চেপেছিল, সেটার নাম, ইতুর অবাক লাগল শুনে, নৌকরওয়ালা বাস । কন্ডাক্টার টিকিট দিল না কাউকে, স্কুলের অ্যাটেন্ডেসন্স রেজিস্টার হাতে প্রত্যেক যাত্রীর কাছে গিয়ে তাদের নামের সামনে ছককাটা ঘরে সই নিয়ে নিলো । মাসের শেষে টাকা নেবে, উপস্হিতি অনুযায়ী । প্যাসেনজারদের পোস্টিং হয়েছে নতুন জেলা সদর নারায়ণপুরে ;  তাদের পরিবারকে নিয়ে যায়নি, নারায়ণপুরে ভালো স্কুল কলেজ, সিনেমা হল, মালটিপলেক্স কিছুই গড়ে ওঠেনি এখনও । ইতুকে কণ্ডাক্টর বলল, দিতে হবে না ।

বাস থেকে নেমে হাতে টানা রিকশোয় চেপে নির্ধারিত জায়গায় পৌঁছে বীরবল মাড়িয়াকে মিসড কল দিয়ে অর্জুন গাছের তলায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল ইতু ।

নমস্তে ইতু দিদি, শুনে, কালো মোটর সদাইকেলের পিলিয়নে  বসে, ইতুর নাকে ছেলেটির যৌবনগ্রন্হির ঝাপটের উগ্র গন্ধ এসে লাগতে প্রায় বমি পেয়ে গেল ; উফ ফেরোমন । মুখে কাঁধের থলেটা চাপা দিয়ে সামলালো। কিছুটা যাবার পর বুঝতে পারলো যে এক হাতে ছেলেটির পেট ধরে থাকতে হবে, আর এক হাতে মোটর সাইকেলে হ্যাণ্ডেল, নয়তো সড়কের যা অবস্হা, নির্ঘাত ছিটকে পড়বে কোনো পাথরে চাকা পড়লেই । ঘামে ভেজা পেটে হাত রেখে ধরতে, ছেলেটি বলল, হ্যাঁ, ঠিক করে বসুন, রাস্তা ভালো নয়, এই তো সবে দুটো ব্লক নিয়ে নারায়ণপুর জেলা তৈরি হয়েছে । ইতুর মনে পড়ল, অমিত এই ভাবেই ওর স্কুটারে পেট ধরে বসেছিল, আর নাভিতে আঙুল দিয়ে সুড়সুড়ি দিয়েছিল ।

যুবকটির পেট, বর্ষায় ভেড়ার লোমের মতন, বেশ ভিজে, উনিশ-কুড়ি বছর বয়স হবে, গায়ের রঙ মুখের গড়ন দেখে আদিবাসি বলেই মনে হয় । ইতু জিগ্যেস করল, দান্তেশ্বরীর মন্দির পড়বে কি রাস্তায় ।

— না দিদি, দান্তেশ্বরী হলো বস্তারের দেবী । নারায়ণপুরে অবুঝমাড়িয়াদের দেবী হলো কাকসার । বৈগারা রাসনাভাকে পুজো করে, আর গোঁড়রা পুজো করে মেঘনাদকে ।

মেঘনাদ ! মাইকেলের ? ইতু নিজেকে নিঃশব্দে বলল ।

যুবকটি বলল, জানেন, এখানে কেউ আসে না, বেশ দূরে দূরে প্রায় দুশো তিরিশটা গ্রাম আছে, চার কিলোমিটার জঙ্গলে ছড়িয়ে, তিরিশ হাজারের বেশি মানুষ, বেশির ভাগই  মাড়িয়া আর গোঁড়, যাদের খোঁজখবর সরকার নেয় না । কেন বলুন তো ? হোল ইনডিয়ায় শুধু এইটুকু এলাকার কোনো সার্ভে আজ পর্যন্ত হয়নি । নারায়ণপুর, বিজাপুর আর বস্তার, এই তিন জেলার জঙ্গল এলাকা হলো অবুঝমাড় ।

ও আচ্ছা, শুকনো ঠোঁটে জিভ বুলিয়ে বলল ইতু ।

জানেন, অবুঝমাড়কে ঘিরে রেখেছে কেন্দ্রিয় রিজার্ভ পুলিশ বল আর ক্রান্তিকারিরা ।

ইতু নিজেকে প্রশ্ন করল, এখানে কেন আসতে চাইলুম ? বাড়িতে কি ভালো ছিলুম না ? আমি তো অলটারনেটিভ মেডিসিন পড়েছি, অমিতের সঙ্গে পালিয়ে গিয়ে কোথাও সংসার পাততে পারতুম, বস্তিতেই থাকতুম না হয়, অমিত কিছু কাজ তো করতো, অন্তত আমার ডিসপেনসারিতে হেলপার হয়ে ? যাকগে, এবার নিজের জন্যে কিছু করব, ক্রান্তিকারিদের চিকিৎসা তো করতে পারব, জঙ্গলে এতো পরিচিত গাছগাছড়া রয়েছে।

বীরবল মাড়িয়া বলল, কিছুক্ষণ থেমে, শ্বাস নিয়ে, অবুঝমাড় এমন ভুতাহা জায়গা যে ক্রান্তিকারিদের শরীরকেও অদৃশ্য ডাইনরা আক্রমণ করে, যতই বন্দুক কামান থাক, কিছুদিনের মধ্যে রোগে ভুগে ভুগে হাড্ডির চামগাদড় হয়ে যায় । আপনি দেখুন কতোদিন এখানে টিকতে পারেন । জল তো নোংরা, টিকতে হলে সালফি খেয়ে চালাতে হবে ।

সালফি ?

হ্যাঁ, সালফি হল তাড়ির মতন দেখতে একরকমের মদ । তালগাছ বা খেজুর গাছের মতন দেখতে হয় গাছগুলো, যেমন করে চেঁচে নিয়ে তালের বা খেজুরের রস বের করে, তেমনি করে সালফি বের করতে হয় ।

ছায়ায় আধঘণ্টা জিরিয়ে কয়েক ঢোঁক জল খাবার পর, মোটর সাইকেলটা চালাঘরের কাছে রেখে, বীরবল বলল, চলুন আরেকটু এগিয়ে দিই ।

মিনিট পনেরো হাঁটার পর, দুটো নীচু চালাঘরের মতন একটা জায়গায় পৌঁছোলো ইতু আর বিরবল । উলঙ্গ কিশোর-কিশোরীরা খেলা করছে, রুক্ষ চুল, দেখেই বোঝা যায় বহুদিন, বা হয়তো কখনো স্নান করেনি। শহরে এই বয়সের মেয়েরা কুঁচকি আর বুক ঢাকা পোষাক পরে ; এদের কুঁচকির চুলও দেখা দেয়া আরম্ভ হয়েছে, বুকও উঠে এসেছে, এই বয়সে ইতু বডিস আর জাঙিয়া পরা আরম্ভ করেছিল ।

কয়েকজন শিড়িঙ্গে শিথিল-দাবনা পুরুষ বসে আছে, তারাও প্রায় উলঙ্গ, কৌপিনগোছের ন্যাকড়ায় লিঙ্গ ঢাকা। বীরবল বলল, ওরা এগ্রামের নয়, কুরসুনার গিয়ে সালফি খেয়ে এখানে মৌতাত নিচ্ছে । এই অবস্হায় ওরা ভেতরে গেলে ক্রান্তিকারিরা ধরে ফেললে ফাইন করবে ।

মানুষ যদি এরকমই থাকতে চায়, তাহলে তাতে পৃথিবীর কোনো ক্ষতি ছিল না, নিজের সঙ্গে নিজে কথা বলছিল ইতু । এই লোকগুলো এখনও বিস্মিত হবার ক্ষমতা রাখে, জীবনকে যথেচ্ছ উপভোগ করতে চায়, পোশাকের পরোয়া নেই, এখনও এরা কলাকৌশলের জাঁতিকলে আটকে পড়েনি, এখনও ভড়ংশূন্য, সরল, স্বাভাবিক ; প্রযুক্তির প্রগতিতে এসে যায় না কিছু । সভ্যতা যতো বুড়ো হয়েছে ততো বিমূর্ত আর অবাস্তব হয়ে গেছে শহরের মানুষ, শিকড় থেকে ওপড়ানো, প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন, যেমন আমি নিজে । মেট্রপলিসের মানুষ আর জৈবিক হৃদয়ের প্রাণী রইলো না, তার আবেগের স্বাভাবিকতা আর আন্তরিকতা উবে গেছে । বোধহয় এটাই মানুষের নৃবৈজ্ঞানিক ভবিতব্য । সভ্যতা যতো সভ্যতর হয়ে চলেছে ততোই আমরা হয়ে চলেছি জটিল, খারাপ, অনৈতিক, ভয়াবহ ।

এই লোকগুলোর আনন্দের পরিভাষা তো এরাই তৈরি করবে, নাকি আমি বা ক্রান্তিকারিরা বাইরে থেকে এসে তাকে বোঝাবো কীসে তাদের আনন্দ । সভ্যতা  মানুষের যৌবনকে ক্ষইয়ে দিচ্ছে, মানুষ আসলে ভঙ্গুর, ঠুনকো, নশ্বর, তার শরীর অসুস্হ হবেই, ঋতুদের প্রকোপ সামলে চলতে হবে তাকে, সভ্য থাকার কাঁচামাল ফুরিয়ে যাচ্ছে, না-খেয়ে আধপেটা-খেয়ে থাকতে হচ্ছে, তার ওপর আবার সন্ত্রাসের আতঙ্ক । কে জানে, আমার কাছে এসব প্রশ্নের উত্তর নেই । দেখি, কী হয় । অন্যদের সুখে-আনন্দে-সুস্হতায় যদি জীবন কাজে লাগাতে পারি তাহলেই যথেষ্ট , তাহলে অমিতকে ভুলে যেতে পারবো।

গ্রামটার পর পথ ক্রমে ওপর দিকে ওঠা আরম্ভ হলো । দুপাশে চেনা-অচেনা নানা রকমের গাছ, ছায়ায় হাঁটতে ভালো লাগছিল ইতুর । তখনই বীরবল বলল, দিদি, আমাকে এখান থেকে ফিরে যেতে হবে, সন্ধ্যা হয়ে এলো । আপনি প্রথমে যে গ্রাম পাবেন, সেখানে অপেক্ষা করবেন, কেউ আপনাকে নিতে আসবে । কিংবা এই সরু পাহাড়ি বনপথ ধরে যদি এগিয়ে যান, একটা বড়ো গ্রাম পাবেন, সেখানে অপেক্ষা করবেন । অন্ধকার হয়ে গেলে কোনো গাছে হাত দেবেন না ; সন্ধ্যার পরে গাছ আর গাছের ডালপালারা সাপ হয়ে যায়, সবুজ, কালো, হলদে, মোটা, রোগা, চিত্তিদার, নানারকম । আপনাকে সাবধানে হাঁটতে হবে । টর্চ এনে থাকলে জ্বালাবেন না, সাপেরা আলোয় বিরক্ত হয় ।

— সে কী, তুমি যাবে না ? ইতু বুঝতে পারলো যে ও এই ছেলেটির ওপর নির্ভর করছিল এতক্ষণ, ওর কল্পকাহিনি খাচ্ছিল । এবার থেকে ও একা । কারোর ঘাড়ে চাপার জন্যে তো বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়েনি ।

–না, আমি ফিরে যাই, এখানে কেউ আপনার কোনো ক্ষতি করবে না । মাড়িয়া-গোঁড়রা  জানেই না কাকে ক্ষতি করা বলে । জঙ্গলের ভেতরে শহরের মানুষ পাবেন না ; যদি পান তো নিজেকে দূরে-দূরে রাখবেন ।

ইতু হাত তুলে, ফির মিলুঙ্গি জানিয়ে, এগোলো বনের পথে । বীরবল চলে গেলে, জুতো আর জিনস খুলে, প্যান্টিটা ফেলে দিয়ে, পেচ্ছাপ করে নিলো । ওহ কতক্ষণ চেপে রেখেছিলুম, বলল হলুদ ফুলের চুমকি বসানো ঘন সবুজ ঝোপকে, যে ঝোপটা হয়তো কোনো ভবঘুরে পাখির গু থেকে বৃষ্টির ছাটে দুহাত মেলে জন্মেছিল । টপ খুলে বডিসও ফেলে দিল । সেই ক্লাস এইট থেকে অভ্যাস, বাইরে থেকে বাড়িতে নিজের ঘরে ঢুকে আগে এই দুটো খুলে ছুঁড়ে ফেলে দেয়া ।

বাঁদিকের বুকটা তুলে দেখলো, দ্বিতীয়বার উত্তেজিত হয়ে দাঁত বসিয়ে দিয়েছিল অমিত, তাই ঘামের দরুণ জ্বালা করছিল । একটা ঘৃতকুমারী পাতা ভেঙে, তার শাঁস কুঁচকিতে আর বুকে, গোলাপি জায়গায় লাগিয়ে নিলো।

বনের ভেতরে সম্পূর্ণ উলঙ্গ দাঁড়িয়ে অবর্ণনীয় ভালোলাগা পেয়ে বসল ইতুকে । দুহাত ওপরে তুলে চেঁচিয়ে উঠল, আমি ইতুউউউউউ, আমি ইতান, পৃথিবীর মাটিতে সম্পূর্ণ স্বাধীন । দুদিকে দুহাত মেলে আবার চেঁচালো, আমি ইতুউউউউউ…আমি আদি মানবিইইইই…আমি ইতু…আমি ইতু…আমি ইতুউউউউ….।

শুকনো পাতার ওপর থেকে পোশাক তুলতে গিয়ে ইতু দেখলো, একটা কাঠবেড়ালি নতজানু হয়ে তাকিয়ে আছে ওর দিকে । ইতু, নগ্ন, শুকনো পাতার ওপরে উবু হয়ে বসে কাঠবিড়ালিটাকে বলল, সেতু বাঁধতে এসে থাকলে ভুল করছিস, সব সেতু ভেঙে চলে এসেছি । কাঠবিড়ালিটা পালিয়ে গেল, পোশাক আর জুতো পরে নিলো, কাঁধে ঝোলা, এগোলো বনপথে ।

ঘণ্টাখানেক চলার পর, সন্ধ্যা নেমে আসায়, অজানা এক গাছের গুঁড়ির কাছে, ছায়ায়, জুতো খুলে, বসে পড়েছিল ইতু, বুকের ভেতরে বাজতে-থাকা ভীতির দামামা দূর থেকে কানের ভেতরে ঢুকে আসছিল । ওপর থেকে কয়েকটা ফুল ঝরঝর করে ঝরে পড়তে চমকে উঠেছিল, তারপর টের পেলো যে এটা মহুয়ার গাছ ; তাইতো অমন গন্ধ বেরুচ্ছিল । মহুয়া ফুলের গন্ধে যদি ভাল্লুক আসে, তাহলে ? কোথায় যেতে হবে সুস্পষ্ট বলে দেয়নি অমিত, ওকে ওর ক্রান্তিকারি মা-বাপ যেমনটা বুঝিয়েছিল, ও সেটাই বলেছে, বলেছিল হাঁটতে থেকো যতোটা পারো, পরিচিত কাউকে ঠিকই পেয়ে যাবে । তন্দ্রা এসে গিয়েছিল ইতুর, গাছে ঠেসান দিয়ে ঢুলতে লাগল। সারাদিনের রোদের আমেজে বুঁদ গাছের পাতাগুলো অবসাদে ঝিমিয়ে ।

ঘুম ভাঙতে, দেখল অন্ধকার, আজকে বোধহয় চাঁদ ওঠার রাত নয় । জুতো পরে উঠে দাঁড়াতে গিয়ে অন্ধকারে গাছে ডান হাত ঠেকতেই মনে হলো সাপের গায়ে হাত দিয়ে ফেলেছে, নরম মাংসল, যেন ভিজে-ভিজে, তাড়াতাড়ি হাত সরিয়ে নিলো । কী করবে ? গাছগুলো রাতে সাপের আকার নিয়ে নিচ্ছে ! বিশ্বাস করি না, অথচ বিশ্বাস করে ফেলছি, ভয়ে । এককালে অমিতকে ভিতু বলে কতো ডাঁট-ফটকার দিয়েছি । কেউ এলে তাকে দেখতেও তো পাবো না জঙ্গলের অন্ধকারে । হয়তো বিভ্রম, মনে করে, বাঁ হাত বাড়িয়ে গাছ অনুমান করে হাত বাড়াতে, ঠাণ্ডা সাপের গায়ে হাত ঠেকল, নরম । সাপের ভয়ে ইতুর বুকের ভেতরের ইঁদুরগুলো দাপাদাপি আরম্ভ করে দিয়েছিল । ইতু বুঝতে পারছিল ওর অস্তিত্ব জুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে আতঙ্ক, সাপের আকার পাওয়া গাছগাছালির আতঙ্ক ।

হঠাৎ ইতুর চোখের ওপর সরু নিয়নের আলোর মতন রশ্মি পড়তে, চোখ ধাঁধিয়ে গেল, বুকের দামামা আরও জোরে বাজা আরম্ভ হলো । কোনো ময়ালের চোখ নয়তো ? আরও তিনটে টর্চ জ্বলতে, ইতু আবছা দেখলো, ওর চারপাশে জলপাই রঙের উর্দিতে চারজন যুবক আর একজন যুবতী । সকলের কাঁধে বন্দুক বা রাইফেল, কে জানে কী, দেখেনি তো কখনও । আমাকেও ঝোলাতে হবে নাকি ! এই উদ্দেশ্যে তো আসিনি, আদিবাসীদের চিকিৎসা করতে এসেছি ।

—ডক্টর ঘোষ ? ওয়েলকাম । একজন যুবক বলল ।

ইতুর মুখ দিয়ে বেরোলো, থ্যাঙ্কস, ম্যায় বহুত ডরি হুই থি ।

যুবতী বলল, জানতি হুঁ, আপ সো গয়ে থে দেখকর আপকো নিন্দ সে নহিঁ জগায়া । আপ জব অপনা নাম লেকর চিল্লায়েঁ, তভি সে হমলোগ আপকে সাথ হ্যাঁয় ।

ওর উলঙ্গ চিৎকার এরা দেখেছে তাহলে ! দেখুকগে, কীই বা এসে যায় ।

যুবতী বলল, ওর নাম সোনারি, বলল, আপ হম লোগোঁকে বিচ মেঁ রহিয়ে, ইতুকে ঘিরে ওরা হাঁটা আরম্ভ করল, অন্ধকারে, টর্চ না জ্বেলে । বনপথের সহযাত্রীদের ঘেরাটোপে বোধহয় আরও ঘণ্টা দেড়েক হেঁটেছিল ইতু ।

তখনই অন্ধকারকে হুঁশিয়ারি দিয়ে কয়েকবার হুইসিল বেজে থেমে গেল ।

আচমকা গুলি চলার শব্দ আরম্ভ হতে, ইতুকে টেনে শুকনো পাতার ওপর নামিয়ে, ওরা ইতুর দেহ ঘিরে শুয়ে পড়ল । ইতু অনুমান করল দুদিক থেকে গুলি চলছে, অন্ধকারে কিছুই দেখতে পাচ্ছে না । ওর মুখ মাটির দিকে, জিভেতে ভয়ার্ত আহ্লাদের স্বাদ । শুকনো পাতার ছোঁয়াচে গন্ধে, বাড়ি থেকে পালাবার পর, প্রথম যখন অমিত ওর ক্লিনিকে এসেছিল, ঠিক ওর শরীরের সন্মোহক গন্ধ ।

অসংখ্য গুলি ওদের দিকে এসে ঝাঁঝরা করে দিল সবাইকে, ইতুকেও । কুণ্ডলীপাকানো ময়াল সাপের মতন পড়ে রইলো ইতুর আর ওর ক্রান্তিকারি রক্ষীদের মৃতদেহগুলো ।

 

নয়

হাসপাতালে, এম আর আই স্ক্যান করার জন্য একজন বয়স্ক রোগিকে শুইয়ে টেকনিশিয়ানকে নির্দেশ দিচ্ছিলো  ডক্টর ঘোষ, তখনই বুড়ো ওয়ার্ডবয় গোপাল নস্কর পাশের ঘরে নিয়ে যাবার বদলে একটা খালি অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে ঢোকে, আর এম আর আই মেশিনের ম্যাগনেটিক ফিল্ডের প্রচণ্ড আকর্ষণে সিলিণ্ডারসুদ্দু ওয়ার্ড বয়টা রোগীকে নিয়ে বাজপাখির ছোঁমারার মতন করে সেঁদিয়ে গেলো মেশিনের ভেতরে ; রোগি তক্ষুনি মারা যায় । ভ্যাবাচাকা খেয়ে টেকনিশিয়ানটা পালালো ।

মেশিনের কোয়েঞ্চিং সুইচ অফ করে ম্যাগনেটিক ফিল্ড ডিঅ্যাকটিভেট করার বদলে রোগি আর ওয়ার্ড বয়কে বের করার চেষ্টা করে ডক্টর ঘোষ, কিছুই হচ্ছে না দেখে হিলিয়াম গ্যাস বের করে দিয়ে ম্যাগনেটিক ফিল্ড অকার্যকর করার চেষ্টা করে, কিন্তু পারে না, সুইচও নেভাতে পারে না । অনিচ্ছাকৃত মৃত্যু ঘটানোর জন্য গ্রেপ্তার হয়ে একদিন হাজতে থাকার পর, পাটনায় পালিয়ে গিয়ে, মানসীর পরামর্শে, রসিক পাসোয়ানের সাহায্যে, গা ঢাকা দেয় ওয়ারিস আলি গঞ্জ । এককালে ছাত্র-রাজনীতি করিয়ে ডাক্তার উন্নীত হয়ে গেল ক্রান্তিকারির রাজনীতিতে, যে রাস্তায় যাবার গোপন ইচ্ছে অনেককাল ধরেই ছিল ।

না পালালেই হতো, পরে মনে হয়েছে  ডাক্তারের , হয়তো অতিবুদ্ধিমতী সুন্দরী মানসী ওইভাবেই তাকে নিজের আয়ত্বে নিয়ে নিলো।  টেকনিশিয়ান প্রশান্ত সরখেল গ্রেপ্তার হয়েছিল, পুলিস হাজতে ছিল চোদ্দো দিন, মেশিনটা ডিফেকটিভ ছিল বলে হাসপাতালের কর্মী ইউনিয়ান দাবি করে পালটা মামলা করার ফলে কেস ঝুলে আছে সেই থেকে । ডাক্তারও না হয় ঝুলেই রইতো, মানসীকে বাধ্য করতো কলকাতায় ট্রান্সফার নিয়ে  সঙ্গে থাকতে । ভয় ছিল যে পুলিশ শেষে বাড়িতে ঢুঁ মারলে বিপ্লবের বইপত্র দেখে অন্য মামলায় ফাঁসিয়ে দিতে পারত, হয়তো আগে থেকেই নজর রেখে থাকবে, তার চেয়ে কাগজপত্র জ্বালিয়ে গা ঢাকা দেয়াই উচিত, ভেবেছিল ডাক্তার ।

মানসীর বাচ্চাটা নির্দিষ্ট দিনের আগেই, জটিলতার কারণে, হাসপাতালে মারা গেল, জানিয়েছিল মানসী, যা আজও বিশ্বাস করে না ডাক্তার, হয়তো কোথাও কারোর জিম্মায় দিয়ে রেখেছে, যাতে বাচ্চার ঝক্কি পোয়াতে না হয় ।

অফিসের কর্মীরা সুযোগ খুঁজছিল ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে  সংঘর্ষের, মানসীকে মেটারনিটি লিভ না দেয়ায়, যেহেতু অফিসের রেকর্ডে মানসীর বিয়ে হয়নি, অফিসের অনুমতি না নিয়ে সারোগেট মাদার হতে রাজি হয়েছে, আর যেহেতু বাচ্চাটা তার নয়,  হরতাল চলল বেশ কয়েকদিন ।

হরতালের সুযোগ নিয়ে নারী-নারকটিক গ্যাঙের সদস্যরা নানা জায়গায় ম্যাটাডর ভ্যান হাঁকালো কিসিম কিসিম কচি-আধপাকা-পাকা যুবতীদের দেহরঙ্গের খেলা খেলতে, কখনও বা গঙ্গার বুকে পালতোলা নৌকোর ছইয়ের ফুল্লকুসুমিত জোছনায় ।

অতনু চক্রবর্তীকে, যে কিনা অফিসে মানসীর পরের ব্যাচের, সে যখন অফিসের কাজে ট্যুরে মিজোরাম যাচ্ছিল, তাকে একটা পছন্দের পারফিউম আনতে বলেছিল মানসী বর্মণ । হরতালের তাঁবুতে মানসীর বাড়ি যাবার পথনির্দেশ যোগাড় করে, পৌঁছে অতনু কলিং বেল টিপতে, কয়েক সেকেণ্ডে ফাঁক হয় চেনবাঁধা দরোজা । টাঙাইল শাড়িতে মানসী বর্মণ, উদাসীন বহিরাবয়ব, সর্বোতোমুখী পরিব্রাজক চাউনি, নিঃশব্দ উলুধ্বনির বলয়ে ঘেরা উচ্চারণ উন্মুখ শরীর । দরোজা খুলে মানসী, ‘আরে আপনি ; চিনতে পারিনি প্রথমটা, অনেকদিন দেখিনি তো, আসুন না ভেতরে আসুন না, বারমহল আর খাসমহল আমার এই দুঘরের ফ্ল্যাট । ওপরের ফ্ল্যাটে আগরওয়াল সায়েব থাকেন, বড় ছ্যাঁচড়া, তাই চেন লাগিয়ে রাখি ।’

অতনু আঁচ করেছিল অনেক লোকজন থাকবে মানসী বর্মণের বাসায়, তার সমর্থনে হরতাল হচ্ছে যখন, থাকবে ধর্মঘটের রেশ, একাধজন নেতা সাঙ্গপাঙ্গ সুদ্দু । পুরো ঘরটা আসবাব কার্পেট কিউরিওতে ঠাসা, সামলে চলাফেরার পরিসর । কোনও অজানা প্রতিপক্ষের দুঃখ ছেয়ে আছে যেন ।

মানসী : ( সোফায় বসতে বসতে ) আসুন না, ওখানটায় বসুন, জানলা দিয়ে ফুরফুরে হাওয়া আসে । ধ্যাৎ, আপনি আপনি বলতে পারছি না। তোমাকে তুমিই বলছি । তুমি তো বেশ ছোটো আমার চেয়ে, তাই না ? ( ঘাম না থাকা সত্ত্বেও আঁচল দিয়ে কপাল পুঁছে ) তুমি তো কোথাও যাও না, কারোর সঙ্গে মেশো না বলে বদনাম। উন্নাসিক, না । কৌতূহল হল বুঝি । ইউনিয়ন এমন পাকিয়ে ফেলেছে ব্যপারটা…

অতনু : ( মানসীর পাশে ধপ করে বসে, পকেট থেকে পারফিউম বের করে এগিয়ে দ্যায়; মানসী হাতে নিয়ে দ্যাখে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ) পুরো ঘটনাটা কেমন যেন অবিশ্বাস্য । ননীদার বিয়ে তো রূপকথার গল্প, তারপর আপনার এই দুঃসাহসী কাজ ।

মানসী : ( মৃদু হাসি ঠোঁটে খেলিয়ে, মাথা নাড়িয়ে আলগা খোঁপার ঢল পড়ে যেতে দ্যায় কাঁধে-পিঠে ) ও বাবা, বেশ গুছিয়ে কথা বলতে জানো । ( পারফিউমের ঢাকনি খুলে বাতাসে স্প্রে করে ) আর কী হবে এসবে ! আমার গা থেকেই এখন মৃগনাভির গন্ধ বেরোয় ( ডান হাতের তর্জনী রাখে বুকের ওপর ) ।

অতনু : ( ঝুঁকে পড়ে প্রায় বুকের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে শোঁকে ) হ্যাঁ, সত্যি তালশাঁসের মতন গন্ধ ।

মানসী : ( অতনু কাছাকাছি চলে আসায় বুক ঢিপঢিপ লুকোতে, অতনুর চুলে আঙুল বুলিয়ে ) দুর বোকা। তালশাঁসে কি মৃগনাভির গন্ধ হয় । মাস্ক পারফিউমের নাম শোনোনি ?

অতনু : ( আচমকা উদাসীন ) কে জানে , গন্ধটা পেলে টের পাবো । কিন্তু আপনি এত বড়ো ঝুঁকি নিলেন যে ? কিছু যদি হয় ? যদি কমপ্লিকেশন হয় ।

মানসী : ( খরস্রোতা ভঙ্গীতে ) কীইইই বা হবে । বরের সঙ্গে ছাড়াছাড়ি না হলে আমার ছেলেমেয়ে ক্লাস ফোর-ফাইভে পড়ত এখন । ( চিন্তিত ভ্রুযুগল ) ।

অতনু : ( মুখ ফসকে অথচ মানসীর দৃষ্টির গভীরে তাকিয়ে ) ছাড়লেন কেন ? সবাই বলে আপনিই তালাক দিয়েছেন ।

মানসী : ( গম্ভীর ) হ্যাঁ, আমিই ছেড়েছিলুম ( ক্ষুব্ধ ) হিজড়ে ছিল লোকটা ।

অতনু : ( বিস্মিত ) হিজড়ে ? হিজড়েরা বিয়ে করে নাকি ?

মানসী : ( পরাজিত হাসি ) সে হিজড়ে হতে যাবে কেন ? ছোটোবেলায় অসুখ-বিসুখ হয়েছিল কিছু, তাইতে অ্যালিগোস্পারমিয়া হয় । ডাক্তার দেখায়নি । অ্যাজোস্পারমিয়া হয়ে গিয়েছিল ।  ( উষ্মা ফুটে ওঠে ) অমন বর থাকাও যা, না থাকাও তা । পোকাই নেই তো ডিম ফোটাবে কী করে ?

অতনু : তাতে কী হয়েছে ? এখন যেমন করলেন, তখনও চুপিচুপি কারোর স্পার্ম নিয়ে নিতেন ।

মানসী ( অবাক ) কী বলছ কি তুমি ! এখন ব্যাপারটা আলাদা । বর থাকতে ওসব করে কখনও কোনো বউ ? ঢি ঢি পড়ে যেত । কেলেংকারির একশেষ । বরও মেনে নেবে কেন ? এখন যা করেছি তাতে কত গর্ব বলো ইউনিয়ানের । টাইমস অফ ইনডিয়াতে বাংলা অ্যাকাডেমির জীবনময় দত্ত আমাকে নিয়ে ফিচার লিখেছেন, তা জানো ?

অতনু : ছাড়াছাড়ির পর আবার বিয়ে করতে পারতেন ।

মানসী : কুমারী মেয়েরাই বসে রয়েছে, বিয়ে হয় না, ডিভোর্সিকে কে বিয়ে করবে ?

অতনু : কেন ? আমি !

মানসী : ( অতনুর চোখে চোখ রেখে কিছুক্ষণ হতবাক ) তুমি ? পাগল নাকি ? ভেবেচিন্তে বলছ ? আগে বলোনি তো কখনও ! ভালো করে কথাই বলতে না । বেশি পড়াশুনা করেছ বলে একটা ভয়-ভয় ভাবও ছিল । তোমার মা কেন মেনে নেবেন ?

অতনু : ভেবেচিন্তে বলছি না । আবেগেও বলছি না । মাও মেনে নেবে না জানি । কিছুকাল আগে হলে আমিও মেনে নিতুম না । কীই বা এসে যায় তাতেও ! কিছুই মানামানির দরকার হয় না মানুষের মতন থাকতে গেলে । জানেন প্রেম মায়া মমতা ভালোবাসা শ্রদ্ধা লোভ সবকিছুই ক্ষণস্হায়ী । মুহূর্তটা ধরুন, ফুরিয়ে গেলে ছেড়ে দিন ।

মানসী : ( বিস্ময় আর শ্রদ্ধা ) কত কথা বলতে পারো, সত্যি ।

অতনু : ( উঠে দাঁড়ায় । দরোজার দিকে এগোয় ) কথায় আর কাজে মিল ঘটে গেলে মানুষ আর মানুষ থাকে না ।

মানসী ( উঠে দাঁড়ায় । অতনুর হাত নিজের দুহাতে নিয়ে ) আবার এসো, অ্যাঁ, আসবে তো ? চা কফি কিচ্ছু খাওয়ালুম না তোমায় ।

অতনু : ( ম্লান হাসে । মাস ছয়েক আগে হলে মানসীর স্পর্শে বজ্রপাত ঘটে যেত তার স্নায়ুকেন্দ্রে )

অতনু চক্রবর্তী চলে যাবার পর তার দেহের গন্ধ ঘরের ভেতরে উড়ে বেড়াচ্ছিল । মানসী বর্মণ টের পেলো তার অরগ্যাজমের অনুভূতি আরম্ভ হয়েছে । দৌড়ে গিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লো, চোখ বুজে স্বামীর মুখ মনে আনার চেষ্টা করা সত্ত্বেও অতনুর মুখ ভেসে উঠতে লাগল । দেহ কেঁপে উঠল কয়েকবার, সত্যি অরগ্যাজম ঘটে গেল, জীবনে প্রথমবার, কেবল একজন পুরুষের দেহের গন্ধের প্রতিক্রিয়ায়, তা কি এই জন্য যে লোকটা দুশ্চরিত্র বলে প্রচারিত, আর মানসী তার লাম্পট্যের প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণে আক্রান্ত হলো । প্রেগনেন্ট তো ছিলই, অতনুকে শোবার ঘরে ডাক দিয়ে তার সঙ্গে একবার শুয়ে দেখা যেত হয়তো । শুলে, ফিসফিসিয়ে  জীবনের প্রকৃত অবস্হা বলা যেত ওকে, বিশ্বাস করতে অসুবিধা হতো না বলেই মনে হয়, তরল চরিত্রের যুবকদের কাছে বিশ্বাস জিনিসটা তেমন গুরুত্ব রাখে না । অফিসের শ্যামলী কর্মকার বলে, যৌনতা বাদ দিলে লম্পটদের চরিত্র আদারওয়াইজ ভালো হয় ।

ভ্রুণটা নির্দিষ্ট সময়ের আগে ভূমিষ্ঠ হলে, আর নষ্ট বলে প্রচারিত হবার পর,  মানসী ডেকে পাঠালো অতনু চক্রবর্তীকে ।

সন্ধ্যাবেলা মানসী বর্মণের ফ্ল্যাটের কলিং বেল বাজিয়ে মিনিট পাঁচেক দাঁড়িয়ে অপেক্ষার পর ফিরে যাবে কিনা ভাবছিল অতনু, দরোজা খুলতেই ধুপকাঠির গন্ধ আর মানসী, রোগাটে, চুলে ববছাঁট, ফ্রিলদেয়া হলুদ ব্লাউজ, তাঁতের ফিকে হলুদ শাড়ি । কই, দুঃখকষ্টের ছাপ, অফিসের বন্ধুরা বলেছিল, পেল না অতনু, চেহারায়, ঘরের আসবাবে ।

আরে, অতনু !

আমি ভাবলুম, এখনও ওপরতলার আগরওয়ালের নেকনজর এড়াতে খুলতে চাইছেন না ।

ও ব্যাটা বিদেয় হয়েছে এই বিলডিং থেকে । পুজো করছিলুম, তাই দেরি হল ।

পুজো ? আপনি পুজো করেন বুঝি ? জানতুম না ।

কেন ? ঠাকুর দেবতা মানো না ? বোসো না, দাঁড়িয়ে রইলে কেন ?

মা মারা যাবার পর ঠাকুর দেবতাদের তোরঙ্গে বন্দি করে রেখেছি । একদিন গিয়ে গঙ্গা ব্রিজ থেকে বিসর্জন দেবো ।

ছিঃ, অমন বলে না । কত বিপজ্জনক চাকরি, কখন কী হয় তার ঠিক আছে । ভগবানে বিশ্বাস রাখতে হয় ।

এসব কী এখানে ?

মানসীর ড্রইংরুমে সেন্টার টেবিলের ওপর রাখা ছিল তুলো, সাইকেল রিকশার ভেঁপুর মতন  লাগানো রবারের হর্ন কাচের গোল বালবে, স্টেনলেস স্টিলের বাটিতে কয়েক চামচ দুধ, গোলাপি হাতলের ডিম্বাকার আয়না । মানসী বর্মণের দপ করে রং পালটানো মুখশ্রী দেখে অতনু টের পেল প্রশ্নটা করা উচিত হয়নি । শাড়ির আঁচল সরায় মানসী । দুই বৃন্তকে ঘিরে ব্লাউজে ছড়িয়ে-পড়া দুধের ভিজে ছোপ দেখে অতনু নির্বাক । দেখিয়ে, মানসীর মনে হল, এর আগে অতনু এসে গন্ধের টোপ ফেলে চলে গিয়েছিল, তার পাল্টা টোপ ভিজে বুকের গন্ধ ।

কী করি, ডাক্তার বলেছে পাম্প করে বের করে দিতে, নইলে ক্যানসার হতে পারে, বলল মানসী । নিজেকে নিঃশব্দে বলল, আমার বর যদি এখন আসতো তাহলে তাকেই বলতুম মুখ দিয়ে টেনে বের করে দাও ।

রোজ পাম্প করতে হয় ?

দু-বেলা । দাঁড়াও চা বসাই । আগের বার না খেয়েই চলে গিসলে । টোস্ট খাবে ? চানাচুর ?

মানসী রান্নাঘরে ঢুকতেই, অতনু টুক করে খেয়ে ফেলল বাটির দুধ । ঠাণ্ডা কিন্তু মিষ্টি । সোঁদা আচ্ছন্ন করা গন্ধ, সারা শরীর জুড়ে শিহরণ খেলে যায় ।

অনভিপ্রেত আকস্মিকতায় থ, ও, মানসী, ‘পাগল., না মাথা খারাপ, ওঃ সত্যি, ওফ, কোন জগতের জীব তুমি ?’ ভেতরের ঘরে চলে যায় মানসী, আর বুঝতে পারে যে সেই অনুভূতিটা আবার ছড়িয়ে পড়ছে দেহে, কেঁপে কেঁপে অরগ্যাজম হয়ে গেল । বিছানায় শুয়ে পড়ল মানসী, নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে নাকি নিজের ওপর, কিংবা অন্য ধরণের প্রেমে পড়ে চলেছে, স্বামী তো রয়েছেই, তার সঙ্গে সময়-সুযোগ পেলেই সঙ্গম করে নিয়েছে, এই যুবক এসে কি ঘটিয়ে চলেছে ! গায়নাককে কি জিগ্যেস করবে ? নাঃ, গায়নাক কী ভাববে ! যেমন চলছে চলুক, পরে আবার ঘটলে দেখা যাবে ।

অসীম পোদ্দার অতনুদের লম্পট পিকনিকে নৌকো থেকে ঝাঁপিয়ে আত্মহত্যা করার আগে একটা ঢাউস ব্যাগ রেখে গেছে মানসীর কাছে, বলেছিল, এটা প্লিজ আপনার কাছে রাখুন, আমি বাইরে যাবো কিছুদিনের জন্য, বন্ধুদের তো জানেনই কাউকে বিশ্বাস করা যায় না ।

ব্যাগে তালা দেয়া ছিল না, বলে কৌতূহল মেটাতে মানসী একদিন জিপ খুলে দেখেছিল, একটা ডায়রিতে পেছনের দিকে পাতার পর পাতা মানসী বর্মণকে প্রেমপত্র লিখে গেছে অসীম পোদ্দার, আর সামনে দিকে লাল কালিতে পাতার পর পাতা লিখে রেখেছে ওঁ রামকৃষ্ণায় নমোঃ, পোর্টম্যাণ্টো ব্যাগের ভেতরে ডায়েরির সঙ্গে ঠেসে-ঠেসে ভরা দোমড়ানো-মোচড়ানো অজস্র  টাকা । নিশ্চয়ই অফিস থেকে চুরি করে রেখেছিল, সুযোগ পেয়ে গছিয়ে গেছে মানসীকে, আত্মহত্যা করার আগে । ব্যাগটা আপাতত অতনুর হাতে ধরিয়ে দেয়া যাক, ওর তো কেউ নেই বাড়িতে, মা মারা গিয়ে অব্দি ঝাড়া হাত-পা । মানসী নিজেকে বোঝালো যে অপ্রত্যাশিত অরগ্যাজমের আনন্দ দেবার জন্য অতনুকে তার দাম হিসাবে দিচ্ছি ব্যাগটা ; তারপর তো চুপচাপ বরের কাছে চলে যাব, যা করার করবে অতনু, খরচ করুক বা বিলি করুক ।

অতনুকে বসিয়ে রেখে, সেজে নেয় মানসী, লালপাড় গরদ, কপালে বিশাল লাল টিপ, হাতে টাকাঠাসা আর আসীম পোদ্দারের ডায়েরি রাখা ব্যাগটা এনে রাখে অতনুর পায়ের কাছে, ‘তালশাঁসের গন্ধ পাচ্ছ না’ জানতে চায় ।

না, চারিদিকে কেমন দুধ-দুধ গন্ধ । বাচ্চাটা নষ্ট হল আপনার মনখারাপ হয়নি ?

এখন জানি আমার পেটে বাচ্চা হতে পারে । তোমার কথা বল । অনেক কানাঘুষো শুনি ।

যা শোনেন সবই সত্যি ।

সত্যি ?

বোঝা গেল অমন সরাসরি সত্যি কথা আশা করেনি মানসী, তাই অন্য প্রসঙ্গে চলে যায়, ‘আমার এই ব্যাগটা তোমার কাছে রেখে দিও, অ্যাঁ, কিছু দরকারি কাগজপত্র আছে । আমি কিছুদিনের জন্য ওরসলিগঞ্জ যাচ্ছি।

ওয়ারিস আলি গঞ্জ ? ও তো মারাত্মক জায়গা, মুসহররা থাকে, সৎযুগ মানঝি, ঝাড়ুদার, কেয়ারটেকার রাঘবের পেছন-পেছন চাবি নিয়ে ঘুরত, ও তো ওখানকার । ইঁদুর পুড়িয়ে খায় ।

ইঁদুর পুড়িয়ে তো অনেক দেশেই খায়, চীনে আর থাইল্যাণ্ডের ভালো রেসিপি আছে ইঁদুর রান্নার, লোকে থাই ফুড বলতে অজ্ঞান, দেখেছো তো । ওতে আবার খারাপ কিসের ? আসলে ওরা একেবারে একঘরে হয়ে গেছে উঁচু জাতের লোকগুলোর চাপে । কুচ্ছিত অবস্হা ।

ওরা তো বিয়ে করে আর ছাড়ে । করেই না অনেক সময়ে, এমনিই থাকে । সৎযুগ মানঝির কতগুলো ছেলেমেয়ে ও নিজেই জানে না । কিন্তু আপনি অমন একটা জায়গায় যাচ্ছেনই বা কেন ?

আমার এক নিকটাত্মীয় ওখানকার গান্ধি আশ্রমে মুসহরদের উন্নতির জন্য কাজ করেন ।

তাই বুঝি ?

হ্যাঁ । দ্বারভাঙা কালী বাড়ি যাচ্ছি, তুমি যাবে ?

চলুন । ব্যাগটা তুলে নিল অতনু । ভাগ্যিস মোটর সাইকেল আনেনি । মোটর সাইকেলে মানসী কি বসতে চাইতো পেছনে । চাইতো না বোধহয় । মেয়েরা জানে যে ব্রেক কষলেই যে মহিলা পিলিয়নে বসে তার বুক চালকের পিঠে ধাক্কা খাবে ।

রিকশয় ঠেসাঠেসি, দুধের গন্ধ পায় অতনু । রাস্তায় এত গর্ত যে ছিটকে পড়তে হবে শক্ত করে ধরে না থাকলে । রাজেন্দ্রনগর, মেছুয়াটুলি, মাখানিয়াকুঁয়া হয়ে অশোক রাজপথে পড়ে । বাঁদিকে গলিতে ঢুকে বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বারভাঙ্গা বিলডিং, এর ভেতরে গঙ্গার তীরে মন্দির । দ্বারভাঙ্গা বিলডিঙে ঢোকার মুখে পথের দুপাশে চর্মরোগ যৌনরোগের হাসপাতাল-বিভাগ । খুঁটিতে বাঁধা গোরু-মোষ ।

ছাত্র ইউনিয়ানের নির্বাচনের সময়ে যে পাম গাছটায় বেঁধে অরবিন্দ অবস্হির মাথায় লোমনাশক লাগানো হয়েছিল, অতনু দেখল, গাছটা এখনও তেমনি ঠায় একা দাঁড়িয়ে, অরবিন্দ অবস্হির স্মৃতি নিয়ে ।

অন্ধকারে প্রাচীন মন্দির, কালচে ধরেছে দেয়ালে, পায়রা চামচিকে অবাধ, ফুল-পচা বেলপাতা শুকনো রেড়ির তেলের গন্ধ । মন্দিরে ঢোকার মুখে অতিগরিব ভিকিরি আর গরিব জুতোরক্ষক । জলভেজা পাথরের ঠাণ্ডা মেঝে । সিঁদুরমাখা হাড়িকাঠ, কখনও ছাগবলি হতো । পাকাদাড়ি আদুলগা বুড়োদের প্রায়ান্ধকার জটলা । ঝোঁপতোলা ঘোমটায় বউ ।

‘খুব জাগ্রত এই মন্দিরের ঘণ্টা, আপনা থেকে বাজে, রাত্তির আটটায়’, জানায় মানসী । অতনু উত্তর দেয় না । ও তখন দেখছিল, নিরন্তর পরিপূর্ণতায় উপচে-পড়া নর্দমা, কুলুঙ্গির মধ্যে শ্যাওলাপোশাক দেবতাদের দুর্বল ভঙ্গি, নিরীহমুখ দেবী-দেবতা, দালানে শুয়ে নিজের কুঁই কুঁই উপলব্ধিকে প্রকাশে মশগুল কুকুর । ‘খুব জাগ্রত, মাথায় জবাফুল রাখার পর যদি পড়ে না যায়, তাহলে মনস্কামনা পূর্ণ হয়’, মানসী বোঝাল ।

আপনার ফুল পড়ে যায়, না থাকে ? জিগ্যেস করল অতনু ।

পড়ে যাবে কেন ! থাকে । একবারও পড়েনি আজ অব্দি ।

নিজেকে নিজে অতনু বলছিল, বাচ্চাটার স্বাস্হ্যের জন্য কি মানত করেছিল মানসী বর্মণ ? কে জানে । জিগ্যেস করা ঠিক হবে না ।

অন্ধকারে প্রদীপ জ্বালিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, একদা দ্বারভাঙ্গা মহারাজের, এখন কারোরই নয়, কালী প্রতিমা। বোধহয় দুধে-চিনিতে চান করানো হয় তাই মাথার ওপরে আটকে থাকে ফুল । দর্শনার্থীরা একের পর এক ফুল চাপিয়ে, পুরুতকে টাকা দিয়ে, মনস্কামনা পুরো করার আগাম মিটিয়ে চলে যাচ্ছে । মানসী ব্লাউজ থেকে টাকা বের করে পুরুতকে দিল, হাত জোড় করে দেখে নিল প্রতিমার মাথার ওপর ফুল রয়েছে, পড়েনি, তার মানে ওনার বর ডাক্তার ঘোষ বহাল তবিয়তে আছেন, পুলিশ পেছু নেয়নি ।

তুমি চাও না কিছু । দেখ না । হয়তো ঝট করে বড়ো অফিসার হয়ে যাবে ।

একটা করকরে নতুন নোট দিল অতনু, পুরুত ফুল চাপালো হাসি মুখে, তক্ষুনি পড়ে গেল ফুলটা । মানসী গম্ভীর, পুরুত গম্ভীর। অতনু আবার একটা করকরে নতুন নোট দিল, পুরুত ঠিক মতন জায়গা বেছে ফুল রাখল যাতে না পড়ে, বেশ কিছুক্ষণ প্রতিমার মাথার চিনিমাখানো মুকুটে ফুল রেখে সরিয়ে নিল হাত, পড়ে গেল ফুলটা। দর্শকদের গুঞ্জন আরম্ভ হয়ে গেছে অতনুকে ঘিরে । তিন বার চড়ানো যায় জানাল এক ভক্তিমতী বউ । অতনু আবার দিল নতুন নোট, প্যাকেট থেকে বের করে । পুরুতের হাত থরথর । ফুল পড়ে গেল । ভিড় জমতে থাকে অতনুকে ঘিরে । মানসীর কাঁপতে-থাকা হাত ধরে বাইরে আসে অতনু,  জুতো পরে যে যার, হাঁটে গলিপথ ধরে দু-জনে চুপচাপ।

প্রাঞ্জল রাজপথে পোঁছে যে যার বাড়ি যাওয়াই, কোনও কথা না বলে, উচিত মনে করে । নভেলটি বুক ডিপোর বহুতল বাড়িটার কাছে রিকশায় তুলে দিল মানসীকে । রিকশয় চাপার আগে অব্দি, অতনুর পাশে দাঁড়িয়ে কাঁপছিল মানসী, নিয়ন্ত্রণহীন, এমনকি হ্যালোজেন আলোয় আবছা বেজে উঠছিল পায়ের মল ।

মানসী আক্রান্ত হয়েছিল অরগ্যাজমে, মন্দিরের ভেতরেই ওর শরীরে আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল ঢেউ, অতনুর পাশে দাঁড়িয়ে ঘটে গেল কেঁপে কেঁপে । অতনু নির্ঘাত ভাবছে কালী প্রতিমা ফুল নিলেন না বলে মানসীর অমন প্রতিক্রিয়া ; অতনুর সঙ্গে থাকলেই কেন এমন ঘটছে, দুশ্চিন্তায় মানসী, মন্দিরের মতন জায়গাতেও ঘটে গেল। গায়নাক দেখাবে, নাকি স্বামীকে বলবে ? কী করেই বা স্বামীকে বলবে যে একজন পরপুরুষের চৌম্বকক্ষেত্র মানসীকে পরপর যৌন আকর্ষনে বিধ্বস্ত করে দিয়েছে !

অতনু টের পায়নি মানসীর কাঁপুনির উৎস, ও বোধ করছিল এক গোপন আনন্দ, কালী প্রতিমাকে পরাজিত করার আনন্দ, মানসীর দৈববিশ্বাস টলিয়ে দেবার আহ্লাদ । ওর আনন্দ দেখে ছুটন্ত ট্রাকগুলোর চক্ষুস্হির । মানসী অমনভাবে না কাঁপলে, কী এক অচেনা থরথর, বাড়ি অব্দি পৌঁছে দিয়ে আসার প্রস্তাব দিত অতনু ।

মোটর সাইকেলের পিলিয়নে বসে অফিসের সহকর্মী অরিন্দম মুখোপাধ্যায়, যে হিউমান রিসোর্সে কাজ করে, অতনুর সঙ্গে অফিস ফেরতা ওর বাড়িতে এসেছিল দিনকতক পরে, দুচার ফুঁক চরস খাবার গোপন সদিচ্ছা নিয়ে । পাকানো সিগারেট তামাকে মিশেল দিয়ে টেনে ঘণ্টা দুয়েক এমন একনাগাড় হেসেছিল অরিন্দম যে, অতনুর মনে হচ্ছিল, আগে একবার অপ্রকৃতিস্হ অরিন্দমের আবার বুঝি ঘটল মগজের বেগড়বাঁই, ফের ফিরে যাবে মানসিক চিকিৎসালয়ে ।

পাশবালিশ টেনে, আয়েস করে ফুঁক মেরে অরিন্দম বলল, জানেন তো মানসী বর্মণ রিজাইন করে চলে গেছে ওরসলিগঞ্জের গান্ধি আশ্রমে কাজ করার জন্যে ?

চলে গেছে ? কবে ? জানি না তো !

আপনি তো এমন বলছেন যেন আপনার অনুমতি নিয়ে যাওয়া উচিত ছিল ।

হ্যাঁ, খবরটা শুনে ভেতরে ভেতরে খারাপ লাগল । কবে গেছে ?

গত মাসের পনেরো তারিখে ; উনি বলেছিলেন, জানাজানি না করতে ।

ওয়ারিস আলি গঞ্জ তো মারাত্মক জায়গা । মুসহররা থাকে । বিনোদ মিশ্রর নকশালদের গড় । একজন সুন্দরী আধুনিকা থাকবেন কী করে সেখানে গিয়ে ? ওরকম একটা জায়গায় গান্ধি আশ্রম করেটাই বা কী ?

আশ্রম পরিচালক ওনার স্বামী ।

স্বামী ? মানসী তো ডিভোর্সি ?

সব বানানো গল্প । লোক দেখানো । ওনার স্বামী এম বি বি এস ডাক্তার । ডাক্তারি করেন আর নিচু জাতের লোকেদের মধ্যে বিপ্লবের প্রচার । বাচ্চাটাও ওনারই । আর, গান্ধি আশ্রম বলে কিছুই নেই ওখানে । আছে ডাক্তারখানা । শুনেছি যে মাওবাদী কমিউনিস্ট সেন্টারের ক্রান্তিকারী কিষাণ সমিতির অফিস ওটা ।

আপনি কী করে এতসব জানলেন ?

উনি চলে যাবার পর জানতে পারলুম রসিক পাসওয়ানকে খুঁচিয়ে-খুঁচিয়ে ।

অতনুর মন খারাপ হয়ে গেল শুনে ।

মানসী বর্মণের জন্য মনকেমন করে অতনুর ; অন্যের স্ত্রীর জন্য মনকেমন । জানা তো ছিল না,  যে অন্যের স্ত্রী, কেন জানায়নি মানসী, কেন বুকের দুধ দেখিয়েছিল, কেন তালশাঁসের গন্ধ শুঁকিয়েছিল, কেন কালী মন্দিরে নিয়ে গিয়েছিল রিকশয় পাশে বসিয়ে, কেন তাহলে ব্যাগটা রাখতে দিয়েছিল, ওটা নিয়ে আমি কী করব, মনের গভীরে ফুঁপিয়ে ওঠে ও, অতনু ।

অফিসের কর্মীদের মাঝে খবর নেয়াদেয়া হয়, মুসহর ছেলেমেয়েদের অক্ষরজ্ঞান দিতে দেখা গেছে মানসী বর্মণকে, গয়া নওয়াদা অওরঙ্গাবাদ জেহানাবাদের গ্রামে, বন্দুকধারী যুবকেরা থাকে ওর পাহারায় ।

বছরখানেক পরে অফিসে একদিন কি হ্যাঙ্গাম, পাগলা ঘণ্টি । বিপদ আপদ ডাকাতি সামলাবার জন্য অফিসে নানা জায়গায় অ্যালার্ম ঘন্টির বোতাম লুকানো আছে । কাচের ঢাকনি ভেঙে বোতাম টিপলে সারা অট্টালিকা জুড়ে বাজতে থাকে পাগলা ঘণ্টি । ন-মাসে ছ-মাসে একবার করে মহড়া হয় । বহুক্ষণ বাজছিল বলে টের পাওয়া গেল আজকেরটা রিহার্সাল নয়, আসল । বাইরে বেরোবার আর ঢোকবার শাটার গেট দরোজা সব বন্ধ হয়ে গেল দ্রুত, তাক করে বসে গেল বন্দুকধারীরা পুরো বিল্ডিঙের বিভিন্ন ফ্লোরে, সুট-টাই পরা কর্তাদের হন-হন গট-গট, চেয়ার থেকে মুণ্ডু বার করে হাফ-কেরানি আর কেরানিদের কচাল । ঘণ্টাখানেক পরে অলক্লিয়ার ঘণ্টি বাজলে জানা যায় ব্যাপারটা । একজন অফিসার, যিনি জোড়াতালি দেয়া নোট পাস করেন এক এক করে, তিনি বাজিয়েছিলেন ।

ছেঁড়া জোড়াতালি নোটের কেরানিদের খাঁচার পেছনে ওই অফিসারের কেবিন, যিনি অ্যালার্ম বেল বাজিয়েছিলেন । পাবলিক আর নোটের দালালরা ছেঁড়াপচা নোটের লট দ্যায় কাউন্টারের কেরানিকে, সে নিজের খাতায়-কমপিউটারে এনট্রি করে অফিসারকে দেয় । তক্ষুনি বদলযোগ্য হলে অফিসার নোটের ওপর সই তারিখ দিয়ে পাঠায় হাফ-কেরানির কাউন্টারে । সেখানে টোকেন দেখিয়ে নতুন নোট নিয়ে যায় পাবলিক বা নোটের দালালরা ।

আপন মনে জোড়াতালি নোট পাস করছিলেন অফিসার । আচমকা একটা নোট হাতে নিয়ে তিনি স্তম্ভিত । নোটটা তিনি নিজেই বছরখানেক আগে ছাপ তারিখ সই দিয়ে পাস করেছিলেন । এটা তো শ্রেডারে শ্রেড হয়ে কাগজের মন্ড হয়ে যাবার কথা । বাজারে গেল কী ভাবে ! তার মানে নিয়ম মেনে নষ্ট করার প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি, মাঝ পথেই মেরে দিয়েছে কেউ; কিন্তু প্রক্রিয়াটা তো এমন যে, কোনো একজনের পক্ষে একাজ করা সম্ভব নয় ; নিশ্চয়ই একটা দল কাজ করছে, বাতিল নোট পাঠিয়ে দিচ্ছে বাইরে সার্কুলেশানে । কবে থেকে চলছে, কত নোট বাজারে বেরিয়ে গেছে, তার মানে তার তো কোনো হিসাব নেই । এক বছর আগের নোট, তার মাঝে কত এরকম নোট চলে গেছে সার্কুলেশানে । যে লোকটা নোটটা দিয়েছে, ধরতে হবে তাকেই । ভয়ে গলা শুকিয়ে যায় অফিসারের, কপালে বিনবিনিয়ে ঘাম । পেপারওয়েট তুলে সজোরে কাচঢাকা অ্যালার্মবেলের কোটরে মেরে বাজিয়ে দিলেন পাগলা ঘণ্টি । খদ্দেরটা নজর রেখেছিল, অফিসার নোটটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আলোয় পরখ করছেন দেখেই সে ব্যাটা হাওয়া ।

পুলিশে খবর দেয়া হল । ওই নোটটা যে কর্মীশেকলের মাঝ দিয়ে একের পর এক গেছে, তাদের নামঠিকানা যোগাড় করে ঢুঁ মারতে লাগল পুলিশ । কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হল । অতনু নিজেকে বলল, মানসী বর্মণ নিশ্চয়ই এই র‌্যাকেটের অংশ নয়, কিন্তু একটা ঢাউস ব্যাগ হুট করে দিয়ে উধাও হয়ে গেলো কেন! !

বাড়ি পৌঁছে খাটের তলা থেকে মানসী বর্মণের দেয়া ব্যাগটা টেনে, ধুলো ঝেড়ে, জিপ খুলতেই অতনু হতবাক, থ । ঠিক যা অনুমান করেছিল । অগোছালো নোটে ঠাসা, ছেঁড়াকাটা নোটের সঙ্গে বদলে নেয়া হয়েছে বা পিলফারেজ করা হয়েছে । ভেতরে অসীম পোদ্দারের ডায়রি, পাতার পর পাতা মানসী বর্মণকে লেখা প্রেমপত্র, যৌনরোগ বা যৌনস্বেচ্ছাচার থেকে পাওয়া রোগ আর সারবে না জানিয়েছে শেষ প্রেমপত্রে । ভাগ্যিস মানসী বর্মণ চলে গেছে, নয়তো এই নোটগুলো ওর বাড়িতে যদি পুলিশ পেতো কী কেলেঙ্কারি হতো !

ভোরবেলা, বাড়িতে দরোজায় তালা ঝুলিয়ে, ওয়ারিস আলি গঞ্জ যাবার বাস ধরার জন্য বেরিয়ে পড়ে অতনু, এক হাতে টাকাঠাসা ঢাউস ব্যাগ, কাঁধে ঝোলানো থলেতে এক সেট জামা কাপড় ।

ওয়ারিস আলি গঞ্জে বাস স্ট্যাণ্ডে বাঙ্গালি ডাক্টার গরিবোঁকা মাস্টারনি কোথায় থাকেন জিগ্যেস করতে একটা রিকশঅলা জানায় চলুন বাবু, আমি পৌঁছে দিচ্ছি, ওনারা তো দেওয়ি-দেওতা ।

রিকশ থেকে অতনু নামলে রিকশঅলাটা বলল, ওই যে ডাগডরবাবু, রোগি দেখছেন ।

এত রোগি ? এতো ছোটোখাটো জনসভার মতন, সবাই মাটিতে বসে ওনার কথা শুনছে, বলে ফেলল অতনু ।

জি হাঁ, দূর দূর থেকে আসে, ওষুধ দেন, টাকা-পয়সা নেন না ।

অতনু ঘরের ভেতরে ঢুকতেই ডাক্তার ওর হাতের ব্যাগ আর ওর মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, নিশ্চয়ই অতনু চক্রবর্তী, যিনি আমার দুধের বাটি থেকে চুমুক মেরে আমার স্ত্রীর গেলে-রাখা দুধ খেয়েছিলেন ?

আপ্যায়নে স্তম্ভিত অতনু, কী বলবে বুঝতে না পেরে চুপ করে রইল । কেমন স্ত্রী ? এই কথাগুলোও নিজের স্বামীকে বলেছে । শহুরে মানুষ দেখে একজন রোগি ভেতর থেকে একটা মোড়া এনে দিতে অতনু দেখল, ডাক্তারও মোড়ায় বসে আছে, টাক পড়া আরম্ভ হয়েছে, ফর্সা দোহারা চেহারা, টেবিলের ওপর নানা ওষুধের স্ট্রিপ ।

অতনু মোড়ায় বসার পর ডাক্তারের বলা পরের কথায় হতবাক হয়ে গেল, ডাক্তার বলল, মানসী চলে এলো দুটো কারণে, প্রথমত বুকের বইতে থাকা দুধ, আর দ্বিতীয়ত আপনার উপস্হিতিতে ওর তিনবার অটোম্যাটিক অরগ্যাজম হয়ে গিয়েছিল; বুক থেকে দুধ গালতে গালতে বিরক্ত হয়ে গিয়েছিল, এখানে আসার পর আমিই আমার স্ত্রীর দুধ পান করার সুযোগ পেলুম, রাইট ফ্রম সোর্স । আপনি এসে ভালো করলেন, আমরা তো অনুমান করেছিলাম যে আপনি আরও আগেই আসবেন ।

ডাক্তার বলা বজায় রাখলো, মানসী বলেছে আমায় যে আপনি ওর নতুন প্রেমিক আর ও-ও আপনার উপস্হিতির প্রতি এমনই আকর্ষিত হয়ে পড়েছিল যে চলে আসতে বাধ্য হল । মানসী রোঁদে বেরিয়েছে, ঘণ্টা দুয়েকে এসে পড়বে । আপনি ততক্ষণ ভেতরে গিয়ে স্নানটান করে নিন, লুঙ্গি-পায়জামা কিছু এনেছেন, না এনে থাকলে আমারই একটা পরে নিন, ভেতরে বারান্দায় তারে ঝুলছে । ওইটা টাকার ব্যাগ তো ? ভালোই করেছেন এনে, বেশ কয়েকজন রোগির যৎসামান্য দামি ওষুধ দরকার, অন্য কাজেও লাগবে । অসীম পোদ্দারের প্রেমিকের ডায়েরিটাও ওতে আছে? থাকুক কখনও সময় হলে পড়ব । মানসী তো ফুলশয্যার রাতে ক্লাস এইট থেকে টুয়েলভ পর্যন্ত যে তিনশো প্রেমপত্র পেয়েছিল সেগুলো পড়ার সুযোগ হয়নি আমার । অনেক কথা বলে ফেললাম । বাংলা বলার সুযোগ পেয়ে ছাড়তে চাইছিলাম না । যান যান, আপনি ভেতরে যান ।

 

দশ

মলয় রায়চৌধুরী ডাক্তার ঘোষকে প্রথমে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন জঙ্গলমহলে আদিবাসিদের কুঁড়হা পরবের দিন,  গা ঢাকা দেবার আর আদিবাসী রোগীদের সেবা করার জন্য, সেখানে মাওবাদীদের জমায়েতে ভিড়ে গিয়ে তাদের নির্দেশ মতো যাতে কাজ করতে পারে । সেখান থেকে চলে যেতে হলো ওয়ারিস আলি গঞ্জে, গান্ধি আশ্রমের নাম করে পার্টির কাজ করার জন্য, রোগীদের মধ্যে বিপ্লবের কথা প্রচারের জন্য । মানসী বর্মণ আর ডাক্তার দুজনে ভালোই ছিল ওয়ারিস আলি গঞ্জে, কিন্তু মলয় রায়চৌধুরী সেখানে পাঠিয়ে দিলেন অতনু চক্রবর্তীকে,  আর ডাক্তারের জীবন ওলোট-পালোট হয়ে গেল । চৈত্রসংক্রান্তির দিন জঙ্গলমহলের আদিবাসিরা মুড়ি বা ছোলার ছাতু আর আম দিয়ে কুঁড়হা উৎসব করে । আগে এই পরব কুরমি আর আদিবাসীরা করতো, ক্রমশ ঝাড়গ্রাম, মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, বীরভূম, উত্তর দিনাজপুর, ঝাড়খণ্ড রাজ্য, বিহার, উড়িষ্যা রাজ্যের জনজাতির মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে । কুরমি সম্প্রদায়ের মানুষরা সেই দিন সকালে গোবর গুলে ঘরের সব ঘরগুলোয় আর উঠোনে ন্যাতা দেন যাতে বাড়ি শুদ্ধ হয়ে ওঠে । মহিলারা বাড়ির দোরগোড়ায়, উঠোনে, তুলসীমঞ্চে, হরিমঞ্চে আলপনা দেন । বাড়ির কর্তা বা বড়ো বউ যিনি উপোসি থাকেন, তিনি চান করে কচি শালপাতার থালাতে আম, মুড়ি বা ছোলার ছাতু আর মহুয়া রেখে পূর্বপুরুষের আত্মার উদ্দেশ্যে তুলসীমঞ্চে প্রার্থনা করেন । পুজোর আগে যাবতীয় সমিধ বাড়িতে জড়ো করে রাখতে হয় । পয়লা মাঘ হলো আখান যাত্রা । অনেকে মানত করে পাঁঠা কিংবা মোরগ বলি দেন । পুজোর মাংস গ্রামের সবাইকে ভাগ করে দেয়া হয় । কুরমিরা মহুয়াকে নারী আর আমকে পুরুষ হিসাবে অনন্তকাল থেকে মান্যতা দিয়ে এসেছে । তারা বলে ‘আম ডাকে বান’ আর ‘মহুল ডাকে খরা’ । যে বছর আম বেশি হয় সে বছর প্রচুর বৃষ্টি পড়ার কথা । যে বছর মহুয়া বেশি হয় সে বছর বৃষ্টি কম হবার কথা । এখন আমও বেশি হয় না, মহুয়াও বেশি হয় না । বৃষ্টি আর খরা নিজের ইচ্ছেমতন আসে ।

ডাক্তার কুরমিদের কুঁড়হা উৎসব মনে রেখেছে, মহুয়ার মদ প্রথমবার খেয়ে বাঁধনছেঁড়া মাতলামো করেছিলো ।

ডাক্তারের মনে আছে পালামৌয়ের নরসিংহপুর পাথরা গ্রামের কথা, সেখানে গিয়েছিলো মলয় রায়চৌধুরীর প্ররোচনায়, দুর্ভিক্ষে আক্রান্ত গ্রামে, খরা, প্রচণ্ড গরম, জল নেই, খাবার নেই, মানুষেরা যে গাছের পাতা আর আমের আঁটি খেয়ে বাঁচার চেষ্টা করে তা কলকাতায় ছাত্র-রাজনীতি করার সময়ে ভাবতেও পারেনি । সরকার খিচুড়ি বিলি করতো, যার জন্যে ছেলে বুড়ো বউ সবাই হাতের তলায় হাত পেতে খিচুড়ি নিয়ে খেতো, ব্যাস এক হাতা, তার চেয়ে বেশি খিচুড়ি যোগাতে পারতো না সরকার । গ্রামের ডিসপেনসারিতে কোনো ওষুধ ছিল না, সেখানেই শুতো ডাক্তার । অবিচারের বিরুদ্ধে ক্ষেপে গেলো ডাক্তার । মানসীকেও নিজের বিশ্বাসে চুবিয়ে ফেলতে সময় লাগলো না ।

তারপর থেকে ডাক্তার কেবল একবেলা খায়, রাতে খায় না কিচ্ছু ।

১৯২৯ সালে লেখা মহেন্দ্রনাথ দত্তের ‘কলিকাতার পুরাতন কাহিনী’ বইয়ের কথাগুলো মনে পড়ে গেল ডাক্তার ঘোষের । উনি লিখেছিলেন, “তখনকার দিনে অধিকাংশ লোক ভাত খাইত । সহরে লোকেরা দিনে আড়াই পোয়া চালের ভাত, রাত্রে আধসের চাল ও তদোপযুক্ত তরকারি । অনেক লোকের বাযিতে গোরু ছিল এইজন্য দুধও পাওয়া যাইত। না হইলে গয়লাদের বাড়ি হইতে দুধ আসিত, সেও সস্তা । কলকাতার দক্ষিণদেশ বা বর্ধমান হইতে আমাদের বাটীতে যখন লোকজন আসিত, তাহারা অধিক পরিমাণে আহার করিত । দুপুরবেলা তিন পোয়া হইতে এক সের চালের ভাত খাইত এবং রাত্রে কিছু কম ।”

আজ, কেন ওনার মনে হচ্ছে যে অবিচারের বিরোধিতা করতে গিয়ে অবিচারের আশ্রয় নেয়া ছাড়া উপায় ছিল না । আজ কেন মনে হচ্ছে মানসীকে ভুল পথে এনে মানসীকে ছাড়তে না পেরে নিজের ভেতরে নিজেই হারিয়ে গেছেন ।

মনে পড়ে যাচ্ছে, মেক্সিকো অলিম্পিকে মার্কিন কৃষ্ণাঙ্গ প্রতিযোগীদের ব্ল্যাক পাওয়ার স্যালিউট ।

মনে পড়ে যাচ্ছে ভিয়েৎনামে ন্যাশানাল লিবারেশান ফ্রন্টের টেট আক্রমণ-প্রণালী ।

মনে পড়ে যাচ্ছে চেকোসলোভাকিয়ার প্রাগ বসন্তকাল ।

মনে পড়ে যাচ্ছে প্যারিসের পথে-পথে ১৯৬৮ সালের মে মাসে ছাত্রদের উথ্থান ।

মনে পড়ে যাচ্ছে ১৯৬৪ সালে কলকাতায় হাংরি আন্দোলনকারীদের হাতে হাতকড়া কোমরে দড়ি পরিয়ে রাস্তায় হাঁটানো।

মনে পড়ে যাচ্ছে ১৯৭১ সালের আগস্টে বরানগরে শয়ে-শয়ে যুবহত্যা, ঠেলায় গাদাগাদি চাপিয়ে গঙ্গায় ।

মনে পড়ে যাচ্ছে লাতিন আমেরিকা, দক্ষিণ আফ্রিকা, প্যালেসটাইন, ভিয়েৎনাম ।

মনে পড়ে যাচ্ছে ঈশ্বরের মৃত্যু ।

মানসী এখনও ঈশ্বরে বিশ্বাস ছাড়তে পারেনি, জানে অতনু ওর মায়ের দেবী-দেবতাকে থলেতে ভরে গঙ্গার জলে ফেলে দিয়েছিল ।

 

এগারো

 

কী করছ কী ? নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, আঃ, ছাড়ো ।

মনে করুন আপনি আমাকে জন্ম দিচ্ছেন, তাই কষ্ট হচ্ছে, মনে করুন, মনে করুন, সেই সময়ের যন্ত্রণা, আপনি কি মনে করেন আমার জন্মাবার কোনো যন্ত্রণা হয়নি, কষ্ট হয়নি ?

আর ইউ ম্যাড ? কী করছ কী, নামো নামো, আমি তোমার মা, কী করছ কী, অমিত, এত জোরে জড়িয়ে ধোরো না, ছাড়ো ছাড়ো, মুখ সরাও, দাঁতও মাজো না কখনও, নোংরা জানোয়ার কোথাকার ।

জানি আপনি আমার মা, কিন্তু জানি না আমার বাবা কে, অতনু না ডাক্তার ঘোষ ? দুজনের সঙ্গেই তো শুতেন এক সময়, তাই না ? এখন না হয় আমার সঙ্গেই শুলেন ।

ছাড়ো, ওফ, ছাড়ো, লুম্পেন একটা ।

কেন ছাড়বো, ওনাদের দুজনকে তো আপনার দুধ খাইয়ে ছিলেন, যা আমার প্রাপ্য ছিল ।

কী করছ কী ?

আপনার দুধ খেতে চেষ্টা করছি ।

দুধ থাকে নাকি এই বয়সে, ইউ ইডিয়ট, নেমে পড়ো, ছাড়ো, ছাড়ো, কখন আমার বিছানায় চলে এসেছো! আরে কী করছ কী !

দুধ নেই জানি, তার বদলে আপনার ঘামই খাচ্ছি, গন্ধ খাচ্ছি, আপনার সঙ্গে আমার সম্পর্ককে গড়ে তুলতে চাইছি । মিষ্টি দুধের বদলে নোনতা ঘাম, আপনার শরীরের জোনাকিদের মুখে পুরে নিজেকে আগুনে পুড়িয়ে নিতে চাইছি ।

পাগল নাকি ? বন্ধ করো, ওফ, নাম, নাম আমার ওপর থেকে,  নাম, তোকে এখানে আনাই উচিত হয়নি। মুখের ওপর থেকে মুখ সরা ।

মারুন চড় । যাক তুইতোকারিতে তো এলেন, এতদিন ছিলাম আপনার সঙ্গে, যেই নিশ্বাস বন্ধ হতে লেগেছে তখন বুঝতে পারলেন যে তুইতোকারি করতে হবে ।

অমিত, তুমি জানোয়ারের কাজ বন্ধ করো, ছাড়ো আমায়, ছাড়ো ।

ছাড়ব না ।

কী করছ, ইউ স্কাউন্ড্রেল, কী করার চেষ্টা করছ ?

আপনার তৃতীয় প্রেমিক হবার চেষ্টা করছি । মুখ বন্ধ রাখুন । নিন প্রেম, নিন প্রেম,  ক্রান্তি, ক্রান্তি, ক্রান্তি…. ।

কষ্ট হচ্ছে, কষ্ট হচ্ছে, ব্যথা করছে । বয়স হয়ে গেছে, এই বয়সে হয় না ওসব, গেট ডাউন, ইউ স্কাউণ্ড্রেল কী চাই তোমার ?

আপনাকে চাই । জানতে চাই, আমার বাবা কে ?

তুমি অতনুর ছেলে নও , তুমি ডাক্তারের ছেলে ।

হ্যাঁ, কাঁদুন, আমি চাই কষ্ট হোক, নিজের কাছে অপমানিত বোধ করুন, নিজের সম্পর্কে আপনার ঘেন্না ধরে যাক, যেমন আমার নিজের জীবনে ঘেন্না ধরে গেছে । যা চাই তা্-ই তো নেবার জন্য আপনার বুকের ওপর চেপেছিলুম । বালিশের তলায় কী খুঁজছেন ? সায়লেন্সার-লাগানো রিভলভার ? আমার দেয়া  টাকায় কিনেছিলেন, এখন আমায় মারবার জন্য চালাতে চান, তাই না ? সেটা আমি আগেই সরিয়ে রেখেছি, জানি আপনার কাছে আপনি ছাড়া আর কারোর কোনো দাম নেই । ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন, শুনেছি, ডাক্তার ঘোষ বলেছেন আমায়, দেখুন ঈশ্বর এখন আপনাকে বাঁচাতে আসছে না । বন্দুকও আপনাকে বাঁচাতে আসছে না । চুলোয় যাক আপনার ক্রান্তি, এটা আমার বদলা নেবার ক্রান্তি । আপনি চেঁচাতেও পারবেন না, জানি, আপনার ক্রান্তিকারিরা জড়ো হলে লজ্জায় বেঁচে থাকতে পারবেন না ।

কী করলে কী তুমি, ছি ছি ছি ছি ।

ওই ছিছি নিয়ে আমি এতকাল বেঁচে ছিলুম, এবারে আপনি আমার সারা জীবনে জড়ো করা ছিছিক্কার নিয়ে বাঁচুন । খাট থেকে উঠবেন না, চুপ করে শুয়ে থাকুন, নয়তো মরবেন, এই দেখুন সায়লেন্সার লাগানো আপনার ক্রান্তির যন্তর, আমারই দেয়া টাকায় কেনা ।

মানসী বর্মণের তেরপলের বাইরে বেরিয়ে অমিত দেখল দূরে অন্ধকারে কনকদুর্গা  দাঁড়িয়ে ; যন্তরটা মানসী বর্মণের তেরপলের কাছে ফেলে দিলো ।

 

বারো

কনকদুর্গা বললো, আই অ্যাম প্রেগন্যান্ট উইথ ইওর চাইল্ড, বাট আই ডোন্ট ওয়ান্ট হিম টো গ্রো আপ এ কিলার লাইক মি, উই আর গোইং টু পাটনা, টু গেট লস্ট ইন দি ক্রাউড ।

অমিত বলল, ঠিক আছে, ইংরিজি ঝাড়িসনি , ভাল্লাগে না শুনতে, মুখস্ত করতে করতে জান হালকান হয়ে গেছে এই ক্রান্তিকারি ঢকোসলাবাজিতে,  টাকার বাণ্ডিলটা রেখে নিয়েছি ; অতনু চক্রবর্তীকে মাথায় নল ঠেকিয়ে উড়িয়ে দিয়েছি । মানসী বর্মণ বেঁচে থাকুক ক্রান্তি করার জন্য, সারা জীবন ভুগুক ছেলেকে অন্যের বাড়িতে ফেলে আসার পাপে, এবার ঘেন্নায় মরে যাবে কেঁদে-কেঁদে, পাগল হয়ে গেলে ভালো হয় । জানাজানি হবার আগে অনেক দূরে চলে যেতে হবে, পাটনায় চলে যাবো, ওখানকার গরিবদের বস্তিগুলো সব আমার জানা ।

হ্যাঁ, ঝিয়ের কাজ করে চালাবো যতোদিন পারি, তুইও পারলে সাইকেল রিকশা চালিয়ে রোজগার করিস । আমি তোর চেয়ে পনেরো বছরের বড়ো ; পনেরো বছর বয়সে বিয়ে হলে তোর বয়সের ছেলে হতো। কোথাও কেউ জিগ্যেস করলে আমি বলবো তুই আমার ছেলে । তুইও তাদের সামনে মা বলে ডাকবি ।

কতোবার যে জীবনে নকল মায়ের পাল্লায় পড়তে হবে কে জানে ।

চল, পালাবার শর্টকাট আমি জানি ।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

Posted in ছন্নছাড়া সময়ের গল্প | Tagged , | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

নেক্রোপুরুষ : মলয় রায়চৌধুরী

        আমি এতোকাল যা করেছি, তা আমার নিজস্ব আর্ট ফর্ম, আমার সৃষ্টিচেতনার বহিঃপ্রকাশ ।

আমি মেয়েদের শবের সঙ্গে শুতে ভালোবাসি ; এটাই আমার জীবনের উদ্দেশ্য । [১]

         তলপেটে বারবার ছোরা ঢুকিয়ে আপনি আমার গু-মুতকে রক্তের সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছেন, উচিত কাজই করেছেন, জানি ডাক্তাররা আমাকে বাঁচাতে পারবে না, তারা চেষ্টা চালালেও, পুলিশ চাইবে না যে আমি বেঁচে থাকি, আপনি এখন রেকর্ড করতে চাইছেন আমার জীবনের ঘটনাগুলো, কেমন করে আমি এই শিল্পবোধে আক্রান্ত হলুম  । করুন, করুন । তবে আপনি যদি আমার কথাগুলো ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করে পড়েন, তাহলে ভালো হয় ।

আমার ইংরেজি, শুনে টের পাচ্ছেন নিশ্চয়ই, ইনডিয়ান ইংলিশ নয়, ইস্ট আফ্রিকান ইংলিশ । মাঝে-মাঝে আমি শ্বাস নেবার জন্য জিরিয়ে নেবো ; আপনি ট্র্যান্সক্রিপ্ট নেবার সময়ে ঘটনাগুলোর ঠিকমতন সংযোগ তৈরি করে নেবেন ।

আপনি জানতে চেয়েছিলেন আমি কোথাকার লোক । বলেছিলুম, অখণ্ড বাংলার । তবু আপনি জোর দিয়ে জানতে চেয়েছিলেন আমি ‘অ্যাকচুয়ালি’ কোথাকার । কেউ কি বলতে পারে সে ‘অ্যাকচুয়ালি’ কোথাকার? বাবার কাছে শুনেছিলুম, আমাদের আদি বাড়ি ছিল চিটাগঙে । ইনডিয়ার পার্টিশানের পর কেউ কি চতুর্থ প্রজন্মে পৌঁছে বলতে পারেন যে তিনি ‘অ্যাকচুয়ালি’ চিটাগঙের বা বরিশালের বা ঢাকার বা কলকাতার বা দিল্লির ?

         হ্যাঁ, আমি মেয়েদের শবের সঙ্গে প্রেম করে পরমসন্তোষ পাই, নাঃ, পেতুম বলা ভালো । মেয়েদের শব মাত্রেই, হোয়াট ইউ কল, সচ্চিদানন্দময়ী, মানে যাদের বুকের বাইরে আর ভেতরে লেজার আলো কিং কোবরার মতন কুণ্ডলি পাকিয়ে ওৎ পেতে থাকে, আচমকা বেরিয়ে জাপটে ধরে, আলোয় আলো করে দ্যায় অস্তিত্বকে ।

এই প্রেমকে  বেআইনি ঘোষণা করার মানে হয় না ; যে মারা গেছে তার নির্বাক অনুমতি নিয়েই তো তার সঙ্গে প্রেম করি, করেছি, কেননা মৃত্যু মানেই তো কাম, প্রতিটি নারীর শবই চিরঘুমন্ত সুন্দরী, স্বপ্নের মৌতাতে ভেসে আসে, ডানা মেলে, তাকে দেখতে সাধারণের চোখে ভালো হোক বা না হোক, ওনারা তো নিজের উইলে লিখে যান না যে মৃত্যুর পর কারোর সঙ্গে প্রেম করবেন না । আর নেহাৎই যদি কারোর মনে হয়, যার সঙ্গে প্রেম করতে চলেছেন তার মুখ কুৎসিত, তাহলে তাকে সুন্দরীর স্বপ্ন পরিয়ে দিতে পারেন, বহু সুন্দরীর মুখ আপনারা পেয়ে যাবেন পোস্টারে, বিজ্ঞাপনে, চকচকে পত্রিকার পাতায়, চোখ বুজে ইচ্ছামতন তা থেকে নিজের কল্পনা বেছে নিতে পারেন ।

কুয়াশায় মোড়া সন্ধ্যা কি বেআইনি, ধানখেতের ওপর দিয়ে বেগে পেছু নেয়া  বৃষ্টি কি বেআইনি, শিমুলের কৌটো ফেটে উড়তে থাকা রোঁয়া কি বেআইনি, আঙুরঝুমকোয় লুকিয়ে থাকা মদ কি বেআইনি, সূর্যকে ঢেকে ফেলা গ্রহণের কালো কি বেআইনি, সমুদ্রের নীলে ধনুকের মতন তিমির নাচ কি বেআইনি, হরিণকে লক্ষ্য করে উড়ন্ত গতিতে ছুটতে থাকা চিতাবাঘ কি বেআইনি, মরুভূমিতে অতিদূরে ভেসে ওঠা মরিচিকার টলটলে জল আর খেজুরগাছের সবুজ সারি কি বেআইনি ! নয়তো ? তবে ? [২]

বুঝলেন তো ? আমি মৃত্যুর কালো নোংরা বোটকা বাসি মুখের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে চেঁচাই, মানে চেঁচাতুম, ‘ফেরত নিচ্ছি, ফেরত নিচ্ছি, ফেরত নিচ্ছি’; আমার চিৎকার শুনে মৃত্যু কালোকে ফর্সা করে তোলে, বোটকাকে সুগন্ধী করে তোলে, বাসিকে তরতাজা চনমনে করে তোলে । তার জন্য সাহস দরকার, ক্ষমতার সাহস, যে ক্ষমতা থাকে শরীরে, এই যে এইখানে, চেয়ে দেখুন, এইখানে ; কাপুরুষদের অমন সাহস থাকে না, কেননা তারা মতান্ধ, তারা নীতিবাদী, তারা আদর্শবাদী, তারা মৌলবাদী, তারা ফাঁকিবাজ, তারা কেবল অন্যের মগজে সুড়সুড়ি দেবার তালে থাকে । ক্ষমতা হল জ্ঞান, জৈব রসায়ন, ধৈর্য ধরে থাকতে হবে।

রাজনৈতিক দলরা দেশে দেশে ক্ষমতা চায় কেন ? ক্ষমতাকে সেই দলের কয়েকজন, বা কেবল একজন, কুক্ষিগত করতে চায় কেন ? অন্যের, মানে জনসাধারণের, ভালোর জন্য নিশ্চয়ই নয় । একবার কেউ ক্ষমতা দখল করলে জোঁকের মতন লেগে থাকে, রক্ত চুষে-চুষে খায় ; তারা ক্ষমতা প্রয়োগ করে কোথাও পৌঁছোতে চায় না, কেননা  ক্ষমতাই তাদের লক্ষ্য । বুঝলেন তো ? মৃত্যুর সঙ্গে যদি ক্ষমতাকে একাকার করে দেয়া যায়, তার চেয়ে কাম্য আর কিছু হতে পারে না । ইতিহাস ঘাঁটলেই টের পাবেন একনায়করা মৃত্যুকে কতো অনায়াসে ক্ষমতার সঙ্গে মিলিয়ে-মিশিয়ে শাসন করে গেছে বছরের পর বছর, আর জনসাধারণ তখন পিণ্ড পিণ্ড শব, অবাধে প্রতিরোধহীন প্রেম করে গেছে ক্ষমতাধরের সাথে, তার নামে স্লোগান দিয়েছে, পতাকা উড়িয়েছে । [৩]

হ্যাঁ, আমি মেয়েদের শবের সঙ্গে প্রেম করতে ভালোবাসি ; বারবার ভুল করে ফেলছি, মরে যাবো কিছু দিনের মধ্যেই জেনেও অভ্যাস ছাড়তে পারছি না । ভালোবাসতুম, ভালোবাসতুম । মেয়েমানুষের শব মাত্রেই মহানন্দময়ী, মানে রিডিমিং, অস্তিত্বের উত্তরণ ঘটায় ।

একনায়কদের দেখবেন, তারা নিজেদের ক্ষমতার প্রতি সৎ, জীবনকে সমুদ্রের মতন সাগরে সাগরে বয়ে যেতে দেয় । একনায়কের জন্য, দলের জন্য, সম্প্রদায়ের জন্য,  বিশেষ দর্শনের উদ্দেশে, যারা মরে যাবার জন্য সব সময় এক পা এগিয়ে, তারা ঘৃণ্য, তারাই ঘৃণ্য, ঘৃণ্য, ঘৃণ্য । দেখছেন তো সাদ্দাম হোসেনকে সরাবার পর সে দেশে কী ঘটছে, গাদ্দাফিকে সরাবার পর লিবিয়ায় কী ঘটছে, আফগানিস্তানে, সিরিয়ায় কী ঘটে চলেছে ! ভালোবাসা সে দেশগুলোয় বালির ঝড়ের সঙ্গে উড়ে চলে গেছে । এতো খুনোখুনি, যদি তারা নারীর শবকেও ভালোবাসা দিত, তাদের দেশে শান্তি নেমে আসতো । তারা তো নারীকে সম্ভ্রম জানাতেও কুন্ঠিত, আফগানিস্তানে ঢিল মেরে-মেরে যুবতীদের শাস্তি দেয়া হচ্ছে আজও, নারীর মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করা হচ্ছে । দেখে, আমার ইচ্ছে করেছে আমি ওই বোরখা-ঢাকা নারীদের শবদেহকে জড়িয়ে কাঁদি।

আমি কোনো তর্কেই ঘৃণার যোগ্য নই । আমি ভালোবাসাকে মাংসের গেঁতো নোংরামি থেকে শিল্পের পর্যায়ে উন্নীত করেছি ।

দেহের ক্ষমতা অবাধ, নিজেকে জানতে হলে সেই ক্ষমতার অপব্যবহার করতেই হবে, ক্ষমতা কেউ দেয় না, নিজের ভেতর ডুবে তুলে আনতে হয় । ক্ষমতা থাকলে ভয়ও ভয়কে ভয় পায় । কোনো একজন মহাত্মা  বলে গেছেন যে, যেদিন প্রেমের ক্ষমতা কাবু করতে পারবে ক্ষমতার প্রেমকে, সেদিন পৃথিবীতে নেমে আসবে শান্তি । আমি প্রেমের ক্ষমতা আর ক্ষমতার প্রেমকে মৃত্যুর বিন্দুতে মেলাতে পেরে শান্তির শীতল স্বর্গ গড়ে তুলতুম । প্রতিটি শবের সঙ্গে প্রেম করার সময় আমি নিজের কথা একেবারে ভুলে যেতুম, নির্বাকের সঙ্গে নির্বাক আলাপ দিয়ে শুরু করতুম, তার দুঃখযন্ত্রণায় তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতুম, প্রেম তো নির্বাক চিৎকার, যার সঙ্গে প্রেম করতুম, সে হাসিমুখে শুনে যেতো । সত্যকার ভালোবাসা কেবল মেয়েমানুষের শবের সঙ্গে সম্ভব । কোনো নারী যদি সত্যকার ভালোবাসা পেতে চায় তাহলে তাকেও পুরুষের শবের সঙ্গে প্রেম করতে হবে, অন্যথায় তাদের মাঝে যা ঘটবে তা ধর্ষণের নামান্তর ।

শবের দুঃখে আমি কষ্ট পাই, পেতুম , শবের যন্ত্রণায় আমি যন্ত্রণা ভোগ করি, করতুম ।

শরীর হলো সাম্রাজ্য , তার যাবতীয় গোপনতা অতিপবিত্র, সে চায় সত্যকে চূড়ান্তভাবে জয় করতে, শরীরের আনন্দ-আহ্লাদকে সিরিয়াসলি নিতে হবে, সিরিয়াসলি মানে জানেন তো, সে তো জানবেনই, আপনি ইংরেজি সাহিত্যে গ্র্যাজুয়েট, বলেছে পুলিশের অ্যাসিসট্যান্ট কমিশনার, যে আপনি বিদূষী, অনেক কিছুই জানবেন, তবে আপনি নাকি কোকেন জাতীয় রাসায়নিক মাদকও নেন, উত্তরাধুনিক জীবনযাপন করেন, আর সেই সূত্রেই এই ছেলেগুলোর সঙ্গে আপনার আলাপ ।

আমি ছোঁড়া চারটেকে বারবার বলেছি, বলতুম, নেশাটা একটু কম কর তোরা, নয়তো নিজেরাও ডুববি, আমাকেও ডোবাবি । শেষ পর্যন্ত তাই হল । ওদের কাছ থেকে আপনি আমার হদিশ পেলেন ।

আপনার দিদি আপনার মাদক নেবার অভ্যাস ছাড়াতে না পেরেই আত্মহত্যা করেছিলেন, তাও বলেছে পুলিশের ইনভেসটিগেটিং অফিসার । দিদিই আপনার অভিভাবক ছিলেন । আপনার উত্তরাধুনিক জীবনযাত্রা, রেভ পার্টিতে গিয়ে সারারাত ধুন্ধুমার নাচ, অচেনা-অজানাদের সঙ্গে ডিসকোয় মাতাল হওয়া, সপ্তাহান্তের উল্লাসে মাদকে আচ্ছন্ন হয়ে মাঝরাতে বাড়ি ফেরা, অনুমোদন করেননি আপনার দিদি । আপনি ওনার নিষেধ শোনা প্রয়োজন মনে করেননি, উঁচু পদের চাকরিতে প্রচুর রোজগার করেন আর ব্যয় করেন, শুনেছি আপনার গল্প।

জানি, ওদের, ছেলে চারটেকে,  আপনি নিজের সঙ্গে এনেছেন পুলিশকে অনুরোধ করে, আমার জীবনের ঘটনা যাতে ওরাও শোনে, ক্লাস টেন পর্যন্ত পড়ে ছেড়ে দিয়েছিল, আমার এই ইংরেজি আত্মজীবনী ওরাও বুঝতে পারছে নিশ্চয়ই । ওই তো মাথা নাড়ছে, বুঝতে পারছে দেখছি ।

আপনি অভিযোগ দায়ের করেছেন যে আমি নেকরোফাইল, ডাক্তাররাও বলেছে আমি নেকরোফিলিয়া রোগে ভুগি, পুলিশও দণ্ড সংহিতার সেই ধারায় আমাকে গ্রেপ্তার করে, হাসপাতালে চারজন সশস্ত্র পুলিশেকে এই ঘরে বসিয়েছে । কিন্তু বিস্বাস করুন, আমি নেকরোফাইল নই, নেকরোফিলিয়া নামে কোনো মানসিক রোগে ভুগি না, ইনসমনিয়া বা ডিমেনশিয়াতেও ভুগি না ।

আমি প্রেমের শিল্পবোধে ভুগি, নারীদেহের সঙ্গে প্রেমের শিল্পবোধে । প্রেম করা তো বেআইনি নয় । তাহলে কেন আপনি আমাকে ঘৃণার পাত্র বলে মনে করলেন ! ভুল, ভুল, ভুল, আপনাদের সবায়ের ভুল । যুদ্ধক্ষেত্রের মৃত্যু-মহামারীর মাঝে, গৃহযুদ্ধের খুনোখুনির মাঝেও, আমি খুঁজে পেয়েছি প্রেমের শান্তি, নারীদেহের শবকে জড়িয়ে, সারারাত জেগে থেকে । [৪]

মৃত্যু আমাকে ভালোবাসে, বলুন ঠিক কি না, নয়তো হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকব কেন ! আমি মৃত্যুকে ভালোবাসি, মৃতার শরীরকে ভালোবাসি, মৃত্যুর ঐন্দ্রজালিক গন্ধকে ভালোবাসি,আর তো কখনও ভালোবাসতে পারব না তাদের, তারাও, কৃষ্ণাঙ্গী শবদেহরাও, আমাকে ভালোবাসতো, তাই চোখ বন্ধ করে থাকতো, আমি চোখের পাতায় চুমু খেতুম, এই ভালোবাসা ছিল শর্তহীন, প্রেম করার সময়ে আমি সেই নারীদেহের বয়ফ্রেণ্ড, প্রেমিক, স্বামী, বন্ধু, অভিভাবক, তারা তা  জানে, আই মিন জানতো, জানতো কিনা বলুন, শবদেহ তো জানে যে ও মাত্র কয়েকদিনের অতিথি, দিনকতক পরেই কুৎসিত হয়ে যাবে, পচতে থাকবে, গায়ে পোকা ধরবে, হাড় চুণ হয়ে যাবে, বা ছাই হয়ে হাওয়ায় মিশে যাবে।

চোখের পাতায় বারবার চুমু খেয়ে আমি অনেকে শবদেহের চোখের পাতা মেলে ধরতে শিখিয়েছি, তারা অতিপরিচিতের মতন আমার দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে থাকতো, ধন্যবাদ জানাতো অপলক ।[৫]

মৃত্যুর পরের দিনও কেবল ঠোঁটেই থাকে বিশুদ্ধতার জীবাণু ; শরীরের সবচেয়ে অনাবৃত এরোগেনাস এলাকা হল মানুষের ঠোঁট, যেখানে গিয়ে কেন্দ্রিত অজস্র স্নায়ুর শেষবিন্দু, সেখানে সামান্য স্পর্শ আমাদের মস্তিষ্কে তথ্যের প্রপাত গড়ে তোলে, ক্যানভাসে হাজার রঙের তুলির ছোঁয়ার মতন । চুমুর ম্যাজিকের মাধ্যমে শরীরে হরমোন আর নিউরোট্র্যান্সমিটারের ঝড় ওঠে । চুমু থেকে যে স্নায়বিক অনুপ্রাণন গড়ে ওঠে তা ত্বক, মগজ, মুখের মাংসপেশী আর ঠোঁটে অবিরাম আনাগোনা করে, যতক্ষণ চুমু খাওয়া বজায় থাকে ততক্ষণ । প্রগাঢ় চুমুর ফলে স্নায়ুবার্তা সৃষ্টি করে ডোপামাইন রসায়ন, যে রসায়ন থেকে আসক্তি আর আকাঙ্খার উৎসার ঘটে, অক্সিটোসিন অর্থাৎ প্রেমের, হরমোন বয়ে যায় দেহের ভেতরে ভেতরে । মৃতার দেহেও তা ঘটে ।

মৃতার ঠোঁটেও একই প্রক্রিয়া ঘটে বলে আমি মনে করি; আপনার হয়তো বিশ্বাস হচ্ছে না । শিল্পবোধ না থাকলে এরকমই হয়, আপনার শিল্পবোধ নেই, কেবল কলেজে-পড়া জ্ঞান আছে, তাই আমার আর্ট ফর্মকে বুঝে উঠতে পারলেন না । প্রেমকে জাগতিক নোংরামির অন্তর্ভুক্ত করে ফেললেন । হয়তো যে সময়ে আপনি আমাকে হত্যার জন্য পরিকল্পনা করছিলেন, তখন আপনি মাদকে আচ্ছন্ন ছিলেন, আচ্ছন্নতায় আক্রান্ত আপনার মস্তিষ্ক আপনাকে চালনা করছিল, আপনি শবের অভিনয় করার জন্য ভ্যানগাড়িতে শুয়ে নিজেকে নোংরা তেরপলে ঢেকে চলে এলেন আমাকে খুন করতে, এমনকি মর্গের ডোমকে বলে পায়ের বুড়ো আঙুলে ভুয়ো নামের ট্যাগও ঝুলিয়ে নিয়েছিলেন । [৬] আপনার দেহের তাপ থেকে আমার অনুমান করা উচিত ছিল যে আপনি ভার্জিন নন ।

হ্যাঁ, আমি নারীর শবের সঙ্গে প্রেম করতুম । নারীর শব মাত্রেই সচ্চিদানন্দময়ী শিল্পমাধ্যম।

আমি কী করতুম ? আমি তার শরীরে প্রেম জাগিয়ে তুলতুম, আমার কাঁপুনিটুকু তাকে দিতুম, অন্ধকারে, বা গোধূলির আলোয়, ঘন জঙ্গলে, গৃহযুদ্ধে ফাঁকা গ্রামের রাস্তায়, পোড়া চালাবাড়ির পেছনে । দিনের আলোয় যা করতে সে-নারীর অস্বস্তি হয়েছে, বা মুখ খুলে বলতে পারেনি, আমি তাই দিয়েছি । আমি কোনো নারীর চরিত্রের কথা ভাবি না, ভাবিনি, সে যদি যৌনকর্মীর কাজও করে থাকে, তাতেও কিছু এসে যায় না, কেননা আমি আমার ভালোবাসা দিয়ে তাকে ওই ব্যবসা থেকে মুক্তি দিই, দিতুম । ওরাও আমার শরীরের দুর্গন্ধ, আমার গায়ের রঙ, আমার নাক-নকশা নিয়ে প্রশ্ন তোলে নি কখনও । ওদের কন্ঠস্বরহীনতাই ছিল ওদের ভাষা, বেঁচে থাকতে হয়তো আমার ভাষা আর ওদের ভাষা আলাদা ছিল, একজন আরেকজনকে কিছুই বুঝিয়ে বলতে পারতুম না, প্রেম করার সময়ে দিব্বি নিজেদের সঙ্গে ভালোবাসার দুটো কথা শোনাতুম, সদ্য পরিচিত দুই পেলিকান পাখির মতো, সমুদ্র থেকে উঠে আসা নিম্নচাপের বাতাসের মতো ।

আগে আমি এই ছেলেগুলোকে থ্যাঙ্কস দিয়ে নিই, প্রায় প্রতি রাতের উপহারের জন্য । ওরা চারজন তো প্ল্যাটফর্মের সিঁড়ির তলায় বসে পাতা ফুঁকতো আর ছিঁচকে চুরি করত । আমিই ওদের বিপথ থেকে বাঁচালুম । এই পোড়ো বাড়িটায় ওরা রাত কাটাতো, এখানে আলো নেই, জলের কল আছে, বাগান জংলি ঝোপে প্রায় অন্ধকার ছিল, সাফ করিয়েছি, চাপাকল কাজ করতো না, সারিয়েছি, তার আগে ওরা ভ্যানগাড়িতে চাপিয়ে আমায় মিনারাল ওয়াটারের ড্রাম  এনে দিত ; মিনারাল ওয়াটারের প্রয়োজন হয় না আমার, আমি ইমিউন। বাজার থেকে আমার জন্য খাবার এনে দিতো, নিজেরাও খেতো, ম্যাকডোনাল্ড, পিৎসা হাট, কেএফসি, ওদের কি খাবার ইচ্ছে হতো না । ওরা একটাই পোশাক পরে মাসের পর মাস চালাতো, আমি ওদের পছন্দের পোশাক কিনে দিয়েছি ।

আমি ওদের আমার সঙ্গে নিয়ে যাবো ভেবেছিলুম, আপনি সব ভেস্তে দিলেন ; ওদের পাসপোর্টও আমি করিয়ে নিয়েছিলুম, লেক ভিকটোরিয়াকে ঘিরে যে দেশগুলো, সেখানে গিয়ে হারিয়ে যাবার প্রচুর সুযোগ, প্রায়ই এথনিক গোষ্ঠীগুলো ক্ষমতা দখলের জন্য লড়ে মরে । সেখানে গিয়ে মিশে যেতে পারতো ভিড়ের ভেতরে ।

ছেলেগুলোর তো কোনো পরিচয়ই ছিল না, ভোটার কার্ড, আধার কার্ড, বিপিএল কার্ড, র‌্যাশান কার্ডের বাইরে যে জগত, ওরা ছিল সেই জগতের বাতিল নাগরিক । আমিই ওদের পরিচয়ের প্রতিষ্ঠা দিয়েছি। আমি চেয়েছিলুম, ওদের নিয়ে গিয়ে লেক ভিকটোরিয়ার ধারে কোনো একটা দেশে ছেড়ে দিই, তারপর ওরা নিজেদের জীবন আফ্রিকার মানুষদের মতন কাটাক, চাষে, জঙ্গলে, মাছ ধরায়, এথনিক গোষ্ঠীতে ঢুকে তাদের দল ভারি করতে, যা চায় ছেলেগুলো ।

আশেপাশের দেশগুলো হ্রদটাকে লেক ভিকটোরিয়া বলে না । লুয়ো ভাষায় বলে নামলোলওয়ে, লুগাণ্ডা ভাষায় বলে নালুবালে, বানটু ভাষায় বলে নেয়ানজা । বয়স ওদের কম, শিখে নিতো কোনো ভাষা । আবহাওয়াও ভারতের মতন, মানিয়ে নিতে পারত । ইচ্ছে হলে চলে যেতে পারতো পাশের দেশ রোয়াণ্ডা কিংবা রোয়াণ্ডা হয়ে কঙ্গোয় । প্রত্যেকে স্হানীয় মেয়েকে বিয়ে করে থেকে যেতে পারতো, গোষ্ঠী-যুদ্ধে অংশ নিতে পারত ।

লেক ভিকটোরিয়াকে নষ্ট করে দিয়েছে ব্রিটেন আর ফ্রান্সের উপনিবেশবাদীরা, তাতে বিদেশি মাছ ছেড়ে । পঞ্চাশ বছরে হ্রদটার জৈবিক চরিত্র পালটে গিয়ে নষ্ট হয়ে গেছে । জাহাজের নোংরায় জলের নীল পবিত্রতা ঘুচে গেছে ।

ওদের আমি বিপথগামী করিনি । কেবল বলতুম যে, বুঝলি, যার সঙ্গে শুচ্ছিস, তার বডি যতো ঠাণ্ডা হবে ততো আনন্দ, রিয়্যালি, আনন্দ, কেন জানিস, স্বর্গ কোথায় বল : ওপরে, ওই আকাশে তো ! ওখানটা কি গরম ? একেবারেই নয় ; ভীষণ ঠাণ্ডা, যতো স্বর্গের কাছাকাছি যাবি ততো ঠাণ্ডা । আমি যে বডির সঙ্গে শুতে চাই তাদের অমন ঠাণ্ডা চাই, বুঝলি, উর্বশী-মেনকাদের নাম শুনেছিস তো, স্বর্গে থাকে, তা ওদের বডি কতো ঠাণ্ডা ভেবে দ্যাখ তোরা, তাই তো প্রাচীন ভারতীয় মুনি-ঋষিরা হকচকিয়ে যেতো, তোরা বোধহয় মুনি-ঋষিদের পেছলাবার গল্পগুলো জানিস না, ফিল্মও তো আজকাল হিন্দু মুনিঋষিদের চরিত্র নিয়ে হয় না । [৭] ওরা অবশ্য টিভির কথা বলেছিল, কিন্তু তার পর্দায় তো অপ্সরাদের দেহের তাপ দেখানো সম্ভব নয় ।

ওদের সঙ্গে শেষবার কথা বলে নিই, আর তো বলা হবে না । এদেশ ছেড়ে চলে যাবো ভেবেছিলুম, কিন্তু ওদের সাহচর্যের কারণে কিছুদিন এই দেশে থাকার ইচ্ছা হল, আমার পূর্বপুরুষদের দেশ, সে দেশের নারীদের শবদেহের সঙ্গে শোবার ইচ্ছা হল, জড়িয়ে ধরে সারারাত কাঁদবার ইচ্ছা হল ।

এনার আগে যে বডিটা তোরা দিয়েছিলি, ওঃ, কচি আঠারো হবে, আর কতো ফর্সা, মরার পর বডি শক্ত হয়ে যায় বলে আরও আনন্দ, কোনো বডিপার্টস ঢলঢলে থাকে না, স্মল লিটল পুসি, বুঝলি । নারীর শব মাত্রেই ভার্জিন, এনট্রি শক্ত হয়ে গিয়ে ভার্জিনিটি ফেরত আনে, তা সে যতো বয়সই হোক, বুকও ফর্ম ফিরে পায়, শীতল, চুমুতে কোল্ড ড্রিংকস আর হাজার গোলাপি সারসের উড়াল। শবের সমস্ত শরীরে কৌমার্য ছেয়ে থাকে ।

জীবন্ত দেহ আমার একেবারে পছন্দ নয়, নিজের ইচ্ছেমতন হ্যাণ্ডল করা যায় না, জীবন্ত দেহের নিজের ইচ্ছে-অনিচ্ছে থাকে, তা মানতে হয়, অমন মানামানি করতে গেলে আনন্দটাই মাটি । তার ওপর জীবন্ত দেহের নিজের তাপ হয়, আমার তাতে ছ্যাঁকা লাগে, আনন্দ পুড়ে ছাই হয়ে যায়, যেন সদ্য বেরিয়ে আসা নীলাভ ধোঁয়া-ওড়ানো লাভার হল্কার ওপর শুয়ে আছি ।

পনেরো-ষোলো বছর বয়সে জীবন্ত দেহের সঙ্গে অনেক শুয়েছি, ভাল্লাগে না, কাদার চোরাবালিতে সেঁদিয়ে যাচ্ছি মনে হয়, সঙ্গে তার রস, কী কেলেঙ্কারি । দেহের যা নাম সেই নামেই সে আটকে থাকবে, আমি তার নাম প্রতি চুমোর সঙ্গে পালটাতে পারব না, ভাববে দেহের বদলে নামে অরগ্যাজম আনতে চাইছে । জীবন্ত দেহের অরগ্যাজম দরকার হয়, অনেক সময়ে বারবার ।

রোয়াণ্ডা থেকে জার্মানিতে যখন গিয়েছিলুম, ওখানে তো যৌনালয়গুলো লিগ্যাল, তাই যৌনরোগের ভয় কম, রেগুলার চেকআপ হয়, কাজের জন্য লাইসেন্স দরকার হয় । সেখানে যৌনকর্মীদের কতোবার বলেছি যে শব সেজে চুপচাপ পড়ে থাকো, তা তারা পারে না, তারা তো আফটার অল জীবন্ত দেহ । হেসে ফ্যালে কিংবা অভ্যাসমতো প্রেমিকার ভান করে, নকল অরগ্যাজমের অভিনয় করে । মেজাজ খারাপ করে দেয় ; আর জার্মান মেয়েদের গা বড্ডো গরম, ওরা, মনে হয়, হিটলারের রাজনৈতিক তাপ থেকে মনে মনে বেরোতে পারেনি এখনও। একজন তো প্রায় হুমকি দেবার মতন করে বলেছিল, অতোই যদি শখ তো চলো না ফুলের কোল্ড স্টোরেজে গিয়ে শুই আর প্রেম করি ।

নারীর শবদেহ ফোর প্লে চায় না, অরগ্যাজম চায় না, সে চায় স্বর্গীয় ভালোবাসা, দেবদূতের ভালোবাসা, চায় তার কৌমার্যের বন্দনা, অর্চনা।

শবদেহের সঙ্গে যে ভাবে ইচ্ছে শুতে পারি, সে খুঁতখুঁত করবে না, অভিনয় করবে না, নারীর শবদেহ হল অবিনশ্বর, শাশ্বত, ভালোবাসা দিয়ে উত্তরণে নিয়ে যায় । মৃত্যুর নিজের হাতে তৈরি করা আর্ট।[৮]

মৃত নারীদের প্রয়াত বলা ভুল. তারা চিরকাল অমর, নারীর শবে অজস্র স্বপ্ন লুকিয়ে থাকে, আমি সেই স্বপ্নগুলোর ভেতরে গিয়ে খেলা করি, জড়িয়ে ধরে নিয়ে যাই সমুদ্রের তলদেশে, শবের দেহ থেকে নানা রঙের রঙিন মাছ বেরিয়ে আসে ঝাঁক বেঁধে, আমাকে ঘিরে খেলা করে তারা,  কিংবা উড়িয়ে নিয়ে যাই মেঘের রূপালি কিনারায়, সে আমাকে তুলতুলে মেঘের চাদরে মুড়ে ঘুমোয় ।

স্যাঁতসেতে মাটি বলে সে, নারীর শবদেহ, কখনও অভিযোগ করবে না, বলবে না যে আমার ডানলোপিলোর বিছানা চাই, মখমলের চাদর চাই, সাটিনে মোড়া বালিশ চাই, স্কচ হুইস্কি চাই, পুরু চকোলেট চাই, সুগন্ধী রঙিন কনডোম চাই । দাঙ্গায় পোড়ানো বাড়ির মেঝেতেও সে সুখী, গৃহযুদ্ধে খুনোখুনির শেষে মাঠের অন্ধকারে মশার ঝাঁকের ভেতরে শুয়েও সে সুখী । [৯]

হ্যাঁ, আমি নারী শবের সঙ্গে প্রেম করে পরমানন্দ পাই । নারীর শব মাত্রেই সচ্চিদানন্দময়ী আর্ট ফর্ম।

নারীর শবদেহ ভালোবালা বিলিয়েই সন্তুষ্ট । তার সঙ্গে ফিসফিস করে অশ্লীল কথা বলা যায় । নারীর শবদেহ থেকে যে জ্ঞান পাওয়া যায়, তা জীবন্ত দেহ থেকে পাওয়া যায় না, জীবন্ত দেহ সব ব্যাপারে নাক গলায়, নিজেকে সবজান্তা মনে করে।

নারীর শবদেহ শোবার সময়ে বিশেষ ক্ষমতা দিতে থাকে, জীবন্ত দেহ উলটে ক্ষমতা শুষে নিতে থাকে। জীবন্ত দেহের জন্য নিত্যনতুন উপহার দিতে হবে । নারীর শবদেহ সেসব কিছুই দাবি করে না, সে বরং দেবার জন্য অপেক্ষা করে থাকে ।

নারীর শবদেহ কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে না যা জীবন্ত দেহ করে, হ্যান চাই, তেন চাই, এই দাও, সেই দাও, এই কোরো না, তাই কোরো না ।

নারীর শবদেহ ফিস ফিস করে কানে কানে বলে আমাকে নাও, আমাকে ভালোবাসো, আমাকে জড়িয়ে ধরো, আমাকে তোমার বুকে মিশিয়ে নাও ।

নারীর শবদেহ সমস্ত কাজকে অনুমোদন করে, মুখ বন্ধ করে বলে হ্যাঁ, যা করছ ভালো করে করো, ভালোবাসো, আমায় আগাপাশতলা ভালোবাসো, ভালোবাসো, ভালোবাসো , তুমিই আমার শেষতম প্রেমিক, আমাকে নাও, আমাকে পৃথিবীর যোগ্য করে তোলো, আকাশের যোগ্য করে তোলো, নীহারিকার যোগ্য করে তোলো, নক্ষত্রপূঞ্জের যোগ্য করে তোলো ।[১০]

নারীর শবদেহ হলো শক্তির পূজারি, আত্মত্যাগের পূজারি । নারীর শবদেহের কোনো ধর্ম হয় না । সে শবে রুপান্তরিত  হবার সঙ্গে-সঙ্গে ধর্মের নোংরামো তাকে ছেড়ে চলে যায় । কোনো ধর্মযুদ্ধে যোগ দিতে সে ওসকাবে না ।

নারীর শবদেহের সঙ্গে প্রেম তাকে আবার জৈব করে তোলে, তার শরীরে শিল্পের প্রাণ এনে দেয় ভালোবাসার মাধ্যমে ।

নারীর শবদেহ বলে ওঠে, উলটো রাস্তায় কেবল প্রতিভাবানরাই হাঁটে, হে প্রতিভাবান, তুমি আমাকে আগুনের সন্ত্রাসে বা মাটির কালো কারাগারে যাবার আগে চুটিয়ে ভালোবাসো, ভালোবাসো, ভালোবাসো ।

জীবন্ত দেহের প্রেম হল দু’পক্ষের পারস্পরিক সন্ত্রাস । আধুনিক সভ্যতা মানেই সন্ত্রাস । আমি আমার শবপ্রিয়াকে আধুনিকতার সন্ত্রাস থেকে বের করে আনি ।

জীবন্ত দেহরা কেউ কাউকে বিশ্বাস করে না । তারা ভালো সন্ত্রাসবাদী আর খারাপ সন্ত্রাসবাদীর কথা বলে, অথচ অসততার সন্ত্রাসবাদ ছাড়া রাজনীতি হয় না, রাজনেতা মানেই অসততা, কোনো রাজনেতা যুদ্ধাস্ত্র কমাবে না, যুদ্ধশিক্ষা বন্ধ করবে না ।

হ্যাঁ, আমি নারী শবের সঙ্গে প্রেম করি । তাদের সঙ্গে প্রেম করে পরমানন্দ পাই । আমার কাছে তা আমার নিজস্ব আর্ট ফর্ম ।

নারীর শবের সঙ্গে কথা বলার সময়ে শব্দগুলো মানেহীন আর ফাঁপা হয়ে গেলেও ক্ষতি নেই ; মানেহীন কথাবার্তাই তো ভালোবাসা, নয়কি ! তা হলেই বা ! মৃত্যু হল জীবনের ওপার থেকে আনা প্রেমের বীজ ।

নারীর শবদেহের অতীত বর্তমান ভবিষ্যত নিয়ে কোনো চিন্তা নেই, যা জীবন্ত দেহের থাকে, জীবন্ত দেহ বর্তমান আর ভবিষ্যতের চিন্তায় নিজেকে বিষাক্ত করে তোলে । যুবতী হলে সে যৌবন হারানোর আতঙ্কে আক্রান্ত হয়, প্রৌঢ়া হলে সে বৃদ্ধা অকর্মণ্য হবার দুশ্চিন্তায় সময় কাটায় ।

জীবন্ত দেহের সঙ্গে শুলে, কিছুক্ষণ পর যে একাকীত্ববোধ কামড়ে ধরে, তা শবদেহের সঙ্গে শুলে হয় না, শবদেহের বগলের খাঁজে জোনাকির ঝাঁক এসে বসলেও সে বিরক্তির অভিনয় করে না, খাঁজ থেকে জোনাকিগুলোর তরল পারা তুলে তার ভেতরে লুকিয়ে যেতে দেয় সে, লুকিয়ে যেতে দেয় তার গন্ধের ঢেউয়ে । বহুক্ষণ চোখ মেলে তার দেহের প্রতিটি ইঞ্চের, খাঁজের, ভাঁজের রহস্য খুঁটিয়ে দেখা যায়, অথচ জি-স্পট হাতড়ে খুশি করার সমস্যায় ভুগতে হয় না, তার সঙ্গে প্রতিটি অভিজ্ঞতা ভিন্ন, জীবন্ত দেহের মতন রিপিটিটিভ নয় ।[১১]

জীবন্ত দেহের সঙ্গে প্রেম হলো অর্থহীন অভিজ্ঞতা, কেননা আরেকজন সেই অভিজ্ঞতাকে থিতোতে দেয় না, বাগড়া দিতে থাকে, মাথা গলায়, অনেক সময়ে তো দু’পায়ের মাঝেও বকবক থামাতে পারে না, বোকার মতন হাসাহাসি করে । দুটি জীবন্ত দেহের মাঝে মূল সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় তাদের মস্তিষ্ক ।

নারীর শবদেহ জানে যে সতীত্ব হল সবচেয়ে গোঁড়া বিকৃতি । শবের তুলনায় বিছানায় কেউ সুশ্রী নয়, তাদের গর্ভবতী হবার আতঙ্ক নেই, গর্ভনিরোধক বড়ি খেতে হয় না ।

নারীর শবদেহরা আমাকে ভয় থেকে টেনে বের করে এনেছে ; আমাকে পাপ-পূণ্যের বিভাজন থেকে মুক্ত করে  জানোয়ারের মতন স্বাধীনতা দিয়েছে, সিংহের মতন, বাঘের মতন, চিতাবাঘের মতন, জাগুয়ারের মতন, হায়েনার মতন, যাদের কোনো কাজে পাপ নেই ।

কোনো কোনো শবের মুখ কি দুঃখি হয় না ? হয় । তাদের কষ্ট আমি নিজের ভেতর তুলে আনি, আর শবদেহের মুখে আমি হাসি ফোটাবার চেষ্টা করি । এমনকি সে শবের বুকে-পেটে পোস্টমর্টেমের কাটা-সেলাই থাকলেও । অবহেলার প্রশ্ন নেই, অবিচারের প্রশ্ন নেই। আমি তাকে বর্তমানে টেনে নিয়ে এলেও তারা নিজের নিজের অতীতের গল্পহীন কাহিনিকে লুকিয়ে রাখে, আমি সেই দুঃখের আলাদা গল্প তৈরি করে নিই, তার দুঃখে কাঁদি । কাগজে তার সম্পর্কে সাংবাদিকরা যে গল্প লেখে, আমি তা বিশ্বাস করি না, সে তো শবদেহ, তার কোনো দোষ থাকতে পারে না, সে অপরাধের, পাপের, গ্লানির ঊর্ধে ।[১২]

নারীর শবদেহ হলো পুরোনো গান যা হারিয়ে গেছে, যে মেলোডি আর ফিরবে না । জীবন্ত দেহ হল এই সময়ের ঝালাপালা গান, যা ক’দিনেই লোকে ভুলে যাবে । আমি নারীর শবের শরীরে আমার পছন্দের সঙ্গীতের ঝিলমিলে নক্ষত্রের পোশাক পরিয়ে দিই, প্রেম নিখুঁত হয়ে ওঠে, ভালোবাসা হয়ে ওঠে পূর্ণাঙ্গ ।

নারীর শবদেহ কখনও প্রেমের প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করে না, ডাক দিলেই আলিঙ্গনে সাড়া দেয় । জীবন্ত দেহ প্রত্যাখ্যান করে, অপমান করে ।

জানি, পছন্দের শবদেহের সঙ্গে আবার দেখা হবে না কোনোদিন । অথচ সারারাত চুমো খেয়েছি ঠোঁটে, বুকে মুখ গুঁজে থেকেছি বহুক্ষণ, অক্লান্ত মুখমেহন করেছি, তা অলৌকিক, তা এক অসেতুসম্ভব সেতু।

হ্যাঁ, আমি নারীর শবের সঙ্গে প্রেম করি । আমি একজন শিল্পী ।

মর্গের ডোমটাকে ড্রাগ অ্যাডিক্ট করাতে এই ছেলেগুলোর পনেরো-কুড়ি দিন সময় না লাগলে আগেই আনন্দ নিতে পারতুম, বুঝলেন, ওদের ড্রাগের টাকা অ্যাডভান্স দিয়ে রেখেছি, যদি আরও দরকার হোতো, দিতুম, ওদের বলেছিলুম আমার কথা কাউকে কক্ষনো বলিসনি যেন, তাহলে আমাকে তো বিপদে ফেলবিই, নিজেরাও বিপদে পড়বি, ডবল ফৌজদারি জুটবে, ড্রাগ নেবার আর মেয়েদের ডেড বডি তোলার ।

যে ভ্যানগাড়ি ওরা কিনেছে, শবকে চাপা দিয়ে আনার তেরপল কিনেছে, এটা প্রশংসার, পাবলিক দেখলে ভাবতো পুলিশের কাজেই যাচ্ছে, যদিও সন্ধ্যার অন্ধকারে কেউ অতো খেয়াল করতো না, তবুও। নারীর শব জানতে পারলে মানুষ তার দেহ দেখতে চায় না, অপয়া মনে করে, অথচ তার গল্পটুকু জানবার জন্য সতত উৎসুক থাকে ।

ওরা একদিন এক নারীর শবদেহের  ওপর পারফিউম ছিটিয়ে এনেছিল । বুঝিয়েছিলুম, শবের উঁচু জাত নিচু জাত হয় না, নোংরা-পরিষ্কার হয় না । শব হল শব, শিল্পমাধ্যম । সুগন্ধিত করার কোনও দরকার ছিল না । গরিব বাড়ির হলেই বা, হয়তো জীবনে কখনও সাবান মাখেনি, তাই বলে শরীরের গন্ধ চাপা দিতে পারফিউম ? ছিঃ । নারীর শবদেহের গন্ধই মাতনলাগানো, একটা আমেজ থাকে, যেন প্রাগৈতিহাসিক যুগের গুহাবাসিনী, জংলি জানোয়ারের কাঁচা মাংস খেয়ে গায়ে হাত পুঁছে নিয়েছে, সৌন্দর্যের ডিভাইন রূপ, পুঁজিবাদের শেকল থেকে মুক্ত ; তার তো ফ্যাশানিস্টা হবার দরকার নেই কোনো, সে তো ঈর্ষার কামড়ে দুমড়ে যায়নি, জীবন্ত দেহদের সঙ্গে প্রতিযোগীতায় নামে না । সে প্রতি মাসের মেন্সের কষ্ট থেকে মুক্ত । আইডিয়াল, কতো রোমান্টিক ভেবে দেখুন ।

এই শিল্পে, অর্থাৎ শবদেহের সঙ্গে প্রেমে, দরকার হয় শিভালরি, ড্রামা, ইশারা, সম্পর্কের গভীরতা, আসক্তি, কামোচ্ছ্বাস, অন্তরঙ্গতা, সমবেদনা, উপলব্ধি, সম্বন্ধ । তাতে “আমি তোমার তুমি আমার” ধরণের ভালগার ফিলমি ক্লিশের জায়গা নেই, আমি তাকে ঘর বাঁধতে বাধ্য করি না, সেও আমাকে সংসার পাততে অনুরোধ করে না । আমি জানি যে আমি প্রতি রাতে একটা তরোয়ালের ধারের ওপরে দাঁড়াই, কিন্তু আমি জানি যে আমার প্রেমিকা একজন শবদেহ, তাই আমার কিছুই হবে না । যে কোনো নতুন আর্ট শুরু করতে গেলে ঝুঁকি নিতে হয় বটে, তবে শেষ পর্যন্ত শিল্পীর কোনো ক্ষতি হয় না । [১৩]

জীবন্ত দেহের সঙ্গে বিয়ে করলে দেখবেন যে প্রেম তাদের জীবনের কেন্দ্র থেকে পরিধির দিকে চলে গেছে । নারীর শবদেহ হল ব্লিস, ইউ ক্যান গো অন কাউন্টিং ইওর ব্লিসেস, যতো দিন তাদের সঙ্গে প্রেম বজায় রাখবেন, ততোদিন আপনি ব্লেসেড । প্রেম হল ক্ষুধার মতন, ক্ষুধাও তো ব্লিস, নয়কি ?

নারীর শব কোনোরকম অন্তর্দ্বন্দ্বতে ভোগে না, তার কোনো উচ্চাকাঙ্খাও থাকে না । আমি তাকে গতকালের সঙ্গে আগামীকাল মেলাবার মুহূর্তে নিয়ে আসি । শবের ওপরে শব হয়ে শুয়ে পড়ি আর ক্রমশ দুজনেই মৃত্যুর ওপারের মানুষ হয়ে যাই । আমি তো তার আত্মপরিচয় হ্যাক করছি না । সে তো অনাত্মা । সে কচি হলেও ভিডিও গেম, কেবল টিভি, ফিল্মে সময় অপচয় করে না, কমপিউটার ভাইরাস নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে না । তার প্রণয়ের জগতে আমি মিষ্টি করে গ্লাইড করে যাই, যার দরুণ সম্পর্ক হয়ে ওঠে স্বতঃস্ফূর্ত ; সে জীবন্তকালের প্রেমিকের বিশ্বাসঘাতকতার জন্য আত্মহত্যা করে থাকলেও, আমি তার জীবনে বিকল্প ন্যারেটিভ যোগ করে প্রতিদানহীনতার গ্লানিকে মুছে দিই ।

জীবন্ত দেহদের প্রেমের কাছে বড় বেশি চাহিদা থাকে, তার ফলে সৃষ্টি হয় মোহভঙ্গ । একজন চায় আরেকজনকে ভোগদখল করার অধিকারী হতে, ফলে অন্যজন সেই বাঁধন কেটে বেরিয়ে যেতে চায় । দুজনের মধ্যে শুরু হয় গোপন লড়াই, যার দরুণ এক পক্ষ পরিত্যক্ত বোধ করে । একজন চালায় গোপন লড়াই, আরেকজন গোপনে বোধ করে পরিত্যক্ত থাকার একাকীত্ব। জীবন্ত প্রেমিক-প্রেমিকা গোপনে পরস্পরকে ঘেন্না করা আরম্ভ করে, আর ভাবে সেটাই বুঝি প্রকৃত প্রেম । জীবন্ত দেহরা সম্পর্ককে চাপাচুপি দিয়ে এমনি করেই যৌবন পার করে, প্রৌঢ় হয়, তারপর বুড়িয়ে যায় ।[১৪]

এই ফাঁকা বাড়িটা যে ওরা আইডেনটিফাই করেছিল, এটা দারুণ কাজ । শহরের ঝুটঝামেলার বাইরে, শাল আর শিমূল গাছে ঘেরা, চারিদিকে বৈঁচির ঝোপ, অসাধারণ, এই পোড়োবাড়ির সন্ধ্যা প্রতিদিন তার গন্ধ বদলে-বদলে অন্ধকারকে মোহিনী করে তোলে ।

এনার সঙ্গে দুর্ঘটনার আগের বডিটা ঠিকমতন ডোমটাকে হ্যাণ্ড ওভার করে দিয়েছিলিস তো তোরা? যেমন ড্রেস পরানো ছিল তেমন করে ? বুড়ো আঙুলে নামের যে ট্যাগ লাগানো ছিল তা আমি দেখিনি, দেখলেই সর্বনাশ, তার পরিচয় তার বডির সঙ্গে লেপ্টে যাবে, তার ধর্ম, তার ভাষা আমাকে ছিঁড়ে খেয়ে ফেলবে । আপনার বুড়ো আঙুলের ট্যাগও আমি চেয়ে দেখিনি ।

আপনি বিশ্বাস করতে পারছেন না যে আমি বাঙালি, রিয়্যাল ব্ল্যাক বেঙ্গলি ব্লাড । আমার পদবি কাঙালি হয়েছিল দাদুর বাবার কারণে, আমার নাম দীনেশ কাঙালি, ওরা, চার্চের পাদরিরা, উচ্চারণ করতে পারত না, করে দিলে ডেনিস কাংগালি । আমার দাদার নাম বাবা রেখেছিলেন রমেশ কাঙালি, পাদরিরা দাদাকে করে দিলে র‌্যামজে কাঙালি । পুরো গল্পটা শুনলে বুঝতে পারবেন ।

জানি একে, আমার শিল্পকর্মকে, আপনারা নেকরোফিলিয়া বলেন ; চেষ্টা করেও এই আকর্ষণ থেকে মুক্ত হতে পারিনি । এই দোষ আমার দাদুর বাবার ছিল । একজন মাসাই যুবতীকে খুন করে তার শবকে ধর্ষণ করেছিল কয়েকজন কুলি, দাদুর বাবা এক মাসাই যুবতীর শবকে জড়িয়ে রাতভর কেঁদেছিলেন । মাসাইরা দুই যুবতীকে ধর্ষণের জন্য তীর-ধনুক বর্শা নিয়ে কুলিদের ঘিরে ধরেছিল কিন্তু দাদুর বাবার আচরণে তারা অবাক হয়ে গিয়েছিল, তারা মেয়ে দুটির শব নিয়ে যখন চলে যাচ্ছিল, তখন তাদের ওপর গুলি চালিয়েছিল রেল কোম্পানির সশস্ত্রবাহিনী, ভবিষ্যতের বিদ্রোহ শুরুতেই দাবিয়ে দেবার উদ্দেশে ।

আমি সেই রোগে আক্রান্ত হলুম রোয়াণ্ডায়, যেসময়ে হুটু আর টুটসিদের খুনোখুনি আরম্ভ হল, আমার মা তো  টুটসিদের হাতে খুন হয়েছিল, বাবাও টুটসিদের হাতে খুন হয়েছিল, পরে দাদা আর দাদার বউ খুন হয়েছিল টুটসিদের হাতে । গৃহযুদ্ধের খুনোখুনির সময়ে আমি হুটু খুনিদের একটা ছোটো দলের নেতা ছিলুম ।

আপনি হয়তো ভাবছেন বাঙালি হয়েও আমি কেন এরকম কালো, পুরু ঠোঁট, থ্যাবড়া নাক, আমার পদবি কেন কাঙালি, বাঙালির তো এরকম পদবি হবার কথা নয়, এরকম চেহারা হবারও কথা নয় । ঠিকই অনুমান করেছেন । আমার দাদু, মানে ঠাকুর্দার নাম ছিল কাঙালি, পদবি কি ছিল তা জানি না, সবাই ওনাকে কাংগালি বলেই ডাকত, ওনার ছেলে হল, তার পদবি হয়ে গেল কাংগালি । [১৫]

দাদুর বাবা আর বউকে যখন ফুসলিয়ে আরও বত্রিশ হাজার কুলির সঙ্গে কেনিয়া-উগাণ্ডা রেললাইন পাতার জন্য ১৮৯৬ সালে আফ্রিকায় নিয়ে যাওয়া  হয়েছিল, তখন দাদুর বাবার বয়স আঠারো আর ওনার বউয়ের বয়স তেরো ।

আড়কাঠিরা ভেবেছিল ওনাদেরও দক্ষিণ আমেরিকায় আখচাষের খেতে মজুর হিসেবে পাঠাবে, কিন্তু আফ্রিকার রেল লাইনের জন্য মাথাপিছু কমিশন বেশি পাচ্ছিল বলে পাঠিয়ে দিলে রেল লাইন পাততে । ব্যাপারটা ভেবে দেখুন । আফ্রিকা থেকে,  জালের ফাঁদ পেতে, পালোয়ান মানুষ ধরে-ধরে দক্ষিণ আমেরিকা আর আমেরিকায় জাহাজে চাপিয়ে ইউরোপীয়রা চালান করে দিলে সেখানে কেনা গোলামের কাজ করতে, ওই যাকে বলে স্লেভ, অথচ সেই পালোয়ানগুলোর দ্বারা কিচ্ছু হবে না মনে করে এশিয়ানদের নিয়ে গেল রেল লাইন পাততে ।

স্লেভদের বাঙালিরা কেন ক্রীতদাস বলে জানি না ; স্লেভরা তো কেনা নয়, জোর করে কিডন্যাপ করে তুলে নেয়া, তারপর নিলাম ডেকে দল বেঁধে বিক্রি ।

রেল লাইন পাতার শ্রমিকদের কেন কুলি বলা আরম্ভ হল তাও জানি না ।

তখন তো পুরো আফ্রিকাকে ইউরোপীয়রা নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগির জন্য খেয়োখেয়ি করছে । ইনডিয়ায় যেমন ইস্ট ইনডিয়া কোম্পানি প্রথমে খুঁটি গেড়ে তারপর সরকারকে ডেকে আনলে, তেমনি কেনিয়া আর উগাণ্ডায় ব্রিটিশ ইস্ট আফ্রিকা কোম্পানি  মোমবাসার কিলিনডিলি বন্দর থেকে কেনিয়া-উগাণ্ডা রেললাইন বসিয়ে ব্রিটিশ সরকারকে আনার পোক্ত ব্যবস্হা করে ফেললে । ১৯০০ সালে লাইনটা পৌঁছেছিল নাইরোবি, ১৯০১ সালে কিসুমুর ফ্লোরেন্স বন্দরে । রেল লাইনকে এলডোরেট থেকে কামপালা পর্যন্ত বেছানো হয়েছিল, যাতে ভিক্টোরিয়া হ্রদে জাহাজে করে মাল চালান এড়ানো যায় । রেল লাইনের জন্যই ইথিওপিয়া থেকে মুসোলিনির  ইটালিকে তাড়াতে পেরেছিল ব্রিটিশ সৈন্যরা, নামে ব্রিটিশ সৈন্য, কিন্তু জওয়ানরা বেশির ভাগ ছিল ভারতীয় । প্রথম দিকে রেলের ইনজিন আর কামরা যেতো ভারত থেকে, যেগুলো প্রায় অকেজো হয়ে গিয়েছিল সেগুলো ।

দু লাখ লোক লেগে ছিল ওই রেল লাইন বসাতে, এমন রেল লাইন যে, বাবার মুখে শুনেছি, লোকে বলত লুনাটিক এক্সপ্রেস , মাসাইরা বলত ইস্পাতের অজগর । [১৬]

সাভো নদীর ধারে লাইন বসাবার সময়ে আঠাশ জন কুলিকে খেয়ে ফেলেছিল দুটো মদ্দা সিংহ । প্রথম যাকে খেয়েছিল, সে একজন শিখ সরদার, তার নাম উগন সিং । পরে যাদের খেয়েছিল সিংহ দুটো, তাদের নাম-সাকিন কেউ জানে না, অতো কুলির মধ্যে প্রায়ই তো কেউ না কেউ মারা যেতো । সিংহদের পালের ব্যাপারটা জানেন তো । সিংহীদের হারেম নিয়ে একজন সিংহই থাকতে পারে । সিংহীদের হারেমের দখল নিতে পালের গোদা বিগ ড্যাডি মদ্দা সিংহকে লড়াইতে হারিয়ে দখল করতে হয় । বাচ্চা হলে মাদিগুলো পালে থেকে যায় আর মদ্দাগুলোর ঘাড়ে কেশর উঁকি দিলেই তাদের তাড়িয়ে দেয়া হয় । তাড়ানো সিংহগুলো তালে থাকে কখন পালের গোদা বিগ ড্যাডি মদ্দাটা বুড়িয়ে যাবে, বা শিকার ধরতে গিয়ে আহত হবে । নতুন যে মদ্দাটা পালের দখল নেয়, সে যদি দ্যাখে যে পালেতে আগের বিগ ড্যাডির শিশু-সিংহ রয়েছে, তাহলে সেগুলোর টুঁটি টিপে মেরে ফ্যালে, যাতে মা-সিংহী আবার গর্ভবতী হবার জন্য তৈরি হয়ে ওঠে । কতো সুন্দর ব্যবস্হা, বলুন । কারোর কোনো পাপবোধ নেই । মরা শিশু-সিংহীর মায়েরাও নতুন মদ্দাকে আকৃষ্ট করার জন্য যা-যা করা দরকার তা করে।     অনেকটা বাড়ি থেকে তাড়ানো বজ্জাত ছেলের মতন । মদ্দা সিংহ দুটো অমনই বজ্জাতি করে বেড়াতো । চিফ ইনজিনিয়ার মিস্টার প্যাটারসন গুলি করে খতম করে দুটোকে ।

এখনকার যে নাইরোবি শহর তার জন্য খেটে মরেছিল ভারতীয় কুলিরা । তার আগে জায়গাটা ছিল বিশাল একটা ডোবা, বাবার ঠাকুর্দারাই নাইরোবিতে আকাশছোঁয়া বাড়িগুলোর বনেদ তৈরি করেছিল । ১৯২০ সালে কেনিয়াকে ব্রিটিশ কলোনি বানানো হয়েছিল । ভারতীয়রা সেখানে এখন পাত্তা পায় না ।

রেল লাইনের গল্প কেন শোনাচ্ছি জানেন ? তাহলে আমার ব্যাকড্রপ বুঝতে সুবিধা হবে । আমি ‘অ্যাকচুয়ালি’ কোন জগতের তা আপনার কাছে স্পষ্ট হবে ।

গুজরাটিরা তার আগে জাহাজে মাল চাপিয়ে আফ্রিকায় পাঠাত । রেল লাইন বসার পর আফ্রিকার ভেতরে মাল পাঠাতে সুবিধা হয়ে গেল, আর মুটের মাথায় চাপিয়ে, সিংহের পালের মুখে পড়ার বিপদ রইল না । একে একে গুজরাটিরা উগাণ্ডা আর কেনিয়ায় ব্যবসা আরম্ভ করে দিলে, ওদের আফ্রিকানরা আজও দুকানওয়ালা বলে ডাকে । ১৯৬০ সালের পর কেনিয়া, উগাণ্ডা, তানজানিয়ার স্বাধীনতার পর ওরা, গুজরাতিরা,  কেনিয়া-উগাণ্ডা থেকে আফ্রিকার অন্য দেশগুলোয় ছড়িয়ে পড়ল।

কাজ শেষ হয়ে গেলে পঁচিশ হাজার কুলি ভারতে ফিরে গিয়েছিল । আমার দাদুর বাবা আর মা উগাণ্ডায় থেকে গেল, উগাণ্ডা জানেন তো, সেই যে দেশে ইদি আমিন নামে একজন শাসক ছিল, পাঁচ লাখ লোককে মেরে ফেলেছিল, যেমন টিক্কা খান পূর্ব পাকিস্তানে বুদ্ধিজীবীদের বেছে-বেছে খুন করেছিল, আল বদর রাজাকর দল গড়েছিল, ঠিক তেমনিই ইদি আমিন নিজের দেশের বুদ্ধিজীবীদের, এমনকি নিজের বন্ধুদেরও, খুন করে লোপাট করে দিয়েছিল । লোকটা সুন্দরী আফ্রিকান দেখলেই জোর করে বিয়ে করত, একটা বউকে নাকি কেটে রেঁধে খেয়ে ফেলেছিল । তারপর ব্যাটা ভারতীয়দের ব্যবসা দখল করে আফ্রিকানদের মধ্যে বিলিয়ে দিলে, আর ভারতীয়দের উগাণ্ডা থেকে কেটে পড়ার হুমকি দিলে, যাদের ব্রিটেনের পাসপোর্ট ছিল তারা ব্রিটেনে পালালো । গুজরাটিরা চালাক-চতুর, ওদের ব্রিটিশ পাসপোর্ট ছিল । আশি হাজার ভারতীয় পালালো নানা দেশে ।

১৯৭৯ সালে আর ১৯৮৬ সালে উগাণ্ডায় গৃহযুদ্ধের সময়ে জঙ্গলের ভেতরের রেল লাইন উপড়ে বেচে দেয়া আরম্ভ করেছিল স্হানীয় আফ্রিকানরা । ভারত থেকে পাঠানো সেকেণ্ড হ্যাণ্ড ইনজিন আর কামরাগুলোও ততোদিনে ঝরঝরে হয়ে পড়েছে ।

আমার বাবা বোকার মতন ব্রিটেনের পাসপোর্ট নেয়নি, ভেবেছিল, জমিজমা খেতখামার রয়েছে, এদেশেই থেকে যাই, আমরা নাকি জাতে চাষি ছিলুম । বাবার মতনই আরও আটঘর বাঙালি পরিবার, যারা জমিজমা খেতখামার নিয়ে আনন্দে ছিল, তারাও থেকে গিয়েছিল । লোকে তাই আমাদের ইনডিয়ান ইস্ট আফ্রিকান বলে চেনে । আমাদের নিজেদের মধ্যেই বিয়ে-শাদি হতো, কেউ-কেউ অবশ্য আফ্রিকান মেয়ের প্রেমে পড়ে বিয়ে করে তাদের গোষ্ঠীতেও ঢুকে গিয়েছিল , যেমন আমার দাদা র‌্যামজে কাঙালি।

শেষে ইদি আমিনের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে আমরা আর ওই নয়টা পরিবার পাশের রাজ্য রোয়াণ্ডায় গিয়ে বসবাস শুরু করলুম । আমি তখন ছোটো ছিলুম, আমার বডি দেখছেন তো, আফ্রিকানদের চেয়ে কম নয়, হাতের মাসল দেখুন, বুকের মাসল দেখুন । ফাইটিঙে কেউ পারত না আমার সঙ্গে, রোয়াণ্ডার হুটুরাও নয়, টুটসিরাও নয় ।

আপনার বোর হচ্ছে না তো ? অনুবাদ করিয়ে ট্র্যান্সক্রিপ্ট নেবেন, অপ্রয়োজনীয় মনে হলে সেই অংশ বাদ দিয়ে পরের অংশ পড়া আরম্ভ করবেন ।

আপনি জামিন নিয়ে আপাতত ছাড়া পেয়েছেন । আমি জামিন নিইনি, ছাড়া পেতে চাই না, কেননা সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার সুযোগ পাচ্ছি । আপনি জামিন নিয়ে থাকলেও মামলা আরম্ভ হলে আপনার বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ প্রমাণ করতে পুলিশের অসুবিধা হবে না ; হত্যার ষড়যন্ত্র করেছিলেন, তাও মর্গের ডোম বলেছে পুলিশকে, এই ছেলেগুলোও তেমনই স্টেটমেন্ট দিয়েছে ; হত্যার জন্য ব্যবহৃত ছোরা, তাতে আপনার আঙুলের ছাপ, আর আমার রক্ত পাওয়া গেছে । জানেন তো তার সাজা কী, হয় যাবজ্জীবন কিংবা ফাঁসি । আমার বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ নেই, এই ছেলেগুলোকে থার্ড ডিগ্রি মার দিয়ে পুলিশ ওদের মুখ থেকে যে তথ্য আদায় করেছে, সে সমস্ত তথ্যের কোনো প্রমাণ নেই, কোনো শবের কিছুই পাওয়া যায়নি, তাদের কবেই পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে বা গোর দেয়া হয়েছে, পুলিশ ওদের কুকুর এনে শুঁকিয়েও পায়নি কিছু ।

আমি নিজে থেকে যাবতীয় তথ্য রেকর্ড করছি, এইটুকুই হয়তো আমার বিরুদ্ধে প্রমাণের জন্য যথেষ্ট । কিন্তু মামলা যখন আরম্ভ হবে তখন আমি এই শহরের কোনো গোরস্তানে মাটির তলায় ঘুমোচ্ছি, হয়তো এমন কোনো নারীর গোরের পাশে, যার শবের সঙ্গে শুয়েছিলুম ।

আপনি প্রকৃত সুন্দরী, ফর্সা, তা আমাকে ক্ষণিকের জন্য দুর্বল করে দিয়েছিল, নয়তো আপনার দেহের তাপ থেকে আমি কি সন্দেহ করতুম না, যে এর শব তো ঠাণ্ডা নয়, এর দেহে নিশ্চয়ই রক্ত চলাচল করছে, এখনও এর প্রকৃত মৃত্যু হয়নি । আপনাকে আপনার পোশাক পরিয়েই এনেছিল ছেলেগুলো, মর্গের ডোম সেভাবেই চাপিয়ে দিয়েছিল ওদের ভ্যানগাড়িতে, তেরপলের চাদর চাপা দিয়ে । আপনি যে শাড়ির ভেতরে ছোরা গুঁজে রেখেছেন তা খেয়াল করতে পারিনি,  আপনার চোখ বোজা অপরূপ কচি মুখের দিকে তাকিয়ে ।

শবকে আমার বিছানায় শুইয়ে দেবার পর আমি পোশাক খুলি, জেনে গিয়েছিলেন হয়তো, এও শিখে এসেছিলেন যে তলপেটে ছোরা মেরে তার বাঁটকে ঘুরিয়ে দিতে হয়,  তেমন করলেই নাড়িভুঁড়ি ছিঁড়ে যায়, বাঁচার সম্ভাবনা থাকে না । [১৭]

প্রতিশোধের জন্য পুরোপুরি তৈরি হয়েই এসেছিলেন । আমি কিন্তু মনে করতে পারছি না কোনটা আপনার দিদির শব ছিল, যার সঙ্গে শুয়েছিলুম বলে আপনি প্রতিশোধ নেবার ষড়যন্ত্র করলেন । আপনার মতন সুন্দরী তো কোনো শবই ছিল না । তাছাড়া আপনার দিদি আত্মহত্যা করে থাকলে শবের পোস্টমর্টেমের কাটা-সেলাই থাকতো বুকে পেটে, যদি না আপনারা কর্তৃপক্ষকে টাকা খাইয়ে আত্মহত্যার মামলা হাশাপ করিয়ে দিয়ে থাকেন । হয়তো তাই করেছেন, কেননা যে দুটি শবের পোস্টমর্টেম করা দেহ ওরা এনেছিল, তারা দুজনেই ছিল কালো ।

আমি আহত হবার পরও আপনার হাত থেকে ছোরাটা কেড়ে নিয়ে আপনাকে খুন করে, শুতে পারতুম আপনার সদ্যমৃত শবের সঙ্গে, আমার দেহে যথেষ্ট শক্তি ছিল । আমার অভিজ্ঞতাও আছে । তা করিনি, কেন জানেন ?

অতীতের এক ঘটনার ঝলক মাথায় আসার সঙ্গে-সঙ্গেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে টুটসিদের হাতে আমার দাদার হত্যা, আর দাদার হুটু বউকে খুন করার আগে  সেখানেই কয়েকজন টুটসি যুবক কী ভাবে বৌদিকে হাতপা বেঁধে ধর্ষণ করেছিল । বাবা-মা দাদাকে বারণ করেছিলেন, বলেছিলেন প্রচুর ভারতীয় মেয়ে আছে, তারা গেঁয়ো হলেই বা, চাষিবাড়ির হলেই বা । কিন্তু দাদা হুটু যুবতীর গভীর প্রেমে পড়েছিলেন ।

আমি হুটু বা টুটসি কোনো পক্ষেই ছিলুম না, আমি তো এথনিকালি ভারতীয়, কেনই বা থাকব কোনো একটা গোষ্ঠীতে, দাদা হুটু মেয়েকে বিয়ে করে সংসার পাতলেও । দাদার বাচ্চা ছেলেটার গলা চাপাতি দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছিল টুটসিরা । আমি পালিয়ে হুটুদের খুনী গোষ্ঠীতে যোগ দিই, বলতে পারেন প্রাণে বাঁচার জন্য ; তখন দুই পক্ষে আরম্ভ হয়ে গেছে তুমুল খুনোখুনি ।

বাবা-মা রোয়াণ্ডায় না গেলেই পারতেন । হুটু আর টুটসি প্রজাতির আফ্রিকানদের উৎস নিয়ে রোয়াণ্ডা আর বুরুণ্ডি আর হ্রদ এলাকায় বহুকালের বিতর্ক । ভারতীয়দের তো আফ্রিকা সম্পর্কে আগ্রহ নেই, তাই কোনো খবর রাখে না, কেবল আমেরিকা-ইউরোপে কি ঘটছে তা নিয়েই ব্যস্ত । রোয়াণ্ডায় হুটুরা সংখ্যাগরিষ্ঠ, তারা স্হানীয়, চাষবাস করে কাটাতো, টুটসিরা বাইরে থেকে এসেছিল, সাধারণত গরুর পাল চরাতো । বিরক্ত হচ্ছেন না তো ? আমার বিষয়ে জানার জন্য, আমার সৃষ্টিচেতনাকে বোঝার জন্য হুটু আর টুটসিদের খুনোখুনির ইতিহাসটা জানা জরুরি ।

আপনাদের ভারতে যেমন সাম্প্রতিককালে কে খাঁটি ভারতীয় তা নিয়ে দাঙ্গা হয়েছে, তেমনিই কারা খাঁটি ভূমিপুত্র তা নিয়ে গণহত্যা ঘটেছে ১৯৭২ সালে বুরুণ্ডিতে, ১৯৯৪ সালে রোয়াণ্ডায় আর ১৯৯৬ থেকে ২০০৩ পর্যন্ত কঙ্গোতে । প্রথমে ছোটোখাটো দাঙ্গা দিয়েই শুরু হয়েছিল, পরে যে ধরণের পারস্পরিক গণহত্যা হয়েছে তা বোধহয় হিটলারের জার্মানিতেও হয়নি ।  হিটলারের লোকেরা চাপাতি দিয়ে মানুষের হাত-পা কেটে ক্ষমতা দখলের লড়াই শুরু করেনি, যা হুটু আর টুটসিরা করেছিল । জেনোসাইড জানেন তো, জেনোসাইড, একজ্যাকটলি তাই, অনেক গ্রামে এখনও হাজার-হাজার মাথার খুলির পাহাড় পাবেন দেশগুলোয় গেলে। এর কারণ জানেন ? কারণ হল ইউরোপের সাম্রাজ্যবাদীদের আফ্রিকা নিয়ে ভাগ বাঁটোয়ারা । দেশগুলোকে কেটে তৈরি করার সময়ে ওরা খেয়াল করেনি যে আফ্রিকার উপজাতিদের প্রতিটি গোষ্ঠী নিজেদের ভৌগলিক এলাকায় থাকে, শান্তিতেই ছিল তারা, কিন্তু দেশগুলোকে গড়ে ওরা উপজাতিদের মধ্যে ক্ষমতার আর জমিজমার রেশারেশির সূত্রপাত ঘটিয়ে ফিরে গিয়েছিল, আড়াল থেকে শোষণ আর শাসনের জন্য । ম্যাপ খুললে দেখবেন বেশ কয়েকটা দেশের সীমা যেন স্কেল দিয়ে সোজা লাইন টেনে আঁকা ।[১৮]

প্রথমে বুরুণ্ডিতে হুটু বধ শুরু করে টুটসি সংখ্যাগরিষ্ঠ সৈন্যবাহিনী । প্রথম সাধারণ নির্বাচনে হুটুরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও রাজা মুয়ামবুটসা হুটু প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করার বদলে নিজের টুটসি সাকরেদদের নিয়োগ করেছিল, পূর্ব পাকিস্তানে যেমন শেখ মুজিবকে প্রধানমন্ত্রী করার বদলে ভুট্টোকে গদিতে বসানো হয়েছিল । পূর্ব পাকিস্তান আর পশ্চিম পাকিস্তান যদি পাশাপাশি হতো তাহলে পূর্ব পাকিস্তানকে বাঙালিমুক্ত করে দিত পশ্চিম পাকিস্তান, এখন যে চাপাতি কয়েকজনের ওপর চালানো হচ্ছে তখন তা হুটু আর টুটসিদের মতন বাঙালিদের ঘরে-ঘরে চালানো হতো ।

হুটু সৈন্যরা বিদ্রোহের চেষ্টা করেছিল, রাজা তখন ভয়ে পালায় । ১৯৭২ সালে হুটুরা সামনে যে টুটসিকে পেয়েছে তাকেই গুলি করেছে বা চাপাতি দিয়ে মুণ্ডু উড়িয়ে দিয়েছে, বাচ্চা ছেলে-মেয়েদের দুই হাত কেটে ছেড়ে দিয়েছে । টুটসি রাষ্ট্রপতির সৈন্যরা তখন পাইকারি হারে খুন করা আরম্ভ করলে হুটুদের । প্রাণ বাঁচাতে হুটুরা জাইরে, রোয়াণ্ডা আর তানজানিয়ায় পালালো । খুনোখুনির বিষ হুটুদের সঙ্গে পৌঁছোলো রোয়াণ্ডায় আর সেখানে প্রথমে দেখা দিল দাঙ্গা, তারপর পারস্পরিক খুনোখুনি, গৃহযুদ্ধ ।

১৯৯৪ সালের এপ্রিল থেকে জুলাই মাসের একশো দিনের মধ্যে রোয়াণ্ডার সংখ্যাগরিষ্ঠ হুটুরা প্রায় দশ লক্ষ টুটসিকে খুন করেছিল । আরম্ভ হয়েছিল রাজধানি কিগালিতে, আর সেই গণহত্যা দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল দেশের সর্বত্র, হুটুদের স্হানীয় সরকারি আধিকারিকরা তাদের  উসকিয়েছিল যাতে টুটসি প্রতিবেশিদের বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়, বাড়ির সবাইকে খুন করে, মেয়েদের গণধর্ষণ করার পর গলা কেটে উড়িয়ে দেয়, বাচ্চাদের হাত বা পা কেটে দেয় ।

টুটসিদের সেনাদল রোয়াণ্ডা প্যাট্রিয়টিক ফ্রণ্ট জুলাই মাসে প্রতিআক্রমণ করে কয়েক লক্ষ হুটুকে খুন করে, তাদের বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়, মেয়েদের গণধর্ষণ করে খুন করে, বাচ্চাদের হাত বা পা কেটে দেয় । কুড়ি লাখ মানুষ এই পারস্পরিক খুনোখুনিতে রূপান্তরিত হয় উদ্বাস্তুতে । ইউরোপ-আমেরিকা যখন নড়েচড়ে বসল তখন দেশটা ধ্বংসের পথে চলে গেছে । আসলে ইউরোপ-আমেরিকা যুগোস্লাভিয়ার ভাঙন নিয়ে যতো ব্যস্ততা দেখিয়েছিল, আফ্রিকার ক্ষেত্রে তারা চিরকাল চোখ বুজে থেকেছে কিংবা দেশগুলোকে ষড়যন্ত্র করে ধ্বংসের পথে পাঠিয়েছে, যাতে সেই দেশগুলোর খনিজের দখল নিতে পারে । রোয়াণ্ডায় সমস্যার বীজ পুঁতেছিল বেলজিয়াম, সংখ্যাগরিষ্ঠ হুটুদের বদলে টুটসিদের মসনদে বসিয়ে । [১৯]

আপনি হয়তো ভাবছেন কি আবোল-তাবোল আফ্রিকার খুনোখুনির ইতিহাস শুনিয়ে চলেছি । আমি, একজন ভারতীয়, যার সঙ্গে হুটু আর টুটসির খুনোখুনির কিছু করার  ছিল না, আমাকে মানসিক শান্তি খোঁজার পথ আবিষ্কার করতে হয়েছে, নিজেকে বাঁচিয়ে পালিয়ে বেড়াতে হয়েছে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মানুষহীন গভীর জঙ্গলে । খুনোখুনির দরুণ দেশের কৃষিব্যবস্হা এমন স্তরে গিয়ে পৌঁছেছিল যে জঙ্গলও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছিল, সব রকমের জন্তু-জানোয়ার ধরে খেয়ে ফেলতে বাধ্য হচ্ছিল মানুষেরা । ঝোপের খাটো হাতি, বাদুড়, লেমুর, ব্লু বাঁদর, গ্বেরেজা বাঁদর, জংলি লাল কাঠবিড়ালি, খরগোশ, জংলি ইঁদুর, হরিণ, জংলি বেড়াল, বেঁজি, অ্যান্টিলোপ, সাপ এমনকি গোরিলার মাংস, পুড়িয়ে, কাঁচা কাঠে পুড়িয়ে। আমাকেও খেতে হয়েছে সেই সব মাংস । জঙ্গলে বেশিদিন লুকিয়ে থাকা সম্ভব হয়নি । তাই ভিড়ে গেলুম হুটুদের সাথে, দাদার আর বৌদির হত্যার প্রতিশোধ নিতে ।

প্রতিশোধ নেবার জন্য আমি হত্যা, বাড়ি জ্বালানো, ধর্ষণের পথ বেছে নিইনি । আমি টুটসি নারীদের শবের সঙ্গে শোয়া আরম্ভ করেছিলুম, আমি তাদের সঙ্গে কেবল শুয়ে থাকতুম, আর জড়িয়ে ধরে কাঁদতুম, সারাদিন, সারারাত, ঘণ্টার পর ঘণ্টা । শব হলেও, একজন নারীকে জড়িয়ে বেশিক্ষণ ধরে থাকলে পুরুষের দেহ আপনা থেকেই জেগে উঠতে থাকে । ক্রমে আমার নেশা বা অভ্যাস হয়ে গেল শবের সঙ্গে শোয়া, তা হুটু নারীর হোক বা টুটসি নারীর । আমি বুঝতে পারছিলুম যে এই দাঙ্গা আর খুনোখুনি আরম্ভ হয়েছে আমার জন্যই, আমাকে এক নতুন শিল্পবোধে উন্নীত করার জন্য ।[২০] আমি গৃহযুদ্ধের আগুন থেকে বেরিয়ে এলুম সম্পূর্ণ এক নতুন মানুষ । কালো নারীর শবে আমি খুঁজে পেয়েছি ভাগ্যের দেবী তাইচেকে, ঔজ্জ্বল্যের দেবী পান্দিয়াকে, শান্তির দেবী আইরিনকে, শিকারের দেবী আর্টেমিসকে, প্রেম আর সৌন্দর্যের দেবী আফ্রোদিতিকে, জ্ঞানের দেবী আথেনাকে, জীবনমৃত্যুর দেবী ব্রিতোমার্তিসকে, প্রতিশোধের দেবী তিসিফোনেকে । অজস্র শব আমায় দিয়েছে নিরাময়, উপশম, সান্ত্বনা ।

আরে…কী করছেন…কী করছেন…শোবেন না…শোবেন না…আমার পাশে শোবেন না…নামুন…নামুন…

Posted in নেক্রোফিলিয়া | Tagged , | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

জঙ্গলরোমিও : মলয় রায়চৌধুরী

 

–কেন-কিঁ কেন-কিঁ কেন-কিঁ কবি লেখক নাট্যকার চিত্রকর অভিনেতা ভাস্কর স্হপতি এরা সবাই অসামাজিক গাধা…

–আরে…এই  মিশকালো নিনড় ভদ্রলোক বলেন কি… ছ’ফিটের হবেন বোধহয়…তাই বলে…

–নট মি…ইটস দি বার্ড’স সঙ…

–কথাগুলা উনার নয়…বাইঞ্চোত আমাগো টিয়াপাখির…উনি টিয়াপাখির কাছ থিকা শিখসেন…

–আপনি ওয়াঁকে নিগ্রো নিগার ব্ল্যাক মুলাট্টো যা ইচ্ছে বলতে পারেন…ওয়াঁর খারাপ লাগবে না…টু বি প্রিসাইজ…উনি আমেরিকান নন…আফ্রিকান…ওয়াঁর মা আফ্রিকা থেকে ইটালিতে গিয়েছিলেন…ওয়াঁর নামটা বিটকেল…ব্যঞ্জনবর্ণ দিয়ে শুরু… ওয়াঁর মতন জিভ মুচড়ে উচ্চারণ করতে হলে…বিদ্যাসাগর  মশায়কে তৃতীয়ভাগ লিখতে হতো…উনি কালু শুনতে অভ্যস্ত…জেলহাজতে ওয়ার্ডেনরা ওয়াঁকে কালু নামেই পেটাতো…আমরা ওয়াঁকে কালু না বলে শিস দিয়ে ডাকি…কালো মানে যে কয়লাটে তা উনি জানেন…অন্যদের জীবনের পাঁক তুলতে-তুলতে এদেশে এসে পৌঁছেচেন…ঠিকই… ওয়াঁর উচ্চতা সাড়ে ছ’ফিট…ব্লাডি ফাকিং হাইট…

–হ্যাঃ হ্যাঃ…কুড়ি কোটি দুর্যোধনের বাল…আমি সালা এগগালে নগসাল ছিলুম… মনে থাকে যেন…

–এই চুপ…যে মরে গেছে তার নকল করবেন না…

–বাংলা জানেন ?

–নাহ…টু বি প্রিসাইজ…ভাঙা-ভাঙা বাংলা…বাকিটা বোবামি দিয়ে বুঝিয়ে দেন…আপনি আমাদের সঙ্গে থাকতে থাকতে ব্লাডি ফাকিং ইউজড টু হয়ে যাবেন…আপনি ওয়াঁর মুখে এক্ষুনি যা শুনলেন…টু বি প্রিসাইজ…তা উনি শিখেছেন আমাদের টিয়াপাখির কাছে…টিয়াপাখিটা প্রতিদিন সকালে ওই কথাগুলো কপচে-কপচে আমাদের ঘুম চটকায়…জঙ্গলের এফ এম রেডিও বলতে পারেন…

–এখানে ডুয়ার্সের গভীর জঙ্গলে এসে জুটলেন কী করে…টিয়াপাখি আর কেলো দুজনেই ? টিয়াপাখি তো শুনেছি বাজার থেকে কিনে খাঁচায় না পুরলে মানুষের মাতৃভাষায় কথা বলেন না…জঙ্গল থেকে ধরে এনে সরাসরি কথা বলানো কঠিন…মানে…যায়ই না বলানো…কথা বলানোর জন্য খাঁচায় পোরা বা পায়ে শেকল বাঁধা জরুরি…দ্যাখেন  না…কাকাতুয়াদের পায়ে শেকল বেঁধে তারপর কথা বলানো হয়…উচ্চমাধ্যমিকে পড়েছিলুম…মানুষ হোমিনিড থেকে হোমোসেপিয়েন হতে পারতেন না…যদি না তাঁরা খাঁচা বা কারাগার আবিষ্কার করতেন…খাঁচা আবিষ্কার করে তাতে মানুষকে পোরবার পরই মানুষ গোঙাতে-গোঙাতে আমাকে ছেড়ে দাও… আমাকে যেতে দাও…আমি কিচ্ছু করিনি…ধরণের তোতলামি আওড়াতে বাধ্য হয়েছিলেন… লজ্জাস্হানে অশথ্থপাতা বাঁধা বা কোমরে ঝাউপাতা ঝোলাবার প্রথা তারপর ঘটেছিল…

–টু বি প্রিসাইজ…যেভাবে আপনি এখানে এসে জুটলেন… আমি এসে জুটেছি…উনি সেভাবেই এসে জুটেছেন…তবে ব্লাডি ফাকিং টিয়াপাখিটা একজন নেপোপ্রেমী চিৎফাঁদ পাঁজি টয়লেট কোম্পানির ঘ্যামচাঁদ মালিকের বাড়ি থেকে চুরি করে আনা…চোদ্দো হাজার কারখানা লাটে উঠে ওই একরকম কারখানাই তো টিকে আছে ধর্ষণমাতৃক দেশে…শ্বেতশুভ্র চিৎফাঁদ পাঁজির টয়লেট  রোল…নেপোপ্রেমী…দুটো টিয়াপাখি আমরা ওয়াঁর বাড়ি থেকে চুরি করে এনেছিলাম…অন্যটাকে গত বছর শেয়ালে বা কোনো জংলি জানোয়ারে পালকসুদ্দু খেয়ে ফেলেছে বলে মনে হয়…সেই পাখি অসামাজিক গাধার বদলে বলতেন সামাজিক চুতিয়া…

–মানে…কেন-কিঁ কেন-কিঁ কেন-কিঁ কবি লেখক নাট্যকার চিত্রকর অভিনেতা ভাস্কর স্হপতি এরা সবাই সামাজিক চুতিয়া ? তার মানে মরা পাখিটা জীবন্ত পাখিটার চেয়ে উচ্চশিক্ষিত  ছিলেন বলে অনুমান করতে পারা যায়…আই অ্যাম শিওর…তাঁকে নেপোপ্রেমী চিৎফাঁদ পাঁজি টয়লেট কোম্পানির বাড়িতে ওপরের খোপের খাঁচায় বেশিদিন থাকতে হয়েছে…

–চিৎফাঁদ পাঁজি টয়লেট  কোম্পানির নেপোপ্রেমী চৌখাম্বা মালিক প্রতি বছর যে খয়রাত দিতেন আর খাইখরচ… খোরপোষের সুপারিশ করতেন…তার জন্য পাখি দুটো পুষেছিলেন…পাখিদুটোর সামনে নাম লেখা গ্রিটিং কার্ড ফেলে দিতেন…টু বি প্রিসাইজ…যে পাখিটা চুতিয়া কপচে গান শোনাতেন…সেই পাখিটা যাঁর নামের কার্ড তুলতেন তাঁকে দশ গুণ…আর অন্য পাখিটা তুললে  চিৎফাঁদ পাঁজি টয়লেট কোম্পানির দশরঙা ক্যালেণ্ডারে তাঁদের ছবি ছাপিয়ে দিতেন…কাঁধে সিল্কের চাদর-গামছা দিয়ে…ঠাণ্ডা-মার্বোনাইটের দিওয়ানে-খাসে…সেসব ঐতিহ্যের কাহিনি ওনার চিৎফাঁদ পাঁজি টয়লেট নেপোপ্রেমী রোলেই নজরে পড়েছিল এককালে…আমরা যখন ওয়াঁর বাড়িতে ডাকাতি করতে গিয়েছিলাম…সেদিনকেই চিৎফাঁদ পাঁজি টয়লেট রোলে ছেপে  বেরিয়েছিল…কী অসাধারণ বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় উনি খয়রাত-খোরপোষ অনুদান প্রকল্প আবিষ্কার করেছেন…আমরা টয়লেট বা টিশ্যু ব্যবহার করার সুযোগ নমাসে-ছমাসে পাই… ওই যখন ব্লাডি ফাকিং ছোটো-ছোটো ঘটনা ঘটাতে বেরোই তখন সেদিনকার চিৎফাঁদ পাঁজি টয়লেট রোলগুলো কোনো ঠেক থেকে দুষ্টুমি করে তুলে নিই…যাতে প্রতিভাশালী গরুপাচারকারী আর সৃষ্টিশীল গাছ-মাছ-ঠিকেদার কত্তাদের খবরাখবর পাওয়া যায়…আর ডাকাতি করার নাব্যতা আছে এমন চিৎফাঁদ টয়লেট পাঁজি মালিকটালিকের নামসাকিন ঘাঁতঘোঁত জানা যায়…নয়তো ডুয়ার্সের এই গভীর জঙ্গলে বসবাস করে কী করেই বা জানা যাবে কারা কারা ব্লাডি ফাকিং ঘাপটি মেরে এদিক-ওদিক হাত ঢোকাচ্ছে…পাখিদুটোর সামনে  কেলো টয়লেট পেপারের টুকরো রেখে রেখে ওয়াঁদের এফ-এম বুকনির বদভ্যাসকে নিয়মিত করে ফেলেছিলেন…কার সঙ্গেই বা উনি কথা বলবেন বলুন…হয় পাখিদুটোর সঙ্গে…নয়তো নিজের প্রেমিকার সঙ্গে…ভালোই ফোঁড়তুলুনি প্রেমিকা পেয়েছেন…কথা আদান-প্রদানের অসুবিধা হয় না…

–খাঁচা থেকে কী করে খেলো জংলি জানোয়ার…আপনারা তো খাঁচাসুদ্দুই তুলে এনেছিলেন…নাকি ?

–হ্যাঃ হ্যাঃ…কুড়ি কোটি দুর্যোধনের বাল…আমি সালা এগগালে নগসাল ছিলুম…মনে থাকে যেন…

–এই চুপ…যে মরে গেছে তার নকল করবেন না…

–আমরা খাঁচাসুদ্দু চুরি করে এনেছিলাম বটে…কিন্তু টু বি প্রিসাইজ…জঙ্গলে উড়িয়ে দেবার পরও ব্লাডি ফাকিং পাখিদুটো  পালালেন না…থেকে গেলেন আমাদের সঙ্গে…বোধহয় মানুষদের সঙ্গে থাকার বদভ্যাস হয়ে গিয়েছে ওনাদের…ওই যে আপনি বললেন…একবার খাঁচায় ঢুকিয়ে বুলি শিখিয়ে দিলেই  তিনি হোমিনিড থেকে হোমোসেপিয়েনের রাস্তায় সরসরিয়ে নামতে শুরু করেন…লাল-গলা পাখিটাকেই খেয়ে ফেললেন কোনো নোলা-সকসকে জংলি জানোয়ার…সেই থেকে বেঁচে-থাকা সবুজগলা পাখিটা রাতের বেলায়  যাঁর ঘরে উড়ে গিয়ে বসেন ইউজুয়ালি সেই ঘরেই থাকেন রাতভর…মানুষ-ন্যাওটা হয়ে গেছেন পাখিটা…কুরুচকুনে টিয়া…

–যাক…জঙ্গলে আপনাদেরও টাইম পাস…ফুটপাতিয়া বাংলায় গালাগাল-গুঞ্জরিত এফ এম সঙ্গীত শোনেন…নয়তো…যা দেখছি…এখানে টিভি মোবাইল বা ওই ধরণের আমুদে গ্যাজেট জিইয়ে রাখার কোনো পরিষেবা নেই…এই সমস্ত ভেবেই আমি সন্ন্যাস নিয়ে হিমালয়ের কোনো গুহার জাঙালভিটে অ্যাডপ্ট করতে যাচ্ছিলুম…মরবার জন্য কারণ চাই তো…জেলে উদ্দেশ্যহীন ঘানি ঘোরাবার চেয়ে…

–আজকাল তো সন্ন্যাসীরাও ল্যাপটপ-পেন ড্রাইভ  আর মোবাইল ফোন…টু বি প্রিসাইজ…স্মার্ট ফোন রাখছেন… কুম্ভমেলায় হোমের আগুন জ্বেলে…ছিলিমে টান দিয়ে…ফোনে মিউজিকাল আশীর্বাদ দিচ্ছেন শিষ্যদের…মোবাইল টাওয়ারের আওতায় সন্ন্যাস নিলেই হল…টাওয়ারগুলো তো দিনকেদিন গ্রামগঞ্জের… শানপুকুরের…মঠের…বাউলদের…শ্মশানের…চিড়িয়াখানার কাছেপিঠে চলে যাচ্ছে…

–আইলেন কী কইরা বাইঞ্চোত এত দূর…ডুয়ার্সের জঙ্গলে…এত ভিতরে…ট্যুরিস্ট রুট ছাইড়া…ফেডেড জিন্স…সবুজ টিশার্ট…স্পোর্টস জুতা…মুক্তাছাগু দাড়ি…

–আমি তো আইনের চোখে আবির দিয়ে পালাচ্ছিলুম…ভেবেছিলুম হিমালয়ে কোনও পাথুরে আড়ালে ঠাঁই নিয়ে সন্ন্যাসীর জীবন কাটাবো…দমদম বিমান বন্দর থেকে ভুটানের পারো বিমানবন্দর…তারপর লোকাল বাসে করে গেলেফু…পারো থেকে গেলেফুও বিমানে আসতে পারতুম…পুলিশে ম্যানিফেস্ট দেখে তা থেকে ফলো করবে আঁচ করে লোকাল বাসে চাপলুম…গেলেফু থেকে হাঁটতে হাঁটতে বর্ডার পার করে শিলিগুড়ির দিকে না গিয়ে ডুয়ার্সের জঙ্গলে ঢুকলুম…তিন দিন হেঁটেছি…কী করব ভেবে পাচ্ছিলুম না…তারপর আড়াল থেকে আপনাদের চারজনকে দেখতে পেলুম…মাটির গর্তে কিছু করছেন…মনে হল আমার বয়সী একজন লোককে তাতে শুইয়ে দিয়ে মাটি ছড়িয়ে দিলেন… এরকম ঘন জঙ্গলে একজনের শবে মাটি ছড়িয়ে দিচ্ছেন দেখে মনে আশা জাগল যে হয়তো আপনারাও আমার মতন সামাজিক গাড্ডায় পড়ে গিয়ে থাকবেন…

[স্কাউন্ড্রেলগুলোর সঙ্গে ঠিকমতো কথা চালিয়ে যেতে পারছি মনে হয়…যা বলছে এরা…বেশ বিপজ্জনক লোকজন…পিওর ক্রিমিনাল না সন্ত্রাসবাদী যাচাই করে দেখা যাক…বেশ ঘাঁটি গেড়ে বসেছে জঙ্গলের ভেতরে…তবে রিপোর্ট ছিল কেবল একজনের উপস্হিতির…এরা তো একটা গ্যাঙ…]

–টু বি প্রিসাইজ…হয়তো ব্লাডি ফাকিং  গাড্ডা…কিন্তু সব গর্ত একই রকম হয় না…আপনার ব্লাডি ফাকিং গাড্ডার কথা বলুন…তারপর আমাদের গাড্ডার কথা শুনবেন…তবে…টু বি প্রিসাইজ…ব্যক্তিগত সাম্প্রতিকের কথাই কেবল বলবেন…আমাদের পারিবারিক বা সামাজিক অতীত নেই…বুদ্ধ বলে গেছেন… অতীত নিয়ে চিন্তা কোরো না…ভবিষ্যতের স্বপ্নে বিভোর হয়ো না…নিজের মনকে বর্তমান মুহূর্তের দিকে একাগ্র করো…বাই বুদ্ধ আই মিন গৌতম বুদ্ধ হু লেফ্ট হিজ ফ্যামিলি…নট দ্য ওয়ান হু ইজ লেফ্ট বাই দি লেফ্ট ফ্যামিলি…

–হ্যাঃ হ্যাঃ…কুড়ি কোটি দুর্যোধনের বাল…আমি সালা এগগালে নগসাল ছিলুম…মনে থাকে যেন…

–এই চুপ…যে মরে গেছে তার নকল করবেন না…

–যাঁর ওপর মাটি ছড়িয়ে দিলেন তিনি  আপনাদের কে ছিলেন… আত্মীয়… বন্ধু… বহিরাগত… চুকলিখোচর…দেহরক্ষী…

–না…না…তিনি আমাদের পঞ্চমজন…ভুল বলেছি…ষষ্ঠজন…ব্লাডি ফাকিং আত্মহত্যা করেছিলেন..টু বি প্রিসাইজ…নাম আমরা ব্যবহার করি না…পুরুষ মানুষের জীবনে সবচেয়ে ক্ষতিকর হল তার পোশাক আর নাম…আমরা নামহীন পুরুষদের নিয়ে পোশাকহীন সমাজ গড়ার পক্ষে…কেবল কোল-প্রেমিকাদের নাম থাকবে…আমাদের প্রেমিকাদের একটি করে নাম আছে…জঙ্গলে এসে আমরা বদলাইনি…জঙ্গলকেই বদলে দিয়েছি…সবাই মিলে যদি উলঙ্গ সমাজ গড়েন তাহলে ভয় শোক মায়া লজ্জা অপমান ঘেন্না অমর্যাদা সংশয় থেকে ছাড়ান পেয়ে যাবেন…প্রেমিকারা আমাদের মরমিয়া উদ্ধার…

–এখানে জঙ্গলে এসে আত্মহত্যা…স্ট্রেঞ্জ…সমাজ সংসার ছেড়ে এসেও আত্মহত্যার কারণ থাকে নাকি…

–এঁড়ে নেকুপুসু জিদ…ওয়াঁর  প্রেমিকার বিশ্বাসঘাতকতা সহ্য করতে পারেননি উনি…যে  প্রেমিকা ওয়াঁর ছিল…তাঁকে উনি বলতেন চাঁদবদনী…লিগালি ব্লণ্ড…

–ওঃ…প্রেমিকার  জন্য বিবাগী হয়ে চলে এসেছিলেন…তা সে তো ওনার বয়ঃসন্ধির রসকশের দিনকালে ঘটে থাকবে…যদিও দূর থেকে আবছা দেখে  মনে হল আমার-আপনার চেয়ে কচিনধর মানুষ…

–আমরা জঙ্গলে নিজের-নিজের সোহাগী প্রেমিকার সঙ্গেই বসবাস করি…ওয়াঁর প্রেমিকাও এখানেই থাকেন…

–প্রেমিকা…বিয়ে-শাদি-নিকা না করে সবাই লিভটুগেদার করছেন নাকি…চুল দাড়িও কামান না…আঁচড়ান না…সবাই…গায়ের দুর্গন্ধে মহিলারা অবজেক্ট করেন না ? সকলে এভাবে বাসি নোংরা লুঙ্গি পরেই কাটিয়ে দেন…খালি পায়ে…দাঁত মাজেন না…চোখে পিচুটি…নখে ময়লা…

[ প্রেমিকা…ডুয়ার্সের গভীর জঙ্গলে প্রেমিকা…তারা কারা…এদের মতোই নোংরা…এদের দলের মহিলা সদস্য…নাকি জোর করে তুলে এনেছে…বলছে লিগালি ব্লণ্ড…বিদেশিনী হবে…আরও খুঁচিয়ে এদের কাণ্ডকারখানা জানবার চেষ্টা করি…]

–না…কেন অবজেক্ট করবেন…ওয়াঁদের থেকেই আমাদের গায়ে…আপনি যাকে বলছেন দুর্গন্ধ…আর আমরা বলি সুগন্ধ…তা ছড়িয়ে পড়ে…মন দেয়া-নেয়ার ঢঙে গন্ধ দেয়া-নেয়া…দরকার পড়লে কেলো চুল দাড়ি কেটে দ্যান…ওয়াঁর কাছে খুর আছে ব্লাডি ফাকিং সেল্ফ ডিফেন্সের জন্য…মুর্গি-খরগোশ-বাদুড় কাটার জন্য অবশ্য ছুরি-চপার আছে…সেই খুর ব্যবহার করে সবাই নমাসে-ছমাসে গোঁপদাড়িভুরুবগলকুঁচকি কামিয়ে  চুলহীন হয়ে যাই…চুলের কোষাগারে জমা থাকে…পাথরে ঘষে খুরে শান দিয়ে রাখেন…কাঁচিও আছে…যদি দরকার পড়ে…আমরা কারোর জন্য স্মৃতি ছেড়ে যেতে চাই না…চুল ছাড়া…নাম থাকলেই স্মৃতির ঝুঠঝামেলা… ইতিহাস-ফিতিহাস…আমাদের প্রেমিকাদের মন আর হৃদয় টাইপের ফালতু ব্যাপারের ঝঞ্ঝাট নেই…কেননা ওনাদের রয়েছে পবিত্র প্রবৃত্তি…বিশুদ্ধ প্রেম…

— সব সময় সবাই খালি গায়ে এই চাককাটা লুঙ্গি পরেই থাকেন…নাকি প্যান্ট-শার্টও পরেন ?

–না…বাইঞ্চোত সাধারণত আমরা সবাই নাঙ্গা পোঙায় থাকি…নাঙ্গা চুকিতকিত খেলি…গাছের ডালে-ডালে নাঙ্গা চোর-পুলিশ খেলি…দোলনচেয়ারে নাঙ্গা দোল খাই…ছিলিমে পাতা ফুঁকি…নাঙ্গা দাবা খেলি…নাঙ্গা তাস খেলি…নাঙ্গা লুডো খেলি…আইজকা উনি মারা গ্যালেন বইলা সন্মান জানাইতে লুঙ্গি পইরতে হইল…জঙ্গলের প্রাণীগো পোশাক পরনের প্রয়োজন নাই…

–আপনি বাঙাল নাকি ?

–হ্যাঁ..উনি রায়টের পরের বাঙাল…রায়টের আগের হলে ওয়াঁর মুখে শুদ্ধ বাঙালেবুলি শুনতেন… বাবুয়ানি দেখতেন…

–আচ্ছা…

–টু বি প্রিসাইজ…আমরা জানি যে পুরুষের পক্ষে পোশাক ব্যাপারটা ক্ষতিকর…শুধু শীতকালে  ঠাণ্ডায় ব্লাডি ফাকিং প্যান্ট-শার্ট-সোয়েটার-কোট-জুতোমোজা না পরলেই নয়…বর্ষায় রেইনকোট…সিসিটিভি থেকে মুখ আড়াল করার ছাতা…যিনি মারা গেছেন তিনি টাকমাথা ছিলেন…ভাবুক ছিলেন তো…পাদতেন আর বলতেন সরি…কম বয়সে টাক পড়ে গিয়েছিল…শীতের সময় টুপি পরতেন…আর জঙ্গলের বাইরে ডাকাতি করতে যেতে হয়…যখন যেমন ডাকাতি তার তেমন পোশাক…আমরা টুকরো-টুকরো ঘটনা দিয়ে গড়া…গন্ধ তো হবেই… থাকতে-থাকতে আপনারও অভ্যাস হয়ে যাবে…ডোন্ট ওয়রি…অভ্যাস আমাদের দাস…যিনি মারা গেলেন তিনি ডাকাতিতে অংশ নিতেন না…সংসার পাহারা দিতেন…চাবির থোলো হ্যাণ্ডল করতেন… এক-তরকারি… দু-তরকারি ভাত রেঁধে রাখতেন…আপনাকে আপাতত ওয়াঁর ডিউটি দেয়া হবে…

–হ্যাঃ হ্যাঃ…কুড়ি কোটি দুর্যোধনের বাল…আমি সালা এগগালে নগসাল ছিলুম…মনে থাকে যেন…

–এই চুপ…যে মরে গেছে তার নকল করবেন না…

–আমার যা ঘেমো প্যাচপ্যাচে হাল…আজকেই চুলহীন হয়ে গেলে ভালো হতো…তিন-চার দিনের খোঁচা দাড়িও খচখচ করছে…

–এক্ষুনি হবার দরকার নেই…সবাই যেদিন হবো…আপনিও হবেন…তাড়াহুড়োর কী আছে…টু বি প্রিসাইজ…চুলহীন হওয়াকেও উৎসব বলে মনে করুন না…তা হলেই তো হল…চুলহীন দেহে সবাই মিলে উলঙ্গ নাচার আনন্দই আলাদা…সেদিন যদি বৃষ্টি পড়ে তো কথাই নেই…এই বয়সে নাচানাচি করেছেন কখনও…না প্রাইমারি স্কুলেতেই ঠ্যাঙের পাঁই-পাঁই ফুরিয়ে গেছে…উচ্ছৃঙ্খল না হলে নাচতে পারবেন না…

–শহরে এই বয়সে কি আর নিজে-নিজে নাচার অবসর থাকে…নানা রকমের সরকারি আর দলীয় বাঁশ নাগরিককে নাচাতে থাকে…নিজে উলঙ্গ হতে হয় না…ওনারাই খুলে নেন…

–তাহলে এখানে আমাদের সঙ্গে চুলহীন গায়ে…ব্লাডি ফাকিং বিনা বাঁশের ফ্রিস্টাইল নাঙ্গা নাচ নাচতে পারবেন… লকিং পপিং শিমিং বামিং…আর যা ইং ইং নাচ হয়…

–ব্যায়াম করেন না আপনারা ?

–করি…করি…সক্কালবেলায় সবাই আচ্ছা-করে কেজেল একসারসাইজ করি…প্রেম করার জন্য খুবই জরুরি…স্বাদের তার পাওয়া যায়…

–ওই যে দেখা যাচ্ছে…দূরে…সবাই মিলে ওই একটা পুরোনো তিনতলা  বাড়িতেই থাকেন ? নাকি রেড- ইনডিয়ান স্টাইলে প্রত্যেকে কুটির-টুটির ঝোপড়ি-টোপড়ি তৈরি করে তাতে প্রেমিকাদের সঙ্গে থাকেন ? চলেই বা কী করে ? জনপদ থেকে তো বেশ দূরে…গভীর জঙ্গলে…দোকান-বাজার…

–টু বি প্রিসাইজ…বলেছি তো…ব্লাডি ফাকিং চুরি-ডাকাতি করে…সাধারণত চিৎফাঁদ পাঁজি টয়লেট নেপোপ্রেমী শীর্ষকত্তা কিংবা  ভুঁড়োকাত্তিক গাছ-মাছ-ঠিকেদার ছাতুদাদা-লাটুদাদাদের বাড়ি বা অফিসে ডাকাতি করি আমরা… ব্যাঙ্ক-ট্যাঙ্কের গেঁও হাই-তোলা ছলঘুমন্ত কেরানিদের অফিসেও ডাকাতি করি…আমাদের একজন গিয়ে ঢুঁ মেরে দেখে আসে কারা কারা শীর্ষকত্তা হয়েছে বা মাছ-গাছ-ঠিকেদারিতে পেল্লাই…সিঁধ কাটা বা হামলে পড়া যাবে…অপরিচিত শহর হলে সেখানের পথের কোনো ষাঁড়ের পিছুপিছু একজন যান পুরুত সেজে…ষাঁড়েরা ধনীদের বাড়ির খবর রাখে…দামি ফলটা-আশটা পায়…বড়সড় দাঁও মারতে পারলে ভালো…নয়তো ফলটল…মুর্গি-টুর্গি রেঁধে-পুড়িয়ে খেয়ে  উলঙ্গ কাটিয়ে দিই যত দিন পারা যায়…তবে আমাদের প্রেমিকাদের খাওয়াবার দায়িত্ব প্রত্যেক প্রেমিক নিজে নেন…তাঁদের আমরা অভুক্ত রাখি না কখনও…তাঁদের ডিপ্রেশানে ভুগতে দিতে পারি না…প্রেম অবিনশ্বর…আট হাজার বছর আগের গুহার দেয়ালেও আঁকা পাবেন…

–তার মানে এই জঙ্গলেও পার্টিবাজি…কোন দল…এনি কালার হেটরেড…

–আমরা কাউকে অচ্ছ্যুৎ অস্পৃশ্য মনে করি না…টু বি প্রিসাইজ…আমাদের চোখে সবাই ব্লাডি ফাকিং ব্ল্যাক…চুলের মতন…

–দুর্যোধনের বাল…নট চুল…

–কালু ভদ্রলোক যা তাগড়া… ডাকাতিতে গাজোয়ারি বা ভয় দেখাতে সুবিধাই হয় ওনার সাহায্য নিয়ে…আফ্রিকার মানুষদের টেসটোসটেরনের মাত্রা বেশি…তাই তো ওনারা সব রকমের দৌড়ঝাঁপে এগিয়ে… কোন আফ্রিকার লোক ? আজকাল আফ্রিকা তো নানারকম…অবশ্য আফ্রিকার লোকেদের দেখে কে যে কোন আফ্রিকার  বোঝা কঠিন…ডাকাতি ব্যাপারটা প্রকৃতিও মেনে নিয়েছে…এই তো জঙ্গলে যে গাছ যতো উঁচুতে ওঠে সে তার শেকড়কে তত তলায় নামাতে থাকে…ওপরে উঠতে হলে শোষণের জন্য নিচে নামতেই হবে…গোড়ার কাছে কাউকে মাথা তুলতে দেয়া হয় না…প্রকৃতির রাজনৈতিক নিয়ম…

–টেসটোসটেরনের মাত্রা আমাগো কারোরই কম নয় দাদা…আমাগো প্রেমিকাদের সঙ্গে আলাপ হইলে জাইনতে পারবেন…কে কতটা ল্যাঞ্জাধারী…উনাদের হইলেই হইল…অরগ্যাজমের চাহিদা নাই…ইনফ্যাচুয়েশানের দুর্ভোগ নাই…

–হ্যাঃ হ্যাঃ…কুড়ি কোটি দুর্যোধনের বাল…আমি সালা এগগালে নগসাল ছিলুম…মনে থাকে যেন…

–এই চুপ…যে মরে গেছে তার নকল করবেন না…

–নিউকামার মোসাই…ওসব শোষণ-শাসনের ইশতাহারি বক্তিমেবাজি ছাড়ুন…বলেছি তো…আমাদের ব্লাডি ফাকিং পারিবারিক সামাজিক অতীত নেই…মানে আমাদের ওপরে ওঠা আর নিচে নামার সুচিন্তা বা দুশ্চিন্তা নেই… কেলোর কোনো দেশ নেই…ছিল এককালে…এদেশে যেদিন ঢুকেছেন সেদিনই উনি নিজের ব্লাডি ফাকিং পাসপোর্ট ছিঁড়ে ফেলে দিয়েছেন…টু বি প্রিসাইজ…ধরা পড়ার পর…আদালতে কয়েকবার তোলা হয়েছিল ওয়াঁকে…তুললে বলতেন যে উনি এদেশেরই লোক…সরকার প্রতিবার হিমসিম খেতো প্রমাণ করার জন্য যে উনি এদেশের নাগরিক নন…যারা ব্লাডি ফাকিং এদেশের নাগরিক তারা গুচ্ছের কাগজপত্র যোগাড় করতে হাল্লাক হয়ে যায় নিজেদের নাগরিক প্রমাণ করার জন্য…যারা নাগরিক নয় তারা যে সত্যিই নাগরিক নয় তা প্রমাণ করার জন্য সরকারকে হন্যে হয়ে ব্লাডি ফাকিং প্রমাণপত্র খুঁজে মরতে হয়…গায়ের রঙ দেখে তো আর দেশ বোঝা যায় না…

–আপনাদের সঙ্গে পরিচয় হল কী ভবে…

–যেভাবে আপনার সঙ্গে হল…চোখাচুখি…টু বি প্রিসাইজ…আমরা একই ব্লাডি ফাকিং কারাগারে বিচারাধীন কয়েদি ছিলাম…আদালতে নিয়ে যাবার পথে কন্সটেবলদের পেঁদিয়ে পালাই…কেলোই সাহায্য করেছিলেন…আমি এই অঞ্চলের লোক হওয়ায় ডুয়ার্সের ঘাঁতঘোঁত ছোটোবেলা থেকে চিনি…তাই সবাইকে নিয়ে ভুটানের সীমায় এই গভীর জঙ্গলে চলে এলাম…এটা রিজার্ভ ফরেস্টের প্রায় নো ম্যানস ল্যান্ড…পর্যটকরা ল্যাংচাতে-ল্যাংচাতে এখান পর্যন্ত পৌঁছোতে পারেন না…আট বছর হয়ে গেল…বললাম তো…আমরা আমাদের পারিবারিক সামাজিক অতীত  ডিলিট করে দিয়েছি…পরিবার হলো অতীতের পরানো আপনার পায়ের মরচেপড়া বেড়ি…আর ভবিষ্যত হল আপনার সামনে লোভের সরকারি সেতু…মানুষের মতন মানুষ হয়ে বাঁচতে হলে…বেড়ি আর সেতু দুটো থেকেই ছাড়ান পেতে হবে…স্মৃতিকে ডিলিট করে ফেলুন…অতীতকে ক্ষমা করলেই ডিলিট করে দিতে পারবেন… আমরা অতীতহীন…কবে যে স্মৃতিহীন হবো জানি না…আপনার নাম আমরা জানতে চাই না…আমাদেরও কারোর কোনো নাম নেই…আপনিও আপনার নাম-পদবি টুসকি বাজিয়ে ভুলে যান…

–হ্যাঁ…বাজালুম…ছেলেবেলায় আমায় ডাকনামে ডাকা হতো…তারপর ডাকনামটা একটু-একটু করে উবে গেল… ডাকনামে ডাকার লোকেরাও উবে যেতে লাগল…তারপর তাঁরা সবাই হাপিশ…ঠিকই বলেছেন…অতীত নিয়ে গর্ব করার মানে হয় না…তা নিজের হোক বা নিজেদের বা পরের…অতীত বললেই কেমন যেন একটা স্যাঁতসেঁতে প্যাচপেচে গন্ধ নাকে এসে লাগে…বিলডারে নিতে পারেনি…কাঙালিরা জবরদখল করতে পারেনি…এরকম… বনেদি কলকাতার নোনা ইঁটের ঝুরঝুরে কোম্পানি আমলের বাড়ি…

–আপনার সঙ্গে ব্লাডি ফাকিং অন্যদের পরিচয় করিয়ে দিই…ইনি…ইনি…ইনি… আর আমি…কেলোকে তো নিজেই চিনে নিয়েছেন…আর যিনি মারা গেছেন তিনি ওইখানে কবরে শুয়ে ঘুমোচ্ছেন…আই মিন চিরনিদ্রায়…

–আপনিই নেতা ? আপনিই শুধু কথা চালিয়ে যাচ্ছেন…বুলির থান-থিত্তি ভালো…অথচ সকলের চেয়ে আপনিই বোধহয় বেঁটে… বেশ সখিমুখো আর ফর্সা…উকিলি ছিরিছাঁদও আছে…গাঁট্টাগোট্টা নেপোলিয়ানিক মুশকো জোয়ান…সিক্স প্যাক বুকপেট করে নিতে পারতেন…

–আমাগো বাইঞ্চোত ফ্যামিলি প্যাক গোদলা তলপেটই কাজে দেয়…আমরা কুস্তি-প্রেম…নখরা-প্রেম করি না…

–হ্যাঃ হ্যাঃ…কুড়ি কোটি দুর্যোধনের বাল…আমি সালা এগগালে নগসাল ছিলুম মনে থাকেন যেন…

–এই চুপ…যে মরে গেছে তার নকল করবেন না…

–টু বি প্রিসাইজ…আমার হাইট চার ফিট সাত ইঞ্চি…আপনি তো আমার মুখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে চলেছেন…তাই ব্লাডি ফাকিং উত্তরও আমিই দিচ্ছি…সবাইকে পথ দেখিয়ে গভীর জঙ্গলে এনেছি…সবাই আমায় অনুসরণ করেছে…সুতরাং আমিই আমাদের স্বরাষ্ট্র  আর খুনোখুনির কর্ণধার…ইনি যানবাহন আর ছিনতাই… ইনি অর্থ আর চুরিডাকাতি…যিনি মারা গেলেন তিনি সংস্কৃতি আর রান্নাবান্না…ইনি…

–এবার তাহলে ওনাকে জিগ্যেস করি…উনি আমার মতনই তামাটে আর মাঝারি…তবে টিঙটিঙে রোগা…আর ট্যারা চোখ… কোঁকড়া চুলও আছে আমার মতন…স্যার…আপনি আমাকে মারতে চাইছিলেন কেন…গুলি চালালেন আমাকে লক্ষ্য করে…ভাগ্যিস টিপ ফসকে গিয়েছিল…নয়তো মারা পড়তুম…রাইফেলটা নামিয়ে রাখুন…প্লিজ…

–টিপ ফসকায় নাই…আপনারে বাইঞ্চোত সতর্ক করার জন্য গুলি চালাইয়াসিলাম…তাছাড়া বুইঝলেন কিনা… আপনে বন্দুক তাক করা হতেসে দেইখা দুইহাত উপরে তুইলা হ্যাণ্ডস আপ কায়দায় স্হির হয়্যা দাঁড়াইয়া পড়সিলেন… বুইঝতে পারলাম যে আপনে বাইঞ্চোত ট্রেসপাসার নন…কুনো ভিতু-ছাপ পথভুলা ট্যুরিস্ট বা ভুলাক্কড় বনবিজ্ঞানী…আপনের কাঁধে বইমেলার কবি টাইপের এই ঝোলা সাড়া আর কিসু নাই দেইখাও আস্বস্ত হইসি… বাইঞ্চোত  ঝোলা সার্চ কইরা কেবল আখরোট কাগজি বাদামের প্যাকেট জলের বোতল আর দুটা পেনসিল টর্চ… বুইঝলেন কিনা…সুতরাং আপনে পুলিসের টিকটিকি কিংবা বনবিভাগের গিরগিটি নন বইলা অনুমান করতে পারলাম…মিনারাল ওয়াটারের বোতল নিয়া সন্ন্যাসজীবন বাইছা নিয়াসেন…

–জামা-প্যান্ট সার্চ করার সময় কাতুকুতু দিচ্ছিলেন কেন…

–আপনের বেবি-কচ্ছপ চেক কইরা নিতে হইল… যে আপনে ব্যাটাছেলে না মেয়্যাছেলে…আর কুঁচকির ভাঁজে ছোরা-পিস্তল লুকায়ে রাখসেন কিনা তাও যাচাই করা বাইঞ্চোত জরুরি আছিল…

–রাতে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে হাঁটার সময় আওয়াজ শুনলেই টর্চ দুটো দুহাতে নিয়ে জ্বেলেছি…যাতে জংলি জীবজন্তুও আমাকে কোনো জানোয়ার মনে করে পালায়…দিনের বেলায় একটা হিজল গাছের তলায় ঘুমিয়ে নিয়েছিলুম…ওই যে নিচের দিকে জলের সোঁতামতন আছে…সেখানে…

–দূর থেগে আবনাগে হারামি বলেই মনে হচ্ছিল…

–হ্যাঁ…ওনার লক্ষ্য অব্যর্থ…আর্মি সেপাই ছিলেন তো…আর্মির ব্লাডি ফাকিং ডেজার্টার…

–রোজরোজ বাইঞ্চোত লেফট রাইট ভালো লাগত না আমার…বুইঝলেন কিনা…সৈন্যবাহিনীর কাজ যুদ্ধ করা…বেয়নেট দিয়া খোঁচানো…বিপদের ঝুঁকি ছাড়া বেঁচে থাকার কুনো মানে নাই…তা নয় আজ বইন্যা তো কাল ভূমিকম্প তো পরশু দাঙ্গা তার পরের দিন ট্রেন দুর্ঘটনা…এই সব কাজে লাগাইয়া জীবনটারে নষ্ট কইরা দিতে আছিল…তাতে গাঁইগুঁই কইরবার ফলে…বুইঝলেন কিনা…আমারে একজন কর্নেলের বাড়ির চাকর কইরা দিলে… ব্যাটম্যান…আজকাল যারে কয় সহায়ক…সায়েবের জুতার গু-গোবর  পরিষ্কার করা থিকা ম্যাডামের ঝুলঝাড়া পর্যন্ত সবই কইরতে হইত…একদিন পুরা বোতল ব্র্যাণ্ডি-টানা বেহেড ম্যাডাম আর কেইলে-পড়া কর্নেলের ঢলে পড়ার সুযোগে…উনার রিভলভার…রাইফেল আর বেশ কিছু কার্তুজ নিয়া বুইঝলেন কিনা… বাইঞ্চোত সটকে পইড়লাম…মিলিটারি পুলিস ধইরতে পারে নাই…ধইরলে কলকাতার পুলিস…রিভলভারটারে বিক্রি করার সময়ে…শালা যে গুণ্ডারে বিক্রি করতে গেলাম সে বাইঞ্চোতই পুলিসের ফাঁদ পাইতা ধরাইয়া দিলে…বাইঞ্চোত খোচর ছিল কী কইরাই বা জানুম…আইজকাল ভোটার-নাগরিকের চাইতা খোচর-ভোটারের সংখ্যা বেশি তা জাইনতাম না…তারপর তো শুইনলেন… কেলোদের সঙ্গে একই প্রিজন ভ্যানে  যাইবার সময়ে…বুইঝলেন কিনা…আমরা প্যাঁচ কইষা নিয়াসিলাম যে কন্সটেবলগুলারে পিটাইয়া পলাইমু… পলাইলাম…আর উনার ডুয়ার্সের অভিজ্ঞতার পিছন-পিছন…বুইঝলেন কিনা…নানা পথে বাইঞ্চোত পৌঁসাইলাম এই জঙ্গলে…সেসব আট বৎসর আগের গল্প…আপনে তো আমাদের ঘটনা শুনতে ব্যস্ত…নিজেরটা বলেন… কী কাজ কইরা পলাইতে আছিলেন…

–ডাক্তারি করতুম…নার্সিং হোম খুলেছিলুম…যা হয় নার্সিং হোমে…অ্যাবরশানের কেস আসত…প্রথম দিকে আইনি গর্ভপাত করতুম…ক্রমে বেআইনি অ্যাবরশানও করতে আরম্ভ করলুম…তা বেশি রোজগারের লোভে মেয়ে পাচার দলের পাল্লায় পড়ে গেলুম…মেয়ে পাচারে সরাসরি যুক্ত ছিলুম না…পাচারকারীরা যেসব মেয়েদের ধরে আনত তাদের অপারেট করে ফ্যালোপিয়ান টিউব বাদ দিয়ে দিতুম যাতে ব্যবসায় নেমে পেটে বাচ্চা না আসে…কারোর ভালো করার দিনকাল আর নেই…আমি তো মেয়েগুলোর ভালোর জন্যই কাজটা করছিলুম…কোথায় অন্য রাজ্যের রেডলাইট এলাকায় বা আরব দেশ-টেশে গিয়ে যাতে বিপদে না পড়ে… হরিয়ানায় বিয়ে করার মতন মেয়ের সংখ্যা কমে যাবার ফলে পাচার বেড়ে গেছে…একই পরিবারে বাবা-কাকা-দাদা-ভাই-ছেলে-ভাইপো সবাই মিলে একটা মেয়ে কিনে পারাপারি করে কাজ চালাচ্ছে…কেনার আগে ওদের শিওর হতে হয় যে ফ্যালোপিয়ান টিউব কেটে বাদ দেয়া আছে কিনা…

[ যাক…স্কাউন্ড্রেলগুলোর কাছে বিশ্বাসযোগ্য গল্প নিজের সম্পর্কে বানিয়ে ফেলতে পেরেছি…নিজেকে ফেরারি অপরাধী না বললে এদের সন্দেহ হতে পারে…দেখা যাক…সাবধানে কথা বলতে হবে যাতে না বেফাঁস কিছু বলে ফেলি…ইনটেলিজেন্সের রিপোর্ট ছিল যে হেলিকপ্টার থেকে এই জঙ্গলে কেবল একজনকেই টার্গেট প্র্যাকটিস করতে দেখা গেছে…লঙ্গিচুড-ল্যাটিচুড ক্যালকুলেট করে লোকেট করেছিল ডিপার্টমেন্ট…বাড়িটা গাছে ঘেরা বলে বোধহয় দেখতে পায়নি…পাঁচ-ছয়জন রয়েছে জানা থাকলে সম্পূর্ণ টিম নিয়ে আসা যেত…আট বছরের পুরোনো ফেরারি বলেই হয়ত এদের ফাইলগুলোয় ধুলো জমেছে…কেস ডরম্যান্ট হয়ে আছে… ]

–তা করতে গিয়ে ব্লাডি ফাকিং মেরেও ফেলেছেন হয়তো…কোথায় আপনার নার্সিং হোম…কোন পাড়ায়…কত নম্বর বিল্ডিং…

–হ্যাঁ…একটা মেয়ে মরে গেল…তার পেটে আগেই বাচ্চার জেলি তৈরি হওয়া আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল…হাওড়ার ভোজপুরি মিউজিক রোডে…পাবলিক আমার নার্সিং হোম ভাঙচুর করলে…ঘুষের টাকা খেয়েও কন্সটেবলরা হাজতে ঠ্যাঙালে… জামিনে ছাড়া পেয়ে…ব্যাস…ভাবলাম সন্ন্যাসী হয়ে যাব হিমালয়ে গিয়ে…নয়তো জেল খাটতে হত…

–দুর্যোধনের বাল…চলুন…আমাদের জাঙাল-বাড়িতে যাওয়া যাগ…বুজে ফেলেচেন নিশ্চই যে আমাদের সঙ্গে আবনাগে থাগতিই হবে…পালাবার চেষ্টা করবিন না…নো এগজিট…পালাবার চেষ্টা করলিই পকাৎপঙ…

–বুইঝলেন কিনা…আমরা কেউই পলাইবার চেষ্টা করি না…একসঙ্গে থাইকবার বাইঞ্চোত শর্ত হইল যে কেউ যদি পলাইয়া যাইবার চেষ্টা করে…আর যদি সে ধরা পইড়া যায়…তাইলে অন্যেরা সালিসি সভা ডাইকা তার বিচারের নাটক কইরা…সামারি এগজিকিউশান করবে…মইরা যাইবার পরে যেইহানে তারে গোর দিয়া হইবে সে জায়গাটা তারে দিয়া আগে থিকা খুঁড়াইয়া রাইখা হইবে…মেজরিটি ডিসিশান ইজ ফাইনাল…ফলে কেউ কারোর নজরদারি করি না…তবে…বুইঝলেন কিনা…বাইঞ্চোত একটা ঘটনা ঘইটা যাইবার পর প্রতিরাতে একজন জাইগা পাহারা দেই…কেননা পুলিস বা পোচার বা ফরেস্টের পাহারাদার এখানে পৌঁছে গ্যালেই ক্যাওড়া…

–হ্যাঃ হ্যাঃ…কুড়ি কোটি দুর্যোধনের বাল…আমি সালা এগগালে নগসাল ছিলুম…মনে থাকে যেন…

–এই চুপ…যে মরে গেছে তার নকল করবেন না…

–আর কোথাও পালাবার জায়গা নেই দাদা…ভেবেছিলুম  নেপাল-ভুটানের জঙ্গলে একাই কাটিয়ে দেব… ভাগ্য ভালো যে আপনাদেরও পেয়ে গেলুম…নজরদারির কথাটা তুলে ভালো করলেন…পশ্চিমবঙ্গের শহরে থাকুন বা গাঁয়ে…আসেপাশের মানুষ সব সময় আপনাকে নজরে-নজরে রেখেছে…পাড়ায় পাড়ায়…দুই দলের দুটো করে ডোসিয়ার তৈরি হয়ে গেছে আপনাকে নিয়ে…কোথায় যাচ্ছেন…কার সঙ্গে মিশছেন…কোথায় চাকরি করেন… কত টাকা রোজগার করেন…কোন ব্যাঙ্কে আপনার অ্যাকাউন্ট…পোস্ট অফিসে কত টাকা আছে…নিজের বাড়ি না ভাড়া…কত ভাড়া দেন…কার কাছে সবজি কেনেন…কোন মাছ কেনেন জিওল না কাটাপোনা…বাঙাল ছিলেন না ঘটি…জবরদখল না নিজের জমি…মলে-মালটিপ্লেক্সে যান কিনা…পিওন কার চিঠি এনে দিল…কাকে চিঠি লিখছেন…কাগজের সম্পাদকদের নালিশ-চিঠি লিখছেন কিনা…কার বাড়ির দিকে তাকিয়ে বেশি দ্যাখেন… কোন দিকের জানলা খুলে রাখেন…কোন টয়লেট রোল পড়েন… ইত্যাদি…কত্তাবাবা বা কত্তামা নয়… চুনোটেঁটিয়ারা নজরে নজরে রেখেছেন…সবাইকে…কত্তাবাবা বা কত্তামা নজরে রাখেন চুনোটেঁটিয়াদের…

–তা যা বলেচেন…আমাদের জাঙালে অমন বাবা-মা সিস্টিম নেইকো…দুর্যোধনের বাল…আবনাগে পেয়ে…আমরাও মরা সহখুনির জায়গায় আরেগজন সহখুনি পেয়ে গেলুম…ওনার শোবার ঘর আর জিনিসপত্তর আবনার কাজে লাগবি…যদিও উনি আমাদের সঙ্গে জাঙালের বাইরে যেতিন না…মুর্গি খুন…খরগোশ খুন…এই কাজগুনোর ভার নিয়েছিলিন…রান্নাবান্না…সংসার…দেকাশোনা…ফ্লিট মারা…সদর দরোজা বন্দ করা…রোদলন্ঠন রোদে রাখা…

–সহখুনি…আপনারা সবাইই কি খুন করেছেন নাকি…আমি তো বেশ ডিজেক্টেড ফিল করছিলুম যে সমাজের একটা আউটকাস্ট ক্যাটগরিতে চলে যেতে হল…ওই যাকে বলে অমরতা…অমর হয়ে ওঠা…লোকের মুখে-মুখে নাম হয়ে ঘোরা…মিডিয়ায় হেডলাইন…সম্পাদকীয়…টিভি-আলোচনার রসেড়া…যাক…আপনারাও খুনি হয়ে উঠেছেন…

–বাইঞ্চোত…আপনে নামহীন হইলে সে সমস্যায় পড়তেন না…

–টু বি প্রিসাইজ…আপনাকে তো একটু আগে উনি বললেন যে আমরা ডাকাতি করে জীবন চালাই… আই মিন অতিবাহিত করি…তাই করতে গিয়ে সকলেই খুনি হয়ে উঠেছি…এই হয়ে ওঠা ব্যাপারটাকে গুরুত্ব দিতে হবে…তবে যাদের যাদের লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছি তারা ব্লাডি ফাকিং মরে গেল কি না…তা চেক করার জন্য সেখানে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করিনি কখনও…অনুমান করা যায় যে বুকে বা মাথায় গুলি মারার পর ওয়াঁদের বাঁচার সম্ভাবনা ক্ষীণ…দেশের স্বাস্হ্য ব্যবস্হার প্রতি আমাদের আস্হা আছে…

–হ্যাঃ হ্যাঃ…কুড়ি কোটি দুর্যোধনের বাল…আমি সালা এগগালে নগসাল ছিলুম…মনে থাকে যেন…

–এই চুপ…যে মরে গেছে তার নকল করবেন না…

–এর পর আর হয়ে ওঠা নেই…এটাই হয়ে ওঠার শেষ ধাপ…খুন করা…মানুষকে খুন করা…আমার হাতে মেয়েটা যখন মরে গেল তখন এই কথাই উপলব্ধি করলুম…যে হত্যাই হল মানব সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যাবার অভিমুখ…যত হত্যা…তত উন্নতি…গণহত্যা হলে তো কথাই নেই…তবে আরেকটা কথাও মনে হয়েছিল… বুঝলেন…

–কী ? তাও বাইঞ্চোত উপলব্ধি ?

–নারী আর পুরুষের সম্পর্ক নষ্ট করে দ্যায় তাদের শরীরের ডিসগাসটিং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ-রস-রসায়ন…

–তার ব্লাডি ফাকিং মানে…

–ওই যেমন ফ্যালোপিয়ান টিউব…তেমনই জরায়ু… ওভুলেশান… বীর্য… টেসটোসটেরন… প্রজেস্টেরন…হরমোন… টেসটিকাল্স… আড্রেনালিন… অ্যান্ড্রোজেন…এসট্রোজেন…ফলিকল… ইউরেথরা…ফেরোমোন…অরগ্যাজম…এটসেটরা এটসেটরা…কত মানুষ যে এগুলোর জন্য খুন হয়…হেরে যায়…ভেস্তে যায়…নিজেই নিজের জীবন নষ্ট করে ফ্যালে…তার ইয়ত্তা নেই…নারী-পুরুষে প্রেমের পথে প্রধান বাধা হলো এই সমস্ত রস-রসায়ন-অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ…প্রেমকে সাংস্কৃতিক ব্যাপার করে ফ্যালে…পদ্যমদ্যখাদ্যবাদ্য…

[ স্কাউন্ড্রেলদের সঙ্গে কথা চালিয়ে যাবার অপমানজনক দুর্গতি হল নিজেকেও স্কাউন্ড্রেলের স্তরে নামিয়ে নিয়ে যেতে হয়…জীবনে কতবার যে এভাবে নামতে হয়েছে…সেসব স্কাউন্ড্রেলরা নিজেদের কেউকেটা প্রমাণ করতে চাইলে আরও ঝামেলা…মানসিক অশান্তি…এই স্কাউন্ড্রেলটার মুণ্ডু গিরগিটির মতন ঘুরতে থাকে…কেলো লোকটা যেন চৌমাথায় কাকে-হাগা নিশ্চল মূর্তি…]

–কথাগুনো সত্যি…আমরা আমাদের প্রেমিকার সঙ্গে নারী-পুরুষ  নোংরা মিশনারি প্রেম করি না…অন্য উপায় আবিষ্কার করে ফেলতে বাধ্য হয়েছি…পবিত্র প্রবৃত্তি…বিশুদ্ধ…লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট…গোইং স্টেডি… প্রেমিকারা আমাদের সোল মেট…মর্ম বিনিময় করি…

–কেন-কিঁ কেন-কিঁ কেন-কিঁ কবি লেখক নাট্যকার চিত্রকার অভিনেতা ভাস্কর স্হপতি এরা সবাই অসামাজিক গাধা…

–ওঃ কেলো…প্লিজ স্টপ রিপিটিং দি প্যারট’স সঙ…

–দেন হোয়াই দিস স্ট্রেঞ্জার ইজ নট টকিং টু মি…

–টু বি প্রিসাইজ…লেট আস ফার্স্ট গেট এ ফিল অফ ইচ আদার দেন ইউ মে ব্লাডি ফাকিং  টক টু হিম… হি ইজ টেলিং আস অ্যাবাউট হিমসেল্ফ…উই আর টেলিং হিম অ্যাবাউট আওয়ারসেল্ভস…হোয়েন ইওর টার্ন কামস ইউ টক অ্যাবাউট ইওরসেল্ফ…

–ওকিপোকি…

–কালোর কন্ঠস্বর বেশ খসখসে…ভারিক্কি বাঁশড়া…

–ব্লাডি ফাকিং কী কথা হচ্ছিল যেন..

–হত্যা করা নিয়ে কথা হচ্ছিল…মানুষ খুন করাই মানব সভ্যতার উত্তরণ…আর তা-ই হল প্রথম আর শেষ রাজনীতি…

–ইউ আর রাইট…মাই মম সেড সো…

–তা যা বলেছেন…তাছাড়া নৈতিকতা আর কী…

–একজন মানুষ খেতে পাচ্ছে না…ফুটপাথে দুমড়ে পড়ে আছে…অথচ আশেপাশে সবাই খেয়েদেয়ে ঢেঁকুর তুলতে তুলতে রাস্তা দিয়ে হেঁটে সূর্যোদয়ের দিকে মিছিল করে এগিয়ে যাচ্ছে…মুখে গান…হাতে  পতাকা পতপতাচ্ছে…রাতের বেলা হলে হাতে চর্বিজ্বালা মশাল…যেতে যেতে তাদের ভুঁড়ি ক্রমশ ঢাউস হয়ে চলেছে…গাল ফুলে মোদো গোলাপি…দ্যাট ইজ দি আলটিমেট অ্যাচিভমেন্ট…

–তা যা কইসেন…বাইঞ্চোত…খাইতে না পাইলে দুমড়াইয়া পইড়া থাকা সালা উপায় নাই…

–ইউ আর রাইট…মাই মম সেড সো…

–আপনারা সিগারেট-টিগারেট লুটে-কিনে আনেন না ? আমার কাছে কয়েকটা বিড়ি আছে…অনুমতি দেন তো ফুঁকে নিই…একটু ফুঁকে নিলে পেটটা হালকা করতে পারব…আখরোটের মোচড় দিচ্ছে মাঝে-মাঝে…

–ফুঁকুন…কিন্তু দেশলাই কাটি নষ্ট করবিন না…আমাদের জাঙাল-সমবায়ে ওটি বেশ জরুরি… এখেনে কারোর কোনো কিচুর অনুমতি নিতি হয় না…প্রেমিকার ব্যাপার ছাড়া…আমরা কেউই চা-কফি সিগারেট-বিড়ি খাই না…শুদু গ্যাঁজা ফুঁকি…এবার ডাগাতি করতি বেরোলি আবনি আবনার দরকারি বিড়ি-সিগারেট-দেসলাই  কিনি কিংবা তুলি নিবেন…বা যদি সঙ্গি না যান থালে আমরাই নিয়ে আসব…কোন ব্র্যাণ্ডের বিড়ি ফোঁকেন ? আমরা যে যার প্রেওজনের জিনিস ডাগাতির সময়ে ব্র্যাণ্ড মিলিয়ে তুলি নিই…নয়তো বেশ দূরে-দূরে গিয়ে কিনতি হয়…পাশের রাজ্যে…চাদ্দিকে আজগাল সিসিটিভির ঝুটঝামেলা…আমার মতন উনিও মদ খেতে ভালোবাসেন বলে মাজে-সাজে বেসবল ক্যাপ পরে মাঝরাতে মদের দোগানে গ্রিল ভেঙি ঢুঁ মারতি হয়…

–চলুন আস্তানার দিকে হাঁটা যাক…আপনাকে আপনার ব্লাডি ফাকিং ঘরটা দেখিয়ে দিই…ঘরটা তিনতলায়…সিঁড়িটা ঘোরানো…আগেকার কালের…সামলে-সুমলে ওঠানামা করতে হয়…রাতের বেলায় বেশ রিস্কি…রোদলন্ঠন আছে অবশ্য…কনেলন্ঠন…

–তার চেয়ে বরং একটু জিরিয়ে নেয়া যাক এখানে বসে…সেই তিন দিন থেকে হাঁটছি… আপনারাও তো গোর দেবার জন্য খোঁড়াখুঁড়ি করে ক্লান্ত হয়ে গেছেন বলে মনে হচ্ছে…দূরে ওই গুঁড়িটার ওপর বসে গ্যাঁজানো যাক… কী বলেন…ছায়ায়…

–হ্যাঁ…কি বলে গিয়ে…ভোঁসড়ির ছ্যানা আমি বেশ ক্লান্ত হয়ে গেছি…

–আপনি কি ছোটোবেলা থেকেই এরকম গৌরবর্ণ-খ্যাংরাটে…কন্ঠস্বরও বেশ মিহি ধরণের…জাপানিদের মতন দেখতে অনেকটা…চিন-জাপানে ছিলেন নাকি…

–কি বলে গিয়ে…আমি বাগবাজারের বনেদি পরিবারের…ভোঁসড়ির ছ্যানা কেন যে অমন তিরিক্ষি স্বর তা জানি না…প্রথম থেকেই রোগাটে ছিলাম না…বসে কথা বলি…কী বলেন…আসুন…সবাই এখানেই বসি…আপনি এদিকে মুখ করে বসুন তাহলে কথা কইতে সুবিধে হবে…তা…হ্যাঁ…বাবা ব্যাঙ্গালোরে চাকরি করতেন…আমি স্কুলে পড়ার সময় মোটাসোটা ছিলাম…কি বলে গিয়ে…স্কুল থেকেই ঘোড়দৌড়ে আকৃষ্ট ছিলাম…বাংগালোরে  বাড়ির কাছেই হর্স ব্রিডারের ফার্ম ছিল…ভোঁসড়ির ছ্যানা… হ্যাণ্ডলারদের সঙ্গে আলাপ-পরিচয়ের ফলে ঘোড়ায় চড়া শিখে ফেললাম…ঘোড়ার জাত…কোন ঘোড়া কেমন দৌড়োয়…সব শিখতে শিখতে জকি হবার শখ হল…জকি হবার জন্য ট্রেনিং নিতে হয়…বাংগালোরে যে ব্রিডিং সেন্টারে ট্রেনিং নিচ্ছিলাম তার মালিক সাফারিওয়ালা আমায় একদিন ঘোড়া হ্যাণ্ডলিং করতে দেখে ট্রেনারের কাজে লাগিয়ে দিলেন…ইলেকট্রিকাল ইনজিনিয়ারিং পড়া ভোঁসড়ির ছ্যানা লাটে উঠে গেল…ঘোড়ার ট্রেনারের পাশাপাশি জকির ট্রেনিংও নিতে লাগলাম…উনি আমাকে একটা ঘোড়া দিয়ে বললেন যে তাকে দুবছরের মধ্যে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে যাতে আগামী রেসে ভালো ফল করে…কি বলে গিয়ে…দুবছর পরে ভোঁসড়ির ছ্যানা ঘোড়াটা সত্যিই ভালো ফল করল…দৌড়ে প্রথম হল না…কিন্তু দ্বিতীয় হল…

— মেয়ে-ঘোড়া না ছেলে ঘোড়া ?

–মেয়ে-ঘোড়া…মেয়ে-ঘোড়া…ছেলে-ঘোড়ারা সামলে-সুমলে দোলাতে-দোলাতে তেমন ছুটতে পারে না…ঘোড়াদের তো আর ল্যাঙোট পরানো যায় না…তা ঘোড়াকে জেতানোর বিশেষ একটা ট্রিক আবিষ্কার করে ফেলেছিলাম আমি…পরের বছর কিন্তু ঘোড়াটা সবকটা রেস জিতে সাফারিওয়ালাকে এত খ্যাতি আর টাকাকড়ি এনে দিলে যে উনি ভোঁসড়ির ছ্যানা আমাকে ওনার চিফ ট্রেনার করে নিলেন…বেশ চলছিল…হুসেইনি কাওয়াসজিরা ওদের স্টাডফার্মে আমাকে ট্রেনার হিসাবে নেবার জন্য চারগুণ মাইনে দিয়ে নিয়ে যেতে চাইলে…সে একেবারে টানাহেঁচড়া…আমি রাজি হইনি…আমার ঘোড়ার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা কেন করব… বলুন… কাওয়াসজিরা আমার কয়েকজন হ্যাণ্ডলারকে হাত করে একদিন আমার রেসের ব্লু আইড গার্ল নামের ঘোড়াকে লুকিয়ে বোলডেনোন  আর স্ট্যানোজোলল অ্যানাবলিক স্টেরয়েড ঠুঁসে দিলে…কলকাতায় রেস হয়েছিল…ঘোড়দৌড়ে ভোঁসড়ির ছ্যানা কেমিকাল দুটো নিষিদ্ধ…কি বলে গিয়ে অ্যাথালিটদের যেমন স্টেরয়েড অচল তেমন ঘোড়ার দৌড়েও নানা স্টেরয়েড নিষিদ্ধ…

–স্টেরয়েড ?

–অ্যাথালিটদের মতনই…দৌড়ের আগে ঘোড়াদের রক্ত কালেক্ট করে পরীক্ষা করা হয় যে তাকে নিষিদ্ধ স্টেরয়েড দেয়া হয়েছে কি না…কিন্তু শালারা আমাকে ফাঁসাবার জন্য ঘোড়ার পেচ্ছাপও চেক করেছিল…পেচ্ছাপে স্টেরয়েড পাবার পর ভোঁসড়ির ছ্যানা চারজনের অনুসন্ধান কমিটি গড়া হয়েছিল…কিন্তু ল্যাবরেটরির প্যাথলজিস্ট সান্তনমের সঙ্গে আমার খাতির ছিল…সে  আমাকে বললে যে ঘোড়ার পেচ্ছাপে আরও এক্সট্রানিয়াস এলিমেন্ট পাওয়া গেছে…আমি বুঝতে পারলাম কী এলিমেন্ট…কেননা সেই রসায়নেই জিতে যেত আমার ঘোড়া…নিষিদ্ধ স্টেরয়েড ব্যবহার করার জন্য আমি প্রথমে সাসপেন্ড আর তার কয়েকদিন পর অ্যারেস্ট হলাম…জানতাম…ভোঁসড়ির ছ্যানা যে এলিমেন্ট পাওয়া গেছে তা জানাজানি হলে অনেক বছরের জেল খাটতে হবে…আদালতে যেদিন নিয়ে যাচ্ছিল সেদিন আমাদের সঙ্গে পুলিশের গাড়িতে  কেলো… ইনি… ইনি… ইনি… ইনি…আর যিনি মারা গেছেন তিনি ছিলেন…যিনি মারা গেছেন মানে আমাদের যে সঙ্গী ভোঁসড়ির ছ্যানা আত্মহত্যা করে নিলেন…কেলো মারামারি আরম্ভ করতেই ওনারাও মারামারি আরম্ভ করে দিলেন… কন্সটেবলগুলো মার খেয়ে অন্যমনস্ক আর আধথেঁতলা হতেই সবায়ের সঙ্গে আমিও পালালাম…ওনারা না থাকলে পালাতে পারতাম না…আমাকে দেখছেন তো ভোঁসড়ির ছ্যানা একেবারে প্যাংলা টিঙটিঙে…

–হ্যাঃ হ্যাঃ…কুড়ি কোটি দুর্যোধনের বাল…আমি সালা এগগালে নগসাল ছিলুম…মনে থাকে যেন…

–এই চুপ…যে মরে গেছে তার  নকল করবেন না…

–এলিমেন্ট বলছিলেন…কী এলিমেন্ট…ভেটেরিনারি ডাক্তার নই…তবু কিছুটা আইডিয়া করতে পারব…

–কি বলে গিয়ে…ভোঁসড়ির ছ্যানা সে আরেকদিন শুনবেন না হয়…

–নিউকামারবাবু…উনার কথাগুলা আমিই বলতেসি…বুইঝলেন কিনা…না শুইনা আপনের মন বাইঞ্চোত খচখচ কইরবে…তার চাইতা এখনই শুইনা নেয়া ভালো…উনি রেসের আগের দিন বাছাই ঘোড়ার সঙ্গে বাইঞ্চোত একাত্ম হইতেন…

–হোয়াট ডু ইউ মিন বাই একাত্ম…দ্যাট অলসো উইথ এ ফিলি…মানুষের আত্মা হয় বলে শুনেছি… যাদের প্ল্যানচেট করে ডেকে আনা যায়…ঘোড়ার আত্মার কথা তো শুনিনি মশায়…অশ্বমেধ যজ্ঞের জন্য যে ঘোড়া ছাড়া হতো তাদেরও আত্মা হতো বলে পড়িনি…মানে গল্প-টল্পতে পড়িনি…অনেক বড়ো পেনিসের শাদা ধবধবে ঘোড়া বাছাই হতো তা শুনেছি বটে…

–ব্লাডি ফাকিং…শাদা ঘোড়ার  শাদা পেনিস হয় না…পুরাণলেখকদের এত ক্ষমতা ছিল…শাদা করে দিলেই পারতেন…

–ছোটোদের পুরাণ বইতে কিন্তু যে ছবি আঁকা ছিল তাতে পেনিস শাদা রঙের ছিল…মনে আছে…সেই কবে পড়েছিলুম…

–মানুষ যতই ফর্সা হোউক পেনিস বাইঞ্চোত কালো হয়…যতই আপনে ফেয়ার অ্যাণ্ড লাভলি লাগান…

–উনি আকস্মিক ভাবে আবিষ্কার করেছিলেন এলিমেন্ট প্রয়োগ করার ব্যাপারটা…এই ব্যাপারে উনি পথ প্রদর্শক…ওয়াঁর কাছ থেকেই আমরা শিখলাম…এলিমেন্ট প্রয়োগ করার কৌশল…আপনিও শিখে ফেলবেন…একবার শিখে ফেললে আর অভ্যাস ছাড়তে পারবেন না…জঙ্গল ছেড়ে বেরোতে ইচ্ছে করবে না…বাইরে বেরিয়ে পৃথিবীকে মনে হবে আনসিভিলাইজড…বর্বর…প্রাগৈতিহাসিক…অশিক্ষিত…

–এলিমেন্টকে আপনি উপাদানও বলতে পারেন…রেসে ব্লাডি ফাকিং ঘোড়াদের জিতিয়ে আনার ট্রিক…

–কি বলে গিয়ে…উপাদান বলতে ভোঁসড়ির ছ্যানা যা বোঝায় আরকি…ও আপনি আমাদের সঙ্গে থাকতে-থাকতে জেনে যাবেন…উপাদান প্রয়োগ করতে শিখে যাবেন…

–অন্য কোনো রসায়ন ?

–নিউগামার স্যার…আবনি এত ইনগুইজিটিভ কেন…এত তাড়াতাড়ি…এই তো সবি এস্চেন…এখুনও তো আমাদের আস্তানায় ঢুকি অতিথি তগমাও পাননি…আবনাকে বিশ্বাস করব তবি তো…

–বিশ্বাস ব্যাপারটাকে কেউ আর বিশ্বাস করে না…ভোটাররাও করে না…পুরুতদের কথা না তোলাই ভাল…

–ভোঁসড়ির ছ্যানা রেসের আগের দিন সন্ধ্যায়…অন্য হ্যাণ্ডলারদের সবাইকে বাড়ি পাঠিয়ে দিতাম… তারপর যে ঘোড়া রেসে যাবে সেই ঘোড়াকে ওই ট্রিকটায় বশীভূত করে নিতাম…

–কী করতেন ?

–বশীভূত করে  ফেলতাম…হিপনোটাইজ…সন্মোহন…

–ঘোটকীকে বশীভূত ? ঘোড়ার তো আঙুলও হয় না যে বেণিমাধব শীলের পাঁজি দেখে বশীকরণের আঙটি কিনে পরাবেন…অ্যাবসার্ড…

–চোখ বুইজা বাইঞ্চোত কল্পনাজগতের পিঠে দুইহাত রাইখা কিছুক্ষণ শান্তিতে কাটানোর চাইতা অ্যানজেলিক স্হিতি আর কী-ই বা হইতে পারে…বাইঞ্চোত ইউ ফিল ইউ আর গডস বায়োলজিকাল ফাদার…

–মারহাবা…ভোঁসড়ির ছ্যানা…ঘোড়া আমার..ফিল করছেন উনি…

–মশায় আমি তো গডই জানি না…তার বাপকে কি করে জানব…কিন্তু ঘোটকীর মসৃণ পিঠে হাত বোলাবার অভিজ্ঞতা ফিল করতে পারি…স্মুথ…সিলকি…লিসাম…ডিলিরিয়াস…

–আমরা বাইঞ্চোত যে যার প্রেমিকাগো আগাপাশ হাত বুলাই…তার জন্য চরিত্রের ভিতরে নাইমা পড়তে হয়…টুপ…ঝুপুস…আলোকিত হয়্যা উঠবেন আপনে…

–কেলোর একটা গড আছে…তার নাম ভোদুন…উনি তো অ্যানিমিস্ট…ওনাদের ট্রাইবটা ইসলাম বা খ্রিশ্চিয়ানিটিতে কনভার্ট হয়নি…ওয়াঁর গডের কাছে হ্যাঁ বললে যা বোঝায়…না বলতেও তা-ই বোঝায়…

–এখানেও সেই গডকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন নাকি উনি…আপনারা সবাই অ্যানিমিস্ট হয়ে গেছেন ?

–না…আমরা ফাকড বাই গড…

–ভগবানের ভবিষ্যৎ অন্ধকার…

–আপনার ভয়েসটা বেশ স্টিরিওফোনিক…

–হ্যাঁ…আমি চেঁচিয়ে ভগবানের অন্ধকার  কালা কানও খুলে দিতে পারি…কেউ এদিক-ওদিক চলে গেলে আমিই বাইসন ষাঁড়ের হাম্বা পাড়ি…মুশকিল হল হাম্বা শুনে অনেক সময়ে ঋতুমতি মাদি বাইসন চলে আসে…আমরা পারভার্ট হতে পারি…লম্পট নই…ষাঁড়ের মতন একপন্হী…ওয়ান অ্যাট এ টাইম…ফলো টু দি এন্ড অব দি আর্থ টু লাভ ইওর প্রেমিকা…শাশ্বত প্রেম…নিঃস্বার্থ ভালোবাসা…

—পার্ভারসান ইজ এ ফর্ম অফ আর্ট…নেপোপ্রেমী চিৎফাঁদ টয়লেট কোম্পানির  টিয়াপাখিটা ঘুরিয়ে সে কথাই বলে বলে টিকে গেল…অথচ অন্যটাকে জংলি বেরাল-শেয়াল-ভাম খেয়ে ফেললে…

–হ্যাঃ হ্যাঃ…কুড়ি কোটি দুর্যোধনের বাল…আমি সালা এগগালে নগসাল ছিলুম…মনে থাকে যেন…

–এই চুপ…যে মরে গেছে তার নকল করবেন না…

–অমন অ্যানোরেকসিক আঁকালো বাঁশ চেহারা নিয়েও এখানে এসে নতুন প্রেমিকা যোগাড় করে নিতে পারলেন ?

–হ্যাঁ…পারব না কেন…প্রেম ছাড়া তো ভোঁসড়ির ছ্যানা গুহার দেয়ালে আঁকাই সম্ভব ছিল না…আমি আমার প্রেমিকার সঙ্গে রোমান্টিক রিলেশানশিপে আছি…আপনাকেও পাইয়ে দেব…সুইট অ্যান্ড সালট্রি… কচিকচি…ভেজা ভেজা…ধারা চারশো আটানব্বুই এ-র ভয়ভাবনা নেই…

–আপনারা বলছেন আপনারা ডাকাত আর খুনি…একই সঙ্গে প্রেমেরও খোল-করতাল বাজাচ্ছেন… পারভারসানকে বলছেন আর্ট…আধুনিক সমাজে থাকলেই তো হতো…যেমন হাফ-অপরাধীরা আর মহাঅপরাধীরা থাকেন…সামাজিক লোকজন তো এই ধরণেরই কথাবার্তা সভা-সমাবেশে মাঠে-ময়দানে র‌্যালির‌্যালায় বলেন…

–টু বি প্রিসাইজ…আমরা ব্লাডি ফাকিং কমিটেড সোলস…নিদার গুড নর ইভিল…আমরা দায়বদ্ধ… আপোষহীন…আমরা উইকেড…ইন লাভ অ্যান্ড লুট…

[ কতগুলো যুবতীকে কিডন্যাপ করে এনেছে এরা…কোথায় লুকিয়ে রেখেছে…ক্রীতদাসী হিসেবে কোথাও বন্ধ করে রেখেছে…সেসব তো কিছুই বলতে চাইছে না…কেবল প্রেমিকা-প্রেমিকা ভেঁজে চলেছে…একা না এসে পুরো টিম নিয়ে আসা উচিত ছিল…]

–নাঃ…কিছুই মাথায় ঢুকছে না…আপনারা বেশ শিক্ষিত সংস্কৃতিমান মজাজীবি বলেই তো মনে হচ্ছে…আমি নিছক ফিকে ছিঁচকে…এই জঙ্গলে কি করেই বা সাসটেন করেন…জ্ঞানের জন্য তো শহরে থাকা জরুরি…নয়কি…বই…সংবাদপত্র…টিভি…স্মার্টফোন…ইনটারনেট…চায়ের টেবিল…কফি… কলম-ডায়েরি… মদের বোতল-টাকনা…পরচর্চা…অক্কাদেমি…সম্বর্ধনা…বক্তৃতা…বিতর্ক…বিদেশি  ফিল্ম…পিঠচুলকানি…এসব ছাড়া জ্ঞানের অ্যালঝিমার হবার চান্স বেশি…

–ওই যে তিনতলা পুরোনো বাড়িটা দেখছেন…ভেতরে দেয়ালগুলোয় বার্মিজ টিক উডের প্যানেলিং…যে বাড়িতে আমরা আজ প্রায় আট বছর আছি…ওটা কখনও কোনো ব্রিটিশ চা বাগান বা চটকল মালিকের ব্লাডি ফাকিং  আস্তানা ছিল…সিপিয়া হয়ে যাওয়া মহিলাদের ফোটো আছে…মহিলারা শুয়ে…হেলান দিয়ে..নানা খেলা খেলছেন… পেরেকে-পেরেকে…ওপরের ঘরে…যে ঘরটা…যিনি মারা গেলেন তাঁর ছিল…আর এখন আপনাকে অ্যালট করা হচ্ছে…ওয়াঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহের বইপত্র আছে…কয়েকজন প্রিন্সলি স্টেটের রাজারাজড়ার জাঁকজমকদার ফোটো আছে…টু বি প্রিসাইজ…বহু পুরানো বইপত্র…ঘাঁটলে হাঁচি পায় এমন বই…হেঁচে নাক দিয়ে জল পড়ে এমন বই…তাঁমাদি শতকের বইও আছে…হাতে লেখা বই… কাঠখোদাই করা বই…নেগলেক্ট…পোকা… আর সময়ের ধুলোয় অবশ্য অনেক বই নষ্ট হয়ে গেছে…যখন আমরা জঙ্গলে ঢুকি তার প্রায় মাস চারেক পরে ঘোরাঘুরি করতে-করতে ব্লাডি ফাকিং বাড়িটা আবিষ্কার করি…  ওই যে গাছগুলো দেখছেন…বাড়িটাকে ঘিরে রয়েছে…লক্ষ্য করে দেখুন…ওগুলো এই জঙ্গলের গাছ থেকে আলাদা…ডুয়ার্সে এলম পপলার সিলভার-বার্চ ওক উইলো অ্যালডার হয় না…ওই গাছটা দেখছেন…লাল রঙের ফুল ওটা রোয়ানে…তার থেকে দূরে বাঁদিকে ওই গাছটা হথর্ন ওর ফলন থই-থই ফলগুলো পাকা লিচু বলে মনে হতে পারে…তা থেকে আরও পেছনে কয়েকটা গাছ দেখা যাচ্ছে…ডালে ডালে লাল রঙের ফুল…ওগুলো পলাশ নয়…রেড মেপল…ওই মানে ইয়ে…ব্লাডি ফাকিং ইংরেজরা পপলার গাছে মিসলটো পরগাছা লাগায়…সেই মিসলটো রয়েছে দেখুন পপলার গাছে…উনি অনেক ফুলের গাছও পুঁতেছিলেন…অনাদরে সেগুলোর বীজ পড়ে-পড়ে শীতের পর ফুটতে শুরু করে…ওয়াইল্ড রানঅ্যাওয়ে ফ্লাওয়ার্স…

–ইংরাজরা আসবার আগে থেকেই বাঙালিরা পরগাছাপ্রেমী…নেপোপ্রেমী…মোসায়েবপ্রেমী…

–গাছপালা ফুলফলের বিশেষজ্ঞ ছিলেন নাকি স্যার…আপনার গলার স্বরও দালের মেহদির মতন রোমান্টিক…গানও গান বা গাইতেন নিশ্চয়ই… এত ভালো গলাকে অপচয় করে বুড়িয়ে দেবার  মানে হয় না… বাকচালাক নেতা নেপোলিয়ানের কন্ঠস্বরও নাকি গমগমে ছিল…

–হ্যাঁ…বুইঝলেন কিনা…ওয়ান্স ইন এ হোয়াইল উনি বাইঞ্চোত ভাঙা গলায় গান গাইয়া শোনান আমাদেরকে…যিনি মারা গ্যালেন তিনি গিটার বাজাইয়া ভাটিয়ালি গান গাইতেন…দালের মেহদি কি স্কচ ভাষার গান করেন…তুরুত্তু  তুরু তুরু গানটা স্কচ…আইজকাল অবশ্য বাঙালি গায়ক-গায়িকারাও বাংলা ফিল্মে স্কচ গান প্লেব্যাক কইরা শোনান…চিৎফাঁদ বানাইল তোরে…তুরুত্তু তুরু তুরু…কেন-কিঁ তুরু তুরু…কেন-কিঁ তুরু তুরু…

–ভালোই হল…আমিও গিটার বাজাতুম…তবে বাংলায় গাইতে পারি না…যে ঘরটা অ্যালট করলেন সেখানেই আছে গিটারটা তো…নাকি…

–হ্যাঁ…যিনি মরি গেলেন…তাঁর ঘরিই রাকা আচে…আবনি মনের সুখে ড়িং ড়াং টিং টাং কত্তে পারবেন…আমরা যখুন আমাদের প্রেমিকার সঙ্গে প্রেম করব…তখুন বাজাবেন…বেশ প্রেম-প্রেম আবহাওয়া গড়ে উটবে… টেসটোসটেরনে টইটুম্বুর…চকাচক…জাঙাল জবজবে…

–আগে চলুন…কি বলে গিয়ে…ভোঁসড়ির ছ্যানা ফুলের গাছগুলো দেখিয়ে দিই…আপনাকে…ফুলের বাগান নয়…আমরা ওদের জীবনে পদক্ষেপ করিনি…জঙ্গলে ওরাও জংলি হয়েই থাকুক…আমাদের মতন…কিন্তু সবাই মিলে খেয়াল রাখি যাতে পোকা-মাকড় না লাগে…মাঝেসাঝে ফুলের মালা গড়ে প্রেমিকাদের পরাই…পেছন দিকে ফলের গাছও আছে…রান্নাবান্না না হলে যা খেয়ে আমরা টিকে থাকি…মানে যখন চুরি-ডাকাতি করতে যেতে ভালো লাগে না…ভোঁসড়ির ছ্যানা আরও অনেক ব্যবস্হা করেছিলেন  সায়েব…

–টু বি প্রিসাইজ…সবুজ আপেল…লাল নাসপাতি…ফলসাগাছ বা ব্লুবেরি…স্ট্রবেরির ঝোপ…টেঁপারি ঝোপের মতন লাল আর সোনালি রাস্পবেরি…কালো আঙুরের মতন দেখতে প্রুণ…ব্লাডি ফাকিং অনেক ফলের গাছ আছে…জংলি টোমাটো আর ঢেঁড়স ঝোপও আছে…

–এরকম ঘন জঙ্গলে কাঠের প্যানেল দেয়া বাড়ি বাগান ফুল-ফল করলেন কেন তা জানতে পেরেছেন…

–না…বুইঝলেন কিনা…বাইঞ্চোত কোনোরকম লিখাজোখা সূত্র নাই….বাড়িটা বাইরে থিকা চুণসুরকির…ভিতরে বার্মিজ টিক উডের প্যানেল…চুসকিমার ধনী আছিলেন নিশ্চয়ই…বর্মা থিকা সেগুনকাঠ আনাইয়া ডুয়ার্সের জঙ্গলে রেস্ট হাউস তৈরি কইরাছিলেন মানেই অঢেল ফরফরানো ট্যাকা…নীলকর-টিলকর বিজনেস আছিল বোধ হয়…দেয়ালে একটা কম্পাস আছে..কোন দিকে ইংল্যাণ্ড… ভুটান… বাংলাদেশ… বিহার…হদিশ পাইবেন…

–লোগটা বইটইতে নিজের নাম…  লিকি যাননি…আমরা অবশ্যি সব বই ঘাঁটিনি…এতো ধুলো…আচে হয়তো একধটায়…যিনি মরি গেলেন তিনি ঘাঁটতেন…আর হাঁচতেন…ক্লাসিক বই হলি মানুষেরা হাঁচে…যদি না হাঁচেন থালে ক্লাসিক নয়…হাঁচির সঙ্গে নাক থেকি জল পড়লি বুজবেন তা কালোত্তীর্ণ…ইংরেজরা  যা পেতো সেখানিই নিজের নাম খোদাই করে দিত…মরি যাবার পরি কবরে…অবৈধ বাচ্চাদের পদবিতে…কিনেকেটে পাওয়া চাগর-চাগরানির নামি…

–হ্যাঁ…তা যা বলেছেন…অনেকটা কুকুরদের পেচ্ছাপ করে এলাকা দেগে দেয়ার মতন…

–হ্যাঃ হ্যাঃ…কুড়ি কোটি দুর্যোধনের বাল…আমি সালা এগগালে নগসাল ছিলুম…মনে থাকে যেন…

–এই চুপ…যে মরে গেছে তার নকল করবেন না…

–বা…কি বলে গিয়ে…ভোঁসড়ির ছ্যানা পাড়ার দেয়াল দখলের মতন…

–এগুলো কী মশায়…যেন মাটিতে চাপড়া-কবর দিয়ে জায়গাটাকে দেগে রাখা হয়েছে…একটা একটু উঁচু…ফুল ছড়ানো…

–যেটা উঁচু…ভোঁসড়ির ছ্যানা সেটা আমাদের প্রথম প্রেমিকার সমাধি…তখন আমরা একজন প্রেমিকাকেই সবাই মিলে শেয়ার করতাম…উনি মারা গেলেন…তার পর থেকে সকলে আলাদা প্রেমিকার সঙ্গে প্রেম করি…

–ওহ..মনটা ভার হয়ে গেল শুনে…আর এই দুটো…

–উই দুটা…বুইঝলেন কিনা…বাইঞ্চোত সত্যই কবর…একটা সম্ভবত পোচার আর অন্যজন তার সঙ্গী…বোধহয় ফরেস্ট গার্ড…ইদিকে আইসা পইড়াসিল…তাদিগে আমরা গুলি কইরা মাইরা ফেলতে বাধ্য হই…তারা তো আপনের-আমার মতো সমাজ-খ্যাদানে আছিল না…তাদিগে মাইরা ফেলার পর বাইঞ্চোত গোর দেয়া হইসিল…ত্যাখন অভিজ্ঞতা আছিল না বইলা বেশি গভীরে কবর দেয়া হয় নাই…পরের দিন সকালে উইঠা দেখি বাইঞ্চোত জংলি জানোয়াররা মাটি খুঁইড়া লাশ বের কইরা মাংস খাইসে…হাড়গোড়গুলা আবার নতুন কইরা গোর দিয়া অনেকটা মাটি চাপা দিতে হইসিল…তাদিগের সঙ্গে যে মোবাইল আছিল তা পাথর দিয়া গুঁড়াইয়া ফেলসি…রেঞ্জারের ডায়েরিটারে বাইঞ্চোত পুড়াইয়া দেয়া হইসিল…সেই ঘটনার পর থিকা আমরা রাতে একজন  জাইগা পাহারা দেই…দিনের বেলাতেও একজনের হাতে বন্দুক থাকে…

–বন্দুক তাক করতেই ভোঁসড়ির ছ্যানা  ঝুঁঝকো দুটো পালাতে আরম্ভ করল…তখনই আমাদের সন্দেহ হল যে ব্যাটারা নিশ্চয়ই টিকটিকি…কিছুটা ধাওয়া করে দুটোকেই পায়ে গুলি করে কাবু করে দিই…মুখ খুলতে ওদের নাম-সাকিন বেরিয়ে পড়ল…একবার এখানে এসে পড়ার পর…আমাদের দেখে ফেলার পর…আর তো ফেরত যেতে দেয়া যায় না…ফেরত গিয়ে  ভোঁসড়ির ছ্যানা আমাদের ডেরার কথা ফাঁস করে দিত আর আমরা…আবার জেলে ঢুকতুম…ধরে এনে সেদিনকেই নিকেশ করে দিতে হয়েছিল…কেননা এত কান্নাকাটি করছিল আর পায়ে পড়ছিল যে শেষে ভোঁসড়ির ছ্যানা আমাদের মধ্যে কারোর মনে দয়ামায়া উঁকি দিলেই হয়েছিল আরকি…যিনি মারা গেলেন তাঁর বড্ডো দয়ার শরীর ছিল…বলছিলেন যে পায়ে গেঁদাপাতা থেঁতো মাখিয়ে পেছনের জেলগারদে বন্ধ করে রেখে দেয়া হোক…সারাজীবন জেলেই থাকুক যাবজ্জীবন কয়েদির মতন…উঁকিঝুকি মেরে  আমরা অ্যামিউজমেন্টের মজা নেবো…খাবার জিনিস ছুঁড়ে-ছুঁড়ে দেবো…

–রেঞ্জারটা বাঙালি ?

–ব্যানার্জি আছিল …গায়ে পৈতাও আছিল বাইঞ্চোত…পৈতাসুদ্ধু  ওরে গোর দিয়াসিলাম আমরা…বেচারা ব্রাহ্মণবাচ্চা…জন্তুজানোয়ারগুলা মাংস খুবলাইয়া খাইবার পর পৈতাটাও খাইয়া থাকবে…পুলিস ওই মোটা ডায়েরিটারে পাইলে বাইঞ্চোত  কয়েকজন ঘোড়েলঘাগুর নামধাম জাইনতে পারত…

–বন্দুক-পিস্তল কোথা থেকে জোগাড় করলেন…বেশ করিৎকর্মা লোক আপনারা…

–সরকার জেল-হাজতে পাঠাইয়া  বাইঞ্চোত আমাগো জীবনে অনেক সুযোগ-সুবিধা কইরা দিসে…কত মানুষের সঙ্গে মেলামেশা আলাপ-পরিচয় কইরতে পারসি…এই পাশের রাজ্যের ল্যাঞ্জাধারীদের আর উই পাশের রাষ্ট্রের কেল্লাছাগুদের সঙ্গেও যোগসাজস কইরা দিসে…তাদিগের ঘাঁটিতে আগাম টাকা আর তালিকা দিয়া আসি…পরে কেউ গিয়া নিয়া আসি…তারা ভাবে আমরা লেখাপড়া-শিখা মানুষ…নিশ্চয়ই বিপ্লব করি…ওরা তো  জানে না যে আকাট না হইলে আইজকার দিনে নেতাগিরিতে মাথা গলানো মুসকিল…হিঁঃ হিঁঃ…

–ওপাশের রাষ্ট্রের ছাগুদের কাছ থেকে পেন ড্রাইভও আনি…গানের…ফিল্মের…কাঁচাছাগুরা শারুখ খান সালমান খান আমির খান ফারহা খান ইরফান খান ইমরান খান সাজিদ খান সইফ আলি খানদের পছন্দ করেন…পাকাছাগুরা সেই ইউসুফ খানেই আটকে গেছেন…অনেক সময়ে ফিল্মের পেন ড্রাইভ এনে দেখি ভুল করে ওয়াঁরা আফগানি ছাগু…পাকিস্তানি ছাগু…আরব ছাগুর চামসানি বোমাকেত্তন দিয়ে ফেলেছেন…মুখে কালো মোজা পরে আলজিভ নেড়ে ভুজুংভড়কি…

[ স্কাউন্ড্রেলগুলো ভেতরের সব কথা বলে দিচ্ছে…হয়তো আমাকে খুন করার ষড় কষছে…যা জানতে চাইছি সবই তো বলে দিচ্ছে…শুধু প্রেমিকাদের আড়াল করে রেখেছে…হয়তো ভাবছে আমি কোনো তরুণীকে চিনে ফেলতে পারি…]

–ওহো…এই ফুলগুলোর কথা বলছিলেন…কয়েকটা ফুল তো কলকাতার বাজারে পাওয়া যায়…

–ড্যাফোডিলস ফুল দেখেছেন ? ছোটোবেলায় ওয়র্ডসওয়র্থের কবিতা পড়ার সময় যে ফুল কল্পনা করে নিতে হতো…এই যে দেখুন…এইটেই ব্লাডি ফাকিং ড্যাফোডিল্স…ডুয়ার্সের জঙ্গলে এসে কান্তি নষ্ট হয়ে গেছে… বাঙালিত্ব পেয়ে বসেছে ফুলটাকে…ছিৎরে আদেখলা…

–ওঃ…আমি ভাবছিলুম লিলিফুল…বেঁজিও রয়েছে…যাক সাপখোপের ভয় নেই…

–আমরাই তো শঙ্খ লাগি…লাগাই…সাপের আবার কি দরকার…

–দেখুন…শাদা সামার স্নোফ্লেক…গোলাপি ফক্সগ্লোভ…নীল স্প্রিং জেনেশিয়ান…বেগুনি জেকবস ল্যাডার…হলুদ প্রিমরোজ…গোলাপি ডরসেথ হিথ…শালুকের মতন উড অ্যানামোন…হলুদ মাঙ্কি ফ্লাওয়ার…

–স্যার…আপনি ইংল্যাণ্ডের গাছপালা ফুলফল সম্পর্কে এত কথা জানেন…ইংল্যাণ্ডে ছিলেন নাকি… আসলে জানতে ইচ্ছা হল…যদিও অতীতের কথা তুলতে নিষেধ করেছেন…

–হ্যাঁ…ইংল্যাণ্ডে ছিলাম…টু বি প্রিসাইজ স্কটল্যাণ্ডে…উচ্চমাধ্যমিক করে গ্ল্যাসগো গিয়ে কেমিকাল ইনজিনিয়ারিং নিয়ে পড়েছিলাম…চাকরিও পেয়েছিলাম ভালো…অভিজ্ঞতা থেকে আমার মনে হয় এই কাঠের বাড়ি যিনি তৈরি করেছিলেন তিনি স্কটল্যাণ্ডের লোক…আমরা এসে একটা বিশেষ ব্র্যাণ্ডের ব্লাডি ফাকিং সিংগল মল্টের বোতল পেয়েছি…বাজারে বিক্রি করলে অত পুরোনো মল্টের দাম অন্তত লাখখানেক কি লাখদুয়েক টাকা হতো…বইয়ের সংগ্রহে স্কটল্যান্ড সম্পর্কে আর স্কটদের সম্পর্কে লেখা বইয়ের সংখ্যাই বেশি…হাঁচির ভয়ে একদুটোই দেখেছিলাম…রবার্ট বার্নসের স্কটিশ ডায়ালেক্ট পোয়েমস…জর্জ ম্যাকডোনাল্ডের এ ফেয়ারি রোমান্স অফ মেন অ্যন্ড উওমেন আর দি প্রিন্সেস অ্যান্ড দি গবলিন…এই সব বইয়ের মলাট দেখেছি…স্কটল্যাণ্ডে একটা সিংগল মল্ট ডিসটিলারিতে বিশেষজ্ঞের কাজ করতাম…মদ খাবার অভ্যাস হয়ে গেল…ডিসটিলারির সেলারে রাখা তিনশ বছরের একটা বোতল দেখে লোভ সামলাতে পারিনি… সেলারে দাঁড়িয়েই ঢকঢকিয়ে মেরে দিয়েছিলাম…মিস্টার ম্যাকফেল্টেন…মানে ডিসটিলারির মালিক…এমন বাপ-মা তুলে অপমান করেছিল যে  রাগের মাথায় ওই বোতলের পোঁদ ভেঙেই খুন করে দিলাম…খচাখচ…খচাখচ…পেটের নাড়িভুঁড়ি বাইরে…রক্তারক্তি…তারপর সেদিনকেই ব্যাক টু ইনডিয়া…ইনডিয়ায় পালিয়ে আসার পর ভেবেছিলাম যে সব চাপা পড়ে গেল…তা হয়নি…ব্লাডি ফাকিং ইংল্যান্ডের পুলিশ ভারত সরকারকে লেটার রোগেটারি লিখে আমার অনুসন্ধানে লাগিয়ে দিলে…ধরা পড়ে গেলাম… অবধারিত এক্সট্রাডিশান থেকে বাঁচার জন্য কেলোর সাহায্য নিয়ে অন্যদের সঙ্গে আমিও পালালাম…সবাই মিলে ভাগলবা…

[ আবার স্কাউন্ড্রেলসুলভ কথা চালাচালি করি…কতক্ষণ নিজেকে স্কাউন্ড্রেলের অভিনয় করতে হবে কে জানে…কি করে এদের জালে তুলব…মহিলাদের উদ্ধার করব…মহিলারা যেতে চাইবেন কি না তাও অজানা…একজন বিদেশিনীও আছেন বোধহয়…তাঁরাও হয়ত এদের দলের সদস্য…অন্য প্রসঙ্গে যাই…যৌনতার প্রসঙ্গে… ]

–আপনি ওদেশে বিদেশিনীদের সঙ্গে শুয়েছেন ? নাকি ওদেশে গিয়েও ভার্জিন রয়ে গেলেন ? ওখানে তো শুনেছি মেয়েদের সঙ্গে শোবার দেদার সুযোগ পাওয়া যায়…না…মানে আপনার হাইটের জন্য প্রশ্নটা মনে এলো…

–না না…ব্লাডি ফাকিং ফ্রি ফর অল নয়…বেশ্যালয়ে পাওয়া যায়…

–যাননি একদিনও ?

–বাঃ অগো যাইবে না আবার…বাইঞ্চোত মেম পাইলে কে সাড়ে…দুধ-আলতা দুটা ঢাউস-ঢাউস বুক…

–যেতাম…যাবার জন্য আমার ব্লাডি ফাকিং ডিসটিলারি থেকে বেশ দূরে যেতে হতো…ট্রেনে করে এডিনবরা কিংবা গ্ল্যাসগো…বেশিরভাগ বেশ্যাই ছিল পূর্ব ইউরোপের…ভাঙা কমিউনিস্ট দেশগুলোর ব্লাডি ফাকিং মেয়ে…সকলেই আমার চেয়ে ঢ্যাঙা আর চওড়া…আমি ফাকিং-সাকিং করতাম না…জাস্ট বুকের ওপর শুয়ে ঢাউস দুটো গোলাপি মাইতে মাথা গুঁজে থাকতাম…বুকে মাথা গুঁজেই বুঝতে পারতাম কেন কম্যুনিস্ট দেশগুলো টিকলনা…আপনি কারোর ভালো করতে চেয়েছেন কি টিকবেন না…ব্লাডি ফাকিং কী হল শেষ পর্যন্ত ? মেয়েগুলোকে বেশ্যাগিরি করতে হচ্ছে…নিজেদের দেশগাঁ থেকে পালিয়ে…যে যুবতীর ঘরে যেতাম তাকে আগে থেকেই বলে দিতাম যে আমি কিসিংও করব না…ফাকিংও করব না…জাস্ট  বুকের ওপর শুয়ে থাকব…দেহের গরম-গরম আমেজ নেবো…ডুবে থাকব হারিয়ে যাওয়া সাম্যবাদের স্বপ্নে…ঘুমিয়ে পড়লে জাগিয়ে দিও…আর পুরো সময়ের বিল বানিয়ে পেমেন্ট নিয়ে নিও…মেয়েগুলো কিন্তু সৎ…একবার তো ট্রেন জার্নি করে ক্লান্তিতে বুকের ওপর শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম… ঘুম ভাঙতে মেয়েটা বললে যে আরেকজন বাঁধা খদ্দের এসে গিয়েছিল বলে আমাকে না জাগিয়ে আমার তলা থেকে বেরিয়ে খদ্দেরের আশ মিটিয়ে…পোঁছাপুঁছি করে…আবার আমার তলায় এসে আমায় জড়িয়ে শুয়ে পড়েছে…সেই বাবদ ডিসকাউন্ট দিয়ে দিলে…

–তা কেন ? ফাক আর সাক  করতে অসুবিধা কোথায় ? ডিসফাংশানের সমস্যা আছে নাকি…

–আমার ব্লাডি ফাকিং যৌনরোগের ভয় আছে…কমিউনিস্টদের নাকি যে প্রেমরোগ ধরে তা সহজে ছাড়ে না… আমাদের দেশেই  দেখুন না…কমিউনিস্টরা চলে গেলেন…কিন্তু ওয়াঁদের দেয়া ভালোবাসার গণরোগ যেমনকার তেমন রয়ে গেছে… দগদগে…ছাতাপড়া…ও রোগ সারতে সময় লাগে…অনেকসময় অবশ্য ব্লাডি ফাকিং ইউটোপিয়ার স্বপ্নে আপনা থেকেই ঘুমের মধ্যে ইজাকুলেশানের টুরুর-টুরুর হয়ে যেত…উত্তেজনা হলেও আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতাম…নিজেকে বোঝাতাম…লিটল গাই…ডু নট গো ইনসাইড…কাম ডাউন…কাম ডাউন…ডু নট বিহেভ লাইক এ কমিসার…

–দেশে ফিরে আর বেশ্যালয়ে যান না যান না…

–আমরা কেউই বেশ্যালয়ে যাই না…কোনো মেয়ে আমাদের প্রেমিকাদের ধারেকাছে আসতে পারবে না…এখন যেমন শান্তিতে আছি তা দিতে পারবে না…আমাদের প্রেমিকারা কোনো সাংসারিক অশান্তি করেন না…পবিত্র প্রেম…অবিনশ্বর সম্পর্ক…তুলতুলে…চুলবুলে…

–বিদেশে বেশ্যালয়ে যেতেন যে…

–তা যেতাম…আগেকার সংসার জীবনে সকলেই যেতাম…

–আপনাদের যে প্রেমিকারা এখানে রয়েছেন তাঁদের বলেছেন…সকলেরই তো প্রেমিকা রয়েছেন এখানে…

–তাঁদের বলাও যা না বলাও তাই…প্রেমিকার সঙ্গে আমার কোর্টশিপ চলছে…শুনলেন না একটু আগে…কেলোর ভোদুন ভগবানের কাছে হ্যাঁ মানে যা বোঝায়…না মানেও তাই বোঝায়…এখানে জঙ্গলের ব্লাডি ফাকিং জীবনে আমাদের ওইটাই মূলমন্তর…চলুন বাড়ির পেছন দিকটাও দেখে নিন…

[ একজন তরুণীকে গণধর্ষণ করে মেরে ফেলেছে স্কাউন্ড্রেলগুলো…অন্য তরুণীদের কিডন্যাপ করে এনে বন্ধ করে রেখেছে নিশ্চয়ই…দেখতেও পাচ্ছি না…গলার আওয়াজও শুনতে পাচ্ছি না…তাদের শাড়ি-ব্লাউজও তো কোথাও দেখছি না…বাইরে শুকোবে…তারাও কি ক্রিমিনাল নাকি…অন্য কোথাও ঘর-টর আছে মনে হয়…]

–চলুন…আমাকেও তো কাজ শেয়ার করে নিতে হবে…দেখে রাখি…আরে…আপনারা তো মুর্গিও পুষেছেন দেখছি…তা দিশি মুর্গি পুষলেন কেন ? ব্রয়লার পুষতে পারতেন…পোলট্রি ফার্মের মতন…

–দিশি মুর্গি নিজের খেয়াল নিজেরা রাখে…ভোঁসড়ির ছ্যানা মোরগ নিজের হারেমে বাদশার ডিউটি সমাধা করে ডিমের ব্যবস্হা করে দ্যায়…হারেমের ডিম থেকে অনেক কনেমুর্গি আর দামড়া-মোরগ সাড্ডল্য হয়… ব্রয়লার রাখলে তাদের স্বাস্হ্যের খেয়াল রাখতে হতো…ছ্যানা কিনে এনে মানুষের মতন মানুষ করতে হতো…বিশেষ খাবার দিতে হতো…ব্রয়লাররা তো মোরগের ভালোবাসার ডিম পাড়ে না…ওটা ওদের মেন্সটুরেশান…ভোঁসড়ির ছ্যানা যথেষ্ট দিশি মুর্গি আছে…পালক ছাড়িয়ে…আগুনে পুড়িয়ে খেলেই হল…নো তেল নো মশলা…নুন মাখান আর কাঁচা লঙ্কা দিয়ে খান…তবে রোজ-রোজ খেলে কোষ্ঠকাঠিন্যের জ্যামে দুঘন্টা তো লাগবেই…পেট পোষ্কার রাখার জন্য পায়খানার মাঠের গাছে-গাছে পঞ্চধাতুর ফাং শুই ঘণ্টি টাঙানো আছে…লঙ্কার গাছও আছে চৌহদ্দির মধ্যে…ওগুলো আমরাই পুঁতেছি…বীজ এনে…ভোঁসড়ির ছ্যানা লঙ্কা পেকে শুকিয়ে গেলে তা থেকেই আবার বীজ তৈরী হয়ে যায়…যিনি মারা গেলেন তিনি মাঝেমধ্যে বাটার চিকেন রাঁধতেন…তাতে বাটার থাকত না অবশ্য…

–বুইঝলেন কিনা…বাইঞ্চোত মুর্গিগুলারে জংলি জানোয়ারে তুইলা নিয়া যায় না…দূরে সইলা গেলে সে সম্ভাবনা থাকে…দিনের বেলায় ছাইড়া দেই…রাতের বেলায় উই খাঁচা দেখতাসেন…প্রায়  ঘরের মাপের… তাতে ঢুকাইয়া দেয়া হয়…ইন ফ্যাক্ট ওরা নিজেরাই সন্ধ্যা হইবার আগে আইসা ঢুইকা পড়ে…বাইঞ্চোত খাঁচাটা বোধহয় স্কট সাহেবে পাখি পোষার জন্য তৈরি করতেসিল…

–আর এটা কী ? এটা তো জেলখানা বা থানার লক-আপের মতন সামনে দিকে  গরাদ দেয়া…

–এটায় হয়তো সায়েব জংলি জানোয়ার পুষত…বা পোষা কুকুর রাখত…কিংবা তখুনকার দিনি ভারতীয়দের সাজা দেবার জন্যি  সায়েবরা ব্যক্তিগত কারাগার রাখত…তাও হতি পারে…ওটাকে আমরা ভাঁড়ার ঘর হিসাবে ব্যবহার করি…যখুনই চাল… আটা… ডাল… আলু… পেঁয়াজ… তেল… আনাজ… মশলাপাতি… বাসন-কোসন…পেটরল…ডিজেল…হ্যানত্যান জিনিস বাল্ক আনা বা হাতানো হয়…তখুন ওর ভেতরে রাখি…ইঁদুরে কাঠবিড়ালিতে খরগোশে নষ্ট করে…তা করুক…তার পরেও যা বাঁচে আমাদের জন্য যথেষ্ট…

–জঙ্গলে গিয়ে টয়লেট করতে হয় নাকি ? সাহেবরাই তো টয়লেটকে বাড়ির ভেতরে নিয়ে আসতে শিখিয়ে গেছে…

–রামায়ণ-মহাভারতে টয়লেটগুলা কি রাজপ্রসাদেই আছিল ? কুরুক্ষেত্রে কুথায় হাইগতে যাইত শতশত কৌরব-পাণ্ডব সৈন্য…যুদ্ধক্ষেত্রে সুলভ শৌচালয় আছিল কি…কৌরবদিগের প্রাসাদে কয়খানা টয়লেট আছিল…অ্যাটাচড ওয়াশরুম…পঞ্চবটি বনে…আকবরের সৈন্য রাজস্হানে লইড়বার সময় কুথায় হাগিত…জলের বদলে বালি দিয়া পুঁছিত কি…

–এই…চুপ করুন…এখন ব্লাডি সিরিয়াস ইশ্যু তুলবেন না…টু বি প্রিসাইজ…প্রত্যেক তলায় ঘরের ভেতরেই একটা করে পায়খানা আছে…পায়খানা মানে চেয়ারের মাঝে গোল করে কেটে এনামেলের গামলা বসানো…তাইতে সায়েব-মেমরা মনে হয় হাগতেন-মুততেন…আর ভারতীয় মেথররা নিয়ে গিয়ে ফেলে আসতেন…এনামেলের পাত্রগুলো আমরা মুর্গিদের খাবার দেবার কাজে লাগাই…

–হ্যাঃ হ্যাঃ…কুড়ি কোটি দুর্যোধনের বাল…আমি সালা এগগালে নগসাল ছিলুম…মনে থাকে যেন…

–এই চুপ…যে মরে গেছে তার নকল করবেন না…

— আপনি এই বয়সেই ফোকলা হয়ে গেলেন কী করে ?

–বুঝলেন কিনা…প্রেমিকার থন চুষে…

–থন না স্তন…

–থন…থন…উনি আপনারে আনন্দদায়ী হুরিপরির কথা কইলেন কৎখন আগে…তা হুরুপরির থন চুষলে দাঁত একটু আইলগা তো হইবেই…হেথায় থাইকতে-থাইকতে প্রেমিকার সঙ্গদানে আপনেরও হইবে…উইটাই বাইঞ্চোত আমাগো দাঁত মাজার পদ্ধতি বইলা মনে লইতে পারেন…

–এখন কোথায় হাগতে যান আপনারা…

–ওই যে ওই দিকে…বাস্তু শাস্ত্র অনুযায়ী ওই দিকটাই সঠিক…যেখানি আবনি গুলি খেয়ে মরার ভয়ে হ্যাণ্ডস আপ করি দাঁড়িয়ে পড়িছিলেন…তার পাশ দিয়ে এক ফার্লংটাক এগিয়ে  আগাছাঘেরা জায়গাটায় ফাঁকা দেখে বসতে হয়…কুয়োটাও ওই দিকেই…আগি কুয়ো থেকে জল তুলি মগি করি নে যাবেন…কুয়োর কাচেই মগ আচি…মাজে-সাজে সবাই মিলে হাগতি বসি গল্পগুজব করার ইচ্ছে হয়…তাই অনেকগুনো মগ আচি…আবনার যদি বড় মাপের বা ফুলআঁকা মগ দরকার হয় তো তাও আচি…যিনি মরি গেলিন তিনি  মুর্গিদের ঠেঙে চেয়ে এনামেলের গামলা নিজের ঘরে নিয়ে গিয়ে রেকেচিন… রাতবিরেতে তিন তলা থেকি নাবতি চাইতেন না…সকালি রোদ উটলে মাটি খুঁড়ি পুঁতি আসতেন…আবনাকে তিন তলার ঘর অ্যালট করা হয়েছে…আবনিও ইচ্ছে হলি চেয়ারে বসি গামলায় হাগতি পারেন…যিনি মরি গেলিন তাঁর রাকা একাধটা গামলা আচি মনে হয়…আমরা তো ওনার ঘরে যখুনতখুন যেতিম না…পচন্দ করতিন না…

–কুয়োটাও সাহেবেরই খোঁড়ানো ?

–ভোঁসড়ির ছ্যানা আমরা মাটি খুঁড়ে লাশকে মাটি চাপা দিতে পারি মানে এই নয় যে জঙ্গলে বসবাস করার জন্য কুয়োও খুঁড়ে ফেলব…

–আমি একটু হেগে আসতে চাই…সকালে পেয়েছিল…কিন্তু জলের অভাবে চেপে গিয়েছিলাম…তারপর ভেতরে সেঁদিয়ে গেছে…

–একটু কেন…বাইঞ্চোত পুরাটাই হাইগা আসুন না…ফুল কোর্স…

–যেখানে হ্যাণ্ডস আপ করে দাঁড়িয়েছিলেন ভোঁসড়ির ছ্যানা সেখান পর্যন্ত সটান চলে যান…তারপর এক-দু ফার্লং এগিয়ে ফাঁকা দেখে বসে পড়ুন…গাছের ডালে-ডালে ফাং শুই বাজনা আছে…কোঁৎ পাড়তে না হয় যাতে…

–বুঝলেন কিনা…হাইগবার জন্য আগে থিকা বাইঞ্চোত এক ফুট গভীর গর্ত কইরা রাখি আমরা…হাইগা চাপা দিয়া দেই…নয়তো জঙ্গলের নিবাসীরা  কেউ কেউ গু খাইবার লোভে নানাদিকে ছড়াইয়া ফ্যালে… ফেলাইয়া-ছড়াইয়া খাইবার অভ্যাস…কয়েকটা গর্ত করা আসে…তারই একটায় আপাতত হাগুন…পরে আপনেও নিজের হাইগবার গর্ত খুঁইড়া রাখবেন… খুরপি-টুরপি আসে…বৎসরখানেক পরে ফার্টিলাইজার হইয়া যায়… অরগ্যানিক সব্জি পাওয়া যায়…স্বাস্হ্যের পক্ষে ভালো…

–এইখানে রেখে যাচ্ছি ঝোলাটা…

–যান…হয়ে আসুন…

–ওকে…সি ইউ…হ্যাভ এ গুড টাইম…

–[ মানুষের গুয়ের গন্ধ পেয়ে তবেই জায়গাটা পিনপয়েন্ট করেছিলুম…রেলে যেতে-যেতে গুয়ের গন্ধ থেকে যাত্রীরা টের পায় এবার শহর এলো…ওদের দিকে এগিয়ে গিয়ে…হ্যাণ্ডস আপ করার আগে এখানেই অটোম্যাটিক পিস্তল  ঝোপের ভেতরে লুকিয়ে রেখেছিলুম…যাতে স্কাউন্ড্রেলগুলো জানতে না পারে…ওই তো…ঝোপের ভেতরে…কাজে দেবে…সবকটা কোনো এক ফাঁকে আনআর্মড থাকলে হাতে-পায়ে গুলি মেরে ঘায়েল করে দেবার সুযোগ খুঁজতে হবে…দুজন অফিসারকেই স্কাউন্ড্রেলরা মেরে ফেলেছে…দুজন ছিল তো ওদের হ্যাণ্ড উইপনস নিয়ে বেরোনো উচিত ছিল…যাক নিজেদের আত্মপরিচয় দ্যায়নি ওরা…স্কাউন্ড্রেলগুলো ভাবছে ওরা পোচার আর ফরেস্ট গার্ড ছিল…হেগে নিই…কখন থেকে চেপে আছি এই স্কাউন্ড্রেলগুলোর পাল্লায়…শালারা ঘোড়েল ক্রিমিনাল…নিজের সঙ্গীকেই মেরে ফেলল কি না কে জানে…মেরে ফেলে হয়ত বলছে আত্মহত্যা করে নিয়েছে…এদিকে প্রেমিকাদের দেখা নেই…কিছু একটা গোলমাল আছে নিশ্চয়ই…প্রেমিকা প্রেমিকা বলে চলেছে…তাদের তো দেখা নেই…কন্ঠস্বরও শোনা যাচ্ছে না…কোথাও নিশ্চয়ই বন্ধ করে রাখে দিনের বেলায়…স্কট সাহেবের হয়ত মাটির তলায় সেলার-টেলার আছে কোথাও…পিস্তলটা এবার কাজে দেবে…জাঙিয়ার ভেতরে ঢুকিয়ে রাখি…ব্যাটারা যদি আবার সার্চ করে তাহলে বিপদ…হাগা…হাগা শব্দ হিব্রু ভাষায় আছে…ওল্ড টেস্টামেন্টে…হাগা মানে হিব্রু ভাষায় মেডিটেশান…লাতিনে অনুবাদ করার সময়ে হাগাকে করে দিয়েছিল মেদিতেশিও…হাগবার জন্য কনসেনট্রেশান জরুরি…মেডিটেট করে…মেডিটেট করে নিচে নামাতে হয়…তিনদিন যাবত এত আজেবাজে খেয়েছি যে কোষ্ঠকাঠিন্য হয়ে গেছে…যাক নামছে…নেমেছে…যাই এবার দেখি স্কাউন্ড্রেলগুলো কি পাঁয়তাড়া কষছে…ইনটেলিজেন্সের ইনফরমেশান ভুল ছিল…এরা সন্ত্রাসবাদী নয়…বইপড়া বিপ্লবী নয়.. ক্রিমিনাল…ঘাগু ক্রিমিনাল…পড়াশোনা করে এই লাইনে ঢুকলে যা হয়…রাজনীতিতে গেলেই পারত…]

–কি বলে গিয়ে, অনেকখুন তো গেচি লোকটা…দুর্যোধনের বাল…এখুনও পেট পোষ্কার হল না ?

–দেকুন তো ওনার  ঝোলার ঘাঁতঘোঁতে লুকোনো কিছু আছে কিনা…বিশ্বাস নেই লোকটাকে… গেলেফু থেকে বড় রাস্তা ধরে জঙ্গলের দিকে নেমে ডুয়ার্সে ঢুকতে বুকের পাটা দরকার…ফেডেড জিন্স…স্পোর্টস জুতো…

–দ্যাখতাসি…

–দুর্যোধনের বাল…টর্চ দুটো দেকুন…পেন-পিস্তল নয়তো…

–নাঃ…ইলেকট্রনিক টর্চ…বাইঞ্চোত ব্যাটারিও নাই…

–দুর্যোধনের বাল…আরেগবার চেগ করি নিন…

–নাঃ…কিসুই তো নাই…

–আমি বলি কি…দুর্যোধনের বাল…ব্যাটাকে উড়িয়ে দেয়া যাগ… ফালতু রিস্ক নিয়ে কি দরকার… কোতাগার কে…সালা মরল না বাঁচল তাতি আমাদের কি…

–কী কন আপনে…আমরাও উনার মতই বাইঞ্চোত বিপদে পড়সিলাম…সকলে এককাট্টা হইয়া স্বাধীন হইলাম… উনাকেও স্বাধীন জীবন কাটাইতে দেয়া উচিত নয় কি…যিনি মারা গ্যালেন তাঁর চাকরিতে একজন বদলিও চাই…আমরা বাইরাইলে এখানে থাইকবে…রাইনধা রাইখতে পারবে…

–দুর্যোধনের বালের স্বাধীনতা…সালা সারা জীবন ল্যাংটো পোঁদের ক্লিভেজ দেখিয়ে চুকিতকিত খেলতি হবি…গাছি চড়ি চোর-পুলিশ খেলতে হবি…লুঙ্গি পরি কাটাতে হবি…শহরের মজা নেই…কিছু নেই…মিছিলে যাবার জো নেই…কোতাও দেয়াল নেই যে তাতি স্লোগান লিগব…মল-মাল্টিপ্লেক্স নেই…ডিসকো নেই…নাইটক্লাব নেই…ডমিনোজ পিৎজা নেই…কোকাকোলা নেই…ম্যাকডোনাল্ডের বার্গার নেই…কেএফসির চিকেন ঠ্যাং নেই…স্টারবাক্স নেই…এ কোন দুর্যোধনের বালের স্বাধীনতা…

–কোন দ্যাশে যে কে বাইঞ্চোত স্বাধীন থাকে…সে দ্যাশ আর সে স্বাধীনতা…বাইঞ্চোত আহা…

–যিনি মারা গেলেন তাঁকে তাহলে মাথায় ঘুষি মেরে বেলেত ফেরত কোতল করলেন কেন…ওনার কি মজার দরকার ছিল না…

–উনি ব্লাডি ফাকিং আমার প্রেমিকার সঙ্গে শুয়েছিলেন…

–শুলেই বা…ওনার  ইরেকশান হতো না…আমরা নিজের চোখে আর হাতে দেখেছি…নাড়িয়ে-চাড়িয়ে দেখেছি…ডিসফাংশানাল…নকশাল করতে গিয়ে পুলিশের লাথিতে বিচি ফেটে গিয়েছিল…

–ব্লাডি ফাকিং উনি আবার নকশাল করতেন নাকি…নকশাল হ্যাঙ্গাম যখন হয়েছিল তখন উনি বাপের টেস্টিকল্সে লিকুইড ছিলেন…উনি যে নেতার  স্যাঙ