ঢুঢু : মলয় রায়চৌধুরীর নভেলা

উৎসর্গ : উদয়ন ঘোষের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধায়

ওনারা আউলা-বাউলা, ওনারা ফড়িঙচাঁদের দল, এক প্রাণবায়ুর সঙ্গে আরেকের ফারাক নেই । চারখানা ফিনফিনে ডানা মেলে ফড়িংচাঁদরা গাইতে গাইতে উড়ছিলেন, উড়তে উড়তে গাইছিলেন, মহাকাশে, ব্ল্যাক হোলের ভেতর থেকে বেরিয়ে, সারা গায়ে  ব্ল্যাক হোলের প্রভায় জ্যোতির্ময় ধুলো, ফলে গানের শব্দগুলোতেও আলো ঝরছিল, কালো কুচকুচিয়া আলো । আগে ওনাদের নাম ছিল গঙ্গাফড়িং ; গঙ্গা তো আর নেই, চাঁদ আছে, ফলে ওনাদের ডানাকাঁপানো সমবেত গান, যেমনভাবে প্রাণবায়ুরা কাঁপতো ইতিহাসের ভেতরে বসবাসের সময়ে । সৌরসংসার তো খাল্লাস, এখন সাম্যবাদ ভালো না আউলা-বাউলা ভালো চিন্তায় বেরিয়ে পড়েছেন ব্রহ্মাণ্ড নিখিলে । চাই ভালো নাকি কিছুই চাই না ভালো ?

ওনারা বেস্পতি  গ্রহের পাশ দিয়ে যাবার সময়ে এই গানখানা গাইছিলেন–

ভালোবাসো

ভালোবাসো ভালোবাসো ভালোবাসো

আমাকে গভীরভাবে ভালোবাসো

আরও আরও বেশি ভালোবাসো

ভালোবাসো ভালোবাসো ভালোবাসো

কিন্তু স্পর্শ কোরো না কখনও কোনোদিন

স্পর্শ করলে ঘাম লালা রক্তের ক্লেদ হবে প্রেম

স্পর্শ করলেই ভালোবাসা সংসারের আবর্তে পড়ে যাবে

স্পর্শ করলেই প্রেম চাল-ডাল-তেলে ফেঁসে যাবে

স্পর্শ করলেই প্রেম হাঁটু আর কোমরের ব্যথা হয়ে যাবে

ত্বকের ঔজ্বল্য শেষ আর পুরোনো হয়ে যাবে

তোমার শ্বাস-প্রশ্বাসও দূরে-দূরে থাক

কখনও লিখো না চিঠি কিংবা ইশারা কোরো না

ভালোবাসো আমি চাই তীব্র ভালোবাসা দাও

তাই শুধু ভালোবাসো গভীরভাবে ভালোবাসো

পৃথিবীর ইতিহাস শেষ হয়ে গেছে কামড়া-কামড়ি ঝগড়াঝাঁটি কাড়াকাড়ি খেয়োখেয়ি ধোঁয়াধোঁয়ি বোমাবুমি করে । তা করলে কী হবে ! সৌরসংসারে গ্রহের সংখ্যা আটটা থেকে  বেড়েই চলেছে ; কে জানে হয়তো আবার ইতিহাস শুরু হলে শয়ে-শয়ে গ্রহ আর গ্রহের ফেরে পড়বে প্রাণবায়ুরা। সূর্য থেকে বাইরের দিকে গেলে প্রথম চারটে গ্রহ দুনিয়ার মতন, মানে, বুধ, শুক্র, পৃথিবী আর মঙ্গল। এর পর চারটে গ্যাসছাড়া দানব: বেস্পতি, শনি, ইউরেনাস আর নেপচুন, চোপরঘণ্টা গ্যাস ছাড়ে, ইতিহাসের সময়কার দার্শনিকদের মতন । এর মধ্যে ছটা গ্রহেরই এক বা একের বেশি চামচা আছে, যাদের বলে উপগ্রহ ; তাদের গ্যাস কিন্তু গ্যাসীয় নয়, বকবকিয় । এর পাশাপাশি ছটা বামন গ্রহ, এছাড়া আরও অনেকগুলো বামন গ্রহ অপেক্ষা করছে দলে ঢুকে পড়ার, আর  হাজার হাজার ছুটকো সৌরসাংসারিক মাল তো আছেই। এখন পৃথিবীর ইতিহাস শেষ হয়ে যাবার পর  গঙ্গা-নামহীন ফড়িঙদল বেরিয়ে পড়েছিল এই ভেবে যে  নানা গ্রহের প্রাণবায়ুদের গান শুনিয়ে আবার যাতে ইতিহাস আরম্ভ করা যায় । এখন ওনারা ফড়িংচাঁদ আউলা-বাউলা, ভালোবাসায় ফুরফুরে ।

ফড়িংচাঁদরা জানেন, বেস্পতি চারটে পেল্লাই গ্যাসীয় দানবের একটা, মানে এটা প্রাথমিকভাবে কঠিন মালমশলা দিয়ে তৈরি নয়। সৌর জগতের সবচেয়ে পেল্লাই এই গ্রহের ব্যাস বিষুবরেখা বরাবর ১৪২,৯৮৪ কিমি। এর ঘনত্ব ১.৩২৬ গ্রাম প্রতি সেন্টিমিটার যা গ্যাসীয় দানবগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। অবশ্য  যেকোন গ্রহ থেকে এর ঘনত্ব কম। গ্যাসীয় দানবগুলোর মধ্যে নেপচুনের ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি । বেস্পতির বায়ুমণ্ডলের ওপরটায় গাঠনিক উপাদানের মধ্যে রয়েছে পরমাণু সংখ্যার দিক দিয়ে ৯৩% হাইড্রোজেন ও ৭% হিলিয়াম। আর গ্যাস অণুসমূহের ভগ্নাংশের দিক দিয়ে ৮৬% হাইড্রোজেন ও ১৩% হিলিয়াম।  হিলিয়াম পরমাণুর ভর যেহেতু হাইড্রোজেন পরমাণুর ভরের চারগুণ তাই বিভিন্ন পরমাণুর ভরের অনুপাত বিবেচনায় আনা হলে শতকরা পরিমাণ বদলে যায় ফলে বেস্পতির বায়ুমণ্ডলের গাঠনিক উপাদানের অনুপাত দাড়ায় ৭৫% হাইড্রোজেন, ২৪% হিলিয়াম এবং বাকি ১% অন্যান্য মৌল। অন্যদিকে ভেতরটা খানিকটা ঘন। এ অংশে রয়েছে ৭১% হাইড্রোজেন, ২৪% হিলিয়াম আর ৫% অন্যান্য মৌল। এছাড়া বায়ুমণ্ডল গঠনকারী অন্যান্য মৌলের মধ্যে ।

ইতিমধ্যে ফড়িংচাঁদের দল ফিসফিসানো কথা শুনতে পেলেন, কেমন যেন চেনা-চেনা—

অমিত একটুখানি চুপ করে থেকে বললে, ‘ লাবণ্য কি এ খবর জেনেছে?’

‘না, আমি তাকে লিখি নি। তোমার মুখে পাকা খবর পাই নি বলে চুপ করে আছি।’

খবরটা সত্যি, কিন’ লাবণ্য হয়তো বা ভুল বুঝবে।’

যতি হেসে বললে, ‘ এর মধ্যে ভুল বোঝবার জায়গা কোথায়? বিয়ে কর যদি তো বিয়েই করবে, সোজা কথা।’

‘দেখো যতি, মানুষের কোনো কথাটাই সোজা নয়। আমরা ডিক্‌শনারিতে যে কথার এক মানে বেঁধে দিই মানব জীবনের মধ্যে মানেটা সাতখানা হয়ে যায় সমুদ্রের কাছে এসে গঙ্গার মতো।’

যতি বললে, ‘অর্থাৎ তুমি বলছ বিবাহ মানে বিবাহ নয়?’

‘ আমি বলছি বিবাহের হাজারখানা মানে। মানুষের সঙ্গে মিশে তার মানে হয়, মানুষকে বাদ দিয়ে তার মানে বের করতে গেলইে ধাঁধা লাগে।’

‘ তোমার বিশেষ মানেটাই বলো-না।’

‘ সংজ্ঞা দিয়ে বলা যায় না, জীবন দিয়ে বলতে হয়। যদি বলি ওর মুল মানেটা ভালোবাসা তা হলেও আর একটা কথায় গিয়ে পড়ব; ভালোবাসা কথাটা বিবাহ কথার চেয়ে আরো বেশি জ্যান-।’

‘ তা হলে, অমিতদা, কথা বন্ধ করতে হয়ে যে। কথা কাঁধে নিয়ে মানের পিছন পিছন ছুটব, আর মানেটা বাঁয়ে তাড়া করলে ডাইনে আর ডাইনে তাড়া করলে বাঁয়ে মারবে দৌড়, এমন হলে তো কাজ বুজে কাজ চালিয়ে নেওয়া যায়।’ ‘ তবে কি আজকের কথাটাকে একেবারে খতম করতে হবে।’

‘ এই আলোচনাটা যদি নিতান-ই জ্ঞানের গরজে হয়, প্রাণের গরজে না হয়, তা হলে খতম করতে দোষ নেই।’

‘ ধরে নাও-না প্রাণের গরজেই।’

‘ শাবাশ, তবে শোনো।’

এই খানে একটু পাদটীকা লাগলে দোষ নেই। অমিতর ছোটো বোন লিসির স্বহস্তে ঢালা চা যতি আজকাল মাঝে মাঝে প্রায়ই পান করে আসছে। অনুমান করা যেতে পারে যে, সেই কারনেই ওর মনে কিছুমাত্র ক্ষোভ নেই যে, অমিত ওর সঙ্গে অপরাহ্নে সাহিত্যলোচনা এবং সায়াহ্নে মোটরে করে বেড়ানো বন্ধ করেছে। অমিতকে ও সর্বন-ঃকরণের ক্ষমা করেছে।

অমিত বললে, ‘ অক্সিজেন এক ভাবে বয় হাওয়ায় অদৃশ্য থেকে, সে না হলে প্রাণ বাঁচে না, আবার অক্সিজেন আর-এক ভাবে কয়লার সঙ্গে যোগে জ্বলতে থাকে, সেই আগুন জীবনের নানা কাজে দরকার-দুটোর কোনোটাকেই বাদ দেওয়া চলে না। এখন বুঝতে পেরেছ?’

‘ সম্পূর্ণ না, তবে কিনা বোঝা বার ইচ্ছে আছে।’

‘ যে ভালোবাসা ব্যাপ্তভাবে আকাশে মুক্ত থাকে অন্তরের মধ্যে সে দেয় সঙ্গ; যে ভালোবাসা বিশেষ ভাবে প্রতিদিনের সব-কিছুতে যুক্ত হয়ে থাকে সংসারে সে দেয় আসঙ্গ। দুটোই আমি চাই।’

‘ তোমার কথা ঠিক বুঝছি কি না সেইটেই……

একজন ফড়িংচাঁদ হেঁড়ে ডানায় বলল, এই ফিসফিসানি কোনও গানওয়ালার ছিল, তিনি বেস্পতিতে থাকেন, সারা গায়ে গ্যাসের আলখাল্লা পরে, ওনার গ্যাস চুরি হয়ে গেছে, জমিজমাও নাকি বেহাত হয়ে যাচ্ছে, ধুমকেতুরা পোঁদে নীল আলো জ্বেলে হাতিয়ে নিচ্ছে, এর আগের পোঁদে লাল-আলো ধুমকেতুরা কোপ মেরে খেপ ফেলতে পারেনি । 

ফড়িংচাঁদরা জানেন, বেস্পতি গ্রহ সূর্য থেকে দূরত্বের দিক দিয়ে পাঁচ নম্বরে আর আকার আয়তনের দিক দিয়ে সৌরজগতের সবচেয়ে বড়ো গ্রহ। বেস্পতি ছাড়া সৌরজগতের বাকি সবগুলো গ্রহের ভরকে এক করলে বেস্পতির ভর তা থেকে আড়াই গুণ বেশি হবে। বেস্পতিকে নিয়ে আরও তিনটে গ্রহ মানে শনি, ইউরেনাস এবং নেপচুনকেও গ্যাস দানব বলা হতো, এখন ফড়িংচাঁদের মতন পালিয়ে-বাঁচা প্রাণবায়ুরা সেই কথাইও বলে থাকেন। এই চারটের অন্য ফড়িংপ্রিয় নাম হলো জোভিয়ান গ্রহ। জোভিয়ান শব্দটা জুপিটার শব্দের বিশেষণ তা জানেন ফড়িংচাঁদ। জুপিটারের গ্রিক প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হতো জিউস। এই জিউস থেকেই জেনো ; জিউস নামের প্রাণবায়ুর কেলোর কিত্তি জানতে বাকি নেই ফড়িংচাঁদের । এই মূল থেকে বেশ কিছু জুপিটার বা বেস্পতিগ্রহ সংশ্লিষ্ট শব্দ তৈরি হয়েছিল। যেমন: জেনোগ্রাফিক। পৃথিবী থেকে দেখলে বেস্পতির আপাত মান পাওয়া যেতো ২.৮। এটা  আকাশে দেখতে পাওয়া তিন নম্বর ঝলমলে জ্যোতিষ্ক। কেবল চাঁদ আর শুক্র গ্রহের উজ্জ্বলতা এর থেকে বেশি, যেমনটা হতো প্রাণবায়ুদের শুক্রকীটের । অবশ্য কক্ষপথের কিছু বিন্দুতে মঙ্গলগ্রহের ঝলমলানি  বেস্পতির চেয়ে বেশি । আদিকাল থেকেই গ্রহটা জ্যোতির্বিজ্ঞানী আর জ্যোতিষীদের কাছে পরিচিত ছিল, যখন তাঁরা পাহাড়ের গুহায় ল্যাংটো-জীবন কাটাতেন। প্রাণবায়ুদের নানা পৌরাণিক কাহিনি আর ধর্মীয় বিশ্বাসও ঘুরপাক খেতো বেস্পতিকে নিয়ে । রোমানরা, সেই যারা যিশু নামের একজন দেবতার কাঠফাঁসি দিয়েছিল, গ্রহটার নাম রেখেছিল পৌরাণিক চরিত্র জুপিটারের নামে। জুপিটার রোমান পুরাণের প্রধান দেবতা। এই নামটা প্রাক-ইন্দো-ইউরোপীয় ভোকেটিভ কাঠামো থেকে এসেছে যার অর্থ ছিল আকাশের বাবা ।

আকাশের বাবা ! তাই ফড়িংচাঁদরা এই বাপের পাশ দিয়েই সবচেয়ে আগে উড়ছিলেন ।

খুব তাড়াতাড়ি ঘোরে বলে বেস্পতির চেহারা কমলালেবু-ছাপ, বিষুবের কাছে ছোট্ট, চোখে পড়ার মত উল্লেখযোগ্য একটি স্ফীতি অংশ রয়েছে। বাইরের বায়ুমণ্ডল বিভিন্ন অক্ষাংশে বিভিন্ন ব্যান্ডে ভাগ করা যেগুলো বেশ সহজেই চোখে পড়ে। এ কারণে একটি ব্যান্ডের সাথে অন্য আরেকটি ব্যান্ডের সংযোগস্থলে ঝড়-ঝাপট আরাম করে। ঠিক যেমনটা পৃথিবীতে গান-বাজনার ব্যাণ্ডগুলো করত । এ ধরনের পরিবেশের  অন্যতম ফলাফল হচ্ছে মহা লালবিন্দু । এটি মূলত একটি অতি শক্তিশালী ঝড় যা সপ্তদশ শতাব্দী থেকে একটানা বয়ে চলেছে, লেনিন-স্তালিন-মাও তেমনটাই তো বলে গেছেন, কিন্তু ওনারা ঝড়টাকে কাবু করার আগে ঝড়টাই ওনাদের কাবু করে ফেলেছিল, ফড়িংচাঁদ জানেন আর আপশোষ করেন। গ্রহটাকে ঘিরে একখানা রোগাটে গ্রহীয় বলয় আর পালোয়ান ম্যাগনেটোস্ফিয়ার রয়েছে। সর্বশেষ খবর, অ্যাঙ্করদের মতে, বেস্পতির রয়েছে ৭৯টে উপগ্রহ, যাদের মধ্যে ৪টে উপগ্রহ পেল্লাই আকৃতির। এই চারটেকে গ্যালিলীয় উপগ্রহ বলা হতো। কারণ ১৬১০ সালে গ্যালিলিও প্রথম এই চারটে উপগ্রহ আবিষ্কার করেছিলেন। সবচেয়ে বড়ো উপগ্রহ গ্যানিমেডের চেহারা বুধ গ্রহের চেয়েও পেল্লাই । বিভিন্ন সময় বেস্পতি গবেষণার উদ্দেশ্যে মহাশূন্য অভিযান হয়েছে, এই এখন ফড়িংচাঁদ যেমন করছেন। পাইওনিয়ার আর ভয়েজার প্রোগ্রামের মহাশূন্যযানগুলো এর পাশ দিয়ে উড়ে গেছে, এখন ফড়িংচাঁদ যেমন গাইতে গাইতে উড়ছেন। 

ফড়িংচাঁদরা যেদেশে থাকতেন, বেস্পতি নামটা সেখানকার ।  এর সঙ্গে নির্দেশ করা হতো বিভিন্ন যুগের সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন রচনায় খেলানো পৌরাণিক চরিত্রকে। সে দেশের সনাতন সাহিত্যমতে বেস্পতি তাদের বৈদিক যুগের একজন ঋষি, যিনি দেবতাদের পরামর্শ দিতেন।  মধ্যযুগের বইতে এই বেস্পতি গ্রহকেও ইঙ্গিত করত।   বৈদিক বইতে উনি হলেন বাগ্মিতার দেবতা, আর কখনও কখনও তাঁকে অগ্নিদেবতার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলতো প্রাণবায়ুরা।ঋগবেদে লিখেছিল, কে যে লিখেছিল কে জানে, পৃথিবীর প্রথম উজ্জ্বল আর পবিত্র মহাআলোক থেকে বেস্পতির জন্ম যিনি সব অন্ধকার দূর করে দ্যান ।  কোথাও কোথাও তার মূর্তি দেখেছে ফড়িংচাঁদ, হাতে দন্ড ও পদ্ম আর জপমালা, আরেকটা পুরাণে প্রাণবায়ুরা লিখেছিল বেস্পতি তারাকে বিয়ে করেছিলেন আর সেই তারাকে নাকি চাঁদ কিডন্যাপ করে একটা ছেলে পয়দা করে তার নাম বুধ। ব্রহ্মা চাঁদের উপর চাপ দিয়ে তারাকে তাঁর স্বামী বেস্পতির কাছে ফিরিয়ে দিতে বাধ্য করেন। ফড়িংচাঁদরা কুলকিনারা পান না যে এতো পাওয়ারফুল হয়েও বেস্পতি কেন বদলা নেয়নি । প্রাণবায়ুদের জীবনে নাকি বেস্পতির  প্রভাব থাকতো। এই প্রভাব অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভালো হতো। বেস্পতি গ্রহের কৃপায় প্রাণবায়ুরা  সবাই বেঁচে থাকতো। বেস্পতির মায়ের নাম শ্রদ্ধা, আর শ্রদ্ধা হলো কর্দম ঋষির তৃতীয় মেয়ে । তাঁর বিয়ে  হয়েছিল অঙ্গিরা ঋষির সঙ্গে। তাঁর বোন যোগসিদ্ধা। প্রাণবায়ুদের জন্ম পত্রিকাতে যে স্থানে বেস্পতি থাকত, সেই স্থানে ক্ষতি করত। কিন্তু যে স্থানে দৃষ্টি দিতো সেই ভাবে শুভ ফল দিতো। বেস্পতি যদি লগ্ন ভাবে বসত, তা হলে জন্মকুণ্ডলীতে সমস্ত দোষ দূর করে দিতে পারত। বৃহস্পতি পঞ্চম, সপ্তম, নবম ভাবে পূর্ণ দৃষ্টি থাকত। দ্বিতীয়, পঞ্চম, দশম, একাদশ ভাবের কারকত্ব। কর্দম থেকে শ্রদ্ধা, বাহ, বাহ, মারহাব্বা ।

ফড়িংচাঁদরা জানেন জ্যোতিষে বেস্পতি বাকপটুতা, দেবস্থান, কর্মযোগ, মাঙ্গলিক কাজ, কর্তব্য, বাহন, কীর্তি, প্রতাপ, ধর্ম, শিক্ষা, স্বর্ণ, পুত্র, মন্ত্র,অন্তরজ্ঞান, রাজতন্ত্র, প্রবচন কারী, লেখক, প্রকাশক, রাজ্যসুখ, রাজকৃপা, সচিব, শারিরিক পুষ্টতা, রত্ন ব্যবসায়ি, ন্যায় বান,  আধ্যাত্মিকতা, রাজনীতি, উচ্চাভিলাস, শিক্ষক, অধ্যাপক, সুসজ্জিত বাহন, সুখদায়ক নিবাস, পুত্র কারক, উকিল, ন্যায়ধিস। নবগ্রহের মধ্যে বৃহস্পতি অত্যাধিক গুরুত্বপূর্ণ। এই গ্রহ জাতকের জীবনে শুভতা ও সুখ দিতো । বেস্পতিকে দেবগুরু বলে। সমস্ত দেবতার পূজনীয়। বেস্পতি যদি জন্ম পত্রিকাতে ভাল থাকে, তা হলে পত্রিকার সমস্ত বিপত্তি দূর করে। বেস্পতিকে ধন, জ্ঞান, সম্মান, সন্তান ইত্যাদির কারক মনে করা হতো। বেস্পতির মূল্যায়ন না করে কোনও ফলাদেশ করা সম্ভব ছিল না। স্কন্ধপুরাণ অনুসারে, প্রভাস তীর্থে গিয়ে বেস্পতি শিবঠাকুরের কঠোর তপস্যা করেন। তখন তার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে তাকে দেবগুরু অকাদেমি পুরস্কার দেন শিবঠাকুর । বেস্পতিকে আবার আগুনের অবতার মনে করা হতো। বৃহস্পতি বলবান হলে জাতক মন্ত্রী পদ পেতো, নিদেন এমপি-এমেলে তো হতোই। কর্কটরাশিতে বৃহস্পতি উচ্চ। শুক্রর পর সবচেয়ে শুভ গ্রহ বেস্পতি। বেস্পতি অশুভ থাকলে জাতককে গোটা জীবন সংঘর্ষ করতে হতো। এই জাতক পূর্ব জীবনের অশুভ ফলভোগের জন্য জন্ম নিতো । বেস্পতির চাউনি দিয়ে অমৃত বৃষ্টি হতো। বেস্পতি লগ্নে বা রাশিতে থাকলে জাতক তাঁদের জীবনে লক্ষ্য স্থির রেখে গভীর আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কঠোর পরিশ্রম করে।

বেস্পতি গ্রহকে একবার পাক খেয়ে পরের পাকে উড়তে-উড়তে ফড়িঙচাঁদরা  যে গানটা ধরেছিলেন সেটা এরকম—

ধন্য ধন্য বলি তারে

বেঁধেছে এমন ঘর

শূন্যের উপর ফটকা করে

সবে মাত্র একটি খুঁটি

খুঁটির গোড়ায় নাইকো মাটি,

কিসে ঘর রবে খাঁটি

ঝড়ি-তুফান এলে পরে

মূলাধার কুঠরি নয় টা

তার উপরে চিলে-কোঠা

তাহে এক পাগলা বেটা

বসে একা একেশ্বরে

উপর নীচে সারি সারি

সাড়ে নয় দরজা তারি

লালন কয় যেতে পারি

কোন্‌ দরজা খুলে ঘরে

—আহা, এই ভাষা শুনিনি গো, গ্যাসের তৈরি একটা প্রাণবায়ু গ্যাসীয় ভাষায় বলল ।

—সত্যি, কতোদিন হয়ে গেল, বিনা গ্যাসের প্রাণী দেখিনি । গ্যাস মেরে মেরে প্রাণীদের নাকি দুনিয়া থেকে হাপিস করে দেয়া হয়েছে ।

—তা, তোমায় এরকম দেখতে কেন, তোমাদের ইতিহাস ফুরোবার পর সবাই কি এরকম হয়ে গেছে, জানতে চাইল একজন দেহাতি গ্যাস-বউ ।

—একজন ফড়িঙ বলল, আমাদের ইতিহাস শেষ হয়ে যাবার পর শুধু আমরাই টিকে আছি । বাকি সবাই কামড়া-কামড়ি ঝগড়াঝাঁটি করে ধুলো-ধোঁয়া হয়ে উবে গেছে । আমাদের ছোটো ভাইরা আছে অবশ্য, উচ্চিংড়ে, আরশোলা, ঝিঁঝি, গুবরে, তাও বিনা ডানার ; আমাদের ডানা টিকে গেছে বলে গ্রহে-গ্রহে ট্যুর করতে বেরিয়েছি ।

—সেই মালগুলো নেই, সেই যারা নানা গ্রহে ঢুকে মাল কামাবার তালে ছিল,  ইতর প্রাণবায়ু ?

—ধুমকেতুদের কথা বলছ ? তাদের কিছুকিঞ্চিত টিকে আছে এদিকে-সেদিকে, কিন্তু আগেকার মতন আর চেনার উপায় নেই, কখনও তাদের পোঁদ থেকে লাল আলো বেরোতো, কখনও নীল, আর এখন তো কয়েকটার কমলা রঙের আলো বেরোয়, বলল ঢ্যাঙা ফড়িঙ ।

—কেন ? জানতে চায় একজন গ্যাসীয় আত্মা । 

—তাদের কারোর এখন হাতের জায়গায় পা, পেটের জায়গায় পোঁদ, মুখের জায়গায় নুনু কিংবা গুদ, চোখের জায়গায় নাক । বিবর্তন গো বিবর্তন । এতো নোংরা করে দিয়েছিল যে জঙ্গলগুলোতে আগুন লেগে গেল, বরফের চাঙড় গলে পাহাড়দের ডুবিয়ে ফেললে, সমুদ্র হয়ে গেল ফেলে দেয়া প্লাসটিক, কনডোম আর চটচটে তেলে চোরাপাঁক । থাকা যায় না সেখানে ।

—অ ! তা এখন কোথায় চললে ? 

—তোমাদের তো গান শোনালুম ; সেটা সব রকমের গ্যাস মিলেমিশে গেয়ো । 

—কিন্তু তোমরা নিজের সম্পর্কে কিছু বললে না তো, এক গ্যাস-যুবতী জানতে চাইল ।

একজন পুংবাউল ফড়িংচাঁদ বলতে লাগল, নিজের সম্পর্কে, গভীর অন্ধকারের ঘুম থেকে নদীর চ্ছল চ্ছল শব্দে জেগে উঠলাম আবার; তাকিয়ে দেখলাম পাণ্ডুর চাঁদ বৈতরণীর থেকে তার অর্ধেক ছায়া গুটিয়ে নিয়েছে যেন কীর্তিনাশার দিকে। ধানসিড়ি নদীর কিনারে আমি শুয়েছিলাম— পউষের রাতে—কোনোদিন আর জাগবো না জেনে কোনোদিন জাগবো না আমি— কোনোদিন জাগবো না আর— হে নীল কস্তুরী আভার চাঁদ, তুমি দিনের আলো নও, উদ্যম নও, স্বপ্ন নও, হৃদয়ে যে মৃত্যুর শান্তি ও স্থিরতা রয়েছে, রয়েছে যে অগাধ ঘুম, সে-আস্বাদ নষ্ট করবার মতো শেলতীব্রতা তোমার নেই, তুমি প্রদাহ প্রবহমান যন্ত্রণা নও— জানো না কি চাঁদ, নীল কস্তুরী আভার চাঁদ, জানো না কি নিশীথ, আমি অনেক দিন— অনেক অনেক দিন, অন্ধকারের সারাৎসারে অনন্ত মৃত্যুর মতো মিশে থেকে, হঠাৎ ভোরের আলোর মূর্খ উচ্ছ্বাসে নিজেকে পৃথিবীর জীব ব’লে বুঝতে পেরেছি আবার; ভয় পেয়েছি, পেয়েছি অসীম দুর্নিবার বেদনা; দেখেছি রক্তিম আকাশে সূর্য জেগে উঠে মানুষিক সৈনিক সেজে পৃথিবীর মুখোমুখি দাঁড়াবার জন্য আমাকে নির্দেশ দিয়েছে ।

আরেকজন পুংফকির বলল, আফিমের ঝোঁকে মনে করিলাম, পতঙ্গের ভাষা কি বুঝিতে পারি না? কিছুক্ষণ কান পাতিয়া শুনিলাম—কিছু বুঝিতে পারিলাম না। মনে মনে পতঙ্গকে বলিলাম, “তুমি কি ও চোঁ বোঁ করিয়া বলিতেছ, আমি কিছু বুঝিতে পারিতেছি না।” তখন হঠাৎ আফিম প্রসাদাৎ দিব্য কর্ণ প্রাপ্ত হইলাম—শুনিলাম, পতঙ্গ বলিল, “আমি আলাের সঙ্গে কথা কহিতেছি—তুমি চুপ কর।” আমি তখন চুপ করিয়া পতঙ্গের কথা শুনিতে লাগিলাম। পতঙ্গ বলিতেছে— দেখ, আলাে মহাশয়, তুমি সে কালে ভাল ছিলে—পিতলের পিলসুজের উপর মেটে প্রদীপে শােভা পাইতে—আমরা স্বচ্ছন্দে পুডিয়া মরিতাম। এখন আবার সেজের ভিতর ঢুকিয়াছ—আমরা চারি দিকে ঘূরে বেড়াই—প্রবেশ করিবার পথ পাই না, পুড়িয়া মরিতে পাই না। দেখ, পুড়িয়া মরিতে আমাদের রাইট আছে—আমাদের চিরকালের হক্‌। আমরা পতঙ্গজাতি, পূর্ব্বাপর আলােতে পুড়িয়া মরিয়া আসিতেছি—কখন কোন আলাে আমাদের বারণ করে নাই। তেলের আলাে, বাতির আলাে, কাঠের আলাে, কোন আলাে কখন বারণ করে নাই। তুমি কাচ মুড়ি দিয়া আছ কেন, প্রভু? আমরা গরিব পতঙ্গ—আমাদের উপর সহমরণ নিষেধের আইন জারি কেন? আমরা কি হিন্দুর মেয়ে যে, পুড়িয়া মরিতে পাব না? দেখ, হিন্দুর মেয়ের সঙ্গে আমাদের অনেক প্রভেদ। হিন্দুর মেয়েরা আশা ভরসা থাকিতে কখন পুড়িয়া মরিতে চাহে না—আগে বিধবা হয়, তবে পুড়িয়া মরিতে বসে। আমরাই কেবল সকল সময়ে আত্মবিসর্জ্জনে ইচ্ছুক। আমাদের সঙ্গে স্ত্রীজাতির তুলনা? আমাদিগের ন্যায়,, স্ত্রীজাতিও রূপের শিখা জ্বলিতে দেখিলে ঝাঁপ দিয়া পড়ে বটে। ফলও এক,—আমরাও পুড়িয়া মরি, তাহারাও পুড়িয়া মরে। কিন্তু, দেখ, সেই দাহতেই তাদের সুখ,—আমাদের কি সুখ? আমরা কেবল পুড়িবার জন্য পুড়ি, মরিবার জন্য মরি। স্ত্রীজাতিতে পারে? তবে আমাদের সঙ্গে তাহাদের তুলনা কেন? শুন, যদি জ্বলন্ত রূপে শরীর না ঢালিলাম, তবে এ শরীর কেন? অন্য জীবে কি ভাবে, তাহা বলিতে পারি না, কিন্তু আমরা পতঙ্গজাতি, আমরা ভাবিয়া পাই না, কেন এ শরীর?—লইয়া কি করিব?—নিত্য নিত্য কুসুমের মধু চুম্বন করি, নিত্য নিত্য বিশ্বপ্রফুল্লকর সূর্য্যকিরণে বিচরণ করি—তাহাতে কি সুখ? ফুলের সেই একই গন্ধ, মধুর সেই একই মিষ্টতা, সূর্যের সেই এক প্রকারই প্রতিভা। এমন অসার, পুরাতন বৈচিত্র্যশূন্য জগতে থাকিতে আছে? কাচের বাহিরে আইস, জ্বলন্ত রূপশিখায় গা ঢালিব।

এক মহিলা ফড়িং বললেন, এনার কথা শুনবেন না, কিচ্ছু মনে রাখতে পারেননি, সেই কবে আফিম খেয়ে ছিলেন, তার নেশা নাকি এখনও রয়েছে ; বলিহারি আত্মবিজ্ঞাপনের অলীক পদমসি ঢঙ ।

ইতিহাস লেখার শুরুতে ফড়িঙদের একসময় শয়তানের ছুঁচ বলে মনে করত মরূভূমির প্রাণবায়ুরা।  ফড়িঙরা দুষ্টু, অবাধ্য খোকাখুকুর মুখ সেলাই করে দেবে বলে  ভয় দেখাতো তারা, কেননা তাদের ছোটোবেলায় যে সব ভয় দেখানো হয়েছিল সেগুলো তারা নিজেদের ছেলে-মেয়েদের ধরিয়ে দিতো, যাতে তারা আবার তাদের ছেলেমেয়েদের ধরিয়ে দিতে পারে ; এই ধরিয়ে দেবার কায়দার নামই স্মৃতি, যাকে পরের প্রাণবায়ুরা বলত ইতিহাস । ইতিহাস লেখার শুরুতে, গ্রামের প্রাণবায়ুদের অনেকের ছোটোবেলার দিনগুলো কাটতো ছোট ফড়িঙের পেছনে ছুটে। সর্বদর্শী এই পরিচিত ফড়িঙ-গায়ক  সুপ্রাচীন হওয়ায়, এদের ঘিরে অনেক কিংবদন্তি চালু করেছিল প্রাণবায়ুরা। ফড়িঙ সম্বন্ধে আরেকটা কিংবদন্তি চালু ছিল যে, এই উড়ন্তজীবরা মরা সাপকে শ্বাস ফেলে বাঁচিয়ে দিতে পারে, কেননা ফড়িংরা পেছন দিয়ে শ্বাস নেয় ; সাপেরা তো আর জানতো না ফড়িঙ ওর শরীরের কোথা থেকে শ্বাস ছাড়ে ! কিংবদন্তিগুলো শুনতে বেশ মজার হলেও কোনোটাই ইতিহাসে ঢুকতে পারেনি। তবে ফড়িঙের ব্যাপারে বিজ্ঞানভিত্তিক আর জব্বর এমন অনেক খবর রয়েছে, যা গ্রহ-উপগ্রহগুলোর প্রাণবায়ুদের অনেকেরই অজানা। সেসব খবর গেয়ে বেড়াবার খাতিরে ফড়িঙের সৌরজগত ঘোরা।   ফড়িঙ একই সময়ে সামনে এবং পেছনে দেখতে পারে। যা অন্য প্রাণবায়ুরা সহজে পারত না। এই গঙ্গাফড়িং ডাইনোসরের যুগ থেকে, মানে ইতিহাসের আগে থেকে এখনও  বহাল তবিয়তে রয়েছে। ইতিহাসের মার খেয়ে সে আজকের  গঙ্গাফড়িঙ। সে  ভিন্ন দুনিয়া দেখতে পায় তার চোখের চাউনি মেলে । ইতিহাসের সময়ে সব রকমের প্রাণবায়ুরা সাধারন  আলো দেখতে পেতো। কিন্তু ফড়িঙ অতিবেগুনি রশ্মি পর্যন্ত দেখতে পারে। ইতিহাসের লোকজন যা দেখতে পেতো না। 

এক মোটাসোটা ফড়িঙচাঁদ গান ধরে । একটা ধুমকেতু চলে আসে কাছাকাছি । ফড়িঙ জানে ধুমকেতু উল্কা বা গ্রহাণু থেকে আলাদা কারণ এর মুণ্ডু আর পোঁদের আলো আছে। কিছু বিরল ধূমকেতু সূর্যের খুব কাছ দিয়ে বারবার ঘোরার  কারণে উদ্বায়ী বরফ আর ধুলো হারিয়ে ছোট গ্রহাণুর মতন জিনিসে পালটে যায় । ফড়িঙরা দেখলো অনেকগুলো ধুমকেতু একসঙ্গে জোট বেঁধেছে, মনে হয় মাস্তনের দল, এককালে ইতিহাসের নেতাদের চামচা ছিল, এখন লাৎ খেয়ে ধুমকেতুতে পালটে গেছে, নয়তো ধুমকেতুরা তো দল বেঁধে মিছিল করে না । বাঞ্চোৎরা নির্ঘাত দলবদলু।

—কী গাইছিস ফালতু ? মাথামুন্ডু নেই ! বলল এক ব্যাটা ধুমকেতু ।

—আরে শালা এই গানটা আমার জানা । ফড়িঙটা বিনা কপিরাইটে গাইছে ।

মোটা-ফড়িঙ বলল, স্যার, ইতিহাস শেষ হয়ে গেছে, দেখুনগে যান, এখন আর কপিরাইটের যুগ নেই, সেসব ছিল পুঁজিবাদের দিনকালে । আরেকটা কথা বলি, আপনাদের পোঁদ দিয়ে তো লাল আলো বেরোতো, নীল হয়ে গেল কেন ? এবারে কি কমলা রঙের আলো বেরোবে ? পাদের আলোর তো তেমনটাই বদগন্ধ !

মোটা-ফড়িঙের কথায় কান দিল না ধুমকেতুরা । ওরা নিজেদের নিয়ে রঙ্গে টইটুম্বুর ।

—এই, ওই বাঞ্চোৎটাকে দ্যাখ, হেলতে দুলতে আসছে, গাণ্ডুটা নিজেকে পালোয়ান ভাবে, নির্ঘাৎ ; দেবো নাকি একটা কিডনি পাঞ্চ ? আর কেড়ে নিই যা আছে মালকড়ি ? 

—না ।  কাড়াটা কিডনি পাঞ্চের সঙ্গে যা্য না । প্যাঁদানির ওটা হয়ে যাবে উদ্দেশ্য । আমাদের কোনো উদ্দেশ্য নেই । কিডনি পাঞ্চ দিসনি, গুগলুটা মোটা, অজ্ঞান হয়ে যাবে ।

—যদি ডজিঙ করে ?

—আচমকা দে । হাতের পেছন দিয়ে বোলো পাঞ্চ ।

—তাতেও খালাস হয়ে যেতে পারে ।

—লোকটা অক্কা পেলে সেটা আবার প্যাঁদানির পারপাস হয়ে দাঁড়াবে ।

—তাহলে, হেডবাট দিয়ে, একখানা হালকা হুক দিই ।

দশাসই ধুমকেতু  মারমুখি ফড়িঙে দলের সামনে ঠিক কী করবে বুঝে উঠতে না পেরে দৌড় লাগায় ।

—তোর নবখুড়োর সেই গানটা ধর, প্যাঁদানির আনন্দে একটু নেচে নিই । বলল এক আউলা ফড়িঙ ।

—ঝাড় দেবার বদলে নাচটা তো উদ্দেশ্য হবে দাঁড়াবে গাণ্ডু । আমাদের তো কোনও উদ্দেশ্য না থাকার কথা । কোনো অ্যাকশানের পারপাস থাকবে না, কেননা জীবনের পারপাস নেই । হ্যাঁ । আমরা সকলের মতন ধনীগ্যাসে যেতে পারতুম, সেখানকার ফুটানি মারার জন্য । কিন্তু তাতে কী হতো ? আমাদের জীবনের কিছু একটা উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়াতো ।

—কারেক্ট । স্বর্ণগ্যাস রোজগারের উদ্দেশ্য । আর শাদা চামড়ার সঙ্গে শোয়া ; তাদের তো বিয়ে করা যাবে না ; যতো বাঞ্চোৎ গেছে, বেশির ভাগ কালো কিংবা স্প্যানিশ বিয়ে করে খুঁটি গেড়েছে ।

—চোদাকে কেন যে জীবনের পরম উদ্দেশ্য করে তোলে গাণ্ডুগোবর্ধনগুলো, শালারা ঢোকাবার জন্যে মুখিয়ে থাকে ।

—সব ব্যাপারেরই পারপাস থাকে বুঝলি ! 

—তা নয় । ওটা একজন মানুষের সেলেকশানের গ্যাঁড়াকল । চেও না, ব্যাস ।

—তাহলে তুই তোর মাকে খুন করেছিলিস কেন ? মায়ের রক্ত দিয়ে দেয়ালে হাসিমুখের ইমোজি এঁকে ছিলিস কেন ।

—খুনটাকে নালিফাই করার জন্য ইমোজি এঁকেছিলুম রে । দ্যাখ, আমি মায়ের গা থেকে কোনো সোনাদানা খুলে নিইনি । ওসব আমার বাবা হাতিয়ে নিয়েছে, যেই জানতে পেরেছে যে মা খুন হয়েছে আর, দেয়ালে রক্তের ইমোজি এঁকে আমি কেটে পড়েছি ।

—তোর ড্যাড তো ডিআইজি । শালা দুজনেই পার পেয়ে গেলি । তোর ড্যাড, তুই বলেছিলি, তোর মায়ের মার্ডার নিয়ে একটা নভেল লিখছে, আগাম টাকাও পেয়েছে পাবলিশারের কাছ থেকে । 

—কিন্তু তোর মায়ের কাটা মাথা পাওয়া গিসলো পাহাড়তলিতে । তোর ড্যাড নাকি তোকে বলেছিল আরও কয়েকজন আত্মীয়কে মার্ডার করতে ; যাতে উনি একটা বেস্টসেলার সিরিজ লিখতে পারেন ।

—জানি, দুজন ফরেনার এগজটিক প্রজাপতি ধরতে গিয়ে সন্ধ্যাবেলা ভালোভাবে দেখতে না পেরে মায়ের মাথাখানা লাথিয়ে দিয়েছিল । তারপর যখন ওরা কাছে গিয়ে টের পেল ওটা একজন মহিলার মাথা, তখন থানায় গিয়ে খবর দিয়েছিল । মাথাটা তখনও নাকি টাটকা, কানে দুল, গলায় হার ইনট্যাক্ট , কানটা শুনতে পাচ্ছিল, আর গলা দিয়ে তোমাকে চাই গান বেরোচ্ছিল।

—ওই যে ! উদ্দেশ্য ! পারপাজ । 

—পুলিস উল্টে ওদেরই জেরা করেছে, কেননা ওদের কাছে  প্রজাপতি ধরে নিজেদের দেশে নিয়ে বার অনুমতি ছিল না । 

—কতো রকমের প্রজাপতি হয়, জুলজিতে পড়েছিলুম । অথচ কারোর বাংলা নাম জানতো না আমাদের প্রফেসরমশাই ।

—তুই এখানকার প্রজাপতি নিয়ে স্টাডি করতে পারতিস । 

—তাহলে তো ওই ওদের মতন জাল নিয়ে প্রজাপতি ধরে সেগুলোকে মেরে ফেলতে হতো ।

—এই, একটা ল্যাঙপেঙে প্রাণবায়ু এদিকেই আসছে । 

ফড়িঙ নামের ছোট পতঙ্গটির রয়েছে অতি প্রাচীন ইতিহাস। দুনিয়ার বুকে ডাইনোসরদের পদচারণার অনেক আগে থেকেই আকাশে উড়ে বেড়িয়েছে ফড়িঙরা। প্রায় ৩০০ মিলিয়নের বেশি বছর ধরে পৃথিবীতে ফড়িংদের বসবাস। সময়ের সাথে পরিবেশের পরিবর্তনে, বিবর্তনের ধারায় একসময়ের সুবিশাল পতঙ্গ ফড়িঙ আজকে পরিণত হয়েছে ছোট পতঙ্গে। কার্বনিফেরাস যুগে ফিরে গেলে দেখা যাবে, ফড়িঙদের পূর্বপুরুষেরা ছিল পতঙ্গদের মধ্যে সবচেয়ে বড় পতঙ্গ। এই যুগে পাওয়া যেত পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পতঙ্গগুলো। সুপ্রাচীন গ্রিফেনফ্লাই হলো পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পতঙ্গ, যাদের বিবেচনা করা হয় ফড়িঙের পূর্বপুরুষ হিসেবে। গ্রিফেনফ্লাইগুলোর পাখার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তের দূরত্ব ছিল ৭১ সেন্টিমিটার ও উইং স্প্যান ছিলো ২৮ ইঞ্চি। কার্বনিফেরাস যুগে বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ ছিল ৩০% এরও বেশি, ক্ষেত্র বিশেষে এই পরিমাণ প্রায় ৫০% পর্যন্তও ছিল। মনে করা হয়, বাতাসে অক্সিজেনের এই উপস্থিতি পতঙ্গগুলোর সুবিশাল আকারের অন্যতম কারণ ছিল।

যে প্রাণবায়ু এই দিকে আসছিল সে গান ধরে—

আমি তোমার কাঙ্গালী গো সুন্দরী রাধা,

আমি তোমার কাঙ্গালী গো 

তোমার লাগিয়া কন্দিয়া ফিরে,

হাছন রাজা কাঙ্গালী গো 

তোমার প্রেমে হাছন রাজার, মনে হুতাশন 

একবার আসি হৃদকমলে, করয়ে আসন 

আইস আউস প্রাণ প্রিয়সী ধরি তোমার পায় 

তোমায় না দেখিলে আমার, জ্বলিয়ে প্রাণ যায় 

ছট্ ফট্ করে হাছন, তোমার কারণ 

ত্বরা করি না আসিলে হইব মরণ 

কান্দে কান্দে হাছন রাজা পড়ে আছাড় খাইয়া

শীঘ্র করি প্রাণ প্রিয়সী, কোলে লও উঠাইয়া 

কোলে ঠান্ডা হইব, হাছন রাজার হিয়া 

সব দুঃখ পাসরিব, চান্দ মুখ দেখিয়া 

হিন্দুয়ে বলে তোমায় রাধা, আমি বলি খোদা 

রাধা বলিয়া ডাকিলে, মুল্লা মুন্সিয়ে দেয় বাধা 

হাছন রাজা বলে আমি, না রাখিব যুদা 

মুল্লা মুন্সির কথা যত সকলই বেহুদা 

বড় দুটি চোখের সুবাদে ফড়িঙদের  দৃষ্টিশক্তি অসাধারণ। এদের দর্শনশক্তি প্রায় ৩৬০ ডিগ্রি এবং মানুষের চেয়ে অধিক সংখ্যক রঙ দেখতে পারে ফড়িঙরা। একটি ফড়িঙের চোখে প্রায় ৩০,০০০ এর মতো লেন্স বা ওমাটিডিয়া রয়েছে, যেগুলোর মাধ্যমে এরা অর্জন করেছে অসাধারণ দর্শন ক্ষমতা। একটি ফড়িঙ তার মস্তিষ্কের প্রায় ৮০ ভাগ ব্যবহার করে দৃষ্টিলব্ধ তথ্য বিশ্লেষণে, ফলে অন্যান্য পোকার চলাচল সহজেই নির্ণয় করতে পারে এরা। তাছাড়া, ওড়ার সময়ে অন্য পতঙ্গ বা কোনো কিছুর সাথে সংঘর্ষের হাত থেকেও রক্ষা পেতে ও খাবার শিকার করতে তাদের এই দৃষ্টি শক্তি দারুণ কাজে দেয়।

—এই হাছন লোকটা কে রে ? 

—গান থেকে মনে হচ্ছে কোনো রাজ্যের রাজা ছিল লোকটা । ইতরগুলোকে পালটে দেবে ভেবে গান বেঁধেছিল ।

—বাংলাটা কেমন যেন খটমট । এই গানে নাচা যায় না । তবে রাজাটা ঠিকই বলেছিল। মোল্লা আর মুনসিগুলো বেহুদার হদ্দ ।

গ্যাসের প্রাণবায়ু অবাক তাকায় । এতো ফড়িঙচাঁদের সঙ্গে পারবে না আঁচ করে কুঁকড়ে দাঁড়িয়ে থাকে, কাঁধে বোঁচকা । কয়েকজন ফড়িঙচাঁদ প্রাণবায়ুটাকে ঘিরে ধরে নাচা আরম্ভ করে । একজন নবখুড়োর গান ধরে।

—গানটার মানে বুঝি না, কিন্তু দারুন একখানা গান । ওদের একজন নাচতে নাচতে বলে ওঠে।

—যে গানের মানে বুঝতে পারবি না, দেখবি সেই গানই তোর ভালো লাগবে ।

অতিথি প্রাণবায়ুও ওদের সঙ্গে গানটা গাইতে থাকে আর মাটির দিকে মাথা ঝুঁকিয়ে নাচতে থাকে । নাচতে নাচতে লোকটার খেয়াল থাকে না যে ফড়িঙদল বাতাসের ফুটপাথে বসে ওর নাচ দেখছে । 

—দারুন গাইছে লোকটা, পাগল মনে হচ্ছে, ডানা নেই তো । 

—বেঁচে থাকার জন্য অনেক লোকের কাছে পাগলামিটা একটা পারপাজ ।

—তুই তোর অদিতি চাপিয়ে দিয়েছিস আমার বীজ ঘিরে এই দৃশ্যের উপর কোনো চাঁদের মেশিন নেই আমাদের মধ্যে আর গ্রামাঞ্চল নেই দূর পাহাড়ে বরফ আছে নাগরিকভাবে উজ্জ্বল রোদ্দুরে চড়ে ধীরে ধীরে পেনিট্রেট করছে উচ্ছ্বল ১ নবাগতা হাওয়া এসব দৃশ্য নিষিদ্ধ সিনেমায় থাকে ৫ মিনিটে মাল পড়ে যায় সেই তো বাস্তব এই আমি দাঁড়িয়ে এই তুই আমার সামনে নিঃসংবাদ বসে আমি তুই তুই আমি কে যে ফুল আর কে যে বৃষ্টির সন্তান ৩য় কেউ ভ্রুক্ষেপ করতে পারে কি অদিতি আর বীজে লম্বা কোনো হাড় থাকছে না নতজানু হলেও পূজা হচ্ছে না দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেও কেউ রাসবিহারী নয় কঙ্কালের বাইরে ছালচামড়ার ভিতরে কোথায় সেই মমির মন্দির কে কোথায় অচেনা ঠাকরুন….

অক্সিজেন টানা ও কার্বন ডাইঅক্সাইড ছাড়ার জন্য ফড়িঙের নিম্ফরা  ব্যবহার করত তাদের পোঁদ। কারণ, তাদের ফুলকা তখন থাকে মলদ্বারের ভেতরে। পোঁদ  দিয়ে সরাসরি জল টেনে নিতো ভেতরে এবং এরপর আবার তা বের করে দিতো একই পথ দিয়ে। এই পদ্ধতিতে চলে গ্যাস আদান-প্রদানের কাজ। এই পদ্ধতির আরেকটা অতিরিক্ত সুবিধা হলো, গতিশক্তির ফলে সামনে এগিয়ে চলে ফড়িঙচাঁদের দল। নিম্ফ অবস্থা থেকে পালটি খাবার জন্য জল থেকে আশেপাশের পাথর কিংবা গাছে আশ্রয় নেয় এগুলো আর তারপর শারীরিক পরিবর্তনের জন্য প্রায় এক ঘণ্টার মতো সময় লাগে। নিম্ফ দশা থেকে মুক্ত হয়ে শারীরিক পরিবর্তনের মাধ্যমে ফড়িং হিসেবে নতুন জীবন শুরু করার মুহূর্তে এরা খুবই ক্যাবলা আর অরক্ষিত অবস্থায় থাকত। শরীরের গঠন আরও মজবুত করে ওড়ার জন্য পর্যাপ্ত শক্তির জন্য সময় লাগত আরও বেশ কয়েকদিন। এই সময়ে বেশিরভাগ ফড়িঙ খাল্লাস হয়ে যেতো ।

—আপনারা কারা, কেমন যেন শুক্রকীটের মতন অথচ কুমিরের মাপের, আগেকার কালে যেমন কুমির ছিল ?

—আমরা হলুম যারা ছোটোলোকমি আর ন্যাকড়াকানি আর চোখবসা আর অতিপ্রাকৃত অন্ধকারে তুরীয় ধোঁয়া টেনে ভাসমান জলশীত বসতবাড়ি-শহরের উপরিভাগে আফরিদি সঙ্গীতের ধ্যান করেছে, যারা স্বর্গের কাছে মেলে ধরেছে তাদের ঘিলুমগজ আর দেখেছে বস্তির চালার ওপর জ্যোতির্ময় ইসলামি দেবদূতদের পায়চারি, যারা পাইকপাড়ার সপ্রতিভ শীতল চোখের মায়ায় ছুটেছে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে দিয়ে আর যুদ্ধ-পণ্ডিতদের সভায় বড়ু চণ্ডীদাসের বিষাদ-আলোয় দৌড়েছে, যারা মাথার খুলির জানালা দিয়ে অশ্লীল গীতিকবিতা প্রকাশ ও খ্যাপামির দরুণ শিক্ষায়তন থেকে বিতাড়িত, যারা কয়েকদিনের না-কামানো ঘরের অন্তর্বাসে গুটিসুটি, নোংরা ফেলার গাদায় পুড়িয়েছে টাকা আর শুনেছে দেওয়াল ফুঁড়ে ঠিকরে-আসা সন্ত্রাস, যারা গাঁজা-চরসের বেল্ট বেঁধে শান্তিনিকেতন থেকে আগরতলা ফেরার পথে ধরা পড়েছে বয়ঃসন্ধির কেশগুচ্ছে, যারা রঙ-সরাইয়ের আগুন চিবিয়েছে কিংবা স্বর্গবীথিকায় চুমুক দিয়েছে রেড়ির তেলে, মৃত্যু, কিংবা নিজের ধড়কে রাতের পর রাত অভিযোগমুক্ত করেছে স্বপ্ন দিয়ে, নেশা দিয়ে, জাগরুক দুঃস্বপ্নে, মদ আর শিশ্ন আর অন্তহীন অন্ডকোষ দিয়ে, বরানগর ও বাঁশদ্রোণীর খুঁটির দিকে ঝাঁপিয়ে-পড়া মেধায় অতুলনীয় কানাগলির শিহরিত মেঘ ও বজ্রস্হির সময়-পৃথিবীকে তার মাঝে আলোকিত করেছে, হলঘরের শূন্যগর্ভ কাঠিন্য, প্রাঙ্গণের গাছসবুজ কবরসকাল ছাদের ওপরে মদখোঁয়ারি, চোখমারা নিয়ন আলোর ট্র্যাফিক জ্যোতিতে দোকানসঙ্ঘের রাস্তায় আনন্দটহল, মোহনবাগানের গর্জাতে-থাকা শীতকালীন সন্ধ্যায় থিরথিরিয়ে-ওঠা গাছপালা এবং সূর্য এবং চাঁদ, ছাই-ক্যানেসতারার আবৃত্তি আর মেধার দয়ালু আলো-মহারাজ, যারা বাংলা মদ খেয়ে খালাসিটোলা থেকে পবিত্র কলুটোলা পর্যন্ত অন্তহীন পরিভ্রমণের জন্যে নিজেদের বেঁধে ফেলেছে সুড়ঙ্গপথে যতক্ষণ না চাকা আর শিশুর হুল্লোড়শব্দ তাদের নামিয়ে এনেছে গ্যাঁজলাওঠা থ্যাঁৎলানো বেহুঁশ-মগজ চিড়িয়াখানার বিষণ্ণ দীপ্তি-নেঙড়ানো আলোয় যারা ডুবে থেকেছে সারারাত খিদিরপুরের সাবমেরিন-আলোয় আর পার্ক স্ট্রিটের  নির্জন দোকানে কাটিয়েছে বিস্বাদ বিয়ারের সারাটা দুপুর, দড়িবোমা সঙ্গীত-বিস্ফোরণে কান পেতেছে সর্বনাশের চিড়খাওয়া আওয়াজ শোনার জন্য, যারা লাগাতার সত্তর ঘন্টা বকবক করেছে বাগান থেকে বিছানা থেকে শুঁড়িবাড়ি থেকে বেলেভিউ থেকে যাদুঘর থেকে বিদ্যাসাগর-সেতু অব্দি, নিষ্কাম আলাপচারীর হারিয়ে-যাওয়া এক সৈন্যদল ঝাঁপিয়ে নেমেছে চাঁদের বাইরে বিবাদি বাগের লাল বিলডিঙে জানালায় ঝুঁকে-পড়া অগ্নিতারণ রাস্তায়, হুললোড় চ্যাঁচামেচি বমি-করে ফিসফিস ঘটনা আর স্মৃতি আর গালাগল্প আর চোখনাচানো নেশা আর হাসপাতালের শক-চিকিৎসা আর জেল আর যুদ্ধ, সাতদিন সারারাত ধরে প্রখরচোখে সমগ্র মেধাশক্তির আমূল উৎপাটন ফুটপাতে ছুঁড়ে দেয়া সাগরতীর্থের উপাসনা-মন্দিরের মাংস, যারা অতলান্তিক পৌরগৃহের ধোঁয়াটে ছবির পোস্টকার্ডের ভূমিপথ এঁকে অনির্দিষ্ট দক্ষিণেশ্বরে নিরুদ্দেশ, অন্ধকারে সাজানো টিকিয়াপাড়ার ঘরের মধ্যে নেশা ভাঙবার পরে বরদাস্ত করেছে পূবদেশের ঘাম আফরিকার হাড়ব্যথা চিনের মস্তিষ্কপ্রদাহ, যারা কোথায় যেতে হবে কুলকিনারা না পেয়ে রেল-স্টেশানে ঘুরে বেড়িয়েছে মাঝরাতে, তারপর চলে গিয়েছে, ভাঙা হৃদয় ফেলে যায়নি, যারা দাদু-প্রাচীন রাতে জুড়িগাড়ি জুড়িগাড়ি জুড়িগাড়িতে বসে সিগারেট ধরিয়ে বর্ষাকাল ফুঁড়ে এগিয়েছে নির্জন খামারবাড়ির দিকে, যারা পড়েছে কুণ্ডলী-জাগানো গুপ্তমন্ত্র কারণ আসানসোল শহরে তাদের পায়ের কাছে সহজাত ধারণায় স্পন্দিত হয়েছে মহাজগত, যারা অলৌকিক সুন্দরবনের বনবিবির দেবদূতদের খোঁজে একা-একা  টহল দিয়েছে উত্তরপাড়া শহরের অলিগলি তারা নিজেরা সত্যিই অলৌকিক দেবদূত ছিল, যারা নিজেদের মনে করেছে উন্মাদ যখন অতিপ্রাকৃত উচ্ছ্বাসে আভাউজ্জ্বল হয়ে উঠেছে মালদহ শহর, যারা শীত-মাঝরাত-পথ আলোব ছোটোশহর-বৃষ্টির প্রেরণায় চিনাপাড়ার চিনামজুরের সঙ্গে আচ্ছাদিত বিলাসগাড়িতে, যারা গানবাজনা বা সঙ্গম বা ঝোল-তরকারির ধান্দায়  ক্ষুধার্ত ও একা ঘুরে মরেছে, আর বেস্পতি ও অনন্তের বিষয়ে আলোচনার জন্যে পিছু নিয়েছে মেধাবী যাদবপুরিয়াদের, অসাধ্য কাজ, তাই জাহাজে পাড়ি দিয়েছে আন্দামানে, যারা মরিচঝাঁপির বৈঠকখানায় তাত পোয়াবার আগুনে কবিতার লাভা ও ছাই ছড়িয়ে রাজাবাজারের আগ্নেয়গিরিতে উবে গেছে  আর পোশাকের ছায়া ছাড়া তারা কিছুই ফেলে যায়নি, যারা তারপর আবার ফিরে এসেছে চামড়ার রঙ ঝলসিয়ে ডাগর শান্তিকামী চোখে দাড়ি আর হাফপ্যান্টে পশ্চিম উপকূলে লালবাজার তদন্ত করে দুর্বোধ্য ফালিকাগজ বিলোতে বিলোতে, যারা পুঁজিবাদের মাদক তামাক-অস্পষ্টতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে নিজেদের বাহুতে সিগারেট-আগুনের ছ্যাঁদা করেছে, যারা জামা-কাপড় ছেড়ে ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে কলেজ স্কোয়ারে বিলিয়েছে অতিসাম্যবাদী পুস্তিকা যখন বন্ধ চটকলের সাইরেনের বিলাপ তাদের দমিয়ে দিয়েছে, বিলাপ দমিয়েছে শেয়ারবাজার, আর দামোদরের ফেরিজাহাজও বিলাপ করেছে, যারা চুনকাম-জিমনাশিয়ামে অন্যের কংকালযন্ত্রের সামনে উলঙ্গ শিহরণে কাঁদতে-কাঁদতে ভেঙে পড়েছে, যারা কামড়ে ধরেছে গোয়েন্দাদের ঘাড় এবং আরণ্যক সমকামের রান্নাবান্না ও নেশাভাঙ ছাড়া অনড় কোনো অপরাধ না করার দরুন পুলিশের গাড়িতে চিৎকার করে উঠেছে আনন্দে, যারা গলিপথে হাঁটু গেড়ে আর্তনাদ করে উঠেছে আর ছাদের ওপর হিঁচড়ে নিয়ে যাবার সময় লিঙ্গ ও পাণ্ডুলিপির ইশারা উড়িয়েছে, যারা মোটরসাইকেলের সন্ত আরোহীদের পায়ুধর্ষণ করতে দিয়ে চিৎকার করেছে উল্লাসে, যারা উড়িয়েছে আর যাদের উড়িয়েছে সেই মানব-দেবদূতরা নাবিকরা অতলান্তিক ও শ্যামবাজারি ভালোবাসার আদর, যারা সকাল-সন্থ্যা অবাধে যাকে-তাকে বীর্য বিলিয়েছে গোলাপবাগানে পার্কের ঘাসের ওপরে আর কবরখানায়, যারা খিলখিলিয়ে হাসতে গিয়ে অবিরাম হেঁচকি তুলেছে আর যখন শ্বেতশুভ্র ল্যাংটো দেবদূতরা তলোয়ার বিদ্ধ করেছে তাদের তারা স্নানের ঘরের আবডালে কেঁদে ফেলেছে, যারা অদৃষ্টের তিন জ্বালাতনকারিনীর কাছে হারিয়েছে নিজেদের প্রেমবালকদের এক সেই বহুকামী টাকার একচোখো মাগি এক সেই একচোখো মাগি যে গর্ভের ভেতর থেকে চোখ মারে এবং সেই একচোখো মাগি যে নিজের পাছার ওপর বসে কিছুই করে না কেবল কারিগরের তাঁতের মেধাবী সোনালি ধাগা ছেঁড়ে, যারা সঙ্গমে ভাবাবিষ্ট ও অতৃপ্ত সঙ্গে এক বোতল বিয়ার এক প্রণয়ী এক প্যাকেট সিগারেট একটা মোমবাতি সুদ্ধ খাট থেকে মেঝেয় পড়েছে মেঝেতে গড়াতে-গড়াতে হলঘরে দেয়াল পর্যন্ত গিয়ে মূর্চ্ছা গিয়েছে পরম-যোনির কল্পনায় এবং ফিরে এসেছে চেতনার শেষ স্তরে, যারা গোধুলির কম্পমান হাজার নারীর চাউনিকে সুধা-মোহিনী করেছে আর ভোরবেলায় লাল চোখ নিয়ে জাগা সত্বেও সূর্যোদয়ের চাউনিকে সুধামোহন করার জন্য তৈরি হয়ে গোলবাড়ির দাওয়ায় দেখিয়েছে পাছার ঝলক আর ঝিলঝিলে উদোম, যারা ব্যাণ্ডেল শহর ছাড়িয়ে বেলেল্লাপনা করতে বেরিয়েছে,  কবিতার গোপন নায়ক, বোলপুরের অ্যাডোনিস ও শিশ্নমানব—- খাবার ঘরের ফাঁকা জায়গায় অসংখ্য মেয়ের সঙ্গে সঙ্গমের স্মৃতি-আনন্দ, সিনেমাঘরের পেঁচোয়-পাওয়া সারিতে, পাহাড়চুড়ায় গুহায় কিংবা চেনাজানা রাস্তায় ফাঁকা শায়াগোটানো শিড়িংগে চাকরানির সঙ্গে আর বিশেষ করে আত্নজ্ঞানবাদী পাকা খেলুড়েদের গোপন পেটরল-পাম্প, এমনকি শহরের অলিগলিতে, যারা বিশাল নোংরা সিনেমায় অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে, স্বপ্নের মধ্যে তুলে নিয়ে গিয়েছে তাদের, জেগে উঠেছে আচমকা বালিব্রিজের তলায়,  সামলেছে নিজেদের আর রাসবিহারি অ্যাভেনিউ-এর ধাবমান স্বপ্নের আতঙ্ক এবং শেষকালে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে চাকরি-খোঁজার দফতরে, যারা সারারাত ডিজেলমাখা জাহাজঘাটায় রক্তভর্তি জুতো পরে এই আশায় হেঁটেছে যে একদিন আফিম আর তাপবাষ্পে ঠাসা ঘর দরজা খুলে দেখবে একটি নদী, যারা চাঁদের যুদ্ধকালীন নীলাভ আলোকবন্যায় হাডসন বাসাবাড়ির কানায় মহান আত্মঘাতী নাটক করেছে আর নশ্বরতায় তাদের পরানো হবে জলপাইপাতার শিরোমুকুট, যারা খেয়েছে কল্পনার খাসির মাংস কিংবা হুগলি নদীর ঘোলাটে  কাঁকড়া হজম করেছে, যারা তাদের ঠেলাগাড়ির পেঁয়াজ আর ফালতু সঙ্গীত নিয়ে রাস্তার রোমান্সে কেঁদে ফেলেছে, যারা সেতুর তলায় অন্ধকারে তাদের বাক্যের ওপর বসে নিশ্বাস ফেলেছে, আর চিলেকোঠার আস্তানায় জেগে উঠেছে তারের বাদ্যযন্ত্র বেঁধে ফেলতে, যারা ব্রহ্মবিদ্যার কমলালেবু-ভরা যক্ষ্মা-আক্রান্ত আকাশের তলায় আগুনের মুকুট পরে সোনাগাছির ছয় তলায় বসে কেশেছে, যারা সারারাত মহিমান্বিত জাদু মন্ত্রোচ্চারণের জন্যে পাশ ফিরে উপুড় হয়ে আঁকিবুকি কেটেছে যা হলুদ ভোরবেলায় হয়ে উঠেছে মানেহীন বুকনির স্তবক, যারা বিশুদ্ধ উদ্ভিদ সাম্রাজ্যের স্বপ্নে রান্না করেছে পচা জন্তু-জানোয়ারের ফুসফুস হৃদয় ঠ্যাঙ লেজ অন্ড বৃক্ক, যারা মাংস-বোঝাই লরির তলায় ডিম খুঁজতে ঝাঁপিয়ে পড়েছে, যারা সময়ের বাইরে অনন্তকে ভোট দেবার জন্যে ছাদের আলসে থেকে হাতঘড়ি ছুঁড়ে ফেলেছে, তারপর দশ বছর ধরে প্রতিদিন তাদের মাথার ওপর পড়েছে টেবিল-ঘড়ির শব্দ, যারা পরপর তিনবার নিজের কব্জি কাটতে অসফল হয়েছে, ছেড়ে দিয়ে বাধ্য হয়েছে পুরানো মালপত্তরের দোকান খুলতে তারা ভেবেছে তারা বুড়িয়ে যাচ্ছে আর কেঁদেছে, যারা তাদের নিরীহ ফ্ল্যানেল-পোশাকে জ্যান্ত পুড়ে মরেছে শরৎ বোস অ্যাভিনিউ-এর সিসকনির্মিত পদ্য-বিস্ফোরণের মাঝে এবং ফ্যাশনের লৌহসেনানীর যুদ্ধ-কিড়মিড়ে এবং বিজ্ঞাপনপরিদের হুংকারের নাইট্রোগ্লিসারিনে এবং ক্ষতিকর বুদ্ধিমান সম্পাদকদের বিষবায়ুতে, কিংবা পিষে গেছে চরম সত্যের মাতাল ট্যাকসিগাড়ির তলায়, যারা ঝাঁপিয়ে পড়েছে হাওড়া ব্রিজ থেকে এসবই সত্যি আর কোথায় বিস্মৃত হারিয়ে গেছে হাড়কাটার অলিগলি আগুনবাড়ির ভুতুড়ে ধোঁয়ায় এমনকি এক গেলাস মাগনা বিয়ারও পায়নি, যারা বিষাদের জানালা খুলে গেয়ে উঠেছে, ভূগর্ভ জানালার বাইরে গিয়ে থুবড়ে পড়েছে, লাফিয়েছে নোংরায়, ঝাঁপিয়েছে বন্ধুদের ওপর, সারা রাস্তা কেঁদেছে, খালি পায়ে নেচেছে ভাঙা মদের গেলাসের ওপর মনকেমন-করা পূববাংলার ভাটিয়ালি সঙ্গীতের গ্রামোফোন রেকর্ড চুরমার হুইসকি শেষ করে রক্তাক্ত পায়খানায় কাতরেছে, কর্নকুহরে চাপা গোঙানি শুনেছে আর দৈত্যাকার বাষ্পরাশির গর্জন, যারা একে অন্যের আঘাতশাস্তি জেল-একাকীত্বে পিপাবন্দী হয়ে যাত্রা করেছে অতীতের রাজপথে কিংবা বরযাত্রী বাজনার পুনর্জন্মে, যারা অমরত্ব জানবার জন্যে আমার ভাবাবেশ ঘটছে কি না কিংবা তোমার ভাবাবেশ ঘটছে কি না কিংবা কারোর ভাবাবেশ ঘটছে কি না তার খোঁজে বাহাত্তর ঘন্টা মাঠবাদাড় চষে বেড়িয়েছে, যারা মাথাভাঙা অব্দি পাড়ি দিয়েছে, মরেছে কুচবিহারে,  ফিরে এসে ব্যর্থ অপেক্ষা করেছে, দেখেছে কোন্নগর আর ভেবেছে আর একলা ঘুরে বেড়িয়েছে কালীঘাটের রাস্তায় এবং শেষ পর্যন্ত সময়কে খুঁজতে বেরিয়ে পড়েছে আর এখন মেচেদা লোকাল তার নায়কদের অভাবে ফাঁকা, যারা ব্যর্থ মন্দির-ঘরে হাঁটু পেতে পরস্পরের মুক্তি আর আলো আর হৃদয়ের জন্যে প্রার্থনা করেছে, যতক্ষণ না ক্ষণকালের জন্যেও অন্তত আত্মার চুলের গোছা আলোকিত হয়ে উঠছে, যারা সোনালি মাথার অসম্ভব অপরাধীদের জন্যে মগজ চিরে অপেক্ষা করেছে জেলখানায় আর তাদের হৃদয়ে বাস্তবতার সৌন্দর্য আলিপুর জেলের লোকগান শোনায়,যারা একটা অভ্যাস গড়ে তুলতে গড়িয়ায় অবসর নিয়েছে, কিংবা বুদ্ধকে ভক্তি জানাতে নাকতলায় কিংবা শিলিগুড়িতে বালকদের জন্যে কিংবা সাদার্ন অ্যাভেনিউতে কালো রেলগাড়ির জন্যে কিংবা প্রেসিডেন্সি থেকে উত্তরবঙ্গ থেকে বর্ধমান থেকে ঘাসফুল-শৃঙ্খলায় কিংবা কবরে, যারা বেতারযন্ত্রকে জাদুসন্মোহনে অভিযুক্ত করে প্রকৃতিস্হ বিচারের দাবি জানিয়েছিল তারপর পড়ে রইলো তাদের নিজেদেরই পাগলামি এবং দুই বাহুর ভেতরে একদল অনিশ্চিত জুরি, যারা যোগমায়াদেবী কলেজে ডাডাইজমের ক্লাসে আলুর স্যালাড ছুঁড়েছে তারপর ন্যাড়ামাথায় আত্ম্ত্যার নাটুকে বক্তৃতা দিয়ে দাঁড়িয়েছে গিয়ে পাগলাগারদের গ্র্যানিট সিঁড়িতে দাবি জানিয়েছে তাৎক্ষণিক রক্ত-পরীক্ষার, আর তার বদলে তারা পেয়েছে ইনসুলিন মেটরাসল ইলেকট্রিকশক হাইড্রোথেরাপি সাইকোথেরাপি পিংপং স্মৃতিবিলোপের পাষাণ-শুন্যতা, যারা কৌতুকহীন প্রতিবাদে একটাই পিংপং প্রতীক টেবিল উল্টে দিয়ে এখন ক্যাটালোনিয়ায় সংক্ষিপ্ত বিশ্রাম নিচ্ছে…

আত্মপরিচয় দেবার জন্য আরেকজন ফিনফিনে ফড়িঙচাঁদ বলতে থাকে, দেখলো সজনী চাঁদনি রজনী,  সমুজল যমুনা গাওত গান, কানন কানন করত সমীরণ,  কুসুমে কুসুমে চুম্বন দান। কাহ লো যমুনা জোছন-ঢল ঢল  সুহাস সুনীল বারি? আজু তোঁহারই উজল সলিল পর  নয়ন সলিল দিব ডারি। কাহ সমীরণ লুটই কুসুম-বন  অলসি পড়সি যমুনায়?’ তোঁহার চম্পক-বাসিত লহরে  মিশাব নিশাস-বায়।জনম গোঁয়ায়নু রোয়ত রোয়ত  হম তর কোই ত কাঁদল না! জনম গোঁয়ায়নু সাধত সাধত  হমকো কোইত সাধল না! সকল তয়াগনু যো ধন আশে  সো বি তয়াগল মোয় অপন ছোড়ি সব, অপন করনু যোয়  সো বি সজনি পর হোয়! যমুনে হাস হাস লো হরখে  হম তর রোয়বে কে? তোঁহারি সুহসিত নীল সলিল পরি  রাধা সঁপবে দে! এক দিবস যব মাধ হমারা  আসবে কিনার তোর,— যব সো পেখবে তোঁহার সলিলে  ভাসত তনুয়া মোর— তব্‌ কি শ্যাম সো মানস পাশে  তিল দুখ পাওবে না? শ্যামক নয়নে বিন্দু নয়ন জল  তবহুঁ কি আওবে না? রয়নে কুঞ্জে আসবে যব সখি  শ্যাম হমারই আশে, ফুকারবে যব্‌ রাধা রাধা  মুরলি ঊরধ-শ্বাসে, যব সব গোপিনী আসবে ছূটই  যব হম আসব না; যব সব গোপিনী জাগবে চমকই  যব হম জগব না, তব কি কুঞ্জপথ হমারি আশে  হেরবে আকুল শ্যাম? বন বন ফেরই সো কি ফুকারবে  রাধা রাধা নাম? না যমুনা, সো এক শ্যাম মম  শ্যামক শত শত নারী; হম যব যাওব শত শত রাধা  চরণে রহবে তারি! তব সখি যমুনে, যাই নিকুঞ্জে,  কাহ তয়াগব দে? অভাগীর তর বৃন্দাবনমে  কহ সখি, রোয়ব কে! ভানু কহে চুপি ‘মান ভরে রহ  আও বনে ব্রজ-নারী, মিলবে শ্যামক শত শত আদর  শত শত লোচন বারি।

ওনাদের কথা সবাই বুঝতে না পারলেও লোকটা বোঝে আর  মাথা ঝুঁকিয়ে গাইতে আর নাচতে থাকে —

বুল্লা আমি জানি না আমি কে

বুল্লা আমি জানি না আমি কে

আমি মসজিদে বিশ্বাস করি না

আমি কাফেরদের রীতিতে বিশ্বাস করি না

আমি শুদ্ধ নই অশুদ্ধও নই

আমি বেদ বা বইতে নেই

আমি ভাঙ আর মদে নেই

আমি হারিয়ে যাইনি অসৎ হইনি

আমি বন্ধনে নেই দুঃখে নেই

আমি বিশুদ্ধে পালিত নই

আমি জলের নই মাটির নই

আমি আগুন নই  বাতাসও নই

বুল্লা আমি জানি না আমি কে

আমি আরবের নই লাহোরের নই

আমি হিন্দিভাষী নাগোর শহরের নই 

আমি হিন্দু নই পেশোয়ারি তুর্কি নই

আমি ধর্মের বিভেদ গড়ে তুলিনি

আমি আদম-ইভ গড়ে তুলিনি

আমি নিজের কোনো নাম দিইনি

আদি বা অন্ত আমি কেবল নিজেকে জানি

আমি আরেকজন কাউকে চিনি না

আমার চেয়ে জ্ঞানী কেউ নেই

এই বুল্লে শাহ লোকটা কে 

বুল্লা আমি জানি না আমি কে

বুল্লা আমি জানি না আমি কে

আমি মোজেস নই ফ্যারাওও নই

আমি আগুন নই বাতাসও নই

আমি অশিক্ষিতদের মাঝে থাকি না

কে এই বুল্লে শাহ, দাঁড়িয়ে রয়েছে ?

বুল্লা আমি জানি না আমি কে

বুল্লা আমি জানি না আমি কে

ফড়িঙচাঁদরা  সামনেও যেমন উড়তে পারে, তেমনি পেছনের দিকেও উড়তে পারে । জোরে-জোরে বা ধীরে, ঠিক সোজা উপরে বা নিচের দিকে ওড়ার দারুণ টেকনিক রয়েছে এদের। তাছাড়া, সামনে-পেছনে না এগিয়ে বাতাসে এমনি ভেসে থাকার দারুণ দক্ষতার ফড়িঙদের  রয়েছে চারটে পাখনা । প্রতিটি পাখনা  স্বাধীনভাবে চালনা করতে পারে ফড়িঙচাঁদরা আর একটা অক্ষ বরাবর সামনে-পেছনে ঘোরাতেও পারে এগুলো। প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৩০ মাইল দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে ফড়িঙচাঁদেরা ।  অসাধারণ দৃষ্টিশক্তি ও উড়তে পারার দক্ষতার দরুণ শিকার ধরতে ও আগের জায়গায় ফিরে আসতে একটা ফড়িঙের মাত্র ১-১.৫ সেকেন্ড সময় লাগে।

—আপনি জানেন না আপনি কে আর সেটা নেচে-গেয়ে বোঝাতে চাইছেন ?

—আমি তো বলছি আমি বুল্লা, অনেকে আমাকে বলে হাছন রাজা ।

—আর লালন সাঁই লোকটা কে ?

—আমিই তো লালন সাঁই, অনেকে বলে আমি শাহবাজ কলন্দর, আমি ভানু শাহ !

—সবই আপনি ? অদ্ভুত !

—অদ্ভুতের কিছু নেই । আমার কিছুই চাই না । কেউ কেউ আবার আমাকে বলে জালালুদ্দিন রুমি ।দাঁড়াও তোমাদের বোঝাই । গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র হলো এমন একটি অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক মতাদর্শ যেখানে বলা হয়: সমাজ ও অর্থনীতি গণতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত হলেও, তাদের কাছে অগ্রাধিকার পাবে সামষ্টিকভাবে জনগণের চাহিদা মেটানো, পুঁজিবাদের ন্যায় ব্যক্তি ব্যক্তিবিশেষের উন্নতি নয়। গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রীরা চান সমাজের পুঁজিবাদ থেকে সমাজতন্ত্রে রূপান্তর যেন মৌলিক মার্কবাদীদের বলা বিপ্লবের পরিবর্তে বিদ্যমান অংশগ্রহণমূলক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায়ই সম্পন্ন হয়। এ ধরনের দর্শন একাধারে যেমন বৈশ্বিকভাবে স্বীকৃত চাহিদাগুলো যেমন আবাসন, পরিবহণ, স্বাস্থ্যসেবা প্রভৃতির সরকারি নিয়ন্ত্রণকে সমর্থন করে, ঠিক তেমনই ভোগ্যপণ্যসমূহের সরবরাহ পুঁজিবাদী মুক্তিবাজার অর্থনীতির মাধ্যমে হওয়াকেই শ্রেয় বলে মনে করে।

লোকটা আবার নাচতে নাচতে গাইতে থাকে ।

কিছু প্রজাতির ফড়িঙ তার এলাকায় অন্য ফড়িঙের প্রবেশ একেবারেই পছন্দ করে না। কোনো ফড়িঙ এই অনধিকার চর্চা করলে, তার বিরুদ্ধে ঐ এলাকার পুরুষ ফড়িং একরকম যুদ্ধ ঘোষণা করে। স্কিমার, ক্লাবটেইলস এবং পেটটেইলস ফড়িঙ ডিম পাড়ার জন্য পুকুরের আশেপাশের জায়গা বেছে নেয়। এই সময় অন্য কোনো ফড়িঙ যদি সেই অঞ্চলে প্রবেশ করে, তাহলে দায়িত্বে থাকা পুরুষ ফড়িঙ তাকে তাড়া করে ভাগিয়ে দিবে। অন্যান্য কিছু প্রজাতি যদিও নিজের সুনির্দিষ্ট অঞ্চল নিয়ে মাথা ঘামায় না, তবুও ওড়ার পথে অন্য পুরুষ ফড়িঙ পথ মাড়িয়ে গেলে, তাদের প্রতি আগ্রাসী আচরণ করে । তাছাড়া, কিছু পুরুষ ফড়িঙ অবশ্য পছন্দের মেয়ে ফড়িঙের জন্য প্রতিপক্ষের সাথে খেয়োখেয়ি করে।

লোকটা বলল, পারস্যে জালালুদ্দীন রুমি, হাফেজ, জামী, পশ্চিম ভারতে কবীর, দাদু, মীরাবাই, রজ্জব প্রমুখ সাধকদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে শ্রীচৈতন্য, নিত্যানন্দ, রূপ, সনাতন, চণ্ডীদাস, গোবিন্দ দাস, ফরিদপুরের ওড়াকান্দির হরিঠাকুরের দল, পাবনা জেলার ঠাকুর শম্ভুচান্দের সম্প্রদায় প্রমুখ কবি ও মহাপুরুষরা ভাববিলাসকে যে দার্শনিক মতবাদের উপর দাঁড় করেছিলেন, ফড়িঙপন্থী সাধকেরা তা করেননি। ফড়িঙ গানের বিধি বা ধাপগুলো এখনও একইভাবে অনুসরণ করা হয় এমনটা বলা যাবে না।  আগে যে ফড়িঙগান শোনা যেত তার অস্তিস্ত্ব আর নেই বলা চলে। এখন দুই ফড়িঙ-সাধকরা নিজেদের মতো করে নিভৃতে সাধনা চালিয়ে যান, অনেকক্ষেত্রেই তাদের রীতিনীতি আলাদা।

বলে, লোকটা গাইতে লাগল—

আমি কি বলিনি তোমায়—

ছেড়ে যেও না আমায় কখনো,

একমাত্র বন্ধু তো কেবল আমিই—

আমিই চিরবসন্ত জীবনের…

শত-সহস্র বছরও যদি আমাকে ঢেলে

দূরে থাকো তুমি ক্রুদ্ধ রিদয়ে,

তবুও ফিরবে তুমি, ফিরে আসতেই হবে তোমায়—

ক্যানোনা আমিই তোমার গন্তব্য, আমিই তোমার শেষ…

আমি কি বলিনি তোমায়—

মোহে পরো না রঙিন পৃথিবীর,

যেহেতু আমিই সবার সেরা— চিত্রশিল্পী সর্বশ্রেষ্ঠ!

আমি কি বলিনি তোমায়—

তুমি মাছ— যেও না কখনো ঐ শুষ্কভূমিতে

যেহেতু সবচেয়ে গভীর— আমিই সমুদ্র— তোমার জন্য যথেষ্ট!

আমি কি বলিনি তোমায়—

ঝালে আটকে পোরো না পাখিদের মতো

কেনোনা আমিই তোমার ডানা— আলোর শক্তি সঞ্চালক…

আমি কি বলিনি তোমায়—

ওদেরকে ব্যর্থ করো তোমাকে বরফে পরিণত করতে,

যেহেতু, আমিই আলোর শিখা, তোমার যথেষ্ঠতম উষ্ণতা

আমি কি বলিনি তোমায়—

ওরা দূষিত করবে তোমাকে এবং বাধ্য করবে ভুলে যেতে,

আর জেনো— আমিই বসন্ত সর্বগুণের…

আমি কি বলিনি তোমায়—

প্রশ্ন করো না আমার প্রক্রিয়া নিয়ে

কারণ, সবকিছুই নির্দেশিত এবং আমিই এর স্রষ্টা…

আমি কি বলিনি তোমায়—

তোমার রিদয় তোমাকে গৃহে ফিরিয়ে নেবে

কারন সে জানে, আমিই তার প্রভু!

অন্য অনেক প্রাণীর মতো, কিছু ফড়িঙ প্রয়োজনের তাগিদে বা আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে নিজেদের সাধারণ এলাকা ছেড়ে পাড়ি জমায় অনুকূল পরিবেশে। কিছু প্রজাতি দল বেঁধে, আবার কিছু প্রজাতি একা শুরু করে এই যাত্রা। উত্তর আমেরিকার গ্রিন ডার্নার্স নামের ফড়িং শীতকালে অপেক্ষাকৃত উষ্ণ পরিবেশের দিকে চলে যায় এবং বসন্তকালে আবার ফিরে আসে নিজের চিরচেনা ভুবনে। বংশবৃদ্ধির জন্য গ্লোব স্কিমার ফড়িং খুঁজে বেড়ায় অস্থায়ী জলাধার, তাই প্রজননের জন্য এরা অনুসরণ করে বৃষ্টিস্নাত এলাকা। এমনকি ভারত ও আফ্রিকার মধ্যবর্তী রেকর্ড ১১,০০০ মাইল দূরত্ব ভ্রমণের রেকর্ড রয়েছে এই গ্লোব স্কিমারদের। কিছু ফড়িঙ সামনে-পেছনে উড়ে বাতাসে ভেসে বেড়ায়, আবার কিছু কোনো কিছুর অবলম্বন করে চুপটি মেরে বসে থাকে। শরীর উষ্ণ রাখতে পাখা দ্রুত চালনা করে তাপ উৎপন্ন করে ফড়িঙ । বসে থেকে অলস সময় কাটাতে পছন্দ করা ফড়িঙ অবশ্য শরীর উষ্ণ রাখতে ব্যবহার করে সূর্যের আলো। পর্যাপ্ত আলো পেতে যথাযথ অবস্থান নিতে এদের জুড়ি নেই। অতিরিক্ত গরমের সময় কিছু ফড়িঙ আবার তাদের পাখা ব্যবহার করে অত্যধিক সূর্যের আলো প্রতিফলিত করতে এবং যেখানে সূর্যের আলো কম সেখানে ডেরা নেয়।

—শাহবাজ কালান্দর আপনি ?

—হ্যাঁ ।

—নাচতে নাচতে গাইবেন ?

—হ্যাঁ । এই দ্যাখো ।

ও হো

হো হো হো

হো লাল মেরী পত

রখিয়ো বলা ঝূলে লালণ

সিংদড়ী দা সেবণ দা

সখী শাহবাজ কলন্দর

দমাদম মস্ত কলন্দর

অলী দম দম দে অন্দর

দমাদম মস্ত কলন্দর

অলী দা পৈলা নম্বর

হো লাল মেরী

চার চরাগ তেরে বরণ হমেশা

পংজবা ম্যায়ঁ বারণ আই বলা ঝূলে লালণ

হো পংজবা ম্যায়ঁ বারণ

আই বলা ঝূলে লালণ

সিংদড়ী দা সেবণ দা

সখী শাহ বাজ কলন্দর

দমাদম মস্ত কলন্দর

অলী দম দম দে অন্দর

দমাদম মস্ত কলন্দর

অলী দা পৈলা নম্বর

হো লাল মেরী

হিংদ সিংদ পীরা তেরী নৌবত বাজে

নাল বজে ঘড়িয়াল বলা ঝূলে লালণ

হো নাল বজে

ঘড়িয়াল বলা ঝূলে লালণ

সিংদড়ী দা সেবণ দা

সখী শাহ বাজ কলন্দর

দমাদম মস্ত কলন্দর

অলী দম দম দে অন্দর

দমাদম মস্ত কলন্দর

অলী দা পৈলা নম্বর

হো লাল মেরী

ও হো হো হো হো হো হো হো হো হো

হর দম পীরা তেরী খৈর হোবে

নাম-এ-অলী বেড়া

পার লগা ঝূলে লালণ

হো নাম-এ-অলী

বেড়া পার লগা ঝূলে লালণ

সিংদড়ী দা সেবণ দা

সখী শাহ বাজ কলন্দর

দমাদম মস্ত কলন্দর

অলী দম দম দে অন্দর

দমাদম মস্ত কলন্দর

অলী দা পৈলা নম্বর

হো লাল মেরী পত

রখিয়ো বলা ঝূলে লালণ

সিংদড়ী দা সেবণ দা

সখী শাহ বাজ কলন্দর

দমাদম মস্ত কলন্দর

অলী দম দম দে অন্দর

দমাদম মস্ত কলন্দর

অলী দা পৈলা নম্বর

দমাদম মস্ত কলন্দর

অলী দা পৈলা নম্বর

দমাদম মস্ত কলন্দর

অলী দা পৈলা নম্বর

দমাদম মস্ত কলন্দর

অলী দা পৈলা নম্বর

দমাদম মস্ত কলন্দর

অলী দা পৈলা নম্বর।

—আমিই ভানু শাহ ! 

—গাইবেন ?

—হ্যাঁ । গাইছি তো, নাচছিও, এই দ্যাখো ।

‘এক রোজ বসে আছি নৌকার উপর

পানির মধ্যে দেখিলাম করিয়া নজর

হায়-রে, পানির উপর দেখিলাম করিয়া নজর।

মুর্দা মানুষ ভাসে এক মাঝ দরিয়ায়

উপরে বসিয়া কাক চক্ষু তার খায়

দেখিয়া আফসোস হইল দিলের ভিতর

কাঁন্দিয়া কইলাম তন-রে কি অইবে তোর।

কোথা রইলা মাতা-পিতা ভাই বন্ধুগণ

কোথায় রইল ঘর বাড়ি অঙ্গের বসন

স্ত্রী-পুত্র ছাড়াইয়া কে ভাসাইল তরে

মাছ-মাছলী টাইন্যা খায় পানির উপরে।

উড়ে যাবে পাখি কোন সূদুরের পারে

শমন এলে পরে মায়ার বাঁধন যাবে ছিঁড়ে

মায়ার বাঁধন যাবে ছিঁড়ে।

লোভ লালসার খাঁচা ভেঙে

পালায় যখন পাখি,

মুক্ত আকাশ পেয়ে তখন

দেবে তোরে ফাঁকিরে মন

দেবে তোরে ফাঁকি

যেভাবেতেই ফাঁদ পাতোনা

ধরা দেবেনা রে

উড়ে যাবে পাখি কোন সূদুরের পারে

শমন এলে পরে মায়ার বাঁধন যাবে ছিঁড়ে

মায়ার বাঁধন যাবে ছিঁড়ে।

পোষা পাখি উড়ে গেলে

খাঁচা পুড়ে ফেলে,

ছাই করিয়ে নাভিকুণ্ড

ফেলবে গাঙের জলে রে মন

ফেলবে গাঙের জলে

স্মৃতিটুকু তলিয়ে যাবে

কেউ পাবেনা তারে

উড়ে যাবে পাখি কোন সূদুরের পারে

শমন এলে পরে মায়ার বাঁধন যাবে ছিঁড়ে

মায়ার বাঁধন যাবে ছিঁড়ে।

দান ধ্যান কার্য শান্তি

সময়মত হবে

একে একে মাস কাটবে

সবাই ভুলে যাবে রে মন

সবাই ভুলে যাবে

দান ধ্যান শ্রাদ্ধ শান্তি

সময়মত হবে

একে একে মাস কাটবে

সবাই ভুলে যাবে রে মন

সবাই ভুলে যাবে

পাষাণ বুকে পুত্র-কন্যা

কাঁদবে অতীত করে

উড়ে যাবে পাখি কোন সূদুরের পারে

শমন এলে পরে মায়ার বাঁধন যাবে ছিঁড়ে

মায়ার বাঁধন যাবে ছিঁড়ে

মায়ার বাঁধন যাবে ছিঁড়ে

ফড়িঙচাঁদের দল তাকে ঘিরে ঘিরে উড়তে লাগলেন আর বেস্পতির চারিপাশে পাক খেতে লাগলেন । তাঁরা পাক খেয়েই চলেছেন । আবার ইতিহাস আরম্ভ হলে তাঁদের গল্প বলব । এখন ওনারা বরং পাক খেতে থাকুন । ততোদিনে হয়তো নিষ্পত্তি হয়ে যাবে যে ‘চাই’ ভালো নাকি ‘চাই না’ ভালো ।

About anubadak

আমি একজন অনুবাদক । এতাবৎ রেঁবো, বদল্যার, ককতো, জারা, সঁদরা, দালি, গিন্সবার্গ, লোরকা, ম্যানদেলস্টাম, আখমাতোভা, মায়াকভস্কি, নেরুদা, ফেরলিংঘেট্টি প্রমুখ অনুবাদ করেছি ।
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s