আমি হাবশি বেতাল : ম্যাজিশিয়ান মলয় রায়চৌধুরী

কবি মনোহর দাস (ষোড়শ/ সপ্তদশ খ্রিষ্টাব্দ): 

‘নানা শাস্ত্র নানা ধর্ম আছয়ে সংসারে

মোর শক্তি নাহি হয় এসব আচারে।

আমি কোন ছার ধর্ম আচরণ করি

থাকুক ধর্মের দায় মর্ম বুঝিতে নারি।

ধর্ম যারে বলে তিনি ব্রহ্মাণ্ড বেড়িয়া

স্থাবর জঙ্গম আদি দেখ বিচরিয়া।

হৃদয়ে উদয় যেই সেই কার্য সার

তাহা বিন অন্য ধর্মকর্ম কিবা সার।’

         রাজা বিক্রমাদিত্যের কাঁধ থেকে অবসর নেবার পর বটগাছে টঙে বসে আছি ; আমি হাবশি বেতাল, ঈশ্বরচন্দ্রের দেয়া  চেয়ার-টেবিল  শেকড় দিয়ে বেঁধে, পৌরাণিক যুগ থেকে, কলি দ্বাপর ত্রেতা সত্য যুগের আগে থেকে । আমার কাজ লেখা । স্হান-কাল-পাত্র বুঝি না,   গুলিয়ে ফেলি । আমি, যে কিনা হাবশি বেতাল, লেখা যে কোনদিকে এগোয় আর পেছোয় তা  নিজেই জানি না । যা  শুনি তা কবে লিখব তার ঠিক-ঠিকানা নেই, মনে পড়লে লিখি, দুশো বছর আগের কথা কাল হয়তো মনে পড়েছিল, এক হাজার বছর আগের কথা হয়তো এখন মনে পড়ল ।  ন্যারেটিভ লণ্ডভণ্ড ।  কলম কাগজ দেখতে পাই না অথচ লিখতে থাকি নিজের মনে, লিখি আর উড়িয়ে দিই ।

          গাছের তলায় একজন সিদ্দি আর তার মগ বেগমের সমাধি, তারা বাইরের জগতটা দেখতে পায়, শুনতে পায়, নিজেরাও কথা বলে, যারা সমাধি দেখতে আসে তাদের সঙ্গেও কথা বলে।অথচ সমাধির মধ্যে তারা নেই ; তাদের কবর অন্য কোথাও, খুঁজে পাওয়া যায়নি ; তারা হয়তো মিথ্যা, বানানো, অস্তিত্বহীন।

         এক পর্যটক জুটি কাল রাতে সমাধির ওপরে শুয়ে বেশ কয়েকবার সঙ্গম করেছিল, রাতভর।

         সকালে সমাধি বলছিল, তোমরা দুজন হনিমুন করতে বেরিয়েছ তো ? কাল রাতে তোমাদের ভালোবাসাবাসির আওয়াজ শুনেছি, পরিচিত শ্বাস-প্রশ্বাস আর শব্দ ; অনেকে জুটিতে মিলে হনিমুন করতে এসে রাতটা কাটিয়ে যায় এই সবুজ অঞ্চলে, খোলা আকাশের তলায়, পূর্ণিমার আলোয়, শিশিরে ; তা চার-পাঁচ হাজারের বেশি জুটির সঙ্গমের আওয়াজ জমিয়ে রেখেছি, মাঝে-মধ্যে বাজিয়ে শুনি। তারা ক্লান্তিতে পাশাপাশি শুয়ে পড়লে  তাদের বলি  গল্প শোনাতে । তোমরা দুজনে শোনাও । ফিরবে তো কাল যখন পর্যটন কোম্পানির বাস  তোমাদের সঙ্গী পর্যটকদের নিয়ে নিতে আসবে । তোমরা ভালোবাসাবাসির জন্যে থেকে গেলে, বুঝেছি, তোমাদের সঙ্গীদের হাসাহাসি আর মন্তব্য থেকে । আমাদের কালে এরকম ভালোবাসাবাসি ছিল না ;  সম্রাটদের ছিল জেনানা, আর তাতে বিয়ে করে আনা বউ, বাঁদি, রক্ষিতা, ক্রীতদাসী, লুট-করে আনা অন্য ধর্মের আর ভাষার যুবতী, সম্রাটের ঘরে পৌঁছে দেবার খোজারা ছিল । রাজা-বাদশাদের সঙ্গে শোবার আর শোয়াবার জন্য এতো যুবতী জোগাড় হতে লাগলো যে হারেমপ্রথা শুরু করা জরুরি হয়ে উঠলো।         

          কয়েকশো বছরের পুরোনো সমাধির দিকে তাকিয়ে যুবক বলল, আপনি ঠিকই বলেছেন, হারেমের গল্প অনেক শুনেছি ।

          যুবতী বলল, আচ্ছা, আগেকার কালে তো লাভ জেহাদ ছিল না ; ভিন ধর্মের বউরা হারেমে থেকেও তাদের ধর্ম বজায় রাখত  । এখন ভিন ধর্মে প্রেম বা বিয়ে করলে লোকে লাভ জেহাদ বলে কেন ? ধরে দুজনকেই কচুকাটা করে !

          ঘোড়া ছুটিয়ে একজন ন্যাড়া-মাথা লম্বা টিকি লোক যাচ্ছিল, যুবতীর কথা শুনতে পেয়ে বলল, ওটা তোমাদের কালের ব্যারাম । আমি বাজিরাও পেশওয়া, আমি তো মাসতানি নামে একজন ভিনধর্মীর সঙ্গে লিভ-ইন করতুম, মাসাতানির ছেলে হলে, তার নাম রাখলুম শামশের বাহাদুর, শামশেরের ছেলের নাম রাখলুম আলি বাহাদুর । আমার হিন্দু বউ কাশিবাঈয়ের ছেলেদের নাম রাখলুম নানাসাহেব আর রঘুনাথ রাও । তরোয়াল ঘোরাতে ঘোরাতে  বাজিরাও পেশওয়া বলল, দাঁড়াও একটু পরে ফিরে আসছি । 

          যুবক বলল, তাহলে সুমন চট্টোপাধ্যায় কেন কবীর সুমন হলেন ?

          যুবতী বলল, নার্গিস বিয়ে করেছিলেন সুনীল দত্তকে । নার্গিসকে গোর দেয়া হলো আর সুনীল দত্তকে দাহ করা হলো ! তাদের মেয়েরা হিন্দু আর খ্রিস্টান বিয়ে করল । ছিলে একবার বিয়ে করল হিন্দু মেয়েকে ; সে মারা গেলে বিয়ে করল মুসলমান মেয়েকে । সেই মুসলমান মেয়ে বাড়িতে হিন্দু দেবদেবীর পুজো করে । আমাদের দেশে তো আজকাল বাঙালির পোশাক ছেড়ে লোকে গেরুয়া বা সবুজ আলখাল্লা পরছে , সবজান্তার বক্তিমে ঝাড়ছে।

         যুবক বলল, আজকাল প্রেমে পড়া বেশ বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়িয়েছে ! মাণ্ডোয়া গিয়েছিলুম । সেখানে শুনে এলুম বাজ বাহাদুর আর রূপমতীর প্রেমের ঘটনা । তখন তো কেউ লাভ জিহাদের জিগির তোলেনি । রূপমতীকে ধর্ম পালটাতেও বলেনি বাজ বাহাদুর ।       

          সমাধি বলল,  ওই যে দেখছো, ওটা বেহুলা লক্ষিন্দরের বাসর ঘর । বগুড়া শহর থেকে দশ কিলোমিটার উত্তরে, মহাস্থান গড় থেকে দু কিলোমিটার দক্ষিণে ওটা গোকুল গ্রাম  ।  এটা বেহুলার বাসর ঘর নামে পরিচিত। অনেকে একে লক্ষ্মীন্দরের মেধ বলে । এ মন্দিরে  ষাঁড়ের প্রতিকৃতি খোদাই করা সোনার পাত পাওয়া গেছে। স্তূপটা বাসরঘর নয়।  স্তূপের পশ্চিমে আছে বাসরঘরের  স্মৃতিচিহ্ন। লখিন্দরের বাবা চাঁদ সওদাগর ছিলেন   শিবঠাকুরের ভক্ত। উনি অন্য কোন দেবতার আরাধনা করতেন না। অথচ শিবের মেয়ে মনসা ছিলেন সাপের দেবী। তার বাবা শিব তাকে বলেছিল, যদি কোন শিবের উপাসক প্রথমে তোর পুজো করে তাহলে মর্ত্যে তোর পুজো শুরু হবে । তখন মনসা চাঁদ সওদাগরকে বাছাই করে তাকে মনসা পুজো করতে বলে। কিন্তু চাঁদ সওদাগর তাতে রাজি হলো না। তখন  মনসা তাকে শাপ দেন- চাঁদ সওদাগরের প্রত্যেক ছেলে সাপের কামড়ে মারা যাবে। মনসার অভিশাপে এইভাবে একে একে লখিন্দর ছাড়া চাঁদ সওদাগরের সব ছেলেই সাপের ছোবলে মারা যায়। তাই লখিন্দরের বিয়ের সময় তার বাবা এমন বাসর ঘর তৈরি করেন যা সাপের পক্ষে ছেঁদা  করা সম্ভব নয়। তবু তাকে সাপে কামড়ায় । তার শব  ভেলায় করে নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হয়। বেহুলা সকলের নিষেধ অমান্য করে  মৃত স্বামীর সাথে ভেলায় চড়ে বসে। তারা ছয় মাস ধরে যাত্রা করে এবং গ্রামের পর গ্রাম পাড়ি দিতে থাকে। এই অবস্থায় মৃতদেহ পচে যেতে শুরু করে ।  বেহুলা তার শ্বশুরকে মনসার পূজা করাতে রাজি হলে লখিন্দরের প্রাণ ফিরে পায়। আসল কথা হলো, হারেমগুলো ছিল লখিন্দরের লোহার ঘরের মতন । তোমরা হয়তো জানতে চাইবে বগুড়া এখানে, এই দাক্ষিণাত্যে, কেমন করে এলো । ওই যে গাছে বসে আছেন হাবশি বেতাল, উনি স্হান-কাল-পাত্র এখানে আনতে পারেন, যখন যেদিন ইচ্ছা ।

          যুবতী বলল, আমি শোনাচ্ছি আপনাকে, দুজনে ভুত-পেত্নির অপচ্ছায়া হয়ে শুয়ে আছেন ঝড়-বৃষ্টি-রোদের মাঝে, ক্ষয়ে গেছে, ঝুরঝুরে হয়ে গেছে আপনাদের সমাধি ; আর্কিওলজির কোনো বোর্ডও নেই যে জানতে পারবো, আপনারা কারা ! ভাগ্যিস বললেন যে আপনারা দুজনে শুয়ে আছেন এই সমাধির ভেতরে ।

          সমাধির  পুরুষ  বলল, হ্যাঁ, বলব তোমাদের আমি কে, তার আগে তোমরা তোমাদের গল্প বলো, শুনি ।

          যুবক বলল, আজ্ঞে আমি নাস্তিক । আমিই লখিন্দর । আমিই রোমিও । আমিই শাহজাহান । আমি সত্যবান । আমি উত্তমকুমার । 

          যুবতী বলল, আমি নব্যনাস্তিক । আমিই বেহুলা । আমিই জুলিয়েট । আমিই মুমতাজ । আমি সাবিত্রী । আমি সুচিত্রা সেন । 

          বাদবাকি পর্যটকদের নিয়ে ফিরে যাবার বাসগুলো এসে পড়েছিল । কিন্তু সমাধির ভেতরের দুজন মানুষ কথা বলে, গল্প শোনায়, আর শুনতে চায়, জানতে পেরে, তারাও থেকে যেতে চাইল । জীবনের ল্যাঙলাথি খেয়ে, সকলেরই তো গল্প আছে, নিজেকে হালকা করার জন্যে, জ্ঞান বিলোবার জন্য । বাস থেকে নামল আমির, ওমরাহ, রাজা, বাদশা, নবাব, সম্রাট, লুটেরা, বর্গি, হারেমের খোজা, মস্তান, গাইয়ে, বাজিয়ে, নাচিয়ে, কবি, লেখক, সম্পাদক, গুণ্ডা, নেতা, চাকর, চাকরানি,পার্টি-সদস্য, আর চাকুরিহীন ছেলে-মেয়ে । তারা সবাই  ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, বার্সেলোনা, রিয়াল মাদ্রিদ,বায়ার্ন মিউনিখ, ম্যানচেস্টার সিটি, আর্সেনাল, চেলসি, লিভারপুল,  জুভেন্টাস, টটেনহাম হটস্পার,  এভারটন, নেপোলি, সাউদাম্পটন, ওয়েষ্টে হ্যাম, শালকে, ইন্টার মিলান, লেস্টার সিটি, অ্যাথলেটিকো মাদ্রিদ, ব্রুশিয়া ডর্টমুন্ড,, পিএসজি,  ম্যানচেস্টার সিটি,  বার্সেলোনা, টটেনহ্যাম হট্সপার, মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল, মোহামেডান স্পোর্টিং  ফুটবল দলের দশ নম্বর জার্সি পরে আছে । তারা এসেছে অঙ্গ,  মগধ ,  কাশী,  কোশল,  বৃজি বা বজ্জি, মল্ল,   চেদি , বৎস,  কুরু, পাঞ্চাল, মৎস্য,  সুরসেন,  অস্মক,  অবন্তী,  গান্ধার আর কম্বােজ দেশ থেকে ।

             বাস থেকে নামবার সময় ফর্সা পর্যটক যুবতী গাইতে আরম্ভ করেছিল, ‘ইয়ে দুনিয়া পিত্তল দি…’

             সমাধির বেগম বলল, ম্যাডাম, ল্যাঙটো নাচবেন না, দশ নম্বর বডিস আর জাঙিয়া পরে নিন, নয়তো বেতাল আপনাকে ল্যাঙড়া তৈমুরের হারেমে পাঠিয়ে দিতে পারে ।

             সমাধির  পুরুষ  বলল, তোমরা সবাই আমার সমাধি ঘিরে বোসো, গাছের ছায়ায়, তোমাদের আমি হারেমের গল্প শোনাই ; আমি তো হারেমের যুগেই জন্মেছিলুম, তাই ব্যাপারটা জানি, যদিও আমার হারেম-টারেম ছিল না ; আমার অতো সময় ছিল না রোজ একজন আধচেনা মেয়ের সঙ্গে শোবার । আমি ছিলুম যোদ্ধা । সম্রাটরা অবশ্য দিনেরাতে কুড়ি-পঁচিশবার শট মারতো ।তোমরা যখন নিজের গল্প শোনাবে তখন নামটা জানিও, মনে রাখব ।

          বাসচালক : নিশ্চয়ই স্যার ।

          সমাধি : স্যার বোলো না। সমাধিদাদা বলতে পারো বা সিদ্দিদা বলতে পারো, স্যার শব্দটা আমার বয়সের সঙ্গে মানায় না । ওকে বেগমদিদি বা বেগমবউদি বলতে পারো ।

          বাসমালিক : সমাধিদাদা, আমার তো মনে হয়, হারেমখানা নিয়ে রহস্যের যেন শেষ নেই। বাবা বলতেন, ইসলাম আসার পর বোধ হয় হারেমপ্রথার  শুরু । কিন্তু হারেমপ্রথা শুরু হয় ইরাক, বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য, হোমারের গ্রিস, পারস্যের পয়সাঅলাদের মধ্যে। তখনো ইসলামের উদয় হয়নি। তবে এটা ঘটনা যে আব্বাসীয় খেলাফতের সময়  হারেম ব্যাপারটা দরবারি স্বীকৃতি পায়। আব্বাসীয় খেলাফতের পর থেকে উসমানীয় খেলাফতের  সময় পর্যন্ত  হারেম  প্রত্যেক রাজারই ছিল। সেখানে অবশ্য হারেমকে হারেমখানা না বলে “সেরাগ্লিয়ো” বলতো । সেরাগ্লিয়োর সঙ্গে এদেশের সম্রাটদের হারেমখানার হুবুহু মিল । সেসব দেশেও হারেমখানায় সম্রাটের পত্নী, উপপত্নী, মা, বোন, দাদী দিদারা থাকতো । সেক্স স্লেভের সংখ্যা অবশ্য একেক রাজার সময় একেক রকম ছিল, নির্ভর করতো রাজা কতোটা সেক্স ম্যানিয়াক। যেমন সম্রাট আকবরের সময় ছিল পাঁচ হাজারেরও বেশি। সম্রাট জাহাঙ্গীরের সময় ছিল দুই হাজারেরও বেশি। সেক্স স্লেভদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা  ছিল না। চাবি-মারা পুতুলের জীবন ছিল হারেমখানায় বন্দি মেয়েদের । অবশ্য হাবশি সুলতান ইলতুৎমিশের মেয়ে রাজিয়া সুলতানা জেনানাঘর থেকে শুধু বেরই হন নি, রাজ্য পর্যন্ত চালিয়েছিলেন।  তবে বেশির ভাগ সময়ই হারেমের মেয়েদের পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন একটা জায়গায় বুড়ি হয়ে যেতে হতো। তাদের রাজনৈতিক অধিকার তো দূরের কথা, ব্যক্তিস্বাধীনতাও  ছিল না। 

          পর্যটক শাহ জালাল : শ্রীচৈতন্যদেবের পিতৃপুরুষের আদি ভূমি হল সিলেটের ঢাকা দক্ষিণ। যদিও মহাপ্রভুর মূল কর্মক্ষেত্র শ্রীহট্ট নয়, তবু তিনি শ্রীহট্ট থেকে পেয়েছেন একাধিক অনুগামী, আর বৈষ্ণব ধর্মাচারের প্রভাব ভারতের অন্য জায়গার তুলনায় ওই এলাকায় কম নয়। তবে সেখানে সুফিতত্ত্ব বৈষ্ণবতত্ত্ব মিলে মিশে এক । সিলেট-কাছাড়ে আউল-বাউল-মারিফতি আর পাঁচালি-কীর্তন-দেহতত্ত্বের বিপুল উৎসারণের সূত্র সেখানেই। প্রচলিত সনাতন ধর্ম, বৌদ্ধ ধর্মের সঙ্গে ইসলাম ধর্মের সংঘাত ঘটার মত কোন পরিস্থিতি এখানে হয়নি।  

           যুবক : তাহলে শ্রীচৈতন্য কি বাঙাল ছিলেন ? প্রভু কহে, কৃষ্ণকৃপা বলিষ্ঠ সবা হৈতে। তোমারে কাড়িল বিষয় বিষ্ঠা গর্ত হৈতে। 

           পর্যটক সানি লেওনি : আমি তো সেকথাই গান গেয়ে বলছিলুম, সবই দেহতত্ব।

           বেগমবউদি : আপনি পোশাক পরে নিন, নয়তো বেতাল আপনাকে ল্যাঙড়া তৈমুরের কাছে পাঠিয়ে দেবে।

          পর্যটক সানি লিওনি : বেগমবউদি, আমার দশ নম্বর ছোটো হয়, এক্সট্রা লার্জ চাই । 

           পর্যটক মিম পালোয়ান : খোজা ছাড়া হারেম আর রাজনীতি অচল, দুটোতেই স্লেভ দরকার ।                          

           পর্যটক  আমীর উল উমরা ওয়াসিফ আলী মির্জা খান বাহাদুর:   প্রাচীন আর মধ্যযুগে রাজাদের হারেমে আর জেনানামহলে পাহারাদার ছিল খোজা পুরুষ। এখনকার ভারতের মতন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পুরুষদের খোজা করার প্রথা খ্রিস্টপূর্ব আট শতকের গোড়ার দিকেও  । এখনকার মতনই খোজারা চাকর বা প্রহরী হিসেবে, খেতাবধারী বা বৃত্তিভোগী রানী আর সরকারের মাস্তান আর মন্ত্রীদের আইডিয়া-দাতার ভূমিকা পালন করত। এ প্রথা এই দেশে শুরু হয়  সুলতানি আমলের গোড়ার দিকে।  খোজারা পালোয়ান হলে রাজনৈতিক আর সামরিক কাজে লাগতো, যেমন সুলতান আলাউদ্দিন খলজির  সেনাপতি-মন্ত্রী মালিক কাফুর । বাংলায় মামলুক হাবশিদের সময়ে খোজারা নিজেদের খেলা দেখাতো, মানে, লেসবিয়ান হবার তরকিব শেখাতো। সাধারণত যুদ্ধের সময়ে বন্দি তরুণ সৈনিকদের খোজা করা হতো। আর স্লেভ পাইরেটরা দাস বাজার থেকে কেনা স্বাস্থ্যবান কমবয়সী ছেলেদের খোজা করে, শিখিয়ে-পড়িয়ে রাজারাজড়ার হারেমে বিক্রি করত। তুর্কি-মুগলদের আগে বাংলায় খোজাপ্রথার অস্তিত্ব সম্পর্কে  প্রমাণ পাওয়া যায় না। পাহারাদারদের নুনু বজায় থাকতো, এখনকার পার্টি-চামচা-খোজাদের যেমন থাকে।

          পর্যটক  রেইস উদ-দৌলা ওয়ারিস আলী মির্জা খান বাহাদুর : খেলা হবে, খেলা হবে ! ইয়ে দুনিয়া পিত্তল দি…

          পর্যটক মির্জা জহিরউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর : খেলা হবে খেলা হবে ! বড়ো মনকেমন করে গো সেই ছেলেটার জন্যে যাকে আমি ভালোবাসতুম ; এদেশের লোকেরা লুকিয়ে হোমো করে, বেশ অনুন্নত দেশ ।

          বাসের ক্লিনার ইবরাহিম লোদি : খেলা হবে খেলা হবে ! ইনকিলাব জিন্দাবাদ ।

          পর্যটক হিউয়েন সাঙ বা হিউয়েন-সাং বা হুয়ান-সাং বা জুয়ানজ্যাং : এদেশের লোকেরা খুবই বোকা । এরা সাপ, প্যাঙ্গোলিন, বাদুড়, বাঁদর, কুকুর, বেরাল কিছুই খায় না, হাঃ হাঃ হাঃ । 

        পর্যটক মুর্শিদ কুলি খান : খেলা হবে খেলা হবে !

        পর্যটক বিরবল : খেলা হবে খেলা হবে ! 

        পর্যটক আলা উদ-দীন হায়দার জঙ সরফরাজ খান বাহাদুর : খেলা হবে খেলা হবে !

          পর্যটক রাজা টোডরমল : খেলা হবে খেলা হবে !

          সমাধিদাদা : এবার টপিক চেঞ্জ করুন ।

         নব্যনাস্তিক যুবতী : আমি নতুন টপিক শুরু করছি ।বুদ্ধ নিজে কোন নতুন ধর্ম প্রতিষ্ঠা করতে চান নি। কিন্তু উনি বেঁচে থাকতেই পয়সাঅলাদের পৃষ্ঠপােষণায় সংঘ প্রচুর টাকাকড়ি যোগাড় করেছিল। তাঁর মৃত্যুর একশাে বছর পরেই তাঁর ভক্তদের মধ্যে থেরবাদী আর মহাসংঘিকদের বিরােধ প্রকট হয়ে ওঠে। তারপরে অশােকের সমর্থনপুষ্ট সংঘ থেরবাদের সমালােচক বৌদ্ধদের তাড়ায় । সম্রাটের আদেশে দেশময় স্তুপ, চৈত্য, বিহার তৈরি হয় । মহাযানী বৌদ্ধরা বুদ্ধকে দেবতা বানায়, অসংখ্য বােধিসত্ত্ব উদ্ভাবন করে, বিভিন্ন দেবদেবীকে বৌদ্ধধর্মের অন্তর্ভুক্ত করে। তা না হলে হয়তাে এদেশে বৌদ্ধধর্মের কয়েক শতাব্দী ব্যাপী প্রবল জনপ্রিয়তা সম্ভব হত না। বুদ্ধ যখন শেষ পর্যন্ত বিষ্ণুর নবম অবতারে পর্যবসিত হলেন, তখন বােঝা গেল বুদ্ধের স্বকীয়তা এদেশ থেকে লােপ পেয়েছে। বৃথাই তিনি সারিপুত্তকে সাবধান করেছিলেন। হিন্দুধর্মের সর্বগ্রাসী পাচকরস বৌদ্ধধর্মকে জারণ করে অবশিষ্ট বৌদ্ধদের একটি নগণ্য সম্প্রদায় হিসেবে হিন্দু সমাজের এককোণে রেখে দিল। হিন্দুয়ানী এদেশে  ব্যাপক প্রতিষ্ঠা পাবার আগে ভারতীয় মনীষীদের মধ্যে অনেকে নাস্তিক বা নব্যনাস্তিক ছিলেন।   অর্থশাস্ত্র” আর “কামসূত্রের”র কিছু উল্লেখ-উদ্ধৃতি থেকে অনুমান করা চলে যে কোন এক সময়ে লােকায়তবাদী চিন্তা অন্তত শিক্ষিত নাগরিকদের উপরে বেশ কিছুটা প্রভাব ফেলেছিল। জড়বাদী দর্শনের যে-গ্রন্থটি পরবর্তীকালে পাওয়া যায় সেটির নাম “তাপপ্লবিংহ”। এটির রচয়িতা জয়রাশী অষ্টম শতকে জীবিত ছিলেন। আন্দোলন-অভ্যুত্থান সম্পর্কে অনেক তথ্য সংগৃহীত হয়েছে এবং এদের চরিত্র ও ফলাফল নিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ হয়েছে ও হচ্ছে।

         পর্যটক কৌস্তুভ দে সরকার : আপনি বড্ডো সিরিয়াস টপিক শুরু করলেন । আজকাল পার্টির লোকেরা এসব আলোচনা করে না । তার চেয়ে তারা খোজা হতে ভালোবাসে ।আচ্ছা, খোজা হলেই বা । শুনেছি যে বেগমের ডাক পড়তে মাসের পর মাস লাগতো, সে খোজাদের ডেকে আঙুল করাতো, কিংবা তাদের বলতো লিঙ্গের মতন জিনিস দিয়ে আনন্দ দিতে । তখনকার দিনে ডিলডো ছিল না, কিন্ত খোজারা ডিলডোর মতন জিনিস তৈরি করে সাপলাই দিতো।

          পর্যটক মেগাসথিনিস : না, না, আলেকজাণ্ডার এদেশে হাজার হাজার ডিলডো বিলি করে গিয়েছিলেন। তক্ষশীলায় মাটি খুঁড়ে পাকিস্তরানিরা পেয়েছে ।

          পর্যটক নবীন কর : অতো বেগমদের হারেমে রেখে তাদের সেক্সুয়াল লাইফ নষ্ট করার মানে হয় না। খোজারা যদি আনন্দ দিতো তো ভালোই করতো । ডিলডো জিন্দাবাদ । হারেমের টপিকটা ইনটারেস্টিঙ । 

           সমাধিদাদা : হারেমের উল্লেখ প্রায় সব রাজপরিবারের ভেতরেই পাওয়া যায়। কেউ বলেন এটা তুর্কি শব্দ আবার কারো মতে, হারেম শব্দটা এসেছে আরবী ‘হারীম’ থেকে, যার অর্থ নিষিদ্ধ বা অলঙ্ঘনীয় সীমারেখা; এটা হলো মহিলাদের জন্য নির্ধারিত এলাকা যেখানে পুরুষদের ঢোকা বারন । তুর্কি সাম্রাজ্যেই হারেমের উল্লেখ প্রথম পাওয়া যায় যা পরে মোগলদের মাধ্যমে উপমহাদেশের সমাজে ঢোকে । হারেমে থাকার জন্যে কেবল মাহরামের( আরবি পরিভাষায় মাহরাম বলতে বোঝায় যাদের বিয়ে করা হারাম) প্রবেশাধিকার আছে। মানে হারেমে সবাই রাজরক্তের ছিল না । তখনকার সময়ে রাজার অনেক বউ আর উপবউ থাকবে এটাই স্বাভাবিক ছিল। নিজেদের দাস-দাসী আর বউদের বাদশা নিজের ইচ্ছেমতন ওলটাবেন-পালটাবেন-শোয়াবেন-বসাবেন  সেটাও অবাক করার ব্যাপার ছিল না। হারেমে তাই সর্বাধিক গুরুত্ব পেত আমোদ-প্রমোদের ব্যবস্থা। অন্তঃপুরের একাংশে থাকতো বাদ্যযন্ত্র এবং হাতি, ঘোড়া ও রথের সাজসজ্জা। 

          পর্যটক সুজা উদ-দৌলা সুজা উদদীন মুহম্মদ খান :পৃথিবীর সব যুদ্ধবাজ বাদশাদের বিরুদ্ধে যেসব কথা শোনা যায় তার ভেতরে উল্লেখযোগ্য হলো যুদ্ধে জয়লাভ করার পর বিভিন্ন প্রদেশ কিংবা অঞ্চল থেকে নানান ধর্ম ও বর্ণের মেয়ে এনে নিজেদের হারেমে রাখা। মুঘল হারেমেও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। কখনো কখনো নাকি হারেমে মেয়েদের সংখ্যা সাত-আট হাজার ছাড়িয়ে যেত। সম্রাজ্ঞী, রাজকন্যা কিংবা বাদশার রক্ষিতারা সকলে নাকি প্রায় একভাবেই সাজগোজ করত। চুলের বেণি, ঝলমলে পোশাক আর মণিমুক্তার গয়না পরে থাকতো আর ওইসব পরেই সেক্স করতো। 

             পর্যটক অ্যালেন গিন্সবার্গ : 

এসো নীপবনে ছায়াবিথী তলে                                               

এসো করো স্নান নবধারা জলে

 দাও আকুলিয়া ঘন কালো কেশ

পরো দেহ ঘেরি মেঘ নীল বেশ

কাজল নয়নে যূঁথী মালা গলে

এসো নীপবনে ছায়াবিথী তলে

এসো করো স্নান নবধারা জলে

আজি ক্ষণে ক্ষণে হাসিখানি সখী

আঁধারে নয়নে উঠুক চমকিয়া

আজি ক্ষণে ক্ষণে

মল্লারো গানে তব মধু স্বরে

দিক বাণী আনি বন মর্মরে

ঘন বরিষণে জল কলকলে

এসো নীপবনে ছায়াবিথী তলে

এসো করো স্নান নবধারা জলে

          পর্যটক আলা উদ-দিন হায়দর জং সরফরাজ খান বাহাদুর: আইন-ই-আকবরী আর আকবরনামার লেখক আবুল ফজল মোগল হারেমকে অভিহিত করেছেন ‘শাবিস্তান-ই-খাস’ নামে। রাজপ্রাসাদের এক বিশাল অংশ জুড়ে ছিল মহল । বাগান আর ফোয়ারার দিকে মুখ করে থাকা অগুনতি কামরায় হাজার দুয়েক নারীর বাস আর তাদের প্রত্যেকের জন্যই আলাদা মহল। এছাড়া আর তিনটি প্রাসাদে বাদশার উপবউরা থাকতো। এগুলোকে বলা হতো, লেথেবার ( রবিবার), মঙ্গল (মঙ্গলবার) এবং জেনিসার (শনিবার) মহল। এই নির্ধারিত দিনগুলোতে বাদশা নির্দিষ্ট প্রাসাদে সেক্স করতে যেতেন। একটি হারেম বা অন্তঃপুরে অনেক ঘরের ব্যবস্থা থাকতো। আলাদা রান্নাঘর, আলাদা প্রহরী, আলাদা গোসলখানা, কোনো কিছুর অভাব ছিল না। 

              যুবক : ব্রিটিশরা যখন শেষ বাদশার কেল্লা ভেঙে চুরমার করে দিলে, তখন পিলপিল করে উপবউ, বাঁদি, রক্ষিতা, স্লেভগার্ল আর তাদের হাজার কয়েক ছেলে-মেয়ে প্রাণ বাঁচাবার জন্যে দেদ্দৌড় দিয়েছিল, কিন্তু কেউই রেঝাই পায়নি।

            পর্যটক রঘু ডাকাত : আমি টপিক পালটাচ্ছি । ইংরেজ শাসনের শুরুর দিকে যখন  বংশানুক্রমিক পেশাগত স্তর থেকে উৎখাত হওয়া মানুষেরা নতুন সামাজিক অর্থনৈতিক স্তরে প্রবেশ কর‍তে পারল না, তখন আমরা সমাজ আর পেশা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে  যাযাবর হয়ে গেলুম। কিন্তু যাযাবরবৃত্তিতে তো দীর্ঘকাল জীবনধারণ করতে পারে না লোকে, আমরা বেছে নিলুম দস্যুবৃত্তি। গড়ে উঠল  ডাকাতের দল আর গ্রামে গ্রামে ডাকাতকালীর থান বা মন্দির। বাঘ যেমন বিশেষ পরিস্থিতিতে নরখাদক হয় তেমনি আমরা পেটের দায়ে পা বাড়ালুম অপরাধের পথে। যুদ্ধ বিগ্রহ মন্বন্তর কোম্পানির অত্যাচার, চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে করদানে বাধ্য জমিদারের মাত্রাছাড়া জুলুমে আমরা বিদ্রোহী হলুম, আর ফিরিঙ্গিরা আমাদের বলল ডাকাত। ওরা কৃষক বিদ্রোহী আর সাধারণ ডাকাতের সাথে পার্থক্য করেনি । বাংলার অসহ্য নৈরাজ্য শান্তিপ্রিয় নিরীহ শ্রমজীবী মানুষকে ঠেলে দিলে চুরি-ডাকাতির রাস্তায় । বিনয় ঘোষ তো বলেছেন, “ডাকাতরা কি কেবল পুলিশ অভিধানের সংজ্ঞানুসারে ডাকাত? অথবা তার চেয়ে বেশি কিছু? তাদের দস্যুবৃত্তির চেতনার সঙ্গে গনমুক্তির রাজনৈতিক বিপ্লবচেতনা মিশিয়ে দিতে পারলে রঘু বিশে বদে হয়ত বিপ্লবের ছোটবড় নায়ক হতে পারত, কিন্তু তখন লালপতাকার যুগ ছিল না, কন্ঠভরা বৈপ্লবিক স্লোগানের যুগ ছিল না, কালীর যুগ ছিল তাই কালী ছিলেন বিদ্রোহ বিপ্লবের প্রতীক”। কালী তো চিরব্যতিক্রমী, প্রচন্ড তান্ডবের প্রতিমূর্তি, তেত্রিশ কোটি দেবদেবীর ভেতর অনন্যা। ডাকাতেকালী উপেক্ষিত, প্রান্তিক, অন্ত্যজ ও অপরাধীদের দেবী, রাজনৈতিক জাতীয়তাবাদী সংগ্রামের অফুরন্ত শক্তি উৎস। ঘোর তমসাচ্ছন্ন রাতে যার ওনার আরাধনা করত তাঁরা অগ্নিযুগের সৈনিক বা অন্ধকারের পথিক । তিনি শাস্ত্রের কালীমাতা, স্নেহমহী ভবতারিণী নন, শস্ত্রের পুজারী বাঙালীর এক লৌকিক দেবী, আমার মতন ডাকাতদের আরাধ্যা হয়ে জন্ম নেন, ও মিশে যান সাধারণ সংস্কৃতির ভেতরে। জয় মা কালী কলকাত্তাওয়ালি ।

          পর্যটক হাশিম উদ-দৌলা মুহম্মদ আলীবর্দী খান বাহাদুর : হারেমের টপিকটা তো বেশ চলছিল । হারেমের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কঠোর আর বাইরের লোকের পক্ষে মোগল হারেমে ঢোকা  রীতিমতো কঠিন ছিল। খোজাদের ‘নাজির’ বলা হতো । প্রত্যেক বেগমের একজন করে নাজির থাকত যাকে তিনি গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন। বেগমদের কারো কোনো জিনিসের দরকার হলে তারা হারেমের কেশিয়ারকে বলত। হারেমে ব্যবহারের জন্য আলাদা কয়েন ছিল যা বাইরে পাওয়া যেত না।  হারেমের দারোগা হিসেবে নিয়োগ করা হতো  প্রৌঢ়াদের । হারেমের সর্বোচ্চ পদাধিকারী মহিলা কর্মচারী ছিল ‘মহলদার’। এরা বাদশার গুপ্তচর হিসেবেও কাজ করত। মহলদারের দরুন রাজকুমারদের সঙ্গে গোলমাল বাধতো। বেচারা রাজকুমার কাউকে লাইন মেরে লুকিয়ে এক খেপ শট মেরে কেটে পড়তে চাইলেও তা পৌঁছে যেত বাদশার কানে । জাহাঙ্গির এ-ব্যাপারে ছিল ওস্তাদ। বাপের রক্ষিতাকেও লুকিয়ে শট মেরে কেটে পড়ত । উজির-আমীররা তাদের দুয়েকটা মেয়েকে মহলে ঢুকিয়ে দিতে চেষ্টা করতো আর এর জন্য হারেমের মহলদারের সাথে মিলে নানা দুরভিসন্ধির আশ্রয়ও তারা নিত। কারণ, একবার যদি মেয়েটা  বাদশাকে সেক্সুয়ালি অ্যাট্রাক্ট করে, তো, ব্যাস, কেল্লা ফতে!

          যুবক : বেচারি জাহানারা সারাজীবন ভার্জিন রয়ে গেল ।

           যুবতী : ওকে আওরঙজেব অ্যাসিড ছুঁড়ে মেরেছিল ;ইনডিয়ায় সেই থেকে অ্যাসিড মারা শুরু হয়েছে।

          পর্যটক নামদেও ধাসাড় : আমি টপিক পালটাচ্ছি । তিনের দশক থেকে সরকার ভারতে ঔপনিবেশিক শাসনের যথার্থ প্রমাণের জন্য নিম্নবর্গের আন্দোলনগুলো সমর্থন করতে শুরু করে। এই সময় এই আন্দোলনগুলোর অনেক নেতাই দেশের সব থেকে ক্ষমতাশালী দল কংগ্রেসের সঙ্গে একাত্ম হওয়াই অনেক বেশি সুবিধাজনক বলে মনে করতে শুরু করেছিলেন। এই ধরণের একটা পরিণতি খানিকটা অবশ্যম্ভাবীও ছিল, কারণ শেষ পর্যন্ত এইসব নেতাদের উদ্দেশ্য ছিল জাতীয় রাজনীতিতে নিজেদের ক্ষমতার আসনে বসানো, বৃহত্তর সমাজ থেকে নিজেদের পৃথক করে রাখা নয়। আর চারের দশকেই ভারতে রাজনৈতিক জাতির প্রতিনিধি হিসেবে কংগ্রেস  বাস্তবিক অর্থেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। কংগ্রেসও ১৯৩৫-এর সাংবিধানিক সংস্কারে বিধিবদ্ধ প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতির ক্ষেত্রে এইসব নেতাদের গুরুত্ব স্বীকার করে নিয়েছিল, ফলে একীকরণ হয়েছিল সহজ। অন্যদিকে নিম্নবর্গের জনসাধারণও সামাজিক আর অর্থনৈতিক অধিকার আদায়ের জন্য তাঁদের অসমাপ্ত সংগ্রাম চালিয়ে নিয়ে যায়। কখনও তার মাধ্যম ছিল জাত-ভিত্তিক সম্প্রদায়, যদিও একেই ক্ষমতার একমাত্র আধার বলে মেনে নিতে আর রাজি ছিলেন না তাঁরা। তাই কখনও তাঁরা জাতীয়তাবাদীদের সঙ্গে সহযোগিতা করেছেন, কখনও সাম্প্রদায়িকতাবাদীদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন, আবার কখনও বা সরাসরি শ্রেণীভিত্তিক কর্মসূচি ও সংগঠনের সমর্থনে ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন। অন্যভাবে বলতে গেলে, যে আন্দোলন এক সময় শুরু হয়েছিল ‘নিম্ন বর্ণের আন্দোলন’ হিসেবে, তা একদিন বিভিন্ন পথে চলতে শুরু করে, কারণ জাত-ভিত্তিক আত্মপরিচয়কে বিভক্ত করে,অথবা আচ্ছন্ন ,এমন অনেক নতুন আত্মপরিচয় গড়ে উঠতে, অথবা সরব হয়ে উঠতে শুরু করেছে। এই আন্দোলনগুলোর মধ্যে তাই সমপ্রকৃতি অথবা একমূখীন প্রগতির খোঁজ না করে এই ধরনের জটিলতারই অনুসন্ধান করা উচিত। সেই অনুসন্ধানই উত্তর দিতে পারবে কেন অত্যন্ত সীমিত ক্ষেত্র ছাড়া এইসব নিম্নবর্ণের প্রতিবাদ ভারতীয় সমাজে প্রচলিত ক্ষমতার সম্পর্ককে ভেঙে ফেলতে সমর্থ হয়নি। 

             পর্যটক জাফর আলী খান বাহাদুর মীর মুহম্মদ জাফর আলী খান বাহাদুর : আমি পুরোনো টপিকে ফিরছি । মোগল হারেমের যেসব নারী বিখ্যাত  তাদের মধ্যে নামকরা হলো বাবরের মেয়ে গুলবদন বেগম, সম্রাজ্ঞী নুরজাহান, শাহজাহানের বউদের একজন, মানে, মমতাজ মহল, দারাশিকোর বউ নাদিরা বেগম, আওরঙ্গজেব মেয়ে জেবুন্নেসা, শাহজাহানের মেয়ে রোশানারা আর জাহানারা আর বেচারা বাহাদুর শাহ জাফরের বউ  জিনাত মহল। বিশেষত, নূরজাহান  তো নিজের লেখা কবিতা পড়তো ;‘মুশায়েরা’ ওনার সময় থেকেই বাড়বাড়ন্ত হয়েছে । কলকাতায় জীবনানন্দ সভাগরে, নজরুল মঞ্চে, অকাদেমিতে আজকাল যে কবিতা পাঠ হয় তা নুরজাহানের কারণে । ভোজের সময় দস্তরখানের ব্যবহার, চোলি বা আধুনিক বডিসের প্রচলন, পোশাকে বোতাম, অন্তর্বাস, নৈশবেশ, কুর্তা,কামিজ আর জরির লেস চালু  করেন  নূরজাহান। সেক্সকে সুরভিত করার জন্যে নূরজাহানের   আবিষ্কার গোলাপের আতর, ‘আতরে জাহাঙ্গীরী’। নূরজাহানের স্নানঘরে বিশাল টবে গোলাপ মধ্যে গোলাপের নির্যাস, আতর, চন্দন, হলুদ চুবিয়ে রাখার চল ছিল । বউ তো রাজ্য চালাচ্ছে, এদিকে তার বর জাহাঙ্গির মাগিবাজি করে বেড়াচ্ছে ।

         পর্যটক নজম উদ-দৌলা নাজিম উদ্দিন আলী খান বাহাদুর :  জাহাঙ্গির বা সেলিমকে, আকবরের হিন্দু বউয়ের ছেলে বলে, অনেকে বলতো ফাসেক । কেন জানো ? নুরজাহানের আগে জাহাঙ্গির একজন দাসীকে  ভালোবাসতো, যাকে তার বাবা আকবরও ভালোবাসতো। তার নাম নাদিরা বেগম  শার্ফ-উন-নিসা। সে দাসী হলেও এতো সুন্দরী ছিল যে তাকে আকবর আনারকলি নাম দিয়েছিলেন । আনারকলি কোন এক বণিক বহরের সাথে ইরান থেকে  লাহোরে  এসেছিল । ব্যাপারটা ইডিপাস কমপ্লেক্সের, মানে বাপ-বেটা একই সঙ্গে একটা মেয়ের সঙ্গে প্রেম করতো । প্রেমিকার টানে বাপের হারেমে ঢুকে গিয়েছিল জাহাঙ্গির আর তার জন্য খুব মার খেয়েছিল । অবৈধ সম্পর্ক গড়ার দোষ দিয়ে  আকবরের নির্দেশে  ইটের ঘরের মধ্যে তাকে জীবন্ত কবর দেয়া হয়েছিল। লাহোরে সরকারি মহাফেজখানায় আছে তার কবর । ফাসেক শব্দটা ফিসক শব্দ থেকে এসেছে । ‘ফিসক’ শব্দের অর্থ হচ্ছে অবাধ্য । বাংলাতে ‘ফাসেক’ শব্দের মানে করা হয় পাপিষ্ঠ। যে  প্রকাশ্যে  হারাম কাজ করতে অভ্যস্ত এবং তোওবা করে পাপ কাজ থেকে ফিরে আসে না, তাকে ফাসেক বলা হয়। উদাহরণঃ নিচের প্রত্যেকটা কাজই পাপ কাজ,  যার কয়েকটা জাহাঙ্গির করেছিল :

– যে লোক মা-বাপের অবাধ্য বা তাদের হক আদায় করে না ।

– যে লোক কোন কারণ ছাড়া জামাতে শরিক হয়না ।

– যে লোক দাড়ি কামায় – জাহাঙ্গির দাড়ি রাখতো না ।

– যে লোক নাভির নিচে কাপড় পরে ।

– যে লোক বউদের হক আদায় করে না, বাড়ির লোকদের সাথে অন্যায় আর জোরজুলুম  করে ।

– যে লোক বাড়ির মেয়েদের হিজাব-পর্দার আদেশ করে না ; জাহাঙ্গিরের বউ নুরজাহান হিজাব-পর্দা করতো না ।

– যারা অবৈধ প্রেম-ভালোবাসায় লিপ্ত । জাহাঙ্গির প্রচুর ভালোবাসাবাসি করতো, পোস্টমডার্ন সম্রাট ছিল ।

       পর্যটক হাছন রাজা : মাটির পিঞ্জিরার মাঝে বন্দি হইয়া রে।

কান্দে হাসন রাজার মন মনিয়া রে।।

মায়ে বাপে বন্দি কই লা, খুশির মাঝারে।

লালে ধলায় বন্দি হইলাম, পিঞ্জিরার মাঝারে।।

উড়িয়া যায় রে ময়না পাখি, পিঞ্জিরাইয় হইল বন্দি।

মায়ে বাপে লাগাইলা মায়া, মায়া জালের আন্দি।।

পিঞ্জিরায় সামাইয়ারে ময়নায় ছটফট করে।

মজবুত পিঞ্জরা ময়নাইয় ভাঙ্গিতে না পারে।।

উড়িয়া জাইব শুয়া পক্ষী, পড়িয়া রইব কায়া।

কিসের দেশ, কিসের খেশ, কিসের মায়া দয়া।।

ময়নাকে পালিতে আছি দুধ কলা দিয়া।

যাইবার কালে নিঠুর ময়নায় না চাইব ফিরিয়া।।

হাসন রাজায় ডাকব তখন ময়না আয় রে আয়।

এমন নিষ্ঠুর ময়নায় আর কি ফিরিয়া চায়।। 

          পর্যটক লাটুবাবু : সমাধিদাদা, নতুন টপিক শুরু করি বরং । নূরজাহান-এর আসল  নাম ছিল মেহেরুন্নিসা । উনিশজন যুবতীকে বিয়ে করার পর জাহাঙ্গির বিধবা মেহেরুন্নিসাকে বিয়ে করে । তিনি হয়ে ওঠেন  জাহাঙ্গীরের প্রধান বেগম । একজন বলিষ্ঠ, সম্মোহনী ও উচ্চশিক্ষিতা নারী হওয়ায় তাকে তখনকার সবচেয়ে প্রভাবশালী মহিলা ভাবা হয় । স্বামী  জাহাঙ্গীরের সেক্স, মদ, আফিমের প্রতি তীব্র আসক্তি থাকায় নূরজাহান ক্ষমতা নিজের হাতে তুলে নিয়েছিলেন । মেহেরুন্নিসার প্রথম বিয়ে  হয় তুর্কিস্তানের  আলি কুলি বেগ এর সঙ্গে। একলা খালি হাতে বাঘ মারার জন্য তার নাম হয় শের আফগান। শোনা যায় মেহের একবার যুবরাজ সেলিমের নজরে পড়ে জান। সেলিমও অমনি খেপে উঠলো মেহেরকে বিয়ে করার জন্য। শেরের মৃত্যুর পর মেহেরকে আগ্রাতে নিয়ে আসা হয়। তখন মেহেরের বয়স তেত্রিশ। ওই বয়সেও উনি ছিলেন মারকাটারি । সাঁইত্রিশ বছর বয়সে বিয়ে করলেন নাছোড় জাহাঙ্গীরকে। জাহাঙ্গীর তার নাম দিলেন নুরজাহান বা জগতের আলো। জাহাঙ্গীর ছিল নামকেওয়াস্তে সম্রাট।  জাহাঙ্গীরের রাজত্যের শেষ দিকে যখন তার ছেলে খুররম আর সেনাপতি মহাব্বত খান বিদ্রোহ করেন তখন বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করেন নুরজাহান।

           পর্যটক ছাতুবাবু : সমাধিবউদি, একটা কথা বলুন যে শাহজাহানের ভালোবাসাবাসিও অদ্ভুত ব্যাপার নয়কি ? বিয়ে করলেন আর্জুমান বানুকে, ওনার ছেলের বউ নুর জাহানের ভাইয়ের মেয়ে, তবে এই নাম পালটে দিলেন শাহজাহান।  নাম রেখেছিলেন মমতাজ মহল। শাহজাহান উনিশের আর্জুমানকে বিয়ে করেন একুশ বছর বয়সে।  শাহজাহানের যৌন চাহিদা এতো বেশি ছিল যে মমতাজের সংসার-জীবন মাত্র আঠারো বছরে শেষ হয়ে যায় । এরই মধ্যে মমতাজ চোদ্দটা বাচ্চা পয়দা করেন। অন্য বেগমদেরও শাহজাহানের যৌনখোরাক মেটাতে হতো, তার ওপর উপবউ, বাঁদি, রক্ষিতা, স্লেভগার্লরা তো ছিলই ।  মমতাজ ছিলেন সম্রাট শাহজাহানের দ্বিতীয় স্ত্রী। কোথাও বলা হয়েছে, মমতাজ শাহজাহানের ৩য় স্ত্রী, কোথাও বলা আছে ৪র্থ স্ত্রী। আসলে কততম স্ত্রী তা কোথাও সঠিকভাবে বলা নেই। সম্রাট শাহজাহান ও মমতাজের প্রেম কাহিনীতে বলা হয়েছে সম্রাট শাহজাহান মমতাজকে বাজারে দেখতে পান এবং প্রথম দেখাতেই মমতাজকে পছন্দ করে ফেলেন। কিন্তু এও শোনা যায় শাহজাহানের সঙ্গে বিয়ে হওয়ার আগেও মমতাজের বিয়ে হয়েছিল। সম্রাট শাহজাহান মমতাজের সেই স্বামীকে হত্যা করে তারপর মমতাজকে বিয়ে করেছিল। মমতাজ মারা যাওয়ার পর শাহজাহান মমতাজের আপন ছোট বোনকে বিয়ে করেন। লোকটা বোধহয় সেক্স পারভার্ট ছিল, ওর পূর্বপুরুষ ল্যাঙড়া তৈমুরের মতন।

            সমাধিবউদি : সব যুগের সব পুরুষ একই রকম । কতো মেয়েকে ফুসলিয়ে আমাদের সমাধির ওপরে পুরুষরা কুকর্ম করে গেছে তার হিসেব বটগাছের ওই হাবশি বেতালই দিতে পারবে ।

          পর্যটক আহমেদশাহ আবদালি : আমি অখন ইনটারভিন করতাসি সমাধিদাদা । চারদিকের কিছু নতুন গজিয়ে ওঠা বালের মতো ক্যারেক্টার দেখি। যার নতুন ওঠে সে তো পুলকের চোটে বালে হাত বুলায় আর ভাবে আহা কি নরম কোমল মোলায়েম! থাক আর কিছুদিন। ঠিক তখনই এইসব বাল লম্বায় বাড়তে বাড়তে এতো বড় হয় যে বালের মালিক নিজের বালে পেচায়া মইরা যায়। এদেরকে তাল দেয় আবার পুরান পাইকা তামার তার হওয়া বালের মালিক। আরে তোর এতো খাউজানি থাকলে নিজের তামার তারগুলা প্লাইয়ার্স দিয়া কাইটা আঁটি বাইন্ধা বাজারে নিয়া বেইচা দে হারামজাদা গুস্তাখ! ঘটনা হইসে পাকনা বাল গুলারে সবাই চিনে, নতুন বাল ওলারা বুঝেনা এই মুর্শিদ তোরে সুটায়া লাল করে দিবে, ব্যথায় হাঁটতেও পারবি না। এই জীবনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষার মধ্যে একটা অতি জরুরী ও একের শিক্ষা হলো, স্নেহ লুকায় রাখতে হয়। যারে স্নেহ করলেন সন্তানস্য, সে যদি সেটা বুঝতে পারে এবং নিশ্চিত হয় স্নেহের জায়গাটা তাইলেই সব শেষ। তারপর… দিনে রাতে, ঢালে বিঢালে এমন এমন ভূত ও বর্তমান ভাবে অঝরা বাঁশ দিতে শুরু করবে যা আপনি গিলতেও পারবেন না, ফালাইতেও পারবেন না। দেওয়ার মত বাঁশ যদি পছন্দ না হয়, সে নিজে টাকা খরচ কইরা আন্দামান নিকোবরে গিয়া উৎকৃষ্ট প্রজাতির ঘন ঝাড়সমেত পোক্ত কঞ্চিঅলা অভৌত, ভৌত, ইহজাগতিক, পরাবাস্তব সবপ্রকার বাঁশ প্লেনের পিঠে কইরা তুইলা বাইন্ধা আইনা এই মহান প্রয়োগ শেষ করবেন দায়িত্বের সাথে। যে তার সারা জীবনে একগাছা বাল ঠিকমতো ফালাইতে পারেনা, সেও এই কাজ এতো নিঁখুত ভাবে করবে যে আপনি তার এই মহান প্রয়োগে ব্যথা ভুইলা গিয়া খুবই আশ্চার্যান্বিত, মুগ্ধ, অভিভূত, পুলকিত, হইয়া গালে হাত দিয়া ভাববেন- আইসসালা! তাম্মায়রেবাপ! এই শাউয়াডারে যে এতো ভালো জানতাম, এতো স্নেহ করতাম, বালপাকনায় এই বয়সে এই জিনিস হিখছে কোম্মে দিয়া!

           পর্যটক শেরশাহ সুরি : আমিও টপিক চেঞ্জ করছি সমাধিদাদা । প্রায় ৫০০ বছর আগে বাগহাটির জয়পুরের বাসিন্দা বিধুভূষণ ঘোষ আর তার ভাই রঘু ঘোষ ঘন জঙ্গলের মধ্যে হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী তাদের মায়ের মূর্তি স্থাপন করে। দিনের বেলায় দুই ভাই দিনমজুরের কাজ করলেও রাতে ধনীদের বাড়িতে ডাকাতি করত। ডাকাতি করে আনা জিনিসপত্র এলাকার গরিব মানুষের মধ্যে বিলি করত। কিংবদন্তি হলো, কারো বাড়িতে ডাকাতি করার আগে রঘু ডাকাত চিঠি দিয়ে বাড়ির মালিককে জানিয়ে দিত। রঘু ডাকাতের লোকজন রাস্তা দিয়ে যাওয়া কোনও মানুষকে ধরে বেঁধে রাখত। সন্ধ্যার পর পুরোহিতকে ডেকে এনে ঢাকঢোল বাজিয়ে নরবলি ও ল্যাটা মাছের পুজো দিয়ে গলাকাটা শব মন্দিরের সামনে  পুকুরে ভাসিয়ে দিত। তারপর মহাপ্রসাদ খেয়ে ডাকাতি করতে বেরোতো। ডাকাত দলের ভয়ে দুপুরের পর থেকে সেই রাস্তা দিয়ে মানুষ চলাচল করত না। সাধক কবি রামপ্রসাদ সেন কোনও এক সময়ে ওই রাস্তা ধরে ত্রিবেণী ফেরিঘাটে ফিরছিলেন। ওই সময়ে রঘু ডাকাতের লোকজন তাঁকে নরবলি দেওয়ার জন্য ধরে নিয়ে এসে বেঁধে রাখে। রাতে রামপ্রসাদকে বলি দেওয়ার  সমস্ত প্রস্তুতি সেরে ফেলা হয়ে গেছে যখন,  বলি দেওয়ার আগে মাকে একটি গান শোনানোর আর্জি করেন। সেই আর্জি মেনে রঘু ডাকাত গান শোনানোর অনুমতি দিলে রামপ্রসাদ এই গানখানা ধরেন। 

                     তিলেক দাঁড়া ওরে শমন,   

বদন ভরে মাকে ডাকি রে ।

আমার বিপদকালে ব্রহ্মময়ী,

এসেন কি না এসেন দেখিরে 

লয়ে যাবি সঙ্গে করে, তার এত ভাবনা কীরে 

তবে তারা-নামের কবচ-মালা,

বৃথা আমি গলায় রাখি রে 

মহেশ্বরী আমার রাজা,

আমি খাস তালুকের প্রজা,

আমি কখনো নাতান, কখনো সাতান,

কখনো বাকির দায়ে না ঠেকি রে 

প্রসাদ বলে মায়ের লীলা,

অন্যে কি জানিতে পারে 

যার ত্রিলোচন না পেল তত্ত্ব,

আমি অন্ত পাবো কীরে 

তারপরেই রঘু ডাকাত বলির হাড়িকাঠে রামপ্রসাদের বদলে কালীমূর্তি দেখতে পায়। এরপর থেকে রঘু ডাকাত বলি বন্ধ করে রামপ্রসাদের সেবার ব্যবস্থা করে।  পরের দিন সকালে নৌকায় করে রামপ্রসাদকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসে।                  

           সমাধিদাদা বলল : এবার আমি নিজেদের কথা বলি ।আমি  হাবশি সুলতান, ডাক নাম চাপু, শুয়ে আছি খুলদাবাদের এই কবরের তলায়, তবে বিশেষ লোক আসে না, আমার সৌধ দেখতে, তা আমি হাবশি বলে নয়, আমার সৌধ তেমন সুন্দর নয়, অথচ আমি কতো কি শিখিয়েছি, এদেশের লোকেদের । তোমাদের মতন বাঙালি পর্যটকের দল সপরিবারে আসে আর অবাক হয় আমার গল্প শুনে । যারা আসে তাদের সবাইকেই আমি গল্প শোনাই ।  কবরের ভেতরটা, বুঝলে, লেখকের বিছানার মতন, একা ভাবতে পারি, শতকের পর শতক ।  ১৪৯৪ সালে ক্যাথলিকদের গুরু পোপ পৃথিবীকে দুইভাগে ভাগ করে দিয়েছিল, কেপ ভের্দে থেকে সোজা লাইন টেনে পূর্ব দিকটায় লুটপাট চালাবে পর্তুগাল আর পশ্চিম দিকটায় স্পেন । স্পেনের দাস ব্যবসায়ীরা যদি আমাকে ধরে বিক্রি করতো তাহলে আমি ভারতে আসার বদলে দক্ষিণ বা উত্তর আমেরিকায় যেতুম । সেখানে গিয়ে কতোকাল যে বংশ পরম্পরায় অত্যাচার সহ্য করতে হতো তা তোমরা ভালোই জানো । এখন শুনি ডোনাল্ড ট্রাম্প নামে একজন এসেছে সেদেশের হাবশিদের নিকেশ করতে ।

          আমিই  সিদ্দি, নিগ্রো, মামলুক, মুর, নিগার,  কালা-আদমি । আমিই সেইন্ট অগাস্টিন অব হিপো, মানসা মুসা, নেলসন ম্যাণ্ডেলা, হাইলে সেলাসি, ডেসমণ্ড টুটু, কোয়ামে এনক্রুমা, অলিভার টাম্বো, কোফি আন্নান, ওয়ানগারি মাথাই, চিনুয়া আচেবে, ওলাউধা ইকুয়িনা, আবেবে বিকিলা, টেগলা লারুপ, হাইলে গেব্রসেলাসি, কেনেনিসা বেকেলে, আসবেল কিপরপ, মার্টিন লুথার কিং, বারাক ওবামা, জেসি ওয়েন্স, মোহম্মদ আলি, ফ্রেডরিক ডগলাস, তুসেইন্ট লুভেরতুরে, বুকার টি ওয়াশিংটন, ডাবলু ই বি দুবয়, ম্যালকম এক্স, পেলে, মাইকেল জর্ডান, থুরগুড মার্শাল, উসেইন বোল্ট, কার্ল লুইস, বব মার্লে, সোজোরনার ট্রুথ, হ্যারিয়েট টাবম্যান, আইডা ওয়েলস, হ্যাটি ম্যাকড্যানিয়েল, রোজা পার্কস, বিলি হলিডে, শার্লি চিশোম, করেটা স্কট কিং, এলেন জনসন সিরলিফ, ওপরা উইনফ্রে,ওয়ানগারি মুটা মাথাই, মায়া অ্যাঞ্জেলু, হুপি গোল্ডবার্গ, জ্যাকি জয়নার-কার্সি, ডেরাটু টুলু, সেরেনা উইলিয়ামস, মাইকেল জ্যাকসন, বিয়োনসে । আমিই অ্যাভেরোস, তারিক ইবন জিয়াদ, আবদ-আর-রহমান, ইবন আল-কোটিয়া, ইয়াহিয়া আল-লাইথি, আব্বাস ইবন ফিরনাস, মাসলামা আল-মাজরিথি, সইদ আল-আনদালুসি, আবু ইশহাক ইবরাহিম আল-জারকালি, আরটেফিয়াস, ইবন বাইজাহ, ইবন জুহুর, ইবন তুফাইল, ইবন আল-বাইতার, ইবন খালদুন, আবু আল-হাসান ইবন আলি আলকালাসাদি, লিও আফরিকানাস, এসতেভানিসিও, ইবন বাতুতা, ইবন হাজম, ইবন ইধারি, ইবন আরাবি, আবু বকর ইবন, টাইগার উডস, আল-আরাবি, মার্টিন লুথার কিং জুনিয়ার ।          

          আমার এই বক্তৃতাটা শুনেছো তো ?

I say to you today, my friends, so even though we face the difficulties of today and tomorrow, I still have a dream. It is a dream deeply rooted in the American dream.

.

I have a dream that one day this nation will rise up and live out the true meaning of its creed: ‘We hold these truths to be self-evident: that all men are created equal.’

.

I have a dream that one day on the red hills of Georgia the sons of former slaves and the sons of former slave owners will be able to sit down together at the table of brotherhood.

.

I have a dream that one day even the state of Mississippi, a state sweltering with the heat of injustice, sweltering with the heat of oppression, will be transformed into an oasis of freedom and justice.

.

I have a dream that my four little children will one day live in a nation where they will not be judged by the color of their skin but by the content of their character.

.

I have a dream today.

.

I have a dream that one day, down in Alabama, with its vicious racists, with its governor having his lips dripping with the words of interposition and nullification; one day right there in Alabama, little black boys and black girls will be able to join hands with little white boys and white girls as sisters and brothers.

.

I have a dream today. I say to you today, my friends, so even though we face the difficulties of today and tomorrow, I still have a dream. It is a dream deeply rooted in the American dream.

.

I have a dream that one day this nation will rise up and live out the true meaning of its creed: ‘We hold these truths to be self-evident: that all men are created equal.’

.

I have a dream that one day on the red hills of Georgia the sons of former slaves and the sons of former slave owners will be able to sit down together at the table of brotherhood.

.

I have a dream that one day even the state of Mississippi, a state sweltering with the heat of injustice, sweltering with the heat of oppression, will be transformed into an oasis of freedom and justice.

.

I have a dream that my four little children will one day live in a nation where they will not be judged by the color of their skin but by the content of their character.

.

I have a dream today.

I have a dream that one day, down in Alabama, with its vicious racists, with its governor having his lips dripping with the words of interposition and nullification; one day right there in Alabama, little black boys and black girls will be able to join hands with little white boys and white girls as sisters and brothers.

.

I have a dream today. 

           আমরা মামলুকরা তো জন্মাই নাস্তিক হয়ে, তারপর যারা আমাদের কেনা গোলাম করে তোলে তাদের ধর্মে আমরা ধর্মান্তরিত হই । কেনা গোলামরা প্রায় সকলেই জন্মায় সর্বপ্রাণবাদী হয়ে, যাকে ক্রেতারা বলে নাস্তিকতা । আমি জন্মগতভাবে ঈশ্বরবিশ্বাসী ছিলুম না ; পরে হয়েছি ।   শেকসপিয়ারে আমার সংলাপ পড়েছো তো ? সেই যে বলেছিলুম : ”হুজুর, সৈনিক হলেও আমি একজন রক্তমাংসের মানুষ। ভালোবেসে যদি কেউ যুদ্ধের কাহিনি শুনতে চায় তাহলে তাকে বিমুখ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমি তাকে দিনের পর দিন শুনিয়েছি খুব ছোটবেলায় দেশ ছেড়ে ভেনিসে এসে কীভাবে আমি সৈনিকের বৃত্তি গ্রহণ করেছি, বিভিন্ন যুদ্ধ জয় করে কীভাবে আমি আজ ভেনিসের প্রধান সেনাপতি হয়েছি — এসব বিভিন্ন ঘটনার কথা বলেছি তাকে। কর্মসূত্রে ওর বাবার কাছে যখনই গিয়েছি, কাজ শেষ হবার পর ডেসডিমোনা আমায় টেনে নিয়ে গেছে তার মহলে। বাচ্চা মেয়ের মতো বায়না ধরেছে গল্প শোনার। যুদ্ধের বর্ণনা শুনতে শুনত আমার প্রতি ভালোবাসার যে ছবি ওর দু-চোখে ফুটে উঠত, সেটা আমার নজর এড়ায়নি। হুজুর, বিধর্মী হয়েও আমি বলছি ডেসডিমোনার ভালোবাসা পেয়ে আমি সত্যিই ধন্য। কোনও তুকতাক বা জাদুমন্ত্র নয় হুজুর, আমর বীরত্বের কাহিনিগুলো একসময় আমারই অজান্তে জয় করেছে ডেসডিমোনার হৃদয়। হে মহামান্য ডিউক, নিজের নির্দোষিতার পক্ষে আমার আর কিছু বলার নেই।”

          সিদ্দিদের মতন ওথেলো আসলে মাগরেবের কালা-আদমি ।মরোক্কো, আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া, লিবিয়া, মরিতানিয়া, উত্তর মালি, উত্তর নিজের আর ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের লোকেরা মাগরেবি বা বার্বার । বর্তমানে মাগরেব কথাটি দিয়ে মরক্কো, আলজেরিয়া ও তিউনিসিয়ার পুরো অঞ্চলকে বোঝানো হয়; ব্যাপকতর অর্থে লিবিয়া আর মোরিতানিয়াকেও এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অতীতে আরবি ভাষাতে মাগরেব বলতে বোঝাতো দেশ তিনটির যেসব অংশ সুউচ্চ অ্যাটলাস পর্বতমালার উত্তরে ও ভূমধ্যসাগরের তীরে অবস্থিত । 

                  সমাধিদাদা বলতে থাকে, সিদ্দিদের যে ধর্মই নির্বিশেষে বেঁধে রাখে সেগুলোর একটি কারণ হিরিয়ারু বা পূর্বপুরুষের উপাসনা। আত্মারা আকারে মৃতর মতনই বলে বিশ্বাস করা হয়। তারা পরিবারকে সমস্ত উদ্বেগের ব্যাপারে পরামর্শ করার জন্য সাক্ষী হিসাবে বিবেচনা করে। জন্ম, বিয়ে এবং মৃত্যুর  অনুষ্ঠানে পূর্বপুরুষদের ডেকে আনা হয়। প্রবাসী বাবা-মায়ের আত্মা হিরিয়ারুকে ঘিরে বাড়ি সাজানো হয়েছে। এটা বাবা-মায়ের  স্মরণ , বেশ কয়েক বছর ধরে তাদের যত্নের জন্য  ধন্যবাদ জানায় আর ভবিষ্যতে পরিবারের ওপর নজর রাখার জন্য অনুরোধ করে। সমস্ত আত্মীয়দের পক্ষে এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়া জরুরি, সুতরাং এইভাবে আত্মীয়তার সম্পর্ক রিনিউ হয় ।  পরিবারের ‘কর্থ’, মানে কর্তা, বছরে দু’বার হিরিয়ারু উপাসনা করে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে নবরত্রি উৎসব চলার সময়ে অনুষ্ঠিত হয়। যদি কোনও কারণে তা সম্ভব না হয় তবে এপ্রিল-মে মাসে অন্যান্য বড় উৎসব হয় – হোলির সময়ও  করা যেতে পারে।  স্পষ্টতই বাবা-মায়ের  মৃত্যুর তারিখের সাথে মেলে না কারণ সিদ্দিরা কেবল প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী পালন করে। হিন্দু সিদ্দিদের সাধারণত অনুষ্ঠানটা চিহ্নিত করার জন্য বিরাট ফাংশন হয় তবে খ্রিস্টান আর মুসলিম সিদ্দিদের ততোটা নয়।       

          সমাধিবউদি বলল, তোমরা, আজকালকার বাঙালিরা, শুনেছি সঞ্জয় বেলাটঠিপুত্তের মতবাদে বিশ্বাস করো ! কোনো বাঙালিকে যদি জিগ্যেস করো “আপনি কি হিন্দু”, সে ভ্যাবাচাকা খেয়ে যাবে ! বেলাটঠিপুত্ত সম্পর্কে না জানা থাকলে আমিই বলছি । সঞ্জয় বেলটঠিপুত্ত বা সঞ্জয় বৈরতীপুত্র, গৌতম বুদ্ধের সময়ের একজন ভারতীয় অনেকান্তবাদী বা অজ্ঞাবাদী দার্শনিক ছিলেন। বিভিন্ন পালি সাহিত্যে সঞ্জয় বেলটঠিপুত্তকে পরিব্রাজক হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে । সারিপুত্ত আর মহামোগ্গলন নামে তার দুইজন প্রধান শিষ্য পরবর্তীকালে  গৌতম বুদ্ধের দর্শন সম্বন্ধে জানতে পেরে সঞ্জয় বেলটঠিপুত্তকে ছেড়ে দিয়ে গৌতম বুদ্ধের শিষ্যত্ব গ্রহণ করে। এইসময় সঞ্জয় বেলাটঠিপুত্তের আড়াইশো শিষ্য তাঁকে ত্যাগ করে গৌতম বুদ্ধের শিষ্য হয়ে যায়। শেষ জীবনে রক্তবমির কারণে সঞ্জয়ের মৃত্যু ঘটে। সুত্তপিটকের দীঘনিকায়ের সামফলসুত্ত অনুসারে, সঞ্জয় বেলাটঠিপুত্ত কোনও দার্শনিক প্রশ্নের উত্তর এড়ানোর উদ্দেশ্যে সর্বদা দ্ব্যর্থবোধক বাক্য প্রয়োগ করে সেইসকল প্রশ্নের উত্তর দিতেন, অনেকটা এখনকার বাঙালি রাজনেতার মতন। তিনি পরলোক, দেবতা, কর্মফল, মুক্তপুরুষ ইত্যাদি অধিবিদ্যা সংক্রান্ত সব প্রশ্ন এড়িয়ে যেতেন, অনেকটা এখনকার বাঙালি লেখকদের মতন। পরলোক বা দেবতা বা কর্মফল বা মুক্তপুরুষের অস্তিত্ব আছে না নেই তা তিনি বলেননি বা জোর দিয়েও বলেননি যে আছে না নেই। যদিও রাহুল সাংকৃত্যায়নের মতে, মানুষের সহজ বুদ্ধিকে ভ্রমে নিক্ষেপ করাই সঞ্জয়ের উদ্দেশ্য  ছিল, অনেকটা এখনকার বাঙালি মন্ত্রীদের মতন ।

          সমাধিদাদা বলতে আরম্ভ করল, তোমরা তো জানো না, গেরিলা লড়াই আমিই মারাঠাদের শিখিয়েছিলুম, যাকে তোমরা বলো বর্গি আক্রমণ । এই অঞ্চলে আরও কয়েকজন নামকরা সিদ্দি যোদ্ধা ছিল, যাদের বংশধররা এখনও আছে, আফ্রিকার মানুষদের মতন নেই আর, রোগাটে আর বেঁটে হয়ে গেছে, এখানকার মুসলমানদের সঙ্গে বিয়ে করে । ওদের লোকে বলে সিদ্দি, সৈয়দ থেকে সিদ্দি । সিদ্দি হল এক জাতীগত গোষ্ঠী যারা ভারত আর পাকিস্তানের কিছু অংশে বসবাস করে। এদের পূর্বপুরুষরা ছিল আবিসিনিয়ার আদিবাসি যাদের পর্তুগিজরা পাকড়াও করে গোলাম হিসেবে ভারতবর্ষে এনেছিল । ভারতের হায়দ্রাবাদ, গুজরাট আর করনাটকাতে আর পাকিস্তানের মাকরান ও করাচীতে প্রায় বিশ থেকে পঁচিশ হাজার সিদ্দি থাকে, কালা আদমি। অধিকাংশ সিদ্দি সুফি মুসলিম হলেও হিন্দু আর ক্যাথলিখ খৃষ্টান আছে ।  আমার মতন ওরাও লড়াই করতো কিন্তু আগেপিছে না ভেবে এমন কাজকর্ম করতো যে শাসক হিসেবে এগোতে পারেনি । জঞ্জিরা দুর্গের আশে-পাশে নেড়ে সিদ্দিদের কবর পাবে, আরও বেশি অবহেলিত, ভাঙাচোরা । যাদের  সিদ্দিরা মনে রেখেছে তাদের মধ্যে নাম করতে হয় সিদ্দি রসুল ইয়াকুত, সিদ্দি মাসুদ, সিদ্দি আবদুল রহমান, সিদ্দি অম্বর আওয়ানি, সিদ্দি রাহিন  আর সিদ্দি সাট । নুনের করের গরমিলের দরুন সিদ্দিরা ১৬৮০ সালে সাম্ভাজি মোকাশিকে থলেতে ঢুকিয়ে জীবন্ত ফেলে দিয়েছিল সমুদ্রে, আর চটিয়ে দিয়েছিল মারাঠাদের । ব্যাস, সেই থেকে মারামারি-কাটাকাটি ।      

            সমাধিদাদা কথা বজায় রাখল, ওনার তো গলা শুকোবার সমস্যা নেই । সে যাক, একটু আগে যা বলছিলুম, পরে বর্গি নামটা আঠারো শতকের  লুটতরাজপ্রিয় অশ্বারোহী মারাঠা সৈন্যদলের  হয়ে গিয়েছিল। তোমরা বাঙালিরা ওদের কাছ থেকে ধুতি পরতে শিখেছ, কেননা ঘোড়ায় চাপতে হলে দু-দিকে পা ঝোলাতে হয় । আর তুর্কিদের কাছ থেকে শিখেছ পাঞ্জাবি পরা । ১৭৪১ থেকে ১৭৫১ সাল পর্যন্ত দশ বছর ধরে বাংলার পশ্চিম সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোয় নিয়মিতভাবে লুটতরাজ চালাত বর্গিরা। বর্গিহানা এই সময় একরকম বাৎসরিক ঘটনায় পরিণত হয়েছিল। মারাঠি ধনগর জাতের লোকেরা অভিযানে যাওয়ার সময় শুধু একটা সাত হাত লম্বা বর্শা নিয়ে বের হত। আমার শেখানো গেরিলা আক্রমণকে পরে বদনাম করে দিয়েছিল ওরা ।বর্গি  শব্দটা মারাঠি বারগির শব্দের অপভ্রংশ। বারগির বলতে মারাঠা ঘোড়সওয়ারদের বোঝাত। এদের ঘোড়া আর অস্ত্রশস্ত্র জোগান দিত মোগল বা মারাঠা শাসক । বাঙালিরা তাদের সঙ্গে লড়ার বদলে গান গাইতো, এইরকম–       

 খোকা ঘুমালো পাড়া জুড়ালো বর্গী এল দেশেবুলবুলিতে ধান খেয়েছে খাজনা দেব কিসে ধান ফুরোলো পান ফুরোলো খাজনার উপায় কি? আর কটা দিন সবুর কর রসুন বুনেছি 

          তোমরা হয়তো জানো, যে বর্গিদের ভয়ে লুকিয়ে রাখা সোনাদানার খোঁজ এখনও হয় । যেমন ঝাড়গ্রামের কুলটিকরিতে আর পশ্চিম মেদিনীপুরে কেশিয়াড়িতে খোঁড়াখুঁড়ি হয়েছে। কুলটিকরি থেকে কেশিয়াড়ি যাওয়ার পথে পড়ে কিয়ারচাঁদ। এই কিয়ারচাঁদের বিরাট এলাকায় শয়ে শয়ে লম্বা, চৌকা নানা রকম পাথর পোঁতা আছে। সাধারণ ভাবে বোঝা যায় না কী এগুলো। কিন্তু লোকে বলে , ওই পাথরগুলোর সঙ্গে বর্গিদের যোগ রয়েছে। এলাকার বাসিন্দারা বলে, তারা দাদুদের কাছে শুনেছে, বর্গিদের অত্যাচারে ভয় পেয়ে স্থানীয় জমিদার সারি সারি পাথর পুঁতেছিলেন। সন্ধ্যার সময় ওই সব পাথরের গায়ে মশাল জ্বেলে বেঁধে দেওয়া হত। দূর থেকে মনে হত, মশালধারী সৈন্য গড় পাহারা দিচ্ছে।এই একটি উদাহরণ থেকেই বোঝা যায় বর্গিরা কতটা আতঙ্ক তৈরি করেছিল মেদিনীপুরে। আঠারো শতকের প্রথম দিকে ওড়িশা সংলগ্ন মেদিনীপুর বারবার বর্গি হানার শিকার হয়েছে। সম্পদহানি তো হয়েছেই। প্রাণহানির হিসেব নেই। ধনগররা ছিল নিম্ন শ্রেণির মারাঠা সৈন্য। অনেক মারাঠা সেন্য বাঙালি মেয়ের প্রেমে আটক হয়ে মেদিনীপুরেই থেকে গিয়েছিল ; তাই ওই অঞ্চলে নানা ধরণের পদবি পাবে যা পশ্চিমবাংলার অন্য জায়গায় পাবে না । তোমরা কেউ কি মেদিনীপুরের ? তাহলে আমার চেয়ে ভালো জানবে ।

          নাস্তিক যুবক : বাঙালিরা তখন কী করছিল ?

          সমাধিদাদা : তখনও বাঙালিদের জন্ম হয়নি । রেডিওতে অনুরোধের আসর শুরু হবার পর ওরা জন্মেছিল ।

           সমাধিবউদি প্রসঙ্গ এগিয়ে নিয়ে যান । সেই সময় আলিবর্দি খাঁ ছিলেন বাংলা-বিহার-ওড়িশার নবাব। তিনি বর্গির হাত থেকে দেশকে রক্ষা করার নানা চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্য়ন্ত কিছুই করে উঠতে পারেননি। ভাগীরথীর পশ্চিম তীরে রাজমহল থেকে মেদিনীপুর ও জলেশ্বর পর্যন্ত অঞ্চলে নবাবি শাসনের পরিবর্তে বর্গিদের প্রভাব বাড়ে। বর্গিরা আচমকা ঘোড়ায় চড়ে ‘হর হর মহাদেব’ বলে গ্রামে ঢুকে পড়ত। তারপর, লুটপাঠ, অত্যাচার করে গ্রাম ধ্বংস করে পালাত।  গঙ্গারাম শাস্ত্রীর রচনায় মরাঠাদের বীভৎসতার বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়।

‘মাঠে ঘেরিয়া বরগী দেয় তবে সাড়া।

সোনা রুপা লুঠে নেয়, আর সব ছাড়া।।

কারু হাত কাটে, কারু নাক কান।

একি চোটে কারু বধয়ে পরাণ।

ভাল ভাল স্ত্রীলোক যত ধরিয়া লইয়া যায়।

অঙ্গুষ্ঠে দড়ি বাঁধি দেয় তার গলায়।

এক জনে ছাড়ে তবে আর জনা ধরে।

তারা সবে  ত্রাহি ত্রাহি ক্রন্দন করে।।’’

         ভাস্কর পণ্ডিতের নেতৃত্বে বিশাল সেনাবাহিনী বাংলায় ঢোকে । বর্গি সৈন্যদলে মহারাষ্টীয় হিন্দু ছাড়াও অসংখ্য মুসলমান, পিণ্ডারি, আর তথাকথিত নিম্নবর্গীয় লুটেরা থাকতো।    নবাব আলিবর্দি খাঁ রঘুজি ভোঁসলের দক্ষ সেনাপতি ভাস্কর পণ্ডিতের গতিবিধির সংবাদ পেয়ে পাঁচেট থেকে ফিরে মেদিনীপুরের চলে আসেন। বর্গিদের অত্যাচার নেমে এল। বাধ্য হয়ে আলিবর্দি খাঁ বিশ্বাসঘাতকতা করে ভাস্কর পণ্ডিতকে খুন করালেন। তারপর এক বছর তিন মাস মেদিনীপুরের স্বস্তি। কিন্তু রঘুজি ভোঁসলে ভাস্কর পণ্ডিতকে খুনের বদলা নেবার জন্য প্যাঁচ কষছিল । সে  পনের হাজার সৈন্য নিয়ে কটক আক্রমণ করলে। পুরো ওড়িশা, মেদিনীপুর আর হিজলি পর্যন্ত এলাকা দখল করে ফেলল। বর্গিরা গ্রাম, নগর পুড়িয়ে, শস্যের ভাঁড়ারে আগুন লাগিয়ে এবং শেষে মানুষের নাক, কান আর বউদের মাই কেটে অত্যাচার শুরু করল, অনেকটা বাঙালি ক্যাডারদের মতন ।১৭৫১ খ্রিস্টাব্দে আলিবর্দি প্রথম রঘুজির সঙ্গে সন্ধি করে মেদিনীপুরের কিছু অংশ, যেমন জলেশ্বর, ভোগরাই, পটাশপুর, কামার্দাচৌর  নিমক মহালগুলো আর ওড়িশার রাজস্ব আদায়ের ভার ভোঁসলে মরাঠাদের উপর ছেড়ে দেন।

         সমাধিদাদা বলল,    তবে ঠাকুর-দেবতায় বর্গিদের ছিল শ্রদ্ধা। তারা কোনও দেব-মন্দির লুট করত না।  বর্গভীমা মন্দিরের কোনও অংশে তারা হাত দেয়নি। ঠিক তেমন ভাবে সাঁকরাইল থানার পিতলকাঠি বা পাথরাকাটি  গ্রামের জয়চণ্ডী মন্দিরকে তারা নতুন ভাবে তৈরি করেছিল। মন্দিরের পাশে ছিল ভুঁইয়া রাজার গড়। রাজাদের প্রচুর ধন-সম্পদ ছিল। বর্গি হাঙ্গামায় তিনি ল্যাঙটোপোঁদা হয়ে যান। বংশধারাও লোপ পায় তাঁর। ফিরে গিয়ে দেখো, এখনও ওই এলাকায় তাঁর ভাঙা-গড়ের চিহ্ন মেলে। আর আছে রানির স্নান করার কুয়ো। বেশ কিছুদিন পরে ওই এলাকার জমিদার জয়চণ্ডীর মন্দির খুঁড়ে বর্গিদের ধনসম্পদ খুঁজেছিল । মন্দিরের ভাঙা দেওয়াল নাটমন্দিরের থাম, জমিদারের লোভের নমুনা হয়ে আছে।     তারপর বলছি, দাঁড়াও, পা চুলকোচ্ছে, কোনো পোকা বোধহয় ফাটল দিয়ে ঢুকে পড়েছে । এই এক হয়েছে, কতো রাজা-রাজড়াদের যুদ্ধে হারালুম কিন্তু এই পোকাগুলোর হাত থেকে কয়েকশো বছরেও রেহাই পেলুম না ।   আচ্ছা, তোমরা কি জানো আলিবর্দী খাঁর সমাধি কোথায় ?

          সমাধিবউদি বলতে লাগল, দাস-দাসি ধরবার দল হিসেবে বর্গিরা গেলো তো এলো পিন্ডারিরা, আমাদের গেরিলা যুদ্ধ নকল করে। পিন্ডারিরা  মোগল  আর  মারাঠা সেনাদের সঙ্গে জুটেছিল আর শেষ পর্যন্ত ১৮১৭-১৮ পিন্ডারি যুদ্ধে নিকেশ হওয়ার আগে তারা নিজেরাই  ছদ্মবেশে আক্রমণ চালাতো । তারা বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করতো আর  তাদের ক্ষতিপূরণ পুরোপুরি যুদ্ধের সময় তারা যে লুটতরাজ করতো সেই সব মালকড়ি নিজেদের দখলে রাখতো ।  তারা ছিল ঘোড়সওয়ার, পদাতিক আর আংশিকভাবে সশস্ত্র, বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে ওস্তাদ আর শত্রুদের অবস্থান সম্পর্কে তাদের যে নিয়োগ করতো তাকে খবর দিতো।  ঝটপট বিশৃঙ্খলভাবে মারকাট চালিয়ে যাওয়ায় তারা ছিল এক্সপার্ট, তবে ১৭৯১ সালে শৃঙ্গেরি শরদা পিঠমে পিন্ডারি অভিযানে ওরা মারাত্মক অবমাননাকর ঘটনা ঘটায়। শিবাজি পিন্ডারি দলকে তাদের শিকারী ক্রিয়াকলাপ সাবধানে  করার জন্য বিধি জারি করেন।   পিন্ডারি নেতারা বেশিরভাগই ছিল মুসলমান  তবে তারা হিন্দুদেরও দলে রাখতো।  সন্ন্যাসী আর সাধুরা তাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য ভাড়াটে সৈন্যের কাজ করা শুরু করে পিণ্ডারিদের আটকাতো।  পিন্ডারিরা পুরো ভারতবর্ষ, দাক্ষিণাত্য আর  গুজরাট, উত্তরপ্রদেশ, বিহার আর ওড়িশার বিভিন্ন অঞ্চল জুড়ে তাণ্ডব চালিয়েছিল।  পিন্ডার শব্দটা পিন্ডা থেকে নেওয়া মনে হয়, যা মাতাল হবার মাদক । এটা একটি মারাঠি নাম যা সম্ভবত একটি “ঘাসের বান্ডিল”  বোঝায়।   পিন্ডারিদের পোশাক ছিল পাগড়ি আর ল্যাঙোট,  মানে হাফল্যাঙটো । তারা সঙ্গে রাখতো পুরোনো মডেলের তালোয়ার , পায়ে চটি । তারা যে কোনও প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক সাম্প্রদায়িক আধিপত্য বা রাজ্যের সঙ্গে  চুক্তি করতো আর লুটে আনা দাস-দাসিদের তাদের কাছে বিক্রি করতো । পিন্ডারিরা প্রায়শই অন্যের হয়ে মারকাট করতো আর নৃশংসতায় ছিল বেপরোয়া, অনেকটা এখনকার ক্যাডারদের মতন । 

        নব্যনাস্তিক যুবতী : বাঙালিরা কী করছিল ?

       সমাধিবউদি : বাঙালিদের তখন জন্ম হয়নি । লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের পর জন্ম হয়েছিল।

          সমাধিদাদা বলতে লাগল, আমার যুদ্ধকৌশলের আগে কিছু নোংরা পদ্ধতিও ছিল এলাকা দখলের আর সম্পদ সংগ্রহের, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ঠগ সম্প্রদায় । তবে তারা কাউকে দাস হিসেবে বিক্রি করতো না, খুন করে ফেলতো ।ঠগ একটা সংস্কৃত শব্দ যা থেকে ঠগি শব্দটা উদ্ভূত। শাব্দিকভাবে এর অর্থ ধোঁকাবাজ, প্রতারক। তোমাদের অভিধানে ঠগি বলতে বিশেষ শ্রেণির এক দস্যুদলকে বোঝায় যারা পথিকের গলায় রুমাল বা কাপড় জড়িয়ে খুন করতো । ঠগীরা ছিল ভারতবর্ষের এক বিশেষ শ্রেণির খুনি সম্প্রদায়। এদের মতন নিষ্ঠুর আর নিপুণ খুনির দল পৃথিবীতে শুধু নয়, ইতিহাসেই বিরল।  জিয়াউদ্দীন বারানির লেখা ‘ফিরোজ শাহর ইতিহাস’ বইতে ঠগিদের কথা প্রথম জানা যায়, বইটা পেলে পড়ে দেখতে পারো, বেশ ইনটারেস্টিঙ। এই ঠগিরা উত্তরভারতে তাদের কাজকারবার শুরু করে। এরপর বহু শতক ধরে বংশ পরম্পরায় তাদের এই কর্মকান্ড চালাতে থাকে। এরা ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়াতো, পথে যাত্রীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতো। তারপর সময়-সুযোগ বুঝে যাত্রীদের মেরে ফেলে সবকিছু লুট করতো। ১৭ আর ১৮ শতকের প্রথম দিকে ভারতের পথিকদের জন্য মূর্তিমান এক আতঙ্কের নাম এই ঠগি। কিন্তু বাংলায় তারা ঢোকে ১২৯০ সালের দিকে। ১২৯০ এর সুলতানী শাসনের সময় প্রায় হাজার খানেক ঠগ ধরা পড়ে । কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে সুলতান তাদের কোনো রকম সাজা না দিয়ে দিল্লীতে ফিরে না আসার শর্তে, অনেকটা আপ্যায়নের সাথে নৌকায় তুলে দিয়ে ভাটির দেশে- মানে তোমাদের  বাংলায় পাঠিয়ে দেয়। আর তারপর থেকেই বাংলার জলে-স্থলে, মাঠে-ঘাটে ছড়িয়ে পড়ে এই খুনির দল। বাংলায় ঠগিদের ইতিহাসের শুরু তখন থেকেই। শুনেছি আজকাল নাকি দুই বাংলায় রাজনৈতিক ঠগির দল দেখা দিয়েছে । কথাটা কি সত্যি ?

             সমাধিদাদা বলে চলে, সেই ঠগিরা নানা সাঙ্কেতিক ভাষায় নিজেদের মধ্যে কথা আদান প্রদান করতো। যেমন- ‘বাসন মেজে আনার’ কথা বলার মধ্য দিয়ে সর্দার তার এক সাঙেতকে কবর তৈরি করার নির্দেশ দিত। ‘ঝিরনী’ শব্দে খুন করার তোড়জোড় আর ‘তামাকু লাও’ শব্দের  মাধ্যমে হত্যার আদেশ দেয়া হতো। এই নির্দেশ পাওয়া মাত্রই মুহূর্তের মধ্যে ফাঁস জড়ানো হতো শিকারের গলায়।    কবর তৈরি করারে দায়িত্ব যার তাকে বলা হতো ‘বিয়াল’। শিকারকে যে ধরে রাখবে তাকে বলা হতো ‘চামোচি’। শিকার যাতে বাধা দিতে না পারে তার জন্য হাত আটকে রাখার দায়িত্ব ‘চুমোসিয়া’র। ‘চুমিয়া’ শিকারের পায়ে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দেবে। ‘ভোজারা’ মৃতদেহগুলো কবরে নিয়ে যাবে । ‘কুথাওয়া’র দায়িত্ব হলো দেহগুলোর হাঁটু ভেঙে থুতনির সঙ্গে লাগিয়ে ভাঁজ করে কবরে দেওয়া। মৃতদেহ পাহারা দেয়া ও বিপদের গন্ধ পেলে জানান দেয়ার দায়িত্বপ্রাপ্তদের বলা হতো ‘ফুরকদেনা’। আর হত্যাকাণ্ডের জায়গাটা সাফসুতরো করে ফেলার দায়িত্ব ছিল ‘ফুরজানা’দের। সদ্য মৃত মানুষদের কবরের ওপর বসত ঠগীদের অমৃতের ভোজ। সে ভোজ আর কিছু নয়, গুড়ের ভোজ। একলা পথিক পেলেই সাদরে তাকে দলের সাথে ভ্রমণের আমন্ত্রণ জানাত। তাদের মতে, যে একবার এই গুড় খাবে, সে ঠগি হয়ে যাবে। ঠগিদের মধ্যে হিন্দু-মুসলমান-শিখ সব ধর্মের লোকই ছিল, যেমন এখনকার রাজনৈতিক দলগুলোতে।      

             সমাধিবউদি এবার কথা আরম্ভ করল ।দাস প্রথার চেয়ে আরও ভয়ানক শোষণের কথা বলি, তা হল নীলচাষ আর নীলকর সাহেবদের অত্যাচার ।লুই বোনারড  নামের একজন ফরাসি বণিকের মাধ্যমে এদেশে আধুনিক পদ্ধতিতে নীলচাষ ও এর ব্যবহার প্রচলন ঘটে| আঠারো শতকের শেষ দিকে  ইংল্যান্ডে শিল্প বিপ্লবের ফলে কাপড় কারখানায়  নীল এর চাহিদা শতগুণ বেড়ে যায়|  ফলে ওই সময়ে নীল চাষের ব্যবসা অত্যন্ত লাভজনক হয়ে ওঠে|  বাঙালি জমিদার আর সুদখোররা  কারবার খুলে বসে আর নদীয়া, যশোর, খুলনা, চব্বিশ পরগনা, বগুড়া, রাজশাহী, মালদা, পাবনা, ফরিদপুর, ময়মনসিংহ, বরিশাল  জেলায় অসংখ্য নীল কুঠি গড়ে ওঠে|  ফরাসি, ডাচ, পর্তুগিজ, দিনেমার, দেশের ধনিক গোষ্ঠী দলে দলে বাংলাদেশ পাড়ি জমায়|   ইংরেজরা  নীল উৎপাদনের জন্য বাংলায়  শোষণ প্রক্রিয়া চালু করেছিল ; জবরদস্তি   চুক্তির প্রচলন করেছিল|  এই  চুক্তির পরিণতিতে কৃষকরা হয়েছিল ভূমিদাস|১৮১০ থেকে ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে পর্যন্ত বাংলায় নীল চাষ উন্নতির চরম শিখরে উঠেছিল|  কৃষকরা বিদ্রোহ ঘোষণা করলো । লাভের পরিমাণ কমে গেলে নীলকররা কারখানাগুলো বিক্রি করতে বাধ্য হয়| ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দে  নীলের উৎপাদন কমে যাওয়ায়  নীলকররা এই ব্যবসা বন্ধ করে দেয়| 

           সমাধিদাদা বলল, আরে, তোমরা আমার গল্প তো শুনছোই না । আমি জন্মেছিলুম আবিসিনিয়ার হারার নামে এক জংলি গ্রামে, ১৫৪৮ সালে, আদাল সুলতানদের রাজ্যে । আমার মতনই এক অস্হির আত্মা ইউরোপে নরকে এক ঋতু কাটিয়ে হারারেতে এসেছিল, তার নাম জঁ নিকোলা আর্তুর র‍্যাঁবো, কবি, সেও দাস ব্যাবসা আর বন্দুকের চোরাচালান করত সুলতানের জন্য, অবশ্য আমার জন্মের অনেক পরে । যাই হোক, তোমরা ফিরে গিয়ে সরকারকে বোলো যাতে আমার সৌধকে সারিয়ে রঙ করানো হয় । ওই আল-সুলতান আল-আজম ওয়াল খাকান আল-মুকাররম আবুল মুজাফফর মুহি উদ-দিন মুহাম্মদ আলমগিরের নকল তাজমহলকে রাঙিয়ে রাখার মানে হয় না । আমার দেয়া নাম পালটে প্রথমে আমার ছেলে ফতেহ খান শহরের নাম দিয়েছিল ফতেহপুর, তারপর খেঁকুরে মোগল  নিজের নামে এই জায়গাটা করে ফেললে আওরঙ্গাবাদ । গুজরাট থেকে সিদ্দিরা দলে-দলে আমার সৌধ দেখতে আসে ;ওরা এদেশের মানুষ হয়ে গেছে বটে কিন্তু ওদের পূর্বপুরুষরাও দাস হয়ে আফরিকা থেকে এসেছিল। ওদের সাহস নিয়ে বেশ মজার গল্প আছে, তা পরে বলবো । এখন এটুকু বলি যে, আই পি এল ক্রিকেটারদের মতন হাবশিদেরও নিলাম হতো, আমারও কয়েকবার হাতবদল হয়েছিল । ইবন বতুতার বর্ণনায় পাওয়া যায় মাত্র এক দিরহাম দিয়ে তখন বাংলাদেশ আটটি স্বাস্থবান মুরগী পাওয়া যেত, এছাড়াও এক দিরহামে পনেরোটা কবুতর, দুই দিরহামে একটি ভেড়া এবং এক স্বর্নমূদ্রারও কম মূল্যে দাস কিনতে পাওয়া যেত।ভালো কালো যুবতীদের দাম ফর্সা যুবতীদের চেয়ে অনেকসময়ে বেশি হতো, কেননা যারা যুবতী কিনতো তারা পোশাক খুলিয়ে পুরো বডি দেখে নিতো ।

           সমাধিদাদা বলতে লাগলো, জানো না বোধহয়, বাঙালিদেরও আমরা কালা আদমিরা এককালে শাসন করেছি । তোমাদের বঙ্গদেশে চতুর্দশ শতাব্দী থেকে সুলতানি শাসন ছিল, তখনই আমরা কালা আদমিরা কিছুকালের জন্য ক্ষমতা দখল করেছিলুম | সেনাবাহিনীতে বেশিরভাগ ছিল কালা পালোয়ান | সেখান থেকে তারা ক্রমশ প্রশাসনিক কর্তা হয়ে উঠল | তবে সবাইকে টেক্কা দিল একজন চতুর কালা আদমি, বরবক শাহজাদা |  বাংলার শাসক জালালউদ্দিন ফতে শাহ-র সময়ে প্রাসাদের মূল রক্ষী ছিল লোকটা| পরে সেনাবিদ্রোহ করে ছিনিয়ে নিলে ক্ষমতা | বরবক ছিল বাংলার প্রথম নিগ্রো  শাসক |  শুরু করেছিলেন নিগ্রো শাসক বংশ | তবে এই শাসন বেশিদিন স্থায়ী হয়নি | নিগ্রোদের সংখ্যা ছিল আট হাজার।  বরবক শাহর ছোট ভাই হুসেইন জালালউদ্দিন ফতেহ শাহ উপাধি নিয়ে সিংহাসনে চড়ে বসে।  বাংলায় নিগ্রো শাসনকাল ছিল মাত্র ছয় বছর। এ সময় এ দেশের ইতিহাস ছিল অন্যায়, অবিচার, বিদ্রোহ, ষড়যন্ত্র আর হতাশার।  চারজন নিগ্রো সুলতানের তিনজনকে খুন করা হয়।   মালদাতে গৌড়ে আছে ফিরোজ মিনারের মতো  নিদর্শন, যা তৈরি হয়েছিল নিগ্রো রাজাদের আমলে | অনেক বাঙালি নিগ্রোদর মতন কালো কেন জানো ? নিগ্রোরা বাঙালিদের বিয়ে করে মিশে গেছে জনজীবনের মূলস্রোতে | বর্তমানে ভারতে প্রায় ৫০ হাজার আফ্রিকান বংশোদ্ভূত আছে | তবে তারা এখন স্হানীয় ভাষা পোশাক-আচার-আচরণে এতটাই ভারতীয়, যে চেহারায় কিছু বৈশিষ্ট্য ছাড়া বোঝার উপায় নেই যে এঁদের নিগ্রো পূর্বপুরুষরা কয়েকশো বছর আগে আফ্রিকা থেকে ভারতে এসেছিলেন | আমার মতন ওরাও প্রমাণ করে দেখিয়েছিল যে নিগ্রোরাও আফরিকা থেকে গিয়ে অন্য দেশে শাসক হতে পারে ।         

         সমাধিদাদা বলে চলল, তোমরা সর্বপ্রাণবাদি নাকি কোনো ধর্মানুসারী তা জানি না, কিন্তু কাছেই আছে জারজারি জারবকশ বা শাহ মুনতাজাবউদ্দিন চিশতির মজার, ভারতীয় উপমহাদেশের সমস্ত সূফিদের মধ্যে সবচেয়ে নামকরা  ছিলেন। তাকে চোদ্দ শতকের প্রথম দিকে দিল্লির নিজামুদ্দিন আউলিয়া এই অঞ্চলে পাঠিয়ে ছিলেন । উনি সাতশো শিষ্য নিয়ে আওরঙ্গবাদে এসেছিলেন আর খুলদাবাদে  কুয়োর কাছে একজন হিন্দু রাজকন্যাকে ধর্মান্তরিত করেছিলেন বলে জানা যায়। জায়গাটাকে এখন “সোহান বাওলি” বা “ভাল লাগার জায়গা” বলা হয়। সেই রাজকন্যাকে খুলদাবাদে সাধু সমাধির কাছে সমাধিস্থ করা হয়েছিল। জারিজারি বকশের সমাধি আমার সমাধি আর শহরের উত্তরগেটের মাঝামাঝি। খুলদাবাদের দরগায় উরস এর জন্য প্রতি বছর হাজার হাজার তীর্থযাত্রী আসে । তাছাড়া   শায়খ বুরহানউদ্দীন  চিশতী আর শায়খ জয়ন-উদ-দ্বীন শিরাজীর সমাধি আছে এই শহরে ।  দরবেশদের কাছে শহরটা পবিত্র আর আধ্যাত্মিক, অথচ আওরঙ্গজেব ওদের পছন্দ করত না ।   

           সমাধিবউদি বলল, তোমরা জানো নিশ্চয়ই যে আজকাল সালাফি পাকিস্তানিরা সুফি, দরবেশ, কলন্দরদের সমাধিগুলো বোমা মরে উড়িয়ে দিচ্ছে । ইরাকে আইসিসরা একই ব্যাপার করেছিল, মিউজিয়ামের সংগ্রহকে ওরা হাতুড়ি পিটিয়ে ভাঙচুর করেছে। সম্প্রতি পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমের নওশেরা রাজ্যের একটি সুফি সমাধিস্থলে তালেবান হামলা আবারো প্রমাণ করলো এ সত্য৷ হ্যাঁ, বহুত্ববাদী ইসলাম তালেবানের জন্য শুধু অগ্রহণযোগ্যই নয়, তত্ত্ব হিসেবেও হুমকি৷                    

         সমাধিদাদা,যিনি মোগল সম্রাট আওরঙজেবের কবরের কাছেই বিখ্যাত ভদ্র মারুতি মন্দির রয়েছে, ইচ্ছে করলে তোমরা দেখতে যেতে পারো । লোকেরা  আশেপাশের জায়গা থেকে  হনুমান জয়ন্তী আর  মারাঠি ক্যালেন্ডার মাসে শনিবারের “শ্রাবণ” পুজো করতে আসে । সেই ফাঁকে আমার সঙ্গেও দেখা করে যায় । ভেবে দেখেছো কি, যে একই জেলার মাটির তলায় আমি আর আমার মোগল শত্রুর পরিবারের লোক শুয়ে ? মোগল পরিবারের সম্রাটটাকে যদিও আজকাল পর্যটকরা গালমন্দ করে । সম্রাট বলে কি আমার দেয়া শহরের নাম পালটে নিজের নামে করে নেবে ! সম্রাট লোকটা সুফি, দরবেশ, চিশতিদের পছন্দ করতো না, এখন মাটির তলায় শুয়ে বুঝতে পারছে কাণ্ডকারখানা । সে যাকগে । আমার জীবনের গল্পটা শোনো বরং ।    আমি মারা গিয়েছিলুম ১৩ই মে ১৬২৬ সালে । আবিসিনিয়া থেকে, আমার মতন যারা কেনা গোলাম হয়ে এদেশে দাসত্বের জন্য এসেছিল, তাদের বলতো আবসি, কবে যেন তা হয়ে গেল হাবশি । আমার তো কোনও ধর্ম ছিল না, আমরা ছিলুম অ্যানিমিস্ট বা সর্বপ্রাণবাদী । প্রকৃতির সব কিছুকেই সপ্রাণ মনে করা, সব ক্রিয়াকলাপের পেছনে প্রাণের অস্তিত্বকে অনুভব করাই হলও সর্বপ্রাণবাদ। তোমরা তো জানো সাম্প্রতিককালের উত্তর-আধুনিক নৃবিজ্ঞানীরা ক্রমশ সর্বপ্রাণবাদের ধারণার প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছেন। আধুনিকতাবাদ ছিল রেনে দেকার্তের বিষয়-বস্তু দ্বৈতবাদ দ্বারা চিহ্নিত  যা সাবজেকটিভকে অবজেকটিভ থেকে আর প্রকৃতিকে আর সংস্কৃতি থেকে আলাদা মনে করতো । আধুনিকতার দৃষ্টিতে সর্বপ্রাণবাদ  হ’ল বৈজ্ঞানিকতার বিপরীত, এবং তাই  নৃতাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞদের অনেকে একে সহজাতভাবে অবৈধ তর্ক বলে মনে করেন । কিন্তু উত্তর-আধুনিক নৃবিজ্ঞানীরা আধুনিকতাবাদী অনুমানগুলি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং তাত্ত্বিক প্রস্তাব দিয়েছেন যে সম্পূর্ণ মানবসমাজ তাদের চারপাশের বিশ্বকে “অ্যানিমেটেড” করে চলেছে। এই সর্বপ্রাণবাদ, আদিম চিন্তাধারার একটি অবশিষ্টাংশের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ । আরও সুনির্দিষ্টভাবে বলা যায় যে, আধুনিকতার “অ্যানিমিজম” মানবতার “পেশাদার উপগোষ্ঠী” দ্বারা চিহ্নিত করা হয়েছে, যেমন আমাদের ক্রিয়াকলাপের একটি সীমিত ক্ষেত্রের মধ্যে বিশ্বকে একটি বিচ্ছিন্ন সত্তা হিসাবে বিবেচনা করার প্রয়াস । মানুষ উল্লিখিত উদ্দেশ্য জগতের পোষা প্রাণী, গাড়ি বা খেলনার মতো উপাদানগুলির সাথে ব্যক্তিগত সম্পর্ক তৈরি করে চলেছে, যা সাবজেক্ট হিসাবে স্বীকৃত। সুতরাং এই সত্ত্বাগুলি আধুনিকতাবাদীদের দ্বারা অনুধাবিত জড় বস্তু হিসাবে নয়, বরং ব্যক্তিমানুষের সঙ্গে যোগাযোগের বস্তু হিসাবে পরিচিত । এই চিন্তা-পদ্ধতির লক্ষ্য হলো আধুনিকতাবাদীদের ধারণাটিকে এড়ানো,  যাঁরা মনে করেন পরিবেশ ব্যাপারটা মনুষ্যজগৎ থেকে পৃথক একটি জড় বিশ্ব নিয়ে গঠিত আর ব্যক্তির দেহ এবং আত্মা আলাদা তা দ্বৈতবাদীভাবে  আধুনিকতাবাদীদের ধারণায় রয়ে গেছে । সর্বপ্রাণবাদ ভাবনাটা ধর্মের আর নৃবিজ্ঞানের উত্তর-আধুনিক প্রক্রিয়াকে, বিশেষভাবে সংগঠিত ধর্মের আগের বিশ্বাস প্রক্রিয়াকে, গুরুত্ব দেয়। যদিও প্রতিটি সংস্কৃতির আছে তাদের নিজস্ব পুরাণ এবং রীতিনীতি, “আধ্যাত্মিক” বা “অতিপ্রাকৃতিক” দিক থেকে উত্তর-আধুনিক ভাবনার ভিত্তিগত সুত্র ধরে “সর্বপ্রাণবাদ”কে সবচেয়ে জরুরি হিসাবে মনে  করা হয়।  অ্যানিমিজম একটি দার্শনিক, ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক বিশ্বাস যে, আত্মা শুধুমাত্র মানুষের মধ্যেই নয় বরং সমস্ত বন্য প্রাণী, উদ্ভিদ, শিলা, প্রাকৃতিক ঘটনা (বিদ্যুৎ, বৃষ্টিপাত ইত্যাদি) সব কিছুতে থাকে । সংগঠিত ধর্ম মানুষের অনেক ক্ষতি করেছে, তা আমি কবরের ভেতরে শুয়ে বুঝতে পারি ।

          যুবতী : মলয় রায়চৌধুরীর কাছে শুনেছি উত্তরাধুনিক সর্বপ্রাণবাদের কথা ।

           যুবক : এই মলয় রায়চৌধুরী লোকটা বুড়ো বয়সেও কেমন করে সুন্দরী যুবতীদের টানে তা বুঝতে পারি ।

         সমাধিদাদা জিগ্যেস করল, উনি কে ? উনি যদি মেশার সুযোগ পেতেন তাহলে আমাদের মাহা উপজাতির মেয়েদের নিশ্চয়ই আকর্ষণ করতেন ।তোমরা কী করেই বা জানবে যে, আমাদের মায়া উপজাতির পুরুষরা যোদ্ধা হিসেবে বিখ্যাত ছিল আর মেয়েরা তাদের বুক-পাছার কারণে ।  আমার বড়ো বোনকে কিনতে চেয়েছিল পর্তুগিজরা, মা বিক্রি করেনি তখন, বলেছিল “ওর জন্য পাঁচ মোহর দিতে হবে”, আমার বোনকে আরবদের সামনে ল্যাংটো করে দেখিয়েছিল, তখনই ওর মাই চকচকে, কুঁচকিতে পশম গজায়নি, কুমারী । কয়েক বছর পরে  সত্যিই ওকে একজন নিয়ে গিয়েছিল পাঁচ মোহরের বদলে । কুমারী হাবশি মেয়েদের এদেশের বাদশারা কিনে বাঁদি করে রাখতো, হাবশি মেয়েরা শোবার সময়ে তুর্কি, মোঙ্গোল, ইরানি মেয়েদের মতন ঢঙ করতো না, জাপটে চুষে খেতো বাদশা আর রাজাদের । 

           সমাধিবউদি বলল, ওর নাম বলি তোমাদের । ওর নাম অম্বর মালিক ; সমাধিদাদা নয় । আরেকজন মালিক ছিল,  সে হলো, বখতিয়ার খলজি । ‘মালিক গাজি ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজি’ নামেও ডাকা হয়, সে লোকটা ছিল খলজি উপজাতির একজন, যারা তুর্কিস্থান থেকে আফগানিস্থানে এসে বসবাস আরম্ভ করেছিল।  খলজি উপজাতি উত্তর-পূর্বের প্রায় সবকটা দখল-যুদ্ধে যোগদানকারী সেনাবাহিনীর অধিপতিদের কাজে নিযুক্ত ছিল। বখতিয়ার খিলজির সেপাইরা বিহার-বাঙলা আক্রমণ করে লুটপাট, বাড়ি পোড়ানো, নারীধর্ষণ এমন সব কুকর্ম চালিয়ে অনেক পরিবারকে মুসলমান বানিয়েছিল, যা টিক্কা-পাকিস্তানির খান সেনারাও পারেনি।আসলে বখতিয়ার খিলজির সেনাদের বেশিরভাগই ছিল দাস, মানে, কেনা গোলাম, বান্দা। তারা সুযোগ ছাড়বে কেন । বখতিয়ার খিলজির মারকাটের দরুন এদেশ থেকে বৌদ্ধধর্ম লোপাট হয়ে গেছে । তার বীরত্বের গুণগান করে বাংলাদেশের শায়র-এ-আজম আল মাহমুদ একটা কবিতা লিখেছিলেন, ‘বখতিয়ারের ঘোড়া’ নামে, আমার সৌধে রয়েছে কবিতাটা, তোমাদের পড়ে শোনাচ্ছি, তোমরা এই ভাষায় কথা বলছিলে বলে বুঝতে পারবে —

মাঝে মাঝে হৃদয় যুদ্ধের জন্য হাহাকার করে ওঠে

মনে হয় রক্তই সমাধান, বারুদই অন্তিম তৃপ্তি;

আমি তখন স্বপ্নের ভেতর জেহাদ, জেহাদ বলে জেগে উঠি।

জেগেই দেখি কৈশোর আমাকে ঘিরে ধরেছে।

যেন বালিশে মাথা রাখতে চায় না এ বালক,

যেন ফুৎকারে উড়িয়ে দেবে মশারি,

মাতৃস্তনের পাশে দু’চোখ কচলে উঠে দাঁড়াবে এখুনি;

বাইরে তার ঘোড়া অস্থির, বাতাসে কেশর কাঁপছে।

আর সময়ের গতির ওপর লাফিয়ে উঠেছে সে।

না, এখনও সে শিশু। মা তাকে ছেলে ভোলানো ছড়া শোনায়।

বলে, বালিশে মাথা রাখো তো বেটা। শোনো

বখতিয়ারের ঘোড়া আসছে।

আসছে আমাদের সতেরো সোয়ারি

হাতে নাংগা তলোয়ার।

মায়ের ছড়াগানে কৌতূহলী কানপাতে বালিশে

নিজের দিলের শব্দ বালিশের সিনার ভিতর।

সে ভাবে সে শুনতে পাচ্ছে ঘোড়দৌড়। বলে, কে মা বখতিয়ার?

আমি বখতিয়ারের ঘোড়া দেখবো।

মা পাখা ঘোরাতে ঘোরাতে হাসেন,

আল্লার সেপাই তিনি, দুঃখীদের রাজা।

যেখানে আজান দিতে ভয় পান মোমেনেরা,

আর মানুষ করে মানুষের পূজা,

সেখানেই আসেন তিনি। খিলজীদের শাদা ঘোড়ার সোয়ারি।

দ্যাখো দ্যাখো জালিম পালায় খিড়কি দিয়ে

দ্যাখো, দ্যাখো।

মায়ের কেচ্ছায় ঘুমিয়ে পড়ে বালক

তুলোর ভেতর অশ্বখুরের শব্দে স্বপ্ন তার

নিশেন ওড়ায়।

কোথায় সে বালক?

আজ আবার হৃদয়ে কেবল যুদ্ধের দামামা

মনে হয় রক্তেই ফয়সালা।

বারুদই বিচারক। আর

স্বপ্নের ভেতর জেহাদ জেহাদ বলে জেগে ওঠা।

           আরেকজন বাগি শায়র, তার নাম মলয় রায়চৌধুরী, সে ‘বখতিয়ারের ঘোড়ার  বংশধর’ নামে একটা কবিতা লিখেছিল, তার কবিতাও আছে আমার সৌধে, পড়ে শোনাচ্ছি তোমাদের :-

বিহারশরিফে পৌঁছে দেখি বাস নেই ট্যাক্সি নেই

অগত্যা এক্কাগাড়িঅলাকে বলি

আরে টাঙ্গা, যাবি নাকি ? 

তোর ঘোড়াকে খেতে দিস না ? এমন হাড়গিলে ? নাম কী তোর ?

আমার নাম মিনহাজউদ্দিন শিরাজ হুজুর, বলল এক্কাগাড়িঅলা ।

হাত দুটো লম্বাটে,  এরকম বেঁটে কেন তুই ?

ছোটাস কেমন করে গাড়ি ?

হুজুর জমানা পহেলে বখতিয়ার খলজি নামে তুর্কি এক লুটেরার সেনারা

এ-তল্লাটে এসে ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে মেয়ে-বউদের ইজ্জত লুটেছিল

আমি সেই তাদের ঔরসের পয়দায়িশ–

আর হুজুর এটা ঘোড়া নয়, এটা তো খচ্চর

বখতিয়ারের ঘোড়ারাও এখানকার ঘোড়িদের ইজ্জত লুটেছিল

এই বেজন্মা খচ্চর তাদের ঔরসের পয়দায়িশ

ওরা সব কালা অকছর ভঁয়েস বরাবর ছিল

ন্যাড়ামাথা পড়ুয়ার দল আর হাজার-হাজার বই দেখে

নালান্দায় আগুন লাগিয়ে নেসতানাবুদ করে দিয়েছিল–

চলুন, বসুন, বলুন কোথায় যাবেন…

          ক্রীতদাস-ক্রিতদাসীরাও কবিতা লিখে গেছেন, যেমন ফিলিস হুইটলে নামের এক কৃষ্ণাঙ্গী । ১৭৭৮ সালে এই কৃষ্ণাঙ্গ ক্রীতদাসী কবি আইনত দাসত্ব থেকে মুক্তিলাভ করেন। গৃহকর্তা জন হুইটলে ব্যক্তিগত উইলে তাঁর মুক্তির কথা উল্লেখ করেন। ১৭৮৪ সালে ফিলিসের স্বামী জন পিটার্স যখন গলা পর্যন্ত ঋণের দায়ে জেলে যান, অসুস্থ শিশু-সন্তানকে নিয়ে ফিলিস তখন ঘোর সংকটে। ৫ ডিসেম্বর ১৭৮৪ সালে মাত্র ৩১ বছর বয়সে ফিলিস মারা যান। তাঁর মৃত্যুর সাড়ে তিন ঘণ্টা পর তাঁর শিশুপুত্রটিও মারা যায়। ক্রীতদাসীর সঠিক জন্মতারিখ কে মনে রাখে? তবে অন্বেষক-গবেষকবৃন্দ মনে করেন সেনেগালের কোনও অঞ্চলে সেনেগাম্বিয়ায় ৮ মে ১৭৫৩ সালে এই আশ্চর্য প্রতিভাময়ী কৃষ্ণাঙ্গ কবির জন্ম হয়েছিল। প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকান  কবি ও লেখক জুপিটার হ্যামনও ছিলেন একজন ক্রীতদাস। তিনিও তাঁর কবিতায় ফিলিস হুইটলের কবিতার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন।মাত্র সাত বছর বয়সে তাকে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিল দাসী-হাটে। তারপর পশ্চিম আফ্রিকার সেনেগাল থেকে সে চালান হয়ে যায় উত্তর আমেরিকায়। ১১ জুলাই, ১৭৬১ সালে ক্রীতদাস-ভর্তি একটি জাহাজে মেয়েটিকে নিয়ে যাওয়া হয় ব্রিটিশ-শাসিত বস্টনে। সেই জাহাজের মালিক টিমথি ফিচ, আর নাবিক ছিলেন পিটার গুইন। মা বাবা তার কিছু একটা নাম রেখেছিল হয়ত। কিন্তু দাসী-হাটের কালো বাতাসে কখন যে হারিয়ে গেছে সেই নাম। নতুন করে তার নাম রাখা হল ক্রীতদাস পারাপারের জাহাজটির নামে — ফিলিস। বস্টনের ধনী ব্যবসায়ী জন হুইটলে তাঁর স্ত্রী সুশান্নার সেবা-দাসী হিসেবে মেয়েটিকে ক্রয় করেছিলেন। প্রথা অনুসারে ফিলিসের নামের সঙ্গে যুক্ত হল হুইটলে পরিবারের পদবী। ক্রীতদাসী পেল নতুন নাম — ফিলিস হুইটলে। কিন্তু এই পরিবারে আশ্রয় পেয়ে নবজন্ম হল তার।বারো বছর বয়সে গৃহকর্ত্রী সুশান্নার বইপত্র পরিষ্কার করে গুছিয়ে রাখতে গিয়ে কী যে হল তার। একটা বই থেকে একটা চিঠির কিছু অংশ দেখে দেখে অবিকল দেয়ালের গায়ে লিখতে থাকে সে। না, কোনও পেনসিল বা কলম দিয়ে নয়, এক টুকরো কাঠকয়লা দিয়ে। বাড়ির অন্য এক দাসী এই খবর পৌঁছে দেয় গৃহকর্ত্রীর কানে। কিন্তু ঘরের দেয়াল নোংরা করার অপরাধে মেয়েটিকে শাস্তি দেওয়া তো দূরের কথা, সেদিন থেকে তাকে গৃহকর্ম থেকে অব্যাহতি দিয়ে দূরদর্শী সুশান্না ফিলিসের লেখাপড়া শেখার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেন। অতি দ্রুত সে আয়ত্ত করে বাইবেলের পাশাপাশি গ্রীক ও ল্যাটিন ভাষা। ভাষা ও সাহিত্যে তার বিস্ময়কর উত্সাহ লক্ষ করে তাকে উপযুক্ত শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় আলেকজান্ডার পোপ, মিল্টন, হোমার, হোরেস এবং ভার্জিলের কবিতার সঙ্গে। এরপর ফিলিসের কাব্য-প্রতিভার চরম বিকাশ ঘটে।  ফিলিস মনে প্রাণে বিশ্বাস করতেন, কবিতার শক্তি অপরিমেয়। কবিতা সমাজ ও রাষ্ট্রের উপর চরম প্রভাব বিস্তার করতে পারে। ব্যক্তিগত জীবনের কথা তিনি যথাসম্ভব কম বলেছেন। তবে একটি কবিতায় সার্বিকভাবে ক্রীতদাসদের জীবনের ওপর আলো ফেলেছেন তিনি, যেখানে প্রবল নৈরাশ্যের মধ্যেও ফুটে উঠেছে একটা আশাবাদিতার সুর, একটা উত্তরণের ইশারা ও প্রত্যয় । “আন বিইং ব্রট ফ্রম আফরিকা টু অ্যামিরিকা’ কবিতায় উনি লিখেছেন, পড়ে শোনাচ্ছি তোমাদের :

Twas mercy brought me from my Pagan land,

Taught my benighted soul to understand

That there’s a God, that there’s a Saviour too:

Once I redemption neither sought nor knew.

Some view our sable race with scornful eye,

“Their colour is a diabolic dye.”

Remember, Christians, Negroes, black as Cain,

May be refin’d, and join the’ angelic train.

          মালিক অম্বর বলতে লাগল, আমার আগেও দাসরা ইতিহাসের কবরে নিজেদের নাম রেখে গেছে । যেমন মুহম্মদ ঘুরী দিল্লিতে প্রায় ৩২ বছর রাজত্ব করেন। একমাত্র মেয়ে ছাড়া তার আর কোনো সন্তান ছিল না। তিনি তার ক্রীতদাসদের নিজের আত্মীয়ের মতো ভালোবাসতেন। কাজেই মুহম্মদ ঘুরীর মৃত্যুর পর তার ক্রীতদাস ও সুযোগ্য সেনাপতি কুতুবউদ্দীন আইবক দিল্লির সিংহাসনে  বসেন। দিল্লির সিংহাসনে তিনিই প্রথম সুলতান। কুতুবউদ্দীন আইবক মুহম্মদ ঘুরীর ক্রীতদাস হিসেবে তার কর্মজীবন শুরু করেন। এ জন্য তার প্রতিষ্ঠিত রাজবংশ ইতিহাসে ‘দাস বংশ’ নামে পরিচিত। অনেকে আবার লজ্জায় একে পাঠান বা আফগান বংশের ইতিহাস বলে । আসলে ওরা ছিল মামলুক, মানে নিগ্রো । ‘মামলুক’ শব্দের অর্থ দাস।     কুতুবুদ্দিন মধ্য এশিয়ার কোথাও জন্মেছিল । তার বাড়ির লোকেরা তাকে গোলাম হিসেবে বিক্রি করে দিয়েছিল।  তোমরা ভেবে দ্যাখো, কুতুবুদ্দিন আইবক ছিল গোলাম, সে যাকে সুলতান করে গেল, মানে ইলতুতমিশ, সেও ছিল গোলাম বা চাকর, তার মেয়ে সুলতানা রাজিয়া  ভারতবর্ষের প্রথম মহিলা শাসক, সে ছিল চাকরের মেয়ে । যখনই ইলতুতমিশকে রাজধানী ছাড়তে হত, তিনি তখন তার কন্যা রাজিয়াকে শাসনভার বুঝিয়ে দিয়ে যেতেন।সুলতান ইলতুতমিশের মৃত্যুর পর তার আরেক ছেলে রোকনুদ্দিন ফিরোজ দিল্লির শাসন কেড়ে নেয় আর প্রায় সাত মাসের মত শাসন করে। ১২৩৬ সালে দিল্লির পাবলিকের  সাহায্য নিয়ে রাজিয়া সুলতানা তার ভাইকে তাড়িয়ে সিংহাসনে বসে ।  নারী হওয়ার কারণে আর পর্দাপ্রথার বিরোধী হয়ে শাসনকাজ পরিচালনা করার জন্যে উলেমা আর প্রভাবশালীদের চটিয়েছিলেন। ওনাকে বিষ খাইয়ে মারা হয়েছিল ।রাজিয়া সুলতানার সমাধি  দিল্লির বুলবুল-ই-খানা মহল্লায় আছে,  অত্যন্ত অবহেলিত ও অপরিচ্ছন্ন অবস্থায় । আমার সমাধির তুলনায় বেশ নোংরা আর ভাঙাচোরা। একজন রানির সমাধির কিনা এই অবস্হা ।     রাজিয়া সুলতানা যে যুবকটিকে ভালোবাসতেন, জামালুদ্দিন ইয়াকুত, সেও ছিল একজন নিগ্রো গোলাম রাজিয়ার বিরুদ্ধে যে তুর্কি দরবারিরা ষড়যন্ত্র করেছিল তারা ইয়াকুতকেও খুন করে । ইয়াকুত ছিল তাগড়া  রাজিয়ার বডিগার্ড । তুর্কিরা কেমন হয় তা তো জানোই, বেশ গোঁড়া ; তারা বদনাম করেছিল যে রাজিয়া সুলতানাকে ঘোড়ায় চাপাবার সময়ে ইয়াকুত রাজিয়ার দুই হাতের তলা দিয়ে সুলতানাকে ধরে ঘোড়ার ওপর বসিয়েছিল । সবই তুর্কিদের বানানো গল্প । রাজিয়া সুলতানা কখনও ঘোড়ায় চাপতো না, হাতির ওপরে হাওদায় বসে যেতো । তবে ইবন বাতুতা লিখে গেছেন যে রাজিয়া সুলতানা ইয়াকুত নামের নিগ্রোকে ভালোবাসতো ।    

          মালিক অম্বরের বেগম নতুন টপিক আরম্ভ করল : ভারত, পাকিস্তান, ফিলিপিনস থেকে যে শ্রমিকরা আরবদেশগুলোতে কাজ করতে যায়, সেখানে মালিকরা তাদের পাসপোর্ট নিজের কাছে রেখে নিয়ে তাদের দাস বানিয়ে ফ্যালে । বিয়ের নাম করে যুবতীদের নিয়ে গিয়ে যৌনদাসী আর চাকরানি দুইই বানিয়ে ফ্যালে, যদিও আরবগুলোর আগে থাকতে চারটে আইনি বউ থাকে । যৌনদাসীর যৌবন ফুরিয়ে গেলে নতুন যৌনদাসী আমদানি করে দেশগুলো থেকে। আরবরা অনেক এমন যুবক-যুবতীকে ফাঁসিয়ে জেলে পুরে দেয় । তাদের টাকাকড়ির জোরের কাছে গরিব দেশগুলোর আবেদন কাজে লাগে না । পাথর খোঁড়া ইত্যাদি সর্বোচ্চ শোষণমূলক এবং বিপজ্জনক ক্ষেত্রগুলোতেই বেশিরভাগ জাতিগত সংখ্যালঘু এবং প্রান্তিক শ্রেণীর মানুষেরা কাজ করে বলে অনুমিত হয়েছে। বহুজাতিক অপরাধ সংঘটনগুলোর সংঘটিত অপরাধকর্মগুলোর মধ্যে মানবপাচারকে অন্যতম দ্রুত অপরাধকর্ম হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক কনভেনশন মতে, মানবপাচার হচ্ছে মানুষের অধিকারের লঙ্ঘন। সেই সাথে এটি ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের একটি নির্দেশনার বিষয়বস্তু। মানবপাচার এবং জোরপূর্বক শ্রম থেকে সুরক্ষা দেবার ক্ষেত্রে বেলারুশ, ইরান, রাশিয়া, তুর্কি হচ্ছে জঘন্যতম রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অন্যতম।    

           বেগমবউদি কথা বজায় রাখলেন,   দাসপ্রথার ইতিহাস অতীত থেকে বর্তমান পর্যন্ত বিভিন্ন সংস্কৃতি, জাতি এবং ধর্মজুড়ে বিস্তৃত ছিল । অবশ্য দাসদের সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং বৈধ অবস্থান বিভিন্ন সমাজে এবং বিভিন্ন স্থানে ভিন্ন ভিন্ন ছিল। আদিম সমাজে দাসপ্রথার প্রচলন বিরল ছিল কারণ এই প্রথা সামাজিক শ্রেণীবিভাগের কারণে তৈরি হয়। দাসপ্রথার অস্তিত্ত মেসোপটেমিয়াতে প্রায় ৩৫০০ খৃস্টপূর্বে প্রথম পাওয়া যায়| অন্ধকার যুগ থেকে মধ্যযুগ পর্যন্ত ইউরোপে অধিকাংশ এলাকাতেই দাসপ্রথা পাওয়া যেত | ইউরোপে বাইজেন্টাইন-উসমানিদের যুদ্ধ , ওলন্দাজ, ফরাসি, স্পেনিশ, পর্তুগিজ, ব্রিটিশ, আরব এবং কিছু পশ্চিম আফ্রিকান রাজ্যের লোকেরা আটলান্টিক দাস বাণিজ্যে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছিল। , “ঊনিশ শতকের শুরুর দিকে আনুমানিক প্রায় তিন চতুর্থাংশ লোকেরাই দাসপ্রথার বন্ধনে আবদ্ধ ছিল।”

দাসপ্রথা একটি অনুমোদিত সামাজিক ও আইনানুগ ব্যবস্থা ছিল । এ ব্যবস্থায় বাজারে মানুষের আনুষ্ঠানিক বেচা-কেনা চলত এবং ক্রীত ব্যক্তি ক্রেতার ব্যক্তিগত সম্পত্তি রূপে কাজ করতে বাধ্য থাকত। প্রাচীন ও মধ্যযুগের প্রায় সব শাসন ব্যবস্থাতেই দাস প্রথার প্রচলন ছিল। গবাদিপশুর ন্যায় মানুষেরও কেনা বেচা চলত। অন্যান্য প্রায় সকল দেশের মতো বাংলায়ও প্রাচীনকাল হতেই দাস প্রথা প্রচলিত হয়ে আসছিল। শুধু আইন পুস্তক ও প্রশাসনিক গ্রন্থেই নয়, এ প্রথা সব ধর্মেও স্বীকৃতি ছিল। সব ধর্মীয় পুস্তকেই ক্রীত দাসদাসীদের সাথে সদ্ব্যবহারের উপদেশ দেওয়া আছে।

          পর্যটক সাইফ উদ-দৌলা নাজাবুত আলী খান বাহাদুর :  দাসত্বের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা প্রথম সমাজ হলো গ্রিক সভ্যতার সমাজব্যবস্থা। গ্রিক সভ্যতার সূচনা যিশুর জন্মের আনুমানিক দুহাজার বছর আগে মাইনোয়ান যুগে। হোমারের দুই মহাকাব্য ইলিয়াড এবং ওডিসির রচনাকাল আনুমানিক ৭৫০-৭০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ। এই দুই মহাকাব্যে দাসত্ব এবং দাসপ্রথার টুকরো কিছু ছবি পাওয়া যায়। হোমার বা হেসিয়ডের রচনা থেকে জানা যায় গ্রিকরা দাসপ্রথাকে জীবনের একটি স্বাভাবিক ঘটনা বলেই ধরে নিত। হোমারের যুগে গ্রিকরা ক্রীতদাস বা ঝষধাব বোঝানোর জন্য সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করত ‘অ্যানড্রোপোডন’ শব্দটি, অ্যানড্রোপোডন কথাটির মানে মনুষ্যপদবিশিষ্ট জীব বা মানুষের মতো জীব। শব্দটি এসেছিল টেট্রাপোডা শব্দের উপমা হিসাবে। টেট্রাপোডার অর্থ চতুষ্পদী গবাদি প্রাণী। পলিবিয়াস বলেছেন, জীবনের অত্যাবশ্যক প্রয়োজন হলো গবাদিপশু আর ক্রীতদাস। গ্রিসের অন্যতম প্রধান দার্শনিক অ্যারিস্টটলের মতে, দাসব্যবস্থা প্রকৃতিরই নিয়ম। গ্রিসের অভিজাতদের ৩০-৪০ জন দাস থাকত। কৃষি এবং শিল্প খাতে শ্রমের চাহিদা মেটানো হতো দাসদের দ্বারা। গ্রিকদের শিল্প যখন সমুদ্র পার হয়ে রফতানি শুরু হয় তখন দাসদের প্রয়োজনীয়তাও বৃদ্ধি পায়,, দাস বেচাকেনার জন্য ব্যবসা শুরু হয়। এথেন্সের দাস ব্যবসায়ীরা এশিয়া মাইনর, সিরিয়া প্রভৃতি দেশ থেকে দাস আমদানি করত। ফিনিসীয় দাস ব্যবসায়ীরা নিজেরাই এথেন্সের বাজারে দাস নিয়ে আসত। সিরিয়া, মিসর, আরব প্রভৃতি দেশের সঙ্গেও এথেন্স এবং অন্য গ্রিক রাষ্ট্রের দাস ব্যবসা শুরু হয়। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকে এথেন্সের অর্থনীতি পুরোপুরিই দাসশ্রমনির্ভর হয়ে পড়ে। গ্রিক ভূস্বামীরা প্রাচ্যে বিলাস ও আলস্যের জীবনযাপন করত। গ্রিকদের প্রাসাদ, সুরম্য অট্টালিকা দাসদের শ্রমেই তৈরি হয়েছিল।

          পর্যটক সরসিজ বসু : প্রাচীন রোম সভ্যতাতেও ছিল দাসপ্রথার প্রচলন। রোমান সাম্রাজ্যের বিজিত প্রদেশগুলোকে রোমে দাস সরবরাহ করতে হতো। খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকের মধ্যভাগে গ্রিস থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল ১ লাখ ৫০ হাজার দাস। খ্রিস্টপূর্ব ২য় এবং ১ম শতকে রোমসহ সারা ইতালিতেই দাস শ্রমের ব্যবহার চরম আকার ধারণ করে। দাসদের প্রধানত খাটানো হতো জমি এবং খনিতে।    পুরাতাত্ত্বিকদের মতে, সিন্ধু সভ্যতা ২৫০০ থেকে ১৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যে অস্তিত্বমান ছিল। বিভিন্ন তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ঐতিহাসিকরা ধারণা করেছেন গ্রামীণ জনসমষ্টির মধ্যেই দাসদের অস্তিত্ব ছিল। শহরে যে এরা ছিলেন তা আরো নিশ্চিত। শহরে কমপক্ষে তিন ধরনের সামাজিক অস্তিত্ব স্বীকৃত শাসকবর্গ (পুরোহিত ও নগরশাসকরা দুটি পৃথক গোষ্ঠী ছিল কিনা তা জানা যায় না), বণিক এবং কারিগর। এই তিনটি সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব থেকে বোঝা যায় ভৃত্যশ্রেণী নিয়ে গঠিত একটি চতুর্থ শ্রেণীর অস্তিত্বের কথা। এই ভৃত্যেরা বেতনভোগী শ্রমিক অথবা দাসও হতে পারতেন (যুদ্ধ বন্দি, ঋণ-দাস ইত্যাদি) গৃহদাস ও ভৃত্যদের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ দাস আর বেতনভোগী শ্রমিকও নিয়োগ করতেন বলেই ইতিহাসবিদদের বিশ্বাস।           বৌদ্ধযুগের সূচনার কিছুদিন আগে (খ্রিস্টপূর্ব ৬ষ্ঠ শতকে) কোনো মানুষ বিভিন্ন কারণে অপর একজনের সম্পূর্ণ ক্ষমতাধীন হয়ে পড়লে তাকে দাস বলা হতো। তবে দেশের আকৃতিগত বিশালতার কারণে কিছু সঙ্কীর্ণ গোষ্ঠী দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল, গোষ্ঠীর বাইরে যাদের বিবাহ ছিল নিষিদ্ধ। পরবর্তী যুগের রচনায় অভিজাত গোষ্ঠী শাসনতন্ত্রের ধাঁচের এই গোষ্ঠীগুলোর অস্তিত্বের সাক্ষ্য মেলে। এই সম্প্রদায়গুলোতে একটা সম্পূর্ণ জনগোষ্ঠীই দাস বলে গণ্য হতো, ফলে এক্ষেত্রে ‘দাস’ শব্দটির শুধু বৈধ ধারণাই নয়, একটি ছদ্ম জাতিগত তাৎপর্যও ছিল। প্রভুরা অনেক সময় দাসীদের উপপত্নী হিসাবে গ্রহণ করতেন I

          পর্যটক শাশ্বত সিকদার : মৌর্য চন্দ্রগুপ্তের সময় দাসপ্রথার অবসানে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল। এ ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন ব্রাহ্মণমন্ত্রী কৌটিল্য। তিনি দাসপ্রথা উঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। সম্রাট অশোকের সময় প্রথম সামাজিক বৈষম্য দূর করার চেষ্টা করা হয়। অশোকের রাজত্বকালে বিচার ও ব্যবস্থা সবার পক্ষে একই করা হয়।    কম্বোডিয়ায় হিন্দু মন্দিরগুলোর মতো বৌদ্ধ মন্দিরগুলোতেও দাস ছিল। খমের মন্দিরের অর্থনীতিতে প্রাধান্য ছিল দাস শ্রমের। মন্দিরে যাদের দান করা হতো তাতে স্ত্রী-পুরুষ উভয় শ্রেণীর দাসের মধ্যে শিশুরাও ছিল। দাসদের সঙ্গে ব্যবহারে সব সময় যথেষ্ট দয়া দেখানো হতো না। ভিক্ষু রাহুল তার সিংহলে বৌদ্ধধর্মের ইতিহাস বইটিতে সিংহলি সঙ্ঘারামগুলোতে দাসপ্রথার কথা প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘… যে প্রাচীনকাল থেকেই স্ত্রী-পুরুষ উভয়শ্রেণীর দাসরা সঙ্ঘারামের নিযুক্ত হতেন এবং তাদের প্রতিপালনের জন্য প্রচুর পরিমাণে অর্থ গচ্ছিত রাখা হতো। সিংহলি রাজাদের হাতে ধৃত যুদ্ধবন্দিরাও এই দাসদের মধ্যে ছিলেন।

          পর্যটক অজিত রায় : বাংলার সুলতানগণ আফ্রিকা, তুরস্ক, পারস্য ও চীনদেশ হতে দাস-দাসী আমদানি করতেন বলে জানা যায়। এ ধরনের কিছু ক্রীতদাসকে মুক্তি দেওয়ার পর মন্ত্রী, প্রশাসক, এমন কি সেনাপতির পদেও উন্নীত করা হয়েছিল। পনেরো শতকের শেষদিকে আবিসিনীয় বংশোদ্ভূত দাসগণ স্বল্প কালের জন্য বাংলায় তাদের নিজস্ব শাসন ব্যবস্থাও কায়েম করেছিল। বাংলার বাজারে ১৮৩০ সাল পর্যন্তও হাবশী ও কাফ্রী নামে পরিচিত আফ্রিকান ক্রীতদাস-দাসী আমদানি করা হতো। বাংলায় সাধারণত ধনী সম্ভ্রান্ত মুসলিমগণ ও ইউরোপীয় বণিকগণ কঠোর পরিশ্রমী ও কর্তব্যনিষ্ঠ বলে খ্যাত হাবশীদেরকে দাস হিসেবে রাখত। ইউরোপীয় ব্যবসায়ীরা তাদের পণ্য পরিবহন ও কারখানা প্রহরার জন্য নিয়মিত শ্রমিকের বিকল্প হিসেবে ক্রীতদাসদের নিয়োগ করত। ইউরোপীয় অধিবাসীদের মধ্যে ক্রীতদাস রাখার এমনই রেওয়াজ হয়ে গিয়েছিল যে, স্যার উইলিয়ম জোনস এর ন্যয় একজন মানবতাবাদী, আইনজ্ঞ ও পন্ডিত ব্যক্তিরও চারজন ক্রীতদাস ছিল।     ক্রীতদাসদের মধ্যে সবচেয়ে দামি হাবশী দাসগণ খানসামা, পাচক (বাবুর্চি), গায়ক, নাপিত, গৃহ প্রহরী ইত্যাদি হিসেবে তাদের প্রভুদের সেবায় নিয়োজিত হতো। দাসদের মধ্যে তাদের মর্যাদা এত উচুঁ ছিল যে, তাদের মালিকগণ তাদের ব্যবসা সংক্রান্ত ও গৃহ পরিচালনা বিষয়ে এবং রাজনৈতিক ব্যাপারেও তাদের সাথে পরামর্শ করতেন।

          পর্যটক শ্রীজাত পিরালী : হিন্দু মালিকগণ দাস গ্রহণের সময় তাদের গোত্রের বাছবিচার করতেন। ঐ বিবেচনায় কায়স্থ , গোয়ালা, চাষা, বৈদ্য প্রভৃতি গোত্রের দাসদের শুদ্ধ (পবিত্র) এবং শূদ্র, তাঁতি, তেলি, ডোম, বাগ্দি, কৈবর্ত, জোলা, চন্ডাল প্রভৃতিদের অশুদ্ধ (অপবিত্র) বলে মনে করা হতো। কোনো ব্রাহ্মণকে দাসে পরিণত করা ধর্মে নিষিদ্ধ ছিল। শুদ্ধ গোত্রের দাসদের ঘরের ভেতরের কাজে এবং অশুদ্ধদের বাইরের কাজে লাগানো হতো।          মুসলিম পরিবারের দাসদাসীরা মুসলমান না হলে তাদের ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করতে হতো। হিন্দু সমাজে দাসদের ক্রীতদাস বা শুধু দাস এবং যারা স্ত্রীলোক তাদেরকে দাসী বলা হতো। মুসলমান সমাজে পুরুষ দাসদের বলা হতো গোলাম বা নফর এবং স্ত্রীলোকদের বান্দি বা লৌন্ডি। লৌন্ডিরা সুদর্শনা হতো এবং তাদেরকে বাজার থেকে কেনা হতো। তাদের প্রয়োজন ছিল গার্হস্থ্য শ্রমিক রূপে নয়, বরং প্রধানত উপ-পত্নী রূপে। হিন্দু ও মুসলিম, উভয় আইন মোতাবেক, যৌন পরিতৃপ্তির জন্য ক্রীতদাসীরা ব্যবহূত হতে পারত। তাদের সন্তান সন্ততিগণও দাস-দাসী হতো, তবে আইন অনুযায়ী, তারা মালিকের জমিজমায় কিছু অধিকার অর্জন করত।    আঠারো শতকের শেষের দিকে ইউরোপে প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাস প্রথার অবলুপ্তি ঘটে। দাস প্রথাধীন শ্রমিক ব্যবস্থা শিল্পায়ন ও শিল্প-বিপ্লবোদ্ভূত মানবিক নব মূল্যবোধের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ প্রতীয়মান হয়। দাস শ্রমের চেয়েও মুক্ত শ্রম অবশ্যই অধিকতর উৎপাদনমূখী ছিল। শিল্পবিপ্লবহীন বাংলার অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থা তখনও দাস শ্রম ও দাস শোষণ প্রথা অাঁকড়ে ছিল। তাই, সহজে দাস শ্রমের বদলে মুক্ত শ্রমের প্রবর্তন সম্ভবপর হয় নি। দাস প্রথার সমর্থনে উপনিবেশিক শাসকগণের আর একটি যুক্তি ছিল যে, হিন্দু ও মুসলিম উভয় ধর্মে এর সমর্থন রয়েছে। কিন্তু, ইউরোপে মানবতাবাদী আন্দোলনের প্রভাবে, উনিশ শতকের গোড়া থেকে, এবং গুরুতর ভাবে ১৮২০ সাল হতে, ব্রিটেনে ক্ষমতাসীন সরকার দাসপ্রথা নিরুৎসাহিত করে। ১৮৩৩ সালের চার্টার অ্যাক্ট দ্বারা যথাসম্ভব দ্রুত সব ধরনের দাস প্রথা অবলুপ্ত করার সুস্পষ্ট পদক্ষেপ নিতে কলকাতার সরকারকে নির্দেশ দেওয়া হয়। 

          পর্যটক রোশনি ইসলাম : প্রাচীনকালের অধিকাংশ বড়মাপের দাস বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব ১৪০ অব্দ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ৭০ অব্দের মধ্যে। অর্থাৎ রোমান সাম্রাজ্যের একটি বিশেষ পর্বে। খ্রিস্টপূর্ব ২য় শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে ক্রমাগত বিদ্রোহের ঘটনা ঘটতে থাকে। যেমন : খ্রিস্টপূর্ব ১৩৬-১৩২ সময়কালে সিসিলির প্রথম যুদ্ধ, ১৩৩-১২৯ সময়কালে এশিয়াতে অ্যারিস্টোনিকাসের অভ্যুত্থান, ১০৪ থেকে ১০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত সিসিলির দ্বিতীয় যুদ্ধ এবং খ্রিস্টপূর্ব ৭৩-৭১ সময়কালে বিখ্যাত স্পার্টাকাসের বিদ্রোহ। এসব বিরাট দাসযুদ্ধ উসকে দিয়েছিল অনেক ছোট সংঘর্ষকে। যেমন : ইতালির বিভিন্ন শহর, অ্যাটিকার খনি অঞ্চল এবং ডেলস দ্বীপে ঘটে যাওয়া নানা অভ্যুত্থান। তবে স্পার্টাকাসের পরাজয়ের পর এ মাপের দাস বিদ্রোহ তার ঘটেনি।    হাইতির দাস বিদ্রোহ (১৭৯১-১৮০৩) পৃথিবীব্যাপী দাসপ্রথাবিরোধী আন্দোলনকে শক্তি জুগিয়েছিল। ইতিহাসবিদ সিএলআর জেমস হাইতির দাস বিদ্রোহ সম্পর্কে বলেছেন, ‘ইতিহাসের একমাত্র সফল দাস বিদ্রোহ।’ হাইতির দাস বিদ্রোহ ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দের ফরাসি বিপ্লব দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিল।     আমেরিকার দক্ষিণাংশের ১১টি রাজ্যের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ছিল দাসশ্রম। ১৮৬০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে দাসের সংখ্যা দাঁড়ায় ৪ মিলিয়ন। আমেরিকার উত্তরাংশে দাসপ্রথাবিরোধী আন্দোলন গড়ে ওঠে সমাজ সংস্কারক উইলিয়াম গ্যারিসন, লেখক হ্যারিয়েট বিচার স্টো প্রমুখের নেতৃত্বে। ১৮৬০ সালে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হন আব্রাহাম লিংকন। লিংকন আমেরিকার পশ্চিমাংশে দাসপ্রথা প্রসারের বিরোধিতা করেন। ১৮৬১ সালের ১২ এপ্রিল শুরু হয় আমেরিকায় গৃহযুদ্ধ। ১৮৬৩ সালে প্রেসিডেন্ট লিংকন ‘দাসপ্রথাবিরোধী ঘোষণা’ জারির মাধ্যমে আমেরিকার দক্ষিণাংশের কনফেডারেট রাজ্যগুলোর দাসদের দাসত্ব মোচন করেন। ১৮৬৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ১৩তম সংশোধনীর মাধ্যমে দেশ থেকে দাসপ্রথা বিলোপ করা হয় I

         মালিক অম্বর আমার সৌধতে দাস প্রথার  নথিপত্র রয়েছে, যা থেকে প্রমাণ মেলে যে, বনেদি সামাজিক-রাজনৈতিক কাঠামো ও গ্রামীণ উৎপাদন ব্যবস্থার সাথে এ প্রথা সরাসরি সংশ্লিষ্ট ছিল। বাজারে মুক্ত শ্রমিক পাওয়া দুষ্কর থাকায় সমাজের শক্তিশালী শ্রেণি তাদের উৎপাদন ও প্রাধান্য অব্যাহত রাখতে সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে দুর্বলতর শ্রেণির লোককে দাস বানিয়ে ফেলতো । অভিজাত শাসকশ্রেণি, তাদের পারিবারিক ও অন্যান্য সামাজিক-রাজনৈতিক পদমর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখার তাগিদে, সুবৃহৎ কর্মীবাহিনীর প্রয়োজন অনুভব করে। গণপূর্ত কাজ, যেমন সরকারি ভবন, বাঁধ, সেতু, সড়ক ও প্রধান পথের নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য রাষ্ট্রের এক বিশাল শ্রমশক্তির প্রয়োজন ছিল। সৈন্য চলাচল ও তাদের রসদ সরবরাহের জন্যও শ্রমশক্তির প্রয়োজন ছিল। দুর্ভিক্ষ, যুদ্ধ ও শ্রেণিভেদ প্রথা যাদেরকে গুরুত্বহীন করে তুলেছিল প্রধানত তারাই দাস প্রথার বলি হতো। অভাবগ্রস্ত, নিঃস্ব, এতিম ও বিধবাদের অনেকেরই শেষ গন্তব্য ছিল ক্রীতদাস বাজার। দাস বাজারের অনেক ঠগ ও অপরাধী বিক্রি করার জন্য শিশুদের অপহরণ করত। আইনত ও প্রথাগতভাবে, ক্রীতদাস-দাসীরা ও তাদের সন্তান-সন্ততিরা তাদের মালিকের সম্পত্তি রূপে পরিগণিত হতো। ক্রীতদাস-দাসী হস্তান্তরযোগ্য পণ্য ছিল। তাই, অনেক মালিক তাদের উদ্বৃত্ত বা অপ্রয়োজনীয় দাস-দাসীদের বাজারে বিক্রি করে দিত।   দাস-দাসীদের আমদানি ও রপ্তানি দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ খাত ছিল। বাংলার সুলতানগণ আফ্রিকা, তুরস্ক, পারস্য ও চীনদেশ হতে দাস-দাসী আমদানি করতেন বলে জানা যায়। এ ধরনের কিছু ক্রীতদাসকে মুক্তি দেওয়ার পর মন্ত্রী, প্রশাসক, এমন কি সেনাপতির পদেও উন্নীত করা হয়েছিল। পনেরো শতকের শেষদিকে আবিসিনীয় বংশোদ্ভূত দাসগণ স্বল্প কালের জন্য বাংলায় তাদের নিজস্ব শাসন ব্যবস্থাও কায়েম করেছিল। বাংলার বাজারে ১৮৩০ সাল পর্যন্তও হাবশী ও কাফ্রী নামে পরিচিত আফ্রিকান ক্রীতদাস-দাসী আমদানি করা হতো। বাংলায় সাধারণত ধনী সম্ভ্রান্ত মুসলিমগণ ও ইউরোপীয় বণিকগণ কঠোর পরিশ্রমী ও কর্তব্যনিষ্ঠ বলে খ্যাত হাবশীদেরকে দাস হিসেবে রাখত। ইউরোপীয় ব্যবসায়ীরা তাদের পণ্য পরিবহন ও কারখানা প্রহরার জন্য নিয়মিত শ্রমিকের বিকল্প হিসেবে ক্রীতদাসদের নিয়োগ করত। ইউরোপীয় অধিবাসীদের মধ্যে ক্রীতদাস রাখার এমনই রেওয়াজ হয়ে গিয়েছিল যে, স্যার উইলিয়ম জোনস এর ন্যয় একজন মানবতাবাদী, আইনজ্ঞ ও পন্ডিত ব্যক্তিরও চারজন ক্রীতদাস ছিল। ক্রীতদাসদের মধ্যে সবচেয়ে দামি হাবশী দাসগণ খানসামা, পাচক (বাবুর্চি), গায়ক, নাপিত, গৃহ প্রহরী ইত্যাদি হিসেবে তাদের প্রভুদের সেবায় নিয়োজিত হতো। দাসদের মধ্যে তাদের মর্যাদা এত উচুঁ ছিল যে, তাদের মালিকগণ তাদের ব্যবসা সংক্রান্ত ও গৃহ পরিচালনা বিষয়ে এবং রাজনৈতিক ব্যাপারেও তাদের সাথে পরামর্শ করতেন। অভিজাত সম্প্রদায়ের হারেমে নিয়োজিত খোজাদের মধ্যে হাবশী দাসদের সংখ্যাই সর্বাধিক ছিল। 

          পর্যটক মাইকেল মধুসূদন : আঠারো ও ঊনিশ শতকের গোড়ার দিকে বাংলার বাজারের জন্য কেবল আফ্রিকাই নয়, বরং আরব, চীন, মালয়, আরাকান ও আসাম হতেও ক্রীতদাস আমদানি করা হতো। আরব দেশ থেকে আনীত দাসদের অধিকাংশই হতো খোজা। বাংলার বাজার হতে ক্রীতদাস রপ্তানিও হতো। ইউরোপীয় বৈদেশিক উপনিবেশগুলির জন্য বাগান শ্রমিক হিসেবে বঙ্গীয় বংশোদ্ভূত দাসদের চাহিদা ছিল। দাস মুখ্যত দু’ধরনের ছিল: গার্হস্থ্য ও কৃষিকার্যাধীন। একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারে গুটি কয়েক দাস থাকবে সেটাই ছিল সামাজিক প্রত্যাশা। তারা পদ ও মর্যাদার প্রতীক ছিল এবং তা কেবল সম্ভ্রান্ত জমিদারের ক্ষেত্রেই নয়, মধ্যবিত্ত ও ধনী কৃষকদের বেলায়ও ছিল। হিন্দু মালিকগণ দাস গ্রহণের সময় তাদের গোত্রের বাছবিচার করতেন। ঐ বিবেচনায় কায়স্থ , গোয়ালা, চাষা, বৈদ্য প্রভৃতি গোত্রের দাসদের শুদ্ধ (পবিত্র) এবং শূদ্র, তাঁতি, তেলি, ডোম, বাগ্দি, কৈবর্ত, জোলা, চন্ডাল প্রভৃতিদের অশুদ্ধ (অপবিত্র) বলে মনে করা হতো। কোনো ব্রাহ্মণকে দাসে পরিণত করা ধর্মে নিষিদ্ধ ছিল। শুদ্ধ গোত্রের দাসদের ঘরের ভেতরের কাজে এবং অশুদ্ধদের বাইরের কাজে লাগানো হতো।    মুসলিম পরিবারের দাসদাসীরা মুসলমান না হলে তাদের ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করতে হতো। হিন্দু সমাজে দাসদের ক্রীতদাস বা শুধু দাস এবং যারা স্ত্রীলোক তাদেরকে দাসী বলা হতো। মুসলমান সমাজে পুরুষ দাসদের বলা হতো গোলাম বা নফর এবং স্ত্রীলোকদের বান্দি বা লৌন্ডি। লৌন্ডিরা সুদর্শনা হতো এবং তাদের বাজার থেকে কেনা হতো। তাদের প্রয়োজন ছিল গার্হস্থ্য শ্রমিক রূপে নয়, বরং প্রধানত উপ-পত্নী রূপে। হিন্দু ও মুসলিম, উভয় আইন মোতাবেক, যৌন পরিতৃপ্তির জন্য ক্রীতদাসীরা ব্যবহূত হতে পারত। তাদের সন্তান সন্ততিগণও দাস-দাসী হতো, তবে হিন্দু ও মুসলিম আইন অনুযায়ী, তারা মালিকের জমিজমায় নামমাত্র কিছু অধিকার অর্জন করত। কৃষি কার্যাধীন দাসের সংখ্যাই ছিল সর্বাধিক। বাজার হতে মুক্তশ্রমিক প্রাপ্তি সম্ভবপর না হওয়ায় সম্ভ্রান্ত স্তরের ও ধনী কৃষক শ্রেণির কৃষিকাজে ক্রীতদাস ব্যবহারের কোনো বিকল্প ছিল না। অতীতকাল থেকে উনিশ শতকের শেষ পর্যন্ত বাংলায় কৃষি কর্মোপযোগী দাস বা দাসখত লেখা শ্রমিক ব্যবহারের ব্যাপক রেওয়াজ ছিল। কেউ সম্পদবিহীন হয়ে স্বাধীন জীবন ধারণে অক্ষম হলে, ইচ্ছুক সম্পদশালী কোনো পরিবারের নিকট নিজেকে বিক্রি করত। এসব পরিবার এ ধরনের অভাগাদের কিনে তাদের ক্ষেতের কাজে লাগাত। তারা সব ধরনের কৃষিকাজ করত যথা, মাটি খনন, পানি সেচ, গো-চারণ, মাছ ধরা, নির্মাণ কাজ ইত্যাদি। শ্রমের বিনিময়ে তারা তাদের প্রভুদের কাছ থেকে খাদ্য, বাসস্থান, বস্ত্র এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে বৃদ্ধ বয়সের ভরণপোষণও পেত। অনেক ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি মহাজনদের কাছে তাদেরকে বিক্রি করে দিয়ে তাদের দেনার দায় পরিশোধ করত। দেনার কারণে দাসত্ব, আজীবন অথবা জীবনের খানিক অংশের জন্য, হতে পারত। যেসব জেলায় বিশেষভাবে কৃষিনির্ভর দাস প্রথার প্রচলন ছিল সেগুলি হচ্ছে সিলেট, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও ঢাকা। 

          পর্যটক ক্যাটরিনা কাইফ :আইন কমিশনের (১৮৩৯) প্রতিবেদনে দেখা যায়, এসব জেলায় প্রতি পাঁচ জনের একজনই ছিল দাস। সাধারণ দাস বাজার থেকে ক্রয় না করে সরাসরি সামাজিক উৎস হতে কৃষিনির্ভর দাস সংগ্রহের রেওয়াজ ছিল। অভাব, দুর্ভিক্ষ, নদী ভাঙন, পরিবারের উপার্জনকারী সদস্যের মৃত্যু প্রভৃতি দুর্যোগ কবলিত ব্যক্তিদের বেঁচে থাকার তাগিদে স্বেচ্ছায় দাসত্ব গ্রহণ করতে হতো। তাদের বেলায় বংশপরম্পরায় গার্হস্থ্য শ্রমিক হিসেবে থেকে যাওয়াই অবধারিত ছিল। তাদের বয়স, শারীরিক গঠন, লিঙ্গ, গোত্র, জাতি, এবং সর্বোপরি দেশের চলতি অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনায় তাদের মূল্য নির্ধারিত হতো। উনিশ শতকের প্রথম দিকে শিশু ও বৃদ্ধদের বাজার দর ছিল পাঁচ থেকে সাত টাকা। স্বাস্থ্যবান তরুণ দাসদের মূল্য হতো কুড়ি থেকে পঞ্চাশ টাকা। অভাব ও দুর্ভিক্ষ হলে বাজার দাসে ছেয়ে যেত এবং তখন দাম পড়ে যেত। আঠারো শতকের শেষের দিকে ইউরোপে প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাস প্রথার অবলুপ্তি ঘটে। দাস প্রথাধীন শ্রমিক ব্যবস্থা শিল্পায়ন ও শিল্প-বিপ্লবোদ্ভূত মানবিক নব মূল্যবোধের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ প্রতীয়মান হয়। দাস শ্রমের চেয়েও মুক্ত শ্রম অবশ্যই অধিকতর উৎপাদনমূখী ছিল। 

          পর্যটক হুমায়ুন জা মুবারক আলী খান বাহাদুর :শিল্পবিপ্লবহীন বাংলার অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থা তখনও দাস শ্রম ও দাস শোষণ প্রথা অাঁকড়ে ছিল। তাই, সহজে দাস শ্রমের বদলে মুক্ত শ্রমের প্রবর্তন সম্ভবপর হয় নি। দাস প্রথার সমর্থনে উপনিবেশিক শাসকগণের আর একটি যুক্তি ছিল যে, হিন্দু ও মুসলিম উভয় ধর্মে এর সমর্থন রয়েছে। কিন্তু, ইউরোপে মানবতাবাদী আন্দোলনের প্রভাবে, উনিশ শতকের গোড়া থেকে, এবং গুরুতর ভাবে ১৮২০ সাল হতে, ব্রিটেনে ক্ষমতাসীন সরকার দাসপ্রথা নিরুৎসাহিত করে। ১৮৩৩ সালের চার্টার অ্যাক্ট দ্বারা যথাসম্ভব দ্রুত সব ধরনের দাস প্রথা অবলুপ্ত করার সুস্পষ্ট পদক্ষেপ নিতে কলকাতার সরকারকে নির্দেশ দেওয়া হয়। ধাপে ধাপে দাস প্রথার অবলুপ্তির জন্য ১৮৪৩ এর ‘অ্যাক্ট ফাইভ’ প্রণীত হয়। এ আইনের আওতায় দাস রাখা অপরাধমূলক ছিল না, এতে কেবল মুক্ত ব্যক্তি ও দাসের মধ্যে আইনগত পার্থক্যের অবসান ঘটানো হয়েছিল। আইনে বিধান রাখা হলো যে, কোনো আদালত কোনো দাসের ওপর কারও দাবি গ্রাহ্য করবে না। এ আইন সব দাসদের মুক্ত বলে ঘোষণা করে নি। বরং আইনে বলা হলো যে, কোনো দাস ইচ্ছে করলে তার মালিককে পরিত্যাগ করে স্বাধীনভাবে বাস করতে পারবে। দাস আমদানি ও রপ্তানি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। তবে, বাস্তবক্ষেত্রে দাসপ্রথা হঠাৎ করে থেমে যায় নি। দাসপ্রথা সামাজিকভাবে ঘৃণ্য ও পরিত্যাজ্য বিবেচিত হতে আরও কয়েক দশক লেগে যায়। মুক্ত শ্রমের ব্যবহার বৃদ্ধি, শিল্পায়নে ক্রমিক অগ্রগতি, এবং উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ হতে মানবতাবাদী আন্দোলনসমূহ দাস প্রথাকে ধীরে ধীরে জনগণের নিকট অপ্রিয় ও সমাজে অগ্রহণযোগ্য করে তোলে। বিশ শতকের গোড়ার দিকে বাংলা দাস প্রথা হতে মুক্ত হয়।

          মালিক অম্বর :আমার সৌধতে আরেকটা নথি আছে, পদবি নিয়ে । আমি তো মালিক অম্বর । দুটোর কোনোটাই আমার পদবি নয় । কিন্তু নিজেদের বংশকে চিহ্নিত করে তার গৌরব প্রকাশের চিরাচরিত প্রবৃত্তি থেকে উদ্ভব হয় পদবীর যা রাজবংশ গুলির একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য ছিল এবং রাজবংশ থেকে ক্রমান্বয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যেও ছড়িয়ে যায় এই প্রথা।এই পদবী এবং উপাধি বিভিন্ন উত্তম কাজের স্বীকৃতি/পুরস্কার সরূপ রাজারা ধারণ করতেন এবং রাজ কর্মকর্তা-সৈন্য-সামন্ত-বিদ্বান ব্যক্তিদের প্রদান করতেন।এই প্রথা সাধারণ প্রজাদের মাঝে জনপ্রিয় হয় এবং তারা নিজেদের পেশা অনুসারে নামের শেষে পদবী যোগ করে। মহাভারতের যুগে কারো পদবী না থাকলেও বাঙালি রাজাদের পদবী ছিল।মহাভারতের দ্বিতীয় পর্বে উল্লেখ করা হয়েছে সমুদ্র সেন এবং তার ছেলে চন্দ্র সেন পান্ডবদের হয়ে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন এবং যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় যজ্ঞে ঋত্বিকের ভূমিকা পালন করেছিলেন বীর সেন নামক ঋষি।[১] এরপর প্রথমে জৈন এবং তারপর বৌদ্ধদের প্রভাব বাঙলায় বৃদ্ধি পায় এবং হিন্দুদের ধর্মাচার জৈন-বৌদ্ধ প্রভাবান্বিত হয়।বল্লালসেন তার অদ্ভুতসাগর গ্রন্থে উল্লেখ করেন আদিপিতৃভূমি বৈদিক বৈদহ রাজ্যের (উত্তরবঙ্গ,মিথিলা,নেপালের দক্ষিণাঞ্চল নিয়ে গঠিত বেদে উল্লেখিত রাজ্য)এরূপ অধঃপতনে মর্মাহত হয়ে কর্ণাটলক্ষি ছেড়ে তার পূর্বপুরুষ বরেন্দ্রসেন বাঙলায় অভিযান চালিয়ে পুন্ড্র রাজ্য অধিকার করেন যেটি বরেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।এই সামন্ত রাজ্য সাম্রাজ্যে পরিণত হয় এবং সনাতন ধর্ম পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।প্রজারা সৎপথে চলবে রাজ্যে শান্তি বিরাজ করবে এই লক্ষ্যে বল্লালসেন কৌলিন্য এবং বর্ণ সমীকরণ করেন।সেইসময় ৩৬ পদবীর হিন্দু ছিল প্রত্যেক ৩৬ বছর পরপর তাদের কৌলিন্য নির্ধারণ করে কর্মানুসারে বর্ণ নির্ধারণ করার নিয়ম করা হয়;এই প্রক্রিয়াকে “সমীকরণ” বলে উল্লেখ করা হয় ।এভাবেই বাঙালি পদবীর পুনর্গঠন ঘটে।

          পর্যটক ওয়াল্লা জা আহমেদ আলী খান বাহাদুর :প্রাচীন কালে কোনও পদবী হতো না। এগুলির সৃষ্টি প্রায় ৮০০ বছর আগে মাত্র।বল্লাল সেন কৌলীন্য প্রথা প্রবর্তনের মাধ্যমে পদবীর প্রচলন করেন।বাঙালিজাতির ইতিহাসে তাই সেন রাজবংশ হতে সেন পদবীই প্রথম পদবীপ্রথা হিসেবে ধরা হয়।পূর্বতন শাসক পালরা ছিলেন বৌদ্ধ ধর্মমতে বিশ্বাসী সে সময়ের বাঙলায় পদবী হত না কিন্তু বাঙলায় বৈদিক গোঁড়া হিন্দু খ্যাত সেন রাজবংশ দ্বারা বাঙলা অধিকৃত হওয়ার পর ধর্মান্তরিতকরণ,বাঙলার সাতটি গ্রামে ব্রাহ্মণ অভিবাসিতকরণ এবং “বর্ণ ও কৌলিন্য” প্রথার প্রচলনের ইতিহাস পাওয়া যায়।অর্থাৎ বাঙলার বর্ণভেদের উদ্দেশ্য শুধু ধর্মীয় নয় রাজনীতি একটি বড় কারণ।যেমন রাজনৈতিক কারণে বৈশ্য বর্ণকে শুদ্রে অবনমিত করা হয় যা এখনো বাঙালি সমাজে প্রচলিত।এর পেছনের কারণ হল রাজা বল্লাল সেন যুদ্ধাভিযানের জন্য বণিকদের কাছে অর্থ দাবি করেন কিন্তু বনিকরা তা নিঃশর্তে দিতে অস্বীকৃতি জানান ফলসরূপ বণিকদেরকে কৌলিন্যচ্যুত হতে হয়।বণিকদের নেতৃত্বেে ছিলেন সুবর্ণবণিক বল্লভানন্দ যার জামাতা ছিলেন অঙ্গের রাজা।বাঙলায় “ক্ষত্রিয়” (ক+ষ+ত্রি+য়/kshtriya) এর অপভ্রংশ “কায়স্ত” রুপে বর্ণের উল্লেখ পাওয়া যায়।মিনহাজ রচিত “তবারক-ই-নাসিরি” তে লক্ষণ সেনের বংশকে খলিফার মত সম্মান করত এবং তাদের বাক্যকে ধর্মবিধান বলে হিন্দুরা স্বীকার করত বলে উল্লখ করেছেন।শিলালিপিতে তাদের বংশকে ব্রহ্মক্ষত্রিয় এবং “অদ্ভুতসাগর” গ্রন্থে বল্লাল সেনের বংশকে “কুলীন কুলশ্রেষ্ঠ” বলা আছে।

           পর্যটক জাফর আলী খান বাহাদুর মীর মুহম্মদ জাফর আলী খান বাহাদুর :বল্লাল সেনের শাসন আমলেই কৌলীন্য প্রথার শুরু। সেন রাজাদের শিলালিপি থেকে জানা যায়, তাঁরা ছিলেন চন্দ্রবংশীয় ‘ব্রহ্মক্ষত্রিয়’ ( ব্রহ্মক্ষত্রিয় বলতে তাদেরকে বোঝানো হয় যারা ব্রাহ্মণ কুলে জন্মগ্রহন করলেও পেশা হিসেবে ব্রাহ্মণ্য পেশা গ্রহণ না করে ক্ষত্রিয়ের পেশা অর্থাৎ রাজ্য শাসন এবং যুদ্ধবিদ্যাকে পেশা হিসেবে গ্রহন করে।)। কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে, সেনরা প্রথমে জৈন আচার্য বংশোদ্ভূত ছিলেন কিন্তু এই মত নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।সেনরা কৌলিন্য প্রথা প্রবর্তনের পর একটি বংশ থেকে আরেকটি বংশকে আলাদা করতে সনাতনীদের মাঝে পদবী প্রথার প্রচলন হয়।বল্লাল চরিত থেকে জানা যায় বল্লাল সেন প্রত্যেক ৩৬ বছর পর পর কর্মানুসারে বর্ণ পরিবর্তনের বিধান রাখেন কিন্তু লক্ষণ সেন এই পরিবর্তনে মনোনিবেশ করেননি।

          পর্যটক আমীর উল-উমরা ওয়াসিফ আলী মির্জা খান বাহাদুর :হাবশি বা সিদ্দি হল এক জাতীগত গোষ্ঠী যারা ভারত ও পাকিস্তানের কিছু অংশে বসবাস করে। এদের পূর্বপুরুষরা অধিকাংশরাই ছিল আবিসিনিয়ার আদিবাসি যাদের পর্তুগীজ ব্যবসায়ীরা ধরে ক্রীতদাশ হিসেবে ভারতবর্ষে নিয়ে আসে।] ভারতের হায়দ্রাবাদ, গুজরাট ও করনাটকাতে এবং পাকিস্তানের মাকরান ও করাচীতে প্রায় বিশ থেকে পঁচিশ হাজার হাবশী বসবাস করে। অধিকাংশ হাবশি সুফি মুসলিম হলেও হিন্দু এবং ক্যাথলিখ খৃষ্টান হাবশিও রয়েছে।  হাবশি নামটির উৎপত্তি হয় আরবী আল-হাবশ থেকে। আরবরা আল-হাবশ বলতে বুঝাতো আবিসিনিয়াকে। ইথিওপিয়ান/ আবিসিনিয়ান জাহাজের ক্যাপ্টেনরা এই উপমহাদেশে পণ্যের সাথে কৃতদাশও নিয়ে আসত এবং বিক্রি করে দিত। হাবশিরা শারিরীক ভাবে অনেক শক্তিশালী ছিল এবং অনেক কাজ করতে পারত, তাই ধীরে ধীরে উপমহাদেশে হাবশি কৃতদাশের চাহিদা বৃদ্ধি পেতে থাকে। এই চাহিদার সুযোগ নিয়ে পর্তুগীজ নাবিক এবং ব্যবসায়ীরা আফ্রিকা থেকে কৃতদাশ ধরে নিয়ে এসে এই উপমহাদেশ বিক্রি করে মুনাফা করত।

          পর্যটক রেইস উদদৌলা ওয়ারিস আলী মির্জা খান বাহাদুর : হাবশিদের সিদ্দি নামেও ডাকা হয়। এই সিদ্দি নামটির উৎপত্তির ব্যাপারে এখনও বিশ্লেষকরা একমত হতে পারেননি। একটি মতানুশারে সিদ্দি শব্দটি আফ্রিকায় সম্মানসূচক হিসেবে ব্যবহার করে হত। শুধুমাত্র সম্মানিত আরবদের এই নামে ডাকা হত, অপরদিকে অবজ্ঞা অর্থ ব্যবহৃত হত সিদ্দি এর বিপরীত শব্দ হাফসি শব্দটি। ধারনা করা হয় তাদের অবজ্ঞা না করে সিদ্দি নামে ডাকার ফলেই অনেক জায়গায় সিদ্দি নামটি প্রচলিত আছে। অপর মতানুশারে সিদ্দি শব্দটির অর্থ আরব জানাজের ক্যাপ্টেন কর্তৃক আনিত। এই ক্যাপ্টেনদের বলা হত সাঈদ।        হাবশিদের অনেকসময় আফ্রো-ইন্ডিয়ান হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়। আরবরা হাবশি বলতে জাঞ্জদের বুঝায় (আরবি জাঞ্জ শব্দের অর্থ আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গ ) এছাড়া চীনারা আরবি ভাষার অনুবাদ করে হাবশিদের জিঞ্ঝি বা জিঞ্জি শব্দটি ব্যবহার করে থাকে।

          পর্যটক মুবারক উদদৌলা আশরাফ আলী খান বাহাদুর :আমেরিকা-ইউরোপের ঔপনিবেশিক  নায়করা দাসদাসি চালানের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে জনতার কাছে এখন খলনায়কে পরিণত হয়েছে। শুধু তাই নয়, বরং কথিত নায়কদের মূর্তি ভেঙে পানিতে নিক্ষেপ করে নিন্দার গভীরতা প্রকাশ করেছে জেগে উঠা জনগণ। দাসপ্রথা বা মানুষকে দাস বানিয়ে বিক্রি করে যারা মুনাফা অর্জন করেছে তাদের অন্যতম কলম্বাস, ভাস্কোদাগামা, রবার্ট ক্লাইভসহ অন্যদের ইউরোপের গণমানুষ এখন নিন্দার চোখে দেখছে। জনতার অপমান অপদস্ত থেকে তারা কেউই বাদ পড়েনি। মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের অন্যতম বড় শহর মিনেপলিসে পুলিশি হেফাজতে কৃষ্ণাঙ্গ জজ ফ্লয়েডকে হত্যার পর দাস ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে পুনরায় গণঘৃণা জেগে উঠে। ব্রিটেনে বর্ণবৈষম্য ও কৃষ্ণাঙ্গ নির্যাতনবিরোধী আন্দোলনকারীরা অন্যদের সাথে দাস ব্যবসায়ী অ্যাডওয়ার্ড কোলস্ট্রেনের মূর্তি ভেঙে গত ৭ জুন সাগরে নিক্ষেপ করেছে। দাসপ্রথার বিরুদ্ধে মানবাধিকার সংগঠনগুলো বারবারই কথা বলে আসছে, কিন্তু তাদের কথা কেউ কানে তুলেনি। দুর্বলের ওপর সবলের প্রভাব প্রতিপত্তি থেকেই দাসপ্রথার উদ্ভব হয়েছিল, দুর্বলতা বলতে যেমন শারীরিক দুর্বলতা বুঝায়, এ ক্ষেত্রে দুর্বলতা বলতে অর্থনৈতিক দুর্বলতাই মুখ্য বিষয় হিসেবে কাজ করেছে। শরীরের রঙ, নিরক্ষরতা ও দরিদ্রতার কশাঘাতে নিপীড়িত নির্যাতিত মানুষগুলোই দাসপ্রথার ভিকটিম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। কথিত মালিকরা দাসের সাথে পশুর চেয়েও খারাপ আচরণ করত। যে মানুষগুলো পণ্যের মতো বাজারে বিক্রি হয়েছে তারাই দাস, বিক্রীত মানুষটি ‘মানুষ’ হিসেবে কোথাও কোনো প্রকার দাবি, অধিকার ও একজন মানুষ অন্য একজন মানুষ থেকে যে আচরণ প্রাপ্য, দাসরা সে আচরণ প্রত্যাশা করতে পারেনি। ইউরোপ ছাড়াও আরব অধ্যুষিত এলাকায় দাসপ্রথা প্রকটভাবে ছিল। দাসপ্রথা নিয়ে এখন অনেকেই অনেক কথা বলেন বটে, কিন্তু আজ থেকে এক হাজার ৫০০ বছর আগে মানবতার মুক্তির দূত হজরত মুহাম্মদ সা: ঐতিহাসিক বিদায় হজের ভাষণে দাসপ্রথা নিরুৎসাহিত করেন। সৌদি ধনাঢ্য ব্যক্তিদের ক্রয়কৃত দাস মুক্তি পেয়েছিল। তিনি দাসমুক্তিকে ইবাদতের অংশ হিসেবে গণ্য করেছেন। যুগে যুগে মানবতাবাদী মনীষীরা দাসপ্রথার বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রাম করেছেন যাদের মধ্যে আব্রাহাম লিঙ্কনের নাম উল্লেখযোগ্য। কিন্তু অনেক দাস ব্যবসায়ী রয়েছে যাদের রাষ্ট্রীয়ভাবে পুরস্কৃত করা হয়েছিল।

          পর্যটক সিরাজদ্দৌলা মুহম্মদ সিরাজদ্দৌলা : লেলিন বলেছেন, দাসত্ব তিনি প্রকার। প্রথমত, এক শ্রেণীর লোক স্বেচ্ছায় দাসত্ব গ্রহণ করে বিনিময়ে তার ক্ষুধার জ্বালা নিবারণসহ জীবন ধারণের প্রয়োজনীয়তা মেটাতে পারে, কিন্তু ব্যক্তিস্বাধীনতা থাকে না। দ্বিতীয়ত, এক শ্রেণীর লোক রয়েছে যারা নিজেরা বুঝতেই পারছে না যে, তারা দাসত্ব করে যাচ্ছে বিনিময়ে আরাম-আয়াশে দিন কাটাচ্ছে, কিন্তু সত্য-মিথ্যার তারতম্য করতে পারে না; ৩. ব্যতিক্রমধর্মী এক শ্রেণীর লোক রয়েছে যারা দাসত্বকে না মেনে প্রতিবাদ করে আসছেন তারাই বিদ্রোহী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন, বিনিময়ে পাচ্ছেন জেল-জুলুম, লাঞ্ছনা-গঞ্জনা, এমনকি ফাঁসির দড়ি।           দাসত্ব গ্লানির ও অপমানজনক। অন্য দিকে ‘বিদ্রোহী’ জীবন অনেক কষ্টের তবে সম্মানজনক। যদিও আইন করে কৃতদাস প্রথা বা দাসপ্রথা বিলুপ্ত বা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে, কিন্তু আমাদের সমাজে কি দাসত্ব বন্ধ হয়েছে? বরং ‘মানসিক দাসত্বের’ পরিমাণ অনেকাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। খেয়ে পরে একটু স্বস্তিতে থাকার জন্য, কোথাও প্রমোশনের জন্য, কোথাও পদ-পদবি পাওয়ার জন্য মানুষ বিশেষ করে আমাদের সমাজে যারা বুদ্ধিজীবী হিসেবে পরিচিত তারা নির্লজ্জের মতো দাসত্ব করে যাচ্ছে। কলকাতামনস্ক কিছু বুদ্ধিজীবী আছেন যারা পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রকে নিজের দেশ মনে করেন, তাদের মানসিক দাসত্ব প্রকটভাবে দেখা দিচ্ছে, বিশেষ করে তাদের লেখনি ও বক্তব্যে।          

             পর্যটক যুবরাজ সেলিম :নাস্তিকবিদ্বেষীরা নাস্তিকতা নিয়ে যেসব অভিযোগ তোলেন তার কোনোটার সাথেই নাস্তিকতার কোনো যোগসূত্র নেই। তাদেরকে প্রায়ই এমন অভিযোগ তুলতে দেখা যায় যে, নাস্তিকতাই লাখ লাখ মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী কিংবা নাস্তিকতার কারণে গনহত্যা হয়! কি হাস্যকর অভিযোগ রে বাবা! এরকম গোমূর্খের মতো অভিযোগ যারা তোলেন তারা যে অত্যন্ত ভ্রমাত্মক এবং তাদের মাথাভর্তি যে মরুভূমির গরম বালু ছাড়া কিছু নেই তাতে আমার কোনো সন্দেহ নেই।

          পর্যটক আবুল ফজল ইবন মুবারক : নাস্তিকতা মানে কি? নাস্তিকতা মানে ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাসের অভাব বা অবিশ্বাস। ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাস করে না এমন একজন মানুষের করা খুন বা ধর্ষণের জন্য তার ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাস না করাকে বা নাস্তিকতাকে দায়ী করা ঠিক ততোটাই হাস্যকর ও অর্থহীন যতোটা হাস্যকর ও অর্থহীন মূলা খায় না এমন একজন মানুষের করা খুন বা ধর্ষণের জন্য তার মূলা না খাওয়াকে দায়ী করা।

          ফকির নাজিওদ্দিন :নাস্তিকবিদ্বেষীদের নাস্তিকতার বিরুদ্ধে এরকম অভিযোগ তোলার পেছনে উদ্দেশ্য কি? তারা মূলত বোঝাতে চান যে, নাস্তিকতা মানবসভ্যতার জন্য খুবই খারাপ বা ভুল এবং তা কঠোরভাবে দমন করা প্রয়োজন। তারা বোঝাতে চান, একজন নাস্তিক সমাজের জন্য অত্যন্ত ভয়াবহ, তাই সমাজে নাস্তিকদের কোনো জায়গা নেই। মূলত, কেউ নাস্তিক হলে তাকে যেন হত্যা করা হয় নয়তো, জেলে বন্দী করে রাখা হয়। নাস্তিকদের বিরুদ্ধে সেই জুলুম নির্যাতন উস্কে দিতেই নাস্তিকবিদ্বেষীদের নাস্তিকতার বিরুদ্ধে এই অর্থহীন অভিযোগ। আমরা যদি ধরেও নেই যে নাস্তিকবিদ্বেষীদের অভিযোগটি সঠিক, আমরা যদি ধরেও নেই যে নাস্তিকতাই স্ট্যালিনের করা গনহত্যার জন্য দায়ী, তাহলে কি এটা প্রমাণিত হয় যে নাস্তিকরা ভুল বা ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাস না করা ভুল? ‘নাস্তিকতা মানবসভ্যতার জন্য খারাপ’ এটি প্রমাণিত হলে কি ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়ে যাবে? আমরা যদি ধরেও নেই যে ইসলাম সমাজে শান্তি নিয়ে আসে আর নাস্তিকতা গনহত্যা, তাতে ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণিত হয় না।

          পর্যটক  শিশুনাগ :অঘোরী সাধু হওয়া মোটেই সহজ কাজ নয়। টানা ১২ বছর কঠোর সাধনার পর অঘোরী গুরুর আশীর্বাদে নিজের ধর্মীয় যাত্রা শুরু করেন অঘোরী সাধুরা। আর তখনই জন্ম হয় এক চরম সাধকের। যাঁদের বস্ত্র হয় মৃত ব্যক্তির জামা-কাপড়ের ছেঁড়া অংশ। শরীরে থাকে মৃত দেহের ছাই। এখানেই শেষ নয়, এমন সাধকদের সারা জীবন বেশ কিছু নিয়ম মেনে চলতে হয়, যেমন- প্রত্যেক অঘোরী সাধু কে একজন গুরুর অধীনে থাকতে হয়। গুরু যা বলেন, সেইভাবে জীবনযাপন করতে হয়। সংগ্রহ করতে হয় মৃতদেহের খুলি, যা তাঁদের সাধনার প্রধান উপকরণ।

          পর্যটক সম্রাট সমুদ্রগুপ্ত : এবার জেনে নেওয়া যাক অঘোরীদের সংস্কৃতি কেমন। মূলত নদীর ধারের কোনও নির্জন শশ্মানে অথবা গভীর জঙ্গলের মধ্যে এঁদের বাস। মৃত ব্যক্তির মাংস খান এঁরা। এঁদের বিশ্বাস, এমনটা করার মধ্যে দিয়ে তাঁরা ভক্তির প্রদর্শন করছেন। কারণ মৃত্যুর পর আত্মা শরীর ছেড়ে অন্য জগতে চলে যায়। তাই যে কোনও মৃত পশুর মাংস খাওয়া আর মানুষের মাংস খাওয়ার মধ্যে কোনও পার্থক্য় খুঁজে পান না অঘোরীরা। শুধু তাই নয়, মৃতদেহ যে কাঠে পোড়ানো সেই একই কাঠে তাঁরা রান্না করে খান। এমনও বিশ্বাস আছে যে অঘোরী সাধুরা মৃতদেহের উপর বসে খুলিকে সামনে রেখে সাধনা করেন। কিন্তু বাস্তবে এমন দৃশ্য কেউ দেখেছেন কিনা তা জানা নেই।

         পর্যটক প্রভাকর বর্ধন : এঁদের সম্পর্কে যা কিছু জানা গিয়েছে, তার বেশিরভাগই প্রাচীন পুঁথিপত্রে লেখা রয়েছে। সভ্য সমাজের থেকে হাজার মাইল দূরে জীবনযাপন করা এমন সাধকদের খোঁজ পাওয়ার সত্যিই খুব কঠিন।তবে এঁদের একেবারেই যে দেখা পাওয়া যায় না, তেমনি নয়। অনেকে বিশ্বাস করেন যে, এখনও আমাদের দেশের দুর্গম পাহাড়-জঙ্গলে বহু অঘোরী সাধু বসবাস করেন। আর শিবরাত্রির সময় তাঁদের মধ্যে অনেকে পশুপতিনাথ মন্দিরে পুজো দিতে আসেন। যদিও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তাঁরা লোকচক্ষুর আড়ালে থাকতেই বেশি পছন্দ করেন।

         পর্যটক সিমুক সাতবাহন :হিমালয়ের ঠান্ডা আবহাওয়া হোক বা গরম- তারা প্রতিটি ঋতুতে জামাকাপড় ছাড়া থাকেন। তাঁরা বিশ্বাস করেন যে, ঈশ্বরের কাছে পৌঁছানোর জন্য ছোটো জিনিসগুলি নিয়ে বিভ্রান্ত হওয়া উচিত নয়, যেমন পরিচ্ছন্ন থাকা এবং পোশাক পরিধান করা। অঘোরীরা বিশ্বাস করেন যে তাঁদের কাছে মানুষের সব রোগ নিরাময়ের ওষুধ আছে। তারা মৃতদেহ থেকে অসাধারণ তেল বের করে ঔষধ তৈরি করেন, যা খুব কার্যকর বলে মনে করা হয়। অঘোরী সাধুরা ঘৃণা থেকে দূরে থাকেন। কর্মের উপর ভিত্তি করে ভগবান শিবের প্রদত্ত সবকিছুই তাঁরা গ্রহণ করেন। তাঁদের মতে,পরিত্রাণের জন্য এটা প্রয়োজনীয়।

         পর্যটক যজ্ঞশ্রী সাতকর্নী : তাঁরা নিজের কাপড় ত্যাগ করলেও মৃতদেহগুলি জ্বলন্ত চিতার ছাই দিয়ে নিজের শরীর ঢেকে রাখেন। মানুষের হাড়কে গহনার মতো পরিধান করেন। বলা হয় যে অধিকাংশ অঘোরীদের তান্ত্রিক ক্ষমতা আছে। তাঁরা কালো জাদুও জানেন এবং তাঁরা যখন মন্ত্রকে উচ্চারণ করতে শুরু করেন তখন তাঁদের মধ্যে কিছু অলৌকিক ক্ষমতা আসে বলে মনে করা হয়। অঘোরীরা নারীদের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক করেন। কিন্তু তাদের ইচ্ছা না থাকলে স্পর্শ করেন না। তাঁরা শশ্মানের মৃতদেহের সঙ্গেও যৌন সম্পর্ক করেন । পর্যটক  শিশুনাগ :অঘোরী সাধু হওয়া মোটেই সহজ কাজ নয়। টানা ১২ বছর কঠোর সাধনার পর অঘোরী গুরুর আশীর্বাদে নিজের ধর্মীয় যাত্রা শুরু করেন অঘোরী সাধুরা। আর তখনই জন্ম হয় এক চরম সাধকের। যাঁদের বস্ত্র হয় মৃত ব্যক্তির জামা-কাপড়ের ছেঁড়া অংশ। শরীরে থাকে মৃত দেহের ছাই। এখানেই শেষ নয়, এমন সাধকদের সারা জীবন বেশ কিছু নিয়ম মেনে চলতে হয়, যেমন- প্রত্যেক অঘোরী সাধু কে একজন গুরুর অধীনে থাকতে হয়। গুরু যা বলেন, সেইভাবে জীবনযাপন করতে হয়। সংগ্রহ করতে হয় মৃতদেহের খুলি, যা তাঁদের সাধনার প্রধান উপকরণ।

      মোল্লা শেখ মোহাম্মদ শাহাদত : নাস্তিকবিদ্বেষীরা আসলেই বিশ্বাস করেন যে ঈশ্বরে বিশ্বাস না করা একজন মানুষকে খুন/ধর্ষণের দিকে নিয়ে যায়। শাঁকচুন্নিতে বিশ্বাস না করা আপনাকে কোনদিকে নিয়ে যায়? যারা শাঁকচুন্নিতে বিশ্বাস করেন না তাদের করা যেকোনো অপরাধের জন্য কি তাদের শাঁকচুন্নিতে বিশ্বাস না করা দায়ী? স্ট্যালিন একজন নাস্তিক হয়ে একটি খুনী শাসনব্যবস্থা পরিচালনা করেন। তাই দাবি করা হয়, নাস্তিকতা মানুষকে খুনী বানায়। স্ট্যালিন কেবল একজন নাস্তিক ছিলেন না, তিনি একজন পুরুষও ছিলেন। সেইসূত্রে আমরা কি দাবি করতে পারি যে, একজন পুরুষের ‘পুরুষত্ব’ কোটি কোটি মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী? বা, একজন পুরুষের পুরুষত্বই তাকে খুনী বানায়? বা, পুরুষ হওয়াটা একজন মানুষের ভুল? আমি যদি কোনো ইসলামী সন্ত্রাসের জন্য ইসলামকে দায়ী করি তাহলে আমাকে যারা বলবে, ‘তিনি সহিহ মুসলিম ছিলেন না, তার অপকর্মের দায় তার, ইসলামের নয়’, ঠিক তারাই বিশ্বাস করেন এবং প্রচার করেন যে, স্ট্যালিনের অপকর্ম সমূহের জন্য তার নাস্তিকতাই দায়ী!

          পর্যটক তানসেন :আমি একজন নাস্তিক আর আমার ন্যায়পরায়ণ হওয়ার জন্য ঈশ্বর বা কোনো ধর্মে বিশ্বাস করার কোনো প্রয়োজন নেই। নাস্তিকবিদ্বেষীদের সমস্যা, তারা এই বিষয়টা কোনোভাবেই বুঝে উঠতে পারে না যে ঈশ্বর বা ধর্মে বিশ্বাস না করে একজন মানুষ কিভাবে ন্যায়পরায়ণ হতে পারে। এই বিষয়টি বুঝার মতো মানসিক সামর্থ্য তাদের নেই। যারা নাস্তিকদের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, আমার মনে হয় না তাদের অধিকাংশই এবিষয়ে কখনো গভীরভাবে ভেবে দেখেছেন যে ঈশ্বরে বিশ্বাস না করে বা কোনো ধর্মে বিশ্বাস না করে কিভাবে একজন মানুষ ন্যায়পরায়ণ হতে পারে। অধিকাংশ ধর্মবিশ্বাসী আস্তিক মনে করেন, একজন মানুষ ধর্মের কারণে ভালো খারাপের পার্থক্য বুঝতে পারেন, ঈশ্বরের ভয়ে খারাপ কাজ থেকে দূরে থাকতে পারেন। সেইজন্য তারা মনে করেন, যারা ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাস করেন না বা কোনো ধর্মে বিশ্বাস করেন না তারা যেকোনো সময় যেকোনো মানুষকে খুন করতে পারেন, নিজের মা-বোনকেও ধর্ষণ করতে পারেন। তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী, তাদের ঈশ্বর-বিশ্বাস বা ধর্মবিশ্বাসই তাদেরকে যেকোনো সময় যেকোনো মানুষকে খুন করা বা নিজের মা-বোনকে ধর্ষণ করা থেকে বিরত রাখে। তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী, তাদের মধ্যে ঈশ্বর-বিশ্বাস বা ধর্মবিশ্বাস না থাকলে তারা হয়তো যেকোনো সময় যেকোনো মানুষকে খুন করতে পারেন, নিজের মা-বোনকেও ধর্ষণ করতে পারেন।

          পর্যটক অজিত বসু : বাঙালি জাতি সম্পর্কে নৃবিজ্ঞানীদের ধারণা, এটি একটি মিশ্রিত জাতি এবং এ অঞ্চলে বসবাসকারী আদিতম মানবগোষ্ঠীসমূহের মধ্যে অন্যতম। পৃথিবীর বহু জাতি বাংলায় অনুপ্রবেশ করেছে, অনেকে আবার বেরিয়েও গেছে, তবে পেছনে রেখে গেছে তাদের আগমনের অকাট্য প্রমাণ। বৃহত্তর বাঙালির রক্তে মিশ্রিত আছে বহু এবং বিচিত্র সব নরগোষ্ঠীর অস্তিত্ব। দীর্ঘকাল বিভিন্ন জন ও কোমে বিভক্ত হয়ে এ আদি মানুষেরা বঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় বসবাস করেছে, এবং একে অপরের সঙ্গে মিশ্রিত হয়েছে শতকের পর শতকব্যাপী। জাতিতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞানীদের মতে পৃথিবীর চারটি প্রধান নরগোষ্ঠীর প্রতিটির কোনো না কোনো শাখার আগমন ঘটেছে বাংলায়। নরগোষ্ঠীগুলি হলো নিগ্রীয়, মঙ্গোলীয়, ককেশীয় ও অষ্ট্রেলীয়। মনে করা হয় যে, বাংলার প্রাচীন জনগুলির মধ্যে অষ্ট্রিক ভাষীরাই সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশের সাঁওতাল, বাঁশফোড়, রাজবংশী প্রভৃতি আদি অষ্ট্রেলীয়দের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এই আদি জনগোষ্ঠীগুলি দ্বারা নির্মিত সমাজ ও সামাজিক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটে আর্যদের আগমনের পর। বাংলাদেশের জনপ্রবাহে মঙ্গোলীয় রক্তেরও পরিচয় পাওয়া যায়। বাঙালির রক্তে নতুন করে মিশ্রন ঘটল পারস্য-তুর্কিস্তানের শক জাতির আগমনের ফলে। বাঙালি রক্তে বিদেশি মিশ্রন প্রক্রিয়া ঐতিহাসিককালেও সুস্পষ্ট। ঐতিহাসিকযুগে আমরা দেখি ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এবং ভারতের বাহির থেকে আসা বিভিন্ন অভিযাত্রী নরগোষ্ঠী বাঙালি জাতি নির্মাণে অবদান রাখতে। গুপ্ত, সেন, বর্মণ, কম্বেজাখ্য, খড়গ, তুর্কি, আফগান, মুগল, পুর্তুগিজ, ইংরেজ, আর্মেনীয় প্রভৃতি বহিরাগত জাতি শাসন করেছে বঙ্গ অঞ্চল এবং রেখে গেছে তাদের রক্তের ধারা। এমনকি পাকিস্তান যুগেও আমরা দেখি রক্ত মিশ্রণে চলমান প্রক্রিয়া। বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে এ শংকরত্ব আরো বেগবান হচ্ছে। এক কথায় বাঙালি একটি শংকর জাতি।

          পর্যটক কংসারি হালদার : তবে আধুনিক শংকরতার পরিবেশ থাকলেও আদি জাতি স্বত্ত্বাই বাঙালির প্রকৃত পরিচয়। বৈদিক স্তবগান-স্ত্ততিতে বাংলা অঞ্চলের কোনো উল্লেখ নেই। বৈদিকদের সর্বপূর্ব জায়গা বিহার। ঐতরীয় ব্রাহ্মণে উল্লেখ আছে যে, পূর্ব আর্যবর্তের আরো পূর্বে থাকে দস্যুরা। দস্যুদের কথা অস্তিত্ব ঘোষণা দিয়ে ঐতরীয়তে উল্লেখ করা হয়েছে যে, পুন্দ্র জাতি এবং তাদের রাজধানী ’পুন্ড্রনগর’-এর কথা। বর্তমান মহাস্থান গড়ই সেই দস্যুদের রাজধানী। ঐতরীয় ব্রাহ্মণে না থাকলেও সমকালীন ঐতরীয় আরণ্যকএ বঙ্গ জাতির উল্লেখ প্রথম পাওয়া যায়। ঐতরীয় রায় দিয়েছে, দস্যুরা পথভ্রষ্ট পাপী কেননা তাঁরা কোনো সত্য গ্রন্থের অনুসারী নয়। রামায়ণ ও মহাভারতে দেখা যায় যে, বঙ্গজরা পাপীতো নয়ই, বরং মিত্রতা প্রতিষ্ঠা করার মতো অতি সম্ভাবনাময় জাতি। রামায়ণে এক তালিকায় রয়েছে কোনো কোনো বঙ্গজ জাতির সঙ্গে আর্যদের মিত্রতা স্থাপিত হয়েছে। মহাভারতে ভীব কর্তৃক পুন্ডবর্ধন ও অন্যান্য কয়েকটি বঙ্গজ জাতিকে বশীভূত করার উল্লেখ আছে। বনপার্বণ গ্রন্থের তীর্থযাত্রা পর্বে পুন্ডনগরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হওয়া গঙ্গার একাংশ করতোয়া নদীকে পবিত্র ঘোষণা করা হয়েছে। এমনিভাবে ধীরে ধীরে বঙ্গজ জাতিগুলি মহাভারতের যুগে এসে আর্যাবর্তের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে মর্যাদার সহিত সম্পৃক্ত হলো।

          পর্যটক ইলা মিত্র :ঐতিহাসিকযুগে এসে প্রথম বঙ্গজ জাতিসমূহের উল্লেখ পাওয়া যায় দিগ্বিজয়ী আলেকজান্ডারের সঙ্গে ভারত বিজয় অভিযানে আসা গ্রিক ঐতিহাসিকদের লেখায়। তাদের লেখায় উল্লেখ করা হয় যে, পূর্ব ভারতে শক্তিশালী রাজ্যের কথা। গ্রিক এবং অন্যান্য বিদেশি ভ্রমণকাহিনীতে উল্লেখ করা হয়েছে পূর্ব ভারতের বিভিন্ন শক্তিশালী রাষ্ট্রের কথা। যেমন, গৌড়, বঙ্গ, হরিকেল, চন্দ্রদ্বীপ, বাঙ্গালাবাদ, পুন্ড, বারেন্দ্রী, দক্ষিণারাড়, উত্তরা রাধামন্ডল, তাম্রলিপ্তি, পুন্ডবর্ধন-ভুক্তি, সুবর্ণবীথি, বর্ধমানভুক্তি, কঙ্কগ্রাম ভুক্তি, মেঘনা নদীর অববাহিকার কয়েকটি রাজ্য। এসব রাজ্য ও ভুক্তি বৃহৎ বঙ্গের রাজনৈতিক বিকাশধারা, এমনকি বৈদেশিক বাণিজ্যে বাংলার ব্যাপক অংশগ্রহণ নির্দেশ করে। চৈনিক পরিব্রাজকদের দৃষ্টিতে পুন্ড্র রাজ্যের সামুদ্রিক বন্দর তাম্রলিপ্তি ছিল একটি আন্তর্জাতিক সামদ্রিক বন্দর। অর্থাৎ আর্য সভ্যতার পাশাপাশি এবং আর্যদের আগমনের আগেই এই বঙ্গভূমিতে গড়ে উঠেছিল নানা ছোটবড় রাজ্য। মহাভারতের বীরকর্ণ, কৃষ্ণ এবং ভীমসেনা বঙ্গরাজ্যগুলি জয় করে বীরত্ব প্রদর্শন করেছিলেন। অর্থাৎ সমকালীন যুগে রাজ্যগুলির বিকাশ ও খ্যাতি ছিল এমনই যে, এগুলিকে জয় করার জন্য আর্যবর্ত থেকে এসেছিলেন ঐশ্বরিক শক্তিধর বীরেরা।

          পর্যটক ভূপাল পাণ্ডা :বাঙালি জাতি পরিচয়ের ঐতিহাসিক যুগ শুরু হয় গুপ্তযুগ (৩২০ খ্রি.- ৬৫০ খ্রি.) থেকে এবং এ যুগেই প্রথম ক্ষুদ্র রাজ্যপুঞ্জগুলিকে নিয়ে গঠিত হয় বিশাল রাজ্য। যেমন গুপ্তদের সাম্রাজ্যিক ছত্রছায়ায় প্রতিষ্ঠিত হয় ক্ষুদ্র রাজ্যের বদলে বৃহৎ রাজ্য যেমন পূর্ব ভারতের দক্ষিণাঞ্চলের বঙ্গরাজ্য ও উত্তরাঞ্চলের গৌড় রাজ্য। বৃহৎ বঙ্গের প্রথম এবং ঐতিহাসিকভাবে সুনির্দিষ্ট এবং শক্তিশালী শাসক।  শশাঙ্ক (খ্রিস্টপূর্ব আনু ৬০০ খ্রি.-৬২৫ খ্রি.) তাঁর দক্ষ শাসনের মাধ্যমে বাংলা ও বাঙালিকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেন। তখন থেকেই বাঙালি জাতিসত্ত্বার যাত্রা শুরু এবং পাল ও সেন আমলে এসে সে সত্ত্বা আরো বিকশিত হয়ে বাঙালি জাতির শক্তিশালী ভিত্তি স্থাপন করে।

          পর্যটক আজম খান : ঠিক কি নাস্তিকদেরকে যেকোনো সময় যেকোনো মানুষকে খুন করা থেকে বিরত রাখে? ঠিক কি নাস্তিকদেরকে ধর্ষণ করা থেকে বিরত রাখে? আমি একজন নাস্তিক এবং আমি মানুষকে খুন করা থেকে বিরত থাকি, আমি মানুষকে ধর্ষণ করা থেকে বিরত থাকি। কারণ আমি তা করতে চাই না। ধর্মবিশ্বাসী আস্তিকরা মনে করেন, যদি আকাশ থেকে কোনো ঈশ্বর তাদের ওপর নজর না রাখেন তাহলে তারা যতখুশি খুন যতখুশি ধর্ষণ করতে পারেন, যা আমি করতে চাই না। আমার কোনো ইচ্ছা নেই কারো শ্বাসরোধ করার, আমার কোনো ইচ্ছা নেই কাউকে যন্ত্রণা দেয়ার। আমি শান্তিপূর্ণভাবে এবং নির্ভয়ে বেঁচে থাকতে চাই। আমার লক্ষ্য, আমার প্রতিবেশীদের সহযোগী হিসেবে গ্রহণ করা ও তাদের সহযোগী হওয়া আর এমন একটি সমাজ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা যেখানে আমি নির্ভয়ে শান্তিপূর্ণভাবে বেঁচে থাকতে পারবো এবং আমার প্রতিবেশীরাও নির্ভয়ে শান্তিপূর্ণভাবে বেঁচে থাকতে পারবে, যাদেরকে ছাড়া আমি নির্ভয়ে শান্তিপূর্ণভাবে বেঁচে থাকতে পারবো না। আর সেজন্য কোনো ঈশ্বরে বিশ্বাস করার প্রয়োজন নেই।

কাশিম খান :নাস্তিকতা কি কোনোভাবেই কোনোকিছুর কারণ? ধরুন, আমি একটি হ্রদে সাতার কাটতে চাই, তবে সেই হ্রদে সাতার কাটা নিষিদ্ধ। কেউ যদি সেই হ্রদে সাতার কাটে তাহলে তাকে ৩০০০ টাকা জরিমানা দিতে হবে। সেই হ্রদে সাতার কাটার ওপর জরিমানা আরোপ করা হয়তো আমাকে সেই হ্রদে সাতার কাটা থেকে বিরত রাখবে। ঠিক একইভাবে, কোনো ঈশ্বর যদি আমাকে চুরি/খুন/ধর্ষণ ইত্যাদি অপকর্মের জন্য জাহান্নামের ভয় দেখায় তাহলে আমার দ্বারা সেইসব অপকর্ম হওয়ার সম্ভাবনা হ্রাস পাবে। ধর্মবিশ্বাসী আস্তিকরা মনে করেন, ‘ঈশ্বরে বিশ্বাস যদি একজন মানুষের দ্বারা খুন/ধর্ষণ হওয়ার সম্ভাবনা হ্রাস করে, তাহলে ঈশ্বরে অবিশ্বাস একজন মানুষের দ্বারা খুন/ধর্ষণ হওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি করে’। না, এরকম ধারণা একদমই ভুল। আমি যদি সেই হ্রদে সাতার কাটতে চাই তাহলে সেই হ্রদে সাতার কাটার ওপর জরিমানা আরোপ হওয়াটা আমাকে তা থেকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে পারে। তবে, আমি যদি সেই হ্রদে সাতার কাটতে না চাই এবং সাতার কাটার জন্য যদি কোনো জরিমানা না থাকে, তাহলে জরিমানা না থাকাটা আমার মধ্যে সাতার কাটার ইচ্ছে তৈরি করবে না। আমি যদি জেনে থাকি, সেই হ্রদের নিচে প্রচুর ধনদৌলত লুকানো আছে, তাহলেই আমার সেখানে সাতার কাটার ইচ্ছা তৈরি হতে পারে। অবশ্যই কোনো বাধ্যকারী কারণ থাকতে হবে যা আমাকে বাধ্য করবে কাজটি করতে।

যুবরাজ মুরাদ: ঈশ্বরে বিশ্বাস না করাটা কোনোকিছুর জন্যই কোনো বাধ্যকারী কারণ নয়। নাস্তিকতার মূলে কোনো নিয়ম-নীতি নেই, কোনো আদেশ-নিষেধ নেই, কোনো উপদেশাবলি নেই, কোনো বৈধতা-অবৈধতা নেই। আস্তিকরা এক বা একাধিক ঈশ্বরের অস্তিত্ব দাবি করে এবং নাস্তিকরা তাদের দাবি বিশ্বাস করে না। ‘আমি কোনো ঈশ্বরে বিশ্বাস করি না’ এবং ‘আমি বিশ্বাস করি ঈশ্বর বলে কিছু নেই’, এই কথা দুটির কোনোটাই কোনো নিয়ম বা আদেশ নয়। এই কথা দুটির কোনোটাই কোনোকিছুর বৈধতা বা অবৈধতা প্রকাশ করে না। একজন নাস্তিক কি করলো না করলো তার দায়ভার নাস্তিকতার না। ঠিক যেমন একজন শাঁকচুন্নিতে অবিশ্বাসী কি করলো না করলো তার দায়ভার শাঁকচুন্নিতে অবিশ্বাস করার না।স্ট্যালিনের সমস্যা তার নাস্তিক হওয়ায় নয়, বরং একজন খুনি সর্বগ্রাসী একনায়ক হওয়ায় ছিলো!

        নাস্তিক যুবক : তত্ত্ব হিসেবে হয়তাে স্বীকার করা চলে নানা ধরনের বিশিষ্ট অভিজ্ঞতার মধ্যে একজাতের অভিজ্ঞতাকে ‘ধর্মীয় অভিজ্ঞতা নামে দেওয়া যায়। আকাশ, সমুদ্র, হিমালয়ের আনস্ত্যের সান্নিধ্যজাত বিস্ময়, প্রথম প্রেমের গভীরতার উপলব্ধি, শিল্পসৃষ্টির অভিনিবেশ ও আনন্দ, জটিল বৌদ্ধিক সমস্যার আকস্মিক বিদ্যুৎক্ষিপ্ৰ সমাধান, মাদকসেবনের কল্যাণে সেবকের চেতনায় বিবিধ অবাস্তব রূপ ও ঘটনাবলীর সাময়িকরিশমানতা—এসব বিভিন্ন জাতীয় অভিজ্ঞতা আমাদের প্রাত্যহিক খাওয়া-দাওয়া, চলাফেরা, কাজকর্মের অভিজ্ঞতা থেকে বেশ কিছুটা অন্য ধরনের। হয়তাে বা ধর্মীয় অভিজ্ঞতা এদেরই মতাে বিশিষ্ট এবং স্মরণীয় কোন অভিজ্ঞতা যা সকলের প্রাত্যহিক জীবনে না ঘটতে পারে। কিন্তু কোন অভিজ্ঞতাকে সম্ভাব্য অভিজ্ঞতা হিসেবে মানার অর্থ নয় যে বিশ্বাসী ঐ অভিজ্ঞতার যে অর্থ আরােপ করেছেন সেটি বিনা প্ৰমাণ-পরীক্ষায় মেনে নেওয়া হচ্ছে। মদ্যপানের মাত্রা বাড়ালে মাতাল ব্যক্তি চোখের সামনের বস্তুকে দ্বিগুণিত রূপে দেখেন ; তাঁর দেখাটা মােটেই অবিশ্বাস্য নয়, শারীরবৃত্তে তার ব্যাখ্যাও মেলে, কিন্তু যে বস্তুটি তিনি দেখেছেন সেটি বাস্তবে দ্বিগুণিত হয় না। সিদ্ধিসেবী তার পায়ের নিচের পথকে ঢেউ খেলানাে ভাবতে পারেন, হাওয়ায় উজ্জীন গােলাপি হাতির লাবণ্য তাকেগৰ্দগদচিত্ত করতেও পারে, কিন্তু ফলে সমতল পথে চড়াই উৎরাই রচিত হয় না, গােলাপি হাত্তি হওয়ায় ওড়ে না। যাঁদের সচরাচর ‘মরমী’ বলা হয়। তারাই সম্ভবত ধর্মীয় অভিজ্ঞতায় সিদ্ধাঠাদের সেই অভিজ্ঞতার উপাদান নিয়ে তাদের কল্পনা নানা রূপ রচনা করে এবং অনেক সময় প্রতীকের সূত্রে কিংবা কবিতায়, গানে, ছবিতে আকার নিয়ে সেই রূপ অন্যদের কাছে পৌঁছােয়। এসব থেকে তাঁদের অভিজ্ঞতার সততা ও কল্পনার সমৃদ্ধতার পরিচয় মেলে, কিন্তু তাদের অভিজ্ঞতা ও কল্পনার বাইরে কোন দেবতার বা তুরীয় লােকের অস্তিত্বের প্রমাণ মেলে না। ধর্মীয় অভিজ্ঞতা অবশ্যই মনস্তত্ত্বের আলােচ্য বিষয়, কিন্তু ঐ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে কোনাে অধিবিদ্যাত্মক প্রস্তাব দাঁড় করানাে অযৌক্তিক।

         পর্যটক স্যামুয়েল বেকেট : অবচেতনা কি?প্রায় আমি ভাবতে চেষ্টা করি ।অবচেতনা বলতে ঠিক কি বুঝায়।আমার কাছে যা মনে হয় তা হল যে কাজটি মানুষটি একে বারে ভাবনা চিন্তা ছাড়াই মনের অন্তরাল থেকে প্রাকৃতিক ভাবেই করে তাই অবচেতনা।আচ্ছা মানুষ কি সব কাজ ভেবে চিন্তেই করে নাকি অবচেতন মনে করে।আমার মনে হয় যে মানুষ সব চেয়ে বেশী কাজ করে অবচেতন মনে।প্রতিটি মানুষের থাকে একটি মন যার একটি অংশ অবচেতন।অবচেতন মন এক অদ্ভুদ অংশ যা দ্বারা মানুষ কল্পনা করতে পারে সব কিছু বাস্তব অবাস্তব সব কিছু।মানুষ হিসাবে মানুষের প্রতি প্রেম ভালবাসা আবেগ অনুভূতি এটা কি চেতন নাকি অবচেতন মনের অংশ?যে কাজটা আমার খুব বেশী জরুরী তাই হচ্ছে অবচেতন মনের কাজ।আসলে সব কাজ চেতনা নিয়ে করতে হয় না যেমনটা পৃথিবীতে সব কিছু জানতে হয় না কিছু জিনিষ অজানা থাকাই ভালো তেমনি অবচেতনা ও।মানুষ হিসাবে আমারো আছে ঐ একটি অবচেতন মন।যার মাধ্যমে আমি সৃষ্টি করে নিয়েছিলাম এক চরিত্র যার সাথে কোনদিন আমার দেখা হয় নি হয় নি কোন কথা।হয়তবা বাস্তবে তার অস্তিত্বও নাই কোন।সে শুধুই কল্পনা এটাই হচ্ছে অবচেতন মনের একটা কারসাজি।মানুষের এই অবচেতন মনের একটা বড় ভূমিকা আছে মানুষের সাথে ।এই অবচেতন মনই মানুষকে সপ্ন দেখায় বাঁচবার ।কেউ তার অবচেতন মনকে পারে না করতে অস্বীকার আমি জানি আমি কি কি আমার হ্মমতা আর জানি আমার সীমাবদ্ধতা ।অবচেতন মনেই এই কথাগুলা বলছি।প্রতিটি লাইনের আগেই জানতাম না পরের লাইন কি হবে।আমায় ঐ মন ঠিকই আমাকে জানিয়ে দিচ্ছে ।আমি ভালবাসি না।প্রতিটি কাজ করছে এই অবচেতনা ।মানুষের জন্য এই অবচেতন মন সত্যিই গুরুত্বপূর্ন একটা ব্যাপার।আচ্ছা মনকে কি আদৌ দেখা সম্ভব?আমার খুব দেখতে মন চায় ।কেউ যখন তার গার্লফ্রেন্ডকে বলে যদি বল তোমাকে আমার মন খুলে দেখাতে পারি তখন আমার বলতে ইচ্ছা হয় ওরে ছাগল পারলে দেখা তো দেখি।আমার যে অদ্ভুদ ইচ্ছা গুলা আসে সবই ঐ অবচেতন মনের অংশ।এই অবচেতন মন নিয়ে থাকতে চায় যতদিন বেঁচে আছি এই ধরনীতে।

          পর্যটক আলী কাদির হাসান আলী মির্জা খান বাহাদুর :মানসিক দাসত্ব করতে শরীর খাটাতে হয় না, বরং মনমানসিকতা ও বিবেককে বিক্রি করে নিজ সত্তাকে জলাঞ্জলি দিতে হয়। নিয়োগকর্তার স্বার্থ রক্ষার্থে সত্যকে মিথ্যায় পরিণত করা এবং মিথ্যাকে সত্যে পরিণত করে বিনিময়ে শাসকগোষ্ঠীর সুদৃষ্টি অর্জন করে নিজ ও পরিবারের জন্য সুখ স্বাচ্ছন্দ্য আদায় করার নামই মানসিক দাসত্ব। এ ধরনের দাসের সংখ্যা বিশেষ করে কথিত বুদ্ধিজীবী সমাজ, কলকাতামনস্ক বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে এ প্রবণতা এখন সবচেয়ে বেশি। সম্প্রতিককালে কথিত বুদ্ধিজীবীদের সাথে পাল্লা দিয়ে সরকারি আমলাসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো কোনো সদস্য, যারা সংখ্যায় মোটেও কম নয়, মানসিক দাসত্বের চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে, যার ফলে জনগণ এখন আর সাধারণত সত্যের আলোর মুখ দেখতে পায় না।

          পর্যটক আজাদ উদদৌলা বাবর আলী খান বাহাদুর :মানুষের জন্যই সভ্যতা। গর্ব করে বুক ফুলিয়ে মানুষ দাবি করে বলে, ‘মানুষ হলো সৃষ্টিকর্তার সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি’। সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টির স্বীকৃতির একমাত্র উপাদান মানুষের ‘বিবেক’। অনেক পশু রয়েছে যারা অনেক চতুর বা চালাক, অনেক সাহসী, অনেক শক্তিধর। কিন্তু জন্মলগ্ন থেকে তারা বিবেকসম্পন্ন হয় না বলে তাদের ‘পশু’ বলা হয়। তবে মানবজাতির মধ্যে কিছু মানুষ রয়েছে যাদের কর্মকাণ্ড পশুত্বকেও হার মানায়। পশুত্ব থেকে দু’পা বিশিষ্ট মানবজাতিকে রক্ষা করার জন্য যুগে যুগে শতাব্দীতে সৃষ্টিকর্তা বার্তাবাহক পাঠিয়েছেন যাদের কেউ অনুকরণ করে, কেউ করে না। মানুষ মাত্রই ‘বিবেক’ রয়েছে, কিন্তু পশুত্ব, লোভ, কামনা-বাসনার কাছে কোথাও কোথাও মানুষের বিবেক হার মেনে যায়, তখন কি শুরু হয় মানসিক দাসত্ব? ‘বিশ্বাসযোগ্যতা’ বলতে যা বোঝায় তা পৃথিবীতে এখন বিরল প্রজাতির মতোই একটি দুষ্প্রাপ্য বিষয়। মানসিক দাসত্বের কারণে মানুষ হয়ে পড়ে বিবেকবর্জিত এবং যাদের বিবেক চলে গেছে তাদের পক্ষে যেকোনো কাজ করা সম্ভব যা চার পা-বিশিষ্ট পশুরা করে থাকে।

          পর্যটক মিশেল ফুকো : নকশাল আন্দোলন কলকাতার ছাত্র সংগঠনগুলোর ব্যাপক সমর্থন পেয়েছিল।[৯] ছাত্রদের একটি বড় অংশ লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে বিপ্লবী কর্মকান্ডে অংশ নিয়েছিল। বিশেষত নামকরা স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্ররা প্রভাবিত হয়েছিল এই আন্দোলনে। চারু মজুমদার বলেছিলেন বিপ্লবী কার্যক্রম শুধুমাত্র গ্রামাঞ্চলে চালিয়ে গেলেই চলবে না, বরং একে সর্বত্র ছড়িয়ে দিতে হবে। তিনি নকশালদের শ্রেণীশত্রু খতম করার নির্দেশ দেন। এ শ্রেণীশত্রুদের মধ্যে যেমন ছিল ভূস্বামী তেমনি ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, পুলিশ অফিসার, রাজনীতিবিদ এবং আরও অনেকে। সে সময় কলকাতার সব স্কুল বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। নকশালপন্থী ছাত্ররা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় দখল করে নিয়ে তার মেশিন শপে পুলিশদের সাথে লড়ার জন্য আগ্নেয়াস্ত্র তৈরি করেছিল। প্রেসিডেন্সি কলেজ ছিল তাদের সদর দফতর। তারা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ডাঃ গোপাল সেন কে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল।

          পর্যটক গায়ত্রী চক্রবর্তি স্পিভাক :নকশালরা অল্পসময়ের মধ্যে ভারতের শিক্ষিত সমাজের ব্যাপক সমর্থন পেয়েছিল। দিল্লীর “সেন্ট স্টিফেন্স কলেজ” তাদের বিচরণ ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। এরপর সরকার নকশালদের কে শক্ত হাতে দমনের সিদ্ধান্ত নেয়। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায় নকশালদের উপর প্রতি-আক্রমণের নির্দেশ দেন। পুলিশকে কিছু মানবতা বিরোধী ক্ষমতা দেওয়া হয়। এর মধ্যে ছিল নির্বিচারে হত্যা এবং অকারণে যে কাউকে বন্দী করার ক্ষমতা। লক -আপ হত্যা, জেলবন্দী হত্যা ও ভূয়ো সংঘর্ষ দ্বারা পুলিশ বিভিন্ন সময় নকশালপন্থীদের হত্যা করেছে। এক মাসের ভেতরে সরকার পর্যটক জাক দেরিদা : নকশাল আন্দোলন দমন করেছিল। “ নকশালদের শক্ত হাতে দমন করা ছাড়া আর কোন উপায় নেই” ভারত সরকার এবং পুলিশের মনোভাব ছিল এমনি। তারা দেশের জনগন কে এ কথাও ভাল ভাবে বুঝিয়েছিল যে “দেশ এখন ঐ চরমপন্থীদের সাথে গৃহযুদ্ধে নেমেছে, এ যুদ্ধে গণতন্ত্রের নামে পরিহাসের কোন স্থান নেই। কেননা ঐ চরমপন্থীদের কাছে গণত্ন্ত্র মূল্যহীন”। এর ফলে দেশবাসীর কাছে নকশালদের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়ে যায়, আর তাদের প্রতি সহানুভূতিশীলরা মুখ ফিরিয়ে নেয়।

         পর্যটক জাক লাকাঁ : অর্ন্তকোন্দলের কারণে আন্দোলনে ছেদ পড়ে। দলের একটি বড় অংশ চারু মজুমদারের নির্দেশিত পথের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। ১৯৭১ সালে সিপিআই(এম-এল) ভেঙে দু টুকরো হয়ে যায়। চারু মজুমদারের দল থেকে সত্য নারায়ন সিং বেরিয়ে যান। ১৯৭২ সালে চারু মজুমদার পুলিশের হাতে ধরা পড়েন এবং আলীপুর জেলে নিহত হন। তাত্ত্বিক নেতা সরোজ দত্তকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে নিয়ে গেলে তার আর খোঁজ পাওয়া যায়নি, সম্ভবত তাকে হত্যা করা হয়। পলিটব্যুরোর অন্যতম নেতা সুশীতল রায়চৌধুরী আত্মগোপন থাকা অবস্থায় মারা যান। প্রধান নেতৃবর্গের বড় অংশই জেল বন্দী হন। পরে নকশালপন্থী দল ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী) বহু ধারা উপধারায় বিভক্ত হয়ে যায়। অনেক বছর পরে অন্যতম প্রধান নেতা কানু সান্যাল ২০১০ সালের ২৩শে মার্চ পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং জেলার নকশালবাড়ী থানার হাতিঘিষা গ্রামের নিজ বাড়িতে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন। শারীরিক অসুস্থতা সইতে না পেরে তিনি আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৮ বছর।

         পর্যটক জুলিয়া ক্রিস্তেভা : সম্প্রতি ২০০৯ সালের মে মাসে পশ্চিমবঙ্গের লালগড়ে পুলিশদের তাড়িয়ে দেয় এবং ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির কর্মিদের উপর হামলা চালায়। এ এলাকায় মাওবাদী জঙ্গীরা তাদের প্রভাব বাড়াচ্ছে এই অভিযোগে রাজ্য সরকার জুনের প্রথম দিকে পুলিশ এবং আধা সামরিক বাহিনীর সমন্বয়ে অভিযান চালিয়ে লালগড় পুনরুদ্ধার করে। মাওবাদী নেতা কিষেনজি এক সাক্ষাতকারে বলেন- “তারা পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতাসীন বাম এবং তাদের পুলিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে নিজেদের জন্য মুক্তাঞ্চল গড়ে তুলতে চায়। আর তারই শুরু হিসেবে তারা লালগড়ে ঘটনাটি ঘটিয়েছে। ১৯৭০ সালের পরে তারা আবার সংগঠিত হয়েছে আর ২০১১ সাল নাগাদ কলকাতাতে তারা সশস্ত্র আন্দোলন পরিচালনা করবে।  সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় এই যে, রাষ্ট্রও মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ করে। যখন শাসকগোষ্ঠী মনে করে, মিথ্যা বলা ছাড়া জনগণকে ধোঁকা দেয়া যাবে না, তখনই রাষ্ট্রীয় প্রচারযন্ত্র মিথ্যাকে সত্য বানিয়ে প্রচার শুরু করে। ফলে রাষ্ট্রীয় প্রচারযন্ত্রের ওপরেও জনগণের আস্থা কমে গেছে। পাশাপাশি ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রচারযন্ত্রগুলোও কোথাও সরকারের বা কোথাও মালিকের স্বার্থ রক্ষা করে, প্রয়োজনে ‘সত্য’কে জলাঞ্জলি দিচ্ছে।

               পর্যটক ফেরাদুন জা মনসুর আলী খান বাহাদুর : ‘বিবেক’ সব সময়ই সত্যের সন্ধানে থাকে, কিন্তু ব্যত্যয় হয় তখনই যখন লোভ, বৈষয়িক প্রতিপত্তি ও চাওয়া-পাওয়ার কামনা-বাসনা মনের ভেতর গভীরভাবে বাসা বাঁধে। ‘সত্য’কে মানুষ তখনই পরিহার করে যখন সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের আশা আকাঙ্ক্ষা প্রকট আকার ধারণ করে। গেরুয়া পোশাক পরে ‘সাধু’ হওয়ার সংখ্যাই এখন বেশি, ‘মন’ রাঙিয়ে ‘সাধু’ হওয়া অর্থাৎ মনে-প্রাণে ‘সাধু’ হওয়ার আধিক্য এখন কোথায়? সবাই বলি ‘সত্য’ সুন্দর অথচ এই সুন্দরকেই আমরা পরিহার করি যখন মানসিক দাসত্ব আমাদের মন-মগজে বাসা বাঁধে।

        পর্যটক চারু মজুমদার : তিতুমীর ওরফে সৈয়দ মীর নিসার আলী, ব্রিটিশ বিরোধী বিপ্লবী ওয়াহাবী আন্দোলন এর সাথে যুক্ত ছিলেন। তাঁর জন্ম  চব্বিশ পরগনার বাদুড়িয়া থানার হায়দারপুর গ্রামে । ১৮২২ সালে তিতুমীর মক্কায় হজ্জ করতে যান, সেখানে আরবের স্বাধীনতা-নেতা সৈয়দ আহমেদ শহীদের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন আর ফিরে এসে তিতুমীর তার গ্রামের দরিদ্র কৃষকদের সাথে নিয়ে হিন্দু জমিদার এবং ব্রিটিশ নীলকদের বিরুদ্ধে সংগঠিত হয়ে আন্দোলন শুরু করেন। তিনি এবং তার অনুসারীরা তৎকালীন হিন্দু জমিদারদের অত্যাচারের প্রতিবাদে ধুতির বদলে ‘তাহ্‌বান্দ’ নামে এক ধরনের পোশাক পরতে শুরু করেন। তাঁর অনুসারীর সংখ্যা বেড়ে এক সময় ৫,০০০ গিয়ে পৌঁছায়।তারা সশস্ত্র সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত হয়। ১৮৩১ সালের ২৩শে অক্টোবর বারাসতের কাছে বাদুড়িয়ার ১০ কিলোমিটার দূরে নারিকেলবাড়িয়া গ্রামে তারা বাঁশের কেল্লা তৈরি করেন। তিতুমীর  চব্বিশ পরগনা, নদীয়া এবং ফরিদপুরের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের অধিকার নিয়ে সেখানে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তাদের সাধারণ তলোয়ার ও হালকা অস্ত্র নিয়ে তিতুমীর ও তার সৈন্যরা ব্রিটিশ সৈন্যদের আধুনিক অস্ত্রের সামনে দাঁড়াতে পারেন নি। ১৪শে নভেম্বর তিতুমীর ও তার চল্লিশ জন সহচর শহীদ হন। তার বাহিনীর প্রধান মাসুম খাঁ বা গোলাম মাসুমকে ফাঁসি দেওয়া হয়। বাশেঁর কেল্লা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।

             পর্যটক ফের্দিনঁ দ্য সোস্যুর :সিলেট ও চট্টগ্রামের ভাষা মান্য বাংলার থেকে খুব আলাদা, আমরা জানি। মান্য উড়িয়া, মান্য অসমিয়া বরং মান্য বাংলায় কথা বলা মানুষ সহজে বোঝেন। সিলেট এবং চট্টগ্রাম – এ দুটী প্রান্তিক অঞ্চল প্রাচীন এবং মধ্যযুগে দেশজ শাসনে থাকাকালীন, এই ঐতিহাসিক সময়টায় সেভাবে গৌড়ের অধীনে ছিল না। ফলে ভাষাটা মান্য বাংলার সঙ্গে যথেষ্ট পরিমাণে ইন্টিগ্রেটেড হয়নি। মুসলমান আক্রমণের পরে ইন্টিগ্রেটেড হয়েছে রাজনৈতিকভাবে, ধর্মীয়ভাবে, কিন্তু মান্য বাংলা ভাষার সঙ্গে ইন্টিগ্রেটেড হওয়ার সুযোগ মেলেনি, কারণ, রাজপুরুষরা, সরকার, সবাই ফার্সি ব্যবহার করেন। এর তুলনায় মৈথিলি, অসমিয়া, উড়িয়াভাষী অঞ্চল প্রাচীন কাল থেকেই আমাদের, গৌড়ের শাসনে থেকেছে, ফলে এ ভাষাগুলি মান্য বাংলার বেশি কাছাকাছি।এর তাৎপর্য হল, মধ্যযুগে তুর্ক–পাঠান–মোগল–ইরানি–আরব মুসলমান শাসনেই বাঙালি জাতির উৎপত্তি – এরকম যে একটা তত্ব বাজারে চালু আছে, সেটি সর্বৈব ভুল। জাতিগঠনের কাজ করার জন্য স্বজাতির শাসক থাকা বাঞ্ছনীয়। বরং, উপরের উদাহরণ থেকে দেখবেন, মধ্যযুগেই বাঙালি সাংস্কৃতিক একীকরণ বাধা পেয়েছে। ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় আকারে দুর্গাপুজো তো শুরুই হল সিরাজকে সরানোর পরে।

         পর্যটক নোম চমস্কি : বাঙালি শব্দটি এইভাবে চর্যার সময় থেকে ক্রমে বিবর্তিত হয়েছে। চৈতন্য নিজেকে বাঙালি বলতেন না, পুরো আন্দোলনটিই গৌড়ীয় বৈষ্ণব আন্দোলন নামে পরিচিত। রামমোহনও নিজেকে বাঙালি বলতেন না। এদের বাদ দিলে তো বাঙালির ইতিহাস লেখা যাবে না। অর্থাৎ গঙ্গারিডাই জাতিকেও বাঙালির মধ্যে ধরতে হবে, সেটাই যৌক্তিক। বাঙালির সংজ্ঞা নমিনাল নয়, বাঙালির সংজ্ঞা নামমাত্র নয়।বাঙালির সংজ্ঞা ভাষাবাদীও নয়। উনিশশো কুড়ি সাল নাগাদ যশোরের একদল গ্রামবাসী পুলিসের কাছে এজাহার দিতে গিয়ে বলছেন এ গ্রামে মোটে পাঁচ ঘর বাঙালি, বাকি সব মুসলমান, আমি অনেকবার সুনীল গাঙ্গুলির “আমি কি বাঙালি” বইটা থেকে উদ্ধৃত করেছি বহুবার। শরৎচন্দ্রে বাঙালি ও মুসলমানের ফুটবলের উল্লেখ আছে, সেটা শরতের সাম্প্রদায়িকতা নয়, বাঙালি শব্দের ঐতিহাসিক অর্থই বোঝায়। মধ্যযুগে এদেশের দেশজ সংস্কৃতির ধারক বাহককে বাঙালি বলতেন বিদেশী শাসক, শাসকদের এজেন্ট সুফি–পীরগণ এবং তাদের দ্বারা ধর্মান্তরিত মুসলমানেরা। বাংলার মুসলমান নিজেকে বাঙালি মনে করত না। উনিশশো পঞ্চাশের দশকে পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামির উত্থান, আওয়ামি মুসলিম লিগ নামে দলটির জন্ম, এরপর পশ্চিম পাকিস্তানকে সফলভাবে চ্যালেঞ্জ করার জন্য হিন্দু ভোটের প্রয়োজনে দলের নাম থেকে মুসলিম ছেঁটে ফেলা, পশ্চিম পাকিস্তানীদের দ্বারা বাংলাভাষী মুসলমানের বংগালি বলে চিহ্নিত হওয়া, হেয় এবং অপমানিত হওয়া। এবং সেই ভাষা আন্দোলন। ফলে বাঙালির একটা ভাষাবাদী সংজ্ঞা তৈরির পেছনে পাকিস্তানের, বিশেষ করে পশ্চিম পাকিস্তানের মুসলমানের বড় ভূমিকা আছে।

         পর্যটক সুকুমার সেন :বাঙালিত্ব কি, সেটা বুঝতে গেলে সর্বাগ্রে বাঙালিকে একটা fetish এ পরিণত করা বন্ধ করতে হবে। বাঙালিকে ইতিহাসের ফ্রেমে পুনর্স্থাপিত করতে হবে, বাঙালি বড় বেশি শেকড়বিচ্ছিন্নভাবে বেঁচে আছে। যেমন কালী হলেন আমাদের শক্তি উপাসনার মূর্ত প্রতীক। কালীর পায়ের তলায় শিব বা রাধাকৃষ্ণ হলেন প্রকৃতিপুরুষ দ্বৈতবাদের মূর্ত প্রতীক। এবং এই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় বাঙালিকে দেখতে হবে, সেখানে কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ সৃষ্ট কালীপ্রতিমার প্রাচীনত্ব বিবেচ্য নয়, গঙ্গারিডাই বা পাণ্ডু রাজার ঢিবিতে মা কালী ছিলেন কি ছিলেন না, সেটা ধর্তব্য নয়। আগেই বলেছি, চৈতন্যও নিজেকে বাঙালি বলতেন না। তাতে কিছু যায় আসে না, ওঁকে বাদ দিয়ে বাঙালি হয় না।

            নব্যনাস্তিক যুবতী : বাঙালি তাহলে কবে জন্মালো ?

             সমাধিবউদি : দেশভাগের দিন ।

         পর্যটক হুমায়ুন আহমেদ :আধুনিক যুগের আগে জাতীয়তাবাদ ছিল না, জাতিচেতনা ছিল না, কথাটা বহুল প্রচলিত, এবং সর্বাংশে ঠিক নয়। স্টিভেন গ্রসবি বলছেন্‌ বাইবেলের ওল্ড টেস্টামেন্টেও জাতিত্ব এবং জাতিচেতনা দেখা যাচ্ছে। যাই হোক, উপমহাদেশে একটা আশ্চর্য হিস্টোরিওগ্রাফি দেখা যায়, আধুনিক শ্রেণীসংগ্রামের তত্ত্বের উত্থানের বহু আগে থেকেই শ্রেণীসংগ্রাম ছিল, শ্রেণীচেতনা ছিল, এরা সবাই একমত। কিন্তু বঙ্কিম এ জিনিসটা “পশ্চিম থেকে আমদানি” করার আগে জাতীয়তাবাদ ছিল না।

পর্যটক গাজি মালিক সুলতান গিয়াসুদ্দিন তুগলক শাহ: খেলা হবে খেলা হবে ।

পর্যটক মুহাম্মাদ বিন তুগলক সুলতান মোহাম্মদ আদিল বিন তুগলক শাহ : ইনকিলাব জিন্দাবাদ :

পর্যটক ফিরোজ শাহ তুগলক সুলতান ফিরোজ শাহ তুগলক : খেলা হবে খেলা হবে ।

পর্যটক তুগলক খান ইবন ফতেহ খান ইবন ফিরোজ শাহ সুলতান গিয়াস উদ দিন তুগলক শাহ : মরো সালে।

পর্যটক আবু বকর খান ইবন জাফর খান ইবন ফতেহ খান ইবন ফিরোজ শাহ সুলতান আবু বকর শাহ: কৌন?

পর্যটক মোহাম্মদ শাহ ইবন ফিরোজ শাহ সুলতান মোহাম্মদ শাহ : ইনকিলাব জিন্দাবাদ ।

পর্যটক হুমায়ুন খান সুলতান আলাউদ্দিন সিকান্দার শাহ : কৌন কমবখত বরদাশত করনে কো পিতা হ্যায় ? হম তো পিতে হ্যায় কি য়হাঁ পর বৈঠ সকে, তুমহে দেখ সকে, তুমহে বরদাশত কর সকে….

পর্যটক মুহাম্মদ শাহ ইবন মুহাম্মদ শাহ সুলতান নাসির উদ্দিন মুহাম্মদ শাহ তুগলক : খুদা কে ওয়াস্তে পর্দা না কাবে সে উঠা জালিম, কঁহি এইসা না হো ইয়া ভি ওয়াহি কাফির সনম নিকলে, কঁহা মেয়খানে কা দরওয়াজা গালিব অর কঁহা ওয়াইজ, পর ইতনা জানতে হ্যাঁয় ওহ যাতা থা কে হাম নিকলে…হাজারো খোয়াইঁশে এইসি কে হার খোয়াইশ পে দম নিকলে, বহোত নিকলে মেরে আরমান, লেকিন ফির ভি কম নিকলে…”

পর্যটক নুসরাত খান ইবনে ফাতেহ খান ইবনে ফিরোজ শাহ সুলতান নারিরুদ্দিন নুসরাত শাহ তুগলক : ম্যায় ভি খ্যায়েফ নহিঁ তখতা-এ-ডর সে, ম্যায় ভি মনসুর হুঁ কহ দো অঘয়ার সে, কিঁউ ডরাতে হো জিন্দন কি দিওয়ার সে, জুল্ম কি বাত কো জাহিল কে রাত কো, ম্যায় নহিঁ মানতা ম্যায় নহিঁ জানতা…

          পর্যটক সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় : জাতীয়তাবাদ সর্বদাই একটি কোর্স কারেকশন হিসেবে উঠে আসে। বাঙালি, পশ্চিম–মুগ্ধ বাঙালি, হিন্দু কলেজের বাঙালি, ইয়ং বেঙ্গলের বাঙালি একটা নির্দিষ্ট পথে চলছিল। বঙ্কিম ছিলেন ইতিহাসের কোর্স কারেকশন। বঙ্কিম যখন বলছেন বাঙালির ইতিহাস চাই নইলে বাঙালি মানুষ হবে না, তখন একটা কোর্স কারেকশন করছেন। এবং বঙ্কিম ব্যক্তিগত উদ্যোগেই কাজ করেছেন, কোনও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ ছিল না। হরপ্রসাদ যখন কাজ করছেন তখন, রাজেন্দ্রলাল মিত্রর এশিয়াটিক সোসাইটি পাশে ছিল, পরে ইংরেজ আশ্রিত এশিয়াটিকের বদলে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ স্থাপিত হয়েছিল, যদিও হরপ্রসাদ সে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করেন বৃদ্ধ বয়েসে, তার কাজকর্মে হতাশ হয়ে। ঠিকই করেছিলেন। দীনেশ সেনের কাজ স্যার আশুতোষ এবং তাঁর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছত্রছায়ায়। কিন্তু বাঙালি জাতীয়তাবাদের সুস্পষ্ট রাজনৈতিক, দার্শনিক, সাংস্কৃতিক ডিসকোর্স নানা কারণে আগে গড়ে ওঠেনি, এবং সপ্তডিঙার আগে বাঙালি জাতীয়তাবাদের স্পষ্ট রূপরেখা দেওয়ার কাজ কেউ করেনি। বাংলাদেশের ‘ওরা’ আর পশ্চিমবঙ্গীয় ‘এরা’ যেটা করেছেন বাঙালির নামে, সেটাকে ভাষাবাদ বলা উচিত, বাঙালি জাতীয়তাবাদ নয়। 

          নাস্তিক যুবক: বাঙালি তাহলে কবে জন্মালো ?

          সমাধিদাদা : রবীন্দ্রসঙ্গীতের গ্রামোফোন রেকর্ড হবার পর ।

                       পর্যটক বাজিরাও পেশওয়া : প্রেমে পড়েননি এমন মানুষ পৃথিবীতে বোধহয় একজনও পাওয়া যাবে না। এই প্রেমের জন্য আমি অমর । আমি মাস্তানির সঙ্গে প্রেমে পড়েছিলুম ; কিন্তু আমরা ধর্ম বদলাইনি । মাস্তানির গর্ভে আমার ছেলে মুসলমান ; কাশিবাঈয়ের গর্ভে আমার ছেলেরা হিন্দু । কেউই এই প্রেমকে লাভ জিহাদ বলেনি ।  প্রেম নিয়ে নানা তবে প্রেমে পড়ার পেছনে রয়েছে অনেক মনস্তাত্ত্বিক ও বৈজ্ঞানিক কারণ। মনোবিদ ও ব্যবহার বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমোনের নানা কারণ, চারপাশের অবস্থান, পরিস্থিতি এসব কারো সঙ্গে মতের মিলের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্রেম মানে না কোনো বাঁধা, মানে না কোনো যুক্তি তর্ক। যে কারণে দিনক্ষণ ঠিক করে কারো জীবনে প্রেম আসে না। তবে যাই হোক, প্রেম তো আসে। প্রথম প্রেম বা ভালোবাসা প্রতিটি মানুষের কাছেই একটু বেশিই স্পেশাল। অনেকে বলেন ‘চাইলেই কি প্রথম প্রেম ভোলা যায়?’। জীবনের একটি নতুন অধ্যায়ের কথা কেউ কোনো দিন চাইলেও ভুলতে পারে না। যে কারণে জীবনে হাজারবার প্রেম আসলেও প্রথম প্রেমের জায়গা কেউ দখল করে নিতে পারে না । এর পেছনে রয়েছে মনোবিদদের নানান ব্যাখ্যা।  গবেষকরা বলছেন, প্রথম প্রেম টিকে না উঠলে বা পরিপূর্ণতা না পেলে অনেকে পরবর্তীতে হয়তো অনেকবার প্রেমের সম্পর্কে জড়ায়। কিন্তু সেই সব প্রেমের অভিজ্ঞতা ছাপিয়ে মনে দাগ কেটে আছে প্রথম প্রেমের স্মৃতি। প্রথম প্রেমের মধুময় কিছু যন্ত্রণা, কিছু পাওয়া না পাওয়ার অনুভূতি আচ্ছন্ন করে রাখে মনকে। হৃদয়ে এতোটাই জায়গা করে নেয় যে কারণে কয়েক যুগ পরও মানুষের স্মৃতি আবেগী হয়ে উঠে সেই প্রথম প্রেমের কথা মনে পড়ায়। যদি কারো প্রথম সম্পর্কে কোনো ভয়ের ঘটনা বা স্মৃতি থাকে তাহলে তো মনে থাকাই স্বাভাবিক। বিপরীতে মানুষকে ভালোবাসার কথা বলার সময় প্রত্যাখ্যান হওয়ার ভয়, তার প্রতিক্রিয়া কেমন হতে পারে, পারিবারিকভাবে কোনো ঝামেলা হওয়ার ভয় এবং প্রেম হওয়ার পর শুরুর দিকে আশা পূরণ করা নিয়ে শঙ্কা, সম্পর্ক টিকে উঠবে কিনা ইত্যাদি ইত্যাদি ভয়ভীতি কাজ করে। এখানে উদ্বেগই মূল বিষয়। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রথম প্রেম অনেকটাই ‘স্কাইডাইভ’ বা প্রথমবার আকাশ থেকে লাফ দেয়ার মতো। প্রথমবার আকাশ থেকে লাফ দেয়ার ঘটনা যেভাবে স্মৃতিতে গেঁথে যায় পরবর্তীকালের কোনো ঘটনা আর হৃদয়ে থেকে যায় না। কারণ প্রথমবার আকাশ থেকে লাফ দেয়ার সময় সর্বোচ্চ ভয় কাজ করে যা পরবর্তীতে থাকে না।         

        পর্যটক বুল্লে শাহ : ১৬ই মে ১৯৭৯, যেদিন মরিচঝাঁপিতে দন্ডকবন থেকে আগত উদ্বাস্তু বিতাড়ন শেষ হল, সেদিন আসলে কী ঘটেছিল? মরিচঝাঁপি দ্বীপ তখন ঘিরে ফেলেছে পুলিশের লঞ্চ এবং অসংখ্য নৌকো। অপারেশনের পুরো দায়িত্ব জ্যোতি বসুর উত্তর দক্ষিণের দুই ম্যান ফ্রাইডের। পেছনে পুলিশ কর্তা আর কলকাতায় বসে সরাষ্ট্র সচিব। অনাহারি, তৃষ্ণার্ত, তবু বাঁচবার স্বপ্নে মশগুল মানুষগুলো হোগলার ছাউনি-ঘেরা ঘরে। সারাদিনের পরিশ্রমে জোগাড় করা চাল কাঠের আগুনে ফুটছে। টগবগ শব্দ হচ্ছে। এই শব্দ উনুনের চার পাশে বসা বাচ্চাগুলোর কানে বিজয়ী অশ্বখুরের ধ্বনি তুলছে- । ঠিক তখনই দলীয় মস্তানরা নিঃশব্দে ঘরে ঘরে আগুন লাগিয়ে দিল। মরিচঝাঁপির আকাশ রাঙা হয়ে উঠল। আগুনলাগা ঘরের চালগুলো শিশু, বৃদ্ধ মানুষগুলোকে গ্রাস করল। ওই যুবা প্রতিবাদী উদ্বাস্তু নেতাকে খুন করে ফিরে এল অন্য মস্তানদের সঙ্গে। তার মনেও পড়ল না, সর্বগ্রাসী আগুনের আলোয় নিজের পিতাকেই সে হত্যা করে গেল। নদী সমুদ্র ঘেরা মরিচঝাঁপি দ্বীপে ন্যূনতম জীবনধারণের প্রয়োজনেই কুমিরমারি থেকে পানীয় জল, চাল ইত্যাদি আনতে হত। ছোট ছোট কাঠের ডিঙি বানিয়ে উদ্বাস্তুরা তাঁদের প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ করতেন। কিন্তু মাঝে মাঝেই অলক্ষ্যে থাকা রাজনৈতিক প্রভুদের নির্দেশে রাজ্য পুলিশ ডিঙি ডুবিয়ে ওঁদের শুধু ভাতে মারাই নয়, জীবনহানিও ঘটাত। বলাই বাহুল্য এই নৌকাডুবিগুলো দেশি বা আন্তর্দেশীয় আইন-বিরোধী কাজ। পঞ্চাশটা নৌকো ভর্তি কাঠ নিয়ে মরিচঝাঁপির মানুষজন দ্বীপে ফিরছিলেন। মাঝদরিয়ায় সেই নৌকোগুলো ডুবিয়ে দেওয়া হয়। কাঠ তো গেল নদীগর্ভে। আর মানুষগুলো? কারা ওই নৌকো ডোবালো? মেলেনা উত্তর। যাঁরা পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতাসীন, সেই দলগুলোই, অর্থাৎ সিপিএম, ফরওয়ার্ড ব্লক এবং আরএসপি-ই কি বহু বছর ধরে বলে আসেননি যে পূর্ববঙ্গের শরণার্থীদের পশ্চিমবঙ্গের বাইরে পাঠাবার কোনও প্রয়োজন নেই? তাঁদের নেতারাই কি দীর্ঘদিন ধরে প্রচার করেননি যে, পশ্চিমবঙ্গেই এদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার মতো পর্যাপ্ত জমি আছে? তাঁরাই কি সর্বতোভাবে উদ্বাস্তুদের বোঝাবার চেষ্টা করেনি যে, আন্দামান বা দন্ডকারণ্যে যাওয়া মানে তাঁদের সর্বনাশ হয়ে যাওয়া? অথচ মরিচঝাঁপি কেমন ছিল সেই ১৯৭০ দশকের শেষ পাদে? প্রায় ১২০ বর্গমাইল ব্যাপ্ত মরিচঝাঁপি সুন্দরবনের সুন্দরী গড়ানের বনভূমি। আর এদিকে কুমিরমারি বাগনার বিস্তৃত অংশ। এখানে সেখানে নারকেল গাছ। জলকাদায় ভরা জমিতে হোগলা আর শীর্ণকায় ছোট গাছগাছড়া। মাঝের উঁচু জমির অংশে সবুজ ঘাস। উপরে নীল আকাশ। ভরা বর্ষায় মাটির সোঁদাগন্ধ। ঝড় আর বাতাস, বন্যা আর সমুদ্রের বানভাসি আশঙ্কায় ভরা সেই প্রায় নির্জন মরিচঝাঁপির দিনরাত। এসবের কথা আশ্চর্য মায়াময়তায় ফুটে উঠেছে অমিতাভ ঘোষের ‘দ্য হাঙরি টাইড’ উপন্যাসে। তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকারের শরিক দলগুলো নিজেদের প্রাককথন আর রাজনৈতিক উত্থানের কথা ভুলে না গিয়ে, পুলিশকর্তা আর ক্যাডারদের না নামিয়ে যদি দ্বীপটি মনুষ্যহীন না করতেন, তবে ওই মরিচঝাঁপিই আজ সমৃদ্ধিতে ভরভরন্ত হয়ে উঠতো। মরিচঝাঁপির উদ্বাস্তু আগন্তুকরা আসার অল্পদিনের মধ্যেই জায়গাটা সাফসুতরো করে বাসযোগ্য করে তুলেছিল। বেশ কিছু নলকূপ বসিয়েছিল। তবে নোনা জলের জন্য সেই অতি অগভীর যন্ত্রগুলো কার্যকর হয়ে ওঠেনি। দরকার ছিল সরকারি সাহায্যের। কিন্তু বামফ্রন্ট সরকার তো প্রথম থেকেই বাম। তাই রায়মঙ্গল এবং আরও দু’টি নদী পেরিয়ে ওঁদের পানীয় জল এবং খাদ্য আনতে হতো। দ্বীপে ছোট ছোট গাছ ছাড়াও কিছু মোটা বেড়ের বড় গাছ ছিল। ঝড়ের কবল থেকে ওইগুলিই দ্বীপটিকে সুরক্ষা দিতে পারত। কিন্তু জীবিকার প্রয়োজনে কিছু গাছ কেটে ওঁরা ডিঙ্গি নৌকো বানিয়েছিলেন। মাটির রাস্তা ঘাট প্রস্তুত করেছিলেন। ছাউনি দিয়ে স্কুলবাড়িও তৈরি হয়েছিল। গোলমালটা লাগল ঠিক এমন সময়েই। শুরু হয়ে গেল মিথ্যাপ্রচার। বড় বড় পুলিশ কর্তার আগমন ঘটল। ফিসফিস প্রচার শুরু হলো – বিদেশী কোনও বড় শক্তি এইসব খেতে-না-পাওয়া চর্মসার মানুষগুলোকে অর্থ, অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করছে। বড় বড় পিচের রাস্তা তৈরী করে সমুদ্র পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়ার প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। বাংলাদেশের সাহায্যে আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদ সুন্দরবন-সংলগ্ন মরিচঝাঁপি থেকে তার সম্প্রসারণের কাজ শুরু করতে যাচ্ছে। অতএব বোঝাই গেল নিরন্ন হাঘরে উদ্বাস্তুদের মরিচঝাঁপির মেয়াদ শেষ। পশ্চিমবঙ্গ সরকার তার পুলিশ বাহিনী দিয়ে প্রায় ঘিরে ফেললো দ্বীপটিকে। নেতৃত্ব দিলেন অমিয় সামন্তদের মতো পুলিশের বড় কর্তারা। খাদ্য, পানীয় জল নিয়ে যাওয়া বন্ধ করলেন। ১৯৭৮-এর নভেম্বর মাস নাগাদ অখন্ড চব্বিশ পরগণার পুলিশের ‘সামন্ত’তন্ত্র ব্যারিকেড তৈরি করল। যাতে মরিচঝাঁপির মানুষজন বাগনা, কুমিরমারি ইত্যাদি অঞ্চল থেকে পানীয় জল আর খাদ্যসংগ্রহ করতে না পারেন। হাইকোর্ট মানবাধিকার রক্ষার্থে পুলিশের এই বেআইনি কাজের বিরুদ্ধে রায় দিল। তখন খাদ্যপানীয় সংগ্রহের দেরি ঘটিয়ে আস্তে আস্তে মানুষগুলোর শক্তিক্ষয় করিয়ে দেওয়া হয়। হোক না আদালত অবমাননা। তারপর এল সেই ভয়ংকর দিন। মে মাসের এক গভীর রাতে দু’শো পুলিশ আর সাধারণ নৌকোয় দু’হাজার ক্যাডার দিয়ে ঘিরে ফেলা হলো মরিচঝাঁপি। আগুন দেওয়া হলো বাড়িগুলোতে। উদ্বাস্তু বোঝাই কিছু নৌকো ডুবিয়ে দেওয়া হলো। আর কিছু শিশু, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, উদ্বাস্তু নেতাকে ধরে বেঁধে আনা হল হাসনাবাদ রেলওয়ে স্টেশনে। কিছু আগুনে পোড়া মানুষ নদীর কুমীর-কামটের পেটে গেলেন। 

                 সমাধিবউদি : বাঙালিরা কী করছিল ?

                 নব্যনাস্তিক যুবতী : আজ্ঞে, বাঙালিরা তখনও জন্মায়নি । বাঙালি জন্মেছে বাংলা টিভি আসার পর।

                 পর্যটক গৌতম বুদ্ধের শিষ্য মহাবজ্রাসন :  মায়ানমার থেকে দলে দলে রোহিঙ্গা মানুষ চলে আসছেন বাংলায়।  রাষ্ট্রসঙ্ঘের হিসেব অনুযায়ী অগাস্টের পঁচিশ তারিখ একটি রোহিঙ্গিয়া জঙ্গিগোষ্ঠী রাখাইন প্রদেশের একাধিক থানা এবং সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালানোর পর একলক্ষ ছেচল্লিশ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গিয়া শরণার্থী সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছে। এঁরা বলছেন, মায়ানমারের সেনা এবং স্বঘোষিত আইনরক্ষকরা গ্রামকে গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছে, মেয়েদের পাকড়াও করে ধর্ষণ করেছে।  গুলিও চালিয়েছে তারা। 

       পর্যটক ইমাদউদ্দিন মুহাম্মদ বিন কাসিম আল সাকাফি : কিন্তু আপনারা কি জানেন যে  তারাই একদিন বাঙালিদের জীবন অতিষ্ঠ করে দিয়েছিল ? এরাই তো মগ, বাঙালির জীবন অতিষ্ঠ করে দিয়েছিল এককালে। মায়ানমারের আরাকান জাতির অন্তর্গত এরা। মগ ভাষা আরাকানি ও বাংলা ভাষার মিশেল । এক সময় রাজার অত্যাচারে ওরা চট্টগ্রাম অঞ্চলে অনুপ্রবেশ করেছিল। ফলে তাদের ভাষার সঙ্গে বাংলা ভাষার সংমিশ্রণে মগভাষার উৎপত্তি হয়। অনুমিত। মগবর্ণমালার নাম ‘ঝা’।  মগভাষায় বড় ছেলেমেয়েকে বলে ‘চোগরি’, কিন্তু বাংলায় কিশোর-কিশোরীকে বলা হয়  ছোকরা-। আত্মীয়সূচক কিছু মগশব্দ বাংলায় ব্যবহূত হয়, যা উচ্চারণ ও অর্থে এক; আবার কোনো কোনো টিতে অর্থের কিছু তারতম্য ঘটেছে। যথা: বাবা, বাজী, মা। আঞ্চলিক বাংলায় বাবা, বাজী সমার্থক, কিন্তু মগভাষায় বাজী মানে জেঠা। মগরা ছোট মেয়েকে বলে ‘মা’, কিন্তু আঞ্চলিক বাংলায় মেয়েকে আদর করে বলা হয় ‘মা’। । আরাকানিদের মধ্যে মগরা অন্যতম প্রধান  গোষ্ঠী। এখন তারা সপরিবারে জলে ভাসছে ।

            পর্যটক কেতকাদাস ক্ষেমানন্দ : ব্রিটিশ আমলে সিধু – কানহু, বিরসা মুণ্ডাদের জন্য বরাদ্দ ছিল ফাঁসির কাঠ। “পরিবর্তিত” সময়ে আপনাদের জন্য বরাদ্দ হয়েছে তিল তিল করে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়ার যাবজ্জীবন কয়েদের ব্যবস্থা। জেলগুলিতে চলে এক তীব্র অনাচার। বন্দীদের বরাদ্দ খাবার, তেল, সাবান, থালা, বাটি, কম্বল, ফিনাইল থেকে ওষুধ অবধি সবই চুরি করে জেল প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিরা; জেলকোডকে পদদলিত করে বন্দীদের উপর চলে শারীরিক পীড়ন; ইন্টারভিউ ব্যবস্থা দেখলে মনে হবে চিড়িয়াখানার জন্তু দেখা হচ্ছে; তুই–তোকারি করে কথা বলা (এমনকি বয়স্ক বন্দীদের ক্ষেত্রেও!) এখানকার নিত্য অভ্যাস। জেলের পরিভাষায় – নতুন আসা বন্দীদের ‘আমদানি’ করা হয় অথবা বেরিয়ে যাওয়া ‘খরচা’ দেওয়া হয় – এর থেকেই বোঝা যাবে কেমন মানুষের মর্যাদা পান জেলের গারদের আড়ালে থাকা বন্দী ভাই, বোনেরা! চিকিৎসা ব্যবস্থা এমনই যে সুস্থ লোকেরা এখানে অসুস্থবোধ করেন আর অসুস্থ হলে বাঁচার আসা কম; উৎকোচ সংস্কৃতির এতটাই রমরমা যে, পয়সা না দিলে এখানে কোন কাজই হয় না; সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল এতোই খারাপ যে, চোর এখানে এসে ডাকাত হয়, আর ডাকাত হয় সুপারি কিলার; মদ–গাঁজা–হেরোইনের রীতিমতো ব্যবসা চলে জেলের ভিতর – এমতাবস্থায় আপনাদের মতো সেইসব বন্দীরা – যারা সংবেদনশীল, আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন; ব্যক্তিগত স্বার্থের কারণে নয়, মানুষের অধিকার রক্ষার কারণে আন্দোলন করতে গিয়ে জেলবন্দী; তারা কেমন থাকতে পারে তা বোঝার জন্য খুব একটা কষ্ট কল্পনার আশ্রয় নিতে হয় না!

        সমাধিদাদা : বাঙালিরা কী করছে ?

        যুবক নাস্তিক : আজ্ঞে বাঙালিদের এখনও জন্ম হয়নি ।

         বটগাছের টঙ থেকে সবকটা কাগজ ওড়াতে-ওড়াতে আমি, হাবশি বেতাল, বলি : দুনিয়াতে আপনার আশেপাশে এমন আইটেম সবসময় পাইবেন, যার সাথে আপনার সর্বোচ্চ ধৈর্য্য দিয়া কথা কইতে চাইবেন, খুব কুল থাকতে চাইবেন, বলার সময় নিজেরে অটো সাজেশন দিতেই থাকবেন যে, যা কিছুই হয়ে যাক আপনি মাথা ঠান্ডা রাখবেন। কিন্তু শালার এমনই মেটেরিয়াল যে, এতো চেষ্টার পরেও জাস্ট তিন থেকে চার মিনিটের মধ্যে সে অত্যন্ত সফলতার সাথে আপনার পায়ের রক্ত মাথায় তুইলা দিবে। তখন সেই মাথার তালুর গরমে ভাত, রুটি, মুড়ি, পপকর্ণ, খই, লাড্ডু যাই রাখেন না কেন সব ফুটতে থাকবে টগবগায়ে।

About anubadak

আমি একজন অনুবাদক । এতাবৎ রেঁবো, বদল্যার, ককতো, জারা, সঁদরা, দালি, গিন্সবার্গ, লোরকা, ম্যানদেলস্টাম, আখমাতোভা, মায়াকভস্কি, নেরুদা, ফেরলিংঘেট্টি প্রমুখ অনুবাদ করেছি ।
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s