লাবিয়ার মাকড়ি : মলয় রায়চৌধুরী

 

         চিনেবাদামের খোসার রঙের দশতলা আদালত-বাড়িটা  ঘন পাইন জঙ্গলের ভেতরে, যেখানে আসতে হলে সোঁদা গন্ধের সুড়ঙ্গ বেয়ে পায়ে হেঁটে আসতে হয়, হাজার হাজার লোক দুশো ছেচল্লিশ বছর যাবত এই পথে চলে চলে বর্ষার পরেও চোরকাঁটা গজাতে দেয় না, জঙ্গলের ভেতরে বলে পেশকার-মুহুরি আর উকিল-মক্কেলরা ক্লান্ত হয়ে গেলে,  শুকনো পাতার ওপর বসে কিংবা শুয়ে জিরিয়ে নেয়, ঝোপঝাড়ের সবুজ আড়ালে পুরুষরা দাঁড়িয়ে আর মহিলারা উবু হয়ে হিসি করে, হাগে, তার কারণ আদালতবাড়ির প্ল্যান অনুমোদন করার সময়ে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ, পায়খানা রাখাকে আইনের পক্ষে ক্ষতিকর মনে করে বাদ দিয়েছিলেন ।

জঙ্গলের ভেতরে অনেকে দল বেঁধে এলে টিফিন বাক্স খুলে মান্দ্রাজি  চাদর পেতে বাজরার রুটি আর বাকরখানি খিচুড়ির পিকনিকও করে নেয় । যে আসামীরা জেল হাজত থেকে আসে, তারা একের পেছনে আরেকজন হাঁটতে হাঁটতে যায়, পালাবার উপায় নেই, কেননা সবার কোমর দড়ি দিয়ে বাঁধা, হাতে হাতকড়া, সামনে একজন পুলিশের হাতে দড়ির এক দিক, পেছনের পুলিশের হাতে আরেক, পাহারা দেবার বন্দুকধারীরা পাশে-পাশে লেফ্ট-রাইট ।

এই আদালত বলতে যে বিচারালয় বোঝায় না তা জজ সাহেব নিজেই এজলাসে বসার সময় প্রতিদিন ব্যাখ্যা করে দিতেন । তিনি এও বুঝিয়ে দিতেন যে জেল বলতে কারাগার বোঝায় না । উনি বলেছিলেন, এগুলো সিস্টেমের অংশ, সার্বভৌম প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা প্রকাশের আধার, ব্যাস, মেনে নিতে হয়, মেনে নিতে হবে, জয়ো হে ।

আদালতে যাবার পথে কোমরে-কোমরে দড়ি-বাঁধা, হাতে হাতকড়া, তরুণ তরুণী যুবক যুবতী প্রৌঢ় প্রৌঢ়া বুড়ো বুড়ি সব রকমের মদ্দামাগি আসামীরা সার দিয়ে ট্যাগোর-রক সুরে বাঁধা এই গানটা গাইতে গাইতে যায়, গানটা অনেকটা অ্যাসিড রকের মতন :

“হা রে, রে রে, রে রে, আমায় জেলে পুরে, দে রে–

যেমন বন্ধ খাঁচার পাখি মনের আনন্দে রে ।

ঘন পাঁকের ধারা যেমন বাঁধন-হারা,

ডিজেল বাতাস যেমন আকাশ লুটে ফেরে ।

হা রে, রে রে, রে রে, আমায় জেলে পুরে দে রে —

দলদাসের নাচন যেমন সকল রাস্তা ঘেরে,

বংশ যেমন বেগে ঢোকে পিছন ফেড়ে,

অট্টহাস্যে সকল পাড়ার শান্তির বুক চেরে ।

হা রে, রে রে, রে রে, আমায় জেলে পুরে, দে রে…..”।

 

যখন আমি জামিনে ছাড়া পাইনি তখন আমিও অমনভাবে সকলের সঙ্গে সারি দিয়ে গলা ছেড়ে গাইতে গাইতে যেতুম । পাহারাদাররা সুরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের পোঁদে লাথি মারতে-মারতে যেতো, ডানদিকের পাহারাদার বাঁ পা দিয়ে আর বাঁ দিকের পাহারাদার ডান পা দিয়ে ।

লাথি খেতে-খেতে আমাদের গাইতে আরও ভালো লাগত, উৎসাহ পেতুম , তার কারণ এই অনুন্দ্যসুন্দর দেশে লাৎখোররাই সবচেয়ে বেশি আনন্দে থাকে, তাদের ভবিষ্যত স্হিতিস্হাপক হয়ে ওঠে ।

আমার মতন যারা জামিনে ছাড়া পেয়ে কেস লড়ছে, তারা বাসা থেকে বা হোটেল থেকে বা জ্ঞাতির বাড়ি থেকে হাঁটতে হাঁটতে পোঁছোয়, উকিল মুহুরি মোক্তার জজ কেরানিদের সঙ্গে পাশাপাশি ।

কাঠিকাবাব আর শোনপাপড়ির দোকানদাররা আদালত চত্বরেই বউ-বাচ্চা নিয়ে থাকে, তাদের ভুঁড়ি-ফোলা বাচ্চারা কেমন করে স্কুলে বা কলেজে পড়তে যায় জানি না । কে জানে, হয়তো বড়ো হয়ে তারাও কাঠিকাবাব আর শোনপাপড়ির দোকানদারি বা মুহুরিগিরি করবে বলে স্কুলে যাওয়া দরকার মনে করে না।

জংলি ঝোপঝাড়ের বদান্যতা, আর ফেলে ছড়ানো ঢ্যাঙা গাছে, সব্জেটে অন্ধকারে জঙ্গলটা ঠাণ্ডা হলেও, গথিক ঢঙের আদালতবাড়িটা বেশ গরম, শীতকালেও বিশেষ হেরফের হয় না । প্রতিষ্ঠানের মালিকরা ভেবেছিল শহর থেকে দূরে জঙ্গলের ভেতরে হলে শহরের ভোঁচকানি তিকড়মবাজি আদালতে এসে পৌঁছোবে না । কিন্তু সে ভাবনার পোঁদে হুড়কো দিয়ে শহর ঠিক পৌঁছে গেছে তার নচ্ছারমো নিয়ে । মাকড়সাদের না মেরে শুধু তাদের জাল আর ঝুল ঝাড়ার ঠিকে দেয়া হয় এক নম্বর পিন্ডিকেটকে ; আরশোলাদের না মেরে কেবল মশা তাড়াবার ঠিকে দেয়া হয় দুই নম্বর পিন্ডিকেটকে ; পানের পিক বাঁচিয়ে চুনকাম করার ঠিকে দেয়া হয় তিন নম্বর পিন্ডিকেটকে ; ছারপোকাদের বাঁচিয়ে আসবাব পালিশের ঠিকে দেয়া হয় চার নম্বর পিন্ডিকেটকে ; পাঁচ ছয় সাত আট নয় দশ কতোগুলো যে পিণ্ডিকেট আছে তার ঠিকঠিকানা নেই ।

প্রতিষ্ঠান আদমসুমারি করে দেখেছে যে যারা আদালতবাড়িতে আসে তাদের শতকরা নিরানব্বুই জন দুঃস্বপ্ন দেখতে ভালোবাসে ; আর, কে না জানে, পিণ্ডিকেটের সাহায্য  না পেলে দুঃস্বপ্ন গড়া সম্ভব নয়।

প্রতিষ্ঠানের চেয়ে কড়া মাদক আর নেই ; অভ্যাস, লোভ আর নেশায় আকাশের দিকে পোঁদ করে সাষ্টাঙ্গ হয়ে যায় অমন নেশাখোররা। ডারউইন নামে একজন সাহেব নাকি ওনার ‘অরিজিন অফ টার্নকোটস’ গ্রন্হে লিখে গেছেন যে অমন নেশায় বাঁদরদের লাল পোঁদও রাতারাতি হলুদ নীল সবুজ কমলা বেগুনী হয়ে যাবার সম্ভাবনা থাকে ।

         আদালতের নয়তলায় নয় নম্বর এজলাসের গুমোট গরম, বেঞ্চে ছারপোকার চামড়া-চাটা হুল, দেয়ালে বারোয়ারি পিকের থুতুর সাতবাস্টে দরানি, বদবুদার ঘামের চটচটে হলকায়, যখন আমার মামলা চলছিল, সপ্তাহে পনেরো মিনেটে মুখে-তাম্বাকু উকিল দাঁড়িয়ে কিছু বললে, আবার পরের সপ্তাহে দশ মিনিট  কুঁজোকেল্টে কেউ গলাখাঁকারি-সাক্ষ্য দিলে, ঢিকিয়ে-ঢিকিয়ে এই ভাবে চলছিল, ক্ষয়াটে সিঁড়ি পাকিয়ে একবার ওপরে, আবার হুড়হুড়ে ভিড়ের ঠেলায়, পাক খুলে নিচের তলায়, তখন আরও অনেক বিচারাধীনের মামলার মারপ্যাঁচ শুনতুম আর ভাব করার চেষ্টা করতুম, বিশেষ করে যারা খুন করে জামিনে রয়েছে, তাদের সঙ্গে ; কেউ পাত্তা দিত না, কেননা আমার মোটর সাইকেল চুরির মামলাটা ওদের ওজনদাঁড়িতে ছিল খবরের কাগজ কিনিয়েদের ওজনমারার মতন ছিঁচকান্তি।

তবু বিশেষ একজনের মামলার ডেট পড়লে, পেছন থেকে যার অন্যমনস্ক হাঁটা দেখলে ঘুষঘুষে জ্বর এসে যায়,  আমি তার শুনানিতে পৌঁছে কান পাততুম পক্ষে-বিপক্ষে কিরকম বেলাগাম তক্কাতক্কি চলছে, এতই প্যাঁচানো ছিল তার কেস, আর সেই তক্কে খুনের দায়ে মামলাটা যে লড়ছে তার সঙ্গে আলাপ হয়ে গেল, প্রথমদিকে ভয়ে-ভয়ে, কেননা খুনি যখন খুনি, একটু শ্রদ্ধা তো তাকে করতেই হবে, আমি যা কোনোকালে পারব না তা সে করে ময়ুরকন্ঠী গলা উঁচিয়ে, বুক ফুলিয়ে, খোঁপার বাঁধন নামিয়ে, আদালত চত্বরে ঢেউ তুলেছে ।

সমাজের ভেতরে-বাইরে খুনিরা সবচেয়ে বেশি শ্রদ্ধার পাত্র বা পাত্রী, অন্য আসামীরা তার তলায় । আমি ছিলুম সবচেয়ে তলার পাদানিতে, ফেকলু মোটর সাইকেল লিফটার । উকিলকে বলেছিলুম, যে বারবার মোটর সাইকেল না বলে বাইক বলুন না, তা উনি বললেন বাইক বললে লোকে ভাববে সাইকেল ।

সরকারি উকিল, চাকরিতে ঢোকার সময়ে যে কালোকোট ছিল তাইতেই চালিয়ে যাচ্ছে, আমার কেস উঠলেই, আমার দিকে হাড়গিলে আঙুল তুলে বলত, বাংলা ভাষাসাহিত্যে স্নাতকোত্তর মোটর সাইকেল রেপিস্ট, তার কারণ নতুন মোটর সাইকেল দেখলে নিজেকে আজও সামলাতে পারি না, মনে হয় লিফ্ট করে নিয়ে পালাই, আর উড়িয়ে রেপ করি, কোনোটা লাল, কোনোটা হলুদ, কোনোটা ঝকঝকে কালো, দেখলেই মাঝরাতের কুয়াশায় তুলে নিয়ে ছুটিয়ে বেড়াই দূর দূর হাইওয়ের ওপর । কিন্তু একসময়ে, রাতকয়েকে মন ভরে গেলে, কিংবা আরও চিকনতনু মোটর সাইকেল দেখতে পেলে, যেখান থেকে তুলে নিয়ে গিয়েছিলুম, তার কাছাকাছি রেখে দিয়ে কেটে পড়ি ।

জজ সাহেব আমার কাছে জানতে চেয়েছিলেন যে আসল রহস্যটা কী ।

আমি সহজ উত্তর দিয়েছিলুম, যে, জগতসংসারের কাণ্ডজ্ঞানহীনতার দমক আর যুক্তিপূর্ণ জীবনের চাহিদার টানাপোড়েনের বিকৃত ভারসাম্যের টাল সামলাবার জন্যে আমাকে নতুন-নতুন মোটর সাইকেল চুরি করে চার-পাঁচ শো কিলোমিটার চালাতেই হয়, এছাড়া এই নির্মম পৃথিবীর প্রতি অনুশোচনাহীন রোষ, আর মানুষে-মানুষে সম্পর্কের প্রতি অবিশ্বাস প্রকাশের উপায় জানি না ; নান্দনিক বিশুদ্ধতা অর্জনের জন্য ভার্জিন মোটর সাইকেল চাপতেই হয় আমাকে, নইলে নিজের ছেৎরানো আত্মপরিচয়কে সামলাতে পারা অসম্ভব হয়ে উঠবে।

জজ জানতে চেয়েছিলেন, কোন ব্র্যাণ্ডের জাঙিয়া পরে চালান ?

আমি যা সত্যি তাই বলেছিলুম, মি লর্ড, আমি সারা জীবনে কখনও জাঙিয়া পরিনি, এখন এই যে আদালতে দাঁড়িয়ে আছি, কোনো আণ্ডারওয়্যার নেই ; মনে-রাখা-অভিজ্ঞতাকে নষ্ট করে দ্যায় আণ্ডারওয়্যার।

জজ বলেছিলেন, এ হল নৈরাত্মসিদ্ধিরর প্রকোপ, মেশিন আপনার মগজকে মিউটিলেট করে দিয়েছে ; সে কারণেই আপনি ভার্জিন মোটর সাইকেলে চেপে গর্ববোধ করেন, মগজ অসুস্হ হলে মানুষের শরীর চাঙ্গা হয়ে ওঠে, যতো কলঙ্ক ততো বিহ্বলতার অসুস্হতা আপনার মগজকে পেয়ে বসে ; প্রেম, মানুষ পশু বা যন্ত্র, যার সঙ্গেই হোক, তা এক আতঙ্কদায়ী অনুভব ।

আমি বলেছিলুম, আপনি যথার্থ বলেছেন হুজুর, যে সব লোকেরা নিজেদের সঠিক জন্মদিন জানে তাদের সম্পর্কে আমার ঘেন্না হয়, মোটর সাইকেল তো কবে জন্মায় কেউই জানতে পারে না, অথচ দেখুন হুজুর, তার জন্মদিনের নথি তৈরি হয় বিক্রির দিন ।

জজ বলেছিলেন, হুম । সমাজকে বাধ্য হয়ে আপনার মতন নিহিলিস্ট, অ্যানার্কিস্ট আর দিবাস্বপ্নদ্রষ্টাদের প্রশ্রয় দিতে হবে, নয়তো এই সমাজের অবসান থামানো যাবে না  । তারপর জজ সাহেব জানতে চেয়েছিলেন, নারীদের অপছন্দ করেন কেন?

যা সত্যি তাই বলেছিলুম আমি, পোশাক খুললেই ম্যানেক্যুইন বেরিয়ে পড়ার ভয়ে, মি লর্ড ; আর তাছাড়া, স্ত্রীলোকদের গোপনাঙ্গকে বড়ো গ্রটেস্ক স্থাপত্যের ব্যাপার মনে হয় । শোবার ঘরের চারটে দেয়ালে যদি আয়না লাগানো থাকে তাহলে প্রেমকর্মকে কি হাস্যকর মনে হবে না ? বলুন আপনি !

বুড়ো জজ, কাঁচাপাকা না-আঁচড়ানো চুল, নাকে ঝোলানো চশমা, আমাকে, যেহেতু একশো বছর পর কুড়ি টাকার নোট লুপ্ত হয়ে যাবে, কুড়ি টাকা জরিমানা করেছিলেন, আর সাবধান করে দিয়েছিলেন যাতে ভবিষ্যতে এরকম কাজ প্রমাণসাপেক্ষে না করি, উপদেশ দিয়েছিলেন, বাংলা ভাষাসাহিত্যে স্নাতকোত্তর হলেও, আমি যদি ইংরেজিতেও স্নাতকোত্তরটা করে নিই, তাহলে বুকার প্রাইজের যোগ্য ‘বাইসাইকেল রেপিস্টস সিকরেট লাইফ’ নামে একখানা বেস্ট সেলার লিখতে পারব ; জজসাহেবও জানেন যে বাংলার বেস্ট সেলার লিস্টটা চারশো বিশ, সে কথা উনি ওনার রায়ে লিখেছেনও ।

পুলিশের যে দুজন সাক্ষ্য দিয়েছিল, আমার বিরুদ্ধে, তারা কখন যে শোরুমের পাশের দেয়ালে  যখন দাঁড়িয়ে পেচ্ছাপ করছিলুম, সে সময়ে, আড়চোখে মোটর সাইকেল দেখতে থাকা আমার ফোটো তুলে নিয়েছিল, ক্লিক শব্দ শুনেও,  জানতেও পারিনি । সাক্ষ্য দেবার সময়ে তারা বলেছিল, আমি নাকি জেলহাজতে কুন্দনলাল সাইগল গাইতুম ।

রায় দেবার পরে জজসাহেব জানতে চেয়েছিলেন, ভোট দিই কিনা ।

আমি সত্যি কথাটাই বলেছিলুম, যে স্যার, ভোট ব্যাপারটা তো বুমেরাং, তাই ভয়ে দিই না, মানবতার মতন চালাকি আর নেই ।

নাকের একটা চুল উপড়ে জজ সাহেব বলেছিলেন, ভালো নির্ণয়, আমিও তাই মনে করি । আদর্শের ভেতরে যতো তাড়াতাড়ি ম্যাগট জন্মায় ততো তাড়াতাড়ি ডাস্টবিনের পচা কুকুরের শবেও জন্মায় না। আমাদের মনে রাখতে হবে যে মানুষ তত্ব ফাঁদে কোনো-না-কোনো পরাজয় বা অসফলতাকে ব্যাখ্যা করার জন্যে ।

আমি বলেছিলুম, জি হুজুর, কম বয়সে যা লাল সেলাম ছিল তা বুড়ো বয়সে ফোকলা দাঁতে ঘোলাটে চোখে অ্যাঁড় খেলাম হয়ে গেছে।

জজ জিগ্যেস করেছিলেন, বিদেশ ভ্রমণ করেছেন ।

বলেছিলুম, হ্যাঁ স্যার, কিন্তু মোটর সাইকেলে নয়, হাওয়াই জাহাজে করে ।

বিশেষ কোনো অভিজ্ঞতা হয়েছে ? কানে কড়ে আঙুল ঢুকিয়ে আরামের পরশ দিতে-দিতে জজ সাহেব জানতে চেয়েছিলেন ।

যা সত্যি আমি তা-ই বলেছিলুম, দিশি পায়খানায় বসে জলে ছোঁচাবার অভ্যাস থাকায়, বিদেশে গিয়ে টয়লেট পেপার ব্যবহারের দরুণ, টাইমস স্কোয়ারে রঙ-করা মাই-খোলা মেমদের সঙ্গে ফোটো তোলাবার সময়েও হাসি মুখ করতে পারতুম না, সব সময় মনে হতো পোঁদে গু লেগে আছে ।

জজ সাহেব বলেছিলেন যে উনি  ব্যারিস্টারের পরিবারের বলে ছোটোবেলা থেকে কমোডে বসে টয়লেট পেপার প্রয়োগ করে হেগে চলেছেন, এমনকি প্রতিদিন রায় দেবার সময়েও উনি নিজের পশ্চাদ্দেশ সম্পর্কে চিন্তা করেন না ; তবে এর পর টাইমস স্কোয়ারে গেলে রঙ-করা উন্মুক্ত-স্তন মেমদের সঙ্গে অবশ্যই ফোটো তোলাবেন ।

আসলে যে টিভিতে জাপানি তেল, বুলেট তেল আর হনুমানের মালা বিক্রি করে তারাই মোটর সাইকেল ধর্ষক লিখে লিখে আমার কেসটাকে গুবলেট করে দিয়েছিল, ওদের কাগজেই রসিয়ে রসিয়ে লিখত, পাবলিক পড়ে নিজেদের টাকে হাত বুলিয়ে ভাবত, এ শালা মোটর সাইকেলকে কেমন করে রেপ করে, নাকি ছুটন্ত মোটর সাইকেলের ওপর কোনো মেয়েমানুষকে চিৎ করে শুইয়ে রেপ করতে করতে গাড়ি ওড়ায় । ওদের সাংবাদিক আমায় জিগ্যেস করেছিল যে মেয়েদের দিকে তাকালে আমার যৌনতার উদ্রেক হয়, নাকি মোটর সাইকেলের দিকে তাকালে ।

আমি সত্যি কথাটাই বলেছিলুম ওনাদের যে, ধোয়া সত্য, লালচে তুলসী পাতায়, নতুন ঝকঝকে মোটর সাইকেল দেখলে আমার লিঙ্গোথ্থান হয়, কিন্তু কোনো যুবতী আমাকে জড়িয়ে চুমুখেলেও আমার দেহে কোনো প্রতিক্রিয়া হয় না ; মনে হয় পাঁঠার মাংসের কার্টিলেজ চুষছি, আমি মেয়েদের স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে সিটি বাজাইনি কখনও, শোরুমের সামনে দাঁড়িয়ে নতুন মোটর সাইকেলের দিকে ঠায় তাকিয়ে হুইসল দিয়ে গান করি ।

জজসাহেব, কানের ঝুলঝুলে লতিতে পাকাচুল, ভুরুতে পাকাচুল, ঝাবড়া গোঁফের চুলও পেকে ঝুলে পড়েছে, আমার মামলার যে আদেশপত্র লিখেছেন, লিখতেও মাস দুয়েক সময় নিয়েছিলেন, তার সঙ্গে আমার মামলার যে কী সম্পর্ক বুঝতে পারিনি বলে আমার রাশভারি উকিল চটে গিয়েছিলেন । উনি বলেছিলেন, মহাশয়, আপনি যদি কাউকে বুঝতে না পারেন তাহলে সেটা আপনার চরিত্রদোষ ।

জজ সাহেব লিখেছেন, “মোটর সাইকেল বহু ভাষায় স্ত্রীলিঙ্গ, আসামী মোটর সাইকেল চুরি করেননি, তার কারণ ধারা তেইশের বারো বি অনুযায়ী, কোনো মহিলাকে চুরি করা যায় না, কিডন্যাপ করা যায়, আসামী কাউকে কিডন্যাপ করেননি, কোনো ক্ষতি করেননি, যেমন চুরি করেছেন তেমনই বিনা আঁচড়ে ফেরত দিয়েছেন, যদিও চুরি করা মহাপাপ নয়, কিঞ্চিদধিক পূণ্য-মিশ্রিত পাপ, তাই মোটর সাইকেলে চাপা পাপ নয়, আদি মানব সমাজে পাপ নামে কিছুই ছিল না, থাকার কারণ নেই, তখন মোটর সাইকেল ছিল না, আদি মানবীদের আমরা মহিলা বলি না, মহিলা বা তরুণী বললে, কিডন্যাপের প্রশ্ন উঠবে, তখনকার দিনে মাতৃতান্ত্রিক ব্যবস্হা ছিল, পুরুষদের সিডিউস করার প্রথা ছিল, মোটর সাইকেলকে সিডিউস করা সম্ভব নয়, যদিও বহু মোটর সাইকেলের বিজ্ঞাপনে প্রায় ল্যাংটো মেয়েমানুষের শরীর ব্যবহার করা হয়ে থাকে ; ধারা একচল্লিশের উপধারা তিন অনুযায়ী বিজ্ঞাপনে নগ্ন নারীর ব্যবহার নিষিদ্ধ নয়, সেহেতু আসামীকে নগ্ন নারী বিজ্ঞাপনে ব্যবহারের জন্য দায়ি করা চলে না, আসামী জাঙিয়া পরে মোটর সাইকেলে চাপেন না, সমাজের উন্নতির জন্য প্রত্যেক নারী-পুরুষের উচিত জাঙিয়া না পরা । একথা ঠিক যে মোটর সাইকেলেও ছিদ্র থাকে যার ভিতরে পেটরল নামের ধাতুরস ফেললে তা উত্তেজিত হয়, এবং কেবল সেকারণেই তাকে নারীছিদ্রের সঙ্গে তুলনা করা যায় না । নারীছিদ্রে পৌরুষের পেট্রল ফেললেই যে তা উত্তেজিত হয়ে উঠবে, তার প্রমাণ নেই । পুরুষ হলেই যে তার পৌরুষ থাকবে তা অকাট্য নয় । যাহা হউক, আসামী যেহেতু আসামী, এবং টাকার দাম বিশ্ববাজারে পড়ে যাচ্ছে, আসামীকে কেবল পড়ে যাওয়া টাকায় দণ্ডাজ্ঞা দেয়া হল । আমাদের মনে রাখতে হবে যে টাকার কোনো লিঙ্গ হয় না, তা হেটেরোসেকসুয়ালও নয় এবং হোমোসেকসুয়ালও নয় ।”[১]

যাক, সিঁড়ির পাকে ঠ্যাঙ পাকিয়ে আর খুলে, আমার মামলাটা চুকেছে, কিন্তু আদালতে আমি চান করে চুল আঁচড়ে একগাল ভাত খেয়ে, নতুন ধুতি-শার্ট পরে, নিয়ম করে আসি, খুনি ময়ূরকন্ঠীর মামলার চাপানওতোর শুনতে ।

         খুনিকে বউ বলব না তরুণী না যুবতী না মহিলা বুঝতে পারতুম না, কেননা বুক দেখে না পাছা দেখে না কোমর দেখে না মাথার চুল দেখে কেমন করে যে ঠাহর করতে হয় তা তখন জানতাম না,কিন্তু তার সঙ্গে, পারস্পরিক ক্লান্তির কারণে ভাব হয়ে গিয়েছিল, উকিল মক্কেল ফরিয়াদি বাদি আসামীদের তেলচিটে জমঘটে যৎসামান্য পোঁদ রাখার মতন  তো আর জায়গা থাকত না, আমরা গিয়ে আদালতের গুটকা ছেটানো জংধরা আধঝোলা লোহার গেটের সামনে ইঁটের দাঁত বেরোনো আদালতভোগান্তি পাবলিকের ছিরিচরণ ঠ্যাঙানো ফুটপাতে বসে গ্যাঁজাতুম, প্রথম-প্রথম ছোঁয়া বাঁচিয়ে, ওই যে, ভাটাম গাছটার তলায়, পানের দোকানের ডান দিকে, গাছের ঝগড়ুটে কাকেদের গু ফেলার এলাকার বাইরে। মেয়েটা বেশ ঢ্যাঙা, চোখ দুটো এতই বড়ো যে সরাসরি তাকালে, খুনির চোখ যখন, তখন বিঁধবেই,  বুকের ভেতরে সেঁদিয়ে চোখ দুটো আমার সারা শরীর ছানবিন করে বেরিয়ে আসতো গলার কাছে, টের পেতুম ।

ময়ূরকন্ঠীর কোনো মুখোশ নেই, আনন্দেরও নেই, দুঃখেরও নেই, নয়তো আদালতে যারা একতলা থেকে নয় তলা, উকিলদের ঘরে গোমড়া মুখে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে থাকে, পেশকারদের আড্ডায় হাই তোলে, কোর্টপেপারের লাইনে আড়মোড়া ভাঙে, তাদের চুপসে মুখের দিকে তাকালেই টের পাওয়া যায়, এককালে আনন্দের অসুখে ভুগেছিল, এখন দুঃখের পোঁচড়ে খানিক ঝুলে আছে, লুকিয়ে রেখেছে যে যার নুনের ছিটে ।

ময়ূরকন্ঠীর কথা শুনে-শুনে আমি ওর মনের অশান্তির ঝড়ঝাপটা টের পাচ্ছিলুম, যা চলে গেছে আর যা চলছে, বাস্তব কিংবা ফেনানো, কোনটা আগে কোনটা পরে তা যদিও বুঝতে পারছিলুম না, তরতরিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল আমার সামনে ছবি এঁকে-এঁকে, কন্ঠস্বর যেন জানে সে কি ঘটিয়ে ফেলেছে, যাতে সারল্য সম্পর্কে সন্দেহ গড়ে ওঠে ।

একদিন হঠাৎই ময়ূরকন্ঠী বলেছিল, প্রেম জিনিসটা স্হূল, অশিষ্ট, রূঢ়, বর্বর, অমার্জিত ; মানুষকে ভালোমন্দজ্ঞানশূন্য করে তোলে, বিচারবুদ্ধিহীন ফানুসে পালটে দ্যায় ; কাউকে যতো বেশি ভালোবাসবে তার প্রতি ততো রূঢ়, বর্বর, অশিষ্ট, অমার্জিত, হতে হবে তোমায় ; তুমি যখন কারোকে ফাকিং করবে তখন তোমায় নিজের যন্ত্রণাবোধকে, যার সঙ্গে সঙ্গম করছ তার যন্ত্রণাবোধের সঙ্গে মিশিয়ে অনুভব করতে হবে । একজনের সঙ্গে যদি প্রতিদিন সঙ্গম করো তাহলে প্রেম লোপাট হয়ে যাবে ; মগজ তো হিসাব রাখে, ক্যালেণ্ডারে টিক দ্যায় । একথাও মনে রাখতে হবে যে প্রেমে লাৎ না খেলে প্রেম সম্পর্কে প্রকৃত উপলব্ধি হয় না, কেননা প্রেমের নিষ্ঠুর নোংরা বুনো ধ্বংসাত্মক নিহিলিজমের আরাম উপভোগ করার পরেই প্রেম সম্পর্কে সঠিক ধারণা গড়ে ওঠে ।

জবাবে আমি বলেছিলুম, আমি তো নতুন মোটর সাইকেল ছাড়া আর কারোর সঙ্গে কখনও প্রেম করিনি, তাই হয়তো ঝাড়পোঁছ করে ফেরত রেখে এসেছি ; একে আরেকজনকে পণ্ড করিনি, প্রেমিক-প্রেমিকাদের মতন ।

        আমার মামলার ডেট না থাকলেও ওর যদি ডেট থাকতো, পৌঁছে যেতুম ওর এজলাসে, হাত তুলে অপেক্ষা করার ইশারা করলেও, আর দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে ওর মামলার প্যাঁচগুলো শুনতে থাকলেও, বুঝতে পারতুম না যে কেন ও খুন করেছে, নাকি করিয়েছে, বেশ কয়েকজনকে, আর কোনো সাক্ষী নেই যে বলবে  খুনের জন্যে ময়ূরকন্ঠীই দায়ি । পুলিশ যে দুটো লোককে থার্ড ডিগ্রি দিয়ে সাক্ষীর কাঠগড়ায় তুলেছিল তারা ঘাবড়ে গিয়ে বেমালুম বলে দিয়েছে যে মেয়েটাকে তারা চেনে না, দেখেনি কখনও। ভালো দেখতে এরকম একজন যুবতী কী করে আর কেন যে খুনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ল হদিশ পেতুম না । সত্যিই খুন করেছে, নাকি নিজের সম্পর্কে গল্প বানিয়ে আসামীত্বের আনন্দ নিচ্ছে, তা্‌ও সন্দেহ হতো আমার ।

আমি ওকে ওর নাম জিগ্যেস করেছিলুম, বলতে চায়নি, আদালতে পেশকার কেস নম্বরের লোক হাজির কিনা চেঁচায়, যেমন আমার মামলায়, আমার নাম উঠতোই না কখনও, পেশকার কেস নম্বর হাঁকতো। যখন আমরা ফুটপাথে বসা আরম্ভ করলুম, ছোঁয়াছুঁয়ির দূরত্ব কমে এলো, মেয়েটি বললে, ঠিক আছে, আমি তোমাকে ৬১৪ বলে ডাকবো আর তুমি আমাকে ৩৯০ বলে ডেকো, যেমনটা আমাদের কেস নম্বর । প্রস্তাবে সঙ্গে-সঙ্গে ঘাড় নাড়িয়ে সায় দিয়েছিলুম মনে আছে, আমার দরকচা বয়সে নম্বরদার খুনি বন্ধুনী পাওয়া চোদ্দোপুরুষের ভাগ্য, তাও এরকম চুলবুলে তরতাজা স্তন ফোলানো, খোঁপা নামানো, পিঠে বাংলা আঁচল-ফেলা মেয়ে, কোনো কোনো দিন ডেনিম জিনসে, পায়ে রঙিন কেডস, হাতে প্লাসটিকের বালা । খুনি মেয়ের স্টাইল স্টেটমেন্ট বেশ ভালো লাগত, দিল খুশ করে দিত ।

একদিন আমি বলেই ফেললুম, যেদিন ও লাল ফুলের চুড়িদার পরে এসেছিল, তোমার মামলার কিছুই তো বুঝতে পারলুম না, তোমার বিরুদ্ধে শুনছি প্রমাণ নেই, তবু তোমায় গ্রেপ্তার করা হল, পুলিশ হাজতে ছিলে, তারপর জেল হাজতে ছিলে কতো দিন, আর এখন দু বছর যাবত মামলা চলছে । হেসে বলেছিল, যেন স্কুলের বন্ধুদের সঙ্গে অশ্লীল জোকস শেয়ার করছে, সব জানতে পারবে একদিন, আমি এটা নিয়ে একটা লেখা জড়ো করেছি, কয়েকজনের লেখা,  সেই কাগজগুলো তোমায় দিয়ে যাবো, তুমি সাজিয়ে নিও ।

যেদিন ওর দশ বছরের জেল হয়ে গেল, সেদিন আমাকে একটা প্লাসটিকের ব্যাগ আর সোনার গয়নার ডিবে দিয়ে বললে, এতে আছে কাগজগুলো, আর সোনার ডিবেতে আছে মুক্তোর মাকড়ি । ডিবে খুলে দেখলুম তিনটে মাকড়ি । আমার কোঁচকানো ভুরুর দিকে তাকিয়ে ময়ূরকন্ঠী বলেছিল, তিনটে মাকড়ি কেন জানতে চাইছ তো, লেখা আছে, তিনটেই করিয়ে ছিলাম অর্ডার দিয়ে ।

জজ সাহেব ময়ূরকন্ঠীর রায়ে যা লিখেছেন, তাও যে বড়ো একটা বুঝতে পেরেছি, তার দাবি করব না।

দণ্ডাদেশ দেবার সময়ে অপারেটিভ প্যারায় উনি লিখেছেন, “যাকে বা যাদের খুন আপনি করেছেন, সে বা তারা তখনই আপনার ভেতরে ঢুকে পড়েছে, আর সারাজীবন থাকবে, সাজা শেষ হবার পরও থাকবে, আপনি তাকে বা তাদের নিজের ভেতরে বইতে-বইতে অনাথ হয়ে যাবেন । এটা ঠিক যে বাজে লোকেদের সঙ্গে মিশলে জ্ঞান বাড়ে, আপনাকে সেই সমস্ত মানুষই ঘিরে থেকেছে শৈশব থেকে । ইস্কুল মাস্টার টাইপের ভালোমানুষরা বড্ডো পানসে, অভিজ্ঞতাহীন, তা আপনি জানেন । শুধু টাকা রোজগার করে কেউ সারভাইভ করে না, তাই খুন চুরি ডাকাতি রাহাজানি লুটপাট গুণ্ডামি মারপিট ইত্যাদির মাধ্যমে সমাজের মিথ্যা জোচ্চুরি ছলনা প্রতারণা  অসাধুতা ভণ্ডামিকে প্রতিরোধের পথ হিসাবে এই সমস্ত কাজ জরুরি হয়ে ওঠে, নইলে তো সারা জীবন বমি করতে করতে কেটে যাবে ; আপনার তো বটেই, সকল অপরাধীরই, বোধ ব্যাপারটা আংশিক, গানের সুরের মতন তা কোনো একটি লাইন ধরে এগোয় না । হত্যা করা মোটেই হিংস্রতার প্রকাশ নয় । আপনি জানতেন যে যা করবেন মন দিয়ে করবেন, ফলাফলের জন্য ভাবতে গেলে সব গুবলেট হয়ে যাবে, কেঁচে যাবে । একথা সত্য যে, সব সুড়ঙ্গের শেষে আলো থাকলেও সে আলো সকলের ভাগ্যে জোটে না ; লক্ষ শুক্রাণুর মধ্যে একটিই কেবল ডিম্বাণুর আলো পায় । একথাও সত্য যে এক-এক সময়ে বেঁচে থাকা অসহ্য হয়ে ওঠে, আর কিছুকাল পর তা ভালো লাগতে আরম্ভ করে, অসহ্যের নেশা হয়ে যায় । আপনার বিরুদ্ধে খুনের প্রমাণ অকাট্য নয়, আনুষঙ্গিক,  এবং আপনি একজন আসামী । আসামী মাত্রেই সাজার পাত্র । অপরাধী-সমাজে খুন যেহেতু সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় বলে পরিগণিত, তাই ধারা একশো সাঁইত্রিশের উপধারা সাত অনুযায়ী আমি আপনাকে শ্রমবর্জিত কারাদণ্ড দিচ্ছি । দণ্ডভোগের জন্য আপনি বেনারসি কটকি মুর্শিদাবাদি বালুচরি যেমন শাড়ি ইচ্ছা পরতে পারেন, আরামকেদারায় বসে সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত দেখতে পারেন ।”[২]

পাঁচজন আসামীকে জজ সাহেব ফাঁসির হুকুম দিয়েছিলেন, মনে আছে, তারা সবাই দলীয় পতাকাকে লুঙ্গির মতন করে পরে একজন পোয়াতি বউকে ধর্ষণ করে খুন করেছিল । জজ সাহেব রায়ে লিখেছিলেন, “মানুষ একদিন মরে যাবে বলেই বেঁচে থাকে, এবং মরে যাবার পর চিতায় ওঠাই ভালো, কেননা তাহলে কাউকে আপনাদের পঁচাশি কুইন্টালের স্মৃতি বইতে হবে না । ফাঁসির মঞ্চে আপনাদের মুখে লিউকোপআস্ট লাগিয়ে দুপুর বারোটায় আধঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রাখা হবে, তার কারণ হল আপনারা ধর্ষণ ও হত্যাকে জীবনের উদ্দেশ্য করে তুলেছেন, অন্তত উদ্দেশ্য তো ছিল আপনাদের । ফাঁসির হুকুম দিয়ে কলমের নিব ভাঙা নিয়ম, কিন্তু আমি বল-পেন ব্যবহার করি।”[৩]

সেন্ট্রাল জেলের জেলার সরসিজ বসু, বেশ  ঢ্যাঙা ভদ্দরলোক, হাসির গমকে কয়েদিরা কুঁকড়ে যায়,  কড়িকাঠ থেকে আরশোলা-টিকটিকি খসে পড়ে, আমি যখন জেল হাজতে চোদ্দদিন পচছি, বাংলা ভাষাসাহিত্যে স্নাতকোত্তর মোটরসাইকেল রেপিস্টের পুলিশি প্রতিবেদন পড়ে, আর টিভিতে গরমাগরম কানার-বচন শুনে,  বলেছিলেন, বোঝা-যায়-না এরকম একখানা গম্ভীর স্বকপোলসত্য কাহিনি জেলের সুভেনিরের জন্যে তৈরি করে দিতে, যা লোকে পড়ে বুঝতে পারবে না, ভাববে বাংলায় বিদেশি ভাষা পড়ছি, অথচ ঘাড় কাৎ করে বাহবা দেবে । ঠিকই, বাংলায় লিখে অমনটা করতে পারব, ইংরেজিতে লিখলে যতোই প্যাঁচালো হোক, যারা পড়ে তারা উজবুক হলেও বুঝে ফ্যালে।

আমি ওনাকে বলেছিলুম, স্যার আমি লিখনদার কিংবা বেচনদার কিছুই হতে চাই না, চাইনি, হবো আবার কি, যা আছি, তা-ই আছি, এই প্যান্ট-জামায়, ব্যাস, লিখে হবেই বা কি ! আপনি হয়তো বলবেন, লেখালিখি অনেক ভালো কাজ, কিন্তু স্যার ভালো কাজ মানেই তো পারভারশান, প্রেম করার মতন আঠালো, ঠাণ্ডা মাথায় আরেকজনের আত্মপরিচয়কে মুছে নস্যাৎ করে তার কল্পনাকে জবরদখল করা ছাড়া প্রেম আর কি হতে পারে বলুন ?  লেখালিখিও তাই নয় কি !

জেলার সরসিজ বসু বললেন, আপনি না চাইলেই বা, হেরে যাবে জেনেও মানুষ একে আরেকজনকে ভুল বুঝিয়ে ঝগড়ার মাধ্যমে কি সম্পর্ক তৈরি করে না ? তবে ! আপনার কতো লোকের সঙ্গে বুনো মাকড়সার জালের মতন অদৃশ্য সম্পর্ক গড়ে উঠবে, দেখবেন । মনে রাখবেন যে যুদ্ধ হল চরম আনন্দের বহিঃপ্রকাশ ; লেখালিখিও যুদ্ধ । আর প্রকৃত প্রেম বলে কিছুই হয় না, সবই মানবদেহের রসায়ন । আমরা তো কতো লোককে ঘৃণা করি, আবার তাদেরই যারা ঘৃণা করে, এমন লোকের সঙ্গে দেখা হলে গর্বে হাসাহাসি করে ফুলে উঠি, নয়কি ! আসলে ঘৃণা করাটা হল এক ধরণের সহিষ্ণুতা । যাক, আপনি লিখুন, এখনও তরতাজা যুবক, নয়তো যতো বয়স বাড়বে, ততো বেশি অবাঞ্ছিত লোকেদের পাবেন আপনার চারিপাশে, আসল শত্রুদের চেয়ে কাল্পনিক শত্রুদের সংখ্যা বাড়তে থাকবে । এখন আমার কাজ আছে, কয়েদিরা স্বমেহন করে-করে জেলের নর্দমা জ্যাম করে দিয়েছে, ইলিশের ডিম উপচে পড়ছে নর্দমাগুলো থেকে ।

কিন্তু স্যার, আমি তো কখনও লেখালিখি করিনি, বলেছিলুম জেলার সাহেবকে ।

উনি বললেন উনি যখন চাকরিতে সবে ঢুকেছিলেন, পায়ে পালিশ-করা বুটজুতো, টানটান উর্দি, তখন জানতেনই না আসামীদের টর্চার করার কাজটা কীভাবে আরম্ভ করতে হয়, প্রথমবার একজন আসামীকে টর্চার করে মুখ খোলাতে গিয়ে কেমন গলদঘর্ম হয়েছিলেন, আসামীটা নিজেই হাসাহাসি টিটকিরি ইয়ার্কি করছিল ; তারপর ধাপে ধাপে সব শিখে নিয়েছেন, সব রকমের টর্চার । টর্চার করে করে মন ভরে গেছে বলে প্রতিষ্ঠানে কাঠখড় পুড়িয়ে জেলার হয়েছেন । টর্চার ব্যাপারটা অনেকটা সঙ্গম করার মতন, মিশনারি আঙ্গিক থেকে এগোতে এগোতে চুরাশি আঙ্গিকের চেয়েও বেশি আঙ্গিক দখলে চলে আসে, নতুন নতুন আবিষ্কার, এই আরকি । টর্চার করা যেমন কেউ শিখিয়ে দেয় না, তেমনই সঙ্গম করা । ইউ জাস্ট ডু ইট অ্যাণ্ড এনজয় দি ফার্স্ট ব্লাড ।

জেলার সাহেবের আদেশ মেনে নিয়েছি । তবে আমি ওনাকে বলেছি যে বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের গম্ভীর-গদ্য থেকে মশলা টানবো না স্যার, তাতে লোকে আমাকে মুকখু মনে করবে, আমি তাই বিটকেল নামের বিদেশীদের গিঁট দেয়া ড্যাংগুলিই খেলবো, তাহলে লোকে আমাকে অন্তত বিদ্বান তো মনে করবে ।

Double space

আজকে দুপুরবেলা আকাশ কালো করে যখন বৃষ্টি হবো-হবো করেও হল না, অনেক খুঁজে ময়ূরকন্ঠীর দেয়া কাগজগুলো বের করে সাজিয়েছি, দেখি খুনের কারণ জানতে পারি কিনা, ঢুকে যেতে পারি কিনা ওর ভেন্ট্রিল্যাকুইস্ট বিবেকে, জানতে পারি কিনা ওর অসুখ আর কর্তৃত্বের ইতিহাস, যা ময়ূরকন্ঠীকে আত্মধ্বংসের মোহনায় ভাসিয়ে দিয়েছে, নিজের ভেতর যে তাঁবু ফেলেছে তার রহস্য কি । হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকতে হবে ওর তাঁবুর লন্ঠনালোকে আনন্দালোকে ।

ময়ূরকন্ঠী যখন জেল থেকে সেজেগুজে বেরোবে তখন তো আমি কোথায় কোন মোটর সাইকেল উড়িয়ে নিয়ে চলেছি তার ঠিকঠিকানা নেই, তাই জেলার সরসিজ বসুকে বলেছি,  ২০২৪ সালের ২৮শে অক্টোবর বারোটা তিরিশ মিনিটে ময়ূরকন্ঠী যখন ছাড়া পাবে, ওর হাতে ছাপা সুভেনিরের একখানা কপি তুলে দিতে । উনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, দেখবেন লেখাটা যাতে খুনির প্রতি পক্ষপাতপূর্ণ হয় ।

আদালতবাড়ি পাইন বনের জঙ্গলে বলে প্রতিষ্ঠানের ঠিকেদাররা জেল তৈরি করিয়েছে সেগুন বনের জঙ্গলে। সে অনেকটা হাঁটা পথ ।

লিখতে বসে যে চিন্তাটা প্রথমে এলো তা এই যে প্রেমের সফলতার জন্যে রঙিন কনডোম কেন, সুগন্ধি কনডোম কেন ? তাহলে কি প্রকাশ্য দিবালোকে প্রেম করা উচিত ! প্রেমের প্রকৃত গন্ধ কেন নেবে না প্রেমিক-প্রেমিকা, প্রেমযন্ত্রের প্রকৃত স্বাদ কেন নেবে না প্রেমিক-প্রেমিকা ! বাস্তব থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে না কি প্রেমিক-প্রেমিকারা !

আমি কি বাস্তবকে কল্পনায় পালটাতে পারব, এত বিশৃঙ্খলার ভেতর জীবন কাটিয়েছি, একজন মানুষকেও দেখলুম না যে অসৎ নয়, যে লোকগুলো ঈশ্বরের কাছে পৌঁছে গেছে বলে দাবি করেছে,  সবচেয়ে অসৎ হবার সম্ভাবনা তাদের মধ্যেই পাই ।

 

Double space

ওম নাস্তি, ওম নাস্তি, ওম নাস্তি লিখে, ঘুমোতে যাবার আগে কাগজগুলো সাজানো শুরু করলুম । জানি ব্যর্থ হবো, তবু আরম্ভ করতে দোষ কোথায় !

সবায়ের জন্যে তো লিখছি না,  যারা সাজা পেয়ে ভুগছে আর ভবিষ্যতে এসে ভুগবে, শুধু তাদের জন্যে লিখছি । যারা বিনা কারণেই সাজা পেয়েছে আর ভবিষ্যতে অকারণে সাজা পাবে, তাদের পড়ে আনন্দ হবে।

জেলার বলেছিলেন, রাতে ঘুমোবার সময় যখন স্বপ্ন দেখবেন, তখন স্বপ্নের ঘোরে লিখবেন, মনে রাখবেন যে জন্মাবার সময়ে আপনার সারা শরীর রক্তে ভাসছিল, তার স্মৃতি নষ্ট হতে দেবেন না ।

আমি বলেছিলুম, যা সত্যি তাই বলেছিলুম, হ্যাঁ স্যার, খুনখারাপি ছাড়া প্রতিষ্ঠানের বদল হয় না, প্রথমে সাফাই করতে হয় ওপরতলার লুম্পেনদের, তারপরে এক এক সিঁড়ি লুম-লুম-পেন-পেন করে নামতে হয়, তবে গিয়ে মহাকাব্য  ।

Three line space

 

জগার্স পার্কে ছয়টা দৌড়-পাকের পর সিমেন্টের ফিকে লাল বেঞ্চে, পাখিদের যৌথ গু এড়িয়ে, অর্ধেক ফাঁকা জায়গায় শাদা শর্টস আর লাল টিশার্ট স্পোর্টশ শু, যুবক বসল, ইউ ডি কোলোনিত একহাতি গামছা পকেট থেকে বের করে মুখ মুছে, তাকালো আগে থাকতে বসে থাকা যুবতীর দিকে, যুবতীর পাছার দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে চাইছিল যুবক, তার আগেই যুবকের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে যুবতী কথা বলা আরম্ভ করল, এমন ঢঙে যেন মৃত্যুর উনি মালকিন ।[৪]

এই বোকাচোদার মরণ, জানিস না যে মেয়েদের দিকে একনাগাড়ে তাকানো অশ্লীল, তাকে দখল করে যৌনতায় কয়েদ করার ইচ্ছে…তখন থেকে দেখছি…কুমিরের কুতকুতে চোখ মেলে স্টকিং করছিস…আর মেয়েমানুষ পাসনি…যা না…ওই তো অতো কচি কচি মেয়েরা মাই দুলিয়ে পোঁদ নাচিয়ে জগিং করছে…ওদের পেছন পেছন গিয়ে দৌড়োতে পারিস না বানচোদের মরণ…আমার পাশে এসে বসার  কি দরকার…আমার চোখ দুটো বড়ো আমার ঠোঁট বেশ পাতলা… আমার স্কিন বেশ ঝকমকে…আমার মাই দুটো হইচই মার্কা…এইসব এক ফাঁকে বলবি বলেই তো পেছু নিয়েছিস…নাকি…আর ইউ ডেফ…ইউ মরণের মাদারফাকার…হোয়াই ডোন্ট ইউ স্টপ স্টকিং…এছাড়া… আর কোনো কারণ আছে তো বল…শুতে চাস এক্ষুনি…নাকি…রাস্তায় চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ি আর তুই চাপ আমার ওপর…আমি শাড়ি তুলে ধরি আর তুই তোর কম্মো করে কেটে পড়…এই চাইছিস তো…কি রে… মুখে কথা সরছে না যে…রাসকেলের মরণ…হাঁ করে তাকিয়ে আছিস…মাই টিপবি…চল তাহলে পার্কের ঘাসে  গিয়ে বসি…ছাতা-টাতা এনেছিস…আড়াল করার জন্য…যত্তো বোকাচোদাগুলো আমার পেছনেই লাগে…ক্ষমতার কেন্দ্রে জরায়ু থাকবেই…

যুবক নিঃশব্দে নিজেকে কানে কানে বলল, একজন মেয়ের সঙ্গে প্রথমবার শোবার কথা ভাবলেই বুক ধড়ফড় করে ; সাজগোজ করে সময় নষ্ট করার মানে হয় না, সেই তো চটচটে ঘাম, যতো সব আঠালো ক্লান্তি, জখমের খোসা, প্রথমবার পাতপাড়ার মতন বসে হলে সবদিক থেকে ভালো । কিন্তু মানতে হবে, এই মেয়েটা শ্রোতার সন্মানহানির কায়দা আলজিভে রপ্ত করে ফেলেছে । [৫]

যুবতী : যা যা… কেটে পড়…বাড়ি যা…তোর মা ব্রেকফাস্ট নিয়ে অপেক্ষা করছে…তবু ফলো করিস…চটি খুলে পেটাবো নাকি…না হাঁক পেড়ে লোক জড়ো করব…আপনি কি ভাবছেন…আপনি স্মার্ট আর হ্যাণ্ডসাম বলে পার পেয়ে যাবেন…উরুর চুল পায়ের গোছের চুল দেখিয়ে হিম্যান প্রমান করতে চাইছেন..আপনার গৌরবর্ণ দোহারা ঢ্যাঙা চেহারা…একমাথা কোঁকড়া চুল দেখে ফেঁসে যাব আমি…অতই সস্তা পেয়েছেন নাকি আমাকে…যান নিজের পথে যান…বিরক্ত করবেন না…ভালো করে কথা বলছি…এর পর চটি পেটা করব সত্যি-সত্যি…কোথা থেকে যে জুটলো এই গবেটটা…নেড়ি কুকুরের মতন লেগেই আছে পেছনে…এই ঢ্যামনা রোমিওর মরণ…নিজের পথ দ্যাখো…আমার পঁচিশ বছর বয়স হয়ে গেছে বলে ভেবো না যে শোবো বলে মুখিয়ে আছি…বারো বছর বয়স থেকে এই বোকাচোদাগুলোকে ফেস করতে হচ্ছে…বাসে চাপো তো পোঁদে বডি ঠেকিয়ে মরণের ল্যাওড়া ফোলাবে…উৎসবে যাও তো ভিড়ের সুযোগ নিয়ে মাই চটকে বেরিয়ে যাবে…বেশ্যালয়ে যাবার মুরোদ নেই মরণের বানচোদগুলোর…রাস্তায় বিনিপয়সার মাগ পেলেই লেগে যাবে পেছনে…আমাকে স্টকিং করার হলে হিটলার করবে…জোসেফ স্ট্যালিন করবে…জুলিয়াস সিজার করবে…

যুবক নিঃশব্দে নিজেকে কানে কানে বলল, রোমান্টিক শব্দটা ইংরেজি, এর বাংলা প্রতিশব্দ  নেই, মেয়েটা যে কথার ঝাড়ের মাঝে শ্বাসের সময় নিচ্ছে, তা ক্রমশ ভয়াবহ হয়ে উঠছে, কথাগুলোর চেয়ে মাঝের নিঃশব্দ ফাঁকটাই আতঙ্কের।

যুবতী : তা সে তুমি যতই নায়কের মতন হাবভাব করো…চলো…চলো…যাও…যাও…কী ভাবছ…আমি ভার্জিন কিনা…হ্যাঁ…আমি ভার্জিন…কারোর সঙ্গে শুইনি…আগে ম্যাস্টারবেট করতুম… এখন অটোমেটিক অরগ্যাজমের টেকনিক রপ্ত করে ফেলেছি…লাবিয়ায় মুক্তো লাগানো একটা মাকড়ি লাগিয়ে নিয়েছি…এই যে দুই কানে যেমন দেখছিস, তেমনই…সেই মাকড়িটা….পার্কে এক পাক হাঁটলেই…বুঝেছিস তো…কিছুক্ষণের ঘষটানিতে আপনা থেকেই অরগ্যাজম হতে থাকে…সেটাই এনজয় করি পার্কের বেঞ্চে বসে…কোনো মরণের কুত্তাপুরুষের দরকার হয় না…হাঃ হাঃ…কি বুঝলি…মাকড়ি তো…দুই কুঁচকিতে উল্কিও করিয়েছি…প্রজাপতি উড়ছে…উল্কি জানিস তো…ট্যাটু…অরগ্যাজমে উড়তে থাকে প্রজাপতি দুটো…বুঝলি…কি হাঁ করে তাকিয়ে আছেন যে…বিশ্বাস হচ্ছে না…ভাবছিস কে কে আছে আমার যে এই সব মজা নিই লাইফের…আছে রে দু দুটো বাপ…একজন অন্ধ…পিটুনির চোটে অন্ধ হয়ে গেছে…আরেকজন অ্যালঝিমার রুগি…ভাবছিস মাটা কমনে আছে…সে বেটি পালিয়েছিল আরেকজন কচি কচকচের সঙ্গে…ছোঁড়াগুলোর টেস্টও বলিহারি…টিভিতে মাকে দেখে প্রেম করে বসল এক ছোঁড়া…মা তার সঙ্গে লিভ-টুগেদার বেঁধেছে…টিভির গল্পটাকেই নিজের জীবনে অ্যাডপ্ট করে নিয়েছে…তুই এখনও তাকিয়ে আছিস যে…কুঁচকির প্রজাপতি দেখতে চাইছিস নাকি…তাহলে তোকে বলি যে আমার বুকের খাঁজে কাঁকড়ার উল্কি আছে…তোরা তো হাজার হাজার বছর আগে গুহায় যেমন থাকতিস এখনও তেমনই আছিস…তুই কি ভাবছিস আমি কারোর সঙ্গে শুতে চাই না…চাই…চাই…চাই…স্ট্যালিনের সঙ্গে শুতে চাই…মাওয়ের সঙ্গে শুতে চাই…হিটলারের সঙ্গে শুতে চাই…সিরাজউদ্দৌলার সঙ্গে শুতে চাই…লর্ড ক্লাইভের সঙ্গে শুতে চাই…আর এন ট্যাগোরের সঙ্গে শুতে চাই…রামকিঙ্কর বেইজের সাথে শুতে চাই…এক এক রাতে এক এক স্বপ্নে শুতে চাই…ফর মি লাভ ইজ ইনসারেকশান…স্টকিং হল প্রতিবিপ্লব…[৬]

যুবক নিঃশব্দে নিজেকে কানে কানে বলল, এরা এক এক সময়ে এক একটা মানুষকে পছন্দ করে, তারপর সারাজীবন একজনকে  নিয়ে কেমন করে কাটায় ! আসলে অন্ধকার জমাট বাঁধতে থাকে, সম্পর্ক গলতে থাকে । সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ শিল্প হল কনফিউজন ক্রিয়েট করা । সেটাই করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে , যেন কোনো আক্রমণ থেকে প্রাণপণে ছিটকে বেরিয়ে এসেছে ।

যুবতী : তোর এখনও শুনে আশ মেটেনি…যা দিকিন এখান থেকে…কার কাছে ট্যাটু করিয়েছি তাই ভাবছিস তো…কোনো মহিলা-টহিলার পারলরে নয়, পুরুষেরই ট্যাটু পারলরে, প্রজাপতি দুটোর গায়ে তিন রকমের রঙ আছে…কাঁকড়াটা লাল করিয়েছি…কোনো মরণের বানচোদ ধর্ষকের পাল্লায় যদি পড়ি কখনও তো তাকে লাল কাঁকড়া ফেস করতে হবে…যদিও জানি যে লাবিয়ার মাকড়িতে তার নুনু আটকে ফর্দাফাঁই হয়ে যাবে…বুঝলি…কী…শুনে ভয় পেয়ে গেলি…এতক্ষণে ধারণা করে নিয়েছিস নির্ঘাত যে আমি বেহেড পাগল…তা ঠিক…আমি কম কথার মেয়ে…বেশি বক বক করতে পারি না…আমি কি করে দুটো বাপকে চালাই ভাবছিস…অন্ধ বাপের পেনশন জোটেনি…কেস চলছে…শালা কবে যে ফয়সালা হবে…তাও আমাকেই সামলাতে হয়…বাপের দপতরে গেলে মরণের কেরানিগুলো আমার খাপেখাপ দেখতে থাকে…অরগ্যাজমের উত্তেজনা-আনন্দ উপভোগ করব…তা নয় মাকড়ি খুলে দৌড়োও আদালতে…জানতে চাইছিস বোধহয় যে দুটো বাপ কেমন করে হতে পারে…হতে পারে..হতে পারে…এই ধরো আমি তোমাকে বিয়ে করে নিলুম…তারপর তোমায় ডিভোর্স না দিয়ে চুপচাপ আরেকজনকে বিয়ে করে নিলুম…একজনের সঙ্গে শুয়ে কি আশ মেটে..বলো তুমি…মেটে না…মেটে না…সব মিথ্যে…ইউ লিভ ফর ওয়ান্স ওনলি…জানতে পেরে আমি দুজনকে এক ছাদের তলায় এনেছি…ভাবছ বাপেদের ককটেল চরিত্র পেয়েছি আমি…তা ঠিক ধরেছ…দুজনের চরিত্র আমার ওপর একসঙ্গে বর্তেছে…কোন বাপের মেয়ে আমি জানি না…বিজ্ঞানের সাহায্য নেয়া যেতে পারত…নিইনি…শেষে হয়তো দেখব এদের দুজনের কেউই আমার বাপ নয়…পুরো টাকা গচ্চা…তাছাড়া জেনেই বা কী হবে কোনটা আমার বাপ…বলো…

যুবক নিঃশব্দে নিজেকে কানে কানে বলল, এই মেয়েটা, সব মেয়ের মতনই, বিভ্রমের বাস্তবতায় বাস করে, যেন ঘুম ভেঙে দেখছে এতোকাল খরগোশের গর্তে ঘুমোচ্ছিল আর হঠাৎ উঁকি দিয়েছে শেয়ালের হাসিহাসি হাঁ-মুখ।[৭]

যুবতী : তুই ভাবছিস আমি কি করি…হ্যাঁ…রান্নাবান্না করি…আমি আসলে ওই হাসপাতালটায় রিসেপশানিস্ট ছিলাম…বুঝলি…তোর জন্যেই তো চাকরিটা গেল…আমি কিই বা করেছি…আমার কোনো দোষ ছিল না…পুরো বিজ্ঞানের দোষ…বিজ্ঞান মানেই ফাঁদ…ফেলে দিল আমাকে ফাঁদে…তুই তো জানিস…দেখেছিলেন তো কী হয়েছিল সেদিন…নার্সটাকে বলেছিলাম এম আর আই রুমে ডাক্তারকে অক্সিজেন মাস্ক দিয়ে আসতে…তাকে বলা হল কিছু সে শুনলো আরো কিছু…সে বেটি কি করলে…সে করিডরে রাখা অক্সিজেন সিলিণ্ডারটা নিয়ে রাখতে চলে গেল এম আর আই রুমে…তারপর যা হবার তাই হলো…এম আর আই মেশিনের রাক্ষসি ম্যাগনেটিক ফিল্ডকে অ্যাক্টিভেট করে দিলে মেটাল সিলিণ্ডারটা…সেকেন্ডের মধ্যে নার্সটাকে আর যে টেকনিশিয়ান সেখানে দাঁড়িয়েছিল দুজনকেই খেলনার মতন টেনে নিলে মেশিনটা…সে কি আওয়াজ…আর চিৎকার… চার ঘণ্টা ধরে আটকে ছিল ওরা…তাতে আমার কি দোষ…ওই দুর্ঘটনার জন্যে নাকি আমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে…দিনকাল খারাপ যাচ্ছে মনে করলে তাকে আরও খারাপ করে তুলে পার পাওয়া যায়…

যুবক নিঃশব্দে নিজেকে কানে কানে বলল, এই যুবতী ভবিষ্যতের কলোনিতে ডেরা ডেলে আছে, সময়কে নষ্ট করে-করে অতীতে পৌঁছোতে চাইছে মনে হয় । এর মগজ সময়কে ভুলে গিয়ে থাকবে, কিন্তু মগজ দাগ রেখে গেছে এর সময়ে । তাই সময়কে নষ্ট করে চলেছে , আর কতো পাক খুলবে কে জানে, নষ্ট হওয়া ছাড়া সময়ের তো অন্য কোনো গতি নেই । হঠাৎ কথা বন্ধ করে আবার আরম্ভ করে, বোধহয় এই নৈঃশব্দের সময়টায় ওর অরগ্যাজমের তুলতুলে বিস্ফোরণ হয় ।

যুবতী : জেনেরাল ইলেকট্রিক থেকে একজন ইনজিনিয়ার এসে মেশিনটা ডিঅ্যাক্টিভেট করার পর ম্যাগনেটিক ফিল্ডটা গেল…মরণের নার্সের তো কনুই ফ্র্যাকচার…টেকনিশিয়ান বেচারা একদিকে নার্স আর সিলিণ্ডারের মাঝে…দুই হাত নার্সের দুই বুকে অথচ টিপতে পারার মতন জ্ঞান নেই…অন্যদিকে মেশিনের হাঁ-মুখে…বেচারার ইউরিনারি ব্লাডার ফুটো হয়ে রক্তারক্তি কাণ্ড…ওদের দুজনকে সারিয়ে তুলতে নিউরোলজিস্ট, নিউরোসার্জন, অরথোপেডিক সার্জন, নেফরোলজিস্ট, প্লাসটিক সার্জন, ইনটেনসিভিস্ট কতো ডাক্তারের যে সময় গেল…নার্সটা কখনও কাজ করেনি এম আর আই রুমে…জানতো না যে এম আর আই রুমে মেটাল নিষিদ্ধ…তোকে এসব কেনই বা বলছি…তুই জেনে কিই বা করবি…মেশিন সুইচ অফ করলেই ওর ম্যাগনেটিক ফিল্ড ডিঅ্যাক্টিভেট হয় না…আমি তো দৌড়ে গিয়ে সুইচ অফ করে দিয়াছিলাম…তারপরেও ওদের দুজনকে টেনে বের করা যাচ্ছিল না… ম্যাগনেটকে মেশিন থেকে আলাদা করতে সময় লেগে গিয়েছিল…চার ঘণ্টা ওইভাবে আটকে…নার্সের দুই মাইয়ে দুই হাত…টিপবে তেমন জ্ঞান নেই…কত দিন হাসপাতালে ভর্তি ছিল…ইনটারনাল এনকোয়ারিতে আমাকেই বলির-ছাগলি করা হল…চাকরি খোয়ালাম…নতুন চাকরি পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে…হসপিটালিটি কোর্সটা না করে কমার্স পড়লে বরং ভালো ছিল…

যুবক নিঃশব্দে নিজেকে কানে কানে বলল, যাক এর বকবকানির কারণ জানা গেল । অ্যাদ্দিনে প্রগতির সহজাত তোতলামির সঙ্গে পরিচয় হয়েছে, হয়তো সেই থেকে যারা ওকে পছন্দ করে তাদের ও অপছন্দ করে । এ যখন জানতে পারবে যে আমি একটা বুনো জানোয়ার, তখন কি হবে !

যুবতী : প্রথম বাপটা আমার জন্যেই অন্ধ হয়ে গেল…পিটুনি খাবার পর যে হাসপাতালেই নিয়ে গেছি…আমার মুখ আর নাম দেখেই নার্সগুলো দুর্দুর করে তাড়িয়েছে…ট্রিটমেন্ট হল না ঠিকমতন…প্রথম বাপটা অন্ধ হয়ে গেল…সেই থেকে পৃথিবীটাকে জুতোতে ইচ্ছে করে…হাসপাতালগুলোকে রাতের অন্ধকারে একদিন পেটরল ঢেলে আগুন লাগাব…তুই তো পেছনে লেগেছিস…হেল্প করবি…নাকি…শুনেই মরণের গাঁড় চুপসে গেল…আমি এক বাক্যির মেয়ে…কাউকে রেয়াত করি না…বদলা নেবোই…বলির পাঁঠা বানালো কিনা আমাকে…আমার কি দোষ…নার্সটাকে বলেছিলাম ডাক্তারকে অক্সিজেন মাস্ক নিয়ে গিয়ে দিতে…উনি অক্সিজেন সিলিণ্ডার নিয়ে ঢুকে পড়লেন…মানুষকে আর বিশ্বাস করি না…কথা বলাকেও বিশ্বাস করি না…বলা হয় কিছু…আরেকজন শোনে কিছু…শেষে কাণ্ড ঘটে অন্যকিছু…দুর্বাঁড়া তোকে কেনই বা বলছি এসব…

যুবকের দিকে পাশ ফিরে বলতে থাকল  যুবতী, বড়ো টানা স্মাজফ্রি কাজলচোখ কুঁচকে ।

যুবক নিঃশব্দে নিজেকে কানে কানে বলছিল, সাতসকালে জগিং পার্কে কাজলটানা চোখ ! হলুদ ব্লাউজের সঙ্গে ম্যাচিং ফিকে হলুদ প্রজাপতি ওড়ানো সিনথেটিক শাড়ি । চুলে হলুদ ক্লিপ । পায়ে হলুদ ফুল  ফ্লিপ-ফ্লপ, জগিং শু নয় । প্রতিদিন আসে না, সপ্তাহে দিন তিনেক । কোনো দিন টপ আর স্ল্যাক্স, কোনোদিন ডেনিম জিনস, কোনোদিন চুড়িদার, ওকে দেখতে পেলে টানের দরুণ কোনো না কোনো যুবক বসে ওর পাশে গিয়ে ।

আজকের যুবকের  দেখে মনে হল মেয়েটা হাঁ করে কুয়াশা খায় আর সেগুলো কথার মোড়কে পুরে ওড়ায়, সেটাই বোধহয় ওর নিজের নিয়ন্ত্রণ খোলার তরকিব, জানে যে ওর কথাগুলো ভাইরাসে আক্রান্ত, ওর ভেতরের পরগাছাগুলোকে কথা শুনিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করছে ।

Double space

 

হাঁটতে বেরিয়ে এই পার্কে কেবল বুড়িদেরই  শাড়িতে দেখেছে যুবক, বা চুড়িদার পরে আসতে । যুবতীরা টপ আর ডেনিম জিন্স, কানে গান, অনেকে ব্রেজিয়ারহীন, মাই থলথলে, কুছ পরোয়া নেই গর্ব । এই যুবতীকে জগিং করতে দেখেনি যুবক, হাত দুলিয়ে হাঁটে, স্রেফ এক পাক, মানে আধ কিলোমিটার , তারপর গিয়ে ওই নির্দিষ্ট সিমেন্টের সিটে ।

যুবক শুনে থতমত, কোনো তরুণীর মুখে এরকম কিলবিলে কথার তোড় শোনেনি এর আগে, মানে সাজুগুজু শিক্ষিতা টাইপের মুখে, তুইতোকারির সঙ্গে আপনি-তুমি মিশিয়ে কী বলতে চাইছে বুঝতে পারছিল না যুবক, সন্দেহও হচ্ছিল যে ইচ্ছে করেই বলছে, আধপাগলি সাজছে ।

সকালে জগিং করার সময়ে তৃতীয় পাক দেবার পর আজ তৃতীয়বার দেখল মেয়েটাকে, সিমেন্টের বেঞ্চে ঠেসান দিয়ে কাঁপছে । জগিং করে না, কেবল হাঁটে মেয়েটা, এক পাক দিয়েই বসে পড়ে বেঞ্চে আর কাঁপে, তিনচার বার কেঁপে বসে থাকে মিনিট দশেক, তারপর উঠে পড়ে । যে যুবকরা টান খেয়ে বসে তাদের কেউ কেউ ওর পেছন-পেছন যায়, কে জানে কোথায় যায় । সত্যিই তাহলে যুবকেরা একে স্টকিং করে।

কথার তোড়ের পর, শুয়ে থাকা বাছুরের ভয় পাওয়ার ঢঙে, আচমকা উঠে দাঁড়াল যুবতী, বলল, ফলো করবি না, তোদের সবকটাকে চিনি ।[৮]

মেয়েটি উঠে পড়ার পর ওকে সতর্ক করার জন্যে, স্টকিঙের উদ্দেশ্যে নয়, এই মেয়েকে দেখে দেখে আশ মিটে গেছে, এখন ছুঁয়ে দেখতে দিলে প্রস্তাবটা লুফে নেবে ।  আজকে যুবতীর সমস্যার কথা বলবে বলে, পিছু নিয়েছিল যুবক, লোকজন বিশেষ নেই এরকম ফাঁকা দেখে বলবে, কিন্তু চারিদিকে ব্যস্ত পথচারীদের আনাগোনার দরুণ, যদিও কেউ পথে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেও এদের কারোর কিছু এসে যাবে না,  বলতে না পেরে, পেছন-পেছন যাচ্ছিল । জগিং পার্ক থেকে বেরিয়ে বাঁদিকে লাল থোকায় ঝিলমিলে গুলমোহর গাছের পাশ দিয়ে যাবার সময়ে, খসে পড়া পাপড়ি মাড়াতে-মাড়াতে, যুবতী যুবকের দিকে পেছন ফিরে বলল, মাদারচোদ ।

গালাগালটা শুনে, আশ্চর্য, যুবকের বেশ ভালো লাগল, জাস্ট হিল্লোল । একজন যুবতীর মুখে এই গালাগাল যে মধুমাখানো রহস্যময় হেঁয়ালি হতে পারে, তা এর আগে জানত না, হৃৎপিণ্ড জিনিসটা রক্তের স্রোতকে ইশারা করে  মগজে পৌঁছে দিয়ে প্রশ্ন করতে থাকল, ইহার পর কী ইহার পর কী ইহার পর কী । বলতে চাইল, শোবেন নাকি আমার মায়ের ভুতাত্মার সঙ্গে, উনি তো স্বর্গে। তার বদলে চুপ করে রইল, আরও হেঁয়ালির গোলকধাঁধার আশায় । [৯]

Double space

 

যুবতী জানতো গালাগাল শুনেও এই যুবক ফলো করায় বিরতি দেবে না। আগেও এরকমই হয়েছে । স্মাজফ্রি কাজলটানা আড়চোখে দেখে নিয়ে, মেয়েটি এবার সরাসরি পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে পড়ল, যুবকের মুখোমুখি হবার জন্য, আর বলল, কি রে মরণের বানচোদ, বললাম না, তা সত্ত্বেও পিছু ছাড়ছিস না দেখছি, লোক জড়ো করব নাকি, অ্যাঁ, মারের চোটে বাপের নাম ভুলে যাবি, যদি না অলরেডি ভুলে গিয়ে থাকিস ।

মেয়েটি যে সিমেন্টের বেঞ্চে বসেছিল, সেখানে আজ রক্তের দাগ দেখেছিল যুবক । দাঁড়িয়ে উঠতে, ফলো করে বুঝতে পারছিল, যুবতীর শাড়ির আঁচল আর পাছায় রক্ত লেগে । প্রতিদিন কাঁপে, নিশ্চয়ই কোনো অসুখ অনুমান করে, যুবক ভাবছিল, ফাঁকা পেয়ে বলবে যে, আপনার আঁচলে আর শাড়িতে রক্ত লেগে । বলতেই যাচ্ছিল, আপনি বোধহয় আজকে ফিসফিস বেঁধে আসেননি ।

দাঁড়িয়ে আছিস, বোকাচোদার মরণ, ফাক অফ, স্টকিং করবেন না, আমি ডিসগাস্টেড ফিল করি, স্কুলের সময় থেকেই আপনাদের মতন রোমিওদের আচরণে বিরক্ত হয়ে-হয়ে ক্লান্ত হয়ে গেছি । কাইন্ডলি ফলো করবেন না । কেন ফলো করছেন জানি, আপনাকে আমি চিনতে পেরেছি, সিরিয়াল স্টকার।

যুবক বলল, আপনাকে যে কথাটা বলতে চাইছি, সেটাই সরাসরি বলি, তাহলে বুঝতে পারবেন কেন স্টকিং করছি । আপনার মাকড়ি ছিঁড়ে গিয়ে থাকবে, ব্লিডিং হচ্ছে বুঝতে পারেননি, তাকেই বোধহয় অরগ্যাজমের আঠা মনে করছেন । আঁচলে আর পেছনে হাত দিয়ে দেখুন ।

যুবতী তক্ষুনি  পেছন হাত দিল না, চোখে এক চিলতে নকল ভয় খেলিয়ে,  আঁচল সামনে এনে রক্ত দেখতে পেয়ে পেছনে হাত দিয়ে টের পেল  চুপচুপে । বলল, সরি, বুঝতে পারিনি, আজকে তো ডিউ ডেট নয়, ডিউ ডেটের আগেই হয়ে গেছে, ডিউ ডেটের একদিন আগেই মাকড়ি খুলে ন্যাপকিন বেঁধে রাখি ।

এই ভাবেই পথ দিয়ে হেঁটে যাবেন ? আমার মোটর সাইকেল আছে, চলুন আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দিই। চিন্তা করবেন না, দরোজা পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে নিজের বাড়ি চলে যাবো । ভাগিয়ে ধর্ষণ করতে নিয়ে যাব না কোথাও, তাছাড়া আপনার লাবিয়ায় মাকড়ির প্রটেকশান তো আছেই ।

চল চল চল চল চল, ভালো আইডিয়া দিয়েছিস , এই ভাবে তো পথে হাঁটা যাবে না, মাছিতে পেছন ঝালাপালা করে দেবে ।

Double space

 

মোটর সাইকেলের পেছনের সিটে বসে যুবককে দুই হাতে জড়িয়ে ধরল যুবতী, বলল, যাগগে, এবার তুই তোর গল্প বল ।

স্টার্ট দিয়ে যুবক বলল, এতোক্ষণ আমার চোদ্দোপুরুষ উদ্ধার করে, গালমন্দ করছিলেন, এখন আমার পিঠে বুক চেপে আছেন কেন, অস্বস্তি হচ্ছে , পিঠে আপনার ডাবল ব্যারেল মাংসের পিস্তল ঠেকাবেন না, আনইজি ফিল করছি । আর আমার গল্প বলতে আমার জীবনের কোনো গল্প নেই, তাতে অন্য কেউ-না-কেউ আছেই।[১০]

যুবকের ঘাড়ে গরম ভাপের শ্বাস ফেলে যুবতী বলল, অস্বস্তি হচ্ছে কেন শুনি ? যখন স্টকিং করছিলিস তখন তো অস্বস্তি হয়নি, দেখি দেখি, হ্যাঁ, তোর তো ফুলে উঠছে রে ! একটুকু ছোঁয়াতেই এই অবস্হা ! এক পরশেই শহিদ মিনার তুলে ফেলতে পারিস, আগের জন্মে গাধা ছিলিস নাকি রে ! অক্টারলুনির তো অনেককাল লেগেছিল ।

মোটেই ফোলেনি, হাত সরান, হাত সরান, কী করছেন কী ? লোকজন যাতায়াত করছে ; দেখতে পেলে তারাই এবার চটি পেটা করবে আমাদের দুজনকে । কোন মাংসের মেয়ে আপনি !

দুজনে একসঙ্গে মার খেলে কী হবে জানিস  তো ? আমরা একজন আরেকজনের সঙ্গে জুড়ে যাবো, সাপের মতন, লোকেদের চোখে, নিজেদের চোখেও । আমি তোর পরগাছা, তুই আমার পরগাছা, ওই দম্পতি বলতে যা বোঝায়, দুজনে দুজনকে চুষতে থাকো ছিবড়ে না হওয়া পর্যন্ত , চকাস-চকাস।

আবার হাত দিচ্ছেন, আমি অকওয়ার্ড ফিল করি এসব ব্যাপারে । প্লিজ । গাড়ি চালাতে অসুবিধা হচ্ছে। তার চেয়ে আপনার গালাগালের বক্তৃতা শুরু করুন বরং, আমার শুনতে ভালো লাগছিল, সেক্সুয়াল থ্রিল পাচ্ছিলাম ।

তোর নাম কি হার্দিক ? এতো হৃদয়বান ড্যাংগুলি । আই মিন হার্ড ডিক ! তোর ডিক তো একটু ছোঁয়াতেই হার্ড হয়ে গেল রে । ম্যাস্টারবেট করিস তো ? তবে এতো সেনসিটিভ কেন, লজ্জাবান লন্ঠন ?

মোটেই হার্ড হয়নি, ওটা আপনার কল্পনা ; আমি যদি হার্ডিক হই তাহলে আপনি তো লাবিয়া কুইন । আগে কখনও শুনিনি যে অরগ্যাজমের জন্যে কেউ লাবিয়ায় মাকড়ি পরে । বাজারে কি কলা-বেগুন-মুলোর অভাব ?

তুই যে আকাট তা তো তোকে ঝাড় দিয়েই বুঝতে পেরেছি । স্বয়ংক্রিয় ব্যাপারটা বুঝিস না । পিস্তলের কথা বলছিলিস একটু আগে, তা বিছানায় হোক বা প্রতিষ্ঠানের সিংহাসনে, না ঠেকালে নড়ে না রে, ঠেকাও আর গুড়ুম । দুঃখের কথা কি জানিস, সিংহাসনটা কখনও খালি থাকে না, ল্যাংড়া গিয়ে নুলো আসে।

বাঁ হাত দিয়ে যুবতীর হাত নিজের বুকের কাছে এনে যুবক বলল, তুই তুই করবেন না । আমিও যদি আপনাকে তুই তুই করি তাহলে কাজের বউ হয়ে উঠবেন । আমার এক ক্লায়েন্ট অবশ্য কাজের বউয়ের সঙ্গেই সংসার করে ।

এবার ডান দিক, হ্যাঁ, সোজা গিয়ে প্রথম রাইট টার্ন ।

এতো দূর থেকে পার্কে হাঁটতে যান, নিজের বাড়ির কাছে বাগান টাগান নেই ? তাছাড়া মাকড়ির আনন্দ তো রাস্তায় হাঁটলেও পেতে পারেন ।

তিন গলির মোড়ের মুখে দুজন যুবক, প্রায় ষণ্ডাগোছের, ডোরাকাটা ফুলশার্ট, শার্টের কলারে লাল টাই, কালো ট্রাউজার,  রাস্তার মাঝে দাঁড়িয়ে হাত তুলে থামতে বলল ওদের ।

এরা যদি মেয়েটার পেছনে লাগে, তাহলে, যুবক পরিকল্পনা ছকে নিল, মেয়েটাকে এদের কব্জায় ফেলে বাঁ দিকের গলিতে ঢুকে শর্টকাট মারবে নিজের আস্তানার দিকে ।

মোটর সাইকেল থামতে, আপনি একটু অপেক্ষা করুন , শহিদ মিনারকে পড়ে যেতে দেবেন না যেন, দু সেকেণ্ডেই ফুসকি হয়ে গেলে ফিরে আরো ভয়ংকর গালাগাল দেবো, বলে, মেয়েটা নিজেই নেমে এগিয়ে গেল স্মার্ট যুবক দুজনের দিকে ।

এরা মেয়েটার বডিগার্ড বা বাউন্সার নাকি  ! যা গালাগাল ছাড়ছিল, আর যাদের সঙ্গে এর মেলামেশা, কোন লাইনের মেয়ে রে বাবা ! হুকার ইন ডিসগাইজ নয়তো ! যুবক কয়েকটা শব্দ ভাসা ভাসা শুনতে পেল, সুপারি,  টাকা, কাট ডাউন, ক্যারি, মিডনাইট। ওদের একজন মেয়েটাকে একটা কাঁধে ঝোলাবার চামড়ার স্লিং ব্যাগ দিল । অন্যজন একটা পুরিয়া দিল, মোড়ক খুলে শুঁকে, হাতে রেখে নিল যুবতী।

অ্যাক্সিলাটারে স্পিড নেবে ভাবছে যখন, ফিরে এসে সিটে বসল যুবতী । ওকেই মেরে ফেলার প্ল্যান করছে নিশ্চই ; রোজ একটা ছেলেকে ফাঁসায় আর খুনের হুমকি দিয়ে র‌্যানসাম আদায় করে বোধহয় । স্পিড নিয়ে এঁকে বেঁকে মেয়েটাকে ফেলে দেবার কথা মনে এসেছিল যুবকের, তখনই যুবতী আবার দুহাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল যুবককে, নিজের বুক যুবকের পিঠে চেপে ধরে । ডান হাত এগিয়ে যুবকের কুঁচকিতে রেখে মেয়েটি বলল, কেমন যুবক আপনি, হার্ড ডিক এক সেকেন্ডেই সফ্ট চিক হয়ে যায়, বাঁ হাতে পুরিয়া খুলে নিজের ঠোঁটে মাখিয়ে যুবতী বলল, এদিক ফের, এদিক ফের, তোকে একটা চুমু খাই ।

গাড়ি থামিয়ে পেছন ফিরল যুবক, এমন সুযোগ ছাড়ার মানে হয় না । লোকজনের যাতায়াতকে ডোন্টকেয়ার করে যুবককে চুমু খেল যুবতী, ঠোঁটের গুঁড়ো যুবকের মুখের ভেতরে জিভ দিয়ে পাঠিয়ে ।

এটা কি জিনিস, জানতে চাইল যুবক, বলল, এ তো চিনি নয়, বেকিং সোডার স্বাদও নেই, হেরোইন -কোকেন খাইয়ে দিলেন নাকি, গাড়ি চালাতে গিয়ে দুজনেই ডিগবাজি খেয়ে পড়ব । আর কতো দূরে আপনার বাসা ?

যা চাটলি তাকে বলে মেয়াও-মেয়াও-কিস, সায়েন্স পড়েছিস না আর্টস ? চাটার অভিজ্ঞতা আছে, নাকি নউশিখিয়া আনাড়ি ! চাটতে না পারলে কোনো প্রেম টেকে না, তা সে নেশা হোক বা সেক্স ।[১১]

আবার তুই তুই করছেন, সসেজ-পোড়া গন্ধের চুমু খেলেন যখন,  অন্তত তুমি তুমি তো করতে পারতেন । না, আমি দর্শনে সান্মানিক স্নাতক  পড়তে পড়তে ছেড়ে দিয়েছিলাম ।

মুকখু ? ওঃ, তাই গালাগাল খেয়েও মুখ বন্ধ করে ছিলিস , বলবি তো যে তুই আকাট , দর্শন আবার বিষয় নাকি, অন্য সাবজেক্টে সিট না পেয়ে শেষে দর্শন, তারপর দার্শনিক হয়ে ঘোলা জলে সাঁতার, বোমক্যাওড়া সাতল্যাওড়া বক্তিমে, যা কখনও কারোর কাজে লাগে না ! চোখ কান নাক মুখ হাত থাকতেও লোকে কেন দার্শনিক হয় জানিস ? দুনিয়ার বাদবাকি মানুষকে তারা মনে করে বোকাচোদার মরণ, তাদের চোখ কান নাক মুখ হাত নেই । তোরও সেই অবস্হা ।

আকাট নই, ভালো রেজাল্টই করতাম, দাদা ক্যানসারে মারা যাবার পর দোকানটা আমাকেই চালাতে হচ্ছে । বাবা মারা যেতে মা চালাতেন, মা মারা যাবার পর দাদা চালাতো, দাদাও মারা গেল, এখন আমি চালাই । যে মেয়েটার সঙ্গে দাদার বিয়ে ঠিক হয়েছিল তাদের বাড়ির লোক তো আমার সঙ্গে তার বিয়ে দেবার জন্যে ঝুলোঝুলি করছিল । আমার চেয়ে চার-পাঁচ বছরের বড়ো মেয়ে তাকে বিয়ে করা যায় নাকি ! ভেতরে ঢুকে কি সাঁতার শিখব ? তাছাড়া মেয়েদের চেয়ে আমার নতুন মোটর সাইকেল বেশি পছন্দ ।

দোকান ? কিসের দোকান ?

দশকর্মভাণ্ডার । জন্ম থেকে নিয়ে চিতায় চড়া পর্যন্ত সব রকমের ফর্দ মেনে সাপলাই দিই ।

ওঃ, যতো অশিক্ষিত সুপারস্টিশাস লোকেদের সঙ্গে তোমার কারবার, ঘোমটাদেয়া সিঁথিতে সিঁদুর শাঁখাপলা বউ, খাটো ধুতি পৈতে ঝোলা পেটমোটা বামুন, খ্যাংরাকাঠি কায়েত, দশ আঙুলে দশ রত্নের আঙটি বদ্যি বামুন, তাদের গঙ্গাজলের নামে কলের জল বিক্রি করো, থার্মোকোলের শালপাতা, কাগজের মাটির ভাঁড়, হলদে রঙের কাঠের গুঁড়োকে হলুদ, কৃষ্ণচূড়ার ডালকে বেলকাঠ, জানি জানি । ওসব ছাড়তে হবে তোমায় । আমি শিখিয়ে দেবো যে মেয়াও-মেয়াও-কিস থেকে কতো বেশি রোজগার করা যায় ।

আপনার কেউ মরে গেলে বলবেন । আমি নিজে ঈশ্বর ঠাকুর্দেবতায় বিশ্বাস করি না, এই সব দশকর্মতেও বিশ্বাস করি না, অন্যেরা বিশ্বাস করছে বলে তাদের জ্ঞান দিতেও যাই না । লোকে যেমন আলু-পটল মাছ-মাংস বিক্রি করে, আমি ঐতিহ্য বিক্রি করি ।

ঐতিহ্য ? গুড ওয়র্ড । ভালো করিস । কেউ মরে গেলে আমি ভালোবাসায় সোপর্দ করি । তারপর যুবতী যোগ করল, এখানে এক মিনিট দাঁড়া, ওই পেটমোটাকে এই ব্যাগটার মাল দিয়ে আসি, বলে, নেমে, রাস্তার পাশে ভিড়ের দিকে এগিয়ে গেল যুবতী ।

Double Space

 

আম কাঠের পালিশ-ওঠা আরাম চেয়ারে হেলান দিয়ে কোলে বন্দুক রেখে বসে থাকা লোকটার হাতে স্লিং ব্যাগ থেকে দুটো হাফ কিলো ময়দার প্যাকেট দিতে, সে পেতলের হাতবাক্স থেকে নোটের তাড়া বের করে যুবতীকে দিল । কোনো কথাবার্তা হল না । এই দেয়ানেয়াও এক ধরণের কথা । সেক্স করার মতন, কথা বলার দরকার হয় না, নাক মুখ দিয়ে নানা রকমের শ্বাস আর আওয়াজ বের করে আনন্দ দেয়ানেয়া করে, ছেলে-মেয়ে, মেয়ে-মেয়ে, ছেলে-ছেলে।

যুবতী তাড়াতাড়ি হেঁটে ফিরে এলে, যুবক কন্ঠস্বর নামিয়ে, যুবতীর খোলা নাভির দিকে তাকিয়ে বলল, বুঝেছি, এই নেশার গুঁড়োর ব্যবসা করেন । নিজেকে কানে কানে জিগ্যেস করল, নাভিতে কি সাবান লাগায় ? নাকি সব সাবান মুখে? নাভিতে বোধহয় লিন্ট জমে গেছে ।

তা খারাপ কি ? তুই দশকর্মের গাঁজা বেচিস, আমি মেয়াও মেয়াও বেচি, বলল যুবতী, যুবকের চোখ অনুসরণ করে নিজের নাভি শাড়িতে আড়াল করল ।

আপনার নাভিতে বোধহয় লিন্ট জমেছে, ওখানেও সাবান লাগাতে হয়।

আমি ওয়াশিং মেশিন নই যে লিন্ট জমবে ; আর যদি জমেও থাকে, তা থেকে কি উল বানিয়ে তোর জন্যে সোয়েটার বুনে দেবো ?

ফ্রি রাইড দেবার বিনিময়ে একটা ফ্রি প্রশ্ন করছি, দশাশই পেটমোটাটা কে ? অমন আরও পেটমোটা আছে নিশ্চয়ই তোমার ক্লায়েন্ট লিস্টে ? কথাগুলো বলে, নিজের কানে কানে যুবক বলল, এ ব্যাটা এতো মোটা, ছোঁচায় কেমন করে ! ছোঁচাবার লোক রাখতে হয়েছে নিশ্চয়ই । যতো বজ্জাত তাদের পোশাক ততো ধবধবে সাদা হয় আজকাল ।

তোরও তো পেটমোটা-ঢাউসবুক বউরা আছে ক্লায়েন্ট লিস্টে ।

তা আছে, তাদের কাকিমা মাসিমা জেঠিমা বলে ডাকতে হয় । তোমার এই পেটমোটাটা কি কাকু জেঠু দাদু মেসো পিসে ।

পেটমোটাটা নেতা, নেতার বয়স আর বডির ওজন যতই হোক, তাদের দাদা বলে ডাকতে হয়।  মিছিলের লোকেদের মেয়াও মেয়াও খাইয়ে মাইলের পর মাইল হাঁটাতে পারে, র‌্যালি-র‌্যালায় মাঝরাত পর্যন্ত না-খাইয়ে বসিয়ে রাখতে পারে । অন্য টাইমে রঙচঙে ঝিলমিলে টুনি জ্বালিয়ে হিজড়েনাচের অনুষ্ঠান করে ওর বাংলা-মাতাল চেলাদের জন্যে, ভাই-বেরাদরদের জন্যে বার-ডান্সার আনিয়ে ঝিনচাক একশো ডেসিবেল অনুষ্ঠান করে । নেতাগিরির জন্য যা যা করা দরকার সবই করে । দেখছিস না, নিজের কোলে রাইফেল, পাশে বডিগার্ডদের পকেটে-কোমরে পিস্তল । গুণ্ডা-মাস্তানের দল ছাড়াও, ওর স্টকে অনেক ভিখিরি আছে, প্রায় শ’দুয়েক হবে, সবাই ভালো অভিনেতা, দরকার পড়লে টিভি-সিনেমার পরিচালকরা ওর কাছ থেকে ভাড়া করে নিয়ে যায়, বেশ্যার ব্যবসাও আছে ওর, তিন চারটে পাড়ায় বেশ্যা বসিয়েছে, তা প্রায় শ’তিনেক হবে । ধর্ষণের মোটর সাইকেল গ্যাঙ আছে, তাদের মেয়াও-মেয়াও চাটিয়ে পাঠিয়ে দ্যায়, পার্টির র‌্যাশান  কার্ডের ঠিকানা জানিয়ে ; তুই জয়েন করতে পারিস, তোর তো মোটর সাইকেল রয়েছে ।

নিশ্চয়ই ডোনেশান দ্যায় সৎ কাজের জন্যে ? জানতে চায় যুবক, কন্ঠস্বরে শ্লেষ ।

শ্লেষকে পাত্তা দেয় না যুবতী, শর্টস-পরা যুবকের চুলে-ভরা উরুতে হাত রেখে বলে, হ্যাঁ, কতো ছেলেমেয়ের পড়াশুনার খরচ মেটায়, বিধবাশ্রমকে দান করে, স্কুল-কলেজে ভর্তি করায়, ওর নিজেরই আছে ইনজিনিয়ারিং আর মেডিকাল কলেজ ।

শুকোতে থাকা ঠোঁট জিভ দিয়ে চেটে যুবক পেছন ফিরে বলল, হাত সরান, গুঁড়োয় কিন্তু আমার নেশা আরম্ভ হয়েছে, অ্যাকসিডেন্ট হতে পারে ; এ-রাস্তাও কতোকাল সারানো হয়নি, জানি না, তার ওপর পিঠে আপনার দোনলার গুঁতো দিয়ে চলেছেন, এরকম ছুঁচালো নকল বডিস পরেন কেন ।

যুবতী বলল, কন্ঠস্বরে আত্মাভিমানের ঝিলিক, নকল নয়, আসল, ছুঁচালো বলে নকল মনে করার কারণ নেই । বডিসও পরে নেই আমি, এখনও ঝুলে যাবার বয়স হয়নি, কেবল ব্লাউজের ওপর শাড়ি ।

গর্বের ব্যাপার বলুন ? আর কতো দূর আপনার গর্বের খোঁচা খেতে খেতে যেতে হবে ?

ওই যে, শ্মশানকলোনির সামনে,  পুরোনো আমলের একতলা বাড়ি দেখছো, ওটাই আমার ঠেক ।

তুমি এতো ঘোরালে কেন তাহলে ? এটা তো জগার্স পার্কের পেছনের শ্মশানকলোনি , এই শ্মশানের ধারে বাড়ি, কাদের বাড়ি এটা, ভাড়া না নিজেদের, এরকম ফাঁকা জায়গায় বাড়ি, রাতের বেলায় মড়া এলে কান্নাকাটিতে ঘুমের দফারফা । এই শ্মশানকলোনি আমি তো চিনি, বাবা, মা দাদাকে এখানের চিতাতেই তুলেছি । একটামাত্র বাড়ি তবু লোকে একে শ্মশানকলোনি কেন বলে জানি না ।

ফর ইওর ইনফরমেশান, আজকাল শবযাত্রীরা আর কান্নাকাটি করে না, গান গাইতে গাইতে আসে, গান গাইতে গাইতে যায় । কান্নাকাটি আগের প্রতিষ্ঠানের সময়ে ছিল, এখন তামাদি হয়ে গেছে । আর কি জানিস, তোর উরু-পায়ের গোছে চুল দেখে তোকে  এতো ভালো লেগে গেল, ওই যাকে খারাপ লোকেরা বলে চিত্তচাঞ্চল্য, ভাবলাম আজকে এই ছেলেটাকেই ধরি । তোকে দেখেই জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করল । আর এই বাড়িটা আমার নিজেরও নয় ভাড়ারও নয়, জবরদখল করা, কখনও কোনো জমিদারের বাইজি-নাচাবার জন্যে তৈরি হয়েছিল ।

জবরদখল ? মানে ?

অন্যের আচার-বিচার, আদর্শ, মতামত, দর্শন, পাঁচালি যদি দখল করে নিজের বলে চালাতে পারিস, বিক্রি করতে পারিস, তাহলে বাসা জবরদখলের দোষ কোথায়, বল তুই আমায় ! ব্রিটিশরা তো এই দেশটাকে জবরদখল করে কলোনি বানিয়েছিল ; আমরা এটাকে শ্মশানকলোনি বানিয়েছি। [১২]

গান গাইতে-গাইতে ?

হ্যাঁ, সেই যে একজন সামাজিক সুপারম্যান মারা গেল, শহরচত্ত্বরে যার ডেডবডি রাখা হয়েছিল পাবলিকের দুখদর্শনের জন্যে, নাকে ভ্যানিলাগন্ধের তুলো গুঁজে, তার শবযাত্রী চেলারা গান গাইতে গাইতে এসেছিল, গাইতে গাইতে ফিরে গিয়েছিল, তখন থেকেই ক্রেজটা ধরে নিয়েছে পাবলিক ।

ক্রেজ ?

হ্যাঁ, ভদ্রমহোদয়, দেখিসনি, সঙ্গে বাজনা-টাজনাও থাকে অনেক শবযাত্রার , একবার একজন বাজিয়ের শব এসেছিল, তার শবযাত্রীরা হেভি মেটাল বাজাতে বাজাতে এসেছিল । বছর দশক হয়ে গেল, নিরীক্ষামূলক শবযাত্রার চল হয়েছে । তোর মা-বাপ-দাদা পটল তুলেছেন অলরেডি, নয়তো তুইও কোনো রক ব্যাণ্ড ভাড়া করে আনতে পারতিস , শ্মশানের অফিসঘরে কানট্রি রক, ফোক রক, পাওয়ার মেটাল, থ্র্যাশ, গ্রাঞ্জ, পাঙ্ক রক, গ্ল্যাম মেটাল, হেভি মেটাল, সকলের ফোন নম্বর আর রেটচার্ট আছে । তবে আজকাল ট্যাগোর রকের চল বেশি ।

 

Double space

আচ্ছা, আপনি যান, আমি চলি । আপনার গা থেকে আমার দোকানের দশকর্মের জিনিসপত্রের গন্ধ বেরোচ্ছে, আশ্চর্য । নিজের অনিশ্চয়তাকে বোঝার চেষ্টায় বলে ফেলল যুবক, যদিও টের পেল যে বলে ফেলাটা বোকামি হয়েছে, কেননা এই যুবতীর গা থেকে যে গন্ধ বেরোচ্ছে তা আঁশটে, যেন লইট্যা মাছ লুকিয়ে রেখেছে কোঁচড়ে ।

ভেতরে চল, দেখতে পাবি, আমার অ্যাঁড়গোবিন্দ ড্যাডি, অন্ধ হয়ে গেছে আড়ং ধোলাইয়ের চোটে, স্রেফ গোটাকতক টাকিয়াল গোঁপুড়ে দাড়িয়ালের দর্শনকে নিজের বলে চালাতে গিয়ে । শেষে ওর শিষ্যরা খুনোখুনি, ব্যাংকলুঠ, ঠিকেদারি, হুমকিটাকা, দালালি, লাশলোপাট, বোমাবাজি, মেয়ে পাচার, এই সব কাজে ঢুকে পড়ল আর বাপের দর্শন-আদর্শের দফারফা করে ছাড়লে ।

বাড়িটার দাবিদার আসেনি, কোনো টেকো বা দাড়িয়াল, সিনডিকেটের লাঠিয়াল, কিংবা মাগি-ধুমসিদের মাফিয়া ? জানতে চায় যুবক, এমন কন্ঠস্বরে যেন আগে জানলে সে-ই দখল করে নিতো ।

কতোকাল হয়ে গেল কোনো দাবিদার আসেনি । সেসময়ে কান্নাকাটি শুনতে আমার ভালো লাগত । মড়া এলেই জানলা খুলে দিয়ে কান্নার রোল শুনতুম । মড়াপোড়ার অমায়িক সুগন্ধ ভালো লাগে । মানুষের হাসি প্রায় সবায়ের একই রকম হয়, কিন্তু কান্না সবায়ের আলাদা-আলাদা, যাকে দেখতে যেমন তার কান্না ঠিক তার উল্টো, যতো ভালো দেখতে, ততো কুচ্ছিত তার কান্না । আজকাল অবশ্য কাঁদবার প্রথা তামাদি হয়ে গেছে।

যুবতী মোটর সাইকেল থেকে নামতে, যুবক পকেটের  রুমাল-ধরণের ছোটো গামছা বের করে সিটের রক্ত পুঁছে শুঁকলো, আর রুমালটা পকেটে রেখে নিল ।

কি, স্বর্গীয় সুগন্ধ না ? থুতনি উঁচিয়ে, জিগ্যেস করল যুবতী, থুতনির কালো তিলে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তারপর পাতলা ঠোঁটে শ্লেষ খেলিয়ে যোগ করল, রুমালের বদলে গামছা ?

যুবক বলল, পৌঁছে দিলাম তো, তার মাশুল হিসেবে রক্তগন্ধা রেখে নিলাম । এই মাপের গামছা দশ রকমের সংস্কারের সব কয়টায় ইউজ হয়, আমি তাতে তোমার রক্ত পুঁছে এগারো নম্বর যোগ করলাম ।

ব্যাস এইটুকু ? চলো চলো বাড়ির ভেতরে চলো, এখনও তো মেয়াও-মেয়াও-কিস সম্পর্কে জ্ঞান দিইনি ।

যুবক চোখ মেরে বলল, জ্ঞান নেবো, একটা শর্তে ।

বোকাচোদার মরণ,  মুকখুর আবার শর্তও আছে, প্রথম আলাপেই চোখ মারে ! কী, শুনি ? চোখ মারার মাশুল হিসাবে কথায় স্ল্যাং মিশিয়ে বলল যুবতী ।

লাবিয়ার মাকড়িটা আমি নিজে হাতে খুলে দেবো, তোমাকে খুলতে তো হবেই, স্যানিটারি ন্যাপকিন বাঁধার জন্য । সেই সুযোগে প্রজাপতি দুটোকেও দেখে নেবো, আমি অমন প্রজাপতি জীবনে দেখিনি, লাবিয়ার মাকড়িও জীবনে দেখেনি, পুরুষ্টু লাবিয়ার ঠোঁটই দেখিনি তো তার মাকড়ি আর কোথ্থেকে দেখবো। ব্যাস, মাকড়ি খুলব, আর কোনো আগ্রহ নেই, বলেছি তো আপনাকে, মেয়েদের চেয়ে নতুন মোটর সাইকেলের বডি আমাকে বেশি টানে, কতো মসৃণ হয় মোটর সাইকেলের ত্বক ।

চলুন, ভেতরে চলুন, একদম আওয়াজ করবেন না দাঁড়ান, তালা খুলি, বাপেদের তালা দিয়ে যেতে হয় । একবার তালা দিয়ে যাইনি, আলঝিমার বাপ গিয়ে আধসাজানো চিতার ওপর শুয়ে পড়েছিল, যারা লাশ নিয়ে এসেছিল তারা চ্যাংদোলা করে গান গেয়ে গালাগাল দিতে-দিতে ফেরত দিয়ে গিয়েছিল ।

তালা খোলার পর অন্ধকার বাড়ির ভেতরে ঢুকে দুর্গন্ধে হেঁচে ফেলল যুবক, ওয়াক সামলে নিল ।

আওয়াজ শুনে চেঁচাতে শুরু করল কোনো বুড়ো হাঁফ-ধরা কন্ঠস্বর ।

মার শালাকে মার শালাকে….

মার মার মার মার মাথা ফাটিয়ে দে, ছাড়িসনি, চুলের মুঠি ধরে উপড়ে নে…

লাগা ক্যাঁৎকা… লাগা, বানচোদ নিজেকে ভেবেছে জ্ঞানের পাতকো…

মার শালাকে মার মার মার মার মার মার বোকাচোদাটাকে….

আমাদের দলের সঙ্গে পাঙ্গা, বুঝিয়ে দিচ্ছি কাদের চটিয়েছে বানচোদ…

টেবিলের কাঁচটা ভেঙে দে, লাঠি দিয়ে হবে না, লোহার রড দিয়ে ভাঙ ভাঙ ভাঙ…

আবার কমপিউটার রাকা হয়েছে, কতো লোকের চাগরি খেয়ে নিলে কমপিউটারগুনো…

মার মার মার মার বানচোদকে…

দেয়ালে ওগুনো কাদের ছবি টানিয়েছে গাণ্ডুটা, আমাদের কোনো নেতার নয়…

মার ডাণ্ডা…ভাঙ ভাঙ…কি পারছিস না…আমাকে দে…

মাথা ফাটিয়ে দে ল্যাওড়ার বাচ্চার…

চোখে মার, নাক ফাটিয়ে দে..

মার মার মার মার মার, টেলিফোনের তার ছিঁড়েছিস…ছেঁড় ছেঁড়…

টাবিলের কাঁচ তুলে ফেলে দে…

শালা পুলিশের ভয় দেখাচ্ছিল আমাদের…

জানে না আমরা কার পোষা…

মার মার জামা ছিঁড়ে দে…পারছিস না…কেটে বের করে নে…

খালি পিঠে বাড়ি না মারলে বোকাচোদার মনে থাকবে না..

দে রদ্দা দে রদ্দা…

মার পেটা পেটা কামিনাটাকে…ল্যাখাপড়ার হিরোগিরি বের করছি বানচোদের…

ইনজিরি ঝাড়ছিল চুতিয়ার বাচ্চা…

বাল উপড়ে নে…

ড্যাডি, কী হচ্ছে কি, আমি আমি, এসেছি, চেঁচিও না, বলে বারণ করল যুবতী ।

অন্ধকারে যে লোকটা চেঁচাচ্ছিল, আবছা বোঝা গেল সেই ড্যাডি নামের বাবা, আরেকটা লোকও বসে আছে, গুম হয়ে, তাকে কী বলে ডাকে তার জন্য অপেক্ষা করছিল যুবক । দুজনের চোখেই কালো চশমা, কাঁধ পর্যন্ত চুল, লম্বা দাড়ি, ঝাবড়া গোঁফ, মনে হয় চুল কেটে দেবার, দাড়ি কামাবার, গোঁফ ছাঁটার সুযোগ থেকে এরা বঞ্চিত ।

বিরাট হলঘরে, যেখানে কখনও মোসাহেবদের নিয়ে পাশবালিশ জড়িয়ে বিলিতি মদ খেতো জমিদার, চারটে বেতের চেয়ারের দুটোয় সামনা সামনি বসে, দুজনেই উলঙ্গ, দুজনেই নিজের লিঙ্গ বই দিয়ে চাপা দিয়ে রেখেছে ; বইগুলো বোধহয় ক্লাস ফাইভ-সিক্সের ভুগোলের শক্ত মলাটের অ্যাটলাস । দুজনের মাঝে কোনো টেবিল নেই । ড্যাডি লোকটা একটা পাইপ ফুঁকছে, কিংবা ফোঁকার ভান করছে ।

যুবতী, বাঁ দিকে তাকিয়ে, স্লিং ব্যাগ থেকে, ইলেট্রনিক টর্চ বের করে ড্যাডি নামের বাবার ওপর ফোকাস করে জিগ্যেস করল, ব্রেকফাস্ট করেছ । বাঁদিকে ফেরার সময়ে বুক দুটো যুবকের দিকে তাক করা ছিল , নিঃঃশব্দে গুড়ুম শুনতে পেল যুবক, অদৃশ্য ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ল ।

ড্যাডি ঘাড় নাড়ালো, আলোয় চিকচিক করে উঠলো মলম লাগানো খোসপাঁচড়া, তারপর বলল, ভালোবাসা খায়নি  মনে হয় , তুই ওদের খেতে দিয়ে যাসনি বোধহয়, গান তো গায়নি ওরা , ভালোবাসা জানে, মাংসই সর্বজনীন ।

অন্য বুড়োটার দিকে মাথা নিচু করে,  যুবতী জিগ্যেস করল, তোমার কফি খাওয়া হয়েছে ?

বুড়ো, যাকে যুবতী জিগ্যেস করেছিল, চকচকে মোদো মুখ তুলে যুবতীর দিকে চুমু ওড়ানোর ঢঙে বলল, তোর ড্যাডির যখন চোখ ছিল, জ্ঞানচক্ষু নয়, চামড়ার চোখ, জ্ঞানচক্ষু তো ওর নেইই,  তখনও নিজের অন্ধত্বকে ছাপিয়ে যেতে পারিনি ।

ড্যাডি, গুমরে উঠে, বলল, একদিন পৃথিবীর বদল ঘটবেই, আর তা ঘটাবে অন্ধ, কালা আর বোবারা, দেখে নিস নর্দমার পোকা ; চোখ আছে বলে গোমরে ফেটে পড়ছিস স্কাউন্ড্রেল । শোন বানচোদ, পুরোনো সমাজের একেবারে নিচু স্তর থেকে ছিটকে পড়া যেসব লোক বেকার হয়ে পচছে, সেই লুম্পেনদের সুপারলুম্পেনরা  বিপ্লবের খাতিরে এখানে-ওখানে আন্দোলনের মধ্যে ঝেঁটিয়ে নিয়ে আসবে একদিন, কিন্তু এদের জীবনযাত্রার ধরণটা এমনই যে, তা প্রতিক্রিয়াশিল ষড়যন্ত্রের ভাড়াটে হাতিয়ারের ভূমিকার জন্য তাদের অনেক বেশি করে তৈরি করে তুলবে । আর তা করছিস তোরাই । একদিন সব বদলে যাবে, দেখিস, নতুন দিগন্ত দেখা দেবে ।

বাপি নামের বুড়ো বলল, বকওয়াস শালা, কি যে মাথামুণ্ডু বাংলিশ বকছে, নিজেই লুম্পেনদের পুষেছিল, তারাই তোর পোঁদে বাশ করে অন্ধ করে দিলে । লুম্পেনদের নিয়ে তত্ববাজি হয় না, এই লুম্পেনরা ইউরোপের লুম্পেন নয়, খাঁটি দেশি লুম্পেন, পিওর দেশি ব্রিড । যখন চোখ ছিল তখন দেখেছিলিস তো এদেশের রাস্তার কুকুর আর ওদের দেশের রাস্তার কুকুররা কতো আলাদা ।

তারপর যুবতীর দিকে তাকিয়ে বাপি জিগ্যেস করল,ভালোবাসার জন্যে  আর খোরাক পাওয়া যাচ্ছে না বুঝি রে ?

ড্যাডি দিল কথাটার উত্তর, খুনখারাপি না করলে উত্তরণ ঘটবে না ; মনে করো পোল্যাণ্ডের জঙ্গলের মাটির তলাকার হাড় ,খুনখারাপি হল মানুষে মানুষে যোগাযোগের প্রধান বার্তামাধ্যম, রক্ত রক্তের সঙ্গে কথা বলে ।

বাপি পোঁদ উঁচু করে জোরে পাদল, ড্যাডির কথার উত্তর হিসাবে, বোধহয় আটকে রেখেছিল, সঠিক সময়ে ছাড়বে বলে ।

বাপির কানে ফিসফিসিয়ে যুবতী বলল, যুবক শুনতে পায় এমন কন্ঠে, একটাকে ফাঁসিয়ে এনেছি, মেয়াও মেয়াও গিলিয়েছি, আরও কয়েকবার মুখে ঠুশে দেবার পর গতি করতে হবে ।

বাপি সে কথায় ততো গুরুত্ব না দিয়ে সামনের বুড়োকে বলল, গামবাট অন্ধ ল্যাঁড়টা আবার জ্ঞান দিতে লেগেছে, শালার চোখ গেলে দিয়েছে পিঁজরেপোলের বাছুর ছেলেছোকরারা, তবু পুঁথির গুদলেট চোরাপাঁক থেকে বেরোতে পারল না। জীবন থেকে আর কিছু পায় না, পায়নি, বিদেশিদের লেখা অনুবাদ করা বদগন্ধের  বই পড়ে-পড়ে বস্তাপচা বুকনি ঝাড়ে । ম্যাকলে যদি ইংরেজি চালু না করত, তাহলে বুকনি ঝাড়ার, বই পড়ার, এলেমও থাকত না গেঁড়েগুলোর ।

এই চোপ ।

তুই চুপ কর অন্ধ ; তোর তো কোথাও যাবার যো নেই ।

তুই পড়ে আছিস কেন, এখানে, পোঁদ মারাতে ?

আমি আসতে চাইনি । আমি এই খুনশ্মশানের  অংশ হতে চাইনি, মেয়েটাই জোর করে নিয়ে এলো, ওর মায়ের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেবার জন্যে, নয়তো ওর মায়ের চাকর হয়ে ভালোই ছিলাম, ওর মায়ের কচি কচকচে বরকেও মেনে নিয়েছিলাম ।

যুবতী বলল, মাকেও যে কবে ভালোবাসায় সোপর্দ করব তার অপেক্ষায় আছি ।

অন্ধ সামনের বুড়োর উদ্দেশে বলল, শালা, মাগের নাঙ কোথাকার । এই ভেড়ুয়াটাকে দেখলেই বঙ্কিমের সেই কথাগুলো মগজে বাজতে থাকে, সেই যে সাম্যতে উনি লিখেছিলেন, রাম সেলাম করিয়া, গালি খাইয়া, কদাচিৎ পদাঘাত সহ্য করিয়া, অথবা ততোধিক কোনো মহৎ কার্য করিয়া, কোনো রাজপুরুষের নিকট প্রসাদপ্রাপ্ত হইয়াছে । রাম চাপরাশ গলায় বাঁথিয়াছে — চাপরাশের বলে বড়োলোক হইয়াছে । আমরা কেবল বাঙ্গালির কথা বলিতেছি না — পৃথিবীর সকল দেশেই চাপরাশবাহকের একই চরিত্র — প্রভূর নিকট কীটানুকীট, কিন্তু অন্যের কাছে ? ধর্মাবতার !! তুমি যে হও, দুই হাতে সেলাম করো, ইনি ধর্মাবতার । ইঁহার ধর্মাধর্ম জ্ঞান নাই, অধর্মেই আসক্তি — তাহাতে ক্ষতি কি ? রাজকটাক্ষে ইনি ধর্মাবতার । ইনি গণ্ডমূর্খ, তুমি সর্বশাস্ত্রবিৎ — সে কথা এখন মনে করিব না, ইনি বড় লোক ইঁহাকে প্রণাম করো । বলে, পেট নাচিয়ে হাসতে লাগল লোকটা ।

দেড়ফুটিয়াটা বঙ্কিম চুরি করে আমায় জ্ঞান দিচ্ছে, আর এতক্ষণ বলছিল আমিই নাকি অন্যের মতাদর্শ নিজের বলে চালাই । ম্যাকলের ধোলাই খেয়ে বঙ্কিম বেরোচ্ছে মুখ দিয়ে, এর শিষ্যগুলোর তো বঙ্কিম পড়তে হলে ভয়ে বিচি শুকিয়ে যায় । সংস্কৃতকে তুলে দিয়েছিল, এখন বোঝো ।

চালাস তো । লেখালিখি আর ছাপানোর ব্যাপার না থাকলে তোরা কি আর পৃথিবীটাকে এরকম বদনাম করতে পারতিস ?

আমি যে আলো দেখতে পাই তুই তা পাস না, তুই এক রকমেরই আলো দেখিস, যার নাম অন্ধকার ।

যুবতী চেঁচিয়ে উঠল, আঃ, একদণ্ড শান্তিতে থাকতে দাও না তোমরা দুজনে । আমি তো তোমাদের সমস্যার সমাধান করছিই, ধৈর্য্য ধরতে পারো না !

Double space

 

যুবকের মাথা ঝিমঝিম করছিল, ঘুমও পাচ্ছিল, জিগ্যেস করল, ভালোবাসা ? মেয়ে না ছেলে ?

হ্যাঁ, ভা, লো, বা আর সা, আমার পোষা চারটে শকুন, আপনি যে বদগন্ধে হাঁচতে লাগলেন, আরেকটু হলেই বমি করে ফেলতেন, তা ওদের জন্যে, ওদের জন্যে লাশের বন্দোবস্ত করতে হয়, কিংবা শ্মশান থেকে আধপোড়া  মাংস যোগাড় করে আনি, বাঁচে না কিছুই, কিন্তু সবটা এক লপ্তে খায় না, আরও পচিয়ে খায়, যার যেমন রুচি ।

শকুন ? পেলেন কোথায় ? ভা-লো-বা-সা ? সা-বা-লো-ভা । সা-রে-গা-মা-পা-ধা-নি-সা ! বেশ সঙ্গীতময় নাম তো ! যুবক গঙ্গাজল ছেটাবার মতন করে হাত নাড়িয়ে বলল, ওম নাস্তি, ওম নাস্তি, ওম নাস্তি । নিজেকে শুনিয়ে নিঃশব্দে বলল, এই লোকগুলো যা বলছে তা সত্যিই ভেবে বলছে কিনা কে জানে, এরা আদপে ভাবেই না হয়তো, কথা বলাটা এদের জীবনযাপনের টাইমপাস ; কিংবা হতে পারে এদের মগজটা বিকৃত বা ফাঁকা ।

এই শ্মশান থেকেই টোপ দিয়ে ধরে এনেছি, ভালো গান গাইতে পারে ওরা, অনেকে মড়া আধপোড়া হয়ে গেলেই কেটে পড়ে, মুদ্দোফরাস আর ডোমগুলোও লোকজন নেই দেখে, নদীর জলে ফেলে, চিতা নিভিয়ে, আধপোড়া লাশ ভাসিয়ে দিয়ে বাড়ি কেটে পড়ে । ওদের প্রিয় গান গাইতে-গাইতে  অমনই এক লাশ খাচ্ছিল কয়েকটা শকুন, তারা রোজ আসত খাবারের লোভে, বাজার থেকে মাংস কিনে এনে পচিয়ে ফাঁদ পেতে ধরে ফেললাম এক এক করে চারটেকে । আধপোড়া লাশ পেলে বেশ কিছুকাল চলে যায়, নয়তো বন্দোবস্ত করতে হয় । ওই ঘরটা শকুনদের নাচমহল, জমিদার ব্যাটা ঝাড়লন্ঠনের মিহি আলোয় বাইজিদের ঠুমরি শুনতো , কয়েকটা বাইজির ফোটো আছে দেয়ালে।

লোকে সুন্দর দেখতে পাখি পোষে, আর তুমি শকুন পুষেছ ? যুবক সত্যিই অবাক ।

শকুনদের আমার ভালো লাগে, আই লাভ দেম, কি বিউটিফুল ওদের দেখতে । তাই তো নাম দিয়েছি ভালোবাসা । ভেবে দেখুন, ভালাবাসা কি শকুনের মতন ছিঁড়ে ছিঁড়ে খায় না প্রেমিক প্রেমিকাদের ? জমিদার মশায়ের ভালোবাসাবাসির বিশাল ঘরেই ওদের ঠাঁই দিয়েছি । ওদের সেক্স করা দেখেছেন ? প্রাণ জুড়িয়ে যাবে দেখলে, পায়ের আর ডানার কী অসাধারণ ভারসাম্য ।

শকুনদের নাম ভালোবাসা রাখাটা কি হিংস্রতা নয় ? বলল যুবক ।

যুবতী বলল, ভায়োলেন্স হবে কেন ! মানুষের মতন ওরাও লেগ পিস চায়, বোনলেস চায়, থাই পিস চায় , ডাবল-ব্রেস্ট চায়, সসেজ-পেনিস চায়। বরং শকুনঘরে ঢুকলে সেই সময়টুকুর জন্যে পৃথিবীর টান চলে যায়, দেখবেন একবার ঢুকে। দুঃখ বিষাদ প্রেমের গ্লানি  কষ্ট যন্ত্রণার মানসিক দুর্দশা থেকে মুক্তি দেয় । ক্ষণিকের জন্যে হলেও কম প্রাপ্তি তো নয়।

বিদেশি সিনেমায় দেখেছি বটে, যেগুলোর তলার দিকে ইংরেজিতে সংলাপ দৌড়োয়, সত্যি কিনা জানি না, ফর্সা মেয়ের লেগ পিস, থাই পিস, ডাবল ব্রেস্ট নিয়ে খেলছে ফর্সা ছেলে, ফর্সা মেয়েটা ছেলেটার সসেজ-পেনিস নিয়ে খেলছে । ওসব সিনেমা বেশি দেখার সুযোগ পাই না, এতো বড়ো লাইন পড়ে টিকিটের জন্যে, ল্যাংটো বডি দেখতে কার না ভাল্লাগে, বলুন ?

আর তো দেখতে পাইনে, কাঁদো কাঁদো গলায় হেঁচকির মতন বলে উঠল ড্যাডি আমের বাবা ।

যুবক নিজের কথা চালিয়ে গেল, পাড়ায় তো দেখেছি একজন মেয়ে অনেকের সঙ্গে ভালোবাসাবাসি করছে । পাড়ার পেছনদিকে একটা জঙ্গলমতন আছে, সেখানের ঝোপগুলো দুললে বুঝতে পারি ভালোবাসাবাসি চলছে । আজকাল তো বাহাত্তুরে বড়ি বেরিয়েছে, একটা বড়ি খেয়ে নাকি বাহাত্তরজন ছোঁড়ার সঙ্গে তিন দিন ধরে একের পর এক  শোয়া যায় । চোদ্দ বছর বয়স হলেই, ওই যে তুমি যাকে বলছ হার্ড ডিক, শহিদ মিনার, তা হয়ে যায় । আমি ওই লাইন পছন্দ করি না । যাকে জানি না, চিনি না, অমন মেয়ের সঙ্গে শুতে আমার ভীষণ ভয় । কারোর সঙ্গে শুতেই চাই না তাই । শুলেই আমার ভেতরের ফাইটারটা সেদিনকেই মরে যাবে । আমি দিনের বেলায় দশকর্মভাণ্ডার চালাই আর রাতে নতুন মোটর সাইকেল লিফ্ট করি, বেচি না, জাস্ট চুরি করে চালাই আর কাছাকাছি রাস্তায় রেখে দিই ।

যুবতী এবার খুঁটিয়ে দেখল যুবককে, বাইসেপ আছে, চোখে প্রশ্নের খোঁচা,  বলল, ওঃ, তুমি তো আমাদের লাইনেরই দেখছি, ভালোই হল, তোমায় আর মেয়াও মেয়াও দেবো না, নিজের কাজে লাগাব । তোমাকে শুতে হবে না, বসে-বসেও জীবনের আনন্দ নেয়া যায় ।

কাজ ? কী কাজ ?

প্রথম কাজ হল আমার মায়ের লিভটুগেদার ছোঁড়াটাকে ভালোবাসায় সোপর্দ করা ।

যত্তো সব ক্রিমিনাল চিন্তা ।

আমার আশঙ্কা ছিল যে কেমন করে তোমাকে আমাদের নোংরায় টেনে আনি ।

মোটর সাইকেল চুরি করে চালানো মোটেই নোংরা কাজ নয় ; এটা আমার হবি ।

যুবতী অন্য বুড়োটাকে জিগ্যেস করল, বাপি, তোমার ব্রেকফাস্ট হয়েছে ? সে কোনো উত্তর দিল না । যুবতী তার মুখের ওপর ইলেকট্রনিক টর্চের আলো ফেলে উঁচু গলায় জানতে চাইল ব্রেকফাস্ট হয়েছে কি না, কোনো উত্তর পেলো না । তার বদলে নাটুকে ঢঙে বুড়ো বলতে লাগল

নাম তো সুনা হোগা, রাহুল

আকাশের দেবতা সেইখানে তাহাকে দেখিয়া কটাক্ষ করিলেন

নাম তো সুনা হোগা, রাজ

কাঁটা ফুটিবার ভয়ও কি নাই কুসুমের মনে

নাম তো সুনা হোগা, দেবদাস

সইতে পারি না ছোটবাবু

নাম তো সুনা হোগা, বাজিগর

শরীর ! শরীর ! তোমার যোনি নাই কুসুম

নাম তো সুনা হোগা, চার্লি

আমি এক মাতাল, ভাঙা বুদ্ধিজীবী, ব্রোকেন ইন্টেলেকচুয়াল

নাম তো সুনা হোগা, ভিকি

প্রতিবাদ করা শিল্পীর প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব ; শিল্প ফাজলামি নয়

নাম তো সুনা হোগা, অর্জুন

বাংলা ভাগটাকে আমি কিছুতেই গ্রহণ করতে পারিনি — আজও পারি না

নাম তো সুনা হোগা, ম্যাক্স

ইউ আর অলওয়েজ এ পার্টিজান, ফর অর এগেইনস্ট ইট

নাম তো সুনা হোগা, ওম কাপুর

সব মাতাল ; আমাদের জেনারেশনের কোনো ভবিষ্যত নেই

নাম তো সুনা হোগা, কবির খান

আমি প্রতি মুহূর্তে আপনাকে ধাক্কা দিয়ে বোঝাব, ইট ইজ নট অ্যান ইম্যাজিনারি স্টোরি

নাম তো সুনা হোগা, জি ওয়ান

এদেশে শ্রমিক আন্দোলন করতে গেলে খৈনিই ধরতে হবে

লাৎ খাও হুমড়ি খেয়ে পড়ো উঠে দাঁড়াও…লাৎ খাও হুমড়ি খেয়ে পড়ো উঠে দাঁড়াও…লাৎ খাও হুমড়ি খেয়ে পড়ো উঠে দাঁড়াও…লাৎ খাও হুমড়ি খেয়ে পড়ো উঠে দাঁড়াও…লাৎ খাও হুমড়ি খেয়ে পড়ো উঠে দাঁড়াও…লাৎ খাও…ধর্ম ফিরছে…ধর্ম ফিরছে…ঈশ্বর ফিরছে না…ধর্ম ফিরছে…কেউ বাঁচবে না…সব…কচুকাটা…খুন…ধর্ষণ…পালাও…পালাও…চাপাতি রাখো….ত্রিশূল রাখো…ধর্ম ফিরছে…ঈশ্বর ফিরছে না…বোমাবারুদ তাজা করো…ধর্ম ফিরছে…ট্যাঙ্ক…ফাইটার জেট…কার্পেট বোমা…সভ্যতার সঙ্কট কেটে গেছে…গরিব-ধনীর ফারাক মিটে যাচ্ছে…ধর্ম ফিরছে…হাহা…হাহা…হাহা…ঈশ্বর ভাগলবা…বিনা ঈশ্বরের জবরদস্ত ধর্ম ফিরছে…

ঢেঁকুর তোলার মতন করে মুখ উঁচিয়ে, ঠোঁটের কোন দিয়ে, যেন বিড়ি খেয়ে ধোঁয়া ছাড়ছে, অন্ধ বলল, ধর্ম হল আফিম আর ঈশ্বর হল কালো গর্ত।

অন্য বুড়ো প্রত্যুত্তর দ্যায়, মুখের ভেতর জিভ খেলিয়ে, আর তোদের বৌড়াহাগুলো যে ভোদকা খেয়ে, হুইস্কি টেনে পোঁদ উল্টে রাস্তার পাশের ডাস্টবিনে  পড়ে থাকে, ওগুলো ধর্ম নয় বুঝি ? উপনিবেশের লোকেরা আফিম চাটে বলে ধর্ম হল আফিম, আর শাদা চামড়ারা হুইস্কি রাম ভোদকার নেশা ছাড়তে পারে না, তবু তা নেশা নয়, অ্যাঁ, শাদা চামড়ার ক্যারদানি শোনো, যতোই জ্ঞান থাকুক, মগজের ভেতরে কালো চামড়াদের ঘেন্না করবেই । শালারা ভোদকা পেঁদিয়ে দেশের কাঠামোটাই ভেঙে ফেললে, ঠিক মতন দাঁড়াতে পারে না, ভোদকার নেশায় হেলে পড়ে, বলে কিনা আফিম হলো খারাপ নেশা ।

অন্ধ বলল, ব্ল্যাক হোল, দি সুপ্রিম হোল, পবিত্র জ্বালাময়ী ছ্যাঁদা, পালসেটিং, থ্রবিং ।

মাংসের গর্তে ঢোকবার ধান্দায় চোখ খোয়ালো আর এখন গর্ত খুঁজে বেড়াচ্ছে আকাশে, বলল অন্য বুড়ো ।

অন্ধ বলল, যখন চোখ ছিল তখন অনেককিছু দেখেছি, বুঝলি গাড়ল, কাফকা কতো মনস্তাপ ঝেড়ে গেলেন, প্রাগে গিয়ে নিজের চোখে দেখে এসেছি ইহুদি গোরস্তানে ওনার কবর, কেন, সবই যদি মুছে ফেলার ছিল তবে নিজের শবকে চিতায় তুলতে বলা উচিত ছিল ; এ হল জীবনের সামঞ্জস্যহীনতা, আমার মতন, চোখ নেই, তবু যা আগে দেখেছি তা দেখতে পাই ।

অন্য বুড়ো, তুলোট জিভ নাচিয়ে বলল, আরে আমিও ডস্টয়ভস্কির কবর দেখে এসেছিলাম সেন্ট পিটার্সবার্গের টিখিন গোরস্তানে, আলেকজান্ড্রা নেভেসকি মঠে ।

যুবকের মনে হল, এরা দুজনে দুঃস্বপ্নের ভেতর দিয়ে নিজেদের বেঁচে থাকাকে হিঁচড়ে টেনে নিয়ে চলেছে।

অন্য বুড়ো বলল, কী বলছি আর তেলচাট্টা ব্যাটা কী বুঝছে ! আই কিউ ঠেকেছে গাড্ডুসে ।

যুবতী ঝাঁঝিয়ে ওঠে, ভুরু কোঁচকায়, বলে, তখন থেকে এক নাগাড়ে বকর বকর করে চলেছ, তোমার এই বাজে অভ্যাসটা গেল না বাপি, কোন শাঁখচুন্নি-পেত্নি তোমার কানে কী সংলাপ যে ঝাড়তে থাকে, তারা কারা যাদের কন্ঠস্বর শুনতে পাও আর ওগরাও, মগজের ময়লা জমেছে তোমার কানে ; একই সঙ্গে স্কিৎসোফ্রেনিয়া আর অ্যালঝিমার রোগের খিচুড়ি বাধিয়েছ । ড্যাডির ব্যাপারটায় যুক্তি আছে, পিটুনি খেয়ে মাথা আর চোখ দুটোই গেছে, তুমি এরকম ডায়ালগবাজি কেন ধরলে জানি না, ব্রেকফাস্ট খাওনি কেন জানি না, নাও হাঁ করো, মেয়াও মেয়াও খাও আর ঝিমোও ।

বাপি নামের বুড়োর মুখে সেই একই পুরিয়া থেকে এক চিমটি পুরে দিল যুবতী । বাপি নামের বাবা চুপ করার আগে যুবকের দিকে তাকিয়ে বলল, এক চুটকি সিন্দুর কি কিমত তুম কেয়া জানো রমেশবাবু, দি লাভার ইজ এ টারমিনাল ইডিয়ট, রমেশবাবু ।

যুবক বাপি নামের বুড়োর দিকে তাকিয়ে বলল, স্যার, আরব ভাষায় প্রেম শব্দটা নেই, তাই ওনারা চারটে করে বউ আর দশ-বিশটা বাঁদি রাখেন, বোরখায় ঢাকা দিয়ে তাদের আড়ালে নিয়ে গিয়ে খোলেন ।

যুবতী চলে গেল রান্নাঘরে, ফিরে এলো, সুপ-স্পুন দেয়া দুটো সুপ বাউল নিয়ে, বাবা দুজনের কোলে রাখা অ্যাটলাসের ওপরে রাখতে, দুজনে একই সঙ্গে জিগ্যেস করল এটা কিসের সুপ রে ? স্বাদ আছে তো ?

যুবতী বলল, এটা তোমাদের প্রিয় নোজবুফোঁ ইন ম্যারো ব্রাইন উইথ নিপলচেরি ।

এ আবার কী সুপ, শুনিনি তো কখনও, বলল যুবক ।

ড্যাডি নামের বাবা জিগ্যেস করল, যে হেঁচেছিল সে তো তোর বাপি নয়, এই লোকটাই কি ? কাকে সঙ্গে নিয়ে এলি? তোর দলের কেউ? নাকি ভালোবাসার জন্যে ?

যুবতী বলল, হ্যাঁ, একজনকে এনেছি, দেখি কি হয়, ওর নাম হার্ড ডিক, শহিদ মিনার । সুইচ টিপে আলো জ্বালিয়ে যোগ করল ।

ড্যাডি বলল, আমরা শ্মশানের মুদ্দোফরাসকে বলে রেখেছি, নামকরা লোকের শব এলে তার আধপোড়া নাকটা কেটে আমাদের জন্যে রাখতে, যতো নামকরা মানুষ, তার নাক ততো উঁচু, তাই তার পোড়া নাক ততো সুস্বাদু হয়, খেয়ে দেখতে পারো । আধপোড়া নাক দিয়ে নোজবুফোঁর স্বাদ অসাধারণ । এর মধ্যে আধপোড়া নিপল দিয়ে ড্রেসিং করলে, আহা, এর তুলনায় আর ডিশ হয় না। মড়াদের আমরা পছন্দ করি, কেননা মড়ারা মনে করিয়ে দ্যায় যে, হ্যাঁ, দোর্দণ্ডপ্রতাপ প্রতিষ্ঠান কোথাও না কোথাও লুকিয়ে লুকিয়ে প্রতিটি নাক আর নিপলের দিকে নজর রেখেছে ।[১৩ ]

নিপলও কি শ্মশানের চিতা থেকে ? জানতে চায় যুবক । তারপর যোগ করে, আপনাদের কোলের অ্যাটলাস টেবিলের আইডিয়াটা প্রশংসাযোগ্য ।

যুবতী জবাব দ্যায়, অফ কোর্স, কুড়ি থেকে পঁয়তাল্লিশের রেঞ্জে ।

বাপিবাবাটা বলল, নিপল হল আফ্রিকার, আহা, মুখে নিলে পুরো মুখ ভরে ওঠে, ঠিক যেন চুরাশিভোগ দোকানের কালোজামের মিষ্টি ।

ড্যাডিবাবাটার পছন্দ হল না, কিংবা হলেও, বিরোধীতা করতে হবে বলে বলল, দুর্বাঁড়া, নিপল হল আইসল্যাণ্ডের, কী গোলাপি, যেন গোলাপের পাপড়ি দিয়ে তৈরি, মুখে নিলেই ফিরে যাবে শৈশবে, ওঁয়াউ-ওঁয়াউ করে হাত-পা নাড়াতে ইচ্ছে করবে ।

আপনারা তো নিপলের চরিত্র বদল করে দিচ্ছেন, চোষবার বস্তুকে পুড়িয়ে খেয়ে ফেলছেন ! কতো আদরের মাংসল বোতাম, যা দুটি হৃদয়কে জোড়ে, মুখে গিয়ে কথাহীন বার্তারস গড়ে তোলে ! হতাশ্বাসে আড়ষ্ট  গলা থেকে হাওয়া দিয়ে বাক্য বের করে বলে ওঠে যুবক ।

প্রতিষ্ঠান নির্দেশ দিয়েছে বদলানোর, তাই চোষবার বস্তুকে খাবার বস্তু করা হয়েছে, মানুষের মতন বাঁচতে হলে আত্মসন্মান খুইয়ে টিকে থাকতে হবে, বুঝলে, এটা বদলের প্রধান রহস্য । মাঝেসাঝে দুঃখের খেপ এসে ল্যাঙ মারে, সো হোয়াট ! তখন বোলো যে বিষাদে ভুগছি, ব্যাস ।

বাপি নিজের মনে বলল, একদিন জয় মা জবাই, তোমাকে আমি পাবই করব সবকটাকে, সবচেয়ে আগে এই চকরলস বুঢ়ুয়াটাকে ।

চামচ দিয়ে খাবার বদলে চুমুক দিয়ে সুপ খেল বুড়ো দুজন, সুড়ুপ সুড়ুপ আওয়াজ করে, আওয়াজে ছিল অবসরপ্রাপ্ত যৌনজিভের ইশারা,খাওয়া হয়ে গেলে পরস্পরের দিকে ছুড়ে মারল সুপের বাউল । দুজনেই লক্ষ্যভ্রষ্ট হল ।

আলোয় বাড়ির ভেতরটা  আর দুটো বুড়োকে আরও বীভৎস, নোংরা আর দুর্গন্ধময় মনে হল যুবকের, কিছুক্ষণ সময় লাগল আবহের সঙ্গে সমঝোতা করতে ।

আচ্ছা, এখনও হার্ড ডিকের মানুষ পাওয়া যায় ? আমি তো ভেবেছিলুম সেসব আমাদের কালের সঙ্গে ফুরিয়েছে । চোখ থেকে কালো চশমা খুলে বলল ড্যাডি নামের বাবা ।

যুবক দেখল লোকটার দুচোখ গলে সাদা হয়ে বাইরে প্রায় বেরিয়ে এসেছে ; বীভৎস ।

না ফুরোয়নি, তোমার ওই হার্ড ডিকের নিসপিসুনির জন্যেই মার খেয়েছিলে । বলল যুবতী ।

যুবক শ্লেষ্মা জড়ানো গলায় বলল, কি যে খাওয়ালেন, এখন বাড়ি যেতে পারব কি না জানি না ; বাইরে মোটর সাইকেলটা আছে কেউ না নিয়ে পালায় ।

কেউ নেবে না, কিছু চুরি যায় না শ্মশানকলোনিতে, মড়ার হাফ-বেকড নাক আর মড়ানীর সিজলিং নিপল ছাড়া । তোমাকে যে মেয়াও মেয়াও কিস দিয়েছি, তার নাম হল মেফিড্রোন, এটা এক ধরণের কেমিকাল, এর নাম মেথিলমেথাক্যাথিনোন, তোমাকে এই জন্য বলছি যে তুমি আকাট মুকখু, আর এখন নেশায় তোমার মাথা কাজ করছে না ; কিছুদিন আগে পর্যন্ত বাজারে কেমিকালের দোকানে সহজেই পাওয়া যেত, এখন সরকার ব্যান করে দিয়েছে, ছাত্রদের মধ্যে পপুলার নেশা, এতে গাঁজা চরসের মতন ফোঁকাফুঁকির বালাই নেই, বদগন্ধও নেই, অতটা নেশাও হয় না, অথচ ফুরফুরে নেশা হয়,  লোয়ার ক্লাস নেশা মনে হয় না, আমি একটা ফ্যাকট্রি থেকে সরাসরি কিনি ।

আমাকে এসব বলছেন, তারপর যদি  প্রতিষ্ঠানে ফাঁস করে দিই ।

তুমি করবে না জানি । তুমি তো নিজেই স্বীকার করলে দিনে সাধু রাতে চোর ।

কী করে জানলে ? কিন্তু চোর ঠিক নই, আমি মোটর সাইকেল ফেরত দিয়ে আসি চালাবার পর।

যে একবার আমার লাবিয়ার মাকড়ি খুলেছে সে আমার কেনা গোলাম হয়ে গেছে ।

দুজন বুড়োই এক সঙ্গে বলে উঠল, একে তোর লাবিয়ার মাকড়ি খোলানোর জন্যে এনেছিস ?

যুবতী বলল, হ্যাঁ, মত বদলাতে হল, খোলাবো সময় হলে ।

বুড়ো দুজন একই সঙ্গে বলে উঠল, তোর মা আমাদের দিয়ে নিজের লাবিয়ার মাকড়ি খোলাবে বলে লোভ দেখিয়ে বিয়ে করেছিল, তারপর ল্যাঙ মেরে দিলে, তাই আজকে আমাদের এই দশা । এর ভাগ্যে যে কী লেখা আছে তা জানি না ; শেষে তোর মা এসে একে তোর কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে না যায় । বুঝলে মিস্টার হার্ড ডিক, মাকড়িটা হল সূর্য আর তাকে ঘিরে পাক খায় যে মুক্ত সেটা হল পৃথিবী । মাকড়িটা যেখানে ঝোলানো, তা হল আকাশগঙ্গা, ছায়াপথ, ওই পথে যদি একটু ভুল করেছ, পিছলে পড়েছ, আমার মতন অন্ধ বা বাপিবুড়োর মতন অ্যালঝিমার রুগি হয়ে মরবে ।

ছিনিয়ে নিলেই হল ! ভালোবাসা আছে কী জন্য ? মাকে থেঁতো করে ভালোবাসার ঘরে ছেড়ে দেবো, ওদের প্রিয় গানের মাঝে ।

যুবক বলল, আমি শুধু খুলে দিতে চাই, জাস্ট অনুসন্ধিৎসা, আপনাদের মতন আকাশগঙ্গায় সেঁদিয়ে সাঁতরাতে  চাই না ।

প্রেম আর মৃত্যুর মধ্যে বিশেষ ফারাক নেই হে, মিস্টার হার্ড ডিক, বলল ড্যাডি নামের বাবা, পাইপের ধোঁয়া উড়িয়ে, দুটোই এক ধাক্কায় কাজ সাঙ্গ করে ফ্যালে ; আদিরস আর অন্তরস।

Double Space

 

যুবক বলল, এমন নেশা করে দিয়েছ যে এখন আমি কিছুই করতে পারব না । আমি ভালো করে দেখতে চাই ।

তুমি ভাবছিলে আমার মেনসের ব্লিডিং হচ্ছে, এখন সে কথা জানতে চাইছ না ?

হ্যাঁ, তাইতো, তুমি অমন অবস্হাতেই রয়েছ দেখছি, যাও চেঞ্জ করে এসো ।

ফর ইয়োর কাইন্ড ইনফরমেশান, আমিই আপনাকে এত দিন ধরে স্টকিং করেছি, আপনি আমাকে স্টকিং করেননি । আমি জানি আপনি রেড বেল্ট কারাটে, ফ্রি স্টাইল বক্সিংও জিতেছেন বেশ কয়েকটা ।

মানে ?

মানে ওটা নকল রক্ত, আমার রক্ত নয় ।

ড্যাডি চিৎকার করে উঠল, রক্ত ? কোথায় রক্ত ? মার শালাকে মার মার মার মার বানচোদকে, দে প্যাঁদানি, মার মার মার মার…বাল উপড়ে নে…

আঃ, কী হচ্ছে ড্যাডি, কোথ্থাও রক্ত নেই, বলল যুবতী ।

ড্যাডি কাঁদতে আরম্ভ করল, আর জড়ানো গলায় বলতে লাগল, আমার কেউ নেই, ওগো আমার কেউ নেই, কেন আমাকে পেটানো হয়েছিল কেউ জানতে চায়নি, আমি নিজেও জানি না কেন আমার নাক থেঁতো করে চোখ গেলে দেয়া হয়েছিল, প্রতিষ্ঠান আসেনি, প্রতিবেশি আসেনি, সংস্হার লোক আসেনি, কোনো এনজিও আসেনি, আমি অন্যগ্রহের প্রাণী হয়ে গেলাম…হায়…

চুপ করো, চুপ করো, চুপ চুপ চুপ, হাঁ করো, ড্যাডি নামে বাবাকে বলল যুবতী ।

ড্যাডি নামের বাবা হাঁ করলে, মুখের মধ্যে এক টিপ মেয়াও মেয়াও গুঁড়ো ঢুকিয়ে দিতে চুপ করল বুড়ো ।

মেয়াও মেয়াও ওনাদেরও ? জিগ্যেস করল যুবক ।

যুবতী বলল, হেসে নয়, গম্ভীর হয়ে গিয়ে, হঠাৎই, দিনের বেলা ঝগড়া করছে তো দুজনে, সন্ধ্যে হলেই একজন আরেকজনের ওপর চাপা আরম্ভ করবে, হোমোসেক্সুয়াল ওল্ড লাভার্স, মায়ের লাথি খাবার পর এখন বিছানাই ওদের স্বর্গ আর নরক, তারপর মুখে হাসি ফিরিয়ে এনে বলল, ঘুরিয়ে বলতে হলে, সত্য বলে কিছু হয় না, যা হয় তা হল অসামঞ্জস্য, অ্যাবসার্ডিটি ।

প্রসঙ্গ পালটে, যুবতীকে যুবক বলল, আমাকে স্টকিং করছিলেন কেন, আমি রেড বেল্ট, ফ্রি হ্যাণ্ড কিক বক্সিং লড়ি, তাতে আপনার কী লাভ ।

ভুরু কুঁচকে যুবতী বলল, তোমার সাহায্য আমার চাই, তুমি রেড বেল্ট, কিক বক্সিং এক্সপার্ট ।

যুবক বলল, আমার নেশা গাঢ় হয়ে চলেছে…জীবনের মানে বা উদ্দেশ্য খুঁজতে যেও না কখনও…আমি এর আগে কী বলেছি মনে করতে পারছি না…আহা কি আনন্দের…নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে ব্যর্থতা ডেকে এনেছি জীবনে…আনবিক বোমা ফাটার পর যে ফুল আকাশে গিয়ে খোলে তার চেয়ে সুন্দর কোনো ফুল আর নেই…সৌন্দর্য চিরকাল ধ্বংস ছাড়া আর কিছু করতে পারে না…মানুষ জাতটাই তো ব্যর্থ…তাহলে নিজের ব্যর্থতা নিয়ে ভাববো কেন…আমি কখনও অপমানিত হই না সে তুমি আমাকে গালমন্দ করো বা জুতোপেটা করো…আমি রাস্তায় পড়ে থাকা ঝিকমিকে থুথু…কতো লোক তো পোঁদে মৌমাছির চাক নিয়ে সারাজীবন মধু বেচার চেষ্টা করে যায়…কোনো আগাম পরিকল্পনা করি না…জানি ব্যর্থ হবো…সবাই পৃথিবীটাকে বদলাবার তালে আছে…তার প্রমাণ তো দেখতেই পাচ্ছি…কোনো বাঞ্চোৎ উদ্দেশ্যসাধনে সক্ষম হয়নি…আমার নেশা হয়ে গেছে…কোথায় গেলে গো লাবিয়া রানি…মাকড়ি কই…আছে…নাকি বানানো গল্প…আমার মায়ের তো কোনো মাকড়িই ছিল না… কানেও নয়…লাবিয়াতেও নয়…আমিই তো মায়ের শবের শাড়ি খুলে নতুন শাড়ি পরিয়েছিলাম চিতায় তোলার আগে…গায়ে গাওয়া ঘি মাখিয়েছিলাম…মায়ের গর্ভে ফিরে যেতে চাই…মা বলেছিল আমি গিরগিটির মতন রং বদলাতে পারি বলে জীবনে কখনও বিপদে পড়ব না…তবে নেশা হচ্ছে কেন…মা মারা যাবার পর কোনো রান্নাই ভাল্লাগে না…

যুবতী : বুড়ো দুটোর মুখ বন্ধ করালাম তো ইনি শুরু হয়ে গেলেন , মেয়াও মেয়াও কিসের উল্টো প্রতিক্রিয়া এই প্রথম দেখছি ।

যুবক : শুরু হলেই শেষ হবে এমন কোনো কথা বিজ্ঞান বলে নি…বিগ ব্যাঙ…বিগ ব্যাঙ…বোবা অন্ধকার…বাবা তো আমার জন্যে গর্ব বোধ করত…আমিও বাবার জন্য গর্ব বোধ করি…দুজনে দুজনের সব গোপন কথা জানতাম…মাস্টারপিস বাবা…বাবা ছিলেন যাদুকর…নেগেটিভকে পজিটিভ করা ছিল ওনার নেশা আর পেশা…আমার ভেতরে অনেক রকমের জন্তুজানোয়ার সাপ-বিছে আছে…তাদের বেরোতে দিই না…কেউ কেউ কেন এতো সুন্দর হয়…ধাঁ করে এসে লাগে…কিন্তু খুঁত থাকবেই…আমি একাই ভালো আছি…কোনো সম্প্রদায়ে থাকতে চাই না…সম্প্রদায়ে গেলেই সবাই মিলে ঘেন্না করার আনন্দে ভুগতে হবে…সম্প্রদায়ও তো নেশা…তার চেয়ে মেয়াও মেয়াও কিসের নেশা বেশ ভালো…কারোর ক্ষতি তো করছি না…যে কথাগুলো পেছনের সিটে বসে বলছিল…হাটতে হাঁটতে আমাকে উদ্দেশ্য করে বলছিল…তার মাধ্যমে কিছুই বলছিল না…সব মিথ্যে…বানানো…এখন আমার যাবতীয় দ্বিধা উবে গেছে…এই বুড়ো দুটো যেচে কেনা গোলাম হয়েছে…কার ক্রীতদাস জানি না…দাসত্ব উপভোগ করছে…যৌনরোগের মতন…আমি তো মেয়েটার দুঃখময় রাগি দৃষ্টিকে ব্যাখ্যা করে বিশেষ কিছু পেলাম না…এদের এই জবরদখল শ্মশানকলোনির বাড়ির মতন বাড়ি দেখিনি জীবনে…অচেনা…আতঙ্কজনক…দুর্দশার আড্ডাখানা…যন্ত্রণা চিরকাল নবীন…প্রত্যেক মেয়ের জ্যামিতি আলাদা অথচ আমি গণিতজ্ঞ নই…অসৎ মেয়েরা কুচ্ছিত হলেও সুন্দরী হয়…তাদের ভেতরের অন্ধকার তাদের সুন্দরী করে তোলে…

এ মাল তো দেখছি যা ভেবেছিলাম তার চেয়ে কয়েককাঠি সরেস ; যুবকের মুখের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে প্রায় চিৎকার করে ডাকে যুবতী, এই হার্ড ডিক, ঠোঁটে এক চুমুতেই নেশা হয়ে গেল ? তাহলে ক্রিটিকাল জায়গায় চুমু খেলে তোকে তো পাগলাগারদে ভর্তি করতে হবে ।

যুবক : বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যে কথা বলে চলেছি…মিথ্যে কথা বলার একটা আনন্দ আছে…দশকর্মের জিনিসপত্তর বেচতে গিয়ে এইটাই সবচেয়ে জরুরি অভিজ্ঞতা….প্রেমের কথা আউড়ে সময় নষ্ট করা উচিত নয়…মরার জন্যে আর সেক্স করার জন্যে ভালো নরম বিছানা খুবই দরকার…সেক্স বাইরে বেরোয়…প্রেম ভেতরে ঢোকে…দুটো উলঙ্গ দেহের মিশ খাওয়া জরুরি…দীর্ঘ জীবনের জন্যে…এর আগে সব বানিয়ে বলেছি…বাপি আঙ্কল…ড্যাডি আঙ্কল…দীর্ঘক্ষণ ধরে চুমুখাওয়া অত্যন্ত কষ্টকর…প্রেমেও মাঝে মাঝে গ্যাপ দিতে হয়…সেক্স হল দুটো উলঙ্গ শরীরের সবচেয়ে উচ্চাঙ্গের নাচ…কোনো মিউজিকের দরকার নেই…শরীরই সঙ্গীত…বাবা বলে দিয়েছিলেন…দশকর্মের মাল বেচছো বলে ঠাকুর্দেবতায় বিশ্বাস কোরোনি যেন…মন্দির-টন্দিরেও যেওনি…ওনারা বশ্যতা দাবি করেন…একবার কারোর অনুগত হলেই জীবন তালগোল পাকিয়ে যাবে…হতবুদ্ধি…বিভ্রান্ত…কিংকর্তব্যবিমূঢ়…রাজনীতিকদেরও ঘেন্না করবে…ওরাও বশ্যতা দাবি করে…সুন্দরীদের সঙ্গে সেক্স করে কখনও মন ভরবে না…তুমি দোটানায় পড়ে যাবে যে বাদবাকি অঙ্গগুলো নিয়ে তখন কী করব…জুলিয়াস সিজার হিটলার স্ট্যালিনের মতন পাছার জোর নিয়ে আর কোনো রোল মডেল পৃথিবীতে জন্মাবে না…মোমবাতি জ্বালিয়ে মিছিল করে রাস্তায় হাঁটলে বিপ্লব পালিয়ে যাবে…বাবা বলেছিলেন ঠাকুর্দেবতা হল অর্শের মতন…শান্তিতে বসে থাকতে দেবে না…

যুবতী বলল, এ তো দেখছি প্রথমবারেই কুপোকাৎ । এরকম হলে তো এর শহিদ মিনার এক মিনিটেই ধ্বসে পড়বে ! বাবা আর কী-কী বলেছিলেন শুনি ?

যুবক : বাবা বলেছিলেন…গরম মাংসের শরীরের সঙ্গে সেক্স করার চেয়ে স্বপ্নদোষে আনন্দ বেশি…কতো হীরে মুক্তো পান্না পোখরাজ তরল আকারে বেরিয়ে ঘুমকে নদীতে পালটে দ্যায়…প্রেম আনন্দও নয় বিষাদও নয়…প্রেম হল মুহূর্তদের চিরকালীন বানাবার অসফল ম্যাজিক…আমরা সবাই নিজেকে শাস্তি দিতে বাধ্য…যুদ্ধ দাঙ্গা খুনোখুনি লুটপাট চলতে থাকবে নয়তো প্রতিষ্ঠানগুলো টিকবে না…মানবসভ্যতা রসাতলে চলে যাবে…

এ মরণের পাবলিক কোন জগতের চুতিয়া রে, বলে ওঠে যুবতী ।

যুবক আধখোলা চোখে চেয়ে বলে, আরেকটা মেয়াও মেয়াও চুমু হবে ?

না, হবে না, বলল যুবতী, শেষে ওভারডোজের বাওয়ালে মরবে । যুবকের মাথা দুহাতে ধরে ঠোঁটে ঠোঁট চেপে বলে ওঠে, ক্লিন সেক্সুয়াল  ভিজে চুমু নাও ।

আরে ! তোমার সেক্সুয়াল চুমু নিয়ে কী করব ? তুমি তো স্তালিন, হিটলার, জুলিয়াস সিজার, প্রতাপাদিত্য,  ট্যাগোরের সঙ্গে শুতে চাও । নেশার ঘোরেও যুবক দেখল যে যুবতী কখন শাড়ি পালটে, চান করে, চুলে শ্যাম্পু করে,  কালো স্ল্যাক্স আর মিলিটারি টপ পরে এসেছে । আঁশটে বদগন্ধের বদলে যুঁই ফুলের সুগন্ধ ।

এতক্ষণ ধরে নেশার ঘোরে আছি ? তোমার স্ল্যাক্সের তলায় লনজারি নেই তো ? থাকলে অসুবিধা হবে কি ? জিগ্যেস করল যুবতীকে । তারপর যোগ করল, আচ্ছা, সারাদিন জানলায় বসে শাহ জাহান কী করতেন, শুধু একটা দেহই কি ভেসে উঠত ওনার চোখে ? আরও যাদের সঙ্গে শুতেন, তাদের মাংসের স্মৃতি কি কিছুই ছিল না ? তাদের বুকের মাপ, মাইয়ের বোঁটা, উরুর তাপ, চুলের মুঠি, বগলের গন্ধ, ফোরপ্লের অরগ্যাজম, মনে পড়ত না ? তাদের দুই পা কি জাহাঁপনার কাঁধে উঠে গহ্বহের নিশিডাক দিত না ?

জবাব দিল বাপি নামের বাবা, বলে উঠল, নেশার ঘোরে ছিলে বলে বেঁচে গেছ, নয়তো আমাদের সম্পর্কে যে বাজে বকছিলে তুমি, তোমার লিঙ্গ কেটে ফেলতুম আমরা । অনেকের লিঙ্গ কেটে ফরম্যালিনে চুবিয়ে রেখেছি, ওই দিকে, বইয়ের তাকের ওপরে, দ্যাখো । আর তোমার প্রশ্নের উত্তরে বলি, প্রেম-ফেম তো এনেছিল কেরেস্তানগুলো, তার আগে ছিল বিশুদ্ধ যৌনতা, আগুনের মতন টাটকা, খাজুরাহো আর কোণারক দেখেছ কি ; আহা, আমাদের ছিল বাৎসায়ন, আম্রপালী, বহুবিবাহ, বহুগমন, সমকাম, বহুস্বামীর সুখের শান্তির স্বস্তির দেশ, প্রেম করতে শিখিয়ে সব নষ্ট করে দিলে কেরেস্তানগুলো । [১৪] হ্যাঁ, তুমি জিগ্যেস করতে পারো যে তাহলে প্রেমিক কেন প্রেমিকার মুখে অ্যাসিড ছুঁড়ে মারে !

ড্যাডি নামের বাবা  বলল, আমি মারতে পারতুম, মারিনি, এতো সুন্দর মুখ, আহা চোখ জুড়িয়ে যায়, মগজের ভেতরের বিবেক সব পরিকল্পনা ফুরফুরিয়ে ভণ্ডুল করে দিলে ! মারলে কিন্তু ওর সুন্দর মুখ আমার কব্জায় চলে আসতো, আমিই শেষবারের মতন ওর সুন্দর মুখ দেখতাম, তারপর যারা দেখত তারা কুচ্ছিত দেখেই চোখ ফিরিয়ে নিতো, যেমন আমায় দেখে ঘেন্না করে সবাই । তারপর নিজেকে শুনিয়ে বলল, মানুষ জন্ম থেকেই দয়াহীন নিষ্ঠুর, মৃত্যুকে সৃষ্টি করে ।

ও, তাই কেনা গোলাম হয়ে গেলেন ? জানতে চায় যুবক ।

ড্যাডি নামের বাবা বলল, আমরা কিনা ক্রীতদাস, কেনা গোলাম ।

বাপি নামের বাবা ড্যাডি নামের বাবাকে বলল, ওই গানটা ধর, আমরা সবাই খোজা গানটা, দুজনে মিলে গাই, আমাদের রানিকে উৎসর্গ-করা গান । বলে উরু পেটা আরম্ভ করল, তবলার ঢঙে ।

বুড়ো দুজন আরম্ভ করল গান : [১৫]

 

আমরা সবাই খোজা, আমাদের এই রানির রাজত্বে

নইলে মোদের রানির সনে মিলব কী শর্তে ?

আমরা হুকুম তামিল করি, তাঁর আঙুল নাড়ায় চরি,

আমরা মজায় আছি দাসের রানির ত্রাসের রাজত্বে–

নইলে মোদের রানির সনে মিলব কী শর্তে ?

রানি সবারে দেন মার, সে মার আদর করে দেন,

মোদের খাটো করে রাখলেই বা হাজার অসত্যে–

নইলে মোরা রানির সনে মিলব কী শর্তে ?

আমরা চলব তাঁরি মতে, শেষে মিলব তাঁরি পথে,

মোরা মরলেই বা বিফলতার বিষম আবর্তে–

নইলে মোরা রানির সনে মিলব কী শর্তে ?

 

গানটা আরও ছিল কি না যুবক জানে না, বুড়ো দুটো চুপ করে যেতে শুনতে পেল দরোজায় বাইরে থেকে তালা খোলার শব্দ, এদেরই কেউ হবে, নয়তো চাবি পাবে কোথ্থেকে ।

Double Space

 

যুবক দেখল সেই দুজন বডিবিলডার ধরণের স্মার্ট লোক, যাদের সঙ্গে যুবতী, ফিসফিস করেছিল, সুপারি, খুন, বডি এই সব নিয়ে, তারা একটা লোককে কাঁধে নিয়ে ঢুকল ।

যুবতী জিগ্যেস করল, কেউ দ্যাখেনি তো ? বেঁচে আছে না কাজ শেষ করে এনেছিস ।

একজন ষণ্ডা, যে খয়েরি স্ট্রাইপের ফুলশার্ট  পরেছিল, গলায় টাই, সে বলল, মনে হয় কাম তামাম হয়ে গেছে । তারপর অন্যজনকে আদেশ দিল, ভালোবাসার ঘরে রেখে দে । দুর্মুশ দিয়ে মাথাটা নরম করে দিস নয়তো ভালোবাসার ভালোবাসতে সময় লেগে যেতে পারে ।

কোথায় পেলি ? জিগ্যেস করল যুবতী ।

খয়েরি ফুলশার্ট বলল, ওই যে, সাতটা গাছ মেরে ফেলেছে, মিলি বাগ, জিপসি মথ, লঙহর্ন বিটলস, বোরার, আর টেন্ট ক্যাটার পিলার ছড়িয়ে, সেগুলোকে মারার কনট্র্যাক্টের টাকা তুলতে গিয়েছিল বিজ্ঞাপন কোম্পানির দপতরে, ওই যে, গাছগুলোর জন্যে যাদের হোর্ডিং ঢাকা পড়ে গিয়েছিল । চালু চিজ বানচোদ, কতো তাড়াতাড়ি গাছগুলোকে মারলে । বিজ্ঞাপনের দপতর থেকে যেই বেরিয়েছে ক্লোরোফর্ম করে কাৎ করে ফেললাম । চ্যাংদোলা করে আনতে হলো ; কয়েকজন শবযাত্রী মড়া পুড়িয়ে হাঁড়ি ফাটিয়ে ন্যাড়া মাথায় চান সেরে গান গাইতে গাইতে বাড়ি ফিরছিল, সমবেত গান থামিয়ে  জানতে চাইছিল যে, কী হল, বাঁশের মাচা পাওয়া গেল না, প্যাকিং বাক্সের মাচা তো সস্তায় পাওয়া যায় ফুটপাথে, ফুলের বাজারের কাছে ?

ওদের বললাম যে পকেট ফাঁকা, কী আর করা যাবে, অগত্যা চ্যাংদোলা করে পোড়াতে নিয়ে যাচ্ছি । ন্যাড়ামাথা শ্মশানফের্তারা শুনে বাহবা দিলে, একজন বলেছে প্রতিষ্ঠানের বারোয়ারি সভায় প্রস্তাবটা লিখিত আকারে তুলবে ।

এই চ্যাংদোলা করে শ্মশানে নিয়ে আসা অনুমোদন করা উচিত প্রতিষ্ঠানের, অনেক খরচ বাঁচবে, খাট-তোষক নষ্ট হবে না, কাঠ নষ্ট হবে না, ফুল নষ্ট হবে না, ফুলবাগানে মৌমাছিরা ডানা-মিউজিকে ফুলেদের ফোসলাতে পারবে, বরেরা মদ খেয়ে বাড়ি ফিরে বউয়ের খোঁপায় ফুল গুঁজতে পারবে, শ্মশানে মন দিয়ে গান গাইতে গাইতে লোকে আসতে পারবে, ফিরতে পারবে । তারপর ঝিমধরা অথচ অবাক যুবকের দিকে তাকিয়ে যুবতী বলল,মায়ের কাছ থেকেই গাছ মারার সিক্রেটটা শিখেছিল কচি-কচকচে স্কাউন্ড্রেলটা।

অন্ধ বুড়ো বলল, হ্যাঁ, কখন থেকে ভালোবাসা অপেক্ষায় রয়েছে, প্রায় দুতিন দিন ওদের খাওয়া জোটেনি। কার লাশ আনলি ?

যুবতী বলল, আমার মায়ের কচকচে-কচি প্রেমিকের ।

অন্ধ বুড়ো বলল, মেমেন্টো হিসাবে ওর নুনু কেটে রেখে নে, তাকে ফরম্যালিন আছে, তাতে চুবিয়ে রাখ, অনেককাল থাকবে, কিন্তু বিচি দুটোর সুপ রাঁধিস, রান্না হলে ওগুলো খেতে বেশ ভাল্লাগে, সুইট অ্যান্ড সাওয়ার টেসটিকলস । তারপর নিজেকে শুনিয়ে বলল, মৃত্যু হল ভাগ্যের ব্যবসাদার ।

অন্ধকে উদ্দেশ্য করে যুবতী বলল, তোমাকে দুশ্চিন্তা করতে হবে না, আমাদের কাজ মৃত্যুর পরের, সারা দিন ধরে বসে বসে মানুষের মাংস পোড়ার উজ্জ্বল চিড়চিড়ে-ফটর ফটর স্বরলিপিতে লেখা গান শোনো, তার বেলায় !

অন্য বুড়ো বলল, দারুন খবর, দারুন, দারুন, এতদিনে একটা কাজের কাজ হল ; ভালোবাসার খাবার সময় ওদের প্রিয় গানটা জোর গলায় গাইবার শিস দিয়ে দিস । তারপর যোগ করল, হ্যাঁ, একটা বিচি আমায় খেতে দিস আর আরেকটা ওই বুড়োকে, কতোকাল যে মানুষের বিচির সুপ খাইনি । শ্মশানে যতো মাল আসে, আত্মীয়রা আনতে এতো দেরি করে, চন্দন মাখানো আর ধুপ জ্বালানো আর গোলাপজল ছেটানোয় যে, সব বিচি ততক্ষণে পচে যায় ।

যারা চ্যাংদোলা করে এনেছিল তারা দুজনে একসঙ্গে বলে উঠল, তাছাড়া আজকাল বিচি ট্রান্সপ্লান্ট করা হচ্ছে তো, কোল-কমপিউটারের জন্যে শুক্রাণু কমতে লেগেছে, তাই বেশ কিছু লাশ বিচি খুইয়ে আসছে।

অন্ধ বুড়ো বলল, হ্যাঁ, মনে আছে, একবার এক সুপারম্যান মড়া-নেতার বিচি সুস্বাদু হবে বলে ডোমের কাছ থেকে চেয়ে আনিয়েছিলাম, এঃ, বানচোদের বিচিতে কি পচা গন্ধ, বমি করতে করতে কাহিল হয়ে গিয়েছিলাম, শালার যতো রাজনীতি, বিচি দুটোতেই জমিয়ে রেখেছিল, মানুষ কতো নীচে নামতে পারে, ভাবো, কতো খারাপ দিনকাল এসে গেল ।

তোমার ভয় পাবার দরকার নেই, নেশায় প্রায় আচ্ছন্ন যুবকের দিকে মুখ নিচু করে বলল যুবতী ।

যুবক শুনতে পেল গান শুরু হয়েছে, ওঃ, এটাই ভালোবাসার খাবার সময়ের গান, শুনেছে কোথাও, পুজোটুজোয় তো নয়, পাঁচালিও নেই কোনো এই গানের ; ফিরে এই গানের একটা পাঁচালি ছাপিয়ে নিতে হবে, বাজার আছে নিশ্চয়ই । শুনতে লাগল গানটা, নেশাঝিমোনো পায়ের তাল দিয়ে । ওকে দেখে অন্যেরাও গানের সঙ্গে পায়ের তাল দিতে লাগল ।

“আমরা করব ভয়,

আমরা করব ভয়,

আমরা করব ভয়, প্রতিদিন…

আহা, বুকের গভীরে আছে বেশ ভয়,

আমরা করব ভয়, প্রতিদিন…

প্রতিদিন সূর্যগ্রহণ,

প্রতিদিন স্বপ্নভাঙন,

কোনোদিন সত্যের ভোর, আসবে না…

এই মনে নেই বিশ্বাস,

আমরা করি অবিশ্বাস,

সত্যের ভোর আসবে না, কোনোদিন…

পৃথিবীর মাটি হবে খটখটে,

বাতাস হবে তিতকুটে, প্রতিদিন…

এই মনে নেই বিশ্বাস,

আমরা করি অবিশ্বাস,

আকাশ হবে গনগনে, প্রতিদিন…

আরো হোক ধ্বংসের গান,

পাবলিককে ধরে পেটান,

ধ্বংসের সুরে হবে গান, প্রতিদিন…

আমরা মানি সব বাধাবন্ধন,

হাতে বাঁধা শেকলের ঝনঝন,

সামনে মিথ্যার জয়, প্রতিদিন…

এই মনে নেই বিশ্বাস,

আমরা করি অবিশ্বাস,

সামনে মিথ্যার জয়, প্রতিদিন…

আমরা করব ভয়,

আমরা করব ভয়, প্রতিদিন…

আহা, বুকের গভীরে আছে বেশ ভয়,

আমরা করব ভয়, প্রতিদিন…

আমরা করব ভয়, প্রতিদিন…”

গানটা শেষ হলে আবার শুরু থেকে রিওয়াইণ্ড হয়ে বাজতে লাগল ।  যুবক জানতে চাইল, এটা কোন বাংলা ব্যাণ্ডের গান ?

অন্ধ ড্যাডি বলল, এটা ভালোবাসার গান, ওরা নিজেরাই গাইছে, এ গানের শেষ নেই, যতক্ষণ লাশ ততক্ষণ আশ ।

বাপি, যার কপালের ডানদিকের আব চকচক করছিল, যুবকের দিকে তাকিয়ে বলল, ঠিকেদারদের জয়ের যুগ চলছে হে, বুঝলে ? ফর ঠিকেদার, অফ ঠিকেদার, বাই ঠিকেদার, নো চেঞ্জ, নো বদল । তাই ভালোবাসার এই গান এখন বেশ জনপ্রিয় ; শ্মশানে যারা আসে তাদের অনেকেই আর হরিবোল দেয় না, এই গান গাইতে গাইতে আসে, গাইতে গাইতে ফিরে যায়, তাদের কাছে শুনে-শুনে শিখে নিয়েছিল শকুনগুলো ।

ড্যাডি, নখ-ওঠা বাঁ পায়ের বুড়ো আঙুল দিয়ে খোদরানো সিমেন্টের মেঝেতে অদৃশ্য কোনো শব্দ লিখতে লিখতে বলল, প্রায় কাঁদো-কাঁদো গলায়, আমার সব বইগুলো হেলায় পড়ে আছে, পড়বার কেউ নেই, বইগুলো অভাগা, পড়ুয়া না পেয়ে ওরাও মরে যাবে একদিন, অনেকগুলো বই তো অলরেডি মরে গেছে, মরা বইদের যে শ্রাদ্ধশান্তি করব, তারও উপায় নেই, দেখতেই পাই না । তারপর সত্যিকারের দীর্ঘশ্বাস ফেলতে ফেলতে বলল, শুনেছি ফুটপাথের বইঅলারাও বিনে পয়সায় দিলে নিতে চায় না, বলে এইসব মরা বইয়ের চেয়ে ছুকরি-ছোকরাদের বেচা কাঁকড়াটে কবিতার বই বরং বেশি বিক্রি হয় ।

যুবক জানতে চাইল, কেন, আমার দোকান থেকে তো নানা দেবী-দেবতার পাঁচালিও বিক্রি হয় রেগুলারলি ; বিয়েতে আজকাল ভোজ খেতে গিয়ে লক্ষ্মীর পাঁচালিই গিফ্ট দ্যায় নিমন্ত্রিতরা, কেননা ছিঁড়ে গেলেও যেখানে সেখানে ফেলে দেয়া যায় না, নদীতে বিসর্জন দিতে হয় ।

ফুটপাথের বই-বেচিয়েরা কেনে তোমার পুরোনো পাঁচালি ? জানতে চাইল অন্ধ ।

না, পাঁচালি সেকেণ্ড হ্যাণ্ড কেনা অশুভ । বিয়েতে সেকেণ্ড হ্যাণ্ড পাঁচালি দেয়া যায় না ; বিয়েতে পাঁচালি দিলে সে বিয়েতে নাকি প্রেমের বদলে সেক্স গুরুত্ব পায় আর গণ্ডায় গণ্ডায়  পিল-পিল করে বাচ্চা হয় বছর-বছর ।

অন্ধ বলল, আগে জানলে একখানা সেকেন্ড হ্যাণ্ড পাঁচালি কিনতাম এই সব জ্ঞানের বই না কিনে ।

বাপি নামের বুড়োর দিকে তাকিয়ে, কেন, আপনি তো দেখতে পান, পড়লেই পারেন, দেয়ালের তাকে, ধুলো পড়ে আবছা, ফ্যাকাশে রঙের মলাট,  সারি দিয়ে রাখা বইয়ের তাকের দিকে ইশারা করে বলল যুবক ।

চক্ষুষ্মান বুড়ো নিজের কালো চশমা খুলে, বলল, আরে ওসব  মরা বিপ্লবের বই পড়ে কিছু হয় নাকি! তাছাড়া বইগুলো ধার নিয়ে আর ফেরত দ্যায়নি, বলে বেড়াতো যে সারাজীবন ঋণী থাকতে চায়, জ্ঞানের প্রতি ঋণী, আসলে গেঁড়িয়েছে বলে ঋণী, সে কথা তো আর সকলে জানছে না । আর জ্ঞান ? ওই তো ও জ্ঞান ফলাতে গিয়ে আগতখোকা-বিগতখোকা-বহিরাগতখোকাদের ঠ্যাঙানি খেয়ে মাশুল দিল ; জ্ঞান ফলাবার জন্যে শেষে অন্ধ হতে হলো । দিকে দিকে অন্ধদের পাকাচুল পঙ্গপাল, ফি-দিন ‘আমরা করব ভয়’ গাইতে গাইতে শ্মশানে আসছে আর আগুনে ছাই হয়ে যাচ্ছে । একটু-আধটু যা বাঁচে ভালোবাসায় খায় ।

আবের ওপর হাত বুলিয়ে আদর করতে করতে বলল, আত্মআবিষ্কারের গুরুত্ব বুঝতে হলে, নিজেকে যে অপরিহার্য তথ্য ঠেশে-ঠেশে খাওয়ানো হয়েছে আর যা থেকে ওই আবিষ্কার বেরাস্তায় চলে গেছে, তার ওপর জবরদস্ত দখল থাকতে হবে । আর বেশি দিন নেই ; ইউরোপে লক্ষ লক্ষ মানুষ আফ্রিকা আরবদেশ আফগানিস্তান থেকে ঢুকে ফাটিয়ে চৌচির করে দেবে, যতো বেগড়বাঁই তত্ব ওরা পৃথিবীর ওপর এতোকাল ফলিয়েছে সেগুলোকে, জাস্ট ওয়েট অ্যাণ্ড ওয়াচ । একসঙ্গে দুটো স্বপ্ন দেখার ক্ষমতা রাখি, বুঝলি ?

পাইপের ধোঁয়া উড়িয়ে, অন্ধ বলল, তুমি চুপ করো দিকিনি ; নিজে তো বিগত সংস্কৃতি আর উদারতার অতিশয়োক্তির বানাউটি আর সর্বনাশী সম্পর্কে ফেঁসে আছো জীবনভর । দেশভক্তি, সামাজিক সাজগোজ, গোমর, মুখখানা দেখেছো নিজের ? ঠিক যেন যোগেন চৌধুরীর আঁকা, ওপর থেকে নিচে ওব্দি নেতিয়ে গলে গলে চুইয়ে পড়ছে ।

চক্ষুষ্মান বুড়ো, খেপে গেছে বোঝা যাচ্ছিল, উত্তেজনায় কাপতে-কাঁপতে বলল, তোমার মুখ দেখেছ, কালো চশমা খুললেই প্রকাশ কর্মকারের আঁকা মুখের মতন দেখায় । চারিদিকে অন্ধকার দেখতে পাও, যা নিজেরাই বানিয়েছ, সুখে থাকার ভান করো, চারিদিকে জোচ্চুরির আর অন্যায়ের দানা পুঁতেছ, এখন প্যারানয়ায় ভোগা ছাড়া তোমার উপায় আছে নাকি, শালা অন্ধ কোথাকার, অন্যের মতাদর্শ ভাঙিয়ে খেয়েছে এতোকাল । ব্যাটা বোঝেই না যে মানুষের সমাজে মানুষের জীবন কাটাতে হলে লাথালাথি হবেই । ইতিহাস-খ্যাদানো ভূগোল-তাড়ানো গাণ্ডু, যার কথা ধেবড়ে গিয়ে মানে বেরোয় না , ভেতরে ঢু ঢু, অন্যের বুকনি কপচায়, সারাজীবন ফাকতা উড়িয়ে লেকচারবাজি করে তোমার জীবনের অ্যাচিভমেন্ট কী ?  লাবিয়ার মাকড়ি খোলার শর্তে সারাজীবন হ্যাঁ আর না, হ্যাঁ আর না, হ্যাঁ আর না, তামিল করে গেল। কথাগুলো দ্রুত বলে পেট নাচিয়ে হাসতে লাগল চক্ষুষ্মান বুড়ো । আবের বদলে আদরের হাত নাভিতে ।

হাসির দমকে কোলের অ্যাটলাস মেঝেয় পড়ে গেলে, যুবক দেখল, বাপির কুঁচকির সব চুল পেকে গেছে । ওর মনে হল, এরা কথা বলে একে আরেকজনের সম্পর্কে যা ঠিকমতন বোঝাতে পারছে না, তা দুজনের আঁকা দিয়ে সঠিক বোঝাতে পেরেছে । কথাদের পেট থেকে মানে উধাও হয়ে গেছে এদের দুজনের, কথাদের বোধহয় পেটখারাপ বা আমাশা হয়েছে, ভ্যাজর-ভ্যাজর দিয়ে পরস্পরের যন্ত্রণাভোগের কারণ বুঝতে চেষ্টা করে চলেছে । নিজেকে নিঃশব্দে বলল, মানুষের কথারও জোলাপ হওয়া উচিত ছিল, সব বেরিয়ে যেতো হড়হড়িয়ে ।[১৬]

Double Space

 

অন্ধ বুড়ো চক্ষুষ্মানের কথা লক্ষ করে ঝাঁপিয়ে পড়ল তার ওপর ।

যুবতী, যুবক, দুজন স্মার্ট ষণ্ডা কিছু বুঝে ওঠার আগেই চক্ষুষ্মান বুড়ো পাছার তলা থেকে মাংসকাটার ভারি চপার বের করে অন্ধের গলা বুক পেট মুখ লক্ষ্য করে চালাতে থাকল একের পর এক, চিৎকার করতে থাকল, করব এদের জবাই, তোমাকে তো পাবই, করব এদের জবাই, তোমাকে তো পাবই ।

অন্ধ বুড়ো পড়ে গেল মেঝেয়, রক্তারক্তি, মুন্ড ধড় থেকে আলাদা । টিকটিকির ল্যাজের মতন নাচতে থাকে মুণ্ডহীন ধড় ।

চক্ষুষ্মানের হাত থেকে চাপাতি কেড়ে নেবার চেষ্টায় স্মার্ট ষণ্ডা দুজন এগোতে, তাদের লক্ষ্য করে এলোপাথারি চপার চালানো আরম্ভ করল বুড়ো ; দুজনেরই গলা থেকে মুণ্ড আলাদা হয়ে ছিটকে পড়ল মেঝের ওপর ।

চক্ষুষ্মান উলঙ্গ বুড়ো মাটিতে পড়ে গিয়েছিল ; সেই অবস্হাতেই  নিজের গলায় কোপ দিয়ে মুন্ডু ধড় থেকে আলাদা করে ছটফট করতে লাগল । মরে গিয়েও দুজনের ধড়ের পারস্পরিক লাথালাথি থামেনি, মুণ্ড দুটো একে আরেকের দিকে তাকিয়ে মরণোত্তর গালমন্দ করে চলেছে ।

যুবকের মনে হল, কাটা মুণ্ডগুলো ওর দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে অট্টহাসি হাসছে, বোধহয় বলছে, কোথায় গেল হে তোমার রেড বেল্ট আর কিক বক্সিং !

মুণ্ডগুলোর দিকে তাকিয়ে যুবকের মনে হল, কোন পাগলদের পাল্লায় পড়েছিলাম, নিজেরা কাটাকাটি না করলে এই শ্মশানকলোনি থেকে বেরোনো কঠিন হয়ে পড়ত ; দুটো বুড়ো আর দুটো পালোয়ান মিলে আমায় সোপর্দ করে দিত ভালোবাসায় ।

চক্ষুষ্মানের কাছে হাঁটু গেড়ে বসে নাড়ি দেখে, তারপর অন্ধের, বুকে কান রেখে, রগের পাশে আঙুল রেখে দেখল যুবক, বলল, এনারা গেছেন, মুণ্ডু আর জোড়া লাগানো যাবে না ; ভালোবাসার ওভার ফিডিং হয়ে যাবে । মেঝে থেকে চপার তুলে সকলের লিঙ্গ এক এক করে কেটে , সেগুলো তাকের ফরম্যালিনের কাচের জারে ফেলে দিল, দেখল জার ভরে গেছে নানা মাপের লিঙ্গে । বইগুলোর সঙ্গে জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতার প্রতিযোগীতা করছে  অজানা লিঙ্গগুলো, সন্দেহ নেই !

যুবতী জিগ্যেস করল, সত্যিই মরে গেল বাপিবাবাটা আর ড্যাডিবাবাটা ? ওদের জন্যেই আমি নিজের জীবন নষ্ট করে এতকিছু করে চলেছি কতোকাল যাবত, সব পণ্ড করে দিল । এরা না থাকলে তো লাবিয়ার মাকড়ি পরতাম না, বিয়ে করে নিতাম তোমার মতন কোনো হাট্টাকাট্টা গাবরু জোয়ানকে।

এখন কী করবে, জানতে চাইল যুবক।

চলো হেল্প করো, এদের চ্যাংদোলা করে ভালোবাসার ঘরে রেখে আসি ।

দুজনে চ্যাংদোলা কর ধড়গুলো রাখলো নিয়ে গিয়ে ভালোবাসার ঘরে ।

দুজন বাবার  কাটামুণ্ডগুলো চুল ধরে ঝুলিয়ে, বইয়ের তাকের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল যুবতী, মুণ্ডুগুলো মেঝেয় রেখে, ছুটে গিয়ে তাকে রাখা কথ্থক নাচের ঘুঙুর নিয়ে দুই পায়ে স্ল্যাক্সের ওপরে বেঁধে নিল, ফিরে এসে দু হাতে দুই বাবাদের দুই মুণ্ডের চুল ধরে ঝুলিয়ে, দুর্বার উন্মাদনায়, অদৃশ্য আগুনশিখার বিশুদ্ধ হল্কা উড়িয়ে, নাচতে লাগল ।

যুবকের নেশা কেটে গিয়েছিল, দেখল  যুবতীর হাতে ঝোলানো মুণ্ড দুটো নাচের তালে তালে চোখ মেলে রশ্মি বিকীর্ণ-করে ওকে ইশারা করছে ।

যুবতীর বেপরোয়া নাচে যুবক ভ্যাবাচাকা, কোনো আড়ষ্টতা নেই গনগনে মুখ যুবতীর, বের করে এনেছে ভেতরের তেজ, সঞ্জীবনী, তাদের পালটে ফেলেছে নাচে ।

নাচের তালে যুবতী গান গাইতে আরম্ভ করল, কন্ঠস্বর  বেশ মশলাদার, পাশা-খেলায় জেতা দুর্যোধনের মামার কাজের বউয়ের মতন, ওদের কাটা গলা থেকে মেঝেয় রক্ত পড়ার সরোদ বাজনা বাজছে, গলা থেকে যে নলিগুলো ঝুলে আছে, লাল লাউডগা সাপের মতন মাথা উঁচিয়ে নিজেদের মধ্যে খেলছে :[১৭]

মম চিত্তে নিতি নৃত্যে কে যা নাচে

তাতা থৈথৈ তাতা থৈথৈ তাতা থৈথৈ

আমি সঙ্গে কী মৃদঙ্গে সদা বাজে

তাতা থৈথৈ তাতা থৈথৈ তাতা থৈথৈ

হাসি কান্না হীরাপান্না দোলে ভালে

কাঁপে ছন্দে ভালো মন্দ তালে তালে

নাচে জন্ম নাচে মৃত্যু পাছে পাছে

তাতা থৈথৈ তাতা থৈথৈ তাতা থৈথৈ

কী আনন্দ কী আনন্দ কী আনন্দ

দিবারাত্রি নাচে মুক্তি নাচে বন্ধ

সে তরঙ্গে ছুটি রঙ্গে পাছে পাছে

তাতা থৈথৈ তাতা থৈথৈ তাতা থৈথৈ

যুবতী নাচ থামাতেই বাবাদুটোর মুণ্ড  চেঁচিয়ে ওঠে, আরে, নাচ থামালি কেন রে, বেশ তো নাচের তালে তাল দিচ্ছিলাম ।

নিকুচি করেছে, আমি নাচছিলাম নিজের আনন্দে, তোমাদের গান শোনাবার জন্যে নয়, তোমাদের ভালোবাসার ঘরে রেখে দিচ্ছি, ওখানে যতো ইচ্ছে গান শুনতে থেকো, বলে, যুবতী মুণ্ড দুটো ঝুলিয়ে ভালোবাসার ঘরে দৌড়ে ঢুকল, পেছনে পেছনে যুবক ।

বাকি মুণ্ডগুলো নিয়ে গিয়ে যুবক দেখল ভালোবাসা  দুর্মুশ করা শবের ভেতরে মাথা পুরো ঢুকিয়ে তারিয়ে তারিয়ে খাচ্ছে, ছিঁড়ে বের করছে, আর গপ গপ করে গিলছে ।

যুবক ভাবল, আচ্ছা, আমরা কেন খাবারের ভেতরে গলা পর্যন্ত মাথা ঢুকিয়ে খেতে পারি না !

যুবতী বলল, এই মুণ্ডগুলোকেও দুর্মুশ করে দিন, নয়তো খেতে সময় লাগবে ওদের ।

—নিজের বাবাদের পিটিয়ে দুর্মুশ করবে ?

—মরে যাবার পর বাবারা কি আর বাবা থাকে ? স্মৃতি হয়ে যায় । স্মৃতির স্টক তো আর অসীম নয়, তাই বাবারাও নতুন স্মৃতিকে জায়গা করে দিয়ে লোপাট হয়ে যাবে । বাবা শব্দটা ফোঁপরা হয়ে যাবে দুচার বছরে ।

—তা ঠিক, আজকাল তো মা-বাপদের ফুটপাতে ফেলে ছেলেমেয়েরা আধুনিক জীবনে উধাও হয়ে যায় ।

দুর্মুশ করার সময়ে রক্তের ছিটে লাগল যুবকের পায়ের উরুর চুলে, শর্টসে, জামায়,  মুখে-চোখে । মাথার ঘিলু ছড়িয়ে পড়তেই শকুনগুলো মুণ্ডু উঁচিয়ে গান গাইতে গাইতে দৌড়ে এলো তরতাজা জ্ঞান খাবার জন্যে ।

—এখন কী করবে ?

—বাবাদের লায়াবিলিটি তো চুকলো, কিন্তু বাড়লো পালিয়ে বেড়াবার লায়াবিলিটি । ভালোবাসা তো ততো তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে ফেলতে পারবে না, পচা গন্ধে শববাহকদের টানবে । পচা গন্ধ কার না ভালোলাগে, বলো ? পচা গন্ধ হলে লোকে টেনে টেনে শোঁকে, তারপরে ইঁহি ইঁহি করে নাকে রুমাল চাপা দ্যায়, তা সে শিকনির রুমাল হলেও । পচা গন্ধের টানে নাকে রুমাল চাপা দিয়ে পাবলিক এদিকে আসবেই । নিজেরা তালা ভাঙবে কিংবা প্রতিষ্ঠানকে ডেকে তালা খোলাবে ।

ভালোবাসার জানলাগুলো খুলে দিই, এতকাল বন্ধ করে রেখেছিলাম যাতে পালিয়ে না যায়, এখন তো আর দরকার নেই, পালাবার হলে পালাক উড়ে ।

—এখানে তোমার কোনো প্রমাণ রয়ে গেল ?

—প্রমাণ বলতে বাবাদের আধখাওয়া শব । আর মেয়াও মেয়াও ভরা বস্তাগুলো ।

—তাহলে কী করবে ?

—পালাতে হবে ।

—চলো আমার বাসায় । আমি তো একা থাকি ।

—দুজনেই ধরা পড়ব । তোমাকে যে কাজে লাগাব বলে এনেছিলুম, তার তো আর দরকার হল না । তুমি চুপচাপ বেরিয়ে পড়ো ।

—কিন্তু লাবিয়ার মাকড়ি খুলিনি যে এখনও ? তোমাকে ফেলে পালাতে পারব না ।

যুবতী তাড়াতাড়ি নিজের পোশাক খুলে মেঝেয় ফেলে দিল ।

যুবক বেশ কাছ থেকে তারিয়ে দেখে নিয়ে মাকড়িটা খুলল, খুলেই, মাকড়িতে চুমু খেল, মাকড়ির জায়গাতেও জিভ বুলিয়ে বলল, স্বর্গ যদি থাকে তা এইখানে, নরক যদি থাকে তা এইখানে ।

যুবতী বলল, যথেষ্ট কাব্যি হয়েছে, পরে ওসব নাটুকেপনার অনেক সময় পাবে, এখন যা করা জরুরি, তা-ই করো ।

যুবক দাঁড়িয়ে জড়িয়ে ধরে বলল, লাবিয়ার মাকড়িই ছিল তোমার তিন বাপের বীশ্ববীক্ষা, বাস্তবের ব্যাখ্যা । এখন এই নাও, রেখে নাও মাকড়ি, পরে দরকার হতে পারে ।

যুবতী বলল, মনে থাকবে, থ্যাংকস ।  ওই ঘরে পেটরলের জেরিক্যান আছে গোটা দশেক, চলো, ছড়িয়ে দিই পুরো বাড়িটায় ।

দুজনে মিলে সারা বাড়িতে পেটরল ছড়াতে লাগল । স্ল্যাক্স পরে নিল যুবতী । দেশলাই কাঠি জ্বেলে ফেলে দিতে, আগুন ছড়িয়ে পড়ল ।

দুজনে হাত ধরাধরি করে পালালো বাড়ির বাইরে ।

চলো, পালাও, বিস্ফোরণ হবে, যুবকের হাত ধরে টান মেরে বাইরে বেরোয় যুবতী, বলে তাড়াতাড়ি করো, কুইক কুইক, জিপ খুলে মোটর সাইকেলে বসো, আমি স্ল্যাকস নামিয়ে বসছি তোমার কোলে, চালাও মোটর সাইকেল, স্টার্ট দাও, উঁচু-নিচু রাস্তা আপনা থেকেই আমাদের পৌঁছে দেবে মহা-আহ্বাদের গন্তব্যে, রসের তীর্থ । ডেথ টু মোনোগ্যামি । বুঝলি, প্রেম হল সবচেয়ে অন্তর্ঘাতী ব্যাপার ।

মোটর সাইকেল স্টার্ট দ্যায়, যুবকের কোলে যুবতী, লাবিয়ার মাকড়ি খুলে এই প্রথম আরেকজনের সাহায্যে । তারপর হাইওয়ে, উড়ে চলে মোটর সাইকেল । দুপাশের গাছের ডালপালারা ওদের কোলপ্রেম দেখে হাততালি দিয়ে পেছন দিকে দৌড়োচ্ছে ।

যুবতী দুহাত ওপরে তুলে চিৎকার করে ওঠে, ইয়াআআআআহাহাহাহা, ধন্যবাদ গ্যালিলিও গ্যালিলি, নড়ে চলেছে, নাড়া দিয়ে চলেছে, নিজেও ওঠানামা করে হাইওয়ের হাওয়ায় ।

দুজনের কেউই পেছন ফিরে দ্যাখে না যে বাড়িটা বিস্ফোরণে উড়ে গেল ।

ফরম্যালিনে চোবানো লিঙ্গগুলো জার ফেটে ছিটকে বেরিয়ে দেবশিশুর ফিনফিনে গঙ্গাফড়িং-ডানা মেলে মেঘ-টুসটুসে হাওয়ায় ছুটে চলল, যাতে খরায় মার খাওয়া দেশটায় বৃষ্টি শিগগির আসে ।[১৮]

তাকে রাখা বইগুলোও মলাটকে ডানা বানিয়ে উড়ে চলল লিঙ্গগুলোর পেছন পেছন ।

ভালোবাসা ততক্ষণে অনেক উঁচু ধোঁয়াটে নীল আকাশে গান গাইতে গাইতে পাক খেয়ে উড়ছে ।

সুনসান হাইওয়েতে , একটা জঞ্জালস্তুপের উদ্দেশ্যে যুবতী আরেকবার চিৎকার করে, মা, এই নাও, টু হেল উইথ তোমার লাবিয়ার মাকড়ি, আমার মেয়ে হলে তাকে লাবিয়ায় মাকড়ি পরতে শেখাব না , এই জঞ্জালেই তুমি আমাকে এক দিনের মাথায় ফেলে দিয়েছিলে, আজ তোমাকে ক্ষমা করে দিচ্ছি ।

 

————————————————————————————————————-

সূত্র

[১] The Four Fundamental Concepts of Psychoanalysis. Jaques Lacan. W.W.Norton & Co. New York, 1977.

[২] Ethics : An Essay on the Understanding of Evil. Alain Badiou. Verso, New York 2000.

[৩] Living in the End Times. Slavoj Zizek, Verso, London 2010.

[৪ ] Eros and Civilization. Herbert Marcuse. Beacon Press. Boston. 1955.

[৫] Terra Nostra. Carlos Fuentes. Farrar, Straus and Giroux. New York. 1976

[৬] Delta of Venus. Anais Nin. Penguin Books. 2008.

[৭] Anti-Oedipus : Capitalism and Schizophrenia. Gilles Deleuze and Felix Guttari. Viking Penguin. New York. 1977.

[৮] Fear of Flying. Erica Jong. Holt, Rinehart and Winston. New York. 1973

[৯] Foucault’s Pendulum. Umberto Eco. Sacker & Warburg. 1988.

[১০]S. Charles and G. Lipovetsky. Hypermodern Times. Polity Press. 2006.

[১১]Thomas de Quincey. Confessions of an English Opium Eater. Taylor & Hessey. London. 1823.

[১২]Emile Durkheim. Suicide. The Free Press. Paris. 1897.

[১৩] Alexander Artievsky. Life Death Whatever : How to Achieve a Bliss Without Trying. Createspace. London.2010

[১৪] Zacharias P Thundy. Courtly Love and Ancient India. East West Literary Relations. Michigan. 1981

[১৫] Ingeborg Hoestery. Pastiche: Cultural Memory in Art, Film, Literature. Indiana University Press. Bloomington.2001

[১৬] C.Castoriadis. The Imaginary Institutions of Society. Polity Press. Cambridge. 1975.

[১৭] S.Banes. Terpsichore in Sneakers : Postmodern Dance. Weslyan University Press. Connecticut. 1987

[১৮]Gunther von Hagens. Body Worlds : The Anatomical Exhibitions of Real Human Bodies.Institute for Plastination, Heidelberg, 2006.

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

About anubadak

আমি একজন অনুবাদক । এতাবৎ রেঁবো, বদল্যার, ককতো, জারা, সঁদরা, দালি, গিন্সবার্গ, লোরকা, ম্যানদেলস্টাম, আখমাতোভা, মায়াকভস্কি, নেরুদা, ফেরলিংঘেট্টি প্রমুখ অনুবাদ করেছি ।
This entry was posted in উত্তর-আধুনিক রূপকথা, ছন্নছাড়া সময়ের গল্প and tagged , , . Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s