এই রোগের নাম চাই : মলয় রায়চৌধুরী

—তুমি পুলিশে চাকরি পেলে কী করে ? তোমার নামে তো অনেককিছু শোনা যেতো, মানে তোমার অসামাজিক কাজকারবারের ব্যাপারে ।

—না স্যার, আমি প্রথম থেকে এরকুম ছিলুম না ; রোজগারপাতির জন্যে, বাবা-মা আর সংসারের ব্যাগার ঠেলতে  আমাকে নানা কাজ করতে হয়েচে, এখুন অবশ্য নানুদি আমার টাকায় সংসার চালাতে দিতে চান না, বলেন ও হোলো রোগের ট্যাকা । আপনি তো জানেন আমার বাবা-মা দুজনেই অন্ধ। অন্ধ ছিলেন না, সুদু ক্যাটারাট ছিল ওনাদের ; বিনে পয়সায় অপারেশান করাতে গিয়ে চোখ খুইয়েচেন, ক্যাম্প বসিয়েছিল ক্লাবের গেঁড়ে-কাত্তিকরা,  চোখের ডাক্তারদের এনে, ক্লাবেই চল্লিশ জনের অপারেশান হয়েছিল, সকলেই অন্ধ হয়ে গেচে । হেমুদা মারা যাবার পর ওনার অন্ধ বাবা-মা ভিককে করে খাচ্চেন, খাচ্চেন আর কি বলব, ওই কোনো রকুমে টিকে আচেন । ক্লাবের কত্তাদের ধরেছিলুম আমরা, তা ওয়াঁরা বললে সরকারের কাচে আবেদন করা হয়েচে । সরকার আর কী করবে বলুন, তাদের কি হেগে-পেদে কাজ নেই যে অন্ধদের পেচনে দৌড়ুবে, অন্ধ বলে তো ভোটও দিতে যেতে পারেনি ওয়াঁরা, শেষে আমরাই ব্যবস্হা করে ওয়াঁদের ভোটগুনো দিলুম, তার বদলে নেতাটা যতো টাকা দেবে বলেছিল, তা দিলে না, ঘাগুর মেসো ।

—কিন্তু পুলিশে চাকরি পেলে কেমন করে, তোমার তো লেখাপড়াও ঢুঢু ।

—বলচি স্যার । ইসকুলে টেন পর্যন্ত পড়েছিলুম, টেনে-টুনে, ক্লাস টিচারদের ভয় দেখিয়ে ; ক্লাস টিচাররা কেউই চাইতো না যে আমি ওয়াঁদের ক্লাসে পরের বচরও থাকি । আর না পড়েও তো বারো ক্লাসের সার্টিফিকেট পাওয়া যায়, জানেন তো । ক্লাবের কত্তা অন্তত এটুকু খয়রাত তো করেছিলেন । বাবা-মায়ের চোখ ফিরিয়ে দিচ্চি, বলেছিলেন উনি সার্টিফিকেটের কাগচটা দেবার সময়ে । ইংরিজি বলতে পারি না, নয়তো উকিল হবার ডিগ্রিও যোগাড় করে ফেলতুম । শালা ইসকুলের মাস্টাররাই ইংরিজি জানে না, পড়াবে কি ! ঝণাদা উকিল হবার ডিগ্রি পেয়েচে বাবা-মায়ের চোখের বদলে, তবে ঝণাদা বাবা-মাকে দেখার বদলে বিয়ে করে অন্য শহরে ওকালতি করতে চলে গেচে, ওয়াঁর মা-বাপ ভিককে করে চালাচ্চেন ।

—ইনটারভিউ তো ইংরেজিতে হয় ?

—না, স্যার, কন্সটেবলদের ইনটারভিউ ইংরিজিতে হয় না । তাই রক্ষে ।

—কিন্তু তুমি তো ইন্সপেক্টার ।

—হ্যাঁ, স্যার, ধাপে-ধাপে হয়েছি ।

—ধাপে-ধাপে ? না লাশে-লাশে ?

—আমার কোনো দোষ নেই স্যার । আমি হুকুম পেয়েছি, হুকুম তামিল করেছি ।

—তোমার দাদা তো রাজনীতি করতেন ?

—দাদা নয় স্যার, উনি আমার কাকা । সংসারটা উনিই টানতেন । রাজনীতি করতেন না উনি, লেকালিকি নিয়ে থাকতেন । তখন  খতমের যুগ চলছিল, ওয়াঁদের কোটা পুরো করার জন্যে কাকাকে বদনাম দিয়ে তুলে নিয়ে গেল, তারপর কয়েকদিন পাওয়া যায়নি ; পাওয়া গেল একটা নৌকো ডুবে যাবার পর।

—বদনাম ?

—বদনামইতো । সব সরকারেরই একদিকে থাকে যারা বদনাম, আরেক দিকে নাম । এ এক গোলকধাঁধা আমি আজও বুঝে উটতে পারিনি । কে যে কখুন নাম থেকে বদনামের দলে চলে যাবে আর কে যে কখুন রঙ পালটে বদনাম থেকে রাতারাতি নামের দলে চলে যাবে, তার কোনো ঠিকঠিকানা নেই ।

—তুমি তো বদনামেও নেই নামেও নেই ।

—হ্যাঁ, স্যার, আমি ওই যারা দোল খায় তাদের দলে । আমি চিরকাল সিংহাসনের পক্ষে, যে বসবে তার থুতু চাটবো, এই আমার জীবনের লটারি ।

—এখন হঠাৎ মুখ খুলতে চাইছ কেন ?

—কালা করতুত করেচে যারা তারা এবার ফেঁসে যাবে । তারা আমাকে ফাঁসাতে চাইচে । আমাকে সরিয়ে দিতে লোক লাগিয়েচে , কাকার মতন আমাকেও লোপাট করার তালে আচে ।

—তুমিও তো ওই যাকে বলছ কালা করতুত, সেই সব কাণ্ড নিজেও করেছ ।

—নিজের ইচ্ছেয় তো করিনি স্যার । হুকুম পেইচি, হুকুম তামিল করিচি ।

—কিন্তু করেছ তো তুমি ?

—আমি কি আর একা করিচি ? ওয়াঁরাও করেচেন । ওয়াঁরাই বেশি করেচেন । আপনি শুনে দংগ রয়ে যাবেন ওয়াঁদের কালা করতুত শুনে । কন্সটেবলের চাকরি তো এমনি-এমনি পাইনি, ওয়াঁদের কালা করতুত ঢাকার জন্যে মনহুস একজন লোকের দরকার ছিল যে কখুনও না বলবে না, মুখ বুজে অর্ডার শুনবে ।

—তোমার ভয় করে না ? একদিকে তোমার ওপরওয়ালারা আরেক দিকে যাদের খতম করেছ তাদের লোকেরা এবার তোমাকে সরিয়ে দিতে চাইবে, মুখ খোলার জন্য ।

—আমি ওয়াঁদের সব কালা করতুত একটা ভিডিওতে রেকর্ড করে রেকিচি ।

—মানে ? সবকটা মার্ডারের ভিডিও তুলে রেখেছ ?

—না, কারা কাকে আর কাদের মার্ডার করার হুকুম দিয়েছিল, তা বলিচি আর সেই সঙ্গে কিছু ফোটুও আচে।

—তোমার ওপরওয়ালারা তো নিজেদের ইচ্ছেয় করেননি । তাঁরাও নেতাদের হুকুমে করেছেন ।

—সে সব নেতাদের নামও রেকর্ড করিচি ভিডিওতে ; সহজে কেউ আমার গায়ে হাত দিতে পারচে না তাই । জানে যে আমার গায়ে হাত দিলেই ভিডিওর কপি পৌঁছে যাবে নিউজ চ্যানেল আর খবরের কাগচের দপতরে, সেরকম ব্যবস্হা করে রেকিচি । আপনি আগে আমাদের পাড়ায় থাকতেন, ছোটোবেলা থেকে চেনেন আমায়, তাই আপনাকেই সব খুলে বলচি, আমাকে লোপাট করে দিলে আপনি সব জানিয়ে দিতে পারবেন । আপনাদের চ্যানেল দেখি তো, বেশ চেঁচামেচি করে খবর পড়েন সবাই, দিল খুশ হয়ে যায় ।

—আমি তো নিউজ চ্যানেলে আগে কাজ করতাম, এখন করি না, এখন আমি তোমাকে নিয়ে একটা বই লিখতে চাইছি । বইটা লিখে রেডি রাখব, তোমাকে সরিয়ে দিলেই প্রকাশ করব । তুমি একটা কনট্র্যাক্ট সই করে দেবেন ।

—হ্যাঁ, স্যার, তখুন বিক্কিরি বেশি হবে । আমি বেঁচে থাকতে বইটা তেমন বিক্কিরি হবে না । বইতে ফোটুগুনোও দেবেন স্যার । আর এই ডায়েরিটা রাখুন, এটা আমার কাকার, উনি লেকালিকি করতেন ।

—কই দেখি । বাঃ, প্রচুর কোটেশান দেখছি, ওনার নিজের ?

—হ্যাঁ, স্যার ।

—যাক ভালো হলো । বইটায় কিছু জ্ঞানগর্ভ ব্যাপার রাখতে পারব, নয়তো সমালোচকরা ভাববে পাল্প ফিকশান । আগের বইটাকে কেউ ননফিকশান বলে মানতে চায়নি ।

—রাখবেন স্যার, কাকা সারা রাত পড়তেন আর লিখতেন, পায়ে পোলিও ছিল তো, ক্রাচ নিয়ে অফিসে যেতেন । বাড়িতে হুইল চেয়ার ব্যবহার করতেন, এঘর-ওঘর করার জন্যে, লেখালিখির জন্য ।

—দাঁড়াও, একটু পড়ি কোটেশানগুলো ।

         *শত্রুতাও সম্পর্কে, যা কেউ চায় না।

         *জলাতঙ্ক রোগটা মানুষেরা কুকুরের কাছ থেকে পেয়েছে ।

         *জীবনে অন্তত একবার কেউ না কেউ না কেউ পিঠে ছুরি মারবেই, আর সে আঘাত কখনও সারবে  

           না।

         *সঙ্গমের চেয়ে যোনির দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকার আনন্দ বেশি ।

         *তুমি যদি কাউকে ঘৃণা করো, সে যদি তা জানতে না পারে, তাহলে ঘৃণা করাটা উদ্দেশ্যহীন ।

         *যদি না চোখে-চোখে রাখা হয়, তাহলে পুলিশ স্টেট হয়ে ওঠার জন্য গণতন্ত্রের মাটি সবচেয়ে নরম ।

         *আমার কখনও ‘লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট’ হয়নি ; প্রতিবার ‘লাভ অ্যাট ফার্স্ট টাচ’ হয়েছে ।

         *সৃজনশীল মানুষের অধঃপতনের অভিজ্ঞতা হওয়া জরুরি, কেননা তা জ্যোতিষ্কদের হয়, পশুদের

          হয় না ।

         *অতীতকে কারাগার মনে করলে সমস্ত স্মৃতি নোংরা হয়ে যায় ।

         *যে মেয়েকে দেখতে এসে পাত্র পক্ষ পছন্দ করল না, সে জীবনকেই রিজেকশান বলে মনে করবে ।

         *কবিতার জন্য নিয়তিকে বশে আনতে হয় ।

         *মানুষ পৃথিবীর প্রতি অপার বিরক্তি নিয়ে জন্মায় ; তাই সে জন্মেই কাঁদতে আরম্ভ করে ।

         *অপবাদ আকর্ষণ করার ক্ষমতা না থাকলে জীবদ্দশায় একজন কবির খ্যাতি মেকি হবার সম্ভাবনা ।

         *মানব সম্প্রদায়ের মুক্তির তাত্বিকরা শেষ পর্যন্ত গণহত্যাকারীতে রূপান্তরিত হয় ।

         *এককালে যারা অবক্ষয়-বিরোধী ছিল, তারাই বঙ্গসমাজে অবক্ষয় নিয়ে এলো ।

         *ভদ্রলোক কাদের বলে ? যারা ক্লিটোরিস উচ্চারণ করতে লজ্জা পায় ।

         *বিশ্বাসঘাতকেরা মরার আগে আত্মসন্মানহীন শিষ্যদল তৈরি করে যায়, যারা মৃতের গোলামি করে  

          বেঁচে থাকে ।

         *রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং গুণ্ডামি হল বিশুদ্ধ ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বীতার পরিসর ।

         *”পবিত্র বই” আর “অপবিত্র বই”-এর পার্থক্য হল যে “অপবিত্র বই” কেবল মানুষরাই লিখতে পারে ।

         *এক-একজন মানুষকে একবার দেখেই টের পাওয়া যায় তার মগজে সাভানার কোন জন্তুদের

          উৎপাত চলছে ।

         *যে লোকটা কখনও কোনো মাদক জীবনে নেয়নি, সে গাঁজা ফোঁকার বিরোধিতা করবেই ।

         *আশাবাদ : একটা নক্ষত্র কয়েক লক্ষ বছর আগে মরে গেছে ; তার আলো এখন পৃথিবীতে এসে

          পৌঁছেচে ।

         *বিছানাকে অন্ধকারে আরণ্যক করে তোলাই ফুলশয্যা ।

         *কবিতার উৎস কোনো না কোনো রহস্য যার উন্মোচন অন্য উপায়ে সম্ভব নয় ।

         *কোথায় জায়গাটা ঠিক কোথায় ?

         *পশুরা জানতে পারল না যে মানুষ হল সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী ।

         *ঈশ্বর কেবলমাত্র একজন এবং তাঁর নাম যৌনতা ।

         *প্রতিশোধের ষড়যন্ত্র করা জরুরি কেননা তা জখমকে শুকোতে দ্যায় না ।

         *জীবন সম্পর্কে কথা বলা প্রায় অসম্ভব কেননা তার জন্য যথার্থ অভিব্যক্তি কোনো ভাষায় নেই।

         *ব্যর্থ বিপ্লবী মার্কসের কবর দেখতে যান ; ব্যর্থ কবি দেখতে যান বদল্যারের কবর ।

         *প্রেম তখনই সফল যখন তা প্রেমিক ও প্রেমিকা দুজনকেই ধ্বংস করে দ্যায় ।

         *বর্ণবিভাজিত সমাজব্যবস্হায় শ্রেণিহীন সমাজের কল্পনা অবাস্তব ; মনুস্মৃতির পাহাড় মাথায়

          চাপিয়ে বিপ্লবের কথা ভাবা বাতুলতা । নির্বাচন প্রক্রিয়া বর্ণবিভাজনের শেকড় সমাজের আরও

          গভীরে পৌঁছে দিয়েছে ।

         *স্মৃতির জ্বলন্ত শবকে শ্মশানের ডোমেদের মতন খুঁচিয়ে আগুনের ফিনকি উড়িয়ে চলেছি।           

—তোমার কাকা বোধহয় প্রেম করতেন ? কবিতার বইও লিখে থাকবেন ।

—হ্যাঁ, করতো তো , কবিতার বইতে লেখা আছে, যাকে ভালোবাসতো তার নাম , সংস্কৃততে কি সব লেখা তাকে নিয়ে।

—কই দেখি ।

—এক-আধ কপি আছে হয়তো । বিক্রি হয়নি তো, আমিই বইয়ের দোকানে দিয়েছিলুম, এক কপিও বিক্রি হয়নি । বইগুলো একে-তাকে ডাকে পাটাত, একআধজন চিটি লিকে জানাতো কেমন লেগেচে । ব্যাস । আমিই তো পোস্টাপিসে গিয়ে ডাকবাক্সে ফেলে আসতুম । এই নিন, রেখে-রেখে উইয়ে কেটে দিয়েচে ।

—বাঃ, ওনার প্রেমিকার নাম তো বেশ, নয়নসুন্দরী  । কোথায় থাকেন উনি ? বেঁচে আছেন এখনও?

—ও তো আমাদের নানুদির ভালো নাম । একটু আগে দেখলেন না, আমাদের বাড়িতেই থাকে এখুন, আগে কম বয়েসে আমাদের কাজের বউ ছিল । উনিই নানুদি, এখন বয়স হয়ে গেচে একটু, তবু চোখ দুটো দেখলেন তো কেমন বড়ো-বড়ো । নানুদির বরকেও পুলিশ মেরে ফেলেছিল, ফালতু ছিঁচকে কাজ করতো, পাউচে মাল ভরে বিক্রি, ড্রাগ নিয়ে এখান-সেখান, ঠ্যাঙানির চোটে মরেই গেল বেচারা । নানুদি আর কাকা তার আগে থেকেই ঘরের দরোজা বন্ধ করে নিজেদের ভালোবাসতো । একবার দরোজার ফাঁক দিয়ে দেখেছিলুম, নানুদি শাড়ি-ব্লাউজ খুলে দাঁড়িয়ে আচে আর কাকা একেবারে কাচ থেকে হুইলচেয়ারে বসে নানুদির দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আচে, দুপায়ের ফাঁকের দিকে, বুঝচেন তো কী বলচি । তারপর নানুদি হাঁটুগেড়ে কাকার কোলে মুখ রাখলে, জানেন তো, মুখ দিয়ে যা করবার করলে । কাকাও মুখ দিয়েই যা করার করতো । নানুদি কাকাকে চান করিয়ে দিতো, সাবান মাখিয়ে দিতো, গা পুঁচে দিতো । কাকা মরে যাবার পর নানুদি বিধবার সাদা সাড়ি ধরেচে । বর মরার পর সাদা সাড়ি ধরেনি ।

—উনি তোমাদের বাড়িতে এসে রয়ে গেলেন তোমার মা-বাবা অবজেকশান নেননি ?

—মা-বাবা দেখতেই পায় না ; নানুদি হাল না ধরলে ওয়াঁরা অক্কা পেয়ে যেতো অ্যাদ্দিনে, ওয়াঁদের কে দেখতো ।

—তুমিই খরচ যোগাও ? প্রচুর টাকা করেছ শুনেছি, জমিজমাও কিনেছ ।

—নাহ, নানুদি আমার টাকা নেন না । উনি বলেন এই রোগের টাকা নেবেন না । রোগের কী আচে বলুন আপনি? নানুদি নিজের বর থাকতেই কাকাকে ভালোবাসতো, ঘর বন্ধ করে কতো কি করতো, অথচ আমার কাজকে বলে রোগ ।

—তুমি খুনি বলে, কতো খুন করেছ তার হিসেব রেখেছ ? খুন করা আর ভালোবাসার মধ্যে মেরে ফেলা আর বাঁচিয়ে রাখার তফাত । তোমার কাকাকে উনি ভালোবেসে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন । তোমাদের সংসারে রয়ে গেলেন তোমার কাকাকে ভালোবাসতেন বলে ।

—না, স্যার, কোনো হিসেব রাখিনি, রাখলে মাথা গোলমাল হয়ে যেতো ।

—তোমার কাকাকে কী ভাবে খুন করা হয়েছিল তা জেনেছ নিশ্চয়ই ওই চাকরিতে যোগ দিয়ে ?

—কাকাকে ওনার হুইল চেয়ারের সঙ্গে নাইলন দড়ি দিয়ে বেঁধে নৌকোয় চাপিয়ে মাঝনদীতে নিয়ে গিয়ে ফেলে দিয়েছিল । গুলি মেরে বা গলা কেটে ফেলে দিলেও কথা ছিল ; তা নয়, একেবারে জ্যান্ত মানুষটাকে তার হুইল চেয়ারের সঙ্গে বেঁধে জলে ফেলে দিলে ।

—তুমি সেই থেকে তোমার কাকার মৃত্যুর প্রতিশোধ নিয়ে চলেছ নানা মানুষকে মেরে ।

—তা জানি না, ভেবে দেখিনি । কাকাকে ছেদ্দাভক্তি করতুম, কিন্তু ওয়াঁর জন্যে জান লড়িয়ে দেবার কতা ভাবিনি কখুনও । মানুষ মারি মারার জন্যে । একজন মানুষকে দনাদ্দন গুলি চালিয়ে উড়িয়ে দেয়াটা যেন নিজেই পাখনা মেলে ওড়ার মতন । মানুষকে মেরে ফেলার আনন্দ বাঘ-সিংহ মারার চেয়ে ঢের ঢের বেশি। আপনাকে বোঝাতে পারব না ।

—প্রথমবার যখন একজনকে মেরেছিলে তখন হাত কাঁপেনি ?

—না স্যার, হাত কাঁপবে কেন ? আমি তো চুরি করছি না বা পকেট মারছি না যে প্রথমবার হাত কাঁপবে।

—চালাঘরসুদ্ধ পুড়িয়ে কয়েকজনকে মেরেছিলে বলে শুনেছি ।

—একা করিনি তো ! আমাদের সিনিয়র সঙ্গে ছিল । বাড়ির ভেতর থেকে মেয়েমানুষ-পুরুষমানুষের বাঁচাও বাঁচাও চিৎকার শুনতেন যদি আপনি । কী যে মজা পাচ্ছিলুম আমরা সবাই বুঝিয়ে বলতে পারব না। সিনিয়ররা আমাদের দামি মদ খাইয়ে নিয়ে গিসল, ভেবেছিল যে আমরা ঘাবড়ে যাবো, ভয় পাবো । আমরা যে ওয়াঁদের মাতায় হাগি তা দুচার মাসেই বুঝে গিসলেন ওয়াঁরা ।

—কেউ বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেননি ?

—চেষ্টা আবার কী করবে । আগুন লাগাবার পর গুলি চালিয়ে চিৎকার-চেঁচামেচি বন্ধ করে দিয়েছিলুম ।

—ধর্ষণের মোটর সাইকেল গ্যাঙ হয়েছে, তুমি তার সদস্য তো ?

—না স্যার, আমি কোনোরকুম রাজনীতিতে নেই ; ওসব রাজনীতির ব্যাপার-স্যাপার, বুঝিও না ভালো।

—সেক্সে তোমার আগ্রহ নেই ।

—আজকাল উঁচু দরের কল গার্ল পাওয়া যায়, টাকা ঢাললে ; রাজনীতির নোংরামিতে কেন যাব মিছিমিছি ।

—উঁচু দরের মানে । অনেক টাকা খরচ করতে হয় ? মধুচক্র ?

—ঠিক তা নয় । নেটওয়ার্ক আছে, তাদের বললে হোটেলে রুম বুক করে সাপলাই দ্যায় । বেশ্যাদের চেয়ে আমার কলগার্লদের পছন্দ । রেট যে বেশি তা ঠিক । উজবেকিস্তানের মেয়েদের ভালো নেটওয়য়র্ক ছিল, মাঝখান থেকে দুজন খুন হয়ে কলগার্লের বাজারটাকে সামনে এনে গোলমাল বাধিয়ে দিয়েছে । ওদের সঙ্গে বিকিনি পরা সেলফি তোলাতেও এক হাজার টাকা চায় । শোবার জন্যে পনেরো হাজার থেকে এক লাখ, মালের বডি অনুযায়ী । তাজাকিস্তানের এক আধবুড়ি ওদের নেটওয়ার্কের আন্টি, তাকে আগাম জানাতে হয়, টাটকা মাল চাইলে আনিয়ে দ্যায় । ট্যুরিস্ট ভিসা নিয়ে আসে, কুড়ি-পঁচিশ লাখ কামিয়ে এক হপ্তায় নিজের দেশে ফিরে যায়। । হিন্দি  ফিলিমে নাচের দলে ঢোকার জন্যে যারা আসে, তাদের রেট আরও বেশি, দেখেছেন তো, সকলেই বলতে গেলে সুন্দুরী আর কী ফসসা, গোলাপি মাখন অ্যাগবারে। আপনার দরকার হলে বলবেন, অ্যারেঞ্জ করে দেব ।

—বলব ।

—ওদের আসা-যাবার গাড়ির ব্যবস্হা করতে হয় ।

—তোমার কাকা কবিতার বইটার নাম রেখেছেন “নয়নতারা”, হ্যাঁ, সংস্কৃতেই উৎসর্গ করেছেন নয়নতারাকে ।

—নানুদি কাকার হুইল চেয়ার ধরে নিজের চারিধারে হাসতে-হাসতে ঘোরাতো আর কাকা ওই সংস্কৃত কবিতাটা পড়ে-পড়ে নানুদিকে শোনাতো । নানুদি তো বাংলা পড়তেই জানে না, সংস্কৃত আর কি বুঝবে, কাকা তবু শোনাত আর নানুদি ওনার চেয়ার নিজের চারিধারে ঘোরাতো ।

—আরে না হে, এটা সংস্কৃত কবিতা নয় । তুমি ভালো করে শোনো, তাহলে বুঝতে পারবে নানুদি কেন নিজের চারিধারে তোমার কাকাকে ঘোরাতেন আর কাকা এটা ওনাকে শুনিয়ে-শুনিয়ে পড়তেন :

 

         ওম ইষ একপদী ভব,

         সা মামনুব্রতা ভব,

         বিষ্ণুস্ত্বা নয়তু পুত্রান বিন্দাবহৈ,

         বহূং স্তে সন্তু জরদষ্টয়ঃ

         ওম ইষ একপদী ভব ইতি প্রথমন ।।

 

         ওম ঊর্জে দ্বিপদী ভব,   

         সা মামনুব্রতা বভ,

         বিষ্ণুস্ত্বা নয়তু পুত্রান বিন্দাবহৈ,

         বহূং স্তে সন্তু জরদষ্টয়ঃ ।

         ওম ঊর্জে জরদষ্টয়ঃ ।।

 

         ওম বায়স্পোষায় ত্রিপদী ভব,

         সা মামনুব্রতা ভব,

         বিষ্ণুস্ত্বা নয়তু পুত্রান বিন্দাবহৈ,

         বহূং স্তে সন্তু জরদষ্টয়ঃ ।

         ওম রায়স সন্তু জরদষ্টয়ঃ ।।

 

         ওম মায়োভব্যাস চতুষ্পদী ভব,

         বিষ্ণুস্ত্বা নয়তু পুত্রান বিন্দাবহৈ,

         বহূং স্তে সন্তু জরদষ্টয়ঃ ।

         ওম মায়োভব্যাস জরদষ্টয়ঃ ।।

 

         ওম প্রজাভ্যঃ পঞ্চপদী ভব,

         সা মামনুব্রতা ভব,

         বিষ্ণুস্ত্বা নয়তু পুত্রান বিন্দাবহৈ,

         বহূং স্তে সন্তু জরদষ্টয়ঃ ।

         ওম প্রজাভ্যঃ সন্তু জরদষ্টয়ঃ ।।

 

         ওম ঋতুভ্যঃ ষষ্টপদী ভব,

         বিষ্ণুস্ত্বা নয়তু পুত্রান বিন্দাবহৈ

         বহূং স্তে সন্তু জরদষ্টয়ঃ ।

         ওম ঋতুভ্যঃ সন্তু জরদষ্টয়ঃ ।।

 

         ওম সখে সপ্তপদী ভব,

         সা মামনুব্রতা ভব,

         বিষ্ণুস্ত্বা নয়তু পুত্রান বিন্দাবহৈ,

         বহূং স্তে সন্তু জরদষ্টয়ঃ ।

         ওম সখে জরদষ্টয়ঃ গা ।।

 

—বুঝলুম না স্যার । সংস্কৃত বইয়ের স-ও দেখিনি কখুনো ।

—এটা বিয়ের মন্ত্র, যা আগুনের চারিধারে বর-বউ ঘোরার সময়ে বর উচ্চারণ করে । বউয়ের দায়িত্ব নেবার মন্ত্র । সপ্তপদী শুনেছ তো, তার মন্ত্র । আমি নিজের বিয়েতে পুরুতের কথামতো এই মন্তর আউড়ে ছিলাম, আজকে ভালোভাবে পড়ে বুঝতে পারলাম । তোমার নানুদিকে উনি নিশ্চয় জানিয়েছিলেন যে এটা বিয়ের মন্ত্র ।

—আচ্ছা, তাই কাকা মারা যাবার পরে নানুদি এক কপি নিজের টিনের সুটকেসে যত্ন করে রেখেচে । আর কাকার ঘরে টোপোর-মুকুটও আচে একটা তাকের ওপরে । নানুদি কাকাকে টোপর পরিয়ে, নিজে মুকুট পরে, হুইল চেয়ার ঘোরাতো, তখুন অতো খেয়াল করিনি যে কাকার ছুটির দিনে চান করাবার আগে দুজনে মিলে বিয়ে করত টোপোর-মুকুট পরে ।

—নানুদি তোমার টাকা নেন না তো সংসার চলে কেমন করে ?

—কাকা ওনার বীমা, পেনসনের আর প্রভিডেন্ট ফাণ্ডের নমিনি করে গিসল নানুদিকে, ভাগ্যিস কাকার বডি পাওয়া গিসল, তাই তো ক্লেম করতে পারলো নানুদি ।

—বডি ? কী করে ? তুমি বলছ রাতে নৌকোয় চাপিয়ে মাঝনদীতে ফেলে দেয়া হয়েছিল । স্টিলের চেয়ারে বাঁধা বডি, ভেসে ওঠার তো কথা নয় ।

—সেও এক ভগবানের ম্যাজিক স্যার ।

—ভগবানের ম্যাজিক ?

—পরের দিন সকালে একটা ভুটভুটির মেশিন ফেটে গিয়ে কেলেঙ্কারি হয়েছিল । কাটা তেল মিলিয়ে চালায়, কখুন যে ফাটে কেউ বলতে পারে ?

—তারপর ?

—যারা সাঁতার জানতো তারা সাঁতরে পারে উটে যেতে পেরেছিল কিন্তু বেশ কয়েকজন বউ আর বাচ্চা তলিয়ে গিসল । তাদের খোঁজে ডুবুরি নাবল । ডুবুরিরা সবচেয়ে আগে কাকার বডিটাই তুলে আনল । পুলিশের নথিতে লেখা আছে যে কাকাও ওই ভুটভুটি করে যাচ্ছিল । ভালোই হল, কি বলুন ? কেন যে দড়ি বাঁধা তা আর কেউ জিগ্যেস করলে না ; করলে নিজেরাই বিপদে পড়ত । আত্মহত্যা বলেও চালাতে পারেনি বীমা কোম্পানি ; বীমার টাকাটা ব্যাংকে রেখেচে নানুদি, তারও সুদ পায় ।

—নানুদি রোজগার করে তোমাকে খাওয়াচ্ছেন তাহলে ।

—না, স্যার, আমি এখানে থাকি না, আমার নিজের ডেরা আচে, এখেনে আপনার সঙ্গে কথা বলার জন্য ডেকেছিলুম । নিরিবিলি পাড়া, বাড়িতেও কোনো কিচাইন নেই ।

—থ্যাংক ইউ, তুমি এই কনট্র্যাক্টটায় সই করে দাও, তোমার জীবনী লেখার গল্পের সত্ত্ব আমাকে দিচ্ছ, আর কেউ লিখতে পারবে না ।

—একটু হিরোগিরি দেখাবেন স্যার ; আমার কয়েকটা ফোটো আছে, দিচ্ছি আপনাকে । কিছু কেচ্ছা জুড়ে দেবেন, কাটবে তাহলে, বিকোবেও ভালো ।

—হ্যাঁ, দেখাবো, রবীন্দ্রনাথকে নিয়েই  গাঁজাখুরি উপন্যাস লিখে বাজার মাৎ করছে লিখিয়েরা । তোমার রোগের তো একটা নাম দিতে হবে, দেবো খুঁজেপেতে একখানা ।

 

         

     

 

         

 

About anubadak

আমি একজন অনুবাদক । এতাবৎ রেঁবো, বদল্যার, ককতো, জারা, সঁদরা, দালি, গিন্সবার্গ, লোরকা, ম্যানদেলস্টাম, আখমাতোভা, মায়াকভস্কি, নেরুদা, ফেরলিংঘেট্টি প্রমুখ অনুবাদ করেছি ।
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s