ঢুঢু : মলয় রায়চৌধুরীর নভেলা

উৎসর্গ : উদয়ন ঘোষের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধায়

ওনারা আউলা-বাউলা, ওনারা ফড়িঙচাঁদের দল, এক প্রাণবায়ুর সঙ্গে আরেকের ফারাক নেই । চারখানা ফিনফিনে ডানা মেলে ফড়িংচাঁদরা গাইতে গাইতে উড়ছিলেন, উড়তে উড়তে গাইছিলেন, মহাকাশে, ব্ল্যাক হোলের ভেতর থেকে বেরিয়ে, সারা গায়ে  ব্ল্যাক হোলের প্রভায় জ্যোতির্ময় ধুলো, ফলে গানের শব্দগুলোতেও আলো ঝরছিল, কালো কুচকুচিয়া আলো । আগে ওনাদের নাম ছিল গঙ্গাফড়িং ; গঙ্গা তো আর নেই, চাঁদ আছে, ফলে ওনাদের ডানাকাঁপানো সমবেত গান, যেমনভাবে প্রাণবায়ুরা কাঁপতো ইতিহাসের ভেতরে বসবাসের সময়ে । সৌরসংসার তো খাল্লাস, এখন সাম্যবাদ ভালো না আউলা-বাউলা ভালো চিন্তায় বেরিয়ে পড়েছেন ব্রহ্মাণ্ড নিখিলে । চাই ভালো নাকি কিছুই চাই না ভালো ?

ওনারা বেস্পতি  গ্রহের পাশ দিয়ে যাবার সময়ে এই গানখানা গাইছিলেন–

ভালোবাসো

ভালোবাসো ভালোবাসো ভালোবাসো

আমাকে গভীরভাবে ভালোবাসো

আরও আরও বেশি ভালোবাসো

ভালোবাসো ভালোবাসো ভালোবাসো

কিন্তু স্পর্শ কোরো না কখনও কোনোদিন

স্পর্শ করলে ঘাম লালা রক্তের ক্লেদ হবে প্রেম

স্পর্শ করলেই ভালোবাসা সংসারের আবর্তে পড়ে যাবে

স্পর্শ করলেই প্রেম চাল-ডাল-তেলে ফেঁসে যাবে

স্পর্শ করলেই প্রেম হাঁটু আর কোমরের ব্যথা হয়ে যাবে

ত্বকের ঔজ্বল্য শেষ আর পুরোনো হয়ে যাবে

তোমার শ্বাস-প্রশ্বাসও দূরে-দূরে থাক

কখনও লিখো না চিঠি কিংবা ইশারা কোরো না

ভালোবাসো আমি চাই তীব্র ভালোবাসা দাও

তাই শুধু ভালোবাসো গভীরভাবে ভালোবাসো

পৃথিবীর ইতিহাস শেষ হয়ে গেছে কামড়া-কামড়ি ঝগড়াঝাঁটি কাড়াকাড়ি খেয়োখেয়ি ধোঁয়াধোঁয়ি বোমাবুমি করে । তা করলে কী হবে ! সৌরসংসারে গ্রহের সংখ্যা আটটা থেকে  বেড়েই চলেছে ; কে জানে হয়তো আবার ইতিহাস শুরু হলে শয়ে-শয়ে গ্রহ আর গ্রহের ফেরে পড়বে প্রাণবায়ুরা। সূর্য থেকে বাইরের দিকে গেলে প্রথম চারটে গ্রহ দুনিয়ার মতন, মানে, বুধ, শুক্র, পৃথিবী আর মঙ্গল। এর পর চারটে গ্যাসছাড়া দানব: বেস্পতি, শনি, ইউরেনাস আর নেপচুন, চোপরঘণ্টা গ্যাস ছাড়ে, ইতিহাসের সময়কার দার্শনিকদের মতন । এর মধ্যে ছটা গ্রহেরই এক বা একের বেশি চামচা আছে, যাদের বলে উপগ্রহ ; তাদের গ্যাস কিন্তু গ্যাসীয় নয়, বকবকিয় । এর পাশাপাশি ছটা বামন গ্রহ, এছাড়া আরও অনেকগুলো বামন গ্রহ অপেক্ষা করছে দলে ঢুকে পড়ার, আর  হাজার হাজার ছুটকো সৌরসাংসারিক মাল তো আছেই। এখন পৃথিবীর ইতিহাস শেষ হয়ে যাবার পর  গঙ্গা-নামহীন ফড়িঙদল বেরিয়ে পড়েছিল এই ভেবে যে  নানা গ্রহের প্রাণবায়ুদের গান শুনিয়ে আবার যাতে ইতিহাস আরম্ভ করা যায় । এখন ওনারা ফড়িংচাঁদ আউলা-বাউলা, ভালোবাসায় ফুরফুরে ।

ফড়িংচাঁদরা জানেন, বেস্পতি চারটে পেল্লাই গ্যাসীয় দানবের একটা, মানে এটা প্রাথমিকভাবে কঠিন মালমশলা দিয়ে তৈরি নয়। সৌর জগতের সবচেয়ে পেল্লাই এই গ্রহের ব্যাস বিষুবরেখা বরাবর ১৪২,৯৮৪ কিমি। এর ঘনত্ব ১.৩২৬ গ্রাম প্রতি সেন্টিমিটার যা গ্যাসীয় দানবগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। অবশ্য  যেকোন গ্রহ থেকে এর ঘনত্ব কম। গ্যাসীয় দানবগুলোর মধ্যে নেপচুনের ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি । বেস্পতির বায়ুমণ্ডলের ওপরটায় গাঠনিক উপাদানের মধ্যে রয়েছে পরমাণু সংখ্যার দিক দিয়ে ৯৩% হাইড্রোজেন ও ৭% হিলিয়াম। আর গ্যাস অণুসমূহের ভগ্নাংশের দিক দিয়ে ৮৬% হাইড্রোজেন ও ১৩% হিলিয়াম।  হিলিয়াম পরমাণুর ভর যেহেতু হাইড্রোজেন পরমাণুর ভরের চারগুণ তাই বিভিন্ন পরমাণুর ভরের অনুপাত বিবেচনায় আনা হলে শতকরা পরিমাণ বদলে যায় ফলে বেস্পতির বায়ুমণ্ডলের গাঠনিক উপাদানের অনুপাত দাড়ায় ৭৫% হাইড্রোজেন, ২৪% হিলিয়াম এবং বাকি ১% অন্যান্য মৌল। অন্যদিকে ভেতরটা খানিকটা ঘন। এ অংশে রয়েছে ৭১% হাইড্রোজেন, ২৪% হিলিয়াম আর ৫% অন্যান্য মৌল। এছাড়া বায়ুমণ্ডল গঠনকারী অন্যান্য মৌলের মধ্যে ।

ইতিমধ্যে ফড়িংচাঁদের দল ফিসফিসানো কথা শুনতে পেলেন, কেমন যেন চেনা-চেনা—

অমিত একটুখানি চুপ করে থেকে বললে, ‘ লাবণ্য কি এ খবর জেনেছে?’

‘না, আমি তাকে লিখি নি। তোমার মুখে পাকা খবর পাই নি বলে চুপ করে আছি।’

খবরটা সত্যি, কিন’ লাবণ্য হয়তো বা ভুল বুঝবে।’

যতি হেসে বললে, ‘ এর মধ্যে ভুল বোঝবার জায়গা কোথায়? বিয়ে কর যদি তো বিয়েই করবে, সোজা কথা।’

‘দেখো যতি, মানুষের কোনো কথাটাই সোজা নয়। আমরা ডিক্‌শনারিতে যে কথার এক মানে বেঁধে দিই মানব জীবনের মধ্যে মানেটা সাতখানা হয়ে যায় সমুদ্রের কাছে এসে গঙ্গার মতো।’

যতি বললে, ‘অর্থাৎ তুমি বলছ বিবাহ মানে বিবাহ নয়?’

‘ আমি বলছি বিবাহের হাজারখানা মানে। মানুষের সঙ্গে মিশে তার মানে হয়, মানুষকে বাদ দিয়ে তার মানে বের করতে গেলইে ধাঁধা লাগে।’

‘ তোমার বিশেষ মানেটাই বলো-না।’

‘ সংজ্ঞা দিয়ে বলা যায় না, জীবন দিয়ে বলতে হয়। যদি বলি ওর মুল মানেটা ভালোবাসা তা হলেও আর একটা কথায় গিয়ে পড়ব; ভালোবাসা কথাটা বিবাহ কথার চেয়ে আরো বেশি জ্যান-।’

‘ তা হলে, অমিতদা, কথা বন্ধ করতে হয়ে যে। কথা কাঁধে নিয়ে মানের পিছন পিছন ছুটব, আর মানেটা বাঁয়ে তাড়া করলে ডাইনে আর ডাইনে তাড়া করলে বাঁয়ে মারবে দৌড়, এমন হলে তো কাজ বুজে কাজ চালিয়ে নেওয়া যায়।’ ‘ তবে কি আজকের কথাটাকে একেবারে খতম করতে হবে।’

‘ এই আলোচনাটা যদি নিতান-ই জ্ঞানের গরজে হয়, প্রাণের গরজে না হয়, তা হলে খতম করতে দোষ নেই।’

‘ ধরে নাও-না প্রাণের গরজেই।’

‘ শাবাশ, তবে শোনো।’

এই খানে একটু পাদটীকা লাগলে দোষ নেই। অমিতর ছোটো বোন লিসির স্বহস্তে ঢালা চা যতি আজকাল মাঝে মাঝে প্রায়ই পান করে আসছে। অনুমান করা যেতে পারে যে, সেই কারনেই ওর মনে কিছুমাত্র ক্ষোভ নেই যে, অমিত ওর সঙ্গে অপরাহ্নে সাহিত্যলোচনা এবং সায়াহ্নে মোটরে করে বেড়ানো বন্ধ করেছে। অমিতকে ও সর্বন-ঃকরণের ক্ষমা করেছে।

অমিত বললে, ‘ অক্সিজেন এক ভাবে বয় হাওয়ায় অদৃশ্য থেকে, সে না হলে প্রাণ বাঁচে না, আবার অক্সিজেন আর-এক ভাবে কয়লার সঙ্গে যোগে জ্বলতে থাকে, সেই আগুন জীবনের নানা কাজে দরকার-দুটোর কোনোটাকেই বাদ দেওয়া চলে না। এখন বুঝতে পেরেছ?’

‘ সম্পূর্ণ না, তবে কিনা বোঝা বার ইচ্ছে আছে।’

‘ যে ভালোবাসা ব্যাপ্তভাবে আকাশে মুক্ত থাকে অন্তরের মধ্যে সে দেয় সঙ্গ; যে ভালোবাসা বিশেষ ভাবে প্রতিদিনের সব-কিছুতে যুক্ত হয়ে থাকে সংসারে সে দেয় আসঙ্গ। দুটোই আমি চাই।’

‘ তোমার কথা ঠিক বুঝছি কি না সেইটেই……

একজন ফড়িংচাঁদ হেঁড়ে ডানায় বলল, এই ফিসফিসানি কোনও গানওয়ালার ছিল, তিনি বেস্পতিতে থাকেন, সারা গায়ে গ্যাসের আলখাল্লা পরে, ওনার গ্যাস চুরি হয়ে গেছে, জমিজমাও নাকি বেহাত হয়ে যাচ্ছে, ধুমকেতুরা পোঁদে নীল আলো জ্বেলে হাতিয়ে নিচ্ছে, এর আগের পোঁদে লাল-আলো ধুমকেতুরা কোপ মেরে খেপ ফেলতে পারেনি । 

ফড়িংচাঁদরা জানেন, বেস্পতি গ্রহ সূর্য থেকে দূরত্বের দিক দিয়ে পাঁচ নম্বরে আর আকার আয়তনের দিক দিয়ে সৌরজগতের সবচেয়ে বড়ো গ্রহ। বেস্পতি ছাড়া সৌরজগতের বাকি সবগুলো গ্রহের ভরকে এক করলে বেস্পতির ভর তা থেকে আড়াই গুণ বেশি হবে। বেস্পতিকে নিয়ে আরও তিনটে গ্রহ মানে শনি, ইউরেনাস এবং নেপচুনকেও গ্যাস দানব বলা হতো, এখন ফড়িংচাঁদের মতন পালিয়ে-বাঁচা প্রাণবায়ুরা সেই কথাইও বলে থাকেন। এই চারটের অন্য ফড়িংপ্রিয় নাম হলো জোভিয়ান গ্রহ। জোভিয়ান শব্দটা জুপিটার শব্দের বিশেষণ তা জানেন ফড়িংচাঁদ। জুপিটারের গ্রিক প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হতো জিউস। এই জিউস থেকেই জেনো ; জিউস নামের প্রাণবায়ুর কেলোর কিত্তি জানতে বাকি নেই ফড়িংচাঁদের । এই মূল থেকে বেশ কিছু জুপিটার বা বেস্পতিগ্রহ সংশ্লিষ্ট শব্দ তৈরি হয়েছিল। যেমন: জেনোগ্রাফিক। পৃথিবী থেকে দেখলে বেস্পতির আপাত মান পাওয়া যেতো ২.৮। এটা  আকাশে দেখতে পাওয়া তিন নম্বর ঝলমলে জ্যোতিষ্ক। কেবল চাঁদ আর শুক্র গ্রহের উজ্জ্বলতা এর থেকে বেশি, যেমনটা হতো প্রাণবায়ুদের শুক্রকীটের । অবশ্য কক্ষপথের কিছু বিন্দুতে মঙ্গলগ্রহের ঝলমলানি  বেস্পতির চেয়ে বেশি । আদিকাল থেকেই গ্রহটা জ্যোতির্বিজ্ঞানী আর জ্যোতিষীদের কাছে পরিচিত ছিল, যখন তাঁরা পাহাড়ের গুহায় ল্যাংটো-জীবন কাটাতেন। প্রাণবায়ুদের নানা পৌরাণিক কাহিনি আর ধর্মীয় বিশ্বাসও ঘুরপাক খেতো বেস্পতিকে নিয়ে । রোমানরা, সেই যারা যিশু নামের একজন দেবতার কাঠফাঁসি দিয়েছিল, গ্রহটার নাম রেখেছিল পৌরাণিক চরিত্র জুপিটারের নামে। জুপিটার রোমান পুরাণের প্রধান দেবতা। এই নামটা প্রাক-ইন্দো-ইউরোপীয় ভোকেটিভ কাঠামো থেকে এসেছে যার অর্থ ছিল আকাশের বাবা ।

আকাশের বাবা ! তাই ফড়িংচাঁদরা এই বাপের পাশ দিয়েই সবচেয়ে আগে উড়ছিলেন ।

খুব তাড়াতাড়ি ঘোরে বলে বেস্পতির চেহারা কমলালেবু-ছাপ, বিষুবের কাছে ছোট্ট, চোখে পড়ার মত উল্লেখযোগ্য একটি স্ফীতি অংশ রয়েছে। বাইরের বায়ুমণ্ডল বিভিন্ন অক্ষাংশে বিভিন্ন ব্যান্ডে ভাগ করা যেগুলো বেশ সহজেই চোখে পড়ে। এ কারণে একটি ব্যান্ডের সাথে অন্য আরেকটি ব্যান্ডের সংযোগস্থলে ঝড়-ঝাপট আরাম করে। ঠিক যেমনটা পৃথিবীতে গান-বাজনার ব্যাণ্ডগুলো করত । এ ধরনের পরিবেশের  অন্যতম ফলাফল হচ্ছে মহা লালবিন্দু । এটি মূলত একটি অতি শক্তিশালী ঝড় যা সপ্তদশ শতাব্দী থেকে একটানা বয়ে চলেছে, লেনিন-স্তালিন-মাও তেমনটাই তো বলে গেছেন, কিন্তু ওনারা ঝড়টাকে কাবু করার আগে ঝড়টাই ওনাদের কাবু করে ফেলেছিল, ফড়িংচাঁদ জানেন আর আপশোষ করেন। গ্রহটাকে ঘিরে একখানা রোগাটে গ্রহীয় বলয় আর পালোয়ান ম্যাগনেটোস্ফিয়ার রয়েছে। সর্বশেষ খবর, অ্যাঙ্করদের মতে, বেস্পতির রয়েছে ৭৯টে উপগ্রহ, যাদের মধ্যে ৪টে উপগ্রহ পেল্লাই আকৃতির। এই চারটেকে গ্যালিলীয় উপগ্রহ বলা হতো। কারণ ১৬১০ সালে গ্যালিলিও প্রথম এই চারটে উপগ্রহ আবিষ্কার করেছিলেন। সবচেয়ে বড়ো উপগ্রহ গ্যানিমেডের চেহারা বুধ গ্রহের চেয়েও পেল্লাই । বিভিন্ন সময় বেস্পতি গবেষণার উদ্দেশ্যে মহাশূন্য অভিযান হয়েছে, এই এখন ফড়িংচাঁদ যেমন করছেন। পাইওনিয়ার আর ভয়েজার প্রোগ্রামের মহাশূন্যযানগুলো এর পাশ দিয়ে উড়ে গেছে, এখন ফড়িংচাঁদ যেমন গাইতে গাইতে উড়ছেন। 

ফড়িংচাঁদরা যেদেশে থাকতেন, বেস্পতি নামটা সেখানকার ।  এর সঙ্গে নির্দেশ করা হতো বিভিন্ন যুগের সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন রচনায় খেলানো পৌরাণিক চরিত্রকে। সে দেশের সনাতন সাহিত্যমতে বেস্পতি তাদের বৈদিক যুগের একজন ঋষি, যিনি দেবতাদের পরামর্শ দিতেন।  মধ্যযুগের বইতে এই বেস্পতি গ্রহকেও ইঙ্গিত করত।   বৈদিক বইতে উনি হলেন বাগ্মিতার দেবতা, আর কখনও কখনও তাঁকে অগ্নিদেবতার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলতো প্রাণবায়ুরা।ঋগবেদে লিখেছিল, কে যে লিখেছিল কে জানে, পৃথিবীর প্রথম উজ্জ্বল আর পবিত্র মহাআলোক থেকে বেস্পতির জন্ম যিনি সব অন্ধকার দূর করে দ্যান ।  কোথাও কোথাও তার মূর্তি দেখেছে ফড়িংচাঁদ, হাতে দন্ড ও পদ্ম আর জপমালা, আরেকটা পুরাণে প্রাণবায়ুরা লিখেছিল বেস্পতি তারাকে বিয়ে করেছিলেন আর সেই তারাকে নাকি চাঁদ কিডন্যাপ করে একটা ছেলে পয়দা করে তার নাম বুধ। ব্রহ্মা চাঁদের উপর চাপ দিয়ে তারাকে তাঁর স্বামী বেস্পতির কাছে ফিরিয়ে দিতে বাধ্য করেন। ফড়িংচাঁদরা কুলকিনারা পান না যে এতো পাওয়ারফুল হয়েও বেস্পতি কেন বদলা নেয়নি । প্রাণবায়ুদের জীবনে নাকি বেস্পতির  প্রভাব থাকতো। এই প্রভাব অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভালো হতো। বেস্পতি গ্রহের কৃপায় প্রাণবায়ুরা  সবাই বেঁচে থাকতো। বেস্পতির মায়ের নাম শ্রদ্ধা, আর শ্রদ্ধা হলো কর্দম ঋষির তৃতীয় মেয়ে । তাঁর বিয়ে  হয়েছিল অঙ্গিরা ঋষির সঙ্গে। তাঁর বোন যোগসিদ্ধা। প্রাণবায়ুদের জন্ম পত্রিকাতে যে স্থানে বেস্পতি থাকত, সেই স্থানে ক্ষতি করত। কিন্তু যে স্থানে দৃষ্টি দিতো সেই ভাবে শুভ ফল দিতো। বেস্পতি যদি লগ্ন ভাবে বসত, তা হলে জন্মকুণ্ডলীতে সমস্ত দোষ দূর করে দিতে পারত। বৃহস্পতি পঞ্চম, সপ্তম, নবম ভাবে পূর্ণ দৃষ্টি থাকত। দ্বিতীয়, পঞ্চম, দশম, একাদশ ভাবের কারকত্ব। কর্দম থেকে শ্রদ্ধা, বাহ, বাহ, মারহাব্বা ।

ফড়িংচাঁদরা জানেন জ্যোতিষে বেস্পতি বাকপটুতা, দেবস্থান, কর্মযোগ, মাঙ্গলিক কাজ, কর্তব্য, বাহন, কীর্তি, প্রতাপ, ধর্ম, শিক্ষা, স্বর্ণ, পুত্র, মন্ত্র,অন্তরজ্ঞান, রাজতন্ত্র, প্রবচন কারী, লেখক, প্রকাশক, রাজ্যসুখ, রাজকৃপা, সচিব, শারিরিক পুষ্টতা, রত্ন ব্যবসায়ি, ন্যায় বান,  আধ্যাত্মিকতা, রাজনীতি, উচ্চাভিলাস, শিক্ষক, অধ্যাপক, সুসজ্জিত বাহন, সুখদায়ক নিবাস, পুত্র কারক, উকিল, ন্যায়ধিস। নবগ্রহের মধ্যে বৃহস্পতি অত্যাধিক গুরুত্বপূর্ণ। এই গ্রহ জাতকের জীবনে শুভতা ও সুখ দিতো । বেস্পতিকে দেবগুরু বলে। সমস্ত দেবতার পূজনীয়। বেস্পতি যদি জন্ম পত্রিকাতে ভাল থাকে, তা হলে পত্রিকার সমস্ত বিপত্তি দূর করে। বেস্পতিকে ধন, জ্ঞান, সম্মান, সন্তান ইত্যাদির কারক মনে করা হতো। বেস্পতির মূল্যায়ন না করে কোনও ফলাদেশ করা সম্ভব ছিল না। স্কন্ধপুরাণ অনুসারে, প্রভাস তীর্থে গিয়ে বেস্পতি শিবঠাকুরের কঠোর তপস্যা করেন। তখন তার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে তাকে দেবগুরু অকাদেমি পুরস্কার দেন শিবঠাকুর । বেস্পতিকে আবার আগুনের অবতার মনে করা হতো। বৃহস্পতি বলবান হলে জাতক মন্ত্রী পদ পেতো, নিদেন এমপি-এমেলে তো হতোই। কর্কটরাশিতে বৃহস্পতি উচ্চ। শুক্রর পর সবচেয়ে শুভ গ্রহ বেস্পতি। বেস্পতি অশুভ থাকলে জাতককে গোটা জীবন সংঘর্ষ করতে হতো। এই জাতক পূর্ব জীবনের অশুভ ফলভোগের জন্য জন্ম নিতো । বেস্পতির চাউনি দিয়ে অমৃত বৃষ্টি হতো। বেস্পতি লগ্নে বা রাশিতে থাকলে জাতক তাঁদের জীবনে লক্ষ্য স্থির রেখে গভীর আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কঠোর পরিশ্রম করে।

বেস্পতি গ্রহকে একবার পাক খেয়ে পরের পাকে উড়তে-উড়তে ফড়িঙচাঁদরা  যে গানটা ধরেছিলেন সেটা এরকম—

ধন্য ধন্য বলি তারে

বেঁধেছে এমন ঘর

শূন্যের উপর ফটকা করে

সবে মাত্র একটি খুঁটি

খুঁটির গোড়ায় নাইকো মাটি,

কিসে ঘর রবে খাঁটি

ঝড়ি-তুফান এলে পরে

মূলাধার কুঠরি নয় টা

তার উপরে চিলে-কোঠা

তাহে এক পাগলা বেটা

বসে একা একেশ্বরে

উপর নীচে সারি সারি

সাড়ে নয় দরজা তারি

লালন কয় যেতে পারি

কোন্‌ দরজা খুলে ঘরে

—আহা, এই ভাষা শুনিনি গো, গ্যাসের তৈরি একটা প্রাণবায়ু গ্যাসীয় ভাষায় বলল ।

—সত্যি, কতোদিন হয়ে গেল, বিনা গ্যাসের প্রাণী দেখিনি । গ্যাস মেরে মেরে প্রাণীদের নাকি দুনিয়া থেকে হাপিস করে দেয়া হয়েছে ।

—তা, তোমায় এরকম দেখতে কেন, তোমাদের ইতিহাস ফুরোবার পর সবাই কি এরকম হয়ে গেছে, জানতে চাইল একজন দেহাতি গ্যাস-বউ ।

—একজন ফড়িঙ বলল, আমাদের ইতিহাস শেষ হয়ে যাবার পর শুধু আমরাই টিকে আছি । বাকি সবাই কামড়া-কামড়ি ঝগড়াঝাঁটি করে ধুলো-ধোঁয়া হয়ে উবে গেছে । আমাদের ছোটো ভাইরা আছে অবশ্য, উচ্চিংড়ে, আরশোলা, ঝিঁঝি, গুবরে, তাও বিনা ডানার ; আমাদের ডানা টিকে গেছে বলে গ্রহে-গ্রহে ট্যুর করতে বেরিয়েছি ।

—সেই মালগুলো নেই, সেই যারা নানা গ্রহে ঢুকে মাল কামাবার তালে ছিল,  ইতর প্রাণবায়ু ?

—ধুমকেতুদের কথা বলছ ? তাদের কিছুকিঞ্চিত টিকে আছে এদিকে-সেদিকে, কিন্তু আগেকার মতন আর চেনার উপায় নেই, কখনও তাদের পোঁদ থেকে লাল আলো বেরোতো, কখনও নীল, আর এখন তো কয়েকটার কমলা রঙের আলো বেরোয়, বলল ঢ্যাঙা ফড়িঙ ।

—কেন ? জানতে চায় একজন গ্যাসীয় আত্মা । 

—তাদের কারোর এখন হাতের জায়গায় পা, পেটের জায়গায় পোঁদ, মুখের জায়গায় নুনু কিংবা গুদ, চোখের জায়গায় নাক । বিবর্তন গো বিবর্তন । এতো নোংরা করে দিয়েছিল যে জঙ্গলগুলোতে আগুন লেগে গেল, বরফের চাঙড় গলে পাহাড়দের ডুবিয়ে ফেললে, সমুদ্র হয়ে গেল ফেলে দেয়া প্লাসটিক, কনডোম আর চটচটে তেলে চোরাপাঁক । থাকা যায় না সেখানে ।

—অ ! তা এখন কোথায় চললে ? 

—তোমাদের তো গান শোনালুম ; সেটা সব রকমের গ্যাস মিলেমিশে গেয়ো । 

—কিন্তু তোমরা নিজের সম্পর্কে কিছু বললে না তো, এক গ্যাস-যুবতী জানতে চাইল ।

একজন পুংবাউল ফড়িংচাঁদ বলতে লাগল, নিজের সম্পর্কে, গভীর অন্ধকারের ঘুম থেকে নদীর চ্ছল চ্ছল শব্দে জেগে উঠলাম আবার; তাকিয়ে দেখলাম পাণ্ডুর চাঁদ বৈতরণীর থেকে তার অর্ধেক ছায়া গুটিয়ে নিয়েছে যেন কীর্তিনাশার দিকে। ধানসিড়ি নদীর কিনারে আমি শুয়েছিলাম— পউষের রাতে—কোনোদিন আর জাগবো না জেনে কোনোদিন জাগবো না আমি— কোনোদিন জাগবো না আর— হে নীল কস্তুরী আভার চাঁদ, তুমি দিনের আলো নও, উদ্যম নও, স্বপ্ন নও, হৃদয়ে যে মৃত্যুর শান্তি ও স্থিরতা রয়েছে, রয়েছে যে অগাধ ঘুম, সে-আস্বাদ নষ্ট করবার মতো শেলতীব্রতা তোমার নেই, তুমি প্রদাহ প্রবহমান যন্ত্রণা নও— জানো না কি চাঁদ, নীল কস্তুরী আভার চাঁদ, জানো না কি নিশীথ, আমি অনেক দিন— অনেক অনেক দিন, অন্ধকারের সারাৎসারে অনন্ত মৃত্যুর মতো মিশে থেকে, হঠাৎ ভোরের আলোর মূর্খ উচ্ছ্বাসে নিজেকে পৃথিবীর জীব ব’লে বুঝতে পেরেছি আবার; ভয় পেয়েছি, পেয়েছি অসীম দুর্নিবার বেদনা; দেখেছি রক্তিম আকাশে সূর্য জেগে উঠে মানুষিক সৈনিক সেজে পৃথিবীর মুখোমুখি দাঁড়াবার জন্য আমাকে নির্দেশ দিয়েছে ।

আরেকজন পুংফকির বলল, আফিমের ঝোঁকে মনে করিলাম, পতঙ্গের ভাষা কি বুঝিতে পারি না? কিছুক্ষণ কান পাতিয়া শুনিলাম—কিছু বুঝিতে পারিলাম না। মনে মনে পতঙ্গকে বলিলাম, “তুমি কি ও চোঁ বোঁ করিয়া বলিতেছ, আমি কিছু বুঝিতে পারিতেছি না।” তখন হঠাৎ আফিম প্রসাদাৎ দিব্য কর্ণ প্রাপ্ত হইলাম—শুনিলাম, পতঙ্গ বলিল, “আমি আলাের সঙ্গে কথা কহিতেছি—তুমি চুপ কর।” আমি তখন চুপ করিয়া পতঙ্গের কথা শুনিতে লাগিলাম। পতঙ্গ বলিতেছে— দেখ, আলাে মহাশয়, তুমি সে কালে ভাল ছিলে—পিতলের পিলসুজের উপর মেটে প্রদীপে শােভা পাইতে—আমরা স্বচ্ছন্দে পুডিয়া মরিতাম। এখন আবার সেজের ভিতর ঢুকিয়াছ—আমরা চারি দিকে ঘূরে বেড়াই—প্রবেশ করিবার পথ পাই না, পুড়িয়া মরিতে পাই না। দেখ, পুড়িয়া মরিতে আমাদের রাইট আছে—আমাদের চিরকালের হক্‌। আমরা পতঙ্গজাতি, পূর্ব্বাপর আলােতে পুড়িয়া মরিয়া আসিতেছি—কখন কোন আলাে আমাদের বারণ করে নাই। তেলের আলাে, বাতির আলাে, কাঠের আলাে, কোন আলাে কখন বারণ করে নাই। তুমি কাচ মুড়ি দিয়া আছ কেন, প্রভু? আমরা গরিব পতঙ্গ—আমাদের উপর সহমরণ নিষেধের আইন জারি কেন? আমরা কি হিন্দুর মেয়ে যে, পুড়িয়া মরিতে পাব না? দেখ, হিন্দুর মেয়ের সঙ্গে আমাদের অনেক প্রভেদ। হিন্দুর মেয়েরা আশা ভরসা থাকিতে কখন পুড়িয়া মরিতে চাহে না—আগে বিধবা হয়, তবে পুড়িয়া মরিতে বসে। আমরাই কেবল সকল সময়ে আত্মবিসর্জ্জনে ইচ্ছুক। আমাদের সঙ্গে স্ত্রীজাতির তুলনা? আমাদিগের ন্যায়,, স্ত্রীজাতিও রূপের শিখা জ্বলিতে দেখিলে ঝাঁপ দিয়া পড়ে বটে। ফলও এক,—আমরাও পুড়িয়া মরি, তাহারাও পুড়িয়া মরে। কিন্তু, দেখ, সেই দাহতেই তাদের সুখ,—আমাদের কি সুখ? আমরা কেবল পুড়িবার জন্য পুড়ি, মরিবার জন্য মরি। স্ত্রীজাতিতে পারে? তবে আমাদের সঙ্গে তাহাদের তুলনা কেন? শুন, যদি জ্বলন্ত রূপে শরীর না ঢালিলাম, তবে এ শরীর কেন? অন্য জীবে কি ভাবে, তাহা বলিতে পারি না, কিন্তু আমরা পতঙ্গজাতি, আমরা ভাবিয়া পাই না, কেন এ শরীর?—লইয়া কি করিব?—নিত্য নিত্য কুসুমের মধু চুম্বন করি, নিত্য নিত্য বিশ্বপ্রফুল্লকর সূর্য্যকিরণে বিচরণ করি—তাহাতে কি সুখ? ফুলের সেই একই গন্ধ, মধুর সেই একই মিষ্টতা, সূর্যের সেই এক প্রকারই প্রতিভা। এমন অসার, পুরাতন বৈচিত্র্যশূন্য জগতে থাকিতে আছে? কাচের বাহিরে আইস, জ্বলন্ত রূপশিখায় গা ঢালিব।

এক মহিলা ফড়িং বললেন, এনার কথা শুনবেন না, কিচ্ছু মনে রাখতে পারেননি, সেই কবে আফিম খেয়ে ছিলেন, তার নেশা নাকি এখনও রয়েছে ; বলিহারি আত্মবিজ্ঞাপনের অলীক পদমসি ঢঙ ।

ইতিহাস লেখার শুরুতে ফড়িঙদের একসময় শয়তানের ছুঁচ বলে মনে করত মরূভূমির প্রাণবায়ুরা।  ফড়িঙরা দুষ্টু, অবাধ্য খোকাখুকুর মুখ সেলাই করে দেবে বলে  ভয় দেখাতো তারা, কেননা তাদের ছোটোবেলায় যে সব ভয় দেখানো হয়েছিল সেগুলো তারা নিজেদের ছেলে-মেয়েদের ধরিয়ে দিতো, যাতে তারা আবার তাদের ছেলেমেয়েদের ধরিয়ে দিতে পারে ; এই ধরিয়ে দেবার কায়দার নামই স্মৃতি, যাকে পরের প্রাণবায়ুরা বলত ইতিহাস । ইতিহাস লেখার শুরুতে, গ্রামের প্রাণবায়ুদের অনেকের ছোটোবেলার দিনগুলো কাটতো ছোট ফড়িঙের পেছনে ছুটে। সর্বদর্শী এই পরিচিত ফড়িঙ-গায়ক  সুপ্রাচীন হওয়ায়, এদের ঘিরে অনেক কিংবদন্তি চালু করেছিল প্রাণবায়ুরা। ফড়িঙ সম্বন্ধে আরেকটা কিংবদন্তি চালু ছিল যে, এই উড়ন্তজীবরা মরা সাপকে শ্বাস ফেলে বাঁচিয়ে দিতে পারে, কেননা ফড়িংরা পেছন দিয়ে শ্বাস নেয় ; সাপেরা তো আর জানতো না ফড়িঙ ওর শরীরের কোথা থেকে শ্বাস ছাড়ে ! কিংবদন্তিগুলো শুনতে বেশ মজার হলেও কোনোটাই ইতিহাসে ঢুকতে পারেনি। তবে ফড়িঙের ব্যাপারে বিজ্ঞানভিত্তিক আর জব্বর এমন অনেক খবর রয়েছে, যা গ্রহ-উপগ্রহগুলোর প্রাণবায়ুদের অনেকেরই অজানা। সেসব খবর গেয়ে বেড়াবার খাতিরে ফড়িঙের সৌরজগত ঘোরা।   ফড়িঙ একই সময়ে সামনে এবং পেছনে দেখতে পারে। যা অন্য প্রাণবায়ুরা সহজে পারত না। এই গঙ্গাফড়িং ডাইনোসরের যুগ থেকে, মানে ইতিহাসের আগে থেকে এখনও  বহাল তবিয়তে রয়েছে। ইতিহাসের মার খেয়ে সে আজকের  গঙ্গাফড়িঙ। সে  ভিন্ন দুনিয়া দেখতে পায় তার চোখের চাউনি মেলে । ইতিহাসের সময়ে সব রকমের প্রাণবায়ুরা সাধারন  আলো দেখতে পেতো। কিন্তু ফড়িঙ অতিবেগুনি রশ্মি পর্যন্ত দেখতে পারে। ইতিহাসের লোকজন যা দেখতে পেতো না। 

এক মোটাসোটা ফড়িঙচাঁদ গান ধরে । একটা ধুমকেতু চলে আসে কাছাকাছি । ফড়িঙ জানে ধুমকেতু উল্কা বা গ্রহাণু থেকে আলাদা কারণ এর মুণ্ডু আর পোঁদের আলো আছে। কিছু বিরল ধূমকেতু সূর্যের খুব কাছ দিয়ে বারবার ঘোরার  কারণে উদ্বায়ী বরফ আর ধুলো হারিয়ে ছোট গ্রহাণুর মতন জিনিসে পালটে যায় । ফড়িঙরা দেখলো অনেকগুলো ধুমকেতু একসঙ্গে জোট বেঁধেছে, মনে হয় মাস্তনের দল, এককালে ইতিহাসের নেতাদের চামচা ছিল, এখন লাৎ খেয়ে ধুমকেতুতে পালটে গেছে, নয়তো ধুমকেতুরা তো দল বেঁধে মিছিল করে না । বাঞ্চোৎরা নির্ঘাত দলবদলু।

—কী গাইছিস ফালতু ? মাথামুন্ডু নেই ! বলল এক ব্যাটা ধুমকেতু ।

—আরে শালা এই গানটা আমার জানা । ফড়িঙটা বিনা কপিরাইটে গাইছে ।

মোটা-ফড়িঙ বলল, স্যার, ইতিহাস শেষ হয়ে গেছে, দেখুনগে যান, এখন আর কপিরাইটের যুগ নেই, সেসব ছিল পুঁজিবাদের দিনকালে । আরেকটা কথা বলি, আপনাদের পোঁদ দিয়ে তো লাল আলো বেরোতো, নীল হয়ে গেল কেন ? এবারে কি কমলা রঙের আলো বেরোবে ? পাদের আলোর তো তেমনটাই বদগন্ধ !

মোটা-ফড়িঙের কথায় কান দিল না ধুমকেতুরা । ওরা নিজেদের নিয়ে রঙ্গে টইটুম্বুর ।

—এই, ওই বাঞ্চোৎটাকে দ্যাখ, হেলতে দুলতে আসছে, গাণ্ডুটা নিজেকে পালোয়ান ভাবে, নির্ঘাৎ ; দেবো নাকি একটা কিডনি পাঞ্চ ? আর কেড়ে নিই যা আছে মালকড়ি ? 

—না ।  কাড়াটা কিডনি পাঞ্চের সঙ্গে যা্য না । প্যাঁদানির ওটা হয়ে যাবে উদ্দেশ্য । আমাদের কোনো উদ্দেশ্য নেই । কিডনি পাঞ্চ দিসনি, গুগলুটা মোটা, অজ্ঞান হয়ে যাবে ।

—যদি ডজিঙ করে ?

—আচমকা দে । হাতের পেছন দিয়ে বোলো পাঞ্চ ।

—তাতেও খালাস হয়ে যেতে পারে ।

—লোকটা অক্কা পেলে সেটা আবার প্যাঁদানির পারপাস হয়ে দাঁড়াবে ।

—তাহলে, হেডবাট দিয়ে, একখানা হালকা হুক দিই ।

দশাসই ধুমকেতু  মারমুখি ফড়িঙে দলের সামনে ঠিক কী করবে বুঝে উঠতে না পেরে দৌড় লাগায় ।

—তোর নবখুড়োর সেই গানটা ধর, প্যাঁদানির আনন্দে একটু নেচে নিই । বলল এক আউলা ফড়িঙ ।

—ঝাড় দেবার বদলে নাচটা তো উদ্দেশ্য হবে দাঁড়াবে গাণ্ডু । আমাদের তো কোনও উদ্দেশ্য না থাকার কথা । কোনো অ্যাকশানের পারপাস থাকবে না, কেননা জীবনের পারপাস নেই । হ্যাঁ । আমরা সকলের মতন ধনীগ্যাসে যেতে পারতুম, সেখানকার ফুটানি মারার জন্য । কিন্তু তাতে কী হতো ? আমাদের জীবনের কিছু একটা উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়াতো ।

—কারেক্ট । স্বর্ণগ্যাস রোজগারের উদ্দেশ্য । আর শাদা চামড়ার সঙ্গে শোয়া ; তাদের তো বিয়ে করা যাবে না ; যতো বাঞ্চোৎ গেছে, বেশির ভাগ কালো কিংবা স্প্যানিশ বিয়ে করে খুঁটি গেড়েছে ।

—চোদাকে কেন যে জীবনের পরম উদ্দেশ্য করে তোলে গাণ্ডুগোবর্ধনগুলো, শালারা ঢোকাবার জন্যে মুখিয়ে থাকে ।

—সব ব্যাপারেরই পারপাস থাকে বুঝলি ! 

—তা নয় । ওটা একজন মানুষের সেলেকশানের গ্যাঁড়াকল । চেও না, ব্যাস ।

—তাহলে তুই তোর মাকে খুন করেছিলিস কেন ? মায়ের রক্ত দিয়ে দেয়ালে হাসিমুখের ইমোজি এঁকে ছিলিস কেন ।

—খুনটাকে নালিফাই করার জন্য ইমোজি এঁকেছিলুম রে । দ্যাখ, আমি মায়ের গা থেকে কোনো সোনাদানা খুলে নিইনি । ওসব আমার বাবা হাতিয়ে নিয়েছে, যেই জানতে পেরেছে যে মা খুন হয়েছে আর, দেয়ালে রক্তের ইমোজি এঁকে আমি কেটে পড়েছি ।

—তোর ড্যাড তো ডিআইজি । শালা দুজনেই পার পেয়ে গেলি । তোর ড্যাড, তুই বলেছিলি, তোর মায়ের মার্ডার নিয়ে একটা নভেল লিখছে, আগাম টাকাও পেয়েছে পাবলিশারের কাছ থেকে । 

—কিন্তু তোর মায়ের কাটা মাথা পাওয়া গিসলো পাহাড়তলিতে । তোর ড্যাড নাকি তোকে বলেছিল আরও কয়েকজন আত্মীয়কে মার্ডার করতে ; যাতে উনি একটা বেস্টসেলার সিরিজ লিখতে পারেন ।

—জানি, দুজন ফরেনার এগজটিক প্রজাপতি ধরতে গিয়ে সন্ধ্যাবেলা ভালোভাবে দেখতে না পেরে মায়ের মাথাখানা লাথিয়ে দিয়েছিল । তারপর যখন ওরা কাছে গিয়ে টের পেল ওটা একজন মহিলার মাথা, তখন থানায় গিয়ে খবর দিয়েছিল । মাথাটা তখনও নাকি টাটকা, কানে দুল, গলায় হার ইনট্যাক্ট , কানটা শুনতে পাচ্ছিল, আর গলা দিয়ে তোমাকে চাই গান বেরোচ্ছিল।

—ওই যে ! উদ্দেশ্য ! পারপাজ । 

—পুলিস উল্টে ওদেরই জেরা করেছে, কেননা ওদের কাছে  প্রজাপতি ধরে নিজেদের দেশে নিয়ে বার অনুমতি ছিল না । 

—কতো রকমের প্রজাপতি হয়, জুলজিতে পড়েছিলুম । অথচ কারোর বাংলা নাম জানতো না আমাদের প্রফেসরমশাই ।

—তুই এখানকার প্রজাপতি নিয়ে স্টাডি করতে পারতিস । 

—তাহলে তো ওই ওদের মতন জাল নিয়ে প্রজাপতি ধরে সেগুলোকে মেরে ফেলতে হতো ।

—এই, একটা ল্যাঙপেঙে প্রাণবায়ু এদিকেই আসছে । 

ফড়িঙ নামের ছোট পতঙ্গটির রয়েছে অতি প্রাচীন ইতিহাস। দুনিয়ার বুকে ডাইনোসরদের পদচারণার অনেক আগে থেকেই আকাশে উড়ে বেড়িয়েছে ফড়িঙরা। প্রায় ৩০০ মিলিয়নের বেশি বছর ধরে পৃথিবীতে ফড়িংদের বসবাস। সময়ের সাথে পরিবেশের পরিবর্তনে, বিবর্তনের ধারায় একসময়ের সুবিশাল পতঙ্গ ফড়িঙ আজকে পরিণত হয়েছে ছোট পতঙ্গে। কার্বনিফেরাস যুগে ফিরে গেলে দেখা যাবে, ফড়িঙদের পূর্বপুরুষেরা ছিল পতঙ্গদের মধ্যে সবচেয়ে বড় পতঙ্গ। এই যুগে পাওয়া যেত পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পতঙ্গগুলো। সুপ্রাচীন গ্রিফেনফ্লাই হলো পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পতঙ্গ, যাদের বিবেচনা করা হয় ফড়িঙের পূর্বপুরুষ হিসেবে। গ্রিফেনফ্লাইগুলোর পাখার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তের দূরত্ব ছিল ৭১ সেন্টিমিটার ও উইং স্প্যান ছিলো ২৮ ইঞ্চি। কার্বনিফেরাস যুগে বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ ছিল ৩০% এরও বেশি, ক্ষেত্র বিশেষে এই পরিমাণ প্রায় ৫০% পর্যন্তও ছিল। মনে করা হয়, বাতাসে অক্সিজেনের এই উপস্থিতি পতঙ্গগুলোর সুবিশাল আকারের অন্যতম কারণ ছিল।

যে প্রাণবায়ু এই দিকে আসছিল সে গান ধরে—

আমি তোমার কাঙ্গালী গো সুন্দরী রাধা,

আমি তোমার কাঙ্গালী গো 

তোমার লাগিয়া কন্দিয়া ফিরে,

হাছন রাজা কাঙ্গালী গো 

তোমার প্রেমে হাছন রাজার, মনে হুতাশন 

একবার আসি হৃদকমলে, করয়ে আসন 

আইস আউস প্রাণ প্রিয়সী ধরি তোমার পায় 

তোমায় না দেখিলে আমার, জ্বলিয়ে প্রাণ যায় 

ছট্ ফট্ করে হাছন, তোমার কারণ 

ত্বরা করি না আসিলে হইব মরণ 

কান্দে কান্দে হাছন রাজা পড়ে আছাড় খাইয়া

শীঘ্র করি প্রাণ প্রিয়সী, কোলে লও উঠাইয়া 

কোলে ঠান্ডা হইব, হাছন রাজার হিয়া 

সব দুঃখ পাসরিব, চান্দ মুখ দেখিয়া 

হিন্দুয়ে বলে তোমায় রাধা, আমি বলি খোদা 

রাধা বলিয়া ডাকিলে, মুল্লা মুন্সিয়ে দেয় বাধা 

হাছন রাজা বলে আমি, না রাখিব যুদা 

মুল্লা মুন্সির কথা যত সকলই বেহুদা 

বড় দুটি চোখের সুবাদে ফড়িঙদের  দৃষ্টিশক্তি অসাধারণ। এদের দর্শনশক্তি প্রায় ৩৬০ ডিগ্রি এবং মানুষের চেয়ে অধিক সংখ্যক রঙ দেখতে পারে ফড়িঙরা। একটি ফড়িঙের চোখে প্রায় ৩০,০০০ এর মতো লেন্স বা ওমাটিডিয়া রয়েছে, যেগুলোর মাধ্যমে এরা অর্জন করেছে অসাধারণ দর্শন ক্ষমতা। একটি ফড়িঙ তার মস্তিষ্কের প্রায় ৮০ ভাগ ব্যবহার করে দৃষ্টিলব্ধ তথ্য বিশ্লেষণে, ফলে অন্যান্য পোকার চলাচল সহজেই নির্ণয় করতে পারে এরা। তাছাড়া, ওড়ার সময়ে অন্য পতঙ্গ বা কোনো কিছুর সাথে সংঘর্ষের হাত থেকেও রক্ষা পেতে ও খাবার শিকার করতে তাদের এই দৃষ্টি শক্তি দারুণ কাজে দেয়।

—এই হাছন লোকটা কে রে ? 

—গান থেকে মনে হচ্ছে কোনো রাজ্যের রাজা ছিল লোকটা । ইতরগুলোকে পালটে দেবে ভেবে গান বেঁধেছিল ।

—বাংলাটা কেমন যেন খটমট । এই গানে নাচা যায় না । তবে রাজাটা ঠিকই বলেছিল। মোল্লা আর মুনসিগুলো বেহুদার হদ্দ ।

গ্যাসের প্রাণবায়ু অবাক তাকায় । এতো ফড়িঙচাঁদের সঙ্গে পারবে না আঁচ করে কুঁকড়ে দাঁড়িয়ে থাকে, কাঁধে বোঁচকা । কয়েকজন ফড়িঙচাঁদ প্রাণবায়ুটাকে ঘিরে ধরে নাচা আরম্ভ করে । একজন নবখুড়োর গান ধরে।

—গানটার মানে বুঝি না, কিন্তু দারুন একখানা গান । ওদের একজন নাচতে নাচতে বলে ওঠে।

—যে গানের মানে বুঝতে পারবি না, দেখবি সেই গানই তোর ভালো লাগবে ।

অতিথি প্রাণবায়ুও ওদের সঙ্গে গানটা গাইতে থাকে আর মাটির দিকে মাথা ঝুঁকিয়ে নাচতে থাকে । নাচতে নাচতে লোকটার খেয়াল থাকে না যে ফড়িঙদল বাতাসের ফুটপাথে বসে ওর নাচ দেখছে । 

—দারুন গাইছে লোকটা, পাগল মনে হচ্ছে, ডানা নেই তো । 

—বেঁচে থাকার জন্য অনেক লোকের কাছে পাগলামিটা একটা পারপাজ ।

—তুই তোর অদিতি চাপিয়ে দিয়েছিস আমার বীজ ঘিরে এই দৃশ্যের উপর কোনো চাঁদের মেশিন নেই আমাদের মধ্যে আর গ্রামাঞ্চল নেই দূর পাহাড়ে বরফ আছে নাগরিকভাবে উজ্জ্বল রোদ্দুরে চড়ে ধীরে ধীরে পেনিট্রেট করছে উচ্ছ্বল ১ নবাগতা হাওয়া এসব দৃশ্য নিষিদ্ধ সিনেমায় থাকে ৫ মিনিটে মাল পড়ে যায় সেই তো বাস্তব এই আমি দাঁড়িয়ে এই তুই আমার সামনে নিঃসংবাদ বসে আমি তুই তুই আমি কে যে ফুল আর কে যে বৃষ্টির সন্তান ৩য় কেউ ভ্রুক্ষেপ করতে পারে কি অদিতি আর বীজে লম্বা কোনো হাড় থাকছে না নতজানু হলেও পূজা হচ্ছে না দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেও কেউ রাসবিহারী নয় কঙ্কালের বাইরে ছালচামড়ার ভিতরে কোথায় সেই মমির মন্দির কে কোথায় অচেনা ঠাকরুন….

অক্সিজেন টানা ও কার্বন ডাইঅক্সাইড ছাড়ার জন্য ফড়িঙের নিম্ফরা  ব্যবহার করত তাদের পোঁদ। কারণ, তাদের ফুলকা তখন থাকে মলদ্বারের ভেতরে। পোঁদ  দিয়ে সরাসরি জল টেনে নিতো ভেতরে এবং এরপর আবার তা বের করে দিতো একই পথ দিয়ে। এই পদ্ধতিতে চলে গ্যাস আদান-প্রদানের কাজ। এই পদ্ধতির আরেকটা অতিরিক্ত সুবিধা হলো, গতিশক্তির ফলে সামনে এগিয়ে চলে ফড়িঙচাঁদের দল। নিম্ফ অবস্থা থেকে পালটি খাবার জন্য জল থেকে আশেপাশের পাথর কিংবা গাছে আশ্রয় নেয় এগুলো আর তারপর শারীরিক পরিবর্তনের জন্য প্রায় এক ঘণ্টার মতো সময় লাগে। নিম্ফ দশা থেকে মুক্ত হয়ে শারীরিক পরিবর্তনের মাধ্যমে ফড়িং হিসেবে নতুন জীবন শুরু করার মুহূর্তে এরা খুবই ক্যাবলা আর অরক্ষিত অবস্থায় থাকত। শরীরের গঠন আরও মজবুত করে ওড়ার জন্য পর্যাপ্ত শক্তির জন্য সময় লাগত আরও বেশ কয়েকদিন। এই সময়ে বেশিরভাগ ফড়িঙ খাল্লাস হয়ে যেতো ।

—আপনারা কারা, কেমন যেন শুক্রকীটের মতন অথচ কুমিরের মাপের, আগেকার কালে যেমন কুমির ছিল ?

—আমরা হলুম যারা ছোটোলোকমি আর ন্যাকড়াকানি আর চোখবসা আর অতিপ্রাকৃত অন্ধকারে তুরীয় ধোঁয়া টেনে ভাসমান জলশীত বসতবাড়ি-শহরের উপরিভাগে আফরিদি সঙ্গীতের ধ্যান করেছে, যারা স্বর্গের কাছে মেলে ধরেছে তাদের ঘিলুমগজ আর দেখেছে বস্তির চালার ওপর জ্যোতির্ময় ইসলামি দেবদূতদের পায়চারি, যারা পাইকপাড়ার সপ্রতিভ শীতল চোখের মায়ায় ছুটেছে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে দিয়ে আর যুদ্ধ-পণ্ডিতদের সভায় বড়ু চণ্ডীদাসের বিষাদ-আলোয় দৌড়েছে, যারা মাথার খুলির জানালা দিয়ে অশ্লীল গীতিকবিতা প্রকাশ ও খ্যাপামির দরুণ শিক্ষায়তন থেকে বিতাড়িত, যারা কয়েকদিনের না-কামানো ঘরের অন্তর্বাসে গুটিসুটি, নোংরা ফেলার গাদায় পুড়িয়েছে টাকা আর শুনেছে দেওয়াল ফুঁড়ে ঠিকরে-আসা সন্ত্রাস, যারা গাঁজা-চরসের বেল্ট বেঁধে শান্তিনিকেতন থেকে আগরতলা ফেরার পথে ধরা পড়েছে বয়ঃসন্ধির কেশগুচ্ছে, যারা রঙ-সরাইয়ের আগুন চিবিয়েছে কিংবা স্বর্গবীথিকায় চুমুক দিয়েছে রেড়ির তেলে, মৃত্যু, কিংবা নিজের ধড়কে রাতের পর রাত অভিযোগমুক্ত করেছে স্বপ্ন দিয়ে, নেশা দিয়ে, জাগরুক দুঃস্বপ্নে, মদ আর শিশ্ন আর অন্তহীন অন্ডকোষ দিয়ে, বরানগর ও বাঁশদ্রোণীর খুঁটির দিকে ঝাঁপিয়ে-পড়া মেধায় অতুলনীয় কানাগলির শিহরিত মেঘ ও বজ্রস্হির সময়-পৃথিবীকে তার মাঝে আলোকিত করেছে, হলঘরের শূন্যগর্ভ কাঠিন্য, প্রাঙ্গণের গাছসবুজ কবরসকাল ছাদের ওপরে মদখোঁয়ারি, চোখমারা নিয়ন আলোর ট্র্যাফিক জ্যোতিতে দোকানসঙ্ঘের রাস্তায় আনন্দটহল, মোহনবাগানের গর্জাতে-থাকা শীতকালীন সন্ধ্যায় থিরথিরিয়ে-ওঠা গাছপালা এবং সূর্য এবং চাঁদ, ছাই-ক্যানেসতারার আবৃত্তি আর মেধার দয়ালু আলো-মহারাজ, যারা বাংলা মদ খেয়ে খালাসিটোলা থেকে পবিত্র কলুটোলা পর্যন্ত অন্তহীন পরিভ্রমণের জন্যে নিজেদের বেঁধে ফেলেছে সুড়ঙ্গপথে যতক্ষণ না চাকা আর শিশুর হুল্লোড়শব্দ তাদের নামিয়ে এনেছে গ্যাঁজলাওঠা থ্যাঁৎলানো বেহুঁশ-মগজ চিড়িয়াখানার বিষণ্ণ দীপ্তি-নেঙড়ানো আলোয় যারা ডুবে থেকেছে সারারাত খিদিরপুরের সাবমেরিন-আলোয় আর পার্ক স্ট্রিটের  নির্জন দোকানে কাটিয়েছে বিস্বাদ বিয়ারের সারাটা দুপুর, দড়িবোমা সঙ্গীত-বিস্ফোরণে কান পেতেছে সর্বনাশের চিড়খাওয়া আওয়াজ শোনার জন্য, যারা লাগাতার সত্তর ঘন্টা বকবক করেছে বাগান থেকে বিছানা থেকে শুঁড়িবাড়ি থেকে বেলেভিউ থেকে যাদুঘর থেকে বিদ্যাসাগর-সেতু অব্দি, নিষ্কাম আলাপচারীর হারিয়ে-যাওয়া এক সৈন্যদল ঝাঁপিয়ে নেমেছে চাঁদের বাইরে বিবাদি বাগের লাল বিলডিঙে জানালায় ঝুঁকে-পড়া অগ্নিতারণ রাস্তায়, হুললোড় চ্যাঁচামেচি বমি-করে ফিসফিস ঘটনা আর স্মৃতি আর গালাগল্প আর চোখনাচানো নেশা আর হাসপাতালের শক-চিকিৎসা আর জেল আর যুদ্ধ, সাতদিন সারারাত ধরে প্রখরচোখে সমগ্র মেধাশক্তির আমূল উৎপাটন ফুটপাতে ছুঁড়ে দেয়া সাগরতীর্থের উপাসনা-মন্দিরের মাংস, যারা অতলান্তিক পৌরগৃহের ধোঁয়াটে ছবির পোস্টকার্ডের ভূমিপথ এঁকে অনির্দিষ্ট দক্ষিণেশ্বরে নিরুদ্দেশ, অন্ধকারে সাজানো টিকিয়াপাড়ার ঘরের মধ্যে নেশা ভাঙবার পরে বরদাস্ত করেছে পূবদেশের ঘাম আফরিকার হাড়ব্যথা চিনের মস্তিষ্কপ্রদাহ, যারা কোথায় যেতে হবে কুলকিনারা না পেয়ে রেল-স্টেশানে ঘুরে বেড়িয়েছে মাঝরাতে, তারপর চলে গিয়েছে, ভাঙা হৃদয় ফেলে যায়নি, যারা দাদু-প্রাচীন রাতে জুড়িগাড়ি জুড়িগাড়ি জুড়িগাড়িতে বসে সিগারেট ধরিয়ে বর্ষাকাল ফুঁড়ে এগিয়েছে নির্জন খামারবাড়ির দিকে, যারা পড়েছে কুণ্ডলী-জাগানো গুপ্তমন্ত্র কারণ আসানসোল শহরে তাদের পায়ের কাছে সহজাত ধারণায় স্পন্দিত হয়েছে মহাজগত, যারা অলৌকিক সুন্দরবনের বনবিবির দেবদূতদের খোঁজে একা-একা  টহল দিয়েছে উত্তরপাড়া শহরের অলিগলি তারা নিজেরা সত্যিই অলৌকিক দেবদূত ছিল, যারা নিজেদের মনে করেছে উন্মাদ যখন অতিপ্রাকৃত উচ্ছ্বাসে আভাউজ্জ্বল হয়ে উঠেছে মালদহ শহর, যারা শীত-মাঝরাত-পথ আলোব ছোটোশহর-বৃষ্টির প্রেরণায় চিনাপাড়ার চিনামজুরের সঙ্গে আচ্ছাদিত বিলাসগাড়িতে, যারা গানবাজনা বা সঙ্গম বা ঝোল-তরকারির ধান্দায়  ক্ষুধার্ত ও একা ঘুরে মরেছে, আর বেস্পতি ও অনন্তের বিষয়ে আলোচনার জন্যে পিছু নিয়েছে মেধাবী যাদবপুরিয়াদের, অসাধ্য কাজ, তাই জাহাজে পাড়ি দিয়েছে আন্দামানে, যারা মরিচঝাঁপির বৈঠকখানায় তাত পোয়াবার আগুনে কবিতার লাভা ও ছাই ছড়িয়ে রাজাবাজারের আগ্নেয়গিরিতে উবে গেছে  আর পোশাকের ছায়া ছাড়া তারা কিছুই ফেলে যায়নি, যারা তারপর আবার ফিরে এসেছে চামড়ার রঙ ঝলসিয়ে ডাগর শান্তিকামী চোখে দাড়ি আর হাফপ্যান্টে পশ্চিম উপকূলে লালবাজার তদন্ত করে দুর্বোধ্য ফালিকাগজ বিলোতে বিলোতে, যারা পুঁজিবাদের মাদক তামাক-অস্পষ্টতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে নিজেদের বাহুতে সিগারেট-আগুনের ছ্যাঁদা করেছে, যারা জামা-কাপড় ছেড়ে ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে কলেজ স্কোয়ারে বিলিয়েছে অতিসাম্যবাদী পুস্তিকা যখন বন্ধ চটকলের সাইরেনের বিলাপ তাদের দমিয়ে দিয়েছে, বিলাপ দমিয়েছে শেয়ারবাজার, আর দামোদরের ফেরিজাহাজও বিলাপ করেছে, যারা চুনকাম-জিমনাশিয়ামে অন্যের কংকালযন্ত্রের সামনে উলঙ্গ শিহরণে কাঁদতে-কাঁদতে ভেঙে পড়েছে, যারা কামড়ে ধরেছে গোয়েন্দাদের ঘাড় এবং আরণ্যক সমকামের রান্নাবান্না ও নেশাভাঙ ছাড়া অনড় কোনো অপরাধ না করার দরুন পুলিশের গাড়িতে চিৎকার করে উঠেছে আনন্দে, যারা গলিপথে হাঁটু গেড়ে আর্তনাদ করে উঠেছে আর ছাদের ওপর হিঁচড়ে নিয়ে যাবার সময় লিঙ্গ ও পাণ্ডুলিপির ইশারা উড়িয়েছে, যারা মোটরসাইকেলের সন্ত আরোহীদের পায়ুধর্ষণ করতে দিয়ে চিৎকার করেছে উল্লাসে, যারা উড়িয়েছে আর যাদের উড়িয়েছে সেই মানব-দেবদূতরা নাবিকরা অতলান্তিক ও শ্যামবাজারি ভালোবাসার আদর, যারা সকাল-সন্থ্যা অবাধে যাকে-তাকে বীর্য বিলিয়েছে গোলাপবাগানে পার্কের ঘাসের ওপরে আর কবরখানায়, যারা খিলখিলিয়ে হাসতে গিয়ে অবিরাম হেঁচকি তুলেছে আর যখন শ্বেতশুভ্র ল্যাংটো দেবদূতরা তলোয়ার বিদ্ধ করেছে তাদের তারা স্নানের ঘরের আবডালে কেঁদে ফেলেছে, যারা অদৃষ্টের তিন জ্বালাতনকারিনীর কাছে হারিয়েছে নিজেদের প্রেমবালকদের এক সেই বহুকামী টাকার একচোখো মাগি এক সেই একচোখো মাগি যে গর্ভের ভেতর থেকে চোখ মারে এবং সেই একচোখো মাগি যে নিজের পাছার ওপর বসে কিছুই করে না কেবল কারিগরের তাঁতের মেধাবী সোনালি ধাগা ছেঁড়ে, যারা সঙ্গমে ভাবাবিষ্ট ও অতৃপ্ত সঙ্গে এক বোতল বিয়ার এক প্রণয়ী এক প্যাকেট সিগারেট একটা মোমবাতি সুদ্ধ খাট থেকে মেঝেয় পড়েছে মেঝেতে গড়াতে-গড়াতে হলঘরে দেয়াল পর্যন্ত গিয়ে মূর্চ্ছা গিয়েছে পরম-যোনির কল্পনায় এবং ফিরে এসেছে চেতনার শেষ স্তরে, যারা গোধুলির কম্পমান হাজার নারীর চাউনিকে সুধা-মোহিনী করেছে আর ভোরবেলায় লাল চোখ নিয়ে জাগা সত্বেও সূর্যোদয়ের চাউনিকে সুধামোহন করার জন্য তৈরি হয়ে গোলবাড়ির দাওয়ায় দেখিয়েছে পাছার ঝলক আর ঝিলঝিলে উদোম, যারা ব্যাণ্ডেল শহর ছাড়িয়ে বেলেল্লাপনা করতে বেরিয়েছে,  কবিতার গোপন নায়ক, বোলপুরের অ্যাডোনিস ও শিশ্নমানব—- খাবার ঘরের ফাঁকা জায়গায় অসংখ্য মেয়ের সঙ্গে সঙ্গমের স্মৃতি-আনন্দ, সিনেমাঘরের পেঁচোয়-পাওয়া সারিতে, পাহাড়চুড়ায় গুহায় কিংবা চেনাজানা রাস্তায় ফাঁকা শায়াগোটানো শিড়িংগে চাকরানির সঙ্গে আর বিশেষ করে আত্নজ্ঞানবাদী পাকা খেলুড়েদের গোপন পেটরল-পাম্প, এমনকি শহরের অলিগলিতে, যারা বিশাল নোংরা সিনেমায় অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে, স্বপ্নের মধ্যে তুলে নিয়ে গিয়েছে তাদের, জেগে উঠেছে আচমকা বালিব্রিজের তলায়,  সামলেছে নিজেদের আর রাসবিহারি অ্যাভেনিউ-এর ধাবমান স্বপ্নের আতঙ্ক এবং শেষকালে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে চাকরি-খোঁজার দফতরে, যারা সারারাত ডিজেলমাখা জাহাজঘাটায় রক্তভর্তি জুতো পরে এই আশায় হেঁটেছে যে একদিন আফিম আর তাপবাষ্পে ঠাসা ঘর দরজা খুলে দেখবে একটি নদী, যারা চাঁদের যুদ্ধকালীন নীলাভ আলোকবন্যায় হাডসন বাসাবাড়ির কানায় মহান আত্মঘাতী নাটক করেছে আর নশ্বরতায় তাদের পরানো হবে জলপাইপাতার শিরোমুকুট, যারা খেয়েছে কল্পনার খাসির মাংস কিংবা হুগলি নদীর ঘোলাটে  কাঁকড়া হজম করেছে, যারা তাদের ঠেলাগাড়ির পেঁয়াজ আর ফালতু সঙ্গীত নিয়ে রাস্তার রোমান্সে কেঁদে ফেলেছে, যারা সেতুর তলায় অন্ধকারে তাদের বাক্যের ওপর বসে নিশ্বাস ফেলেছে, আর চিলেকোঠার আস্তানায় জেগে উঠেছে তারের বাদ্যযন্ত্র বেঁধে ফেলতে, যারা ব্রহ্মবিদ্যার কমলালেবু-ভরা যক্ষ্মা-আক্রান্ত আকাশের তলায় আগুনের মুকুট পরে সোনাগাছির ছয় তলায় বসে কেশেছে, যারা সারারাত মহিমান্বিত জাদু মন্ত্রোচ্চারণের জন্যে পাশ ফিরে উপুড় হয়ে আঁকিবুকি কেটেছে যা হলুদ ভোরবেলায় হয়ে উঠেছে মানেহীন বুকনির স্তবক, যারা বিশুদ্ধ উদ্ভিদ সাম্রাজ্যের স্বপ্নে রান্না করেছে পচা জন্তু-জানোয়ারের ফুসফুস হৃদয় ঠ্যাঙ লেজ অন্ড বৃক্ক, যারা মাংস-বোঝাই লরির তলায় ডিম খুঁজতে ঝাঁপিয়ে পড়েছে, যারা সময়ের বাইরে অনন্তকে ভোট দেবার জন্যে ছাদের আলসে থেকে হাতঘড়ি ছুঁড়ে ফেলেছে, তারপর দশ বছর ধরে প্রতিদিন তাদের মাথার ওপর পড়েছে টেবিল-ঘড়ির শব্দ, যারা পরপর তিনবার নিজের কব্জি কাটতে অসফল হয়েছে, ছেড়ে দিয়ে বাধ্য হয়েছে পুরানো মালপত্তরের দোকান খুলতে তারা ভেবেছে তারা বুড়িয়ে যাচ্ছে আর কেঁদেছে, যারা তাদের নিরীহ ফ্ল্যানেল-পোশাকে জ্যান্ত পুড়ে মরেছে শরৎ বোস অ্যাভিনিউ-এর সিসকনির্মিত পদ্য-বিস্ফোরণের মাঝে এবং ফ্যাশনের লৌহসেনানীর যুদ্ধ-কিড়মিড়ে এবং বিজ্ঞাপনপরিদের হুংকারের নাইট্রোগ্লিসারিনে এবং ক্ষতিকর বুদ্ধিমান সম্পাদকদের বিষবায়ুতে, কিংবা পিষে গেছে চরম সত্যের মাতাল ট্যাকসিগাড়ির তলায়, যারা ঝাঁপিয়ে পড়েছে হাওড়া ব্রিজ থেকে এসবই সত্যি আর কোথায় বিস্মৃত হারিয়ে গেছে হাড়কাটার অলিগলি আগুনবাড়ির ভুতুড়ে ধোঁয়ায় এমনকি এক গেলাস মাগনা বিয়ারও পায়নি, যারা বিষাদের জানালা খুলে গেয়ে উঠেছে, ভূগর্ভ জানালার বাইরে গিয়ে থুবড়ে পড়েছে, লাফিয়েছে নোংরায়, ঝাঁপিয়েছে বন্ধুদের ওপর, সারা রাস্তা কেঁদেছে, খালি পায়ে নেচেছে ভাঙা মদের গেলাসের ওপর মনকেমন-করা পূববাংলার ভাটিয়ালি সঙ্গীতের গ্রামোফোন রেকর্ড চুরমার হুইসকি শেষ করে রক্তাক্ত পায়খানায় কাতরেছে, কর্নকুহরে চাপা গোঙানি শুনেছে আর দৈত্যাকার বাষ্পরাশির গর্জন, যারা একে অন্যের আঘাতশাস্তি জেল-একাকীত্বে পিপাবন্দী হয়ে যাত্রা করেছে অতীতের রাজপথে কিংবা বরযাত্রী বাজনার পুনর্জন্মে, যারা অমরত্ব জানবার জন্যে আমার ভাবাবেশ ঘটছে কি না কিংবা তোমার ভাবাবেশ ঘটছে কি না কিংবা কারোর ভাবাবেশ ঘটছে কি না তার খোঁজে বাহাত্তর ঘন্টা মাঠবাদাড় চষে বেড়িয়েছে, যারা মাথাভাঙা অব্দি পাড়ি দিয়েছে, মরেছে কুচবিহারে,  ফিরে এসে ব্যর্থ অপেক্ষা করেছে, দেখেছে কোন্নগর আর ভেবেছে আর একলা ঘুরে বেড়িয়েছে কালীঘাটের রাস্তায় এবং শেষ পর্যন্ত সময়কে খুঁজতে বেরিয়ে পড়েছে আর এখন মেচেদা লোকাল তার নায়কদের অভাবে ফাঁকা, যারা ব্যর্থ মন্দির-ঘরে হাঁটু পেতে পরস্পরের মুক্তি আর আলো আর হৃদয়ের জন্যে প্রার্থনা করেছে, যতক্ষণ না ক্ষণকালের জন্যেও অন্তত আত্মার চুলের গোছা আলোকিত হয়ে উঠছে, যারা সোনালি মাথার অসম্ভব অপরাধীদের জন্যে মগজ চিরে অপেক্ষা করেছে জেলখানায় আর তাদের হৃদয়ে বাস্তবতার সৌন্দর্য আলিপুর জেলের লোকগান শোনায়,যারা একটা অভ্যাস গড়ে তুলতে গড়িয়ায় অবসর নিয়েছে, কিংবা বুদ্ধকে ভক্তি জানাতে নাকতলায় কিংবা শিলিগুড়িতে বালকদের জন্যে কিংবা সাদার্ন অ্যাভেনিউতে কালো রেলগাড়ির জন্যে কিংবা প্রেসিডেন্সি থেকে উত্তরবঙ্গ থেকে বর্ধমান থেকে ঘাসফুল-শৃঙ্খলায় কিংবা কবরে, যারা বেতারযন্ত্রকে জাদুসন্মোহনে অভিযুক্ত করে প্রকৃতিস্হ বিচারের দাবি জানিয়েছিল তারপর পড়ে রইলো তাদের নিজেদেরই পাগলামি এবং দুই বাহুর ভেতরে একদল অনিশ্চিত জুরি, যারা যোগমায়াদেবী কলেজে ডাডাইজমের ক্লাসে আলুর স্যালাড ছুঁড়েছে তারপর ন্যাড়ামাথায় আত্ম্ত্যার নাটুকে বক্তৃতা দিয়ে দাঁড়িয়েছে গিয়ে পাগলাগারদের গ্র্যানিট সিঁড়িতে দাবি জানিয়েছে তাৎক্ষণিক রক্ত-পরীক্ষার, আর তার বদলে তারা পেয়েছে ইনসুলিন মেটরাসল ইলেকট্রিকশক হাইড্রোথেরাপি সাইকোথেরাপি পিংপং স্মৃতিবিলোপের পাষাণ-শুন্যতা, যারা কৌতুকহীন প্রতিবাদে একটাই পিংপং প্রতীক টেবিল উল্টে দিয়ে এখন ক্যাটালোনিয়ায় সংক্ষিপ্ত বিশ্রাম নিচ্ছে…

আত্মপরিচয় দেবার জন্য আরেকজন ফিনফিনে ফড়িঙচাঁদ বলতে থাকে, দেখলো সজনী চাঁদনি রজনী,  সমুজল যমুনা গাওত গান, কানন কানন করত সমীরণ,  কুসুমে কুসুমে চুম্বন দান। কাহ লো যমুনা জোছন-ঢল ঢল  সুহাস সুনীল বারি? আজু তোঁহারই উজল সলিল পর  নয়ন সলিল দিব ডারি। কাহ সমীরণ লুটই কুসুম-বন  অলসি পড়সি যমুনায়?’ তোঁহার চম্পক-বাসিত লহরে  মিশাব নিশাস-বায়।জনম গোঁয়ায়নু রোয়ত রোয়ত  হম তর কোই ত কাঁদল না! জনম গোঁয়ায়নু সাধত সাধত  হমকো কোইত সাধল না! সকল তয়াগনু যো ধন আশে  সো বি তয়াগল মোয় অপন ছোড়ি সব, অপন করনু যোয়  সো বি সজনি পর হোয়! যমুনে হাস হাস লো হরখে  হম তর রোয়বে কে? তোঁহারি সুহসিত নীল সলিল পরি  রাধা সঁপবে দে! এক দিবস যব মাধ হমারা  আসবে কিনার তোর,— যব সো পেখবে তোঁহার সলিলে  ভাসত তনুয়া মোর— তব্‌ কি শ্যাম সো মানস পাশে  তিল দুখ পাওবে না? শ্যামক নয়নে বিন্দু নয়ন জল  তবহুঁ কি আওবে না? রয়নে কুঞ্জে আসবে যব সখি  শ্যাম হমারই আশে, ফুকারবে যব্‌ রাধা রাধা  মুরলি ঊরধ-শ্বাসে, যব সব গোপিনী আসবে ছূটই  যব হম আসব না; যব সব গোপিনী জাগবে চমকই  যব হম জগব না, তব কি কুঞ্জপথ হমারি আশে  হেরবে আকুল শ্যাম? বন বন ফেরই সো কি ফুকারবে  রাধা রাধা নাম? না যমুনা, সো এক শ্যাম মম  শ্যামক শত শত নারী; হম যব যাওব শত শত রাধা  চরণে রহবে তারি! তব সখি যমুনে, যাই নিকুঞ্জে,  কাহ তয়াগব দে? অভাগীর তর বৃন্দাবনমে  কহ সখি, রোয়ব কে! ভানু কহে চুপি ‘মান ভরে রহ  আও বনে ব্রজ-নারী, মিলবে শ্যামক শত শত আদর  শত শত লোচন বারি।

ওনাদের কথা সবাই বুঝতে না পারলেও লোকটা বোঝে আর  মাথা ঝুঁকিয়ে গাইতে আর নাচতে থাকে —

বুল্লা আমি জানি না আমি কে

বুল্লা আমি জানি না আমি কে

আমি মসজিদে বিশ্বাস করি না

আমি কাফেরদের রীতিতে বিশ্বাস করি না

আমি শুদ্ধ নই অশুদ্ধও নই

আমি বেদ বা বইতে নেই

আমি ভাঙ আর মদে নেই

আমি হারিয়ে যাইনি অসৎ হইনি

আমি বন্ধনে নেই দুঃখে নেই

আমি বিশুদ্ধে পালিত নই

আমি জলের নই মাটির নই

আমি আগুন নই  বাতাসও নই

বুল্লা আমি জানি না আমি কে

আমি আরবের নই লাহোরের নই

আমি হিন্দিভাষী নাগোর শহরের নই 

আমি হিন্দু নই পেশোয়ারি তুর্কি নই

আমি ধর্মের বিভেদ গড়ে তুলিনি

আমি আদম-ইভ গড়ে তুলিনি

আমি নিজের কোনো নাম দিইনি

আদি বা অন্ত আমি কেবল নিজেকে জানি

আমি আরেকজন কাউকে চিনি না

আমার চেয়ে জ্ঞানী কেউ নেই

এই বুল্লে শাহ লোকটা কে 

বুল্লা আমি জানি না আমি কে

বুল্লা আমি জানি না আমি কে

আমি মোজেস নই ফ্যারাওও নই

আমি আগুন নই বাতাসও নই

আমি অশিক্ষিতদের মাঝে থাকি না

কে এই বুল্লে শাহ, দাঁড়িয়ে রয়েছে ?

বুল্লা আমি জানি না আমি কে

বুল্লা আমি জানি না আমি কে

ফড়িঙচাঁদরা  সামনেও যেমন উড়তে পারে, তেমনি পেছনের দিকেও উড়তে পারে । জোরে-জোরে বা ধীরে, ঠিক সোজা উপরে বা নিচের দিকে ওড়ার দারুণ টেকনিক রয়েছে এদের। তাছাড়া, সামনে-পেছনে না এগিয়ে বাতাসে এমনি ভেসে থাকার দারুণ দক্ষতার ফড়িঙদের  রয়েছে চারটে পাখনা । প্রতিটি পাখনা  স্বাধীনভাবে চালনা করতে পারে ফড়িঙচাঁদরা আর একটা অক্ষ বরাবর সামনে-পেছনে ঘোরাতেও পারে এগুলো। প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৩০ মাইল দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে ফড়িঙচাঁদেরা ।  অসাধারণ দৃষ্টিশক্তি ও উড়তে পারার দক্ষতার দরুণ শিকার ধরতে ও আগের জায়গায় ফিরে আসতে একটা ফড়িঙের মাত্র ১-১.৫ সেকেন্ড সময় লাগে।

—আপনি জানেন না আপনি কে আর সেটা নেচে-গেয়ে বোঝাতে চাইছেন ?

—আমি তো বলছি আমি বুল্লা, অনেকে আমাকে বলে হাছন রাজা ।

—আর লালন সাঁই লোকটা কে ?

—আমিই তো লালন সাঁই, অনেকে বলে আমি শাহবাজ কলন্দর, আমি ভানু শাহ !

—সবই আপনি ? অদ্ভুত !

—অদ্ভুতের কিছু নেই । আমার কিছুই চাই না । কেউ কেউ আবার আমাকে বলে জালালুদ্দিন রুমি ।দাঁড়াও তোমাদের বোঝাই । গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র হলো এমন একটি অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক মতাদর্শ যেখানে বলা হয়: সমাজ ও অর্থনীতি গণতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত হলেও, তাদের কাছে অগ্রাধিকার পাবে সামষ্টিকভাবে জনগণের চাহিদা মেটানো, পুঁজিবাদের ন্যায় ব্যক্তি ব্যক্তিবিশেষের উন্নতি নয়। গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রীরা চান সমাজের পুঁজিবাদ থেকে সমাজতন্ত্রে রূপান্তর যেন মৌলিক মার্কবাদীদের বলা বিপ্লবের পরিবর্তে বিদ্যমান অংশগ্রহণমূলক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায়ই সম্পন্ন হয়। এ ধরনের দর্শন একাধারে যেমন বৈশ্বিকভাবে স্বীকৃত চাহিদাগুলো যেমন আবাসন, পরিবহণ, স্বাস্থ্যসেবা প্রভৃতির সরকারি নিয়ন্ত্রণকে সমর্থন করে, ঠিক তেমনই ভোগ্যপণ্যসমূহের সরবরাহ পুঁজিবাদী মুক্তিবাজার অর্থনীতির মাধ্যমে হওয়াকেই শ্রেয় বলে মনে করে।

লোকটা আবার নাচতে নাচতে গাইতে থাকে ।

কিছু প্রজাতির ফড়িঙ তার এলাকায় অন্য ফড়িঙের প্রবেশ একেবারেই পছন্দ করে না। কোনো ফড়িঙ এই অনধিকার চর্চা করলে, তার বিরুদ্ধে ঐ এলাকার পুরুষ ফড়িং একরকম যুদ্ধ ঘোষণা করে। স্কিমার, ক্লাবটেইলস এবং পেটটেইলস ফড়িঙ ডিম পাড়ার জন্য পুকুরের আশেপাশের জায়গা বেছে নেয়। এই সময় অন্য কোনো ফড়িঙ যদি সেই অঞ্চলে প্রবেশ করে, তাহলে দায়িত্বে থাকা পুরুষ ফড়িঙ তাকে তাড়া করে ভাগিয়ে দিবে। অন্যান্য কিছু প্রজাতি যদিও নিজের সুনির্দিষ্ট অঞ্চল নিয়ে মাথা ঘামায় না, তবুও ওড়ার পথে অন্য পুরুষ ফড়িঙ পথ মাড়িয়ে গেলে, তাদের প্রতি আগ্রাসী আচরণ করে । তাছাড়া, কিছু পুরুষ ফড়িঙ অবশ্য পছন্দের মেয়ে ফড়িঙের জন্য প্রতিপক্ষের সাথে খেয়োখেয়ি করে।

লোকটা বলল, পারস্যে জালালুদ্দীন রুমি, হাফেজ, জামী, পশ্চিম ভারতে কবীর, দাদু, মীরাবাই, রজ্জব প্রমুখ সাধকদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে শ্রীচৈতন্য, নিত্যানন্দ, রূপ, সনাতন, চণ্ডীদাস, গোবিন্দ দাস, ফরিদপুরের ওড়াকান্দির হরিঠাকুরের দল, পাবনা জেলার ঠাকুর শম্ভুচান্দের সম্প্রদায় প্রমুখ কবি ও মহাপুরুষরা ভাববিলাসকে যে দার্শনিক মতবাদের উপর দাঁড় করেছিলেন, ফড়িঙপন্থী সাধকেরা তা করেননি। ফড়িঙ গানের বিধি বা ধাপগুলো এখনও একইভাবে অনুসরণ করা হয় এমনটা বলা যাবে না।  আগে যে ফড়িঙগান শোনা যেত তার অস্তিস্ত্ব আর নেই বলা চলে। এখন দুই ফড়িঙ-সাধকরা নিজেদের মতো করে নিভৃতে সাধনা চালিয়ে যান, অনেকক্ষেত্রেই তাদের রীতিনীতি আলাদা।

বলে, লোকটা গাইতে লাগল—

আমি কি বলিনি তোমায়—

ছেড়ে যেও না আমায় কখনো,

একমাত্র বন্ধু তো কেবল আমিই—

আমিই চিরবসন্ত জীবনের…

শত-সহস্র বছরও যদি আমাকে ঢেলে

দূরে থাকো তুমি ক্রুদ্ধ রিদয়ে,

তবুও ফিরবে তুমি, ফিরে আসতেই হবে তোমায়—

ক্যানোনা আমিই তোমার গন্তব্য, আমিই তোমার শেষ…

আমি কি বলিনি তোমায়—

মোহে পরো না রঙিন পৃথিবীর,

যেহেতু আমিই সবার সেরা— চিত্রশিল্পী সর্বশ্রেষ্ঠ!

আমি কি বলিনি তোমায়—

তুমি মাছ— যেও না কখনো ঐ শুষ্কভূমিতে

যেহেতু সবচেয়ে গভীর— আমিই সমুদ্র— তোমার জন্য যথেষ্ট!

আমি কি বলিনি তোমায়—

ঝালে আটকে পোরো না পাখিদের মতো

কেনোনা আমিই তোমার ডানা— আলোর শক্তি সঞ্চালক…

আমি কি বলিনি তোমায়—

ওদেরকে ব্যর্থ করো তোমাকে বরফে পরিণত করতে,

যেহেতু, আমিই আলোর শিখা, তোমার যথেষ্ঠতম উষ্ণতা

আমি কি বলিনি তোমায়—

ওরা দূষিত করবে তোমাকে এবং বাধ্য করবে ভুলে যেতে,

আর জেনো— আমিই বসন্ত সর্বগুণের…

আমি কি বলিনি তোমায়—

প্রশ্ন করো না আমার প্রক্রিয়া নিয়ে

কারণ, সবকিছুই নির্দেশিত এবং আমিই এর স্রষ্টা…

আমি কি বলিনি তোমায়—

তোমার রিদয় তোমাকে গৃহে ফিরিয়ে নেবে

কারন সে জানে, আমিই তার প্রভু!

অন্য অনেক প্রাণীর মতো, কিছু ফড়িঙ প্রয়োজনের তাগিদে বা আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে নিজেদের সাধারণ এলাকা ছেড়ে পাড়ি জমায় অনুকূল পরিবেশে। কিছু প্রজাতি দল বেঁধে, আবার কিছু প্রজাতি একা শুরু করে এই যাত্রা। উত্তর আমেরিকার গ্রিন ডার্নার্স নামের ফড়িং শীতকালে অপেক্ষাকৃত উষ্ণ পরিবেশের দিকে চলে যায় এবং বসন্তকালে আবার ফিরে আসে নিজের চিরচেনা ভুবনে। বংশবৃদ্ধির জন্য গ্লোব স্কিমার ফড়িং খুঁজে বেড়ায় অস্থায়ী জলাধার, তাই প্রজননের জন্য এরা অনুসরণ করে বৃষ্টিস্নাত এলাকা। এমনকি ভারত ও আফ্রিকার মধ্যবর্তী রেকর্ড ১১,০০০ মাইল দূরত্ব ভ্রমণের রেকর্ড রয়েছে এই গ্লোব স্কিমারদের। কিছু ফড়িঙ সামনে-পেছনে উড়ে বাতাসে ভেসে বেড়ায়, আবার কিছু কোনো কিছুর অবলম্বন করে চুপটি মেরে বসে থাকে। শরীর উষ্ণ রাখতে পাখা দ্রুত চালনা করে তাপ উৎপন্ন করে ফড়িঙ । বসে থেকে অলস সময় কাটাতে পছন্দ করা ফড়িঙ অবশ্য শরীর উষ্ণ রাখতে ব্যবহার করে সূর্যের আলো। পর্যাপ্ত আলো পেতে যথাযথ অবস্থান নিতে এদের জুড়ি নেই। অতিরিক্ত গরমের সময় কিছু ফড়িঙ আবার তাদের পাখা ব্যবহার করে অত্যধিক সূর্যের আলো প্রতিফলিত করতে এবং যেখানে সূর্যের আলো কম সেখানে ডেরা নেয়।

—শাহবাজ কালান্দর আপনি ?

—হ্যাঁ ।

—নাচতে নাচতে গাইবেন ?

—হ্যাঁ । এই দ্যাখো ।

ও হো

হো হো হো

হো লাল মেরী পত

রখিয়ো বলা ঝূলে লালণ

সিংদড়ী দা সেবণ দা

সখী শাহবাজ কলন্দর

দমাদম মস্ত কলন্দর

অলী দম দম দে অন্দর

দমাদম মস্ত কলন্দর

অলী দা পৈলা নম্বর

হো লাল মেরী

চার চরাগ তেরে বরণ হমেশা

পংজবা ম্যায়ঁ বারণ আই বলা ঝূলে লালণ

হো পংজবা ম্যায়ঁ বারণ

আই বলা ঝূলে লালণ

সিংদড়ী দা সেবণ দা

সখী শাহ বাজ কলন্দর

দমাদম মস্ত কলন্দর

অলী দম দম দে অন্দর

দমাদম মস্ত কলন্দর

অলী দা পৈলা নম্বর

হো লাল মেরী

হিংদ সিংদ পীরা তেরী নৌবত বাজে

নাল বজে ঘড়িয়াল বলা ঝূলে লালণ

হো নাল বজে

ঘড়িয়াল বলা ঝূলে লালণ

সিংদড়ী দা সেবণ দা

সখী শাহ বাজ কলন্দর

দমাদম মস্ত কলন্দর

অলী দম দম দে অন্দর

দমাদম মস্ত কলন্দর

অলী দা পৈলা নম্বর

হো লাল মেরী

ও হো হো হো হো হো হো হো হো হো

হর দম পীরা তেরী খৈর হোবে

নাম-এ-অলী বেড়া

পার লগা ঝূলে লালণ

হো নাম-এ-অলী

বেড়া পার লগা ঝূলে লালণ

সিংদড়ী দা সেবণ দা

সখী শাহ বাজ কলন্দর

দমাদম মস্ত কলন্দর

অলী দম দম দে অন্দর

দমাদম মস্ত কলন্দর

অলী দা পৈলা নম্বর

হো লাল মেরী পত

রখিয়ো বলা ঝূলে লালণ

সিংদড়ী দা সেবণ দা

সখী শাহ বাজ কলন্দর

দমাদম মস্ত কলন্দর

অলী দম দম দে অন্দর

দমাদম মস্ত কলন্দর

অলী দা পৈলা নম্বর

দমাদম মস্ত কলন্দর

অলী দা পৈলা নম্বর

দমাদম মস্ত কলন্দর

অলী দা পৈলা নম্বর

দমাদম মস্ত কলন্দর

অলী দা পৈলা নম্বর

দমাদম মস্ত কলন্দর

অলী দা পৈলা নম্বর।

—আমিই ভানু শাহ ! 

—গাইবেন ?

—হ্যাঁ । গাইছি তো, নাচছিও, এই দ্যাখো ।

‘এক রোজ বসে আছি নৌকার উপর

পানির মধ্যে দেখিলাম করিয়া নজর

হায়-রে, পানির উপর দেখিলাম করিয়া নজর।

মুর্দা মানুষ ভাসে এক মাঝ দরিয়ায়

উপরে বসিয়া কাক চক্ষু তার খায়

দেখিয়া আফসোস হইল দিলের ভিতর

কাঁন্দিয়া কইলাম তন-রে কি অইবে তোর।

কোথা রইলা মাতা-পিতা ভাই বন্ধুগণ

কোথায় রইল ঘর বাড়ি অঙ্গের বসন

স্ত্রী-পুত্র ছাড়াইয়া কে ভাসাইল তরে

মাছ-মাছলী টাইন্যা খায় পানির উপরে।

উড়ে যাবে পাখি কোন সূদুরের পারে

শমন এলে পরে মায়ার বাঁধন যাবে ছিঁড়ে

মায়ার বাঁধন যাবে ছিঁড়ে।

লোভ লালসার খাঁচা ভেঙে

পালায় যখন পাখি,

মুক্ত আকাশ পেয়ে তখন

দেবে তোরে ফাঁকিরে মন

দেবে তোরে ফাঁকি

যেভাবেতেই ফাঁদ পাতোনা

ধরা দেবেনা রে

উড়ে যাবে পাখি কোন সূদুরের পারে

শমন এলে পরে মায়ার বাঁধন যাবে ছিঁড়ে

মায়ার বাঁধন যাবে ছিঁড়ে।

পোষা পাখি উড়ে গেলে

খাঁচা পুড়ে ফেলে,

ছাই করিয়ে নাভিকুণ্ড

ফেলবে গাঙের জলে রে মন

ফেলবে গাঙের জলে

স্মৃতিটুকু তলিয়ে যাবে

কেউ পাবেনা তারে

উড়ে যাবে পাখি কোন সূদুরের পারে

শমন এলে পরে মায়ার বাঁধন যাবে ছিঁড়ে

মায়ার বাঁধন যাবে ছিঁড়ে।

দান ধ্যান কার্য শান্তি

সময়মত হবে

একে একে মাস কাটবে

সবাই ভুলে যাবে রে মন

সবাই ভুলে যাবে

দান ধ্যান শ্রাদ্ধ শান্তি

সময়মত হবে

একে একে মাস কাটবে

সবাই ভুলে যাবে রে মন

সবাই ভুলে যাবে

পাষাণ বুকে পুত্র-কন্যা

কাঁদবে অতীত করে

উড়ে যাবে পাখি কোন সূদুরের পারে

শমন এলে পরে মায়ার বাঁধন যাবে ছিঁড়ে

মায়ার বাঁধন যাবে ছিঁড়ে

মায়ার বাঁধন যাবে ছিঁড়ে

ফড়িঙচাঁদের দল তাকে ঘিরে ঘিরে উড়তে লাগলেন আর বেস্পতির চারিপাশে পাক খেতে লাগলেন । তাঁরা পাক খেয়েই চলেছেন । আবার ইতিহাস আরম্ভ হলে তাঁদের গল্প বলব । এখন ওনারা বরং পাক খেতে থাকুন । ততোদিনে হয়তো নিষ্পত্তি হয়ে যাবে যে ‘চাই’ ভালো নাকি ‘চাই না’ ভালো ।

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

চশমরঙ্গ : মলয় রায়চৌধুরীর উপন্যাস

বাইলাইন : অ্যাকাডেমি অফ দি পারফরমিং ফ্লেশ

মলয় রায়চৌধুরী

          নগেন দত্ত নিজের মগজের ভেতরের গোলাপি অন্ধকারকে বলছিলেন, আমি তো একজন সাধারণ ল্যাওড়াকান্তি মানুষ মাত্র, তবে কেন সবাই আমাকে প্রতিভাধর বলে, চেনা কিশোররা প্রতিভাধারী নগেন বলে পঞ্চাশ একশো দেড়শো বছর আগে ক্ষ্যাপাতো, এখনও ক্ষ্যাপায়, এখন, যখন তাঁর বয়স চব্বিশ পেরিয়ে সবে পঁচিশ ; প্রায় তিরিশ বছর আটকে ছিলেন চব্বিশতম বয়সে, তাঁর দাদামশায়ের ফারসি ভাষায় লেখা উইলে সেরকমই নির্দেশ ছিল, কত বছর বয়সে কোন বয়সে কতোকালের জন্যে আটকে থাকতে হবে, নগেন দত্ত তা মেনে চলেছেন ! 

          ওনার, দাদামশায়ের, যিনি ছিলেন ছয় ফিট লম্বা, চওড়া কপাল, কাঁধ পর্যন্ত চুল, জোড়াভুরু, সিক্সপ্যাক অ্যাব, যদিও সময়ের প্রথা অস্বীকার করে একটিই বিয়ে করেছিলেন, উইলে ‘কী করিতে পারিবে’ আর কী করিতে পারিবে না’, তার দুটি তালিকা আছে, ‘কী করিতে পারিবে না’ তালিকার কাজ করতে গিয়ে দেখেছেন নগেন দত্ত যে তিনি তা সত্যিই পারেননি, যেমন একবার এক কুকুরীকে ধর্ষণ করার চেষ্টা করেছিলেন যখন তাঁর সজীব বয়স উত্তাল নয় বছরে আটকে ছিল ।

          যারা ওনাকে, মানে নগেন দত্তকে, প্রতিভাধারী বলে ক্ষ্যাপায়, তাদের উনি ইচ্ছে করলেই উন্মাদ করে দিতে পারেন, স্রেফ লম্পটের শিস দিয়ে, করেন না, কেননা জিনিয়াসগিরি হল দানবিক আর দৈব প্রাপ্তির মিশেল, সকলের জীবনে জোটে না ।

          নগেন দত্ত, ছটফটে তারুণ্যের অনিশ্চয়তায়  যখন প্রেসিডেন্সি কালেজে পড়তেন, হেনরি মেইনে ছিলেন ভাইস চ্যান্সেলার, সহপাঠী নবীনচন্দ্র সেন, যিনি তাঁর সঙ্গেই ১৮৬৫ সালে এফ এ পাশ করেছিলেন, তাঁকে বলতেন, ‘তোমার মাথায় কীট প্রবেশ করিয়াছে, সত্বর বৈদ্যের নিকট যাও।’ 

          নগেন দত্ত উত্তরে বলেছিলেন, ‘মাথায় কীট আছে বলেই আমি নগেন দত্ত, নয়তো বাংলার নাগরিক আমায় নুনুযুবক বলে চিনতো ।’ 

          তখনও নুড়িপূজক আর কাটানেড়েরা মারামারি কাটাকাটি করে আলাদা হয়নি, একই জালে ধরা দুই সের ওজনের ইলিশ খেতো, একই খেতের ধানের পান্তা-ভাত খেতো, একই বানভাসিতে ডুবে পচে ভেসে উঠতো হাত ধরাধরি করে সুন্দরবনের মোহনায়, তারপর হারিয়ে যেতো, একই দুর্ভিক্ষে কেঁদেকেটে ‘একটু ফ্যান দাও গো মা’ বলে গেরস্তের দোরে কঙ্কালসার পরিবার নিয়ে হাজিরা দিতো, একই মড়কে রাস্তায় মরে পড়ে থাকতো, যার ওপর একই নীল মাছি ‘মরিলে কান্দিস না আমার দায়’ গাইতে গাইতে মরে যেতো ।

          নিজের জীবনীতে নগেন দত্ত সম্পর্কে লিখেছিলেন নবীনচন্দ্র সেন, যদিও পাণ্ডুলিপির সেই পৃষ্ঠা হারিয়ে গিয়েছিল হাতে সাজানো সীসার অক্ষরের ছাপাখানা থেকে, নবীনচন্দ্র সেনের সন্দেহ ছিল যে এই কুকীর্তি স্বয়ং নগেন দত্তের, উনি অমরত্ব নিজে চান না, অন্যদের বিলিয়ে থাকেন। 

         নবীনচন্দ্র সেন লিখেছিলেন যে, “নগেন দত্ত নামের তরুণটি লুডউইগ বিঠোফেনের সি শার্প মাইনরে বাজানো চোদ্দো নম্বর পিয়ানো সোনাটা শুনিলে উন্মাদের ন্যায় আচরণ করিতেন, তখন তাঁহাকে সামলাইবার জন্য তিরিশ হাজারিনীর দেশে লইয়া যাইতে হইত।”  

          তিরিশ হাজারিনীর দেশে কেবল বুদ্ধিমান আর সাহসী পুরুষরাই যাতায়াত করে ।

          তিনি, নগেন দত্ত, কখনও কদমছাঁট, কখনও ব্যাকব্রাশ তেলচুকচুক, কখনও বাবরিছাঁট, কখনও পিগটেল নুটি, আকাশে বসন্তকালের কালবৈশাখির হাড়ভাঙা পরিশ্রমের কালো মেঘ আর আওয়াজহীন মেয়াদি বিদ্দ্যুচমক সত্ত্বেও, কোনো বাড়িতে চেনবাঁধা নেড়ি-কুকুরের অনুনয়ী ডাক শুনতে-শুনতে, বৃষ্টির আগের রাশ-টানা শীৎশিতে হাওয়া মুখে মেখে, মনে করার চেষ্টা করছিলেন, দেড়-দুশো বছর আগের আকুলি-বিকুলি ঘটনা, বা তারও আগের হতে পারে, ঝোড়ো ঝড় এড়িয়ে আলোকপ্রাপ্তির জন্যে নৌকো থেকে নেমে তিরিশ হাজারিনীর দেশে যখন এসেছিলেন উনি, মাত্র কয়েকটা পাকা দোতলা বাড়ি ছিল, জমিদারি আয়েসের হাঁসজারু স্হাপত্যের বাড়ি, এলাকাটা তখন এরকম বহুযোনিক ছিল না, পাড়া নামের বিদকুটে ব্যারিকেড অঞ্চল হয়নি বলে, আজ কালো টয়োটা এটিওস সেন্ট্রাল অ্যাভেনিউতে পার্ক করে, হঠাৎ লোডশেডিঙের নানাবিধ অন্ধকার হাতড়িয়ে, মুঠোয়ধরা মোবাইলে দেড়-দুশো বছর আগে রেকর্ড করা, জিপিএস পথনির্দেশ দেখতে-দেখতে, আর ইয়ার ফোনে তা শুনতে-শুনতে, এগোচ্ছিলেন, রেকর্ড করা কন্ঠস্বর ওনার নিজের, অথচ যাকে কালেজের শিক্ষকরা মনে করেন তা এক ডেপুটি ম্যাজিসট্রেটের । 

           তখনকার, যখন লোকে তাঁকে, তিনি সাধারণ মানুষ নন বলে, প্রতিভাধর কিংবা অতিমানুষ আখ্যা দিতো, সেইসব অচেনা-আধাচেনা মানুষের কথাগুলো শুনে, নগেন দত্ত নিজের মগজের ভেতরের গোলাপি অন্ধকারে,   প্রতিক্রিয়ায় বলে ওঠতেন, “যতো সব অ্যাঁড়গ্যাঁজানে পেঁচো মালের গুষ্টি।” 

          তিরিশ হাজারিনীর দেশের পথে, তিল ধারণের জায়গা নেই এমন জমাট অন্ধকারে, ওনার কথাগুলো প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে এলো ওনার কাছে, তা শুনে টের পেলেন, কেউ উনোনে চাপানো কড়াইতে সর্ষের গরম তেলে হিঙের ফোড়ন দিলো, হয়তো ধোকার ডালনা বানাবে, যেমন ওনার স্ত্রী সূর্যমুখী,  আশি বছর আগে কচিসবুজ তুঁতে-বিষ খেয়ে আত্মহত্যার আগে রাঁধতো ।

        হেডফোনে যা উনি শুনছিলেন :

         “আকাশে মেঘাড়ম্বরকারণ রাত্রি প্রদোষকালেই ঘনান্ধতমোময়ী হইল । গ্রাম, গৃহ, প্রান্তর, পথ, নদী, কিছুই লক্ষ্য হয় না । কেবল বনবিটপী সকল, সহস্র সহস্র খদ্যোতমালাপরিমণ্ডিত হইয়া হীরকখচিত কৃত্রিম বৃক্ষের ন্যায় শোভা পাইতেছিল । কেবলমাত্র গর্জনবিরত শ্বেতকৃষ্ণাভ মেঘমালার মধ্যে হ্রস্বদীপ্তি সৌদামিনি মধ্যে মধ্যে চমকিতেছিল — স্ত্রীলোকের ক্রোধ একেবারে হ্রাসপ্রাপ্তি হয় না । কেবলমাত্র নববারিসমাগমপ্রফুল্ল ভেকেরা উৎসব করিতেছিল । ঝিল্লিরব মনোযোগপূর্বক লক্ষ্য করিলে শুনা যায়, রাবণের চিতার ন্যায় অশ্রান্ত রব করিতেছে, কিন্তু বিশেষ মনোযোগ না করিলে লক্ষ্য হয় না । শব্দের মধ্যে বৃক্ষাগ্র হইতে বৃক্ষপত্রের উপর বর্ষাবিশিষ্ট বারিবিন্দুর পতনশব্দ, বৃক্ষতলস্হ, বর্ষাজলে পত্রচূত জলবিন্দু পতনশব্দ, পথিস্হ অনিঃসৃত জলে শৃগালের পদসঞ্চরণশব্দ, কদাচিৎ বৃক্ষারূঢ় পক্ষীর আর্দ্র পক্ষের জল মোচনার্থ পক্ষবিধূনন শব্দ । মধ্যে মধ্যে শমিতপ্রায় বায়ুর ক্ষণিক গর্জন, তৎসঙ্গে বৃক্ষপত্রচূত বারিবিন্দু সকলের এককালীন পতনশব্দ । ক্রমে নগেন্দ্র দূরে একটা আলো দেখিতে পাইলেন । জলপ্লাবিত ভূমি অতিক্রম করিয়া, বৃক্ষচ্যূত বারি কতৃক সিক্ত হইয়া, বৃক্ষতলস্হ শৃগালের ভীতি বিধান করিয়া, নগেন্দ্র সেই আলোকাভিমুখে চলিলেন । বহু কষ্টে আলোক সন্নিধি উপস্হিত হইলেন । দেখিলেন এক ইষ্টকনির্মিত প্রাচীন বাসগৃহ হইতে আলো নির্গত হইতেছে । গৃহের দ্বার মুক্ত ।”

         ঠিক জায়গাতেই এসে পড়েছি, তিরিশ হাজারিনীর দেশে, নিজের মগজের ভেতরে নিজেকে ফিসফিস করে বললেন নগেন দত্ত, যেন পারিবারিক মানদণ্ডের অলিখিত অথচ সর্বমান্য সীমালঙ্ঘন করতে চলেছেন এমন সাবধানি সন্তর্পণে, খরগোশের গর্তের মুখে শেয়ালের অপেক্ষারত ঔৎসুক্যের মতন, যদিও দাদামশায়ের বাঁধা সীমা উনি পেরোন না, পেরোবার উপায় নেই, তা এক মহাজাগতিক সীমা । কোনো মামণিকে যে পিং করবেন তাও প্রেমের শেমে বাঁধা ।

          বেশ দূরে, ঝিমন্ত-হলুদ  আলো জ্বলছিল দেখে, নিশ্চিন্ত হলেন নগেন দত্ত, লন্ঠনের আলো, হ্যাজাকের নয়, ওই তো একটা বাড়ির সদরের কপাট হাঁ করে খোলা, নাগরদের গিলে ফেলার অপেক্ষায়, যারা এই পাড়ায় আরেকটু রাত হলেই আসা আরম্ভ করবে । কিন্তু জঙ্গলের বদলে রয়েছে ইঁটের দাঁত-বেরোনো ফুটপাথ-ঘেঁষা দিনকয়েকের পচা জঞ্জাল, শেয়ালের বদলে খ্যাংরাটে হাড়গিলে  ভেড়ুয়াদের ঘ্যানঘ্যানানি, রয়েছে বুড়িয়ে হেলে পড়া বৃষ্টি-বাদলার মার খাওয়া নোংরা কুঁজো বাড়ি, কার্নিশের ফাঁকে বেবি অশথ্থগাছ, অন্ধকারে যেটুকু দেখা যায়, বাড়িগুলোর সামনে কচি-পাকা নানা রকমের চংকুমণি ঢলঢলে-যৌবন যুবতী আর উঠতি-যুবতীরা  দাঁড়িয়ে আছে, পোশাকও অদ্ভুত, যেন হাফশেমিজের তলা কেটে কোমরে বেঁধেছে, যেন শেমিজের ওপরটা কেটে ওপরে পরেছে যাতে তাদের বুকের খাঁজের মনমাতানো আলো আর কোমরের হাতমাতানো বেড় দেখতে পাওয়া যায় ,ওপরের সঙ্গে তলাকার পোশাকের মিল নেই কোনো, অন্তত তাই মনে হল অন্ধকারে ।

         যাতায়াত-মুখর ল্যাদখোর রাস্তায় আরেকটু খুঁটিয়ে দেখে বুঝতে পারলেন নগেন দত্ত, যাকে উনি কাটা-শেমিজ বলে ভাবছিলেন, তা ওদের ত্বকে আঁকা, কয়েকটা পেইনটিঙ উনি ইতালি, ফ্রান্স, নেদারল্যাণ্ড, আমেরিকায় দেখেছেন, যখন পতৃদেবের হাত ধরে গিয়েছিলেন ওই দেশগুলোয়, ভ্যানগঘের ‘স্টারি নাইটস’, সান্দ্রা বত্তিচেলির ‘বার্থ অফ ভেনাস’, গুস্তাভ ক্লিমটের ‘দি কিস’, গেওর্গে সেরার ‘এ সানডে আফটারনুন’, দিয়েগো ভেলাকোয়েজের ‘লা মেনিনাস’, জ্যাকসন পোলকের ‘নম্বর ফাইভ’, দিয়েগো রেভেরার ‘দি ফ্লাওয়ার ক্যারিয়ার’, আরও অনেকের । ছবিগুলোর নিউড দেখে নগেন দত্ত বাবাকে বলেছিলেন, ইশ কি ভীষণ বাজে সুন্দর মেয়েরা। উত্তরে বাবা বলেছিলেন, ছবি দেখে ক্রাশ খাসনি, এখন অনেক বছর বাঁচবি, অপেক্ষায় শিমুল পলাশ রঙ ধরে।

          অন্ধকারে ভেসে বেড়াচ্ছে মেয়েগুলোর কাঁচা মাংসের ডাক, কতোরকমের পাখির ডাকের গন্ধ, গত দুশো বছর যাবত শুনে এসেছেন নগেন দত্ত, বাদাতিতির, লালগলা-বাতাই, রাজসরালি, ধলাকপাল রাজহাঁস, চকাচকি, মেটেহাঁস, মেটেধনেশ, নাটাবটের, কুটিকুড়ালি, নীলকন্ঠ, সুইচোরা, পাপিয়া, কোকিল, মালকোয়া, কুবোপাখি, চন্দনা, ঘরবাতাসি, রাতচরা. তিলাঘুঘু, হরিয়াল, ডাহর, সারস, ডাহুক, নেউপিপি, সোনাজিরিয়া, গাঙচিল, মধুবাজ, চড়ুই, ঈগল, শাহিন, পানকৌড়ি, কানিবক, কাস্তেচরা, মদনটাক, শুমচা, বেনেবউ, ফিঙে, ফটিকজল, দোয়েল — তাদের ডানা-ঝাপটানো ডাকের মিহিমিহি সুবাস রয়ে গেছে নগেন দত্তের শরীরে । 

          উনি, নগেন দত্ত, কয়েকশো বছর যাবত খুঁজে ফিরছেন কুন্দনন্দিনী নামে কুমারীফাটল এক তরুণীকে । জীবনের উদ্দেশ্য থাকা প্রয়োজন মনে করে নয়, খুঁজে চলেছেন মেয়েটিকে ভালোবাসবেন বলে, তাকে আজও ভালোবাসতে পারেননি নগেন দত্ত ; আসলে ভালোবাসাই ওনার জীবনের উদ্দেশ্য, বেঁচে থাকার মানে । বেঁচে থাকার জন্যে ওনাকে কিছুই করতে হয় না, কিন্তু জানেন যে ভালোবাসার জন্যে অনেককিছু করতে হবে । জীবন ওনার তারিখহীন হয়ে গেছে ।

          মগজের ভেতরে যে গানটা তাঁকে বিনবিনে উনকির মতন ছেঁকে ধরেছিল, অন্ধকারকে চটচটে একাকীত্ব থেকে বের করে আনার জন্য, তা মুখ দিয়ে জগন্ময় মিত্রের কন্ঠস্বরে বেরিয়ে আসছে শুনে অবাক হলেন না নগেন দত্ত, বেরোতে দিলেন গানখানা, ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকসুদ্দু, কেননা ওনার মুখের ভেতরে হেন বাঙালি-অবাঙালি পুরুষ নেই যার কন্ঠস্বর সময়ে-অসময়ে বেরিয়ে আসেনি গত পঞ্চাশ একশো দেড়শো বছর যাবত, উনি যদি আজ ধুতি-পাঞ্জাবির বদলে জিনস-টিশার্ট পরে থাকতেন, তাহলে হয়তো গলার ভেতরে নাচতে আরম্ভ করতেন এলভিস প্রিসলে তাঁর ‘জেল হাউস রক’ গানখানা গাইতে-গাইতে, কিংবা হয়তো মাইকেল জ্যাকসনের ‘আই জাস্ট কান্ট স্টপ লাভিং ইউ’ গাইতে গাইতে, এখন ধুতি-পাঞ্জাবি-কোলহাপুরি পরে আছেন বলে জগন্ময় মিত্রের গানখানা আচমকাই বেরিয়ে এলো, নয়তো বড়ে গুলাম আলির ‘কা করুঁ সজনা আয়ে না বালম’ ও বেরোতে পারত, কার গান যে কখন বেরোবে তার ওপর ওনার, নগেন দত্তর বড়ো একটা নিয়ন্ত্রণ নেই, তা উনি মুখ বন্ধকরে রেখেও দেখেছেন, গান এসে গেলে তা বেরোবেই বেরোবে, আর ভালোবাসার গান হলে তা থামানো অসম্ভব :

                   ভালোবাসা মোরে ভিখারি করেছে

                   তোমারে করেছি রানি ।

                   তোমারই দুয়ারে কুড়াতে এসেছি

                   ফেলে দেওয়া মালাখানি

                   নয়নের জলে যেকথা জানাই

                   সে ব্যথা আমার কেহ বোঝে নাই

                   মেঘের মরমে যে মিনতি কাঁদে

                   চাঁদ বুঝিবে না জানি ;

                  ভালোবাসা মোরে ভিখারি করেছে

                  তোমারে করেছে রানি

                  মাধবীলতা গো আজ তুমি

                  আছ ফুলের স্বপনসুখে

                  একদিন যবে ফুল ঝরে যাবে

                  লুটাবে ধূলির বুকে ।

                  খেয়ালি প্রেমের খেলা বোঝা দায়

                  কখনো হাসায় কখনো কাঁদায়

                  মুক হয়ে যায় কারও মুখরতা

                  কারও মুখে জাগে বাণী

                  ভালোবাসা মোরে ভিখারি করেছে

                  তোমারে করেছে রানি….

         ভালোবাসা, নগেন দত্ত চেয়েছেন, বিপথে যাবার মতন হোক, পথে যা পাবে ভেঙে গুঁড়িয়ে চুরমার করে, নারকেল গাছের মাথা থেকে পাতা মুড়িয়ে, ডাবের কাঁদি ছিঁড়ে ফেলে, চিলের বাসার ডিম ফাটিয়ে, বটগাছকে ঝুরি-শেকড়সুদ্দু উপড়ে ফেলে, মেছোবকের ঘুমন্ত ঝাঁক উড়িয়ে, নদীর জলে বান এনে, মাছের ঝাঁকেদের মধ্যে ঘুর্ণির মতন ঢুকে যাক, চালাবাড়িসুদ্দু গ্রামের পর গ্রাম এক জায়গা থেকে নিয়ে গিয়ে আরেক জায়গায় বসিয়ে দিক, শহরের বাড়িগুলো হেলে পড়ুক ভালোবাসার ভূমিকম্পে, ঝড়ে উড়তে থাকুক মিছিল ফেরত মানুষের দল, সবকিছু এলোমেলো হয়ে যাক তাঁর প্রাপ্য ভালোবাসার পাত্রীর জন্যে ।

          আশা ছাড়ে না অনুভূতির দালাল  পেশাদার কোটনারা, খ্যাংরাটে পিম্পদের ঢ্যামনাকাত্তিক চেল্লাচিল্লির ঘ্যানঘ্যানানি ছেঁকে ধরেছিল ওনাকে, ঠিক যেমন ওদের হাড়ের সঙ্গে কোনোরকমে চিপকে আছে চামড়াটে মাংস, মুখের ভেতরে সেকারণেই থেমে গিয়েছিল গানখানা, ব্যাটারা দেখেছে নগেন দত্ত নেমেছেন টয়োটা গাড়ি থেকে, ওরা জানে খদ্দেরটা মালদার হাবলা, রসের নাগর, খাজা পাবলিক নয়, টাকার টাইমকল, সহজে ইল্লি খায় না, দশ কুড়ি চল্লিশ একশো দেড়শো বছরে অবিরাম কয়েকদিনের জন্যে আসে আর তারপর কোথায় হারিয়ে যায়, কোনো মেয়ে এনাকে ভালো কাস্টমার সার্ভিস দিলে তার একশো-দুশো বছরের জন্যে জীবনের বীমা করিয়ে দ্যান। 

          কাচরাদের ক্যাচাল ভ্যানতারা এড়িয়ে,  অন্ধকারে বাঁহাতে মোবাইল দেখে এগোচ্ছেন , ডানহাতে অ্যাটাচিকেস, যাতে হয়তো অনেক টাকা আছে, তবু লুটপাটের চেষ্টা করে না দালালরা, তুকতাক করে এমন ক্ষতি করে দিতে পারেন যে হঠাৎ চিৎপটাঙ হয়ে মরে পড়বে গলিতে, মুখ দিয়ে গলগল করে রক্ত, এর আগে দুজন নাঙের সঙ্গে ঘটেছে অমন ঘটনা, একজনকে তো আকাশের চিল বানিয়ে উড়িয়ে দিয়েছিলেন, সেই থেকে দালালটাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি, থানায় নালিশ করতে গেলে ওসি বলেছিল, “এই, এই মালগুলোকে লকআপে বন্ধ করে দুচার ঘা দিয়ে হুঁশ ফিরিয়ে আন তো।”  যখন তাদের হুঁশ ফিরেছিল তখন ওরা দেখল যে কেষ্টপুরের খালের পাঁকে পোঁদ উল্টে উলঙ্গ পড়ে আছে, চারিদিকে অশ্লীল আধুনিক বাংলা ভাষার শহুরে ডিগডিগে কিচাইন ।

          আকাশের মেঘ আর কালবৈশাখিও যে নগেন দত্তই নিজের সঙ্গে নিয়ে এসেছেন সে ব্যাপারে কয়েকজন পুরোনো ভেড়ুয়া নিশ্চিন্ত, নয়তো এখন তো কালবৈশাখির মরসুম নয় ।

          লেগেই আছে পিটপিটে-চোখ ফ্যাঁচফ্যাঁচে সর্দি দাঁতক্যালানে দালালরা, যেমনটা ওরা প্রতিবার নগেন দত্তকে দেখলেই বিস্কুটখেকো নেড়ি-কুকুরের মতন পেছনে দৌড়োয়, মেজাজ চটকে যাবার যোগাড়, স্যার যেমন চান তেমন পাইয়ে দেবো, এই বাড়িতে আসুন, ফর্সা ধবধবে পাঞ্জাবি পাবেন, গুলশন কৌর, ফুরসত মাজিঠিয়া, সিমরন সিং,  গালফোলা ঢাউসবুক নেপালি চান পাবেন, ছিনমুন থাপা, চম্পক গুরুং, কুচর কইরালা, ঘড়ঘড়ে সর্দিবন্ধ গলার স্বরে, না স্যার, আমাদের বাড়িতে আসুন, মারোয়াড়ি বউয়ের সঙ্গে শুয়েছেন কখনও, জগৎশেঠের বাঁদির মেয়ের মেয়ের মেয়ের মেয়ে, ছয়েলছবিলি ঝুনঝুনওয়ালি, রাজস্হান থেকে টাটকা আমদানি, ব্রিটিশ সায়েবদের আমলের মারোয়াড়ি বউ, শিফনশাড়ি, কানে ঝমঝমে দুল, এয়ার কান্ডিশান ঘর, ঠোঁটে ল্যাকমে, গায়ে ডিওডোরেন্ট, ঘরে রুম ফ্রেশেনার, নাকি সুরে, লোকটার গালে ছুরি খাওয়ার দাগ, স্যার ওদের ছাড়ুন, আমি টিভিস্টার পাইয়ে দেবো, বাংলা চান বাংলা, হিন্দি চান হিন্দি, এক্সট্রা লার্জ বুকের সাইজ হুজুর, এক্সট্রা লার্জ পাছা, একবার এসে দেখুন না হয় তারপর যা ভালো বোঝেন করবেন, সারা রাত চান, ঘণ্টাখানেক চান, এমনকি দশ-পনেরো মিনিটের জন্যেও পাবেন হুজুর, বড়ো ছ্যাঁদা চান পাবেন, ছোটো ছ্যাঁদা চান পাবেন, যেন কিছুক্ষণ আগেই ঘুম ভেঙেছে, হাই তোলা বন্ধ রেখে ।

         নাহ, এ পাগল কাউকে পাত্তা দেবে না, বলল একজন কমবয়সী দালাল, ফিসফিস, হাঁ-মুখে চোলাই সাঁটা হাওয়া, চোঙা প্যান্ট । এই দালাল পঁচাত্তর বছর আগে, যখন ওর বয়স কুড়ি ছিল, নাইট-ভিউ গ্যালারির দরোজায় গেট-মিটিং করে পিম্পদের হরতাল ডেকেছিল, তবে তাতে অন্য পিম্পরা যোগ না দেয়ায় পাড়ার নেতা হতে পারেনি, বাইরের এক পালোয়ান এসে পাড়ার নেতা হয়ে গিয়েছিল, মনে পড়ল নগেন দত্তর। পালোয়ানের নাতি এখন মোহোল্লা কমিটির মুখ্য-কোটনা ।

         নগেন দত্ত কাউকে পাত্তা দিচ্ছেন না দেখে একজন খ্যাংরাকাঠি লুঙ্গিপরা গুটকামুখ দালাল টিটকিরি মারল, ওর বড়ো ছ্যাঁদার পাল্লায় পড়বেন না হুজুর, ঝাণ্ডা নিয়ে বড়ো ছ্যাঁদায় ঢুকবেন আর পুরো পার্টি দলবল নিয়ে মিছিলের স্লোগান দিতে-দিতে বেরিয়ে আসবে আবনার পিছন-পিছন । 

          নগেন দত্ত জানেন যে লোকটা সঠিক কথা বলেছে, ওনার ক্ষমতা আছে তা করার, একবার রাস্তা পেরোতে আধ ঘণ্টা লেগে গিয়েছিল বলে, ময়দানমুখো র‌্যালিকে সেই মিছিলের একজন মহিলার গর্ভে লোপাট করে দিয়েছিলেন, গর্ভের ভেতরে স্লোগানের দপদপানি শুনে সিজার করতে হয়েছিল মেডিকাল বোর্ডকে । এক ইঞ্চি মাপের মানুষেরা গর্ভ থেকে  ‘ইয়ে আজাদি ঝুঠা হ্যায়’ স্লোগান দিতে-দিতে বেরিয়েছিল।

          আমি শুতে আসিনি, জীবনে হাজার-হাজার বার শুয়েছি, দিনে দুতিনবার দুতিন জনের সঙ্গে শুয়েছি, বাৎসায়নের সবগুলো শোয়া শুয়ে নিয়েছি, এখন ভালোবাসতে আর ভালোবাসা পেতে এসেছি, এবার শুধু ভালোবাসার পাত্রীর ভালোবাসা চাইছি, বললেন নগেন দত্ত ।

          খেটে-খাওয়া মা আর খুঁটে খাওয়া বাপের ঝুপ্পুসলীলায় পয়দা-হওয়া দালালগুলো নাছোড়, মাংসের ঝোল দিয়ে ভাত মুখে পুরে কথা বলার ঢঙে, পাবেন স্যার, ভালোবাসা পাবেন, যেমন করে ভালোবাসতে চান পাবেন, দাঁড়িয়ে, বসে, পা ছড়িয়ে, উপুড় হয়ে, কুকুরের পোজে, সিংহের পোজে, গণ্ডারের পোজে, হাতির পোজে, বাসুন না যেমন ভাবে চান, একবার এসে তো দেখুন, দেখবেন ভালোবাসবার জন্য মুখিয়ে আছে, আপনার মন ভরে যাবে, রোজ আসতে ইচ্ছে করবে, বেশি রেট নয় স্যার, চলুন না, একবার নিজের চোখে দেখে তো নিন, যাদের দেখছেন এরা ভালো কোয়ালিটির আইটেম নয় স্যার, সস্তা, রোগ বাধিয়ে দেবে, ওপরে চলুন, নামি-দামি পাইয়ে দেব আপনাকে  । 

          মোবাইলকে লাউডস্পিকার মোডে লাগিয়ে নরেন দত্ত পিম্পগুলোকে বললেন, শোন শোন, তোরা শোন, আমি এই মেয়েকে খুজছি, তাকেই ভালোবাসতে চেয়েছি,  ভালোবাসতে এসেছি, তা দুশো বছর আগের কথা তো হবেই, বেশি তো কম নয় ।

          দালালগুলো নগেন দত্তকে ঘিরে মোবাইলে রেকর্ড করা কথা শুনতে লাগল, এতো কাছ থেকে যে নগেন দত্ত নিজের মগজের গোলাপি অন্ধকারে নিজেকে বললেন, ব্যাটারা ষাট-সত্তর বছর স্নানটান করে নি, গায়ে কি দুর্গন্ধ, এখন থেকেই ধেনো টেনে রেখেছে, বা হয়তো দশ বছর আগে যে ধেনো টেনেছে তার খোঁয়ারির বদবুতে মুখ ম-ম করছে ।

          একজন দালাল বলল, স্যার এর আগে কি এই মেয়েটাকেই খুঁজেছিলেন ?

          নগেন দত্ত বললেন দুশো বছর যাবত খুঁজে চলেছি, তোরা মন দিয়ে শোন :

          “সকলেই বিস্মিত হইয়া দেখিল যে যুবতীর শরীরে আর রূপ ধরে না । সেই বহুসুন্দরীশোভিত রমণীমণ্ডলেও, কুন্দনন্দিনী ব্যতীত তাহা হইতে সমধিক রূপবতী কেহই নহে । তাহার স্ফুরিত বিম্বাধর, সুগঠিত নাসা, বিস্ফারিত ফুল্লিন্দীবরতুল্য চক্ষু, চিত্ররেখাবৎ ভ্রুযুগ, নিটোল ললাট, বাহুযুগের মৃণালবৎ গঠন, এবং চম্পকদামবৎ বর্ণ, রমণীকুলদুর্লভ ।”

          মোবাইল অফ করে নগেন দত্ত বললেন, বুঝেছ, এই মেয়েকেই খুঁজছি ।

          একজন দালাল, গলায় মাফলার জড়ানো, এই গরমেও, বলল, স্যার এটা কি সরকারি হিন্দি, দূরদর্শনে খবর পড়ে, সেরকম মনে হল, শুনি কিন্তু কিছুই বুঝতে পারি না । এর আগে তো আপনি কুঁদি নামে একটা মেয়েকে খুঁজতে আসতেন ।

          আরে, না রে ল্যাওড়ার ক্যাওড়া, মালায়ুলি মালায়ুলি, নীলকমল গ্যালারিতে আছে, দেখিছিস তো, এমনি করেই কতাটতা বলে, রেমড়িঁআম্মা, চলুন স্যার, নিয়ে যাচ্ছি মালায়ুলির কাছে, তবে ওর গায়ের যা রঙ, আবনার পাঞ্জাবি-ধুতি শাদা থাগলে হয়, ঘড়ঘড়ে গলার দালাল ।

          মালায়ুলি নয়, মালায়ুলি নয়, হায়দ্রাবাদি, কাইকু কাইকু করে কতা বলে, মোচোরমান চলবে তো হুজুর, ওর চেয়ে ভালো মোচোরমান মেয়ে পাইয়ে দেবো, আরবদেশের চেয়ে ফর্সা, চলুন আমার সঙ্গে, বুকে মুখ গুঁজে পিথ্থিবির সব দুখ্খু ভুলে যাবেন , অবশ্যি মেয়েদের হিন্দু-মোচোরমান বলে কিছু নেই স্যার, ওসব আস্ত-খোসা আর ছাড়ানো-খোসা পুরুষদের ব্যাপার স্যার, চলুন না, একবারটি দেখে নিন, নাকিসুর দালাল ।

         কারেন্ট চলে আসতে, ভেড়ুয়াগুলোকে দেখলেন নগেন দত্ত, নাঃ, কর্নওয়ালিসের দেয়া জমিদারি উঠে যাবার আগে এদের কেউই তাঁর মোসাহেব ছিল না, এরা তো সংসদীয় গণতন্ত্রের বাইপ্রডাক্ট, একেবারে ভিকিরি, দুবেলা নালির চোলাই আর পচাই-তাড়ি খেয়ে পড়ে থাকে । এরা কুন্দনন্দিনী উচ্চারণ করতে পারবে না ভেবে কুন্দনন্দিনীর ডাকনামটার কথা বলেছিলেন ।

          আরেকজন ভেড়ুয়া, গমগমে গলায় বলল, হুজুর, শুনে তো কিছুই বুঝতে পারিনি, তবে কুন্দনন্দিনী শুনতে পেলুম । আমার মাসিপিসির গ্যালারিতে যতোগুলো মেয়ে আছে সকলের নামই কুন্দনন্দিনী । ওই যে গন্ধরানির বাড়ি দেখছেন, সেখানে। আপনি আগের বার গিসলেন বোধয় স্যার ।

         মাসিপিসির গ্যালারি ? মুখময় পানিবসন্তের আলপনাদেয়া কোটনাটার দিকে মুখ ঘুরিয়ে, জানতে চাইলেন নগেন দত্ত, মাসি আর পিসি একই সঙ্গে ! যতোদূর জানি, আগে তো মাসি বলেই ডাকা হতো বাড়িউলিকে । তার বাড়িতে একজন নয়, দুজন নয়, সবাই কুন্দনন্দিনী ! কেমন করে জানা যাবে আসল কুন্দনন্দিনী কে ! ভালোবাসার পাত্রীকে কেমন করে খুঁজে পাবো ?

          না স্যার, উনি আগে কালেজে পড়াতেন, প্রফেসার চক্কোত্তি, কালেজের ছেলে-মেয়েরা ওনাকে পিসি বলে ডাকতো, কালেজে পড়িয়ে আর বেনামে বই লিখে তেমন রোজগারপাতি হতো না বলে এই লাইনে এয়েচেন, ওনার মালিক অনেক ট্যাকা ঢেলেচেন, আগের মাসি ছোটোবেলায় ওনার বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করতো, তাপ্পরে কেউ ফুসলিয়ে ঝিকে বেচে দিলে দিল্লির মেড়ো পার্টিকে, সে আর ছাড়ে কেন, হেভি দাম দিয়ে কুমারী মেয়ের পরদা ছিঁড়তে পেলো । প্রফেসার চক্কোত্তি অ্যাগবার এসেছিলেন গন্ধরানির কাছে, বছর তিরিশ-চল্লিশ আগে, নকশাল করবার সময়ে গন্ধরানির খাটের তলায় পনেরোদিন লুক্কে ছিলেন, দুজনের এমন সখি-সখি ভাবভালোবাসা হল যে প্রফেসর চক্কোত্তি  গন্ধরানির ব্যবসা অনেক ট্যাকা দিয়ে কিনে নিলেন, লোকে বলে ট্যাকাটা ওনার গুরু-মহারাজের। অ্যাগবারে নতুন ঢঙে সাজিয়েচেন স্যার । গন্ধরানিকে রেখে এয়েচেন বুড়োবুড়ি আবাসে ।

          —ওঃ, ছোটো থেকে প্রোমোশান পেয়ে-পেয়ে এই বাড়িটা দখল করে নিলেন ?

          —জি হুজুর, আগের মাসির নামই গন্ধরানি । পাড়ার মেয়েরা বাড়িটাকে মাসিপিসির গ্যালারি বলে জানে । ঘড়ঘড়ে কন্ঠস্বরের দালাল ।

          —চলো, নিয়ে চলো, আসল কুন্দনন্দিনীকে যদি পাই, দেড়শো বছরের কান্না চোখের তলার থলিতে জমে আছে । 

          —পাবেন, পাবেন, সুদু এপার বাংলা-ওপার বাংলার মেয়ে পাবেন মাসিপিসির গ্যালারিতে, সকলের নামই কুন্দনন্দিনী ।

         —চলো, নিয়ে চলো, কতকাল হয়ে গেল বাংলা ভাষার সঙ্গে শুইনি, বাংলা ভাষার অরগ্যাজমের আনন্দ উপভোগ করিনি, ঠোঁটে বাংলা ভাষার থুতু পাইনি, বুকে বাংলা মাংসের জাপট পাইনি, বোধহয় পঞ্চাশ আশি একশো বছর হয়ে গেল । সেই কবে তিথি আহমেদ আর ছন্দরানি মজুমদারের সঙ্গে লিভ-টুগেদার করার দিনকালে যেটুকু আয়েশ করেছিলুম ।

          নিজের মগজের গোলাপি অন্ধকারে নিজেকে ফিসফিস করে বললেন, যে মেয়েগুলোকে দোরগোড়ায় দেখছি, এরা বাঙালিনী নয় বলেই তো মনে হচ্ছে, ত্বকে শ্যামল কোমলতা নেই, চোখ ডাগর নয়, পাছা অব্দি কোঁকড়ানো চুল নয়, কেবল ফর্সা দিয়ে নগেন দত্তের মন ভরে না, অবাঙালিনী হলে আবোলতাবোল কথা বলার আনন্দের তো উপায় নেই, কেবল দুদণ্ড জড়িয়ে শোয়া আর ইল্লি করে উঠে পড়ার জন্যে তো আসেননি, ভালোবাসতে আর ভালোবাসা পেতে এসেছেন, যে ভালোবাসা কুন্দনন্দিনী দেবে বলে কথা দিয়েছিল বহুকাল আগে । অ্যাটাচিকেসটা সেই জন্যেই তো এনেছেন সঙ্গে ।

          রাস্তার মুখে নীলের ওপর সাদা অক্ষরে লেখা কোবরেজ হরিদাস পাল সরণী ।

          মনে পড়ল নগেন দত্তর, জঙ্গলের মধ্যে শিশু গাছের তলায় বসে-থাকা নাকে-নস্যি হরিদাস পাল কোবরেজের সঙ্গে কথা কাটাকাটি হয়েছিল ।

          —তুমি কি ?

          —আমি জীব ।

          —তুমি কোন জীব ?

          —আমি তটস্হ জীব ।

          —থাকেন কোথায় ?

          —ভাণ্ডে ।

          —ভাণ্ড কিরূপে হৈল ?

          —তত্ববস্তু হইতে ।

          —তত্ববস্তু কি ?

          —পঞ্চ আত্মা, একাদশেন্দ্র, ছয় রিপু, ইচ্ছা, এই সকল য়েক যোগে ভাণ্ড হইল । আমি সেহেতু চিরযুবক।

          নগেন দত্তর উত্তর শুনে হরিদাস পাল কোবরেজ বলেছিলেন, সঠিক উত্তর দিয়েছ, আলোকপ্রাপ্তির জন্যে জঙ্গলে প্রবেশ করতে পারো । 

         আলোকপ্রাপ্তি শব্দের সঙ্গে কুন্দনন্দিনীর কোথাও মিল আছে, মনে হল নগেন দত্তর।

          আজকে রাস্তাটায় ঢুকে সবই গুলিয়ে যাচ্ছিল নগেন দত্তর । ময়নামতির বাড়ির নাম হয়েছে নীলকমল গ্যালারি, সুখরানির বাড়ির নাম হয়েছে প্রেমকমল গ্যালারি, হরিমতির বাড়ির নাম হয়েছে প্রেমবন্ধন গ্যালারি, হেমনন্দিনীর বাড়ির নাম হয়েছে গঙ্গাজমুনা গ্যালারি, নলিনীবালার বাড়ির নাম হয়েছে নাইট লাভার্স গ্যালারি, যশোমতির বাড়ির নাম  পালটে কি হয়েছে দেখতে হবে , পিসির বাড়ির ঝিয়ের কথা বলছে, তাহলে কি যশোমতির কথা বলছে ! তবে বাড়ির দরজায় একটা নম্বর দেয়া, লোডশেডিঙের সময়ে অন্ধকার ফুটো-করা আলো দেখা যাচ্ছিল এই বাড়ির দরোজায় । 

           আরেকটু ভেতরে ঢুকতে পারতেন নগেন দত্ত, চিনতে পারলেন,   দুর্গাবরণ মিত্র সরণী, হ্যাঁ, এই জমিদারবাবুর  সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল বলে মনে পড়ছে, ওনার কাছারিবাড়িতে রামপ্রসাদ সেন নামে একটি ছেলে ভালো শ্যামাসঙ্গীত গাইত।  মগজের ভেতরে রামপ্রসাদ সেনের কন্ঠস্বর গেয়ে উঠতে চেয়েছিল, শ্লেষ্মা দিয়ে চাপা দিলেন এখনকার মতন, পরে ওনাকে গলায় গাইতে দেওয়া যাবে, আপাতত কালীবন্দনার প্রয়োজন ঘটেনি ।

         তারপর হামাম বক্স সরণী, নাঃ, এনার সঙ্গে পরিচয় হয়নি । এই এলাকায় যারা বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে, তারা তেমন আকর্ষক নয় । তাদের গায়ে কালিঘাটের পট আঁকা । 

         এদের কাউকে বেছে নিয়ে কুন্দনন্দিনীর রূপ দিতে পারি, নিজের মগজের গোলাপি অন্ধকারে নিজেকে বললেন নগেন দত্ত, কিন্তু তার ভেতরটা, যাকে আগেকার লোকেরা বলত অন্তরজগত, তা তো পালটে কুন্দনন্দিনীর করে দিতে পারব না ।  আমার চাই আসল কুন্দনন্দিনী, যাকে দুশো বছর যাবত খুঁজছি ।        

          মনে পড়ল ওনার,  কাজী জহির রায়হান নামে এক মুসলমান যুবকের সঙ্গে বছর পঁয়তাল্লিশ আগে পরিচয় হয়েছিল বটে,  বাংলাদেশ যুদ্ধের সময়ে যারা মুক্তি যুদ্ধ এড়িয়ে তিরিশ হাজারিনীর দেশে আলোকপ্রাপ্তির জন্যে আসত, লুকিয়ে-লুকিয়ে তাদের মুভি ফিল্ম তুলেছিল, সেই থেকে কাজী জহির রায়হানকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি । দেশটা তখন পাকিস্তান ছিল, এখন বাংলাদেশ হয়েছে ; বাংলাদেশ হলেও অনেকের অন্তরজগতে পাকিস্তান রয়ে গেছে ।

          নগেন দত্তের একবার মনে হয়েছিল কাজী জহির রায়হানকে জীবন্ত করে ঢাকায় পাঠিয়ে দেবেন, তা আর করেননি, শেষে ওপার বাংলার লোকেরাও তাঁকে প্রতিভাবান মনে করবে, এই আতঙ্কে ।

          পিসিমাসির গ্যালারির বাড়ির দরোজা খোলা দেখে, দালালটাকে কোনো গুরুত্ব না দিয়ে,  ওপরে দোতলায় ওঠার সময়ে নগেন দত্ত বাইরে হাত নাড়িয়ে শিলাবৃষ্টি আরম্ভ করে দিলেন, তিরিশ হাজারিনীর শহরে শিলাবৃষ্টিতে ফসল নষ্ট হবার সমস্যা নেই, পিম্পগুলো অন্তত আড়ালে আশ্রয় নেবে ।

         সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময়ে, হাজার-হাজার পুরুষেরা উঠে-উঠে সিঁড়ির গোলাপি দেয়ালকে ছুঁয়ে মসৃণ করে দিয়েছে, স্লেট-রঙের সিঁড়িগুলো ক্ষইয়ে দিয়েছে,  দেখলেন দেয়ালজুড়ে বাংলায় লেখা রয়েছে ‘বিইং অ্যাণ্ড নাথিংনেস’, বিইং-এর ওপর  পুরুষের বিশাল লিঙ্গ আঁকা আর নাথিংনেসের ওপরে ফাটল-স্ফীত ভগ । 

          সিঁড়িতে কোথাও লুকোনো স্পিকার থেকে জি-মাইনরে য়োহানেস ব্রাহমসের পাঁচ নম্বর হাংগেরিয়ান নাচ বাজছিল মৃদুস্বরে, আগত নাগরদের মেজাজকে আহ্লাদে চুবিয়ে দেবার খাতিরে ।

          নিজের মগজের গোলাপি অন্ধকারে নিজেকে নগেন দত্ত বললেন, ঠিক বাড়িতেই এসে পড়েছি, বছর আশি আগে যখন এসেছিলেন তখন সিঁড়ির দেয়ালে এই লেখা আর লিঙ্গ-যোনির হাতে আঁকা রঙিন ছবি ছিল, বাজনাও এইটেই ছিল। 

          বিইং মানে যা ‘আছে’, নাথিংনেস মানে যা ‘নেই’। আঁকা লিঙ্গ দাঁড়িয়ে থেকে প্রমাণ করছে যে সে ‘আছে’, শিশ্নকে গোলাপি রঙ করে গেছেন কোনো আন্তর্জাতিক বহুজাতিক প্রেমিক ছবি-আঁকিয়ে, হয়তো এদেশেরই, হয়তো ফরাসি দেশের, হয়তো ইতালির রেনেসঁসের সময়কার, যাঁদের তুলির মাপ একহাত সাতইঞ্চি ছিল, বিখ্যাত ছবি-আঁকিয়েরা, যশোমতির বাড়িতে প্রেম করতে এলে ছবিগুলোকে চাঁঙ্গা করে দিয়ে যান । টুকরো দু-পাট লাবিয়ার মাঝে গোলাপি ভগাঙ্কুর প্রমাণ করছে যে সেখানে বিইং জিনিসটা ‘নেই’ । 

          দালালটা ঠিকই বলেছিল, ‘নেই’ এর হিন্দু-মুসলমান হয় না ।     

          সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময়ে নগেন দত্ত অনুভব করতে পারছিলেন যে তিনি উলুপি-সুবাসের হ্রদের হাফঠাণ্ডা তলদেশ থেকে ওপরের দিকে উঠছেন, আলোকপ্রাপ্তির আধুনিকতায় ধুয়ে যাচ্ছে তাঁর পোশাক, যেমন দুশো বছর আগে হয়েছিল, তখন বাবার সঙ্গে এসেছিলেন, বাবা নিয়ে এসেছিলেন ছেলেকে যৌনকর্মে সুদক্ষ করে তোলার জন্য । 

          নগেন দত্তের বাবা ভাব-ভালোবাসায় বিশ্বাস করতেন না, বিশ্বাস করতেন যৌনখেলার দক্ষতায়, যেমন তাঁর পূর্বপুরুষরা তিন-চারশো বছর আগে দশবারোজন বউ রাখতেন আর আনন্দ করতেন । 

          বাবা একটি যুবতীকে চিৎ করিয়ে শুইয়ে, ছেলেকে বলেছিলেন, তুমি যতোই প্রেমের রসবিজ্ঞান পড়ো, লিঙ্গের স্মৃতির কাছে সবই তুচ্ছ, যে লিঙ্গের নিজস্ব স্মৃতি নেই, বুঝতে হবে তাতে মনুষ্যত্বের অভাব রয়েছে, এইভাবে দশ বছরের ছেলেকে শিক্ষা দিয়েছিলেন :

          বাবা : এই দুটো হল ঠোঁট, তোর যেমন আছে তেমন মেয়েদেরও থাকে, দেখেইছিস, তা এই দুটো ঠোঁটে তুই নিজের দুটো ঠোঁট রেখে ডাবের জল খাবি ।

          ছেলে : ডাব তো আমাদের শেতলপুরের জমিদারিতে কাঁদি কাঁদি হয় বাবা, একজন মেয়ের ঠোঁটে কেন খাবো, ডাবের জল তো পাবো না, কী পাবো তাহলে ?

          বাবা : যখন খাবি তখন বুঝতে পারবি, লালার সঙ্গে লালা মিশলে জ্বালা বাড়ার জ্বালা কমে ।

          ছেলে : আচ্ছা, তুমি বলছ যখন তখন খেতেই হবে ।

          বাবা : এই দ্যাখ, এদুটো হল মাই, কিন্তু শক্তপোক্ত হলে তাকে বলে স্তন, ছোটো বেলায় যেমন করে চাকরানিদের দুধ খেয়েছিস, এখনও তেমন করেই খাবি ।

          ছেলে : এখন আর কেন দুধ খাবো বাবা, বাড়িতে গোরুর খাঁটি দুধ তো খাইই ।

          বাবা : দুধ খাবার মতন করে খাবি, কিন্তু দুধ বেরোবে না, আনন্দ খাবি, দুধ থাকলে একরকমের আনন্দ হয়, আবার দুধ না থাকলে আরেকরকমের আনন্দ ।

          ছেলে : দুধের বদলে কী বেরোবে তাহলে ?

          বাবা : কিছুই বেরোবে না, তুই যখন খাবি তখন বুঝতে পারবি ।

          ছেলে : বাবা, এনাকে এরকম উলঙ্গ দেখে আমার কুঁচকির  জায়গায় টিং-টিং করে  শিরশিরানি আরম্ভ হয়ে গেছে ।

          বাবা : গেছে তো ? এই যে কুঁচকির মাঝে যা দেখছিস, সেখানে শিরশিরানির সঙ্গে শিরশিরানি মেশালে  তোর আনন্দধারা প্রবাহিত হবে, তোর মন ভালো হয়ে যাবে, অন্ধকার থেকে আলোয় পৌঁছোবি, আলোকপ্রাপ্তি ঘটবে ।

          যে মেয়েটি শুয়েছিল সে আচমকা উঠে বসে বলেছিল, ওভাবে বোঝালে হবে না কত্তা, শেষে বন্দরের বদলে খেয়াঘাটে জাহাজ ভেড়াবে তোমার ছেলে, তোমাকে চিন্তা করতে হবে না, ও আমি হাতে-নাতে শিখিয়ে দেবো, যেমন করে তোমায় শিখিয়েছিলুম, তোমার শশুরের উইল অনুযায়ী । এখন তুমি বাইরে গিয়ে অপিক্ষে করো, আমরা মহড়া দিয়ে নিই । ওকে জানতে হবে তো দুটো শরীরকে কেমন করে স্হিতাবস্হা থেকে স্ফীতির অবস্হায় নিয়ে যায় প্রেম, ওতো এখনও জানে না যে প্রেম হল স্হিতাবস্হার বিরুদ্ধে প্রথম উল্লাস ।

          ছেলে বলেছিল, জানি গো জানি, প্রেমিকার সবকিছু জেনে ফেললেই প্রেম গুবলেট ।

          শিক্ষিকা মেয়েটি বলেছিল, নগেন দত্তর চুলে বিলি কেটে, অ্যাই তো কতার মতোন কতা ।

          ছেলে সেইমতো জীবন কাটাচ্ছিল, কিন্তু হঠাৎই কুন্দনন্দিনীকে দেখে তার প্রতি ভালোবাসায় আক্রান্ত হলেন নগেন দত্ত।

          ছেলেকে ভালোবাসায় আক্রান্ত হতে দেখে হঠাৎ মারা গিয়েছিলেন নগেন দত্তের বাবা । 

          শেষ শয্যায় শুয়ে উনি, নগেন দত্তের বাবা, বলেছিলেন, আমার আর কোনো আপশোষ নেই, পরশুই দেখে এলুম মোহনবাগান ফুটবলাররা খালি পায়ে আই এফ এ শিল্ড ফাইনালে ইস্ট ইয়র্কশায়ার রেজিমেন্টকে কেমন গুহারান হারালো । 

          ১৯১১ সালের সে-কথা মনে আছে নগেন দত্তর । তবে পরাজয়ের সঙ্গে গুয়ের সম্পর্কের রহস্য উদঘাটন করতে পারেননি আজও ।

         আজকে, সিঁড়ি দিয়ে ওঠবার সময়ে টের পেলেন, ‘আছের’ সঙ্গে ‘নেইয়ের’ মিলনে আলোকপ্রাপ্তি ঘটে এই গ্যালারিতে,  নগেন দত্ত নিজের মোবাইলে বিইং অ্যাণ্ড নাথিংনেসর ফোটো তুলে নিলেন, দেড়-দুশো বছর পরে আবার যখন আসবেন তখন মিলিয়ে দেখার জন্য, বিইং কতোটা উন্নতশির হলো আর নাথিংনেস কতোটা ডাকসাইটে গোলাপি  ।

          দেশ-বিদেশের কতো কতো ‘আছে’ এখানে আসে ‘নেইদের’ সঙ্গে মিলন করতে, নিজেকে আলোয় আলো করে তুলতে । ‘নেইরা’ কতো কতো ‘আছেকে’ আলোয় ভরে দ্যায় ।

         সিঁড়ি দিয়ে উঠে, দোতলার বারান্দায় ঢোকার মুখে চারিধারে লাল টুনিআলো ঝোলানো একটা সাইনবোর্ড টাঙানো, তাতে সাদার ওপরে গেরুয়া রঙে লেখা “দি অ্যাকাডেমি অফ পারফরমিং ফ্লেশ” । সাইনবোর্ডেরও ছবি তুলে নিলেন মোবাইলে, তুলে, মনে পড়ে গেল সেই গানটা, কে যেন গেয়েছিল, মগজের ভেতরে তার গুনগুন শুনতে পাচ্ছিলেন নগেন দত্ত :                              

                                   পা গা মা রে সা নি

                                  পা নি সা রে মা গা রে

                                  রে মা পা নি ধা মা পা না সা রে নি সা

                                  পা ধা মা পা নি ধা মা গা গা সা নি সা

         ঘষা-কাচের আড়াল-তোলা মাসিপিসি গ্যালারির কিউবিকলের পাশ দিয়ে দোতলার বারান্দায় পৌঁছোলেন নগেন দত্ত, মাসিপিসির সঙ্গে কথা পরে বলবেন । 

         যে কোনে একশো বছর আগে এই বাড়ির মাসি জলচৌকিতে বসে দোক্তাদেয়া পানের খিলি সাজাতো, আর মেয়ে বাছাই নিয়ে দরাদরি করত, সেখানটা ফাঁকা, সেই জলচৌকির ওপরে মাসির দোক্তামুখ হাসির ফোটো, তাতে যে রজনীগন্ধার মালা পরানো, তা দশ বছর আগে শুকিয়ে গেছে, মাসি তবুও দোক্তামুখে হাসি বজায় রেখেছে ।

          নগেন দত্ত দেখলেন, বারান্দায় দুটো খাটে দুঃখকাতর দুটো কাটা-মুণ্ডু রাখা , তাদের  মলম ধরণের কিছু মাখানো হয়েছে, দুই খাটের পাশে মুণ্ডুদের শিয়রে দুজন যুবক মেঝেয় বসে, যেন কাটা মাথায় হাত বুলিয়ে তাদের ধড়হীনতার দুঃখ কমাবার চেষ্টা করছে । 

          মুণ্ডুদের মুখে গোঁজা সিগারেটের ফিকে নীল ধোঁয়া জিজ্ঞাসার চিহ্ণ হয়ে উঠে যাচ্ছে প্রেমালাপে ব্যস্ত কড়িকাঠের টিকটিকিদের মাঝে, মুণ্ডুদের খাটের পাশে চায়ের কাপে ফোঁকা সিগারেট গোঁজা, কিন্তু সিগারেটের ধোঁয়া বেরোচ্ছে যুবকদের মুখ থেকে, মুণ্ডুদের মুখ থেকে নয়, ধোঁয়ার গন্ধে নগেন দত্ত টের পেলেন ওরা চরস ফুঁকছে । 

          বোঝা গেল না জিজ্ঞাসায় আক্রান্ত কারা, মুণ্ডুদুটো নাকি পাশে বসে থাকা যুবকেরা ।

          টিকটিকি আর টিকটিকিনী বিরক্ত হল তাদের প্রেমে ব্যাঘাত ঘটায়, ক্লাইম্যাক্সে প্রায় পৌঁছে গিয়েছিল, বাধ সাধলো চরসের ধোঁয়া ; বিরক্তি জানাতে বাধ্য হল
          টিকটিকি : এই বাঞ্চোত মানুষগুলো আমাদের শান্তিতে থাকতে দেবে না, আমাদের সবকিছু দখল করে নিয়েছে, কোথাও যাবার যো নেই, ওদের বাড়ির বউগুলো তো আমাদের দেখলেই অজ্ঞান হবার যোগাড়, যাও বা একটু দূরত্ব রেখে প্রেম করছি, তাও করতে দেবে না । এদিকে নিজেরা বাজার খুলে বসে আছে ।

          টিকটিকিনী : ওদের কথা আর বোলো না, ঘরের ভেতরে দেখেছি তো, মরদগুলো চুর হয়ে থাকে, পায়ের ফাঁকে গেল না বালিশের ফাঁকে গেল, সেসব টের পায় না, ব্যাস, নিজের শকড়ি বয়ে গেলেই হলো । মাগিগুলোও চুষে পকেট ফাঁকা করে ফেরত পাঠিয়ে দিচ্ছে । সেদিন তো একজনকে সিঁড়ি দিয়ে লাথিয়ে বের করে দিলে, যন্তর দিয়ে “আই লাভ ইউ” বলতে পারেনি বলে ।

         টিকটিকি : ওদের সংস্কৃতি হল গোলাপায়রার সংস্কৃতি, চোপরদিন বকরবকম বকরবকম ছাড়া অন্য কাজ নেই ।

         টিকটিকিনী : ওদের সমাজে যারা দুর্বল তাদের ওরা বলে ভালোমানুষ, হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ ।

         টিকটিকি : ওয়ান টু থ্রি বলব, আর দুজনে মিলে ওদের মাথায় হাগবো, কি বলিস ? নে, ওয়ান টু থ্রি।

         টিকটিকি আর টিকটিকিনীর ন্যাড় ঝরে পড়ে যুবতী কন্ঠস্বরের যুবকদের কোঁকড়া চুলে, আর পাকতে লাগলো ওদের মাথার চুল ।

          নগেন দত্তের সন্দেহ হল যে এই দুই ধড়হীন মুণ্ডুর দেহ ডিকনসট্রাক্ট করে ফেলা হয়েছে, অবিনির্মাণ, পি সি সরকার, মানে প্রতুলচন্দ্র সরকার যেমন অবিনির্মাণ করতেন মঞ্চে রাখা তরুণীর দেহ, পি সি সরকারের বাবা ভগবানচন্দ্র সরকার ওনাদের টাঙ্গাইলের বাড়িতে ১৯০৯ সালে নগেন দত্তকে দেখিয়েছিলেন অবিনির্মাণের ক্যারদানিখানা, নগেন দত্ত তখন কৈশোরে আটকে আছেন , সবে গোঁফে রদবদল ঘটছে, কতোকাল আটকে ছিলেন কৈশোরে তা আর মনে নেই ওনার ।

          নিজের মগজের গোলাপি অন্ধকারে নিজেকে নগেন দত্ত বললেন, দেখি, সময় পেলে এদের দেহ দুটো রিকনসট্রাক্ট করে জেনে নেবো প্রকৃত আদল-আদরা , এদের মুণ্ডুদের বোধহয় ডেফারাল চলছে।

          যুবকেরা মুণ্ডুদের ঠোঁট থেকে সিগারেট বের করে নিলে, দুটো মুণ্ডুই একসঙ্গে বলে উঠল, “নগেন এসেছ?” 

         নগেন দত্তর মনে হল, মুণ্ডু দুটো নয়, যে যুবকেরা খাটের শিয়রে বসে আছে, কথাটা তারাই একসঙ্গে বলে উঠল ; নিজের মগজের গোলাপি অন্ধকারে প্রশ্ন জেগে উঠল নগেন দত্তের, যুবকদের কন্ঠস্বর এরকম মেয়েলি আর সুরেলা কেন ? এরা সত্যিই যুবক নাকি তিনি কোনো মায়ায় আক্রান্ত হয়েছেন, পায়ুকামের মায়ায় । মুণ্ডু দুটো তাঁকে চিনল কেমন করে ! কখনও শুয়েছেন হয়তো এদের সঙ্গে, পঞ্চাশ, আশি, একশো বছর আগে, মুখ তো আর মনে থাকে না, বড়ো জোর বুকের উঁকি-দেয়া আঁচিল মনে থাকে, উরুর ট্যারা-চাউনি তিল মনে থাকে, ভগাঙ্কুরের জটার-পেন উথাল-পাথাল মনে থাকে, অকুস্হলের পাকানো চুলের গান মনে থাকে, মনমাতানো গন্ধ আর হাতমাতানো কোমর মনে থাকে । 

          মুণ্ডু দুজনের উদ্দেশে নগেন দত্ত বললেন, আপনাদের তো চিনতে পারছি না, আগেও কতোবার এসেছি, সকালে, দুপুরে, মাঝরাতে, কিন্তু কখনও দেখিনি তো, বললেন নগেন দত্ত, তারপর যোগ করলেন, দেহের বাকি অংশ নেই কেন ?

         চিনতে পারছ না কেন নগেন ? আমি তোমার তিথি আহমেদ, বেগমপুরের জর্দাভরা কতো পান খাইয়েছো, তুমি প্রথমবার যখন ঢাকায় রাতের-বউ বাছতে এলে তখন আমাকে বেছে নিয়েছিলে, আর জলপাইগুড়ি থেকে ছন্দরানি মজুমদারকে, তোমাদের গোবিন্দপুরের জমিদারিতে, ছাতিমগাঁয়ের বাগানবাড়িতে নিয়ে গিয়ে তুলেছিলে, ভুলে গেলে এতো তাড়াতাড়ি ? বিলিতি মদ খাবার পর, তুমি আমায় আদর করে কখনও মেরি, কখনও এমিলি বলে ডাকতে । মাথায় কাঁচাপাকা চুল, চোখে চশমা, কাটা-মুণ্ডু, জোর করে হেসে বললে।

         নগেন দত্ত বললেন, মনে পড়েছে গো, বাবর আহমেদ পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন, তিথি নামটা বড়ো ভালো লাগেছিল, অনেকের নামের ভেতরেই মাংসল ইশারা গোঁজা থাকে ।

         অন্য মুণ্ডু বলে উঠল, আর আমাকে মনে নেই তোমার ? 

         ছন্দরানি মজুমদার ? তিনি কোথায়, দেখলে মনে করতে পারব হয়তো, উত্তরবঙ্গে যেতুম তো মাঝেমাঝে, দেশভাগের যেমন দুঃখের দিক ছিল, তেমনই আনন্দের দিকও ছিল, বললেন নগেন দত্ত । 

        তাঁর সন্দেহ হল যে মুণ্ডুটা নিজে কথাগুলো বলেনি, ছন্দরানির খাটের পাশে যে যুবক মুণ্ডুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে, কথাগুলো সেই বলল, অথচ কথা বলার মতন করে ছন্দরানির ঠোঁট তো নড়ছিল ।

          অ, মা, সেকি অলুক্ষুণে কতা গো, বলে উঠলে অন্য মুণ্ডু, আমিই তো ছন্দরানি মজুমদার, উত্তরবঙ্গে বেড়াতে গিয়ে পছন্দ হয়ে গিয়েছিল তোমার, তুমি আমাকে আদর করে কখনও বলতে পুলি, কখনও বলতে মিশলি, এরই মধ্যে ভুলে গেলে, আমাদের দুজনকেই তো তুমি ছাতিমগাঁয়ের বাগানবাড়িতে তুলে নিয়ে গিয়েছিলে ঢাকা আর জলপাইগুড়ি  থেকে, গোড়েগ্রাম থেকে যুঁইবেলির মালা এনে দিতো মোচোরমান মালি, তোমার জুড়িগাড়ি করে, বাদামি রঙের একজোড়া ঘোড়া, সহিস দিদিয়ের  সন্ধেবেলা গঙ্গার ধারে বেড়াতে নিয়ে যেতো ।

         যে নিজেকে ছন্দরানি বললে, নগেন দত্ত দেখলেন, তার মাথায় চুল নেই, টাক পড়ে গেছে, চোখে চশমা, ঠোঁট নড়ছিল বটে, কিন্তু কথাগুলো যে যুবকদের কন্ঠ থেকে বেরোচ্ছিল তা নিশ্চিত । বুড়িদের কন্ঠস্বর হলে  তো কাঁপা-কাঁপা হতো । টাক পড়া মাথায় হাত বুলিয়ে চলেছে যুবতী-কন্ঠস্বরের যুবক ।

          তা তোমাদের দুঃখটা কিসের, জানতে চাইলেন নগেন দত্ত, যুবক দুজন হাত বুলিয়ে চলেছে, যন্ত্রণার কি উপশম হচ্ছে ?

         আমাদের দুঃখ চাউনির গো, চাউনির, বলে ওঠে দুই কাটা-মুণ্ড, কিংবা বোধহয় যুবতী কন্ঠস্বরের দুই যুবক । 

         মুখ আর পোশাক দেখে এদের যুবক ভাবছি, সত্যিই কি এরা যুবক, কন্ঠস্বর তো যুবতীর । এটা কি আমার চাউনির যন্ত্রণা, পোশাক আর মুখ দেখে মনে হচ্ছে ‘আছে’, কন্ঠস্বর শুনে মনে হচ্ছে ‘নেই’, এই যুবক-যুবতী পার্থক্য করতে না পারা ? নিজেকে প্রশ্ন করলেন নগেন দত্ত । 

         মগজের গোলাপি অন্ধকারের মধ্যে নিজেকে বললেন, আমার পায়ুকামেও আগ্রহ ছিল, এখনও আছে যৎসামান্য, হয়তো তাই এই আধাযুবক-আধাযুবতীদের দিকে টান অনুভব করছি । কিন্তু সে কামেচ্ছা  পুরো করতো তিথি আহমেদ-ছন্দরানি মজুমদাররা আর নানা বয়সের নানা রানিরা । পুরুষদের সঙ্গে তো পায়ুকামের খেলা খেলিনি । নারীর দেহে ধরে থাকার মতন যে দুটি নোঙর  থাকে তা পুরুষের দেহে নেই, নারীদেহের নোঙরগুলো আঁকড়ে অনেক ঝড়ঝাপটা পার হওয়া যায় ।

          তোমাদের আবার কিসের চাউনির যন্ত্রণা, যদি বলতে দেহ না থাকার যন্ত্রণা, বা গলাটা কাটা থাকার যন্ত্রণা, তাহলে না হয় বুঝতুম, চাউনি মেলে তো দিব্বি দেখছ, দেখেও এসেছ এতোকাল কতো কতো নানা মাপের নানা রঙের নানা দামের ‘আছে’, যার রসাস্বাদন করেছ তোমাদের ‘নেই’ দিয়ে  ।

          আ খেলে যা, আমাদের দুজনের যন্ত্রণা কি একই হতে হবে, বললে তিথি আহমেদের  মাথা, যতো চাউনি সারা জীবন আমাকে দেখেছে, আমার ‘নেইয়ের’ দিকে তাকিয়ে থেকেছে, আমার বুকের দিকে তাকিয়ে থেকেছে, আমার বোঁটার দিকে তাকিয়ে থেকেছে, সব চাউনি জমা করা আছে আমার মনখারাপের ওজনপাল্লায় । যারা যারা দেখে গেছে তারা আমার ফাঁকফোকোর, বুক, বোঁটা, পাছা নিজেদের চাউনির সঙ্গে তুলে নিয়ে গেছে, যেন ওগুলো ওনাদের দখলের মালপত্তর।

         আমার চাউনি কিন্তু দেখেছে, বললে ছন্দরানি মজুমদারের মাথা, নজর রেখেছে,’আছেঅলাদের’ ওপর, ভেতর পর্যন্ত দেখেছে, সেপাইলস্করদের দেখেছে ।

         নিজের মগজের গোলাপি অন্ধকারে নেমে নগেন দত্ত নিজেকে বললেন, একথাও তো ঠিক, একজনের স্বাধীনতা মানে তো আরেকজনের স্বাধীনতা নয়, স্বাধীনতার নানা রকমফের আছে, কে কার থেকে, কী থেকে স্বাধীন হতে চায়, সেটা তো তার নিজের ব্যাপার ।

         যে ঘরগুলো দেখা যাচ্ছিল সেদিকে তাকিয়ে নগেন দত্ত বললেন, তোমাদের মেয়েদের ঘরে মেঝেয় শেতলপাটি পাতা নেই কেন ? ধুতি খুলব কোথায়, পরবই বা কোথায় দাঁড়িয়ে ? নরুণপেড়ে ধুতির কাছা-কোঁচা যে নোংরা হয়ে যাবে । পঞ্চাশ বছর আগেও পাতা থাকতো, তার আগেও পাতা থাকতো ।

          তিথি আহমেদের মুণ্ডু বললে, শেতলপাটির যুগ চলে গেছে গো, লোকে খেতে ধানগম পুঁতবে না শেতলপাটির গাছ পুঁতবে, শান্তিপুরী ধুতির যুগও চলে গেছে, এখন মাসিপিসির গ্যালারিতে হবু শশুররা হবু জামাইকে ট্রেনিং দেওয়াতে নিয়ে এলে লাল টকটকে ধুতি পরিয়ে আনে, বরযাত্রীদলের নাপিত এখানেই ধুতি খুলে দেখে নেয় যন্তর ঠিকঠাক আছে কিনা, তবু তুমি আমাদের রসের নাগর, বিছানার ওপর দাঁড়িয়ে ধুতি খুলতে পারো, পরতেও পারো, তা ধুতি খোলার দরকারটাই বা কি, পরে থেকেও প্রণয় করা  যায়, যেমন আমাদের করতে, একবার আমাকে একবার ওকে, একবার আমাকে একবার ওকে, একবার আমাকে একবার ওকে, এই করে তো সকাল হয়ে যেতো গো, তুমি কি আর আমাদের ঘুমুতে দিতে ।

          ছন্দরানির  মাথা বললে, ধুতি খোলার দরকারটাই বা কেন, তুমি তো কখনও জাঙিয়া পরো না, ধুতি পরেই সব কাজ করতে । আজকাল, মঙ্গলা হাটের দিন ছাড়া, বুড়ো ক্লায়েন্টরাও ধুতি পরে আসে না, সবাই ফুলপ্যান্ট-শার্ট পরে আসে, তারা মেঝেয় ঝপ করে প্যান্ট ফেলে, কাজ সেরে চলে যায়, কারই বা কোমরে অতো সময় আছে, তোমার কালের মতন, তুমি ভুলে যাচ্ছ বোধহয় এটা হল যুগসন্ধিক্ষণ, ছোকরা বয়সীরা, যারা সকালে আসে, প্যান্ট খোলারও সময় পায় না, জিপ নাবিয়ে কাজ সেরে আপিসমুখো হয়, তাতে নাকি আপিসের চাপ কমে । আমি তাদের বলি ভালো গো ভালো, এখানে এসে চাপ বাড়াও, সেখানে গিয়ে চাপ কমাও ।

          অবাক হলেন না নগেন দত্ত, তবে কয়েকটা দরোজায় উনি দেখলেন মেয়েরা পেতলের ঝিকমিকে জিপ-বসানো হাফপ্যান্ট পরে, বুকে  সাঁতার কাটার ফুলতোলা বুকবাঁধুনি, কাকে ছেড়ে কাকে বাছি মনে হচ্ছিল নগেন দত্তর । আজকালকার ফ্যাশান বেশ আকর্ষণীয়, মাসে প্রতিদিনই আসতে হবে, একদিনে একজনের সঙ্গে খেলা করা যাবে । তবে খুঁটিয়ে দেখে বুঝতে পারলেন, ওগুলো পোশাক নয়, আন্তর্জাতিক পেইনটারদের আঁকা ত্বক, যিনি যখন যার কাছে এসেছেন, চামড়ায় এঁকে দিয়ে গেছেন ।

          তার আগে কুন্দনন্দিনীকে ভালোবাসতে চাই, পেতেই হবে কুন্দনন্দিনীকে, ওহ কুন্দনন্দিনী । প্রেম করা, প্রণয় করা মানে ভালোবাসা নয় । 

          তিথি আহমেদ বললে, বুঝলে নগেন, তুমি ভালো বলে মহৎ, মহৎ বলে ক্ষমতাশালী, ক্ষমতাশালী বলে সুন্দর, সুন্দর বলে সুখি, সুখি বলে ঈশ্বরভক্ত ।

          ধন্যবাদ জানিয়ে নগেন দত্ত বললেন, আমি ঈশ্বরভক্ত ছিলুম, এখন আর নই রে, কেননা আমার বাবার সময়েই ঈশ্বর মারা গিয়েছিল, বাবা ঈশ্বরের শ্রাদ্ধশান্তি করিয়েছিলেন, হাজার লোক খেয়েছিল, এখন আমি আপনভক্ত । তবে আমার পোষা অ্যালসেশিয়ানটা আমাকে ওর একমাত্র ভগবান বলে মনে করে । বুঝলে কিনা, আমি কুকুরের ঈশ্বর । 

          ছন্দরানি মজুমদার বললে, উচিত কথা বলেছ নগেন, লাঞ্ছিত-নিপীড়িতরাই কেবল ভালো বলে গরিবরা ভালো, গরিবরা ভালো বলে নিম্নবর্গেরা ভালো, নিম্নবর্গেরা ভালো বলে সর্বহারারা ভালো, সর্বহারারা ভালো বলে তারা কষ্টজর্জর, কষ্টজর্জররা ভালো বলে তারা বঞ্চিত, বঞ্চিতরা ভালো বলে তারা অসুস্হ, অসুস্হরা ভালো বলে তারা কুশ্রী, কুশ্রীরা ভালো বলে তারা ধার্মিক ।

          ধন্যবাদ জানিয়ে নগেন দত্ত বললেন, ওই গরিব হওয়া ভালো, সর্বহারা হওয়া ভালো, উদ্বাস্তু হওয়া ভালো, ইংরেজি না শেখা ভালো, কমপিউটার না শেখা ভালো, হড়তাল ডাকা ভালো,  বনধ ডাকা ভালো, এগুলোয় আমি আর নিজেকে সোপর্দ করি না, একশো-দেড়শো  বছর ধরে যথেষ্ট করেছি, মুখ টকে গেছে সেসব করে-করে । 

          কিছুক্ষণ থেমে, কোমরে দুহাত রেখে নগেন দত্ত বললেন, ১৯২২ সালে আমি স্ট্যালিনকে বলেছিলুম, হুঁশিয়ার, এই পেছলতত্ত্ব পিছলেই যাবে ল্যাঠামাছের মতন, স্ট্যালিন বিশ্বাস করলে না, ট্রটস্কির পেছনে লেগে গেল, এখন দ্যাখো, কোথাকার ভোমরা কোথায় গিয়ে মধু খাচ্ছে, মাটি ফুঁড়ে বেরোচ্ছে নানা মাপের মাফিয়া আর তাদের গোলাপিউরু লালকুঁচকি বিছানাবউ ।

          তিথি আহমেদ আর ছন্দরানি মজুমদার দুজনে একই সঙ্গে চিৎকার করে উঠলো, তাহলে তুমি কি চাও ?

          নগেন দত্ত বললেন, কুন্দনন্দিনীকে চাই, আসল কুন্দনন্দিনীকে চাই, তাকে ভালোবাসতে চাই।

         তিথি আহমেদ বললে, তাহলে তোমাকে সেই গানখানা শোনাই যেটা তোমার বাগানবাড়িতে নেচে-নেচে গাইতুম, প্রেমের গান, তাহলে তোমার বিশ্বাস হবে যে আমিই তোমার তিথি ।

         কোন গান ? ভুরু কুঁচকে জানতে চাইলেন নগেন দত্ত ।

         সেই যে পোস্টমডার্ন প্রেমের গানখানা, বলে, গাইতে আরম্ভ করল তিথি আহমেদের মাথা, গাইতে-গাইতে খাটের ওপরে ড্রোনের মতন ভাসতে লাগল মুণ্ডুখানা, তালে তালে হাততালি দিতে লাগল যুবতী কন্ঠস্বরের যুবকেরা, রাস্তার মোড়ে ভিকখে চাইবার সময়ে হিজড়েরা যেভাবে হাততালি দ্যায় :

                  চাঁদনিরাতের পেতনিপিসি সজনেতলায় খোঁজ না রে

                  থ্যাঁৎলামাথা হ্যাংলা সেথা হাড়কচকচ ভোজ মারে ।

                  চালতাগাছে আলতাপরা নাক ঝোলানো শাঁকচুনি

                  মাকড়ি নেড়ে বলে আমায় তো কেউ ডাকছনি ।

                  মুণ্ডু ঝোলা উলটোবুড়ি ঝুলছে দেখ চুল খুলে,

                  বলছে দুলে, মিনসেগুলোর মাংস খাব তুলতুলে ।          

          নগেন দত্ত বললেন, হ্যাঁ, যতোদিন না মিনসেগুলোর মাংস খুবলে খাওয়া হচ্ছে, ততোদিন এমনি করেই চলবে, তারপর যোগ করলেন, আমার সারেঙ্গিঅলা ওস্তাদ তো তোমাদের পোস্ট-মার্কসিস্ট প্রেমের গান শিখিয়েছিল একখানা, মনে পড়ছে, মগজে বাজছে গানটা, ভুলে গেলে নাকি গো ?

          ছন্দরানি মজুমদারের মাথা বলে উঠল, হ্যাঁ হ্যাঁ, খুব মনে আছে, তোমার মোসাহেবরা পাশ বালিশ জড়িয়ে মাঙনার আফিমের নেশা করে কতো মাথা দোলাতো, তুমি লণ্ডনে তোমার বাবার হরমোন চিকিৎসা করাতে নিয়ে যেতে বছরে একবার , তখনও মোসায়েবরা পাশবালিশ জড়িয়ে আফিম টেনে এই গানখানা শুনতে চাইতো । গাইছি শোনো, গাইতে গাইতে ছন্দরানির মাথা ড্রোনের মতন  ভাসতে লাগল খাটের ওপর :

                  মিশিমাখা শিখিপাখা আকাশের কানে কানে

                  শিশিবোতল ছিপিঢাকা সরু সরু গানে গানে

                  আলোভোলা বাঁকা আলো আধোআধো কতো দূরে

                  সরু মোটা শাদা কালো ছলছল ছায়া সুরে

         গানের সুরে সুরে হাততালি দিচ্ছিল বটে যুবতী কন্ঠস্বরের যুবকেরা, কিন্তু সে হাততালি বুড়োদের মতন শ্লথ, কেননা তাদের পুরো চুলে পাক ধরে গেছে মাথায় টিকটিকি হাগার দরুন । 

          আরেকবার শুরু করতে যাচ্ছিল ছন্দরানি, নগেন দত্ত বললেন, থাক থাক, পরে আবার শুনবোখন, এখন তোমাদের মনে করার চেষ্টা করি, গান মনে এলেই তো আর গায়িকাকে মনে পড়ে না, তোমাদের দেহগুলো থাকলে নাহয় খুঁত দেখে-দেখে আর তিল গুনে-গুনে মনে করতে পারতুম ।

         এক পলক চোখ বুজে তিথি আহমেদ আর নন্দরানি মজুমদারের দেহ রিকনসট্রাক্ট করে ফেললেন নগেন দত্ত, পুণর্নিমাণ । 

          নিজের মগজের গোলাপি অন্ধকারে নিজেকে বললেন, ১৯৬৭ সালে যখন প্যারিসে থাকতুম লাতিন কোয়ার্টারের একটা লজে, সবাই তাকে বলত বিট লজ, সেখানে উইলিয়াম বারোজ, গ্রেগরি কোর্সো, অ্যালেন গিন্সবার্গ, ব্রায়ন জিসিন নামে মার্কিন ছোকরারা ল্যাংটোপোঁদে হ্যাশিস ফুঁকে নাচতো, সেই লজ থেকে বাদামি কোটের পকেটে দুহাত ঢুকিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে রাস্তায় বেরিয়েছি, তখন বসন্তকালের সকাল, রাস্তার দুপাশে চেরিব্লসম আর পলোনিয়া গাছের সারি, পার্কে-পার্কে আর ঝুলবারান্দার টবে ফুটে আছে হলুদ ড্যাফোডিল, পিওনিস, আইরিস, লিলি, গুর্দোঁ ফুল, বাচ্চারা নাসতুরতিয়াম ফুল ছিঁড়ে-ছিঁড়ে খাচ্ছে, তখন জাক দেরিদা নামে একজন ফরাসির সঙ্গে দেখা হয়েছিল, তার কাছ থেকেই শিখেছিলুম, অবিনির্মাণ আর পুনর্ণিমানের ওয়র্ডপ্লে । 

         তারপর যখন ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে গেলুম, আমেরিকায়, তখন, ১৯৮১ সালের হেমন্তে, তামারঙের পাতায় ঢাকা কপার বিচ গাছ, হর্সচেস্টনাট গাছ থেকে সব পাতা ঝরে গেছে, নীল রঙের বিশাল মাপের লিঙ্গর মতন ফল ঝোলানো ডেড ম্যানস ফিংগার্স গাছ, লাল পাতায় ঢাকা জাপানি মেপল, জাপানি সেডারের ঝোপ চারিধারে, উপিং চেরি, রেড ওক, পড়াবার বদলে বাগানে ঘাসের ওপর শুয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে ভালো লাগতো, সেই সময়ে পল ডি মান, জিওফ্রে হার্টম্যান, জে হিলস মিলার ওরা তো টেবিলের ওপর এক তরুণীর দেহের কাটা টুকরোগুলো রেখে, দিখিয়েছিল, কেমন করে জোড়া লাগাতে হয় আর আবার কেটে টুকরো করতে হয় । 

         নগেন দত্তের আপশোষ হল, কেন যে পি সি সরকার ওনার ইন্দ্রজাল প্রয়োগ করে মানুষকাটার সময়ে কাটাকুটির তত্ব বানাননি ! তাহলে এখন তত্বের রয়ালটি পেতো ওনার বংশধররা, যেমন জাক দেরিদার রয়ালটি পাচ্ছে তার বংশধররা ।

         পুনর্নিমান প্রক্রিয়ার নিয়মগুলো প্রয়োগ করে দেখলেন নগেন দত্ত, তিথি আহমেদ ফর্সা, চোখ দুটো সামান্য কটা, নাক একটু টেপা, ঠোঁট চিনা মেয়েদের মতন গোল, কোমর পাতলা, বুক দুটো মাঝারি, পাছার ঢেউ আদরযোগ্য, অরগ্যাজমের অভিনয় করত না, জড়িয়ে ধরে নখ আর দাঁত বসাতো কাঁধে, পা দিয়ে কোমর জড়িয়ে নিতো । 

        মনে পড়তে লাগল, মদ খেয়ে যখন তিথি আহমেদ চুর হয়ে যেতো, ওর উলঙ্গ শরীর হয়ে উঠতো মায়াবী, পাঁজাকোলা করে পাক খেলে শরীর ভরে যেতো আগুনের হলকায়, সহজে নিভতো না সে আগুন, তরল আগুন, মদে মাতাল দেহের সঙ্গে প্রেম করাটা ধর্ষণ হয়ে যাবে ভেবে অপেক্ষা করতেন নগেন দত্ত, কখন তিথি আহমেদ খোঁয়ারির ভেতর থেকে তাঁকে ডাক দেবে ।

         তিথি আহমেদের মায়ের মায়ের মায়ের মায়ের মায়ের মায়ের মায়ের মায়ের মায়ের দিদিমির দিদিমা ছিলেন সুলতান ইলিয়াস শাহের পেয়ারের বাঁদির মেয়ে, তাই তিথির থুতুতে চাটগাঁইয়া স্বাদ বেশ ভালো লাগতো নগেন দত্তর, বুলিবুকনির যৌন আহ্লাদ উপভোগ করতেন, কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকতের ঢেউয়ের মতন দোল খেতো ওর উরু জোড়া । আহা সে কি ঘেমো মাংসল ঘুমের রাত গেছে ।

         একই প্রক্রিয়ায় দেখলেন, ছন্দরানি মজুমদার কালচে, চোখ দুটো বেশ বড়ো, কপাল ছোট্ট, কোঁকড়ানো চুল পাছা পর্যন্ত, বুক দুটো ঢাউস, পাছাও ঢাউস, কোমর পাতলা, অরগ্যাজম অনেক বার হতো, একের পর এক, শরীর কাঁপিয়ে-কাঁপিয়ে, একের পর আরেক, নিজেই ওপরে থাকতে চাইতো । ছন্দরানি মাতাল হয়ে কেবল হাসতো, হাসতেই থাকতো, যেন ওর ভাঁড়ারের শব্দরা ফুরিয়ে গিয়ে কেবল হাসিগুলোর দেহঢেউ  টিকে আছে, হাসতে হাসতেই উঠে পড়তো নগেন দত্তের ওপর, কালচে কোমরে খেলতো ভুঁড়িনাচন, কখনও মায়াবি খোঁয়ারিতে হারিয়ে যেতো না ।

          চিকনচাম রোগাটে গুটকাখোর দালাল, নগেন দত্তর পাশে দাঁড়িয়ে হাবামুখে অপেক্ষা করছিল, বললে, স্যার চলুন না, এই গ্যালারির ম্যানেজার প্রফেসার চক্কোত্তির সঙ্গে কথা বলে রেট-সময় ঠিক করে নেবেন, এই সব বাজে কথা বলে ফালতু সময় নষ্ট করছেন, দেখছেন তো কেমন ভাসা-ভাসা প্রকৃতির, এতক্ষণে মনের মতন মেয়ে বেছে নিতে পারতেন, মাসকাবারি বাবু হতে চাইলে উনি ডিসকাউন্ট দ্যান, আপনি জোয়ান হয়েও দেড়-দুশো বছর আগে আসতেন বলছিলেন, তা উনি সিনিয়র সিটিজেনদের জন্যে ভরতুকির ব্যবস্হা রেখেছেন, সুগন্ধী কনডোম, ডিওডেরেন্ট, তোয়ালে, ফুলের মালা, বিছানায় ফুলশয্যার ফুল, অ্যাটাচড টয়লেট যাতে আপনার সামনেই আপনার প্রেমিকা ধোয়াধুয়ি না করে, ধোয়াধুয়ির জন্যে টয়লেটে জেট-ওয়াটার স্প্রে-পাইপ আছে, প্রথম দিন এক্সট্রা বেনেফিটস ফ্রি।

          দালালটাকে বুকপকেট থেকে একহাজার টাকার একটা নোট দিয়ে নগেন দত্ত বললেন, যা, এখান থেকে যা, এদের কাছ থেকে তোর দালালি চাইতে আসিসনি, জানিস তো আমাকে, কি থেকে কি হয়ে যাবি, নিজেই জানতে পারবি না।

          হ্যাঁ হুজুর হ্যাঁ হুজুর বলতে-বলতে সিঁড়ি বেয়ে প্রায় গড়িয়ে চলে গেল চিকনচাম পিম্প । উঠে এলো হাঁপাতে-হাঁপাতে,  প্রমিথিউসের অদৃশ্য পাথর ঠেলে, বলল, স্যার, আকাশ থেকে কয়লার টুকরোর মতন বড়ো-বড়ো শিল পড়েছে, কুচকুচে কালো, হাঁটু জলে ভরে গেছে রাস্তা, এই দেখুন আমার পা দুখানা।

          নগেন দত্ত পায়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, যা, আহিরিটোলা ঘাটে গিয়ে পা ধুয়ে নে, কালো জল নামতে সময় লাগবে, ওগুলো সব দিল্লি আর চেন্নাইয়ের উকিল ছিল, জমাট বেঁধে  অন্য লোকেদের জান কয়লা করতে গিয়ে নিজেরাই কয়লা হয়ে গেছে।

          নগেন দত্ত ঢুকলেন পিসির ঘরে, ভেতরে আসতে পারি, ঢুকে দেখলেন, মহিলা নয়, একজন পুরুষমানুষ, ডানদিক ঘেঁষে সিঁথিকাটা, চুলে পাক ধরেছে, চোখে চশমা, মুখে পানের খিলি, চেনা মনে হল, আগের বার এসে দেখে থাকবেন, বা অন্য কোথাও, বিপ্লবে ব্যসনে দুর্ভিক্ষে, ঢুকে পড়লেন ঘরে, হ্যালো, প্রফেসার, হাউ আর ইউ । 

          মনে পড়ল, যে কালেজে নগেন দত্ত একসময়ে বিজ্ঞান পড়াতেন সেই কালেজেই দর্শনের অধ্যাপক ছিলেন পি চক্রবর্তী ।

          ঘরে আরেকজন লোক বসেছিল, তার পাশে বসলেন নগেন দত্ত, ভালো পারফিউম মেখেছে লোকটা, চাককাটা ফুলশার্ট, চওড়া টাই, কালো ট্রাউজারে বেশ স্মার্ট । 

          তোমাদের কথা পুরো করে নাও, আমার তো তাড়াহুড়ো নেই, জানোই তো, বললেন নগেন দত্ত  ।

          প্রফেসর পি চক্রবর্তী পরিচয় করিয়ে দিলে, ইনি নগেন দত্ত, ইনডাসট্রিয়ালিস্ট, জমিজমাও প্রচুর, বয়সের গাছপাথর নেই কথাটা এনাকে দেখেই বলে গেছেন হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় ওনার বঙ্গীয় শব্দকোষ বইখানায়, অবশ্য কলিম খান ওনার শব্দকোষে নগেন দত্তের উল্লেখ করেননি । 

         আগন্তুকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলে প্রফেসর পি চক্রবর্তী, আর ইনি তারকনাথ ব্যানার্জি, লোকে ঠাট্টা করে বলে টিবি, রপ্তানির ব্যবসা করেন ।

         প্রফেসর পি চক্রবর্তী টেবিলের তলা থেকে একটা পাত্র তুলে তাতে পানের পিক ফেললেন, ওয়াক থুঃ ।

         পানের পিকদানিটা নতুন ধরণের দেখে নগেন দত্ত বললেন, অমন পিকদানি তো দেখিনি ।

         উত্তরে প্রফেসর পি চক্রবর্তী বললে, একে বলে ‘ওয়াখটিন’, নতুন বেরিয়েছে বছর ষাটেক হল, রাশিয়ায় একজন লোক ছিল মিখায়েল বাখতিন নামে, তার স্মৃতিতে বেরিয়েছে, এই ‘ওয়াখটিনে’ পানের পিক ফ্যালো, শিকনি ফ্যালো, থুতু ফ্যালো, ধাতুরস ফ্যালো, সব নিমেষে উবে যায় । আমার বা অন্যদের গ্যালারিতে যেমন নানা ভাষার খদ্দের এসে মিশে যায়, তেমনিই এই ‘ওয়াখটিন’, বাংলার ভেতরেই তুমি পাবে হিন্দি মারোয়াড়ি গুজরাতি পাঞ্জাবি অহমিয়া ওড়িয়া তামিল তেলুগু মালায়ালম কন্নড় মারাঠি আর যতো বিদেশি খদ্দের হয় সব ।

         আগন্তুক নগেন দত্তের দিকে মুখ করে বলল, এই প্রডাক্টটা আমরাই ম্যানুফ্যাকচার করি ।

         নগেন দত্ত চুপচাপ বসে পিসি আর টিবির কথা শুনতে লাগলেন ।

         পিসি : তিন পিসের দাম ক্যাশে দিতে হলে জিএমকে জিগ্যেস করতে হবে ।

         টিবি : জিগ্যেস করে তাড়াতাড়ি জানিও ।

         পিসি : অরিজিনাল না সেকেন্ডহ্যাণ্ড ?

          টিবি : অরিজিনাল ছিল, এক লাখে বিক্রি হয়েছিল এক-একটা আইটেম । 

          পিসি : রিপেয়ার করাতে হবে তার মানে ।

          টিবি : রিপেয়ার করিয়ে নিও, তোমার প্রবলেম কোথায়, তোমার কাছে তো ভালো রিপেয়ারিং ইউনিট আছে । দরকার হলে আরও ইমপ্রুভ করিয়ে নিতে পারো ।

          পিসি : জিএমের পারমিশান নিতে হবে ।

          টিবি : ইমপ্রুভ করিয়ে নিলে ওগুলো প্রত্যেকটা দুলাখে বিকোবে, ক্রেতা আমি যোগাড় করে দেবো । ওদের কাস্টমার সার্ভিস অনেক ভালো, কোনো বেগড়বাঁই নেই, নো কমপ্লেইন্টস ।

          পিসি : ওকে, জিএমের সঙ্গে ডিসকাস করে তোমায় কল ব্যাক করব ।

          টিবি : ওকে, বাই ।

          টিবি চলে গেল উঠে ।

          ঘরে এসি চলছে, পুরোনো উইনডো এসি, হালকা ঘরঘর আওয়াজ, টেবিলে ফুলদানিতে বিদেশি ফুলের তোড়া, মালদার কোনো পার্টি দিয়ে গিয়ে থাকবে দুপুরে আয়েস করতে এসে । কাচের গেলাসে সোনার দাঁতের পাটি ভিজছে, কার কে জানে, হয়তো কোনো খাজা খদ্দের ইল্লি করার সময়ে খুলে রেখেছিল । চারিদিকের দেয়ালে সুন্দরী-করে-তোলা মামুলি মেয়েদের পোস্টার । পেছনের দেয়ালে কোনো গুরু-মহারাজের গেরুয়া ছবি, হাত ওপরে তুলে বাতাসকে আশীর্বাদ করছে, খালি গায়ে, গলায় রুদ্রাক্ষের মালা, ভুঁড়ি ঝুলে পড়েছে গেরুয়া লুঙ্গির তলায়, ফ্রেমে  সাদাচন্দনে র‌্যাঁদামারা কাঠের মালা, যা বোধহয় গত চল্লিশ বছরে বদলানো হয়নি ; ঘরে চন্দনের গন্ধ বেরোচ্ছে, ধুপকাঠি থেকে। গুরু-মহারাজের ফোটোতে তাঁর বাণী সোনালী অক্ষরে লেখা রয়েছে, “সত্যের জয় কখনও হয় না, কখনও হয়নি, কখনও হবে না।”

         স্মার্টফোন আর অ্যাটাচি টেবিলের ওপর রাখলেন নগেন দত্ত ।

         প্রফেসার চক্রবর্তী অবাক উঠে দাঁড়িয়ে সবাক, বললেন, আরে, নগেন দত্ত না ? কতোকাল পরে দেখছি, পঞ্চাশ একশো না দুশো, অ্যাঁ, কত বছর হল । বোসো, বোসো, কি খাবে বলো, কনিয়াক না শেরি ? চুল্লু চাও তো তাও আছে, ওটাই বেশি চলে তিরিশ হাজারিনীর দেশে, জানোই তো মাফিয়া জন্মায় না এই ভূঁয়ে, সবই তাপ্পিমারা মাস্তান ।

         —নো, থ্যাংকস, এখন পানভোজন করতে চাই না, অন্য কাজে এসেছি, হ্যাঁ, তোমার সঙ্গে শেষ সাক্ষাৎ পঞ্চাশ বছর সাত মাস কুড়ি দিন আগে ;  তুমি যখন কালেজে পড়াতে ।

         —চন্দনকাঠের মালা দেখছিলে তো ? উনি আমার গুরু মহারাজ ।  খাঁটি একেবারে, বীরপ্পন ছিল গুরু-মহারাজের শিষ্য, নিজের হাতে গাছে র‌্যাঁদা মেরে মালা তৈরি করে পরিয়ে দিয়েছিল ওনাকে । 

          ‘ওয়াখটিন’-এ আরেকবার পিক ফেলে প্রফেসর চক্কোত্তি বলল, এই তিরিশ হাজারিনীর দেশে মনুস্মৃতি চলে না, বুঝলে, আর যেখানেই চলুক, ক্লায়েন্টরা সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময়ে তাদের জাত-ধর্ম-পরিবার সবকিছু পেছনে ফেলে আসে । শিষ্যদের পনজিস্কিমের টাকায় গুরু-মহারাজ নিজের টিভি, সংবাদপত্র, ল্যাংবোট অনেককিছু করে ফেলেছেন । অধ্যাপক চক্কোত্তি যোগ করলে, তোমার চেহারার বেশ খোলতাই হয়েছে কিন্তু, সেই পঁচিশ বছরই চলছে বোধহয় ?

         —হ্যাঁ, দাদামশায়ের উইলের আইনি বাঁধন তো উপেক্ষা করতে পারি না ।

         —আমি তো, জানোই, সাতাশি বছর কার্ড হোল্ডার ছিলুম, কিন্তু হেড অফ দি ডিপার্টমেন্ট করলে না, বড়ো-ছোটো এমনকি চুনোপুঁটিদেরও কতো তেল দিলুম, কোনও ফল হল না, তাই রেগেমেগে এই লাইনে চলে এলুম, গুরু-মহারাজের কাছে দীক্ষা নিয়ে শান্তিতে ব্যবসা চালাচ্ছি । আগেরবার এসে কুন্দনন্দিনী নামে একটি মেয়ের খোঁজ করেছিলে, মনে আছে, রেকর্ড করা আছে আমার মোবাইলে, মালদার ক্লায়েন্ট পেলে তাদের শোনাই তোমার বর্ণনা, টিভিতে আমাদের সেক্সুয়াল পাওয়ার বাড়াবার প্রডাক্ট বিক্রির জন্যে কাজে লাগাই ।

        —মানে ? ওই জাপানি কোরিয়ান ক্যামবোডিয়ান তেল ? বুলেট-বড়ি ? স্টে অন ? হোল নাইট ?

        —কারেক্ট, কারেক্ট । তোমার উদাত্ত গলা বেশ কাজে দ্যায় ।

         —তাই বুঝি ? কই শোনাও তো । কারখানা-টারখানা খুলে ব্যবসাও করছ তাহলে । এটা সাইড বিজনেস? আগ্রহ না থাকলেও কথার পিঠে কথা চাপিয়ে বললেন নগেন দত্ত ।

         অধ্যাপক চক্রবর্তী তাঁর টেবিলের ডেস্কটপে একটা সিডি ঢুকিয়ে বললেন, শোনো, তোমারই কন্ঠস্বর। ব্যাকগ্রাউন্ডে গিটারের মৃদু আবহ গড়ে নগেন দত্তের কথাগুলো শুনতে লাগলেন নগেন দত্ত ।

         “বৃহৎ নীল দুইটি চক্ষু — চক্ষু দুইটি শরতের মত সর্বদাই স্বচ্ছ জলে ভাসিতেছে — সেই দুইটি চক্ষু আমার মুখের উপর স্হাপিত করিয়া চাহিয়া থাকে ; কিছু বলে না — আমি সে চক্ষু দেখিতে দেখিতে অন্যমনস্ক হই, আর বুঝাইতে পারি না । তুমি আমার মতিস্হৈর্যের এই পরিচয় শুনিয়া হাসিবে, বিশেষ তুমি বাতিকের গুণে গাছ কয় চুল পাকাইয়া ব্যঙ্গ করিবার পরওয়ানা হাসিল করিয়াছ ; কিন্তু যদি তোমাকে সেই দুইটি চক্ষুর সন্মুখে দাঁড় করাইতে পারি, তবে তোমারও মতিস্হৈর্যের পরিচয় পাই । চক্ষু দুইটি যে কিরূপ তাহা আমি এ-পর্যন্ত স্হির করিতে পারিলাম না । তাহা দুইবার একরকম দেখিলাম না ; আমার বোধহয়, যেন এ পৃথিবীর সে চোখ নয় ; অন্তরীক্ষে যেন কি দেখিয়া তাহাতে নিযুক্ত আছে । কুন্দ যে  নির্দোষ সুন্দরী, তাহা নহে । অনেকের সঙ্গে তুলনায় তাহার মুখাবয়ব অপেক্ষাকৃত অপ্রশংসনীয় বোধ হয়, অথচ আমার বোধহয়, এমন সুন্দরী কখনও দেখিনাই । বোধহয় যেন কুন্দনন্দিনীতে পৃথিবী ছাড়া কিছু আছে, রক্তমাংসের যেন গঠন নয়, যেন চন্দ্রকর কি পুষ্পসৌরভকে শরীরী করিয়া তাহাকে গড়িয়াছে । তাহার সঙ্গে তুলনা করিবার সামগ্রী হঠাৎ মনে হয় না । অতুল্য পদার্থটি, তাহার সর্বাঙ্গীন শান্তভাবব্যক্তি — যদি স্বচ্ছ সরোবরে শরচ্চন্দ্রের কিরণসম্পাতে যে ভাবব্যক্তি, তাহা বিশেষ করিয়ে দেখ তবে ইহার সাদৃশ্য কতন অন্তর্ভূত করিতে পারিবে । তুলনায় অন্য সামগ্রী পাইলাম না।”

        সিডিটা ড্রয়ারে রেখে প্রফেসার চক্রবর্তী বললেন, তোমার এই অসাধারণ বর্ণনার দরুণ একজন কুন্দনন্দিনীকে কেউ এংগেজ করে নিলে সেদিন আরেকজনকে কুন্দনন্দিনী নামে চালাই, সেও এংগেজ হয়ে গেলে অন্য কাউকে কুন্দনন্দিনী নামে চালিয়ে দিই । বাইরে নিয়ে যাবার অর্ডার এলে কচি কুন্দনন্দিনীকে পাঠাই না, ডুলিকেট, ট্রিপলিকেট যে ফ্রি থাকে তাকে কুন্দনন্দিনী নাম দিয়ে পাঠিয়ে দিই, সবাইকে ট্রেনিং দেয়া আছে । বুঝতেই পারছ, এটা সাইড বিজনেস নয়, প্রধান ব্যবসা, পলিটিশিয়ানদের সঙ্গে ওঠাবসার দরুন অনেক সময়ে পাশের গ্যালারি থেকে পারফরমিং ফ্লেশ ধার নিই । সত্যি কথা বলতে কি, আসল কুন্দনন্দিনী যে কে তা আমি নিজেই জানি না, তাই গোলমাল এড়াতে সবায়ের নামই কুন্দনন্দিনী করে দিয়েছি ।

          —পারফরমিং ফ্লেশ ? প্রশ্ন তুলে নগেন দত্ত নিজের মগজের গোলাপি অন্ধকারে নিজেকে বললেন, কন্ঠস্বরটা আমার নয়, একজন ডেপুটি ম্যাজিসট্রেটের, যাঁর বন্দে মাতরম গান এখন অনেকে খাকি ঢোলা-হাফপ্যান্ট পরে গায়, অনেকে তাকে নিজেদের স্লোগান বানিয়ে ফেলেছে, অনেকে আবার ডেপুটি ম্যাজিসট্রেটকে পছন্দ করে না, তারা বলে স্লোগানটা তাদের ধর্মবিরোধী ।

          অধ্যাপক চক্রবর্তী বললেন, তাছাড়া আর কী ? ক্লায়েন্ট তো এমন ফ্লেশ চায় যে মনের মতন পারফর্ম করবে । নয়কি ? আঠার সঙ্গে আঠা জুড়ে শরীরে ঢেউয়ের পর ঢেউ তুলবে, তুমিও তো তাই চাও । কুন্দনন্দিনী তোমাকে মনের মতন পারফরম্যান্স দিয়েছিল বলেই তো তাকে দু-আড়াইশো বছরেও ভুলতে পারোনি ।

          —-না না, ভুল ধারণা, আমি ভালোবাসতে চেয়েছি, ভালোবাসা পেতে চেয়েছি, কুন্দনন্দিনীর সঙ্গে শোয়া হয়নি কখনও, তাকে খুঁজে ফিরছি একশো-দেড়শো বছর হয়ে গেল , সারা দেশের লোকালয় ঘুরে-ঘুরে খুঁজে চলেছি ।

          —-আরে সেই কথাই তো বলছি, পারফরমিং ফ্লেশ হল একটা আর্ট,  আর যে ওই আর্টকে অ্যাপলাই করতে শিখে গেছে, সে ভালোবাসা এগজিবিট করতে শিখে গেছে বুঝতে হবে, আর্টের বাংলা হল শিল্প । ভালোবাসা হল সবচেয়ে উন্নত প্রদর্শনী, একে আরেকের কাছে, দেখছি তো কতো মাল আসে আর যায়, আজ একশো বছর হতে চলল, আমি কি আর ভালোবাসাবাসি করিনি ভাবছ, অনেকের সঙ্গে করেছি, সে ছিল ভালোবাসার দিনকাল, তখন আমাকে রোগে ধরেনি, এখন সকলে কুইকি পছন্দ করে, মরনিং আফটার ট্যাবলেট বেরিয়ে আমাদের মার্কেট ডাউন করে দিয়েছে ওষুধ কোম্পানিগুলো, তার ওপর ভার্জিনিটি রিপেয়ারিঙেরও ক্লিনিক বড়ো-বড়ো শহরে, আমার কাছে কোনো খদ্দের ভার্জিন মাল চাইতে এলে স্টকের কম বয়সী মেয়ের ভার্জিনিটি রিপেয়ার করিয়ে পাঠাই পার্টিকে । 

         চক্কোত্তি বলা বজায় রাখলে, সিগারেট ধরিয়ে এক ফুঁক মেরে, আমার স্টকে কোনো মেয়ে এলে তাকে শেখাতে হয় যে ক্লায়েন্টের ক্লাইম্যাক্স যখন হবে, তার সঙ্গে অরগ্যাজমের অভিনয় করতে হবে, যাতে সে নিজেকে সফল মনে করে, যদি সে অবাঙালি হয় তাহলে তাকে ‘জানেমন, বলম পরদেসি, আপকা প্যার মুঝে পাগল কর দিয়া, ফির জরুর আইয়েগা, ম্যায় ইন্তজার করুঙ্গি’ আর যদি বাঙালি হয় তাহলে একই ভাবে সিংক্রোনাইজ করে তাকে বলতে হবে, ‘আপনাকে ভালোবেসে ফেলেছি, এতো সুন্দর করে আপনি ভালোবাসা দেন প্রতিদান না দিয়ে পারি না, আপনার মতন এভাবে কেউ ভালোবাসেনি আমায়, আবার নিশ্চই আসবেন, আমি অপেক্ষা করব’, এটসেটরা, উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়ে টেনশন কমাবার জন্যে যে খোকা কাস্টমার আসে, তাদের বলতে হয়, আবার এসো, লক্ষিটি, সব শিখিয়ে দেবো, কতোরকমের আনন্দ হয় জানতে পারবে, আমি অপেক্ষা করব, অ্যাঁ, তারপর থুতনিতে হাত বুলিয়ে খোকা-ক্লায়েন্টকে পার্টিং কিস দিতে হয়, অভিনয় শেখাবার জন্যে চিৎপুর যাত্রাদল থেকে অভিনেত্রী ভাড়া করে আনি ।

          নগেন দত্ত জিগ্যেস করলেন, আচ্ছা, বারান্দায় দুটি ধড়হীন মাথা দেখলুম, বললে তারা তিথি আহমেদ আর ছন্দরানি মজুমদার, আমার লিভ টুগেদার বউ ছিল, মনে করতে পারলুম না, তাদের দেহে তো সালভাদর দালি আর পাবলো পিকাসোর পেইনটিঙ শাড়ির মতন করে আঁকা ছিল । যুবতী-কন্ঠস্বরের যুবকরাই বা কেন পাশে বসে মাথায় হাত বোলাচ্ছে, তাও বুঝতে পারলুম না ।

         প্রফেসার চক্কোত্তি ওরফে পিসি চোখ থেকে চশমা খুলে টেবিলের ওপর রেখে, মদখোর চিকনগালে বাঁহাত দিয়ে আদর করতে-করতে, সুইংগিং চেয়ারে একচিলতে হেলে  বললে, তিথি আহমেদ আর ছন্দরানি মজুমদার হলেন গাইড, কালেজে হেড অফ দি ডিপার্টমেন্ট ছিলেন, অবসর নিয়েছেন, তোমার দাদামশায়ের উইল অনুযায়ী, যে বয়সে ওনাদের শেষবার দেখেছিলে সেই বয়সেই আটকে আছেন, ছাত্রদের গাইড করার জন্যে মাথাটাকে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন করে তোলেন ওনারা, সেই ক্ষমতাও তো তোমার দাদামশায়ের উইল অনুযায়ী তোমারই দেয়া, আর যুবতী-কন্ঠস্বরের যুবক দুজন ওনাদের আন্ডারে ডক্টরেট করছে, কেননা আজকাল ডক্টরেট না করলে লেকচারারের চাকরি পাকা হয় না, মাইনেও স্কেল অনুযায়ী হয় না, ডক্টরেট করার জ্ঞানের জন্যে আফগানি খাঁটি চরস আনিয়ে দিয়েছি। 

         তা না হয় বুঝলুম, বললেন নগেন দত্ত, তা ওদের ধড় নেই কেন ।

         যে গাইডদের ধড় থাকে তারা বেশ বিপজ্জনক ; তাদের সঙ্গে না শুলে, তাদের সঙ্গে দার্জিলিং, দীঘা কিংবা পুরিতে বেড়াতে না গেলে গাইডরা পিএইচডির কাগজটা সহজে ছাড়ে না । আমাকে তো ওদের জন্যে একটা পুরো লাইব্রেরি খুলতে হয়েছে, ওই তো দ্যাখো, তবে কোনো বইই আমার গ্যাঁটের কড়ি খরচ করে কেনা নয় । ওনাদের নাম তিথি আহমেদ আর ছন্দরানি মজুমদার হলেও, ধড় নেই বলে ছাত্রীরা নিশ্চিত হতে পেরেছে যে লেসবিয়ান কাজকম্মো করতে পারবেন না, আজকাল সকলেই যে-যার দেহকে যুগপোযোগী করে ফেলেছে, জানো তো ।

         ঘষাকাচের পার্টিশানের লাগোয়া গোদরেজ আলমারিতে রাখা বইগুলো কাছ থেকে দেখতে গেলেন নগেন দত্ত, যদি কাজে লাগে এমন কোনো বই , যদিও ওনার বাবা নিজেদের কারখানা আর ব্যবসা অন্ধ্রপ্রদেশে তুলে নিয়ে গেছেন, ইনকেলাব জিন্দাবাদ চলবে না চলবে না, এড়াবার জন্যে, বইগুলো দাতব্য করে দিয়েছিলেন গ্রামের চণ্ডীমন্দিরে । 

          নগেন দত্ত বললেন, দ্বারকানাথ ঠাকুরের নাম শুনেছ তো ? তা দ্বারকাবাবুর  ব্যাংক ইনশিওরেন্স জাহাজ কোম্পানি চটকল কয়লা চা বাগানের ম্যানেজিং এজেন্সি আর চিনে আফিম পাঠাবার কারবারে আমার বাবার আর ঠাকুর্দার শেয়ারের কাগজ ছিল, হঠাৎ করে উনি মারা গেলেন আর সেই থেকে বাঙালির ব্যবসা লাটে উঠে গেল । ১৮৪৬ সালের আগস্টে আমি তো বাবার সঙ্গে লণ্ডনে ছিলুম যখন দ্বারকাবাবুর দেহ থেকে হৃৎপিণ্ড কেটে নিয়ে ওনাকে কেনসাল গ্রিন গোরস্তানে কবর দেয়া হয়েছিল । 

          ভুরু কুঁচকে নগেন দত্ত বললেন, ব্যবসা-বাণিজ্য লাটে উঠিয়ে দেবার দায় ওনার ছেলে দেবেন্দ্রনাথ আর নাতিদের । দেবেনবাবু বেমমো-বেমমো করে এমন ধর্ম নিয়ে পড়ল যে ব্যবসা ছারখার, তারপর যাও বা পুঁজি ছিল, দ্বারকাবাবুর নাতিরা পড়াশুনা আর লেখালিখিতে খরচ করে নামখ্যাতি করার পেছনে দৌড়ুলো । এখন সব ফক্কা-টরেটক্কা, কোন বেমমো যে কোথায় আছে তার খোঁজখবর রাখেনা কেউ, মাদুর গুটিয়ে শান্তিনিকেতনে, সেখানেও হরেদরে পেঁকোজল,  অধ্যাপকরা পড়াবার বদলে অন্য কাজে লেগে থাকে। পুরস্কারের সোনার বিসকুটটাও কেউ নিয়ে গিয়ে গয়না করে ফেলেছে।

         কয়েকটা বই দেখে, সেদিকে আঙুল দেখিয়ে, নগেন দত্ত বললেন, এই বইগুলো তোমার এখানে কারোর কাজে লাগে নাকি ?

        —আমার আলমারিতে যে বইপত্র দেখছ সবই ক্লায়েন্টদের ডোনেট করা কিংবা ভুলে ফেলে যাওয়া, তবুও কাজে লাগে ডক্টরেট করিয়ে ছাত্রীদের । একবার এক মার্কিন ছাত্রী গবেষণার উদ্দেশ্যে একমাসের জন্যে যৌনকর্মীর কাজ করে গেল, ক্লায়েন্টদের সাক্ষাৎকার নিতো কথা বলার ছলে, মেম পাবার জন্যে আগে থেকে ক্লায়েন্টরা বায়না দিয়ে যেতো, অনেক প্রফিট করেছি ওই এক মাস, সে প্রচুর বই ফেলে গেছে, ওই যে বিটকেল নামের বইগুলো, অন গ্র্যামেটোলজি অফ সেক্স, ফরম্যালিজম অ্যান্ড দি নিউড, এগজিসটেনশিয়াল পোজিশানস, ডিকন্সট্রাকশান অফ দি ফ্যালাস, দি রিটার্ন অফ দি রিয়াল স্লিট, হারমেনিউটিক্স অ্যাজ হরমোনাল চেঞ্জ, বডি অফ দি আদার, দি ট্রুথ অ্যাবাউট দি ট্রুথ অফ ইমমরট্যাল ট্রাইঅ্যাঙ্গল, কার কাজে যে লাগে ঈশ্বরই জানেন, প্রচ্ছদ দেখে পড়ুয়া কাস্টমাররা প্রশংসা করে অথচ পড়ে না ।

        —আর এগুলো, এগুলোও কেউ ডোনেট করেছে নাকি ?

        —না না, কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো আর দাস ক্যাপিটালের কথা বলছ তো ? ওগুলো এক ছোকরা কমরেডের, বইগুলোর গন্ধ শুঁকলেই বুঝতে পারবে সোভিয়েত দেশে ছাপানো, গোরুর খুর গলিয়ে তৈরি আঠায় পুট সাঁটা হয়েছে, বৃষ্টি পড়লেই বইগুলো সোভিয়েত দেশের দুঃখে দুর্গন্ধ ছাড়ে । 

         তা জানি, তা জানি, রাশিয়ার গোরু আর রাশিয়ার মেয়েমানুষ, ওদের থন তো বিশ্বখ্যাত, তা সে যতোই দুর্গন্ধ থাকুক, একবার মুখ গুঁজে পড়ে থাকলে রাশিয়ার পুরো শীতকাল  কাবার হয়ে যায় । বললেন নগেন দত্ত, বিশেষজ্ঞর গাম্ভীর্যে।।

          সেই ছোকরা কমরেড রাতটা কাটিয়ে সকালে উঠে টিভিতে জানতে পারলো যে পরিবর্তনের সরকার গদিতে বসতে চলেছে, কমরেডদের রাজত্ব শেষ, পরিবর্তনঅলারা কমরেডদের ধরে-ধরে আড়ং ধোলাই দিচ্ছে । রাতের কমরেড এমন ধরাধরি করতে লাগল যে নাপিত ডাকিয়ে তার দাড়ি-গোঁফ কামিয়ে, চুল কদমছাঁট করিয়ে এখান থেকে বেরিয়েছিল, কাঁধের ঝোলাটা আমার টেবিলের ওপর ফেলে বলেছিল, এগুলোর যা গতি করার করবেন । 

         ড্রয়ার থেকে নোংরা বাদামি একটা কাঁধব্যাগ বের করে চক্কোত্তি বললে, এই ঝোলা থেকেই ওই বইগুলো পেয়েছিলুম, আর একটা ডায়েরি, সেটা আমি যত্ন করে রেখে দিয়েছি, ব্যাটা এখানে কার সঙ্গে কবে শুয়েছে, তার দিনক্ষণ-রেট সবই লিখে রেখেছিল, মেয়েরা কত রকমের, তাদের গুণদোষ কি-কি।  বই পড়াপড়ি আর লেখালিখিই কাল হয়েছে বাঙালির ।

          তাতে কুন্দনন্দিনীর নাম ছিল ? জানতে চাইলেন নগেন দত্ত ।

          অতো আর দেখিনি, থাকলেও থাকতে পারে, সকলের নামই তো কুন্দনন্দিনী করে দিয়েছি, বললেন প্রফেসর চক্কোত্তি । তারপর যোগ করলেন, যেন কোনো ব্যাপারই নয় এমন স্বাভাবিক কন্ঠস্বরে, ছোকরাকে সেদিন রাতেই পিটিয়ে মেরেছিল, ছবি বেরিয়েছিল কাগজে, কে বা কারা মেরেছিল তা আজও ধরতে পারেনি পুলিশ, তবে বিশ্বস্ত সূত্রের খবর ছাপা হয়েছিল যে তার সাগরেদরা যারা রাতারাতি কমরেড থেকে পরিবর্তনের দিকে চলে গিয়েছিল তারাই ওকে সাবড়ে দিলে । টিভিতে দেখোছো তো ব্যাঙরা ওজনপাল্লার একদিক থেকে আরেক দিকে লাফাচ্ছে, কানমুলে নাক খৎ দিচ্ছে ।

         তোমার আলমারিতে তো কুড়িটি প্রেমের চটচটে  উপন্যাস, পনেরোটি ভালোবাসার রগরগে উপন্যাস, তিনশো প্রেমের ভিজে কবিতা, শ্রেষ্ঠ প্রেমের চকাচক কবিতা, শ্রেষ্ঠ ভুতের ননস্টপ প্রেমের কবিতা, শ্রেষ্ঠখোকাদের প্রেমের কবিতা, কাফকার প্রেমের উপন্যাস, ডসটয়েভস্কির ভালোবাসা, মুরাকামির জাপানি যৌনতা আর প্রেম, আরও অনেকের শ্রেষ্ঠপ্রেমের কবিতার বই দেখছি । ওগুলোও কি ফেলে গেছে ক্লায়েন্টরা ?

          না, কেউ কেউ কুন্দনন্দিনীদের উপহার দিয়ে গেছে । শোবার আগে নিজেদের কবিতা শুনতে চেয়েছে কুন্দনন্দিনীদের গলায় । প্রধান অতিথি হয়ে দেখেছি তো, কবিতাপাঠের আসরে তো কেউ বড়ো একটা কবিতা শোনে না, পেছনের সারিতে বসে ঝিমোয়, চা-সিঙাড়া খেয়ে কেটে পড়ে নিজের কবিতা পড়ার পর, তাই একরাতের ভালোবাসার পাত্রীর গলায় নিজের কবিতা শুনে দাঁড়ানো যন্তরকে শোনায় । 

          টেবিলের ওপর রাখা গুরু-মহারাজের ফোটো ঝোলা দিয়ে মুছে অধ্যাপক চক্রবর্তী বললে,

আমার প্রজেক্ট অত্যন্ত সরল ; পুরুষরা ইডিয়ট, আমার কুন্দনন্দিনীদের কাজ হল তাদের বোকা বানিয়ে যতো পারা যায় নিংড়ে নেয়া। তাই তো চব্বিশ ঘণ্টা একটা টেলিফোন সেক্সের লাইন খোলা রাখি ।

         টেলিফোন সেক্স ? তাতে মন ভরে ? জানতে চাইলেন নগেন দত্ত ।

         পুরুষদের ইডিয়ট বলেছে কেন, ইডিয়ট জানোয়ার, মেয়েদের সিডাকটিভ গলার আওয়াজ স্বমেহন করতে সাহায্য করে ; যে মেয়েদের  অবসর নেবার বয়স হয়েছে, তাদের আমি টেলিফোন সেক্সের টেবিলে বসিয়ে দিই পালা করে, তাদের অভিজ্ঞতা কাজে দ্যায়, একটা মালটিলাইন বোর্ড আছে তার জন্য, আগেই অনলাইন পেমেন্ট করতে হয়, ইনটারনেটে স্কাইপে যৌনআলাপের ব্যবস্হাও করেছি, তাতে অবসরপ্রাপ্তদের বসিয়ে দিই ফিল্ম স্টারের মুখোশ পরিয়ে । ব্যাকগ্রাউণ্ডে বাংলা বা হিন্দি ফিলমের গান বাজে, হওলে-হওলে, ছিনছিনাছিনছিন, ইয়ামবা ইয়ামবা ।

         যাকগে যাক, কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো আর ডায়েরিটা বের করে দাও তো একটু, কেমন যেন চেনা-চেনা লাগছে, বললেন নগেন দত্ত, গলায় উদ্বেগ ।

          প্রফেসর চক্কোত্তি, নিজের মনে বললেন, কোন জিনিয়াসের পাল্লায় পড়েছি, মাঝে মাঝেই আসে আর কেলো করে যায়, ঘাঁটাতে চাই না বেশি, কাঁড়ি-কাঁড়ি টাকা কোথা থেকে পায় কে জানে, এমনও নয় যে টাকাগুলো চিনে ছাপিয়ে পাকিস্তানি কিংবা বাংলাদেশিরা এপারে এনেছে, সবই খাঁটি টাকা, যাচাই করিয়ে দেখেছি, তবুও প্রতিভাধর বলে কথা, এঁটুলির বাড়ন্ত, জিনিয়াসের সঙ্গদান করার সময়ে সকলকেই সাময়িকভাবে পাগল হয়ে উঠতে হয়, তাই কিই বা করি, পাগলামিই করি, অবশ্য পাগলামি করার মধ্যে আনন্দ আছে ।

          বইয়ের গোদরেজ আলমারি থেকে ডায়েরি, কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো আর দাস ক্যাপিটাল বের করে, প্রফেসর চক্কোত্তি টেবিলের ওপর রাখতেই, নগেন দত্ত প্রায় কেড়ে নিয়ে বললেন, আরে এগুলো তো আমারই, আমিই ফেলে গিয়েছিলুম কখনও ।

          এই দ্যাখো, বললেন নগেন দত্ত, ১৭৫২ সালে ভারত মুকুজ্জে নিজের হাতে ‘রসমঞ্জরী’ বই থেকে এই লাইনগুলো লিখে দিয়েছিলেন । ভারত মুকুজ্জেকে জানো তো, ওই যে, ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর, মহারাজা কেষ্টচন্দ্রর দরবারি কবি ছিলেন, তোমার এই গ্যালারিতে কতোবার এসেছেন-গেছেন, ওনার অভিজ্ঞতার থই পাওয়া যাবে না, আমি তো ওনার নির্দেশিকা মিলিয়ে কুন্দনন্দিনীকে মনে-মনে আবার থেকে গড়ে নিয়েছি । তুমিও এই নির্দেশিকা দেখে বাছবাছাই করতে পারো, এতো কুন্দনন্দিনী তোমার আণ্ডারে ।

          —না, আমি মানিক বাঁড়ুজ্জের শশীরোগে ভুগি, বললেন প্রফেসার চক্কোত্তি । বলার পর তাঁর সন্দেহ হল যে এই রোগের জন্যে নগেন দত্তই দায়ি, গেলবার নগেন দত্ত ফিরে যাবার পর থেকে এই রোগে ধরেছে তাঁকে, নগেন দত্তের আসল কুন্দনন্দিনীকে খুঁজে দিতে পারেননি সেবার । এবার লোকটা কী করবে কে জানে, হয়তো তাঁকে বলবে “তুমি মোটা চামড়ার মানুষ”, আর উনি নিমেষে গণ্ডার হয়ে যাবেন ।

          নগেন দত্ত শশীরোগের বিষয়ে জানেন না বলে অপ্রস্তুত গলায় বললেন, অমন রোগের কথা শুনিনি তো ।

          মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’ বইটা পড়েছ তো, তাতে শশী নামে যে চরিত্র আছে, তার এরেকটাইল ডিসফাংশান রোগ ছিল, আমিও আজকাল ওই রোগেই ভুগি । 

          নিজের মগজের ভেতরে নিজেকে নগেন দত্ত বললেন, তার মানে ‘আছে’ থেকেও ‘নেই’ । বিইং নিজেই নাথিংনেস, চিন্তা করে হাসতে লাগলেন, কীক্কাণ্ড, বিইং আর নাথিংনেসে কোনো তফাতই থাকে না বহু ক্ষেত্রে । সিঁড়ির দেয়ালের পেইনটিঙের মানে ছবি দেখে যা মনে হয়েছিল তা নয় । দুটো অঙ্গের প্রতিটিই নাথিংনেস হতে পারে ।

          নগেন দত্ত বললেন, তোমার কথায় মনে পড়ে গেল, ১৯২১ সালে একবার শরৎ চাটুজ্জের সঙ্গে চিনেপাড়ায় দেখা হয়েছিল, উনি আফিম কিনতে গিয়েছিলেন আর আমি আফিম সাপলাই দিতে গিয়েছিলুম এক চীনে হোলসেলারকে, মালদায় আমাদের যে জমিদারি, সেখানে প্রচুর পোস্তখেত আছে, তা শরৎ চাটুজ্জেকে আমি জিগ্যেস করেছিলুম যে চন্দ্রমুখীর সঙ্গে দেবদাসের রিলেশানশিপটা কমপ্লিকেটেড করে দিলেন কেন ? উনি বলেছিলেন, দেবদাস এতো মদ খেতো যে ওকে এরেকটাইল ডিসফাংশান রোগে ধরেছিল, তা বুঝতে পারার পর দেবদাস মদ খাওয়া আরও বাড়িয়ে দিলে, ধেনো টানতে লাগল, তা আমি আর কি করি, দেবদাসের মুখে মাতালের সংলাপ দেয়া ছাড়া , সংলাপের জন্যে বইটা হিট হয়ে গেল, একটা বইয়ের সংলাপের টাকা থেকে সারা বছরের আফিমের খরচ উঠে যায় ।

         —এখনও পোস্তচাষ হয় ? এখন তো মার্কিন চাপে আফিম বেআইনি হয়ে গেছে শুনি, জানতে চাইলেন অধ্যাপক চক্রবর্তী ।

         —বেআইনি বলে কিছু আছে নাকি, এই তো কয়েকমাস আগে আমার কালিয়াচকের চাষিরা বিপদে পড়েছিল বলে নিজেরাই নিজের হাতে আইন তুলে নিয়ে ফয়সালা করে ফেললে ; আইনভাঙার কোনো প্রমাণ কারোর কাছে নেই। 

         প্রফেসর চক্কোত্তি বললেন, সে যাহোক, নির্দেশিকাটা দেখান দিকি, ক্লায়েন্টদের হয়তো কাজে দিতে পারে, কেন কেউ একজন বিশেষ মেয়েকে পছন্দ করে, আর তার চেয়ে সুন্দর-মুখ সরেস-বডির মেয়েকে করে না, তার হদিশ পাইনি আজ পর্যন্ত, এ যেন বিয়ের জন্যে মেয়ে বাছাই করার মতন, কোন মেয়েকে যে কোন বরের পছন্দ হয়ে যায়, কেন হয়, তার ব্যাখ্যা নেই কোনো।

         নগেন দত্ত পড়া আরম্ভ করলেন, এই বলে যে, নারীরা চার রকমের হয়, পদ্মিনী, চিত্রিনী, শঙ্খিনী আর হস্তিনী, তোমার এই গ্যালারিতেই তো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে লিখে গেছেন ভারত মুকুজ্জে । তাঁর, নগেন দত্তর, গলা থেকে বেরোতে লাগল আঠারো শতকের বাঙালি বামুনের স্বর:

                                                   পদ্মিনী

                        নয়ন কমল            কুঞ্চিত কুন্তল            ঘন কুচস্হল

                                                  মৃদু হাসিনী।

                        ক্ষুদ্ররন্ধ্র নাসা          মৃদুমন্দ ভাষা           নৃত্যগীতে আশা

                                                  সত্যবাদিনী ।।

                        দেবদ্বিজে ভক্তি        পতিঅনুরক্তি           অল্পরতিশক্তি

                                                  নিদ্রাভোগিনী

                        মদন আলয়            লোম নাহি হয়          পদ্মগন্ধ কয়

                                                  সেই পদ্মিনী ।।

                                                     চিত্রিনী

                        প্রমাণ শরীর           সর্ব কর্মে স্হির          নাভি সুগভীর

                                                  মৃদু হাসিনী ।

                        সুকঠিন স্তন           চিকুর চিকন             শয়ন ভোজন

                                                  মধ্যচারিনী ।।

                        তিন রেখে যুত        কন্ঠবিভূষিত            হাস্য অবিরত

                                                  মন্দ গামিনী ।

                        মদন আলয়           অল্প লোম হয়            ক্ষারগন্ধ কয়

                                                   সেই চিত্রিনী।।

                                                     শঙ্খিনী

                       দীঘল শ্রবণ             দীঘল নয়ন                  দীঘল চরণ

                                                  দীঘল পাণি।

                       মদন আলয়             অল্পলোম হয়                 মীনগন্ধ কয়

                                                  শঙ্খিনী জানি ।।

                                                    হস্তিনী

                       স্হূল কলেবর           স্হূল পয়োধর               স্হূল পদকর

                                                  ঘোর নাদিনী ।

                       আহার বিস্তর           নিদ্রা ঘোরতর               রমণে প্রখর

                                                  পরগামিনী ।।

                        ধর্মে নাহি ডর         দম্ভ নিরন্তর                   কর্মেতে তৎপর

                                                  মিথ্যাবাদিনী ।

                        মদন আলয়            বহুলোম হয়                  মদগন্ধ কয়

                                                   সেই হস্তিনী ।।

          —ক্লায়েন্টরা কতো রকমের হয় লিখেছিলেন নাকি ? জানতে পারলে ক্লায়েন্ট অনুযায়ী কুন্দনন্দিনীদের কোন দরোজায় কে দাঁড়াবে, ডিসাইড করতে পারবো তাহলে ।

         নগেন দত্ত বললেন, পুরুষরা জানোয়ার, তা ভারত মুকুজ্জে ১৭৫৫ সালে আমাকে বলেছিলেন, আর লালন সাঁইও বলেছিলেন আমাকে ১৮৭০ সালে, সে আজ অনেককাল হয়ে গেল, পুরুষদের বিশেষ হেরফের হয়নি, জানোয়ারই রয়ে গেছে, আমি নিজেকে দিয়েই জানতে পারি, কখন কোন পশু হয়ে গেলুম, মেয়েদের বরং অনেক রদবদল ঘটে গেছে, আর চার রকমে আটকে নেই ।

         কোন জানোয়ার ? কুকুর নিশ্চয়ই, পুরুষগুলোকে দেখি হয় কুকুরের মতন ল্যাজ নাড়ায় কিংবা কামড়াতে দৌড়োয়, জ্ঞানীর গাম্ভীর্যে বললেন অধ্যাপক চক্রবর্তী ।

         নগেন দত্ত বললেন, এখানে গুণাগুণের কথা আলোচনা করছি আমরা, প্রভূভক্তির নয় । ভারত মুকুজ্জে আর লালন সাঁইয়ের মতে পুরুষ চার রকম জানোয়ারের মতন হয়, খরগোশ, হরিণ, ঘোড়া আর ষাঁড় । তবে ১৯৪০ সালে যখন আফ্রিকায় গিয়েছিলুম, সিংহের চামড়ার ব্যবসার ব্যাপারে, তখন মাসাই নদীতে যে কুমিরগুলোকে দেখেছিলুম, আমার মনে হয় সবকটা পুরুষ ওই কুমিরদের মতন, বুঝলে, কুমিররা কামড়ে খেতে পারে না তো, একটা জেব্রা কি মোষ যদি নদীর জলে ধরতে পারে, সব কয়টা কুমির মিলে তাকে ছিঁড়ে-ছিঁড়ে খায়, ছেঁড়ার জন্যে কামড় দিয়ে জলের মধ্যে পাক খেয়ে মাংস-নাড়িভুঁড়ি টেনে বের করে আনে ।

        —যা বলেছো, বেশিরভাগ বাঞ্চোতই ষাঁড় কিংবা ঘোড়া, জান কালি করে দ্যায় মেয়েগুলোর । কালেজের ছেলেরা দল বেঁধে আসে হরিণ-খরগোশের মতন ল্যাংচার টুকটুকুনি দিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে বাড়ি চলে যায়, কিংবা কোনো কুন্দনন্দিনীর সঙ্গে আমোদ করে । রেসের দিন থাকলে ষাঁড়-ঘোড়াগুলো বাড়িটাকে একেবারে চোরছ্যাঁচড়ের আড়ত বানিয়ে তোলে, আর ব্যাটারা যদি দলবেঁধে কোনো মেয়ের ঘরে ঢোকে তাহলে কুমিরেরও বেহদ্দ হয়ে ওঠে। 

          এতোটা টানা বলার পর টেবিলের ওপরে রাখা কাচের গেলাসের জল খেয়ে, জিভ দিয়ে ঠোঁট চেটে চক্কোত্তিমশায় বললে, তা কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টোর সঙ্গে ভারত মুকুজ্জের রসমঞ্জরীর কোটেশান ঠিক মেলাতে পারলুম না, ও-দুটো তুমি পিটুনি খেয়ে মারা যাবার আগে অষ্টপ্রহর সঙ্গে নিয়ে ঘুরতে, কেন ?

          বলশেভিক বিপ্লবের পর যখন স্ট্যালিনের সঙ্গে মসকোয় দেখা করেছিলুম, দিনের বেলা দশটাতেই অন্ধকার, ভাগ্যিস ঘড়ি ছিল, ওভারকোটের ওপর মাথায় কুরাকুল ভেড়ার চামড়ায় তৈরি অ্যাসট্রাখান টুপি পরে, টুপির ওপরে হ্যাট তুষার থামাবার জন্যে, ওভারকোটের তলায় প্যাডেড কোট, হাতে কুমির চামড়ার দস্তানা, তার তলায় কাপড়ের দস্তানা, কাপড়ের মোজার ওপর থার্মাল মোজা, থার্মাল জাঙিয়া, জুতোর ওপরে পরার পেরেক বসানো গোরেটেক্স বুটজুতো, তখন তুষারে ঢাকা পড়ে গেছে রেড স্কোয়ার, চোখের পাতায় তুষার জমে যাচ্ছে আর ঝাড়ছি, মুলো দিয়ে ভোদকা খেয়ে বেরিয়েছিলুম, মুখের গন্ধ দূর করার জন্যে কালো চকোলেট চুষতে-চুষতে, ভোদকা কেনার কি লাইন । 

          ঠিক সময়ে ওনার কাছে না পৌঁছোলে দেখা করেন না শুনেছিলুম, তা উনি বলেছিলেন যে প্রত্যেকটা গরিব দেশে একজন করে স্ট্যালিন থাকা দরকার, যে শ্রমিকের শত্রুদের ধরে-ধরে নিকেশ করবে, একনায়কের গদিতে বসে রাজত্ব করবে, লাল সৈন্যদের প্রধান হবে, অধস্তন কাউকে ইচ্ছে হলে পেপারওয়েট ছুঁড়ে নাচাবে, বেয়াড়াদের খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে পাঠিয়ে দেবে বরফের দেশে জেল খাটতে । 

         আমি ভেবেছিলুম যে আমিই হবো সেই একেশ্বর, তাই মাঝে-মাঝে কমিউনিস্ট ইশতাহার পড়তুম আর স্বপ্ন দেখতুম । দীর্ঘশ্বাস দীর্ঘতর করে বললেন নগেন দত্ত । স্ট্যালিন বললে, জনগণের ভেতরটা বদলে দিতে না পারলে একনায়ক হওয়া যায় না, লাগাতার নাগরিকের ভেতরটা বদলাবার মেশিন তার শরীরে চালু রাখতে হবে, সকলের দ্বারা তা সম্ভব নয় ।

         একটা ব্যাপারে স্ট্যালিন আমার ওপর চটে গিয়েছিলেন, জুলিয়াস সিজারকে খুন করার ষড়যন্ত্রে আমিও ছিলুম, শুনে থাকবে, মার্কাস জুনিয়াস ব্রুটাস আর কয়েকজন মিলে আমরা নির্ণয় নিয়েছিলুম যে পম্পেই থিয়েটারের কাছে ১৫ ই মার্চ জুলিয়াস সিজারকে ছোরা মেরে-মেরে খুন করব, কেননা ওর বড্ডো বাড় বেড়ে গিয়েছিল, আমাদের কথায় কান দেয়া দরকার মনে করতো না, তখনও যিশুখ্রিস্ট জন্মায়নি, সে চুয়াল্লিশ সালে, আমিও দিয়েছিলুম কয়েক ঘা, খচাখচ, সেদিন ছিল দোলপূর্ণিমা, দুধে ভাঙ মিলিয়ে টেনেছিলুম, কাৎ হয়ে পড়ে গেল সিজার । 

          স্ট্যালিন বললে, ইতিহাসকে ওইভাবে পাল্টানো উচিত হয়নি, আসলে স্ট্যালিনের নিজেরও তো ভয় ছিল, তাই কাউকে সন্দেহ হলেই কোতল করে দিতো । সাধারণ মানুষরা ভুল বুঝলে বেশ মজা পেতো স্ট্যালিন। উত্তরে আমি ডেনিস দিদেরোর কথা বলেছিলুম । দিদেরো বলেছিলেন যে যতোদিন না শেষ পুরোহিতের নাড়ি দিয়ে শেষ রাজার গলায় পেঁচিয়ে মারা হচ্ছে, ততোদিন মানুষ স্বাধীন হবে না । শুনে স্তালিনের সেই যে শরীর খারাপ হলো, পরের দিন ওকে ওর খাটের পাশে অজ্ঞান অবস্হায় পাওয়া গিয়েছিল ।

         ফেরার আগে আমি স্ট্যালিনকে জিগ্যেস করেছিলুম যে হিটলার কেমন করে একনায়ক হয়ে গেল, সে কি জার্মানদের ভেতরটা বদলে দিতে পেরেছিল ?

          স্ট্যালিন বললে, ও ব্যাটা টেম্পো বজায় রাখতে পারেনি, ব্যাটার একটা বিচি ছিল না, আর দাঁড়ানো অবস্হায় নুনু ছিল এক ইঞ্চির, যাকে কমিউনিস্ট ডিকশনারিতে বলে ন্যানোনুনু, তাই যুদ্ধু হেরে গেল, দেশটাকে টুকরো করে ফেললে, ধরা পড়ার ভয়ে বিষ খেয়ে নিলে, ছ্যা ছ্যা ছ্যা । আমেরিকানরা  ওর ন্যানোনুনু খুঁজে পেয়েছিল, সেটা ব্যবহার করে ওরা হাইড্রোজেন বোমা আবিষ্কার করলে ।

          তারপর ? কান দুটো গাধা-কান করে জানতে চাইলে অধ্যাপক চক্রবর্তী । অধ্যাপকের কাছে মাঝে মাঝে ক্লায়েন্টরা এই হিটলারি সমস্যা নিয়ে আসে, তার জন্য ট্রেনিং দিয়ে রাখতে হয়েছে দুটি মেয়েকে ।

          তারপর কুন্দনন্দিনীর দেখা পেলুম আর বিপ্লব সমাজে ঘটার বদলে আমার মগজে ঘটে গেল, সব ওলোটপালোট হয়ে গেল । তদ্দিনে স্ট্যালিন আর ওর বসানো লোকগুলো গণেশ উল্টে খাল্লাস । আমাদের এখানে স্ট্যালিনের রুবল খেয়ে অনেক বাঙালি কর্নওয়ালিসের জমিদারি আরম্ভ করে দিলে, কেজিবির দপতরে তাদের নাম-সাকিন দেখেছি, আমার কাছে তার তালিকা আছে।

         তা চলে এলে কেন ? অনেকে তো রাশিয়ান ভাষায় বাংলা লিখে প্রচুর পয়সা কড়ি করে ফিরেছে। সেসময়ে ডবকা-উরুর রুশ মেয়েদের অবশ্য সঙ্গে আনতে পারেনি, এখন তো রুশ মেয়েরা নিজেরাই পাকাপাকি বর বা সাময়িক বর খুঁজতে এদেশে আসছে, ডবকা উরু দেখাতে আর কোনো লজ্জা নেই তাদের ।

          আমি কুন্দনন্দিনীর জন্যে বেঁচে আছি । কতোকাল হয়ে গেল খুঁজে পাচ্ছি না কুন্দনন্দিনীকে । খরগোশ, হরিণ, ঘোড়া, কুমির, ষাঁড়ের মতন জানোয়ারি করেও খুঁজে পেলুম না, আরও জানোয়ার হয়ে চলেছি, জানোয়ারেরা আরও বেশি-বেশি জানোয়ার হয়ে চলেছে । আমি যেকোনো মেয়েকে কুন্দনন্দিনী বানিয়ে ফেলতে পারি, কিন্তু তার ভেতরটা বানাতে পারব না, যাকে ভালোবাসবো তার ভেতরটাই তো আসল ।

          অধ্যাপক চক্কোত্তি, হতাশা মেশানো গলায় বললে, তুমি স্ট্যালিন হলে আমার ব্যবসা লাটে উঠিয়ে আমাকেই কোতল করে দিতে ; ভাগ্যিস স্ট্যালিনের যুগ গিয়ে আবার তুঘলকের যুগ ফিরে এসেছে, সোনার টুকরো ছেলেদের রাতারাতি গাধার চামড়ার টুকরোয় গড়া ছেলে বানিয়ে ফেলা হচ্ছে, তারা নিজেরাই গাধা কিংবা খচ্চরের চামড়ায় গড়ে ফেলছে নিজেদের, এ একেবারে স্বর্ণযুগ, স্বর্ণযুগ, বুঝলে নগেন, বলছি কেন যে পারফরমিং ফ্লেশ হল উন্নততম শিল্প, আদি শিল্প বলে গেছেন রসশাস্ত্রীরা । এই শিল্প ছাড়া তো অন্য কোনো শিল্পের কথা শুনিনা ।

          তা বটে, বললেন নগেন দত্ত ।

          অধ্যাপক চক্রবর্তী, অধ্যাপকের ক্লাস নেবার ঢঙে বললে, দ্যাখো, একদিক থেকে সোভিয়েত দেশ ভেঙে গিয়ে ভালো হয়নি, আমার মার্কেটে নতুন নতুন কমপিটিটর এসে পড়েছে, ফর্সা চামড়া, ঢ্যাঙা ঠ্যাং, লাল-টুকটুকে ঠোঁট, উঁচু বুক, গোলাপি বোঁটার মেয়েরা, এসটোনিয়া, লাটভিয়া, লিথুয়ানিয়া, রোমানিয়া, আজারবাইজান, আরমেনিয়া, জর্জিয়া, ইউক্রেন, মলডোভা থেকে । 

          টেবিলের ওপর থেকে ঝোলাটা ড্রয়ারে ঢুকিয়ে অধ্যাপক চক্কোত্তি বললে, এখন আপকানট্রির ক্লায়েন্টদের হাতে ঠিকেদারির আর দিল্লিঘুষের দেদার কাঁচা টাকা, তারা এই মেম মেয়েদেরই পছন্দ করছে আজকাল, সেই জন্যেই তো আমি এপার বাংলা আর ওপার বাংলা ছাড়া আমার গ্যালারিতে অন্য আইটেম রাখি না, কেননা আপকান্ট্রির পুরুষরা বাঙালি মেয়েদের পেলে সব কিছু ভুলে যায় । ওসব ফর্সা মেমদের সঙ্গে সেলফি তোলাতে হলেও হাজার টাকা লাগে, বিয়েতে নাচাতে হলে আরো বেশি, শুতে লাগে এক থেকে দেড় লাখ ; আমার মেয়েদের সঙ্গে সেলফি তোলাতে হলে প্রথমে ক্লায়েন্ট হতে হয়, তারপর যতো ইচ্ছে সেলফি তোলো, ব্ল্যাকমেইলিঙের পাল্লায় পড়লে তার দায় ক্লায়েন্টের ।

          নগেন দত্ত বললেন, দ্যাখো, কুন্দনন্দিনীকে যদি পদ্মিনী হিসেবে পাই তাহলে বেশ হয়, কিন্তু ভারত মুকুজ্জে বলেছে যে তাদের অকুস্হলে লোম থাকে না, সেখানে লোম না থাকাটা যেন কেমন বিসদৃশ, নয়কি !

          চিন্তা নেই তোমার, বললে প্রফেসার চক্কোত্তি, যাত্রাদলের অভিনেত্রীরা ট্রেনিং দিচ্ছে কেন, এই অভাব পুরণের জন্যেই তো ! যাদের বগলে আর কুঁচকিতে যথেষ্ট লোম নেই, গ্রাহক চাহিদা অনুযায়ী আমরা স্পিরিটগাম দিয়ে সাময়িকভাবে নকল চুল বসিয়ে দেবার ব্যবস্হা করেছি, আদারওয়াইজ লোম কারোরই রাখা হয়নি, পদ্মিনী, শঙ্খিনী, চিত্রিনী আর হস্তিনী, যারই বলো, লেজার ট্রিটমেন্ট করে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে ।

         —আচ্ছা, সেকারণেই  সিঁড়ির দেয়ালে ‘বিইং অ্যান্ড নাথিংনেস’ দুটোই দেখলুম লোমহীন ।

         অন্য প্রসঙ্গে চলে গেল অধ্যাপক চক্রবর্তী, নগেন দত্তকে জিগ্যেস করলে, কতো টাকা নিয়ে ঘোরো তোমার অ্যাটাচি কেসে, এমন পাড়ায় যাতায়াত করো, কখন ছিনতাই হয়ে খুন হয়ে যাবে, সাবধানে চলাফেরা করা উচিত, তার ওপর একটু আগেই শিলাবৃষ্টি আরম্ভ হয়েছে ।

         শিলাবৃষ্টি এই এক্ষুনি বন্ধ হয়ে গেছে, বলার পর, নগেন দত্ত অ্যাটাচির মুখ অধ্যাপক চক্রবর্তীর দিকে ঘুরিয়ে বোতাম টিপতেই খুলে গেল, আর দেখা গেল তাতে রাখা রয়েছে একটা ফেডেড জিনস, লাল রঙের টিশার্ট, জগিং করার জুতো-মোজা, খাপে গোঁজা কাগজপত্র ।

         টাকা মেটাবে কেমন করে ? জানতে চাইলে উদ্বিগ্ন অধ্যাপক, আমার গ্যালারিতে চার্জ সবচেয়ে বেশি জানো তো , তোমার ট্যাঁক তো ফাঁকা দেখছি ।

         নগেন দত্ত অ্যাটাচি কেস বন্ধ করে আরেকবার খুলে দেখালেন যে একহাজার টাকার চল্লিশটা প্যাকেট রাখা । দেখে, পঁচাত্তর বছর আগের ভীতি ফিরে এলো অধ্যাপক চক্রবর্তীর মগজে, বললে, দাঁড়াও অনেকক্ষণ হিসি চেপে আছি । 

        ঘরের লাগোয়া ওয়াশরুমে পেচ্ছাপ করতে দৌড়ুলো চক্কোত্তি প্রফেসর, আধ ঘন্টা লাগল ওনার ব্লাডার খালি হবার ধারার আওয়াজ বন্ধ হতে । 

         অথচ নিজের ঘরে ফিরলো  না অধ্যাপক মশায়। 

          ঘণ্টাখানেক অপেক্ষা করে ওয়াশরুমে ঢুকে নগেন দত্ত দেখলেন দেয়ালে একটা গোপন দরোজা, উঁকি দিয়ে দেখলেন টিমটিমে আলোয় একাধিক সিঁড়ি নানা দিকে নেমে গেছে, তার মানে অ্যাটাচিকেসের ভোলবদলে ভয় পেয়ে পালিয়েছে প্রফেসর চক্কোত্তি, অথচ ভয়ের তো কিছু নেই । হয়তো ওর এরেকটাইল ডিসফাংশানকেও ভাবছে আমার কারসাজি । কারসাজি করতে হলে ওর ‘বিইং’কেই ‘নাথিংনেস’ করে দিতুম । যাকগে, পুলিশের রেইড হলে মেয়েদের এই পথেই লোপাট করে দ্যায় চক্কোত্তি, বেচারা, জীবনের ফুটোগুলো নিয়ে বাঁচতে শেখেনি, পালাতে শিখেছে, বাঙালিদের নাম ডোবালো ।

          এই পাড়ায় গ্যালারিগুলো পালাবার পথ রেখেছে, রাস্তাগুলো পালাবার পথ রাখেনি, সবকটা রাস্তা কোথাও গিয়ে কানা হয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে, এছাড়া অধঃপতনের আহ্লাদে গদগদ হবার অন্য উপায় নেই, ফোসলানোর বিভ্রমে আটকে পড়ে বার বার সবাই এসে খুঁজতে চায় পাড়াটা থেকে বেরোবার বিকল্প পথ ।

          আরেকটু অপেক্ষা করেই দেখি, ভাবলেন নগেন দত্ত, মাথার কোঁকড়া কালো চুলে হাত বুলিয়ে । পেছন ফিরে দেখলেন, দুটি যুবতী ঢুকলো ঘরে, বলে উঠলেন, আরে তিথি আর ছন্দরানি, তোমরা তো বিগতবুড়ি হয়ে গিয়েছিল, আবার দেহ ফিরে পেলে কী করে ? আমি তো তোমাদের পুনর্নিমাণ করে দেখলুম একটু আগে, আগাপাশতলা। এখনও পোশাক না পরেই আছো ? চক্কোত্তিবাবুর কোনো ক্লায়েন্ট এসে পড়লে বিপদে পড়বে, যাও আগে পোশাক পরে এসো ।

          তিথিই প্রথম কথা বলল, নগেন দত্তকে জড়িয়ে গালে ঠোঁট চিপে, মমুয়াআআআআআঃ, ডক্টরেট করিয়ে ছাত্ররা গেছে, তাই তুমি চলে যাবার আগে পুরোনো রাতগুলো আরেকবার গুলজার করার জন্যে এলুম, তক্কে-তক্কে ছিলুম, নজর রেখেছিলুম দরোজার দিকে, চলো আমরা দুজনে তোমার দুদিকে শুয়ে জম্পেশ খেলা করি ।

          নগেন দত্ত তিথি আহমেদের মুখটা ঘুরিয়ে নিজের দিকে এনে ঠোঁটে চুমু খেয়ে বললেন, তোরাও যে অধ্যাপক হয়ে গেছিস তা জানতুম না, অধ্যাপনার সঙ্গে মর্ষকামী সেক্স যায় কিনা তেমন জানি না গো । তখন তো তোরা আকাট ছিলিস, খেলতে ভালো লাগতো, মুকখুর সঙ্গে খেলার স্বাদ আর বিএ-এমএ পাশের সঙ্গে খেলার স্বাদে কি তফাত নেই, কী বলিস তোরা ? ।

          ছন্দরানি বললে, অধ্যাপনা করি বলে কি আমাদের যৌনতা নেই, আমাদের দেহও কি অধ্যাপকদের মতন গোমড়া থাকবে নাকি ! আমাদেরও লাবিয়া  আছে, উৎসুক ভগাঙ্কুর আছে, তুমি আমাদের সমান স্ট্যাটাসের, আমরা তো সীমা ভেঙে ছাত্র ফুসলিয়ে তাদের সঙ্গে শুতে পারি না, টাকা না নিয়ে শুলে স্ট্যাটাসে বাধে, এতো পড়াশুনা করে ফেলেছি, হাজার দশেক বই পড়ে ফেলেছি, সতেরোটা গবেষণার বই লিখে ফেলেছি ইংরেজি আর বাংলায়, তুমি, আমাদের দেহের ঈশ্বর, আজ দেখা দিলে আশি-নব্বুই বছর পর, ঝিনচাকুনি খেলা তো খেলতেই হবে ।

         নগেন দত্ত বললেন, ওহ, আমার জ্ঞানচক্ষু যাকে বলে উন্মীলন করে দিলি তোরা দুজনে, আমি তো কখনও স্ট্যাটাসের কথা ভেবে কারোর সঙ্গে শুইনি, দেশে হোক বা বিদেশে, কমিউনিস্ট রাষ্ট্রে হোক বা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে, ব্রিটেনের পুঁজিবাদে হোক বা ভিয়েতনামের সাম্যবাদে,  নিউ ইয়র্কের আনডারগ্রুাউন্ড হুকারের সঙ্গে হোক বা জার্মানির ওভারগ্রাউন্ড ব্রথেলে, আমি তো ভাবতুম যা পাই তাই খাই হল প্রকৃত প্রেমিকের লক্ষণ । বুঝতেই পারছিস যে আমি একজন আন্তর্জাতিকতাবাদী । 

          তিথি আহমেদ বললে, চলো না গো, জানই তো আমার গায়ে সুলতান ইলিয়াস শাহের রক্ত বইছে, সেরকম স্ট্যাটাসের নাগর পাইনি বহুকাল, সবই এলেবেলে রাস্তাছাপ, প্লেবিয়ান কোমরের মিনসে-মরদ, চুমু খাবার টেকনিক জানে না, শোবার শৈলী জানে না, জড়াবার আঙ্গিক জানে না, তাদের কেবল মুঠোয় কনটেন্ট হলেই হয়ে গেল, আমাদের যেন সাধ-আহ্লাদ নেই, উপচে ওঠার ইচ্ছে নেই । সংসার করিনি কেন বলো তো, সংসার মানেই তো পুনরাবৃত্তি, একই পুরুষ, একই দুর্গন্ধ, একই বিছানায় দিন নেই রাত নেই, বাচ্চার পর বাচ্চা বিইয়ে চলো বছর-বছর, ওহ ভাবা যায় না।

          তোরা এখন অধ্যাপনা করিস, ছাত্র ঠ্যাঙাস, সকালে টিউশানি রাতে ইশক সমুন্দর ডাল দে অন্দর, তোদের কি বিনা পোশাকে পাগলু ডান্স করা শোভা পায়? আমার কথা বাদ দিচ্ছি, আমি হলুম জমিদার বাড়ির ছেলে, কর্নওয়ালিসের দেয়া অধিকার শরীরে রয়ে গেছে, আইনে থাকুক বা না থাকুক, তাই ভাবছিলুম…। 

         নগেন দত্ত ভেবেছিলেন অধ্যাপক চক্কোত্তির পেছন-পেছন ওয়াশরুমের কোনও একটা গোপন সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে দেখবেন রহস্যটা কি, আবার দুজন যুবতী টোপ ফেলেছে, লোভ ছাড়তে পারছেন না, জানোয়ারগুলো ভেতর থেকে ডাক দিচ্ছে । সেই সঙ্গে মনের ভেতরে কুন্দনন্দিনীর চাহিদা আকুপাঁকু  । 

         বিনা পোশাকে কই, ঠিক করে চেয়ে দেখবে তো ! তুমিই তো সালভাদর দালিকে ১৯২৯ সালে বলেছিলে আমার শরীরে ‘দি গ্রেট ম্যাসটারবেটর’ পেইনটিংখানা এঁকে দিতে, দ্যাখো কেমন ঝলমল করছে সারা শরীর জুড়ে, বলল তিথি আহমেদ, নগেন দত্তের দিকে পেছন ফিরে, সামনে দিক দেখাবার পর ।

         নগেন দত্ত বললেন, তাই তো চিন্তায় ছিলুম যে তোরা বুড়ি হলি কেমন করে, দাদামশায়ের উইলে লেখা আছে যে আমি যার সঙ্গেই শুই না কেন, তার বয়স উনিশ থেকে কুড়ির ভেতরে আটকে থাকবে ।

         আমি উনিশেই আছি গো, তিথি আহমেদ  নিজের দুই বুকে হাত রেখে বললে, এ রঙ একেবারে পাকা, তোমার গায়ে বা ধুতি-পাঞ্জাবিতে লাগবে না । সালভাদর দালি তো বলেই ছিলেন তোমাকে যে ‘দি গ্রেট ম্যাসটারবেটর’ হল কালজয়ী পেইনটিং, আমার দেহ জয় করে ফেলেছে কালপ্রবাহকে । তোমার দাদামশায়ের উইল অনুযায়ী আমার পিরিয়ডও মাসে-মাসে হয় না যে পেইনটিং খারাপ হয়ে যাবে ; সেই যে সালভাদর দালি আমার দেহে এঁকে দিলেন, তারপর তো একশো বছর হতে চলল, মাসিক হয়নি, স্যানিটারি প্যাড বেঁধে পেইনটিংটার মাঝখানে প্যাচ বসাতে হয়নি । কালেজে পড়াতে গেলে এর ওপর জিনস আর টপ পরে নিই, যদিও উপাচার্য মশায় বলেছেন যে পেইনটিঙ দেখতে না পেলেও ছাত্ররা পেইনটিঙের নাম শুনে বিপথগামী হয়ে যেতে পারে । আমি উপাচার্য মশায়কে বললুম যে আমার পড়াবার বিষয় হল ‘লিঙ্গ উইথ স্টিকস’, যাকে কালেজ পড়ুয়ারা বলে লিঙ্গুইস্টিকস, তাতে তো তারা বিপথগামী হচ্ছে না, বিশ্বখ্যাত পেইনটিঙ দেখে হবার প্রশ্ন ওঠে না।    

        তা ঠিক,বললেন নগেন দত্ত, সালভাদর দালি বলে কথা, কজনের ভাগ্যে জোটে অমন দৈহিক অমরত্ব ! তাছাড়া কালেজের ছাত্রদের পড়াবার সময়ে তুই দেহের ভাষাকে আড়াল করে রাখতে পারছিস, মাংসের ত্রিকোনমিতিকে আড়াল করে রাখতে পারছিস, যখন কোনো ছাত্রের সঙ্গে শুচ্ছিস তখন সে তোর দেহের গোপন চিহ্ণ আবিষ্কার করে আহ্লাদে রসাক্ত হবার সুযোগ পাচ্ছে ।

         ছন্দরানি বললে, আমার  বুকদুটোকে কাঁচা আমের রঙে রাঙিয়ে দিয়েছিল পাবলো পিকাসো নামে তোমার এক বন্ধু, দুটোরই তলায় হাত আঁকা, যেন তুমি তুলে ধরে আছো, যেদিন আঁকছিল সেইদিনকে তো তুমি অমন করেই হাত রেখেছিলে, আর এই তলায় মাঝখান থেকে কাটা পিচফল এঁকে দিয়েছিল, তার বদলে ওনার সঙ্গে শুতে হয়েছিল, তুমি বলেছিলে, শুয়েনে-শুয়েনে, কজনেরই বা ভাগ্য হয় পাবলো পিকাসোর সঙ্গে শোবার, তা উনি ভেবেছিলেন উনিই বুঝি ধামসা-ধামসি করতে এক্সপার্ট, আমি এমন ধামসে দিয়েছিলুম যে ওনার রাশিয়ান বউকে চেয়ার ঠেলে ওনাকে এয়ারপোর্টে প্লেন ওব্দি নিয়ে যেতে হয়েছিল। শোবার আগে উনি ওনার গুয়ের্নিকা নামের পেইনটিঙ আমার গায়ে শাড়ির মতন এঁকে দিয়েছিলেন, সুবিধে এই যে স্নান করলেও যায় না আর শাড়ি পরারও দরকার হয় না ।

         তা ভালো করেছিস, কাঁচা সবুজ আম দেখে কালেজের ছেলেদের নোলা নিশ্চই সকসক করে, কার্নিভালের লালা ঝরায় । তুই কী পড়াচ্ছিস তোর কালেজে, জানতে চাইলেন নগেন দত্ত, তুইও কি উনিশে আটকে আছিস ।

         না গো, বললে ছন্দরানি, আমি  কুড়িতে  রয়েছি সেই ইংরেজদের সময় থেকে, তখন স্যানিটারি ন্যাপকিন আসেনি, দ্রৌপদীর মতন কানি বাঁধতে হতো । কিন্তু ইংরেজদের সময় থেকে পিরিয়ড তিরিশ বছরে একবার হয় বলে নিশ্চিন্তে আছি । আমি অনেক সহজ বিষয় পড়াই, লুডহ্বিগ হিটগেনস্টাইন নামে একজন সায়েবের লেখালিখি, যা উনি জটিল করে লিখে গেছেন ।

        মানে ?

        এই ধরো উনি বলেছেন, এক এক করে বলব, নাকি গড়গড় করে বলে যাবো ? গড়গড় করে বললে আমি বুঝতে পারব না কি বলছি আর তুমি কী শুনছ ?

        তাহলে এক এক করেই বল ।

         লুডহ্বিগ হ্বিটগেনস্টাইন বলেছেন :

          ১) সেই সমস্ত ব্যাপারই হল জগৎ যা যেমন ঘটে চলেছে ।

          ২) সেই সমস্ত ব্যাপার একসঙ্গে হল জগৎ, বস্তুর নয় ।

          ৩) জগৎ নির্ধারিত হয় ঘটনা দিয়ে আর ওই ঘটনাগুলোর ঘটনা হবার মধ্যে দিয়ে ।

          ৪) তার কারণ ঘটনার সামগ্র্য ঠিক করে দ্যায় যা যেমন ঘটছে আর যা যেমন ঘটছে না ।

          ৫) যে সমস্ত ঘটনা যৌক্তিক পরিব্যাপ্তির ভেতরে রয়েছে তা-ই হল জগৎ ।

          ৬) ঘটনাসমূহের দ্বারা জগৎ বিভাজিত ।

          ৭) অন্য সবকিছু একইরকম থেকে গেলেও, প্রতিটি ব্যাপার যেমন ঘটছে তেমন হতে পারে কিংবা তেমন নাও হতে পারে ।

          ৮) একটা ঘটনা, তা যেমন ঘটছে, তা হল অস্তিত্বশীল বস্তুস্হিতি ।

          ৯) বস্তুস্হিতি হল বস্তুর সমন্বয় ।

          ১০) কোনও না কোনও সম্ভাব্য বস্তুস্হিতির অঙ্গ হওয়া বস্তুগুলোর পক্ষে অপরিহার্য ।

          দশটা তর্কবিন্দু এক-এক করে বলার পর নগেন দত্ত আগ্রহ হারিয়ে বার বার ওর কাঁচা আমের দিকে তাকাচ্ছেন দেখে ছন্দরানি জিগ্যেস করল, আরও অনেক আছে, অনেক-অনেক, সেগুলোও বলব ?

          নগেন দত্ত বললেন, থাক আর বলতে হবে না, তা  এতো তর্কবিন্দু থাকা সত্ত্বেও, এই জগতে তাহলে কুন্দনন্দিনীকে খুঁজে পাচ্ছি না কেন ?

          তিথি আর ছন্দরানি দুজনেই একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল, এখনও সেই কুন্দনন্দিনীর খোঁজ চলছে ? কী এমন আছে কুন্দনন্দিনীর যা আমাদের নেই ?

          তোদের বাইরেটা আছে, তা কুন্দনন্দিনীর মতনই, কিন্তু আমি চাই কুন্দনন্দিনীর ভেতরের কুন্দনন্দিনীকে । যে কোনো মেয়ের বাইরেটা আমি কুন্দনন্দিনীর মতন গড়ে নিতে পারি, হুবহু পারি, কিন্তু কোনো মানুষের ভেতরটা তো পারি না, তাই আসল মানুষটাকে দরকার, তাকে ভালোবাসতে চাই, ভালোবাসা তো ভেতরের ব্যাপার, জানিসই তো । 

          একটুক্ষণ থেমে নগেন দত্ত বললেন, এই একই কথা স্ট্যালিনের সঙ্গে হয়েছিল, উনি বলেছিলেন মানুষের ভেতরটা না বদলাতে পারলে তাদের নিয়ন্ত্রণে আনা যায় না । স্ট্যালিন চলে গেল আর সবায়ের ভেতরে উনি একটা করে যে স্ট্যালিন গড়ে দিয়েছিলেন, তারাও চলে গেল ওনার সঙ্গে, যতো দেশের নেতার ভেতরে স্ট্যালিন একটা করে স্ট্যালিন ঢুকিয়ে ছিলেন, তারাও তাদের ভেতরের স্ট্যালিনকে বের করে ফেলে দিয়ে পুরোনো মালগুলো বের করে আনলে, তাদের দেশগুলোতেও একই ব্যাপার ঘটল, বুঝতে পারছিস তো কী বলছি ।

          নগেন দত্তের বাঁ পাশের চেয়ারে বসে, ডান পায়ের ওপর বাঁ পা রেখে, তিথি আহমেদ জানতে চাইল, তাহলে লিবিয়ার গদ্দাফি আর ইরাকের সাদ্দাম গেল কেন ? ছন্দরানি বসল নগেন দত্তের ডানদিকে, পা ফাঁক করে দোলাতে লাগল , নগেন দত্তের গায়ে গা ঠেকছিল, বুঝতে পারছিলেন নন্দরানির দেহে তাপ রয়েছে, তিথি আহমেদের দেহ সেই তুলনায় ঠাণ্ডা।

         নগেন দত্ত বললেন, আরে ওরা কিছুই বদলাতে পারেনি, শুধু ভয় পাওয়াকে বদলে দিয়েছিল, তাই তো নিজেরাও ভয় পেয়ে শেষকালে গিয়ে লুকোলো নর্দমায় আর গর্তের ভেতরে । মানুষের ভেতরটা বদলাবে তবে তো দেশটাকে বদলাবে । ওরা যাবার পর ভেতরের ভয় অনেকেরই চলে গেছে, তারা এখন অন্যদের ভয় পাইয়ে খুন লোপাট গণধর্ষণ বোমা-মারা সোনাদানা লুট, মূর্তিভাঙা, কালোবাজারি, পেটরল বিক্রি, ক্রীতদাসী বিক্রি এই সব কাজ করে চলেছে, ওদের ভেতরটা যা ছিল, কয়লার রঙের বরফখণ্ড, তা-ই রয়ে গেছে ।

         মূর্তিগুলোকে কেন ভাঙে আজও বুঝতে পারলুম না, এ এক হেঁয়ালি ! বললে ছন্দরানি ।

         হেঁয়ালির কি আছে ? নিজেদের মেয়েমানুষের যদি অমন বড়ো-বড়ো বুক না থাকে, নিজেদের পুরুষদের যদি অমন বড়ো-বড়ো ব্রবডিংনাগের মেশিন না থাকে, তাহলে ঈর্ষায় জ্বলেপুড়ে ভাঙাভাঙি করা ছাড়া তো আত্মগ্লানি থেকে মুক্ত হবার পথ নেই  ।

         গলার স্বরে আফশোষ ফুটিয়ে তিথি আহমেদ, গায়ে শাড়ির মতন জড়ানো সালভাদর দালির হলুদ রঙের পেইনটিং, বাঁহাত দিয়ে টেবিলের ওপরে রাখা পেপার ওয়েট ঘোরাতে ঘোরাতে বলল, দেয়ালে ওই গুরু-মহারাজের ছবি দেখছো, ওই বাঞ্চোতের সঙ্গে আমাকে মাসে একবার শুতে যেতে হয়, পাঁচতারা হোটেলে, উনি সেখানে স্যুট-টাই পরে কর্পোরেট মালিকের সাজে আসেন । ভালো পয়সা আর পাঁচতারার শীতাতপ আরাম সত্ত্বেও লোকটার গায়ে রামছাগলের বোটকা বিটকেল গন্ধে বমি পেয়ে যায়, বাঞ্চোটার লিঙ্গও এক ইঞ্চের, চক্কোত্তি বলে যে অমন হিটলারেরও ছিল, অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে জাগিয়ে তুলতে হয়, ক্লাইমেক্সের সময়ে রামছাগলের মতন জিভ বের করে উলু দ্যায় । 

          পেপার ওয়েটের ভেতরে  গোলাপি রঙে ‘ভালোবাসা’ লেখাটার দিকে তাকিয়ে তিথি আহমেদ বলল, ভালোবাসা কাকে বলে তা জানা হল না জীবনে, রোমান্টিক প্রেম কাকে বলে তা অনুভব করা হল না, শুধু শোয়া আর শোয়া ।

          নগেন দত্ত তিথি আহমেদের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, আমি তো সারাজীবন খুঁজে চলেছি ভালোবাসার পাত্রীকে, আমিও তো জানি না, আমারও তো শোয়া আর শোয়া । তিথির হনু সামান্য উঁচু, গালে গোলাপি আভা, ঠোঁট চিনাদের মতন ছোট্ট আর গোল হলেও,  ছড়ানো শ্যাম্পু করা চুল কাঁধ পর্যন্ত, নাকও ছোটো আর একটু ওঠানো, মুখশ্রীতে ক্ষমতা আছে নিজের ভাব প্রকাশের আর লুকোনোর, জোরে হাসে, হাসাতেও পারে নানা কথা বলে ।

          সুর্মা আতর কাজল তেল মাখা, গোলছাঁদের মুখে টসটসে হাসি ফুটিয়ে ছন্দরানি মজুমদার পা নাড়াতে-নাড়াতে বললে, আমি এই বেশ ভালো আছি, তোমাকেই ভালোবেসেছিলুম, তা এখনও বজায় রেখেছি, তা সে যতজনের সঙ্গেই শুই না কেন । তারপর নগেন দত্তের চোখের দিকে তাকিয়ে সরাসরি বললে, তখন থেকে তুমি আমার আমের দিকে তাকাচ্ছ, খেতে ইচ্ছে হয় খাও না, তোমারই তো ফল, তোমার গাছে ফলিয়ে গেছে তোমার বন্ধু পাবলো পিকাসো । 

         নগেন দত্ত জিগ্যেস করলেন, একবার বাঁদিক আর আরেকবার ডানদিকে মাথা ঘুরিয়ে, চক্কোত্তি গেল কোথায়, ওয়াশরুমের ভেতরের গোপন দরোজা দিয়ে সেই যে গেছে, ফেরার নাম নেই ।

         তিথি আহমেদ, চোখ বুজে, চোখের গোলাপি অন্ধকারে নিজেকে পুরোপুরি চুবিয়ে বলল, ও, তাই বুঝি, তাহলে কোনও কারণে তোমাকে ভয় পেয়ে পালিয়েছে, এখন কিছুদিন আর ফিরবে না ।

         সে কি রে, অবাক হলেন নগেন দত্ত, তাহলে এই যে রাত হতে চলল, রাতচরা খদ্দেররা আসা তো আরম্ভ হয়ে গেছে, দরদস্তুর, সময়, ঘরনির্দেশ, মাগবাছাই সেসব কে সামলাবে ।

         ছন্দরানি মজুমদার , যার দেহে আঁকা পিকাসোর গুয়ের্নিকা শাড়ি, আর যার চাউনির মধ্যে কৌতূহল ঝলকাচ্ছিল, বললে, কেন, যে দুজন আমাদের আন্ডারে পিএইচডি করছে, তারাই তো সামলায় পিসি বাড়ি না থাকলে, ওদের শেখানো-পড়ানো হচ্ছে কেন, এই জন্যেই তো ! পিসির তো ছেলেপুলে নেই, তার ওপর কি একটা ব্যামো আছে যে ছেলেপুলে হবে না, তাই ওরা দুজনই ওনার বংশ ধরে আছে ।

         ছন্দরানির সবুজ ফজলি আমের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে নগেন দত্ত বললেন, তোর আম দেখতে-দেখতে মনে পড়ে গেল সাত বছর আগে পালতোলা নৌকোয় তোর সঙ্গে পূর্ণিমার রাতে শোয়ার কথা, আমার ছোঁয়াকাতর অঙ্গ তোকে ভেদ করে ভেতরে গিয়ে থামতেই চাইছিল না, এগিয়েই যাচ্ছিল, যেন কিছু অনুসন্ধান করছে, তখন আমি বুঝতে পারলুম যে তোর ভেতরে গিয়ে আমার প্রাণপুরুষ স্বপ্ন দেখতে আরম্ভ করেছে, অদ্ভুত স্বপ্ন, আজও মনে আছে, মাংসের তৈরি মেশিনের শহর, বাড়িঘরও মাংসের, রাস্তাঘাটও মাংসের, গাছ আর ফুলফলও মাংসের, কতো রঙের মাংস, শুধু মানুষ আর অন্য প্রাণীরা পেতলের তামার রুপোর লোহার আর নানা ধাতুর মিশেলের । আমার অঙ্গ ঘুরে বেড়াতে লাগল ওই মাংসের শহরে, দেখল ধাতুর তৈরি সব মানুষ আর প্রাণীরাই আনন্দ করছে, নাচছে গাইছে মদ খাচ্ছে ভাতরুটি খাচ্ছে, ছাগল-গোরু-শুয়োরের মাংস ধাতুর বলে তাদের ব্লাস্ট ফার্নেসে গলিয়ে গেলাসে আর কাপে ভরে খাচ্ছে । তুই বলতে লাগলি, হে আড়ম্বর আরও ভেতরে এসো, আরও ভেতরে এসো, আরও ভেতরে এসো, কিন্তু তুই আমাকে বলছিলি না, তোর ভেতরে গিয়ে যে স্বপ্ন দেখছিল, তাকে বলছিলি, আমি যদিও ঘুমিয়ে পড়েছিলুম, কিন্তু তোর কথা শুনতে পাচ্ছিলুম, বুঝতে পারছিলুম যে স্বপ্নটা আমি দেখছি না, দেখছে আমার প্রিয় অঙ্গখানা তোর প্রিয় অঙ্গের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী হয়ে  । 

         হ্যাঁ, এই এক তোমার অস্ত্রখানার চরিত্রেরই দেখেছি তোমার সঙ্গে মিল আছে, স্বপ্ন দেখতে জানে, বেশির ভাগ মিনসে নিজেরাই মেশিন, জানেই না যে তারা যেমন স্বপ্ন দেখে, তেমনই তাদের অঙ্গখানার স্বপ্নের সঙ্গে আমার অঙ্গের স্বপ্নের মিল হওয়া উচিত । তোমাকে বলেছিলুম তো, সেদিন নৌকোয় আমার অঙ্গখানাও একই সঙ্গে স্বপ্ন দেখছিল, ভেসে চলেছি একজন মানুষের ভেতরের নৌকোয় চেপে, লাল রঙের সমুদ্রে সে কি ঢেউ, লাল জলের ঘুর্ণি উঠে এলো আর আমার অঙ্গ সেই লাল ঘুর্ণির সঙ্গে ঘুরতে লাগল, ভাসিয়ে নিয়ে চলল লাল বানভাসিতে আশেপাশের সবকিছু, তারপর আছড়ে লাল জলের সমুদ্রে পড়ে গেল লাল জলের জলস্তম্ভ । আমি ভার্জিন ছিলুম তো, আর সেটাই ছিল আমার প্রথম রাত, তার আগে থেকেই, তোমাকে দেখে পর্যন্ত ভালোবাসতে শুরু করেছিলুম, মনে আছে তোমার, আমি তোমার বুক চাটছিলুম, হাত চাটছিলুম, কোমর চাটছিলুম, মনে হচ্ছিল তোমার পুরোটা চেটে নিজের পাকস্হলিতে ঢুকিয়ে নিই । আমার শরীরের ভেতরে তখন ঘুরে বেড়াচ্ছে তোমার ছেড়ে দেয়া ভয়ংকর সামুদ্রিক জীবরা, হাঙর, তিমি, শুশুক, ড্র্যাগনমাছ, ভ্যামপায়ার স্কুইড, লাল-জেলিফিশ, ব্লবমাছ, কফিনমাছ, আইসোপড, স্টারগেজার, চিমেরা, অক্টোপাস, অ্যাঙ্গলারমাছ, হ্যাচেটমাছ, ব্যারেলচোখো, ভাইপারমাছ, গবলিনমাছ, ওঃ, কতো রক্ত বেরিয়েছিল, যা দেখে তোমার মতন নৈমিত্তিক অভিজ্ঞ মানুষও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলে ।

          আসলে তোর ভেতরে ঢুকে আমার স্বপ্নের নদী খুঁজে বেড়াচ্ছিল কুন্দনন্দিনীকে, ডাকছিল তাকে কেঁদে-কেঁদে, তারপর না পেয়ে মুষড়ে পড়েছিল ।

          ছন্দরানি বললে, আমি তোমাকে চেয়েছিলুম, তোমাকে পেয়েছিলুম, আজও তোমাকেই চাই, অন্যের সঙ্গে শুলেও চোখ বুজে মনে করি যে তোমার সঙ্গেই শুয়ে আছি, আমার সঙ্গে যা করা হচ্ছে, তা তুমিই করছ । তোমাকে জিইয়ে রেখেছি আমার ভেতরে, প্রতিদিন ক্লায়েন্টরা আমাকে এইভাবে তোমাকে পাইয়ে দ্যায় ।

          তিথি আহমেদ বললে, সমস্যা কি জানিস, তিরিশ হাজারিনীর দেশে যারা আসে সকলেই দুঃখি, ভাবে শুলে বুঝি দুঃখু চলে যাবে, অথচ শোবার ব্যাপার তো আনন্দের, আহ্লাদের, মাংসের সঙ্গে মাংসের সংঘাত আর সংঘর্ষের, জন্নতপ্রাপ্তির । এই এক তোমাকে ছাড়া নগেন, কাউকে দেখলুম না যে আমাকে সন্তুষ্ট করতে পারে ।

          ছন্দরানি সায় দিয়ে বললে, হ্যাঁ গো সত্যি কথাই বলেছে তিথি, বুড়োগুলো তো বটেই ছেলে-ছোকরারাও কুন্দনলাল সায়গলের কান্নাকাটি শুনতে চায় । শুনে-শুনে মুখস্হ হয়ে গেছে, অনেক সময়ে এমন রাত গেছে যে শোবার বদলে রাত জেগে সায়গল গেয়ে গেছি একের পর এক । মেড়োপার্টিগুলো ফাটকায় লস খেয়ে আসে আর কান্নার গান শুনতে চায়, এই করে-করে চটকলগুলোর বারোটা বাজিয়ে দিলে ।

         তাই বুঝি ? দাঁড়া, কুন্দনলাল সায়গলকে ডাকছি, উনি ভালো বোঝেন কোন গানটা আসল-দুঃখের আর কোন গানটা দুঃখের অভিনয়ের ।

         ডাকো  তাহলে । বললে ছন্দরানি, ও নগেন দত্তের ক্ষমতায় অবিশ্বাস করে না । করার কথা নয় । যার মাংস ওর দেহে গিয়ে স্বপ্ন দেখে পথ হারিয়ে যায়, তার ক্ষমতার তুলনা হয় না ।

         কই সায়গল, এসো, তোমার দুজন প্রেমিকা তোমার দুঃখের গান শোনার জন্যে উৎসুক ।

         দরোজা খুলে ঘরে ঢুকলেন কে এল সায়গল, এক হাতে শিভাস রিগাল বোতল, আরেক হাতে একটা বড়ো কাঁচের গ্লাস । একটু ঝুঁকে পড়েছেন গানের ভারে ।

          চক্কোত্তির চেয়ারে বসে জিগ্যেস করলেন, কোন গানটা তোমাদের শোনাবো ? 

          তিথি আর ছন্দরানি দুজনে একসঙ্গে বলে উঠল, সায়গলসাব, আমাদের একটা দুঃখের গান শোনান । আমাদের ক্লায়েন্টরা দুঃখের গান শোনার জন্যে হাপিত্যেশ করে থাকে ।

          সায়গল বললেন, আমার নিজের তো কোনো দুঃখ নেই, সবাই দুঃখ কমাবার জন্যে মদ খায়, আমি দুঃখ পাবার জন্যে মদ খাই, দাঁড়াও বোতলটা খালি করে নিই, তোমরা দুজনেও খাবে নাকি, এটা আসল শিভাস রিগাল, প্রযোজকের দেয়া ভেজাল মাল নয় ?

           ওরা দুজনে বললে, না,না, আপনি খান, যদিও ভেজালে আমাদের আপত্তি নেই, দেশ স্বাধীন হয়ে গেছে, এখন আসল আর ভেজালে কোনো তফাত নেই স্যার ।

            সায়গল পুরো বোতল ফাঁকা করে গান ধরলেন । নগেন দত্ত চোখ বুজে গানটার পুরোনো সঙ্গীতযন্ত্র প্রয়োজনমতো জুড়ে দিলেন ।

                  অব ম্যায় কা করুঁ কিত জাউঁ

                  ছুট গয়া সব সাথ সহারা

                  অপনে ভি কর গয়া কিনারা

                  এক বাজি মেঁ সবকুছ হারা

                  আশা হারি, হিম্মত হারি

                  অব ক্যা দান লগাউঁ

                  মাঈ কা করুঁ কিত জাউঁ

                  জো পৌধা সিঁচা মুরঝায়া

                  টুট গয়া জো মহল বনায়া

                  বুঝ গয়া জো ভি দিয়া জলায়া

                  মন অন্ধিয়ারা জগ অন্ধিয়ারা

                  জ্যোত কহাঁ সে লাউঁ মাঈ

                  কা করুঁ কিত জাউঁ…

          গান শেষ হলে, বোতল আর গ্লাস হাতে নিয়ে উবে গেলেন কুন্দনলাল সায়গল ।         

          তিথি বললে, দেখলে তো, কেবল আমার নয় ছন্দরও ওই একই প্রবলেম । ওফ দুঃখ বিষাদ অবসাদ গ্লানি ক্ষোভ উদ্বেগ উৎকন্ঠা বিবমিষা যন্ত্রণা করে-করে মরে গেল খদ্দেরগুলো, এখানে এসেছিস আনন্দ কর, আনন্দ দে, তা নয়্, কান্নাকাটি, এক্কেবারে সহ্য করতে পারি না । মদে চুর হলে তো একেবারে ল্যাজেগোবরে, বাড়িতে তো কাঁদতে পারে না, এখানে এসে কাঁদে।

          তার কারণ আছে, বললেন নগেন দত্ত, আমি তোর সঙ্গে প্রথম রাতে শুয়েই বুঝে গিয়েছিলুম, অবশ্য আমাকে বুঝতে হয়েছিল হাত দিয়ে, মগজ দিয়ে নয় । তুই ইলিয়াস শাহী পরিবারের, তোকে কম বয়সে খতনা করা হয়েছিল, তোর দেহের স্বপ্ন দেখার কুঁড়িটাকে কেটে ফেলে দেয়া হয়েছিল তো ফুল আর কোথ্থেকে ফুটবে, আমি জেনে গিয়েছিলুম যে ফুল ফোটাতে হলে অনেকক্ষণ সার দিতে হবে, মাটি খুঁড়তে হবে, জল দিতে হবে, তারপরই তোর দেহে স্বপ্ন আসবে যা তোর মগজ নষ্ট করতে পারবে না ।

          ছন্দরানি বললে, আমার ঘরে ইশকুলের একটা ছেলে আসে, এগারো ক্লাসে পড়ে, টিউশানির টাকা খরচ করতে আসে তিরিশ হাজারিনীর দেশে । তুমি তো জানোই যে কারোর বুকেপিঠে ঘামাচি আর গালে ব্রণ আমি একেবারে সহ্য করতে পারি না । ছেলেটা আলোয় পোশাক ছাড়তে লজ্জা পাচ্ছিল বলে আমি আলো নিভিয়ে ওর শার্ট-প্যান্ট খুলতে সাহায্য করলুম, তারপর দেখি কি, সারা পিঠ আর বুক জুড়ে ঘামাচি । 

          পা নাড়ানো থামিয়ে ছন্দরানি বললে, আমার কাছে ঘামাচির ট্যালকম পাউডার রাখি, তা ভালো করে মাখিয়ে দিলুম ছেলেটার পিঠে-বুকে, গালের ব্রণতে বোরোলিন লাগিয়ে দিলুম । ছেলেটা বিছানায় টাকাটা রেখে কেঁদে ফেললে, সে এক কেলেঙ্কারি, কিছুতেই শুতে রাজি হল না, শার্ট-প্যাণ্ট পরে টুক করে আমার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে সিঁড়ি দিয়ে পোঁ-পাঁ । তারপর যখনই আসে, পাউডার মাখিয়ে দিতে বলে, টাকা দিয়ে বলে, এটা পাউডার আর পাউডার-মাখানোর দাম মনে করে রেখে নিন। কতোবার বলেছি যে এসো বিছানায় এসো, অন্তত শিখে যাও কী করে কি করতে হয়, তা নয়, পাউডার মেখে চোখের জল ফেলে চলে যায় । একদিন বললে, ওর একজন প্রেমিকা আছে, সেও জানে যে ওর গা-ময় ঘামাচি হয়, কিন্তু কখনও বলেনি যে চলো তোমায় পাউডার মাখিয়ে দিই, কিংবা পাউডার কিনে দিয়ে বলেনি যে এটা গায়ে মেখো । ছেলেটা এলে আমার ভালো লাগে, বলে দিয়েছি যে ইচ্ছে হলেই এসো, কিন্তু পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলে কষে এক থাপ্পড় দেবো ।

          যাক, তিরিশ হাজারিনীর দেশে একজন তো তোকে শ্রদ্ধায় উন্নীত করেছে, বললেন নগেন দত্ত, তোর নিজের ছেলে লণ্ডনে পড়াশুনা করলেও, এখানে পাতানো ছেলের ভালোবাসা পাচ্ছিস আবার ছেলে তোর প্রেমিকও, কজনের ভাগ্যেই বা ছেলে-প্রেমিক জোটে,  । 

          তিথির মুখের প্রকাশভঙ্গী দেখে নগেন দত্তের মনে হল, তিথি যেন ভাবছে ছন্দরানির সঙ্গে জীবন পালটা-পালটি করে নিতে পারলে ভালো হতো । তিথির চরিত্রে একটা ব্যঙ্গ করার দিক আছে, যাকে ভুল করে মনে হতে পারে দাম্ভিকতা । 

          দাদামশায়ের উইল অনুযায়ী ওদের দুজনেরই আইডিওলজিকাল মেনোপজ শুরু হয়ে গেছে, উনিশ-কুড়িতে আটকে থেকে কোনো সমস্যা নেই ।

          হ্যাঁ গো, ছেলেটা আমায় ম্যাম বলে ডাকে, কতোবার বলেছি যে আমার নাম ধরে ডাক, তা ডাকবে না, বলে যে ওর প্রেমিকা আর ও দুজনে মিলে অন্ধ্রপ্রদেশের জঙ্গলে পালাবে মাওবাদী বিপ্লব করতে; কী যে বিপ্লবে পেয়েছে আজকালকার ছেলেমেয়েদের । এতো রকমের মাল আসে, কী বলব, তারা নানা সম্পর্কের আগল ভাঙতে চায়, যা তিরিশ হাজারিনীর দেশের বাইরে অনুমোদন পায় না । একজন আমাকে বৌদি বলে ডাকে তো একজন কাকিমা, একজন মাসিমা বলে ডাকে তো আরেকজন পিসিমা । মুখে বিড়বিড় করতে থাকে তারা, নানা কথা বলে-বলে, বৌদি তোকে ভালোবাসি, মাসি তোকে ছাড়া বাঁচব না, কাকি তুইই আমার সব, পিসি তুমি আমার হৃদয় কেড়ে নিয়েছো । আমিও সায় দিয়ে যাই, যাতে যার আনন্দ । এদের অনেকে প্রথম দিন এলে বুঝতে পারি যে খেয়াঘাট কোথায় আর বন্দর কোথায় তা জানে না ।

          নগেন দত্ত বললেন, আমার পতৃদেবও আমাকে শেখাবার জন্যে যার কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন, তার কাছেই আমি বন্দর আর খেয়াঘাটের পার্থক্য শিখেছিলুম ।

          ছন্দরানি বললে, একবার কালেজের ছয়টা ছেলে এসেছিল, দেখেই টের পেয়েছিলুম পয়সাঅলা বাড়ির, বললে যে, কাগজে গণধর্ষণ পড়ে-পড়ে ওদেরও গণধর্ষণ করার ইচ্ছে হয়েছে, কিন্তু রাস্তাঘাটের পার্টিগুণ্ডাদের মতন তো গণধর্ষণ করতে পারবে না, তাই এই বাড়িতে এয়েচে । মাসিপিসি বললে, তার জন্যে তো তোমাদের নিজেদের মধ্যে মারামারি করতে হবে, যাকে গণধর্ষণ করবে তার সঙ্গে টানাহেঁচড়া করতে হবে, সেসব করতে গিয়ে ঘরের জিনিসপত্রের ভাঙচুর হলে খেসারত কে দেবে । ওদের দলের ফর্সা ছেলেটা একতাড়া পাঁচশো টাকার নোট মাসিপিসিকে দিয়ে বললে, এই নিন আগাম ক্ষতিপূরণ, দু-ক্রেট বিয়ার আর চিকেন ললিপপ আনিয়ে দিন, আর যাকে আমরা গণধর্ষণ করব তাকে তার আলাদা চার্জ দিয়ে দেবো, কেননা যা ব্যক্তিগত তা যে সর্বজনীন তা আমরা আজ প্রমাণ করে ছাড়ব । 

          নগেন দত্ত কৌতূহলে বললেন, তারপর ?

          মাসিপিসি ওদের পাঠিয়ে দিলে মীরার ঘরে, মীরাকে তো চেনো, ওর গায়ে এডওয়ার্ড মুঞ্চ ১৮৯৩ সালে ‘দি স্ক্রিম’ পেইনটিঙ এঁকে দিয়ে গিয়েছিল শাড়ির মতন করে, ওর ঘরটা বেশ বড়ো, খাটের চারিপাশে যথেষ্ট জায়গা আছে, আয়নাও সাবেকি, ঠুনকো নয়, ঠাকুরদেবতার তাকও বেশ ওপরে । ছোঁড়াগুলো কেমন করে কি করবে ভেবে পাচ্ছিল না, মীরার দেয়া চোলাই মদ খেয়ে বোকার মতন হাসাহাসি করছিল । কাস্টামাররা প্রথম এসে সন্দেহমাখা চাউনি তুলে তাকায় । মীরাকে দেখেছো তো,  রঙ ধবধবে, চুলও বড়ো, ছোট্টো কপাল, পাতলা ঠোঁট, শুধু চোখ দুটো ছোটো বলে মার খেয়ে গেছে, নয়তো ওর রেট দশ মিনিটের দশ হাজারে শুরু হতো । যাকগে, তা ছেলেগুলো সাহস যোগাতে পারছে না দেখে মীরা একজনের গালে বসিয়ে দিলে কষে একখানা চড় । 

          বাইরে উড়ন্ত বাদলাপোকাদের দিকে তাকিয়ে কথা বজায় রাখল ছন্দরানি, চড় খেতেই তার মুখ থেকে বাংলা ভাষা লোপাট, খিস্তি আরম্ভ করে দিলে, খানকি, ব্লাডি বিচ, রাঁঢ়, মাগি, ফাকিং স্লাট, স্ট্রিট হুকার, এইসব, তবুও কেউ এগোচ্ছে না দেখে আরেকজনকে দিলে একখানা চড়, আমরা বারান্দা থেকে রগড় দেখছিলুম, ওদের মধ্যে যেটা ঢ্যাঙা ছিল সেই প্রথমে এগিয়ে গেল মীরার দিকে, তাকে টেনে আলাদা করলে ফর্সা ছেলেটা, লেগে গেল নিজেদের মধ্যে সত্যিকার মারামারি, বিয়ারের বোতলগুলো খুলে-খুলে এ ওকে ও তার মাথায় ঢেলে নিজেদের ভিজিয়ে ফেললে, মীরাও সেই সুযোগে বাকি দুটোকে কষিয়ে দিলে চড়, একটা ছোকরা লাফিয়ে মীরার ওপর পড়তেই মীরা তাকে নিয়ে সোজা বিছানায়, নিজের গোড়ালি দিয়ে ছেলেটের পোঁদে দুতিনবার চাপ দিতেই তার হাওয়া কলকলিয়ে বেরিয়ে গেল, সিংহির মতন আঁচড়ে কামড়ে গরগর আওয়াজ তুলে ওর শখ মেটালো । পরের তিনটেকেও মীরা  আঁচড়ে কামড়ে পোঁদে গোড়ালির চাপ দিয়ে ওই ভাবেই হাওয়া বের করে দিলে, বিয়ারে ভিজে পোশাক শোকাবার জন্যে ল্যাংটো পোঁদে ল্যাংচা বের করে বসে-বসে ললিপপ খেলে ছোঁড়াগুলো । ওদের ছিল প্রথমবারের শোয়াশুয়ি, মীরার দেয়া বোরোলিন লাগিয়ে পা ফাঁক করে অনেকক্ষণ ধরে ল্যাংচার জ্বালা সারিয়েছিল ।  

          হাসিমুখে ছন্দরানি স্মৃতির আমোদ নিয়ে বললে, ওরা গণধর্ষণের পালা সাঙ্গ করে বিদেয় হল । মীরা ওদের বলেছিল, যখন ওরা ওর ঘর থেকে টলতে-টলতে বেরোচ্ছে, এখন মদে চুর হয়ে আছো, যাও গিয়ে নর্দমায় একরাত কাটিয়ে বাড়ি ফিরো, নর্দমায় রাত না কাটালে জীবনের উত্তম অভিজ্ঞতা হবে না । 

          হাসি বজায় রেখে ছন্দরানি আরও বলল, তিরিশ হাজারিনীর দেশে মীরার কিন্তু খ্যাতি আছে একসঙ্গে দশবারোজনকে হ্যাণ্ডল করার । মীরা বলেছিল, ওদের মধ্যে একজনকে ও চিনতে পেরেছিল, সে মীরার ভাইপো, যে ভাইটা পার্টি করতো আর মীরাকে ফুসলিয়ে বেচে দিয়েছিল দিল্লির এক ব্যাবসাদারকে, তার বড়ো ছেলে ।

          তাছাড়া কি জানো, বলল ছন্দরানি কিছুক্ষণ থেমে, যেন চেঁচিয়ে চিন্তা করছে, মীরার ঘরের আয়নায় নিজেকে দেখতে গেলে নিজেকে দেখা যায় না, তার বদলে হনুমান, শিম্পাঞ্জি, বেবুন, গেরিলা, বাঁদর, ওরাং ওটাং দেখতে পাওয়া যায়, আগের জন্মে লোকটা যা ছিল, তাই কেউ বেগড়বাঁই করলেই আয়নার পর্দাটা সরিয়ে দ্যায় মীরা, ও তো জুলজির অধ্যাপনা করে, জন্তু-জানোয়ারের অন্তরজগতের খবর রাখে ।

          তিথি বলল, এমন-এমন সব জোটে না, কী বলব । যাকগে, সেই থেকে বসে আছ, রাত তো বেশ হল, তোমার খিদে পেয়েছে নিশ্চই ? বলো তো কিছু রান্না করি তোমার জন্যে, পোর্টাবেলো মাশরুমের সঙ্গে অলিভ অয়েলে বাছুরের মাংস দারুণ রাঁধতে পারি, বা যদি চাও তাহলে রসুন রেড ওয়াইন ভিনিগারে চুবিয়ে হরিণের মাংসের স্টির-ফ্রাই, পরোটায় মুড়ে,  কিংবা অর্ডার করে আনাই ; তিরিশ হাজারিনীর দেশে খাবার হোটেল প্রচুর। 

         নগেন দত্ত বললেন, তার চেয়ে চল বাইরে গিয়ে খাওয়া যাক, সালামি আর বিয়ার, তারপর না হয় একটা ফিল্ম দেখা যাবে, কতো যুগ হয়ে গেল দেখিনি । ওয়াশরুমের যে রাস্তায় চক্কোত্তি পালিয়েছে, ওই রাস্তার কোনো একটা সিঁড়ি দিয়েই যাই, ওকে খুঁজে পেতে পারি, খুঁজে না পেলেও ক্ষতি নেই, নিচের তলায় কি হয় আর চক্কোত্তির গোপন ব্যাপারখানা জানারও ইচ্ছে রয়েছে ।

          কোন রাস্তা ? গোপন পথ আছে নাকি কোনো, কই জানি না তো ! এতোকাল রয়েছি এই বাড়িতে ! বললে তিথি আহমেদ ।         

       নগেন দত্ত বললেন, তিথির দিকে চেয়ে, সে কি রে, ওই ওয়াশরুমের ভেতরে একটা দরোজা আছে, সেই দরোজা দিয়ে অনেকগুলো সিঁড়ি নিচে কোথাও কিংবা অনেক দিকে চলে গেছে, তা তোরা জানিস না ? আজব ব্যাপার ।

        ছন্দরানি বললে, মুখময় শঙ্কার পাতলা চাদর, না, এই ঘরে কতোবার এসেছি গেছি, কখনও তো চক্কোত্তিমশায়কে দেখিনি টয়লেটে গেলো আর লোপাট হয়ে গেল ।

        লোপাট হয়ে গেল বলেই তো অপেক্ষা করে এক ঘণ্টা পরেও যখন এলো না, তখন ভেতরে ঢুকে সিঁড়িগুলো দেখতে পেলুম, বললেন নগেন দত্ত ।

        দুজনেই বললে, চলো, আমরা ওনার কালোধান্দার অনেককিছু জানি, আবার অনেককিছু জানিও না । এই পোশাকেই যাই, হাজার তিরিশিনীর দেশে পোশাক-আশাকের তেমন বাঁধাধরা নিয়মনীতি নেই, ওপর ঢাকা-তলা ঢাকা মনে হলেই হল, তা সে ঢাকা বাস্তব হোক বা কাল্পনিক । 

          তিথি বললে, আমি তো সালভাদর দালির আঁকা দেহশাড়ি পরেই আছি, ছন্দও পাবলো পিকাসোর আঁকা দেহশাড়ি পরে আছে । তুমি তোমার পোশাক পালটে নাও ।

         ব্রিফকেস খুলে পোশাক পালটে নিলেন নগেন দত্ত । লাল টিশার্ট, ব্লু-জিনস আর জগিঙ-জুতো । ইল্যাসটিক ব্যাণ্ডে বাঁধা পিগটেল চুল । ব্রিফকেস টেবিলের ওপরেই রেখে দিলেন, চক্কোত্তি ফিরলে যা করার করবে ।

         টয়লেটের গোপন দরোজা খুলে ওরা দেখলো অনেকগুলো সিঁড়ি রয়েছে আর তাদের মুখে বোর্ড টাঙানো ; ইতিহাসের পুর্নলিখন, ধর্মের কারখানা, রাজনৈতিক বৈধতা, গ্রন্হাদির রূপবদল, চিৎকারনিলয়, স্লোগানছন্দ, খোচরত্বের প্রশিক্ষণ, নাটুকেপনা প্রশিক্ষণ, গুপ্তচর প্রশিক্ষণ, দলবদল প্রশিক্ষণ, ভোটার ক্রয়-বিক্রয় পদ্ধতি প্রশিক্ষণ, ইত্যাদি ইত্যাদি, এক পলকে যেটুকু পড়া গেল । সবকটা বোর্ডের তলায় ছৌ-নাচের মুখোশ ঝুলছে, এক-একটায় এক-একরকম, দেবীর, দেবতার, অসুরের, দানবের, পশুর । কারণ আছে নিশ্চই ।

        যে বোর্ডে লেখাছিল ‘রাজনৈতিক বৈধতা’’ সেই সিঁড়িটা সামনে ছিল বলে সেটা দিয়েই নামল ওরা । 

         নেমে দেখতে পেল, হাসপাতালের বিশাল অপারেশান থিয়েটার, কড়িকাঠ থেকে তার বেঁধে ঝোলানো, সাদার ওপর গেরুয়ায় লেখা বোর্ড টাঙানো,  তার তলায় অপারেশান চলছে পার্টিশান করা ঘরে, তীব্র আলোর তলায় সার্জেনরা গেরুয়া মেডিকাল স্ক্রাব  পরে, মুখে গেরুয়া কাপড়ের স্ক্রাব বেঁধে একাগ্র হয়ে শল্যচিকিৎসায় ব্যস্ত ।

           বোর্ডে যা লেখা রয়েছে তার সঙ্গে শল্যচিকিৎসকদের কাজের মিল খুঁজে না পেয়ে, তিথি আহমেদ বলল, একেই বলে লিঙ্গ উইথ স্টিকস বা লিঙ্গুইস্টিকস, যা পড়ছ বা যা দেখছ তার সঙ্গে যা ভাবছ তার মিল নেই ।

         ওরা তিনজন যে নামল তাতে শল্যচিকিৎসক আর সাহায্যকারী নার্সদের দৃকপাত নেই । পরিবেশ বেশ শীতল, প্রায়ান্ধকার, গভীর । চিকিৎসালয়ের ভীতিকর গন্ধের নৈঃশব্দ । ছন্দরানির মনে হল আতঙ্কের অন্ধকারের গিঁট গড়ে উঠছে গলার কাছে ।

          নগেন দত্ত দেখলেন, বোর্ডগুলোয় লেখা রয়েছে কী ধরনের অপারেশান চলছে :  রাইনোপ্লাস্টি ( নাককে সুন্দর করা তোলার কাজ চলছে ), ব্লেফারোপ্লাস্টি ( চোখের পাতায় সৌন্দর্যদান  করার কাজ চলছে), ফেশিয়াল স্কার রিভিজন ( মুখের দাগ মোছার চিকিৎসা চলছে  ), ফোরহেড লিফ্টস ( কপালকে আকর্ষক করার চিকিৎসা চলছে ), হেয়ার রিপ্লেসমেন্ট ( টাকে চুল বসাবার চিকিৎসা চলছে ), মেনট্রোপ্লাস্টি ( থুতনিকে সৌন্দর্যময় করার কাজ চলছে ), অটোপ্লাস্টি ( কানকে সৌন্দর্যময় করার কাজ চলছে ), ব্রেস্ট রিকন্সট্রাকশান আফটার ম্যাসেকটনি ( ক্যানসারে স্তন কাটা গেলে নতুন স্তন বসাবার কাজ চলছে  ), ফ্যালোপ্লাস্টি ( লিঙ্গকে ছোটো বা বড়ো করার কাজ চলছে ), ম্যাস্টোপ্লাস্টি ( স্তনকে বড়ো বা ছোটো করার কাজ চলছে  ), বাটক লিফ্ট ( পশ্চাদ্দেশ উঁচু করা তোলার কাজ চলছে ), লাবিয়াপ্লাস্টি ( যোনিকে বড়ো বা ছোটো করার কাজ চলছে  ), ব্রাউপ্লাস্টি ( ভ্রূযুগল সৌন্দর্যময় করার কাজ চলছে ), ভার্জিনিটি রিপেয়ার ( সতীচ্ছদ রিপু করার কাজ চলছে ), পাম রিপ্লেসমেন্ট ( হাত কচলাবার হাত জোড়া চলছে ) ।

       ছাদের দিকে তাকিয়ে ওরা টের পেলো যে পাহারা দেবার জন্যে কর্তৃপক্ষ বাদামি মেঘের মতন রসায়নে উড়িয়ে রেখেছেন নানা রকমের ভুতপ্রেত, পেত্নি, শাঁকচুন্নি, মেছোভুত, গেছোভুত, ব্রহ্মদত্যি, কানাভুলো, পিশাচ, মিলিটারি ভুত, অতৃপ্তভুত, তারা নিজেদের মধ্যে সংস্কৃত আর লাতিন ভাষায় কথা বলছে ।

            একটা গেছোভুত ছন্দরানির সবুজ আমে মুখ রেখে চুষে উড়ে গিয়ে ফিরে এসে কুঁচকিতে থাবড়া মেরে চলে গেল । ছন্দরানি তার গালে কষে চড় মারলেও বুঝতে পারল যে ভুতটা কোনো পারদর্শী বাষ্পীয় রসায়নে তৈরি, ছোঁয়া যায় না  । অথচ ভুতটার গায়ে বিজবিজে এঁটুলি । সংস্কৃত ভাষায় ভুতটা বলল, বস্তুরা যে অবস্তু তা নিজের হাতে দেখলি তো রে মাগি ।

            তিথি আহমেদকে জড়িয়ে ধরল একটা মেছোভুত, কী বিটকেল গন্ধ, বলে চেঁচিয়ে ভুতটাকে দুহাতে ছাড়াতে চেষ্টা করলেও পারল না তিথি, ভুতটা কোনো বস্তু দিয়ে গড়া নয় । ভুতটা রাস্তাছাপ ছোকরার মতন সিটি বাজিয়ে ছাদের কাছে উড়ে গিয়ে হাসতে হাসতে বলল, লাতিন ভাষায়, বস্তুদেরও বস্তুহীনতা হয় গো খুকি ।

           বিরাট দুটো মাই ফুলিয়ে একটা শাঁকচুন্নি বাদামি মেঘ থেকে সরাসরি নেমে এসে নগেন দত্তকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে চুমো খেয়ে বুকের গোলাপি বেলুন আরও ফুলিয়ে ফাটালো, তার ভেতর থেকে দুধ বেরিয়ে ছিটকে জ্বালা করতে লাগল ওদের তিনজনের । নগেন দত্ত শাঁকচুন্নির গলা দুহাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরতে, ভুতটার মাথা আর ধড় আলাদে হয়ে উড়ে গেল খিঁকখিঁক হিঁঃহিঁঃ হাসতে হাসতে ।

           এবার সবকটা ভুতপ্রেত, শাঁকচুন্নি, মেছোভুত, গেছোভুত, ব্রহ্মদত্যি, কানাভুলো, অতৃপ্তভুত বাদামি মেঘকে নিয়ে নিচে নেমে এসে তিথি আর ছন্দরানিকে ঘিরে পাক খেতে লাগল, নাচতে লাগল  বাদামি মেঘের কুণ্ডলী, ক্রমশ নীল রঙের দেবতা-টাইপ হয়ে, বাবরি চুলে ময়ূর-পালক, ওদের ঘিরে গাইতে লাগল, নাচতে লাগলো হিপ-হপ ।

          সরে গিয়ে একপাশে দাঁড়িয়ে নগেন দত্ত মনে করতে পারলেন যে গানটা যিনি লিখেছেন, জয়দেব, তাঁর সঙ্গে বহুকাল আগে, বারো শতক নাগাদ, পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে একবার দেখা হয়েছিল, মন্দিরের নাচিয়েরা এই গানটা গাইতে গাইতে নেচেছিল :

                  স্মরসমরোচিতবিরচিতবেশা

                  গলিতকুসুমদরবিলুলিতকেশা

                  হরিপরিরম্ভণবলিতবিকারা

                  কুচকলসোপরি তরলিতহারা

                  বিচলদলকললিতাননচন্দ্রা

                  তদধরপানরভসকৃতন্দ্রা

                  চঞ্চলকুণ্ডলললিতকপোলা

                  মুখরিতরসজঘনগতিলোলা

                  দমিতবিলোকিতলজ্জিতহসিতা

                  বহুবিধকূজিত রতিরসসিতা

                  বিপূলপূলকপৃথুবেপথুভঙ্গা

                  শ্বসিতনিমিলতবিকসদনঙ্গা

                  শ্রমজলকণভরসুভগশরীরা

                  পরিপতিতোরসি রতিরণধীরা

          গান শেষে, নীল দেবতা-টাইপ মিলিয়ে যেতে, ব্রহ্মদত্যি সংস্কৃততে বলল, দরোজা তো খুলবে না, দরোজা তো খুলবে না, আগে বলো, অলবার্সের হেঁয়ালি কাকে বলে ?

          নগেন দত্ত উত্তর জানতেন, তিনি এককালে কালেজে বিজ্ঞান পড়াতেন । সংস্কৃততে বললেন, মহাবিশ্ব যদি সুষমভাবে তারাপূর্ণ হতো, তাহলে যেদিকেই তাকাই না কেন, আমাদের দৃষ্টি কোনো না কোনো তারার পিঠে গিয়ে পৌঁছোনোর কথা, আর সেক্ষেত্রে, রাতের আকাশ অন্ধকার হবার কথা নয় । রাতের আকাশ অন্ধকার থাকে কেননা আমাদের দৃষ্টি একই সঙ্গে সব তারার পিঠে গিয়ে পৌঁছোয় না । বহু তারার আলো এখনও পৃথিবীতে এসে পৌঁছোয় নি ।

           মিচকে প্রেমিকের মতন মিলিয়ে যাওয়া নীল মানুষ বাদামি মেঘ হয়ে গেল আর ভুতগুলো হাততালি দিয়ে ছাদের কাছে  মিশে গেল ।

           বাইরে বেরোবার কাঁচের দরোজার কাছে গেলে তা আপনা থেকে খুলে গেল । দরোজার ওপরে গুরু-মহারাজের ফ্রেমেবাঁধানো বিশাল ছবি, ওপরের ঘরের ছবির মতনই চন্দনকাঠ চাঁছাইয়ের মালা পরানো । একই বাণী সোনালি রঙে লেখা, “সত্যের জয় কখনও হয় না, কখনও হয়নি, কখনও হবে না” । 

        দরোজার কাছে যে মিলিটারি ভুত দাঁড়িয়েছিল, সারা মুখে আর গায়ে পোশাকের বদলে সাদা রঙ করা, কেবল লিঙ্গের রঙ কুচকুচে কালো,  লাল শিশ্ন জ্বলছে টর্চের মতন, সে ওদের দেখে স্যালুট ঠুকলো । নগেন দত্ত একটা এক হাজার টাকার নোট দিতে, গদগদ লোকটা মাথা নিচু করে আবার সেলাম ঠুকলো। বলল, স্যার, আমাদের ভুতপ্রেত বলে মনে করবেন না, আমরা সবাই ভুতগ্রস্ত দেবদূত, আপনারা কখনও দেবদূত দেখেননি বলে হয়তো আমাদের বিশুদ্ধ ভুত বলে মনে করছেন ।

           নগেন দত্ত লাতিন ভাষায় জিগ্যেস করলেন, ছৌ-নাচের মুখোশগুলো কিসের জন্যে ?

           মিলিটারি ভুত সংস্কৃততে  বলল, জানি না স্যার, আগে যে মেছোভুত বাউন্সার ছিল সে জানতে চাওয়ায় তার চাকরি চলে গেছে । তবে কানাঘুষা শুনেছি যে এই অপারেশান থিয়েটারে ভবিষ্যতের মানুষ গড়ার কাজ চলছে, তাদের মুখ হবে মুখোশের মতন আর কাজ করবে যন্ত্রের মতন, তাদের একটা করে নম্বর থাকবে আর মানুষের বদলে তাদের বলা হবে নাগরিক, তারা গ্রামে থাকুক বা জঙ্গলে সবাই হবে নাগরিক, তারা টাকার জন্যে সবকিছু করবে ।

           মিলিটারি ভুত চলে গেলে, তিথি বলল, তিরিশ হাজারিনীর দেশটা তার মানে  মরণের গুরু-মহারাজ বাঞ্চোতের, ইচ্ছে করে লিঙ্গকে ন্যানোনুনু করিয়ে নিয়েছে, যাতে যে ওর সঙ্গে শোবে সে গলদঘর্ম হয়ে যাবে ব্যাটাকে জাগিয়ে তুলতে, ক্যাওড়াটার পলিটিকালি কারেক্ট লিঙ্গ, বোকাচোদার গায়ে পুলিশের জেরা করবার ঘরের টেবিলের মতন তেলচিটে দুগ্গন্ধ।

          আরে ! চমকে উঠলেন নগেন দত্ত, বললেন, এই হম্বিতম্বি গুরু-মহারাজই অধ্যাপক চক্কোত্তির কোম্পানির জিএম, এরই পারমিশান নেবার জন্যে চক্কোত্তি গেছে ওনার আশ্রমে । এতক্ষণে বুঝতে পারলুম তারক ব্যানার্জির সঙ্গে কোন ব্যাপারে কথা হচ্ছিল । তিনটে মেয়েকে নিয়ে আসবে, তাদের একলাখ করে বিক্রি করেছিল অলরেডি, এবার তাদের ভার্জিনিটি রিপেয়ার করে আর শল্যচিকিৎসায় সুন্দরী করে প্রত্যেককে দুলাখ টাকা করে বিক্রি করবে ।

         ওনার আশ্রম তো ছত্তিশগড় না ঝাড়খণ্ডে কোথাও আছে ঘন জঙ্গলের ভেতরে, বললে তিথি আহমেদ, খিস্তিখোরটা আমাকে পটিয়ে নিয়ে যেতে চেয়েছিল, যাইনি, জঙ্গলের লাইফ আমায় স্যুট করবে না, মশারি টাঙিয়ে আমি কাস্টমার সার্ভিস ভালো দিতে পারি না , তারওপর লোকটা ন্যানোনুনুর কাহ্ণ । জীবনের বেশিরভাগ তো কাটালুম তিরিশ হাজারিনীর দেশে, এখানের অনিশ্চয়তার অনির্ণেয়তার নেশা ধরে গেছে গো । প্রতিদিন মানুষের সঙ্গে সাময়িক সম্পর্ক পাতাই, আমার সম্পর্ক প্রতিদিন বদলাতে থাকে, তা নয় এক ব্যাটা থলথলে গুরু-মহারাজের আশ্রমে গিয়ে পাকা সম্পর্ক তৈরি করে ভৈরবী হয়ে খঞ্জনি বাজিয়ে নাচো আর রাতে তার ওজন সামলাও । ভাবলেও ঝাঁট জ্বলে যায় ।

          গম্ভীর মুখে ছন্দরানি মন্তব্য করলে, হ্যাঁ, মানবসম্পর্ক কখনও স্হায়ী হওয়া উচিত নয় ; স্হায়ী হলে তারা বালকের সুবোধত্ব হারিয়ে ফ্যালে, খিল্লি কেস হয়ে যায় । 

          বাইরে বেরিয়ে ওরা দেখলো বিরাট আঁস্তাকুড়, শল্যচিকিৎসার পর বাড়তিমাংস ফেলে দেয়া হয়েছে জঞ্জালের স্তূপে, নাকের চিলতে, ঠোঁটের টুকরো, মাইয়ের শাঁস, পেটের বাড়তি চর্বি, পাছার বাড়তি মাংস আর চামড়া, নুনুর ডগা, যোনির কুচি, ফেলে দেয়া হাত-পা-মুণ্ডু আর নানা রকমের মাংসের ছাঁট যা চেনার উপায় নেই, আর একটা ড্রামে রক্ত, যতো রক্ত বেরিয়েছে তা ওই ড্রামে এনে ফেলে থাকবে । 

        তিথি আহমেদ, যে সাধারণত কোনোকিছুই সিরিয়াসলি নেয় না, ওর মনে হল, কোনো দৃশ্য দেখলে তার একটা মানে গড়ে নেয়া যায় মনের ভেতরে, কিন্তু যা দেখছে তা যেন  চিরকুট না লিখে মারা যাওয়া আত্মহত্যাকারীর মতন রহস্যময় ।

          আঁস্তাকুড় জুড়ে মানুষের গাদাগাদি, পুরুষ, নারী, কিশোর, বাচ্চা সবাই কাড়াকাড়ি করছে মাংস নিয়ে তক্ষুনি খাবার জন্য, যা হাতে পাচ্ছে গপাগপ খেয়ে ফেলছে, গলায় আটকে গেলে ড্রামের কাছে গিয়ে আঁজলা ভরে রক্ত খেয়ে আবার ফিরে এসে মানুষের ছাঁট মাংস খাচ্ছে, জঞ্জাল খাচ্ছে, টিনের কৌটো, কাঁচের বয়াম, প্লাসটিকের বোতল, পচা কাপড়, আধুনিকতার ফেলে দেয়া সমস্তকিছু খেয়ে ফেলছে, দেখে মনে হচ্ছে যেন আধুনিকতাকেই সাবাড় করে দিতে চাইছে, এদের ধাপার মাঠে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দিলে কয়েক দিনে সব খেয়ে পরিষ্কার করে ফাঁকা মাঠ বানিয়ে দিতো । ওদের হাতগুলো আর হাঁ-মুখ বেশ বড়ো ।

          ছন্দরানি বললে, এই মানুষগুলো কারা, ওপরে তিরিশ হাজারিনির দেশের রাস্তায় তো কখনও দেখিনি এরকম রোগা, হাড়গিলে, না-খেতে পাওয়া মানুষদের কাড়াকাড়ি, আমরা বোধহয় আনডারগ্রাউণ্ডে অন্য কোনো সিসটেমে চলে এলুম । 

          নগেন দত্তও এরকম মানুষজন দেখেননি আগে, শিড়িঙ্গে, হাড়ের ওপর চামড়া, গায়ে মাংস প্রায় নেই, বাচ্চাগুলোর পেট তবুও ফোলা, এরা বোধহয় অনেককাল স্নান করেনি, চুল রুক্ষ, পোশাক বলতে পুরুষরা কানি বেঁধে আছে, নারীদের ময়লা শাড়িতে যতোটুকু শুকনো বুক ঢাকা যায়, বাচ্চাদের পোশাক বলতে কিছুই নেই ।

          গায়ে সাদা রঙ করা মিলিটারি ভুতটা, যাকে সিকিউরিটির লোকের চেয়ে  বাউন্সার বলেই মনে হচ্ছিল, এসে লাঠিপেটা করে তাড়ালো লোকগুলোকে, বলল, যতোই তাড়াই, তিষ্ঠোতে দ্যায় না, দশ মিনিট পরেই আবার দল বেঁধে চলে আসে, এতো খাচ্ছে, দিনের পর দিন খাচ্ছে, তবু ওদের পেট ভরে না । আমি একজন ভুতগ্রস্ত দেবদূত, আমাকেও ভয় পায় না । অন্য ভুতদের লেলিয়েও দেখেছেন কর্তৃপক্ষ, কাউকেই ভয় পায় না ওরা ।

          খেলেই বা, ক্ষতি কি ? গলার স্বরে ঔদ্ধত্য মিশিয়ে বলল তিথি আহমেদ।

          মিলিটারি ভুত বলল, ওরা খায় কিন্তু হাগে না । এরা তিরিশ হাজারিনীর দেশের বৈধ নাগরিক নয়, তাই নিচের স্তরে নামিয়ে দেয়া হয়েছে, পরার পোশাক নেই যাদের, তাদের বৈধ কাগজপত্রই বা কোথ্থেকে হবে, তিরিশ হাজারিনীর দেশের ব্যবস্হাকে পালটাবার কোনো উপায় নেই, এই লোকেরা পালটে দেবে ভেবেছেন, তাহলেই হয়েছে । কন্ঠস্বরে সহানুভূতি থাকলেও, ষণ্ডামার্কা ভুত চাকরির দাবি-দাওয়ার কাছে অনুগত, কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই বলল কথাগুলো, সম্ভবত আগন্তুকদের কৌতূহল মেটাবার জন্য বলে-বলে অভ্যস্ত  ।

         ওরা তিনজনেই একসঙ্গে বলে উঠল, এটা বোধহয় গণতন্ত্রের আনডারগ্রাউন্ড ব্যবস্হা ।

         একটু এগিয়ে, নগেন দত্তর দুইপাশে ছন্দরানি আর তিথি ওনার পকেটে ওদের একটা হাত ঢুকিয়ে, কাঁধে মাথা রেখে, হাঁটতে লাগল । নগেন দত্ত জানেন চারিপাশের পরিবেশকে কেমন করে নিয়ন্ত্রণ আর মেরামত করে নিতে হয় । বাঁহাত ডানদিকের পকেটে ঢুকিয়ে তিথি আহমেদ নগেন দত্তর প্রত্যঙ্গ নাড়াচাড়া করতে করতে বললে, এটা আমার । ডানহাত বাঁদিকের পকেটে ঢুকিয়ে প্রত্যঙ্গ নাড়াচাড়া করতে করতে ছন্দরানি বললে, এটা আমার ।

          তিথি আর ছন্দরানি দুজনেই একসঙ্গে বলে উঠল তোমার আদি রসের দুটো যন্ত্র নাকি, শোবার সময়ে তো একটাই দেখেছি ।

          নগেন দত্ত বললেন, তোরা পকেটে হাত ঢোকাতেই জেনে গিয়েছিলুম কী করতে চলেছিস, তাই দুজনের মধ্যে রেশারেশি যাতে না হয় তাই দুটো প্রত্যঙ্গ করে নিলুম । দাদামশায় ওনার উইলে লিখে গেছেন যে আমার ওপর যদি একইসঙ্গে একই সময়ে কয়েকজন দাবি জানায় তাহলে নিজেকে সমানভাবে তাদের মধ্যে ভাগবাঁটোয়ারা করে দেবো ।

         তিথি আহমেদ নগেন দত্তর গালে তুলতুলে ঠোঁট ঠেকিয়ে চুমু খেল, মমুয়াআআআআআঃ ।

         নগেন দত্ত বললেন, দাদামশায়ের উইল অনুযায়ী তোদের তো অনেক সম্পত্তি আর টাকাকড়ি দেয়া হয়েছে, তবু এই তিরিশ হাজারিনীর দেশে পড়ে আছিস কেন ?

         ছন্দরানি নগেন দত্তের দিকে ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে বলল, আরে, তোমরাই শুধু জীবনের সাধআহ্লাদ উপভোগ করবে, আমাদের বুঝি ইচ্ছে হয় না,  অনেকের সঙ্গে শুই, নানা আঙ্গিকে শুই, নানা বয়সের সঙ্গে শুই, নানা ভাষার সঙ্গে শুই, নানা মাপের সঙ্গে শুই, নানা চামড়ার সঙ্গে শুই, নানা গন্ধের সঙ্গে শুই ? তোমার দাদামশায়ের উইল অনুযায়ী এখন কম বয়সে যতদিন আটকে আছি ততোদিন জীবনের মজাগুলো নিয়ে নিতে চাই ।

           তিথি বললে, হ্যাঁ, শনৈশনৈ । কাদের সঙ্গ পাইনি বলো দিকিন ? ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের আন্দোলনের সময়ে একজন ছোকরা এসে আমার লেপের তলায় ঘুমোচ্ছিল, ব্রিটিশের পুলিশ তাকে ঘুম থেকে তুলে লাঠি পিটিয়ে নিয়ে চলে গেল ।  

          ১৯১৫ সালে গদর ষড়যন্ত্রের সময়ে একজন আমার লেপের তলায় এসে লুকিয়েছিল, ব্রিটিশের পুলিশ তাকে দড়ি বেঁধে নিয়ে চলে গেল । 

          ১৯২০ সালে অনুশীলন সমিতির একজন এসে আমার সঙ্গে লেপের তলায় লুকিয়েছিল, ব্রিটিশের পুলিশ তাকে হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে গেল । 

          ১৯২০ সালে কুইট ইনডিয়ার সময়ে একজন লালটুশ যুবক আমার লেপের তলায় লুকিয়েছিল, ব্রিটিশের পুলিশ তাকে ধরেবেঁধে নিয়ে চলে গেল। 

          ১৯২৮ সালে কমিউনিস্টদের যখন মিরাট ষড়যন্ত্রর দোষ দিলে, তখন আমার চাদরের তলা থেকে একজন দাঁড়িঅলা ছোকরাকে ব্রিটিশের পুলিস ধরেবেঁধে নিয়ে গেল । 

          ১৯৪৬ সালের দাঙ্গায় এক গুণ্ডা এসে আমার খাটের তলায় লুকিয়েছিল, ব্রিটিশের পুলিশ তাকে প্যাঁদাতে-প্যাঁদাতে নিয়ে গেল ; ওই বছরেই কিসান সভার একজন আমার লেপের তলায় জড়িয়ে ঘুমোচ্ছিল, ব্রিটিশ পুলিশ দরোজা ধাক্কিয়ে লোকটাকে নিয়ে চলে গেল । 

          ১৯৪৮ সালে কমিউনিস্টরা যখন ‘ইয়ে আজাদি ঝুঠা হ্যায়’ জিগির তুলে ট্রামবাস পোড়ালে তখন স্বদেশি পুলিশ আমার ঘর থেকে মাসকাবারি বাবুকে কোমরে দড়ি বেঁধে নিয়ে চলে গেল । 

          ১৯৫৪ সালে এক উদ্বাস্তু নেতা আমার ঘরে লেপের তলায় দুপুরে জিরোচ্ছিল, তখন স্বদেশী পুলিশ ধরেবেঁধে নিয়ে চলে গেল । 

          ১৯৬২ সালে একজন চিনা যুবক আমার লেপের তলায় জড়িয়ে ঘুমোচ্ছিল, তখন স্বদেশী পুলিশ তাকে চড় মারতে-মারতে নিয়ে চলে গেল । 

          ১৯৬৪ সালে মলয় রায়চৌধুরী নামে এক চশমাপরা রোগাটে কবি আমার ওপর চেপে সবে আরম্ভ করেছে, স্বদেশী পুলিশ টেনে আমার ওপর থেকে নামিয়ে হাতে হাতকড়া আর কোমরে দড়ি পরিয়ে নিয়ে চলে গেল, পুলিশের সঙ্গে দুজন খোচর ছিল যারা ওই কবিটার চলাফেরার ওপর নজর রাখতো । 

          ১৯৭০ সালে বর্ধমানের সাঁইবাড়ির গোলমালের সময়ে একজন লোক এসে আমাকে জড়িয়ে ঘুমোচ্ছিল, তাকে প্যাঁদাতে-প্যাঁদাতে নিয়ে গেল পুলিশের মতন পোশাক পরা একদল লোক । 

          ১৯৭১ সালে একজন নকশাল যখন আমার খাটের তলায় এসে লুকিয়েছিল, স্বদেশী পুলিশ মার দিতে-দিতে হিঁচড়ে সিঁড়ি দিয়ে নিয়ে চলে গেল । 

          ১৯৭৬ সালে ইন্দিরার এমারজেন্সির সময়ে একজন লেখক আমার কম্বলের তলায় ঘুমোচ্ছিল, স্বদেশী পুলিশ তাকে চ্যাংদোলা করে তুলে নিয়ে গেল । 

          ১৯৭৯ সালে যখন মরিচঝাঁপি থেকে পালিয়ে এসে একজন বুড়ো শান্তিতে আমাকে জড়িয়ে শুয়েছিল, পুলিশ তাকে টানতে-টানতে নিয়ে চলে গেল । 

          ১৯৮২ সালে গেরুয়া লুঙ্গি পরা গোঁফদাড়িঅলা একজন মাঝবয়সী আমার ঘরে শুয়েছিল, সাদা পোশাকের পুলিশ বললে যে সে আনন্দমার্গী, আইন ভেঙেছে, তাকে চ্যাংদোলা করে তুলে নিয়ে গেল । 

          ২০০০ সালে নানুরের এক মুসলমান বুড়ো আমার লেপের তলায় লুকিয়েছিল, তাকে সাদা পোশাকের লোকেরা হিঁচড়ে নিয়ে চলে গেল । 

          ২০০৭ সালে নন্দীগ্রামের এক চাষি আমার লেপের তলায় আমাকে জড়িয়ে শুয়েছিল, তাকে স্বদেশি পুলিশ মারতে-মারতে ধরে নিয়ে গেল । 

          ২০১১ সালে মুখে গামছা বেঁধে একজন ঘুমোচ্ছিল আমার কম্বলের তলায়, যাতে আমি লোকটার মুখ ছাড়া সবকিছু দেখতে পাই, তাকে তো মুখে গামছা ঢাকা অবস্হাতেই তুলে নিয়ে গিয়েছিল স্বদেশী পুলিশ ।

          তাহলে দেখতে পাচ্ছে, দেশটাকে কতো ভালো করে জানতে পেরেছি তিরিশ হাজারিনীর দেশের নাগরিক হয়ে ? জীবন বড্ডো ব্যানাল, বুঝলে গো, তা থেকে বেরোবার উপায় তো খুঁজে পেয়েছি । 

        নগেন দত্ত তিথির গালে চুমো দিয়ে বললেন, সাবধানে থাকিস, এখন উত্তরাধুনিক যুগ চলছে তিরিশ হাজারিনীর দেশে, লোকে খুন হয়ে গেলে টিভি আর কাগজের গল্প হয়ে যায়, তারপর তার কথা সবাই ভুলে যায়, নতুন গল্প চলে আসে । এটা তাড়াতাড়ি ভুলে যাবার দিনকাল ।

        তিথির মুখেচোখে তখওন আত্মগর্বের ছোঁয়া । নিজের চেয়ে চারিপাশের জগতসংসারকে নিয়ে বেশি চিন্তিত যেন । একনাগাড়ে কথা বলার পর জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে তিথি আহমেদ বলল, ব্যথায় আনন্দ আছে, যন্ত্রণাতেও আহ্লাদ আছে, আহ উহ করাতেও মজা আছে , পোঁদে চিমটি কাটে তাও অনেক সময়ে ভালো লাগে, আমরা তো লজ্জাবোধের সিংহাসনে বসে রাজত্ব করি ।

        তিথির কথাকে এগিয়ে নিয়ে গেল ছন্দরানি, বলল, তিরিশ হাজারিনীর দেশে আমরা সবায়ের শিরদাঁড়া তরতাজা করে দিই, রিফ্রেশ করে পৃথিবীর সঙ্গে লড়তে পাঠাই, ওদের চিন্তার ভেতরে লড়বার গানের সুর ঢুকিয়ে দিই । যাদের শিরদাঁড়া থাকে না তাদের কুণ্ডলিণী দিয়ে শিরদাঁড়া ঢুকিয়ে পথে ছেড়ে দিই, বলি যে, যাও, পেঁদিয়ে এসো, লাথিয়ে এসো, বাঞ্চোত দুনিয়াটাকে ।

        নগেন দত্ত ছন্দরানির দিকে তাকিয়ে বললেন, তোর বয়স না হয় আটকে আছে, তোর ছেলের বয়স তো আটকে নেই, সে তো তোর চেয়ে বয়সে বড়ো হয়ে গেছে ইতিমধ্যে ।

       তিথি আহমেদের দিকে তাকিয়ে নগেন দত্ত বললেন, তোর মেয়েরও বয়স তোর চেয়ে বেশি হয়ে গেছে, মনে রাখিস ।

        দুজনেই বলে উঠল, ওরা তোমার বাচ্চা তুমি বুঝবে, তুমি ওদের ইনজিনিয়ার-ডাক্তার বানাতে চেয়েছো, ওদের কাছে আমরা দুজনে তো কবেই মরে গেছি । 

         নগেন দত্ত বললেন, কদিন বাদেই আমি লণ্ডনে যাচ্ছি, গিয়ে ওদের দুজনকে বিয়ে দিয়ে দেব, নয়তো ওদের বয়স আমার চেয়ে বেশি হয়ে গেলে মুশকিল হবে ।

         ও মা, সেকি ! ভাইয়ের সঙ্গে বোনের বিয়ে ? তোমার কি মাথা খারাপ ? বললে ছন্দরানি । যেন উদ্বেগের স্বপ্ন ভেঙে আচমকা জেগেছে ।

         নগেন দত্ত বললেন, দাদামশায়ের উইলে সেরকমই লেখা আছে, আমি তো রাজনীতিক নই যে আইনি নির্দেশকে অমান্য করব । দাদামশায় লিখে গেছেন যে আমার দুই শয্যাসঙ্গিনীর সন্তানদের পরস্পরের বিয়ে না হলে তারা সম্পত্তির ভাগ পাবে না । 

          দাদামশায় রোমান সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করার স্বপ্ন দেখতেন, রোমের যেমন ভাইবোনের সম্পর্ক থেকে বিরাট সাম্রাজ্যের পত্তন হয়েছিল, উনিও চেয়েছেন যে আমার ছেলেমেয়ের মিলনে তেমনই এক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা হোক । দাদামশায় ওনার উইলে লিখেছেন যে তিরিশ হাজারিনীর দেশের অবস্হা ভালো নয়, সেখানের বিষাক্ত পরিবেশ থেকে যেন আমার সন্তানদের দূরে রাখা হয়, যেন নতুন একটা দেশের পত্তন করা হয়, যেখানে বরফের রঙ কখনও কয়লার মতন হবে না, টিউকলের জল খেয়ে আর্সেনিক আর আন্ত্রিক হবে না, নুন খেয়ে নিমকহারামি হবে না, বিশ্বাসঘাতকতা থাকবে না, মানুষের হাগবার মাঠে জাতিপ্রথা প্রয়োগ করে হবে না, বিরোধীদের মাটিতে পুঁতে দিলেও তারা যেন সেখানে আজীবন রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতে পারে, মাঠের পাকা ফসল কেটে নিলে যে কাটল তার যেন পেচ্ছাপ-পায়খানা বন্ধ হয়ে যায়, মিছিলে হাঁটলে নেতারা যেন নাগরিকের পায়ে রুমা অয়েল মালিশ করে দ্যায়, আরও অনেক নির্দেশিকা আছে, দুশোর বেশি, অতো কি আর মনে থাকে । 

          তিথি আর ছন্দরানি চুপ করে, নগেন দত্তের কথা, এতক্ষণ যাবত শোনার বদলে, নিজেদের হাতে-ধরা নরম মাংসকে শক্ত করে তোলার চেষ্টা করছিল ।

          নগেন দত্ত বললেন, তোরা যা করার চেষ্টা করছিস তা হবে না, কেননা, দাদামশায়ের উইলে এ-কথাও লেখা আছে যে যুগপৎ দুজনে আমাকে উত্তেজিত করতে পারবে না, আমার উত্তেজনাবোধ সেসময়ে নিস্পৃহ দিবানিদ্রায় থাকবে ।

          ওঃ, বলে দুজনেই আত্মনিয়ন্ত্রণ করে নিলে, কী আর করা যায়, বিকল্পের কোনো বিকল্প নেই ।

          নগেন দত্ত বললেন, তাছাড়া ওরা তো জানে না যে ওরা ভাইবোন । ছন্দরানি, তোর ছেলের নাম রেখেছি অর্ণব মজুমদার আর তিথি, তোর মেয়ের নাম রেখেছি লিপি আহমেদ । ওদের নাম তোদের বলেছিলুম অনেককাল আগে, জানি না ভুলে গেলি কেমন করে ।

         প্রসঙ্গ পালটাতে হল নগেন দত্তকে, বললেন, এটা তো তিরিশ হাজারিনীর দেশ নয় রে, মাটির তলায় অন্য কোনো দেশে এসে পড়েছি আমরা । পকেট থেকে স্মার্টফোন বের করে জিপিএস নির্দেশের মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা করলেন, কোন দেশে বা রাষ্ট্রে এসে পড়েছেন । জিপিএস নির্দেশে বললে, “কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্হা জানিয়েছে আপনাদের সমীক্ষা একান্তভাবে গোপনীয়, আপনার সঙ্গিনীরা জীবিত অবস্হায় তাঁদের দেহশাড়ি কোনো বিদেশিকে বিক্রি করতে পারবেন না ।”

        দূরে অধ্যাপক চক্কোত্তিকে যেতে দেখে,  শার্ট-প্যান্টের বদলে খালি গা্য়ে লুঙ্গি পরেছিল,  নগেন দত্ত চেঁচিয়ে ডাকলেন, চক্কোত্তি, ও চক্কোত্তি, কোথায় গিয়েছিলে, তোমার অপেক্ষায় বসে-বসে বিরক্ত হয়ে বেরিয়ে পড়েছি তোমার খোঁজে ।

       ওরা দেখল, নগেন দত্তের চিৎকারে আকৃষ্ট হয়ে, কুড়ি-পঁচিশজন অধ্যাপক চক্রবর্তী, সকলে একই রকম চাককাটা লুঙ্গি পরে,  আকাশ থাকে নেমে আসছে হাত দুটোকে ডানার মতন নাড়াতে, নাড়াতে ।

       একজন চক্কোত্তি মাটিতে নেমে, লুঙ্গিকে হাঁটু পর্যন্ত তুলে, বলল, বলুন কী বলবেন, আমরা আজ ব্যস্ত আছি, নির্বাচন করাতে যাচ্ছি ।

      তিথি আহমেদ বলল, আপনি একজন থেকে এতোগুলো হয়ে গেলেন কেমন করে মাসিপিসি ? কে আসল কে নকল কিছুই তো বুঝতে পারছি না ।

        চাককাটা লুঙ্গি-পরা চক্কোত্তি বলল, আমরা সকলেই আসল, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যে তিরিশ হাজারিনীর শাখা-প্রশাখা আছে তা আমরাই চালাই, তবে আজকে নির্বাচন বলে আমরা একত্রিত হয়েছি, আমাদের নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বীহীন, থাকে বটে নাম-কা-ওয়াস্তে প্রতিদ্বন্দ্বী, আমরাই তাদের দাঁড় করাই, নয়তো লোকে কী ভাববে । আমাদের বাবা জি এম আর মা জি এম অজস্র চক্কোত্তি গড়ে তুলেছেন নির্বাচন প্রক্রিয়ার জন্যে, সেই কাজেই যাচ্ছি, পরে দেখা হবে ওভারগ্রাউণ্ডে । বলে উড়ে চলে যাবার চেষ্টা করছিল নেমে-আসা চক্কোত্তি, হাত দুটোকে ডানার মতন নাড়িয়ে, কোমর থেকে ঝুলছে চাককাটা লুঙ্গি ।

        তিথি আহমেদ বললে, এখানে কোনো শৌচালয় দেখছি না, হাগা পেয়ে গেছে, মুততেও হবে, একটু ডিরেকশানটা বলে দিন না ।

        উড়তে-উড়তে প্রফেসর চক্কোত্তি বললে, এখানে হাগবার মোতবার পাদবার আজাদি নেই ।

        নগেন দত্ত বললেন, আমি আর ছন্দ তোকে আড়াল করছি, তুই পুরো-কোটা হেগে-মুতে-পেদে নে ।

        তিথি আহমেদ শিমুল-পলাশে ঘেরা গাছতলায় বসে হেগে-মুতে-পেদে নিলে ।

        নগেন দত্ত বললেন, পাদবার আজাদি নেই, এ আবার কেমন বখাটে-ক্ষয়াটে জগত ! মনে আছে, ১২৩৬ সালে যখন দিল্লি গিয়েছিলুম, রাজিয়া সুলতান বলেছিল ওসব তুর্কিদের মাথায় আমি হাগি আর ওদের মুখে পাদি। মনে আছে, ১৩০৩ সালে যখন চিত্তোরে ছিলুম, আলাউদ্দিন খিলজি সেখানের রাজাকে মেরে রাজার সুন্দরী বউ পদ্মিনীকে পাবার চেষ্টা করেছিল ; রানি আত্মহত্যা করার আগে সোনার থালায় হেগে আর মুতে পাঠিয়েছিল খিলজিকে, আমার স্বচক্ষে দেখা, আর এটা কিরকম আন্ডারগ্রাউণ্ড এলাকা যে হাগবার-মোতবার-পাদবার স্বাধীনতা নেই ।

        কে বললে নেই, না থাকলে জোর করে আজাদি নিতে হয়, বলে বেশ জোরে পাদল ছন্দরানি মজুমদার, তারপর বললে, তা নির্বাচন অথচ তো মারামারি কাটাকাটি হচ্ছে না তো !

        গাছ থেকে ঝরা শিমুলের পাপড়ি দিয়ে পোঁদ পুছতে-পুঁছতে তিথি আহমেদ  বলল,  খুনোখুনির পালা শেষ হয়ে গেছে বোধহয়, আঁস্তাকুড়ে যারা জঞ্জাল খাচ্ছিল, তারা মরা মানুষের হাত-পা-মুণ্ডুও তো খাচ্ছিল চুষে-চুষে, হয়তো নির্বাচনের ছাঁটমাংসও তাতে ছিল, এখানে সকলেই লেড়িয়েছে বলে মনে হয় ।

         নাঃ, এটা বোধহয় কোনো জনগণতান্ত্রিক দেশ, তিরিশ হাজারিনীর দেশ নয়, তিরিশ হাজারিনীতে নির্বাচন হলে সবাইকে নিজের পরিচয়পত্র নিয়ে গিয়ে বোতাম টিপতে হয়, একজন মানুষের সঙ্গে আরেকজনের কোনো মিল থাকে না । এদেশে দেখছি সকলেই চক্কোত্তির মতন দেখতে, কারোর সঙ্গে কারোর তফাত নেই, বললে ছন্দরানি মুজমদার । তিরিশ হাজারিনীতে তো নির্বাচনের রেট আর আমাদের রেটে বিশেষ তফাত নেই, এখানে সবাই দেখতে সমান, রেট ফিক্স হয় কেমন করে !

         নগেন দত্ত বললেন, অনেক এলাকায় সত্য নিজেই সত্যের শত্রু ।

         তিথি আহমেদ বললে, ঠিকই বলেছিস ছন্দ, ওপরে ছিল সন্ধ্যাবেলা । এতো তাড়াতাড়ি দুপুর হয়ে গেল কেমন করে ! যাকগে যাক, চলো কিছু খেয়ে নেওয়া যাক, সেই সকাল থেকে দুজন সমকামীকে পড়াতে-পড়াতে কিছুই খাওয়া হয়নি ; হেগে পেট একেবারে খালি ।

        একটা চীনা রেস্তরাঁ দেখে ঢুকলো তিনজনে, বসল ফাঁকা টেবিলে । দেয়ালে ঝুলছে গ্যাঙ অফ ফোরের চিয়াং চিংএর সাদা-কালো ছবি, চশমা-পরা, ওপর দিকে তাকিয়ে । 

        ওরা  দেখল ওয়েটাররা সকলেই চক্কোত্তির মতন হুবহু লুঙ্গি পরে, যারা খাচ্ছে, তারাও হবহু চক্কোত্তি । চীনা রেস্তরাঁ নাম দিয়েছে কেন তাহলে !

        মেনুতে নতুন ধরণের পিৎজা দেখে অর্ডার দিল, লেখা রয়েছে সাংস্কৃতিক বিপ্লব বিফল হবার কারণে এবং দেং জিয়াও পিং-এর বিড়ালতত্বের প্রভাবে কাঁচা মাল সব চিন থেকে আসে বলে বেশ সস্তা । পিৎজায় টপিং দেয়া আছে ফ্রাইড জোঁক, পিকলড কেঁচো, উচ্চিংড়ের চিজলিং, হাফ-বয়েলড কোলা ব্যাঙের জিভ, কাঁচা সবুজ ফড়িং আর ঘন চিজের আস্তরণ, সঙ্গে সৌদি আরব থেকে আনা উটের দুধের চা ফ্রি ।

        তিথি আহমেদ আর ছন্দরানি মজুমদার যখন পিৎজা খাচ্ছিল, চিজের সুতোর আঠালো টান পিৎজা থেকে ওদের মুখ পর্যন্ত বেশ অশ্লীল আনন্দ দিচ্ছিল নগেন দত্তকে, এক দৃষ্টে সেদিকে তাকিয়ে বললেন, খেতে-খেতেও তোরা সৌন্দর্য সৃষ্টি করিস ।

         নগেন দত্ত পিৎজা খেতে-খেতে, মেনুকার্ডের দিকে তাকিয়ে বললেন, এদের এখানে দেখছি মানুষের ঘাম থেকে চোলাই করা মদ পাওয়া যায় । তিন জনের জন্যে তিন পেগ অর্ডার দিয়ে বললেন, তোদের স্ট্যালিনের গল্প বলার সময়ে একরকম মদের কথা বলতে তো ভুলেই গেছি, স্ট্যালিন খাইয়েছিলেন । আমি মুলো আর ভোদকা খেয়ে গেছি, গন্ধ পেয়ে উনি বললেন, আরে পৃথিবীর সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ মদ তৈরি হয় চোখের জল চোলাই করে, সাইবেরিয়া থাকে ড্রামে ভরে-ভরে আসে, খাইয়েছিলেন নতুন বোতল খুলে, তিন পেগ খেয়েছিলুম, চোখের জল তো নোনতা হয়, কিন্তু উনি নতুন প্রযুক্তির গুণে তাকে রেড ওয়াইনের চেয়ে মিষ্টি করে তুলেছিলেন ।

         তিথি আহমেদ বললে, আহা গো, টেকনোলজিটা যদি জেনে আসতে তাহলে আমাদের কাজে দিতো, কতো ফ্যাঁচফ্যাঁচে সর্দি কান্না যে কাঁদে পুরুষরা আমার কাঁধে মাথা রেখে, যদি চোখের কাছে কাচের  বয়াম ধরি তাহলে রোজ সকালে একজন কাস্টামারের কাছ থেকে একলিটার করে বিশুদ্ধ কান্নার জল পেয়ে যাবে, সারা রাতে দশজন কাস্টামার হলে দশ লিটার । 

         ছন্দরানি মজুমদার ঘামের মদে চুমুক দিতে-দিতে বললে, এর স্বাদ তেমন ভালো নয়, কেমন যেন নরমাংসে মেশানো পেট্রলের গন্ধ বেরোচ্ছে, মনে হয় গদ্দাফির লিবিয়া কিংবা সাদ্দামের ইরাক থেকে আমেরিকানরা চুরি করে এনে বাজারে ছেড়েছে, এখন তো খোলাবাজারের আলোবেলা ।

         ওয়েটারকে ডেকে তিথি আহমেদ জিগ্যেস করল, জোঁকগুলো তো শুকনো, রক্তে টুসটুসে নয় কেন ?

         ওয়েটার একটা কাঁচের প্লেটে ঝাড়ন ঘষতে-ঘষতে বলল, ম্যাডাম, জোঁকগুলো তো চিন থেকে ইমপোর্ট করা, কাস্টমসের লোকেদের ঘুষ না দিলে ছাড়ে না, ততো দিনে ওদের গা থেকে রক্ত শুকিয়ে যায় ।

         ছন্দরানি ভুরু কুঁচকে জিগ্যেস করল, ইনডিয়ান জোঁক দিলেই তো পারেন, টপিং তাহলে ফ্রেশ থাকবে।

         ওয়েটার প্লেট পোঁছা বজায় রেখে বললে, ইনডিয়ান জোঁকে চীনা জোঁকের মতন স্বাদ হয় না ; চীনা জোঁকের বিশেষ চাষ হয়, পুরো গ্রাম ঘিরে ফেলে সেখানকার নাগরিকদের হাত-পা বেঁধে তাদের গায়ে জোঁক ছাড়া হয়, টুপ-টুপ করে জোঁকগুলো পড়ে গেলে রেড আর্মির লোকেরা কালেক্ট করে এক্সপোর্ট করার পারমিশান দ্যায় ।

         আপশোষ বেরোলো তিথি আহমেদের মুখ থেকে, খোলাবাজার হয়েও এই অবস্হা !

         ছন্দরানি একটা জোঁক চুষতে-চুষতে বলল, খোলাবাজারের বাঁশ আমেরিকানদের পোঁদেই ঢুকছে এখন, চাকরি নেই, কারখানা বন্ধ, সস্তার জিনিস চিন থেকে যাচ্ছে, সস্তার শিক্ষিতরা ইনডিয়া থেকে যাচ্ছে, আইটির সস্তার জিনিসও যাচ্ছে । 

         খেয়ে, টিপস দিয়ে, বেরোতে যাবে, চীনা রেস্তঁরায় একজন চক্কোত্তি আরেকজনকে পেটে ছোরা মেরে দিলে, তাকে বেয়ারাগুলো, তাদের দেখতেও চক্কোত্তি, জড়িয়ে ধরতে, ছাড়িয়ে নিয়ে এলোপাতাড়ি ছোরা চালানো আরম্ভ করলে, দুজনের পেটে লাগতে তারা মাটিতে পড়ে কাতরাতে লাগলো, একজন চক্কোত্তি বেয়ারা ওদের বলল, পালান পালান, এ বিরোধীতার কাজ করে বলে পাগল হয়ে গেছে, নিজের ইশকুল, নার্সিং হোম, ভুটভুটির ব্যাবসা, চালের কল, আলুর কোল্ড স্টোরেজ, গাঁয়ে তিনতলা পাকাবাড়ি, অনেক-কিছু করে ফেলেছে, পালান পালান ।

          তিথি জানতে চাইল, কিসের বিরোধীতা করেছিল ?

          বেয়ারা বলল, বিরোধিতার আবার কারণ হয় নাকি ! কারণ থাকলে তো বিরোধিতাই হতো না ।

          নন্দরানি নিজের মনে বললে, এখানেও ওই একই ব্যাপার, খুন হয়ে গল্প হয়ে যাও, তারপর নতুন খুন এসে পুরোনো খুনের গল্পকে সরিয়ে দেবে । চলো, এখানে  অযথা সময় নষ্ট  করার মানে হয় না।

          ওরা বেরিয়ে হন হন  হাঁটা দিলো । 

          বাচ্চা ছেলেমেয়েদের মিছিল যাচ্ছিল বলে রাস্তা পেরোতে দেরি হল, বাচ্চাদের হাতে প্ল্যাকার্ড, তাতে লেখা “ভয় পাবার মতো কিছু লিখবেন না”, ‘ভয় পাবার মতো কিছু বলবেন না”, “ভয় পাবার মতো কিছু ভাববেন না”, “ভয় পাবার মতো কিছু শুনবেন না”, “ভয় পাবার মতো কিছু দেখবেন না”, সেই সঙ্গে স্লোগান দিচ্ছে, “তুঘলকের জয় হবেই, জয় তুঘলকের জয়, তুঘলক জিতবেন, তিনি জিতবেন, তিনি জিতবেন, তিনি তুঘলক, তিনি তুঘলক, তিনি তুঘলক, তিনি জিতবেন, তুঘলকবিরোধীরা নিপাত যাক, নিপাত যাক, জয় দৌলতাবাদের জয়, মানুষ যদি নাও পৌঁছোয় তার ঠ্যাং দৌলতাবাদে পৌঁছোবে, জয় তুঘলকের জয় ।”

         তিথি আহমেদ নাক চাপা দিয়ে বলল, এ কি রে বাবা, বাচ্চাদের গা থেকে রামছাগলের বোটকা গন্ধ বেরোচ্ছে, এই গন্ধই তো গুরু-মহারাজের গা থেকে বেরোয় । 

         ছন্দরানি বিজ্ঞের মুখ করে বলল, ওই গুরু-মহারাজটাই তার মানে তুঘলক, কতো বেজন্মা বাচ্চা পয়দা করেছে, তাদের গায়ের দুর্গন্ধ দিয়ে তাদের পরিচয় জানিয়ে দিচ্ছে ।

          সম্ভব, খুবই সম্ভব তিথি, তুঘলকের গা থেকে অমন গন্ধ বেরোতো বলে লিখে গেছে ইবন বতুতা, বললেন নগেন দত্ত । তুঘলক নানা তত্ব বের করেছিলেন, একজনের চেয়ে বেশি মানুষকে যদি নির্বিচারে কোতল করতে হয় তাহলে তার জন্যে তত্ব দরকার, আর উনি তো মানুষ খুন করার রেকর্ড করে গেছেন, শত্রু হোক বা বন্ধু হোক, কাউকে বাদ দেননি  । 

          নতুন মোহম্মদ বিন তুঘলক এলো নাকি ইতিহাস বইয়ের পাতা থেকে নেমে, স্বগতোক্তি করলেন নগেন দত্ত, যে হারে পুতুলনাচের পুতুলরা সংখ্যায় বাড়ছে ।

          রাজপথে একটা সিনেমা হল দেখতে পেয়ে তিথি আহমেদ চেঁচিয়ে উঠল, ওই তো, ওই যে একটা সিনেমা হল. চলো-চলো, প্রমথেশ বড়ুয়া কিংবা ফিয়ারলেস নাদিয়ার ফিল্ম হলে জমে যাবে ।

          ছন্দরানি মজুমদার, বলে উঠল, তোর ওই একঘেয়ে পছন্দ, আমি দেখতে চাই দেব-শুভশ্রী জুটির ফিল্ম । দেবের পরাণ জ্বলিয়া যায় রে, চ্যালেঞ্জ, খোকাবাবু, খোকা চারশোবিশ, চাঁদের পাহাড়, দুই পৃথিবী, রোমিও, সবকটা দেখেছি । তুইও তো দেখতে গিয়েছিলি ।

        তিথি আহমেদ : দেবটা তৃণমূল বলে ভাল্লাগে না ।

        ছন্দরানি মজুমদার : ভালো না লাগবার কী আছে ? ওর বাড়ির সবাই সিপিএমকে ভোট দ্যায় ।        নগেন দত্ত : চুপ কর দিকিনি তোরা । কুন্দনন্দিনীকে খুঁজতে বেরিয়েছি আর তোরা এখন প্রমথেশ বড়ুয়া-ফিয়ারলেস নাদিয়া-দেব নিয়ে পড়লি । আমার মনের ভেতরের গোলাপি অন্ধকারে যদি তোদের দুজনকে বসিয়ে দিতে পারতুম তাহলে বুঝতে পারতিস আমার মনের চিনচিনে হাহাকারগুলো ।

         সিনেমা হলের সামনে পৌঁছে ওরা দেখলো, দেয়ালে বিশাল পোস্টার লাগানো, একজন সুন্দরীর মুখ আঁকা, পোস্টারে লেখা সুপ্রসিদ্ধ  পরিচালক সৃজিৎ মুখোপাধ্যায় নির্দেশিত ‘কুন্দনন্দিনী”, মহাসমারোহে পঞ্চাশতম বৎসর চলিতেছে,  কান চলচ্চিত্র উৎসবে প্ল্যাটিনাম তালপাতা প্রাপ্ত, বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে প্ল্যাটিনামের ভাল্লুক প্রাপ্ত, ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে প্ল্যাটিনামের সিংহ প্রাপ্ত, স্পেনের চলচ্চিত্র উৎসবে প্ল্যাটিনামের শামুক প্রাপ্ত এবং লোকার্নো চলচ্চিত্র উৎসবে প্ল্যাটিনাম চিতাবাঘ প্রাপ্ত ।

         তিথি আহমেদ বললে, এই পরিচালক তো বেশ নামকরা গো, তিরিশ হাজারিনীর দেশের বইমেলায় আগুন ধরিয়েছিল, সেই লোকটা না ?

         ছন্দরানি মজুমদার বললে, উনি একলা আগুন ধরাননি, ওনার সঙ্গে গৌতম ঘোষ নামে আরেকজন ছিলেন, যাঁকে মুজফফরপুরের লোকেরা নিবারণ বলে ডাকতো ছোটোবেলায় ।

         নগেন দত্ত বললেন, কী আবোল-তাবোল বকছিস তোরা, ওটা ছিল সৃজিৎ মুখোপাধ্যায়ের মগজভাঁড়ের গুলগল্প, হাংরি আন্দোলনকে বদনাম করার জন্যে । কল্পনা ব্যাপারটা হল ক্ষয়রোগ, ক্ষইয়ে দিতে থাকে, ভেতরে-ভেতরে, মানুষকে, সমাজকে, সংস্কৃতিকে, দেশকে ।

         তিথি আহমেদ বললে, হ্যাঁ, ওই আন্দোলনের অনেকে প্রফেসর বেবি নস্কর , প্রফেসর দীপ্তি কুণ্ডু আর প্রফেসর মীরা দাশের ঘরে প্রায়ই দূর-দূর থেকে আসত, অশোকনগর, চন্দননগর, উত্তরপাড়া, বরানগর, বেলঘরিয়া, বেনারস, হাওড়া, বিষ্ণুপুর, ত্রিপুরা, বি টি রোড, আরও নানা শহর থেকে, প্রফেসর বেবিকে ওদের খুব পছন্দ ছিল, বেবির দেহশাড়ি এঁকে দিয়ে গিয়েছিলেন তোমার বন্ধু পল গগাঁ, ওনার দি সিয়েস্তা পেইনটিঙের হুবহু, তাই ওরা বেশ পছন্দ করতো প্রফেসর বেবিকে, গায়ে মাখবার সেন্ট পাউডার ময়েশ্চারাইজার সুগন্ধী কনডোম এনে দিত, ফুলের তোড়া এনে দিত, গান শোনাতো, সবাই মিলে টাকা তুলে টাকাও দিতো, বেবি তো সাজগোজ করে না, তাই ওদের পছন্দের ছিল । বেবি অন্য গ্যালারিতে চলে যাবার পর ওদের একজনের কি দুঃখ কি দুঃখ, মোটা কাঁচের চশমাপরা স্কুল-টিচার বেবিকে মার্কসবাদ বোঝাতো, স্ট্যালিন, মাওসে তুং, কিউবা, ভিয়েতনাম, চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লব, বোমবার্ড দি হেডকোয়ার্টার বোঝাতো, নিজের বই উপহার দিত, যৌনকর্মীরা কেন যৌনকর্মী তা বোঝাতো, হাসতো এমন যেন গার্গল করছে, বেবিকে লেখা প্রেমপত্রও আছে বেবির আয়নার ড্রয়ারে ।

         টিচারটাকে প্রফেসর বেবি বলত, পৃথিবীকে বদলানো যায় না গো, কিছুই বদলানো যায় না, তুমি এইসব আলফাল চিন্তা করে, মদে চুর হয়ে, জীবন নষ্ট করছ কেন ? বেবি বাংলার প্রফেসর শুনে ওদের সে কি আনন্দ ।

         আমি বলতুম, জীবনের আনন্দ নাও, বেঁচে থাকার আনন্দ নাও, জীবনের উদ্দেশ্য থাকলে বেঁচে থাকার মজা নষ্ট হয়ে যায়, বলল ছন্দরানি মজুমদার ।

         তিথি বলল, বেশিরভাগ মরদরা জানে না যে অন্ধকারই সেক্সকে আলো যোগায়, অথচ তারা তুলতুলে ফাটলে আলো খুঁজে বেড়ায় ।

         ওরা তিনজন দেখল সিনেমা হলের কোলাপসিবল গেট বন্ধ, তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে সেই মিলিটারি ভুতটা, সারা গায়ে সাদা রঙ আর লিঙ্গ কয়লার মতন কুচকুচে, শিশ্নে আলো জ্বলছে, নগেন দত্তকে দেখে চিনতে পারল, হেসে বলল, স্যার “হাউস ফুল”, এই শো তো শেষ হয়ে এলো, পরের শোও সম্পূর্ণ বুকড । 

         নগেন দত্তর তর সইছিল না, পকেট থেকে তিনটে হাজার টাকার নোট বের করে মিলিটারি ভুতের হাতে দিয়ে বললেন, ঢুকতে দাও, নইলে ঢুকেই যাবো আর তুমি টের পাবে না, দেখতেই হবে, ওই তো পোস্টারে যার মুখ আঁকা সে-ই তো কুন্দনন্দিনী, তাকেই খুঁজছি আজ পঞ্চাশ একশো দুশো বছর যাবত ।

         মিলিটারি ভুত গেটের তালা খুলে দিয়ে বলল, যান, তাড়াতাড়ি যান, শেষ হয়ে এলো, লাস্ট সিনে পাবলিক এতো জোরে-জোরে কাঁদে যে সংলাপ শুনতে পাবেন না । লাইটম্যানকেও ওর পাওনা মিটিয়ে দেবেন, তাহলে এইলের সিঁড়িতে বসে দেখতে পারবেন, অলরেডি এইলের সিঁড়িতেও পাবলিক বসে আছে ।

        মিলিটারি ভুতকে আরেকটা একহাজার টাকার নোট দিয়ে নগেন দত্ত বললেন, তাড়াতাড়ি করো, তুমিই নিয়ে চলো, ফিল্ম শেষ হয়ে গেলে কুন্দনন্দিনীকে পাবো কী করে । মিলিটারি ভুত, যার কালো কুচকুচে লিঙ্গের টর্চ জ্বলছিল, তার  পেছন -পেছন, টর্চের আলোয়, দৌড়োলো তিনজনে, আরেক হুবহু মিলিটারি ভুত টর্চ জ্বেলে, টাকা নিয়ে, ওদের বসতে দিলে, পর্দার দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন নগেন দত্ত, কুন্দনন্দিনী আমি এসে গেছি ।

         দ্বিতীয় মিলিটারি ভুত টর্চ নিভিয়ে, বকুনি দিয়ে বলল, এই চুপ করুন, কুন্দনন্দিনীর সংলাপ শুরু হচ্ছে, তারপর ডাকবেন ।

         নগেন দত্ত দেখলেন কুন্দনন্দিনী ওনারই বসতবাড়ির পালঙ্কের রেলিঙে মাথা রেখে মাটিতে বসে কাঁদছিল। অবাক হলেন,পর্দায় তো উনি নিজে, কই ফিল্মে তো কখনও অভিনয় করেননি । ফিল্মের নগেন দত্ত আর কুন্দনন্দিনীর সংলাপ শুনতে লাগলেন, হতবাক, থ, কী করা উচিত বুঝে উঠতে পারছিলেন না ।

         ফিল্মের নগেন দত্ত : এ কি কুন্দ ! তুমি কি দোষে ত্যাগ করিয়া যাইতেছ ?

         কুন্দনন্দিনী : তুমি কি দোষে আমাকে ত্যাগ করিয়াছ ? কাল যদি তুমি আসিয়া এমনি করিয়া একবার কুন্দ বলিয়া ডাকিতে — কাল যদি একবার আমার নিকটে এমনি করিয়া বসিতে — তবে আমি মরিতাম না । আমি অল্পদিন মাত্র তোমাকে পাইয়াছি — তোমাকে দেখিয়া আমার আজিও তৃপ্তি হয় নাই ।

         এইলে-বসা নগেন দত্ত : আরে, আমি আবার কখন ছেড়ে গেলুম ! কতোকাল ধরে তোকে খুঁজে চলেছি, একশো বছর, দুশো বছর হয়ে গেল, আর তুই এখন মরার কথা বলছিস !

         কুন্দনন্দিনী : আমি অল্পদিন মাত্র তোমাকে পাইয়াছি — তোমাকে দেখিয়া আমার আজিও তৃপ্তি হয় নাই । আমি মরিতাম না । ছি ! তুমি অমন করিয়া নীরব হইয়া থাকিও না । আমি তোমার হাসিমুখ দেখিতে দেখিতে যদি না মরিলাম — তবে আমার মরণেও সুখ নাই । 

         ফিল্মের নগেন দত্ত : কেন তুমি এমন কাজ করিলে ? তুমি একবার কেন আমায় ডাকিলে না ?

         এইলে-বসা নগেন দত্ত : আমি আবার কী করলুম, আমি তো কবে থেকে তোকে ডেকে চলেছি, তোর খোঁজই পাইনি এতোকাল ।

         তিথি আহমেদ : তোমার কুন্দনন্দিনী বিষ খেয়েছে মনে হচ্ছে, দেখছ না ঠোঁট কেমন করছে, মরবার কথা বলছে, কিছু একটা করো নগেন, শিগগির কুন্দনন্দিনীকে হাসপাতালে নিয়ে চলো ।

         ছন্দরানি মজুমদার : ওই ফিল্মের নগেনটা এক নম্বরের কাপুরুষ, কোথায় অ্যামবুলেন্স ডেকে হাসপাতালে নিয়ে যাবে, তা নয়, সংলাপবাজি করছে, আর তুমিও নগেন, এখানে এইলে হাত গুটিয়ে বসে আছ, যাও যাও, পাঁজাকোলা করে তুলে আনো, আমি ততক্ষণ একটা অ্যামবুলেন্স ডেকে আনছি ।

        তিথি আহমেদ : তাড়াতাড়ি যা ছন্দ, ট্যাক্সি পেলে ট্যাক্সিই ধরে নিস, বলিস ডবল ভাড়া দেবো, যা ছুট্টে যা।

        কুন্দনন্দিনী : তাহা ভাবিও না । যাহা বলিলাম তাহা কেবল মনের আবেগে বলিয়াছি । তোমার আসিবার আগেই আমি মনে স্হির করিয়াছিলাম, দিদি যদি কখনও ফিরিয়া আসেন তবে তাঁহার কাছে তোমাকে রাখিয়া আমি মরিব — আর তাঁহার সুখের পথে কাঁটা হইয়া থাকিব না ।

       তিথি আহমেদ : এই দিদিটা আবার কে ?

       এইলে-বসা নগেন দত্ত : মন্তর  পড়ে বিয়ে-করা আমার প্রথম বউ, সূর্যমুখী ।

       তিথি আহমেদ : নিজেই কেলো করে রেখেছো । কুন্দনন্দিনীকে এতই যদি ভালোবাসতে তাহলে ওকে জোর করে ধরে রাখতে হতো । এখন ভোগো, নিজের খোঁড়া কুয়োয় নিজেই পড়েছ ; কে বলেছিল কুয়ো খুঁড়তে ? তোমার কি জলের অভাব ছিল !

       এইলে-বসা নগেন দত্ত : আমি তো বুঝতেই পারছি না ফিল্মের নগেন দত্তটা কিছু ব্যবস্হা নিচ্ছে না কেন!

       কুন্দনন্দিনী : আমি মরিব বলিয়াই স্হির করিয়াছিলাম — তবে তোমাকে দেখিলে আমার মরিতে ইচ্ছা করে না । আমার কথা কহিবার তৃষ্ণা নিবারণ হইল না — আমি তোমাকে দেবতা বলিয়া জানিতাম — সাহস করিয়া কখনও মুখ ফুটিয়া কথা কহি নাই । আমার সাধ মিটিল না — আমার শরীর অবসন্ন হইয়া আসিতেছে — আমার মুখ শুকাইতেছে — জিভ টানিতেছে — আমার আর বিলম্ব নাই ।

       ছন্দরানি মজুমদার : এখনও বোকার মতন বসে আছো তোমরা, যাও যাও, কুন্দনন্দিনীকে কোলে তুলে নিয়ে এসে, ফিল্মের নগেন দত্তকে বাদ দাও, ওর দ্বারা কিসসু হবে না, তাড়াতাড়ি করো, অ্যামবুলেন্স এসে গেছে, আমার এক ক্লায়েন্ট ডাক্তারকে ফোন করে দিয়েছি, উনি পেট থেকে বিষ বের করে তিরিশ হাজারিনীর দেশের অনেক মেয়েকে বাঁচিয়েছেন ।

       ফিল্মের নগেন দত্তের কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে পড়ল কুন্দনন্দিনী । ওরা তিনজনে এইল দিয়ে দৌড়োতে-দৌড়োতে ফিল্মের ভেতরে ঢুকে ফিল্মের নগেন দত্তর কোল থেকে কুন্দনন্দিনীকে পাঁজা-কোলা করে তুলে সিনেমা হলের বাইরে দৌড়োলো ।

       কুন্দনন্দিনী গলা জড়িয়ে ধরল নগেন দত্তর ।

       নগেন দত্ত বললেন, কুন্দ, তোকে আমি বাঁচাবোই, কতোকাল ধরে তোকে খুঁজছি, তোকে ভালোবাসতে চাইছি ।

       কুন্দনন্দিনী বলল, আমার ঠোঁটে এখন বিষ, তুমি বাঁচিয়ে তোলার পর চুমু খাবো গো, কতোকাল অপেক্ষায় আছি ।

        সাইরেন বাজিয়ে রাস্তা থেকে গাড়িদের একপাশে সরিয়ে, অ্যামবুলেন্স পৌঁছোলো এস এস কে এম হাসপাতালে । 

          ড্রাইভারের পাশ থেকে দ্রুত নেমে অ্যামবুলেন্সের পেছনের দরোজা খুলে নগেন দত্ত দেখলেন তিথি আহমেদ আর ছন্দরানি মজুমদার বসে আছে ।

       নগেন দত্ত জানতে চাইলেন, কুন্দনন্দিনী কোথায়, ওকে তো স্ট্রেচারে শুইয়ে রেখে তারপর সামনে গিয়ে বসলুম ।

       তিথি আহমেদ : ও মা, কুন্দনন্দিনী তো বললে, ও বিষ খায়নি, বিষ খাবার বিভ্রম তৈরি করছিল, সিগন্যালে অ্যামবুলেন্স থামতে, ও বললে তোমার পাশে গিয়ে বসতে যাচ্ছে ।

      ছন্দরানি মজুমদার : আমিও তো এতক্ষণ ভাবছিলুম তোমার পাশেই বসে আছে । 

      নগেন দত্ত : কই, আসেনি তো ! আবার কয়েকশো বছরের জন্যে হারিয়ে গেল ও, আবার আমাকে খুঁজে বেড়াতে হবে, জীবনে ভালোবাসবার সুযোগ বোধহয় কখনও আসবে না, শুধু ভালোবাসার খোঁজই করতে থাকবো ।

          তিথি আহমেদ নগেন দত্তকে জড়িয়ে ধরে বলল, এখন তুমি কিরকম অনুভব করছ বলো, কী ভাবছা তা বলতে হবে না ।

          নগেন দত্তর অস্ফূট কাতরোক্তি শোনা গেলো, ভালোবাসাকে অতিক্রম করে এবার থেকে নিজেকে খুঁজবো, নিজেকে তো আজ পর্যন্ত জানতে পারিনি ।

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

খাজুরাহো ধ্বংস – একটি পোস্টমডার্ন নাটক : মলয় রায়চৌধুরী

নাদির শাহ : দ্যাখ আবদালি, এটা ১৭৭৪ সাল । তোর দু’কানের লতি এই জন্যে কেটে দিলুম যে তুই চিরজীবন মনে রাখবি তুইই আমার ভাবশিষ্য ; আমার তো কোনও বংশধর নেই । মনে রাখিস যে আমি আর আমার মা উজবেক-তুর্কীদের  দাস হিসেবে কাজ শুরু করেছিলুম কিন্তু আমি ওদের ফাঁদ কেটে পালাই। আমি তারপর  সৈন্যবাহিনীতে যোগ দিয়ে ক্রমশ  প্রধান হয়ে উঠি ।  পৃথিবীকে কাফেরমুক্ত করার দায়িত্ব তোকে দিয়ে যাচ্ছি। আমাদের স্লোগান মনে আছে তো তোর ? জান, জর, জমিন । মানে, মেয়েমানুষ, সোনা, এলাকাদখল । আমাকে ভালো করে কবর দিয়ে তুই কাজে এগো । 

আদিল শাহ আবদালি : মনে থাকবে সম্রাট ; আফগানদের নাম রওশন করব । কাফের বলতে তো ওই একটাই দেশ, আল-হিন্দ । তিব্বত আছে বটে, কিন্তু ওখানে সোনাদানা আর কাজের জমি পাওয়া যায় না । বাঁচলো চিন ; সেখানে চেঙ্গিজ খানের বৌদ্ধ বংশধরদের রাজত্ব, পেরে ওঠা যাবে না । খোয়াজা চিশতির আশীর্বাদ নিয়ে আমি তাহলে এগোই।

নাদির শাহ : হ্যাঁ, বেস্ট অফ লাক ।

হজরত ইবলিশ : আপনি চিন্তা করবেন না হুজুর । আবদালিকে আমি গাইড করব । খাজুরাহোর সংবাদ ওকে জানতে দেবো না ।

নান্নুকা : ৮৩১ থেকে ৮৫৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত আমি ছিলুম ভারতের চান্দেলা রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা। আমি জেজকভূক্তি এলাকায়, যা এখন মধ্যপ্রদেশের বুন্দেলখণ্ড, শাসন করতুম। আশ্চর্য যে চান্দেলাদের সম্পর্কে কাব্যিক গীতগুলিতে আমার কথা  উল্লেখ করা হয়নি, আর তার বদলে চন্দেলা বংশের প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে “চন্দ্রবর্মণ” উল্লেখ করা হয়েছে। খাজুরাহোতে ওরা যে দুটো শিলালিপি পেয়েছে, তাতে আমার, মানে নান্নুকাকে, রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে । আরেকটা শিলালিপিতে বলা হয়েছে যে আমি অনেক শত্রু জয় করেছিলুম আর অন্যান্য রাজকুমাররা আমাকে ভয় পেয়ে আমার আনুগত্য স্বীকার করেছিল। তাতে আরও বলা হয়েছে যে আমাকে দেখতে ছিল “প্রেমের দেবতার মতো” । খ্রিস্টীয় ১০০২-এর  শিলালিপিতে আমাকে সূর্য আর আমার পরিবারের সদস্যদের মণি-মুক্তো হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে। আমার তীরন্দাজির দক্ষতা কিংবদন্তি নায়ক অর্জুনের সাথে তুলনা করেছে।সুতরাং, খাজুরাহো বেড়াতে এলে, কথাগুলো মনে রাখবেন ।

ঐতিহাসিক আর. কে, দীক্ষিত : চান্দেলার রেকর্ডে নান্নুকাকে দেওয়া খেতাবগুলোর মধ্যে রয়েছে নাপা, নরপতি আর মহাপতি। এগুলো খুব উঁচু স্তরের খেতাব নয় । তাই কয়েকজন আধুনিক ঐতিহাসিক বিশ্বাস করেন যে নান্নুকা কেবল একটি সামন্ত  শাসক ছিলেন। বুন্দেলখণ্ডের স্থানীয় ঐতিহ্য অনুসারে, চন্দেলারা প্রতিহারদের পরাধীন করার পরে সেই অঞ্চলের শাসক হয়েছিলেন।

আবু রিহান আল বিরুনি : আমি আমার ভ্রমণকাহিনিতে লিখেছিলুম, তাই । নয়তো লোকে জানতে পারতো না যে খাজুরাহো ধ্বংসের কাজ প্রথম আরম্ভ  করেছিল গজনির সুলতান মাহমুদও ভেবেছিল যে কাফেরদের মন্দির মানেই তাতে অঢেল সোনাদানা মিলবে । সপ্তাহখানেক ভাঙচুর করার পর কিছুই না পেয়ে ওর সেনারা যখন চটে লাল, তখন ওদের বোঝালো যে মূর্তিপূজকদের মূর্তিগুলো ভাঙা ওদের কর্তব্য । পঁচাশিটা মন্দির ছিল, সুলতানের সেনারা তিরিশটার মতন ভাঙার পর হাল ছেড়ে দিলে । এরকম মূর্তি আমি দুনিয়ার কোথাও দেখিনি ।

রমেশচন্দ্র মজুমদার : চান্দেলারা প্রথমে কন্যাকুবজার (কান্নৌজ) গুর্জারা-প্রতিহারদের সামন্ততন্ত্র হিসাবে শাসন করেছিল। দশম শতাব্দীর চান্দেলা শাসক যশোবর্মন কার্যত স্বাধীন হয়েছিলেন, যদিও তিনি প্রতিহারদের  স্বীকৃতি অব্যাহত রেখেছিলেন। তাঁর উত্তরসূরী ধঙ্গদেবের সময়কালে, চান্দেলারা সার্বভৌম শক্তি হয়ে উঠেছিল। তারা প্রতিবেশী রাজবংশ, বিশেষত মালওয়ার পরমার এবং ত্রিপুরীর কালাচুরিদের সাথে যুদ্ধ করার সাথে সাথে তাদের শক্তি  হ্রাস পায়। একাদশ শতাব্দীর পর থেকে, চান্দেলারা গজনভি আর মুহম্মদ ঘুরিসহ  মুসলিম শাসকদের কাফের-নিধন ধ্বংসযজ্ঞে অভিযানের মুখোমুখি হয়েছিল। চান্দেলা শক্তি কার্যকরভাবে তেরো শতাব্দীর শুরুতে চাহমন ও ঘুরি আক্রমণগুলির পরে শেষ হয়ে গিয়েছিল ।

বিজয়শক্তি :  মধ্য ভারতের বুন্দেলখণ্ড অঞ্চলের চান্দেলা রাজবংশের নবম শতাব্দীর শাসক ছিলুম আমি। যদিও চান্দেলাদের নথিতে সাধারণত আমার বড় ভাই আর পূর্বসূরি জয়শক্তির সাথে আমার উল্লেখ পাওয়া যায়। আমরা দু’জনে মিলে  ৮৬৫ থেকে ৮৮৫ পর্যন্ত শাসন করেছিলুম । আমি ছিলুম বাকপতির ছেলে আর আমার বড় ভাই জয়শক্তির স্থলাভিষিক্ত হন। আমাকে ভিজা, বিজয়া এবং বিজজাকা নামেও জানতো লোকেরা । আমার পর আমার ছেলে রাহিলা চান্দেলার শাসক হয়েছিল । খাজুরাহো হলো মন্দিরের দেশ, চান্দেলাদের দেশ । খাজুরাহোতে পা রাখা মানেই চান্দেলাদের রাজত্বে ফিরে যাওয়া। চোখের ওপর আশ্চর্য মন্দিরগুলির অলঙ্করণ শিল্প ফিরিয়ে আনবে ৯৫০ থেকে ১০৫০ খ্রিষ্টাব্দের বাতাবরণ। মন্দিরের গায়ে দেবদেবী, অপ্সরা, নর্তকী, মিথুন মূর্তিগুলোতে  প্রাণস্পন্দন পাওয়া যাবে। এক্কেবারে শহরের কেন্দ্রে মন্দিরগুলোর অবস্থান। ফুলবাগিচায় সাজানো চত্বর জুড়ে কাণ্ডারীয় মহাদেব, লক্ষণ, জগদম্বা, চৌষটযোগিনী, চিত্রগুপ্ত প্রমুখ মন্দিরের রাজমালা। ভেবে দেখুন, বিদেশ থেকে এসে একদল ম্লেচ্ছ, যাদের কোনও শিল্পবোধ ছিল না, বেশিরভাগ স্হাপত্য গুঁড়িয়ে মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছে । ওদের বংশধরদের কোনও লজ্জা-শরম নেই ; ধ্বংসের কথা বুক ফুলিয়ে স্কুলের বাচ্চাদের পড়ায় ।

সবুক্তগিন : আমি তেমন বিখ্যাত নই । আমার ছেলে গজনির সুলতান মাহমুদ বেশি বিখ্যাত । আমি তো ক্রিতদাস ছিলুম । অবশ্য বলতে পারেন যে আমি গজনভি রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা আবু মনসুর  সেবুক তিগিন । ৯৭৭ থেকে ৯৯৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত কুড়ি বছর রাজত্ব করেছিলুম।  প্রথম জীবনে  দাস হলেও আমি আমার মালিক আল্প তিগিনের মেয়েকে বিয়ে করেছিলুম ।  বুখারার সামানি সাম্রাজ্যের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে প্রথমে আমার শশুর আর তারপর আমি স্বাধীনভাবে  আফগানিস্তানের  গজনির শাসক হই । আমরা নামে সামানিদের কর্তৃত্বকে স্বীকার করলেও আমার ছেলে মাহমুদ নিজেকে পুরোপুরি স্বাধীন বলে ঘোষণা করে। 

ঐতিহাসিক উমা চক্রবর্তী : কল্পিত কিংবদন্তীতে চান্দেলাদের উৎস অস্পষ্ট। রাজবংশের লিপিবদ্ধ রেকর্ডগুলির পাশাপাশি বালভদ্র-বিলাস এবং প্রবোধ-চন্দ্রোদয়ের মতো সমসাময়িক গ্রন্থগুলো থেকে  বোঝা যায় যে চান্দেলরা কিংবদন্তি-কথিত চন্দ্রবংশের অন্তর্ভুক্ত ছিল । খ্রিস্টীয় ৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে খাজুরাহো শিলালিপিতে রাজবংশের প্রথম রাজা নান্নুকা ছিলেন চান্দেলা ঋষি চন্দ্রত্রেয়, যিনি ছিলেন আত্রির পুত্র। ১০০০ খ্রিস্টাব্দে খাজুরাহো শিলালিপিতে কিছুটা আলাদা বিবরণ দেওয়া হয়েছে, যেখানে চন্দ্রাত্রেয়কে ইন্দুর (চাঁদ) পুত্র এবং আত্রির নাতি হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। ১১৯৯ খ্রিস্টাব্দে বাঘারী শিলালিপি এবং ১২৬০ খ্রিস্টাব্দ অজয়গড় শিলালিপিতে অনুরূপ পৌরাণিক বিবরণ রয়েছে। বালভদ্র-বিলাস চন্দ্রের পূর্বপুরুষদের মধ্যে অত্রির নামও রেখেছিলেন। আর একটি খাজুরাহো শিলালিপিতে চান্দেলা রাজা ধঙ্গদেবকে যাদবদের বর্ধনী বংশের সদস্য হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে  (যিনি চন্দ্র রাজবংশের অংশ হিসাবে নিজেকে দাবি করেছিলেন)।

বাকপতি :  ৮৪৫ থেকে ৮৬৫ সালে মধ্য ভারতের চান্দেলা রাজবংশের  শাসক ছিলুম।  চান্দেলার শিলালিপিতে আমার পদবী কেতিপা (“দেশের কর্তা”) হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে।  খাজুরাহোর  দুটো শিলালিপি থেকে জানা যাবে, আমার বাবা ছিলেন নান্নুকা । শিলালিপিতে আমাকে আমার সাহসিকতা, শালীনতা এবং জ্ঞানের জন্য বিখ্যাত রাজা হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে। শিলালিপিগুলোতে বলা আছে যে আমি বেশ কয়েকটি শত্রু দেশকে যুদ্ধে হারিয়েছিলুম আর আমি  প্রজাদের প্রিয় ছিলেন।আমার জ্ঞান ও বাকশক্তির জন্য আমার নাম বাকশতীর সাথে তুলনা করা হয়, যিনি ছিলেন আমাদের বক্তৃতার দেবতা। শিলালিপিতে  আরও বলা হয়েছে  যে আমি বুদ্ধির সাথে সাহসের সংমিশ্রণে পৃথু এবং কাকুৎস্যের মতো কিংবদন্তী রাজাদেরকে অতিক্রম করে গিয়েছিলুম।  ৯৫৪ খ্রিস্টাব্দের একটা শিলালিপিতে বলা হয়েছে যে বাকপতির “আনন্দ পর্বত” (ক্রিড়া-গিরি) ছিল বিন্ধ্যপর্বতে, যেখানে পদ্মের উপর বসে কিরাতা মহিলারা তাঁর সম্পর্কে গান গেয়েছিলেন, আর ময়ূররা জলপ্রপাতের শব্দে নেচেছিল। 

ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার : পূর্ব ভারতের পাল রাজা দেবপালার দক্ষিণ সম্প্রসারণকে বাকপতি সম্ভবত সমর্থন করেছিলেন। বাকপাতির দুটি পুত্র ছিল: জয়শক্তি (জেজা) এবং বিজয়শক্তি (বিজ)। তাঁর পরে তাঁর বড় ছেলে জয়শক্তি তাঁর উত্তরসূরি বিজয়শক্তি রাজ্য শাসন করেছিলেন । 

তসলিমা নাসরিন : ভারতের মধ্যপ্রদেশে একটি ছোট গ্রামের নাম খাজুরাহো। খেজুর হতো বলেই হয়তো খাজুরাহো নাম গ্রামটির। খাজুরাহোর জঙ্গলের  মন্দিরগুলো চান্দেলা রাজপুত রাজারা বানিয়েছিলেন ৯৫০ সালের দিকে। ওরা রাজত্ব করেছিল দশম শতক থেকে চতুর্দশ শতক পর্যন্ত। মহারাজা রাও বিদ্যাধরের সময় শুরু হয়েছিল খাজুরাহোর মন্দির নির্মাণ। খাজুরাহোর জঙ্গলে ৮৫টি মন্দির ছিল। এখন আছে সাকুল্যে ২৫টি। বাকিগুলো ধ্বংস করেছে শত্রুসৈন্য। গজনির সুলতান মাহমুদ ছিলেন ধ্বংসকারীদের একজন। সেই প্রাচীনকালে যৌনতার যে চর্চা ছিল ভারতবর্ষে, তার কিছু নিদর্শন দেখতে পাই মন্দিরগুলোর গায়ে। আমি তো মুগ্ধ দেখে নারীপুরুষের কামশিল্প। কোনও সংকোচ নেই কারওর। নারীও পুরুষের মতো যৌনশিল্পে দক্ষ। কবে যে রক্ষণশীলতা গ্রাস করে ফেলেছে পুরো ভারতীয় উপমহাদেশ, জানি না। সম্ভবত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীরা তাদের ভিক্টোরিয়ান রক্ষণশীলতা ভারতবর্ষে ছড়িয়ে দেওয়ার পর। মানুষের মগজধোলাই তো অনেকটাই হয়েছে। তা না হলে যৌনতার যে চিত্র আমরা ধর্মের মন্দিরে দেখি, সেই যৌনতা এত শীঘ্র এই অঞ্চলে ট্যাবু হয়ে যায় কী করে?! আজকাল তো হিন্দু আর মুসলিম— দুই ধর্মীয় মৌলবাদীই নারী স্বাধীনতাবিরোধী, খাজুরাহো মন্দিরের যৌনশিল্পের ঘোরবিরোধী তারা।কামসূত্রের অনেক আসনই দেখি মন্দিরের গায়ে। কামসূত্র ভারতবর্ষে লেখা হলেও জনপ্রিয় ভারতবর্ষের বাইরে, বিশেষ করে ইউরোপে। ভারতবর্ষের মানুষ কামসূত্রের চর্চা করে না বললেই চলে। যৌনতা, এখনকার সাধারণ হিন্দুরাও মনে করে, পাপ। গান্ধীও তো বলেছিলেন সন্তান উৎপাদনের উদ্দেশ্য ছাড়া সুখভোগের উদ্দেশে যে সেক্স করে, সে পাপ করে।মন্দিরে নারী পুরুষের যৌনশিল্প আমাকে মুগ্ধ করলেও, পশুর সঙ্গে পুরুষের সঙ্গম আমাকে ভীষণ অস্বস্তি দিয়েছে। পশু-ধর্ষণ তাহলে প্রাচীনকাল থেকেই ছিল ! পশুরা নিশ্চয়ই মানুষের সঙ্গে সঙ্গম করতে চায় না, মানুষকে সঙ্গমের অনুমতি নিশ্চয়ই দেয় না তারা। তাহলে এই সঙ্গম সঙ্গম নয়, এ নিতান্তই ধর্ষণ। সেই প্রাচীনকাল থেকে পশুপাখিদের নির্যাতন করে আসছে মানুষ। তাদের হত্যা করেছে, বন্দি করেছে, যন্ত্রণা দিয়েছে। পশুপাখিরাও পুরুষের যৌন-নির্যাতনের শিকার।এখনও সব বয়সের নারী তা আছেই, দুধের শিশুরা, এমনকী পশুও পুরুষের যৌন নির্যাতন থেকে রেহাই পায় না। পুরুষ যে কবে মানুষ হবে ! জানি সব পুরুষই মন্দ নয়, সব পুরুষই ধর্ষক নয়, কিন্তু ভালো পুরুষের ওপর তো দায়িত্ব বর্তায় পুরুষ জাতটাকে মানুষ করার। ধর্ষণের বিরুদ্ধে, নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে, পশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে ভালো পুরুষরা কেন সংগঠিত হচ্ছে না। তারা কিভাবে আন্দোলন করার দায়িত্ব শুধু ভিকটিমদের, তাদের নয়? সমাজটাকে কলুষমুক্ত করার, বৈষম্যমুক্ত করার, শুদ্ধ করার দায়িত্ব শুধু নারীদের, পুরুষদের নয়?

গজনির সুলতান মাহমুদ : এটা সত্যি যে আমার বাবা ক্রিতদাস ছিলেন বলে আমি ইনফিরিয়রিটি কমপ্লেক্সে ভুগতুম আর দুর্বলদের ওপর অত্যাচার করে নিজেকে সবার চেয়ে সুপিরিয়র মনে করতুম । গজনি আসলে বেশ গরিবদের রাজ্য ছিল । আমি নানা রাজ্য আক্রমণ করে সোনাদানা মণিমুক্ত আনতুম । যাদের যুদ্ধে হারিয়ে দিতুম তাদের রাজ্য থেকে অনেককে এনে দাস হিসেবে খাটাতুম । যেসব মেয়েদের তুলে আনতুম তাদের বিলিয়ে দিতুম আমার দরবারীদের মধ্যে ।  ৯৯৭ থেকে ১০৩০ সালে আমার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমি পূর্ব ইরানিয় এলাকা আর ভারত উপমহাদেশের উত্তর পশ্চিম অংশ , বর্তমান আফগানিস্তান ও পাকিস্তান, জয় করি।  সাবেক প্রাদেশিক রাজধানী গজনিকে এক বৃহৎ সাম্রাজ্যের সমৃদ্ধশালী রাজধানীতে পরিণত করেছিলুম। আমার সাম্রাজ্য বর্তমান আফগানিস্তান, পূর্ব ইরান ও পাকিস্তানের অধিকাংশ এলাকা জুড়ে ছিল। আমি সুলতান  উপাধিধারী প্রথম শাসক যে আব্বাসীয় খিলাফতের আনুগত্য স্বীকার করে নিজের শাসন চালু রেখেছিলুম। ১০২২ সালে আমি খাজুরাহো ধ্বংস করেছিলুম, কিন্তু সোনাদানা কিছুই পাইনি । 

তাপ্তী গুহঠাকুরতা : এটি সর্বজনবিদিত যে, ১১৯২ এর  দুই শতাব্দীর আগে, যখন আদিবাসী ইন্দো-মুসলিম রাষ্ট্র এবং জনগোষ্ঠী উত্তর ভারতে প্রথম আবির্ভূত হয়েছিল, ইরানি আর তুর্কিরা পরিকল্পিতভাবে দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান নগর কেন্দ্রগুলিতে অভিযান চালিয়ে এবং লুটপাট করে, মন্দিরগুলো ভেঙে ফ্যালে  এবং প্রচুর সোনা মণিমুক্ত দাস-দাসী ও তরুণীদের পূর্ব আফগানিস্তানে নিজেদের ঘাঁটিতে নিয়ে যায়। রীতিটি শুরু হয়েছিল ৯৮৬ সালে, যখন গজনভির সুলতান সবুকতিগিন ( ৯৭৭-৯৯৭এর রাজত্বকালে) হিন্দু  রাজাদের আক্রমণ করে হারিয়েছিল ।তারা কাবুলের উত্তর-পশ্চিম পাঞ্জাবের মধ্যবর্তী অঞ্চলটি নিয়ন্ত্রণ করতো । সুলতানের ছেলের একান্ত সচিব আবু নসর `উতবির মতে, সাবুক তিগিন লামঘান (কাবুলের তাৎক্ষণিক পূর্বে অবস্থিত) অভিমুখে যাত্রা করেছিল, এটি একটি বিশাল শক্তি ছিল সেই সময়ে আর সমৃদ্ধ শহর হিসাবে চিহ্নিত ছিল । সাবুকতিগিন এটি আক্রমণ করেছিল আর কাফেরদের বসবাসের আশেপাশের জায়গাগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেয় । তারপর মূর্তি-মন্দির ভেঙে সাবুকতিগিন সেখানে ইসলামধর্ম প্রতিষ্ঠা করেছিল ।

ব্রিটিশ ইন্ডোলজিস্ট ভি. এ. স্মিথ :  চান্দেরালরা ভর বা গোন্ডের কোন এক উপজাতি ছিল । আর সি সি মজুমদার সহ আরও কয়েকজন পণ্ডিত এই তত্ত্বকে সমর্থন করেছিলেন। চান্দেলারা মানিয়া নামে একটি উপজাতির দেবী উপাসনা করতেন, যার মন্দিরগুলি মহোবা এবং মানিয়াগড়ে রয়েছে ।   গোন্ডের সাথে সম্পর্কিত  জায়গা গুলোর সাথে তাদের সম্পর্ক রয়েছে। এছাড়াও, রানী দুর্গাবতী, যার পরিবার দাবি করেছিল যে চান্দেলা বংশোদ্ভূত গারহ-মন্ডলার একজন গন্ড প্রধানকে বিয়ে করেছিলেন। ঐতিহাসিক আর. কে. দীক্ষিত এই যুক্তিগুলি বিশ্বাসযোগ্য মনে করেন না । তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন যে মানিয়া কোনও উপজাতি দেবতা ছিলেন না। এছাড়াও, গোন্ড অঞ্চলের সাথে রাজবংশের যোগসূত্রটি  কোনও সাধারণ বংশোদ্ভূত হওয়ার ইঙ্গিত দেয় না । রাজবংশের পূর্বসূরিদের এই অঞ্চলগুলিতে শাসক পদে পোস্ট করা হতে পারে।  গোন্ড প্রধানের সাথে দুর্গাবতীর বিবাহকে এক-কথায় খারিজ করা যেতে পারে।  চান্দেলারা মূলত গুজর-প্রতিহারের প্রতিনিধি ছিল। নান্নুকা  রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। খাজুরাহোকে কেন্দ্র করে একটি ছোট রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন। 

চন্দ্রবর্মণ : সুলতানটা মূর্খ ছিল । ব্যাটা জানতো না শিল্প কাকে বলে । নিজের হারেমে হাজার খানেক বউ-বাঁদি-রাখেল নিয়ে রেলা করেছে সারাজীবন, আর মূর্তিগুলো দেখে ওর গায়ে জ্বর এলো, মাথা গণ্ডোগোল হয়ে গেল । মন্দিরগুলো গড়তে কতো শিল্পীকে দিনের পর দিন কাজ করতে হয়েছে, কতো শ্রমিককে সকাল-সন্ধ্যা পাথর বয়ে আনতে হয়েছে, তা খেয়াল করলো না । একশো বছর লেগেছিল, আর সুলতান ব্যাটা যখন দেখলো এখানে সোনাদানা নেই তখন তিন দিনে যতোটা পারলো মাটিতে মিশিয়ে কেটে পড়ল । যত্তোসব বহিরাগত ইডিয়ট ।

সিকন্দর লোদি : আসলে আমার মা ছিলেন হিন্দু স্যাকরার মেয়ে । সুন্নি আলেমরা আমাকে খুব হ্যাটা করতো । লুকিয়ে হাসাহাসি করে বলতো কাফারের বাচ্চা কোথাকার । আমি যখন খবর পেলুম যে খাজুরাহোতে অনেক মন্দির আছে তখন ভাঙচুর করতে বাধ্য হলুম । তাছাড়া আমি আব্বাসীয় খিলাফতকে মানতুম, কেননা নবী মুহাম্মদ এর চাচা আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিবের বংশধরদের  ৭৫০ খ্রিস্টাব্দে কুফায় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ৭৬২ খ্রিস্টাব্দে বাগদাদে রাজধানী নিয়ে যান। আসল ভাঙাভাঙি করেছিল  গজনির সুলতান মাহমুদ । ও ভেবেছিল সোমনাথ মন্দিরের মতন এখানকার মন্দিরেও সোনাদানা মণিমুক্ত পাবে । সেসব না পেয়ে ক্ষেপে গিয়ে আরও ভাঙাভাঙি করেছে । কিন্তু আমাকে পদে-পদে প্রমাণ করতে হয়েছে আমি খাঁটি মুসলমান। তাই আমি সালার মাসুদের বার্ষিক শোভাযাত্রা নিষিদ্ধ করেছিলুম আর হুকুম দিয়েছিলুম যে মেয়েরা কোনও সন্তের মাজারে যেতে পারবে না । মরবার দিন পর্যন্ত ভুলিনি যে আমার গায়ে মূর্তিপুজক কাফেরের রক্ত ।

হজরত ইবলিশ : এখন বুঝলি ? আমি তোদের সবায়ের ঘাড়ে চেপে আল-হিন্দে টেনে এনেছিলুম ।

জয়শক্তি : আমি বাবা বাকপাতির উত্তরসূরি । আমি জেজা বা জেজক নামেও পরিচিত। মহোবায় প্রাপ্ত একটি শিলালিপিতে বলা হয়েছে যে চান্দেলা অঞ্চলটিকে (পরে বুন্দেলখণ্ড বলা হয়) আমার নামানুসারে “জেজকভূক্তি” রাখা হয়েছিল। চান্দেলার নথিগুলোতে আমার আর বিজয়শক্তি সম্পর্কে বেশিরভাগ তথ্য প্রকৃতির গৌরবময়, এবং অল্প ঐতিহাসিক গুরুত্বের, তার কারণ আমাদের রাজত্বে স্হপতি ও ভাস্কর অনেক ছিল কিন্তু লেখক বেশি ছিল না।  এই নথিগুলোতে উল্লেখ করা হয়েছে যে আমরা আমাদের শত্রুদের ধ্বংস করেছিলুম, কিন্তু পরাজিত কোনও শাসকের নাম লেখকরা উল্লেখ করেনি ।কালাচূড়ির রাজা কোক্কাল  চান্ডেলার রাজকন্যা নাভ-দেবীকে বিয়ে করেছিলাম। বিষয়টা অবশ্য তর্কসাপেক্ষ । ঐতিহাসিক আর সি সি মজুমদারের মতে এই রাজকন্যা জয়শক্তির কন্যা হতে পারেন। আবার ঐতিহাসিক আর. কে. দীক্ষিত বিশ্বাস করেন যে মেয়েটি সম্ভবত রাহিলার মেয়ে বা বোন ছিলেন।ওনারা মনে করেন আমি  সম্ভবত উত্তরাধিকারী না রেখে মারা গিয়েছিলুম, যার কারণে আমার ছোট ভাই আমার সিংহাসনে বসেছিল ।

আবু রিহান-আল-বিরুনি : গজনির সুলতান মাহমুদের সঙ্গে আমি ছিলুম যখন ও খাজুরাহোর মন্দিরগুলো ভাঙছিল। ও বেটা ভেবেছিল এই মূর্তিগুলোর ভেতরে সোমনাথ মন্দিরের মতন অঢেল মণিমুক্ত সোনাদানা আছে। সোমনাথ মন্দিরে আক্রমণের কারণে এখনো মুসলিমদের কাছে মাহমুদ একজন ইসলাম প্রচারক বীর যোদ্ধা। পাকিস্তানের জাতীয় পাঠ্যক্রমে মাহমুদের ভারত আক্রমণকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে পড়ানো হয়। মাহমুদ বুঝতে পেরেছিল, হাজার হাজার হিন্দু সোমনাথে পুজো দেবার সময় বিপুল পরিমাণ অর্থ সম্পদ দক্ষিণা হিসেবে মন্দিরে দিতো। ফলে সোমনাথ মন্দির ছিল  ধন-সম্পদ, সোনা, রত্নের বিশাল ভাণ্ডার। মাহমুদের সতেরোতম আক্রমণ ছিল সোমনাথ মন্দিরে লুট করার উদ্দেশ্যে। রাজপুত সৈন্যবাহিনী সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ করলেও সোমনাথ মন্দিরের শেষ রক্ষা করতে পারেনি। তিনদিন যুদ্ধের পর মাহমুদের বাহিনী মন্দিরে ঢুকে পড়ে, মন্দিরের সব মূর্তি এবং শিবলিঙ্গ ভেঙে ফেলে, সোনার মূর্তি, মূল্যবান পাথর, নগদ অর্থ, অলংকার যা ছিল সব নির্বিচারে লুট করে নিয়ে যায়, মূর্তি যেহেতু ইসলামে নিষিদ্ধ তাই মাহমুদ সোনার মূর্তি গলিয়ে  ২ কোটি দিনার মুদ্রায় পরিণত করে। মাহমুদ সোমনাথ মন্দির লুটের সময় ৫০০০ রাজপুত সৈন্যকে মন্দিরের মধ্যেই ধড় থেকে মাথা আলাদা করে দিয়েছিল ।

হজরত ইবলিশ : আরে গজনির মাহমুদটা তো জাহিল । পাকিস্তানের আরেক নাম জাহিলিয়া, জানিস না ?

দিল্লীর গার্গী কলেজের ইতিহাসের অধ্যাপক মীনাক্ষী জৈন :  মাহমুদ সোমনাথ মন্দির এতটাই ধ্বংস করে দিয়েছিল যে ১০২৫ থেকে ১০৩৮ সাল পর্যন্ত সেখানে কোনও তীর্থযাত্রী যেতে পারেনি। তুর্কি-ইরানি সাহিত্যে মাহমুদের সোমনাথ মন্দিরে আক্রমণের ইতিহাসকে মহিমান্বিত করে উপস্থাপিত হয়। মাহমুদের আক্রমণে সোমনাথ মন্দিরের নগরী সৌরাষ্ট্রে ৫০,০০০ মানুষের মৃতদেহের যে স্তূপ জমে উঠে তা সৎকার করার মত অবশিষ্ট লোক পর্যন্ত ছিল না।

হজরত ইবলিশ : ওর ঘাড়ে তো আমিই চেপে ছিলুম । এখন ব্যাটা জাহান্নমে গরম তেলেতে টগবগ করে ফুটছে।

ইবন বাতুতা : কুতুবুদ্দিন আইবকও সুলতান মাহমুদের দেখাদেখি গিয়েছিল খাজুরাহোতে । ও বেটা মূর্তিগুলো ভেঙেছিল কেননা ওগুলো ওর যৌনতাকে চাগিয়ে তুলছিল অথচ মাঠের মধ্যে মেয়েদের ধরে-ধরে ধর্ষণ করতে পারছিল না ; সে কাজগুলো করছিল ওর সেনারা, ঘোড়ায় তুলে নিয়ে খোলা মাঠেই ধর্ষণ করছিল । কুতুব উদ্দিনের মূল কৃতিত্ব আসলে রাজ্য বিস্তারের থেকেও ইসলামের প্রচার আর প্রসার ।  কুতুবউদ্দিন আইবেক কমপক্ষে এক হাজার মন্দির ধ্বংস করে সেই ভিত্তির উপরেই নতুন করে মসজিদ নির্মাণ করেছিল। হিন্দুদের উপর ন্যক্কারজনক হত্যা, নিপীড়ন, তাদের মন্দির দখলের প্রক্রিয়া চলতেই থাকল শাসক শ্রেণীর প্রত্যক্ষ মদতে আর ছত্রছায়ায়। দিল্লীর জামে মসজিদের পূর্বদিকের প্রবেশপথে কোরআনের আয়াত লেখা সোনার পাতগুলো বানানো হয়েছে বিভিন্ন মন্দির থেকে লুট করা সাতাশটা সোনার প্রতিমা গলিয়ে। 

হজরত ইবলিশ : তাহলেই বোঝো কেমন প্রজাবৎসল শাসক ছিল ।

কিশোরী শরণ লাল : কুতুবউদ্দিন আইবেকের মন্দির এবং প্রতিমা ভাঙার খ্যাতি অতীতের সবাইকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল, তার সমসাময়িক বা পরেও মন্দির বা প্রতিমা ভাঙার ক্ষেত্রে তার ধারে কাছে কেউ নেই।তাদের ওসকাতে ইরান, আফগানিস্তান থেকে দলে আসতে লাগল সুফি দরবেশ, ইসলামী পণ্ডিত। রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টায় এবং পৃষ্ঠপোষকতায় স্থানীয় হিন্দুদের ইসলামের দাওয়াত দেয়া চলতে লাগল সমানতালে। পরিস্থিতি কেমন ছিল, একটা উদাহরণ দিলে হয়ত একটু বোধগম্য হবে, কুতুবউদ্দিন আইবক যখন কৈল/কালিঞ্জার, এখনকার আলীগড়ে পৌঁছায়, তখন যেসব সৈন্য বুদ্ধিমান এবং ভবিষ্যৎ বুঝতে পেরেছিল, তারা দলে দলে ইসলাম কবুল করতে শুরু করে। আর যারা নিজেদের আবহমান কাল ধরে পিতৃপুরুষের প্রচলিত ধর্ম ত্যাগ করে ইসলামের ছায়া তলে আসেনি তারা চিরতরে তলোয়ারের ছায়াতলে চলে যায়। আলীগড়ে মুসলমানের আধিক্য এই কারণেই আর ওরা সেই জন্যই আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় খুলতে পেরেছিল ।

কুতুবউদ্দিন আইবক : আমার পূর্বপুরুষেরা ছিল তুর্কি হাবশি  । আমার একটা আঙুল কাটা  । শৈশবে হাবশি  দাস  হিসেবে বিক্রি করা হলে আমাকে কেনে  ইরানের খোরাসান অঞ্চলের  নিসাপুরের প্রধান কাজী  । কাজী  আমাকে পড়াশোনার সুযোগ দিয়েছিল, আর ফার্সি এবং আরবি ভাষায় দক্ষ করে তোলে। সেই সঙ্গে আমাকে তীর চালানো আর ঘোড়ায় চড়া শিখিয়েছিল ।কাজি মারা যাবার পরে ওনার ছেলে আমাকে আবারও এক দাস বণিকের কাছে বিক্রি করে দেয়। আমাকে এবার কিনে নেয় গজনির গভর্নর জেনারেল মুহাম্মদ ঘুরি।  মুহাম্মদ ঘুরি আমাকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দেয় আর নিজের সহচর হিসেবে নিয়োগ করে। আমিও ইনফিরিয়রিটি কমপ্লেক্সে ভুগতুম, আমার কাটা আঙুল, কেনা গোলাম আর গায়ের রঙ কালো বলে ।  হাসান নিজামী ঠিকই বলেছে যে আমার নির্দেশে হিন্দু মন্দির ভেঙে মসজিদ তৈরি করা হত, যেমন স্থাপত্যিক ধ্বংসাবশেষ দিয়ে দিল্লির কুতুব মিনার কমপ্লেক্স এবং আজমিরের আধাই দীন কা ঝোপড়া তৈরি করা হয়েছে । আমি বেশিদিন রাজত্ব করিনি ;   সুলতান হিসেবে ১২০৬ থেকে ১২১০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ,মাত্র চার বছর  সুলতানগিরি করেছিলুম ।ওইটুকু সময়েই খাজুরাহোর অনেকগুলো মন্দির ভেঙে মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছিলুম । কুতুব মিনার তৈরি করতে অনঙ্গপাল তোমারের দুর্গ ভেঙে তার মালমশলা ব্যবহার করেছিলুম । অনঙ্গপালের লোহার মিনার কুতুবমিনারের পাশেই আছে । দেখেছেন নিশ্চয়ই ?

হজরত ইবলিশ : কুতুবউদ্দিন আইবক শাসক না হলে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় সম্ভব হতো না ; ওখানে অতো ছাত্র-ছাত্রীর জমায়েত তো কাফেরদের ধর্ম পালটানোর কারণে ।

তসলিমা নাসরিন : খাজুরাহোর পুলিশদের একজনের নাম বিধু বিশ্বাস। আমার সঙ্গে বাংলায় কথা বলেছেন। পূর্ববঙ্গে ছিল তাঁর পূর্বপুরুষের বাড়ি, ১৯৬৫ সালে বাবা মা চলে আসেন ভারতের মধ্যপ্রদেশে, এখানেই বাবার চাকরি হয়ে যায়, এখানেই স্থায়ীভাবে থেকে যান। বিধু বিশ্বাস কোনও দিন পূর্ববঙ্গে যাননি, ঢাকায় তাঁর পূর্বপুরুষের ভিটেমাটিও দেখেননি। নচিকেতার গান শুনেছেন ? জিজ্ঞেস করে টের পেলাম নচিকেতার নামই শোনেননি কখনও। বাংলাটা বলতে শিখেছেন বাড়িতে বাবা মা বাংলা বলতেন বলে, আর প্রতিবেশীদের অনেকে ছিলেন বরিশাল থেকে আসা, তাদের কাছ থেকেও শিখেছেন বাংলা। বাংলা পড়তে পারেন কি না জিজ্ঞেস করলে আমার আশঙ্কা হয় বিধু বিশ্বাস বলবেন যে তিনি বাংলা পড়তে পারেন না। এই উত্তরটি শুনতে ভালো লাগবে না বলেই জিজ্ঞেস করিনি। তাঁর বাবা নাকি একবার বলেছিলেন, ‘দেশের গাছ থেকে আম খেতাম, এত বড় বড় কাঁঠাল হতো কাঁঠাল খেতাম, পেয়ারা খেতাম, লিচু খেতাম, পুকুরের মাছ খেতাম, আহা কী সুখেই না ছিলাম! এ কোন দেশে এলাম, এখানে তো মাটি নেই, চারদিক শুকনো, কিছুই ফলে না, চারদিকে শুধু পাথর, শুধু পাথর।’ বিধু বিশ্বাস আমার মনে হয় তাঁর বাবার কথাগুলো শুধু শুনে গেছেন, অনুভব করতে পারেননি। তাঁর জন্ম, বেড়ে ওঠা, সব মধ্যপ্রদেশে। মধ্যপ্রদেশের বাইরেও কোথাও যাননি। জানেন না বাংলা ঠিক কাকে বলে, কেমন দেশকে বাংলাদেশ বলে। তাঁকে বলি একবার ঢাকা ঘুরে আসতে। একবার দেখে আসতে তাঁর বাপ-দাদার ভিটেমাটি, দেখে আসতে গাছগাছালি, পুকুর নদী। মনে আছে নচিকেতা কেমন কেঁদেছিলেন পূর্বপুরুষের মাটিতে গিয়ে ! জানি না বিধু বিশ্বাস সেভাবে কাঁদবেন কি না। ধর্মের কারণে মানুষের উদ্বাস্তু হওয়াটা আমাকে কাঁদায়। ‘ফেরা’ নামে একটি উপন্যাস লিখেছিলাম অনেক আগে, ওই উপন্যাসে লিখেছিলাম নিজের দেশের মাটি ত্যাগ করার কষ্টের কথা। আমার নিজের কিন্তু তখনও নির্বাসন দণ্ড হয়নি। তার আগেই মানুষের নির্বাসনের কষ্টটা কী করে অনুভব করেছিলাম জানি না। ধর্মের কারণে মানুষ নিষ্ঠুর হয়েছে, স্বার্থান্ধ হয়েছে। নিষ্ঠুরতা আর স্বার্থান্ধতার কারণে লক্ষ লক্ষ মানুষ দেশত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছে। বিধু বিশ্বাসের বাবার মতো কত মানুষ যে উদ্বাস্তু হয়েছে, নিজের ভাষা আর সংস্কৃতি থেকে দূরে সরতে বাধ্য হয়েছে! বিধু বিশ্বাসের ছেলে মেয়েরা কি নিজেদের বাঙালি বলে? হয়তো বলে না। কিন্তু বিধু বিশ্বাস ইচ্ছে করলে যেতে পারেন বাংলাদেশে, ঘুরে বেড়াতে পারেন ও দেশে। আমি পারি না। আমারই অনুমতি নেই বাংলাদেশে ফেরার। মাঝে মাঝে ভাবি ওরা অমুসলিম হয়ে যত অপরাধ করেছে, আমি অধার্মিক হয়ে তার চেয়েও বেশি অপরাধ করেছি। আসলেই কি আমরা অপরাধ করেছি? নাকি তারাই অপরাধী যারা আমাদের আদর্শ বা বিশ্বাসের কারণে আমাদের অত্যাচার করে, আমাদের ধর্ষণ করে, হত্যা করে, আমাদের জেলে পোরে, নির্বাসনে পাঠায়?

রাহিলা :  আমি  বিজয়শক্তির ছেলে । আমার রাজত্বকাল ৮৮৫ সাল থেকে ৯০৫ সাল ।অন্যান্য প্রারম্ভিক চান্দেলা শাসকদের মতো আমিও প্রতিহারের অধস্তন ছিলুম।আমি বহু সামরিক অভিযান চালিয়েছিলুম যার কথা পাওয়া যাবে আমার বংশধরদের লেখা  দুটো খাজুরাহো শিলালিপিতে  । শিলালিপিতে যোদ্ধা হিসাবে আমার প্রশংসা করা হয়েছে ।  ‘পরমালা রাসো’ কিংবদন্তিতে, আমার সামরিক অভিযানের  বিবরণ আছে । প্রজাদের জন্য আমি  বেশ কয়েকটা কাজ করেছিলুম ।  অজয়গড় মন্দিরের শিলালিপিতে আমার নাম আছে । মহোবার রহিল্য সাগর হ্রদ, যার তীরে একটা মন্দির আছে, তা আমার নামে । ‘পরমালা রাসো’ অনুযায়ী  রাজাবাসিনী জনপদটা প্রতিষ্ঠা করেছিলুম, যা বাদৌসার কাছে এখন রসিন গ্রাম । এই গ্রামে চান্দেলা ধাঁচের মন্দির আছে। 

যশোবর্মণ : কোনও ব্যাটা নেড়ে রাজা-সুলতান মন্দিরগুলোর পেছনে যে কাহিনি আছে তা জানার চেষ্টা করেনি। গল্পটা এই রকম । বারানসীতে হেতম্বী নামে পরমা সুন্দরী এক ব্রাহ্মণ কন্যা ছিলেন। অল্প বয়সেই তিনি বিধবা হন। একবার গ্রীষ্মের এক জ্যোৎস্না আলোকিত রাতে তিনি যখন ঝিলের জলে স্নান করছিলেন, তখন স্নানরতা অবস্থায় তাঁকে দেখে চন্দ্রদেব মুগ্ধ হন ও তাঁকে কামনা করেন। চন্দ্র মানুষের রূপ ধারণ করে পৃথিবীতে আসেন এবং হেতম্বী ও চন্দ্রদেব মিলিত হন। শারীরিক মিলনের ফলে হেতম্বী গর্ভবতী হয়ে পড়েন ও নিজের ভুল বুঝতে পেরে চিন্তিত হয়ে পড়েন। চন্দ্রদেব তখন ভবিষ্যৎবাণী করেন যে হেতম্বীর গর্ভে যে সন্তান আছে, সে হবে বিপুল ক্ষমতার অধিকারী ও খাজুরাহোর প্রথম রাজা। হেতম্বী বারানসী ত্যাগ করে দূরে খেজুরবনে গিয়ে সন্তানের জন্ম দেন। সন্তানের জন্মের পর হেতম্বী তাঁর নাম রাখেন চন্দ্রবর্মণ। পিতার মতোই সে সাহসী ও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। চন্দ্রের আদেশে চন্দ্রবর্মণ ওই এলাকায় মন্দির নির্মাণ করেন ও মন্দিরগাত্রে চন্দ্রপ্রভাবিত মূর্তি খোদাই করেন।  হেতম্বী আর চন্দ্রদেবের কাম ও প্রেমের নিদর্শন হিসেবেই খাজুরাহো মন্দির তৈরি করিয়েছিলুম । বেশিরভাগটাই দেবদেবীদের মিলন মুহূর্তের ছবি। নগ্ন শরীর, আর যৌনতা––প্রাচীন বা ভারতীয় ঐতিহ্যে বিভিন্ন সংস্কৃত কাব্যে দেখি যে এই সমস্তর অনুপুঙ্খ বিবরণ। অর্থাৎ প্রাচীনকালে ভারতীয় সংস্কৃতিতে মিলনের বর্ণনাকে অশ্লীল বলে চিহ্নিত করা হয়নি । তাই মন্দির জুড়ে শুধু যৌনতা আর কামের ছবি। চন্দ্রের ভবিষ্যৎবাণী ছিল এই মন্দির  হেতম্বীকে তার পাপ থেকে মুক্তি দেবে। যাঁরা খাজুরাহো দেখতে আসেন তাঁরা নিজস্বপাপ মুক্তির জন্য আসেন ।

চন্দ্রবর্মণ : চন্দ্র দেবতা এবং এক রূপসী ব্রাহ্মণকন্যা হেমবতীর মিলনে এক পুত্র জন্মায়৷ নাম দেওয়া হয় চন্দ্রবর্মন৷ আমি সেই চন্দ্রবর্মন, যার হাতে চান্দেলা রাজবংশের জন্ম৷ খাজুরাহো ছিল চান্দেলা রাজপুত রাজাদের রাজধানী৷ চন্দ্রবর্মনের হাতে শুরু হয়ে ৯৫০ সাল থেকে ১০৫০ সাল পর্যন্ত একশো বছর ধরে বংশের নানা রাজার সময়ে বেলেপাথরের পঁচাশিটা মন্দির গড়ে ওঠে খাজুরাহোয়৷ তৈরি হয়েছে সৃষ্টিরক্ষার দেবতা বিষ্ণু ও সৃষ্টি-ধ্বংসের দেবতা শিবের এইসব মন্দির৷ অবস্থান হিসাবে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে খাজুরাহোর মন্দিররাজি : পশ্চিম, পূর্ব ও দক্ষিণ । এক,  অনবদ্য লক্ষ্মণ– পশ্চিমের মন্দির, বারোটা মন্দির নিয়ে৷ মিথুন মূর্তির আধিক্য ঘটেছে লক্ষ্মণ মন্দিরের নিম্নভাগে৷ দুই, যুদ্ধ জয়ের স্মারক– রয়েছে একত্রিশ মিটার উঁচু শিখরওয়ালা কাণ্ডারীয় মহাদেব মন্দির৷ খাজুরাহোর বৃহত্তম আর উচ্চতমও বটে ।  গজনির মাহমুদের সাথে যুদ্ধজয়ের স্মারক রূপে ১০৩০-এ মহারাজা বিদ্যাধরের তৈরি কান্ডারীয় মন্দির৷ তিন, পান্নার শিব জগদম্বা থেকে সামান্য উত্তরে পুবমুখী চিত্রগুপ্ত অর্থাৎ সূর্য মন্দির৷ অর্ধমণ্ডপ, মহামণ্ডপ, অন্তরাল ও সভাগৃহ–চার স্তরে তৈরি মন্দিরের ভাস্কর্য  ৷ সিলিং-এর অলঙ্করণে অভিনবত্ব আছে৷চার, দুলাদেও– দুলাদেও অর্থাৎ নববধূ৷ দুলাদেও আর চতুর্ভুজ এই দুই মন্দির নিয়ে দক্ষিণমন্দির গোষ্ঠী৷ মূল চবুতরা থেকে দেড় কিলো মিটার দক্ষিণে দুলাদেও মন্দির৷

হজরত আদম : খাজুরাহোর মন্দিরগুলোর আনাচে কানাচে রয়েছে নানা ঐতিহাসিক কাহিনী। একটা গল্প পাপমোচনের আবার একটা  অভিশাপের। হেতম্বী চন্দ্রদেবের সঙ্গে মিলনের পাপবোধে ভুগছিলেন। তাকে সেই পাপবোধ থেকে মুক্তি দিতেই তার সন্তান চন্দ্রবর্মন রতিক্রিয়ায় রত এই পঁচাশিটা মূর্তি নির্মাণ করান। সব মূর্তিতেই  দেব-দেবীদের দেখানো হয়েছে।  আরেকটি কাহিনী রয়েছে অভিশাপের। খাজুরাহো গ্রামে এক সাধু আসেন। তিনি তার শিষ্যদের সেখানে রেখেই যান কোথাও। সেই সময়েই তার শিষ্যরা এক রোগে আক্রান্ত হয়েছিল। তবে গ্রামের কেউই তাদের সাহায্য করেনি ভেষজ বা জল দিয়ে। সাধু ফিরে এসে সেইসব কথা জানতে পেরে রেগে গিয়ে গ্রামবাসীদের অভিশাপ দিয়েছিলেন যে পাষাণের মতো কঠোর বাসিন্দারাও পাথর হয়ে যাবে। সেই থেকেই গ্রামবাসীরা নাকি পাষাণে পরিণত হয়েছে কামরত অবস্থায়। আবার অন্যদিকে এক মহিলা তাদের শুধুমাত্র অল্প সাহায্য দিতে এগিয়ে এসেছিলেন। তার ভূমিকায় মুগ্ধ হয়ে সাধু তাকে বলেছিলেন পিছনে না তাকিয়ে গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে। তবে কৌতূহলী মেয়েটি তার বিপরীত কাজটি করেছিল। কিছুদূর গিয়েও সাধুর আদেশ অমান্য করে পিছনে ফিরতেই সেও পাথর হয়ে যায়। সেই থেকেই এই মন্দিরে সন্ধের পর আর কেউ যায় না, পাথর হয়ে যাওয়ার ভয়ে।

যশোবর্মণ : খাজুরাহো (খর্জুরবাহক) স্মারকগুলো রাজপুত বংশোদ্ভুত চান্দেল রাজবংশের অধীনে ৯৫০ ও ১০৫০ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে নির্মিত।   এই সময়টা ছিল আমাদের রাজবংশের শাসনের স্বর্ণযুগ। বর্তমানে এই স্মারকসমূহের যেগুলো অক্ষত অবস্থায় আছে সেগুলো যৌথভাবে হিন্দু ধর্ম এবং জৈন ধর্ম-এর স্থাপত্য। এগুলোতে  নানান স্থাপত্যশৈলীর বিস্ময়কর মিশ্রণ দেখা যায়। এই স্থাপত্যের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন কন্দারিয়া মন্দির। ছয় বর্গকিলোমিটার আয়তনবিশিষ্ট মন্দিরপ্রাঙ্গণে নির্মিত পঁচাশিটা মন্দিরের মধ্যে মাত্র বাইশটা মন্দির এখনো টিকে আছে ; বাকিগুলো ভেঙে দিয়ে গেছে বহিরাগত ম্লেচ্ছ শাসকরা। মধ্যপ্রদেশে অবস্থিত এই অঞ্চলটি ১৯৮২ সালের ১৫ অক্টোবর ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকার অন্তর্ভুক্ত হয় । দ্বাদশ শতাব্দীর ম্লেচ্ছ-আক্রমণের আগে চন্দেলা সংস্কৃতির অনন্য এবং মৌলিক শিল্পকৌশলের নিদর্শন ও প্রমাণ এবং একটি সাংস্কৃতিক সম্পত্তি হিসাবে মন্দিরগুলো পৃথিবীর বিস্ময় ।

ঐতিহাসিক লীলা গান্ধি : অঞ্চলটা ঐতিহাসিকভাবে অনেক রাজ্য এবং সাম্রাজ্যের অংশ ছিল। খাজুরাহোর এই অঞ্চলে সর্বাধিক পরিচিত শক্তি ছিল ভটসা। এই অঞ্চলে তাদের উত্তরসূরিদের মধ্যে মৌর্য, সুঙ্গাস, কুশান, পদ্মাবতীর নাগ, ভাকাতক রাজবংশ, গুপ্ত, পুষ্যভূতি রাজবংশ এবং গুজরা-প্রথর রাজবংশ অন্তর্ভুক্ত ছিল। গুপ্ত আমলে বিশেষত এই অঞ্চলে স্হাপত্য এবং শিল্পের বিকাশ ঘটেছিল, আর তাদের উত্তরসূরীরা শৈল্পিক ঐতিহ্য অব্যাহত রেখেছিল।  চান্দেলারা এই অঞ্চলটি নবম শতাব্দী থেকে শাসন করেছিলেন যদিও তারা গুজারা-প্রথারাসের অধীন ছিল। ধঙ্গদেবের রাজত্বকালে চান্দেলা স্বাধীন হয়েছিল এবং এই সময়ে অনেকগুলি গুরুত্বপূর্ণ মন্দির নির্মিত হয়েছিল। ১১৮২ সালে শাকম্ভরীর চাহামানাসের পরে কুতুব উদ্দিন আইবক  ১১০২ সালে চান্দেলাদের মারাত্মক আক্রমণ করে। চান্দলারা মহোবা, কালিনজর এবং অজয়গড়ের দুর্গে চলে যাওয়ার ফলে খাজুরাহো একটি ছোট্ট গ্রামে পরিণত হয়। ইবনে বতুতা খাজুরাহো ঘুরে দেখেছিল এবং মন্দিরের উপস্থিতি এবং কয়েকজন তপস্বীর বর্ণনা দিয়েছিল। কিছু মন্দির ১৪৯৯ সালে সিকান্দার লোদি দ্বারা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল। ষোড়শ শতাব্দীর মধ্যে খাজুরাহো একটি তুচ্ছ জায়গা হয়ে যায় এবং ১৮১৯ সালে সিজে ফ্রাঙ্কলিন (সামরিক সমীক্ষক) দ্বারা  “পুনরায় আবিষ্কার” করার আগে এলাকাটি অবহেলিত ছিল। তবে খাজুরাহোকে বিশ্বের নজরে ফিরিয়ে আনার প্রকৃত অবদান টি.এস. বার্ট-এর (একজন ব্রিটিশ সেনা ক্যাপ্টেন)  যিনি এটি ১৮৩৮ সালে পরিদর্শন করেছিলেন। পরবর্তী উল্লেখযোগ্য দর্শনার্থী ছিলেন ১৮৫২ থেকে ১৮৫৫ সালের মধ্যে আলেকজান্ডার কানিংহাম। 

ধঙ্গদেব :  শিলালিপিতে আমি ধঙ্গদেব নামে খ্যাত, ভারতের চান্দেলা রাজবংশের একজন রাজা ছিলুম। আমি জেজকভূক্তি অঞ্চলে (বর্তমান মধ্য প্রদেশে বুন্দেলখন্ড) শাসন করতুম। আমি প্রতিহরদের অধীনতা অস্বীকার করে চান্দেলাদের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিলুম।  বিশ্বনাথ মন্দির সহ খাজুরাহোতে চমৎকারর মন্দিরগুলি গড়িয়েছিলুম । আমার বাবা ছিলেন যশোবর্মণ এবং তাঁর রানী পুপা (পুষ্প) দেবী। আমার রাজত্বকালে  প্রথম শিলালিপি ৯৫৩-৯৫৪ সালের  চতুরভুজ শিলালিপি। এর আগেই আমি সিংহাসনে আরোহণ করেছিলুম। আমার আরোহন বিতর্কিত ছিল, কারণ তাঁর ভাই কৃষ্ণকে রাজ্যের মালওয়া সীমান্ত রক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছিল।  আমার সময়ের অন্যান্য শিলালিপিগুলির মধ্যে রয়েছে নানারা (বা নানৌউরা) শিলালিপি, ৯৯৮ সালের এবং খাজুরাহোতে লালাজি শিলালিপি — ৯৯৯ সালের ।  বংশধরদের শিলালিপিতেও আমার নাম পাওয়া যাবে।

ঐতিহাসিক বিশ্বনাথ দত্ত : পরবর্তী মধ্যযুগীয় গ্রন্থগুলো ছত্রিশটা রাজপুত বংশের মধ্যে চান্দেলাকে অন্তর্ভুক্ত করেছে করে, যদিও সেই সময়কালে রাজপুত বলে কিছু ছিল না । তারা ষোড়শ শতাব্দীতে আবির্ভূত হয়েছিল। এই ধরনের গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে মহোবা-খন্দ, বর্ণ রত্নাকারা, পৃথ্বীরাজ রাসো এবং কুমারপাল-চরিত। বংশের উৎসের মহোবা-কাণ্ড কিংবদন্তিটি এইরকম: বেনারসের গহরওয়ার রাজার পুরোহিত হেমরাজের এক সুন্দর কন্যা ছিল, যার নাম হেমাবতী। একবার, হেমাবতী যখন একটি পুকুরে স্নান করছিলেন, তখন চাঁদ দেবতা চন্দ্র তাকে দেখে তাঁর প্রতি প্রেম করেছিলেন। অবিবাহিত মা হওয়ার অসম্মান নিয়ে হেমাবতী উদ্বিগ্ন ছিলেন, কিন্তু চন্দ্র তাকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে তাদের পুত্র মহান রাজা হয়ে উঠবেন। এই শিশুটি ছিলেন রাজবংশের পূর্বসূরি চন্দ্রবর্মা। চন্দ্র তাঁকে একজন দার্শনিকের পাথর দিয়ে উপস্থাপন করেছিলেন এবং তাঁকে রাজনীতি শিখিয়েছিলেন।  রাজবংশের নিজস্ব রেকর্ডগুলিতে হেমাবতী, হেমরাজ এবং ইন্দ্রজিৎ উল্লেখ নেই। এইরকম কিংবদন্তিগুলি পরে দরবারি কবিদের আবিষ্কার বলে মনে হয়। সাধারণভাবে, মহোবা-কাণ্ড ঐতিহাসিকভাবে অবিশ্বাস্য। এমনকি পৃথ্বীরাজ রসোও  ঐতিহাসিকভাবে অবিশ্বাস্য  হিসেবে বিবেচিত।

হাসান নিজামি : আমার বই ‘তাজ-উল-মাসির-এ লিখেছি যে, সোমনাথ মন্দিরের ছাদ থেকে ঝুলন্ত ঝাড়বাতি মূল্যবান রত্নাদিতে খচিত ছিল। পরবর্তীকালের লেখক ফিরিস্তার মতে, গজনির সুলতান মাহমুদ ফাঁপা পাথরে তৈরি বিগ্রহ ভেঙে ফেলে তার ভেতরে রাখা হীরা ও মণি-মাণিক্য হস্তগত করে।  লিঙ্গদেবতাটি সম্পূর্ণরূপে নিরেট স্বর্ণের তৈরি ছিল। লোদি সুলতানরা মুসলমান ছিল এবং তাদের পূর্বসূরীদের মতো তারাও মুসলিম বিশ্বের উপর আব্বাসীয় খিলাফতের কর্তৃত্বকে স্বীকার করতো । যেহেতু সিকান্দার লোদির মা একজন হিন্দু ছিলেন, তাই সিকন্দার লোদি রাজনৈতিক সাফল্য হিসাবে শক্তিশালী সুন্নি গোঁড়ামির আশ্রয় নিয়ে তার ইসলামিক প্রমাণাদি প্রমাণ করার চেষ্টা করেছিল। ও হিন্দু মন্দিরগুলি ধ্বংস করেছিল আর আলেমদের চাপের মুখে একজন ব্রাহ্মণকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার অনুমতি দিয়েছিল, যিনি হিন্দু ধর্মকে ইসলামের মতো ভদ্র বলে ঘোষণা করেছিলেন। সিকন্দর লোদি মহিলাদের মধ্যে মুসলিম সাধুদের মাজার (সমাধি) দেখতে নিষেধ করেছিল এবং কিংবদন্তি মুসলিম শহীদ সালার মাসুদের বর্শার বার্ষিক মিছিল নিষিদ্ধ করেছিল। 

হজরত ইবলিশ : সিকন্দর লোদি বেজন্মা বলে পরিচিত ছিল, ওর সভাসদদের মাঝে । 

মুহম্মদ নাজিম :  গজনির সুলতান মাহমুদ তার তলোয়ারের এক আঘাতে সোমনাথের শিবলিঙ্গটি ধ্বংস করেন। যদিও তিনি বিগ্রহ ধ্বংস করেন তা হলেও একথা নিশ্চিত করে বলা যায় না যে, বিগ্রহে রক্ষিত রত্নাদি  অথবা এর গায়ে খচিত মণি-মাণিক্য ) সংগ্রহের উদ্দেশ্যেই তিনি মূর্তি ধ্বংস করেন। স্বর্ণ ব্যতীত গজনভী মুদ্রা প্রস্তুত অসম্ভব বলেই সম্ভবত এটি করা হয়। মুহম্মদ হাবিব বলেন যে, সোনা এবং রূপার তৈরি বিগ্রহ গলিয়ে গজনভীর মুদ্রায় রূপান্তরিত করা হতো। ধ্বংস করেছিল কাফেরনিধনের উদ্দেশ্যে ।

হজরত আহনাফ : মুহম্মদ ঘুরির আধ্যাত্মিক উপদেষ্টা খাজা মইনুদ্দিন চিশতীর পরামর্শে শেষ রাতের দিকে পৃথ্বীরাজ চৌহানের উপর আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। অতর্কিত আক্রমণে চৌহানের সেনাবাহিনী দিশেহারা হয়ে পড়ে। রাতের আঁধারে ঘোড়সওয়ারী তরোয়ালধারী ম্লেচ্ছ আফগান-তুর্কি সেনাদের যৌথ আক্রমণ প্রতিহত করে পাল্টা আক্রমণ  করেই বিপুল সৈন্যক্ষয় হয়ে যায়। ঘোড়ায় চড়া তীরের মত গতিবেগের ম্লেচ্ছ সেনাদের রুখতে পারে না চৌহানবাহিনী। শেষ রাত থেকে অভুক্ত অবস্থায় যুদ্ধ করতে করতে পৃথ্বীরাজের সেনাবাহিনী তখন ক্লান্ত, তাদের শেষ শক্তি ক্ষয় হয়ে আসছে, এদিকে যুদ্ধ চলছে একনাগাড়ে শেষরাত পেরিয়ে সকাল গড়িয়ে দুপুর পর্যন্ত। ইতিমধ্যে সেনাদের মাঝে সেনাপতি খাণ্ডেরাও মারা যাওয়ার সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার ফলে তাদের মনোবল ভগ্নপ্রায় এবং অবিন্যস্ত। এরকম ছত্রভঙ্গ সেনাদের উপর নতুন উদ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়ল তরোয়াল হাতে দ্রুত গতির অশ্বারোহী  ১২০০০ ম্লেচ্ছ সেনা। তাদের সামনে দাঁড়ানোর ক্ষমতা তখন  পৃথ্বীরাজের সেনাবাহিনীর আর অবশিষ্ট ছিল না। তারা  বেঘোরে ম্লেচ্ছদের হাতে মারা পড়তে লাগল। এদিকে যুদ্ধ দুপুর গড়িয়ে বিকেল পর্যন্ত যুদ্ধ চলতে থাকে। যুদ্ধের নতুন কৌশল নিয়ে আলোচনার জন্য ১৫০ জন ঊর্ধ্বতন সেনানায়ক এবং মিত্র রাজাদের নিয়ে পৃথ্বীরাজ চৌহান একটা গাছের ছায়ার নিচে দাঁড়ায়। তারা মরণপণ যুদ্ধের শপথ নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে ফেরার আগেই তুর্কি আফগান ম্লেচ্ছ বাহিনী চারিদিক থেকে ঘিরে ফেলে এবং একই সাথে চলতে থাকে বৃষ্টির মত তীর নিক্ষেপ, তখনই আসলে বেজে গেছে মরণঘন্টা। তুর্কি এবং আফগান ম্লেচ্ছবাহিনীর আক্রমণে রাজপুতরা নিমেষে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। শেষ মুহূর্তে চৌহান রাজপ্রাসাদের দিকে পালানোর চেষ্টা করলেও ঘুরির হাতে বন্দী হয়ে যায়। পৃথ্বীরাজ চৌহানকে বন্দী করেই মুহম্মদ ঘুরি চলে যায় রাজপ্রাসাদে রাণী সংযুক্তার খোঁজে। তখন সম্ভ্রম রক্ষায় সংযুক্তা তার দাসীদের নিয়ে জহরব্রত করার জন্য প্রস্তুতি নিলেও ততক্ষণে ঘুরি রাজপ্রাসাদে পৌঁছে যায় এবং তাকেও বন্দী করে নিয়ে আসে। বাইরে তখনো যুদ্ধ চলছে সমান তালে, এদিকে কিছুমাত্র সময় দেরী না করে পৃথ্বীরাজ চৌহানের সামনেই তার প্রিয়তমা সুন্দরী স্ত্রী সংযুক্তাকে ধর্ষণ করে ঘুরি। পৃথ্বীরাজকে ইসলাম কবুল করার জন্য চাপ দিতে থাকে ঘুরি। কিন্তু চৌহান রাজি হয় না। আর এদিকে চলতে থাকে সংযুক্তাকে পালাক্রমে ধর্ষণ। বন্দী অবস্থায় চৌহান ঘুরিকে হুংকার দিলে ঘুরি চৌহানের চোখ অন্ধ করে দেয়। ১৫ দিন একনাগাড়ে সংযুক্তাকে ধর্ষণ করার পর ঘুরি চৌহানের শিরশ্ছেদ করে কাটা মাথাটা খাজা মইনুদ্দিন চিশতীকে উপহার দেয়। চৌহানের কাটা মাথা দেখে, খাজা মইনুদ্দিন চিশতী স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলে, “অনেক কষ্টের পর অবশেষে আমরা চূড়ান্ত বিজয় পেলাম।”

ঐতিহাসিক পাপিয়া ঘোষ : রাজপুত (সংস্কৃত রাজা-পুত্র থেকে, “একজন রাজার পুত্র”) বর্ণ, গোত্র এবং স্থানীয় গোষ্ঠীগুলির একটি বৃহত  উপাদানে গড়া, যা ভারতীয় উপমহাদেশে উদ্ভূত  বংশদ্ভুত সামাজিক অবস্থান  নিয়েছে। রাজপুত শব্দটি কোনও বর্ণকে চিহ্ণিত করে না । গোষ্ঠীটিতে আকাধিক বর্ণ আছে । বৌদ্ধিকতার সাথে ঐতিহাসিকভাবে  বিভিন্ন পিতৃতান্ত্রিক গোত্রকে অন্তর্ভুক্ত করেছে: বেশ কয়েকটি গোষ্ঠী রাজপুত মর্যাদার দাবি করে, যদিও সমস্ত দাবি সর্বজনস্বীকৃত নয়। আধুনিক পণ্ডিতদের মতে প্রায় সমস্ত রাজপুত বংশের উৎপত্তি কৃষক বা যাজক সম্প্রদায়ের থেকেই হয়েছিল এবং বহু গোষ্ঠির জন্ম গ্রিকদের বংশধর থেকে । সুতরাং চান্দেলাদেরও সেই দৃষ্টিকোন থেকে দেখতে হবে । 

হজরত ইবলিশ : ম্লেচ্ছরা যদি খাজুরাহোর মন্দিরগুলো অক্ষত রাখতো তাহলে তারা এদেশের লোকেদের শ্রদ্ধা অর্জন করতো । তাদের জন্যই এখন সারা আল-হিন্দে ম্লেচ্ছদের সবাই ঘেন্না করে । আর খাজা মইনুদ্দিন একজন চিশতি হয়ে কেমন করে জঘন্য কাজকে উৎসাহ দিয়েছিল । লজ্জায় আমার মাথা কাটা যাচ্ছে ।

                                     —————XXXXXXX——————

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

কলকাতা বিক্রি আছে – পোস্টমডার্ন নাটক : মলয় রায়চৌধুরী

নুরুদ্দিন মহম্মদ জাহাঙ্গীর বাদশাহ গাজী : আমি সিংহাসন দখল নিয়ে ব্যস্ত ছিলুম বলে ইংরেজগুলো সুবে বাংলায় ঢুকে পড়তে পেরেছিল।৩৬ বছর বয়েসে  বাবা মারা যাবার ৮ দিন পর ৩০ নভেম্বর, ১৬০৫  থেকে আমার ২২ বছরের রাজত্বের শুরু। মনে রাখিস লক্ষ্মীকান্ত, জায়গিরটা আমিই তোদের দিয়েছি, যদিও সুন্দরবনের লাগোয়া বলে তোরা নিতে চাইছিলিস না । তা আমি কী করব বল ! ভবানন্দ মজুমদার ছিল আমাদের খোচর । ওকে ভালো জমিজমা দিতে হলো । তোরা প্রতাপাদিত্যের বিরুদ্ধে আমাদের হেল্প করলে তিন ফসলি জমিজমা পেতিস । যারা ইতিহাস লিখবে তাদের বলে দিস যে কলকাতার জনক আসলে আমি, কেননা আমিই গ্রামগুলো তোদের দিয়েছি।

সুবাহার ইবরাহিম খান : দ্যাখ জোব চার্ণক, জমি আমি দিচ্ছি, তোরা আবার গোয়ার পর্তুগিজদের মতন দুর্গ খাড়া করিসনি যেন  । সুতানুটি, গোবিন্দপুর আর কলিকাতা গ্রাম তিনটে  মুঘল সম্রাটের খাসমহলের জমি, বাদশা জাহাঙ্গির সাবর্ণ রায়চৌধুরীদের দিয়েছে জায়গিরটা । আমি তোকে ব্যবসা করার সুবিধে করে দিলুম । ইতিহাসে লিখতে ভুলিসনি যে কলকাতার জনক আমি ।

বিদ্যাধর রায়চৌধুরী : কিন্তু সুবাহদার, এই গ্রাম তিনটের জায়গিরদারি তো সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের । আমাদের যৎসামান্য আয় হয় গ্রামগুলো থেকে ; প্রজারাও আমাদের ভালোবাসে । ইংরেজরা দিল্লির বাদশাকে মাত্র ষোলো হাজার টাকা ঘুষ দিয়ে কাজ হাসিল করে ফেললো । আমরাই তো এই গ্রামগুলোর জনক । 

ভিদকুন কুইসলিঙ : আমার আসল নাম সৈয়দ মীর জাফর আলী খান, ইরান থেকে এসে আলীবর্দী খানের সৈন্যদলে যোগ দিয়েছিলুম, বাংলা বিশেষ বলতে পারি না, ফারসিতে কাজ চালাই । তা যতোই প্রজারা ভালোবাসুক । তোমরা তো ক্লাইভকে তুষ্ট করতে পারোনি । সিরাজের যুদ্ধ আদ্যন্ত এক ‘বেওসা’, যার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাবে মুনশি নবকেষ্টর মতো লোক রাতারাতি মহারাজা নবকৃষ্ণ দেব বাহাদুর হয়ে গেল। শোভাবাজার রাজবাড়ি এখন তাই বিয়ে, অন্নপ্রাশন, উপনয়নের জন্য ভাড়া দেয়া হয়। ওরা মনে করে ওরাই কলকাতার জনক । আমাকেই লোকে অযথা দোষ দ্যায় । এই নবকেষ্ট তো ক্লাইভের জন্যে মানত করে দূর্গাপুজোও করে ফেলল । নবকেষ্টর বংশধররা  জোব চার্ণককে কলকাতার জনক বলে উঠেপড়ে লেগেছিল ; হাইকোর্টে মামলায় হেরে গিয়ে এখন তারা ফিবছর সুতানুটি উৎসব চালায় ।

মির্জা মুহম্মদ সিরাজ-উদ-দৌলা :  শোভাবাজর রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা নবকৃষ্ণ দেব পলাশীর যুদ্ধের আগে  ছিল  ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মুন্সি, পরে হয়েছিল সুতানুটির তালুকদার। এর পরে ওয়ারেন হেস্টিংসের মুন্সি, তারপর ড্রেক সাহেব তেজাউদ্দীনকে কোম্পানির মুন্সির পদ থেকে সরিয়ে সেখানে বসালে নবকৃষ্ণকে।পলাশীর যুদ্ধের ফলে নবকৃষ্ণের কপাল খুলে গেল। মীরজাফর, রামচাঁদ রায়, আমীর বেগ আর নবকৃষ্ণ মিলে আমার লুকোনো কোষাগার লুঠ করে বহু কোটি টাকা নিজেদের মধ্যে ভাগ বাঁটোয়ারা করে নিলে। নবকৃষ্ণ কেবল টাকাই পেলো না ! বাড়তি পাওনা পেল সম্মান ও ক্ষমতা ।১৮৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশির রণাঙ্গনে মীরজাফরের বেইমানির দরুণ ইংরেজ সেনপতি ক্লাইভের হাতে আমার পরাজয় ঘটলে সবচেয়ে যারা উল্লসির হয়েছিল তাদের মধ্যে ছিল হিন্দু বিশ্বাসঘাতকরা, নদিয়ার কৃষ্ণচন্দ্র আর কলকাতার নবকৃষ্ণ। কোম্পানির জয়কে তারা হিন্দুর জয় বলে প্রচার চালালো। ধূর্ত ক্লাইভও তাদের তেমনই বোঝালো। ক্লাইভের পরামর্শেই তারা পলাশীর যুদ্ধের বিজয়-উৎসব করার আয়োজন করলো।বসন্তকালীন দুর্গাপুজোকে তাঁরা পিছিয়ে আনলো শরৎকালে ! ১৭৫৭ সালে বহু টাকা খরচ করে শরৎকালীন দুর্গাপুজো করে তারা পলাশীর যুদ্ধের স্মারক উৎসব পালন করলো ! অন্যা হিন্দু জমিদার আর ব্যবসাদাররাও মহা উৎসাহে সেই ফূর্তিতে যোগদান করলো ! হেরে গেলেও, আমিই মালিক । আমাকে কলকাতার জনক মনে করা উচিত ।

জুডাস ইসকারিয়ট : আমার আসল নাম রায় দুর্লভরাম । আমাকে কেন কলকাতার জনক মনে করা হবে না ? আমি তো বাংলার নবাবি শাসনামলের একজন কর্মকর্তা। আমি নবাব আলীবর্দী খানের অধীনে উড়িষ্যার প্রাদেশিক শাসনকর্তা পদে ছিলুম। বাংলায় মারাঠা আক্রমণকালে আমি বাংলার নবাবের পক্ষে মারাঠাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নিই। যদিও পলাশীর যুদ্ধের সময়  নবাব সিরাজউদ্দৌলার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে ইংরেজদের সহযোগিতা করেছিলুম আর যুদ্ধে অংশগ্রহণ থেকে বিরত ছিলুম।  বিশ্বাসঘাতকদের জন্যেই তো ক্লাইভ জিতেছিল । আমি বিশ্বাসঘাতকতা না করলে কলকাতা দখল করে ক্লাইভের মুণ্ডু ধড় থেকে আলাদা করে দিতো সিরাজদ্দৌলা।আমাকে কলকাতার জনক মনে করা উচিত।১৭৬৫ খ্রিষ্টাব্দে মীর কাশিম ইংরেজদের সাথে বক্সারের যুদ্ধে যাবার প্রাক্কালে ষড়যন্ত্রকারী আমার গলায় বালির বস্তা বেঁধে মুঙ্গেরের দূর্গশীর্ষ থেকে জীবন্ত দেহ নিক্ষেপ করে গঙ্গার বুকে। এভাবেই গঙ্গার বক্ষে সলিল সমাধি হয় আমার।

দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর : বড় লোকেদের যেন একটা ধারণা ছিল যে ভাল মন্দ বিচার না করিয়া খুব খরচ করিতে পারিলেই সমাজের মধ্যে প্রতিপত্তি বৃদ্ধি পাইবে। মাতৃশ্রাদ্ধে নবকৃষ্ণ দেবের ন’লক্ষ টাকা খরচের পিছনে এই উদ্দেশ্য উঁকি দেয়। তাঁর মাতৃশ্রাদ্ধ উপলক্ষে যে সভা হয় এবং যেখানে সমবেত অভ্যাগত ও পণ্ডিতগণের আবাসস্থল এবং কাঙালিদের জন্য পণ্যবীথিকা সংস্থাপিত হয়, তা থেকে উক্ত অঞ্চলের নামকরণ হয় সভাবাজার বা শোভাবাজার (পূর্ব নাম রাসপল্লি)। ১৭৬৬ খ্রিস্টাব্দে লর্ড ক্লাইভের চেষ্টায় তিনি ‘মহারাজা বাহাদুর’ উপাধি ও ৬-হাজারি মনসবদারের পদ পান। তাঁর অধীনে আরজবেগী দপ্তর, মালখানা, চব্বিশ পরগনার মাল আদালত, তহশিল দপ্তর প্রভৃতি ছিল। পরে তিনি কোম্পানির কমিটির রাজনৈতিক বেনিয়ান হন।তিনি ও তাঁর বংশজগণ প্রায় শতাধিক বছর ধরে ক্ষমতা ও প্রভাব বহাল রেখেছিলেন।১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধে বিজয় লাভে শোভাবাজার রাজবাড়িতে রাজা নবকৃষ্ণ দেব লর্ড ক্লাইভের সম্মানে দুর্গাপূজার আয়োজন করে বিজয় উৎসব পালন করেন। সেই থেকে প্রতি বৎসর শোভাবাজার রাজবাড়িতে দুর্গাপূজার আয়োজন হয়ে থাকে। । সিরাজদ্দৌলার কোষাগার থেকে চুরি করা টাকায়  নবকৃষ্ণ দেব রাজবাড়িটি নির্মাণ করেন ।পলাশির পরে কলকাতার সামাজিক সাম্রাজ্যে তিনি হয়ে উঠলেন প্রায় মুকুটহীন সম্রাট। তাঁর সামাজিক গুরুত্ব তখন রাজনৈতিক নেতাদের থেকে বেশি। এই সামাজিক গুরুত্ব লাভে তাঁকে সাহায্য করেছিল তার সরকারি পদের গুরুত্ব এবং কলকাতার কোম্পানির কর্তাদের সঙ্গে তার সুসম্পর্ক। নিজের সামাজিক ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে তিনি কলকাতায় ডেকে এনেছিলেন উঁচুদরের কুলীনদের। ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের দান করেছিলেন জমি, বাড়ি ইত্যাদি। এই সবই দলপতি হওয়ার পূর্বপ্রস্তুতি। দলপতি হতে প্রয়োজন ছিল বিত্ত-বৈভব প্রদর্শন। তার মাধ্যম ছিল শ্রাদ্ধ, বিয়ে বা অন্য পারিবারিক ও সামাজিক অনুষ্ঠানে অপরিমিত অর্থব্যয়। সে কালে ধনীদের দু’হাতে দানধ্যান করাকে বদান্যতা ভাবলে ভুল হবে। নবকৃষ্ণ কলকাতার দুষ্টক্ষত । আমরা জোড়াসাঁকো পরিবারই কলকাতার জনক; আমাদের ছাড়া কলকাতা অচল ।

আজিম-উশ-শান : ঘাবড়াসনি বিদ্যাধর । ব্রিটিশ বসতি  অন্য ভূস্বামীদের আরও আটত্রিশটা গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে। এটা  ১৭১৭ সাল । ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে  তোদের গ্রামের জমিদারি সত্ব দিলেও, অন্য জমিদারদের কাছ থেকে ওরা বাকি গ্রামগুলো কিনতে  পারেনি। তোর টাকাকড়ি জমিয়ে রাখতে পারলি না ; সবাই একগাদা বিয়ে করে গুচ্ছের বাচ্চা পয়দা করলি । যাই হোক, সব গ্রামগুলো তো মুঘল বাদশার । তাই আমিই কলকাতার জনক, মনে রাখিস ।

বিদ্যাধর রায়চৌধুরী : আমরা  ব্রিটিশদের এই তিনটে গ্রাম ছেড়ে দেওয়ার পক্ষপাতী ছিলুম না ।  ব্রিটিশরা মুঘল রাজদরবারে ঘুষ দিয়ে এই গ্রাম তিনটের ইজারা কেনার অনুমতি আদায়ে সমর্থ হয়েছে। এটা ১৬৯৮ সাল । আপনারা ইংরেজদের হাতে গ্রাম তিনটে তুলে দিতে বাধ্য করলেন। ওরা বার্ষিক মাত্র ১,৩০০ টাকা রাজস্বের বিনিময়ে গ্রাম তিনটের ইজারা কিনে নিলে। চুক্তিপত্রটা ফার্সি ভাষায় লেখা ; ভাগ্যিস আমাদের পরিবারে সবাই ফার্সি ভাষা জানে । আপনি তো জানেন এই পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা জিয়া গঙ্গোপাধ্যায়  সন্ত কামদেব ব্রহ্মচারী নামে সন্ন্যাসী হয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর ছেলে লক্ষ্মীকান্ত গঙ্গোপাধ্যায়  ১৬০৮ সালে  মুঘল সম্রাটের কাছ থেকে সুন্দরবনের লাগোয়া ভূসম্পত্তি জায়গির হিসেবে পেয়েছিলেন।  মুঘল সম্রাট আকবর আমাদের ‘রায়’ আর জাহাঙ্গির  ‘চৌধুরী’ উপাধি দিয়েছিলেন। তাই ‘রায়চৌধুরী’ আমাদের পদবিতে পরিণত হয়েছে। আমরা দাবি করি না যে আমরা কলকাতার জনক । 

আজিম-উশ-শান : আমিই বা কী করব ? শায়েস্তা খান এর উত্তরাধিকারী সুবাহদার ইবরাহিম খান বাংলায় ব্যবসা-বাণিজ্য আবার শুরু করতে ব্রিটিশদের ডেকে পাঠিয়েছিল। দুটো প্রধান বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছতে জব চার্নক নামে ওদের একজন প্রতিনিধি সুবাহদারের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করেছিল। একটা ছিল ইংরেজদের বসতি হুগলি থেকে সুতানুটিতে স্থানান্তরের প্রস্তাবে সরকারকে অবশ্যই রাজি হতে হবে। দ্বিতীয়ত, বার্ষিক পূর্বনির্দিষ্ট ৩০০০ টাকা কর পরিশোধের বিনিময়ে কোম্পানিকে বাংলায় শুল্কমুক্ত বাণিজ্যের অনুমতি প্রদানকারী একটি ফরমানের দ্বারা সুবাহদার তাদের অনুমতি দেবেন। সুবাহদার ইবরাহিম খান তাদের তোলা দুটো প্রস্তাবই মেনে নিলে । মনে হচ্ছে কলকাতা নামের বাচ্চাটার বাপ অনেকগুলো ।

বিদ্যাধর রায়চৌধুরী : হ্যাঁ, জব চার্ণক মারা যাবার পর ওর জামাই  ক্যাপ্টেন চার্লস আয়ারকে আমরা ১৬৯৮ সালের ১১ই নভেম্বর কলকাতা – সুতানুটি – গোবিন্দপুর গ্রাম তিনটের প্রজাস্বত্ব মাত্র ১৩০০ টাকায় একটি দলিলের দ্বারা দান করে দিতে বাধ্য হয়েছিলুম, তার কারণ আপনারা ঘুষ খেয়ে আমাদের ওপর চাপ দিয়েছিলেন । আমরা এখানকার জায়গিরদার  অথচ মুঘলরা আমাদের গুরুত্ব দিল না । দলিলটা আমরা  সই করেছিলুম আটচালা বাড়িতে, যেখানে আজও আমরা দূর্গাপুজো করি । ক্লাইভের চামচা নবকৃষ্ণদেবের অনেক আগে থেকে আমাদের পুজো হয় । আমরা ক্লাইভের পোঁদে তেল দিতে রাজি হইনি । রাজা বা মহারাজা খেতাব আমাদের দরকার পড়েনি, নবকৃষ্ণ আর কৃষ্ণচন্দ্রর মতন ।

বেনেডিক্ট অ্যারনল্ড : আমার আসল নাম মীর মুহম্মদ কাসিম আলী খান । শোভাবাজার রাজপরিবারের প্রতিষ্ঠাতা নবকৃষ্ণ দেব সম্পর্কে এই কথাটি অক্ষরে অক্ষরে মিলে যায়। পিতৃহীন অবস্থায় কলকাতার কাছে গোবিন্দপুরে এসে থাকতে শুরু করে। বলা ভালো, অত্যন্ত সাধারণ অবস্থা ছিল। কিন্তু বুদ্ধি ছিল প্রখর। নিজের চেষ্টায় উর্দু, আরবি, ফার্সি শিখেছিল। ইংরেজ সরকারের হয়ে কাজ করার জন্য সমস্ত রকম গুণই তার মধ্যে বর্তমান ছিল।  ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সামান্য মুনশী হিসেবে জীবন শুরু হয় নবকৃষ্ণ দেবের। সরকারি কাজকর্মের পাশাপাশি ওয়ারেন হেস্টিংসকে ফার্সি ভাষা শেখানোর কাজ করতো। বাংলার নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছে রবার্ট ক্লাইভ। সিরাজের পক্ষে আছে মীরজাফর। ক্লাইভ তখন নিশ্চিন্ত ।  সময়মতো নবাবের পক্ষ ত্যাগ করল মীরজাফর। ‘ইনাম’স্বরূপ মীরজাফর নবাবের গদিতে বসল। কিন্তু পেছনে থেকে লাভবান হলো আরও দুজন।  কৃষ্ণচন্দ্র এবং নবকৃষ্ণ দেব। মীরজাফরের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ইতিমধ্যেই তারা খুঁজে পেয়েছে সিরাজের গোপন কোষাগার। সবাই সেই বিপুল ধনসম্পত্তি ভাগাভাগি করে নেয়। তা সত্তেও নবকৃষ্ণের ভাগে কম কিছু পড়েনি। দেখতে দেখতে বিশাল ধনদৌলতের মালিক হয়ে গেল নবকৃষ্ণ। শুধু টাকাই নয়, এল সম্মানও। ইংরেজদের পক্ষ নেওয়ার জন্য পেল ‘রাজা বাহাদুর’ খেতাব; অতঃপর ১৭৬৬ সালে ‘মহারাজা বাহাদুর’। সবথেকে বড়ো কথা, গোটা সুতানুটি অঞ্চলের তালুকদার হয়ে গেল । সামান্য মুনশী থেকে বিশাল সাম্রাজ্য ও ধন-দৌলতের মালিক— এমনই চমকপ্রদ উত্থান রাজা নবকৃষ্ণ দেবের। সেইসঙ্গে প্রতিষ্ঠিত হল শোভাবাজার রাজবাড়ি । তখন সবে পলাশীর যুদ্ধ শেষ হয়েছে। নবকৃষ্ণদেব ভীষণ খুশি। আর এখানেই ধর্মের তাসটি খেললেন চতুর ক্লাইভ। নিজে খ্রিস্টান, মূর্তিপূজার ঘোর বিরোধী; তা সত্তেও নবকৃষ্ণকে বোঝালেন কলকাতায় একটি বিজয় উৎসব করার জন্য। ‘হিন্দু ভাবাবেগ’ রক্ষা পেয়েছে বলে কথা ! কিন্তু কীভাবে হবে উৎসব? নবকৃষ্ণ ঠিক করলেন, দেবী দুর্গার আরাধনা করেই তুষ্ট করবেন ক্লাইভকে। শুরু করবেন বিজয় উৎসব। ১৭৫৭ সালেই নিজের নবনির্মিত ঠাকুরদালানে শুরু করলেন অকাল বোধন। শুরু হল কলকাতার দুর্গাপূজা। তাতে একশো এক টাকা দক্ষিণাও পাঠিয়েছিলেন ক্লাইভ ! বিশাল আয়োজন করে শুরু হল শোভাবাজার রাজবাড়ির পুজো। কালে কালে যা শহরের ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশে গেছে । বিশ্বাসঘাতকের পুজোতে ভোগ খেয়ে বাঙালিও সেই বিশ্বাসঘাতকতা আর কোষাগার চুরির অংশভাক। চুরির টাকা খরচ করে কলকাতার জনক হতে চাইছে ওর বংশধররা । 

মহারাজা প্রতাপাদিত্য : মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়   নদীয়ার রাজা আর কৃষ্ণনগর রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা ভবানন্দ মজুমদারের বংশধর। ভবানন্দ আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে রাজবংশ শুরু করেছিল । কৃষ্ণচন্দ্রের কৃষ্ণনগরেই তাঁর জন্ম; বাবা রঘুরাম রায়। রক্ষণশীল এই হিন্দু রাজা বাংলা, সংস্কৃত ও ফারসি ভাষায় সমান ব্যুৎপন্ন ছিল। কৃষ্ণচন্দ্র ছিল রাজনৈতিক দূরদৃষ্টিসম্পন্ন একজন কূটকৌশলী লোক। তার ষড়যন্ত্রে বাংলায় ইংরেজ শাসন কায়েম হয় এবং মুসলমান রাজত্বের অবসান ঘটে। এই রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে ও ইংরেজদের সঙ্গে মিত্রতা করে আর ক্লাইভের পক্ষ নিয়ে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন ত্বরান্বিত করেছিল। ইংরেজদের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় নবাব  মীর কাসেম তাকে বন্দি করে মৃত্যুদন্ড দিলে ইংরেজদের সহায়তায় ও মুক্তি পায়। ইংরেজদের প্রতি পক্ষপাতিত্বের পুরস্কার হিসেবে  ইংরেজ কর্তৃক ‘মহারাজা’ উপাধিতে ভূষিত হয়। তদুপরি ক্লাইভের কাছ থেকে উপঢৌকন হিসেবে পায়  পাঁচটা কামান। সে সময়ে বাংলায় যে বর্গীর আক্রমণ হতো তা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ও নিজের রাজধানী ‘শিবনিবাস’ নামের জায়গায় নিয়ে গিয়েছিল। ক্লাইভের চামচা হিসেবে ওরা তো নিজেদের কলকাতার জনক দাবি করতেই পারে ।

জয়চাঁদ : আমার আসল নাম নবকৃষ্ণ দেব ।পলাশীর যুদ্ধের আগে বাংলা অঞ্চলে সাতজন হিন্দু রাজা ছিল। এদের মধ্যে রাজনৈতিক দিক থেকে বিচক্ষণ নদীয়ার শাসক মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় উপলব্ধি করে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যায় মুসলমানদের শাসনের দিন ফুরিয়ে এসেছে। অন্যদিকে ব্রিটিশদের উত্থান ছিল সময়ের ব্যাপার মাত্র। বিষয়টি তিনি অন্য ছয়জন হিন্দু রাজাকেও বোঝাতে সক্ষম হন। কৃষ্ণচন্দ্র অন্য হিন্দু রাজাদের আরও বোঝাতে সক্ষম হন যে, তাদের সনাতন ধর্ম মুসলমানদের হাতে নিরাপদ নয়, বরং ব্রিটিশদের হাতে নিরাপদ। ফলে সব হিন্দু রাজার সমর্থন নিয়ে মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় হাত মেলায় রবার্ট ক্লাইভের সঙ্গে। ইংরেজদের সঙ্গে এই সখ্যতা এমন পর্যায়ে পৌঁছোয় যে, রবার্ট ক্লাইভ পলাশীর যুদ্ধ-ময়দানে যাওয়ার সময় কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের প্রাসাদে রাত কাটিয়েছিল । যুদ্ধের পর ইংরেজদের সঙ্গে এই সখ্য চললেও নবাব মীর কাশেমের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র। এই দ্বন্দ্বের রেশ ধরেই কৃষ্ণচন্দ্র রায়কে মৃত্যুদণ্ড দেন মীর কাসিম। কিন্তু ক্লাইভের বদান্যতায় বেঁচে যায় আর রাজা খেতাব পায় ।বস্থায় মারা যান উমিচাঁদ

মার্কাস ব্রুটাস : আমাদের  পরিবারের নাম জগত শেঠ । পলাশীর যুদ্ধে একদিকে যেমন ইংরেজদের কূটকৌশল আর অস্ত্রশস্ত্র কাজ করেছিল, অন্যদিকে ঠিক তেমনিভাবে কাজ করেছিল আমার অঢেল টাকা। আমার আসল নাম মহাতাপ চাঁদ। আর  টাইটেল  জগৎ শেঠ, যার অর্থ পৃথিবীর ব্যাংকার। মূলত এই টাইটেলটা প্রথম লাভ করে আমার দাদা ফাতেহ চাঁদ। আমরা মাড়োয়ারি  পরিবার । মূলত সুদের কারবার আর ব্যাংকিংয়ে জড়িত । পলাশীর যুদ্ধের আগেই বংশ পরম্পরায় পিতামহের টাইটেল জগৎ শেঠ আমার নামে যুক্ত হয়।  য় জমিদাররা আমার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই খাজনা পরিশোধ করতো। আবার নবাবরাও দিল্লিতে খাজনা পাঠাতে আমাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করতো। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে ইংরেজরা এদেশে আসতে থাকলে ইংল্যান্ডের মুদ্রার সঙ্গে ভারতীয় মুদ্রা বিনিময় করার প্রয়োজন দেখা দেয়। আর এ সুযোগটি গ্রহণ করি আমরা। বিশেষত ইংরেজরা ঘুষ আর দুর্নীতি বাবদ ভারতীয় মুদ্রায় যে অর্থ পেত তা ইংল্যান্ডের মুদ্রায় বা সোনা ও রত্নে বিনিময় করে দিতুম আমরা । তাই ইংরেজদের কাছে আমাদের কদর ছিল। ফলে নবাব সিরাজউদ্দৌলকে পলাশীর যুদ্ধে হারানোর ষড়যন্ত্রে ব্যাপক ভূমিকা নিই । পলাশীর যুদ্ধের পর মীর জাফরের আমলে ভালোই ছিলুম আমি, মহাতাপ চাঁদ আর খুড়তুতো ভাই  মহারাজ স্বরূপ চাঁদ। কিন্তু  মীর কাসিমের সঙ্গে খেয়োখেয়িতে জড়িয়ে পড়লে ওর বিরুদ্ধে  নতুন ষড়যন্ত্র শুরু করতে বাধ্য হই। পলাশীর যুদ্ধের ছয় বছরের মাথায় ইংরেজদের কাছে  ষড়যন্ত্রমূলক একটি চিঠি লিখেছিলুম । কিন্তু চিঠিটা কেমন করে যেন  মীর কাসিমের হস্তগত হয়। এতে চটে  ওঠে  মীর কাসিম আর আমাকে মুর্শিদাবাদ থেকে তাড়ায় । এদিকে ১৭৬৩ সালে ইংরেজদের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে হেরে যায়  মীর কাসিম ।  মীর কাসিম এই অপমান মানতে পারেননি। ব্যাটা ছুটে আসে আমাদের নতুন আস্তানা মাংঘরে। মাংঘরে একটি টাওয়ারে আশ্রয় নিয়েও প্রাণ বাঁচতে পারিনি আমি।  মীর কাসিম আর ওর সৈন্যরা আমার, মহাতাপ চাঁদের, আর  স্বরূপ চাঁদসহ  পরিবারের সবার মুণ্ডু ধড় থেকে আলাদা করে দ্যায় । এই আত্ম বলিদানের জন্যে আমি দাবি করি যে আমিই কলকাতার জনক ।  

সুশীল চৌধুরী : ১৭৫৭ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি বাংলার নওয়াব  সিরাজউদ্দৌলা ও ইংলিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়। নওয়াব কলকাতার ইংরেজ বসতি অধিকার করেন (১৮-২০ জুন ১৭৫৬) এবং ইংরেজরা তাঁর প্রকৃত ক্ষতিসমূহের প্রতিবিধান করতে অস্বীকার করলে তিনি তাদের কলকাতা শহর থেকে বিতাড়িত করেন। তিনি এ শহরের নতুন নামকরণ করেন আলীনগর। ইংরেজরা সাহায্যের আবেদন জানালে মাদ্রাজ থেকে ক্লাইভ এবং ওয়াটসন-এর অধীনে অতিরিক্ত সৈন্যবাহিনী উপনীত হয় এবং কলকাতা পুনর্দখল করে। নওয়াব কলকাতা অভিমুখে যাত্রা করেন। কিন্তু কলকাতার কাছে খুব ভোরে ইংরেজরা আকস্মিক আক্রমণ করলে নওয়াব পশ্চাদপসরণ করেন। ইংরেজরা তাঁকে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করার জন্য প্রস্তাব দেয়। নওয়াব তাঁর প্রধান উপদেষ্টাবৃন্দ ও মন্ত্রীদের পরামর্শক্রমে এ চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এ চুক্তির প্রধান ধারাগুলি হলো ক. নওয়াব ১৭১৭ সালের ফররুখ সিয়ারের ফরমান এ প্রদত্ত সকল সুবিধা ইংরেজদেরকে দেবেন, খ. কোম্পানির দস্তক এর আওতায় বাংলার ভেতর দিয়ে যেসব পণ্যদ্রব্য অতিক্রম করবে সেগুলির ওপর থেকে শুল্ক তুলে নিতে হবে, গ. নওয়াব বিনা বাধায় কলকাতার ইংরেজ দুর্গটিকে সুরক্ষিত করার অনুমতি দেবেন এবং ঘ. কলকাতায় ইংরেজগণ স্বাধীনভাবে মুদ্রাঙ্কন করতে পারবে। এ চুক্তির শর্তাবলি বাংলায় ইংরেজদের অনুকূলে ছিল এবং সেখানে তাদের প্রভাব বৃদ্ধি করেছিল। ১৭৫৭ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি ক্লাইভ সিলেক্ট কমিটির কাছে লিখেন যে, এ চুক্তির শর্তাবলি কোম্পানির জন্য ‘একই সঙ্গে সম্মানজনক ও সুবিধাজনক’। সিরাজউদ্দৌলার জন্য এ চুক্তি কিছুটা অপমানকর হলেও তিনি এটি মেনে নেন। তবে তিনি ইংরেজদের সামরিক বাহিনীর ভয়ে ভীত হয়ে একাজ করেন নি। তিনি বরং আহমদ শাহ আবদালীর নেতৃত্বে আসন্ন আফগান আক্রমণের আশঙ্কায় আলীনগরের চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন। এ সময় তিনি খবর পেয়েছিলেন যে, আহমদ শাহ আবদালী দিল্লি ধবংস করার পর (১৭৫৬) বাংলার দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন। পরবর্তী ঘটনাবলি দ্বারা তাঁর ধারণা ভুল প্রমাণিত হলেও সম্ভবত তিনি মনে করেছিলেন যে, ওই মুহূর্তে ইংরেজরা নয় বরং আফগানরাই ছিল তাঁর জন্য অধিকতর বিপজ্জনক। এ কারণে তিনি রাজা রামনারায়ণের নেতৃত্বে তাঁর সামরিকবাহিনীর সেরা অংশটি আফগান বাহিনীকে বাধা দেওয়ার জন্য পাটনায় প্রেরণ করেছিলেন। যদিও এ চুক্তি বেশি দিন স্থায়িত্বলাভ করে নি। এর প্রধান কারণ, ইংরেজরা এর শর্তাবলি মেনে চলে নি। ফলে চুক্তিটি ভেঙ্গে যায় এবং ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর যুদ্ধ সংঘটিত হয়। 

আহমদ শাহ দুররানি : আমি সুবে বাঙ্গাল আক্রমণের কথা ভাবিনি । কাফেরদের ধ্বংস করার কাজে ব্যস্ত ছিলুম । সিরাজ আমার সঙ্গে যোগাযোগ করলে ইংরেজদের তাড়াতে হেল্প করতে পারতুম । আমি শিখ গণহত্যায় কুখ্যাত হয়ে আছি, অমৃতসরে শিখদের পবিত্র স্বর্ণ মন্দিরে হামলা করে  ধংস্ব করে দিয়েছিলুম। এছাড়াও তিনি ১৭৪৬ ও ১৭৬২ সালে হাজার হাজার শিখকে খুন করেছিলুম।আফগানিস্তানে আমাকে লোকে বলে আহমদ শাহ বাবা ।

মার্শাল পেতাঁ : আমার নাম উমিচাঁদ । প্রকৃত নাম ছিল আমির চাঁদ। আমি একজন শিখ আর জন্মসূত্রে পাঞ্জাবের বাসিন্দা। কিন্তু কলকাতায়  দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করছিলুম আর অঢেল ধনদৌলত কামিয়েছিলুম। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিতেও টাকা খাটিয়েছিলুম আর মুর্শিদাবাদ দরবারে কোম্পানির পক্ষে দালালি করতুম। এতে বেশ লাভবান হই । কলকাতায় অনেক ঘরবাড়ি কিনি । আরও লাভের আশায় আমিও গোপনে লর্ড ক্লাইভ আর মীর জাফরের সঙ্গে যোগ দিই।   পলাশীর যুদ্ধে নবাবকে হারিয়ে যে ধন-সম্পদ পাওয়া যাবে তার পাঁচ অংশ চেয়েছিলুম।  গোপন পরিকল্পনা ফাঁসের হুমকিও দিয়েছিলুম। ক্লাইভ ব্যাটা আমার প্রস্তাবে সম্মত হয়ে একটি চুক্তি করেছিল । চুক্তিটার যে দুটো কপি করিয়েছিল তা জানতুম না। যার একটাতে আমাকে অর্জিতব্য সম্পদের  পাঁচ ভাগ দেওয়ার কথা লেখা থাকলেও অন্যটাতে অর্থাৎ মূল কপিতে তা লেখা হয়নি। মূল কপি ব্যাটা আমাকে দেখায়নি । আসল ঘটনা জানার পরে আমি সত্যিই পাগল হয়ে গিয়েছিলুম ।  হ্রাস পায় আমার  স্মৃতিশক্তি।  অসহায় আর করুণ অবস্থায় দশ বছর উন্মাদ ছিলুম । ওই অস্হায় ১৭৬৭ সালে মারা যাই । এই যে ইংরেজদের ঢুকিয়ে আনলুম তাতে তো প্রমাণ হয় যে আমিই কলকাতার জনক ।

হুমায়ুন : দশম শতাব্দীতে যে পাঁচজন ব্রাহ্মণকে বাংলায় সর্বশ্রেষ্ঠদের মধ্যে অন্যতম বলে গন্য করা হতো, সাবর্ণ রায় চৌধুরী পরিবার তাঁদের অন্যতম । তা সত্তেও ওদের চরিত্রে ক্ষত্রিয়ের তেজ দেখে  বংশের পঞ্চানন গঙ্গোপাধ্যায়কে খান উপাধি দিয়েছিলুম । ওরা রায়চৌধুরীর বদলে খান পদবী ব্যবহার করলে ভালো করতো । আফগান সেনাদের প্রধান হয়ে পঞ্চানন তো পাঁচু শক্তিখান নামে আগ্রা, দিল্লি, লাহোর, কাবুলেও খ্যাতি পেয়েছিল । ওকে শের শা্হ সুরি ডেকেছিল ওর পক্ষের সেনাপতি হবার জন্য, কিন্তু যায়নি । অবশ্য ওদের বংশই তো কলকাতার জনক হলো ।

পাঁচু শক্তিখান : হ্যাঁ, শের শাহ আমাকে ডেকে পাঠিয়েছিল, যাইনি কেননা মোগল সম্রাট আমাকে সন্মান দিয়েছেন ।মারাঠারা আমাকে ডেকে পাঠিয়েছিল ওদের সঙ্গে যোগ দিতে । ওদের গেরিলা যুদ্ধশৈলী পছন্দ ছিল না বলে যাইনি ।কে কলকাতার জনক হবে তা নিয়ে আমার কোনো আগ্রহ ছিল না ।

ভোলা ময়রা : আমার নাম ভোলানাথ মোদক।  হুগলী জেলার গুপ্তিপাড়ায় জন্মছিলুম। বাবার নাম কৃপানাথ। কলকাতার বাগবাজারে আমার মিষ্টির দোকান ছিল। পাঠশালায় সামান্য লেখাপড়া করলেও সংস্কৃত, ফারসী ও হিন্দিতে জ্ঞান ছিল। পুরাণ ও ধর্মশাস্ত্র সামান্য পড়েছিলুম। কবির দল তৈরীর আগেও  বহু কবিতা রচনা করেছিলুম। কলকাতার অনেক খবরই রাখি । কলকাতার মাঝখানে এখনকার বিবাদীবাগের লালদিঘির কাছে সাবর্ণ রায়চৌধুরীদের কাছারি আর গৃহদেবতা শ্যাম রায়ের  মন্দির  ছিল।  কাছারির দোল উৎসবের আবিরে দিঘির রং লাল হয়ে যেত বলে এই দিঘির নাম হয়েছিল লালদিঘি। জন অ্যান্টনি নামে এক পর্তুগিজ ভাগ্যান্বেষী সাবর্ণদের কাছারিতে কাজ করতো। তার পৌত্র অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি পরে বিখ্যাত কবিয়াল হয়েছিল।ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রথমে এই কাছারিটা ভাড়া নেয় আর পরে কিনে নেয়। ওখানেই বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সচিবালয় মহাকরণ । আমার মনে হয় আমরা কবিয়ালরা কলকাতার জনক ।

মোহনলাল : ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর যুদ্ধের সময় আমি সিরাজের প্রতি অবিচল বিশ্বস্ততায় যুদ্ধ করেছিলুম। যুদ্ধক্ষেত্রে মীর মদনের মৃত্যুর পরেও আমার একক চেষ্টায় যুদ্ধের গতি সিরাজের অনুকূলে ছিল। কিন্তু নিজের অদূরদর্শিতা ও মানসিক দুর্বলতার কারণে সিরাজ,  মীর জাফর প্রমুখ বিশ্বাসঘাতকদের প্রভাবে যুদ্ধ বন্ধ রাখার আদেশ দেন। ফলত: নবাব বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় ও শোচনীয় পরাজয় ঘটে। আমি যুদ্ধক্ষেত্রে মারা যাইনি।  যুদ্ধে আহত হই আর যখন জানতে পারি যে মীর জাফর আমাকে খুন করার জন্য তল্লাশি চালাচ্ছে, তখন গা ঢাকা দিই। কিন্তু যুদ্ধ পরবর্তী পর্যায়ে আমার বড় ছেলে, পূর্নিয়ার নায়েব নাজিম, শ্রীমন্ত লালকে  মিরন খুন করেছিল। ছোট ছেলে হুক্কা লাল পালিয়ে আত্মরক্ষা করেছিল। আমার বোন ছিল সিরাজের প্রণয়িনী আর আমি তাদের বাচ্চা ছেলেকে নিয়ে মুর্শিদাবাদ ছেড়ে ময়মনসিংহে চলে যাই। তারপর আমার অজ্ঞাতবাস পর্বের নানা কিংবদন্তি ছড়িয়ে আছে বাংলায়।এই কিংবদন্তিগুলোই কলকাতার জনক ।

কানকাটা দানশা ফকির : ১৭৫৭ সালের ২৩ শে জুন পলাশীর যুদ্ধে হেরে যাবার পর, সিরাজদ্দৌলা – তার স্ত্রী লুৎফুন্নেসা ও চাকর গোলাম হোসেনকে নিয়ে রাজধানী থেকে বের হয়ে স্থলপথে ভগবানগোলায় পৌঁছে যান আর সেখান থেকে নৌকাতে পদ্মা ও মহানন্দার মধ্য দিয়ে উত্তর দিক যাত্রা করেন। তাঁর আশা ছিল পশ্চিমাঞ্চলে পৌঁছোতে পারলে ফরাসি সৈনিক মসিঁয়ে নাস-এর সহায়তায় পাটনা পর্যন্ত গিয়ে রামনারায়ণের কাছ থেকে সৈন্য সংগ্রহ করে ফরাসি বাহিনীর সহায়তায় বাংলাকে রক্ষা করবেন। শেষরক্ষা হয় নি । মহানন্দা নদীর স্রোত অতিক্রম করে এলেও তাতে জোয়ার ভাটার ফলে হঠাৎ করে জল কমে যাওয়ায় নাজিমপুরের মোহনায় এসে তাঁর নৌকা চড়ায় আটকে যায়। তিনি নৌকা থেকে নেমে খাবার সংগ্রহের জন্য একটি মসজিদের কাছে বাজারে আসেন। আমি নবাবকে দেখে চিনে ফেলি কেননা একবার নবাবের শাস্তি পেয়ে আমি একটা কান হারিয়েছিলুম। আমি নবাবের খবর জানিয়ে দিই । মীর জাফরের লোক এসে  সিরাজদ্দৌলাকে বন্দি করে রাজধানী মুর্শিদাবাদে নিয়ে যায় । এর পরের দিন ৪ জুলাই  মীরজাফরের নির্দেশে তার ছেলে মিরনের তত্ত্বাবধানে মুহম্মদি বেগ নামের এক জল্লাদ সিরাজদ্দৌলাকে খুন করে করে। সিরাজের মৃত্যুর পর তার শব হাতির পিঠে চড়িয়ে সারা শহর ঘোরানো হয়। মুর্শিদাবাদের খোশবাগে নবাব আলিবর্দী খানের কবরের কাছে তাকে কবর দেয়া হয়। মীর জাফর আমাকে জমিজমা আর  মোটা ইনাম দিয়েছিল । আমি ধরিয়ে না দিলে কলকাতার জন্ম হতো না ।

কৌস্তুভ দে সরকার : সিরাজের কাছে হেরে গিয়ে, কলকাতা উদ্ধারে সর্বাত্মক অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় ইংরেজদের তরফ থেকে। এক্ষেত্রেও ইংরেজ বাহিনীর প্রধান হিসেবে প্রস্তাব করা হয় ক্লাইভের নাম। বিশেষ করে পণ্ডিচেরির দায়িত্বে থাকা পিগটের নামও এসেছিল এ অভিযান পরিচালনায় নেতৃত্বের জন্য; কিন্তু অল্প অভিজ্ঞতা নিয়ে এমন অভিযানের জন্য তিনি প্রস্তুত ছিলেন না। পক্ষান্তরে হাঁপানি রোগী লরেন্সের পক্ষে বাংলার আর্দ্র-উষ্ণ আবহাওয়ায় অভিযান পরিচালনা করা অনেক কঠিন ছিল। শেষ পর্যন্ত ক্লাইভের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে নেতৃত্বের দায়ভার গিয়ে উপস্থিত হয় কর্নেল জন এডলারকর্নের ওপর। তিনি পদাতিক ও নৌযুদ্ধে পারদর্শী ছিলেন। পাশাপাশি বাংলার পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধ চালিয়ে নেয়ার সাহস ও শক্তিমত্তা তার মধ্যে ছিল। এর পর ইংরেজ বাহিনী সেন্ট ডেভিডের মাটি থেকে কলকাতা অভিমুখে যাত্রা করে। আরেক দফা সংঘাতে কেঁপে ওঠার আতঙ্কে থমথমে অবস্থা বিরাজ করে প্রকৃতিতে।

গৌতম বসুমল্লিক : বাংলায় দুর্গাপুজো প্রবর্তনের কৃতিত্ব যাঁরই হোক না কেন, কলকাতায় দুর্গার পুজো প্রথম অনুষ্ঠিত হয় ১৬১০ খ্রিস্টাব্দে, বরিষার ,বেহালা সখের বাজার অঞ্চল,  সাবর্ণ গোত্রীয় রায়চৌধুরী পরিবারের আটচালা মণ্ডপে। তখন অবশ্য কলকাতা শহরে রূপান্তরিত হয়নি, তবে মণ্ডপটি আরও একটি কারণে ঐতিহাসিক। ওই আটচালা মণ্ডপে বসেই ১৬৯৮ খ্রিস্টাব্দের ১০ জুন তারিখে জোব চার্নকের জামাই চার্লস আয়ারের সঙ্গে ‘সুতানুটি’, ‘গোবিন্দপুর’ ও ‘কলকাতা’ গ্রাম তিনটির হস্তান্তরের বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছিল রায়চৌধুরী বাড়ির তত্কালীন কর্তাদের সঙ্গে । সুতরাং ওনারাই কলকাতার জনক ।

সুবিমল বসাক : সুতানুটী নামটা এসেছে ওই টেক্সটাইল শিল্পের বাড়বাড়ন্ত থেকে। বাঙালির কলকাতার শ্রী ইংরেজ আসার আগে কিরকম ছিল, সেটা ইংরেজরা যে দিল্লির বাদশাকে ১৬০০০ টাকা দিয়েছিল এই তিনটে গ্রাম সুতানুটী, কলকাতা, গোবিন্দপুরের প্রজাসত্ত্ব কেনার জন্য ১৬৯৮ সালে, তা দেখলে টের পাওয়া যায়। সাবর্ণদের ১৩০০ টাকা দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু সাবর্ণরা তো দেওয়ার মালিক নয়, মোগল আমলে সমস্ত জমিই বাদশার, লোকে প্রজাসত্ত্ব (রেভেনিউ রাইট) কিনতে পারে কেবল, তো কলকাতার সেই প্রজাসত্ত্ব কিনতে বাদশার ফরমান আনতে হয়েছিল। এঁদো জমির জন্য কে ১৬০০০ টাকা দেয়? কলকাতা যদি গণ্ডগ্রাম হত, সেযুগে এই পরিমাণ টাকার ঝুলি হাতে নিয়ে বাদশার দ্বারস্থ হত না ইংরেজ।ব্রিটিশদের আসার আগে সুতানুটি অঞ্চলের সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী বণিক পরিবার ছিলুম আমরা বসাকেরা। আমরা ছিলুম সুতানুটি বাজারে প্রধান বস্ত্রব্যবসায়ী। ব্রিটিশদের আসার পর আমাদের পরিবারের  সমৃদ্ধি ঘটেছিল। আমার পূর্বপুরুষ শোভারাম বসাক (১৬৯০-১৭৭৩)   কোটিপতি ব্যবসায়ী ছিলেন আর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে বস্ত্র সরবরাহ করতেন। গোবিন্দপুর দুর্গনির্মাণের জন্য ধ্বংস করা হলে বসাকরা উত্তর সুতানুটি হাট (বর্তমান বড়বাজার) অঞ্চলে সরে যায় । পরে মাড়োয়ারিরা আসার ফলে  বসাকেরা কোণঠাসা হয়ে পড়ে। সুতানুটি হাটের নামও পরে বদলে  বড়বাজার হয়।  শোভারাম বসাকের উত্তরসূরি রাধাকৃষ্ণ বসাক (মৃত্যু ১৮১১) বেঙ্গল ব্যাংকের দেওয়ান হয়েছিলেন। অষ্টাদশ শতাব্দীতে শহরের প্রধান ব্যবসায়িক পরিবারগুলি নগরাঞ্চলীয় সম্পত্তিতে বিনিয়োগ করতে শুরু করেন। শোভারাম বসাক তার উত্তরসূরিদের জন্য সাঁইত্রিশটি বাড়ি রেখে গিয়েছিলেন। রাধাকৃষ্ণ বসাক কেবল বড়বাজারেই রেখে যান ষোলোটি বাড়ি। অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে কলকাতার বিকাশ শুরু হলে  বসাকদেরও পতন শুরু হয়।  বসাকদের সঙ্গে সঙ্গে সুতানুটিও কলকাতায় বিলীন হয়ে যায়।  ১৬৯০ সালে সুতানুটিতেই জব চার্ণক প্রথম এসেছিল। এই অঞ্চলকে কেন্দ্র করে শুধুমাত্র কলকাতা শহরটিই বিকশিত হয়ে ওঠেনি, বরং ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সূচনায় এখানেই ঘটেছিল। আদি কলকাতার ব্ল্যাক টাউন তথা কলকাতার সংস্কৃতির আঁতুড়ঘর সুতানুটি আজও কলকাতার ইতিহাস সম্পর্কে অনুসন্ধিৎসু ব্যক্তিদের কাছে এক পরম আগ্রহের বিষয়। সুতরাং কলকাতার জনক আমরা, জোব চার্ণকের আগে থেকে যারা এখানে ছিলুম ।

কংস নারায়ণ : ১৬ শতকে  বাংলার নবাব দিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক চুকিয়ে দিয়েছিল। বাংলা তখন স্বাধীন নবাবের হাতে। পরাক্রান্ত মুঘলদের আটকাতে তাঁরা তৈরি করলেন একশ্রেণীর হিন্দু জনশক্তি। তাঁদেরই একজন ছিলুম আমি ।আমি  নবাবদের সাহায্য নিয়েছিলুম।  নবাবী আমলে কিন্তু দুর্গাপূজা কখনও বাধাপ্রাপ্ত হয়নি। মোটামুটি ভাবে বলা যায়, অবিভক্ত বাংলার  প্রথম দুর্গা পুজোর উদ্বোধন আমি করেছিলুম । তা থেকে প্রমাণ হয় যে ষোড়শ শতকে আমি তখনকার গৌড়ের সুলতানদের কাছ থেকে প্রভূত অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক সাহায্য পেতুম। সুতরাং আমার দুর্গাপূজা স্বাভাবিকভাবেই হিন্দু্–মুসলমানের উৎসব হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু পলাশীর যুদ্ধকে কেন্দ্র করে মাথা চাড়া দিয়ে উঠল ইংরেজদের বাণিয়া শক্তি। যে যে হিন্দুদের হাতে অর্থ ছিল, তাঁদের হাতে কোনও রাজনৈতিক ক্ষমতা ছিল না। তাই তাঁরা গোপনে লর্ড ক্লাইভকে সাহায্য করতে শুরু করলেন। এদের পূর্বভাগে ছিলেন কৃষ্ণনগরের রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়। পলাশীর যুদ্ধে সিরাজের শোচনীয় পরাজয়ের পর খুব স্বাভাবিকভাবেই বাংলার রাজনৈতিক শক্তির পুনর্বিন্যাস ঘটে। রাজতন্ত্র থেকে বাংলার ক্ষমতা এক লাফে চলে যায় বাণিয়াদের হাতে। সেই সময়ে কিন্তু ইংরেজরা সরাসরি ভারতে প্রবেশ করেনি। প্রবেশ করেছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি। আর সেই কম্পানির দৌলতে ইংরেজদের ঘাঁটি হয় কলকাতায়। ফলে তাদের সৌজন্যে কলকাতায় তৈরি হল একশ্রেণীর উচ্চবিত্ত রাজমহল। তাঁদের মধ্যে অন্যতম শোভাবাজার রাজবাড়ি রাজা নবকৃষ্ণ দেব। নবকৃষ্ণ কলকাতায়  ইংরেজ শক্তিকে তেল মারার জন্য বারোয়ারি দুর্গাপুজোর উদ্বোধন করেচিল। ইংরেজরা শুধু যোগদানই করেনি, রীতিমতো সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিল  ছোটলাট ও বড়লাট। আমি ইংরেজদের তেল মারার জন্য দুর্গাপুজো করতুম না ।

হাইনরিখ লুশকভ : আমার আসল নাম সৈয়দ মীর জাফর আলী খান  । আমি  ইরানি বংশোদ্ভূত। আমার বাবার নাম সৈয়দ আহমেদ নাজাফি। আমি বাবা-মা র দ্বিতীয় ছেলে। ইরান থেকে একদম নিঃস্ব হয়ে  বাংলায় এসেছিলুম ভাগ্যান্বেষণে। এখানে এসে বিহারের নায়েব আলীবর্দী খানের অধীনে চাকরি শুরু করি। অনেকেই জানেন না ইরানি ভাষায় খুব সুন্দর গান গাইতে পারতুম আমি । কিন্তু আমি ভালো বাংলা বলতে পারতুম না বলে আলীবর্দী খান নিজের উত্তরাধিকারী হিসেবে সিরাজউদ্দৌলাকে বেছে নেন । পলাশির যুদ্ধে আমি সেই অবহেলার বদলা নিয়েছিলুম ।

মীর কাসেম আলী খান : মীর জাফরকে ক্ষমতাচ্যুত করে আমি  ক্ষমতা দখল করেছিলুম। পরে ইংরেজদের সাথে আমার বিরোধ বাধে আর বকসারের যুদ্ধে হেরে যাই ।  ইংরেজদের ভয়ে পালিয়ে বেড়াতুম । অচেনা অবস্থায় দিল্লীতে মারা গিয়েছিলুম । আমার মাথার কাছে পড়ে থাকা একটা পোঁটলায় পাওয়া যায় নবাব মীর কাসেম হিসেবে ব্যবহৃত আমার চাপকান। তা  থেকে লোকে জানতে পারে শবটা বাংলার ভূতপূর্ব নবাব মীর কাসেম আলী খান। জানি না আমার কবর কোথায় । তবে আমিই কলকাতার জনক, কেননা আসল কলকাঠি তো আমিই নেড়েছিলুম ।

ঘনাদা : ১৮৮৬ সালে প্রকাশিত ‘দ্য ট্রায়াল অব মহারাজা নন্দকুমার’ গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে যে, মিডলটনের পত্রালাপ দাখিল করা হলে ওয়ারেন হেস্টিংস ঘুষ নেয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত হতো। ওয়ারেন হেস্টিংস, তার বন্ধু ইলাইজা ইম্পের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে মহারাজ নন্দকুমারের ফাঁসির আদেশ বের করেছিল। মহারাজ নন্দকুমারের ফাঁসি ওয়ারেন হেস্টিংসের জীবন ও কর্মকাল এবং কোলকাতার একটি বিতর্কিত অধ্যায়।মাত্র ২৩ বছর বয়সে সিরাজউদ্দৌলা ১৫ এপ্রিল ১৭৫৬ সালে নবাবী লাভ করেন। তার নবাবীর সময়কাল ছিল মাত্র ১ বছর ২ মাস ৮ দিন অর্থাৎ ৪৩৪ দিন। এ সময়ের মধ্যে নবাব সিরাজউদ্দৌলা দু’দুবার ইংরেজদের বিরুদ্ধে কলকাতা অভিযানে স্বয়ং নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং ইংরেজদের পরাজিত করেছেন। পূর্ণিয়ার যুদ্ধে শত্রুকে পরাজিত করেছেন। প্রধান সেনাপতি মীর জাফর, সেনাপতি রাজা দুর্লভরাম, উমিচাঁদ, রাজা রায়বল্লভ, ইয়ার লতিফ, জগৎ শেঠ, ঘসেটি বেগম, ইংরেজ সেনাপতি ওয়াটসন, ওয়াটস, ক্লাইভ প্রমুখ সিরাজউদ্দৌলার নবাবীর প্রথম দিন থেকে ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের মাধ্যমে বিশ্বাসঘাতকতা, রাজদ্রোহ ও দেশদ্রোহিতায় লিপ্ত থেকে নবাবকে ব্যতিব্যস্ত করে রেখেছিল। তাতে একদিনের জন্য তরুণ নবাবের ব্যক্তিগত জীবনে কোনো আরাম-আয়েশ ভোগ-বিলাসের সময়-সুযোগ ছিল না। সিরাজউদ্দৌলাই প্রকৃতপক্ষে কলকাতার জনক । 

খান আবদুল হাদি :আলিবর্দীর শাসনকালের শেষ দিকে স্বার্থান্বেষী মহল কীভাবে গোটা শাসনতন্ত্রকে নিজেদের হাতের মুঠোয় পুরতে সচেষ্ট হয়ে উঠেছিল, সে সম্পর্কে সিরাজকে আমি বারবার সতর্ক করে দিয়েছিলুম। সেনাবাহিনীকে কেন্দ্র করে মীরজাফর আর খাদিম হুসেন খানের একটা বড় অঙ্কের টাকা পকেটস্থ করার বিষয়টা হাতেনাতে ধরিয়ে দিয়েছিলুম। বস্তুত এই ঘটনাবলী জানার ফলে সিরাজের ভেতরে যে অগ্নিবর্ষী একটি দৃষ্টিভঙ্গি প্রবল হয়ে উঠেছিল, তা কায়েমি স্বার্থান্বেষীদের প্রায় কোণঠাসা করে ফেলেছিল। তাই তারা সিরাজকে দুর্বিনীত, চরিত্রহীন ইত্যাদি নানা অভিধায় অভিহিত করে পলাশী যুদ্ধের পটভূমিকা নির্মাণের কাজটি বেশ জোরদারভাবেই করতে শুরু করে দিয়েছিল। সিরাজই কলকাতার জনক ।

মীর মদন : পলাশীর আমবাগানে আমি আর মোহনলাল  দুই সেনাপতি মিলে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পক্ষে আমৃত্যু লড়াই করেছিলুম। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর প্রান্তরে অন্য বিশ্বাসঘাতক সেনাপতিরা নিশ্চেষ্ট থাকলেও আমরা দুজনে ইংরেজ বাহিনীকে আক্রমণ করি।  প্রবল আক্রমণে টিকতে না পেরে ইংরেজ সেনাপতি রবার্ট ক্লাইভ তার সেনাবাহিনী নিয়ে আমবাগানে আশ্রয় নেয়। মীর জাফর, ইয়ার লতিফ খান, রায় দুর্লভ প্রমুখ নিস্পৃহ থাকলেও আমার গোলন্দাজ বাহিনীর প্রতাপে ইংরেজ বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। দুপুরের দিকে হঠাৎ বৃষ্টি নামলে নবাব বাহিনীর গোলাবারুদ ভিজে যায়। তবুও আমি আর মোহনলাল ইংরেজদের সাথে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার পক্ষপাতী ছিলুম। কিন্তু প্রধান সেনাপতি মীর জাফর সিরাজকে বোঝালো যুদ্ধ বন্ধ রাখতে। যুদ্ধ চলার সময়ে গোলার আঘাতে আমি মারা যাই । আমার অনুগত কিছু সৈনিক আমার মৃতদেহকে গোপনে মুর্শিদাবাদের রেজিনগরের কাছে ভাগীরথী নদী তীরবর্তী ফরিদপুর গ্রামে কবর দে। এখনও ফরিদপুরে ফরিদ খানের সমাধির পাশে অবহেলায় সমাধিস্থ রয়েছি। এছাড়াও পলাশীর স্মৃতিসৌধের কাছে চাষজমির ভেতরে তিনটি অনুচ্চ স্মারক আছে, যা মীর মদন, নৌবে সিং হাজারি আর বাহাদুর খানের স্মৃতিতে তৈরি। পলাশীর যুদ্ধক্ষেত্রের আমবাগান আর নেই । একসময় প্রচুর আমগাছ ছিল। তা ছিল রানি ভবানীর আমবাগান । এখন রাস্তা হয়েছে।  এখানে সমাধিস্থ করা হয় নবাবের আরও দুই বীর কমান্ডার বাহাদুর আলী খান আর ক্যাপ্টেন নৌবে সিং হাজারিকে। বন্দুকধারী ইউনিটের অধিনায়ক ছিলেন বাহাদুর আলী খান। আর গোলন্দাজ বাহিনীর ক্যাপ্টেন ছিলেন নৌবে সিং হাজারি। যুদ্ধের পরপরই এখানে গোপনে তাঁদের সমাধিস্থ করা হয়েছিল। সমাধিস্থলে যাওয়ার কোনো পাকা রাস্তা নেই। পাটখেতের আল ধরে যেতে হয়।

মোহনলাল : ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর যুদ্ধের সময় আমি সিরাজের প্রতি অবিচল বিশ্বস্ততায় যুদ্ধ করেছিলুম। যুদ্ধক্ষেত্রে মীর মদনের মৃত্যুর পরেও আমার একক চেষ্টায় যুদ্ধের গতি সিরাজের অনুকূলে ছিল। কিন্তু নিজ অদূরদর্শিতা ও মানসিক দুর্বলতার কারণে সিরাজ,  মীর জাফর প্রমুখ বিশ্বাসঘাতকদের প্রভাবে যুদ্ধ বন্ধ রাখার আদেশ দেন। ফলত: নবাব বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় ও শোচনীয় পরাজয় ঘটে। আমি যুদ্ধক্ষেত্রে মারা যাইনি।  যুদ্ধে আহত হই আর যখন জানতে পারি যে মীর জাফর আমাকে খুন করার জন্য তল্লাশি চালাচ্ছে, তখন গা ঢাকা দিই। কিন্তু যুদ্ধ পরবর্তী পর্যায়ে আমার বড় ছেলে, পূর্নিয়ার নায়েব নাজিম, শ্রীমন্ত লালকে মীর মিরন খুন করেছিল। ছোট ছেলে হুক্কা লাল পালিয়ে আত্মরক্ষা করেছিল। আমার বোন ছিল সিরাজের প্রণয়িনী আর আমি তাদের বাচ্চা ছেলেকে নিয়ে মুর্শিদাবাদ ছেড়ে ময়মনসিংহে চলে যাই। তারপর আমার অজ্ঞাতবাস পর্বের নানা কিংবদন্তি ছড়িয়ে আছে বাংলায় । আমাকে একটি কলঙ্কিত চরিত্র হিসেবেই ব্রিটিশরা তুলে ধরেছিল। অথচ আমি পলাশীর যুদ্ধে সমস্ত রকমের বিরুদ্ধাচরণকে অস্বীকার করে যেভাবে দেশের হয়ে লড়েছিলুম, সে সম্পর্কে ইতিহাস প্রায় নীরব। সিরাজের কলকাতা অভিযানকালেও (১৭৫৬) আমি যে দক্ষতা আর অসমসাহসের পরিচয় রেখেছিলুম, সেই ইতিহাসও বাঙালির কাছে তুলে ধরা হয় না। পূর্ণিয়া অভিযান এবং পূর্ণিয়ার শাসনব্যবস্থার খোলনলচে বদলাতে আমার ঐতিহাসিক অবদানের কথা ব্রিটিশরা চেপে গেছে। পলাশীর পরিপ্রেক্ষিত রচনার ক্ষেত্রে চন্দননগরকে ঘিরে ফরাসি এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির টানাপোড়েনে সিরাজকে সঠিক ভূমিকা পালনের ক্ষেত্রে আমার আর মীরমদনদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত সঠিক। ফলে জগৎ শেঠদের  মতো লোকেরা ভালোভাবেই বুঝতে পারছিল যে সিরাজ কোনো অবস্থাতেই তাদের হাতের পুতুল হবেন না। জগৎ শেঠের সঙ্গে আমার সংঘাতের স্বরূপটা বেশ ভালোভাবেই বুঝেছিল মীর জাফর। 

শওকত জঙ্গ : আমি হলুম বাংলার নবাব আলীবর্দী খান-এর নাতি আর সিরাজউদ্দৌলার পিসতুতো ভাই।আলীবর্দী খানের ছিল তিন মেয়ে। তিন মেয়েকেই উনি নিজের বড়ভাই হাজি আহমদ-এর তিন ছেলে, নোয়াজেশ মোহাম্মদের সাথে বড় মেয়ে ঘসেটি বেগমের, সৈয়দ আহমদ খান সওলত জং সাথে মেজ মেয়ে মায়মুনা বেগমের আর জয়েনউদ্দিন আহম্মদের সাথে ছোট মেয়ে আমেনা বেগমের বিয়ে দেন। তিনি ছিলেন আলীবর্দী খানের মেজ মেয়ে মায়মুনা বেগমের সন্তান। আমিও চেষ্টা করেছিলুম সিরাজকে সরিয়ে সিংহাসনে বসতে । অথচ পলাশীর পর কেউ আমাকে পাত্তা দিল না । 

শশী ঘোষ : কলকাতা বিশ্বের সব থেকে পুরনো শহরের মধ্যে অন্যতম। এমন একটা শহর যার পরতে পরতে লুকিয়ে আছে ইতিহাস। এই ইতিহাসে রয়েছে যেমন ভালবাসা ঠিক তেমনি রয়েছে রোমাঞ্চ। ধরুন আপনার কাছে একটা টাইম ট্রাভেল মেশিন আর সেই টাইম ট্রাভেলে করে এসে পৌঁছালেন পুরনো শহরে। কলকাতায় তখন ব্রিটিশ রাজ। আপনার জানার মধ্যে শুধু ধর্মতলা আর স্রেফ কয়েকটা জায়গার নাম। বাকি অংশ শুধু জঙ্গল আর জঙ্গল। ধর্মতলা থেকে রাজভবন হয়ে এগোতে শুরু করলেন অফিসপাড়ার দিকে। এই জায়গা তখন শুধু নির্জন রাজপথ। কলকাতার ওয়েলেসলি প্লেস থেকে কাউন্সিল হাউজ পর্যন্ত এই রাস্তাটিকে তখন বলা হত ‘ফ্যান্সি লেন’।মনে হতেই পারে ব্রিটিশ আমলের কোনও ইংরেজের শখ বা শৌখিনতার সঙ্গে এর নিশ্চয় রাস্তার সম্পর্ক আছে। যার জন্যে এর নাম হয়েছে ‘ফ্যান্সি লেন’। তবে বলে রাখি আপনার এই মনে হওয়াটা একদমই ভুল। ইংরেজী শব্দ ফ্যান্সির সঙ্গে এর কোনও সম্পর্ক নেই।এই ‘ফ্যান্সি’ কথাটা এসেছে ‘ফাঁসি’ শব্দ থেকে। আঁতকে উঠলেন বুঝি! ফাঁসি। তাও প্রকাশ্য দিবালোকে। ভরা রাস্তার উপর। জনসাধারণের চোখের সামনে। বীভৎস এই ঘটনার সাক্ষী থেকেছে শহর কলকাতা! সাহেবি উচ্চারণে ‘ফাঁসি’টা হয়ে গিয়েছে ফ্যান্সি, ফলে গোটা মানেটাই ঘেঁটে ঘ ! ঐতিহাসিকরা বলছেন, ইংরেজি ‘ফ্যান্সি’ (Phancy) শব্দটি যে ‘শৌখিন’ অর্থে ব্যবহৃত হয়, এই রাস্তার নামের মানে মোটেই তা নয়। কলকাতার অন্যতম পুরনো রাস্তা এটি, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু ঘটনা। একটা সময় এর পাশ দিয়ে একটা খাল বা ‘ক্রিক’ প্রবাহিত হত বলে জানা যায়। এখন অবশ্য সেটি মুছে গেছে। আর্চডিকন হাইড তাঁর ‘প্যারোকিয়াল অ্যানালস’ এবং ‘পেরিশ অব বেঙ্গল’ বই দুটিতে সেই বর্ণনা দিয়ে গেছেন— “The creek took a half turn round this battery and kept Eastwards beneath three gated bridges, until the fences turned downwards from it at Fancy Lane.” তখন খুব বেশি দিন হয়নি ইংরেজরা কলকাতায় এসেছে। জোব চার্নক তখনও জীবিত। ডালহাউসির কাছে এখন যেখানে কাউন্সিল হাউস স্ট্রিট, বিলিতি আমলে একেবারেই লালদিঘির প্রায় গা-ঘেঁষা সাহেবপাড়া। গোটা জায়গাটাই ছিল জঙ্গল। লোকজন তখন এই ধারে তেমন ঘেঁষতে সাহস পেত না। লোকজন বিশেষ ছিল না বললেই চলে।চারপাশে শুধু অজস্র গাছ, আর তাঁতে লুকিয়ে থাকতো চোর-ডাকাত। সে অন্য যুগ। অন্য জগৎ। জব চার্নকের কলকাতায় তখন নতুন রাজত্ব। সাহেবদের শৌখিনতা তখন গরিব লোকদের ফাঁসি দেওয়া। অপরাধ তখন যাই থাকুক না কেন একটাই শাস্তি ফাঁসি। ১৮০০ সালের কথা। ঢেঁড়া পিটিয়ে বেড়াচ্ছে কম্পানির লোক। কী, না ব্রজমোহনের ফাঁসী হবে। ব্রজমোহনের অপরাধ একটা মুল্যবান ঘড়ি সে চুরি করেছে। যার দাম ২৫টাকা। সে ফাঁসি হবে প্রকাশ্য স্থানে কোনও চৌমাথায়। বহু লোকের সামনে। চারদিকে থেকে পিল পিল করে লোক আসছে। ফাঁসি দেখবে। আজকের ওয়েলেসলি প্লেসে তখন অনেক বড় বড় গাছ ছিল। সেখানেই বসলো মেলা। রাস্তার মোড়ে একটি গাছের কাছে তৈরি করা হয় ফাঁসির মঞ্চ। ফাঁসি হল। সবাই ইংরেজদের এই ন্যায়পরায়ণতা দেখে ধন্যি ধন্যি করল। সেই সময় থেকেই রাস্তার মাঝখানেই এইভাবে ফাঁসি দেওয়া আরম্ভ হল। অত্যন্ত লঘু অপরাধেও অনেক সময় ফাঁসি দেওয়া হত। রাস্তার ধার ঘেঁষে সার সার ঝুলে থাকত দেহ। ফাঁসি দেওয়া রাস্তাটির নামই পরবর্তীকালে হয়ে যায় ‘ফ্যান্সি লেন’ যা বর্তমান পান্নালাল রোড। ইংরেজদের মুখে মুখে ‘ফাঁসি’ শব্দটাই বদলে হয়ে গিয়েছিল ‘ফ্যান্সি’। সেই থেকেই এই নাম। পুরনো কলকাতা নিয়ে লেখায় শ্রীপান্থ বলছেন, মহারাজ নন্দকুমারের ফাঁসি দেখে সবাই ফিরেছিলেন গঙ্গাস্নান করে।কারণ নন্দকুমার ছিলেন ব্রাহ্মণ। ব্রহ্মহত্যা দেখার মহাপাপ ধুয়ে ফেলতে গঙ্গাস্নানই ছিল সামাজিক বিধান। তবে সাধারণ অপরাধীদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট যে রাস্তা ছিল, সেখানে মহারাজ নন্দকুমারকে ফাঁসি দেওয়া হয়নি। গলিটিতেই এখন রয়েছে রাজভবনের স্টাফ কোয়ার্টার্স। আর কিছু অফিস ও দু’একটি দোকান। এবং ব্রিটিশ আমলের চিহ্ন নিয়ে ভেঙে-পড়া পুরোনো বাড়ি। পুরনো কলকাতার এই ভয়ঙ্কর ইতিহাস অনেকেরই হয়তো অজানা। সুতরাং বুঝতেই পারছেন যে নন্দকুমার ছিলেন কলকাতার জনক ।

সুপ্রীতি বর্মণ : কলকাতা শহরকে ইউরোপীয় নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করতে ১৭৫৬ সালের জুন মাসে সিরাজ অতর্কিতে কলকাতা আক্রমণ করেন। ইতিমধ্যে কোম্পানি কলকাতায় ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ নির্মাণ করে পরিস্থিতি জটিল করে তুলেছিল। ২০ জুনের আক্রমণের সঙ্গে সঙ্গেই কলকাতার পতন ঘটে। ফলে ভারতীয়রা শহরের দখল নেন।এরপর সেনাপতি মানিকচাঁদের হাতে দুর্গের শাসনভার ছেড়ে দিয়ে সিরাজ-উদ-দৌলা রাজধানীতে ফিরে আসেন, ১২ জুলাই । কলকাতার নতুন নাম দেন – আলিনগর । এই নামটার একটা ধারা মেনেই – বর্তমান কলকাতার একটা অংশের নাম – আলিপুর ।

আলীবর্দী খান : ১৭৫৬ সালে কলকাতায় দুর্গনির্মাণে বিরক্ত হয়ে আমার নাতি নবাব সিরাজদ্দৌল্লা কলকাতা আক্রমণ করেছিল। কলকাতা অধিকারের পর সিরাজ এই শহরের নাম বদল করে আমার নামানুসারে ‘আলিনগর’ রেখেছিল । ১৭৫৮ সালে ইংরেজরা কলকাতা পুনরুদ্ধার করলে পুরোনো নামটা আবার বহাল হয়। তবে সিরাজের কলকাতা দখল ছিল ইংরেজদের কাছে এক দুঃস্বপ্নের সময়। এই যুদ্ধে গোবিন্দপুর, সুতানুটি, কলকাতা ও চিৎপুরের মধ্যে কেবলমাত্র ‘হোয়াইট টাউন’ নামে পরিচিত কলকাতা সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ‘ব্ল্যাক টাউন’ খুব একটা ক্ষতিগ্রস্থ হয়নি। কেবল বড়োবাজারে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছিল আর ইংরেজরা গোবিন্দপুর গ্রামটা জ্বালিয়ে দিয়েছিল। হুগলি নদীর চল্লিশ কিলোমিটার ভাটিতে ফলতায় ইংরেজরা পালিয়ে যায়। আলিনগর নাম থেকে প্রমাণিত যে আমিই কলকাতার জনক । 

মহারাজা নন্দকুমার : পলাশীর ষড়যন্ত্রের পর নন্দকুমারকে মীর জাফর দেওয়ান নিযুক্ত করে সব সময় তাকে নিজের কাছে রাখতেন। নন্দকুমার ভূষিত ছিল মহারাজা উপাধীতে। কিন্তু ওয়ারেন হেস্টিংস এর সাজানো মিথ্যা মামলায় আসামীর কাঠগড়ায় তার বিচার হয়। অদৃষ্টের কি নির্মম পরিহাস তাকে শেষ পর্যন্ত এই বিচারের রায়ে শেওড়াগাছে ঝুলতে হয় ফাঁসী কাষ্ঠে। মহারাজ নন্দকুমারের সাথে মীর জাফরের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। মীর জাফর তার শেষ জীবনে যাবতীয় কাজ কর্ম নন্দকুমারের পরামর্শনুসারে করতেন। তার অন্তিম শয্যায় নন্দকুমারই তার মুখে কিরীটেশ্বরী দেবীর চরণামৃত তুলে দিয়েছিলেন।

ধিরুভাই অম্বানি : বাঙালি বাড়ির বউরা আমার বউয়ের মতন হলে আজ পশ্চিমবাংলা অনেক ধনী রাজ্য হতো । একটা উদাহরণ দিই । দ্বারকানাথের ইংরেজ-সংসর্গ তাঁর মা বা স্ত্রী কেউই ভাল চোখে দেখেননি। দ্বারকানাথ এ ব্যাপারে স্ত্রীর মতামত অগ্রাহ্য করলে দিগম্বরী স্বামীর সঙ্গে দেখা-সাক্ষাতেও ইতি টানেন। পরিস্থিতি এমনই দাঁড়ায় যে, দিগম্বরী হিন্দু পণ্ডিতদের ডেকে ম্লেচ্ছদের সঙ্গে একত্রে পানভোজন করা স্বামীর বিরুদ্ধে বিবাহবিচ্ছেদের বিধানও চেয়েছিলেন। পণ্ডিতেরা নিদান দেন, ‘স্বামীকে ভক্তি ও তাঁহার সেবা অবশ্য কর্তব্য, তবে তাঁহার সহিত একত্র সহবাস প্রভৃতি কার্য্য অকর্তব্য।’ স্ত্রীর সাংসারিক দায়িত্বটুকু পালন করা ছাড়া দিগম্বরী স্বামীর সঙ্গে আর কোনও সম্পর্ক রাখেননি। কাজের সূত্রে দ্বারকানাথের সঙ্গে যত বার কথা বলতে হত, তত বারই নাকি তিনি গঙ্গাজলে চান করতেন, এমন কথাও শোনা যায়। সুতরাং দ্বারকানাথই কলকাতার জনক।

জয়িতা ভট্টাচার্য : কলকাতায় ইংরেজরা তাদের বসতির বাইরে দুর্গপ্রাচীরের মতো প্রতিরক্ষা বেষ্টনী তৈরির চেষ্টা নিলে নবাবের নির্দেশে তা ধ্বংস করা হয়। একইভাবে ফরাসিরা প্রাচীর নির্মাণ করলেও তারা নবাবকে বোঝাতে সক্ষম হয় যে, এটা কোনো দুর্গ না, বরং স্থাপত্যিক কাঠামোর সংস্কার করা হচ্ছে মাত্র। নবাব ফরাসিদের কথা বিশ্বাস করলেও ইংরেজদের বিশ্বাস করতে চাননি। ফলে ফরাসিরা তাদের দুর্গপ্রাচীর টিকিয়ে রাখতে পারলেও শেষ পর্যন্ত ধ্বংস করা হয় ইংরেজদের দুর্গ। তবে এখানকার মূল বাস্তবতা হচ্ছে, ইংরেজরা যে দুর্গপ্রাচীর নির্মাণ করেছে, সেটা যতটা না নবাবের বিরুদ্ধে যায়, তার চেয়ে ঢের ফরাসিদের প্রতিরোধে কার্যকর হতো। এক্ষেত্রে তার খালা ঘষেটি বেগমের চক্রান্ত করার সুযোগ হয়ে যায়। পাশাপাশি কুশলী ইংরেজ গভর্নর রজার ডেরেক পরিস্থিতির সুযোগ নিতে চাইলেন। সব মিলিয়ে যুবক সিরাজদ্দৌলার পক্ষে এ ধরনের অস্বাভাবিক ঘটনায় উপযুক্ত ও কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্ভব হয়নি। ক্ষিপ্ত সিরাজদ্দৌলা এবার প্রতিটি ক্ষেত্রে ইংরেজদের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেয়ার চেষ্টা করেন। তিনি মুর্শিদাবাদের কাছাকাছি কাশিমবাজারের ইংরেজ কুঠি দখল করে কলকাতার দিকে অগ্রসর হন। ইংরেজরা প্রথম থেকেই নবাবকে প্রতিরোধ করার মতো সাহস রেখেছিল; কিন্তু তাদের সামরিক ছাউনিতে উপযুক্ত সংখ্যায় সৈন্য ছিল না। এতে তাদের মনে ত্রাস সৃষ্টি হয়। তাই তারা নবাবের বাহিনীর আগমন বুঝতে পেরে কুঠি ত্যাগ করে। গভর্নর ডেরেক সপরিবারে চেপে বসেন একটি জাহাজে। এর পর পুরো কুঠি নবাবের আনুকূল্যে চলে যায়। আর কুখ্যাত অন্ধকূপ হত্যার গাঁজাখুরি গল্প ফাঁদা  হয় ঠিক এর পর পরই। কলকাতার পতন হলে ভারতে অবস্থানরত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্তাব্যক্তিরা নড়েচড়ে বসেন। দীর্ঘ বৈঠকের পর কলকাতা পুনরুদ্ধারের জন্য সর্বস্ব দিয়ে চেষ্টা করার উদ্যোগ নেয়া হয়। ছয় সপ্তাহের প্রস্তুতি চলে সেন্ট ডেভিড দুর্গে। 

বাহাদুর শাহ জাফর : মূলত জোব চার্ণকের সহস্র দোষ ছিল এবং সুতানুটিতে যখন সে  ১৬৯০ সালে পৌঁছেছিল  তার তিনবছর পরই সে যৌনরোগের কারণে দেহত্যাগ করে তাই কখনই তাঁকে কলকাতা শহরের প্রতিষ্ঠাতা বলা সম্ভব নয়। এরপর ১৬৯৬সালে চার্লস আয়ার(জোব চার্ণকের জামাই) কলিকাতা কুঠীর এজেন্ট হিসাবে নিযুক্ত হয়। সেই সময় চার্লস আয়ার চক্রান্ত করে আওরঙজেবের পৌত্র পাটনা-নিবাসী আজিম উস শানের থেকে একটা সনদ নিয়ে আসে। এই সনদটি আনবার জন্য আজিম উস শানকে ষোল হাজার টাকা ঘুষ দিয়েছিল কোম্পানি । তাতে লেখা থাকে যে বাংলার সকল জমিদারদের ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে সাহায্য করতে হবে। কিন্তু সাবর্ণরা এই আদেশপত্রে সাক্ষর করতে রাজি ছিলেন না তবুও সম্রাটের আদেশ মতন বড়িশার আটচালায় চার্লস আয়ারের সাথে সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের প্রজাসত্ত্ব হস্তান্তরিত হয় বার্ষিক ১৩০০টাকা খাজনার বিনিময়ে। এই খাজনা ব্রিটিশ কোম্পানি ১৭৫৭ সাল অবধি সাবর্ণদের দিতো । সুতরাং কলকাতা কখনই বিক্রি করে দেওয়া হয়নি। পরবর্তীকালে ব্রিটিশ আমলে কলকাতায় বড় বর ইমারত তৈরি হলেও প্রথম ইমারতটি তৈরি হয়েছিল জমিদার সাবর্ণ চৌধুরীদের আমলেই। সুতরাং সাবর্ণরা প্রজাসত্ত্ব হস্তান্তরিত করেছিল, জমিদারিসত্ত্ব নয়। এই প্রজাসত্ত্ব ছিল বাদশাহের অধীনস্থ তালুকদারের অধিকার। কেন না, অন্যান্য জায়গীরের মতন সুতানুটি, কলিকাতা এবং গোবিন্দপুরের জমিদারিসত্ত্ব বিক্রি করার অধিকার সাবর্ণদের ছিল না। সুতরাং এতদিন যারা এই বিক্রি করার গল্প সাজিয়েছেন তারা নিতান্তই ব্রিটিশ তোষণের জন্যই করেছেন এর কোন বাস্তবিক ভিত্তি নেই। সুতরাং কলকাতার জনক আজিম উস শান ।

 মীর মোহাম্মদ আলী খান : লোকে আমাকে মীরণ নামে এক ডাকে চেনে । আমি পলাশী ষড়যন্ত্রের পরবর্তী ঘটনাগুলোর প্রধানতম নায়ক। আমিই সিরাজের মূল হত্যাকারী, সিরাজের মাতা আমেনা বেগম, সিরাজের ভাই মির্জা মেহেদীকেও নিষ্ঠুর ভাবে হত্যা করেছিলুম । আমারই নির্দেশে মোহাম্মদী বেগ সিরাজকে খুন করে। শুধু খুন  নয় ; সিরাজউদ্দৌলার লাশকে আমি ক্ষত বিক্ষত করে তারই প্রিয় হাতির পিঠে  বেঁধে গোটা মুর্শিদাবাদ শহর ঘুরিয়েছিলুম যাতে সবাই এই বীভৎস দৃশ্য দেখে যেনো পরবর্তীতে বাংলার বুকে বিদ্রোহ করতে না পারে।  সিরাজের মা আমেনা বেগম তার ছেলের লাশ দেখার জন্য দৌড়ে হাতির কাছে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান আর সে’সময় মীরণের স্যাঙাতরা সিরাজের মাকে কিল, চড় ও ঘুষি মেরে আবার জেলখানায় বন্দী করে রাখে। হাতিটা কিন্তু সে সময় সিরাজের লাশ তার পিঠে নিয়ে আমেনা বেগমের সামনে বসে পড়ে। আমার মৃত্যু ঘটে বজ্রপাতে। মীর জাফর তখনও বাংলার নবাব। বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতই পিতার কানে সে সংবাদ পৌঁছেছিল। তিনি মীরণের মৃত্যু শুনে বেঁহুশ হয়ে পড়েন। মুর্শিদাবাদে মীরণের লাশ, নিয়ে আসা হলো। কি বীভৎস বিকৃত পোড়ালাশ। পিতাকে না দেখতে দিয়ে লাশ দাফন করা হলো। এভাবেই মীরণের মৃত্যু। এটা আর কিছুই নয় আসল ঘটনাকে চাপা দেওয়ার একটা কৌশল মাত্র। মীরণকে খুন করে ইংরেজদের নির্দেশে মেজর ওয়ালস্। তবে  এই ঘটনাটা ধামাচাপা দেয়ার জন্য ইংরেজরা বজ্রপাতে মীরণের মৃত্যুর মিথ্যা গল্প বানিয়েছিল।

 মোহাম্মদী বেগ : আমি ছিলুম নবাব আলীবর্দী খাঁর খাস চাকর। আলীবর্দী খাঁর আমল থেকেই তাঁর পরিবারের একজন সদস্যরূপে তাঁরই স্নেহছায়ায় আমি বেড়ে উঠি। সিরাজউদ্দৌলার সঙ্গেও আমার বিশেষ সখ্যতা ছিল। সিরাজউদ্দৌলাকে মীরণের নির্দেশে হত্যা করেছিলুম আমি । আমি একটা খঞ্জর দিয়ে আঘাত করে নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিলুম। দিনটি ছিল ১৭৫৭ খৃষ্টাব্দের ৩’রা জুলাই। নবাব সিরাজ এ সময় আমার কাছে প্রাণ ভিক্ষা চাননি । তিনি কেবল আমার কাছ থেকে দু’রাকাত নামাজ পড়ার অনুমতি চেয়েছিলেন। বলাবাহুল্য  সিরাজের সেই অন্তিম ইচ্ছাও প্রত্যাখ্যান করেছিলুম।  সংসারের দাম্পত্য কলহে বদ্ধ উম্মাদ হয়ে গিয়েছিলুম আর একদিন কুঁয়োয় ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করি। 

 ইয়ার লতিফ খান : আমি ছিলুম নবাব সিরাজের একজন সেনাপতি।  পলাশী ষড়যন্ত্রের সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলুম। পলাশীর যুদ্ধের মাঠে আমার সেনারা মীর জাফর, রায় দুর্লভের বাহিনীর মতন কাঠের পুতুল হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। যুদ্ধের পরে বখরা দেবার ভয়ে ইংরেজরা আমাকে খুন করে লাশ লোপাট করে দিয়েছিল ।

মেহের উন নিসা বেগম : লোকে আমাকে ঘসেটি বেগম নামেই বেশি চেনে । আমি  নবাব আলীবর্দী খানের বড় মেয়ে। বিয়ে হয়েছিল নওয়াজিস মুহম্মদ শাহমাত জং-এর সাথে  যিনি  ঢাকার নায়েব নাজিম নিযুক্ত হয়েছিলেন। নিঃসন্তান হওয়ায় আমি আর আমার স্বামী সিরাজউদ্দৌলার ছোটো ভাই ইকরামউদ্দৌলাকে দত্তক নিয়েছিলুম। কিন্তু ইকরামউদ্দৌলা তরুণ বয়সে গুটিবসন্তে মারা যায়।  নওয়াজশ মুহম্মদ দুঃখে মারা যান। আমি উত্তরাধিকার সূত্রে  স্বামীর  প্রচুর সম্পদ পেয়েছিলুম । নবাব আলীবর্দী খান মারা যাবার পরে, আমি চেষ্টা করছিলুম দ্বিতীয় বোন মায়মুনা বেগমের ছেলে শওকত জংকে সিংহাসনে বসানোর। কিন্তু সিরাজউদ্দৌলা সিংহাসনে বসতে করতে সমর্থ হয়। শেষে, তিনি আলীবর্দী খানের সেনাপতি মীর জাফর, ব্যবসায়ী জগৎ শেঠ আর উমিচাঁদের সঙ্গে গোপনে ষড়যন্ত্র করি। পলাশীর যুদ্ধে সিরাজউদ্দৌলা হেরে যাবার পর ইংরেজরা মীর জাফরকে নবাব বানায়।মীর জাফর, আমাকে ঢাকার জিনজিরা প্রাসেদে বন্দি করে রেখে ডিয়েছিল। কিন্তু আমাকে বিপদজনক শত্রু মনে করে, মীর জাফরের ছেলে  মীরন আমাকে ১৭৬০ সালে মুর্শিদাবাদ ফেরত নিয়ে আসার আদেশ দেয়। , মুর্শিদাবাদ ফেরার পথে আমাদের নৌকো খরস্রোতা বুড়ীগঙ্গা নদীতে পূর্ব পরিকল্পনা মোতাবেক আমাকে নৌকায় তুলে বুড়ীগঙ্গা নদীতে নৌকা ডুবিয়ে মেরে ফেলে। আমার আর্তনাদ আহাজারী নদীর কিনার থেকে নিশুতি রাতে পথচারীরা শুনতে পেয়েছিল।

ওয়াটস : আমি কোম্পানির একজন আমলা । পলাশীর যুদ্ধে  ষড়যন্ত্রের নেপথ্যে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল আমার। আমি পাল্কীতে করে বউ  সেজে মীর জাফরের বাড়িতে গিয়ে চুক্তিতে মীর জাফরের স্বাক্ষর এনেছিলুম। পলাশীর যুদ্ধের পর কোম্পানীর কাছ থেকে বরখাস্ত হয়ে মনের দুঃখে ও অনুশোচনায় ইংল্যান্ডে হঠাৎ হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যাই।

প্রদোষচন্দ্র মিত্র : সাম্রাজ্যবাদের পূজারিরা ঢাক-ঢোল পিটিয়ে জোব চার্নককে কলকাতার ‘বাবা’র আসনে বসানোর যত অপচেষ্টাই করুন না কেন, কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গের এবং ভারতবর্ষের মানুষ তা প্রত্যাখ্যান করবেনই। প্রসঙ্গত শেষ বার যখন চার্নক সুতানুটিতে এসেছিলেন তখন তিনি বর্তমান বেনেটোলা আর শোভাবাজারের মধ্যবর্তী মোহন টুনির ঘাটে নেমেছিলেন বলে অনেকে মনে করেন। তবে জোব চার্নক কলিকাতা বা গোবিন্দপুরে আসেননি, কারণ তিনি গুপ্তরোগে আক্রান্ত ছিলেন। এবং তাঁর অবস্থা ছিল বড়োই শোচনীয়। প্রায় দু’শো লোক তখন জ্বরে ও ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত। তার ওপর তিনিও আক্রান্ত। শেষ বয়সটা সুতানুটিতে কাটিয়ে তাঁর জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটেছিল। তা হলে তাঁকে কেন কলকাতার জনক বলা হবে? তা ছাড়া কলকাতা নামের উৎপত্তি বহু প্রাচীন গ্রন্থেই পাওয়া যায়। ঐতিহাসিকদের অনুমান, কলকাতা দু’ হাজার বছরের পুরোনো এক জনপদ। ‘আইন-ই-আকবরি’র রাজস্ব আদায়ের খতিয়ানে ‘কলিকাতা’ নামের উল্লেখ আছে। বিপ্রদাস পিপলাইয়ের ‘মনসাবিজয়’ কাব্যে (১৪৯৫-৯৬), কবিকঙ্কন মুকুন্দরামের ‘চণ্ডীমঙ্গল’-এ কলিকাতার উল্লেখ পাওয়া যায়। ওলন্দাজ বণিক ফান ডেন ব্রুক-এর অঙ্কিত মানচিত্রেও কলকাতার উল্লেখ রয়েছে। ‘পদ্মাবতী’র রচনাকাল আনুমানিক ১৬৪৫-৫২ সাল। সেই গ্রন্থেও কলকাতা রয়েছে। তা হলে কখনোই জোব চার্নককে কলকাতার জনক বলা যায় না। তা ছাড়া চার্নক আসার বহু আগে থেকেই কলকাতা ধীরে ধীরে শহরে রূপান্তরিত হতে শুরু করে – পাকাবাড়ি, পাকা রাস্তা, বাণিজ্যনগরীর নানান কাজও শুরু হয়ে যায় চার্নক আসার বহু আগে থেকেই। তাই এ তত্ত্ব কখনোই সমর্থনযোগ্য নয় যে জোব চার্নক কলকাতার জনক ।

Posted in Uncategorized | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

আমি হাবশি বেতাল : ম্যাজিশিয়ান মলয় রায়চৌধুরী

কবি মনোহর দাস (ষোড়শ/ সপ্তদশ খ্রিষ্টাব্দ): 

‘নানা শাস্ত্র নানা ধর্ম আছয়ে সংসারে

মোর শক্তি নাহি হয় এসব আচারে।

আমি কোন ছার ধর্ম আচরণ করি

থাকুক ধর্মের দায় মর্ম বুঝিতে নারি।

ধর্ম যারে বলে তিনি ব্রহ্মাণ্ড বেড়িয়া

স্থাবর জঙ্গম আদি দেখ বিচরিয়া।

হৃদয়ে উদয় যেই সেই কার্য সার

তাহা বিন অন্য ধর্মকর্ম কিবা সার।’

         রাজা বিক্রমাদিত্যের কাঁধ থেকে অবসর নেবার পর বটগাছে টঙে বসে আছি ; আমি হাবশি বেতাল, ঈশ্বরচন্দ্রের দেয়া  চেয়ার-টেবিল  শেকড় দিয়ে বেঁধে, পৌরাণিক যুগ থেকে, কলি দ্বাপর ত্রেতা সত্য যুগের আগে থেকে । আমার কাজ লেখা । স্হান-কাল-পাত্র বুঝি না,   গুলিয়ে ফেলি । আমি, যে কিনা হাবশি বেতাল, লেখা যে কোনদিকে এগোয় আর পেছোয় তা  নিজেই জানি না । যা  শুনি তা কবে লিখব তার ঠিক-ঠিকানা নেই, মনে পড়লে লিখি, দুশো বছর আগের কথা কাল হয়তো মনে পড়েছিল, এক হাজার বছর আগের কথা হয়তো এখন মনে পড়ল ।  ন্যারেটিভ লণ্ডভণ্ড ।  কলম কাগজ দেখতে পাই না অথচ লিখতে থাকি নিজের মনে, লিখি আর উড়িয়ে দিই ।

          গাছের তলায় একজন সিদ্দি আর তার মগ বেগমের সমাধি, তারা বাইরের জগতটা দেখতে পায়, শুনতে পায়, নিজেরাও কথা বলে, যারা সমাধি দেখতে আসে তাদের সঙ্গেও কথা বলে।অথচ সমাধির মধ্যে তারা নেই ; তাদের কবর অন্য কোথাও, খুঁজে পাওয়া যায়নি ; তারা হয়তো মিথ্যা, বানানো, অস্তিত্বহীন।

         এক পর্যটক জুটি কাল রাতে সমাধির ওপরে শুয়ে বেশ কয়েকবার সঙ্গম করেছিল, রাতভর।

         সকালে সমাধি বলছিল, তোমরা দুজন হনিমুন করতে বেরিয়েছ তো ? কাল রাতে তোমাদের ভালোবাসাবাসির আওয়াজ শুনেছি, পরিচিত শ্বাস-প্রশ্বাস আর শব্দ ; অনেকে জুটিতে মিলে হনিমুন করতে এসে রাতটা কাটিয়ে যায় এই সবুজ অঞ্চলে, খোলা আকাশের তলায়, পূর্ণিমার আলোয়, শিশিরে ; তা চার-পাঁচ হাজারের বেশি জুটির সঙ্গমের আওয়াজ জমিয়ে রেখেছি, মাঝে-মধ্যে বাজিয়ে শুনি। তারা ক্লান্তিতে পাশাপাশি শুয়ে পড়লে  তাদের বলি  গল্প শোনাতে । তোমরা দুজনে শোনাও । ফিরবে তো কাল যখন পর্যটন কোম্পানির বাস  তোমাদের সঙ্গী পর্যটকদের নিয়ে নিতে আসবে । তোমরা ভালোবাসাবাসির জন্যে থেকে গেলে, বুঝেছি, তোমাদের সঙ্গীদের হাসাহাসি আর মন্তব্য থেকে । আমাদের কালে এরকম ভালোবাসাবাসি ছিল না ;  সম্রাটদের ছিল জেনানা, আর তাতে বিয়ে করে আনা বউ, বাঁদি, রক্ষিতা, ক্রীতদাসী, লুট-করে আনা অন্য ধর্মের আর ভাষার যুবতী, সম্রাটের ঘরে পৌঁছে দেবার খোজারা ছিল । রাজা-বাদশাদের সঙ্গে শোবার আর শোয়াবার জন্য এতো যুবতী জোগাড় হতে লাগলো যে হারেমপ্রথা শুরু করা জরুরি হয়ে উঠলো।         

          কয়েকশো বছরের পুরোনো সমাধির দিকে তাকিয়ে যুবক বলল, আপনি ঠিকই বলেছেন, হারেমের গল্প অনেক শুনেছি ।

          যুবতী বলল, আচ্ছা, আগেকার কালে তো লাভ জেহাদ ছিল না ; ভিন ধর্মের বউরা হারেমে থেকেও তাদের ধর্ম বজায় রাখত  । এখন ভিন ধর্মে প্রেম বা বিয়ে করলে লোকে লাভ জেহাদ বলে কেন ? ধরে দুজনকেই কচুকাটা করে !

          ঘোড়া ছুটিয়ে একজন ন্যাড়া-মাথা লম্বা টিকি লোক যাচ্ছিল, যুবতীর কথা শুনতে পেয়ে বলল, ওটা তোমাদের কালের ব্যারাম । আমি বাজিরাও পেশওয়া, আমি তো মাসতানি নামে একজন ভিনধর্মীর সঙ্গে লিভ-ইন করতুম, মাসাতানির ছেলে হলে, তার নাম রাখলুম শামশের বাহাদুর, শামশেরের ছেলের নাম রাখলুম আলি বাহাদুর । আমার হিন্দু বউ কাশিবাঈয়ের ছেলেদের নাম রাখলুম নানাসাহেব আর রঘুনাথ রাও । তরোয়াল ঘোরাতে ঘোরাতে  বাজিরাও পেশওয়া বলল, দাঁড়াও একটু পরে ফিরে আসছি । 

          যুবক বলল, তাহলে সুমন চট্টোপাধ্যায় কেন কবীর সুমন হলেন ?

          যুবতী বলল, নার্গিস বিয়ে করেছিলেন সুনীল দত্তকে । নার্গিসকে গোর দেয়া হলো আর সুনীল দত্তকে দাহ করা হলো ! তাদের মেয়েরা হিন্দু আর খ্রিস্টান বিয়ে করল । ছিলে একবার বিয়ে করল হিন্দু মেয়েকে ; সে মারা গেলে বিয়ে করল মুসলমান মেয়েকে । সেই মুসলমান মেয়ে বাড়িতে হিন্দু দেবদেবীর পুজো করে । আমাদের দেশে তো আজকাল বাঙালির পোশাক ছেড়ে লোকে গেরুয়া বা সবুজ আলখাল্লা পরছে , সবজান্তার বক্তিমে ঝাড়ছে।

         যুবক বলল, আজকাল প্রেমে পড়া বেশ বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়িয়েছে ! মাণ্ডোয়া গিয়েছিলুম । সেখানে শুনে এলুম বাজ বাহাদুর আর রূপমতীর প্রেমের ঘটনা । তখন তো কেউ লাভ জিহাদের জিগির তোলেনি । রূপমতীকে ধর্ম পালটাতেও বলেনি বাজ বাহাদুর ।       

          সমাধি বলল,  ওই যে দেখছো, ওটা বেহুলা লক্ষিন্দরের বাসর ঘর । বগুড়া শহর থেকে দশ কিলোমিটার উত্তরে, মহাস্থান গড় থেকে দু কিলোমিটার দক্ষিণে ওটা গোকুল গ্রাম  ।  এটা বেহুলার বাসর ঘর নামে পরিচিত। অনেকে একে লক্ষ্মীন্দরের মেধ বলে । এ মন্দিরে  ষাঁড়ের প্রতিকৃতি খোদাই করা সোনার পাত পাওয়া গেছে। স্তূপটা বাসরঘর নয়।  স্তূপের পশ্চিমে আছে বাসরঘরের  স্মৃতিচিহ্ন। লখিন্দরের বাবা চাঁদ সওদাগর ছিলেন   শিবঠাকুরের ভক্ত। উনি অন্য কোন দেবতার আরাধনা করতেন না। অথচ শিবের মেয়ে মনসা ছিলেন সাপের দেবী। তার বাবা শিব তাকে বলেছিল, যদি কোন শিবের উপাসক প্রথমে তোর পুজো করে তাহলে মর্ত্যে তোর পুজো শুরু হবে । তখন মনসা চাঁদ সওদাগরকে বাছাই করে তাকে মনসা পুজো করতে বলে। কিন্তু চাঁদ সওদাগর তাতে রাজি হলো না। তখন  মনসা তাকে শাপ দেন- চাঁদ সওদাগরের প্রত্যেক ছেলে সাপের কামড়ে মারা যাবে। মনসার অভিশাপে এইভাবে একে একে লখিন্দর ছাড়া চাঁদ সওদাগরের সব ছেলেই সাপের ছোবলে মারা যায়। তাই লখিন্দরের বিয়ের সময় তার বাবা এমন বাসর ঘর তৈরি করেন যা সাপের পক্ষে ছেঁদা  করা সম্ভব নয়। তবু তাকে সাপে কামড়ায় । তার শব  ভেলায় করে নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হয়। বেহুলা সকলের নিষেধ অমান্য করে  মৃত স্বামীর সাথে ভেলায় চড়ে বসে। তারা ছয় মাস ধরে যাত্রা করে এবং গ্রামের পর গ্রাম পাড়ি দিতে থাকে। এই অবস্থায় মৃতদেহ পচে যেতে শুরু করে ।  বেহুলা তার শ্বশুরকে মনসার পূজা করাতে রাজি হলে লখিন্দরের প্রাণ ফিরে পায়। আসল কথা হলো, হারেমগুলো ছিল লখিন্দরের লোহার ঘরের মতন । তোমরা হয়তো জানতে চাইবে বগুড়া এখানে, এই দাক্ষিণাত্যে, কেমন করে এলো । ওই যে গাছে বসে আছেন হাবশি বেতাল, উনি স্হান-কাল-পাত্র এখানে আনতে পারেন, যখন যেদিন ইচ্ছা ।

          যুবতী বলল, আমি শোনাচ্ছি আপনাকে, দুজনে ভুত-পেত্নির অপচ্ছায়া হয়ে শুয়ে আছেন ঝড়-বৃষ্টি-রোদের মাঝে, ক্ষয়ে গেছে, ঝুরঝুরে হয়ে গেছে আপনাদের সমাধি ; আর্কিওলজির কোনো বোর্ডও নেই যে জানতে পারবো, আপনারা কারা ! ভাগ্যিস বললেন যে আপনারা দুজনে শুয়ে আছেন এই সমাধির ভেতরে ।

          সমাধির  পুরুষ  বলল, হ্যাঁ, বলব তোমাদের আমি কে, তার আগে তোমরা তোমাদের গল্প বলো, শুনি ।

          যুবক বলল, আজ্ঞে আমি নাস্তিক । আমিই লখিন্দর । আমিই রোমিও । আমিই শাহজাহান । আমি সত্যবান । আমি উত্তমকুমার । 

          যুবতী বলল, আমি নব্যনাস্তিক । আমিই বেহুলা । আমিই জুলিয়েট । আমিই মুমতাজ । আমি সাবিত্রী । আমি সুচিত্রা সেন । 

          বাদবাকি পর্যটকদের নিয়ে ফিরে যাবার বাসগুলো এসে পড়েছিল । কিন্তু সমাধির ভেতরের দুজন মানুষ কথা বলে, গল্প শোনায়, আর শুনতে চায়, জানতে পেরে, তারাও থেকে যেতে চাইল । জীবনের ল্যাঙলাথি খেয়ে, সকলেরই তো গল্প আছে, নিজেকে হালকা করার জন্যে, জ্ঞান বিলোবার জন্য । বাস থেকে নামল আমির, ওমরাহ, রাজা, বাদশা, নবাব, সম্রাট, লুটেরা, বর্গি, হারেমের খোজা, মস্তান, গাইয়ে, বাজিয়ে, নাচিয়ে, কবি, লেখক, সম্পাদক, গুণ্ডা, নেতা, চাকর, চাকরানি,পার্টি-সদস্য, আর চাকুরিহীন ছেলে-মেয়ে । তারা সবাই  ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, বার্সেলোনা, রিয়াল মাদ্রিদ,বায়ার্ন মিউনিখ, ম্যানচেস্টার সিটি, আর্সেনাল, চেলসি, লিভারপুল,  জুভেন্টাস, টটেনহাম হটস্পার,  এভারটন, নেপোলি, সাউদাম্পটন, ওয়েষ্টে হ্যাম, শালকে, ইন্টার মিলান, লেস্টার সিটি, অ্যাথলেটিকো মাদ্রিদ, ব্রুশিয়া ডর্টমুন্ড,, পিএসজি,  ম্যানচেস্টার সিটি,  বার্সেলোনা, টটেনহ্যাম হট্সপার, মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল, মোহামেডান স্পোর্টিং  ফুটবল দলের দশ নম্বর জার্সি পরে আছে । তারা এসেছে অঙ্গ,  মগধ ,  কাশী,  কোশল,  বৃজি বা বজ্জি, মল্ল,   চেদি , বৎস,  কুরু, পাঞ্চাল, মৎস্য,  সুরসেন,  অস্মক,  অবন্তী,  গান্ধার আর কম্বােজ দেশ থেকে ।

             বাস থেকে নামবার সময় ফর্সা পর্যটক যুবতী গাইতে আরম্ভ করেছিল, ‘ইয়ে দুনিয়া পিত্তল দি…’

             সমাধির বেগম বলল, ম্যাডাম, ল্যাঙটো নাচবেন না, দশ নম্বর বডিস আর জাঙিয়া পরে নিন, নয়তো বেতাল আপনাকে ল্যাঙড়া তৈমুরের হারেমে পাঠিয়ে দিতে পারে ।

             সমাধির  পুরুষ  বলল, তোমরা সবাই আমার সমাধি ঘিরে বোসো, গাছের ছায়ায়, তোমাদের আমি হারেমের গল্প শোনাই ; আমি তো হারেমের যুগেই জন্মেছিলুম, তাই ব্যাপারটা জানি, যদিও আমার হারেম-টারেম ছিল না ; আমার অতো সময় ছিল না রোজ একজন আধচেনা মেয়ের সঙ্গে শোবার । আমি ছিলুম যোদ্ধা । সম্রাটরা অবশ্য দিনেরাতে কুড়ি-পঁচিশবার শট মারতো ।তোমরা যখন নিজের গল্প শোনাবে তখন নামটা জানিও, মনে রাখব ।

          বাসচালক : নিশ্চয়ই স্যার ।

          সমাধি : স্যার বোলো না। সমাধিদাদা বলতে পারো বা সিদ্দিদা বলতে পারো, স্যার শব্দটা আমার বয়সের সঙ্গে মানায় না । ওকে বেগমদিদি বা বেগমবউদি বলতে পারো ।

          বাসমালিক : সমাধিদাদা, আমার তো মনে হয়, হারেমখানা নিয়ে রহস্যের যেন শেষ নেই। বাবা বলতেন, ইসলাম আসার পর বোধ হয় হারেমপ্রথার  শুরু । কিন্তু হারেমপ্রথা শুরু হয় ইরাক, বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য, হোমারের গ্রিস, পারস্যের পয়সাঅলাদের মধ্যে। তখনো ইসলামের উদয় হয়নি। তবে এটা ঘটনা যে আব্বাসীয় খেলাফতের সময়  হারেম ব্যাপারটা দরবারি স্বীকৃতি পায়। আব্বাসীয় খেলাফতের পর থেকে উসমানীয় খেলাফতের  সময় পর্যন্ত  হারেম  প্রত্যেক রাজারই ছিল। সেখানে অবশ্য হারেমকে হারেমখানা না বলে “সেরাগ্লিয়ো” বলতো । সেরাগ্লিয়োর সঙ্গে এদেশের সম্রাটদের হারেমখানার হুবুহু মিল । সেসব দেশেও হারেমখানায় সম্রাটের পত্নী, উপপত্নী, মা, বোন, দাদী দিদারা থাকতো । সেক্স স্লেভের সংখ্যা অবশ্য একেক রাজার সময় একেক রকম ছিল, নির্ভর করতো রাজা কতোটা সেক্স ম্যানিয়াক। যেমন সম্রাট আকবরের সময় ছিল পাঁচ হাজারেরও বেশি। সম্রাট জাহাঙ্গীরের সময় ছিল দুই হাজারেরও বেশি। সেক্স স্লেভদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা  ছিল না। চাবি-মারা পুতুলের জীবন ছিল হারেমখানায় বন্দি মেয়েদের । অবশ্য হাবশি সুলতান ইলতুৎমিশের মেয়ে রাজিয়া সুলতানা জেনানাঘর থেকে শুধু বেরই হন নি, রাজ্য পর্যন্ত চালিয়েছিলেন।  তবে বেশির ভাগ সময়ই হারেমের মেয়েদের পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন একটা জায়গায় বুড়ি হয়ে যেতে হতো। তাদের রাজনৈতিক অধিকার তো দূরের কথা, ব্যক্তিস্বাধীনতাও  ছিল না। 

          পর্যটক শাহ জালাল : শ্রীচৈতন্যদেবের পিতৃপুরুষের আদি ভূমি হল সিলেটের ঢাকা দক্ষিণ। যদিও মহাপ্রভুর মূল কর্মক্ষেত্র শ্রীহট্ট নয়, তবু তিনি শ্রীহট্ট থেকে পেয়েছেন একাধিক অনুগামী, আর বৈষ্ণব ধর্মাচারের প্রভাব ভারতের অন্য জায়গার তুলনায় ওই এলাকায় কম নয়। তবে সেখানে সুফিতত্ত্ব বৈষ্ণবতত্ত্ব মিলে মিশে এক । সিলেট-কাছাড়ে আউল-বাউল-মারিফতি আর পাঁচালি-কীর্তন-দেহতত্ত্বের বিপুল উৎসারণের সূত্র সেখানেই। প্রচলিত সনাতন ধর্ম, বৌদ্ধ ধর্মের সঙ্গে ইসলাম ধর্মের সংঘাত ঘটার মত কোন পরিস্থিতি এখানে হয়নি।  

           যুবক : তাহলে শ্রীচৈতন্য কি বাঙাল ছিলেন ? প্রভু কহে, কৃষ্ণকৃপা বলিষ্ঠ সবা হৈতে। তোমারে কাড়িল বিষয় বিষ্ঠা গর্ত হৈতে। 

           পর্যটক সানি লেওনি : আমি তো সেকথাই গান গেয়ে বলছিলুম, সবই দেহতত্ব।

           বেগমবউদি : আপনি পোশাক পরে নিন, নয়তো বেতাল আপনাকে ল্যাঙড়া তৈমুরের কাছে পাঠিয়ে দেবে।

          পর্যটক সানি লিওনি : বেগমবউদি, আমার দশ নম্বর ছোটো হয়, এক্সট্রা লার্জ চাই । 

           পর্যটক মিম পালোয়ান : খোজা ছাড়া হারেম আর রাজনীতি অচল, দুটোতেই স্লেভ দরকার ।                          

           পর্যটক  আমীর উল উমরা ওয়াসিফ আলী মির্জা খান বাহাদুর:   প্রাচীন আর মধ্যযুগে রাজাদের হারেমে আর জেনানামহলে পাহারাদার ছিল খোজা পুরুষ। এখনকার ভারতের মতন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পুরুষদের খোজা করার প্রথা খ্রিস্টপূর্ব আট শতকের গোড়ার দিকেও  । এখনকার মতনই খোজারা চাকর বা প্রহরী হিসেবে, খেতাবধারী বা বৃত্তিভোগী রানী আর সরকারের মাস্তান আর মন্ত্রীদের আইডিয়া-দাতার ভূমিকা পালন করত। এ প্রথা এই দেশে শুরু হয়  সুলতানি আমলের গোড়ার দিকে।  খোজারা পালোয়ান হলে রাজনৈতিক আর সামরিক কাজে লাগতো, যেমন সুলতান আলাউদ্দিন খলজির  সেনাপতি-মন্ত্রী মালিক কাফুর । বাংলায় মামলুক হাবশিদের সময়ে খোজারা নিজেদের খেলা দেখাতো, মানে, লেসবিয়ান হবার তরকিব শেখাতো। সাধারণত যুদ্ধের সময়ে বন্দি তরুণ সৈনিকদের খোজা করা হতো। আর স্লেভ পাইরেটরা দাস বাজার থেকে কেনা স্বাস্থ্যবান কমবয়সী ছেলেদের খোজা করে, শিখিয়ে-পড়িয়ে রাজারাজড়ার হারেমে বিক্রি করত। তুর্কি-মুগলদের আগে বাংলায় খোজাপ্রথার অস্তিত্ব সম্পর্কে  প্রমাণ পাওয়া যায় না। পাহারাদারদের নুনু বজায় থাকতো, এখনকার পার্টি-চামচা-খোজাদের যেমন থাকে।

          পর্যটক  রেইস উদ-দৌলা ওয়ারিস আলী মির্জা খান বাহাদুর : খেলা হবে, খেলা হবে ! ইয়ে দুনিয়া পিত্তল দি…

          পর্যটক মির্জা জহিরউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর : খেলা হবে খেলা হবে ! বড়ো মনকেমন করে গো সেই ছেলেটার জন্যে যাকে আমি ভালোবাসতুম ; এদেশের লোকেরা লুকিয়ে হোমো করে, বেশ অনুন্নত দেশ ।

          বাসের ক্লিনার ইবরাহিম লোদি : খেলা হবে খেলা হবে ! ইনকিলাব জিন্দাবাদ ।

          পর্যটক হিউয়েন সাঙ বা হিউয়েন-সাং বা হুয়ান-সাং বা জুয়ানজ্যাং : এদেশের লোকেরা খুবই বোকা । এরা সাপ, প্যাঙ্গোলিন, বাদুড়, বাঁদর, কুকুর, বেরাল কিছুই খায় না, হাঃ হাঃ হাঃ । 

        পর্যটক মুর্শিদ কুলি খান : খেলা হবে খেলা হবে !

        পর্যটক বিরবল : খেলা হবে খেলা হবে ! 

        পর্যটক আলা উদ-দীন হায়দার জঙ সরফরাজ খান বাহাদুর : খেলা হবে খেলা হবে !

          পর্যটক রাজা টোডরমল : খেলা হবে খেলা হবে !

          সমাধিদাদা : এবার টপিক চেঞ্জ করুন ।

         নব্যনাস্তিক যুবতী : আমি নতুন টপিক শুরু করছি ।বুদ্ধ নিজে কোন নতুন ধর্ম প্রতিষ্ঠা করতে চান নি। কিন্তু উনি বেঁচে থাকতেই পয়সাঅলাদের পৃষ্ঠপােষণায় সংঘ প্রচুর টাকাকড়ি যোগাড় করেছিল। তাঁর মৃত্যুর একশাে বছর পরেই তাঁর ভক্তদের মধ্যে থেরবাদী আর মহাসংঘিকদের বিরােধ প্রকট হয়ে ওঠে। তারপরে অশােকের সমর্থনপুষ্ট সংঘ থেরবাদের সমালােচক বৌদ্ধদের তাড়ায় । সম্রাটের আদেশে দেশময় স্তুপ, চৈত্য, বিহার তৈরি হয় । মহাযানী বৌদ্ধরা বুদ্ধকে দেবতা বানায়, অসংখ্য বােধিসত্ত্ব উদ্ভাবন করে, বিভিন্ন দেবদেবীকে বৌদ্ধধর্মের অন্তর্ভুক্ত করে। তা না হলে হয়তাে এদেশে বৌদ্ধধর্মের কয়েক শতাব্দী ব্যাপী প্রবল জনপ্রিয়তা সম্ভব হত না। বুদ্ধ যখন শেষ পর্যন্ত বিষ্ণুর নবম অবতারে পর্যবসিত হলেন, তখন বােঝা গেল বুদ্ধের স্বকীয়তা এদেশ থেকে লােপ পেয়েছে। বৃথাই তিনি সারিপুত্তকে সাবধান করেছিলেন। হিন্দুধর্মের সর্বগ্রাসী পাচকরস বৌদ্ধধর্মকে জারণ করে অবশিষ্ট বৌদ্ধদের একটি নগণ্য সম্প্রদায় হিসেবে হিন্দু সমাজের এককোণে রেখে দিল। হিন্দুয়ানী এদেশে  ব্যাপক প্রতিষ্ঠা পাবার আগে ভারতীয় মনীষীদের মধ্যে অনেকে নাস্তিক বা নব্যনাস্তিক ছিলেন।   অর্থশাস্ত্র” আর “কামসূত্রের”র কিছু উল্লেখ-উদ্ধৃতি থেকে অনুমান করা চলে যে কোন এক সময়ে লােকায়তবাদী চিন্তা অন্তত শিক্ষিত নাগরিকদের উপরে বেশ কিছুটা প্রভাব ফেলেছিল। জড়বাদী দর্শনের যে-গ্রন্থটি পরবর্তীকালে পাওয়া যায় সেটির নাম “তাপপ্লবিংহ”। এটির রচয়িতা জয়রাশী অষ্টম শতকে জীবিত ছিলেন। আন্দোলন-অভ্যুত্থান সম্পর্কে অনেক তথ্য সংগৃহীত হয়েছে এবং এদের চরিত্র ও ফলাফল নিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ হয়েছে ও হচ্ছে।

         পর্যটক কৌস্তুভ দে সরকার : আপনি বড্ডো সিরিয়াস টপিক শুরু করলেন । আজকাল পার্টির লোকেরা এসব আলোচনা করে না । তার চেয়ে তারা খোজা হতে ভালোবাসে ।আচ্ছা, খোজা হলেই বা । শুনেছি যে বেগমের ডাক পড়তে মাসের পর মাস লাগতো, সে খোজাদের ডেকে আঙুল করাতো, কিংবা তাদের বলতো লিঙ্গের মতন জিনিস দিয়ে আনন্দ দিতে । তখনকার দিনে ডিলডো ছিল না, কিন্ত খোজারা ডিলডোর মতন জিনিস তৈরি করে সাপলাই দিতো।

          পর্যটক মেগাসথিনিস : না, না, আলেকজাণ্ডার এদেশে হাজার হাজার ডিলডো বিলি করে গিয়েছিলেন। তক্ষশীলায় মাটি খুঁড়ে পাকিস্তরানিরা পেয়েছে ।

          পর্যটক নবীন কর : অতো বেগমদের হারেমে রেখে তাদের সেক্সুয়াল লাইফ নষ্ট করার মানে হয় না। খোজারা যদি আনন্দ দিতো তো ভালোই করতো । ডিলডো জিন্দাবাদ । হারেমের টপিকটা ইনটারেস্টিঙ । 

           সমাধিদাদা : হারেমের উল্লেখ প্রায় সব রাজপরিবারের ভেতরেই পাওয়া যায়। কেউ বলেন এটা তুর্কি শব্দ আবার কারো মতে, হারেম শব্দটা এসেছে আরবী ‘হারীম’ থেকে, যার অর্থ নিষিদ্ধ বা অলঙ্ঘনীয় সীমারেখা; এটা হলো মহিলাদের জন্য নির্ধারিত এলাকা যেখানে পুরুষদের ঢোকা বারন । তুর্কি সাম্রাজ্যেই হারেমের উল্লেখ প্রথম পাওয়া যায় যা পরে মোগলদের মাধ্যমে উপমহাদেশের সমাজে ঢোকে । হারেমে থাকার জন্যে কেবল মাহরামের( আরবি পরিভাষায় মাহরাম বলতে বোঝায় যাদের বিয়ে করা হারাম) প্রবেশাধিকার আছে। মানে হারেমে সবাই রাজরক্তের ছিল না । তখনকার সময়ে রাজার অনেক বউ আর উপবউ থাকবে এটাই স্বাভাবিক ছিল। নিজেদের দাস-দাসী আর বউদের বাদশা নিজের ইচ্ছেমতন ওলটাবেন-পালটাবেন-শোয়াবেন-বসাবেন  সেটাও অবাক করার ব্যাপার ছিল না। হারেমে তাই সর্বাধিক গুরুত্ব পেত আমোদ-প্রমোদের ব্যবস্থা। অন্তঃপুরের একাংশে থাকতো বাদ্যযন্ত্র এবং হাতি, ঘোড়া ও রথের সাজসজ্জা। 

          পর্যটক সুজা উদ-দৌলা সুজা উদদীন মুহম্মদ খান :পৃথিবীর সব যুদ্ধবাজ বাদশাদের বিরুদ্ধে যেসব কথা শোনা যায় তার ভেতরে উল্লেখযোগ্য হলো যুদ্ধে জয়লাভ করার পর বিভিন্ন প্রদেশ কিংবা অঞ্চল থেকে নানান ধর্ম ও বর্ণের মেয়ে এনে নিজেদের হারেমে রাখা। মুঘল হারেমেও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। কখনো কখনো নাকি হারেমে মেয়েদের সংখ্যা সাত-আট হাজার ছাড়িয়ে যেত। সম্রাজ্ঞী, রাজকন্যা কিংবা বাদশার রক্ষিতারা সকলে নাকি প্রায় একভাবেই সাজগোজ করত। চুলের বেণি, ঝলমলে পোশাক আর মণিমুক্তার গয়না পরে থাকতো আর ওইসব পরেই সেক্স করতো। 

             পর্যটক অ্যালেন গিন্সবার্গ : 

এসো নীপবনে ছায়াবিথী তলে                                               

এসো করো স্নান নবধারা জলে

 দাও আকুলিয়া ঘন কালো কেশ

পরো দেহ ঘেরি মেঘ নীল বেশ

কাজল নয়নে যূঁথী মালা গলে

এসো নীপবনে ছায়াবিথী তলে

এসো করো স্নান নবধারা জলে

আজি ক্ষণে ক্ষণে হাসিখানি সখী

আঁধারে নয়নে উঠুক চমকিয়া

আজি ক্ষণে ক্ষণে

মল্লারো গানে তব মধু স্বরে

দিক বাণী আনি বন মর্মরে

ঘন বরিষণে জল কলকলে

এসো নীপবনে ছায়াবিথী তলে

এসো করো স্নান নবধারা জলে

          পর্যটক আলা উদ-দিন হায়দর জং সরফরাজ খান বাহাদুর: আইন-ই-আকবরী আর আকবরনামার লেখক আবুল ফজল মোগল হারেমকে অভিহিত করেছেন ‘শাবিস্তান-ই-খাস’ নামে। রাজপ্রাসাদের এক বিশাল অংশ জুড়ে ছিল মহল । বাগান আর ফোয়ারার দিকে মুখ করে থাকা অগুনতি কামরায় হাজার দুয়েক নারীর বাস আর তাদের প্রত্যেকের জন্যই আলাদা মহল। এছাড়া আর তিনটি প্রাসাদে বাদশার উপবউরা থাকতো। এগুলোকে বলা হতো, লেথেবার ( রবিবার), মঙ্গল (মঙ্গলবার) এবং জেনিসার (শনিবার) মহল। এই নির্ধারিত দিনগুলোতে বাদশা নির্দিষ্ট প্রাসাদে সেক্স করতে যেতেন। একটি হারেম বা অন্তঃপুরে অনেক ঘরের ব্যবস্থা থাকতো। আলাদা রান্নাঘর, আলাদা প্রহরী, আলাদা গোসলখানা, কোনো কিছুর অভাব ছিল না। 

              যুবক : ব্রিটিশরা যখন শেষ বাদশার কেল্লা ভেঙে চুরমার করে দিলে, তখন পিলপিল করে উপবউ, বাঁদি, রক্ষিতা, স্লেভগার্ল আর তাদের হাজার কয়েক ছেলে-মেয়ে প্রাণ বাঁচাবার জন্যে দেদ্দৌড় দিয়েছিল, কিন্তু কেউই রেঝাই পায়নি।

            পর্যটক রঘু ডাকাত : আমি টপিক পালটাচ্ছি । ইংরেজ শাসনের শুরুর দিকে যখন  বংশানুক্রমিক পেশাগত স্তর থেকে উৎখাত হওয়া মানুষেরা নতুন সামাজিক অর্থনৈতিক স্তরে প্রবেশ কর‍তে পারল না, তখন আমরা সমাজ আর পেশা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে  যাযাবর হয়ে গেলুম। কিন্তু যাযাবরবৃত্তিতে তো দীর্ঘকাল জীবনধারণ করতে পারে না লোকে, আমরা বেছে নিলুম দস্যুবৃত্তি। গড়ে উঠল  ডাকাতের দল আর গ্রামে গ্রামে ডাকাতকালীর থান বা মন্দির। বাঘ যেমন বিশেষ পরিস্থিতিতে নরখাদক হয় তেমনি আমরা পেটের দায়ে পা বাড়ালুম অপরাধের পথে। যুদ্ধ বিগ্রহ মন্বন্তর কোম্পানির অত্যাচার, চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে করদানে বাধ্য জমিদারের মাত্রাছাড়া জুলুমে আমরা বিদ্রোহী হলুম, আর ফিরিঙ্গিরা আমাদের বলল ডাকাত। ওরা কৃষক বিদ্রোহী আর সাধারণ ডাকাতের সাথে পার্থক্য করেনি । বাংলার অসহ্য নৈরাজ্য শান্তিপ্রিয় নিরীহ শ্রমজীবী মানুষকে ঠেলে দিলে চুরি-ডাকাতির রাস্তায় । বিনয় ঘোষ তো বলেছেন, “ডাকাতরা কি কেবল পুলিশ অভিধানের সংজ্ঞানুসারে ডাকাত? অথবা তার চেয়ে বেশি কিছু? তাদের দস্যুবৃত্তির চেতনার সঙ্গে গনমুক্তির রাজনৈতিক বিপ্লবচেতনা মিশিয়ে দিতে পারলে রঘু বিশে বদে হয়ত বিপ্লবের ছোটবড় নায়ক হতে পারত, কিন্তু তখন লালপতাকার যুগ ছিল না, কন্ঠভরা বৈপ্লবিক স্লোগানের যুগ ছিল না, কালীর যুগ ছিল তাই কালী ছিলেন বিদ্রোহ বিপ্লবের প্রতীক”। কালী তো চিরব্যতিক্রমী, প্রচন্ড তান্ডবের প্রতিমূর্তি, তেত্রিশ কোটি দেবদেবীর ভেতর অনন্যা। ডাকাতেকালী উপেক্ষিত, প্রান্তিক, অন্ত্যজ ও অপরাধীদের দেবী, রাজনৈতিক জাতীয়তাবাদী সংগ্রামের অফুরন্ত শক্তি উৎস। ঘোর তমসাচ্ছন্ন রাতে যার ওনার আরাধনা করত তাঁরা অগ্নিযুগের সৈনিক বা অন্ধকারের পথিক । তিনি শাস্ত্রের কালীমাতা, স্নেহমহী ভবতারিণী নন, শস্ত্রের পুজারী বাঙালীর এক লৌকিক দেবী, আমার মতন ডাকাতদের আরাধ্যা হয়ে জন্ম নেন, ও মিশে যান সাধারণ সংস্কৃতির ভেতরে। জয় মা কালী কলকাত্তাওয়ালি ।

          পর্যটক হাশিম উদ-দৌলা মুহম্মদ আলীবর্দী খান বাহাদুর : হারেমের টপিকটা তো বেশ চলছিল । হারেমের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কঠোর আর বাইরের লোকের পক্ষে মোগল হারেমে ঢোকা  রীতিমতো কঠিন ছিল। খোজাদের ‘নাজির’ বলা হতো । প্রত্যেক বেগমের একজন করে নাজির থাকত যাকে তিনি গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন। বেগমদের কারো কোনো জিনিসের দরকার হলে তারা হারেমের কেশিয়ারকে বলত। হারেমে ব্যবহারের জন্য আলাদা কয়েন ছিল যা বাইরে পাওয়া যেত না।  হারেমের দারোগা হিসেবে নিয়োগ করা হতো  প্রৌঢ়াদের । হারেমের সর্বোচ্চ পদাধিকারী মহিলা কর্মচারী ছিল ‘মহলদার’। এরা বাদশার গুপ্তচর হিসেবেও কাজ করত। মহলদারের দরুন রাজকুমারদের সঙ্গে গোলমাল বাধতো। বেচারা রাজকুমার কাউকে লাইন মেরে লুকিয়ে এক খেপ শট মেরে কেটে পড়তে চাইলেও তা পৌঁছে যেত বাদশার কানে । জাহাঙ্গির এ-ব্যাপারে ছিল ওস্তাদ। বাপের রক্ষিতাকেও লুকিয়ে শট মেরে কেটে পড়ত । উজির-আমীররা তাদের দুয়েকটা মেয়েকে মহলে ঢুকিয়ে দিতে চেষ্টা করতো আর এর জন্য হারেমের মহলদারের সাথে মিলে নানা দুরভিসন্ধির আশ্রয়ও তারা নিত। কারণ, একবার যদি মেয়েটা  বাদশাকে সেক্সুয়ালি অ্যাট্রাক্ট করে, তো, ব্যাস, কেল্লা ফতে!

          যুবক : বেচারি জাহানারা সারাজীবন ভার্জিন রয়ে গেল ।

           যুবতী : ওকে আওরঙজেব অ্যাসিড ছুঁড়ে মেরেছিল ;ইনডিয়ায় সেই থেকে অ্যাসিড মারা শুরু হয়েছে।

          পর্যটক নামদেও ধাসাড় : আমি টপিক পালটাচ্ছি । তিনের দশক থেকে সরকার ভারতে ঔপনিবেশিক শাসনের যথার্থ প্রমাণের জন্য নিম্নবর্গের আন্দোলনগুলো সমর্থন করতে শুরু করে। এই সময় এই আন্দোলনগুলোর অনেক নেতাই দেশের সব থেকে ক্ষমতাশালী দল কংগ্রেসের সঙ্গে একাত্ম হওয়াই অনেক বেশি সুবিধাজনক বলে মনে করতে শুরু করেছিলেন। এই ধরণের একটা পরিণতি খানিকটা অবশ্যম্ভাবীও ছিল, কারণ শেষ পর্যন্ত এইসব নেতাদের উদ্দেশ্য ছিল জাতীয় রাজনীতিতে নিজেদের ক্ষমতার আসনে বসানো, বৃহত্তর সমাজ থেকে নিজেদের পৃথক করে রাখা নয়। আর চারের দশকেই ভারতে রাজনৈতিক জাতির প্রতিনিধি হিসেবে কংগ্রেস  বাস্তবিক অর্থেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। কংগ্রেসও ১৯৩৫-এর সাংবিধানিক সংস্কারে বিধিবদ্ধ প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতির ক্ষেত্রে এইসব নেতাদের গুরুত্ব স্বীকার করে নিয়েছিল, ফলে একীকরণ হয়েছিল সহজ। অন্যদিকে নিম্নবর্গের জনসাধারণও সামাজিক আর অর্থনৈতিক অধিকার আদায়ের জন্য তাঁদের অসমাপ্ত সংগ্রাম চালিয়ে নিয়ে যায়। কখনও তার মাধ্যম ছিল জাত-ভিত্তিক সম্প্রদায়, যদিও একেই ক্ষমতার একমাত্র আধার বলে মেনে নিতে আর রাজি ছিলেন না তাঁরা। তাই কখনও তাঁরা জাতীয়তাবাদীদের সঙ্গে সহযোগিতা করেছেন, কখনও সাম্প্রদায়িকতাবাদীদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন, আবার কখনও বা সরাসরি শ্রেণীভিত্তিক কর্মসূচি ও সংগঠনের সমর্থনে ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন। অন্যভাবে বলতে গেলে, যে আন্দোলন এক সময় শুরু হয়েছিল ‘নিম্ন বর্ণের আন্দোলন’ হিসেবে, তা একদিন বিভিন্ন পথে চলতে শুরু করে, কারণ জাত-ভিত্তিক আত্মপরিচয়কে বিভক্ত করে,অথবা আচ্ছন্ন ,এমন অনেক নতুন আত্মপরিচয় গড়ে উঠতে, অথবা সরব হয়ে উঠতে শুরু করেছে। এই আন্দোলনগুলোর মধ্যে তাই সমপ্রকৃতি অথবা একমূখীন প্রগতির খোঁজ না করে এই ধরনের জটিলতারই অনুসন্ধান করা উচিত। সেই অনুসন্ধানই উত্তর দিতে পারবে কেন অত্যন্ত সীমিত ক্ষেত্র ছাড়া এইসব নিম্নবর্ণের প্রতিবাদ ভারতীয় সমাজে প্রচলিত ক্ষমতার সম্পর্ককে ভেঙে ফেলতে সমর্থ হয়নি। 

             পর্যটক জাফর আলী খান বাহাদুর মীর মুহম্মদ জাফর আলী খান বাহাদুর : আমি পুরোনো টপিকে ফিরছি । মোগল হারেমের যেসব নারী বিখ্যাত  তাদের মধ্যে নামকরা হলো বাবরের মেয়ে গুলবদন বেগম, সম্রাজ্ঞী নুরজাহান, শাহজাহানের বউদের একজন, মানে, মমতাজ মহল, দারাশিকোর বউ নাদিরা বেগম, আওরঙ্গজেব মেয়ে জেবুন্নেসা, শাহজাহানের মেয়ে রোশানারা আর জাহানারা আর বেচারা বাহাদুর শাহ জাফরের বউ  জিনাত মহল। বিশেষত, নূরজাহান  তো নিজের লেখা কবিতা পড়তো ;‘মুশায়েরা’ ওনার সময় থেকেই বাড়বাড়ন্ত হয়েছে । কলকাতায় জীবনানন্দ সভাগরে, নজরুল মঞ্চে, অকাদেমিতে আজকাল যে কবিতা পাঠ হয় তা নুরজাহানের কারণে । ভোজের সময় দস্তরখানের ব্যবহার, চোলি বা আধুনিক বডিসের প্রচলন, পোশাকে বোতাম, অন্তর্বাস, নৈশবেশ, কুর্তা,কামিজ আর জরির লেস চালু  করেন  নূরজাহান। সেক্সকে সুরভিত করার জন্যে নূরজাহানের   আবিষ্কার গোলাপের আতর, ‘আতরে জাহাঙ্গীরী’। নূরজাহানের স্নানঘরে বিশাল টবে গোলাপ মধ্যে গোলাপের নির্যাস, আতর, চন্দন, হলুদ চুবিয়ে রাখার চল ছিল । বউ তো রাজ্য চালাচ্ছে, এদিকে তার বর জাহাঙ্গির মাগিবাজি করে বেড়াচ্ছে ।

         পর্যটক নজম উদ-দৌলা নাজিম উদ্দিন আলী খান বাহাদুর :  জাহাঙ্গির বা সেলিমকে, আকবরের হিন্দু বউয়ের ছেলে বলে, অনেকে বলতো ফাসেক । কেন জানো ? নুরজাহানের আগে জাহাঙ্গির একজন দাসীকে  ভালোবাসতো, যাকে তার বাবা আকবরও ভালোবাসতো। তার নাম নাদিরা বেগম  শার্ফ-উন-নিসা। সে দাসী হলেও এতো সুন্দরী ছিল যে তাকে আকবর আনারকলি নাম দিয়েছিলেন । আনারকলি কোন এক বণিক বহরের সাথে ইরান থেকে  লাহোরে  এসেছিল । ব্যাপারটা ইডিপাস কমপ্লেক্সের, মানে বাপ-বেটা একই সঙ্গে একটা মেয়ের সঙ্গে প্রেম করতো । প্রেমিকার টানে বাপের হারেমে ঢুকে গিয়েছিল জাহাঙ্গির আর তার জন্য খুব মার খেয়েছিল । অবৈধ সম্পর্ক গড়ার দোষ দিয়ে  আকবরের নির্দেশে  ইটের ঘরের মধ্যে তাকে জীবন্ত কবর দেয়া হয়েছিল। লাহোরে সরকারি মহাফেজখানায় আছে তার কবর । ফাসেক শব্দটা ফিসক শব্দ থেকে এসেছে । ‘ফিসক’ শব্দের অর্থ হচ্ছে অবাধ্য । বাংলাতে ‘ফাসেক’ শব্দের মানে করা হয় পাপিষ্ঠ। যে  প্রকাশ্যে  হারাম কাজ করতে অভ্যস্ত এবং তোওবা করে পাপ কাজ থেকে ফিরে আসে না, তাকে ফাসেক বলা হয়। উদাহরণঃ নিচের প্রত্যেকটা কাজই পাপ কাজ,  যার কয়েকটা জাহাঙ্গির করেছিল :

– যে লোক মা-বাপের অবাধ্য বা তাদের হক আদায় করে না ।

– যে লোক কোন কারণ ছাড়া জামাতে শরিক হয়না ।

– যে লোক দাড়ি কামায় – জাহাঙ্গির দাড়ি রাখতো না ।

– যে লোক নাভির নিচে কাপড় পরে ।

– যে লোক বউদের হক আদায় করে না, বাড়ির লোকদের সাথে অন্যায় আর জোরজুলুম  করে ।

– যে লোক বাড়ির মেয়েদের হিজাব-পর্দার আদেশ করে না ; জাহাঙ্গিরের বউ নুরজাহান হিজাব-পর্দা করতো না ।

– যারা অবৈধ প্রেম-ভালোবাসায় লিপ্ত । জাহাঙ্গির প্রচুর ভালোবাসাবাসি করতো, পোস্টমডার্ন সম্রাট ছিল ।

       পর্যটক হাছন রাজা : মাটির পিঞ্জিরার মাঝে বন্দি হইয়া রে।

কান্দে হাসন রাজার মন মনিয়া রে।।

মায়ে বাপে বন্দি কই লা, খুশির মাঝারে।

লালে ধলায় বন্দি হইলাম, পিঞ্জিরার মাঝারে।।

উড়িয়া যায় রে ময়না পাখি, পিঞ্জিরাইয় হইল বন্দি।

মায়ে বাপে লাগাইলা মায়া, মায়া জালের আন্দি।।

পিঞ্জিরায় সামাইয়ারে ময়নায় ছটফট করে।

মজবুত পিঞ্জরা ময়নাইয় ভাঙ্গিতে না পারে।।

উড়িয়া জাইব শুয়া পক্ষী, পড়িয়া রইব কায়া।

কিসের দেশ, কিসের খেশ, কিসের মায়া দয়া।।

ময়নাকে পালিতে আছি দুধ কলা দিয়া।

যাইবার কালে নিঠুর ময়নায় না চাইব ফিরিয়া।।

হাসন রাজায় ডাকব তখন ময়না আয় রে আয়।

এমন নিষ্ঠুর ময়নায় আর কি ফিরিয়া চায়।। 

          পর্যটক লাটুবাবু : সমাধিদাদা, নতুন টপিক শুরু করি বরং । নূরজাহান-এর আসল  নাম ছিল মেহেরুন্নিসা । উনিশজন যুবতীকে বিয়ে করার পর জাহাঙ্গির বিধবা মেহেরুন্নিসাকে বিয়ে করে । তিনি হয়ে ওঠেন  জাহাঙ্গীরের প্রধান বেগম । একজন বলিষ্ঠ, সম্মোহনী ও উচ্চশিক্ষিতা নারী হওয়ায় তাকে তখনকার সবচেয়ে প্রভাবশালী মহিলা ভাবা হয় । স্বামী  জাহাঙ্গীরের সেক্স, মদ, আফিমের প্রতি তীব্র আসক্তি থাকায় নূরজাহান ক্ষমতা নিজের হাতে তুলে নিয়েছিলেন । মেহেরুন্নিসার প্রথম বিয়ে  হয় তুর্কিস্তানের  আলি কুলি বেগ এর সঙ্গে। একলা খালি হাতে বাঘ মারার জন্য তার নাম হয় শের আফগান। শোনা যায় মেহের একবার যুবরাজ সেলিমের নজরে পড়ে জান। সেলিমও অমনি খেপে উঠলো মেহেরকে বিয়ে করার জন্য। শেরের মৃত্যুর পর মেহেরকে আগ্রাতে নিয়ে আসা হয়। তখন মেহেরের বয়স তেত্রিশ। ওই বয়সেও উনি ছিলেন মারকাটারি । সাঁইত্রিশ বছর বয়সে বিয়ে করলেন নাছোড় জাহাঙ্গীরকে। জাহাঙ্গীর তার নাম দিলেন নুরজাহান বা জগতের আলো। জাহাঙ্গীর ছিল নামকেওয়াস্তে সম্রাট।  জাহাঙ্গীরের রাজত্যের শেষ দিকে যখন তার ছেলে খুররম আর সেনাপতি মহাব্বত খান বিদ্রোহ করেন তখন বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করেন নুরজাহান।

           পর্যটক ছাতুবাবু : সমাধিবউদি, একটা কথা বলুন যে শাহজাহানের ভালোবাসাবাসিও অদ্ভুত ব্যাপার নয়কি ? বিয়ে করলেন আর্জুমান বানুকে, ওনার ছেলের বউ নুর জাহানের ভাইয়ের মেয়ে, তবে এই নাম পালটে দিলেন শাহজাহান।  নাম রেখেছিলেন মমতাজ মহল। শাহজাহান উনিশের আর্জুমানকে বিয়ে করেন একুশ বছর বয়সে।  শাহজাহানের যৌন চাহিদা এতো বেশি ছিল যে মমতাজের সংসার-জীবন মাত্র আঠারো বছরে শেষ হয়ে যায় । এরই মধ্যে মমতাজ চোদ্দটা বাচ্চা পয়দা করেন। অন্য বেগমদেরও শাহজাহানের যৌনখোরাক মেটাতে হতো, তার ওপর উপবউ, বাঁদি, রক্ষিতা, স্লেভগার্লরা তো ছিলই ।  মমতাজ ছিলেন সম্রাট শাহজাহানের দ্বিতীয় স্ত্রী। কোথাও বলা হয়েছে, মমতাজ শাহজাহানের ৩য় স্ত্রী, কোথাও বলা আছে ৪র্থ স্ত্রী। আসলে কততম স্ত্রী তা কোথাও সঠিকভাবে বলা নেই। সম্রাট শাহজাহান ও মমতাজের প্রেম কাহিনীতে বলা হয়েছে সম্রাট শাহজাহান মমতাজকে বাজারে দেখতে পান এবং প্রথম দেখাতেই মমতাজকে পছন্দ করে ফেলেন। কিন্তু এও শোনা যায় শাহজাহানের সঙ্গে বিয়ে হওয়ার আগেও মমতাজের বিয়ে হয়েছিল। সম্রাট শাহজাহান মমতাজের সেই স্বামীকে হত্যা করে তারপর মমতাজকে বিয়ে করেছিল। মমতাজ মারা যাওয়ার পর শাহজাহান মমতাজের আপন ছোট বোনকে বিয়ে করেন। লোকটা বোধহয় সেক্স পারভার্ট ছিল, ওর পূর্বপুরুষ ল্যাঙড়া তৈমুরের মতন।

            সমাধিবউদি : সব যুগের সব পুরুষ একই রকম । কতো মেয়েকে ফুসলিয়ে আমাদের সমাধির ওপরে পুরুষরা কুকর্ম করে গেছে তার হিসেব বটগাছের ওই হাবশি বেতালই দিতে পারবে ।

          পর্যটক আহমেদশাহ আবদালি : আমি অখন ইনটারভিন করতাসি সমাধিদাদা । চারদিকের কিছু নতুন গজিয়ে ওঠা বালের মতো ক্যারেক্টার দেখি। যার নতুন ওঠে সে তো পুলকের চোটে বালে হাত বুলায় আর ভাবে আহা কি নরম কোমল মোলায়েম! থাক আর কিছুদিন। ঠিক তখনই এইসব বাল লম্বায় বাড়তে বাড়তে এতো বড় হয় যে বালের মালিক নিজের বালে পেচায়া মইরা যায়। এদেরকে তাল দেয় আবার পুরান পাইকা তামার তার হওয়া বালের মালিক। আরে তোর এতো খাউজানি থাকলে নিজের তামার তারগুলা প্লাইয়ার্স দিয়া কাইটা আঁটি বাইন্ধা বাজারে নিয়া বেইচা দে হারামজাদা গুস্তাখ! ঘটনা হইসে পাকনা বাল গুলারে সবাই চিনে, নতুন বাল ওলারা বুঝেনা এই মুর্শিদ তোরে সুটায়া লাল করে দিবে, ব্যথায় হাঁটতেও পারবি না। এই জীবনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষার মধ্যে একটা অতি জরুরী ও একের শিক্ষা হলো, স্নেহ লুকায় রাখতে হয়। যারে স্নেহ করলেন সন্তানস্য, সে যদি সেটা বুঝতে পারে এবং নিশ্চিত হয় স্নেহের জায়গাটা তাইলেই সব শেষ। তারপর… দিনে রাতে, ঢালে বিঢালে এমন এমন ভূত ও বর্তমান ভাবে অঝরা বাঁশ দিতে শুরু করবে যা আপনি গিলতেও পারবেন না, ফালাইতেও পারবেন না। দেওয়ার মত বাঁশ যদি পছন্দ না হয়, সে নিজে টাকা খরচ কইরা আন্দামান নিকোবরে গিয়া উৎকৃষ্ট প্রজাতির ঘন ঝাড়সমেত পোক্ত কঞ্চিঅলা অভৌত, ভৌত, ইহজাগতিক, পরাবাস্তব সবপ্রকার বাঁশ প্লেনের পিঠে কইরা তুইলা বাইন্ধা আইনা এই মহান প্রয়োগ শেষ করবেন দায়িত্বের সাথে। যে তার সারা জীবনে একগাছা বাল ঠিকমতো ফালাইতে পারেনা, সেও এই কাজ এতো নিঁখুত ভাবে করবে যে আপনি তার এই মহান প্রয়োগে ব্যথা ভুইলা গিয়া খুবই আশ্চার্যান্বিত, মুগ্ধ, অভিভূত, পুলকিত, হইয়া গালে হাত দিয়া ভাববেন- আইসসালা! তাম্মায়রেবাপ! এই শাউয়াডারে যে এতো ভালো জানতাম, এতো স্নেহ করতাম, বালপাকনায় এই বয়সে এই জিনিস হিখছে কোম্মে দিয়া!

           পর্যটক শেরশাহ সুরি : আমিও টপিক চেঞ্জ করছি সমাধিদাদা । প্রায় ৫০০ বছর আগে বাগহাটির জয়পুরের বাসিন্দা বিধুভূষণ ঘোষ আর তার ভাই রঘু ঘোষ ঘন জঙ্গলের মধ্যে হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী তাদের মায়ের মূর্তি স্থাপন করে। দিনের বেলায় দুই ভাই দিনমজুরের কাজ করলেও রাতে ধনীদের বাড়িতে ডাকাতি করত। ডাকাতি করে আনা জিনিসপত্র এলাকার গরিব মানুষের মধ্যে বিলি করত। কিংবদন্তি হলো, কারো বাড়িতে ডাকাতি করার আগে রঘু ডাকাত চিঠি দিয়ে বাড়ির মালিককে জানিয়ে দিত। রঘু ডাকাতের লোকজন রাস্তা দিয়ে যাওয়া কোনও মানুষকে ধরে বেঁধে রাখত। সন্ধ্যার পর পুরোহিতকে ডেকে এনে ঢাকঢোল বাজিয়ে নরবলি ও ল্যাটা মাছের পুজো দিয়ে গলাকাটা শব মন্দিরের সামনে  পুকুরে ভাসিয়ে দিত। তারপর মহাপ্রসাদ খেয়ে ডাকাতি করতে বেরোতো। ডাকাত দলের ভয়ে দুপুরের পর থেকে সেই রাস্তা দিয়ে মানুষ চলাচল করত না। সাধক কবি রামপ্রসাদ সেন কোনও এক সময়ে ওই রাস্তা ধরে ত্রিবেণী ফেরিঘাটে ফিরছিলেন। ওই সময়ে রঘু ডাকাতের লোকজন তাঁকে নরবলি দেওয়ার জন্য ধরে নিয়ে এসে বেঁধে রাখে। রাতে রামপ্রসাদকে বলি দেওয়ার  সমস্ত প্রস্তুতি সেরে ফেলা হয়ে গেছে যখন,  বলি দেওয়ার আগে মাকে একটি গান শোনানোর আর্জি করেন। সেই আর্জি মেনে রঘু ডাকাত গান শোনানোর অনুমতি দিলে রামপ্রসাদ এই গানখানা ধরেন। 

                     তিলেক দাঁড়া ওরে শমন,   

বদন ভরে মাকে ডাকি রে ।

আমার বিপদকালে ব্রহ্মময়ী,

এসেন কি না এসেন দেখিরে 

লয়ে যাবি সঙ্গে করে, তার এত ভাবনা কীরে 

তবে তারা-নামের কবচ-মালা,

বৃথা আমি গলায় রাখি রে 

মহেশ্বরী আমার রাজা,

আমি খাস তালুকের প্রজা,

আমি কখনো নাতান, কখনো সাতান,

কখনো বাকির দায়ে না ঠেকি রে 

প্রসাদ বলে মায়ের লীলা,

অন্যে কি জানিতে পারে 

যার ত্রিলোচন না পেল তত্ত্ব,

আমি অন্ত পাবো কীরে 

তারপরেই রঘু ডাকাত বলির হাড়িকাঠে রামপ্রসাদের বদলে কালীমূর্তি দেখতে পায়। এরপর থেকে রঘু ডাকাত বলি বন্ধ করে রামপ্রসাদের সেবার ব্যবস্থা করে।  পরের দিন সকালে নৌকায় করে রামপ্রসাদকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসে।                  

           সমাধিদাদা বলল : এবার আমি নিজেদের কথা বলি ।আমি  হাবশি সুলতান, ডাক নাম চাপু, শুয়ে আছি খুলদাবাদের এই কবরের তলায়, তবে বিশেষ লোক আসে না, আমার সৌধ দেখতে, তা আমি হাবশি বলে নয়, আমার সৌধ তেমন সুন্দর নয়, অথচ আমি কতো কি শিখিয়েছি, এদেশের লোকেদের । তোমাদের মতন বাঙালি পর্যটকের দল সপরিবারে আসে আর অবাক হয় আমার গল্প শুনে । যারা আসে তাদের সবাইকেই আমি গল্প শোনাই ।  কবরের ভেতরটা, বুঝলে, লেখকের বিছানার মতন, একা ভাবতে পারি, শতকের পর শতক ।  ১৪৯৪ সালে ক্যাথলিকদের গুরু পোপ পৃথিবীকে দুইভাগে ভাগ করে দিয়েছিল, কেপ ভের্দে থেকে সোজা লাইন টেনে পূর্ব দিকটায় লুটপাট চালাবে পর্তুগাল আর পশ্চিম দিকটায় স্পেন । স্পেনের দাস ব্যবসায়ীরা যদি আমাকে ধরে বিক্রি করতো তাহলে আমি ভারতে আসার বদলে দক্ষিণ বা উত্তর আমেরিকায় যেতুম । সেখানে গিয়ে কতোকাল যে বংশ পরম্পরায় অত্যাচার সহ্য করতে হতো তা তোমরা ভালোই জানো । এখন শুনি ডোনাল্ড ট্রাম্প নামে একজন এসেছে সেদেশের হাবশিদের নিকেশ করতে ।

          আমিই  সিদ্দি, নিগ্রো, মামলুক, মুর, নিগার,  কালা-আদমি । আমিই সেইন্ট অগাস্টিন অব হিপো, মানসা মুসা, নেলসন ম্যাণ্ডেলা, হাইলে সেলাসি, ডেসমণ্ড টুটু, কোয়ামে এনক্রুমা, অলিভার টাম্বো, কোফি আন্নান, ওয়ানগারি মাথাই, চিনুয়া আচেবে, ওলাউধা ইকুয়িনা, আবেবে বিকিলা, টেগলা লারুপ, হাইলে গেব্রসেলাসি, কেনেনিসা বেকেলে, আসবেল কিপরপ, মার্টিন লুথার কিং, বারাক ওবামা, জেসি ওয়েন্স, মোহম্মদ আলি, ফ্রেডরিক ডগলাস, তুসেইন্ট লুভেরতুরে, বুকার টি ওয়াশিংটন, ডাবলু ই বি দুবয়, ম্যালকম এক্স, পেলে, মাইকেল জর্ডান, থুরগুড মার্শাল, উসেইন বোল্ট, কার্ল লুইস, বব মার্লে, সোজোরনার ট্রুথ, হ্যারিয়েট টাবম্যান, আইডা ওয়েলস, হ্যাটি ম্যাকড্যানিয়েল, রোজা পার্কস, বিলি হলিডে, শার্লি চিশোম, করেটা স্কট কিং, এলেন জনসন সিরলিফ, ওপরা উইনফ্রে,ওয়ানগারি মুটা মাথাই, মায়া অ্যাঞ্জেলু, হুপি গোল্ডবার্গ, জ্যাকি জয়নার-কার্সি, ডেরাটু টুলু, সেরেনা উইলিয়ামস, মাইকেল জ্যাকসন, বিয়োনসে । আমিই অ্যাভেরোস, তারিক ইবন জিয়াদ, আবদ-আর-রহমান, ইবন আল-কোটিয়া, ইয়াহিয়া আল-লাইথি, আব্বাস ইবন ফিরনাস, মাসলামা আল-মাজরিথি, সইদ আল-আনদালুসি, আবু ইশহাক ইবরাহিম আল-জারকালি, আরটেফিয়াস, ইবন বাইজাহ, ইবন জুহুর, ইবন তুফাইল, ইবন আল-বাইতার, ইবন খালদুন, আবু আল-হাসান ইবন আলি আলকালাসাদি, লিও আফরিকানাস, এসতেভানিসিও, ইবন বাতুতা, ইবন হাজম, ইবন ইধারি, ইবন আরাবি, আবু বকর ইবন, টাইগার উডস, আল-আরাবি, মার্টিন লুথার কিং জুনিয়ার ।          

          আমার এই বক্তৃতাটা শুনেছো তো ?

I say to you today, my friends, so even though we face the difficulties of today and tomorrow, I still have a dream. It is a dream deeply rooted in the American dream.

.

I have a dream that one day this nation will rise up and live out the true meaning of its creed: ‘We hold these truths to be self-evident: that all men are created equal.’

.

I have a dream that one day on the red hills of Georgia the sons of former slaves and the sons of former slave owners will be able to sit down together at the table of brotherhood.

.

I have a dream that one day even the state of Mississippi, a state sweltering with the heat of injustice, sweltering with the heat of oppression, will be transformed into an oasis of freedom and justice.

.

I have a dream that my four little children will one day live in a nation where they will not be judged by the color of their skin but by the content of their character.

.

I have a dream today.

.

I have a dream that one day, down in Alabama, with its vicious racists, with its governor having his lips dripping with the words of interposition and nullification; one day right there in Alabama, little black boys and black girls will be able to join hands with little white boys and white girls as sisters and brothers.

.

I have a dream today. I say to you today, my friends, so even though we face the difficulties of today and tomorrow, I still have a dream. It is a dream deeply rooted in the American dream.

.

I have a dream that one day this nation will rise up and live out the true meaning of its creed: ‘We hold these truths to be self-evident: that all men are created equal.’

.

I have a dream that one day on the red hills of Georgia the sons of former slaves and the sons of former slave owners will be able to sit down together at the table of brotherhood.

.

I have a dream that one day even the state of Mississippi, a state sweltering with the heat of injustice, sweltering with the heat of oppression, will be transformed into an oasis of freedom and justice.

.

I have a dream that my four little children will one day live in a nation where they will not be judged by the color of their skin but by the content of their character.

.

I have a dream today.

I have a dream that one day, down in Alabama, with its vicious racists, with its governor having his lips dripping with the words of interposition and nullification; one day right there in Alabama, little black boys and black girls will be able to join hands with little white boys and white girls as sisters and brothers.

.

I have a dream today. 

           আমরা মামলুকরা তো জন্মাই নাস্তিক হয়ে, তারপর যারা আমাদের কেনা গোলাম করে তোলে তাদের ধর্মে আমরা ধর্মান্তরিত হই । কেনা গোলামরা প্রায় সকলেই জন্মায় সর্বপ্রাণবাদী হয়ে, যাকে ক্রেতারা বলে নাস্তিকতা । আমি জন্মগতভাবে ঈশ্বরবিশ্বাসী ছিলুম না ; পরে হয়েছি ।   শেকসপিয়ারে আমার সংলাপ পড়েছো তো ? সেই যে বলেছিলুম : ”হুজুর, সৈনিক হলেও আমি একজন রক্তমাংসের মানুষ। ভালোবেসে যদি কেউ যুদ্ধের কাহিনি শুনতে চায় তাহলে তাকে বিমুখ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমি তাকে দিনের পর দিন শুনিয়েছি খুব ছোটবেলায় দেশ ছেড়ে ভেনিসে এসে কীভাবে আমি সৈনিকের বৃত্তি গ্রহণ করেছি, বিভিন্ন যুদ্ধ জয় করে কীভাবে আমি আজ ভেনিসের প্রধান সেনাপতি হয়েছি — এসব বিভিন্ন ঘটনার কথা বলেছি তাকে। কর্মসূত্রে ওর বাবার কাছে যখনই গিয়েছি, কাজ শেষ হবার পর ডেসডিমোনা আমায় টেনে নিয়ে গেছে তার মহলে। বাচ্চা মেয়ের মতো বায়না ধরেছে গল্প শোনার। যুদ্ধের বর্ণনা শুনতে শুনত আমার প্রতি ভালোবাসার যে ছবি ওর দু-চোখে ফুটে উঠত, সেটা আমার নজর এড়ায়নি। হুজুর, বিধর্মী হয়েও আমি বলছি ডেসডিমোনার ভালোবাসা পেয়ে আমি সত্যিই ধন্য। কোনও তুকতাক বা জাদুমন্ত্র নয় হুজুর, আমর বীরত্বের কাহিনিগুলো একসময় আমারই অজান্তে জয় করেছে ডেসডিমোনার হৃদয়। হে মহামান্য ডিউক, নিজের নির্দোষিতার পক্ষে আমার আর কিছু বলার নেই।”

          সিদ্দিদের মতন ওথেলো আসলে মাগরেবের কালা-আদমি ।মরোক্কো, আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া, লিবিয়া, মরিতানিয়া, উত্তর মালি, উত্তর নিজের আর ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের লোকেরা মাগরেবি বা বার্বার । বর্তমানে মাগরেব কথাটি দিয়ে মরক্কো, আলজেরিয়া ও তিউনিসিয়ার পুরো অঞ্চলকে বোঝানো হয়; ব্যাপকতর অর্থে লিবিয়া আর মোরিতানিয়াকেও এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অতীতে আরবি ভাষাতে মাগরেব বলতে বোঝাতো দেশ তিনটির যেসব অংশ সুউচ্চ অ্যাটলাস পর্বতমালার উত্তরে ও ভূমধ্যসাগরের তীরে অবস্থিত । 

                  সমাধিদাদা বলতে থাকে, সিদ্দিদের যে ধর্মই নির্বিশেষে বেঁধে রাখে সেগুলোর একটি কারণ হিরিয়ারু বা পূর্বপুরুষের উপাসনা। আত্মারা আকারে মৃতর মতনই বলে বিশ্বাস করা হয়। তারা পরিবারকে সমস্ত উদ্বেগের ব্যাপারে পরামর্শ করার জন্য সাক্ষী হিসাবে বিবেচনা করে। জন্ম, বিয়ে এবং মৃত্যুর  অনুষ্ঠানে পূর্বপুরুষদের ডেকে আনা হয়। প্রবাসী বাবা-মায়ের আত্মা হিরিয়ারুকে ঘিরে বাড়ি সাজানো হয়েছে। এটা বাবা-মায়ের  স্মরণ , বেশ কয়েক বছর ধরে তাদের যত্নের জন্য  ধন্যবাদ জানায় আর ভবিষ্যতে পরিবারের ওপর নজর রাখার জন্য অনুরোধ করে। সমস্ত আত্মীয়দের পক্ষে এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়া জরুরি, সুতরাং এইভাবে আত্মীয়তার সম্পর্ক রিনিউ হয় ।  পরিবারের ‘কর্থ’, মানে কর্তা, বছরে দু’বার হিরিয়ারু উপাসনা করে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে নবরত্রি উৎসব চলার সময়ে অনুষ্ঠিত হয়। যদি কোনও কারণে তা সম্ভব না হয় তবে এপ্রিল-মে মাসে অন্যান্য বড় উৎসব হয় – হোলির সময়ও  করা যেতে পারে।  স্পষ্টতই বাবা-মায়ের  মৃত্যুর তারিখের সাথে মেলে না কারণ সিদ্দিরা কেবল প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী পালন করে। হিন্দু সিদ্দিদের সাধারণত অনুষ্ঠানটা চিহ্নিত করার জন্য বিরাট ফাংশন হয় তবে খ্রিস্টান আর মুসলিম সিদ্দিদের ততোটা নয়।       

          সমাধিবউদি বলল, তোমরা, আজকালকার বাঙালিরা, শুনেছি সঞ্জয় বেলাটঠিপুত্তের মতবাদে বিশ্বাস করো ! কোনো বাঙালিকে যদি জিগ্যেস করো “আপনি কি হিন্দু”, সে ভ্যাবাচাকা খেয়ে যাবে ! বেলাটঠিপুত্ত সম্পর্কে না জানা থাকলে আমিই বলছি । সঞ্জয় বেলটঠিপুত্ত বা সঞ্জয় বৈরতীপুত্র, গৌতম বুদ্ধের সময়ের একজন ভারতীয় অনেকান্তবাদী বা অজ্ঞাবাদী দার্শনিক ছিলেন। বিভিন্ন পালি সাহিত্যে সঞ্জয় বেলটঠিপুত্তকে পরিব্রাজক হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে । সারিপুত্ত আর মহামোগ্গলন নামে তার দুইজন প্রধান শিষ্য পরবর্তীকালে  গৌতম বুদ্ধের দর্শন সম্বন্ধে জানতে পেরে সঞ্জয় বেলটঠিপুত্তকে ছেড়ে দিয়ে গৌতম বুদ্ধের শিষ্যত্ব গ্রহণ করে। এইসময় সঞ্জয় বেলাটঠিপুত্তের আড়াইশো শিষ্য তাঁকে ত্যাগ করে গৌতম বুদ্ধের শিষ্য হয়ে যায়। শেষ জীবনে রক্তবমির কারণে সঞ্জয়ের মৃত্যু ঘটে। সুত্তপিটকের দীঘনিকায়ের সামফলসুত্ত অনুসারে, সঞ্জয় বেলাটঠিপুত্ত কোনও দার্শনিক প্রশ্নের উত্তর এড়ানোর উদ্দেশ্যে সর্বদা দ্ব্যর্থবোধক বাক্য প্রয়োগ করে সেইসকল প্রশ্নের উত্তর দিতেন, অনেকটা এখনকার বাঙালি রাজনেতার মতন। তিনি পরলোক, দেবতা, কর্মফল, মুক্তপুরুষ ইত্যাদি অধিবিদ্যা সংক্রান্ত সব প্রশ্ন এড়িয়ে যেতেন, অনেকটা এখনকার বাঙালি লেখকদের মতন। পরলোক বা দেবতা বা কর্মফল বা মুক্তপুরুষের অস্তিত্ব আছে না নেই তা তিনি বলেননি বা জোর দিয়েও বলেননি যে আছে না নেই। যদিও রাহুল সাংকৃত্যায়নের মতে, মানুষের সহজ বুদ্ধিকে ভ্রমে নিক্ষেপ করাই সঞ্জয়ের উদ্দেশ্য  ছিল, অনেকটা এখনকার বাঙালি মন্ত্রীদের মতন ।

          সমাধিদাদা বলতে আরম্ভ করল, তোমরা তো জানো না, গেরিলা লড়াই আমিই মারাঠাদের শিখিয়েছিলুম, যাকে তোমরা বলো বর্গি আক্রমণ । এই অঞ্চলে আরও কয়েকজন নামকরা সিদ্দি যোদ্ধা ছিল, যাদের বংশধররা এখনও আছে, আফ্রিকার মানুষদের মতন নেই আর, রোগাটে আর বেঁটে হয়ে গেছে, এখানকার মুসলমানদের সঙ্গে বিয়ে করে । ওদের লোকে বলে সিদ্দি, সৈয়দ থেকে সিদ্দি । সিদ্দি হল এক জাতীগত গোষ্ঠী যারা ভারত আর পাকিস্তানের কিছু অংশে বসবাস করে। এদের পূর্বপুরুষরা ছিল আবিসিনিয়ার আদিবাসি যাদের পর্তুগিজরা পাকড়াও করে গোলাম হিসেবে ভারতবর্ষে এনেছিল । ভারতের হায়দ্রাবাদ, গুজরাট আর করনাটকাতে আর পাকিস্তানের মাকরান ও করাচীতে প্রায় বিশ থেকে পঁচিশ হাজার সিদ্দি থাকে, কালা আদমি। অধিকাংশ সিদ্দি সুফি মুসলিম হলেও হিন্দু আর ক্যাথলিখ খৃষ্টান আছে ।  আমার মতন ওরাও লড়াই করতো কিন্তু আগেপিছে না ভেবে এমন কাজকর্ম করতো যে শাসক হিসেবে এগোতে পারেনি । জঞ্জিরা দুর্গের আশে-পাশে নেড়ে সিদ্দিদের কবর পাবে, আরও বেশি অবহেলিত, ভাঙাচোরা । যাদের  সিদ্দিরা মনে রেখেছে তাদের মধ্যে নাম করতে হয় সিদ্দি রসুল ইয়াকুত, সিদ্দি মাসুদ, সিদ্দি আবদুল রহমান, সিদ্দি অম্বর আওয়ানি, সিদ্দি রাহিন  আর সিদ্দি সাট । নুনের করের গরমিলের দরুন সিদ্দিরা ১৬৮০ সালে সাম্ভাজি মোকাশিকে থলেতে ঢুকিয়ে জীবন্ত ফেলে দিয়েছিল সমুদ্রে, আর চটিয়ে দিয়েছিল মারাঠাদের । ব্যাস, সেই থেকে মারামারি-কাটাকাটি ।      

            সমাধিদাদা কথা বজায় রাখল, ওনার তো গলা শুকোবার সমস্যা নেই । সে যাক, একটু আগে যা বলছিলুম, পরে বর্গি নামটা আঠারো শতকের  লুটতরাজপ্রিয় অশ্বারোহী মারাঠা সৈন্যদলের  হয়ে গিয়েছিল। তোমরা বাঙালিরা ওদের কাছ থেকে ধুতি পরতে শিখেছ, কেননা ঘোড়ায় চাপতে হলে দু-দিকে পা ঝোলাতে হয় । আর তুর্কিদের কাছ থেকে শিখেছ পাঞ্জাবি পরা । ১৭৪১ থেকে ১৭৫১ সাল পর্যন্ত দশ বছর ধরে বাংলার পশ্চিম সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোয় নিয়মিতভাবে লুটতরাজ চালাত বর্গিরা। বর্গিহানা এই সময় একরকম বাৎসরিক ঘটনায় পরিণত হয়েছিল। মারাঠি ধনগর জাতের লোকেরা অভিযানে যাওয়ার সময় শুধু একটা সাত হাত লম্বা বর্শা নিয়ে বের হত। আমার শেখানো গেরিলা আক্রমণকে পরে বদনাম করে দিয়েছিল ওরা ।বর্গি  শব্দটা মারাঠি বারগির শব্দের অপভ্রংশ। বারগির বলতে মারাঠা ঘোড়সওয়ারদের বোঝাত। এদের ঘোড়া আর অস্ত্রশস্ত্র জোগান দিত মোগল বা মারাঠা শাসক । বাঙালিরা তাদের সঙ্গে লড়ার বদলে গান গাইতো, এইরকম–       

 খোকা ঘুমালো পাড়া জুড়ালো বর্গী এল দেশেবুলবুলিতে ধান খেয়েছে খাজনা দেব কিসে ধান ফুরোলো পান ফুরোলো খাজনার উপায় কি? আর কটা দিন সবুর কর রসুন বুনেছি 

          তোমরা হয়তো জানো, যে বর্গিদের ভয়ে লুকিয়ে রাখা সোনাদানার খোঁজ এখনও হয় । যেমন ঝাড়গ্রামের কুলটিকরিতে আর পশ্চিম মেদিনীপুরে কেশিয়াড়িতে খোঁড়াখুঁড়ি হয়েছে। কুলটিকরি থেকে কেশিয়াড়ি যাওয়ার পথে পড়ে কিয়ারচাঁদ। এই কিয়ারচাঁদের বিরাট এলাকায় শয়ে শয়ে লম্বা, চৌকা নানা রকম পাথর পোঁতা আছে। সাধারণ ভাবে বোঝা যায় না কী এগুলো। কিন্তু লোকে বলে , ওই পাথরগুলোর সঙ্গে বর্গিদের যোগ রয়েছে। এলাকার বাসিন্দারা বলে, তারা দাদুদের কাছে শুনেছে, বর্গিদের অত্যাচারে ভয় পেয়ে স্থানীয় জমিদার সারি সারি পাথর পুঁতেছিলেন। সন্ধ্যার সময় ওই সব পাথরের গায়ে মশাল জ্বেলে বেঁধে দেওয়া হত। দূর থেকে মনে হত, মশালধারী সৈন্য গড় পাহারা দিচ্ছে।এই একটি উদাহরণ থেকেই বোঝা যায় বর্গিরা কতটা আতঙ্ক তৈরি করেছিল মেদিনীপুরে। আঠারো শতকের প্রথম দিকে ওড়িশা সংলগ্ন মেদিনীপুর বারবার বর্গি হানার শিকার হয়েছে। সম্পদহানি তো হয়েছেই। প্রাণহানির হিসেব নেই। ধনগররা ছিল নিম্ন শ্রেণির মারাঠা সৈন্য। অনেক মারাঠা সেন্য বাঙালি মেয়ের প্রেমে আটক হয়ে মেদিনীপুরেই থেকে গিয়েছিল ; তাই ওই অঞ্চলে নানা ধরণের পদবি পাবে যা পশ্চিমবাংলার অন্য জায়গায় পাবে না । তোমরা কেউ কি মেদিনীপুরের ? তাহলে আমার চেয়ে ভালো জানবে ।

          নাস্তিক যুবক : বাঙালিরা তখন কী করছিল ?

          সমাধিদাদা : তখনও বাঙালিদের জন্ম হয়নি । রেডিওতে অনুরোধের আসর শুরু হবার পর ওরা জন্মেছিল ।

           সমাধিবউদি প্রসঙ্গ এগিয়ে নিয়ে যান । সেই সময় আলিবর্দি খাঁ ছিলেন বাংলা-বিহার-ওড়িশার নবাব। তিনি বর্গির হাত থেকে দেশকে রক্ষা করার নানা চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্য়ন্ত কিছুই করে উঠতে পারেননি। ভাগীরথীর পশ্চিম তীরে রাজমহল থেকে মেদিনীপুর ও জলেশ্বর পর্যন্ত অঞ্চলে নবাবি শাসনের পরিবর্তে বর্গিদের প্রভাব বাড়ে। বর্গিরা আচমকা ঘোড়ায় চড়ে ‘হর হর মহাদেব’ বলে গ্রামে ঢুকে পড়ত। তারপর, লুটপাঠ, অত্যাচার করে গ্রাম ধ্বংস করে পালাত।  গঙ্গারাম শাস্ত্রীর রচনায় মরাঠাদের বীভৎসতার বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়।

‘মাঠে ঘেরিয়া বরগী দেয় তবে সাড়া।

সোনা রুপা লুঠে নেয়, আর সব ছাড়া।।

কারু হাত কাটে, কারু নাক কান।

একি চোটে কারু বধয়ে পরাণ।

ভাল ভাল স্ত্রীলোক যত ধরিয়া লইয়া যায়।

অঙ্গুষ্ঠে দড়ি বাঁধি দেয় তার গলায়।

এক জনে ছাড়ে তবে আর জনা ধরে।

তারা সবে  ত্রাহি ত্রাহি ক্রন্দন করে।।’’

         ভাস্কর পণ্ডিতের নেতৃত্বে বিশাল সেনাবাহিনী বাংলায় ঢোকে । বর্গি সৈন্যদলে মহারাষ্টীয় হিন্দু ছাড়াও অসংখ্য মুসলমান, পিণ্ডারি, আর তথাকথিত নিম্নবর্গীয় লুটেরা থাকতো।    নবাব আলিবর্দি খাঁ রঘুজি ভোঁসলের দক্ষ সেনাপতি ভাস্কর পণ্ডিতের গতিবিধির সংবাদ পেয়ে পাঁচেট থেকে ফিরে মেদিনীপুরের চলে আসেন। বর্গিদের অত্যাচার নেমে এল। বাধ্য হয়ে আলিবর্দি খাঁ বিশ্বাসঘাতকতা করে ভাস্কর পণ্ডিতকে খুন করালেন। তারপর এক বছর তিন মাস মেদিনীপুরের স্বস্তি। কিন্তু রঘুজি ভোঁসলে ভাস্কর পণ্ডিতকে খুনের বদলা নেবার জন্য প্যাঁচ কষছিল । সে  পনের হাজার সৈন্য নিয়ে কটক আক্রমণ করলে। পুরো ওড়িশা, মেদিনীপুর আর হিজলি পর্যন্ত এলাকা দখল করে ফেলল। বর্গিরা গ্রাম, নগর পুড়িয়ে, শস্যের ভাঁড়ারে আগুন লাগিয়ে এবং শেষে মানুষের নাক, কান আর বউদের মাই কেটে অত্যাচার শুরু করল, অনেকটা বাঙালি ক্যাডারদের মতন ।১৭৫১ খ্রিস্টাব্দে আলিবর্দি প্রথম রঘুজির সঙ্গে সন্ধি করে মেদিনীপুরের কিছু অংশ, যেমন জলেশ্বর, ভোগরাই, পটাশপুর, কামার্দাচৌর  নিমক মহালগুলো আর ওড়িশার রাজস্ব আদায়ের ভার ভোঁসলে মরাঠাদের উপর ছেড়ে দেন।

         সমাধিদাদা বলল,    তবে ঠাকুর-দেবতায় বর্গিদের ছিল শ্রদ্ধা। তারা কোনও দেব-মন্দির লুট করত না।  বর্গভীমা মন্দিরের কোনও অংশে তারা হাত দেয়নি। ঠিক তেমন ভাবে সাঁকরাইল থানার পিতলকাঠি বা পাথরাকাটি  গ্রামের জয়চণ্ডী মন্দিরকে তারা নতুন ভাবে তৈরি করেছিল। মন্দিরের পাশে ছিল ভুঁইয়া রাজার গড়। রাজাদের প্রচুর ধন-সম্পদ ছিল। বর্গি হাঙ্গামায় তিনি ল্যাঙটোপোঁদা হয়ে যান। বংশধারাও লোপ পায় তাঁর। ফিরে গিয়ে দেখো, এখনও ওই এলাকায় তাঁর ভাঙা-গড়ের চিহ্ন মেলে। আর আছে রানির স্নান করার কুয়ো। বেশ কিছুদিন পরে ওই এলাকার জমিদার জয়চণ্ডীর মন্দির খুঁড়ে বর্গিদের ধনসম্পদ খুঁজেছিল । মন্দিরের ভাঙা দেওয়াল নাটমন্দিরের থাম, জমিদারের লোভের নমুনা হয়ে আছে।     তারপর বলছি, দাঁড়াও, পা চুলকোচ্ছে, কোনো পোকা বোধহয় ফাটল দিয়ে ঢুকে পড়েছে । এই এক হয়েছে, কতো রাজা-রাজড়াদের যুদ্ধে হারালুম কিন্তু এই পোকাগুলোর হাত থেকে কয়েকশো বছরেও রেহাই পেলুম না ।   আচ্ছা, তোমরা কি জানো আলিবর্দী খাঁর সমাধি কোথায় ?

          সমাধিবউদি বলতে লাগল, দাস-দাসি ধরবার দল হিসেবে বর্গিরা গেলো তো এলো পিন্ডারিরা, আমাদের গেরিলা যুদ্ধ নকল করে। পিন্ডারিরা  মোগল  আর  মারাঠা সেনাদের সঙ্গে জুটেছিল আর শেষ পর্যন্ত ১৮১৭-১৮ পিন্ডারি যুদ্ধে নিকেশ হওয়ার আগে তারা নিজেরাই  ছদ্মবেশে আক্রমণ চালাতো । তারা বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করতো আর  তাদের ক্ষতিপূরণ পুরোপুরি যুদ্ধের সময় তারা যে লুটতরাজ করতো সেই সব মালকড়ি নিজেদের দখলে রাখতো ।  তারা ছিল ঘোড়সওয়ার, পদাতিক আর আংশিকভাবে সশস্ত্র, বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে ওস্তাদ আর শত্রুদের অবস্থান সম্পর্কে তাদের যে নিয়োগ করতো তাকে খবর দিতো।  ঝটপট বিশৃঙ্খলভাবে মারকাট চালিয়ে যাওয়ায় তারা ছিল এক্সপার্ট, তবে ১৭৯১ সালে শৃঙ্গেরি শরদা পিঠমে পিন্ডারি অভিযানে ওরা মারাত্মক অবমাননাকর ঘটনা ঘটায়। শিবাজি পিন্ডারি দলকে তাদের শিকারী ক্রিয়াকলাপ সাবধানে  করার জন্য বিধি জারি করেন।   পিন্ডারি নেতারা বেশিরভাগই ছিল মুসলমান  তবে তারা হিন্দুদেরও দলে রাখতো।  সন্ন্যাসী আর সাধুরা তাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য ভাড়াটে সৈন্যের কাজ করা শুরু করে পিণ্ডারিদের আটকাতো।  পিন্ডারিরা পুরো ভারতবর্ষ, দাক্ষিণাত্য আর  গুজরাট, উত্তরপ্রদেশ, বিহার আর ওড়িশার বিভিন্ন অঞ্চল জুড়ে তাণ্ডব চালিয়েছিল।  পিন্ডার শব্দটা পিন্ডা থেকে নেওয়া মনে হয়, যা মাতাল হবার মাদক । এটা একটি মারাঠি নাম যা সম্ভবত একটি “ঘাসের বান্ডিল”  বোঝায়।   পিন্ডারিদের পোশাক ছিল পাগড়ি আর ল্যাঙোট,  মানে হাফল্যাঙটো । তারা সঙ্গে রাখতো পুরোনো মডেলের তালোয়ার , পায়ে চটি । তারা যে কোনও প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক সাম্প্রদায়িক আধিপত্য বা রাজ্যের সঙ্গে  চুক্তি করতো আর লুটে আনা দাস-দাসিদের তাদের কাছে বিক্রি করতো । পিন্ডারিরা প্রায়শই অন্যের হয়ে মারকাট করতো আর নৃশংসতায় ছিল বেপরোয়া, অনেকটা এখনকার ক্যাডারদের মতন । 

        নব্যনাস্তিক যুবতী : বাঙালিরা কী করছিল ?

       সমাধিবউদি : বাঙালিদের তখন জন্ম হয়নি । লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের পর জন্ম হয়েছিল।

          সমাধিদাদা বলতে লাগল, আমার যুদ্ধকৌশলের আগে কিছু নোংরা পদ্ধতিও ছিল এলাকা দখলের আর সম্পদ সংগ্রহের, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ঠগ সম্প্রদায় । তবে তারা কাউকে দাস হিসেবে বিক্রি করতো না, খুন করে ফেলতো ।ঠগ একটা সংস্কৃত শব্দ যা থেকে ঠগি শব্দটা উদ্ভূত। শাব্দিকভাবে এর অর্থ ধোঁকাবাজ, প্রতারক। তোমাদের অভিধানে ঠগি বলতে বিশেষ শ্রেণির এক দস্যুদলকে বোঝায় যারা পথিকের গলায় রুমাল বা কাপড় জড়িয়ে খুন করতো । ঠগীরা ছিল ভারতবর্ষের এক বিশেষ শ্রেণির খুনি সম্প্রদায়। এদের মতন নিষ্ঠুর আর নিপুণ খুনির দল পৃথিবীতে শুধু নয়, ইতিহাসেই বিরল।  জিয়াউদ্দীন বারানির লেখা ‘ফিরোজ শাহর ইতিহাস’ বইতে ঠগিদের কথা প্রথম জানা যায়, বইটা পেলে পড়ে দেখতে পারো, বেশ ইনটারেস্টিঙ। এই ঠগিরা উত্তরভারতে তাদের কাজকারবার শুরু করে। এরপর বহু শতক ধরে বংশ পরম্পরায় তাদের এই কর্মকান্ড চালাতে থাকে। এরা ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়াতো, পথে যাত্রীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতো। তারপর সময়-সুযোগ বুঝে যাত্রীদের মেরে ফেলে সবকিছু লুট করতো। ১৭ আর ১৮ শতকের প্রথম দিকে ভারতের পথিকদের জন্য মূর্তিমান এক আতঙ্কের নাম এই ঠগি। কিন্তু বাংলায় তারা ঢোকে ১২৯০ সালের দিকে। ১২৯০ এর সুলতানী শাসনের সময় প্রায় হাজার খানেক ঠগ ধরা পড়ে । কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে সুলতান তাদের কোনো রকম সাজা না দিয়ে দিল্লীতে ফিরে না আসার শর্তে, অনেকটা আপ্যায়নের সাথে নৌকায় তুলে দিয়ে ভাটির দেশে- মানে তোমাদের  বাংলায় পাঠিয়ে দেয়। আর তারপর থেকেই বাংলার জলে-স্থলে, মাঠে-ঘাটে ছড়িয়ে পড়ে এই খুনির দল। বাংলায় ঠগিদের ইতিহাসের শুরু তখন থেকেই। শুনেছি আজকাল নাকি দুই বাংলায় রাজনৈতিক ঠগির দল দেখা দিয়েছে । কথাটা কি সত্যি ?

             সমাধিদাদা বলে চলে, সেই ঠগিরা নানা সাঙ্কেতিক ভাষায় নিজেদের মধ্যে কথা আদান প্রদান করতো। যেমন- ‘বাসন মেজে আনার’ কথা বলার মধ্য দিয়ে সর্দার তার এক সাঙেতকে কবর তৈরি করার নির্দেশ দিত। ‘ঝিরনী’ শব্দে খুন করার তোড়জোড় আর ‘তামাকু লাও’ শব্দের  মাধ্যমে হত্যার আদেশ দেয়া হতো। এই নির্দেশ পাওয়া মাত্রই মুহূর্তের মধ্যে ফাঁস জড়ানো হতো শিকারের গলায়।    কবর তৈরি করারে দায়িত্ব যার তাকে বলা হতো ‘বিয়াল’। শিকারকে যে ধরে রাখবে তাকে বলা হতো ‘চামোচি’। শিকার যাতে বাধা দিতে না পারে তার জন্য হাত আটকে রাখার দায়িত্ব ‘চুমোসিয়া’র। ‘চুমিয়া’ শিকারের পায়ে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দেবে। ‘ভোজারা’ মৃতদেহগুলো কবরে নিয়ে যাবে । ‘কুথাওয়া’র দায়িত্ব হলো দেহগুলোর হাঁটু ভেঙে থুতনির সঙ্গে লাগিয়ে ভাঁজ করে কবরে দেওয়া। মৃতদেহ পাহারা দেয়া ও বিপদের গন্ধ পেলে জানান দেয়ার দায়িত্বপ্রাপ্তদের বলা হতো ‘ফুরকদেনা’। আর হত্যাকাণ্ডের জায়গাটা সাফসুতরো করে ফেলার দায়িত্ব ছিল ‘ফুরজানা’দের। সদ্য মৃত মানুষদের কবরের ওপর বসত ঠগীদের অমৃতের ভোজ। সে ভোজ আর কিছু নয়, গুড়ের ভোজ। একলা পথিক পেলেই সাদরে তাকে দলের সাথে ভ্রমণের আমন্ত্রণ জানাত। তাদের মতে, যে একবার এই গুড় খাবে, সে ঠগি হয়ে যাবে। ঠগিদের মধ্যে হিন্দু-মুসলমান-শিখ সব ধর্মের লোকই ছিল, যেমন এখনকার রাজনৈতিক দলগুলোতে।      

             সমাধিবউদি এবার কথা আরম্ভ করল ।দাস প্রথার চেয়ে আরও ভয়ানক শোষণের কথা বলি, তা হল নীলচাষ আর নীলকর সাহেবদের অত্যাচার ।লুই বোনারড  নামের একজন ফরাসি বণিকের মাধ্যমে এদেশে আধুনিক পদ্ধতিতে নীলচাষ ও এর ব্যবহার প্রচলন ঘটে| আঠারো শতকের শেষ দিকে  ইংল্যান্ডে শিল্প বিপ্লবের ফলে কাপড় কারখানায়  নীল এর চাহিদা শতগুণ বেড়ে যায়|  ফলে ওই সময়ে নীল চাষের ব্যবসা অত্যন্ত লাভজনক হয়ে ওঠে|  বাঙালি জমিদার আর সুদখোররা  কারবার খুলে বসে আর নদীয়া, যশোর, খুলনা, চব্বিশ পরগনা, বগুড়া, রাজশাহী, মালদা, পাবনা, ফরিদপুর, ময়মনসিংহ, বরিশাল  জেলায় অসংখ্য নীল কুঠি গড়ে ওঠে|  ফরাসি, ডাচ, পর্তুগিজ, দিনেমার, দেশের ধনিক গোষ্ঠী দলে দলে বাংলাদেশ পাড়ি জমায়|   ইংরেজরা  নীল উৎপাদনের জন্য বাংলায়  শোষণ প্রক্রিয়া চালু করেছিল ; জবরদস্তি   চুক্তির প্রচলন করেছিল|  এই  চুক্তির পরিণতিতে কৃষকরা হয়েছিল ভূমিদাস|১৮১০ থেকে ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে পর্যন্ত বাংলায় নীল চাষ উন্নতির চরম শিখরে উঠেছিল|  কৃষকরা বিদ্রোহ ঘোষণা করলো । লাভের পরিমাণ কমে গেলে নীলকররা কারখানাগুলো বিক্রি করতে বাধ্য হয়| ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দে  নীলের উৎপাদন কমে যাওয়ায়  নীলকররা এই ব্যবসা বন্ধ করে দেয়| 

           সমাধিদাদা বলল, আরে, তোমরা আমার গল্প তো শুনছোই না । আমি জন্মেছিলুম আবিসিনিয়ার হারার নামে এক জংলি গ্রামে, ১৫৪৮ সালে, আদাল সুলতানদের রাজ্যে । আমার মতনই এক অস্হির আত্মা ইউরোপে নরকে এক ঋতু কাটিয়ে হারারেতে এসেছিল, তার নাম জঁ নিকোলা আর্তুর র‍্যাঁবো, কবি, সেও দাস ব্যাবসা আর বন্দুকের চোরাচালান করত সুলতানের জন্য, অবশ্য আমার জন্মের অনেক পরে । যাই হোক, তোমরা ফিরে গিয়ে সরকারকে বোলো যাতে আমার সৌধকে সারিয়ে রঙ করানো হয় । ওই আল-সুলতান আল-আজম ওয়াল খাকান আল-মুকাররম আবুল মুজাফফর মুহি উদ-দিন মুহাম্মদ আলমগিরের নকল তাজমহলকে রাঙিয়ে রাখার মানে হয় না । আমার দেয়া নাম পালটে প্রথমে আমার ছেলে ফতেহ খান শহরের নাম দিয়েছিল ফতেহপুর, তারপর খেঁকুরে মোগল  নিজের নামে এই জায়গাটা করে ফেললে আওরঙ্গাবাদ । গুজরাট থেকে সিদ্দিরা দলে-দলে আমার সৌধ দেখতে আসে ;ওরা এদেশের মানুষ হয়ে গেছে বটে কিন্তু ওদের পূর্বপুরুষরাও দাস হয়ে আফরিকা থেকে এসেছিল। ওদের সাহস নিয়ে বেশ মজার গল্প আছে, তা পরে বলবো । এখন এটুকু বলি যে, আই পি এল ক্রিকেটারদের মতন হাবশিদেরও নিলাম হতো, আমারও কয়েকবার হাতবদল হয়েছিল । ইবন বতুতার বর্ণনায় পাওয়া যায় মাত্র এক দিরহাম দিয়ে তখন বাংলাদেশ আটটি স্বাস্থবান মুরগী পাওয়া যেত, এছাড়াও এক দিরহামে পনেরোটা কবুতর, দুই দিরহামে একটি ভেড়া এবং এক স্বর্নমূদ্রারও কম মূল্যে দাস কিনতে পাওয়া যেত।ভালো কালো যুবতীদের দাম ফর্সা যুবতীদের চেয়ে অনেকসময়ে বেশি হতো, কেননা যারা যুবতী কিনতো তারা পোশাক খুলিয়ে পুরো বডি দেখে নিতো ।

           সমাধিদাদা বলতে লাগলো, জানো না বোধহয়, বাঙালিদেরও আমরা কালা আদমিরা এককালে শাসন করেছি । তোমাদের বঙ্গদেশে চতুর্দশ শতাব্দী থেকে সুলতানি শাসন ছিল, তখনই আমরা কালা আদমিরা কিছুকালের জন্য ক্ষমতা দখল করেছিলুম | সেনাবাহিনীতে বেশিরভাগ ছিল কালা পালোয়ান | সেখান থেকে তারা ক্রমশ প্রশাসনিক কর্তা হয়ে উঠল | তবে সবাইকে টেক্কা দিল একজন চতুর কালা আদমি, বরবক শাহজাদা |  বাংলার শাসক জালালউদ্দিন ফতে শাহ-র সময়ে প্রাসাদের মূল রক্ষী ছিল লোকটা| পরে সেনাবিদ্রোহ করে ছিনিয়ে নিলে ক্ষমতা | বরবক ছিল বাংলার প্রথম নিগ্রো  শাসক |  শুরু করেছিলেন নিগ্রো শাসক বংশ | তবে এই শাসন বেশিদিন স্থায়ী হয়নি | নিগ্রোদের সংখ্যা ছিল আট হাজার।  বরবক শাহর ছোট ভাই হুসেইন জালালউদ্দিন ফতেহ শাহ উপাধি নিয়ে সিংহাসনে চড়ে বসে।  বাংলায় নিগ্রো শাসনকাল ছিল মাত্র ছয় বছর। এ সময় এ দেশের ইতিহাস ছিল অন্যায়, অবিচার, বিদ্রোহ, ষড়যন্ত্র আর হতাশার।  চারজন নিগ্রো সুলতানের তিনজনকে খুন করা হয়।   মালদাতে গৌড়ে আছে ফিরোজ মিনারের মতো  নিদর্শন, যা তৈরি হয়েছিল নিগ্রো রাজাদের আমলে | অনেক বাঙালি নিগ্রোদর মতন কালো কেন জানো ? নিগ্রোরা বাঙালিদের বিয়ে করে মিশে গেছে জনজীবনের মূলস্রোতে | বর্তমানে ভারতে প্রায় ৫০ হাজার আফ্রিকান বংশোদ্ভূত আছে | তবে তারা এখন স্হানীয় ভাষা পোশাক-আচার-আচরণে এতটাই ভারতীয়, যে চেহারায় কিছু বৈশিষ্ট্য ছাড়া বোঝার উপায় নেই যে এঁদের নিগ্রো পূর্বপুরুষরা কয়েকশো বছর আগে আফ্রিকা থেকে ভারতে এসেছিলেন | আমার মতন ওরাও প্রমাণ করে দেখিয়েছিল যে নিগ্রোরাও আফরিকা থেকে গিয়ে অন্য দেশে শাসক হতে পারে ।         

         সমাধিদাদা বলে চলল, তোমরা সর্বপ্রাণবাদি নাকি কোনো ধর্মানুসারী তা জানি না, কিন্তু কাছেই আছে জারজারি জারবকশ বা শাহ মুনতাজাবউদ্দিন চিশতির মজার, ভারতীয় উপমহাদেশের সমস্ত সূফিদের মধ্যে সবচেয়ে নামকরা  ছিলেন। তাকে চোদ্দ শতকের প্রথম দিকে দিল্লির নিজামুদ্দিন আউলিয়া এই অঞ্চলে পাঠিয়ে ছিলেন । উনি সাতশো শিষ্য নিয়ে আওরঙ্গবাদে এসেছিলেন আর খুলদাবাদে  কুয়োর কাছে একজন হিন্দু রাজকন্যাকে ধর্মান্তরিত করেছিলেন বলে জানা যায়। জায়গাটাকে এখন “সোহান বাওলি” বা “ভাল লাগার জায়গা” বলা হয়। সেই রাজকন্যাকে খুলদাবাদে সাধু সমাধির কাছে সমাধিস্থ করা হয়েছিল। জারিজারি বকশের সমাধি আমার সমাধি আর শহরের উত্তরগেটের মাঝামাঝি। খুলদাবাদের দরগায় উরস এর জন্য প্রতি বছর হাজার হাজার তীর্থযাত্রী আসে । তাছাড়া   শায়খ বুরহানউদ্দীন  চিশতী আর শায়খ জয়ন-উদ-দ্বীন শিরাজীর সমাধি আছে এই শহরে ।  দরবেশদের কাছে শহরটা পবিত্র আর আধ্যাত্মিক, অথচ আওরঙ্গজেব ওদের পছন্দ করত না ।   

           সমাধিবউদি বলল, তোমরা জানো নিশ্চয়ই যে আজকাল সালাফি পাকিস্তানিরা সুফি, দরবেশ, কলন্দরদের সমাধিগুলো বোমা মরে উড়িয়ে দিচ্ছে । ইরাকে আইসিসরা একই ব্যাপার করেছিল, মিউজিয়ামের সংগ্রহকে ওরা হাতুড়ি পিটিয়ে ভাঙচুর করেছে। সম্প্রতি পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমের নওশেরা রাজ্যের একটি সুফি সমাধিস্থলে তালেবান হামলা আবারো প্রমাণ করলো এ সত্য৷ হ্যাঁ, বহুত্ববাদী ইসলাম তালেবানের জন্য শুধু অগ্রহণযোগ্যই নয়, তত্ত্ব হিসেবেও হুমকি৷                    

         সমাধিদাদা,যিনি মোগল সম্রাট আওরঙজেবের কবরের কাছেই বিখ্যাত ভদ্র মারুতি মন্দির রয়েছে, ইচ্ছে করলে তোমরা দেখতে যেতে পারো । লোকেরা  আশেপাশের জায়গা থেকে  হনুমান জয়ন্তী আর  মারাঠি ক্যালেন্ডার মাসে শনিবারের “শ্রাবণ” পুজো করতে আসে । সেই ফাঁকে আমার সঙ্গেও দেখা করে যায় । ভেবে দেখেছো কি, যে একই জেলার মাটির তলায় আমি আর আমার মোগল শত্রুর পরিবারের লোক শুয়ে ? মোগল পরিবারের সম্রাটটাকে যদিও আজকাল পর্যটকরা গালমন্দ করে । সম্রাট বলে কি আমার দেয়া শহরের নাম পালটে নিজের নামে করে নেবে ! সম্রাট লোকটা সুফি, দরবেশ, চিশতিদের পছন্দ করতো না, এখন মাটির তলায় শুয়ে বুঝতে পারছে কাণ্ডকারখানা । সে যাকগে । আমার জীবনের গল্পটা শোনো বরং ।    আমি মারা গিয়েছিলুম ১৩ই মে ১৬২৬ সালে । আবিসিনিয়া থেকে, আমার মতন যারা কেনা গোলাম হয়ে এদেশে দাসত্বের জন্য এসেছিল, তাদের বলতো আবসি, কবে যেন তা হয়ে গেল হাবশি । আমার তো কোনও ধর্ম ছিল না, আমরা ছিলুম অ্যানিমিস্ট বা সর্বপ্রাণবাদী । প্রকৃতির সব কিছুকেই সপ্রাণ মনে করা, সব ক্রিয়াকলাপের পেছনে প্রাণের অস্তিত্বকে অনুভব করাই হলও সর্বপ্রাণবাদ। তোমরা তো জানো সাম্প্রতিককালের উত্তর-আধুনিক নৃবিজ্ঞানীরা ক্রমশ সর্বপ্রাণবাদের ধারণার প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছেন। আধুনিকতাবাদ ছিল রেনে দেকার্তের বিষয়-বস্তু দ্বৈতবাদ দ্বারা চিহ্নিত  যা সাবজেকটিভকে অবজেকটিভ থেকে আর প্রকৃতিকে আর সংস্কৃতি থেকে আলাদা মনে করতো । আধুনিকতার দৃষ্টিতে সর্বপ্রাণবাদ  হ’ল বৈজ্ঞানিকতার বিপরীত, এবং তাই  নৃতাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞদের অনেকে একে সহজাতভাবে অবৈধ তর্ক বলে মনে করেন । কিন্তু উত্তর-আধুনিক নৃবিজ্ঞানীরা আধুনিকতাবাদী অনুমানগুলি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং তাত্ত্বিক প্রস্তাব দিয়েছেন যে সম্পূর্ণ মানবসমাজ তাদের চারপাশের বিশ্বকে “অ্যানিমেটেড” করে চলেছে। এই সর্বপ্রাণবাদ, আদিম চিন্তাধারার একটি অবশিষ্টাংশের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ । আরও সুনির্দিষ্টভাবে বলা যায় যে, আধুনিকতার “অ্যানিমিজম” মানবতার “পেশাদার উপগোষ্ঠী” দ্বারা চিহ্নিত করা হয়েছে, যেমন আমাদের ক্রিয়াকলাপের একটি সীমিত ক্ষেত্রের মধ্যে বিশ্বকে একটি বিচ্ছিন্ন সত্তা হিসাবে বিবেচনা করার প্রয়াস । মানুষ উল্লিখিত উদ্দেশ্য জগতের পোষা প্রাণী, গাড়ি বা খেলনার মতো উপাদানগুলির সাথে ব্যক্তিগত সম্পর্ক তৈরি করে চলেছে, যা সাবজেক্ট হিসাবে স্বীকৃত। সুতরাং এই সত্ত্বাগুলি আধুনিকতাবাদীদের দ্বারা অনুধাবিত জড় বস্তু হিসাবে নয়, বরং ব্যক্তিমানুষের সঙ্গে যোগাযোগের বস্তু হিসাবে পরিচিত । এই চিন্তা-পদ্ধতির লক্ষ্য হলো আধুনিকতাবাদীদের ধারণাটিকে এড়ানো,  যাঁরা মনে করেন পরিবেশ ব্যাপারটা মনুষ্যজগৎ থেকে পৃথক একটি জড় বিশ্ব নিয়ে গঠিত আর ব্যক্তির দেহ এবং আত্মা আলাদা তা দ্বৈতবাদীভাবে  আধুনিকতাবাদীদের ধারণায় রয়ে গেছে । সর্বপ্রাণবাদ ভাবনাটা ধর্মের আর নৃবিজ্ঞানের উত্তর-আধুনিক প্রক্রিয়াকে, বিশেষভাবে সংগঠিত ধর্মের আগের বিশ্বাস প্রক্রিয়াকে, গুরুত্ব দেয়। যদিও প্রতিটি সংস্কৃতির আছে তাদের নিজস্ব পুরাণ এবং রীতিনীতি, “আধ্যাত্মিক” বা “অতিপ্রাকৃতিক” দিক থেকে উত্তর-আধুনিক ভাবনার ভিত্তিগত সুত্র ধরে “সর্বপ্রাণবাদ”কে সবচেয়ে জরুরি হিসাবে মনে  করা হয়।  অ্যানিমিজম একটি দার্শনিক, ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক বিশ্বাস যে, আত্মা শুধুমাত্র মানুষের মধ্যেই নয় বরং সমস্ত বন্য প্রাণী, উদ্ভিদ, শিলা, প্রাকৃতিক ঘটনা (বিদ্যুৎ, বৃষ্টিপাত ইত্যাদি) সব কিছুতে থাকে । সংগঠিত ধর্ম মানুষের অনেক ক্ষতি করেছে, তা আমি কবরের ভেতরে শুয়ে বুঝতে পারি ।

          যুবতী : মলয় রায়চৌধুরীর কাছে শুনেছি উত্তরাধুনিক সর্বপ্রাণবাদের কথা ।

           যুবক : এই মলয় রায়চৌধুরী লোকটা বুড়ো বয়সেও কেমন করে সুন্দরী যুবতীদের টানে তা বুঝতে পারি ।

         সমাধিদাদা জিগ্যেস করল, উনি কে ? উনি যদি মেশার সুযোগ পেতেন তাহলে আমাদের মাহা উপজাতির মেয়েদের নিশ্চয়ই আকর্ষণ করতেন ।তোমরা কী করেই বা জানবে যে, আমাদের মায়া উপজাতির পুরুষরা যোদ্ধা হিসেবে বিখ্যাত ছিল আর মেয়েরা তাদের বুক-পাছার কারণে ।  আমার বড়ো বোনকে কিনতে চেয়েছিল পর্তুগিজরা, মা বিক্রি করেনি তখন, বলেছিল “ওর জন্য পাঁচ মোহর দিতে হবে”, আমার বোনকে আরবদের সামনে ল্যাংটো করে দেখিয়েছিল, তখনই ওর মাই চকচকে, কুঁচকিতে পশম গজায়নি, কুমারী । কয়েক বছর পরে  সত্যিই ওকে একজন নিয়ে গিয়েছিল পাঁচ মোহরের বদলে । কুমারী হাবশি মেয়েদের এদেশের বাদশারা কিনে বাঁদি করে রাখতো, হাবশি মেয়েরা শোবার সময়ে তুর্কি, মোঙ্গোল, ইরানি মেয়েদের মতন ঢঙ করতো না, জাপটে চুষে খেতো বাদশা আর রাজাদের । 

           সমাধিবউদি বলল, ওর নাম বলি তোমাদের । ওর নাম অম্বর মালিক ; সমাধিদাদা নয় । আরেকজন মালিক ছিল,  সে হলো, বখতিয়ার খলজি । ‘মালিক গাজি ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজি’ নামেও ডাকা হয়, সে লোকটা ছিল খলজি উপজাতির একজন, যারা তুর্কিস্থান থেকে আফগানিস্থানে এসে বসবাস আরম্ভ করেছিল।  খলজি উপজাতি উত্তর-পূর্বের প্রায় সবকটা দখল-যুদ্ধে যোগদানকারী সেনাবাহিনীর অধিপতিদের কাজে নিযুক্ত ছিল। বখতিয়ার খিলজির সেপাইরা বিহার-বাঙলা আক্রমণ করে লুটপাট, বাড়ি পোড়ানো, নারীধর্ষণ এমন সব কুকর্ম চালিয়ে অনেক পরিবারকে মুসলমান বানিয়েছিল, যা টিক্কা-পাকিস্তানির খান সেনারাও পারেনি।আসলে বখতিয়ার খিলজির সেনাদের বেশিরভাগই ছিল দাস, মানে, কেনা গোলাম, বান্দা। তারা সুযোগ ছাড়বে কেন । বখতিয়ার খিলজির মারকাটের দরুন এদেশ থেকে বৌদ্ধধর্ম লোপাট হয়ে গেছে । তার বীরত্বের গুণগান করে বাংলাদেশের শায়র-এ-আজম আল মাহমুদ একটা কবিতা লিখেছিলেন, ‘বখতিয়ারের ঘোড়া’ নামে, আমার সৌধে রয়েছে কবিতাটা, তোমাদের পড়ে শোনাচ্ছি, তোমরা এই ভাষায় কথা বলছিলে বলে বুঝতে পারবে —

মাঝে মাঝে হৃদয় যুদ্ধের জন্য হাহাকার করে ওঠে

মনে হয় রক্তই সমাধান, বারুদই অন্তিম তৃপ্তি;

আমি তখন স্বপ্নের ভেতর জেহাদ, জেহাদ বলে জেগে উঠি।

জেগেই দেখি কৈশোর আমাকে ঘিরে ধরেছে।

যেন বালিশে মাথা রাখতে চায় না এ বালক,

যেন ফুৎকারে উড়িয়ে দেবে মশারি,

মাতৃস্তনের পাশে দু’চোখ কচলে উঠে দাঁড়াবে এখুনি;

বাইরে তার ঘোড়া অস্থির, বাতাসে কেশর কাঁপছে।

আর সময়ের গতির ওপর লাফিয়ে উঠেছে সে।

না, এখনও সে শিশু। মা তাকে ছেলে ভোলানো ছড়া শোনায়।

বলে, বালিশে মাথা রাখো তো বেটা। শোনো

বখতিয়ারের ঘোড়া আসছে।

আসছে আমাদের সতেরো সোয়ারি

হাতে নাংগা তলোয়ার।

মায়ের ছড়াগানে কৌতূহলী কানপাতে বালিশে

নিজের দিলের শব্দ বালিশের সিনার ভিতর।

সে ভাবে সে শুনতে পাচ্ছে ঘোড়দৌড়। বলে, কে মা বখতিয়ার?

আমি বখতিয়ারের ঘোড়া দেখবো।

মা পাখা ঘোরাতে ঘোরাতে হাসেন,

আল্লার সেপাই তিনি, দুঃখীদের রাজা।

যেখানে আজান দিতে ভয় পান মোমেনেরা,

আর মানুষ করে মানুষের পূজা,

সেখানেই আসেন তিনি। খিলজীদের শাদা ঘোড়ার সোয়ারি।

দ্যাখো দ্যাখো জালিম পালায় খিড়কি দিয়ে

দ্যাখো, দ্যাখো।

মায়ের কেচ্ছায় ঘুমিয়ে পড়ে বালক

তুলোর ভেতর অশ্বখুরের শব্দে স্বপ্ন তার

নিশেন ওড়ায়।

কোথায় সে বালক?

আজ আবার হৃদয়ে কেবল যুদ্ধের দামামা

মনে হয় রক্তেই ফয়সালা।

বারুদই বিচারক। আর

স্বপ্নের ভেতর জেহাদ জেহাদ বলে জেগে ওঠা।

           আরেকজন বাগি শায়র, তার নাম মলয় রায়চৌধুরী, সে ‘বখতিয়ারের ঘোড়ার  বংশধর’ নামে একটা কবিতা লিখেছিল, তার কবিতাও আছে আমার সৌধে, পড়ে শোনাচ্ছি তোমাদের :-

বিহারশরিফে পৌঁছে দেখি বাস নেই ট্যাক্সি নেই

অগত্যা এক্কাগাড়িঅলাকে বলি

আরে টাঙ্গা, যাবি নাকি ? 

তোর ঘোড়াকে খেতে দিস না ? এমন হাড়গিলে ? নাম কী তোর ?

আমার নাম মিনহাজউদ্দিন শিরাজ হুজুর, বলল এক্কাগাড়িঅলা ।

হাত দুটো লম্বাটে,  এরকম বেঁটে কেন তুই ?

ছোটাস কেমন করে গাড়ি ?

হুজুর জমানা পহেলে বখতিয়ার খলজি নামে তুর্কি এক লুটেরার সেনারা

এ-তল্লাটে এসে ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে মেয়ে-বউদের ইজ্জত লুটেছিল

আমি সেই তাদের ঔরসের পয়দায়িশ–

আর হুজুর এটা ঘোড়া নয়, এটা তো খচ্চর

বখতিয়ারের ঘোড়ারাও এখানকার ঘোড়িদের ইজ্জত লুটেছিল

এই বেজন্মা খচ্চর তাদের ঔরসের পয়দায়িশ

ওরা সব কালা অকছর ভঁয়েস বরাবর ছিল

ন্যাড়ামাথা পড়ুয়ার দল আর হাজার-হাজার বই দেখে

নালান্দায় আগুন লাগিয়ে নেসতানাবুদ করে দিয়েছিল–

চলুন, বসুন, বলুন কোথায় যাবেন…

          ক্রীতদাস-ক্রিতদাসীরাও কবিতা লিখে গেছেন, যেমন ফিলিস হুইটলে নামের এক কৃষ্ণাঙ্গী । ১৭৭৮ সালে এই কৃষ্ণাঙ্গ ক্রীতদাসী কবি আইনত দাসত্ব থেকে মুক্তিলাভ করেন। গৃহকর্তা জন হুইটলে ব্যক্তিগত উইলে তাঁর মুক্তির কথা উল্লেখ করেন। ১৭৮৪ সালে ফিলিসের স্বামী জন পিটার্স যখন গলা পর্যন্ত ঋণের দায়ে জেলে যান, অসুস্থ শিশু-সন্তানকে নিয়ে ফিলিস তখন ঘোর সংকটে। ৫ ডিসেম্বর ১৭৮৪ সালে মাত্র ৩১ বছর বয়সে ফিলিস মারা যান। তাঁর মৃত্যুর সাড়ে তিন ঘণ্টা পর তাঁর শিশুপুত্রটিও মারা যায়। ক্রীতদাসীর সঠিক জন্মতারিখ কে মনে রাখে? তবে অন্বেষক-গবেষকবৃন্দ মনে করেন সেনেগালের কোনও অঞ্চলে সেনেগাম্বিয়ায় ৮ মে ১৭৫৩ সালে এই আশ্চর্য প্রতিভাময়ী কৃষ্ণাঙ্গ কবির জন্ম হয়েছিল। প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকান  কবি ও লেখক জুপিটার হ্যামনও ছিলেন একজন ক্রীতদাস। তিনিও তাঁর কবিতায় ফিলিস হুইটলের কবিতার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন।মাত্র সাত বছর বয়সে তাকে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিল দাসী-হাটে। তারপর পশ্চিম আফ্রিকার সেনেগাল থেকে সে চালান হয়ে যায় উত্তর আমেরিকায়। ১১ জুলাই, ১৭৬১ সালে ক্রীতদাস-ভর্তি একটি জাহাজে মেয়েটিকে নিয়ে যাওয়া হয় ব্রিটিশ-শাসিত বস্টনে। সেই জাহাজের মালিক টিমথি ফিচ, আর নাবিক ছিলেন পিটার গুইন। মা বাবা তার কিছু একটা নাম রেখেছিল হয়ত। কিন্তু দাসী-হাটের কালো বাতাসে কখন যে হারিয়ে গেছে সেই নাম। নতুন করে তার নাম রাখা হল ক্রীতদাস পারাপারের জাহাজটির নামে — ফিলিস। বস্টনের ধনী ব্যবসায়ী জন হুইটলে তাঁর স্ত্রী সুশান্নার সেবা-দাসী হিসেবে মেয়েটিকে ক্রয় করেছিলেন। প্রথা অনুসারে ফিলিসের নামের সঙ্গে যুক্ত হল হুইটলে পরিবারের পদবী। ক্রীতদাসী পেল নতুন নাম — ফিলিস হুইটলে। কিন্তু এই পরিবারে আশ্রয় পেয়ে নবজন্ম হল তার।বারো বছর বয়সে গৃহকর্ত্রী সুশান্নার বইপত্র পরিষ্কার করে গুছিয়ে রাখতে গিয়ে কী যে হল তার। একটা বই থেকে একটা চিঠির কিছু অংশ দেখে দেখে অবিকল দেয়ালের গায়ে লিখতে থাকে সে। না, কোনও পেনসিল বা কলম দিয়ে নয়, এক টুকরো কাঠকয়লা দিয়ে। বাড়ির অন্য এক দাসী এই খবর পৌঁছে দেয় গৃহকর্ত্রীর কানে। কিন্তু ঘরের দেয়াল নোংরা করার অপরাধে মেয়েটিকে শাস্তি দেওয়া তো দূরের কথা, সেদিন থেকে তাকে গৃহকর্ম থেকে অব্যাহতি দিয়ে দূরদর্শী সুশান্না ফিলিসের লেখাপড়া শেখার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেন। অতি দ্রুত সে আয়ত্ত করে বাইবেলের পাশাপাশি গ্রীক ও ল্যাটিন ভাষা। ভাষা ও সাহিত্যে তার বিস্ময়কর উত্সাহ লক্ষ করে তাকে উপযুক্ত শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় আলেকজান্ডার পোপ, মিল্টন, হোমার, হোরেস এবং ভার্জিলের কবিতার সঙ্গে। এরপর ফিলিসের কাব্য-প্রতিভার চরম বিকাশ ঘটে।  ফিলিস মনে প্রাণে বিশ্বাস করতেন, কবিতার শক্তি অপরিমেয়। কবিতা সমাজ ও রাষ্ট্রের উপর চরম প্রভাব বিস্তার করতে পারে। ব্যক্তিগত জীবনের কথা তিনি যথাসম্ভব কম বলেছেন। তবে একটি কবিতায় সার্বিকভাবে ক্রীতদাসদের জীবনের ওপর আলো ফেলেছেন তিনি, যেখানে প্রবল নৈরাশ্যের মধ্যেও ফুটে উঠেছে একটা আশাবাদিতার সুর, একটা উত্তরণের ইশারা ও প্রত্যয় । “আন বিইং ব্রট ফ্রম আফরিকা টু অ্যামিরিকা’ কবিতায় উনি লিখেছেন, পড়ে শোনাচ্ছি তোমাদের :

Twas mercy brought me from my Pagan land,

Taught my benighted soul to understand

That there’s a God, that there’s a Saviour too:

Once I redemption neither sought nor knew.

Some view our sable race with scornful eye,

“Their colour is a diabolic dye.”

Remember, Christians, Negroes, black as Cain,

May be refin’d, and join the’ angelic train.

          মালিক অম্বর বলতে লাগল, আমার আগেও দাসরা ইতিহাসের কবরে নিজেদের নাম রেখে গেছে । যেমন মুহম্মদ ঘুরী দিল্লিতে প্রায় ৩২ বছর রাজত্ব করেন। একমাত্র মেয়ে ছাড়া তার আর কোনো সন্তান ছিল না। তিনি তার ক্রীতদাসদের নিজের আত্মীয়ের মতো ভালোবাসতেন। কাজেই মুহম্মদ ঘুরীর মৃত্যুর পর তার ক্রীতদাস ও সুযোগ্য সেনাপতি কুতুবউদ্দীন আইবক দিল্লির সিংহাসনে  বসেন। দিল্লির সিংহাসনে তিনিই প্রথম সুলতান। কুতুবউদ্দীন আইবক মুহম্মদ ঘুরীর ক্রীতদাস হিসেবে তার কর্মজীবন শুরু করেন। এ জন্য তার প্রতিষ্ঠিত রাজবংশ ইতিহাসে ‘দাস বংশ’ নামে পরিচিত। অনেকে আবার লজ্জায় একে পাঠান বা আফগান বংশের ইতিহাস বলে । আসলে ওরা ছিল মামলুক, মানে নিগ্রো । ‘মামলুক’ শব্দের অর্থ দাস।     কুতুবুদ্দিন মধ্য এশিয়ার কোথাও জন্মেছিল । তার বাড়ির লোকেরা তাকে গোলাম হিসেবে বিক্রি করে দিয়েছিল।  তোমরা ভেবে দ্যাখো, কুতুবুদ্দিন আইবক ছিল গোলাম, সে যাকে সুলতান করে গেল, মানে ইলতুতমিশ, সেও ছিল গোলাম বা চাকর, তার মেয়ে সুলতানা রাজিয়া  ভারতবর্ষের প্রথম মহিলা শাসক, সে ছিল চাকরের মেয়ে । যখনই ইলতুতমিশকে রাজধানী ছাড়তে হত, তিনি তখন তার কন্যা রাজিয়াকে শাসনভার বুঝিয়ে দিয়ে যেতেন।সুলতান ইলতুতমিশের মৃত্যুর পর তার আরেক ছেলে রোকনুদ্দিন ফিরোজ দিল্লির শাসন কেড়ে নেয় আর প্রায় সাত মাসের মত শাসন করে। ১২৩৬ সালে দিল্লির পাবলিকের  সাহায্য নিয়ে রাজিয়া সুলতানা তার ভাইকে তাড়িয়ে সিংহাসনে বসে ।  নারী হওয়ার কারণে আর পর্দাপ্রথার বিরোধী হয়ে শাসনকাজ পরিচালনা করার জন্যে উলেমা আর প্রভাবশালীদের চটিয়েছিলেন। ওনাকে বিষ খাইয়ে মারা হয়েছিল ।রাজিয়া সুলতানার সমাধি  দিল্লির বুলবুল-ই-খানা মহল্লায় আছে,  অত্যন্ত অবহেলিত ও অপরিচ্ছন্ন অবস্থায় । আমার সমাধির তুলনায় বেশ নোংরা আর ভাঙাচোরা। একজন রানির সমাধির কিনা এই অবস্হা ।     রাজিয়া সুলতানা যে যুবকটিকে ভালোবাসতেন, জামালুদ্দিন ইয়াকুত, সেও ছিল একজন নিগ্রো গোলাম রাজিয়ার বিরুদ্ধে যে তুর্কি দরবারিরা ষড়যন্ত্র করেছিল তারা ইয়াকুতকেও খুন করে । ইয়াকুত ছিল তাগড়া  রাজিয়ার বডিগার্ড । তুর্কিরা কেমন হয় তা তো জানোই, বেশ গোঁড়া ; তারা বদনাম করেছিল যে রাজিয়া সুলতানাকে ঘোড়ায় চাপাবার সময়ে ইয়াকুত রাজিয়ার দুই হাতের তলা দিয়ে সুলতানাকে ধরে ঘোড়ার ওপর বসিয়েছিল । সবই তুর্কিদের বানানো গল্প । রাজিয়া সুলতানা কখনও ঘোড়ায় চাপতো না, হাতির ওপরে হাওদায় বসে যেতো । তবে ইবন বাতুতা লিখে গেছেন যে রাজিয়া সুলতানা ইয়াকুত নামের নিগ্রোকে ভালোবাসতো ।    

          মালিক অম্বরের বেগম নতুন টপিক আরম্ভ করল : ভারত, পাকিস্তান, ফিলিপিনস থেকে যে শ্রমিকরা আরবদেশগুলোতে কাজ করতে যায়, সেখানে মালিকরা তাদের পাসপোর্ট নিজের কাছে রেখে নিয়ে তাদের দাস বানিয়ে ফ্যালে । বিয়ের নাম করে যুবতীদের নিয়ে গিয়ে যৌনদাসী আর চাকরানি দুইই বানিয়ে ফ্যালে, যদিও আরবগুলোর আগে থাকতে চারটে আইনি বউ থাকে । যৌনদাসীর যৌবন ফুরিয়ে গেলে নতুন যৌনদাসী আমদানি করে দেশগুলো থেকে। আরবরা অনেক এমন যুবক-যুবতীকে ফাঁসিয়ে জেলে পুরে দেয় । তাদের টাকাকড়ির জোরের কাছে গরিব দেশগুলোর আবেদন কাজে লাগে না । পাথর খোঁড়া ইত্যাদি সর্বোচ্চ শোষণমূলক এবং বিপজ্জনক ক্ষেত্রগুলোতেই বেশিরভাগ জাতিগত সংখ্যালঘু এবং প্রান্তিক শ্রেণীর মানুষেরা কাজ করে বলে অনুমিত হয়েছে। বহুজাতিক অপরাধ সংঘটনগুলোর সংঘটিত অপরাধকর্মগুলোর মধ্যে মানবপাচারকে অন্যতম দ্রুত অপরাধকর্ম হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক কনভেনশন মতে, মানবপাচার হচ্ছে মানুষের অধিকারের লঙ্ঘন। সেই সাথে এটি ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের একটি নির্দেশনার বিষয়বস্তু। মানবপাচার এবং জোরপূর্বক শ্রম থেকে সুরক্ষা দেবার ক্ষেত্রে বেলারুশ, ইরান, রাশিয়া, তুর্কি হচ্ছে জঘন্যতম রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অন্যতম।    

           বেগমবউদি কথা বজায় রাখলেন,   দাসপ্রথার ইতিহাস অতীত থেকে বর্তমান পর্যন্ত বিভিন্ন সংস্কৃতি, জাতি এবং ধর্মজুড়ে বিস্তৃত ছিল । অবশ্য দাসদের সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং বৈধ অবস্থান বিভিন্ন সমাজে এবং বিভিন্ন স্থানে ভিন্ন ভিন্ন ছিল। আদিম সমাজে দাসপ্রথার প্রচলন বিরল ছিল কারণ এই প্রথা সামাজিক শ্রেণীবিভাগের কারণে তৈরি হয়। দাসপ্রথার অস্তিত্ত মেসোপটেমিয়াতে প্রায় ৩৫০০ খৃস্টপূর্বে প্রথম পাওয়া যায়| অন্ধকার যুগ থেকে মধ্যযুগ পর্যন্ত ইউরোপে অধিকাংশ এলাকাতেই দাসপ্রথা পাওয়া যেত | ইউরোপে বাইজেন্টাইন-উসমানিদের যুদ্ধ , ওলন্দাজ, ফরাসি, স্পেনিশ, পর্তুগিজ, ব্রিটিশ, আরব এবং কিছু পশ্চিম আফ্রিকান রাজ্যের লোকেরা আটলান্টিক দাস বাণিজ্যে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছিল। , “ঊনিশ শতকের শুরুর দিকে আনুমানিক প্রায় তিন চতুর্থাংশ লোকেরাই দাসপ্রথার বন্ধনে আবদ্ধ ছিল।”

দাসপ্রথা একটি অনুমোদিত সামাজিক ও আইনানুগ ব্যবস্থা ছিল । এ ব্যবস্থায় বাজারে মানুষের আনুষ্ঠানিক বেচা-কেনা চলত এবং ক্রীত ব্যক্তি ক্রেতার ব্যক্তিগত সম্পত্তি রূপে কাজ করতে বাধ্য থাকত। প্রাচীন ও মধ্যযুগের প্রায় সব শাসন ব্যবস্থাতেই দাস প্রথার প্রচলন ছিল। গবাদিপশুর ন্যায় মানুষেরও কেনা বেচা চলত। অন্যান্য প্রায় সকল দেশের মতো বাংলায়ও প্রাচীনকাল হতেই দাস প্রথা প্রচলিত হয়ে আসছিল। শুধু আইন পুস্তক ও প্রশাসনিক গ্রন্থেই নয়, এ প্রথা সব ধর্মেও স্বীকৃতি ছিল। সব ধর্মীয় পুস্তকেই ক্রীত দাসদাসীদের সাথে সদ্ব্যবহারের উপদেশ দেওয়া আছে।

          পর্যটক সাইফ উদ-দৌলা নাজাবুত আলী খান বাহাদুর :  দাসত্বের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা প্রথম সমাজ হলো গ্রিক সভ্যতার সমাজব্যবস্থা। গ্রিক সভ্যতার সূচনা যিশুর জন্মের আনুমানিক দুহাজার বছর আগে মাইনোয়ান যুগে। হোমারের দুই মহাকাব্য ইলিয়াড এবং ওডিসির রচনাকাল আনুমানিক ৭৫০-৭০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ। এই দুই মহাকাব্যে দাসত্ব এবং দাসপ্রথার টুকরো কিছু ছবি পাওয়া যায়। হোমার বা হেসিয়ডের রচনা থেকে জানা যায় গ্রিকরা দাসপ্রথাকে জীবনের একটি স্বাভাবিক ঘটনা বলেই ধরে নিত। হোমারের যুগে গ্রিকরা ক্রীতদাস বা ঝষধাব বোঝানোর জন্য সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করত ‘অ্যানড্রোপোডন’ শব্দটি, অ্যানড্রোপোডন কথাটির মানে মনুষ্যপদবিশিষ্ট জীব বা মানুষের মতো জীব। শব্দটি এসেছিল টেট্রাপোডা শব্দের উপমা হিসাবে। টেট্রাপোডার অর্থ চতুষ্পদী গবাদি প্রাণী। পলিবিয়াস বলেছেন, জীবনের অত্যাবশ্যক প্রয়োজন হলো গবাদিপশু আর ক্রীতদাস। গ্রিসের অন্যতম প্রধান দার্শনিক অ্যারিস্টটলের মতে, দাসব্যবস্থা প্রকৃতিরই নিয়ম। গ্রিসের অভিজাতদের ৩০-৪০ জন দাস থাকত। কৃষি এবং শিল্প খাতে শ্রমের চাহিদা মেটানো হতো দাসদের দ্বারা। গ্রিকদের শিল্প যখন সমুদ্র পার হয়ে রফতানি শুরু হয় তখন দাসদের প্রয়োজনীয়তাও বৃদ্ধি পায়,, দাস বেচাকেনার জন্য ব্যবসা শুরু হয়। এথেন্সের দাস ব্যবসায়ীরা এশিয়া মাইনর, সিরিয়া প্রভৃতি দেশ থেকে দাস আমদানি করত। ফিনিসীয় দাস ব্যবসায়ীরা নিজেরাই এথেন্সের বাজারে দাস নিয়ে আসত। সিরিয়া, মিসর, আরব প্রভৃতি দেশের সঙ্গেও এথেন্স এবং অন্য গ্রিক রাষ্ট্রের দাস ব্যবসা শুরু হয়। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকে এথেন্সের অর্থনীতি পুরোপুরিই দাসশ্রমনির্ভর হয়ে পড়ে। গ্রিক ভূস্বামীরা প্রাচ্যে বিলাস ও আলস্যের জীবনযাপন করত। গ্রিকদের প্রাসাদ, সুরম্য অট্টালিকা দাসদের শ্রমেই তৈরি হয়েছিল।

          পর্যটক সরসিজ বসু : প্রাচীন রোম সভ্যতাতেও ছিল দাসপ্রথার প্রচলন। রোমান সাম্রাজ্যের বিজিত প্রদেশগুলোকে রোমে দাস সরবরাহ করতে হতো। খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকের মধ্যভাগে গ্রিস থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল ১ লাখ ৫০ হাজার দাস। খ্রিস্টপূর্ব ২য় এবং ১ম শতকে রোমসহ সারা ইতালিতেই দাস শ্রমের ব্যবহার চরম আকার ধারণ করে। দাসদের প্রধানত খাটানো হতো জমি এবং খনিতে।    পুরাতাত্ত্বিকদের মতে, সিন্ধু সভ্যতা ২৫০০ থেকে ১৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যে অস্তিত্বমান ছিল। বিভিন্ন তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ঐতিহাসিকরা ধারণা করেছেন গ্রামীণ জনসমষ্টির মধ্যেই দাসদের অস্তিত্ব ছিল। শহরে যে এরা ছিলেন তা আরো নিশ্চিত। শহরে কমপক্ষে তিন ধরনের সামাজিক অস্তিত্ব স্বীকৃত শাসকবর্গ (পুরোহিত ও নগরশাসকরা দুটি পৃথক গোষ্ঠী ছিল কিনা তা জানা যায় না), বণিক এবং কারিগর। এই তিনটি সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব থেকে বোঝা যায় ভৃত্যশ্রেণী নিয়ে গঠিত একটি চতুর্থ শ্রেণীর অস্তিত্বের কথা। এই ভৃত্যেরা বেতনভোগী শ্রমিক অথবা দাসও হতে পারতেন (যুদ্ধ বন্দি, ঋণ-দাস ইত্যাদি) গৃহদাস ও ভৃত্যদের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ দাস আর বেতনভোগী শ্রমিকও নিয়োগ করতেন বলেই ইতিহাসবিদদের বিশ্বাস।           বৌদ্ধযুগের সূচনার কিছুদিন আগে (খ্রিস্টপূর্ব ৬ষ্ঠ শতকে) কোনো মানুষ বিভিন্ন কারণে অপর একজনের সম্পূর্ণ ক্ষমতাধীন হয়ে পড়লে তাকে দাস বলা হতো। তবে দেশের আকৃতিগত বিশালতার কারণে কিছু সঙ্কীর্ণ গোষ্ঠী দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল, গোষ্ঠীর বাইরে যাদের বিবাহ ছিল নিষিদ্ধ। পরবর্তী যুগের রচনায় অভিজাত গোষ্ঠী শাসনতন্ত্রের ধাঁচের এই গোষ্ঠীগুলোর অস্তিত্বের সাক্ষ্য মেলে। এই সম্প্রদায়গুলোতে একটা সম্পূর্ণ জনগোষ্ঠীই দাস বলে গণ্য হতো, ফলে এক্ষেত্রে ‘দাস’ শব্দটির শুধু বৈধ ধারণাই নয়, একটি ছদ্ম জাতিগত তাৎপর্যও ছিল। প্রভুরা অনেক সময় দাসীদের উপপত্নী হিসাবে গ্রহণ করতেন I

          পর্যটক শাশ্বত সিকদার : মৌর্য চন্দ্রগুপ্তের সময় দাসপ্রথার অবসানে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল। এ ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন ব্রাহ্মণমন্ত্রী কৌটিল্য। তিনি দাসপ্রথা উঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। সম্রাট অশোকের সময় প্রথম সামাজিক বৈষম্য দূর করার চেষ্টা করা হয়। অশোকের রাজত্বকালে বিচার ও ব্যবস্থা সবার পক্ষে একই করা হয়।    কম্বোডিয়ায় হিন্দু মন্দিরগুলোর মতো বৌদ্ধ মন্দিরগুলোতেও দাস ছিল। খমের মন্দিরের অর্থনীতিতে প্রাধান্য ছিল দাস শ্রমের। মন্দিরে যাদের দান করা হতো তাতে স্ত্রী-পুরুষ উভয় শ্রেণীর দাসের মধ্যে শিশুরাও ছিল। দাসদের সঙ্গে ব্যবহারে সব সময় যথেষ্ট দয়া দেখানো হতো না। ভিক্ষু রাহুল তার সিংহলে বৌদ্ধধর্মের ইতিহাস বইটিতে সিংহলি সঙ্ঘারামগুলোতে দাসপ্রথার কথা প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘… যে প্রাচীনকাল থেকেই স্ত্রী-পুরুষ উভয়শ্রেণীর দাসরা সঙ্ঘারামের নিযুক্ত হতেন এবং তাদের প্রতিপালনের জন্য প্রচুর পরিমাণে অর্থ গচ্ছিত রাখা হতো। সিংহলি রাজাদের হাতে ধৃত যুদ্ধবন্দিরাও এই দাসদের মধ্যে ছিলেন।

          পর্যটক অজিত রায় : বাংলার সুলতানগণ আফ্রিকা, তুরস্ক, পারস্য ও চীনদেশ হতে দাস-দাসী আমদানি করতেন বলে জানা যায়। এ ধরনের কিছু ক্রীতদাসকে মুক্তি দেওয়ার পর মন্ত্রী, প্রশাসক, এমন কি সেনাপতির পদেও উন্নীত করা হয়েছিল। পনেরো শতকের শেষদিকে আবিসিনীয় বংশোদ্ভূত দাসগণ স্বল্প কালের জন্য বাংলায় তাদের নিজস্ব শাসন ব্যবস্থাও কায়েম করেছিল। বাংলার বাজারে ১৮৩০ সাল পর্যন্তও হাবশী ও কাফ্রী নামে পরিচিত আফ্রিকান ক্রীতদাস-দাসী আমদানি করা হতো। বাংলায় সাধারণত ধনী সম্ভ্রান্ত মুসলিমগণ ও ইউরোপীয় বণিকগণ কঠোর পরিশ্রমী ও কর্তব্যনিষ্ঠ বলে খ্যাত হাবশীদেরকে দাস হিসেবে রাখত। ইউরোপীয় ব্যবসায়ীরা তাদের পণ্য পরিবহন ও কারখানা প্রহরার জন্য নিয়মিত শ্রমিকের বিকল্প হিসেবে ক্রীতদাসদের নিয়োগ করত। ইউরোপীয় অধিবাসীদের মধ্যে ক্রীতদাস রাখার এমনই রেওয়াজ হয়ে গিয়েছিল যে, স্যার উইলিয়ম জোনস এর ন্যয় একজন মানবতাবাদী, আইনজ্ঞ ও পন্ডিত ব্যক্তিরও চারজন ক্রীতদাস ছিল।     ক্রীতদাসদের মধ্যে সবচেয়ে দামি হাবশী দাসগণ খানসামা, পাচক (বাবুর্চি), গায়ক, নাপিত, গৃহ প্রহরী ইত্যাদি হিসেবে তাদের প্রভুদের সেবায় নিয়োজিত হতো। দাসদের মধ্যে তাদের মর্যাদা এত উচুঁ ছিল যে, তাদের মালিকগণ তাদের ব্যবসা সংক্রান্ত ও গৃহ পরিচালনা বিষয়ে এবং রাজনৈতিক ব্যাপারেও তাদের সাথে পরামর্শ করতেন।

          পর্যটক শ্রীজাত পিরালী : হিন্দু মালিকগণ দাস গ্রহণের সময় তাদের গোত্রের বাছবিচার করতেন। ঐ বিবেচনায় কায়স্থ , গোয়ালা, চাষা, বৈদ্য প্রভৃতি গোত্রের দাসদের শুদ্ধ (পবিত্র) এবং শূদ্র, তাঁতি, তেলি, ডোম, বাগ্দি, কৈবর্ত, জোলা, চন্ডাল প্রভৃতিদের অশুদ্ধ (অপবিত্র) বলে মনে করা হতো। কোনো ব্রাহ্মণকে দাসে পরিণত করা ধর্মে নিষিদ্ধ ছিল। শুদ্ধ গোত্রের দাসদের ঘরের ভেতরের কাজে এবং অশুদ্ধদের বাইরের কাজে লাগানো হতো।          মুসলিম পরিবারের দাসদাসীরা মুসলমান না হলে তাদের ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করতে হতো। হিন্দু সমাজে দাসদের ক্রীতদাস বা শুধু দাস এবং যারা স্ত্রীলোক তাদেরকে দাসী বলা হতো। মুসলমান সমাজে পুরুষ দাসদের বলা হতো গোলাম বা নফর এবং স্ত্রীলোকদের বান্দি বা লৌন্ডি। লৌন্ডিরা সুদর্শনা হতো এবং তাদেরকে বাজার থেকে কেনা হতো। তাদের প্রয়োজন ছিল গার্হস্থ্য শ্রমিক রূপে নয়, বরং প্রধানত উপ-পত্নী রূপে। হিন্দু ও মুসলিম, উভয় আইন মোতাবেক, যৌন পরিতৃপ্তির জন্য ক্রীতদাসীরা ব্যবহূত হতে পারত। তাদের সন্তান সন্ততিগণও দাস-দাসী হতো, তবে আইন অনুযায়ী, তারা মালিকের জমিজমায় কিছু অধিকার অর্জন করত।    আঠারো শতকের শেষের দিকে ইউরোপে প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাস প্রথার অবলুপ্তি ঘটে। দাস প্রথাধীন শ্রমিক ব্যবস্থা শিল্পায়ন ও শিল্প-বিপ্লবোদ্ভূত মানবিক নব মূল্যবোধের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ প্রতীয়মান হয়। দাস শ্রমের চেয়েও মুক্ত শ্রম অবশ্যই অধিকতর উৎপাদনমূখী ছিল। শিল্পবিপ্লবহীন বাংলার অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থা তখনও দাস শ্রম ও দাস শোষণ প্রথা অাঁকড়ে ছিল। তাই, সহজে দাস শ্রমের বদলে মুক্ত শ্রমের প্রবর্তন সম্ভবপর হয় নি। দাস প্রথার সমর্থনে উপনিবেশিক শাসকগণের আর একটি যুক্তি ছিল যে, হিন্দু ও মুসলিম উভয় ধর্মে এর সমর্থন রয়েছে। কিন্তু, ইউরোপে মানবতাবাদী আন্দোলনের প্রভাবে, উনিশ শতকের গোড়া থেকে, এবং গুরুতর ভাবে ১৮২০ সাল হতে, ব্রিটেনে ক্ষমতাসীন সরকার দাসপ্রথা নিরুৎসাহিত করে। ১৮৩৩ সালের চার্টার অ্যাক্ট দ্বারা যথাসম্ভব দ্রুত সব ধরনের দাস প্রথা অবলুপ্ত করার সুস্পষ্ট পদক্ষেপ নিতে কলকাতার সরকারকে নির্দেশ দেওয়া হয়। 

          পর্যটক রোশনি ইসলাম : প্রাচীনকালের অধিকাংশ বড়মাপের দাস বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব ১৪০ অব্দ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ৭০ অব্দের মধ্যে। অর্থাৎ রোমান সাম্রাজ্যের একটি বিশেষ পর্বে। খ্রিস্টপূর্ব ২য় শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে ক্রমাগত বিদ্রোহের ঘটনা ঘটতে থাকে। যেমন : খ্রিস্টপূর্ব ১৩৬-১৩২ সময়কালে সিসিলির প্রথম যুদ্ধ, ১৩৩-১২৯ সময়কালে এশিয়াতে অ্যারিস্টোনিকাসের অভ্যুত্থান, ১০৪ থেকে ১০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত সিসিলির দ্বিতীয় যুদ্ধ এবং খ্রিস্টপূর্ব ৭৩-৭১ সময়কালে বিখ্যাত স্পার্টাকাসের বিদ্রোহ। এসব বিরাট দাসযুদ্ধ উসকে দিয়েছিল অনেক ছোট সংঘর্ষকে। যেমন : ইতালির বিভিন্ন শহর, অ্যাটিকার খনি অঞ্চল এবং ডেলস দ্বীপে ঘটে যাওয়া নানা অভ্যুত্থান। তবে স্পার্টাকাসের পরাজয়ের পর এ মাপের দাস বিদ্রোহ তার ঘটেনি।    হাইতির দাস বিদ্রোহ (১৭৯১-১৮০৩) পৃথিবীব্যাপী দাসপ্রথাবিরোধী আন্দোলনকে শক্তি জুগিয়েছিল। ইতিহাসবিদ সিএলআর জেমস হাইতির দাস বিদ্রোহ সম্পর্কে বলেছেন, ‘ইতিহাসের একমাত্র সফল দাস বিদ্রোহ।’ হাইতির দাস বিদ্রোহ ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দের ফরাসি বিপ্লব দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিল।     আমেরিকার দক্ষিণাংশের ১১টি রাজ্যের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ছিল দাসশ্রম। ১৮৬০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে দাসের সংখ্যা দাঁড়ায় ৪ মিলিয়ন। আমেরিকার উত্তরাংশে দাসপ্রথাবিরোধী আন্দোলন গড়ে ওঠে সমাজ সংস্কারক উইলিয়াম গ্যারিসন, লেখক হ্যারিয়েট বিচার স্টো প্রমুখের নেতৃত্বে। ১৮৬০ সালে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হন আব্রাহাম লিংকন। লিংকন আমেরিকার পশ্চিমাংশে দাসপ্রথা প্রসারের বিরোধিতা করেন। ১৮৬১ সালের ১২ এপ্রিল শুরু হয় আমেরিকায় গৃহযুদ্ধ। ১৮৬৩ সালে প্রেসিডেন্ট লিংকন ‘দাসপ্রথাবিরোধী ঘোষণা’ জারির মাধ্যমে আমেরিকার দক্ষিণাংশের কনফেডারেট রাজ্যগুলোর দাসদের দাসত্ব মোচন করেন। ১৮৬৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ১৩তম সংশোধনীর মাধ্যমে দেশ থেকে দাসপ্রথা বিলোপ করা হয় I

         মালিক অম্বর আমার সৌধতে দাস প্রথার  নথিপত্র রয়েছে, যা থেকে প্রমাণ মেলে যে, বনেদি সামাজিক-রাজনৈতিক কাঠামো ও গ্রামীণ উৎপাদন ব্যবস্থার সাথে এ প্রথা সরাসরি সংশ্লিষ্ট ছিল। বাজারে মুক্ত শ্রমিক পাওয়া দুষ্কর থাকায় সমাজের শক্তিশালী শ্রেণি তাদের উৎপাদন ও প্রাধান্য অব্যাহত রাখতে সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে দুর্বলতর শ্রেণির লোককে দাস বানিয়ে ফেলতো । অভিজাত শাসকশ্রেণি, তাদের পারিবারিক ও অন্যান্য সামাজিক-রাজনৈতিক পদমর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখার তাগিদে, সুবৃহৎ কর্মীবাহিনীর প্রয়োজন অনুভব করে। গণপূর্ত কাজ, যেমন সরকারি ভবন, বাঁধ, সেতু, সড়ক ও প্রধান পথের নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য রাষ্ট্রের এক বিশাল শ্রমশক্তির প্রয়োজন ছিল। সৈন্য চলাচল ও তাদের রসদ সরবরাহের জন্যও শ্রমশক্তির প্রয়োজন ছিল। দুর্ভিক্ষ, যুদ্ধ ও শ্রেণিভেদ প্রথা যাদেরকে গুরুত্বহীন করে তুলেছিল প্রধানত তারাই দাস প্রথার বলি হতো। অভাবগ্রস্ত, নিঃস্ব, এতিম ও বিধবাদের অনেকেরই শেষ গন্তব্য ছিল ক্রীতদাস বাজার। দাস বাজারের অনেক ঠগ ও অপরাধী বিক্রি করার জন্য শিশুদের অপহরণ করত। আইনত ও প্রথাগতভাবে, ক্রীতদাস-দাসীরা ও তাদের সন্তান-সন্ততিরা তাদের মালিকের সম্পত্তি রূপে পরিগণিত হতো। ক্রীতদাস-দাসী হস্তান্তরযোগ্য পণ্য ছিল। তাই, অনেক মালিক তাদের উদ্বৃত্ত বা অপ্রয়োজনীয় দাস-দাসীদের বাজারে বিক্রি করে দিত।   দাস-দাসীদের আমদানি ও রপ্তানি দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ খাত ছিল। বাংলার সুলতানগণ আফ্রিকা, তুরস্ক, পারস্য ও চীনদেশ হতে দাস-দাসী আমদানি করতেন বলে জানা যায়। এ ধরনের কিছু ক্রীতদাসকে মুক্তি দেওয়ার পর মন্ত্রী, প্রশাসক, এমন কি সেনাপতির পদেও উন্নীত করা হয়েছিল। পনেরো শতকের শেষদিকে আবিসিনীয় বংশোদ্ভূত দাসগণ স্বল্প কালের জন্য বাংলায় তাদের নিজস্ব শাসন ব্যবস্থাও কায়েম করেছিল। বাংলার বাজারে ১৮৩০ সাল পর্যন্তও হাবশী ও কাফ্রী নামে পরিচিত আফ্রিকান ক্রীতদাস-দাসী আমদানি করা হতো। বাংলায় সাধারণত ধনী সম্ভ্রান্ত মুসলিমগণ ও ইউরোপীয় বণিকগণ কঠোর পরিশ্রমী ও কর্তব্যনিষ্ঠ বলে খ্যাত হাবশীদেরকে দাস হিসেবে রাখত। ইউরোপীয় ব্যবসায়ীরা তাদের পণ্য পরিবহন ও কারখানা প্রহরার জন্য নিয়মিত শ্রমিকের বিকল্প হিসেবে ক্রীতদাসদের নিয়োগ করত। ইউরোপীয় অধিবাসীদের মধ্যে ক্রীতদাস রাখার এমনই রেওয়াজ হয়ে গিয়েছিল যে, স্যার উইলিয়ম জোনস এর ন্যয় একজন মানবতাবাদী, আইনজ্ঞ ও পন্ডিত ব্যক্তিরও চারজন ক্রীতদাস ছিল। ক্রীতদাসদের মধ্যে সবচেয়ে দামি হাবশী দাসগণ খানসামা, পাচক (বাবুর্চি), গায়ক, নাপিত, গৃহ প্রহরী ইত্যাদি হিসেবে তাদের প্রভুদের সেবায় নিয়োজিত হতো। দাসদের মধ্যে তাদের মর্যাদা এত উচুঁ ছিল যে, তাদের মালিকগণ তাদের ব্যবসা সংক্রান্ত ও গৃহ পরিচালনা বিষয়ে এবং রাজনৈতিক ব্যাপারেও তাদের সাথে পরামর্শ করতেন। অভিজাত সম্প্রদায়ের হারেমে নিয়োজিত খোজাদের মধ্যে হাবশী দাসদের সংখ্যাই সর্বাধিক ছিল। 

          পর্যটক মাইকেল মধুসূদন : আঠারো ও ঊনিশ শতকের গোড়ার দিকে বাংলার বাজারের জন্য কেবল আফ্রিকাই নয়, বরং আরব, চীন, মালয়, আরাকান ও আসাম হতেও ক্রীতদাস আমদানি করা হতো। আরব দেশ থেকে আনীত দাসদের অধিকাংশই হতো খোজা। বাংলার বাজার হতে ক্রীতদাস রপ্তানিও হতো। ইউরোপীয় বৈদেশিক উপনিবেশগুলির জন্য বাগান শ্রমিক হিসেবে বঙ্গীয় বংশোদ্ভূত দাসদের চাহিদা ছিল। দাস মুখ্যত দু’ধরনের ছিল: গার্হস্থ্য ও কৃষিকার্যাধীন। একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারে গুটি কয়েক দাস থাকবে সেটাই ছিল সামাজিক প্রত্যাশা। তারা পদ ও মর্যাদার প্রতীক ছিল এবং তা কেবল সম্ভ্রান্ত জমিদারের ক্ষেত্রেই নয়, মধ্যবিত্ত ও ধনী কৃষকদের বেলায়ও ছিল। হিন্দু মালিকগণ দাস গ্রহণের সময় তাদের গোত্রের বাছবিচার করতেন। ঐ বিবেচনায় কায়স্থ , গোয়ালা, চাষা, বৈদ্য প্রভৃতি গোত্রের দাসদের শুদ্ধ (পবিত্র) এবং শূদ্র, তাঁতি, তেলি, ডোম, বাগ্দি, কৈবর্ত, জোলা, চন্ডাল প্রভৃতিদের অশুদ্ধ (অপবিত্র) বলে মনে করা হতো। কোনো ব্রাহ্মণকে দাসে পরিণত করা ধর্মে নিষিদ্ধ ছিল। শুদ্ধ গোত্রের দাসদের ঘরের ভেতরের কাজে এবং অশুদ্ধদের বাইরের কাজে লাগানো হতো।    মুসলিম পরিবারের দাসদাসীরা মুসলমান না হলে তাদের ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করতে হতো। হিন্দু সমাজে দাসদের ক্রীতদাস বা শুধু দাস এবং যারা স্ত্রীলোক তাদেরকে দাসী বলা হতো। মুসলমান সমাজে পুরুষ দাসদের বলা হতো গোলাম বা নফর এবং স্ত্রীলোকদের বান্দি বা লৌন্ডি। লৌন্ডিরা সুদর্শনা হতো এবং তাদের বাজার থেকে কেনা হতো। তাদের প্রয়োজন ছিল গার্হস্থ্য শ্রমিক রূপে নয়, বরং প্রধানত উপ-পত্নী রূপে। হিন্দু ও মুসলিম, উভয় আইন মোতাবেক, যৌন পরিতৃপ্তির জন্য ক্রীতদাসীরা ব্যবহূত হতে পারত। তাদের সন্তান সন্ততিগণও দাস-দাসী হতো, তবে হিন্দু ও মুসলিম আইন অনুযায়ী, তারা মালিকের জমিজমায় নামমাত্র কিছু অধিকার অর্জন করত। কৃষি কার্যাধীন দাসের সংখ্যাই ছিল সর্বাধিক। বাজার হতে মুক্তশ্রমিক প্রাপ্তি সম্ভবপর না হওয়ায় সম্ভ্রান্ত স্তরের ও ধনী কৃষক শ্রেণির কৃষিকাজে ক্রীতদাস ব্যবহারের কোনো বিকল্প ছিল না। অতীতকাল থেকে উনিশ শতকের শেষ পর্যন্ত বাংলায় কৃষি কর্মোপযোগী দাস বা দাসখত লেখা শ্রমিক ব্যবহারের ব্যাপক রেওয়াজ ছিল। কেউ সম্পদবিহীন হয়ে স্বাধীন জীবন ধারণে অক্ষম হলে, ইচ্ছুক সম্পদশালী কোনো পরিবারের নিকট নিজেকে বিক্রি করত। এসব পরিবার এ ধরনের অভাগাদের কিনে তাদের ক্ষেতের কাজে লাগাত। তারা সব ধরনের কৃষিকাজ করত যথা, মাটি খনন, পানি সেচ, গো-চারণ, মাছ ধরা, নির্মাণ কাজ ইত্যাদি। শ্রমের বিনিময়ে তারা তাদের প্রভুদের কাছ থেকে খাদ্য, বাসস্থান, বস্ত্র এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে বৃদ্ধ বয়সের ভরণপোষণও পেত। অনেক ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি মহাজনদের কাছে তাদেরকে বিক্রি করে দিয়ে তাদের দেনার দায় পরিশোধ করত। দেনার কারণে দাসত্ব, আজীবন অথবা জীবনের খানিক অংশের জন্য, হতে পারত। যেসব জেলায় বিশেষভাবে কৃষিনির্ভর দাস প্রথার প্রচলন ছিল সেগুলি হচ্ছে সিলেট, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও ঢাকা। 

          পর্যটক ক্যাটরিনা কাইফ :আইন কমিশনের (১৮৩৯) প্রতিবেদনে দেখা যায়, এসব জেলায় প্রতি পাঁচ জনের একজনই ছিল দাস। সাধারণ দাস বাজার থেকে ক্রয় না করে সরাসরি সামাজিক উৎস হতে কৃষিনির্ভর দাস সংগ্রহের রেওয়াজ ছিল। অভাব, দুর্ভিক্ষ, নদী ভাঙন, পরিবারের উপার্জনকারী সদস্যের মৃত্যু প্রভৃতি দুর্যোগ কবলিত ব্যক্তিদের বেঁচে থাকার তাগিদে স্বেচ্ছায় দাসত্ব গ্রহণ করতে হতো। তাদের বেলায় বংশপরম্পরায় গার্হস্থ্য শ্রমিক হিসেবে থেকে যাওয়াই অবধারিত ছিল। তাদের বয়স, শারীরিক গঠন, লিঙ্গ, গোত্র, জাতি, এবং সর্বোপরি দেশের চলতি অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনায় তাদের মূল্য নির্ধারিত হতো। উনিশ শতকের প্রথম দিকে শিশু ও বৃদ্ধদের বাজার দর ছিল পাঁচ থেকে সাত টাকা। স্বাস্থ্যবান তরুণ দাসদের মূল্য হতো কুড়ি থেকে পঞ্চাশ টাকা। অভাব ও দুর্ভিক্ষ হলে বাজার দাসে ছেয়ে যেত এবং তখন দাম পড়ে যেত। আঠারো শতকের শেষের দিকে ইউরোপে প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাস প্রথার অবলুপ্তি ঘটে। দাস প্রথাধীন শ্রমিক ব্যবস্থা শিল্পায়ন ও শিল্প-বিপ্লবোদ্ভূত মানবিক নব মূল্যবোধের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ প্রতীয়মান হয়। দাস শ্রমের চেয়েও মুক্ত শ্রম অবশ্যই অধিকতর উৎপাদনমূখী ছিল। 

          পর্যটক হুমায়ুন জা মুবারক আলী খান বাহাদুর :শিল্পবিপ্লবহীন বাংলার অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থা তখনও দাস শ্রম ও দাস শোষণ প্রথা অাঁকড়ে ছিল। তাই, সহজে দাস শ্রমের বদলে মুক্ত শ্রমের প্রবর্তন সম্ভবপর হয় নি। দাস প্রথার সমর্থনে উপনিবেশিক শাসকগণের আর একটি যুক্তি ছিল যে, হিন্দু ও মুসলিম উভয় ধর্মে এর সমর্থন রয়েছে। কিন্তু, ইউরোপে মানবতাবাদী আন্দোলনের প্রভাবে, উনিশ শতকের গোড়া থেকে, এবং গুরুতর ভাবে ১৮২০ সাল হতে, ব্রিটেনে ক্ষমতাসীন সরকার দাসপ্রথা নিরুৎসাহিত করে। ১৮৩৩ সালের চার্টার অ্যাক্ট দ্বারা যথাসম্ভব দ্রুত সব ধরনের দাস প্রথা অবলুপ্ত করার সুস্পষ্ট পদক্ষেপ নিতে কলকাতার সরকারকে নির্দেশ দেওয়া হয়। ধাপে ধাপে দাস প্রথার অবলুপ্তির জন্য ১৮৪৩ এর ‘অ্যাক্ট ফাইভ’ প্রণীত হয়। এ আইনের আওতায় দাস রাখা অপরাধমূলক ছিল না, এতে কেবল মুক্ত ব্যক্তি ও দাসের মধ্যে আইনগত পার্থক্যের অবসান ঘটানো হয়েছিল। আইনে বিধান রাখা হলো যে, কোনো আদালত কোনো দাসের ওপর কারও দাবি গ্রাহ্য করবে না। এ আইন সব দাসদের মুক্ত বলে ঘোষণা করে নি। বরং আইনে বলা হলো যে, কোনো দাস ইচ্ছে করলে তার মালিককে পরিত্যাগ করে স্বাধীনভাবে বাস করতে পারবে। দাস আমদানি ও রপ্তানি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। তবে, বাস্তবক্ষেত্রে দাসপ্রথা হঠাৎ করে থেমে যায় নি। দাসপ্রথা সামাজিকভাবে ঘৃণ্য ও পরিত্যাজ্য বিবেচিত হতে আরও কয়েক দশক লেগে যায়। মুক্ত শ্রমের ব্যবহার বৃদ্ধি, শিল্পায়নে ক্রমিক অগ্রগতি, এবং উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ হতে মানবতাবাদী আন্দোলনসমূহ দাস প্রথাকে ধীরে ধীরে জনগণের নিকট অপ্রিয় ও সমাজে অগ্রহণযোগ্য করে তোলে। বিশ শতকের গোড়ার দিকে বাংলা দাস প্রথা হতে মুক্ত হয়।

          মালিক অম্বর :আমার সৌধতে আরেকটা নথি আছে, পদবি নিয়ে । আমি তো মালিক অম্বর । দুটোর কোনোটাই আমার পদবি নয় । কিন্তু নিজেদের বংশকে চিহ্নিত করে তার গৌরব প্রকাশের চিরাচরিত প্রবৃত্তি থেকে উদ্ভব হয় পদবীর যা রাজবংশ গুলির একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য ছিল এবং রাজবংশ থেকে ক্রমান্বয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যেও ছড়িয়ে যায় এই প্রথা।এই পদবী এবং উপাধি বিভিন্ন উত্তম কাজের স্বীকৃতি/পুরস্কার সরূপ রাজারা ধারণ করতেন এবং রাজ কর্মকর্তা-সৈন্য-সামন্ত-বিদ্বান ব্যক্তিদের প্রদান করতেন।এই প্রথা সাধারণ প্রজাদের মাঝে জনপ্রিয় হয় এবং তারা নিজেদের পেশা অনুসারে নামের শেষে পদবী যোগ করে। মহাভারতের যুগে কারো পদবী না থাকলেও বাঙালি রাজাদের পদবী ছিল।মহাভারতের দ্বিতীয় পর্বে উল্লেখ করা হয়েছে সমুদ্র সেন এবং তার ছেলে চন্দ্র সেন পান্ডবদের হয়ে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন এবং যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় যজ্ঞে ঋত্বিকের ভূমিকা পালন করেছিলেন বীর সেন নামক ঋষি।[১] এরপর প্রথমে জৈন এবং তারপর বৌদ্ধদের প্রভাব বাঙলায় বৃদ্ধি পায় এবং হিন্দুদের ধর্মাচার জৈন-বৌদ্ধ প্রভাবান্বিত হয়।বল্লালসেন তার অদ্ভুতসাগর গ্রন্থে উল্লেখ করেন আদিপিতৃভূমি বৈদিক বৈদহ রাজ্যের (উত্তরবঙ্গ,মিথিলা,নেপালের দক্ষিণাঞ্চল নিয়ে গঠিত বেদে উল্লেখিত রাজ্য)এরূপ অধঃপতনে মর্মাহত হয়ে কর্ণাটলক্ষি ছেড়ে তার পূর্বপুরুষ বরেন্দ্রসেন বাঙলায় অভিযান চালিয়ে পুন্ড্র রাজ্য অধিকার করেন যেটি বরেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।এই সামন্ত রাজ্য সাম্রাজ্যে পরিণত হয় এবং সনাতন ধর্ম পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।প্রজারা সৎপথে চলবে রাজ্যে শান্তি বিরাজ করবে এই লক্ষ্যে বল্লালসেন কৌলিন্য এবং বর্ণ সমীকরণ করেন।সেইসময় ৩৬ পদবীর হিন্দু ছিল প্রত্যেক ৩৬ বছর পরপর তাদের কৌলিন্য নির্ধারণ করে কর্মানুসারে বর্ণ নির্ধারণ করার নিয়ম করা হয়;এই প্রক্রিয়াকে “সমীকরণ” বলে উল্লেখ করা হয় ।এভাবেই বাঙালি পদবীর পুনর্গঠন ঘটে।

          পর্যটক ওয়াল্লা জা আহমেদ আলী খান বাহাদুর :প্রাচীন কালে কোনও পদবী হতো না। এগুলির সৃষ্টি প্রায় ৮০০ বছর আগে মাত্র।বল্লাল সেন কৌলীন্য প্রথা প্রবর্তনের মাধ্যমে পদবীর প্রচলন করেন।বাঙালিজাতির ইতিহাসে তাই সেন রাজবংশ হতে সেন পদবীই প্রথম পদবীপ্রথা হিসেবে ধরা হয়।পূর্বতন শাসক পালরা ছিলেন বৌদ্ধ ধর্মমতে বিশ্বাসী সে সময়ের বাঙলায় পদবী হত না কিন্তু বাঙলায় বৈদিক গোঁড়া হিন্দু খ্যাত সেন রাজবংশ দ্বারা বাঙলা অধিকৃত হওয়ার পর ধর্মান্তরিতকরণ,বাঙলার সাতটি গ্রামে ব্রাহ্মণ অভিবাসিতকরণ এবং “বর্ণ ও কৌলিন্য” প্রথার প্রচলনের ইতিহাস পাওয়া যায়।অর্থাৎ বাঙলার বর্ণভেদের উদ্দেশ্য শুধু ধর্মীয় নয় রাজনীতি একটি বড় কারণ।যেমন রাজনৈতিক কারণে বৈশ্য বর্ণকে শুদ্রে অবনমিত করা হয় যা এখনো বাঙালি সমাজে প্রচলিত।এর পেছনের কারণ হল রাজা বল্লাল সেন যুদ্ধাভিযানের জন্য বণিকদের কাছে অর্থ দাবি করেন কিন্তু বনিকরা তা নিঃশর্তে দিতে অস্বীকৃতি জানান ফলসরূপ বণিকদেরকে কৌলিন্যচ্যুত হতে হয়।বণিকদের নেতৃত্বেে ছিলেন সুবর্ণবণিক বল্লভানন্দ যার জামাতা ছিলেন অঙ্গের রাজা।বাঙলায় “ক্ষত্রিয়” (ক+ষ+ত্রি+য়/kshtriya) এর অপভ্রংশ “কায়স্ত” রুপে বর্ণের উল্লেখ পাওয়া যায়।মিনহাজ রচিত “তবারক-ই-নাসিরি” তে লক্ষণ সেনের বংশকে খলিফার মত সম্মান করত এবং তাদের বাক্যকে ধর্মবিধান বলে হিন্দুরা স্বীকার করত বলে উল্লখ করেছেন।শিলালিপিতে তাদের বংশকে ব্রহ্মক্ষত্রিয় এবং “অদ্ভুতসাগর” গ্রন্থে বল্লাল সেনের বংশকে “কুলীন কুলশ্রেষ্ঠ” বলা আছে।

           পর্যটক জাফর আলী খান বাহাদুর মীর মুহম্মদ জাফর আলী খান বাহাদুর :বল্লাল সেনের শাসন আমলেই কৌলীন্য প্রথার শুরু। সেন রাজাদের শিলালিপি থেকে জানা যায়, তাঁরা ছিলেন চন্দ্রবংশীয় ‘ব্রহ্মক্ষত্রিয়’ ( ব্রহ্মক্ষত্রিয় বলতে তাদেরকে বোঝানো হয় যারা ব্রাহ্মণ কুলে জন্মগ্রহন করলেও পেশা হিসেবে ব্রাহ্মণ্য পেশা গ্রহণ না করে ক্ষত্রিয়ের পেশা অর্থাৎ রাজ্য শাসন এবং যুদ্ধবিদ্যাকে পেশা হিসেবে গ্রহন করে।)। কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে, সেনরা প্রথমে জৈন আচার্য বংশোদ্ভূত ছিলেন কিন্তু এই মত নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।সেনরা কৌলিন্য প্রথা প্রবর্তনের পর একটি বংশ থেকে আরেকটি বংশকে আলাদা করতে সনাতনীদের মাঝে পদবী প্রথার প্রচলন হয়।বল্লাল চরিত থেকে জানা যায় বল্লাল সেন প্রত্যেক ৩৬ বছর পর পর কর্মানুসারে বর্ণ পরিবর্তনের বিধান রাখেন কিন্তু লক্ষণ সেন এই পরিবর্তনে মনোনিবেশ করেননি।

          পর্যটক আমীর উল-উমরা ওয়াসিফ আলী মির্জা খান বাহাদুর :হাবশি বা সিদ্দি হল এক জাতীগত গোষ্ঠী যারা ভারত ও পাকিস্তানের কিছু অংশে বসবাস করে। এদের পূর্বপুরুষরা অধিকাংশরাই ছিল আবিসিনিয়ার আদিবাসি যাদের পর্তুগীজ ব্যবসায়ীরা ধরে ক্রীতদাশ হিসেবে ভারতবর্ষে নিয়ে আসে।] ভারতের হায়দ্রাবাদ, গুজরাট ও করনাটকাতে এবং পাকিস্তানের মাকরান ও করাচীতে প্রায় বিশ থেকে পঁচিশ হাজার হাবশী বসবাস করে। অধিকাংশ হাবশি সুফি মুসলিম হলেও হিন্দু এবং ক্যাথলিখ খৃষ্টান হাবশিও রয়েছে।  হাবশি নামটির উৎপত্তি হয় আরবী আল-হাবশ থেকে। আরবরা আল-হাবশ বলতে বুঝাতো আবিসিনিয়াকে। ইথিওপিয়ান/ আবিসিনিয়ান জাহাজের ক্যাপ্টেনরা এই উপমহাদেশে পণ্যের সাথে কৃতদাশও নিয়ে আসত এবং বিক্রি করে দিত। হাবশিরা শারিরীক ভাবে অনেক শক্তিশালী ছিল এবং অনেক কাজ করতে পারত, তাই ধীরে ধীরে উপমহাদেশে হাবশি কৃতদাশের চাহিদা বৃদ্ধি পেতে থাকে। এই চাহিদার সুযোগ নিয়ে পর্তুগীজ নাবিক এবং ব্যবসায়ীরা আফ্রিকা থেকে কৃতদাশ ধরে নিয়ে এসে এই উপমহাদেশ বিক্রি করে মুনাফা করত।

          পর্যটক রেইস উদদৌলা ওয়ারিস আলী মির্জা খান বাহাদুর : হাবশিদের সিদ্দি নামেও ডাকা হয়। এই সিদ্দি নামটির উৎপত্তির ব্যাপারে এখনও বিশ্লেষকরা একমত হতে পারেননি। একটি মতানুশারে সিদ্দি শব্দটি আফ্রিকায় সম্মানসূচক হিসেবে ব্যবহার করে হত। শুধুমাত্র সম্মানিত আরবদের এই নামে ডাকা হত, অপরদিকে অবজ্ঞা অর্থ ব্যবহৃত হত সিদ্দি এর বিপরীত শব্দ হাফসি শব্দটি। ধারনা করা হয় তাদের অবজ্ঞা না করে সিদ্দি নামে ডাকার ফলেই অনেক জায়গায় সিদ্দি নামটি প্রচলিত আছে। অপর মতানুশারে সিদ্দি শব্দটির অর্থ আরব জানাজের ক্যাপ্টেন কর্তৃক আনিত। এই ক্যাপ্টেনদের বলা হত সাঈদ।        হাবশিদের অনেকসময় আফ্রো-ইন্ডিয়ান হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়। আরবরা হাবশি বলতে জাঞ্জদের বুঝায় (আরবি জাঞ্জ শব্দের অর্থ আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গ ) এছাড়া চীনারা আরবি ভাষার অনুবাদ করে হাবশিদের জিঞ্ঝি বা জিঞ্জি শব্দটি ব্যবহার করে থাকে।

          পর্যটক মুবারক উদদৌলা আশরাফ আলী খান বাহাদুর :আমেরিকা-ইউরোপের ঔপনিবেশিক  নায়করা দাসদাসি চালানের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে জনতার কাছে এখন খলনায়কে পরিণত হয়েছে। শুধু তাই নয়, বরং কথিত নায়কদের মূর্তি ভেঙে পানিতে নিক্ষেপ করে নিন্দার গভীরতা প্রকাশ করেছে জেগে উঠা জনগণ। দাসপ্রথা বা মানুষকে দাস বানিয়ে বিক্রি করে যারা মুনাফা অর্জন করেছে তাদের অন্যতম কলম্বাস, ভাস্কোদাগামা, রবার্ট ক্লাইভসহ অন্যদের ইউরোপের গণমানুষ এখন নিন্দার চোখে দেখছে। জনতার অপমান অপদস্ত থেকে তারা কেউই বাদ পড়েনি। মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের অন্যতম বড় শহর মিনেপলিসে পুলিশি হেফাজতে কৃষ্ণাঙ্গ জজ ফ্লয়েডকে হত্যার পর দাস ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে পুনরায় গণঘৃণা জেগে উঠে। ব্রিটেনে বর্ণবৈষম্য ও কৃষ্ণাঙ্গ নির্যাতনবিরোধী আন্দোলনকারীরা অন্যদের সাথে দাস ব্যবসায়ী অ্যাডওয়ার্ড কোলস্ট্রেনের মূর্তি ভেঙে গত ৭ জুন সাগরে নিক্ষেপ করেছে। দাসপ্রথার বিরুদ্ধে মানবাধিকার সংগঠনগুলো বারবারই কথা বলে আসছে, কিন্তু তাদের কথা কেউ কানে তুলেনি। দুর্বলের ওপর সবলের প্রভাব প্রতিপত্তি থেকেই দাসপ্রথার উদ্ভব হয়েছিল, দুর্বলতা বলতে যেমন শারীরিক দুর্বলতা বুঝায়, এ ক্ষেত্রে দুর্বলতা বলতে অর্থনৈতিক দুর্বলতাই মুখ্য বিষয় হিসেবে কাজ করেছে। শরীরের রঙ, নিরক্ষরতা ও দরিদ্রতার কশাঘাতে নিপীড়িত নির্যাতিত মানুষগুলোই দাসপ্রথার ভিকটিম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। কথিত মালিকরা দাসের সাথে পশুর চেয়েও খারাপ আচরণ করত। যে মানুষগুলো পণ্যের মতো বাজারে বিক্রি হয়েছে তারাই দাস, বিক্রীত মানুষটি ‘মানুষ’ হিসেবে কোথাও কোনো প্রকার দাবি, অধিকার ও একজন মানুষ অন্য একজন মানুষ থেকে যে আচরণ প্রাপ্য, দাসরা সে আচরণ প্রত্যাশা করতে পারেনি। ইউরোপ ছাড়াও আরব অধ্যুষিত এলাকায় দাসপ্রথা প্রকটভাবে ছিল। দাসপ্রথা নিয়ে এখন অনেকেই অনেক কথা বলেন বটে, কিন্তু আজ থেকে এক হাজার ৫০০ বছর আগে মানবতার মুক্তির দূত হজরত মুহাম্মদ সা: ঐতিহাসিক বিদায় হজের ভাষণে দাসপ্রথা নিরুৎসাহিত করেন। সৌদি ধনাঢ্য ব্যক্তিদের ক্রয়কৃত দাস মুক্তি পেয়েছিল। তিনি দাসমুক্তিকে ইবাদতের অংশ হিসেবে গণ্য করেছেন। যুগে যুগে মানবতাবাদী মনীষীরা দাসপ্রথার বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রাম করেছেন যাদের মধ্যে আব্রাহাম লিঙ্কনের নাম উল্লেখযোগ্য। কিন্তু অনেক দাস ব্যবসায়ী রয়েছে যাদের রাষ্ট্রীয়ভাবে পুরস্কৃত করা হয়েছিল।

          পর্যটক সিরাজদ্দৌলা মুহম্মদ সিরাজদ্দৌলা : লেলিন বলেছেন, দাসত্ব তিনি প্রকার। প্রথমত, এক শ্রেণীর লোক স্বেচ্ছায় দাসত্ব গ্রহণ করে বিনিময়ে তার ক্ষুধার জ্বালা নিবারণসহ জীবন ধারণের প্রয়োজনীয়তা মেটাতে পারে, কিন্তু ব্যক্তিস্বাধীনতা থাকে না। দ্বিতীয়ত, এক শ্রেণীর লোক রয়েছে যারা নিজেরা বুঝতেই পারছে না যে, তারা দাসত্ব করে যাচ্ছে বিনিময়ে আরাম-আয়াশে দিন কাটাচ্ছে, কিন্তু সত্য-মিথ্যার তারতম্য করতে পারে না; ৩. ব্যতিক্রমধর্মী এক শ্রেণীর লোক রয়েছে যারা দাসত্বকে না মেনে প্রতিবাদ করে আসছেন তারাই বিদ্রোহী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন, বিনিময়ে পাচ্ছেন জেল-জুলুম, লাঞ্ছনা-গঞ্জনা, এমনকি ফাঁসির দড়ি।           দাসত্ব গ্লানির ও অপমানজনক। অন্য দিকে ‘বিদ্রোহী’ জীবন অনেক কষ্টের তবে সম্মানজনক। যদিও আইন করে কৃতদাস প্রথা বা দাসপ্রথা বিলুপ্ত বা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে, কিন্তু আমাদের সমাজে কি দাসত্ব বন্ধ হয়েছে? বরং ‘মানসিক দাসত্বের’ পরিমাণ অনেকাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। খেয়ে পরে একটু স্বস্তিতে থাকার জন্য, কোথাও প্রমোশনের জন্য, কোথাও পদ-পদবি পাওয়ার জন্য মানুষ বিশেষ করে আমাদের সমাজে যারা বুদ্ধিজীবী হিসেবে পরিচিত তারা নির্লজ্জের মতো দাসত্ব করে যাচ্ছে। কলকাতামনস্ক কিছু বুদ্ধিজীবী আছেন যারা পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রকে নিজের দেশ মনে করেন, তাদের মানসিক দাসত্ব প্রকটভাবে দেখা দিচ্ছে, বিশেষ করে তাদের লেখনি ও বক্তব্যে।          

             পর্যটক যুবরাজ সেলিম :নাস্তিকবিদ্বেষীরা নাস্তিকতা নিয়ে যেসব অভিযোগ তোলেন তার কোনোটার সাথেই নাস্তিকতার কোনো যোগসূত্র নেই। তাদেরকে প্রায়ই এমন অভিযোগ তুলতে দেখা যায় যে, নাস্তিকতাই লাখ লাখ মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী কিংবা নাস্তিকতার কারণে গনহত্যা হয়! কি হাস্যকর অভিযোগ রে বাবা! এরকম গোমূর্খের মতো অভিযোগ যারা তোলেন তারা যে অত্যন্ত ভ্রমাত্মক এবং তাদের মাথাভর্তি যে মরুভূমির গরম বালু ছাড়া কিছু নেই তাতে আমার কোনো সন্দেহ নেই।

          পর্যটক আবুল ফজল ইবন মুবারক : নাস্তিকতা মানে কি? নাস্তিকতা মানে ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাসের অভাব বা অবিশ্বাস। ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাস করে না এমন একজন মানুষের করা খুন বা ধর্ষণের জন্য তার ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাস না করাকে বা নাস্তিকতাকে দায়ী করা ঠিক ততোটাই হাস্যকর ও অর্থহীন যতোটা হাস্যকর ও অর্থহীন মূলা খায় না এমন একজন মানুষের করা খুন বা ধর্ষণের জন্য তার মূলা না খাওয়াকে দায়ী করা।

          ফকির নাজিওদ্দিন :নাস্তিকবিদ্বেষীদের নাস্তিকতার বিরুদ্ধে এরকম অভিযোগ তোলার পেছনে উদ্দেশ্য কি? তারা মূলত বোঝাতে চান যে, নাস্তিকতা মানবসভ্যতার জন্য খুবই খারাপ বা ভুল এবং তা কঠোরভাবে দমন করা প্রয়োজন। তারা বোঝাতে চান, একজন নাস্তিক সমাজের জন্য অত্যন্ত ভয়াবহ, তাই সমাজে নাস্তিকদের কোনো জায়গা নেই। মূলত, কেউ নাস্তিক হলে তাকে যেন হত্যা করা হয় নয়তো, জেলে বন্দী করে রাখা হয়। নাস্তিকদের বিরুদ্ধে সেই জুলুম নির্যাতন উস্কে দিতেই নাস্তিকবিদ্বেষীদের নাস্তিকতার বিরুদ্ধে এই অর্থহীন অভিযোগ। আমরা যদি ধরেও নেই যে নাস্তিকবিদ্বেষীদের অভিযোগটি সঠিক, আমরা যদি ধরেও নেই যে নাস্তিকতাই স্ট্যালিনের করা গনহত্যার জন্য দায়ী, তাহলে কি এটা প্রমাণিত হয় যে নাস্তিকরা ভুল বা ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাস না করা ভুল? ‘নাস্তিকতা মানবসভ্যতার জন্য খারাপ’ এটি প্রমাণিত হলে কি ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়ে যাবে? আমরা যদি ধরেও নেই যে ইসলাম সমাজে শান্তি নিয়ে আসে আর নাস্তিকতা গনহত্যা, তাতে ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণিত হয় না।

          পর্যটক  শিশুনাগ :অঘোরী সাধু হওয়া মোটেই সহজ কাজ নয়। টানা ১২ বছর কঠোর সাধনার পর অঘোরী গুরুর আশীর্বাদে নিজের ধর্মীয় যাত্রা শুরু করেন অঘোরী সাধুরা। আর তখনই জন্ম হয় এক চরম সাধকের। যাঁদের বস্ত্র হয় মৃত ব্যক্তির জামা-কাপড়ের ছেঁড়া অংশ। শরীরে থাকে মৃত দেহের ছাই। এখানেই শেষ নয়, এমন সাধকদের সারা জীবন বেশ কিছু নিয়ম মেনে চলতে হয়, যেমন- প্রত্যেক অঘোরী সাধু কে একজন গুরুর অধীনে থাকতে হয়। গুরু যা বলেন, সেইভাবে জীবনযাপন করতে হয়। সংগ্রহ করতে হয় মৃতদেহের খুলি, যা তাঁদের সাধনার প্রধান উপকরণ।

          পর্যটক সম্রাট সমুদ্রগুপ্ত : এবার জেনে নেওয়া যাক অঘোরীদের সংস্কৃতি কেমন। মূলত নদীর ধারের কোনও নির্জন শশ্মানে অথবা গভীর জঙ্গলের মধ্যে এঁদের বাস। মৃত ব্যক্তির মাংস খান এঁরা। এঁদের বিশ্বাস, এমনটা করার মধ্যে দিয়ে তাঁরা ভক্তির প্রদর্শন করছেন। কারণ মৃত্যুর পর আত্মা শরীর ছেড়ে অন্য জগতে চলে যায়। তাই যে কোনও মৃত পশুর মাংস খাওয়া আর মানুষের মাংস খাওয়ার মধ্যে কোনও পার্থক্য় খুঁজে পান না অঘোরীরা। শুধু তাই নয়, মৃতদেহ যে কাঠে পোড়ানো সেই একই কাঠে তাঁরা রান্না করে খান। এমনও বিশ্বাস আছে যে অঘোরী সাধুরা মৃতদেহের উপর বসে খুলিকে সামনে রেখে সাধনা করেন। কিন্তু বাস্তবে এমন দৃশ্য কেউ দেখেছেন কিনা তা জানা নেই।

         পর্যটক প্রভাকর বর্ধন : এঁদের সম্পর্কে যা কিছু জানা গিয়েছে, তার বেশিরভাগই প্রাচীন পুঁথিপত্রে লেখা রয়েছে। সভ্য সমাজের থেকে হাজার মাইল দূরে জীবনযাপন করা এমন সাধকদের খোঁজ পাওয়ার সত্যিই খুব কঠিন।তবে এঁদের একেবারেই যে দেখা পাওয়া যায় না, তেমনি নয়। অনেকে বিশ্বাস করেন যে, এখনও আমাদের দেশের দুর্গম পাহাড়-জঙ্গলে বহু অঘোরী সাধু বসবাস করেন। আর শিবরাত্রির সময় তাঁদের মধ্যে অনেকে পশুপতিনাথ মন্দিরে পুজো দিতে আসেন। যদিও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তাঁরা লোকচক্ষুর আড়ালে থাকতেই বেশি পছন্দ করেন।

         পর্যটক সিমুক সাতবাহন :হিমালয়ের ঠান্ডা আবহাওয়া হোক বা গরম- তারা প্রতিটি ঋতুতে জামাকাপড় ছাড়া থাকেন। তাঁরা বিশ্বাস করেন যে, ঈশ্বরের কাছে পৌঁছানোর জন্য ছোটো জিনিসগুলি নিয়ে বিভ্রান্ত হওয়া উচিত নয়, যেমন পরিচ্ছন্ন থাকা এবং পোশাক পরিধান করা। অঘোরীরা বিশ্বাস করেন যে তাঁদের কাছে মানুষের সব রোগ নিরাময়ের ওষুধ আছে। তারা মৃতদেহ থেকে অসাধারণ তেল বের করে ঔষধ তৈরি করেন, যা খুব কার্যকর বলে মনে করা হয়। অঘোরী সাধুরা ঘৃণা থেকে দূরে থাকেন। কর্মের উপর ভিত্তি করে ভগবান শিবের প্রদত্ত সবকিছুই তাঁরা গ্রহণ করেন। তাঁদের মতে,পরিত্রাণের জন্য এটা প্রয়োজনীয়।

         পর্যটক যজ্ঞশ্রী সাতকর্নী : তাঁরা নিজের কাপড় ত্যাগ করলেও মৃতদেহগুলি জ্বলন্ত চিতার ছাই দিয়ে নিজের শরীর ঢেকে রাখেন। মানুষের হাড়কে গহনার মতো পরিধান করেন। বলা হয় যে অধিকাংশ অঘোরীদের তান্ত্রিক ক্ষমতা আছে। তাঁরা কালো জাদুও জানেন এবং তাঁরা যখন মন্ত্রকে উচ্চারণ করতে শুরু করেন তখন তাঁদের মধ্যে কিছু অলৌকিক ক্ষমতা আসে বলে মনে করা হয়। অঘোরীরা নারীদের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক করেন। কিন্তু তাদের ইচ্ছা না থাকলে স্পর্শ করেন না। তাঁরা শশ্মানের মৃতদেহের সঙ্গেও যৌন সম্পর্ক করেন । পর্যটক  শিশুনাগ :অঘোরী সাধু হওয়া মোটেই সহজ কাজ নয়। টানা ১২ বছর কঠোর সাধনার পর অঘোরী গুরুর আশীর্বাদে নিজের ধর্মীয় যাত্রা শুরু করেন অঘোরী সাধুরা। আর তখনই জন্ম হয় এক চরম সাধকের। যাঁদের বস্ত্র হয় মৃত ব্যক্তির জামা-কাপড়ের ছেঁড়া অংশ। শরীরে থাকে মৃত দেহের ছাই। এখানেই শেষ নয়, এমন সাধকদের সারা জীবন বেশ কিছু নিয়ম মেনে চলতে হয়, যেমন- প্রত্যেক অঘোরী সাধু কে একজন গুরুর অধীনে থাকতে হয়। গুরু যা বলেন, সেইভাবে জীবনযাপন করতে হয়। সংগ্রহ করতে হয় মৃতদেহের খুলি, যা তাঁদের সাধনার প্রধান উপকরণ।

      মোল্লা শেখ মোহাম্মদ শাহাদত : নাস্তিকবিদ্বেষীরা আসলেই বিশ্বাস করেন যে ঈশ্বরে বিশ্বাস না করা একজন মানুষকে খুন/ধর্ষণের দিকে নিয়ে যায়। শাঁকচুন্নিতে বিশ্বাস না করা আপনাকে কোনদিকে নিয়ে যায়? যারা শাঁকচুন্নিতে বিশ্বাস করেন না তাদের করা যেকোনো অপরাধের জন্য কি তাদের শাঁকচুন্নিতে বিশ্বাস না করা দায়ী? স্ট্যালিন একজন নাস্তিক হয়ে একটি খুনী শাসনব্যবস্থা পরিচালনা করেন। তাই দাবি করা হয়, নাস্তিকতা মানুষকে খুনী বানায়। স্ট্যালিন কেবল একজন নাস্তিক ছিলেন না, তিনি একজন পুরুষও ছিলেন। সেইসূত্রে আমরা কি দাবি করতে পারি যে, একজন পুরুষের ‘পুরুষত্ব’ কোটি কোটি মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী? বা, একজন পুরুষের পুরুষত্বই তাকে খুনী বানায়? বা, পুরুষ হওয়াটা একজন মানুষের ভুল? আমি যদি কোনো ইসলামী সন্ত্রাসের জন্য ইসলামকে দায়ী করি তাহলে আমাকে যারা বলবে, ‘তিনি সহিহ মুসলিম ছিলেন না, তার অপকর্মের দায় তার, ইসলামের নয়’, ঠিক তারাই বিশ্বাস করেন এবং প্রচার করেন যে, স্ট্যালিনের অপকর্ম সমূহের জন্য তার নাস্তিকতাই দায়ী!

          পর্যটক তানসেন :আমি একজন নাস্তিক আর আমার ন্যায়পরায়ণ হওয়ার জন্য ঈশ্বর বা কোনো ধর্মে বিশ্বাস করার কোনো প্রয়োজন নেই। নাস্তিকবিদ্বেষীদের সমস্যা, তারা এই বিষয়টা কোনোভাবেই বুঝে উঠতে পারে না যে ঈশ্বর বা ধর্মে বিশ্বাস না করে একজন মানুষ কিভাবে ন্যায়পরায়ণ হতে পারে। এই বিষয়টি বুঝার মতো মানসিক সামর্থ্য তাদের নেই। যারা নাস্তিকদের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, আমার মনে হয় না তাদের অধিকাংশই এবিষয়ে কখনো গভীরভাবে ভেবে দেখেছেন যে ঈশ্বরে বিশ্বাস না করে বা কোনো ধর্মে বিশ্বাস না করে কিভাবে একজন মানুষ ন্যায়পরায়ণ হতে পারে। অধিকাংশ ধর্মবিশ্বাসী আস্তিক মনে করেন, একজন মানুষ ধর্মের কারণে ভালো খারাপের পার্থক্য বুঝতে পারেন, ঈশ্বরের ভয়ে খারাপ কাজ থেকে দূরে থাকতে পারেন। সেইজন্য তারা মনে করেন, যারা ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাস করেন না বা কোনো ধর্মে বিশ্বাস করেন না তারা যেকোনো সময় যেকোনো মানুষকে খুন করতে পারেন, নিজের মা-বোনকেও ধর্ষণ করতে পারেন। তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী, তাদের ঈশ্বর-বিশ্বাস বা ধর্মবিশ্বাসই তাদেরকে যেকোনো সময় যেকোনো মানুষকে খুন করা বা নিজের মা-বোনকে ধর্ষণ করা থেকে বিরত রাখে। তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী, তাদের মধ্যে ঈশ্বর-বিশ্বাস বা ধর্মবিশ্বাস না থাকলে তারা হয়তো যেকোনো সময় যেকোনো মানুষকে খুন করতে পারেন, নিজের মা-বোনকেও ধর্ষণ করতে পারেন।

          পর্যটক অজিত বসু : বাঙালি জাতি সম্পর্কে নৃবিজ্ঞানীদের ধারণা, এটি একটি মিশ্রিত জাতি এবং এ অঞ্চলে বসবাসকারী আদিতম মানবগোষ্ঠীসমূহের মধ্যে অন্যতম। পৃথিবীর বহু জাতি বাংলায় অনুপ্রবেশ করেছে, অনেকে আবার বেরিয়েও গেছে, তবে পেছনে রেখে গেছে তাদের আগমনের অকাট্য প্রমাণ। বৃহত্তর বাঙালির রক্তে মিশ্রিত আছে বহু এবং বিচিত্র সব নরগোষ্ঠীর অস্তিত্ব। দীর্ঘকাল বিভিন্ন জন ও কোমে বিভক্ত হয়ে এ আদি মানুষেরা বঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় বসবাস করেছে, এবং একে অপরের সঙ্গে মিশ্রিত হয়েছে শতকের পর শতকব্যাপী। জাতিতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞানীদের মতে পৃথিবীর চারটি প্রধান নরগোষ্ঠীর প্রতিটির কোনো না কোনো শাখার আগমন ঘটেছে বাংলায়। নরগোষ্ঠীগুলি হলো নিগ্রীয়, মঙ্গোলীয়, ককেশীয় ও অষ্ট্রেলীয়। মনে করা হয় যে, বাংলার প্রাচীন জনগুলির মধ্যে অষ্ট্রিক ভাষীরাই সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশের সাঁওতাল, বাঁশফোড়, রাজবংশী প্রভৃতি আদি অষ্ট্রেলীয়দের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এই আদি জনগোষ্ঠীগুলি দ্বারা নির্মিত সমাজ ও সামাজিক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটে আর্যদের আগমনের পর। বাংলাদেশের জনপ্রবাহে মঙ্গোলীয় রক্তেরও পরিচয় পাওয়া যায়। বাঙালির রক্তে নতুন করে মিশ্রন ঘটল পারস্য-তুর্কিস্তানের শক জাতির আগমনের ফলে। বাঙালি রক্তে বিদেশি মিশ্রন প্রক্রিয়া ঐতিহাসিককালেও সুস্পষ্ট। ঐতিহাসিকযুগে আমরা দেখি ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এবং ভারতের বাহির থেকে আসা বিভিন্ন অভিযাত্রী নরগোষ্ঠী বাঙালি জাতি নির্মাণে অবদান রাখতে। গুপ্ত, সেন, বর্মণ, কম্বেজাখ্য, খড়গ, তুর্কি, আফগান, মুগল, পুর্তুগিজ, ইংরেজ, আর্মেনীয় প্রভৃতি বহিরাগত জাতি শাসন করেছে বঙ্গ অঞ্চল এবং রেখে গেছে তাদের রক্তের ধারা। এমনকি পাকিস্তান যুগেও আমরা দেখি রক্ত মিশ্রণে চলমান প্রক্রিয়া। বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে এ শংকরত্ব আরো বেগবান হচ্ছে। এক কথায় বাঙালি একটি শংকর জাতি।

          পর্যটক কংসারি হালদার : তবে আধুনিক শংকরতার পরিবেশ থাকলেও আদি জাতি স্বত্ত্বাই বাঙালির প্রকৃত পরিচয়। বৈদিক স্তবগান-স্ত্ততিতে বাংলা অঞ্চলের কোনো উল্লেখ নেই। বৈদিকদের সর্বপূর্ব জায়গা বিহার। ঐতরীয় ব্রাহ্মণে উল্লেখ আছে যে, পূর্ব আর্যবর্তের আরো পূর্বে থাকে দস্যুরা। দস্যুদের কথা অস্তিত্ব ঘোষণা দিয়ে ঐতরীয়তে উল্লেখ করা হয়েছে যে, পুন্দ্র জাতি এবং তাদের রাজধানী ’পুন্ড্রনগর’-এর কথা। বর্তমান মহাস্থান গড়ই সেই দস্যুদের রাজধানী। ঐতরীয় ব্রাহ্মণে না থাকলেও সমকালীন ঐতরীয় আরণ্যকএ বঙ্গ জাতির উল্লেখ প্রথম পাওয়া যায়। ঐতরীয় রায় দিয়েছে, দস্যুরা পথভ্রষ্ট পাপী কেননা তাঁরা কোনো সত্য গ্রন্থের অনুসারী নয়। রামায়ণ ও মহাভারতে দেখা যায় যে, বঙ্গজরা পাপীতো নয়ই, বরং মিত্রতা প্রতিষ্ঠা করার মতো অতি সম্ভাবনাময় জাতি। রামায়ণে এক তালিকায় রয়েছে কোনো কোনো বঙ্গজ জাতির সঙ্গে আর্যদের মিত্রতা স্থাপিত হয়েছে। মহাভারতে ভীব কর্তৃক পুন্ডবর্ধন ও অন্যান্য কয়েকটি বঙ্গজ জাতিকে বশীভূত করার উল্লেখ আছে। বনপার্বণ গ্রন্থের তীর্থযাত্রা পর্বে পুন্ডনগরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হওয়া গঙ্গার একাংশ করতোয়া নদীকে পবিত্র ঘোষণা করা হয়েছে। এমনিভাবে ধীরে ধীরে বঙ্গজ জাতিগুলি মহাভারতের যুগে এসে আর্যাবর্তের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে মর্যাদার সহিত সম্পৃক্ত হলো।

          পর্যটক ইলা মিত্র :ঐতিহাসিকযুগে এসে প্রথম বঙ্গজ জাতিসমূহের উল্লেখ পাওয়া যায় দিগ্বিজয়ী আলেকজান্ডারের সঙ্গে ভারত বিজয় অভিযানে আসা গ্রিক ঐতিহাসিকদের লেখায়। তাদের লেখায় উল্লেখ করা হয় যে, পূর্ব ভারতে শক্তিশালী রাজ্যের কথা। গ্রিক এবং অন্যান্য বিদেশি ভ্রমণকাহিনীতে উল্লেখ করা হয়েছে পূর্ব ভারতের বিভিন্ন শক্তিশালী রাষ্ট্রের কথা। যেমন, গৌড়, বঙ্গ, হরিকেল, চন্দ্রদ্বীপ, বাঙ্গালাবাদ, পুন্ড, বারেন্দ্রী, দক্ষিণারাড়, উত্তরা রাধামন্ডল, তাম্রলিপ্তি, পুন্ডবর্ধন-ভুক্তি, সুবর্ণবীথি, বর্ধমানভুক্তি, কঙ্কগ্রাম ভুক্তি, মেঘনা নদীর অববাহিকার কয়েকটি রাজ্য। এসব রাজ্য ও ভুক্তি বৃহৎ বঙ্গের রাজনৈতিক বিকাশধারা, এমনকি বৈদেশিক বাণিজ্যে বাংলার ব্যাপক অংশগ্রহণ নির্দেশ করে। চৈনিক পরিব্রাজকদের দৃষ্টিতে পুন্ড্র রাজ্যের সামুদ্রিক বন্দর তাম্রলিপ্তি ছিল একটি আন্তর্জাতিক সামদ্রিক বন্দর। অর্থাৎ আর্য সভ্যতার পাশাপাশি এবং আর্যদের আগমনের আগেই এই বঙ্গভূমিতে গড়ে উঠেছিল নানা ছোটবড় রাজ্য। মহাভারতের বীরকর্ণ, কৃষ্ণ এবং ভীমসেনা বঙ্গরাজ্যগুলি জয় করে বীরত্ব প্রদর্শন করেছিলেন। অর্থাৎ সমকালীন যুগে রাজ্যগুলির বিকাশ ও খ্যাতি ছিল এমনই যে, এগুলিকে জয় করার জন্য আর্যবর্ত থেকে এসেছিলেন ঐশ্বরিক শক্তিধর বীরেরা।

          পর্যটক ভূপাল পাণ্ডা :বাঙালি জাতি পরিচয়ের ঐতিহাসিক যুগ শুরু হয় গুপ্তযুগ (৩২০ খ্রি.- ৬৫০ খ্রি.) থেকে এবং এ যুগেই প্রথম ক্ষুদ্র রাজ্যপুঞ্জগুলিকে নিয়ে গঠিত হয় বিশাল রাজ্য। যেমন গুপ্তদের সাম্রাজ্যিক ছত্রছায়ায় প্রতিষ্ঠিত হয় ক্ষুদ্র রাজ্যের বদলে বৃহৎ রাজ্য যেমন পূর্ব ভারতের দক্ষিণাঞ্চলের বঙ্গরাজ্য ও উত্তরাঞ্চলের গৌড় রাজ্য। বৃহৎ বঙ্গের প্রথম এবং ঐতিহাসিকভাবে সুনির্দিষ্ট এবং শক্তিশালী শাসক।  শশাঙ্ক (খ্রিস্টপূর্ব আনু ৬০০ খ্রি.-৬২৫ খ্রি.) তাঁর দক্ষ শাসনের মাধ্যমে বাংলা ও বাঙালিকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেন। তখন থেকেই বাঙালি জাতিসত্ত্বার যাত্রা শুরু এবং পাল ও সেন আমলে এসে সে সত্ত্বা আরো বিকশিত হয়ে বাঙালি জাতির শক্তিশালী ভিত্তি স্থাপন করে।

          পর্যটক আজম খান : ঠিক কি নাস্তিকদেরকে যেকোনো সময় যেকোনো মানুষকে খুন করা থেকে বিরত রাখে? ঠিক কি নাস্তিকদেরকে ধর্ষণ করা থেকে বিরত রাখে? আমি একজন নাস্তিক এবং আমি মানুষকে খুন করা থেকে বিরত থাকি, আমি মানুষকে ধর্ষণ করা থেকে বিরত থাকি। কারণ আমি তা করতে চাই না। ধর্মবিশ্বাসী আস্তিকরা মনে করেন, যদি আকাশ থেকে কোনো ঈশ্বর তাদের ওপর নজর না রাখেন তাহলে তারা যতখুশি খুন যতখুশি ধর্ষণ করতে পারেন, যা আমি করতে চাই না। আমার কোনো ইচ্ছা নেই কারো শ্বাসরোধ করার, আমার কোনো ইচ্ছা নেই কাউকে যন্ত্রণা দেয়ার। আমি শান্তিপূর্ণভাবে এবং নির্ভয়ে বেঁচে থাকতে চাই। আমার লক্ষ্য, আমার প্রতিবেশীদের সহযোগী হিসেবে গ্রহণ করা ও তাদের সহযোগী হওয়া আর এমন একটি সমাজ প্রতিষ্ঠার চ